সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

যা পেয়েছি, তাতেই পূর্ণতা


যা পেয়েছি,  তাতেই পূর্ণতা ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - জুন  - ২০২৬ ইং

উৎসর্গ  -


ভূমিকা -

মানুষের জীবন মূলত অনুভূতির এক অবিরাম যাত্রা। সেই যাত্রার পথেই কখনো প্রেম এসে হৃদয়কে আলোকিত করে, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস নিঃশব্দে জমে ওঠে, আবার কখনো প্রকৃতি তার রঙ, গন্ধ ও ঋতুচক্রের মায়ায় আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে যায়। কবিতা সেই স্পর্শেরই ভাষা, অনুভবেরই অনুরণন।

এই গ্রন্থের কবিতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বা অলংকারের প্রদর্শনী নয়; বরং সময়, স্মৃতি, আবেগ এবং জীবনানুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। এখানে প্রেম কখনো নিবিড় সান্নিধ্যের, কখনো অপেক্ষার; বিরহ কখনো নীরব অভিমানের, কখনো হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখের স্মৃতিবাহী। একই সঙ্গে প্রকৃতি তার চিরন্তন রূপে উপস্থিত হয়েছে—বর্ষার বৃষ্টি, কদমফুল, জোছনার আলো, নদীর ঢেউ কিংবা ঋতুবদলের মৃদু আহ্বানে।

সমকালীন জীবনের নানা অনুভব, মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব, ভালোবাসার অনির্বচনীয় আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক - এসবই এই কবিতাগুলোর প্রধান সুর। আধুনিক সময়ের দ্রুতগামী জীবনে হারিয়ে যেতে বসা কোমল অনুভূতিগুলোকে শব্দের শরীরে ধরে রাখার এক আন্তরিক প্রয়াস রয়েছে এই সংকলনে।

যদি কোনো কবিতা পাঠকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আনন্দ, বেদনা কিংবা ভালোবাসার সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্যও সেতুবন্ধন রচনা করতে পারে, তবেই এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।

পাঠকের হাতে এই বই তুলে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। আন্তরিক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রইল সকল পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং সাহিত্যপ্রেমী মানুষের প্রতি।

কোয়েল তালুকদার 
দক্ষিণ খান, ঢাকা। 



১.      তোমাকে দেখা 


তোমাকেই দেখা শেষ হলো না -
তাই আকাশের দিকে তাকাই বারবার,
যেন মেঘের ছায়ায় লুকিয়ে আছো তুমি
একটি অপূর্ণ বিকেলের মতো।

নদীর কাছে গেলে জল কেঁপে ওঠে,
হয়তো সে-ও তোমার খবর জানে 
ঢেউয়েরা গোপনে বলে যায় -
কাউকে কখনও পুরো দেখা হয় না।

শিউলি ঝরা ভোরে, জোনাকিভেজা মধ্যরাতে,
চাঁদের ম্লান আলোয় কিংবা
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে -
তোমার ছায়া এসে বসে থাকে
আমার নিঃসঙ্গ জানালায়।

আমি যতই তোমাকে দেখি,
ততই মনে হয় -
তোমার ভেতরে আরও একটি তুমি আছে,
তারও ভেতরে আরেকটি অচেনা আলো,
যার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
ফুরিয়ে যায় জীবন।

তোমাকেই দেখা শেষ হলো না,
আর কবে কাকে দেখব?
এই প্রশ্ন নিয়েই হয়তো
একদিন নক্ষত্র হয়ে যাবো দূর আকাশে।

তখন যদি রাতের শেষে
তুমি একবার মুখ তুলে তাকাও,
দেখবে - একটি তারা নিঃশব্দে জ্বলছে,
শুধু তোমাকে দেখার জন্য, 
শুধু তোমাকেই।


২.     নদীর কাছে


নদী দেখলেই আমার মনে হয়, 
পৃথিবীর সব ক্লান্তির একটি গোপন ঠিকানা আছে, 
আর তার নাম নদী।

নদীর জলে মুখ রাখলে শোনা যায় 
বহুদিন আগের হারিয়ে যাওয়া মানুষের ডাক, 
ভেসে আসে কাশবনের নিঃশ্বাস, দূর কোনো গোধূলির মায়ামাখা শঙ্খধ্বনি।

আমি তখন নদীর দিকে চেয়ে থাকি - 
যেন সে কোনো জলরাশি নয়, বরং নীল শাড়ি পরা 
এক মায়াবতী, চুলে যার বৃষ্টির গন্ধ, চোখে যার 
হাজার বছরের বিষণ্নতা।

নদী দেখলেই ভেসে যেতে ইচ্ছে করে, 
কোনো গন্তব্য ছাড়া, 
শুধু স্রোতের হাতে হাত রেখে অচেনা আকাশের নিচে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

নদী জানে - মানুষের বুকের ভিতর কত 
অপ্রকাশিত কান্না থাকে, কত অসমাপ্ত প্রেম, 
কত চিঠি লেখা হয় না কখনও।

তাই সন্ধ্যা নামলে সে নীরবে আমার পাশে এসে বসে, জলের পাতায় আঁকে চাঁদের মুখ, 
আর বলে - যেও না কোথাও, তোমার সব দুঃখ আমাকে দাও, আমি সাগর পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাব।

তখন মনে হয়, নদী শুধু নদী নয় -
সে এক অনন্ত মায়া, যার বুকে ডুবে যায় না মানুষ, 
ডুবে যায় শুধু তার সমস্ত একাকীত্ব।


৩.     মায়ার পৃথিবী


এই পৃথিবীতে এসে প্রথম দেখেছি, নদীর বুকে ভাসমান বিকেলের আলো, সাগরের অন্তহীন নীল বিষণ্নতা, চাঁদের গায়ে লেগে থাকা রূপালি নিঃসঙ্গতা, সূর্যের অগ্নিময় আহ্বান, আর দূর আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রদের নীরব সংসার।

তারপর একদিন দেখা হলো তোমার সাথে, যেন বহু জন্মের পরিচিত কোনো স্বপ্ন, যে স্বপ্নের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল অজস্র ফুলের গন্ধ, অজানা পাখির ডাক, আর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বিকেল।

তুমি এলে, পৃথিবীটা হঠাৎ আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠল। গাছের পাতায় পাতায় জমল মায়া, বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় জন্ম নিল প্রেম, আর আমার সমস্ত একাকীত্ব তোমার নামের কাছে এসে মাথা নত করল।

ভাবতাম, এভাবেই থাকবে চিরকাল, যেমন নদী সাগরের দিকে যায়, যেমন রাত চাঁদের জন্য অপেক্ষা করে, তেমন করেই তুমি জড়িয়ে থাকবে আমার জীবনকাল জুড়ে।

কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নির্মম। ফুল ঝরে যায়, নদী শুকিয়ে যায়, তারারাও একদিন নিভে যায়।
ভালোবাসারও মৃত্যু হয়,  নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে, অথবা হঠাৎ ঝড়ের মতো।

তখন বিদায়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখের কোণে জমে ওঠে প্রথম বৃষ্টির জল, মনে হয়, পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে মানুষ যেমন শেষবারের মতো চারপাশের সবকিছু ছুঁয়ে দেখতে চায়, তেমনি আমিও ছুঁয়ে দেখতে চাই তোমার সমস্ত স্মৃতি।

আর অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বুঝি,  ভালোবাসা মরে না পুরোপুরি, সে শুধু রূপ বদলায়, চলে যায় দূরের কোনো নক্ষত্রলোকে, যেখানে আজও তুমি আছো, আর আমি আছি, দুজনেই পৃথিবীর মায়া হয়ে।


৪.      নিঃশব্দলোকের সন্ধানে


মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে
শব্দের সমস্ত নদী পেরিয়ে
চলে যাই এক অচেনা নিঃশব্দলোকের দিকে -
যেখানে মেঘেরা আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কিন্তু কোনো গর্জন তোলে না;
ঝিঁঝি পোকারা ডানা মেলে,
তবু গানের কোনো তরঙ্গ ওঠে না বাতাসে।

সেখানে নদী আছে -
কিন্তু জলের বুকে কোনো ছলাৎছল নেই,
চাঁদ আছে -
কিন্তু আলো ঝরে নীরব শিশিরের মতো।

মানুষও আছে হয়তো,
তবু কেউ কাউকে আঘাত করে না শব্দের তীরে,
কোনো বঞ্চনা সেখানে
মর্মরধ্বনি হয়ে হৃদয়ে বাজে না।

আমি বহুদিন ধরে
সেই নিঃশব্দলোকের ঠিকানা খুঁজছি -
ধুলোমাখা পথের শেষে,
অস্তগামী সূর্যের লাল খামে,
নক্ষত্রের ঘুমন্ত বাগানে।

যতদূর যাই, ততই বুঝি -
সেই দেশ কোনো মানচিত্রে আঁকা নেই,
কোনো পথিক তার পথ জানে না।

হয়তো সে নিঃশব্দলোক
পৃথিবীর বাইরে কোথাও নয় -
আমাদের ক্লান্ত হৃদয়ের গভীরে
এক গোপন হ্রদের মতো লুকিয়ে আছে।

যেখানে একদিন
সব কান্না ঘুমিয়ে পড়ে,
সব অভিমান পাখি হয়ে উড়ে যায়,
আর আত্মা, দীর্ঘ যাত্রার শেষে,
নীরবতার সাদা ফুলের নিচে
মাথা রেখে বলে -
এবার একটু বিশ্রাম নিই।


৫.     মায়াবতী ও আনন্দ শহর


ঊনিশ বছর আগে আনন্দ শহর কোলকাতায়
সন্ধ্যা নেমেছিল শঙ্খের দীর্ঘ সুরে,
আকাশ জুড়ে জ্বলছিল প্রদীপের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্র,
আমার সাথে ছিল মায়াবতী।

সেই সময় পৃথিবীটাকে বড় সহজ মনে হতো,
ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি যেন দূর কোনো স্বপ্নের ডাক,
ভিড়ের মধ্যেও হাতের কাছে পাওয়া যেত
একটি নির্ভরতার উষ্ণতা -

যে শহরে জানলা বন্ধ থাকলেও
পাখিদের গান ঠিক ভোর এনে দেয়,
সেই শহরের অলিগলিতে
আমরা হেঁটেছিলাম নিঃশব্দে -
কথার চেয়ে বেশি কথা ছিল চোখে।

গঙ্গার বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিত,
আমি ভাবতাম -
মানুষের জীবনে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য
বোধহয় আর নেই।

তারপর কত ঋতু চলে গেল,
কত নদী বদলে ফেলল নিজের পথ,
কত মুখ এলো, কত মুখ হারাল -
কিন্তু লক্ষ্মীপূজার সেই সন্ধ্যা
আজও বুকের ভেতর প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

এখনও কোথাও শঙ্খ বাজলে
মনে হয়, কোলকাতার কোনো পুরোনো গলি থেকে
মায়াবতী হেঁটে আসছে ধীরে ধীরে।

গঙ্গার জলে এখনও হয়ত সন্ধ্যার আলো পড়ে
দূরের কোনো নৌকার ক্ষীণ প্রদীপ মায়ার মতো 
কাঁপতে থাকে জলের বুকে -
আমরা কেবল তীরে দাঁড়িয়ে নেই...  

