শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

সেদিন বিকাল বেলা ( কবিতাগ্রন্থ )


সেদিন বিকাল বেলা     (  কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ২০২৫ ইং

উৎসর্গ  -


১.     তোমার পথ চেয়ে

তোমার পথ চেয়ে বসে থাকি
এ বসে থাকা কোনো স্থির ভঙ্গি নয়,
এটা ভেতরের এক দীর্ঘ, চলমান অপেক্ষা।

দরজার বাইরে নয়,
আমি অপেক্ষা করি সময়ের ভেতরে।
বিকেলের আলো সরে যায় ধীরে,
আর বুঝে নিই,
আলো নয়, ফিরে যাওয়ার অভ্যাসটাই
আমাকে কাঁদায়।

পথটা প্রতিদিন একই থাকে,
তবু তোমার না-আসায়
সে নতুন করে শূন্য হয়।
হাওয়ার শব্দে খুঁজি তোমার পায়ের আওয়াজ,
জানি- এই শহরের শব্দগুলো
এখন আর কাউকে ফেরায় না।

ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, কিন্তু সময় এগোয় না;
সে শুধু আমাকে ঘিরে ঘুরপাক খায়,
যেন আমিই তার একমাত্র অবলম্বন।

রাতে জানালার কাচে মুখ রাখলে
অন্ধকারে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখি
তার চোখে জমে থাকে তোমার অনুপস্থিতি।

চাঁদ ওঠে, নামহীন তারা জ্বলে,
অথচ একটুও আলো হয় না ভেতরে।
কারণ আলো আসলে
কারও ফিরে আসার আরেক নাম।

আমি এখনও তোমার পথ চেয়ে আছি।
হয়তো তুমি আসবে না,
তবু এই অপেক্ষাটাই
এখন আমার ঠিকানা,
আমার শেষ বিশ্বাস।


২.      রমণী ও নদী


রমণীর চেয়ে নদীই বেশি উতলা,
তার বুকে সারা বছর ঢেউয়ের জ্বর
চুলে চুলে স্রোতের চিঠি,
নীরবতার ভেতরেও গর্জন লুকোনো।

স্রোতের টানে ভেসে যায় দয়িত,
কখনো নৌকার ছায়া হয়ে,
কখনো নামহীন ভাঙা স্বপ্ন—
তটভূমিতে পড়ে থাকে শুধু পায়ের ছাপ।

রমণী অপেক্ষা জানে,
নদী জানে না থামতে,
সে বহে, সে ভাঙে, সে নেয়,
আর রেখে যায় নোনা দীর্ঘশ্বাস।

চাঁদের রাতে নদী আরও উন্মুখ,
আকাশের বুক থেকে আলো ছিনিয়ে নেয়,
দয়িতের হাত আলগা হয়ে আসে,
জলের ভেতর ডুবে যায় প্রতিশ্রুতি।

শেষে বোঝা যায়,
ভালোবাসা কখনো তীর, কখনো স্রোত;
যে তীরে দাঁড়িয়ে ডাকে, সে হারায়,
আর যে ভেসে যায়— সে-ই পায়।


৩.      কী লিখব তোমায়


কী লিখব তোমায় আজ শব্দেরা
সবাই ক্লান্ত,
কলমের ডগায় এসে ভেঙে পড়ে 
নীরবতার ভারে।

কী গান শোনাব তোমায়
আজ সুরগুলোও জানে,
মন ভালো নেই বলে
তারা কেউ উচ্চস্বরে ওঠে না।

আজ মন ভালো নেই
আকাশটা বুকের ভেতর নেমে এসেছে,
মেঘেরা জমে আছে চোখের কোণে,
কিন্তু বৃষ্টি নামতে চায় না।

তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম অনেক কিছু,
ভালোবাসা, অভিমান, কিছু অপূর্ণ প্রার্থনা,
সবই আজ স্তব্ধ হয়ে আছে
হৃদয়ের বন্ধ জানালায়।

তবু যদি কিছু লেখা হয়,
তবে এই একটিই বাক্য—
আজ মন ভালো নেই,
আর সেই না-ভালোর মধ্যেও
তোমার নামটা নীরবে ভালো লাগে।


৪.     বসন্ত এলো, তুমি এলে না

বসন্ত এলো-
শিমুলে আগুন জ্বলে,
পলাশে রক্তিম হাসি,
কোকিল ডাকে ভোরের কাননে,
হাওয়ায় ওড়ে নবজন্মের গান।

বসন্ত এলো-
রাস্তায় রাস্তায় রঙিন স্বপ্ন,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে আলো,
মাটির বুকে উষ্ণ নিঃশ্বাস,
সবাই পেল আপনজনকে।
শুধু তুমি এলে না।

তোমার না আসায়
ফুলের গন্ধে বিষাদ মিশে যায়,
কোকিলের ডাকে শুনি হাহাকার,
রঙিন আকাশও হয়ে ওঠে ফ্যাকাসে।

আমি বসন্তের ভিড়ে দাঁড়িয়ে
একলা শীতের মানুষ,
হাত বাড়িয়ে থাকি-
যদি হঠাৎ তুমি এসে বলো,
'দেরি হয়ে গেছে, তবু এসেছি।'

কিন্তু বসন্ত ফুরিয়ে যায়,
পাতা ঝরে, রঙ নিভে আসে,
আর আমার ভেতরে
চিরকাল বসন্ত হয়েও
তুমি আর আসো না।


৫.    প্রাণখানা দিলাম 


প্রাণখানা দিলাম, তুমি নিলে না
তবু হাত বাড়িয়ে রইলাম শূন্যতায়।
আমার বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলে ছিল,
তুমি তাকে নাম দিয়েছিলে- সময় নয়।

আমি শব্দে শব্দে ঘর বেঁধেছিলাম,
তোমার একটুখানি থাকার আশায়।
তুমি এসে দরজায় দাঁড়াওনি কোনোদিন,
চলে গেলে নিঃশব্দ বিকেলের ছায়ায়।

প্রাণখানা দিলাম-
কোনো হিসাব রাখিনি, কোনো শর্তও না।
তুমি নিলে না,
তবু সে প্রাণ আজও তোমার নামেই কাঁদে,
ভাঙা হৃদয়ের প্রতিটি শিরাতন্ত্র বলে-
ভালোবাসা কখনও ফেরত চায় না।


৬.     রাধার দিনলিপি


আজও বৃন্দাবন নিঝুম হয়ে আছে, শ্যাম,
তোমার বাঁশির সুর নেই-
কুঞ্জবনে কেবল দীর্ঘশ্বাসের ছায়া।

যমুনা জিজ্ঞেস করে -কোথায় তোমার কানাই?
আমি চোখ নামাই জলে,
ঢেউ জানে আমার লজ্জা, জানে আমার দহন।

পলাশের ডালে বসে কোকিল ডাকে নাম ধরে,
ডাকে- শ্যাম… শ্যাম…
আর আমার বুকের ভেতর পুড়ে যায় দিনের প্রদীপ।

চন্দন মাখি, তবু শীতল হয় না প্রাণ,
বিরহের আগুনে দগ্ধ দেহ, দগ্ধ মন।
সখীরা বোঝে না কেন এমন ব্যাকুলতা—
তারা জানে না প্রেমই আমার ধর্ম।

হে নন্দনন্দন,
তুমি আছ বলেই আমি বিরহে বাঁচি,
তুমি নেই বলেই প্রতিক্ষণে মরি।

এই দিনলিপি রাখলাম যমুনার তীরে-
যদি কোনো ভোরে ফিরে আসো, শ্যাম,
পড়ো রাধার অশ্রু-লেখা প্রেম।
 

৭.      আকাশ কাঁদে 


চুপচাপ কাঁদে যে আকাশ
সে কান্নার শব্দ নেই—
বৃষ্টি নামে না,
শুধু মেঘের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে
অপ্রকাশিত হাহাকার।

পাখিরা জানে,
ডানা ভেজে না তবু উড়ান ভারী হয়—
কারণ আকাশ আজ নিজের মধ্যেই
ভেঙে পড়ে।

শহরের আলো বুঝতে পারে না,
জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হয়
একটি দীর্ঘশ্বাস,
যার নাম নীরবতা।

চুপচাপ কাঁদে যে আকাশ,
তার চোখে জমে থাকা জল
নেমে আসে না পৃথিবীতে—
সে জল হয়ে থাকে
আমার বুকের ভেতর।


৮.     আমি তোমাকে ভালোবাসি


আমি চিৎকার করব-
যেন আমার গলার শিরা ফেটে যায়,
যেন আকাশ থমকে শোনে,
যেন পৃথিবী জানে-
হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আমি লুকোব না,
ভয়কে চেপে ধরব না বুকের কোণে।
তোমার নাম উচ্চারণ করব
আইনের সামনে, সমাজের সামনে,
সব নিষেধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

যারা আঙুল তুলবে- তুলুক।
যারা আগুন ধরাতে চাইবে- ধরাক।
আমি ছাই হয়েও আবার বলব,
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এই ভালোবাসা কোনো ফিসফাস নয়,
এটা যুদ্ধঘোষণা।
এই ভালোবাসা কোনো অনুরোধ নয়,
এটা আমার অস্তিত্বের স্বাক্ষর।
যদি এই উচ্চারণে আমার সর্বনাশও হয়,
তবু শেষ নিঃশ্বাসে আমি চিৎকার করে বলব-
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

রাষ্ট্র শুনুক, সমাজ শুনুক,
নৈতিকতার প্রহরীরা কান পেতে থাকুক-
আমি দাঁড়িয়ে বলছি,
গলা ফাটিয়ে বলছি-
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এই ভালোবাসা অনুমতির ধার ধারে না,
সিলমোহর চায় না,
সভ্যতার লাইসেন্স লাগে না একে।
এটা জন্মেছে রক্তের ভেতর,
এটা আমার অধিকার।

যদি তোমাকে ভালোবাসা অপরাধ হয়-
তবে আমি অপরাধী।
যদি এটা বিদ্রোহ হয় তবে আমি বিদ্রোহী।
আমি প্রেমকে লুকোতে শিখিনি,
আমি প্রেমকে অস্ত্র করেছি।
এই উচ্চারণে ভেঙে পড়ুক ভণ্ডামি, ভয়, ভীরু নিয়ম।

শুনে রাখো, আমি ভালোবাসি,
এবং এই ভালোবাসা
কোনো দিন আত্মসমর্পণ করবে না।



৯.     নদী ভেসে যায়



নদী ভেসে যায় পাড় ভেঙে, ঠোঁটে কাদামাটি লেগে-
সে কথা বলে না আর, শুধু বুকভরা স্রোতে জেগে।
তার চোখে জমে থাকে গ্রামের হারানো ঘর,
ডুবন্ত পথ, ভাঙা উঠোন, অনাথ দুপুর-ভোর।

নদী জানে ক্ষুধার মানে, জানে কান্নার স্বাদ,
ভেজা ঠোঁটে লেগে থাকে মানুষের দীর্ঘ হাহাকার।
সে বয়ে নেয় গোপন নাম, মুছে যাওয়া ইতিহাস,
নিঃশব্দে লিখে যায় ভাঙনের উপাখ্যান-আকাশ।

পাড়ের মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে—কিছুই বলার নেই,
নদী শুধু চলে যায়, থামে না কারও দোহাইয়ে।
ঠোঁটে কাদামাটি লেগে, বুকভরা নোনা জল,
নদী ভেসে যায়—আমাদের মতোই অনির্বচনীয়, নিশ্চল। 


১০.      বিরহে ভিজে 


বিরহে ভিজে বৃন্দাবনের পথ—
ধূলোর বুকে লেগে আছে কান্নার ছাপ,
কদমতলার ছায়ায় আজো থেমে থাকে
অপূর্ণ আলাপ, অশ্রু-ভেজা জপ।

যমুনা আজ ধীরে বয়ে যায়,
ঢেউয়ের কোলেও শূন্যতার সুর—
কৃষ্ণহীন বাঁশি কাঁপে হাওয়ায়,
রাধার নিশ্বাসে ভাঙে দূর।

মঞ্জরীরা জানে, রাত কেন দীর্ঘ,
তারারা কেন জ্বলে নিভে—
প্রতিটি পদচিহ্নে লেখা থাকে
ফেরার প্রতীক্ষা, প্রেমের শিবে।

বৃন্দাবনের পথ আজ সাক্ষী হয়ে
শোনে হৃদয়ের অনন্ত ডাক—
বিরহই এখানে পূর্ণতা পায়,
প্রেমই এখানে চির অটল থাক।


১১.      চোখ : নিষিদ্ধ বিদ্রোহ


তোমার চোখ রাষ্ট্রদ্রোহী
এক নজরেই উল্টে দেয় আমার ভেতরের সংবিধান।
যে নিয়মে বাঁচতাম,
সব ভেঙে পড়ে তোমার পাপী তাকানোর নিচে।

তোমার চোখ খুনি,
প্রেমের নামে গণহত্যা চালায়
আমার স্বপ্ন, বিশ্বাস, আগামী
সব সারিবদ্ধ লাশ হয়ে পড়ে থাকে বুকে।

তোমার চোখ অন্ধকার গির্জা,
আমি সেখানে ঢুকি প্রার্থনা নয়, পাপ করতে।
তোমার চোখের সামনে দাঁড়ালে
আমার ঈশ্বরও মুখ ফিরিয়ে নেয়।

তোমার চোখ আগুন নয়
তোমার চোখ যুদ্ধ,
যেখানে আমি অস্ত্রহীন দাঁড়িয়ে থাকি
আর আনন্দের সাথে পরাজয় স্বীকার করি।

তোমার চোখ রক্তিম পতাকা,
আমি সেই পতাকায় চুমু খাই বিদ্রোহীর মতো।
জানি, এর শাস্তি মৃত্যু-
তবু ভালোবাসা মানে তো ফাঁসি মেনে নেওয়া।

তোমার চোখ আমাকে ধ্বংস করে,
আর সেই ধ্বংসেই আমি প্রেম খুঁজি।
কারণ নিরাপদ ভালোবাসা নয়-
আমি ভালোবাসি শুধুই নিষিদ্ধ বিপদ।

তোমার চোখই আমার শেষ বিদ্রোহ,
শেষ অপরাধ, শেষ চুম্বন-
এরপর যা থাকে,
তা শুধু রক্তে লেখা নীরবতা।


১২.      চোখের অপরাধ


তোমার চোখ আমাকে খুন করে প্রতিদিন,
নিঃশব্দে—কোনো ছুরি নেই, শুধু তাকানো।
এক ফোঁটা দৃষ্টি ঝরে পড়লেই
আমার দেহ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্তাক্ত স্মৃতি।

তোমার চোখ আগুন-
ছোঁয়া লাগে না, তবু পোড়ায়,
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা
সব শান্ত জল শুকিয়ে যায়।

তোমার চোখ আদালত,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি কাঠগড়ায়-
কোনো সাফাই নেই,
এক চাহনিতেই ঘোষিত হয় শাস্তি।

তোমার চোখ নদী,
যেখানে আমি বারবার ডুবে যাই,
সাঁতার জানি, তবু বাঁচতে চাই না-
ডুবেই আমার মুক্তি।

তোমার চোখ অভিশাপ,
তবু সেই অভিশাপেই আমি আশ্রয় খুঁজি,
কারণ তোমার চোখ ছাড়া
আমার শোকের কোনো নাম নেই।

তোমার চোখই আমার অনিষ্ট,
তোমার চোখই শেষ প্রার্থনা-
এই দুইয়ের মাঝখানেই
আমার সমস্ত প্রেম রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকে।


১৩.     অর্ধেক আলোয় অর্ধেক অন্ধকারে


আমি এক যৌবনবতীর শরীর দেখেছিলাম
অর্ধেক আলোয়, অর্ধেক অন্ধকারে-
যেন সন্ধ্যার সাথে ভোরের গোপন চুক্তি।

তার কাঁধে আলো থেমে ছিল 
লাজুক পাখির মতো,
অন্ধকার নামছিল কোমরের ঢেউয়ে,
নীরব জোয়ারের মতন শ্বাসে শ্বাসে।

চুলের ছায়া গলে পড়ছিল গলায়,
রাতের কালি মেখে চাঁদের দুধে,
আমি দেখছিলাম- ছুঁইনি,
তবু চোখেই পুড়ছিল আঙুল।

তার শরীর ছিল না শুধু শরীর,
ছিল প্রতীক্ষা, ছিল মন্ত্র, ছিল সেই মুহূর্ত-
যেখানে কাম কথা বলে না,
শুধু দৃষ্টি দিয়ে ধীরে ধীরে খুলে যায়।

অর্ধেক আলো আমাকে ডেকেছিল,
অর্ধেক অন্ধকার টেনে নিয়েছিল ভেতরে-
আমি তখন পুরুষ নই,
আমি তখন কেবল বিস্ময়।


১৪.       তুমিই মেঘ, তুমিই বৃষ্টি


আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল নিঃশব্দে,
দূরের নীলচে আহ্বানে বৃষ্টি নামার আগে,
পথের ধুলো ভিজছিল একাকীত্বে,
হাওয়া অপেক্ষা করছিল তোমার নাম ধরে।

তারপর তুমি এলে,
বৃষ্টিভেজা চোখে, মেঘলা হাসিতে।
হঠাৎ করে আকাশ শূন্য হয়ে গেল,
মেঘের আর দরকার রইল না কিছুতেই।

যখন তুমি কাছে থাকো,
আকাশ নিজেই খুলে দেয় ছাতা,
বৃষ্টি থেমে যায় লজ্জায়,
কারণ তোমার ছোঁয়াতেই
ভিজে যায় আমার সমস্ত ভুবন।

তখন তুমি মেঘ,
নরম, গভীর, আশ্রয়ের মতো।
তখন তুমি বৃষ্টি,
নিঃশব্দ, অবিরাম, হৃদয়ের ভেতর নামে।
আকাশ তখন আর ওপরে থাকে না,
নেমে আসে বুকের গভীরে।

মেঘ-বৃষ্টি মিলিয়ে
একটাই নাম লেখা থাকে সেখানে,
তুমি।


১৫.      বাসন্তী পূর্ণিমার কাছে 


সে আমাকে চিনিয়েছিল জীবনের অর্থ
শুধু বেঁচে থাকা নয়,
বরং বেঁচে ওঠার মানে।
তার লাস্যে ছিল বসন্তের প্রথম দোলা,
হাস্যে ছিল ভোরের রোদের নির্ভীক স্পর্শ,
বিভঙ্গে বিভঙ্গে আমার চিত্তে
সে ঢেলে দিয়েছিল
যৌবনের প্রথম লাবণ্যজ্যোৎস্না।

আমি তখন শব্দ চিনতাম না ভালো করে,
তবু তার চোখে চোখ রেখে
হৃদয়ের প্রথম দ্রাবিত অক্ষর
পড়ে নিয়েছিলাম নিঃশব্দে।

সেও ভালোবেসেছিল,
কোনো শর্তের ব্যাকরণ ছাড়াই,
হৃদয় দিয়ে হৃদয় পড়ার সেই আদিম পাঠে। এই কক্ষেই, যেখানে দেয়ালে আজও আটকে আছে আমাদের নিঃশ্বাসের গন্ধ।

এক বাসন্তী পূর্ণিমার রাত্রে
আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম।
অলংকারহীন, জোরহীন,
এক পুরুষ যেমন করে কথা দেয়
তার নারীর কাছে, চোখে চোখ রেখে,
সময়ের চোখে চোখ রেখে।
চাঁদ তখন জানত এই প্রতিশ্রুতি সহজ নয়,
বাতাস জানত এই ভালোবাসা চিরন্তনও হতে পারে, ভাঙনও হতে পারে।

তবু সেই রাতে
আমরা দু’জনেই বিশ্বাস করেছিলাম,
ভালোবাসা মানে
একটি জীবনকে আরেকটি জীবনের হাতে
নিঃশর্তে তুলে দেওয়া।

আজও সেই পূর্ণিমা এলে আমি থমকে দাঁড়াই, নিজেকে জিজ্ঞেস করি-
কতটা পেরেছি আমি সেই পুরুষ হয়ে উঠতে,    যে সেদিন কথা দিয়েছিল
একটি নারীর জীবনের কাছে।


১৬.      তুমি না থাকলে 


তুমি কাছে থাকলে বুকের ভিতর ঢুকে পড়ে 
বন্যার জলের মতো ভালোবাসা,
সব বাঁধ ভেঙে, সব ভয় ডুবিয়ে
হৃদয় উপচে ওঠে অতলান্ত জলে,
নিঃশ্বাসগুলোও তখন উৎসবের ঢোল বাজায়,
আমার একাকিত্ব হার মানে তোমার স্পর্শে।

আর তুমি না থাকলে,
হা হা করে শূন্যতা এসে বসে হৃদয়ের ঘরে,
চেয়ারের ওপর, জানালার ধারে,
নাম না-জানা দীর্ঘশ্বাস হয়ে।

সময় থেমে থাকে, ঘড়ির কাঁটা কেবল তোমার অনুপস্থিতির হিসাব লেখে।
তুমি থাকো বলেই আমি পূর্ণ,
তুমি না থাকলে আমি কেবল একখণ্ড প্রতীক্ষা।

এই দুই অবস্থার মাঝখানেই
আমার সমস্ত প্রেম, আমার সমস্ত জীবন
তোমার দিকেই ঝুঁকে থাকে।


১৭.      বিষের প্রেমপত্র


সারা শরীরে আমার তোমার বিষ দাঁতের দংশন
ক্ষতগুলো জ্বলছে, তুমি বলো-
এ নাকি ভালোবাসা নয়,
এ নাকি তোমার অপ্রেমের বিষাক্ত চিহ্ন।

তবু আমি জানি,
এই বিষে আছে এক অদ্ভুত নেশা,
যেখানে যন্ত্রণা আর কাম
একই শিরায় একসাথে হাঁটে।

তোমার স্পর্শ মানেই
কালো আগুনের মতো জ্বালা,
তোমার নিঃশ্বাস মানেই
রাত্রির গোপন ছুরি-
যা কাটে, তবু মারতে পারে না।

তুমি দাও ক্ষত,
আমি তাকে আদর করে রাখি,
তুমি ছুঁড়ে দাও অবহেলা,
আমি তাতেই শরীর ভিজিয়ে নিই।

তোমার ঠোঁটের কাছে গেলে
ভয় আর লোভ একসাথে কাঁপে,
মনে হয়, এই বুঝি বিষ ঢুকবে,
এই বুঝি বাঁচার শেষ স্বাদ পাবো।

আমরা দু’জনেই জানি,
এ প্রেম সুস্থ নয়,
এ প্রেমে আছে পচন, আঁধার, দহন-
তবু এই অসুখেই আমার শরীর তোমার নামে
বারবার আত্মসমর্পণ করে ।


১৮.     যেখানেই যাই 


যেখানেই যাই তোমার উপস্থিতি থাকে আমার হৃদয় জুড়ে,
তুমি কাছে নেই তবুও তুমি আছ আমার সকল গানের সুরে।

চোখ বন্ধ করলে দেখি তোমার ছায়া, আলো-অন্ধকারের মায়াবনে,
নীরব রাতের নিঃশ্বাসে তুমি জেগে থাকো আমার জানালার কোণে।

পথের ভিড়ে মানুষের কোলাহলে হঠাৎ থমকে যায় যদি,
প্রতিটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে তোমার নাম নিরবধি।

সময় এগোয় ঋতু বদলায়, বদলায় 
শহরের দৃশ্য,
তবুও আমার ভেতরে তুমি একই রকম গভীর, একই রকম নিশ্চুপ স্পর্শ।

তুমি না থেকেও আছ এই অদ্ভুত 
উপস্থিতির টানে,
আমার জীবন জুড়ে বাজে তোমারই গান, আমারই প্রাণে।


১৯.     নীরব নীড়


নদীর ঘাটে তখন সন্ধ্যার আলো,
জলছায়া কাঁপে মেঘ আর শরতের কোলাহলে।
ময়ূরকণ্ঠিরঙা নীলাভ দুকূল জড়ানো 
তার শরীর,
নদীর স্রোতের মতোই শান্ত অথচ গভীর।

শ্বেত উত্তরীয়ে ঢাকা বক্ষোজ কুসুম,
যেন ভোরের শিশিরে লাজুক কোনো পদ্ম।
ভ্রমরের মতো চোখ কালো, নীরব, চঞ্চল,
অপাঙ্গ দৃষ্টিতে ডাক দেয় মধুর ও প্রবল।

সে কি আমাকেই ডাকল? বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে প্রশ্ন,
ঘাটের ধুলো, নৌকার দড়ি সবই হয়ে ওঠে স্পর্শ।

নদী থেমে শোনে, বাতাসও রাখে শ্বাস,
এক মুহূর্তে জমে যায় অনন্তের অভিলাষ।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি ডাকা আর না-ডাকার মাঝখানে,
তার চোখে ভেসে ওঠে এক অচেনা মানে।

নদীর ঘাটে সেই দেখা অল্প, তবু গভীর,
একটি অপাঙ্গ দৃষ্টিতেই বদলে গেল আমার নীরব নীড়।


২০.      রুপোলী ডাক


রুপোলী জ্যোৎস্নার মতো
সে দাঁড়িয়ে বারান্দার ধারে,
নীরব ইশারায় ডাকে,
চলো, রাতের অচেনা পথে।
তার চোখে ভাসে দূরযাত্রার নীল মানচিত্র,
তার নিঃশ্বাসে ঝরে পড়ে
মুক্তির গোপন সুর।

কিন্তু ঘরের ভেতর আরেকজন মায়াবতী,
প্রদীপের আলোয়
তার ছায়া লেপ্টে আছে দেয়ালে।
তার চুলে বাঁধা দিনের সব চেনা ক্লান্তি,
তার চোখে জমে আছে
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

বাইরে জ্যোৎস্না বলে,
চলো, নিজেকে হারাও।
ভিতরে মায়া বলে, থামো, এখানেই তুমি পূর্ণ।
দুটো ডাকে
ছিঁড়ে যায় বুকের নরম মানচিত্র,
পা বাড়াতে চাইলে শেকড় জড়িয়ে ধরে হৃদয়।

আমি জানি না
কোন ডাক সত্য, কোনটা স্বপ্ন-
রুপোলী আলো, না প্রদীপের স্থির উষ্ণতা।
তাই দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি
নিঃশব্দ প্রহরী হয়ে,
এক পা ঘরের ভেতর,
এক পা জ্যোৎস্নার সীমান্তে।

যাই না কোথাও,
তবু ভেতরে ভেতরে ভেসে যাই বহুদূর।
মায়া আর মুক্তির মাঝখানেই
আমার নিরুদ্দিষ্ট বাস।


২১.     তুমি নেই জীবনে


তুমি নেই জীবনে,
অথচ তুমি আছ ছায়ার মতোন, মায়ার মতোন আমারই জীবনে জীবনে।
চোখ বুজলেই নাম ধরে ডাকে তোমার নীরবতা,
হাওয়ার ভেতর ভেসে আসে তোমার না-বলা কথারা।

পথে হাঁটি একা, তবু পাশে হেঁটে চলে তোমার স্মৃতি,
প্রতিটা বিকেল রোদে পুড়ে যায় তোমার অপেক্ষায়।
তুমি স্পর্শ নও, তবু স্পর্শের মতো গভীর,
তুমি বাস্তব নও, তবু সত্যের চেয়েও বেশি সত্য।

যেখানে তুমি নেই, সেখানেই তোমার সবচেয়ে বেশি বাস,
আমার শূন্যতার বুক জুড়ে তুমি অদৃশ্য, অবিনাশ।
এই জীবনটা বুঝি তোমাকে ছাড়া নয়,
তুমি নেই, এই কথাটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যে হয়ে রয়।


২২.     শেষ অভিযাত্রা 


জ্যোৎস্নায় প্লাবিত তারার আকাশে হারিয়ে 
যাব একদিন,
এই ভাবনাটুকু বুকের ভিতর রেখে
আমি হাঁটি প্রতিদিনের ভিড়ের মধ্যে,
মুখে হাসি, হাতে কাজ,
চোখে জমে থাকে অনন্তের নীরব ডাক।

একদিন শরীর নামিয়ে রাখব সময়ের দোরগোড়ায়,
নিঃশ্বাস খুলে যাবে সব বন্ধন থেকে
নাম, পরিচয়, অভিমান, ভালোবাসা
সবাই দাঁড়িয়ে থাকবে দূরে,
আমি শুধু হালকা হয়ে যাব।

মৃত্যু তখন কোনো শত্রু হবে না,
সে হবে দীর্ঘ ক্লান্তির শেষে
একটি শান্ত আলো-ঘর,
যেখানে প্রশ্ন নেই, নেই আর ফেরার তাড়া।

জ্যোৎস্নার স্রোতে ভেসে যাবে আমার ছায়া,
তারারা চিনে নেবে আমাকে আপন করে,
আমি মিলিয়ে যাব নক্ষত্রের নিঃশব্দ গানে-
থেকে যাবে শুধু স্মৃতির মৃদু কম্পন,
আর পৃথিবীর বুকে আমার অনুপস্থিতির শান্তি।


২৩.       সুরভীর স্পর্শ 


আমার জামায় ছুঁয়ে আছে তোমার শরীরের 
মধুরিমা, আশ্চর্য কিছু সুরভী,
অদৃশ্য আলিঙ্গনে ভিজে আছে প্রতিটি সুতো, 
প্রতিটি স্মৃতি।

তুমি চলে গেলেও, তবু তোমার উষ্ণতা
রয়ে যায় আমার বুকের কাছাকাছি, 
নিঃশব্দ আগুন হয়ে।
এই জামা জানে তোমার নীরব হাসি,
জানে লাজুক ঘ্রাণ, জানে ক্ষণিক স্পর্শের ইতিহাস।

হাওয়ায় দুললে মনে হয়, তুমি পাশেই দাঁড়িয়ে,
চুল সরিয়ে বলছো- 'আমি আছি, ভয় নেই।'
আমি জামাটা গায়ে জড়াই, আর রাত গভীর হয়,
তোমার সুরভীতে ভরে ওঠে নিঃসঙ্গতা।

এই তো ভালোবাসা, স্পর্শ না করেও ছুঁয়ে থাকা,
চলে গিয়েও কাছে থেকে গেছ।


২৪.      সুবাসিত রমণী


এত সুন্দর সুবাস, কোন রমণীর গা থেকে 
ভেসে আসে রাতের নিবিড় অন্ধকার চিরে?
চাঁদের আলো থেমে যায় নাকে এসে,
শ্বাস নিলেই বুকের ভেতর
অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে।

এই গন্ধে আছে
ভেজা চুলের গোপন দীর্ঘশ্বাস,
অর্ধখোলা ব্লাউজের ভাঁজে লুকোনো
উত্তপ্ত দুপুরের স্মৃতি।

জুঁই, চন্দন আর ঘামের মাঝখানে
একটি শরীর নীরবে কথা বলে।
রাত যত গভীর হয়, গন্ধ ততই সাহসী হয়ে ওঠে,
সে আর শুধু ফুল নয়, সে যেন শরীরের ভাষা, নখের আঁচড়,  ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যাওয়া অধীর চুম্বন।

আমি চোখ বন্ধ করি, কিন্তু গন্ধ আমাকে খুলে দেয়, একটি রমণী দাঁড়িয়ে থাকে অদৃশ্য আলোয়,
তার শরীর জুড়ে রাতের রাজত্ব,
আর আমি নিঃশব্দে হেরে যাই সুবাসের কাছে।


২৫.      চেনা মুখ 


এই মুখ অনেক চেনা, অস্পষ্ট কোনো 
স্মৃতির মতো, চোখে চোখ রেখে কিছু না বলেই 
একদিন  হেঁটে চলে গিয়েছিল সময়ের 
উল্টো দিকে।

পথের উপর তাকে দেখেছিলাম,
ধুলো আর আলোয় মিশে থাকা একদণ্ড উপস্থিতি,
ঠিক পথের প্রান্তেই মুছে গিয়েছিল তার রেখা,
যেন মানচিত্র ভুল করে রেখে গেছে ।

আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ক্ষণিক মুহূর্ত-
পথ তখন প্রান্ত খুঁজছিল, 
একটিই প্রশ্ন- সে কী ছয়ামূর্তি তবে, উত্তর নেই - 
ওই চেনা মুখ, মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে।


২৬.     ঘাসের ঘটনা 


দীঘির পাড়ে ঘাসের উপর চাঁদের আলোয় 
শয্যা পেতেছিল এক কুমারী মেয়ে,
চোখে মুখে আকুল করা ভালোবাসার জোর,
সে সেই রাতে মা হতে চেয়েছিল।

কিন্তু সেটি ছিল একটি দুঃখের গল্প,
যে গল্পটি কেউ জানে না,
ঐ মেয়ের সমস্ত সম্ভ্রম সেই রাতে ভুলুণ্ঠিত হয়েছিল চোখের জলে।

চাঁদ তখনও নির্বাক ছিল,
ঘাস জানত না কোন দোষে ভিজছে তারা,
দীঘির জল কাঁপছিল অকারণ লজ্জায়,
আর বাতাস বয়ে আনছিল ভাঙা নিঃশ্বাস।

ভালোবাসা সেদিন আসেনি হাত ধরে,
এসেছিল মুখোশ পরা নিষ্ঠুরতা,
স্বপ্নের গর্ভে ঢুকে হিমশীতল নীরবতা রেখে গেছে।

সে মেয়ে এখনো হাঁটে, কিন্তু পায়ের শব্দ নেই,
হাসে কিন্তু চোখের ভেতর রাত জমে থাকে।
তার দুঃখের গল্প কেউ শোনে না,
সমাজ কান পেতে শোনে শুধু তার নিঃশব্দ
চিৎকার।


২৭.      বন্ধুত্বের পঞ্চাশ বছর


পঞ্চাশ বছর! কী আশ্চর্য শব্দ,
সময় এখানে সংখ্যা নয়,
এ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে
আমাদের যৌবনের আনন্দ বেদনা।

ক্লাসরুমের কাঠের বেঞ্চে গোপনে লেখা 
প্রিয় সহপাঠীর নামগুলো
আজও কি হৃদয়ে শিহরণ তোলে? 
খাতার ভাঁজে লুকোনো কবিতা,
ক্যান্টিনের চায়ের ধোঁয়ার ভেতর
রাজনীতি, প্রেম আর বিপ্লবের তর্ক—
সবাই যেন আজও অপেক্ষায় ছিল
এই পুনর্মিলনের।

চুলে রুপালি চাঁদ নেমেছে,
চোখের কোণে জমেছে বহু বর্ষার রেখা,
তবু একে অপরকে দেখামাত্র
আমরা আবার সেই আগের আমরা-
যাদের স্বপ্ন ছিল অদম্য,
যাদের রাত ছিল দীর্ঘ,
আর ভবিষ্যৎ ছিল অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল।

কেউ হারিয়েছে শহর, কেউ দেশ,
কেউ হারিয়েছে প্রিয় মানুষ,
তবু বন্ধুত্ব, এই একমাত্র ঠিকানা
কখনও বদলায়নি।

সময়ের নদী ভেঙে গেছে বহু পাড়,
কিন্তু এই সেতু ভাঙেনি।
আজ হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালে
শুনতে পাই হারানো দিনের ডাক-
“এই তো, দেরি করিস না,
ক্লাস শুরু হয়ে যাবে!”

আর আমরা হাসি, নিজেদেরই বয়স দেখে নয়,
নিজেদেরই বেঁচে থাকা দেখে।
বন্ধুত্বের পঞ্চাশ বছর মানে শুধু অতীত নয়,
এ এক সাহসী অভিজ্ঞান,
সব হারালেও কিছু সম্পর্ক সময়কে হার মানায়।

আজকের এই মিলনমেলায় আমরা 
প্রতিজ্ঞা করি নীরবে—
যতদিন শ্বাস, ততদিন স্মৃতি,
আর যতদিন স্মৃতি, ততদিন আমরা বন্ধু। 

তারিখ - ৫/১/২০২৬ ইং
ঢাকা। 


২৮.      রাত্রি


রাত্রি, তোমাকে আমার ভালো লাগে
দিনের সমস্ত ক্লান্তি যখন চোখ বুজে পড়ে,
তখন তোমার নীরব হাত
আমার কপালে ছুঁয়ে দেয় শান্তির চিহ্ন।

অন্ধকারের ভেতর তুমি ভয় নও,
তুমি তো আলো লুকোনো এক গোপন প্রতিশ্রুতি,
তারাদের চোখে চোখ রেখে
আমাকে একা থাকতে শেখাও।

দিনের কোলাহল ভেঙে
তুমি দাও নিঃশব্দের আশ্রয়,
আমার না বলা কথাগুলো
তোমার বুকেই সবচেয়ে নিরাপদ।

রাত্রি, তোমাকে আমার ভালো লাগে,
কারণ তোমার মধ্যেই আমি নিজেকে পাই
সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য করে।


২৯.      তুমি দেখে যাও 


তুমি ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আসো,
রাস্তা থেকে আমার ঘরে,
দু’দিকের দূরত্ব ভাঙে তোমার পায়ের শব্দে।

তবু তুমি কি দেখো
ঘরের কোণে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস?
আমার যন্ত্রণা পড়ে থাকে
খোলা রাস্তার ধুলোয়,
নিভে যাওয়া বাতির কালো ছায়ায়।

তুমি এসে বসো,
চোখ বুলিয়ে যাও দেয়ালের ছবি,
বুকের ভেতর যে আর্তনাদ নীরবে রক্তক্ষরণ করে।
সে কি তোমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে?

তুমি যাতায়াত করো অবলীলায়,
ঘর আর রাস্তার মাঝখানে,
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি একটাই প্রশ্ন নিয়ে,
তুমি দেখে যাও, নাকি শুধু দেখে 
যাওয়ার ভান করো?


৩০.     এক্স প্রেমিক


আমি তোমার এক্স প্রেমিক
অতীতের পরতে পরতে আটকে থাকা এক নাম,
যাকে এখন উচ্চারণ করো
নির্লিপ্ত এক নিঃশ্বাসে।

তোমার নতুন হাসির পাশে
আমার স্মৃতি কেবল ছায়া,
একটা পুরোনো গান, যার সুর জানো,
কিন্তু আর গাও না।

আমি দেখেছি তোমার চোখে
ভবিষ্যতের আলো,
সেই আলোয় আমি ছিলাম না
তবু একদিন
আমি ছিলাম তোমার রাত।

এখন তোমার আঙুলে অন্য কারও স্পর্শ,
আমার জন্য পড়ে থাকে অনাহুত মায়া,
আমি তোমার এক্স প্রেমিক, এখন কেউ না
এখন শুধু কিছু অসমাপ্ত বাক্য
আর ভালোবাসার ব্যর্থ ইতিহাস।


৩১.     অথৈ স্বপ্ন


স্বপ্নগুলোও এখন আর ভালো দেখি না
পরিযায়ী পাখিরা ডানা মেলে  উড়ে যায়
নীলিমার গভীরে, 
মিলিয়ে যায় তারা নামহীন গন্তব্যে।

রাতের আকাশ ভেঙে পড়ে 
সাগরের জলোচ্ছ্বাসে সারা পৃথিবী ডুবে যায় 
একটানা কান্নায়,
ঘর, পথ, স্মৃতি—সব ভেসে যায়,
শুধু ভয় আর নিঃশ্বাসের লড়াই রয়ে যায়।

আমি অথৈ জলে হাবুডুবু খাই,
কোনো তীর নেই, কোনো আলোর রশ্মি নেই,
প্রার্থনাগুলোও শূন্যে উড়ে যায়,
হাত বাড়ালেই কেবল শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতা। 

তবু এই ডুবে যাওয়ার মাঝেই
আমি আঁকড়ে ধরি আলোনঝলমল সকাল,
হয়তো কোনো এক ভোরে স্বপ্নেরা আবার ফিরবে,
ভেজা ডানা মেলে আমাকে ভাসিয়ে নিতে।



৩২.     কোনো বন্ধু নেই 


তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই
এই সত্যটা প্রতিদিন নতুন করে ব্যথা দেয়।
ভিড়ের শহরে দাঁড়িয়ে থাকি নির্বাক,
সব মুখের ভিড়ে তোমার মুখটাই খুঁজি শুধু।

তুমি ছিলে আমার অর্ধেক বলা কথা,
অপূর্ণ বাক্যের শেষ যতিচিহ্ন,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা কান্না
তোমার কাছেই এসে হতো নির্ভয়।

আজ কেউ জিজ্ঞেস করে না-কেমন আছি,
কেউ শোনে না দীর্ঘ নীরবতার ভাষা।
রাতগুলো তাই তোমার নামেই ডুবে যায়,
তারারাও যেন আমাকে চিনতে ভুলে যায়।

তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই,
এই একাকীত্বই এখন বুকের ভিতর বাসা বেঁধেছে।
তবু প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি,
যদি কোনো একদিন তুমি আবার বন্ধু 
হয়ে ফিরে আসো।


৩৩.     স্মৃতির মায়াজাল


কিছু স্মৃতি একজীবন বেঁচে থাকে হৃদয়ের গোপন ঘরে,
তারা যায় না মুছে বরং নীরবে শেকড় ছড়ায় ভেতরে।
হাসির চেয়েও তারা ভারী, আনন্দের চেয়েও গভীর,
অদেখা এক বেদনার মতো বুকের ভেতর স্থির।

যে মুহূর্তগুলো একদিন আলো ছিল,
আজ তারা ছায়া হয়ে নামে সন্ধ্যার নীল।
চেনা গন্ধ, পুরোনো গান, হঠাৎ দেখা কোনো পথএ,
সবাই মিলে ডেকে তোলে হারিয়ে যাওয়া অতীতের রথ।

স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর সে কাঁদে না, কাঁদায়,
হালকা ছোঁয়ায়ও বুকের ভিতর ঝড় লাগায়।
তবু মানুষ স্মৃতিকে তাড়ায় না দূরে,
কারণ দুঃখের মাঝেও সে ভালোবাসার চিহ্ন রেখে যায় চুপে।

হঠাৎ কোনো গান, কোনো গন্ধ
বুকের ভেতর খুলে দেয় শোকের দরজাখানা।
যে দিনগুলো একদিন আলো ছিল,
আজ তারা ক্লান্ত ছায়া, হাসির মুখোশ খুলে
চুপচাপ বসে থাকে চোখের জলে ভেজা বিকেল।

শেষমেশ বুঝি এই দুঃখই আমাদের করে মানব,
স্মৃতির ভার নিয়েই তো এগিয়ে যায় জীবন অবিরাম।
কিছু স্মৃতি তাই দুঃখ হয়ে থেকেও অমূল্য,
এই স্মৃতি নিয়েই আমরা গভীরভাবে বেঁচে থাকি।


৩৪.      দ্রোহী হও 


আমাকে তুমি পাবে না বালিকা, প্রেমে তুমি 
যতই দ্রোহী হও
আমি সেই নদী নই যে ডাক দিলেই 
তটে এসে ভাঙে,
আমি শিখেছি ফিরতে, শিখেছি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে,
তোমার আগুনে হাত পুড়িয়েও নির্বাক 
দাঁড়িয়ে থাকতে।

তুমি বলো, ভাঙবে নিয়ম, ভাঙবে দূরত্বের দেয়াল,
আমি জানি, কিছু দেয়াল ভাঙলে আকাশও ভেঙে পড়ে।

তোমার চোখে যে ঝড়, তা আমার বুকে 
এসে থামে না,
আমি এখন নিঃশব্দের পক্ষপাতী, 
শান্তির সহোদর।

আমাকে তুমি পাবে না, যত চিঠি 
লেখো অভিমানে,
যত রাত জাগো নাম ধরে, যত গান 
গাও ডাকে।

আমি হারিয়ে গেছি নিজেরই নির্জন মানচিত্রে,
যেখানে প্রেম মানে দূরে থাকা, 
ছুঁয়ে না ছোঁয়ার শপথে।
তবু জেনে রেখো, তোমার দ্রোহের 
প্রতি রইল শ্রদ্ধা,
সব ভালোবাসা পাওয়া হয় না হলেও 
তার মাহাত্ম্য অসীম।


৩৫.     তোমার স্বপ্ন চাই 


আমি তোমার শরীর চাই না, আমি তোমার স্বপ্ন চাই,
যে স্বপ্নে ভোরের আলোয় তুমি নিজের নাম খুঁজে পাও।
আমি চাই না রাতের তাড়াহুড়ো, উষ্ণ স্পর্শের দাবি,
আমি চাই তোমার দীর্ঘশ্বাসে লুকোনো অনুচ্চারিত কথা।

আমি চাই তোমার চোখের ভেতর জমে থাকা দূর আকাশ,
যেখানে ক্লান্তির পরে একটু ভর দিয়ে বসা যায়।
আমি চাই তোমার ভয়ের হাত ধরে হাঁটার সাহস,
ভেঙে পড়লেও যেন আমাকে পাশে পাও।

আমি তোমার ঠোঁট নয়, তোমার নীরবতা ভালোবাসি,
যে নীরবতায় জমে থাকে হাজার অনুচ্চারিত গান।
আমি তোমার শরীর চাই না, আমি তোমার স্বপ্ন চাই—
যেখানে আমি কেবল প্রেম হয়ে থাকি, কোনো অধিকার হয়ে নয়।


৩৬.       সেদিন বিকাল বেলা

সেদিন বিকাল বেলা,
রোদটা হঠাৎ নরম হয়ে এসেছিল,
গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে
আলোরা যেন ধীরে ধীরে নামছিল মাটিতে।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সময়টুকু
হঠাৎ থমকে গিয়েছিল,
চায়ের কাপে ধোঁয়ার মতো
কিছু না বলা কথা ভেসে উঠেছিল বাতাসে।

তুমি এসেছিলে খুব সাধারণভাবে,
কিন্তু বিকালটা আর সাধারণ থাকেনি;
তোমার চোখে লুকোনো ছিল
অজানা দূরত্ব আর ফেরার ইচ্ছে।

পাখিরা ডানায় ভর দিয়ে ফিরছিল নীড়ে,
আর আমাদের মাঝখানে
একটি বিকাল বসে ছিল চুপচাপ,
জানত এই মুহূর্ত আর ফিরে আসবে না।

সেদিন বিকাল বেলা,
দিনটা সন্ধ্যার দিকে হেলে পড়েছিল,
আর আমি শিখে নিয়েছিলাম,
কিছু বিদায় আলোতেই লেখা হয়।


৩৭.     রাত নামে শহরে


রাত নামে শহরে, আঁধার নামে তার সঙ্গে আজও পূর্ণ চন্দ্ররাতে
তুমি কি এখনও সেজে আছো?

নীরব রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো
হেলে পড়ে ক্লান্ত ছায়ার কাঁধে,
জানালার ফাঁকে জমে থাকে অচেনা অপেক্ষা,
ঘড়ির কাঁটাও যেন ধীরে হাঁটে তোমার নাম ধরে।

রাতের এই নিরালে
কত ভালোবাসাই যে বাসতে ইচ্ছে হয়,
চাঁদের ঐ আড়ালে
লুকিয়ে রাখা কথা, না বলা স্পর্শ,
অধরা সব স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

হাওয়ার গায়ে লেগে আসে তোমার গন্ধ,
শহরের বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে স্মৃতির আলো,
এই অন্ধকারেও চোখ বন্ধ করলে
দেখি, তুমি দাঁড়িয়ে আছো রুপোলি নীরবতায়।

আজও কি জানালায় বসে আছো তুমি,
চাঁদের দিকে তাকিয়ে, আমাকেই ভেবে?
রাত গভীর হলে শহর ঘুমিয়ে পড়ে,
জেগে থাকে শুধু-
আমার বুকভরা ভালোবাসা আর তোমার অদৃশ্য অপেক্ষা।


৩৮.      অচেনা প্রসন্ন মুখ 


নীরবতার গহ্বরে যখন নিজেরই ছায়া 
ভারী হয়ে আসে,
চারদিক জুড়ে থাকে শুধুই একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস,
ঠিক তখনই, অচেনা এক প্রসন্নমুখ
নীরব পদধ্বনিতে এসে পাশে দাঁড়ায়।

সে কিছু বলে না,
তার চোখে থাকে আশ্বাসের আলো,
হালকা হাসিতে ভেঙে যায়
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকার।

হয়তো সে বন্ধু,
হয়তো স্মৃতি, কিংবা নিছকই এক মানবিক স্পর্শ, তবু তার উপস্থিতিতে বুঝে যাই,
আমি একা নই এই পথচলায়।

যখনই ভেঙে পড়ি,
যখনই নিঃসঙ্গতার দরজা বন্ধ হয়ে আসে,
ঠিক তখনই কেউ একজন
নীরবে এসে পাশে দাঁড়ায়, আর আমার বিষণ্ণতার মুখচ্ছবি অলক্ষ্যে হয়ে ওঠে প্রসন্নময়।


৩৯.       আমরা মিশিনি


আমরা মিশিনি উন্মত্ত হয়ে অথৈ জোৎস্নায়,
চাঁদের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিইনি রাতে।
আমরা উড়িনি মুক্ত ডানায় লক্ষ তারার নীড়ে,
নীল আকাশের বুক চিরে দুঃসাহসী স্বপ্ন আঁকিনি।
আমরা ভাসিনি বুঁদ হয়ে স্বেদ জলে
দেহের উত্তাপে পৃথিবী কাঁপাইনি এক মুহূর্তে।

তবু আমাদের ক্ষণগুলো ছিল,
নীরব অথচ দীপ্ত,
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের কবিতার মতো গীতিময়।
অল্প কথায় গভীর, চোখের চাহনিতে সম্পূর্ণ।

আমরা বসেছিলাম বিকেলের শেষ রোদে,
দুটি ছায়া লম্বা হয়ে পাশাপাশি হাঁটছিল।
কোনো প্রতিজ্ঞা ছিল না,
তবু সময় থমকে শুনছিল আমাদের নীরবতা।

তুমি একবার হাসলে, আর সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল আমার সমস্ত দিনলিপিতে।
আমি একটুখানি থামলাম,
তোমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
নিজেকে চিনে নিতে।

আমাদের ভালোবাসা ছিল সংযত দীপশিখার মতো, ঝড় ডেকে আনেনি,
তবু অন্ধকারকে ভয় দেখিয়েছে।
কোনো উচ্চারণ ছাড়াই হৃদয়ের পাতায় লিখে গেছে অক্ষয় কিছু পঙ্‌ক্তি।

আজও সেই ক্ষণগুলো হঠাৎ এসে দাঁড়ায়,
চা-কাপের ধোঁয়ায়,বিকেলের জানালায়,
অথবা অকারণ কোনো গানে।

আমরা বড়ো কিছু হইনি, তবু অল্প হয়ে থেকেও অম্লান রয়ে গেছি,
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকার মতোই সময়ের মুঠোয় ধরা একটি চিরন্তন মুহূর্ত।


৪০.     স্বৈরিণী 


তুমি স্বৈরিণী নও, ময়ুরাক্ষীও নও,
তুমি প্রেমিকা,
যার চোখে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে,
যার নীরব দৃষ্টিতে শরীর নয়,
আগে কেঁপে ওঠে আত্মা, আমরা দু’জনেই প্রেমে অনাহারী।

তোমার আঙুল যখন আমার কবজিতে নামে, তা কোনো শাসন নয়,
তা এক নিঃশব্দ আমন্ত্রণ।
আমার নিঃশ্বাস যখন তোমার কানের কাছে
অল্প কেঁপে ওঠে, তা লালসা নয়
তা বহুকালের জমানো আকুলতা।

আমরা ভালোবাসি সেই প্রেম, যে দেহে দেহে উৎসব করে, ভিতরে আগুন জ্বালায়,
কিন্তু চোখে চোখে রেখে দেয় অগাধ বিশ্বাস,
যে প্রেম স্বর্গ হলে লজ্জা পায় না,
আর নরক হলে অনুতপ্ত হয় না।

তোমার শরীর আমার কাছে যুদ্ধক্ষেত্র নয়,
আমার শরীর তোমার কাছে রাজ্যও নয়,
এ দু’টি কেবল দুটি তৃষ্ণার নদী,
যারা মিলতে চায় মোহনায়।

তাই তুমি স্বৈরিণী নও, আমিও 
কেবল পুরুষ নই 
আমরা এক যুগল প্রেমবুভূক্ষু প্রাণ,
যারা জানে ভালোবাসা মানে দখল নয়,
ভালোবাসা মানে সমর্পণ, সমান উত্তাপে,    সমান দাহে।


৪১.     পাশাপাশি হাঁটি 


সে আর আমি পাশাপাশি হাঁটি
কারণ আমাদের জন্য পথ বেঁধে দিয়েছে
এক বন্ধনহীন গ্রন্থি-
না নাম আছে তার, না নিয়ম,
শুধু স্পন্দন, অদৃশ্য, অথচ অনিবার্য।

আমরা হাঁটি নীরবতার ভেতর দিয়ে,
পায়ের শব্দে শব্দ জমে না,
মাঝখানে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই,
তবু বাতাস জানে আমরা একসঙ্গে চলেছি।

তারপর আর কী থাকে?
থাকে শুধু অন্ধকার-
যেখানে চোখের চেয়ে হৃদয় আগে দেখে ফেলে,
যেখানে আলো না থাকলেও
স্পর্শের মানচিত্র আঁকা থাকে।

মুখোমুখি বসিবার সেই ক্ষণ,
দু’টি চেয়ারের দূরত্বে
সময়ের সমস্ত প্রশ্ন জমে ওঠে,
কথা বলতে হয় না,
নিঃশ্বাসই হয়ে ওঠে ভাষা।

আমি তার চোখে দেখি
আমার অজানা ভাঙাচোরা স্বপ্নগুলো,
সে আমার দিকে তাকিয়ে
নিজের একাকীত্ব রেখে যায়
আমার কাঁধের কাছে।

আমরা জানি,
এই হাঁটা কোনো গন্তব্যে পৌঁছোবে না,
তবু পাশাপাশি হাঁটার মধ্যেই
জীবন তার গভীর অর্থ খুঁজে নেয়,
অন্ধকারের ভেতরেও
দু’জন মানুষের নীরব আলো জ্বলে ওঠে।


৪২.     স্মৃতি হয়ে যাব


একদিন সব স্মৃতির মায়া ভেসে যাবে জলে,
খড়কুটোর মতো আমিও একদিন ভেসে যাব-
নামহীন স্রোতে, অচেনা দিকে।

যে মুখগুলো একদিন আশ্রয় ছিল,
যে কথাগুলো বুকের ভেতর আগুন জ্বালাতো,
সবই ধীরে ধীরে জলছাপ হয়ে মুছে যাবে।

আমি থাকব না কোনো কোলাহলে,
থাকব না কোনো অপেক্ষার ঘরে-
শুধু নিঃশব্দ ভাসমান এক অস্তিত্ব,
জল আর আকাশের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া।


৪৩.    পূর্ব নাম 


তুমি আর আমাকে ডাকো না পূর্ব নাম ধরে,
যে নামটি তুমি রেখেছিলে শুধু আমাকে
ডাকার জন্য, সে নাম এখন বাতিল চিঠির মতো,
ঠিকানা আছে, প্রাপক নেই।

সব আজ বিষণ্ণ অতীত, তুমি ভুলে গেছ 
সেই নাম, অথচ আমি এখনও থমকে যাই
যখন হঠাৎ কেউ ডাকে, মনে হয় তুমি।

সে নামের মধ্যে ছিল অপরাহ্ণের রোদ,
চায়ের কাপে জমে থাকা নীরবতা,
আর দু’জনের মাঝে গোপন হাসি।

এখন নামহীন হয়ে ঘুরি আমি,
ভিড়ের ভিতর একা, শব্দহীন পরিচয়ে 
বেঁচে থাকা মানুষ।

ডাকবে না বলেই জানি, তবু রাতে ঘুম ভাঙে,
মনে হয়, হয়তো আজ তুমি পুরনো অভ্যাসে
একবার শুধু নামটা ধরে ডাকবে।


৪৪.     নতুন ভোর 


এই আঁধার কেটে যাবে, আসবে নতুন ভোর,
ভাঙা স্বপ্নের ছাই থেকে জ্বলে উঠবে রোদ্দুরের ঘোর।
যে রাত আজ বুকের ভেতর জমিয়েছে দীর্ঘ শীত,
তারই শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে আছে আলোর সঙ্গীত।

ক্লান্ত পথিকের চোখে জমে থাকা যত অশ্রু-রেখা,
ভোরের শিশির ছুঁয়ে দেবে, সুখের সব স্বপ্ন দেখা।
হারিয়ে যাওয়া নামগুলো, ব্যর্থতার সব দাগ,
নতুন সকালে কপালে লিখবে নতুন কোনো রাগ।

এই আঁধার চিরকাল নয়, যতই হোক গভীর,
সময়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকে আশার বীজ স্থির,
আজ না হোক কাল, তবু বিশ্বাস রেখো মন,
আঁধার কেটে যাবে ভোর আসবেই একদিন।


৪৫.     আলোকবর্তিকা 


তুমি আঁধার রাতে প্রদীপ জ্বালাও আমার ঘরে,
তুমি নিজই হয়ে যাও আলো।
যখন সব শব্দ ক্লান্ত হয়ে যায়,
নীরবতার বুক চিরে তুমি এসে দাঁড়াও,
নিভে যাওয়া বিশ্বাসের সলতেটুকু
তোমার নিঃশ্বাসে আবার জ্বলে ওঠে।

আমি পথ হারাই অজানা ভয় আর প্রশ্নের ভিড়ে,
তুমি চুপচাপ হাত বাড়াও,
কোনো দিকনির্দেশ ছাড়াই
আমাকে ফিরিয়ে আনো নিজের কাছে।

বাইরে ঝড় হলে জানালার কাঁপুনি শোনা যায়,
ভেতরে তখন তোমার আলো,
স্থির, উষ্ণ, অবিচল।

অন্ধকার যত গভীরই হোক,
তোমার একফোঁটা উপস্থিতিই যথেষ্ট
রাত্রিকে সকাল করে তুলতে।
তুমি আলো,
আমার সমস্ত আঁধারের বিরুদ্ধে তুমি 
নিঃশর্ত এক আলোকবর্তিকা।


৪৬.     বন্ধু


আজকাল তোকে মনে পড়ে
একটা পুরনো গানের মতো
সুরটা চিনি,
কিন্তু কথাগুলো আর ঠিক মনে আসে না।

আমরা একসঙ্গে হাঁটিনি সব পথ,
তবু প্রতিটা মোড়ে
তোর ছায়াটা লেগে আছে
ভাঙা ইটের দেয়ালে, চা-স্টলের ধোঁয়ায়,
অসমাপ্ত কথার দীর্ঘশ্বাসে।

তুই জানিস, আমি খুব সহজে হাসি না,
আর কাঁদলে কাউকে ডাকি না
তবু ঠিকই তুই বুঝে যাস
কখন আমার বুকের ভেতর নীরবে জমে 
ওঠে অশ্রু।

অনেক রাত কেটেছে
আমাদের না-বলা কথায়
চাঁদের আলো জানালায় থেমে ছিল,
আর আমরা শুধু সময়ের শব্দ শুনেছি
দুইটা হৃদয়ের মাঝখানে।

জীবন আমাদের একই স্বপ্ন দেয়নি,
একই গন্তব্যও নয়,
তবু একটুকরো সময় দিয়েছে
যেখানে আমরা ছিলাম
অবিশ্বাস্য রকম সত্য।

বন্ধু,
হয়তো একদিন আমাদের দেখা কমে যাবে,
কথা ছোট হবে,
নাম ধরে ডাকাও থেমে যাবে 
কিন্তু বিশ্বাস কর তোর উপস্থিতি
আমার জীবনের পাতায়
চিরস্থায়ী দাগ হয়ে থাকবে।

কারণ কিছু মানুষ জীবনের গল্পে আসে না,
তারা গল্পটাকেই মানুষ হয়ে বাঁচিয়ে রাখে।
তুই ঠিক তেমনই, বন্ধু-
আমার জীবনের সবচেয়ে নীরব,
সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য অনুভব।

আজ চারপাশে এত মানুষ,
তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা,
কারণ তোর পাশে বসে নীরব থাকার মানুষটা
আর সহজে মেলে না।

বন্ধু,
যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি,
আমি আজও তোর নামটা মনে মনে ডাকি,
জানি তুই শুনবি না, তবু ডাকাটা থামে না।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও
চলে যায় না, তারা থেকে যায়
একটা অভ্যাস হয়ে, একটা ব্যথা হয়ে।

যদি কোনো এক সন্ধ্যায়
হঠাৎ দেখা হয়ে যায়,
আমরা হয়তো বলব- “অনেকদিন পর দেখা!”
তারপর আবার নীরব হয়ে যাব।
সেই নীরবতার মধ্যেই সব কথা থাকবে, 
আমাদের হারানো সময়, ফুরিয়ে যাওয়া স্বপ্ন,
আর না-বলা ভালোবাসা।

যদি জীবন আবার একটা সুযোগ দিত,
আমি নতুন করে কিছু চাইতাম না,
শুধু চাইতাম আরেকটা সন্ধ্যা, 
তোর পাশে বসে চুপচাপ হারিয়ে যেতে।

সেই সন্ধ্যার পর
আমি আর তোকে ডাকব না,
কারণ ডাকলে শূন্যতা আরও বড় হয়।


৪৭.      দূরত্ব 


একটুখানি ইশারা করলেই কেউ কেউ 
কাছে চলে আসে
চোখের কোণে অদৃশ্য ডাক,
নীরবতার ভিতরেও তারা শুনে ফেলে নাম।

আর কাউকে হাত ধরে টানলেও
সে কাছে আসে না,
দূরত্ব তখন মাপা হয় না পায়ে,
মাপা হয় অনীহা আর অনুপস্থিতিতে।

কাছাকাছি থাকা আর কাছে থাকা
এক জিনিস নয়,
একই ছাদের নীচে থেকেও
মানুষ কত সহজে প্রবাসী হয়ে যায়।

যে আসে ইশারায়,
সে বোঝে স্পর্শের আগেই হৃদয়ের ভাষা;
আর যাকে টানতে হয়,
সে অনেক আগেই চলে গেছে
নিজের ভেতরের কোনো দূর দেশে।

তাই আজ আর হাত বাড়াই না,
ইশারাও করি না কাউকে-
যে আসার, সে এমনিই আসে;
আর যে আসে না,
তার জন্য দূরত্বই হোক শেষ পরিচয়।


৪৮.    আমার না-থাকার উৎসব


আমি চলে গেলে কেউ কাঁদবে না,
আমার নামে টিপ পরবে না কেউ কপালে।
শূন্য উঠোনে বাতাস আসবে-যাবে,
নামহীন এক ছায়া হয়ে থাকব দেয়ালে।

কেউ আর বলবে না- 'ফিরে এসো, সন্ধ্যা নামছে।'
আমার অপেক্ষার বেঞ্চে
জমে থাকবে ধুলো, অবহেলা আর নীরবতা।

আমার ব্যবহৃত কাপটিতে
শেষ চুমুকের স্মৃতি শুকিয়ে যাবে,
ডায়েরির পাতায় অর্ধেক লেখা বাক্যগুলো
কারও চোখে আর প্রশ্ন তুলবে না।

আমি যে এতটা মানুষ ছিলাম,
এতটা নিঃশব্দে ভালোবেসেছিলাম,
সেই হিসেব কেউ রাখবে না,
ভালোবাসার খাতায় নামটা কেটে দেবে সময়।

আমার ঘরের জানালায় আলো জ্বলবে ঠিকই,
কিন্তু সে আলো আর আমাকে খুঁজবে না অন্ধকারে।
কেউ বুঝবে না, আমি চলে যাইনি অভিমানে,
আমি ফুরিয়ে গেছি ধীরে ধীরে,
অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার ক্লান্তিতে।

শেষমেশ আমি থাকব
কেবল একটি না-বলা কথার মতো,
যা কেউ শোনেনি কখনও-
তাই চলে গেলেও কাউকে কাঁদাতে 
পারল না।


৪৯.    দেখা হবে 


কবে কোন্ দিন কোন্ ছায়াপথে দেখা হবে 
বলে দাও,
নক্ষত্রের ঠিকানায় লিখে রাখি সেই সময়।

অচেনা আলোর ভিড়ে চিনে নেব তোমার ছায়া,
মহাকাশের নীরবতায় দু’টি নিঃশ্বাস-
একই কক্ষপথে এসে থামুক, এই প্রার্থনা।


৫০.     দুঃখী কবিতা 


আকাশ আজ ফুরিয়ে গেছে রঙহীনতায়,
বাতাস বইছে, তবু কোনো বার্তা আনে না।
মানুষে ভরা এই গ্রহে দিনলিপির প্রতিটি কাজ
অভ্যাসের মতো নিস্তেজ,
ক্লান্ত হাতের ঘড়ির কাঁটা ঘোরে শুধু।

পেছনে তাকালে স্মৃতি, পোড়া বালুর ঢিবি,
পায়ের ছাপ টেকে না সেখানে।
এখনের মাটি আরও কঠিন,
ফাটলের ভেতর দিয়ে
শুকনো দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে।

আগামীকালও যেন একই মরুপ্রান্তর,
দূরে দিগন্ত আছে, কিন্তু মেঘ নেই,
ছায়া নেই,
নেই সন্ধ্যার নরম আলো
আর আঁধারের মৃদু আশ্রয়।

তবু বুকের গভীরে
একফোঁটা জল জমে থাকে
অচেনা, অনুচ্চারিত।
হয়তো কোনোদিন
এই ঊষরতার মাঝেই
একটি সবুজ অক্ষর জন্ম নেবে।

তবু বুকের গভীরে
একফোঁটা জল জমে থাকে না আর,
শুধু তৃষ্ণার স্মৃতি, অচেনা, অনুচ্চারিত।
হয়তো কোনোদিন এই ঊষরতার মাঝেই
কিছু একটা জন্ম নেবে,
সবুজ নয়, নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের মতো
আরও একটি দুঃখী কবিতা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন