শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

মায়া নদীর বুকে ( অণু কবিতাগ্রন্থ )


মায়া নদীর বুকে  ( কাব্যগ্রন্থ৷) 

প্রথম প্রকাশ -  জানুয়ারি, ২০২৬ ইং

উৎসর্গ -


১.      মায়া নদীর বুকে 


মায়া নদী তুমি কোথায় বয়ে চলেছ
চাঁদের ছায়া মেখে, নক্ষত্রের ঘুম ভেঙে?
তোমার জলে হাত ডুবালেই
সময় গলে যায়, স্মৃতি হয় তরল আলো।

আমাকে তোমার বুকে নিয়ে ভাসিয়ে নাও,
এই ক্লান্ত তীর থেকে দূরে
যেখানে নামহীন পাখিরা গান শেখে
আর দুঃখেরা জলে ডুবে শ্বাস ভুলে যায়।

তোমার স্রোতে আছে কি মায়ের ডাক,
আছে কি কোনো হারানো মুখের হাসি?
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে দেখি
অন্য এক জন্মের জানালা খুলে যাচ্ছে।

মায়া নদী, তোমার জল কি স্বপ্নের?
নাকি স্বপ্নই তোমার জল হয়ে বয়ে চলে?
আমাকে ভাসাও, কোনো মোহনায় নয়,
ভাসাও সেইখানে
যেখানে পৌঁছলে আর ফিরতে হয় না।


২.     চোখের ভিতর 


দৃষ্টির সীমা থেকে তুমি কতো দূরে,
তবু চোখ বুজলেই কাছে এসে দাঁড়াও
মায়ার আলো জ্বেলে দাও অন্ধকার হৃদয়ে,
নিঃশব্দে ছুঁয়ে যাও আমার সমস্ত না-পাওয়া।

একবার যদি সামনে পেতাম,
রেখে দিতাম চোখের ভিতরে,
যেন পলক পড়লেও হারিয়ে না যাও,
যেন সময় তোমাকে ছুঁতে না পারে।

তুমি নদীর মতো ধরা দাও না,
তবু তৃষ্ণা বাড়াও প্রতিদিন।
তুমি স্বপ্নের মতো ভাঙো না,
তবু জাগরণে আরও গভীর হও।

এই দূরত্বই কি তোমার মায়া?
নাকি আমার ভালোবাসার সীমাহীনতা?
তাই তো চোখের ভেতর রাখার স্বপ্ন দেখি-
যেখানে দৃষ্টি শেষ, সেখানেই তুমি শুরু।



৩.      নীশিথের আলো


নিশীথের আলোয় তুমি অর্ধেক গোপন, 
অর্ধেক প্রকাশ,
রেশমের ছায়া নামে উরুতে,
বক্ষের উপর চাঁদের দ্যুতি এসে
থামে।

কোন্ অন্তরালের খনি থেকে
কোহিনুরের মতো ঝরে পড়ে আলো
শ্বাসে শ্বাসে নড়ে ওঠে পর্দা,
মোগল হেরেম নীরবে কেঁপে ওঠে।

চোখে চোখে আগুনের ভাষা,
নিঃশব্দে জ্বলে ওঠে প্রদীপ,
ঘরের দেয়াল শোনে হৃদস্পন্দন,
শয্যা জানে স্পর্শের প্রতীপ।

শরীরে নামে উষ্ণতার ঢেউ,
নামহীন তৃষ্ণা নেয় আকার,
আমি তুমি দুই ছায়া মিলি,
রাত্রি লেখে আদিরসের বয়ান।


৪.      প্রেম বুভুক্ষুর আগুনে


এক অপ্রস্তুত বিকেলে আমরা হঠাৎ প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে উঠেছিলাম,
সময় তখন নিঃশ্বাস ধরে ছিল।
আমি প্রথমে ছুঁয়ে দেখেছিলাম তোমার হাত, আঙুলের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে গিয়েছিল, তুমি চোখ বন্ধ করে থাকলে,
যেন দৃষ্টি নয়, স্পর্শই ছিল তোমার ভাষা।

আকাশের বিনম্র মেঘ সরে গিয়েছিল ধীরে,
আমি মুহূর্তে বুঝে নিয়েছিলাম
তোমার ভেতরের দীপ্তমান মানব-অস্থি,
দেহের গোপন মানচিত্র,
যেখানে অলকানন্দার সুবাস
বিন্দু বিন্দু ঝরে পড়ছে শিরায়-শিরায়।

আমার শক্ত উদ্বাহু বাহু
ধীরে ধীরে ধাবমান হলো তোমার দিকে,
তুমি নৈঃশব্দ্যে আসমানের ছায়ায় শুয়ে থাকলে,
তোমার শরীরের কোমল কিনারায়
তখন পাড় ভাঙছিল,
উত্তাপের ঢেউ, অনিবার্য আকর্ষণ।

আমার হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে আসে
তোমার আন্তঃসীমানা থেকে বহিঃসীমানায়,
তোমার সকল কক্ষপথ পেরিয়ে
সুনির্মল নাভির তলে সব গোপন প্রান্তরেখায়, যেখানে ভাষা থেমে যায়, 
শুধু নিঃশ্বাস কথা বলে।

আমি অনুভব করি দেহের সকল তপ্ত দাহে,
শীৎকারের অব্যক্ত হ্রেষাধ্বনিতে,
প্রেম বুভুক্ষুর আগুনে জ্বলে
আমাদের সকল শৌর্য, সকল বীর্য,
একসময় পুড়ে খাক হয়ে যায়,
রয়ে যায় শুধু দুই দেহের ছাইয়ের ভেতর
একটি দীর্ঘ, নিঃশব্দ আলিঙ্গন।



৫.        সাদা শাড়ির নিরবতায় নদী



খুব ভালো লাগে তোমাকে
যখন তুমি সাদা শাড়ি পরে
নদীর ধারে ঘুরতে যাও
হাওয়ার সঙ্গে শাড়ির আঁচল কথা বলে,
জলের ঢেউ তোমার পায়ের কাছে এসে
থেমে থেমে নিশ্বাস নেয়।

তোমার চুলে তখন রোদ্দুরের আঙুল,
নদীর ওপারে নীল আকাশ
চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে
মনে হয়, পৃথিবীর সব নীরবতা
আজ তোমার দিকেই ঝুঁকে আছে।

তুমি হাঁটো ধীরে,
ঘাসে ভেজা শিশির পায়ে মাখে,
শিউলি গাছের ছায়া
তোমার কাঁধে এসে আশ্রয় চায়।

নদীতীরে আলো নামে শব্দহীন,
ছায়ারা বসে থাকে ভাঙা সময়ের মতো,
তোমার পায়ের কাছে মাটি
নিজেকে মুছে ফেলে বারবার,
যেন তুমি হাঁটলে
পৃথিবী নতুন করে লেখা যায়।

আমি তখন দৃশ্য নই,
আমি একটি দূরের অনুভব,
জলের ওপরে ভাসতে থাকা
একটি অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি—
তুমি তাকাও না,
তবু আমি ভিজে যাই
তোমার সাদা শাড়ির নীরবতায়।



৬.        তুমি যদি না আসো 



তুমি যদি না আসো, তারপরও ফুল ফুটবে, 
ফুল ঝরে যাবে, কেউ সেই ফুল নেবে না।
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামবে ধীরে- 
টেবিলে বিকেলের চা দিয়ে যাবে, 
চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, তুমি আর আসবে না।

রাতের তারা জ্বলে উঠবে আকাশে, 
চাঁদের আলোয় বন্যা নামবে চরাচর জুড়ে , 
তুমি শুধু আর আসবে না।

তুমি যদি আর না-ই আসো,
তবুও ভোর হবে,
পাখিরা জানালার কাঁচে ঠোকর দেবে,
সূর্য ধীরে ধীরে উঠবে দেয়ালের ফাটল বেয়ে,
কেউ খেয়াল করবে না।

তুমি যদি আর না আসো,ঘড়ির কাঁটা 
ঠিকই চলবে, একটা সময় আরেকটাকে 
ঠেলে সরিয়ে দেবে,
ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে,
তারিখ বদলাবে,শুধু তুমি বদলাবে না।

তুমি যদি আর না-ই আসো, রাত গভীর হবে নিঃশব্দে,
তারা গুনতে গুনতে ঘুম আসবে না,
চাঁদ জানবে সব আলো থাকা সত্ত্বেও কিছু 
অন্ধকার দূর হয় না।

আর আমি,
তুমি না এলেও থাকব, এই না-আসার ভেতরেই
এক অদ্ভুত মায়া হবে তোমার জন্য,
তুমি তা বুঝতে পারবে না।


৭.      তোমার মুখখানি


মৌনতা দিয়েই ঢেকে থাক তোমার মুখখানি, অভিমান নয়, 
বিস্মৃতির মেঘে ঢেকে যাক আকাশটিও,
তারাদের নাম ভুলে যাক রাত,
চাঁদ আর আলো ছড়াতে না শিখুক আজ।

প্রতিরাত বেঘোর ঘুমের মাঝখানে
কোনো স্বপ্ন এসে দরজায় কড়া নাড়ে না,
চোখের পাতায় জমে থাকে কেবল
দিনের ক্লান্ত ধুলো।

শোনা হয় না আর কারোর গল্পকথা,
ঘরের কোণে রাখা ঘড়িটাও
সময়ের হিসেব ভুলে থেমে যায়,
দেয়ালের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়
কিন্তু কোনো প্রশ্ন তোলে না।
আমার বুকের ভেতর জমে ওঠা
অজস্র না-বলা কথা
মৌনতাকেই বেছে নেয় আশ্রয়।

যদি কোনো দিন শব্দেরা ফিরে আসে,
তবে তারা আসুক ধীরে, মৌনতার হাত ধরেই, আলোর মতো নয়, ছায়ার মতো নীরবে।


৮.     ঘুমাও 



কেউ একজন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে, তুমি ঘুমাও।
রাতটি ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার অদৃশ্য দরজা, ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়
সময় ভুলে বসে নিজের নাম।

এটি কোনো সাধারণ রাত নয়, এটি অনন্ত,
যেখানে ভোরের কোনো তাড়া নেই,
পাখির ডাক নেই, জেগে ওঠার কোনো শর্ত নেই।

চোখ বন্ধ করলেই নেমে আসে অন্ধকার,
তার ভেতরে ভাসে অগণিত স্বপ্ন,
কিছু অসম্পূর্ণ চিঠির মতো,
কিছু প্রথম স্পর্শের উষ্ণতার মতো,
কিছু আবার হারিয়ে যাওয়া মুখ,
যাদের নাম তুমি ভুলে গেছ,
কিন্তু মায়া ভুলতে পারোনি।

স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন জন্ম নেয়,
একটি আয়নার সামনে আরেকটি আয়না,
শেষ কোথায় কেউ জানে না।
এখানে দুঃখ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,
আনন্দেরও নেই কোনো চূড়ান্ত সীমা।

কেউ একজন আবার ফিসফিসিয়ে বলে,
ভয় পেয়ো না, জেগে উঠতে হবে না।
এই রাতেই সব প্রশ্ন বিশ্রাম নেয়,
এই স্বপ্নেই সব উত্তর ধীরে ধীরে
অদৃশ্য হয়ে যায়।

তুমি ঘুমাও, কারণ এই অনন্ত রাতে
জেগে থাকা মানে, সব হারানোকে মনে রাখা, আর ঘুমানো মানে-
সবকিছুকে স্বপ্ন হয়ে বাঁচতে।


৯.      নদীর মায়া


বারে বারে নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করে,
সে কেবল জল নয়, সে এক রমণী,
নিজের শরীরকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাকে ডাকে

তার তটরেখা জুড়ে কোমলের বাঁক,
নরম বালুর উষ্ণতায় আমি খুঁজে পাই লুকানো স্পর্শ,
হাওয়ার শিহরণে কাঁপে তার শাড়ির আঁচল,
ঢেউ এসে আলতো করে সরিয়ে দেয়।

রোদে তার গা ঝিলমিল করে,
জলরাশির ভেতর দ্যুতি খেলে যায়,
আমি চোখ নামাতে পারি না,
লজ্জা আর লোভ একসাথে জেগে ওঠে।

নদী জানে, আমি তাকিয়ে থাকি,
নিঃশব্দে, অপরাধী প্রেমিকের মতো,
সে তখন আরো উন্মুক্ত হয়,
ঢেউ ভেঙে ভেঙে কাছে আসে,
আমাকে ছুঁয়ে যায় হাঁটুর নিচে,
তারপর হেসে সরে যায় আবার।

এই জন্যই বারে বারে নদীর কাছে যাই,
সে আমাকে কিছু দেয় না, তবু সব নিয়ে নেয়, আমি ফিরে আসি খালি হাতে,
কিন্তু শরীরজুড়ে লেগে থাকে
তার জল, তার গন্ধ, তার মায়া।


১০.     ঝাউবনের আঁধার 


কক্সবাজারের বালুকাবেলায় ঝাউবনের ছায়া গাঢ় হয়ে এলে
সন্ধ্যার কাঁধে নেমে এসেছিল আঁধার -
নাজনীনের কণ্ঠে তখন মৃদু ফিসফাস,
'আরও আঁধার হোক,
আলো যেন আমাদের খুঁজে না পায়।'

সাগরের দিক থেকে আসে লবণাক্ত হাওয়া,
ঢেউয়ের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসে
আমাদের হাত দুটি জড়িয়ে থাকে,
ভালোবাসা তখন কোনো নাম চায় না,
শুধু একাকার হয়ে থাকতে চায়।

ঝাউপাতার ফাঁক দিয়ে
চাঁদও যেন চোখ সরিয়ে নিয়েছিল,
পৃথিবী ভুলে গিয়েছিল আমাদের ঠিকানা,
সে বলেছিল- ভয় নেই,
আমি বলেছিলাম- থাকুক এই মুহূর্ত, অনন্তকাল।

যদি হঠাৎ সাগর জেগে ওঠে, যদি ঢেউ অস্থির হয়ে নামে তটে,
আমরা তবু দাঁড়িয়ে থাকব, ভালোবাসার গভীর জলে একসাথে ভেসে, একসাথে ডুবে, একই স্বপ্নের নীলে।



১১.     ছায়ার ভেতর আলো



আমরা দু’জন আইনত নয়, লোকচক্ষুর নয়, দিনের আলোয় যার নাম নেই,
রাতের নিঃশ্বাসে সে-ই ভুল ঠিকানা। 

তোমার হাত ধরলে কাঁপে না শুধু হাত,
কাঁপে সংসারের দেয়াল,
কাঁপে শপথ, কাঁপে দায়িত্বের ভারী দরজা,
তবু এই স্পর্শে
জীবন প্রথমবারের মতো জীবিত।

আমরা জানি, এই প্রেমের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কোনো বৈধ সকাল নেই,
আছে শুধু চুরি করা সন্ধ্যা আর দীর্ঘশ্বাসে ভেজা বিদায়।

তুমি ফিরবে তোমার নামে,
আমি ফিরব আমার দায়িত্বে,
মাঝখানে পড়ে থাকবে কিছু চুম্বন,
কিছু না-বলা কথা আর একরাশ অপরাধবোধ।

তবু কেন জানি এই নিষিদ্ধ আগুনে হাত পুড়িয়েও মন বলে ওঠে-
সব প্রেম যদি পবিত্র হতো,
তবে এই ব্যথাটুকু এত গভীর করে ভালোবাসতে শিখাত না।


১২.     অপূর্ণ পূজার গান


একে একে চলে গেল কত বসন্তদিন,
পাতাঝরা ক্যালেন্ডারে জমে থাকে নামহীন ঋতু,
সুখ–দুঃখের হিসেব কষলে
দুঃখের দিকেই কাঁটা বেশি ঝুঁকে,
তবুও সাধ হয়,
এই আকাশের ছায়া, এই পৃথিবীর ধুলো মেখে আরও একটু থেকে যেতে।

কত কথা বলা হলো না-
কত হাত বাড়িয়েও ছুঁতে পারিনি আপনজন,
পাওয়ার তালিকায় ফাঁক,
দেবার খাতায় অসমাপ্ত লাইন,
আজ প্রাণের ভেতর সেই অপূর্ণতার ঢেউ বড় বেশি বাজে।

তবু জানি- হারিয়ে যায়নি সব,
যা দিতে পারিনি, তার ইচ্ছেটুকু বেঁচে আছে,
যা পাইনি, তার স্বপ্ন আজও আলো জ্বালে।

এই বুকের ভেতর ভাসে স্বীকারোক্তি,
‘জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।’
এই জানা-নাজানার মাঝেই হেঁটে যাই প্রতিদিন- অপূর্ণতার কাঁটা বুকে নিয়ে পূর্ণতার দিকে।


১৩.      বদলে যাই


কোনো কোনো দিন 
নিজেকে নদী মনে হয়, মনে হয় আমার জলে তোমাকে ভাসিয়ে দিই,
ভেসে যাক ক্লান্তি,
তোমার কপালে লেগে থাকুক আমার ঢেউয়ের চুম্বন।

কোনো কোনো দিন
নিজেকে আগ্নেয়গিরি মনে হয়, 
মনে হয় তপ্ত আগুনে তোমাকে পুড়িয়ে দিই, পুড়ে যাক ভয়, 
ছাই হয়ে যাক দূরত্ব, তাপের মধ্যেই 
জন্ম নিক, আরও গভীর 
কাছাকাছি আসা।

কোনো কোনো দিন
আমি আকাশ হয়ে তোমাকে ঢেকে রাখি মেঘে মেঘে, তুমি বৃষ্টি হয়ে নামো,
আমার বুক ভিজিয়ে দাও নিঃশব্দে।

কোনো কোনো দিন আমি রাত হই,
তুমি হও নক্ষত্র -
আমার অন্ধকারে তোমার আলোয় পথ খুঁজি।

হঠাৎ কোনোদিন গীতি কবিতা হয়ে যাই, মনে হয়- তুমি আমার সঞ্চারী
গানে গানে তোমার নাম জপি, তোমার নামটাই শুধু বলে যাই।

আসলে আমি প্রতিদিনই বদলে যাই, 
কখনো নদী, আগুন, আকাশ, রাত, গান -
যে রূপেই আসি না কেন,
শেষ পর্যন্ত আমি শুধু তোমার কাছেই
ফিরে আসতে চাই।


১৪.      নিঃশব্দ উপমা 


তুমি সন্ধ্যার কুসুমগন্ধ, কখনো পথের ধুলো,
কখনো বসন্তের ঝরা পাতা,
জীর্ণ হয়ে বসন্ত বাতাসেই উড়ে হারিয়ে যাও।

তুমি ভোরের শিশিরবিন্দু,
রোদের প্রথম ছোঁয়ায় অদৃশ্য,
তুমি নদীর বাঁক, ঢেউয়ে ভেঙে যায় 
নামহীন তটে।

তুমি জানালার ধারে ফেলে রাখা চিঠি,
যা পড়া হয়নি কখনো,
তুমি দীপশিখার কাঁপা আলো,
অল্প হাওয়াতেই নিভে যাওয়ার ভয়।

তুমি রাতের শেষ তারাটি,
ভোর নামলেই যে হারিয়ে যায় আকাশের গভীরে।
তুমি কাছে থেকেও দূর,
ধরা দিয়েও অধরা,
এই জীবনের সব অসম্পূর্ণতার ভেতর
তুমি আমার নিঃশব্দ উপমা।


১৫.      বাল্যকালের রাজ্য


কত কিছু ছিল বাল্যকালে, খেলার ঘরের মাটির চুলায় চড়ত মিছেই ভাত,
খেলার বউয়ের চোখে লাজ,
কাগজের ফুলে সাজত বাসররাত।

লাল ওড়নায় ঢেকে রাখা হাসির সংসার,
কাঠির পুতুলই ছিল সন্তান,
নাম দেওয়া হতো দুপুরের রোদে বসে,
কেউ রাজকন্যা, কেউবা যোদ্ধা।

ছেঁড়া চাদরেই রাজসিংহাসন,
ভাঙা বেঞ্চই সিংহদরবার,
আমরাই রাজা, আমরাই প্রজা,
আইন ছিল না,ছিল কেবল স্বপ্নের অধিকার।

এক মুহূর্তে বিয়ে, পরমুহূর্তে বিচ্ছেদ,
আবার সন্ধ্যায় মিলন,
কান্নাও ছিল অভিনয়, হাসিটাই ছিল আসল জীবন।

সেই বাল্যকালে সবকিছু ছিল, হারানোর ভয় ছিল না, কারণ জানতাম,
খেলা শেষ হলেই মা ডাকবে নাম ধরে,
আর সব দুঃখ মুঠোয় ভরে ঘরে ফেরা যাবে।

আজ বড় হয়ে বুঝি, সেই খেলাগুলোই ছিল
আমাদের সবচেয়ে সত্যি জীবন,
যেখানে ভালোবাসা শেখা হয়েছিল
কোনো শর্ত ছাড়াই।



১৬.      অরণ্যের মানচিত্র



কে বলবে এখানে একদিন অরণ্য ছিল,
পাখিরা ভোরে ডাক দিত পাতার ঘুম ভেঙে,
আজ কংক্রিটের দেয়ালে দেয়ালে
শুধু প্রতিধ্বনি, শুধু যন্ত্রের নিঃশ্বাস।

কে বলবে এখানে একদিন নদী ছিল,
জল বয়ে যেত নীল স্বপ্নের মতো,
আজ সেই পথে হাঁটে ধুলো,
বালুর চরে পড়ে থাকে শুকনো ঢেউয়ের স্মৃতি।

বৃক্ষরাজি কেটে আমরা বানিয়েছি নগর,
ছায়া কেটে বানিয়েছি আলো, পাতার সবুজ মুছে চিহ্ন এঁকেছি মানচিত্রে
এইখানে মানুষ থাকে।

রাত নামলে শহর ঘুমোয়,
কিন্তু মাটির গভীরে জেগে থাকে
একটি বন, একটি নদী, যাদের নাম আর কেউ ডাকে না।

তবু বাতাস হঠাৎ কাঁপে, কোনো পুরোনো পাতার শব্দে,
বালুর বুক ফুঁড়ে উঠে আসে জলের আকুলতা।
প্রকৃতি ভুলে যায় না কিছুই, আমরাই শুধু ভুলে যাই,
এই শহরের নীচে চাপা পড়ে আছে
একটি অরণ্য, একটি নদীর কান্না।


১৭.      আলো আঁধারে তুমি 


তুমি শান্ত সকালের প্রথম রোদ
আমি চোখ বন্ধ করে গায়ে মেখে নিই তোমার উষ্ণতা,
যেন দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি ধুয়ে যায় আলোয় আলোয়।

তুমি আমার শ্রান্ত দুপুর,
টুপটুপ করে ঝরে পড়ে হলুদ পাতা,
সময় তখন নিঃশব্দে হাঁটে,
ঘাম আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে।

তুমি বিকেলের শীর্ণা নদী,
কূলে বসে আমি শুনি তোমার জলের গান,
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে লেখা থাকে
অবাক্ত কথার নীল চিঠি।

তুমি সন্ধ্যাতারা,
একাকী আকাশে জ্বলে থাকো অবিচল,
ইশারায় ডেকে বলো,
আমাকেও একদিন তারা হয়ে উঠতে।

তুমি রাতের অন্ধকার, 
যেখানে হারিয়ে গেলে আমি সারারাত তোমাকেই খুঁজি,
নীরবতার গভীরে জ্বালাই নামহীন প্রদীপ।

তুমি সময়, তুমি ঋতু,
তুমি আলো-ছায়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি অবিনাশী অনুভব,
যাকে হারালেই আমার সমস্ত কবিতা
হঠাৎ করে আরও দুঃখী হয়ে ওঠে।


১৮.     তুমি পাশে থাকলে 


তুমি যখন পাশে থাকো
ঘরের কোণে জমে থাকা ছায়াগুলোর
উপর হঠাৎ আলো এসে পড়ে,
নিঃসঙ্গতা তখন দৌড়ে পালায়
অচেনা কোনো দেশের দিকে।

বিষাদের নামে যে কবর খুঁড়েছিল মন,
সেখানে জন্মায় বুনোফুল,
একাকীত্ব মাথা নত করে
মাটির ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ে।

দুঃখগুলো চুপিচুপি বিদায় নেয়,
শেষবারের মতো ফিরে তাকায়
আর সুখ,
শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে
তোমার উপস্থিতির উষ্ণতায়।

তুমি পাশে থাকলে সময় থেমে যায় 
মায়ায়, আর আমি বিশ্বাস করি, 
এই পৃথিবী এখনো
ভালোবাসার জন্যই বেঁচে আছে।


১৯.     আলোর নিচে অদৃশ্য


আনন্দ সিনেমা হলের সামনে
মেয়েটি এসে দাঁড়ায়,
আলো ঝরে পড়ে তার শরীরে,
কিন্তু আলো পৌঁছায় না
ভেতরের গভীরতম অন্ধকারে।

সে সাজে, যেন সাজ নয়, একখণ্ড 
মুখোশ- যা পরে নিলে
কান্না চিনে ফেলা যায় না।

রাত তার কাছে সময় নয়,
রাত মানে দরকষাকষি,
কয়েকটি নোটের বিনিময়ে
স্বপ্নগুলো নীরবে হস্তান্তর।

তার শরীরের উপর দিয়ে
হেঁটে যায় অচেনা ছায়ারা,
কিন্তু আত্মাটা বসে থাকে
এক কোণে, চোখ বুঁজে।

ভোর আসে ধীরে,
যেন অপরাধবোধে ভেজা আলো,
মেকআপ গলে পড়ে
অবশ মুখের কিনারায়।

হাতে চালডাল, কাঁধে অদৃশ্য ঋণ
সে বাড়ি ফেরে,
নিজেকে রেখে আসে কোথাও।

আনন্দ সিনেমা হলের সামনে
হাসির পোস্টার কাঁপে বাতাসে,
আর তার জীবন, একটি করুণ দৃশ্য-
যার জন্য কোনো টিকিট 
কাটা হয় না।


২০.      সেই কবে একদিন 


সেই কবে একদিন আমার এলোমেলো জীবনে বুড়িগঙ্গার পাড়ে সন্ধ্যা নেমেছিল,
এক আলস্য দিনে বৃষ্টি নেমেছিল ঢের,
সেই কবে কোনদিন এক উন্মূল তরুণী আমার জন্য উন্মুখ হয়েছিল।

ভাঙা ঘড়ির কাঁটায় সময় থেমে গিয়েছিল,
চায়ের কাপে জমে ছিল দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়া,
ফুটপাতের আলোয় ছায়ারা প্রেম শিখেছিল,
সেই কবে শব্দহীন গানে কান পেতে ছিল নিঃসঙ্গতা।

ভিড়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে পাইনি কাউকেই ,
অচেনা কোনো শহর আমার নাম জানত,
সেই কবে পকেটে ছিল না কিছু, 
তবু স্বপ্ন ছিল অঢেল।

রাতের শেষে ভোরকে ডেকেছিলাম 
প্রাণ ভরে , সেই কবে একদিন জীবনটা এমনই বিপন্ন ছিল -
মধুময় স্মৃতিরা ঝরনা ধারার মতো বুকের ভেতর চুপচাপ বয়ে যেত স্মৃতি থেকে স্মৃতির দিকে।


২১.     ভাঙচুর করিনি 


তুমি চলে যাবার পর নিজেকে ভাঙচুর করিনি,
নষ্ট হতে দিইনি যকৃত, হৃদযন্ত্র, কণ্ঠনালি,
আমার প্রতিক্ষণ মনে হয়, এই হৃদয়ের ভিতর তুমি একদিন ছিলে।

তোমার শূন্যতায় আমি আগুন জ্বালাইনি,
চুপচাপ শিখেছি নিঃশ্বাসের শুদ্ধ ব্যাকরণ,
রাত নামলে বুকের ভেতর হাহাকার হয়,
একটি স্থির নীরবতায় শুয়ে থাকে
তোমার প্রতিচ্ছায়া এবং তোমার অস্তিত্ব। 

আমি ভেঙে পড়িনি আয়নার সামনে,
চুল এলোমেলো করে কাঁদিনি দিনভর,
বরং ক্ষতগুলোর উপর সময় দিয়ে 
পরিচর্যা করেছি।

কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে, জলের দাগের 
মতো দেয়ালে,
মুছতে গেলেই আরও স্পষ্ট হয়,
তবু ঘর ভেঙে ফেলিনি।

আজও বাঁচি, স্বাভাবিক মানুষের মতো,
হাসি, কাজ করি, পথ পার হই-
তবু গভীর রাতে,
হৃদয়ের এক কোণে আলো জ্বলে ওঠে-
সেখানে তুমি ছিলে,
এবং আশ্চর্যভাবে এখনো আছো।


২২.     তুমি ফিরে এসো

তুমি ফিরে এসো, তুমি প্রাণে এসো
এই শূন্য ঘরে বাতাস থেমে আছে -
তুমি এলে জানালা খুলে যাবে 
ক্লান্ত দুপুর মাথা রাখবে তোমার কাঁধে।

তুমি ফিরে এসো ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগাতে,
অভিমানের নীল দাগ ধুয়ে দিতে বৃষ্টিতে,
যে হৃদয় মরুভূমি হয়ে ছিল এতকাল,
সেখানে আবার নদী নামুক তোমার নামে।

তুমি প্রাণে এসো, শুধু পাশে নয়,
রক্তের ভেতর, বিশ্বাসের ভেতর,
যেন হারিয়ে গেলে আবারও খুঁজে পাই
নিজেকেই তোমার স্পর্শে, তোমার আলোয়।

তুমি ফিরে এসো, অচেনা কোনো বাতাসে,
ঠিক নাম ধরে নয়, ধীরে ধীরে হেঁটে এসে
সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বেলো নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে।


২৩.    প্রেম মৃত্যুঞ্জয়ী


মৃত্যু এসেছিল নিঃশব্দ পায়ে,
সব আলো নিভিয়ে দিয়ে
কিন্তু তোমার নামটুকু
অন্ধকারের বুকেও জ্বলে উঠল।

যে ঠোঁট আর কথা বলে না,
সেই নীরবতায় আজও
তোমার হাসির শব্দ লেগে থাকে
এক অনন্ত প্রতিধ্বনি।

দেহ মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে,
স্বপ্নগুলো ছাই হয়ে যায়,
তবু ভালোবাসা মরতে জানে না
সে কবর ভেঙে উঠে আসে।

যেখানে শেষ বলেই কিছু নেই,
সেখানেই তুমি আছো
মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে।

সব শেষের পরে একটাই সত্য
নিঃশ্বাসের মতো বেঁচে থাকে,
প্রেম বেঁচে রইল মৃত্যুতে।


২৪.      জন্মদিনে


আজ জন্মদিনে দাঁড়িয়ে বুঝি, অপূর্ণতাগুলিই আমার সবচেয়ে আপন স্মৃতি।
যা পাইনি, তা আজ আর শূন্য লাগে না;
সে-সব না-পাওয়া মিলেই তো আমাকে বানিয়েছে,
নীরব, ধৈর্যশীল, ভেতরে ভেতরে আলো জমিয়ে রাখা এক মানুষ।

যে কাজগুলো সম্পূর্ণ হল না,
তারা সময়ের কোণে কোণে ধূপের গন্ধ হয়ে রইল,
মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে-
বিকেলের রোদে, পুরোনো গান শুনতে শুনতে,
বা কোনো এক নির্জন রাতে নিজের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে।

আজকের দিনে তাই কোনো হিসেব নেই, কোনো অভিযোগও নেই,
শুধু কৃতজ্ঞতা,
এই অসমাপ্ত জীবনকে এতখানি অনুভব করার সুযোগ দেওয়ার জন্য।

আজ আর কিছু চাইবার নেই,
চাওয়াগুলো অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
হাত বাড়ালে ধরা পড়ে কেবল বাতাস,
আর বুকের ভেতর জমে থাকে
নামহীন কিছু শূন্যতা,
যাদের কোনো ভাষা নেই, কোনো দাবি নেই। এই অস্ত বেলায় এসে মনে হচ্ছে, একটু আফসোস তবু রয়ে গেল --

'জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা...।'

তারিখ - ১৮/১/২০২৬ ইং
ঢাকা।। 


২৫.       তুমি আছ বিষণ্নতায়



তুমি আছ বিষণ্নতায়,
ঠিক যেমন থাকে সন্ধ্যার শেষ আলো,
দিন ফুরোনোর পরও
আকাশ ছেড়ে যেতে পারে না।

তুমি আছ বিষণ্নতায়,
নির্জন জানালার পাশে বসে থাকা
এক কাপ ঠান্ডা চায়ের মতো
যাকে কেউ আর ছুঁতে চায় না,
তবু সে নিজের উষ্ণতা ভুলে যায়নি।

আমার দুঃখগুলো যখন
কথা বলতে পারে না,
তখন তোমার উপস্থিতি
একটা অদৃশ্য হাত হয়ে
ভেতরের ভাঙা শব্দগুলো জোড়া লাগায়।

তুমি আছ বিষণ্নতায়,
কান্না নও, আবার হাসিও নও,
শুধু বুকের গভীরে জমে থাকা
একটা দীর্ঘশ্বাস,
যার মানে বোঝে কেবল রাত।

আমি জানি,
সব আলোই উৎসবের জন্য নয়,
কিছু আলো থাকে
অন্ধকারের পাশে বসে থাকার জন্য।

আর সেই আলোর মতোই
তুমি আছ বিষণ্নতায়, নিঃশব্দ, গভীর,
অপরিহার্য।


২৬.      দুঃখ নিতে এসেছি 


দুঃখ নেবার জন্য তোমার কাছে এসেছি
সুখ তো বহুদিন নিজেই আমার কাছে আসে না,
হৃদয়ের ভাঙা ঘরে জমে থাকা নীরবতা
আজ তোমার চোখে রেখে হালকা হতে চাই।

আমি চাইনি সান্ত্বনার ভাষা,
চাইনি আশ্বাসের কৃত্রিম আলো
শুধু চাই, তুমি চুপ করে বসে থাকো,
যেন আমার দুঃখগুলো কথা বলার সাহস পায়।

এই বুকভরা দীর্ঘশ্বাস,
এই ক্লান্ত সন্ধ্যাগুলো
সব তোমার হাতে তুলে দিয়ে বলি,
একটু ধরে রাখো, ভেঙে পড়ছি আমি।

দুঃখ নেবার জন্য তোমার কাছে এসেছি,
ফেরার পথে যদি হালকা হয়ে যাই,
তবে জেনো, তুমি কিছু না বলেও
আমাকে বাঁচিয়ে দিলে।


২৭.       গভীর নিঃশ্বাসে


বাড়ির বাইরের আঙিনায় আমি দাঁড়িয়ে,
রাত গভীর, ঘুম আসে না চোখে,
ঘুমের ভেতরেও তোমার অনুপস্থিতি জেগে আছে বলে বাইরে এসেছি।

নিস্তব্ধতা আজ গান গাইছে,
শব্দহীন, অথচ ভারী,
তার সুরে সুরে হাঁটে আমার একাকীত্ব।

তারাভরা আকাশ মাথার ওপর,
কিন্তু প্রতিটি তারার আজ নির্বাক প্রশ্ন
তুমিও কি আমাকে খুঁজছ কোথাও?
আমি তাকাই অন্ধকারে,
তোমাকে খুঁজি বাতাসের দোলায়,
পাতার কাঁপুনিতে, রাত্রির দীর্ঘশ্বাসে।

কিন্তু তুমি নেই, না ঘুমে, না জাগরণে,
না নিস্তব্ধতার গভীরে,
না আকাশের ঝলমলে নীল রহস্যে।

তবু কী আশ্চর্য,
এই না-থাকাই যেন তোমার উপস্থিতি,
আমার চোখের ক্লান্তিতে,
বুকের গভীর নিঃশ্বাসে,
এই নিরুপায় ভালোবাসায়।



২৮.      তোমাকে দেবো



তোমাকে একটি সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছ দেবো,
তুমি সেটি লাগাবে তোমার ঘরের কোণে, জানালার পাশে,
বিকেলের আলোয় তার সুবাস ভেসে আসবে।

তোমাকে রবি ঠাকুরের গীতবিতান উপহার দেবো, তুমি গান শিখবে,
গাইবে- এসো এসো আমার ঘরে এসো,
আর আমার নিঃশব্দের গানহীন দিনগুলো
হঠাৎ করে উৎসব হয়ে উঠবে।

তোমাকে একটি পাতার বাঁশি দেবো, নিশুতি রাতে কিংবা অলস দুপুরে
তুমি বাজাবে;
বাঁশির সুরে ঘুম ভাঙবে পাখিদের,
আমার হৃদয়ে নামবে নীরবতা।

তোমাকে নদীর কূলে একটি বাড়ি 
বানিয়ে দেবো,
ভরা বর্ষায় শুনবে স্রোতের ধ্বনি,
জলের ভাষায় লেখা থাকবে
আমাদের না-বলা কথাগুলো।

তোমাকে দেবো একটি কাঠের দোলনা,
বকুলগাছের ছায়ায় ঝুলবে,
দোল খেতে খেতে তুমি হাসবে,
আর সময় থমকে দাঁড়াবে
তোমার একফোঁটা হাসির কাছে।

তোমাকে দেবো একটি মাটির প্রদীপ,
ঝড়ের রাতে জ্বালাবে তুমি,
আলোয় আলোয় ভরে উঠবে ঘর,
অন্ধকার শিখবে হেরে যেতে।

তোমাকে দেবো একটি নীল আকাশ,
ছেঁড়া মেঘ থাকবে, দু-একটা তারা,
রাত জেগে তুমি গুনবে তারা,
আর আমি গুনবো তোমার নিঃশ্বাস।

তোমাকে দেবো আমার জীবন,
কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো দাবি ছাড়া,
তুমি যদি চাও থাকবে-
না চাইলে, এই দেওয়াটুকুই আমার 
গ্লানি হয়ে থাকবে।


২৯.       আলোর দিকে 


আমি যে ক্লান্ত আত্মা রূপের কাছে নয়,
রূপের ভেতর লুকোনো মমতার কাছে আশ্রয় চাই,
আমার অন্তর জুড়ে বিস্তৃত খরাতাপ,
তবু সে তাপ নিভুক অন্যের হাসির জলে,
অন্যের শান্ত সুখে।

আমি যে শান্তির নাম জানি, কিন্তু তার ঠিকানা 
ভুলে গেছি,
কোন্ দিগন্তে সে দাঁড়িয়ে,
কোন্ আকাশের নিচে তার নিঃশব্দ আলো নামে?

অন্ধকারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আমি তোমার কণ্ঠ খুঁজি,
যদি একটি শব্দ দাও, আমি পথ চিনে নেব,
বলো-  কোন পথে প্রাণ জেগে ওঠে?
কোন স্রোতে মানুষ মানুষের হাত ধরে হাঁটে?

যেখানে জীবন আর একা নয়,
স্বপ্ন সেখানে লজ্জা পায় না,
আর আগামী দিন ভয় নয়, বিশ্বাসের মিছিল 
হয়ে হৃদয়ের দিকে এগিয়ে আসে।



৩০.      এত ভালোবাসি 



কেমন করে যে তোমাকে এত ভালোবাসি
তা ভাষায় বলতে পারি না,
শুধু বুকের ভেতর এক গোপন ঘর জানে
যেখানে আলো ঢোকে না, বাতাসও নয়
সেখানে আমি তোমাকে লুকিয়ে রাখি
গোপন প্রার্থনার মতো।

তুমি একদিন ভেসে যাবে নদীর মতো,
নিজস্ব জলস্রোতে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব তীরে,
আমাদের চার চোখ মিলিয়ে
কতো কথা জন্ম নিয়েছিল
কতো স্বপ্ন, রাত্রি জাগা কতো আঁধার
আর ভোরের  প্রতিশ্রুতি।

সব কথা, সব স্বপ্ন
কি তবে এমনই হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে
একটি বিদায়ের উচ্চারণে?

তুমি চলে গেলেই কি ভালোবাসার মৃত্যু হবে? আমি জানি না মৃত্যু কী, 
জানি না বিচ্ছেদ কাকে বলে, 
আমি শুধু জানি, তুমি ছিলে বলেই আমার অন্তর্ আলোময়।

আমি তোমাকে কুড়িয়ে এনেছিলাম
আমারই দুঃখ-বেদনার উঠান থেকে,
এক মর্মরিত জীবনের কোণায় পড়ে থাকা
বস্তুবৃক্ষের ঝরা ফুলের মতো,
তবু সেই ঝরা ফুলেই আমার সমস্ত বসন্ত
নিঃশব্দে ফুটে উঠেছিল।

ভালোবাসা হারায় না, সে থেকে যায়, 
বুকের গভীরতায়, কোনো এক অদৃশ্য নদীর তলায় চিরদিনের মতো।


৩১.         যে জীবন চলে গেছে



জীবনের পথে পথে হারিয়েছি কত মুখ, 
কত নাম, কত অচেনা হয়ে যাওয়া 
আপন মানুষ।
তাদের অনেকেই আজ নেই 
নেই সন্ধ্যার চায়ের সময়ে... 

আহা! যদি আবার দেখা পেতাম
কোনো শীষ-ডাকা দোয়েলের ভোরে,
কুয়াশা মাখা মাঠের প্রান্তে,
যেখানে আলো  নামে ধীরে ধীরে,
অথবা আমলকী ঝাড়ের পাশে,
সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে
তাদের চোখে পড়ত স্নিগ্ধ হাসির রোদ।

কিংবা ছলাৎ ছলাৎ জলছবির নদীর কূলে,
বসে আছে কেউ
কথা নেই, তবু কত কথা জমে আছে
জলের ঢেউয়ের মতো বুকের ভিতর।

আমি কাছে গিয়ে কিছু বলতাম না,
শুধু বসে থাকতাম
সময়কে একটু থামিয়ে রাখার জন্য।

যে জীবন চলে গেছে,
সে জীবনের মানুষগুলো ফিরে আসে না,
তবু স্মৃতির ভেতর তারা হাঁটে,
ভোরের পাখির ডাকে, জীর্ণ পাতার মর্মরে
শীর্ণ নদীর দীর্ঘশ্বাসে।

এইভাবেই তারা বেঁচে থাকে, 
আমার পাওয়া  না-পাওয়ার  জীবন্ত
প্রার্থনা হয়ে।



৩২.      শীত ও আগুন 



গ্রীষ্মের গভীর রাতে একদিন 
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল,
চারপাশে তখন নিস্তব্ধতার ঘন ছায়া,
হিমেল কোনো পাহাড়ি রাজ্যে যেন,
আমার শরীর শীতে  কাঁপছে।

এত শীত যে, আমি স্ত্রীকে কম্পিত 
কণ্ঠে বললাম,“আমাকে জড়িয়ে ধরো,
দুই–তিনটা লেপ এনে দাও,
আমি খুব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি।”

তুমি কাঠের তোরঙ্গ খুলে লেপ নামালে দ্রুত,
আমাকে জড়িয়ে ধরলে আগুনের উষ্ণতায়
কপালে তোমার হাত- না, জ্বর নেই।
পায়ের তালু ছুঁয়ে দেখলে, হিম শীতল।
হাতের করতল পরখ করলে
তাও বরফের মতো হিম,
তোমার চোখে তখন এক অজানা ভয়,
নীরব প্রার্থনায় তুমি। 

আমি শুয়ে ভাবছিলাম, এই কি তবে
মৃত্যুর দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা?
মৃত্যু কি এমনই হয়, নিঃশব্দ, শীতল,
শরীরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে
উষ্ণতা চুরি করে নেয়?

তুমি আমাকে জড়িয়ে রাখলে
আরও শক্ত করে কিছুক্ষণ, আমি বেঁচে রইলাম
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়।

সেই রাতে বুঝেছিলাম, মৃত্যু যদি শীতের হয়,
তবে কারোর  ভালোবাসা একটি চিরন্তন 
আগুন।


৩৩.      আমরা



আমরা এমনই করে কাছে আসি,
অচেনা বিকেলের মায়াবী আলোয়
একটু চুপচাপ একটু দ্বিধায়,
তবু হৃদয় জুড়ে যায় আকুল মমতায়।

আমরা এমনই করে ভালোবাসি,
বেশি কথা নয়, গভীর নীরবতায়
চোখের ভেতর কথা লুকিয়ে রেখে
ভরসা বুনি নিঃশব্দ সময়ের গাঁথায়।

আমরা এমনই করে হাত ধরি,
ভিড়ের মাঝে থাকে হারাবার ভয় 
কোনো অঙ্গীকারের কথা ছাড়াই
থাকি পাশে, থাকে থাকার দায়। 

আমরা এমনই করে বেঁচে থাকি
অল্প চাওয়ায়, দীর্ঘ অপেক্ষায়
ভালোবাসা যে ঢেউ নয়, নদী-
জানে সে, কেমন আপন হয়ে যায়।



৩৪.     অধরা রোদ্দুর



অজান্তে কোন ভোরের গন্ধে মনটা 
আজ আবার কেঁপে ওঠে,
হাওয়ায় ভেসে আসে অচেনা 
এক নাম—তোমারই।

দিগন্ত জুড়ে ধানের গন্ধ,সবুজ মাঠে 
ঝিলমিল আলো,
তবু বুকের গভীর কোথাও অকারণ 
এক আগুন জ্বালো।

চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত 
কোনো নদীর জল,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অভিমান 
ভরা নীরব ছল।

তুমি তো নেই তবু প্রতিটি শ্বাসে 
তোমার ছায়া পড়ে,
জীবনের প্রতিটি বাঁকে তোমার 
মুখই কথা বলে।

এ কোন প্রেম, যা পেতে নেই তবু হৃদয় 
ছাড়ে না তারে,
যে ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখে মৃত্যুর 
ভেতরেও সংসারে।

যদি আবার কোনো জন্মে এই মন 
খুঁজে পায় তোমায়,
তবে আর কাঁদবে না চোখ, ভালোবেসে 
ভরবে হৃদয়খানায়।



৩৫.        ঝাউপাতার খাতা



ক্লাসরুমের জানালায় এখনো কতো নাম
চকডাস্টে মুছে যায়
তবু আমার চোখে থেকে যায়
পুরোনো রোল নম্বরের মতো,
সেই দুপুরগুলো এখনো জানালার কাঁচে
জমে থাকে রোদ আর চকমাখা ধুলো। 

আমার স্কুল সহপাঠী ঝর্ণা
আমার প্রেমিকা হতে চেয়েছিল,
বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে রাখা
ভাঙা কলম আর ভাঁজ-করা স্বপ্ন,
খাতার শেষ পাতায় আঁকা হৃদয়ের পাশে
ঝর্ণার নামটা আজও ঝাপসা নয়।

মাজেদা, শিউলি, দোলা
আমাদের বেঞ্চের চার কোণে বসে
স্বপ্ন আঁকত অংক খাতার পাতায় পাতায় 
কে কার দিকে তাকায়
সেই নিয়ে কত চাপা হাসি, কত লুকোনো কাঁপুনি!

কেউই শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিরিতে বসতে 
পারেনি প্রিয় মানুষের সাথে-
ভেঙে গেছে শৈশবের কাঁচের ঘর।

দোলা একাত্তরের আগুনে পোড়া নাম,
ধর্ষিত শরীর নিয়ে
শিলিগুড়ির অচেনা রাস্তায় মিলিয়ে গেছে,
ওর চোখে আমি দেখেছিলাম
ইছামতীর নদীর মতো দীর্ঘ কান্না-
এখন হয়ত জলপাইগুড়ির তিস্তা নদীতে 
কান্না ঝরায়।

শিউলি বিয়ে করেছে এক স্কুল শিক্ষককে,
সাদা শাড়ির নিচে ঢেকে রেখেছে
সব না-বলা বসন্ত।

মাজেদা আটলান্টিকের ওপারে
ওর চিঠিতে এখন শুধু
সমুদ্রের লবণ আর দূরত্বের গন্ধ।

আর ঝর্ণা,
সে বিয়ে করল এক মাতালকে,
শুনেছি, ও এখন বদ্ধ পাগল,
চুল ধুলোর মতো জমে হয়েছে জট
পুরোনো সেই কালোকেশ আর নেই। 

ঝর্ণা একবার আমার কাছে থেকে
নোটখাতা নিয়েছিল
ফেরত দিতে গিয়ে ভেতরে রেখেছিল
একটি ঝাউপাতা,
সেই পাতা কবে জীর্ণ হয়ে গেছে,
তবু খাতার ভাঁজে আজও
ওর আঙুলের উষ্ণতা খুঁজে পাই।

বিকেলের ঘন্টা বাজার পর
যে পথটুকু একসাথে হেঁটেছিলাম,
সেই ধুলো-মাখা করিডোরে
এখনো ওর হাসির শব্দ জমে আছে।

শীর্ণতোয়া ইছামতীর নদীর ধারে বসে
ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প করতাম,
কে হবে ডাক্তার, কে কবি, কে বিপ্লবী
আর কে ভালোবাসবে কাকে
আজীবন।

এখন সন্ধ্যার বাতাসে
ওদের নামগুলো উড়ে আসে
ঝর্ণা, মাজেদা, শিউলি, দোলা,
চারটি ঋতুর মতো
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ব্যথা।

স্কুলের পুরোনো গেটে ঝুলে থাকা তালা
আমাদের মতোই বয়স নিয়েছে,
তবু খুললেই মনে হয়-
তোমরা ভেতরে অপেক্ষা করছ।

আমি একা বসে থাকি, 
পুরোনো খাতার  পাতায় ঝাউপাতার গন্ধে 
আদ্র সময় নিয়ে,
যেখানে প্রেম ছিল নিষ্পাপ,
আর ভবিষ্যৎ ছিল একটি খোলা জানালা-
যে জানালা দিয়ে এখনো বহু বছর 
আগের  মায়াবী বাতাস এসে অন্তরকে 
দোলা দেয়।



৩৬.       গোপন অলিন্দ 



সবার জীবনে একটি নিভৃত কক্ষ থাকে,
যেখানে আলো ঢোকে না,
শব্দ ফিরে আসে ক্লান্ত হয়ে।

সেখানে জমে থাকে পুরোনো নিঃশ্বাস,
অপূর্ণ কথার ধুলো,
আর ভাঙা সময়ের ছায়া।

নিঝুম রাত্রিতে দুপুরের মতো নেমে আসে জোৎস্না, অলিন্দের ফাঁক গলে
গায়ে লাগে শীতল স্মৃতি।

ঘুম ভাঙলে
সে বসে থাকে অন্ধকারের ধারে,
চেয়ে দেখে বহু বছর আগের
একটি নিভে আসা দীপ,
যার আলোতে ছিল একদিন বেঁচে থাকার অদম্য সাহস।

কখনও অন্ধকার তাকে ধীরে গ্রাস করে,
চোখের ভেতর ডুবে যায়
নামহীন সব মুখ।

না—এগুলো কোনো ভ্রান্তি নয়,
এগুলোই তার একান্ত সত্য, দূর অতীতের
অশ্রু-মাখা মায়া,
যা আজও প্রতিরাতে হৃদয়ের দরজায় 
এসে নিঃশব্দে কাঁদে।



৩৭.      সুজাতা সান্যাল



কালিগঙ্গার বাঁকে সেদিন সন্ধ্যায় উঠেছিল চাঁদ,
তারায় তারায় ভরে গিয়েছিল হেমন্তের নির্জন রাত।
রঙিন জোনাকীর মতো ব্রণে ভরা তার গাল,
‘ভালোবাসি’ কথাটি বলেনি সুজাতা সান্যাল।

সন্ধ্যার সন্ন্যাসীকে কেউ ভালোবাসে কি?
বুনো হাঁসদের কি থাকে কোনো ঘর, কোনো নীড় কি?
আমারও ঘর নেই, চুলো নেই, নেই কোনো চাল,
এই কথাটি জেনে গিয়েছিল সুজাতা সান্যাল।

কালিগঙ্গার জলে ভাসিয়েছিলাম ডিঙি নাও,
অন্ধকারে বলেছিলাম ওকে—এসো, প্রেম দাও।
গালভরা হাসিতে বলেছিল—‘দেখা হবে কাল’,
তারপর আর আসেনি সুজাতা সান্যাল।

কত রাত্রি পড়ে রইনু একা কালিগঙ্গা তীরে,
কৃষ্ণপক্ষের কত তারা ঝরে গেছে ধীরে ধীরে।
কত যে দুঃখ-বেদনায় কাটাইলাম এতকাল,
গোপন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে গেছে সুজাতা সান্যাল।

আজও নদীর জলে ভাসে তার ছায়ার আবছা আলো,
জোছনার ফাঁকে ফাঁকে রাত কখনো আঁধার কালো,
সময়ের ধুলোয় ঢেকে গেছে চেনা মুখের জাল,
তবু বুকের গভীরে বেঁচে আছে সুজাতা সান্যাল।


৩৮.     নদীর ধারে ভাঙা স্বপ্ন



কী যে এক স্বপ্ন ছিল
নদীর কাছে থাকবে বাড়ি,
নদীর কূলে করব বাস তুমি আর আমি,
সবই এখন স্বপ্ন ভাঙা কাঁচের টুকরো -
নদীর কূলে এখন নির্জন,
তুমিও নেই, আমিও নেই।

ভোরের কুয়াশায় ভিজে থাকা ঘাসে
আমাদের পায়ের ছাপ খুঁজে ফিরি
জোছনার আলোয় হাত ধরার কথা ছিল,
এখন শুধু ঢেউয়ের দীর্ঘশ্বাস।

যে জানালায় বসে আমরা দেখতাম
নৌকার আলো, সন্ধ্যার লণ্ঠন,
সেই জানালায় আজ ঝুলে থাকে
নিস্তব্ধতার ভারী পর্দা।

নদী এখনো বয়ে যায়,
কিন্তু তার জলে আর আমার মুখ নেই,
তোমার হাসির প্রতিবিম্ব নেই
শুধু ভাঙা আকাশের ছায়া।

চায়ের কাপে জমে থাকা ধোঁয়ার মতো
আমাদের কথা উড়ে যায়,
মনে পড়ে— থাকব এখানেই,
আর সেই কথাই আজ সবচেয়ে দূর।

রাতে যখন ঝিঁঝিঁ পোকার গান নামে,
আমি শুনি আমাদের অপূর্ণ গল্প,
চাঁদটা থেমে থাকে ওপারে
ডাকে, কিন্তু আমি আর যাই না।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আমি বলি,
স্বপ্নরা কি ফিরে আসে কখনও?
ঢেউ শুধু মাথা নেড়ে চলে যায়
নীরব, অব্যক্ত, দীর্ঘ।

এই কূলেই রেখে যাই
আমাদের অচেনা ভবিষ্যৎ,
ভাঙা স্বপ্নের ভেলায় ভাসিয়ে দিই
আমার সব মনখারাপ।



৩৯.      ভাঙনের নদী 



তুমি কী বুঝতে পারছ, এই চোখ কতটুকু কেঁদেছে
কতটুকু জল ফেলেছে,
ভেঙেছে নদীর পাড়ের মতো চোখের পাতা?

এই চোখের ভেতর এখনো জমে আছে
অপ্রকাশিত বৃষ্টির শব্দ,
রাতের অন্ধকারে  ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

আমি হাঁটি নির্জন পথে,
যেখানে প্রতিটি পা ফেলে শব্দহীন কাঁদে ছায়ারা, আর বাতাসে ঝুলে থাকে
পুরোনো নামের ধুলো।

কেউ জানে না,
আমার বুকের ভিতর কতখানি অভিমান জমে আছে, কতখানি প্রেম
অচেনা হয়ে গেছে নিজের কাছেই।

চাঁদের আলোও আজ আর ছুঁতে চায় না,
সে জানে এই মুখে অভ্যস্ত বিষাদের ছাপ,
রাতের মতো গভীর ক্ষত।

আমি কথা বলি না, তবু প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ভেসে ওঠে হারানোর গান,
কেউ শোনে না, শুধু আকাশ নুয়ে পড়ে
আমার নীরবতার ভারে।

এখন এই চোখ
নদীর মতো বয়ে যায় ভিতরের দিকে,
কেউ দেখে না, কেউ বোঝে না,
শুধু আমি জানি এই অশ্রুরও ক্লান্তি আছে,
এই ভাঙনেরও শেষ কোথাও নেই।



৪০.     কংস নদীর জল


দেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকে দুপুরের দীর্ঘশ্বাস
জানালায় ধুলো জমে থাকা আলো
কংস নদীর ঢেউয়ের মতো আর নড়ে না।

বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই
নেত্রকোনার সেই নিরিবিলি ঘাট,
ডায়েরীর পাতায় কুসুমের অক্ষর
হঠাৎ করেই বুকে নেমে আসে
ভাঙা শামুকের মতো বেদনায়।

'আমি তোমাকে ভালোবাসি'
এই তিনটি শব্দ আজও কাঁদে,
জলের বুকের মতো গভীর,
কিন্তু জল ছুঁতে গেলে হাতে আসে শুধু শূন্যতা।

তুমি বলেছিলে,
এই স্বপ্ন কেউ ভাঙতে পারবে না।
তবু দেখো, স্বপ্নের কাঁধে
সময়ের নখর বসে গেছে নিঃশব্দে।

আজ কংস নদী হয়তো বয়ে যায় আগের মতোই,
কিন্তু আমার ভেতর নদী থেমে আছে,
শুকনো পাথরের উপর ভেঙে পড়া
অদৃশ্য কান্নার শব্দে।



৪১.      মুক্তির গল্প 



মিলা একদিন বলেছিল,“আমাকে মুক্তি দাও,
আমাকে আর ধরে রেখো না,
মায়া কোরো না,আমাকে ঘৃণা দাও।”

আমি তো লিখি মানুষের মুক্তির গল্প,
রাত্রি জেগে জেগে অসীমের বুক চিরে খুঁজি
জীবনের জয়গান।
কিন্তু কখন যে কোনো কাহিনী
নিজের জীবনের হয়ে যায়, আমি নিজেও 
জানি না।

মিলা যখন এলো, তার অতীতের দরজায়
আমি কড়া নাড়িনি।
আজ যখন সে চলে যেতে চায়,
তাকেও বলিনি,“কোথায় যাবে তুমি?”
“কে তোমার ভালোবাসা?”
আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি,
নিজের বুকের খাঁচা ভেঙে, নিজের জীবন থেকেই।

এখন আমার ভেতরে
একটাই প্রতিধ্বনি  চিরদিনের বলে
এই জগতে কিছু নেই।
হাসি নেই,কান্না নেই, দুঃখ নেই, বেদনা নেই,
ঘৃণাও নয়,ভালোবাসাও নয়।
সবই কেবল ফুরিয়ে যাওয়ার নাম,
মুক্তির আরেকটি গল্প।



৪২.      বনকুঞ্জবন



এই বনকুঞ্জবন থেকে আমি একদিন চলে যাব সন্ধ্যার অতসী ঝাড়ে
তবু গুঞ্জন করে গান গাইবে জোনাকিরা।

সমুদ্রের বুকে আকাশ ছড়িয়ে দেবে লাল আভা,
সাঁজের সূর্য ডুবে যাবে অচেনা বিষাদের ভেতর।

এই পর্ণকুটিরে কে এসেছিল অবগুণ্ঠনে,
চকিত চোখে লাজুকতা
সন্ধ্যা তারার মতো কাঁপছিল।

কণ্ঠে নেই তার চন্দ্রহার, কর্ণে নেই কুসুম কলি,
বক্ষপথে নেমে গেছে গোলাপী জলের নদী।

সেই সমুদ্রের দিকে পাড়ে দাঁড়িয়ে খুঁজি
ঝিনুকের ভিতর মুক্তা,
কিন্তু মুক্তা নেই ঝিনুকেও, নেই সেই সমুদ্রেও, শুধু রয়ে যায় অফুরন্ত সন্ধ্যা।



৪৩.     অস্তসন্ধ্যার বীণা



তোমাদের জন্য লিখেছি বহু গল্প ও কবিতা, 
কাগজে কাগজে রেখে এসেছি আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ -
এখন বেলা শেষ হয়ে এসেছে,
ছায়ারা লম্বা, স্মৃতিরা নীরব।
ওগো বন্ধু আর চেও না,
আমার হৃদয়ের ঘরে আর শব্দ নেই,
শুধু কিছু নিঃশব্দ প্রার্থনা জমে আছে।

বীণায় অস্তমিত সন্ধ্যার সুর বাজছে,
শুনতে দাও সেই করুণ সুর
এই সুরের ভিতরে লুকিয়ে আছে
হারানো দিনের ধূলোয় আঁকা পদচিহ্ন।

আকাশ আজ কপালে জোছনার টিপ পরে,
তারার চোখে জল,
তারা জানে, বিদায় মানেই শেষ নয়,
এ শুধু আরেকটা নীল দরজা।
আমি সেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে
হাওয়ার সঙ্গে কথা বলি,
সে বলে— “থাকো, আরও একটু থাকো”
আর সময় চুপচাপ সরে যায়।

যদি কিছু দিতে না পারি,
তবু এই সুরটা নিও,
অস্তসন্ধ্যার বীণায় যে মায়া বাজে,
সেই মায়াতেই আমি রয়ে যাবো।


৪৪.      নির্জনতা


কেউ এসে দরজায় দাঁড়াবে
এমন কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না,
তবু বুকের ভেতর
একটা অকারণ অপেক্ষা
দিনভর কাঁপতে থাকে।

হাওয়ার শব্দেও চমকে উঠি,
মনে হয় এই বুঝি কেউ ডাকল,
ছায়ার নড়াচড়াতেও
চোখ চলে যায় জানালার দিকে,
কিন্তু ফিরে আসে শুধু
শূন্যতার প্রতিচ্ছবি।

রাস্তাগুলো আজ খুব চুপ,
দেয়ালের গায়ে জমে আছে
পুরনো সন্ধ্যার ছায়া,
ঘড়ির কাঁটাও যেন
কারো জন্য থেমে আছে
অথচ কেউ নেই।

হঠাৎ মনে হয় এই একাকিত্বই বুঝি
আমার নিত্যসঙ্গী,
যাকে আমি নাম দিই অভ্যাস,
যার অন্য নাম নির্জনতা।


৪৫.      আক্ষেপ 


কোনো এক চন্দ্রালোকিত রাত্রিতে
আকাশ থেকে নাকি-
ঘরের চালের উপর টুপটাপ করে
ঝরে পড়বে সাদা মুক্তোর মতো জোছনা,
আমি সেই মুক্তাঝরা রোশনির আলো দেখব না।

কোনো এক বর্ষার দিনে
পৃথিবীর সমস্ত কদমফুল
প্রেয়সীদের খোঁপায় ফুটে থাকবে,
খোঁপার সেই সুবাস, সেই শোভা
আমার চোখ ছুঁয়ে যাবে না।

কোনো এক শীতের রাতে
রাতভর শিশির ঝরবে
বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের সুরের মতো,
সে-সুরে ভিজে যাবে পৃথিবী,
আমার কানে সে সুর ধরা দেবে না।

কোনো এক শরতে
যমুনার চরে কাশফুল এমনভাবে ফুটবে
যেন আকাশ আর নদী
একই শ্বেত রঙে মিশে গেছে
সে শুভ্র বিস্তার আমার দেখা হবে না।

নিঝুম সন্ধ্যার শেষে রাত্রি নামবে চরাচরে,
বেতস লতার ঝাড়ে লক্ষ লক্ষ জোনাকি জ্বলে উঠবে,
নীল আলোয় ভরে যাবে লোকালয়,
আমি সেই নীল জনপদে হাঁটব না।

এক বসন্তদিনে শিমুল-পলাশের বনে
লাল ফুলকির মতো আগুন জ্বলবে,
আকাশ জুড়ে খঞ্জনা পাখির গান,
সে-মুখর সুর আমার শোনা হবে না।

এক মেঘ–বৃষ্টি–রোদ্রের দিনে
হঠাৎ ময়ূরাক্ষীর মতো রুপোলি জল
ঝরে পড়বে উঠানের উপর,
ভিজবে নবীন যুগলেরা,
আমার শরীর সে-জলে শীতল হবে না।

এক হেমন্তের সোনালি ভোরে পাখিরা অলিন্দে বসে ডাকবে, ভৈরবী সুর বাজবে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় -
চায়ের কাপে উঠবে কুয়াশার ধোঁয়া,
আমি সেই ভোরে জাগব না।

কোনো এক মায়াময় প্রদীপজ্বলা সন্ধ্যায়
কারও চোখে আমার নাম ঝলমল করবে,  আঁখিকোণে জল টলমল করবে -
ভালোবাসা চেয়ে রবে নীরবে,
আমি তার দিকে তাকাতে পারব না।

ফাগুন রাতে  আনমনা হয়ে 
কেউ আমার পুরোনো চিঠি খুলে পড়বে,
পড়তে পড়তে চিঠির শব্দ ভিজে
অশ্রু ললাটগামী হবে -
আমি সেই কান্না মুছতে পারব না।

আমি থাকব না, আমার স্বপ্ন থাকবে না,
এই রূপ, রং, সৌন্দর্য, মায়া 
কিছুই আর ছোঁবে না আমাকে-
তবু আমার আক্ষেপগুলো সকরুণ 
দীর্ঘশ্বাস হয়ে পৃথিবীর বুকের উপর 
পড়ে থাকবে।


৪৬.     চলে গেল নীরবে 


চলে গেল সে নীরবে,
যাবার বেলায় সে বলে গেল না-
'যাচ্ছি, দুচোখ ভরে দেখে নাও।'

তার পায়ের শব্দ
রয়ে গেলো আমার উঠোনে 
হাওয়ার গায়ে লেগে থাকা
অদৃশ্য কাঁপনের মতো।

ঘরে তখনো তার ছায়া
আলনায় কাপড় সাজানো, ভাঙা বিকেলের 
আলোয়  সে বসে আছে।

আমি জিজ্ঞেস করিনি, কেন এই চলে যাওয়া,
কেন চোখে কোনো অশ্রুর দাগ নেই?
বিদায় কি এমনই হয়-
অচেনা, অদৃশ্য, হঠাৎ?

সে চলে গেছে,
কিন্তু তার না-বলা কথারা আমার ভেতর
দিনরাত দরজা খোলে,
এখন প্রতিটি সন্ধ্যা তার নাম ধরে ডাকে,
আর আমি শিখে নিচ্ছি-
যে চলে যায়, সে কখনো পুরোপুরি যায় না।



৪৭.      একবার যদি বলতে


একবার যদি বলতে- ভালোবাসি তোমাকে,
এই কথাটুকু বললেই ধর্মগ্রন্থের বাক্য
কী বদলে যেত,
নাকি আকাশের নীল রঙ হয়ে যেত কালো ধূসর!

একবার যদি বলতে-
তোমার চোখের ভেতর আমি ঘর বাঁধতে চাই,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত শীত গলে যাক।

কী এমন অপরাধ ছিল এতে, বলো?
ফুল কি বসন্তকে দোষী করে,
নদী কি সাগরের দিকে যেতে ভয় পায়?
তবু আমরা দাঁড়িয়ে থাকি
শব্দের কাঁটাতারের এপারে-ওপারে।

আমি জানি,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
আমার ভেতরে আলো জ্বলে ওঠে,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো নয়,
বরং পূর্ণিমার মতো শান্ত, দীপ্ত।

একবার যদি বলতে-
এই জীবনের ক্লান্ত পথে
তোমার হাতটাই আমার ভরসা,
তোমার কাঁধেই রেখে দিতে চাই
আমার সকল অজানা দুঃখ।

তাতে কি আকাশ ভেঙে পড়ত?
নাকি পৃথিবী থেমে যেত ঘূর্ণনে?
নাকি কেবলই আমাদের বুকের ভেতর
একটু বেশি করে বাঁচত প্রেম!



৪৮.      বাঁশিওয়ালা



ছেলেবেলায় এক আম্রমুকুলের ফাগুন দিনে
এক বাঁশিওয়ালা এসেছিল আমাদের পাড়ায়
কাবুলিওয়ালার মতো পরণে পোশাক,
নজরুলের মতো বাবরি চুল,
চোখে দূরযাত্রার ধুলো, ঠোঁটে রোদের রেশ।

তার ঝাঁপিতে ছিল রংবেরঙের বাঁশি,
একেকটা বের করত
আর আকাশের রঙ বদলে যেত,
কখনও মাঠে ছুটত হাওয়ার দল,
কখনও নদী থমকে দাঁড়াত শুনতে,
কখনও মায়ের চোখে জমে উঠত
অচেনা কোনো পুরোনো গান।

আমরা তখন ছোট,
মুঠোয় ধরা কয়েকটা পয়সা,
চোখ ভরা বিস্ময়,
আর হৃদয়ে অজানা এক দীর্ঘ পথ।

বাঁশির সুরে গলে যেত দুপুর,
ছায়া নেমে আসত আমাদের কাঁধে,
সে চলে গেলে,
আম্রমুকুলের গন্ধও কেমন যেন ফিকে হয়ে যেত,
রোদে পুড়ে যাওয়া বিকেলগুলো
আর ফিরে পেত না সেই সুরের ডাক।

আজও হঠাৎ কোনো বাতাসে
ভেসে আসে তার সেই বাঁশির রেশ
আমি থমকে দাঁড়াই, 
ছেলেবেলার উঠোনে ফিরে যাই,
এক বাঁশিওয়ালা বলেছিল- বাঁশি বাজাও,  হারানো গান বাঁশির সুরে ফিরে আসে।



৪৯.     জ্যোৎস্না-ভেজা মহুয়া বন

দূরন্ত চাঁদের রাত্রিতে
আমাদের অন্তরে আনন্দের হিল্লোল 
বহিয়া যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি-
জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে
চলে যাই মহুয়া বনে,
যেখানে রাত ভালোবাসার গন্ধে 
নেশাগ্রস্ত।

পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো
তোমার মুখে ছায়া এঁকে দেয়,
চুলে জড়িয়ে থাকে বাতাসের কোমল গান,
যেখানে আমি বারবার হারিয়ে যেতে চাই।

মহুয়ার সুবাসে মিশে থাকে
আমাদের অচেনা শিহরণ,
হৃদয় ধীরে ধীরে শেখে নাম না জানা এক প্রার্থনা,
ভালোবাসা মানে জ্যোৎস্নাতলায় হাঁটা,
এই স্পর্শহীন ছোঁয়া,
এই চুপচাপ পাশে থাকা।

চাঁদের আলোয় আমাদের ছায়া
এক হয়ে যায় মাটির ওপর,
কথাহীন দু’টি হৃদয় একই সুরে কাঁপে,
এই রাত জানে-
আমরা কেউ কাউকে ধরে রাখি না,
কেবল হারিয়ে যাই  জ্যোৎস্না-ভেজা 
মহুয়া বনে।


৫০.     দোলনচাঁপার ঘ্রাণ


কতো দোলনচাঁপা ফুটে ঝরে গেল,
কতো রোদ্দুর ছায়ায় ঢেকে গেল-
সন্ধ্যার নির্জনতায় কোনো দোলনচাঁপা-ই
বলল না- ভালোবাসি।

যদি বলত,
আমিও তোমার খোঁপায় গুঁজিয়ে দিতাম 
একটি সুগন্ধী ফুল 
আর আবেশ কণ্ঠে বলতাম— ভালোবাসি।

শিউলির মতো কোমল হয়ে যেত মন,
চাঁদের আলোয় ভিজে যেত প্রেম 
দু’চোখে জমে থাকা অজস্র কথা
শব্দস্বরে বলত -  ভালোবাসি।

প্রতিটি না-বলা বাক্যও বুকের ভেতর
আগুনের মতো জ্বলে ওঠে-
প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি খুঁজি তোমাকে,
যেন বাতাসও তোমার নাম যপে।

পৃথিবীর কোলাহলে হারিয়ে যায় কতো ফুল 
তুবুও একদিন ঠিক ফুল হয়ে ফুটবে
ভালোবাসা, তার রং হবে দোলনচাঁপার 
মতো শুভ্র।

কোনো এক সন্ধ্যায় যদি তুমি হঠাৎ 
বলে ওঠো- 'ভালোবাসি'
আমি তখন আকাশ ভরে হাসব,
আর সব নক্ষত্রদের চিৎকার করে শোনাব,
আমিও তোমাকে ভালোবাসি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন