শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

তার চোখের তারায় ( কাব্যগ্রন্থ)



তার চোখের তারায়  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  --

উৎসর্গ  -


১.   শূন্যতার ভিতর 


আমি চলে গেলে তোমার কাছে শূন্যতা থাকবে,
তোমার এই শূন্যতার ভিতর আমার আত্মার 
স্পন্দন রেখে গেলাম,
ক্লান্ত দুপুরের অবসাদে চুপিচুপি শুনতে পাবে আমার উপস্থিতির অস্তিত্ব।

তোমার জানালার পর্দা দুলে উঠলে ভেবো,
আমিই হয়তো বাতাস হয়ে ফিরে এসেছি -
অকারণে বইয়ের পাতা উল্টে গেলে
সেই অক্ষরের ফাঁকে লুকিয়ে থাকবে আমার 
কণ্ঠের অনুচ্চারিত শব্দরাশি। 

গোধূলির রঙ যখন আকাশে ঝরে পড়বে -
মনে হবে, আমার চোখের চেনা বিষণ্ণতা
রোদ্দুর থেকে ম্লান হয়ে সন্ধ্যার কপালে বসেছে,
তুমি হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে না,
তবু স্পষ্ট টের পাবে আমি তোমার খুব কাছে।

বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা নেমে এলে
তোমার উঠোনে যে গন্ধ জাগে,
সেটুকু মাটির ভেজা সুরে
আমার অপ্রকাশিত ভালোবাসা জেগে থাকবে।

রাত গভীর হলে, সবাই ঘুমিয়ে গেলে,
তোমার নিঃশ্বাসের ভেতর বাজবে আমার নাম -
হয়তো স্বপ্নে এসে বলব,
দেখো, চলে যাওয়া মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়।

তোমার শূন্যতার ভেতরেই পূর্ণ হয়ে থাকব,
অদেখা অথচ অনিবার্য এক উপস্থিতি হয়ে,
যতদিন তুমি একা বসে স্মৃতির দরজা খুলবে, 
ততদিন আমার অনুপস্থিতিই হবে তোমার 
সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী।


২.     প্রার্থনার আয়ু



আরও কুড়ি বছরের জীবন চাই
অতীতের অন্ধ গলিগুলোতে
যে ভুলের শেকড় পুঁতে রেখেছি নিজেই,
সেগুলো উপড়ে ফেলার মতো শক্তি চাই।

আমার গ্লানি ও ব্যর্থতার ধুলো
প্রতিদিন বুকের ওপর যে জমে থাকে,
তার বদলে এক মুঠো নির্ভার সকাল চাই,
একটুখানি নির্মল আত্মবিশ্বাস।

বঞ্চনার কাঁটা সরিয়ে
পূর্ণ প্রাপ্তির একটি সবুজ উঠোন চাই,
যেখানে সন্ধ্যা নামলে
হিসেবের খাতায় লাল কালির বদলে
নীল স্বপ্নেরা ফুটে উঠবে।

যা পাইনি, তার জন্য আর হাহাকার নয়,
যা পেয়েছি, তাকে ভালোবেসে
নতুন করে জীবন গড়ার অবসর চাই,
ভাঙা স্বপ্নের ইট দিয়েই
একটি ছোট্ট আশ্রয় বানাতে চাই আবার।

হে ঈশ্বর, এই দীর্ঘ প্রার্থনার ভেতর
শুধু বছর বাড়ানোর আকুতি নেই
আছে মানুষ হয়ে ওঠার সাধ -
আরও কুড়ি বছর দাও,
কিন্তু তার চেয়েও বেশি দাও
সাহস, সংযম, আর ক্ষমা করার মন।

যেন শেষ বিকেলে দাঁড়িয়ে বলতে পারি,
এই জীবন বৃথা যায়নি,
এই পৃথিবীতে আমারও একটি আলোকরেখা 
রয়ে গেছে।


৩.      নারী 


নারী মায়ের জাত,
নারী মানেই একটি আদিগন্ত আশ্রয়,
একটি অনন্ত স্নেহের নদী,
যার উৎসে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর জন্মকথা।

নারী মায়ের জাত,
সে কন্যা হয়ে ঘর ভরায় হাসিতে,
ভগিনী হয়ে রাখে বন্ধনের দীপ,
প্রেয়সী হয়ে শেখায় হৃদয়ের ভাষা,
আর মা হয়ে পৃথিবীকে দেয় ভবিষ্যৎ।

তার আঁচলে লুকানো থাকে নিরাপত্তার 
নীল আকাশ,
তার হাতের স্পর্শে মুছে যায় দুঃখের দীর্ঘ ছায়া।
অশ্রু ঝরে, তবু সে ভাঙে না,
কারণ তার ভিতর জেগে থাকে সহস্র সূর্যের সাহস।

যে নারী শস্য ফলায় মাঠে,
যে নারী কলম ধরিয়ে দেয় সন্তানের হাতে,
যে নারী রাত্রি জেগে রাখে পরিবারের স্বপ্ন,
তাদের প্রতিটি পদচিহ্নেই লেখা থাকে শ্রদ্ধার বাণী।

এসো, আমরা তাকে কেবল দিবসের 
ফুলে নয়,
প্রতিদিনের আচরণে সম্মান জানাই,
তার স্বাধীনতা, তার স্বপ্ন, তার অধিকারকে
নিজের মতো করেই ভালোবাসি।


৪.       শান্তি প্রশান্তি 


সঙ্গমের পর তার মুখে ছিল
অদ্ভুত এক শান্ত নীলাভ আলো,
যেন দীর্ঘ খরার শেষে
মাঠ ভরে ওঠা প্রথম বৃষ্টির জল।

কপালের ঘামে লেগে থাকা
অল্প কিছু এলোমেলো চুল,
ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত তৃপ্তির রেখা,
আমার নাম উচ্চারণ না করেও
যেন বহুবার ডেকে গেছে।

তার চোখ দুটি আধখোলা,
গভীর জলের মতো স্থির,
সেখানে আর কোনো দাবী নেই,
শুধু নরম স্বীকারোক্তি,
আমি তোমার ভিতরেই আছি।

বুকের ওঠানামা ধীরে ধীরে থামে,
দেহের উত্তাপ নেমে আসে মৃদু কুয়াশায়,
আর তার মুখচ্ছবিতে ফুটে ওঠে
এক অনাবিল প্রশান্তি -
যেন সমুদ্র ঝড় শেষে
নিজেই নিজের ঢেউকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমি তাকিয়ে থাকি,
তার চোখের কোণে জমে থাকা আলোয়
নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাই।

সেই মুহূর্তে প্রেম আর শরীর
দুই আলাদা স্রোত নয়, একই নদীর দুই তীর,
যেখানে আমরা পাশাপাশি শুয়ে
নীরবতার ভেতর সব শব্দকে থামিয়ে
আনন্দে মেতে উঠি।



৫.     কুড়ি বছরের অপেক্ষা 



এক তুমুল বৃষ্টির দিনে
জীবনানন্দ দাশ পড়ছিলাম,
“কুড়ি বছর পর যদি দেখা হয় আবার...”
জানালার কাঁচ বেয়ে নামছিল জলের অক্ষর,
মনে হচ্ছিল প্রতিটি ফোঁটা
তোমার নাম লিখে যাচ্ছে।

কুড়ি বছর কেটে গেছে সত্যিই
বৃষ্টিরা এসেছে, গেছে, শহরের পথ পাল্টেছে,
আমার চুলে নেমেছে অকাল শীতের ছায়া।
শুধু তুমি এলে না আর,
কোনো ভেজা দুপুরে, কোনো কুয়াশা-ঢাকা সন্ধ্যায়।

আমি ভেবেছিলাম, হয়তো হঠাৎ একদিন,
স্টেশনের ভিড়ে,
অথবা বইমেলার গন্ধমাখা বাতাসে,
তোমার চোখে চোখ পড়বে;
আমরা দু’জনেই চমকে উঠে বলব -
“এতদিন কোথায় ছিলে?”

কিন্তু সময় বড় নির্দয়, সে কাউকে ফেরায় না,
শুধু ভেতরে ভেতরে
একটা অনামা অপেক্ষা রেখে যায়।

আজও যখন তুমুল বৃষ্টি নামে,
আমি জানালার পাশে বসে থাকি,
মনে হয়, এই বুঝি তুমি এলে
ভেজা শাড়ির আঁচল গুটিয়ে,
হাসলে একটু, বললে -
“দেখো, কুড়ি বছর তো কেবল সংখ্যা;
ভালোবাসা তো কখনও পুরোনো হয় না।”

তবু দেখা হয়নি,
শুধু কুড়ি বছরের দীর্ঘ নীরবতা
আমার বুকের ভিতর একটি চিরভেজা 
বিকেল হয়ে রয়ে গেছে।


৬.      তার চোখের তারায়


তার চোখের তারায় আমি এক আকাশ দেখি,
সেখানে অগণিত নক্ষত্র জ্বলে,
কেউ নিভে যায় না সহজে,
কেউ আলো দেয় নিঃশব্দে, অবিরত।

তার চোখের ভেতর সন্ধ্যার মতো মায়া নামে,
দূরের বাঁশির সুরের মতো ডাকে,
আমি পথ ভুলে যাই,
তবু সেই ভুলে যাওয়াই হয়ে ওঠে আমার ঠিকানা।

কখনো তার চোখ ঝড় তোলে,
কালবৈশাখীর মতো অস্থির;
আবার কখনো শ্রাবণের ভেজা দুপুর,
অশ্রুজলের ভিতর নরম রোদের স্পর্শ।

আমি তার চোখের তারায়
আমার ক্লান্ত দিন রেখে আসি,
দুঃখের ভার নামিয়ে দিই নিঃশব্দে
সেখানে কেউ প্রশ্ন করে না,
শুধু ভালোবাসা জেগে থাকে অন্ধকারের ভেতরও।

যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই
সময়ের অচেনা ভিড়ে,
তার চোখের তারায় আমার নামটি যেন 
জ্বলতে থাকে একটি ছোট্ট আলো হয়ে,
তার হৃদয়ের আকাশে।


৭.      বক্সা রোডের বনবাংলো



স্টেশনটির নাম বক্সা রোড স্টেশন, বনের নিবিড়ে অদ্ভুত নির্জন -
দূরে পাহাড়ের কালো রেখা, কুয়াশার ভেজা শ্বাসে থমথমে গহন।

আমি আর মায়াবতী একরাত্রি ওখানে ছিলাম 
বন বিভাগের বাংলোয়,
ঝিঁঝিঁর ডাক আর অচেনা পাতার শব্দে ঘুম ভাঙত বারবার ভয়ও।

রাত নামতেই ট্রেনের লাইন নিঃশব্দ,
তবু মনে হতো কেউ যেন হেঁটে যায়, 
লোহার ওপর ধীর পা ফেলে।
হয়তো পুরোনো কোনো সিগন্যালম্যান,
অথবা পথ হারানো আত্মা, অন্ধকারে যার চোখ জ্বলে।

বাংলোর পেছনে শাল-সেগুনের অরণ্য,
হঠাৎ দূরে শোনা গেল হিংস্র গর্জন-
মায়াবতীর হাত শক্ত হয়ে এল আমার মুঠোয়,
বলল - ওটা কি বাঘ?
আমি জানালার ফাঁক গলে তাকালাম,
চাঁদের আলোয় এক ছায়া,
হয়তো চিতা, হয়তো কেবল ভয়।

বাতাসে কাঁচা রক্তের গন্ধ ভেসে এলো,
নাকি আমাদের কল্পনা?
বুনো হাতির দল কি পাশের ঝোপ ভেঙে এগোচ্ছে?
মাটি কেঁপে উঠল একবার -
তারপর নিস্তব্ধতা,
যেন জঙ্গল নিজেই শ্বাস আটকে শুনছে আমাদের হৃদস্পন্দন।

মাঝরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ,
টক্… টক্… টক্… খুলে দেখি কেউ নেই,
শুধু বারান্দার শেষে ভেজা পায়ের ছাপ,
যেন কেউ সদ্য নদী পেরিয়ে এসেছে।

দূরে শেয়ালের দীর্ঘ হাহাকার,
তারও ওপরে অদ্ভুত এক নারীকণ্ঠের কান্না,
মায়াবতী কেঁপে উঠে ফিসফিস করে বলল,
এই বনে নাকি এক ব্রিটিশ সাহেবের স্ত্রী
অপঘাতে মারা গিয়েছিল,
তার কান্না এখনো শোনা যায় পূর্ণিমায়।

আমাদের কেরোসিন বাতি দপদপ করে নিভে গেল,
অন্ধকারে কেবল তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা,
আর বাইরে অদৃশ্য চোখের দৃষ্টি।

ভোরের আগে শেষবার,
জানালার ধারে দুটো জ্বলন্ত বিন্দু,
কোনো বন্যপ্রাণীর চোখ?
নাকি সেই অশরীরী অপেক্ষা?

সূর্য উঠতেই সব স্বাভাবিক, পাখির ডাক, 
পাতার নড়াচড়া,
রাতের সব ভৌতিকতা যেন স্বপ্ন।

তবু আজও মনে হয়,
বক্সা রোডের সেই বনবাংলোয় আমরা 
একা ছিলাম না,
অরণ্য তার গোপন ইতিহাস নিয়ে
আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল
অন্ধকারের গভীর ভয়ংকর চোখে।


৮.     আত্মার উড়ান


আমি কবি হওয়ার জন্য লিখি না,
লিখি শুধু মনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে,
যে মন প্রতিটি সকালে  সূর্যের মতো
আমায় সুপ্রভাত জানায় আলোর অঞ্জলি তুলে।

আমার কষ্টরা পাথরের মতো জমে থাকে বুকে,
নিঃশব্দে ভারী করে রাখে শ্বাসের ভেতরটা,
তখন শব্দেরা এসে হাত রাখে কাঁধে,
বলে, লিখে ফেলো, তবেই হালকা হবে ব্যথা।

আমি লিখি বেঁচে থাকার জন্য,
ডুবে যেতে যেতে খড়কুটোর মতো
একটি পংক্তি আঁকড়ে ধরি -
তাতেই ফিরে পাই তীরের দিশা।

মানুষ মরে গেলে নাকি আত্মা আকাশে ভেসে যায়,
তারারা তাকে চিনে নেয় দূরের আত্মীয় ভেবে।

আমিও যদি যাই একদিন,
চাই না নিছক নক্ষত্র হয়ে ঝুলে থাকতে,
আমার আত্মা যেন বাজপাখির ডানায় ভর করে
নীল আকাশ চিরে নেমে আসে আবার,
আর কোনো এক নিঃসঙ্গ কবির বুকের ভেতর
তীক্ষ্ণ আলোর মতো গেঁথে যায়।

সে কবি হয়তো জানবেও না -
কেন হঠাৎ তার কলম কেঁপে উঠল,
কেন অকারণ ভিজে এলো তার চোখ,
কেন শব্দেরা ঝরে পড়ল বজ্রের মতো দীপ্ত।

সেই বজ্রের ভেতরেই থাকব আমি,
অমর কোনো নাম নয়,
শুধু এক টুকরো জ্বালা, এক টুকরো প্রেম,
যে প্রেম কবিতাকে ভালোবেসেছিল
নিজের সমস্ত নিঃশ্বাস দিয়ে।

আমি কবি হওয়ার জন্য লিখি না,
আমি লিখি, যেন আমার আত্মা
কবিতার ভেতরেই চিরকাল বেঁচে থাকে।


৯.      জন্মদ্বার


তুমি কোনো লজ্জার শব্দ নও,
তুমি আদিম অরণ্যের মতো গভীর,
অন্ধকারের ভিতরে লুকোনো প্রথম আলো।

তোমার উষ্ণ অন্ধকারে
একটি হৃদস্পন্দন প্রথম নিজেকে চিনতে শেখে,
একটি রক্তকণা ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে ওঠে,
মাংসের ভিতর স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়।

তুমি সৃষ্টি-নদীর উৎস,
যেখানে ব্যথা আর বিস্ময় একসাথে জাগে।
রক্ত, জল, আর কান্নার ভেতর দিয়ে
তুমি পৃথিবীকে উপহার দাও নতুন ভোর।

কত সহস্রাব্দ ধরে
মানুষের ইতিহাস তোমার পথ বেয়ে নেমে এসেছে
প্রতিটি নবজাতকের প্রথম চিৎকার
তোমার সহিষ্ণুতা আর সাহসের সাক্ষ্য।

তোমার ভিতরেই
মায়ের নিঃশব্দ প্রার্থনা জমা থাকে,
ভাঙা হাড়ের মতো যন্ত্রণাও থাকে,
তবু থাকে অদ্ভুত এক দীপ্তি
যা কেবল জন্ম দিতে জানে।

যোনি মানে শুধু শরীর নয়,
যোনি মানে উৎস, মানবতার দরজা,
অস্তিত্বের প্রথম আশ্রয়।

তুমি তাই গোপন নও, তুমি পবিত্র -
কারণ তোমার মধ্য দিয়েই
পৃথিবী বারবার নতুন করে শুরু হয়।


১০.      প্রতিশ্রুতি



অল্প ভালোবাসায় কাউকে আমি
আমার ভালোবাসা দান করি না,
এ ভালোবাসা ভিক্ষা নয়,
এ শুধু কপালে ছুঁয়ে বয়ে বেড়ানো এক পবিত্র স্পর্শ।

তুমি আরও বড়ো হও,
হৃদয়ের ভেতর যতটুকু আকাশ আছে
তার সবটুকু বিস্তার করো,
নিজেকে নদীর মতো উদার করো।

আমি দূর থেকে দেখি,
তোমার চোখে কতটা জোছনা জমে,
তোমার নিঃশ্বাসে কতটা সত্যের গন্ধ,
তোমার দুই হাত কতটা প্রার্থনায় ভেজে।

যেদিন তুমি আমাকে
অগাধ, নির্ভেজাল, নির্ভীক ভালোবাসা দেবে,
যেদিন তোমার ভালোবাসা হবে সমুদ্রের মতো গভীর,
আর আকাশের মতো সীমাহীন,
সেদিন আমি আর লুকোবো না।

নিজেই উন্মুখ হয়ে
আমার সমস্ত গোপন দরজা খুলে দেবো,
আমার সব অনুচ্চারিত কবিতা
তোমার বুকে মাথা রাখবে।

সেদিন আর কপালে নয়,
আমার ভালোবাসা তোমার হৃদয়ে বাসা বাঁধবে,
আর আমরা দু’জন একই স্বপ্নের ভেতর
একই আলোয় জেগে থাকবো।



১১.      চলে যাব সব ফেলে



চলে যাব সব ফেলে, এই অবগুণ্ঠিত নীলাকাশ,
জলে ভরা টইটম্বুর এই নদী, স্মৃতির বসতবাড়ি, শ্রাবণ কদম্ব ফুল।
রেখে যাব লুকিয়ে রাখা জীর্ণ প্রেমপত্র আর তোমাকে দেওয়া নাকফুল।

রেখে যাব জানালার কার্নিশে শুকিয়ে যাওয়া রোদ্দুর,
বালিশের নিচে গোপন দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতা,
চায়ের কাপের অসমাপ্ত বিকেল,
যেখানে তোমার ঠোঁটের দাগ আজও কাপে লেগে আছে।

চলে যাব, ঘরের ভেতর হালকা শব্দ হলে
তুমি ভাববে, আমি বুঝি পাশের ঘরে আছি,
আলমারির ভেতর ঝুলে থাকা আমার শার্টে
এখনও বুকের গন্ধ মিশে আছে কি না,
একবার হাত বুলিয়ে দেখবে।

রেখে যাব বৃষ্টিভেজা উঠোনে খালি পায়ের ছাপ,
অধোচোখে তাকানোর লাজুক অভ্যাস,
রাত গভীর হলে হঠাৎ বলে ওঠা, ঘুমিয়েছো?
আর উত্তর না পেয়েও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা।

চলে যাব সব ফেলে,
শুধু তোমার কপালের উপর একফোঁটা অনুচ্চারিত আলো রেখে
যেন অন্ধকার নামলেও তুমি টের পাও,
কেউ একসময় তোমাকে ভীষণ ভালোবেসেছিল।

আর যদি কোনোদিন শ্রাবণের শেষে
কদম্বের গন্ধ হঠাৎ বুক ভাসিয়ে দেয়,
জেনে নিও,
আমি দূর কোনো আকাশে দাঁড়িয়ে
তোমার নাম উচ্চারণ করছি।



১২.      ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী 



ভরা নিশীথে তোমায় ভাবলে
আমার বুকের ভেতর কেমন এক কাঁপুনি জাগে,
যেন অন্ধকারেরও আছে হিংসা,
সে তোমায় আমার থেকে চুরি করে নিতে চায়।

যদি কাছে টানতে গিয়ে তুমি
ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাও নিশ্বাসের আড়ালে?
যদি হঠাৎ সব তারা নিভে যায়
আর তোমার মুখখানি ডুবে যায় অচেনা ছায়ায়?

সে ভয়েই আমি হাত বাড়াই না,
শুধু আকাশের দিকে চেয়ে থাকি।
তাই বলি, এসো পূর্ণিমায় -
ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী,
এসো ধবল আলোর পশরা নিয়ে।

তোমার সাদা শাড়ির ঢেউ যেন
চাঁদের আলো ছুঁয়ে নদীর মতো ঝরে পড়ে
আমার নির্জন উঠোনে।
সে আলোয় আমি পথ চিনে নেব,
চিনে নেব তোমার চুলের গন্ধ,
চোখের কোণে লুকোনো মায়া,
আর তোমার হাতের কম্পন।

অন্ধকারে হারানোর ভয় নেই তখন,
কারণ পূর্ণিমার আলোর মতো
তুমিই হবে আমার দৃশ্যমান প্রেম,
আমার নির্ভরতার আকাশ,
 সাদা শাড়িতে মোড়া চিরচেনা ভালোবাসা। 


১৩.      দরজার ওপাশে 


বিকেল কিংবা সন্ধ্যার সময়টা
কেমন অকারণ মনখারাপের হয়,
সূর্যের শেষ রঙটুকু জানালার ফাঁক গলে
শরীরে এসে থাকে,
আর মনে পড়ে যায় জীবনের অস্তমিত সময়।

আকাশের গায়ে তখন ধূসর চাদর,
পাখিরা ফিরে যায় নিজেদের নীড়ে,
শুধু আমার ভেতরেই কেউ একজন
ফিরে আসার পথ খুঁজে পায় না আর।

এমনই কোনো এক বিকেলে
দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিলে তুমি,
হাতের আঙুলে দ্বিধার কাঁপন,
চোখে এক অজানা অনুরোধের ধূসর  আলো।

আমি জানতাম, বলতে পারলেই
সমস্ত নিঃসঙ্গতা ভেঙে যেত,
তবু কী এক অদ্ভুত সংকোচে
বলিনি - এসো, ঘরের ভিতর।

তোমার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে সরে গেল,
সন্ধ্যা আরও গাঢ় হলো,
আমার ঘরের বাতাসে জমল
অকথিত আহ্বানের ধুলো।

এখন প্রতিটি বিকেলে দরজার 
কপাটে হাত রাখি,
ভাবি, যদি আবার ফিরে আসো,
এইবার দ্বিধা ভাঙবে কি?

সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে গেলে
আমি চুপচাপ বলি -
এসো, ঘরের ভিতর এসো,
আমার সমস্ত অন্ধকার তোমার জন্যই খোলা।


১৪.      অনুচ্চারিত ভালোবাসা 


আমিও তোমাকে কিছু বলিনি, তুমিও বলোনি, 
দুজনেই দেরি করে ফেলেছি,
বড়োই আফসোস হয়, যদি একটিবার সুযোগ পেতাম, 
কোথাও কোনো দীঘির পাড়ে দুজন সারা বিকেল বসে থাকতাম...

শাপলার পাতা ছুঁয়ে ভেসে যেতো আমাদের 
না-বলা কথারা,
জলের ভিতর ডুবে থাকত কাঁপতে থাকা স্বীকারোক্তি।
একটু বাতাস এলেই তোমার ওড়নার কোণে
আমার সমস্ত দ্বিধা জড়িয়ে যেত নিঃশব্দে।

সূর্য ডুবতে ডুবতে লাল হয়ে উঠত আকাশ,
আর সেই রঙে রঙিন হতো আমাদের অনুচ্চারিত ভালোবাসা।

তোমার আঙুলের পাশে আমার আঙুল
অকস্মাৎ ছুঁয়ে গিয়ে সরে যেত,
যেন অপরাধ করেছি, অথচ সে-ই ছিল একমাত্র সত্য।

আমরা হয়তো বলতাম না - ভালোবাসি,
শুধু চুপচাপ শুনতাম জলের শব্দ,
আর মনে মনে ভাবতাম -
এই নীরবতাই কি সবচেয়ে গভীর উচ্চারণ নয়?

হঠাৎ সন্ধ্যা নামত,
দূরে কোনো মসজিদের আজান ভেসে আসত ধূসর আলোয়,
আমরা দুজনেই একটু চমকে উঠতাম,
সময়ের কথা মনে পড়ে যেতো,
তবু কেউই উঠতে চাইতাম না।

যদি আরেকটু বসে থাকা যেতো!
যদি পৃথিবীটাকে থামিয়ে রাখা যেতো
এই এক বিকেলের ভিতরে!

আজ এতদিন পর ভাবি,
আমাদের দেরিটুকুই ছিল আমাদের নিয়তি,
তবু সেই দীঘির পাড়ে না-বসার আক্ষেপ
এখনও সন্ধ্যা হলেই বুকের ভেতর জলে ঢেউ তোলে।

আমিও বলিনি, তুমিও বলোনি
কিন্তু সেই না-বলার মাঝেই
একটি পূর্ণ প্রেম
আজও নীরবে জেগে আছে।



১৫.       স্বপ্নের অপূর্ণ আলোক



স্বপ্ন দেখি, নিশীথের অন্ধকারে,
যেখানে আকাশ ঝুঁকে পড়ে
আমার ক্লান্ত চোখের পাপড়িতে।

স্বপ্ন ভাঙে, ভোরের কাঁচা আলোয়
যেন হঠাৎ চমকে ওঠা পাখি,
ডানা ঝাপটে উড়ে যায় অচেনা আকাশে।

স্বপ্ন বৃষ্টিতে ভিজে,
শ্রাবণের অবিরাম ঝরে পড়া জলে
কাগজের নৌকার মতো
ধীরে ধীরে গলে যায় তার রঙিন শরীর।

স্বপ্ন স্তব্ধবাক হয়,
অপ্রকাশিত কথার ভারে
ঠোঁট সেলাই করা কোনো ব্যথার মতো
নিঃশব্দে বসে থাকে জানালার ধারে।

জোনাকির ক্ষুদ্র ডানার নিচে
স্বপ্ন হারায়,
অতিসামান্য আলোর প্রতিশ্রুতিতে
অন্ধকারই থেকে যায় অধিক আপন।

স্বপ্ন কখনোই আলো হয়ে জ্বলে ওঠে না,
তবু প্রতিরাতে আমি আবারও 
চোখ বুজে রাখি,
হয়তো কোনো এক অলক্ষ্যে
অদেখা সূর্যের ভিতর আমারই একটি স্বপ্ন
অগ্নিশিখা হয়ে উঠবে একদিন।


১৬.    ট্রয়ের ভস্ম


মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি ভেনাস-ক্লিওপেট্রার চেয়ে বেশি সুন্দর,
মনে হয় দেবী আফ্রোদিতিও তোমাকে দেখে 
হিংসা করে,
মাঝে মাঝে মনে হয়, কবে না জানি তুমি হেলেনের মতো আমার ট্রয় নগরী ভেঙে দাও।

তোমার চুলে যেন ভেনাস-এর সমুদ্রফেনা,
তোমার চোখে লুকিয়ে আছে ক্লিওপেট্রা-র গোপন মায়া,
আর ঠোঁটের বাঁকে সেই আদিম প্রলোভন
যা একদিন আফ্রোদিতি-র আয়নাকেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

তুমি যখন ধীরে হেসে ওঠো,
মনে হয় ইতিহাসের সমস্ত যুদ্ধ থেমে যায় -
কিন্তু আবার ভয়ও জাগে,
যদি তুমি হও সেই হেলেন,
যার একটিমাত্র দৃষ্টিতে জ্বলে ওঠে
আমার অন্তরের গোপন ট্রয়।

তোমার পদচিহ্নে ধুলো হয় রাজ্য,
তোমার নীরবতায় ভেঙে পড়ে প্রাচীর,
তোমার অভিমানে সমুদ্র সরে যায় তীর থেকে
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি এক অসহায় সৈনিকের মতো,
শুধু তোমার প্রেমের পতাকা বুকে নিয়ে।

মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি কোনো নক্ষত্রলোকের রাণী,
ভুল করে নেমে এসেছ আমার এই মাটির গ্রহে,
তোমার কণ্ঠে শোনা যায় অদৃশ্য বীণার সুর,
তোমার ছোঁয়ায় জেগে ওঠে রক্তের ভেতর বসন্ত।

তুমি যদি একবার বলো - এসো,
আমি ইতিহাস ত্যাগ করে হবো কেবল প্রেমিক,
তুমি যদি একবার ফিরেও চাও,
আমি ট্রয়ের ভস্মে দাঁড়িয়ে গড়বো নতুন নগরী,
শুধু তোমার নামের ইট দিয়ে,
তোমার নিঃশ্বাসের সুরকি মেখে।

কারণ সত্যি বলতে কী -
ভেনাস, ক্লিওপেট্রা, আফ্রোদিতি, হেলেন,
সবাই কেবল উপমা, তুমি এলে তারা মিলিয়ে যায়,
আর আমার সমস্ত পৌরাণিক ভাঙন পেরিয়ে
শুধু একটাই সত্য জেগে থাকে -
সে তুমি।


১৭.      একদিন দুপুরে 


একদিন তপ্ত দুপুরবেলায় তুমি আগুন পলাশ বনে এসে দাঁড়াবে,
রাঙা পলাশের আবীর মাখবে তোমার গালে,
রোদে ঝলসে উঠবে তোমার লাজুক মুখ,
হাওয়ার ভেতর ভাসবে অচেনা এক দুরুদুরু স্পন্দন।

তোমার বুক দুরুদুরু,
অথচ চোখে ঝলমলে এক জ্যোৎস্নার স্বপ্ন,
আমার নামে কাজল দেবে চোখে,
ঠোঁটে মেখে নেবে গোপন আদরের আভা।

জুঁই ফুল দিয়ে তুমি চুলের বিনুনি গাঁথবে,
খোঁপায় গুজবে হলুদ গোলাপ,
আর সেই ফুলের গন্ধে মাতাল হবে চারদিক,
মনে হবে বসন্ত তার সমস্ত রঙ উজাড় করে
শুধু তোমারই পাশে এসে বসেছে।

তপ্ত বাতাস হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যাবে,
ছায়ারা এসে পায়ের কাছে লুটাবে,
দু’জনার নীরবতা গাছের পাতায় পাতায়
অকথিত প্রতিশ্রুতির মতো ঝরে পড়বে।

তুমি একটু এগিয়ে এসে বলবে না কিছুই,
শুধু চোখ রাখবে আমার চোখে,
সেখানে জ্বলে উঠবে আগুন পলাশের চেয়েও লাল বহুদিনের জমে থাকা অনুরাগ।

আমি তোমার কপালে আঙুল ছুঁইয়ে
দুপুরটাকে সন্ধ্যা করে দেবো,
আর রাঙা পলাশের নিচে আমাদের ছায়া দু’টি ধীরে ধীরে এক হয়ে যাবে
অবিরাম মায়ার গভীরে।


১৮.      বিনিময়ে ভালোবাসা



তুমি আমাকে ভালোবাসা দাও,
আমি দেবো তোমাকে রাত জেগে লেখা 
তোমাকে নিয়ে কবিতা,
আরও দেবো সন্ধ্যার অনুরাগ, দেবো ধূসর মুহূর্ত,
যেখানে নীরবতার ভেতর তোমার নামই 
ধ্বনিত হবে।

তুমি যদি একটু হাত বাড়াও,
আমি দেবো জোনাকিভরা অন্ধকার পথের আলো,
শীতের কুয়াশায় জড়িয়ে রাখা উষ্ণ নিঃশ্বাস,
আর ভোরের শিশিরে লেখা অচেনা কিছু স্বপ্ন।

তুমি যদি চোখ তুলে একবার তাকাও,
আমি দেবো আকাশের নীল নির্জনতা,
নদীর বুক ভরা গোপন স্রোত,
আর দেবো হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে রাখা 
অগণিত শব্দহীন প্রেম।

তুমি যদি পাশে বসো একটুখানি,
আমি দেবো বিকেলের মায়া, শ্রাবণের বৃষ্টি,
চাঁদের আলোয় ভিজে থাকা দীর্ঘ প্রতীক্ষা,
আর আমার সমস্ত অনিদ্রা রাত,
শুধু তোমার জন্য।

তুমি শুধু ভালোবাসা দাও,
আমি আমার সমস্ত জীবনটাকেই
ধীরে ধীরে কবিতায় রূপান্তর করে
তোমার হাতের ওপর রেখে দেবো।


১৯.      অশোকতরু তলে 


আমরা যখন হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে
অশোকতরু তলে বসেছিলাম,
চারদিক নির্জন, মনুষ্যশূন্য;
দূরে তপ্ত দুপুরের মরীচিকার ঢেউ
নীরব মাঠে আছড়ে পড়ছিল।

তুমি তোমার বাহু প্রসারিত করে আমন্ত্রণ জানালে,
অপরূপ চুম্বনরাশি ঝরে পড়ছিল
দুজনের ঠোঁটের উপর
তরুর ঝরা পাতার ঝরে পড়ার মতো।

তোমার কপালে তখন রোদের হালকা ঘাম,
আমি আঙুল ছুঁইয়ে মুছে দিতেই
তুমি কেঁপে উঠেছিলে মৃদু,
যেন বাতাসে দুলে ওঠে
লজ্জাবতী লতার গোপন ডাল।

তোমার খোলা চুল আমার বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল,
অশোকফুলের গন্ধে ভরে উঠেছিল চারপাশ,
আমি তোমার মুখ দু’হাতে তুলে
দীর্ঘ চুম্বনে ডুবে গিয়েছিলাম,
আর দুপুরের নীরবতা
হঠাৎ গভীর হয়ে উঠেছিল।

তোমার শাড়ির আঁচল
হাওয়ায় আলগা হয়ে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আমার হাত,
সেই স্পর্শে শরীর জেগে উঠছিল
অজানা কোনো আদিম স্রোতে।

তুমি ধীরে ধীরে কাছে এলে,
তোমার উষ্ণ নিশ্বাস এসে পড়ল আমার গলায়,
মনে হচ্ছিল এই অশোকতরুর ছায়াতেই
পৃথিবীর প্রথম প্রেমিক-প্রেমিকা
আবার জন্ম নিচ্ছে।

দূরে রোদের দগ্ধ মাঠ, উপরে স্তব্ধ আকাশ -
আর আমাদের দুজনের দেহে
নীরবে জেগে উঠছিল
এক প্রাচীন, অদম্য, মধুর আগুন।


২০.     সেই নদীর সন্ধ্যা



নদীর কূলে এক সন্ধ্যায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাম, দুজন দুজনের হবো।
জলের ওপর লাল আভা ছিল,
আকাশে নেমেছিল নিঃশব্দ কোমলতা।

তারপর যেন অদৃশ্য কোনো বিধান এলো,
ঈশ্বর আমাদের মিলনের পথ বন্ধ করে দিলেন,
হঠাৎ করেই আলাদা হয়ে গেল
দুটি হাত,
যারা এক হওয়ার শপথ নিয়েছিল।

সেই নদীর আজও সন্ধ্যা নামে,
জল আজও কুলকুল শব্দে বিষণ্ন গানের সুর তোলে,
শুধু তুমি আর আমি,
আমাদের হয়ে উঠতে পারিনি।

কখনও কখনও সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়,
জলের ভিতর তোমার ছায়া দুলছে,
হাওয়ার ভিতর ভেসে আসে তোমার অব্যক্ত ডাক,
কিন্তু সবই ভ্রম, শুধু নদী বয়ে যায়।

সন্ধ্যা নামে, আর আমার হৃদয়ের ভিতর
অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির মতো তুমি চিরকাল 
থেকে যাও।


২১.     স্বপ্নের আলিঙ্গন


যখন ঘুমিয়ে থাকি
মনে হয় তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছো,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা
আমার বুকের ভেতর ঢেউ তোলে।

মনে হয় তোমার চুলের গন্ধ
রাতের বাতাসে মিশে আছে,
আমার কাঁধে মাথা রেখে
তুমি কোনো স্বপ্ন দেখছো।

কিন্তু হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখি,
বালিশের পাশে কেবল শূন্যতা,
বিছানার চাদরে নেই তোমার স্পর্শ,
নেই তোমার উষ্ণ বাহুর বেষ্টনী।

তখন বুঝি
রাত আমাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়েছিল,
স্বপ্ন শুধু একটু সময়ের জন্য
তোমাকে আমার কাছে এনে দিয়েছিল।

ভোর হলেই
সবকিছু আবার নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে,
আর আমি একা শুয়ে থাকি
তোমার অনুপস্থিতির দীর্ঘ শীতলতায়।


২২.    কবিতায় স্বপ্ন 

অসাধারণ কবিতায় যে স্বপ্ন হৃদয় 
দিয়ে দেখা হয়,
সে স্বপ্ন কি কখনও মিথ্যে থাকে?
যদি দু’টি হৃদয় একই আকাশের নিচে
একই স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে
তবে সময়ও একদিন কোমল করে রাখে।

চলো, আমরা দুজনে
হাতের ভেতর হাত রেখে
বাকিটা সময় এমনই করে বাঁচি -
কবিতার মতো,
নিঃশব্দ গভীর ভালোবাসায় মাতি।


২৩.     মায়ের প্রতিচ্ছবি 


এই যে তুমি এত ভালোবাসো,
এই যে তোমার উপর নির্ভর করে বাঁচতে শিখেছি,
এই যে তুমি নিঃশব্দে সাজিয়ে রাখো আমাদের ছোট্ট সংসার
এই যে তোমার মায়ার সুতোয় জড়িয়ে থাকে আমার প্রতিটি দিন।

এই যে তুমি সবার মুখে হাসি ফোটাও,
নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখো অচেনা সন্ধ্যার মতো,
এই যে তুমি অল্পে সুখ খুঁজে নাও
আর আমার দুঃখগুলো নিজের বুকেই রাখো
এসব দৃশ্য আমি আগে কোথায় দেখেছি জানো?
মায়ের চোখে, মায়ের স্পর্শে, মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।

আজ আবার সেই একই আলো দেখি -
তোমার চোখের গভীরে, তোমার মমতার 
নিবিড়ে,
মনে হয়, পৃথিবীর সব মায়া বুঝি
একদিন মায়ের হৃদয় থেকে
চুপিচুপি এসে বাসা বেঁধেছে তোমার ভিতর।


২৪.      যারা স্বপ্ন দেখিয়েছিল


যারা স্বপ্ন দেখিয়েছিল তারা আজ কেউ নেই,
সময়ের দীর্ঘ স্রোতে ভেসে গেছে
তাদের কণ্ঠ, তাদের হাতের উষ্ণতা।

একদিন তারা বলেছিল,
“দেখো, একদিন তোমার আকাশ
রঙে রঙে ভরে উঠবে।”
আজ সেই আকাশই কেবল আছে,
কিন্তু তাদের ডাকে আর জাগে না ভোর।

যে পথ ধরে তারা হেঁটে যেত
সেই পথে আজ ধূসর ধুলো উড়ে,
পুরোনো দিনের মতো
কেউ আর হাত ধরে বলে না -
“চলো, সামনে আরও আলো আছে।”

কখনো গভীর রাতে
স্বপ্ন আর জাগরণের মাঝখানে
মনে হয় তারা ফিরে এসেছে,
ম্লান কণ্ঠে আবার স্বপ্ন দেখায়।

কিন্তু চোখ খুললেই দেখি
চারদিকে নিঃসঙ্গ সময়ের শূন্যতা,
শুধু বুকের ভেতর
একটা দীর্ঘ হাহাকার বেঁচে থাকে।

যারা স্বপ্ন দেখিয়েছিল
তারা আজ কেউ নেই 
তবু তাদের দেখানো স্বপ্নগুলো
নিভে যাওয়া প্রদীপের ধোঁয়ার মতো
এখনও ভাসে
আমার নির্জন জীবনের আকাশে।


২৫.     মধ্যরাত্রির নির্জনতা


পৃথিবী জুড়ে এত মানুষ,
অথচ কোনো মধ্যরাত্রিতে কাউকে দেখতে 
পাই না,
ঘর ভর্তি নির্জনতা খাঁ-খাঁ করে,
দেয়ালের ছায়াগুলোও যেন কথা বলতে 
ভয় পায়।

জানালার ফাঁক দিয়ে নেমে আসে অন্ধকার,
দূরের কোনো কুকুর ডাকে একবার,
তারপর আবার সব থেমে যায়, 
মনে হয় পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে পড়েছে আমাকে ভুলে।

টেবিলের উপর পড়ে থাকে অগোছালো 
কিছু স্মৃতি,
পুরোনো দিনের হাসি,
কিছু অর্ধেক লেখা চিঠি,
আর তোমার নামের পাশে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

মাঝে মাঝে মনে হয়
এই বিশাল পৃথিবীতে আমিই বুঝি একা 
জেগে আছি, 
তারারাও দূরে দূরে দাঁড়িয়ে
নীরব চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে।

তবু ভোর হলে মানুষে মানুষে ভরে 
উঠবে পথঘাট,
কোলাহলে ঢেকে যাবে এই রাতের শূন্যতা,
শুধু আমার বুকের ভিতর এই মধ্যরাত্রির নির্জনতা
খাঁ-খাঁ করেই থেকে যাবে।


২৬.     বুড়িগঙ্গার রাত



তুমি তখন বুড়িগঙ্গার কূলে দাঁড়িয়ে
চোখের তারায় ভেসে আছে নদীর কালো জল,
শহর জুড়ে নেমে এসেছে  রাত্রির ধুলো,
দূরে কোথাও ঢং ঢং করে বাজে পুরোনো 
কোনো স্কুলের ঘণ্টা।

বাতাসে ভেসে আসে দিনের ক্লান্ত স্মৃতি,
লণ্ঠনের আলোয় জেগে থাকে ঘাটের সিঁড়ি,
জলের বুকে চাঁদের ভাঙা প্রতিচ্ছবি
নীরবে লিখে যায় এক অদৃশ্য কবিতা।

তুমি দাঁড়িয়ে থাকো,
মনে হয় যেন এই শহরের সব নির্জনতা
তোমার চোখের ভেতর এসে আশ্রয় নিয়েছে।

আর বুড়িগঙ্গা ধীরে ধীরে বয়ে যায়,
আমাদের অপ্রকাশিত কথাগুলো
তার কালো জলের গভীরে লুকিয়ে নিয়ে।


২৭.    শূন্য ঘরের পথে


রাতে লাইটপোস্টের নীচ দিয়ে
যখন হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরি,
তখন মনে হয়,
তারচেয়ে সারারাত এইভাবেই হাঁটতে থাকি।

ঘরে গেলে অসীম শূন্যতা
আমাকে গোগ্রাসে গিলে খায়,
ঐ ঘরে যে তুমি আর নেই।

দরজাটা খুললেই
একটা নীরবতা এসে বসে বুকের ভেতর,
দেয়ালগুলোও যেন চুপচাপ তাকিয়ে থাকে,
তোমার অনুপস্থিতির দিকে।

বালিশে আজও তোমার গন্ধ খুঁজি,
জানালার পাশে বসে শুনি
দূরের কোনো অচেনা ট্রেনের শব্দ -
মনে হয় তুমি বুঝি ফিরছো
অন্ধকার ভেঙে।

কিন্তু রাত যত গভীর হয়
ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সত্য,
এই ঘরে শুধু আমি আছি,
আর চারদিকে জমে থাকা
অগণিত নিঃসঙ্গতা।

তাই মাঝে মাঝে মনে হয়
রাস্তার লাইটপোস্টগুলোই যেন আমার আপন,
তাদের হলুদ আলোয় হাঁটতে হাঁটতে
একটা রাত পার করে দিই -
কারণ ঘরে ফিরলেই শূন্যতা আবার
তোমার নাম ধরে ডাকে।


২৮.     নয় বছর পেরিয়ে 


কত ক্লান্তি, অস্থিরতা আর বেদনার ভিতর
তুমি চলে গেছ, আজ নয় বছর,
তবু মনেই হয় না
সময়ের ক্যালেন্ডার এতদূর এগিয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে মনে হয়
এই তো সেদিন -
তোমার নাম ধরে ডেকেছিলাম
অন্ধকার বারান্দার মলয় বাতাসে।

এখন কেবল
শীতল এক হাওয়া ঘুরে ঘুরে যায়,
সমূহ স্মৃতি আর ব্যর্থতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে
নিঃশব্দে উড়ে যায় দূরের আকাশে।

পুরোনো বিকেলের মতো
কিছু কথা জানালার পাশে বসে থাকে,
কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন
চুপচাপ ধুলো জমা বইয়ের পাতায় ঘুমায়।

তুমি নেই,
তবু তোমার হালকা উপস্থিতি
বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যার মতো
হৃদয়ের উঠোনে নেমে আসে হঠাৎ।

নয় বছর পেরিয়ে গেছে -
তবু তোমাকে ভুলিনি,
তুমি শুধু মানুষ নও এখন,
তুমি এক দীর্ঘ মায়া,
যে মায়া স্নিগ্ধ হাওয়ার মতো
আমার চারপাশে ঘুরে ঘুরে বেঁচে থাকে।


২৯.     রক্তমুখী নীলা


একদিন এক জ্যোতিষী
আমার হাতের রেখা ছুঁয়ে বলেছিল,
“তোমার ভাগ্যে ঝড় আছে,
একটা নীলা পাথর পরো,
ওটাই তোমার অমঙ্গল ঠেকাবে,
রক্তমুখী নীলা।”

আমি তখন চুপ করে ভেবেছিলাম,
নীলা তো আমার জীবনেও আছে,
তার চোখে ছিল নীল আকাশের নীলাভ আলো,
তার নামও ছিল নীলা।

কিন্তু কে জানতো,
পাথরের নীলা আর মানুষের নীলা
এক রকম নয়।

এক বিকেলে দেখলাম,
সে অন্য এক যুবকের হাত ধরে
চলে যাচ্ছে দূর পথের দিকে,
পিছনে ফেলে রেখে যাচ্ছে
আমার সমস্ত স্বপ্নের উঠোন।

তারপর থেকে
আমার আকাশে আর নীল রঙ ওঠে না,
জ্যোতিষীর সেই কথাটা
মাঝে মাঝে কানে বাজে
“রক্তমুখী নীলা।”

হয়তো পাথরটা না নিয়েই ভুল করেছি,
অথবা নিয়েও লাভ হতো না -
কারণ যে নীলা চলে যায়
অন্যের হাত ধরে,
তার মুখ আর কোনোদিন
ফিরে তাকায় না।


৩০.     স্মৃতির রাজ্য


এই জীবনে আর কোনো রাজ্যপাট গড়তে চাই না,
সিংহাসনের স্বপ্ন আজ ক্লান্ত বাতাসে ভেসে যায়।

জীবন তো শেষমেশ এক দীর্ঘ পথের গল্প,
কেউ পায় রাজ্য, রাজরাণী, রাজকন্যা,
কেউ আবার হাতে পেয়েও হারিয়ে ফেলে সবকিছু,
আর কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে শূন্য দু’হাত নিয়ে,
প্রবঞ্চিত ভাগ্যের নিঃশব্দ প্রহরী হয়ে।

এ জীবনে কত কিছুই ঘটে গেল,
কত দেশ পেরোলাম, কত অচেনা মুখের ভিড়,
তুষার ঝরা শীতের কত রাত
নেমে এসেছে জানালার ধারে নিঃশব্দে।

পুষ্প-কাননে ফুটে থাকা নতুন ফুলের গন্ধে
কত বসন্ত হঠাৎ জেগে উঠেছে হৃদয়ে,
আবার পদ্ম-কুসুমের মতো কোমল কত হৃদয়
কেঁদে কেঁদে মিশে গেছে দীঘির জলে। 

আজ সবই যেন দূরের কোনো স্বপ্ন,
মায়া-ভেজা, আলো-আঁধারের স্মৃতি,
তবু মনে হয়, এই পথচলাই ছিল আমার রাজ্য,
এই স্মৃতিগুলোই আমার অদৃশ্য সিংহাসন।


৩১.     অভিমানের আলো 


আমাদের কথা ফুরায় না, গল্পও শেষ হয় না,
ভালোবাসা পূর্ণ হয় নীরব অভিমানে -
আমাদের প্রেম একদিন রূপ নেয়
পৃথিবীর অন্তহীন গানে।

তোমার চোখে যখন সন্ধ্যা নামে,
আমার হৃদয় জ্বলে ওঠে অচেনা প্রদীপে
তোমার নামের ঢেউ ওঠে বাতাসে,
ভেসে আসে দূর কোনো রূপকথার নীড়ে।

আমরা দুজন হেঁটে যাই সময়ের দীর্ঘ পথে
কখনো ফুলের গন্ধে, কখনো অশ্রুর নীলে।
অভিমান এসে বসে থাকে খোলা জানালায়,
তবু ভালোবাসা হারিয়ে যায় না কোনো কালে।

রাত যখন তারাদের কাঁধে ভর দিয়ে ঘুমায়,
তখনও তোমার কথা জেগে থাকে আমার ভেতর,
মনে হয়—এই পৃথিবীর সব গানই যেন
আমাদের প্রেমের গল্প বলে অবিরত।

চুপচাপ ভোর নামে আকাশের নীল কপালে,
নতুন আলো জাগে অচেনা স্বপ্নের মতো -
তোমার আমার সেই অভিমানের ভিতরেই
লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গভীরতম আলো।


৩২.     ফিরে পাওয়া


যদি তোমাকে আর একবার ফিরে পাই,
তবে অপূর্ণতার সব ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে পূর্ণ করে দেবো -
যে কথাগুলো বলিনি কোনোদিন,
সেগুলো জোনাকির আলো হয়ে জ্বলে উঠবে 
তোমার চারপাশে।

যদি তোমাকে আবার ছুঁতে পারি,
তবে হৃদয়ের সব নীরবতা খুলে দেবো
আমার সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত ব্যথা
তোমার হাতের মুঠোয় রেখে দেবো নিঃশব্দে।

যদি তুমি আবার আমার আকাশে ফিরে আসো,
আমি প্রতিটি ভোরকে নতুন করে সাজাবো 
তোমার নামে,
বাতাসে ভাসবে অনুচ্চারিত গান,
আর আমাদের হারানো দিনগুলো ফিরে পাবে রং।

তাই যদি একবার ফিরে পাও তোমার পথ
আমার এই হৃদয়ের দিকে -
আমি তোমাকে আর হারাতে দেবো না,
আমার সমস্ত অসমাপ্ত স্বপ্ন দিয়ে
তোমার জীবনকে আলোর মতো জড়িয়ে রাখবো।


৩৩.     আসার প্রতিশ্রুতি


যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্তের বাতাস,
সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব ঝিরি ঝিরি দুলে উঠবে,
ম্রিয়মাণ দূর্বাদল ভোরের শিশিরে
আবার সজল হয়ে জেগে উঠবে আলোয়।

যেদিন পূর্ণিমা রাতের রুপোলি ছায়া
নেমে আসবে পদ্মপুকুরের নিস্তব্ধ জলে,
আর আকাশের নীল গভীরতায়
স্বপ্নেরা ভেসে যাবে অচেনা কোনো সুরে।

সেই দিন, সেই রাত্রির গভীর মুহূর্তে
আমি আসব তোমার কাছে -
হাজার বছরের অন্ধকার পথ পেরিয়ে,
অসংখ্য নিঃসঙ্গ রাত্রির ধুলো মাড়িয়ে।

সময় যদি থেমে যায় তবুও আসব,
যুগের পর যুগ যদি পেরিয়ে যায় তবুও,
কারণ তোমার কাছে আসার জন্যই
আমার সমস্ত পথচলা,
আমার সমস্ত অপেক্ষা। ✨


৩৪.    মুহূর্তের মায়া


হঠাৎ এক বিকেলের শান্ত আলোয়
তোমার মুখে পড়েছিল অদ্ভুত শান্তি,
মনে হয়েছিল - এই ক্ষণিক পৃথিবীতে
সমস্ত ভালোবাসা যেন থেমে আছে 
তোমার চোখে।

বাতাসে ভেসে আসছিল অচেনা 
ফুলের গন্ধ,
তোমার চুলে লেগে ছিল সন্ধ্যার রঙ
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম,
এই মুহূর্তটাই বুঝি জীবনের সবচেয়ে 
সুন্দর সময়।

কিন্তু সময় তো নদীর মতো
ধরা দেয় না, থেমেও থাকে না
তুমি চলে গেলে, আলো ফুরোল,
রয়ে গেল শুধু স্মৃতির ভেজা পথ।

আজও কখনো একলা সন্ধ্যায়
সেই বিকেলের কথা মনে পড়ে
বুঝি, কিছু কিছু সুখ
শুধু মুহূর্তের মায়া হয়েই থাকে। 


৩৫.    শিউলির গোপন ঘ্রাণ


আজ রাতে শিউলির গন্ধে হঠাৎ
মনটা হয়ে ওঠে অকারণ উন্মনা,
মনে পড়ে একদিন তোমার আঙুল ছুঁয়ে
আমার হৃদয় জেগে উঠেছিল
অদ্ভুত এক মায়ার আলোয়।

সেই স্পর্শে কত নিঃশব্দ স্বপ্ন
খুলেছিল পাপড়ি,
যেন অচেনা কোনো ফুল
পূর্ণিমার জ্যোৎস্নাস্নাত বাতাসে
হঠাৎ বেঁচে ওঠে অলৌকিক হয়ে।

তারপর সবই কেমন দূরে সরে গেল
শুধু গভীর রাতে হঠাৎ ভেসে আসে সেই গন্ধ,
আর আমার একাকী মন
ভাঙা স্বপ্নের পাপড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে
নিঃশব্দে খোঁজে তোমার হারিয়ে যাওয়া স্পর্শ।


৩৬.     মরুর জ্যোৎস্নায় রাজকন্যা


মরুর বালিয়াড়িতে নেমেছে জ্যোৎস্না,
দূরে জেগে আছে থিবস নগরের প্রাচীন প্রাসাদ,
সেখানে বাতাসে ভেসে আসে অচেনা বীণার সুর,
আর ইতিহাসের নিঃশ্বাসে দুলে ওঠে রাত।

আমি যেন স্বপ্নের এক পথিক,
হেঁটে যাই সময়ের দীর্ঘ করিডোরে
হঠাৎ দেখি প্রাসাদের জানালায় দাঁড়িয়ে আছে
নেফারতিতি-র মতো এক রাজকন্যা।

তার চোখে মরুর তারার আলো,
কেশে লেগে আছে নীল নদীর বাতাস
সে মৃদু হাসলে মনে হয়
সহস্র বছরের নিদ্রা ভেঙে জেগে ওঠে প্রাচীন মিসর।

আমি তাকে কিছু বলতে চাই,
কিন্তু শব্দগুলো বালুর মতো উড়ে যায়
শুধু হৃদয়ে থেকে যায়
এক অমলিন, প্রাচীন, মায়াময় প্রেমের গন্ধ।

আর ভোর হলে বুঝি
সবই ছিল মরুর জ্যোৎস্নার স্বপ্ন,
তবু সেই রাজকন্যা আজও
আমার কবিতার ভেতর নিঃশব্দে হেঁটে বেড়ায়। ✨

৩৭.      স্বপ্নরাজ্যের যুবরাজ


স্বপ্নে দেখি একটি রাজ্যের আমি যুবরাজ,
নিস্তব্ধ প্রাসাদের চূড়ায় জ্বলে নীলাভ আকাশের আলো,
আর বাহুলগ্না শাহজাদি তখন আমার পাশে,
তার চোখে ঝরে পড়ে অচেনা তারার ভালোবাসা।

চাঁদের ধূপছায়া নেমে আসে রাজপ্রাসাদের বাগানে,
শিউলি আর রজনীগন্ধা গোপনে ছড়ায় গন্ধ;
তোমার মায়াময় হাসির ভিতর আমি খুঁজে পাই
অসংখ্য জন্মের অদেখা কোনো বন্ধন।

তোমার কেশে রাতের নদী বয়ে যায় ধীরে,
তোমার ঠোঁটে জেগে থাকে অগ্নি-রঙা ফুল;
আমার বুকের ভিতর তখন জেগে ওঠে
দীপ্ত কামেমঞ্জরিত এক অনন্ত কূল।

স্বপ্নের সিংহাসনে বসে আমি শুধু ভাবি
রাজ্য নয়, মুকুট নয়, প্রাসাদের ঐশ্বর্য নয়;
আর বাহুলগ্না, তোমার একটুখানি স্পর্শই
আমার সমস্ত রাজ্যের সমান অমলময়।

আর যদি হঠাৎ ভোরের আলোয় স্বপ্ন ভেঙে যায়,
রাজ্য মিলিয়ে যায় কুয়াশার মতো
তবু তোমার নামের আলো বুকের ভেতর রেখে
আমি সারাজীবন হেঁটে যাব সেই স্বপ্নপথে। ✨


৩৮.      সৃষ্টির প্রথম ভোর 


তোমার চোখে যেন জারুলবনের নীল ছায়া,
সন্ধ্যার বাতাসে দুলে ওঠা কোনো গোপন অরণ্য
সেই অরণ্যের ভিতর আমি পথ হারাই
যেন শ্রাবণের নদী হঠাৎ ডাকে অজানা সাগরকে।

তোমার চুল কালো মেঘের দীর্ঘ বর্ষা,
যেখানে বিদ্যুতের মতো হঠাৎ ঝলকে ওঠে হাসি;
আমি সেই মেঘের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত মাটি,
এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য উন্মুখ, অধীর।

তোমার শাড়ি রাত্রির নদীর মতো
ধীরে ধীরে ভেসে যায় শরীরের চরে;
অন্ধকারের বালুচরে তখন
চাঁদের মতো জেগে ওঠে  উত্তাপ।

তোমার ঠোঁট লাল কদমফুল
বর্ষার প্রথম গোপন সুগন্ধে ভরা;
যেন দূর বনের ভিতর
একটি অচেনা পাখি ডেকে ওঠে প্রেমের ভাষায়।

তোমার শরীর যেন উর্বর মাটির ভোর,
যেখানে রৌদ্রের প্রথম সোনালি ধান
মাথা তুলে দাঁড়ায় ধীরে ধীরে;
আমি সেই কৃষক -
স্বপ্নের বীজ বুনি নিঃশব্দ আবেগে।

আর যখন তুমি কাছে আসো --
মনে হয় 
তোমার স্পর্শে আলোকিত হয়ে ওঠে
যেন সৃষ্টি শুরুর প্রথম ভোর
পুনরায় জন্ম নিচ্ছে আমাদের দু’জনার শরীরে।


৩৯.     কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বপ্ন


তোমার সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া হয়নি কখনও,
তবু আমার ঘুমের ভেতর নীল পাহাড় জন্ম নেয়
শালপাতা ঝরা অরণ্যের নির্জন পথে
তোমার আঙুল ধরেই হাঁটে আমার একাকী স্বপ্ন।

শুকনো পাতার মৃদু শব্দে
দুলে ওঠে চৈত্রের অলস বাতাস,
তুমি তখন কড়ি আঙুলে বেঁধে রাখো আমাকে,
যেন হারিয়ে না যাই পৃথিবীর ভিড়ে।

দেবী, একদিন আমরা ঠিক পৌঁছে যাব
সাদা মেঘের কাছে, কাঞ্চনজঙ্ঘার আলোয়-
যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় সূর্য ওঠে ধীরে
আর তোমার চোখে ভাসে নীল বিস্ময়।

চৈত্রের শূন্য অরণ্যে
আমরা দু’জন হারিয়ে যাব নিঃশব্দে,
তোমার কাঁধে রেখে আমার ক্লান্ত স্বপ্ন
আমি শুনব দূরের ঝরনার গোপন গান।

আর যদি সন্ধ্যা নামে পাহাড়ি আকাশে,
তুমি শুধু বলো - আমি আছি,
তখন মনে হবে এই পৃথিবীর সব পথ
শেষ হয়ে গেছে তোমার হাতের মুঠোয়।


৪০.     মৌন সন্ধ্যার ডাক


কখনও কখনও কাউকে ছুঁয়ে দেখার তাড়না থাকে না, তবু ইচ্ছে করে -
একটা মৌন বিকেল পাশাপাশি বসে
গল্পের ভেতর হারিয়ে যাই দু’জন।

কোনো স্পর্শ নয়,
শুধু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
ধীরে ধীরে খুলে দিই দিনের ক্লান্ত দরজা,
আর বাতাসে ভেসে যাক
অকথিত কথার মৃদু সুর।

একঘর মানুষের ভিড়ের মাঝখানে
হঠাৎ যদি চোখে চোখ পড়ে,
মনে হয় নিঃশব্দে বলি -
সবাই চলে গেলে
একবার কি দেখা করবে?

হলুদ আকাশের নিচে
যেখানে সন্ধ্যা নেমে আসে খুব ধীরে,
পাখিরা ফেরে নীড়ে
আর আলো গলে পড়ে নদীর জলে।

সেখানে আমরা বসে থাকব চুপচাপ,
কথা খুব বেশি হবে না -
তবু মনে হবে
এই নীরবতাই যেন পৃথিবীর
সবচেয়ে গভীর গল্প।


৪১.      বৃষ্টির মুঠোয় প্রেম


যে মেয়েটি আমায় নিয়ে ভাবে, আমি তার পিঠে 
হাত রেখে বলি -
শোন মেয়ে, এই যে ঝরে পড়া বৃষ্টি,
প্রতিটি ফোঁটার ভেতর লুকানো আছে
কোনো এক প্রেমিকের দমফাটা আবদার।

তুমি যদি হাতের মুঠো খুলে দাও
আর একটু ভিজে যাও আকাশের নিচে,
দেখবে -
বৃষ্টির জলে মিশে আছে অদ্ভুত মধুর স্বাদ,
যেন কারও নীরব ভালোবাসা
তোমার কাঁধে এসে বসেছে।

জামার বোতাম না খুললে যেমন
বুকের ভেতর জমে থাকা মেঘ বেরোয় না,
তেমনি হৃদয়ের জানালা না খুললে
ভালোবাসার বাতাস ঢোকে কী করে বলো?

একবার সব ছেড়ে দাও -
অভিমান, ভয়, লুকোনো দীর্ঘশ্বাস,
সব ঝেড়ে ফেলে আকাশের দিকে তাকাও
দেখবে,
নীল আকাশের ওপারে
একটা পৃথিবী তোমাকে ডাকছে।

বৃষ্টি তখন শুধু জল হয়ে ঝরে না,
ঝরে কারও নীরব আকুলতা,
কারও গোপন ভালোবাসা,
কারও অদেখা স্বপ্নের স্পর্শ।

আর সেই ভেজা আলোর ভেতর
তুমি যদি একবার আমার দিকে তাকাও,
দেখবে -
এই সুন্দর পৃথিবীর সমস্ত আকাশ জুড়ে
ফুটে আছে তোমার আর আমার
অলিখিত প্রেমের নক্ষত্র।


৪২.     আগুনের কাছে অনুমতি


প্রতিটা মেয়ের ভেতরই থাকে
একটা নিভু নিভু অগ্নিশিখা -
বসন্তের গোপন বনানীর মতো
যার উত্তাপ সবাই পায় না।

কেউ কেউ আসে, ছুঁয়ে দেখে,
কিন্তু আগুন তাদের চিনে না, 
শুধু একদিন কোনো এক স্পর্শে
তার নিঃশ্বাস হালকা কেঁপে ওঠে।

তখন তুমি ধীরে কাছে এসে
তার ঝড়ভেজা কপালে রাখো ঠোঁট,
কাঁপা আঙুল ঠোঁটে রেখে বলো -
চুপ… এই রাতটা শুধু আমাদের হোক।

তার চোখে তখন অন্ধকার জ্বলে,
জারুলবনের মতো গভীর নেশা, 
তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে সে বলে,
ভালোবাসা যদি আগুন হয়,
তবে আজ আমায় পুরোটা পুড়িয়ে দিও না
শুধু একটু উষ্ণতায় জড়িয়ে রেখো।

আর সেই রাতের বাতাসে
দুজনের নিঃশ্বাস মিশে গেলে শরীর নয় -
প্রথমে জেগে ওঠে
দুজন মানুষের উন্মত্ত আদিম প্রেম। 


৪৩.     ভাঙাচোরা গল্প


কিছু মানুষ থাকে -
যাদের নাম উচ্চারণ করলেই
হৃদয়ের ভেতর একটা আলো জ্বলে ওঠে,
মনে হয়,
তাদের কাঁধে মাথা রেখে
একটা দীর্ঘ রাত ঘুমিয়ে থাকি নিশ্চিন্তে।

তাদের হাত ধরতে ইচ্ছে করে,
যেন পৃথিবীর সব ঝড়
একটু দূরে সরে যায় সেই স্পর্শে।

তাদের বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে
বলতে ইচ্ছে করে -
থাকো না, একটু আরেকটু কাছে…
কিন্তু সময় বড় নির্মম,
নদীর স্রোতের মতো
কাউকে ধরে রাখে না বেশিদিন।

একদিন হঠাৎ দেখি,
যে মানুষটিকে আগলে রাখতে চেয়েছিলাম
সে দূরের আকাশে মিলিয়ে গেছে।

তারপর শুধু থেকে যায় -
কিছু অর্ধেক বাক্য,
কিছু অসমাপ্ত বিকেল,
আর বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমে ওঠা
অসীম কিছু শূন্যতা।

সেই মানুষগুলো
ফিরে আসে না আর কখনও -
তারা কেবল
আমাদের ধূসর স্মৃতির ভেতর
একটা ভাঙাচোরা গল্প হয়ে
কুয়াশার মতো ভেসে থাকে সারাজীবন।


৪৪.     দূরের তুমি


মাঝে মাঝে অন্ধকার ঘরে
তোমার বুকে মাথা রেখে
নিঃশব্দে জানলা দিয়ে বৃষ্টি উপভোগ করতে ইচ্ছে করে,
মনে হয় পৃথিবীটা তখন খুব কাছের।

বৃষ্টির ফোঁটা  তোমার নামের মতো টুপটাপ ঝরে,
আমি চোখ বুজে ভাবি -
এই বুঝি তুমি চুলে হাত রেখে বলবে,
ভয় পেয়ো না, আমি তো আছি।

কিন্তু জানালার ওপাশে এখন
শুধুই দূরের অন্ধকার আর বৃষ্টির শব্দ,
তুমি নেই,
শুধু তোমার উষ্ণতার স্মৃতি
নিভে না এমন প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

তবু আজও যখন রাত নামে
আর বৃষ্টি ধীরে ধীরে নামে শহরের গায়ে,
আমি নিঃশব্দে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবি -
কোনো এক অচেনা আকাশের নিচে
তুমিও কি আমার মতোই
একটু বৃষ্টি, একটু স্মৃতি
আর একটু অসমাপ্ত ভালোবাসা নিয়ে
নীরবে দাঁড়িয়ে আছ?


৪৫.      আমাদের ছোট্ট পৃথিবী


আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী একজন মানুষ
বিশ্বাস করি, দুটো হৃদয় যখন
নির্ভেজাল মায়ায় একে অপরকে খুঁজে পায়,
তখন পৃথিবীর ভিড় থেকে আলাদা হয়ে
তারা বানিয়ে নেয় এক গোপন আকাশ।

সেই আকাশে থাকে না কোনো কোলাহল,
থাকে না মানুষের নিষ্ঠুর হিসাব -
শুধু থাকে দুটো নাম,
দু’জোড়া চোখের মায়ার আলাপ,
আর হাতের মুঠোয় ধরা একটুখানি উষ্ণতা।

সেই পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামে ধীরে,
জানালার পাশে বসে দু’জন মানুষ
নীরবতায়ও গল্প করে -
একজনের নিঃশ্বাসে অন্যজনের স্বপ্ন
অদৃশ্য পাখির মতো উড়ে বেড়ায়।

বাইরের পৃথিবী তখন যতই বড় হোক,
যতই ভিড় জমুক অচেনা মুখে
তবু তাদের ছোট্ট পৃথিবীটায়
আর কারোর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

শুধু তুমি আর আমি আর আমাদের ভালোবাসা,
যেন অনন্ত নীল আকাশের নিচে
দু’টি হৃদয়ের শান্ত, দীপ্ত একটি চিরন্তন ঘর।


৪৬.      আমার জীবনসাথী


স্বামী আমার বন্ধু, আমার জীবনের জীবনসঙ্গী,
আমার সুখ-দুঃখের  আশ্রয়,
আমার প্রিয় গানের গোপন সুর -
যে সুরে জেগে ওঠে হৃদয়ের গভীরময়।

তার চোখে দেখি শান্ত আকাশ,
দুপুর শেষে নেমে আসা নীল আলো,
তার কণ্ঠে শুনি এমন মায়া -
যেন দূরের বাঁশিতে বাজে কোনো ভালোবাসার 
অচেনা সুর। 

দিনের ক্লান্তি ঝরে পড়ে তার স্নিগ্ধ হাতের স্পর্শে,
যেন সন্ধ্যার বাতাস এসে
নিভিয়ে দেয় হৃদয়ের সব গোপন দহন নিঃশব্দে।

পথ যত দূরেই যাক, যত ঝড়ই উঠুক -
তার হাতটি থাকুক আমার হাতে,
কারণ সে শুধু স্বামী নয়,
সে আমার জীবনের সবচেয়ে মায়াময় প্রার্থনা,
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের গভীর 
ভালোবাসাতে।


৪৭.     মিস ইউ


প্রায়ই কর্মহীন সময়ে জানালা খুলে দেখি
দূরের কোনো নদী, কোনো ভেজা মাটির গন্ধ,
চেয়ে থাকি তার দিকে দীর্ঘক্ষণ -
তবু সময় যেন ফুরোয় না কিছুতেই;
মনে হয় ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে
আমার ফেলে আসা আকাশের ঠিকানায়।

মাঝে মাঝে জানালার কাঁচে হাত রাখি -
ভাবি, ওপাশেই বুঝি আমার গ্রাম ,
ধানক্ষেতের বাতাস, মায়ের আঁচলে নামে সন্ধ্যা,
আর শৈশবের কুয়াশাভেজা ভোর।

এই শহরের রাতের গভীর নিঃসঙ্গতায়
একটা শব্দই শুধু বুকের ভিতর বাজে -
নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস হয়ে ভেসে ওঠে বারবার
Miss you, আমার কুসুমপুর।


৪৮.     একদিন ভুলে যাবো


একদিন তোমায় সুন্দর করে ভুলে যাবো,
তোমার বাড়ির উঠোনে আর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বো না শ্রাবণ রাত্রি দুপুরে, 
তোমার মাথার উপর আর ছাতা মেলে ধরবো না,
বৃষ্টিতে ভিজুক তোমার পথ,
আমি দূরের আকাশ হয়ে চেয়ে থাকবো শুধু।

একদিন তোমায় আর জিগ্যেস করবো না
কি হয়েছে তোমার? আজ কেন মনখারাপ?
বলবো না -
তোমার কেউ না থাকুক, আমি তো আছি,
আমায় বলতে পারো মনখারাপের কারণ।
সেদিন আমার দরজাটাও বন্ধ থাকবে নীরবে,
তোমার দীর্ঘশ্বাসগুলো ফিরে যাবে 
শূন্য বাতাসে।

একদিন তোমার রাতজাগা গল্পগুলো
শুনবো না আর চুপ করে,
তোমার চোখের ভেজা কোণে
আঙুল ছুঁয়ে বলবো না -
এই পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর,
তবুও আমি আছি তোমার পাশে।

একদিন সত্যিই দূরে চলে যাবো,
তোমার স্মৃতির গলিপথ এড়িয়ে
যেখানে একসময়
আমার সমস্ত বিকেল পড়ে থাকতো।

একদিন তোমায় ঠিকই ভালোবাসতে ভুলে যাবো,
একদিন তোমার নামটা
হঠাৎ মনে পড়লেও বুক কাঁপবে না আর
কোনো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়ও না।

তবু জানো,
যে দিন সত্যিই তোমায় ভুলে যাবো,
সেদিন হয়তো পৃথিবীটা একটু ফাঁকা লাগবে,
কারণ তোমাকে ভুলতে গিয়েই
আমি আমার অর্ধেক হৃদয় হারিয়ে ফেলবো।

একদিন তোমায় ঠিকই ভালোবাসতে ভুলে যাবো,
একদিন তোমায় ভালোবাসতে ভুলে যাবো -
তবু কোথাও গভীর নীরবতায়
তুমি হয়তো রয়ে যাবে
আমার না-বলা শেষ কবিতার মতো।


৪৯.      হারতে চাই 


আমি যার প্রতি আকর্ষণ বোধ করি,
তাকে কোনো প্রশ্নপত্র দিই না,
তার হৃদয়ের মানচিত্র মাপতে বসি না
শুধু নিঃশব্দে নিজের দরজা খুলে দিই।

আমি যার দিকে টান অনুভব করি,
তার জন্য বুকের ভেতরকার সব আলো
এক মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়ে
তার হাতে তুলে দিতে পারি আমার সমস্ত আগুন।

যাকে ভালোবাসি -
তার সামনে আমি কোনো যোদ্ধা নই,
তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে
জয়ের পতাকা ওড়াতে ইচ্ছে করে না কখনও।

বরং তার কাছে হেরে যেতে ভালো লাগে,
অপমানের ধুলো মেখেও
তার দরজার সিঁড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে,
যেন ভোরের আগে ফেরা কোনো পথহারা পাখি।

আমি জানি,
ভালোবাসা সবসময় ন্যায়বিচার করে না,
তবু আমি ভালোবাসার আদালতে
নিজেকেই বারবার দোষী সাব্যস্ত করি।

কারণ,
আমি জিততে চাই না তার বিরুদ্ধে -
আমি শুধু চাই
তার কাছে বারবার ঠকতে,
আর সেই ঠকায় লুকিয়ে থাকুক
আমার সবচেয়ে সত্যিকারের ভালোবাসা।


৫০.     দু’জনের গোপন গ্রহ


আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী একজন মানুষ,
বিশ্বাস করি,
দুটি হৃদয় যখন একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়ে,
তখন এই বিশাল পৃথিবী ধীরে ধীরে সরে যায় দূরে,
মানুষের ভিড়, কোলাহল, সবকিছু 
ফিকে হয়ে আসে।

তখন তারা গড়ে তোলে এক অদ্ভুত নীল আকাশ,
যেখানে সূর্য ওঠে তোমার হাসির আলোয়,
আর চাঁদ নামে আমার নিঃশ্বাসে
মায়াময় জোছনা হয়ে।

সেই পৃথিবীতে আর কারোর কোনো দরকার হয় না,
না কোনো শহর, না কোনো ভিড়,
শুধু দুটি মানুষের হাতের মুঠোতে
একটা অচেনা স্বর্গ জন্ম নেয় নিঃশব্দে।

সেখানে বৃষ্টি মানে তোমার চুলে মুখ লুকিয়ে থাকা,
সন্ধ্যা মানে পাশাপাশি বসে থাকা অনন্ত নীরবতায়,
আর রাত মানে -
তোমার বুকের কাছে পৃথিবীর সব ক্লান্তি রেখে 
ঘুমিয়ে পড়া।

যদি কোনোদিন এই পৃথিবী আমাদের ভুলেও যায়,
তবু ভয় নেই,
কারণ আমরা তো গোপনে বানিয়ে ফেলেছি
আরেকটা ছোট্ট গ্রহ।

যেখানে শুধু তুমি আছো, আমি আছি,
আর আমাদের ভালোবাসা নক্ষত্রের মতো অনন্ত,
সময়েরও ওপারে জ্বলতে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন