ওসিয়তনামা ( কাব্যগ্রন্থ )
প্রথম প্রকাশ -
উৎসর্গ -
১. শেষ শক্তি
একে একে তুমি
আমার ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিয়ে যাচ্ছ,
যেন আমি একা থাকলেই
তোমার রাজত্ব সম্পূর্ণ হয়।
জানি, তোমার অনেক পাওয়ার-
তুমি পাহাড় ভাঙতে পারো,
সমুদ্র থামাতে পারো,
সূর্যের আলো পর্যন্ত ঢেকে দিতে পারো।
কিন্তু সেই পাওয়ার
আমার বুকের ভেতরই কেন বারবার নামাও?
আমার ঘরের কোণে এখন
খালি চেয়ারগুলো পড়ে আছে,
নাম ধরে ডাকে নীরবতায়-
আমি শুনি, অথচ কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারি না।
তুমি বলো, সবই নিয়ম-
আমি বলি, তবু কেন আমারই পালা?
প্রতিটি বিদায়ের পরে
আমাকে নতুন করে মরতে হয়।
আমি তো কারও সর্বনাশ চাইনি,
আমি শুধু মানুষ ভালোবেসেছি-
তাহলে কেন ভালোবাসাই
তোমার চোখে সবচেয়ে বড় অপরাধ?
যদি তোমার শক্তি দেখাতেই হয়,
তবে একবার আমার চোখে তাকাও,
দেখবে- এই ভাঙা হৃদয়েই
তোমার সব যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন লেখা আছে।
তবু আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
শূন্যতার মাঝেও নিঃশ্বাস নিই,
কারণ জানি- ভালোবাসা হারালেও
মানুষ হয়ে থাকা এখনো
আমার শেষ শক্তি।
২. নিশ্ছিদ্র সন্ধ্যার শরীর
যাও, অন্ধকারের কোমল কুঞ্জে যাও
গোধূলির গন্ধ মেখে
চুপচাপ ঘুমের দরজা খুলে দাও।
ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেই
আমরা হারিয়ে যাব
দেয়ালের ছায়া ছুঁয়ে।
এখানেই দেখা হবে
ভাঁজে ভাঁজে খোলা নির্জনতায়,
শব্দের কাপড় খুলে
শ্বাসের তাপে লেখা পড়ব আমরা।
বুকে নেমে আসবে নক্ষত্রের ধুলো,
চোখে জমবে মেঘের জল।
তুমি কাছে এলে
একাকীত্বও দু’জন হয়ে যায়।
তোমার শরীরে সন্ধ্যার নীল,
আমার আঙুলে আলো-ছায়ার কাঁপন
কোনো নাম নেই এই মিলনের,
তবু গভীরভাবে চেনা।
স্পর্শে স্পর্শে জন্ম নেবে মধুর গান,
সময় থেমে দাঁড়াবে দরজায়।
এভাবেই, অদেখা আগুনে
আমরা দু’জন পুড়ে
আবার নতুন হয়ে ফিরব।
৩. মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়বে
মৃত্যু যেদিন এসে দরজায় কড়া নাড়বে,
আমি হাসব, ভয় নয়- একরাশ অভিমানে,
বলব,
'এলেই যখন, আরও আগে আসো নাই কেন?
কেন পৃথিবীর প্রতি এতদিন মায়া বাড়িয়ে দিলে?'
আমি তো প্রস্তুত ছিলাম শিশুর মতো ঘুমিয়ে যেতে,
কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছ
ভোরের আলো ভালোবাসতে,
বৃষ্টির গন্ধে বুক ভিজাতে,
নদীর ঢেউয়ে শোনাতে হারিয়ে যাওয়া নাম।
তুমি আমাকে দিলে মায়ের বুকে আশ্রয়,
ভালোবাসার চোখে অনন্ত সুখ,
দু’ফোঁটা হাসির ভেতরেও অপরাজেয় এক জীবন।
তারপর হঠাৎ বলো, সব শেষ?
এই শরীর, এই স্মৃতি, এই প্রার্থনা
সবই কি ধুলো হয়ে যাবে?
মৃত্যু, তুমি বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক,
আগে শেখাও বেঁচে থাকার সব মন্ত্র,
তারপর ছিনিয়ে নাও পাঠ্যবই।
তবু জানি, যেদিন তুমি আবার ডাকবে,
আমি পিছু হটব না।
শুধু একবার ফিরে তাকাব এই পৃথিবীর দিকে-
যাকে তুমি আমার হৃদয়ে এত গভীর করে লিখে দিলে।
৪. ভালোবাসাকে প্রশ্ন
ভালোবাসাকে ডেকে এনে সামনে বসিয়ে
বললাম-এই নাও রৌদ্রছায়া দুপুর।
তাকে বলা হলো -
তুমি কী ওকে কাছে টেনে নেবে?”
ভালোবাসা চোখ বুজে গুনগুন করে বললো-
আমি যাকে ছুঁই, সে তো গান হয়ে যায়….
তারপর ডেকে আনা হলো
এক ক্লান্ত সন্ধ্যাকে, শরীরজুড়ে দাগ,
মনের ভেতর পুরনো কান্নার চিহ্ন,
ভালোবাসাকে বলো হলো- নেবে একে?
ভালোবাসা মাথা নুইয়ে বলল,
ও তো নদী, মোহনায় মিলিয়ে যায় ।
তারপর একে একে আনা হলো
রুক্ষ, কোমল, এলোমেলো চুলের,
ভোরের আলোকে - আর শীতল মুখ,
উজ্জ্বল চোখের গোধূলির বিষণ্ণতাকে,
দুজনকেই সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন
ছুড়ে দেওয়া হলো - এদের কী ভালো লাগে?
ভালোবাসা হেসে উঠে বললো -
তুমি যাদের আমার কাছে নিয়ে এসেছ ,
ওরা ক্ষণিকের মোহ, অচেনা টান,
এমনিতেই এরা দূরের হয়ে যায়।
৫. ঘুম ভাঙার পর
প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায়
দেহ জুড়ে ক্লান্তির আবেশ,
তখনও রাত ফুরায়নি,
অন্ধকারের বুকের ভেতর
চাঁদের মতো জেগে থাকে তোমার নাম।
পাঁজরে ধরে আছে তোমার কোমল হাত,
যেন ভাঙা শ্বাসের মধ্যে
একটুখানি আশ্রয়।
হৃদপিণ্ডের গভীরে
শব্দহীন এক আলো জ্বলে ওঠে,
যার ভাষা শুধু আমি বুঝি।
ঘুমের ভেতরেও তুমি
আমার রক্তের ছন্দে মিশে থাকো,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে
লিখে দাও অস্তিত্বের জানান
যেখানে আমিই শুধু নই,
আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে তুমিই।
ভোর আসার আগেই বুঝে যাই-
আমি বেঁচে আছি,
কারণ তুমি আছো
আমার ভেতরের সবচেয়ে গোপন জায়গায়।
৬. ওসিয়তনামা
ভালোবাসব বলে যে ওসিয়ত আমরা করেছি,
তার যেন কোনোদিন বরখেলাপ না হয়,
এই প্রার্থনায় আজ আমি নিয়তবদ্ধ
তোমার চিরপ্রেমিক হয়ে থাকার জন্য।
ঠোঁটে জমে আছে নাগলিঙ্গমের রক্তিম ছায়া,
বুকে বহমান আগুনের গোপন স্রোত-
আজ ভালোবাসা দিবস,
এসো, আলিঙ্গনের ভেতর দিয়ে
আমরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করি।
আমার যা কিছু প্রেমময়, তার সবটাই তোমার,
সব ব্যবচ্ছেদের ছেদ উঠিয়ে দিই,
দেবার-নেবার সকল হিসাবের সঙ্গী হও তুমি।
পাথরে পাথরে ঘষে যে আগুন জ্বলে ওঠে,
সেই আগুনে আমরা পুড়িয়ে দিই
আমাদের সমস্ত একাকিত্ব।
বদনাম যা হবার হোক,
আমি চিৎকার করে বলব-
তুমি আমার, প্রিয়তমা, কেবলই আমার।
যদিও তুমি আমার,
তবু তুমি অন্য কারোর নও,
বিশ্বলোকের অগাধ ভিড় থেকে
আমি তুলে এনেছি তোমাকেই,
তোমার কম্পিত দেহের শিহরণে
আমিও শিহরিত হই।
তারপর আর কোনো কথা থাকে না-
নিঃশব্দে শেষ হয় সব প্রশ্ন।
তারপর আমরা আমাদের মিলনের পর্ব শেষে
ভালোবাসার এই ওসিয়তনামায়
দু’জন একসাথে স্বাক্ষর করি।
৭. বৃষ্টিভেজা আগমন
যখন বৃষ্টি নামে, তখন তুমি খালি পায়ে
হেঁটে হেঁটে আসো,
তোমার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় বৃষ্টির ধ্বনিতে,
আর আমার বুকের ভিতর ঝরে পড়ে
অদৃশ্য জলধারা।
চুলে লেগে থাকে মেঘের শীতল গন্ধ,
তোমার চোখে ভিজে থাকা আকাশ,
আমি হাত বাড়ালে বৃষ্টি থেমে যায় না
শুধু আমাদের মাঝখানে
একটু চুপ হয়ে দাঁড়ায়।
তোমার পায়ের ছাপ ভিজে মাটিতে
লিখে যায় আমার নাম,
প্রতিটি ফোঁটা যেন বলে- ভালোবাসা মানে
ফিরে আসা,
ভালোবাসা মানে এই ভেজা পথ।
তুমি যখন হাসো,
বৃষ্টির শব্দ হালকা হয়ে যায়,
মনে হয় পৃথিবীর সব বর্ষণ
শুধু আমাদের দুজনের জন্যই।
৮. রাধার মানভঞ্জন
নিশিথ নিঃশ্বাসে কাঁপে বৃন্দাবন,
মল্লিকাগন্ধে ভিজে শ্যাম-চরণ।
বাঁশির ডাকেতে পাগল রজনী,
রাধা-হৃদয়ে জ্বলে অনল-রণী।
চরণে ধূলি মেখে শ্যাম ফিরে আসে,
চোখে জোছনার অবাধ্য হাসে।
রাধা বলে—“ওরে ছলনাময়!
আজ আর ধরা দেব না হে নির্দয়।”
শ্যাম বলে—“হে প্রাণ! মান কেন এত?
বাঁশির প্রতিটি সুরে আছ তুমি সতত।”
রাধা চেয়ে দেখে, কপোল লাজে রাঙা,
চুলে গাঁথা জোছনা, কেশে বনফুল ভাঙা।
নয়নে নয়নে গোপন উচ্চারণ,
শ্বাসে শ্বাসে প্রেমের গভীর জ্বালান।
অধরে অধর ছোঁয়ার আগে,
থেমে যায় কাল বৃন্দাবন-সাঁঝে।
রাধা মুছে মান, বক্ষে রাখে শ্যাম,
মিলনে জাগে অনন্ত ধাম।
নিশিথে লুপ্ত হয় বিরহের কোলাহল,
দুটি হৃদয়ে এক প্রেম-জ্বলজ্বল।
৯. পথ
এই পথ জানে কত পা এসে থেমেছে,
কত স্বপ্ন হোঁচট খেয়ে
ধুলো হয়ে গেছে সন্ধ্যার কোলের ভেতর।
এই পথ জানে
কে ফিরেছে বুকভরা আলো নিয়ে,
আর কে ফিরেছে চোখে
অপরাজেয় অন্ধকারের নোনা জল।
রোদ্দুরের নিচে সে পুড়ে পুড়ে শিখেছে সহনশীলতা,
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে শিখেছে
নিজেকে নতুন করে ধুয়ে নেওয়ার মন্ত্র।
পথের কাঁধে জমে থাকে অজস্র
বিদায়ের ছায়া,
তবু সে প্রতিদিন ভোরে
নতুন যাত্রার ডাক দেয়।
হেঁটে যাওয়া মানুষ বদলায়,
ঋতু বদলায়, শহর বদলায়-
শুধু পথ বদলায় না,
সে অপেক্ষায় থাকে,
চুপচাপ, নির্ভর, অবিচল।
যে দিন তুমি ক্লান্ত হয়ে নিজেকে
হারাতে বসবে,
এই পথই তোমাকে বলবে-
চলো, এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি।
১০. অল্পে পূর্ণতা
বেশি দীর্ঘ জীবন আমি চাই না,
রোগে শোকে ন্যূজ হয়ে যাওয়া,
কিংবা সংসারের বোঝা হয়ে থাকা
আমার কোনো প্রার্থনা নয়।
আমি চাই এমন কিছু সকাল-
যেখানে শ্বাস নেবে আলো,
জানালার ধারে বসে থাকবে পাখির গান,
আর আমার বুকের ভেতর
জ্বলবে কৃতজ্ঞতার উজ্জ্বল দীপ।
আমি চাই এমন কিছু বিকেল-
যেখানে ক্লান্তি মানে বিশ্রাম,
অপমান মানে নয় পরাজয়,
আর সময় আমাকে ছুঁয়ে যাবে
বন্ধুর মতো, ঋণীর মতো নয়।
যেদিন হাত কাঁপবে কলম ধরতে,
সেদিন যেন চোখে থাকে আকাশ,
পায়ের নিচে থাকে নিজের জমিন,
আর মুখে থাকে একফোঁটা হাসি
যা কাউকে বোঝা করে না।
আমি চাই না অগণিত বছর,
আমি চাই পূর্ণ কয়েকটি মুহূর্ত-
যেন জীবন বলে উঠতে পারে,
তুমি আমাকে ভোগ করোনি,
তুমি আমাকে অশেষ করেছ।
আর শেষ বিকেলে,
যখন সূর্য নামবে কোমল আগুনে,
আমি যেন বলি-
এতটুকুই যথেষ্ট ছিল, এর বেশি হলে
আমি নিজেকেই হারাতাম।
১১. দীপালির বিয়ে
আজ দীপালির বিয়ে,
কতই বা ওর বয়স—চৌদ্দ?
সানাই বাজছে, কী অসাধারণ করুণ সুর,
সাথে বীনার বিদায়ী ঝংকার
কাঁপছে বাতাসে।
দীপালি নদীর সাথে কথা বলত,
জলের ধ্বনি শুনত কান পেতে-
ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে খুঁজে নিত
নিজের দীপ্ত নাম।
দীপালি পাখির সাথে কথা বলত,
অলিন্দে দাঁড়িয়ে ডেকে নিত রোদ্দুর,
তার চোখে তখন ছিল আকাশের নীল
আর ঘাসফুলের মতো নরম স্বপ্ন।
আজ সে লাল শাড়িতে বাঁধা,
মায়ের চোখের জলে ভিজে আছে তার কপাল,
হাতে মেহেদির অক্ষরে লেখা
একটি অনুচ্চারিত বিদায়।
ঘরের কোণে তার শৈশব
মাটির পুতুলের মতো পড়ে আছে,
হাসির ভাঙা ডানা গুটিয়ে
অচেনা গৃহের পথে হাঁটছে সে।
নদী আজ চুপ করে আছে,
পাখিরা জানালার ধারে থমকে গেছে-
যেন তারাও বুঝে গেছে
একটি ছোট্ট স্বপ্ন আজ হারিয়ে গেল।
দীপালি, তুমি কি শুনতে পাও?
সানাইয়ের সুরে আজ কাঁদছে তোমার নাম,
চৌদ্দ বছরের বুকের ভিতর
ডুবে যাচ্ছে একখানা নীল আকাশ।
আজ দীপালির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে…
আর কোথাও একটি নদী
নিঃশব্দে তার ঢেউ গুনে গুনে
একটি মেয়েকে খুঁজে ফেরে।
১২. ভালোবাসা মানে
ভালোবাসা মানে কণ্ঠে কণ্ঠে গান নয়,
ভালোবাসা মানে নীরবতার ভেতরে
হৃদয়ের শব্দ চিনে নেওয়া।
ভালোবাসা মানে হাত ধরা দুপুর নয়,
ভালোবাসা মানে অন্ধকার রাতেও
একটি আলো হয়ে জেগে থাকা।
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে হারিয়ে গিয়েও
ফিরে আসার পথ জানিয়ে রাখা।
ভালোবাসা মানে চোখে চোখে স্বপ্ন নয়,
ভালোবাসা মানে চোখ ভিজে গেলে
আকাশ হয়ে ঝরে পড়া।
ভালোবাসা মানে শুধু সুখের গল্প নয়,
ভালোবাসা মানে দুঃখের পাশে বসে
অদৃশ্য হয়ে কাঁদা।
ভালোবাসা মানে শরীরের তৃষ্ণা নয়,
ভালোবাসা মানে আত্মার গভীরে
নীরব আগুন জ্বালানো।
ভালোবাসা মানে দু’জন থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে দু’জন হয়েও
একজন হয়ে যাওয়া।
১৩. বংশী নদীর জল
সেই কবে থেকে বংশী নদীর পাড়ে যেতে মন চায়-
যেখানে সন্ধ্যার মৌন আকাশের নিচে
নদীর জল নাকি নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকে,
চোখ বুজে শোনে দিনের ক্লান্ত শ্বাস।
আবার কখনও মন চায়
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে
তোমাদের বাড়ির পাশের ছোট্ট জামতৈল স্টেশনে-
যেখানে প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে
এক দুপুরে বসে
আমরা দু’জন গরম চা খেয়েছিলাম,
আর সময় তখন থেমে ছিল
ধোঁয়ার মতো হালকা, নীল।
আরেক বিকেলে,
রেললাইনের পাশে হেঁটে হেঁটে
চলে গিয়েছিলাম ছোট্ট সেই ব্রিজটির কাছে-
সেখান থেকে দেখেছিলাম
দূরের ধানক্ষেতের সবুজ সমুদ্র,
দক্ষিণা হাওয়ার শীতল স্পর্শ
আমাদের গায়ে এসে লেগেছিল
মায়ার মতো, অদৃশ্য চাদর হয়ে।
ওমর খৈয়াম পড়তে পড়তে
বারবার মদ আর মদিরার কথা পড়েছি—
মদের অর্থ আমি জানি,
তবু কোনো মদিরাতে মত্ত হতে চাই না;
আমার নেশা কেবল স্মৃতি,
আর সেই স্মৃতির ভেতরেই
তুমি নিঃশব্দে জ্বলে থাকো।
একাকী হলে আমার খুব ঘুম পায়,
আর ভয় লাগে ঘুমিয়ে পড়তে-
যদি আর জাগা না হয়!
কারণ এখনও তো দেখা হয়নি
বংশী নদীর সেই নিঃস্তব্ধ জল,
শোনা হয়নি জামতৈল স্টেশনে দাঁড়িয়ে
দ্রুতগামী ট্রেনের
চলে যাওয়ার শেষ হুইসেলের কান্না।
তাই আমি জেগে থাকি, স্বপ্নের কোল ঘেঁষে,
অপেক্ষার বাতি জ্বালিয়ে-
যেন একদিন সত্যিই
বংশীর জলে ছুঁয়ে নিতে পারি
নিজেরই হারিয়ে যাওয়া ছায়া।
১৪. অচেনা সুখের গান
শিলিগুড়ি থেকে ভোরের ট্যাক্সিতে
পথ ছুটে গিয়েছিল পাহাড়ের বুক চিরে,
সবুজের ঢালে ঢালে
রোদ আর কুয়াশা খেলছিল লুকোচুরি।
সুকনা হেরিটেজ স্টেশন—
পুরনো ঐতিহ্যের গায়ে জমে থাকা শতাব্দীর নিঃশ্বাস,
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল
সময় যেন থমকে গেছে
একটি পোস্টকার্ডের ফ্রেমে।
বন্ধু শিশির রায়,
তোমারই আহ্বানে এই যাত্রা,
তোমার কথাতেই জেগে উঠেছিল
ভুলে যাওয়া পথের ডাক।
পথের ধারে কুঞ্জলতার নীল ডাক,
জারুল ফুলের রাঙা শাখা ঝুঁকে পড়া ছায়ায়,
হাওয়ার গায়ে লেগে থাকত ফুলের গন্ধ,
মুহূর্তগুলো ফুলের মতোই ঝরে পড়ত
পথের উপরে,
পাহাড়ের ঢাল ছিল ছবির মতো,
মেঘের ছায়া এসে বসত আমাদের চোখে,
হাওয়ার ভেতর ভাসত
অচেনা কোনো সুখের গান।
ভয় ছিল না সেদিন,
শুধু নিঃশ্বাসভরা প্রশান্তি,
আমার এক পাশে ছিল স্বামী,
আরেক পাশে বন্ধু-
দুই ভালোবাসার মাঝখানে
আমি যেন এক নিঃশব্দ নদী।
সেই মুহূর্তগুলো আজও
মনের অ্যালবামে ঝুলে থাকে,
রোদে ভেজা পাহাড়,
পুরনো স্টেশনের চুপচাপ হাসি,
আর আমাদের তিনজনের
অমলিন, অনন্ত যাত্রা।
---- মায়াবতী।
১৫. ফেরার পথে কেউ নেই
ঝরাপাতার মর্মর শব্দে তোমার আগমনের
পদধ্বনি শুনি,
চোখ মেলে রাখি পথের দিকে-
আসলে সব ভ্রম,
কোনো পথ দিয়েই কেউ আর আসেনি ফিরে…
তবু সন্ধ্যার আলো নুয়ে পড়লে
আমি তোমার ছায়া খুঁজি জানালার কাঁচে,
বাতাসে ভেসে আসে তোমার নাম—
অথচ কোথাও তুমি নেই,
শুধু স্মৃতির ঘুমন্ত দ্বার খোলে নিঃশব্দে।
ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে
তোমার চোখের জল মনে পড়ে,
রাতের আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদ
আমাকে তোমার মায়াবী মুখের কথা বলে।
আমি জানি-
তুমি ফেরার পথে নেই,
তবু প্রতিটি ভোরে দরজা খুলে বসে থাকি,
যেন কোনো এক অসম্ভব মুহূর্তে
তুমি হঠাৎই এসে বলবে-
এখনও কি আমাকে চাও?
কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথের মতো
আমার অপেক্ষা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়,
তবু হৃদয়ের গভীরে
তোমার নামটুকু জ্বলে থাকে-
একটি মায়াময় প্রদীপ,
যা নিভে গিয়েও আলো দেয়।
তাই আজও ঝরাপাতার শব্দে থমকে যাই,
মনে হয়- এই বুঝি তুমি…
এই বুঝি ফিরে এলে…
১৬. শেষ ডাক
শেষ মুহূর্তে মানুষ আর বড় থাকে না
সে হয়ে যায় ছোট্ট একটি শিশু,
যার চোখে জমে থাকে
অচেনা অন্ধকারের ভয়।
শ্বাসের প্রতিটি ঢেউ
ডুবে যেতে চায় গভীর কোনো স্মৃতিতে,
যেখানে ছিল প্রথম আলো, প্রথম স্পর্শ,
প্রথম 'তুমি নিরাপদ: বলা কণ্ঠ।
কেউ ডাকে— মা,
কারণ মায়ের নাম মানে আশ্রয়।
কেউ ডাকে— ও,
কারণ সেই মানুষটি ছিল জীবনের ছায়া।
কেউ ডাকে— আমার সন্তান,
কারণ তার ভেতর লুকিয়ে আছে নিজেরই আগামী।
শেষ সময়ে আমরা নাম ডাকি না,
ডাকি সেই হৃদয়টিকে
যার কাছে ভেঙে পড়লেও লজ্জা নেই,
যার বুকে মাথা রাখলে
মৃত্যুও কিছুটা কম ভয়ংকর লাগে।
তখন আর সম্পর্ক থাকে না,
থাকে শুধু নিরাপত্তার আলো,
একটুকরো উষ্ণতা
অন্ধকারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
আর সেই ডাক আকাশে মিলিয়ে যায়,
যেন বলছে-
ভালোবাসা কখনও মরে না,
সে শুধু অন্য আলোয় চলে যায়।
১৭. আলোকবর্তিকা
মনে হয়,
জগতের সকল অন্ধকার
আমি তোমার কাঁধে জড়ো করে রাখি,
ঢেকে রাখি তোমাকে
রাত্রির দীর্ঘ শাল দিয়ে।
রাখিও তাই,
আমার অক্ষম আলো,
আমার ভীত স্বপ্ন,
আমার সমস্ত ছায়ার বোঝা
তোমার নিঃশ্বাসে রেখে।
কিন্তু জানি না কখন,
কোন অদৃশ্য ক্ষণে
তুমি নিজেই হয়ে ওঠো
শত সহস্র আলোকবর্তিকা-
অন্ধকারের বুক চিরে
নীরবে জ্বলে ওঠো।
তখন মুহূর্তেই
আমার অন্ধকার ঘর
রৌদ্রের মত উজ্জ্বল হয়ে যায়,
ছায়ারা পিছু হটে,
দেয়ালের গায়ে নাচে আলো।
আমি বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি-
যাকে ঢাকতে চেয়েছিলাম অন্ধকারে,
সে-ই তো আমার
সবচেয়ে উজ্জ্বল সকাল।
১৮. কিচ্ছু হয়নি
একবার স্কুলের স্মরণিকার জন্য
এক মুঠো স্বপ্ন দিয়ে লিখেছিলাম কবিতা-
স্যারের ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি,
“কিচ্ছু হয়নি, তোর দ্বারা কবিতা হবে না।”
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম,
শব্দও আঘাত দিতে পারে।
কলেজে পড়ার সময়
একটা গল্প লিখে জমা দিয়েছিলাম-
সম্পাদক চোখ তুলে তাকাল না,
বলল, “কিছুই হয় নাই, ছাপানো যাবে না।”
কাগজের ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে গেল আমার বুক। তবু আমি থামিনি।
শহরের দেয়ালে দেয়ালে
নামহীন পংক্তি লিখে রেখেছি-
কেউ পড়ে, কেউ পড়ে না,
কেউ মুছে দেয়, কেউ রেখে দেয়
নিজের নিঃশ্বাসে।
রাতে যখন সবাই ঘুমোয়,
আমি জেগে থাকি শব্দের পাশে-
অবহেলার ছাই থেকে
আমি জ্বালাই অক্ষরের আগুন।
আমাকে কেউ ডাকেনি কবি বলে,
কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি মঞ্চে ওঠার জন্য,
তবু প্রতিটি না-শোনা শব্দের ভেতর
আমি শুনি নিজের অস্তিত্বের শব্দ।
আমি লিখি-
কারণ লেখা ছাড়া আমার আর কোনো ঘর নেই,
কারণ আমাকে যে লেখক হতে হবে।
একদিন হয়তো আমার নামও
কোনো অচেনা হৃদয়ে আলো হয়ে জ্বলবে-
সেদিন আর কেউ বলবে না,
“কিচ্ছু হয়নি।”
১৯. থাকব পাশাপাশি
এই বাড়ির আঙিনায়
কৌতূহলের পাখিরা ডানা মেলে
নীল আকাশে ভেসে যায়-
তোমার চোখে তখন জ্বলে ওঠে
নীলমণির মৃদু দীপ্তি।
দিন গুনব না আর,
সময়ের ক্যালেন্ডার ছিঁড়ে ফেলে শুধু বাঁচব-
মাটির সোঁদা গন্ধে, বৃষ্টিভেজা ঘাসের শিরায়,
নামহীন শান্তির মতো থাকব পাশাপাশি।
সন্ধ্যা নামলে আমাদেরই ছায়া
দু’দিক থেকে এগিয়ে এসে এক হবে-
আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় হবে,
তারারা জানালার কপাট খুলে
অন্তরালের গল্প শোনাবে।
আমরা দু’জন পৃথিবীর কোলাহল
পেরিয়ে আরও গভীরে ডুবে যাব কৌতূহলের উষ্ণ স্পর্শে,
আর মায়ার স্বচ্ছ আলোয়।
২০. শেষ বিদায়
আজ একজন আপন মানুষের জানাজায়
দাঁড়িয়ে ছিলাম-
কাতারে কাতারে নীরব মানুষ,
চোখে অশ্রুর ধারা,
বুকে অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস।
মসজিদের ইমাম সাহেব
নামাজ শুরুর আগে কফিনটির দিকে তাকিয়ে বললেন-
“দেখুন, এই কফিনটি আপনারও হতে পারত;
হয়তো পরের কফিনটাই হবে আপনার।”
কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল না,
ধীরে ধীরে নেমে এলো আমাদের হৃদয়ের ভেতর,
একটি অদৃশ্য হাত যেন টোকা দিল-
সময়ের দরজায়, জীবনের আয়নায়।
চার কাঁধে ভর দিয়ে যে চলে গেল আজ,
সেও তো গতকাল আমাদের মতোই হাঁটছিল আলোয়,
হাসছিল, কথা বলছিল,
অপূর্ণ স্বপ্ন বুকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ছিল।
কফিনের কাঠে আজ নিথর যে দেহ,
সে-ই তো ছিল একদিন উষ্ণ স্পন্দন,
একটি পরিবার, একটি গল্প,
অগণিত স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
মাটি অপেক্ষায় থাকে নীরবে-
কারো নাম ধরে ডাকে না,
কেবল সময় হলেই
আলতো করে টেনে নেয় আপন বুকে।
ইমামের সেই বাক্য এখনও কানে বাজছে-
জীবন বড়ই ক্ষণিক, বড়ই অনিশ্চিত;
আমরা সবাই পথিক,
নিজ নিজ কফিনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি।
তবু এই সচেতনতা যদি
আমাদের হৃদয়কে করে নরম, কর্মকে করে সৎ,
ভালোবাসাকে করে গভীর-
তবে হয়তো কফিনের ভয় নয়,
বরং প্রস্তুতির আলোয় একদিন আমরা-ও ফিরব
শান্ত, নিশ্চিন্ত, প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে।
২১. প্রেমিক
তোমাকে অনেকেই ভালোবেসেছে,
তোমাকে যে বেশি ভালোবেসেছে, সে আমি।
ভিড়ের ভিতর নাম না-জানা এক আলো হয়ে
তোমার চোখের ভাষা পড়েছি আমি।
তোমার হাসিতে যতজন খুঁজেছে সকাল,
আমি খুঁজেছি অনন্ত দুপুরের শান্তি,
তোমার নীরবতায় যতজন শুনেছে অভিমান,
আমি শুনেছি অব্যক্ত প্রতিশ্রুতির ক্লান্তি।
তোমার চুলে লেগে থাকা বাতাসের গন্ধে
যতজন লিখেছে ক্ষণিকের গান,
আমি লিখেছি ঋতুর পর ঋতু জেগে থাকা
এক দীর্ঘ অমলিন প্রাণ।
তুমি হয়তো অনেকের স্বপ্নের জানালা,
আমি তোমার ঘরের প্রদীপ হতে চেয়েছি,
ঝড় এলে নিভে না যাওয়া ক্ষুদ্র আলো,
অন্ধকারে কাঁপলেও পাশে রয়েছি।
তোমাকে অনেকেই ভালোবেসেছে,
ফুলের মতো, উৎসবের মতো, ক্ষণিক রঙে;
আমি ভালোবেসেছি শিকড়ের মতো-
নিভৃতে, গভীরে, মাটির ঢঙে।
যদি কোনোদিন ফিরে তাকাও
সব ভালোবাসার ভিড়ের মাঝে-
দেখবে, সবচেয়ে নীরব যে মানুষটি দাঁড়িয়ে,
সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে সে-ই তোমাকে।
২২. ফিরে যাই সেই গ্রামে
গ্রামে যেতে ইচ্ছে করে,
উন্মাতাল বসন্ত বাতাস গায়ে মেখে
পথের ধুলোর সাথে মিশে যাই আবার।
শিরিষপাতা উড়ে এসে ছুঁয়ে দিক কপাল,
দিগন্তজোড়া নীল আকাশ হোক আমার চাদর।
তপ্ত দুপুরে রোদ্দুরের আগুন পেরিয়ে
খালি পায়ে হেঁটে যাই কাঁচা বাঁশের সাঁকো ধরে,
ঘাসফড়িং লাফিয়ে উঠুক পায়ের কাছে,
আর দূর তেপান্তরের মাঠের ওপারে
জলস্রোতের মতো দুলুক মরীচিকার স্বপ্ন।
ঠাকুর বাড়ির জারুল বনে
বেগুনি ফুল ঝরে পড়ুক নীরবতায়,
কোকিলের ডাকে কেঁপে উঠুক শৈশবের দুপুর,
সেই ডাক যেন মায়ের ডাকার মতোই পরিচিত,
অচেনা শহরের ভিড়ে যার প্রতিধ্বনি নেই।
পুকুরপাড়ে কাশফুলের দোলায়
হারিয়ে যাক জমে থাকা ক্লান্তি,
কাদামাটির গন্ধে জেগে উঠুক ভোলা দিন,
মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে
আবার খুঁজে পাই নিজের ছোট্ট আমিকে।
এই শহুরে কোলাহল ছেড়ে
ফিরে যেতে চাই সেই সরল বিকেলে,
যেখানে সন্ধ্যা নামে ধীরে,
আর আকাশের প্রথম তারা দেখে
মনে হয়, জীবন আসলে খুব বেশি কিছু নয়,
শুধু একটু বাতাস, একটু রোদ,
আর কিছু অমলিন স্মৃতির ঘ্রাণ।
২৩. একই মাটির গন্ধ
আকাশে কাঁটাতারের বেরা নেই,
নদীতেও নেই কোনো সীমানার দাগ,
মেঘেরা ভেসে যায় দেশ থেকে দেশে
বৃষ্টি নামে নির্দ্বিধায় সকলের ভাগ।
শালিক জানে না পাসপোর্টের ভাষা,
পাখিরা শেখেনি মানচিত্রের পাঠ,
সমুদ্রের ঢেউ কারো নাম ধরে ডাকে না,
তবু তীরে তীরে ওঠে অদৃশ্য প্রহরীর ঘাট।
এই মাটির গন্ধ কি আলাদা কোথাও?
ধানের শিষে কি বদলায় রং?
রোদ কি আলাদা করে দেখে মানুষ,
কার কপালে দেবে আলোর ঢং?
শিশুর কান্না একই রকম,
মায়ের ডাকে একই সুর,
ভালোবাসার ভাষা তো অনুবাদ চায় না
হৃদয় জানে তার ভরপুর।
তবু কেন কাঁটাতারের জাল বিছাই
এই ধুলো-মাটির বুকে?
কার ভয়ে আমরা ভাগ করি পৃথিবী,
নিজেরই ছায়াকে রেখে দূরে?
হয়তো একদিন ভোরের আলো
সব রেখা মুছে দেবে ধীরে,
মানুষ মানুষকে চিনবে শুধু
মানুষ বলেই-
সীমানাহীন নীলের নীড়ে।
২৪. চিরন্তন ভালোবাসা
তুমি মন চাইলে,
নিঃসংকোচে মন খুলে দিলাম তোমার আকাশে,
যেন পাখিরা উড়ে যায় নির্ভয়ে।
তুমি হৃদয় চাইলে,
বুকের গোপন কুঠুরি থেকে তুলে দিলাম স্পন্দন,
তোমার নামে লিখে দিলাম সমস্ত রক্তকণিকা।
তুুমি চুমু চাইলে,
অধরের নরম আলো ছুঁয়ে দিল তোমার সন্ধ্যা,
লাজুক বাতাসে কেঁপে উঠল নীল জানালা।
তারপর তুমি বললে,
আরও কাছে, আরও গভীরে,
আমার সমগ্র সত্তা চাও।
আমি মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম,
সবটুকু দিলে,
আমার ভেতর আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকবে?
তুমি বললে,
থাকবে আমাদের আগামী,
একটি নতুন সূর্যোদয়,
রক্তে লেখা ভবিষ্যৎ,
সন্তান।
আমি বললাম, সন্তানও দেবো,
স্বপ্নের মতো করে,
ভালোবাসার বীজ বুনে।
তারপর আমরা দুজন
একই সুরে, একই নিঃশ্বাসে বললাম -
শরীরের চেয়ে গভীর হোক আমাদের বন্ধন,
সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হোক আমাদের পথচলা,
জন্ম থেকে জন্মান্তর জুড়ে ভালোবাসা
চিরকালের হোক।
২৫. গল্পের নায়িকারা
আমাকে কেউ কেউ বলে -
তোমার গল্প পড়লে মনে হয়, ঐ গল্পের নায়িকারা
তোমার প্রেমিকা ছিল,
আমি হেসে বলি— হ্যাঁ, ছিল তো বটেই।
কীর্তিকা ছিল বর্ষার প্রথম ভেজা বিকেল,
কমলিকা শরতের সাদা মেঘে ভাসা আলো,
দোলা মিত্র কুয়াশা ঢাকা রেলস্টেশনের অপেক্ষা,
হৈমন্তী ছিল হেমন্তের হলুদ পাতা ঝরার শব্দ।
লায়লা নামাজ শেষে নিঃশব্দ প্রার্থনা,
কুসুম ছিল রোদে ফোটা শিউলির ঘ্রাণ,
মিত্রা নীলচে সন্ধ্যার গভীরতা,
নিলোৎসী দূর নদীর ওপারে ঝিলমিল করা আলো।
জরি ছিল উৎসবের শাড়ির সোনালি কারুকাজ,
মরিয়ম ছিল ভোরের আজানের সুর,
পল্লবী কচি পাতার মতো কাঁপা প্রথম স্বীকারোক্তি,
নমিতা অভিমানের ঝুমঝুম বৃষ্টি,
অমৃতা নামের মতোই এক চুমুক অমলিন স্বাদ।
তারা কেউ আমার হাতে হাত রাখেনি,
কেউ কপালে আলতো ছোঁয়া দেয়নি -
তবু প্রত্যেকে আমার হৃদয়ের
একেকটি গোপন ঘরে আলোর প্রদীপ
জ্বেলে রেখেছিল।
আমি তাদের প্রেম করিনি,
আমি তাদের লিখেছি,শব্দে শব্দে ছুঁয়েছি,
বাক্যে বাক্যে জড়িয়ে ধরেছি।
যতদিন গল্প বেঁচে থাকবে,
ততদিন তারা আমারই থাকবে,
রক্তে নয়, কল্পনায় নয়,বরং সেই অদৃশ্য জায়গায়
যেখানে লেখকের কলম
ভালোবাসার আরেক নাম হয়ে ওঠে।
২৬. প্রতীক্ষা
ভেবেছিলাম,
এই শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে তুমি এসে
রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনায়ে যাবে,
আমি গীতাঞ্জলি খুলে বসে রইলাম --
তুমি আর এলে না।
বৃষ্টি নেমেছিল নীল ময়ূরাক্ষীর মতো
বারান্দার ধারে,
শিউলির গন্ধে ভরে উঠেছিল নিঝুম আঙিনা,
দূরের বাঁশবাগানে হাওয়ার মৃদু সুর -
ভাবতাম, এ কি তোমার পায়ের শব্দ?
বৃষ্টির নুপুরে তোমার মুখ কল্পনা করে
আমি ছুঁয়েছি কেবল শূন্যতা -
অপেক্ষারও যে একটি শরীর আছে,
সেদিন তা বুঝেছি।
তোমার জন্য রেখে দেওয়া কাঁসার বাটিতে দুধভাত
শুকিয়ে গেছে বহু আগেই,
কিন্তু আমার ভেতরের শিশুটি এখনো বিশ্বাস করে,
তুমি হঠাৎই এসে বলবে -
শোনো, এই গানটা শুধু তোমার জন্য।
রাত পেরিয়ে ভোর হয়,
ভোর পেরিয়ে আবার রাত্রি আসে -
আমি দরজার কপাট অল্প ফাঁক রেখে দিই,
যদি হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে
তোমার গানের প্রথম সুর।
তুমি আসোনি,
তবু শ্রাবণ এলে আজও আমার বুকের ভেতর
অনেকগুলো মেঘ এসে জড়ো হয়,
আর আমি নীরবে ভাবি -
অপেক্ষাও এক ধরনের প্রেম,
যার শেষ নেই।
২৭. সময়ের আগেই বিদায়
প্রিয় মানুষকেও অনেক সময় ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়,
হারাবার কষ্ট যেন প্রলম্বিত না হয়,
ক্ষত যদি হবেই, হোক একবারেই গভীর,
ধীরে ধীরে পচে উঠুক না কোনো নীরব দাহ।
যে হাত একদিন শপথে কেঁপেছিল,
আজ সে হাতই ছাড়তে শেখে -
ভালোবাসা মানে শুধু আঁকড়ে ধরা নয়,
কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়ার কঠিন শিক্ষাও বটে।
আমরা জানি, কিছু সম্পর্কের আয়ু
শরতের কাশফুলের মতো-
দূর থেকে অপার সাদা,
ছুঁলেই ঝরে যায় তুলোর মতো ভঙ্গুরতায়।
তাই হৃদয়ের দরজা নিজেই বন্ধ করি,
যেন ঝড় ঢুকে সব ভেঙে না দেয়,
আগুন নেভাই নিজের হাতে,
যেন ধোঁয়ায় অন্ধ না হয় ভবিষ্যতের পথ।
প্রিয় মানুষকেও তাই কখনো বিদায় বলতে হয়
অভিমান নয়, প্রতিশোধ নয়,
শুধু বাঁচার জন্য,
শুধু ভেঙে পড়ার সময়টুকু ছোট করার জন্য।
কারণ আমরা জানি,
অতিরিক্ত ভালোবাসা যখন বিষ হয়ে ওঠে,
তখন দূরত্বই একমাত্র ওষুধ,
আর সময়ের আগেই বিদায়ই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।
২৮. নোলক
নাকের নোলক পরিয়ে দিয়েছিলে তুমি
লাজুক বিকেলের রোদে কেঁপেছিল তোমার আঙুল,
সেদিন থেকে আমার শ্বাসে তোমার
নামেরই নীরব ঝংকার।
এই নোলক শুধু রূপার বৃত্ত নয়,
এ এক প্রতিজ্ঞা,
আমার হাসি, কান্না, অভিমান
সবকিছুর মধ্যিখানে তোমার স্পর্শের সীলমোহর।
এই নোলক খুলবেও তুমি,
যেদিন আমার চোখে আর আলো থাকবে না,
শরীর নিথর হয়ে শুয়ে থাকবে সাদা কাফনের ভাঁজে,
তখনও যেন তোমার হাতই শেষবার
আমার মুখ ছুঁয়ে বলে - এ আমার প্রিয়তমা।
আমাকে যেন না খুলতে হয় অলংকার,
না মুছতে হয় চোখের কাজল
না গুনতে হয় নিঃশ্বাসের অবশিষ্ট সংখ্যা-
সে ভার যেন না আসে আমার কাঁধে।
আল্লাহর কাছে আমার একটাই প্রার্থনা-
আমার আয়ু তোমার চেয়ে কম হোক,
আমি আগে যাই,
তোমার বুকের ভিতর আমার স্মৃতির ব্যথা রেখে।
আমার নোলক খুলে রেখো একটি
কাঠের বাক্সে যত্নে,
তুমি বেঁচে থেকো আমার নামটুকু নিয়ে।
যদি কখনো একলা রাতে চাঁদের আলো
জানালায় এসে পড়ে,
নোলকটা হাতে নিয়ে একটু অশ্রুপাত করিও --
আমি তখন বাতাস হয়ে এসে তোমার
কপালে চুমু দিয়ে বলব,
ভালোবাসা কখনো প্রাণহীন হয় না।
২৯. অন্ধকারে আলো
মৃত্যুশয্যায় কাতর হয়ে মেয়েটি বলেছিল-
আমি চলে গেলে
তোমায় ভালোবাসবে কে?
রাত জাগলে বকবে কে,
না খেলে জোর করে খাওয়াবে কে?
তুমি বিয়ে করে নাও
আমি দেখে যেতে চাই, তুমি ভালো থাকবে।
ছেলেটি তাকে জড়িয়ে বলেছিল—
চুপ, তুমি ছাড়া আমি কারও নই।
তুমিই আমার সব আলো,
স্রষ্টা এমন নিষ্ঠুর হবেন না।
মেয়েটি ফিসফিস করে বলেছিল—
অন্ধকারে খুব ভয় লাগে আমার,
তবু কি না আমাকেই যেতে হবে
চির-অন্ধকারের দেশে…
তোমার বুকে মাথা রেখে
আলোয় থাকতে খুব ইচ্ছে করে।
তারপর একদিন সত্যিই সে চলে গেল।
ছেলেটি প্রতি রাতে কবরের পাশে বসে
মোমবাতি জ্বালায়-
যেন অন্ধকার তাকে ছুঁতে না পারে।
ইদানীং ছেলেটির ক্যান্সার ধরা পড়েছে,
মৃত্যু নয়, তার ভাবনা শুধু একটাই-
সে চলে গেলে
মোমের আলো জ্বালাবে কে?
হায়! ভালোবাসা এমনই- আলো হয়ে বেঁচে
থাকতে চায়।
(ফেসবুকে একজনের স্টাটাস অবলম্বনে।)
৩০. একবার আলো দাও
বারে বারে ভেঙে পড়ি, প্রভু,
নিজের হাতেই নিজেকে মাটি করি
ধুলোর চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যাই।
অন্ধকারের সঙ্গে সখ্য করি,
তবু ভোরের জন্য কাঁদি
এই দ্বন্দ্বেই দিন ফুরোয়।
প্রভু, আমাকে একবার ধুয়ে দাও
অভিমান আর অবহেলার কাদামাটি থেকে,
ভেতরের গোপন কালিমা মুছে দাও
যাতে মানুষ শুধু খোলস না দেখে,
দেখে অন্তরের স্বচ্ছ আলো।
আমি বারবার হারাই পথ,
পাপের কাছে হেরে যাই,
নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাই।
তুমি একবার ছুঁয়ে দাও
যদি বাঁচাটাই মূল কথা হয়,
তবে বাঁচার মতো করেই বাঁচাইও।
প্রভু,
একবার আমাকে নির্মল করো-
যেন নষ্ট হওয়ার আগে
নিজেকে ফিরে পাই।
৩১. ফুরানোর আগে
ফুরিয়ে গেল এই ভুবনের ইতিকথা,
হায় জীবন, তুমি ফুরিয়ে নিঃশেষ করে দিলে,
অথচ কত কথা বাকি ছিল,
কত অশ্রু জমে ছিল চোখের কোণে।
সূর্য ডুবে গেলে যেমন
আকাশে একটু লালচে স্মৃতি রয়ে যায়,
তেমনি আমার দিনগুলোও
শেষ আলোয় ঝিমিয়ে পড়ে
তোমার নাম উচ্চারণ করে।
আমি তো ভেবেছিলাম -
আরও কিছু পথ হাঁটব কাঁধে কাঁধ রেখে,
আরও কিছু পূর্ণিমা গুনব
তোমার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে;
কিন্তু সময় বড়ো নির্দয় সে কারও হাত ধরে না।
হায় জীবন,
তুমি কেন এত দ্রুত শেষের দিকে টেনে নিলে?
কেন সব স্বপ্নের উপর
ঝরাপাতার মতো শীত নামিয়ে দিলে?
তবু ফুরিয়ে যাওয়ার মাঝেও আলো থাকে-
তোমার ছোঁয়া, তোমার হাসি,
বিকেলের বাতাসে এখনও ভেসে আসে।
মৃত্যুরও কি সবকিছু নেওয়ার সাধ্য আছে?
সে কি নিতে পারে সেই স্পর্শ,
যা মিশে গেছে আমার রক্তে?
সে কি মুছে দিতে পারে
তোমার নামে লেখা সকল প্রার্থনা।
ফুরিয়ে যাক ভুবনের ইতিকথা, ফুরিয়ে যাক
আমার দিনলিপি -
তবু যদি কোনো এক অন্তিম রাতে তারারা
শুনতে চায় আমার গল্প,
তারা জানুক - আমি শেষ অবধি বেঁচেছিলাম
ভালোবাসার আলোয়।
৩২. দিগবালিকার প্রতিশ্রুতি
ছোট বেলার এক বাল্য সখীকে বলেছিলাম,
তুই কী আমার হবি?
দিগবালিকা মিষ্টি হেসে কাছে এসে
বলেছিল, হবো তোর, তবে চিরকালের জন্যে।
কাঁঠালতলার ছায়ায় বসে কত যে স্বপ্ন
বুনেছিলাম দু’জনে
তুই বলতিস, আকাশ যদি ভেঙে পড়ে,
আমি হাত ছেড়ে যাবো না কোনো ক্ষণে।
বিকেলের রোদে ধুলো মেখে
আমরা লিখতাম নাম কাদামাটির দেয়ালে,
তোর চুলে রোদের সোনালি আগুন,
আমার বুক ভরা আলো জ্বালায়।
বৃষ্টিভেজা দুপুরগুলোয় এক ছাতার নিচে
লুকিয়ে থাকা,
তুই হেসে বলতিস - “বড় হয়ে গেলেও
এই হাতটা যেন ছাড়িস না।”
সময় কিন্তু বড় নির্দয়-
সে কাঁধে তুলে নেয় আলাদা পথের ঝুলি,
তোর মাথায় লাল শাড়ির রোদ উঠল,
আমার আকাশে জমল ভুলে-যাওয়া কুয়াশার ধুলি।
তবু আজও গভীর রাতে
হঠাৎ জেগে উঠলে শুনি সেই স্বর
তুই কী আমার হবি?
আর বাতাস ভেসে আনে উত্তর
হবো তোর অন্য কোনো জন্মে,
অন্য কোনো ভোর।
সেই প্রতিশ্রুতি আজও ঝরে
শিউলি ফুলের মতো ভোরের শিশিরে,
ছোট্ট বেলার বাল্য সখী-
তুই রয়ে গেছিস হৃদয়ের গোপন নীল নীড়ে।
৩৩. গণতন্ত্রের সংজ্ঞা
কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতেন শারমিন আপা,
আপা যখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বলতেন -
“জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য…”
আমি তখন গোপনে তাঁর দেহরূপে মুগ্ধ হয়ে
অন্য এক রাষ্ট্রের মানচিত্র আঁকতাম।
বোর্ডে চক ঘষে লিখতেন-
Abraham Lincoln-এর উদ্ধৃতি,
আর আমার ভেতর কেঁপে উঠত
অপ্রকাশিত এক স্বাধীনতার ঘোষণা।
তিনি বলতেন -
Jean-Jacques Rousseau এর সামাজিক চুক্তির কথা, বলতেন --
''Man is born free, and everywhere he is in chains''.
আমি মনে মনে ভাবতাম,
হৃদয়েরও কি কোনো চুক্তিপত্র হয়?
স্বাক্ষরহীন, তবু বাধ্যতামূলক?
আপার শাড়ির আঁচলে ছিল গোধূলির রঙ, কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা -
যেন সংসদে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন,
আর আমি বিরোধীদলহীন এক তরুণ প্রতিনিধি,
নিঃশব্দে সমর্থন জানাচ্ছি
প্রতিটি উচ্চারণে।
সেই অসম বয়সে প্রেমে পড়েছিলাম তাঁর-
কিন্তু নিবেদন করতে পারিনি…
কারণ পাঠ্যসূচিতে প্রেম ছিল না,
ছিল শুধু রাষ্ট্র, সংবিধান, নীতি ও ন্যায়।
পরীক্ষার খাতায় লিখেছিলাম
গণতন্ত্রের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য -
কিন্তু লিখিনি তাঁর চোখের ভেতর লুকানো
আমার ব্যক্তিগত বিপ্লবের কথা।
আজও যখন কোনো সভায় গণতন্ত্রের
কথা শুনি, মনে পড়ে—
একটি শ্রেণিকক্ষ, একজন শারমিন আপা,
আর এক কিশোর হৃদয়,
যে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল,
কিন্তু কখনো তা প্রকাশ্যে পাঠ করেনি।
৩৪. মখমল স্পর্শের ভিতর
তোমার শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি
মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ
হঠাৎ নেমে এসেছে দু’হাতে ছোঁয়ার মতো কাছে।
এমন মখমল রূপ আগে দেখিনি,
চাঁদের আলোও এত মসৃণ নয়,
নদীর ঢেউও এত গোপন কাঁপনে কাঁপে না।
তোমার কাঁধে রাখা আলোর রেখা
আমার আঙুলকে ডাকে,
যেন অচেনা কোনো বাগানের ভিতর
ফুটে আছে নিশিগন্ধার গোপন উচ্ছ্বাস।
তোমার শ্বাসের ভেতর জেগে ওঠে উষ্ণ বসন্ত, বুকের ধকধক শব্দে
বাজে মৃদু মাদল -
আমি শুনি, আর ধীরে ধীরে ডুবে যাই
সেই সুরের গভীরে।
তোমার গায়ে সন্ধ্যার রঙ, তোমার দৃষ্টিতে অদৃশ্য আগুন,
আমার সমস্ত সংযম পতঙ্গের মতো ঘুরে ঘুরে জ্বলে ওঠে সেই আলোর কাছে।
এমন বিহ্বল করা সৌন্দর্য শুধু দেখা যায় না, ছুঁতে হয়,
অনুভবের গভীর জলে ডুব দিতে হয়,
যেখানে দুই শরীর দুই নদীর মতো এসে
এক গোপন মোহনায় মিলিয়ে যায়।
সেই মিলনের ভিতর শব্দ থাকে না,
থাকে শুধু উষ্ণতা, আর ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া রাত্রি --
তখন তার মখমল শরীরে ওঠে আমার নিঃশ্বাসের দীর্ঘ ঝড়।
৩৫. ছুঁয়ে আছো
আমার জামায় ছুঁয়ে আছে তোমার শরীরের মধুরিমা,
কবোষ্ণ বুকের ঘ্রাণ,
যেন সন্ধ্যার শেষ আলোয় ভেজা শিউলিফুলের অবগাহন।
চুলের গন্ধে লেগে আছে অদৃশ্য এক বসন্ত,
আঙুলে এখনও কাঁপে তোমার স্পর্শের রেশ,
হৃদয়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে
নাম না-জানা এক সুরের কম্পন।
তুমি হেঁটে গেলে
বাতাসও যেন তোমার পায়ের শব্দ ধার করে নেয়,
আমার চারপাশে উষ্ণতা রেখে
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় দূরে।
তোমার গলার কাছে যে নীল শিরা কাঁপে,
তার ছন্দে আমার অস্থিরতা দোলে;
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণ ঢেউ
আমার রাত্রির জানালায় এসে ধাক্কা দেয়।
এখনও বুকের ভেতর
তোমার মাথা রাখার ভার অনুভব করি-
সে ভার কোনো বোঝা নয়,
সে যেন শান্ত এক আকাশ
আমার সমস্ত অস্থিরতা ঢেকে রাখে।
জামার পরতে পরতে তোমার উপস্থিতি,
ঘ্রাণে, উষ্ণতায়, অনুচ্চারিত স্বীকারোক্তিতে-
আমি চোখ বন্ধ করলেই
তোমার দেহের কোমল আলোকছটা
আমার একাকিত্বে মিশে যায়।
স্পর্শের পরে যে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি থাকে,
আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে
সেই মৃদু, মধুর অনুরণন প্রতিক্ষণ বাজে।
৩৬. নোঙর
যে ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে এসেছিল
সেই ঘাটে আর ফেরা হলো না-
স্মৃতির কাশবনে আজও দোলে
প্রথম বিদায়ের কাঁপা হাওয়া।
পেছনে পড়ে রইল শৈশবের জলসিঁড়ি,
অদেখা স্বপ্নের কাদামাটি,
আর অচেনা নদীর ডাকে ভেসে যাওয়া দিনগুলো।
আমি ভেবেছিলাম, সব নদীই সাগরের দিকে যায়,
সব যাত্রাই শেষ হয় বিস্তারে।
কিন্তু আমার নৌকা অদৃশ্য স্রোতের টানে
তোমার ঘাটেই এসে থামল।
তোমার চোখ ছিল শান্ত জলের মতো,
যেখানে ঢেউ উঠলেও শব্দ হয় না,
তোমার হাসি ছিল বাতিঘর,
দূর অন্ধকারেও যে আলো ফেলে।
আমি আর ফেরার পথ খুঁজিনি।
ছেঁড়া পাল মেরামত করিনি,
দিকচিহ্ন আঁকিনি আকাশে।
তোমার ঘাটের কাশফুলে আমার
ক্লান্তি নেমে এলো,
তোমার পাড়ের নরম বালিতে আমার
নোঙর গেঁথে গেল
তবু জানি, একদিন জোয়ার বদলাবে,
তোমার ঘাটও হয়তো চিনবে না আমাকে।
তখন আমি নিঃশব্দে খুলে নেব নোঙর,
ভেসে যাব অচেনা স্রোতে -
ফিরব না কোনো ঘাটেই আর,
শুধু নদীর বুকেই হারিয়ে থাকব
অপূর্ণ যাত্রার মতো।
৩৭. অস্তরাগের আগে
তীর্যক রোদ্ররাশির উপর যখন বিকালের ছায়া
নেমে আসে তখন মনটা সত্যি খারাপ লাগে,
অনেকটা মুখর জীবনের উপর সন্ধ্যার ম্লান অস্তরাগের বিষণ্নতার মতো,
যেন হঠাৎ থেমে যায় হাসির কলরোল,
নির্জন বারান্দায় কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস ভেসে থাকে।
দূরের আকাশে পাখিরা ফেরে নীড়ে,
তাদের ডানায় জমে থাকে সারাদিনের ক্লান্ত রোদ,
আমার বুকেও তেমনি জমে থাকে অকারণ বিষণ্ণতা,
যার কোনো ঠিকানা নেই, তবু ভারী হয়ে ওঠে শ্বাস।
গাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসে পথের বুকে,
যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায়,
কোনো এক অদেখা নাম ধরে ডাকে -
কিন্তু ফিরতি সাড়া মেলে না কোথাও।
দিনের রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়,
রক্তিম আভা গলে পড়ে ধূসরতায়,
ঠিক তেমনি স্বপ্নগুলিও আলো হারায়
অব্যক্ত ক্লান্তির অনামা সন্ধ্যায়।
তবু জানি,
অন্ধকার একেবারে শেষ কথা নয়,
এই ম্লান অস্তরাগের পরেই
নক্ষত্রেরা জ্বলে উঠবে নীরব আশ্বাস হয়ে।
তাই বিষণ্ণ বিকেলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি,
ছায়ার ভিতর থেকে আলো খুঁজি-
কারণ প্রতিটি দিনশেষই হয়তো
নতুন কোনো প্রভাতের গোপন প্রস্তুতি।
৩৮. ফিরে আসবে
তুমি আবার ফিরে আসবে -
যে শ্রাবণে চলে গেছ, তেমনি বৃষ্টিমুখর আরেক শ্রাবণে,
জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে অশ্রুর মতো জল,
আমি ভাবব, এ বুঝি তোমারই গোপন অশ্রুপাত।
আর যদি না আসো সেই ভেজা দুপুরে,
হয়তো আসবে পাগল-করা ধবল জোছনা রাতে,
পরনে থাকবে দার্জিলিং থেকে আনা
সেই সাদা রঙের জর্জেট শাড়ি,
চুলে কদমফুলের গন্ধ -
চাঁদের আলোয় তোমাকে দেখাবে অলৌকিক, স্বপ্নময়।
হয়তো হঠাৎ বাতাস দুলে উঠবে,
আমার উঠোনে হাস্নাহেনারা ফিসফিস করে
বলবে - সে এসেছে...
আমি দরজা খুলে দাঁড়াবো -
দেখব, শুধু জোছনা আর শূন্যতা।
তুমি যদি শরীর হয়ে না-ও আসো,
আসবে কি স্মৃতি হয়ে?
ভেজা মাটির গন্ধে, পুরনো চিঠির ভাঁজে,
অথবা ঘুম ভাঙা কোনো নিশীথে
হৃদয়ের ভেতর নীরব স্পন্দন হয়ে।
আমি জানি, প্রতিটি ঋতুই তোমার অজুহাত-
শ্রাবণ তোমার চোখের জল,
শরৎ তোমার শুভ্র শাড়ি,
হেমন্ত তোমার বিদায়ের নিঃশ্বাস,
আর বসন্ত তোমার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
তুমি আবার ফিরে আসবে -
হয় বৃষ্টি হয়ে, নয়তো জোছনা হয়ে,
নয়তো এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে আমার কানে কানে বলবে -
আমি তো আছিই,
তোমার অপেক্ষার ভেতরেই।
৩৯. বৃষ্টির জন্য
বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছি তপ্ত রোদে
পুড়ে যায় শরীর,
জানি তুমি আসলেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হবে,
তুমি আমার বুকের তলায় ছায়া নেবে,
কী অদ্ভুত সেই শীতল উচ্ছ্বাস।
দিগন্তজোড়া ধুলোয় যখন দিনটি ঝাপসা হয়ে যায়,
আমার চোখে তখন শুধু তোমার মেঘের রেখা—
তুমি কি টের পাও,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই বাতাসের গায়ে জল জমে?
রোদ্দুরের দহন যত বাড়ে,
আমার ভেতরে তত জন্ম নেয় নীল এক শ্রাবণ
সেখানে তোমার চুলের গন্ধে ভিজে থাকে ঘাস,
তোমার মসৃণ কণ্ঠে কাঁপে প্রথম বজ্রের আলো।
আমি জানি, তুমি এলে
শুকনো নদীগুলো গোপনে স্রোত খুঁজে পাবে,
মরুভূমির বুকে হঠাৎ সবুজের আর্তি উঠবে -
আমার এই পোড়া বুকেও ফুটবে কচি ঘাসের স্বপ্ন।
তুমি এলে আমি আর রোদে দগ্ধ মানুষ থাকব না,
তোমার দু’হাতের আড়ালে লুকিয়ে
আমি হয়ে উঠব এক অস্ত সূর্যের বিকেল,
যেখানে কেবল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর কাঁপতে থাকা ভালোবাসা।
এসো,
আমার দহনকে তোমার জলে ভাসাও,
আমার শুষ্ক দিনগুলোকে ভিজিয়ে দাও অনন্ত আদরে,
আমি আজও বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছি -
তোমার বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার জন্য।
৪০. দিলরুবা
সেই কবে কাকে প্রথম প্রেমপত্র লিখেছিলাম,
তা আজ আর মনে নেই..
অস্পষ্ট মনে পড়ে একটি নাম— দিলরুবা।
মনে পড়ে, নীল কালির কলমে কাঁপা কাঁপা অক্ষর,
খাতার পাতা ভিজে যেত লজ্জায়, ঘামে,
লআর অকারণ দীর্ঘশ্বাসে।
পোস্ট অফিসের লাল বাক্সটার সামনে দাঁড়িয়ে
কতবার যে চিঠিটা ঢোকাতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে এনেছি, ভয় ছিল, সে পড়বে তো?
আরও ভয় ছিল, যদি সত্যিই পড়ে ফেলে!
সেই সময়টা ছিল কাঁচা আমের মতো টক-মিষ্টি,
বিকেলের মাঠে হাওয়ার ভেতর উড়ত তার ওড়না,
আমি দূর থেকে দেখতাম,
দেখেই ভেবে নিতাম, এ-ই বুঝি প্রেম।
স্কুলের বারান্দায় চকচকে রোদ পড়লে
তার মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠত,
আমি অঙ্কের খাতায় অকারণে লিখতাম তার নাম,
যেন সংখ্যার ভিড়ে সে-ই একমাত্র সমাধান।
প্রথম প্রেমপত্রে লিখেছিলাম,
তুমি হাসলে পৃথিবীটা বদলে যায়।
আজ ভাবি, পৃথিবী বদলায়নি,
শুধু বদলে গিয়েছিল আমার ভেতরের অনুভব।
তারপর কত বছর কেটে গেছে,
কত শহর, কত মুখ, কত অজানা সম্পর্ক,
তবু মাঝে মাঝে বর্ষার রাতে
পুরোনো ট্রাঙ্ক খুললে কাগজের গন্ধে ভেসে আসে
একটি নাম— দিলরুবা।
সে এখন কোথায় আছে জানি না,
হয়তো কারও সংসারের উঠোনে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালে,
হয়তো সন্তানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে
ভুলে গেছে এক কিশোরের লেখা নীল কালির চিঠি।
কিন্তু আমি যখন নিজের বয়সের দিকে তাকাই,
দেখি, ভেতরে কোথাও এক কিশোর
এখনো দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ভাঁজ করা চিঠি,
চোখে অনন্ত দ্বিধা আর অসমাপ্ত স্বপ্ন।
প্রথম প্রেমপত্রের সেই কাঁপা অক্ষরগুলোই
হয়তো আমাকে লেখক বানিয়েছে,
অথবা অন্তত শিখিয়েছে,
ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি পুরোনো হয় না,
শুধু স্মৃতির ভেতর একাত্মা হয়ে থাকে,
দিলরুবার নামের মতোই।
৪১. নিঃসঙ্গতার অনুশীলন
সব ভিড় পেরিয়ে
আমি একটু নীরবতার কাছে বসি
যেন কোলাহলের শহরে
নিজের জন্য গোপন একটি জানালা খুলি।
সবাই হাত ধরে পথ চলে,
আমি পথের ধুলো ছুঁয়ে বুঝি
হাত না থাকলেও
পায়ের ছাপ রেখে যাওয়া যায়।
নিঃসঙ্গতা কোনো অভিমান নয়,
এ এক দীর্ঘ সাধনা
নিজের ভিতরের অন্ধকারে
নিজেকেই প্রদীপ বানানো।
অনেক মুখের ভিড়ে থেকেও
আমি আমার নাম ধরে ডাকি নিজেকে,
কারণ সব সঙ্গই আশ্রয় নয়,
কিছু সঙ্গ শুধু শব্দের বাড়াবাড়ি।
দিন কেটে যায়
অপ্রকাশিত কথারা বুকের ভেতর ঢেউ তোলে,
তবু ভাঙি না, ডুবি না পুরোপুরি
কারণ আমি শিখেছি
ডুবে গিয়েও শ্বাস নিতে।
জানি, সবাই পাশে থাকে না শেষ পর্যন্ত,
সব পথেই সহযাত্রী মেলে না
তাই একাকীত্বকে সঙ্গী করে
আমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠি সম্পূর্ণ।
যদি কোনোদিন মুক্তি আসে,
সে আসুক ভেতর থেকে
কারণ একা থাকার যে শিল্প রপ্ত করেছি,
তা-ই আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত।
৪২. প্রার্থনা সঙ্গীত
আমার ছোট ছোট কর্মের ভিতর,
পথ চলতে চলতে পদধ্বনিতে, কিংবা রাতের
নিশ্ছিদ্র নীরবতার ভিতর -
প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো প্রাণে করুণ সুর বাজে
তোমার অনুপস্থিতিতে।
ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাসে পা রাখলেই মনে হয়
কোনো এক অদৃশ্য হাত ছুঁয়ে দিল -
হয়তো তুমি, অন্য কোনো আকাশের আড়াল থেকে
আমার একাকীত্বের কাঁধে হাত রাখছো চুপিচুপি।
দুপুরের ক্লান্ত রোদে জানালার পাশে দাঁড়ালে
হঠাৎ হাওয়ার দোলায় পর্দা কেঁপে ওঠে,
মনে হয় তোমার সাদা শাড়ির আঁচল
আবারও আমার ঘরে ঢুকে পড়ে অনাহূত।
সন্ধ্যার আকাশে যখন প্রথম তারা জ্বলে,
আমি তাকিয়ে থাকি,
ভাবি, তুমি কি ওই দূর নক্ষত্রের পাশে বসে
আমার নামটুকু এখনও উচ্চারণ করো?
শহরের কোলাহলে হেঁটে যাই নিরুত্তাপ,
তবু ভিড়ের ভেতর আচমকা চমকে উঠি -
কারণ কারও হাসির ভঙ্গিতে,
কারও চুলে বাতাস লাগার ঢঙে
তোমার হারিয়ে যাওয়া মুখখানি ভেসে ওঠে।
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ঘুম ভাঙলে
মনে হয়, এ শুধু বর্ষণ নয়,
এ আমার জমে থাকা অশ্রুরই পুনর্জন্ম,
যা তোমার অনুপস্থিতিকে ভিজিয়ে দেয় অন্তহীন।
রাত গভীর হলে বুকের ভেতর
একটি নীরব প্রার্থনা জেগে থাকে,
ফিরে এসো না, যদি না আসতে পারো,
তবু আমার স্বপ্নের জানালায়
একটু জোছনা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো।
কারণ আমি আজও বিশ্বাস করি -
হারানো প্রেম কখনও সম্পূর্ণ হারায় না,
সে রয়ে যায় প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো,
অশ্রুর মতো পবিত্র,
এক দীর্ঘ, মায়াময় প্রতিধ্বনি হয়ে।
৪৩. পাষাণের প্রার্থনা
যে জলে উন্মাতাল ঢেউ নেই,
আমি সেই নির্জীব জলে কী আমার রাজহংস ভাসাতে পারি?
নিস্তব্ধতার বুক চিরে কি ওঠে কোনো নীল শিহরণ,
নাকি সবই কেবল আয়নার মতো ঠান্ডা, নিরাবেগ?
বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা ঝরতে ঝরতে যদি উত্তাল হয় দিঘিও,
সেখানেও যে সমুদ্রস্বাদ পাব তার নিশ্চয়তা কী!
ছোট ছোট কম্পনে যদি কেঁপে ওঠে তটরেখা,
তবু কি জোয়ারের গভীরতা মাপা যায়
শুধু আঙুল ডুবিয়ে?
আমার ভেতর যে আগুন,
সে কি কেবল ধূপের ধোঁয়া হয়ে মিলাবে আকাশে,
নাকি একদিন বজ্রের মতো ফেটে পড়বে
তোমার অবনত কপালের উপরে?
শ্বাসে শ্বাসে জমে থাকা আদিম আকাঙ্ক্ষা
তোমার চুলের ঘ্রাণে কি খুঁজে পাবে মুক্তি?
যদি সে উর্বশী না হয় -
স্বর্গ থেকে নামা কোনো অলৌকিক আলো,
যদি না হয় অহল্যাও—
পাষাণ ভেঙে জন্ম নেওয়া কোনো শুদ্ধ আর্তি,
তবে আমি কেন জাগাই অগ্নিস্রোত
এই মাটির শরীরে?
আমি পাষাণই থেকে যাব প্রেমে কিংবা অপ্রেমে,
যতদিন না কোনো উষ্ণ হাত
আমার স্তব্ধ বুকে রাখে তার স্পন্দন।
যতদিন না কোনো নারীর নিবিড় নৈকট্যে
নির্জীব জল হঠাৎ সাগর হয়ে ওঠে -
ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে
আমাকে ডুবিয়ে দেয় আদিম শৃঙ্গারে।
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, সব দিঘি কি সাগর হয়?
সব স্পর্শ কি জন্ম দেয় ঝড়?
নাকি কিছু জল কেবল জলই থাকে,
আর কিছু হৃদয় চিরকাল হৃদয়ই থাকে।
৪৪. আলোকবর্তিকার স্পর্শ
একটি স্বপ্ন দেখছিলাম -
কবরের মতো নীরব এক ঘর,
দেয়ালগুলো যেন মাটির স্তব্ধতা,
ছাদের ভেতর জমে আছে অজস্র অন্ধকার।
আমি শুয়ে আছি চোখ মেলে,
তবু কিছুই দেখি না,
শুধু নিজের শ্বাসের শব্দ
কানে ফিরে আসে মৃত প্রতিধ্বনির মতো।
হঠাৎ দূরে,
অস্পষ্ট এক আলোর বিন্দু কেঁপে ওঠে,
যেন অমাবস্যার গর্ভে জন্ম নেয় ক্ষীণ চাঁদ।
আলোটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে,
তার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে এক রমণীর অবয়ব।
চিনতে চাই তাকে,
সে কি কোনো হারানো প্রেয়সী?
নাকি কোনো অচেনা মায়াবতী
যে জন্মান্তরের পথ পেরিয়ে এসেছে?
তার চোখে ছিল অদ্ভুত শান্তি,
অথচ সেই শান্তির ভেতর
গভীর এক অনন্ত বিষাদ।
সে আলোকবর্তিকাটি আমার পাশে রেখে
নিঃশব্দে ঝুঁকে পড়ে,
আমার বুকের ওপর তার কপাল,
তার কপালে জেগে ওঠে উষ্ণ এক স্পর্শের নদী। মৃদু স্বরে বলে,
“স্পর্শটুকু মনে রেখ, ভুলে যেও না।”
সেই কণ্ঠস্বর যেন
মাটির নীচে শুয়ে থাকা বীজে জল ঢালে,
আমার বুকের ভিতর অন্ধকার কেঁপে ওঠে।
আমি তাকে ধরতে চাই,
নাম ধরে ডাকতে চাই -
কিন্তু নাম তো জানি না!
শুধু স্পর্শের ভিতর দিয়ে
এক অদ্ভুত পরিচয়ের জন্ম হয়।
ঠিক তখনই স্বপ্ন ভেঙে যায়,
ঘুমহীন রাতের মধ্যে আমি একা,
বুকের উপর এখনো রয়ে গেছে
তার কপালের উষ্ণতা,
আর অন্ধকার ঘরে আলোর মতো ভেসে থাকে একটি বাক্য -
“ভুলে যেও না…”
৪৫. মায়ার অন্য নাম
আমি তাকে বললাম,
তুমি কী আমাকে ভালোবাসো?
সে বলল, না।
বললাম, তাহলে কী করো?
সে দ্বিধাহীন বলে ফেলল, মায়া করি।
আমি শুনে বললাম না কিছুই,
শুধু ভাবলাম,
মায়া ছাড়া আর কে-ই বা অকারণে
কারো কথা ভাবে?
মায়া ছাড়া আর কে-ই বা
অভিমান জমিয়ে রাখে বুকের ভিতর।
তবু অন্য কারও সামনে
তার নামে কোনো অভিযোগ তোলে না?
সে জানুক আর না জানুক,
এই মায়াটাই ভালোবাসা।
যে ভালোবাসা উচ্চারণে লজ্জা পায়,
কিন্তু নীরবে পাশে বসে থাকে
শীতের সকালের রোদ হয়ে।
সে বলে, ভালোবাসি না,
তবু আমার জ্বর এলে তার গলা কেঁপে ওঠে,
আমি চুপ থাকলে সে অকারণে প্রশ্ন তোলে -
কী হয়েছে?
ভালোবাসা যদি ঝড় হয়,
তবে মায়া তার স্থির আকাশ;
ভালোবাসা যদি অগ্নি হয়,
তবে মায়া তার দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতা।
আমি জানি,
একদিন সে হয়তো বলবে না কখনোই
ভালোবাসি -
তবু আমার পথের ধুলোয়
তার মসৃণ পদচিহ্ন রয়ে যাবে।
কারণ,
ভালোবাসা কখনও কখনও
নিজের নাম গোপন করে
মায়া হয়ে বেঁচে থাকে।
৪৬. শেষের কবিতায় মায়াবতী
রবি ঠাকুর, তুমি তোমার শেষের কবিতায়
লাবণ্য, কেতকীর পাশাপাশি আর একটি চরিত্র রেখে দিতে পারতে,
হয়তো তার নাম দিতে মায়াবতী,
যে দূর হতে গোপনে অমিত রায়কে ভালোবাসতো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তোমার সেই অনন্ত আকাশে
যেখানে শব্দেরা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে,
সেখানে কি একটু জায়গা ছিল না
এক নীরব প্রেমের জন্য?
শেষের কবিতা–র পাতায় পাতায়
যেখানে তর্কের ছলে প্রেম,
প্রেমের ভেতরে অহংকার,
অহংকারের আড়ালে গোপন কান্না -
সেখানে কি এক ফোঁটা অশ্রু ঝরাতে পারত না
অদেখা কোনো চোখ?
মায়াবতী হয়তো শিলং পাহাড়ের কুয়াশার মতো
অমিতের পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকত,
কথা বলত না,
শুধু তার ছায়ার সঙ্গে ছায়া মিশিয়ে
ফিরে যেত সন্ধ্যার আগে।
লাবণ্য পেত অমিতের মননের দীপ্তি,
কেতকী পেত সংসারের নিশ্চিন্ত ছায়া -
আর মায়াবতী?
সে পেত শুধু কাহিনির আড়ালে না-লেখা
একটি নাম,
রাতের অন্ধকারে অমিতের অজান্তে
একটি দীর্ঘশ্বাসের অধিকার।
রবি ঠাকুর, তুমি তো জানতেই -
সব প্রেম উচ্চারণের জন্য নয়,
কিছু প্রেম কেবল বাতাসে মিশে থাকে,
বুকের ভেতর নীল ধোঁয়ার মতো।
তাই যদি রাখতে
মায়াবতীকে সেই শেষের কবিতায়
তবে হয়তো বুঝতাম,
অমিতের সমস্ত যুক্তির আড়ালে
একটু অযৌক্তিক ব্যথাও ছিল,
যা কেবল দূরের কারও নীরব ভালোবাসায়
চিরদিন অমলিন হয়ে থাকে।
৪৭. জোছনাহত পদচিহ্ন
জোছনাহত পদচিহ্ন রেখে গেছ যে রাতে,
সেই রাত এখনো সাদা ধূপের মতো জ্বলে,
রমনার নির্জন ঘাসে শুয়ে থাকে তোমার ছায়া,
আমি আঙুল ছুঁই, অথচ তুমি নেই কোথাও।
চাঁদ ছিল অকারণ উদার,
তোমার চুলে তার রূপালি অবাধ্যতা,
আমি ভেবেছিলাম, এই আলোর ভিতরেই
চিরদিনের মতো থেমে যাবে পৃথিবী।
তুমি হেঁটে গেলে দূর্বাঘাসের পথ মাড়িয়ে,
পায়ের শব্দে কেঁপে উঠল নীরবতা;
আমি পেছন থেকে ডাকিনি,
ডাকলে যদি ভেঙে যেতো জোছনার মায়া।
আজও শ্রাবণের ভেজা জানালায়
তোমার নাম লিখি আঙুলের কুয়াশায়,
মুছে যায়, তবু থেকে যায়-
যেন নদীর বুকে জেগে থাকা বালুচর।
যে শহর আমাদের দেখেছিল পাশাপাশি,
সে শহর এখনো জোছনায় ভিজে যায়;
কেবল তুমি অন্য কোনো আলোর দিকে হেঁটেছ,
আর আমি এই আলোতেই বন্দী।
জোছনাহত সেই পদচিহ্ন
এখনো আমার বুকের ভিতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে,
ধুয়ে ফেলতে চেয়েছি বহু পূর্ণিমা, তবু মুছে যায়নি কিছুই;
শুধু আমি ক্ষয়ে গেছি একটু একটু করে।
৪৮. মায়াবতীর মুখচ্ছবি
মায়াবতীর মুখচ্ছবি এঁকে রেখেছি মনের দেয়ালে,
ধূলো জমে, তবু মুছে যায় না তার হাসির রেখা।
এক বিকেলের কমলা রোদে প্রথম দেখেছিলাম তাকে,
চুলের ফাঁকে লেগে ছিল কাঁচা কদমফুলের গন্ধ।
সেই দিনগুলো ছিল মধুমাসের মতো,
পুকুরপাড়ে নীল জলের ভেতর ডুবে যেত আকাশ,
আমরা দু’জন বসতাম ঘাসের উপর,
কথার চেয়ে নীরবতাই বলত বেশি।
তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্বপ্নালু ছায়া,
যেন বহু জন্মের চেনা কোনো নদী;
আমি নাম জানতাম, ঠিকানা জানতাম না,
তবু মনে হতো, সে-ই আমার চিরপরিচিতা।
বইমেলার ভিড়ে একবার হারিয়ে গিয়েছিল সে,
আমি ভেবেছিলাম, এই বুঝি গল্পের শেষ -
হঠাৎ পিছন থেকে ডেকে উঠল,
এত সহজে কী মায়া ফুরোয়?
আজ এত বছর পর,
শ্রাবণের জানালায় বৃষ্টির টুপটাপে
আমি খুঁজি সেই মুখচ্ছবি,
অস্পষ্ট কাঁচে ভেসে ওঠে তার আধখানা হাসি।
মায়াবতী এই শহরের রোদে দাঁড়িয়ে আছে,
আমার ভেতর সে রয়ে গেছে
মধুময় নস্টালজিয়া হয়ে,
যেন পুরোনো ডায়েরির পাতায় রাখা শুকনো ফুল,
স্পর্শ করলেই যার গন্ধে ভরে ওঠে সমগ্র জীবন।
৪৯. তুমি এলে
তোমার চোখে সন্ধ্যার নীল -
বুকে চাঁদের ঢেউ,
স্পর্শহীন স্পর্শে জাগে নীরবে
কোথাও কেউ -
তুমি এলে হাওয়ার মতো, নাম না জানা গন্ধ মেখে,
আমি শুধু জেগে থাকি তোমারই স্বপ্ন বুকে রেখে।
৫০. নোঙর ফেলা হৃদয়
তোমার ঘাটে নোঙর ফেলেছি এক বিকেলে,
শহর তখন ব্যস্ত ছিল,
আমরা লুকিয়ে রেখেছি নদীর গোপন স্রোত,
চোখে চোখে লিখেছি নিষিদ্ধ গান।
তোমার আঙুল ছুঁয়ে ছিল আমার কবজির শিরা,
কাঁপন উঠেছিল অচেনা ঢেউয়ের মতো,
সেই কাঁপনে ডুবে গিয়েছিল সংসারের দেয়াল,
থেমে গিয়েছিল দায়িত্বের অনুশাসন।
তোমার কাঁধের উষ্ণতায় মুখ রাখতেই
পৃথিবী সরে গিয়েছিল দূরের কোনো গ্রহে,
শরীরের ভেতর জেগে উঠেছিল আগুন,
দু’টি নিঃশ্বাস মিশে হয়েছিল এক প্রার্থনায়।
তুমি বলেছিলে, এই প্রেমের নাম নেই,
আমি বলেছিলাম, নাম থাকলেই বা কী হয়?
আমাদের ঠোঁটের ভাষা ছিল অন্য অভিধানে লেখা,
যেখানে পাপের পাশে ফুটে থাকে কদমফুল।
রাতের শেষে যখন ফিরেছি আলাদা ঘরে,
বালিশে লেগে ছিল তোমার চুলের গন্ধ;
আমি জানি, এ নোঙর স্থায়ী নয়,
তবু হৃদয় বারবার ভিড়ে যায় তোমার ঘাটে।
সংসার নদী বয়ে চলে নিয়মমাফিক,
কিন্তু গোপন উপনদী খুঁজে নেয় নিজের পথ,
সেই উপনদীর জলে ডুব দিয়ে
আমরা রেখে যাই শরীরের স্বাক্ষর,
আর একে অপরের বুকে ফেলে যাই
নোঙর ফেলা এক অনিবার্য হৃদয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন