সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী



নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী  ( কাব্যগ্রন্থ  ) 

প্রথম প্রকাশ  -

উৎসর্গ  -

ভূমিকা -


১.      নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী 

যে রাতে সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল, আর ক্লান্ত দেহে জমেছিল অনন্ত নির্জনতা, সেই রাতেও তোমার মুখই ভেসে উঠেছিল বৃষ্টির পরে নদীর জলে জেগে থাকা চাঁদের মতো।

চারপাশে ছিল মানুষের কোলাহল, তবু হৃদয়ের গভীরতম ঘরে শুধু তোমার পায়ের শব্দ শুনেছিলাম- যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো বসন্ত নিঃশব্দে ফিরে আসে শুকনো বকুলতলায়।

মনে পড়ে তোমার সেই সহজ গর্ব, চোখের কোণে জমে থাকা উদাসী দীপ্তি, আর চুলের গন্ধে জড়িয়ে থাকা অচেনা কোনো সন্ধ্যার মায়াবী বিষাদ। মনে হয়, একবার যদি ছুঁয়ে দিতে পারতাম তোমার সমস্ত অভিমান, তবে হয়তো পৃথিবীর সব শীত কোমল হয়ে যেত শিশিরের মতো।

তুমি ছিলে নিষ্ঠুরও, তবু তোমার নীরবতা ছিল প্রার্থনার মতো পবিত্র। এক ফোঁটা অশ্রুর জন্য কত দীর্ঘ রাত্রি যে আমি জেগে থেকেছি, তার হিসেব আজ আর রাখি না।

এখনও কোনো কোনো গোধূলিতে অকারণে বাতাসে তোমার নাম ভেসে আসে, আর আমি পুরোনো প্রেমের কাছে ফিরে গিয়ে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করি।

হয়তো তুমি আর ফিরবে না, হয়তো সময় তার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তবু আমার সমস্ত অসমাপ্ত ভালোবাসা আজও তোমার জন্যই সংরক্ষিত -

যেমন শুকনো গোলাপের ভাঁজে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকে একটি সুগন্ধ, একটি স্পর্শ, একটি অমলিন মুখের স্মৃতি।


২.   অনন্ত মায়াবী আলো


তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
সোনালি রঙের প্রভাত হবে, প্রতিদিন অস্তাচলে যাবে সূর্য।
তবু সন্ধ্যার নীলাভ আলোয়,
অকারণে তোমার নাম ভেসে উঠবে শিউলি-গন্ধে।

হয়তো নদী তার নিজস্ব সুরেই বয়ে যাবে,
হিজল-ছায়ায় বসে থাকবে জ্যোৎস্নার নির্জনতা,
শুধু আমার জানালায় এসে
অতীতের কোনো পাখি ডেকে যাবে তোমার কথা।

তুমি নেই, তবু আকাশে নক্ষত্রেরা নিভে যায় না,
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে বসন্তের রঙ ফুরোয় না;
শুধু এক ফোঁটা শিশির হয়ে
তোমার স্মৃতি জেগে থাকে ঘাসের গভীর সবুজে।

অনেক রাত পেরিয়ে যাবে,
চাঁদ তার ধ্রুপদি আলোয় ভরিয়ে দেবে পৃথিবী,
আর আমি নিঃশব্দে শুনে যাবো -
দূরের বাতাসে তোমার অদেখা পদধ্বনি।

কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে
মেঘের শরীরে লেখা থাকবে তোমার অনুপস্থিতি,
তবু কদমফুলের সুবাসে
মনে হবে, তুমি খুব কাছে ছুঁয়ে দেখার মতো।

ভালোবাসা তো শুধু পাশে থাকার নাম নয়,
কখনও কখনও দূরত্বেরও নিজস্ব এক মায়া থাকে
যেমন নদী সাগরকে না ছুঁয়েও
আজীবন তারই দিকে বয়ে যায়।

তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
জীবন তার নিজস্ব নিয়মে ফুল ফোটাবে, পাখি ডাকবে,
শুধু হৃদয়ের গভীরতম নক্ষত্রলোকটিতে
একটি আসন চিরকাল তোমার জন্যই রয়ে যাবে-
যেখানে কোনো বিদায় নেই,
কেবল নিঃশব্দ ভালোবাসায় জেগে থাকবে তুমি 
এক অনন্ত মায়াবী আলোর মতোন।


৩.     ছুঁয়ে দেখা হবে


চাঁদের নরম রূপালি ধূলি মেখে যাও 
ঘুমিয়ে থাকা জানালার পাশে
অপরূপ নীরবতার মতো এসে দাঁড়াও।

এখানেই দেখা হবে। 

বুকে এত অরণ্য, এত অচেনা পাখির ডাক,
তবু তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
দিগন্তজোড়া বিষণ্ন আলো জেগে ওঠে।
আমি একা বসে থাকি -
রাতের গায়ে নক্ষত্রের চাদর জড়িয়ে।

যদি কখনো হেমন্তের বাতাসে
তোমার চুলের গন্ধ ভেসে আসে,
যদি নদীর জলে ডুবে থাকা চাঁদ
আমাদের পুরোনো স্বপ্নগুলো ফিরিয়ে দেয় -
তবে কোনো শব্দ নয়,
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়,
শুধু চোখের গভীর থেকে চোখে -
নীরবতার সমস্ত ফুল ফুটিয়ে আবারও 
ছুঁয়ে দেখা হবে।

তুমি থাকবে দূরের মতো,
আমি থাকব প্রতীক্ষার মতো,
তবু ভালোবাসা তার গোপন দরজা খুলে
একদিন নিশ্চয়ই এসে বলবে -
এসো।

আজ আর বিচ্ছেদ নয়, আজ শুধু 
মায়াময় আলোয়, 
আত্মার গভীরে ছুঁয়ে দেখা হবে।


৪.     তোমার ছায়া 


দূরগামী কোনো ট্রেনের জানলায় হেলে 
থাকা এক চিলতে ঘুম, ভিড়ের মধ্যে মুখগুলো 
বদলে যায়, স্টেশন আসে, স্টেশন ফুরোয়, 
শুধু হঠাৎ কোনো অপরিচিত ক্লান্ত মুখে 
তোমারই বিষণ্নতা চিনে ফেলি।

প্রতিদিনের শেষে তোমার চোখে 
চোখ রেখে দেখি, ঝরে যাওয়া পাতারাও কত নিঃশব্দে বহন করে প্রেম, সন্ধ্যার আকাশে একফোঁটা তারা উঠলে মনে হয়, তুমি এখনও হারিয়ে যাওনি।

চারপাশে ভুলের মুখ, 
ভুলের ইতিহাস, তার মধ্যেও গোপনে, অতি গোপনে, আমার শালে লেগে আছে তোমার না-জানা 
শরীরের  সুবাস।

একটুখানি স্বপ্ন যদি ধার দাও, 
আমি আবার ভোরের দিকে হাঁটব, হিজলপাতার নিচে, শিশিরের পাশে, 
যেখানে কেউ জানবে না, কী গভীর মায়ায় 
তোমাকে ভালোবেসে গিয়েছি 
এই পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের ভিতর।


৫.     তারার দীপাবলি


খুব ইচ্ছে ছিল -
একদিন খোলা অটোরিকশায়
পূর্বাচলের তিনশো ফুট রাস্তা ধরে
চলে যাব দুজনে,
যতদূর গেলে পৃথিবীর শেষ বিকেলটুকু
আকাশের গায়ে নীল হয়ে জ্বলে ওঠে।

গিয়েছিলাম একদিন -
সেই বিকেলের কোমল আলোয়
অনেকদিন পর দেখলাম,
মাথার উপরে সীমাহীন আকাশেরও ওপরে
আরও এক আকাশ ভেসে থাকে,
দু'পাশে সবুজের অবিরাম বিস্তার,
সজল বাতাসের গায়ে
অচেনা পাখির ডানার শব্দ।

এই শহরের এত কাছে
এত নির্মল বাতাস, এতখানি নীল,
এতখানি অবকাশ লুকিয়ে আছে 
জানতাম না।

ঠিক এমনই চেয়েছিলাম আমরা -
এমনই পাশাপাশি থাকা,
এমনই পথের ভেতর হারিয়ে যাওয়া,
এমনই বাতাসে মুছে যাওয়া
জীবনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

সেই বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
আমাদের কোনও দুঃখ ছিল না,
ওর অসুখের বিদীর্ণ ব্যথাও যেন
দূরের মেঘের আড়ালে ঘুমিয়ে ছিল,
কোনও খেদ ছিল না,
কোনও হিসেব ছিল না জীবনের কাছে।

কিছু কিছু ক্ষণ আসে -
যখন ধন-দৌলত, প্রাপ্তি, অপূর্ণতা
সবই তুচ্ছ হয়ে যায়,
নিরাকার এক সুখ এসে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে যায় শরীর ও মন,
অমিয়ধারার মতো ধুয়ে দেয়
ক্লান্ত দিনের সমস্ত ধূলি।

সেই সন্ধ্যার মেঘমালা থেকে
আমরা পেয়েছিলাম
প্রেমের আশ্রয়ে জন্ম নেওয়া
এক গভীর শান্তি।
দূরের আকাশে চেয়ে মনে হয়েছিল -
আর একটু পরেই
লাল, নীল, সোনালি তারারা
দীপাবলির প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠবে
অনন্ত আকাশের বারান্দা জুড়ে।

কিন্তু তার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে,
তারারা জ্বলবে -
আমরা থাকব না।

তবু হয়তো সেই অসমাপ্ত সন্ধ্যার ভিতরে
আমাদের পাশাপাশি বসে থাকা দুটি ছায়া
অনেক দিন পরে,
কোনও নক্ষত্রের স্নিগ্ধ আলোয়
আবারও একে অপরকে খুঁজে নেবে -
যেন ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না,
শুধু আকাশ বদলায়, আর তারারা প্রতি রাতে
দীপাবলির মতো জ্বলে ওঠে।


৬.      তুমি চলে গেছ


তুমি চলে গেছো অনন্ত নক্ষত্রের দেশে,
আর আমি রয়ে গেছি এই ভাঙা পৃথিবীর ধুলোয়,
যেখানে স্মৃতিগুলো এখনো শ্বাস নেয় 
তোমার নামে।

তুমি আর ফিরবে না এই মাটির পথে,
তবু মন কেমন এক অদ্ভুত অপেক্ষায় আটকে থাকে।

তুমি যদি কখনো অন্য কোনো আকাশে হাঁটো,
চাঁদের আলোয় যদি চেনা কোনো হাসি খুঁজে পাও,
তবে জেনে নিও -
নিঃশব্দ প্রার্থনার মতো এখনও বেঁচে আছি 
অচেনা জন্মের প্রান্তে -

যেখানে নাম নেই, ঠিকানা নেই, 
কেবল অনুভব আছে, আশা জেগে আছে -
কোনো এক জোনাকজ্বলা মৌন সন্ধ্যায় 
আবার দেখা হবে আমাদের।


৭.    যারা চলে গেছে


একে একে সব প্রণয়ী-প্রণয়িনীরা চলে গেল,
কেউ চলে গেল জীবনের অস্তাচলের ওপারে,
কেউ গেল চির অভিমানে -
ফেলে রেখে গেল শুকিয়ে যাওয়া কিছু বিকেল,
আর বুকের গহীনে অমলিন কিছু নাম।

একে একে নিভে গেল অনেক চেনা প্রদীপ,
কারও চোখে জমল নক্ষত্রের ঘুম,
কারও ঠোঁটে রয়ে গেল না-বলা বিদায়ের ভাষা,
তবু পুরোনো পথগুলো আজও সন্ধ্যা নামলে
অপেক্ষার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

যারা একদিন হাত ধরেছিল,
তারা আজ ছড়িয়ে আছে সময়ের বিভিন্ন ঋতুতে -
কেউ বৃষ্টির গন্ধ হয়ে আসে,
কেউ শরতের সাদা মেঘে,
কেউ বা গভীর রাতে হঠাৎ জেগে ওঠা
একটি নামহীন বিষণ্নতায়।

এক এক করে সব চিঠির কালি ফিকে হয়ে গেল,
শুকিয়ে গেল বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি,
শুধু কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন
জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে মাঝেমধ্যে,
আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে।

কেউ চলে গেল জীবনের ব্যস্ত নগরে,
কেউ হারিয়ে গেল অনন্ত নক্ষত্রলোকের ঠিকানায়,
কেউ বা নীরবতার চাদর গায়ে জড়িয়ে
আর ফিরে তাকায়নি কখনও।

তবু মাঝরাতে চাঁদের আলো নেমে এলে
মনে হয় -
সব হারিয়ে যাওয়া প্রণয়ীরা বুঝি
অদৃশ্য কোনো বাগানে বসে এখনও একে 
অপরের কথা বলে।

হয়তো কোনো এক অনন্ত ভোরে,
যেখানে অভিমান নেই, বিচ্ছেদ নেই,
সেখানে আবার দেখা হবে -
তখন কেউ আর চলে যাবে না,
কেউ আর হারিয়ে যাবে না, শুধু তারার 
দীপাবলির নিচে আমরা সবাই চিনে নেব 
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মুখ।


৮.       মাটির কাছে ফিরে এসে


এক দিন মনে হতো, এই হৃদয় নিজেই যেন 
জোনাকির আলো,
নিজেই নিজের জন্য রচনা করত মায়ার বনভূমি,
অচেনা নক্ষত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে ভাবত -
সমস্ত সৌন্দর্য বুঝি তারই অন্তরঙ্গ ভূমি।

তার পর একে একে ঋতুরা বদলে গেল,
সময়ের সুস্থ শিষ্টতায় ধরা পড়ল সমস্ত স্বপ্ন,
দেখলাম, যে ফুলগুলোকে অমর ভেবেছিলাম -
তারা নিভৃতে ঝরে পড়ে, কারও থাকে না স্মরণ।

আমার বিশ্বাসের মূল, এই পৃথিবীর গভীর মাটিতে
কত যে ক্ষত নিয়ে পড়ে ছিল নীরব হয়ে,
তবু সন্ধ্যার পরে কোনো এক নির্জন আকাশে
একটি তারা আজও জ্বলে থাকে মৃদু বিষাদে।

মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া মায়ারা সব মরে না,
কিছু কিছু থেকে যায় শিশির হয়ে ঘাসের পাতায়,
আর আমি, মাটির কাছে ফিরে এসে শিখেছি -
সব আলো উজ্জ্বল নয়, সব স্বপ্নও নয় চিরস্থায়ী।

যা ভেঙে যায়, তারও থাকে এক গোপন সৌন্দর্য,
যেমন শরতের শেষে কুয়াশা নামে,
আর নিঃশব্দে পৃথিবী হয়ে ওঠে আরও মায়াবী।


৯.      বিষণ্ণ বিকেলের কাছে


মুখ তুলে তাকালেই দেখি
বিকেলের আকাশে কেমন এক অনন্ত ক্লান্তি 
জমে আছে,
মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে ভেসে আসে
কবরস্থানের বাতাসে ছড়ানো কর্পূরের গন্ধ,
কী এক অদ্ভুত স্মৃতির মতো,
যেন কেউ নীরবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

বাতাসে তখন পাখিদের ডাকও
কেমন যেন অস্ফুট হয়ে আসে,
রোদ ধীরে ধীরে গাছের ছায়ায় ডুবে যায়,
আর হৃদয়ের ভিতর
কার যেন পদশব্দ শুনি বারবার।

যাদের সঙ্গে একদিন
অনেক কথা ছিল, অনেক আলো ছিল,
তারা আজ কেবল দূরের নক্ষত্র,
শীতল, নিঃসঙ্গ, নিঃশব্দ -
তবু তাদের জন্যই
অকারণ চোখ ভিজে ওঠে সন্ধ্যার আগে।

কখনো মনে হয়,
এই পৃথিবী আসলে একটি দীর্ঘ বিদায়ের আয়োজন,
মানুষেরা আসে, কিছু হাসি রেখে যায়,
কিছু অসমাপ্ত স্পর্শ, কিছু নামহীন অভিমান *
তারপর একদিন
কর্পূরের গন্ধের মতো মিলিয়ে যায় আকাশের দিকে।

আর আমি বিকেলের শেষে
অকারণে জানালার পাশে বসে থাকি,
অসীম বিষণ্নতা এসে বসে থাকে পাশে,
যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো সঙ্গী -
যার চোখে নীরবতার জল,
আর যার কণ্ঠে কেবল একটি কথাই ভেসে আসে-
সবকিছুই একদিন চলে যায়,
শুধু গন্ধ হয়ে থেকে যায় কিছু স্মৃতি,
আর কিছু অসমাপ্ত ভালোবাসা।


১০.      অন্ধকারের ওপারে



আমি জানি , তুমি চলে গেছ নক্ষত্রেরও ওপারে -  প্রতিটি সন্ধ্যা নামলে তোমার অনুপস্থিতি তাই
গভীর হয়ে ওঠে।

বাতাসে কিসের যেন অচেনা গন্ধ আসে, 
মনে হয়, কোনো দূর অন্ধকারে বসে তুমি হয়তো এখনও একটি পুরোনো দিনের কথা ভাবছ।

আমাকে কী তোমার মনে পড়ে?
যেমন আমার মনে পড়ে- হঠাৎ ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মতো, অকারণ বিষণ্ন কোনো বিকেলের মতো, 
জানালায় বৃষ্টির প্রথম শব্দের মতো।

অনেক কথা বলা হয়নি, 
অনেক অভিমান রয়ে গেছে বুকের গোপন কুঠুরিতে, তবু মনে হয়, সমস্ত না-বলা কথারও একটি আলো আছে, যা নিভে যায় না মৃত্যুর পরেও।

মাঝে মাঝে গভীর রাতে একটি তারাকে 
অন্যসব তারার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হয়, 
তখন ভাবি, হয়তো তুমি সেখানেই আছ, 
অদৃশ্য কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে 
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছ চুপচাপ।

আর যদি সত্যিই আরেকটি দেখা হওয়ার 
দেশ থেকে থাকে, তবে একদিন সমস্ত অন্ধকার, 
সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে তুমি আবার ডাকবে 
আমার নাম।

সেদিন অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া বিকেলের মতো 
আমিও নীরবে বলব -
দেখো, এতদিন পরেও তোমাকে ভুলতে পারিনি; তোমার জন্যই আমার হৃদয়ে এখনও একটু মায়াময় বিষাদ বেঁচে আছে।


১১.      কল্পনার সেই মানুষ


যাকে করেছিলাম কল্পনা,
সেই এসে জড়িয়ে নিল আমার সমগ্র জীবন -
যেন বহুদিনের অনিদ্রার শেষে
হঠাৎ নেমে এল শান্ত কোনো ভোর।

আমি ভেবেছিলাম, মানুষটি বুঝি
শুধুই থাকবে মেঘের মতো দূরে,
অথচ সে এসে নিঃশব্দে বসে পড়ল
আমার সমস্ত একাকিত্বের পাশে।

তার চোখে ছিল সন্ধ্যার আলো,
কণ্ঠে ছিল অচেনা নদীর সুর -
আমি ধীরে ধীরে ভুলে গেলাম
কত দীর্ঘ ছিল বিষণ্নতার পথ।

কখনও মনে হয় -
মানুষেরা কি সত্যিই এমন করে আসে?
নাকি কোনো সুদূর নক্ষত্রের দেশে
অনেক আগে থেকেই লেখা ছিল এই মিলন?

তাই আজও নিশীথের অন্ধকারে
চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি -
কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা
ফুলের মতোই নীরবে ফোটে।


১২.   স্মৃতিটুকু থাক্

সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসে অচেনা কোনো
গানের সুর,
ঝরা শিউলির গন্ধে জেগে ওঠে হারানো দিনের
উদাস দুপুর।

যারা চলে গেছে, তারা কি সত্যিই দূরে
চলে যায়?
নক্ষত্রের আলো হয়ে তারা কি নিভৃত আকাশে
নিঃশব্দে ভেসে রয়?

আমি শুধু চুপচাপ শুনি সময়ের বিষণ্ন
বাঁশির ডাক,
সব হারানোর পরও তোমার স্মৃতিটুকুই
নিভৃতে আমার হৃদয়ে থাক্।


১৩.     হঠাৎ মনে পড়ে


অনেক আনন্দময় ক্ষণে হঠাৎই তোমাকে মনে পড়ে,
রৌদ্রভেজা দুপুরে কিংবা বৃষ্টিমাখা অলস বিকেলে,
তোমার ফেলে যাওয়া কিছু কথা নিঃশব্দে ফিরে আসে মনের আঙিনায়।

কোনো প্রিয় গানের সুরে জেগে ওঠে বিস্মৃত স্পর্শের আবেশ,
শিউলি-ঝরা পথের ধারে মনে হয়, তুমি বুঝি এখনও আছ খুব কাছে।

যত দূরেই যাও না কেন, স্মৃতিরা তো দূরত্ব মানতে শেখেনি,
তারা নক্ষত্রের মতোই জ্বলে ওঠে অকারণে, গভীর রাত্রির নির্জনতায়।

তাই আনন্দের মধ্যেও কোথাও এক কোমল শূন্যতা রয়ে যায়,
আর সেই শূন্যতার ভেতরেই তোমার নামটি নীরবে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।


১৪.       ফিরে ডেকো না


তুমি আর ডাকো না আমাকে জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে,
খুঁজো না আর অলিন্দ খুলে দূরের দীঘির ঘাটে
যেখানে ছিলাম আমি দাঁড়িয়ে -
সেই বিকেলের রোদ আজ বহুদিন নিভে গেছে,
শিউলির গন্ধে ভরা পথটিও হারিয়েছে, 
জোনাকিদের গোপন আলোর মতো
আমিও মিশে গেছি অনন্ত সন্ধ্যার আঁধারে। 

তুমি আর অপেক্ষা কোরো না জানালার পাশে,
বকুলঝরা উঠোনে রেখে দিও না কোনো অভিমান,
কুয়াশাভেজা ভোরে যে পায়ের শব্দ শুনতে পেতে,
সে তো অনেককাল হলো হয়েছে স্মৃতিরই গান।

নদীর ওপারে যে কাশফুল দুলে ওঠে নিঃশব্দে,
তারাও জানে, ফিরে আসা সবসময় সম্ভব নয়,
কিছু মানুষ নক্ষত্র হয়ে থাকে দূর আকাশে,
কেবল আলো পাঠায়, কাছে এসে ধরা দেয় না আর।

যদি কোনোদিন শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভিজে ওঠে মন,
যদি হঠাৎ মনে পড়ে যায় অকারণ কোনো কথা,
তবে ভেবো, আমি আছি -
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পুরোনো নামে।

আর যদি নিশীথ রাতে বাতাসে কেঁপে ওঠে পর্দা,
মনে কোরো না, আমি ফিরে এসেছি আবার -
শুধু হয়তো কোনো বিস্মৃত ভালোবাসা
নীরবে ছুঁয়ে গেছে তোমার ঘুমন্ত চোখ।

তাই তুমি আর ডাকো না আমাকে,
জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে -
আমি এখন সময়ের অতল জলে ভেসে থাকা
এক নামহারা প্রতিধ্বনি, দূরের দীঘির নিস্তব্ধ ঘাটে
যেখানে একদিন ছিলাম দাঁড়িয়ে।


১৫.     অনুপস্থিতির দুই প্রান্তে 


আমি যাকে মনে করি, সে আমায় মনে করে না -
এ কথা কোনোদিন বিশ্বাসের আলোয় আনতে পারিনি,
যাকে ভালোবেসেছি স্বচ্ছ নদীর মতো,
সে ভালোবাসবে না আমায়, এমন নিষ্ঠুর সত্য মানিনি।

পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে
আমি যার নামের জন্য উদাস বাতাসে ফিরি,
যার অনুপস্থিতিতে জেগে থাকে দীর্ঘ রাত্রিরা,
সে কি আমার জন্য একটুও ব্যাকুল হবে না, 
ভাবতেই পারি না।

হয়তো অন্য কোনো আকাশের নিচে,
সে-ও আমার মতোই গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
হয়তো আমার নামটুকু উচ্চারণ না করেও
আমার স্মৃতির প্রদীপ জ্বেলে রাখে নির্জনে।

ভালোবাসা তো শুধু একতরফা পথ নয়,
তারও আছে অদৃশ্য প্রতিধ্বনির আয়োজন -
আমি যেমন তাকে খুঁজি নক্ষত্রভরা সব রাতে,
তেমনি কোনো গহন বিষণ্নতায়
সে-ও হয়তো খুঁজে ফেরে আমারই অনুপস্থিত 
আমারই ছায়া।


১৬.       তোমার বুকের পরে


আমার পৃথিবী ছোট হয়ে আসে তোমার
বুকের পরে,
তুমি পাশে থাকলেই হাজার বছর বাঁচতে
ইচ্ছে করে।

তুমি পাশে থাকলেই মনে হয়, মৃত্যু নয় -
অনন্তের পথ ধরে,
আরও হাজার জন্ম বাঁচতে ইচ্ছে করে
তোমার বুকের পরে।

তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় জেগে ওঠে
হারানো স্বপ্নের ঘোরে,
চোখের মায়ার গভীর মগ্নতায়
জীবন খুঁজে পাই তোমার বুকের পরে।

যত দূরেই যাক সময়, যতই বদলে যাক
পৃথিবীর রূপ, রং, রোদ্দুরে,
আমার সমস্ত প্রেম, সমস্ত  আকুলতা
এসে থেমে থাকে তোমার বুকের পরে।

যদি কখনও নিভে আসে জীবনের প্রদীপ,
শেষ প্রার্থনাটুকুও থাকবে তোমারই তরে -
মৃত্যুকেও ভুলে গিয়ে আরও একবার
জন্ম নিতে ইচ্ছে করবে তোমার বুকের পরে।


১৭.      বিলম্বিত আগমন


তুমি এসেছিলে অবশেষে -
যখন আমি আর এই পার্থিবে নেই,
শুকনো ঝরাপাতার মতো ঝরে গেছি ,
ফিরে দেখার জন্য রেখে গেছি 
কেবল কিছু ক্ষীণ ঋণ।

যে প্রদীপটি জ্বলত তোমার প্রতীক্ষায়,
অনেক আগেই তার শেষ আলোটুকুও নিভে গেছে,
তবু বাতাসে রয়ে গেছে আমার উচ্চারিত নাম। 

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে, 
আর চারদিকে ছিল গভীর সন্ধ্যা,
আমি তখন দূর নক্ষত্রের দেশে নিঃসঙ্গ, নিরুপায় -
শুধু শিশিরভেজা ঘাসের উপর নেমে এসেছিল 
এক দীর্ঘ বেদনা,
যেন দেরিতে এসে তুমি শুনতে পেয়েছিলে 
আমার শেষ অপেক্ষার কান্না।


১৮.      কবে বৃষ্টি হয়েছিল


কবে বৃষ্টি হয়েছিল, 
আজ আর ঠিক মনে পড়ে না,
মনে আছে ভেজা বিকেলের বিষণ্নতার কথা -
তুমি খুব ধীরে বলেছিলে কিছু কথা,
মেঘের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল সেই কথকতা। 

কোন্‌ পাখি ডেকেছিল দূরের বনপথ ধরে,
আজও সে সুর ভেসে আসে -
কবে বৃষ্টি হয়েছিল - মনে নেই আর,
শুধু মনে আছে, তোমার চোখে ছিল শ্রাবণের 
অন্ধকার।

তোমার স্মৃতি হয়ে ওঠে সন্ধ্যার ভাষা,
যখন রাত নামে, নক্ষত্রেরা জেগে থাকে আকাশজুড়ে,
মনে হয়, সেই বৃষ্টিভেজা দিনটি এখনও ঘুমিয়ে আছে তোমার বুকের পরে।

সময়ের নদী কত দূরে নিয়ে গেছে আমাদের দু'জনকে,
তবু হঠাৎ বৃষ্টির গন্ধে তোমাকেই মনে পড়ে -
অবেলাতে, নিভৃত ক্ষণে।


১৯.    মেঘজল ও বুনো জলপদ্ম


কালো মেঘের মতো চুল ঢেকে দিয়েছিল
তোমার গোল্লাছুট খেলার পিঠ,
অর্ধেক নেমে এসেছিল উপত্যকার টিলা ছুঁয়ে
লতাগুল্মের নিভৃত সংগীতে।

ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
ধীরে ধীরে জল হয়ে গিরিপথ বেয়ে
অচেনা কোনো অতল খাদে নেমে যায়,
আর সেখানে ফুটে ওঠে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম।

তোমার চোখে ছিল বর্ষার প্রথম বিদ্যুৎ,
ঠোঁটে ছিল সন্ধ্যার রক্তিম নক্ষত্রের আলো,
আমি শুধু বিস্মিত পথিকের মতো
দাঁড়িয়ে শুনেছি নীরবতার বাঁশি।

কত অরণ্য, কত নদী, কত সুগন্ধি বাতাস
সেদিন এসে জড়ো হয়েছিল আমাদের চারপাশে-
যেন পৃথিবীর আদিম কোনো প্রেমগাথা
শিউলি-ঝরা রাতে আবার ফিরে এসেছে।

আর দূরের আকাশে ভেসে থাকা চাঁদ
মেঘের আড়াল থেকে চুপি চুপি দেখে গেছে -
দুটি নিঃশ্বাসের মধ্যিখানে
কীভাবে জন্ম নেয় হাজার বুনো জলপদ্মের স্বপ্ন।


২০.     অনন্তের পরে


নিভে গেলে প্রদীপ, জেগে থাকি 
নক্ষত্রের দেশে,
হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসি একই 
স্বপ্নের বেশে।
শিউলি-ভেজা ভোরে তোমার নাম 
ডাকে বাতাস,
সন্ধ্যার পাখিরা জানে আমাদের 
পুরোনো ইতিহাস।

যত দূরে যাই, তত কাছে আসে মধুর  
কোনো ক্ষণ,
সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাজে 
চেনা স্পন্দন,
যদি এক জন্মে হারাই, অন্য জন্মে 
খুঁজে নিও,
অচেনা মুখের ভিড়ে আমায় চোখের 
ভাষায় চিনে নিও।

ফুরিয়ে যাবে যুগ, ফুরোবে না হৃদয়ের 
এই আবেশ -
জন্ম থেকে জন্মান্তরে ভালোবেশে 
জীবন করিও শেষ।


২১.    স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে


আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে,
যাও যত দূরেই-তুমি রবে হৃদয়ের গোপন কুটিরে লুকিয়ে।

সময়ের নদী বয়ে যাবে তার আপন স্রোতের টানে,
তবু কিছু বিষণ্ন বিকেল ফিরে আসবে শুধু তোমারই নামে।

জ্যোৎস্না-ভেজা কোনো নিঃসঙ্গ রাতে হঠাৎ মনে 
পড়বে আবার,
ফেলে আসা সেই পথের মায়া, সেই প্রথম প্রেমের অলিখিত অঙ্গীকার।

হয়তো আর দেখা হবে না পৃথিবীর ব্যস্ত জনারণ্যে,
তবু তোমার স্পর্শ রয়ে যাবে আমার গানের সুরে, স্বপ্নের অনন্ত প্রাঙ্গণে।

ঝরে যাবে কত ঋতু, বদলে যাবে সময়ের রঙ 
আর পরিচয়,
তবু ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই- শেষ কোথায় তার হয়!

আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, শেষ হয় না 
সত্যিকারের প্রেম,
জন্ম পেরিয়ে জন্মান্তরে তুমি রবে- স্মৃতি হয়ে, 
যেন নিকষিত হেম।


২২.     বৃষ্টির আড়ালে


তুমি কাঁদবে বলে - উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে, 
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো -
তুমি ভিজলে, গোপন করলে তোমার 
চোখের জল।

আকাশ বুঝি আগেই জেনে রেখেছিল 
তোমার সকল অভিমান,
তাই মেঘেরা নেমে এলো সঙ্গী হয়ে।

ভেজা শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখলে 
না-বলা শত কথা,
দূরের কদমগাছ শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

আমি তখন দূরে, হঠাৎ বুকের ভেতর অকারণে 
বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল এক বিকেল,
মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ
বৃষ্টির শব্দে ঢেকে রেখে কাঁদছে আমারই জন্য।

আর সেই কান্না আজো ভেসে আসে 
শ্রাবণের গভীর রাতে জোনাকির নিভু আলোয়,
জন্মে জন্মে হারিয়ে ফেলা কোনো 
প্রিয় চোখের অশ্রুর মতো।


২৩.     জন্মান্তরের চেনা


হয়তো কোনো শ্রাবণ রাতে কদমফুলের 
গন্ধে ভেসে -
আমার নামই ডেকেছিল সে নিভৃত নদীর 
তীরে এসে।

হয়তো কোনো কুয়াশাভেজা ভোরে 
শিউলিপাতার নিচে -
দু'জনার হারানো স্বপ্ন জেগেছিল খঞ্জনা
পাখির পিছে।

চাঁদের আলো ঝরে পড়েছে বহু শতাব্দী 
ধরে ধীরে -
তবু তার চোখ চিনে নিয়েছে আমায় বারে
বারে ফিরে।

যত দূরেই যাই না কেন, যত জন্মই 
যাক ফুরিয়ে -
সে-ই যেন অপেক্ষায় থাকে কাশবনে --
অলকানন্দা ঝাড়ে।

হয়তো কোনো অচেনা পথে সন্ধ্যা নেমেছে 
বিষণ্ন হয়ে -
তবু তার মায়াভরা মুখ ভেসে ওঠে নিঃশব্দ 
বৃষ্টিস্রোতে বয়ে।

যখনই হারাই আমি সময়ের অসীম 
অন্ধকারে -
সে যেন প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে আমার 
সকল হাহাকারে।

একদিন সব পথ ফুরাবে, নিভে যাবে 
পৃথিবীর নীল -
তবু দু'জনার ভালোবাসা রবে নক্ষত্রের মতো 
অবিনাশী, সুনীল।

আর যদি আবার জন্ম হয় কোনো শ্যামল 
গ্রামের নিভৃত নীড়ে -
সে-ই যেন খুঁজে নেবে আমায়, কাশবনে -
অলকানন্দার ঝাড়ে।


২৪.      শেষ বিকেলের স্বপ্ন 


আমি তো চেয়েছিলাম, বৃদ্ধ বয়সের কোনো শান্ত বিকেলে,
তোমার কাঁপা হাতটা ধরে ধীরে ধীরে সূর্যাস্ত দেখতে।

চেয়েছিলাম, ঝরে-পড়া পাতার শব্দে দু'জন 
ফেলে আসা দিনের গল্পগুলো আবার নতুন করে বলতে।

চেয়েছিলাম, সন্ধ্যার পাখিরা যখন ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন তোমার চোখের গভীরে আমার শেষ আশ্রয় খুঁজতে।

চেয়েছিলাম, সময়ের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গিয়ে,
এক কাপ উষ্ণ চায়ের ধোঁয়ায় ভালোবাসার পুরোনো দিনগুলো ছুঁতে।

চেয়েছিলাম, পৃথিবী যখন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বে,
তোমার কাঁধে মাথা রেখে জ্যোৎস্নাভেজা রাতের গান শুনতে।

আর,
যদি কোনো একদিন মৃত্যু এসে দাঁড়ায় দুয়ারে,
শেষবার তোমার হাতটা ধরে বলব --
আমাদের ভালোবাসা ফুরোয়নি এখনো,
সূর্য ডুবে গেলেও আকাশে রয়ে গেছে তার
দ্যুতিময় রঙের আবেশ।



২৫.       বসন্তের খোঁজে 



আমি তো চেয়েছিলাম রঙের গল্প,
চেয়েছিলাম আবির ছুঁয়ে দিক আমার অবয়বে -
যখন বসন্ত নামে উঠোনে,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি একা -
হাতে কোনো রং নেই। 

আমার সেই বান্ধবীর হাসি কি 
এখনও বেঁচে আছে?
নাকি সে-ও আমার মতোই
কোনো অচেনা শূন্যতায়
নিজেকেই খুঁজে ফিরছে বারবার?


২৬.      সমাধিফলকে লেখা নেই


তুমি রয়েছ নিদ্রিত সময়ের ওপারে কিংবা আমারই 
শ্বাসের পাশে নীরবে, কিছু বিষণ্নতায় -
রয়ে গেছো অপ্রকাশিত নামে, ডুবে থাকা কোনো 
গুপ্ত উপাখ্যানে, আছো তুমি অশেষ অপেক্ষার 
ভেজা অন্ধকারে। 

কিছু উচ্চারণ, আর কিছু অব্যক্ত থেকে যাওয়া কথায় -
আজও তুমি বিলুপ্ত দিনের ছাপ হয়ে আমার অস্থিমজ্জায়, জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো নিভে গিয়েও জেগে আছো -
এক অনন্ত স্মৃতির নিঃশব্দ এপিটাফ হয়ে।


২৭.      অভিমানের পরে


সে একদিন চোখ ভিজাইয়া কইছিলো -
যদি হারাইয়া যাই,
আমারে আরেকবার ডাইকা নিও,
না হইলে এই মন আর বাঁচবো না।

সন্ধ্যার আলো আঁধারে জোনাকির ডানায়
যখন আলো নিভে যায় রাতের গভীরে, 
তখন তারে মনে পড়ে -
দূরের সংসারে, আপন মানুষগুলোর ভিড়ে
সে যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া থাকে
সে যখন স্বপ্ন দেখাদেখিতেও নেই। 

চইলা যাওয়া দোষের কিছু না -
মানুষ তো শেষমেশ দূরেই সইরা যায়,
খালি কিছু কথা
অপূর্ণ প্রতিজ্ঞার মতো
জানালার ফাঁক দিয়া ঢুইকা পড়া হাওয়ায়
একা একা কাঁপতে থাকে।

তারে মনে পড়ে -
বৃষ্টি থাইমা গেলে যেমন মাটিতে রাইখা যাওয়া 
গন্ধ মনে পড়ে, ঠিক তেমনি তারে মনে পড়ে।


২৮.       দূরত্বের আলো



দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
যেন সন্ধ্যার তারা- ছোঁয়া যায় না, তবু পথ দেখায় -
কাছাকাছি এলে কত কথা হারিয়ে যায় বাতাসে,
দূরে থাকলেই তুমি ভেসে ওঠো স্পষ্ট নীল আকাশে।

দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
কাছে এলে বিকেলের নদীতে হেলে পড়া কোনো নিঃশব্দ আলো নেমে আসে চোখের ভিতর। 

তুমি হেঁটে যাও -
আর শিউলি-ঝরা পথগুলো গোপনে তোমার নাম উচ্চারণ করে,
উত্তরের হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় আমার একাকী বারান্দা।

দূরত্বেরও বোধহয় নিজস্ব এক মায়া আছে -
তাই না-পাওয়া জিনিসগুলো এত সুন্দর লাগে,
রাত্রির তারাদের মতো তুমি জ্বলে থাকো দূরে,
আর আমি জেগে থাকি, 
তোমারই আলোয় ভিজে থাকা এক দীর্ঘ 
অপেক্ষা হয়ে।


২৯.      যমুনার কাছে


আমার সেই যমুনা- অলস বিকেলের রোদে যার জলে ভেসে থাকে শৈশবের মুখ, মায়ের ডাকার মতো স্নেহ।
শ্যামল তীরের ঘাসে বসে কতদিন দক্ষিণের বাতাসে শুনেছি অকারণ বিষাদেরও এক মধুর কলধ্বনি।

আকাশভরা আলো নেমে এলে নীল আর সবুজের মাঝখানে প্রসারিত দিগন্ত আমাকে ডেকে বলে - ফিরে এসো, এইখানেই তোমার নাম লেখা আছে।

জলের ভিতরে জেগে ওঠে সন্ধ্যার তারারা, নির্জন কাশবনে ঘুমিয়ে পড়ে পাখিদের ক্লান্তি- আমি সমস্ত শরীরমন ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করি সেই স্নিগ্ধ মাতৃস্নেহে।

মনে হয়, জন্মে জন্মে যদি কোথাও ফিরে আসতে হয়, তবে এই যমুনার তীরেই- যেখানে আনন্দ আর ব্যাকুলতা একই ঢেউয়ের ভিতর মায়ার মতো জড়িয়ে থাকে অনির্বচনীয় দিনরাত্রি।


৩০.      ঠোঁটের কাছে

তোমার ঠোঁট, দুই পাপড়ি লবণমাখা সন্ধ্যা,
যেখানে দিনের সমস্ত ক্লান্ত পাখিরা এসে
ডানা গুটিয়ে বসে থাকে।

আমি যখন তোমার দিকে তাকাই,
মনে হয় কোনো প্রাচীন সমুদ্র
তার গোপন জোয়ার তুলে রেখেছে
দুটি নরম তটে।

তোমার ঠোঁটের কোণে যে হাসি জমে থাকে,
সে যেন বৃষ্টিভেজা বকুলের গন্ধ -
দেখা যায় না,
তবু চারপাশের বাতাসকে বদলে দেয়।

কখনও মনে হয়,
ওখানে এক ফোঁটা লাল মদিরা রাত্রি ঘুমিয়ে আছে,
কখনও মনে হয়,
অপরিচিত কোনো গ্রহের আলো
পৃথিবীতে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার ঠোঁটের কাছে এলে
আমার সমস্ত উপমা ভেঙে যায় -
গোলাপ, শিশির, চাঁদ, সমুদ্র,
সবই হঠাৎ অপ্রতুল মনে হয়।

তখন শুধু মনে হয়,
পৃথিবীর আদিমতম কোনো প্রেম
দুটি নরম পাপড়ির ভেতর বসে
ধীরে ধীরে তার আলো জ্বালিয়ে রাখছে।


৩১.      ত্রিশ বছরের প্রতীক্ষা


তাহার সাথে আবার দেখা হইল- 
ঠিক ত্রিশ বছর পর। সময়ের দীর্ঘ নদী পার হইয়া 
দুইটি ক্লান্ত হৃদয় আবার এক মুহূর্তের জন্য 
একই আকাশের নীচে দাঁড়াইল।

হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল- সেই জ্যোৎস্নাভেজা রাত্রি, নদীর পারে ঝরিয়া পড়া জলের কলতান, 
বকুলের গন্ধে ভিজে থাকা পথ, 
আর হাতের কাছে এসেও না-ধরা 
কিছু স্বপ্নের কথা।

কত প্রেম ছিল, কত না-বলা অভিমান, 
কত চিঠিহীন দিন আর নিঃশব্দে কাঁদিয়া ওঠা 
কত রাত্রি- সব যেন একে একে ফিরিয়া আসিল 
স্মৃতির জানালা ঠেলিয়া।

বিদায়ের সময় ত্রিশ বছর আগের মতোই সে আবার মৃদুস্বরে বলিল-  'আবার কবে দেখা হইবে?'
প্রকম্পিত কণ্ঠে বলিলাম-  হয়তো আরও ত্রিশ বছর পর...।'

সে তখন আনত নয়নে কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া 
ম্লান হাসিতে বলিয়াছিল- 'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'

আজ এতকাল পরে সেই কথাটিই জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসে বুকে।
কারণ বুঝিয়াছি-  মানুষ শুধু বয়স লইয়া বাঁচে না, মানুষ বাঁচিয়া থাকে কাহারও স্মৃতিতে, কাহারও অশ্রুজলে, কাহারও গভীর নীরবতায়।

হয়তো আবার দেখা হইবে না- 
তবু কোনো পূর্ণিমা রাতে, নদীর পারে বাতাস উঠিলে, জলপতনের শব্দ শুনিলে, আমি এখনও মনে মনে শুনিতে পাই -

'আবার কবে দেখা হইবে?'

আর দূর নক্ষত্রের আলোয়, অদৃশ্য কারও আনত নয়নের ভিতর হইতে ভেসে আসে সেই মায়াময় প্রশ্ন-
'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'

যেন ভালোবাসা কখনও মরে না, শুধু অপেক্ষার 
বয়স বাড়িতে থাকে।


৩২.       চোখে যেন না নামে বৃষ্টি


সারা আকাশ মেঘে ঢেকে
দিনরাত ঝরুক জল,
নদী ভাসুক, মাঠ ভিজুক,
সবুজ হোক ধরাতল।

বজ্র নামে দূর গগনে,
ঝড় উঠুক অচেনা ক্ষণে,
তবু যেন কাঁপন না লাগে
তোমার স্বপ্নের বাগানে।

সারা বছর বৃষ্টি হোক,
ভিজুক পৃথিবীর সব পথ -
শুধু না ভেজে তোমার চোখ,
সেখানে থাকুক রোদের রথ।

যত কান্না আছে পৃথিবীতে
আমার জানালায় এসে ঝরুক,
তোমার দুটি চোখের ভেতর
শুধু ভালোবাসার আলো ভরুক।


৩৩.     জ্যোতির্ময় করো


আমাদের পদচিহ্নে একদিন জেগে উঠেছিল অরণ্য ঘুমন্ত পাতার ভেতর সবুজের গোপন উৎসব। দুপুরের সূর্য নেমে এসেছিল পাহাড়ের কাঁধে, শিলার গায়ে গায়ে আগুনরঙা আলোর আরতি জ্বেলে। 

জলপ্রপাত ছুটেছিল উন্মত্ত প্রেমিকের মতো, পাথরের বুকে আঘাত হেনে গেয়েছিল অনন্ত সঙ্গীত, আর আমরা ঝরনার স্বচ্ছ জলে ধুয়ে নিয়েছিলাম পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি।

আজও অরণ্য সবুজের মদিরায় দুলে ওঠে, আজও পাহাড় উষ্ণ হয় সূর্যের গভীর স্পর্শে, আজও বাতাস বয়ে আনে অচেনা ফুলের গন্ধ, আজও ঝরনার জলে আকাশের নীল ভেঙে পড়ে। সময় চলে যায়, তবু প্রকৃতি তার প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলে না কখনও।

শুধু তুমি নেই, তবু তোমার উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে নদীর জলে, ঘাসের জঙ্গলে , সন্ধ্যার নক্ষত্রে। যেন প্রতিটি ঢেউ তোমার নাম উচ্চারণ করে, প্রতিটি বাতাস তোমার চুলের সুবাস হয়ে আমার নিঃসঙ্গতাকে ছুঁয়ে যায়।

এসো, আমাকে আলিঙ্গন করো নদীর মতো, যেমন নদী দুই তীরের সমস্ত দূরত্ব ভাসিয়ে নেয়। জড়িয়ে ধরো সাগরের মতো, যেমন গভীরতা তার সমস্ত গোপন ব্যথাকে বুকে আশ্রয় দেয়। মিশে যাও মোহনার মতো, যেখানে পৃথক স্রোতেরা ভুলে যায় নিজেদের পরিচয়।

চুম্বন দাও, যেমন ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে দেয় শিশিরভেজা পৃথিবী, যেমন জননীর কোলে ঘুমিয়ে থাকা দেবশিশুর কপালে আশীর্বাদের কোমল স্পর্শ।

এসো বাহুবন্ধনে, আমার সমস্ত অন্ধকারে আলো হয়ে। এসো, আমার রক্তে, আমার স্বপ্নে, আমার অনন্ত প্রতীক্ষায় সূর্যের মতো দীপ্ত হয়ে জ্বলো,এসো, আমার প্রেমকে জ্যোতির্ময় করো।


৩৪.      মায়ার ঘুম


সেই চোখ যেদিন প্রথম দেখিলাম, দীঘির জলে তখন সন্ধ্যার আকাশ ভাসিতেছিল, কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে অচেনা এক নীল বিষণ্নতা ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল পৃথিবীর বুকে।

তোমার চোখে ছিল জলের ভাষা, কোনও উচ্চারণ ছিল না, তবু কত শত অব্যক্ত বাক্য ঢেউ হইয়া ভাঙিতেছিল আমার অন্তরে।

মনে হইয়াছিল, তুমি বুঝি বহু জন্মের পথ হাঁটিয়া আসিয়াছ, ক্লান্ত পাখির মতো একটু মায়ার আশ্রয় খুঁজিয়া।

আমি তোমার দিকে তাকাইয়া ছিলাম, তুমি আমার দিকে, মধ্যখানে শুধু কাঁপিতেছিল জ্যোৎস্নাভেজা নীরবতা।

তারপর তুমি কিছুই বলিলে না, শুধু চোখের কোণে একফোঁটা অদৃশ্য শিশির রাখিয়া ধীরে ধীরে ঘুমাইয়া পড়িলে।

আজও সেই ঘুমের শব্দ শুনি, রাত গভীর হইলে, চাঁদের আলো যখন দীঘির জলে নিঃশব্দে ভাঙিয়া পড়ে।
মনে হয়, তুমি এখনও সেখানে আছো, জলরেখার ওপারে, মায়ার ভিতরে, একটি স্বপ্ন হয়ে, যাহাকে ছুঁইতে গেলে জাগিয়া ওঠে শুধু অশ্রুর আলো।


৩৫.      রমণী 


আমাদের দেহ নদীর মতো,
কখনও নুড়ির নীরবতা, কখনও বালিয়াড়ির দীর্ঘশ্বাস,
কখনও ঝর্ণার উচ্ছ্বাসে রিমঝিম ভেঙে পড়ে 
আলোর জল -
এক কূল ভাসে, অন্য কূল প্লাবিত হয়,
তবু প্রেমের উৎস কখনও ফুরায় না।

আমাদের চান্দ্র-চুম্বনগুলি চিকচিকে জলের মতো,
সমুদ্রের শুভ্র ফেনার মতো ক্ষণস্থায়ী 
অথচ অনন্ত, আবার হাঙরের দংশনের মতোই গভীর,
তাদের আশ্লেষ লেগে থাকে ঠোঁটে, 
চিবুকে, শ্বাসে, রাত্রির সমস্ত নক্ষত্রালোকে।

আমাদের দেহ স্বচ্ছ আয়নার মতো,
বিধৌত চরাচরের মতো নগ্ন ও নিবিড়
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ নিজেরই প্রতিচ্ছবি 
হয়ে ফিরে আসে -
আঙুলের আঁচড়ে জেগে ওঠে রক্তিম ফুল,
করুণা থাকে না, মমতা থাকে না -
থাকে শুধু দহন, এবং এক অবিনশ্বর 
আত্মসমর্পণের দীপ্তি।

প্রতিক্ষণ আমরা ক্ষত হই,
খুলে যায় সকল বন্ধন, সকল বন্ধনী
উপত্যকা ভেঙে পড়ে, 
চাঁদ বিক্ষত হয়, তারারা একে একে নেমে আসে আমাদের বালিশে।

তখন আর জানা যায় না,
কে তুমি, কে প্রেমিকা, কে কুলবধূ, 
সব পরিচয় গলে গিয়ে রয়ে যায় 
শুধু এক আদিম নারী, আর এক অনন্ত প্রেম, 
যার কাছে পৃথিবীর সমস্ত নদী এসে
নিঃশব্দে সমুদ্রে মিশে যায়।


৩৬.      রয়েছ তুমি জীবন জুড়ে 


তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
আর কোনো শূন্যতা নেই -
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
নিঃসঙ্গতার সব দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।

তুমি আছো বলেই
জানালার ধারে বসে থাকা বিকেলগুলো
অকারণে বিষণ্ন হয় না আর।

আমার প্রতিটি ভোরে
তোমার আলো এসে জড়িয়ে ধরে শিশিরকে,
প্রতিটি রাত্রি
তোমার স্বপ্নের চাঁদে ধুয়ে নেয় ক্লান্ত হৃদয়।

তুমি রয়েছ বলেই
নদী জানে সাগরের ঠিকানা,
বাতাস জানে ফুলের গন্ধের অর্থ,
আর আমি জানি -
ভালোবাসা কখনও শুধু একটি শব্দ নয়।

তোমার দুটি চোখে
আমি আমার ভবিষ্যৎকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখি-
যেন বহুদিনের পথচলা শেষে
একটি পাখি ফিরে পেয়েছে নিজের নীড়।

যদি কোনোদিন
সব আলো নিভেও যায় পৃথিবী থেকে,
তবু তোমার মায়ার প্রদীপটুকু
আমার অন্তরে জ্বলতেই থাকবে।

তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
তাই প্রতিটি ঋতুই আমার কাছে বসন্ত -
তুমি রয়েছ আমার সমস্ত অস্তিত্বে,
আর কোনো শূন্যতা নেই,
তোমার নামের ভেতরই আমার 
অনন্ত জীবনের কোমল স্পন্দন।


৩৭.      নীলগিরি পাহাড়ে একদিন 


নীলগিরি পাহাড়ে আমরা ছিলাম একদিন একরাত-
সেই একদিনই আজও একটি অনন্ত ঋতু,
পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নেমেছিল
নীলচে বিষণ্নতার মতো -
মেঘ এসে তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিল,
যেখানে আকাশও মানুষ হয়ে যায়।

তুমি বলেছিলে,
"যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই,
এই পাহাড় আমাকে মনে রাখবে।"

রাত গভীর হলে
তারাগুলো খুব কাছে নেমে এসেছিল।
মনে হয়েছিল,
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়
অপূর্ণ সব স্বপ্ন।

তোমার হাতের উষ্ণতা
আমার শীতার্ত আঙুলে জড়িয়ে ছিল,
যেন পৃথিবীর সমস্ত শীতের বিরুদ্ধে
একটি  অনন্ত প্রতিরোধ।

হঠাৎ দূরের অরণ্যে
কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠল
আমরা দু'জনেই চমকে তাকালাম—
সেই ক্ষণিক ভয়ও
অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হয়ে
আজও বেঁচে আছে স্মৃতির গহিনে।

ভোরে সূর্য উঠেছিল
মেঘের ভাঙা জানালা দিয়ে।
তুমি বলেছিলে -
"দেখো, আলোও কত ধীরে জন্ম নেয়!"

আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম,
কিছু কিছু ভালোবাসাও
এভাবেই আলো হয়ে ওঠে,
তারপর একদিন
অকারণে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।

ফেরার পথে
পাহাড়গুলো আর আমাদের দিকে তাকায়নি,
হয়তো তারা জানত -
যে প্রেম ফিরে আসে না
তার জন্য পথ অপেক্ষা করে না।

যখন কোনো নীল বিকেল নামে,
অথবা মেঘ এসে জানালায় হাত রাখে,
আমি নিঃশব্দে ফিরে যাই
নীলগিরি পাহাড়ের সেই একদিন একরাতে।

সেখানে এখনও
একজোড়া পদচিহ্ন পাশাপাশি আছে -
একটি আমার, আরেকটি তোমার,
শুধু তুমি নেই।


৩৮.     এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায়


এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায় -
মন্দাক্রান্তায় রচিত হয়েছিল সে আবেগে অনুরাগে...
চাঁদের শুভ্র আলোয় নুয়ে পড়েছিল কদমের ডাল,
নদীর জলে জেগেছিল নীরব প্রেমের অনুবাদ।

তার চোখে ছিল নীল আকাশের গভীর বিস্ময়,
ঠোঁটে ছিল অপ্রকাশিত কোনো গানের প্রথম কলি।
আমি শুধু শুনেছিলাম -
নিঃশব্দেরও একটি ভাষা আছে,
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় ভালোবাসা।

বকুলের গন্ধ ভেসে এসেছিল বাতাসের গোপন চিঠিতে,
শিউলি ঝরে পড়েছিল আমাদের পায়ের কাছে -
মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সমস্ত ঋতু বুঝি
সেই একটি সন্ধ্যাতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার বাহুর উষ্ণতায়
জ্যোৎস্নাও পেয়েছিল মানবিক হৃদস্পন্দন;
আমার সমস্ত বিষাদ
একটি সাদা পাখির মতো উড়ে গিয়েছিল
দিগন্তের নীল নির্জনতায়।

তারপর কত পূর্ণিমা এলো,
কত নদী বদলালো পথ,
কত নক্ষত্র নিভে গেল নিঃশব্দে -
তবু সেই সন্ধ্যার আলো
এখনও আমার জানালায় এসে বসে,
মৃদুস্বরে তোমার নাম উচ্চারণ করে।

যদি আবার কোনো পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়,
তবে আর কোনো কবিতা লিখব না -
শুধু তোমার চোখের গভীরে মুখ রেখে
আজীবনের সমস্ত অব্যক্ত প্রেম
নীরবে পড়ে শুনব।


৩৯.      শূন্যতায় তুমি


আমি সমর্পণ করতে চাই - 
তুমি থাকো না-হয় সহস্র আলোকবর্ষ দূরে, 
তবু তোমার নামের ক্ষীণ আলো আমার রাত্রির জানালায় এসে নীরবে বসুক।

এ শহর আজ অদ্ভুত ফাঁকা - 
রাস্তায় নেমে মনে হলো, ইট-পাথরও যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে, মানুষ আছে, অথচ কোলাহল নেই, 
হাসি আছে, অথচ প্রাণ নেই।

জনারণ্যময় রাজপথই আমার বেশি প্রিয় -
সেখানে মানুষের পদধ্বনির ভিড়ে নিজের কান্নার শব্দ হারিয়ে যায়, অগণিত মুখের ভেতর নিজের একাকীত্বটুকুও চুপিচুপি আড়াল করে রাখা যায়।

কিন্তু এই নিস্তব্ধতা - 
সে তো হৃদয়ের ভেতর ধীরে ধীরে জন্ম দেয় 
এক অনন্ত শূন্যতার মহাকাশ, যেখানে শুধু তোমার অনুপস্থিতির নক্ষত্রেরা জ্বলে।

হে প্রভু, এমন শূন্যতা আমাকে দিও না -
যেখানে প্রার্থনাও প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে,
বরং আমাকে সমর্পণ করো মানুষের ভালোবাসায়, পাখির ডানায় ভেসে আসা সকালের গানে, 
বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে, 

আর সেই অমলিন আশায় - 
যেখানে দূরতম আলোকবর্ষ পেরিয়েও কেউ একজন আমার জন্য একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে।


৪০.       অশেষ করেছ


হঠাৎ একদিন শরীর কেঁপে উঠল প্রবল জ্বরে।
সময়ের সমস্ত শব্দ যেন থেমে গেল।
দুই দিন অচৈতন্যের অন্ধকারে ডুবে ছিলাম।
কীবোর্ডে আঙুল ছোঁয়ানোর শক্তিটুকুও ছিল না।
কাউকে কিছু জানাইনি, কেমন এক বিষণ্নতা 
আমাকে ঘিরে রেখেছিল।

বারবার মনে হচ্ছিল,
এই বুঝি সৃষ্টিকর্তা আমাকে তাঁর অদৃশ্য ডাকে ফিরিয়ে নেবেন।
কিন্তু না, তিনি নেননি।

এক জোড়া স্নেহময় হাত, অক্লান্ত সেবাযত্ন, 
আর অগাধ মমতা আমার নিভে-আসা প্রাণে 
আবার আলো জ্বেলে দিল।

মৃত্যুর দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বুঝলাম -
জীবন আসলে প্রতিদিন নতুন করে পাওয়া এক অলৌকিক উপহার।

তখনই অন্তরের গভীর থেকে ভেসে উঠল রবীন্দ্রনাথের সেই অমলিন প্রার্থনা -

“আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব -
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।”

আজ মনে হয়,
আমরা কেউই কেবল নিজের শক্তিতে বেঁচে থাকি না।
অদৃশ্য করুণার স্পর্শে,
কোনো এক মানুষের নিবেদিত ভালোবাসায়,
আর অনন্ত দয়ার ছায়াতেই
জীবন বারবার ফিরে আসে -
নতুন আলোয়, নতুন শ্বাসে, নতুন আশায়।


৪১.     জোনাকির নকশা


এইখানে নিঝুম এসে নামে অতর্কিতে গূঢ় রাতদুপুর, চাঁদেরও যেন সাহস হয় না আমার জানালায় কড়া নাড়ার।

নীরবতার বুক চিরে জোনাকিরা বুনে চলে অদৃশ্য আলোর সূক্ষ্ম নকশা, যেন তোমার নামের আদ্যাক্ষর অন্ধকারের ক্যানভাসে লিখে যায়।

শিরা-ধমনী জুড়ে তোমার সেই এক তীব্র স্পর্শ এখনও রক্তের ভেতর ঢেউ তোলে, সমস্ত দেহ যেন অপেক্ষার এক দীর্ঘ নদী।

আমি কতবার ডেকেছি তোমাকে, বাতাসের কাছে, অশ্বত্থের পাতায়, দূর নক্ষত্রের নিভে-আসা আলোয়। উত্তর আসেনি কোথাও, শুধু রাত আরও গভীর হয়েছে।

তবু জানো, হারিয়ে যাওয়াও কখনও কখনও ভালোবাসার আরেকটি ভাষা। যে ভাষা কেবল জোনাকি, শিশির আর মধ্যরাত্রিরা বোঝে।

যদি কোনো এক রাত্রি প্রহরে তুমি ফিরে আসো, তবে দেখবে, আমার বুকের দরজায় এখনও জ্বলে আছে একটি ক্ষুদ্র আলো, যা কোনোদিন নিভতে শেখেনি।

সেই আলোয় আমরা আবার লিখব অসমাপ্ত স্বপ্নের শেষ অধ্যায়, যেখানে বিচ্ছেদ থাকবে, কিন্তু একাকীত্ব থাকবে না, থাকবে শুধু তোমার নামে জেগে থাকা এক অনন্ত জোনাকির নকশা।


৪২.     যৌবনের রক্তাক্ত দিন


আমাদের যৌবনের রক্তাক্ত দিনে
নির্মোহ ছিলাম, প্রেমে -
নির্লোভ ছিলাম, বিত্তে -
নির্বোধও ছিলাম, তবু স্বপ্নের কাছে পরাজিত হইনি কখনো।

মুঠোভরা আকাশ নিয়ে হেঁটেছি ধুলোমাখা রাজপথে,
ক্ষুধার চেয়েও বড় ছিল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা।

রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে, তবু আদর্শের রং আজও শুকায়নি,
হারিয়ে গেছে কত নাম, অথচ তাদের প্রতিধ্বনি এখনো বাতাসে জেগে থাকে।

আজ ফিরে দেখি, সেই নির্বোধ যৌবনই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ সময়,
কারণ ভালোবাসতেই জানতাম, আর বিশ্বাস করতে জানতাম পৃথিবীকে।


৪৩.     প্রথম কুমুদিনী


যেদিন প্রথম আলো এসে নিঃশব্দে আমার কাঁধে হাত রেখেছিল,
কর্দমের গভীর নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠেছিল একটি সাদা কুমুদিনী।
সেদিনই মনে হয়েছিল -
অদৃশ্য কোনো নিষিদ্ধ আলোর দিকে
আমার ছায়া আগে পৌঁছে গেছে।

চোখে তখনও শিশিরের অনভ্যস্ত ভাষা,
তবু চারদিকের দৃষ্টিরা
আমার আয়নার জল বদলে দিল।
নিজেকে ঢেকে রাখতে শিখলাম -
যেন প্রস্ফুটনও এক গোপন অপরাধ,
যার রায় লেখা থাকে নিঃশব্দতার অক্ষরে।

আমি তো কেবল ফুটেছিলাম -
যেমন ভোর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিজেকে উচ্চারণ করে,
যেমন নদী নিজের দিক জানে না, তবু সমুদ্রের দিকে যায়,
যেমন কাদামাটির অন্তঃস্থলে
অজান্তেই জন্ম নেয় শ্বেতের প্রথম স্বপ্ন।

কিন্তু পৃথিবী ফুলের দিকে তাকায়নি,
তারা দেখেছিল নিজেদের ছায়া,
আর সেই ছায়ার কালিমাই
আমার পাপের নাম হয়ে উঠেছিল।

আজ বহু ঋতু পরে
শুকিয়ে যাওয়া সেই পুষ্করিণীর কিনারে দাঁড়িয়ে
মনে হয় -
কুমুদিনীর কোনো অপরাধ ছিল না;
অপরাধ ছিল সেই চোখের,
যারা নির্মল জলের গভীরেও
অশুভের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফেরে।

তবু আজও,
আমার অন্তর্জলের অন্ধকারে
একটি সাদা ফুল নীরবে ফুটে ওঠে।
সে কোনো স্বীকারোক্তি নয়, কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাও নয়,
সে কেবল প্রকৃতির প্রথম নিঃশ্বাস,
এক নিষ্পাপ হৃদয়ের
নামহীন, অনন্ত প্রস্ফুটন।


৪১.     রুদ্রাক্ষের চোখে


তিনি আসেন -
যেন কর্দম ছিঁড়ে ফোটা প্রথম শ্বেত কুমুদিনী,
দেহে কোনো অহংকার নেই,
তবু প্রতিটি পরতে নিভৃতে জেগে থাকে
প্রকৃতির দীর্ঘ সাধনা।

চুড়ো করে বাঁধা চুলের নিচে
কপালের রক্তচন্দন যেন সন্ধ্যাতারার অগ্নিবিন্দু,
সরু রুদ্রাক্ষের মালা
গলার কাছে মন্ত্রের মতো কাঁপে -
মনে হয়, শরীরও বুঝি এক প্রার্থনার ভাষা।

তাঁর গাত্রবর্ণে -
দুধের শুভ্রতা নেই, কৃষ্ণমেঘের গাঢ়তাও নয়,
আষাঢ়ের প্রথম ভোরের মতো
অদ্ভুত এক কোমল আলোকছায়া,
যেখানে হাত রাখলে
হয়তো শিশিরের শব্দও শোনা যায়।

কিন্তু তাঁর চোখ -
হে ঈশ্বর, সেই চোখ দুটি!
হরিণীর চমক, নদীর গভীরতা,
আর মধ্যরাত্রির অব্যক্ত নক্ষত্রলোক -
সব এসে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে।

যে একবার ডুবে যায়,
সে আর নিজের তীরে ফিরতে পারে না।
তাঁর মুখ শিশুর মতো নির্মল,
কিন্তু ওষ্ঠের কোণে জেগে থাকে
অগ্নিশপথের অনমনীয় রেখা -
মনে হয়, প্রেম এলে তিনি ফুল,
বিচ্ছেদ এলে অনড় শিলাখণ্ড।

আমি তাঁকে দেখি -
দেহ নয়, যেন এক মায়াবী উপাসনালয়,
যেখানে স্পর্শেরও আগে
হৃদয় নতজানু হয়ে যায়,
আর সমস্ত কামনা ধীরে ধীরে রূপ নেয়
নির্বাক আরাধনায়।


৪২.     প্রেমের কোনো বিধিবিধান নেই


দুই নারী যখন পরস্পরের হাত ছুঁয়ে দাঁড়ায়,
শহরের সমস্ত সাইনবোর্ড হঠাৎ বাতাসে কেঁপে ওঠে।
যেন নিষেধের ভাষাগুলো একে একে ঝরে পড়ে
শিউলি-ফোটা ভোরের মতো নীরবে।

তাদের স্পর্শে কোনো বিদ্রোহের স্লোগান নেই -
আছে কেবল নদীর মতো অনিবার্য এক স্রোত,
যে স্রোত জানে, ভালোবাসা
মানচিত্রের রেখা কিংবা আইনের দাগ মানে না।

আর দূরে, সভ্যতার পোশাক গায়ে জড়ানো 
কিছু মানুষ কীবোর্ডে আগুন জ্বেলে লেখে রায়,
তাদের বুকের অদৃশ্য ব্যথা
মিমের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদে।

তবু প্রেম তো সেই প্রাচীন পাখি -
রবীন্দ্রসুরে যেমন উড়ে যায় আকাশের ওপারে,
তেমনি দুই নারীর চোখেও সে বাসা বাঁধে;
কবিতার পাতা ছিঁড়ে নেমে আসে জীবনের উঠোনে।

ভালোবাসা যদি সত্যিই আলো হয়,
তবে সে আলো কার কপালে পড়বে,
কার হাত ছুঁয়ে জ্বলে উঠবে -
সে সিদ্ধান্ত কোনো শহরের নয়,
কেবল হৃদয়ের।


৪৩.     কাঠচাঁপার হৃদয়


যমুনার কূলে সেদিন বিকেল নেমেছিল প্রার্থনার মতো, একটি কাঠচাঁপা গাছের নিচে এক যুবকের কোলে ছিল না পৃথিবী, 
ছিল একটি মেয়ের সমস্ত নিশ্চিন্ত ঘুম -
কথা ছিল না, শুধু দুটি চোখ একে অপরের ভেতর একটি অনন্ত দেশের মানচিত্র এঁকে যাচ্ছিল।

তারপর তারা চলে গেলে মাটির বুকে রয়ে গেল-
একটি লেখা- সাহানা- রঞ্জন, আর তার পাশে আঁকা একটি ছোট্ট হৃদয়।

হঠাৎ একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে পড়ল 
সেই হৃদয়ের ওপর, মনে হলো, যে দেশে ফুল 
নামের ওপর নয়, হৃদয়ের ওপর  ঝরে পড়ে,  
সে দেশে ঘৃণা কখনও শেষ কথা 
হতে পারে না।

মানুষের সব পরিচয়ের ওপরে যদি কোনো 
উপত্যকা থাকে, তার নাম প্রেম -
আর প্রেমের ওপর যদি প্রতিদিন একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে, তবে এই মাটি চিরকাল মানুষেরই থাকবে।


৪৪.    নক্ষত্রের চোখে জল


সেই কবে
আমার প্রথম যৌবনের মৌবনে
কিছু ফুল ছিল,
ফোটার আগেই তারা ঝরে গেল।

বিদায়ের আগে
দখিনা বাতাসের কানে রেখে গেল একটি বাক্য-
চিরবিরহিণীর দীর্ঘশ্বাসের মতো ধীর,

"তোমার তো একটা বিশ্ব আছে,
আছে অনন্ত আকাশ।
সেখানে তুমি নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে,
তোমার আলোয় ভরে উঠবে চারদিক।"

শুধু একটি সত্য
তাদের অজানাই থেকে গেল -
সব আলো আনন্দ নয়, 
কিছু নক্ষত্র
দূর থেকে জ্বলতে জ্বলতে
নিজের অশ্রু
নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখে।


৪৫.     শেষ বিকেলের বন্ধুদের জন্য


জীবনের এই অস্তরাগে এসে হঠাৎ মনে হয়-
যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত প্রথম আলোর সেই সরু পথটি, যেখানে বন্ধুত্ব ছিল নামহীন, তবু সবচেয়ে সত্য।

যারা হাত ধরেছিল শৈশব, কৈশোর কিংবা প্রথম যৌবনের দুপুরে, সময়ের দীর্ঘ নদী তাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কোন্ অচেনা মোহনায়।

বিশ, তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ বছরের নীরবতা-
তবু কি তারা কোথাও আমার নামটি একবারও উচ্চারণ করে? নাকি আমিও তাদের স্মৃতির আকাশে একটি ঝরে-পড়া নক্ষত্র মাত্র?

বড়ো ইচ্ছে করে- কোনো এক অলৌকিক সন্ধ্যায় সবাই এসে বসুক একটি পুরোনো বটগাছের ছায়ায়, কারও চুলে রূপোলি ধুলো, কারও চোখে জীবনের গভীর ক্লান্তি, তবু হাসিটুকু থাকুক সেই আগেকার মতোই।

আমরা কেউ কাউকে প্রশ্ন করব না, কে কত হারিয়েছি, কে কত দূরে গিয়েছি, শুধু একবার চোখে চোখ রেখে বলব, "বন্ধু, এতদিন পরেও তুমি আমার ভেতরে বেঁচে আছ।"

তারপর সন্ধ্যা আরও গাঢ় হবে। পৃথিবী আপন নিয়মে অন্ধকারে ঢেকে যাবে। কেবল চোখের কোণে চিকচিক করে উঠবে কয়েক ফোঁটা অশ্রুর আলো - আর মনে হবে, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ বিচ্ছেদও সত্যিকারের বন্ধুত্বকে কখনো সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না।


৪৬.      তার কানে কানে


যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি আজও ভাসে
সাঁঝের মলিন গানে।
যে সুরটি জাগেনি আমার বীণার তারে,
সে সুর নীরব হয়ে
কাঁদে হৃদয়-পারে।

মাধবী চলে গেল এক মধুর নিশীথে,
ফেলে গেল চাঁদের আলো
অশ্রুর স্নিগ্ধ স্মৃতিতে।
বকুলের ঝরা ফুল গোপনে যে পথ জানে,
সেই পথ আজও ডাকে
তোমার কানে কানে।

যে নদী হারিয়ে গেছে সুদূর মোহনার দেশে,
তার কলতান রয়ে গেছে
নিভৃত বিরহ-শেষে।
যে পাখিটি উড়ে গেল আকাশের নীল পানে,
সে আর ফিরে এল না
ফাগুনের কোনো গানে।

আজিও সন্ধ্যাতারা জ্বলে নিরালার আকাশে,
বাতাস কেবল তোমারই
নামটি এসে ভাসে।
বীণার ব্যথার সুর ঝরে নীরব অভিমানে—
যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি রবে চিরদিন
তোমার কানে কানে।


৪৭.     তুমি থাকলেই


আমরা কোনো রূপকথার প্রাসাদ তুলব না 
আকাশের কিনারে,
মেঘের সিঁড়ি বেয়ে সুখের দেশে যাব বলেও 
শপথ নেব না।
জানি, সব শপথেরই একদিন সন্ধ্যা নামে,
সব আলোরই থাকে নিভে যাওয়ার নিজস্ব সময়।

তাই এসো,
একটি সাধারণ বিকেলের পাশে বসে থাকি
আর যতটুকু স্বপ্ন ভেসে ওঠে,
ততটুকুই আমাদের অনন্ত হোক।

তোমার হাতের উষ্ণতায়
আমি কোনো অলৌকিকতা খুঁজি না,
শুধু চাই, পথ দীর্ঘ হলে
হাতটি যেন আলগা না হয়।

ঝড় এলে জানালাগুলো কেঁপে উঠুক,
বৃষ্টি এসে মুছে দিক উঠোনের সব পদচিহ্ন,
তবু হৃদয়ের ভেতর
একটি প্রদীপ জ্বলে থাকুক -
যার শিখা দেখে আমরা চিনে নেব
এখনও ঘরে ফেরার পথ আছে।

কোনো নিয়তির দরজায় আমরা করুণা 
চাইব না, কোনো নক্ষত্রের কাছে
সুখের হিসেবও রাখব না।
যা কিছু হারাবে,
তারও ওপারে যদি একটি বিশ্বাস থেকে যায়,
তবে সেটুকুই হবে আমাদের উৎসব।

একদিন চুলে রুপোলি ধুলো জমবে,
চোখের কোণে নেমে আসবে বহু দিনের ক্লান্তি,
তবু যদি সন্ধ্যার শেষে তুমি মৃদু স্বরে বলো,
আমি আছি তোমারই -
তাহলেই পৃথিবীর সমস্ত অসমাপ্ত গান
পূর্ণ হয়ে যাবে।


৪৮.     শেষ আলোর আগে


শেষ বিকেলের ভেজা বাতাসে
আমার সব পথ ধীরে ধীরে নদী হয়ে যায়,
দূর আকাশে কার অচেনা মেঘ
নিঃশব্দে নামিয়ে দেয় বিদায়ের নীল পর্দা।

বকুলের ডালে ঝুলে থাকে
অকথিত দিনের শেষ সুবাস -
ঝরাপাতারাও যেন জানে
ফিরে আসার সব প্রতিশ্রুতি একদিন বৃষ্টিতে মুছে যায়।

আমি আর কোনো আলো চাই না,
শুধু তোমার স্মৃতির ক্ষীণ প্রদীপটি
নিভে যাওয়ার আগে
একবার আমার মুখের দিকে তাকাক।

তারপর যদি রাত নামে,
নামুক শিশিরের নরম পায়ে;
আমার সমস্ত ক্লান্তি
মিশে যাক ভেজা মাটির গন্ধে।

হয়তো দূরের কোনো বাঁশির সুরে
আবার ফুটবে অদেখা প্রভাত,
আর আমি থাকব না -
তবু আমার অস্ফুট ভালোবাসা
কদমফুলের গায়ে গায়ে
তোমার জানালায় ভোর হয়ে ঝরে পড়বে।


৪৯.    শেষ প্রহরের গান


দিনের প্রদীপ নিবে আসে ধীরে,
সাঁঝের আরতির ধোঁয়া ভেসে যায় গগনে।
কোন্ অদৃশ্য আহ্বান ডাকে আমাকে
দূর নক্ষত্রের নিস্তব্ধ উপাসনালয়ে।

পৃথিবীর যত সুখ-দুঃখ,
আজ যেন ঝরা শিউলির মতো
নিঃশব্দে ঝরে পড়ে চরণের কাছে
কিছুই আর ধরে রাখিতে সাধ জাগে না।

যে ফুল ফোটেনি, তারও গন্ধ
মিশে আছে আমার নিঃশ্বাসে -
যে গান গাওয়া হলো না,
সে আজ ঈশ্বরের বীণায় বাজে
অশ্রুর অতল রাগিণী হয়ে।

হে করুণাময়ী চিরসাথি,
তোমার মায়ার করুণ স্পর্শে
আমার সমস্ত অভিমান ধুয়ে যাক।
এই ক্ষণিক জীবনের জীর্ণ বসন
তোমার বাতাসে উড়ে যাক দূরে।

যখন শেষ মেঘটিও মিলাবে আকাশে,
শেষ পাখিটিও ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন আমায় ডেকো -
শব্দে নয়, আলোতেও নয়,
গভীর নীরবতার সেই অনন্ত সুরে।


৫০.     যদি আর দেখা না হয়


চুম্বন চেয়ো না, ঠোঁটের কাছে আজও অসংখ্য অব্যক্ত বিদায় জমে আছে। তার চেয়ে তোমার হাতখানি এক মুহূর্ত আমার হাতে রাখো, যেন সন্ধ্যার শেষ আলো অন্ধকারে মিশে যাওয়ার আগে একবার পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখে।

যদি রৌদ্র বড়ো কঠিন হয়ে ওঠে, আমার স্মৃতির ছায়ায় একটু বসো। আমি তো আর ফিরব না, তবু বাতাসে ভেসে থাকবে তোমার নাম ধরে ডাকা আমার বিদায়ের সুর।

যে স্বপ্নগুলি তোমার চোখে রেখে যেতে চেয়েছিলাম, তারা আজও রাত্রির আকাশে অচেনা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে। তুমি যখন জানালার পাশে একলা দাঁড়াবে, হয়তো তাদের কোনো একটি তোমার চোখের জলে নেমে আসবে।

ভালোবাসা আমাদের একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল না, ছিল পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে দুই ভিন্ন পথের মোড়ে নিঃশব্দে থেমে যাওয়ার নিয়তি।

তবু যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, কোনো ডাক দিও না। আমি তখন হয়তো তোমারই কোনো পুরোনো বিকেলে, ঝরে-পড়া শিউলির গন্ধে, অথবা মেঘমুখর আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসব।

সেদিন একটি দীর্ঘশ্বাসই যথেষ্ট হবে, তার মধ্যেই রয়ে যাবে আমাদের না-বলা সব চুম্বন, না-ফেরা সব পথ, আর এক জীবনের অব্যক্ত ভালোবাসা।

যা পেয়েছি, তাতেই পূর্ণতা


যা পেয়েছি,  তাতেই পূর্ণতা ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - জুন  - ২০২৬ ইং

উৎসর্গ  -


ভূমিকা -

মানুষের জীবন মূলত অনুভূতির এক অবিরাম যাত্রা। সেই যাত্রার পথেই কখনো প্রেম এসে হৃদয়কে আলোকিত করে, কখনো বিরহের দীর্ঘশ্বাস নিঃশব্দে জমে ওঠে, আবার কখনো প্রকৃতি তার রঙ, গন্ধ ও ঋতুচক্রের মায়ায় আমাদের অন্তরকে স্পর্শ করে যায়। কবিতা সেই স্পর্শেরই ভাষা, অনুভবেরই অনুরণন।

এই গ্রন্থের কবিতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বা অলংকারের প্রদর্শনী নয়; বরং সময়, স্মৃতি, আবেগ এবং জীবনানুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। এখানে প্রেম কখনো নিবিড় সান্নিধ্যের, কখনো অপেক্ষার; বিরহ কখনো নীরব অভিমানের, কখনো হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখের স্মৃতিবাহী। একই সঙ্গে প্রকৃতি তার চিরন্তন রূপে উপস্থিত হয়েছে—বর্ষার বৃষ্টি, কদমফুল, জোছনার আলো, নদীর ঢেউ কিংবা ঋতুবদলের মৃদু আহ্বানে।

সমকালীন জীবনের নানা অনুভব, মানুষের অন্তর্গত একাকিত্ব, ভালোবাসার অনির্বচনীয় আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক - এসবই এই কবিতাগুলোর প্রধান সুর। আধুনিক সময়ের দ্রুতগামী জীবনে হারিয়ে যেতে বসা কোমল অনুভূতিগুলোকে শব্দের শরীরে ধরে রাখার এক আন্তরিক প্রয়াস রয়েছে এই সংকলনে।

যদি কোনো কবিতা পাঠকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আনন্দ, বেদনা কিংবা ভালোবাসার সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্যও সেতুবন্ধন রচনা করতে পারে, তবেই এই প্রয়াস সার্থক বলে মনে করব।

পাঠকের হাতে এই বই তুলে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। আন্তরিক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রইল সকল পাঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং সাহিত্যপ্রেমী মানুষের প্রতি।

কোয়েল তালুকদার 
দক্ষিণ খান, ঢাকা। 



১.      তোমাকে দেখা 


তোমাকেই দেখা শেষ হলো না -
তাই আকাশের দিকে তাকাই বারবার,
যেন মেঘের ছায়ায় লুকিয়ে আছো তুমি
একটি অপূর্ণ বিকেলের মতো।

নদীর কাছে গেলে জল কেঁপে ওঠে,
হয়তো সে-ও তোমার খবর জানে 
ঢেউয়েরা গোপনে বলে যায় -
কাউকে কখনও পুরো দেখা হয় না।

শিউলি ঝরা ভোরে, জোনাকিভেজা মধ্যরাতে,
চাঁদের ম্লান আলোয় কিংবা
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে -
তোমার ছায়া এসে বসে থাকে
আমার নিঃসঙ্গ জানালায়।

আমি যতই তোমাকে দেখি,
ততই মনে হয় -
তোমার ভেতরে আরও একটি তুমি আছে,
তারও ভেতরে আরেকটি অচেনা আলো,
যার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
ফুরিয়ে যায় জীবন।

তোমাকেই দেখা শেষ হলো না,
আর কবে কাকে দেখব?
এই প্রশ্ন নিয়েই হয়তো
একদিন নক্ষত্র হয়ে যাবো দূর আকাশে।

তখন যদি রাতের শেষে
তুমি একবার মুখ তুলে তাকাও,
দেখবে - একটি তারা নিঃশব্দে জ্বলছে,
শুধু তোমাকে দেখার জন্য, 
শুধু তোমাকেই।


২.     নদীর কাছে


নদী দেখলেই আমার মনে হয়, 
পৃথিবীর সব ক্লান্তির একটি গোপন ঠিকানা আছে, 
আর তার নাম নদী।

নদীর জলে মুখ রাখলে শোনা যায় 
বহুদিন আগের হারিয়ে যাওয়া মানুষের ডাক, 
ভেসে আসে কাশবনের নিঃশ্বাস, দূর কোনো গোধূলির মায়ামাখা শঙ্খধ্বনি।

আমি তখন নদীর দিকে চেয়ে থাকি - 
যেন সে কোনো জলরাশি নয়, বরং নীল শাড়ি পরা 
এক মায়াবতী, চুলে যার বৃষ্টির গন্ধ, চোখে যার 
হাজার বছরের বিষণ্নতা।

নদী দেখলেই ভেসে যেতে ইচ্ছে করে, 
কোনো গন্তব্য ছাড়া, 
শুধু স্রোতের হাতে হাত রেখে অচেনা আকাশের নিচে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

নদী জানে - মানুষের বুকের ভিতর কত 
অপ্রকাশিত কান্না থাকে, কত অসমাপ্ত প্রেম, 
কত চিঠি লেখা হয় না কখনও।

তাই সন্ধ্যা নামলে সে নীরবে আমার পাশে এসে বসে, জলের পাতায় আঁকে চাঁদের মুখ, 
আর বলে - যেও না কোথাও, তোমার সব দুঃখ আমাকে দাও, আমি সাগর পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাব।

তখন মনে হয়, নদী শুধু নদী নয় -
সে এক অনন্ত মায়া, যার বুকে ডুবে যায় না মানুষ, 
ডুবে যায় শুধু তার সমস্ত একাকীত্ব।


৩.     মায়ার পৃথিবী


এই পৃথিবীতে এসে প্রথম দেখেছি, নদীর বুকে ভাসমান বিকেলের আলো, সাগরের অন্তহীন নীল বিষণ্নতা, চাঁদের গায়ে লেগে থাকা রূপালি নিঃসঙ্গতা, সূর্যের অগ্নিময় আহ্বান, আর দূর আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রদের নীরব সংসার।

তারপর একদিন দেখা হলো তোমার সাথে, যেন বহু জন্মের পরিচিত কোনো স্বপ্ন, যে স্বপ্নের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল অজস্র ফুলের গন্ধ, অজানা পাখির ডাক, আর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের বিকেল।

তুমি এলে, পৃথিবীটা হঠাৎ আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠল। গাছের পাতায় পাতায় জমল মায়া, বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় জন্ম নিল প্রেম, আর আমার সমস্ত একাকীত্ব তোমার নামের কাছে এসে মাথা নত করল।

ভাবতাম, এভাবেই থাকবে চিরকাল, যেমন নদী সাগরের দিকে যায়, যেমন রাত চাঁদের জন্য অপেক্ষা করে, তেমন করেই তুমি জড়িয়ে থাকবে আমার জীবনকাল জুড়ে।

কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নির্মম। ফুল ঝরে যায়, নদী শুকিয়ে যায়, তারারাও একদিন নিভে যায়।
ভালোবাসারও মৃত্যু হয়,  নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে, অথবা হঠাৎ ঝড়ের মতো।

তখন বিদায়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখের কোণে জমে ওঠে প্রথম বৃষ্টির জল, মনে হয়, পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে মানুষ যেমন শেষবারের মতো চারপাশের সবকিছু ছুঁয়ে দেখতে চায়, তেমনি আমিও ছুঁয়ে দেখতে চাই তোমার সমস্ত স্মৃতি।

আর অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বুঝি,  ভালোবাসা মরে না পুরোপুরি, সে শুধু রূপ বদলায়, চলে যায় দূরের কোনো নক্ষত্রলোকে, যেখানে আজও তুমি আছো, আর আমি আছি, দুজনেই পৃথিবীর মায়া হয়ে।


৪.      নিঃশব্দলোকের সন্ধানে


মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে
শব্দের সমস্ত নদী পেরিয়ে
চলে যাই এক অচেনা নিঃশব্দলোকের দিকে -
যেখানে মেঘেরা আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কিন্তু কোনো গর্জন তোলে না;
ঝিঁঝি পোকারা ডানা মেলে,
তবু গানের কোনো তরঙ্গ ওঠে না বাতাসে।

সেখানে নদী আছে -
কিন্তু জলের বুকে কোনো ছলাৎছল নেই,
চাঁদ আছে -
কিন্তু আলো ঝরে নীরব শিশিরের মতো।

মানুষও আছে হয়তো,
তবু কেউ কাউকে আঘাত করে না শব্দের তীরে,
কোনো বঞ্চনা সেখানে
মর্মরধ্বনি হয়ে হৃদয়ে বাজে না।

আমি বহুদিন ধরে
সেই নিঃশব্দলোকের ঠিকানা খুঁজছি -
ধুলোমাখা পথের শেষে,
অস্তগামী সূর্যের লাল খামে,
নক্ষত্রের ঘুমন্ত বাগানে।

যতদূর যাই, ততই বুঝি -
সেই দেশ কোনো মানচিত্রে আঁকা নেই,
কোনো পথিক তার পথ জানে না।

হয়তো সে নিঃশব্দলোক
পৃথিবীর বাইরে কোথাও নয় -
আমাদের ক্লান্ত হৃদয়ের গভীরে
এক গোপন হ্রদের মতো লুকিয়ে আছে।

যেখানে একদিন
সব কান্না ঘুমিয়ে পড়ে,
সব অভিমান পাখি হয়ে উড়ে যায়,
আর আত্মা, দীর্ঘ যাত্রার শেষে,
নীরবতার সাদা ফুলের নিচে
মাথা রেখে বলে -
এবার একটু বিশ্রাম নিই।


৫.     মায়াবতী ও আনন্দ শহর


ঊনিশ বছর আগে আনন্দ শহর কোলকাতায়
সন্ধ্যা নেমেছিল শঙ্খের দীর্ঘ সুরে,
আকাশ জুড়ে জ্বলছিল প্রদীপের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্র,
আমার সাথে ছিল মায়াবতী।

সেই সময় পৃথিবীটাকে বড় সহজ মনে হতো,
ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি যেন দূর কোনো স্বপ্নের ডাক,
ভিড়ের মধ্যেও হাতের কাছে পাওয়া যেত
একটি নির্ভরতার উষ্ণতা -

যে শহরে জানলা বন্ধ থাকলেও
পাখিদের গান ঠিক ভোর এনে দেয়,
সেই শহরের অলিগলিতে
আমরা হেঁটেছিলাম নিঃশব্দে -
কথার চেয়ে বেশি কথা ছিল চোখে।

গঙ্গার বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিত,
আমি ভাবতাম -
মানুষের জীবনে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য
বোধহয় আর নেই।

তারপর কত ঋতু চলে গেল,
কত নদী বদলে ফেলল নিজের পথ,
কত মুখ এলো, কত মুখ হারাল -
কিন্তু লক্ষ্মীপূজার সেই সন্ধ্যা
আজও বুকের ভেতর প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

এখনও কোথাও শঙ্খ বাজলে
মনে হয়, কোলকাতার কোনো পুরোনো গলি থেকে
মায়াবতী হেঁটে আসছে ধীরে ধীরে।

গঙ্গার জলে এখনও হয়ত সন্ধ্যার আলো পড়ে
দূরের কোনো নৌকার ক্ষীণ প্রদীপ মায়ার মতো 
কাঁপতে থাকে জলের বুকে -
আমরা কেবল তীরে দাঁড়িয়ে নেই...  

তবুও গঙ্গা নীরবে বয়ে নিয়ে যায় আমাদের 
না-বলা সব কথামালা,
সেই না-থাকার মধ্যেই সবচেয়ে গভীরভাবে রয়ে যায় মায়াবতী, রয়ে যায় আনন্দ শহর -
রয়ে যায় এক অনন্ত জ্যোৎস্নাভেজা রাত্রি।


৬.     শব্দহীন বেদনা


এমন কিছু দুঃখ আছে, যাদের কোনো নাম নেই, 
কোনো অভিধান নেই, 
কোনো ভাষা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।

বুকের ভেতর তারা নিঃশব্দে বাসা বাঁধে, 
যেমন অন্ধকার রাতের গভীরে কোনো হারানো পাখির কান্না- শোনা যায় না, 
তবু আকাশ জুড়ে তার প্রতিধ্বনি।

আমি অনেকবার শব্দ খুঁজেছি, 
অনেকবার কবিতার কাছে গিয়েছি, 
নদীর কাছে, বৃষ্টির কাছে, 
জোনাকির ক্ষুদ্র আলোতেও লিখতে চেয়েছি 
আমার গোপন বিষাদের ইতিহাস।

কিন্তু শব্দেরা বড় অসহায়। 
তারা কেবল দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, ভেতরের ঘরে ঢুকতে পারে না।

আমার কিছু বেদনা আছে অবোলা প্রাণীর চোখের মতো - শুধু চেয়ে থাকে, কিছু বলতে পারে না। 
তাদের ভাষা নেই, আছে শুধু দীর্ঘশ্বাসের মতো এক অনন্ত নীরবতা।

তখন মনে হয়, 
পৃথিবীর সমস্ত কবিতার চেয়েও গভীর 
একটি অপ্রকাশিত কান্না আমার ভিতরে 
ঘুমিয়ে আছে।

আর আমি, সেই কান্নার পাহারাদার হয়ে, 
প্রতিদিন একটু একটু করে শিখে যাই - 
সব দুঃখ বলা যায় না, কিছু দুঃখ শুধু তারাদের 
মতো দূরে জ্বলে থাকে, 
আর নিঃশব্দে মানুষের হৃদয় আলোকিত করে।


৭.     সর্বনাশের দিনলিপি


প্রথম সর্বনাশ করেছি প্রেম করে - এক জোড়া চোখের ভেতর পুরো আকাশটাকে গুটিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। ভাবতাম, ভালোবাসা মানেই চিরবসন্ত, কোনো পাতা ঝরবে না কখনও।

দ্বিতীয় সর্বনাশ করেছি বিয়ে করে - দু'জন মানুষের স্বপ্ন যে একই ছাদের নিচে এসে কত ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, সে পাঠ তখনও জানা ছিল না। তবু হাত ধরেছিলাম, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

তৃতীয় সর্বনাশ করেছি সংসার পেতে - চালের হিসেব, ডালের হিসেব, অভাবের হিসেব, অভিমানের হিসেব - দিনশেষে দেখলাম, সবচেয়ে কঠিন অঙ্ক মানুষকে বুঝে ওঠা।

এখন জীবনের কী মজা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি-
সুখ আসে অতিথির মতো, দুঃখ থাকে ঘরের মানুষের মতো। তবু ভোর হলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, এক চিলতে রোদ এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করে।

তাই সর্বনাশের গল্প বলতে বলতে হাসি পেয়ে যায়- 
এই প্রেম, এই বিয়ে, এই সংসার, সব হারিয়েও মানুষ আবার ভালোবাসে।

বোধহয় এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সর্বনাশ।


৮.      হাস্নাহেনার রাত


ভাঙাচোরা হৃদয় আমার, আত্মাও আজ স্পন্দনহীন- যেন বহুদিন আগে নিভে যাওয়া কোনো প্রদীপ, যার ধোঁয়া এখনো ঘুরে বেড়ায় স্মৃতির অন্ধকার ঘরে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো, দেখবে না আমাকে ঠিক আগের মতো - চোখের ভেতর আর সেই নীল বিস্ময় নেই, স্বপ্নের জানালাগুলোও এক এক করে বন্ধ হয়ে গেছে।

তবু দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে - নিঃশব্দে, নির্ভয়ে, যেন পৃথিবীর সমস্ত বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের এক গোপন প্রতিবাদ।

তাদের গন্ধ ভেসে আসে রাতের শীতল বাতাসে, আর আমি ভাবি - ভালোবাসা বোধহয় মানুষ নয়, কোনো মুখও নয়; ভালোবাসা হয়তো সেই হাস্নাহেনা, যে ঝরে যায়, তবু সুবাস রেখে যায় দীর্ঘকাল।

তুমি যদি আসো, আমার ভাঙা হৃদয়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ নীরব থেকো - দেখবে, সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও একটু আলো রয়ে যায়, একটু গন্ধ রয়ে যায়, আর দূরে কোথাও, চাঁদের সাদা বিষণ্নতায়, হাস্নাহেনারা এখনো ফুটে থাকে।



৯.       বাতাসের ভেতর তুমি



আমার সমস্ত ভালোবাসা বুনো নদীর মতো - 
কোনো বাঁধ মানে না, কোনো মানচিত্র চেনে না, 
শুধু তোমার দিকেই ছুটে যায় অবিরাম, 
অবুঝ জোয়ারে।

আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীর অসংখ্য 
মুখের ভিড়ে তোমাকেই আমি ভালোবাসি- 
যেমন নক্ষত্র বিশ্বাস করে আকাশকে, যেমন সমুদ্র বিশ্বাস করে চাঁদের টানকে।

কিন্তু তোমার হৃদয়ের ভেতর এক গভীর 
নীরবতা বাস করে, যেন বহু শতাব্দী ধরে 
কেউ সেখানে কোনো প্রদীপ জ্বালায়নি। 

আমি সেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনি 
নিঃশব্দের শব্দ, আর ধীরে ধীরে আহত হই 
নিজেরই প্রতিধ্বনিতে।

তবু অভিযোগ নেই -
কারণ, দূর থেকে যখন বাতাস এসে আমার 
শরীর ছুঁয়ে যায়, আমি চোখ বন্ধ করে ভাবি- 
হয়তো সে আগে ছুঁয়ে এসেছে তোমার চুল, 
তোমার নিঃশ্বাসের গোপন বাগান।

তখন পৃথিবীটা হঠাৎ অসহ্য সুন্দর হয়ে ওঠে -
সেই বাতাসের ভেতরই তোমার 
শরীরের গন্ধ পাই, আর তোমাকে অনুভবে রাখি।


১০.     ফিরে আসার ইচ্ছে


শত বছর পরে, এমনই কোনো বৃষ্টি-বৃষ্টি সন্ধ্যা রাত্রিতে ভেজা মাটির ফোঁড়া কাটা ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে বসে ঝিঁঝি পোকারা ডাকবে তাদের চিরচেনা নিঃসঙ্গ সুরে।

বাঁশঝাড়ের আড়ালে বনমৌরির গন্ধে ঘন হয়ে উঠবে অন্ধকার, জোনাকিরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদীপ হাতে ঘুরে বেড়াবে রাতের বিস্মৃত উঠোনে, যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বপ্নের খোঁজে।

সেই গোপন রাতের গভীরে আমিও ফিরে আসব, হয়তো মানুষ হয়ে নয়, হয়তো নামহীন কোনো প্রাণের বেশে, একটি ঝিঁঝি পোকা, অথবা জোনাকির ক্ষণিক আলো হয়ে।

চেনার মতো আজিকার কোনো মানুষ তখন আর থাকবে না, আমার নাম, মুখ, স্মৃতি - সবই মিশে যাবে সময়ের ধুলোর ভেতর।

তবু এই পৃথিবী নামে গ্রহটিকে এত সহজে ছেড়ে যাওয়া যায় কি? নদীর জলে, ঘাসের ডগায়, বর্ষার গন্ধে, চাঁদের আলোয় এত মায়া জমে থাকে যে -
তাই আবার ফিরতে ইচ্ছে করে, যে রূপেই হোক, যত তুচ্ছ কিছু হয়ে হলেও।

ফিরে আসতে ইচ্ছে করে রাতের অন্ধকারে জ্বলা এক বিন্দু আলো হয়ে, অথবা দূর বাঁশবনের আড়ালে অবিরাম ডেকে যাওয়া একটি একাকী ঝিঁঝি পোকা হয়ে।


১১.      অস্তিত্ব


লোকটির ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। ভোরের  আলো জানালার ফাঁক গলে বিছানার চাদরে এসে বসেছিল চুপচাপ।

চোখ বন্ধ রেখেই সে বলেছিল -
তুমি এত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছ যে, আমার ঘুম ভেঙে দিলে।

কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল কিছুক্ষণ, যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো পাখি পুরোনো ডালে ফিরে এসে বসেছে।

তারপর সে চোখ মেলল।

পাশে কেউ নেই।
শুধু বালিশের ওপর পড়ে আছে তার অনুপস্থিতি, 
আর চাদরের গায়ে  ঘুমিয়ে আছে 
বহু বছরের সংসার।

লোকটি তখন বুঝল - মানুষ চলে গেলেও তার নিঃশ্বাস চলে যায় না, থেকে যায় দেয়ালে, দরজায়, রাতের গভীর নীরবতায়।

যাকে আমরা হারানো বলি, 
সে হয়তো অন্য কোনো রূপে বেঁচে থাকে -
একটি অভ্যাস হয়ে, একটি ডাকে, একটি ভুল 
করে বলা বাক্যে।

সেই ভোরে শূন্য বিছানার পাশে বসে লোকটি প্রথম অনুভব করল -
ভালোবাসারও এক ধরনের অস্তিত্ব আছে, যার জন্য শরীর লাগে না, লাগে শুধু স্মৃতি।

আর স্মৃতি কখনও কখনও জীবিত মানুষের চেয়েও অনেক বেশি জোরে নিঃশ্বাস নেয়।


১২.    শিপ্রা নদীর তীরে 


গিয়েছিলাম কবে শিপ্রা নদীর পারে
আজ আর মনে নেই দিন তারিখ ঋতু -
শুধু মনে আছে, নতজানু হয়ে
আঁজলা ভরে ছুঁয়েছিলাম টলটলে শীতল জল।

সেই জলের ভেতর যেন ঘুমিয়ে ছিল
কোনো বিস্মৃত বিকেলের সোনালি রোদ,
কোনো হারানো পাখির ডানার শব্দ,
কোনো অচেনা বেদনার নীল আভা।

বহু পথ হেঁটেছি তারপর... 
বহু নদী পেরিয়েছে জীবনের ভেতর দিয়ে, 
দু'হাতে ছুঁয়েছি কত জল -
কখনও গভীর রাতে
নিস্তব্ধতার জানালা খুলে গেলে মনে হয়,
আমার হাতে এখনও লেগে আছে
জলের সেই শীতল মায়া।

সময় সব নাম মুছে দেয়,
সব মুখ কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায় 
যেমন দূর বাঁশির সুর বাতাসের অন্তরে -
তেমনি শিপ্রা আজও বয়ে চলে
আমার স্মৃতির গভীরতম তীরে।


১৩.      মায়ালোকের মানুষ 


চোখে তার
যেন সহস্র বর্ষের নিভে-যাওয়া নক্ষত্রের আলো,
মুখে তার সন্ধ্যার নদীর মতো এক গভীর বিষণ্নতা।

মনে হতো -
সে বুঝি এই পৃথিবীর কেউ নয়,
কোনো হারিয়ে-যাওয়া স্বপ্নলোক থেকে
ভুল করে নেমে এসেছে মানুষের ভিড়ে।

তার হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল
শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শরতের বাতাস,
তার কণ্ঠে ছিল
দূর সমুদ্রের একাকী জাহাজের বাঁশির সুর।

আমি তাকে দেখেছি একবার -
অথবা হয়তো দেখিনি,
হয়তো সে ছিল কেবলই এক মায়া,
চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠা কোনো প্রাচীন স্মৃতি।

তবু আজও মনে পড়ে -
রাত্রি যখন গভীর হয়,
ঝিঁঝি পোকারা যখন অন্ধকারের ভাষায় কথা বলে,
তখন মনে হয় সে কোথাও আছে -
বনমৌরির গন্ধে,
শিশিরভেজা ঘাসে,
অথবা কোনো বিস্মৃত নক্ষত্রের ছায়াপথে।

এই ব্রহ্মাণ্ডও হয়তো দেখেছিল তাকে চুপিচুপি 
কোনো অলৌকিক ধূমকেতুর 
দীর্ঘ জ্বলে-ওঠা পথে, 
তারপর সে মিলিয়ে যায় অনন্তের দিকে,
রেখে যায় শুধু
এক অকারণ বিষণ্নতা,
আর এক অমোঘ অনুভব। 

কিছু কিছু মানুষ
জন্মায় না পৃথিবীর জন্য,
তারা আসে শুধু
মানুষের হৃদয়ে একটু অনন্তের স্বাদ রেখে যেতে।


১৪.     আশার আলো


যতদিন জীবন আছে ততদিন আশা করবোই -
যা চাই তা পাই বা না পাই... 
তবু দূর আকাশে জ্বলে থাকা নক্ষত্রের দিকে 
নীরবে তাকিয়ে থাকবো নিরন্তর।

সব স্বপ্ন তো পূর্ণ হওয়ার জন্য আসে না, 
কিছু স্বপ্ন আসে হৃদয়ের জানালায় একফালি 
চাঁদের আলো হয়ে বসে থাকতে -
কিছু অপেক্ষা থাকে শুধু অপেক্ষা বলেই সুন্দর।

যতদিন শ্বাস আছে ততদিন বিশ্বাস করবো - 
একদিন হয়তো হারিয়ে যাওয়া পথও আমার দুয়ারে ফিরে আসবে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়  
শিউলি-ঝরা ভোরের মতো নিঃশব্দে।

যা হারিয়েছি, তার জন্য আর আক্ষেপ নয়, 
কারণ প্রতিটি শূন্যতার গভীরে অদেখা কোনো 
ফুলের বীজ ঘুমিয়ে থাকে, 
সময় এলেই সে ফুটে ওঠে বিস্ময়ের রঙে।

যতদিন জীবন আছে ততদিন আশা করবোই - 
যা চাই তা পাই বা না পাই... 
কারণ আশাহীন মানুষের চেয়ে নিঃসঙ্গ 
আর কেউ নেই পৃথিবীতে, 
আর একটি ছোট্ট আশার প্রদীপই কখনও কখনও অন্ধকারের চেয়েও দীপ্তিময় হয়। 


১৫.     নদী উপাখ্যান 


হাঁড়িধোয়া নদীটির বয়স কত জানি না আমি। কোন্ আদিম কুয়াশার ভোরে শীতলক্ষ্যার কোল ছিঁড়ে তার জন্ম হয়েছিল তাও জানি না।

শুধু জানি, একসময় সে ছিল চপলা। উছলা জলের উন্মাদ এক কিশোরী নদী। বর্ষার ভিতর যার হাসি ভাঙত, যার ঢেউয়ে কাঁপত কাশবন, যার বুকের ভিতর অস্থির আকাশ নেমে আসত সন্ধ্যাবেলা।

এখন সে শান্ত। স্থির। নিঃশব্দ বিষাদের মতো তার জল পড়ে থাকে।

সেদিনও এমনই এক কার্তিক বিকেল ছিল। মরা রোদের ভিতর শালিকেরা একে একে ফিরে যাচ্ছিল ঘরে, দূরের ধানখেতে ধানের গন্ধ জমছিল ধীরে ধীরে।
আমি আর একটি মেয়ে হাঁটছিলাম হাঁড়িধোয়ার তীর ধরে।

মেয়েটির নামও ছিল নদী।
তার বাড়ি শীতলক্ষ্যার পারে, পলাশে। হয়তো সেই কারণেই তার চোখে এত জল ছিল, তার কণ্ঠে এত দূরের স্রোতের শব্দ।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থেমে গেল।
তারপর নেমে গেল জলের কাছে। দু’হাত আজলা করে হাঁড়িধোঁয়ার জল তুলে আনল বুকে।
নরম স্বরে বলল— “হাত পাতো...”

আমি হাত পাতলাম।
সে তার আজলার জল আমার হাতে ঢেলে দিয়ে বলল- “এই জল আমায় আবার দাও। আমি তোমার পানি গ্রহণ করব...”

কী অদ্ভুত ছিল সেই মুহূর্ত!
মনে হয়েছিল, কার্তিকের বিষণ্ণ আকাশের নিচে দুইটি মানুষ নয়  দুইটি নদী পরস্পরের ভিতর তাদের নিঃসঙ্গতা ঢেলে দিচ্ছে।

আমি জল ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তাকে।
আর সেই বিকেলেই, হয়তো অদৃশ্য কোনো নিয়তির কাছে, আমিও তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম আমার সমস্ত হৃদয়।

নদী আমার পানি গ্রহণ করেছিল ঠিকই  কিন্তু আমাকে আর গ্রহণ করেনি।
তারপর একদিন সে চলে গেল।

কোথায় গেল জানি না।
হয়তো অন্য কোনো নদীর দেশে।

হয়তো আজ সে দাঁড়িয়ে থাকে দানিয়ুবের নীল শীতের পাশে, হয়তো হাডসনের ধূসর জলে তার চুল উড়ে যায় একা একা, হয়তো লীফি নদীর তীরে কুয়াশাভেজা সন্ধ্যায় সে ধীরে ধীরে হাঁটে অচেনা মানুষের ভিড়ে।

আর আমি ভাবি,
সেইসব বিদেশি নদীর জলে কখনও কি সে আমার মুখ দেখতে পায়?

কোনো ঢেউ কি তাকে মনে করিয়ে দেয় কার্তিকের সেই বিকেল, হাঁড়িধোঁয়ার নিঃশব্দ তীর, আর এক মানুষকে, যে আজও দু’হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে এক মুঠো জল ফিরে পাবার আশায়?

রাত গভীর হলে এখনও আমি শুনতে পাই— হাঁড়িধোঁয়ার স্থির জলে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে-
“হাত পাতো...”
আর তখন আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে একটি নদী ভেঙে পড়ে।


১৬.       জ্যোৎস্নার কান্না


ঘরের ভিতরে কেউ ছিল না, 
তবু কে যেন অন্ধকারের গভীর থেকে নিঃশব্দে ডাকছিল আমার নাম।

তন্দ্রার ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে কানে এলো 
গুমরে গুমরে কান্না - 
যেন বহুদিনের হারানো কোনো আত্মা ফিরে এসেছে তার পুরোনো ঠিকানায়।

মনে হলো, আমার পায়ের উপর টপটপ করে ঝরে পড়ছে জল - কিন্তু সে জল বৃষ্টির নয়, 
কোনো অদেখা চোখের নীরব অশ্রু, 
যা শতবর্ষ ধরে জমেছিল এক বিস্মৃত অপেক্ষার ভিতরে।

আমি আলো জ্বালালাম -
চারদিকে শুধু নিঃসঙ্গ দেয়াল, নিস্তব্ধ আসবাব, আর শূন্যতার দীর্ঘ ছায়া।

তখন ভাবলাম, হয়তো বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে -
জানালা খুলতেই দেখি, 
চরাচর জুড়ে উন্মাদ জ্যোৎস্না, 
আকাশ যেন রূপার নদী ঢেলে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কারও না-বলা ভালোবাসার গন্ধ।

সেই রাতে বুঝেছিলাম -  
সব কান্নার কোনো শরীর থাকে না, সব অশ্রু চোখ থেকে ঝরে না।

কিছু কিছু কান্না জ্যোৎস্না হয়ে নেমে আসে পৃথিবীতে, আর কিছু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরেও নিঃশব্দে ফিরে আসে স্বপ্নের দরজা দিয়ে।


১৭.       শপথের অতলে


আমার সমস্ত স্বপ্ন ফিরিয়ে দাও, 
যেগুলো একদিন তোমার চোখের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল, অথবা, 
যদি তারা আর ফেরার পথ না খুঁজে পায়, 
তবে তাদের সঙ্গে আমাকেও রেখে দিও তোমার নীরবতার পাশে।

যাওয়ার আগে শুনে যাও আমার শেষ নিবেদন -
তোমার কপালের উপর নেমে আসা 
সন্ধ্যাতরুর ছায়ার কসম, 
যে ছায়া আমার সমস্ত ক্লান্তি ঢেকে দেয়, 
তোমার চুলে জড়িয়ে থাকা রাতের সুবাসের কসম, যেখানে হারিয়ে যায় অগণিত অনুচ্চারিত বাক্য।

তোমার সেই গভীর চোখের কসম, 
যার ভেতরে আমি দেখেছি অজস্র জন্মের পথচিহ্ন, তোমার হাসির কসম, 
যা হঠাৎ ভোরের প্রথম আলোর মতো 
অন্ধকার হৃদয়ে নেমে আসে।

তোমার হাতের কসম, যার একটুখানি স্পর্শে 
পৃথিবীকে নতুন মনে হয়, 
তোমার নামের কসম, যা উচ্চারণ করলেই 
বুকের মধ্যে শঙ্খধ্বনির মতো জেগে 
ওঠে ভালোবাসা।

শিউলিফোটা ভোরের কসম, 
বর্ষার জানালায় টুপটাপ ঝরে পড়া স্মৃতির কসম, চাঁদের আলোয় একা জেগে থাকা নদীর কসম, 
যারা জানে, প্রতীক্ষা কত দীর্ঘ হতে পারে।

আর যদি কোনোদিন এই পৃথিবীর সমস্ত পথ 
আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবুও আমি শপথ করে বলি -

নক্ষত্রের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, সময়ের শেষ নদী শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত,
আমার হৃদয় তোমারই থাকবে - 
যেমন সাগর থাকে চাঁদের, 
যেমন সুবাস থাকে ফুলের, 
যেমন প্রেম থাকে এক অনন্ত, মায়াময় 
শপথের বাণীবদ্ধে।


১৮.     যমুনাবতীর জলে


কত বছর ধরে তোমার মুখ দেখিতে পাই না,
হাস্নাহেনারা ঝরে গেছে বর্ষার বাদল বাতাসে,
নতুন জলে ভরে গেল কতবার যমুনাবতী।

কতবার শরতের চাঁদ নেমে এলো নির্জন ঘাটে,
কতবার কাশফুলের সাদা ঢেউ কেঁপে উঠল বাতাসে,
তবু তোমার পায়ের শব্দ আর ফিরল না পথের বাঁকে।

সন্ধ্যার পরে দূর কোনো বাঁশবনে পাখি ডাকে,
আমি ভাবি, হয়তো তুমি ডাকছো নাম ধরে,
তারপর দেখি, শুধু কুয়াশা ভেসে আসে নদীর ওপারে।

পুরোনো দিনের মতো আজও জানালাটি খোলা রাখি,
চাঁদের আলো এসে পড়ে, তুমি এসে পড়ো না,
রাত্রিরা দীর্ঘ হয়, অথচ প্রতীক্ষার শেষ হয় না।

যে স্বপ্নগুলো তোমার চোখের আলোয় বেঁচে ছিল,
এক এক করে তারা ঝরে গেছে নিঃশব্দ নক্ষত্রের মতো-
শুধু স্মৃতিগুলো জেগে আছে ভাঙা মন্দিরের প্রদীপ হয়ে।

হয়তো কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় যমুনাবতীর জলে 
মুখ ধুয়ে ফিরে আসবে হারানো সময় -
আর আমি চিনে নেব তোমাকে, যেমন নদী চিনে নেয় বহুদিন পরে ফিরে আসা বৃষ্টির জল।


১৯.    অনন্তকালের আগে


দেখো, অনন্তকাল শিশিরবিন্দুর মতো
আমাদের আঙুলের ডগায় কাঁপছে,
অথচ কোনো ভোরই পুরোপুরি ফোটেনি এখনো।

একটি সাদা বকের ডানায় ভর করে
দূরের জলাভূমিতে যাবার কথা ছিল -
কে যাবে?

তুমি কী যাবে?
কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে এখানে।

দেখো, অনন্তকাল নদীর স্রোতের মতো
আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে,
অথচ একবারও তার জলে নামা হলো না।

একটি নীল শাপলার কাছে
সব গোপন দুঃখ রেখে আসার কথা ছিল -
কে রাখবে?

তুমি কী রাখবে? 
বড় নীরব এই চরভূমি।

দেখো, অনন্তকাল পরিযায়ী পাখির মতো
আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে যায়,
অথচ আমাদের কোনো যাত্রাই শেষ হয় না।

একটি হলুদ সন্ধ্যাকে
সযত্নে ভাঁজ করে রাখার কথা ছিল -
কে রাখবে?

তুমি কী রাখবে? 
বাতাসে পুরোনো দিনের গন্ধ।

ওঠো, চলো যাই --

তারপর আমরা চলে যাই -
ঘাসের ওপর পড়ে থাকে কয়েকটি অসমাপ্ত কথা,
একটু রোদ,
একটু বিষণ্নতা,
আর একটি স্বপ্নের ভিতর
অপেক্ষা করতে থাকে অনন্তকাল।

হয়তো কোনো এক নক্ষত্রভরা রাতে
আবার দেখা হবে -
তখন আমরা বলব,
দেখো, এতদিন পরেও
কোনো কথাই শেষ হয়নি এখনো।


২০.      কবিতার উপাসনা


কবিতা লেখার আগে
নিঃশব্দ নদীর কাছে বসে এসো,
কবিতা পড়ার আগে
নিজের অন্তরের ধূলি ঝেড়ে এসো।

যদি বিস্ময়ের প্রতি তোমার বিশ্বাস না থাকে,
তবে পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টিও না -
যদি হৃদয়ের পবিত্রতায় আস্থা না থাকে,
তবে শব্দের বাগানে প্রবেশ কোরো না।

যেমন দীপের ভিতরে জেগে থাকে প্রার্থনা,
তেমনি কবিতার ভিতরে জেগে থাকে অনন্তের স্পর্শ,
লোভের ধোঁয়ায় তাকে কালিমালিপ্ত কোরো না।

ভয়ংকর অভিশাপ নেমে আসবে -
প্রতিটি ছন্দের ভিতরে জন্ম নেবে শূন্যতা,
প্রতিটি উচ্চারণে ঝরে পড়বে অসমাপ্ত স্বপ্ন,
প্রতিটি গানের কপালে জমবে অকাল বিষাদ।

কবিতা লেখার আগে
একটি ক্লান্ত মুখে হাসি ফোটাও,
কবিতা লেখার আগে
পাখিদের জন্য একমুঠো শস্য ছড়িয়ে এসো।

কবিতা লেখার আগে
নিজের ভুলগুলোর সামনে মাথা নত করে এসো,
কবিতা লেখার আগে
করুণার জলে হৃদয় ধুয়ে এসো।

কারণ কবিতা কেবল বাক্য নয় -
এ হৃদয়ের গুপ্ত মন্ত্র,
নক্ষত্রের নিঃশব্দ ইশারা,
মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের রেখে যাওয়া
এক বিন্দু আলোর স্বাক্ষর।


২১.     হে রক্তজবা


একটি সুখের দিন দিও আমায়, হে রক্তজবা! অনেক দিন হলো বিষাদের বাগানে বসে আছি, অনেক দিন হলো জানালার ধারে শুধু ঝরে পড়া পাতার শব্দ শুনি।

একটি সকাল দিও, যেখানে শিশিরভেজা ঘাসের উপর পাখিদের ডানার ছায়া নেমে আসে,  আর হৃদয় ভুলে যায় পুরোনো সব ক্ষতচিহ্নের নাম।

একটি বিকেল দিও, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো অভিমান ছাড়া ফিরে আসে স্মৃতিতে, আর দূরের বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে অদৃশ্য নদীর গন্ধ ভেসে আসে।

একটি সন্ধ্যা দিও, যেখানে প্রদীপের শিখার মতো নিভু নিভু ভালোবাসা আবার জেগে ওঠে, আর আকাশের প্রথম তারা আমার নিঃসঙ্গতার কপালে আশীর্বাদের মতো আলো ছুঁয়ে দেয়।

একটি সুখের দিন দিও আমায়, হে রক্তজবা! যে দিনে অশ্রুরাও হবে পবিত্র, ব্যথারাও হবে মধুর স্মৃতি, আর বহুদিনের ক্লান্ত আত্মা তোমার লাল পাপড়ির ভেতর একফোঁটা শান্তির মতো নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বে।

যদি একটি দিনই দাও,  তবে সে দিনটি এমন হোক, যেন শত দুঃখের রাত্রি পেরিয়ে হঠাৎ পূর্ণিমার আলোয় ফিরে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সমস্ত মায়া।


২২.      চুম্বনেরও ওপারে


যেভাবে নদীরা বয়ে যায়
নিম্নভূমি থেকে আরও গভীর সাগরে,
নারীরাও সেভাবেই, প্রেমের ভিতরে,
এক স্পর্শের চেয়ে অধিকতর স্পর্শের আকাঙ্ক্ষা বুকে ধরে।

নারীরা গোপনে তাই
পুরুষজগতে
একটি দীর্ঘ আলিঙ্গনের চেয়ে আরও দীর্ঘতর
মায়ার আশ্রয় খুঁজে ফেরে।

শুধু ঠোঁটের ভাষা নয়,
শুধু ক্ষণিক উষ্ণতা নয়,
তারা খোঁজে এমন এক হৃদয়,
যেখানে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা
জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসে নিবিড় স্নেহ।

অনেক পুরুষ সে কথা জানে না,
তারা ভাবে -
ফুলের সুবাস মানেই বুঝি বসন্তের সমাপ্তি।
কিন্তু আকাশে ভেসে থাকা নারীরা
অতৃপ্ত স্বপ্নের ডানা মেলে
আরও সুদূর নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কারণ নারীরা গোপনে শুধু
একটি চাওয়ার চেয়ে অধিকতর চাওয়া,
একটি চুম্বনের চেয়ে অধিকতর চুম্বন,
একটি রাত্রির চেয়ে দীর্ঘতর মুগ্ধতা,
আর প্রেমের গভীরতম ভাষা বুঝতে পারে -
এমন একজন মানুষের সন্ধানেই
আজীবন নীরবে জেগে থাকে।



২৩.      অন্ধকারের সেতু


রাতের গভীর থেকে উঠে এসেছিল
প্রেমের ইচ্ছাগুলো -
দূর নক্ষত্রের মতো নিবিড় ,
তবু তাদের ভিতরে ছিল
অজস্র অশ্রুত গানের ঢেউ।

অন্ধকার তখন আমাদের মাঝখানে
একটি গোপন সেতু হয়ে ছিল,
যেখানে কোনো শব্দের প্রয়োজন হয়নি,
শুধু নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
জেগে উঠেছিল হাজার বছরের পরিচয়।

তোমার উজ্জ্বল ঊরুতে
যখন আমার স্পর্শ কেঁপে উঠেছিল,
মনে হয়েছিল -
চাঁদের আলোও বুঝি এত কোমল নয়,
বৃষ্টির শব্দও এত মায়াময় নয়।

তোমার চুলের ভিতরে জড়িয়ে ছিল রাত,
তোমার চোখের ভিতরে জ্বলছিল নক্ষত্রেরা,
আর আমার সমস্ত একাকীত্ব
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
তোমার শরীরের সুবাসে আশ্রয় নিয়েছিল।

সেই থেকে প্রতিটি রাত্রি
আমাদের অসমাপ্ত চুম্বনের স্মৃতি হয়ে আছে,
আর প্রেমের ইচ্ছাগুলো
আজও গান হয়ে ভেসে আসে -
যেন অন্ধকারের বুকের উপর
দুই হৃদয়ের গোপন আলোর উৎসব।


২৪.     নদীর জলে সিমন্তী 


গ্রীষ্মের অলস বিকেল, সোনারঙা সূর্যের কোমল আলো সবুজ পৃথিবীর কপালে এঁকে দিচ্ছিল অদৃশ্য আশীর্বাদের টিপ।

আমি তখন একা, নদীতীরের নিভৃত পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম বাতাসের সঙ্গে কথা বলতে - হঠাৎ তোমাকে দেখলাম, সিমন্তী।

তুমি ছিলে যেন পদ্মপাতার উপর ভোরের প্রথম শিশিরবিন্দু, অথবা জ্যোৎস্নাভেজা শ্রাবণের রাতে সাদা বকপাখির নিঃশব্দ উড়াল।

তোমার মুখখানি যেন শরৎ সকালের নির্মল আকাশে এক ফালি পূর্ণিমার চাঁদ, যার দিকে চেয়ে থাকলে মানুষের হৃদয় ধীরে ধীরে প্রার্থনায় ভরে ওঠে।

তোমার দুটি চোখ যেন গভীর নদীর বুকে জেগে থাকা দুটি নীল নক্ষত্র, যেখানে সন্ধ্যাতারারা এসে নিজেদের আলো রেখে যায়।

তোমার হাসি ছিল শিউলি-ঝরা ভোরের মতো কোমল, বকুলবনের গন্ধের মতো মধুর, আর তোমার কণ্ঠস্বরে ছিল দূরের কোনো বাঁশিওয়ালার বিষণ্ন অথচ মায়াভরা সুর।

তোমার ভেজা কালো চুল নেমে এসেছিল বর্ষামেঘের মতো, মনে হচ্ছিল, আষাঢ়ের সমস্ত মেঘ এসে তোমার কাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার সুষমা ছিল কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম বিকেলের মতো দীপ্ত, আবার নদীর জলের মতো শান্ত, যেন পৃথিবীর সমস্ত রূপকথা একটি মানুষের শরীরে এসে  ফুটে উঠেছে।

আর আমি,  মন্ত্রমুগ্ধ কোনো পথিকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম দূরে।

মনে হচ্ছিল, ঈশ্বর যখন গোলাপের পাপড়ি, শিশিরের স্বচ্ছতা, কোকিলের গান, আর পূর্ণিমার আলো দিয়ে একটি স্বপ্ন নির্মাণ করেছিলেন, সেই স্বপ্নের নামই দিয়েছিলেন - 
সিমন্তী।

আজও যখন নদীর জলে অস্তসূর্যের সোনালি আগুন ঝরে পড়ে, আমি নিঃশব্দে তোমার নাম উচ্চারণ করি।
কারণ পৃথিবীতে অনেক ফুল ফুটে, অনেক তারা জ্বলে, অনেক নদী সাগরের পথে বয়ে যায় -

কিন্তু আমার হৃদয়ের আকাশে একটিই চাঁদ উদয় হয়,
সে তুমি, আমার সিমন্তী, আমার সমস্ত কবিতার গোপন উপমা।


২৫.     অনিন্দিতা


অনিন্দিতা তুমি এসো,
চাঁদের নীলাভ জ্যোৎস্নাভরা রাতে,
যমুনা তীরে, শিশিরে -
এসো নিঃশব্দ হৃদয়ে আমার। 

কুয়াশার আঁধার সরিয়ে নদীর জলের মতো 
তুমি স্বপ্নের ফুল হয়ে এসো।

অনিন্দিতা, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তুমি,
শুনো গান ওই বিষণ্ণ বাঁশির -
তারার নিভু-নিভু আলোর ভিতর,
এসো তুমি এই বৃষ্টির কাছে, উন্মনা বাতাসে। 

এসো একাকী জীবনের কাছে
সময়ে অসময়ে আরো নিবিড় করে 
অচেনা স্বপ্নের ভিতর।

এসো জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে শিউলি 
ঝরার সুবাসের মতো -
এসো, আকাশভরা তারার ঘোরলাগা
রোশনাইয়ের মতো। 


২৬.   অলিখিতের দিকে


ঐ পৃথিবীর জানালার ওপারে
নিভৃত অন্ধকারের ভেতর
লিখতে যেয়ো না তুমি হৃদয়ের গোপন নাম -
বাতাসেরও তো এক বিস্মৃতির অভ্যাস আছে,
সে অনেক আদরের শব্দ
নক্ষত্রের ধুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়।

যে কথা জোৎস্নার কাছে বলা যায়,
মানুষের কোলাহলে তাকে উচ্চারণ কোরো না,
দুপুরের উজ্জ্বলতায়
অনেক স্বপ্নের রঙ ফিকে হয়ে আসে,
অনেক প্রতীক্ষা শুকিয়ে যায়
শরতের সাদা কাশফুলের মতো।

ঐ পৃথিবীর দেয়ালের পরে
যে অদৃশ্য রাজ্য জেগে থাকে,
সেখানে কেবল নীরবতারাই জানে
কোন প্রেমের জন্ম হয়েছিল,
কোন অশ্রু ভোরের শিশির হয়ে
পাতার গায়ে নেমেছিল নিঃশব্দে।

তাই তোমার অন্তরের গোপন প্রদীপ
সবাইকে দেখাতে যেয়ো না -
আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে
কত নাম, কত প্রতিশ্রুতি, কত আকুলতা
ধীরে ধীরে মুছে যায়।

শুধু কিছু মায়া রয়ে যায় -
গভীর নদীর জলে চাঁদের ভাঙা প্রতিচ্ছবির মতো,
অথবা দূর কোনো বৃষ্টিভেজা রাতে
অচেনা বাঁশির সুর হয়ে
নিঃসঙ্গ আকাশের বুকে।

আর যে কথাগুলো সত্যিই অনন্ত,
তারা কোনো দেয়ালে লেখা থাকে না -
তারা নির্জনে ফুটে ওঠে
রক্তগোলাপের সুগন্ধে,
আর হারিয়ে যাওয়া পাখিদের ডানায়
সন্ধ্যাতারার আলো হয়ে।


২৭.     বৃষ্টির গোপন সুর


অন্ধকার ঘরের ভিতরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে 
জেগে ওঠে বহুদিনের নিভে থাকা স্মৃতি, 
আর আমার একাকী হৃদয় তোমার নামের ভিতরে আশ্রয় খুঁজে ফেরে।

বাইরের আকাশে বিদ্যুতের ক্ষণিক আলো জ্বলে ওঠে, ঠিক তেমনি হঠাৎ জেগে ওঠে 
তোমার চোখের সেই গভীর মায়া - 
যেখানে একদিন আমি সমস্ত পৃথিবীর ক্লান্তি 
ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম।

মনে হয়, এই বৃষ্টিভেজা রাতেরও এক গোপন ভাষা আছে, যে ভাষায় মেঘেরা তোমার কথা বলে, আর বাতাস ভেসে আনে তোমার হারিয়ে যাওয়া শরীরের  সুগন্ধ।

যদি এমন কোনো অলৌকিক মুহূর্তে 
ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে তোমার সঙ্গে 
দেখা হয়ে যায়, তবে আমি আর কোনো কথা বলব না - শুধু তোমার হাতের উষ্ণতায় 
আরেকটি অনন্ত বর্ষার রাত নিঃশব্দে 
কাটিয়ে দিতে চাই।

কারণ, মাঝরাতে তুমুল বৃষ্টির শব্দে 
ঘুম ভেঙে গেলে আজও তোমার কথা মনে পড়ে-
যেন পৃথিবীর সমস্ত বৃষ্টি গোপনে 
তোমার নাম উচ্চারণ করে, 
আর আমার সমস্ত প্রেম নিভৃত অন্ধকারে 
একটি জোনাকির মতো তোমার প্রতীক্ষায় 
জ্বলতে থাকে।


২৮.     সুন্দর করুণধারা


বৃষ্টি মুখর রাতে ফাঁকা রাস্তা বেয়ে
ঝড়োবাতাস ছাড়া আর কিছুই আসে না,
দূরদেশে থাকা স্বামীর স্মৃতিগুলো শুধু
জানালার ওপাশে ভেজা ছায়ার মতো ভাসে।

এক গুরু-নিতম্বিনী নারী, 
নিঃসঙ্গ ঘরে,
চুলের ভাঁজে জড়িয়ে রাখে অগণন দীর্ঘশ্বাস,
আয়নার সামনে নিভু আলোয়
তার শরীর যেন বর্ষার গোপন উপাখ্যান।

বাইরে বিদ্যুতের ক্ষণিক ঝলকানি,
ভেতরে অস্থিরতার মৃদু ঢেউ -
দূরবর্তী কণ্ঠস্বরের প্রতীক্ষায়
তার দুটি চোখ হয়ে ওঠে আরও গভীর।

বালিশের পাশে রাখা চিঠিগুলোতে
এখনও শুকোয়নি ভালোবাসার গন্ধ,
অথচ দীর্ঘ রাতের নীরবতা
বারবার জাগিয়ে তোলে অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা।

মেঘেরা যতই গর্জে উঠুক আকাশ জুড়ে,
তার হৃদয়ে বাজে অন্য এক সুর -
যে সুরে মিলনের প্রতিশ্রুতি আছে,
আছে প্রিয় মানুষের স্পর্শের আকুতি।

আর সারা রাত ধরে বৃষ্টিরা
ছাদের কার্নিশে টুপটাপ শব্দ তুলে
শুধু এই কথাটুকুই বলে যায় -
বিরহও কখনো কখনো
প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর করুণধারা।


২৯.     কমলাপুর স্টেশনে এক বিষণ্ন দুপুর


আমি বসে আছি কমলাপুর স্টেশনের
শীতল কংক্রিটের বেঞ্চের উপর।
আজ রোদের কোনো তাড়া নেই,
আকাশের সমস্ত নীল ধীরে ধীরে
কালো হয়ে উঠছে।

মেঘ জমছে -
যেন বহুদিন না-কাঁদা দুটি চোখে
ফিরে এসেছে পুরোনো জল,
যেন কোনো বিস্মৃত শোক
আবার তার নাম মনে করতে শুরু করেছে।

এইখান থেকে ট্রেনে উঠতে পারতাম,
যমুনা নদীর কাছে যেতে পারতাম,
দূরের জলের ভিতরে ডুবে থাকা
কোনো বিকেলের স্মৃতি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম।

যেতে পারতাম রাজেন্দ্রপুরের শালবনেও,
যেখানে বাতাসের ভিতরে পাতারা গোপনে
ঈশ্বরের মতো কথা বলে,
আর নীরবতা তার সবুজ প্রার্থনা ছড়িয়ে রাখে।

কিন্তু আজ কোথাও যাব না।

আজ আমি শুধু বসে থাকব এই স্টেশনে,
মাথার উপর জমে থাকা কালো মেঘ নিয়ে,
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির ভিতরে
একটি পুরোনো দিনের বার্ষিক শোক পালন করে।

দেখব, কীভাবে ট্রেন আমাকে রেখে
দূরে চলে যায় -
ধোঁয়া আর হুইসেলের বিষণ্ন শব্দে
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তার শেষ কামরা,
যেন কোনো স্মৃতি অন্ধকারের ভিতরে
হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে।

যেভাবে একদিন,
ঠিক এমনই এক মেঘলা বিকেলে,
বাবা চলে গিয়েছিলেন -
কোনো বিদায়ের পতাকা না নেড়ে,
কোনো ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি না রেখে,
শুধু এক দীর্ঘ শোকার্ততা
আমাদের ঘরের নিঃশব্দ দেয়ালগুলোর ভিতরে
রেখে গিয়েছিলেন।

তারপর থেকে প্রতিটি স্টেশন
আমার কাছে একটি অসমাপ্ত অপেক্ষার নাম,
প্রতিটি ট্রেন
একটি হারিয়ে যাওয়া মুখের প্রতিধ্বনি,
প্রতিটি হুইসেল
বুকের গভীরে জেগে ওঠা
কোনো অনাথ সন্ধ্যার আর্তনাদ।

আর যখন বৃষ্টি নামে,
আমি ভাবি -
স্বর্গেরও হয়তো নিজস্ব কোনো কমলাপুর স্টেশন আছে,
সেখানে কোনো নক্ষত্রভেজা প্ল্যাটফর্মে
বাবা একা বসে থাকেন,
মেঘের ওপারে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে
আমাদের কথা ভাবেন।

আর পৃথিবীর এই বিষণ্ন দুপুরে
আমি একা বসে থাকি -
যেন কোনো যাত্রী নই,
কোনো গন্তব্যহীন মানুষের মতোও নই।

শুধু একটি ফেলে-যাওয়া সন্তান,
যার বুকের গভীরে আজও
একটি ট্রেন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে -
ধোঁয়া, বৃষ্টি আর দূরবর্তী হুইসেলের ভিতর দিয়ে,
আর ফিরে আসছে না।

কিছু বিদায়ের কোনো শেষ কামরা থাকে না
তারা একবার চলে গেলে,
মানুষের হৃদয়ের ভিতর দিয়েই
অনন্তকাল ধরে যাত্রা করে।


৩০.      একই  আকাশ একই আলো


এক আকাশের নিচে একই আলো
এই পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি -
তোমার আঙ্গিনায় যে চাঁদের ধূসরতা নামে,
আমার এখানেও সেই নীরবতা
জলরঙের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

দুই প্রান্তে দুটি একাকী সন্ধ্যা,
তবু বাতাসের গোপন পথ ধরে
একই ফুলের গন্ধ এসে লাগে হৃদয়ে।

তুমি হয়তো সমুদ্রের শব্দ শোনো,
আমি শুনি বৃষ্টির মৃদু পতন -
তবু তাদের ভিতরে একই বিষণ্ন সুর
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

পৃথিবী যত দূরেই হোক, অন্ধকার যত 
গভীরই হোক, এক আকাশের নিচে
একটি নক্ষত্রের নিবিড় আলোয় আমরা দুজনে 
এখনও অদৃশ্য কোনো স্বপ্নের পারে
একই নিঃশ্বাসে বেঁচে আছি।


৩১.     অপরাহ্নের বিষণ্নতা


নীলচে শাপলার গন্ধে পাখিদের ডানার মতো 
বিষণ্নতা ভেসে আছে এই নির্জন বিকেলের ভিতরে,
ধীরে ধীরে হেঁটে যাই ;
আজ আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই আমাদের।

ধানক্ষেতের ধারে কত শুকনো কাশফুল
বাতাসে মাথা নত করে আছে,
দূরের নদীর শব্দ এসে
চুপচাপ বসে থাকে ঘাসের শরীরে।

খড়কুটো উড়ে এসে জড়িয়ে গেছে আঁচলের কিনারে,
ঝাউবনের ছায়া লেগে আছে চুলের ভিতরে,
কোনো কথা বলি না -
শুধু মেঘের দিকে চেয়ে থাকি দুজনে।

সন্ধ্যা নামার আগে আগে
কয়েকটি ক্লান্ত ফড়িং নেমে আসে নরম মাটিতে,
পুরোনো দিনের মতো
একটি নামও উচ্চারণ করি না আর।

তবু পৃথিবীর এই নীলাভ প্রান্তরে
শিশিরের মতো অদৃশ্য হয়ে থাকে আমাদের স্মৃতি,
আর পশ্চিমের আলো নিভে এলে
মনে হয় -
অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া দুটি মানুষের মতো
আমরা এখনও পাশাপাশি হেঁটে চলেছি,
কিন্তু কেউ কারও কাছে পৌঁছাতে পারি না।



৩২.      মন যখন উড়ুক্কু



ঝড় আসে ঝড়ে উড়ে যায় পথের ধূলো,
নির্ঝরের পাশে ঝরে পড়ে ক্লান্ত পাতা,
সবুজ বৃক্ষের বুকে লাগে বিষণ্নতার ক্ষত
এই চরাচর জুড়ে শুধু ধূলো উড়ে, পাতা ঝরে,
রৌদ্রক্লান্ত দুপুরের শেষে
আমি বড়ো নিঃসঙ্গ, বড়ো ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকি।

আকাশের নীল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে,
দূরের পাখিরা ফেরে আপন নীড়ের দিকে,
শুধু আমার মন উড়ুক্কু এক পাখির মতো -
কোনো অচেনা আলোর খোঁজে ভেসে বেড়ায়।

যদি কোনো রক্তিম আভায় সিক্ত সন্ধ্যাবেলায়
তুমি এসে দাঁড়াতে আরক্ত শরীরের মায়াবী সাজে,
চোখে নিয়ে শরতের প্রথম তারার বিস্ময়,
চুলে মেখে কদমফুলের গোপন সুবাস। 

তবে হয়তো সমস্ত বিষণ্নতা জেগে উঠত সুর হয়ে,
ঝরা পাতারাও ফিরে পেত সবুজের স্বপ্ন,
আর তোমার স্নিগ্ধ উপস্থিতির মৃদু আলোয়
উদ্বেলিত হয়ে উঠত আমার সমস্ত মুহূর্ত। 

মনে হতো -
এই পৃথিবীতে এখনো প্রেম আছে,
এখনো সন্ধ্যার রক্তিম মেঘের নিচে
কারও জন্য অপেক্ষা করে থাকা বৃথা নয়।


৩৩.     নদীর জলের স্থান হয় না নদীতে



নদীর জলের স্থান হয় না নদীতে, 
ওর সমস্ত নীল বিষাদ ভেসে যায় সাগরের দিকে ;
যেন কোনো পুরোনো চিঠি শেষমেশ পৌঁছে যায় 
অচেনা কারও হাতে।

পথে পথে কাশফুলের সাথে কথা বলে, 
চর জেগে ওঠে, আবার ডুবে যায় জোয়ারের অন্ধকারে, তবু নদী জানে - ধরে রাখার চেয়ে বিদায় 
দেওয়াই তার নিয়তি।

যেমন মানুষের হৃদয়ে সব ভালোবাসা থাকে না চিরকাল, কিছু স্মৃতি উড়ে যায় শালিকের ডানায়, 
কিছু স্বপ্ন আশ্রয় নেয় দূর নক্ষত্রের কাছে।

একদিন সন্ধ্যার আবছায়ায় আমি দেখেছি, 
নদী চুপচাপ কাঁদছে - 
তার বুকের জল কোথাও নেই আর, সব চলে গেছে অনন্ত উন্মনা সাগরের গভীরে।

তবু নদী শুকিয়ে যায় না, 
কারণ আকাশের মেঘেরা জানে - যা হারিয়ে যায় 
বলে মনে হয়, তা-ই ফিরে আসে বৃষ্টির মায়া হয়ে, 
অন্য কোনো ঋতুতে, অন্য কোনো নাম নিয়ে।



৩৪.       দিগন্তজোড়া আনন্দের গন্ধ 



সকালও কখনো এমন নিবিড় অন্ধকারে নামে- মনে হয়, আকাশ যেন বহুদিনের গোপন কথা মেঘের আঁচলে ঢেকে রেখেছে। দূরের গাছেরা নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু বাতাসে ভেসে আসে অদেখা বৃষ্টির গন্ধ।

আঁধার থাকুক চারিধারে, যদি তোমার স্পর্শ থাকে অন্তরের গভীরে- তবে আলো না ফুটলেও ক্ষতি কী! একটি অচেনা সুখ শিউলি ফুলের মতো ঝরে পড়ে নিস্তব্ধ সকালের বুকে।

দিগন্তের সমস্ত আনন্দ যেন অদৃশ্য কোনো সুর হয়ে এসে মেশে আমার চিত্তের উপাসনায়। ভেজা মাটির গন্ধ, বকুলের মৃদু সুবাস, আর তোমার স্মৃতির নীল আলো - সব মিলেমিশে এক অপরূপ মন্দির গড়ে তোলে হৃদয়ের ভিতর।

হয়তো এখনো বৃষ্টি নামেনি, তবু পত্রপল্লবে কাঁপে তার আগমনী সঙ্গীত - আর আমি বিস্ময়ে দেখি, কীভাবে এক টুকরো ঘন আঁধারও তোমার উপস্থিতিতে আনন্দের মতো দীপ্ত হয়ে ওঠে।

যেন পৃথিবীর সমস্ত মেঘ আজ কেবল এইটুকুই বলতে এসেছে - ভালোবাসা থাকলে, আলো নয়, আঁধারও একদিন ফুল হয়ে ফোটে।



৩৫.      নিমন্ত্রণহীন


খুব কাছের বন্ধু ছিলে তুমি, একই বেঞ্চে বসে কত সময় পার করেছি, একই খাতার পাতায় এঁকেছি অসংখ্য অনর্থক স্বপ্নের কথা।

বৃষ্টিভেজা ক্যাম্পাস, চায়ের কাপে উড়ে যাওয়া ধোঁয়া, অকারণ হাসি, পরীক্ষার আগের উৎকণ্ঠা, 
সবকিছুর মাঝখানে ছিল আমাদের একটি সহজ বন্ধুত্ব।

হঠাৎ অনেক বছর পর দেখলাম -
তোমার বাড়িতে উৎসবের আলো জ্বলে উঠেছে, চারদিকে কত হাসি রাশিরাশি, কত আনন্দ করলে তোমরা - শুধু  আমি সেখানে নেই। 

আমার দুয়ারে কোনো নিমন্ত্রণ এসে পৌঁছাল না।
আমি জানালার পাশে বসে ভাবলাম -
মানুষ কি সত্যিই দূরে সরে যায়, বন্ধত্ব ফুরিয়ে যায়।

তোমাকে দোষ দিইনি,  তবু বুকের কোথাও একটি নীরব ব্যথা জমে উঠল, যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো পাখি হঠাৎ আর ফিরে এল না সন্ধ্যায়।

বেদনা বড় বিচিত্র - সে চোখে জল আনে না সবসময়, কখনো কেবল মনে হয়, এ পৃথিবীর সমস্ত আনন্দের ভিড়ে আমি বুঝি ভুলবশত বাদ পড়ে যাওয়া এক নাম।

তবু তোমার ঘরে আলো জ্বলুক, হাসিতে ভরে উঠুক আঙিনা - আমি দূর থেকে আশীর্বাদ করি।

শুধু গভীর রাতে, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে 
নিঃশব্দে প্রশ্ন জেগে উঠবে -
এত কাছে থেকেও, কবে যে আমি তোমার আনন্দের তালিকা থেকে এত দূরে চলে গেলাম, তা আর জানা হলো না।


৩৬.     অনন্ত প্রান্তরের মায়া


তোমায় কাছে পেতাম যদি আজ নিশীথের 
নীল আলোয় কথাগুলো ধীরে ধীরে খুলে যেত -
যেন বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা কোনো নদী হঠাৎ 
জেগে ওঠে চাঁদের স্পর্শে।

চারিদিকে হিজল-শিরীষের গন্ধমাখা ছায়া, 
ঘাসের বুকে নক্ষত্রেরা নেমে এসে শিশিরের মতো জ্বলজ্বল করত, হাওয়ার প্রান্তরে ভেসে বেড়াত অকথিত দিনের সব মায়া।

তোমার চোখে মুখে হয়তো দূর কোনো সন্ধ্যার বিষণ্নতা লেগে থাকত, আমি তার পাশে বসে শুনতাম পাতার ফাঁকে ফাঁকে জেগে থাকা ঝিঁঝিঁ পোকার গোপন সংগীত।

কোনো তাড়া থাকত না আর, কোনো ভোরের ডাকও নয়, শুধু পৃথিবীর সমস্ত নির্জনতা দুজন মানুষের নিঃশব্দ সান্নিধ্যে মায়াময় হয়ে উঠত ধীরে ধীরে।

আর রাতের শেষ প্রহরে, শিরীষের ঘুমন্ত ফুলে, ঘাসের গভীরে নেমে আসা নক্ষত্রে, আর হাওয়ার অনন্ত প্রান্তরে তোমার আমার ভালোবাসা বেঁচে থাকত না-বলা কথাদের মতো।


৩৭.      এ কী করুণ করুণাধারা


এ কী করুণ করুণাধারা! 
কার অশ্রু নেমে আসে মেঘের অন্তরাল ভেঙে, 
কার ব্যথা ঝরে পড়ে বৃষ্টির বিন্দু হয়ে 
নিভৃত বিকেলের শূন্য উঠোনে?

দূরের বৃক্ষগুলো আজ বড় একা লাগে, 
যেন তারাও হারিয়েছে কোনো প্রিয় পাখির গান, 
কোনো চেনা ছায়ার আশ্রয়।

এমন দিনে মনে পড়ে,  
যারা একদিন ছিল খুব কাছে, তারা আজ কেবল স্মৃতির মতো ধূসর আকাশে ভেসে বেড়ায়। 
ডাকলেও আর ফিরে আসে না, 
তাদের পদধ্বনি মিশে গেছে অসংখ্য বিস্মৃত 
সন্ধ্যার ভিতরে।

হৃদয়ের গোপন নদীতে কেন আজ এত জোয়ার? অপূর্ণতার পুরোনো নৌকাটি নিঃশব্দে দুলে ওঠে, কোনো ঘাটে আর ভিড়ে না।

এ কী করুণ করুণাধারা! 
এ কোন বিষাদের বৃষ্টি-যার কোনো শেষ নেই, 
আমিও হয়ে যাব একটি পুরোনো স্মৃতি, 
কোনো নির্জন হৃদয়ের নিঃশব্দ 
কান্নার মতো।


৩৮.     একটি অপেক্ষার গল্প


সেদিন সন্ধ্যায়
খামখেয়ালি কিশোরীটি ভাত চাপিয়েছিল মাটির চুলোর আগুনে,
কারও ফিরে আসার আনন্দে।
চালের ভেতর তখন ফুটছিল সাদা সাদা স্বপ্ন,
হাঁড়ির ঢাকনায় জমছিল শিশিরের মতো ভালোবাসা।

কিন্তু কে জানে -
কোন অচেনা বিষাদের পাখি এসে
তার মনটাকে দূর আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গেল!
সে বসে রইল জানালার ধারে,
আর চুলোর আগুনে ধীরে ধীরে
ভাতের গন্ধ বদলে গেল পোড়া ধোঁয়ায়।

তারপর বহু বছর কেটে গেল।

এখন তার চারপাশে
শুধু ধোঁয়ার কালো স্মৃতি,
আর মানুষের অবিশ্বাস।
যত্নের কথা বললে সবাই হাসে,
ভালোবাসার কথা বললে কেউ আর চোখ তুলে চায় না।

যে মানুষটির জন্য একদিন
সে আঁচলে লুকিয়ে রেখেছিল সমস্ত দুপুর,
সে মানুষটি এখন নেই -
যেন কখনো ছিলই না।

আর যারা প্রতিদিন ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়,
যাদের জন্য শহরের পর শহর নিভে যায়,
যাদের জানালায় আর কোনো চিঠি এসে বসে না,
যাদের নাম ধরে ডাকে না কেউ -
তারা গোপনে এক আশ্চর্য জগতের কথা ভাবে।

সেখানে সন্ধ্যা নামে ধানের গন্ধ মেখে,
ফুটফুটে সাদা ভাতের উষ্ণ বাষ্পে ভরে ওঠে উঠোন।
মায়ের আঁচল বাতাস হয়ে এসে
মাথার ঘাম মুছে দেয়।

রঙিন কাগজের চরকি ঘুরতে থাকে
শৈশবের আকাশে,
আর জোনাকিরা একে একে জ্বেলে দেয়
ছোট্ট হ্যারিকেনের আলো।

সেই আলো হাতে
কুসুমপুরের এক কুঁড়েঘরের সামনে
আজও কেউ দাঁড়িয়ে থাকে -
কোনো অভিযোগ নেই তার,
নেই অভিমান।

শুধু দূর থেকে বলে -

“এতদিন কোথায় ছিলে?
ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, এসো, আজ আর কিছু পোড়াবে না। আজ তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে আছি…।"


৩৯.      অবশ সন্ধ্যার কথা


সখীরা আমার, তোদের চোখে কত রঙিন গল্প, জোৎস্নাভেজা পথের ধারে গেঁথে রাখিস মালা - প্রিয়জনের হাত ধরে কত কথা যে 
বলিস অবিরল।

আমারও ছিল এক মায়াবী সন্ধ্যা, 
শিউলি-গন্ধে ভরা বাতাস, কাঁপা কাঁপা চাঁদের আলো, আর দুটি চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাওয়ার 
এক আশ্চর্য আহ্বান।

তারপর কী যে হয়েছিল মনে নেই, 
শুধু মনে পড়ে, আকাশভরা তারারা নেমে 
এসেছিল কাছে, বকুলের গন্ধে ভরে উঠেছিল রাত, আর হৃদয়ের ভেতর অজানা এক 
সুখের ঢেউ ছুঁয়ে গিয়েছিল আমাকে।

আজও সখীরা যখন অভিসারের গল্প বলে, 
আমি চুপ করে হাসি 
কারণ কিছু কিছু স্মৃতি শব্দে ধরা দেয় না, 
শুধু নিঃশব্দে ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে পড়ে 
হৃদয়ের উপরে।


৪০.      আজ সারারাত 


আজ সারারাত তোমার নামে কবিতা লিখব,
আজ সারারাত কবিতার অলংকার হবে তুমি -
আজ সারারাত তোমার সর্বাঙ্গে সেজে উঠবে উপমা, উৎপ্রেক্ষা।

আজ সারারাত আমি আলো-আঁধারির ভেতর 
খুঁজব তোমার প্রাণের শব্দ,
যেন দূরের নদীর মতো অবিরাম এসে ছুঁয়ে যায় 
আমার ঘুম-ভাঙা চোখ।

তুমি থাকো -
অদৃশ্য কোনো কবিতার প্রথম লাইন হয়ে,
যেখানে প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে একটি করে 
অস্থির ভালোবাসা।

আজ সারারাত জমবে তোমার স্মৃতি -
যেন জোনাকির মতো জ্বলে ওঠা অসংখ্য 
ছোট ছোট হৃদস্পন্দন।

আমি লিখতে থাকব,
আর কাগজ ধীরে ধীরে ভরে উঠবে তোমার গন্ধে,
তৈরি হবে এক অদ্ভুত মায়াময় শিহরণে।

শেষে হয়তো আর কবিতা থাকবে না -
থাকবে শুধু তুমি,
আর থাকবে তোমাকে ঘিরে লেখা একটি 
সারারাতের অপেক্ষা লিপি ।


৪১.      জোছনার মতো খুলে দাও


নদীর ঢেউয়ের মতো জেগে উঠুক 
ভালোবাসা, শীতের সকালের কুয়াশার মতো 
নরম হোক নিঃশ্বাস,
ধানের শিষের মতো দুলুক দু'চোখের 
উচ্ছ্বাস।

হিজলপাতার মতো কাঁপুক গোপন 
অভিমান,
বকুলফুলের মতো ঝরে পড়ুক 
ভালোবাসার গান।

সন্ধ্যার আকাশের মতো মেলে দাও 
নীল আঁচল,
বৃষ্টিভেজা মাটির মতো উঠুক মায়ার 
কলকল।

পদ্মার চর যেমন জেগে ওঠে 
জোছনার পরশে,
তেমনি তুমি ফুটে ওঠো আমার 
প্রেমের আবেশে।

চাঁদের আলোর মতো নিঃশব্দে কাছে 
এসো আজ,
ভালোবাসায় খুলে দাও শরীরের যত 
গোপন ভাঁজ।



৪২.        অজানার খাতায়



কত অচেনা মুখ এসে
চেনা হয়ে বসেছিল হৃদয়ের উঠোনে,
কত চেনা মুখই আবার
নিঃশব্দে অচেনার দেশে পাড়ি দিল।

কেউ বিদায়ের কথা বলেনি,
কেউ শেষবার ফিরে তাকায়নি,
শুধু কিছু অসমাপ্ত আলাপ
বিকেলের আলোয় ঝুলে রইল।

অথচ কত হিসেব বাকি ছিল -
কে কতটা মায়া রেখে গেল,
কে কতটা অভিমান নিয়ে চলে গেল,
কে কার চোখে জোছনা হয়ে ছিল,
আর কে ছিল নিঃশব্দ অন্ধকার।

কেউ কি সত্যিই জানে,
কে কতটা দিল,
কে কতটা পেল,
কার বুকের ভেতর কতটা শূন্যতা জমল?

সময়ের পুরোনো খাতায়
সেসব সংখ্যার কোনো অঙ্ক মেলে না,
শুধু নামহীন কিছু দীর্ঘশ্বাস
পাতার ভাঁজে ভাঁজে শুকিয়ে থাকে।

তারপর একদিন
আমরাও হয়তো কারও স্মৃতিতে
একটি অস্পষ্ট মুখ হয়ে যাবো -
যার সঙ্গে দেনা-পাওনার হিসেবটুকুও
কখনো চুকানো হবে না।

শুধু অজানার খাতায় লেখা থাকবে ;
কেউ এসেছিল,
কিছুটা ভালোবেসেছিল,
কিছুটা হারিয়েছিল,
আর অনেকখানি না-বলা কথা রেখে
নিঃশব্দে হারিয়ে গিয়েছিল।


৪৩.      যা পেয়েছি, তাতেই পূর্ণতা


একটাই জীবন জেনেও
জড়াইনি অন্য আর কারোর জীবনে -
যতটুকু সময় আছে,
আছি তোমার সাথে সুখ-দুঃখের এই ভূবনে,
জীবনে যা পেয়েছি,
অমৃতসুধায় ভরে থাক, আর কিছু চাহিনে।

তোমার হাতের উষ্ণতায়
শীতের রাতও হয়ে ওঠে বসন্তের গান,
তোমার চোখের মায়ায়
হারিয়ে যায় শত অভিমান।

যে পথটুকু একসাথে হেঁটেছি,
সেই পথেই ফুটুক অনন্ত স্মৃতির ফুল,
ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়ে
বারবার হতে চাই নির্ভুল।

হয়তো সব স্বপ্ন পূর্ণ হবে না,
সব আকাশে উঠবে না পূর্ণিমার চাঁদ,
তবু তোমার পাশে থেকে
জীবনকে মনে হয় ঈশ্বরের দেওয়া প্রসাদ।

একটাই জীবন জেনেও,
তাই আর কোনো প্রাপ্তির হিসেব রাখিনি মনে,
তোমার হাসির আলোয় ভরে উঠুক দিন,
তোমার নামের জোছনায় ডুবে থাকুক ক্ষণে ক্ষণে।

জীবনে যা পেয়েছি তোমার প্রেমে,
অমৃতসুধায় ভরে থাক, 
আর কিছু চাহিনে।


৪৪.     চন্দ্রপক্ষের অপেক্ষা 


কত রাত পোহালো, তবু তার সঙ্গে দেখা হলোনা-
অথচ প্রতিটি নিশীথ তার নামের আলোয় ধীরে ধীরে ভোর হয়ে গেছে।

তুমি কি ছিলে এই রাত্রিতে, এই চন্দ্রপক্ষে, 
নিজেকে বিসর্জন দিতে দিতে মাটির গভীর প্রেমে নিমগ্ন?

যেখানে দেহের বিষও ভালোবাসার স্পর্শে অমৃত হয়ে ওঠে, যেখানে ক্লান্ত দুটি আত্মা নিঃশব্দ আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকে জন্মজন্মান্তরের মতো।

আমি শুনেছি, ভালোবাসার ফুলে ভরে উঠেছিল জল, জলের বুকে জেগেছিল নীল কম্পন, 
তবুও কেউ শুনতে পায়নি তার গোপন স্পন্দনের ভাষা।

চাঁদ ঝরে পড়েছিল জানালার কার্নিশে, 
তারারাও নেমেছিল নীরব সাক্ষী হয়ে - 
কেবল তুমি এলে না।

তবু আমি অপেক্ষা করেছি, যেমন নদী অপেক্ষা করে সমুদ্রের জন্য, যেমন শিশির অপেক্ষা করে প্রথম সূর্যের স্পর্শের জন্য।

হয়তো কোনো এক আলস্য প্রহরে, 
যখন সমস্ত অভিমান মিশে যাবে ধূলির সঙ্গে, 
তখন তুমি ফিরে আসবে -

আর আমার সমস্ত রাত, সমস্ত চন্দ্রপক্ষ, সমস্ত অসমাপ্ত ভালোবাসা তোমার চোখের গভীরে একটি দীর্ঘ আলোর মতো আবার জন্ম নেবে।


৪৫.     উত্তম পুরুষ


তোমার চোখের ভেতর যে সোনালি বিকেল বাস করে,
সেখানে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে ফিরে যাই -
যেন বহুদিনের চেনা কোনো নদী
নিজের স্রোতকে খুঁজে পায় সমুদ্রের কাছে।

আমি তোমার নাম উচ্চারণ করি না সবসময়,
তবু নিঃশব্দে তোমাকেই ডাকি -
শিশিরভেজা ঘাসের মতো কোমল হয়ে
আমার সমস্ত ভোর তোমার কাছে নতজানু হয়।

আমি জানি,
একটাই জীবন আমাদের হাতে,
তাই এই ক্ষণিক পৃথিবীতে
আমি অন্য কোনো আলোর কাছে যাইনি -
তোমার হাসির ভেতরই খুঁজেছি
চাঁদের সমস্ত জোছনা।

যখন সন্ধ্যা নামে,
আমি তোমার কণ্ঠস্বরের মতো শান্ত কোনো গান শুনি,
আর মনে হয় -
ভালোবাসা আসলে কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়,
ভালোবাসা মানে তোমার পাশে বসে থাকা।

আমি উত্তম পুরুষ, আমার সমস্ত আমি জুড়ে
তুমিই একমাত্র প্রথম রমণী 
যার জন্য প্রতিটি কবিতা লেখা হয়,
আর যার চোখে চোখ রাখলেই
পৃথিবীর সব ব্যাকরণ ভেঙে গিয়ে
শুধু প্রেমের ভাষাটুকু বেঁচে থাকে।

তখন মনে হয়, জীবন যতটুকুই হোক,
যদি তোমার উষ্ণ সান্নিধ্যে পাই, তবে অনন্তকাল 
একটি মায়াময় সন্ধ্যার মতো 
সুন্দর একটি জীবন কাটাতে পারি।



৪৬.       সাধারণ মেয়ের গল্প



যে মেয়েটি সন্ধ্যাবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ 
জ্বালিয়ে চুপচাপ আকাশ দেখে, আর বুকের ভেতর রাখে অসংখ্য না-বলা কথা -
কবিতায় আমি তার কথা লিখতে চাই।

যে মেয়েটি রূপকথার রাজকন্যা নয়, নেই তার 
সোনালি প্রাসাদ, শুধু দু'চোখে কিছু জোছনা, 
আর কিছু স্বপ্ন, বৃষ্টিভেজা কদমফুলের গন্ধে মাখা -
কবিতায় আমি তার কথা বলতে চাই। 

তার হাসি নদীর ঢেউয়ের মতো, 
দুঃখগুলো নিঃশব্দে ডুবে থাকে জলজ শাপলার শিকড়ের মতো -
যেখানে প্রেম মানে কাউকে না পেয়েও আজীবন ভালোবেসে যাওয়া,
আর অপেক্ষা মানে প্রতিটি পূর্ণিমায় 
একটি ছায়ার জন্য জেগে থাকা।

একটা কবিতা লিখব আমি -
যে কবিতা পড়ে মনে হবে এই মেয়েটিকে 
কোথাও যেন আমি দেখেছি ,
হয়তো নিতান্ত সে সাধারণ মেয়ে , 
হয়তো সে একটি মায়াময় কবিতা।



৪৭.      স্বপ্নের আকাশ



জানি পাশেই আছ, ছুঁয়ে দেখতে পারি না,
জানি কাছেই আছ, উপলব্ধি করি না,
তবু স্বপ্ন দেখি, একদিন দু'জনে আকাশ ছোঁব।

জানি তোমার নিঃশ্বাস ভেসে আসে বাতাসে,
জানি তোমার নাম জেগে থাকে আমার একান্ত বিষণ্নতায়,
তবুও অদৃশ্য দূরত্বের দেয়াল ভেঙে
একদিন পাশাপাশি হাঁটার স্বপ্ন দেখি।

তুমি না থেকেও আছো -
নদীর বুকে জেগে থাকা জোৎস্নার মতো,
ফুলের গন্ধে লুকিয়ে থাকা বসন্তের মতো।

যদি কোনো ভোরে দু'জনার দেখা হয়,
তবে সমস্ত অভিমান গলে যাবে রোদের উষ্ণতায়,
সমস্ত অপেক্ষা মিলিয়ে যাবে পাখির ডানায় ভেসে,
ততদিন স্বপ্নই হোক আমাদের আশ্রয়,
ততদিন দূরত্বই হোক ভালোবাসার আরেক নাম। 

হৃদয় জানে, যারা সত্যিই একে অপরের,
তারা কখনও হারিয়ে যায় না,
শুধু সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে
একদিন একই আকাশের নিচে তারা মিলিত হয়।



৪৮.      ব্যবধান


হয়তো তুমি আছো ঠিক পাশের জানালায়,
তবু স্পর্শের আগে কত ঋতু পেরিয়ে যায়,
কত সন্ধ্যা নক্ষত্রের কাছে
নিজের নীরবতা জমা রাখে।

আমরা দু'জন একই আকাশ দেখি,
একই বৃষ্টিতে ভিজে উঠি -
তবু কোনো অদৃশ্য নদী
দু'তীরের মতো আলাদা করে রাখে আমাদের।

তবু কেন এমন হয় -
খুব নিকটের মানুষটিও
কখনো কখনো হয়ে ওঠে
এক অনন্ত অপেক্ষা।

আর সেই অপেক্ষার ভেতরেই
জেগে থাকে মায়া,
জেগে থাকে না-পাওয়া চাঁদের আলো,
জেগে থাকে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো বিস্তৃত 
অসমাপ্ত ভালোবাসা।


৪৯.     একদিন তুমি এসেছিলে


একদিন তুমি এসেছিলে 
নিভু নিভু প্রদীপের  শিখায়, হঠাৎ জেগে ওঠা 
আলোর মতো -
তখন চারদিকে ছিল শিউলি ঝরার শব্দ,
আর দূর আকাশে জেগেছিল 
কিছু নক্ষত্রের নীরবতা।

তুমি কথা বলোনি খুব বেশি,
তবু তোমার চোখের ভেতর
অগণিত নদীর স্রোত শুনেছিলাম -
যেন বহুদিনের চেনা কোনো পথ
ফিরে পেয়েছে তার হারানো যাত্রী।

তোমার স্পর্শ এসে জড়িয়ে ছিল
আমার সমস্ত বিষণ্নতাকে -
অথচ সুখেরও এক গভীর দুঃখ আছে,
সে কথা সেদিন বুঝিনি।

তুমি রয়ে গেছো, নিশীথের বাতাসের মতো,
ছুঁয়ে যাও, ধরা দাও না -
তবু তোমার অনুপস্থিতির মধ্যেই
ফুটে থাকে আমার সমস্ত ভালোবাসা,
আর সমস্ত মায়াময় জীবন।


৫০.      চাঁদের আলোয় একা একা 


আজকে রাতে তোমায় যদি আমার কাছে পেতাম,
অনেক না-বলা কথারা জেগে উঠত নিঃশব্দে -
যেমন দূরের কোনো নদী
চাঁদের আলোয় একা একা কথা বলে।

হাওয়ার দীর্ঘ প্রান্তর জুড়ে
ভেসে বেড়াত তোমার নামের মৃদু উচ্চারণ -
শিশিরভেজা পাতার মতো
নেমে আসত শান্ত এক ভালোবাসা।

আমরা হয়তো খুব আস্তে কথা বলতাম,
যেন শব্দে ভেঙে না যায়
রাত্রির স্বচ্ছ জাদু -
তোমার চোখে জমে থাকা জোছনার ভিতর
আমি খুঁজে নিতাম বহু জন্মের পরিচয়।

কোনো তাড়া থাকত না,
কোনো বিদায়ের ভয়ও নয় -
শুধু দূর আকাশের তারারা
নীরবে শুনে যেত আমাদের হৃদয়ের ভাষা।

আর যদি হঠাৎ ভোর হয়ে যেত,
তবুও মনে হতো -
এই পৃথিবীর সমস্ত পথ পেরিয়ে
আমরা এসে পৌঁছেছি
একটি মায়াবী নিস্তব্ধতার কাছে,
যেখানে ভালোবাসা ঘাসের মতো জন্মায়,
আর তোমার হাতের উষ্ণতায়
একটি দীর্ঘ জীবন
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।