শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই ( কাব্যগ্রন্থ)


মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই   (কাব্যগ্রন্থ)  

প্রথম প্রকাশ - 

উৎসর্গ --


১.      যে দুপুরগুলো ফিরে আসে না

যে দুপুরগুলো ফিরে আসে না,
তারা এখনো রোদ মেখে দাঁড়িয়ে থাকে স্মৃতির জানালায়।
এক কাপ আধখানা চা, অথচ কত কথা
তোমার চোখে ছিল ভবিষ্যৎ,
আমার বুকজুড়ে ছিল ভরসার ছায়া।

ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হাঁটা সেই রাস্তাগুলো,
বটগাছের নীচে বসে থাকা নীরবতা,
হঠাৎ হেসে ওঠা,
কারণটা আজ আর মনে পড়ে না,
শুধু হাসির শব্দটা কানে বাজে,
মৃদু, ক্ষয়িষ্ণু, দূরের।

তোমার ওড়নার কোণে আটকে ছিল দুপুরের হাওয়া,
ঘড়ির কাঁটা থমকে থাকত
যখন তুমি বলেছিলে- “সময় থাকলে বসি আর একটু।”
সময় যে চলে যায়, তা তখন কেউ শেখায়নি।

এখন দুপুর আসে,
কিন্তু রোদে আর উষ্ণতা নেই।
চা ঠান্ডা হয় দ্রুত, কথা জমে না আর।
তুমি অন্য বিকেলে ব্যস্ত, আমি অন্য জীবনে বন্দি।
তবু কখনো হঠাৎ একটা অলস দুপুরে
হৃদয়ের ভেতর খসে পড়ে
সেই না-ফেরা সময়ের শব্দ।

ভালোবাসা ছিল, শুধু তাকে ধরে রাখার মতো
আমরা বড়ো হইনি তখন।
যে দুপুরগুলো ফিরে আসে না,
তারা প্রেম হয়ে বেঁচে থাকে নিঃশব্দে
নস্টালজিয়ায়।


২.      শেষ হয়নি স্মৃতির গল্প


শেষ হয়নি স্মৃতির গল্প,
আজও প্রতিটি বিকেল তোমার নাম ধরে ডাকে।
চা-ঠান্ডা জানালার ধারে বসে
পুরনো দিনের রোদ গুনে গুনে
আমি এখনো তোমার ফেরার হিসেব রাখি।

তুমি নেই,
তবু তোমার হাসি ভেজা ছায়া
ঘরের কোণে কোণে ঝুলে থাকে।
কথা না বলা কত শত বাক্য
নীরব হয়ে বুকের ভেতর
ধীরে ধীরে পুরোনো হয়।

একদিন যেসব পথে আমরা হাঁটিনি,
সেই পথগুলো আজো আমাকে চেনে।
পাতাঝরার শব্দে, হঠাৎ পাওয়া কোনো গন্ধে
তুমি এসে দাঁড়াও, একটু, শুধু একটু।

ভালোবাসা কি ফুরোয়?
নাকি সময়ের খাতায় স্মৃতি হয়ে টিকে থাকে চুপচাপ?
তোমার না-থাকার মধ্যেই আমি তোমাকে 
রোজ পাই,
এই পাওয়াটুকুই আমার হার।

শেষ হয়নি স্মৃতির গল্প-
শেষ হয় না কিছুই আসলে।
কিছু মানুষ শুধু সময়ের ওপারে চলে যায়,
ভালোবাসা রেখে যায় নস্টালজিয়ার 
দীর্ঘশ্বাস হয়ে।


৩.     ভালোবাসার স্থানকাল


তোমার ওড়নার ঘ্রাণ লেগে থাকত আমার নিঃশ্বাসে,
কলাভবনের করিডোরে হেঁটে যাওয়ার সময় 
কাঁধ ছুঁয়ে গেলে
বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠত দুপুর।

সেমিনার কক্ষের অন্ধ কোণে
তোমার চোখ আমার চোখে আটকে
ভাষাহীন হয়ে যেত পাঠ্যবই।

লাইব্রেরির বারান্দায়
রোদ্দুর গলে পড়ত তোমার গলায়,
আমি চুপিচুপি তাকিয়ে থাকতাম,
তোমার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা
অপ্রকাশিত হাসির দিকে।

কার্জন হলের সবুজ ঘাসে পা ছুঁয়ে পা,
সেই স্পর্শে শরীর জানত,
মন যা মানতে চায় না।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুকুরপাড়ে
জলের নীরবতায়
আমাদের নিঃশ্বাস ছিল খুব কাছাকাছি,
তোমার আঙুল আমার কব্জিতে
অনেক কথা বলে দিত, যা বলা ছিল নিষেধ।

মৌলি রেস্তোরাঁয় কফির উষ্ণতায়
তোমার ঠোঁটের ছোঁয়া কল্পনায়
আমার ঠোঁট পুড়ে যেত।

বুড়িগঙ্গার তীরে সন্ধ্যা নামলে
নদী যেমন গা ছুঁয়ে যায় ঘাটের,
তুমিও তেমন ছুঁয়ে গেলে অল্প, অস্থির, বিপজ্জনক।

বলাকা সিনেমাহলের অন্ধকারে
হাত ধরা ছিল আমাদের সবচেয়ে সাহসী কাজ,
তবু সেই অন্ধকারেই আমি চিনে নিয়েছিলাম
তোমার শরীরের মানচিত্র।

অনিকা, তুমি ছিলে অন্য একজনের বাগদত্তা, 
আর আমি ছিলাম তোমার নিষিদ্ধ দুপুর।
আমাদের প্রেম ছিল গভীর, আকুল,
ধ্রুপদী সৌন্দর্যে ভরা।

ভালোবাসা আমাদের ছুঁয়ে ছিল
দেহে , রক্তে, শ্বাসে, কিন্তু অধিকার পায়নি।
আজ বিচ্ছেদের পরে শরীর ভুলে যেতে চায়,
কিন্তু স্মৃতি পারে না-
করিডোর, ঘাস, নদী, সব জায়গায় এখনও
তোমার উষ্ণতা জমে আছে।


৪.      একলা ঘরের সন্ধ্যাগুলো


একলা ঘরের সন্ধ্যাগুলো
ধীরে নামে,
চায়ের কাপে জমে থাকা বাষ্পের মতো
অচেনা নীরবতা ছুঁয়ে দেয় ঠোঁট।

দেয়ালের ঘড়ি ক্লান্ত স্বরে
সময় গুনে চলে,
প্রতিটি টিকটিক যেন
ফিরে না-আসা কোনো মুখের ডাক।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলো
বারবার রাস্তার দিকে তাকায়,
হয়তো কারও ছায়া খুঁজে ফেরে,
হয়তো শুধু অভ্যাসবশত।

খাটের এক পাশে ভাঁজ করা দিনগুলো,
অন্য পাশে অগোছালো স্মৃতি,
মাঝখানে আমি,
নিজের সাথে কথা বলার অপ্রয়োজনীয় সাহস নিয়ে।

এই একলা ঘরের সন্ধ্যাগুলোই
আমাকে সবচেয়ে বেশি চেনে,
কারণ এখানে
আমি কাউকে অভিনয় করে দেখাতে পারি না।


৫.     অচেনা দিন


অচেনা হয়ে যাওয়া চেনা দিন
ক্যালেন্ডারের পাতায় নাম আছে,
কিন্তু আর কোনো ডাক নেই।
সকাল আসে ঠিকই,
তবু আগের মতো আলো ধরে না জানালায়।

যে দুপুরে হাসি ছিল সহজ,
এখন সেখানে শুধু ক্লান্তির ছায়া,
চায়ের কাপে ভাসে না গল্প,
ভাসে শুধু সময়ের ভাঙা প্রতিচ্ছবি।

চেনা রাস্তাগুলোও আজ
নতুন করে প্রশ্ন করে,
তুমি কি সেই আগের তুমি?
পায়ের ছাপে আর মেলে না স্মৃতির মাপ।

সন্ধ্যা নামে নিঃশব্দে,
ঘরের কোণে জমে থাকে না বলা কথা,
অচেনা হয়ে যাওয়া এই দিনগুলো
তবু ফিরে আসে-
চেনা কোনো ব্যথার মতো,
নাম ধরে ডেকে যায়। 


৬.    শূন্যতার ফুলবাগানে প্রেম


শূন্যতার ফুলবাগানে আমি একা 
দাঁড়িয়ে ছিলাম, মাটি ছিল নীরব,
হাওয়ায় ছিল না কোনো গান,
আকাশটুকু কেবল দীর্ঘশ্বাসে ভরা।

সেই বাগানে কোনো রঙিন গোলাপ 
ছিল না,
ছিল শুধু অপেক্ষার কাঁটা
আর স্মৃতির শুকনো পাতা।

তবু জানি না কী আশ্চর্যে
তোমার নাম উচ্চারণ করতেই
একটি অচেনা কুঁড়ি কেঁপে উঠল।
তুমি এলে না,
কিন্তু তোমার না-আসাটুকুই
জল দিল শূন্যতার মাটিতে।

বিরহের ছায়ায় জন্ম নিল
নিঃশব্দ কিছু ফুল,
যাদের গন্ধ কেবল হৃদয়ই চেনে।

এই প্রেম কোনো উৎসব নয়,
কোনো পূর্ণিমার রাতও না;
এ এক নীরব চাষাবাদ-
প্রতিদিন একটু একটু করে
নিজেকে হারিয়ে ফেলার সাধনা।

শূন্যতার ফুলবাগানে তাই
আমি আজও প্রেম আগলে রাখি,
কারণ এখানে ভালোবাসা
ফুটে থাকে কাউকে না পাওয়ার 
গভীরতায়।
    

৭.      পূর্ণিমা নিশীথের দেবযানী


তুমি রবে না, আমি রবো না, রবে না এই ক্ষণভঙ্গুর সময়ের কোনো নাম, কোনো মুখ।
মুছে যাবে ক্যালেন্ডারের দিন,
ঘড়ির কাঁটা থামবে এক অচেনা দুপুরে,
শহরের সব শব্দ ক্লান্ত হয়ে
নীরবতার কাছে আশ্রয় নেবে।

শুধু রয়ে যাবে আমাদের পায়ের চিহ্ন,
ধুলো, ঘাস আর ভেজা মাটির স্মৃতিতে,
যে পথে হেঁটে আমরা জেনেছিলাম-
একসাথে থাকা মানেই শুধু ভালোবাসা 
নয়, সময়ের সাথে চলা। 

কোনো কথা আর থাকবে না,
ভাষা ঝরে পড়বে পাতাঝরার মতো,
শুধু গল্প থাকবে-
পূর্ণিমা নিশীথের কোনো এক দেবযানীর
স্বপ্নের গভীরে লুকানো,
যেখানে আলো আর অন্ধকার
একসাথে আমাদের নাম উচ্চারণ করবে।

সেই গল্পে আমরা থাকব, থাকবে দু’টি নিঃশ্বাসের দূরত্বে একটুখানি ভালোবাসা,
একটুখানি হারিয়ে যাওয়া,
আর অনন্তের বুকে রেখে যাওয়া
অদৃশ্য এক ছাপ।


৮.     কালচক্রের প্রান্তে তুমি


এই দুঃখময় জগতে যা কিছু সুন্দর, 
সে তুমি,
তোমার চোখে জমে থাকে অচেনা আলোর ভাষা,
তোমার নীরবতায় বিশ্রাম নেয়
আমার ক্লান্ত আত্মা।

সে তোমার প্রেম,
এক ফোঁটা শিশিরের মতো, ভোরের আগেই ঝরে পড়ে,
তবু সারারাত ভিজিয়ে রাখে হৃদয়ের পাথুরে জমিন।

জানি, জন্ম-মৃত্যুর অবিরাম কালচক্রে
এই প্রাপ্তিকেও একদিন হারাতে হবে,
তোমার হাত ছেড়ে যাবে আমার হাত,
নামহীন হয়ে পড়ে থাকবে
আমাদের সব বলা-না-বলা কথা।

তবু আজ, এই ক্ষণিক সময়ে
তোমার ভালোবাসা আমার আশ্রয়,
এই অস্থায়ী পৃথিবীতে
এক টুকরো চিরস্থায়ী স্বপ্ন।

হারাবো জেনেই তোমায় ভালোবাসি,
কারণ যা চিরকাল থাকে,
তা কখনো এত গভীর করে
হৃদয়ে দাগ কাটে না।


৯.     পৃথিবীর রূপ–রস–গন্ধ


ঈশ্বরকে একদিন জিজ্ঞেস করব,
অনন্ত মহাকালের ভিড়ে
দু’একটি ক্ষণ কেন আমাকে
এই মাটির বুকেই নামিয়ে দিলে?

আমি যে মানুষের প্রেম ছাড়তে পারি না,
ভালোবাসার উষ্ণতা
এখনো আঙুলে লেগে থাকে।
আত্মজার চোখে জমে থাকা
একফোঁটা অভিমান
আমি কী করে উপেক্ষা করি?
তার মুখ মলিন করে কোন স্বর্গে যাই?

এখানে নদী আছে, অব্যক্ত কথা বয়ে নেয়,
নীল আকাশ আছে,
যেখানে চোখ রাখলে মন হালকা হয়ে আসে।
পাখিরা ডাকে ভোরের নাম ধরে,
আর সন্ধ্যায় দোলনচাঁপা, চামেলীর সুবাস
নিঃশব্দে হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।

স্বর্গের প্রতি আমার কোনো লোভ নেই,
সেখানে হয়তো নিখুঁত শান্তি-
কিন্তু এই অসম্পূর্ণ পৃথিবীতেই
আছে কাঁদা, কান্না, হাসি আর ভালোবাসার
অপরিমেয় স্পর্শ।

তাই ঈশ্বর, যদি কোনো প্রার্থনা রাখি,
আমাকে এখানেই রাখো।
পৃথিবীর রূপে, রসে, গন্ধে
আমি এখনো বেঁচে থাকতে চাই।


১০.     পথের প্রান্তে


পথের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পলাতকেরা,
চোখ মেলে, সারাবিকেল তাকিয়ে থাকে
সুদূরের এক অদৃশ্য পথিকের দিকে।
আমার চোখও সেখানেই ছিল,
যেন অপেক্ষাই কোনো একমাত্র পেশা।

একদল বালক পাশ দিয়ে চলে গেল,
বাঁশির সুরে হাওয়ার বুক কেঁপে উঠল,
মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা
সহজ, সরল, অনাবিল মনে হলো।

সন্ধ্যা নামলে কী হবে,
পৃথিবী কি অন্ধকারে ডুবে যাবে,
নাকি কোথাও কোনো শিখা
হঠাৎ জ্বলে উঠবে?
আমি কিছুই বুঝতে পারি না।

গতকাল ঘরে ফেরার পথে
রেললাইনের ধারে শুনে এসেছি
এক পাগলির অট্টহাসি,
সেই হাসির পর থেকেই
মনটা থেমে থেমে বাজে
বেহালার ছেঁড়া তারের মতো।

জীবনের সবকিছু এলোমেলো,
সবকিছু ছন্নছাড়া,
দিনগুলো যেন ভুল ঠিকানায় এসে
ফিরে যেতে ভুলে গেছে।

এত বোহেমিয়ান হলে চলে কী করে
এই বয়সে?
যতই কেউ দাঁড়িয়ে থাকুক পথের উপর, অপেক্ষায়
আমার যখন সময় হবে, আমি তখনই 
চলে যাব,
অন্ধকার থাকুক অথবা শিখা প্রজ্জ্বলিত-
পথ তো পথই, শেষ পর্যন্ত হাঁটতেই হয়।


১১.     শূন্যতার মানচিত্র


তুমি না থাকলে এই ঘরটা আর ঘর থাকে না
মহাকাশের মতো ধূ-ধূ,শূন্যতা লাগে 
দেয়ালগুলো কেমন গ্রহচ্যুত নক্ষত্র,
ছাদে ঝুলে থাকে নিঃশ্বাসহীন অন্ধকার।

খাটের একপাশে শুয়ে আছে রাত্রিহীন রাত,
বালিশে জমে থাকা তোমার চুলের গন্ধ
আজ কেবল স্মৃতির ছাই।

রাস্তা-ঘাট, চরাচর অট্টহাসি দিয়ে চিৎকার 
করে বলে- 'তোর কেউ নেই, কেউ নেই!'
ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন সাক্ষী,
আমার একাকীত্বের রাষ্ট্রদূত।

সময় এখানে একটা থেমে যাওয়া ঘড়ি,
কাঁটার বদলে শুধু ঘুরে ফিরে আসে
তোমার না-থাকার শব্দ।

জানালার বাইরে চাঁদ আজ পরিত্যক্ত কয়েন,
আলো আছে কিন্তু মূল্য নেই,
পাখির ডাকও কেমন নির্বাসিত,
ফিরে যাওয়ার ঠিকানা ভুলে গেছে।

আমি প্রতিদিন শূন্যতার সাথে বসে চা খাই,
নিঃসঙ্গতা আমার স্থায়ী ঠিকানা,
আর তুমি, এই ঘরের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতির 
মানবী কন্যা। 

আমি প্রতিদিন শূন্যতার কাছেই হাত পাতি,
এই জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই,
তুমি নেই - আর তোমাকে হারানোর ক্ষতটুকুই
আমার শেষ সম্পদ।



১২.     মায়াময় সন্ধ্যা


যে সন্ধ্যাগুলো শুধু আমাদের ছিল,
এখন তারা অচেনা হয়ে গেছে
চেনা গাছ, চেনা পথ, চেনা আকাশ
সবাই যেন মুখ ফিরিয়ে নেয় ধীরে ধীরে।

তবু রাত নামলে
অদৃশ্য প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠে তোমার নাম,
অন্ধকারের বুক চিরে
নরম আলোয় ভিজে যায় আমার একলা ঘর।

জোনাকিরা জানে সেই মন্ত্র,
হাওয়ারাও জানে,
তোমার স্মৃতির ছোঁয়ায়
নিস্তব্ধতা পর্যন্ত নিশ্বাস নেয়।

কোনো তারার খসে পড়া আলোতে
হঠাৎ তোমার হাসি ঝরে পড়ে,
আমি কুড়িয়ে নিই,
যেন স্বপ্নের ভাঙা কাচ, তবু উষ্ণ।

ভোর এলে সব মুছে যায়,
কেবল থেকে যায় এই বিশ্বাস,
এই অচেনা পৃথিবীতেও
তুমি আছো, মায়ার মতো, আলো হয়ে।


১৪.    মানচিত্র 


তোমার শরীরের মানচিত্রে আমি 
পথ হারাই  বারবার,
এই হারানোই আমার সবচেয়ে চেনা ঠিকানা।
তোমার কাঁধের ঢালে
নেমে আসে সন্ধ্যার নরম ছায়া,
সেখানে আমার ক্লান্ত দিনের সব প্রশ্ন 
থেমে যায়।

গলার কাছে জমে থাকা নিঃশ্বাসে
আমি শুনি অচেনা নদীর ডাক,
যে নদী শুধু আমার নামেই বারবার বাঁক নেয়।
তোমার দেহের ভাষা অক্ষরহীন, তবু গভীর,
আঙুল ছুঁলেই খুলে যায় অসংখ্য গোপন দরজা।
আমি প্রবেশ করি ধীরে,
ভক্তের মতো, চোরের মতো নয়; কারণ এই শরীর
কেবল আকাঙ্ক্ষা নয়,এ আমার উপাসনালয়।

তোমার কোমরের বাঁকে রাত্রি থমকে দাঁড়ায়,
সময় ভুলে যায় তার গণনা।
ঠোঁটের কাছে এলে সব শব্দ আত্মসমর্পণ করে,
শুধু স্পর্শ বেঁচে থাকে, দীর্ঘ, ধীর, অনিবার্য।

আমি জানি,
এই মানচিত্রে বারবার হারানো মানে
ফিরে আসার পথ জেনে যাওয়া।
প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি উষ্ণতা আমাকে ডেকে বলে-
ভয় নেই,এই হারিয়ে যাওয়াতেই
তোমার আমার হয়ে ওঠা।


১৫.     নীরব প্রার্থনা 


যে প্রেম একদিন শ্বাসে শ্বাসে ছিল,
আজ সে নীরবে প্রার্থনার মতো,
কোনো উচ্চারণ নেই তার,
ঠোঁটের কোণে জমে থাকা
একফোঁটা দীর্ঘশ্বাসই যথেষ্ট।

দিনের কোলাহলে সে আর ধরা দেয় না,
রাতের গভীরে গোপনে বসে থাকে
দু’হাত জোড় করে।

একসময় স্পর্শে স্পর্শে
আগুন জ্বলে উঠত আমাদের,
এখন দূরত্বই তার সাধনভূমি,
চোখ বুজলেই তোমার মুখ,
চোখ খুললেই নিয়তি।

এই প্রেম আর কিছু চায় না,
না পাওয়া, না পাওয়ানোর হিসেব নেই;
শুধু ভাঙা হৃদয়ের কোণে
একটি নিঃশব্দ প্রদীপ হয়ে
জ্বলে থাকে সারাক্ষণ।


১৬.    গন্ধের ঘর


চুলের গন্ধে একটা ঘর ছিল
দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে থাকত
অবলীলায় বলা না-হওয়া কথা।

সন্ধ্যার বাতাসে তুমি এলে,
জানালার পর্দা কেঁপে উঠত
নিঃশব্দ হাসিতে।

এখন ঘর নেই
ইট, কাঠ, ছাদ সব ভেঙে পড়েছে
সময়ের নির্মম ভারে।

শুধু রয়ে গেছে চুলের সেই গন্ধ,
যা কোনো ঠিকানা মানে না।

রাতে ঘুম এলে হঠাৎ বুকের ভেতর
একটা পুরোনো দরজা খোলে,
আমি ঢুকে পড়ি ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে
অক্ষত এক মায়াময় স্মৃতিতে।

ঘর ভেঙে যাক,
ভেঙে যাক সমস্ত আশ্রয়-
এই গন্ধটুকু থাক,
আমার নিঃস্বতার শেষ ঘর হয়ে।


১৭.      চুক্তি


তুমি শীতের রাতে তোমার উষ্ণতা দাও,
আমি দেবো ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন ভালোবাসা।
তুমি নিভু নিভু প্রদীপের মতো পাশে থাকো,
আমি জানালার ধারে রাখব আশ্বাস।

তুমি হাত বাড়াও অন্ধকার ভেঙে,
আমি আঙুলে আঙুল জড়িয়ে বলব,আছি।
তুমি ক্লান্ত সন্ধ্যার দীর্ঘশ্বাস হও,
আমি হবো সকালের রোশনাই।

তুমি যদি হিমেল বাতাসের কাঁপন হও,
আমি বুকের ভেতর জমিয়ে রাখব আগুন।
তুমি রাত হয়ে আমাকে ঢেকে দাও,
আমি ভোর হয়ে তোমাকে জাগিয়ে তুলব ধীরে।

এইভাবেই চলুক আমাদের চুপচাপ বিনিময়, উষ্ণতা আর কুয়াশার,
রাত আর ভোরের ভালোবাসার।


১৮.     দেখা হবে না 


জানি আমাদের আর কখনো দেখা হবে না,
তবু বিকেলের আলো নামলেই
তোমার ছায়া এসে পড়ে জানালার ধারে,
চা ঠান্ডা হয়ে যায়,
স্মৃতিগুলো উসকে ওঠে।

যে রাস্তায় পাশাপাশি হেঁটেছিলাম,
সেই রাস্তা আজও আছে
শুধু আমরা নেই,
দেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা পোস্টারের মতো
আমাদের হাসিগুলো ফিকে,
তবু ছেঁড়া হয়নি।

তোমার বলা অসম্পূর্ণ বাক্যগুলো
এখনো বাতাসে ভাসে,
কখনো পাতার খসখসিতে,
কখনো দূরের ট্রেনের হুইসেলে,
আমি শুনি, বুঝে নিই
কিছু বিদায় কখনো উচ্চারিত হয় না।

রাত হলে আকাশ নেমে আসে বুকের ভেতর,
তারাদের আলোয় ভিজে ওঠে
একটা সময়,
যে সময় শুধু আমাদের ছিল,
সে সময়ের দরজায় আজও তালা নেই,
শুধু চাবিটা হারিয়ে গেছে।

জানি আমাদের আর কখনো দেখা হবে না,
এই জানাটাই এখন আমার প্রার্থনা,
দেখা না হলেও মায়ার ভেতর তুমি থেকো
নস্টালজিক, নীরব, চিরচেনা এক 
আলো হয়ে।


১৯.      কালোকেশী কন্যা


কালোকেশী কন্যার কাজল কালো চোখ
সে চোখে রাত নামে ধীরে শব্দহীন-
যেখানে আকাশ এসে থামে,
তারার প্রতিফলনে ঢেউ ওঠে না,
শুধু নীরবতা আরও ঘনীভূত হয়।

তার কপালের ঢালুতে আলো বসে থাকে
শিউলিফুলের শিশিরের মতো
অল্প ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে,
বেশি আলো সহ্য করে না।
ভ্রু দু’টি যেন আঁকা হয়নি,
বরং সন্ধ্যার রেখা নিজে নিজে এঁকে দিয়েছে।

কালো চুল তার পিঠ বেয়ে নামে
নদীর মতো- শীতের নদী,
গভীর, স্থির, অথচ ভিতরে ভিতরে চলমান।
বেণীর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে
পুরনো কোনও গান, যা শুধু বাতাস জানে,
আর জানে তার কাঁধ।

গালের উপর আলো পড়লে
মনে হয় কাঁচা আমের খোসায় রোদ্দুর লেগেছে,
সবুজের ভিতরে লুকোনো মিষ্টি হাসি এলে ঠোঁটের কোণে
দুটো ছোট চাঁদ জ্বলে ওঠে,
সে হাসি উচ্চস্বরে নয়,বরং প্রদীপের মতো
নিজের আলোয় ঘরটাকে বদলে দেয়।

তার গলা মধুর -
কথা বললে শব্দ নয়, অনুভব নামে।
হাঁটার সময় পায়ের তলায়
পথ মসৃণ হয়ে যায়, মাটি যেন তাকে চেনে,
আর মানুষ হয়ে উঠতে চায়।


২০.     তুমি এসো মঙ্গলালোকে 


আমার দুঃখের দিনে তুমি সুখের 
বার্তা নিয়ে এসো,
আমার অমঙ্গল সব সরিয়ে  মঙ্গলালোকে এসো।

ভাঙা স্বপ্নের কাঁচে যখন রক্তাক্ত হয় রাত,
তুমি ভোরের মতো নেমে এসো, 
মুছিয়ে দিও সব ক্ষতচিহ্ন।

যখন বিশ্বাস ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে পথের ধুলোয়,
তুমি হাত ধরে বলো, এই পথ শেষ নয়, 
চল আরও দূরে।

আমার নিঃশ্বাসে জমে থাকা দীর্ঘশীতল ভয়,
তোমার উষ্ণ কণ্ঠে গলে যাক, 
হোক নিশ্চিন্তের নাম।

যে দিনগুলো আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়,
তুমি সেদিন পাশে বসে সময়কে 
আবার ডেকো।

অন্ধকার যদি আমায় গ্রাস করতে চায় হঠাৎ,
তুমি প্রদীপ হয়ে জ্বেলো হৃদয়ের গোপন ঘরে।

সব শেষে, আমি যখন নিজেকেই হারিয়ে ফেলি,
তুমি ঈশ্বরের মতো নীরবে বলো,
আমি আছি, ভয় নেই।



২১.      বিবাহিত প্রেমিকা 



তোমার কপালে সিঁদুর,
আমার চোখে শুধু সন্ধ্যার ছায়া
আমরা দু’জনেই জানি,
এই ভালোবাসা দিনের আলোয় হাঁটে না।

তুমি সংসারের ভেতর একটি নিখুঁত নীরবতা,
আমি তার বাইরে দাঁড়িয়ে নামহীন অপেক্ষা।
তোমার হাসিতে যতটা অভ্যাস,
আমার স্পর্শে ততটাই অপরাধ
তবু রাত নামলে আমাদের হৃদয় দুটোই
একই ভুল ঠিকানায় পৌঁছে যায়।

তুমি ফিরে যাও ঘরের দিকে,
আমি রয়ে যাই ধোঁয়ার মতো
কোনো চিহ্ন নেই, শুধু শরীরে লেগে থাকা
একটু উষ্ণতা, একটু অনুশোচনা।

এই প্রেমের কোনো ভবিষ্যৎ নেই,
কোনো দাবি নেই,  কোনো শপথও না
তবু তুমি জানো, আর আমিও জানি,
কিছু ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে 
জন্ম দেয় স্বর্গীয় অনুভব।


২২.     পরকীয়া 


তোমার শাড়িতে আমার নাম লেখা থাকে
খুলে পড়া আঁচলের ফাঁক দিয়ে
যে শ্বাস বেরোয়,
সে শ্বাস আমার বুক চিনে নেয়।

তুমি স্ত্রীর মতো ঘুমাও না আমার পাশে,
তবু তোমার শরীর আমার শরীরের 
ভাষা জানে কোথায় থামতে হয়,
কোথায় একটু দেরি করলে পাপ মধু 
হয়ে ঝরে পড়ে।

তোমার ঠোঁটে সংসারের স্বাদ,
আমার ঠোঁটে নিষিদ্ধতার ক্ষুধা
মাঝখানে শুধু একটি কাঁপতে থাকা মুহূর্ত,
যেখানে তুমি আর বিবাহিতা নও,
আমি আর নির্দোষ নই।

তোমার দেহ একটি চুপচাপ প্রার্থনাঘর,
আমি সেখানে মাথা রাখি কোনো ঈশ্বর ছাড়াই।
ঘাম, নিঃশ্বাস, কাঁপুনি সব মিলিয়ে
একটি গোপন ধর্ম।

প্রার্থনা শেষ হলে তুমি সরে যাও,
চুল গুছিয়ে নাও, আয়নায় ফিরে পাও
সংসারী মুখ।
আমি পড়ে থাকি বিছানায় তোমার শরীরের 
গন্ধে মোড়া একটি দীর্ঘশ্বাস হয়ে।

এই প্রেমে নাম নেই, ভবিষ্যৎ নেই,
শুধু শরীর আছে, আর শরীরের ভেতর
অপরাধের মতো জ্বলতে থাকা
একটা অসহায় সুখ আছে।


২৩.     রাতের দুই প্রান্ত


বিছানার একপাশ ফাঁকা,
অন্যপাশ ভরা স্মৃতিতে
চাদরের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে
কথা না বলা কত রাত।

নিভে যাওয়া বাতির আলো
দেয়ালে আঁকে তোমার ছায়া,
আমি হাত বাড়ালে পাই শুধু
হাওয়ার শীতল দীর্ঘশ্বাস।

রাত জানে,
কোথায় শরীর, কোথায় আত্মা,
কোথায় থেমে যায় স্পর্শ
আর কোথা থেকে শুরু হয় অভাব।

ঘুম আসে না, তবু চোখ বুজে থাকি,
যেন স্বপ্নের ভুল ঠিকানায়
হঠাৎ তুমি এসে পড়বে, একটুখানি মায়া হয়ে,
একটুখানি আলো হয়ে।


২৪.     বদলে যায় 


বদলে যায় পৃথিবীর রং,
বদলে যায় কবিতার পাণ্ডুলিপি,
বদলে যায় আকাশের নীল,
বদলে যায় চেনা গানের সুর,
বদলে যায় তোমার মন, আর তুমি।

বদলে যায় নদীর গতি
একদিন শান্ত, একদিন উন্মত্ত,
বদলে যায় বাতাসের স্বাদ,
কখনো মধুর, কখনো তিতকুটে স্মৃতি।

বদলে যায় ঘড়ির কাঁটার ভাষা,
সময় আর কথা বলে না চোখে চোখে,
বদলে যায় জানালার আলো,
সন্ধ্যা নামে অচেনা ছায়া হয়ে।

বদলে যায় শহরের মুখ,
পথচেনা মোড়েও হারিয়ে যায় পা,
বদলে যায় মানুষের হাসি,
ভেতরে জমে ওঠে না-বলা ব্যথা।

এখন আর অপেক্ষাও কিছু চায় না,
শূন্যতা নিজেই নিজের ঠিকানা,
সব বদলের শেষে শুধু এটুকুই সত্য-
আমি আছি, তবু কিছুই আমার না।



২৫.     পথের বাঁধন



যে পথে হেঁটেছি আমরা হাওয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে, সেই পথ আজও জানে
পায়ের শব্দের ভাষা।
পথের দু’ধারে ছিল অদৃশ্য হাতের ছোঁয়া,
তোমার নীরব উপস্থিতি
আমার হাঁটার গতি ঠিক করে দিত।

কখনো দূরত্ব ছিল বাঁক, কখনো অপেক্ষা ছিল সেতু, তবু পথ ছিঁড়ে যায়নি,
কিছু বাঁধন পায়ে নয়, আত্মায়।

রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পথ শিখিয়েছে থাকা, ফিরে না তাকিয়েও
কীভাবে স্মৃতি বয়ে নিতে হয়।

আজ আমরা আলাদা প্রান্তে, পথও যেন দুই দিকে গেছে, তবু মাঝখানে রয়ে গেছে
একটি অদৃশ্য সুতো-
পথের বাঁধন, যা ছাড়ে না,
শেষ গন্তব্যের আগ পর্যন্ত।



২৬.     অপেক্ষায় থাকি 



অপেক্ষায় থাকি, 
ভোরের আলোর ছ্বটায় শিশিরভেজা পাতার মতো নীরবে তুমি আসো
পাখির প্রথম ডাকে আমার নাম জড়িয়ে
যদি তুমি আসো।

অপেক্ষায় থাকি, 
যদি দুপুরের রৌদ্রজ্বালায় তুমি আসো,
ঘামের নোনা গন্ধে মিশে থাকা সাহস নিয়ে,
ছায়া খুঁজতে খুঁজতে আমার পাশে দাঁড়াও।

অপেক্ষায় থাকি, যদি বিকেলের ক্লান্ত হাওয়ায়
তুমি আসো,
রোদ-ছায়ার দোলনায় দুলতে দুলতে,
চায়ের কাপে জমে থাকা অব্যক্ত কথার মতো।

