নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী ( কাব্যগ্রন্থ )
প্রথম প্রকাশ -
উৎসর্গ -
ভূমিকা -
১. নিষ্ঠুরতমা, হে রূপবতী
যে রাতে সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল, আর ক্লান্ত দেহে জমেছিল অনন্ত নির্জনতা, সেই রাতেও তোমার মুখই ভেসে উঠেছিল বৃষ্টির পরে নদীর জলে জেগে থাকা চাঁদের মতো।
চারপাশে ছিল মানুষের কোলাহল, তবু হৃদয়ের গভীরতম ঘরে শুধু তোমার পায়ের শব্দ শুনেছিলাম- যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো বসন্ত নিঃশব্দে ফিরে আসে শুকনো বকুলতলায়।
মনে পড়ে তোমার সেই সহজ গর্ব, চোখের কোণে জমে থাকা উদাসী দীপ্তি, আর চুলের গন্ধে জড়িয়ে থাকা অচেনা কোনো সন্ধ্যার মায়াবী বিষাদ। মনে হয়, একবার যদি ছুঁয়ে দিতে পারতাম তোমার সমস্ত অভিমান, তবে হয়তো পৃথিবীর সব শীত কোমল হয়ে যেত শিশিরের মতো।
তুমি ছিলে নিষ্ঠুরও, তবু তোমার নীরবতা ছিল প্রার্থনার মতো পবিত্র। এক ফোঁটা অশ্রুর জন্য কত দীর্ঘ রাত্রি যে আমি জেগে থেকেছি, তার হিসেব আজ আর রাখি না।
এখনও কোনো কোনো গোধূলিতে অকারণে বাতাসে তোমার নাম ভেসে আসে, আর আমি পুরোনো প্রেমের কাছে ফিরে গিয়ে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করি।
হয়তো তুমি আর ফিরবে না, হয়তো সময় তার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তবু আমার সমস্ত অসমাপ্ত ভালোবাসা আজও তোমার জন্যই সংরক্ষিত -
যেমন শুকনো গোলাপের ভাঁজে বহু বছর ধরে বেঁচে থাকে একটি সুগন্ধ, একটি স্পর্শ, একটি অমলিন মুখের স্মৃতি।
২. অনন্ত মায়াবী আলো
তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
সোনালি রঙের প্রভাত হবে, প্রতিদিন অস্তাচলে যাবে সূর্য।
তবু সন্ধ্যার নীলাভ আলোয়,
অকারণে তোমার নাম ভেসে উঠবে শিউলি-গন্ধে।
হয়তো নদী তার নিজস্ব সুরেই বয়ে যাবে,
হিজল-ছায়ায় বসে থাকবে জ্যোৎস্নার নির্জনতা,
শুধু আমার জানালায় এসে
অতীতের কোনো পাখি ডেকে যাবে তোমার কথা।
তুমি নেই, তবু আকাশে নক্ষত্রেরা নিভে যায় না,
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে বসন্তের রঙ ফুরোয় না;
শুধু এক ফোঁটা শিশির হয়ে
তোমার স্মৃতি জেগে থাকে ঘাসের গভীর সবুজে।
অনেক রাত পেরিয়ে যাবে,
চাঁদ তার ধ্রুপদি আলোয় ভরিয়ে দেবে পৃথিবী,
আর আমি নিঃশব্দে শুনে যাবো -
দূরের বাতাসে তোমার অদেখা পদধ্বনি।
কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে
মেঘের শরীরে লেখা থাকবে তোমার অনুপস্থিতি,
তবু কদমফুলের সুবাসে
মনে হবে, তুমি খুব কাছে ছুঁয়ে দেখার মতো।
ভালোবাসা তো শুধু পাশে থাকার নাম নয়,
কখনও কখনও দূরত্বেরও নিজস্ব এক মায়া থাকে
যেমন নদী সাগরকে না ছুঁয়েও
আজীবন তারই দিকে বয়ে যায়।
তুমি নেই, তাই বলে কী আমার সব থেমে যাবে -
জীবন তার নিজস্ব নিয়মে ফুল ফোটাবে, পাখি ডাকবে,
শুধু হৃদয়ের গভীরতম নক্ষত্রলোকটিতে
একটি আসন চিরকাল তোমার জন্যই রয়ে যাবে-
যেখানে কোনো বিদায় নেই,
কেবল নিঃশব্দ ভালোবাসায় জেগে থাকবে তুমি
এক অনন্ত মায়াবী আলোর মতোন।
৩. ছুঁয়ে দেখা হবে
চাঁদের নরম রূপালি ধূলি মেখে যাও
ঘুমিয়ে থাকা জানালার পাশে
অপরূপ নীরবতার মতো এসে দাঁড়াও।
এখানেই দেখা হবে।
বুকে এত অরণ্য, এত অচেনা পাখির ডাক,
তবু তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
দিগন্তজোড়া বিষণ্ন আলো জেগে ওঠে।
আমি একা বসে থাকি -
রাতের গায়ে নক্ষত্রের চাদর জড়িয়ে।
যদি কখনো হেমন্তের বাতাসে
তোমার চুলের গন্ধ ভেসে আসে,
যদি নদীর জলে ডুবে থাকা চাঁদ
আমাদের পুরোনো স্বপ্নগুলো ফিরিয়ে দেয় -
তবে কোনো শব্দ নয়,
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়,
শুধু চোখের গভীর থেকে চোখে -
নীরবতার সমস্ত ফুল ফুটিয়ে আবারও
ছুঁয়ে দেখা হবে।
তুমি থাকবে দূরের মতো,
আমি থাকব প্রতীক্ষার মতো,
তবু ভালোবাসা তার গোপন দরজা খুলে
একদিন নিশ্চয়ই এসে বলবে -
এসো।
আজ আর বিচ্ছেদ নয়, আজ শুধু
মায়াময় আলোয়,
আত্মার গভীরে ছুঁয়ে দেখা হবে।
৪. তোমার ছায়া
দূরগামী কোনো ট্রেনের জানলায় হেলে
থাকা এক চিলতে ঘুম, ভিড়ের মধ্যে মুখগুলো
বদলে যায়, স্টেশন আসে, স্টেশন ফুরোয়,
শুধু হঠাৎ কোনো অপরিচিত ক্লান্ত মুখে
তোমারই বিষণ্নতা চিনে ফেলি।
প্রতিদিনের শেষে তোমার চোখে
চোখ রেখে দেখি, ঝরে যাওয়া পাতারাও কত নিঃশব্দে বহন করে প্রেম, সন্ধ্যার আকাশে একফোঁটা তারা উঠলে মনে হয়, তুমি এখনও হারিয়ে যাওনি।
চারপাশে ভুলের মুখ,
ভুলের ইতিহাস, তার মধ্যেও গোপনে, অতি গোপনে, আমার শালে লেগে আছে তোমার না-জানা
শরীরের সুবাস।
একটুখানি স্বপ্ন যদি ধার দাও,
আমি আবার ভোরের দিকে হাঁটব, হিজলপাতার নিচে, শিশিরের পাশে,
যেখানে কেউ জানবে না, কী গভীর মায়ায়
তোমাকে ভালোবেসে গিয়েছি
এই পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের ভিতর।
৫. তারার দীপাবলি
খুব ইচ্ছে ছিল -
একদিন খোলা অটোরিকশায়
পূর্বাচলের তিনশো ফুট রাস্তা ধরে
চলে যাব দুজনে,
যতদূর গেলে পৃথিবীর শেষ বিকেলটুকু
আকাশের গায়ে নীল হয়ে জ্বলে ওঠে।
গিয়েছিলাম একদিন -
সেই বিকেলের কোমল আলোয়
অনেকদিন পর দেখলাম,
মাথার উপরে সীমাহীন আকাশেরও ওপরে
আরও এক আকাশ ভেসে থাকে,
দু'পাশে সবুজের অবিরাম বিস্তার,
সজল বাতাসের গায়ে
অচেনা পাখির ডানার শব্দ।
এই শহরের এত কাছে
এত নির্মল বাতাস, এতখানি নীল,
এতখানি অবকাশ লুকিয়ে আছে
জানতাম না।
ঠিক এমনই চেয়েছিলাম আমরা -
এমনই পাশাপাশি থাকা,
এমনই পথের ভেতর হারিয়ে যাওয়া,
এমনই বাতাসে মুছে যাওয়া
জীবনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।
সেই বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
আমাদের কোনও দুঃখ ছিল না,
ওর অসুখের বিদীর্ণ ব্যথাও যেন
দূরের মেঘের আড়ালে ঘুমিয়ে ছিল,
কোনও খেদ ছিল না,
কোনও হিসেব ছিল না জীবনের কাছে।
কিছু কিছু ক্ষণ আসে -
যখন ধন-দৌলত, প্রাপ্তি, অপূর্ণতা
সবই তুচ্ছ হয়ে যায়,
নিরাকার এক সুখ এসে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে যায় শরীর ও মন,
অমিয়ধারার মতো ধুয়ে দেয়
ক্লান্ত দিনের সমস্ত ধূলি।
সেই সন্ধ্যার মেঘমালা থেকে
আমরা পেয়েছিলাম
প্রেমের আশ্রয়ে জন্ম নেওয়া
এক গভীর শান্তি।
দূরের আকাশে চেয়ে মনে হয়েছিল -
আর একটু পরেই
লাল, নীল, সোনালি তারারা
দীপাবলির প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠবে
অনন্ত আকাশের বারান্দা জুড়ে।
কিন্তু তার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে,
তারারা জ্বলবে -
আমরা থাকব না।
তবু হয়তো সেই অসমাপ্ত সন্ধ্যার ভিতরে
আমাদের পাশাপাশি বসে থাকা দুটি ছায়া
অনেক দিন পরে,
কোনও নক্ষত্রের স্নিগ্ধ আলোয়
আবারও একে অপরকে খুঁজে নেবে -
যেন ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না,
শুধু আকাশ বদলায়, আর তারারা প্রতি রাতে
দীপাবলির মতো জ্বলে ওঠে।
৬. তুমি চলে গেছ
তুমি চলে গেছো অনন্ত নক্ষত্রের দেশে,
আর আমি রয়ে গেছি এই ভাঙা পৃথিবীর ধুলোয়,
যেখানে স্মৃতিগুলো এখনো শ্বাস নেয়
তোমার নামে।
তুমি আর ফিরবে না এই মাটির পথে,
তবু মন কেমন এক অদ্ভুত অপেক্ষায় আটকে থাকে।
তুমি যদি কখনো অন্য কোনো আকাশে হাঁটো,
চাঁদের আলোয় যদি চেনা কোনো হাসি খুঁজে পাও,
তবে জেনে নিও -
নিঃশব্দ প্রার্থনার মতো এখনও বেঁচে আছি
অচেনা জন্মের প্রান্তে -
যেখানে নাম নেই, ঠিকানা নেই,
কেবল অনুভব আছে, আশা জেগে আছে -
কোনো এক জোনাকজ্বলা মৌন সন্ধ্যায়
আবার দেখা হবে আমাদের।
৭. যারা চলে গেছে
একে একে সব প্রণয়ী-প্রণয়িনীরা চলে গেল,
কেউ চলে গেল জীবনের অস্তাচলের ওপারে,
কেউ গেল চির অভিমানে -
ফেলে রেখে গেল শুকিয়ে যাওয়া কিছু বিকেল,
আর বুকের গহীনে অমলিন কিছু নাম।
একে একে নিভে গেল অনেক চেনা প্রদীপ,
কারও চোখে জমল নক্ষত্রের ঘুম,
কারও ঠোঁটে রয়ে গেল না-বলা বিদায়ের ভাষা,
তবু পুরোনো পথগুলো আজও সন্ধ্যা নামলে
অপেক্ষার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
যারা একদিন হাত ধরেছিল,
তারা আজ ছড়িয়ে আছে সময়ের বিভিন্ন ঋতুতে -
কেউ বৃষ্টির গন্ধ হয়ে আসে,
কেউ শরতের সাদা মেঘে,
কেউ বা গভীর রাতে হঠাৎ জেগে ওঠা
একটি নামহীন বিষণ্নতায়।
এক এক করে সব চিঠির কালি ফিকে হয়ে গেল,
শুকিয়ে গেল বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি,
শুধু কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন
জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে মাঝেমধ্যে,
আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে।
কেউ চলে গেল জীবনের ব্যস্ত নগরে,
কেউ হারিয়ে গেল অনন্ত নক্ষত্রলোকের ঠিকানায়,
কেউ বা নীরবতার চাদর গায়ে জড়িয়ে
আর ফিরে তাকায়নি কখনও।
তবু মাঝরাতে চাঁদের আলো নেমে এলে
মনে হয় -
সব হারিয়ে যাওয়া প্রণয়ীরা বুঝি
অদৃশ্য কোনো বাগানে বসে এখনও একে
অপরের কথা বলে।
হয়তো কোনো এক অনন্ত ভোরে,
যেখানে অভিমান নেই, বিচ্ছেদ নেই,
সেখানে আবার দেখা হবে -
তখন কেউ আর চলে যাবে না,
কেউ আর হারিয়ে যাবে না, শুধু তারার
দীপাবলির নিচে আমরা সবাই চিনে নেব
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মুখ।
৮. মাটির কাছে ফিরে এসে
এক দিন মনে হতো, এই হৃদয় নিজেই যেন
জোনাকির আলো,
নিজেই নিজের জন্য রচনা করত মায়ার বনভূমি,
অচেনা নক্ষত্রের দিকে হাত বাড়িয়ে ভাবত -
সমস্ত সৌন্দর্য বুঝি তারই অন্তরঙ্গ ভূমি।
তার পর একে একে ঋতুরা বদলে গেল,
সময়ের সুস্থ শিষ্টতায় ধরা পড়ল সমস্ত স্বপ্ন,
দেখলাম, যে ফুলগুলোকে অমর ভেবেছিলাম -
তারা নিভৃতে ঝরে পড়ে, কারও থাকে না স্মরণ।
আমার বিশ্বাসের মূল, এই পৃথিবীর গভীর মাটিতে
কত যে ক্ষত নিয়ে পড়ে ছিল নীরব হয়ে,
তবু সন্ধ্যার পরে কোনো এক নির্জন আকাশে
একটি তারা আজও জ্বলে থাকে মৃদু বিষাদে।
মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া মায়ারা সব মরে না,
কিছু কিছু থেকে যায় শিশির হয়ে ঘাসের পাতায়,
আর আমি, মাটির কাছে ফিরে এসে শিখেছি -
সব আলো উজ্জ্বল নয়, সব স্বপ্নও নয় চিরস্থায়ী।
যা ভেঙে যায়, তারও থাকে এক গোপন সৌন্দর্য,
যেমন শরতের শেষে কুয়াশা নামে,
আর নিঃশব্দে পৃথিবী হয়ে ওঠে আরও মায়াবী।
৯. বিষণ্ণ বিকেলের কাছে
মুখ তুলে তাকালেই দেখি
বিকেলের আকাশে কেমন এক অনন্ত ক্লান্তি
জমে আছে,
মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে ভেসে আসে
কবরস্থানের বাতাসে ছড়ানো কর্পূরের গন্ধ,
কী এক অদ্ভুত স্মৃতির মতো,
যেন কেউ নীরবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
বাতাসে তখন পাখিদের ডাকও
কেমন যেন অস্ফুট হয়ে আসে,
রোদ ধীরে ধীরে গাছের ছায়ায় ডুবে যায়,
আর হৃদয়ের ভিতর
কার যেন পদশব্দ শুনি বারবার।
যাদের সঙ্গে একদিন
অনেক কথা ছিল, অনেক আলো ছিল,
তারা আজ কেবল দূরের নক্ষত্র,
শীতল, নিঃসঙ্গ, নিঃশব্দ -
তবু তাদের জন্যই
অকারণ চোখ ভিজে ওঠে সন্ধ্যার আগে।
কখনো মনে হয়,
এই পৃথিবী আসলে একটি দীর্ঘ বিদায়ের আয়োজন,
মানুষেরা আসে, কিছু হাসি রেখে যায়,
কিছু অসমাপ্ত স্পর্শ, কিছু নামহীন অভিমান *
তারপর একদিন
কর্পূরের গন্ধের মতো মিলিয়ে যায় আকাশের দিকে।
আর আমি বিকেলের শেষে
অকারণে জানালার পাশে বসে থাকি,
অসীম বিষণ্নতা এসে বসে থাকে পাশে,
যেন বহুদিনের পরিচিত কোনো সঙ্গী -
যার চোখে নীরবতার জল,
আর যার কণ্ঠে কেবল একটি কথাই ভেসে আসে-
সবকিছুই একদিন চলে যায়,
শুধু গন্ধ হয়ে থেকে যায় কিছু স্মৃতি,
আর কিছু অসমাপ্ত ভালোবাসা।
১০. অন্ধকারের ওপারে
আমি জানি , তুমি চলে গেছ নক্ষত্রেরও ওপারে - প্রতিটি সন্ধ্যা নামলে তোমার অনুপস্থিতি তাই
গভীর হয়ে ওঠে।
বাতাসে কিসের যেন অচেনা গন্ধ আসে,
মনে হয়, কোনো দূর অন্ধকারে বসে তুমি হয়তো এখনও একটি পুরোনো দিনের কথা ভাবছ।
আমাকে কী তোমার মনে পড়ে?
যেমন আমার মনে পড়ে- হঠাৎ ঝরে পড়া শিউলি ফুলের মতো, অকারণ বিষণ্ন কোনো বিকেলের মতো,
জানালায় বৃষ্টির প্রথম শব্দের মতো।
অনেক কথা বলা হয়নি,
অনেক অভিমান রয়ে গেছে বুকের গোপন কুঠুরিতে, তবু মনে হয়, সমস্ত না-বলা কথারও একটি আলো আছে, যা নিভে যায় না মৃত্যুর পরেও।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে একটি তারাকে
অন্যসব তারার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হয়,
তখন ভাবি, হয়তো তুমি সেখানেই আছ,
অদৃশ্য কোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছ চুপচাপ।
আর যদি সত্যিই আরেকটি দেখা হওয়ার
দেশ থেকে থাকে, তবে একদিন সমস্ত অন্ধকার,
সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে তুমি আবার ডাকবে
আমার নাম।
সেদিন অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া বিকেলের মতো
আমিও নীরবে বলব -
দেখো, এতদিন পরেও তোমাকে ভুলতে পারিনি; তোমার জন্যই আমার হৃদয়ে এখনও একটু মায়াময় বিষাদ বেঁচে আছে।
১১. কল্পনার সেই মানুষ
যাকে করেছিলাম কল্পনা,
সেই এসে জড়িয়ে নিল আমার সমগ্র জীবন -
যেন বহুদিনের অনিদ্রার শেষে
হঠাৎ নেমে এল শান্ত কোনো ভোর।
আমি ভেবেছিলাম, মানুষটি বুঝি
শুধুই থাকবে মেঘের মতো দূরে,
অথচ সে এসে নিঃশব্দে বসে পড়ল
আমার সমস্ত একাকিত্বের পাশে।
তার চোখে ছিল সন্ধ্যার আলো,
কণ্ঠে ছিল অচেনা নদীর সুর -
আমি ধীরে ধীরে ভুলে গেলাম
কত দীর্ঘ ছিল বিষণ্নতার পথ।
কখনও মনে হয় -
মানুষেরা কি সত্যিই এমন করে আসে?
নাকি কোনো সুদূর নক্ষত্রের দেশে
অনেক আগে থেকেই লেখা ছিল এই মিলন?
তাই আজও নিশীথের অন্ধকারে
চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি -
কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা
ফুলের মতোই নীরবে ফোটে।
১২. স্মৃতিটুকু থাক্
সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসে অচেনা কোনো
গানের সুর,
ঝরা শিউলির গন্ধে জেগে ওঠে হারানো দিনের
উদাস দুপুর।
যারা চলে গেছে, তারা কি সত্যিই দূরে
চলে যায়?
নক্ষত্রের আলো হয়ে তারা কি নিভৃত আকাশে
নিঃশব্দে ভেসে রয়?
আমি শুধু চুপচাপ শুনি সময়ের বিষণ্ন
বাঁশির ডাক,
সব হারানোর পরও তোমার স্মৃতিটুকুই
নিভৃতে আমার হৃদয়ে থাক্।
১৩. হঠাৎ মনে পড়ে
অনেক আনন্দময় ক্ষণে হঠাৎই তোমাকে মনে পড়ে,
রৌদ্রভেজা দুপুরে কিংবা বৃষ্টিমাখা অলস বিকেলে,
তোমার ফেলে যাওয়া কিছু কথা নিঃশব্দে ফিরে আসে মনের আঙিনায়।
কোনো প্রিয় গানের সুরে জেগে ওঠে বিস্মৃত স্পর্শের আবেশ,
শিউলি-ঝরা পথের ধারে মনে হয়, তুমি বুঝি এখনও আছ খুব কাছে।
যত দূরেই যাও না কেন, স্মৃতিরা তো দূরত্ব মানতে শেখেনি,
তারা নক্ষত্রের মতোই জ্বলে ওঠে অকারণে, গভীর রাত্রির নির্জনতায়।
তাই আনন্দের মধ্যেও কোথাও এক কোমল শূন্যতা রয়ে যায়,
আর সেই শূন্যতার ভেতরেই তোমার নামটি নীরবে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।
১৪. ফিরে ডেকো না
তুমি আর ডাকো না আমাকে জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে,
খুঁজো না আর অলিন্দ খুলে দূরের দীঘির ঘাটে
যেখানে ছিলাম আমি দাঁড়িয়ে -
সেই বিকেলের রোদ আজ বহুদিন নিভে গেছে,
শিউলির গন্ধে ভরা পথটিও হারিয়েছে,
জোনাকিদের গোপন আলোর মতো
আমিও মিশে গেছি অনন্ত সন্ধ্যার আঁধারে।
তুমি আর অপেক্ষা কোরো না জানালার পাশে,
বকুলঝরা উঠোনে রেখে দিও না কোনো অভিমান,
কুয়াশাভেজা ভোরে যে পায়ের শব্দ শুনতে পেতে,
সে তো অনেককাল হলো হয়েছে স্মৃতিরই গান।
নদীর ওপারে যে কাশফুল দুলে ওঠে নিঃশব্দে,
তারাও জানে, ফিরে আসা সবসময় সম্ভব নয়,
কিছু মানুষ নক্ষত্র হয়ে থাকে দূর আকাশে,
কেবল আলো পাঠায়, কাছে এসে ধরা দেয় না আর।
যদি কোনোদিন শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভিজে ওঠে মন,
যদি হঠাৎ মনে পড়ে যায় অকারণ কোনো কথা,
তবে ভেবো, আমি আছি -
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পুরোনো নামে।
আর যদি নিশীথ রাতে বাতাসে কেঁপে ওঠে পর্দা,
মনে কোরো না, আমি ফিরে এসেছি আবার -
শুধু হয়তো কোনো বিস্মৃত ভালোবাসা
নীরবে ছুঁয়ে গেছে তোমার ঘুমন্ত চোখ।
তাই তুমি আর ডাকো না আমাকে,
জলপাই তলায় দাঁড়িয়ে -
আমি এখন সময়ের অতল জলে ভেসে থাকা
এক নামহারা প্রতিধ্বনি, দূরের দীঘির নিস্তব্ধ ঘাটে
যেখানে একদিন ছিলাম দাঁড়িয়ে।
১৫. অনুপস্থিতির দুই প্রান্তে
আমি যাকে মনে করি, সে আমায় মনে করে না -
এ কথা কোনোদিন বিশ্বাসের আলোয় আনতে পারিনি,
যাকে ভালোবেসেছি স্বচ্ছ নদীর মতো,
সে ভালোবাসবে না আমায়, এমন নিষ্ঠুর সত্য মানিনি।
পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে
আমি যার নামের জন্য উদাস বাতাসে ফিরি,
যার অনুপস্থিতিতে জেগে থাকে দীর্ঘ রাত্রিরা,
সে কি আমার জন্য একটুও ব্যাকুল হবে না,
ভাবতেই পারি না।
হয়তো অন্য কোনো আকাশের নিচে,
সে-ও আমার মতোই গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
হয়তো আমার নামটুকু উচ্চারণ না করেও
আমার স্মৃতির প্রদীপ জ্বেলে রাখে নির্জনে।
ভালোবাসা তো শুধু একতরফা পথ নয়,
তারও আছে অদৃশ্য প্রতিধ্বনির আয়োজন -
আমি যেমন তাকে খুঁজি নক্ষত্রভরা সব রাতে,
তেমনি কোনো গহন বিষণ্নতায়
সে-ও হয়তো খুঁজে ফেরে আমারই অনুপস্থিত
আমারই ছায়া।
১৬. তোমার বুকের পরে
আমার পৃথিবী ছোট হয়ে আসে তোমার
বুকের পরে,
তুমি পাশে থাকলেই হাজার বছর বাঁচতে
ইচ্ছে করে।
তুমি পাশে থাকলেই মনে হয়, মৃত্যু নয় -
অনন্তের পথ ধরে,
আরও হাজার জন্ম বাঁচতে ইচ্ছে করে
তোমার বুকের পরে।
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় জেগে ওঠে
হারানো স্বপ্নের ঘোরে,
চোখের মায়ার গভীর মগ্নতায়
জীবন খুঁজে পাই তোমার বুকের পরে।
যত দূরেই যাক সময়, যতই বদলে যাক
পৃথিবীর রূপ, রং, রোদ্দুরে,
আমার সমস্ত প্রেম, সমস্ত আকুলতা
এসে থেমে থাকে তোমার বুকের পরে।
যদি কখনও নিভে আসে জীবনের প্রদীপ,
শেষ প্রার্থনাটুকুও থাকবে তোমারই তরে -
মৃত্যুকেও ভুলে গিয়ে আরও একবার
জন্ম নিতে ইচ্ছে করবে তোমার বুকের পরে।
১৭. বিলম্বিত আগমন
তুমি এসেছিলে অবশেষে -
যখন আমি আর এই পার্থিবে নেই,
শুকনো ঝরাপাতার মতো ঝরে গেছি ,
ফিরে দেখার জন্য রেখে গেছি
কেবল কিছু ক্ষীণ ঋণ।
যে প্রদীপটি জ্বলত তোমার প্রতীক্ষায়,
অনেক আগেই তার শেষ আলোটুকুও নিভে গেছে,
তবু বাতাসে রয়ে গেছে আমার উচ্চারিত নাম।
তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে,
আর চারদিকে ছিল গভীর সন্ধ্যা,
আমি তখন দূর নক্ষত্রের দেশে নিঃসঙ্গ, নিরুপায় -
শুধু শিশিরভেজা ঘাসের উপর নেমে এসেছিল
এক দীর্ঘ বেদনা,
যেন দেরিতে এসে তুমি শুনতে পেয়েছিলে
আমার শেষ অপেক্ষার কান্না।
১৮. কবে বৃষ্টি হয়েছিল
কবে বৃষ্টি হয়েছিল,
আজ আর ঠিক মনে পড়ে না,
মনে আছে ভেজা বিকেলের বিষণ্নতার কথা -
তুমি খুব ধীরে বলেছিলে কিছু কথা,
মেঘের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল সেই কথকতা।
কোন্ পাখি ডেকেছিল দূরের বনপথ ধরে,
আজও সে সুর ভেসে আসে -
কবে বৃষ্টি হয়েছিল - মনে নেই আর,
শুধু মনে আছে, তোমার চোখে ছিল শ্রাবণের
অন্ধকার।
তোমার স্মৃতি হয়ে ওঠে সন্ধ্যার ভাষা,
যখন রাত নামে, নক্ষত্রেরা জেগে থাকে আকাশজুড়ে,
মনে হয়, সেই বৃষ্টিভেজা দিনটি এখনও ঘুমিয়ে আছে তোমার বুকের পরে।
সময়ের নদী কত দূরে নিয়ে গেছে আমাদের দু'জনকে,
তবু হঠাৎ বৃষ্টির গন্ধে তোমাকেই মনে পড়ে -
অবেলাতে, নিভৃত ক্ষণে।
১৯. মেঘজল ও বুনো জলপদ্ম
কালো মেঘের মতো চুল ঢেকে দিয়েছিল
তোমার গোল্লাছুট খেলার পিঠ,
অর্ধেক নেমে এসেছিল উপত্যকার টিলা ছুঁয়ে
লতাগুল্মের নিভৃত সংগীতে।
ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
ধীরে ধীরে জল হয়ে গিরিপথ বেয়ে
অচেনা কোনো অতল খাদে নেমে যায়,
আর সেখানে ফুটে ওঠে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম।
তোমার চোখে ছিল বর্ষার প্রথম বিদ্যুৎ,
ঠোঁটে ছিল সন্ধ্যার রক্তিম নক্ষত্রের আলো,
আমি শুধু বিস্মিত পথিকের মতো
দাঁড়িয়ে শুনেছি নীরবতার বাঁশি।
কত অরণ্য, কত নদী, কত সুগন্ধি বাতাস
সেদিন এসে জড়ো হয়েছিল আমাদের চারপাশে-
যেন পৃথিবীর আদিম কোনো প্রেমগাথা
শিউলি-ঝরা রাতে আবার ফিরে এসেছে।
আর দূরের আকাশে ভেসে থাকা চাঁদ
মেঘের আড়াল থেকে চুপি চুপি দেখে গেছে -
দুটি নিঃশ্বাসের মধ্যিখানে
কীভাবে জন্ম নেয় হাজার বুনো জলপদ্মের স্বপ্ন।
২০. অনন্তের পরে
নিভে গেলে প্রদীপ, জেগে থাকি
নক্ষত্রের দেশে,
হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসি একই
স্বপ্নের বেশে।
শিউলি-ভেজা ভোরে তোমার নাম
ডাকে বাতাস,
সন্ধ্যার পাখিরা জানে আমাদের
পুরোনো ইতিহাস।
যত দূরে যাই, তত কাছে আসে মধুর
কোনো ক্ষণ,
সময়ের সীমানা পেরিয়ে বাজে
চেনা স্পন্দন,
যদি এক জন্মে হারাই, অন্য জন্মে
খুঁজে নিও,
অচেনা মুখের ভিড়ে আমায় চোখের
ভাষায় চিনে নিও।
ফুরিয়ে যাবে যুগ, ফুরোবে না হৃদয়ের
এই আবেশ -
জন্ম থেকে জন্মান্তরে ভালোবেশে
জীবন করিও শেষ।
২১. স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে
আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে,
যাও যত দূরেই-তুমি রবে হৃদয়ের গোপন কুটিরে লুকিয়ে।
সময়ের নদী বয়ে যাবে তার আপন স্রোতের টানে,
তবু কিছু বিষণ্ন বিকেল ফিরে আসবে শুধু তোমারই নামে।
জ্যোৎস্না-ভেজা কোনো নিঃসঙ্গ রাতে হঠাৎ মনে
পড়বে আবার,
ফেলে আসা সেই পথের মায়া, সেই প্রথম প্রেমের অলিখিত অঙ্গীকার।
হয়তো আর দেখা হবে না পৃথিবীর ব্যস্ত জনারণ্যে,
তবু তোমার স্পর্শ রয়ে যাবে আমার গানের সুরে, স্বপ্নের অনন্ত প্রাঙ্গণে।
ঝরে যাবে কত ঋতু, বদলে যাবে সময়ের রঙ
আর পরিচয়,
তবু ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই- শেষ কোথায় তার হয়!
আমাদের গল্পটা শেষ হবে না, শেষ হয় না
সত্যিকারের প্রেম,
জন্ম পেরিয়ে জন্মান্তরে তুমি রবে- স্মৃতি হয়ে,
যেন নিকষিত হেম।
২২. বৃষ্টির আড়ালে
তুমি কাঁদবে বলে - উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে,
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো -
তুমি ভিজলে, গোপন করলে তোমার
চোখের জল।
আকাশ বুঝি আগেই জেনে রেখেছিল
তোমার সকল অভিমান,
তাই মেঘেরা নেমে এলো সঙ্গী হয়ে।
ভেজা শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখলে
না-বলা শত কথা,
দূরের কদমগাছ শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
আমি তখন দূরে, হঠাৎ বুকের ভেতর অকারণে
বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল এক বিকেল,
মনে হয়েছিল, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ
বৃষ্টির শব্দে ঢেকে রেখে কাঁদছে আমারই জন্য।
আর সেই কান্না আজো ভেসে আসে
শ্রাবণের গভীর রাতে জোনাকির নিভু আলোয়,
জন্মে জন্মে হারিয়ে ফেলা কোনো
প্রিয় চোখের অশ্রুর মতো।
২৩. জন্মান্তরের চেনা
হয়তো কোনো শ্রাবণ রাতে কদমফুলের
গন্ধে ভেসে -
আমার নামই ডেকেছিল সে নিভৃত নদীর
তীরে এসে।
হয়তো কোনো কুয়াশাভেজা ভোরে
শিউলিপাতার নিচে -
দু'জনার হারানো স্বপ্ন জেগেছিল খঞ্জনা
পাখির পিছে।
চাঁদের আলো ঝরে পড়েছে বহু শতাব্দী
ধরে ধীরে -
তবু তার চোখ চিনে নিয়েছে আমায় বারে
বারে ফিরে।
যত দূরেই যাই না কেন, যত জন্মই
যাক ফুরিয়ে -
সে-ই যেন অপেক্ষায় থাকে কাশবনে --
অলকানন্দা ঝাড়ে।
হয়তো কোনো অচেনা পথে সন্ধ্যা নেমেছে
বিষণ্ন হয়ে -
তবু তার মায়াভরা মুখ ভেসে ওঠে নিঃশব্দ
বৃষ্টিস্রোতে বয়ে।
যখনই হারাই আমি সময়ের অসীম
অন্ধকারে -
সে যেন প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে আমার
সকল হাহাকারে।
একদিন সব পথ ফুরাবে, নিভে যাবে
পৃথিবীর নীল -
তবু দু'জনার ভালোবাসা রবে নক্ষত্রের মতো
অবিনাশী, সুনীল।
আর যদি আবার জন্ম হয় কোনো শ্যামল
গ্রামের নিভৃত নীড়ে -
সে-ই যেন খুঁজে নেবে আমায়, কাশবনে -
অলকানন্দার ঝাড়ে।
২৪. শেষ বিকেলের স্বপ্ন
আমি তো চেয়েছিলাম, বৃদ্ধ বয়সের কোনো শান্ত বিকেলে,
তোমার কাঁপা হাতটা ধরে ধীরে ধীরে সূর্যাস্ত দেখতে।
চেয়েছিলাম, ঝরে-পড়া পাতার শব্দে দু'জন
ফেলে আসা দিনের গল্পগুলো আবার নতুন করে বলতে।
চেয়েছিলাম, সন্ধ্যার পাখিরা যখন ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন তোমার চোখের গভীরে আমার শেষ আশ্রয় খুঁজতে।
চেয়েছিলাম, সময়ের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গিয়ে,
এক কাপ উষ্ণ চায়ের ধোঁয়ায় ভালোবাসার পুরোনো দিনগুলো ছুঁতে।
চেয়েছিলাম, পৃথিবী যখন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বে,
তোমার কাঁধে মাথা রেখে জ্যোৎস্নাভেজা রাতের গান শুনতে।
আর,
যদি কোনো একদিন মৃত্যু এসে দাঁড়ায় দুয়ারে,
শেষবার তোমার হাতটা ধরে বলব --
আমাদের ভালোবাসা ফুরোয়নি এখনো,
সূর্য ডুবে গেলেও আকাশে রয়ে গেছে তার
দ্যুতিময় রঙের আবেশ।
২৫. বসন্তের খোঁজে
আমি তো চেয়েছিলাম রঙের গল্প,
চেয়েছিলাম আবির ছুঁয়ে দিক আমার অবয়বে -
যখন বসন্ত নামে উঠোনে,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি একা -
হাতে কোনো রং নেই।
আমার সেই বান্ধবীর হাসি কি
এখনও বেঁচে আছে?
নাকি সে-ও আমার মতোই
কোনো অচেনা শূন্যতায়
নিজেকেই খুঁজে ফিরছে বারবার?
২৬. সমাধিফলকে লেখা নেই
তুমি রয়েছ নিদ্রিত সময়ের ওপারে কিংবা আমারই
শ্বাসের পাশে নীরবে, কিছু বিষণ্নতায় -
রয়ে গেছো অপ্রকাশিত নামে, ডুবে থাকা কোনো
গুপ্ত উপাখ্যানে, আছো তুমি অশেষ অপেক্ষার
ভেজা অন্ধকারে।
কিছু উচ্চারণ, আর কিছু অব্যক্ত থেকে যাওয়া কথায় -
আজও তুমি বিলুপ্ত দিনের ছাপ হয়ে আমার অস্থিমজ্জায়, জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো নিভে গিয়েও জেগে আছো -
এক অনন্ত স্মৃতির নিঃশব্দ এপিটাফ হয়ে।
২৭. অভিমানের পরে
সে একদিন চোখ ভিজাইয়া কইছিলো -
যদি হারাইয়া যাই,
আমারে আরেকবার ডাইকা নিও,
না হইলে এই মন আর বাঁচবো না।
সন্ধ্যার আলো আঁধারে জোনাকির ডানায়
যখন আলো নিভে যায় রাতের গভীরে,
তখন তারে মনে পড়ে -
দূরের সংসারে, আপন মানুষগুলোর ভিড়ে
সে যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া থাকে
সে যখন স্বপ্ন দেখাদেখিতেও নেই।
চইলা যাওয়া দোষের কিছু না -
মানুষ তো শেষমেশ দূরেই সইরা যায়,
খালি কিছু কথা
অপূর্ণ প্রতিজ্ঞার মতো
জানালার ফাঁক দিয়া ঢুইকা পড়া হাওয়ায়
একা একা কাঁপতে থাকে।
তারে মনে পড়ে -
বৃষ্টি থাইমা গেলে যেমন মাটিতে রাইখা যাওয়া
গন্ধ মনে পড়ে, ঠিক তেমনি তারে মনে পড়ে।
২৮. দূরত্বের আলো
দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
যেন সন্ধ্যার তারা- ছোঁয়া যায় না, তবু পথ দেখায় -
কাছাকাছি এলে কত কথা হারিয়ে যায় বাতাসে,
দূরে থাকলেই তুমি ভেসে ওঠো স্পষ্ট নীল আকাশে।
দূর হতে তোমাকে ভালো দেখতে পাই,
কাছে এলে বিকেলের নদীতে হেলে পড়া কোনো নিঃশব্দ আলো নেমে আসে চোখের ভিতর।
তুমি হেঁটে যাও -
আর শিউলি-ঝরা পথগুলো গোপনে তোমার নাম উচ্চারণ করে,
উত্তরের হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় আমার একাকী বারান্দা।
দূরত্বেরও বোধহয় নিজস্ব এক মায়া আছে -
তাই না-পাওয়া জিনিসগুলো এত সুন্দর লাগে,
রাত্রির তারাদের মতো তুমি জ্বলে থাকো দূরে,
আর আমি জেগে থাকি,
তোমারই আলোয় ভিজে থাকা এক দীর্ঘ
অপেক্ষা হয়ে।
২৯. যমুনার কাছে
আমার সেই যমুনা- অলস বিকেলের রোদে যার জলে ভেসে থাকে শৈশবের মুখ, মায়ের ডাকার মতো স্নেহ।
শ্যামল তীরের ঘাসে বসে কতদিন দক্ষিণের বাতাসে শুনেছি অকারণ বিষাদেরও এক মধুর কলধ্বনি।
আকাশভরা আলো নেমে এলে নীল আর সবুজের মাঝখানে প্রসারিত দিগন্ত আমাকে ডেকে বলে - ফিরে এসো, এইখানেই তোমার নাম লেখা আছে।
জলের ভিতরে জেগে ওঠে সন্ধ্যার তারারা, নির্জন কাশবনে ঘুমিয়ে পড়ে পাখিদের ক্লান্তি- আমি সমস্ত শরীরমন ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করি সেই স্নিগ্ধ মাতৃস্নেহে।
মনে হয়, জন্মে জন্মে যদি কোথাও ফিরে আসতে হয়, তবে এই যমুনার তীরেই- যেখানে আনন্দ আর ব্যাকুলতা একই ঢেউয়ের ভিতর মায়ার মতো জড়িয়ে থাকে অনির্বচনীয় দিনরাত্রি।
৩০. ঠোঁটের কাছে
তোমার ঠোঁট, দুই পাপড়ি লবণমাখা সন্ধ্যা,
যেখানে দিনের সমস্ত ক্লান্ত পাখিরা এসে
ডানা গুটিয়ে বসে থাকে।
আমি যখন তোমার দিকে তাকাই,
মনে হয় কোনো প্রাচীন সমুদ্র
তার গোপন জোয়ার তুলে রেখেছে
দুটি নরম তটে।
তোমার ঠোঁটের কোণে যে হাসি জমে থাকে,
সে যেন বৃষ্টিভেজা বকুলের গন্ধ -
দেখা যায় না,
তবু চারপাশের বাতাসকে বদলে দেয়।
কখনও মনে হয়,
ওখানে এক ফোঁটা লাল মদিরা রাত্রি ঘুমিয়ে আছে,
কখনও মনে হয়,
অপরিচিত কোনো গ্রহের আলো
পৃথিবীতে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
তোমার ঠোঁটের কাছে এলে
আমার সমস্ত উপমা ভেঙে যায় -
গোলাপ, শিশির, চাঁদ, সমুদ্র,
সবই হঠাৎ অপ্রতুল মনে হয়।
তখন শুধু মনে হয়,
পৃথিবীর আদিমতম কোনো প্রেম
দুটি নরম পাপড়ির ভেতর বসে
ধীরে ধীরে তার আলো জ্বালিয়ে রাখছে।
৩১. ত্রিশ বছরের প্রতীক্ষা
তাহার সাথে আবার দেখা হইল-
ঠিক ত্রিশ বছর পর। সময়ের দীর্ঘ নদী পার হইয়া
দুইটি ক্লান্ত হৃদয় আবার এক মুহূর্তের জন্য
একই আকাশের নীচে দাঁড়াইল।
হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল- সেই জ্যোৎস্নাভেজা রাত্রি, নদীর পারে ঝরিয়া পড়া জলের কলতান,
বকুলের গন্ধে ভিজে থাকা পথ,
আর হাতের কাছে এসেও না-ধরা
কিছু স্বপ্নের কথা।
কত প্রেম ছিল, কত না-বলা অভিমান,
কত চিঠিহীন দিন আর নিঃশব্দে কাঁদিয়া ওঠা
কত রাত্রি- সব যেন একে একে ফিরিয়া আসিল
স্মৃতির জানালা ঠেলিয়া।
বিদায়ের সময় ত্রিশ বছর আগের মতোই সে আবার মৃদুস্বরে বলিল- 'আবার কবে দেখা হইবে?'
প্রকম্পিত কণ্ঠে বলিলাম- হয়তো আরও ত্রিশ বছর পর...।'
সে তখন আনত নয়নে কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া
ম্লান হাসিতে বলিয়াছিল- 'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'
আজ এতকাল পরে সেই কথাটিই জ্যোৎস্নার মতো নেমে আসে বুকে।
কারণ বুঝিয়াছি- মানুষ শুধু বয়স লইয়া বাঁচে না, মানুষ বাঁচিয়া থাকে কাহারও স্মৃতিতে, কাহারও অশ্রুজলে, কাহারও গভীর নীরবতায়।
হয়তো আবার দেখা হইবে না-
তবু কোনো পূর্ণিমা রাতে, নদীর পারে বাতাস উঠিলে, জলপতনের শব্দ শুনিলে, আমি এখনও মনে মনে শুনিতে পাই -
'আবার কবে দেখা হইবে?'
আর দূর নক্ষত্রের আলোয়, অদৃশ্য কারও আনত নয়নের ভিতর হইতে ভেসে আসে সেই মায়াময় প্রশ্ন-
'ত্রিশ বছর বাঁচিব তো?'
যেন ভালোবাসা কখনও মরে না, শুধু অপেক্ষার
বয়স বাড়িতে থাকে।
৩২. চোখে যেন না নামে বৃষ্টি
সারা আকাশ মেঘে ঢেকে
দিনরাত ঝরুক জল,
নদী ভাসুক, মাঠ ভিজুক,
সবুজ হোক ধরাতল।
বজ্র নামে দূর গগনে,
ঝড় উঠুক অচেনা ক্ষণে,
তবু যেন কাঁপন না লাগে
তোমার স্বপ্নের বাগানে।
সারা বছর বৃষ্টি হোক,
ভিজুক পৃথিবীর সব পথ -
শুধু না ভেজে তোমার চোখ,
সেখানে থাকুক রোদের রথ।
যত কান্না আছে পৃথিবীতে
আমার জানালায় এসে ঝরুক,
তোমার দুটি চোখের ভেতর
শুধু ভালোবাসার আলো ভরুক।
৩৩. জ্যোতির্ময় করো
আমাদের পদচিহ্নে একদিন জেগে উঠেছিল অরণ্য ঘুমন্ত পাতার ভেতর সবুজের গোপন উৎসব। দুপুরের সূর্য নেমে এসেছিল পাহাড়ের কাঁধে, শিলার গায়ে গায়ে আগুনরঙা আলোর আরতি জ্বেলে।
জলপ্রপাত ছুটেছিল উন্মত্ত প্রেমিকের মতো, পাথরের বুকে আঘাত হেনে গেয়েছিল অনন্ত সঙ্গীত, আর আমরা ঝরনার স্বচ্ছ জলে ধুয়ে নিয়েছিলাম পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি।
আজও অরণ্য সবুজের মদিরায় দুলে ওঠে, আজও পাহাড় উষ্ণ হয় সূর্যের গভীর স্পর্শে, আজও বাতাস বয়ে আনে অচেনা ফুলের গন্ধ, আজও ঝরনার জলে আকাশের নীল ভেঙে পড়ে। সময় চলে যায়, তবু প্রকৃতি তার প্রেমপত্র ছিঁড়ে ফেলে না কখনও।
শুধু তুমি নেই, তবু তোমার উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে নদীর জলে, ঘাসের জঙ্গলে , সন্ধ্যার নক্ষত্রে। যেন প্রতিটি ঢেউ তোমার নাম উচ্চারণ করে, প্রতিটি বাতাস তোমার চুলের সুবাস হয়ে আমার নিঃসঙ্গতাকে ছুঁয়ে যায়।
এসো, আমাকে আলিঙ্গন করো নদীর মতো, যেমন নদী দুই তীরের সমস্ত দূরত্ব ভাসিয়ে নেয়। জড়িয়ে ধরো সাগরের মতো, যেমন গভীরতা তার সমস্ত গোপন ব্যথাকে বুকে আশ্রয় দেয়। মিশে যাও মোহনার মতো, যেখানে পৃথক স্রোতেরা ভুলে যায় নিজেদের পরিচয়।
চুম্বন দাও, যেমন ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে দেয় শিশিরভেজা পৃথিবী, যেমন জননীর কোলে ঘুমিয়ে থাকা দেবশিশুর কপালে আশীর্বাদের কোমল স্পর্শ।
এসো বাহুবন্ধনে, আমার সমস্ত অন্ধকারে আলো হয়ে। এসো, আমার রক্তে, আমার স্বপ্নে, আমার অনন্ত প্রতীক্ষায় সূর্যের মতো দীপ্ত হয়ে জ্বলো,এসো, আমার প্রেমকে জ্যোতির্ময় করো।
৩৪. মায়ার ঘুম
সেই চোখ যেদিন প্রথম দেখিলাম, দীঘির জলে তখন সন্ধ্যার আকাশ ভাসিতেছিল, কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে অচেনা এক নীল বিষণ্নতা ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল পৃথিবীর বুকে।
তোমার চোখে ছিল জলের ভাষা, কোনও উচ্চারণ ছিল না, তবু কত শত অব্যক্ত বাক্য ঢেউ হইয়া ভাঙিতেছিল আমার অন্তরে।
মনে হইয়াছিল, তুমি বুঝি বহু জন্মের পথ হাঁটিয়া আসিয়াছ, ক্লান্ত পাখির মতো একটু মায়ার আশ্রয় খুঁজিয়া।
আমি তোমার দিকে তাকাইয়া ছিলাম, তুমি আমার দিকে, মধ্যখানে শুধু কাঁপিতেছিল জ্যোৎস্নাভেজা নীরবতা।
তারপর তুমি কিছুই বলিলে না, শুধু চোখের কোণে একফোঁটা অদৃশ্য শিশির রাখিয়া ধীরে ধীরে ঘুমাইয়া পড়িলে।
আজও সেই ঘুমের শব্দ শুনি, রাত গভীর হইলে, চাঁদের আলো যখন দীঘির জলে নিঃশব্দে ভাঙিয়া পড়ে।
মনে হয়, তুমি এখনও সেখানে আছো, জলরেখার ওপারে, মায়ার ভিতরে, একটি স্বপ্ন হয়ে, যাহাকে ছুঁইতে গেলে জাগিয়া ওঠে শুধু অশ্রুর আলো।
৩৫. রমণী
আমাদের দেহ নদীর মতো,
কখনও নুড়ির নীরবতা, কখনও বালিয়াড়ির দীর্ঘশ্বাস,
কখনও ঝর্ণার উচ্ছ্বাসে রিমঝিম ভেঙে পড়ে
আলোর জল -
এক কূল ভাসে, অন্য কূল প্লাবিত হয়,
তবু প্রেমের উৎস কখনও ফুরায় না।
আমাদের চান্দ্র-চুম্বনগুলি চিকচিকে জলের মতো,
সমুদ্রের শুভ্র ফেনার মতো ক্ষণস্থায়ী
অথচ অনন্ত, আবার হাঙরের দংশনের মতোই গভীর,
তাদের আশ্লেষ লেগে থাকে ঠোঁটে,
চিবুকে, শ্বাসে, রাত্রির সমস্ত নক্ষত্রালোকে।
আমাদের দেহ স্বচ্ছ আয়নার মতো,
বিধৌত চরাচরের মতো নগ্ন ও নিবিড়
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ নিজেরই প্রতিচ্ছবি
হয়ে ফিরে আসে -
আঙুলের আঁচড়ে জেগে ওঠে রক্তিম ফুল,
করুণা থাকে না, মমতা থাকে না -
থাকে শুধু দহন, এবং এক অবিনশ্বর
আত্মসমর্পণের দীপ্তি।
প্রতিক্ষণ আমরা ক্ষত হই,
খুলে যায় সকল বন্ধন, সকল বন্ধনী
উপত্যকা ভেঙে পড়ে,
চাঁদ বিক্ষত হয়, তারারা একে একে নেমে আসে আমাদের বালিশে।
তখন আর জানা যায় না,
কে তুমি, কে প্রেমিকা, কে কুলবধূ,
সব পরিচয় গলে গিয়ে রয়ে যায়
শুধু এক আদিম নারী, আর এক অনন্ত প্রেম,
যার কাছে পৃথিবীর সমস্ত নদী এসে
নিঃশব্দে সমুদ্রে মিশে যায়।
৩৬. রয়েছ তুমি জীবন জুড়ে
তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
আর কোনো শূন্যতা নেই -
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
নিঃসঙ্গতার সব দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যায়।
তুমি আছো বলেই
জানালার ধারে বসে থাকা বিকেলগুলো
অকারণে বিষণ্ন হয় না আর।
আমার প্রতিটি ভোরে
তোমার আলো এসে জড়িয়ে ধরে শিশিরকে,
প্রতিটি রাত্রি
তোমার স্বপ্নের চাঁদে ধুয়ে নেয় ক্লান্ত হৃদয়।
তুমি রয়েছ বলেই
নদী জানে সাগরের ঠিকানা,
বাতাস জানে ফুলের গন্ধের অর্থ,
আর আমি জানি -
ভালোবাসা কখনও শুধু একটি শব্দ নয়।
তোমার দুটি চোখে
আমি আমার ভবিষ্যৎকে শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখি-
যেন বহুদিনের পথচলা শেষে
একটি পাখি ফিরে পেয়েছে নিজের নীড়।
যদি কোনোদিন
সব আলো নিভেও যায় পৃথিবী থেকে,
তবু তোমার মায়ার প্রদীপটুকু
আমার অন্তরে জ্বলতেই থাকবে।
তুমি রয়েছ আমার জীবন জুড়ে,
তাই প্রতিটি ঋতুই আমার কাছে বসন্ত -
তুমি রয়েছ আমার সমস্ত অস্তিত্বে,
আর কোনো শূন্যতা নেই,
তোমার নামের ভেতরই আমার
অনন্ত জীবনের কোমল স্পন্দন।
৩৭. নীলগিরি পাহাড়ে একদিন
নীলগিরি পাহাড়ে আমরা ছিলাম একদিন একরাত-
সেই একদিনই আজও একটি অনন্ত ঋতু,
পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নেমেছিল
নীলচে বিষণ্নতার মতো -
মেঘ এসে তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিল,
যেখানে আকাশও মানুষ হয়ে যায়।
তুমি বলেছিলে,
"যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই,
এই পাহাড় আমাকে মনে রাখবে।"
রাত গভীর হলে
তারাগুলো খুব কাছে নেমে এসেছিল।
মনে হয়েছিল,
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়
অপূর্ণ সব স্বপ্ন।
তোমার হাতের উষ্ণতা
আমার শীতার্ত আঙুলে জড়িয়ে ছিল,
যেন পৃথিবীর সমস্ত শীতের বিরুদ্ধে
একটি অনন্ত প্রতিরোধ।
হঠাৎ দূরের অরণ্যে
কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠল
আমরা দু'জনেই চমকে তাকালাম—
সেই ক্ষণিক ভয়ও
অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হয়ে
আজও বেঁচে আছে স্মৃতির গহিনে।
ভোরে সূর্য উঠেছিল
মেঘের ভাঙা জানালা দিয়ে।
তুমি বলেছিলে -
"দেখো, আলোও কত ধীরে জন্ম নেয়!"
আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম,
কিছু কিছু ভালোবাসাও
এভাবেই আলো হয়ে ওঠে,
তারপর একদিন
অকারণে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।
ফেরার পথে
পাহাড়গুলো আর আমাদের দিকে তাকায়নি,
হয়তো তারা জানত -
যে প্রেম ফিরে আসে না
তার জন্য পথ অপেক্ষা করে না।
যখন কোনো নীল বিকেল নামে,
অথবা মেঘ এসে জানালায় হাত রাখে,
আমি নিঃশব্দে ফিরে যাই
নীলগিরি পাহাড়ের সেই একদিন একরাতে।
সেখানে এখনও
একজোড়া পদচিহ্ন পাশাপাশি আছে -
একটি আমার, আরেকটি তোমার,
শুধু তুমি নেই।
৩৮. এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
এসেছিল সে পূর্ণিমা সন্ধ্যায় -
মন্দাক্রান্তায় রচিত হয়েছিল সে আবেগে অনুরাগে...
চাঁদের শুভ্র আলোয় নুয়ে পড়েছিল কদমের ডাল,
নদীর জলে জেগেছিল নীরব প্রেমের অনুবাদ।
তার চোখে ছিল নীল আকাশের গভীর বিস্ময়,
ঠোঁটে ছিল অপ্রকাশিত কোনো গানের প্রথম কলি।
আমি শুধু শুনেছিলাম -
নিঃশব্দেরও একটি ভাষা আছে,
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় ভালোবাসা।
বকুলের গন্ধ ভেসে এসেছিল বাতাসের গোপন চিঠিতে,
শিউলি ঝরে পড়েছিল আমাদের পায়ের কাছে -
মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সমস্ত ঋতু বুঝি
সেই একটি সন্ধ্যাতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে।
তোমার বাহুর উষ্ণতায়
জ্যোৎস্নাও পেয়েছিল মানবিক হৃদস্পন্দন;
আমার সমস্ত বিষাদ
একটি সাদা পাখির মতো উড়ে গিয়েছিল
দিগন্তের নীল নির্জনতায়।
তারপর কত পূর্ণিমা এলো,
কত নদী বদলালো পথ,
কত নক্ষত্র নিভে গেল নিঃশব্দে -
তবু সেই সন্ধ্যার আলো
এখনও আমার জানালায় এসে বসে,
মৃদুস্বরে তোমার নাম উচ্চারণ করে।
যদি আবার কোনো পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়,
তবে আর কোনো কবিতা লিখব না -
শুধু তোমার চোখের গভীরে মুখ রেখে
আজীবনের সমস্ত অব্যক্ত প্রেম
নীরবে পড়ে শুনব।
৩৯. শূন্যতায় তুমি
আমি সমর্পণ করতে চাই -
তুমি থাকো না-হয় সহস্র আলোকবর্ষ দূরে,
তবু তোমার নামের ক্ষীণ আলো আমার রাত্রির জানালায় এসে নীরবে বসুক।
এ শহর আজ অদ্ভুত ফাঁকা -
রাস্তায় নেমে মনে হলো, ইট-পাথরও যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে, মানুষ আছে, অথচ কোলাহল নেই,
হাসি আছে, অথচ প্রাণ নেই।
জনারণ্যময় রাজপথই আমার বেশি প্রিয় -
সেখানে মানুষের পদধ্বনির ভিড়ে নিজের কান্নার শব্দ হারিয়ে যায়, অগণিত মুখের ভেতর নিজের একাকীত্বটুকুও চুপিচুপি আড়াল করে রাখা যায়।
কিন্তু এই নিস্তব্ধতা -
সে তো হৃদয়ের ভেতর ধীরে ধীরে জন্ম দেয়
এক অনন্ত শূন্যতার মহাকাশ, যেখানে শুধু তোমার অনুপস্থিতির নক্ষত্রেরা জ্বলে।
হে প্রভু, এমন শূন্যতা আমাকে দিও না -
যেখানে প্রার্থনাও প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে,
বরং আমাকে সমর্পণ করো মানুষের ভালোবাসায়, পাখির ডানায় ভেসে আসা সকালের গানে,
বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে,
আর সেই অমলিন আশায় -
যেখানে দূরতম আলোকবর্ষ পেরিয়েও কেউ একজন আমার জন্য একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে।
৪০. অশেষ করেছ
হঠাৎ একদিন শরীর কেঁপে উঠল প্রবল জ্বরে।
সময়ের সমস্ত শব্দ যেন থেমে গেল।
দুই দিন অচৈতন্যের অন্ধকারে ডুবে ছিলাম।
কীবোর্ডে আঙুল ছোঁয়ানোর শক্তিটুকুও ছিল না।
কাউকে কিছু জানাইনি, কেমন এক বিষণ্নতা
আমাকে ঘিরে রেখেছিল।
বারবার মনে হচ্ছিল,
এই বুঝি সৃষ্টিকর্তা আমাকে তাঁর অদৃশ্য ডাকে ফিরিয়ে নেবেন।
কিন্তু না, তিনি নেননি।
এক জোড়া স্নেহময় হাত, অক্লান্ত সেবাযত্ন,
আর অগাধ মমতা আমার নিভে-আসা প্রাণে
আবার আলো জ্বেলে দিল।
মৃত্যুর দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বুঝলাম -
জীবন আসলে প্রতিদিন নতুন করে পাওয়া এক অলৌকিক উপহার।
তখনই অন্তরের গভীর থেকে ভেসে উঠল রবীন্দ্রনাথের সেই অমলিন প্রার্থনা -
“আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব -
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।”
আজ মনে হয়,
আমরা কেউই কেবল নিজের শক্তিতে বেঁচে থাকি না।
অদৃশ্য করুণার স্পর্শে,
কোনো এক মানুষের নিবেদিত ভালোবাসায়,
আর অনন্ত দয়ার ছায়াতেই
জীবন বারবার ফিরে আসে -
নতুন আলোয়, নতুন শ্বাসে, নতুন আশায়।
৪১. জোনাকির নকশা
এইখানে নিঝুম এসে নামে অতর্কিতে গূঢ় রাতদুপুর, চাঁদেরও যেন সাহস হয় না আমার জানালায় কড়া নাড়ার।
নীরবতার বুক চিরে জোনাকিরা বুনে চলে অদৃশ্য আলোর সূক্ষ্ম নকশা, যেন তোমার নামের আদ্যাক্ষর অন্ধকারের ক্যানভাসে লিখে যায়।
শিরা-ধমনী জুড়ে তোমার সেই এক তীব্র স্পর্শ এখনও রক্তের ভেতর ঢেউ তোলে, সমস্ত দেহ যেন অপেক্ষার এক দীর্ঘ নদী।
আমি কতবার ডেকেছি তোমাকে, বাতাসের কাছে, অশ্বত্থের পাতায়, দূর নক্ষত্রের নিভে-আসা আলোয়। উত্তর আসেনি কোথাও, শুধু রাত আরও গভীর হয়েছে।
তবু জানো, হারিয়ে যাওয়াও কখনও কখনও ভালোবাসার আরেকটি ভাষা। যে ভাষা কেবল জোনাকি, শিশির আর মধ্যরাত্রিরা বোঝে।
যদি কোনো এক রাত্রি প্রহরে তুমি ফিরে আসো, তবে দেখবে, আমার বুকের দরজায় এখনও জ্বলে আছে একটি ক্ষুদ্র আলো, যা কোনোদিন নিভতে শেখেনি।
সেই আলোয় আমরা আবার লিখব অসমাপ্ত স্বপ্নের শেষ অধ্যায়, যেখানে বিচ্ছেদ থাকবে, কিন্তু একাকীত্ব থাকবে না, থাকবে শুধু তোমার নামে জেগে থাকা এক অনন্ত জোনাকির নকশা।
৪২. যৌবনের রক্তাক্ত দিন
আমাদের যৌবনের রক্তাক্ত দিনে
নির্মোহ ছিলাম, প্রেমে -
নির্লোভ ছিলাম, বিত্তে -
নির্বোধও ছিলাম, তবু স্বপ্নের কাছে পরাজিত হইনি কখনো।
মুঠোভরা আকাশ নিয়ে হেঁটেছি ধুলোমাখা রাজপথে,
ক্ষুধার চেয়েও বড় ছিল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা।
রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে, তবু আদর্শের রং আজও শুকায়নি,
হারিয়ে গেছে কত নাম, অথচ তাদের প্রতিধ্বনি এখনো বাতাসে জেগে থাকে।
আজ ফিরে দেখি, সেই নির্বোধ যৌবনই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ সময়,
কারণ ভালোবাসতেই জানতাম, আর বিশ্বাস করতে জানতাম পৃথিবীকে।
৪৩. প্রথম কুমুদিনী
যেদিন প্রথম আলো এসে নিঃশব্দে আমার কাঁধে হাত রেখেছিল,
কর্দমের গভীর নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠেছিল একটি সাদা কুমুদিনী।
সেদিনই মনে হয়েছিল -
অদৃশ্য কোনো নিষিদ্ধ আলোর দিকে
আমার ছায়া আগে পৌঁছে গেছে।
চোখে তখনও শিশিরের অনভ্যস্ত ভাষা,
তবু চারদিকের দৃষ্টিরা
আমার আয়নার জল বদলে দিল।
নিজেকে ঢেকে রাখতে শিখলাম -
যেন প্রস্ফুটনও এক গোপন অপরাধ,
যার রায় লেখা থাকে নিঃশব্দতার অক্ষরে।
আমি তো কেবল ফুটেছিলাম -
যেমন ভোর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিজেকে উচ্চারণ করে,
যেমন নদী নিজের দিক জানে না, তবু সমুদ্রের দিকে যায়,
যেমন কাদামাটির অন্তঃস্থলে
অজান্তেই জন্ম নেয় শ্বেতের প্রথম স্বপ্ন।
কিন্তু পৃথিবী ফুলের দিকে তাকায়নি,
তারা দেখেছিল নিজেদের ছায়া,
আর সেই ছায়ার কালিমাই
আমার পাপের নাম হয়ে উঠেছিল।
আজ বহু ঋতু পরে
শুকিয়ে যাওয়া সেই পুষ্করিণীর কিনারে দাঁড়িয়ে
মনে হয় -
কুমুদিনীর কোনো অপরাধ ছিল না;
অপরাধ ছিল সেই চোখের,
যারা নির্মল জলের গভীরেও
অশুভের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফেরে।
তবু আজও,
আমার অন্তর্জলের অন্ধকারে
একটি সাদা ফুল নীরবে ফুটে ওঠে।
সে কোনো স্বীকারোক্তি নয়, কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাও নয়,
সে কেবল প্রকৃতির প্রথম নিঃশ্বাস,
এক নিষ্পাপ হৃদয়ের
নামহীন, অনন্ত প্রস্ফুটন।
৪১. রুদ্রাক্ষের চোখে
তিনি আসেন -
যেন কর্দম ছিঁড়ে ফোটা প্রথম শ্বেত কুমুদিনী,
দেহে কোনো অহংকার নেই,
তবু প্রতিটি পরতে নিভৃতে জেগে থাকে
প্রকৃতির দীর্ঘ সাধনা।
চুড়ো করে বাঁধা চুলের নিচে
কপালের রক্তচন্দন যেন সন্ধ্যাতারার অগ্নিবিন্দু,
সরু রুদ্রাক্ষের মালা
গলার কাছে মন্ত্রের মতো কাঁপে -
মনে হয়, শরীরও বুঝি এক প্রার্থনার ভাষা।
তাঁর গাত্রবর্ণে -
দুধের শুভ্রতা নেই, কৃষ্ণমেঘের গাঢ়তাও নয়,
আষাঢ়ের প্রথম ভোরের মতো
অদ্ভুত এক কোমল আলোকছায়া,
যেখানে হাত রাখলে
হয়তো শিশিরের শব্দও শোনা যায়।
কিন্তু তাঁর চোখ -
হে ঈশ্বর, সেই চোখ দুটি!
হরিণীর চমক, নদীর গভীরতা,
আর মধ্যরাত্রির অব্যক্ত নক্ষত্রলোক -
সব এসে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে।
যে একবার ডুবে যায়,
সে আর নিজের তীরে ফিরতে পারে না।
তাঁর মুখ শিশুর মতো নির্মল,
কিন্তু ওষ্ঠের কোণে জেগে থাকে
অগ্নিশপথের অনমনীয় রেখা -
মনে হয়, প্রেম এলে তিনি ফুল,
বিচ্ছেদ এলে অনড় শিলাখণ্ড।
আমি তাঁকে দেখি -
দেহ নয়, যেন এক মায়াবী উপাসনালয়,
যেখানে স্পর্শেরও আগে
হৃদয় নতজানু হয়ে যায়,
আর সমস্ত কামনা ধীরে ধীরে রূপ নেয়
নির্বাক আরাধনায়।
৪২. প্রেমের কোনো বিধিবিধান নেই
দুই নারী যখন পরস্পরের হাত ছুঁয়ে দাঁড়ায়,
শহরের সমস্ত সাইনবোর্ড হঠাৎ বাতাসে কেঁপে ওঠে।
যেন নিষেধের ভাষাগুলো একে একে ঝরে পড়ে
শিউলি-ফোটা ভোরের মতো নীরবে।
তাদের স্পর্শে কোনো বিদ্রোহের স্লোগান নেই -
আছে কেবল নদীর মতো অনিবার্য এক স্রোত,
যে স্রোত জানে, ভালোবাসা
মানচিত্রের রেখা কিংবা আইনের দাগ মানে না।
আর দূরে, সভ্যতার পোশাক গায়ে জড়ানো
কিছু মানুষ কীবোর্ডে আগুন জ্বেলে লেখে রায়,
তাদের বুকের অদৃশ্য ব্যথা
মিমের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদে।
তবু প্রেম তো সেই প্রাচীন পাখি -
রবীন্দ্রসুরে যেমন উড়ে যায় আকাশের ওপারে,
তেমনি দুই নারীর চোখেও সে বাসা বাঁধে;
কবিতার পাতা ছিঁড়ে নেমে আসে জীবনের উঠোনে।
ভালোবাসা যদি সত্যিই আলো হয়,
তবে সে আলো কার কপালে পড়বে,
কার হাত ছুঁয়ে জ্বলে উঠবে -
সে সিদ্ধান্ত কোনো শহরের নয়,
কেবল হৃদয়ের।
৪৩. কাঠচাঁপার হৃদয়
যমুনার কূলে সেদিন বিকেল নেমেছিল প্রার্থনার মতো, একটি কাঠচাঁপা গাছের নিচে এক যুবকের কোলে ছিল না পৃথিবী,
ছিল একটি মেয়ের সমস্ত নিশ্চিন্ত ঘুম -
কথা ছিল না, শুধু দুটি চোখ একে অপরের ভেতর একটি অনন্ত দেশের মানচিত্র এঁকে যাচ্ছিল।
তারপর তারা চলে গেলে মাটির বুকে রয়ে গেল-
একটি লেখা- সাহানা- রঞ্জন, আর তার পাশে আঁকা একটি ছোট্ট হৃদয়।
হঠাৎ একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে পড়ল
সেই হৃদয়ের ওপর, মনে হলো, যে দেশে ফুল
নামের ওপর নয়, হৃদয়ের ওপর ঝরে পড়ে,
সে দেশে ঘৃণা কখনও শেষ কথা
হতে পারে না।
মানুষের সব পরিচয়ের ওপরে যদি কোনো
উপত্যকা থাকে, তার নাম প্রেম -
আর প্রেমের ওপর যদি প্রতিদিন একটি কাঠচাঁপা ফুল ঝরে, তবে এই মাটি চিরকাল মানুষেরই থাকবে।
৪৪. নক্ষত্রের চোখে জল
সেই কবে
আমার প্রথম যৌবনের মৌবনে
কিছু ফুল ছিল,
ফোটার আগেই তারা ঝরে গেল।
বিদায়ের আগে
দখিনা বাতাসের কানে রেখে গেল একটি বাক্য-
চিরবিরহিণীর দীর্ঘশ্বাসের মতো ধীর,
"তোমার তো একটা বিশ্ব আছে,
আছে অনন্ত আকাশ।
সেখানে তুমি নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে,
তোমার আলোয় ভরে উঠবে চারদিক।"
শুধু একটি সত্য
তাদের অজানাই থেকে গেল -
সব আলো আনন্দ নয়,
কিছু নক্ষত্র
দূর থেকে জ্বলতে জ্বলতে
নিজের অশ্রু
নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখে।
৪৫. শেষ বিকেলের বন্ধুদের জন্য
জীবনের এই অস্তরাগে এসে হঠাৎ মনে হয়-
যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত প্রথম আলোর সেই সরু পথটি, যেখানে বন্ধুত্ব ছিল নামহীন, তবু সবচেয়ে সত্য।
যারা হাত ধরেছিল শৈশব, কৈশোর কিংবা প্রথম যৌবনের দুপুরে, সময়ের দীর্ঘ নদী তাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কোন্ অচেনা মোহনায়।
বিশ, তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ বছরের নীরবতা-
তবু কি তারা কোথাও আমার নামটি একবারও উচ্চারণ করে? নাকি আমিও তাদের স্মৃতির আকাশে একটি ঝরে-পড়া নক্ষত্র মাত্র?
বড়ো ইচ্ছে করে- কোনো এক অলৌকিক সন্ধ্যায় সবাই এসে বসুক একটি পুরোনো বটগাছের ছায়ায়, কারও চুলে রূপোলি ধুলো, কারও চোখে জীবনের গভীর ক্লান্তি, তবু হাসিটুকু থাকুক সেই আগেকার মতোই।
আমরা কেউ কাউকে প্রশ্ন করব না, কে কত হারিয়েছি, কে কত দূরে গিয়েছি, শুধু একবার চোখে চোখ রেখে বলব, "বন্ধু, এতদিন পরেও তুমি আমার ভেতরে বেঁচে আছ।"
তারপর সন্ধ্যা আরও গাঢ় হবে। পৃথিবী আপন নিয়মে অন্ধকারে ঢেকে যাবে। কেবল চোখের কোণে চিকচিক করে উঠবে কয়েক ফোঁটা অশ্রুর আলো - আর মনে হবে, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ বিচ্ছেদও সত্যিকারের বন্ধুত্বকে কখনো সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না।
৪৬. তার কানে কানে
যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি আজও ভাসে
সাঁঝের মলিন গানে।
যে সুরটি জাগেনি আমার বীণার তারে,
সে সুর নীরব হয়ে
কাঁদে হৃদয়-পারে।
মাধবী চলে গেল এক মধুর নিশীথে,
ফেলে গেল চাঁদের আলো
অশ্রুর স্নিগ্ধ স্মৃতিতে।
বকুলের ঝরা ফুল গোপনে যে পথ জানে,
সেই পথ আজও ডাকে
তোমার কানে কানে।
যে নদী হারিয়ে গেছে সুদূর মোহনার দেশে,
তার কলতান রয়ে গেছে
নিভৃত বিরহ-শেষে।
যে পাখিটি উড়ে গেল আকাশের নীল পানে,
সে আর ফিরে এল না
ফাগুনের কোনো গানে।
আজিও সন্ধ্যাতারা জ্বলে নিরালার আকাশে,
বাতাস কেবল তোমারই
নামটি এসে ভাসে।
বীণার ব্যথার সুর ঝরে নীরব অভিমানে—
যে কথাটি বলা হলো না মাধবীর কানে,
সে কথাটি রবে চিরদিন
তোমার কানে কানে।
৪৭. তুমি থাকলেই
আমরা কোনো রূপকথার প্রাসাদ তুলব না
আকাশের কিনারে,
মেঘের সিঁড়ি বেয়ে সুখের দেশে যাব বলেও
শপথ নেব না।
জানি, সব শপথেরই একদিন সন্ধ্যা নামে,
সব আলোরই থাকে নিভে যাওয়ার নিজস্ব সময়।
তাই এসো,
একটি সাধারণ বিকেলের পাশে বসে থাকি
আর যতটুকু স্বপ্ন ভেসে ওঠে,
ততটুকুই আমাদের অনন্ত হোক।
তোমার হাতের উষ্ণতায়
আমি কোনো অলৌকিকতা খুঁজি না,
শুধু চাই, পথ দীর্ঘ হলে
হাতটি যেন আলগা না হয়।
ঝড় এলে জানালাগুলো কেঁপে উঠুক,
বৃষ্টি এসে মুছে দিক উঠোনের সব পদচিহ্ন,
তবু হৃদয়ের ভেতর
একটি প্রদীপ জ্বলে থাকুক -
যার শিখা দেখে আমরা চিনে নেব
এখনও ঘরে ফেরার পথ আছে।
কোনো নিয়তির দরজায় আমরা করুণা
চাইব না, কোনো নক্ষত্রের কাছে
সুখের হিসেবও রাখব না।
যা কিছু হারাবে,
তারও ওপারে যদি একটি বিশ্বাস থেকে যায়,
তবে সেটুকুই হবে আমাদের উৎসব।
একদিন চুলে রুপোলি ধুলো জমবে,
চোখের কোণে নেমে আসবে বহু দিনের ক্লান্তি,
তবু যদি সন্ধ্যার শেষে তুমি মৃদু স্বরে বলো,
আমি আছি তোমারই -
তাহলেই পৃথিবীর সমস্ত অসমাপ্ত গান
পূর্ণ হয়ে যাবে।
৪৮. শেষ আলোর আগে
শেষ বিকেলের ভেজা বাতাসে
আমার সব পথ ধীরে ধীরে নদী হয়ে যায়,
দূর আকাশে কার অচেনা মেঘ
নিঃশব্দে নামিয়ে দেয় বিদায়ের নীল পর্দা।
বকুলের ডালে ঝুলে থাকে
অকথিত দিনের শেষ সুবাস -
ঝরাপাতারাও যেন জানে
ফিরে আসার সব প্রতিশ্রুতি একদিন বৃষ্টিতে মুছে যায়।
আমি আর কোনো আলো চাই না,
শুধু তোমার স্মৃতির ক্ষীণ প্রদীপটি
নিভে যাওয়ার আগে
একবার আমার মুখের দিকে তাকাক।
তারপর যদি রাত নামে,
নামুক শিশিরের নরম পায়ে;
আমার সমস্ত ক্লান্তি
মিশে যাক ভেজা মাটির গন্ধে।
হয়তো দূরের কোনো বাঁশির সুরে
আবার ফুটবে অদেখা প্রভাত,
আর আমি থাকব না -
তবু আমার অস্ফুট ভালোবাসা
কদমফুলের গায়ে গায়ে
তোমার জানালায় ভোর হয়ে ঝরে পড়বে।
৪৯. শেষ প্রহরের গান
দিনের প্রদীপ নিবে আসে ধীরে,
সাঁঝের আরতির ধোঁয়া ভেসে যায় গগনে।
কোন্ অদৃশ্য আহ্বান ডাকে আমাকে
দূর নক্ষত্রের নিস্তব্ধ উপাসনালয়ে।
পৃথিবীর যত সুখ-দুঃখ,
আজ যেন ঝরা শিউলির মতো
নিঃশব্দে ঝরে পড়ে চরণের কাছে
কিছুই আর ধরে রাখিতে সাধ জাগে না।
যে ফুল ফোটেনি, তারও গন্ধ
মিশে আছে আমার নিঃশ্বাসে -
যে গান গাওয়া হলো না,
সে আজ ঈশ্বরের বীণায় বাজে
অশ্রুর অতল রাগিণী হয়ে।
হে করুণাময়ী চিরসাথি,
তোমার মায়ার করুণ স্পর্শে
আমার সমস্ত অভিমান ধুয়ে যাক।
এই ক্ষণিক জীবনের জীর্ণ বসন
তোমার বাতাসে উড়ে যাক দূরে।
যখন শেষ মেঘটিও মিলাবে আকাশে,
শেষ পাখিটিও ফিরবে আপন নীড়ে,
তখন আমায় ডেকো -
শব্দে নয়, আলোতেও নয়,
গভীর নীরবতার সেই অনন্ত সুরে।
৫০. যদি আর দেখা না হয়
চুম্বন চেয়ো না, ঠোঁটের কাছে আজও অসংখ্য অব্যক্ত বিদায় জমে আছে। তার চেয়ে তোমার হাতখানি এক মুহূর্ত আমার হাতে রাখো, যেন সন্ধ্যার শেষ আলো অন্ধকারে মিশে যাওয়ার আগে একবার পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখে।
যদি রৌদ্র বড়ো কঠিন হয়ে ওঠে, আমার স্মৃতির ছায়ায় একটু বসো। আমি তো আর ফিরব না, তবু বাতাসে ভেসে থাকবে তোমার নাম ধরে ডাকা আমার বিদায়ের সুর।
যে স্বপ্নগুলি তোমার চোখে রেখে যেতে চেয়েছিলাম, তারা আজও রাত্রির আকাশে অচেনা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে। তুমি যখন জানালার পাশে একলা দাঁড়াবে, হয়তো তাদের কোনো একটি তোমার চোখের জলে নেমে আসবে।
ভালোবাসা আমাদের একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল না, ছিল পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে দুই ভিন্ন পথের মোড়ে নিঃশব্দে থেমে যাওয়ার নিয়তি।
তবু যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, কোনো ডাক দিও না। আমি তখন হয়তো তোমারই কোনো পুরোনো বিকেলে, ঝরে-পড়া শিউলির গন্ধে, অথবা মেঘমুখর আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসব।
সেদিন একটি দীর্ঘশ্বাসই যথেষ্ট হবে, তার মধ্যেই রয়ে যাবে আমাদের না-বলা সব চুম্বন, না-ফেরা সব পথ, আর এক জীবনের অব্যক্ত ভালোবাসা।