লাবণ্যবতী ( কাব্যগ্রন্থ )
প্রথম প্রকাশ --
উৎসর্গ -
১. লাবণ্যবতী
প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিলাম, মনে হয়নি সে কোনো মেয়ে। মনে হয়েছিল, বাংলার প্রাচীন কোনো নদী হঠাৎ মানুষের শরীর নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তার নাম লাবণ্যবতী।
নামের ভেতর জল ছিল, চোখের ভেতর ছিল ধূসর সন্ধ্যার অচেনা পাখির ডাক, আর চুলের ভেতর বর্ষার প্রথম অন্ধকার।
সে যখন হাঁটত, মনে হতো নদী তার নিজের স্রোত ভুলে সবুজ মাঠের বুক চিরে নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। তার হাসি ছিল জলে ভাঙা চাঁদের আলো, ধরা যায় না, তবু সারারাত পৃথিবীকে ভিজিয়ে রাখে।
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম কি না, আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, তার পাশে দাঁড়ালে আমার সমস্ত ভাষা জলের নিচে ডুবে যেত।
একদিন সে চলে গেল।
কেউ বলল, সে দূর দেশের কোনো মানুষের হাত ধরে অন্য আকাশে চলে গেছে। কেউ বলল, সে কখনো মানুষই ছিল না— বর্ষার শেষে নদীর মতো সময়ের ভেতর মিলিয়ে গেছে।
অনেক বছর পরে এক কুয়াশাভেজা ভোরে আমি একটি বিস্মৃত নদীর তীরে দাঁড়ালাম। গ্রামের বৃদ্ধেরা বলল, এই নদীর নাম লাবণ্যবতী।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, জল আমাকে চিনে ফেলেছে।
ঢেউ এসে আমার পায়ের কাছে এমনভাবে ভেঙে পড়ল, যেমন একদিন তার কেশের গন্ধ এসে আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতাকে ছুঁয়েছিল।
আমি নদীকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি সেই মেয়ে?
নদী কোনো উত্তর দিল না। শুধু কাশবনের ওপর দিয়ে একটি শঙ্খচিল উড়ে গেল, আর ধূসর চাঁদের শেষ আলো জলের ভেতরে নিঃশব্দে ডুবে রইল।
সেই থেকে আজও বুঝে উঠতে পারিনি, লাবণ্যবতী কি নদী হয়ে জন্ম নিয়েছিল, নাকি নদীই একদিন একজন প্রেমিকার রূপ ধারণ করেছিল?
হয়তো মানুষের সমস্ত প্রেমই শেষ পর্যন্ত নদী হয়ে যায়।
অথবা, পৃথিবীর প্রতিটি নদী আসলে এমন এক নারীর দীর্ঘশ্বাস, যাকে কোনো প্রেমিক কখনো সম্পূর্ণভাবে পেতে পারেনি।
২. তোমার মতো মায়া
তোমার মতো কেউ কি এমন মায়া করবে,
চুপচাপ পাশে বসে
আমার সমস্ত গল্পকথা পড়বে?
কেন তুমি চলে যেতে চাও এত দূরে।
তুমি চলে গেলে
বিকেলের রোদে তোমার ছায়া খুঁজব,
বৃষ্টির শব্দে শুনব তোমার নাম,
আর রাত গভীর হলে
জানালার ওপারে চাঁদটাকে জিজ্ঞেস করব -
কোথায় গেলে তুমি?
তুমি জানো না,
কিছু মানুষ চলে যায় না কখনো,
তারা থেকে যায় -
বুকের ভেতর গোপন কোনো ব্যথা হয়ে,
অকারণ মন খারাপের বিকেল হয়ে,
অথবা ঘুমহীন রাতের শেষে
এক ফোঁটা অশ্রুর মতো।
তাই যদি যাও, একবার ফিরে তাকিয়ো -
দেখবে, তোমার পথের ধারে
আমি দাঁড়িয়ে আছি। হয়তো কিছু বলব না,
শুধু চোখের মায়ায় বলব -
যেও না এত দূরে, তোমাকে ছাড়া
আমার পৃথিবীটা বড় একা হয়ে যায়।
৩. আর কী দেখা হবে না
তোমার সাথে কী আর দেখা হবে না?
এই একটি প্রশ্ন
আজকাল আমার সমস্ত দিনের ভিতর
একটি নিঃসঙ্গ পাখির মতো
ডানা ঝাপটায় -
কেউ শোনে না তার শব্দ,
শুধু আমি শুনি।
ভোর হলে মনে হয়, এই বুঝি দরজার ওপাশে
তোমার চেনা পায়ের শব্দ -
কিন্তু দরজা খুলি, দেখি, কেউ নেই।
শুধু ভোরের বাতাস
তোমার অনুপস্থিতির গন্ধ নিয়ে
ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে।
তুমি চলে যাওয়ার পর ঘরটা আর ঘর নেই -
দেয়ালগুলো কেমন অচেনা,
আয়নার ভিতর মানুষটিও অপরিচিত।
যে মানুষটি প্রতিদিন তোমার চোখে
নিজেকে খুঁজে পেত,
আজ সে নিজের কাছেই একজন নির্বাসিত মানুষ।
তোমার পরিধেয় কাপড়গুলো এখনও আলমারিতে,
তোমার প্রিয় কাপটিতে ধুলো জমেছে,
বালিশের একপাশে
এখনও যেন তোমার মাথার উষ্ণতা।
কত আশ্চর্য— মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তার অনুপস্থিতি ঘরের প্রতিটি জিনিসে
আরও গভীর হয়ে থেকে যায়।
রাত নামলে তোমাকে আরও বেশি মনে পড়ে।
জানালার বাইরে চাঁদ ওঠে,
আমি ভাবি— তুমি কি সেই একই চাঁদ দেখছো
কোনো অদৃশ্য জানালার পাশে?
নাকি তোমার ওপারের আকাশে
এখন আর রাত নামে না?
আমাদের কত কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল -
শেষবার তোমার হাত ধরে
কত কথা বলা হয়নি,
কত অভিমান মুছে দেওয়া হয়নি।
জীবন বড় নিষ্ঠুর -
যাকে সারাজীবন পাশে পাওয়ার কথা,
একদিন তাকেই শুধু স্মৃতির ভেতর খুঁজতে হয়।
তোমার সাথে কী আর দেখা হবে না?
যদি কোনো ওপারের আকাশ থাকে,
যদি মৃত্যুরও পরে ভালোবাসা বেঁচে থাকে,
তবে অপেক্ষা কোরো আমার জন্য।
আমি বিশ্বাস করতে চাই -
কোনো এক অনন্ত বিকেলে,
সব পৃথিবীর ক্লান্তি পেরিয়ে,
সব কান্নার ওপারে তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে।
আমাদের নিশ্চয়ই দেখা হবে --
মৃত্যু আমাদের আলাদা করবে না কখনো,
শুধু কিছুদিনের জন্য
একটি দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে
ফেলে রেখেছে মাত্র।
৪. ডুব
ডুব দিতে চাই, ডুবে যেতে চাই -
আমি সাঁতারও জানি,
তবু তোমার চোখের নীল জলে
হারাতে চাই আজ প্রাণখানি।
আমাকে শীতল করো মেয়ে,
তোমার দু’হাতের মায়ায়,
উষ্ণ দুপুর নেমে আসুক
আমাদের আপন ছায়ায়।
তোমার চুলের ঘ্রাণে যেন
বৃষ্টি নামে ধীরে,
তোমার বুকের কাছে এসে
সব ক্লান্তি যাক ফিরে।
তোমার ঠোঁটের তপ্ত আগুনে
জ্বলি একটু, পুড়ি -
তারপর তোমার ভালোবাসায়
শিশির হয়ে ঝরি।
আজ কোনো কথা নয় প্রিয়,
শুধু কাছে এসো -
দুই হৃদয়ের গোপন নদী
এক স্রোতে মিশে যাক।
আমি সাঁতার জানি, তবু
তোমার কাছে হারতে চাই -
ডুবে গিয়ে তোমার মায়ায়
নতুন করে বাঁচতে চাই।
৫. আড়িয়াল খাঁর তীরে
কথা ছিল,
বিয়ে করে এই শহর ছেড়ে
দুজন চলে যাবে অনেক দূরে,
আড়িয়াল খাঁর কূলে
ছোট্ট একটি ঘর হবে তাদের।
বর্ষায় নদী যখন
থইথই করে উঠবে জলে,
জানালার পাশে বসে
দুজন শুনবে বৃষ্টির গান।
নদীর জলে ভাসবে জোছনা,
বৃষ্টির রাতে কদমের গন্ধে
ভরে উঠবে তাদের উঠোন,
আর দুজনের হাতের উষ্ণতায়
শীতের রাতও হয়ে যাবে বসন্ত।
কিন্তু কথা তো সবসময়
নদীর মতো গন্তব্যে পৌঁছায় না।
মেয়েটি সুদূর হাডসন নদীর তীরে
অন্য কারও হাত ধরে হাঁটছে
অপরিচিত শহরের আলোয়
তার চোখে এখন
নতুন কোনো স্বপ্ন জ্বলে।
আর ছেলেটি,
অজ পাড়াগাঁয়ের এক স্কুল শিক্ষক,
প্রতিদিন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের
স্বপ্নের বর্ণমালা শেখায়।
ছুটির বিকেলে নদীর ধারে একা হাঁটে -
কখনো কখনো তার মনে হয়
এই যে মেঘ জমেছে আকাশে,
এই যে বৃষ্টি নামবে একটু পর,
এই যে নদীটা আজও জলের শব্দে কথা বলে --
'তুমি কি কোথাও
হঠাৎ থেমে দেখতে পাও
এখানে একটি ছোট্ট বাড়ি আছে -
দরজায় কদমফুলের গন্ধ ভাসে
জানালায় বৃষ্টির শব্দ,
আর বারান্দায় পাশাপাশি বসে আছে
দুজন মানুষ।'
৬. প্রথম সাদা পাতা
কত স্বপ্ন পড়ে আছে -
জীবনের পুরোনো উঠোনজুড়ে,
কত জীর্ণ স্মৃতির স্তূপ,
যেখানে একদিন বসন্ত এসেছিল
নিঃশব্দ পায়ের শব্দে।
কত স্বপ্ন ভেঙে গেছে
প্রথম প্রহরের অন্ধকারেই,
কত আলোর সিঁড়ি উঠে গিয়ে
হারিয়ে গেছে কোনো অচেনা
অন্ধ গলির মুখে।
তবু মনে হয়,
সকল পাওয়ার সাধ কি তবে
অর্ধেক পৃথিবীর মতোই
চিরকাল অপূর্ণ থেকে যাবে?
যে পথটুকু হাঁটিনি কোনোদিন,
সেই পথের ধুলো কি আজও
আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে?
পুরোনো বাতাসে আজ
আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় -
তবু সেই বাতাসের বুক চিরে
হঠাৎ ভেসে আসে
বহু কালের পরিচিত এক কণ্ঠস্বর,
মনে হয়, কেউ যেন এখনও
দু’হাত বাড়িয়ে বসে আছে
আমার ফিরে আসার অপেক্ষায়।
আমি ফিরে যেতে চাই -
সময় পেরিয়ে, স্মৃতি পেরিয়ে,
সেই অতীতের ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে,
যেখানে অসংখ্য স্বপ্ন নিয়ে
কেউ একজন বসেছিল
দু’হাত পেতে।
আমি আজও খুঁজি
আমার জীবনের হিজিবিজি লেখা পাতাগুলোর ভিড়ে
সেই প্রথম সাদা পাতাটি -
যেখানে কোনো দুঃখ লেখা ছিল না,
কোনো বিচ্ছেদের দাগ ছিল না,
ছিল শুধু কয়েকটি নির্মল স্বপ্ন
আর ভালোবাসার অনন্ত সম্ভাবনা।
পাতাটি রাখা আছে -
চন্দনকাঠের কোনো এক পুরোনো সিন্দুকে,
সময়ের ধুলোয় ঢাকা,
তবু অদ্ভুত যত্নে আগলে রাখা।
সেখানে কত স্বপ্ন তোলা আছে -
কত স্বপ্নের নীল আকাশ,
কত অপ্রকাশিত ভালোবাসা,
কত না-বলা কথা,
আর কত ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের
নিঃশব্দ কাচের টুকরো।
আমি সিন্দুকটি খুলি না -
শুধু দূর থেকে
নির্লিপ্ত দু’চোখ মেলে দেখি।
কারণ জানি,
কিছু স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য নয়,
কিছু স্বপ্ন শুধু
সারা জীবন বুকে বয়ে বেড়ানোর জন্য।
আর কিছু সাদা পাতা -
কখনো লেখা হয় না;
তবু সেখানেই
আমাদের সমগ্র জীবন
সবচেয়ে সুন্দর হয়ে থেকে যায়।
৭. হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প
জীবনের বাঁকে বাঁকে যাকেই কাছে টেনেছি,
সেই কোনো এক অচেনা দূরত্বে হারিয়ে গেছে -
কেউ চলে গেছে অভিমানে,
কেউ সময়ের স্রোতে,
কেউবা নিঃশব্দে মুছে দিয়েছে
আমার নাম তার হৃদয়ের খাতায়।
যাদের ভেবেছিলাম শেষ বিকেলের সঙ্গী হবে,
তারা সবাই একদিন
সন্ধ্যার ছায়ার মতো সরে গেছে;
শুধু তাদের ফেলে যাওয়া মায়াগুলো
আজও আমার ঘরের কোণে কোণে
চুপিচুপি বসে থাকে।
কত মুখ মনে পড়ে -
কত চোখ, কত কথা, কত স্পর্শ,
কত অসমাপ্ত গল্প
আজও বুকের ভেতর কাঁদে।
কেউ কথা দিয়েছিল পাশে থাকবে,
কেউ বলেছিল— 'কখনো যাব না',
অথচ তারাই সবচেয়ে দূরের মানুষ হয়ে
হারিয়ে গেছে সময়ের ওপারে।
আমি শুধু কাছে টানতে চেয়েছিলাম,
একটু মায়া, একটু ভালোবাসা,
একটু আপন করে রাখার আকুলতা—
মানুষ তো নদীর মতো, কখনো কাছে আসে,
কখনো ভাঙন নিয়ে দূরে সরে যায় -
কেউ থাকে না চিরকাল,
শুধু কিছু মানুষ
আমাদের ভেতরে থেকে যায় আজীবন।
৮. অক্ষরে বেঁধে রাখা বেদনা
জীবনের কিছু অনির্বচনীয় বেদনা
চোখের জলে ভেসে যেতে দিই না -
নীরবে বুকের গহিনে লুকিয়ে রাখি,
যেমন সন্ধ্যার আকাশ তার শেষ আলোটুকু
অন্ধকারের কাছে সমর্পণ করে।
কিছু দুঃখ আছে যার কোনো ভাষা হয় না,
কোনো নাম হয় না,
কোনো মানুষের কাছে বসে
সহজ করে বলা যায় না তার কথা।
শুধু গভীর রাতে জানালার পাশে বসে
মনে হয়—
কেউ একজন ছিল,
কেউ একজন নেই,
অথচ তার শূন্যতা
আজও ঘরের প্রতিটি দেয়ালে ঝুলে আছে।
কত হারিয়ে যাওয়া মুখ,
কত অসমাপ্ত কথা,
কত ফিরে না-আসা বিকেল
মনের ভেতর নিঃশব্দে হেঁটে বেড়ায়।
কখনো পুরোনো কোনো গন্ধে,
কখনো বৃষ্টির শব্দে,
কখনো অকারণে থেমে যাওয়া কোনো গানে
তারা ফিরে আসে -
আর আমি চুপ করে থাকি।
কাঁদি না।
কারণ কিছু কান্না চোখ দিয়ে ঝরে না,
তারা শব্দ হয়ে জন্ম নেয়।
কিছু দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশে যায় না,
তারা কবিতার পঙ্ক্তিতে আশ্রয় নেয়।
তাই আমার সমস্ত না-পাওয়া,
সমস্ত হারিয়ে ফেলা,
সমস্ত ভাঙা স্বপ্নের টুকরোগুলো
আমি কুড়িয়ে নিই অক্ষরের ভেতর।
যে কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি,
সেগুলো লিখে রাখি গল্পে,
যে কান্নাগুলো কাউকে দেখাইনি,
সেগুলো রেখে দিই কবিতায়।
আমার গল্পের প্রতিটি চরিত্রে
হয়তো একটু করে আমি আছি,
প্রতিটি কবিতার বিষণ্ণ পঙ্ক্তিতে
লেগে আছে কোনো এক হারানো দিনের ছায়া।
কেউ পড়ে ভাববে -
এ তো শুধু গল্প, এ তো শুধু কবিতা!
কেউ জানবে না -
কত রাতের নিঃসঙ্গতা পেরিয়ে,
কত অশ্রু গোপন করে, কতবার ভেঙে পড়ে
একটি পঙ্ক্তি জন্ম নেয়।
তাই জীবনের কিছু অনির্বচনীয় বেদনা
চোখের জলে ভেসে যেতে দিই না।
তাদের যত্ন করে তুলে রাখি -
অক্ষরের ভাঁজে, স্মৃতির পাতায়,
আমার গল্পে, আমার কবিতায়।
যদি কোনোদিন
আমাকে আর খুঁজে না পাও,
তবে আমার লেখা খুলে দেখো -
হয়তো সেখানে একটি অসমাপ্ত বিকেল,
একটি হারানো মুখ, একটি দীর্ঘশ্বাস
আর আমার সমস্ত না-বলা ভালোবাসা
অক্ষরের ভেতর আজও বেঁচে আছে।
আমি চলে গেলেও
আমার বেদনারা হয়তো থেকে যাবে -
কবিতার মতো, গল্পের মতো,
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো -
নিঃশব্দে, অমলিন হয়ে।
৯. শেষ দেখা
অনেক প্রিয় মানুষ ছিল একদিন -
আমাদের প্রতিদিনের সকাল-সন্ধ্যার ভেতর,
আড্ডার কথায়, হাসির শব্দে,
অকারণ অভিমানে,
অথবা পাশে বসে থাকা একটুখানি বিকেলে।
কেউ ছিল খুব কাছে,
তবু কত অজান্তেই দূরে সরে গেছে
কেউ হাত নেড়ে বলেছিল—
“আবার দেখা হবে,”
অথচ সেই দেখা আর হয়ে ওঠেনি।
কত পথের মোড়ে
হয়তো তাদের সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা হয়ে গেছে
আমরা কেউ জানিনি।
বিদায়ের মুহূর্তটিকে
সাধারণ একটি মুহূর্ত ভেবেই
ফিরে এসেছি নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে।
কেউ চলে গেছে অন্য শহরে,
কেউ অন্য কোনো আকাশের নিচে,
কেউ সময়ের গভীর অন্ধকারে
চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে।
কেউ হয়তো আজও বেঁচে আছে
আমাদের মতোই কোনো জানালার পাশে বসে
পুরোনো দিনের কথা ভাবে,
কিন্তু দেখা করার মতো
কোনো পথ আর খুঁজে পায় না।
কখনো হঠাৎ কোনো গন্ধে,
কোনো গানে, কোনো পুরোনো রাস্তায়,
কিংবা সন্ধ্যার বাতাসে
তাদের মুখ ভেসে ওঠে, মনে হয় -
এই তো, একটু পরেই বুঝি দরজায় কড়া নাড়বে,
বলবে— “কেমন আছো?”
জীবনে কিছু মানুষের সঙ্গে
শেষ দেখা হয়ে যায়
আমরা জানতেও পারি না।
তাই আজও যাদের ভালোবাসি,
তাদের বিদায় দিতে ভয় হয়।
শেষবারের মতো তাকিয়ে থাকি,
কথা একটু বেশি বলি,
হাতটা একটু বেশিক্ষণ ধরে রাখি -
যদি এ-ই হয় শেষ দেখা!
জীবনে কত মানুষের সঙ্গেই
হয়তো আমাদের শেষ দেখা হয়ে গেছে,
অথচ আমরা জানতাম না—
সেদিনই ছিল শেষবার।
১০. অপরাজিত জীবন-রহস্য
যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায়, নক্ষত্রেরা নিভে যায়
একে একে, নদী বদলায় তার পুরোনো পথ,
শহর হারায় তার চেনা মুখ—
তবু কোথা থেকে যেন জীবন ফিরে আসে আবার,
ভাঙা পাথরের বুক চিরে সবুজ ঘাসের মতো।
কত মৃত্যু এসে দাঁড়ায় জীবনের দুয়ারে,
কত বিদায় মিশে যায় অশ্রুর নোনা জলে—
তবু শেষ হয়ে যায় না কিছুই,
অন্ধকারের গভীরতম গর্ভে কোনো এক ভোর
নিঃশব্দে জন্ম নেয়।
যে স্বপ্ন একদিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল,
তারই কোনো অদৃশ্য বীজ বহু বছর পরে
হৃদয়ের নির্জন মাটিতে আবার অঙ্কুরিত হয়,
যে ভালোবাসা ভেবেছিলাম চিরতরে হারিয়ে গেছে,
সে-ই কখনো বাতাস হয়ে ফিরে এসে
ছুঁয়ে যায় কপাল।
মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়,
স্মৃতিরাও একদিন সন্ধ্যার মতো অস্পষ্ট হয়,
তবু জীবনের গোপন নদী থামে না কোথাও,
অদৃশ্য কোনো স্রোতে সে বহন করে চলে
আমাদের সমস্ত কান্না, সমস্ত অসমাপ্ত স্বপ্ন।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য মহিমা -
ধ্বংসের ভেতর থেকেও সে নির্মাণের গান গায়,
শূন্যতার বুকেও রেখে যায় পূর্ণতার আভাস।
তাই যুগে যুগে যখন মনে হয়—
সব শেষ, সব আলো নিভে গেছে,
ঠিক তখনই অচেনা কোনো ভোরে
একটি পাখি ডেকে ওঠে,
একটি ফুল গোপনে ফোটে,
একটি হৃদয় আবার ভালোবাসতে শেখে।
আর তখন বুঝি,
জীবন আসলে পরাজিত হয় না কখনো,
সে শুধু কিছুদিন অন্তরালে থাকে,
তারপর আরও অপূর্ব মহিমায় আবার আত্মপ্রকাশ করে—
যেন অনন্তের বুক থেকে
নেমে আসা কোনো মায়াময় আলো।
১১. চাঁদের সুবাস
শরীরে চাঁদের সুবাস মেখে
জড়িয়ে নিয়েছিলাম তাকে,
সারারাত আমরা ভিজেছিলাম জ্যোৎস্নায় -
মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে,
শুধু আমাদের জন্য আকাশে জেগে আছে চাঁদ।
তার চুলে মুখ রেখে
আমি শুনেছিলাম রাতের গান
কত কথা যে বলা হয়নি,
কত কথা শুধু চোখের ভেতর দিয়ে
একে অন্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল -
তার কোনো হিসাব নেই।
জোনাকির নীল আলোয়
আমি বারবার দেখছিলাম তাকে -
তার মুখে তখন এমন এক মায়া,
যেন বহুদিনের হারানো কোনো স্বপ্ন
হঠাৎ মানুষের রূপ নিয়ে
আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
দূরে কোথাও রাতজাগা পাখি ডাকছিল,
বাতাসে ভেসে আসছিল শিউলির গন্ধ -
সে খুব কাছে ছিল,
তবু তাকে ছুঁয়ে আমার মনে হচ্ছিল
সে বুঝি কোনো এক অলৌকিক জগতের মানুষ,
যাকে ছুঁয়ে থাকা যায়,
কিন্তু কোনোদিন পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
সেই রাতে তার চোখে
আমি আমার সমস্ত অসমাপ্ত জীবন দেখেছিলাম -
যে ভালোবাসাগুলো হারিয়ে গেছে,
যে কথাগুলো বলা হয়নি,
যে পথগুলো আমাদের কোথাও নিয়ে যায়নি -
সবকিছু যেন এসে
তার চোখের গভীরে আশ্রয় নিয়েছিল।
কিছু রাত থেকে যায়,
মনের খুব গোপন কোনো ঘরে -
বহু বছর পরও চোখ বন্ধ করলে
আমি সেই রাতটিকে দেখতে পাই,
তাকে দেখতে পাই,
আর অনুভব করি—
আমার শরীরে এখনও চাঁদের সেই সুবাস লেগে আছে,
আর জোনাকির নীল আলোয়
আমি এখনও নিঃশব্দে তাকেই দেখে চলেছি।
১২. ভালো থেকো
ভালো থেকো নক্ষত্রভরা রাতে,
যখন আকাশের নীল অন্ধকারে
একটি একটি করে জ্বলে উঠবে
হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতির মতো তারা।
ভালো থেকো আঁধার কালো রাতে,
যখন চারপাশ ঘুমিয়ে যাবে নিঃশব্দে,
ভালো থেকো নবমীর দিনে,
শিউলির গন্ধে ভরে উঠুক তোমার সকাল।
ভালো থেকো দুর্যোগে, দুর্ভিক্ষে,
ঝড়ের রাতে ভাঙা ঘরের পাশে,
যখন পৃথিবী তার সমস্ত আলো হারিয়ে
মানুষের চোখে একটু আশার প্রদীপ খুঁজবে।
ভালো থেকো অচেনা শহরের ভিড়ে,
ভালো থেকো একলা ফেরার পথে,
ভালো থেকো স্টেশনের শেষ ট্রেনে,
যে ট্রেন কোনোদিন তোমাকে আমার কাছে আনবে না।
ভালো থেকো শরতের সাদা মেঘে,
হেমন্তের নবান্নের গন্ধে,
ভালো থেকো বসন্তের প্রথম কোকিলে,
বর্ষার ভেজা দুপুরের দীর্ঘশ্বাসে।
ভালো থেকো যখন কেউ তোমাকে
আমার কথা মনে করিয়ে দেবে,
চুপ করে থেকো—
কোনো উত্তর দিতে হবে না;
ভালো থেকো সব হারানোর পরেও,
ভালো থেকো শেষ বিদায়ের পরেও,
যে ভালোবাসা তোমার কাছে পৌঁছাতে পারেনি
তার জন্য কোনোদিন মন খারাপ কোরো না।
ভালো থেকো,
খুব ভালো থেকো—
আমার না-হওয়া জীবনের
সবচেয়ে সুন্দর মানুষ হয়ে।
১৩. এই আকাশ শুধু তুমিময়
এই আকাশ শুধু তুমিময়,
এই বাতাসে তোমার দূরাগত পায়ের শব্দ বাজে -
মনে হয়, কত দূরের কোনো পথ পেরিয়ে
তুমি বুঝি আবার আমার কাছে ফিরে আসছো।
এই শ্রাবণ-বৃষ্টিতে
যেন তোমার চোখের জলের ধ্বনি শুনি;
প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা এসে জানালার কাচে
তোমার না-বলা কথাগুলো লিখে যায়।
ভেজা কদমফুলের গন্ধে
হঠাৎ তোমার চুলের ঘ্রাণ পাই,
দূরের মেঘের গর্জনে শুনি
তোমার অভিমানের গোপন স্বর।
জোনাকির ক্ষীণ আলোয়
কখনো মনে হয়, তুমি দাঁড়িয়ে আছো
আমার একলা উঠোনের শেষ প্রান্তে -
চোখে তোমার সেই চেনা মায়া,
ঠোঁটে একটুখানি অসমাপ্ত হাসি।
রাত যত গভীর হয়,
ততই তোমার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে -
চাঁদের আলোয়, বৃষ্টির শব্দে,
নিঃশব্দ ঘরের একাকিত্বে
তুমি যেন আরও কাছে এসে বসো।
শুধু হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব,
এমন এক অলীক দূরত্বে
সারারাত তোমাকে অনুভব করি।
আর ভোর হলে দেখি,
আকাশে বৃষ্টি নেই,
জানালার পাশে তুমি নেই,
শুধু ভেজা বাতাসে রয়ে গেছে
তোমার পায়ের শব্দ,
আর আমার বুকের ভেতর
তোমাকে হারানোর সেই পুরোনো মায়া।
১৪. পৃথিবীর পুণর্জন্ম
পৃথিবী একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে—
সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসবে শেষ ঢেউ,
আকাশের নীল ধুয়ে যাবে ধূসর ধুলোয়,
নিভে যাবে শহরের সমস্ত আলো,
মানুষের কণ্ঠ, পাখির গান, শিশুর হাসি—
সবকিছু একদিন মিশে যাবে। মহাশূন্যের অন্ধকারে।
তারপর—
কত সহস্র বছর পরে
সেই বিরাণ পৃথিবীর কোনো এক অচেনা মাটিতে
হয়তো বুঁদবুঁদ করে উঠবে কোনো প্রাণ।
কে হবে সে?
কোনো পাখি?
কোনো অরণ্যচারী জীব?
কোনো সরীসৃপ,
যে একদিন ধুলো সরিয়ে
প্রথমবারের মতো তাকাবে মৃত আকাশের দিকে?
নাকি—
সেই নতুন প্রাণ হবে মানুষের?
যদি মানুষের হয়,
তবে কোন্ দুইটি প্রাণ
মাটির গভীর অন্ধকার ভেদ করে
আবার উঠে আসবে পৃথিবীর আলোয়?
আমি ভাবি—
হয়তো তুমি আর আমি।
হয়তো কোনো এক অনন্ত ভোরে
পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে দুটি উষ্ণ হাত
আস্তে আস্তে মাটি সরাবে,
দুটি চোখ প্রথমবার দেখবে
নীল আকাশের অবশিষ্ট সামান্য নীল,
আর আমরা বিস্ময়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে
চিনে নেব বহু জন্মের পুরোনো ভালোবাসা।
তারপর তুমি বলবে—
“এই পৃথিবী কি আমাদের?”
আমি বলব—
“ছিল না,
এবার থেকে হবে।”
আমরা আবার গড়ব একটি আবাস—
ধ্বংসস্তূপের পাশে ছোট্ট একটি ঘর,
জানালার বাইরে দু-একটি বৃক্ষ,
দূর আকাশে উড়বে অচেনা পাখি,
আর সন্ধ্যা নামলে তুমি আমার পাশে বসে
শুনবে পৃথিবীর নতুন হৃদস্পন্দন।
কোনো ধর্ম থাকবে না,
থাকবে না বিভাজনের রেখা,
থাকবে না যুদ্ধের পতাকা,
থাকবে না মানুষের অহংকার—
শুধু থাকবে দুটি প্রাণ,
একটি পৃথিবী,
আর ভালোবাসার জন্য একটি দীর্ঘ, অনন্ত সময়।
সেদিন হয়তো
পৃথিবী আবার জন্ম নেবে—
আমাদের দুজনের চোখের ভেতর দিয়ে।
সেদিন প্রাণের সঙ্গে প্রাণের মিলন হবে,
মাটির সঙ্গে আকাশের,
নিঃসঙ্গতার সঙ্গে ভালোবাসার।
আর মহাবিশ্বের অসীম নীরবতার মধ্যে
হয়তো প্রথমবার দুটি মানুষের হৃদয়
একসঙ্গে বলে উঠবে—
“আমরা ফিরে এসেছি, আবার পৃথিবী গড়তে।”
১৫. যে চিঠি কখনো পাঠানো হয়নি
অনেক রাত পেরিয়ে একদিন
হঠাৎ মনে হলো -
তোমাকে কিছু বলা দরকার।
কী বলা দরকার, তা জানতাম না,
তবু বুকের ভেতর
একটি পুরোনো দরজা খুলে গেল।
জানালার পাশে বসে
চাঁদের আলোটুকু তুলে রাখলাম কাগজে,
দূরের বাঁশবাগান থেকে
এক মুঠো বাতাস এনে দিলাম শব্দের সঙ্গে,
আর নদীর জলে ভেসে যাওয়া
কয়েকটি অচেনা নৌকার নাম
লিখে রাখলাম তোমার জন্য।
তারপর দেখলাম -
কাগজে জায়গা ফুরিয়ে যাচ্ছে,
অথচ তোমাকে বলা কথাগুলো
ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
তাই লিখলাম -
তোমার জন্য আমি কোনো ফুল রাখিনি,
ফুল ঝরে যায়,
কোনো তারাও রাখিনি,
তারাও একদিন নিভে যায়।
শুধু রেখেছি
একটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা,
যেখানে কেউ কারও কাছে
কিছু চাইবে না,
শুধু পাশাপাশি বসে থাকবে
নিস্তব্ধতার ভেতর।
রেখেছি একটুখানি শরৎ,
কাশফুলের দোলায়
যেখানে তোমার নাম উচ্চারণ না করেও
তোমাকে মনে পড়বে।
আর রেখেছি
একটি অসমাপ্ত পথ -
যে পথের শেষ কোথাও নেই,
তবু সন্ধ্যা নামলেই মনে হবে,
এই তো তুমি আসছো
দূরের আলো পেরিয়ে।
চিঠিটা শেষে ভাঁজ করতে গিয়ে
হঠাৎ থেমে গেলাম।
ভাবলাম,
তোমাকে পাঠাব কেন?
তুমি তো জানোই না
কতবার তোমার অনুপস্থিতির সঙ্গে
আমি কথা বলেছি,
কতবার রাতের কাছে
তোমার খবর চেয়েছি,
কতবার ভোরের প্রথম পাখিটাকে দেখে
মনে হয়েছে -
আজ বুঝি তুমি ফিরবে।
তাই চিঠিটা পাঠাইনি।
পুরোনো একটি বইয়ের ভেতর
লুকিয়ে রেখেছি যত্ন করে।
হয়তো কোনোদিন কেউ বইটি খুলবে,
হলুদ হয়ে যাওয়া পাতার ভাঁজে
একটি অচেনা চিঠি পাবে,
আর পড়তে পড়তে বুঝবে—
কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না,
তবু তাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ জীবন
নিঃশব্দে লিখে ফেলা যায়।
আর কিছু ভালোবাসা
কখনো কারও কাছে পৌঁছায় না -
তবু তারা চাঁদের মতো থেকে যায়,
দূরে থেকেও
সারারাত আলো দিয়ে যায়।
১৬. তোমাকে ছুঁয়ে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখ আমার হাত,
চেয়ে চেয়ে দেখ আমার চোখ,
মন দিয়ে মন নাও—
প্রেম দিয়ে প্রেম।
গোপনে গোপনে কাছে এসো,
শ্বাসে শ্বাসে মিশে যাক সন্ধ্যা,
অভিমানের সব দরজা খুলে
আমায় একটু আপন করে নাও।
চোখের ভাষা চোখে পড়ো,
ঠোঁটের ভাষা ঠোঁটে শোনো,
অস্পষ্ট যে কথারা জমে আছে—
মায়া দিয়ে তাদের অর্থ বোঝো।
জোছনায় জোছনা মেখে দিও,
বৃষ্টিতে বৃষ্টির মতো ভিজিও,
আমার একাকী রাতের পাশে
মায়াবী কোনো স্বপ্ন হয়ে থেকো।
আঙুলে আঙুল রাখো ধীরে,
হৃদয়ে হৃদয় রাখো,
হারিয়ে গেলে তোমার মাঝে
আমায় আর খুঁজতে চেয়ো না।
তুমি হয়ে এসো আমার ঘুম,
আমি হয়ে থাকি তোমার স্বপ্ন,
তোমার সমস্ত নীল আকাশে
আমার জন্য একটুখানি চাঁদ রেখো।
কাছে এসে কিছু বলো না—
শুধু তাকিয়ে থেকো নিরন্তর,
তোমার চোখের তারায় তারায়
আমি ডুবে যাই গভীরতর।
যদি ভালোবাসো, তবে এমন করে—
যেন শেষ নেই এই পথের,
যেন তুমি আর আমি মিলে উড়াই
দীর্ঘ এই প্রেমের জয়রথের।
১৭. আনন্দ কাব্য
এই বিশাল মহাজগতের বুকে
কত নক্ষত্র, কত অন্ধকার, কত অনন্ত বিস্ময় -
তারই মাঝে ছোট্ট একটি পৃথিবী,
আর সেই পৃথিবীর বুকে
আমার এই ক্ষণিকের জীবন।
জানি,
এই জীবনের পথে দুঃখের ছায়াই বেশি,
কখনো ঝড়ে ভাঙে স্বপ্ন,
কখনো অশ্রু এসে ভিজিয়ে দেয় চোখ -
তবু আমি দুঃখের কাছে
আমার সমস্ত আনন্দ সমর্পণ করি না।
আমি বরং রোদ্দুরের দিকে তাকাই -
ঝলমলে সেই সোনালি রোদে
খুঁজে নিই বেঁচে থাকার উৎসব।
ভোরের পাখির কলকাকলিতে
শুনি জীবনের নতুন আহ্বান,
গাছের পাতায় হাওয়ার দোলনে
শুনি অদৃশ্য কোনো বাঁশির সুর।
রিমঝিম বৃষ্টির গান নামে যখন,
আমি জানালা খুলে দাঁড়াই,
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায়
ছুঁয়ে দেখি পৃথিবীর নির্মল আনন্দ।
নদীর পাড়ে বসে
শীতল বাতাস যখন চুল উড়িয়ে যায়,
মনে হয়—
এই তো জীবন, এই তো বেঁচে থাকার
অপার সৌন্দর্য!
ভোরের খোলা হাওয়ায়
বুকভরে নিই কয়েক মুহূর্তের নির্মল শ্বাস,
মনে হয় - আর কী চাই মানুষের?
একটু আলো, একটু বাতাস,
কয়েকটি পাখির গান,
একটি নদীর পাশে বসে থাকা,
আর প্রিয় কোনো মুখের মায়াভরা হাসি।
আমি জানি, এই জীবন দীর্ঘ নয়—
একদিন সন্ধ্যা নামবে,
আকাশের শেষ আলোটুকুও
ধীরে ধীরে নিভে যাবে।
তবু যতদিন আছি,
আমি জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো
দুই হাত ভরে কুড়িয়ে নেব।
কারণ জীবন মানেই শুধু কান্না নয়,
জীবন মানে রৌদ্রের নিচে দাঁড়িয়ে
আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারা;
জীবন মানে বৃষ্টির শব্দে মন ভিজিয়ে নেওয়া;
জীবন মানে বাতাসের স্পর্শে
হঠাৎ অকারণে ভালো লেগে যাওয়া।
এই বিশাল মহাজগতে
আমার অস্তিত্ব হয়তো এক ক্ষুদ্র ধূলিকণা -
তবু এই ক্ষুদ্র জীবনটুকু
আমি ভালোবাসায় ভরে রাখতে চাই।
যতদিন পৃথিবীর আলো দেখি,
যতদিন পাখিরা গান গায়, যতদিন নদী বয়ে যায়,
যতদিন ভোরের বাতাস আমার বুক ছুঁয়ে যায় -
ততদিন আমি বলব,
দুঃখ যতই থাক, জীবন তবু সুন্দর।
ক্ষণিক হলেও— এই জীবন
আমার,
এই আনন্দও আমার।
১৮. আত্মার সাথে আত্মার মিলন
তোমার সাথে আমার দেখা -
শুধু দুটি চোখের দেখা নয়,
এ যেন বহু জন্মের কোনো অচেনা পথ
হঠাৎ এসে মিশে গেছে একই ঠিকানায়।
তোমাকে ছুঁতে গিয়ে
আমি স্পর্শ করি আমারই গভীরতম সত্তা,
তোমার চোখের পাতায় শুনি
আমার অপ্রকাশিত কথাদের প্রতিধ্বনি।
আমাদের মাঝে দূরত্ব থাকুক,
থাকুক আকাশজোড়া নীরবতা -
তবু তুমি আমার খুব কাছে,
যেমন নিঃশ্বাসের কাছে প্রাণ,
যেমন রাতের কাছে চাঁদের আলো।
তোমার হাতটি হাতে নিলে
মনে হয়, এ হাত তো নতুন নয় -
কত জন্ম আগে কোনো এক সন্ধ্যায়
এ হাতেই রেখে গিয়েছিলাম
আমার সমস্ত ভালোবাসা।
তাই তোমাকে ভালোবাসা
শুধু হৃদয়ের কোনো ক্ষণিক আবেগ নয়,
এ যেন আত্মার সঙ্গে আত্মার
অদৃশ্য এক চিরন্তন চুক্তি -
যেখানে কোনো ভাষা লাগে না,
কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয় না।
তুমি থাকো আমার একাগ্রতার ভেতর,
আমি থাকি তোমার প্রার্থনায়;
পৃথিবী আমাদের আলাদা করে রাখলেও
দুটি আত্মা কি কখনো আলাদা থাকে?
যদি একদিন সব আলো নিভে যায়,
সব পরিচয় মুছে যায় সময়ের পাতায়,
তবুও কোনো অদৃশ্য মহাকাশে
তোমার আত্মা চিনে নেবে আমার আত্মাকে -
আর আমরা আবার মিলিত হবো,
দুটি নদীর মতো,
দুটি নক্ষত্রের মতো,
দুটি অনন্ত ভালোবাসার মতো।
সেদিন আর কোনো শরীর থাকবে না,
থাকবে না কোনো দূরত্ব, কোনো ভয় -
শুধু তুমি আর আমি,
আর আমাদের ভালোবাসার সেই চিরন্তন মুহূর্ত -
যেখানে আত্মার সাথে আত্মার মিলন হয়।
১৯. ফিরে আসো অন্য গল্পে
শেষ লাইনে এসে থেমে যাই -
কলম থামে, গল্প থামে না;
শব্দেরা নিঝুম হয়ে যায়
তবু কোথাও এক অদৃশ্য নদী
বয়ে যায় অবিরাম।
কাহিনির শেষ পৃষ্ঠায়
তোমাকে বিদায় দিতে গিয়েও দেখি -
তুমি দাঁড়িয়ে আছো
আমার অসমাপ্ত বাক্যের ভেতর,
চোখে তোমার সেই চিরচেনা আলো।
আমি ভাবি, এই তো শেষ -
আর কোনো কথা নেই,
আর কোনো দেখা নেই,
আর কোনো গল্প নেই আমাদের।
কিন্তু জীবন কি কখনো
শেষ লাইনে এসে শেষ হয়?
শেষ শব্দটির পরেও থেকে যায় তোমার গন্ধ,
জানালার পাশে সন্ধ্যার হাওয়া,
দূর কোনো বাঁশির বিষণ্ণ সুর,
আর বুকের গভীরে অমীমাংসিত ভালোবাসা।
তখন তুমি ফিরে আসো -
আগের তুমি নও, অন্য কোনো রূপে,
অন্য কোনো ঋতুর মেঘ হয়ে,
অন্য কোনো ভোরের আলো হয়ে,
অথবা নিঃশব্দ কোনো স্বপ্নের ভিতর।
আমি আবার কলম তুলে নিই।
নতুন পৃষ্ঠা খুলি,
নতুন করে তোমার নাম লিখি -
আর বুঝতে পারি,
যে গল্পটিকে শেষ ভেবেছিলাম,
সেটিই আসলে
আরেকটি গল্পের প্রথম লাইন।
তাই গল্প শেষ হয় না কখনো -
শুধু চরিত্রেরা বদলে যায়,
সময় বদলে যায়,
জীবন তার পোশাক পাল্টায়।
আর তুমি -
আমার প্রতিটি শেষ লাইনের পরে
আরও একবার নতুন কোনো গল্প হয়ে
আমার কাছে ফিরে আসো।
২০. উমরাও জান :
যে নারীটি ভালোবাসা চেয়েছিল
উমরাও জানের কথা মনে হলে আমার লখনউয়ের কোনো কোঠার কথা মনে পড়ে না -
মনে পড়ে একটি মেয়ের কথা।
একটি খুব সাধারণ মেয়ে, যার একদিন একটি বাড়ি ছিল, উঠোন ছিল, মায়ের গন্ধ ছিল, সন্ধ্যার আজান ছিল, আর ছিল এমন কিছু স্বপ্ন—যেগুলোর কোনো দাম বাজারে লেখা থাকে না।
তার নাম তখন উমরাও জান ছিল না।
ছিল আমিরান।
কেউ একজন তাকে একদিন তার শৈশব থেকে তুলে নিয়ে গেল।
মানুষ কখনও কখনও মানুষকে শুধু অপহরণ করে না—তার সময়কেও অপহরণ করে, তার ভবিষ্যৎকে অপহরণ করে, তার স্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়।
তারপর তাকে সাজানো হলো।
নাচ শেখানো হলো, গান শেখানো হলো, কবিতা শেখানো হলো।
তার চোখে কাজল পরানো হলো, ঠোঁটে রঙ লাগানো হলো, পায়ে পরানো হলো ঘুঙুর।
সবাই চাইল সে সুন্দর হোক।
কেউ জানতে চাইল না -
সে সুখী কি না।
অদ্ভুত এই পৃথিবী।
একজন নারীর সৌন্দর্যকে সবাই দেখতে পায়,
কিন্তু তার ভিতরের ক্ষত দেখতে পায় না।
উমরাও নাচত।
তার ঘুঙুরের শব্দে রাত জেগে থাকত শহর।
পুরুষেরা তার দিকে তাকিয়ে প্রেমের কথা বলত, কবিতা বলত, আকাঙ্ক্ষার কথা বলত।
কিন্তু সে যখন একা হয়ে যেত,
তখন কারও জন্য গান গাইত না।
নিজের জন্য গাইত।
হয়তো সেই গানেই ছিল তার হারানো শৈশব,
মায়ের মুখ,
একটি অচেনা উঠোন,
আর সেই প্রশ্ন -
“আমাকে কি কেউ কোনোদিন আমার নাম ধরে ডাকবে?”
তারপর প্রেম এলো।
প্রেম কখনও কখনও মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে না;
সে আসে একটি নতুন স্বপ্নের মতো,
তারপর চলে যায় একটি পুরোনো ক্ষতের মতো।
নবাব সুলতান যখন তার জীবনে এল, উমরাও হয়তো প্রথমবার বিশ্বাস করেছিল -
কেউ তাকে কিনতে আসেনি,
কেউ তার গান শুনতে আসেনি,
কেউ তার শরীরের কাছে আসতে আসেনি -
কেউ একজন শুধু তার পাশে বসতে চায়।
এই সামান্য চাওয়াটুকুই তো ছিল তার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা।
সে হয়তো ভেবেছিল -
একদিন ঘুঙুর খুলে রাখবে,
গয়না খুলে রাখবে,
মেহফিলের আলো নিভে যাবে,
আর কোনো এক ছোট্ট ঘরে
সন্ধ্যার পর দুজন মানুষ পাশাপাশি বসে থাকবে।
কিন্তু সমাজের কিছু দরজা
ভালোবাসার জন্যও বন্ধ থাকে।
সেখানে বংশের পরিচয় লাগে,
সম্মানের পরিচয় লাগে,
অর্থের পরিচয় লাগে -
শুধু হৃদয়ের পরিচয় যথেষ্ট নয়।
তাই প্রেমও তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করল না।
উমরাও আবার ফিরে গেল আলোয় -
যে আলো আসলে অন্ধকারকে আরও স্পষ্ট করে।
তারপর আরও কিছু মানুষ এল,
কিছু সম্পর্ক এল,
কিছু স্বপ্ন এল -
এবং একে একে সবাই চলে গেল।
শুধু উমরাও রয়ে গেল।
এই থেকে যাওয়াটাই হয়তো তার সবচেয়ে বড় শাস্তি।
কারণ চলে যাওয়া মানুষটি বেঁচে যায় স্মৃতির মধ্যে,
আর যে থেকে যায় -
সে প্রতিদিন একই স্মৃতির ভিতর একটু একটু করে মরে।
কত রাত সে আয়নার সামনে বসেছিল কে জানে।
নিজেকে দেখত।
তারপর হয়তো মনে হতো -
এই মুখটা কি সত্যিই আমার?
এই চোখ দুটো কি আমার?
এই ঠোঁটে যে হাসি -
এটা কি আমার,
নাকি অন্যের আনন্দের জন্য শেখানো একটি অভিনয়?
একদিন হয়তো আয়নার মানুষটিকে দেখে সে বুঝেছিল -
তার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানুষ এসেছে,
কিন্তু সবচেয়ে কম মানুষ তাকে চিনেছে।
সবাই উমরাও জানকে চেয়েছে।
কেউ আমিরানকে চায়নি।
এইখানেই তার সমস্ত বিষাদ।
আজ এত বছর পরও
কোনো এক নিঃশব্দ রাতে
যখন দূর থেকে কোনো গজলের সুর ভেসে আসে,
আমার মনে হয় -
উমরাও জান এখনও কোথাও বসে আছে।
তার পায়ের কাছে পড়ে আছে পুরোনো ঘুঙুর।
চুলে আর ফুল নেই।
চোখের কাজল মুছে গেছে।
মেহফিল শেষ।
সবাই চলে গেছে।
শুধু জানালার বাইরে চাঁদটি দাঁড়িয়ে আছে।
সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলে -
“আমি তো খুব বেশি কিছু চাইনি।
আমি শুধু চেয়েছিলাম,
কেউ একজন আমাকে আমার সৌন্দর্যের জন্য নয়,
আমার দুঃখের জন্য ভালোবাসুক।”
কেউ উত্তর দেয় না।
চাঁদও না।
রাত আরও গভীর হয়।
আর উমরাও জান বুঝতে পারে -
কিছু প্রেম মানুষের জীবনে আসে
পাওয়ার জন্য নয়,
চিরকাল না-পাওয়ার একটি সুন্দর ব্যথা হয়ে থাকার জন্য।
তাই আজও তার গল্প শেষ হয়নি।
কারণ কিছু নারী ইতিহাসে বেঁচে থাকে না,
বেঁচে থাকে মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।
উমরাও জানও তেমনই এক দীর্ঘশ্বাস।
একজন নারী -
যাকে সবাই দেখেছিল,
কিন্তু খুব অল্প মানুষই
তার ভিতরের মানুষটিকে দেখেছিল।
আর হয়তো তার শেষ গজলটি ছিল এই -
“আমার ঘুঙুরের শব্দ শুনে মুগ্ধ হয়ো না,
শুনতে পেলে আমার নীরবতাটুকুও শুনো।
আমি যে নারী হয়ে জন্মেছিলাম,
তার চেয়েও বড় কথা—
আমি একজন মানুষ ছিলাম।
আমারও একটি হৃদয় ছিল।
সেখানে একজনের জন্য
একটি ছোট্ট ঘর ছিল।
দুঃখ শুধু -
কেউ কোনোদিন
সেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়নি।”
২১. সউদ, তুমিও চলে গেলে বন্ধু!
তোমার সঙ্গে আর একবার দেখা হওয়ার কথা ছিল—
কত কথা জমে ছিল, কত স্মৃতি ফিরে দেখার ছিল,
কত পুরোনো দিনের মতো পাশাপাশি বসে
আরেকবার হাসার কথা ছিল আমাদের।
কিন্তু জীবন বড় নিষ্ঠুর;
সে কাউকে শেষ দেখাটুকুরও নিশ্চয়তা দেয় না।
তুমি চলে গেলে,
আর আমাদের সেই শেষ দেখা আর হলো না।
এখন তোমাকে খুঁজলে
শুধু স্মৃতির দরজা খুলে যায়—
সেখানে তুমি আছো,
তোমার হাসি আছে, তোমার কণ্ঠস্বর আছে,
আছে আমাদের একসঙ্গে হেঁটে যাওয়া কত অচেনা-চেনা পথ।
শুধু তুমি নেই।
ভাবি, মৃত্যু কি সত্যিই সব দেখা শেষ করে দেয়?
হয়তো দেয় না।
হয়তো এই দৃশ্যমান পৃথিবীর বাইরে
অন্য কোনো অচেনা কক্ষপথে,
অন্য কোনো অপার্থিব জগতে
আমাদের জন্য আরও একটি দেখা অপেক্ষা করে থাকে।
তাই বন্ধু,
তুমি ওপারের কোনো নক্ষত্রের নিচে দাঁড়িয়ে থেকো—
অপেক্ষা করো আমার জন্য।
এই জীবনের অসমাপ্ত কথাগুলো,
এই না-বলা বিদায়,
এই শেষ দেখা না হওয়ার বেদনা
বুকে নিয়েই একদিন আমিও আসব।
সেদিন আর কোনো তাড়া থাকবে না,
কোনো বিদায়ের ভয় থাকবে না—
শুধু দুজন পুরোনো বন্ধু
দীর্ঘদিন পর আবার মুখোমুখি বসব।
আর তখন তোমাকে বলব—
“সউদ, এতদিন কোথায় ছিলে বন্ধু?"
কত পথ, কত প্রান্তরে তোমাকে খুঁজে বেড়িয়েছি, আর কী না তোমার দেখা পেলাম এই অশ্রু নদীর তীরে।
( বন্ধুবর মুজতবা সউদের মৃত্যুতে এই৷ শোককথা।)
তারিখ - ৩০/৮/২০২৬ ইং
২২. রাতের পদাবলী
কবিতা লিখব বলে আজও রাত জেগে আছি -
জানালার ওপারে তখন গভীর রাত,
ঘুমিয়ে পড়েছে পৃথিবী,
শুধু জেগে আছে কয়েকটি নক্ষত্র
আর আমার অপেক্ষা।
একসময় নিশাচর পাখিরা এলো,
ডানায় মেখে আনল অন্ধকারের গোপন বার্তা।
দূর আকাশ থেকে তারারা ছুটে এলো,
বাতাস এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল
আমার নিঃসঙ্গ কপাল।
তারপর চারদিক এমন নিস্তব্ধ হলো
যেন নৈঃশব্দ্যেরও একটি নিজস্ব গান আছে -
আমি কান পেতে শুনলাম।
জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে
সাদা নদীর মতো ভেসে গেল আকাশের বুক জুড়ে।
চাঁদের আলোয় মনে হলো,
কেউ একজন আসছে -
খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে,
অথচ তার প্রতিটি পদক্ষেপ
আমার হৃদয়ের ভেতর স্পষ্ট বাজছে।
তোমার পদধ্বনি!
আমি কলম তুলে নিলাম।
ভাবলাম, আজ তবে লিখব -
একটি কবিতা,
একটি দীর্ঘ প্রেমের পদাবলী,
যেখানে থাকবে রাত, জ্যোৎস্না, নক্ষত্র,
নিশাচর পাখি আর বাতাসের গোপন স্বর।
কখন যে রাত ফুরিয়ে ভোর হলো,
জানতে পারিনি।
সকালে ঘুমজড়ানো চোখে
খাতাটি খুলে দেখি -
কোথাও কোনো পদ নেই,
কোনো পদাবলী নেই,
নেই একটি কবিতারও পঙ্ক্তি।
সারা পাতা জুড়ে শুধু একটি নাম -
সে তোমার নাম।
২৩. জোছনার কূলে তুমি
কোনো কোনো হারিয়ে যাওয়া মানুষ
কখনোই সত্যি হারায় না -
তারা থেকে যায়
নির্জনতার গভীর কোনো ঘরে,
নিঃশব্দে খুলে রাখা
পুরোনো এক জানালার পাশে।
রাত যখন সমস্ত কোলাহল
নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয়,
শহর ঘুমিয়ে পড়ে,
পথের বাতিগুলো একে একে
অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে -
তখন তোমাকে খুঁজে পাই নদীর কূলে,
জোছনা-প্লাবিত কোনো এক সময়ে,
যেখানে জলও যেন
ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে
একটি বিস্মৃত নাম।
সেখানে বসে মনে হয় -
তুমি এই তো পাশে, একটু দূরে,
সাদা আলোয় ভেজা ঘাসের ওপরে
তোমার ছায়াটি পড়ে আছে।
নির্জন রাতে নদীর কাছে গেলে
আমি কোনো মানুষ খুঁজি না,
খুঁজি তোমার রেখে যাওয়া
সেই অদৃশ্য স্পর্শ -
যে স্পর্শে আমার ক্লান্ত হৃদয়
জোছনার জলে স্নাত হয়,
মন ভরে যায় দূর কোনো বাঁশির সুরে,
আর মনে হয় -
হারিয়ে যাওয়া বলে কিছু নেই,
কিছু মানুষ শুধু
অন্য এক আকাশের নিচে চলে যায়;
তবু তাদের ভালোবাসা
নদীর মতো থেকে যায়।
২৪. অনন্ত জ্যোৎস্নায়
নির্ঘুম রাতে কে যেন ফিসফিস করে বলে -
যাকে হারিয়েছ,
তাকে খুঁজতে হয় না
সে তোমার ভেতরেই থাকে।
এই গভীর রাতের নির্জনতা থেকে
তাই আজ তোমাকে বলছি -
তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য
আমি কত শহর পেরিয়েছি,
কত অপরিচিত মুখের ভিড়ে
তোমার চোখ খুঁজেছি—
তার হিসাব রাখিনি।
শুধু এটুকু জানি,
কেউ তোমার মতো করে
আমার মনকে বুঝতে পারেনি।
তবু তুমি নেই—
এই কথাটি আজও
পুরোপুরি বিশ্বাস হয় না।
সন্ধ্যা নামলে
দূরের কোনো পাতায় বাতাস কেঁপে উঠলে
মনে হয়,
তুমি বুঝি আমার নাম ধরে ডাকলে।
নদীর ওপার থেকে
অচেনা কোনো মাঝি গান ধরলে
মনে হয়,
কোনো এক ঘাটে
তুমি এখনও অপেক্ষা করছ।
আর পূর্ণিমার রাতে
জলে ভেঙে পড়া চাঁদ দেখে
মনে হয়—
কিছু আলো
মানুষ হারিয়েও হারায় না।
প্রিয়,
আমাদের প্রেমের কোনো শেষ দৃশ্য ছিল না।
কোনো স্টেশনে বিদায় নয়,
কোনো শেষ কথাও নয়—
তুমি শুধু একদিন
আমার জীবনের গল্প থেকে
ধীরে ধীরে সরে গেলে।
যেমন সন্ধ্যা
আকাশ থেকে সরে যায়,
যেমন নদী
একটি বাঁক পেরিয়ে
অন্যদিকে চলে যায়।
শুধু যদি কোনোদিন
অকারণে মন খারাপ হয়,
কোনো পুরোনো গানের ভেতর
আমার কথা হঠাৎ মনে পড়ে—
তোমার জীবনের কোথাও
একটি অদৃশ্য কোণে
তার জন্য সামান্য মায়া থাকুক।
আর যদি মৃত্যুর পরেও
মানুষের দেখা হয়—
কোনো নামহীন নদীর তীরে,
কোনো অচেনা নক্ষত্রের নিচে,
কোনো অনন্ত জোছনায়—
এই আশাটুকু বেঁচে রাখুক।
২৫. শেষ তারার কাছে
গভীর রাতে
কোথা থেকে এসে
তোমার পাশে বসেছিলাম -
মনে নেই।
শুধু মনে আছে,
নদীর জলে তখন
একটি হারানো নক্ষত্র কাঁপছিল।
ভোরের আগে তুমি চলে গেলে,
কোন পথে -
তা জানলাম না।
আজও কোনো নিঃশব্দ রাতে
দূরের একটি তারা জ্বলে উঠলে
মনে হয় -
আমাদের দেখা হওয়াটা
হয়তো কোনোদিনই শেষ হয়নি।
২৬. অচেনা নক্ষত্রের দিকে
কোনো এক গভীর রাতে
ঘুমন্ত শহরের সমস্ত আলো পেরিয়ে
আমরা এসে দাঁড়াই এক অদৃশ্য নদীর ধারে -
নদীটি কোথা থেকে আসে,
কোথায় তার শেষ,
তা জানে শুধু জলের পুরোনো স্মৃতি।
তখন তোমার চোখে
আমি একটি নিভে যাওয়া নক্ষত্রের আলো দেখি,
যে আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
তার নিজের আকাশটুকু হারিয়ে ফেলেছে।
দূরে কোথাও
একটি পাখি ভুল সময়ে ডেকে ওঠে,
বাতাস হঠাৎ বদলে যায়,
শিউলি-গন্ধের মতো
কোনো পুরোনো স্মৃতি এসে
তোমার চুল ছুঁয়ে চলে যায়।
ভোর হওয়ার আগেই
নদীর জল অন্ধকার হয়ে আসে।
তুমি উঠে দাঁড়াও,
আমি দেখি -
তোমার পায়ের কাছে পড়ে আছে
এক মুঠো অচেনা আলো।
তারপর নিস্তব্ধতা।
আর আকাশের অনেক দূরে
একটি ক্ষীণ নক্ষত্র
কেন জানি
আজও জ্বলতে থাকে।
২৭. সম্রাজ্ঞীর কাছে
তোমার জন্যই একদিন
জোছনা তার সমস্ত সাদা চিঠি খুলে রেখেছিল,
নদী থেমে শুনেছিল তোমার নাম।
হয়তো কোনো বনভূমির গভীর নীরবতায়
একটি পাখি হঠাৎ ডেকে উঠবে -
আর তুমি বুঝবে,
কেউ একজন আজও তোমার অপেক্ষায়
একটি অদৃশ্য জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো শ্রাবণের বৃষ্টি
তোমার কপালে নেমে এসে বলবে -
যে মানুষটি হারিয়ে গেছে,
সে আসলে হারায়নি কোথাও,
সে শুধু মেঘের আড়ালে
তোমাকে ভালোবেসে যাচ্ছে।
হয়তো কোনো পূর্ণিমার রাতে
নদীর জলে ভেসে উঠবে
একটি অচেনা মুখ -
তুমি চমকে উঠে বলবে,
এ তো আমারই কোনো পুরোনো স্বপ্ন!
তখন নিসর্গ হেসে বলবে -
স্বপ্ন নয়, সম্রাজ্ঞী,
সে ছিল তোমারই অনন্তকাল,
তোমরা দুজন
একই নক্ষত্রের নিচে জন্মেছিলে,
শুধু সময় তোমাদের
দুই ভিন্ন তীরে রেখে গেছে।
আর কোনো এক শীতের ভোরে
যখন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে যাবে,
তুমি হয়তো শুনবে -
দূর আকাশ থেকে কেউ ডাকছে তোমাকে,
ফিরে এসো -
যেখানে প্রেম শেষ হয় না,
শুধু মানুষ বদলে যায়
নক্ষত্র হয়ে।
২৮. এক সন্ধ্যা
প্রেমিকের মৃত্যুর বহু বছর পর
এক ছুটির দিনে মধ্যবয়সী চিরকুমারী মেয়েটি
হঠাৎ চলে এল সেই শহরে,
যে শহরটিকে সে কোনোদিন দেখেনি,
অথচ প্রেমিকের গল্পে
অসংখ্যবার হেঁটে গেছে।
সারাদিন সে ঘুরে বেড়াল
সেইসব রাস্তায়,
যেসব রাস্তার নাম একদিন
প্রেমিকের কণ্ঠে শুনেছিল,
যেসব মোড়ে তার পদচিহ্নের গল্প ছিল,
যেসব বিকেল পেরিয়ে
একজন মানুষ ধীরে ধীরে
তার জীবন থেকে মৃত্যুর দিকে চলে গিয়েছিল।
কোনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে
সে অকারণে থেমে গেল,
কোনো পুরোনো জানালার দিকে তাকিয়ে
মনে হলো -
এই বুঝি পর্দা সরিয়ে
সে বলবে, এই তুমি এলে?
সন্ধ্যা নামলে শহরটি
হঠাৎ ঝলমল করে উঠল।
আকাশে ঝিরঝির বৃষ্টি,
বাতাসে এক অদৃশ্য মানুষের গন্ধ -
মেয়েটি হোটেলের ঘরে ফিরে
বেলকনিতে এসে বসল।
দূরে শহরের আলো, নিচে ভিজে রাস্তায়
ছুটে চলা অগণিত অচেনা মানুষ
আর তার পাশে একটি খালি চেয়ার।
সে জানে,
এই চেয়ারটিতে কেউ কোনোদিন বসবে না।
তবু আজ তার মনে হলো,
মৃত মানুষদেরও বুঝি
কিছু কিছু সন্ধ্যায়
শহরে ফিরে আসার অধিকার থাকে।
শহর জানল না,
একজন নারী আজ
একজন মৃত মানুষের জন্য
একটি সন্ধ্যার অবকাশে একাকী
বসে আছে।
শুধু বাতাস জানল—
কেউ একজন এত বছর পরও
কাউকে ভালোবাসে।
আর সেই রাতে
ঝিরঝির বৃষ্টির নিচে
শহরের সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার পরও
একটি বেলকনিতে
একটি নারী বসে ছিল -
তার পাশে
অদৃশ্য এক প্রেমিক,
আর তাদের মাঝখানে
চিরদিনের মতো
একটি অসমাপ্ত কবিতা।
২৯. তুমি যদি ফিরে আসো
তুমি যদি ফিরে আসো
শিউলি-ভেজা ভোরে,
আমি তখন গান হয়ে যাব
তোমার নীল ঘোরে।
তুমি যদি চাঁদ হয়ে আসো
নিভে-যাওয়া রাতে,
আমি হবো জোনাকির আলো
তোমার দু’টি হাতে।
তুমি যদি নদী হও গো,
আমি হবো ঢেউ,
তোমার বুকে হারিয়ে গিয়ে
খুঁজব আপন কেউ।
তুমি যদি দূর আকাশে
একটি তারা হও,
আমি তখন রাত হয়ে যাব—
আমায় ছুঁয়ে রও।
যদি কোনো সন্ধ্যাবেলায়
মনে পড়ে আমায়,
নিঃশব্দে একবার এসো
বকুল-ঝরা ছায়ায়।
কিছু কথা বলা হয়নি,
কিছু গানও বাকি -
তোমার নামে আজও আমার
ঘুম ভাঙে একাকি।
তুমি যদি ফিরে আসো
শিউলি-ভেজা ভোরে,
আমি তখন গান হয়ে যাব
তোমার নীল ঘোরে।
৩০. তোমার অনুপস্থিতির শব্দ
তুমি গেলে দরজাটা
খোলা রইল চুপ,
ঘরের ভেতর হাঁটতে থাকে
তোমার ছায়ার রূপ।
বালিশজুড়ে রাত নামে,
ঘুম আসে না আর,
তোমার ফেলে যাওয়া গন্ধে
ভরে থাকে ঘর।
তুমি যেন ভাঙা ঘড়ির
থেমে থাকা কাঁটা,
সময়েরও আগে এসে
করলে আমায় একা।
ফিরবে বলে রাখিনি তো
কোনো প্রদীপ জ্বেলে,
তবু কেন পথের ধুলো
তোমার নামই বলে?
আমার যত নীরবতা
তোমার কাছে ঋণ,
তুমি ছাড়া পূর্ণ হলো
এমন কোনো দিন?
ফিরবে বলে রাখিনি তো
কোনো প্রদীপ জ্বেলে,
তবু কেন পথের ধুলো
তোমার নামই বলে?
তুমি যাবে, পথও যাবে,
ফুরিয়ে যাবে রাত—
শুধু আমার বুকের মধ্যে
থেকে যাবে তোমার আঘাত।
আর যদি এই জন্মে
হয় না দেখা আর,
তোমার অনুপস্থিতিই
হোক আমার শেষ গান।
৩১. মায়াবতী
তপ্ত দুপুর পেরিয়ে,
পরন্ত বিকেলের ধূসর আলোয়,
কিংবা সন্ধ্যার মৌন অন্ধকারে -
নিশীথের সমস্ত নক্ষত্র পেরিয়েও
যখন ঘরে ফিরি,
দরজায় শুধু একবার
কড়া নাড়ি -
অমনি একজন মায়াবতী
ভেতর থেকে খুলে দেয় দরজা,
আমার ক্লান্তির কাছে
একটুও প্রশ্ন রাখে না।
টেবিলে ধোঁয়া ওঠা ভাত,
গুছিয়ে রাখা সংসার,
বিছানায় পরিপাটি চাদর,
ফুলদানিতে অচেনা কোনো ফুল
সারাদিনের গন্ধ বিলিয়ে যায়।
রাত্রি নামলে
মশারিটুকুও আমাকে টানাতে হয় না -
সে যেন আমার ঘুমের চারপাশে
অদৃশ্য এক চাঁদের জাল বুনে দেয়।
আমি শুধু ফিরে আসি -
আর সে,
আমার ফিরে আসাটুকুকেই
উৎসব ভেবে নেয়।
অথচ -
শুক্লপক্ষের কোনো এক জ্যোৎস্নারাতে
তার জন্য
একটি রজনীগন্ধার বৃন্তও আনিনি কখনো,
আকাশের নীল থেকে
একটি নীলকণ্ঠের পালকও
চুপিচুপি এনে রাখিনি তার বালিশের পাশে।
কত সহজে
যে মানুষটি আমার সমস্ত ক্লান্তি মুছে দেয়,
তার ক্লান্তির খবর
আমি রাখিনি।
আজ বুঝি -
সংসারের সবচেয়ে বড় ভালোবাসাগুলো
ফুল চায় না,
চাঁদ চায় না,
কোনো কবিতার অলংকারও চায় না,
তারা শুধু চুপ করে থাকে
একটি দরজার ওপাশে -
কেউ ফিরবে বলে।
আর সেই মায়াবতী
আজও হয়তো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে,
হাতে তার কোনো রজনীগন্ধা নেই -
শুধু আমার জন্য
খোলা রাখে একটি দরজা।
৩২. ফিরে আসার ঋণ
তোমাকে ফেলে দিয়ে
একদিন পথে নেমেছিলাম -
ভাবলাম, পৃথিবী বুঝি অনেক বড়,
তোমাকে ছাড়া অন্য কোথাও
হারিয়ে থাকা যায়।
তারপর কত পথ, কত সন্ধ্যা,
কত যাযাবর বাতাসের সঙ্গে
ঠিকানা বদলেছি আমি -
তবু পথ ভুল হলেই
অদৃশ্য কোনো হাত
আমাকে ফিরিয়ে এনেছে তোমার দুয়ারে।
তুমি হয়তো জানো না -
কোনো এক বিদায়ের বিকেলে
আমার জন্য তোমার চোখে
দুই ফোঁটা জল নেমেছিল।
সেই জল এখনো আমার কাছে
এক অনন্ত ঋণ।
তাই চলে যাই -
আবার ফিরে আসি।
বারবার পৃথিবী ছেড়ে
তোমার কাছেই ফিরে আসি -
শুধু সেই দুই ফোঁটা অশ্রুর
ঋণ শোধ করতে করতে
হয়তো একদিন
আমার সমস্ত পথই
তোমার কাছে এসে শেষ হবে।
৩৩. কুসুমপুরে ফিরিবার কথা
বিষাদ কিছুতেই কাটাইতে পারিতেছি না -
এত ক্ষরণ, এত অনুশোচনা,
তবুও হৃদয়ের ভিতর
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো রাত জমিয়া থাকে।
ভাবিতেছি -
কিছুদিনের জন্য কুসুমপুর হইতে ঘুরিয়া আসিব।
পূর্ণিমার রাত্রিতে
পুকুরপাড়ের চালার উপর হাঁটিব একা একা;
চরাচর ভরিয়া উঠিবে চাঁদের আলোয়,
পুকুরের জলে কাঁপিবে
একটি শ্বেত স্বপ্নের ছায়া।
বৃক্ষরাজীতে বাতাসের গুঞ্জন বাজিবে,
আর ঘাটের চাতালে
অনবরত ঝরিয়া পড়িবে জ্যোৎস্না।
সেই জ্যোৎস্নার নিচে দাঁড়াইয়া
আমি আমার সমস্ত দুঃখ
জলের কাছে রাখিয়া আসিব।
হয়তো -
কুসুমপুরের সেই পুরোনো রাত
আমার ম্লান ও পাণ্ডুর মনখানি
আবার একটু ভালো করিয়া দিবে।
৩৪. কেমনে প্রকাশি...
হৃদয়ের গোপন রক্ত দিয়ে
রক্তজবা ফুটিয়ে রেখেছি -
এসো তুমি, তোমার সকল মায়া জড়িয়ে।
এক পা, দু-পা করে
নীরব চরণ ফেলো আমার দিকে,
বিস্ময়ের দুটি চোখ মেলে
একবার শুধু দেখো আমায়।
নাও—এই ফুল, এই রক্তিম নিবেদন;
বিনিময়ে দিও তোমার
কনকচাঁপা-রঙা বুকের সুবাস,
ডোরাকাটা ঠোঁটের
অগণন চুম্বন।
তারপর -
অবগুণ্ঠন সরিয়ে, সমস্ত দ্বিধা ভুলে
আমার চোখের গভীরে চোখ রেখে বলো—
ভালোবাসি।
ভালোবাসি।
যে কথাটি শোনার জন্য
এতদিন ধরে
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে
ফুল ফুটিয়ে রেখেছি।
৩৫. ভ্রম
কবে, কখন, কে চলে গেছে
বিস্মৃতির ওপারে-
সে কথা আজ আর মনে পড়ে না।
হয়তো আমিও ভুলেছি তাকে,
সেও আমাকে।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
থমকে থাকে রাত।
বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে মনে হয়-
ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
কোনো মুখ নেই, নাম নেই,
নেই কোনো দৃশ্যমান ছায়া—
তবু নিস্তব্ধতার গভীরে
কার যেন ক্ষীণ শ্বাসের শব্দ।
আমি চোখ মেলে শুনি-
এ কি কোনো হারানো মানুষের ফিরে আসা,
নাকি আমারই বিস্মৃত স্মৃতি
অন্ধকারের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
জানালার এপাশে আমি,
ওপাশে গভীর রাত।
আর আমাদের মাঝখানে
একটি ছায়া মানুষের উপস্থিতি-
যাকে ছুঁতে গেলে
মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
তখন মনে হয়,
হয়তো কেউ ছিল না কখনো -
শুধু রাত জেগে
আমার একাকিত্বই
নিজের শ্বাস শুনছিল।
৩৬. রাতের শব্দ
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আমি চোখ খুলি না। অন্ধকারের গায়ে কান পেতে শুয়ে থাকি। নিস্তব্ধতারও যে একটি শরীর আছে, একটি গোপন স্পন্দন আছে—সেই সময় যেন তা টের পাই।
কোথাও থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসে।
প্রথম প্রথম ভাবতাম, ও বুঝি আমার নিজের হৃদয়ের শব্দ—বুকের ভেতর থেকে কেউ হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। পরে বুঝেছি, না, ও হৃদয়ের শব্দ নয়; ও রাতের নিজস্ব পদধ্বনি। রাতও তবে হাঁটে! অন্ধকারের পথ ধরে, ঘুমন্ত পৃথিবীর পাশ দিয়ে, মানুষের বন্ধ দরজা ও জানালার নিচে নিচে সে হেঁটে যায়।
কোনো কোনো রাতে সেই শব্দ বদলে যায়। মনে হয়, দূরে কোথাও একটি অশ্ব ছুটে চলেছে—খট্ খট্, খট্ খট্—তার খুরের শব্দ নিঝুম অন্ধকারে কেঁপে কেঁপে ওঠে।
একদিন দরজা খুলে দেখি, সত্যিই একটি অশ্ব দাঁড়িয়ে আছে আমার উঠোনে। তার চোখে অদ্ভুত জ্যোৎস্না, শরীরে রাতের মতো কালো ছায়া। কিন্তু তার পিঠে কোনো আরোহী নেই।
আর একদিন, কে জানে কীভাবে, সেই আরোহী হয়ে উঠি আমি নিজেই।
নিঝুম নৈঃশব্দ ভেঙে অশ্ব ছুটিয়ে দিই তেপান্তরের দিকে। ছুটতে ছুটতে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে, কিংবা বহু আগেই কোথাও চলে গেছে। সামনে শুধু শূন্য মাঠ—খাঁ খাঁ করছে। আকাশ আছে, বাতাস আছে, দূরের নক্ষত্র আছে; অথচ কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।
কোনো পদধ্বনি নেই।
কোনো ডাক নেই।
শুধু আমি, আমার অশ্ব, আর অনন্ত রাত।
তারপর একসময় দেখি, অশ্ব নেই। তেপান্তর নেই। শূন্য মাঠ নেই।
সবই ভ্রম।
আমি তখনও আমার বিছানায় শুয়ে আছি, চোখ বন্ধ করে। চারদিকে গভীর রাত।
আর সেই রাতের অদৃশ্য পদধ্বনিগুলো—অন্ধকারের ভেতর—আমাকে ঘিরে জেগে আছে।
মনে হয়, ঘুমিয়ে আছে শুধু মানুষ;
জেগে আছে রাত—
আর রাতের সমস্ত শব্দ।
৩৭. অদৃশ্য আলোর কাছে
যেদিন সমস্ত পথের শেষে
ক্লান্ত পাখির মতো ফিরে আসব নিজের কাছে,
সেদিন তুমি এসো -
কোনো নাম নিয়ে নয়, কোনো পরিচয়ের আলোয় নয়,
শুধু ভোরের শিশির হয়ে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে দিও আমার কপাল।
আমার ভেতর যে ঘরটি বহুদিন অন্ধকার,
তার জানালায় একটু চাঁদ রেখে যেয়ো,
যে নদীটি শুকিয়ে গেছে বুকের গোপন বালুচরে,
তার কাছে এনে দিও এক মুঠো জলের গান।
যদি কোনোদিন দুঃখ এসে
আমার দরজায় বসে থাকে নিরাশ্রয়ের মতো,
তাকে তাড়িয়ো না -
তার চোখে হাত রেখে বলো,
‘এসো, আজ একটু বিশ্রাম নাও,
মানুষের হৃদয়েও তো
কিছু কান্নার জন্য জায়গা থাকে।’
আমার অহংকারগুলো ঝরে যাক
শিউলির মতো নীরব ভোরে,
অভিমানগুলো ভেসে যাক
অচেনা কোনো নদীর স্রোতে।
আমি শুধু রেখে দিতে চাই
একটি নির্মল হৃদয় -
যেখানে কোনো মানুষের জন্য
দরজা কখনো বন্ধ হবে না।
যে আলো চোখে দেখা যায় না,
সেই আলোয় ভরে উঠুক আমার অন্তর,
যে প্রেমের কোনো দাবি নেই,
সেই প্রেমের কাছে নত হোক জীবন।
শেষ রাতে যখন পৃথিবীর সব শব্দ
এক এক করে নিভে যাবে,
যখন আকাশ তার সমস্ত তারা
গুটিয়ে নেবে নীল অন্ধকারে,
তখনও যেন বুকের ভিতর
একটি ক্ষীণ প্রদীপ জ্বলে থাকে—
কেউ নেই, তবু কেউ আছে,
কিছু চাই না, তবু কিছু পাওয়া হয়ে গেছে,
এই অদৃশ্য স্নেহের ভিতরেই
নিঃশব্দে পূর্ণ হয়ে উঠুক
আমার অসমাপ্ত জীবন।
৩৮. ব্রত-বিব্রত
জীবনের কোলাহল পেরিয়ে
একদিন মানুষ ফিরে যায় নিজেরই অন্তরের বনে,
যেখানে কোনো ডাক নেই,
কোনো পাওয়ার হিসাব নেই,
শুধু ঝরে-পড়া পাতার মতো
ঝরে যায় কত জন্মের মায়া।
দূর কোনো অচেনা নদীর তীরে
সন্ধ্যা নামে ধূপের ধোঁয়ার মতো,
আর মন --
যে মন এতকাল পৃথিবীকে ভালোবেসেছে,
সে ধীরে ধীরে শিখে নেয়
হারিয়ে যাওয়াও এক ধরনের ফিরে আসা।
বৃক্ষের ছায়ায় বসে তখন
নিজেকেই মনে হয় অপরিচিত কোনো পথিক;
পেছনে পড়ে থাকে সংসারের আলো,
সামনে কেবল নক্ষত্রভরা অন্ধকার—
সেই অন্ধকারের ভিতরেই
নিভৃতে জ্বলে ওঠে
জীবনের আরেক পর্বের ম্লান প্রদীপ।
৩৯. কি নাম ছিল মেয়েটার
সেই গাঁয়ের বালিকাটির কথা মনে পড়ে,
শুধু তার নামটি মনে পড়ে না।
মনে আছে মিষ্টি ঠোঁট,
তীব্র চাহনি,
আর বিকেলের মাঠে তার ছুটে চলা।
কলাপাতায় লিখেছিলাম প্রেমপত্র,
লিখে আবার নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।
কী লজ্জা, কী ভয় -
আজ আর মনে নেই;
শুধু মনে হয়, সেই চিঠির সঙ্গে
আমার শৈশবেরও কিছুটা হারিয়ে গেছে।
গোল্লাছুট খেলতাম, ছোঁয়াছুঁয়ির খেলায়
কখনো তার কাছে যাওয়া,
কখনো দূরে সরে যাওয়া।
সেই ছোট্ট খেলাগুলোর মধ্যেই
কখন যে মন তাকে চিনে নিয়েছিল,
জানি না।
সন্ধ্যায় সে গান গাইত পূজার উঠোনে।
ধূপের গন্ধে, শিউলির সুবাসে
তার কণ্ঠ মিশে থাকত।
কী নামে তাকে ডাকতাম -
আজ আর মনে পড়ে না।
এত বছর পরেও নামটি ভুলে গেছি,
কিন্তু মেয়েটিকে নয়।
কখনো সন্ধ্যা নামে,
ধূপ জ্বলে কোথাও,
দূর থেকে ভেসে আসে একটি গান -
তখন মনে হয়,
গাঁয়ের সেই পথ ধরে
একটি মেয়ে এখনও হেঁটে যাচ্ছে।
আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি -
মনে মনে ডাকি তাকে,
কিন্তু নামটি আর আসে না।
৪০. আবীর দে
চন্দনের গন্ধ নিতে গিয়ে
তোমার বুকের গন্ধ পেয়েছি
এইরকম কত ভুল যে করেছি
তোমার কাছে এসে!
চাঁদ ভেবে ছুঁয়েছি তোমার মুখ,
ভোর ভেবে জেগেছি চোখে
নদী ভেবে ডুব দিয়েছি তোমায়,
ফিরিনি আর কোনো তীরে।
চন্দন নেব না তোর থেকে,
আজ শুধু একটু আবীর দে
যে আবীর ছুঁয়ে গেলে
বিষণ্ণ বিকেলও রঙিন হয়ে ওঠে,
যে রঙ মুছে ফেললেও
আঙুলে থেকে যায় দীর্ঘদিন।
ভালোবাসা জমেছে যত
সবই লুটিয়ে নে
আমার গোপন বসন্ত,
অকথিত অভিমান,
রাত্রির জানালায় রেখে যাওয়া
এক মুঠো জ্যোৎস্নাও নে।
শুধু আমাকে ফিরিয়ে দিস না
সেই পুরোনো নির্জন ঘরে
যেখানে তোর স্মৃতিরা এসে
নিঃশব্দে দরজায় কড়া নাড়ে।
যদি কোনোদিন আবার
চন্দনের গন্ধে মন ভরে যায়,
জেনে নিস -
সুগন্ধটা চন্দনের নয়,
তোর বুকের কাছ থেকে
ভুল করে নিয়ে আসা
আমার একটুখানি ভালোবাসা।
তাই চন্দন নেব না তোর থেকে
আবীর দে,
আর যত ভালোবাসা জমেছে
আমার এই একলা হৃদয়ে,
নিঃশব্দে এসে
সবটুকু লুটে নে।
৪১. দূরের প্রাণ
মেয়েটি যতদিন বাড়িতে ছিল,
তার হাসি, গল্প আর ছোট ছোট অভিমানে
সারাক্ষণ মুখর হয়ে থাকত ঘরদোর।
মেয়েটি আজ অনেক দূরে—
সুদূর আটলান্টিকের ওপারে,
অন্য এক আকাশের নিচে তার দিন কাটে।
আর এদিকে, তার ফেলে যাওয়া ঘরটায়
সন্ধ্যা নামে করুণার শব্দে।
বারান্দায় বাতাস আসে,
দরজার কাছে এসে থেমে যায়—
যেন কেউ ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা করে।
ওর ঘরের বিছানা,
আলমারির এক কোণে পড়ে থাকা পরিচিত কিছু জিনিস,
সবকিছুতেই কেমন তার অনুপস্থিতির গন্ধ।
বাড়িটা এখন খুব শান্ত—
এতটাই শান্ত যে কখনো কখনো
নিজের বুকের তলায় অস্ফুট কান্নার শব্দ
শোনা যায়।
৪২. বাবা, তুমি চোর নও
বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা এক মানুষ
তার শরীরে ধুলো,
চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অপমান,
আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের ভিড়
যাদের চোখ আছে,
কিন্তু দেখার মতো হৃদয় নেই।
কেউ বলে— চোর!
কেউ বলে— শাস্তি হোক!
কেউ মোবাইলে ধরে রাখে
একজন মানুষের লাঞ্ছনার ছবি;
কেউ শুধু পাশ কাটিয়ে যায়—
যেন মানুষের কান্না
আজকাল খুব স্বাভাবিক কোনো শব্দ।
অথচ সেই ভিড়ের বাইরে
মাটিতে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি
কিছুই বোঝে না -
সে জানে শুধু,
ওই ক্ষতবিক্ষত মানুষটি তার বাবা।
নিজের ভাগের রুটিটুকু
দু'হাতে তুলে দেয় বাবার মুখে,
ক্ষুধার কথা ভুলে গিয়ে
আঙুল দিয়ে মুছে দেয়
বাবার ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা খাবার।
তার চোখে কোনো আদালত নেই,
কোনো সাক্ষী নেই,
কোনো অপরাধের প্রমাণ নেই—
আছে শুধু একটুকরো বিশ্বাস:
“বাবা খারাপ হতে পারে না।”
হায় মানুষ!
আমরা কত সহজে একজনকে চোর বানাই,
কত সহজে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলি
একটি মানুষের শরীর—
কিন্তু একটি শিশুর বিশ্বাসকে
বেঁধে রাখার মতো
কোনো দড়ি কি আমাদের আছে?
সেদিন হয়তো
খুঁটিতে বাঁধা ছিল একজন মানুষ,
কিন্তু সত্যি বলতে—
বাঁধা ছিল আমাদের বিবেক,
বাঁধা ছিল আমাদের মানবতা,
বাঁধা ছিল
সভ্যতার মুখে ঝুলে থাকা
শেষ আলোকটুকু।
আর সেই ছোট্ট মেয়েটি—
সে কিছুই জানে না পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে;
সে শুধু জানে,
বাবার মুখে একটুখানি খাবার দিলে
বাবা হয়তো আবার হাসবে।
পৃথিবী, তুমি তাকে ক্ষমা কোরো—
সে এখনো মানুষকে ভালোবাসতে জানে।
আর আমাদের ক্ষমা কোরো না—
আমরা সব দেখেও
চোখ ফেরাতে শিখেছি।
৪৩. মনে কি পড়ে
মনে কি পড়ে, কোভা—
সেদিন ব্যস্ত শহরের সমস্ত কোলাহল ডুবিয়ে
হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল।
ভেজা হাইওয়ের বুক চিরে
তুমি চলে গিয়েছিলে অনেক দূর,
আর তোমার পাশে
আমি—একটি নীরব বিকেল।
রিমঝিম জলে ধুয়ে যাচ্ছিল পথের ক্লান্তি,
দূরের গাংচিল ডানা মেলেছিল
অদৃশ্য কোনো সমুদ্রের দিকে;
ঝাউবনের গায়ে গায়ে
বৃষ্টি লিখছিল দীর্ঘ কোনো বিষণ্ণতা।
তুমি ছিলে নীরব,
চোখের গভীরে জমেছিল অচেনা মায়া।
তারপর হঠাৎ—
বাহুর উষ্ণ আশ্রয়ে
আমার সমস্ত দূরত্ব ভেঙে দিয়ে
তুমি বলেছিলে,
“তোমাকে ভালোবাসি।”
সেই তিনটি শব্দের কাছে
সেদিন পৃথিবী খুব ছোট হয়ে এসেছিল;
শুধু বৃষ্টি ছিল,
দুটি মানুষ ছিল,
আর ছিল এক অদৃশ্য ভবিষ্যৎ—
যার শেষ আমরা কেউ জানতাম না।
বিনম্র সেই হাসি,
চোখের সেই মায়াবী আলো—
আজও কখনো কোনো বর্ষার সন্ধ্যায়
অকারণে ফিরে আসে।
তখন মনে হয়,
নগরীর সমস্ত সভ্যতা ভেঙে
সেদিন আমরা শুধু দুজন
ভেজা পথের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তারপর শান্তা মনিকার তীরে
শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরেছিলে আমাকে।
তারও আগে প্যাসিফিকের জল
কী আশ্চর্য স্তব্ধতায়
নিজের ঢেউ গোপন করেছিল—
যেন সমুদ্রও জানত,
কিছু বিদায় উচ্চারণ করা যায় না।
আজ বৃষ্টি নামে,
হাইওয়ে ভিজে যায়,
দূরে কোথাও গাংচিল উড়ে যায়—
শুধু সেই বিকেলটি আর ফিরে আসে না।
হয়তো স্মৃতি এমনই—
একদিন খুব কাছে এসে
জীবনের সমস্ত আলো ছুঁয়ে যায়,
তারপর নিঃশব্দে সরে গিয়ে
মনের গভীরে রেখে যায়
একটি ভেজা পথ,
একটি অসমাপ্ত আলিঙ্গন,
আর একটি প্রশ্ন—
মনে কি পড়ে, কোভা?
৪১. তুমি থেকো
জীবন সব বাঁকে ফুল বিছায় না
কোথাও পরাজয়,
কোথাও দীর্ঘ অন্ধকার।
তবু চলে যেতে নেই।
দেখো, জানালার ওপারে আকাশ এখনও নীল,
দূরে নদী এখনও বয়ে যায়—
আর আমার বুকের ভেতর
তোমার জন্য একটি আলো জ্বলে।
তুমি অসুস্থ—
তাই বলে ভোর থেমে যায়নি।
রাত্রিরও একদিন শেষ হয়।
তুমি শুধু থেকো—
আমার হাতের উষ্ণতায়,
একটি অসমাপ্ত প্রার্থনার মতো।
দুঃখ আমাদের হারাক,
তবু আমরা হারব না।
পরাজিত হয়েই একদিন জিততে হয়,
তখনই তো মানুষ বাজিগর।
তুমি থেকো, প্রিয়তমা,
তোমাকে নিয়েই আমার এখনও
বেঁচে থাকার এত কারণ।
৪২. সেই বাড়ি আমার নয়
যে বাড়িতে তুমি নেই
সে বাড়ির উঠোনে সন্ধ্যা নামুক,
চাঁদের আলো এসে ফিরে যাক নিঃশব্দে,
সে বাড়িতে ভয়ংকর নির্জনতা বুভুক্ষময় হয়।
তোমাকেই দিয়েছি হৃদয়—
এই কথা জানুক
জোছনার শীতল জল,
নদীর নির্জন ঢেউ,
আর পৃথিবীর যাবতীয় শোকশ্লোক।
তুমি নেই বলে
ফুলের গন্ধেও আজ কেমন শূন্যতা,
বাতাস ছুঁয়ে যায়—তবু মন ছোঁয় না,
তোমার নামহীন কোনো প্রার্থনা
আমার ঠোঁটে আর জাগে না।
যদি কোনোদিন
সব সুখ এসে দাঁড়ায় আমার দরজায়,
আমি শুধু তোমার অনুপস্থিতির দিকে তাকিয়ে
এক মুঠো বিষণ্ণ আলো হাতে নেব—
কারণ তুমি নেই যে বাড়িতে ,
সে বাড়ি আমার নয়।
তোমার জন্যই রেখে দিয়েছি
আমার সমস্ত নীল বিষাদ,
সমস্ত বৃষ্টি,
সমস্ত একাকী রাত—
আর হৃদয়ের শেষ প্রদীপটি,
যেখানে আজও তোমার নাম
নিঃশব্দে জ্বলে থাকে।
৪৩. কোমলগান্ধারে
যারা একদিন ভালোবেসে
ভালোবাসা পায়নি—
তারা আজ অনেক দূরের নক্ষত্র,
নিভে যায়, তবু রাতের আকাশ থেকে
তাদের আলো মুছে যায় না।
কত অসমাপ্ত চুমুর দাগ
অন্ধকারে পড়ে থাকে—
আশ্লেষহীন, অথচ উষ্ণ,
রাত গভীর হলে জানালার পাশে
দু-একটি জোনাকি জ্বলে ওঠে,
আর মনে পড়ে যায়
কবেকার নির্মাল্য ভালোবাসা।
দূরের স্টেশনে হুইসেল বাজে,
কোনো অদৃশ্য বাঁশিওয়ালা
রাতের বুক চিরে তুলে নেয় সুর—
কে বাজায়, জানি না।
যেই বাজাক বাঁশি,
মনে পড়ে যায়
প্রেমিকার কম্পিত ঠোঁট।
চোখ বন্ধ করি—
আঁধারেরও ওপারে দেখি
অজস্র ঘাসফড়িং উড়ে যাচ্ছে
অচেনা কোনো চরাচরে;
কেউ যেন খুব কাছে এসে বলে—
ঘুমালে নাকি?
শিউলিবনের গন্ধে তখন
কুসুমপুর ফিরে আসে।
কোমলগান্ধারে কে যেন বলে—
তোমার ঠোঁটে ধানের ছায়া গো,
আমছায়ার মতো সুনিবিড়;
সেই গহীন ছায়ায়
হারিয়ে যায় শহরের এক রাখাল বালক।
কত হাস্নাহেনা-সুরভিত দিন
গ্লানির জলে ভেসে গেছে—
তার হিসাব রাখিনি।
যা চলে গেছে, তাকে ডেকে
আর কী লাভ?
গতস্য শোচনা নাস্তি—
তবু কোনো কোনো গভীর রাতে
দূরের বাঁশি থেমে গেলে
মনে হয়,
ভালোবাসা বুঝি হারায়নি কোথাও;
শুধু একদিন নক্ষত্র হয়ে
আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
৪৪. সংসারের মানুষ
একটি সংসারে
সবচেয়ে বেশি কর্মচঞ্চল করে যে মানুষটি,
সে নয় শুধু সংসারের প্রাণ—
প্রাণ থাকে সেই করুণাময়ী মানুষটির কাছে,
যে ভোরের আগে উঠে
চুলায় আগুন জ্বালে,
অগোছালো দিনটাকে দু’হাতে গুছিয়ে দেয়।
সে মা হতে পারে,
স্ত্রী হতে পারে—
নাম যাই হোক,
সংসারের আসল মানুষটি সে-ই।
তার হাতে ভাতের গন্ধ,
তার আঁচলে ঘুমের শান্তি,
তার কণ্ঠে ফিরে আসার ডাক—
ঘরের প্রতিটি জিনিসে
অদৃশ্য হয়ে মিশে থাকে তার স্পর্শ।
একদিন সে অসুস্থ হলে
হঠাৎ দেখা যায়—
ঘড়ি চলে, অথচ সময় চলে না;
চুলায় আগুন জ্বলে,
তবু রান্নাঘরে ঘরের গন্ধ থাকে না।
বিছানা থাকে,
শুধু ঘুমটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
যে মানুষটি সারাজীবন
নিজেকে একটু একটু করে বিলিয়ে
একটি ঘরকে ‘সংসার’ বানায়,
তার অনুপস্থিতিতেই বোঝা যায়—
ঘর আর সংসার এক জিনিস নয়।
তখন বুঝি,
একজন মানুষ শুধু মানুষ নয়—
কখনো সে একটি ঘরের ছাদ,
একটি পরিবারের পবিত্র প্রার্থনা,
এক মুঠো আলো
যার নিচে সবাই নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকে।
তাই সে যখন অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকে,
পুরো বাড়িটাই যেন
তার বিছানার পাশে বসে থাকে—
নিঃশব্দে,
এক বুক ভয় নিয়ে, একটি প্রার্থনার মতো।
কারণ সংসারে
কিছু মানুষ চলে গেলে
শূন্যতা হয় না শুধু—
একটি পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়।
৪৫. দাঁড়াও সুন্দর
যেদিন শেষবারের মতো চলে যাব,
সেদিন পথ ডেকে বলবে—
দাঁড়াও, সুন্দর;
একটু ধুলো মেখে যাও পায়ে,
এই পৃথিবীর শেষ স্পর্শটুকু নিয়ে যাও।
শূন্য নীল আকাশ বলবে—
এসো, তোমাকে নীলাদ্রি করে দিই।
রাতের তারারা বলবে—
কোথায় যাবে আর?
আমাদের ভিড়ে একটি তারা হয়ে
চিরকাল জ্বলে থেকো।
দখিনা সজল বাতাস
নিঃশব্দে ছুঁয়ে বলবে—
তোমার আতর-মাখা শরীরের
শেষ গন্ধটুকু আমার কাছে রেখে যাও।
ফুল বলবে—
আজ তোমার জন্যই ফুটেছিলাম,
আমার সমস্ত সুবাস নিয়ে যাও।
পাখি বলবে—
যাবেই যখন,
আমার একটি পালক সঙ্গে রেখো।
নদী দূর থেকে ডাকবে—
এসো, আর একবার অবগাহন করো,
জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে যাও।
আর কোনো এক নারী—
চোখের ভেতর বর্ষা নিয়ে বলবে,
প্রেম দেবো,
তবু তুমি যেও না।
তবু চলে যাব।
খরতাপে চোখ পুড়িয়ে
তপ্ত মাঠ পেরিয়ে,
ধুনো-ধূপের গন্ধমাখা
আকুল আশ্বিন সন্ধ্যার ভিতর দিয়ে।
হাঁটব—
যতক্ষণ না আকাশে প্রথম তারা জ্বলে ওঠে।
চলব—
যতক্ষণ না মেঠো পথের শেষ আলোটি নিভে যায়।
তারপর অন্ধকারে
দেখব শুধু জোনাকিরা—
উঠছে, পড়ছে,
জ্বলছে, নিভছে।
মনে হবে,
এই তো জীবন—
একটু আলো,
একটু অন্ধকার,
আর চলে যাওয়ার আগে
পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসার কাছে
একবার ফিরে তাকানো।
৪৬. দূরে
দূরে উঠোনের পাশে
বুড়ো নিমগাছের ছায়ায়
ধান ভানে এক বর্ষীয়সী রূপসীর মাতা—
ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভাঙে
পুরোনো কোনো গানের।
ধানের গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস,
কোথাও কাঁসার থালায় রোদ ঝলমল করে,
দূরের পুকুরে
একটি শালিক নেমে এসে
জলের বুক ছুঁয়ে যায়।
কেউ নেই—
শুধু বাতাস আছে,
সে-ও যেন কারও নাম ধরে
অকারণে গান গায়।
দূরে,
আমার ফেলে আসা সেই গ্রাম,
আর তার দুপুরের ভিতর
আজও এক মায়ের মুখ
ধানের গন্ধ হয়ে ভেসে থাকে।
৪৭. পৃথিবীর হৃদয় আছে
পৃথিবীর হৃদয় আছে, প্রাণ আছে—
তাই তো এত ভালোবাসি তাকে।
ভোরের প্রথম রোদ যখন ঘাসের বুকে নামে,
মনে হয়, কেউ আদর করে হাত রেখেছে
আমার সমস্ত ক্লান্তির কপালে।
নদী যখন বয়ে যায়, সে শুধু জল বয়ে নেয় না,
বয়ে নেয় কত মানুষের কান্না, কত গোপন প্রেম,
বৃক্ষ যখন ছায়া দেয়, সে শুধু ছায়া দেয় না,
অচেনা পথিকের মাথায় তুলে দেয়
মায়ের মমতামাখা আঁচল।
এই পৃথিবী অভিমান বোঝে,
বোঝে বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস,
তাই তো ঝরে যাওয়া পাতার জন্যও
কখনো কখনো বুকের ভেতর
কেমন এক শূন্যতা জেগে ওঠে।
এখানে মৃত মানুষেরাও বেঁচে থাকে—
পুরোনো উঠোনে, শিউলি-ঝরা সকালে,
কোনো মায়ের শূন্য আঁচলে,
বাবার হাত ধরে হেঁটে যাওয়া
হারিয়ে-ফেলা শৈশবের পথে।
পৃথিবী, তুমি কেবল মাটি নও,
তুমি আমার সমস্ত মায়ার আধার,
তোমার বুকে যত দুঃখ, যত মৃত্যু,
ততই তোমাকে ভালোবাসি—
যেন তোমার হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে
আমারও একটু জায়গা আছে।
একদিন যখন চলে যাব,
আমার শরীর মিশে যাবে তোমার মাটিতে—
তখন কোনো বসন্তের সকালে
ঘাসের ডগায় শিশির হয়ে ঝরব,
কিংবা অচেনা কোনো ফুলের সুবাসে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে দেব কারও মন।
পৃথিবীর হৃদয় আছে, প্রাণ আছে—
তাই তাকে ছেড়ে যেতে ভয় হয়,
এ পৃথিবী যে শুধু বেঁচে থাকার জায়গা নয়,
এ আমার ভালোবাসা,
আমার সমস্ত জন্মের চেয়ে
অধিক আপন এক আশ্রয়।
৪৮. শুকুর মাহমুদের কবর
একাত্তরে আমরা তখন ক্লাস নাইনে,
বুকের ভেতর সদ্য জেগেছে স্বাধীনতার স্বপ্ন।
চারদিকে আগুন, আকাশজুড়ে ধোঁয়া,
মাটির বুকে রক্তের দাগ—
তবু একটি ছেলে হেঁটে গেল সীমান্তের ওপারে,
নাম তার শুকুর মাহমুদ,
চোখে তার যুদ্ধজয়ের দুরন্ত শপথ।
রৌমারীর পথে সে পাড়ি দিয়েছিল ঘর,
মায়ের মায়া, বাবার স্নেহ, শৈশবের উঠোন—
সবকিছু পেছনে ফেলে।
ভেবেছিল, প্রশিক্ষণ শেষে ফিরবে একদিন,
হাতে অস্ত্র, বুকে বাংলাদেশ,
হানাদারের চোখে চোখ রেখে বলবে—
এই মাটি আমার, এই দেশ আমার!
কিন্তু হায়, ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস!
যে ছেলেটি শত্রুর বুলেট বুকে নিতে চেয়েছিল,
একটি অসুখ তাকে নিঃশব্দে কেড়ে নিল।
কোনো রণাঙ্গন নয়, কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়,
ডায়রিয়ার কাছে থেমে গেল তার কিশোর জীবন—
স্বাধীনতার সূর্য ওঠার আগেই
একটি সূর্য ডুবে গেল অচেনা মাটিতে।
রৌমারীর কোথাও আজও হয়তো ঘাস গজায়,
বাতাস বয়ে যায়, পাখি ডাকে ভোরে,
কোনো অচেনা গাছের ছায়ায়
ঘুমিয়ে আছে আমাদেরই এক সহপাঠী—
যার কবরের ঠিকানা জানে না কেউ,
যার নাম লেখা নেই কোনো স্মৃতিফলকে,
যার মায়ের কান্না পৌঁছেছিল কি না
সেই দূর দেশের মাটিতে—জানি না।
শুকুর, বন্ধু আমার,
তুই কি জানিস, দেশ স্বাধীন হয়েছে?
লাল-সবুজের পতাকা উড়েছে আকাশে,
পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় বয়ে গেছে কত জল,
আমাদের মাথায় জমেছে কত স্মৃতির ধুলো—
শুধু তোর কবরের ঠিকানা হারিয়ে গেছে
সময়ের অতল অন্ধকারে।
আজ এত বছর পরেও মনে হয়,
আমাদের সেই ক্লাসরুমে
একটি বেঞ্চ বুঝি খালি পড়ে আছে,
কেউ একজন আর ফিরে আসেনি
ছুটির ঘণ্টা বেজে যাওয়ার পরও।
বন্ধু, তোর জন্য কোনো ফুল নিয়ে
কোনোদিন দাঁড়াতে পারিনি তোর কবরে
জানি না কোন মাটিতে শুয়ে আছিস,
কোন আকাশ তোর মাথার ওপর।
তবু বিশ্বাস কর, শুকুর মাহমুদ—
যে দেশের জন্য ঘর ছেড়েছিলি,
সে দেশের প্রতিটি মুঠো মাটিতে
মিশে আছে তোরই অদৃশ্য ঠিকানা।
তোর কবর আমরা খুঁজে পাইনি,
কিন্তু ইতিহাসের বুক থেকে
তোর নামটি মুছে যেতে দেব না—
তুই ফিরে আসিসনি, বন্ধু,
তবু তোর জন্যই ফিরে এসেছিল বাংলাদেশ।
৪৯. রাতের অন্ধকার
কখন যে ভালোবাসার দিনগুলো হাওয়ায়
ভেসে যায়, বন্ধ হয়ে যায় কবরের দরজা --
নিভে যায় একে একে রাতের অন্ধকার।
যে হাত একদিন হাত ধরে বলেছিল—
“থেকো, আর কোথাও যেও না,”
সেই হাত আজ স্মৃতির ভিতর ঘুমায়,
জেগে থাকে শুধু তার ছায়া।
বসন্ত আসে, নদীর জলে জোৎস্না নামে,
শুধু আমার জানালায় ফেরে না কোনো আলো,
তুমি চলে যাওয়ার পর জেনেছি—
প্রেমেরও কবর হয়,
শুধু তার ওপর ঘাস জন্মায় না,
রাত্রির পর রাত্রি সেখানে একটি মৃত চাঁদ কাঁদে।
৫০. স্পর্শের বার্তা
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়—
দেখি, তোমার একটি নিষ্কলুষ হাত
এখনও আমার বুকের ওপর,
যেন ঘুমেরও গভীরে তুমি
নিঃশব্দে বলে যাও—
দূরে যেও না, আমি আছি।
জানালার বাইরে তখন
নক্ষত্রেরা একে একে নিভে যায়,
শুধু তোমার স্পর্শটুকু
আমার অন্ধকারে জেগে থাকে—
অস্তিত্বের শেষ প্রদীপের মতো।
কোনোদিন যদি বিদায়ের ক্ষণে
তোমার ওই দুটি হাত
আর একবারও ছুঁতে না পারে আমাকে,
তবে নিঃশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ো—
চলে যেয়ো।
শুধু আমার অশ্রুর ভেতর
তোমার মুখের কোনো ছায়া রেখো না,
আমি যেন সারাজীবন
সেই ছায়াকে সত্যি ভেবে
তোমাকে ফিরে আসার অপেক্ষায়
বসে না থাকি।
কারণ কিছু বিদায়
দরজা বন্ধ করে যায় না—
একটি মানুষের বুকের ভেতর
চিরদিনের জন্য
একটি দরজা খোলা রেখে যায়।