বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

যারা আর ফিরে আসে না ( কাব্যগ্রন্থ)





যারা আর ফিরে আসে না  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

এই বন্ধুটি আমাদের মেলবন্ধনের 
রূপকার, যার উপস্থিতি রবীন্দ্রনাথের 
গীতবিতানের অমল গানের মতো শব্দে-নিঃশব্দে ছড়িয়ে দেয় ঐক্যের সুর।
আমাদের সব আয়োজন, সব উৎসবের 
প্রাণসঞ্চারিনী সে। 

দিলরুবা জলিল শাহীন,
এই গ্রন্থখানি তোমারই নামে।
তোমার মমতা, সৃজন আর অনাবিল ভালোবাসার 
প্রতি এক নীরব কৃতজ্ঞতা।


১.       বিষণ্নতার বারান্দায় তুমি



বিষণ্নতার বারান্দায় তুমি দাঁড়িয়ে থাক
সন্ধ্যার নরম আলোয় ভিজে
যেন কেউ নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেলো
তোমার ম্লান চোখের উপকথা।

হালকা হাওয়ায় দুলে ওঠে তোমার চুল,
আমি দেখি
কত না বলা কথা জমে আছে
নিঃশ্বাসের ভেজা জানালায়।

তুমি যখন বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে
দিগন্তে তাকাও
আমি বুঝি, তোমার দূরত্বে
আমার হৃদয়ের সব নীলচে অনুরাগ
আলতো কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।

তবুও তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
আমি দেখি
বিষণ্নতার ভেতর থেকেও
একটা ছোট্ট দীপশিখা জ্বলে ওঠে,
যেন তুমি ডাকছো আমাকে
অদেখা কোনো আলোয়।

এবার তুমি ফিরে তাকাও,
বারান্দার বিষণ্নতাকে পেরিয়ে
আমার দিকে আসো ধীরে,
হৃদয়ের ভেজা পথে ফুটুক
নতুন ভোরের সূর্যরঙা উষ্ণতা।


২.   অনন্ত পর্বত জুড়ে 

নিভৃতে রামগিরির পথে
ঝড়ের ডানায় ভেসে আসে তোমার নাম
পর্বতের বুক জুড়ে তখন
জ্বলে ওঠে নীলাভ আগুন,
তুষারগুচ্ছের ফাঁকে ফাঁকে
নির্ঝরের মতো বাজে প্রেমের গোপন সুর।

আমরা হেঁটে যাই মেঘ-ভেজা শৃঙ্গের ধারে
কপোল ছুঁইয়ে দেয় হিমেল বাতাস,
আর তুমি যেন দূর থেকে
শেফালির সুবাস হয়ে এসে
আমার অস্থিমজ্জায় ঢেলে দাও আলো।

এসো প্রিয়ে,
তোমার রাঙা পদতলে ফুটুক তারার দল
নুপূরের রিনিঝিনি ছড়িয়ে যাক
নীল ছায়াঘেরা উপত্যকায়।
বনমল্লিকার ঝাড় পেরিয়ে
এসো তুমি সঙ্গীতের মতো ধীরে,
এসো হৃদয়ের মিলনদুয়ারে।

রক্তিম চাঁদ আজ উঠেছে শুধু আমাদের জন্য
রামগিরির গাঢ় নীরবতা ভেঙে
তোমার আমার মিলনের গান

গুঞ্জরিত হোক অনন্ত পর্বতজুড়ে।


৩.       ময়ুরাক্ষী, তুমি আমার


তোমার চোখে নদীর ঢেউ,
সেই ঢেউয়ের ভেতর নীল-রঙা স্বপ্নেরা
নীরব গোপন মায়ায় ডেকে যায় আমাকে।
তোমার চুলে রাতের গন্ধ,
যেন আকাশ নিজের অন্ধকার খুলে
তোমার কাঁধে রেখে দিয়েছে সুধার পরশ।

তোমার হাসি
একটি অচেনা সকাল,
যেখানে শিশিরেরা কাঁপতে কাঁপতে
সূর্যের প্রথম আলোয় প্রেম শেখে।

আমি শুধু বলি
আর কতো দূরে থাকো ময়ুরাক্ষী?
এই বুকের ভেতর যে নদী বয়ে যায়
তা তোমার নাম উচ্চারণ করেই
চিরকালীন স্রোত হয়ে থাকতে চায়।

চাইলে তোমাকে কাবিননামার শব্দে নয়,
হৃদয়ের নরম কাগজে লিখে দিতে পারি
একটি মাত্র প্রতিশ্রুতি
তুমি থাকো, এই ভুবন থাকবে আলোকিত।

এসো তবে,
তোমার তরুণ হাসির আলোয়
আমার সমস্ত দিনকে পুষ্পিত করে দাও
ময়ুরাক্ষী, তুমি আমারই হয়ে যাও।


৪.       একটি প্রেমের কবিতা


তুমি ছিলে জন্মজল
গভীর, স্নিগ্ধ, মায়াভরা এক প্রবাহ,
যার কাছে পৌঁছাতে গেলে
পুনর্জন্ম নিতে হয় শরীর-স্মৃতির ভেতর।

তোমার ছাঁপ ছুঁয়ে আসে পৃথিবীর প্রথম স্নেহ,
প্রথম গোপন আলো
যা হাত বাড়াতেই নরম উষ্ণতায় গলে যায়।

তোমার জলরেখায়
আমি শিখেছি নীরবতার গভীর নতজানু ভাষা,
শিখেছি কী করে
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে
দীর্ঘশ্বাসের মতো এক অচেনা প্রাণস্পর্শ।

তুমি নড়লে জল কেঁপে ওঠে
ফেনার নীচে লুকানো থরথর রহস্য
ধীরে ধীরে উঠে আসে আলোর কাছে।

আমি ভাসি তোমার স্রোতে
আদিম জ্যোৎস্নার মতো সাদা,
নদীর দেহে দেহ রেখে খুঁজে ফিরি সেই প্রথম কম্পন,যা পৃথিবীকে এক মুহূর্তে

 নতুন করে বানায়

তোমার তীরে দাঁড়িয়ে
আজও মনে হয়
আমি যেন সেই অজানা নোঙ্গর,
যাকে ডেকে নেয়
তোমার গোপন ভাটার দোল, আর তুমি
অলক্ষ্যে, নরম ঢেউ হয়ে
আমাকে টেনে নাও
তোমার গভীর, উষ্ণ, অন্তঃসলিলায়।


৫.      স্পন্দন

যে চুম্বন শুধু ঠোঁটের ছুঁইছুঁই নয়

দু’টি দেহের উষ্ণ রেখা যখন

নিভৃত অন্ধকারে একে অন্যের দিকে বেঁকে আসে

যে আশ্লেষ শুধু বাহুর বলয়ে আটকে থাকে না,

দেহের ভিতরে  লুকোনো স্পন্দন

ধীরে ধীরে আরেক স্পন্দনের সাথে

গোপনে তাল মিলিয়ে ফেলে।


যে ঘনিষ্ঠতা শুধু গভীর স্রোতে ডুবে যাওয়া নয়,

বরং শরীরের ভাঁজে ভাঁজে

একটি নরম অন্ধ আলো জন্ম দেয়

যে সাড়া শুধু উত্তুঙ্গ স্বরের মুক্তি নয়,

বুকের নিঃশ্বাসে জমে থাকা

একটি দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের কম্পন।


তবু দেহের সমস্ত ভাষা সেখানে থাকে,

ঠোঁটের আর্দ্র কোণায়, শরীরের উন্মত্ত ঢেউয়ে,

গোপন কোনো কেন্দ্রে জমে থাকা

নামহীন আকর্ষণের ভারে।


সবকিছু প্রকাশ্য নয়, তবু সবকিছু ঘটে

দেহই জানে, দেহই তার নীরব উপাখ্যান 

লিখে যায়।


৬.       পথ যেন শেষ না হয়


জলপাইগুড়ির চা-বাগানে হেলে পড়ে সন্ধের আলো,

পাতার ভাঁজে ভাঁজে হেসে ওঠে অচেনা কোনো গোপন বনগীতি।

সবুজের দোলায় ভিজে ওঠে জানালার কাচ,

আর ট্যাক্সির মৃদু দোলায় মনে হয়

সমস্ত পৃথিবী ধীরে ধীরে আমাদের পাশে এসে বসেছে।


একদিকে তোমার উষ্ণ নিঃশ্বাসের শান্ত নিশ্চিন্ততা,

আরেকদিকে বন্ধু শিশির রায়ের গল্পে ভেসে থাকা পুরোনো দিনের সৌরভ।

আমি মাঝখানে বসে শুনি পথের গান,

শুনি চাকার ঘুরে ওঠা দূরের প্রতিধ্বনি,

শুনি নিজের মনে জন্ম নিতে থাকা ছোট্ট অনন্তের স্বপ্ন।


বনের গভীরতা যত বাড়ে, তত স্পষ্ট হয় মায়ার রেখা,

গাছেরা দূর থেকে হাত বাড়িয়ে বলে,

'আর একটু থেকে যাও, আরেকটু ধীরে যাও'

কুয়াশা যেন নরম শাল জড়িয়ে দেয় গাড়ির গায়ে,

আমরা তিনজন যেন ভেসে যেতে থাকি সময়ের ওপারে।


ফুয়েন্টসোলিং-এর দিকে টান পড়ে ঠিকই,

তবুও মনে হয়

এই পথ, এই বন, এই দোলা,

এই তিনজনের নিঃশব্দ হাসি

কতটা সুন্দর, কতটা আপন, কতটা অনন্ত।


যেন পথটাই আমাদের ধরে রাখতে চায়,

যেন সে-ও জানে

কিছু যাত্রা শেষ হলে মন খালি হয়ে যায়,

তাই সে ফিসফিস করে বলে যায়

'যেও না এখনই…

এই পথটুকুই তো আসলে তোমাদের সত্যি আশ্রয়।'


৭.       চোখ বুঝলেই নীল ভোর 


তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করলে
চোখ দু’টো নিঃশব্দে বন্ধ করি,
অতঃপর নীলোচ্ছ্বাস এক আলো
আমার অন্তর্লোকে ভেসে ওঠে ধীরে।

দেখি
বারান্দার রেলিং ধরে তুমি হেঁটে যাচ্ছো,
নীল শাড়ির আভা বাতাসে ঢেউ তোলে,
চুলে লেগে থাকা সূর্যরেখা
এক নিঃশ্বাসে আমাকে ডেকে নেয়।

তোমার চোখেও নীলেরই ছায়া
যেন অনন্ত সমুদ্র খুঁজছে তীর,
যেন বহুদিনের অপেক্ষা
হঠাৎ ফিরে পেয়েছে তার সঙ্গীকে।

কিন্তু চোখ খুললেই দেখি
অন্য মানুষ, অন্য কলরব,
আকাশের রঙও বদলে গেছে,
দূরে ধূঁ–ধূ প্রান্তরের ভোঁতা নীরবতা।

তবু জানি, চোখ বুজলেই
ফিরে আসবে তোমার সেই নীল ভোর,
ফিরে আসবে তোমার চলার শব্দ
যেন পৃথিবীর গোপন মায়া
শুধু আমার জন্যই বারবার জন্ম নেয়।


৮.         সন্ধ্যা মালতীর সুবাস


ঝরা পাতার শব্দে

তোমার আগমনের গান শুনি

নীল আলোয় ভিজে থাকা বিকেলে

হঠাৎই বাতাস বলে ওঠে, তুমি এসেছ।


খোঁপায় পরো তুমি সাদা সন্ধ্যা মালতী,

তোমার বাগানের তুমি যেন মালিনী একজন,

প্রতিদিন জল ঢালো সেখানে।

তুমি নিজেই হয়ে যাও কখনও সন্ধ্যা মালতী

নিজের সুবাসে নিজেই মোহিত,

নিজের আলোয় নিজেই আলোকিত।


তোমার পায়ের ধ্বনি  শিশিরের ভিজে

যার শব্দে থমকে যায় দুপুর

তোমার চাহনি ছুঁয়ে দিলে

মাটির ওপর খেলা করে গোধূলির লাজুক আলো।


যখন তুমি হাসো,

আলতো দোল খায় সমস্ত বাগান,

মালতীর পাপড়ি নেমে আসে তোমার মৃত্তিকায়

তখন মনে হয়, ভালোবাসা আসলে

একটি স্নিগ্ধ আকাশ,

যেখানে তুমি চাঁদ হয়ে ধীরে ধীরে ওঠো।


এসো, আজ রাতেও তোমার হাত রেখে দিও

আমার হাতে,

মালতীর দুঃখী সুবাসে আমরা দু’জন

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাব

ঝরা পাতার শব্দে, নিঃশব্দ সন্ধ্যায়,

একটি দীর্ঘ, গভীর, অনন্ত কবিতার ভেতর।


৯.         পিছনে ফিরে তাকিও না


কাউকে ছেড়ে যখন চলে আসে মানুষ,
পথের ধুলোয় তখন থামে না কোনও নিশ্বাস
পিছন ফিরে তাকালে
মায়ার ঘূর্ণি হঠাৎ পা জড়িয়ে ধরে,
ডেকে বলে “এবারও কি যাবে?
এবারও কি আমাকে ফেলে এগোবে?”

তুমি তাকিও না।
স্মৃতিরা জানে কেমন করে হৃদয় নরম হয়,
জানালার কাঁচে জমা কুয়াশার মতো
আচমকা দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয় তারা।
একবার থেমে গেলে
আবার যাত্রা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চলতেই হবে
তোমার ভিতরের আলো, অদেখা পথের ডাক
তোমাকে ডাকে আরও দূরে, আরও সামনে।
পেছনের দরোজায় হাত রাখো না,
বাতাসের মতো হালকা হয়ে এগিয়ে চলো;
কারণ যে সম্পর্ক নিজের ভারে ভেঙে যায়,
তাকে বহন করার দায় তোমার নয়।

পিছনে ফিরে তাকিও না
মায়া সুন্দর, কিন্তু বাঁধনও বটে।
তুমি যে মুক্ত আকাশের মানুষ,
তোমার হাওয়া থেমে থাকলে চলবে কেন?

চলে যাও, ধীরে ধীরে দৃঢ় পায়ে
আজকের সূর্য তোমার জন্যই উঠেছে,
আগামীকালও ঠিক উঠে যাবে
তোমার এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে।


১০.        অর্পণ 


তুমি তুলে দিয়েছিলে হাতে

ভালোবাসবার ভার

তোমাকে ভালোবেসে আজ

আমি নির্ভার, 


যার বুকে এত ভালোবাসা

নির্ঝরিণীর মতো নিরলস ঝরে,

তাকে ফিরিয়ে দেবো কী করে

সে শক্তি কি আছে আমার অন্তরে।


ভালোবাসা তো দান, অর্পণ,

ফিরিয়ে দেওয়ার জিনিস নয় কখনো

তাই তোমায় রেখে হৃদয়ের গহীনে

আমি শুধু ভালোবাসি নিঃশব্দে

অবিরত, অনন্ত, অক্ষয়ভাবে।


১১.       উদাস মন


মাঝে মাঝে ভালো লাগে না কিছুই
মন হয়ে যায় শ্রাবণের মেঘ,
কাঙাল হাওয়ার মতো ভাসতে থাকে
অচেনা কোন দূরদেশের দিকে।

খরা-লাগা বিকেলে
হঠাৎই নেমে আসে ভিজে অন্ধকার,
মনের উঠোনে নুয়ে পড়ে
অকারণ বেদনাভেজা এক নিমন্ত্রণ।

তবু এই মন চায় উড়ে যেতে
নীল পাহাড়ের ওপার
বা অচিন সমুদ্রের গোপন শব্দে,
যেখানে কেউ রাখে না বাঁধন,
যেখানে বিষণ্নতাও গান হয়ে যায়।

শ্রাবণের মেঘে মেঘে
এই মন আজও খোঁজে আশ্রয়
হয়তো ঠিক সেইখানেই
নতুন এক ভোরের দরজায়
কেউ নিঃশব্দে আলো রেখে গেছে।


১২.       কোনও যতিচিহ্ন নেই


কিছু সময় আসে ভালোবাসা উন্মাতাল হয়ে ওঠে
নিঃশব্দ উপত্যকার মতো নম্র বুকের ঢালে রেখে দিই চোখ
তোমার দেহে তখন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে অচেনা উষ্ণতা
মদিরার নেশা ভাসে হৃদয়ের ভিতর থেকে

জানালাহীন ঘরে হঠাৎ বাতাস থমকে দাঁড়ায়
স্বপ্ন ভেঙে কর্কশ শব্দে ছড়িয়ে যায় বাতাসে
তোমার ছায়ার ভিতর আমায় টেনে নেয় অদৃশ্য আলো
ডানায় ডানায় ছুঁয়ে যায় জন্মান্তরের কোনো স্মৃতি

শরীরের উপর শরীরের ঢেউ ভাঙে নীরব সাগরতটে
বুকের নিঃশ্বাসে ওঠা নামায় তৈরি হয় রহস্যের গোপন জোয়ার
আঙুলের স্পর্শে খুলে যায় রাত্রির অরণ্য
বুকে পিঠে কাঁধে উষ্ণতার ক্ষুদ্র আগুন জ্বলে ওঠে নিভৃতে

বেহিসাবী চাওয়াগুলো একে একে দুঃসহ আলোয় দীপ্ত হয়ে ওঠে
তোমার দেহরেখা ধরে বয়ে চলে মৃদু ঘূর্ণির মতো ঘাম
যেন বৃক্ষে চাঁদের আলো নেমে এসে দোল খায়
হৃদয়ের গভীরে তৈরি হয় এক প্রগাঢ় আলোড়ন
এক অন্তহীন নিমগ্নতা
যেখানে তুমি আমি মিলেমিশে হয়ে যাই শুধু দিগন্তের দীর্ঘশ্বাস। 


১৩.        ধরিত্রীর টানে


কি করে ভুলি
এই আকাশের নীল শান্ত ছায়া,
ধরিত্রীর উষ্ণতা, বাতাসের সতেজ গান,
জলের ঝিকিমিকি আলোতে ভেসে থাকা রূপকথা।

পৃথিবীর প্রতিটি অংশ যেন
আমার চোখে একেকটি নতুন বিস্ময়
পাইন গাছের চকচকে ডগা,
বালুকাময় সমুদ্রতটের নিঃশব্দ ঢেউ,
অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা রহস্য কুয়াশা,
আদিগন্ত ফসলের সবুজ প্রান্তর।

ঝিলিমিলি বাতাস যখন
ধানক্ষেত ছুঁয়ে যায়,
অশোকের গাছ থেকে
পাতারা যখন ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে
তখন মনে হয়,
এই পৃথিবীই আমাকে ডাকছে গভীর প্রেমে।

এইসব সৌন্দর্যই
আমাকে প্রতিদিন
ঘর থেকে টেনে বের করে আনে
প্রকৃতির অনন্ত টানে,
জীবনের অনিবার্য টানে।


১৪.       যেতে যেতে পথে


যেতে যেতে পথের উপর হবে দেখা,
চলতে চলতে নদীর কূলে হবে আমাদের মিলন,

হাওয়ার ডানায় ভর করে কোনো এক সাঁঝবেলার আলো
ছুঁয়ে যাবে তোমার চুলে লেগে থাকা ঘাসফড়িংয়ের গন্ধ,
আমরা থেমে থাকব দু’জন
অদেখা কোনো স্বপ্নের ঢেউয়ে ভাসব নীরব অনুভবে।

ফুলেরা নিজেদের মতো ফুটবে, ঝরবে,
আমরা তবু হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে নেবো এক টুকরো ধ্যানমগ্ন সময়
যেখানে তোমার হাত ছুঁয়ে আমার হাত
গোপনে বুনে নেবে অপরূপ কোনো অবাক বন্ধন।

তারারা নামবে মাথার উপর,
রাত ধীরে ধীরে নরম আর মায়াবী হয়ে উঠবে,
আর আমরা দু’জন
পথের শেষ কোথায় ভুলে গিয়ে
শুধু একে অপরের ভেতর
খুঁজে নেবো ফিরে পাওয়ার নিঃশব্দ সীমানা।


১৫.         মাধবীর কাছে 


নীল ভোরের অন্ধ জানালা খুলে

মাধবী এসেই বলে -

তোমার নামেই আজ সূর্য উঠুক,

তোমার চোখেই যেন দিনটা ভরে যায়।


পথের হাওয়া থমকে দাঁড়ায়

তার পদচারণার নরম সুরে,

তার কেশে ঝরে পড়ে আকাশের আলো,

চাঁদের নীরব নেশা জড়িয়ে থাকে তার মুখে।


সে হাসলেই মনে হয়

ঝরে পড়া পাপড়ির মতো

আমার বুকও হালকা হয়ে উড়ে যায়।

সে বলে

ভালোবাসা মানে তো থাকা নয়,

চোখ ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যেও থাকে অনন্ত জোয়ার।


আমি প্রতিদিন ভোরে

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকি

যদি আবার মাধবী এসে বলে যায়,

তোমার হৃদয়ে আজও জায়গা কি আছে 

আমার জন্য?


মাধবী এসে থমকে দাঁড়ায়,

তার ওড়নায় জড়ানো সন্ধ্যার গন্ধ,

সে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলে

তোমার স্পর্শে আজ আমার সব ক্লান্তি গলে যাক।


চাঁদের আলো তার চুলে লেগে

ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসে,

তার হৃদয়ের ধ্বনি ভেসে আসে

দূরের কোনো নরম বাঁশির সুর হয়ে।


সে বলে

ভালোবাসা মানেই প্রতিদিন নতুন করে

তোমার দিকে ফিরে আসা।

তার কণ্ঠ নরম কুয়াশার মতো

আমাকে ঘিরে থাকে নিঃশব্দে।


হঠাৎ থেমে সে তাকায় আমার দিকে

তার চোখে জমে ওঠে অলস দুপুরের আলো,

সে ধীরে বলে

তোমার নীরবতাতেই আমি সবচেয়ে জোরে

আমাকে ডাকার শব্দ শুনি।


তার হাসি শুকনো পাতায় ভোরের শিশিরের মতো

নরম করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

মাধবী বলে

তোমাকে ভাবলেই সমস্ত শহর

কাশফুল হয়ে দোলে হাওয়ায়।


সে এক পা এগিয়ে কাঁধে রাখে হাত

তার স্পর্শে হাওয়া পর্যন্ত

গরম হয়ে ওঠে ভালোবাসার কারণে।

সে ফিসফিস করে বলে

আমার পথ যত দূরেই যাক,

শেষরাতে তোমার স্বপ্নেই ফিরে আসি।


আর আমি ভাবি

এই একটুখানি মুহূর্তই বুঝি

প্রেমের সমস্ত মহাকাব্য হয়ে ওঠে। 


১৬.       তুমি এবং শূন্যতা 


তুমি আমার দুঃখের কারণ,
তুমি থাকলে উৎসব, না থাকলে শূন্যতা।

তোমার অভিমানের দেয়ালে থমকে যায় সব শব্দ,
তোমার হাসির আলোয় খুলে যায় মনের জানালা।

তুমি না বললে দিনগুলো হয় নির্জন উপকূল,
তুমি বললেই জোয়ার ওঠে—হৃদয় ভেসে যায় অজানা স্রোতে।

তুমি আমার পথের দূরত্ব, আবার পথচলার প্রেরণা,
তোমার স্পর্শে জীবনের নিঃস্বতা পায় পূর্ণতার জন্ম।

তুমি গেলে সময় থেমে যায়,
তুমি ফিরলে সময় আবার ডানা মেলে উড়ে…

এভাবেই তোমাকে নিয়ে
আমার প্রতিটি দিন
একটু কষ্ট, একটু আলো, আর অনন্ত ভালোবাসা।


১৭.       অপ্রেমে রয়ে গেলে তুমি


তুমি এখনও সম্পূর্ণ রমণী হয়ে উঠতে পারোনি
তোমার চোখে জমে আছে কিশোরী দ্বিধার কুয়াশা
স্পর্শ এলে দোল খায় লাজুক চঞ্চলতা
দীর্ঘ শ্বাসে ঝরে পড়ে অর্ধেক খোলা স্বপ্নের দাহ।

তুমি রয়ে গেলে অপ্রেমে
যেন নদী, উৎস আছে কিন্তু স্রোত নেই
যেন গহন রাত্রির নরম চাঁদ
আলো আছে, উত্তাপ নেই।

তোমার শরীরে লেখা ছিলো বহু অক্ষর
কিন্তু পাঠকের মতো কেউ
ঠাঁই করে নিল না তার গভীরতায়
তাই সব শব্দই রয়ে গেল অসমাপ্ত।

তুমি রয়ে গেলে অপ্রেমে
যেন প্রথম বর্ষার গন্ধ মাটিকে ভিজায়,
কিন্তু মাটির ভেতরে জন্মায় না কোনও উন্মত্ত সবুজ।

হয়তো কোনোদিন প্রেমের হাওয়ায়
তোমার রক্ত উথলে উঠবে
হয়তো সেইদিন তুমি সম্পূর্ণ রমণী হয়ে উঠবে
নিজের কাছে, নিজের ভেতরেই।


১৮.     কোমলে কুসুমে প্রিয়া


কোমলে কুসুমে প্রিয়া যখন আসে
নরম আলোয় ভেসে ওঠে তার রূপ
ভোরের শিশিরে ভেজা পাপড়ির মতো
মৃদু কাঁপে তার হাসির ধূপ।

তার গায়ের ছায়া ফুলবনের হাওয়া,
নরম ছুঁয়ে যায় বুকের উপত্যকা;
রঙিন সন্ধ্যার ধীরে নামা আলো
ঢেকে দেয় তার চোখের নীরবতা।

তার চুলে যেন রাতের মেঘেরা
গোপনে বুনে রাখে আলোর গন্ধ,
তার ত্বকে ফুটে ওঠে মধুমল্লিকার
স্নিগ্ধ, নিস্তব্ধ, উষ্ণ ছন্দ।

প্রিয়া যখন কাছে আসে ধীরে,
কম্পিত বাতাসে ভর করে প্রেম
সে হয় রূপকথার নরম স্পর্শ
যেখানে হৃদয় ডাকে একাকীত্বের নিমেষে।

কোমলে কুসুমে তার সকল রূপ
উষ্ণ জোছনার মতো বিছিয়ে থাকে,
প্রেমের গভীর নীরব সম্ভাষণে
দু’টি মন গোপনে জড়িয়ে থাকে।


১৯.     আলো আসুক 


আলো না আসুক,
দুঃখই কাঁদিয়ে দিক চোখ
তোমার প্রাণের খাতায়
কেবলই আলোর কথা লেখা হোক।

অন্ধকারের ভাঁজে ভাঁজে
যদি লুকিয়ে থাকে আমারই নাম,
তবু তোমার পথের ধুলোর মতো
নির্মল হয়ে থাকুক আমার সব অভিমান।

রাত নামলে নীরবতার গা ছুঁয়ে
হয়তো কোথাও জেগে উঠবে একটুকু ব্যথা,
কিন্তু তোমার জানালার পাশে
সকালের রোদ হয়ে ফুটুক আমার যত কথা।

তোমার আকাশে যদি ঝড়ে
ভিজে যায় দিনের অঙ্গীকার,
আমি দূরেই থাকব,
তোমার আলোয় রক্ষার প্রহরী হয়ে থাকব বারবার।


২০.     কেউ আসে, কেউ যায়


কেউ আসে, কেউ চলে যায়,

মনের আঙিনায় রেখে যায় হালকা স্পর্শের ছায়া

ঠিক যেমন সময়ে বদলায় রাজা,

রাজ্য থাকে রাজা আসে রাজা যায়।


হৃদয়ের সিংহাসনে অনেকেই এলো, গেলো,

কেউ কেউ হাওয়ার মতো ছুঁয়ে বিলীন হলো

কিন্তু তুমি এলে এক ভোরের আলো হয়ে,

দীর্ঘ অন্ধকারের পর এসে আলো জ্বালালে।


যেমন পুরনো রাজা হারায় সিংহাসন ,

নতুন রাজা খুঁজে পায় তার সুরভি ভরা মুকুট,

তেমনি আমি ভুলেছি কত স্মৃতি, কত নাম,

তোমাকে পেয়ে হৃদয় ফিরেছে নতুন প্রভাতের ধাম।


জীবন বলে—কেউ থাকে না চিরকাল,

তবু তুমি থাকো আমার মাঝে, নীরব মহাকাল।

কেউ আসে, কেউ যায় ঠিক রাজাদের মতোই,

তবু প্রেমের রাজ্যটি চিরদিন শুধু তোমারই।


২১.       অমর জাতির গান


জাতি উঠে দাঁড়ায় যখন অন্ধকার ভেদ করে,
তখন পাহাড়ও থমকে শোনে তার পদধ্বনি।
রক্তে লেখা ইতিহাস জ্বলে ওঠে দীপ্ত মশালের মতো,
সময় থেমে থাকে তার আত্মগৌরবের সামনে।

মাটির বুকের গভীরে শত বছরের আর্তি,
তবু মাথা নোয়ায় না
কারণ প্রতিটি শেকড়ে আছে অসংখ্য স্বপ্নের নীল নকশা,
যা ভেঙে যায় না ঝড়েও, ঝলসে যায় না রক্তঝরা দিনে।

যে জাতি শেখে চোখের জলকে শক্তি করতে,
যে জাতি শেখে ক্ষুধার মধ্যেও ন্যায় বলতে,
যে জাতি জানে মৃত্যু নয়
স্বাধীনতাই তার চূড়ান্ত পরিচয়,
সে জাতি কখনও হারায় না অমরত্বের আলো।

এই জাতির বুকেই জন্ম নেয় কবিতা,
যে কবিতা একদিন যুদ্ধের পোড়া ধুলো মুছে
পৃথিবীর মানচিত্রে আঁকে নতুন সূর্য।
হাজার বছর পরও সেই কবিতা বাঁচবে
একটি নামের মতোই
স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাহসের অমরশিখা হয়ে।

আমরা সেই জাতির সন্তান
যে জাতি মাথা তোলে দাঁড়ায়,
যে জাতি অন্ধকারকে জ্বালিয়ে আলো বানায়,
যে জাতি নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে
ইতিহাসের পাতায় লিখে যায়
অমরতার ঘোষণা।


২২.       প্রতিফলনের নিয়ম 


ভালোবাসা দিলে ভালোবাসাই ফিরে আসে,
নরম মাটিতে বীজ রোপার মতো
একদিন অঙ্কুর ফোটে, সবুজে ভরে ওঠে জীবন।

ঘৃণা দিলে ঘৃণাই ফিরে আসে,
শুষ্ক মরুর বুকে ঝড় ডাকার মতো
বালুঝড়েই ঢেকে যায় নিজেরই পদচিহ্ন।

মানুষের হৃদয় এক আয়না,
যা দাও, তাই প্রতিদিন ফিরিয়ে দেয়
হাসি দিলে আলো বাড়ে,
অসহিষ্ণুতা দিলে অন্ধকার ঘন হয়।

তাই এসো, আমরা হাতে রাখি কোমল আলো,
শব্দে রাখি উষ্ণতা
পৃথিবী যতটুকু দেই,
ঠিক ততটুকুই আমাদের কাছে ফিরে আসে।

রাগ দিলে রাগই জন্ম নেয়,
কিন্তু ক্ষমা দিলে ফোটে নির্মল শান্তি
দূরের মানুষও হয়ে ওঠে আপন।

এক বিন্দু মমতা দিলে
সমুদ্র হয় স্নেহের ঢেউয়ে
তাই বুকে জমা করো ভালোবাসা,
তবেই পৃথিবী বদলাবে তোমার চোখে।


২৩.      ঘোষণাপত্র


বিজয়ের এই মাসে
রক্তের নদী পেরিয়ে উঠতে থাকা সূর্য আমাদের আবার ডাকে
স্মৃতি জাগাও, দাঁড়িয়ে যাও,
কারণ ভুলে যাওয়া মানেই আবার অন্ধকারকে সুযোগ দেওয়া।

এই মাসে আমরা দেখি
নির্যাতনের সেই কালো রাত,
যেখানে মানুষের শরীর নয়,
জানোয়ারের নৃশংসতাও লজ্জায় কেঁপে উঠেছিল।
আমরা শুনি সেই কান্না, সেই আর্তনাদ,
যা বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণকে চিরকাল ভা করে রেখেছে।

আমরা ঘোষণা করি
এই দেশের বুক বিদীর্ণ করা বিশ্বাসঘাতকদের নাম
ইতিহাসের পাথরে খোদাই হয়ে থাকবে
লজ্জার দগদগে দাগ হয়ে।
যারা রাতের আঁধারে
বুকের ভিতর জন্ম দেওয়া ভয়ের হাত ধরে
শান্ত গ্রামে নেমে এসেছিল হত্যাযজ্ঞ চালাতে,
যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মৃত্যুর বাজার বসিয়েছিল
তাদের অপরাধের ছায়া আমরা কখনও ক্ষমা করব না।

বিজয়ের এই মাসে
আমরা আরও জোরে, আরও দৃপ্ত কণ্ঠে বলি—
স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রতিটি হাত,
মানুষ হত্যার প্রতিটি ষড়যন্ত্র,
মায়ের কোলে ফিরতে না পারা প্রতিটি শিশুর নিঃশ্বাস
মিলেমিশে তৈরি করেছে আমাদের ন্যায়ের শপথ।

এই শপথ শুধু রাগের নয়,
এই শপথ বিচারচেতনার,
যেখানে অপরাধের সামনে মাথা নত করার প্রশ্ন নেই,
যেখানে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড
শুধুই ঘৃণার নয়
চিরকালীন নিন্দার প্রতীক।

আজ তাই আমরা বলি
বাংলার আকাশে আর কোনও অন্ধকারের স্থান নেই,
এই ভূমি যুদ্ধের রক্তে পবিত্র হয়েছে,
এই নদী, এই বাতাস, এই ধুলো
স্বাধীনতার সন্তানদের বুকের আগুনে উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
বিজয় শুধু উৎসব নয়
বিচারের আগুন জ্বালিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা।

বিজয়ের মাসে তাই আবারও ঘোষণা
যারা মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছিল
তারা ইতিহাসের অন্ধকারে নির্বাসিত থাকবে;
আর যারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল,
তারা চিরকাল আলো হয়ে থাকবে
আমাদের হৃদয়ের পতাকায়।


২৪.         তোমার অনুপস্থিতি


আমার প্রতিটি বিষণ্ণতাই
আসলে তুমি কাছে না থাকা এক অদৃশ্য রোগ
যেন শরীরের ভিতর
অতল সমুদ্রের ঢেউ জমে থাকা একটি ধুকধুকে শোক।

তোমার অনুপস্থিতি হলো
দীর্ঘ রাত্রির মাথায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ চাঁদ,
তার আলোয় জন্ম নেয় কুয়াশা,
সেই কুয়াশায় আমার স্বপ্নগুলো পথহারা পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ফিরে আসতে জানে না আর।

তোমাকে ছাড়া সময় থমকে থাকা
একটি ভাঙা রূপকথা,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠা ছড়িয়ে দেয়
অনবরত উদাসী বিষাদের বর্ণমালা।

এই রোগে জ্বর আসে নরম,
হৃদয়ের ভেতর তুলোর মতো
কিন্তু জ্বালাটি গভীর,
যেমন গভীর হয় পাহাড়চূড়ায়
এক মুঠো সূর্যের নিঃসঙ্গ হাহাকার।

তোমার সান্নিধ্যই শুধু ওষুধ,
যার স্পর্শে খোলে হৃদয়ের বন্ধ জানালা,
তুমি কাছে এলেই মনে হয়
ডুবে যাওয়া নক্ষত্রেরা আবার জ্বলে ওঠে,
অন্ধকার গলে সোনালি আলো হয়ে
আমার শিরায় শিরায় বয়ে যায়।

তাই বলি, আমার প্রতিটি বিষণ্ণতা
তোমার না-থাকার নির্মম এক যন্ত্রণা,
তুমি ফিরে এলে সমস্ত রোগ সেরে ওঠে
এক নিমিষেই তোমার মায়ার স্পর্শে।


২৫.       দুঃখের অনিবার্য আগমন


ভালোবাসায় দুঃখ আসবেই
মৃত্যুর মতো নীরব, ধীর, তবু অনিবার্য,
যেন চাঁদের আলো ফুরিয়ে গেলে
অচেনা অন্ধকার এসে বসে জানালার পাশে।

যাকে ভালোবাসি, তারই ছায়া
আমার পায়ের আঙুলে কাঁটা হয়ে লাগে,
হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়লে
আনন্দ আর শোক একই গৃহে
পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে।

ভালোবাসা মানে আলো,
কিন্তু সেই আলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে
দীর্ঘ এক ছায়া
যেখানে হারানোর ভয়,
অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস,
ফেরার পথের গোপন কুয়াশা।

তবু এ-ই তো তার মহিমা
দুঃখকে বুকে ধরে রাখার সাহস,
ভালোবাসার প্রতিটি হাসির আড়ালে
ত্রস্ত এক মৃত্যুর মতো নীরব ক্ষয়,
আর সেই ক্ষয়ের মধ্যেই
আমরা খুঁজে পাই বেঁচে থাকার নতুন অর্থ।

ভালোবাসায় দুঃখ আসবেই
মৃত্যু যেমন আসে শান্তির সাথে,
তেমনি দুঃখ এসে শেখায়
ভালোবাসার গভীরতম সত্য:
যাকে আমরা হারাতে ভয় পাই,
তাকে নিয়েই আমাদের সমস্ত আলো।


২৬.        মায়াবী নদী


প্রেম কি শুধু শরীরের দাগ?
না-শরীরও তো শেষমেশ ভেসে ওঠা এক অদৃশ্য নদী,
যার স্রোত কখনও ভাঙে, কখনও গড়ে,
হৃদয়ও তো তারই মতো
নামহীন জোয়ারের ভেতর জন্ম নেয়,
হারায়, আবার ফিরে আসে।

গোধূলি নামে যখন
নদীর বুকে অচেনা নরম কম্পন,
তখন তুমি যাও
জলের ধারে বসে থাকো নিঃশব্দে।

তোমার সঙ্গিনীর কানে কানে
কিছু স্বপ্নের মতো কথা বলো
যে কথার কোনো মানচিত্র নেই,
যে শব্দ কেবল বাতাসে ভেসে ওঠে
আর সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়
তবুও থেকে যায় পর্দার ওপারে
মায়ার মতো, ছায়ার মতো।

তাকে দুঃখ দিও না
তার ভেতরেও তো আছে অনাবিষ্কৃত গ্রহ,
গোপন স্রোতের গা ছমছমে ডাক।

সে তোমাকে যা দেবে,
তা হয়তো আলো নয়, অন্ধকারও নয়,
এক অচেনা স্পর্শ
যার ব্যাখ্যা তুমি কখনও পাবে না,
তবুও জানবে
এটাই প্রেমের সেই অদৃশ্য নদীমাঠ,
যেখানে সবকিছু সত্য,
তবু কিছুই পুরোপুরি বোঝা যায় না।


২৭.        নিঃসঙ্গ আলোর গোপন সুর


মাঝে মাঝেই দিনের শেষ আলো
স্বপ্নের জানালায় নরমভাবে টোকা দেয়
দূরাগত কোনও অদৃশ্য ঘন্টার ধ্বনি
মনে দোলা তোলে জোয়ার ভাটার মতো,
তখন মনে হয় সব ছেড়ে
স্বপ্নঢাকা কোনও পথের মাথায়
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি বহুক্ষণ,
যেন বাতাসের ভেতরই জন্ম নিচ্ছে
এক গোপন গন্তব্যের মায়া।

কখনও আবার অকারণে ফিরে আসে
হারানো সন্ধ্যার মধুময় মুহূর্ত
আলো, শব্দ, গন্ধ সব মিলেমিশে
সন্ধের নরম অন্ধকারে
আমার ঘরটাকে ভরে তোলে অচেনা জাদুতে।
সেই জাদুর ভেতর আমি অনিমিখ চেয়ে থাকি,
যেন কোনও পুরনো স্মৃতি এসে
আঙুল ছুঁয়ে বলে যায়
“আমি এখনও আছি।”

তখন বুঝি,
আমার সমস্ত পাওয়া না-পাওয়ার মাঝেই
কত গভীর শূন্যতা লুকিয়ে থাকে
এক অদ্ভুত মায়াময় নিঃসঙ্গতা,
যার সামনে আমি
নিঃশব্দে, নিঃস্ব হয়ে দাঁড়াই।


২৮.        অদৃশ্য স্পর্শের গান


আমার নিঃশ্বাসে ভেসে আসে তোমার অদৃশ্য স্পর্শের গান,
যেন দূর–নক্ষত্রের আলো ছুঁয়ে যায় নরম অন্ধকার।
হঠাৎ কেঁপে ওঠে জানলার ধারে শুকনো বাতাস,
মনে হয় তুমি পাশ কাটিয়ে গেলে অচেনা কোনো স্রোতের মতো।

চোখ বুঁজে ভেবে দেখি
তোমার স্পর্শ আসলে কোনো আঙুল নয়,
এ এক রহস্যমাখা আলো,
যা ছায়া হয়ে নামিয়ে দেয় হৃদয়ের ভিতর ঝরনার শব্দ।

রাত গভীর হলে
তোমার অদৃশ্য হাত এসে ছুঁয়ে দেয় কপালের কাছে,
নামহীন এক উষ্ণতা নিয়ে
যেন বহু পুরোনো এক স্মৃতি আজও হাঁটছে আমার সঙ্গে।

আমি তখন একা নই,
কারণ তোমার সেই নীরব স্পর্শ
অদৃশ্য হলেও জ্বালিয়ে রাখে অন্তরের প্রদীপ।
তার আলোয় আমি শুনি
ভালোবাসা আসলে ঠিক এরকমই,
দেখা যায় না, তবু ভরে রাখে সমগ্র পৃথিবী।


২৯.       এসো

এসো, আমাকে আলিঙ্গন করো সেই শান্ত নদীর মতো
নরম স্রোতে বুকে ঢেউ তোলো,
যেন বহুদিনের তৃষ্ণা মেটে এক ছোঁয়ায়।

জড়িয়ে ধরো সমুদ্রের গভীরতায়,
যেখানে অসীম নীলতার মতো
তোমার নীরব প্রেম ছড়িয়ে থাকে চারদিকে।

মিশে যাও মোহনার গোপন রহস্যে,
যেখানে দুই আলোর পথ এসে
একটি সুরে গাঁথা হয় নিঃশব্দে।

তোমার চুম্বন দাও সেই দেবশিশুর মাতৃক্রোড়ের উষ্ণতায়,
যেখানে নিরাপত্তার ঘ্রাণ,
আর জন্মের প্রথম আলো মিশে থাকে।

এসো, বাহুবন্ধনে আমাকে সম্পূর্ণ করো
আমার সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে
জ্যোতির্ময় করো সূর্যের মতো,
নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি হয়ে
আমার বুকে নিঃশব্দে উদিত হও।


৩০.        উন্মোচিত নক্ষত্র সময়


প্রস্ফুটিত শরীর খুলে খুলে দাও
একান্ত ঐশ্বর্যগুলি উৎসর্গ করো
নির্জন পরশমণি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দাও
আমাদের কোনো অপূর্ণকাল নেই;
আমরা দু’জনই যেন কোনও রহস্যের ভাজ খুলে
গোপন আলো বর্ষণ করি একে অপরের অন্তরে।

এই সন্ধ্যার বাতাসে অদৃশ্য যে সুর বেজে ওঠে,
তা তোমার নিঃশ্বাসে জন্ম নিয়ে আমার বুকে নেমে আসে।
আমরা দু’জন মিলে যেন আদিম কোনও আকাঙ্ক্ষার নদী
স্রোতের ভিতর স্রোত, আলোয় ঢেকে থাকা সুধা,
যেখানে রাতের সব ক্লান্ত তারাগুলো
আমাদের দেহের উপর নেমে এসে বিশ্রাম নেয়।

তোমার স্পর্শের ভিতর যে নীলাভ দিগন্ত,
আমি সেখানে প্রতিদিন ডুব দিতে চাই,
যেমন কুয়াশা ভোরের বুক ভিজিয়ে ফেলে
ধীরে, নরম, পরম নিবিড়তায়।
তুমিও আমার ভেতরে রেখে দাও তোমার সমস্ত অনুচ্চারিত সঙ্গীত,
যেমন কোনও লুকানো দেবালয় আপন আলো জ্বালে
নিস্তব্ধ প্রার্থনার মতো।

এসো, এই জন্মে, এই মুহূর্তে,
আমরা পরস্পরকে সম্পূর্ণ করে দিই—
অদৃশ্য আলো, দেহজ গন্ধ, কোমল উত্তাপ,
সব মিলেমিশে যাক একই নাক্ষত্রিক ঘূর্ণিতে।
কোনো আক্ষেপ, কোনো অসম্পূর্ণতা, কোনো অপেক্ষা নয়
শুধু তুমি আর আমি,
আর আমাদের বিস্ময়ে ভরা উন্মুক্ত মিলন-সময়।


৩১.       নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী


ওষ্ঠদ্বয়ের উপর  চুম্বনরাশি ঢেলে দিতাম নিরালায়,পায়ের আঙুল থেকে মাথার কালো চুল পর্যন্ত ঢেউ উঠত, সবখানে ছড়িয়ে দিতাম গভীর সোহাগের মণিরত্ন, অদৃশ্য আলোয় জ্বলত তোমার দেহের উপাসনা।

তবু কোনো এক সন্ধ্যায়, যদি ঝরে পড়ে তোমার এক ফোঁটা অশ্রু, রূপের নির্মম অধিপত্নী তুমি, সেই অশ্রু ম্লান করে দিতে পারে তোমার চোখের তীব্র জ্যোতি, ভেঙে দিতে পারে তোমার সব অভিমান, সব নিবেদন, সব অবনত প্রেম।

তবু তোমাকেই কেন্দ্র করেজ্বলে ওঠে আমার সমগ্র রাতের আকাশ, নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী, তোমার ক্ষণিক অশ্রুই আমার সকল আলো-অন্ধকারের নিয়তি।


৩২.       যেখানে যাও 


যেখানে যাও যত দূরে, ভোরের সূর্যের মতো দীপ্ত তুমি,

হাওয়ার ভেসে যাওয়া গানে লুকিয়ে থাকে তোমার নাম,

দূরত্ব যতই বাড়ুক, হৃদয়ের দিগন্ত ততই বলে

তুমি আছো হৃদয় গহীনে আমার নীরব প্রার্থনার তলে।

তাই যেখানে যাও, উড়ে যাও যদি নক্ষত্রেরও ওপারে,

নিজের অজান্তে থেকো তুমি আমার প্রতিটি শ্বাসে প্রশ্বাসে।


৩৩.        শঙ্খনদের পাড়ে


এত বছর পেরিয়ে গেছে

তবু স্মৃতিরা নরম কুয়াশা ভোরের মতো ফিরে আসে।

মনে পড়ে সেই বিকেল

পাহাড়ি পথের নীরব নুড়ি,

শঙ্খ নদীর কাঁধ ছুঁয়ে

দুজন মানুষের পাশাপাশি হাঁটার উষ্ণ প্রতিধ্বনি।


মনে পড়ে

তোমার চুলে বাতাসের নরম দোল,

আমার কথার মাঝখানে তোমার মৃদু হাসি,

দূরের বন থেকে ভেসে আসা নাম-না-জানা পাখির ডাক,

আর আমাদের পদধ্বনির অপ্রকাশিত সুর।


মনে পড়ে

এক ঝুম বৃষ্টির দুপুরে কুয়াশার আড়াল থেকে

হঠাৎ তোমার মুখ দেখার মোহ,

হাওয়ায় ভিজে যাওয়া তোমার চোখের পাতা,

আর আমার শিউরে ওঠা হৃদয়ের শব্দ।


মনে পড়ে

খোলা মাঠে শুকনো ঘাসের উপর বসে

সূর্যাস্তের কমলা রঙে

তোমার মুখটাকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা,

যেন পৃথিবীর সব আলো তোমাতে এসে থেমে আছে।


মনে পড়ে

রাত নামার আগেই তোমার হাত ধরে বলা

চলো, আরও একটু পথ হাঁটি

আর তুমি বলেছিলে,

এই হাঁটাই তো আমাদের ছোট্ট জীবনের

সবচেয়ে বড়ো যাত্রা।


এত বছর পরেও,স্মৃতিরা শুকায় না

তারা নদীর মতোই বয়ে আসে,

পাহাড়ের মতোই অটল থাকে,

আর তোমার মতোই অবিরাম, মধুর,

অপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে।


৩১.         জানি দূরে চলে যাব 


দূরে চলে যাব, জেনেও
এমন নিখুঁত আদরে রাখি তোমাকে,
যেন প্রতিটি ছোঁয়ায়
গোপন করে দিই বিদায়ের সমস্ত ভার।

তোমার চোখে যখন মৌনতার আলো নামে
আমি তখন সযত্নে সাজিয়ে রাখি
একটি সন্ধ্যার রূপকথা
যেখানে বাতাসও তোমার নাম ধরে ডাকে।

জানি, কোনও একদিন হঠাৎ
আমি ভেসে যাব অচেনা নক্ষত্রপথে,
তবু তোমার কাঁধে আজও রাখি
আমার নির্লোভ উষ্ণ হাত,
যেন সে স্পর্শটুকু তোমাকে বলে,

“রাখো আমাকে, যতক্ষণ থাকা যায়,
হয়তো কাল অনন্ত দূরের হবো
তবু আজ তোমার পাশে
একটি অশ্রুজল-ভেজা চাঁদের আলো হয়ে থাকি।”


৩২.      ঠোঁটের আগুন


দাও তোমার ঠোঁটের আলো,

দাও ঠোঁটের আগুন,

হাওয়ার মতো দুরন্ত বেগে কে

এসে নেভালো সেই আগুন।


রোদ থেকে ডেকে তাকে বসাও কাছে 

ভালোবাসো সৌম্য সুন্দর যতনে-

জড়াও দু’হাতে পৃথিবী যেন পাছে

থেমে থাকে স্পন্দনে।


রাত নামলে  ফিরিয়ে দেবো

স্বপ্নের সব রঙ, সব ছোঁয়া, সব উষ্ণতা-

তুমি শুধু কাছে থেকো 

চুমুর ভিতর লুকিয়ে রেখো

আমার সকল মুগ্ধতা।


৩৩.      ঢেউহীন জলের বিষণ্ণ সৌন্দর্য 


যে জলে উন্মাতাল ঢেউ নেই,
আমি কি সেই নিঝুম, নির্জীব জলে আমার রাজহংস ভাসাতে পারি?
শুষ্ক বাতাসে দুলে ওঠা শাপলা–পাতার মতো
আমার মনও থির থির করে, তবু ঢেউ তো জন্মায় না হঠাৎ।

বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা ঝরতে ঝরতে যদি উত্তাল হয় দিঘি,
তবু কি তার বুক থেকে সমুদ্রের নোনাধরা স্বাদ উঠবে?
নাকি কেবল নীরবতার কুয়াশা ছড়িয়ে
আমাকে ফিরে দেবে আমার নিজের গভীর একাকিত্বে?

যদি সে উর্বশী না হয়, আলো ছড়ানো দেবী,
যদি না হয় অহল্যা, পাথর ছাড়িয়ে মুক্ত হওয়া এক নিশ্বাস,
তবে আমি পাষাণই রয়ে যাব, প্রেমে কিংবা অপ্রেমে,
কারণ যে হৃদয় জাগতে জানে না, তাকে তো কোনো নক্ষত্রই জাগাতে পারে না।

তবু অদ্ভুত এ জীবনে কখনও সামান্য ছোঁয়াতেও
প্রতিধ্বনির মতো জন্ম নেয় আলোক, ক্ষুদ্র তরঙ্গও ভেঙে দেয় নীরবতা;
হয়তো কোনো অচেনা হাত এসে ছুঁয়ে দিলে
পাষাণের গায়েও ফুলের রঙ লাগে,
হয়তো সেদিন রাজহংসও ভেসে যাবে
ঢেউহীন জলেই, অদ্ভুত এক বিষণ্ণ সৌন্দর্যের ভিতর।


৩৪.      হে রাজ- রাজেশ্বরী


হে রাজ, রাজ্যশ্বরী প্রিয়তমা আমার,
তোমার পদতলে জমে থাকা মৃত্তিকা যেন আমারই শিরায় ঢেউ তোলে,
তুমি আমাকে দাও সেই মাটির ছোঁয়া,
যার গন্ধে সহস্র জন্মের স্মৃতি জেগে ওঠে।
মহাকালের নির্জন প্রাচীরে থেকে
এক দণ্ড সময় তুলে এনে দাও,
আমি তোমার হৃদয়ের কোলে রাখব
হেমশস্যের সোনালি বীজ,
যা থেকে পৃথিবী জেগে উঠবে নতুন দীপ্তিতে।

তুমি তোমাকে উৎকর্ষিত কর, প্রস্ফুটিত কর,
অন্তর্লীনে, অন্তর-শরীরে ছড়াও অপরূপ সৌরভ,
যেন নীরব সন্ধ্যায় জোনাকির সারি
চাঁদের আলোকে ভাষা দেয়।
সমুদ্র মন্থনের গোপন আলোড়নে
ফুটে উঠুক পারিজাত- আমার ভূমিকন্যা,তোমার আশীর্বাদের শিরায় জন্ম নিক তাদের প্রথম আলোকদৃষ্টি।

তোমার কণ্ঠে যদি ওঠে কোনো প্রার্থনা,
আমি তা বাতাসে বুনে দেব,
ঘূর্ণি হয়ে তা নেমে আসবে
তোমার কেশে, তোমার হাতে, তোমার স্বপ্নে।
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণতায়
আমি জাগ্রত করব প্রতিটি ঋতুর সঙ্গীত
বসন্তের আঙুলে রঙিন অশোকপাতা,
বর্ষার বুকে নদীভরা গান,
হেমন্তের শিউলি-গন্ধে ভাসা প্রভাত,
শীতের কুয়াশায় লুকিয়ে থাকা অনন্ত আকুলতা।

হে অবর্ণনীয়া,
তুমি আমার মাটির উৎস,
আমি তোমার বুকে বপন করি জ্যোতির্ময় বীজ,
যাতে আগামী দিনের শিশুরা
তোমার নাম শুনলে
আকাশে তুলসীপাতার মতো ঘ্রাণ পায়।

তুমিই আমার অনন্ত ভূমি,
তুমিই আমার চিরজাগ্রত আকাশ।
তোমার প্রেমের অভিষেকে
আমি প্রতিটি শ্বাসে লিখে যাই একটাই শপথ—
যতদিন আমার নিশ্বাসে আগুন আছে,
আমি তোমাকে প্রস্ফুটিত রাখব
এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের চিরন্তন পারিজাত হয়ে। 


৩৫.       হাসির আড়ালে কান্না 


হাসিখুশি মানুষেরাই রাতের আধারে অসহায়ের মতো কাঁদে
দিনভর তারা রোদ্দুর বয়ে আনে মুখে,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে ক্ষতচিহ্ন,
ভাঙা স্বপ্নের নীরব শব্দ কেউ শোনে না।

তারা জানে, কাঁদলে প্রশ্ন আসবে,
তাই হাসিরই পোশাক পরে নেয় বারবার,
লোকচক্ষুর মেলায় তারা শক্ত, অটল
ভেতরে ভেতরে গলে যায় বরফের পাহাড়।

রাত নামলে সব মুখোশ খুলে পড়ে,
নিভে যায় দিনের সাজানো আলো,
বালিশ ভিজে ওঠে অনুচ্চারিত নামেই,
অশ্রুতে ভাসে না-বলা হাজার কথা।

হাসিখুশি মানুষেরাই সবচেয়ে একা,
কারণ কেউ ভাবেই না
এই হাসির ভেতরেও
একটি ক্লান্ত হৃদয় নীরবে কাঁদে।


৩৬.         স্বপ্নের ঠিকানা


আমি স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসি,
কিন্তু যাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনি
সে এখনো আমার কাছেই থাকে,
দিনের আলোয়, নিঃশ্বাসের পাশে।

তাই স্বপ্নগুলো আপাতত
চুপচাপ বসে থাকে চোখের কোণে,
জেগে থাকাই তখন যথেষ্ট,
তার হাত ছোঁয়ার উষ্ণতায়।

যেদিন হঠাৎ দূরত্ব নামবে,
পথের মাঝে নীরবতা জমবে,
সেদিনই স্বপ্নের দরজা খুলব
তাকে ডেকে নেব ঘুমের দেশে।

স্বপ্নের ভিতর সে থাকবে আমার,
কোনো বিদায়ের ব্যথা ছাড়াই,
চোখ বুজলেই কাছে আসবে,
হৃদয়ের ঠিকানায় ফিরে আসবে বারবার।

দূরে গেলে তবেই স্বপ্ন,
কাছে থাকলে জাগরণ
এইভাবেই ভালোবাসা
আমার দিন আর রাত ভাগ করে নেয়।


৩৭.       লেখার কাছে ফিরে যেও


কখনও যদি নিজেকে খুব একা লাগে,
যদি তোমার পাশে বসবার মতো কেউ না থাকে,
যদি নিঃসঙ্গতার ধূপ আগুনে
নিঃশব্দে পুড়তে থাকো সারাক্ষণ

তবে তুমি লেখার কাছে ফিরে যেও।

সেখানে শব্দেরা জল হয়ে আসবে,
তোমার শুকনো চোখে ভিজিয়ে দেবে রাত,
কবিতারা চুপিচুপি হাত ধরবে,
আর গল্পেরা গল্প হয়ে নয়
সহযাত্রী হয়ে পাশে বসবে।

তুমি কবিতার সঙ্গে কথা বলো,
তার শূন্যতার বুকে রেখে দাও নিজের ভার,
গল্পের সঙ্গে গল্প করো
সে তোমাকে শোনাবে
তোমারই বলা হয়নি এমন কত কথা।

লেখা কখনও ছেড়ে যায় না,
সে নিঃসঙ্গতার ছাইয়ের ভেতর
আগুনটুকু লুকিয়ে রাখে।
আর তুমি, শব্দে শব্দে
নিজেকে আবার খুঁজে পাও
অল্প আলোয়, গভীর নির্জনে।


৩৮.         নিকষিত হেম


সৃষ্টিকর্তার মুঠোয় গড়া
অতি ক্ষুদ্র এক সময়ের জীবন
সে জীবনের সমস্ত আলো ছায়া
তুমিই হলে আমার একমাত্র সহচরী।

তোমার এলোমেলো চুলের আড়ালে
মুখ লুকিয়ে নিঃশ্বাস নিই প্রাণভরে,
তোমার বুকের পাঁজরে ঠেস দিয়ে
মহাকালের সুখ-দুঃখ শিখে নিই ধীরে ধীরে।

জীবননদী বয়ে চলে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ক্ষয় হয় দিন, ক্ষয় হয় আমি,
তবু তোমার নাম উচ্চারণ করলে
সময় হয়ে ওঠে নিকষিত হেম।

যেদিন পার হতে হবে ওপার তট,
শেষ আলো নিভে আসবে দিগন্তে,
সেদিনও চাই
তোমাকেই ভালোবাসতে ভালোবাসতে
এই জীবন ছেড়ে যেতে।


৩৯.           নদীর কাছে নমিতা


কি পাগল মেয়ে সে নমিতা,

আমার একখানা হাত তার পাঁজরে জড়িয়ে

জলের দিকে টেনে নিয়ে যায় আমাকে।

চোখে তার টলটলে বিস্ময়,

কণ্ঠে স্বচ্ছতার প্রার্থনা।


সে বলে

দেখো, কী অপার এই জল,

কী নির্মল রূপ, কী পবিত্র শ্বাস!

এসো, আমার সাথে তুমি এই জল স্পর্শ করো,

আমাকে অশেষ করো

দাও জগৎ, দাও জন্মান্তরের দান,

দাও তোমার মঙ্গল ছোঁয়া।


আমি যদি বলি

নাও আমার ধনদৌলত,

নাও সকল সঞ্চিত ঐশ্বর্য,

নাও আমার নাম, আমার অহংকার,

নাও সব

তবে কি তুমি ফিরিয়ে দেবে না নিজেকে?


কত যুগ আগে তোমাকে দেখেছিলাম,

সময়ের কুয়াশায় ভুলে গিয়েছিলাম মুখ,

তবু এই নদীর মতোই

তোমার ডাকে ছিল চিরচেনা টান।

কতকাল ধরে এমনই এক ক্ষণ

আমি প্রার্থনা করে এসেছি

একটি নদী,

আর তোমার মতো একজন,

যার কাছে আমার সমস্ত কিছু

নিঃশর্তে দান করতে পারি।


আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

নেমে এসেছে জীবনের তীরে।

জল কাঁপে, বাতাস থেমে শোনে,

নদী সাক্ষী থাকে আমাদের নীরব অঙ্গীকারে।


এই মুহূর্তকে তুমি ফিরিয়ে দিও না রঞ্জন

আমাকে, এই জলকে,

এই অনন্ত স্পর্শকে,  এই চিরন্তন দানের ইচ্ছেটুকুকে

তুমি অস্বীকার কোরো না।


৪০.         আত্মা প্রস্থানের সময়


যখন আত্মা দেহ থেকে প্রস্থান করবে,

সময়টা তখন হবে যেন থেমে থাকা এক নিঃশব্দ সন্ধ্যা।

চারদিকের আলো যেন একটু ক্ষীণ হয়ে আসবে,

হাওয়ায় ভাসবে অদ্ভুত এক শূন্যতার গন্ধ—

না ভয়, না সান্ত্বনা;

এক অচেনা অপেক্ষার অমোঘ টান।


মনের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিগুলো

হঠাৎ করে যেন নদীর স্রোতের মতো ফিরে আসবে

স্মৃতিগুলো তখন নদীর উজান ধরে ফিরে আসে।

ভেসে ওঠে শৈশবের কাদায় হাঁটা দুপুর,

মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া বিকেল,

প্রথম প্রেমের কাগজ-চিঠির মৃদু কাঁপুনি,

ভুলে যাওয়া বন্ধুর হাসি,

ভুল করে কাঁদানো কারও মুখ।

সবকিছু তখন এক পর্দায় ভেসে ওঠে

কখনও উজ্জ্বল, কখনও ফিকে,

তবে সবই অদ্ভুতভাবে স্পর্শহীন,

যেন দূর কোনও জানালা থেকে দেখা পুরোনো জীবন

কারও অচেনা ক্ষমা, কারও গভীর অভিমান।


ঠিক কোন সময়ে হবে?

যখন শরীর আর ধরতে পারবে না বেদনার ভার;

যখন নিঃশ্বাসের ভাঙা তালের মাঝে

জীবন ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে আসবে।

হয়তো কোনো গভীর রাতে,

যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকবে,

রাতের বাতি নিভে আসবে,

আর অন্ধকারের বুকেও শোনা যাবে এক চিরপরিচিত ডাক।

অথবা কোনো দুপুরে, রোদের ম্লান সোনালি ছায়ায়,

যেখানে নীরবতা এসে হাত রাখে কাঁধে।

সময় তখন নিজের নিয়ম ভুলে যায়।

রাতের গভীরে হতে পারে

যখন সবাই ঘুমিয়ে কঠিন পৃথিবীর চাপ ভুলে আছে।

অথবা ভোরে, যখন প্রথম আলোয় আকাশ ভিজছে,

আর পাখিরা মনে করছে

আজও জীবন শুরু হচ্ছে আরেকবার।

বা দুপুরে, যখন রোদ সামান্য ঢলে পড়ে,

আর বাতাস ফিসফিস করে বলে

"এটাই হয়তো শেষ যাত্রার সঠিক সময়।"


প্রস্থানের সেই মুহূর্তে হয়তো দেহ হবে ভারী,

কিন্তু আত্মা হয়ে উঠবে অদ্ভুত হালকা

যেন বহুদিনের বোঝা নামিয়ে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে।

তারপর ধীরে ধীরে খুলে যাবে এক অদেখা পথের দরজা,

যেখানে আর কোনও ব্যথা নেই,

শুধু থাকে এক নিশ্চুপ, করুণাময় আলো।


৪১.        পদ্মা পাড়ের দীর্ঘশ্বাস 


রঞ্জন,

দীর্ঘ অসুখের নীরব লড়াই শেষে

দেড় মাস আগে

আমার স্বামী আলোর মতো নিভে গেল।

ধরে রাখার সব চেষ্টা

হাওয়ার কাছে হার মানল।


এই শহরে

দেয়ালগুলো হঠাৎ খুব উঁচু হয়ে গেল,

রাস্তাগুলো ভয় শেখাতে লাগল।

নিজেকে এত একা, এত অনিরাপদ মনে হলো যে

ফিরে এলাম আমার ছোট্ট শহর—ভেড়ামারায়।

জানি, এখানেও ভালো লাগবে না;

তবু দূরের কোলাহল থেকে

এই নীরবতার কাছেই আশ্রয় নিলাম।


মনটা প্রায়ই অপার্থিব কোনো ছায়াপথে

ছুটে যেতে চাইবে

যেখানে দুঃখেরও ক্লান্তি আছে, 

শোকেরও বিশ্রাম।


একটি স্কুলে পড়াব

ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের, ওদের অক্ষরের ফাঁকে

আমার ভাঙা দিনগুলো লুকিয়ে রাখব।

ওদের হাসির শব্দে মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকব

আমার স্বামীর নাম,

আমার বুকের ভিতর জমে থাকা শূন্যতা।


তবু সন্ধ্যা নামলেই

ঘরে আলো জ্বালাতে গিয়ে হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসবে।

এই আলো তো ওর হাতেই প্রতিদিন জ্বলে উঠত,

সে কথা মনে পড়লে

আলোই যেন অন্ধকার হয়ে যায়।


কোনো কোনো দিন মনটাকে ভালো করতে

একাই হেঁটে চলে যাব পদ্মা পাড়ে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে দেখব

পদ্মায় কত জল! অজস্র, অবিরাম, গভীর।

কী যে ভালো লাগবে আমার

জল দেখলে কেমন করে চোখ ভরে যায়।


সেই জলের ঢেউয়ে ছায়ার মতো ভেসে উঠবে

তোমার মুখ।

পদ্মা তখন আর নদী থাকবে না

সে হবে স্মৃতির আয়না,যেখানে হারিয়ে যাওয়া

আর পাওয়া না-পাওয়ার সব কাহিনি

একসাথে জ্বলে উঠবে।


রঞ্জন,

এইভাবেই আমি বাঁচব, কিছুটা ভুলে,

কিছুটা মনে রেখে জলের ভেতর মুখ খুঁজে নিয়ে,

আলো জ্বালিয়ে আবার নিভিয়ে।

— রুনু


৪২.         চোখের জল


পৃথিবীর সব জল শুকিয়ে গেলেও
আমার আঁখিতে তখনও জোয়ার থাকবে
নোনা নয়, লোনা নয়,
সে জল স্মৃতির,
ভালোবাসার অনিবার্য দায়ে ভেজা।

নদী থেমে গেলে কী আসে যায়,
সমুদ্র যদি নিজের নাম ভুলে যায়,
আমার চোখে তখনও ভাসবে
তোমার মুখের সেই নীরব আলো,
যেখানে হারিয়েছিলাম
সব চাওয়া-পাওয়ার হিসাব।

আমি কিছু চাইনি কখনও,
পাইনি বলেও কোনও অভিযোগ রাখিনি
শুধু বুকের গভীরে
একটি অদৃশ্য চুক্তি লিখে রেখেছি,
যেখানে লেখা
ভুলে যেও না, এটাই আমার প্রাপ্য।

সময় যদি সমস্ত চিহ্ন মুছে দেয়,
যদি সম্পর্কেরা ধুলো হয়ে যায়,
আমার চোখে তখনও জমে থাকবে
এক ফোঁটা অনন্ত স্মরণ,
যা তোমাকে দোষ দেবে না,
শুধু মনে রাখবে।

কিছু ভালোবাসা থাকে যা স্পর্শ চায় না,
কথা চায় না,
শুধু নীরবে বেঁচে থাকার একটি দায় তুলে দেয়—
সে দায়টুকুই নিও, আমায় মনে রাখিতে।


৪৩.         গভীর ব্যথার কবিতা


ডিসেম্বরের শেষ প্রহর,

স্বাধীনতার আলো তখন

হেমন্তের কুয়াশা ভেদ করে

বাংলার আকাশ ছুঁতে চাইছে

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই

নেমে এলো এক শীতল, অশ্রুভেজা অন্ধকার।


রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতায়

পাকিস্তানি সেনারা,

তাদের দোসর আলবদর–আলশামসের হাত ধরে

চিহ্নিত করতে লাগল

দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের

যারা বন্দুক নয়,

কলম আর জ্ঞানের আগুনে

স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিল।


মিরপুরের নিস্তব্ধতা, রায়েরবাজারের গহর,

ঢাকার দুয়ারে দুয়ারে

চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো

শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক

এই মাটির মেধা,

এই দেশের স্বপ্নবুননকারীরা।


অন্ধকারের বুকেই

তাদের শেষ নিশ্বাস থেমে গেল,

রক্তে ভিজল বাংলার ভোর,

চিহ্ন হয়ে রইল ইতিহাসের পাতায়

কেননা তারা জানত

স্বাধীনতা জন্ম নেয় না কথায়,

জন্ম নেয় ত্যাগে,

অপূরণীয় ক্ষতির বেদনায়।


১৪ ডিসেম্বর তাই শুধু দিন নয়,

একটি জাতির অভিমান,

একটি দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতি—

যেখানে মৃত্যুর মধ্যেও

বেঁচে আছে আলোর দীপশিখা।


আর বিজয়ের সকাল যখন উঠল

লালসবুজ পতাকা নিয়ে,

তখন আমরা বুঝলাম

যারা মাটিতে মিশে গেলেন,

তারা আসলে মিশে রইলেন আমাদের আত্মায়,

শহীদ বুদ্ধিজীবী

বাংলাদেশের চিরন্তন আলোকশিখা।


৪৪.            এই দেশ শহীদদের


রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ 

তবু আমরা নত হব না।

রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ,

পচা অন্ধকারে ঢেকে গেছে পথঘাট,

কিন্তু আমাদের শিরায় শিরায় জ্বলে

রক্তঝরা একাত্তরের অগ্নিস্মৃতি।

যারা দেশ তুলে দিয়েছিল অমানুষের হাতে,

আজও তারা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়

কাগজে-কলমে নতুন চেহারা,

কিন্তু ভেতরে একই বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ।


আমরা যারা মাটির কাছে মাথা রাখি,

জানি এই দেশের প্রতিটি দানা

শহীদের রক্তে সিক্ত

এই সত্য তারা মুছতে পারবে না কোনোদিন।


তাই প্রতিবাদ ওঠে বুকের গভীর থেকে

ধুলো ঝেড়ে দাঁড়িয়ে যায় ইতিহাস,

লাল-সবুজ পতাকা মেলে ধরে বলে

মৃত্যুর ভয়ে নয়, স্বপ্নের বিনিময়ে জন্মেছে আমার স্বাধীনতা।


রাজাকারেরা যতই দাপাক,

যতই বিকৃত করুক সময়ের আখ্যান

আমাদের কণ্ঠে উঠবে বজ্রনাদ:

দেশদ্রোহীর স্থান নেই এ মাটিতে,

এই দেশ শুধু মুক্তিযোদ্ধারই উত্তরাধিকার।


রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ 

তাই আমাদের ঘৃণা, ধিক্কার, প্রতিবাদ

আগুন হয়ে উঠুক।

যাদের মুখ দেখলে আজও মনে পড়ে

গর্ভবতী মায়ের চিৎকার, 

জ্বলন্ত গ্রামের ধোঁয়া, নির্যাতিত কিশোরীর ভাঙা স্বপ্ন।


ওরা মানুষ নয়

ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম জীব

দেশের বুকের ওপর লেগে থাকা

অপমানের দগদগে ক্ষত।


আমরা ঘৃণা করি

কারণ ওরা ঘৃণারই যোগ্য। ওদের নাম উচ্চারণ মানে রক্তাক্ত হাহাকারের দরজা খুলে দেওয়া।


ওরা মুখ পাল্টে এসেছে আবার,

কখনও নেতা, কখনও উপদেষ্টা,

কখনও নীতির মুখোশ পরে

কিন্তু ভেতরে একই কালিমা,

একই বিশ্বাসঘাতক ।

এই মাটি জানে ওদের আসল চেহারা

এই বাতাস আজও কাঁদে তাদের পাপে

এই নদী বহন করেছে লাশ,

যারা ওদের হাতে নিথর হয়েছিল।


তাই আজ আমরা ঘোষণা করি

রাজাকারকে মানুষ ভাবব না,

ইতিহাসের বর্জ্য বলে ধিক্কার দেব,

প্রতিটি মঞ্চে, প্রতিটি শপথে

তাদের কালো নাম উচ্চারিত হবে ।


এই দেশ শহীদের, এই পতাকা বীরদের,

রাজাকারদের জন্য শুধু ঘৃণা, শুধু ধিক্কার,

আর আমাদের অদম্য প্রতিবাদ।


৪৫.        ফিরে না-আসার গান


এই ঘরে রেখে যাব খা-খা শূন্যতা
দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকবে নিঃশ্বাসহীন সময়,
চৌকাঠে ঝুলে থাকবে না-বলা কথার ধুলো,
উঠোনে পড়ে থাকবে ঝরা পাতা,
যেন প্রতিটা পাতাই আমারই অসমাপ্ত বিদায়।

তুমি জীর্ণ পাতার মর্মর ডিঙিয়ে হাঁটবে ধীরে ধীরে,
নাম ধরে ডাকবে
ডাকে শুধু প্রতিধ্বনি ফিরবে,
আমার অস্তিত্ব নয়,
আমার ঘ্রাণ নয়,
আমার উপস্থিতির ছায়াও নয়।

কখনো যদি ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামে,
থইথই জলের উঠোনে দাঁড়িয়ে তুমি একা ভিজবে,
বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায়
জেগে উঠবে পুরোনো হাসি, পুরোনো কান্না,
স্মৃতিরা এসে বসবে তোমার কাঁধে
নিঃশব্দ, ভারী, অবুঝ।

কিন্তু আমি আসব না।
আমি থাকব না ভেজা আকাশে,
না কাদামাটির গন্ধে,
না তোমার চোখের জলে।

মানুষ চলে গেলে
ঘর থাকে, উঠোন থাকে, বৃষ্টি থাকে
শুধু মানুষ আর ফিরে আসে না।


৪৬.        আমাদের কোনো কথা হয় না


কুসুমপুর আজও আছে। ঝোপেঝাড়ে ভাঁটফুল ফোটে, ঠিক আগের মতোই। ঘুঘু ডাকে একা বসে, পলাশের ডালে রোদ লেগে থাকে রক্তিম, দূর আকাশে চিল ডানা মেলে উড়ে যায়। প্রকৃতি জানে না—আমাদের কথা ফুরিয়ে গেছে। সে তার কাজ করে যায় নিঃশব্দে, নির্লিপ্তভাবে।

কত কথা জমে ছিল বুকের গভীরে—কখনও বলা হয়নি। কত গল্প ছিল, যাদের শুরু হয়েছিল, শেষ হয়নি। দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল বিষাদের পাতায় পাতায়। ক্লান্ত সন্ধ্যারা একে একে পেরিয়ে গেল, আমরা কেবল চুপ করে রইলাম। শব্দরা আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিল।

শীর্ণা নদীটি আজও বয়ে চলে, দু’কূলে নির্জনতার ভার। গাঙচিল আর ডাকে না, কাশবনের ফুল ঝরে পড়ে মাটিতে—কেউ আর তা কুড়োয় না। নদী জানে, জল জানে,  আমাদের মধ্যে এখন কেবল নীরবতা।

সন্ধ্যামণি আর গন্ধ ছড়ায় না, দূর্বাঘাসে বসার জায়গা তৈরি হয় না। সন্ধ্যা নামে, ঝিঁঝি ডাকে, রাতের পাখিরা নিজেদের ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীর সবকিছুতেই কথা আছে শুধু আমাদের মধ্যে নেই।

অনেকে চলে গেছে প্রিয় মানুষের হাত ধরে। আমরাও চলে গেছি, তবে আলাদা আলাদা পথে। একই স্মৃতির দরজা পেরিয়ে দু’দিকে হেঁটে গেছি আমরা। তাই হয়তো আর ফেরার ভাষা নেই।

এখন দূর শহরে বসে আমি গল্প লিখি, গান লিখি, অকারণ দীর্ঘশ্বাস ফেলি। রাতের নিঃশব্দে সরে যেতে থাকা তারাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা শোনে। আকাশ শোনে। শুধু তুমি শোনো না।
আমাদের কোনো কথা হয় না, এখন আর কোনোদিনই হয় না।


৪৭.        পূর্ণিমা রাত্রিপ্রহরে


পূর্ণিমা রাত্রির প্রহরে আমি জেগে থাকি

ঘুম নয়, নিস্তব্ধতার সঙ্গে চোখের দীর্ঘ আলাপ।

দু’চোখ মেলে রাখি চাঁদের দিকে,
যেন চন্দ্রকিরণের প্রতিটি সুতোর ফাঁকে
তোমার আসার শব্দ লুকিয়ে আছে।
তুমি যদি নিঃশব্দে এসে আবার ফিরে যাও,
তবু সেই ক্ষণ
আমার জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তিতে
একটি অনন্ত বিরতির মতো থেমে থাকবে।

আমার সব শ্রান্ত অবসর তখন
নিজের ভারে নুয়ে পড়ে,
দিনের শেষে জমে থাকা অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাসগুলো
নিমগ্ন হয় তোমার ভাবনায়।
তুমি যদি শান্ত চরণে এসে
আমার বুকে মাথা রাখো,
তবে হৃদয় আর বোঝা হয়ে থাকে না—
সে হয়ে ওঠে আশ্রয়,
যেখানে ক্লান্তি নাম ভুলে যায়,
যন্ত্রণাও বিশ্রাম নিতে শেখে।

চাঁদের আলো আর আকাশের বিষয় থাকে না,
সে ধীরে ধীরে রূপ নেয় তোমার স্পর্শে
কোমল, নীরব, গভীর ও অদৃশ্য।
রাত্রি তখন শব্দহীন প্রার্থনার মতো
আমাদের চারপাশে গুটিয়ে বসে থাকে,
সময় শ্বাস ফেলতে ভুলে যায়,
আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে বুঝতে পারি
ভালোবাসা কখনও উচ্চারণ চায় না।

যদি ভোর আসে,
যদি দিনের কোলাহলে তুমি আবার হারিয়ে যাও,
এই পূর্ণিমা, এই নিঃশব্দ আলিঙ্গন
আমার ভেতরে রয়ে যাবে
ঘুমহীন চোখের গভীরে,
চাঁদের আলোয় লেখা
একটি অমোচনীয় গদ্য কবিতা হয়ে।


৪৮.         যারা গল্প হয়ে থাকে


কিছু মানুষকে দুঃখের দিনে
হঠাৎ মনে পড়ে
ভোরের মিষ্টি রোদ্দুর হাতে
যারা এসে
অন্ধকারের দাগ মুছে দিত নিঃশব্দে।

তারা এসেছিল জীবন-প্রান্তে,
ক্লান্ত দিনের শেষ বাঁকে,
আমি কাঙালের মতো
আজও তাদের হাত ধরতে চাই
শূন্যতার ভিক্ষা হাতে নিয়ে।

আর তারা আসে না।
কেউ আর বলে না
“মুখখানি কেমন মলিন,
এসো, আঁচলে মুছে দিই।”
সে কণ্ঠ আজ নিঝুম রাতের ঘুমে
চুপ করে থাকে।

তারা চলে গেছে স্বপ্ন হয়ে,
চাঁদের আলোর মতো
ছোঁয়া যায় না, তবু
অন্ধকার হলে ঠিকই মনে পড়ে।

এখন তারা আমার গল্প,
পাতায় পাতায় বেঁচে থাকা স্মৃতি।
আমি যখন একা বসে থাকি,
দুঃখ আমাকে ছুঁলে
তাদের নাম উচ্চারণ করি না,
তবু তারা এসে পড়ে
হৃদয়ের গভীর প্রান্তরে,
নিঃশব্দ ভালোবাসার মতো।


৪৯.      জোছনার লীলাবতী


আশ্বিনের নিঝুম জোছনায়
সাদা শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে নেমে এলে তুমি
রাধিকার মতো নীরব,
চোখে লাজ আর ঠোঁটে অমৃতের ইশারা।

আমলকীর বনে সন্তর্পণে হারিয়ে গেলাম দু’জন,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের শ্বাস,
জোনাকিরা জ্বালাল শরীরের গোপন প্রদীপ,
চাঁদের গায়ে লেগে রইল আগুনের দাগ।

কুসুমের গন্ধে মাতাল বাতাস
আমার বুক ছুঁয়ে তোমার কেশে জড়িয়ে পড়ে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে মিশে যায় অচেনা ভাষা
স্পর্শের আগে যে ভাষা শেখানো হয় না।

তোমার কাঁধে নেমে আসে আমার নির্ভরতা,
চোখের পলকে কাঁপে বহু জন্মের তৃষ্ণা,
তুমি তখন আর রাধিকা নও
লীলাবতী,
আমার রাতভর জাগ্রত প্রার্থনা।

জোছনা ধীরে ধীরে গলে যায় দেহের ভেতর,
সময় থমকে দাঁড়ায় আমাদের মাঝে—
কোনো উচ্চারণ নয়, কোনো প্রতিজ্ঞা নয়,
শুধু স্বর্গীয় ভালোবাসা, নীরব, গভীর, অনিবার্য।


৫০.         যারা আর ফিরে আসে না


যারা আর ফিরে আসে না
তাদের পায়ের শব্দ আজও শোনা যায় ভোরের উঠোনে,
শিউলি ঝরার ফাঁকে ফাঁকে
হালকা হাওয়ার মতো এসে বসে থাকে স্মৃতির বেঞ্চে।
কেউ ডাকে না, তবু নাম ধরে ডেকে ওঠে মন,
চা–কাপের ধোঁয়ার ভেতর ভেসে ওঠে
তাদের মুখ—অল্প হাসি, অল্প ক্লান্তি।

যারা আর ফিরে আসে না
তারা রয়ে গেছে পুরোনো দেয়ালের ফাটলে,
ক্যালেন্ডারের ছেঁড়া পাতায়,
একটি অসমাপ্ত চিঠির ভাঁজে ভাঁজে।
বিকেলের রোদ নামলে
হঠাৎ মনে হয়
এই তো বুঝি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে,
বলবে, “কেমন আছ?”
কিন্তু দরজাটা শুধু নীরবতাই খোলে।

যারা আর ফিরে আসে না
তারা জানে না,
রাতের গভীরে কীভাবে হঠাৎ কান্না জেগে ওঠে,
কীভাবে বুকের ভেতর
একটা নাম বারবার ধাক্কা খায়।
জানে না
একটি গান, একটি গন্ধ, একটি পুরোনো রাস্তা
কীভাবে আমাদের ভেঙে দেয়
অচেনা শিশুর মতো।

তবু যারা আর ফিরে আসে না
তারা পুরোপুরি যায়ও না।
তারা বেঁচে থাকে
আমাদের অভ্যাসে, অপেক্ষায়,
ভুল করে বলা একটি নামের ভেতর।
তারা বেঁচে থাকে
যে শূন্যতাকে আমরা ভালোবাসা বলে ভুল করি।

এই জীবন জুড়ে আমরা তাদেরই নিয়ে বাঁচি
যারা আর ফিরে আসে না,
কিন্তু আমাদের ভেতর থেকে
কোনোদিন চলে যেতে শেখেনি।

বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

দাঁড়াও সময় ( কবিতাগ্রন্থ )


দাঁড়াও সময়  ( কাব্যগ্রন্থ )        

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর -২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

মধুমতী–চন্দনা–বারাশিয়ার পলিমাটির
অববাহিকা থেকে আমার জীবনে এসে 
বন্ধুত্বের আলো জ্বেলেছিল  দুই তরুণ— 
নেয়ামুল বারী ও সিদ্দিকুজ্জামান বাহার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে
সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে গভীর মানবিকতায়
ওরা আমায় বেঁধে রেখেছিল। 

আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকা
সেই সহপাঠী দুই প্রিয়বন্ধুকেই
এই গ্রন্থটি গভীর মমতায় উৎসর্গ করলাম।



১.        লুকানো প্রেমপত্র 


চলে যাব সব ফেলে একদিন,
এই অবগুণ্ঠিত নীলাকাশের ঢেকে-রাখা স্বপ্নগুলোকে
শ্রাবণদুপুরের নোনা ভেজা হাওয়ার হাতে দিয়ে।
জলে-ভরা টইটম্বুর নদীর কাছে বলব—
"আমার না-বলা কথাগুলো বয়ে নিও ধীরে ধীরে,
যেদিকে শেষ বিকেলের রোদ সরে যায়।"

স্মৃতির বসতবাড়ির উঠোনে
ঝরে পড়বে কদম্বের সুবাসভরা নিঃশ্বাস,
খোলা দরজার ফাঁকে তুমি হয়তো
পুরোনো দিনের একটি হাসি রেখে যাবে।
আমি রেখে যাব শুধু লুকিয়ে রাখা
জীর্ণ প্রেমপত্রের হলদে পাতাগুলো—
তোমার নামের আলোয় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর।

আর রেখে যাব তোমাকে দেওয়া নাকফুল—
তার ক্ষুদ্র রূপোলি বৃত্তে জড়িয়ে আছে
সংকোচ, স্পর্শ, অচিন হাহাকার,
আর সেই প্রথম দিকের কম্পমান ভালোবাসা।

তারপর হাঁটব অচেনা পথের দিকে—
যেখানে আমার থাকবে না আমি,
থাকবে শুধু তোমাকে ভাবার
একটুখানি নীরব অনন্তকাল।


২.       অনন্ত বিচ্ছেদের আগুন

ভালোবেসে কাছে আসতে পারোনি যখন,
তখন থাক— দূরত্বই হোক চূড়ান্ত প্রমাণ।
যে পথে হাঁটেনি তোমার পদধ্বনি,
সেই পথে আজ নিঃসঙ্গতারই শপথ ধ্বনি।

বিচ্ছেদই যদি হয় অনন্তের লেখা,
তবে সেই লেখায় আমি হবো কেবল একা।
রোগে শোকে দগ্ধ হবে এই দেহখানি,
তবু রাখব না আর কোনো দায় তোমার জানি।

স্মৃতিগুলো জ্বলে যাবে ছাই হয়ে শেষে,
পোড়া পাতার মতো ঝরে পড়বে অবশেষে।
শুধু রাতঘুমে মাঝে মাঝে আসবে তুমি—
ধোঁয়া হয়ে, স্বপ্ন হয়ে, নিভে যাওয়া আলোকবিন্দু কোনো ভ্রমি।

তবু থাক— এ যন্ত্রণা আমিই বহন করি,
ভালোবেসে কাছে আসতে না পারার এ-ই মর্মপথ ভরি।
বিচ্ছেদের আগুন যদি অনন্তই হয়,
আমি তাতে হেঁটে যাব— নীরব, নির্বাক, নির্নয়।


৩.       মায়ার নদী


নদীর মতো তুমি বয়ে যাও নিঃশব্দ ধারায়,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি পাথর—নিজেকে লুকিয়ে রাখি।
সন্ধ্যার মতো তুমি মিশে যাও অচেনা আলোয়,
আমি অস্থির হাওয়ার মতো আড়মোড়া ভেঙে ডাকি।

নির্জনতার বুক জুড়ে তোমার পদচিহ্ন পড়ে,
আমি শুনি দূরের কোনো হারানো বাঁশির সুর।
অন্ধকারের মতো তুমি ঢেকে দাও সব গোপন,
আমার ভেতর দপদপ করে ওঠে আগুনের নীল নূপুর।

কোথায় যাও তুমি—কলেবরহীন ধোঁয়ার মতো?
কোথায় হারাও তুমি—স্বপ্নের ভোরের নরম আয়েশে?
আমি শুধু জানি—মায়া জড়িয়ে তুমি ফিরবে আবার,
হৃদয়ের ভেজা জানালায় বৃষ্টির মতো এসে।


৪.       নিষ্কলুষ হাতের স্বপ্ন


গতরাতের নিস্তব্ধতায়
হঠাৎই ঘুম ভেঙে দেখি—
তোমার নিষ্কলুষ একজোড়া হাত
নরম বাতাসের মতো
আমার বুক ছুঁয়ে আছে।

এটাই তোমার গুপ্ত বার্তা,
এটাই তোমার অস্তিত্বের সতর্ক ছোঁয়া—
যেন ভুলে না যাই
তোমার নিকটতার আলোয় আমি জন্মাই প্রতিদিন।

কোনোদিন, কোনো বিদায়ের ক্ষণে
যদি তোমার দুই হাত
আমার কাছে পৌঁছাতে না পারে আর,
যদি স্পর্শের সেতুটি ভেঙে যায়—

তবে তুমি নিঃশব্দে দারজা লাগিয়ে
দূরে চলে যেয়ো,
আমার অশ্রুর ভেজা আয়নায়
তোমার মুখের কোনো ছায়া
ফেলে না গিয়ে…

কারণ ছায়া থাকলে
আমি আবারও তোমাকে ডাকব,
আবারও ভুলব না
তোমার হাতের সেই নিষ্কলুষ উষ্ণতা।


৫.       হারানো আলো


ভীষণ ক্লান্তি হৃদয়ে আমার,
আত্মাও ক্ষীণ— যেন নিভু-নিভু প্রদীপ,
শীতল বাতাসে দুলে ওঠে শুধু
অপ্রকাশিত কোনো দুঃখের আলো নিয়ে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো,
দেখতে পাবে— আমি আর আগের মতো নই,
স্মৃতির নদী শুকিয়ে এসেছে অনেকটা,
নৌকার দড়িতে জড়ানো আছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে,
তাদের গন্ধে রাতের আকাশ থমকে থাকে—
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকি চাঁদের নিচে
একটি ভাঙা তটরেখার মতো নির্জন।

তুমি এলে হয়তো বাতাস জুড়ে
চুপিসারে বেজে উঠবে কোনো পুরোনো সুর,
যেন খোলা জানালায় ঢুকে
কিশোরী বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়া।

তবু জানো—
আমার ভিতরের অনল এখন অল্প,
কেবল তোমার একটি স্পর্শ
আবার জ্বালাতে পারে পুরোনো নক্ষত্র,
আবার ফিরিয়ে দিতে পারে
হারানো আলো, হারানো আমাকে।


৬.        দাঁড়িয়ে আছো


তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার চোখের পাতার খুব কাছেই—

যেন অতি সতর্ক ভোরের আলো, ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে নিস্তব্ধতার দরজা।
আমি তাকালেই দেখি, তোমার চুলে আমার দৃষ্টির ছায়া লেগে আছে;
যেন দু’জনের মাঝখানে বাতাসও আর পথ খুঁজে পায় না।

তোমার চোখের উপর তুমি রেখে দিলে তোমারই আরেক জোড়া চোখ—
এমন গভীর, এমন স্থির, এমন অনুচ্চার সৌন্দর্যে ভরা
যে সেখানে কোনো শোক নেই, কোনো বেদনার কালো ছায়া নেই,
তবুও অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ কাঁপন থরে থরে জ্বলে ওঠে।

সেই চোখের অভ্যন্তরে আমার ভালোবাসা জেগে আছে—
নিভে না যাওয়া প্রদীপের মতো,
নান্দনিক কোনো নক্ষত্রের মতো,
যে আলো নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে তোমার শিরায়, আমার নিশ্বাসে।

তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছো,
চোখের পাতার কিনারা ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের মতো,
একটি অনন্ত গদ্যকবিতা হয়ে—
যার প্রতিটি বাক্য আমি স্পর্শ করতে চাই,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে চাই,
বারবার, বারবার, যতদিন চোখে আলো থাকে।


৭.         ফেরা 


এক অস্তরাগের সন্ধ্যাবেলায়, খুব কাছে ঝুঁকে সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ নিয়েছিলাম—

হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল সেই সুবাস।

তারপর কত সন্ধ্যা অন্ধকারে ডুবে গেল,

আকাশের রক্তিম রং শুকিয়ে গেল বাতাসে,

তবু আর কোনো সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ

আমার নাকে এসে লাগেনি,

যেন সেই প্রথম সন্ধ্যাই শেষ সন্ধ্যা হয়ে রইল।

আরেকদিন চন্দ্রালোকভরা এক রাত্রি-দুপুরে

জোছনা-ভেজা কামিনীর গন্ধ গায়ে মেখেছিলাম—

সেই সুবাস যেন সাদা আলো ম্লান দুঃখ,

যেন কারও নরম নিঃশ্বাস এসে গাল ছুঁয়ে যায়।

তারপর কত জোছনা-তৃষ্ণার রাত নিঃশব্দ সরে গেল,

কামিনী আর তার স্নিগ্ধতা বিলিয়ে দেয়নি, দূরের কোনো ঘরের আঙিনায় হয়তো সে এখনও ফোটে, এখনও গন্ধ বিলায়।

তারও পরে এক অষ্টাদশীর মাথা ভরা কালো কুন্তলের গন্ধ নিয়েছিলাম, 

আর এক হেমন্ত-গোধূলির ধূসর মায়ায়

কুড়ি বছরের এক রমণীর বুকের উষ্ণতা

আমাকে  আত্মহারা করেছিল-

অষ্টাদশীর চুলের সেই গন্ধ আর রমণীর বুকের গন্ধে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি,

হয়তো ভালোবাসা এই রকমই হয়।

এইসব সুবাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে

একদিন পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম,

চেনা রাস্তা, চেনা মানুষ, চেনা ঠিকানাগুলো

হঠাৎ এক অচিন শূন্যতায় মিলিয়ে গেল।

ফেরার পথ জানতাম না,

তবু পথিকের মতো ক্লান্ত চোখে

পথের উপর বসে থেকেছি বহুদিন-

বাড়ি ফিরিনি, কেউ ডাকেনি।

আর একদিন হঠাৎ  মানিব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছিলাম—

সেই ব্যাগে ছিল প্রেমিকার পুরোনো চিঠি,

যেখানে মলিন অক্ষরে লেখা ছিল

আমার জন্য তার অপেক্ষার কথা , তার একান্ততা, তার বিরহব্যথা।

ব্যাগ হারানোর কথা শুনে সে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল চিরতরে।

তার সেই বিদায়বেলা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শোকসংগীত।

এখন প্রায়ই দেখি—পাতা ঝরে, আলো নিভে যায়, কোথায় অগোচরে সন্ধ্যা-মালতী ফোটে,

কোথায় বর্ষার রাতের গভীরে কামিনী তার গন্ধ বিলায়; অষ্টাদশীর সেই মেয়েটি জানিনা কার ঘরের বউ,

আর সেই কুড়ি বছরের রমণী  চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে তার বিগত যৌবনার গল্প বলে ,

আমি শুধু জানি, কত অপেক্ষার মৃত্যু হলো, পথ চেয়ে চেয়ে কত বসন্ত হারিয়ে গেল,

কিন্তু যাদের জন্য এ নীরব প্রতীক্ষা—

সেইসব অভিমানীরা আর কোনো পথ দিয়েই ফিরে এলো না,

কোনোদিন হয়তো ফিরবেও না আর।


৮.        পদচিহ্নের অনন্তকাল


তোমার অস্তিত্বে আমার ভালোবাসার সুবাস লাগুক,
যেন ভোরের শিশিরে নুয়ে থাকা বকুলপাতায়
অকারণ স্পর্শ নামে মৃদু স্নেহে।

তোমার পায়ের পাতার ধুলোয় থাকুক আমাদের পথচলার স্মৃতি—
যে পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে
আমরা খুঁজেছিলাম একে অপরের গভীরতম নীরবতা।

আমি চাই, আমার মমতার কোমল ছোঁয়া
তোমার দ্রোহের আগুনে শীতল হোক,
ঘৃণার কাঁটাগুলো ভিজে উঠুক স্নিগ্ধতায়—
যেন প্রেম নিজেই এসে তোমার হৃদয়ে বৃষ্টি হয়ে নামে।

আমার সমস্ত গীতিকবিতা যার নাম ধরে শ্বাস নেয়,
সেই তুমি—
আমার প্রেমের ছায়ায়, আলোয়, বর্ণে
নিতান্তই পুষ্পিত হও, পল্লবিত হও
অদ্ভুত অনন্ত কোমলতায়।

এভাবেই তুমি স্পর্শ করো আমার সমস্ত অস্তিত্ব—
প্রেমের এক গোপন নির্দেশে,
যেন জন্মান্তরে লেখা থাকে আমাদের মিলনরেখা।

আমরা একদিন থাকব না,
কিন্তু রবে ধুলোমাখা সেই পথ,
সন্ধ্যাবেলার বাতাস,
আর পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা
আমাদের গভীর, অমোচনীয় পদচিহ্ন—
অনন্তকাল।


৯.       ছায়াপথে দেখা


যে দিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে—
তার তো আর বেশি দেরি নেই,
হয়তো এই গোধূলির পরেই,
হয়তো পরের কোনো নক্ষত্রবৃষ্টির রাতে।

তোমার পায়ের ধুলো ঝরে পড়বে
দিগন্তের নীল-অন্ধকারে,
আর আমি দূর কোনো নীহারিকার সিঁড়ি বেয়ে
তোমার দিকে আসব নীরবে, নিঃশব্দে—
যেন আলো ফেরার আগে প্রথম বাতাসের স্পর্শ।

সেই অনুপম মুহূর্তে
তারারা থেমে যাবে কক্ষপথ ভুলে,
গ্রহেরা শোনবে আমাদের পদধ্বনি,
গ্যালাক্সির বুক জুড়ে জ্বলে উঠবে
অপরিচিত এক প্রেমের কম্পন।

তোমার চোখে যখন ছায়াপথের ধুলো লেগে ঝলমল করবে,
আমি চিনে নেব সেই পুরোনো আলো—
যা যুগ-যুগান্ত ধরে আমাকে ডেকে এসেছে।

যেদিন দেখা হবে,
সেদিন সব অভিমান, সব দূরত্ব,
সব না-বলা কথারা ভেসে যাবে
তারার নৌকোয় ভর করে—
শুধু আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে থাকব
অনন্তের দরোজায়,
একটি মহাজাগতিক প্রেমের প্রথম সাক্ষ্য হয়ে।

ছায়াপথের সেই দিন—
হয়তো দেরি নেই,
হয়তো এখনই নেমে আসছে
আমাদের দু’জনের পথের দিকে
একটি আলো-জ্যোৎস্না ভেজা দিগন্ত।


১০.       নিষিদ্ধ উষ্ণ রাত


নীল অন্ধকারে গোপন আলো জ্বেলে
তারা এগিয়েছিল দু’জন—
না জাত, না ধর্ম, না বয়সের কোনো সীমানা
তাদের থামাতে পারেনি।

এক-একটি দাহনময় শ্বাস
জ্বেলে তুলছিল বৈশাখের উত্তাপ—
যেন ঝড় এসে দু’টি দেহের ভেতর
খুঁজে পাচ্ছে তার অনিঃশেষ ঘর।

তাদের চোখে ছিল আগুনের ঢেউ,
হৃদয়ের ভেতর দীপ্ত স্রোত—
স্পন্দনের পর স্পন্দন
কাঁপছিল দিগন্তের মতো।

ঠোঁটের কিনারায় তখন
অতল নিষিদ্ধতার স্বাদ,
হেমলকের বিষও যেন
মধুর হয়ে উঠতে চাইত
সেই মিলনের উষ্ণ রাতে।

তারা জানত—
এ চুম্বন কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নয়,
এ এক গভীর, আদিম, অচেনা ভাষা
যেখানে শরীর শুধু অঙ্গীকার,
আর কামনা—ফেনিয়ে ওঠা নদীর জল।

তবু তারা থামেনি—
তাদের ঠোঁটের নিবিড় আলিঙ্গনে
রাতের আকাশ থমকে দাঁড়িয়েছিল,
এবং পৃথিবী বুঝেছিল—
নিষেধও কখনো কখনো
তৃপ্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্ত।


১১.       জাদুকরী সন্ধ্যার রোমাঞ্চ


এক জাদুকরী সন্ধ্যায়
সূর্য যখন রক্তিম আগুন হয়ে
দিগন্তের নীরবতায় ডুবে যাচ্ছিল,
বালুকাময় তীরে দাঁড়িয়ে তাঁরা—
দু’টি ছায়া, দু’টি স্পন্দন,
ঢেউ এসে আলতো চুমু দিচ্ছিল তাঁদের পায়ে,
যেন সমুদ্র নিজেই প্রেমের সাক্ষী।

বাতাসে লোনা গন্ধে
মিশে ছিল এক অচেনা উত্তাপ,
চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল মুখ,
আর উপরে, নীল অন্ধকারে
তারারা জ্বলছিল এমন ব্যাকুলতায়
যেন তারাও কিছু বলতে চায়।

তাঁরা হাত ধরতেই
এক অদ্ভুত কাঁপন দেহে দেহে বয়ে গেল,
হৃদয়ের গোপন কক্ষ খুলে গেল শব্দহীন—
চোখে চোখ রেখে
তিনি বললেন সেই প্রথম আলাপন,
যা হৃদয়কে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়।

তারপর ঢেউয়ের শব্দে ঢেকে
নরম স্বরে প্রতিশ্রুতি দিলেন তাঁরা—
সমুদ্র যেমন জোয়ারকে পায়,
আকাশ যেমন রাতকে জড়িয়ে ধরে,
তেমনই তাঁরা একে অপরকে
চিরকাল জড়িয়ে রাখবে মমতার উত্তাপে।

১২.      নক্ষত্র-বীথির পথে


আমার ঠিকানায় এসে
তুমি পাবে না আর—
শুধুই একটি নাম লেখা আছে
ধুলোধুসর দরজায়।

যেখানে গেছি চলে,
সেথায় কোনো পথিকেরই পৌঁছানো নয়;
কেউ পারে না থাকতে পাশে,
কেউ পারে না ডেকে নিতে ফিরে।

যে জীবন ছিল ভাঁটফুলের গন্ধে
মহুয়ার মাতাল সুরে রাঙা,
সেই জীবন ছেড়ে এবার
আমি হারিয়ে গেছি
নক্ষত্র-বীথির বিস্ময় দেশে।

সেখানে রাতেরা নীরব,
আলোয় ভাসে আমার অদেখা স্বপ্ন;
তুমি শুধু দূর থেকে
আমার নামটুকু পড়ো—
আমি আছি, অচেনা আলোর ওপারে।


১৩.       নৈশকবি


কবিতা লিখব বলে রাত জাগি—
জানলার ধারে এসে বসে নিশাচর পাখির দল,
তারারা আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে
ঝরে পড়া অক্ষরের মতো।

বাতাস আসে গোপন সুরে,
নৈঃশব্দ্যের গভীরতম গান
মনে করিয়ে দেয়—
রাতও এক অনাহত কবি।

জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে ছাতার মতো,
মুছে দেয় দিনভর ক্লান্তি,
তোমার পদধ্বনির মতো নরম প্রতিধ্বনি
অন্তর আঙিনায় বাজতে থাকে।

সকাল হলে খাতা খুলে দেখি—
না আছে কোনো শব্দ,
না আছে কোনো উপমা,
না কোনো ছন্দের রেখা।

সারা পাতা জুড়ে শুধু তোমার নাম—
যেন তুমি-ই প্রতিটি কবিতার আদি-উৎস,
যেন আমার সমগ্র রাতজাগা সৃজন
তোমার নামের দিকেই
ধারাবাহিক নক্ষত্রপতনের মতো
অবশেষে এসে থেমেছে।


১৪.       কালের দীর্ঘশ্বাস 


শত বছর পরে,
অমনই এক স্থবির বিকেলের গোধূলিতে
কারও বিষণ্ণ চোখ মেলে বসে থাকবে
এই পুরোনো বাড়ির বারান্দায়—
ক্লান্ত অফিসযাত্রী কারও পদশব্দ
ধীরে ধীরে উঠোন পেরোবে,
হয়তো সেই পদধ্বনি আমারই চলার পুনরাবৃত্তি,
শ্বাসটুকু পর্যন্ত মিলবে আমাদের বংশের রক্তস্রোতের সুরে।

ওরা জানবেও না—
একদা এই বারান্দায়, ঠিক এই রেলিঙে হাত রেখে
কেউ একজন বসে থাকত মায়া ভেজা দৃষ্টিতে,
রাত নামার আগে কারো ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায়।

হাওয়ায় লতিয়ে ওঠা গন্ধরাজের ডালে
যে আকুলতার গন্ধ ছিল,
যে দীর্ঘশ্বাস জমে ছিল ছাদের কার্নিশে,
যে অপেক্ষার কুয়াশা শুকায়নি বহু দিন—
সবই এখনও লুকিয়ে আছে
ইটের গায়ে, কাঠের সিঁড়ির সোঁদা গন্ধে,
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে।

একদিন ওরা বসবে—
কিন্তু জানবে না,
ওদের নিঃশ্বাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
আমাদের বহু পুরোনো না-বলা কথারা।

এভাবেই অপেক্ষা সঞ্চারিত হয় রক্তে,
শতাব্দী পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—
আর বারান্দা জুড়ে ভেসে থাকে
কালের দীর্ঘশ্বাস।


১৫.        গঙ্গার তীরে সত্যস্বরূপ


গঙ্গার তীরে— 

যেখানে জলরাশি নীরব মহিমায় যুগকে আচ্ছন্ন করে রাখে,

যেখানে প্রথম প্রভাতের আলো পাঠশালার মতো

আমাদের হৃদয়ে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে তুলেছিল
প্রেমের প্রথম শিখা—
সেই পবিত্র তীরেই আমি দেখাব তোমাকে
আমার সত্যস্বরূপ,
আমার সমগ্র অন্তরাল,
যা আজও তোমার নাম শুনলেই
নদীর স্রোতের মতো কেঁপে ওঠে।

স্মরণ আছে?
সেই গঙ্গাবক্ষের নীলাভ আলোয় দাঁড়িয়ে
আমরা নিবেদন করেছিলাম হাতে হাত রেখে—
যত ঝড়ই আসুক,
যতকালই কেটে যাক,
আমরা থাকব যুথবদ্ধ,
অপরের হৃদয়রশ্মিতে জড়ানো
দুটি অনিচ্ছেদ্য প্রাণের মতো।

আজ সেই প্রতিজ্ঞার বিস্মৃত ধ্বনি
আবার শুনিয়ে দেব তোমাকে—
তীরের বালুকায় দাঁড়িয়ে,
জলছায়ার মৃদু কাঁপনে ভেসে ভেসে
আমার গভীরতম স্বরূপ উন্মোচন করে।
তুমি দেখবে—
আমি কখনো হারাইনি,
কেবল সময়ের চাদরে আড়াল হয়েছিলাম মাত্র।

গঙ্গার সেই শাশ্বত নীল জলে
যেদিন তোমার চোখে আমি আবার
আমাকেই চিনে নেব—
সেদিনই পূর্ণ হবে
আমাদের সেই পুরোনো নিবেদনের মহাদূত,
যে এখনো গোপনে রক্ষা করে রাখে
আমাদের দু’জনার অটুট বন্ধন।


১৬.      বিনিদ্র রজনীর গল্প


চোখের বৃত্তে যে অচেনা কালো দাগ,
তার নিচে জমে আছে বহু রাতের নীরব ছায়া—
আলো নিভে গেলে যেসব গল্প জেগে ওঠে
তার সবকিছুরই একমাত্র চরিত্র তুমি।

অগণিত রজনী পেরিয়ে
স্বপ্নেরা আমার জানালায় এসে থেমে থাকে,
তোমার নামের ধ্বনি শুনলেই
তারা হেলে পড়ে নিভে যায় স্নিগ্ধ বাতাসে।

জানি না তুমি বোঝো কি না—
এই অবসন্ন চোখে জমে থাকা প্রতিটি ছায়াই
তোমার অনুপস্থিতির ছোট্ট স্মৃতিফুল,
যাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিদিন
একটি নতুন দীর্ঘশ্বাসে লিখি কবিতা।

তোমাকেই ঘিরে বোনা
সে বিনিদ্র রাতগুলোর সমস্ত গল্প,
আর তুমি জানতেও পারোনি—
আমার প্রতিটি নিদ্রাহীনতার
মূল চরিত্র শুধু তুমি


১৭.        অস্তবেলার মায়াবী সুর


বেলা শেষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
আমি শুনি এক ক্ষীণ আলোর হাঁটা—
আকাশের কোলে ক্লান্ত রোদ
একফোঁটা স্বপ্ন রেখে যেভাবে ঘরে ফেরে,
আমিও সেভাবেই ফিরছি ধীরে ধীরে
নিঃশব্দের রহস্যময় উপত্যকায়।

ওগো বন্ধু, অনেক দিয়েছি—
শব্দের কাঁথা, ব্যথার মণিমুক্তা,
অতৃপ্ত রাতের বিষণ্ণ রূপকথা।
তোমরা নিয়েছো, আমিও দিয়েছি—
সময় যেন পুরোনো কোনও বীণার মতো
তার ছিঁড়ে গেলেও সুর রেখে যায়।

এবার আর চাইবে না কিছু—
আমার হাত এখন কেবল সন্ধ্যার আলো স্পর্শ করে,
আমার গলা কেবল দিগন্তের সোনালি রাগে ভরে ওঠে।
দাও আমাকে শুনতে সেই দিগন্তপুরাণ—
যেখানে সূর্য ডোবে ধীরে,
আর অন্ধকার তার কোমল বাহু বাড়িয়ে
আমাকে টেনে নেয় অনন্তের শান্ত স্বপ্নে।

যা বাকি আছে—
একটু নীরবতা, একটু আকাশ,
আর বীণার অস্তমিত সুরের
একটুকু মায়াবী কাঁপন।

সেই সুরেই আজ আমি হারাতে চাই।


১৮.      পথের পদচিহ্নে ফিরে আসা


এভাবেই আমাদের যাত্রা বোনা থাকে—
তোমার হাঁটার শব্দে আমার আদিম নাড়ির ধ্বনি মিশে যায়,
আমার পথের ধুলোয় জেগে ওঠে তোমার ফেরার প্রতিধ্বনি।
যে রাস্তা একদিন আমার একাকীত্ব বয়ে নিয়ে যেত,
আজ সেই পথেই তোমার আঙুলের উষ্ণতা ছায়া ফেলে রাখে।

আমার জীবন যে পথ দিয়ে চুপিচুপি চলে যায়,
তুমি সেই পথের ঘাসে মাথা ঝুঁকিয়ে
আমার পায়ের চিহ্ন ছুঁয়ে দেখো—
এই তো আমি, এই তো আমার ফেরা, আমার অপেক্ষা।

তুমি যদি বলো—
“আমি যেদিকে যাই, তোমার জীবনও সেদিকে ভেসে আসে”—
তবে জানবে,
তোমার নিশ্বাসের সামান্য দোলায়ও
আমার দিগন্ত বদলে যায়।

তুমি যেখানে থামো,
সেখানে আমার দিন শেষ হয়, রাত শুরু হয়,
সেখানে বাতাসও তোমার নাম উচ্চারণ করে।

এইভাবে চলতে চলতে
আমাদের দুজনের পথ একদিন
একটি মাত্র রেখায় মিলেমিশে যাবে—
যেখানে ফিরে আসা আর যাওয়া
দু’টিই হয়ে উঠবে এক অনন্ত প্রেমের পদচিহ্ন।


১৯.      ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী 


ভরা নিশীথে কেমন এক অদ্ভুত ভয় জেগে ওঠে—
মনে হয় তুমি হাত বাড়ালেই হাওয়ার মতো হারিয়ে যাবে,
চিরচেনা পথ হঠাৎই অচেনা অন্ধকারে ডুবে যাবে,
চাঁদের আলো মুছে গেলে পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রবে
আমারই দিকে তাকিয়ে।

তাই বলি—
এসো পূর্ণিমার শুভ্রতা মেখে,
ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী,
যেদিন আকাশ জেগে থাকবে দুধসাদা আলোয়
আর ধরণীর বুক জুড়ে ছড়াবে নরম কুয়াশার মতো স্বপ্নের পশরা।
সেদিন তোমার শাড়ির আঁচলেও উঠবে
এক অতল কোমল উজ্জ্বলতা—
যা দেখলে মনে হবে
রাত্রির বুক ফুঁড়ে
কেউ যেন তুলে এনেছে আলোকে জন্ম দেওয়া কোনো ফুল।

এসো,
আমি সেই ফুলের গন্ধে পথ চিনে নেব,
শুধু পথই নয়—
চিনে নেব তোমাকেও,
তোমার চোখে লুকানো থমথমে নির্জনতা,
তোমার কণ্ঠে ঝুলে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মৃদু সুর,
আর তোমার সাদা শাড়ির আড়ালে নড়ে ওঠা
এক অপ্রকাশিত আলো।

পূর্ণিমার নিস্তব্ধ রাতে
তুমি যদি এক মুহূর্ত পাশে দাঁড়াও—
এই ভরা নিশীথ
আর কোনোদিনই ভয়ের হবে না,
বরং হয়ে উঠবে আমাদের দুজনের
এক সোনালি-সাদা স্বপ্নযাত্রা।


২০.      ছায়ার মতো মায়া


তুমি নেই—
তবু অদ্ভুত ছায়ার মতো
দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে
নরম নরম উপস্থিতি হয়ে
থেকে যাও আমার পাশে।

হাওয়া যখন চুলে হাত বুলিয়ে যায়,
মনে হয় তোমার আঙুলের স্পর্শ;
জোছনা যখন জানালায় ফেলে স্নিগ্ধ রূপ—
মনে হয় তোমারই হাসি নেমেছে ঘরে।

আমি জানি, তুমি নেই কোথাও,
তবু তোমাকে পাই পথের ধুলোয়,
অনুপস্থিতির মায়াবি নীড়ে
তুমি হয়ে ওঠো আরও বেশি সত্য।

এভাবেই তুমি —
না থাকা থেকেও থাকো,
মায়ার আবরণে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
ছায়ার মতো অনুসরণ করো আমাকে
জীবনের পর জীবন ধরে।


২১.      চোখে লেখা আলো অন্ধকার 


তোমার চোখে স্বপ্ন ছিল—
ঢেউয়ের মতো জেগে থাকা নরম আলো,
পূর্ণিমা রাতের ছায়া ছিল—
দু’জনার নিঃশব্দ কথোপকথনের মতো।
সন্ধ্যা মালতীর শুভ্রতা ছিল—
তার গন্ধে ভরে যেত আমার ক্লান্ত দিন,
আর সারারাত শিশির ঝরে এখানেই—
এই দুই চোখের ভেতর জমে ওঠা
অকথিত হাজার অনুভবের ওপরে।

এখানেই যত ক্ষেদ—
ভাঙা পথের ধুলোর মতো জমে থাকা অভিযোগ,
অচিনপুরে হাঁটা সকল ক্লান্ত পদচিহ্ন,
যার প্রতিটি তোমার দিকে হাত বাড়ায় নিঃশব্দে।

জীবনের যত গল্প বলা—
এই চোখেই লেখা আছে তার প্রতিটি পাতা,
একেকটি স্মৃতি যেন পুরোনো নরম পত্রের মতো
হাওয়া আসলে শব্দ তোলে,
তোমার ডাকের মতো।

আর মৃত্যুর ছায়াও—
এই চোখে দেখতে পাই কখনো কখনো,
ঠিক সন্ধ্যার শেষ আলোটা মুছে যাওয়ার আগে
যেমন দীর্ঘ শ্বাসের মতো নেমে আসে বিষণ্নতা।
কিন্তু তবু তোমার চোখেই খুঁজে পাই
নতুন ভোরের প্রথম রঙ,
যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন
আবার জন্ম নেয় নীরবে—
আমাদেরই ভিতরের আলো হয়ে।


২২.        অরণ্যের পথ বেয়ে মালবিকা


এসেছিলে আচম্বিতে—
বৃষ্টিভেজা পাতার মতো নরম শব্দে,
চলে গেলে এত নিঃশব্দে
যে প্রতিটি বাতাসই যেন শোকগাথা শোনাতে থাকে সন্ধ্যার পরে।
ধূসর রঙ ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের মতো
তুমি মিলিয়ে গেলে দিগন্ত-পারের কোনো অচেনা নক্ষত্রে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দিনশেষের দীর্ঘ ছায়ার মতো
নিঃশব্দ, অবণ্ঠিত, তবু তোমাকে ডাকতে ডাকতে।

আজও যখন বসন্তসন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে,
মাঠের ওপরে জোনাকিরা জ্বলে ওঠে
মৃদু ঝংকারে, সুরে সুরে—
আমি চমকে উঠি, ভাবি
এই বুঝি তোমার পদধ্বনি এল,
এই বুঝি অরণ্যের পথ ধরে
দুলে উঠল তোমার শাড়ির আভাস।

মালবিকা,
একবার এসো তুমি—
সময়ের অন্তহীন কালস্রোত বেয়ে,
শিশির ভেজা পথ ধরে,
আকাশের গোপন ডাকে সাড়া দিয়ে
যেমন কোনো হারানো তারা
হঠাৎ ঝরে পড়ে নীল আলোর ভিতর।

এসো,
আমার অসমাপ্ত প্রার্থনাগুলো পূর্ণ করো,
চরিতার্থ করো সেই অর্ধেক রেখে যাওয়া চুম্বন,
যার উষ্ণতা এখনো রাতের বুকে
তোমার নামে জ্বলে থাকে।

এসো,
এই অরণ্য, এই বাতাস, এই জোনাকি—
সবাই তোমাকে ফিরে পেতে চায়,
আর আমি—
তোমার এক পলকের মায়ায়
আবার জন্ম নিতে চাই।


২৩.        নামহীন উপাখ্যান


কেউ বলেনি আমাদের কথা,
কোনও উপাখ্যানেও নেই আমাদের কাহিনি—
তবু অন্ধকার গলিপথে, নিঃশব্দ জানালায়
আমাদের ছায়ারা নীরবে লিখে গেছে ইতিহাসের
অপ্রকাশিত অধ্যায়।

আমরা হতে পারিনি কোনও কিংবদন্তী—
শহরের কোলাহলে ডুবে গেছে প্রেমের ক্ষুদ্র উচ্চারণ,
নেই কোনও স্মৃতিফলক, নেই কোনও নক্ষত্র-লিপি,
তবু হৃদয়ের গোপন প্রদেশে
আমাদের নামে ফুল ফুটে আছে আজও।

জীবনের পাতাগুলো ছিঁড়ে গেছে কতবার—
কখনও বৃষ্টি ভিজিয়েছে, কখনও রোদের তাপ—
তবু সেই ছেঁড়া পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে
হেমন্তের প্রথম শিশির,
জোনাকির সুরভি,
আর তোমার ছোঁয়ার অনুপম জনপদ।

হেমন্ত ভোরে শিউলি ঝরে যায়,
চুমোগুলো উড়ে যায় বাতাসে—
অথচ তাদের ঘ্রাণ লেগে থাকে
আমাদের অনুপস্থিত নদীর দুই কূলে।

বসন্তে বাতাসে গান উঠবে আবার,
অচেনা পথের ধুলোর মধ্যে
হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে কোনও স্মৃতি—
তখনই মনে হবে,
আমরা কেউ না হয় কিংবদন্তী নই,
তবু আমাদের হৃদয়, আমাদের প্রেম—
সৃষ্টির যেকোনও পুরাণের চেয়ে
শতগুণ গভীর এবং সত্য।


২৪.        অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস


আমার শুধু আকুল করে ধরব তোমার হাত,
শীত-নিভে যাওয়া বিকেলে কিংবা
নক্ষত্রভরা ঘুমহীন রাত।
কিন্তু তুমি ধরতে দাওনি—
রেখেছো দূরে, অহর্নিশ,
যেন দু’পা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা
দুটি নৌকা—
জোয়ার এলেও যাদের কাছে আনে না স্রোত।

ছুঁয়েছি আমি বিরহ
সকাল–সন্ধ্যা–অন্তরাত,
তোমার অনুপস্থিতিকে ছায়ার মতো
নিজের চারপাশে বয়ে ফিরেছি।
চুমোর বদলে পেয়েছি নীরবতা,
মায়ার বদলে পেয়েছি ক্লান্ত ছায়া,
তবু তুমিই ছিলে হৃদয়ে
অবিরাম বেজে ওঠা এক নামহীন সুর।

এই জীবনে কিছুই না পাই তোমার জন্য—
না কোনো প্রতিশ্রুতি, না কোনো প্রত্যাবর্তন,
শুধু রেখে গেলে কিছু হাওয়ায় উড়ে যাওয়া দিন
আর দু-এক ফোঁটা অপূর্ণতার শিশির।
তবুও, তোমাকে ঘিরেই
আমার প্রতিটি প্রার্থনা,
পথে পথে ছড়িয়ে দিলাম
তোমার নামে সব আলো আর আশীর্বাদ—

রইল শুধু আমার শুভাশিস,
তুমি যেন ভালো থাকো,
যদিও আমার থেকে তোমার দূরত্ব—
চিরকালীন, অনিবার্য, তবুও অপরিমেয় মধুর।


২৫.         অন্তরের আলোর দীপশিখা 


যেখানে যাও, যত দূরেই যাও,
তোমার পথভরা আলো যেন কমে না কোনওদিন—
রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের মতোই
তুমি থেকো অনন্ত দীপ্তিতে,
থেকো স্বপ্নের নীলাভ জ্যোৎস্নায় ভেজা।

জীবনের হাজার ভিড়ের ভেতর,
তুমি কি জানো—
নিঃশব্দে তোমাকেই ডেকেছি প্রতিক্ষণ?
একটু ছায়া, একটু শীতল বাতাস,
একটু সুর, একটু আলো—
সবকিছুর মধ্যেই তোমারই উপস্থিতি
নীরবে পথ দেখিয়ে গেছে।

তুমি জানোনি হয়তো—
আমার অন্তরের গভীরে
জ্বলছে এক টুকরো দীপশিখা ,
যেখানে শুধু তোমার নাম,
তোমার পদধ্বনি, তোমার মমতা
মিশে আছে সময়ের অতলান্তে।

যত দূরেই যাও না কেন,
এই মন জানে—
তোমার আলোতে পথ চিনে নেওয়া যায়,
তোমাকে মনে রেখেই
বেঁচে থাকা যায় নীরব বিস্ময়ে।

তুমি আছো, সবসময়—
হৃদয়ের গোপন আলো হয়ে।


২৬.       নিভৃত প্রতিচ্ছবি


হঠাৎই কোনো বিকেলে, আলো-অন্ধকারের ফাঁকে
আমার মুখের উপর নেমে আসে তোমার ছায়া—
নির্বাক, অথচ কত কথা বলে সেই ছায়ার রেখা।
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
যেন দূর নক্ষত্রের নরম আলো এসে
আমার চোখের গভীরে পড়ে।

আমি থেমে যাই—
হৃদয়ের গোপন সব দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে।
তোমার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু
শত ঝরনার মতো ঝরে পড়ে আমার দিকে।
সেই জল যেন হাজার বছরের ব্যথা,
আবার সেই জলেই ধুয়ে যায়
আমার সমস্ত দুঃখের অবশেষ।

তোমার মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ নীল,
আমার বুকের ভিতর অনিমেষে জ্বলে ওঠে।
আমি দেখি—
তোমার প্রতিটি নীরবতা আসলে আমারই ভাষা,
তোমার প্রতিটি বেদনা
আমার হৃদয়ে জন্ম নেওয়া একেকটি অশ্বত্থ পাতা।

এইভাবেই,
অভিমান-ঢাকা কোনো সন্ধ্যার তলায়
আমরা দুজন একে অন্যের ছায়ায় রূপ নিই—
নিঃশব্দে, অদৃশ্য প্রেমের মতো
যা কারও কাছে ধরা পড়ে না,
তবু আমাদের মধ্যে নদীর মতো বয়ে চলে
অবিরাম, অনন্ত, অবিশ্রান্ত।


২৭.       আর একবার…


আর একবার জন্ম নিতে সাধ জাগে—
স্কুলফেরা পথের ওই ধুলো ভরা বিকেল,
আমগাছটির শান্ত ছায়া,
ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নুয়ে পড়া খেল।

গাব ফুলের গন্ধে জাগা ভোর,
হাঁটুর কাছে লুটিয়ে থাকা শিশিরের স্মৃতি,
হাত ভরে কুড়ানো সাদা-কালো দুঃখ–সুখ,
তখন যেন এ জীবন ছিল অতি নিখুঁত মণিমুক্তা।

বর্ষার ভেজা আঙিনায় শুকোনো পাটের গন্ধ,
নদীর সোঁদা মাটি লেগে থাকা দুপুরগুলো—
হঠাৎই মনে হয়, সবই কি তবে রূপকথা?
নাকি সত্যি ছিল? হাঁটছিলাম প্রাণ ভরে ওদের সঙ্গে।

জন্ম যদি হতো আর একবার,
অথচ হবে না—জানি কতটাই অসম্ভব!
তবু মনে মনে সেই দিনগুলোকে ডাকি—
ফিরে এসো, আমার মাটির দিন,
আমার সহজ, নিষ্পাপ, ঢেউ ভাঙা শৈশব।

আর একবার…
শুধু আর একবার—
হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েই যাক পুরোনো দিনের উৎসব।


২৮.         অবগুণ্ঠনহীন ভালোবাসার কবিতা


হৃদয়ের গভীর রক্তে রাঙা রক্তজবা
আমি ফুটিয়ে রেখেছি তোমারই প্রতীক্ষায়।
ওগো তুমি এস—
এক পা, দু’পা, ধীরে ধীরে মাটির ওপর ভর দিয়ে,
উজ্জ্বল চোখের দীপ্তি মেলে
একবার শুধু তাকাও আমার দিকেই।

এ যে তোমার জন্য রাখা ফুল—
স্নিগ্ধ কনকচাঁপার বুকের মতোই উষ্ণ,
তোমার হাতে তুলেই দিও আমাকে।
তোমার ডোরাকাটা ঠোঁটের
ঝর্ণার মতো নেমে আসা চুম্বন
রাশি রাশি ঢেকে দিক আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা।

তারপর অবগুণ্ঠন খুলে,
দ্বিধাহীন, নির্ভীক, পবিত্র স্বরে
বলবে তুমি—
“ভালোবাসি… ভালোবাসি…
এ ভালোবাসাই আমার সর্বস্ব।”


২৯.       ফিরে আসা


তোমাকে ফেলে দিয়েও
পথে নেমে যাই—
যেন পথই জানে না
কাকে হারিয়ে আমি কতটা শূন্য।

ঘুরি নির্জন গোধূলিতে,
মাটির গন্ধে মিশে থাকে
অদৃশ্য কান্নার সুর;
যাযাবর আলো ডুবতে ডুবতে
হঠাৎই পথ ভুল করে
তোমার দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাকে।

তুমি জানো না—
কবে একদিন তোমার চোখের কোণে
নেমে এসেছিল দু’ফোঁটা নীরব জল,
সেই জলের উষ্ণতা আজও
আমার ভিতর আগুনের মতো জ্বলে।

হয়তো সেই ঋণেই
বারবার ফিরে আসি তোমার কাছে,
যেন বৃষ্টিভেজা পথ জানে—
আমি যত দূরে যাই না কেন,
আমার ফিরে আসার ঠিকানাটি
শুধুই তুমি।


৩০.        মায়াবী রূপে তুমি


তোমাকে যেখানে নিয়ে যাব—
সেখানে নীরবতারাও নিঃশব্দ হয়ে থাকে,
শূন্যতার কণাগুলো উড়ে বেড়ায়
মহাশূন্যের মতো গভীর নিঃস্বতায়।
কেউ নেই, কোনও পথিকও নয়—
শুধু তোমার পদধ্বনির প্রতিধ্বনি
দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।

যেখানে থাকবে তুমি—
সেখানে কান্নাও জন্ম নিতে ভয় পায়,
অশ্রুরাও থেমে থাকে
অধরস্পর্শী কোন স্বপ্নের মতো।
নিস্তব্ধতার সাদা কুয়াশায়
ঢেকে যায় চারপাশের সব শব্দ।

আর যেখানে রবে তুমি—
সেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না,
তারারা পথ হারায়
অন্ধকারের অনিঃশেষ ঘোরলাগা ঘোরে।
এই অতল, অচেনা, গভীর রাতের ভেতর—
তুমি আমাকেই খুঁজে পাবে,
কারণ আমি সেই অন্ধকারে
তোমার নামের মতোই জ্বলি—
নিভে যাওয়া আলো হয়ে,
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের শেষ আভা হয়ে।


৩১.      হেমন্তের অন্তঃপুর


রাজপথের কোলাহল ভেঙে
জনারণ্যের ভিড় ছুঁয়ে
যে মুখটি হঠাৎ থেমে ছিল
আমার বুকের ভিতর গোপনে—
তারই জন্য দিনগুলো জ্বলত অলক্ষ্যে
অদৃশ্য কোনো প্রদীপের মতো।

তবু একদিন হেমন্তের শীতল আকাশে
ধুলোবালির সাঁঝরঙো বাতাসে
কোথায় যে মিলিয়ে গেল সেই মুখ,
হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও
ধরতে পারলাম না—
তারারা নেমে এল অন্তঃপুরে,
আর সে জেগে রইল নক্ষত্রের ভিড়ে।

আজও নিশীথে তারার আলোয়
তার অনুপস্থিতি ঝরে পড়ে নীরবে—
যে স্মৃতি হারায় না কখনো,
যে মানুষটি হারিয়ে যায় ঠিকই,
তবু থেকে যায়
হেমন্তের বুকের গভীরে
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো।


৩২.       প্রদীপ জ্বেলে রেখো


যদি হঠাৎ রাত নেমে আসে পথহারা অন্ধকারে,
যদি বাতাস থেমে যায় সব পত্রহীন নিস্তব্ধতায়,
যদি হৃদয়ের শিয়রে জমে ওঠে ক্লান্তির নীল কুয়াশা—
তুমি শুধু হাত বাড়িয়ে দিও, আমি ফিরে আসব তোমার আঙিনায়।

যদি রঙহীন হয়ে যায় এই পৃথিবীর সব সুর,
যদি স্মৃতির জানালা ধরে ঝরে পড়ে নীরবতার বৃষ্টি,
যদি চোখের উপরে নেমে আসে অচেনা ছায়ার পর্দা—
তুমি চন্দ্রালোকে বুনে দিও স্বপ্নের একটুকরো দৃষ্টি।

যদি অলৌকিকতার দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়,
যদি নক্ষত্রেরা নিভে যায় নিঃশব্দ কোনও গহ্বরে,
যদি হৃদয় পথ খুঁজে না পায়, হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে—
তুমি গ্রহ-তারার আলো কুড়িয়ে এনে প্রদীপ জ্বেলে রেখো
আমার নামহীন অন্ধকারের মর্মর গভীর ঘরে।

তোমার সেই আলোই হবে আমার পথ,
আমার ফিরে আসার নির্ভরতার নীরব ডাক—
যেখানে তুমি, সেখানেই জেগে থাকে সমস্ত পৃথিবীর ঋতু,
সেখানে অন্ধকারও কাঁপতে কাঁপতে হার মানে আলোর কাছে।


৩৩.         মায়াজাল


একি তবে মায়ারই টান,
রোদ্র ক্লান্ত দুপুরে হৃদয় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়—
তোমার ছায়া দুলে ওঠে আমার নিঃশ্বাসে,
সকল আকুলতা যেন পথ খুঁজে পায় তোমার দিকে।

ভাবনার জানালা খুলে যায় একে একে,
অন্তর্মহলের অন্ধকার ঘরগুলো আলোয় ভরে ওঠে—
আমি তখন নির্মোহে দিতে চাই
আমার সকল শূন্যতা, সকল ব্যথা, সকল জ্বালা।

হঠাৎই যেন তোমার কণ্ঠে বাজে
নরম কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত,
তুমি থামিয়ে দাও পৃথিবীর সব গান
এক বিস্ময়ের নীরবতায়,
বাহু বাড়িয়ে বলো—
"এসো, এসো, আমার ঘরে এসো।"

সেই ডাকে ভেঙে যায় দিনের তন্দ্রা,
হৃদয়ের সমস্ত পথ খুলে যায় নিঃশব্দে—
আমি তোমার আশ্রয়ে এসে দাঁড়াই,
যেন জন্মজন্মান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি
এই এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে ওঠে।


৩৪.      সংসারভূক


একটি কোমল ছোঁয়া ভোরের ঘুম ভাঙায়,
চুড়ির রিনিঝিনি বাজে কি না— মনে থাকে না ঠিক,
তবু নিঃশ্বাসের ভিতর তার মায়া গাঁথা থাকে
অচেনা স্বপ্নের মতো, মায়াবী কুয়াশার দিক।

রাতের স্বপ্নে কি চুম্বন নেমে এসেছিল?
না কি সে-ই ছিল ভোরের আলো হয়ে?
চোখ মেলতেই দেখি— পৃথিবী জুড়ে শুধু সে,
তার দিকে তাকানোতেই দিনের সমস্ত শুরু রয়ে।

কোর্টের বোতাম গুঁজে দিয়ে
নরম কপাল রাখে বুকের ওপর,
অফিসের চাবি তুলে দেয় হাতে—
যেন এক টুকরো নিশ্চয়তা, স্থির নদীর ঘোর।

এতটুকু টান, এতটুকু স্নেহে ভরা সংসার,
তার দুহাতের উষ্ণতায় কত শান্তির রং…
তবু জানো, আজও নিজেকে তার মতো করে
সংসারভূক করতে পারলাম না অনুরাগের ঢঙ।

হয়তো আমি এখনো পথের ধুলো বুকে রাখি,
হয়তো ঘর মানে আমার কাছে অন্য কোনো গান—
তবু তার দেওয়া সকালের ভালবাসা
প্রতিদিন নিঃশব্দে করে আমায় নতুন মানুষ— নতুন প্রাণ।


৩৫.         শূন্যতার ভেতর ভরার গল্প


কেউ কাছে আসে—
হঠাৎ সন্ধ্যার বাতাসের মতো,
মাথার চুলে আলতো ছুঁয়ে যায়
এক মুহূর্তের উষ্ণতায়।

কেউ আবার দূরে চলে যায়—
নীরব পায়ের শব্দ ফেলে রেখে যায়
দোরগোড়ায়, উঠোনে,
অতীতের মাটিতে শুকনো পাতা হয়ে।

পাখি উড়ে গেলে যেমন
দু’একটা পালক পড়ে থাকে,
তেমনি আলনায় ঝুলে থাকে
তোমার ব্যবহৃত গন্ধওয়ালা কাপড়,
রান্নাঘরে চুলার ধোঁয়া
আরো একটু সময় আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কথার প্রতিধ্বনিও
ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় দেয়ালের ফাঁকে।

তারপর আসে সেই দীর্ঘ নিশ্বাস—
শূন্যতার বিস্তীর্ণ ঘর,
যেখানে কেউ নেই, কিছু নেই—
কেবল অপেক্ষা।

আর ঠিক তখনই
যে নতুন করে আসে—
সে ভরিয়ে দেয় সব শূন্যতা,
নতুন আলোর রেখা টেনে দেয়
বাতাসে, জানালায়, হৃদয়ের কোণে।

এভাবেই জীবন শেখায়—
যাওয়াই শেষ নয়,
আসারও আছে এক নিজের সময়।


৩৬.       কঠিন কোমল 


এক পুরুষ এক নারীর মাঝে
দেখে নিজেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি—
উত্থান-পতনের লুকানো ইতিহাস,
চোখের গভীরে নিজের মুখের অচেনা রূপরেখা।
কথা বলার ফাঁকে ঠোঁটের ক্ষীণ কাঁপন,
রাগ-অভিমানের অদৃশ্য ঢেউ—
সবটুকুই অনুভবে তাকে ছুঁয়ে যায়।
কান পেতে শোনে কান্না,
দেখে লবণজল বেয়ে যাওয়া নীরব নদী।

তবু প্রেম মানে কেবল শরীরের মিলন নয়,
হৃদয়ের গহনে পৌঁছানোর পথ
আরও নিঃশব্দ, আরও সূক্ষ্ম।
নারী পুরুষের হৃদয়স্পর্শ পায়
যখন এক জোড়া হাত
তার বুকের ওপর নয়—
স্থির হয়ে থাকে কাঁধে, নিশ্চিন্তের মতো।
যে হাত শাড়ি খোলার জন্য নয়,
পরিয়ে দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকে।

নারীদের ভাবনা আলাদা—
পুরুষরা দেখে বাইরের আলো,
আর নারীরা ছুঁয়ে ফেলে
ভেতরের শীতল ছায়া।
এই শক্ত কাঠামোর ভিতরেই
তারা খুঁজে নেয় লুকিয়ে থাকা কোমলতা,
মমতার নিঃশব্দ কাঁপন।


৩৭.     যদি তুমি আসো


যদি তুমি আসো—
নির্জন সেই ছায়াপথ বেয়ে,
আমি হাঁটব রৌদ্রের ধাঁচ
কাঁধে মেখে, চোখে আলো নিয়ে।
মেঘের ভেতর সূর্যকে বশ মানিয়ে
চলে যাব দূর অনন্তের দিকে—
তোমার পদধ্বনির নরম প্রতিধ্বনি
পথের ধুলোয় তুলে নেবে গল্প।

হঠাৎ যখন জল হয়ে ফিরব ফিরে
ঝরঝর বৃষ্টির দোলায়,
ভিজবে ধানক্ষেত, কচি পাতার গা—
মাটির গন্ধে ভরে উঠবে চারধার।
নদী উঠবে স্ফীত সুরে,
তার বুকজুড়ে দোলা দেবে
তোমার নিঃশ্বাসের অদৃশ্য ঢেউ।

সাঁঝ নামলে সোনালি আলোয়
দিগন্ত হবে ক্ষণিকের স্বপ্নবাড়ি,
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
দু’হাত ভরে ধরব আলো।
আর সেই নীরবতার ভেতর
উৎসব করবে জোনাকিরা—
একেকটি দপদপে আলোয়
আমাদের পথ লিখবে কবিতার মতো।

তুমি যদি শুধু একবার আসো—
আমি আলো, জল, বাতাস হয়ে
তোমার চারপাশে প্রসারিত হব,
আর পৃথিবী নতুন করে
জেগে উঠবে তোমার স্পর্শে।


৩৮.    অনন্ত রাত্রি 


নীল অন্ধকারে ঢেউ ওঠে—
হে প্রিয়তমা, হে প্রণয়ণী,
তোমার স্পর্শে জেগে ওঠে
আমার অনন্ত দহন,
রাত্রির গোপন গা-ভেজানো উত্তাপ।

তুমি যখন কাঁপতে থাকা হাতে
আমার বুকে রাখো তোমার পরাগভরা কুসুম,
যন্ত্রণার কাঁপুনি মেশা সেই কুসুমেই
জ্বলে ওঠে আদিরসের শিখা—
যেখানে ব্যথা আর উন্মাদনা
এক নদীর মতো মিলেমিশে যায়।

তোমার ঠোঁটের দীপ্ত লালাভ আলো
ধীরে ধীরে কাছে এলে
আমার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে,
আমার ভেতরের স্ফুলিঙ্গেরা
রক্তমদির স্বরে বলে ওঠে—
এসো… আরও কাছে এসো…

তোমার চুম্বনে খুলে যায়
আমার গোপন সব অনলদ্বার;
শোণিতের ঋণে, প্রণয়ের অনিবার্য টানে
আমার ঘুমন্ত কামনা
ঝড় হয়ে জেগে ওঠে তখন।

রাত্রির গভীরতম সুরে
তোমার দেহের সুগন্ধ
মিশে যায় আমার শিরায় শিরায়
যেন তুমি আমার সমস্ত সত্তা
এক ফোঁটা আগুনে রূপান্তর করেছো।

হে প্রণয়িণী,
এই রাত্রি যেন অনন্ত হয়—
আমাদের উত্তাপের নীরব সংলাপে
সব সীমা ভেঙে যাক,
সব নিশ্বাস থেমে যাক
আকুল রসের মাদকতায়।


৩৯.       কুয়াশার অন্তরালে


চন্দ্রিমা উদ্যানে আজ
মেঘের ছায়া নেমে আসবে নিঃশব্দে,
সপ্তপদির পাতার ভিতর দিয়ে
ভগ্ন-রোদ্দুরের এক টুকরো আলো
তোমার মুখে লিখবে অদৃশ্য কোনো স্বাক্ষর।

এলোমেলো হাওয়া
তোমার চুলে বাঁধবে নরম অস্থিরতা,
অসতর্ক নিঃশ্বাসে
খসে পড়বে ওড়নার মখমলি ক্ষীণ-রঙ,
যেন কোনো ভুল করা প্রজাপতি
আলো বদলাতে গিয়ে ফেলে গেল তার পাখা।

লতা-গুল্মের অন্ধকারে
একটি দুরন্ত গিরগিটির দৌড়
চকিত তৈরি করবে ক্ষণিকের রহস্য—
আমাদের চোখের ভিতরেও
নাচবে সেই সবুজ আতঙ্কের ঝিলিক।

ঘাসফুলের গন্ধে
আমরা দু’জন হঠাৎই ভেসে উঠব
অচেনা কোনো মাধুর্যের কুসুমে,
আঙুলের স্পর্শে
দেহ-জমির নোনা রোদে
জেগে উঠবে অসংখ্য নকশা—
যেন আদিম কোনো ভাষা
শুধু স্পর্শেই পাঠ শেখায়,
যেখানে শব্দ নেই, শুধু অন্তর্ময় আলো
আর নিভু নিভু নিঃশ্বাসের ছায়া।

সেখানে প্রেম একটি বাতাস-বোনা অরুন্ধতি—
দেখা যায় না, তবু স্পষ্ট বুঝি
আমাদের চারপাশে সে নরম কুয়াশার মতো ঘিরে আছে।


৪০.       মহাসমুদ্রের ওপারে যাত্রা 


আমি যাব—
তুমি না বললেও যাব,
নীরবতার অতল থেকে ডাক আসে দূর গহীনে।
মহাসমুদ্রপাড়ের বালুকাবেলায়
একজন  মাঝি দাঁড়িয়ে রাখে তার কালো নৌকা—
অপেক্ষায়, শুধু আমার জন্য।

আমি জানি, একদিন
সেই নৌকার মসৃণ কাঠ ছুঁয়ে
আমি ভেসে যাব পরপারের নীল নিস্তব্ধতায়।
জলের গায়ে গায়ে থরথর আলো,
ঢেউয়ের কূলে জমে থাকা অজানা সব গল্প
আমাকে নিয়ে যাবে আরো দূরে—
জন্মের প্রথম দিগন্তে, বা শেষ গভীরতায়।

তুমি থাক বা না থাক,
আমার যাত্রা থেমে থাকবে না।
হয়তো সেদিন বাতাসে ভেসে আসবে
তোমার কিছু অব্যক্ত শব্দ,
কিছু অনামা ব্যথা,
হয়তো আমার নৌকার পাল ধীরে দুলে উঠবে
তোমার স্মৃতির ছোঁয়ায়।

তবু আমি যাব—
শান্ত কোনো অন্ধকারে,
অথবা আলো-ছায়ার অপার রাজ্যে,
যেখানে আর কোনোরূপ ফিরে তাকানো নেই।
শুধু সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস,
মাঝির নীরব দৃষ্টি,
আর অনন্ত পথ—
আমাকে নিয়ে যাবে মহাসমুদ্রের ওপাড়ে।


৪১.       অমর্ত্যের আলো


নিশীথের নীলাভ আলোয়
স্বপ্নলোকের সব স্বপ্ন দিয়েই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—
তবু তুমি এলে না আমার ঘরে,
এলে না কোন মায়াবী স্বপ্নের ভোরে।

হেমন্তের এক নীরব সন্ধ্যায়
হৃদয় উজাড় করে বলতে চেয়েছিলাম—
‘স্বপন-দুয়ার ভেঙে এসো,
অরুণ-আলোর মতো জ্বলে উঠো আমার চোখে,
ক্ষণিকের মায়া নয়—
চিরকালের আশ্রয় হয়ে এসো আমার ঘরে।’

কিন্তু তোমাকে ছুঁইতে পারিনি—
মনে হয়েছিল, ছোঁয়া মাত্রই
ভেঙে যাবে কল্পলোকের এ নরম ভালোবাসা,
মুছে যাবে তোমার অপার্থিব রূপ।

তাই দূরেই থেকো তুমি—
শত সহস্র অন্ধকার রাত পার হয়ে
অমর্ত্যের আলো হয়ে,
মহাকালের প্রেম হয়ে,
আমারই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থেকো।


৪২.      ভালোবাসার কবিতা


কেউ লেখেনি আমাদের কথা,
তবু ভোরের বাতাস জানে—
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
আমার নাম একদিন নরম আলোয় ডেকেছিলে।

উপাখ্যান হয়নি, কিংবদন্তীও নই আমরা,
তবু শরতের নীল আকাশের মতো
নিঃশব্দে জেগে থাকে আমাদের স্পর্শ,
হেমন্তের শিউলির মতো কোমল,
যা ঝরে পড়ে— তবু হারায় না কোনোদিন।

জীবনের ছেঁড়া পাতাগুলো
তোমার আঙুলে ছুঁয়ে গেলে
অদ্ভুত এক সুর বেজে ওঠে—
চুম্বনের উড়ে যাওয়া স্মৃতির মতো
অচেনা বাতাসে গোপনে দোলে।

পথঘাটে ফোটা ফুলের রঙে রঙে
আমরা আবার লিখে নেব নতুন গল্প—
যেখানে তুমি থাকবে, স্বপ্ন থাকবে,
আর থাকবে একটুকরো মায়া
যা ভাসে ভালোবাসার অনন্ত আলোয়।

তুমি আর আমি নির্জন কোনো দুপুরে
চুপচাপ বসে থাকব পাশাপাশি,
আর পৃথিবী বুঝতেই পারবে না
কত গভীর আমাদের অমলিন অধরা প্রেম।


৪৩.       অ- সুখ 


নরম ছোঁয়ায় তোমার লুকিয়ে থাকে অলৌকিক আরোগ্য—

যেন দেহে দেই না কোনও যন্ত্রণা,
মনেও থাকে না কোনও ক্ষতচিহ্ন।
তোমার স্পর্শ পেলেই
অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ঔষধ, হাসপাতাল, ডাক্তার—
সব ক্লান্তি ভেঙে গলে যায় নীরবতার বরফ,
তুমি হয়ে ওঠো মুখর, আলোঝরা।

তেমনই করে, বারেবারে,
তোমার ছোঁয়া এসে সরিয়ে দেয়
আমার সমস্ত অ-সুখ, সমস্ত মলিনতা—
আমার ভুবন জুড়ে শুধু
তোমার আঙুলের উষ্ণতায়
জন্ম নেয় নতুন দিনের নরম শান্তি।


৪৪.    বেদনায় ঢাকা নিসর্গ 


পথে প্রান্তরে দিগন্তে আজ ভালোবাসার চিহ্ন নেই,
শহরের বুকে জমে আছে বিষণ্ন কুয়াশা—
ঢাকা যেন নীরব এক দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে ভিড়ে হারিয়ে যায় মানুষের হৃদস্পন্দন।

রাস্তাগুলো শুনে ক্লান্তির শব্দ,
বিলবোর্ডে আলো জ্বলে, কিন্তু মনেতে অন্ধকার।
তুমি চোখ মেলে দেখো—
এই শহর কি সত্যিই বেঁচে আছে,
নাকি স্মৃতির ভগ্ন ইটের মতো পড়ে আছে নিথর?

কোথায় কার চোখে আজ জল?
সবাই হাঁটে শুধু মুখঢাকা মরুভূমির মতো—
কেউ কারও দুঃখ শোনে না,
কেউ কারও হাত ধরে না।

তবু তুমি যদি একবার ফিরে তাকাও,
হয়তো দেখবে—
একটি ক্ষীণ আলো,
একটি নিঃশব্দ হাহাকার,
যা এখনও ভালোবাসার নাম ধরে বেঁচে আছে বুকের গভীরে।


৪৫.    স্বর্গপথে ধ্রুপদী রমণী 


ঈশ্বর যেন নিখুঁত মনোযোগে
আমার জন্যই গড়েছিলেন এক ধ্রুপদী রমণী—
যার চোখে সন্ধ্যাতারার আলো,
মুখে ভোরের শিশিরভেজা নরম দীপ্য,
একটুকরো হাসি যেন আকাশের নীল থেকে
রঙ চুরি করে এনে বসিয়ে দিয়েছে ঠোঁটের কোলে।

তাকে দেখলেই মনে হতো
সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়—
আমার দৃষ্টিতে রং মাখে তার মুখ,
আমার নিঃশ্বাসে বাঁশির সুর হয়ে বাজে তার সৌরভ।
সৌন্দর্যের কিছু ছটা রয়ে যায় ভাবনার আঙিনায়,
আর কিছু হারিয়ে যায় স্বর্গের পথে,
যেখান থেকে সে নেমে এসেছিল
আমার হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে।

আজ আমি সেই স্বর্গের পথেই আছি—
হয়তো তার হাত ধরে, হয়তো তার আলোয়,
হয়তো তার চোখের গভীর আকুলতায় ভেসে।
চারপাশে নীরবতার রেশ,
কিন্তু আমার হৃদয়ে তার পদধ্বনি—
যেন অনন্তের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক পবিত্র সঙ্গীত।

প্রেম এমনই—
যেখানে দুই আত্মা ধীরে ধীরে
একটি আলোয় মিশে যায়,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয়
একটি নতুন আকাশ,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ফিরে আসে ধ্রুপদী রমণীর মায়াময় উপস্থিতি।

যদি সত্যিই ঈশ্বর আমাকে কিছু দান করে থাকেন—
তবে সে দান এই ভালোবাসা,
এই অপার কোমলতা,
এই স্বর্গের পথে তার হাত ধরে হাঁটার অধিকার।

আমি হাঁটি,
আর তার চোখের ভিতরে
অনন্ত প্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে—
দ্বিধাহীন, দীপ্ত, চিরন্তন।


৪৬.       নির্জন যমুনা কূলে


তুমি নিজেকে লুকাতে পারবে না—
না যমুনার ধূসর জলে,
না দুরবাহাটির নিশ্ছিদ্র অরণ্যের গভীরে।
তোমাকে ছুঁতে গিয়েছিলাম যেমন,
ঠিক তেমনি ছুঁয়ে ফেলেছিলাম জ্বলন্ত আগুন—
তবু তুমি কোনদিনই আগুন হতে চাওনি,
হতে চেয়েছিলে শুধু নিঃশব্দ এক আলো।

আমি যেমন তোমার থেকে দূরে যেতে পারি না,
তুমিও তেমনি পালাতে পারো না
আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অনন্ত পথ থেকে।
কত যুগ ধরে আমরা ছড়িয়ে আছি
দুই ভাঙা নক্ষত্রের মতো—
একটি ছায়াপথে তুমি,
অন্যটি নির্বাসিত আমার বহিমান হৃদয়।

তোমার জন্যই আমি গিয়েছি
অরণ্যের অন্তর্গহীনে,
ঝরে পড়েছি অগাধ জলধির ঢেউয়ে—
তবু যেদিকেই ফিরেছি
তোমার মুখচ্ছবিই রেখার মতো
ভেসে উঠেছে আমার চেতনার আয়নায়।

দ্বিধার বন্ধ দরজাগুলো
আজ খুলে দাও, এসো সেই পথে
যে পথের পাশেই শুয়ে আছে আমার
অরণ্যময়, ঘুমভাঙা জীবন।

কোনও এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণে
দুরবাহাটির অরণ্যে
বা নির্জন যমুনা কূলে—
আর কি কখনও হবে না আমাদের দেখা?
নাকি সময়ের অন্ধ তটরেখায়
আমরা আবারও একবার
নিজেদের খুঁজে পাবো—
আগুন আর আলোর মতো,
একটুখানি স্পর্শেই জ্বলে উঠতে প্রস্তুত?


৪৭.       মায়ার গোধূলি


মাঝে মাঝে দিনের শেষ আলো স্বপ্নের পর্দা সরিয়েএকটি অচেনা ঘন্টারধ্বনি গভীরের দরজায় টোকা দেয়—

তখন ইচ্ছে করে
সব ব্যস্ততা ফেলে দূরের পথ ধরতে,
যেখানে গন্তব্য নেই,
শুধু নীরবতার ভিজে ঘ্রাণ
এবং আকাশের নীল বিষাদ।

কখনও আবার পুরনো কোনও সন্ধ্যা
তার সোনালি নরম আলো নিয়ে
ফিরে আসে ধীরে ধীরে,
তার সাথে আসে পরিচিত শব্দ,
ম্লান গন্ধ, ফুরিয়ে যাওয়া চুম্বনের উষ্ণতা—
সেইসব এসে মিশে যায়
আমার নিভু নিভু ঘরের সান্ধ্য অন্ধকারে।
আমি অনিমেষ তাকিয়ে থাকি,
যেমন কেউ তাকায় আপন স্মৃতিতে হারিয়ে।

এত আলো, এত শব্দ,
এত স্মৃতি পেয়েও
কেন জানি নিজেকে মনে হয়
এক বিরাট শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা—
যেন সমস্ত প্রাপ্তির ভিতরেই
আমার নিঃস্বতার সবচেয়ে ঘন ছায়া।

তবু এই মায়া, এই আলেয়ারা
প্রতি সন্ধ্যায় এসে
আমার বুকের উপর রেখে যায়
একটি আদিম প্রশান্তি—
যেন অনন্তের ওপার থেকে
কেউ ফিসফিস করে বলে,
“তোমার শূন্যতাও আলো হয়ে জ্বলবে একদিন।”


৪৮.       ঘরদুয়ারের কবিতা


তুমি সুন্দর করে ঘর দুয়ার গোছাও—
ঝকঝকে রাখ মেঝে,
পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখো আলনায় কাপড়, বারান্দায় ঝুল পড়ে না কোনওদিন,
আসবাবপত্রেও জমে না ধুলোর দুঃখ।

মাঝে মাঝে ভাবি—
আমি না থাকলেও কি তুমি
এমনই করে সাজাবে ঘর?
ফুলদানিতে রাখবে ফুল,
সন্ধ্যা নেমে এলে জ্বালাবে বাতি
ঠিক আগের মতোই, শান্ত সৌম্যে।

আঙিনার ধুলোমাটি মুছতে মুছতে
একদিন মুছে যাবে আমার পায়ের চিহ্নও।
আমার জন্য কেঁদে থাকা
তোমার চোখের অশ্রুবিন্দুগুলোও
শুকিয়ে যাবে সময়ের বাতাসে।

তখন হয়তো তোমার মুখে ভাসবে
একটি করুণ, দূরবর্তী হাসি—
যেন ভুলে যাওয়ার মাঝেও
আমাকে মনে রাখার শেষ আলো।


৪৯.     প্রতিবিম্বে তোমার মুখ 


নীল বিকেলের নরম আলোয়
হঠাৎই কখনও তুমি আমার মুখের উপর
ছায়া ফেলে দাঁড়াও—
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
আর সেই মুখের ভিতর লুকানো
অগণিত অশ্রুর দীপ্তি।

আমি তাকিয়ে থাকি—
শত ঝরনার ঢেউ যেন
করুণাধারায় নেমে আসে তোমার চোখ থেকে,
সেই জল ধুয়ে দেয় আমার সকল ক্লান্তি,
স্নিগ্ধ করে দেয় প্রান্তরের মতো শুষ্ক হৃদয়।

তোমার ছায়া যখন মুখে পড়ে,
আমি যেন হয়ে উঠি এক নীরব নদী—
শুধু তোমার স্নিগ্ধ জলের স্পর্শে
নবজন্ম পেতে চাই,
বারবার, আরেকবার।


৫০.      দাঁড়াও, সময়


পৃথিবীর বয়স কত—
কোটি কোটি বর্ষের স্তরে স্তরে
জমে থাকা নীল-সবুজ ইতিহাস।
মহাকাল কত দীর্ঘ—
তার শেষ কিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না
আলোকবর্ষেরও ওপারে।

তবু মানুষ?
একটি ঢিল জলে ফেলতে যতটুকু সময় লাগে,
মহাকালের তুলনায় তার জীবন
মাত্র একটি অণুমুহূর্ত।
নিঃশ্বাস ফেলার মতো ক্ষুদ্র,
আঙুলের ফাঁক গলে যাওয়া আলোের মতো হালকা।

এই ক্ষণিক দিন নিয়েই মানুষ
ভালোবাসাকে করে অনন্ত—
স্পর্শে, অশ্রুতে, হাসিতে, প্রতীক্ষায়।
এত ক্ষুদ্র আয়ু নিয়ে
সে শেখায় পৃথিবীকে মায়ার রঙ।

বিস্ময় লাগে—
যে প্রাণ এক নিমিষের জন্য জন্মায়,
সেই-ই আবার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে
ভরিয়ে তোলে এই দীর্ঘ মহাকালকে।

দাঁড়াও, সময়—
তোমার অনন্ত গতির মাঝে
মানুষের এই ক্ষুদ্র ভালোবাসাই
সবচেয়ে দীপ্ত, সবচেয়ে সত্য।

কালো জোনাকির গান ( কাব্যগ্রন্থ )


কালো জোনাকির গান  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

ওরা দু’জন- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আমার প্রথম সহপাঠী বন্ধু, একজন বেলায়েত হাসান, আরেকজন হাসি চৌধুরী।

বেলায়েত- এখনো কাছে, হাত বাড়ালেই 
ছোঁয়া যায়। হাসি চলে গেছে জীবন-নদীর ওপারে, ওর ম্লান হাসি এখনও ভেসে আসে অতীতের নরম ঢেউ হয়ে।

আজও কে কাকে কতটা মনে রেখেছে,
তা হয়তো আমার হৃদয় জানে,

এই বইটি 
দু’জনের হাতেই অর্পণ করলাম -
একজনের উষ্ণ করতলে, আরেকজনের নক্ষত্র-ছাওয়া করুণ আলোয়।





১.      মাধবীর অমাধুরীর গান

মাধবী বলেছিল
“পৃথিবীতে দুটো জিনিসেই মাধুরী আছে
বাগদাদের ফুল, যার সুগন্ধে মরুভূমিও নরম হয়,
আর রাজস্থানের মীরা বাঈ,
যার পদাবলির সুরে ভোরের আকাশও কাঁপে।
আমি তার কিছুই নই
আমার ভিতরে কোনো মাধুরী খুঁজো না।”

কিন্তু আমি দেখেছি
তার চোখের আড়ালে নদীর মতো হেলে থাকা নীরবতা,
যেন গোধূলির কুয়াশায় লুকোনো মেঘের সোনালি রেখা।
তার কণ্ঠে কখনও শুষ্ক পাহাড়ি বাতাস,
কখনও ভোরের শিশিরের মতো অদৃশ্য স্পর্শ,
যা ছুঁয়ে না গিয়েও মনকে ঘিরে ফেলে।

মাধবী বোঝেনি
মাধুরী সবসময় ফুল বা গান নয়,
কখনও তা নির্জন বটগাছের তলে পড়ে থাকা আলোর ছায়া,
কখনও পথ চলে যাওয়া হাওয়ার অদ্ভুত মৃদু শব্দ,
কখনও নদীর স্রোতে টলমল করা সন্দিগ্ধ রূপালি দীপ্তি।

তিনি ভেবেছেন তাঁর ভেতর শুষ্কতা—
আর আমি দেখেছি ঠিক সেই শুষ্কতার মধ্যেই
এক ফোঁটা গোপন বৃষ্টি
যা কারও নজরে আসে না,
তবু পৃথিবীকে ভিজিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

মাধবী
তুমি বাগদাদের ফুল নও,
তুমি মীরা বাঈও নও—
তুমি তার চেয়েও দুরূহ,
এক অচেনা মরূদ্যান,
যেখানে পানির শব্দ নেই,
তবু তৃষ্ণা মেটে।

তুমি বলো- “মাধুরী খুঁজো না।”
আর আমি দেখি
তোমার প্রতিটি উচ্চারণে, প্রতিটি নীরবতায়,
কোনো এক অজ্ঞাত সুর
নিজের মতো করে জন্ম নিচ্ছে
যাকে নাম দেওয়া যায় না,
শুধু অনুভব করা যায়।


২.      শিলালিপিতে আমাদের প্রেম

কোনো এক প্রাচীন প্রস্তরের বুকে
আমরা দু’জনে দাঁড়িয়ে লিখে রাখব
নাম— দুইটি দীপ্ত অক্ষর,
আর কিছু নির্মল নিঃশ্বাসে-জন্মানো শব্দ,
যারা সময়ের গর্ভে থেকেও
আমাদের হৃদয়স্পন্দনের প্রতিধ্বনি বহন করবে।

হেমন্তের নীরব শিশির
দূর্বাঘাস ছুঁয়ে যখন ঝরে পড়বে
সেই শিলালিপির উপরে,
অচেতন শব্দগুচ্ছ তখনও
চেয়ে থাকবে পৃথিবীর অনাদি রূপের দিকে
যেন প্রত্যেক ঝলমলে শিশিরবিন্দু
আমাদের প্রেমকে নতুন আলোয় জাগিয়ে দেয়।

রাত্রির গভীর প্রহরে
যখন চারদিকে শুধু নীরবতার নিশ্বাস,
খোদাই করা সেই অভিজ্ঞান চিহ্ন
জেগে থাকবে অনন্ত কালের প্রহরী হয়ে
রেখে যাবে আমাদের স্বপ্নের ছায়া,
রেখে যাবে লজ্জারঙা আরক্ত মুখমণ্ডল,
রেখে যাবে সেই অমলিন মুহূর্ত
যেখানে তুমি আর আমি,
দুইটি জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে
এক হয়ে ছিলাম।

আমাদের প্রেম,
প্রস্তরেও থেমে থাকবে না
সময়ের ভিতর দিয়ে
সে বয়ে যাবে শিলালিপির মতোই
নীরব অথচ চিরস্থায়ী আলোয়।


৩.      অনুসঙ্গের আদিম জ্বলন 


ধরতে গিয়েই দেখলাম
তোমার স্পর্শের ভিতর লুকোনো
এক অগ্নিগর্ভ নিশ্বাস,
যেন এলোমেলো বৃষ্টির মতো
গাছে–গাছে ছড়িয়ে পড়ছে তৃষ্ণা।

তুমি এগিয়ে দিলে বক্ষ,
আমি শুনলাম ধুকপুক করা
এক অনাবিষ্কৃত প্রান্তরের ডাক
সেখানে বাতাসও দহনময়,
সেখানে রাতও উষ্ণতার শস্যশ্যামল।

আমার আঙুল জেগে উঠল
তোমার ত্বকের আলোক-তরঙ্গে
যেন চাঁদের আলো
তোমার শিরায় শিরায় বয়ে যায়,
আর আমি পথ হারাই তার ঢেউ-লাগা পথে।

“শীতল করো”- বললে তুমি,
আর আমি সমস্ত উত্তাপ দিয়ে
তোমার গোপন নক্ষত্রলোকে
মেখে দিলাম মৃদু কুয়াশা,
দুজনার শরীর মিলেমিশে
এক অনির্বাণ অমৃতের উৎস ধরে।

সেই অমাবস্যা রাতের মতো
যেখানে শুধু দেহের ভাষা বলে
অস্পষ্ট, তবু অশেষ,
অদৃশ্য, তবু অগ্নিবর্ণ।

আমরা দু’জন একই আগুনে পুড়ে
একই জলে তৃপ্তি খুঁজি
যেন পৃথিবীর প্রথম দাহন
আর শেষ বৃষ্টি একসাথে নামছে
আমাদের দু’হাতের ভাঁজে।


৪.        অস্তমিত বেলার শূন্য খেলা


কখন যে ঢলে পড়ল বেলা,
কখন যে ফুরিয়ে গেল ক্ষণ
জানে না কেউ, শুধু নিঃশব্দে
ঝরে পড়ে সময়ের মন।

যে খেলায় শূন্য করে ভরেছিল
আমার প্রাণের সমস্ত স্থান,
সে-খেলার আলো-ছায়ায় আমি
রইলাম বসে জীবনজুড়ে অনুধ্যান।

অদেখা কোনো হাত ছুঁয়ে যায়
দেয় শূন্যতা, দেয় ভরাও,
মাঝে মাঝে মনে হয় যেন
হারিয়েও তাকে ফিরে পাও।

তাই আজও চুপ করে বসে আছি,
স্মৃতির আলো-ছায়ার কোণে,
যার জন্য শূন্যও পূর্ণ হয়
সে-ই আছে আমার জীবনবৃণে।


৫.      যদি তুমি আসতে


যদি তুমি আসতে,
বহুদূরের জলছবি ভেঙে
হাতে রেখে যেতে এক মুঠো উষ্ণতা,
আমি তোমার পথের ধূলিকণাও
পুনর্জন্মের মতো ধারণ করতাম।

তুমি এগোলে
হাওয়ার পোশাকে মেঘের মতো নরম হয়ে
ছুঁয়ে যেত তোমার নীরবতা;
আমি তাতে বুনে দিতাম রাঙা লাজুক সন্ধে,
যেন চোখের পাতা ভিজে ওঠে অকারণে।

তুমি যদি দাঁড়াতে
আমার শূন্য বুকে থমকে থাকা হৃদয়-ধ্বনির পাশে,
আমি তোমার কণ্ঠস্বরের আলোয়
উৎসব জ্বালাতাম অন্তরে
আবীর, গন্ধ, রঙে রঙে পূর্ণিমার মতো ভরে উঠতাম।

আর তুমি
যদি এক মুহূর্ত তাকাতে
আমার কাঁপা দেহের আল্পনায়,
তবে বুঝতে
আমি আসলে কতদিন ধরে
শুধু তোমাকেই ভালোবাসার রূপকথায় লিখে রেখেছি
একটি অনন্ত, অদৃশ্য, জ্বলন্ত কবিতার মতো।


৬.      মায়ার পথরেখা


তুমি রবে না আমি রবো না
রবে না এই সময়ও;
তবু কুয়াশার ভেতর দিয়ে
ভেসে থাকবে আমাদের হেঁটে-যাওয়া পায়ের শব্দ,
নিভে-নিভে জ্বলা চাঁদের ধূসর আলোয়
যেন কোনো পুরোনো স্মৃতির দোলা।

কথা থাকবে না
কথারা তো সময়ের সঙ্গে ফুরোয়;
শুধু থাকবে গল্প,
অদৃশ্য নক্ষত্রের গোপন ভুবনে
যেখানে নিশীথিনী তার সোনালি নিশ্বাসে
জাগিয়ে তোলে এক দেবযানীর স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নে আমরা দু’জন
অর্ধেক ছায়া, অর্ধেক আলো হয়ে
হেঁটে যাই নীরবতার সিঁড়ি বেয়ে
আর পিছনে পড়ে থাকে
মহাজাগতিক ধুলোর মতো
অলৌকিক, অবিনশ্বর আমাদের পথরেখা
অমলিন, অচঞ্চল, 
চিরকালের মায়ায় বাঁধা।


৭.       চন্দ্রালোকের আদিরস


জোছনার দুধসাদা ঢালে
তোমার শরীর ছিল তীর্থের মতো 
শ্বাসের ধূপ ছড়িয়ে দিয়েছিল রাত।

নিভৃত বাঁশবনের মর্মর-ঝরনা পেরিয়ে
আমি ছুঁয়েছিলাম তোমার ললাট
সেই ছোঁয়া ধীরে ধীরে
নেমে গিয়েছিল তোমার চোখের জলীয় রেখায়,
গলায়, কলারবোনে,
যেন আলোকধারা বিন্দু বিন্দু গলে
দেহে খুলছে নক্ষত্রের দরজা।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
রাতের অর্ধ-জাগ্রত স্বপ্নের মতো
দেহ যেন স্নিগ্ধ অরণ্যের উষ্ণ পাতাল,
যেখানে স্পর্শ মানে আগুন,
নিঃশ্বাস মানে গলন,
নিকটতা মানে জন্ম নেয়া নতুন পৃথিবীর।

আমার আঙুলে তোমার ত্বক
ধীর তরঙ্গে কেঁপে উঠেছিল
একটি উষ্ণ নদীর মতো,
যার গোপন স্রোতে নিমজ্জিত হতে হতে
আমি হারাচ্ছিলাম নিজেকে।

তোমার ঠোঁট
চাঁদের আলোয় রক্তিম শপথের মতো—
আমার নামে কাঁপছিল;
হৃদয়ের ভেতর শুনছিলাম
দেহের গভীরতম নীরব স্পন্দন।

বলেছিলে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…"
আমি সেই সুরে, সেই দেহের ভাষায়
ডুবে গেলাম পুরোপুরি
আলোর, আঁধারের, শ্বাসের, উষ্ণতার
মহাজাগতিক আদিরসে।


৮.        চন্দ্রালোকে দেহ-তন্ত্র

রাত্রির মধ্যাহ্নে
চাঁদের আলো হঠাৎ থমকে দাঁড়াল
যেন জানত, আমাদের দেহেরা
আজ এক অজ্ঞাত রহস্যের দরজা খুলবে।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসা
কোনো প্রাচীন স্বপ্নদেবীর মতো
চোখে নীরব মন্ত্র,
চুলের ডগায় জোনাকির গোপন আগুন।

আমি তোমার ললাটে চুম্বন দিলে
মনে হল
দূর নক্ষত্রের পথে
একটি অদেখা দরজা খুলে গেল ধীরে,
আর তার থেকে নেমে আসছে
অপরিচিত নীল আলোর উষ্ণ তরল।

শরীরের উপর শরীর,
ছায়ার উপর ছায়া,
বাঁশঝাড়ের মর্মর শব্দে
আমরা হারিয়ে যেতে লাগলাম
কে আমি? কে তুমি?
স্পর্শই যেন আমাদের পরিচয় পাল্টে দিচ্ছে
মুহূর্তে মুহূর্তে।

তোমার ত্বক ছুঁতেই
একটি শীতল আগুন
আমার হাত ধরে
অন্তরালের অন্ধকারে নিয়ে গেল,
যেখানে দেহের সীমানা নেই
শুধু স্পন্দন,
শুধু উষ্ণতার অদ্ভুত আলোড়ন,
শুধু শ্বাসের মধ্যে জন্ম নেওয়া রহস্য।

তোমার ঠোঁটের উপর
চাঁদের মায়া জমে ওঠে
সেই আলোতে প্রতিটি স্পর্শ
অপরাধের মতো নিষিদ্ধ,
আবার পরিত্রাণের মতো পবিত্র।

তুমি নরম কণ্ঠে বললে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…”
আর আমি বুঝলাম,
এই প্রেম কোনো ঋতুর নয়,
এই দেহ কোনো দেহের নয়—
এ এক লুকানো তন্ত্র,
যেখানে আমরা দু’জন
একই আলোর ভিন্ন ছায়া।


৯.       নীলাভ অধ্যায় 


নীল-অর্ধরাত্রির সেই নীরব মুহূর্তে
তোমাকে মনে হয় এক অদৃশ্য দীপশিখা
দূর নক্ষত্রবীথি যেমন ধীরে ধীরে
নরম আলো ছড়ায় আকাশের গভীরে,
তুমিও তেমনি গোপন রূপে নীলাভ,
নরম পরশে জাগাও অজানা স্মৃতি।

নগ্নতায় তুমি পিকাসোর এক বন্য রেখাচিত্র,
বাঁকা, বেপরোয়া, তবু আশ্চর্য সুরেলা
যেন শরীরের প্রতিটি টানে আছে
অদ্ভুত কোনো অসমাপ্ত শিল্পকাহিনি।
ঢাকাই মসলিনের মতোন তন্বী তুমি
হাওয়ায় দুললে যার স্বপ্নও কাঁপে,
কাঁচা মাটির ভাঁজে-ভাঁজে
তোমার বাঁকগুলো জন্ম নেয় আবার।

তোমার গা জুড়ে জ্বলে পূর্ণিমার
মৃদু-বাঁকা গোলাপী আলো
চাঁদের সিঁথি থেকে যেন
ঝরে পড়ে রেশমি জোছনা।
আর তুমি
সেই আলোতে গলে পড়ো,
ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে,
সারারাত্রি জুড়ে
অকারণ এক কোমল আকুলতায়।

তোমার কাছে এ রাত যেন
শৃঙ্গারময় এক উপাখ্যান
দেহ নয় শুধু,
স্পর্শ নয় শুধু,
বরং জোৎস্নার ভেতর লুকিয়ে থাকা
অদেখা হৃদয়ের নিঃশ্বাস।


১০.        বুকের গভীর খাঁজে

অন্ধকারই তোমার প্রিয়
তাই বুকের গভীর খাঁজে তোমাকে লুকিয়ে রাখি,
যেন গোপন কোনো শস্যভাণ্ডার,
যার উষ্ণতা জানে শুধু চাঁদহীন রাত্রি।

রাত্রি হিংসা করে তোমার সেই আবেশ
শরীরের ঘ্রাণে তুমি যখন আলতো কেঁপে ওঠো,
আমি শুনি দূরবর্তী স্রোতের মতো
একটি নরম নিশ্বাসের ঢেউ।

সেই মুহূর্তেই
স্বপ্নের বীজ বুনে দিই তোমার উর্বর মৃত্তিকায়
এক টুকরো ছায়া,
এক ফোঁটা আলো,
এক বিন্দু আদিরসের নিঃশব্দ স্পন্দন।

তুমি তখন দিগন্তের মতো প্রসারিত,
আমি তখন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ি
মাটির সঙ্গে মিশে যাই,
আর জন্ম নেয়
এক অনাদৃত ভোরের অন্তরঙ্গ অঙ্কুর।


১১.       শরীর বৃত্তের উপাখ্যান 

কালো মেঘের মতো চুল
ঢেকে দিয়েছিল তোমার দৌড়ে–ফেরা বয়সের পিঠ,
যেন প্রাচীন কোনো অরণ্য
ধীরে ধীরে নেমে আসছে উপত্যকার ঢালে।

অর্ধেক এসে থেমে থাকা সেই অন্ধকার
টিলার গায়ে ঝুঁকে পড়ে,
যেখান থেকে শরীরের মানচিত্র
প্রথম আলোর মতো খুলে যায়
গোপন উপকূল, গোপন ঢেউ,
অচেনা পথের হালকা কুয়াশা।

ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
জল হয়ে যখন গিরিপথ বেয়ে নামে,
তোমার অঙ্গভূমির প্রতিটি বাঁক
সেই নেমে–আসা জলের কাঁপুনি পায়।
নরম আলোয় তরল হয়ে ওঠে
ঢালের প্রতিটি নিঃশ্বাস।

আর সেই অতল খাদে
যেখানে দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়,
যেখানে শব্দ জন্ম নেয় আবার,
ফুটে থাকে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম
অচেনা, অদৃষ্ট, আত্মাভাষী।

প্রতিটি জলপদ্ম যেন বলে ওঠে
শরীর আসলে একটি প্রাচীন অরণ্য,
যার সব পথই যুগের পর যুগ
অপরিচিতের দিকে খোলে;
যেখানে স্পর্শ মানে শুধু স্পর্শ নয়
একটি আদিম বৃত্তে ফিরে যাওয়া।


১২.       পোড়ামাটির প্রেম


তোমার শরীরে ছিল মাটির উষ্ণতা
গ্রামের গোধূলিবেলার মতো শান্ত,
চুলের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ধোঁয়া-গন্ধ
বলত— আগুন পেরিয়ে এসেছ তুমি,
তবু জ্বলা শেষ হয়নি অন্তরান্ত।

কাঁচা মাটি ছুঁইতে গিয়ে বুঝেছিলাম
ভালোবাসা প্রথমে নরম, তারপর শক্ত,
তোমার চোখে তখনো শুকায়নি
আদিম নদীর ভেজা স্রোত।

যে প্রেমে পোড়া দাগ থাকে,
সেখানে আলোও জন্ম নেয়
দু’হাতের ছাঁচে তোমাকে গড়তে গড়তে
নিজেকেই নতুন করে চিনেছি
মাটির মতো ধুলোমাখা, তবু পবিত্র বেশ।

জ্বলে ওঠো আবার,
আমার বুকে আগুন রেখেই
পোড়ামাটির প্রতিমার মতো
তোমার প্রেম আজো
অভ্রান্ত, অটল, নিখাদ দাঁড়িয়ে আছে
আমার সমস্ত দিনের মাঝে।


১৩.       প্রেমময়ী তুমি


মনখারাপের নীল রাতটিতে
চোখ বুঝে শুয়ে ছিলাম নিঃশব্দে,
দূর অতীতের সব মুখভাসা স্মৃতিরা
ভেসে ভেসে আসছিল ধীরে ধীরে।

বুকের উপর রাখা ধর্মগ্রন্থ
আঁধারের কোলে শান্ত জ্যোতির মতো
শব্দেরা থামিয়ে দিচ্ছিল ব্যথা,
কিন্তু ঘুমের ভিতরেও ছিল এক শূন্যতা।

হঠাৎই পায়ের মৃদু শব্দ
স্বপ্ন নাকি জাগরণের সীমানায়?
চেয়ে দেখি তুমি!
সবসময়ের হাসি-ভরা সেই চেনা মুখখানি।

আমার বুকে রাখা বইটিকে
তুমি স্নেহে সরিয়ে রাখো টেবিলের কোণে,
আর আমি তোমাকে টেনে নিই হৃদয়ের গভীরে
যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা পূরণ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে।

ওই একটুখানি আলিঙ্গনের উষ্ণতায়
কী অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে!
মেঘ সরে জ্যোৎস্না যেমন
চুপিচুপি ছুঁয়ে যায় নদীর গায়ে।

প্রেমময়ী তুমি
তোমার ছোঁয়াতেই মিলিয়ে যায় সব দুঃখ, সব বিষাদ,
তুমি এলে বলেই বুঝি
জীবন আবার গায় নতুন আশার গান।


১৪.       পরম নির্ভরতার আলিঙ্গন 


নীল-অন্ধকার গোধূলিতে তোমার অকম্পিত হাত

আমার দিকে বাড়িয়ে এসেছিল

যেন বহু যুগের প্রতীক্ষা শেষে পাওয়া

এক আশ্রয়দায়ী দীপশিখা।

বলেছিলে- “পরম নির্ভর বাহুডোর…

এসো, আমার উষ্ণতায় তোমাকে আবদ্ধ করি।”


আমি তখন ভেসে গিয়েছিলাম

তোমার বুকে ছায়াবীথির মতো জেগে থাকা

সেই প্রশান্ত সবুজপাতার নরম বনানীতে।

তুমি দেখিয়েছিলে হৃদয়ের ঠিকানা

যেখানে নীরবে ধুকধুক করছে

রক্তের লাল সমুদ্র, স্মৃতির জ্যোৎস্না,

আর কিছু অদ্ভুত নীরব ঝড়।


বলেছিলে

“এই স্থান তোমার,

অপনার মতো করে সাজিয়ে রেখো।

ধুলো জমতে দিও না,

বেদনার কালো ছাইও নয়।

যত্ন নিলে, এ হৃদয় তোমাকে

হাজার বছর আলো দেবে।”


তোমার শব্দে

মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর রঙ

আকাশের নক্ষত্রেরা যেন চমকে তুলে

আমাদের নাম উঁচু করে ধরল।

শরীরের ছায়া আর আলোর সীমারেখা মিশে গিয়ে

এক সমুদ্রজোয়ার তুলেছিল

অদৃশ্য অনুভূতির উর্ধ্বমুখী ঢেউ।


আমি দু’হাত ভরে তুলে নিয়েছিলাম

সেই অনির্বচনীয় নির্ভরতা,

তোমার বুকের উষ্ণ প্রবাহ,

হৃদয়ের গভীর লাল রঙ।


আর বলেছিলাম

“এই স্থানকে আমি রক্ষা করব,

আমার ধ্বনি, আমার নিশ্বাস, আমার দিনরাত্রি দিয়ে।

কারণ এই বুকের অন্তরালে

আমার সমস্ত পথ, আমার সমস্ত ঘর।”


এভাবেই আমাদের আলিঙ্গনের ভিতরে

জন্ম নিয়েছিল এক দীর্ঘ, অনন্ত,

ধুকধুক করা পৃথিবী।


১৫.       সততার শরীরবাণী


তুমি যদি তার শরীর চাও,
তবে খোলাখুলি বলো
অন্ধকারের কোণে নয়,
চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট হও।

ভালোবাসার আবরণে
লোভের আগুন ঢেকে
দূষণ কোরো না তার বিশ্বাসে
মিথ্যে স্পর্শে ভেঙো না তার নিজস্বতা।

ইচ্ছের ভাষা সৎ হওয়ারই নাম,
সাহসী হও, স্বীকার করো খোলামেলা প্রার্থনা—
তবেই শরীর হবে সম্মত আলোক,
তবেই স্পর্শের পথ হবে পবিত্র ও সত্য।

ভালোবাসার অভিনয় কোরো না
সততার হাত ধরেই
মানুষের হৃদয় জেতা যায়,
আর শরীরও দেয় আপনাকে
নিজের মতো সম্মত করে,
নিজের মতো সত্য হয়ে।


১৬.     দু'দরজার পূর্ণতা


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৭.     বিনিদ্রতার অন্তর্লিখন


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৮.       বুকের গভীরের দান

তুমি ভালোবাসা দাও
বুকের গভীর থেকে উঠে আসে উষ্ণ জোয়ার,
নরম অন্ধকার ভেদ করে
একটা অচেনা আলো এসে থামে আমার চোখের কোলে।

আমি তখন করতল পেতে রাখি
তোমার বুকের ঠিক বাহিরে,
যেন কোনও পূর্ণিমা রাতের আগে
মেঘে ঢাকা চাঁদকে ধরে রাখতে চাই
এক মুহূর্তের জন্য হলেও।

তোমার ভালোবাসা ঢলে পড়ে
আমার নিঃশব্দ ফাঁকফোকরে,
আঙুলের রেখায় জমে ওঠে
নতুন জীবনের স্বচ্ছ দীপ্তি।

তুমি দাও
আমি গ্রহণ করি।
তোমার গভীরতা
আমার বিস্তার হয়ে ওঠে।

এই বিনিময়েই
আমাদের দু’জনের ভেতর
একটি অনন্ত নরম ক্ষয়হীন পৃথিবী
নিঃশব্দে জন্ম নেয়।


১৯.       কবিতা, নদী ও নারী


কবিতা নদীর মতো
নিরন্তর বয়ে চলে শব্দের স্বচ্ছ স্রোত,
গভীর থেকে গভীরতর আবেগ তুলে আনে
নরম ঢেউয়ের গোপন স্পর্শে।

নদী নারীর মতো
কখনও শান্ত, কখনও উচ্ছ্বসিত,
ধারে-ধারে জন্ম দেয় উর্বরতা,
জলের ভাষায় লিখে রাখে আকুলতার অনলিখিত গান।

নারী কবিতার মতো
এক এক শব্দে খোলে অপরূপ বিস্ময়,
চোখের ভেতর লুকিয়ে রাখে হাজার রূপকথা,
স্পর্শের নিশ্বাসে ফুটিয়ে তোলে সৃষ্টির প্রথম আলো।

অথচ তিনজনই যেন এক
একই সুরের বহমানতা, একই আদিম টান,
একই দহন, একই বিশ্রাম,
কবিতা, নদী ও নারী
একই বৃন্তে ফুটে থাকা
অন্তহীন সৃষ্টির তরঙ্গমান রূপ।

সবাই মিলে তারা
পৃথিবীর বুক জুড়ে বয়ে চলা
এক অনন্ত মহাকাব্যের তিন অধ্যায়।


২০.     আসব তোমার কাছেই


আসব তোমার কাছেই
যদি তুমি খুলে দাও তোমার নীলাভ আকাশ,
যদি ছুঁয়ে দাও আমার কাঁধে
বহমান নদীর কুলকুল শব্দের স্নিগ্ধ জলছায়া।

যদি দেখাও সবুজ উপত্যকার নিঃশ্বাস,
আমি হামাগুড়ি দেব তার ঢালে,
ঝর্ণা উপচে পড়বে পুকুর-নালার গোপন স্রোতধারায়,
জলের গায়ে লেপ্টে থাকবে আমাদের দু’জনের
নামহীন বিকেলের ঘ্রাণ।

যদি নিয়ে যাও হাত ধরে
পূর্ণিমার স্বপ্ন-আলোকিত পথ ধরে কোনও নিরুদ্দেশে,
যেখানে সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে,
আর রাতের অন্ধকারে থেকে থেকে
জোনাকিরা জ্বলে ওঠে তোমার চোখের মতো।

যেখানে রাতভোর ভিজে থাকা যায়
নির্বাক শিশিরের কোমলতায়,
আর মনে হয়
বিশ্বের সব পথই শেষে এসে মেশে
তোমার কাছেই,
তোমার অনন্ত আলিঙ্গনে।


২১.       ঐশ্বর্যের দান


তোমাকে দিলাম আমার সন্ন্যাস

ঝরে-পড়া ছিন্ন পাতা, অনাস্বাদিত অপূর্ণ প্রেম,

দীর্ঘ দিনের দীনতা, আমার নিজেরই গোপন গ্লানি।

শূন্য হস্তে দাঁড়িয়ে আছি তোমার দরজায়,

যেন গোধূলির তীর্থযাত্রী

যার সবই শেষ, শুধু অভিসারের আকাঙ্ক্ষা বাকি।


তুমি দাও আমাকে সপ্তপর্ণীর সবুজ পাতা,

যার শিরার ভিতর দিয়ে দেহের নরম আলো চুইয়ে পড়ে;

দাও নীলকণ্ঠ পাখির পালক,

যাতে ছুঁয়ে দেখি তোমার গ্রীবার নীল ছায়া

সেই ছায়া ঠিক নদীর কলধ্বনির মতো

ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে বক্ষের উপত্যকায়।


দাও শুভ্র মেঘের জলকণা,

যা এসে নামে তোমার শরীরের উষ্ণ ভূখণ্ডে

যেন শীতল বর্ষার বিন্দু

শিল্পীর ক্যানভাসে সারা রাত নাচে,

বুকে, কাঁধে, উরুর ঘন সবুজ প্রান্তরে।


আমাকে দাও তোমার সৌধ,

দেহের স্থাপত্য

যেখানে বক্ররেখায় বাঁক নেয় নীরবতা,

যেখানে চোয়ালের কাছে বাঁশরির সুর,

বাহুর কাছে আয়েশী খড়ির দাগ,

আর নাভির ঠিক ওপরেই জোনাকির আলো জমা হয়।

আমি সেই সৌধে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাই

যেন কোন আদিম নগরের ভিতর

যেখানে স্তম্ভ, শীর্ষ, পর্ণশিখর

সবই কোনো মহাজাগতিক শিল্পীর মেঘ-মায়া স্পর্শ।


দাও আমাকে নিস্তব্ধতা,

তোমার শ্বাসের আড়ালে থাকা সেই সুবর্ণ নীরব আলো;

দাও অমরত্ব

তোমার উরুর ধার বেয়ে নেমে আসা উষ্ণ রেশে;

দাও মর্মরিত বেদনা,

যখন হাত ছুঁয়ে যায় তোমার কাঁধের কোণে,

গোপন কাঁপন বাজে তোমার অস্থিমজ্জায়।


আর দাও সেই ঘন আকুল নিঃশ্বাস

যা আমার শরীরের উপরে

জোছনার মতো পড়ে গভীর নরমতায়।


আমি তখন তোমার সামনে অগ্নিশিখার মতো উন্মুক্ত,

তুমি আমার সামনে দেবযানীর মতো গাঢ়

একা তুমি আর আমি,

আর আমাদের শরীরের স্থাপত্য,

যার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি রেখা

একেকটি আদিম শিল্প,

একেকটি পূজা,

একেকটি অনন্ত সৃষ্টি।


২২.      অচ্ছ্যুত ছোঁয়া 


যে রমণীটি আমার নয়,
সে যদি হঠাৎ নিঃশব্দে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়,
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তাপ জেগে ওঠে,
যেন নিষিদ্ধ বনের ভিতর প্রথমবার পদচিহ্ন রাখলাম আমি।

যে শরীর ছুঁইতে চাই না,
তা যদি নিজেই এসে ছুঁয়ে দেয় নিশ্বাসের গোপন ঘরে,
তবে কি তা পাপ,
নাকি দেবতার হাতে খোদাই করা কোনও গুপ্ত পূজার আয়োজন?
হাত বাড়ালেই আগুনের মতো শিহরণ,
তবু হাত সরাতেই জমে ওঠে বরফের দাহ,
কাছে পেলে তৃষ্ণা বাড়ে, দূরে গেলে বিষাদ নামে।

মন তখন অদ্ভুত এক ভাসমান নৌকা,
তটের কাছে গিয়ে আবার ভেসে যায় অচেনা স্রোতে।
ছুঁইতে চাই না
কিন্তু তার ছায়া, তার উষ্ণতা, তার শ্বাসের নরম ছোঁয়া
আমাকে বারবার টেনে আনে এক অনিবার্য জোয়ারে।

এ কি কেবল মুহূর্তের আবেশ?
নাকি শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম কোনও উপাসনা?
না কি এ এক অচিন্ত্য প্রেম
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় অনির্বচনীয় আকুলতা?

অচ্ছূত সেই রমণী
প্রতিবার যখন আমার কাছে ফিরে আসে,
তার চোখে অগ্নি, গলায় ঝড়,
আর আমার কাছে সে হয়ে ওঠে
স্পর্শে জন্মানো সন্ধ্যাতারার দেবী।


২৩.       সঞ্চারিণী তুমি


এই নীল আকাশ কেঁপে ওঠে নীরব সম্মোহনে,
অরণ্যের আদিম ছায়া দোল খেয়ে বলে
তুমি চির প্রণয়ীতমা,
প্রকৃতির শ্যামল বুকের গোপন সুরভি।

সাগরের ফেনায়িত গভীর গর্জন
বুকে তুলে আনে অনন্ত প্রত্যয়
শত ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে উচ্চারণ করে,
তুমি চির স্বরূপা, তুমি জলের গানের বেদনা ও বীণার সুর।

ধরিত্রীতে বয়ে যাওয়া প্রতিটি বাতাস
মৃদুমন্দ স্পর্শে উচ্চারণ করে
তুমি আনন্দময়ী, তুমি শাশ্বত অস্তিত্বের দীপ্ত নক্ষত্র।

বিশ্বলোকের এক ঝাঁক শুকপাখি
অসীম নীলের তীরে উড়ে যেতে যেতে
গেয়ে যায় নির্মল সুখের গান
আর সেই গানের চিত্রিত অন্তরা তুমি,
তুমিই তার লুকানো রাগিণী, তার অরূপ মাধুর্য।

তুমি সঞ্চারিণী
সমস্ত সুরের ভিতর ছড়িয়ে থাকা
অলৌকিক এক কম্পন,
আকাশ থেকে অরণ্য,
সাগর থেকে স্বর্গলোক অবধি
তোমার নামেই বাজে পৃথিবীর সব সংগীত।


২৪.        নীলাভ অবকাশ 


নীলাভ এক অবকাশে কখনো এমন সময় আসে-

ভালোবাসা হঠাৎই উন্মাতাল হয়ে ওঠে,

তোমার নরম বুকের উপত্যকায় আমি রেখে দিই
দুই চোখের সমস্ত নিবেদন,
যেন দু’টি ভিজে পাখি আশ্রয় চায় সন্ধ্যার নীরবতায়।

মদিরার মতো ঘন, অচেনা এক গন্ধ
তোমার শরীর থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে
জড়িয়ে ধরে আমার সমস্ত অনুভব।
তখন স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়
ভঙ্গুর কাঁচের মতো কাঁপতে কাঁপতে,
তবুও সেই স্বপ্নের টুকরোতেই
আমরা খুঁজে পাই এক গোপন দীপ্তি।

শরীর থেকে শরীরে হতে থাকে
অজস্র অস্বীকৃত লেনদেন
কোনও হিসাব নেই, কোনও খতিয়ান নেই,
শুধুই দু’জনার দূরন্ত আকাঙ্ক্ষার
উন্মুক্ত দেবদারু-ছায়া।

চাওয়া-পাওয়া মিলেমিশে যায়
এক অনন্ত পূর্ণতায়,
যেন দিগন্তে জেগে ওঠা
অগ্নিবর্ণ সূর্যের মতো।

এভাবেই, দেহের গভীরতম গোপনে
নিশ্চুপে গড়ে ওঠে
এক প্রগাঢ় আলোড়ন
যার কম্পন ছড়িয়ে পড়ে
আমাদের নশ্বর পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে
অসীম আলোর ভুবনে।


২৫.       প্রেমোৎসব


তুমি নও কোনো স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর দুরন্ত ছায়া,

তুমি প্রেম-অর্চনার দেবী

গ্রীষ্মদহনে মেঘমালা যেমন আকুল,

আমি তেমনই তোমার সোহাগ-শীতলে আশ্রয় খুঁজি।


আমিও চাইলে স্ত্রৈণ নই,

তুমিও পারোনি কখনো স্বৈরিণীর মুখোশ পরতে;

কারণ আমরা যে দু’জন

প্রেমবুভূক্ষু যুগল, জন্মেছি একই অগ্নিতৃতীয়ার আলোয়।


যেন হেমন্ত-সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায়

নাগেশ্বরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে,

তেমনি আমাদের দেহে দেহে ওঠে উৎসবের ঢেউ

সেখানে নেই নিষেধ, নেই পৃথক কোনো স্বর্গ-নরক,

শুধুই স্পর্শের রাজ্য, নিশ্বাসের মন্দ্র প্রতিধ্বনি,

শুধুই প্রেম

যে প্রেম দেহকে শুচি করে, নরককে পরিণত করে স্বর্গোদ্যানে।


২৬.      অগ্নিসংযোগে প্রেম


তুমি নও স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর প্রলুব্ধ ছায়া

তুমি সেই মৌলিক নারী,

যার দৃষ্টির এক বিন্দুতে শ্যামঘন মেঘের গর্ভে

বিদ্যুৎ জন্মায়,

যার পদধ্বনিতে কুসুমিত হয় নিষ্প্রাণ অরণ্য।


আমি চাইলে শক্ত; তুমি চাইলে কোমল

তবু আমাদের কারও নাম নেই,

কারণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে

আমরা এক প্রবল অগ্নিশিখা,

যেখানে দেহের ভাষা ঢেউ হয়ে ওঠে

আর আত্মা কেঁপে ওঠে তার সঙ্গীতে।


তোমার গ্রীবায় ঝুলে থাকা নিশ্বাস

আমাকে আছড়ে ফেলে নীললোহিত ধ্যানের গভীরে,

যেখানে তোমার ত্বকের গোধূলিচ্ছায়ায়

জ্বলে ওঠে প্রজ্জ্বলিত সন্ধ্যারা।

তোমার চোখে তখন কামনামেঘ

তাহার নিচে ঝরে পড়ে তপ্ত নীরবতার বৃষ্টি।


আমার বক্ষের উপত্যকায় তুমি

বিজলির রেখার মতো জেগে ওঠো

একবার ডানায় আগুন,

একবার ঠোঁটে শীতের শিশির,

আর মাঝখানে অচিন এক দেবীর হাসি।


স্বর্গ নাকি নরক?

ওসব তুচ্ছ বিভাজন

আমরা যখন মিলিত হই হৃদয়ের গহ্বর-দীঘিতে,

সেখানে ইন্দ্রও নাম লেখায়,

যমও ফিরে তাকায় বিস্ময়ে।


কারণ আমাদের প্রেম

অগ্নিযজ্ঞে উত্থিত ধূপের মতো,

দেহে দেহে দুলে ওঠা মদির অর্ধচন্দ্রের মতো,

এক আদিম, অনন্ত, নিশ্বাস-উৎসব;

যেখানে তুমি দাও আলো,

আমি দিই জ্যোৎস্নার পথ,

আর দু’জনে মিলে সৃষ্টি করি

এক অচঞ্চল, অচিন্ত্য, অগ্নি-রূপী প্রেমলোক।


২৭.        প্রেমাগ্নির গুপ্তলোক


তুমি নও কোনো স্বৈরিণীর তীব্র ছায়া,

তুমি নও ময়ুরাক্ষীর উন্মত্ত ক্ষুধাও

তুমি সেই অরণ্যদেবী,

যার গোপন তমসায় প্রথম আলো জন্মায়,

যার নিঃশ্বাসে বুনো হাওয়া দিক পরিবর্তন করে,

যার কোমল শিরায় বয়ে চলে

অচিন আম্রবনের মধুর অন্ধকার।


আমি চাইলে কঠোর, তুমি চাইলে লাজুক,

তবু দেখো, এই পরিচয়ও টিকে না,

কারণ আমাদের মিলন কোনো নামে বাঁধা পড়ে না,

তা হলো বনের নিদাঘের মতো,

যেখানে দুই বৃষ্টি-দেবতা

গোপনে অগ্নিকে আলিঙ্গন করে।


তোমার চুলের আঁধারে যে গন্ধ,

তা দীপশিখার কুণ্ডলি তোলে আমার বুকে,

একবার শীতল ধূপ,

একবার অগ্নিমেঘ,

আর তার মাঝখানে হঠাৎ

তোমার চোখ

যেন ক্ষুদ্র দুই যজ্ঞকুণ্ড,

আমি যার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে

হই বিলীন, হই বারবার জন্ম।


তোমার ত্বকের কান্তিধূসর ঢেউ

আমার হাতের ছায়ায় কেঁপে ওঠে

আমি শুনতে পাই

দূর কোনো প্রাচীন মন্দিরের ঢাক,

তার গম্ভীর রেশ এসে নামে

তোমার কণ্ঠগাত্রে,

তুমি তখন কেবল নারী নও

তুমি আদিম উৎসর্গ,

যেখানে প্রেমেরই পুরোহিত আমি।


আমরা যখন কাছে যাই,

বায়ু থমকে দাঁড়ায়

রাত্রির কালো বেণী লুটিয়ে থাকে মাটিতে,

দূরে কোনো নক্ষত্র

অর্ধেক অন্ধকার হয়ে যায় আমাদের তাপ টেনে,

আর স্বর্গ-নরকের সীমা ভেঙে

এক নতুন অগ্নিপথ খোলে।


সেই পথে আমরা দুই দেহ নয়

দুই প্রাচীন শক্তি,

যারা স্পর্শের ভেতর দিয়ে

তৈরি করে এক আলো-অন্ধকারের পৃথিবী,

যেখানে তোমার ঠোঁটে আছে রাত্রির ধূপ-গন্ধ,

আর আমার বুকের ভিতর

জ্বলে উঠে সৃষ্টি হয়

এক নতুন যুগ, এক নতুন রস,

এক অগ্নিদেবতার আশীর্বাদে গড়া

অতল প্রেমলোক।


২৮.       হে পুণ্যশীলা


কত শত যুগের কালনাগ ছুঁয়েছে তোমার শরীর,
তবুও শ্বেত কমলের পাপড়িগুলো নীল হয়ে ওঠে
তীব্র উত্তাপে, ঘামজলে রং বদলায় তোমার শাড়ি,
মেঘলা গোধূলির মতো গাঢ়, আবার ঝড়ের পর স্নিগ্ধ।

কপাট খুললেই দেখি প্রথম আদিম প্রান্তর,
মুগ্ধতার নিঃশ্বাসে কেঁপে ওঠে লতাগুল্ম,
তরঙ্গায়িত রুপালি জল গড়িয়ে পড়ে
তোমার উপত্যকার গভীর নীল নদী থেকে।
লাজুক আলোয় তোমার সেই প্রান্তর
পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টির মতো সজীব হয়ে ওঠে।

তুমি লজ্জার স্রোতে সাঁতার কাটো, ঈর্ষার জলে ডুব দাও,
একেকটি ঢেউয়ে হারিয়ে ফেলো পরিধেয় অলঙ্কার,
অবেলায় খুলে রাখো পৃথিবীর সব ভার—
নিরাভরণ হয়ে ওঠো নবজাত ভোরের মতো নির্মল,
আদিম, অস্পর্শ, অচিন্ত্যরূপা।

আমি তখন তোমার অস্তনদীর জলে নামি ধীরে,
সেও এক পবিত্র গহ্বর
যেখানে জল গাঢ়, আলো নরম, বাতাস উদ্দাম।
আমি অবগাহন করি তোমার নরম ঢেউয়ে,
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ বাষ্পে ধুয়ে যায় আমার পাপ,
অন্তর শুষে নেয় স্রোতের শুদ্ধতা।
আমি ক্রমে পুণ্যবাণ হয়ে উঠি
তোমার দেহধারার পবিত্র স্নিগ্ধতায়—

হে পুণ্যশীলা,
তোমার আদিম জলে ডুবে জন্মাই আমি আবার,
নতুন, অনাবৃত, অনন্তের মতো পবিত্র।


২৯.         অমৃত না–মেলা প্রেম

হাতের রেখায় যতটা উষ্ণতা ছিল
সবই ঢেলে দিলাম তোমার দিকে,
তবু কেন জানি অমৃতভরা সেই সুধাপাত্র
কখনো পূর্ণ হলো না।

সময়ের গায়ে গায়ে জমে ওঠা নীরবতা
ভেঙে তুমি একদিন চলে গেলে দূরে,
হৃদয়ের দ্বার তখনও ছিল খোলা—
তুমি শুধু তাকাও, এই আশায়।

বৃষ্টিভেজা রাত্রির মতো
তোমার স্মৃতি আজও ছুঁয়ে যায়,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো আমি
অল্প আলোয় এখনও তোমাকেই খুঁজি।

ভুলে যেতে চাই, পারি না
হৃদয়ের গভীরতম কুঠুরিতে
তোমার নাম লেখা আছে কাঁটার অক্ষরে;
বেদনাতেও এক অদ্ভুত মাধুর্য জ্বলে।

জানি, একদিন তুমি আর ফিরবে না,
তবু হৃদয় তার আপন নিয়মে
আজও তোমার জন্যই ঢেউ তোলে
অমৃত না–মেলা প্রেমের সাগর হয়ে।


৩০.        রহস্যময় প্রকোষ্ঠ


নারীর শরীর
রহস্যময় এক প্রকোষ্ঠ,
আলো আর অন্ধকারের যুগল নিবাস,
যেখানে দরজা খুললেই
কেউ জেগে ওঠে সৌরালোকে,
কেউ আবার তলিয়ে যায়
অদৃশ্য গভীরের ছায়ায়।

একজন রমণী
জীবনের সব বিষাক্ত তোলপাড়
নিঙড়ে দেয় শহরের আবছায়া স্তম্ভে,
অঙ্কন করে নীরব চিত্র
যেখানে তার আত্মা
শান্তির জন্য ডাকে
নিজের অন্তরতম অবচেতনে।

শহরের বৃষ্টিসন্ধ্যা যখন নেমে আসে,
তার দেহ ভিজে ওঠে অবলীলায়,
ধরে রাখে সেই পুরুষকে
যার কাছে বিশ্ব কোনো একদিন
ঋণী হয়ে থাকে নিঃশব্দে
যে ঋণ ফেরত দেয়
দু’টি দেহের মিলনে।

সব সঙ্গমে আনন্দ জন্মায় না,
কিছু মুহূর্তে জন্ম নেয় জীবন
সেই জীবন সে উৎসর্গ করে
মাত্র একজনকেই,
যার কাছে সে পেখম মেলে
ময়ূরের সুধামাখা ভঙ্গিতে।

অন্যদের কাছে সে শুধু প্রাণহীন প্রতিমা
নিঃশব্দ, নিরাবেগ, অস্পর্শ্য এক মূর্তি।


৩১.      অন্তঃসলিলা মিলনরাগ


তুমি শুধু একবার খুলে দাও হৃদয়ের গোপন কপাট,
এই উচ্ছ্বল যুবকের সামনে আর বন্ধ কোরো না কোনো দরজা।
লজ্জার অবগুন্ঠনটুকু সরিয়ে ফেলো
দেখো, আলো কেমন নেমে আসে তোমার চোখে,
আমার শ্বাসে কেমন জন্ম নেয় নতুন সব উচ্চারণ।

তোমাকে শেখাবো ভালোবাসা কী—
ভাঙা আর গড়ার অনন্ত কারুকাজ,
শরীরের নিখুঁত শিল্প, আবেগের গভীর নকশা
যেখানে সব তছনছ হয়ে আবারও জন্ম নেয়
নতুন এক সৃষ্টির রূপে।

আমি হাঁটু মুড়ে দু’হাতে ছুঁতে চাই
তোমার সঞ্চিত স্মৃতির স্বর্ণরেণু,
যে সব মণিমুক্তা তুমি আজও বুকের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছো,
যে যন্ত্রণাগুলো তোমার ভেতর নরম আলো হয়ে জ্বলে
সেগুলোকে আজ মুক্তি দাও, রাখো আমার বুকে।

এসো, মাথা রাখো এই উন্মূল যুবকের হৃদস্পন্দনে,
অকাতরে বিলিয়ে দাও তোমার সব মণিকাঞ্চন,
তোমার অলৌকিক স্নিগ্ধতা, তোমার নিশ্বাসের ভোর।

আমরা মিলব নদীর মতো
শিরায় শিরায়, স্রোতে স্রোতে,
অন্তঃশীল ধারার অনির্বাণ রূপে।
আমরা ভেসে ভেসে তুলে আনব
অলক্তমাখা পদ্ম-কুসুম,
যেখানে দেহ জল হয়, হৃদয় হয়ে যায় নীরব ঢেউ,
আর ভালোবাসা রূপ নেয়
অমোঘ, আদিযৌবনের কোনও প্রাচীন মন্ত্রে।


৩২.       এসো দু’জনে


হাতখানি বাড়িয়ে দাও
চুড়ির রিনঝিন সুরে আজ যেন অর্ধচন্দ্র দোলে,
মেহেদির গাঢ় রং তোমার আঙুলে গোপন মাধুরী লিখে রেখেছে;
এসো, সে হাতেই আমি অঙ্গুরীর চিরন্তন দীপ্তি পরিয়ে দিই।

মাথাটি ঝুঁকিয়ে দাও
কুচবরণ কেশে তুমি বেঁধেছ রাজকুমারীর নীল খোঁপা,
তার ভাঁজে লুকিয়ে আছে স্বপ্নের কুয়াশা;
এসো, সে খোঁপায় আমি রক্তগোলাপের রেশমি সুবাস ছুঁইয়ে দিই।

মুখখানি তুলো
কপালে পরা টিপে জ্বলে থাকে সন্ধ্যাতারার আলো,
চোখের কাজলে গভীর রাতের নরম ছায়া;
এসো, সে মুখে লোধ্ররেণুর লাজুক কোমলতা মেখে দিই।

কোমরটি এগিয়ে দাও
মোঘল নর্তকী আনারকলির বিছা জ্বলছে রেশম অগ্নিশিখায়,
তার দোলায় দেহের চিত্রল খেয়াল ফুটে ওঠে;
এসো, নাভীপদ্মে চারুকলার নক্ষত্ররেখা এঁকে দিই।

পা দুটি বাড়িয়ে দাও
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো পদধ্বনি বাজে তোমার পায়ে,
আলতার আঁচলে ফুটে থাকে রক্তিম ভোরের লাবণ্য;
এসো, সে পায়ে নুপুর জড়িয়ে দিই নীরব রাতের সুরমালা।

বুকখানি কাছে আনো
আতরের গন্ধ, চন্দনের ধূপ, আর অদৃশ্য পূর্ণিমা-মলয়
তোমার বুকে আজ সমুদ্রের ন্যায় ধ্বনি তোলে;
এসো, সে বুকখানি আমি আলিঙ্গনে বন্ধন দিই,
শান্তির মতো, প্রেমের মতো, চিরন্তন নিবিড়তায়।

ভালোবাসা ভরিয়ে দাও
পূর্ণিমার আলোয় আজ চারিধার উন্মুখ, সমর্পিত, জাগ্রত;
এসো দু’জনে এই নিশীথে
প্রেমের ফল্গুধারা বইয়ে দিই
নক্ষত্রের নীচে, বাতাসের সুরে, নিঃশব্দ আকাশের বুকে।


৩৩.       ম্রিয়মাণ হেমন্ত সন্ধ্যা


কী এক মায়বী শব্দের ধ্বনি  ভেসে এলো, বন্ধু

তোমার সেই ম্রিয়মান সন্ধ্যার স্মৃতিরা যেন আজও বাতাস ছুঁয়ে যায়।

স্বপ্নের সারথিরা যে গভীর অন্ধকারে তোমায় নামিয়ে দিয়েছিল,

সেখানে অলীক মাছেরা, অদৃশ্য শোক, আর না-পাওয়ার আলো জ্বলে ছিল

তার সবটাই অনুভব করলাম তোমার শব্দে।

তুমি যে বেদনার রৌদ্রোজ্জ্বল সকালটির নাম খুঁজে পাওনি,

সেই নামহীন নগ্নতার মধ্যে

আমি দেখলাম তোমার আত্মার নিরাবরণ সাদা চিঠি

যা উড়ে গেল নীল আকাশ ছুঁয়ে,

যমুনা পারের বন্ধুর কাছে।

বন্ধু, তোমার সেই ‘কবি-পাগল’ মনটাকে

হেমন্তের ম্রিয়মান আলোয় ভালোবাসার যে হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল,

তা আজও জ্বলজ্বল করে ওঠে শব্দের ভিতরে।

লাশকাটা ঘরের নিঃসঙ্গতা ভেদ করে

যে প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়েছিল,

তারা এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে তোমার স্বপ্নের রং,

আর সেই রঙেই তোমার কথার বিপরীতে লিখছি আমি।

বন্ধু, তোমার বেদনার ভিতরে যে আলো লুকানো,

আমি সেই আলোরই পাশে বসে আছি

নির্জন হেমন্তের সন্ধ্যা জুড়ে

তোমার শব্দের মায়া ছুঁয়ে।


৩৪.       চন্দনে চন্দনে 


শাড়ির আঁচলটুকু আধখানা মুখে রেখে
যেভাবে তুমি দাঁড়িয়েছিলে রাতের নির্জনা ভেদ করে
সেই রাত ভোর হয়েছিল বুনো চন্দনের গাঢ় গন্ধে,
যেন তোমার ত্বকেই জন্ম নিয়েছিল সুগন্ধের প্রথম আভা।
তার আগের রাত- কোজাগরীর পূর্ণিমা ভিজে উঠেছিল
তোমার চোখের জ্যোৎস্নার মতো দীপ্ত সুধায়।

তুমি এমনই,
মায়ায়, মদিরায়, অচেনা এক আকর্ষণে ভরা
যে আকর্ষণের নেশায় আমি
অগণিত রাত বসে থেকেছি নিঃশব্দে,
বুকে মেখে নিয়েছি চন্দনের কুহক আর
গভীর নিশীথে ভাসিয়ে দিয়েছি জ্যোৎস্নার নরম ঢেউ।

আজ তুমি এত কাছে
আমার নিঃশ্বাসের বাঁকে বাঁকে মিশে আছো,
তোমার ত্বকে ছড়িয়ে আছে চন্দনের নরম উত্তাপ,
তোমার দেহভরা আলোয় ঝরে পড়ছে পূর্ণিমার স্বর্ণধারা।
চন্দনে চন্দনে, জ্যোৎস্নায় জ্যোৎস্নায়—
তুমি আর আমি একাকার হয়ে আছি,
তারারাও যেন থমকে আছে আমাদের গোপন নীরবতার সামনে।


৩৫.        ধবলতুষারের নিশীথরাগ


সারারাত তোমার শরীরের উষ্ণতা
জ্বলতে ছিল আমার বুকে
সকালে দেখি তুমি নেই,
শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ভেসে আসে
ধবলতুষারের কুচি,
যেন তোমার ছোঁয়ার শীতল স্মৃতি।

কখন যে ভেঙে গিয়েছিল
আমাদের জোড়া-শরীরের মায়াবী বাঁধ,
কখন যে তরঙ্গ উঠে
ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দুই দেহকে
মনে নেই, কিছুই নেই,
শুধু ভেজা চাদরে তোমার আঙুলের দাগ,
উন্মাতাল নিশ্বাসের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।

রাতের গভীরে তুমি ছিলে
এক উষ্ণ আদিম ঝড়
আমার বুকে ঝরে পড়েছিলে
জ্যোৎস্নার মতো,
চুলে লেগে ছিল তোমার কামরসের গন্ধ,
শরীরের প্রতিটি কোণে
তোমার উত্তাপের স্বাক্ষর।

সকালের বিমুগ্ধ আলোয়
আমি শুধু ভাবি
রাতের সেই বুনো উচ্ছ্বাসে
তুমি কি সত্যিই ছিলে,
নাকি তুমি
ধবলতুষার গলে তৈরি হওয়া
এক ক্ষণিক উষ্ণ অলৌকিকতা?


৩৬.        অগ্নিশিখার গোপন রাত্রি


তোমার দেহে যখন গোধূলি নামে,
আমি দেখি
মধ্যরাত্রির গোপন বাগান
ধীরে ধীরে খুলে যায় অবিমিশ্র আলোয়।

শিহরণে কেঁপে ওঠা ত্বক
জ্যোৎস্নার মতো গলে আসে আঙুলের উপর,
তোমার কেশে লুকানো সুগন্ধ
হঠাৎ উন্মোচিত হয় বজ্রনিশির নিস্তব্ধতায়।

তুমি কাছে এলে,
দূরাগত নদী গর্জে ওঠে নিশ্বাসের তালে,
জলরেখার মতো বাঁক নেয় তোমার গ্রীবা,
চোখে জমাট বাঁধে
অদৃশ্য অগ্নিশিখা
যেখানে আমার ছায়া ছুঁয়ে যায় তোমার তৃষ্ণার তটরেখা।

প্রেম তখন ক্ষুধার রূপ ধরে,
শরীর তখন মন্দিরের দরজার মতো
ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার আগুনজড়ানো রহস্য।

আমি তোমাকে ছুঁই না
তুমি নিজেই হয়ে ওঠো সংবেদনার আকাশ,
আমি শুধু হাওয়া,
যার স্পর্শে কম্পিত হয়
তারুণ্যের লতা,
রাত্রির পর্দা,
এবং তোমার সমগ্র দেহের দীপ্ত অতল।

এই মিলনের অগ্নিবীজে
আমরা দু’জনেই
এক নতুন ভোরের জন্ম দিই
যেখানে কাম আর প্রেম
একই শিখায় জ্বলে,
একই ছায়ায় নিভে যায়,
আবার জ্বলে ওঠে।


৩৭.     অগ্নিজ হিমালয়ের নিচে


রাত্রি যখন রক্তিম ছাই হয়ে ওঠে,
তোমার দেহ তখন জ্বালামুখ
এক অনন্ত আগ্নেয় প্রান্তর
যেখানে আমার ছায়া পড়তেই
ধোঁয়ায় ভরে যায়
তারুণ্যের জ্বলে-পোড়া বাতাস।

তোমার শ্বাস
ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে আমার বুকে,
আমি শুনি দগ্ধ লতার আর্ত শব্দ,
শোনাই জ্বলে ওঠা রক্তের নাচন।

তোমার গ্রীবা বাঁকে যেন বজ্রপাতের আগে
আকাশের শেষ সঙ্কোচ,
তারপর হঠাৎফেটে যায় নীরবতার খোলস,
আমাদের উভয়ের ভিতরের দাহ
এক হয়ে ওঠে উন্মাদ নদীর স্রোতে।

তুমি যখন চোখ বন্ধ করো,
পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যায়,
কিন্তু সেই অন্ধকারেই
আমাদের মিলিত উত্তাপ
পাহাড়ের হৃদয়ে সঞ্চিত
লাল লাভার মতো
ফেটে ফেটে ওঠে।

দেহ তখন সীমানাহীন
স্পন্দনের ঢেউয়ে ঢাকা পড়ে
সমস্ত লজ্জা, সমস্ত প্রতিরোধ।

অতঃপর আমরা দুটি জ্বলন্ত ধূমকেতু,
কক্ষপথ ভেঙে
আছড়ে পড়ি পরস্পরের জীবনে,
ফুটে ওঠে এক নির্জন অগ্নিবৃক্ষ
যার পাতায় ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে
অবদমিত কামনা,
এবং শেকড়ে জমে থাকে আমাদের স্পন্দিত রাত্রির গভীরতম নীরব উত্তাপ।


৩৮.        জামতৈলের নির্জন কুটীরে


কত পথের ধুলো মেখে হেঁটেছি,
বাতাসের কাছে রেখে গেছি দীর্ঘশ্বাস,
শূন্য খেয়াঘাটে রাত কাটিয়েছি
অচেনা তারার সঙ্গে কথাবার্তায়।

কত বন্দর, কত জনপদ,
সবাই যেন ক্ষণিক ছায়া,
সবাই যেন চলে যায় হাতছাড়া হয়ে,
কিন্তু হৃদয়ের সেই একটিমাত্র সুর
কোথাও মিলেনা, কোনো কোলাহলেই না।

তবু খুঁজে গেছি…
শহরের ভিড়ে, নদীর কূলে,
ঝড়ের ভিতর, নীরব দুপুরে,
অন্ধকারে চোখ রেখে
জ্বলে ওঠা কোনো সঙ্গী-আলোর সন্ধানে।

অবশেষে পেলাম,
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে,
এক নির্জন, শ্রান্ত, শান্ত কুটীরে;
বাতাসে ছিলো ধানের গন্ধ,
বারান্দায় শুকাচ্ছিল রোদ্দুরের নীরবতা,
আর তুমি
আমার হারানো সকল পথ
এক ক্ষণে ফিরে এনে
দাঁড়িয়েছিলে দুয়ারের সামনে।

সেদিন বুঝলাম,
যাকে এতকাল খুঁজেছি
সে আসলে কোনো দূরের অলৌকিকতা নয়,
বরং এক নিভৃত ঘরের কোমল আলো,
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক নিঃশব্দ উপস্থিতি,
যার কাছে পৌঁছে গেলে
সব পথের কষ্ট, সব ঘুরে বেড়ানো,
অবশেষে পায় তার অর্থ।


৩৯.       জামতৈলের নির্জন কুটীরে 


কত পথ হেঁটেছি
জলধারায় ভেজা মাটি, পুড়ে যাওয়া দুপুরের তাপ,
রাতের বুকে কালো ঝিঁঝিঁর শব্দ
সবই যেন আমাকে ঠেলে নিয়ে গেছে
কোনো অজ্ঞাত গন্তব্যের দিকে।

কত প্রান্তর
পদচিহ্নহীন, ছায়াহীন,
যেখানে বাতাসও কখনো
আমার নাম উচ্চারণ করেনি;
তবু আমি হেঁটেছি,
কারণ হৃদয়ের ভিতর
একটি অপরূপ আকুলতা
চিরকাল বলেছে
“আরও একটু এগোও…
ওপাশেই কেউ অপেক্ষায় আছে।”

কত বন্দর, কত লোকালয়
মানুষ এসেছে, মানুষ গেছে,
জোয়ার-ভাটা স্রোতের মতো
সব ভালোবাসা এসেছে দূরে মিলিয়ে গেছে।
আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি
অন্তরের গহীন গৃহে
এক আলোর প্রতীক্ষায়।

অন্ধকারেও চোখ রেখে
যাকে খুঁজেছি এতকাল
সে যে কোনো মুখ ছিল না,
সে ছিল এক উচ্চারিত না হওয়া নাম,
এক অচিহ্নিত স্পর্শ,
এক অদেখা অথচ অনুভূত সঙ্গ।

অবশেষে পেলাম
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে
এক নির্জন শ্রান্ত শান্ত কুটীরে।

সেদিন সন্ধ্যা নেমেছিল ধীরে,
কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরেছিল কাশফুলের ডগা,
রেললাইনে জমে ছিল বহুদিনের বেদনা
তার মধ্যেই তুমি এসে দাঁড়ালে
দু’হাত ভরে অথচ নিস্তব্ধ আলো হয়ে।

তোমার চোখে তখন
দুপুরের ধানক্ষেতের মতো শান্ত সবুজ,
শ্বাসে ছিলো নদীর স্নিগ্ধ সুর,
কণ্ঠে ছিলো অব্যক্ত অথচ পূর্ণ কোনো ডাক।

তোমাকে দেখে মনে হল
এই তো সেই,
এই তো সেই দীর্ঘ খোঁজা আশ্রয়,
এই তো সেই ছায়া
যার কাছে পথ-ফুরানো ক্লান্তি
ফিরে পায় নতুন অর্থ।

জামতৈলের সেই কুটিরে
আমরা বসেছিলাম পাশাপাশি
বাতাসে উড়ে যাচ্ছিল
পৃথিবীর সব ব্যর্থ যাত্রার গল্প,
আর আমাদের নীরবতার ভিতর
দু’টি হৃদয় ধীরে ধীরে
এক নদী হয়ে মিলেছিল।

তখন বুঝলাম
এতদিন যে সকল পথ, সকল প্রান্তর,
সব লুকানো কান্না, সব একাকীত্ব,
সবকিছুই আমাকে নিয়ে এসেছে
এই অল্প আলোয় ভেজা
তোমার ছোট্ট ঘরটিতে।

আর তুমি
দূরের কোনো স্বপ্ন নও,
তুমি এ পৃথিবীরই এক নিভৃত আশ্রয়,
যেখানে গেলে ক্লান্ত পথিকরা
নিজেদের হারিয়ে না ফেলে
বরং খুঁজে পায়
তাদের সত্যিকার ঘর।


৪০.       গতস্য শোচনা নাস্তি


জীবনের কত হাস্নাহেনা-সুরভি
নিভে গেছে গ্লানির গাঢ় অন্ধকারে,
কত রাত্রি, কত প্রভাত
ভেসে গেছে অশ্রুজলের অচেনা স্রোতে—
তবু সময় বলে যায় নরম স্বরে,
গতস্য শোচনা নাস্তি
যা গেছে, তার আর ফেরবার পথ নেই।

যে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে নিঃশব্দে,
তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদার কোনো মানে নেই,
কারণ আলোর মতোই ভবিষ্যৎ আসে
নিজের তাল, নিজের দোলা নিয়ে।
ঝরে যাওয়া ফুলের গন্ধও
শ্যামল মাটিতে মিশে নতুন জন্ম ডাকে
জীবন বড় বিচিত্র পুনর্জন্মের কারিগর।

তাই আজও, ক্লান্ত বুকের গভীরে
একটি শান্ত শ্বাস ভাসে
যত ক্ষত, যত হারানো সুরভি,
সবকিছু পেরিয়েও সময়ের নদী বয়ে যায়,
আর আমরা শিখি,
যা ছিল, তা ছিলই
কিন্তু যা আসছে,
তা-ই আমাদের সত্য, আমাদের ভোর।

গতস্য শোচনা নাস্তি
তবু এগিয়ে চলাই জীবনের প্রথম ধর্ম।


৪১.        প্রথম অনুভবের পথে

হাত ছুঁয়ে দেখলাম
রেখাগুলো আজও ফিসফিসিয়ে বলে পুরনো কোনো গান,
যেন সময়ের মুঠোয় আটকে থাকা
এক টুকরো চিরসবুজ স্মৃতি।

তোমার চোখের তারায়
এখনো জ্বলে ওঠে প্রথম দেখার বিস্ময়—
ঝলমলে, দীপ্ত, অচেনা আলোর মতো
যা আমাকে টেনে নিয়ে যায় নীরবতার গভীরে।

ঠোঁটের পৃষ্ঠে কাঁপন,
বুকের নিচে উতল ভালোবাসা
সবই যেন ফিরে আসে নবজন্মের ছায়াপথে,
ইচ্ছাগুলোও মায়াবদ্ধ,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
তারারা নেমে আসে ভোরের দিগন্তে।

চলো তবে,
অনাগতের পথে হাঁটতে থাকি
সেই প্রথম অনুভবের মতো,
যেখানে দু’জনার চাওয়া-পাওয়া
আলোর রেখায় বাঁধা হয়ে
নতুন ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকে।


৪২.    তুমি ভোরের চাঁপাফুল 


 তুমি ভোরের চাঁপা ফুল আর জুঁই,এত মধুর সুবাস আমি কোথায় থুই,হৃদয়ের গোপন কোষে রাখি তুলে, নিঃশব্দ ভোরের শিশিরভেজা দুলে দুলে।

তুমি দিতে চাও না কিছুই, আমি জানি,
তবু তোমার ছায়া এসে ছুঁয়ে যায় প্রাণই;
অদৃশ্য স্রোতে ভাসাও হৃদয়গীত,
স্পর্শ না ছুঁয়েও তুমি দাও উষ্ণ নীতি।

নির্বিকার থাক, সে আমি নিঃশব্দে বুঝি,
তবুও তোমার মাঝেই নিমগ্নতা খুঁজি;
তোমার মুখের লাজুক আলোর রেখা,
চোখের কোণে যেন কোন্‌ অতল দেখা।

তুমি দূরে দাঁড়ালেও কেমন এক টান,
শিউলি ভেজা বাতাসে দোলে তোমার গান;
অচেনা স্বপ্নেরা জপে তোমার নাম,
নীরব আকাশে জ্বলে প্রেমেরই চাঁদ-ধাম।

তাই বলি
তুমি থাকো, থাকো শুধু এই মায়ার মতন,
আমি তোমারই পথে ছড়িয়ে রাখব মন;
তোমার সুবাসে চলুক জীবনের ধারা,
ভোরের চাঁপাজুঁই তুমি আমার সৌরভসারা।


৪৩.        জলকাব্য 


কোন্ অচেনা মেঘের ছায়া থেকে
হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আমি জানি না
রবিকিরণ পেরিয়ে যাওয়া আলোও
আমার চোখে ধরা দেয় না কখনো।

রাতের আকাশে তারাদের দীপ্তি
সূর্যের বেপথু কিরণে
লুকিয়ে পড়ে নিঃশব্দে
ঠিক তেমনই লুকিয়ে থাকে
আমার অনুচ্চারিত প্রণয়ের ভাষা।

কখনও হঠাৎ মন আমার
বৈরাগীর মতো নির্জন হয়,
অপ্রকাশিত শিহরণের ঢেউ
অদেখা মেঘ থেকে ঝরে পড়ে
জলের মতো কোনো নদীর বুকে।

সেই নদীও হঠাৎই বিহ্বল হয়ে
আকুল স্রোতে ছুটে যায় সাগরপানে,
মেঘ তখন পরাজিত,
রবিকিরণ তরঙ্গের কোলঘেঁষে
উথলে ওঠে নূতন আলোয়।

শেষে সব জলবিন্দু
নদীর আবক্ষ গহ্বরে মিলিয়ে যায়
নিশ্চুপ, নিঃশেষ,
তবু চিরন্তন সঙ্গমের
অমলিন সুর ছড়িয়ে রেখে।


৪৪.      নিঃশব্দ পদচিহ্ন 


কাল সারারাত ছিল তারা-ভরা রাত,
আকাশ জেগে ছিল জেগে ছিল শুধু নিস্তব্ধতার বাতি।
চাঁদের গায়ে জমেছিল শীতল নীলের আবেশ,
তবু আমার চোখের উপকূলে
কেউ এসে রাখেনি স্বপ্নের হালকা স্পর্শ।

নির্জনতা যেন নিঃশব্দ পদচিহ্ন ফেলে
বসে ছিল আমার মাথার কাছে,
ঘুম আসেনি এসেছে শুধু ক্লান্তির নরম কুয়াশা।
দূরের তারা এক এক করে ডেকেছে,
বলেছে “দেখো, এ রাতও কারো জন্য জ্বলে!”
কিন্তু আমার জানালায়
কেউ খোলেনি গল্পের দরজা।

হায়, এ নির্ঘুম রাতও হলো ব্যর্থ,
স্বপ্নরাণী কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি?
কার আকাশে নক্ষত্র ছুঁতে গেলে
আমার চোখ রেখে গেলে শূন্য?

আজও ভোর হবে, আলো উঠবে ধীরে,
তবু জমে থাকা সেই আক্ষেপ
মুছে যাবে কিনা জানি না।
তোমার একটুখানি উপস্থিতি
হলে রাত জেগে থাকা কত সহজ হতো,
আর স্বপ্নহীন ঘুমগুলো
হতো তোমারই নামে লেখা একেকটি কবিতা।


৪৫.       অচেনা পদচিহ্নর মায়া 


শত বছর পরে,
নিশীথের বৃষ্টিভেজা ঘ্রাণে
জেগে উঠবে অচেনা কোনো ঝোপ,
মাটির ফোঁড়া কাটা লুকোনো কোনে
ঝিঁঝি পোকা ডাকবে নীরবতার বুক চিরে।

বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষা আঁধারে
বনমৌরির সুগন্ধ উড়ে বেড়াবে
পুরোনো কোনো গান হয়ে,
জোনাকিদের চোখে উঠবে
আলো আর আকুলতার দোল।

সেই অগোচর রাতে,
আমি ফিরে আসব অতি ক্ষুদ্র সত্তা হয়ে,
নিভৃতে ভেসে উঠব জোনাকির আঁচলে,
কিংবা ঝিঁঝি পোকার কম্পিত ডানায়।
কারো চেনা মুখ থাকবেনা হয়ত,
মাটি শুধু স্মরণ করবে অচেনা পদচিহ্নের মায়া।

তবু এই পৃথিবীতে
ফিরে আসার যে গভীর আকাঙ্ক্ষা
তার কোন নাম নেই,
শুধুই আলো হয়ে, শব্দ হয়ে,
অথবা এক বিন্দু নরম প্রাণ হয়ে
আবার জন্মাতে চাওয়া
এই অনন্ত নীল গ্রহের হৃদয়ে।


৪৬.        বিদায় বীণা 

এই যে রাত্রির বুকের ভেতর
হঠাৎই নিভে গেল তোমার পদধ্বনি
মনে হয়, ঘুমন্ত আকাশ থেকে কেউ
তারাদের গায়ে ছায়া মেখে
তোমাকে খুব ধীরে তুলে নিয়ে গেছে।

কী নিয়তি তবে এভাবে ডাকে?
কোন্ অদৃশ্য তীর্থপথে তুমি
অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে হেঁটে গেলে
আমরা শুধু শুনে রইলাম
তোমার বিষণ্ন শ্বাসের প্রতিধ্বনি।

জীবন-বীণার সুর থেমে গেছে ঠিকই,
তবু তার ছিন্ন তারে আজো
মৃদু কান্নার মতো কোথাও কাঁপে আলো।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদ
হয়তো এখনো তোমার খোঁজে জেগে থাকে।

তুমি যে রেখে গেলে অশ্রুর নীরব মেঘ,
সেই মেঘ ভিজিয়ে রাখে কত অনামা রাত।
আর আমরা, এই ধূলিমাখা পৃথিবীর মানুষ,
তোমার শূন্যতার দিকে তাকিয়ে
নিঃশব্দে উপলব্ধি করি
বিদায় কখনও শেষ নয়,
শুধু আরেক যাত্রার আরম্ভ।


৪৭.      তোমার আমার পৃথিবী 


তুমি নও
তোমার ছায়া পড়ুক আমার প্রাণে,
স্পর্শ নয়
তোমার চেয়ে থাকা তান তুলুক আমার গানে।
এখন একটু দূরেই থাকো—
এই দূরত্বেই জমে উঠুক নীরব কথার ঢেউ,
এই ফাঁকে জমে উঠুক আকুলতার নরম রোদ্দুর।

আবার একদিন বকুলঢাকা বনে হাঁটব দু’জনে,
আবার একদিন
শ্রাবণ আকাশ নীলাদ্রি হবে হৃদস্পন্দনে—
তোমার হাতের উষ্ণতায় খুলে যাবে ভুলে থাকা সব জানালা,
ঝরনার জলে কাঁপবে আমাদের অনুচ্চারিত সময়গুলো।

হয়তো সেদিন
চোখের ভেতর ভেজা আলোয় দেখব
কতদিনের না-বলা ভালোবাসা,
হয়তো সেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে
ফুটে উঠবে আমাদের একসাথে থাকা সুরের কাব্য।

এখন শুধু একটু দূরে থেকো
এই দূরত্বটুকু হোক আমাদের পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি,
যেন ফিরে আসার মুহূর্তে
তোমার আমার পুরো পৃথিবী
একটি চুম্বনের মতো নীরবে জেগে ওঠে।


৪৮.    রহস্যময় রাতের অমৃতসুধা


কোথায় সেই রহস্যময় রাত
যার অন্ধ তারায় জ্বলত আমাদেরই অচেনা নাম,
যার নিঃশ্বাসে ভেসে আসত লুকোনো কোনো পুরনো প্রতিশ্রুতি,
চোখে চোখে লেখা হতো নীরবতার গভীরতম বাণী।

কোথায় সেই হৃদয়–দুয়ার খুলে দেওয়া আশ্চর্য সন্ধ্যা,
যেখানে বাতাসও থমকে দাঁড়াত তোমার পদক্ষেপের শব্দে,
যেখানে ছায়ারা জানত আমাদের গোপন আকুলতা,
আর চাঁদের আলোয় লেপ্টে থাকত অগোচর অভিমান।

কোথায় সেই অনাস্বাদিত মখমলের সমুদ্র জল,
যার ঢেউয়ে কাঁপত শরীরের ভেতর লুকোনো সুর,
যার নোনাজলে ডুবে যেত ভয়, দুঃখ, একাকীত্ব,
শুধু জন্ম নিতো নবপ্রেমের তরঙ্গ ভারী নরম আলোয়।

কোথায় সে দাঁড়িয়ে অমৃত–সুধা পাত্র হাতে,
উল্লাসে, নিবিড় প্রার্থনায়, অধীর চোখে ডাক দিত,
“দাও ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে…”
আর আমরা দু’জন ডুবে যেতাম সেই চিরচেনা অজানায়,
যেখানে সময় থেমে থাকে, ফুলেরা নিশব্দ হয়ে শোনে,
আর আকাশের নীচে জন্ম নেয় অব্যক্ত এক প্রেমের মহারাত্রি।

সেই রাত কি এখনও আছে কোথাও—
নাকি তোমার হৃদয়েই লুকিয়ে রাখা,
নিস্তব্ধ কোনো শিরায় অনন্তের মতো?


৪৯.        স্পর্শের  কবিতা


রাতের জানালায় জ্বলে ওঠে তোমার ছায়া-

সেই ছায়াই আমার সব পাপের জন্মদাতা।

আমরা দু’জনই জানি, এই পথ বৈধ নয়,

তবু অকারণের উষ্ণতা

কেন যেন শরীরের ভেতর

জ্বলে ওঠা মোমবাতির মতো টেনে নেয়।


তোমার গলার হালকা ঢেউ

আমার শ্বাসে এসে লাগে

কানে কানে তুমি ফিসফিস করলে

আমার বুকের ভেতর

ঝড় ওঠে অস্থির বৃষ্টির।

তোমার কাঁধের মোলায়েম ঢাল

আমার আঙুলে এলে কাঁপে,


লাজুক অন্ধকারে

তোমার পিঠের উপত্যকায়

আমার দৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে

গোপন জ্যোৎস্নার মতো।

তোমার ঠোঁট

কোমল নিষিদ্ধ কোনো ফলের মতো,

ছুঁতেই মনে হয়

সারা শরীর উষ্ণ হাওয়া হয়ে উঠছে।

তুমি যখন একটুখানি ঝুঁকে

আমার বুকে হাত রাখো

মনে হয় দাহন জ্বলে উঠে

গোপনে রাখা সব অগ্নিকণা থেকে।


আমাদের মাঝে থাকে না কোনো আইন,

থাকে শুধু  নীরব চুক্তি

তোমার বুকে উঠে-নেমে যাওয়া

অচেনা ঢেউ

আমার হাতের তালুতে

প্রতিবারই নতুন অপরাধ লিখে দেয়।

এই পরকীয়া পাপ নয়,

বরং এমন এক দহন  যা নিভে গেলে

সারা দেহ শীতল হয়ে যায়।

তাই তুমি যখন রাতের গভীরে আমার দিকে আসো

তোমার আলোর মতো দেহ নিয়ে

আমি সমস্ত ভ্রম ভেঙে

তোমাকে আবার স্পর্শ করি

অন্যায় জেনেও, অবশ হয়ে।


৫০.         নিঃশ্বাসে তুমি, প্রশ্বাসে তুমি 


আমি নিঃশ্বাস নেই

তোমার শরীর থেকে ছুঁয়ে আসা উষ্ণ বাতাসে,

যেন ভোরের কুয়াশা গায়ে মেখে

নরম হয়ে ওঠে আমার প্রতিটি কোষ।


আমি প্রশ্বাস রেখে যাব

তোমার নিঃশ্বাসের অনুরণনে—

যেখানে তুমি আছো,

সেখানে ঢেউ তোলে আমার হৃদয়ের নীরব স্পন্দন।


তোমার কণ্ঠের ক্ষীণ কম্পনে

জেগে ওঠে আমার ঘাসফুলের মতো স্বপ্ন,

তোমার আঙুলের অদেখা ছোঁয়ায়

জ্বলে ওঠে শরীরজোড়া অনন্ত জ্বালাময়ী আকুলতা।


আমি তোমার নিশ্বাসে বাঁচি

যেন প্রতিটি শ্বাসই আমাদের দু’জনার

অদৃশ্য কোনো গোপন বাঁধন,

যা ছিন্ন হলেও আবার জুড়ে যায়

ভালোবাসার মায়াবী শব্দহীন স্পর্শে।


তুমি দূরে গেলে

আমি বাতাসে খুঁজি তোমার ফেরা পদধ্বনি,

তুমি পাশে এলে

আমি নিজেকে হারাই তোমার অনামিক স্নিগ্ধ গন্ধে।


হয়তো ভালোবাসা এতটুকুই

এক শ্বাস থেকে আরেক শ্বাসে

দু’জনার অদৃশ্য বিনিময়,

যেখানে আমরা নেই আলাদা

শুধুই হই একে অপরের

চিরন্তন বায়ুর মতো সঙ্গী।