শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

শান্ত চরণে এসো ( কাব্যগ্রন্থ )


শান্তচরণে  এসো   ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  --

উৎসর্গ   --


১.     শান্তচরণে এসো


তোমার পদস্পর্শে দিনের সকল 
ধূলি ঝরিয়া যাক
যেমন সন্ধ্যার শেষে আকাশ আপন 
আলো গুটাইয়া লয়,
তেমনি আমার সকল উচ্চারণ তোমার 
কাছে নত হইয়া থাক।

শান্তচরণে এসো তুমি, যেন শিশির নামে
নিদ্রিত শিউলির বুকে -
যেন পূর্ণিমা নদীর অশান্ত জলে
নিঃশব্দে তাহার শ্বেত করুণা বিছাইয়া দেয়।

শান্তচরণে তুমি এসো, আমার গানের শেষ সুরটি
তোমার অন্তর্ময় বিলীন হউক,
আমার সকল অশ্রু তোমার করুণার সাগরে
নামহীন নদীর মতো মিশিয়া যাক।

ঝড়ের গর্জনে নহে,
অলৌকিক আলোকচ্ছটায় নহে,
বরং একটি উজ্জ্বল প্রভাতের মতো
করুণার আলোয় সমস্ত আকাশ ভরিয়া 
শান্তচরণে এসো।

যদি কথা বলো
তবে ফুলের গন্ধের মতো বলো,
যে ভাষা কানে আসে না,
তবু প্রাণের সমস্ত নির্জনতাকে
মধুর করিয়া তোলে।

যদি চাহিয়া দেখো, তবে এমন দৃষ্টিতে দেখো,
যাহাতে আমার সকল ক্ষত
নিজেই আপন লজ্জা ভুলিয়া যায়,
যাহাতে মনে হয়, ক্ষমাই এই বিশ্বের
সর্বশ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য।

আমার সকল দুঃখের ধুলো
তোমার পায়ের কাছে নত হইয়া থাক,
আমার সকল গান
তোমার  কাছে সুর খুঁজিয়া পাক।

তারপর যদি
পৃথিবীর সকল পথ একদিন ফুরাইয়া আসে,
যদি সকল প্রদীপ নিভিয়া যায়,
তবু যেন শেষ প্রহরে
এইটুকু বলিতে পারি, তুমি এসেছিলে।

যখন বিদায়ের সময় আসিবে,
তখনও যেন মনে হয়, তুমি ঝড় হইয়া নহে, 
অভিমান হইয়া নহে, 
ভোরের প্রথম আলোর মতো অশেষ মমতার 
দীপ্তি লইয়া শান্তচরণে এসেছিলে।


২.    ভালোবাসার চোখে জল 

ভালোবাসবে অথচ তুমি কাঁদবে না,
তাই কী হয়?
নদী কি পারে সমুদ্রের কথা ভেবে
একটিবারও জোয়ার না তুলতে?

যে ফুল ভোরের শিশিরে ভিজে না,
সে কি জানে সুগন্ধের অন্তর্গত বিষাদ?
যে আকাশ কোনো সন্ধ্যায়
একটুখানি লাল হয়ে ওঠে না,
সে কি বুঝেছে বিদায়ের অর্থ?

ভালোবাসা মানে
শুধু হাতের উষ্ণতা নয়,
কখনও দূরত্বের দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে
নিঃশব্দে নেমে আসা এক ফোঁটা অশ্রুও।

তুমি যদি সত্যিই ভালোবাসো,
তবে একদিন কোনো কারণ ছাড়াই
একটি পুরোনো গানের ভেতর
আমার নাম শুনে চমকে উঠবে।

একটি নির্জন বিকেলে
বাতাসের গায়ে আমার গন্ধ পাবে।
তারপর অকারণেই
চোখের কোণে জমে উঠবে জল।

কারণ ভালোবাসা
কোনো বিজয়ের উৎসব নয় -
এ এক নক্ষত্রের ধীরে ধীরে নিভে যাওয়া আলো,
যা অন্ধকারেও
দীর্ঘকাল পথ দেখিয়ে যায়।

তাই বলি,
ভালোবাসবে অথচ তুমি কাঁদবে না,
তাই কী হয়?
অশ্রুহীন প্রেম
শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো,
মানচিত্রে তার নাম থাকে,
কিন্তু তার বুকে আর কোনো নৌকার স্বপ্ন 
ভেসে ওঠে না।


৩.    যদি আমি চলে যাই


যদি আমি চলে যাই, ঘাসের উপর শিশিরের মতো ভোরের আলোয় যদি মিলিয়ে যাই, তবে আমাকে খুঁজো না কোনও সমাধিফলকে, কোনও নামহীন শোকের ভিড়ে।

আমি লুকিয়ে থাকব ঝরে-পড়া শিউলির গন্ধে, 
সন্ধ্যার আকাশে একা জেগে থাকা অচেনা নক্ষত্রের পাশে।

যদি কোনোদিন তোমার জানালায় হাওয়া এসে নিঃশব্দে পর্দা দুলিয়ে দেয়, ভাববে না সে কেবল বাতাস, সেখানে আমার অসমাপ্ত উচ্চারণ এখনও তোমার নামই বলে।

যদি হঠাৎ একটি পুরোনো পথ তোমাকে থামিয়ে দেয়, যদি মনে হয়, এখানে কেউ একজন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছিল, তবে জেনে নিও, ধুলো হয়ে গেলেও অপেক্ষারা মরে না কখনও।

আমি চাই না তুমি অশ্রুর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখো,
শুধু কখনও যদি পূর্ণিমার আলোয় তোমার ছায়া দীর্ঘ হতে হতে আমার ছায়ার মতো লাগে.. তখন আমি আসব।

অথবা তোমার হৃদয়ের এমন এক কক্ষে আসব, যেখানে কেউ কোনোদিন কখনও বিদায় বলতে শেখেনি।


৪.      তোমার বুকের ভিতর 


তোমার বুকের ভিতর বর্ষার মেঘ আছে,
কদম্ব ফুল আছে,
ধবল বকের পালক আছে,
সন্ধ্যাতারা আছে।

নদীর বুকে ভেসে যাওয়া চাঁদের নৌকা আছে 
কাশবনের দোলায় হারিয়ে যাওয়া বাতাস আছে 
শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর প্রথম সূর্যের কম্পমান আলো আছে। 

তোমার বুকের ভিতর অচেনা বনপথ আছে,
যেখানে হরিণেরা ভয় পায় না,
পাখিরা গান গায় নাম না-জানা ভাষায়,
আর নীল প্রজাপতিরা উড়ে বেড়ায়
স্বপ্নেরও গভীর কোনো ঋতুতে।

তোমার চোখের গভীরে আষাঢ়ের নদী আছে 
সেখানে ভেসে থাকে অপেক্ষার সাদা শাপলা,
অভিমানের নীল শালুক,
আর অজস্র না-বলা কথার জলরেখা।

তোমার হাসির ভিতর বকুলের গন্ধ মিশে থাকে,
দূরের কোনো মন্দিরের সন্ধ্যা-ঘণ্টা বাজে,
জোনাকিরা নেমে আসে
নিভে যাওয়া দিনের কপালে।

তোমার বুকের ভিতর 
একটি প্রাচীন বাঁশির সুর ঘুমিয়ে আছে 
যেন সহস্র বছর আগে
কেউ ভালোবেসে তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু রেখে গেছে তার শেষ সুর।

সেই শ্নাসের মর্মর সুরে সন্ধ্যা মৌন হয়ে আসে,
জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে ভিজিয়ে দেয় পৃথিবীর কপাল,
আর আমার সমস্ত একাকিত্ব
নদীর জলে গলে যাওয়া প্রদীপের মতো
আলো হতে হতে হারিয়ে যায়।

তোমার বুকের ভিতর 
এক ঝলক নীল আলোর করুণা আছে
একটি অবিনশ্বর আশ্রয় আছে -

যদি কোনোদিন পথ ভুলে অন্ধকারে 
দাঁড়িয়ে যাই, তবু তোমার বুকের ভেতর 
একটি প্রদীপ জ্বলবে আমার জন্য, সেই প্রদীপ 
নিভবে না কোনোদিন।


৫.      পরমা


বহু শতাব্দীর ধুলো পায়ে মেখে, তক্ষশিলার ভগ্ন তোরণ পেরিয়ে, উজ্জয়িনীর সন্ধ্যার প্রদীপের পাশে দাঁড়িয়ে, পাটলিপুত্রের রাজপথে হারিয়ে যাওয়া রথের চাকার শব্দ শুনে আর বৈশালীর অশ্বত্থতলে অসংখ্য বিস্মৃত মুখের দীর্ঘশ্বাস কুড়িয়ে আমি এসেছি।

আমি দেখেছি নর্মদার জলে ভেসে যাওয়া রক্তিম গোধূলি, শোণের বালুচরে বাতাসের নিঃসঙ্গ লিপি, বিন্ধ্যপর্বতের গায়ে মেঘের ধ্যান, আর সাতপুরার অরণ্যে অদৃশ্য হরিণের চোখের মতো জ্বলে ওঠা রাত।

কত রাজ্য উঠেছে, কত পতাকা ধুলোর সঙ্গে মিশে গেছে, কেবল পথই রয়ে গেছে - সময়ের কপালে লেখা এক অন্তহীন যাত্রার মতো।

আমার দুই হাতে তখন শুধু ক্লান্তির শীতল ছায়া, 
চোখে জমে ছিল অগণিত সন্ধ্যার অনিদ্রা। সেই সময় তুমি এলে বহু বছরের পুরনো সভ্যতার পথ হেঁটে। 

তোমার কেশ বর্ষার রাতে কালো যমুনার নিঃশব্দ স্রোত, তোমার দুটি চোখ মানস সরোবরের প্রভাতী নীলের মতো গভীর, তোমার হাসি অমরকণ্টকের প্রথম ঝরনার জলের মতো স্বচ্ছ, তোমার পদধ্বনি শতদ্রুর বালুচরে নেমে আসা সাদা বকের ডানার মতো কোমল।

তুমি কোনো প্রশ্ন করোনি, শুধু আমার দিকে চেয়ে ছিলে, সেই দৃষ্টির ভিতর আমি প্রথম শুনেছিলাম পৃথিবীর সমস্ত ঝড়ের পরে নেমে আসা ভাঙাগড়ার গল্প।

আর তখনই মনে হলো, এতকাল আমি ইতিহাসের ধূলিধূসর পথেই হেঁটেছি, আজ প্রথম কোনো মানুষের হৃদয়ের কাছে এসে পৌঁছেছি।


৬.      বন্ধ চোখের ভিতর


একদিন তুমি খুব নিবিড় হয়ে 
আমার বন্ধ চোখের দিকে তাকাবে,
আমি তখন দেখতে পাব না—তোমার চোখের কোণে জমে ওঠা লোনা জল।

তখন হয়তো সন্ধ্যা নামবে পৃথিবীতে, 
কাশফুলের সাদা নিঃশ্বাসে কেঁপে উঠবে নদীর তীর - একটি পাখি অনেক দূরের আকাশে হারিয়ে যাবে, 
শুধু তোমার বুকের ভেতর অকারণে ভারী হয়ে 
থাকবে একটি করুণ বিষাদ।

তোমার চোখের কোণে যে জল জন্ম নেবে, 
সে জল কেবল মানুষের অশ্রু নয় -
হয়তো বহু সহস্রাব্দ আগে কোনো বিলুপ্ত নদী 
তার শেষ স্রোতটুকু তোমার চোখে আশ্রয় নিয়েছে, আমি তা দেখতে পাবো না।

তুমি হয়তো আমার নাম উচ্চারণ করবে , 
মানুষের সমস্ত সম্বোধন একসময় পাতার নিচে মাটির গন্ধ হয়ে থাকে, কেবল একটি অদৃশ্য করুণা চারদিকে ঘুরে বেড়ায়।

তারপর পৃথিবী আবার তার নিজস্ব নিয়মে চলবে - কাশবন সাদা হবে, 
শালিকেরা বিকেলের আলো কুড়িয়ে নেবে, 
নদীর ওপর কুয়াশা নামবে,
দুটি বন্ধ চোখ অনন্তের দিকে মুখ করে থাকবে, 
যেন তারা কিছুই দেখে না, 
অথচ সমস্ত বিদায়ের ভার বহন করবে।

পৃথিবীর সমস্ত ঝরে-পড়া পাতা, 
সমস্ত হারিয়ে-যাওয়া নদী, 
সমস্ত নিভে-যাওয়া নক্ষত্র জলের 
ভেতর এসে আশ্রয় নেবে -
আর আমি—অসংখ্য ঋতুর ওপারে, 
অন্ধকারের গভীরে—সেই অশ্রুর কোনো 
নীরব ফল্গুধারা দেখব না।


৭.      দেখা অদেখার হিসাব


একটি প্রদীপের শিখায়
কতগুলো অন্ধকার অপেক্ষা করে,
একটি জানালার শিকে 
কত দূরের পথ এসে থেমে থাকে।

একটি পুরোনো চিঠির খামে
কত না-বলা বিকেল ঘুমিয়ে থাকে,
একটি নদীর নীরবতায়
কত ডুবে যাওয়া নাম ভেসে ওঠে।

একটি শুকনো পাতার গায়ে
কত ঋতুর বিদায় লেখা থাকে,
একটি শিশিরবিন্দুর ভেতর
কত আকাশ নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

একটি মানুষের হাসিতে
কত কান্না মুখ লুকিয়ে বাঁচে,
একটি শূন্য ঘরের বাতাসে
কত ফিরে-না-আসা পায়ের শব্দ বাজে।

একটি স্পর্শ হারিয়ে গেলে
কত শীত নেমে আসে হৃদয়ের দেশে,
একটি কবিতা লিখতে বসলে
কত জীবন কলমের নিবে এসে দাঁড়ায় --

আর একজন তোমাকে ভালোবেসে
কত জন্ম একা হয়ে থাকা যায়।


৮.      পুরুষদেহ


তোমার দেহে প্রথম যে আলো পড়ে, সে আলো আর সাধারণ থাকে না, তারও যেন জন্ম হয় কোনো প্রাচীন প্রেমের উপাখ্যানে।

বুকের উপর নক্ষত্রেরা নিশীথে লিখে যায় অনুচ্চারিত মহাকাব্য, আমি কেবল দূর থেকে পড়ি তার দীপ্ত অক্ষরের মৃদু কম্পন।

তোমার বাহুদ্বয়—দুটি অরণ্যপথ, যেখানে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে কোনো প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।তোমার শিরায় শিরায় রৌদ্রের যে নীল স্পন্দন, তাতে বসন্তও বুঝি নিজের প্রথম ভাষা খুঁজে পায়।

তোমার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, রাত্রিরও একটি গোপন হৃদয় আছে, যেখানে চাঁদ তার সমস্ত জ্যোৎস্না একজন মানুষের জন্যই নিঃশব্দে সঞ্চয় করে।

আমি তোমার কাছে যাই না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকি সেই অদৃশ্য আলোর কিনারায়, যেখানে দৃষ্টির ভেতর দৃষ্টি গলে যায়, আর হৃদয়ের গোপন বাগানে নিঃশব্দে ফুটে ওঠে একটি নামহীন কুসুম।

তোমার চলার ভঙ্গিতে পৃথিবী যেন সামান্য কেঁপে ওঠে, যেন কোনো অদৃশ্য বীণায় প্রথম তারটি ছুঁয়ে দিয়েছে কেউ। তোমার নীরবতা - সবচেয়ে দীর্ঘ প্রেমপত্র, যার প্রতিটি বিরামচিহ্নে জেগে থাকে আকাঙ্ক্ষার নীল পাখি।

পুরুষদেহও কখনো কখনো একটি সুগন্ধি কবিতা হয়ে ওঠে, যার প্রতিটি পঙ্ক্তি ঠোঁটে নয়, হৃদয়ের গভীরতম গোপন বাগানে নিঃশব্দে ফুটে ওঠে, আর তার কুসুমের মতোই স্পর্শের আগে সুবাস হয়ে ভেসে থাকে।


৯.      বালুচুরির আঁচল


রূপালি মসলিন থেকে নয়, জয়পুরের কারুকার্যখচিত ঘাঘরা থেকেও নয়,  তুমি পরেছিলে একখানি বালুচরি শাড়ি। কোন অন্তঃপুরের নিবিড় অন্ধকার ভেদ করে ঝিমঝিম সুগন্ধ নেমে এসেছিল তোমার চারপাশে?
কোন অচেনা কাননে অদৃশ্য কুসুমেরা একযোগে প্রস্ফুটিত হয়েছিল?

আমি হতে চেয়েছি সেই কুসুমের নিবেদিত হন্তারক, নিঃশব্দে পৌঁছে যেতে চেয়েছি তোমার গোপন গুহার আদিম বিস্ময়ে। ভূলোকে তোমার বক্ষ কেঁপে ওঠে মাদক বসন্তরাত্রির মতো, দু'পাশের বিহ্বল পাঁজর থেকে রক্তের উষ্ণ স্রোত এক মুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে শোনে হৃদয়ের গোপন উচ্চারণ। আর বসন্ত-হাওয়ায় উড়ে যায় তোমার বালুচরির আঁচল - আকাশের নীলের মতোই অনাবৃত এক মায়া।

তারপর,  মধুর পরম্পরায় আমরা কি ডুবে থাকি আকণ্ঠ, হে প্রিয়তমা, হে প্রণয়িণী?

তুমি আমাকে দাও যন্ত্রণার শিশিরমাখা একগুচ্ছ কুসুম, দাও তোমার উজ্জ্বল অধরের নিঃশব্দ অঙ্গীকার, শোণিতের চিরঋণে দাও প্রেম, দাও অনন্ত সমর্পণের দীপ্তি।

আমার সমস্ত ঘুমন্ত প্রণয় জেগে উঠুক তোমার স্পর্শের আভায়, সমস্ত ভাষা থেমে যাক, থেমে যাক নিঃশ্বাসেরও উচ্চারণ, শুধু রয়ে যাক দু'টি আত্মার গভীরতম রসাস্বাদন, যেখানে দেহ শেষ হয়ে যায়, আর প্রেম হয়ে ওঠে আদিম, অনন্ত, অবিনশ্বর।


১০.     পৃথিবীর রূপ 


চোখ যদি আর পৃথিবীর রূপ আর দেখতে 
না পায়,
তবু কি ভোর হবে না?
শিউলিরা কি নীরবে ঝরে পড়বে না ঘাসের বুকে?
নদী কি তার পুরোনো সুরে সমুদ্রের দিকে যাবে না?

শুধু আমার ভিতরেই
একটি জানালা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে
যেখানে একদিন
তোমার মুখ ছিল প্রথম প্রার্থনার মতো উজ্জ্বল।

আমি তখন স্পর্শে চিনব পৃথিবী,
বাতাসের গন্ধে বুঝব কদম ফুটেছে,
বৃষ্টির শব্দে বুঝব আকাশ কেঁদেছে,
আর মানুষের কণ্ঠে খুঁজে নেব হারিয়ে যাওয়া আলো।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে -
শেষবারের মতো তোমাকে দেখে
'এই মুখটিই আমার পৃথিবী' -
এ কথাটি আর চোখে চোখ রেখে বলতে পারব না।

তখন হয়তো অন্ধকারই
আমার একমাত্র দীর্ঘ নদী হবে,
আমি তার জলে ভাসতে ভাসতে
আলোর স্মৃতিগুলো বুকের কাছে আগলে রাখব।

কারণ,
দৃষ্টি হারিয়ে যায় -
কিন্তু যে চোখ ভালোবেসেছিল,
সে চোখ কোনোদিন অন্ধ হয় না।


১১.     এই শহর তোমার নাম জানে


আজকাল তোমাকে খুব খুঁজি আমি, যেমন বুড়িগঙ্গা নিজের হারিয়ে-ফেলা স্বচ্ছ জল খোঁজে জোয়ারের অন্ধকারে।

লালবাগ কেল্লার প্রাচীন ইটগুলোয় এখনও কি বিকেলের রোদ তোমার মুখের মতো কমনীয় হয়ে নামে? নাকি ইতিহাসও তোমার সঙ্গে কোথাও চলে গেছে?

নবাববাড়ির বারান্দা পেরিয়ে যে বাতাস একদিন তোমার চুল উড়িয়ে দিয়েছিল, সে বাতাস আজও আসে, কিন্তু কাউকে আর চিনতে পারে না।

রমনা পার্কের গাছগুলো প্রতিটি বসন্তে নতুন পাতা মেলে, শুধু আমাদের বসে থাকা বেঞ্চটি প্রতিবছর একটু একটু করে আরও নির্জন হয়ে যায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দীর্ঘ পথ এখনও সন্ধ্যার আলোয় ভিজে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হয়, এই বুঝি তুমি কৃষ্ণচূড়ার ছায়া ভেঙে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলে, কাছে গিয়ে দেখি, ওটা কেবল বাতাসের ছলনা।

বইমেলায় আজও যাই। নতুন কবিতার বই খুললেই মুদ্রণের কালির ভেতর তোমার আঙুলের গন্ধ খুঁজি। ভিড়ের মধ্যে কত মুখ দেখি, শুধু তোমার মুখটিই কোনো প্রকাশক ছাপাতে পারেনি।

মৌলিতে বসে থাকি, এক কাপ কফি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। চেয়ারটা খালি থাকে। ওয়েটার আজও অভ্যাসবশত দু'জনের দিকেই তাকায়, যেন তুমি একটু পরেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কৃষ্ণচূড়ার গন্ধ আজও ভেসে বেড়ায়। অপরাজিত বাংলার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়, যৌবন আসলে কোথাও যায় না, শুধু মানুষগুলো নিজেদের ভেতর থেকে হারিয়ে যায়।

তবু আজও মনে হয়, একদিন বিকেলের শেষ আলো বুড়িগঙ্গার জলে গলে পড়বে। তুমি নিঃশব্দে এসে বসবে পাশে।

কোনো অভিমান থাকবে না, কোনো প্রশ্নও নয়।
শুধু ঢাকার আকাশে একঝাঁক শালিক ঘরে ফিরবে, আর আমরা বুঝে নেব, কিছু শহর আসলে মানুষকে ধরে রাখে না, মানুষের অপেক্ষাটুকুই আজীবন আগলে রাখে।

আর কিছু ভালোবাসা, পুরোনো ঢাকার সরু গলির মতো, যতবার ফিরে আসো, ততবারই মনে হয়, এই পথেই বুঝি তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল।


১২.     পড়ন্ত বিকেল


বুড়ো বটগাছের ছায়ায় একটি পাখি ডেকে ওঠে, মনে হয়, সে-ও বুঝি আমাদের অসমাপ্ত কথাগুলো আকাশের নীল খাতায় লিখে রাখছে-

যদি কোনোদিন আমার সমস্ত পথ ধুলোর কাছে ফিরে যায়, তবু তুমি বিশ্বাস রেখো, তোমাকে ভালোবাসার জন্য আমার হৃদয় কখনও পথ হারাবে না।

যে প্রেম চোখের জলে ভিজে থাকে, সে প্রেমের মৃত্যু হয় না। সে বারে বারে পড়ন্ত বিকেলের আলো হয়ে ফিরে আসে... 


১৩.     কেউ রইল না


যাকে জীবনভর ডেকেছিলাম, সে অন্য কোনো আকাশে সন্ধ্যা নামিয়েছে।
যে আমার ঘরে একটি প্রদীপ জ্বালাতে চেয়েছিল, 
তাকে বলেছিলাম - এখন নয়, আরেকদিন।

তারপর ঋতুগুলো একে একে বদলে গেল, নদী পথ ভুলে সমুদ্রে মিশে গেল, পুরোনো চিঠিগুলো হলুদ হয়ে নিজেদের ভাষাও ভুলে গেল।

একদিন ফিরে তাকিয়ে দেখি, যাকে চেয়েছিলাম,
সে নেই, যে আমাকে চেয়েছিল, সেও আর নেই।

এখন শুধু বিকেলের দীর্ঘ ছায়া আমার পাশে এসে বসে থাকে, আর বাতাস খুব ধীরে বলে -
মানুষ কখনও কখনও ভালোবাসা হারায় না, 
হারিয়ে ফেলে সেই সময়টুকু, যখন ভালোবাসাকে ধরে রাখা যেত।

তাই আজ কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অভিমানও নয়। শুধু মনে হয় -  সব দরজা একদিন খুলেই ছিল, আমিই দেরি করে পৌঁছেছিলাম।

সেই থেকে আমার ঘরে শুধু শূন্যতা থাকে -
আর জানালার ওপাশে একটি নামহীন পাখি প্রতিদিন সন্ধ্যায় ডেকে যায় সেইসব মানুষের নাম - যারা একদিন আমার হতে চেয়েছিল।


১৪.    মেঘের ভিতর মায়াবতী


আকাশ যখন মেঘে মেঘে নিজের নাম ভুলে যায়,
আমার তখন ইচ্ছে করে
একটি রিকশার ধীর চাকার শব্দে
পৃথিবী থেকে একটু দূরে সরে যাই -

সঙ্গে থাকুক মায়াবতী।

কোনো ঠিকানা নয়,
কোনো প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতিও নয় -
শুধু ভেজা বাতাসের শরীরে
পথের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে থাকুক।

যে রাস্তাগুলোর শেষ নেই,
সেখানেই মানুষ সবচেয়ে বেশি
নিজের হারিয়ে যাওয়া মুখ খুঁজে পায়।

হঠাৎ
আকাশ তার নীল বিষণ্নতা ছিঁড়ে ফেলবে -
বৃষ্টি নামবে,
যেন বহু শতাব্দী ধরে জমে থাকা
অচেনা মানুষের কান্না।

আমি হুড তুলব না।

ভিজে যাক
তোমার চুলের ভিতর লুকিয়ে থাকা সন্ধ্যা,
আমার কাঁধে ঘুমিয়ে থাকা অনুচ্চারিত জীবন,
আমাদের মাঝখানে নিঃশব্দে জন্ম নেওয়া
সমস্ত আকুলতা।

তুমি হয়তো কিছুই বলবে না।

কারণ
কিছু নিস্তব্ধতা আছে,
যেখানে শব্দ উচ্চারণ করলেই
ভালোবাসার আয়ু কমে যায়।

এক পশলা বৃষ্টি,
একটি ধীরে চলা রিকশা,
আর এমন একজন মানুষ,
যার পাশে বসে থাকলে
নিজেকেও দূরের কোনো নক্ষত্রের মতো মনে হয়।

তারপর বৃষ্টি থেমে যাবে।

সব বৃষ্টিই থামে, 
শুধু ভেজা থাকে রিকশার লোহার হাতল,
দু-একটি কদমপাতা,
আর মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা
অপ্রকাশিত বিদায়ের ঋতু।

অনেক বছর পরে
হয়তো আর মায়াবতী থাকবে না,
রিকশাও থাকবে না,
শহর তার সব পথ বদলে ফেলবে।

কেবল বর্ষার প্রথম মেঘ উঠলেই
বুকের গভীরে কে যেন
ধীরে ধীরে একটি ভেজা ঘণ্টা বাজাবে। 

আমার মনে হবে -
পৃথিবীতে সবচেয়ে সস্তা সুখগুলোরই
মূল্য সবচেয়ে বেশি,
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য
আসলে খুব সামান্য জিনিসে লুকিয়ে থাকে।

আর মানুষের বেদনাগুলো
শুধু বৃষ্টির শব্দ হয়ে অন্ধকার জানালায়
অনন্তকাল ধরে ঝরে পড়ে।


১৫.     চলো, দূরের কোনো গ্রামে যাই


এই বিশ্রী শহর আর ভালো লাগে না— 
চলো, দূরের কোনো গ্রামে যাই।
যেখানে এখনো একটি ছোট নদী ধীরে ধীরে 
নিজের নাম ভুলে কাশবনের পাশে ঘুমিয়ে থাকে, ধনীদহ বিলের জলে শাপলার মুখে 
সন্ধ্যার রঙ লেগে থাকে, আর হিজল-করচের ছায়া জলের গভীরে নেমে গিয়ে আর-একটি 
পৃথিবীর খবর আনে।

চলো, সেই আলপথে হাঁটি— 
যেখানে আকন্দফুলের সাদা বিষণ্নতা, 
ভাটফুলের নীরব সুবাস, 
কচুরিপানার বেগুনি স্বপ্ন জলকে এক অচেনা আকাশের মতো করে রাখে।

শঙ্খচিল ভেসে যাবে অপরাহ্নের শেষ রৌদ্র বুকে নিয়ে মাছরাঙা নীল বিদ্যুতের মতো নেমে আসবে জলের ভিতর। দূরে ধানের ক্ষেতে বাতাস এমনভাবে দুলবে, মনে হবে পৃথিবী আজও কোনো কৃষকের নিঃশব্দ প্রার্থনায় বেঁচে আছে।

গোধূলি নামবে। গরুর গলার ঘণ্টায় ধীরে ধীরে 
জমবে সন্ধ্যার শব্দ, বাঁশবনের ভেতর থেকে বউকথাকও একবার ডেকে উঠবে, 
তারপর সমস্ত গ্রাম কুয়াশার পাতলা চাদরে 
নিজেকে ঢেকে ফেলবে।

চলো, কোনো বুড়ো অশ্বত্থের নিচে বসি। হয়তো সেখানে আমাদের বহু জন্মের ক্লান্তি শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়বে, হয়তো কেউ জানবেও না, 
আমরা একদিন এই পৃথিবীতে ছিলাম - 
শুধু শিশিরভেজা ঘাস আমাদের পায়ের শব্দ আরও কিছুদিন মনে রাখবে।

রাত হলে নক্ষত্রেরা ধনীদহ বিলের জলে নেমে আসবে। দূরে কোনো জেলের ডিঙিতে একটি কুপিবাতি জ্বলবে, মনে হবে, অন্ধকারও কখনো কখনো মানুষের পাশে বসে চুপচাপ জীবন কাটাতে শেখে।

এই শহরে কংক্রিটের দেয়াল আকাশকে টুকরো টুকরো করে, মানুষের মুখে আর ধানের গন্ধ নেই, বৃষ্টির জলেও আর কাদামাটির স্মৃতি জাগে না। এখানে রাত নামে, কিন্তু জোনাকি নামে না।

তাই চলো,  দূরের কোনো গ্রামে যাই। 
যেখানে ভোরবেলা দোয়েলের ডাক ঘুম ভাঙাবে, যেখানে নদীর কুয়াশা চুপিচুপি মানুষের 
চোখে স্বপ্ন রেখে যায়, 
আর একদিন যদি আমাদেরও পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়, তবে যেন এই বাংলারই কোনো কাশবনের পাশে, শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর, 
শঙ্খচিলের দীর্ঘ ছায়ার নিচে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে 
থাকতে পারি— যেন আমরা কখনো এই মাটির 
বাইরে জন্মাইনি।


১৬.      ধুলোমাখা নীড়


আমি তোমাকে কোনোদিন বলিনি, 'ভালোবাসি',
তুমিও বলোনি। কথাটা আমাদের ঠোঁট পর্যন্ত এসে প্রতিবারই ফিরে গেছে চালের দাম, ভাড়াবাড়ির বকেয়া, আর হাসপাতালের করিডোরে।

আমরা একসঙ্গে হাঁটি, ফেটে যাওয়া স্যান্ডেলের শব্দে পুরো শহর বুঝে ফেলে আমাদের পকেটের নিঃস্বতা - এক কাপ চা ভাগ করে খাই, চায়ের চেয়ে বেশি গরম থাকে মাসের শেষ সপ্তাহ।

তুমি বলো, আজ বাজারে ইলিশের দিকে তাকিয়েই ফিরে এসেছি, আমি বলি, তাহলে নদীর কাছে যাই? তুমি মৃদু হেসে বলো, নদীগুলোও এখন ধুঁকে ধুঁকে বয়ে যায়।

আমরা কোনোদিন হাত ধরিনি প্রকাশ্যে, কারণ করতলের উপর সংসারের হিসাব লেখা থাকে, 
তবু ভিড় বাসে হঠাৎ ব্রেক কষলে তোমার কাঁধ আমার কাঁধে লেগে যায়, সেইটুকুই সেদিনের উৎসব।

তোমার চোখের নিচে অনিদ্রার যে কালো অর্ধচন্দ্র, আমি প্রতিরাতে সেখানে একটি একাকী পাখির মতো আশ্রয় খুঁজি। তুমি বলো - তোমার ডাক্তারী পরীক্ষা গুলো করাতে হবে। আমি বলি - চলো, কোথাও হারিয়ে যাই। 
তুমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলো - হারানোরও তো ভাড়া লাগে।

এই শহরে প্রেমিকদের জন্য বেঞ্চ কমে গেছে, 
পার্কের গাছগুলোও ধোঁয়ার ভেতর কাশি দেয়। তবু আমরা এক টুকরো আকাশকে দু'ভাগ করে নিজ নিজ পকেটে রেখে দিই।

কেউ জানে না, আমাদের অসমাপ্ত কথাগুলো রাতে বিদ্যুতের তারে বসে থাকে, ভোর হলে চড়ুই হয়ে উড়ে যায়।

আমাদের ভালোবাসা কোনো সিনেমার সংলাপ নয়, কোনো লাল গোলাপের উৎসবও নয় - এটি শুধু একটি ছেঁড়া ব্যাগে যত্ন করে রাখা শেষ পাঁচশো টাকার নোটের মতো, খরচ করতেও ভয় লাগে, ফেলে দিতেও মন চায় না।

হয়তো কোনোদিন আমরা তবু বলব - 'ভালোবাসি।' 
সেদিন পৃথিবীতে অলৌকিক কিছু ঘটবে না, 
শুধু দীর্ঘদিন বৃষ্টি না-পাওয়া একটি গাছের শুকনো ডালে হঠাৎ একটি সবুজ পাতা জন্মাবে।


১৭.     অশেষের কাছে


আমাকে যতবার ভেবেছি শেষ,
ততবারই অদৃশ্য কোনো হাত
আমার ভাঙা প্রদীপে নতুন সলতে জ্বেলে দিয়েছে।

শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে
রাত্রির শেষে যেমন হঠাৎ জোয়ার নামে,
তেমনি আমার নিঃস্বতার ভেতরেও
অচেনা পাখিরা এসে রেখে গেছে ভোরের গান।

যে ফুল ঝরে পড়েছিল
ধুলোর কাছে মাথা নত করে,
তারই গন্ধে একদিন ভরে উঠেছে
সমস্ত নির্জন বাগান।

আমি হারিয়েছি 
তাই তো আকাশ আমাকে নক্ষত্র দিয়েছে,
আমি কেঁদেছি 
তাই বৃষ্টিরা আমার নাম মুখস্থ করেছে,
আমি শূন্য হয়েছি 
তাই অনন্ত এসে বসেছে আমার হৃদয়ের চৌকাঠে।

হে অসীম তুমি 
তোমার এই বিস্ময়কর লীলায়
ক্ষয়ও এক ধরনের জন্ম,
বিদায়ও এক গোপন আগমন।

আমার সমস্ত ফুরিয়ে যাওয়াকে
তুমি এমন মমতায় বহন করো
যেন প্রতিটি শেষের গভীরে
আরও একটি প্রথম সকাল অপেক্ষা করে।

তাই আজ আর পূর্ণ হতে চাই না—
শুধু তোমার হাতে অশেষ হয়ে থাকতে চাই,
যেন প্রতিটি নিশ্বাস শেষে 
আরও একটি নতুন জীবন নিভে গিয়ে 
আবার জ্বলে ওঠে।


১৮.    নারী 


যেদিন নারী শব্দটির ভেতর থেকে
মানুষ মুছে গিয়ে
শুধু শরীরের একটি দরজা বেঁচে রইল -
সেদিনই পৃথিবী তার প্রথম আয়নাটি ভেঙে ফেলেছিল।

তারপর জন্ম নিল অসংখ্য উপকথা।
রাক্ষসেরা মানুষের পোশাক পরল,
খোক্কসেরা সভ্যতার ভাষা শিখল,
রাজপুত্রেরা ভালোবাসার নামে
তলোয়ারের চেয়ে ধারালো অধিকার লিখল।

রাজকন্যারা তখন আর মানুষ নয় -
রাজ্যের মানচিত্রে আঁকা একখণ্ড জমি,
সন্ধিচুক্তির অলঙ্কার,
অথবা বিজয়ীর মুকুটে বসানো
অমূল্য রত্নমাত্র।

তাদের হাসিরও ছিল মালিক,
কান্নারও ছিল পাহারাদার।
সোনার কাঠির ছোঁয়ায় যে ঘুম ভাঙত,
সে ঘুম থেকে জেগেও
নিজের জীবনে ফিরতে পারত না কখনও।

সময়ের নদী আরও বহুদূর গড়াল।
রাজপুত্রেরা সুলতান হলো,
সম্রাট হলো,
কখনও ধর্মের মুখোশ,
কখনও আইনের সিলমোহর পরে
নারীর চারপাশে গড়ে তুলল
অদৃশ্য দেয়াল।

অথচ সেই নারীরই চোখে
পৃথিবীর প্রথম ভোর জেগেছিল,
তারই করতলে
শিশুর প্রথম আকাশ খুলেছিল,
তারই নিঃশ্বাসে
মানুষ শিখেছিল ভালোবাসা।

তবু ইতিহাস তাকে লিখেছে
কখনও দেবী, কখনও দাসী,
কখনও বনলতা সেন -
যেন নারী মানেই
কারও ক্লান্তির আশ্রয়,
নিজস্ব কোনো মহাবিশ্ব নয়।

আমি আজ সেই পুরোনো অভিধান ছিঁড়ে ফেলতে চাই।
নারী মানে কোনো তার গোপনাঙ্গ নয়,
কোনো সম্পদ নয়,
কোনো হেরেমের অলঙ্কার নয়,
কোনো কবিতার উপমাও নয় কেবল।

নারী মানে -
নিজস্ব নক্ষত্রমণ্ডল,
নিজস্ব নদীর উৎস,
নিজস্ব ভাষায় উচ্চারিত
একটি পূর্ণ মানুষ।

যেদিন এই অর্থটি
আমরা সত্যিই শিখে নেব,
সেদিন রাক্ষসেরা রূপকথায় ফিরে যাবে,
রাজপুত্রেরা মুকুট খুলে মানুষ হবে,
আর পৃথিবীর প্রতিটি কন্যাশিশু
প্রথমবারের মতো
নিজের নামেই জন্ম নেবে।


১৯.      বিদায় বলো না


কত স্বপ্ন দেখেছি দুজন, কত স্বপ্ন রয়ে গেছে --
অসমাপ্ত স্বপ্নেরও একধরনের কান্না থাকে, 
তুমি এখনই বলো না, বিদায়! 

অসমাপ্ত স্বপ্নেরা খুব অভিমানী, একজনের অনুপস্থিতি তারা কোনোদিন মানতে পারবে না।

চলো, আরেকটু বেঁচে থাকি, একটি একটি করে 
স্বপ্নের প্রদীপের সলতে-য় আগুন দিই, 
নদীর ওপারে যে নীল সন্ধ্যা আমাদের নামে অপেক্ষা করছে, সেখানে একসঙ্গে পৌঁছি।

তার আগে বিদায় নয়, কারণ ভালোবাসার শেষ ইচ্ছেটুকুও দুজন মানুষের হাত ধরেই পূর্ণতা পেতে চায়।

এসো, সব স্বপ্নের প্রদীপ একে একে জ্বালিয়ে নিই, 
তারপর একদিন খুব সন্তর্পণে একই আকাশের 
শেষ আলোটুকু চোখে নিয়ে 
একসঙ্গে পেরিয়ে যাব অনন্তের ওপারে।


২০.     নীলাভ অধ্যায়


সুন্দরেরও একটি নির্জন ভূগোল আছে, সেখানে তুমি একা হাঁটো, সন্ধ্যার শেষ নীল পাখিটির মতো, অথবা বহু সহস্র বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা কোনো নক্ষত্রের নিঃশ্বাস।

তোমার মুখে অপরিচিত চাঁদের আলো এসে বসে, যেন সময় তার সমস্ত ক্লান্তি রেখে গেছে দুটি চোখের ভেতর।

নগ্নতায় তুমি পিকাসোর অসমাপ্ত ক্যানভাস, ভাঙা রেখার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক আদিম ভাষা, ঢাকাই মসলিনের মতো স্বচ্ছ, তবু স্পর্শেরও অতীত। কাঁচা মাটির গন্ধে গড়ে ওঠা এক অনন্ত পটপ্রতিমা, যার দিকে তাকালে সভ্যতার সমস্ত আয়না নতজানু হয়ে পড়ে।

তোমার শরীর জুড়ে পূর্ণিমা তার বক্র আলো মেলে ধরে, গোলাপি নয়, বরং জোৎস্নায় দ্রবীভূত কোনো বিস্মৃত নীহারিকার রক্তিম স্মৃতি। তুমি ঝরে পড়ো শিশিরের মতো নয়, অদৃশ্য নক্ষত্রধুলোর মতো, ধীরে ধীরে, সারারাত্রি জুড়ে।

তোমার চুলে অন্ধকার তার সবচেয়ে প্রাচীন নদী লুকিয়ে রাখে, তোমার ঠোঁটে ভোরের প্রথম পাখির অনুচ্চারিত গান। তোমার নীরবতা ছুঁয়ে আমার সমস্ত শব্দ পাতাঝরার বনের মতো ঝরে যায়।

তখন মনে হয়,  ভালোবাসা কোনো উচ্চারণ নয়, একটি নীলাভ অধ্যায় মাত্র, যেখানে পৃথিবীর সব আলো শেষ পর্যন্ত এসে তোমার ছায়াতেই আশ্রয় নেয়।


২১.     কোথায় ফেলে এলে


কোথায় ফেলে এলে সেই নদী -
জোৎস্নার ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে যে নামত, সেই কাশবন, সেই শিশিরভেজা ঘাস, 
সেই নির্জন বাঁশঝাড়ের গান? কোথায় সেই দুপুর, 
গরুর ঘণ্টার শব্দে ঘুমিয়ে পড়া পথ, 
সেই ধানের গন্ধে ভরে থাকা বাতাস, সেই গোধূলি বিকেলের পাখির উড়ান?

কোথায় সেই মেয়েটি -
চুলে বৃষ্টির গন্ধ, চোখে নদীর নীল ছায়া, 
যে দু'হাত বাড়িয়ে বলেছিল, 'ফিরে এসো, সন্ধ্যা নামার আগে।' আজ কেবল কুয়াশা নামে,
ভেজা পাতার গায়ে সময়ের ধুলো, অথচ তার  
পায়ের শব্দ শুনি দূর অশ্বত্থের 
পাতার ফাঁকে।

কোথায় সেই করমচা, বনলেবু -
শাপলার ঘুমন্ত সাদা মুখ, সেই কাদামাটির উঠোন, ধোঁয়া ওঠা ভাত, মায়ের ডাকার সুর? 
সবই কি চলে গেছে অদৃশ্য কোনো ঋতুর নৌকায় ভেসে নাকি তারা লুকিয়ে আছে বুকের ভেতর, বহুদিনের সুদূর?

আজ ভোর হলে অসংখ্য কাক ডেকে ওঠে 
ধূসর আকাশ জুড়ে, নবান্নের গন্ধ আসে—
তবু শূন্য থাকে আমার সমস্ত গ্রাম। মনে হয়, পৃথিবী নয় আমি-ই হারিয়ে গেছি কোনো এক কুয়াশায়, 
ফিরে পাই না সেই দিন, সেই মানুষ, সেই অবিনশ্বর নাম।

কোথায় সে নিয়ে গেছে সঙ্গে করে সেই নদী, 
কুয়াশা, শাপলার নিঃশ্বাস, সেই বনপথ, ভিজে ঘাস, নিশিপাখির ডানায় লেগে থাকা জোৎস্নার ধূলি? কোথায় সেই বিকেল, 
তালবনের ছায়ায় শালিকেরা ঘরে ফিরত, 
দূর বাঁশবনের ভেতর কার যেন হারিয়ে যাওয়া বাঁশির সুর দুলত ধীরে।

কোথায় সেই মেয়ে, এলোচুলে নদীর গন্ধ, 
চোখে শ্রাবণের নীল বিষাদ, 
ভেজা সাদা হাতে যে একদিন ছুঁয়ে দিয়েছিল আমার সমস্ত নির্জনতা? 
আজও কি সে করমচার বনে দাঁড়িয়ে থাকে,
ধূসর চাঁদের নিচে, নাকি কাশফুলের মতো উড়ে গেছে কোনো বিস্মৃত জন্মের অনন্ত ব্যাকুলতায়?

কোথায় সেই কচি তালশাঁস, 
সেই নোনা গাছ, ভেজা মাটি, বেলকুঁড়ি ছাওয়া পথের গন্ধ? সেই ধোঁয়া ওঠা ভাত, 
মায়ের ডাকে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালার ক্ষণ -
সবই কি আজ মৃত নক্ষত্রের আলো, বহু শতাব্দী পরে এসে পৌঁছানো ছন্দ?

হয়ত কোনো এক হেমন্তের নবান্নভোরে আবার ফিরে পাবো সব, নদী, ক্ষেত, মাঠ, কুয়াশা, শিউলি-ঝরা উঠোন, মায়ের স্নেহভরা ডাক -
আর, যদি না পাই, তবে একদিন আমিও ধানের গন্ধ হয়ে মিশে যাবো বাংলার বাতাসে, 
তখন কোনো এক নিঃসঙ্গ রমণী ভোরের অন্ধকারে আমাকে মনে করে দেখবে দূরের কোনও স্বচ্ছতোয়া নদী।


২২.    ঘরের প্রাণ


আমার এই ঘর বহু যতন করে যে মানুষটি গুছিয়ে রাখত প্রতিদিন, সে ছিল না শুধু একজন মানুষ—সে ছিল ঘরের নিঃশ্বাস, দেয়ালের নীরব হাসি, জানালার ভোরের আলো।

আজ ধুলো জমেছে আলমারির কোণে, টেবিলের ওপর সময়ের মতো পুরু বিষণ্নতা। যে বারান্দায় সন্ধ্যাবেলা ফুলের গন্ধ ভেসে আসত, সেখানে আজ চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছে—মনে হয়, মানুষহীন ঘরকে প্রকৃতি নিজের মতো করে দখল করে নিচ্ছে।

রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝেই পোড়া ভাতের গন্ধ ভেসে আসে। কেউ আর ব্যস্ত হয়ে বলে না- 'ওগো, হাঁড়িটা দেখো তো!' স্নানঘরের বালতিতে উপচে পড়ে জল, কেউ আর কলটি বন্ধ করতে দৌড়ে আসে না।

জানালার পর্দাগুলো অনেক দিন রোদ পায়নি। তাদের রঙে লেগে আছে অপেক্ষার ধূসর বিকেল। চার দেয়ালের ভেতর একটি দীর্ঘশ্বাস নীরবে হাঁটে, সন্ধ্যা নামে, অথচ কোনো প্রদীপ জ্বলে না।

তখনই বুঝি—একটি সংসারের প্রাণ ইট, কাঠ, সিমেন্ট নয়। সংসারের প্রাণ একজন স্ত্রী, একজন মা—যাঁর কোমল হাতের স্পর্শে অগোছালো জীবনও হয়ে ওঠে উৎসব।

তিনি ঘর শুধু পরিষ্কার করেন না, মুছে দেন মানুষের ক্লান্তি। তিনি শুধু ভাত রান্না করেন না, ভালোবাসার গন্ধ মিশিয়ে দেন প্রতিটি কণায়। তিনি শুধু বিছানা গুছিয়ে রাখেন না, স্বপ্নগুলোকেও ভাঁজ করে রাখেন যত্নে।

যেদিন তিনি পারেন না, অথবা কোনো এক অনন্ত দূরত্বে হারিয়ে যান, সেদিন বোঝা যায়—একটি ঘরেরও মন আছে, অভিমান আছে, নিঃসঙ্গতা আছে।

আর তখন,পরিপাটি সেই ঘরটি নীরবে কেঁদে ওঠে—ধুলোর আস্তরণে, পোড়া ভাতের গন্ধে, মলিন পর্দার ভাঁজে ভাঁজে...

কারণ, ঘর কখনো জিনিস পত্রে বাঁচে না—ঘর বেঁচে থাকে একজন মায়াময়ী নারীর নিঃশব্দ ভালোবাসায়।

এই ঘরে একদিন একজন নারী থাকতেন।

তিনি ভোরের আলোকে পর্দায় গেঁথে দিতেন, দুপুরকে সাজিয়ে রাখতেন ধোয়া থালার ঝকঝকে দীপ্তিতে, সন্ধ্যার প্রদীপে মিশিয়ে দিতেন তাঁর দীর্ঘশ্বাস। আমরা কেউ বুঝিনি—একটি সংসার আসলে তাঁর দুটি হাতের ভেতরেই বাস করত।

যেদিন তাঁর হাত থেমে যায়, যেদিন তিনি আর পারেন না অথবা কোনো অনন্ত নক্ষত্রলোকে চলে যান—সেদিনই বোঝা যায়, ঘরেরও হৃদয় আছে।

আর গভীর রাতে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই—খালি ঘরটি খুব আস্তে আস্তে তার হারিয়ে-যাওয়া গৃহলক্ষ্মীকে ডেকে বলে—

'ফিরে এসো...তোমাকে ছাড়া ঘর আর ঘর থাকে না, সে কেবল চারটি দেয়াল হয়ে বেঁচে থাকে, আর তার প্রতিটি ইটে জমে ওঠে একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার ধুলো।'


২৩.     বনলতা


চুলে তোমার শ্বেত বেলীর মালা,
সাদা শাড়ির লাল পাড়ে লেগে আছে
নাটোরের ধুলো-ভেজা বিকেল।

তুমি তাকিয়ে আছো দূরে,
যেন হাজার বছর ধরে কেউ আসবে বলে
অপেক্ষায় আছো বটের ছায়ায়,
চোখে তোমার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।

আমি ক্লান্ত পথিক,
বাংলার কত মাঠ, কত নদী ঘুরে
তোমার ওই শান্ত চোখের সামনে এসে
থেমে গেছি।

বলো না, তুমিই কি সেই?
যাকে জীবনানন্দ খুঁজেছিল
অন্ধকারে, ইতিহাসের ভিড়ে -
আমার সব ক্লান্তি মুছে দিতে?


২৪.     চোখের মায়ায়

তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে, ভোরের আলো হাসে,
একটুখানি তাকালেই মন হারিয়ে ভাসে।
কাজল ছাড়াই এত মায়া, কেমনে আঁকলে বলো?
ওই চোখেরই অতল তলে আমি ডুবেই চলো।

ওই চোখে মেঘ জমে, আবার বৃষ্টিও ঝরে,
ওই চোখেই অভিমান, আবার স্বপ্ন গড়ে।
কথা না বলেও সে কত কথা বলে যায়,
নীরব থেকেও হাজার কবিতা লিখে যায়।

একবার তাকাও, থমকে যাক পৃথিবী,
তোমার চোখের তারায় আমি খুঁজি আমার সবই।
ওই দৃষ্টির মায়াজালে বাঁধা পড়েছি আমি,
চোখ তো নয়, যেন দু'টো পদ্ম, ভীষণ দামি।


২৫.     শেষ পর্যন্ত 


অনেক দীর্ঘ পথ হেঁটে
একদিন তুমি এসে দাঁড়ালে আমার দরজায়,
ঠিক যেমন
শুকনো নদী হঠাৎ এক বর্ষার রাতে
জলের গন্ধে ভরে ওঠে,

ঠিক যেমন
বহুদিন বন্ধ থাকা জানালায়
ভোরের প্রথম রোদ এসে
নিঃশব্দে বসে পড়ে,

ঠিক যেমন
মায়ের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়লে
শিশুর সমস্ত কান্না
এক নিমিষে থেমে যায়,

ঠিক যেমন
শিউলি ঝরার শব্দে
শরতের ভোর নিজের পরিচয় দেয়,
তেমনি করেই তুমি এলে।

আমি তখন
মানুষের ভিড়ে একা হয়ে যাওয়ার শিল্প শিখে ফেলেছি,
হাসির ভেতরে লুকিয়ে রাখতাম
অসংখ্য অপ্রকাশিত সন্ধ্যা।

তুমি এসে
আমার বুকের ধুলো ঝেড়ে দিলে,
ভাঙা স্বপ্নগুলোর গায়ে
আবার রঙের প্রলেপ দিলে।

আজও মনে হয় -
সব মানুষের জীবনে
কেউ না কেউ আসে,
কিন্তু কিছু মানুষ আসে
নিয়তির লেখা হয়ে।

আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন—
তাই পৃথিবীর এত পথ হারিয়ে
শেষ পর্যন্ত
তোমার কাছেই এসে পৌঁছেছি।


২৬.     বারান্দা ও ঘর


ঘর মানে শুধু চারটি দেয়াল নয়, ঘর মানে প্রতিদিনের ভাতের গন্ধ, অসুখের রাতে কপালে রাখা শীতল হাত, বৃষ্টির দিনে একই ছাতার নিচে নীরব থেকে পাশাপাশি হাঁটা।

বারান্দা সুন্দর— সেখানে বাতাস আসে, চাঁদ নামে, তারা জ্বলে, দূরের অচেনা বাঁশির সুর মুহূর্তের জন্য মনকে ডেকে নেয়।

কিন্তু বারান্দা কখনো রাত্রির শেষ আশ্রয় নয়। ঝড় এলে সে আঁকড়ে ধরে না, জ্বর এলে জল বাড়িয়ে দেয় না, বৃদ্ধ বয়সে কাঁপা হাত নিঃশব্দে নিজের হাতে তুলে নেয় না।

যে প্রেম শুধু চোখের আলো, সে অনেক সময় সন্ধ্যার মতো ক্ষণিক, যে প্রেম চোখের জল মুছে দেয়, সে-ই ভোরের মতো দীর্ঘ।

মোহের রঙ বড় উজ্জ্বল, তাই সে সহজে চোখে পড়ে, কিন্তু ভালোবাসার রঙ ধীরে ধীরে হৃদয়ে মিশে যায়, ঠিক পুরোনো ঘরের দেয়ালে জমে থাকা চন্দনের গন্ধের মতো।

যে মানুষ বারান্দার হাওয়াকে ঘর ভেবে বসে, সে একদিন বুঝতে শেখে, বাতাসের কোনো ঠিকানা নেই, আলোও সারারাত থাকে না।

তাই সম্পর্কের সত্য উচ্ছ্বাসে নয়, অপেক্ষায়, নতুনের নেশায় নয়, বিশ্বস্ততার গভীরে। যেখানে একজন মানুষ আরেকজনের ভাঙা স্বপ্নও নিজের হাতে জোড়া লাগায় - সেখানেই প্রেম পূর্ণ হয়।

ঘরকে যদি প্রতিদিন একটু যত্ন, একটু কথা, একটু ক্ষমা আর একটু ভালোবাসা দেওয়া যায়, তবে আর কোনো বারান্দার মায়াবী হাওয়া ঘরের উষ্ণতাকে হারাতে পারে না।


২৭.     তুমি নাও


তুমি নাও ভোরের প্রথম শিশির, নাও কাশবনের সাদা দোল, নাও নদীর বুকে ভেসে থাকা একটি নামহীন নৌকার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

তুমি নাও কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা বিকেল, নাও শালিকের ঠোঁটে লেগে থাকা ধানের গন্ধ, নাও বৃষ্টিভেজা উঠোনে কদমফুলের নরম অপেক্ষা।

তুমি নাও বাঁশবনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া বাতাসের বাঁশি, নাও দূর গ্রামের সন্ধ্যা-প্রদীপ, নাও জোনাকির আলোয় লেখা অপ্রকাশিত কোনো প্রেমপত্র।

তোমার দুই হাতের জন্য রেখে দিয়েছি শেফালির শুভ্রতা, তোমার কপালের জন্য রেখেছি আশ্বিনের নির্মল চাঁদ, তোমার চোখের জন্য রেখেছি পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ নীল।

তুমি নাও মেঘের অলস ভেলা, নাও পলাশবনের রক্তিম উল্লাস, নাও বকুলতলায় পড়ে থাকা অচেনা কারও মৃদু বিষণ্নতা, নাও গভীর রাতের তারাভরা আকাশের অনন্ত ধ্যান।

যদি একদিন পৃথিবী সব রং হারিয়ে ফেলে, সব গান থেমে যায়, সব নদী শুকিয়ে যায় আর সব ফুল ভুলে যায় কীভাবে সুবাস হতে হয়—
তবুও, তুমি , তোমার জন্য আমি লুকিয়ে রাখব এক মুঠো ভোর, এক ফালি চাঁদ, একটি পাখির অমলিন ডাক, আর আমার সমস্ত না-বলা ভালোবাসা -

যাতে তুমি যখনই পৃথিবীকে অন্ধকার মনে করবে, তখনও তোমার চারপাশে একটি নির্মল বসন্ত ফুটে উঠতে পারে।


২৮.      মন ভেসে যায় 


মন ভেসে যায় দূর অচেনা কোনো নির্জন নদীর তীরে,
যেখানে বিকেলগুলো এখনো কাশফুলের গায়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে,
আর বাতাস পুরোনো দিনের নাম ধরে ধীরে ধীরে ডেকে যায়।

সেখানে নিশ্চয়ই রয়ে গেছে
আমার ফেলে আসা শৈশবের পায়ের চিহ্ন,
ভেজা ঘাসে জমে থাকা শিশিরের প্রথম বিস্ময়,
মাটির উঠোনে বৃষ্টির গন্ধে ভিজে থাকা একটি পৃথিবী।

মনে হয়, সেই নদী আজও চেনে
আমার কাগজের নৌকা,
জোছনা রাতে জলে ছুঁড়ে দেওয়া ছোট্ট স্বপ্নগুলো,
আর নাম না-জানা পাখির ডানায় লেখা প্রথম ভালোবাসার অক্ষর।

কত মুখ হারিয়ে গেছে,
কত কণ্ঠস্বর সন্ধ্যার আলোছায়ায় মিশে নিঃশব্দ হয়েছে -
তবু তাদের মায়া রয়ে গেছে
তালগাছের মাথায় দুলে ওঠা শেষ আলোর মতো।

যদি কোনোদিন আবার ফিরে যাই,
হয়তো নদীটি আমাকে চিনবে না,
কিন্তু বাতাস হঠাৎ লেবুপাতার গন্ধ হয়ে বলবে -
"তুমি তো কোনোদিন সত্যিই চলে যাওনি,
তোমার মন আজও এই নির্জন তীরেই বসে আছে।"

তখন আমি দু'হাত ভরে তুলে নেব
এক মুঠো বিকেল,
এক মুঠো জোছনা,
আর এক জীবনের অমলিন বিষণ্নতা,
যা আজও আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়
দূর অচেনা কোনো নির্জন নদীর তীরে।


২৯.      বাবার আঙিনার আলো


একদিন সন্ধ্যাবেলা
মেয়েটি বারান্দার রেলিংয়ে মাথা রেখে বলেছিল -
'বাবা, মানুষ কি সত্যিই একদিন
নিজের ঘর বদলে ফেলে?'

বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

পাখিরা তখন নীড়ে ফিরছে,
শিউলি গাছের নিচে
সাদা ফুল জমছে নীরবে।

তিনি ধীরে বললেন -
'ঘর বদলায় মা,
কিন্তু কিছু পথ কখনও বদলায় না।
তুই যেদিন অন্য আকাশে
নিজের প্রদীপ জ্বালাবি,
সেদিনও আমার এই উঠোন
তোর পায়ের শব্দের জন্য
প্রতিদিন বিকেলে অপেক্ষা করবে।'

মেয়েটি হেসে বলল -
'আমি তো দূরে চলে যাব।'

বাবা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন -
দূরত্ব মানে কেবল মানচিত্রের হিসাব।
যে সন্তান বাবার বুকের ভেতর থাকে,
সে কখনও দূরে যায় না।
শুধু তার জন্য রেখে দেওয়া
ভাতের শেষ লোকমাটা
অপেক্ষা করতে শিখে যায়।'

তারপর নেমে এলো সন্ধ্যা।

আজানের সুরে ভিজে উঠল বাতাস,
বাবা চুপচাপ উঠোনে দাঁড়িয়ে রইলেন -
যেন সময়ের কাছে
আরও কয়েকটা শৈশব ধার চাইছেন।

বছর কেটে যাবে,
দেয়ালের রং বদলাবে,
বারান্দার টবে নতুন ফুল ফুটবে,
তবু একটি ঘর থাকবে
যেখানে মেয়ের নাম উচ্চারণ করলেই
জানালার পর্দা হালকা দুলে উঠবে।

কারণ -

বাবারা ভালোবাসার কথা
খুব কম বলেন,
তারা ভালোবাসাকে দরজার কপাটে,
খাবারের থালায়, রাত জেগে থাকা চোখে,
আর অনাগত প্রতীক্ষায় লিখে রাখেন।

তাই পৃথিবীর সব মেয়েই,
যত বড়ই হোক, যত দূরেই যাক,
তার বাবার হৃদয়ে
চিরকালই এক মুঠো রোদ,
একটি শিউলি-সকাল,
আর আদরের ছোট্ট রাজকন্যা হয়ে থাকে।


৩০.      তোমার সাথে দেখা হবে


তোমার সাথে দেখা হবে পরজীবনের
নতুন কোনো পূর্ণিমা রাত্রি প্রহরে -
যেখানে সময়ের কাঁটা থেমে থাকবে
আর বিচ্ছেদের কোনো অভিধান থাকবে না।

সেখানে চাঁদের আলো ঝরে পড়বে
শিউলিফুলের শুভ্র পাপড়ির মতো,
আমরা দুজনে হাঁটব
অচেনা কোনো নক্ষত্রবীথির পথে। 

পৃথিবীর সমস্ত অসমাপ্ত কথা
জোনাকির মতো এসে বসবে
আমাদের দু'হাতের উপরে -
আর স্পর্শ হবে আঙ্গুলে আঙ্গুল ছুঁয়ে 
যে স্পর্শ এক জীবনে অধরা ছিল,
সে স্পর্শ হবে অনন্তের ভাষায়।

সেই পূর্ণিমা রাতে কোনো বিদায় 
থাকবে না আমাদের , থাকবে না 
মৃত্যুর কালো দরজা -
শুধু থাকবে দুটি আত্মার একে
অপরকে চিনে নেওয়ার বিস্ময়।


৩১.    আমাদের দেখা হোক


কুয়াশায় ভেজা কোনো ভোরে, যেখানে শিশিরেরা 
ঘাসের বুকে সারারাতের গোপন প্রেমপত্র লিখে রাখে, 
সেখানে আমাদের দেখা হোক।

নদীর মতো ধীরে, যেন প্রতিটি শব্দ ভেসে যায় 
কাশফুলের শুভ্র দোলায়, আর প্রতিটি ক্ষণ 
একটি সাদা বকের ডানায় আকাশ পেরিয়ে দূরে চলে যায়, 
সেখানে আমাদের কথা হোক।

আমাদের চোখে চোখ রাখা হোক— যেন বহু জন্মের 
চেনা দুটি নক্ষত্র আবার এক আকাশে ফিরে এসেছে, 
কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না, 
তবু সমস্ত উত্তর চোখের গভীরে জেগে থাকবে।

শিউলি ঝরার ক্ষণে, অথবা বৃষ্টিস্নাত বিকেলের একফালি 
নির্জন পথের ধারে, তোমার আঙুলের উষ্ণতায় আমার সমস্ত শীত পাতাঝরার শব্দ হয়ে ঝরে পড়ুক।

আমাদের হাঁটা হোক - ধানের গন্ধে ভরা মেঠোপথে, 
বাঁশবনের ছায়া মাড়িয়ে, দূরের নদীর ঢেউ শুনতে শুনতে,
গোধূলির গাভীগুলো ঘরে ফিরুক, 
আর আমরা ফিরি না, সন্ধ্যা আমাদের দুজনকে তার 
নীল আঁচলে লুকিয়ে রাখুক।

আমাদের ভালোবাসা হোক - বকুলের গন্ধের মতো, 
থাকে, অথচ ধরা যায় না, নদীর স্রোতের মতো, দূরে যায়, 
তবু ফিরে আসে, পুরোনো এক কবিতার মতো, 
বারবার পড়লেও প্রতিবারই নতুন লাগে।

আর যদি কোনোদিন সমস্ত ঋতু নিঃশেষ হয়ে যায়, 
সব নদী শুকিয়ে যায়, সব পাখি ভুলে যায় ফিরে আসার পথ -
তবু আমাদের দেখা হোক, 
একফোঁটা শিশির হয়ে তোমার চোখের পাতায়, 
একটি নামহীন বাতাস হয়ে তোমার চুলের ভেতর।


৩২.     পথের শেষে 


তুমি আমার কাছে সেই অনুবাদহীন কবিতা, 
যার প্রতিটি অক্ষর স্পর্শ করতে গিয়ে আমি আরও 
গভীর অন্ধকারে ডুবে যাই।

তোমার রূপের অনল আমাকে পুড়িয়ে দিক, 
তোমার মাধুরী আমাকে মুগ্ধ করে রাখুক, আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।

শুধু এতটুকু চাই,
যতদিন আমার ভেতরে একটি হৃদস্পন্দনও বেঁচে থাকবে, 
ততদিন যেন কোনো অদৃশ্য বাঁশির সুর আমাকে ঘর থেকে বের করে তোমার দিকে নিয়ে যায়।

কারণ তোমার কাছে যাওয়ার যে পথ -
তার কোনো নাম নেই, কোনো ঠিকানা নেই,
কোনো মানচিত্র নেই।

সে শুধু আমার হৃদয়ের ভিতর দিয়ে তোমার কাছে 
গিয়ে শেষ হয়েছে।


৩৩.      পরাজিত 


কখনো মনে হয়, 
তোমাকে আমি এই জীবনে প্রথম দেখিনি। 
তোমার চোখের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত পূর্বপরিচয়ের 
বেদনা জেগে ওঠে। 
মনে হয়, কোনো এক অজানা জন্মের সন্ধ্যায় 
আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম—
দূরে যমুনার কালো জল, 
কদমফুলের গন্ধে ভারী বাতাস, আর খুব কাছে কোথাও 
একটি বাঁশি বাজছিল। 
তারপর কোনো অদৃশ্য বিধান আমাদের 
আলাদা করে দিয়েছিল। 
সেই অসমাপ্ত বিচ্ছেদের দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে 
তুমি আবার এসেছো আমার জীবনে—
শুধু আমাকে আবারও তোমার প্রেমে পরাজিত 
করার জন্য।


৩৪.      তোমার চুল 


তোমার চুলের গন্ধে কী যেন আছে -
তা কোনো ফুলের সুবাস দিয়ে বোঝানো যায় না। 
তুমি যখন খুব কাছে এসে দাঁড়াও, 
বাতাসেরও যেন নিজস্ব কোনো ভাষা থাকে না,
সে শুধু তোমার শরীরের উষ্ণতা বহন করে 
আমার দিকে আসে। 

তখন মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধি ফুল হয়তো 
কোনো এক অদৃশ্য রাতে তোমার চারপাশে 
এসে নিজেদের গন্ধ রেখে গেছে, 
 আর তুমি অন্যমনস্কভাবে তা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো।


৩৫.      তোমার মাধুরী 


তোমার রূপের অনল-বিচ্ছুরণ, তোমার মাধুর্য, 
তোমার মাধুরী—
এসবের কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। 
শুধু জানি, সন্ধ্যা নামার পর ঘরের ভেতর যতই নিজেকে 
আটকে রাখতে চাই, 
জানালার ওপারে তোমার অদৃশ্য উপস্থিতি 
আমাকে অস্থির করে তোলে। 

মনে হয়, কে যেন খুব কোমল হাতে আমার সমস্ত 
দ্বিধার কপাট খুলে দিচ্ছে, আমি উঠে দাঁড়াই, 
দরজা পেরিয়ে অচেনা পথে হাঁটতে শুরু করি - 
কোথায় যাব জানি না, 
শুধু জানি, পথের শেষ প্রান্তে তুমি আছো।


৩৬.      তোমার চোখ 


তোমার চোখের দিকে তাকালে 
আমার ভেতরের বহুদিনের নিস্তব্ধতা কেমন যেন 
শব্দ পেতে শুরু করে। 
সেই চোখে আমি কখনো শ্রাবণের ঘন মেঘ দেখি, 
কখনো দেখি শীতের শেষ প্রহরের নীলাভ কুয়াশা, 
আবার কখনো মনে হয়, 
কোনো এক প্রাচীন বৃন্দাবনের নির্জন কুঞ্জে 
বাঁশির সুর থেমে গেছে, 
শুধু তার রেশটুকু এসে তোমার চোখে আশ্রয় নিয়েছে।
আমি সেই রেশের কাছে পরাজিত হই।


৩৭.      তোমার অনুপস্থিতি 


রাত্রি যখন গভীর হয়, 
চারপাশের সমস্ত শব্দ যখন নিভে আসে, 
তখন তোমাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। 
জানালার পাশে বসে মনে হয়, 
দূর কোনো অন্ধকারে তুমি হয়তো এখনো জেগে আছো। 
হয়তো তোমার চুলের ভেতর দিয়ে বাতাস খেলছে, 
হয়তো তুমি অকারণে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছো। 
সেই কল্পনাটুকুই আমার রাতকে পূর্ণ করে। 

তোমাকে ছুঁতে না পেরেও তোমার উপস্থিতি 
আমার ঘর ভরে রাখে, 
তোমার অনুপস্থিতিই তখন সবচেয়ে গভীর 
উপস্থিতি হয়ে ওঠে।

আমি বুঝেছি—
প্রেম আসলে কাছে পাওয়ার নাম নয়। 
প্রেম হলো, দূরে থেকেও কারও নিঃশ্বাস নিজের 
নিঃশ্বাসের মধ্যে অনুভব করা,
কারও অনুচ্চারিত কথাকে নিজের হৃদয়ের 
ভাষায় অনুবাদ করা, 
কারও চোখের এক মুহূর্তের বিষণ্নতাকে সারারাত 
নিজের মধ্যে বহন করা।


৩৮.      তোমার হাসি 


তোমার হাসি 
আমার কাছে কোনো সাধারণ হাসি নয় -
তোমার ঠোঁটের কোণে যখন সামান্য আলো জেগে ওঠে, 
 তখন আমার বহুদিনের বিষণ্নতা 
তার কাছে গিয়ে বসে থাকে। 

সেই হাসির মধ্যে এমন এক মধুর নিষ্ঠুরতা আছে—
যা আমাকে কাছে ডাকে, 
আবার আরও কাছে আসার আকাঙ্ক্ষায় 
আমাকে অসম্ভব এক দূরত্বের মধ্যে ফেলে রাখে। 

আমি তখন তোমাকে ছুঁতে চাই না,
শুধু চাই, সেই মুহূর্তটুকু দীর্ঘ হোক—
যেন সময়ও তোমার মুখের কাছে এসে 
তার গতি ভুলে যায়।


৩৯.      তবু যাই


তোমার কাছে আসা আমার কোনো সিদ্ধান্ত নয়,
এ যেন এক প্রাচীন নিয়তি -
আমি জানি, তোমার কাছে গেলে আমার সমস্ত 
সংযম ভেঙে যাবে, তবু যাই। 
জানি, তোমার চোখের কাছে গিয়ে আমার সমস্ত যুক্তি 
নির্বাসিত হবে, তবু তাকাই। 
জানি, তোমার নৈকট্য আমার হৃদয়ের বহু 
গোপন দরজা খুলে দেবে, তবু তোমার পাশে দাঁড়াই—

যেন ডুবে যাওয়ার ভয় জেনেও কেউ নদীর 
গভীর জলে পা রাখে।


৪০.    তবু ভুলে যেওনা 


যদি কোনোদিন হঠাৎ আমার পথ গিয়ে মিশে যায় 
অচেনা কোনো সন্ধ্যার শেষে,
যদি তোমার জানালায় আর আমার নামের বাতাস এসে 
কড়া না নাড়ে  - তবু ভুলে যেওনা। 

যদি নতুন কোনো ঋতু তোমার উঠোনে ছড়িয়ে দেয়
অন্য কারও ফুল,
যদি তার হাসিতে ভরে ওঠে তোমার 
দীর্ঘদিনের নির্জন দুপুর,
আর আমার কথা ধুলো জমা কোনো পুরোনো বইয়ের মতো নীরবে পড়ে থাকে - তবু ভুলে যেওনা। 

আমি তো চেয়েছিলাম তোমার জীবনের 
শেষ পৃষ্ঠাটুকু হতে,
কিন্তু নিয়তির কলমে কত অসমাপ্ত গল্পই 
তো লেখা থাকে -
তাই যদি একদিন আমাদের দুজনের আকাশ 
আলাদা হয়ে যায়,
তবু কোনো পূর্ণিমা রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভেবো—
কেউ একজন একদিন এই আলোতেই 
তোমাকে ভালোবেসেছিল।

তোমার চুলে যদি হঠাৎ অকারণে জেগে ওঠে 
শিউলির গন্ধ, কিংবা 
কোনো পুরোনো গানের সুরে মনটা অকারণে কেঁপে ওঠে-
ভেবো, সেটুকুই হয়তো আমার ফিরে আসা।

যদি ভুলে থাকা তোমার সুখ হয়,
শুধু এতটুকু কোরো—ভালোবাসার একেবারে শেষ প্রহরে
আমার জন্য রেখো একটি ছোট্ট নীল দরজা,
যেখানে কোনোদিন কেউ যাবে না,
কেউ আসবে না—
শুধু নিঃশব্দে পড়ে থাকবে আমাদের একসঙ্গে 
কাটানো কয়েকটি মায়াময় সন্ধ্যা।

আর যদি কোনোদিন অনেক বছর পর
নিজেকেই প্রশ্ন করো—
'কেউ কি সত্যিই আমাকে এতটা ভালোবেসেছিল?'

তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসো, আর বলো—

হ্যাঁ, একজন ছিল—যে চলে গিয়েও 
তোমার ভেতর থেকে কখনো পুরোপুরি চলে যেতে পারেনি,
সে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল।



৪১.     যে মুখে সন্ধ্যার মায়া


কোন্‌ অলক্ষুণে আলোয় দেখেছিলাম তোমার মুখ—মনে নেই আজ,শুধু মনে আছে,সেই এক পলকের দেখা কীভাবে আমার সমস্ত জীবনের গোপন ঋতু হয়ে গেল!

তোমার মুখে কী ছিল—শিউলির ভোর, নাকি দূর কোনো নদীর জলেডুবে যাওয়া আকাশের নীল? তবু কেন জানি মনে হয়েছিল, এই মুখ আমি কোনো এক জন্মে দেখেছি, কোনো এক বিস্মৃত বিকেলে তোমার চোখের কাছে রেখে এসেছিলাম আমার একখণ্ড নীরবতা।

কিছু কিছু মুখ থাকে—যাদের দেখলে পৃথিবীকে আর নির্মম মনে হয় না, মনে হয়, এই তো বেঁচে থাকার মতো একটি কোমল কারণ এখনো রয়ে গেছে।

তোমার মুখটিও তেমন—তার ভাঁজে ভাঁজে লেগে ছিল বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ, শুকপাখির নরম পালকের মতো এক অদৃশ্য স্নিগ্ধতা, আর কোথা থেকে যেন ভেসে আসা এক পুরোনো দুঃখ।

তোমার চোখের গভীরে আমি দেখেছিলাম সন্ধ্যা নামার আগে নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী গাছটির ছায়া, দেখেছিলাম—অনেক কথা বলতে চেয়েও চুপ করে থাকা কোনো মানুষের অসহায় ভালোবাসা।

তাই সেই ক্ষণিক দেখা ক্ষণিক থাকেনি আর—চুপিসারে আমার বুকের মধ্যে শেকড় ছড়িয়েছে, দিনের ভিড়ে, রাতের নিঃসঙ্গতায়,অকারণে জানালার পাশে দাঁড়ালে আজও তোমার মুখ ভেসে ওঠে।

কী আশ্চর্য মায়া! কিছু মানুষকে ভালোবাসতে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় না—একটি মাত্র দৃষ্টি, একটি মাত্র মুখ, একটি মাত্র অসমাপ্ত মুহূর্তই যথেষ্ট।

তারপর সারাজীবন মানুষটি থাকে না,থেকে যায় শুধু তার মুখ—আর সেই মুখের চারপাশে জেগে থাকে এক অদৃশ্য পৃথিবী, যেখানে প্রতিরাতে আমি হারিয়ে যাই, আর ভোর হলে তোমাকে না পেয়েও তোমাকেই খুঁজে ফিরি।


৪২.     স্মৃতির ভিতর যে মানুষটি


তোমাকে আমি কত বছরের চিনি
তার হিসাব কোনো ক্যালেন্ডারে নেই, 
আছে শুধু সন্ধ্যার আলোয়, 
বৃষ্টির গন্ধে, আর হঠাৎ থেমে যাওয়া কোনো 
কথার ভেতরে।

কতদিন পাশাপাশি হেঁটেছি
কত কথা বলা হয়নি, কত কথা চোখের পাতায় এসে 
নিঃশব্দে ফিরে গেছে। 
তবু তোমার নামটি যখন ডেকেছি, 
সে নাম শুধু একটি নাম ছিল না
তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমার দেখা আকাশ,
আমার ছুঁয়ে-না-দেখা স্বপ্ন,
আমার একান্ত গোপন বসন্ত।

তুমি যে মানুষটি ছিলে আমার কাছে, 
সে কি কেবল তোমার নিজের তৈরি?না
আমার অপেক্ষার একটু আলো,
আমার অভিমানের একটু অন্ধকার,
আমার ভালোবাসার কিছু অদৃশ্য স্পর্শ
তোমাকে ধীরে ধীরে 
আমার মনের মানুষ করে তুলেছিল।

তারপর কত বছর কেটে গেল।

দিনেরা নিজেদের পথ হারাল, 
রাতেরা জানালার পাশে এসে
কারও নাম না নিয়ে ফিরে গেল।
আমাদের সেই পুরোনো দিনগুলো
একদিন দেখলাম—
মুঠো মুঠো শুকনো পাতার মতো
সময়ের বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

তারা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে
‘আমাদের রাখবে কোথায়?
কোন স্মৃতির ঘরে
আবার আলো জ্বালাবে?’

আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না।

শুধু চুপ করে থাকি
যেন বহু দূরের কোনো নদীর ধারে
শেষ বিকেলের নৌকা দেখছি।

দিনগুলো তখন একে একে
অচেনা আকাশের দিকে চলে যায়।
কেউ যায় উত্তরে,
কেউ দক্ষিণের মেঘে হারায়,
কেউ বা সন্ধ্যার পাখির মতো
ফিরে আসার পথ ভুলে যায়।

শুধু তুমি
কী আশ্চর্য মায়ায়
আজও আমার ভিতরে থেকে যাও।



৪৩.     শ্রাবণের প্রথম তুমি


আজ কেমন এক বিষণ্ণতার দিন
আকাশে মেঘ নেই, তবু আলো যেন মেঘের আড়ালে।
কেমন এক বিষণ্ণ রাত্রি
জোনাকিরাও আজ আলো জ্বালতে ভুলে গেছে,
শুধু জানালার কপাটে এসে বসে আছে
অকারণ নৈঃশব্দ্য।

কেউ জানে না, আমার কী হয়েছে।
আমি নিজেও জানি না।
শুধু এই অন্ধকার জানে,
জানে রাতের শেষ প্রহরে
বালিশের কাছে নুয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস,
জানে সেই নাম
যে নাম উচ্চারণ করলেই
হৃদয়ের গোপন দরজা খুলে যায়।

আজ তোমাকে অনেক নামে ডাকতে ইচ্ছে করছে।

ডাকব তোমাকে শ্রাবণ বলে?
নাকি প্রথম বৃষ্টির মতো কোনো  বিষাদ?
নাকি চাঁপার গন্ধে ভেসে আসা
সেই হারিয়ে-যাওয়া বিকেল?

তুমি আজ আমার কাছে
শ্রাবণের প্রথম মেঘ—যাকে ছুঁতে পারি না,
তবু যার ছায়ায়
আমার সমস্ত ক্লান্ত পৃথিবীএকটু শীতল হয়ে আসে।

মনে পড়ে

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পশ্চিম পাড়।
সেদিন পদ্মা কেমন উন্মনা ছিল!
জলের বুক চিরে ছুটে যাচ্ছিল ঢেউ,
আর দূরে কোথাও সন্ধ্যা নামছিল
অলক্ষ্যে, ধীরে ধীরে।

ব্রিজের লাল পাতে
কিশোর বয়সের কাঁপা হাতে
লিখেছিলাম একটি নাম
সাহানা জোয়ার্দার।

ভাবিনি, একদিন
লোহার বুক থেকেও নাম মুছে যায়,
মুছে যায় অক্ষর,
মুছে যায় ঋতু,
মুছে যায় মানুষের মুখ
শুধু কিছু নাম
অদ্ভুতভাবে থেকে যায় হৃদয়ের ভিতর।

আজ সেই নাম নেই কোথাও।
নেই সেই বিকেল,
নেই সেই অস্থির যৌবন,
নেই পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা
সেই মানুষটিও।

শুধু চাঁদের রাতের আবছায়ায়
কখনো কখনো মনে হয়
পদ্মার ওপার থেকে
কেউ যেন আমাকে ডাকছে।

তারপর এলে তুমি।

কোনো শব্দ না করে,
কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে
শুধু এসে বসলে
আমার দীর্ঘ একাকীত্বের পাশে।

তোমার চোখে দেখলাম
অনেক দূরের কোনো নক্ষত্রের আলো,
তোমার কণ্ঠে শুনলাম
বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া
একটি পরিচিত বিকেলের ডাক।

তখন বুঝলাম
সব প্রেমের শুরু হয় দেখা দিয়ে নয়,
কিছু প্রেম জন্ম নেয়
অকারণ মনে পড়ে যাওয়ার ভিতর।

তোমাকে তাই কবিতা লিখি।

যখন রাত গভীর হয়,
যখন ঘুম এসে ফিরে যায়,
যখন চাঁদের আলো
ঘরের মেঝেতে একা পড়ে থাকে
তখন তোমার নামটুকু
নিঃশব্দে ছুঁয়ে দেখি।

তোমার নামের ভিতর
চাঁপার গন্ধ আছে,
শ্রাবণের বৃষ্টি আছে,
পদ্মার ঢেউ আছে,
হারিয়ে যাওয়া দিনের মায়া আছে
আর আছে আমার
অসংখ্য না-বলা কথা।

জানো,
কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায় না শুধু
তাদের নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।

তুমি তেমনই একজন।

তোমাকে কাছে না পেয়েও
তোমার ছায়ার সঙ্গে কথা বলি,
তোমাকে ছুঁতে না পেরেও
তোমার গন্ধ খুঁজি বাতাসে,
তোমাকে না দেখেও
চাঁদের আলোয় তোমার মুখ আঁকি।

আর যখন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে যায়,
যখন রাত তার শেষ অন্ধকারটুকু
আমার জানালায় রেখে যায়
তখন মনে হয়,

এই জন্মে যদি আর কিছু না-ও পাই,
তবু তোমার নামটি থাকুক
আমার শেষ কবিতার পাতায়।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মুছে-যাওয়া নামের মতো নয়
আরও গভীরে, আরও গোপনে,
আমার রক্তের ভিতর লেখা হয়ে।

কারণ তুমি শুধু আমার ভালোবাসা নও
তুমি আমার হারানো দিনের পুনর্জন্ম,
আমার একাকীত্বের গোপন সঙ্গী,
আমার শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টি,
আমার চাঁপার গন্ধমাখা বিষণ্ণতা—

তুমি আমার সমস্ত দিবারাত্রির
নিঃশব্দ, অনন্ত কাব্য।


৪৪.      তোমার মুখ 


তোমার মুখটি আর স্পষ্ট মনে নেই,
কণ্ঠস্বরটিও কখনো কখনো
স্বপ্নের মতো অস্পষ্ট হয়ে আসে,
তবু তোমার নামটি উচ্চারণ করলেই
আমার সমস্ত হারানো দিন
হঠাৎ ফিরে এসে বসে পাশে।

তখন বুঝি
মানুষ হারিয়ে যায়, সময় হারিয়ে যায়,
পথ হারিয়ে যায়, 
কিন্তু কোনো এক গভীর ভালোবাসা 
হারায় না কখনো।

সে শুধু স্মৃতির অন্ধকারে 
একটি ক্ষীণ জোনাকির মতো জ্বলে থাকে
যতদিন কেউ একজন 
নিঃশব্দে তার নাম ধরে ডেকে যায়।


৪৫.      শেষ কথাটি 


দুই-একদিন পরপর দূর প্রবাসী মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়।
কখনো মেসেঞ্জারের ওপারে তার মুখ দেখি,
কখনো হঠাৎ তার কল আসে -
অচেনা দূরত্ব পেরিয়ে খুব পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর
ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে,“কেমন আছো বাবা?”

আমি বলি—ভালো আছি।
অথচ সে জানে না,
তার একটি ফোনের অপেক্ষায়
কত দীর্ঘ হয়ে যায় একটি দিন,
কত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে সন্ধ্যার পরের ঘর।

ওখানে সে ব্যস্ত থাকে,
জীবন তাকে সময় দেয় না,
কখনো আমার ফোন ধরতে পারে না।
আমি জানি, তার কোনো দোষ নেই।
তবু ফোনের পর্দায় তার নামটি না জ্বলে উঠলে
মনের ভেতর কেমন এক অকারণ শূন্যতা নামে।

তখন মনে হয়,
যদি আজই হঠাৎ পরপারে চলে যাই!

যদি আর কোনোদিন
মেসেঞ্জারের সবুজ আলোটি জ্বলে না ওঠে,
যদি আমার ফোনটি চুপচাপ পড়ে থাকে টেবিলের কোণে,
যদি ওপার থেকে মেয়েটি বারবার ফোন কল করে -
যদি কেউ আর ফোন না ধরে তখন! 

তবে কি সে বুঝবে,
কত কথা বলা বাকি ছিল?

হয়তো সে সেদিন খুব কাঁদবে।
মনে মনে বলবে—“সেদিন বাবার ফোনটা ধরতে পারিনি,
আর একবারও ফোন করে বলিনি -
বাবা, তুমি কেমন আছো?”

হয়তো তার বুকের ভেতর
একটি অসমাপ্ত বাক্য
সারা জীবন কাঁটার মতো বিঁধে থাকবে।

আমারও তো কত কথা জমে আছে-
তার ছোটবেলার কথা,
প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন,
তার হাত ধরে রাস্তা পার হওয়ার স্মৃতি,
অসুখ হলে রাত জেগে পাশে বসে থাকা,
আর কত না বলা ভালোবাসা।

সব কথা কি আর বলা হয়?

কিছু কথা থেকে যায়
কণ্ঠের কাছে এসে থেমে যায়,
কিছু আদর পৌঁছায় না দূর প্রবাসে,
কিছু “ভালো থেকো”শেষবার বলার সুযোগটুকুও পায় না।

তাই যেদিন কথা হয় না,
সেদিন গভীর রাতে
আমি নীরবে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকি।

মনে হয়,
আর যদি কোনোদিন কথা না হয়?

আর যদি আমার শেষ কথাটি
তার কানে পৌঁছানোর আগেই
আমার কণ্ঠ থেমে যায়?

তখন হয়তো মেয়েটি দূর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে
কাঁদতে কাঁদতে বলবে -

“বাবা, আর একবার ফোনটা ধরো,
আমি আজ তোমার সঙ্গে অনেক কথা বলব।
আজ আর ব্যস্ত থাকব না…
শুধু তুমি একবার ফিরে এসো।”



৪৬.      মন ভালো করার সিক্রেট 


যেদিন মনটা অকারণে বিষণ্ণ হয়ে আসে,
সেদিন আমি বিষাদকে পরতে দিই না শরীরে -
পরি আমার সবচেয়ে সুন্দর জামাটি,
পায়ে দিই প্রিয় জুতো।

তারপর মায়াবতীকে বলি -
তুমি আজ সুন্দর একটি শাড়ি পরো,
কপালে দিও একটি ছোট্ট টিপ,
চুলগুলো একটু যত্ন করে বেঁধো।
মন খারাপেরও তো একদিন
সাজতে ইচ্ছে করে!

যদি তখন বিকেল হয়,
অথবা সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে -
আমরা দুজন একটি রিকশায় উঠে বসি।
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে
কোনও নির্জন রাস্তার দিকে
রিকশাটি চলতে থাকে টুংটাং শব্দে।

পথের ধারে কোনও টং দোকান দেখলে
হঠাৎ বলি— থামো।
দু কাপ ধোঁয়া ওঠা চা,
আর তোমার সঙ্গে অকারণ কিছু কথা -
এই সামান্যতেই কখন যে
বিষণ্ণতার দরজায় আলো এসে দাঁড়ায়!

কখনও চলে যাই দিয়াবাড়ির কাশবনে।
সাদা কাশফুলের দোল খেতে খেতে
মনে হয়, জীবন বুঝি এতটাও কঠিন নয়।

লেকের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে
আমরা দুজন জল দেখি, বিকেলের শেষ রোদ
জলের গায়ে সোনালি চিঠি লেখে,
দূরে পাখিরা ঘরে ফেরে,
আর পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে
সন্ধ্যার মায়াবী অস্তরাগ।

কোনও কোনওদিন
শহরের কোনও ছোট্ট রেস্টুরেন্টে বসি দুজন।
প্লেটে চামচের মৃদু টুংটাং,
টেবিলের ওপারে তুমি, আর তোমার অবিরাম কথা
আমি শুনি।

কিছু কথা মনে থাকে, কিছু কথা হারিয়ে যায়,
কিছু কথা শুধু তোমার ঠোঁটে
লেগে থাকে সন্ধ্যার গন্ধ হয়ে।
তারপর হঠাৎ দেখি কিছু লাবণ্যমুগ্ধ মুহূর্ত
বৃষ্টিরেণুর মতো এসে পড়েছে চোখে।

কী আশ্চর্য!
যে মনটি কিছুক্ষণ আগেও অন্ধকারে ডুবে ছিল,
সেই মনেই নেমে আসে
অনাবিল আলোর জোয়ার।
তখন মনে হয়—
সুখ আসলে খুব বড় কিছু নয়,
সুখ মানে পাশাপাশি বসে থাকা,
এক কাপ চা ভাগ করে নেওয়া,
একটি রিকশার ধীর দুলুনি,
সন্ধ্যার আকাশে পাখির ফিরে যাওয়া,
আর জীবনের সমস্ত ক্লান্তির ভেতর
একজন প্রিয় মানুষকে
একান্তে কাছে পাওয়া।

তুমি পাশে থাকলে আমার মন খারাপও যেন
একটি সুন্দর বিকেল হয়ে যায়।
বিষণ্ণতাও তখন
কাশফুলের মতো দোলে বাতাসে।

আর আমরা দুজন,
সমর্পিত জীবনের ছোট্ট উঠোনে চুপচাপ বসে থাকি, 
চোখে সন্ধ্যার আলো,
মনে অদৃশ্য কোনও সুর—
মনে হয়, এই তো জীবন,
এই তো ভালোবাসা, এই তো বেঁচে থাকার
সবচেয়ে মায়াময় কারণ।



৪৭.       কাশবনের সেই বিকেল


কোনো এক শরতের বিকেলে
কাশফুলের সাদা ঢেউ পেরিয়ে
তোমার হাত ধরে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

কথা ছিল -
নীল আকাশে ভেসে থাকবে দু-একটি অভিমানী মেঘ,
হাওয়ায় দুলবে কাশের কোমল শিউলি-সাদা মন,
আর আমরা দুজন
পৃথিবীর সব চেনা পথ ভুলে
অচেনা কোনো পথের দিকে হেঁটে যাব।

কথা ছিল,
তুমি কিছু বলবে না -
শুধু  আমার হাতটি ধরে রাখবে;
আমি তোমার চোখের ভেতর
একটি শান্ত শরতের আকাশ খুঁজব।

দূরে কোথাও পাখি ডেকে উঠবে,
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে আসবে কাশবনের ঘাসে,
আর আমাদের পায়ের শব্দ
মিশে যাবে বাতাসের গোপন গানে।

তারপর হয়তো
কোনো এক বাঁকে এসে তুমি থেমে বলবে -
এ পথের শেষ কোথায়?
আমি বলব—“শেষ কেন?
যতদিন তোমার হাত আমার হাতে,
ততদিন তো পথই আমাদের ঘর।”

কিন্তু সেই শরৎ আর এলো না,
কাশফুল ফুটল -
শুধু তুমি এলে না।
আমি ভাবি, কোনো এক জন্মে নিশ্চয়ই
আমরা সেই পথটি হেঁটে গিয়েছিলাম…
শুধু এই জন্মের স্মৃতিতে
তার একটু মায়া রয়ে গেছে।



৪৮.      দুই যুগের ভালোবাসা


এই যে আমরা -
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে
নিঃশব্দে দুজন দুজনের হয়ে আছি,
কত পথ পাশাপাশি হেঁটেছি,
কত বসন্ত, কত পূর্ণিমা
জোৎস্না ঝরা বকুলতলায় এসে
আমাদের ভালোবাসার গল্প শুনে গেছে।

কত কথা হারিয়ে গেছে নীরবতায়,
কত ভালোবাসা গান হয়ে
ভেসে গেছে বাতাসের  ডানায়—
আর আমাদের দুজনের হৃদয় থেকে
সেই গান ছড়িয়ে পড়েছে
পৃথিবীর পথ থেকে প্রান্তরে।

দুজনের মায়ায়
একদিন বেঁধেছিলাম ছোট্ট এক ঘর,
সেই ঘর ধীরে ধীরে হয়ে উঠল সংসার,
তারপর এলো সন্তানেরা -
মায়ার শেকড় আরও গভীরে গেল,
আর আমরা বুঝতেই পারিনি
কখন একে অন্যের নিঃশ্বাসেরও
অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছি।

তবু মাঝে মাঝে গভীর রাতে
একটি অদ্ভুত ভয় এসে
চুপ করে বসে থাকে পাশে -
এই মায়াময় পৃথিবী থেকে,
এই ভালোবাসার সংসার থেকে
আমাদের দুজনের মধ্যে
কে আগে চলে যাবে?

যে-ই যাক আগে,
যে মানুষটি থেকে যাবে -
তার ভোরগুলো কেমন হবে?
সন্ধ্যা নামলে কার জন্য
দরজার দিকে তাকাবে সে?

জোৎস্না ঝরবে, বকুল ফুটবে,
পুরোনো গান বাজবে -
তবু পাশে থাকবে না সেই মানুষটি,
যার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল
জীবনের এতগুলো ঋতু।

তখন কি শূন্য ঘরটিও
তাকে চিনতে পারবে?
বালিশে পড়ে থাকা
অপরজনের গন্ধ কি
আরও একবার তাকে কাঁদাবে?

কতদিনই বা বাঁচা যায়
এমন অসীম শূন্যতা বুকে নিয়ে?
হয়তো তখনও জীবন চলবে -
সূর্য উঠবে, পাখি ডাকবে,
সন্তানেরা কাছে আসবে,
পৃথিবী তার নিয়মে ঘুরবে;
শুধু একটি মানুষ
নিঃশব্দে খুঁজে ফিরবে
তার হারিয়ে যাওয়া অর্ধেক জীবন।

তাই আজও তোমার হাতটি
একটু শক্ত করে ধরে রাখি -
যতদিন আছি,
যতদিন এই পৃথিবীর আলোয়
আমাদের দুজনের ছায়া পাশাপাশি পড়ে।

আর যদি কোনোদিন
আমাদের একজনকে একা করে
অন্যজন চলে যেতেই হয়,
তবে প্রার্থনা শুধু এই -
যে আগে যাবে,
সে যেন ওপারের কোনো নক্ষত্র হয়ে
অপেক্ষা করে থাকে,
আর যে থাকবে,
সে যেন প্রতিটি জোৎস্নারাতে
আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে -
ভালোবাসা কখনো চলে যায় না,
শুধু মানুষটি
একদিন অন্য আকাশে গিয়ে
অপেক্ষা করতে শেখে।

দুই যুগের এই ভালোবাসা তাই
সময় পেরিয়েও থাকুক -
বকুলের গন্ধে,
জোৎস্নার আলোয়,
সন্তানদের হাসিতে,
আর দুজনের হৃদয়ের গভীরতম ঘরে -
যেখানে মৃত্যু এসেও
দুজনকে আলাদা করতে না পারে।



৪৯.       অনু দুঃখ



খুব একা হলে আমি জীবনের পুরোনো পাতাগুলো উল্টে দেখি। জানি, সেখানে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, তবু মানুষ বোধহয় অসম্ভবের কাছেই বারবার ফিরে যায়। পুরোনো বইয়ের মতো জীবনটাকেও তখন মনে হয়—কোথাও মলিন, কোথাও ছেঁড়া, কোথাও অক্ষরহীন। কোনো কোনো পাতায় এতদিনের ধুলো জমে আছে যে, চোখের খুব কাছে ধরেও কিছু পড়া যায় না। শুধু বোঝা যায়, একদিন সেখানে কিছু ছিল—খুব আপন, খুব উজ্জ্বল, খুব জীবন্ত।

তারপরও আমি খুঁজি।

কী খুঁজি, নিজেই জানি না। হয়তো তোমাকে, হয়তো তোমার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আমাকে।

জীবনের যে-সময়টুকু একদিন খুব অর্থপূর্ণ মনে হয়েছিল, আজ তার দিকে তাকালে কেমন এক অদ্ভুত শূন্যতা জেগে ওঠে। কত মানুষ এসেছিল, কত মানুষ চলে গেছে; কত সম্পর্ক সময়ের কাছে পরাজিত হয়েছে; কত প্রতিশ্রুতি নিজেরই প্রতিধ্বনিতে হারিয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয়, এতদিন ধরে যে জীবন বয়ে এনেছি, তার কোনো গন্তব্যই ছিল না।

ঠিক তখনই তোমার কথা মনে পড়ে।

তোমার কথা মনে পড়লেই আমার ভেতরের অন্ধকারে একটি ক্ষীণ আলো জ্বলে ওঠে। খুব বেশি নয়—যতটুকু আলোয় একটি পুরোনো মুখ মনে পড়ে, যতটুকু আলোয় একটি হারানো পথের রেখা দেখা যায়।

তখন তোমাকে আবার খুঁজি।

জানি, তোমাকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। জানি, সময় আমাদের দুজনকে দুই তীরে ফেলে বহু দূর বয়ে নিয়ে গেছে। তবু মানুষ কি সবসময় সম্ভাবনার জন্য অপেক্ষা করে? কখনো কখনো সে অপেক্ষা করে শুধু নিজের ভেতরের একটি দরজা খোলা রাখার জন্য।
রাত গভীর হলে আমি চিঠি লিখি।

কোনো বিশেষ কথা থাকে না সেই চিঠিতে। 
লিখি—আজও তোমাকে মনে পড়ে। 
লিখি—কিছু সন্ধ্যা এখনো তোমার নামে নেমে আসে।
লিখি—কিছু গান শুনলে বুকের ভেতর অকারণে একটি পুরোনো জানালা খুলে যায়। 
লিখি—তোমার কথা ভুলে থাকার অভিনয় করতে করতে আমি ক্লান্ত।
আর যা লিখতে পারি না, 
তা কাগজের সাদা অংশে রেখে দিই।

ভোরের একটু আগে চিঠিটি খামে ভরি। 
নাম লিখি। ঠিকানা লিখি। 
কত যত্নে সেই ঠিকানাটি লিখি—যেন অক্ষরগুলো একটু ভুল হলেই তুমি আরও দূরে সরে যাবে।

তারপর পোস্ট অফিসে যাই।
চিঠিটি দিয়ে ফিরে আসি।

ফিরে আসার পথে মনে হয়, এবার হয়তো উত্তর আসবে।
কিছু অপেক্ষা খুব ছোট হয়, অথচ তার ভেতর একটি সম্পূর্ণ জীবন লুকিয়ে থাকে।

আমি অপেক্ষা করি।

ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে বহুদিনের ঘুমন্ত একটি পাখি। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি কেউ আমার নাম ধরে ডাকল।

কেউ ডাকে না।

কোনো চিঠি আসে না।

তারপর একদিন হঠাৎ বুঝতে পারি—চিঠিটি আমি ভুল ঠিকানায় পাঠিয়েছি।

না, ঠিকানাটি ভুল ছিল না। ভুল ছিল আমার বিশ্বাস।
সেই ঠিকানায় তুমি আর থাকো না।

হয়তো বাড়িটিও নেই। হয়তো জানালার রং বদলে গেছে। হয়তো যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদিন তুমি আকাশ দেখেছিলে, সেখানে এখন অন্য কারও কাপড় শুকোয়। পৃথিবী এভাবেই মানুষের স্মৃতির ওপর দিয়ে নিজের সংসার পেতে বসে।

শুধু আমার কাছে সেই ঠিকানাটি এখনো অমলিন।

সেখানেই তুমি আছো -
একটি বিকেলের আলোয়,
একটি অসমাপ্ত কথার পাশে,
একটি বিদায়হীন বিদায়ের মধ্যে।

কখনো কোনো পুরোনো গান শুনে ঘোর ভেঙে যায়। কখনো বৃষ্টির গন্ধে। কখনো অচেনা কারও চোখে হঠাৎ পরিচিত বিষাদ দেখে। কখনো নিঃসঙ্গ দুপুরে জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হয়, তুমি বুঝি ঠিক এইমাত্র চলে গেলে।

তারপর বাস্তবতা এসে খুব ধীরে বলে -

আজ তুমি আর আমার কেউ নও।
এই একটি বাক্য কতবার যে আমাকে নতুন করে একা করেছে, তার হিসাব নেই।

তবু আশ্চর্য, তোমাকে হারানোর পরও তুমি আমার ভেতর থেকে হারাওনি। বরং সময় যত গেছে, তোমার অনুপস্থিতি তত গভীর হয়েছে। তুমি আর মানুষ নও—তুমি এখন একটি অনুভূতি, একটি ঋতু, একটি পুরোনো গন্ধ, একটি অকারণ বিষণ্ণতা। তুমি এখন সেইসব সন্ধ্যার নাম, যেগুলো কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ করে দেয়।

সময় বয়ে যায়।

আমরা ভাবি, সময় সবকিছু মুছে দেয়। আসলে সময় শুধু দাগগুলোর ওপর নতুন দাগ বসায়। পুরোনো ক্ষত ঢেকে যায়, কিন্তু তার নিচে থেকে যায় স্পর্শের স্মৃতি।

আমিও বেঁচে থাকি।

দিনের কাজ করি, মানুষের সঙ্গে কথা বলি, হাসি, কখনো আনন্দও পাই। বাইরে থেকে আমার জীবনকে সম্পূর্ণ মনে হতে পারে। শুধু আমি জানি, আমার ভেতরে একটি ঘর আছে—সেখানে বহু বছর ধরে কেউ থাকে না। জানালায় ধুলো জমে, দরজায় মাকড়সার জাল, তবু ঘরটি আমি বন্ধ করি না।

কারণ সেখানে তুমি আছো।

আর মানুষ তার সব হারানো জিনিসের জন্য ঘর খোলা রাখে না; কিছু কিছু হারানোকে সে শুধু নিজের অস্তিত্বের অংশ করে রাখে।
রাত হলে সেই ঘরে যাই।
কখনো কোনো কথা বলি না। শুধু বসে থাকি।

মনে হয়, তুমি যদি হঠাৎ এসে দাঁড়াও, আমি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করব না। জানতে চাইব না, এতদিন কোথায় ছিলে। জানতে চাইব না, কেন ফিরে আসোনি। শুধু একবার দেখব তোমার মুখের দিকে—দেখব, সেখানে আমার জন্য এখনও কোনো পুরোনো আলো বেঁচে আছে কি না।

তারপর হয়তো তুমি আবার চলে যাবে।

আমি জানি।
তবু কিছু মানুষকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, হারিয়ে যাওয়ার সৌন্দর্যটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য মনে রাখা হয়।
তুমিও তেমনই।

আজ আর তোমার কাছে কোনো চিঠি পাঠাই না।
ঠিকানাটিও আর লিখি না।
শুধু মাঝরাতে কখনো কখনো কাগজের ওপর তোমার নাম লিখে আবার মুছে ফেলি। তারপর জানালা খুলে দিই। দূরে কোথাও রাত জেগে থাকা কোনো শহরের আলো দেখি। মনে হয়, পৃথিবী কত বিশাল—আর মানুষের হৃদয় তার চেয়েও আশ্চর্য; সেখানে একজন মানুষ চলে গিয়েও কতকাল থেকে যেতে পারে!

তারপর বাতি নিভিয়ে দিই।
একলা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি।
ঘুম আসার আগে শেষ যে কথাটি মনে হয়, সেটিও তোমাকে নিয়ে নয়—নিজেকেই বলি,
সব হারানো দুঃখ নয়।
কিছু দুঃখ মানুষকে তার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

আর তুমি,
তুমি আমার সেই সামান্য দুঃখ,
যাকে আমি কোনোদিন পুরোপুরি ভুলতে চাইনি।
কারণ কিছু ভালোবাসার শেষ হয় না;
শুধু তাদের ঠিকানা বদলে যায়।
তোমার ঠিকানা এখন আর কোনো শহরে নেই,
কোনো ডাকঘরে নেই,
কোনো চিঠির খামে নেই।

তোমার ঠিকানা - 
আমার ভেতরের সেই নির্জন ঘর,
যেখানে প্রতিরাতে একটি ক্ষীণ আলো জ্বলে থাকে,
আর তার পাশে চুপচাপ বসে থাকে -
একটি অনু দুঃখ।


৫০.     ভালো থেকো 


আমি যখন থাকব না, তখনও তুমি ভালো থেকো -
তখন, 
একাকী ভোরের পাখিদের গান শুনবে,
বন্ধ ঘরে বিছানায় শুয়ে
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে হারিয়ে যাবে দূর কোনো স্মৃতির ভেতর।
নিঝুম দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে
শুনবে ঝরা পাতার মর্মর -
হয়তো মনে হবে,
কেউ একজন নিঃশব্দে তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল।

বিকেলে পশ্চিম দিগন্তে চেয়ে দেখবে
আবির-মাখা লাল মেঘের ভেলা;
সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে ধীরে ধীরে পায়চারি করে
খুঁজবে আমার পায়ের চিহ্ন -
যেখানে একদিন পাশাপাশি হেঁটেছিলাম
জীবনের দীর্ঘতম পথ।

রাত্রি হলে জানালাটি খুলে দিও।
তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকো,
পঞ্চমীর চাঁদের আলোয় স্নান করো।
জোছনা যদি এসে তোমার কপালে হাত রাখে,
ভাববে না—সে আমি।

আর যদি ঘুমিয়ে পড়ো,
স্বপ্নেও আমাকে খুঁজো না।
আমি থাকব না সেখানে -
না জাগরণের আলোয়, না ঘুমের অন্ধকারে,
না কোনো স্বপ্নের অলীক ভুবনে।

উত্তরের হাওয়া এলে
তার কাছে নিঃশ্বাস চেয়ো না,
সেখানে আমার শরীরের কোনো গন্ধ থাকবে না,
থাকবে না আমার কণ্ঠের কোনো অশ্রুত সুর -
শুধু দূর আকাশের বিষণ্ণতা
তোমার জানালায় এসে কড়া নাড়বে।

তবু...

যদি কোনোদিন
আমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি জেগে ওঠে,
তবে পৃথিবীর চেনা পথ ছেড়ে
দূর কোনো কক্ষপথ ধরে
পরিযায়ী পাখির মতো চুপিচুপি চলে এসো।

পৃথিবীর ওপারে, জোছনারও ওপারে,
যেখানে সময় থেমে থাকে
আর ভালোবাসা মৃত্যুকেও অতিক্রম করে -
অপার্থিব কোনো এক ভুবনে
হয়তো হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে আমাদের।

তুমি শুধু ভালো থেকো, আমি না থাকলেও।
কারণ,আমার সমস্ত না-থাকার ভেতরেও
তোমার ভালো থাকাটুকুই আমার শেষ ভালোবাসা।