তবুও গঙ্গা নীরবে বয়ে নিয়ে যায় আমাদের 
না-বলা সব কথামালা,
সেই না-থাকার মধ্যেই সবচেয়ে গভীরভাবে রয়ে যায় মায়াবতী, রয়ে যায় আনন্দ শহর -
রয়ে যায় এক অনন্ত জ্যোৎস্নাভেজা রাত্রি।


৬.     শব্দহীন বেদনা


এমন কিছু দুঃখ আছে, যাদের কোনো নাম নেই, 
কোনো অভিধান নেই, 
কোনো ভাষা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।

বুকের ভেতর তারা নিঃশব্দে বাসা বাঁধে, 
যেমন অন্ধকার রাতের গভীরে কোনো হারানো পাখির কান্না- শোনা যায় না, 
তবু আকাশ জুড়ে তার প্রতিধ্বনি।

আমি অনেকবার শব্দ খুঁজেছি, 
অনেকবার কবিতার কাছে গিয়েছি, 
নদীর কাছে, বৃষ্টির কাছে, 
জোনাকির ক্ষুদ্র আলোতেও লিখতে চেয়েছি 
আমার গোপন বিষাদের ইতিহাস।

কিন্তু শব্দেরা বড় অসহায়। 
তারা কেবল দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, ভেতরের ঘরে ঢুকতে পারে না।

আমার কিছু বেদনা আছে অবোলা প্রাণীর চোখের মতো - শুধু চেয়ে থাকে, কিছু বলতে পারে না। 
তাদের ভাষা নেই, আছে শুধু দীর্ঘশ্বাসের মতো এক অনন্ত নীরবতা।

তখন মনে হয়, 
পৃথিবীর সমস্ত কবিতার চেয়েও গভীর 
একটি অপ্রকাশিত কান্না আমার ভিতরে 
ঘুমিয়ে আছে।

আর আমি, সেই কান্নার পাহারাদার হয়ে, 
প্রতিদিন একটু একটু করে শিখে যাই - 
সব দুঃখ বলা যায় না, কিছু দুঃখ শুধু তারাদের 
মতো দূরে জ্বলে থাকে, 
আর নিঃশব্দে মানুষের হৃদয় আলোকিত করে।


৭.     সর্বনাশের দিনলিপি


প্রথম সর্বনাশ করেছি প্রেম করে - এক জোড়া চোখের ভেতর পুরো আকাশটাকে গুটিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। ভাবতাম, ভালোবাসা মানেই চিরবসন্ত, কোনো পাতা ঝরবে না কখনও।

দ্বিতীয় সর্বনাশ করেছি বিয়ে করে - দু'জন মানুষের স্বপ্ন যে একই ছাদের নিচে এসে কত ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, সে পাঠ তখনও জানা ছিল না। তবু হাত ধরেছিলাম, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

তৃতীয় সর্বনাশ করেছি সংসার পেতে - চালের হিসেব, ডালের হিসেব, অভাবের হিসেব, অভিমানের হিসেব - দিনশেষে দেখলাম, সবচেয়ে কঠিন অঙ্ক মানুষকে বুঝে ওঠা।

এখন জীবনের কী মজা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি-
সুখ আসে অতিথির মতো, দুঃখ থাকে ঘরের মানুষের মতো। তবু ভোর হলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, এক চিলতে রোদ এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করে।

তাই সর্বনাশের গল্প বলতে বলতে হাসি পেয়ে যায়- 
এই প্রেম, এই বিয়ে, এই সংসার, সব হারিয়েও মানুষ আবার ভালোবাসে।

বোধহয় এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সর্বনাশ।


৮.      হাস্নাহেনার রাত


ভাঙাচোরা হৃদয় আমার, আত্মাও আজ স্পন্দনহীন- যেন বহুদিন আগে নিভে যাওয়া কোনো প্রদীপ, যার ধোঁয়া এখনো ঘুরে বেড়ায় স্মৃতির অন্ধকার ঘরে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো, দেখবে না আমাকে ঠিক আগের মতো - চোখের ভেতর আর সেই নীল বিস্ময় নেই, স্বপ্নের জানালাগুলোও এক এক করে বন্ধ হয়ে গেছে।

তবু দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে - নিঃশব্দে, নির্ভয়ে, যেন পৃথিবীর সমস্ত বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের এক গোপন প্রতিবাদ।

তাদের গন্ধ ভেসে আসে রাতের শীতল বাতাসে, আর আমি ভাবি - ভালোবাসা বোধহয় মানুষ নয়, কোনো মুখও নয়; ভালোবাসা হয়তো সেই হাস্নাহেনা, যে ঝরে যায়, তবু সুবাস রেখে যায় দীর্ঘকাল।

তুমি যদি আসো, আমার ভাঙা হৃদয়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ নীরব থেকো - দেখবে, সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও একটু আলো রয়ে যায়, একটু গন্ধ রয়ে যায়, আর দূরে কোথাও, চাঁদের সাদা বিষণ্নতায়, হাস্নাহেনারা এখনো ফুটে থাকে।



৯.       বাতাসের ভেতর তুমি



আমার সমস্ত ভালোবাসা বুনো নদীর মতো - 
কোনো বাঁধ মানে না, কোনো মানচিত্র চেনে না, 
শুধু তোমার দিকেই ছুটে যায় অবিরাম, 
অবুঝ জোয়ারে।

আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীর অসংখ্য 
মুখের ভিড়ে তোমাকেই আমি ভালোবাসি- 
যেমন নক্ষত্র বিশ্বাস করে আকাশকে, যেমন সমুদ্র বিশ্বাস করে চাঁদের টানকে।

কিন্তু তোমার হৃদয়ের ভেতর এক গভীর 
নীরবতা বাস করে, যেন বহু শতাব্দী ধরে 
কেউ সেখানে কোনো প্রদীপ জ্বালায়নি। 

আমি সেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনি 
নিঃশব্দের শব্দ, আর ধীরে ধীরে আহত হই 
নিজেরই প্রতিধ্বনিতে।

তবু অভিযোগ নেই -
কারণ, দূর থেকে যখন বাতাস এসে আমার 
শরীর ছুঁয়ে যায়, আমি চোখ বন্ধ করে ভাবি- 
হয়তো সে আগে ছুঁয়ে এসেছে তোমার চুল, 
তোমার নিঃশ্বাসের গোপন বাগান।

তখন পৃথিবীটা হঠাৎ অসহ্য সুন্দর হয়ে ওঠে -
সেই বাতাসের ভেতরই তোমার 
শরীরের গন্ধ পাই, আর তোমাকে অনুভবে রাখি।


১০.     ফিরে আসার ইচ্ছে


শত বছর পরে, এমনই কোনো বৃষ্টি-বৃষ্টি সন্ধ্যা রাত্রিতে ভেজা মাটির ফোঁড়া কাটা ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে বসে ঝিঁঝি পোকারা ডাকবে তাদের চিরচেনা নিঃসঙ্গ সুরে।

বাঁশঝাড়ের আড়ালে বনমৌরির গন্ধে ঘন হয়ে উঠবে অন্ধকার, জোনাকিরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদীপ হাতে ঘুরে বেড়াবে রাতের বিস্মৃত উঠোনে, যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বপ্নের খোঁজে।

সেই গোপন রাতের গভীরে আমিও ফিরে আসব, হয়তো মানুষ হয়ে নয়, হয়তো নামহীন কোনো প্রাণের বেশে, একটি ঝিঁঝি পোকা, অথবা জোনাকির ক্ষণিক আলো হয়ে।

চেনার মতো আজিকার কোনো মানুষ তখন আর থাকবে না, আমার নাম, মুখ, স্মৃতি - সবই মিশে যাবে সময়ের ধুলোর ভেতর।

তবু এই পৃথিবী নামে গ্রহটিকে এত সহজে ছেড়ে যাওয়া যায় কি? নদীর জলে, ঘাসের ডগায়, বর্ষার গন্ধে, চাঁদের আলোয় এত মায়া জমে থাকে যে -
তাই আবার ফিরতে ইচ্ছে করে, যে রূপেই হোক, যত তুচ্ছ কিছু হয়ে হলেও।

ফিরে আসতে ইচ্ছে করে রাতের অন্ধকারে জ্বলা এক বিন্দু আলো হয়ে, অথবা দূর বাঁশবনের আড়ালে অবিরাম ডেকে যাওয়া একটি একাকী ঝিঁঝি পোকা হয়ে।


১১.      অস্তিত্ব


লোকটির ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। ভোরের  আলো জানালার ফাঁক গলে বিছানার চাদরে এসে বসেছিল চুপচাপ।

চোখ বন্ধ রেখেই সে বলেছিল -
তুমি এত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছ যে, আমার ঘুম ভেঙে দিলে।

কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল কিছুক্ষণ, যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো পাখি পুরোনো ডালে ফিরে এসে বসেছে।

তারপর সে চোখ মেলল।

পাশে কেউ নেই।
শুধু বালিশের ওপর পড়ে আছে তার অনুপস্থিতি, 
আর চাদরের গায়ে  ঘুমিয়ে আছে 
বহু বছরের সংসার।

লোকটি তখন বুঝল - মানুষ চলে গেলেও তার নিঃশ্বাস চলে যায় না, থেকে যায় দেয়ালে, দরজায়, রাতের গভীর নীরবতায়।

যাকে আমরা হারানো বলি, 
সে হয়তো অন্য কোনো রূপে বেঁচে থাকে -
একটি অভ্যাস হয়ে, একটি ডাকে, একটি ভুল 
করে বলা বাক্যে।

সেই ভোরে শূন্য বিছানার পাশে বসে লোকটি প্রথম অনুভব করল -
ভালোবাসারও এক ধরনের অস্তিত্ব আছে, যার জন্য শরীর লাগে না, লাগে শুধু স্মৃতি।

আর স্মৃতি কখনও কখনও জীবিত মানুষের চেয়েও অনেক বেশি জোরে নিঃশ্বাস নেয়।


১২.    শিপ্রা নদীর তীরে 


গিয়েছিলাম কবে শিপ্রা নদীর পারে
আজ আর মনে নেই দিন তারিখ ঋতু -
শুধু মনে আছে, নতজানু হয়ে
আঁজলা ভরে ছুঁয়েছিলাম টলটলে শীতল জল।

সেই জলের ভেতর যেন ঘুমিয়ে ছিল
কোনো বিস্মৃত বিকেলের সোনালি রোদ,
কোনো হারানো পাখির ডানার শব্দ,
কোনো অচেনা বেদনার নীল আভা।

বহু পথ হেঁটেছি তারপর... 
বহু নদী পেরিয়েছে জীবনের ভেতর দিয়ে, 
দু'হাতে ছুঁয়েছি কত জল -
কখনও গভীর রাতে
নিস্তব্ধতার জানালা খুলে গেলে মনে হয়,
আমার হাতে এখনও লেগে আছে
জলের সেই শীতল মায়া।

সময় সব নাম মুছে দেয়,
সব মুখ কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায় 
যেমন দূর বাঁশির সুর বাতাসের অন্তরে -
তেমনি শিপ্রা আজও বয়ে চলে
আমার স্মৃতির গভীরতম তীরে।


১৩.      মায়ালোকের মানুষ 


চোখে তার
যেন সহস্র বর্ষের নিভে-যাওয়া নক্ষত্রের আলো,
মুখে তার সন্ধ্যার নদীর মতো এক গভীর বিষণ্নতা।

মনে হতো -
সে বুঝি এই পৃথিবীর কেউ নয়,
কোনো হারিয়ে-যাওয়া স্বপ্নলোক থেকে
ভুল করে নেমে এসেছে মানুষের ভিড়ে।

তার হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল
শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শরতের বাতাস,
তার কণ্ঠে ছিল
দূর সমুদ্রের একাকী জাহাজের বাঁশির সুর।

আমি তাকে দেখেছি একবার -
অথবা হয়তো দেখিনি,
হয়তো সে ছিল কেবলই এক মায়া,
চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠা কোনো প্রাচীন স্মৃতি।

তবু আজও মনে পড়ে -
রাত্রি যখন গভীর হয়,
ঝিঁঝি পোকারা যখন অন্ধকারের ভাষায় কথা বলে,
তখন মনে হয় সে কোথাও আছে -
বনমৌরির গন্ধে,
শিশিরভেজা ঘাসে,
অথবা কোনো বিস্মৃত নক্ষত্রের ছায়াপথে।

এই ব্রহ্মাণ্ডও হয়তো দেখেছিল তাকে চুপিচুপি 
কোনো অলৌকিক ধূমকেতুর 
দীর্ঘ জ্বলে-ওঠা পথে, 
তারপর সে মিলিয়ে যায় অনন্তের দিকে,
রেখে যায় শুধু
এক অকারণ বিষণ্নতা,
আর এক অমোঘ অনুভব। 

কিছু কিছু মানুষ
জন্মায় না পৃথিবীর জন্য,
তারা আসে শুধু
মানুষের হৃদয়ে একটু অনন্তের স্বাদ রেখে যেতে।


১৪.     আশার আলো


যতদিন জীবন আছে ততদিন আশা করবোই -
যা চাই তা পাই বা না পাই... 
তবু দূর আকাশে জ্বলে থাকা নক্ষত্রের দিকে 
নীরবে তাকিয়ে থাকবো নিরন্তর।

সব স্বপ্ন তো পূর্ণ হওয়ার জন্য আসে না, 
কিছু স্বপ্ন আসে হৃদয়ের জানালায় একফালি 
চাঁদের আলো হয়ে বসে থাকতে -
কিছু অপেক্ষা থাকে শুধু অপেক্ষা বলেই সুন্দর।

যতদিন শ্বাস আছে ততদিন বিশ্বাস করবো - 
একদিন হয়তো হারিয়ে যাওয়া পথও আমার দুয়ারে ফিরে আসবে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়  
শিউলি-ঝরা ভোরের মতো নিঃশব্দে।

যা হারিয়েছি, তার জন্য আর আক্ষেপ নয়, 
কারণ প্রতিটি শূন্যতার গভীরে অদেখা কোনো 
ফুলের বীজ ঘুমিয়ে থাকে, 
সময় এলেই সে ফুটে ওঠে বিস্ময়ের রঙে।

যতদিন জীবন আছে ততদিন আশা করবোই - 
যা চাই তা পাই বা না পাই... 
কারণ আশাহীন মানুষের চেয়ে নিঃসঙ্গ 
আর কেউ নেই পৃথিবীতে, 
আর একটি ছোট্ট আশার প্রদীপই কখনও কখনও অন্ধকারের চেয়েও দীপ্তিময় হয়। 


১৫.     নদী উপাখ্যান 


হাঁড়িধোয়া নদীটির বয়স কত জানি না আমি। কোন্ আদিম কুয়াশার ভোরে শীতলক্ষ্যার কোল ছিঁড়ে তার জন্ম হয়েছিল তাও জানি না।

শুধু জানি, একসময় সে ছিল চপলা। উছলা জলের উন্মাদ এক কিশোরী নদী। বর্ষার ভিতর যার হাসি ভাঙত, যার ঢেউয়ে কাঁপত কাশবন, যার বুকের ভিতর অস্থির আকাশ নেমে আসত সন্ধ্যাবেলা।

এখন সে শান্ত। স্থির। নিঃশব্দ বিষাদের মতো তার জল পড়ে থাকে।

সেদিনও এমনই এক কার্তিক বিকেল ছিল। মরা রোদের ভিতর শালিকেরা একে একে ফিরে যাচ্ছিল ঘরে, দূরের ধানখেতে ধানের গন্ধ জমছিল ধীরে ধীরে।
আমি আর একটি মেয়ে হাঁটছিলাম হাঁড়িধোয়ার তীর ধরে।

মেয়েটির নামও ছিল নদী।
তার বাড়ি শীতলক্ষ্যার পারে, পলাশে। হয়তো সেই কারণেই তার চোখে এত জল ছিল, তার কণ্ঠে এত দূরের স্রোতের শব্দ।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থেমে গেল।
তারপর নেমে গেল জলের কাছে। দু’হাত আজলা করে হাঁড়িধোঁয়ার জল তুলে আনল বুকে।
নরম স্বরে বলল— “হাত পাতো...”

আমি হাত পাতলাম।
সে তার আজলার জল আমার হাতে ঢেলে দিয়ে বলল- “এই জল আমায় আবার দাও। আমি তোমার পানি গ্রহণ করব...”

কী অদ্ভুত ছিল সেই মুহূর্ত!
মনে হয়েছিল, কার্তিকের বিষণ্ণ আকাশের নিচে দুইটি মানুষ নয়  দুইটি নদী পরস্পরের ভিতর তাদের নিঃসঙ্গতা ঢেলে দিচ্ছে।

আমি জল ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তাকে।
আর সেই বিকেলেই, হয়তো অদৃশ্য কোনো নিয়তির কাছে, আমিও তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম আমার সমস্ত হৃদয়।

নদী আমার পানি গ্রহণ করেছিল ঠিকই  কিন্তু আমাকে আর গ্রহণ করেনি।
তারপর একদিন সে চলে গেল।

কোথায় গেল জানি না।
হয়তো অন্য কোনো নদীর দেশে।

হয়তো আজ সে দাঁড়িয়ে থাকে দানিয়ুবের নীল শীতের পাশে, হয়তো হাডসনের ধূসর জলে তার চুল উড়ে যায় একা একা, হয়তো লীফি নদীর তীরে কুয়াশাভেজা সন্ধ্যায় সে ধীরে ধীরে হাঁটে অচেনা মানুষের ভিড়ে।

আর আমি ভাবি,
সেইসব বিদেশি নদীর জলে কখনও কি সে আমার মুখ দেখতে পায়?

কোনো ঢেউ কি তাকে মনে করিয়ে দেয় কার্তিকের সেই বিকেল, হাঁড়িধোঁয়ার নিঃশব্দ তীর, আর এক মানুষকে, যে আজও দু’হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে এক মুঠো জল ফিরে পাবার আশায়?

রাত গভীর হলে এখনও আমি শুনতে পাই— হাঁড়িধোঁয়ার স্থির জলে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে-
“হাত পাতো...”
আর তখন আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে একটি নদী ভেঙে পড়ে।


১৬.       জ্যোৎস্নার কান্না


ঘরের ভিতরে কেউ ছিল না, 
তবু কে যেন অন্ধকারের গভীর থেকে নিঃশব্দে ডাকছিল আমার নাম।

তন্দ্রার ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে কানে এলো 
গুমরে গুমরে কান্না - 
যেন বহুদিনের হারানো কোনো আত্মা ফিরে এসেছে তার পুরোনো ঠিকানায়।

মনে হলো, আমার পায়ের উপর টপটপ করে ঝরে পড়ছে জল - কিন্তু সে জল বৃষ্টির নয়, 
কোনো অদেখা চোখের নীরব অশ্রু, 
যা শতবর্ষ ধরে জমেছিল এক বিস্মৃত অপেক্ষার ভিতরে।

আমি আলো জ্বালালাম -
চারদিকে শুধু নিঃসঙ্গ দেয়াল, নিস্তব্ধ আসবাব, আর শূন্যতার দীর্ঘ ছায়া।

তখন ভাবলাম, হয়তো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে -
জানালা খুলতেই দেখি, 
চরাচর জুড়ে উন্মাদ জ্যোৎস্না, 
আকাশ যেন রূপার নদী ঢেলে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কারও না-বলা ভালোবাসার গন্ধ।

সেই রাতে বুঝেছিলাম -  
সব কান্নার কোনো শরীর থাকে না, সব অশ্রু চোখ থেকে ঝরে না।

কিছু কিছু কান্না জ্যোৎস্না হয়ে নেমে আসে পৃথিবীতে, আর কিছু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরেও নিঃশব্দে ফিরে আসে স্বপ্নের দরজা দিয়ে।


১৭.       শপথের অতলে


আমার সমস্ত স্বপ্ন ফিরিয়ে দাও, 
যেগুলো একদিন তোমার চোখের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল, অথবা, 
যদি তারা আর ফেরার পথ না খুঁজে পায়, 
তবে তাদের সঙ্গে আমাকেও রেখে দিও তোমার নীরবতার পাশে।

যাওয়ার আগে শুনে যাও আমার শেষ নিবেদন -
তোমার কপালের উপর নেমে আসা 
সন্ধ্যাতরুর ছায়ার কসম, 
যে ছায়া আমার সমস্ত ক্লান্তি ঢেকে দেয়, 
তোমার চুলে জড়িয়ে থাকা রাতের সুবাসের কসম, যেখানে হারিয়ে যায় অগণিত অনুচ্চারিত বাক্য।

তোমার সেই গভীর চোখের কসম, 
যার ভেতরে আমি দেখেছি অজস্র জন্মের পথচিহ্ন, তোমার হাসির কসম, 
যা হঠাৎ ভোরের প্রথম আলোর মতো 
অন্ধকার হৃদয়ে নেমে আসে।

তোমার হাতের কসম, যার একটুখানি স্পর্শে 
পৃথিবীকে নতুন মনে হয়, 
তোমার নামের কসম, যা উচ্চারণ করলেই 
বুকের মধ্যে শঙ্খধ্বনির মতো জেগে 
ওঠে ভালোবাসা।

শিউলিফোটা ভোরের কসম, 
বর্ষার জানালায় টুপটাপ ঝরে পড়া স্মৃতির কসম, চাঁদের আলোয় একা জেগে থাকা নদীর কসম, 
যারা জানে, প্রতীক্ষা কত দীর্ঘ হতে পারে।

আর যদি কোনোদিন এই পৃথিবীর সমস্ত পথ 
আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবুও আমি শপথ করে বলি -

