শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০১৬

যতবার আলো জ্বালাতে চাই

"...যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিবে যায় বারে বারে।
আমার জীবনে তোমার আসন গভীর অন্ধকারে।..."
এই গানটি প্রথম শুনেছিলাম পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কণ্ঠে আকাশবানি কোলকাতা কেন্দ্র থেকে।ঐ সময়ে পুরানো গ্রামোফোন রেকর্ডে হয়তো গানটি বাজিয়েছিলো। তারপর শুনেছি দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে। মেয়েদের মধ্যে সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠেও গানটি শুনেছি। আমাদের কলিম শরাফীও দরদ দিয়ে  গানটি গাইতেন
কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক। সেই কা্ঁপা কা্ঁপা তরুণ বয়সে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কণ্ঠে এই গামটি রেডিওর কাছে কান রেখে- কান পেতে শুনেছিলাম।
আমি আজো পঙ্কজের সেই গান সেই সুর শুনতে পাই।

",,উৎসবে তার আসে নাই কেহ,বাজে নাই বাঁশি, সাজে নাই গেহ--
   কাঁদিয়া তোমায় এনেছে ডাকিয়া ভাঙা মন্দির-দ্বারে।.."



বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৬

সুরাইয়া খানম

সুরাইয়া খানম সময়ের প্রতিভাবান এক গুণী সাহসী মেয়ে । ১৯৭৫ সনে প্রথম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন সারা ক্যামপাস জুড়ে সুরাইয়া খানমের নামটি শোনা যেতো। তিনি অসম্ভব রকমের সুন্দরী ও অসাধারন ব্যক্তিত্বের অধিকারিনী ছিলেন । সেই সময়ে তিনি ইংরেজী বিভাগের চৌকষ অ্ধ্যাপক ছিলেন।সুরাইয়া খানম' ভালো কবিতাও লিখতেন।তা্ঁর 'নাচের শব্দ' কাব্যগ্রন্থটি বহু প্রসংশিত হয়েছিলো ।
প্রয়াত রোম্যান্টিক কবি আবুল হাসানের সাথে কি তাঁর কি কোন প্রেম ছিল ? নাকি বন্ধুত্ব এইটি এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।তা্ঁর অনেক কবিতাই তা্ঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিলো।
কি অভিমানে সুরাইয়া খানম আশির দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে প্রবাস জীবনে চলে যায় । একি তা্ঁর স্বেচ্ছা নির্বাসন ছিলো? সুদূর আমেরিকার আরিজনা'র মরুময় এক শহরে বিয়ে করে সংসারও পেতেছিলেন। স্বামী সৈয়দ সালাউদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালেই মারা যান । তাঁদের একমাত্র মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে সেদেশেই বসবাস করছে। সুরাইয়া খানম শেষের দিনগুলিতে সম্পূর্ণ একা ছিলেন। কিন্ত সে নিঃসঙ্গ একাকী সময়ও একসময় ফুরিয়ে যায়। ২০০৬ সালের ২৫ মে'র কোনো এক প্রভাতে সুরাইয়া খানম চিরকালের জন্য না ফেরার দেশে চলে যান।

সেভক পাহাড়ে

গ্রামে আমি যখন ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের স্কুলে তিন জন অধীর ছিলো।একজন অধীর হালদার, আরেকজন অধীর কুন্ডু অন্যজন অধীর ঘোষ।তিন জনের সাথেই আমার সখ্যতা ছিলো।দারিদ্র আর অভাবের কারনে ওরা লেখাা পড়ায় বেশী দূর এগুতে পারে নাই।ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েই ঝরে যায়। একটা সময় পর্যন্ত ওদের সাথে যোগাযোগ ছিলো, দেখা হতো, কথাও হতো।তারপর কালের পরিক্রমায় আমিই দূরে চলে আসি।আমার দীর্ঘ নানা জীবনে ওদেরকে আমি একেবারে ভুলে গেছি তা নয়।কর্মহীন কোনো কোনো অবসরে ওদেরকে মনে করেছি।
তারপর চলে গেছে আরো অনেক বছর। সময়ের ব্যবধানে তিন অধীরই চলে গেছে ভারতে।অধীর হালদার বালুঘাটে,অধীর ঘোষ রায়গজ্ঞ আর অধীর কুন্ডু চলে যায় শিলিগুরি।
২০০৯ সালে আমি আর আমার স্ত্রী জলপাইগুরির ডুয়ার্সে বেড়াতে যাই। বাড়ী থেকে শুধু এইটুকু জেনে যাই,অধীর কুন্ডু শিলিগুরিতে কোথাও ফল বিক্রি করে।।আমি আর আমার স্ত্রী শিলিগুরিতে তিন দিন ছিলাম।থাকতাম সেন্ট্রাল প্লাজা হোটেলে। আমরা রিক্সায় ছোটো শহর শিলিগুরি ঘুরেছি। বাস টার্মিনাল,বাজার, রেল স্টেশন সব ফলের দোকানে অধীরকে খু্ঁজেছি পাই নাই।
শেষ দিনের বিকালে আমরা বেড়াতে যাই সেভক পাহাড়ে।  সেভক ব্রীজে দাড়িয়ে আমরা নদীর কালো জল দেখেছি।দূরের পাহাড় দেখেছি।নিসর্গের অপরূপ রূপের মাঝে অবগাহন করেছি।সন্ধ্যা তখনো হয় নাই। ব্রিজের কাছেই পাহাড়ের একটু উপরে কালী মন্দির।আমরা মন্দির দেখে পাশেই সেভক বাজারে আসি।একটি রেস্টুরেন্টে বসে দুজন কিছু খেয়ে নেই। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপর চলে আসি। রেস্টুরেন্টের পাশেই একটি ফলের দোকনে অধীরকে দেখতে পাই। চিনতে অসুবিধা হচ্ছিলো।মাথার চুল পেকে গেছে।আমি অধীরের পিঠে হাত রাখি। ও চমকে ওঠে। মুখ ফিরে আমাকে দেখে। এবং চিনতে পায়।অধীর আামাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেয়।
রা্স্তার উপর দাড়িয়েই অধীরের সাথে অনেক কথা হয়। ও বলে-ভাবীকে সঙ্গে এনেছিস,আমার বাড়ীতে যাবিনা ? অামি বললাম: 'এবার না।কাল সকালে চলে যাব। আবার যখন আসিব,তখন যাইবো।' এই কথা বলিয়া ট্যাক্সি তে উঠিলাম।দেখলাম-অধীরের চোখে জল। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়া উঠিয়াছে। পাশের মন্দিরে শঙ্খধ্বনি বাজিতেছে। উচু নীচু পাহাড় আর টিলা পেড়িয়ে আমাদের ট্যাক্সি শিলিগুরির দিকে দ্রুতবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে।



বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০১৬

দিয়া বাড়ী

মন খারাপ থাকলে কিংবা মন ভালো থাকলে দুটো কারনেই মাঝে মাঝে আমরা দুজন দিয়া বাড়ী বেড়াতে যাই। বাসা থেকে দিয়া বাড়ী দেড় কিলোমিটার দূরে। এক বিকালে রিক্সায় চড়ে প্রসস্ত রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে  দিয়া বাড়ী যাই। কাশবনের পাশ দিয়ে রিক্সা চলতে থাকে। রিক্সায় চলতে চলতে চলে যাই লেকের পাড়ে ব্রিজের উপরে। দশ টাকা দিয়ে বাদাম কিনি। বাদাম খেয়ে খোসাগুলো ফেলে দেই লেকের পানিতে।দূরে বেরী বা্ঁধের উপর দিয়ে চলে যায় মিরপুরের সব বাস।বা্ঁধের ওপারে ধূধূ বিল।ছোনের ছাউনির নীচে খোলা চা'র দোকানের মাচায় বসে গরম চা'র কাপে দেই চুমু-ক। হাাপি পছন্দ করে আবার ফুসকা আর বেল পুরী। আস্তে আস্তে সূর্য ডুবে যায়। তখন  দিয়া বাড়ী হয়ে ওঠে অপূর্ব এক আলো ছায়ার বাড়ী। বক আর শালিকেরা  উড়ে চলে যায়। ছোটো ছোটো মুনিয়া পাখীদের কিচির মিচির বাড়তে থাকে। হ্যাপির মাথার কালো চুলের মতো সন্ধ্যা নেমে আসে। কোথাও নিয়ন বাতি জ্বলে ওঠেনা। অদ্ভূত মায়াময় আধারে ঢেকে যায় সমগ্র দিয়া বাড়ী। ঘরে ফিরে আসতে মন চায়না তখন। আমাদের মন দুলেে ওঠে। মায়াবী পর্দা উন্মোচিত হতে চায়।মনে হয় অনন্ত আাকাশের নীচেই থেকে যাই। মনে হয় কাশবনের পাশে শুয়ে থাকি দুর্বা ঘাসের উপর অন্ন্ত রাত। সারারাত জোনাকিরা আলো ঝরাতে থাকুক !

সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

রামপাল !! সুন্দরবন !

রামপাল ! রামপাল !! সুন্দরবন ! সুন্দরবন !! বা্ঁচাও! বা্ঁচাও!! এ কথা গুলো শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হইয়া গিয়াছে।একদল বলিতেছে সুন্দরবন রক্ষা করিতে হইবে। বিদ্যুৎ চাইনা। আরেকদল বলিতেছে, আমরা বিদ্যুৎ চাই।
আমার কথা হইলো, সুন্দরবনও চাই।বিদ্যুৎও চাই।যারা বিদ্যুৎ চায়না,তাহারা ঢাকা শহরে এসি রুমে চিত্ত সুখে ঘুমিয়া থাকে। কিছু পরিবেশপ্রেমী ইন্টারনেটে নানা উদ্ভট তথ্য দিয়া ভরিয়া তুলিতেছে।। যে যেমন পারে সত্য মিথ্যা কল্পকাহিনী রচিতেছে। কোনটি বিশ্বাস করিব ? সুন্দরবন থেকে রামপাল কতোদূর ? বিদ্যুৎ কেন্দ্র হইলে বাঘ কি আদৌ পালিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে আত্মাহুতি দেবে? সব হরিণ কি লাফিয়া লাফিয়া ভারত অংশে চলিয়া যাইবে? আনুু মুহাম্মদ দের বলছি- ভালো মন্দ সবকিছু জনগণকে বোঝান।পয়োজনে ভিডিও করিয়া আনিয়া হাটে বাজারে প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাবলিকগো দেখান। প্রকল্পটি কোথায় করিলে ভাল হয়.সাজেস্ট করেন। নিজের খেয়ে বনের মহিষ যখন তাড়াচ্ছেনই ,তখন ভাত আরো একটু বেশী খেয়ে মহিষ ভালো করেই তাড়ান। দশ পনেরো জন মানুষ লইয়া রাস্তায় গ্যাদারিং করিলে পুলিশের পিটুনি কেবল খাইবেন। আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করেন। লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটান।পুলিশের বাপেরও সাধ্যি হইবে না পাবলিকের গায়ে হাত তুলিতে। আন্দোলন নিশ্চয় সফল হইবে।

হলে সিট পাওয়ার কাহিনী

১৯৭৬ সালের প্রথম দিকের কথা।তখনো সেকেন্ড ইয়ারে উঠি নাই। মিরপুরে বোনের বাসা থেকে ক্লাস করতাম। বন্ধুবর মোশারফকে একদিন বললাম, আমার হলে একটি সিট দরকার।। মোশারফ ছাত্র ইউনিয়ন করতো এবং সূর্যসেন হলে থাকতো। মোশারফ আমাকে জসীম উদ্দীন হলে সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।সাজ্জাদও আমাদের বন্ধু। বাংলা বিভাগ পরিবর্তন করে আইন বিভাগে চলে গিয়েছিলো।বাড়ী নোয়াখালীর হাতিয়ায়। খুবই বন্ধু বৎসল ছেলে। সাজ্জাদও ছাত্র ইউনিয়ন করতো। আমি সাজ্জাদকে বললাম,মোশারফ পাঠিয়েছে, হলে আমার সিট দরকার। সাজ্জাদ বললো, সিট পাবি কিন্তু তোকে ছাত্র ইউনিয়ন করতে হবে।আমার চোদ্দ গোস্ঠী করে আওয়ামী লীগ আর আমাকে কিনা হতে হবে কমিউনিস্ট। তারপরেও প্রস্তাবে রাজি হলাম।কারণ হলে আমার সিট দরকার। তখন সকাল এগারোটা বাজে।সাজ্জাদ বিছানায় শুয়ে শুয়েই কথা বলছিলো।ও তখনো নাস্তা করে নাই। পকেট হতে দুই টাকা বের করে দিয়ে ও আমাকে ফরমাস করলো, দুটো কলা আর একটি পাউরুটি কিনে এনে দিতে।আমি তালুকদার বংশের ছেলে। ওর এই ফরমাস শুনে খুবই সম্ভ্রমে লাগলো।কি আর করবো,আমার যে হলে সিট দরকার। সাজ্জাদের কাছ থেকে দুই টাকা নিয়ে কলা আর পাউরুটি কিনতে যাই।সূর্য সেন হলের কাফেটেরিয়ার পাশে একটি টং দোকান ছিলো। দোকানদারকে বললাম, মামু,আমাকে দুটো পচা কলা আর একটা বাসি পাউরুটি দাও। দোকানদার তাই করলো। সাজ্জাদকে কলা আর পাউরুটি এনে দিলাম।সাজ্জাদ হেসে বললো,এগুলো কি এনেছিস রে? বললাম, দোকানে এইগুলিই ছিল। সাজ্জাদ এতোই ভালো ছেলে ছিলো যে, আমাকে  ঠিকই হলে সিটের ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী

১৯৭৬ সাল। তখন জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন চলছে। সব জায়গায় রাজনীতি নিষিদ্ধ।বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে আনা যেতো না। সেই পাথর সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের কবি জসীম উদ্দীন হল শাখার সভাপতি। ১৪ই আগস্ট রাত ১১টার দিকে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা নিতাই দা,  এবং এফ, রহমান হলের কাবুল ও খায়রল আমার রুমে এসে উপস্থিত হয়। নিতাই দা'র হাতে ছিলো একটি বড়ো আর্ট পেপার । নিতাই দা'ই মোড়ানো আর্ট পেপারটি খুলে দেখিয়েছিলো । তাতে বড়ো করে বঙ্গবন্ধুর স্কেচ করা ছবি আকা্ঁ ছিলো। ছবির নীচে লেখা : "বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।"-----বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। আর্ট পেপারে লেখা এই পোস্টার তখন প্রতিটি হলেই বিতরণ করা হয়েছিলো। পরের দিন ১৫ই আগস্টের প্রত্যুসে সূর্য ওঠার আগেই আমি সেই পোস্টারটি নীচে হল গেটের সামনে লাগিয়ে দিয়েছিলাম।  এ ভাবেই ছাত্র ইউনিয়ন  বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করেছিলো।