রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

পুণ্য করো, পূর্ণ করো


পুণ্য করো, পূর্ণ করো   ( কাব্যগ্রন্থ ) 


উৎসর্গ  -


১.    এসো তুমি 

এসো, দুটি হাতের বন্ধনে হারিয়ে যাক সকল দূরত্ব। রৌদ্র যদি জ্বালায় পথের ধুলো, আমার ছায়ার তলে তোমার ক্লান্ত বিকেল ঘুমিয়ে থাক।

তোমার চোখের গভীর নীল আমার সমস্ত আকাশ হয়ে উঠুক, আমি সন্ধ্যার শেষ তারাটি কুড়িয়ে তোমার আঁচলে বেঁধে দেব, যেন কোনো অন্ধকার তোমার নাম উচ্চারণ না করে।

যদি কোনো রাতে স্বপ্নেরা পথ ভুলে যায়, আমার হৃদয়ের প্রদীপখানি জ্বেলে রাখব । তুমি শুধু এসে ডেকে দিও একবার, আমি সমস্ত নক্ষত্রের আলো তোমার দুটি চোখে পরিয়ে দেব।

ভালোবাসা তো চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নয়, সে এক অনন্ত অর্ঘ্য, যেখানে একটি চুম্বনের বিনিময়ে সমস্ত জীবন নিঃশেষে দিয়ে দেওয়াও অল্প বলে মনে হয়।


২.      চুম্বনের বিনিময়


চুমু দাও, ঠোঁটের মাঝে রেখে যাই এক মৌনতার বিকেল। তুমি যদি হাত বাড়াও, আমি দু'হাত ভরে তোমার সমস্ত ক্লান্তি তুলে নেব।

এসো, রোদের তীব্রতা থেকে ছায়ার মতো জড়িয়ে রাখি তোমায়, বুকের ভেতর এমন এক বন আছে, যেখানে কোনো দুঃখ পথ খুঁজে পায় না।

তুমি চোখ বুজলেই আমি স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালাব, তারার আলো কুড়িয়ে রাতের আঁচলে বুনে দেব আমাদের প্রেমের গোপন নকশা।

তুমি শুধু একবার ভালোবেসে বলো, আছি। 
আমি সমস্ত অভিমান নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে তোমার কপালে রাখব ভোরের প্রথম চুম্বন।

যতদিন আকাশে চাঁদের পাশে একটি নক্ষত্রও জ্বলে, ততদিন তোমার হাতের উষ্ণতায় আমি লিখে যাব বিরতিহীন প্রেমের কবিতা।


৩.     যদি আর দেখা না হয়


চুম্বন চেয়ো না, ঠোঁটের কাছে আজও অসংখ্য অব্যক্ত বিদায় জমে আছে। তার চেয়ে তোমার হাতখানি এক মুহূর্ত আমার হাতে রাখো, যেন সন্ধ্যার শেষ আলো অন্ধকারে মিশে যাওয়ার আগে একবার পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখে।

যদি রৌদ্র বড়ো কঠিন হয়ে ওঠে, আমার স্মৃতির ছায়ায় একটু বসো। আমি তো আর ফিরব না, তবু বাতাসে ভেসে থাকবে তোমার নাম ধরে ডাকা আমার বিদায়ের সুর।

যে স্বপ্নগুলি তোমার চোখে রেখে যেতে চেয়েছিলাম, তারা আজও রাত্রির আকাশে অচেনা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে। তুমি যখন জানালার পাশে একলা দাঁড়াবে, হয়তো তাদের কোনো একটি তোমার চোখের জলে নেমে আসবে।

ভালোবাসা আমাদের একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল না, ছিল পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে দুই ভিন্ন পথের মোড়ে নিঃশব্দে থেমে যাওয়ার নিয়তি।

তবু যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, কোনো ডাক দিও না। আমি তখন হয়তো তোমারই কোনো পুরোনো বিকেলে, ঝরে-পড়া শিউলির গন্ধে, অথবা মেঘমুখর আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসব।

সেদিন একটি দীর্ঘশ্বাসই যথেষ্ট হবে, তার মধ্যেই রয়ে যাবে আমাদের না-বলা সব চুম্বন, না-ফেরা সব পথ, আর এক জীবনের অব্যক্ত ভালোবাসা।


৪.      দিগ্বধূ

সেথা, ললাটে শশিধর-শুভ্র চন্দন-রেখা দীপে, অরুণ-প্রভাত লাজে যেন লুকায় তাহার রূপে। 
আঁখি- নীল ইন্দীবর-দল, নিবিড় স্বপ্ন-ঘেরা, 
দৃষ্টিপাতে মুগ্ধ হয় বন-হরিণীরও সেরা।

অধরে বন্দী নব-বকুল-রাঙা মধুর হাসি, 
বচনে ঝরে বীণার তানে বসন্ত-পবন ভাসি। 
কপোলে কিঞ্চিৎ কুমকুম-ছায়া, সাঁঝের রাগ, 
তাহারি তরে দিবস ভুলে সন্ধ্যা করে অনুরাগ।

চিকুরে ঘন বর্ষা-যামিনী, তমাল-ছায়া ঢালে, 
কুন্দকলি গন্ধ বিলায় অলক-বিহার-কালে। 
কর্ণে দোলে শিরীষ-মঞ্জরী, মৃদু সমীর-সাথে, 
যেন তারা গোপন কথা কয়  নিশিপাতে।

কণ্ঠে মুক্তা-জ্যোৎস্নার মালা, শুভ্র তরঙ্গ-হারা, 
বাহুদ্বয় শঙ্খলতার ন্যায় সুকোমল স্নিগ্ধধারা। 
কটিতটে কাঞ্চী-কলরব, মঞ্জীরে লয়ের নৃত্য, 
চরণে রাঙা অলক্তক-ছোঁয়া প্রভাত-অরুণ কৃত্য।

তবু নহে কেবল অঙ্গের ঐশ্বর্য, রূপের গৌরব -
হৃদয়ে তাহার করুণাধারা, শান্তি-সুধার উৎসব। 
যেমন পূর্ণিমা আলো বিলায় নীরব আকাশ-মাঝে, তেমনি সে হাসি ছড়ায় সুধা ক্লান্ত জীবনের সাজে।

দেবী কি মানবী—জানি না তাহা, বিস্ময়ে মভরে,
স্বর্গ হতে ভ্রান্ত এক রশ্মি বুঝি নেমেছে ধরণী-পরে। 
যদি কভু মেঘদূত যায় তাহার অলক-পথের ধারে, 
বলিও এক কবি আজিও বসে আছে তাহার
প্রতীক্ষাপারে।


৫.      উদাসী হাওয়া


পাগল হাওয়ায় স্মৃতির পাপড়ি ঝরে -
কে যেন সন্ধ্যার রঙে অচেনা স্বপ্ন ভরে।
শিউলি-গন্ধ ভেসে আসে
হারানো কার আঙিনা থেকে।

চাঁদের আলো কেঁদে মরে
নিভৃত নদীর বুকে -
যে কথাটি বলা হলো না,
বাতাস আজও তা বয়ে ফেরে।

শুকনো পাতার মর্মর-সুরে
বিরহ গোপনে ঘরে ফেরে,
দূর আকাশের নীল বিষাদে
একটি তারা জেগে রয়,
তারই চোখে অশ্রু হয়ে।

যদি কোনোদিন বসন্ত আসে
ভাঙা বনের নির্জনতায়,
ঝরে-পড়া ফুলের গন্ধে
খুঁজে নিও আমায়।

থাকব সাঁঝের শেষ আলোয় ভেসে,
যেমন থাকে শেষের গান
অশ্রুভেজা হৃদয়ের শেষে।


৬.      পূর্বপুরুশের জন্য মায়া


প্রায়ই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি, মনে হয়, এই পৃথিবী 
এত মায়া কোথা থেকে শেখে?
যাদের রক্তে আমার প্রথম ভোর, 
যাদের শ্বাসে একদিন বংশের প্রদীপ জ্বলেছিল, 
তাদের মুখ আমি দেখিনি কখনো। 

কোনো পুরোনো অ্যালবামের পাতায় নয়, 
কোনো বিবর্ণ তৈলচিত্রের ফ্রেমেও নয়,
তবু তারা আসে।

ঘুমের  নদী পেরিয়ে তাদের মুখ ভেসে ওঠে,
চোখ মেলে দেখি - চারদিকে শুধু আলো, 
কিন্তু মুখগুলো আবার সময়ের অন্ধকারে 
মিলিয়ে যায়।

তখন শতবর্ষ আগেকার একটি বিবর্ণ ছবির খোঁজে 
মন হাতড়ায় অদৃশ্য জাদুঘর। 
কিছু ভাঙা রেখা, কিছু মুছে যাওয়া ছায়া, 
কিছু নামহীন চোখের ভাষা - সেগুলো জোড়া দিয়ে আমি একটি মুখ গড়ি, আর সেই মুখে অকারণ আপনজনের হাসি খুঁজে পাই।

হয়তো এ-ই উত্তরাধিকার,  রক্তের চেয়েও গভীর, নামের চেয়েও প্রাচীন, যেখানে অদেখা মানুষও হৃদয়ের আপন হয়ে থাকে।

তারপর হঠাৎ চোখের কোণে জল জমে। 
মনে হয়, অশ্রু বুঝি শুধু দুঃখ নয়, এও এক প্রার্থনা, যেখানে মৃতেরা নিঃশব্দে জীবিতদের কপালে মায়ার হাত রেখে যায়।

আমি সেই স্পর্শেই বেঁচে থাকি -
অদেখা মুখের দিকে চেয়ে, যেন দূর নক্ষত্রের আলো, 
যা আজ এসে পৌঁছেছে, কিন্তু যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক, অনেক আগে।


৭.      বর্ষামঙ্গল


কথা ছিল
মেঘগুরু গম্ভীর এক বর্ষারাতে
আমরা ভাসাব একটি নৌকা,
নদীর বুক বেয়ে চলে যাব
অজানা বৃষ্টির দেশে।

কিন্তু মধ্যরাত্রির নিবিড় প্রহরে
তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে
ক্লান্ত হয়ে পড়ি আমি,
তুমি  মুখ ফিরিয়ে
ধীরে ধীরে মেঘ হয়ে যাও।

তোমার সেই মেঘ হয়ে ওঠা দেখে
আমার সমস্ত আকাশে
এক গভীর বিষাদের ছায়া নামে।

তারপর দেখি
সেই মেঘের অন্তর থেকে
টুপটাপ ঝরে পড়ে বৃষ্টি,
যেন তোমার অব্যক্ত কান্না।

তবু এসো
আষাঢ়ের প্রথম মেঘ হয়ে এসো,
এসো, আমার বর্ষালিপি -
ঝরতে ঝরতে
আমার সমস্ত শুষ্কতা ভিজিয়ে দাও।

এসো,
একটি আনন্দনদী পার হই দুজনে,
বৃষ্টির জলে সাঁতার কেটে
হারিয়ে যাই
অবিরাম বর্ষার অন্তহীন গানে।


৮.     ভেসে যেতে চাই 


সারারাত দুঃস্বপ্নের অন্ধকারে
নামহীন এক বনের ভেতর হেঁটেছি আমি -
ভোর হলে জানালাটি খুলে দেখি,
রক্তিম আকাশের একচিলতে আলো
আমার সমস্ত বিষাদে হাত রেখে বলে -
এখনও সকাল ফুরোয়নি।

যাকে কোনোদিন চাইনি,
নিয়তির অমোঘ হাত ধরে তাকেই গ্রহণ করেছি,
আর যাদের জন্য হৃদয়ের দরজা খুলেছিলাম,
তারা একে একে দূরের দিগন্তে মিশে গেছে।

হতাশা আগুনের মতো -
সে ভেতরের বন জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়,
তবু আমি আগুন হতে চাই না,
চাই বর্ষায় উচ্ছ্বসিত এক নদী হতে,
যে হারিয়েও গান গায়,
ভেঙেও সমুদ্রের দিকে ছুটে চলে।

যতদিন এই পৃথিবীর আদ্র বাতাসে আমার শ্বাস,
ততদিন আমি ভেসে যেতে চাই -
কদমফুলের গন্ধে, বৃষ্টির বিন্দুর মৃদু প্রার্থনায়,
বিনম্র দিগন্তের নীল আঁচল ছুঁয়ে।

যদি আর কিছু না-ও পাই,
তবু এই ভাসমান জীবনটুকুই থাক -
মেঘের কাছে অর্পিত,
বৃষ্টির কাছে ঋণী,
আর ভোরের রক্তিম আকাশের কাছে
চিরকৃতজ্ঞ।


৯.      এখনও আলো নিভে যায়নি


তুমি কি ভোরের প্রথম পাখির ডাক শুনে
ঘুমন্ত মানুষের কপালে একটু আলো রেখে যাও?
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি -
বাতাস এলেই মনে হয়,
তোমারই হাত ছুঁয়ে গেল।

তুমি কি বৃষ্টির দিনে
একটি ভিজে কুকুরছানাকে
নিজের ছাতার নিচে ডেকে নাও?
আমি দূর থেকে দেখি,
পৃথিবী তখন আরও একটু বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

যে বৃদ্ধ মানুষটি
বারবার থেমে থেমে পথের নাম জিজ্ঞেস করেন,
তুমি কি তার পাশে
ধৈর্যের মতো কিছুক্ষণ হাঁটো?
আমি সেই পথের ধুলো হয়ে
তোমাদের পায়ের শব্দ শুনি।

তুমি কি কখনও
নিজের সমস্ত বিশ্বাসেরও আগে
একজন মানুষের কান্নাকে জায়গা দাও?
আমি সেই কান্নার পাশে
একটি শীর্ণা নদীর মতো বসে থাকি।

আর যদি কোনোদিন
আমার দিকে ফিরেও না তাকাও,
তবু জেনো -
আমি তোমার জন্য একটি দরজা খোলা রাখব,
একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখব,
একটি অসমাপ্ত কবিতা রেখে দেব টেবিলের ওপর।

কারণ,
যতদিন কেউ কারও দিকে
এক মুঠো মমতা বাড়িয়ে দেয়,
ততদিন পৃথিবী শেষ হয়ে যায় না।

দেখো -
সন্ধ্যার শেষ পাখিটিও
এখনও আকাশ ছেড়ে যেতে চায় না।


১০.     যতবার আলো জ্বালাতে চাই


ঘুমের ভেতরে, নির্ঘুমেরও গভীরে আমি যে স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালাই, শেষ রাতের বাতাস এসে 
এক এক করে নিভিয়ে দেয় সব।

ভোরের আগে সবচেয়ে অন্ধকার যে মুহূর্ত, 
সেইখানেই দেখি - আমার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা কালো পাখি হয়ে অচেনা আকাশে উড়ে যাচ্ছে।

কেন এমন হয়? কেন আশাগুলো ফুল হয়ে 
ফোটার আগেই ঝরে পড়ে?
কেনই বা জীবন পেয়েছিলাম, যদি প্রতিটি প্রাপ্তির অন্তরালে একটি দীর্ঘ বিচ্ছেদ অপেক্ষা করে থাকে?

আর তুমি - কেন এসেছিলে? কোন্ নক্ষত্রের ভুলে আমার নিঃসঙ্গ আকাশে এক মুহূর্তের জন্য আলো হয়ে উঠেছিলে? যদি শেষ পর্যন্ত তোমাকেই অন্ধকারের কাছে ফিরে যেতে হতো!

'যতবার আলো জ্বালাতে চাই, নিভে যায় বারে বারে। আমার জীবনে তোমার আসন আজও গভীর অন্ধকারে।'

সেই অন্ধকারে আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি না- শুধু শুনি, কোনো একটি নদী আমার বুকের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

হয়তো কোনোদিন এই জীবন ফুরিয়ে যাবে 
শেষ প্রদীপের শেষ শিখার মতো, 
তবু তার আগে, একবার যদি তুমি ফিরে এসে 
আমার সমস্ত অন্ধকারের পাশে বসে থাকতে- 
তবে আমি আর আলো চাইতাম না, 
তোমার ভালোবাসাই চিরদিনের ভোর বলে মানতাম।


১১.     যখন সব পথ ফুরিয়ে যায়


যখন আমার সমস্ত পথ
একটি বন্ধ দরজার কাছে এসে থেমে যায়,
আর ফিরে তাকালে দেখি -
পায়ের দাগগুলোও বৃষ্টি মুছে দিয়েছে,
তখন তুমি এসো।

কোনো বিজয়ী প্রভাত হয়ে নয় 
একটি প্রদীপের শিখা হয়ে, যে অন্ধকারের সঙ্গে লড়ে না, শুধু পাশে থাকে।

যখন
বুকের ভেতর প্রার্থনার ভাষাও শুকিয়ে যায়,
ঠোঁট নড়ে, কিন্তু কোনো নাম উচ্চারিত হয় না,
তখন তুমি আমার অকথিত আর্তনাদ নিজের মতো করে শুনে নিও।

যখন একের পর এক প্রিয় মুখ মেঘের ওপারে 
মিলিয়ে যায়,
আর স্মৃতিগুলো শীতের শুকনো পাতার মতো 
ঝরে পড়ে,
তখন তুমি কোনো অলৌকিক মিলনের প্রতিশ্রুতি দিও না --
শুধু এই অসহনীয় শূন্যতার মধ্যে তোমার করুণার একফোঁটা উষ্ণতা রেখো।

যখন আমি আর কিছুই চাইতে পারি না,
চাওয়ার শক্তিটুকুও ক্ষয় হয়ে যায়,
তখন তুমি আমার হয়ে আমাকেই বয়ে নিয়ো -
যেমন নিস্তব্ধ নদী রাতের আকাশকে কোনো শব্দ না করে বয়ে নিয়ে যায়।

আর যদি একদিন
আমার সমস্ত আলো নিভে যায়,
সব গান থেমে যায়,
সব অপেক্ষা শেষ হয়ে যায়,
তবু তুমি দূরে দাঁড়িয়ে থেকো না -
আমার এই নিঃস্ব অন্ধকারের ভেতরেই অদৃশ্য হয়ে মিশে থেকো।

ভাবব, 
কোথাও এক অনন্ত করুণা নিঃশব্দে আমার ভাঙা হৃদয়ের পাশে বসে আছে।


১২.      সাগরের পারে, পাহাড়ের ঢালে


সাগরের পারে, পাহাড়ের ঢালে
একটি ঘর তুলতে চাই,
যেখানে বিকেলের শেষ আলো
শঙ্খের মতো চুপচাপ বসে থাকবে।

চারদিকে শুধু নীলের বিস্ময়,
নীচে অনন্ত সমুদ্র, উপরে পাহাড় -
মাঝখানে আমাদের ছোট্ট ঘর,
যেন পৃথিবীর বুক থেকে ছিটকে পড়া
একটি ভুলে যাওয়া স্বপ্ন।

রাত নামলে
ঢেউ এসে দরজায় কড়া নাড়বে,
বাতাস চুপিচুপি
তোমার এলোমেলো চুলে
জোছনার গন্ধ মেখে দেবে।

আমি দূরের বাতিঘরের আলো দেখে ভাবব -
সব পথ কি শেষ পর্যন্ত
প্রিয় মানুষের কাছেই ফিরে আসে?

আমাদের উঠোনে একটি কৃষ্ণচূড়া থাকবে,
বৃষ্টির দিনে সে লাল আগুন ঝরাবে,
আর এক কোণে থাকবে
একটি শিউলি গাছ -
ভোরবেলা যার সাদা ফুল কুড়িয়ে
আমি তোমার নাম লিখব সমুদ্রের ভেজা বালিতে।

যদি কোনোদিন তুমি
অভিমানের মেঘ হয়ে দূরে সরে যাও,
তবু এই ঘর ভাঙব না,
বারান্দায় দুটি চেয়ারের একটি
তোমার জন্যই খালি থাকবে। 

একদিন যখন
চুলে রূপালি সন্ধ্যা নেমে আসবে,
আমরা চুপচাপ বসে শুনব -
ঢেউয়ের ভেতর কত শতাব্দীর কান্না,
পাহাড়ের ঘাসে কত অপ্রকাশিত প্রেম,
আর আকাশের নীলের মধ্যে
কত মানুষের অপূর্ণ জীবন ভেসে আছে।


১৩.      পথের উপর পড়ে আছি


যার জন্য পথে পথে ঘুরছি,
তার জন্য আজও পথের উপর পড়ে আছি,
কত বর্ষা এসে
আমার পথে শ্যাওলার রং মেখে চলে গেল,
কত হেমন্ত ঝরিয়ে দিল
শুকনো পাতার মর্মর ইতিহাস -
তবু তোমার পদচিহ্নের দিকে মুখ করে
আমার অপেক্ষা আজও শেষ হলো না।

সন্ধ্যা নামলে
দূরের তারারা আমাকে তোমার নাম ধরে ডাকে -
আমি মনে করি, 
হয়তো এইবার তুমি ফিরবে
কোনো হারিয়ে যাওয়া নদীর ওপার থেকে।

চাঁদের আলোয় দেখি,
পথের ধুলোও আজকাল আমার চেয়ে বেশি একা,
তারা সারারাত তোমার পায়ের শব্দ কুড়িয়ে বেড়ায়,
ভোর হলে শিশির হয়ে
আমার চোখের কোণে ঝরে পড়ে।

যদি কোনোদিন ফিরে আসো,
দেখবে- আমি আর মানুষ নই,
রাস্তার ধারে জন্মানো এক বিষণ্ন বৃক্ষ,
যার পাতায় পাতায়
তোমার না-আসার দীর্ঘশ্বাস ঝুলে আছে।

কিংবা, হয়তো একদিন
পথই আমাকে আপন করে নেবে,
মরে গেলে ধুলো আমাকে ঢেকে রাখবে,
বুনো ঘাস আমার বুকের ভেতর জন্মাবে,
আর পথিকেরা ভাববে -
এখানে কোনো এক মানুষ নয়,
একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা ঘুমিয়ে আছে।


১৪.     সন্ধ্যার সময়


তুমি চলে গেছ -
তারপর থেকে সময়গুলো একটি দীর্ঘ, ধূসর নদীর মতো আমার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়।
আমি তবু বলি - খুব একটা খারাপ লাগে না, 
মানুষ তো শেষ পর্যন্ত সব হারানো নিয়েই 
বেঁচে থাকতে শেখে।

কিন্তু সন্ধ্যা নামলে আমার সমস্ত সাহস  শিশির
ঝরার মতো কেঁপে ওঠে।

আমি একা হাঁটি পরিচিত পথের ধারে -
অলকানন্দার ফুলগুলো ফুটে থাকে, তাদের গায়ে তোমার অনুপস্থিতির গন্ধ।

পশ্চিম আকাশে এক-একটি তারা জ্বলে ওঠে, 
মনে হয়, ওরা বহুদিন ধরে আমার সমস্ত 
গোপন দুঃখ জানে।

তারপর, অকারণে তারা মৃদু হেসে বলে -
দেখো, পৃথিবী এখনও সুন্দর, শুধু যার হাত ধরে তুমি এই সৌন্দর্য দেখেছিলে, সে আর তোমার পাশে নেই।

আমি তখন কোনো উত্তর দিই না -
শুধু হাঁটতে থাকি, আর পথের ধুলোয় আমার ছায়াটাকে দেখে মনে হয় - 
সে-ও যেন আমাকে ছেড়ে আরেকটু দূরে সরে যাচ্ছে।

তুমি চলে গেছ -
আর এই পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর নিঃসঙ্গতার নাম সম্ভবত একটাই - এই সন্ধ্যার সময়।


১৫.     কোনো গল্প নেই


এক বর্ষারাত্রে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম -
দিগন্তজোড়া বৃষ্টির অনন্ত অবতরণ,
দখিনা হাওয়ার কাঁপনে
অন্ধকার যেন তার সমস্ত বিষাদ
পাতায় পাতায় লিখে যাচ্ছিল।

দু'হাত বাড়িয়ে
অঞ্জলি ভরেছিলাম বৃষ্টিজলে,
হঠাৎ বুকের গভীরে
কে যেন নিঃশব্দে রেখে গেল
এক অনন্ত ব্যথার শঙ্খধ্বনি।

মনে পড়ল -
একদিন একটি গল্প লিখব ভেবেছিলাম -
যার জীবন নিয়ে সেই গল্প,
সে চায়নি কেউ জানুক তার কথা,
সে চেয়েছিল সমস্ত উচ্চারণ
নিজের বুকের অতল অন্ধকারে
পাথরের মতো ডুবে থাক।

তবু কথা কি লুকিয়ে থাকে?
আকাশের তারারা জেনে গিয়েছিল,
দখিনা বাতাস শুনেছিল তার দীর্ঘশ্বাস;
পাড়ভাঙা নদী
তার জলরেখায় বহন করেছিল সেই কান্না,
আর জোছনায় বিমুগ্ধ রাত্রি
নিভৃতে পড়েছিল তার অদৃশ্য দিনলিপি।

আমি তখনও অঞ্জলিতে জল ভরছিলাম,
আর মনে হচ্ছিল -
সব গল্পই বুঝি শেষে বৃষ্টির জলে ধুয়ে যায়।

দিনশেষে ফিরে এসে যার সঙ্গে দুটি কথা বলি,
তার মুখের স্নিগ্ধ আলোয়
ক্লান্তিরা একে একে
অরণ্যের পাখির মতো বাসায় ফেরে।

তার চোখে আমি খুঁজে পাই অফুরান শান্তি,
সে-ই আমার একমাত্র আশ্রয় -
যেমন কূলহারা নাবিক হঠাৎ দূরে দেখে
এক টুকরো সবুজ তীর।

তাই আজ আর কোনো গল্প নেই -
আমার সমস্ত অপ্রকাশিত বেদনা,
সমস্ত উচ্চারণহীন গান, সমস্ত ভাঙা স্বপ্নের ধূলি
তার কাছেই রেখে দিই -
বনমল্লিকার গন্ধে ভেজা বৃষ্টিস্নাত গভীর রাত্রিতে
তার সঙ্গেই কথা হয় প্রাণের সমস্ত ভাষায়।

যদি কেউ জিজ্ঞেস করে -
তোমার জীবনের গল্প কোথায়?
আমি বলব - গল্প বলে কিছু নেই,
যে মানুষটির কাছে
আমার সমস্ত দুঃখ বেদনা আশ্রয় পেয়েছে,
সে-ই আমার একমাত্র গল্প।


১৬.      জন্মান্তরের দেখা 


কত জন্ম, কত অন্ধকারে, কত বেদনার প্রহর কেটেছে তারপর তোমাকে পেলাম -
যেন বহু শতাব্দী ধরে একটি নামহীন পাখি ভুল আকাশে উড়ে বেড়িয়েছিল, 
ভুল বন, ভুল নদী, ভুল মানুষের মুখে খুঁজেছিল 
নিজের ঠিকানা।

কত শীত নেমেছে অস্থিমজ্জায়, 
কত বর্ষা ভিজিয়েছে নিঃসঙ্গ জানালা, 
কত সন্ধ্যা তারাদের কাছে পরাজয়ের কথা বলে নিঃশব্দে ফিরে এসেছি।

মনে হতো, এই পৃথিবীতে বুঝি আমার জন্য কোনো আলো লেখা নেই - শুধু দীর্ঘ পথ,
আর পায়ের কাছে ঝরে পড়া শুকনো পাতার শব্দ।

তারপর তোমাকে পেলাম -
যেন বহুদিন বন্ধ থাকা একটি ঘরের জানালা খুলে গেল হঠাৎ, ভেতরে ঢুকে পড়ল কচি রোদের গন্ধ, শিউলিফোটা ভোর, দূরের বাঁশির সুর, 
আর নাম না-জানা কোনো ফুলের অলৌকিক সুবাস।

তুমি এলে - আর আমি বুঝলাম, 
সব অপেক্ষাই বৃথা ছিল না, সব কান্না একদিন 
একটি হাসির কাছে আত্মসমর্পণ করার 
জন্যই জন্মায়।

এখনও রাত নামে, এখনও আকাশে মেঘ জমে, 
এখনও পৃথিবী তার পুরোনো বিষাদে ভরে ওঠে- 
তবু আর ভয় পাই না।

অসংখ্য জন্মের অন্ধকার পেরিয়ে 
যে মানুষটিকে একবার পাওয়া যায়, 
সে-ই সমস্ত হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের আলো, 
সমস্ত ক্লান্ত নদীর জল, সমস্ত জীবনের 
সবচেয়ে মায়াময় প্রাপ্তি।


১৭.      প্রথম দেখার জ্যোৎস্না


আমাদের প্রথম দেখার সেই দিনে যে বাঁশিটি দূর অরণ্যের বুক চিরে বেজে উঠেছিল, তার প্রতিটি সুরে ছিল এক অনন্ত আনন্দের আহ্বান। মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত প্রতীক্ষা বুঝি সেই সুরের ভেতর এসে আশ্রয় নিয়েছে।

আমাদের প্রথম প্রণয়ের যে জ্যোতির্ময় আলো নিভৃত হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল, তার দীপ্তি কেবল আমাদের দুজনকে আলোকিত করেনি - সে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল আকাশের নক্ষত্রে, নদীর জলে, গাছের পাতায়, বিশ্বলোকের অনন্ত বিস্ময়ে।

কেতকী বনের শালমঞ্জরী-ছোঁয়া উতল হাওয়ায় সেদিন ময়ূরীরা নৃত্যে মেতেছিল। বনভূমির প্রতিটি লতা, প্রতিটি পাখি, প্রতিটি বাতাস যেন আমাদের মিলনের সংবাদ গোপনে গেয়ে বেড়াচ্ছিল।

তারপর আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম নির্জন বনতলে- মর্মরমুখর এক জোছনা-রাত্রির বিহ্বলতায়। চাঁদের রূপালি আলোয় তোমার চোখের গভীরে আমি আমার সমস্ত জন্মের পরিচয় খুঁজে পেয়েছিলাম, আর তোমার হাতের উষ্ণতায় পৃথিবীর সমস্ত নিঃসঙ্গতা গলে গিয়েছিল।

সেই রাতের পর আমরা হাত রেখে হাতে পৃথিবীর শঙ্কুল, ধূলিমাখা, সুখ-দুঃখে জড়ানো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছেছিলাম এই মায়ার সংসারে।

কখনও গভীর নিশীথে দূরে কোনো অচেনা বাঁশি বেজে উঠলে মনে হয়, প্রথম দেখা কখনও ফুরিয়ে যায় না, সে আজও শালবনের পাতায় পাতায় দোলে, জোছনার আলোয় জেগে থাকে, আর আমাদের ভালোবাসাকে অনন্তের দিকে ডেকে নিয়ে যায়।


১৮.      নির্জন পরশমণি


ধূসর মেঘের সঙ্গে হাওয়ার রাত
অলৌকিক জলে ভিজে তুমি আজ
আরও নিবিড়, আরও মেদুর।

এসো,
তোমার অগণন চুম্বনের গোপন আলো
আমার ঠোঁটে, কপালে,  রেখে যাও।
এই রাতে কোনো বিষাদ রেখো না,
রেখো না কোনো অভিমান।

আজ শ্রাবণের মেঘে মিশে আছে
অনন্ত মদিরা,
এই রাতের কোনো ভোর নেই,
শুধু দীর্ঘতর হয় স্পর্শের জ্যোৎস্না।

ধীরে ধীরে খুলে দাও
তোমার প্রস্ফুটিত অস্তিত্বের সব গোপন পাপড়ি,
একান্ত ঐশ্বর্য,
সযত্নে লুকিয়ে রাখা সুগন্ধ,
আমার দুহাতের উপাসনায় অর্পণ করো।

নির্জন পরশমণির মতো
আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে জাগিয়ে দাও,
যেন প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয় নতুন নক্ষত্র,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আরও গভীর হয় আমাদের আদিম আকর্ষণ।

আজ দেহের ভেতর দিয়ে
আত্মাও কথা বলুক,
আজ সমস্ত দূরত্ব বিলীন হোক
বৃষ্টি, বাতাস আর অন্ধকারের স্নিগ্ধ আচ্ছাদনে।

আমাদের কোনো অপূর্ণকাল নেই,
শুধু অনিঃশেষ সমর্পণ,
শুধু একে অপরের দিকে অবিরাম ঝুঁকে থাকা
দুই অনন্ত ঋতুর মায়াময় মিলন।


১৯.      প্রসন্ন মুখের সেই তুমি


হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু বিকেল নামে, যখন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ দূরের কোনো মেঘে হারিয়ে যায়। আমি চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি। মনে হয়, বুকের ভেতর একটি নির্জন নদী ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।

তখন একে একে ফিরে আসে কত হারিয়ে যাওয়া মুখ, কত অসমাপ্ত কথা, কতদিন আগের একটুখানি হাসি। তারা কেউ কিছু বলে না, শুধু এসে বসে থাকে আমার নিঃসঙ্গতার পাশে।

নিজেকে বড় বিপন্ন লাগে।

টেবিলের ওপর রাখা ধর্মগ্রন্থটি দুই হাতে তুলে নিই। অক্ষরগুলো যেন এক এক ফোঁটা নির্মল জল হয়ে অন্তরের দগ্ধ ভূমিতে ঝরে পড়ে।

পড়তে পড়তে কখন যে ঘুম এসে আমার সমস্ত বিষাদ ঢেকে দেয়, তা আর মনে থাকে না।

হঠাৎ, কার যেন পায়ের মৃদু শব্দ।

ঘুম ভেঙে দেখি, চিরদিনের সেই প্রসন্ন মুখ নিয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছো।

আমার বুকের ওপর রাখা ধর্মগ্রন্থটি অত্যন্ত যত্নে টেবিলের ওপর রেখে দিলে।

তারপর তুমি আমাকে বুকে টেনে নিলে।

সেই আলিঙ্গনে সমস্ত মনখারাপ শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ল।
মনে হলো, প্রেমও এক প্রার্থনা, প্রার্থনাও এক গভীর আলিঙ্গন।

আর তুমি -

অনন্ত করুণার মতো, ভোরের প্রথম আলোর মতো, ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো আমার সমস্ত অন্ধকারের ভেতর চিরকাল প্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছো।


২১.      পুণ্য করো, পূর্ণ করো 


আমাকে তুমি পুণ্য করো, আমাকে তুমি পূর্ণ করো -
আমার রক্তে যে প্রাচীন বিষণ্নতা শত জন্ম ধরে শেকড় গেড়ে আছে, তাকে তুমি শিশিরে ভিজিয়ে দিও, সে যেন একদিন নামহীন ফুল হয়ে ফোটে।

আমার সকল অপূর্ণতা জমে আছে ভাঙা ঘাটের পাশে সবুজ শেওলার মতো, তুমি একবার জোয়ার হয়ে এসো, আমি ধীরে ধীরে ডুবে যেতে চাই তোমার পবিত্র  জলে।

আমার কণ্ঠে আর কোনো ভাষা নেই, শুধু বাতাসে ভেসে যাওয়া একটি অসমাপ্ত বাঁশির সুর। তুমি তাকে স্পর্শ করো, সে যেন কান্না না হয়ে সন্ধ্যাতারার আলো হয়ে ঝরে।

আমাকে এমন শূন্য করো, যাতে শূন্যতারও একটি পবিত্র অর্থ জন্মায়। আমাকে এমন পূর্ণ করো, যাতে সমস্ত প্রাপ্তি নিঃশব্দে ঝরে পড়ে একটি বেলপাতার ওপর শেষ বৃষ্টিবিন্দুর মতো।

যদি আর কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছাতে না-ও পারি, তবু আমার প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া পথ তোমার দিকেই বাঁক নিক।

আমাকে তুমি পুণ্য করো, যেন ক্ষয়ও একদিন করুণার অন্য নাম হয়ে ওঠে।
আমাকে তুমি পূর্ণ করো, যেন আমার সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত বিদায়, সমস্ত নিঃসঙ্গতা শেষ পর্যন্ত তোমারই অনন্ত নীরবতায় আশ্রয় পায়।


২২.     ছুটি


কে কাকে ছুটি দেবে 
ছুটি কি কখনও মানুষের হাতে থাকে?
আজান শুনেই ভেঙে গেল ঘুম,
প্রার্থনায় বসতেই
সমস্ত পৃথিবীর জল এসে জমল দুই চোখে।

মনে হলো,
কিছুদিন নিজেকেই নিজের কাছ থেকে সরিয়ে রাখি-
নামহীন কোনো নির্জনতায়,
যেখানে কেউ আমাকে খুঁজবে না।

হঠাৎ মনে পড়ে -
সেই ছোটবেলার মাঠ,
কানামাছি, ডাংগুলি, গোল্লাছুট।
সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে এলে
যে শিশুটি দৌড়ে বাড়ি ফিরত,
সে কি এখনও কোথাও আমার ভেতরে লুকিয়ে আছে?

আমি তাই একটু আড়ালে যাই -
অভিমান করে নয়,
শুধু ক্লান্ত আলোর মতো
অস্তরাগে মিশে থাকার জন্য।

তবু জানি, ফিরে আসব -
মাঝে মাঝে এই পরিচিত আঙিনায়,
হয়তো বাতাসের ছদ্মবেশে,
হয়তো ভোরের প্রথম পাখির ডানায় ভর করে।

আর যদি কেউ প্রশ্ন করে - 
কোথায় চলে গেলে তুমি? আমি শুধু রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা পঙ্‌ক্তিটুকুর মতো উত্তর দেবো -
'তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।'


২৩.      পথের দিকে চেয়ে আছি


হঠাৎ একদিন
মন অকারণে অস্থির হয়ে ওঠে।

আমি অনেক দূর পর্যন্ত তাকাই -
যেখানে সমান্তরাল পথ
দিগন্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে
নিজের নামটুকুও ভুলে যায়।

কোথাও কোনো ছায়া নেই।
কোনো পরিচিত পদধ্বনি নেই।
শুধু বাতাসের ভিতর
একটি অদৃশ্য বিদায়ের দীর্ঘশ্বাস।

মনে হয়,
এই তো সেদিনই শুরু হয়েছিল সব।

একটি স্বপ্ন,
একটি হাতের উষ্ণতা,
একটি অনন্ত বলে বিশ্বাস করা পথ।

শুরু হতে না হতেই
পথের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়াল জীবন।

যা কিছু আনন্দ ছিল,
সময়ের নদী সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

শুধু পড়ে আছে
কিছু অপূর্ণ বিকেল,
কিছু না-বলা কথা,
কিছু অপ্রাপ্তির ধুলো -
পথের ওপর।

আমি এখনও পথপানে চেয়ে আছি।

আমার দৃষ্টি যেখানে থেমে যায়,
অপেক্ষা তারও বহুদূর পর্যন্ত হেঁটে যায়।

তারও ওপারে
এক গভীর শূন্যতা
নির্জন পাখির মতো
অন্তরের আকাশে ডানা ঝাপটায়।

তখন আমি
অন্তর্যামীকে স্মরণ করি।
তাঁর নীরবতার কাছে রেখে দিই
আমার সমস্ত প্রশ্ন।

তবু মেনে নিতে পারি না -
জীবন এত দ্রুত ফুরিয়ে যায় কেন।

এত গল্প ছিল,
এত আলো ছিল,
এত ডাক ছিল -
সবই যেন অসমাপ্ত থেকে গেল।

এখন
কেউ আর কোথাও নেই।

না জীবনের ভেতরে,
না সেই বহুদূরের পথে।

তবু আমি পথের দিকেই চেয়ে থাকি।

হয়তো কোনোদিন
ফিরে আসবে না কেউ।

তবু এই অপেক্ষার মধ্যেই
এক অনন্ত প্রার্থনা জেগে থাকে।

আর আমি নিঃশব্দে বলি -
'আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ'।


২৪.       অনন্তের দিকে


যখন সমস্ত নদী নিজের উৎস ভুলে যায়,
আর তৃষ্ণার বালুচরে
পদচিহ্নও ধুলো হয়ে উড়ে যায় -
যখন চারদিকে
অহংকারের লৌহদ্বার বন্ধ হয়ে যায়,
মানুষ নিজেরই ছায়াকে
ঈশ্বর ভেবে বসে থাকে,
তখন তুমি
এক মুঠো ভোরের আলো নিয়ে এসো।

যখন আমার সমস্ত শব্দ
নিজের কাছেই অপরিচিত লাগে,
প্রার্থনার ভাষাও
ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যায়,
তখন তুমি শ্বাসের ভেতর গোপনে
একটি অনন্ত প্রদীপ জ্বেলে রেখো।

যখন বাসনারা
ধূমকেতুর মতো আকাশ পুড়িয়ে দেয়,
আর চোখে জমে থাকে
অগণিত মরীচিকার ধুলো,
তখন তুমি অন্তরের গভীরতম অরণ্যে
একটি নির্মল নদী খুলে দিও।

শেষ বিকেলের নিভে আসা আলোয়
যদি দেখি আমার দুটি হাতই শূন্য,
তবু শূন্যতাকে ভয় দিও না,
সবটুকু সমর্পণ দিয়ে পূর্ণতা হয়ে তুমি এসো।


২৫.     আজ সেই সাত তারিখ


আজ সাত তারিখ।

আমার জীবনের যত প্রথম, সবই ছিল বাবা'র হাত ধরে।

প্রথম ঈদের সকাল - সাদা টুপির ভেতর শিশুমুখ, নামাজের মাঠে ভিড়ের মধ্যে আমার ছোট্ট হাতটি শক্ত করে ধরে ছিলেন তিনি।

প্রথম স্কুল, প্রথম বর্ণমালা, প্রথম পথ চিনে নেওয়া।

প্রথম নানা বাড়ি, চৈত্রের ছোনগাছার মেলা, গারোদহ নদীর নৌকা বাইচ, ধনিদহ বিলের জলে মাছ ধরা দেখার বিস্ময় - সব পথেই সামনে ছিলেন বাবা, আমি শুধু তাঁর হাতের উষ্ণতা ধরে পৃথিবীটাকে চিনে নিতে শিখেছিলাম।

প্রথম সিরাজগঞ্জ শহর, প্রথম ঢাকা - কত অচেনা পথ, কত বিস্ময়ের দরজা খুলেছিল একটি পরিচিত হাতের ভরসায়।

তারপর একদিন -

জুলাইয়ের ছিল সাত তারিখ।

বাবা নিঃশব্দে আমার হাত ছেড়ে দিলেন। আমি তখনও বুঝিনি, কিছু হাত একবার ছেড়ে গেলে আর কোনোদিন ফিরে আসে না।

আজও যখন কোনো নতুন পথে হাঁটি, অবচেতনে হাত বাড়িয়ে দিই। হঠাৎ মনে হয় - পাশে কেউ নেই।

শুধু আকাশের খুব দূরে, অদৃশ্য এক স্নেহের স্পর্শ এখনও যেন বলে - "ভয় পেয়ো না , আমি আছি।

কিন্তু পৃথিবীর সব পথ পেরিয়েও আমি জানি, আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টি চিরদিনের জন্য থেমে আছে -

১৯৮২ সালের জুলাই মাসের সেই সাত তারিখে।


২৬.      তুমি যদি রহিতে কাছে 


বাতাসের গায়ে ভালোবাসা খুঁজি,
বৃষ্টির গায়ে অনন্ত জল;
সারাদিন তোমার পথের দিকে চেয়ে
আমার দুটি আঁখি হয় টলমল।

দুঃখ যদি আসে, আসুক দুজনারই কাঁধে,
গ্লানিরা যদি আসে, আসুক একই আকাশ হতে,
তুমি শুধু হাতটি রেখো আমার হাতে
সব অন্ধকার পার হয়ে যাব প্রার্থনাতে।

এই এক জীবনের ক্ষণিক আলোকধারায়,
আর কিছু চাই না নিয়তির কাছে --
শুধু তুমি, সমস্ত ঋতুর শেষে,
আমারই থেকো, আমারই হৃদয়ের কাছে।


২৭.      প্রেমে কিছু নেই


প্রেমে কিছু নেই, আছে শুধু দীর্ঘশ্বাস -
তবু সেই দীর্ঘশ্বাসেই
হৃদয়ের মন্দিরে জ্বলে থাকে
অমল এক প্রদীপ।

তুমি এলে না -
তবু তোমার না-আসার পথেই
প্রতিদিন ফুল ঝরে,
প্রতিদিন অকারণে বকুলের গন্ধে
আমার সমস্ত আকাশ ভরে ওঠে।

যে বাণী অধরে রইল,
সে-ই আজ অনন্তের গান হয়ে
নিভৃত সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসে।

যে স্পর্শ কোনোদিন পেলুম না,
সে-ই আমার দুই হাত জুড়ে
অদৃশ্য আশীর্বাদের মতো বিরাজ করে।

হয়তো মিলন ক্ষণিক,
বিরহই চিরন্তন -
তাই তো বিদায়ের অশ্রুজলে
প্রেম তার পূর্ণ আরতি জ্বালায়।

হে দূরের আপন,
তোমায় চেয়ে চেয়ে আমার সকল প্রার্থনা
আলো হয়ে আকাশে মিশে যায়।

তোমায় পাওয়ার আর কোনো সাধ নেই -
শুধু এইটুকু কামনা,
আমার সকল দুঃখ তোমার পথের ধূলি হয়ে থাকুক,
আমার সকল গান
তোমার চরণে নিবেদন হয়ে ঝরে পড়ুক।

প্রেমে কিছু নেই, আছে শুধু দীর্ঘশ্বাস -
আর সেই দীর্ঘশ্বাসের অন্তরালে
অসীমের অমৃতস্পর্শ,
যেখানে হারানোই প্রাপ্তি,
আর অশ্রুই হয়ে ওঠে
আত্মার শ্রেষ্ঠ আরাধনা।


২৮.      অনন্ত যাত্রার সূচনা 


আজ আর কোনো প্রার্থনা আনিনি -
এনেছি শুধু যুগযুগান্তরের ক্লান্ত নীরবতা,
অসংখ্য জন্মের অব্যক্ত কান্না,
আর এক মুঠো ধূলি,
যাকে এতদিন আমার জীবন বলে জেনেছিলাম।

তোমার অনন্ত আকাশের নিচে
আমার সমস্ত অহংকার
শুকনো বকুলের পাপড়ির মতো ঝরে পড়ুক,
আমার সকল অর্জন
সন্ধ্যার আরতির ধোঁয়ার মতো
নামহীন বাতাসে বিলীন হয়ে যাক।

তুমি যে শূন্যতা দাও,
তারও গভীরে শুনি এক অদৃশ্য পূর্ণতার বীণা।
তুমি যে বিরহ দাও,
তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে
গোপনে জেগে ওঠে তোমার চরণধ্বনি।

আমাকে আর সুখ দিও না -
যদি সে আমাকে তোমার থেকে দূরে নিয়ে যায়।
আমাকে দুঃখও দিও না -
যদি সে আমার অন্তরকে কঠিন করে তোলে।

আমাকে শুধু এমন এক নীরবতা দাও,
যেখানে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস
তোমারই নাম হয়ে ঝরে।
যেদিন আমার শেষ প্রদীপ নিভে যাবে,
সেদিন যেন কোনো ভয় না থাকে -
শুধু মনে হয়,
দীর্ঘ পথের শেষে
এক চিরপরিচিত করুণাময় আশ্রয়ে ফিরছি।

হে পূর্ণ,
আমার সকল অপূর্ণতার শেষ উচ্চারণ তুমি,
আমার সকল নীরবতার অন্তর্লীন সঙ্গীত তুমি;
আমার সকল হারানোর অন্তরে
অমল, অবিনশ্বর প্রাপ্তি তুমি।

তোমার চরণের ধূলিতেই
আমার সমস্ত পথের অবসান -
আর সেই অবসানেই
আমার অনন্ত যাত্রার সূচনা।


২৯.      অদিতি


নদীর ঘাটে তাকে প্রথম দেখেই
মনে হয়েছিল -
জল বুঝি আজ নারী হয়ে
নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।

ময়ূরকণ্ঠিরঙা নীলাভ দুকূল
তার দেহের ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
অলক্ষ্যে লিখছিল জোয়ারের ব্যাকরণ।

শ্বেত উত্তরীয়ের আড়ালে
বসন্তের দুটি সফেদ কুসুম
মৃদু বাতাসে কেঁপে উঠছিল -
যেন অশোকবনে প্রথম প্রেমের সংবাদ।

তার কেশে ছিল বর্ষার মেঘ,
কপালে সন্ধ্যাতারার এক বিন্দু আলো,
অধরে অর্ধফোটা বকুলের গন্ধ,
আর গ্রীবা বেয়ে নেমে আসা
অলস ছায়ার ভেতর
দিনের শেষ রৌদ্র আশ্রয় নিয়েছে।

ভ্রমরের মতো দুটি চোখ—
একবার শুধু অপাঙ্গে তাকাল।
সেই দৃষ্টি শরীরে নয়,
রক্তেরও গভীরে
অদৃশ্য কোনো বীণার তার ছুঁয়ে দিল।

আমি কাছে গিয়ে বললাম -
'তোমার নাম?'

সে নদীর মতো মৃদু হেসে বলল -
'অদিতি।'

শব্দটি উচ্চারিত হতেই ঘাটের সমস্ত জল
অকারণে কেঁপে উঠল, আমার মনে হলো—
এ নাম কোনো নারীর নয়,
এ নাম সেই প্রথম ভোরের, 
যেখানে সৃষ্টিকর্তা
মাটির শরীরে সৌন্দর্যের প্রথম স্পর্শ এঁকে
নিঃশব্দে রেখে গিয়েছিলেন অনন্ত 
আকাঙ্ক্ষার বীজ।

সেদিন তাকে আর স্পর্শ করিনি।
শুধু তার চলে যাওয়ার পথজুড়ে
আমার সমস্ত জীবন
নদীর ভেজা বালুর মতো শুয়ে রইল -
একটি অপূর্ণ আলিঙ্গনের
অমলিন প্রতীক্ষায়।


৩০.       প্রথম প্রহরে


প্রথম প্রহরে, কে ধরেছিল হাত প্রথম - 
স্পর্শে ছিল উষ্ণতা,  চোখে ছিল খোলা আকাশ-
আমার চোখে ছিল পথের ডাক - 
কথারা তখনও জন্ম নেয়নি, তবু দুটি হৃদয় বুঝেছিল একে অপরের ভাষা।

হাতের রেখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সময়ের নদী বয়ে গেছে কত দূর, তবু সেই প্রথম স্পর্শ আজও বুকের গভীরে বাজায় অদৃশ্য বীণার সুর।

যদি কোনোদিন আবার তবে এসো -  
সেই প্রথম দিনের মতোই হাত বাড়িয়ে দিও। 

আমি আবারও বিশ্বাস করব,  
ভালোবাসা কখনও পুরোনো হয় না, সে কেবল প্রথম স্পর্শের স্মৃতিতে চিরনবীন হয়ে থাকে।


৩১.     তোমার দেহের আলো


নারী, 
তোমার দেহে আমি কোনো ক্ষণস্থায়ী আগুন খুঁজি না, খুঁজি এক অনন্ত ঋতুর মধুর আশ্রয় - 
যেখানে চাঁদের আলো অলক্ষ্যে এসে কাঁধে রাখে 
শুভ্র হাত।

তোমার চোখের গভীরে যে নীল নদী বয়ে যায়, 
আমি তারই তীরে বসে অসংখ্য জন্মের তৃষ্ণা গুনি -
তোমার কেশের অন্ধকারে রাত্রি তার সমস্ত নক্ষত্র লুকিয়ে রাখে, আর তোমার অধরের হাসি 
আমার সমস্ত ক্লান্তিকে শিশিরের মতো 
গলিয়ে দেয়।

তোমার দেহ, যেন ভোরের প্রথম পদ্ম, 
স্পর্শহীন সৌন্দর্যে দীপ্ত, 
তার প্রতিটি রেখায় প্রকৃতি লিখে গেছে অবিনশ্বর প্রেমের গোপন শ্লোক।

আমি তোমার রূপে হারাতে চাই না, 
আমি চাই তোমার মাধুর্যের ভেতর নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে, যেমন নদী সমুদ্রে গিয়েও নিজস্ব স্রোতের স্মৃতি ভুলে না।

কোনোদিন সব আলো নিভেও যায়, 
তবু তোমার মুখের কোমল আভা আমার অন্তরের প্রদীপ হয়ে থাকবে, আর আমি --
নারী, তোমার সৌন্দর্যের উপাসনায় আজীবন 
বেঁচে থাকব।


৩২.     বিভ্রমের ওপারে


আমি তোমাকে ভালোবাসি -
এই একটি কথাই সত্য ছিল,
আজ নির্জন দুয়ারে দাঁড়িয়ে
বর্ষার মেঘে ঢেকে যাওয়া বিকেল দেখি।

আর একটু পরই
লাল আভায় জ্বলতে থাকা সূর্য
মেঘের নিচে ডুবে যাবে,
সন্ধ্যার নিবিড় আলোছায়ায়
মিশে যাবে তার সমস্ত উচ্চারণ।

এখানে জীবনের কোনো বিভ্রম নেই,
কোনো ভ্রান্তিও নেই,
বিভ্রম আর ভ্রান্তির
দুই তীর পেরিয়েই
আমি একদিন তোমাকে দেখেছিলাম -
যেমন দেখা যায়
নিজের অন্তরের নিভৃততম আলো।

ঝিরঝির করে যে বৃষ্টি নামে
বারবার এই পৃথিবীর বুকে,
সে-ও সত্য হয়ে ঝরে -
তার কোনো অভিনয় নেই,
সে অশ্রুর অনুকরণ করে না,
সে কেবল আকাশের
নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।

জীবনের একেবারে শুরু থেকেই
আমি জীবনকেই ভালোবেসেছি,
সব ঐশ্বর্য,
সব প্রাপ্তির দিকে
একদিন দু'হাত বাড়িয়েছিলাম।

কত আকুলতা, কত প্রত্যাশা -
শেষ পর্যন্ত
কখনো কখনো বঞ্চনার ছদ্মবেশে
আমার কাছেই ফিরে এসেছে।

তখন পথ থেমে গেছে,
পা থেমে গেছে,
স্বপ্নেরও যেন ক্লান্তি নেমেছে।

আজ বুঝি -
সবই ছিল ভ্রান্তি,
সময় শেখানো এক মায়ার পাঠ।

এখন আর সেইসব স্মৃতির জন্য
মনের ভেতর কোনো আসন রাখি না।

কয়টা দিনই বা বাকি!
এই সায়াহ্নের কোমল আলোয়
যতটুকু পথ এখনও সামনে পড়ে আছে,
ততটুকুই আমার প্রার্থনা।

শেষবেলায়
আমি আর কোনো বিভ্রমে হারাতে চাই না -
শুধু সত্যের হাত ধরে
হেঁটে যেতে চাই অস্তরাগের দিকে।


৩৩.     তোমার আত্মার দেশে


তোমার আত্মার দেশে আমি কীভাবে 
আশ্রয় পেলাম, আজও তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে 
পাই না।

তোমার দুটি বাহু ছিল না শুধু আলিঙ্গনের উষ্ণতা, 
ছিল এক অনন্ত আকাশ, যেখানে আমার 
সমস্ত ক্লান্ত পাখিরা নিঃশব্দে ফিরে এসে বাসা বেঁধেছিল।

আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল বর্ষার প্রথম বিদ্যুতের মতো  ক্ষণিক, তীব্র, কাঁপনজাগানো - 
আর তুমি ছিলে মেঘভেজা অরণ্যের সেই চিরন্তন সবুজ, যেখানে প্রতিটি দহন শেষ পর্যন্ত শিশির হয়ে ঝরে পড়ে।

আমি যতবার তোমার চোখের দিকে চেয়েছি, 
ততবার মনে হয়েছে, ভালোবাসা কোনো শব্দ নয়, 
এ এক গভীর নদী, যেখানে ডুবে গেলে আর তীরে ফেরার ইচ্ছে থাকে না।

যদি কখনও সমস্ত নক্ষত্র তাদের আলো ফিরিয়ে নেয়, যদি পৃথিবী তার সমস্ত রঙ ভুলে যায়, 
তবু তোমার নামের ভিতর একটি প্রদীপ জ্বলে থাকবে- আর আমি, সেই আলোয় অবিরাম তোমাকেই ভালোবেসে যাব।


৩৪.      কেন এসেছিলে


কী মনে করে এসেছিলে তুমি আমার জীবনের পারে, কোন্ বেদনার প্রদীপ নিভে গিয়েছিল তোমার অন্তঃপুরে? কোন্ অশ্রুর নীল উপাখ্যান তোমাকে টেনে এনেছিল এই পথহারা যুবকের নির্জন দুয়ারে?

আমি তো তখন শুক্লপক্ষহারা এক চাঁদ, অবহেলিত বনের বকুলের মতো নিঃশব্দে ঝরে পড়ছিলাম নিজেরই দীর্ঘশ্বাসের ওপর।

তুমি এলে, যেন শারদপ্রভাতের প্রথম শিশির পারিজাতের পাপড়িতে চুম্বন এঁকে দেয়, 
যেন মন্দাকিনীর স্বচ্ছ জলে পূর্ণিমার চাঁদ নিজের রূপ প্রথম আবিষ্কার করে।

তোমার দুটি চোখ নীলপদ্মের গভীর গোধূলি,
সেখানে আমি দেখেছিলাম অসংখ্য  জন্মের অপ্রকাশিত পরিচয়,
তোমার কেশের অন্ধকারে আমার সমস্ত ক্লান্ত দিন আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল।

তুমি কিছুই বলোনি, তবু তোমার হৃদয়বীণার তারে অশ্রুত রাগিণীর মতো আমার অন্তর জুড়ে বাজতে থাকল, সেই সুরে দুঃখও একদিন ফুল হয়ে ফুটল, বিষাদও সুগন্ধ হয়ে বাতাসে ভেসে গেল।

আজ গোধূলির বেলাশেষে বকুলঝরা পথ ধরে 
হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় - তুমি কি সত্যিই এসেছিলে? নাকি বসন্তের কোনো অলীক সমীরণ আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়কে ক্ষণিকের জন্য স্বপ্নের অর্ঘ্যে ভরিয়ে দিয়েছিল?


৩৫.      আমার দিন ফুরালো


কত পথের ধুলো মেখে,
কত অনিদ্রা রাতের প্রহর পার হয়ে
যখন এসে দাঁড়ালাম তোমার আঙ্গিনায়,
তখন দেখি -
আমার জীবন সন্ধ্যার আলোয় ঢেকে গেছে।

এত সংক্ষিপ্ত জীবনে
আমি কীভাবে তোমাকে জানাব
আমার ভালোবাসার সেই অসীম ইতিহাস -
যার শুরু ছিল জন্মেরও আগে,
শেষ হবে মৃত্যুরও পরে?

আমার না-বলা কথাগুলো
তোমার আঁচলে তুলে রেখো -
আমি হয়তো আর দীর্ঘদিন থাকব না,
কিন্তু একদিন সন্ধ্যার বাতাসে
হঠাৎ যদি অকারণে তোমার চোখ ভিজে ওঠে,
জেনে নিও -
আমার অসমাপ্ত ভালোবাসাই
তোমার দুয়ারে এসে কড়া নেড়েছিল।

ভালোবাসা কখনও সময়ের দৈর্ঘ্যে মাপা যায় না,
কখনও কখনও
একটি ক্ষণস্থায়ী স্পর্শই
অনন্ত জীবনের সমান হয়ে থাকে।


৩৬.      যদি জন্ম হতো লালনের কালে


আমার জন্ম যদি হতো লালন ফকিরের সেই কালে, তবে হয়তো একদিন ধুলো-মাখা পথ পেরিয়ে পৌঁছে যেতাম আখড়ার উঠোনে, মানুষ খোঁজার সেই অন্তহীন সাধনায়।

হতাম তাঁরই এক নামহীন শিষ্য, কাঁধে একটি একতারা, বুকে অনন্ত প্রশ্ন, গেয়ে বেড়াতাম, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় কি না।

সংসারের সকল হিসাব-নিকাশ নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে হয়ে যেতাম এক বৈরাগী পথিক, ঘর থাকত না, তবু আকাশ হতো আমার ছাদ, পৃথিবী হতো আমার একমাত্র আশ্রয়।

ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে যেত সন্ধ্যার বাতাসে,আর আমি গানের সুরে, ভাবের ঘোরে হারিয়ে যেতাম দেহের সীমানা পেরিয়ে, খুঁজতাম সেই অচিন মানুষকে, যে লুকিয়ে থাকে প্রতিটি হৃদয়ের গভীরে।

আহা, কী অপরূপ হতো সে জীবন! না কোনো প্রাপ্তির অহংকার, না কোনো হারানোর ভয়, শুধু পথ, শুধু গান, শুধু মুক্তির আকুলতা, আর লালনের চোখে দেখা এই বিস্ময়ভরা মানুষের পৃথিবী।


৩৭.     বর্ষার সেই রাত্রি


বৃষ্টি-ঝরা এক নিবিড় বর্ষা-রাতে,
এসেছিলে তুমি বাতাসের মর্মর গোপন ধ্বনিতে
দিগন্ত চিরে বিদ্যুতের ক্ষণিক দীপ্তি যেন
তোমার আগমনের অলিখিত স্বাক্ষর হয়ে জ্বলে উঠেছিল।

রিমঝিম বৃষ্টির সুরে,
অচেনা কোনো অনন্তের আহ্বানের মতো
জড়িয়ে নিয়েছিলে আমাকে -
নিঃশব্দ, নির্ভার, নিবিড় আলিঙ্গনে।

সেই থেকে যত বর্ষা নামে,
জলভেজা প্রতিটি সন্ধ্যা তোমারই নাম উচ্চারণ করে,
প্রতিটি মেঘের কান্নায় শুনি তোমার কণ্ঠস্বর,
প্রতিটি বিদ্যুতের ঝলকে দেখি হারিয়ে যাওয়া মুখ।

তুমি এসেছিলে ক্ষণিকের জন্য -
কিন্তু রেখে গেছ এক অনন্ত বর্ষাকাল,
যেখানে আজও আমার হৃদয়
অবিরাম বৃষ্টি হয়ে তোমাকেই খুঁজে ফেরে।


৩৮.     মায়ার অন্তরীপ


তোমার কথা মনে হলেই শরীরজুড়ে বয়ে যায় 
অদেখা কোনো নদীর গোপন স্রোত, আজও তোমার নাম আমার হৃদয়ের গভীরতম কক্ষে নিঃশব্দ প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

তোমাকে ভাবতে ভাবতেই কত ঋতু এসে ফিরে গেছে, তবু আমার জানালায় তোমারই ছায়া এসে বসে থাকে সন্ধ্যার প্রথম তারার মতো।

আমরা পাশাপাশি হাঁটতে পারিনি,  তবু একই আকাশের নিচে একই চাঁদের আলোয় হয়তো দুজনেই একই দীর্ঘশ্বাসের ভাষা শিখেছিলাম, দূরত্ব শুধু পথের ছিল, ভালোবাসার নয়।

যে হাতটি ধরার কথা ছিল, সে হাত আজও বাতাসে ভেসে আসে, যে ডাকটি শুনবার কথা ছিল, তা আজও বৃষ্টির শব্দে আমার নাম ধরে কাঁদে।

জানি, সব প্রেমের শেষ মিলন হয় না, কিছু প্রেম নক্ষত্র হয়ে দূরে জ্বলে, কিছু প্রেম গোপন ফুলের সুবাস হয়ে আজীবন হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে।

তুমি যদি কোনোদিন হঠাৎ ফিরে তাকাও, দেখবে আমি এখনও সেই পথেই দাঁড়িয়ে, যেখানে তোমার প্রথম হাসি আমার সমগ্র জীবনকে ভালোবাসা বলে চিনিয়েছিল।


৩৯.     রহস্যময়ী


আমার প্রতিটি নিঃসঙ্গতার অন্তরালে
শুধু তারই নামের প্রতিধ্বনি ছিল -
সে রয়ে গেল ভোরের শিশিরে লেখা 
এক অপাঠ্য কবিতা,
সাঁঝের আকাশে ভেসে থাকা এক রহস্যময় 
নীল বিষাদ --
তার ব্যস্ত জীবনের ক্ষণিক ছায়া,
আমার সমস্ত জীবনের উপর সবচেয়ে সুন্দর,
সবচেয়ে বিষণ্ন মায়া রেখে গেছে।


৪০.    অন্ধকার পাণ্ডুলিপির পাশে


কোন্-এক বিস্মৃত গ্রন্থাগারের নিভু আলোয়
হঠাৎ যেন দেখেছিলাম তোমাকে -
হাজার বছরের ধুলোর নিচে ঘুমিয়ে থাকা
একটি নামহীন পাণ্ডুলিপির মতো।

তোমার মুখে ছিল শ্রাবণের শেষ বিকেল,
চোখে ছিল দূর নদীর নীল নিঃসঙ্গতা,
মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত নীরবতা
এসে আশ্রয় নিয়েছে তোমার দুটি চোখে।

তুমি কোনো কথা বলোনি -
তবু বাতাস ভরে উঠেছিল অদ্ভুত এক ভাষায়,
যে ভাষা কেবল ঝরা বকুল জানে,
অথবা জানে সন্ধ্যার পর নির্জন বনপথ।

আমি তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম,
যেমন কোনো পথহারা নাবিক
দূরের বাতিঘরের আলো দেখে,
জেনেও যে সেখানে পৌঁছানো হবে না কোনোদিন।

তারপর কত বর্ষা এলো, কত শীত পেরোল,
কত পাখি উড়ে গেল অচেনা আকাশে,
শুধু তুমি থেকে গেলে -
পুরোনো বইয়ের ভাঁজে রাখা
শুকিয়ে যাওয়া এক শেফালির পাপড়ির মতো,
স্পর্শ করলেই ভেঙে পড়ে সুগন্ধ হয়ে।

সময় আমাকে বহু দূরে নিয়ে গেছে,
তবু হৃদয়ের গোপন কক্ষে
তোমার জন্য একটি প্রদীপ আজও জ্বলে -
তার আলো খুব ক্ষীণ,
কিন্তু সে-আলোতেই আমি দেখি
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মুখটি।

হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না,
তবু আমার সমস্ত কবিতার ভেতর
তুমি নিঃশব্দে হেঁটে যাবে -
যেমন শরতের আকাশে একাকী মেঘ ভেসে যায়,
যেমন অন্ধকার নদীতে চাঁদের ভাঙা আলো
কারও অজান্তে কেঁপে ওঠে।

আর আমি -
একজন আজন্ম পাঠকের মতো
তোমার অনুলিখিত জীবনের পাতা উল্টে উল্টে
শেষ পর্যন্ত শুধু এইটুকুই শিখব,
সবচেয়ে গভীর ভালোবাসাগুলো
কখনো উচ্চারণে নয়,
চিরকাল রয়ে যায়
একটি অন্ধকার পাণ্ডুলিপির নিঃশব্দ হলুদ পাতায়।


৪১.     শুধু তোমার জন্য


রাত নেমেছে নিঃশব্দে নীল
জানালাতে তুমি,
চাঁদের আলো ভিজে ওঠে
জাগে প্রেমের ভূমি।

ঘাসের বুকে শিশির নাচে
হাওয়া ছোঁয় যে চুল,
তোমার ছোঁয়ায় হৃদয় আমার 
ফুটে ওঠে ফুল।

আঙুল এসে আঙুল ছোঁয়
কাঁপে মনের তার,
নীরবতার সেতার বুকে বাজে 
ভালোবাসার সুরধার।

দুচোখ ভাসে প্রেমের নদী
থেমে থাকে ক্ষণ,
তারারাও আজ লিখে রাখে 
মিলনেরই পণ।

তোমার বুকে মাথা রেখে 
হারাই সুখের দেশে,
অভিমান সব গলে যায় 
ভালোবাসার শেষে।

তোমার নামে বাঁচি আমি 
প্রতিটি প্রহরকাল,
আমার নামে হাসো তুমি 
অনন্ত চিরকাল।


৪২.      হলুদের একটি দুপুর


যখন তুমি দাঁড়িয়ে থাক বারান্দায় -
তখন রোদেরও একটি গোপন উচ্চারণ থাকে,
দেয়ালের গায়ে গায়ে হলুদ পরাগ ঝরে,
বাতাস তার সমস্ত নাম ভুলে গিয়ে
তোমার আঁচলের তলে আশ্রয় খোঁজে।

আমি দূরত্বের ভিতর বসে শুনি -
আলোরও বুঝি একটি হৃদস্পন্দন আছে।

তোমার দিকে তাকানো মানে
একটি নদীর উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া,
কোনো কথা নয় -
শুধু পলকের ভেতর জন্ম নেয় অনন্ত সংলাপ।

চোখের কোণে জমে থাকা অপ্রকাশিত বিকেল
ধীরে ধীরে কুসুম হয়ে ফোটে।

তোমার হলুদ শাড়ি তখন
সরিষাক্ষেত নয়,
বরং পৃথিবীর প্রাচীনতম সূর্যালোকের স্মৃতি,
যেখানে সময় নিজেই খুলে রাখে তার অলংকার।

আমার ইচ্ছে হয় -
তোমার ছায়ার পাশে আর-একটি ছায়া হয়ে থাকি,
যেন ভালোবাসা কোনো উচ্চারিত শব্দ নয়,
বরং দুজনের মাঝখানে জন্ম নেওয়া আলো।

তারপর সন্ধ্যা নামে -
কেউ জানে না,
আকাশে প্রথম তারাটি ওঠার আগে
কতবার তোমার নাম
আলো নিজের ভেতর নিঃশব্দে উচ্চারণ করে।


৪৩.       আমার বুকের ভেতর


শৈশব থেকেই আমার বুকের ভেতর
অদ্ভুত এক নীল পাখি ডানা ঝাপটাত -
তার নাম ছিল ভালোবাসা,
তার ছায়ার নাম ছিল বিষণ্নতা।

যে প্রেম এসেছিল,
সে ফুলের গন্ধের সঙ্গে
অদৃশ্য বিষও মিশিয়ে দিয়েছিল রক্তে।

অনেক সন্ধ্যা তাই নিঃশব্দে নীল হয়ে গেছে,
অনেক রাত জানালার পাশে বসে
নিজেরই নাম ভুলে থেকেছি -
তবু আমি হারাইনি।

কারণ অন্ধকারেরও একটি উচ্চারণ আছে,
আর সেই উচ্চারণের নাম—কবিতা।

আমি দেখেছি,
সবচেয়ে গভীর ক্ষতও একদিন
শব্দের ভেতর জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে -
সবচেয়ে দীর্ঘ কান্নাও
একসময় নদী হয়ে সমুদ্রে মিশে যায়।

যদি কেউ জিজ্ঞেস করে -
কী তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এতকাল?
আমি শুধু ম্লান হেসে বলব,
মানুষ নয়, বিচ্ছেদ নয়, কোনো অলৌকিক 
আশ্বাসও নয়,
আমাকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে কবিতা।


৪৪.      নারীদেহ


তোমার চোখ যখন থেমে থাকে
আমার কাঁধের বাঁকে -
আমি তখন নদী হই না,
হই জোয়ারের আগের নিস্তব্ধ স্রোত।

আমার শরীর কোনো প্রার্থনার ঘর নয়,
আবার কোনো যুদ্ধক্ষেত্রও নয় -
এখানে নরম ঘাস জন্মায়,
ভোরের শিশির পায়ের কাছে
নিজেই নতজানু হয়।

তুমি যদি স্পর্শের ভাষা জানো,
তবে হাত রেখো
যেন ফুলের ওপর বসে একটি প্রজাপতি,
লোভের ওজন নিয়ে নয়,
বিস্ময়ের হালকা ডানায়।

আমার ঠোঁটে যে লালিমা,
তা কেবল রক্তের নয় -
অগণিত অনুচ্চারিত ঋতুর,
অপেক্ষার,
আর আধখোলা জানালায় ঢুকে পড়া
দক্ষিণ হাওয়ার।

আমি নারী -
আমার দেহে আদিম অরণ্যের গন্ধ আছে,
আছে পাকা ধানের ক্ষেতে
হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির শব্দ।

যে শুনতে পারে,
সে-ই কেবল জানে
কীভাবে কোমলতাও উষ্ণ হয়ে ওঠে।

তাই আমাকে জয় করতে এসো না, 
এসো, পাশাপাশি বসি -
হয়তো কোনো সন্ধ্যায়
তোমার আঙুল ছুঁয়ে যাবে আমার কবজি,
আর সেই সামান্য স্পর্শেই
দূরের এক নক্ষত্র ধীরে ধীরে খুলে দেবে
তার দীপ্তময় গোপন আলো।


৪৫.      অপ্রকাশের আলো


দিগন্তেরও ওপারে যে আকাশের শুরু,
সেখানেই বুঝি তোমার অনুভূতির বাস।
বাতাস এসে শুধু তার অনুবাদ করে,
ফুলেরা এসে শেখে সুবাসের ভাষা।

তোমাকে বলার মতো কোনো শব্দ নেই -
সব অভিধান একদিন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
তোমার সৌন্দর্য উচ্চারণের আগে
ভাষা নিজেই নতজানু হয়ে যায়।

আমি তাই চুপচাপ হয়ে পাশে বসে থাকি,
অপ্রকাশিত ভালোবাসার প্রদীপ হাতে।
তোমাকে পাওয়ার নয়,
তোমাকে অনুভব করার মধ্যেই
আমার সমস্ত প্রাপ্তি।

তুমি দূর নক্ষত্রের মতো দীপ্ত থাকো,
আমি অন্ধকার আকাশের এক নিবেদিত দর্শক।
আলোকে স্পর্শ করি না -
শুধু তার বিস্ময়ে ভিজে থাকি।

কতবার তোমার নামহীন উপস্থিতি
আমার ভেতর বসন্তের দরজা খুলে দিয়েছে।
তবু এই না-বলা অনুরাগেই আমার শান্তি -
কিছু ভালোবাসা উচ্চারণে নয়,
হৃদয়ের গভীরতম আলোয়
চিরকাল পূর্ণ হয়ে থাকে।


৪৬.     জ্যোৎস্নারও অতীত


এমন পূর্ণিমা রাত -
তবু মনে হয়, আকাশের সমস্ত আলো
তোমার দেহের ভাষা শিখতেই
পৃথিবীতে নেমে এসেছে।

তোমার ত্বক কোনো রঙ নয়,
প্রাচীন কোনো ভোরের কোমল উচ্চারণ,
যেখানে আলো এসে
নিজেরই সংজ্ঞা ভুলে যায়।

কাঁধ থেকে কবজি,
ঘাড় থেকে নিঃশ্বাসের নরম বাঁক -
সবই যেন এক অনলিখিত উপাখ্যান,
যার প্রতিটি পঙক্তি
স্পর্শ নয়, বিস্ময়ে পড়তে হয়।

স্বেদবিন্দুগুলো হীরক নয় শুধু,
তারা যেন নক্ষত্রের ক্ষুদ্র উত্তরাধিকার
এক ফোঁটা দীপ্তি ঝরে পড়লেই
রাত্রির অন্ধকার আরও গভীর, আরও মায়াময় 
হয়ে ওঠে।

তোমার চোখে সমুদ্রের গোপন জোয়ার,
ঠোঁটে উতাল বর্ষা ঋতুর আহ্বান,
চুলের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে
অরণ্যের বহুদিনের অপ্রকাশিত বাতাস।

আমি জানি,
নারীর দেহ কেবল দেহ নয় -
সে এক নক্ষত্রমণ্ডল,
যেখানে সৌন্দর্য তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘোরে,
আর রহস্য
নিজেকেই অনন্তকাল আবিষ্কার করে।

আমি কোনো বিজয় চাই না,
শুধু আলো হয়ে দাঁড়াতে চাই তোমার সেই  
জ্যোৎস্নার পাশে -
যেখানে ভালোবাসা স্পর্শের চেয়েও গভীর,
স্বর্গের সমস্ত দরোজা খুলে দিয়েও শেষ পর্যন্ত 
অধরাই থেকে যায়।


৪৭.     মায়াবী আলোর দিকে


ছেলেবেলা থেকেই
জীবন আমাকে ডেকে নিত বিস্ময়ের নাম ধরে -
যেন প্রতিটি সকালই
অচেনা কোনো গ্রহের প্রথম সূর্যোদয়।

আমার পথের ধারে
একটি মায়াবী আলো জ্বলত নিভুনিভু ,
কেউ তাকে দেখত না,
শুধু আমার ছায়া তার দিকে হেঁটে যেত।

বইয়ের পাতার সঙ্গে
আমার কোনো সহজ বন্ধুত্ব ছিল না,
অক্ষরগুলো দূরের পাখির মতো
ডানা ঝাপটে উড়ে যেত চোখের আকাশ পেরিয়ে।

তবু একদিন -
কোনো অলক্ষ্য বাতাসে ভেসে এলো কবিতা,
সে দরজা খুলে নয়,
এসেছিল জানালার আলো হয়ে।

তারপর থেকে
শব্দ আর শুধু শব্দ রইল না,
তারা হয়ে উঠল নদী,
হয়ে উঠল নক্ষত্রের গোপন ভাষা,
হয়ে উঠল হৃদয়ের দীপ্ত মানচিত্র।

আমার জীবনের পাশে যে আলো জ্বলছে,
তার নাম হয়তো কবিতা,
যে আমাকে শেখায়,
মুক্তি কখনো দূরের কোনো দেশ নয় -
মুক্তি হলো
নিজের বিস্ময়কে আজীবন বাঁচিয়ে রাখার 
আরেক নাম।


৪৮.     সকল মণিরত্নমে


যদি কোনো নিদ্রাহীন রাতে সারাক্ষণ জেগে থাকো, অলিন্দের পাশে ইজিচেয়ারে বসে শোনো নক্ষত্রের  পতনের শব্দ, যদি আমার শূন্যতায় তোমার বিছানা একদিন শোকের মতো হিমশীতল হয়ে ওঠে --

তবে প্রশ্ন রেখো নক্ষত্ররাত্রির কাছে, 
যা কিছু সংবেদনশীল, যা কিছু জ্যোৎস্নার মতো সমুজ্জ্বল, তাদের ডেকে বলো - এসো।

আকাশ থেকে যে নক্ষত্র ঝরে পড়ে, বাতাস থেকে যে বিষাদ নীলাভ হয়ে ওঠে,  
পাতার আড়ালে কেঁপে ওঠে যে দীর্ঘশ্বাস -
সবাই একদিন বলে দেবে আমার অনুপস্থিতির ভাষা, 
সবাই জানিয়ে দেবে - কোথাও আমি আর নেই।

তবু তুমি লুকিয়ে রেখো না তোমার বিস্ময়কর সম্পদরাজি, তোমার আনন্দময়ী আনন্দরূপ।

যে শরীরে আমি জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসতাম, চুম্বনে চুম্বনে লিখতাম ঋতুর গোপন উপাখ্যান, যে কেশের অরণ্য থেকে পায়ের নখের দীপ্তি পর্যন্ত আমার মুগ্ধতা আলোর মতো ঘুরে বেড়াত --

সেই অনুচ্চারিত ঐশ্বর্য আজও রয়ে যাক আমার শেষ স্পর্শের স্মৃতিতে, সকল মণিরত্নমে।


৪৯.    তোমাকে মনে পড়ে,  ক্যামেলিয়া

( উৎসর্গ - কবি দিলারা হাফিজ - কে )

তোমাকে মনে পড়ে, ক্যামেলিয়া -
যেন গোধূলির শেষে এক নামহীন পাখি
ডেকে ওঠে আমার নিঃসঙ্গতার উঠোনে।

তোমার ডাগর দু'চোখে
পৃথিবীর সমস্ত অজানা প্রশ্নের নীল জল জমে থাকত।
তুমি উত্তর খুঁজতে না -
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে,
যেন নক্ষত্রেরা কোনোদিন
তোমার কপালে লিখে দেবে জীবনের গোপন ব্যাখ্যা।

কিন্তু পৃথিবী বড় কৃপণ।
সে প্রশ্ন ভালোবাসে,
উত্তর দিতে জানে না।
তাই একদিন
অভিমানী বাতাসের মতো
নিঃশব্দে চলে গেলে তুমি -
অনন্তবাসের নিজস্ব ঠিকানায়।

তারপর থেকে
শিউলি ঝরার শব্দেও তোমার পায়ের ধ্বনি শুনি,
ভেজা জানালার কাচে
তোমার মুখের অস্পষ্ট রেখা ভেসে ওঠে।
পূর্ণিমা এলে মনে হয়,
চাঁদ আজও তোমার সাদা ওড়নার গন্ধে ভিজে আছে।

আমি আজও জানি না,
মৃত্যু কি সত্যিই শেষ বিদায়,
নাকি অন্য কোনো নক্ষত্রলোকে
তুমি এখনও বসে আছো -
সেই একই বিস্ময়ভরা চোখে
অমীমাংসিত প্রশ্নের আলো নিয়ে।

আর আমি,
এই পৃথিবীর ধুলোয় দাঁড়িয়ে,
প্রতিটি সন্ধ্যায় তোমার নাম উচ্চারণ না করেও
তোমাকেই ডেকে যাই।

কারণ কিছু মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিই
সবচেয়ে দীর্ঘ,
সবচেয়ে মায়াময়,
সবচেয়ে গভীর কবিতা হয়ে
বেঁচে থাকে আমাদের ভেতরে।


৫০.     ক্লান্তি আমার অবসন্নতা আমার 


একেকদিন ভোর আসে, তবু জানালায় আলো নয়, শুধু ক্লান্তির সাদা চাদর মুড়ে দেয় সমস্ত শরীর। ক্ষিপ্রতা কোথায় যেন চুপচাপ খুলে রেখে যায় তার জুতো, আমি ধীরে ধীরে হেঁটে যাই নিজেরই ভেতরের করিডোরে।

একেকদিন উদভ্রান্ত হয়ে মাথা খুঁড়ি অদৃশ্য দেয়ালে, কোনো উত্তর ঝরে না - শুধু প্রতিধ্বনিরা নিজেদেরই কান্না শুনে।

পৃথিবীটাকে তখন হাসপাতালের মতো লাগে, নির্জন, ওষুধের গন্ধে ভিজে থাকা দীর্ঘ বারান্দা, ক্লান্ত বেঞ্চে বসে আছে অপেক্ষার নত মুখ।

সময় সেখানে স্যালাইনের ফোঁটার মতো ঝরে, ঘড়ির কাঁটা অসুস্থ মানুষের নিঃশ্বাস গোনে, আর জানালার ওপারে একটি শালিকও যেন ডাকতে ভুলে যায় নিজের নাম।

তবু জানি, এই অবসন্নতারও শেষ আছে। যেমন দীর্ঘ জ্বরের পর একদিন হঠাৎ কপাল ছুঁয়ে নেমে আসে শীতল বাতাস --

তেমনি কোনো এক অবসন্ন বিকেলে মেঘের আড়াল সরিয়ে আলো এসে বলবে -- 'এখনও তোমার ভেতরে একটি নদী বেঁচে আছে, শুধু কিছুক্ষণ তার জল ঘুমিয়ে ছিল।


সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী



নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী  ( কাব্যগ্রন্থ  ) 

প্রথম প্রকাশ  -

উৎসর্গ  -

ভূমিকা -


১.      নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী 

যে রাতে সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল, আর ক্লান্ত দেহে জমেছিল অনন্ত নির্জনতা, সেই রাতেও তোমার মুখই ভেসে উঠেছিল বৃষ্টির পরে নদীর জলে জেগে থাকা চাঁদের মতো।

চারপাশে ছিল মানুষের কোলাহল, তবু হৃদয়ের গভীরতম ঘরে শুধু তোমার পায়ের শব্দ শুনেছিলাম- যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো বসন্ত নিঃশব্দে ফিরে আসে শুকনো বকুলতলায়।

মনে পড়ে তোমার সেই সহজ গর্ব, চোখের কোণে জমে থাকা উদাসী দীপ্তি, আর চুলের গন্ধে জড়িয়ে থাকা অচেনা কোনো সন্ধ্যার মায়াবী বিষাদ। মনে হয়, একবার যদি ছুঁয়ে দিতে পারতাম তোমার সমস্ত অভিমান, তবে হয়তো পৃথিবীর সব শীত কোমল হয়ে যেত শিশিরের মতো।

তুমি ছিলে নিষ্ঠুরও, তবু তোমার নীরবতা ছিল প্রার্থনার মতো পবিত্র। এক ফোঁটা অশ্রুর জন্য কত দীর্ঘ রাত্রি যে আমি জেগে থেকেছি, তার হিসেব আজ আর রাখি না।

এখনও কোনো কোনো গোধূলিতে অকারণে বাতাসে তোমার নাম ভেসে আসে, আর আমি পুরোনো প্রেমের কাছে ফিরে গিয়ে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করি।

হয়তো তুমি আর ফিরবে না, হয়তো সময় তার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তবু আমার সমস্ত অসমাপ্ত ভালোবাসা আজও তোমার জন্যই সংরক্ষিত -

যেমন শুকনো গোলাপের ভাঁজে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকে একটি সুগন্ধ, একটি স্পর্শ, একটি অমলিন মুখের স্মৃতি।


২.   অনন্ত মায়াবী আলো


তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
সোনালি রঙের প্রভাত হবে, প্রতিদিন অস্তাচলে যাবে সূর্য।
তবু সন্ধ্যার নীলাভ আলোয়,
অকারণে তোমার নাম ভেসে উঠবে শিউলি-গন্ধে।

হয়তো নদী তার নিজস্ব সুরেই বয়ে যাবে,
হিজল-ছায়ায় বসে থাকবে জ্যোৎস্নার নির্জনতা,
শুধু আমার জানালায় এসে
অতীতের কোনো পাখি ডেকে যাবে তোমার কথা।

তুমি নেই, তবু আকাশে নক্ষত্রেরা নিভে যায় না,
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে বসন্তের রঙ ফুরোয় না;
শুধু এক ফোঁটা শিশির হয়ে
তোমার স্মৃতি জেগে থাকে ঘাসের গভীর সবুজে।

অনেক রাত পেরিয়ে যাবে,
চাঁদ তার ধ্রুপদি আলোয় ভরিয়ে দেবে পৃথিবী,
আর আমি নিঃশব্দে শুনে যাবো -
দূরের বাতাসে তোমার অদেখা পদধ্বনি।

কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে
মেঘের শরীরে লেখা থাকবে তোমার অনুপস্থিতি,
তবু কদমফুলের সুবাসে
মনে হবে, তুমি খুব কাছে ছুঁয়ে দেখার মতো।

ভালোবাসা তো শুধু পাশে থাকার নাম নয়,
কখনও কখনও দূরত্বেরও নিজস্ব এক মায়া থাকে
যেমন নদী সাগরকে না ছুঁয়েও
আজীবন তারই দিকে বয়ে যায়।

তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
জীবন তার নিজস্ব নিয়মে ফুল ফোটাবে, পাখি ডাকবে,
শুধু হৃদয়ের গভীরতম নক্ষত্রলোকটিতে
একটি আসন চিরকাল তোমার জন্যই রয়ে যাবে-
যেখানে কোনো বিদায় নেই,
কেবল নিঃশব্দ ভালোবাসায় জেগে থাকবে তুমি 
এক অনন্ত মায়াবী আলোর মতোন।


৩.     ছুঁয়ে দেখা হবে


চাঁদের নরম রূপালি ধূলি মেখে যাও 
ঘুমিয়ে থাকা জানালার পাশে
অপরূপ নীরবতার মতো এসে দাঁড়াও।

এখানেই দেখা হবে। 

বুকে এত অরণ্য, এত অচেনা পাখির ডাক,
তবু তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
দিগন্তজোড়া বিষণ্ন আলো জেগে ওঠে।
আমি একা বসে থাকি -
রাতের গায়ে নক্ষত্রের চাদর জড়িয়ে।

যদি কখনো হেমন্তের বাতাসে
তোমার চুলের গন্ধ ভেসে আসে,
যদি নদীর জলে ডুবে থাকা চাঁদ
আমাদের পুরোনো স্বপ্নগুলো ফিরিয়ে দেয় -
তবে কোনো শব্দ নয়,
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়,
শুধু চোখের গভীর থেকে চোখে -
নীরবতার সমস্ত ফুল ফুটিয়ে আবারও 
ছুঁয়ে দেখা হবে।

তুমি থাকবে দূরের মতো,
আমি থাকব প্রতীক্ষার মতো,
তবু ভালোবাসা তার গোপন দরজা খুলে
একদিন নিশ্চয়ই এসে বলবে -
এসো।

আজ আর বিচ্ছেদ নয়, আজ শুধু 
মায়াময় আলোয়, 
আত্মার গভীরে ছুঁয়ে দেখা হবে।


৪.     তোমার ছায়া 


দূরগামী কোনো ট্রেনের জানলায় হেলে 
থাকা এক চিলতে ঘুম, ভিড়ের মধ্যে মুখগুলো 
বদলে যায়, স্টেশন আসে, স্টেশন ফুরোয়, 
শুধু হঠাৎ কোনো অপরিচিত ক্লান্ত মুখে 
তোমারই বিষণ্নতা চিনে ফেলি।

প্রতিদিনের শেষে তোমার চোখে 
চোখ রেখে দেখি, ঝরে যাওয়া পাতারাও কত নিঃশব্দে বহন করে প্রেম, সন্ধ্যার আকাশে একফোঁটা তারা উঠলে মনে হয়, তুমি এখনও হারিয়ে যাওনি।

চারপাশে ভুলের মুখ, 
ভুলের ইতিহাস, তার মধ্যেও গোপনে, অতি গোপনে, আমার শালে লেগে আছে তোমার না-জানা 
শরীরের  সুবাস।

একটুখানি স্বপ্ন যদি ধার দাও, 
আমি আবার ভোরের দিকে হাঁটব, হিজলপাতার নিচে, শিশিরের পাশে, 
যেখানে কেউ জানবে না, কী গভীর মায়ায় 
তোমাকে ভালোবেসে গিয়েছি 
এই পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের ভিতর।


৫.     তারার দীপাবলি


খুব ইচ্ছে ছিল -
একদিন খোলা অটোরিকশায়
পূর্বাচলের তিনশো ফুট রাস্তা ধরে
চলে যাব দুজনে,
যতদূর গেলে পৃথিবীর শেষ বিকেলটুকু
আকাশের গায়ে নীল হয়ে জ্বলে ওঠে।

গিয়েছিলাম একদিন -
সেই বিকেলের কোমল আলোয়
অনেকদিন পর দেখলাম,
মাথার উপরে সীমাহীন আকাশেরও ওপরে
আরও এক আকাশ ভেসে থাকে,
দু'পাশে সবুজের অবিরাম বিস্তার,
সজল বাতাসের গায়ে
অচেনা পাখির ডানার শব্দ।

এই শহরের এত কাছে
এত নির্মল বাতাস, এতখানি নীল,
এতখানি অবকাশ লুকিয়ে আছে 
জানতাম না।

ঠিক এমনই চেয়েছিলাম আমরা -
এমনই পাশাপাশি থাকা,
এমনই পথের ভেতর হারিয়ে যাওয়া,
এমনই বাতাসে মুছে যাওয়া
জীবনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

সেই বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
আমাদের কোনও দুঃখ ছিল না,
ওর অসুখের বিদীর্ণ ব্যথাও যেন
দূরের মেঘের আড়ালে ঘুমিয়ে ছিল,
কোনও খেদ ছিল না,
কোনও হিসেব ছিল না জীবনের কাছে।

কিছু কিছু ক্ষণ আসে -
যখন ধন-দৌলত, প্রাপ্তি, অপূর্ণতা
সবই তুচ্ছ হয়ে যায়,
নিরাকার এক সুখ এসে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে যায় শরীর ও মন,
অমিয়ধারার মতো ধুয়ে দেয়
ক্লান্ত দিনের সমস্ত ধূলি।

সেই সন্ধ্যার মেঘমালা থেকে
আমরা পেয়েছিলাম
প্রেমের আশ্রয়ে জন্ম নেওয়া
এক গভীর শান্তি।
দূরের আকাশে চেয়ে মনে হয়েছিল -
আর একটু পরেই
লাল, নীল, সোনালি তারারা
দীপাবলির প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠবে
অনন্ত আকাশের বারান্দা জুড়ে।

কিন্তু তার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে,
তারারা জ্বলবে -
আমরা থাকব না।

তবু হয়তো সেই অসমাপ্ত সন্ধ্যার ভিতরে
আমাদের পাশাপাশি বসে থাকা দুটি ছায়া
অনেক দিন পরে,
কোনও নক্ষত্রের স্নিগ্ধ আলোয়
আবারও একে অপরকে খুঁজে নেবে -
যেন ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না,
শুধু আকাশ বদলায়, আর তারারা প্রতি রাতে
দীপাবলির মতো জ্বলে ওঠে।


৬.      তুমি চলে গেছ


তুমি চলে গেছো অনন্ত নক্ষত্রের দেশে,
আর আমি রয়ে গেছি এই ভাঙা পৃথিবীর ধুলোয়,
যেখানে স্মৃতিগুলো এখনো শ্বাস নেয় 
তোমার নামে।

তুমি আর ফিরবে না এই মাটির পথে,
তবু মন কেমন এক অদ্ভুত অপেক্ষায় আটকে থাকে।

তুমি যদি কখনো অন্য কোনো আকাশে হাঁটো,
চাঁদের আলোয় যদি চেনা কোনো হাসি খুঁজে পাও,
তবে জেনে নিও -
নিঃশব্দ প্রার্থনার মতো এখনও বেঁচে আছি 
অচেনা জন্মের প্রান্তে -

যেখানে নাম নেই, ঠিকানা নেই, 
কেবল অনুভব আছে, আশা জেগে আছে -
কোনো এক জোনাকজ্বলা মৌন সন্ধ্যায় 
আবার দেখা হবে আমাদের।


৭.    যারা চলে গেছে


একে একে সব প্রণয়ী-প্রণয়িনীরা চলে গেল,
কেউ চলে গেল জীবনের অস্তাচলের ওপারে,
কেউ গেল চির অভিমানে -
ফেলে রেখে গেল শুকিয়ে যাওয়া কিছু বিকেল,
আর বুকের গহীনে অমলিন কিছু নাম।

একে একে নিভে গেল অনেক চেনা প্রদীপ,
কারও চোখে জমল নক্ষত্রের ঘুম,
কারও ঠোঁটে রয়ে গেল না-বলা বিদায়ের ভাষা,
তবু পুরোনো পথগুলো আজও সন্ধ্যা নামলে
অপেক্ষার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

যারা একদিন হাত ধরেছিল,
তারা আজ ছড়িয়ে আছে সময়ের বিভিন্ন ঋতুতে -
কেউ বৃষ্টির গন্ধ হয়ে আসে,
কেউ শরতের সাদা মেঘে,
কেউ বা গভীর রাতে হঠাৎ জেগে ওঠা
একটি নামহীন বিষণ্নতায়।

এক এক করে সব চিঠির কালি ফিকে হয়ে গেল,
শুকিয়ে গেল বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি,
শুধু কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন
জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে মাঝেমধ্যে,
আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে।

কেউ চলে গেল জীবনের ব্যস্ত নগরে,
কেউ হারিয়ে গেল অনন্ত নক্ষত্রলোকের ঠিকানায়,
কেউ বা নীরবতার চাদর গায়ে জড়িয়ে
আর ফিরে তাকায়নি কখনও।

তবু মাঝরাতে চাঁদের আলো নেমে এলে
মনে হয় -
সব হারিয়ে যাওয়া প্রণয়ীরা বুঝি
অদৃশ্য কোনো বাগানে বসে এখনও একে 
অপরের কথা বলে।

হয়তো কোনো এক অনন্ত ভোরে,
যেখানে অভিমান নেই, বিচ্ছেদ নেই,
সেখানে আবার দেখা হবে -
তখন কেউ আর চলে যাবে না,
কেউ আর হারিয়ে যাবে না, শুধু তারার 
দীপাবলির নিচে আমরা সবাই চিনে নেব 
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মুখ।


৮.       মাটির কাছে ফিরে এসে


এক দিন মনে হতো, এই হৃদয় নিজেই যেন 
জোনাকির আলো,
নিজেই নিজের জন্য রচনা করত মায়ার বনভূমি,
অচেনা নক্ষত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে ভাবত -
সমস্ত সৌন্দর্য বুঝি তারই অন্তরঙ্গ ভূমি।

তার পর একে একে ঋতুরা বদলে গেল,
সময়ের সুস্থ শিষ্টতায় ধরা পড়ল সমস্ত স্বপ্ন,
দেখলাম, যে ফুলগুলোকে অমর ভেবেছিলাম -
তারা নিভৃতে ঝরে পড়ে, কারও থাকে না স্মরণ।

আমার বিশ্বাসের মূল, এই পৃথিবীর গভীর মাটিতে
কত যে ক্ষত নিয়ে পড়ে ছিল নীরব হয়ে,
তবু সন্ধ্যার পরে কোনো এক নির্জন আকাশে
একটি তারা আজও জ্বলে থাকে মৃদু বিষাদে।

মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া মায়ারা সব মরে না,
কিছু কিছু থেকে যায় শিশির হয়ে ঘাসের পাতায়,
আর আমি, মাটির কাছে ফিরে এসে শিখেছি -
সব আলো উজ্জ্বল নয়, সব স্বপ্নও নয় চিরস্থায়ী।

যা ভেঙে যায়, তারও থাকে এক গোপন সৌন্দর্য,
যেমন শরতের শেষে কুয়াশা নামে,
আর নিঃশব্দে পৃথিবী হয়ে ওঠে আরও মায়াবী।


৯.      বিষণ্ণ বিকেলের কাছে


মুখ তুলে তাকালেই দেখি
বিকেলের আকাশে কেমন এক অনন্ত ক্লান্তি 
জমে আছে,
মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে ভেসে আসে
কবরস্থানের বাতাসে ছড়ানো কর্পূরের গন্ধ,
কী এক অদ্ভুত স্মৃতির মতো,
যেন কেউ নীরবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

বাতাসে তখন পাখিদের ডাকও
কেমন যেন অস্ফুট হয়ে আসে,
রোদ ধীরে ধীরে গাছের ছায়ায় ডুবে যায়,
আর হৃদয়ের ভিতর
কার যেন পদশব্দ শুনি বারবার।

যাদের সঙ্গে একদিন
অনেক কথা ছিল, অনেক আলো ছিল,
তারা আজ কেবল দূরের নক্ষত্র,
শীতল, নিঃসঙ্গ, নিঃশব্দ -
তবু তাদের জন্যই
অকারণ চোখ ভিজে ওঠে সন্ধ্যার আগে।

কখনো মনে হয়,
এই পৃথিবী আসলে একটি দীর্ঘ বিদায়ের আয়োজন,
মানুষেরা আসে, কিছু হাসি রেখে যায়,
কিছু অসমাপ্ত স্পর্শ, কিছু নামহীন অভিমান *
তারপর একদিন
কর্পূরের গন্ধের মতো মিলিয়ে যায় আকাশের দিকে।

আর আমি বিকেলের শেষে
অকারণে জানালার পাশে বসে থাকি,
অসীম বিষণ্নতা এসে বসে থাকে পাশে,
যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো সঙ্গী -
যার চোখে নীরবতার জল,
আর যার কণ্ঠে কেবল একটি কথাই ভেসে আসে-
সবকিছুই একদিন চলে যায়,
শুধু গন্ধ হয়ে থেকে যায় কিছু স্মৃতি,
আর কিছু অসমাপ্ত ভালোবাসা।


১০.      অন্ধকারের ওপারে



আমি জানি , তুমি চলে গেছ নক্ষত্রেরও ওপারে -  প্রতিটি সন্ধ্যা নামলে তোমার অনুপস্থিতি তাই
গভীর হয়ে ওঠে।

বাতাসে কিসের যেন অচেনা গন্ধ আসে, 
মনে হয়, কোনো দূর অন্ধকারে বসে তুমি হয়তো এখনও একটি পুরোনো দিনের কথা ভাবছ।

আমাকে কী তোমার মনে পড়ে?
যেমন আমার মনে পড়ে- হঠাৎ ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মতো, অকারণ বিষণ্ন কোনো বিকেলের মতো, 
জানালায় বৃষ্টির প্রথম শব্দের মতো।

অনেক কথা বলা হয়নি, 
অনেক অভিমান রয়ে গেছে বুকের গোপন কুঠুরিতে, তবু মনে হয়, সমস্ত না-বলা কথারও একটি আলো আছে, যা নিভে যায় না মৃত্যুর পরেও।

মাঝে মাঝে গভীর রাতে একটি তারাকে 
অন্যসব তারার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হয়, 
তখন ভাবি, হয়তো তুমি সেখানেই আছ, 
অদৃশ্য কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে 
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছ চুপচাপ।

আর যদি সত্যিই আরেকটি দেখা হওয়ার 
দেশ থেকে থাকে, তবে একদিন সমস্ত অন্ধকার, 
সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে তুমি আবার ডাকবে 
আমার নাম।

সেদিন অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া বিকেলের মতো 
আমিও নীরবে বলব -
দেখো, এতদিন পরেও তোমাকে ভুলতে পারিনি; তোমার জন্যই আমার হৃদয়ে এখনও একটু মায়াময় বিষাদ বেঁচে আছে।


১১.      কল্পনার সেই মানুষ


যাকে করেছিলাম কল্পনা,
সেই এসে জড়িয়ে নিল আমার সমগ্র জীবন -
যেন বহুদিনের অনিদ্রার শেষে
হঠাৎ নেমে এল শান্ত কোনো ভোর।

আমি ভেবেছিলাম, মানুষটি বুঝি
শুধুই থাকবে মেঘের মতো দূরে,
অথচ সে এসে নিঃশব্দে বসে পড়ল
আমার সমস্ত একাকিত্বের পাশে।

তার চোখে ছিল সন্ধ্যার আলো,
কণ্ঠে ছিল অচেনা নদীর সুর -
আমি ধীরে ধীরে ভুলে গেলাম
কত দীর্ঘ ছিল বিষণ্নতার পথ।

কখনও মনে হয় -
মানুষেরা কি সত্যিই এমন করে আসে?
নাকি কোনো সুদূর নক্ষত্রের দেশে
অনেক আগে থেকেই লেখা ছিল এই মিলন?

তাই আজও নিশীথের অন্ধকারে
চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি -
কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা
ফুলের মতোই নীরবে ফোটে।


১২.   স্মৃতিটুকু থাক্

সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসে অচেনা কোনো
গানের সুর,
ঝরা শিউলির গন্ধে জেগে ওঠে হারানো দিনের
উদাস দুপুর।

যারা চলে গেছে, তারা কি সত্যিই দূরে
চলে যায়?
নক্ষত্রের আলো হয়ে তারা কি নিভৃত আকাশে
নিঃশব্দে ভেসে রয়?

আমি শুধু চুপচাপ শুনি সময়ের বিষণ্ন
বাঁশির ডাক,
সব হারানোর পরও তোমার স্মৃতিটুকুই
নিভৃতে আমার হৃদয়ে থাক্।


১৩.     হঠাৎ মনে পড়ে


অনেক আনন্দময় ক্ষণে হঠাৎই তোমাকে মনে পড়ে,
রৌদ্রভেজা দুপুরে কিংবা বৃষ্টিমাখা অলস বিকেলে,
তোমার ফেলে যাওয়া কিছু কথা নিঃশব্দে ফিরে আসে মনের আঙিনায়।

কোনো প্রিয় গানের সুরে জেগে ওঠে বিস্মৃত স্পর্শের আবেশ,
শিউলি-ঝরা পথের ধারে মনে হয়, তুমি বুঝি এখনও আছ খুব কাছে।

যত দূরেই যাও না কেন, স্মৃতিরা তো দূরত্ব মানতে শেখেনি,
তারা নক্ষত্রের মতোই জ্বলে ওঠে অকারণে, গভীর রাত্রির নির্জনতায়।

তাই আনন্দের মধ্যেও কোথাও এক কোমল শূন্যতা রয়ে যায়,
আর সেই শূন্যতার ভেতরেই তোমার নামটি নীরবে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।


১৪.       ফিরে ডেকো না


তুমি আর ডাকো না আমাকে জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে,
খুঁজো না আর অলিন্দ খুলে দূরের দীঘির ঘাটে
যেখানে ছিলাম আমি দাঁড়িয়ে -
সেই বিকেলের রোদ আজ বহুদিন নিভে গেছে,
শিউলির গন্ধে ভরা পথটিও হারিয়েছে, 
জোনাকিদের গোপন আলোর মতো
আমিও মিশে গেছি অনন্ত সন্ধ্যার আঁধারে। 

তুমি আর অপেক্ষা কোরো না জানালার পাশে,
বকুলঝরা উঠোনে রেখে দিও না কোনো অভিমান,
কুয়াশাভেজা ভোরে যে পায়ের শব্দ শুনতে পেতে,
সে তো অনেককাল হলো হয়েছে স্মৃতিরই গান।

নদীর ওপারে যে কাশফুল দুলে ওঠে নিঃশব্দে,
তারাও জানে, ফিরে আসা সবসময় সম্ভব নয়,
কিছু মানুষ নক্ষত্র হয়ে থাকে দূর আকাশে,
কেবল আলো পাঠায়, কাছে এসে ধরা দেয় না আর।

যদি কোনোদিন শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভিজে ওঠে মন,
যদি হঠাৎ মনে পড়ে যায় অকারণ কোনো কথা,
তবে ভেবো, আমি আছি -
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পুরোনো নামে।

আর যদি নিশীথ রাতে বাতাসে কেঁপে ওঠে পর্দা,
মনে কোরো না, আমি ফিরে এসেছি আবার -
শুধু হয়তো কোনো বিস্মৃত ভালোবাসা
নীরবে ছুঁয়ে গেছে তোমার ঘুমন্ত চোখ।

তাই তুমি আর ডাকো না আমাকে,
জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে -
আমি এখন সময়ের অতল জলে ভেসে থাকা
এক নামহারা প্রতিধ্বনি, দূরের দীঘির নিস্তব্ধ ঘাটে
যেখানে একদিন ছিলাম দাঁড়িয়ে।


১৫.     অনুপস্থিতির দুই প্রান্তে 


আমি যাকে মনে করি, সে আমায় মনে করে না -
এ কথা কোনোদিন বিশ্বাসের আলোয় আনতে পারিনি,
যাকে ভালোবেসেছি স্বচ্ছ নদীর মতো,
সে ভালোবাসবে না আমায়, এমন নিষ্ঠুর সত্য মানিনি।

পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে
আমি যার নামের জন্য উদাস বাতাসে ফিরি,
যার অনুপস্থিতিতে জেগে থাকে দীর্ঘ রাত্রিরা,
সে কি আমার জন্য একটুও ব্যাকুল হবে না, 
ভাবতেই পারি না।

হয়তো অন্য কোনো আকাশের নিচে,
সে-ও আমার মতোই গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
হয়তো আমার নামটুকু উচ্চারণ না করেও
আমার স্মৃতির প্রদীপ জ্বেলে রাখে নির্জনে।

ভালোবাসা তো শুধু একতরফা পথ নয়,
তারও আছে অদৃশ্য প্রতিধ্বনির আয়োজন -
আমি যেমন তাকে খুঁজি নক্ষত্রভরা সব রাতে,
তেমনি কোনো গহন বিষণ্নতায়
সে-ও হয়তো খুঁজে ফেরে আমারই অনুপস্থিত 
আমারই ছায়া।


১৬.       তোমার বুকের পরে


আমার পৃথিবী ছোট হয়ে আসে তোমার
বুকের পরে,
তুমি পাশে থাকলেই হাজার বছর বাঁচতে
ইচ্ছে করে।

তুমি পাশে থাকলেই মনে হয়, মৃত্যু নয় -
অনন্তের পথ ধরে,
আরও হাজার জন্ম বাঁচতে ইচ্ছে করে
তোমার বুকের পরে।

তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় জেগে ওঠে
হারানো স্বপ্নের ঘোরে,
চোখের মায়ার গভীর মগ্নতায়
জীবন খুঁজে পাই তোমার বুকের পরে।

যত দূরেই যাক সময়, যতই বদলে যাক
পৃথিবীর রূপ, রং, রোদ্দুরে,
আমার সমস্ত প্রেম, সমস্ত  আকুলতা
এসে থেমে থাকে তোমার বুকের পরে।

যদি কখনও নিভে আসে জীবনের প্রদীপ,
শেষ প্রার্থনাটুকুও থাকবে তোমারই তরে -
মৃত্যুকেও ভুলে গিয়ে আরও একবার
জন্ম নিতে ইচ্ছে করবে তোমার বুকের পরে।


১৭.      বিলম্বিত আগমন


তুমি এসেছিলে অবশেষে -
যখন আমি আর এই পার্থিবে নেই,
শুকনো ঝরাপাতার মতো ঝরে গেছি ,
ফিরে দেখার জন্য রেখে গেছি 
কেবল কিছু ক্ষীণ ঋণ।

যে প্রদীপটি জ্বলত তোমার প্রতীক্ষায়,
অনেক আগেই তার শেষ আলোটুকুও নিভে গেছে,
তবু বাতাসে রয়ে গেছে আমার উচ্চারিত নাম। 

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে, 
আর চারদিকে ছিল গভীর সন্ধ্যা,
আমি তখন দূর নক্ষত্রের দেশে নিঃসঙ্গ, নিরুপায় -
শুধু শিশিরভেজা ঘাসের উপর নেমে এসেছিল 
এক দীর্ঘ বেদনা,
যেন দেরিতে এসে তুমি শুনতে পেয়েছিলে 
আমার শেষ অপেক্ষার কান্না।


১৮.      কবে বৃষ্টি হয়েছিল


কবে বৃষ্টি হয়েছিল, 
আজ আর ঠিক মনে পড়ে না,
মনে আছে ভেজা বিকেলের বিষণ্নতার কথা -
তুমি খুব ধীরে বলেছিলে কিছু কথা,
মেঘের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল সেই কথকতা। 

কোন্‌ পাখি ডেকেছিল দূরের বনপথ ধরে,
আজও সে সুর ভেসে আসে -
কবে বৃষ্টি হয়েছিল - মনে নেই আর,
শুধু মনে আছে, তোমার চোখে ছিল শ্রাবণের 
অন্ধকার।

তোমার স্মৃতি হয়ে ওঠে সন্ধ্যার ভাষা,
যখন রাত নামে, নক্ষত্রেরা জেগে থাকে আকাশজুড়ে,
মনে হয়, সেই বৃষ্টিভেজা দিনটি এখনও ঘুমিয়ে আছে তোমার বুকের পরে।

সময়ের নদী কত দূরে নিয়ে গেছে আমাদের দু'জনকে,
তবু হঠাৎ বৃষ্টির গন্ধে তোমাকেই মনে পড়ে -
অবেলাতে, নিভৃত ক্ষণে।


১৯.    মেঘজল ও বুনো জলপদ্ম


কালো মেঘের মতো চুল ঢেকে দিয়েছিল
তোমার গোল্লাছুট খেলার পিঠ,
অর্ধেক নেমে এসেছিল উপত্যকার টিলা ছুঁয়ে
লতাগুল্মের নিভৃত সংগীতে।

ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
ধীরে ধীরে জল হয়ে গিরিপথ বেয়ে
অচেনা কোনো অতল খাদে নেমে যায়,
আর সেখানে ফুটে ওঠে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম।

তোমার চোখে ছিল বর্ষার প্রথম বিদ্যুৎ,
ঠোঁটে ছিল সন্ধ্যার রক্তিম নক্ষত্রের আলো,
আমি শুধু বিস্মিত পথিকের মতো
দাঁড়িয়ে শুনেছি নীরবতার বাঁশি।

কত অরণ্য, কত নদী, কত সুগন্ধি বাতাস
সেদিন এসে জড়ো হয়েছিল আমাদের চারপাশে-
যেন পৃথিবীর আদিম কোনো প্রেমগাথা
শিউলি-ঝরা রাতে আবার ফিরে এসেছে।

আর দূরের আকাশে ভেসে থাকা চাঁদ
মেঘের আড়াল থেকে চুপি চুপি দেখে গেছে -
দুটি নিঃশ্বাসের মধ্যিখানে
কীভাবে জন্ম নেয় হাজার বুনো জলপদ্মের স্বপ্ন।


২০.     অনন্তের পরে


নিভে গেলে প্রদীপ, জেগে থাকি 
নক্ষত্রের দেশে,
হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসি একই 
স্বপ্নের বেশে।
শিউলি-ভেজা ভোরে তোমার নাম 
ডাকে বাতাস,
সন্ধ্যার পাখিরা জানে আমাদের 
পুরোনো ইতিহাস।

যত দূরে যাই, তত কাছে আসে মধুর  
কোনো ক্ষণ,
সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাজে 
চেনা স্পন্দন,
যদি এক জন্মে হারাই, অন্য জন্মে 
খুঁজে নিও,
অচেনা মুখের ভিড়ে আমায় চোখের 
ভাষায় চিনে নিও।

ফুরিয়ে যাবে যুগ, ফুরোবে না হৃদয়ের 
এই আবেশ -
জন্ম থেকে জন্মান্তরে ভালোবেশে 
জীবন করিও শেষ।


২১.    স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে


আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে,
যাও যত দূরেই-তুমি রবে হৃদয়ের গোপন কুটিরে লুকিয়ে।

সময়ের নদী বয়ে যাবে তার আপন স্রোতের টানে,
তবু কিছু বিষণ্ন বিকেল ফিরে আসবে শুধু তোমারই নামে।

জ্যোৎস্না-ভেজা কোনো নিঃসঙ্গ রাতে হঠাৎ মনে 
পড়বে আবার,
ফেলে আসা সেই পথের মায়া, সেই প্রথম প্রেমের অলিখিত অঙ্গীকার।

হয়তো আর দেখা হবে না পৃথিবীর ব্যস্ত জনারণ্যে,
তবু তোমার স্পর্শ রয়ে যাবে আমার গানের সুরে, স্বপ্নের অনন্ত প্রাঙ্গণে।

ঝরে যাবে কত ঋতু, বদলে যাবে সময়ের রঙ 
আর পরিচয়,
তবু ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই- শেষ কোথায় তার হয়!

আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, শেষ হয় না 
সত্যিকারের প্রেম,
জন্ম পেরিয়ে জন্মান্তরে তুমি রবে- স্মৃতি হয়ে, 
যেন নিকষিত হেম।


২২.     বৃষ্টির আড়ালে


তুমি কাঁদবে বলে - উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে, 
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো -
তুমি ভিজলে, গোপন করলে তোমার 
চোখের জল।

আকাশ বুঝি আগেই জেনে রেখেছিল 
তোমার সকল অভিমান,
তাই মেঘেরা নেমে এলো সঙ্গী হয়ে।

ভেজা শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখলে 
না-বলা শত কথা,
দূরের কদমগাছ শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

আমি তখন দূরে, হঠাৎ বুকের ভেতর অকারণে 
বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল এক বিকেল,
মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ
বৃষ্টির শব্দে ঢেকে রেখে কাঁদছে আমারই জন্য।

আর সেই কান্না আজো ভেসে আসে 
শ্রাবণের গভীর রাতে জোনাকির নিভু আলোয়,
জন্মে জন্মে হারিয়ে ফেলা কোনো 
প্রিয় চোখের অশ্রুর মতো।


২৩.     জন্মান্তরের চেনা


হয়তো কোনো শ্রাবণ রাতে কদমফুলের 
গন্ধে ভেসে -
আমার নামই ডেকেছিল সে নিভৃত নদীর 
তীরে এসে।

হয়তো কোনো কুয়াশাভেজা ভোরে 
শিউলিপাতার নিচে -
দু'জনার হারানো স্বপ্ন জেগেছিল খঞ্জনা
পাখির পিছে।

চাঁদের আলো ঝরে পড়েছে বহু শতাব্দী 
ধরে ধীরে -
তবু তার চোখ চিনে নিয়েছে আমায় বারে
বারে ফিরে।

যত দূরেই যাই না কেন, যত জন্মই 
যাক ফুরিয়ে -
সে-ই যেন অপেক্ষায় থাকে কাশবনে --
অলকানন্দা ঝাড়ে।

হয়তো কোনো অচেনা পথে সন্ধ্যা নেমেছে 
বিষণ্ন হয়ে -
তবু তার মায়াভরা মুখ ভেসে ওঠে নিঃশব্দ 
বৃষ্টিস্রোতে বয়ে।

যখনই হারাই আমি সময়ের অসীম 
অন্ধকারে -
সে যেন প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে আমার 
সকল হাহাকারে।

একদিন সব পথ ফুরাবে, নিভে যাবে 
পৃথিবীর নীল -
তবু দু'জনার ভালোবাসা রবে নক্ষত্রের মতো 
অবিনাশী, সুনীল।

আর যদি আবার জন্ম হয় কোনো শ্যামল 
গ্রামের নিভৃত নীড়ে -
সে-ই যেন খুঁজে নেবে আমায়, কাশবনে -
অলকানন্দার ঝাড়ে।


২৪.      শেষ বিকেলের স্বপ্ন 


আমি তো চেয়েছিলাম, বৃদ্ধ বয়সের কোনো শান্ত বিকেলে,
তোমার কাঁপা হাতটা ধরে ধীরে ধীরে সূর্যাস্ত দেখতে।

চেয়েছিলাম, ঝরে-পড়া পাতার শব্দে দু'জন 
ফেলে আসা দিনের গল্পগুলো আবার নতুন করে বলতে।

চেয়েছিলাম, সন্ধ্যার পাখিরা যখন ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন তোমার চোখের গভীরে আমার শেষ আশ্রয় খুঁজতে।

চেয়েছিলাম, সময়ের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গিয়ে,
এক কাপ উষ্ণ চায়ের ধোঁয়ায় ভালোবাসার পুরোনো দিনগুলো ছুঁতে।

চেয়েছিলাম, পৃথিবী যখন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বে,
তোমার কাঁধে মাথা রেখে জ্যোৎস্নাভেজা রাতের গান শুনতে।

আর,
যদি কোনো একদিন মৃত্যু এসে দাঁড়ায় দুয়ারে,
শেষবার তোমার হাতটা ধরে বলব --
আমাদের ভালোবাসা ফুরোয়নি এখনো,
সূর্য ডুবে গেলেও আকাশে রয়ে গেছে তার
দ্যুতিময় রঙের আবেশ।



২৫.       বসন্তের খোঁজে 



আমি তো চেয়েছিলাম রঙের গল্প,
চেয়েছিলাম আবির ছুঁয়ে দিক আমার অবয়বে -
যখন বসন্ত নামে উঠোনে,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি একা -
হাতে কোনো রং নেই। 

আমার সেই বান্ধবীর হাসি কি 
এখনও বেঁচে আছে?
নাকি সে-ও আমার মতোই
কোনো অচেনা শূন্যতায়
নিজেকেই খুঁজে ফিরছে বারবার?


২৬.      সমাধিফলকে লেখা নেই


তুমি রয়েছ নিদ্রিত সময়ের ওপারে কিংবা আমারই 
শ্বাসের পাশে নীরবে, কিছু বিষণ্নতায় -
রয়ে গেছো অপ্রকাশিত নামে, ডুবে থাকা কোনো 
গুপ্ত উপাখ্যানে, আছো তুমি অশেষ অপেক্ষার 
ভেজা অন্ধকারে। 

কিছু উচ্চারণ, আর কিছু অব্যক্ত থেকে যাওয়া কথায় -
আজও তুমি বিলুপ্ত দিনের ছাপ হয়ে আমার অস্থিমজ্জায়, জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো নিভে গিয়েও জেগে আছো -
এক অনন্ত স্মৃতির নিঃশব্দ এপিটাফ হয়ে।


২৭.      অভিমানের পরে


সে একদিন চোখ ভিজাইয়া কইছিলো -
যদি হারাইয়া যাই,
আমারে আরেকবার ডাইকা নিও,
না হইলে এই মন আর বাঁচবো না।

সন্ধ্যার আলো আঁধারে জোনাকির ডানায়
যখন আলো নিভে যায় রাতের গভীরে, 
তখন তারে মনে পড়ে -
দূরের সংসারে, আপন মানুষগুলোর ভিড়ে
সে যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া থাকে
সে যখন স্বপ্ন দেখাদেখিতেও নেই। 

চইলা যাওয়া দোষের কিছু না -
মানুষ তো শেষমেশ দূরেই সইরা যায়,
খালি কিছু কথা
অপূর্ণ প্রতিজ্ঞার মতো
জানালার ফাঁক দিয়া ঢুইকা পড়া হাওয়ায়
একা একা কাঁপতে থাকে।

তারে মনে পড়ে -
বৃষ্টি থাইমা গেলে যেমন মাটিতে রাইখা যাওয়া 
গন্ধ মনে পড়ে, ঠিক তেমনি তারে মনে পড়ে।


২৮.       দূরত্বের আলো



দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
যেন সন্ধ্যার তারা- ছোঁয়া যায় না, তবু পথ দেখায় -
কাছাকাছি এলে কত কথা হারিয়ে যায় বাতাসে,
দূরে থাকলেই তুমি ভেসে ওঠো স্পষ্ট নীল আকাশে।

দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
কাছে এলে বিকেলের নদীতে হেলে পড়া কোনো নিঃশব্দ আলো নেমে আসে চোখের ভিতর। 

তুমি হেঁটে যাও -
আর শিউলি-ঝরা পথগুলো গোপনে তোমার নাম উচ্চারণ করে,
উত্তরের হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় আমার একাকী বারান্দা।

দূরত্বেরও বোধহয় নিজস্ব এক মায়া আছে -
তাই না-পাওয়া জিনিসগুলো এত সুন্দর লাগে,
রাত্রির তারাদের মতো তুমি জ্বলে থাকো দূরে,
আর আমি জেগে থাকি, 
তোমারই আলোয় ভিজে থাকা এক দীর্ঘ 
অপেক্ষা হয়ে।


২৯.      যমুনার কাছে


আমার সেই যমুনা- অলস বিকেলের রোদে যার জলে ভেসে থাকে শৈশবের মুখ, মায়ের ডাকার মতো স্নেহ।
শ্যামল তীরের ঘাসে বসে কতদিন দক্ষিণের বাতাসে শুনেছি অকারণ বিষাদেরও এক মধুর কলধ্বনি।

আকাশভরা আলো নেমে এলে নীল আর সবুজের মাঝখানে প্রসারিত দিগন্ত আমাকে ডেকে বলে - ফিরে এসো, এইখানেই তোমার নাম লেখা আছে।

জলের ভিতরে জেগে ওঠে সন্ধ্যার তারারা, নির্জন কাশবনে ঘুমিয়ে পড়ে পাখিদের ক্লান্তি- আমি সমস্ত শরীরমন ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করি সেই স্নিগ্ধ মাতৃস্নেহে।

মনে হয়, জন্মে জন্মে যদি কোথাও ফিরে আসতে হয়, তবে এই যমুনার তীরেই- যেখানে আনন্দ আর ব্যাকুলতা একই ঢেউয়ের ভিতর মায়ার মতো জড়িয়ে থাকে অনির্বচনীয় দিনরাত্রি।


৩০.      ঠোঁটের কাছে

তোমার ঠোঁট, দুই পাপড়ি লবণমাখা সন্ধ্যা,
যেখানে দিনের সমস্ত ক্লান্ত পাখিরা এসে
ডানা গুটিয়ে বসে থাকে।

আমি যখন তোমার দিকে তাকাই,
মনে হয় কোনো প্রাচীন সমুদ্র
তার গোপন জোয়ার তুলে রেখেছে
দুটি নরম তটে।

তোমার ঠোঁটের কোণে যে হাসি জমে থাকে,
সে যেন বৃষ্টিভেজা বকুলের গন্ধ -
দেখা যায় না,
তবু চারপাশের বাতাসকে বদলে দেয়।

কখনও মনে হয়,
ওখানে এক ফোঁটা লাল মদিরা রাত্রি ঘুমিয়ে আছে,
কখনও মনে হয়,
অপরিচিত কোনো গ্রহের আলো
পৃথিবীতে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার ঠোঁটের কাছে এলে
আমার সমস্ত উপমা ভেঙে যায় -
গোলাপ, শিশির, চাঁদ, সমুদ্র,
সবই হঠাৎ অপ্রতুল মনে হয়।

তখন শুধু মনে হয়,
পৃথিবীর আদিমতম কোনো প্রেম
দুটি নরম পাপড়ির ভেতর বসে
ধীরে ধীরে তার আলো জ্বালিয়ে রাখছে।


৩১.      ত্রিশ বছরের প্রতীক্ষা


তাহার সাথে আবার দেখা হইল- 
ঠিক ত্রিশ বছর পর। সময়ের দীর্ঘ নদী পার হইয়া 
দুইটি ক্লান্ত হৃদয় আবার এক মুহূর্তের জন্য 
একই আকাশের নীচে দাঁড়াইল।

হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল- সেই জ্যোৎস্নাভেজা রাত্রি, নদীর পারে ঝরিয়া পড়া জলের কলতান, 
বকুলের গন্ধে ভিজে থাকা পথ, 
আর হাতের কাছে এসেও না-ধরা 
কিছু স্বপ্নের কথা।

কত প্রেম ছিল, কত না-বলা অভিমান, 
কত চিঠিহীন দিন আর নিঃশব্দে কাঁদিয়া ওঠা 
কত রাত্রি- সব যেন একে একে ফিরিয়া আসিল 
স্মৃতির জানালা ঠেলিয়া।

বিদায়ের সময় ত্রিশ বছর আগের মতোই সে আবার মৃদুস্বরে বলিল-  'আবার কবে দেখা হইবে?'
প্রকম্পিত কণ্ঠে বলিলাম-  হয়তো আরও ত্রিশ বছর পর...।'

সে তখন আনত নয়নে কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া 
ম্লান হাসিতে বলিয়াছিল- 'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'

আজ এতকাল পরে সেই কথাটিই জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসে বুকে।
কারণ বুঝিয়াছি-  মানুষ শুধু বয়স লইয়া বাঁচে না, মানুষ বাঁচিয়া থাকে কাহারও স্মৃতিতে, কাহারও অশ্রুজলে, কাহারও গভীর নীরবতায়।

হয়তো আবার দেখা হইবে না- 
তবু কোনো পূর্ণিমা রাতে, নদীর পারে বাতাস উঠিলে, জলপতনের শব্দ শুনিলে, আমি এখনও মনে মনে শুনিতে পাই -

'আবার কবে দেখা হইবে?'

আর দূর নক্ষত্রের আলোয়, অদৃশ্য কারও আনত নয়নের ভিতর হইতে ভেসে আসে সেই মায়াময় প্রশ্ন-
'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'

যেন ভালোবাসা কখনও মরে না, শুধু অপেক্ষার 
বয়স বাড়িতে থাকে।


৩২.       চোখে যেন না নামে বৃষ্টি


সারা আকাশ মেঘে ঢেকে
দিনরাত ঝরুক জল,
নদী ভাসুক, মাঠ ভিজুক,
সবুজ হোক ধরাতল।

বজ্র নামে দূর গগনে,
ঝড় উঠুক অচেনা ক্ষণে,
তবু যেন কাঁপন না লাগে
তোমার স্বপ্নের বাগানে।

সারা বছর বৃষ্টি হোক,
ভিজুক পৃথিবীর সব পথ -
শুধু না ভেজে তোমার চোখ,
সেখানে থাকুক রোদের রথ।

যত কান্না আছে পৃথিবীতে
আমার জানালায় এসে ঝরুক,
তোমার দুটি চোখের ভেতর
শুধু ভালোবাসার আলো ভরুক।


৩৩.     জ্যোতির্ময় করো


আমাদের পদচিহ্নে একদিন জেগে উঠেছিল অরণ্য ঘুমন্ত পাতার ভেতর সবুজের গোপন উৎসব। দুপুরের সূর্য নেমে এসেছিল পাহাড়ের কাঁধে, শিলার গায়ে গায়ে আগুনরঙা আলোর আরতি জ্বেলে। 

জলপ্রপাত ছুটেছিল উন্মত্ত প্রেমিকের মতো, পাথরের বুকে আঘাত হেনে গেয়েছিল অনন্ত সঙ্গীত, আর আমরা ঝরনার স্বচ্ছ জলে ধুয়ে নিয়েছিলাম পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি।

আজও অরণ্য সবুজের মদিরায় দুলে ওঠে, আজও পাহাড় উষ্ণ হয় সূর্যের গভীর স্পর্শে, আজও বাতাস বয়ে আনে অচেনা ফুলের গন্ধ, আজও ঝরনার জলে আকাশের নীল ভেঙে পড়ে। সময় চলে যায়, তবু প্রকৃতি তার প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলে না কখনও।

শুধু তুমি নেই, তবু তোমার উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে নদীর জলে, ঘাসের জঙ্গলে , সন্ধ্যার নক্ষত্রে। যেন প্রতিটি ঢেউ তোমার নাম উচ্চারণ করে, প্রতিটি বাতাস তোমার চুলের সুবাস হয়ে আমার নিঃসঙ্গতাকে ছুঁয়ে যায়।

এসো, আমাকে আলিঙ্গন করো নদীর মতো, যেমন নদী দুই তীরের সমস্ত দূরত্ব ভাসিয়ে নেয়। জড়িয়ে ধরো সাগরের মতো, যেমন গভীরতা তার সমস্ত গোপন ব্যথাকে বুকে আশ্রয় দেয়। মিশে যাও মোহনার মতো, যেখানে পৃথক স্রোতেরা ভুলে যায় নিজেদের পরিচয়।

চুম্বন দাও, যেমন ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে দেয় শিশিরভেজা পৃথিবী, যেমন জননীর কোলে ঘুমিয়ে থাকা দেবশিশুর কপালে আশীর্বাদের কোমল স্পর্শ।

এসো বাহুবন্ধনে, আমার সমস্ত অন্ধকারে আলো হয়ে। এসো, আমার রক্তে, আমার স্বপ্নে, আমার অনন্ত প্রতীক্ষায় সূর্যের মতো দীপ্ত হয়ে জ্বলো,এসো, আমার প্রেমকে জ্যোতির্ময় করো।


৩৪.      মায়ার ঘুম


সেই চোখ যেদিন প্রথম দেখিলাম, দীঘির জলে তখন সন্ধ্যার আকাশ ভাসিতেছিল, কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে অচেনা এক নীল বিষণ্নতা ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল পৃথিবীর বুকে।

তোমার চোখে ছিল জলের ভাষা, কোনও উচ্চারণ ছিল না, তবু কত শত অব্যক্ত বাক্য ঢেউ হইয়া ভাঙিতেছিল আমার অন্তরে।

মনে হইয়াছিল, তুমি বুঝি বহু জন্মের পথ হাঁটিয়া আসিয়াছ, ক্লান্ত পাখির মতো একটু মায়ার আশ্রয় খুঁজিয়া।

আমি তোমার দিকে তাকাইয়া ছিলাম, তুমি আমার দিকে, মধ্যখানে শুধু কাঁপিতেছিল জ্যোৎস্নাভেজা নীরবতা।

তারপর তুমি কিছুই বলিলে না, শুধু চোখের কোণে একফোঁটা অদৃশ্য শিশির রাখিয়া ধীরে ধীরে ঘুমাইয়া পড়িলে।

আজও সেই ঘুমের শব্দ শুনি, রাত গভীর হইলে, চাঁদের আলো যখন দীঘির জলে নিঃশব্দে ভাঙিয়া পড়ে।
মনে হয়, তুমি এখনও সেখানে আছো, জলরেখার ওপারে, মায়ার ভিতরে, একটি স্বপ্ন হয়ে, যাহাকে ছুঁইতে গেলে জাগিয়া ওঠে শুধু অশ্রুর আলো।


৩৫.      রমণী 


আমাদের দেহ নদীর মতো,
কখনও নুড়ির নীরবতা, কখনও বালিয়াড়ির দীর্ঘশ্বাস,
কখনও ঝর্ণার উচ্ছ্বাসে রিমঝিম ভেঙে পড়ে 
আলোর জল -
এক কূল ভাসে, অন্য কূল প্লাবিত হয়,
তবু প্রেমের উৎস কখনও ফুরায় না।

আমাদের চান্দ্র-চুম্বনগুলি চিকচিকে জলের মতো,
সমুদ্রের শুভ্র ফেনার মতো ক্ষণস্থায়ী 
অথচ অনন্ত, আবার হাঙরের দংশনের মতোই গভীর,
তাদের আশ্লেষ লেগে থাকে ঠোঁটে, 
চিবুকে, শ্বাসে, রাত্রির সমস্ত নক্ষত্রালোকে।

আমাদের দেহ স্বচ্ছ আয়নার মতো,
বিধৌত চরাচরের মতো নগ্ন ও নিবিড়
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ নিজেরই প্রতিচ্ছবি 
হয়ে ফিরে আসে -
আঙুলের আঁচড়ে জেগে ওঠে রক্তিম ফুল,
করুণা থাকে না, মমতা থাকে না -
থাকে শুধু দহন, এবং এক অবিনশ্বর 
আত্মসমর্পণের দীপ্তি।

প্রতিক্ষণ আমরা ক্ষত হই,
খুলে যায় সকল বন্ধন, সকল বন্ধনী
উপত্যকা ভেঙে পড়ে, 
চাঁদ বিক্ষত হয়, তারারা একে একে নেমে আসে আমাদের বালিশে।

তখন আর জানা যায় না,
কে তুমি, কে প্রেমিকা, কে কুলবধূ, 
সব পরিচয় গলে গিয়ে রয়ে যায় 
শুধু এক আদিম নারী, আর এক অনন্ত প্রেম, 
যার কাছে পৃথিবীর সমস্ত নদী এসে
নিঃশব্দে সমুদ্রে মিশে যায়।


৩৬.      রয়েছ তুমি জীবন জুড়ে 


তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
আর কোনো শূন্যতা নেই -
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
নিঃসঙ্গতার সব দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।

তুমি আছো বলেই
জানালার ধারে বসে থাকা বিকেলগুলো
অকারণে বিষণ্ন হয় না আর।

আমার প্রতিটি ভোরে
তোমার আলো এসে জড়িয়ে ধরে শিশিরকে,
প্রতিটি রাত্রি
তোমার স্বপ্নের চাঁদে ধুয়ে নেয় ক্লান্ত হৃদয়।

তুমি রয়েছ বলেই
নদী জানে সাগরের ঠিকানা,
বাতাস জানে ফুলের গন্ধের অর্থ,
আর আমি জানি -
ভালোবাসা কখনও শুধু একটি শব্দ নয়।

তোমার দুটি চোখে
আমি আমার ভবিষ্যৎকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখি-
যেন বহুদিনের পথচলা শেষে
একটি পাখি ফিরে পেয়েছে নিজের নীড়।

যদি কোনোদিন
সব আলো নিভেও যায় পৃথিবী থেকে,
তবু তোমার মায়ার প্রদীপটুকু
আমার অন্তরে জ্বলতেই থাকবে।

তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
তাই প্রতিটি ঋতুই আমার কাছে বসন্ত -
তুমি রয়েছ আমার সমস্ত অস্তিত্বে,
আর কোনো শূন্যতা নেই,
তোমার নামের ভেতরই আমার 
অনন্ত জীবনের কোমল স্পন্দন।


৩৭.      নীলগিরি পাহাড়ে একদিন 


নীলগিরি পাহাড়ে আমরা ছিলাম একদিন একরাত-
সেই একদিনই আজও একটি অনন্ত ঋতু,
পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নেমেছিল
নীলচে বিষণ্নতার মতো -
মেঘ এসে তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিল,
যেখানে আকাশও মানুষ হয়ে যায়।

তুমি বলেছিলে,
"যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই,
এই পাহাড় আমাকে মনে রাখবে।"

রাত গভীর হলে
তারাগুলো খুব কাছে নেমে এসেছিল।
মনে হয়েছিল,
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়
অপূর্ণ সব স্বপ্ন।

তোমার হাতের উষ্ণতা
আমার শীতার্ত আঙুলে জড়িয়ে ছিল,
যেন পৃথিবীর সমস্ত শীতের বিরুদ্ধে
একটি  অনন্ত প্রতিরোধ।

হঠাৎ দূরের অরণ্যে
কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠল
আমরা দু'জনেই চমকে তাকালাম—
সেই ক্ষণিক ভয়ও
অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হয়ে
আজও বেঁচে আছে স্মৃতির গহিনে।

ভোরে সূর্য উঠেছিল
মেঘের ভাঙা জানালা দিয়ে।
তুমি বলেছিলে -
"দেখো, আলোও কত ধীরে জন্ম নেয়!"

আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম,
কিছু কিছু ভালোবাসাও
এভাবেই আলো হয়ে ওঠে,
তারপর একদিন
অকারণে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।

ফেরার পথে
পাহাড়গুলো আর আমাদের দিকে তাকায়নি,
হয়তো তারা জানত -
যে প্রেম ফিরে আসে না
তার জন্য পথ অপেক্ষা করে না।

যখন কোনো নীল বিকেল নামে,
অথবা মেঘ এসে জানালায় হাত রাখে,
আমি নিঃশব্দে ফিরে যাই
নীলগিরি পাহাড়ের সেই একদিন একরাতে।

সেখানে এখনও
একজোড়া পদচিহ্ন পাশাপাশি আছে -
একটি আমার, আরেকটি তোমার,
শুধু তুমি নেই।


৩৮.     এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায়


এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায় -
মন্দাক্রান্তায় রচিত হয়েছিল সে আবেগে অনুরাগে...
চাঁদের শুভ্র আলোয় নুয়ে পড়েছিল কদমের ডাল,
নদীর জলে জেগেছিল নীরব প্রেমের অনুবাদ।

তার চোখে ছিল নীল আকাশের গভীর বিস্ময়,
ঠোঁটে ছিল অপ্রকাশিত কোনো গানের প্রথম কলি।
আমি শুধু শুনেছিলাম -
নিঃশব্দেরও একটি ভাষা আছে,
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় ভালোবাসা।

বকুলের গন্ধ ভেসে এসেছিল বাতাসের গোপন চিঠিতে,
শিউলি ঝরে পড়েছিল আমাদের পায়ের কাছে -
মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সমস্ত ঋতু বুঝি
সেই একটি সন্ধ্যাতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার বাহুর উষ্ণতায়
জ্যোৎস্নাও পেয়েছিল মানবিক হৃদস্পন্দন;
আমার সমস্ত বিষাদ
একটি সাদা পাখির মতো উড়ে গিয়েছিল
দিগন্তের নীল নির্জনতায়।

তারপর কত পূর্ণিমা এলো,
কত নদী বদলালো পথ,
কত নক্ষত্র নিভে গেল নিঃশব্দে -
তবু সেই সন্ধ্যার আলো
এখনও আমার জানালায় এসে বসে,
মৃদুস্বরে তোমার নাম উচ্চারণ করে।

যদি আবার কোনো পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়,
তবে আর কোনো কবিতা লিখব না -
শুধু তোমার চোখের গভীরে মুখ রেখে
আজীবনের সমস্ত অব্যক্ত প্রেম
নীরবে পড়ে শুনব।


৩৯.      শূন্যতায় তুমি


আমি সমর্পণ করতে চাই - 
তুমি থাকো না-হয় সহস্র আলোকবর্ষ দূরে, 
তবু তোমার নামের ক্ষীণ আলো আমার রাত্রির জানালায় এসে নীরবে বসুক।

এ শহর আজ অদ্ভুত ফাঁকা - 
রাস্তায় নেমে মনে হলো, ইট-পাথরও যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে, মানুষ আছে, অথচ কোলাহল নেই, 
হাসি আছে, অথচ প্রাণ নেই।

জনারণ্যময় রাজপথই আমার বেশি প্রিয় -
সেখানে মানুষের পদধ্বনির ভিড়ে নিজের কান্নার শব্দ হারিয়ে যায়, অগণিত মুখের ভেতর নিজের একাকীত্বটুকুও চুপিচুপি আড়াল করে রাখা যায়।

কিন্তু এই নিস্তব্ধতা - 
সে তো হৃদয়ের ভেতর ধীরে ধীরে জন্ম দেয় 
এক অনন্ত শূন্যতার মহাকাশ, যেখানে শুধু তোমার অনুপস্থিতির নক্ষত্রেরা জ্বলে।

হে প্রভু, এমন শূন্যতা আমাকে দিও না -
যেখানে প্রার্থনাও প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে,
বরং আমাকে সমর্পণ করো মানুষের ভালোবাসায়, পাখির ডানায় ভেসে আসা সকালের গানে, 
বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে, 

আর সেই অমলিন আশায় - 
যেখানে দূরতম আলোকবর্ষ পেরিয়েও কেউ একজন আমার জন্য একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে।


৪০.       অশেষ করেছ


হঠাৎ একদিন শরীর কেঁপে উঠল প্রবল জ্বরে।
সময়ের সমস্ত শব্দ যেন থেমে গেল।
দুই দিন অচৈতন্যের অন্ধকারে ডুবে ছিলাম।
কীবোর্ডে আঙুল ছোঁয়ানোর শক্তিটুকুও ছিল না।
কাউকে কিছু জানাইনি, কেমন এক বিষণ্নতা 
আমাকে ঘিরে রেখেছিল।

বারবার মনে হচ্ছিল,
এই বুঝি সৃষ্টিকর্তা আমাকে তাঁর অদৃশ্য ডাকে ফিরিয়ে নেবেন।
কিন্তু না, তিনি নেননি।

এক জোড়া স্নেহময় হাত, অক্লান্ত সেবাযত্ন, 
আর অগাধ মমতা আমার নিভে-আসা প্রাণে 
আবার আলো জ্বেলে দিল।

মৃত্যুর দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বুঝলাম -
জীবন আসলে প্রতিদিন নতুন করে পাওয়া এক অলৌকিক উপহার।

তখনই অন্তরের গভীর থেকে ভেসে উঠল রবীন্দ্রনাথের সেই অমলিন প্রার্থনা -

“আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব -
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।”

আজ মনে হয়,
আমরা কেউই কেবল নিজের শক্তিতে বেঁচে থাকি না।
অদৃশ্য করুণার স্পর্শে,
কোনো এক মানুষের নিবেদিত ভালোবাসায়,
আর অনন্ত দয়ার ছায়াতেই
জীবন বারবার ফিরে আসে -
নতুন আলোয়, নতুন শ্বাসে, নতুন আশায়।


৪১.     জোনাকির নকশা


এইখানে নিঝুম এসে নামে অতর্কিতে গূঢ় রাতদুপুর, চাঁদেরও যেন সাহস হয় না আমার জানালায় কড়া নাড়ার।

নীরবতার বুক চিরে জোনাকিরা বুনে চলে অদৃশ্য আলোর সূক্ষ্ম নকশা, যেন তোমার নামের আদ্যাক্ষর অন্ধকারের ক্যানভাসে লিখে যায়।

শিরা-ধমনী জুড়ে তোমার সেই এক তীব্র স্পর্শ এখনও রক্তের ভেতর ঢেউ তোলে, সমস্ত দেহ যেন অপেক্ষার এক দীর্ঘ নদী।

আমি কতবার ডেকেছি তোমাকে, বাতাসের কাছে, অশ্বত্থের পাতায়, দূর নক্ষত্রের নিভে-আসা আলোয়। উত্তর আসেনি কোথাও, শুধু রাত আরও গভীর হয়েছে।

তবু জানো, হারিয়ে যাওয়াও কখনও কখনও ভালোবাসার আরেকটি ভাষা। যে ভাষা কেবল জোনাকি, শিশির আর মধ্যরাত্রিরা বোঝে।

যদি কোনো এক রাত্রি প্রহরে তুমি ফিরে আসো, তবে দেখবে, আমার বুকের দরজায় এখনও জ্বলে আছে একটি ক্ষুদ্র আলো, যা কোনোদিন নিভতে শেখেনি।

সেই আলোয় আমরা আবার লিখব অসমাপ্ত স্বপ্নের শেষ অধ্যায়, যেখানে বিচ্ছেদ থাকবে, কিন্তু একাকীত্ব থাকবে না, থাকবে শুধু তোমার নামে জেগে থাকা এক অনন্ত জোনাকির নকশা।


৪২.     যৌবনের রক্তাক্ত দিন


আমাদের যৌবনের রক্তাক্ত দিনে
নির্মোহ ছিলাম, প্রেমে -
নির্লোভ ছিলাম, বিত্তে -
নির্বোধও ছিলাম, তবু স্বপ্নের কাছে পরাজিত হইনি কখনো।

মুঠোভরা আকাশ নিয়ে হেঁটেছি ধুলোমাখা রাজপথে,
ক্ষুধার চেয়েও বড় ছিল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা।

রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে, তবু আদর্শের রং আজও শুকায়নি,
হারিয়ে গেছে কত নাম, অথচ তাদের প্রতিধ্বনি এখনো বাতাসে জেগে থাকে।

আজ ফিরে দেখি, সেই নির্বোধ যৌবনই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ সময়,
কারণ ভালোবাসতেই জানতাম, আর বিশ্বাস করতে জানতাম পৃথিবীকে।


৪৩.     প্রথম কুমুদিনী


যেদিন প্রথম আলো এসে নিঃশব্দে আমার কাঁধে হাত রেখেছিল,
কর্দমের গভীর নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠেছিল একটি সাদা কুমুদিনী।
সেদিনই মনে হয়েছিল -
অদৃশ্য কোনো নিষিদ্ধ আলোর দিকে
আমার ছায়া আগে পৌঁছে গেছে।

চোখে তখনও শিশিরের অনভ্যস্ত ভাষা,
তবু চারদিকের দৃষ্টিরা
আমার আয়নার জল বদলে দিল।
নিজেকে ঢেকে রাখতে শিখলাম -
যেন প্রস্ফুটনও এক গোপন অপরাধ,
যার রায় লেখা থাকে নিঃশব্দতার অক্ষরে।

আমি তো কেবল ফুটেছিলাম -
যেমন ভোর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিজেকে উচ্চারণ করে,
যেমন নদী নিজের দিক জানে না, তবু সমুদ্রের দিকে যায়,
যেমন কাদামাটির অন্তঃস্থলে
অজান্তেই জন্ম নেয় শ্বেতের প্রথম স্বপ্ন।

কিন্তু পৃথিবী ফুলের দিকে তাকায়নি,
তারা দেখেছিল নিজেদের ছায়া,
আর সেই ছায়ার কালিমাই
আমার পাপের নাম হয়ে উঠেছিল।

আজ বহু ঋতু পরে
শুকিয়ে যাওয়া সেই পুষ্করিণীর কিনারে দাঁড়িয়ে
মনে হয় -
কুমুদিনীর কোনো অপরাধ ছিল না;
অপরাধ ছিল সেই চোখের,
যারা নির্মল জলের গভীরেও
অশুভের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফেরে।

তবু আজও,
আমার অন্তর্জলের অন্ধকারে
একটি সাদা ফুল নীরবে ফুটে ওঠে।
সে কোনো স্বীকারোক্তি নয়, কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাও নয়,
সে কেবল প্রকৃতির প্রথম নিঃশ্বাস,
এক নিষ্পাপ হৃদয়ের
নামহীন, অনন্ত প্রস্ফুটন।


৪১.     রুদ্রাক্ষের চোখে


তিনি আসেন -
যেন কর্দম ছিঁড়ে ফোটা প্রথম শ্বেত কুমুদিনী,
দেহে কোনো অহংকার নেই,
তবু প্রতিটি পরতে নিভৃতে জেগে থাকে
প্রকৃতির দীর্ঘ সাধনা।

চুড়ো করে বাঁধা চুলের নিচে
কপালের রক্তচন্দন যেন সন্ধ্যাতারার অগ্নিবিন্দু,
সরু রুদ্রাক্ষের মালা
গলার কাছে মন্ত্রের মতো কাঁপে -
মনে হয়, শরীরও বুঝি এক প্রার্থনার ভাষা।

তাঁর গাত্রবর্ণে -
দুধের শুভ্রতা নেই, কৃষ্ণমেঘের গাঢ়তাও নয়,
আষাঢ়ের প্রথম ভোরের মতো
অদ্ভুত এক কোমল আলোকছায়া,
যেখানে হাত রাখলে
হয়তো শিশিরের শব্দও শোনা যায়।

কিন্তু তাঁর চোখ -
হে ঈশ্বর, সেই চোখ দুটি!
হরিণীর চমক, নদীর গভীরতা,
আর মধ্যরাত্রির অব্যক্ত নক্ষত্রলোক -
সব এসে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে।

যে একবার ডুবে যায়,
সে আর নিজের তীরে ফিরতে পারে না।
তাঁর মুখ শিশুর মতো নির্মল,
কিন্তু ওষ্ঠের কোণে জেগে থাকে
অগ্নিশপথের অনমনীয় রেখা -
মনে হয়, প্রেম এলে তিনি ফুল,
বিচ্ছেদ এলে অনড় শিলাখণ্ড।

আমি তাঁকে দেখি -
দেহ নয়, যেন এক মায়াবী উপাসনালয়,
যেখানে স্পর্শেরও আগে
হৃদয় নতজানু হয়ে যায়,
আর সমস্ত কামনা ধীরে ধীরে রূপ নেয়
নির্বাক আরাধনায়।


৪২.     প্রেমের কোনো বিধিবিধান নেই


দুই নারী যখন পরস্পরের হাত ছুঁয়ে দাঁড়ায়,
শহরের সমস্ত সাইনবোর্ড হঠাৎ বাতাসে কেঁপে ওঠে।
যেন নিষেধের ভাষাগুলো একে একে ঝরে পড়ে
শিউলি-ফোটা ভোরের মতো নীরবে।

তাদের স্পর্শে কোনো বিদ্রোহের স্লোগান নেই -
আছে কেবল নদীর মতো অনিবার্য এক স্রোত,
যে স্রোত জানে, ভালোবাসা
মানচিত্রের রেখা কিংবা আইনের দাগ মানে না।

আর দূরে, সভ্যতার পোশাক গায়ে জড়ানো 
কিছু মানুষ কীবোর্ডে আগুন জ্বেলে লেখে রায়,
তাদের বুকের অদৃশ্য ব্যথা
মিমের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদে।

তবু প্রেম তো সেই প্রাচীন পাখি -
রবীন্দ্রসুরে যেমন উড়ে যায় আকাশের ওপারে,
তেমনি দুই নারীর চোখেও সে বাসা বাঁধে;
কবিতার পাতা ছিঁড়ে নেমে আসে জীবনের উঠোনে।

ভালোবাসা যদি সত্যিই আলো হয়,
তবে সে আলো কার কপালে পড়বে,
কার হাত ছুঁয়ে জ্বলে উঠবে -
সে সিদ্ধান্ত কোনো শহরের নয়,
কেবল হৃদয়ের।


৪৩.     কাঠচাঁপার হৃদয়


যমুনার কূলে সেদিন বিকেল নেমেছিল প্রার্থনার মতো, একটি কাঠচাঁপা গাছের নিচে এক যুবকের কোলে ছিল না পৃথিবী, 
ছিল একটি মেয়ের সমস্ত নিশ্চিন্ত ঘুম -
কথা ছিল না, শুধু দুটি চোখ একে অপরের ভেতর একটি অনন্ত দেশের মানচিত্র এঁকে যাচ্ছিল।

তারপর তারা চলে গেলে মাটির বুকে রয়ে গেল-
একটি লেখা- সাহানা- রঞ্জন, আর তার পাশে আঁকা একটি ছোট্ট হৃদয়।

হঠাৎ একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে পড়ল 
সেই হৃদয়ের ওপর, মনে হলো, যে দেশে ফুল 
নামের ওপর নয়, হৃদয়ের ওপর  ঝরে পড়ে,  
সে দেশে ঘৃণা কখনও শেষ কথা 
হতে পারে না।

মানুষের সব পরিচয়ের ওপরে যদি কোনো 
উপত্যকা থাকে, তার নাম প্রেম -
আর প্রেমের ওপর যদি প্রতিদিন একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে, তবে এই মাটি চিরকাল মানুষেরই থাকবে।


৪৪.    নক্ষত্রের চোখে জল


সেই কবে
আমার প্রথম যৌবনের মৌবনে
কিছু ফুল ছিল,
ফোটার আগেই তারা ঝরে গেল।

বিদায়ের আগে
দখিনা বাতাসের কানে রেখে গেল একটি বাক্য-
চিরবিরহিণীর দীর্ঘশ্বাসের মতো ধীর,

"তোমার তো একটা বিশ্ব আছে,
আছে অনন্ত আকাশ।
সেখানে তুমি নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে,
তোমার আলোয় ভরে উঠবে চারদিক।"

শুধু একটি সত্য
তাদের অজানাই থেকে গেল -
সব আলো আনন্দ নয়, 
কিছু নক্ষত্র
দূর থেকে জ্বলতে জ্বলতে
নিজের অশ্রু
নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখে।


৪৫.     শেষ বিকেলের বন্ধুদের জন্য


জীবনের এই অস্তরাগে এসে হঠাৎ মনে হয়-
যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত প্রথম আলোর সেই সরু পথটি, যেখানে বন্ধুত্ব ছিল নামহীন, তবু সবচেয়ে সত্য।

যারা হাত ধরেছিল শৈশব, কৈশোর কিংবা প্রথম যৌবনের দুপুরে, সময়ের দীর্ঘ নদী তাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কোন্ অচেনা মোহনায়।

বিশ, তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ বছরের নীরবতা-
তবু কি তারা কোথাও আমার নামটি একবারও উচ্চারণ করে? নাকি আমিও তাদের স্মৃতির আকাশে একটি ঝরে-পড়া নক্ষত্র মাত্র?

বড়ো ইচ্ছে করে- কোনো এক অলৌকিক সন্ধ্যায় সবাই এসে বসুক একটি পুরোনো বটগাছের ছায়ায়, কারও চুলে রূপোলি ধুলো, কারও চোখে জীবনের গভীর ক্লান্তি, তবু হাসিটুকু থাকুক সেই আগেকার মতোই।

আমরা কেউ কাউকে প্রশ্ন করব না, কে কত হারিয়েছি, কে কত দূরে গিয়েছি, শুধু একবার চোখে চোখ রেখে বলব, "বন্ধু, এতদিন পরেও তুমি আমার ভেতরে বেঁচে আছ।"

তারপর সন্ধ্যা আরও গাঢ় হবে। পৃথিবী আপন নিয়মে অন্ধকারে ঢেকে যাবে। কেবল চোখের কোণে চিকচিক করে উঠবে কয়েক ফোঁটা অশ্রুর আলো - আর মনে হবে, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ বিচ্ছেদও সত্যিকারের বন্ধুত্বকে কখনো সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না।


৪৬.      তার কানে কানে


যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি আজও ভাসে
সাঁঝের মলিন গানে।
যে সুরটি জাগেনি আমার বীণার তারে,
সে সুর নীরব হয়ে
কাঁদে হৃদয়-পারে।

মাধবী চলে গেল এক মধুর নিশীথে,
ফেলে গেল চাঁদের আলো
অশ্রুর স্নিগ্ধ স্মৃতিতে।
বকুলের ঝরা ফুল গোপনে যে পথ জানে,
সেই পথ আজও ডাকে
তোমার কানে কানে।

যে নদী হারিয়ে গেছে সুদূর মোহনার দেশে,
তার কলতান রয়ে গেছে
নিভৃত বিরহ-শেষে।
যে পাখিটি উড়ে গেল আকাশের নীল পানে,
সে আর ফিরে এল না
ফাগুনের কোনো গানে।

আজিও সন্ধ্যাতারা জ্বলে নিরালার আকাশে,
বাতাস কেবল তোমারই
নামটি এসে ভাসে।
বীণার ব্যথার সুর ঝরে নীরব অভিমানে—
যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি রবে চিরদিন
তোমার কানে কানে।


৪৭.     তুমি থাকলেই


আমরা কোনো রূপকথার প্রাসাদ তুলব না 
আকাশের কিনারে,
মেঘের সিঁড়ি বেয়ে সুখের দেশে যাব বলেও 
শপথ নেব না।
জানি, সব শপথেরই একদিন সন্ধ্যা নামে,
সব আলোরই থাকে নিভে যাওয়ার নিজস্ব সময়।

তাই এসো,
একটি সাধারণ বিকেলের পাশে বসে থাকি
আর যতটুকু স্বপ্ন ভেসে ওঠে,
ততটুকুই আমাদের অনন্ত হোক।

তোমার হাতের উষ্ণতায়
আমি কোনো অলৌকিকতা খুঁজি না,
শুধু চাই, পথ দীর্ঘ হলে
হাতটি যেন আলগা না হয়।

ঝড় এলে জানালাগুলো কেঁপে উঠুক,
বৃষ্টি এসে মুছে দিক উঠোনের সব পদচিহ্ন,
তবু হৃদয়ের ভেতর
একটি প্রদীপ জ্বলে থাকুক -
যার শিখা দেখে আমরা চিনে নেব
এখনও ঘরে ফেরার পথ আছে।

কোনো নিয়তির দরজায় আমরা করুণা 
চাইব না, কোনো নক্ষত্রের কাছে
সুখের হিসেবও রাখব না।
যা কিছু হারাবে,
তারও ওপারে যদি একটি বিশ্বাস থেকে যায়,
তবে সেটুকুই হবে আমাদের উৎসব।

একদিন চুলে রুপোলি ধুলো জমবে,
চোখের কোণে নেমে আসবে বহু দিনের ক্লান্তি,
তবু যদি সন্ধ্যার শেষে তুমি মৃদু স্বরে বলো,
আমি আছি তোমারই -
তাহলেই পৃথিবীর সমস্ত অসমাপ্ত গান
পূর্ণ হয়ে যাবে।


৪৮.     শেষ আলোর আগে


শেষ বিকেলের ভেজা বাতাসে
আমার সব পথ ধীরে ধীরে নদী হয়ে যায়,
দূর আকাশে কার অচেনা মেঘ
নিঃশব্দে নামিয়ে দেয় বিদায়ের নীল পর্দা।

বকুলের ডালে ঝুলে থাকে
অকথিত দিনের শেষ সুবাস -
ঝরাপাতারাও যেন জানে
ফিরে আসার সব প্রতিশ্রুতি একদিন বৃষ্টিতে মুছে যায়।

আমি আর কোনো আলো চাই না,
শুধু তোমার স্মৃতির ক্ষীণ প্রদীপটি
নিভে যাওয়ার আগে
একবার আমার মুখের দিকে তাকাক।

তারপর যদি রাত নামে,
নামুক শিশিরের নরম পায়ে;
আমার সমস্ত ক্লান্তি
মিশে যাক ভেজা মাটির গন্ধে।

হয়তো দূরের কোনো বাঁশির সুরে
আবার ফুটবে অদেখা প্রভাত,
আর আমি থাকব না -
তবু আমার অস্ফুট ভালোবাসা
কদমফুলের গায়ে গায়ে
তোমার জানালায় ভোর হয়ে ঝরে পড়বে।


৪৯.    শেষ প্রহরের গান


দিনের প্রদীপ নিবে আসে ধীরে,
সাঁঝের আরতির ধোঁয়া ভেসে যায় গগনে।
কোন্ অদৃশ্য আহ্বান ডাকে আমাকে
দূর নক্ষত্রের নিস্তব্ধ উপাসনালয়ে।

পৃথিবীর যত সুখ-দুঃখ,
আজ যেন ঝরা শিউলির মতো
নিঃশব্দে ঝরে পড়ে চরণের কাছে
কিছুই আর ধরে রাখিতে সাধ জাগে না।

যে ফুল ফোটেনি, তারও গন্ধ
মিশে আছে আমার নিঃশ্বাসে -
যে গান গাওয়া হলো না,
সে আজ ঈশ্বরের বীণায় বাজে
অশ্রুর অতল রাগিণী হয়ে।

হে করুণাময়ী চিরসাথি,
তোমার মায়ার করুণ স্পর্শে
আমার সমস্ত অভিমান ধুয়ে যাক।
এই ক্ষণিক জীবনের জীর্ণ বসন
তোমার বাতাসে উড়ে যাক দূরে।

যখন শেষ মেঘটিও মিলাবে আকাশে,
শেষ পাখিটিও ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন আমায় ডেকো -
শব্দে নয়, আলোতেও নয়,
গভীর নীরবতার সেই অনন্ত সুরে।


৫০.     যদি আর দেখা না হয়


চুম্বন চেয়ো না, ঠোঁটের কাছে আজও অসংখ্য অব্যক্ত বিদায় জমে আছে। তার চেয়ে তোমার হাতখানি এক মুহূর্ত আমার হাতে রাখো, যেন সন্ধ্যার শেষ আলো অন্ধকারে মিশে যাওয়ার আগে একবার পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখে।

যদি রৌদ্র বড়ো কঠিন হয়ে ওঠে, আমার স্মৃতির ছায়ায় একটু বসো। আমি তো আর ফিরব না, তবু বাতাসে ভেসে থাকবে তোমার নাম ধরে ডাকা আমার বিদায়ের সুর।

যে স্বপ্নগুলি তোমার চোখে রেখে যেতে চেয়েছিলাম, তারা আজও রাত্রির আকাশে অচেনা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে। তুমি যখন জানালার পাশে একলা দাঁড়াবে, হয়তো তাদের কোনো একটি তোমার চোখের জলে নেমে আসবে।

ভালোবাসা আমাদের একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল না, ছিল পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে দুই ভিন্ন পথের মোড়ে নিঃশব্দে থেমে যাওয়ার নিয়তি।

তবু যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, কোনো ডাক দিও না। আমি তখন হয়তো তোমারই কোনো পুরোনো বিকেলে, ঝরে-পড়া শিউলির গন্ধে, অথবা মেঘমুখর আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসব।

সেদিন একটি দীর্ঘশ্বাসই যথেষ্ট হবে, তার মধ্যেই রয়ে যাবে আমাদের না-বলা সব চুম্বন, না-ফেরা সব পথ, আর এক জীবনের অব্যক্ত ভালোবাসা।