নক্ষত্রের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, সময়ের শেষ নদী শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত,
আমার হৃদয় তোমারই থাকবে - 
যেমন সাগর থাকে চাঁদের, 
যেমন সুবাস থাকে ফুলের, 
যেমন প্রেম থাকে এক অনন্ত, মায়াময় 
শপথের বাণীবদ্ধে।


১৮.     যমুনাবতীর জলে


কত বছর ধরে তোমার মুখ দেখিতে পাই না,
হাস্নাহেনারা ঝরে গেছে বর্ষার বাদল বাতাসে,
নতুন জলে ভরে গেল কতবার যমুনাবতী।

কতবার শরতের চাঁদ নেমে এলো নির্জন ঘাটে,
কতবার কাশফুলের সাদা ঢেউ কেঁপে উঠল বাতাসে,
তবু তোমার পায়ের শব্দ আর ফিরল না পথের বাঁকে।

সন্ধ্যার পরে দূর কোনো বাঁশবনে পাখি ডাকে,
আমি ভাবি, হয়তো তুমি ডাকছো নাম ধরে,
তারপর দেখি, শুধু কুয়াশা ভেসে আসে নদীর ওপারে।

পুরোনো দিনের মতো আজও জানালাটি খোলা রাখি,
চাঁদের আলো এসে পড়ে, তুমি এসে পড়ো না,
রাত্রিরা দীর্ঘ হয়, অথচ প্রতীক্ষার শেষ হয় না।

যে স্বপ্নগুলো তোমার চোখের আলোয় বেঁচে ছিল,
এক এক করে তারা ঝরে গেছে নিঃশব্দ নক্ষত্রের মতো-
শুধু স্মৃতিগুলো জেগে আছে ভাঙা মন্দিরের প্রদীপ হয়ে।

হয়তো কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় যমুনাবতীর জলে 
মুখ ধুয়ে ফিরে আসবে হারানো সময় -
আর আমি চিনে নেব তোমাকে, যেমন নদী চিনে নেয় বহুদিন পরে ফিরে আসা বৃষ্টির জল।


১৯.    অনন্তকালের আগে


দেখো, অনন্তকাল শিশিরবিন্দুর মতো
আমাদের আঙুলের ডগায় কাঁপছে,
অথচ কোনো ভোরই পুরোপুরি ফোটেনি এখনো।

একটি সাদা বকের ডানায় ভর করে
দূরের জলাভূমিতে যাবার কথা ছিল -
কে যাবে?

তুমি কী যাবে?
কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে এখানে।

দেখো, অনন্তকাল নদীর স্রোতের মতো
আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে,
অথচ একবারও তার জলে নামা হলো না।

একটি নীল শাপলার কাছে
সব গোপন দুঃখ রেখে আসার কথা ছিল -
কে রাখবে?

তুমি কী রাখবে? 
বড় নীরব এই চরভূমি।

দেখো, অনন্তকাল পরিযায়ী পাখির মতো
আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে যায়,
অথচ আমাদের কোনো যাত্রাই শেষ হয় না।

একটি হলুদ সন্ধ্যাকে
সযত্নে ভাঁজ করে রাখার কথা ছিল -
কে রাখবে?

তুমি কী রাখবে? 
বাতাসে পুরোনো দিনের গন্ধ।

ওঠো, চলো যাই --

তারপর আমরা চলে যাই -
ঘাসের ওপর পড়ে থাকে কয়েকটি অসমাপ্ত কথা,
একটু রোদ,
একটু বিষণ্নতা,
আর একটি স্বপ্নের ভিতর
অপেক্ষা করতে থাকে অনন্তকাল।

হয়তো কোনো এক নক্ষত্রভরা রাতে
আবার দেখা হবে -
তখন আমরা বলব,
দেখো, এতদিন পরেও
কোনো কথাই শেষ হয়নি এখনো।


২০.      কবিতার উপাসনা


কবিতা লেখার আগে
নিঃশব্দ নদীর কাছে বসে এসো,
কবিতা পড়ার আগে
নিজের অন্তরের ধূলি ঝেড়ে এসো।

যদি বিস্ময়ের প্রতি তোমার বিশ্বাস না থাকে,
তবে পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টিও না -
যদি হৃদয়ের পবিত্রতায় আস্থা না থাকে,
তবে শব্দের বাগানে প্রবেশ কোরো না।

যেমন দীপের ভিতরে জেগে থাকে প্রার্থনা,
তেমনি কবিতার ভিতরে জেগে থাকে অনন্তের স্পর্শ,
লোভের ধোঁয়ায় তাকে কালিমালিপ্ত কোরো না।

ভয়ংকর অভিশাপ নেমে আসবে -
প্রতিটি ছন্দের ভিতরে জন্ম নেবে শূন্যতা,
প্রতিটি উচ্চারণে ঝরে পড়বে অসমাপ্ত স্বপ্ন,
প্রতিটি গানের কপালে জমবে অকাল বিষাদ।

কবিতা লেখার আগে
একটি ক্লান্ত মুখে হাসি ফোটাও,
কবিতা লেখার আগে
পাখিদের জন্য একমুঠো শস্য ছড়িয়ে এসো।

কবিতা লেখার আগে
নিজের ভুলগুলোর সামনে মাথা নত করে এসো,
কবিতা লেখার আগে
করুণার জলে হৃদয় ধুয়ে এসো।

কারণ কবিতা কেবল বাক্য নয় -
এ হৃদয়ের গুপ্ত মন্ত্র,
নক্ষত্রের নিঃশব্দ ইশারা,
মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের রেখে যাওয়া
এক বিন্দু আলোর স্বাক্ষর।


২১.     হে রক্তজবা


একটি সুখের দিন দিও আমায়, হে রক্তজবা! অনেক দিন হলো বিষাদের বাগানে বসে আছি, অনেক দিন হলো জানালার ধারে শুধু ঝরে পড়া পাতার শব্দ শুনি।

একটি সকাল দিও, যেখানে শিশিরভেজা ঘাসের উপর পাখিদের ডানার ছায়া নেমে আসে,  আর হৃদয় ভুলে যায় পুরোনো সব ক্ষতচিহ্নের নাম।

একটি বিকেল দিও, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো অভিমান ছাড়া ফিরে আসে স্মৃতিতে, আর দূরের বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে অদৃশ্য নদীর গন্ধ ভেসে আসে।

একটি সন্ধ্যা দিও, যেখানে প্রদীপের শিখার মতো নিভু নিভু ভালোবাসা আবার জেগে ওঠে, আর আকাশের প্রথম তারা আমার নিঃসঙ্গতার কপালে আশীর্বাদের মতো আলো ছুঁয়ে দেয়।

একটি সুখের দিন দিও আমায়, হে রক্তজবা! যে দিনে অশ্রুরাও হবে পবিত্র, ব্যথারাও হবে মধুর স্মৃতি, আর বহুদিনের ক্লান্ত আত্মা তোমার লাল পাপড়ির ভেতর একফোঁটা শান্তির মতো নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বে।

যদি একটি দিনই দাও,  তবে সে দিনটি এমন হোক, যেন শত দুঃখের রাত্রি পেরিয়ে হঠাৎ পূর্ণিমার আলোয় ফিরে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সমস্ত মায়া।


২২.      চুম্বনেরও ওপারে


যেভাবে নদীরা বয়ে যায়
নিম্নভূমি থেকে আরও গভীর সাগরে,
নারীরাও সেভাবেই, প্রেমের ভিতরে,
এক স্পর্শের চেয়ে অধিকতর স্পর্শের আকাঙ্ক্ষা বুকে ধরে।

নারীরা গোপনে তাই
পুরুষজগতে
একটি দীর্ঘ আলিঙ্গনের চেয়ে আরও দীর্ঘতর
মায়ার আশ্রয় খুঁজে ফেরে।

শুধু ঠোঁটের ভাষা নয়,
শুধু ক্ষণিক উষ্ণতা নয়,
তারা খোঁজে এমন এক হৃদয়,
যেখানে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা
জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসে নিবিড় স্নেহ।

অনেক পুরুষ সে কথা জানে না,
তারা ভাবে -
ফুলের সুবাস মানেই বুঝি বসন্তের সমাপ্তি।
কিন্তু আকাশে ভেসে থাকা নারীরা
অতৃপ্ত স্বপ্নের ডানা মেলে
আরও সুদূর নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কারণ নারীরা গোপনে শুধু
একটি চাওয়ার চেয়ে অধিকতর চাওয়া,
একটি চুম্বনের চেয়ে অধিকতর চুম্বন,
একটি রাত্রির চেয়ে দীর্ঘতর মুগ্ধতা,
আর প্রেমের গভীরতম ভাষা বুঝতে পারে -
এমন একজন মানুষের সন্ধানেই
আজীবন নীরবে জেগে থাকে।



২৩.      অন্ধকারের সেতু


রাতের গভীর থেকে উঠে এসেছিল
প্রেমের ইচ্ছাগুলো -
দূর নক্ষত্রের মতো নিবিড় ,
তবু তাদের ভিতরে ছিল
অজস্র অশ্রুত গানের ঢেউ।

অন্ধকার তখন আমাদের মাঝখানে
একটি গোপন সেতু হয়ে ছিল,
যেখানে কোনো শব্দের প্রয়োজন হয়নি,
শুধু নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
জেগে উঠেছিল হাজার বছরের পরিচয়।

তোমার উজ্জ্বল ঊরুতে
যখন আমার স্পর্শ কেঁপে উঠেছিল,
মনে হয়েছিল -
চাঁদের আলোও বুঝি এত কোমল নয়,
বৃষ্টির শব্দও এত মায়াময় নয়।

তোমার চুলের ভিতরে জড়িয়ে ছিল রাত,
তোমার চোখের ভিতরে জ্বলছিল নক্ষত্রেরা,
আর আমার সমস্ত একাকীত্ব
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
তোমার শরীরের সুবাসে আশ্রয় নিয়েছিল।

সেই থেকে প্রতিটি রাত্রি
আমাদের অসমাপ্ত চুম্বনের স্মৃতি হয়ে আছে,
আর প্রেমের ইচ্ছাগুলো
আজও গান হয়ে ভেসে আসে -
যেন অন্ধকারের বুকের উপর
দুই হৃদয়ের গোপন আলোর উৎসব।


২৪.     নদীর জলে সিমন্তী 


গ্রীষ্মের অলস বিকেল, সোনারঙা সূর্যের কোমল আলো সবুজ পৃথিবীর কপালে এঁকে দিচ্ছিল অদৃশ্য আশীর্বাদের টিপ।

আমি তখন একা, নদীতীরের নিভৃত পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম বাতাসের সঙ্গে কথা বলতে - হঠাৎ তোমাকে দেখলাম, সিমন্তী।

তুমি ছিলে যেন পদ্মপাতার উপর ভোরের প্রথম শিশিরবিন্দু, অথবা জ্যোৎস্নাভেজা শ্রাবণের রাতে সাদা বকপাখির নিঃশব্দ উড়াল।

তোমার মুখখানি যেন শরৎ সকালের নির্মল আকাশে এক ফালি পূর্ণিমার চাঁদ, যার দিকে চেয়ে থাকলে মানুষের হৃদয় ধীরে ধীরে প্রার্থনায় ভরে ওঠে।

তোমার দুটি চোখ যেন গভীর নদীর বুকে জেগে থাকা দুটি নীল নক্ষত্র, যেখানে সন্ধ্যাতারারা এসে নিজেদের আলো রেখে যায়।

তোমার হাসি ছিল শিউলি-ঝরা ভোরের মতো কোমল, বকুলবনের গন্ধের মতো মধুর, আর তোমার কণ্ঠস্বরে ছিল দূরের কোনো বাঁশিওয়ালার বিষণ্ন অথচ মায়াভরা সুর।

তোমার ভেজা কালো চুল নেমে এসেছিল বর্ষামেঘের মতো, মনে হচ্ছিল, আষাঢ়ের সমস্ত মেঘ এসে তোমার কাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার সুষমা ছিল কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম বিকেলের মতো দীপ্ত, আবার নদীর জলের মতো শান্ত, যেন পৃথিবীর সমস্ত রূপকথা একটি মানুষের শরীরে এসে  ফুটে উঠেছে।

আর আমি,  মন্ত্রমুগ্ধ কোনো পথিকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম দূরে।

মনে হচ্ছিল, ঈশ্বর যখন গোলাপের পাপড়ি, শিশিরের স্বচ্ছতা, কোকিলের গান, আর পূর্ণিমার আলো দিয়ে একটি স্বপ্ন নির্মাণ করেছিলেন, সেই স্বপ্নের নামই দিয়েছিলেন - 
সিমন্তী।

আজও যখন নদীর জলে অস্তসূর্যের সোনালি আগুন ঝরে পড়ে, আমি নিঃশব্দে তোমার নাম উচ্চারণ করি।
কারণ পৃথিবীতে অনেক ফুল ফুটে, অনেক তারা জ্বলে, অনেক নদী সাগরের পথে বয়ে যায় -

কিন্তু আমার হৃদয়ের আকাশে একটিই চাঁদ উদয় হয়,
সে তুমি, আমার সিমন্তী, আমার সমস্ত কবিতার গোপন উপমা।


২৫.     অনিন্দিতা


অনিন্দিতা তুমি এসো,
চাঁদের নীলাভ জ্যোৎস্নাভরা রাতে,
যমুনা তীরে, শিশিরে -
এসো নিঃশব্দ হৃদয়ে আমার। 

কুয়াশার আঁধার সরিয়ে নদীর জলের মতো 
তুমি স্বপ্নের ফুল হয়ে এসো।

অনিন্দিতা, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তুমি,
শুনো গান ওই বিষণ্ণ বাঁশির -
তারার নিভু-নিভু আলোর ভিতর,
এসো তুমি এই বৃষ্টির কাছে, উন্মনা বাতাসে। 

এসো একাকী জীবনের কাছে
সময়ে অসময়ে আরো নিবিড় করে 
অচেনা স্বপ্নের ভিতর।

এসো জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে শিউলি 
ঝরার সুবাসের মতো -
এসো, আকাশভরা তারার ঘোরলাগা
রোশনাইয়ের মতো। 


২৬.   অলিখিতের দিকে


ঐ পৃথিবীর জানালার ওপারে
নিভৃত অন্ধকারের ভেতর
লিখতে যেয়ো না তুমি হৃদয়ের গোপন নাম -
বাতাসেরও তো এক বিস্মৃতির অভ্যাস আছে,
সে অনেক আদরের শব্দ
নক্ষত্রের ধুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়।

যে কথা জোৎস্নার কাছে বলা যায়,
মানুষের কোলাহলে তাকে উচ্চারণ কোরো না,
দুপুরের উজ্জ্বলতায়
অনেক স্বপ্নের রঙ ফিকে হয়ে আসে,
অনেক প্রতীক্ষা শুকিয়ে যায়
শরতের সাদা কাশফুলের মতো।

ঐ পৃথিবীর দেয়ালের পরে
যে অদৃশ্য রাজ্য জেগে থাকে,
সেখানে কেবল নীরবতারাই জানে
কোন প্রেমের জন্ম হয়েছিল,
কোন অশ্রু ভোরের শিশির হয়ে
পাতার গায়ে নেমেছিল নিঃশব্দে।

তাই তোমার অন্তরের গোপন প্রদীপ
সবাইকে দেখাতে যেয়ো না -
আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে
কত নাম, কত প্রতিশ্রুতি, কত আকুলতা
ধীরে ধীরে মুছে যায়।

শুধু কিছু মায়া রয়ে যায় -
গভীর নদীর জলে চাঁদের ভাঙা প্রতিচ্ছবির মতো,
অথবা দূর কোনো বৃষ্টিভেজা রাতে
অচেনা বাঁশির সুর হয়ে
নিঃসঙ্গ আকাশের বুকে।

আর যে কথাগুলো সত্যিই অনন্ত,
তারা কোনো দেয়ালে লেখা থাকে না -
তারা নির্জনে ফুটে ওঠে
রক্তগোলাপের সুগন্ধে,
আর হারিয়ে যাওয়া পাখিদের ডানায়
সন্ধ্যাতারার আলো হয়ে।


২৭.     বৃষ্টির গোপন সুর


অন্ধকার ঘরের ভিতরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে 
জেগে ওঠে বহুদিনের নিভে থাকা স্মৃতি, 
আর আমার একাকী হৃদয় তোমার নামের ভিতরে আশ্রয় খুঁজে ফেরে।

বাইরের আকাশে বিদ্যুতের ক্ষণিক আলো জ্বলে ওঠে, ঠিক তেমনি হঠাৎ জেগে ওঠে 
তোমার চোখের সেই গভীর মায়া - 
যেখানে একদিন আমি সমস্ত পৃথিবীর ক্লান্তি 
ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম।

মনে হয়, এই বৃষ্টিভেজা রাতেরও এক গোপন ভাষা আছে, যে ভাষায় মেঘেরা তোমার কথা বলে, আর বাতাস ভেসে আনে তোমার হারিয়ে যাওয়া শরীরের  সুগন্ধ।

যদি এমন কোনো অলৌকিক মুহূর্তে 
ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে তোমার সঙ্গে 
দেখা হয়ে যায়, তবে আমি আর কোনো কথা বলব না - শুধু তোমার হাতের উষ্ণতায় 
আরেকটি অনন্ত বর্ষার রাত নিঃশব্দে 
কাটিয়ে দিতে চাই।

কারণ, মাঝরাতে তুমুল বৃষ্টির শব্দে 
ঘুম ভেঙে গেলে আজও তোমার কথা মনে পড়ে-
যেন পৃথিবীর সমস্ত বৃষ্টি গোপনে 
তোমার নাম উচ্চারণ করে, 
আর আমার সমস্ত প্রেম নিভৃত অন্ধকারে 
একটি জোনাকির মতো তোমার প্রতীক্ষায় 
জ্বলতে থাকে।


২৮.     সুন্দর করুণধারা


বৃষ্টি মুখর রাতে ফাঁকা রাস্তা বেয়ে
ঝড়োবাতাস ছাড়া আর কিছুই আসে না,
দূরদেশে থাকা স্বামীর স্মৃতিগুলো শুধু
জানালার ওপাশে ভেজা ছায়ার মতো ভাসে।

এক গুরু-নিতম্বিনী নারী, 
নিঃসঙ্গ ঘরে,
চুলের ভাঁজে জড়িয়ে রাখে অগণন দীর্ঘশ্বাস,
আয়নার সামনে নিভু আলোয়
তার শরীর যেন বর্ষার গোপন উপাখ্যান।

বাইরে বিদ্যুতের ক্ষণিক ঝলকানি,
ভেতরে অস্থিরতার মৃদু ঢেউ -
দূরবর্তী কণ্ঠস্বরের প্রতীক্ষায়
তার দুটি চোখ হয়ে ওঠে আরও গভীর।

বালিশের পাশে রাখা চিঠিগুলোতে
এখনও শুকোয়নি ভালোবাসার গন্ধ,
অথচ দীর্ঘ রাতের নীরবতা
বারবার জাগিয়ে তোলে অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা।

মেঘেরা যতই গর্জে উঠুক আকাশ জুড়ে,
তার হৃদয়ে বাজে অন্য এক সুর -
যে সুরে মিলনের প্রতিশ্রুতি আছে,
আছে প্রিয় মানুষের স্পর্শের আকুতি।

আর সারা রাত ধরে বৃষ্টিরা
ছাদের কার্নিশে টুপটাপ শব্দ তুলে
শুধু এই কথাটুকুই বলে যায় -
বিরহও কখনো কখনো
প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর করুণধারা।


২৯.     কমলাপুর স্টেশনে এক বিষণ্ন দুপুর


আমি বসে আছি কমলাপুর স্টেশনের
শীতল কংক্রিটের বেঞ্চের উপর।
আজ রোদের কোনো তাড়া নেই,
আকাশের সমস্ত নীল ধীরে ধীরে
কালো হয়ে উঠছে।

মেঘ জমছে -
যেন বহুদিন না-কাঁদা দুটি চোখে
ফিরে এসেছে পুরোনো জল,
যেন কোনো বিস্মৃত শোক
আবার তার নাম মনে করতে শুরু করেছে।

এইখান থেকে ট্রেনে উঠতে পারতাম,
যমুনা নদীর কাছে যেতে পারতাম,
দূরের জলের ভিতরে ডুবে থাকা
কোনো বিকেলের স্মৃতি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম।

যেতে পারতাম রাজেন্দ্রপুরের শালবনেও,
যেখানে বাতাসের ভিতরে পাতারা গোপনে
ঈশ্বরের মতো কথা বলে,
আর নীরবতা তার সবুজ প্রার্থনা ছড়িয়ে রাখে।

কিন্তু আজ কোথাও যাব না।

আজ আমি শুধু বসে থাকব এই স্টেশনে,
মাথার উপর জমে থাকা কালো মেঘ নিয়ে,
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির ভিতরে
একটি পুরোনো দিনের বার্ষিক শোক পালন করে।

দেখব, কীভাবে ট্রেন আমাকে রেখে
দূরে চলে যায় -
ধোঁয়া আর হুইসেলের বিষণ্ন শব্দে
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তার শেষ কামরা,
যেন কোনো স্মৃতি অন্ধকারের ভিতরে
হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।

যেভাবে একদিন,
ঠিক এমনই এক মেঘলা বিকেলে,
বাবা চলে গিয়েছিলেন -
কোনো বিদায়ের পতাকা না নেড়ে,
কোনো ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি না রেখে,
শুধু এক দীর্ঘ শোকার্ততা
আমাদের ঘরের নিঃশব্দ দেয়ালগুলোর ভিতরে
রেখে গিয়েছিলেন।

তারপর থেকে প্রতিটি স্টেশন
আমার কাছে একটি অসমাপ্ত অপেক্ষার নাম,
প্রতিটি ট্রেন
একটি হারিয়ে যাওয়া মুখের প্রতিধ্বনি,
প্রতিটি হুইসেল
বুকের গভীরে জেগে ওঠা
কোনো অনাথ সন্ধ্যার আর্তনাদ।

আর যখন বৃষ্টি নামে,
আমি ভাবি -
স্বর্গেরও হয়তো নিজস্ব কোনো কমলাপুর স্টেশন আছে,
সেখানে কোনো নক্ষত্রভেজা প্ল্যাটফর্মে
বাবা একা বসে থাকেন,
মেঘের ওপারে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে
আমাদের কথা ভাবেন।

আর পৃথিবীর এই বিষণ্ন দুপুরে
আমি একা বসে থাকি -
যেন কোনো যাত্রী নই,
কোনো গন্তব্যহীন মানুষের মতোও নই।

শুধু একটি ফেলে-যাওয়া সন্তান,
যার বুকের গভীরে আজও
একটি ট্রেন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে -
ধোঁয়া, বৃষ্টি আর দূরবর্তী হুইসেলের ভিতর দিয়ে,
আর ফিরে আসছে না।

কিছু বিদায়ের কোনো শেষ কামরা থাকে না
তারা একবার চলে গেলে,
মানুষের হৃদয়ের ভিতর দিয়েই
অনন্তকাল ধরে যাত্রা করে।


৩০.      একই  আকাশ একই আলো


এক আকাশের নিচে একই আলো
এই পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি -
তোমার আঙ্গিনায় যে চাঁদের ধূসরতা নামে,
আমার এখানেও সেই নীরবতা
জলরঙের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

দুই প্রান্তে দুটি একাকী সন্ধ্যা,
তবু বাতাসের গোপন পথ ধরে
একই ফুলের গন্ধ এসে লাগে হৃদয়ে।

তুমি হয়তো সমুদ্রের শব্দ শোনো,
আমি শুনি বৃষ্টির মৃদু পতন -
তবু তাদের ভিতরে একই বিষণ্ন সুর
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

পৃথিবী যত দূরেই হোক, অন্ধকার যত 
গভীরই হোক, এক আকাশের নিচে
একটি নক্ষত্রের নিবিড় আলোয় আমরা দুজনে 
এখনও অদৃশ্য কোনো স্বপ্নের পারে
একই নিঃশ্বাসে বেঁচে আছি।


৩১.     অপরাহ্নের বিষণ্নতা


নীলচে শাপলার গন্ধে পাখিদের ডানার মতো 
বিষণ্নতা ভেসে আছে এই নির্জন বিকেলের ভিতরে,
ধীরে ধীরে হেঁটে যাই ;
আজ আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই আমাদের।

ধানক্ষেতের ধারে কত শুকনো কাশফুল
বাতাসে মাথা নত করে আছে,
দূরের নদীর শব্দ এসে
চুপচাপ বসে থাকে ঘাসের শরীরে।

খড়কুটো উড়ে এসে জড়িয়ে গেছে আঁচলের কিনারে,
ঝাউবনের ছায়া লেগে আছে চুলের ভিতরে,
কোনো কথা বলি না -
শুধু মেঘের দিকে চেয়ে থাকি দুজনে।

সন্ধ্যা নামার আগে আগে
কয়েকটি ক্লান্ত ফড়িং নেমে আসে নরম মাটিতে,
পুরোনো দিনের মতো
একটি নামও উচ্চারণ করি না আর।

তবু পৃথিবীর এই নীলাভ প্রান্তরে
শিশিরের মতো অদৃশ্য হয়ে থাকে আমাদের স্মৃতি,
আর পশ্চিমের আলো নিভে এলে
মনে হয় -
অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া দুটি মানুষের মতো
আমরা এখনও পাশাপাশি হেঁটে চলেছি,
কিন্তু কেউ কারও কাছে পৌঁছাতে পারি না।



৩২.      মন যখন উড়ুক্কু



ঝড় আসে ঝড়ে উড়ে যায় পথের ধূলো,
নির্ঝরের পাশে ঝরে পড়ে ক্লান্ত পাতা,
সবুজ বৃক্ষের বুকে লাগে বিষণ্নতার ক্ষত
এই চরাচর জুড়ে শুধু ধূলো উড়ে, পাতা ঝরে,
রৌদ্রক্লান্ত দুপুরের শেষে
আমি বড়ো নিঃসঙ্গ, বড়ো ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকি।

আকাশের নীল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে,
দূরের পাখিরা ফেরে আপন নীড়ের দিকে,
শুধু আমার মন উড়ুক্কু এক পাখির মতো -
কোনো অচেনা আলোর খোঁজে ভেসে বেড়ায়।

যদি কোনো রক্তিম আভায় সিক্ত সন্ধ্যাবেলায়
তুমি এসে দাঁড়াতে আরক্ত শরীরের মায়াবী সাজে,
চোখে নিয়ে শরতের প্রথম তারার বিস্ময়,
চুলে মেখে কদমফুলের গোপন সুবাস। 

তবে হয়তো সমস্ত বিষণ্নতা জেগে উঠত সুর হয়ে,
ঝরা পাতারাও ফিরে পেত সবুজের স্বপ্ন,
আর তোমার স্নিগ্ধ উপস্থিতির মৃদু আলোয়
উদ্বেলিত হয়ে উঠত আমার সমস্ত মুহূর্ত। 

মনে হতো -
এই পৃথিবীতে এখনো প্রেম আছে,
এখনো সন্ধ্যার রক্তিম মেঘের নিচে
কারও জন্য অপেক্ষা করে থাকা বৃথা নয়।


৩৩.     নদীর জলের স্থান হয় না নদীতে



নদীর জলের স্থান হয় না নদীতে, 
ওর সমস্ত নীল বিষাদ ভেসে যায় সাগরের দিকে ;
যেন কোনো পুরোনো চিঠি শেষমেশ পৌঁছে যায় 
অচেনা কারও হাতে।

পথে পথে কাশফুলের সাথে কথা বলে, 
চর জেগে ওঠে, আবার ডুবে যায় জোয়ারের অন্ধকারে, তবু নদী জানে - ধরে রাখার চেয়ে বিদায় 
দেওয়াই তার নিয়তি।

যেমন মানুষের হৃদয়ে সব ভালোবাসা থাকে না চিরকাল, কিছু স্মৃতি উড়ে যায় শালিকের ডানায়, 
কিছু স্বপ্ন আশ্রয় নেয় দূর নক্ষত্রের কাছে।

একদিন সন্ধ্যার আবছায়ায় আমি দেখেছি, 
নদী চুপচাপ কাঁদছে - 
তার বুকের জল কোথাও নেই আর, সব চলে গেছে অনন্ত উন্মনা সাগরের গভীরে।

তবু নদী শুকিয়ে যায় না, 
কারণ আকাশের মেঘেরা জানে - যা হারিয়ে যায় 
বলে মনে হয়, তা-ই ফিরে আসে বৃষ্টির মায়া হয়ে, 
অন্য কোনো ঋতুতে, অন্য কোনো নাম নিয়ে।



৩৪.       দিগন্তজোড়া আনন্দের গন্ধ 



সকালও কখনো এমন নিবিড় অন্ধকারে নামে- মনে হয়, আকাশ যেন বহুদিনের গোপন কথা মেঘের আঁচলে ঢেকে রেখেছে। দূরের গাছেরা নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু বাতাসে ভেসে আসে অদেখা বৃষ্টির গন্ধ।

আঁধার থাকুক চারিধারে, যদি তোমার স্পর্শ থাকে অন্তরের গভীরে- তবে আলো না ফুটলেও ক্ষতি কী! একটি অচেনা সুখ শিউলি ফুলের মতো ঝরে পড়ে নিস্তব্ধ সকালের বুকে।

দিগন্তের সমস্ত আনন্দ যেন অদৃশ্য কোনো সুর হয়ে এসে মেশে আমার চিত্তের উপাসনায়। ভেজা মাটির গন্ধ, বকুলের মৃদু সুবাস, আর তোমার স্মৃতির নীল আলো - সব মিলেমিশে এক অপরূপ মন্দির গড়ে তোলে হৃদয়ের ভিতর।

হয়তো এখনো বৃষ্টি নামেনি, তবু পত্রপল্লবে কাঁপে তার আগমনী সঙ্গীত - আর আমি বিস্ময়ে দেখি, কীভাবে এক টুকরো ঘন আঁধারও তোমার উপস্থিতিতে আনন্দের মতো দীপ্ত হয়ে ওঠে।

যেন পৃথিবীর সমস্ত মেঘ আজ কেবল এইটুকুই বলতে এসেছে - ভালোবাসা থাকলে, আলো নয়, আঁধারও একদিন ফুল হয়ে ফোটে।



৩৫.      নিমন্ত্রণহীন


খুব কাছের বন্ধু ছিলে তুমি, একই বেঞ্চে বসে কত সময় পার করেছি, একই খাতার পাতায় এঁকেছি অসংখ্য অনর্থক স্বপ্নের কথা।

বৃষ্টিভেজা ক্যাম্পাস, চায়ের কাপে উড়ে যাওয়া ধোঁয়া, অকারণ হাসি, পরীক্ষার আগের উৎকণ্ঠা, 
সবকিছুর মাঝখানে ছিল আমাদের একটি সহজ বন্ধুত্ব।

হঠাৎ অনেক বছর পর দেখলাম -
তোমার বাড়িতে উৎসবের আলো জ্বলে উঠেছে, চারদিকে কত হাসি রাশিরাশি, কত আনন্দ করলে তোমরা - শুধু  আমি সেখানে নেই। 

আমার দুয়ারে কোনো নিমন্ত্রণ এসে পৌঁছাল না।
আমি জানালার পাশে বসে ভাবলাম -
মানুষ কি সত্যিই দূরে সরে যায়, বন্ধত্ব ফুরিয়ে যায়।

তোমাকে দোষ দিইনি,  তবু বুকের কোথাও একটি নীরব ব্যথা জমে উঠল, যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো পাখি হঠাৎ আর ফিরে এল না সন্ধ্যায়।

বেদনা বড় বিচিত্র - সে চোখে জল আনে না সবসময়, কখনো কেবল মনে হয়, এ পৃথিবীর সমস্ত আনন্দের ভিড়ে আমি বুঝি ভুলবশত বাদ পড়ে যাওয়া এক নাম।

তবু তোমার ঘরে আলো জ্বলুক, হাসিতে ভরে উঠুক আঙিনা - আমি দূর থেকে আশীর্বাদ করি।

শুধু গভীর রাতে, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে 
নিঃশব্দে প্রশ্ন জেগে উঠবে -
এত কাছে থেকেও, কবে যে আমি তোমার আনন্দের তালিকা থেকে এত দূরে চলে গেলাম, তা আর জানা হলো না।


৩৬.     অনন্ত প্রান্তরের মায়া


তোমায় কাছে পেতাম যদি আজ নিশীথের 
নীল আলোয় কথাগুলো ধীরে ধীরে খুলে যেত -
যেন বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা কোনো নদী হঠাৎ 
জেগে ওঠে চাঁদের স্পর্শে।

চারিদিকে হিজল-শিরীষের গন্ধমাখা ছায়া, 
ঘাসের বুকে নক্ষত্রেরা নেমে এসে শিশিরের মতো জ্বলজ্বল করত, হাওয়ার প্রান্তরে ভেসে বেড়াত অকথিত দিনের সব মায়া।

তোমার চোখে মুখে হয়তো দূর কোনো সন্ধ্যার বিষণ্নতা লেগে থাকত, আমি তার পাশে বসে শুনতাম পাতার ফাঁকে ফাঁকে জেগে থাকা ঝিঁঝিঁ পোকার গোপন সংগীত।

কোনো তাড়া থাকত না আর, কোনো ভোরের ডাকও নয়, শুধু পৃথিবীর সমস্ত নির্জনতা দুজন মানুষের নিঃশব্দ সান্নিধ্যে মায়াময় হয়ে উঠত ধীরে ধীরে।

আর রাতের শেষ প্রহরে, শিরীষের ঘুমন্ত ফুলে, ঘাসের গভীরে নেমে আসা নক্ষত্রে, আর হাওয়ার অনন্ত প্রান্তরে তোমার আমার ভালোবাসা বেঁচে থাকত না-বলা কথাদের মতো।


৩৭.      এ কী করুণ করুণাধারা


এ কী করুণ করুণাধারা! 
কার অশ্রু নেমে আসে মেঘের অন্তরাল ভেঙে, 
কার ব্যথা ঝরে পড়ে বৃষ্টির বিন্দু হয়ে 
নিভৃত বিকেলের শূন্য উঠোনে?

দূরের বৃক্ষগুলো আজ বড় একা লাগে, 
যেন তারাও হারিয়েছে কোনো প্রিয় পাখির গান, 
কোনো চেনা ছায়ার আশ্রয়।

এমন দিনে মনে পড়ে,  
যারা একদিন ছিল খুব কাছে, তারা আজ কেবল স্মৃতির মতো ধূসর আকাশে ভেসে বেড়ায়। 
ডাকলেও আর ফিরে আসে না, 
তাদের পদধ্বনি মিশে গেছে অসংখ্য বিস্মৃত 
সন্ধ্যার ভিতরে।

হৃদয়ের গোপন নদীতে কেন আজ এত জোয়ার? অপূর্ণতার পুরোনো নৌকাটি নিঃশব্দে দুলে ওঠে, কোনো ঘাটে আর ভিড়ে না।

এ কী করুণ করুণাধারা! 
এ কোন বিষাদের বৃষ্টি-যার কোনো শেষ নেই, 
আমিও হয়ে যাব একটি পুরোনো স্মৃতি, 
কোনো নির্জন হৃদয়ের নিঃশব্দ 
কান্নার মতো।


৩৮.     একটি অপেক্ষার গল্প


সেদিন সন্ধ্যায়
খামখেয়ালি কিশোরীটি ভাত চাপিয়েছিল মাটির চুলোর আগুনে,
কারও ফিরে আসার আনন্দে।
চালের ভেতর তখন ফুটছিল সাদা সাদা স্বপ্ন,
হাঁড়ির ঢাকনায় জমছিল শিশিরের মতো ভালোবাসা।

কিন্তু কে জানে -
কোন অচেনা বিষাদের পাখি এসে
তার মনটাকে দূর আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গেল!
সে বসে রইল জানালার ধারে,
আর চুলোর আগুনে ধীরে ধীরে
ভাতের গন্ধ বদলে গেল পোড়া ধোঁয়ায়।

তারপর বহু বছর কেটে গেল।

এখন তার চারপাশে
শুধু ধোঁয়ার কালো স্মৃতি,
আর মানুষের অবিশ্বাস।
যত্নের কথা বললে সবাই হাসে,
ভালোবাসার কথা বললে কেউ আর চোখ তুলে চায় না।

যে মানুষটির জন্য একদিন
সে আঁচলে লুকিয়ে রেখেছিল সমস্ত দুপুর,
সে মানুষটি এখন নেই -
যেন কখনো ছিলই না।

আর যারা প্রতিদিন ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়,
যাদের জন্য শহরের পর শহর নিভে যায়,
যাদের জানালায় আর কোনো চিঠি এসে বসে না,
যাদের নাম ধরে ডাকে না কেউ -
তারা গোপনে এক আশ্চর্য জগতের কথা ভাবে।

সেখানে সন্ধ্যা নামে ধানের গন্ধ মেখে,
ফুটফুটে সাদা ভাতের উষ্ণ বাষ্পে ভরে ওঠে উঠোন।
মায়ের আঁচল বাতাস হয়ে এসে
মাথার ঘাম মুছে দেয়।

রঙিন কাগজের চরকি ঘুরতে থাকে
শৈশবের আকাশে,
আর জোনাকিরা একে একে জ্বেলে দেয়
ছোট্ট হ্যারিকেনের আলো।

সেই আলো হাতে
কুসুমপুরের এক কুঁড়েঘরের সামনে
আজও কেউ দাঁড়িয়ে থাকে -
কোনো অভিযোগ নেই তার,
নেই অভিমান।

শুধু দূর থেকে বলে -

“এতদিন কোথায় ছিলে?
ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, এসো, আজ আর কিছু পোড়াবে না। আজ তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে আছি…।"


৩৯.      অবশ সন্ধ্যার কথা


সখীরা আমার, তোদের চোখে কত রঙিন গল্প, জোৎস্নাভেজা পথের ধারে গেঁথে রাখিস মালা - প্রিয়জনের হাত ধরে কত কথা যে 
বলিস অবিরল।

আমারও ছিল এক মায়াবী সন্ধ্যা, 
শিউলি-গন্ধে ভরা বাতাস, কাঁপা কাঁপা চাঁদের আলো, আর দুটি চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাওয়ার 
এক আশ্চর্য আহ্বান।

তারপর কী যে হয়েছিল মনে নেই, 
শুধু মনে পড়ে, আকাশভরা তারারা নেমে 
এসেছিল কাছে, বকুলের গন্ধে ভরে উঠেছিল রাত, আর হৃদয়ের ভেতর অজানা এক 
সুখের ঢেউ ছুঁয়ে গিয়েছিল আমাকে।

আজও সখীরা যখন অভিসারের গল্প বলে, 
আমি চুপ করে হাসি 
কারণ কিছু কিছু স্মৃতি শব্দে ধরা দেয় না, 
শুধু নিঃশব্দে ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে পড়ে 
হৃদয়ের উপরে।


৪০.      আজ সারারাত 


আজ সারারাত তোমার নামে কবিতা লিখব,
আজ সারারাত কবিতার অলংকার হবে তুমি -
আজ সারারাত তোমার সর্বাঙ্গে সেজে উঠবে উপমা, উৎপ্রেক্ষা।

আজ সারারাত আমি আলো-আঁধারির ভেতর 
খুঁজব তোমার প্রাণের শব্দ,
যেন দূরের নদীর মতো অবিরাম এসে ছুঁয়ে যায় 
আমার ঘুম-ভাঙা চোখ।

তুমি থাকো -
অদৃশ্য কোনো কবিতার প্রথম লাইন হয়ে,
যেখানে প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে একটি করে 
অস্থির ভালোবাসা।

আজ সারারাত জমবে তোমার স্মৃতি -
যেন জোনাকির মতো জ্বলে ওঠা অসংখ্য 
ছোট ছোট হৃদস্পন্দন।

আমি লিখতে থাকব,
আর কাগজ ধীরে ধীরে ভরে উঠবে তোমার গন্ধে,
তৈরি হবে এক অদ্ভুত মায়াময় শিহরণে।

শেষে হয়তো আর কবিতা থাকবে না -
থাকবে শুধু তুমি,
আর থাকবে তোমাকে ঘিরে লেখা একটি 
সারারাতের অপেক্ষা লিপি ।


৪১.      জোছনার মতো খুলে দাও


নদীর ঢেউয়ের মতো জেগে উঠুক 
ভালোবাসা, শীতের সকালের কুয়াশার মতো 
নরম হোক নিঃশ্বাস,
ধানের শিষের মতো দুলুক দু'চোখের 
উচ্ছ্বাস।

হিজলপাতার মতো কাঁপুক গোপন 
অভিমান,
বকুলফুলের মতো ঝরে পড়ুক 
ভালোবাসার গান।

সন্ধ্যার আকাশের মতো মেলে দাও 
নীল আঁচল,
বৃষ্টিভেজা মাটির মতো উঠুক মায়ার 
কলকল।

পদ্মার চর যেমন জেগে ওঠে 
জোছনার পরশে,
তেমনি তুমি ফুটে ওঠো আমার 
প্রেমের আবেশে।

চাঁদের আলোর মতো নিঃশব্দে কাছে 
এসো আজ,
ভালোবাসায় খুলে দাও শরীরের যত 
গোপন ভাঁজ।



৪২.        অজানার খাতায়



কত অচেনা মুখ এসে
চেনা হয়ে বসেছিল হৃদয়ের উঠোনে,
কত চেনা মুখই আবার
নিঃশব্দে অচেনার দেশে পাড়ি দিল।

কেউ বিদায়ের কথা বলেনি,
কেউ শেষবার ফিরে তাকায়নি,
শুধু কিছু অসমাপ্ত আলাপ
বিকেলের আলোয় ঝুলে রইল।

অথচ কত হিসেব বাকি ছিল -
কে কতটা মায়া রেখে গেল,
কে কতটা অভিমান নিয়ে চলে গেল,
কে কার চোখে জোছনা হয়ে ছিল,
আর কে ছিল নিঃশব্দ অন্ধকার।

কেউ কি সত্যিই জানে,
কে কতটা দিল,
কে কতটা পেল,
কার বুকের ভেতর কতটা শূন্যতা জমল?

সময়ের পুরোনো খাতায়
সেসব সংখ্যার কোনো অঙ্ক মেলে না,
শুধু নামহীন কিছু দীর্ঘশ্বাস
পাতার ভাঁজে ভাঁজে শুকিয়ে থাকে।

তারপর একদিন
আমরাও হয়তো কারও স্মৃতিতে
একটি অস্পষ্ট মুখ হয়ে যাবো -
যার সঙ্গে দেনা-পাওনার হিসেবটুকুও
কখনো চুকানো হবে না।

শুধু অজানার খাতায় লেখা থাকবে ;
কেউ এসেছিল,
কিছুটা ভালোবেসেছিল,
কিছুটা হারিয়েছিল,
আর অনেকখানি না-বলা কথা রেখে
নিঃশব্দে হারিয়ে গিয়েছিল।


৪৩.      যা পেয়েছি, তাতেই পূর্ণতা


একটাই জীবন জেনেও
জড়াইনি অন্য আর কারোর জীবনে -
যতটুকু সময় আছে,
আছি তোমার সাথে সুখ-দুঃখের এই ভূবনে,
জীবনে যা পেয়েছি,
অমৃতসুধায় ভরে থাক, আর কিছু চাহিনে।

তোমার হাতের উষ্ণতায়
শীতের রাতও হয়ে ওঠে বসন্তের গান,
তোমার চোখের মায়ায়
হারিয়ে যায় শত অভিমান।

যে পথটুকু একসাথে হেঁটেছি,
সেই পথেই ফুটুক অনন্ত স্মৃতির ফুল,
ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়ে
বারবার হতে চাই নির্ভুল।

হয়তো সব স্বপ্ন পূর্ণ হবে না,
সব আকাশে উঠবে না পূর্ণিমার চাঁদ,
তবু তোমার পাশে থেকে
জীবনকে মনে হয় ঈশ্বরের দেওয়া প্রসাদ।

একটাই জীবন জেনেও,
তাই আর কোনো প্রাপ্তির হিসেব রাখিনি মনে,
তোমার হাসির আলোয় ভরে উঠুক দিন,
তোমার নামের জোছনায় ডুবে থাকুক ক্ষণে ক্ষণে।

জীবনে যা পেয়েছি তোমার প্রেমে,
অমৃতসুধায় ভরে থাক, 
আর কিছু চাহিনে।


৪৪.     চন্দ্রপক্ষের অপেক্ষা 


কত রাত পোহালো, তবু তার সঙ্গে দেখা হলোনা-
অথচ প্রতিটি নিশীথ তার নামের আলোয় ধীরে ধীরে ভোর হয়ে গেছে।

তুমি কি ছিলে এই রাত্রিতে, এই চন্দ্রপক্ষে, 
নিজেকে বিসর্জন দিতে দিতে মাটির গভীর প্রেমে নিমগ্ন?

যেখানে দেহের বিষও ভালোবাসার স্পর্শে অমৃত হয়ে ওঠে, যেখানে ক্লান্ত দুটি আত্মা নিঃশব্দ আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকে জন্মজন্মান্তরের মতো।

আমি শুনেছি, ভালোবাসার ফুলে ভরে উঠেছিল জল, জলের বুকে জেগেছিল নীল কম্পন, 
তবুও কেউ শুনতে পায়নি তার গোপন স্পন্দনের ভাষা।

চাঁদ ঝরে পড়েছিল জানালার কার্নিশে, 
তারারাও নেমেছিল নীরব সাক্ষী হয়ে - 
কেবল তুমি এলে না।

তবু আমি অপেক্ষা করেছি, যেমন নদী অপেক্ষা করে সমুদ্রের জন্য, যেমন শিশির অপেক্ষা করে প্রথম সূর্যের স্পর্শের জন্য।

হয়তো কোনো এক আলস্য প্রহরে, 
যখন সমস্ত অভিমান মিশে যাবে ধূলির সঙ্গে, 
তখন তুমি ফিরে আসবে -

আর আমার সমস্ত রাত, সমস্ত চন্দ্রপক্ষ, সমস্ত অসমাপ্ত ভালোবাসা তোমার চোখের গভীরে একটি দীর্ঘ আলোর মতো আবার জন্ম নেবে।


৪৫.     উত্তম পুরুষ


তোমার চোখের ভেতর যে সোনালি বিকেল বাস করে,
সেখানে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে ফিরে যাই -
যেন বহুদিনের চেনা কোনো নদী
নিজের স্রোতকে খুঁজে পায় সমুদ্রের কাছে।

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি না সবসময়,
তবু নিঃশব্দে তোমাকেই ডাকি -
শিশিরভেজা ঘাসের মতো কোমল হয়ে
আমার সমস্ত ভোর তোমার কাছে নতজানু হয়।

আমি জানি,
একটাই জীবন আমাদের হাতে,
তাই এই ক্ষণিক পৃথিবীতে
আমি অন্য কোনো আলোর কাছে যাইনি -
তোমার হাসির ভেতরই খুঁজেছি
চাঁদের সমস্ত জোছনা।

যখন সন্ধ্যা নামে,
আমি তোমার কণ্ঠস্বরের মতো শান্ত কোনো গান শুনি,
আর মনে হয় -
ভালোবাসা আসলে কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়,
ভালোবাসা মানে তোমার পাশে বসে থাকা।

আমি উত্তম পুরুষ, আমার সমস্ত আমি জুড়ে
তুমিই একমাত্র প্রথম রমণী 
যার জন্য প্রতিটি কবিতা লেখা হয়,
আর যার চোখে চোখ রাখলেই
পৃথিবীর সব ব্যাকরণ ভেঙে গিয়ে
শুধু প্রেমের ভাষাটুকু বেঁচে থাকে।

তখন মনে হয়, জীবন যতটুকুই হোক,
যদি তোমার উষ্ণ সান্নিধ্যে পাই, তবে অনন্তকাল 
একটি মায়াময় সন্ধ্যার মতো 
সুন্দর একটি জীবন কাটাতে পারি।



৪৬.       সাধারণ মেয়ের গল্প



যে মেয়েটি সন্ধ্যাবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ 
জ্বালিয়ে চুপচাপ আকাশ দেখে, আর বুকের ভেতর রাখে অসংখ্য না-বলা কথা -
কবিতায় আমি তার কথা লিখতে চাই।

যে মেয়েটি রূপকথার রাজকন্যা নয়, নেই তার 
সোনালি প্রাসাদ, শুধু দু'চোখে কিছু জোছনা, 
আর কিছু স্বপ্ন, বৃষ্টিভেজা কদমফুলের গন্ধে মাখা -
কবিতায় আমি তার কথা বলতে চাই। 

তার হাসি নদীর ঢেউয়ের মতো, 
দুঃখগুলো নিঃশব্দে ডুবে থাকে জলজ শাপলার শিকড়ের মতো -
যেখানে প্রেম মানে কাউকে না পেয়েও আজীবন ভালোবেসে যাওয়া,
আর অপেক্ষা মানে প্রতিটি পূর্ণিমায় 
একটি ছায়ার জন্য জেগে থাকা।

একটা কবিতা লিখব আমি -
যে কবিতা পড়ে মনে হবে এই মেয়েটিকে 
কোথাও যেন আমি দেখেছি ,
হয়তো নিতান্ত সে সাধারণ মেয়ে , 
হয়তো সে একটি মায়াময় কবিতা।



৪৭.      স্বপ্নের আকাশ



জানি পাশেই আছ, ছুঁয়ে দেখতে পারি না,
জানি কাছেই আছ, উপলব্ধি করি না,
তবু স্বপ্ন দেখি, একদিন দু'জনে আকাশ ছোঁব।

জানি তোমার নিঃশ্বাস ভেসে আসে বাতাসে,
জানি তোমার নাম জেগে থাকে আমার একান্ত বিষণ্নতায়,
তবুও অদৃশ্য দূরত্বের দেয়াল ভেঙে
একদিন পাশাপাশি হাঁটার স্বপ্ন দেখি।

তুমি না থেকেও আছো -
নদীর বুকে জেগে থাকা জোৎস্নার মতো,
ফুলের গন্ধে লুকিয়ে থাকা বসন্তের মতো।

যদি কোনো ভোরে দু'জনার দেখা হয়,
তবে সমস্ত অভিমান গলে যাবে রোদের উষ্ণতায়,
সমস্ত অপেক্ষা মিলিয়ে যাবে পাখির ডানায় ভেসে,
ততদিন স্বপ্নই হোক আমাদের আশ্রয়,
ততদিন দূরত্বই হোক ভালোবাসার আরেক নাম। 

হৃদয় জানে, যারা সত্যিই একে অপরের,
তারা কখনও হারিয়ে যায় না,
শুধু সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে
একদিন একই আকাশের নিচে তারা মিলিত হয়।



৪৮.      ব্যবধান


হয়তো তুমি আছো ঠিক পাশের জানালায়,
তবু স্পর্শের আগে কত ঋতু পেরিয়ে যায়,
কত সন্ধ্যা নক্ষত্রের কাছে
নিজের নীরবতা জমা রাখে।

আমরা দু'জন একই আকাশ দেখি,
একই বৃষ্টিতে ভিজে উঠি -
তবু কোনো অদৃশ্য নদী
দু'তীরের মতো আলাদা করে রাখে আমাদের।

তবু কেন এমন হয় -
খুব নিকটের মানুষটিও
কখনো কখনো হয়ে ওঠে
এক অনন্ত অপেক্ষা।

আর সেই অপেক্ষার ভেতরেই
জেগে থাকে মায়া,
জেগে থাকে না-পাওয়া চাঁদের আলো,
জেগে থাকে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো বিস্তৃত 
অসমাপ্ত ভালোবাসা।


৪৯.     একদিন তুমি এসেছিলে


একদিন তুমি এসেছিলে 
নিভু নিভু প্রদীপের  শিখায়, হঠাৎ জেগে ওঠা 
আলোর মতো -
তখন চারদিকে ছিল শিউলি ঝরার শব্দ,
আর দূর আকাশে জেগেছিল 
কিছু নক্ষত্রের নীরবতা।

তুমি কথা বলোনি খুব বেশি,
তবু তোমার চোখের ভেতর
অগণিত নদীর স্রোত শুনেছিলাম -
যেন বহুদিনের চেনা কোনো পথ
ফিরে পেয়েছে তার হারানো যাত্রী।

তোমার স্পর্শ এসে জড়িয়ে ছিল
আমার সমস্ত বিষণ্নতাকে -
অথচ সুখেরও এক গভীর দুঃখ আছে,
সে কথা সেদিন বুঝিনি।

তুমি রয়ে গেছো, নিশীথের বাতাসের মতো,
ছুঁয়ে যাও, ধরা দাও না -
তবু তোমার অনুপস্থিতির মধ্যেই
ফুটে থাকে আমার সমস্ত ভালোবাসা,
আর সমস্ত মায়াময় জীবন।


৫০.      চাঁদের আলোয় একা একা 


আজকে রাতে তোমায় যদি আমার কাছে পেতাম,
অনেক না-বলা কথারা জেগে উঠত নিঃশব্দে -
যেমন দূরের কোনো নদী
চাঁদের আলোয় একা একা কথা বলে।

হাওয়ার দীর্ঘ প্রান্তর জুড়ে
ভেসে বেড়াত তোমার নামের মৃদু উচ্চারণ -
শিশিরভেজা পাতার মতো
নেমে আসত শান্ত এক ভালোবাসা।

আমরা হয়তো খুব আস্তে কথা বলতাম,
যেন শব্দে ভেঙে না যায়
রাত্রির স্বচ্ছ জাদু -
তোমার চোখে জমে থাকা জোছনার ভিতর
আমি খুঁজে নিতাম বহু জন্মের পরিচয়।

কোনো তাড়া থাকত না,
কোনো বিদায়ের ভয়ও নয় -
শুধু দূর আকাশের তারারা
নীরবে শুনে যেত আমাদের হৃদয়ের ভাষা।

আর যদি হঠাৎ ভোর হয়ে যেত,
তবুও মনে হতো -
এই পৃথিবীর সমস্ত পথ পেরিয়ে
আমরা এসে পৌঁছেছি
একটি মায়াবী নিস্তব্ধতার কাছে,
যেখানে ভালোবাসা ঘাসের মতো জন্মায়,
আর তোমার হাতের উষ্ণতায়
একটি দীর্ঘ জীবন
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন