সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

কতো মোহ কতো মায়া


কতো মোহ কতো মায়া  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - জুন  ২০২৬ ইং

উৎসর্গ   -


১.      কতো  মোহ কতো  মায়া


কতো যে মোহ, কতো যে মায়া,
এই যমুনা তীরে, আমার কুসুমপুরে
কত যে ভালোলাগা জমে থাকে নিঃশব্দে।

ধানক্ষেতে সবুজ পাতার দোলা,
হাওয়ায় হেলে পড়ে,
মনে হয় কেউ যেন আদর করে ছুঁয়ে গেল।

ভোর হলে
কুয়াশা নেমে আসে নিঃশব্দে,
গাভীর গলায় ঘণ্টা বাজে ধীরে, খুব ধীরে,
আলপথ ভিজে থাকে শিশিরে।

সূর্যের প্রথম আলো
খেজুর পাতায় এসে থামে,
তারপর ছড়িয়ে পড়ে মাঠজুড়ে -
একটা অদ্ভুত, হলুদ স্বপ্নের মতো।

নদীর জলে ভাসে নৌকা,
মাঝির গলায় ভাটিয়ালি
সুরটা ভেসে যায় দূরে,
তবুও থেকে যায় মনে, অনেকটা সময়।

দুপুর মানে
তালগাছের ছায়া লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা,
উঠোন ভরে কাঁঠালের গন্ধ,
আর এক ফাঁকে কারও নিঃশব্দ হাসি।

পুকুর ঘাটে কলস হাতে কিশোরী,
জলে মুখ দেখে হয়তো নিজের,
হয়তো কারও অপেক্ষা।

তারপর সন্ধ্যা নামে ধীরে, খুব ধীরে,
চুলোর ধোঁয়া উড়ে যায় আকাশে,
ঘরের ভেতর আলো জ্বলে -
একটা শান্তির মতো।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে চারদিক ভরে ওঠে,
তারারাও জেগে থাকে
এই ছোট্ট গ্রামটার মতোই।

এই কুসুমপুর, এই মায়া, এই টান -
এখানেই লুকিয়ে আছে আমার পুরো পৃথিবী। 


২.     মানুষ নাকি ভালোবাসা


ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে না 
হওয়াটাই বোধহয় ঠিক
কারণ সংসার শুরু হলে
অনেক অনুভূতি শুকিয়ে যায়।

একদিন যে চোখে ছিল বিস্ময়,
সেই চোখেই জমে ওঠে অভিমান,
একই ছাদের নিচে থেকেও
দূরত্ব হয়ে ওঠে অজানা মহাকাশ।

হয়তো মানুষটা পাশে থাকে
হাতের নাগালে, নিঃশ্বাসের ভেতর,
তবুও ভালোবাসা
চুপচাপ সরে যায় অন্ধকারের দিকে।

আর যদি বিয়ে না হয় -
তবে উল্টো এক গল্প বোনা হয়,
মানুষটা হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে,
কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায়
একটি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে।

স্মৃতির ভেতর সে হাসে,
অপূরণীয়তায় পায় পূর্ণতা,
ছোঁয়া না পাওয়া ভালোবাসা
অদ্ভুতভাবে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী হয়।

তাই কখনও মনে হয়
মানুষ আর ভালোবাসার এই দ্বন্দ্বে,
ভালোবাসাই বেশি প্রিয়,
কারণ মানুষ ক্ষয়ে যায়,
ভালোবাসা রয়ে যায়।


৩.     বন ও নদী


হাঁটছিলাম বনপথে,পথ হারিয়ে পেলাম 
একটি নদী, নদীতে কোনো নৌকা নেই,
স্নান করার ঘাটও নেই
পানকৌড়ি উড়ছে, বক মাছ খুঁজছে,
মাছরাঙাও আছে।

ঠিক তখনই, ছোট্ট বনপথ বেয়ে
একটি মেয়ে এল একাকী হেঁটে,
তার পায়ের শব্দ ছিল শব্দহীন
যেন মাটিকেও জাগাতে চায় না।

চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো, চোখে নীরবতা,
মনে হলো, সে যেন এই বনেরই কোনো 
গোপন গল্প,
যাকে কেউ কোনোদিন পুরো শোনেনি।

নদীর কূলে এসে সে থামল,
দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল জলের দিকে -
যেন নিজের ভেতরের কথাগুলো
জলের কাছে জমা রাখছে।

তার ওড়নার কোণে আটকে ছিল কিছু 
শুকনো পাতা, হয়তো পথের ক্লান্তি,
হয়তো কিছু না বলা স্মৃতি -
আমি দূর থেকে দেখছিলাম,
কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস হলো না।

একসময় সে হাঁটু গেড়ে বসল,
আঙুল ডুবালো জলে, জল কেঁপে উঠল 
যেন নদীও তাকে চিনে ফেলেছে।

পানকৌড়ি থেমে গেল উড়তে, বক তাকিয়ে 
রইল স্থির হয়ে,
মাছরাঙা যেন ভুলে গেল শিকার -
সেই মুহূর্তে সবকিছুই শুধু তাকে দেখছিল।

সন্ধ্যার আলো নামতে নামতে
সে উঠে দাঁড়াল ধীরে,
একবারও পেছনে তাকাল না -
যে পথ দিয়ে এসেছিল,
সেই পথেই মিলিয়ে গেল।

আমি তখনো বসে, নদী আর সেই মেয়ের 
মাঝখানে এক অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে ভাবছিলাম -
সব নদী যেমন নীরব নয় 
সব মানুষও তেমন একা নয়।

তবু কিছু মানুষ নিজের ভেতরেই বহন করে
একটি নির্জন নদী, আর একা হেঁটে আসে
তারই কূলে।


৪.      মমতার শরীর


রাস্তাঘাটের ভিড়ে যখন চোখ হোঁচট খায়
কোনো অচেনা নারীর শরীরে
তখন হঠাৎ একটা স্মৃতি এসে হাত রাখে কাঁধে
মা মনে হয় ডাকছে , আমি থেমে যাই।

মনে পড়ে একদিন আমিও একটি উষ্ণ বুকে 
মাথা রেখে ক্ষুধা মিটিয়েছিলাম,
একটি শুকনো ঠোঁটের প্রার্থনায়
জীবন পেয়েছিলাম।

সেই বুক কেবল শরীর ছিল না,
ছিল আশ্রয়, ছিল জান্নাতের দরজা,
ছিল পৃথিবীর প্রথম আলো।

তাই আজ কোনো শরীর দেখি না আর
দেখি ত্যাগের নদী,
দেখি রাত জেগে থাকা ক্লান্ত চোখ,
দেখি নিঃশব্দ যুদ্ধের ইতিহাস।

নারী মানে একটি আঁচলের ছায়া,
একটি ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে
শেষ দুধের ফোঁটা তুলে দেওয়ার
অলিখিত কবিতা।

তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে লুকানো থাকে
অসংখ্য অশ্রু, অসংখ্য অনাহার,
অসংখ্য নিঃশব্দ জয়।

তাই আজ শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়
কামনায় নয়, মমতায় ভিজে যায় দৃষ্টি।

আমি প্রার্থনা করি পৃথিবীর প্রতিটি মা যেন
একটু আলো পায়, একটু ভাত,
একটু নিশ্চিন্ত ঘুম।
কোনো বুক যেন খালি না থাকে আর,
কোনো শিশু যেন চোখের জল নয়—
দুধের স্বাদে বড় হয়।

আর আমরা মানুষ হতে শিখি আবার,
মায়ের মমতায় ভেজা একটি পৃথিবীর ভিতরে
যেখানে শ্রদ্ধাই ভালোবাসার সবচেয়ে 
পবিত্র নাম।


৫.     সে নেই, তবুও আসে


আমি কোনো একজনকে ভালোবাসতাম,
সে নেই, তবুও তাকে মনে রেখেছি,
সে আসে ফিরে ফিরে অপার্থিবের মতো
তাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি না
শুধু প্রাণ ভরে দেখি, প্রাণের মতো।

সে নেই তবুও আমার প্রতিটি সন্ধ্যার ভেতর
তার পায়ের শব্দ শুনি,
জানালার পাশে একা বসলে মনে হয়, 
দূরের কোনো নক্ষত্র
তার নাম ধরে আমাকে ডাকে।

কখনও ঘুম ভাঙা ভোরে
তার মুখ ভেসে ওঠে শিশিরের ভিতরে,
আমি হাত বাড়াই - জল কেঁপে ওঠে শুধু,
মানুষটি আর ধরা দেয় না।

তার জন্য রেখে দিয়েছি আমার কিছু বিষণ্ণতা ,
কিছু অপ্রকাশিত কবিতা,
আর বুকের খুব গোপন এক কষ্ট
যা কাউকে কখনও বলিনি।

রাত গভীর হলে
চাঁদের আলো এসে বসে আমার বিছানায়,
আমি ভাবি -
এই আলো কি তারই পাঠানো?
এই নিঃশব্দতা কি তারই ভাষা?

সে নেই তবুও পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর জিনিসে
আমি তার ছায়া খুঁজি - বৃষ্টির গন্ধে, নদীর জলে,
অথবা নির্জন পথের ধুলোয়।

হয়তো মানুষ হারিয়ে যায়,
কিন্তু ভালোবাসা কোথাও যায় না -
সে রয়ে যায় একটি দীর্ঘশ্বাস হয়ে,
একটি মায়াবী আলো হয়ে, অথবা গভীর রাতে
হৃদয়ের খুব কাছে জেগে থাকা
একটি নাম হয়ে।


৬.      নদী হয়ে যাই 


মাঝে মাঝে আমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য 
কাঙাল হয়ে যাই,
সে এক তৃষ্ণা!  তোমাকে ছুঁইলেই নদী হয়ে যায়,
অন্তরধারায় বয়ে যায় প্রবল স্রোত।

তোমার আঙুলের সামান্য স্পর্শে
আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা জেগে ওঠে জোৎস্নার মতো,
দূর আকাশের নক্ষত্রেরা নেমে আসে
চোখের গভীরে।

আমি তখন আর মানুষ থাকি না,
একটি ভেজা বনপথ হয়ে যাই -
যেখানে তোমার পদচিহ্ন পড়ে
আর জন্ম নেয় অচেনা ফুলের গন্ধ।

তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
যেভাবে সন্ধ্যা ছুঁয়ে দেখে নদীর জল,
যেভাবে বাতাস এসে নীরবে কাঁপিয়ে দেয় 
শিউলি গাছের শাখা প্রশাখা।

তুমি কাছে এলে
আমার সমস্ত রক্তে নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টি,
ভেতরের সমস্ত শুষ্কতা ভিজে ওঠে 
আমি তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না -
ধীরে ধীরে নদী হয়ে যাই।


৭.     যমুনার কাছে


ওর খুব সখ ছিল
সবচেয়ে সুন্দর নদীটি একদিন দেখবে-
আমি বলেছিলাম,
চলো তবে নদীর দেশে যাই,
বাংলাদেশের বুকজুড়ে যে জলরেখারা
স্বপ্নের মতো বয়ে গেছে,
তাদের একে একে ছুঁয়ে দেখি।

প্রথমে নিয়ে গেলাম পদ্মা নদীর কাছে।
পদ্মা তখন বিকেলের আলোয়
অলস চুল ছড়িয়ে বসে আছে,
দূরে জেলেদের নৌকা,
চরে কাশফুল,
আর আকাশজোড়া বিষণ্ন রোদ।
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল -
'এ যেন কোনো রাণীর নদী!'

তারপর গেলাম মেঘনা নদীর পাড়ে।
মেঘনার ঢেউয়ে তখন
কুয়াশার ভিতর ভেসে যাচ্ছিল সন্ধ্যা।
ও দু’চোখ ভরে দেখল, মুগ্ধ হলো -
তবু মুখে কিছু বলল না।

আমি ওকে নিয়ে গেলাম কর্ণফুলী নদীর কাছে,
যেখানে পাহাড় এসে
জলের কানে কানে কথা বলে।
ও নদীর বুকে হাত রেখে বলল -
এ নদী খুব মায়াবী।

তারপর তিস্তা নদী, সাঙ্গু নদী,
আর কত নদী,  সব দেখল ও,
সব নদীর কাছেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল
মুগ্ধ পাখির মতো।

একদিন শেষ বিকেলে যখন আমি ওকে 
নিয়ে এলাম যমুনা নদীর তীরে,
তখন আকাশে ধীরে ধীরে নামছিল অন্ধকার,
দূরে চর, বাতাসে কাশফুলের গন্ধ,
আর নদীজুড়ে এক অদ্ভুত গভীরতা।

ও অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল,
মনে হলো, নদী আর মেয়েটি
নিজেদের মধ্যে কোনো গোপন কথা বলছে -
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
এই নদীটাও কি সুন্দর? 
ও শান্ত হেসে বলল - “সুন্দর তো সব নদীই,
কিন্তু যমুনার ভিতরে একা একা কাঁদে
আমার নিজের হৃদয়।”

তারপর থেকে আমি যখনই ওকে মনে করি,
দেখি - একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে যমুনার পাড়ে,
চুলে বাতাস লেগেছে,
আর পৃথিবীর সমস্ত নদী এসে
নীরবে মিশে যাচ্ছে তার চোখের ভিতর।


৮.    শেষ উপহার


আমি চলে যাচ্ছি, যেখানে যাচ্ছি
সেখানে থেকে আর ফেরা হবে না -
পৃথিবীর সমস্ত পথ একদিন শেষ হয়ে যায়
অন্ধকার কোনো নক্ষত্রের কাছে।

তবু যাওয়ার আগে
আমি তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি
আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস—
সে আমার প্রেম।

একে যত্নে রেখো,
পুরোনো চিঠির ভিতর শুকিয়ে থাকা ফুলের মতো,
বা বহুদিন না বাজানো
একটি বেহালার নিঃসঙ্গ সুরের মতো।

যখন গভীর রাতে হঠাৎ জানালায় বৃষ্টি নামবে,
তুমি হয়তো অনুভব করবে -
কেউ একজন খুব নিঃশব্দে তোমার নাম 
ধরে ডাকছে, সে আমি নই,
আমার রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

আমি চলে গেলে
আমার জন্য কেঁদো না খুব বেশি,
শুধু কখনও জোৎস্নার দিকে তাকিয়ে
মনে কোরো - একজন মানুষ ছিল,
যে তোমাকে ভালোবেসে
নিজের সমস্ত আলো নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

তোমার হাসির ভিতর
আমি রেখে গেলাম আমার সমস্ত বসন্ত,
তোমার চোখের ভিতর আমার সমস্ত আকাশ।

আর যদি কোনোদিন একাকীত্ব তোমাকে ছুঁয়ে বসে,
তবে হাত বাড়িয়ে দিও - দেখবে, শূন্যতার ভিতরেও
আমার প্রেম এখনো
তোমার হাতের আজলায় ভরে আছে।


৯.     অর্ধাঙ্গিনী 


অবসাদের বিকেলে যখন বিছানায় শুয়ে থাকি,
মনে হয় দেহের অর্ধেক নেই,
মানুষ ঠিকই বলে, স্ত্রী হচ্ছে অর্ধাঙ্গিনী।

তুমি পাশে না থাকলে
ঘরের ভেতর শব্দগুলোও কেমন একা হয়ে যায়,
জানালার পর্দা নড়ে, অথচ বাতাস ঢোকে না,
শুধু তোমার অনুপস্থিতি এসে
নিঃশব্দে বসে থাকে বালিশের পাশে।

চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াই,
স্বাদ পাই না কোনো 
মনে হয়, তোমার আঙুলের স্পর্শ ছাড়া
সব উষ্ণতাই অসম্পূর্ণ।

রাতে ঘুম ভাঙলে হাত বাড়াই অভ্যাসবশত,
শূন্যতা ছাড়া কিছু পাই না,
তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে ওঠে-
যেন অর্ধেক চাঁদ নিয়ে
আকাশ বেঁচে আছে কোনোভাবে।

তুমি ছিলে বলেই
এই পৃথিবীর ক্লান্ত দিনগুলোও সহনীয় ছিল,
তুমি না থাকলে বুঝি
মানুষ শুধু একা হয় না,
ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকেও হারিয়ে যায়।

তবু তোমার স্মৃতি
আমার নিঃসঙ্গতার ভেতর জোনাকির মতো জ্বলে,
আমি সেই আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বেঁচে থাকি,
যেন অন্ধকারেরও কোথাও
তোমার মায়া লেগে আছে।


১০.     মনে রেখো না


তুমি চলে যাচ্ছ যাও, কিন্তু আমাকে মনে রেখো না,
যেমন পথিক যে পথ দিয়ে হেঁটে চলে যায়,
পথিক পথকে মনে রাখে না।

মনে রেখো না -
যেমন বিকেলের শেষ আলো
নিভে গেলে জানালার কাঁচে আর ফিরে আসে না,
যেমন নদী সাগরে মিশে গিয়ে
পেছনের ঘাটের নাম ভুলে যায় ধীরে ধীরে।

আমাকে ভুলে যেও
পুরোনো কোনো গানের অস্পষ্ট সুরের মতো,
যা একসময় খুব প্রিয় ছিল,
কিন্তু বহুদিন পরে
শুধু তার বিষণ্ন আবেশটুকু মনে থাকে।

তুমি চলে যাও -
যেমন শরতের মেঘ ভেসে যায় দূর আকাশে,
কোনো বৃক্ষ তাকে ধরে রাখতে পারে না,
তবু ঝরে পড়া পাতারা
অনেকক্ষণ তার ছায়া বুকে নিয়ে কাঁপে।

আমি তোমাকে ডাকব না আর,
শুধু নির্জন রাতের বাতাসে
তোমার নামের মতো কিছু দীর্ঘশ্বাস ভেসে যাবে।

তুমি হয়তো শুনবেও না -
যেমন সমুদ্র শুনতে পায় না
এক ফোঁটা বৃষ্টির গোপন কান্না।

তবু কখনো যদি খুব একা লাগে,
আর পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে আসে,
তখন এক মুহূর্তের জন্য ভেবো ;
কোথাও কেউ ছিল,
যে তোমাকে এতটাই ভালোবেসেছিল
যে তোমাকে ভুলে যাওয়ার স্বাধীনতাও 
দিয়ে গেছে।


১১.    মায়াবতী 


আমি তাকে ডাকি মায়াবতী বলে -
সে জীবন আর মরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে
যেন সন্ধ্যার শেষ আলো,
যেখানে অন্ধকারও এসে মাথা নত করে।

আমি যখন ক্লান্ত হয়ে
নিজের ভিতরে ডুবে যাই,
সে নিঃশব্দে এসে বসে পাশে,
ঠিক যেমন নদীর ধারে বসে থাকে চাঁদের আলো।

তার চোখে এক অদ্ভুত মায়া -
দেখলে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ
একদিন নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়বে -
সে আমার কপালে হাত রাখলে
জ্বরও কোমল হয়ে যায়,
ভাঙা স্বপ্নগুলো
আবার ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে শেখে।

আমি তাকে বলি - তুমি কি মানুষ,
নাকি বহু জন্মের প্রার্থনা থেকে উঠে আসা
কোনো অলৌকিক শান্তি?
তার হাসিতে ঝরে পড়ে শিউলি-ভেজা ভোর,
আর মৃত নক্ষত্রের বুকেও জেগে ওঠে আলো।

কখনো মনে হয়,
আমি যদি একদিন হারিয়েও যাই -
সে ঠিক আমাকে খুঁজে নেবে
বৃষ্টির শব্দের ভিতর থেকে।

কারণ সে শুধু প্রেমিকা নয়, 
সে এক আশ্রয়, এক অবগুণ্ঠিত বিষাদ, 
এক অনন্ত মায়ার নাম -
তাই, আমি তাকে ডাকি মায়াবতী বলে। 

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকে,
যাদের ছুঁলে মনে হয়
মৃত্যুও হয়তো খুব সুন্দর হতে পারে।


১২.     যেখানে প্রেম নদী হয়ে যায় 


একদিন আবারও আমরা যমুনা তীর ধরে হাঁটবো,
যমুনার জল চেয়ে দেখুক, 
আমরা আগের মতোই আছি -

চির প্রবাহিত এই জলের মতো আমরা ভেসে যাই,
আমরা ভালোবেসে যাই...
সন্ধ্যার  আলো তখন নদীর বুকে ঝুঁকে পড়বে,
আর তোমার চুলে বাতাস এসে
পুরোনো দিনের গোপন চিঠিগুলো উড়িয়ে দেবে।

আমরা হয়তো খুব বেশি কথা বলবো না,
তবু নির্জনতারাও বুঝে নেবে -
কিছু প্রেম শব্দ ছাড়া বেঁচে থাকে,
যেমন আকাশ বেঁচে থাকে নক্ষত্রের অপেক্ষায়।

যমুনার ঢেউ এসে পায়ের কাছে মাথা রাখবে,
দূরের কোনো বাঁশির সুরে
হৃদয় আবারও কিশোর হয়ে উঠবে।

তুমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকবে,
আমি তাকিয়ে থাকবো তোমার দিকে -
কারণ পৃথিবীর সব নদীর চেয়েও গভীর
তোমার চোখের সেই মায়াময় জল।

একদিন রাত নামবে ধীরে ধীরে,
চাঁদ ভেসে উঠবে জলের আয়নায়,
আমরা দু’জন পাশাপাশি বসে ভাববো -
ভালোবাসা আসলে কোথাও যায় না,
সে শুধু মানুষের ভেতর নদী হয়ে বয়ে চলে।

যদি কোনোদিন পৃথিবী আমাদের ভুলেও যায়,
যমুনা ঠিক মনে রাখবে -
এই তীর ধরে দু’জন মানুষ হেঁটেছিল,
যারা একে অপরকে
শেষ পর্যন্ত অসম্ভব রকম ভালোবেসেছিল।


১৩.     হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা


এই দীর্ঘ জীবনের অধ্যায়ে অধ্যায়ে
কত মুখ যে এসে বসেছিল হৃদয়ের বারান্দায় -
আজ আর তাদের নামও পুরো মনে পড়ে না,
শুধু হঠাৎ কোনো বিকেলের আলোয়
একটা পুরোনো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।

কতজন ছিল 
যারা খুব সাধারণ কথাতেই আপন হয়ে উঠেছিল,
চায়ের কাপের ধোঁয়ার মতো
ধীরে ধীরে মিশে গিয়েছিল জীবনের ভেতর।

তারপর একদিন
অদৃশ্য কোনো স্টেশনে নেমে গেছে সবাই,
ট্রেন চলেছে,
শুধু জানালার পাশে বসে থেকেছে শূন্যতা।

কেউ কেউ জীবনের দরজায়
খুব আস্তে কড়া নেড়েছিল -
একটু স্থান চেয়েছিল হৃদয়ের ভেতর,
একটু ছায়া,
একটু দীর্ঘশ্বাস ভাগ করে নেবার অধিকার।

আমরা তখন বুঝিনি, মানুষ হারিয়ে গেলে
তার ফেলে যাওয়া নীরবতাও
একদিন এত প্রিয় হয়ে ওঠে।

এখন মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
অনেক মুখ মনে পড়ে -
যাদের সাথে বহু বছর কথা হয়নি,
দেখা হয়নি, তবু তারা রয়ে গেছে
পুরোনো বইয়ের ভাঁজে রাখা শুকনো ফুলের মতো।

কাউকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে -
কিন্তু কোনো ঠিকানা নেই,
কোনো পথ নেই,
শুধু স্মৃতির ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়।

ভাবি,
জীবনের এই শেষের দিকের অধ্যায়ে
হঠাৎ কোনোদিন কি দেখা হয়ে যাবে?
হয়তো কোনো ভিড়ের শহরে,
হয়তো বৃষ্টিভেজা বিকেলে,
হয়তো হাসপাতালের করিডোরে,
অথবা কোনো বইমেলায় -
দু’জনই চুপ করে তাকিয়ে থাকবো কিছুক্ষণ,
তারপর কেউই বলবো না
কতটা অভিমান জমেছিল এতোদিন।

শুধু চোখের গভীরে
একটু কেঁপে উঠবে পুরোনো পৃথিবী,
আর মনে হবে -
মানুষ আসলে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না,
কিছু মানুষ আজীবন থেকে যায়
হৃদয়ের নিঃশব্দ, বিষণ্ন অধ্যায়ে।


১৪.     মায়ার ভেতর একটি মানুষ


মায়ের মতো করে কেউ যদি খোঁজ নেয়,
সে তুমি -
ঘুমভাঙা ভোরে জানালার কার্নিশে নেমে আসা
স্নিগ্ধ আলোর মতো শান্ত,
গভীর দুঃখের রাতে কপালে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে থাকা আশ্বাসের হাতের মতো কোমল।

জ্বরমাখা কোনো দীর্ঘ রাত্রির মতো
তোমার মমতা জেগে থাকে অবিরাম -
তুমি কখনো সংসারের মায়াবী প্রদীপ,
যার আলোয় অন্ধকারও ধীরে ধীরে ঘর হয়ে ওঠে,
কখনো কুয়াশাভেজা ভোর,
যেখানে হারিয়ে যাওয়া মন ফিরে পায় পথ।

কখনো বোনের মতো অভিমানী ছায়া,
আবার কখনো বন্ধুর মতো নীরবে পাশে বসে
আমার সমস্ত ক্লান্তি, ব্যথা আর না-বলা কথাগুলো অবলীলায় শুনে যাও।

আমি ভেঙে পড়লে তুমি মৃদুমন্দ বাতাস হয়ে আসো,
চারদিকে অন্ধকার নামলে
জোনাকির মতো জ্বলে ওঠো নিঃশব্দে -
যেন পৃথিবীর সমস্ত স্নেহ, মায়া আর প্রশান্তি
একটি মানুষের হৃদয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার চোখে আমি ঘরের আলো দেখি,
দেখি ভোরের উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধোয়া 
শাড়ির গন্ধ,
দেখি বৃষ্টিভেজা বিকেলে
অপেক্ষার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসা -
দেখি এমন এক আশ্রয়,
যেখানে মানুষ সমস্ত যুদ্ধ শেষে
নিঃশব্দে ফিরে আসতে চায়।

পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার তুলনা নেই,
এ সত্য চিরন্তন -
তবু এও সত্য, কিছু কিছু নারী আছেন,
যারা এক জীবনে নিঃশব্দে
মা, বোন, বন্ধু আর প্রেমময়ী স্ত্রী হয়ে ওঠেন।

তাদের মমতার ভেতরই মানুষ
আবার বাঁচতে শেখে, দুঃখের পৃথিবীতেও 
আবার ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখে।


১৫.     মায়া চিহ্ন


আমার দুই চোখ রাতের গভীরে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়,
দৃষ্টি ভেসে যায় বহুদূর -
সেই প্রথম কলাবৃত যৌবনের  আলোকছায়ায়,
যেখানে কাশফুলের মতো কেঁপে উঠত হৃদয়,
আর অকারণ বাতাসেও জেগে উঠত অদ্ভুত ব্যথা।

তারুণ্যের অসংযত এক দুপুরে
আমার হাতের করতলে চুম্বন এঁকে
কেউ একজন ধীরে বলেছিল -
এ আমার স্মৃতিময় অভিজ্ঞান তোমার জন্য… মনে রেখো।

তার চোখে তখন নদীর জলের মতো গভীর মায়া ছিল,
আর কণ্ঠে ছিল বিচ্ছেদের অদৃশ্য পূর্বাভাস, 
সেই ধূসর মায়া-চিহ্ন
আজও কখনো কখনো জেগে ওঠে নিশীথের নির্জনতায়,
তবু আমি তাকে আর মনে রাখতে চাই না -
কারণ কিছু স্মৃতি বুকে রাখলে 
হৃদয়ের ভেতর নিঃশব্দে শীতল হয়ে আসে।

আমার পাশে সারারাত্রি নিষ্কলুষ কেউ একজন 
ঘুমিয়ে থাকে
তার নিঃশ্বাসে মিশে থাকে সংসারের শান্ত গন্ধ,
ভোরের শিশিরের মতো নির্মল এক আশ্রয়।
আমি কোনো কালিমা ছুঁইয়ে দিতে চাই না
তার শুভ্র দেহরূপে, তার নির্ভরতার আকাশে।

তার মুখের দিকে তাকালে
আমি দেখতে পাই জীবনের সকল আনন্দ-বেদনার রূপ-
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা ক্লান্ত বিকেলের শান্তি,
ঝড়ের পরে নেমে আসা ঝকঝকে আলো,
অপেক্ষার শেষে ফিরে পাওয়া এক চিরচেনা ঘর।

তখন রাত আরও গভীর হয়,
আর আমি নিঃশব্দে আমার সমস্ত পুরোনো মায়া
খুলে রাখি অন্ধকারের কাছে।
শুধু বর্তমানের উষ্ণ হাতটি ধরে
মনে মনে বলি—
মানুষ শেষ পর্যন্ত স্মৃতিতে নয়,
ভালোবাসার পবিত্র আশ্রয়েই বেঁচে থাকে।


১৬.      আকুতি 


মানুষ আসে, কিছু ভালোবাসা রেখে যায়,
কিছু নাম হৃদয়ের ভেতর নিঃশব্দে বেঁচে রয় -
কত হাত ছুঁয়ে যায়, কত চোখে মায়া ঝরে,
তবু সময় সবকিছু ধীরে ধীরে দূরে সরায় ঘোরে।

শিউলি ফুলের মতো ভোরে ফুটে থাকা দিন,
অল্প বাতাসেই ঝরে পড়ে নীরব রঙিন ঋণ।
তবু এই ক্ষণিক জীবন কত গভীর আলোয় ভরা-
একটু স্নেহ, একটু প্রেমেই পৃথিবী লাগে সারা।

হয়তো জীবন ছোট বলেই এত মায়া জাগে,
বিদায়ের ভয় লেগে থাকে প্রতিটি অনুরাগে
তাই তো মানুষ চুপিচুপি হৃদয় রেখে যায় -
কেউ কবিতায়, কেউ স্মৃতিতে, কেউ অশ্রুর ছায়ায়।

শেষ বিকেলের আলো নিভে গেলে হঠাৎ মনে হয়, 
কত কথা বলা হলো না, কত মানুষ ধরা হলো না হৃদয়ের আয়নায় -
যারা একদিন খুব কাছে ছিল, তারাও কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।

শুধু কিছু অপূর্ণ স্পর্শ, কিছু না-পাওয়া দীর্ঘশ্বাস রয়ে যায় 
মাঝে মাঝে বিষণ্ন রাতে মনে পড়ে হারানো সেই মুখ, যাদের জন্য একসময় হৃদয় ভরে উঠত অদ্ভুত সুখ।

জীবন যেন নদীর জল, 
ধরে রাখতে চাইলেও থাকে না ধরা, 
তবু আফসোস হয়ে বুকে বাজে -
আরেকটু যদি পাশে রাখা যেত তাদের।


১৭.      যা নিতে পারো নি


তুমি যখন বাক্সপোটরা গুছিয়ে নিলে শেষ 
বিকেলের আলোয়, 
আমি নিঃশব্দে দেখেছি - কত যত্নে তুলে নিচ্ছ 
শুধু পুরনো কাপড়গুলো,
যেগুলো পরে প্রথম এসেছিলে আমার ঘরে,
যেন ফিরে যাচ্ছ সেই প্রথম দিনের কাছে,
যেখানে এখনো কোনো অভিমান জন্ম নেয়নি।

আমার দেওয়া বিয়ের কাতান শাড়িটা
আলমারির তাকে নিঃসঙ্গ পড়ে রইল,
তার রঙে এখনো লেগে আছে
একটি সংসারের প্রথম স্বপ্নের গন্ধ -
তুমি ছুঁয়েও দেখলে না।

পায়ে তুলে নিলে সেই পুরনো, পরিত্যক্ত চপ্পল,
যেটা তোমার বাড়ি থেকে আসার দিন
অবহেলায় পড়ে ছিল দরজার কোণে, 
হয়তো মানুষ অভিমানে
সবচেয়ে পুরনো কষ্টগুলোকেই সঙ্গে নেয়।

তুমি কিছুই নিলে না আমার থেকে -
না নতুন শাড়ি, না অলংকার,
না একসাথে সাজানো সংসােরের কোনো স্মৃতি।

তবু ঘর জুড়ে রয়ে গেলে তুমি, 
আয়নার ধুলোয়,
বালিশের কভারে, রাতের নিঃশব্দ পানির গ্লাসে,
এমনকি দরজার হাতলেও তোমার স্পর্শ থেকে গেল।

চলে যাওয়ার সময় তুমি কি সত্যিই
সব মায়া সঙ্গে নিতে পেরেছ?
উঠোনের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বিকেলটা এখনো
তোমার নাম ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে -
রাত হলে বিছানার অর্ধেক অংশ এখনো 
তোমার জন্য খালি থাকে।

মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তার ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো
ঘরের দেয়ালে শিউলি ফুলের গন্ধ হয়ে লেগে থাকে বহুদিন।

তুমি হয়তো কাপড় নিয়ে গেছ,
কিন্তু তোমার হাসির শব্দ, চোখের জলের নোনা মায়া,
আর আমার নাম ধরে ডাকার সেই কোমল স্বর,
এসব কিছুই নিতে পারোনি -
সেগুলো এখনো এই ঘরে রয়ে গেছে,
আমার নিঃসঙ্গতার পাশে বসে ধীরে ধীরে 
মৌনতার সন্ধ্যা নামায়।


১৮.      একাকী চাঁদের আলোয় 


একাকী চাঁদের আলোয় ভেসে ভেসে যাই,
নিভে যাওয়া নক্ষত্রদের পাশে তোমাকেই খুঁজে পাই।
রাতের নীরব নদী জোছনার আঁচলে ঢাকে,
তোমার স্মৃতিরা তখন কুয়াশা হয়ে হৃদয়ে নেমে থাকে।

শিউলি-ভেজা বাতাস এসে চুলে চুমু খায় ধীরে,
তোমার নামের মায়া জেগে ওঠে নিঃশব্দ অন্ধকার ঘিরে।
দূরের কোনো বাঁশির সুর বিষণ্ন হয়ে ডাকে,
মনে হয় তুমি এখনও জেগে আছো নীল আকাশের ফাঁকে।

চাঁদের সাদা অভিমানে রাত আরও গভীর হয়,
তোমাকে না-পাওয়ার ব্যথাও তখন অদ্ভুত মধুরময়।
আমি জোছনার ভেলায় ভেসে ছুঁতে চাই তোমার হাত,
যেন শত জন্মের প্রেম লিখে রাখে নিঃসঙ্গ এই রাত।

কত না বলা কথারা ঝরে পড়ে শিশির হয়ে ঘাসে,
তোমার অনুপস্থিতিও আজ মায়া হয়ে বসে পাশে।
একাকী চাঁদের আলোয় ভেসে ভেসে যাই,
তবু প্রতিটি জোছনা রাতে শুধু তোমাকেই ফিরে পাই।


১৯.      স্বাগতম,  বিষণ্ণ বাতাসের গান-এ


এখানে শব্দেরা শুধু লেখা নয়,
কখনও তারা ঝরে পড়া শিউলি,
কখনও গভীর রাতের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

যে মানুষগুলো হৃদয়ে অল্প মায়া নিয়ে বেঁচে থাকে,
যারা পুরোনো স্মৃতির গন্ধে হঠাৎ থেমে যায়,
যাদের চোখে এখনো রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ জমে থাকে -
এই আঙিনা তাদের জন্য।

এখানে বিষাদও সুন্দর,
নীরবতাও এক ধরনের কবিতা।

বাতাস যখন পুরোনো দিনের কথা বলে,
আমরা শুধু সেই সুর শুনে যাই।
আপনাদের প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি নিঃশব্দ গল্প
এই চ্যানেলের আকাশে জোনাকির মতো জ্বলে থাকুক।
ভালোবাসা রইল -
বিষণ্ণ বাতাসের গান থেকে।


২০.      সারাজীবনের জন্য


আমি সারাজীবনের জন্য তোমাকে পেলাম -
যেন বহুদিনের পথহারা নদী
অবশেষে সমুদ্রের ঠিকানা খুঁজে পেল।

তোমার চোখের ভেতর সন্ধ্যার যে আলো,
সেখানে আমি আমার ক্লান্ত জীবন রেখে দিই।
তোমার কণ্ঠে যে মায়া ঝরে,
তা নিঃশব্দে আমার সমস্ত বিষাদ ধুয়ে নেয়।

কত মানুষ এলো, চলে গেল -
কেউ হৃদয়ের দরজায় নাম লেখাতে পারেনি।
শুধু তুমি এলে,
আর আমার ভেতরের নিঃসঙ্গ ঘরটিতে
জ্বলে উঠল চাঁদের মতো শান্ত এক প্রদীপ।

এখন রাত হলে আমি আর একা নই,
জানালার পাশে বসে মনে হয় -
পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব শেষ হয়ে গেছে।
তোমার হাতের উষ্ণতায়
সময়ও যেন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমি সারাজীবনের জন্য তোমাকে পেলাম -
এই একটি বাক্যের ভেতরই
আমার সমস্ত প্রার্থনা, 
সমস্ত প্রেম,
সমস্ত জীবনের অর্থ লুকিয়ে আছে।


২১.     মনে পড়বে একদিন


তোমার একদিন ঠিকই মনে পড়বে
কে তোমাকে বুকের গভীর থেকে ভালোবাসা দিয়ে ভালোবেসেছিল -
কার কণ্ঠে ছিল তোমার নামের জন্য প্রার্থনা,
কার চোখে ছিল অবিরাম জ্যোৎস্না।

মনে পড়বে,
একজন মানুষ ধূসর মৌন সন্ধ্যায়
তোমার অনুপস্থিতিকেও ছুঁয়ে থাকত,
যেন দূরের কোনো তারা ছিঁড়ে গেলে
আকাশেরও একটু কষ্ট হয়।

তুমি হয়তো তখন অন্য কোনো জানালায় দাঁড়িয়ে
বৃষ্টির শব্দ শুনবে একা,
আর হঠাৎই বুকের ভেতর কেঁপে উঠবে
পুরোনো কোনো মায়া -
যে মায়ার নাম ছিল ভালোবাসা।

মনে পড়বে,
কেউ একজন তোমার অভিমানের দিনগুলোও
ফুলের মতো যত্নে তুলে রেখেছিল,
তোমার নীরবতার মাঝেও শুনেছিল
অব্যক্ত হৃদয়ের শব্দ।

সময় অনেক কিছু মুছে দেয়,
তবু কিছু মানুষ থেকে যায় ভেজা চিঠির গন্ধ হয়ে,
শেষরাতের দীর্ঘশ্বাস হয়ে,
অথবা অকারণে ভেসে আসা কোনো বিষণ্ণ 
গানের সুর হয়ে।

আর সেদিন,
তুমি হয়তো খুব ধীরে বলবে -
এতটা সত্যি করে, এতটা যত্ন করে,  
এতটা মাধুরী মিশিয়ে, 
আমাকে আর কেউ কোনোদিন ভালোবাসেনি…।


২২.     অপেক্ষার মানুষ


এমন কেউ একজনকে চাই
যে আমার পাশে বসে
আমার মনের কথাগুলো মন দিয়ে শুনবে -
নীরবতার ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসও
যে মমতার হাতে ছুঁয়ে দেবে।

এমন কেউ একজন আসুক -
যে আমাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখবে,
ঝড় এলে বুক পেতে দাঁড়াবে,
আর ক্লান্ত বিকেলের মতো নিভে গেলে
চোখের ভেতর একটু আলো হয়ে জ্বলবে।

আমি এমন এক মানুষের অপেক্ষায় আছি
যার কণ্ঠে থাকবে মায়ার নদী,
যে অভিমান বুঝবে শব্দ ছাড়া,
এবং ভাঙা স্বপ্নের পাশে বসে
ধীরে ধীরে নতুন আকাশ এঁকে দেবে।

সে হয়তো খুব সাধারণ হবে -
তবু তার ছোঁয়ায় পৃথিবীর সব বিষাদ
কেমন কোমল হয়ে যাবে।
তার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে
আমি ভুলে যেতে চাই
কত একাকী ছিল আমার পথগুলো।

রাত গভীর হলে সে হয়তো বলবে -
তুমি ক্লান্ত হলে আমার কাঁধে মাথা রাখো,
আর আমি নিঃশব্দে অনুভব করব,
ভালোবাসা আসলে কোনো শব্দ নয় 
একটি নিরাপদ আশ্রয়ের নাম।

এমন কেউ একজন আসুক -
যে আমার ভেতরের ভাঙাচোরা মানুষটাকে
অবহেলা নয়, আদরে দিয়ে ছুঁয়ে দেবে।
যে চলে যাওয়ার ভয় নয়,
থেকে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি হবে।

আর জীবনের শেষ সন্ধ্যায়
যখন চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে যাবে,
সে শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে -
'আমি আছি… তোমার পাশেই অনন্তকাল'
আর সেই কয়টি শব্দেই
আমার সমস্ত শূন্যতা ভরে উঠবে।


২৩.    সেইসব পায়ের চিহ্ন 


কখনও কখনও নিশীথের গভীর নৈঃশব্দ্যে 
কুসুমপুরের পথঘাট আমার অন্তরের ভিতর 
পুনরায় জাগিয়া উঠে।
মনে হয় - বহুদিন পূর্বে ফেলে আসা সেই কৈশোর এখনও কোনও ধূলিধূসর বাঁশবনের ছায়ায় দাঁড়াইয়া আছে, এখনও কোনও নির্জন মেঠোপথের ধারে আমার প্রতীক্ষা করিতেছে।

আমি আবার হাঁটিতে থাকি -
সেই কাদামাটির পথ দিয়া,
সেই নদীতীরের ঘাসভেজা প্রভাত দিয়া,
সেই স্নানশেষ মধ্যাহ্নের নিঃসঙ্গ উঠোন দিয়া।

পুকুরঘাট হইতে ফিরিবার সময় আমার ভেজা পদচিহ্নগুলি পথের উপর দীর্ঘক্ষণ জ্বলজ্বল করিয়া থাকিত -যেন সদ্য ধোয়া পৃথিবীর বুকে কিশোর জীবনের একটুখানি স্বাক্ষর।

আজ ভাবি -
সেইসব পায়ের ছাপ কি এখনও কোথাও রয়ে গিয়াছে?
নাকি বর্ষার জলে, শরতের ধুলায়, কিংবা অগণিত অপরিচিত মানুষের চলার শব্দে তাহারা অনেক আগেই মুছিয়া গিয়াছে?

আমি তো হাঁটিয়াছিলাম আমার পূর্বপুরুষদের পদচিহ্নের উপর দিয়া।
তাঁদেরও পূর্বে আরও কত মানুষের পদরেণু এই মাটির সহিত মিশিয়া গিয়াছে -
কত অশ্রু, কত হাসি, কত স্বপ্ন, কত অব্যক্ত বেদনা
এই কুসুমপুরের পথের ধুলায় আজও নিঃশব্দে ঘুমাইয়া আছে।

প্রভাতের সেই আলো -
যাহা একদিন তালবনের ফাঁক দিয়া আমার কিশোর মুখে পড়িত,
সন্ধ্যার সেই গাঢ় অন্ধকার -
যাহার ভিতর দূর বাঁশির সুর ভাসিয়া আসিত,
মধ্যরাত্রির সেই নিস্তব্ধতা -
যেখানে কেবল শেয়ালের ডাক আর অদৃশ্য পাতার মর্মর শব্দ শুনিতাম,
আজও তাহারা আমার অন্তরের গভীরে ধ্বনিত হইয়া উঠে।

কবেকার কোকিলের ডাক,
কবেকার শিউলি ফুলের শুভ্র গন্ধ,
কবেকার নক্ষত্রভরা আকাশ হইতে ঝরিয়া পড়া আলোকরেণু -
সব মিলিয়া যেন আমার চিত্তের ভিতরে এক বিষণ্ন অনন্তের জন্ম দেয়।

মনে হয় -
আমি একা নই,
আমার সহিত হেঁটে চলিয়াছে বহু মৃত দিনের ছায়া, বহু বিস্মৃত মানুষের মায়া।

তবুও জীবন কত আশ্চর্য!

আজিকার এই প্রভাতের প্রসূন,
অমিতাভ জ্যোৎস্নার এই নীরব আলো,
সন্ধ্যামালতীর এই অতল সুগন্ধ -
সব যেন আমার পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ বহন করিয়া আসে।

তাঁদের অযুত স্নেহ আমার চলার পথে বকুলরেণুর মতো ঝরিয়া পড়ে।
আমি যখন একা পথ চলি,
মনে হয় -
অদৃশ্য কারও স্নেহমাখা হাত এখনও আমার মাথার উপর রাখিয়া আছে।

আর তখন এই পৃথিবী,
এই ধূলিমাখা জীবন,
এই ক্ষণস্থায়ী পথচলা -
হঠাৎ করিয়াই এক অপার্থিব মায়ায় ভরিয়া উঠে।


২৪.      খোঁজ 


খুঁজি মেঘের ছায়ায়, খুঁজি অনন্ত আঁধারে
কোথাও দেখিতে পাই না -
কোন্ বিচ্ছুরিত আলোয় খুঁজে পাবো তোমারে,
কোন্ নক্ষত্রের ভাষায় ডাকি তোমার নাম না?

নিশীথের নীরব বুকে ঝরে শিশিরের গান,
চাঁদের মলিন আলোয় জাগে বিষণ্ন অভিমান।
বাতাসে ভেসে আসে কার অচেনা সুবাস,
মনে হয় তুমি বুঝি রয়েছ খুব কাছাকাছি আশপাশ।

নদীর জলে চেয়ে দেখি কাঁপে তোমার ছায়া,
ছুঁইতে গেলে মিলায় গিয়ে, বাড়ায় শুধু মায়া।
অচিন কোনো স্বপ্নপুরে তুমি কি জেগে আছো?
আমার সকল হারানো সুর নীরবে কি শুনে যাচ্ছো?

বকুল-ঝরা পথের শেষে সন্ধ্যা নামে ধীরে,
তোমার স্মৃতি জোনাক হয়ে জ্বলে অন্তহীনে।
হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে রাখি তোমার ছবি,
তুমি ছাড়া এই পৃথিবী অসমাপ্ত এক কবি।

যদি কোনো ভোরের আলো ছুঁয়ে দেয় দু’চোখ,
যদি কোনো অচেনা পাখি ডাকে নিরালোক,
তবে বুঝিব - দূর আকাশে তুমি এখনো আছো,
আমার সকল নীরবতায় মায়া হয়ে ভাসো।


২৫.     দুঃসহবাস


কাল রাতে তোমার পায়ের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়,
তুমি থাকলে শব্দ হয়, না থাকলে নৈঃশব্দ।
কাল রাতে দেখি রাত-ঝুম-ঝুম বৃষ্টি, 
তুমি থাকলেই বৃষ্টি হয়,
না থাকলে শুধু জমে থাকা মেঘের দীর্ঘশ্বাস।

রাতের শেফালীকে ঘুমিয়ে যেতে দেখেছি -
তুমি ঘুমিয়ে থাকলেই আমাকে জেগে থাকতে হয়,
সে এক ঘুমহীন, স্বপ্নহীন, দুঃসহবাস।

দরজার খিড়কিতে আজও তোমার আঙুলের 
ছোঁয়া লেগে আছে ,
চাঁদের আলো এলেই মনে হয় তুমি নিঃশব্দে ফিরে এসেছ।

এই শহরের সমস্ত নীরবতা তোমার নাম ধরে ডাকে,
আর আমি একা বসে শুনি -
ভালোবাসারও কখনও কখনও শব্দ হয়,
যেমন গভীর রাতে হঠাৎ ভেঙে পড়া বৃষ্টির মতো,
পা টিপে টিপে সন্তর্পণে আঁধার ভেদ করে 
চলে আসছ।


২৬.     অন্তর্লীন জোয়ার


মানুষের মনের গভীরে
অদৃশ্য কোনো বন জন্ম নেয় -
সেখানে সুপ্ত বীজেরা
গোপনে অপেক্ষা করে যুগের পর যুগ।

কখন কোন্‌ বৃষ্টির শব্দে
হৃদয়ের মাটি ফেটে যাবে,
কখন কোন্‌ নিষিদ্ধ ফুলের গন্ধে
জেগে উঠবে অবাধ আকাঙ্ক্ষা -
তা কেউ জানে না।

হঠাৎ একদিন
চোখের ভেতর অন্য এক মুখের আলো নামে।
দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত সংসার,
ধূপের ধোঁয়ার মতো নিশ্চিন্ত বিকেল,
সবকিছু কেঁপে ওঠে নিঃশব্দে।
যেন দূর সমুদ্রের গোপন জোয়ার
রাতের নদী ভাসিয়ে নেয়।

পরকীয়া -
শব্দটি শুনলেই সমাজের জানালাগুলো
এক এক করে বন্ধ হয়ে যায়।
তবু প্রেম কি কখনও
শুধু শুদ্ধতার নিয়ম মেনে জন্মায়?

সে তো আগুনের মতো, 
যেখানে শুকনো পাতা পায়,
সেখানেই জ্বলে ওঠে।

কখনও সে প্রেম মধুর,
বৃষ্টিভেজা কদমফুলের গন্ধের মতো;
কখনও সে বিশ্বাসঘাতক,
ভাঙা আয়নায় মুখ দেখার মতো নির্মম।

তবু মানুষ বারবার
নিজেরই অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে
অন্য এক আলোর খোঁজ করে -
কিন্তু এই আলো যে সত্যিকার আলো নয়, 
এ যে এক ভয়ংকর  অন্ধকার!


২৭.     পথের গান


যদি কোনোদিন সময় থেমে যায় নিঃশব্দ শালবনের ভিতর,
আমি তবে একা হেঁটে যাবো পৃথিবীর পুরোনো ধূলির উপর -
দেখিব কুয়াশা নেমে আসে ধানের ক্ষেতে মৃত পাখির ডানার মতো,
দেখিব নদী জেগে থাকে - অন্ধকারে কার যেন বিস্মৃত ক্ষত।

দেখিব সন্ধ্যার নীল আলোয় শিউলি-গাছ কেঁপে ওঠে ধীরে,
কোনো এক অচেনা নারী চুল খুলে বসে থাকে নদীর তীরে;
তার চোখে হয়তো লেগে আছে বহু জন্মের হারানো ঘুম,
তার ঠোঁটে ঝরে পড়ে নীরবতা—বৃষ্টির ভিতরে ডুবে যাওয়া কুম্ভ।

আমি শুনিব দূর নক্ষত্রেরা ডাকে কারে অশ্রুর মতন স্বরে,
দেখিব জোনাকিরা জ্বলে উঠে মৃত শতাব্দীর অন্ধকার ঘরে;
দেখিব শিশিরভেজা ঘাসের উপর চাঁদের ক্লান্ত রূপালি হাত,
আর বাতাসে ভেসে আসে কার জানি অদেখা জীবনের প্রভাত।

যদি অনন্তকাল বাঁচি আমি - তবু কোনোদিন জানিব না ঠিক
কেন এই পৃথিবী এত মায়াময়, এত একা, এত অসীম দিক;
কেন রাত্রির শেষে ভোর আসে ছিন্ন স্বপ্নের মতো নিঃশব্দ হয়ে,
কেন মানুষ হারায়ে যায় - তবু তার স্মৃতি ঘাসের ভিতরে রয়ে।


২৮.     একসাথে পথ চলা


জীবনের অনেকটা পথ একসাথে চলে এসেছি
ধুলোমাখা দুপুর পেরিয়ে,
অগণিত বিষণ্ণ সন্ধ্যার ভাঙা সেতু ডিঙিয়ে,
চলে এসেছি দুজন হাত ধরে।

কত নদী শুকিয়ে গেছে আমাদের চোখের সামনে,
কত শালিক উড়ে গেছে অচেনা আকাশে -
তবু তোমার হাতের উষ্ণতা
এখনও আমার শীতল আঙুলে জেগে থাকে।

মনে আছে?
এক বর্ষার রাতে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে
তুমি বলেছিলে -
'মানুষ হারিয়ে যায় না,
শুধু সময়ের ভিতর একটু দূরে সরে যায়।'
সেই কথাটি আজও জোনাকির মতো
আমার বুকের ভিতর জ্বলে।

আমরা দু’জন যেন দুই ক্লান্ত পথিক,
তবু একই নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে হাঁটি।
চারদিকে যত ভাঙন, যত অবসাদ,
তোমার চোখে তাকালে মনে হয় -
এ পৃথিবী এখনও সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়নি।

সামনে আরো যেতে হবে -
আরো বহু কুয়াশা পেরোতে হবে,
অচেনা শীত নামবে জানালার পাশে,
সময় আরো কিছু প্রিয় জিনিস কেড়ে নেবে হয়তো।

তবু আমি জানি,
তুমি পাশে থাকলে
সব হারানোর মধ্যেও
একটি উজ্জ্বল আলো বেঁচে থাকে।

যেদিন খুব দূরের কোনো বিকেলে
আমাদের চুলে নেমে আসবে শেষ রূপালি ধূলি,
সেদিনও হয়তো আমরা
একই আকাশের নিচে বসে বলবো -
'দেখো, পথ এখনও ফুরোয়নি…
চলো, আরেকটু একসাথে যাই।'


২৯.     বুড়ীগঙ্গা : এক বিষণ্ণ নদীর গান


বুড়ীগঙ্গা একটি বিষণ্ণ নদী -
তার জলের ভিতরে জমে আছে
শত বছরের কান্না,
অসংখ্য সন্ধ্যার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

এই নদীর বুকেই প্রথম শুনেছিল মানুষ
জীবনের কাঁপা কাঁপা উচ্চারণ;
আবার শেষ বিকেলের আলো নিভে গেলে
এই নদীতেই ডুবে গেছে
শেষ বিদায়ের শব্দ।

সূর্যের শেষ রশ্মি এসে
ক্লান্ত পাখির মতো বসে থাকে তার ঢেউয়ে;
তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় -
যেন কারও চোখের শেষ স্বপ্ন
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

বুড়ীগঙ্গার জলে ভেসে গেছে কত সুখ,
কত অপূর্ণ প্রেম,
কত ছেঁড়া চিঠি,
কত অভিমানী মুখের নীরবতা।

ভেসে গেছে শঙ্খচিলের ছায়া,
ভেসে গেছে মায়ের ডাক,
ভেসে গেছে দূরের কোনো আজানের বিষণ্ণ সুর।

রাত্রি নামলে নদীটি আরো একা হয় -
কালো জলের ভিতরে তখন
চাঁদও যেন কাঁদতে থাকে নিঃশব্দে।
দূরের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে -
মনে হয় মৃত মানুষের স্মৃতি
এখনো শহরের বুকে জেগে আছে।

আমি কখনো কখনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ভাবি -
মানুষ কি সত্যিই কোথাও হারিয়ে যায়?
নাকি বুড়ীগঙ্গা তাদের সব বেদনা
নিজের গভীর জলে লুকিয়ে রাখে?

এই নদী জানে -
জীবন আসলে এক ভেসে চলা নৌকা,
যেখানে সুখ ক্ষণিকের আলো,
আর বিষাদই চিরদিনের মাঝি।


৩০.     কলিজার টুকরা : রামিসা


ঘরে ঢোকার আগে
ফ্রিজের ভেতর কাঁচের জগে
এক গ্লাস শরবত রেখে দিত ছোট্ট দুই হাত -
'বাবা আসলে খাইবা…:
এইটুকু যত্নেই যেন
একটা পৃথিবী বেঁচে থাকত।

ফোন বেজে উঠত দিনে পঞ্চাশবার -
'বাবা, তুমি কখন আসবা?'
আকাশের পাখিরাও বুঝি এত ডাকেনি কাউকে
যতবার এক শিশু ডেকেছিল তার বাবাকে।

স্কুলের খাতায় প্রথম নাম,
চোখে ভরা রোদের মত স্বপ্ন;
পপুলার স্কুলের সেই ছোট্ট মেয়ে
বইয়ের পাতায় ফুল শুকিয়ে রাখত,
আর বাবার বুকে মুখ গুঁজে
নির্ভয়ে ঘুমিয়ে পড়ত প্রতিরাতে।

আট বছর ধরে
একজন বাবা নিজের বুককে বানিয়েছিলেন বিছানা-
আজ সেই বুক খালি।
আজ রাত এলে
বালিশের পাশে শুধু কান্না বসে থাকে।

বাবা আজও হয়তো
দরজা খুলে অভ্যাসবশত ডাকেন -
'মা, আমি আইছি…'
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে,
কেউ আর দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে না তাকে।

ফ্রিজে আর শরবত রাখা হয় না,
ফোনও আর বাজে না ঘনঘন;
তবু দেয়ালের ভেতর, বাতাসের ভেতর,
অদৃশ্য এক কণ্ঠ আজও কাঁদে -
“বাবা… তুমি কখন আসবা?”

পৃথিবীর সব শোকের চেয়েও ভারী
একটি সন্তানের অনুপস্থিতি।
কারণ সন্তান হারালে
মানুষ শুধু একজন মানুষকে হারায় না -
সে হারায় তার সকাল,
তার ঘুম,
তার ভবিষ্যৎ,
তার পুরো পৃথিবী।

আর এক অসহায় বাবা
রাতভর অন্ধকারে বসে শুধু ভাবেন -
'আমি এই কলিজার টুকরা ছাড়া
থাকবো কেমনে…'


৩১.      অনন্ত সুরের কাছে


অনেক দাম দিয়ে তোমাকে পেয়েছি -
তাই তো আজও হৃদয়ের গোপন উপকূলে
তোমার নাম এলেই জেগে ওঠে
জোৎস্নাভেজা কোনো পুরোনো বীণার সুর।

কত অন্ধকার নদী পার হয়ে,
কত নির্জন রাতের নিঃশব্দ প্রহর গুনে
আমি পৌঁছেছিলাম তোমার কাছে -
যেন বহু জন্মের শেষে
হারানো কোনো নক্ষত্র ফিরে পায় তার আকাশ।

তোমাকে ভালোবেসে আমি শিখেছি -
বেদনারও একটি নীল আলো থাকে,
শূন্যতারও গভীরে লুকিয়ে থাকে মায়া।

তুমি পাশে থাকলে পৃথিবীটাকে মনে হয়
শিশিরভেজা শিউলির বাগান -
আর তুমি দূরে গেলে
সমস্ত বিকেল জুড়ে শুধু ঝরে পড়ে
অদৃশ্য বিষণ্নতার পাতা।

জীবন বীণায় আজও তোমারই সুর বাজে,
অদেখা বাতাসে কেঁপে ওঠে তার তার;
আমি স্তব্ধ হয়ে শুনি -
যেন কোনো অলৌকিক সন্ধ্যা
আমার সমস্ত একাকিত্বে
তোমার নাম লিখে দিচ্ছে বারবার।

তুমিহীন এই মন আজও জানে ;
সব প্রেম শেষ হয়ে যায় না;
কিছু প্রেম রয়ে যায়
চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা নদীর মতো,
নিঃশব্দে অন্তর গভীরে।


৩২.     স্পর্শের পূর্বে


মাঝে মাঝে তুমি এত দূরে চলে যাও
যেন সময়েরও বহু আগে হারিয়ে যাওয়া
কোনো নীল গ্রহের নিঃসঙ্গ আলো।

তোমার নাম তখন
ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে আমার ভেতরে,
যেন কার্তিকের কুয়াশায় ভিজে যাওয়া
অচেনা বকুলের গন্ধ।

আমি জানি না, তুমি মানুষ, না কি
রাত্রির গোপন কোনো মায়া;
শুধু অনুভব করি, তোমার অনুপস্থিতি এলে
চারপাশের সমস্ত পৃথিবী অদ্ভুত 
ধীর হয়ে যায়।

নদীগুলো আর সাগরের দিকে যায় না,
পাখিরা ভুলে যায় আকাশের ভাষা,
ঘাসের ডগায় জমে থাকে
অপ্রকাশিত বিষণ্ণতার শিশির।

আমি তখন একা বসে থাকি
অন্ধকারের গভীর বারান্দায় -
যেখানে শুধু তোমার স্মৃতিরা
গাঢ় নীল আগুন হয়ে জ্বলে।

তারপর হঠাৎ তুমি ফিরে আসো -
যেন বহু শতাব্দী পরে ভাঙা কোনো মন্দিরে
আবার জ্বলে উঠেছে প্রদীপ।

তোমাকে দেখে মনে হয়,
স্বপ্নেরা বুঝি সত্যিই কখনও মরে না।
তবু বিশ্বাস হয় না।

মনে হয়,
তুমি বুঝি জ্যোৎস্নার ছদ্মবেশে আসা
কোনো ক্ষণিক বিভ্রম -
ভোর হলেই মিলিয়ে যাবে
শীতের মাঠে ভেসে থাকা ধোঁয়ার মতো।

তাই আমি ধীরে ধীরে তোমার আঙুল ছুঁয়ে দেখি-
দেখি, সেখানে রক্তের উষ্ণতা আছে কি না,
নাকি শুধু নক্ষত্রের শীতল ধূলি।
তোমার চোখের ভিতরে তাকিয়ে খুঁজি
পৃথিবীর শেষ আশ্রয়।

আর তখন, সমস্ত দূরত্ব ভেঙে গিয়ে
অদ্ভুত নীরবতায় ভেসে ওঠে একটি সত্য -
ভালোবাসা আসলে কাছে আসার নয়,
ভালোবাসা হলো দূরে চলে গিয়েও
কারও আত্মার ভিতরে
অবিকল রয়ে যাওয়ার শিল্প।


৩৩.      চড়ুইদের বাসা


পাখিদের দেখি, কী সহজে তারা সন্ধ্যার 
আকাশে একটু খড়, একটু শুকনো পাতা,
আর একমুঠো ভালোবাসা জড়ো করে
ঘর বেঁধে ফেলে।

আহা, তুমি আর আমি যদি পাখি হতাম -
তাহ’লে হয়তো কোনো কৃষ্ণচূড়ার ডালে
নরম বাসা হতো আমাদের;
বর্ষার রাতে ডানার নিচে লুকিয়ে রেখে
তোমাকে বলতাম -
ভয় পেয়ো না, আমি আছি।

কিন্তু দেখো, আমি তো মানুষ -
অথচ মানুষের এই পৃথিবীতে
মানুষ হওয়ার চেয়েও কঠিন
একটি ছোট্ট ঘর জোগাড় করা।

টিউশনি করে ফিরে আসি 
মেসের  স্যাঁতসেঁতে ঘরে;
লোহার খাটে শুয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখি -
একজোড়া চড়ুই পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে -
কী অনাবিল সুখী ওরা।

বুকের ভেতর কেমন এক শূন্যতা
ধীরে ধীরে বৃষ্টি হয়ে নামে -
পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় হয়তো সেই মানুষ, 
যার কোনো ঘর নেই।


৩৪.     ঋদ্ধতা


আমার হৃৎস্পন্দন প্রথম কেঁপে উঠেছিল
তোমার প্রাণের গোপন স্পর্শে -
সে কী অদ্ভুত দীপ্তি, কী গভীর প্রাণোচ্ছ্বাস!
মনে হয়েছিল, বহু যুগ নিভে থাকা কোনো নক্ষত্র
হঠাৎ জ্বলে উঠেছে আমার রাত্রির আকাশে।

তুমি প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিলে -
এক নিঃশব্দ হেমন্ত-রাত্রির মধ্য প্রহরে,
যখন নক্ষত্ররা নতজানু হয়ে ছিল মাঠের বুকে,
আর পৃথিবী ঘুমোচ্ছিল অচেনা বিষণ্নতায়।

সেই আগুনে পুড়েছিল
সবুজ শ্যামল শস্যের বিস্তীর্ণ প্রান্তর,
পুড়েছিল আমার সমস্ত একাকিত্ব,
সমস্ত অব্যক্ত শীতলতা।

তারপর একদিন,
শ্রাবণের কালো মেঘ ডেকে আনল বৃষ্টি,
জলের ভিতর জেগে উঠল তোমার নামের মায়া।
মুঠো মুঠো প্রেম ছড়িয়ে পড়ল দিকদিগন্তে -
ভেজা কদমফুলের গন্ধে,
নদীর কাঁপা ঢেউয়ে,
অলিন্দে জমে থাকা অস্ফুট দীর্ঘশ্বাসে।
সে কী হৃদয়-আকুল করা প্রেমোচ্ছ্বাস!
মনে হতো, আকাশেরও বুঝি
একটি গোপন হৃদয় আছে।

দীর্ঘ সহযাপনের পর
আমরা ধীরে ধীরে ঋদ্ধ হয়েছিলাম -
যেন দহন শেষে পোড়া মাটির শুদ্ধতা,
যেন মেঘভাঙা জলের স্বচ্ছ স্রোতধারা,
যেখানে সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে যায় নিঃশব্দে।

এখনও তোমার চোখের দিকে তাকালে
মনে হয় -
আমাদের প্রেম কোনো ক্ষণিক ঋতু নয়,
বরং আলো-আঁধারের ভিতর
অনন্তকাল ধরে জ্বলে থাকা এক 
মায়াবী প্রদীপ।


৩৫.     নাগবল্লি


চিম্বুকের পাহাড়ে আজও নিশ্চয়
সন্ধ্যা নামে ধোঁয়ার মতো ধীরে -
আর কোনো এক নির্জন খাদ পেরিয়ে
দূর অরণ্যের গায়ে নাগবল্লি ফুলটি
নিভৃত আগুনের মতো ফোটে।

আমি তাকে ছুঁতে পারিনি কোনোদিন।
শুধু দূর থেকে দেখেছিলাম -
কমলা ও সাদা পাপড়িতে
কোন অদ্ভুত বিষাদ মেখে ছিল,
যেন কারও নিষ্পাপ মুখে শেষ বিকেলের আলো।

তার কাছে যাওয়ার পথে ছিল
গভীর গিরিখাত, অসংখ্য সর্পিল ভয়,
ঝোপের ভেতর অদৃশ্য হিসহিস শব্দ,
আর ছিল আমার অক্ষমতা -
মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন পরাজয়।

তবু আমি জানি,
সেই ফুল আসলে কোনো ফুল ছিল না -
সে ছিল অন্য কেউ।
সে ফুটেছিলে আমার নাগালের ঠিক বাইরে,
যেখানে প্রেম পৌঁছাতে চায়,
কিন্তু জীবন পৌঁছাতে দেয় না।

আমি বহুবার ভেবেছি,
একদিন সব ভয় ডিঙিয়ে তার কাছে যাবো;
নাক স্পর্শ করে নেবো তোমার গোপন সুবাস,
আঙুলে মেখে নেবো তার পাপড়ির কোমলতা।
কিন্তু প্রতিবারই পৃথিবী
আরও একটু গভীর খাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঝখানে।

এখন হয়তো সে ঝরে গেছে -
কোনো নিভৃত বনকুঞ্জে,
পাতার নিচে ঘুমিয়ে আছে তার রঙ,
বৃষ্টির জলে মিশে গেছে সৌরভ।

তবু আশ্চর্য, আজও কখনো কখনো
হেমন্তের নির্জন বাতাসে
আমি এক অচেনা গন্ধ পাই-
আর মনে হয়, দূর পাহাড়ের গায়ে
নাগবল্লি এখনও ফুটে আছে, 
শুধু আমি পৌঁছাতে পারিনি।


৩৬.     মাঝনদীর মাঝি


আমারে নিবা মাঝি লগে -
এই কথাটা কইছিলাম এক বর্ষার সন্ধ্যায়,
যখন নদীর জলে ডুবছিল শেষ আলো,
আর তোমার চোখে উঠছিল নিষিদ্ধ চাঁদ।

তুমি তখন অন্য ঘরের মানুষ,
আমি অন্য কারও নামের পাশে বন্দী;
তবু বুকের ভিতর কে যেন
নৌকার বৈঠা ঠেলে দিত বারবার।

আমারে নিবা মাঝি লগে -
এই জীবনের হাটে আমার আর কিচ্ছু নাই,
শুধু কিছু অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস,
আর তোমার ছোঁয়া লেগে থাকা
একখান নীল শাড়ির গন্ধ।

রাত হলেই নদী ডাকত,
ডাহুক পাখি কাঁদত চরজুড়ে;
তুমি নিঃশব্দে বলতে -
চলো, আজ আর ফিরি না ঘরে...

আমি ভয় পাইতাম -
সমাজ, সংসার, মানুষের চোখ;
তবু তোমার কাঁধে মাথা রাখলে
সব পাপ কেমন পূর্ণিমা হইয়া যাইত।

আমারে নিবা মাঝি লগে -
যদি ডুইবা যাই মাঝনদীতে,
তবু তোমার বুকের ভিতর ডুবি;
এই মিথ্যা পৃথিবীর চেয়ে
সেই ডুবও অনেক সত্যি।


৩৭.    মায়াডোরের বন্ধনে


যদি দখিনা বাতাস আসে ঘরে,
আনমনে বসে থেকো দুয়ার খুলে -
সাঁঝের বেলায় হাস্নাহেনা ঝরবে নীরবতাজুড়ে।

হয়ো না তুমি কোনো একলা পাখি,
শিশিরভেজা স্বপ্ন মেখে আঁখি -
রেখো আমায় বুকের গভীর মায়াডোরে ঢাকি।

মাধবী রাতে জেগে উঠুক সুর,
প্রেমদোলায় দুলুক দুটি হৃদয় ভরপুর -
সুরের আবেশে ফুরিয়ে যাক নিশিরাত নিভৃতপুর।

তোমার অফুরন্ত কর্মব্যস্ত ক্ষণে,
ভালোবাসা রেখো উজাড় করে প্রাণে -
বেঁধো আমায় চিরদিন তোমার মায়াবী বন্ধনে।


৩৮.     মুক্তাহীন সমুদ্র


এই বনকুঞ্জ থেকে একদিন আমি চলে যাব - 
যেমন ঝরে যায় অচেনা কোনো পাতা হেমন্তের নিঃশব্দ বিকেলে।

তবু সন্ধ্যার অতসীঝাড়ে জোনাকিরা গুঞ্জন তুলে গান গাইবে, নীল অন্ধকারের বুকে জ্বেলে রাখবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্রের আলো।

সমুদ্রের উপরে আকাশ তখনও লালিমায় রাঙাবে অস্তসূর্যের মুখ, ঢেউয়েরা আপন মনে তটরেখায় লিখবে অনন্তের নাম।

এই পর্ণকুটিরে - কোন একদিন, কোন এক সন্ধ্যায় অবগুণ্ঠন ঢাকা এক নারী এসেছিল; চকিত চোখে তার সন্ধ্যাতারার মতো লাজুক দীপ্তি ছিল, নিভৃত বনের ছায়ার মতো কোমল।

কণ্ঠে ছিল না কোনো চন্দ্রহার, কর্ণে ছিল না কুসুমকলির অলঙ্কার, তবু তার সৌন্দর্য নেমে এসেছিল গোলাপি জলের নদীর মতো বক্ষপথ বেয়ে, দূর সমুদ্রের অন্তহীন নীলিমায়।

আমি তখন তটভূমিতে বসে ঝিনুকের ভিতর মুক্তা খুঁজেছি, ঢেউয়ের পর ঢেউ ভেঙে পড়েছে পায়ের কাছে, আকাশ ভরে গেছে গোধূলির রঙে।

কিন্তু যে মুক্তা খুঁজেছি সারাজীবন, 
সে ছিল না ঝিনুকের গভীরে, ছিল না সমুদ্রের অতল জলে।

সে ছিল এক মুহূর্তের দৃষ্টিতে, একটি নীরব সন্ধ্যার স্মৃতিতে, একটি হারিয়ে যাওয়া মুখের মায়ায় - 

যা আজও জোয়ার হয়ে ফিরে আসে, 
আর আমাকে ডেকে বলে - ভালোবাসার সব মুক্তা পাওয়া যায় না কখনও।


৩৯.     সমুদ্রের আহ্বান


এই বনছায়ায় রাত্রি নামে ধীরে ধীরে,
কুন্তল-কালো অন্ধকার মেলে দেয় তার ডানা,
অদূরে অকূল সাগর
অজানা কোনো ভাষায় ডেকে যায় আমাকে।

কার প্রতীক্ষায় বসে আছি আমি
এই নিঃস্বীম আঁধারের অলিন্দে?
কোন্‌ হারানো মুখ ভেসে ওঠে
জোয়ারের গোপন জলে?

ঝিঁঝিঁরা ডাকুক অবিরাম,
কালো পেঁচা চমকে দিয়ে উড়ে যাক
ঘন বৃক্ষের মাথার উপর দিয়ে—
তবু আজ আর ঘরে থাকা হবে না।

আমি দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ব,
রাত্রির নৈঃশব্দ্য পায়ে মেখে,
ধীরে ধীরে হেঁটে যাব
সেই আদিম জলরেখার দিকে।

সমুদ্র আমাকে চেনে -
হয়তো বহু জন্মের পরিচয়ে,
তাই তার ঢেউয়ের ভেতর শুনি
আমারই বিস্মৃত নামের উচ্চারণ।

পথে যদি ভাঙা ঝিনুক বিঁধে যায় পায়ে,
বিঁধুক -
কিছু ব্যথা তো আশীর্বাদের মতো,
কিছু রক্তক্ষরণও পথ দেখায়।

আমি চলে যাব আরও দূরে,
যেখানে আকাশ ও জল
নিভৃত আলিঙ্গনে মিশে থাকে,
আর রাত্রি তার সমস্ত অন্ধকার দিয়ে
ঢেকে রাখে পৃথিবীর গভীরতম মায়া।


৪০.      মনে রেখো


মনে রেখো, একদিন আমিও এসেছিলাম তোমার নিঃসঙ্গ বিকেলের জানালায়, স্নিগ্ধ রোদের মতো। তোমার অব্যক্ত কথাগুলো চুপচাপ কুড়িয়ে নিয়েছিলাম শুকনো পাতার শব্দের মতো।

মনে রেখো, একদিন আমিও ছিলাম তোমার আকাশের নীলতম মেঘ, যে মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামতে চেয়েছিল তোমার ক্লান্ত হৃদয়ের উপরে। কিন্তু ঋতু বদলেছে, পথ বদলেছে, তবু বদলায়নি ভালোবাসার রঙ।

যদি কোনো জ্যোৎস্নারাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, আর দূরের কোনো বাঁশির সুর বুকে পুরোনো ব্যথা জাগিয়ে তোলে, মনে রেখো, সেই সুরের ভিতরে আমিও আছি।

যদি দুঃখের আগুনে পুড়ে যায় দিন, যদি চারদিক শূন্য লাগে, তবে চোখ বুজে একবার ডাকো, আমি হয়তো আসব না, তবু আমার ভালোবাসা ছায়ার মতো এসে দাঁড়াবে পাশে।

যে হাতে প্রথম কাঁপন তুলেছিলে, যে নামে প্রথম জেগেছিল ভোর, যে নদী একদিন তোমার সাগরের দিকে নিঃশব্দে বয়ে গিয়েছিল, একা লাগে যদি, মনে রেখো তাকে।

কারণ কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু চলে যায় না; তারা থেকে যায় হৃদয়ের গভীরতম অলিন্দে, দূরের তারার মতো, দেখা যায় না সবসময়, তবু আলো দেয় আজীবন।


৪১.     অভিসারিণী মেয়ে


অভিসারিণী মেয়ে, কার নাম নিয়ে, জেগেছিলে নিশিথে? কার পদধ্বনি শুনে দূর গগনে, হারালে স্বপ্নস্মৃতিতে?

অভিসারিণী মেয়ে, জোছনা বিছিয়ে, কারে ডেকেছিলে চুপে? কোন সে পথিক, হৃদয় ছুঁয়ে, মিশেছিল তোমার রূপে?

অভিসারিণী মেয়ে, শ্রাবণধারা নিয়ে, এসেছিল কি সে একদিন? কদমের গন্ধে, ভেজা আনন্দে, রঙিন হয়েছিল স্বপ্মদিন?

অভিসারিণী মেয়ে, সন্ধ্যার ছায়ে, কার তরে বেঁধেছিলে মালা? কার অচেনা চোখে, মুগ্ধতার আলোকে, জ্বালিয়েছিলে প্রেমের জ্বালা?

দেখনি কি ফিরে, অভিসারিণী মেয়ে, আরও কত প্রাণ ছিল পথের ধারে? তবু এক মুখেরই, অনন্ত প্রতীক্ষায়, ডুবেছিলে বিষণ্ন অন্ধকারে।

আজও কি বসে, অভিসারিণী মেয়ে, খোলা কেশে নদীর কূলে? নাকি সে এসেছে, তোমারই পাশে, রাখেনি আর হৃদয় ভুলে?

বকুলের ছায়ে, দুটি প্রাণ মিলে, লিখেছে গোপন অনুরাগ- অভিসারিণী মেয়ে, প্রেমেরই নেয়ে, ভাসাও চিরন্তন রাগ।


৪২.     মেয়ে তুমি 


আজ সারাদিন আকাশটা তোমার মতোই ছিল, কিছুটা অভিমানী, কিছুটা কোমল, আর ভীষণ মায়াময়। দূরের মেঘেরা যখন ধীরে ধীরে শহরের মাথার ওপর জড়ো হচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল তারা বুঝি তোমারই কোনো অপ্রকাশিত কথা বয়ে আনছে।

জানো, কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের কথা মনে পড়লে ঋতুরও রং বদলে যায়। তোমাকে ভাবলেই আমার কাছে বর্ষা শুধু বৃষ্টি হয়ে নামে না, নামে কদমফুলের গন্ধ হয়ে, জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ হয়ে, কিংবা ভেজা বাতাসে হারিয়ে যাওয়া কোনো পুরোনো গানের সুর হয়ে।

এই শহরের ভিড়ে কত মানুষ হেঁটে যায়, কত মুখ আসে-যায়, অথচ আমার দিনগুলো এখনো তোমার নামের চারপাশেই ঘোরে। সকালের প্রথম আলোয় তোমার ছায়া দেখি, দুপুরের নির্জনতায় তোমার অনুপস্থিতি টের পাই, আর সন্ধ্যা নামলেই মনে হয়, কোথাও একজন মেয়ে আছে, যার জন্য এতগুলো রঙ, এতগুলো ঋতু, এতগুলো অপেক্ষা জমে আছে।

আমি জানি না ভালোবাসা ঠিক কাকে বলে। শুধু জানি, তোমার কথা মনে হলে বুকের ভেতর এক ধরনের শান্ত বেদনা জেগে ওঠে। সেই বেদনা কষ্ট নয়, আবার সুখও নয়, যেন দূরের কোনো নদী নিরন্তর বয়ে চলেছে, আর তার জলে ভাসছে তোমার নাম।

যদি কোনোদিন হঠাৎ বৃষ্টিভেজা বিকেলে তোমার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দখিন হাওয়া চুল উড়িয়ে দেয়, তবে একবার চোখ বুজে শুনো। হয়তো বাতাসের ভেতরেই আমার না-বলা কথাগুলো ভেসে যাবে তোমার কাছে।

কারণ এই শহরে এখনো একটি হৃদয় আছে, যে প্রতিদিন নতুন করে তোমাকে ভালোবাসার অজুহাত খুঁজে পায়।
আশা করি এতে আপনার মূল লেখার মায়া, অপেক্ষা ও নীরব প্রেমের আবহ বজায় আছে।


৪৩.      প্রশান্ত জমিন


দুহাত প্রসারিত রেখেছি তোমার জন্য, যেন শ্রাবণ শেষে ধুয়ে যাওয়া সবুজ কোনো মাঠ, যেখানে ক্লান্ত পাখিরা ফিরে আসে সন্ধ্যার আগে, আর বাতাস রাখে তার গোপন ভালোবাসার কথা।

বুক আমার প্রশান্ত জমিন, এখানে কোনো কাঁটাতার নেই, নেই অবিশ্বাসের শুষ্ক মরুভূমি, শুধু তোমার পদচিহ্নের অপেক্ষায় নরম ঘাসেরা জেগে আছে অনিমেষ।

চোখ দুটো উন্মুখ আকাশের মতো, দিগন্তে তোমার আগমনের রঙ খুঁজি- কোন মেঘের আড়াল ভেঙে তুমি আসবে, কোন আলোর নদী বেয়ে ছুঁয়ে যাবে আমার অন্তর।

আর দ্বিধা কিসের, প্রিয়? সব অভিমান নদীতে ভাসিয়ে দাও, সব সংশয় ঝরিয়ে দাও বৃষ্টির মতো। এসো, আমার হৃদয়ের এই নির্জন উঠোনে তোমার সমস্ত স্বপ্ন নিয়ে ঠাঁই নাও।

তোমাকে ধারণ করার জন্যই এতদিন ধরে সাজিয়ে রেখেছি এই পৃথিবী- এক মুঠো জোছনা, কিছু কদমফুলের গন্ধ, আর অগণিত ভালোবাসা।

এসো, আমার প্রসারিত বাহুর ভেতর একটি অনন্ত আশ্রয়ের মতো, যেখানে প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয় বসন্ত, আর প্রতিটি নিশ্বাসে উচ্চারিত হয়- শুধুই তোমার নাম।


৪৪.     প্রজাপতির গান


তোমাকে বুকে জড়ালেই আমার আকাশজুড়ে মেঘেরা গুরুগম্ভীর সুরে জেগে ওঠে, ঝমঝম বৃষ্টির ছন্দ নেমে আসে পৃথিবীর বুকে-  যমুনার জলে হঠাৎ ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস বাড়ে, কাশফুলের শুভ্রতা লাজুক রাঙায় চন্দনের আভায়।

তোমার বুকের ক্ষুদ্র তিলেও জেগে ওঠে শিহরণ, খয়েরি ডানার চিলেরা ভেসে যায় মেঘের অলিন্দে, ঝাউপাতার মতো এলোমেলো বাতাস এসে আলতো করে ছুঁয়ে দেয় তোমার শরীর, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অব্যক্ত কোনো মুগ্ধতার গন্ধ।

বৃষ্টিস্নাত ক্ষণে লতা, গুল্ম, বৃক্ষ আর ফুল একসঙ্গে ফুটে ওঠে নবীন বিস্ময়ে, বাগানের সবচেয়ে গোপন ফুলটি ছিঁড়তে গিয়ে আমি ধীরে ধীরে প্রজাপতি হয়ে যাই - রঙিন ডানায় মেখে নিই তোমারই স্বপ্ন।

আর তুমি, দুই চোখে শ্রাবণের নিবিড় নীলিমা নিয়ে, নীরবে শুনতে থাকো সেই প্রজাপতির গান- যেখানে প্রেম মানে শুধু ছোঁয়া নয়, একটি ফুলের হৃদয় থেকে আরেকটি ফুলের হৃদয়ে সুগন্ধ হয়ে উড়ে যাওয়া।



৪৫.     ঋদ্ধতা : দেহের অগ্নি



আমার হৃৎস্পন্দন প্রথম কেঁপে উঠেছিল তোমার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে, সে কী গোপন কম্পন! মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টিতে ফেটে থাকা মাটিতে হঠাৎ নেমে এসেছে প্রথম বর্ষার জল।

তুমি প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিলে এক হেমন্ত-রাত্রির গভীর নির্জনতায়, যখন জানালার বাইরে শিশির নেমে আসছিল নিঃশব্দে, আর তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরছিল আমার সমগ্র সত্তাকে।

সেই আগুনে পুড়েছিল আমার সকল সংকোচ, সকল অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা। তোমার চোখের গভীর মাদকতায় আমি হারিয়েছিলাম পথ, হারিয়েছিলাম নিজেকেও।

তারপর একদিন শ্রাবণের বৃষ্টির মতো তুমি নেমে এলে, চুলের ভেজা গন্ধে, কাঁপতে থাকা অধরের নীরব আহ্বানে। তোমার কাঁধে মুখ রেখে আমি শুনেছিলাম দেহেরও একটি গোপন ভাষা আছে, যে ভাষা শুধু প্রেম জানে, শুধু স্পর্শ জানে।

মুঠো মুঠো ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের দুজনের মধ্যবর্তী সমস্ত দূরত্বে। তোমার বক্ষের উত্থান-পতন, আমার কাঁপা নিঃশ্বাস, আর রাত্রির নিবিড় নীরবতা, সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক অনির্বচনীয় শৃঙ্গার সংগীত।

দীর্ঘ সহযাপনের পর আমরা ঋদ্ধ হয়েছিলাম, শুধু হৃদয়ের বন্ধনে নয়, দেহের গভীর স্বীকৃতিতেও। যেন দুটি নদী নিজস্ব নাম ভুলে গিয়ে একই স্রোতে বয়ে চলে দূর সমুদ্রমুখে।


৪৬.       চুম্বনের কাছে পরাজয়


সমাজের সমস্ত নিষেধ, বংশের অহংকার, রীতি-নীতির উঁচু প্রাচীর- কিছুই মানে না আমার কপালে রেখে যাওয়া তোমার সেই চুম্বন।

তুমি যখন বিদায়ের আগে অলস চোখে তাকিয়ে বলো- 'ভালো থেকো',  তখন মনে হয় মৃত্যুর গভীর অন্ধকার ফুঁড়ে আবার জেগে উঠছে শরীর, রক্তে ফিরে আসছে অজানা কোনো বসন্তের উত্তাপ।

আমি জানি না, আমার আগে কতজন পেয়েছে তোমার ঠোঁটের এই মায়া, কতজনের নিঃশ্বাসে মিশেছে তোমার গোপন সুগন্ধ।

তবু ঈর্ষা নয়, আমি শুধু চাই তোমার সমস্ত অতীতের পাশে একটি দীর্ঘ বর্তমান হয়ে থাকতে।

যদি স্মৃতিরা তোমার গলায় গোলাপের মালা পরায়, তবে আমি সেই গোলাপের কাঁটাগুলো নিজ গলায় ধারণ করব- কারণ প্রেমে সুখের চেয়ে ব্যথাই অধিক বিশ্বস্ত।

এসো, আজ ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলি--

তোমার ঠোঁটের ধার গোলাপের কাঁটার চেয়েও তীক্ষ্ণ, আর তার কোমলতা পৃথিবীর সমস্ত শিশিরের চেয়েও মধুর।

যদি দহনই নিয়তি হয়, তবে তোমার ঠোঁটের আগুনে পুড়ি, যদি ক্ষতই প্রাপ্তি হয়, তবে তোমার চুম্বনের ক্ষত বুকে ধারণ করে বাঁচি।

তোমার নিঃশ্বাস যখন আমার মুখের কাছে এসে থামে, মনে হয় দুই তীর ভেঙে এক নদী আরেক নদীর ভেতরে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে।

নদীর কিনারে তখন দিগন্ত আর আকাশ একটি নীল আলিঙ্গনে আবদ্ধ, ঝাউ, বট, দেবদারু পাতায় পাতায় বিনিময় করছে প্রাচীন প্রেমের গোপন ভাষা।

আর আমরা দুই শরীরের ভেতরে জেগে থাকা একটি মাত্র আকাঙ্ক্ষা, একটি মাত্র স্পন্দন, একটি মাত্র চুম্বনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই, যেন পৃথিবীর আদিমতম প্রেম আবার জন্ম নিচ্ছে আমাদের ঠোঁটের ভেতর।


৪৭.      গোধূলির ওপারে তুমি


মনখারাপের নীল বিকেলে
হঠাৎ তোমার কথা এসে বসে জানালার ধারে,
যেন বহুদিনের চেনা কোনো পাখি
ভুলে যাওয়া বাসার পথ খুঁজে ফেরে।

জানি না তুমি তখন কোথায় -
কোন আকাশের নিচে, কার কথার ভেলায় ভেসে,
কার চোখের গভীরে রেখে আসো
তোমার দিনের শেষ আলো।

তবু অদ্ভুত,
যখনই হৃদয় বিষণ্ণতার শেওলায় ঢেকে যায়,
তখনই তোমার স্মৃতি
কদমফুলের গন্ধ হয়ে নামে নির্জন সন্ধ্যায়।

মনে হয়, তুমি খুব দূরে -
এত দূরে যে ডাকলেও পৌঁছাবে না স্বর,
তবু কেন ভালোবাসারা জেগে ওঠে একে একে,
নিভে যাওয়া প্রদীপের শেষ শিখার মতো?

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে -
আকাশে গোধূলির রঙ মিশে যায় ধূসর মেঘে,
আর তুমি স্মৃতির মুখগুলো মুছে মুছে
আরও দূরে হেঁটে যাও সময়ের পথে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি -
পুরোনো কোনো বৃক্ষের মতো একা,
পাতার ফাঁকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে।

হয়তো একদিন
সব স্মৃতি ঝরে যাবে শুকনো শিউলির মতো,
তবু কোনো এক বিষণ্ণ গোধূলিতে
তোমার নামের অক্ষরগুলো
আবার ভেসে উঠবে আমার আকাশে।

কারণ কিছু মানুষ চলে যায়,
কিন্তু চলে যায় না তাদের রেখে যাওয়া মায়া-
সে মায়া সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা
দুঃখ-কাতরের হৃদয়ের প্রদীপে
নিভতে না-জানা আলো হয়ে জ্বলে।


৪৮.     কবিতার কাছে


বেশ্যারা আমার কবিতা পড়ে না- 
যদি পড়ত, হয়তো কোনো এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় হিসেবের খাতা বন্ধ করে দরজার ওপাশে বসত চুপচাপ।

আমি জানি, মানুষের শরীরেরও ক্লান্তি আছে, 
আছে অপমানের দীর্ঘ করিডোর, 
যেখানে প্রতিটি দরজায় ঝুলে থাকে অবহেলার মরিচাধরা তালা।

যদি তারা আমার কবিতা পড়ত, 
হয়তো দেখতে পেত- পৃথিবী এখনো শেষ হয়ে যায়নি, কোনো কোনো নদী এখনো নাম না জানা ফুলের গন্ধ বয়ে আনে।

তখন তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে 
নিজেদের নতুন করে চিনত, দেখত- দেহের চেয়েও বড়ো একটি পরিচয় আছে, যেখানে চোখের জলে 
জন্ম নেয় অগণিত নক্ষত্র।

আমার কবিতার প্রেমে নয়, 
হয়তো তারা প্রেমে পড়ত নিজেদের হারিয়ে যাওয়া আত্মার,  যে আত্মা বহুদিন ধরে অন্ধকার ঘরে বসে অপেক্ষা করছে এক মুঠো ভোরের জন্য।

আর আমি দূর থেকে শুধু দেখতাম - 
একেকটি ক্লান্ত মুখ কী আশ্চর্য আলোয় ভরে উঠছে, যেন বহুদিনের বন্দি পাখিরা খুলে দিয়েছে ডানা।

সেদিন আমার কবিতা কিছুই বলত না, 
শুধু নীরবে পাশে বসে থাকত - যেমন বসে থাকে পূর্ণিমার চাঁদ একাকী সমুদ্রের পাশে, কোনো দাবি ছাড়া, কেবল মায়া হয়ে।


৪৯.    সিন্ড্রেলার ঘুম


মধ্যরাতে কিছু অবাধ্য বাতাস জানালার কাছে
এসে শব্দ করে বলে - খুলে দাও।
জ্যোতির্ময় এক আলোর বিভায় ঝলমলিয়ে উঠি,
কানের কাছে গুণগুণ করে জোনাকি।

তখনও নিশ্চুপ এক তরুণী -
তখনও রাজকন্যা সিন্ড্রেলার ঘুম কিছুতেই ভাঙানো গেল না।

চাঁদের রুপালি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে পরীরা,
তাদের আঙুলে লেগে থাকে নক্ষত্রের গুঁড়ো।
নিভৃত বাগানে শিউলি ফুলেরা
সাদা ডানায় লিখে যায় গোপন বার্তা।

দূরের কোনো অদেখা নদী
ঘুমঘোরে গেয়ে ওঠে বিষণ্ণ জলসঙ্গীত,
আর রাতের বুকজুড়ে ভেসে বেড়ায়
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের পালতোলা নৌকা।

জানালার কাঁচে কাঁচে জমে ওঠে কুয়াশার অক্ষর,
সেখানে কে যেন লিখে যায় -
'জেগে ওঠো, পৃথিবী আজ মায়ার পোশাক 
পরে আছে।'

তবু তরুণীর চোখের পাতায়
অপরূপ নিদ্রার নীল প্রজাপতি,
তবু তার ঠোঁটের কোণে
অব্যক্ত কোনো রূপকথার হাসি।

শেষরাতে যখন আকাশের গায়ে
প্রথম ভোরের রঙ ছড়িয়ে পড়ে,
একটি জোনাকি নিঃশব্দে এসে বসে তার কপালে-
হয়তো তখনই স্বপ্নের রাজ্য থেকে ফিরে আসে সে।

আর অবাধ্য বাতাস, পরীরা, চাঁদ আর জোনাকিরা
নিভৃত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে -
এত আলো, এত ডাক, এত মায়ার পরেও
কী গভীর হতে পারে এক রাজকন্যার ঘুম!


৫০.    কঙ্কণা 


সন্ধ্যা নামলে শহরের বাতিগুলো এক এক করে জ্বলে ওঠে, আর আমার ভেতরে নিভে যায় অসংখ্য অনুচ্চারিত স্বপ্নকথা।

সেইসব নিভে যাওয়া আলোর পাশে হঠাৎ 
তুমি এসে বসো - নদীর মতো শান্ত নয়, 
বৃষ্টির মতোও নয়, বরং শুকনো মাটিতে প্রথম 
সবুজ ঘাসের মতো।

তোমার চোখে কোনো পৌরাণিক রহস্য নেই, 
আছে ঘরে ফেরার নিশ্চিন্ত পথ, 
আছে ক্লান্ত দিনের শেষে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা 
চায়ের উষ্ণতার মতো।

আমি যখন পৃথিবীর কাছে নিজেকেই 
অপরিচিত মনে করি, তখন তোমার কণ্ঠস্বর জানালার পাশে রাখা প্রদীপের মতো আমাকে নিজের নাম মনে করিয়ে দেয়।

কঙ্কণা, তুমি কোনো রূপকথার নারী নও - 
তুমি সেই মানুষ, যার কাছে এলে জীবনের সমস্ত কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, 
আর হৃদয়ের ভাঙা ঘরগুলোতে আবার আলো 
জ্বলে ওঠে।

তোমাকে ভালোবাসা মানে কেবল সৌন্দর্য 
দেখা নয় - বরং এই অস্থির পৃথিবীতে একটুখানি আশ্রয়ের প্রশান্তি খুঁজে পাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন