শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ ( কাব্যগ্রন্থ )



১.       ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ


ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ
কালো পতাকার মতো অন্ধকার,
মসজিদের মিনার, মন্দিরের ঘন্টা, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি
সবকিছুকে একসাথে গিলে খেতে চায়।
তার হাতে বই নয় বারুদ,
তার চোখে প্রশ্ন নয় হুকুম,
তার কানে গান নয় শুধু আদেশের চিৎকার।

ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ,
শিশুর খাতার পাতায় রক্তের দাগ আঁকতে আঁকতে,
মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিতে নিতে স্বপ্ন,
শিক্ষকের কণ্ঠ রোধ করে,
যুক্তির গলা টিপে ধরে বলে,
ভাবো না, মানো।

ওরা আসে ঈশ্বরের নাম নিয়ে,
কিন্তু ঈশ্বর সেখানে থাকেন না।
ওরা আসে ধর্মের পোশাকে,
কিন্তু সেখানে মানবতা নেই।
ওরা মুখে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেয়,
আর পায়ের নিচে বানায় নরক।

ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ,
রাষ্ট্রের অলিগলিতে,
বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে,
অনলাইনের অন্ধকার গলিতে,
যেখানে হতাশা ভিক্ষা করে,
সেখানে ওরা ঘৃণার বীজ বোনে।

ওরা বলে- তুমিই শ্রেষ্ঠ,
আর গোপনে শেখায়- অন্যরা শত্রু।
এই জঙ্গিবাদ
শুধু বোমা নয়,
শুধু বন্দুক নয়,
এ এক বিষাক্ত দর্শন,
যা মানুষের ভেতরের মানুষটাকেই
ধীরে ধীরে হত্যা করে।

আমি দেখেছি,
কীভাবে প্রশ্ন করা ছেলেটা
একদিন প্রশ্ন করাই ভুলে যায়,
কীভাবে কবিতা লেখা মেয়েটা
একদিন শুধু শ্লোগান মুখস্থ করে,
কীভাবে প্রতিবেশী
হঠাৎ অচেনা হয়ে ওঠে,
একটি লেবেলের জন্য।

ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ,
আর আমরা যদি নীরব থাকি,
যদি যুক্তি তুলে রাখি আলমারিতে,
যদি মানবতাকে বলি, “পরে কথা হবে”,
তাহলে সে ধেয়ে আসবে আরও দ্রুত,
আর আমাদের নীরবতাকেই বানাবে অস্ত্র।

তাই শোনো-
এই আগুনের বিপরীতে আগুন নয়,
এই অন্ধকারের বিপরীতে আলো চাই।
চাই প্রশ্ন, চাই শিক্ষা,
চাই ভিন্নমতকে বাঁচিয়ে রাখার সাহস।
চাই এমন কণ্ঠ,
যে কণ্ঠ বলবে:
মানুষ আগে, মতবাদ পরে।

ধেয়ে আসছে জঙ্গিবাদ
কিন্তু আমরা যদি দাঁড়াই
বই হাতে, যুক্তি হাতে,
ভালোবাসার অদম্য দৃঢ়তায়,
তাহলে ইতিহাস লিখবে অন্য কথা।
লিখবে-
অন্ধকার এসেছিল,
কিন্তু মানুষ মাথা নোয়ায়নি।


২.        অথর্বদের বিরুদ্ধে

যে মাথা ভাবে না
সে মাথা শাসন করবে কেন?
যে বাহু কাঁপে না
সে বাহু রক্ষা করবে কাকে?

অথর্বের হাতে রাষ্ট্র
রাষ্ট্র তখন দড়িতে ঝোলানো!
অথর্বের হাতে বন্দুক
সত্য তখন গুলিবিদ্ধ!

বলুন, বলুন
রাষ্ট্র কি খেলনা?
মানুষ কি সংখ্যা?
লাশ কি উন্নয়নের সিঁড়ি?

যে মুখ শুধু আদেশ দেয়,
কান বন্ধ রাখে আর চোখ ঢেকে রাখে
সে মুখ শাসক নয়,
সে মুখ ইতিহাসের অপরাধী!

সংবিধান কোথায়?
— তালাবদ্ধ।
বিচার কোথায়?
— নিখোঁজ।
মানুষ কোথায়?
— ভয়ে চুপ!

অথর্ব বলে— “শান্তি”
আর শহর জ্বলে।
অথর্ব বলে— “নিরাপত্তা”
আর বুক ঝাঁঝরা হয়।

রাষ্ট্র নয় এটা
এটা ক্ষমতার কারখানা!
নাগরিক নয় আমরা
আমরা বন্দী!

মগজহীন মাথা নামাও!
রক্তমাখা বাহু থামাও!
রাষ্ট্র ফেরাও মানুষের হাতে,
রাষ্ট্র ফেরাও বিবেকের কাছে!

কারণ মনে রেখো
যে দেশে অথর্ব শাসক,
সেই দেশে দুঃখ সীমাহীন।
আর যে দুঃখ সীমাহীন,
সেই দুঃখ একদিন
বিদ্রোহ হয়ে ফিরে আসবেই।


৩.       মশাল কার হাতে

অন্ধকার
ভোরও অন্ধকার,
সূর্যের তীর্যক রশ্মিও আজ অন্ধকারের কাছে পরাজিত।
দিন হাঁটে রাতের ছায়া গায়ে মেখে,
মানচিত্রের প্রতিটি শহর—এক একটি নিভে যাওয়া চিতা।

চারদিকে কেবল হুংকার,
বিবেকের গলা চেপে ধরা শ্লোগান,
আইনের খাতায় আগুন,
মানুষের হাতে পাথর
প্রশ্ন করা আজ রাষ্ট্রদ্রোহ।

আলো চাই
কিন্তু বাতি ভাঙা,
মশাল লুকোনো,
যে হাত জ্বালাতে পারে
সেই হাতই আগে কেটে ফেলা হয়।

মব কি শাসককে ঘিরে ধরে?
নাকি শাসকই মব হয়ে ওঠে
ক্ষমতার অন্ধ উল্লাসে?
কার লাঠিতে লেখা থাকে ন্যায়,
কার রক্তে সই হয় আইন?

শিশুর চোখে ভয়ের ঘুম,
মায়ের স্তনে আর্তনাদ,
দেশটা আজ প্রশ্নবিদ্ধ কবরস্থান
যেখানে সত্যকে চাপা দিতে
সবচেয়ে বেশি মাটি লাগে।

তবু শোনো
একটুকরো আলো এখনো বেঁচে আছে
কোনো এক নাগরিকের বুকে।
যেদিন ভয় পুড়ে ছাই হবে,
সেদিনই উঠবে মশাল
হাত বদলাবে ইতিহাস।

কার হাতে উঠবে সেই আগুন?
এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে বিপজ্জনক,
আর সবচেয়ে জরুরি।


৪.       রক্তে-লেখা স্বাধীনতার গান

এই দেশটি হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি
একে জন্ম নিতে হয়েছে রক্তের মধ্য দিয়ে,
আর্তচিৎকারের ভেতর দিয়ে,
একাত্তরের দীর্ঘ রাত পেরিয়ে।

মুক্তিযোদ্ধারা কোনো গল্পের নায়ক নয়
তারা ছিল রক্তমাংসের মানুষ,
তবু ভয়কে জয় করে
অস্ত্র বানিয়েছিল বুকের সাহসকে।
মায়ের মুখ, সন্তানের মুখ, প্রিয় মানুষের মুখ
চোখের সামনে ভেসে উঠত,
তবু তারা পিছু ফেরেনি।

শহীদের রক্ত মাটিতে পড়তেই
এই ভূমি বদলে গিয়েছিল
আগাছা নয়, জন্ম নিতে শুরু করেছিল
স্বাধীনতার অঙ্কুর।
প্রতিটি লাল ফোঁটা রক্ত
একটি করে প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠেছিল
এই দেশ আর দাস থাকবে না।

হানাদারের বন্দুকের নলের সামনে
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ বুকগুলো
আমাদের জন্য রেখে গেছে
একটি উড়তে-জানা পতাকা।
নীল আকাশ আজ যে এত প্রশস্ত,
তা আসলে তাদের বিস্তৃত আত্মারই প্রতিচ্ছবি।

আমাদের বিজয়
কেবল যুদ্ধের শেষদিন নয়,
এ এক দীর্ঘ শোকের মধ্য দিয়ে পাওয়া আলো,
একটি জাতির পুনর্জন্ম।

আজ যখন আমরা স্বাধীন বাতাসে শ্বাস নিই,
রাস্তায় হাঁটি মাথা উঁচু করে,
তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসে জড়িয়ে থাকে
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ,
শহীদদের নীরব রক্তভাষা।

মুক্তিযোদ্ধা, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান,
যাদের বুকের ভেতর আগুন ছিল,
আর চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।

হানাদারের কালো বুটে পিষ্ট মাটি
যেদিন কেঁপে উঠেছিল আর্তনাদে,
সেদিনই তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল
খালি হাতে, ভাঙা অস্ত্র আর অদম্য সাহসে।

শহীদের রক্তে রাঙা পথ
আজও কথা বলে নীরবে,
এই লাল মাটির প্রতিটি দানা
স্বাধীনতার শপথে ভেজা।

মায়ের কোল শূন্য করে,
প্রিয়জনের অশ্রু উপেক্ষা করে
তারা লিখে গেছে বিজয়ের ইতিহাস
নিজেদের প্রাণের দামে।

তাদের আত্মত্যাগেই
হানাদারমুক্ত হলো এই দেশ,
উড়ল স্বাধীন পতাকা
নীল আকাশের বুকে মাথা উঁচু করে।

আমাদের বিজয়
কেবল একটি দিনের উল্লাস নয়,
এ এক রক্তঋণ,
যা বহন করি প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

শ্রদ্ধায় মাথা নত করি আমরা
শহীদদের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি,
কারণ তোমাদের রক্তেই জন্ম নিয়েছে
আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।

এই দেশ
শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লেখা এক মহাকাব্য,
যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি শুরু হয়
শ্রদ্ধা আর দায়বদ্ধতার শব্দ দিয়ে।


৫.       আমার স্পর্ধিত অহংকার

রক্তমাখা ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাসে গড়া
আমার এই দেশ
রক্তের আখরে তৈরি আমার  স্বপ্নের মানচিত্র,
এই মাটির ধুলোয় লেগে আছে
শহীদের রক্ত , কৃষকের প্রার্থনা,
আর অনাগত দিনের অবিনাশী আশা।

আমার মাটি
লাঙলের ফলা চুমু খায় যে বুক,
যেখানে বীজ বুনলে জন্ম নেয় গান,
দুর্ভিক্ষের রাত পেরিয়ে
ভোরের আলো জ্বলে ওঠে অবিচল বিশ্বাসে।

আমার জাতীয় পতাকা
সবুজে শস্যের শান্তি,
লালে স্বাধীনতার অমোঘ দাম।
বাতাসে ওড়ার প্রতিটি মুহূর্তে
সে আমাকে মনে করিয়ে দেয়
আমি মাথা নত করার জন্য জন্মাইনি।

আমার জাতীয় সঙ্গীত
শুনলেই বুকের ভেতর নদী বয়ে যায়,
চোখে জমে ওঠে ইতিহাসের জল।
সে সুরে আছে মায়ের ডাক,
সে সুরে আছে সংগ্রামের শপথ।

এই দেশ, এই মাটি,
এই পতাকা, এই গান
আমার পরিচয়, আমার সাহস।
সব হারাতে পারি,
কিন্তু এ অহংকার নয়
এ আমার স্পর্ধিত অহংকার,
এ আমার চিরন্তন বাংলাদেশ।


৬.       জয় বাংলা

জয় বাংলা
এই দুই অক্ষরের আগুনে
জ্বলে উঠেছিলো নীরব বুকের ভিতর
একটি জাতির প্রথম উচ্চারণ।

পদ্মার ঢেউয়ে ঢেউয়ে
মেঘনার দীর্ঘশ্বাসে
ধানক্ষেতের সবুজ শিরায়
রক্তের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো এই ডাক,
জয় বাংলা।

এ ছিলো শ্লোগান নয় শুধু,
এ ছিলো শপথ
ক্ষুধার বিরুদ্ধে, ভয়ের বিরুদ্ধে,
শেকলের লোহার দাঁতের বিরুদ্ধে
মানুষ হয়ে ওঠার শপথ।

মায়ের আঁচলে লুকানো কান্না
হঠাৎ শক্ত মুষ্টি হয়ে উঠেছিলো,
কিশোরের চোখে জন্ম নিয়েছিলো আকাশ,
বুড়োর কাঁপা কণ্ঠেও ছিলো দৃঢ়তা
জয় বাংলা।

যুদ্ধ শেষে ধুলো ঝরানো পতাকায়
রোদ উঠেছিলো নতুন দিনের,
ক্লান্ত শরীরের ভেতর
স্বপ্ন আবার হাঁটা শিখেছিলো।

আজও যখন অন্ধকার নামে,
যখন প্রশ্ন করে ইতিহাস
তখন বাতাসে আবার ভেসে ওঠে
একই অমর ধ্বনি,
একই নির্ভীক উচ্চারণ

জয় বাংলা।


৭.        একই বৃত্তে আটকে থাকা 
            আকাশ

পঞ্চান্ন বছর আগে
আর আজ
পরিস্থিতি কি বদলেছে সত্যিই?
নাকি আমরা এখনো
একই রক্তাক্ত বৃত্তের ভেতর
ঘুরপাক খাচ্ছি নীরবে?

জি সি দেব
গোবিন্দ চন্দ্র দেব,
ধ্যানী মানুষ, শিক্ষক, অধ্যাপক।
যিনি বুদ্ধকে বোঝাতে গিয়েছিলেন আমেরিকায়,
আর কানাডার মঞ্চে দাঁড়িয়ে
ইসলামের মানবিক আলো দেখিয়েছিলেন।

যিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের ওপর,
আর সেই বিশ্বাসেই
রাত জাগা এক গরিব মেধাবী ছাত্রকে
পুত্র করে নিয়েছিলেন।
টাকার অভাব ছিল,
স্বপ্নের অভাব ছিল না
প্রুফ দেখত রাতভর,
আর দিনের আলোয়
ভবিষ্যৎ গড়ত নিজের মতো করে।

একদিন আরেকটি কন্যাও এল ঘরে
নাম রোকেয়া।
সেই রোকেয়া দেখেছিল
যে রাতে স্যারকে ডেকে নেওয়া হলো
ছদ্মবেশী ছাত্রটি তাড়াহুড়ো করছিল,
আর স্যার বলেছিলেন
হতবিহ্বল কণ্ঠে
“দুটো ভাত খেয়ে যাও বাবা।”

সে ভাত খেল না।
আর স্যারও
আর কোনোদিন ফিরলেন না।

রক্তাক্ত দেহ পড়ে ছিল কোথাও,
চোখ দুটো তখনো
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলে
জন্মভূমির আকাশের দিকে তাকিয়ে
কী করুণ সেই চাহনি!

আলতাফ মাহমুদ
সুর জানতেন, গান জানতেন,
বন্দুক চিনতেন না।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারিকে
যিনি অমর করে রেখেছেন সুরে।

তাকেও বলা হয়েছিল
“কথা আছে।”
কিন্তু সে কথা
আর শেষ হলো না কোনোদিন।
সুর থেমে গেল,
গান রয়ে গেল ইতিহাসে।

আমি ওঁদের দেখিনি।
যাদের দেখেছি
তাঁরা আমার শহরের মানুষ।

নতুন চন্দ্র সিংহ
ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে লাঠি,
দানশীল, শিক্ষানুরাগী,
বাংলা ও বাঙালির নিঃশব্দ অভিভাবক।

কোনো কথা ছাড়াই
গুলি করা হয়েছিল তাঁকে।
লুটিয়ে পড়ার আগে
চশমাটা ভেঙে গিয়েছিল মাটিতে
সেদিন থেকেই যেন
জাতির দৃষ্টিটা ভাঙা কাঁচে
ঝাপসা হয়ে রইল।

গলির মোড়ে থাকতেন
ডাক্তার শফি সাহেব।
রাশভারি, ভদ্র,
প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী।
টিনের চালার ভিড়ে
তাঁর দালান ছিল আলাদা।

কী কথা ছিল তাঁর সঙ্গে?
যে কথা বলে নিয়ে গিয়ে
ফিরিয়ে আনা হলো না আর।
পরে তাঁর নামের পাশে
শহীদ জায়া হয়ে দাঁড়ালেন
বেগম মুশতারী শফি।

আর প্রফুল্ল বাবু
নীরিহ, পরিমিতভাষী আইনজীবী।
একলা মানুষটি
এক যুবককে ভালোবেসে
পুত্রতুল্য করে নিয়েছিলেন।

সেই ছায়াসঙ্গীই একদিন
জলপাই রঙের জিপে
তাঁকে তুলে দিয়েছিল।
চোখ বাঁধা অবস্থায়
মৃদু কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন
“জানোয়ারগুলো আমার কাছে কী চায়?”

যুবকটি অন্য চোখে
মেজরকে জানিয়েছিল
Job done.

প্রফুল্ল বাবু আর ফিরলেন না।
টেবিলে রাখা চা
ঠান্ডা হয়ে জল হলো।
অপঠিত খবরের কাগজ
হয়তো ভেসে গেল
রক্তের ধারায়।

বাইরে তখনো বাতাসে ভাসছিল
“কী শোভা কী ছায়া গো,
কী স্নেহ কী মায়া গো...”

( মূল লেখা ও তথ্যঋণ শ্রদ্ধেয়  অজয় দাস গুপ্ত। আমি শুধু কবিতায় উপস্থাপন করেছি মাত্র।)


৮.        ঘোষণাপত্র


বিজয়ের এই মাসে
রক্তের নদী পেরিয়ে উঠতে থাকা সূর্য আমাদের আবার ডাকে
স্মৃতি জাগাও, দাঁড়িয়ে যাও,
কারণ ভুলে যাওয়া মানেই আবার অন্ধকারকে সুযোগ দেওয়া।

এই মাসে আমরা দেখি
নির্যাতনের সেই কালো রাত,
যেখানে মানুষের শরীর নয়,
জানোয়ারের নৃশংসতাও লজ্জায় কেঁপে উঠেছিল।
আমরা শুনি
সেই কান্না, সেই আর্তনাদ,
যা বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণকে চিরকাল ভারি করে রেখেছে।

আমরা ঘোষণা করি
এই দেশের বুক বিদীর্ণ করা বিশ্বাসঘাতকদের নাম
ইতিহাসের পাথরে খোদাই হয়ে থাকবে
লজ্জার দগদগে দাগ হয়ে।
যারা রাতের আঁধারে
বুকের ভিতর জন্ম দেওয়া ভয়ের হাত ধরে
শান্ত গ্রামে নেমে এসেছিল হত্যাযজ্ঞ চালাতে,
যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মৃত্যুর বাজার বসিয়েছিল
তাদের অপরাধের ছায়া আমরা কখনও ক্ষমা করব না।

বিজয়ের এই মাসে
আমরা আরও জোরে, আরও দৃপ্ত কণ্ঠে বলি
স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রতিটি হাত,
মানুষ হত্যার প্রতিটি ষড়যন্ত্র,
মায়ের কোলে ফিরতে না পারা প্রতিটি শিশুর নিঃশ্বাস
মিলেমিশে তৈরি করেছে আমাদের ন্যায়ের শপথ।

এই শপথ শুধু রাগের নয়,
এই শপথ বিচারচেতনার,
যেখানে অপরাধের সামনে মাথা নত করার প্রশ্ন নেই,
যেখানে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড
শুধুই ঘৃণার নয়
চিরকালীন নিন্দার প্রতীক।

আজ তাই আমরা বলি
বাংলার আকাশে আর কোনও অন্ধকারের স্থান নেই,
এই ভূমি যুদ্ধের রক্তে পবিত্র হয়েছে,
এই নদী, এই বাতাস, এই ধুলো
স্বাধীনতার সন্তানদের বুকের আগুনে উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
বিজয় শুধু উৎসব নয়
বিচারের আগুন জ্বালিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা।

বিজয়ের মাসে তাই আবারও ঘোষণা
যারা মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছিল
তারা ইতিহাসের অন্ধকারে নির্বাসিত থাকবে;
আর যারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল,
তারা চিরকাল আলো হয়ে থাকবে
আমাদের হৃদয়ের পতাকায়।



৯.      এক গভীর ব্যথার কবিতা


ডিসেম্বরের শেষ প্রহর,
স্বাধীনতার আলো তখন
হেমন্তের কুয়াশা ভেদ করে
বাংলার আকাশ ছুঁতে চাইছে
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই
নেমে এলো এক শীতল, অশ্রুভেজা অন্ধকার।

রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতায়
পাকিস্তানি সেনারা,
তাদের দোসর আলবদর–আলশামসের হাত ধরে
চিহ্নিত করতে লাগল
দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের
যারা বন্দুক নয়,
কলম আর জ্ঞানের আগুনে
স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিল।

মিরপুরের নিস্তব্ধতা, রায়েরবাজারের গহর,
ঢাকার দুয়ারে দুয়ারে
চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো
শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক
এই মাটির মেধা,
এই দেশের স্বপ্নবুননকারীরা।

অন্ধকারের বুকেই
তাদের শেষ নিশ্বাস থেমে গেল,
রক্তে ভিজল বাংলার ভোর,
চিহ্ন হয়ে রইল ইতিহাসের পাতায়
কেননা তারা জানত
স্বাধীনতা জন্ম নেয় না কথায়,
জন্ম নেয় ত্যাগে,
অপূরণীয় ক্ষতির বেদনায়।

১৪ ডিসেম্বর তাই শুধু দিন নয়,
একটি জাতির অভিমান,
একটি দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতি
যেখানে মৃত্যুর মধ্যেও
বেঁচে আছে আলোর দীপশিখা।

আর বিজয়ের সকাল যখন উঠল
লালসবুজ পতাকা নিয়ে,
তখন আমরা বুঝলাম
যারা মাটিতে মিশে গেলেন,
তারা আসলে মিশে রইলেন আমাদের আত্মায়,
শহীদ বুদ্ধিজীবী
বাংলাদেশের চিরন্তন আলোকশিখা।

******

ডিসেম্বরের শেষ প্রহর—
আকাশ জোড়া কুয়াশার ভাঁজ খুলে
স্বাধীনতার আলো যখন
দিগন্তের গোপন দরজায় কড়া নাড়ছিল,
ঠিক তখনই নেমে এলো এক অদৃশ্য ছায়াপাত
হেমন্তের শীতল শ্বাসে গুটিয়ে গেল
বাংলার গভীরতম দীর্ঘশ্বাস।

রাত্রির স্তব্ধতার ভিতর,
কালচে চাঁদের নিচে
অসুরের ছায়ার মতো এগিয়ে এল
পাকিস্তানি সেনারা
তাদের সঙ্গে আলবদর–আলশামসের
অশুভ চিহ্নিত হাত।
তারা খুঁজে নিল সেইসব মানুষকে
যাদের হাতে ছিল না অস্ত্র,
ছিল কেবল জ্ঞানের নীল শিখা,
চিন্তার অগ্নিবীজ
যারা অন্ধকারকে আলোয় ফেরাতে
নিজেদের হৃদয় পর্যন্ত বাজি রেখেছিল।

মিরপুরের রাত তখন
এক বিশাল কালো সমুদ্র
রায়েরবাজারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে
চোখ বাঁধা স্বপ্নেরা
ধ্বংসের উপত্যকায় হারিয়ে গেল।
শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, সাংবাদিক
পরম মমতার মতো যারা
এই মাটিকে বুকে আগলে রেখেছিল,
তারা সবাই ভোরের আগেই
অদৃশ্য পর্দার আড়ালে মিলিয়ে গেলেন।

বাংলার ভোর সেইদিন
রক্তে ধোয়া রঙে রাঙা হলো;
ইতিহাসের কোলাজে তৈরি হলো
অপূরণীয় এক ক্ষতচিহ্ন।
কিন্তু সেই ক্ষতের ভিতরেই
জ্বলে উঠল অগ্নিশিখা
কারণ স্বাধীনতার জন্ম
শুধু স্বপ্নে নয়,
জন্ম ত্যাগের গভীরতম নক্ষত্রে।

১৪ ডিসেম্বর তাই
কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়
এটি এক জাতির নিশ্বাসবন্ধ করা মুহূর্ত,
অপমান আর বিষাদের মিশ্র ছায়ালেখায়
অঙ্কিত এক চিরন্তন স্মৃতি।
একটি দিন, যেখানে মৃত্যুর ভিতর থেকেও
আলো ছড়ায়;
যেখানে নিভে যাওয়া প্রদীপের ভিতরে
জেগে ওঠে হাজারো নতুন শিখা।

আর যখন বিজয়ের সকাল
লাল-সবুজ রঙের নদী নিয়ে উথলে উঠল,
তখন আমরা বুঝলাম
যারা মাটির গভীরে শুয়ে গেলেন,
তারা আসলে মিশে রইলেন আমাদের অস্তিত্বে।
তাদের নিস্তব্ধ চোখের আলোতেই
আজও পথ খুঁজে পায় বাংলাদেশ
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা
চিরদিনের জন্য হয়ে থাকলেন
এই জাতির আত্মায় জ্বলা
অবিনাশী আলোকদীপ।



১০.      এই দেশ—আমাদের মা


এই দেশ আমাদের মা
তার বুকের মাটিতে লুকিয়ে আছে
শহীদের উষ্ণ রক্তের দাগ,
জোছনার মতো জ্বলে ওঠা স্মৃতি,
গোপন কান্নার শব্দ,
আর লাল-সবুজ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া,
সে মাটিতেই ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ
মাটি যেন হয়ে উঠেছে এক পবিত্র গ্রন্থ,
যার প্রতিটি দানায় লেখা আছে
অগ্নিযুদ্ধের ইতিহাস,
বিচ্ছিন্ন প্রাণের মহাকাব্য।

তাই সন্তানদের বলো
এই মাটি কোনো জমি নয়,
এ আমাদের মায়ের কোল,
এখানে অবহেলা নয়,
শ্রদ্ধার হাঁটুপড়ে প্রণাম চাই।

তাদের শেখাও
দেশকে ভালোবাসা মানে
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দনে
মায়ের শ্বাস অনুভব করা;
দেশকে রক্ষা করা মানে
নিজের শিরায় শিরায়
মায়ের নাম বয়ে বেড়ানো।

আর যদি কখনো
এই মাটির জন্য প্রাণ দিতে হয়
সন্তান যেন নিঃশব্দে বলে,
“মা, তোমার জন্যই আমার উৎসর্গ।”

কারণ
এই দেশ, এই মাটি, এই আকাশ—
সবই আমাদের মা।



১১.       একজন শহীদের বীর গাথা 


নাম ছিল তাঁর সুলতান মাহমুদ
একটি নাম, যার ভেতর লুকিয়ে ছিল জোয়ারের মতো উচ্ছ্বাস,
ঝড়ের মতো তেজ, আর মাটির মতো দৃঢ়তা।
ইসমাইল হোসেনের গেরিলা বাহিনীতে
তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ অগ্নিশিখা
সিরাজগঞ্জের জনপদে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে
রাত্রির আঁধার চিরে চলত তাঁর পদধ্বনি।

নদীর পাড়ে, কাশবনে, খড়ের উঠোনে,
অন্ধকার কুঁড়েঘর থেকে মাঠের বুকে
যেখানে শত্রু ছিল, সেখানেই তিনি আগুন হয়ে দাঁড়াতেন।
দেশমাতৃকার টানে তাঁর বুকে জ্বলত
অদম্য প্রতিশোধ,
স্বাধীনতার স্বপ্নের রঙে রাঙা
এক অনির্বাপ্য শপথ।

কোনো এক সন্ধ্যা
যুদ্ধের দগদগে উত্তাপে আকাশ লাল,
গন্ধে ভরা গানপাউডার,
চারদিকে ঝড়ের মতো গুলির শব্দ।
সেই দিনেই শেষবারের মতো
সুলতানের চোখে জ্বলে উঠেছিল বিজয়ের দীপ্তি।
শত্রুর গ্রেনেডে থেমে যায় তাঁর তরুণ প্রাণ,
কিন্তু থেমে যায় না বাংলার স্বাধীনতার যাত্রা
কারণ একজন শহীদের মৃত্যুই
হাজার মানুষের হৃদয়ে নতুন আগুন জ্বালায়।

এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেন
সিরাজগঞ্জের কাটাখালি নদীর শান্ত তীরে,
রহমতগঞ্জ গোরস্থানের অনন্ত নীরবতায়।
কাটাখালির পাশের সেই সরু রাস্তা দিয়ে
যে-ই হেঁটে যায়
হয়তো কেউ জানে, হয়তো কেউ জানে না
এই সবুজ ঘাসের নিচে ঘুমিয়ে আছে
এক তরুণ বীরের অমর গল্প।

কোনো বাতাস বয়ে গেলে মনে হয়,
সুলতানের আক্ষেপহীন নিঃশ্বাস
এখনও সেই নদীর জলে ভাসে।
রাতের আকাশে জোনাকির আলো
মনে করিয়ে দেয় তাঁর অদৃশ্য পদচিহ্ন।
শিশুর হাসিতে, বৃদ্ধের প্রার্থনায়,
ফসলি জমির সোনালি রোদে
তিনি যেন আজও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন।

সুলতান মাহমুদ
তোমার রক্তে লিখিত ইতিহাস
বাংলা কখনো ভুলবে না।
তোমার নীরব সমাধির গায়ে
মাটি প্রতিদিন নতুন করে ফিসফিস করে বলে—
“এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক বীর,
যার মৃত্যু নয়—
স্বাধীনতার আরেক নাম।”



১২.       বিজয়ের ডিসেম্বর 


ডিসেম্বর…
শীতের কুয়াশা ভেদ করে আসে
রক্তে লেখা লাল ভোর।
এক সাগর অশ্রু,
লাখো প্রাণের বিনিময়ে
জন্ম নেয় এক স্বাধীন দেশ
সবুজের বুকে লাল সূর্যের ঘোর।

মুক্তির ডাক উঠেছিল ৭১–এ—
জয় বাংলা!
সে ডাক ছিল বজ্রকণ্ঠ,
সে ডাক ছিল অগ্নিশপথ।
কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক
সবার শিরায় জেগে উঠেছিল
স্বাধীনতার রক্তিম রথ।

মুক্তিযোদ্ধা…
তোমাদের হাতে অস্ত্র ছিল,
হৃদয়ে ছিল দেশ,
চোখে ছিল মুক্তির আগুন,
পায়ে ছিল কাদামাখা পথ।
তবু থামেনি তোমাদের পদযাত্রা,
ভয় ভেঙে এগিয়ে গেছে বুক
মায়ের মুক্তির জন্য
জীবন ছিল তোমাদের ব্রত।

মা কেঁদেছে…
বধূ জ্বেলেছে দীপ,
শিশু বুক চেপে কাটিয়েছে
নির্ঘুম রাত।
আর বীরেরা?
জল–জঙ্গলে গড়ে তুলেছে
মুক্তির দুর্জয় দুর্গ,
নদীর স্রোতেও ভেসে উঠেছে
রণগানের মাত।

তারপর
১৬ ডিসেম্বর।
পতন হলো শত্রুর অহংকার,
নিঃশেষ হলো অন্ধকার।
আকাশে উড়ল বিজয়ের পতাকা,
মুঠো খুলে দেশ দাঁড়াল গৌরবে—
রক্তস্নাত বাংলাদেশ,
অদম্য, অনন্য, দুর্বার!

শহীদ…
তোমরা ঘুমিয়ে আছ মাটির বুকে,
তবু জেগে আছ প্রতিটি নিশ্বাসে।
তোমাদের রক্তে আঁকা মানচিত্র
রবে চিরকাল বাংলার আকাশে।
যতবার পতাকা দোলে
ততবার মনে পড়ে,
এ দেশ তোমাদের ত্যাগে কেনা,
এ বিজয় তোমাদের ভালোবাসা।

ডিসেম্বর শুধু মাস নয়
এটি গৌরবের গান,
ত্যাগের মহাকাব্য,
স্বাধীনতার অমর ধ্বনি।
যেখানে বীরের রক্ত সোনা ফলায়,
স্বপ্ন নতুন ভোর আনে অবিরত বাণী।

মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ
তোমাদেরই ঋণে
আমরা পেয়েছি স্বাধীন প্রাণ,
স্বাধীন ভাষা,
স্বাধীনতাই আমাদের পরিচয়,
তোমাদের ত্যাগই আমাদের অহংকার।

জয় বাংলা! জয় স্বাধীনতা!
জয় লাখো শহীদের আত্মদান! 


১৩.       হে আমার দেশ, এই কি তুমি


কেমন আছে হতভাগিনী এই দেশ
প্রশ্নটা আর প্রশ্ন থাকে না,
উত্তর নিজেই জ্বলছে রাস্তায়, পুড়ছে ঘরে ঘরে,
ভাঙছে মানুষের ভেতরের মানুষটা।
স্বাধীনতার নামে যে বাতাস বইবার কথা ছিল,
সে বাতাস আজ বারুদের গন্ধে ভারী,
নিঃশ্বাস নিলেই বুকের ভেতর আগুন ধরে।

এই কি সেই দেশ
যার জন্য বুক পেতে দিয়েছিল কেউ,
যার জন্য রক্ত লিখেছিল ইতিহাস?
এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম
যেখানে ভয়ই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়,
আর নীরবতাই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম?

এই ধ্বংসযজ্ঞের দেশ আমার নয়।
আমার দেশ ছিল মানুষের
মানুষে-মানুষে হাত রাখার দেশ,
ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার দেশ।
আজ সে দেশ খুঁজে ফিরি ধ্বংসস্তূপে,
দেয়ালে দেয়ালে আঁকা পোস্টারে,
টেলিভিশনের চিৎকারে
কিন্তু পাই শুধু বিকৃত মুখ,
ঘৃণার ভাষা, বিভক্তির মানচিত্র।

থামাও এই জঙ্গিপনা
থামাও বিশ্বাসের নামে খুন,
নীতির নামে লুণ্ঠন,
ক্ষমতার নামে অন্ধত্ব।
কারা শিখিয়েছে আমাদের
একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আলাদা হয়ে যেতে?
কারা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে
পাথর, আগুন আর কুৎসিত স্লোগান?

কে আমাদের ত্রাণকর্তা?
রাষ্ট্র? নেতা? নাকি কোনো  ফেরেশতা?
নাকি ত্রাণকর্তা আসবে না
কারণ আমরা নিজেরাই
নিজেদের বাঁচাতে ভুলে গেছি?
সেই মহামানব কই,
যিনি মানুষকে মানুষ বলে ডাকবেন,
যিনি সংখ্যার আগে নাম উচ্চারণ করবেন,
যিনি বলবেন
“এই দেশ ধ্বংসের জন্য নয়,
এই দেশ বাঁচার জন্য।”

হে আমার দেশ
তোমার মলিন মুখখানি দেখলে
আমি নয়নজলে ভাসি।
এই কান্না দুর্বলতার নয়,
এই কান্না ভালোবাসার।
কারণ আমি এখনও বিশ্বাস করি
ছাইয়ের নিচে আগুনের চেয়েও গভীরে
লুকিয়ে আছে আলো।
একদিন এই দেশ আবার মানুষ হবে,
যদি আমরা
একটিবার, সত্যিই একটিবার,
মানুষ হওয়ার সাহস করি।

-----------
তারিখ - ১৯/ ১২ / ২০২৫ ইং
ঢাকা।


১৪.       শকুন বিষয়ক কবিতা 


আমার দেশে আকাশটা আর নীল নয়,
ডানা ঝাপটায় কালো ছায়ার মিছিল।
সূর্য ওঠে, তবু ভোর জ্বলে না
আলো কেড়ে নেয় ঠোঁট-তীক্ষ্ণ শকুনদল।

গাছের ডালে এখন বসে থাকে হিসেব,
হাড় গোনে, মাংসের ভাগ মাপে।
মাঠে আর ফসলের ঘ্রাণ নেই
লালসার গন্ধে পচে ওঠে প্রতিটি বাতাস।

নদীর স্রোতেও ভেসে আসে পালক,
পানির বুকে ক্ষুধার বৃত্ত আঁকে,
জল আর শীতল করে না পা
জলেও শিকার খোঁজে লোভী চোখ।

দেশের মানচিত্রে এখন নখের দাগ,
খচিত ক্ষতের মতো সীমানা।
মায়ের বুকেও জমে ওঠে ভয়
স্নেহের বদলে রক্তের হিসাব।

কিন্তু শোনো, শকুনের আহ্বান শেষ সত্য নয়
মাটির গভীরে এখনো বীজ ঘুমিয়ে আছে।
একদিন ঠিক ঝড় উঠবে গর্বের ডাকে,
পালকের অন্ধকার ছিঁড়ে বের হবে নতুন ভোর।

সেদিন আকাশ আর দখলে থাকবে না ঠোঁটের,
ডানা ঝাপটাবে স্বাধীনতার পাখি,
শকুনের শহর পুড়ে ছাই হবে বাতাসে
আর আমার দেশ আবার বাঁচবে মানুষের নিঃশ্বাসে।


১৫.         পোড়া বাড়িটা 


ধানমন্ডি ৩২-এর ভাঙা পোড়াবাড়িটা
আজও দাঁড়িয়ে থাকে
শূন্য এক প্রহরীর মতো,
যার চোখে জমে আছে ইতিহাসের কালো ধুলো,
নিঃশব্দ আর্তনাদ, আর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্মৃতির আগুন।

দেয়ালগুলো ভেঙে গেছে,
কিন্তু ক্ষতের মতো টিকে আছে গুলির দাগ
সেই দাগে লুকিয়ে থাকে
একদিনের আতঙ্ক, একদিনের বিদ্রোহ,
একদিনের হাহাকার, যেখানে
মানুষের চিৎকার ছাপিয়ে উঠেছিল অন্যায়ের গর্জন।

জানালার ভাঙা কাচে
এখনো নাকি বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ে,
যেন কেউ দরজায় কড়া নাড়বে
যেন কেউ ফিরে আসবে…
কিন্তু কেউ আসে না, আসেও না আর।
ইতিহাসের ফেরার পথ থাকে না কখনো।

বাড়িটির প্রতিটি ইটে
আছে একেকটি অশ্রুবিন্দু,
প্রতিটি সিঁড়িতেই রয়েছে
অপূর্ণ স্বপ্নের ছায়া।
রাত হলে বাতাস যখন ফিসফিস করে,
মনে হয়
সেই দিনগুলোর নিঃশ্বাস
আজও ঘুরে বেড়ায় ভাঙা বারান্দায়।

ধানমন্ডি ৩২-এর পোড়াবাড়ি
তুমি শুধু একটা বাড়ি নও,
তুমি এক জাতির বুকের ক্ষত,
এক রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়
মাটি পর্যন্ত কেঁদে উঠছে
কেউ হারিয়ে যাওয়া সেই প্রভাতের জন্য।

তোমার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে
আমরা শিখি
ইতিহাস কখনো ভাঙে না,
ভাঙে শুধু দেয়াল;
স্মৃতি, ত্যাগ আর ক্ষরণের ব্যথা
চিরদিন বেঁচে থাকে
তোমার মতোই নিঃশব্দ,
কিন্তু অমর এক পোড়াবাড়ির ভস্মে।


১৬.       এই দেশ এমন ছিল না


দীপু চন্দ্র দাস একটি নাম নয়,
একটি শ্বাস, একটি ঘরেফেরা সন্ধ্যা,
মায়ের ডাকে সাড়া দেওয়া এক জীবন।

তাকে মেরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে
আগুনে পোড়ানো হয়েছে
এই আগুন কেবল শরীর পোড়ায়নি,
পুড়িয়েছে আমাদের বিবেক,
পুড়িয়েছে রাষ্ট্রের চোখ।

শহীদরা কি এই আগুনের জন্য
রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন?
এই গাছের ডালে কি
স্বাধীনতার পতাকা ওড়ার কথা ছিল না?
আজ সেখানে ঝুলছে মানুষের দেহ
এ কোন স্বাধীনতা?

যে হাতে আগুন, সে হাত কি জানে
আগুনেরও একদিন সাক্ষ্য দিতে হয়?
যে মুখ নীরব, সে মুখ কি জানে
নীরবতাও অপরাধের সহযাত্রী?

এই দেশে মানুষ পোড়ে,
আর আমরা খবর পড়ি।
এই দেশে মানুষ ঝোলে,
আর আমরা স্ক্রল করি।
এই দেশে খুন হয় মানবতা,
আর আমরা বলি— “দুঃখজনক”।

না। আর নয়।
এই মাটি শহীদের, এই আকাশ প্রতিবাদের,
এই বাতাস প্রশ্নের
কে দিল তোমাদের এই বর্বরতা?

দীপু চন্দ্র দাসের দেহ নয়,
আজ ঝুলছে আমাদের লজ্জা।
আজ পুড়ছে আমাদের মুখোশ।

উঠে দাঁড়াও, মানুষ হও।
ন্যায়ের পক্ষে চিৎকার করো।
কারণ— এই দেশকে বাঁচাতে হলে
আগুন নয়,
মানুষকেই আগে আগুন নেভাতে 
হবে।


১৭.        দোষ বিশ্বাসের নয়



ধর্ম খারাপ নয়
সে তো প্রদীপের মতো,
অন্ধকারে আলো দেয়,
ভয় পেলে আশ্রয় হয়,
ভেঙে গেলে মানুষকে
মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনে।

খারাপ হয় তখনই,
যখন কিছু ধার্মিক
প্রদীপের শিখায়
নিজের অহংকার জ্বালায়,
ভালোবাসার আয়াত মুছে
ঘৃণার ব্যাখ্যা লেখে।

ধর্ম বলে—ক্ষমা করো,
তারা বলে—শাস্তি দাও।
ধর্ম বলে—সবাই সমান,
তারা বলে—আমরাই শ্রেষ্ঠ।
এই ফারাকটুকুতেই
রক্তাক্ত হয় পৃথিবী।

ধর্ম তো শেখায়
ক্ষুধার্তকে রুটি দিতে,
নগ্নকে কাপড় পরাতে,
চোখের জল মুছিয়ে
মানুষ হয়ে দাঁড়াতে।
কিন্তু কিছু ধার্মিক
ধর্মকে বানায়
ক্ষমতার তলোয়ার।

মসজিদ, মন্দির, গির্জা
সবই তো মানুষের জন্য,
মানুষই যদি না থাকে,
তবে ইট-পাথরের প্রার্থনা
কার কাছে যাবে?
ধর্ম খারাপ নয়
খারাপ সেই মুখোশ,
যে মুখোশ পরে
মানুষ মানুষকে মারে।

বিশ্বাস যদি হৃদয়ে থাকে,
হাত যদি থাকে ভালোবাসায়
তবেই ধর্ম
তার প্রকৃত অর্থ ফিরে আসে।


১৮.         নেতা আসলেন 


নেতা এলেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসিত নীরবতা ভেঙে, ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে।
খালি পায়ে মাটি স্পর্শ করলেন তিনি,
মাতৃভূমির কপালে রেখে দিলেন শ্রদ্ধার চুম্বন।

মা, মাটি, মানুষ—এই তিনই তাঁর আরাধ্য,
এই তিনের কাছেই তাঁর রাজনীতির শপথ,
এই তিনের মধ্যেই তাঁর স্বপ্নের রাষ্ট্র।

নেতা ফিরলেন
শুধু শরীর নিয়ে নয়, ফিরে এলেন অগ্নিসাক্ষী প্রত্যয়ে।

অপশক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী ছায়া, ইতিহাসবিরুদ্ধ অন্ধকারকে
সরিয়ে দিয়ে তিনি এই দেশকে এগিয়ে নেবেন আলোর দিকে,
প্রগতির পথে, ন্যায়ের পথে, মানবিকতার পথে।

এই ফিরে আসা প্রতিশোধের নয়,
এই ফিরে আসা সংশোধনের,
এই ফিরে আসা ভাঙাগড়ার, নতুন করে গড়ে তোলার।

একাত্তরের শহীদদের তিনি স্মরণ করবেন মাথা নত করে
কারণ তাদের রক্তেই লেখা এই দেশের মানচিত্র।
তাদের আত্মত্যাগেই অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা,
তাদের চেতনাতেই বোনা গণতন্ত্রের বীজ।
সেই চেতনাকে তিনি রাজনীতির কেন্দ্রে আনবেন,
অসহিষ্ণুতার বদলে সহনশীলতা,
ঘৃণার বদলে সংলাপ,
প্রতিহিংসার বদলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন।

তিনি যেন মনে করেন
রাজনীতি হবে মানুষের জন্য,
ক্ষমতার জন্য নয়।
ভিন্নমত হবে শক্তি, দুর্বলতা নয়।
পিতার আদর্শে, পিতার মতোই,
বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত তিনি মজবুত করবেন,
যেখানে কথা বলার অধিকার থাকবে সবার।

ভয় নয়, থাকবে বিশ্বাস;
দমন নয়, থাকবে অংশগ্রহণ।
মানুষ আজ ক্লান্ত, সংঘাতে, অস্থিরতায়, অনিশ্চয়তায়।
মানুষ চায় শান্তি, চায় আইনের শাসন,
কোনো মব সন্ত্রাস নয়, কোনো ধ্বংস, জ্বালাও পোড়াও নয়-
চায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা,
যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে,
মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হবে না।

এই প্রত্যাশার ভার নিয়েই নেতা এলেন
শুধু হাততালির জন্য নয়,
ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সাহস নিয়ে।
তিনি জানেন, পথ কঠিন, বাধা আসবে, ষড়যন্ত্র হবে
তবু তিনি চলবেন,
কারণ তাঁর পায়ের নিচে আছে এই দেশের মাটি,
আর বুকের ভেতরে আছে মানুষের আশা।

নেতা ফিরেছেন
এটি কেবল একজন মানুষের প্রত্যাবর্তন নয়, এটি একটি সময়ের ডাক,
একটি জাতির নতুন করে দাঁড়ানোর আহ্বান।
__________
তারিখ - ২৫/ ১২/ ২০২৫ ইং
ঢাকা।।


১৯.      শিশুর বাসযোগ্য দেশ


রাজশাহীর পঙ্গু মাসুদের ঘরে
এক জোড়া ছোট্ট জুতো আজও দরজায় চেয়ে থাকে,
টাঙ্গাইলের মোমিনের উঠোনে
দোলনাটা থেমে আছে, হাওয়াই দোল খায়।
দীপু দাশের শিশুটি রাতে ভয় পেলে
বাবার নাম ডাকে, কান্না করে ,
গোপালগঞ্জে দীপ্ত সাহার ঘরে
ঘুম আসে না মায়ের চোখে, সেখানে অশ্রুর জোয়ার।
ওসমান হাদির সন্তানের হাতে
ভবিষ্যৎটা কাগজের নৌকা বৃষ্টি নামলেই ভিজে যায়।
আরও কত নাম -
আর কত শৈশব নিঃশব্দে এতিম?
লক্ষ্মীপুরের আয়শা নামটা আজ বাতাসে কাঁপে,
মাগুরার আছিয়া একটি অসমাপ্ত হাসি।

ওরা কেউ রাজনীতি বোঝে না,
ধর্মের ভারি শব্দও নয়
তবু কেন জীবন দিতে হয় নির্বাক শৈশবকে?
শিশু মানে তো রোদে ভেজা সকাল,
খেলার মাঠে উড়ন্ত কণ্ঠ,
মায়ের আঁচলে নিরাপদ পৃথিবী।

এসো, দায়টা ভাগ করি, কোনো শিশুর 
রাত আর যেন বাবাহীন না হয়,
কোনো মায়ের চোখ আর শূন্যতায় ভরে না যায়।
ভালো থেকো, সুস্থ থেকো, আগামী গড়বার কারিগর।
তোমাদের জন্যই আমাদের আজকের শপথ
একটি শিশুর বাসযোগ্য বাংলাদেশ।


২০.      I Have a Dream

I have a dream
একদিন ভোরের আলো আর ভয়ের ভাষা জানবে না,
মানুষের কণ্ঠে থাকবে না ঘৃণার কাঁটা,
ভালোবাসা হবে সবচেয়ে সহজ উচ্চারণ।

I have a dream
যেখানে শিশুর চোখে থাকবে শুধু রঙিন আকাশ,
ক্ষুধা নয়, অস্ত্র নয়—
তাদের হাতে থাকবে বই আর খেলনার হাসি।

I have a dream
এই মাটি আর রক্তে ভেজা থাকবে না,
অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে পড়বে নীরবে,
ন্যায় দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে,
মানুষের পাশে মানুষ হয়ে।

I have a dream
যেখানে ধর্ম, ভাষা, বর্ণ নয়
হৃদয়ের ওজনেই মানুষ চেনা হবে,
যেখানে স্বাধীনতা হবে শ্বাসের মতো স্বাভাবিক,
আর শান্তি হবে ঘরের বাতাস।

I have a dream—
এই স্বপ্ন একদিন কবিতায় থাকবে না শুধু,
রাস্তায়, ঘরে, মানুষের আচরণে
ধীরে ধীরে সত্য হয়ে উঠবে—
আমাদেরই হাতে, আমাদেরই ভালোবাসায়।



২১.        ব্যারিকেড


আমার দেশের মাটিতে মিশে আছে
শহীদের দেহ, শহীদের করোটি
রক্তের সাথে রক্ত, অস্থির সাথে অস্থি
এত বছরে তারা মৃত্তিকা হয়েছে।

এই মাটি কেবল মাটি নয়
এ এক জীবন্ত ইতিহাস,
এখানে পা ফেললে শিরদাঁড়া সোজা রাখতে হয়,
এখানে মাথা নত না করে দাঁড়াতে হয়
সত্য আর সম্মানের পক্ষে।

এই পবিত্র ভূমির উপর দাঁড়িয়ে
স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার
যদি আস্ফালন করে,
যদি মুক্তিযোদ্ধার দিকে ছুড়ে দেয় অপমান
তবে এ মাটি নিজেই প্রতিবাদ করবে,
মাটি ফেটে উঠে বলবে- 
এ দেশ তোমাদের নয়।

যে হাতে একদিন অস্ত্র ধরেছিল মুক্তিসেনা,
সেই হাত আজও শক্ত আছে,
একাত্তরের আগুন নিভে যায়নি
তা কেবল ছাইয়ের নিচে জ্বলছে।

আমরা ভুলিনি গণকবরের নীরব কান্না,
ভুলিনি মা’র শূন্য আঁচল, ভুলিনি সেই পতাকা
যা উঠেছিল রক্তের দামে।

তাই এই অপশক্তিকে রুখতেই হবে,
শব্দে, শপথে, সচেতনতায়
একাত্তরের মতোই
পরাজয়ের সিলমোহর দিতে হবে তাদের কপালে।
কারণ এই দেশ শহীদের,
এই মাটি শহীদের,
এখানে মাথা উঁচু করে বাঁচবে শুধু 
মুক্তির সন্তানরাই।

এখানে বিশ্বাসঘাতকের কোনো অধিকার নেই,
একাত্তর শেষ হয়নি, একাত্তর চলছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, শিরায় শিরায়, চেতনায় চেতনায়।
তাই উঠে দাঁড়াও রাজাকারের বিরুদ্ধে-
প্রতিটি শ্লোগান হোক মিছিল ধ্বনি,
প্রতিটি হৃদয় হোক ব্যারিকেড।



২২.        একাত্তর এখনো শেষ হয়নি

একাত্তর শেষ হয়নি
বলছি, একাত্তর শেষ হয়নি!
রক্তের নদী পেরিয়ে
আমরা জিতেছিলাম মানচিত্র,
কিন্তু ব্যর্থতা ছিল আমাদেরও,
এই ব্যর্থতার দায় আজও
আমাদের কাঁধে জ্বলছে আগুন হয়ে।

পাক হানাদার পালিয়েছিল,
ট্যাংক-কামান-রাইফেল ফেলে
কিন্তু রাজাকার রয়ে গেল আমাদের ঘরের ভেতর, আমাদের রাষ্ট্রের ভেতর,
আমাদের রাজনীতির ভেতর!
ওরা বদলেছে নাম, ওরা পাল্টেছে পোশাক-
কখনো আলখাল্লা, কখনো টাই,
কখনো সংবিধানের পাতা হাতে
কখনো ধর্মের বুলি মুখে
ওরা আজও খুন করে ইতিহাস!

শোনো
ওরা শহীদের রক্তে প্রশ্ন তোলে,
মায়ের সম্ভ্রমে সন্দেহ ছড়ায়,
মুক্তিযুদ্ধকে বলে ‘ভ্রান্ত অধ্যায়’!
এই দুঃসাহস কোথা থেকে পায়?

পায় আমাদের নীরবতা থেকে,
পায় আমাদের আপস থেকে!
আজও ওরা ডেকে আনে পাকিদের
কখনো সীমান্তে, কখনো অর্থনীতিতে,
কখনো মগজ ধোলাইয়ের পাঠশালায়।

রাজাকার জন্ম দেয় রাজাকার
এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য!
কিন্তু শোনো
এই মাটি নির্বীজ নয়!
এই মাটি শহীদের রক্তে সজীব!
এই বাংলার বুকের ভেতর
এখনো গর্জে ওঠে
মুক্তিযোদ্ধার শপথ!

আমরা আর ভুল করব না
ক্ষমা নয়, বিচার চাই!
আপস নয়, উৎখাত চাই!
রাজাকারদের এই বাংলায়
এক ইঞ্চি জায়গাও নয়!
কলম হবে আগ্নেয়াস্ত্র,
কণ্ঠ হবে মিছিল,
স্মৃতি হবে আদালত
রায়ের নাম হবে:
রাজাকার নিধন, ইতিহাস উদ্ধার!

আজ শপথ নাও
একাত্তরকে বিক্রি হতে দেব না,
শহীদের রক্তকে অবমানিত হতে দেব না!
যতদিন না শেষ রাজাকার
এই বাংলার মাটি ছাড়ে
ততদিন বলো একসাথে, গর্জে বলো
একাত্তর শেষ হয়নি!
একাত্তর শেষ হয়নি!
একাত্তর শেষ হয়নি!


২৩.     ভয় পাও


ভয় পাও তোমরা হে মবের দল, ভয় পাও
লাঠির জোরে যে সাহস দাঁড়ায়,
সে সাহস টেকে না দীর্ঘদিন।

ভয় পাও
কারণ তোমাদের চিৎকারের নিচে
নীরব মানুষ জেগে উঠছে।
কোন মানুষটিকে দেখে ভয় পাও, হে জানোয়ার দল?
যার হাতে নেই অস্ত্র, কিন্তু চোখে জমে আছে
শত বছরের অপমানের আগুন।
যার কণ্ঠস্বর এখনো নিচু, কিন্তু বুকের ভেতর
গর্জায় ইতিহাস।

ভয় পাও
যে মানুষটি একা দাঁড়িয়ে বলে,
“আমি অন্যায় মানব না।”
যে ভিড়ের উন্মাদনায় মিশে যায় না,
যার মেরুদণ্ড এখনো সোজা,
যার মাথা নত হয় না তোমাদের হুঙ্কারে।

তোমরা সংখ্যা নিয়ে এসেছ,
সে এসেছে সত্য নিয়ে।
তোমরা এসেছ মুখোশ পরে,
সে এসেছে নিজের মুখ নিয়ে।
এইখানেই তোমাদের ভয়
কারণ সত্য একা হলেও
ভিড়ের চেয়ে শক্তিশালী।

ভয় পাও
কারণ মানুষটি এখনও মানুষ, জানোয়ার হয়ে যায়নি।
কারণ সে জানে
ভয় দেখিয়ে রাজত্ব হয়, কিন্তু ভয় ভেঙে বিপ্লব জন্মায়।

আজ তোমরা হাসছ,
লাঠি উঁচিয়ে উৎসব করছ
মনে রেখো, ইতিহাসের আদালতে
মবের কোনো নাম থাকে না,
থাকে শুধু অপরাধ।

ভয় পাও তোমরা হে মবের দল, ভয় পাও
কারণ আজ তোমাদের পেছনে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে,
আর রাষ্ট্রের পেছনে লুকিয়ে আছে
রক্তমাখা নীরবতা।

ভয় পাও
যে মানুষটি জানে, আইনের বই কেবল কাগজ নয়,
সংবিধান কেবল শোকেসে সাজানো শব্দ নয়।
যে মানুষটি একদিন শিখেছে
রাষ্ট্র মানে জনগণ, মব নয়।

তোমরা এসেছ হেলমেট, লাঠি আর মুখোশে,
সে এসেছে খালি হাতে,
কিন্তু বুকভরা অধিকার নিয়ে।
তোমরা শিখেছ আদেশ মানতে,
সে শিখেছে অন্যায় মানতে না।

ভয় পাও
কারণ আজ তোমরা চিৎকার করছ
দেশপ্রেমের নামে,
আর সে নীরবে ধরে রেখেছে দেশটাকেই।
তোমরা পতাকা ঢেকে রেখেছ রক্তে,
সে পতাকা ধুতে এসেছে প্রশ্নে।
রাষ্ট্র যখন মব হয়ে যায়,
তখন একজন মানুষই যথেষ্ট
রাষ্ট্রকে আবার মানুষ বানাতে।

ভয় পাও
কারণ তোমাদের ক্ষমতা ভাড়াটে,
আর তার সাহস জন্মগত।
তোমাদের হাতে সময় আছে, তার হাতে ইতিহাস।
মনে রেখো
মবের কোনো মুখ থাকে না,
কোনো নাম থাকে না,
কোনো দায়ও থাকে না।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মব মানেই অপরাধ।

ভয় পাও হে জানোয়ার দল, ভয় পাও
কারণ যে মানুষটিকে আজ দেশদ্রোহী বলছ,
আগামীকাল এই দেশটিই তার নাম উচ্চারণ করবে
মাথা উঁচু করে।
ভয় পাও হে মবের দল, ভয় পাও
কারণ যে মানুষটিকে আজ ঠেসে ধরেছ,
আগামীকাল সেই মানুষটিই তোমাদের ভয় হয়ে দাঁড়াবে।

২/১/ ২০২৬ ইং
ঢাকা।। 


২৪.      গণকবরের পাশে


গণকবরের পাশে আজ শব্দেরা জন্ম নেয়,
মাটির ভেতর চাপা আর্তনাদ হঠাৎ জেগে ওঠে।
যে নামগুলো মুছে ফেলা হয়েছিল ভয়ের কালিতে,
তাদের রক্তেই লেখা থাকে আগামী সকালের মানচিত্র।

এই মাটি নীরব নয়
এখানে প্রতিটি দানা আগুনের মতো জ্বলে,
মায়ের কোল হারানো শিশুর চোখে
ভবিষ্যৎ দাঁত কামড়ে ধরে অপেক্ষা করে।

গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে
মিথ্যা আর ক্ষমতার মিনার কেঁপে ওঠে,
কারণ ইতিহাস জানে
রক্ত কখনও চুপ করে থাকে না।

যে হাত শেকল পরিয়েছিল স্বপ্নের কব্জিতে,
সেই হাত আজ কাঁপে মানুষের চোখের সামনে।
ভয় পালায়, লুকোতে চায় অন্ধকারে,
কিন্তু সূর্য এবার জন্ম নেয় লাশের ভেতর থেকেই।

এ কবিতা শোকের নয়,
এ কবিতা শপথের— যে শপথ বলে:
আর কোনো গণকবর হবে না,
আর কোনো শিশুর স্বপ্ন মাটিচাপা পড়বে না।
গণকবরের পাশে জন্ম নেওয়া এই কবিতা
কাগজে নয়— মানুষের বুকে লেখা,
এখন তা হাঁটছে রাস্তায়,
মুষ্টিবদ্ধ হাতে, উচ্চারণে।


২৫.      গণকবরের গান


গণকবরের পাশে জন্ম নিল যে সুর,
মাটির নিচে চাপা রক্তে জেগে ওঠে দূর।
মায়ের কান্না, সন্তানের ক্ষুধা,
এক হয়ে আজ শপথ নিল, আর নয় নীরবতা।

যারা ভেবেছিল ইতিহাস ঘুমোবে চিরকাল,
ভুল ভেবেছে তারা,
এই মাটি আগুন ছড়ায়।

ওই শোনো! শোনো!
গণকবরের পাশে জন্ম নেওয়া গান,
ভাঙবে শেকল, পোড়াবে ভয়,
উঠে দাঁড়াবে লাল-সবুজ প্রাণ।
শোনো! শোনো!
এই গান মানে বিদ্রোহ,
এই গান মানে মানুষ
আর মাথা নত করবে না কোনো শাসকের রোষে!

লাশের ওপর গড়া সিংহাসন কাঁপে আজ,
মিথ্যার মিনার ভাঙে, সত্য উঠে রাজ।
যে হাত রক্তে ভেজা কলম চালায়,
সেই হাতে আজ কাঁপন, ইতিহাস ফিরে চায়।

যে নামগুলো মুছে ফেলেছিল খবরের কাগজ,
তাদের নামেই আজ পোস্টার, দেয়াল, আকাশ।

ওই শোনো! শোনো!
গণকবরের পাশে জন্ম নেওয়া গান,
চোখে চোখ রেখে বলে দেবে,
“আমরাই এই দেশের প্রাণ।”
শোনো! শোনো!
এই গান মানে শপথ,
এই গান মানে শেষ লড়াই-
আর নয় পিছু হটা, আর নয় নীরবতা!

একটা কবর, একশো কণ্ঠ,
হাজার মুষ্টিবদ্ধ হাত।
ভয় আজ পালাচ্ছে নগ্ন পায়ে,
রাস্তায় রাস্তায় জ্বলে উঠছে রাত।

শোনো! শোনো!
এই গান থামবে না আর,
যতদিন অন্যায় বেঁচে থাকে,
ততদিন এই গান যুদ্ধের দামামা 
গণকবরের পাশে জন্ম নেওয়া গান,
এই গানই আগামীকাল,
এই গানই মুক্তির ঘোষণা!


২৬.     অপহৃত রাষ্ট্র, বন্দী সভ্যতা


একটা স্বাধীন রাষ্ট্র মাটিতে যার পতাকা, আকাশে যার শপথ,
তার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে
রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যায়
অন্য এক দেশের বুটওয়ালারা।

কী জঘন্য দৃশ্য!
সভ্যতার নামে এই কি তবে সভ্যতা?
গণতন্ত্রের পাঠশালায় এই কি প্রথম অধ্যায়,
অপহরণ!
যারা মুখে মুখে স্বাধীনতার স্তোত্র গায়,
যাদের ভাষণে মানবাধিকার ঝরে পড়ে
ফুলের মতো, তাদের হাতেই কেন রক্ত,
কেন হাতকড়া, কেন কালো হুড?

ওহে গণতন্ত্রের মুখোশধারী!
আজ তোমার মুখোশ খসে পড়েছে,
নিচে বেরিয়ে এসেছে
লাল দাঁতওয়ালা সাম্রাজ্যবাদী হিংস্রতা।
এই কি তোমার আইন? এই কি তোমার নীতি? কে নিন্দা করবে?
কে বজ্রকণ্ঠে বলবে,
“এটা অপরাধ!” কে ছিটাবে থুথু
এই ভণ্ড সভ্যতার চকচকে মুখে?

আজ যদি নীরব থাকো,
কাল তোমার ভোটকেও তুলে নিয়ে যাবে,
তোমার কণ্ঠকেও বন্দি করবে,
তোমার দেশকেও বানাবে
একটা মানচিত্রহীন কারাগার।

এই কবিতা কোনো বিলাপ নয়, এ এক জ্বলন্ত দলিল।
এই কবিতা একখানা প্রশ্ন, যা ইতিহাস 
ছুড়ে মারবে
তোমাদের দরজায় দরজায়।

মনে রেখো,
বুটের শব্দে সত্য চাপা থাকে না,
অপহরণে মরে না গণতন্ত্র, কিন্তু তোমাদের মুখোশ চিরতরে পুড়ে যায়।

তারিখ - ৪/১/২০২৬ ইং
ঢাকা। 


২৭.     অভয়ারণ্য


দেশটা রাজাকারদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে,
ইতিহাসের রক্তমাখা পাতায়
যাদের নাম ছিল কলঙ্ক,
আজ তারা বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় মঞ্চের আলোয়।

শহীদের হাড়গোড়ের ওপর
গজিয়ে ওঠে তাদের আরামদায়ক প্রাসাদ,
মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে
ওরা টেনে দেয় সুবিধার নতুন সীমারেখা।

এই দেশ কার?
বিকিয়ে দেওয়া স্মৃতির, না
রক্ত দিয়ে লেখা প্রতিজ্ঞার?
যদি নীরব থাকি-
তবে রাজাকারই হবে রাষ্ট্রের ভাষা।

শোনো, মাটির ভেতর এখনো আগুন আছে,
পদ্মার ঢেউ জানে বিদ্রোহের ব্যাকরণ,
একদিন প্রশ্নগুলোই রায় দেবে,
কে দেশপ্রেমিক, আর কে ইতিহাসের পলাতক।


২৮.      আমার কবিতা 



আমার কবিতা নদী ও পাহাড়ের গল্প শোনায়,
উজানের ঢেউয়ে ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস ভাসে আমার কবিতা। 

আমার কবিতা ধর্ষিতার রক্তাক্ত শাড়ির ছবি আঁকে,
নিঃশব্দ চিৎকারে ফেটে যায় রাতের বুক,
তার অন্তরবেদনার মর্মর কান্না
অবুঝ বাতাসকেও কাঁদিয়ে তোলে কবিতার শব্দে।

আমার কবিতা তৃতীয় বিশ্বের অনাহারী মানুষের কথা বলে,
ভাতহীন থালায় জমে থাকা শূন্যতার 
হিসেব নেয়,
মায়ের স্তনে শুকিয়ে যাওয়া দুধের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করে।

আমার কবিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুর হাতে 
খেলনার বদলে ধ্বংসস্তূপ তুলে দেয়,
ভাঙা স্কুলঘরের ব্ল্যাকবোর্ডে
লিখে দেয় ভয়, উদ্বাস্তু আর নির্বাসন।

আমার কবিতা শ্রমিকের নাঙ্গা হাতে রক্ত দেখে,
কলকারখানার ধোঁয়ার ভেতর
তার নিঃশ্বাস হারিয়ে যাওয়ার গল্প লেখে,
রিকশার পেছনে ঝুলে থাকা ক্লান্ত সন্ধ্যা,
ঘামে ভেজা শহরের দীর্ঘ আর্তনাদের
কথা লেখে।

আমার কবিতা সংখ্যালঘুর ভাঙা ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে,
পুড়ে যাওয়া দেবালয়ের ছাইয়ে খোঁজে বিশ্বাস, রাষ্ট্রের মানচিত্রে হারিয়ে যাওয়া
নামহীন মানুষের পরিচয় খোঁজে।

আমার কবিতা নিখোঁজ লাশের প্রশ্ন তোলে,
জলে ভাসা মুখহীন স্মৃতির কথা বলে -
ক্ষমতার মসৃণ ভাষার নিচে চাপা পড়ে থাকা
অসহায় সত্যকে তুলে আনে আলোয়।

আমার কবিতা বিবেকের দায় কাধে নেয়
শব্দ হয় প্রতিবাদের ভাষা,
কবিতায় মানুষের বাঁচা মরার কথা লেখা হয়, মানুষ হয়ে বাঁচে।



২৯.      কেবলই মৃত্যু সংবাদ


প্রতিদিন সকালে কাগজ খুললেই
শিরোনামে ঝরে পড়ে নাম-
কারও বাবা, কারও মা,
কারও আবার অসমাপ্ত স্বপ্ন।

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালগুলোও
আজকাল শোনে শুধু বিদায়ের কথা,
হাসির পোস্টার ঢেকে যায়
কালো বর্ডারের নীরব নোটিশে।

ফোন বেজে ওঠে,
ভয় পেয়ে উঠি,
এই বুঝি আরেকটি কণ্ঠ বলবে
“সে আর নেই…”

চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে আসে,
গল্প থেমে যায় মাঝপথে,
জীবন যেন প্রতিদিন
একটু একটু করে মরে।

তবু রাতের গভীরে কেউ একজন
তারকা হয়ে জ্বলে থাকে আকাশে,
মৃত্যুর খবরের ভিড়েও
জীবন লুকিয়ে রাখে তার শেষ আলো।

কারণ কেবলই মৃত্যু সংবাদ নয়,
প্রতিটি বিদায়ের ফাঁকে ফাঁকে
বেঁচে থাকার একটুখানি আহ্বান
নিঃশব্দে হাত নাড়ে।



৩০.     লেনিন : অগ্নিস্বরের নাম


যখন ইতিহাস কেবল রাজাদের নামে লেখা হচ্ছিল,
যখন শ্রমিকের ঘাম ছিল অদৃশ্য,
কৃষকের হাড় ছিল নীরব-
ঠিক তখনই এক মানুষ
কলমকে বানালেন হাতুড়ি,
ভাবনাকে বানালেন ব্যারিকেড।
তার নাম—লেনিন।

তিনি জন্মাননি সিংহাসনের ছায়ায়,
জন্মাননি স্বর্ণমুকুটের নিচে,
তিনি জন্মেছিলেন প্রশ্ন নিয়ে,
কেন কিছু মানুষ ভরপেট খায়
আর কোটি কোটি মানুষ খিদেয় মরে?

লেনিন দেখেছিলেন
কারখানার চিমনির ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ,
দেখেছিলেন শ্রমিকের কর্মঠ হাত,
দেখেছিলেন শিশুর চোখে অনাহারের ছায়া।

তিনি চুপ থাকেননি,
চুপ থাকা তখন ছিল অপরাধ।
তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাস বদলায়,
যখন নিপীড়িতরা উঠে দাঁড়ায়।”
এই বাক্য ছিল না শুধু তত্ত্ব,
ছিল আগুন,ছিল বজ্রপাত।

জারশাসনের কালো দেয়ালে
তিনি ঠুকেছিলেন লাল হাতুড়ি,
প্রতিটি আঘাতে ভেঙে পড়েছিল ভয়,
ভেঙে পড়েছিল শতাব্দীর দাসত্ব।

কারাগার ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়,
নির্বাসন ছিল তার পাঠশালা।
তুষারঢাকা সাইবেরিয়ায়
তিনি শিখেছিলেন তিতিক্ষা
ঠান্ডা যতই তীব্র হোক,
চিন্তা জমে বরফ হয় না।

ক্ষুধা তাকে নত করেনি,
নিঃসঙ্গতা তাকে ভাঙেনি।
তিনি জানতেন,
একাকী মানুষও ইতিহাসের দিক ঘুরিয়ে দিতে পারে
যদি তার পাশে থাকে সত্য।

অক্টোবর এসেছিল রক্তমাখা হাতে,
লেনিন দাঁড়িয়েছিলেন জনতার সামনে,
কোনো দেবতা নয়, একজন সহযোদ্ধা হয়ে।
তিনি বলেছিলেন-
“ক্ষমতা শ্রমিকের, ক্ষমতা কৃষকের।”

সেই দিন রাজপ্রাসাদ কাঁপল,
সেই দিন প্রাসাদের দরজা খুলে গেল,
ঢুকে পড়ল খালি পায়ের মানুষ,
ঢুকে পড়ল স্বপ্ন।

লেনিন জানতেন, 
বিপ্লব মানে ফুলের বাগান নয়,
বিপ্লব মানে ক্ষত, বিপ্লব মানে দায়িত্ব,
বিপ্লব মানে প্রতিদিনের লড়াই।

তিনি ভুল করেছিলেন,
তিনি দ্বিধায় পড়েছিলেন, তবু তিনি পালাননি।
কারণ তিনি ছিলেন মানুষ,
আর মানুষেরই ছিল ইতিহাস বদলানোর দায়।

আজও যখন
পুঁজির থাবা চেপে বসে মানুষের গলায়,
আজও যখন
শ্রমিকের মজুরি আর মালিকের লভ্যাংশের মাঝে
আকাশ-পাতাল ফারাক,
তখন লেনিন ফিরে আসেন একটি প্রশ্ন হয়ে।

তিনি বলেন না, “আমাকে পূজা করো।”
তিনি বলেন—
“আমার মতো প্রশ্ন করো,
আমার মতো প্রতিবাদ করো।”
লেনিন কোনো মূর্তি নন,
লেনিন একটি প্রক্রিয়া।

যতদিন শোষণ থাকবে,
যতদিন মানুষ মানুষকে কিনবে,
ততদিন লেনিন বেঁচে থাকবেন
একটি অগ্নিস্বর হয়ে।

আজও লাল পতাকা উড়লে
হাওয়ার মধ্যে শোনা যায় তার কণ্ঠ-
“উঠো, সংগঠিত হও,
ইতিহাস তোমার অপেক্ষায়।”


৩১.      আলো আসবেই 


এই জংলী শাসন থেকে, এই কালো সময়ের 
থাবা থেকে এই দেশ কবে মুক্ত হবে,
কবে ভোরের প্রথম আলো ভাঙবে রুদ্ধ দুয়ার,
কবে ভয়ের দেয়ালে ফুটবে নির্ভীক ফুল?

কবে যে রোদের মতো শান্তি দিয়ে
সাজবে এই দেশ,
রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবে মানুষ নিঃশঙ্ক চিত্তে, 
সোজা মেরুদণ্ডে।

পৃথিবী জুড়ে কবে বাজবে সুন্দরের গান,
যেখানে যুদ্ধ নয়, থাকবে কাজের কথা,
লুট নয়, থাকবে ন্যায়ের হিসাব,
ক্ষমতার চেয়েও বড় হবে মানুষের সম্মান।

কতকাল পরে আমাদের স্বর্ণচ্ছটা
জীবন নির্মাণ হবে?
যেখানে শ্রমের ঘামে রোদ ঝিলমিল করবে,
ক্ষুধা আর অবমাননা থাকবে ইতিহাসের জাদুঘরে বন্দি,
আর ভালোবাসা হবে রাষ্ট্রের অঘোষিত আইন।

সেদিন আসবে,
হয়তো ধীরে, হয়তো রক্তাক্ত পথে, 
কিন্তু আসবেই,
সেদিন আমরা আর অপেক্ষা করব না,
নিজেরাই দাঁড়াবো আলোর দিকে মুখ করে,
ভাঙবো আঁধারের সিংহাসন,
লিখবো নতুন করে  দেশের নাম।

তারিখ - ১৮/১/২০২৬ ইং
ঢাকা।


৩২.      রক্তে-রঙা পতাকা



একাত্তরের কোনো এক দিনে 
তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ের
স্বপ্ন ছিঁড়ে গিয়েছিল,
তার কান্না আটকে গিয়েছিল মাটির বুকে,
নামহীন অন্ধকারে।
সে জানত না, তার লজ্জা-ঢাকা কাপড়ের রক্ত
একদিন রঙ হয়ে উঠবে পতাকার।

বিজয়ের দিনে
সমির আলীর পাতার বাঁশি কেঁদেছিল হাওয়ায়,
সে সুরে ছিল ভাঙা ঘরের দরজা,
নিখোঁজ বাবার নাম,
আর মায়ের চোখে জমে থাকা নোনাজল।
আমরা সেই সুরে শিখেছিলাম হাঁটা,
ভয় পেরিয়ে সাহসের দিকে।

পতাকা উঠেছিল মুক্ত আকাশে, মানচিত্রের ভাঁজে ভাঁজে লেখা ছিল অগণিত নাম 
যাদের কবর নেই,
যাদের কান্না নেই,
কিন্তু আছে রক্তের প্রতিজ্ঞা।

এই পতাকা শুধু কাপড় নয়, এ একেকটি শিরা, একেকটি শ্বাস, মায়ের আঁচলের মতো 
আমাদের ঢাকে,
আবার আগুনের মতো আমাদের জাগায়।
লাল অংশে লজ্জা নয়, 
লাল অংশে প্রতিরোধ,
সবুজে শুধু মাঠ নয়, 
সবুজে নতুন জন্ম।

যখনই পতাকা উড়ে, আমি শুনি সেই বাঁশির সুর,
দেখি সেই মেয়েটির চোখ, 
সে বলে, ভুলে যেয়ো না আমাকে।
আর আমরা শপথ নিই- 
রক্তের দামে কেনা  এই পতাকা কখনো নামাবো না, মর্যাদায় উঁচুতে রাখবো আকাশে।



৩৩.      ভাস্কর্য ভাঙে, ইতিহাস নয়



বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান আমার রক্তে হাঁটে,
আমার শ্বাসে শ্বাসে বেঁচে থাকে,
যেমন বঙ্গবন্ধু, যেমন জাতীয় চার নেতা,
যেমন একাত্তর,
আমার বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলে।

তোমরা ৩২ ভাঙো, কিন্তু কী করে ভাঙবে
আমার মায়ের কান্নায় লেখা ইতিহাস?
কী করে মুছবে
রক্তে আঁকা একটি মানচিত্র?

ভাস্কর্য ভাঙো, কংক্রিটের শরীর ভেঙে দাও,
কিন্তু ভাঙতে পারবে না আমার অন্তরের প্রাচীর,
যেখানে তারা দাঁড়িয়ে আছে সূর্যের 
মতো অটল।

আমরা যারা হৃদয়ে বহন করি
এই আগুন-মানুষগুলোকে,
আমাদের কাছে তারা মূর্তি নয়
তারা শিরায় বইতে থাকা নাম।

একাত্তর কোনো ইটের দেয়াল নয়,
এ এক জীবন্ত নদী, ভাঙলেও বয়ে যাবে,
মুছলেও জ্বলবে,
শহীদদের রক্তেই আমরা পেয়েছি দেশ,
ওদের আগুনেই
আমাদের পতাকা উড়েছে আকাশে।



৩৪.       জেলগেটে শেষ দেখা


নয় মাসের শিশুটি কোলে ধরা যায়
কিন্তু সময় ধরা যায় না,
জেলগেটের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
একটি জীবন প্রথমবার বাবাকে চিনে,
আর শেষবার ছুঁয়ে নেয় পৃথিবী।

সে জানে না, এই আদর, এই চুমু,
এই বুকের উষ্ণতা ফিরে আসবে না আর।
শুধু বাতাস জানে
কত দীর্ঘশ্বাস জমে আছে
এই লোহার দরজার ফাঁকে।

কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী,
নিরুপায় এক তরুণী মা, চোখে ছিল ঘর বাঁধার স্বপ্ন,
হাতভরা ছিল আগামীর আলো,
আজ তার শাড়ির আঁচলে
শুধু শোকের ধুলো,
চোখের ভেতর ভাঙা নক্ষত্র।

যুবকটি অপরাধী নয়,অসহায়।
স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারে না,
কারণ চোখে চোখ রাখলেই
ভেঙে পড়ে বুকের দেয়াল,
সে বাবার মতো হাসতে চেয়েছিল,
আজ সে কেবল কান্না লুকায়।

এই প্রথম দেখা এই শেষ,
একটি শিশু
মায়ের কোলে জন্ম নিয়ে
মৃত্যুর কোলে ঘুমালো।

মানবতা কি সত্যিই আমাদের কাছ থেকে
বিদায় নিয়েছে?
নাকি আমরা চোখ বন্ধ করে আছি,
যেন না দেখতে হয়
এই নিষ্পাপ মৃত্যুর ইতিহাস।


৩৫.      একই আকাশ


সীমান্তে কাঁটাতারের বেরা,
ওপারে প্রহরী, এপারে প্রহরী,
রক্তের মতো লাল সূর্য নামে প্রতিদিন।

উপরে একই আকাশ ঝুলে থাকে,
কোনো পাসপোর্ট চায় না মেঘ,
তারাদের চোখে কোনো মানচিত্র নেই,
তবু মাটিতে মানুষ বিভক্ত।

একই জাতিসত্তা, একই ভাষার
অক্ষরগুলো কাঁটায় আটকে যায়,
মায়ের ডাক থেমে থাকে
লোহার শিসে।

এপারেও হাহাকার, ওপারেও হাহাকার,
ক্ষুধা আর ভয়ের উচ্চারণ একই,
শুধু দুঃখের ঠিকানা বদলায়।

রাতে চাঁদ দু’পাড়ে সমান আলো দেয়,
কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকার
কাঁটাতারের মতোই বেড়ে চলে।

হে আকাশ, একদিন তুমি নেমে এসো,
এই সীমান্তে দাঁড়িয়ে বলো-
মানুষের চেয়ে বড় কোনো দেয়াল নেই,
আর মানুষের চেয়ে গভীর কোনো দেশও নেই।


৩৬.     দারিদ্র্যের জন্মসনদ


আমার জন্ম একটি রাষ্ট্রীয় ভুল,
একটা ফাইলের কোণে আটকে থাকা নাম,
যে নামে কোনো ভোট নেই,
কোনো মূল্য নেই,
শুধু ঘাম আর অপমানের হিসাব।

আমার জন্মে কোনো বাজি পোড়েনি,
কোনো নেতা হাসেনি,
কারণ আমি জন্মেছি
ওদের উন্নয়নের গ্রাফের বাইরে,
বাতিলের সারিতে,
ক্ষুধার কাগজে মোড়া এক শরীর।

চারদিকে বিলবোর্ডে ঝুলছে স্বপ্ন,
মেগা প্রকল্পের উজ্জ্বল দাঁত,
আর নিচে আমরা,
পথের ধুলোয় লেখা নামহীন মানুষ,
যাদের ঘামেই চলে শহর,
কিন্তু শহর আমাদের চেনে না।

বাসের কাঁচে ভেসে ওঠে ব্র্যান্ডের আলো,
ঢেকে যায় ফুটপাতে পড়ে থাকা
আমাদের মতো শরীরগুলো।
আমরা বাঁচি না,
আমাদের ব্যবহার করা হয়।

আমার পেছনে হাঁটে এক যুবক,
তার চোখে ক্ষুধার বিস্ফোরণ।
সে জানে না, আমিও তার মতোই
একটা বাতিল প্রজন্ম,
যাদের ভবিষ্যৎ আগেই বন্ধক রাখা।

ঘরে ঢুকলে ছাদের ফাঁক দিয়ে
চাঁদ নামে, স্ত্রীর চোখে জমে থাকে
রাষ্ট্রের অনুত্তরিত প্রশ্ন।
আমাদের সন্তানরা জন্মায়
ঋণ, বঞ্চনা আর পুলিশের লাঠির
ছায়া নিয়ে।

ডাক্তারের নাম জানি, হাসপাতালের 
পথও চিনি, তবু যাই না,
কারণ আমাদের শরীরে চিকিৎসার অধিকার নেই।
আমাদের বলা হয়- তোমরাই সমস্যা, তোমরাই বোঝা।
কিন্তু বলো— কে বানিয়েছে এই বোঝা?
কার কলমে লেখা আমাদের দারিদ্র্যের জন্মসনদ?

আমি অপরাধী নই, অপরাধী সেই শাসন,
যেখানে মানুষের দাম
চালের দামের চেয়েও সস্তা।
যেখানে সংসদে বসে
আমাদের ক্ষুধা নিয়ে দরকষাকষি হয়,
আর রাস্তায় আমাদের রক্তে
উন্নয়নের মানচিত্র আঁকা হয়।

তবু আমি দাঁড়াই, কণ্ঠ ফেটে স্লোগান 
হয়ে উঠি, বলি-
আমার জন্ম পাপ নয়, পাপ সেই রাষ্ট্র
যে আমাদের জন্ম দিয়েই 
অপরাধী বানায়।

যদি মরতেই হয়, আমি মরব প্রশ্ন হাতে,
ইতিহাসের বুকে একটা আগুনের দাগ হয়ে।
কারণ আমি পাপি নই-
আমি অভিযোগ, আমি প্রতিবাদ,
আমি বিস্ফোরণের শুরু।


৩৭.     ক্যাম্পাস তোমাদের



ঢাবির সংগ্রামী ছাত্রসমাজকে বলছি-
গত আঠারো মাসে
অন্ধকারের কিছু হিংস্র ছায়া
তোমাদের স্বপ্নের উঠোনে বিষ ঢেলেছে,
ভেঙেছে আস্থা,
শ্বাসরোধ করেছে শ্রেণিকক্ষের আলো।

ওরা মানুষ ছিল না-
ওরা ছিল লোভের মুখোশ,
ঘৃণার মূর্তি,
মরিচাধরা রাতের কর্কশ শব্দ।

আজ সময় এসেছে
সে কালো ছায়াগুলোকে
রোদের দিকে ঠেলে দেওয়ার-
বাতাসকে মুক্ত করার,
মাটিকে আবার মানুষের মতো শ্বাস নিতে দেওয়ার।

এই ক্যাম্পাস ছিল সাহসীদের,
এই প্রাঙ্গণ ছিল দীপ্ত কণ্ঠের,
এই উঠোনে একদিন
স্বপ্ন হাঁটত বুক উঁচু করে।

এখানেই প্রথম উড়েছিল
স্বাধীনতার পতাকা,
এখানেই উচ্চারিত হয়েছিল
প্রতিবাদের শপথ।

আজ আবার বলি-
তোমরা উৎসব করো,
তোমরা গান গাও প্রাণ ভরে,
তোমাদের কণ্ঠে ফিরুক ভোরের আগুন,
তোমাদের চোখে উঠুক নতুন দিনের আলো।

এই ক্যাম্পাস অন্ধকারের নয়,
এই অঙ্গন ভয়ের নয়,
এই ভূমি তোমাদের,
এই স্বপ্ন আবার আমাদের।

তোমাদের কণ্ঠে উঠুক ঝড়,
তোমাদের হাতে জ্বলে উঠুক শিখা-
কারণ আজ লড়াই শুধু ছাত্রের নয়,
আজ লড়াই ভবিষ্যতের।

চলো, এই ক্যাম্পাস আবার দখল করি-
আলোর নামে,
স্বাধীনতার নামে,
মানুষ হয়ে ওঠার নামে।

তারিখ - ১৪/২/২০২৬ ইং
ঢাকা। 


৩৮.     রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই


আমি চাই এমন এক ভোর
যেখানে সূর্য উঠবে
কোনো কলঙ্কের ছায়া ছাড়া,
যেখানে মাটির গন্ধে মিশে থাকবে
শহীদের রক্তের অমর শপথ।

আমি চাই এমন এক পতাকা
যার লাল বৃত্তে আর কখনো
বিশ্বাসঘাতকের মুখ ভেসে উঠবে না,
সবুজ জমিনে লেখা থাকবে
সত্যের অক্ষর,
স্বাধীনতা কারো দয়া নয়,
এটি রক্তে কেনা অধিকার।

যারা অন্ধকারে দেশ বিক্রি করেছিল,
মায়ের চোখের জলকে তুচ্ছ করেছিল,
তারা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে
শুনুক মানুষের বজ্রকণ্ঠ-
“তোমাদের ক্ষমা নেই।”

আমরা বুক পেতে শিখেছি জয়বাংলার আগুনে,
আমাদের কণ্ঠে এখন শহীদের কণ্ঠস্বর—
অন্যায় মানি না, মিথ্যা মানি না।
এই দেশ কারো ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়,
এই দেশ কোটি প্রাণের স্বপ্ন।

যেখানে রাজাকার নেই,
সেখানে মাথা উঁচু করে হাঁটে মানুষ।
রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই-
এই দাবি শুধু শ্লোগান নয়,
এ আমাদের অস্তিত্বের শপথ,
এই মাটিতে জন্ম নেওয়া সব সন্তানের 
সম্মান।

  

৩৯.     মুক্তি সেনা



রক্তাক্ত মানচিত্রে তিনি হাঁটলেন
ভাঙা গ্রাম, পোড়া শস্য, অনাথ নদীর পাশে-
শুনলেন মাতৃভূমির দীর্ঘশ্বাস,
আর বুকের ভেতর আগুন জ্বালালেন প্রতিজ্ঞার।

তাঁর চোখে ছিলো স্বাধীনতার সূর্য,
তাঁর কণ্ঠে ছিলো মাটির মন্ত্র,
মুক্তির মশালশিখায় জ্বলে উঠলেন তিনি
প্রতিটি শিখায় একটি করে জীবন,
প্রতিটি আগুনে একটি করে জয়।

আমাদের স্বাধীনতা যখন আঁধারে ঢেকে যাচ্ছিল, তখন তিনি দাঁড়িয়েছেন আলো হয়ে,
বুক দিয়ে ঠেকিয়েছেন মৃত্যুর ঝড়,
হাত তুলে বলেছেন— এই দেশ যাবে না হারিয়ে।

তাঁর রক্তে লেখা আছে আমাদের সকাল,
তাঁর নিঃশ্বাসে বহে লাল-সবুজ পতাকার গান,
তিনি শুধু একজন নন-
তিনি একটি যুগ, একটি ডাক, একটি প্রার্থনা।

আজও যখন রাত দীর্ঘ হয়,
আর ইতিহাস কাঁপে অশ্রুতে,
আমরা বলি-
ফজলুর রহমান মানেই ভোর,
ফজলুর রহমান মানেই বাংলাদেশ। 

তারিখ - ১৪/ ২ / ২০২৬ ইং
ঢাকা।। 



৪০.      তারেক রহমানকে 


জীবজন্তুকে ভালোবাসা ভালো,
কিন্তু ভালোবাসা মানে
নিজেকে তাদের খাদ্য করে দেওয়া নয়।

কালনাগের চোখ শান্ত মনে হলেও
তার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে বজ্রের ছোবল,
শকুন আকাশে ভেসে থাকে
কিন্তু নামলে সে মাংসেরই প্রার্থনা করে।

বনেরও আছে তার সীমানা,
নদীরও আছে তার গভীরতা,
যে রেখা পেরোলে
ভালোবাসা বদলে যায় বিপদের নামে।

তাই দূর থেকেই মুগ্ধ হও,
পাতার ফাঁক দিয়ে চেয়ে দেখো,
শব্দের ভেতর দিয়ে অনুভব করো,
ছোঁয়ার আগে ভেবে নাও:
সব নিকটতা নিরাপদ নয়।

ভালোবাসো,
কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে থেকে।

তারিখ -১৬/২/২০২৬ ইং
ঢাকা। 


৪১.       স্মৃতির মিনার

শহীদ মিনার কবর নয়,
নেই সেখানে মাটির নিচে নিঃশ্বাসহীন কোনো দেহ,
তবু আছে রক্তের উষ্ণতা,
ভাষার জন্য ঝরে পড়া অগ্নি-শপথের ইতিহাস।

শহীদ মিনার শ্মশান নয়,
ধূপের ধোঁয়ায় নয় তার পবিত্রতা-
তার শুদ্ধতা আসে উচ্চারিত একেকটি বর্ণ থেকে,
মায়ের মুখের প্রথম ডাক থেকে।

ওই সাদা স্তম্ভে লেগে আছে
ফেব্রুয়ারির ভোর,
মায়ের কান্না, ভাইয়ের রক্ত,
অদম্য তরুণের বুকভরা সাহস।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
কোনো ধর্মের প্রাঙ্গণ নয়-
এটি এক ভাষার প্রতীক,
এক জাতির জেগে ওঠা স্মৃতিস্তম্ভ।

এখানে প্রার্থনা যদি করতেই হয়,
তবে তা হোক নীরবতায়,
একটি ফুলের পাপড়িতে,
একটি মাথা নত করায়।

কারণ স্মৃতিরও নিজস্ব মর্যাদা আছে,
শ্রদ্ধারও নিজস্ব ভাষা-
অতিরিক্ত শব্দে তা মলিন হয়,
অতিরিক্ত আড়ম্বরেই হয় ভাঁড়ামি।

এসো, দাঁড়াই চুপচাপ-
হৃদয়ের ভেতর উচ্চারণ করি
যে ভাষায় আমরা বাঁচি,
যে ভাষায় আমরা কথা বলি।


৪২.    পেটের স্লোগান 


আমার পেটে খিদে থাকলে,
জিন্দাবাদ দিলে জিন্দাবাদ খেয়ে ফেলন,
আমার পেটে যদি খিদে থাকে,
জয়বাংলাও খেয়ে ফেলব,
পেটের খিদে থাকলে ইনকিলাবেরও 
সাউয়া-মাউয়া ছিঁড়ে খাব।

কারণ খিদে কোনো দল চেনে না,
খিদে কোনো পতাকার রং বোঝে না,
খিদে শুধু ভাত চেনে,
ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ির গন্ধ চেনে।

তোমরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগুন ঝরাও ভাষণে,
আমি চুলায় আগুন চাই, 
তোমরা বলো স্বপ্নের উন্নয়ন,
আমি বলি,  এক মুঠো চাল দাও আগে।

তোমাদের প্রতিশ্রুতি পোস্টারের কালি,
বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়,
আমার সন্তানের কান্না
রাতে ধুয়ে যায় না কিছুতেই।

তোমরা ইতিহাসের পাতা উল্টাও,
আমি খালি থালার তলা উল্টাই -
সেখানে কোনো বিপ্লব নেই,
শুধু আঁচড় কাটা অভাব।

খিদে যখন জেগে ওঠে,
সংবিধানের ধারা গিলে খাই,
খিদে যখন চিৎকার করে,
রাষ্ট্রভাষাও চুপ হয়ে যায়।

আমি মানুষ,
স্লোগানের দেয়ালে টাঙানো পোস্টার নই,
আমার রক্তে আগুন আছে,
কিন্তু পেটের আগুন আগে নেভাও।

তারপর ডাক দিও -
জিন্দাবাদ, জয়বাংলা, ইনকিলাব শ্লোগান দেবো,
পেট ভরা মানুষের কণ্ঠেই
সত্যিকারের স্লোগান জন্ম নেয়।



৪৩.      ফাগুনের আগুন কবিতা 



আজ এই সভায় আমি একুশের কবিতা পড়তে এসেছি,
বলতে এসেছি- সেদিন কী হয়েছিল?
কিন্তু কীভাবে বলব সেই রক্তক্ষরণের কথা?
কীভাবে পড়ব সেই আগুনঝরা পঙ্‌ক্তি?

আমি তো দেখিনি বায়ান্নর সেই রক্তক্ষরণ।
এই কবিতার কবিও দেখেনি-
একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২।
আমাদের জন্ম সেই রক্তপাতের পর,
তবু কী করে পড়ি একুশের অমর কবিতা! 

আজকের এই সভার সম্মানিত সভাসদ,
শ্রদ্ধেয় শ্রোতা ও দর্শকদের বলছি-
আমরা একুশ দেখিনি,
কিন্তু কিংবদন্তি থেকে জেনেছি একুশ কী।
ইতিহাসের পাতায় পাতায় পড়ে
জেনেছি-
একুশ আমাদের কী দিয়েছিল,
আর কেড়ে নিতে চেয়েছিল কী!

সেই উত্তাল রাতে
এক তরুণ লিখেছিলেন-
“আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”
আজও একুশ এলে
আমরা সমস্বরে সেই গান গাই।

ভাটির দেশের আরেক যুবক লিখেছিলেন-
“ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার রক্ত,
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত…”

আর আজ আমিও বলতে চাই
মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর কণ্ঠে-
“এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার উর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
আমি কাঁদতে আসিনি…”
আমি এসেছি শোনাতে
রক্তমাখা শব্দের কান্না,
আগুনে পোড়া ইতিহাসের ধ্বনি।

এখানে যারা ছাত্র,
কারখানার শ্রমিক,
কৃষক, শিক্ষক,
গৃহিণী, তরুণ-তরুণী-
সবাই শোনো
একুশের সেই রক্তাক্ত আখ্যান-

এখানে যারা নেই-
তারাও শুনুক, তারাও জানুক,
এই কবিতার শব্দগুলো,
যা লেখা আছে
আমাদের বাংলা বর্ণমালায়।

কবিতার শব্দ হোক আগুনের ফুলকি!
সেদিনও কবিতা ছিল প্রজ্জ্বলিত লেলিহান-
যার আগুনে পুড়েছিল ফ্যাসিবাদের দম্ভ,
শাসকের নিষ্ঠুর প্রজ্ঞাপন।

প্রতিবছর আটই ফাগুনে
সব পথ এসে মিলে
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে,
খালি পায়ে মানুষ আসে,
মৌনতায় দাঁড়ায়
ভাষাশহীদ মিনারের তলায়।

লক্ষ মানুষ কেন দেয় ফুল?
কী হয়েছিল সেই ফাগুন দিনে?
সেদিনও আকাশ ছিল নীল,
পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া ফুটেছিল আগুনরঙে।
কিন্তু ওরা চেয়েছিল
আমার মায়ের কণ্ঠ রোধ করতে,
আমাদের বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে।
বলেছিল-
একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা।

গর্জে উঠেছিল ছাত্ররা,
১৪৪ ধারা ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছিল,
 শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ ভেঙে বলেছিল-
“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!”

গুলিতে ঝরে পড়েছিল
সালাম, বরকত, জাব্বার, শফিক,
পথে লুটিয়ে পড়েছিল
পলাশের মতো লাল রক্ত।

মুহূর্তে শহর হয়ে উঠেছিল আগ্নেয়গিরি-
বন্ধ দোকান, থমকে যাওয়া যান,
ধর্মঘট, প্রতিবাদ,
আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে।

তারপর ইতিহাস…
তারপর রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলো।
আজ আমরা বাংলায় কথা বলি-
কারণ এই ভাষা
রক্ত দিয়ে কেনা।

এই ফাগুনে আগুনকে স্মরণ করি,
কারণ এই আগুনেই লেখা হয়েছিল 
আমাদের বাংলা ভাষা। 


৪৪.     সাতই মার্চের জাগরণ


সাতই মার্চের সেই বিকেল -
রেসকোর্সের আকাশে জেগে উঠেছিল
এক জাতির অদম্য উচ্চারণ।
বিভ্রান্ত সময়ের ঘন কুয়াশা ভেদ করে
একটি কণ্ঠ বলেছিল,
জাগো, প্রস্তুত হও, ভয় পেও না।

সেই ভাষণ ছিল আগুনের মতো,
নিভে যাওয়া হৃদয়ে জ্বালিয়েছিল দীপ;
অবাধ্য হওয়ার সাহস,
অজানার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিশ্বাস।

মুক্তিযোদ্ধার বুকের ভেতর
ধ্বনিত হতো তার প্রতিধ্বনি -
স্বাধীন বাংলা বেতারের তরঙ্গে তরঙ্গে
জেগে উঠত আত্মত্যাগের আহ্বান।

ইতিহাসের দীর্ঘ নদীতে
ভুল-ত্রুটি থাকলেও মানুষ থাকে,
তবু সাতই মার্চের সেই ডাক
আজও জাগায় এক জাতির আত্মা,
স্বাধীনতার জন্য
অটল, অমলিন, অনির্বাণ। 


৪৫.      আকাশের আগে যে সংবাদ


সেদিন ভোরটা ছিল অদ্ভুত 
ঢাকার আকাশ যেন কানে কানে
কিছু গোপন কথা শুনছিল,
ঘাসের মাথায় শিশির থরথর কাঁপছিল,
মনে হচ্ছিল
সময় নিজেই অপেক্ষা করছে।

রেসকোর্সের মাঠে
মানুষ জমেছিল সমুদ্রের মতো 
কিন্তু সে সমুদ্রের ঢেউ ছিল না জল,
ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা শত বছরের শব্দ।

দূরে কোথাও একটি কণ্ঠ উঠল,
যেন বজ্রপাতের আগে আকাশের ডাক,
সেই কণ্ঠে ছিল নদীর স্রোত,
মাটির গন্ধ,
আর অদেখা ভবিষ্যতের আলো।

মানুষ তখনও পুরো বুঝে উঠতে পারেনি,
কিন্তু মাঠের ওপরে উড়ে যাওয়া পাখিরা
হঠাৎ ডানা ধীর করে দিল,
তারা আকাশে গোল হয়ে ঘুরছিল,
যেন পৃথিবীর মানচিত্র নতুন করে আঁকা হচ্ছে
তাদের চোখের সামনে।

কণ্ঠের প্রতিটি বাক্য
মাটিতে পড়ছিল বীজের মতো
সেই বীজ থেকে জন্ম নেবে একদিন
একটি পতাকা, একটি নাম,
একটি দেশ।

সেদিন
পাখিরা প্রথম শুনেছিল বাতাসের গোপন বার্তা,
এই মাটির বুক ফেটে
খুব শিগগিরই জন্ম নেবে স্বাধীনতার সূর্য।

আর মানুষ?
মানুষ তখনও দাঁড়িয়ে ছিল,
কিন্তু তাদের ছায়া
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল
একটি অদেখা আগামী দিনের দিকে।


৪৬.     এই মাটি ছুঁয়ে আছি


এই মাটি ছুঁয়ে আছি
রক্তের উষ্ণতায়, ঘামের লবণে,
পায়ের তলায় জমে থাকা
সহস্র নামহীন মানুষের স্বপ্নে।

এই মাটির গন্ধে আছে
ধানের শীষ, নদীর ঢেউ,
শহীদের কণ্ঠরুদ্ধ শেষ শ্বাস
আর মায়ের চোখের নীরব বৃষ্টি।

পদ্মার জলে ভাসে ইতিহাস,
মেঘনার বুকে লেখা গান
লড়াই, ক্ষুধা, ভালোবাসা
একসাথে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার।

আমি মাথা নত করি এই ধুলোয়,
কারণ এ ধুলোই মুকুট,
এখানে পড়ে থাকা প্রতিটি কণা
আমাকে বলে,ভয় পেয়ো না, দাঁড়াও।

এই মাটি ছুঁয়ে আছি বলেই
আমি পথ হারাই না,
ঝড় এলে বুক পেতে দিই,
অন্যায় এলে কণ্ঠ তুলে দাঁড়াই।

যতদিন শ্বাস আছে বুকে,
এই মাটির নামেই থাকবে শপথ
আমি যাবো না ছেড়ে, ভাঙবো না বিশ্বাস,
এই দেশই আমার ঠিকানা, শেষ সত্য।


৪৭.    ধিক্কার

জাতীয় সংগীত যখন বেজে ওঠে -
মাটির ভেতর থেকে জেগে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের শপথ,
রক্তমাখা পতাকার ভিতর
শোনা যায় শহীদের নিঃশব্দ উচ্চারণ।

আর তখনই কিছু মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়,
কিছু চোখ নত হয় অপরাধের ভারে
ইতিহাসের অন্ধকার গলি থেকে
ভেসে আসে রাজাকারি ছায়া।

তারা বসে থাকে।
হ্যাঁ, বসেই থাকুক -
যাদের বুকের ভিতর নেই দেশ,
যাদের স্মৃতিতে নেই মুক্তির গান,
দাঁড়াবার শক্তি তাদের কোথা থেকে আসবে?

জাতীয় সংগীত তো শুধু সুর নয়
এটা একাত্তরের আগুন,
এটা মায়ের কান্না,
এটা বিজয়ের পতাকার উড়াল।

যারা সেই ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল,
তাদের হাঁটু কাঁপবেই
কারণ সত্যের সামনে
বিশ্বাসঘাতকের মেরুদণ্ড থাকে না।

তাই তারা বসে থাকে,
নীরব, স্তব্ধ, শক্তিহীন
আর ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে মাথা উঁচু করে,
বলতে থাকে -
দেশদ্রোহের লজ্জা
কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।


৪৮.  ধিক্কার 


এমন এক দেশে জন্মেছি আমি
যেখানে ইতিহাসের বুক চিরে
রক্তে লেখা একাত্তরকে
কিছু লোক কালি দিয়ে ঢাকতে চায়।

যেখানে সংসদের পবিত্র মেঝেতে
মুক্তিযুদ্ধের আর্তনাদ নয়,
ঘাতকের নামে উচ্চারিত হয়
মিথ্যা শ্রদ্ধার শব্দ।

যে হাতগুলো একদিন
মায়ের কোল খালি করেছিল,
যে চোখগুলো আগুন জ্বালিয়েছিল গ্রামে গ্রামে,
যে কণ্ঠে ছিল বিশ্বাসঘাতকের শপথ
আজ তাদেরই ডাকা হয় “শহীদ”!

ধিক্কার এই ভাষাকে,
ধিক্কার সেই আসনকে
যেখানে সত্যকে হত্যা করে
মিথ্যার জন্য শোক প্রস্তাব তোলা হয়।

একাত্তরের মাটি কিন্তু ভুলে যায় না
পদ্মা, মেঘনা, যমুনার জলে
এখনো ভেসে ওঠে শহীদের রক্তের স্মৃতি।

শোনো -
এই দেশের বাতাসে এখনো উচ্চারিত হয়
একটাই সত্যের নাম --
মুক্তিযুদ্ধ।

আর যারা ঘাতককে শহীদ বানাতে চায়,
ইতিহাস তাদের জন্য লিখে রাখবে
একটি শব্দ -
ধিক্কার!