অপেক্ষায় থাকি, 
যদি সন্ধ্যার প্রদীপ-জ্বলা আলোয় তুমি আসো
ঘরে ফেরার পথের শেষ বাঁকে,
হাতের মুঠোয় ধরে রাখা অচেনা বিশ্বাস হয়ে।

অপেক্ষায় থাকি, 
যদি রাত্রির গভীর অন্ধকারে তুমি আসো
নক্ষত্রহীন আকাশের নীচে,
স্বপ্নের দরজায় টোকা দেওয়া নিঃশব্দ প্রার্থনা হয়ে।

অপেক্ষায়ই থাকি,
ভোর থেকে রাত্রি, রাত্রি থেকে ভোর,
আমি কেবল অপেক্ষার বুঁদ হয়ে থাকি-
যদি তুমি আসো।



২৭.     শুক্লাদ্বাদশীর রাতে 



এই হেমন্তের শুক্লাদ্বাদশীর রাতে
চলো দুজন পালিয়ে যাই
চাঁদের গায়ে কাশফুলের সাদা চিঠি রেখে,
নক্ষত্রের ঠিকানায় লিখে দিই আমাদের নাম।

শহরের ক্লান্ত ঘড়িগুলোকে পেছনে ফেলে
নীরব কোনো নদীর ধারে দাঁড়াই,
যেখানে হাওয়ারা প্রেম বোঝে,
আর জল জানে কীভাবে গোপন কথা রাখতে হয়।

তোমার আঁচলের ভাঁজে জড়ানো থাকুক রাত,
আমার কাঁধে হেমন্তের শীতল নিঃশ্বাস।
দূরের গ্রাম, অচেনা আলো,
একটুখানি ভয় সবই হোক আমাদের।

কেউ ডাকবে না নাম ধরে,
কেউ প্রশ্ন করবে না পরিচয়।
শুধু তোমার চোখে আমার ঘর,
আমার বুকে তোমার নির্ভয়।

আঁচলের ফাঁক দিয়ে
রাত নেমে আসবে তোমার বুকে,
আমি কেবল কান পেতে থাকব
হৃদস্পন্দনের গোপন মন্ত্রে।

হেমন্তের বাতাসে তোমার চুলের গন্ধ
আমাকে টেনে নেবে আরও কাছে,
ঠোঁটের কিনারায় থরথর করে জেগে উঠবে 
অনুচ্চারিত আহ্বান।

সেই পবিত্র রাতের আড়ালে
চলো আমরা আদিম হয়ে উঠব -
কোনো নাম নেই, কোনো দায় নেই,
শুধু শরীরের স্মৃতিতে লেখা হবে 
ভালোবাসার এক দীর্ঘ শ্লোক।



২৮.     রমণী রাত্রির মতো 


রমণী রাত্রির মতো তার শরীর নিজের 
ছায়ার সঙ্গে কথা বলে, 
আলো-অন্ধকারের মাঝখানে।

প্রতীক্ষা কোনো ব্যক্তির নয়, 
বরং এক আগমনের, একটি সম্ভাব্য স্পর্শের, 
নামহীন অথচ চেনা। 

ঠোঁটের প্রান্তে জমে থাকে উষ্ণতার স্মৃতি, 
স্তনের ভেতরে দুলে ওঠে অদৃশ্য ঢেউ; 
না পুরো ছোঁয়া, না সম্পূর্ণ দূরত্ব-
দুইয়ের মাঝখানে এক দীর্ঘ থেমে থাকা।

শরীরের মানচিত্রে আলো হেঁটে বেড়ায়,
কোথাও তীব্র, কোথাও ম্লান। 
প্রতিটি রেখা জানে সে কিসের অপেক্ষায়,
তবু কিছু বলে না; নীরবতাই এখানে একমাত্র ভাষা, গভীর ও পূর্ণ।

দেহ কোনো বস্তু নয়, এ এক দীর্ঘ বাক্য, 
শেষ চিহ্নহীন। আকাঙ্ক্ষা এখানে আর চাহিদা নয়,
সে এক ধীর জ্যোৎস্না, যা জ্বলে ওঠে শুধু থাকায়, 
শুধু সম্ভাবনায়।

রমণী রাত্রির মতো নিজের ভেতরেই পূর্ণ, 
স্থিরতার মাঝেই যার সমস্ত আকাঙ্ক্ষার লেনদেন সম্পূর্ণ করে।


২৯.     তুমি আসতে যদি


তুমি আসতে যদি, 
কপাল জুড়ে চন্দনের টিপ দিতাম,
গালভর্তি আবীর মেখে দিতাম,
গোলাপ ঠোঁটে কনকচাঁপার রঙ ভরাতাম,
বুক থেকে লোধ্ররেণুর সুবাস নিতাম।

তুমি আসতে যদি,
দরজার চৌকাঠে ঝুলত আলোর মালা,
সন্ধ্যার হাওয়ায় ভিজে উঠত আমার চুল,
নূপুরের শব্দে জেগে উঠত ঘুমন্ত উঠোন,
চাঁদের সঙ্গে চুপিচুপি কথা বলত রাত।

তুমি আসতে যদি,
আমি শব্দগুলোকে সাজাতাম পায়ের কাছে,
নীরবতার ভেতর রেখে দিতাম হৃদয়ের মানচিত্র,
দু’হাত ভরা উষ্ণতায় তোমার ক্লান্তি নামাতাম,
চোখের পাতায় লিখে দিতাম ফেরার ঠিকানা।

তুমি আসতে যদি,
আমার শ্বাসে শ্বাসে মিশে যেত তোমার নাম,
সময় থমকে দাঁড়াত এক মুহূর্তের জন্য,
ভাঙা দিনের সব দুঃখ গলে যেত জোছনায়,
আর পৃথিবীটা হতো কেবল আমরা দু’জন।

তুমি আসোনি -
তবু এই অপেক্ষার ঘরে আজও চন্দনের গন্ধ লেগে থাকে, আবীর শুকিয়ে রঙিন স্মৃতি হয়, আর লোধ্ররেণুর সুবাসে
আমি প্রতিদিন তোমার আসার কল্পনাটুকু
নীরবে বাঁচিয়ে রাখি।


৩০.    গোপন নামে ডেকো


তোমাকে কয়েকটি ডাকনামে ডাকতাম
সে নামগুলো বাতাসও শোনেনি,
তোমাকে কিছু গোপন ভালোবাসার স্পর্শ দিতাম
চাঁদের আলোও তা দেখতে পেত না।

তোমাকে নিয়ে পূর্ণিমারাতে অভিসারে বের হতাম,
পায়ের শব্দ ঢেকে দিত শিশিরের ঘাস,
আমাদের হাসি লুকিয়ে থাকত
রাতজাগা শিউলির গন্ধে।

তোমার চোখে চোখ রাখলে
সময় থেমে যেত অচেনা এক প্রার্থনায়,
আমাদের কথা থাকত আধো-স্বরে,
যেন শব্দগুলোও শিখে গিয়েছিল গোপন থাকতে।

তোমার কাঁধে মাথা রাখতাম
সেই আশ্রয়ের কথা কেউ জানত না,
আমার বুকের ভেতর তোমার নাম
নীরবে রক্ত হয়ে বইত।

ভোর এলে আমরা আলাদা হয়ে যেতাম
দু’টি নিরীহ মানুষের মুখোশ পরে,
কেবল রাত জানত এই শহরে এখনো
একটি গোপন প্রেম বেঁচে আছে।


৩১.     বিদায়


কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো কাঁদে না
শুধু চোখের ভেতর কুয়াশা হয়ে বসে থাকে।
পুরোনো গানের মতো হঠাৎ বেজে ওঠে, 
কারও অনুমতি ছাড়াই।

বিদায়ের পরে সবকিছু একই থাকে,
শুধু মনটা আর আগের মতো ফিরে আসে না।
চেনা রাস্তায় হাঁটলেও পা দুটো যেন জানে
কিছু একটা ফেলে আসা হয়েছে।

রাত নামলে নাম ধরে ডাকি না তোমাকে,
তবু বাতাস জানে,
এই দীর্ঘ নীরবতার ভেতর একটা না–বলা বিদায় আজও বসে আছে।

মনখারাপটা তাই ভারী নয়,
শুধু গভীর, মায়ার মতো দেখা যায় না,
তবু ছাড়ে না।

বিদায়, একটা ছোট শব্দ, তবু তার ভেতরে ঢুকে থাকে অগণিত না বলা কথা।
তুমি চলে গেলে, ঘরটা ফাঁকা হয়নি,
ফাঁকা হয়েছে সময়ের বুক,
জানালার পাশে আলো দাঁড়িয়ে থাকে
কার জন্য জ্বলবে, সে যেন ভুলে যায়।

কিছু স্মৃতি আছে, যারা কাঁদে না।
চুপচাপ চোখের ভেতর কুয়াশা হয়ে জমে থাকে।, হঠাৎ কোনো বিকেলে
পুরোনো গান বাজে,আর মনটা অকারণেই
পিছনে ফিরে যায়।

বিদায়ের পর সব রাস্তাই চেনা,
তবু হাঁটতে গেলে পা দুটো টের পায়
কিছু একটা ফেলে আসা হয়েছে।
রাত নামলে তোমার নাম ডাকি না,
তবু নীরবতা জানে, এই অন্ধকারে
একটা অসমাপ্ত বিদায় আজও জেগে আছে।

মনখারাপটা ভারি নয়,শুধু গভীর।
মায়ার মতো দেখা যায় না, তবু ছাড়ে না।


৩২.     স্বর্গের পথে আছি


দীর্ঘ পথ পায়ে মাড়িয়ে
আজও পৌঁছতে পারিনি কোনো গন্তব্যে।
জীবনভর হেঁটেছি,
মাইলের পর মাইল, সময়ের পর সময়,
তবু কোনো স্বর্গের দোরগোড়ায়
আমার পা থামেনি কখনও।

এখন আর কোথায় যাবো,
লুকাবো কোন্ অচেনা নরকের অন্ধকারে?
আমার জন্য ঈশ্বর গড়ে দিয়েছিলেন
একজন ধ্রুপদী রমণী,
যার চোখের গভীরতায়
আমার সমস্ত দৃষ্টির রং ভিজে যায়,
যার মুখাবয়ব
উজ্জ্বল তুলিতে আঁকে নীরব মুগ্ধতা।

কিছু সৌন্দর্যের ছোঁয়া
থেকে যায় দীর্ঘশ্বাসের ভেতর,
কিছু প্রেম জমে থাকে
অধরা স্বপ্নের কোলঘেঁষে,
আর কিছু অনুভব-
স্বর্গের পথে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই জন্ম নেয়।

আমি এখন সেই পথেই হাঁটছি,
যেখানে পাপ নেই, অনুশোচনা নেই,
শুধু তার নাম উচ্চারণ করলেই
আত্মা হালকা হয়ে আসে।

আমি জানি, গন্তব্য না পেলেও
এই পথটাই আমার স্বর্গ-
আমি এখন সেই স্বর্গের পথেই আছি।


৩৩.     প্রথম পাঠ


কী আনাড়ি আমি! 
চুম্বন কী তাও জানতাম না,
জানতাম না এটি শরীরের ভাষা,
জানতাম না নীরবতার ভেতরেও
এত স্পন্দন লুকিয়ে থাকে।

ভেবেছিলাম, এ শুধু ঠোঁটের ছোঁয়া,
দু’টি শ্বাসের ভুল বোঝাবুঝি,
অথচ একদিন বুঝলাম,
এ হৃদয়ের দরজায় প্রথম কড়া নাড়া।

আমার লাজুক চোখ তখনও শিখেনি আগুন চিনতে, আমার হাত জানত না
কোন স্পর্শে কাঁপে আত্মা।
তুমি এসে হেসে বলেছিলে, সব কিছু জানতে হয় না, 
কিছু অনুভব করলেই হয়।

সেদিন বুঝলাম-
চুম্বন কেবল সম্ভোগের পাঠ নয়,
এ অজ্ঞতার বুকের ভেতর ভালোবাসার প্রথম পাঠ।


৩৪.      দুনিয়া একটি করিডোর 


এই দুনিয়া একটি করিডোর
দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে থাকা সময়ের ফিকে ছবি,
আমরা থামি, তাকাই,
ভাবি এইটুকুই বুঝি জীবন।

পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়
জন্ম আর বিদায়ের মাঝখানে,
হাঁটতে হাঁটতে শিখে যাই
কীভাবে হাসি লুকোতে হয়,
কীভাবে কান্না নীরবে বহন করতে হয়।

করিডোরে জানালা নেই, আছে শুধু কিছু দরজা
কিছু খুলে যায় অহংকারে,
কিছু বন্ধ থাকে ক্ষমা না চাইলে।

আমরা আলো জ্বালাই,
নাম দিই সাফল্য, সম্পর্ক, সংসার
অথচ সব আলোই ধার করা,
সব ছায়া আমাদের সঙ্গেই হাঁটে।

হঠাৎ একদিন
মৃত্যুর দরজায় কড়া নাড়ে নীরব হাত,
কোনো ঘোষণা নেই, কোনো সময়সূচিও না।
সেই দরজার ওপারে করিডোর শেষ হয়ে যায়,
শুরু হয় আসল জগৎ
যেখানে মুখোশ লাগে না, ওজন হয় শুধু কর্মের।

তখন এই দুনিয়া
পেছনে পড়ে থাকা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
আর জীবনভর হাঁটা পথটি
একটি প্রশ্ন হয়ে ঝুলে থাকে,
করিডোরে থাকাকালীন আমরা কি পথিক ছিলাম,
না কি পথটাই ভুলে গিয়েছিলাম?


৩৫.       শান্ত ধীরে


জীবনের পথে পথে আমরা প্রকাশিত হই
খুব শান্ত ধীরে।
কোনো ঘোষণা ছাড়া, কোনো ঢাকঢোল 
না পিটিয়েই একদিন হঠাৎ বুঝে ফেলি, 
আমরা আছি।

সময় আমাদের নাম ধরে ডাকে না,
তবু প্রতিটি সকালে
সে আমাদের কাঁধে হাত রাখে,
আর বলে, চলো, আর একটু এগোই।

কথারা তখন পূর্ণ বাক্য হতে চায় না,
অর্ধেক উচ্চারণেই তারা সবচেয়ে সত্যি।
কিছু স্বপ্ন পকেটে রাখা ভাঙা কয়েনের মতো,
খরচ করা যায় না,
ফেলে দিতেও মন সায় দেয় না।

সন্ধ্যা নামে দিনের ক্লান্তি ঘাসের ওপর বসে পড়ে,
রাত্রি ধীরে ধীরে
আমাদের ভেতরে আলো জ্বালায়।
আমরা শিখি, সব অনুভূতির নাম থাকে না,
সব ভালোবাসা চাওয়া চায় না।

এইভাবেই নীরবতার ভেতর দিয়ে,
আলোর মৃদু স্রোতে জীবন আমাদের ছুঁয়ে যায়,
মায়ার মতো,
অচেনা অথচ আপন কোনো স্মৃতির 
রোমন্থনে।



৩৬.     কথা ছিল 


কথা ছিলো, এক টুকরো রঙিন কাপড় পেলে
ভোরের কুয়াশায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি
শীতল আঙুলে ছুঁয়ে নেবে আকাশের মানচিত্র।

পথের ধারে ঝরে-পড়া দিনের টুকরো কুড়াতে 
সে শিখে নেবে ইতিহাসের ভার,
নীরব পাতার ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা
অজস্র না-বলা গল্প।

হিমেল সকালের হাওয়ায়
তার শ্বাসে মিশে যাবে গানের প্রথম স্বর,
মাটির বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা
এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা।

চোখে থাকবে ক্ষুধা,
তবু মেরুদণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকবে আলো,
কারণ সে জানে,
এই দেশ মানে কেবল মানচিত্র নয়,
এই দেশ মানে তার হাতের তালু,
তার জমে থাকা স্বপ্ন,আর পাতার মর্মরে 
লুকিয়ে থাকা একটি আগামীকাল।
   


৩৭.      আনন্দধারায়



তুমি এলে আমার কাছে,
ভীত হরিণীর মতো কাঁপা চোখে
ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজতে থাকো,
যেন স্পর্শ মানেই প্রস্থান।

কিন্তু দ্রৌপদীও তো
দেবতার সান্নিধ্যে এমন দ্বিধা রাখেনি,
ভরসার বুকেই রেখেছিল মাথা।

তোমার অম্লান দেহখানি
ধূসর ধূলার সঙ্গে মিশে যাক,
মাটি জানুক জীবনের উষ্ণতা,
জানুক কীভাবে সৃষ্টি হাসে।

আমি চাই সেই উল্লাস
যেখানে জন্ম নেয় আলো,
যেখানে প্রেম মানে আশ্রয়।

ভালোবাসার আকুলতায়
কোনো কান্না মানায় না,
এখানে চোখ ভরে থাকে স্বপ্ন,
ঠোঁটে থাকে নীরব সম্মতি।

চলে যেও না
থেকে যাও এই মুহূর্তে,
আমার বাহু-লগ্ন হয়ে।
এখানেই থেমে থাকুক সময়,
নিঃশ্বাসের সঙ্গে নিঃশ্বাস মিলুক,
ভয়গুলো গলে যাক উষ্ণতায়।

এই তো জীবন
এই অপার আনন্দধারায়
আমরা দু’জন, নির্বাক, অথচ জীবনকে উপভোগ করার জন্য উন্মুখ!

       
৩৮.    আমি যাব


আমি যাব, তুমি না বললেও যাব।
ডাক না দিলেও,
চোখ ফিরিয়ে নিলেও যাব।

দীর্ঘদিন ধরে যে পথ
আমার পায়ের নিচে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে,
আজ সে পথ আমাকে ডাকছে।
পিছুটান ক্লান্ত, 
স্মৃতির বোঝা ভারী হয়ে উঠেছে।

মহাসমুদ্রের পাড়ে
একজন মাঝি অপেক্ষা করছে,
চোখে তার অনন্তের নীল, হাতে পুরোনো নৌকা, যেন বহু জন্ম ধরেই আমার 
নাম জানে।

ঐ নৌকায় উঠে আমি একদিন চলে যাব,
ঢেউয়ের প্রশ্ন, বাতাসের কান্না
সব পেছনে ফেলে।

পেছনে পড়ে থাকবে অধরা ভালোবাসা,
অপূর্ণ কথোপকথন, কিছু সন্ধ্যা,
যেখানে তুমি ছিলে,
আর আমি অপেক্ষা করেছিলাম।

মহাসমুদ্রের ওপাড়ে কী আছে জানি না,
হয়তো নীরবতা, হয়তো মুক্তি,
হয়তো এমন এক সকাল
যেখানে আর কাউকে বোঝাতে হয় না
কেন চলে যেতে হয়।

আমি যাব। কারণ কখনও কখনও
থেকে যাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই
সবচেয়ে সত্য ও উত্তম।


৩৯.     এখানেই সমাপ্তি 


ওকে আজ বড় শান্ত দেখাচ্ছে,
ওর কপালে লিখে দাও সুরমার আখর
ওর চোখে মুছে দাও দিনশেষের ক্লান্তি।

আতর মাখা সুগন্ধি কাপড়ে ওকে  
জড়িয়ে দাও,
শরীরের সবক্ষত ঢেকে যাক 
যেন পার্থিব কোনো অস্তিত্ব আর 
বাইরে না থাকে।

ওকে বলো, এইটাই ওর শেষ প্রহর,
এইখানেই নামল পর্দা।

ও অনেক দিয়েছিল, এবার ও যেতে পারে-
চুপচাপ, নির্ভার,
আলোহীন এক প্রশান্তির দিকে,
ওকে আর ডেকো না।


৪০.     আশ্চর্য মর্মরে


কোনদিন কোনো জনম দেখিনি
তারে ক্ষণতরে,
সেই তুমি এসে মর্মরিত হলে
আশ্চর্য মর্মরে।

অচেনা হাওয়ার মতো ছুঁয়ে গেলে
অবেলার এক প্রান্তরে,
চোখের কোণে জমে রইল আলো
নামহীন এক অন্তরে।

তুমি কি ছিলে কোনো স্বপ্নখণ্ড,
না কি স্মৃতির ছায়া
নীরবতার বুক চিরে ভেসে এলো
হালকা এক মায়া।

কথা না বলেও কত কথা
রেখে গেলে নিঃশব্দে,
হৃদয়ের পাতায় লিখে দিলে
অদৃশ্য এক নিবন্ধে।

এখনও সন্ধ্যা নামে ধীরে
তোমার সেই গন্ধে,
আমি বুঝি কিছু আগমন থাকে
থাকার আনন্দে।



৪১.      বিদায়ের পথে 


সেই তুমি আসলে যখন
আমি তখন জীবনেও নেই, মরণেও নেই,
একটি নিঃশ্বাস আরেকটির সঙ্গে দ্বিধায় ঝুলে আছে,
আমি মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়িয়ে,
পেছনে পড়ে আছে পরিচিত সব আলো।

তুমি আমাকে দেখছ
আমিও তোমাকে দেখছি-
দু’চোখের মাঝখানে জমে আছে অগণিত কথা,
কিন্তু মুখ খুললে কোনো শব্দ জন্ম নেয় না,
শুধু নিস্তব্ধতার দীর্ঘ ছায়া।

আমি বলেছিলাম তোমার সাথে অনেক কথা,
অস্পষ্ট করে, শব্দহীন উচ্চারণে,
হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা ডাক
বাতাসে মিশে গিয়েছিল,
তুমি শুনতে পাওনি,
হয়তো শোনার সময় তখন ছিল না।

আমার চোখে তখন করুণার জল,
অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই,
শুধু একরাশ মমতা
শেষবারের মতো তোমার দিকে ছড়িয়ে দিই।

যে পথে আমি যাচ্ছি
সেখানে আর ফেরার চিহ্ন নেই,
তবু মনে হয়, যদি একটিবার তুমি বুঝতে
এই নীরবতাই ছিল আমার শেষ আর্তি।

আমি হারিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে, অচেনা অন্ধকারে নয়,
এক করুণ আলোয়, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তুমি নেই। 

~  কোয়েল তালুকদার 
তারিখ - ১৩/১/২০২৬ ইং

( আমার এক জুনিয়র বন্ধু নাম শহীদ। কুমিল্লা বাড়ি। ও আমার জসীমউদ্দিন হলের রুমমেট ছিল। কত যে প্রাণের সম্পর্ক ছিল। শহীদ এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ও যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। প্রার্থনায় রাখবেন।)


৪২.     সোমেশ্বরীর ধারে 


রিনা মারাক, গারো পাহাড়ের পাদদেশে
এক বিকেলের নাম।
সোমেশ্বরী নদী তখন ধীরে কথা বলছিল,
পাথরের গায়ে গায়ে জল বয়ে যাচ্ছিল
আর রিনা মেষ চড়াচ্ছিল,
যেন পাহাড়ের নীরবতা পাহারা দিচ্ছে।

ভাঙা বাংলায় কথা হয়েছিল ওর সাথে,
শব্দগুলো ছিল খণ্ডিত,
কিন্তু চোখ দুটি ছিল সম্পূর্ণ অদ্ভুতভাবে বাঙালি, অদ্ভুতভাবে চেনা,
হাসলে মনে হতো 
নদীর জল একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

ওর সাথে কথা বলার জন্য দ্বিতীয় দিনে গিয়ে খুঁজেছি, পাইনি -
তৃতীয় দিনে আরও গভীরভাবে,
চতুর্থ দিনে শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে থেকেছি। রিনা ছিল না-
ছিল মেষের পায়ের পুরোনো দাগ,
ছিল পাহাড়ের ছায়া,
ছিল নদীর নীরব কুলু কুলু শব্দ! 

কেউ বলে না পাহাড়ের মেয়েরা কোথায় যায়, তারা শুধু একদিন নদীর মতো
দৃষ্টি থেকে সরে পড়ে।

রিনা মারাকও হয়তো তাই, এখনো কোথাও আছে, সোমেশ্বরীর ধারে,
নাকি শুধু আমার স্মৃতির ভাঙা বাংলোর আঙ্গিনায় চিরকাল মেষ চাড়াচ্ছে।


৪৩.     সম্মতির সীমানা


চাইলেই খুলে দেওয়ার মতো
আমার কোনো বন্ধন নেই,
অন্তর্বাসের হুক হোক বা
গল্পের পাতায় আঁকা দৃশ্য।

আমার শরীর কোনো প্লট-ডিভাইস নয়,
তোমার কলমের সুবিধে-মতো বাঁক নেয় না।
আমি চরিত্র নই যে নির্দেশে নত হবো,
আমি মানুষ, আমার আছে নিজের শব্দ।

আমার ‘না’ মানে পর্দা নামা,
আমার ‘হ্যাঁ’ মানে আকাশ খোলা;
এই দুইয়ের মাঝখানে
কেউ ঢুকে পড়ে না জোর করে।

আমাকে সস্তা পণ্য ভাবো না,
আমি বাজারে ঝোলানো দামট্যাগ নই।
আমার ইচ্ছে, আমার সময়,
আমার শরীর সবই আমার।

যদি গল্প লেখো, লেখো সম্মতির আলোয়;
যদি প্রেম চাও, চাও সম্মান দিয়ে।
কারণ আমি খুলে দিই শুধু
নিজের ইচ্ছের দরজা, চাবিটা থাকে 
আমার কাছেই।



৪৪.     উপমিত ভালোবাসা 



তোমার বেনী চুলের বাঁধনে আমার ভালোবাসা বেঁধে রেখেছ,
শাড়ির আঁচলে গিঁটে লুকিয়ে রেখেছ চুম্বন,
চোখের তারায় গোপনে দেখো আমাকে,
আমি বুঝে নিই, উচ্চারণহীন ডাক।

তোমার কপালের টিপে আটকে থাকে আমার দিনের সূর্য,
ভ্রুর বাঁকে বাঁকে লেখা থাকে অপেক্ষার মায়াবী সুবর্ণরেখা।

হাসির মুখচ্ছবিতে দেখি-  
হৃদয়ের মৃদু ঢেউ, তোমার পায়ের নূপুরে বাঁধা সন্ধ্যার শব্দে আর
হাঁটার ছন্দে ছড়িয়ে পড়ে আমার নাম।

চুলের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা ঘ্রাণে
আমি হারাই নিজেকে, খুঁজে ফিরি তোমাকেও - তোমার কণ্ঠের উষ্ণতায় 
গলে যায় সময়,
শ্বাসের ওঠানামায় দুলে ওঠে বিশ্বাস।

এইসবের ভেতরেই আমরা দু’জন একটি দীর্ঘ ভালোবাসা হয়ে থাকি।


৪৫.     কোনো বিচ্ছেদ নেই 


আমরা দুজন দু’টি নদীর মতো,
আলাদা নামে জন্মেছিলাম,
শেষে এসে সমুদ্রে একাকার।

এখানে বিদায়ের ভাষা নেই,
শেষ ট্রেনের হুইসেল বাজে না,
চিঠির খামে জমে থাকে না
অশ্রুর নোনাজল।

সব দূরত্ব গলে যায়
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়,
সময় এখানে থেমে থাকে,
ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে
আমাদের বুকে মাথা রেখে।

জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে
একটি দীর্ঘ আলিঙ্গন,
সেইখানেই আমাদের বাস।

তুমি যখন বলো কিছুই নয়,
আমি শুনি সমস্ত মহাবিশ্ব,
তোমার চোখে চোখ রাখলে
ভেঙে পড়ে সব একাকিত্বের দেয়াল।

কোথাও কোনো বিচ্ছেদ নেই,
আছে শুধু মিলনের নীরব উৎসব,
যেখানে আমি আর তুমি
একই আলোয়,একই আনন্দে,
চিরকাল, প্রিয়তমা।


৪৬.    মেঘলোকের ডাক


মেঘলোকে যাবার জন্য আজ কেন এত 
ব্যাকুল হচ্ছে মন
কে আছে সেখানে, কে হাতছানি দেয় 
নীল আকাশের গোপন ঘরে?

শহরের কোলাহল থেমে গেলে
হঠাৎ শুনি বৃষ্টির শব্দে কারো নুপুর,
তুমি কি সেই জন! 

তোমার চুলে মেঘ জমে থাকে,
চোখে আকাশের গভীর জল,
তুমি হাঁটো মানেই বৃষ্টি নামে-
পৃথিবী ধুয়ে যায়, আমিও।

বৃষ্টির মেয়ে,
তোমাকে আমি ভালোবাসি
ভেজা পাতার গন্ধে,
জানালার কাঁচে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে,
মেঘের ছায়ায় লেখা অদৃশ্য চিঠিতে।

যদি একদিন সত্যিই মেঘলোকে যাই,
তোমার হাত ধরেই যাব-
সেখানে আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না,
শুধু বৃষ্টি, আর বৃষ্টির ভেতর অনন্ত 
প্রেমের শব্দহীন গান।


৪৭.     তিনটি গোলাপ 


আমরা তিন বন্ধু,
একই খাতায় স্বপ্ন লিখতাম,
একই ভুলে শাস্তি পেতাম,
একদিন সাহস করে
তিনটি গোলাপ নিয়ে দাঁড়ালাম 
হেড স্যারের মেয়ে অমিয়ার সামনে,
বলেছিলাম ওকে,“একটি রাখবে,
দুটি ফেলে দিবে,
এত ভালোবাসা একা বইবে কী করে?”

অমিয়া কিছু বলেনি, চোখ নামিয়ে 
তিনটি গোলাপই বুকে চেপে ধরেছিল,
সেই মুহূর্তে স্কুলঘণ্টা বেজেছিল,
আমাদের বুকেও এক অচেনা বিদায়ের 
ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে। 

জীবন আমাদের ছড়িয়ে দিয়েছে
ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায়,
মলিন খাতার ভাঁজে, শুকনো গোলাপের পাতায়
কিছু না পাওয়ার মাঝেই কিছু স্মৃতি থাকে,
যা আজীবন আমাদের হয়ে থাকে।

সময় কেটে গেছে, গোলাপ শুকিয়েছে,
বন্ধুত্ব বুড়ো হয়েছে-
অমিয়া হয়নি আমাদের কারোর,
তবু আজও তিনটি গোলাপের ঘ্রাণে
আমরা তিনজন পথে চলছি কালের যাত্রায় 
মহাকালের দিকে।


৪৮.      বৃত্তের ভেতরে 


তোমার গলা শঙ্খের বাঁকে বাঁকে লেখা মন্ত্র,
বুকের বৃত্তে সূর্যাস্ত নামে, দুটি গোলাপী সন্ধ্যা,
লাজে-রঙে রক্তিম, আমি ছুঁই না, তবু দগ্ধ হই।

তোমার নাভি একটি রহস্যময় ঘূর্ণি,
যেখানে সৃষ্টির প্রথম ডাক এখনো প্রতিধ্বনিত।
তার চারপাশে কোমরের বৃত্ত
মৃৎশিল্পীর নিখুঁত হাতের কাজ, একটু ঢেউ খেলালে
আমার সমস্ত সংযম ভেঙে পড়ে।

উরু দুটি পূর্ণিমার ঢাল, মাঝখানে গোপন নিশ্ছিদ্র রাত
সেখানে শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের ভাষা।
পা দুটো পদ্মদণ্ড, যেন দেবী নামবেন ভেবে
পৃথিবী নিজেই প্রস্তুত।

তুমি যখন কাছে আসো,
আমার শরীর আর আমি এক থাকি না,
আমি হয়ে যাই কেবল স্পর্শ,
আর তুমি একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত,
যার ভেতরে ঢুকলে আর কোনো 
শূন্যতা থাকে না।


৪৯.      পৃষ্ঠা উল্টানোর দিন


যেদিন  পৃষ্ঠা উল্টিয়ে উল্টিয়ে প্রথম তোমার 
সৌন্দর্য দেখলাম
শব্দেরা তখন লজ্জায় থমকে গিয়েছিল,
অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে
তোমার নিঃশ্বাস জমে ছিল উষ্ণ শিশির হয়ে।

প্রথম পাতায় ছিল তোমার কপাল,
স্নিগ্ধ আলোয় লেখা এক প্রার্থনা,
দ্বিতীয় পাতায় চোখ, দু’টি দীঘি,
যেখানে ডুবে গেলে ফেরার পথ ভুলে যায় মন।

পাতা যত উল্টাই, তত গভীর হয় রাত,
তোমার চুলের ঘন অন্ধকারে
আমার আঙুল পথ খোঁজে,
সুগন্ধে ভিজে ওঠে সমস্ত নীরবতা।

এক পাতায় তোমার কাঁধ, চাঁদের মতো ঢালু,
আরেক পাতায় গলা, যেখানে আমার নাম
অদৃশ্য কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বারবার।

তারপর আসে সেই পৃষ্ঠা,
যেখানে লজ্জা আর সাহস
একই বাক্যে মিলেমিশে থাকে,
ত্বকের ভাষা তখন আর গোপন থাকে না,
ছোঁয়া নিজেই কবিতা হয়ে ওঠে।

শেষ পৃষ্ঠায় এসে দেখি, কোনো সমাপ্তি নেই,
তুমি এক জীবন্ত পাঠ, যাকে যতবার পড়ি,
ততবারই প্রথমবারের মতো ভালোবাসতে 
ইচ্ছে করে।


৫০.     মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই


মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই
সেই পুরোনো বিকেলের কাছে
যেখানে রোদ শান্ত হয়ে ঝরে পড়তো
তোমার চুলের উপর,
আর বাতাসে ভেসে থাকত
অদ্ভুত এক মায়া।

মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই
সেই পথের ধারে -
যেখানে হেঁটেছিলাম আমরা দুজন
নিঃশব্দ কথোপকথনে,
তোমার চোখে ছিল অচেনা স্বপ্ন
আমার হাতে ছিল অকারণ কাঁপুনি।

মহুয়ার সুবাসে ফিরে যাই
একটা হারিয়ে যাওয়া ঋতুর ভিতর
যেখানে তুমি আছো এখনও
ঝরে পড়া ফুলের মতো কোমল হয়ে,
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি দূরে
স্মৃতির বনে একা পথিক হয়ে।

যখন হঠাৎ কোনো রাতে
বাতাসে ভেসে আসে মহুয়ার গন্ধ
আমি বুঝি,
সময় কখনও পুরোপুরি চলে যায় না,
কিছু বিকেল, কিছু চোখের ভাষা
মহুয়ার সুবাসে আবার ফিরে আসে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন