পদ্মরাগে আঁকা আনন্দিতা ( কাব্যগ্রন্থ )
প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং
উৎসর্গ -
১. অপেক্ষার আশ্রয়
তোমার জন্য ঠাঁই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি,
তুমি আসবে বলে—
দরজার কপাটে হাওয়া থেমে আছে,
সময় নিজের শ্বাস আটকে রেখেছে আমার পাশে।
যদি না আসো—
যতক্ষণ আয়ু আছে, ততক্ষণই অপেক্ষা করব,
হোক তা শতবছর,
হোক তা ধূসর হয়ে যাওয়া দিনপঞ্জির দীর্ঘশ্বাস।
আমি দাঁড়িয়ে থাকব প্রহরের কিনারায়,
ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে পড়লেও
আমার চোখে ক্লান্তি নামবে না;
কারণ আশা কখনো অবসর নেয় না।
রোদ এলে ছায়া মেলে ধরব তোমার নামে,
বৃষ্টি এলে ভিজে যাব নির্বাক,
রাত্রি নামলে তারা গুনব—
প্রতিটি তারায় লিখব তোমার অনুপস্থিতির ইতিহাস।
মানুষ যাবে, শহর বদলাবে,
পথের নাম পাল্টাবে বহুবার—
তবু এই জায়গাটুকু
তোমার জন্য অক্ষত রেখে দেব হৃদয়ের ভেতর।
যদি কোনোদিন এসে বলো—
“আমি দেরি করে ফেলেছি,”
আমি হাসব, বলব—
না, তুমি ঠিক সময়েই এসেছ,
অপেক্ষা তো কখনো দেরি বোঝে না।
আর যদি কোনোদিন না-ই আসো,
তবু এই অপেক্ষাই হবে আমার প্রাপ্তি—
কারণ ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে দাঁড়িয়ে থাকা,
শেষ শ্বাস পর্যন্ত,
একটি নামের আশ্রয়ে।
২. এই শহর
এই শহর অনেক নস্টালজিক—এই শহর জুড়ে কেবল মায়া
ভাঙা ফুটপাথে জমে আছে পায়ের ছাপের ইতিহাস,
পুরোনো দোকানের সাইনবোর্ডে ঝুলে থাকা বিকেলের আলো,
চায়ের কাপে ধোঁয়ার মতো উঠে আসে কত না বলা কথা,
একদিনের মানুষ, একদিনের হাসি—সবাই কোথায় হারালো?
এই শহরে সন্ধ্যা নামলে ঘড়ির কাঁটা ধীরে চলে,
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠে স্মৃতির মতো কাঁপতে কাঁপতে।
বন্ধ জানালার ওপাশে শোনা যায় অচেনা রেডিওর গান,
যেন কারো ফেলে যাওয়া শৈশব এখনো বাজে অদৃশ্য ঢেউতে।
কলেজ ফেরত বিকেলের আড্ডা, পকেটে লুকানো স্বপ্ন,
বৃষ্টিতে ভেজা খাতা, দেয়ালে আঁকা প্রথম ভালোবাসার নাম।
রিকশার ঘণ্টায় মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ,
এই শহর জানে—ফিরে আসে না সময়, শুধু রেখে যায় দাম।
এখানে প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একখণ্ড বিদায়,
প্রতিটি গলিতে ঘুমিয়ে আছে পুরোনো প্রতিশ্রুতি।
চেনা মুখগুলো আজ অচেনা জানালার আড়ালে,
তবু শহরটা আজও ডাকে—আয়, ভুলে যাস না স্মৃতি।
এই শহর অনেক নস্টালজিক, এই শহর জুড়ে কেবল মায়া,
যত দূরে যাই, তত গভীরে টানে তার নিরব ছায়া।
৩. তুমি নও, তবু তুমি আছ
তুমি নও—
তোমার ছায়াটুকু পড়ুক আমার প্রাণে,
স্পর্শ নয়,
তোমার চেয়ে থাকা নীরব তান
তুলুক আমার গানের গভীর তলে।
এখন একটু দূরেই থাকো—
এই দূরত্বেই থাকুক মায়ার নিরাপদ আশ্রয়,
চোখের আড়ালে জমে উঠুক অপেক্ষার আলো,
অভিমানহীন নীরবতায় পাক শিকড় আমাদের সময়।
আমি জানি,
আবার একদিন
বকুলঢাকা বনে হাঁটব দুজনে—
শ্বাসে শ্বাসে মিশে যাবে অচেনা সুগন্ধ,
পাতার ফাঁকে ঝরে পড়বে পুরোনো দিনের হাসি।
আবার একদিন
শ্রাবণ-আকাশ নীলাদ্রি হবে হৃদস্পন্দনে,
বৃষ্টির শব্দে জেগে উঠবে চাপা আকুতি,
মেঘের ভাঁজে ভাঁজে লিখে নেব
ফিরে পাওয়ার অমোঘ প্রতিশ্রুতি।
সেই দিনের জন্যই আজ এই বিরতি—
না পাওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকুক পাওয়ার মানে,
তুমি নও, তবু তোমার উপস্থিতি
অদৃশ্য প্রদীপ হয়ে জ্বলে থাকুক
আমার সমস্ত প্রাণে।
৪. এখনও
এখনও ভালোবাসি—
সময় যত দূরে সরে যায়, ততই গভীরে নামে তুমি,
ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো থেমে থেমে
আমার হৃদয়ের ভেতর তোমার নাম বাজে।
এখনও কাছে আসি নিঃশব্দ চরণে,
রাত্রির ঘুমন্ত প্রহরে
যখন সব শব্দ অবসর নেয়,
আমি তখন তোমার স্মৃতির দরজায়
হালকা করে কড়া নাড়ি।
এখনও স্মরি তোমায় অনিঃশেষ অশ্রু ক্ষরণে—
এই অশ্রুগুলো কোনো অভিযোগ নয়,
এরা কেবল ভালোবাসার অব্যক্ত ভাষা,
যে ভাষা উচ্চারিত হলে
ভেঙে পড়ত নীরবতার সমস্ত দেয়াল।
তুমি না থাকলেও তোমার ছায়া থাকে,
আমার দীর্ঘশ্বাসে, আমার প্রার্থনায়,
আমার প্রতিটি অসমাপ্ত বাক্যে।
ভুলে যাওয়ার অভিনয় করি বটে,
কিন্তু জানি,
ভালোবাসা কখনো স্মৃতির বাইরে যায় না,
সে কেবল নিঃশব্দে বেঁচে থাকে,
আমার মতোই, এখনও।
৫. জোৎস্নাবিধৌত প্রত্যাবর্তন
তোমাকে ছোঁয়ার আগেই
চাঁদ পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল,
রাতের কপালে ঝরে পড়ল শেষ আলো—
তোমার বন্ধ চোখের নীচে
নিভে গেল সব দীপশিখা।
যে উষ্ণতার আনন্দ
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে নেওয়া যেত,
সে আনন্দ আজ অচেনা দূরত্বে,
শ্বাসের আগে শ্বাস হারিয়ে
নিঃশব্দে সরে গেল।
সব জোৎস্না তোমাকে পাওয়ার আগেই
আকাশলীন হয়ে গেল,
নক্ষত্রেরা মুখ ফিরিয়ে নিল,
রাত বুঝে নিল—
কিছু প্রাপ্তি দেরি হলে
চিরকালের অপেক্ষা হয়ে যায়।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম
অপূর্ণ স্পর্শের কিনারায়,
মুঠো ভরা আলো নিয়ে
শূন্যতার দিকে তাকিয়ে।
সময় শুধু বলল—
সব ভালোবাসা এক রাতেই জেগে ওঠে না।
তবু প্রশ্ন জাগে অবিরাম—
জোৎস্না বিধৌত হয়ে
তুমি কি আবার চাঁদ হয়ে ফিরে আসবে?
নাকি আলোয় আলোয় ক্ষয়ে গিয়ে
আমার রাতেই হারিয়ে যাবে?
যদি ফেরো,
এই অন্ধকারকে সঙ্গে এনো না,
শুধু একটু আলো দিও—
যাতে আর কোনো ভালোবাসা
ছোঁয়ার আগেই ডুবে না যায়।
৬. রাত্রি তুমি দ্বিধা হও
ঘোর লাগা নির্জন পাতার গায়ে
লিখে রাখি তোমার নাম—
শিশিরের অক্ষরে, অদৃশ্য কালি দিয়ে।
উদ্বেলিত রাত্রির আকাশে
জ্বলে ওঠে বিগলিত চাঁদ,
তার আলোয় নরম হয় অন্ধকারের গিরে ধরা গাঁট।
তারা’রা যে যার মতো ভেসে যায়—
কেউ স্মৃতির নদীতে, কেউ আকাঙ্ক্ষার বাতাসে।
নীরবতার বুক চিরে
হেঁটে যায় রাতখোর যুগল,
ম্লান সময়ের কোল থেকে তুলে নেয়
তাদের আরাধ্য সর্গীয় স্বাদ।
আমি তোমার দিকে তাকাই—
চোখে জমে ওঠে দূরত্বের নীল,
ঠোঁটে কাঁপে উচ্চারণহীন প্রার্থনা।
পাতার ছায়ায় ছায়ায়
আমাদের নিঃশ্বাসেরা গোপন চুক্তি করে,
বলতে শেখে—এখনো বেঁচে আছে আলো।
এই রাত দীর্ঘ হোক,
ঘড়ির কাঁটা ভুলে যাক পথ।
চাঁদের গলিত দুধে ধুয়ে যাক দুঃখ,
তারার পতনে ভিজে উঠুক আশা।
নির্জন পাতার গায়ে লেখা নামের মতো
তুমিও থেকে যাও—
অমোচনীয়, নিঃশব্দ,
৭. সৎ থাকো
যদি চাও শরীর—
তবে চোখে চোখ রেখে বলো,
ভাষা লুকিয়ে রেখো না মিথ্যার পর্দায়,
ভালোবাসার মুখোশ পরে
কামনার হাত বাড়িও না।
ভালোবাসা কোনো ফাঁদ নয়,
যেখানে বিশ্বাস নামিয়ে
ইচ্ছের শিকার করা যায়।
ভালোবাসা মানে স্পষ্টতা—
হ্যাঁ কিংবা না—
দুটোই সমান মর্যাদার।
যে হৃদয় দেয়,
সে সত্য চায়;
অভিনয়ের উষ্ণতা নয়,
চায় সৎ উচ্চারণ।
৮. সুরের স্মৃতি
রাতের দিকে ঘন মেঘ এলে
বুকের ভিতর সকরুণ বাঁশি বাজে—
কে যেন অদৃশ্য আঙুলে ছুঁয়ে দেয়
হারিয়ে যাওয়া সুরের স্মৃতি।
আবছা আঁধারের পরত ভেদ করে
ভেসে ওঠে তার মুখ,
চাঁদের আলোয় নয়—
বরং মেঘের ছায়া মেখে,
নরম, নীরব, অচেনা এক চেনা অবয়ব।
হাওয়ার দোলায় কাঁপে জানালার পর্দা,
আমার শ্বাসে জমে থাকে নামহীন ডাক;
কত কথা বলার ছিল,
কিন্তু শব্দরা ভিজে যায় অন্ধকারে।
সে কি জানে—
এই রাতগুলো এখনও তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে?
মেঘ জমলে হৃদয় ভারী হয়,
আর স্মৃতির আকাশে
একটিমাত্র মুখই জ্বলে থাকে
নিভু নিভু আলো।
৯. শহর জুড়ে শূন্যতা
এই শহর জুড়ে কেবল শূন্যতা
যেন পরিত্যক্ত স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী ট্রেন,
ঘণ্টা বাজে, কিন্তু কোনো যাত্রী নামে না।
রাস্তাগুলো দুঃখময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
প্রতিটি মোড়ে জমে থাকে তোমার না-থাকার ধুলো।
এই শহরের জানালাগুলো
বন্ধ খামে রাখা চিঠির মতো—
ঠিকানা আছে, পাঠক নেই।
বিকেলের আলো নামে দেওয়ালে,
কিন্তু ছায়ার ভেতর তোমার অবয়ব আর ফেরে না।
এখানকার নদী এখন আয়না ভাঙা,
জল বয়ে যায়—অর্থহীন বাক্যের মতো,
কোনো তীর তাকে ডাকে না।
চাঁদ ওঠে ঠিকই,
তবে সে যেন নির্বাসিত প্রদীপ—
আলো আছে, উষ্ণতা নেই।
তুমি ছিলে এই শহরের, শেষ উজ্জ্বল তারা, তুমি চলে গেছ—
শহরটা কেবল বিশেষণ হয়েই রইল,
নামহীন, অর্থহীন, শূন্যতায় মোড়া।
১০. আগুনের পরশমণি
প্রথমে মনে করেছিলাম, তুমি সন্ধ্যা তারার মতো মৃদু, স্নিগ্ধ আলোর আশ্বাস,
ক্লান্ত দিনের শেষে যে আলো কপালে ছুঁয়ে দেয় শান্তির হাত।
কাছে এলে বুঝলাম, তুমি কেবল আলো নও, তুমি আগুনও, গভীর ও নিঃশব্দ দহন।
ছুঁতে গিয়েই জানলাম, রূপেরও উত্তাপ থাকে, স্বপ্নেরও জ্বালা আছে।
তোমার চোখের ভেতর লুকোনো নীল আগ্নেয়গিরি
আমার সমস্ত অনিশ্চয়তাকে জ্বালিয়ে দিল।
আমি ধীরে ধীরে পুড়তে শিখলাম,
পুড়ে অঙ্গার হয়ে উঠেও
তোমাকেই আঁকড়ে রইলাম।
তোমার নীরবতার ছায়ায়
আমার শব্দেরা ঝরে পড়ল,
শ্বাসের মধ্যে জমে থাকল এক অদ্ভুত তৃষ্ণা-
যা নিভে না, কেবল গভীর হয়।
আমি বুঝলাম, ভালোবাসা মানে কেবল স্নিগ্ধতা নয়,
ভালোবাসা মানে দহনকে আশ্রয় করা।
এখন আর সন্ধ্যাতারার আলো খুঁজি না,
রাত্রির বুক চিরে যে আগুন জ্বলে থাকে
তার দিকেই তাকিয়ে থাকি,
যদি আবার পুড়তে হয় তোমার আলোতেই পুড়ব, অঙ্গার হয়েও তোমার নামেই প্রদীপ জ্বালাবো।
১১. হেমন্ত সন্ধ্যায় নীরব দেখা
সেদিন হেমন্ত সন্ধ্যায় তোমার সাথে দেখা হলো পথের উপরে,
কোনও কথাই বলা হলো না—
কেমন উদাস নীরব তোমার চেয়ে থাকা,
চলে গেলে পথের অন্য বাঁক ধরে অন্য পথে।
ঝরাপাতার মতো শব্দহীন পড়ে রইল দৃষ্টি,
বাতাসে কাঁপছিল অপূর্ণ বলা কতশত কথা।
দু’জনের মাঝখানে জমে উঠল এক ফোঁটা নিঃশ্বাস,
যেন সময় নিজেই থেমে শুনছিল আমাদের নীরবতা।
আকাশে তখন হালকা কুয়াশার পর্দা,
চাঁদটাও অর্ধেক লুকিয়ে ছিল মেঘের আড়ালে।
তোমার চোখে পড়েছিল অচেনা দূরত্ব,
আমার বুকে জমে উঠেছিল অজানা ভালোবাসার হাহাকার।
পথটা অনেকক্ষণ তোমার গন্ধ বয়ে নিয়ে গেল,
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম—একাকী ছায়ার মতো।
সেদিনের সেই না-বলা কথাগুলো আজও হেমন্ত সন্ধ্যায়,
ঝরা পাতার ফাঁকে ফাঁকে তোমাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর।
১২. ভোরের প্রতিশ্রুতি
এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন,
আজ ভাসিয়ে দাও—
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমাকে নাও,
হে নিশীথিনী।
এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্রবীথিকে- আকুল করে তোলো,
দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল।
নীরব চাঁদের ছায়ায় খুলে যাক সব দ্বিধা,
শ্বাসে শ্বাসে জড়িয়ে পড়ুক অব্যক্ত ব্যাকুলতা;
সময়ের কপাট ভেঙে ঝরে পড়ুক মুহূর্তের স্বর্ণ,
ভুলে যাক পৃথিবী, ভুলে যাক নাম-পরিচয়।
তোমার চোখের গভীরে ডুবে যাক আমার রাত,
কণ্ঠে কণ্ঠে বোনা হোক নীরবতার গান;
শিশিরভেজা এই অন্ধকারে
আমি হই তোমার—
আর তুমি হও একমাত্র ভোরের প্রতিশ্রুতি।
১৩. অস্তিত্ব
ভালোবাসার প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম কোনও নদীর কাছে, খোলা আকাশের নীচে- গ্রীষ্মের প্রখর দীপ্তিতে,
বর্ষার ধারায় ভেজা চুলে,
শীতের উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরা নিঃশ্বাসে।
প্রাণখোলা বসন্তবাতাসে শরীর শিখেছিল ছন্দ, শরতের ঔদার্যে চোখ শিখেছিল প্রশান্তি, হেমন্তের পেলবতায় চিনেছিল স্পর্শের ভাষা।
সৌন্দর্যে আর বীভৎসতায়,
উৎস আর মোহনায়, নগ্নতায় এবং আড়ালে-
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ সব শব্দের সাথে
তোমার নামটিই জড়িয়ে আছে।
তোমার কাঁধে মাথা রাখলে
আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়,
তোমার বুকে মুখ রাখলে
রক্তে রক্তে নামে এক আদিম আলো।
তুমি কাছে এলে শব্দেরা লজ্জা পায়,
নীরবতা হয়ে ওঠে উষ্ণ, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে জন্ম নেয় অদৃশ্য অথচ স্পষ্ট
এক ভাষা।
আমাদের শরীর তখন আর শরীর থাকে না-
হয়ে যায় নদী, হয়ে যায় ঢেউ ,
একটি আরেকটিকে চিনে নেয়
প্রাচীন কোনো স্মৃতির মতো।
আঙুলের হালকা স্পর্শে সময়ের গিঁট
খুলে যায়,
দেহের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা আগুন
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।
এই ভালোবাসা শিখিয়েছে দেহের কোনো অপরাধ নেই, দেহও এক প্রার্থনা-
যেখানে আত্মা নীরবে নতজানু হয়।
তাই আজও ধূসর পৃথিবীর সব নিষেধ ভেঙে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় জানে ভালোবাসা মানে তুমি, আর তুমি মানেই আমার অস্তিত্ব ।
১৪. আলো তুমি আলেয়া
আলো তুমি—
কিন্তু নীরব, রাতের গভীরে জ্বলে ওঠো,
আমার নাম উচ্চারণ করো
কুয়াশার ঠোঁটে ঠোঁট রাখো।
তুমি আলেয়া—
চোখে চোখ রাখলে সমস্ত দিক হারিয়ে যায়,
তোমার শরীরজুড়ে
ভেসে থাকে নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না।
আমি জানি—
তুমি প্রতিশ্রুতি নও, তবু তোমার দিকে এগোই
কারণ তোমার দূরত্বেই
আমার ভালোবাসা নিঃশ্বাস নেয়।
তুমি কাছে এলে
অন্ধকার কাঁপে, তোমার আলোয় পুড়ে যায়
আমার সমস্ত সংযম, সমস্ত ভয়।
আলো তুমি, আলেয়া তুমি—
ধরা দিলে হারিয়ে যাও, হারিয়ে গিয়েও বুকের ভেতর
চিরকাল জ্বলে থাকো
গোপন প্রেমের মতো।
১৫. টুনি
শৈশবে হারিয়েছিলাম
অতি প্রিয় খেলার সাথীকে,
নাম ছিল টুনি।
বিকেলের রোদে ও ছুটে বেড়াত,
আমার হাতের তালুতে, আর ওর পালকের নিচে লুকিয়ে থাকত নরম, উষ্ণ এক জীবন।
আজও কখনও কখনও
হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে সেই মৃদু গন্ধ—
ভেজা পালক, রোদ আর নিষ্পাপ সময়ের
অদ্ভুত মিশ্র সুগন্ধ।
টুনি ছিল আমার নিঃশব্দ আনন্দ,
শৈশবের আকাশে ওড়ার প্রথম স্বপ্ন।
ওর চোখে ছিল কোনো প্রশ্ন নয়,
শুধু বিশ্বাস, আমি আছি, তাই ভয় নেই।
একদিন হঠাৎ করেই খেলার মাঠ
ফাঁকা হয়ে গেল, ডানার শব্দ থেমে
গেল বিকেলে।
শিখেছিলাম তখন হারানো মানে কী,
কিছু শূন্যতা, কখনও পূরণ হয় না।
তবু আশ্চর্য, এই দুঃখের ভেতরেই
একটা ক্ষীণ হাসি লেগে থাকে
চোখে, মুখে।
কারণ টুনি হারিয়ে যায়নি পুরোপুরি—
ও রয়ে গেছে গন্ধে, স্মৃতিতে,
আর আমার শৈশবের সবচেয়ে কোমল ভালোবাসায়।
১৬. দুঃখের ওপারে সুখ
দুঃখ তোমারও আছে, আমারও আছে,
চুপচাপ জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মতো,
নীরব রাতের বুকে লুকিয়ে থাকা
অভিমানী অন্ধকারের মতো।
জীবনের পথে পথে কাঁটার আঁচড়,
ভাঙা স্বপ্নের ক্ষতচিহ্ন
আমাদের দু’জনেরই সমান প্রাপ্য।
তবু যখন আমরা মুখোমুখি হই—
দুটি ক্লান্ত হৃদয় একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়ে,
তখন দুঃখগুলো আর ভারী থাকে না।
তোমার চোখের একটুকরো আলো
আমার বুকের অন্ধকার ভেদ করে যায়,
আমার নীরব হাত তোমার কাঁধে রাখলেই
শান্তির বাতাস বইতে শুরু করে।
আমরা একসাথে থাকলে
দুঃখ আর শেকড় গাঁড়তে পারে না—
হাওয়ার মতো উড়ে যায় দূরে,
ভাঙা মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়ে আকাশে।
হাসির আড়ালে লুকিয়ে পড়ে কান্না,
ভয়ের জায়গা নেয় সাহস,
একাকিত্ব হার মানে ভালোবাসার কাছে।
তখন বুঝি—
সুখ মানে নিখুঁত জীবন নয়,
সুখ মানে কাউকে পাওয়া
যার কাছে দুঃখও নিরাপদ আশ্রয়।
তোমার পাশে থাকলেই
সব অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে,
সব ভারী দিন হালকা হয়ে যায়।
দুঃখ থাকুক, থাকুক তার ইতিহাস—
আমরা মিলিত হলেই
জীবন হয়ে ওঠে সহনীয়, সুন্দর, মানবিক।
দু’টি হৃদয়ের সংলাপে দুঃখ হারিয়ে যায় নিঃশব্দে, আর সুখ জন্ম নেয়—
একসাথে থাকার গভীর অর্থে।
দুঃখ থাকুক দূরে, স্মৃতির মতো—
আমরা কাছাকাছি থাকলেই
এই মুহূর্ত, এই স্পর্শ, এই উষ্ণতা
আমাদের পৃথিবী হয়ে ওঠে।
১৭. জোনাকির অন্ধকারে
তোমার হৃদয়ের গভীর অন্ধকারে
ঘুরেছি অনেক—জোনাকির মতো,
ডানায় ডানায় বেঁধে এনেছিলাম
অপেক্ষার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো।
ভেবেছিলাম, কোনো এক নিঃশ্বাসে
জ্বলে উঠবে প্রেমের প্রদীপ,
তোমার নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে
খুঁজে পাবো উষ্ণ কোনো দীপ।
কিন্তু প্রতিটি স্পর্শে ফিরেছি শূন্য হাতে,
চোখের সামনে শুধু নীরব দেয়াল,
ভালোবাসা সেখানে ছিলো না—
ছিলো কেবল অন্ধকারের দীর্ঘকাল।
আমি জোনাকি হয়েই জ্বলে উঠতে চেয়েছিলাম,
নিজেকে পুড়িয়ে আলো দিতে,
তুমি শুধু আঁধার আগলে রেখে
শিখিয়েছো নিভে যেতে।
আজ আর আলো খুঁজি না তোমার ভেতরে,
অন্ধকারকেও করেছি আপন,
তবু গভীর রাতে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে-
আমি বলি,
একদিন খুব ভালোবেসেছিলাম একজন।
১৮. পদ্মরাগে আঁকা আনন্দিতা
আমরা যখন কাছাকাছি আসি তখন
তোমার উচ্ছ্বসিত দেহখানি কাঁপছিল,
মুখ ঝিকমিক করছিল—
কটির কিঙ্কিনী রুমঝুম শব্দে বাজছিল
মৃদঙ্গের মতো এক অন্তর্লীন রাগ।
তোমার নাভি-বৃত্তে আঁকা ছিল
পদ্মরাগমণির সুরভিত কারুকার্য,
মনে হয়েছিল—
তুমি আনন্দিতা, এক মায়াবতী।
চুলের ফাঁক দিয়ে নেমে আসছিল সন্ধ্যার আলো,
কাঁধে কাঁধে লেগে থাকত চাঁদের নরম নিঃশ্বাস।
তোমার চোখে তখন নদীর মতো গভীরতা-
যেখানে ডুবে গেলে ফিরে আসার ইচ্ছে জাগে না, শুধু ভেসে থাকতে মন চায়
নীরব নিবিড় ভালোবাসায়।
তোমার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি
ভেঙে দিচ্ছিল সমস্ত দূরত্ব,
আমি স্পর্শ করিনি, তবু ছুঁয়ে ছিলাম—
শব্দে, দৃষ্টিতে, হৃদয়ের গোপন কম্পনে।
আমাদের মাঝখানে বাতাসও ছিল উষ্ণ,
সে জানত—এই মুহূর্ত প্রার্থনার মতো পবিত্র।
তুমি কাছে এলে সময় থমকে দাঁড়ায়,
দিন-রাত্রি ভুলে যায় নিজের নাম-
তোমার শরীরের ভাষা পড়ে আমি বুঝে নিই- ভালোবাসা কখনো শুধু বলা নয়,
কখনো সে দেহের স্নিগ্ধ আলো,
কখনো গভীর নিঃশ্বাসে লুকোনো গান।
সেই রাতে তুমি ছিলে
স্বপ্ন আর সত্যের মাঝামাঝি এক নীলিমা,
আর আমি- তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা
চিরকালের এক প্রেমিক মুহূর্ত।
১৯. হৃদয়ের গোপন দুপুর
এই দুপুরটা রোদ্দুরে ভেজা,
তোমার কণ্ঠে লুকোনো নরম ডাক—
ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে দু’চোখের মাঝখানে,
সময়ও আজ প্রেমের কাছে পরাজিত।
হৃদয়ের গোপন দুপুরে
তুমি আসো নিঃশব্দ পায়ের ছাপে,
শ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে রেখে যাও
অলিখিত কিছু প্রতিশ্রুতি।
জানালার ফাঁক দিয়ে আলো নামে,
তোমার চুলে লেগে থাকে সোনালি বিস্ময়,
আমি শব্দ ভুলে যাই,
শুধু অনুভব করি—
ভালোবাসা এমনই উষ্ণ।
এই দুপুরে কোনো প্রশ্ন নেই,
নেই ভবিষ্যতের ভিড়,
শুধু দু’টি হাত—
একটি আরেকটির মানচিত্র খোঁজে।
যদি সন্ধ্যা নামে, নামুক,
রাতও আসুক নীরবতার চাদর মেলে—
এই হৃদয়ের গোপন দুপুরে
তুমি থাকলেই
সব সময় আমার হয়ে যায়।
২০. তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে
তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে—
দিনের সব ক্লান্ত রোদ
নরম হয়ে যায়,
অবুঝ পাখিরা ডানা গুটোয়
আমার বুকের ভেতর।
ওই চোখে তাকালেই
শহরের কোলাহল থেমে যায়,
আকাশ নুয়ে পড়ে তোমার পাপড়ির ধারে,
আর সময়—
অল্প একটু থেমে
আমাদের দিকে তাকায়।
তোমার দৃষ্টির গোধূলিতে
আমি ধীরে ধীরে হারাই,
ভালোবাসা তখন আর শব্দ চায় না,
শ্বাসে শ্বাসে জড়িয়ে
নীরবতার গান গায়।
চোখের কোণে জমে থাকা
অচেনা আলো-ছায়া
আমাকে ডাকে,
আমি জানি—
এই সন্ধ্যার শেষে
রাত আসবে না একা।
কারণ তোমার চোখেই
সব অন্ধকার আলো হয়ে যায়,
তোমার চোখেই
আমার সমস্ত ফেরার পথ
শান্ত হয়ে নামে।
২১. কলাবতী
ভালোবাসি কলাবতী নারীর শরীর,
করি কুর্নিশ তার দেহপল্লবে—
যেখানে যুগ যুগান্তরের ক্ষুধা
নীরবে মাথা নত করে দাঁড়ায়।
তার অবয়বে লেখা আছে ইতিহাস,
নখের আঁচড়ে, নিঃশ্বাসের ভাঁজে,
দেখি তার ভোগচিহ্ন, যেন যুদ্ধশেষের মাঠ,
যেখানে প্রেম আর ধ্বংস, একই মুদ্রার
দুই পিঠ।
যখন রক্তাক্ত হয় সর্বভূক মাংস ও করোটি,
তখনও সে নারী, অবিনশ্বর, অনমনীয়,
ভাঙনের মধ্যেই যার নতুন জন্ম।
তার বুকের গভীরে জমে থাকে আগুন,
চোখে জ্বলে ওঠে অদম্য প্রশ্ন,
সে জানে—দেহ শুধু ভোগের নয়,
দেহ একেকটি মানচিত্র,
যেখানে আঁকা থাকে ক্ষমতা, ক্ষুধা,
আর বেঁচে থাকার নির্মম সত্য।
আমি তাকে ভালোবাসি এই জন্যই—
তার ক্ষতগুলো কথা বলে,
তার নীরবতা চিৎকার হয়ে ওঠে,
আর তার শরীর শেষ পর্যন্ত এক মহাকাব্য,
রক্ত আর আলোয় লেখা মানব অস্তিত্বের কবিতা।
২২. মহুয়া বনে একরাত্রি
আমরা তখন মহুয়া বনে—
ঝরাপাতার গন্ধে ভেজা নীরবতা,
তুমি তাকালে অন্ধকারের দিকে,
অবসন্ন, দ্বিধাহীন—
আঁধারের ক্লান্তি জড়ানো চোখে
মুখের উপর বিচ্ছুরিত হচ্ছিল নক্ষত্রের আলো।
আকাশ আর মাটিকে মমতায় কাছের করে নিলে তুমি,
তোমার নিঃশ্বাসে নড়ে উঠল বনের বুক,
বাতাস থমকে দাঁড়াল ঝাউঝোপের আড়ালে—
সমস্ত ক্ষণগুলো ঝলমল করে উঠল যেন
অচেনা কোনো উৎসবের দীপশিখায়।
তারপর ধীরে ধীরে—
তোমার শরীরের উষ্ণতা এসে ছুঁয়ে দিল আমার রাত,
মহুয়ার গন্ধ মিশে গেল নিঃশব্দ ভাষায়।
চোখের পাতায় কাঁপন তুলে
তুমি নেমে এলে আরও কাছে,
নক্ষত্রেরা তখন লজ্জায় ঝরে পড়ছিল
আমাদের মাঝখানের অল্প অল্প ফাঁকে।
শেষ মুহূর্তে আমরা আর আলাদা
রইলাম না—
আদিম কোনো স্মৃতির মতো জড়িয়ে গেলাম একে অন্যে,
অন্ধকারের গায়ে লিখে দিলে শরীরের কবিতা,
স্পর্শে স্পর্শে জেগে উঠল সৃষ্টির প্রথম গান।
মহুয়া বন সাক্ষী রইল—
প্রেম যখন রক্তে, নিঃশ্বাসে, নিস্তব্ধতায়
শুদ্ধ শৃঙ্গারে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
২৩. ধ্রুপদী এক মানচিত্র
অপেক্ষায় থাকি—
শাড়ির আঁচল সরিয়ে দেখব তোমার পিঠের আঁচিল, কালো তিলকের গোপন মানচিত্র,
যেখানে আলো থেমে যায়, ছায়া কথা বলে।
তুমি ঘুরে দাঁড়ালে, সন্ধ্যার মতো নরম—
একটু লাজ, একটু সাহস,
চোখের পাতায় জোছনার কাঁপুনি।
রমণীর কাছে কবিরা পরপুরুষ—
প্রেমভোগী প্রজাপতি,
ছিন্নভিন্ন ফুলের পাপড়িতে ঠোঁট রাখে,
ভালোবাসে ক্ষণিকের মধু।
তবু তোমার কাছে এসে
আমার কবিতা হাঁটে ধীরে,
শব্দগুলো খুলে রাখে জুতো,
নীরবতায় শুয়ে পড়ে।
নরম মাংসের শরীর শুয়ে থাকে
গ্রীবা বাঁকিয়ে নদীর মতো—
স্রোত নেই, তবু গভীরতা আছে।
শ্বাসে শ্বাসে ভিজে ওঠে রাত,
ঝরে জ্যোৎস্না, কাঁপে বসন্তের বাতাস
দিগ্বিদিগ ঊর্ধশ্বাসে।
পাতার ফাঁকে ফাঁকে তোমার নাম লিখে যায় হাওয়া, আমি হাত বাড়াই না—
অপেক্ষাই আমার স্পর্শ, দূরত্বের এই মিষ্টি তীর বুকে গেঁথে রাখি যত্নে,
তুমি এক পা এগোলে সমস্ত পৃথিবী এগোয়-
চাঁদ থামে, নদী শোনে,
আর আমার কবিতা তোমার পিঠের সেই তিলকের কাছে চিরদিনের ঠিকানা খুঁজে।
২৪. বাবা
বাবা মানে ভোরের প্রথম আলো,
চুপচাপ উঠোন ঝাঁট দেওয়া একাকী মানুষ,
যার কাঁধে ভর করেই
আমার সকালগুলো হাঁটতে শিখেছিল।
শৈশবে বুঝিনি—
ওই শক্ত হাতের তালু আসলে ছিল
নরম আশ্রয়ের ছাতা,
রোদে-ঝড়ে মাথার ওপর অবিচল।
বাবা কথা কম বলত,
কিন্তু সন্ধের বাতাসে
ওর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর
লুকিয়ে থাকত হাজার না-পাওয়া স্বপ্ন,
যেগুলো সে আমার চোখে তুলে দিয়েছিল
নিজের চোখ খালি রেখে।
স্কুলফেরত বিকেলে
বাবার সাইকেলের বেল
এখনো কানে বাজে—
সেই শব্দে ছিল নিরাপত্তা,
ছিল ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা।
একদিন বড় হয়ে দেখি,
বাবার চুলে রূপালি চাঁদ নেমেছে,
হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তির ছায়া—
তবু আমাকে দেখে
চোখের কোণে ঠিকই জ্বলে ওঠে
অচেনা এক গর্বের আলো।
বাবার হাতটা আর আগের মতো শক্ত নয়,
কিন্তু সেই হাত ধরলেই
আমার বুকের ভেতর
শৈশব ফিরে আসে দৌড়ে।
বাবা— তুমি এখন নেই,
জীবন নদীর ওপারে নৌকো বেঁধে
চুপচাপ বসে আছো ।
এপারে দাঁড়িয়ে আমি হাত নাড়ি,
জানি—দেখতে পাও না,
তবু নদীর জল বেয়ে
তোমার আশীর্বাদ এসে
আমার কপালে পড়ে।
বাবা, তুমি কোনো কবিতা নও,
তুমি সেই নীরব পাঠ,
যা না পড়লেও
সারা জীবন মুখস্থ হয়ে থাকে।
২৫. প্রথম নিঃশ্বাস
মসৃণ গাত্রবর্ণ, জলভরা ঘন মেঘের মতো
কুঞ্চিত কেশদাম,
আরক্ত মুখে জমে আছে অবদমিত কোনো
সন্ধ্যার ডাক।
এই রাতে শরীর জানে, কীভাবে নীরবতা
ভেঙে পড়ে, কীভাবে অচেনা স্পর্শ
রক্তে তোলে গোপন ঢেউ।
শক্ত দু’হাত এসে ছুঁয়ে দিক লুকানো অস্থি,
যেখানে নাম নেই, যেখানে ভাষা পৌঁছয় না—
সেখানেই জ্বলে উঠুক আলো।
অন্তর্গুহার তমসা সরিয়ে দিক এক ঝলক প্রলয়,
দু’পাড়ে উঠুক উদ্ধত জোয়ার,
শরীরের মানচিত্রে হোক আদিম বিজয়ের দাগ।
কোনো দূরন্ত হাঙর নয়, বরং এক অবাধ সাহস
ভেঙে দিক সমস্ত সংযম,
নরম করোটিতে বাজুক অপরিমেয় উচ্ছ্বাসের ঢাক।
কিছু মুহূর্ত হোক হেমবর্ণ, কিছুটা সময় মধুময়,
ঘামে, নিঃশ্বাসে, কম্পনে
মিশে যাক দুই ক্লান্ত পৃথিবী।
তারপর— সব শব্দ থেমে যাক,
সমস্ত ক্লান্তি নেমে আসুক একটি দীর্ঘ, গভীর
অবসন্ন সুখে…
না— এটি শেষ নয়,
এটি কেবল শুরু, এটি প্রেম লীলার
প্রথম নিঃশ্বাস।
২৬. চড়াইকোল স্টেশনে জোছনার রাত
স্টেশনটি ছিল বিদ্যুৎহীন—
তবু অন্ধকার ছিল না একটুও,
কারণ চাঁদ তখন সমস্ত চরাচর জুড়ে
নিজের আলো ঢেলে দিচ্ছিল নিঃশব্দে।
প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম তার চড়াইকোল,
লোকাল ট্রেনটি আসছিল দেরিতে,
যেন সময়ও এখানে
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
পুরনো কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম আমরা—
আমি আর মায়াবতী,
চারপাশে জোছনার অথৈ সমুদ্র,
রেললাইনের লোহার দাগ বেয়ে
চাঁদের আলো গড়িয়ে যাচ্ছিল দূরে,
কোথাও ডাকছিল নিশাচর পাখি,
কোথাও ঘাসের ভেতর
নিঃশব্দে কেঁপে উঠছিল প্রেম।
মায়াবতী ফিসফিস করে বলল—
“জোছনায় ভিজতে ইচ্ছে করছে…”
তার চোখে তখন
একটি পূর্ণিমা থরথর করে কাঁপছে,
আমি বুঝে গেলাম,
এই ইচ্ছে আসলে শরীরের নয়—
এই ইচ্ছে আত্মার।
বলেছিলাম আমি, চলো -
কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই,
যেন এই শব্দের ভেতর
সমস্ত জীবনের সম্মতি জড়িয়ে আছে।
আমরা নেমে গেলাম রেললাইনের পাশে,
জুতো খুলে রাখলাম বাস্তবতার ধুলো,
পায়ের তলায় জোছনা,
মাথার ওপর আকাশের নীল নিঃশ্বাস।
সে হেসেছিল, চাঁদের আলো গড়িয়ে পড়েছিল
তার গালের ঢালে,
আমি হাত বাড়িয়ে ধরেছিলাম
আলো আর শরীরের মাঝখানের সেই নরম দূরত্ব।
লোকাল ট্রেন তখনও আসেনি,
ঘড়ি থেমে ছিল, স্টেশন নিঃশব্দে দেখছিল
দু’টি মানুষ কীভাবে অল্প অল্প করে
জোছনার ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে।
চড়াইকোল, তুমি সেদিন শুধু একটি স্টেশন ছিলে না,
তুমি ছিলে আমাদের প্রথম নিঃশর্ত রাত,
যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না,
কিন্তু ভালোবাসা পুরো চরাচর আলোকিত করে রেখেছিল।
২৭. হৃদয় হরণ করো
তার হাতের উপর হাত রেখে বলি—
তুমি কী অপূর্ব সুন্দর, তুমি হৃদয় হরণ করো
তুমি আমার ভালোবাসা।
এই প্রেম কোনো স্পষ্ট রেখায় আঁকা নয়,
এখানে শব্দরা আগে লজ্জা পায়,
তারপর ধীরে ধীরে শরীর খুঁজে নেয় শরীর।
তোমার চোখ ঢেকে দিলে
অন্ধকারের মধ্যেই আমি আলো দেখি—
কারণ তুমি না দেখলেও,
আমার ভেতরে তোমার দেখা জমে থাকে।
তুমি বিমূর্ত—
কখনো বিকেলের হালকা বাতাস,
কখনো ঘুমের ভেতর হঠাৎ জেগে ওঠা দীর্ঘশ্বাস।
তোমাকে ছুঁই না, তবু ছোঁয়ার কাঁপন
আমার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেমে উচ্চারণ নেই,
আছে শুধু অনুভবের নীরব আর্তনাদ।
তোমার চোখের পাতা বন্ধ থাকলে
আমার ঠোঁট আরও সাহসী হয়,
আমি প্রেম বলি স্পর্শ দিয়ে,
নিঃশব্দে শরীরের ভাষায়।
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত ক্লান্তি খুলে পড়ে,
আমি বুঝে যাই—
ভালোবাসা মানে দেখা নয়,
ভালোবাসা মানে বিশ্বাস।
এই প্রেম কোথাও যায় না,
কোথাও থামে না।
এটা আমাদের মাঝখানে
একটি দীর্ঘ, গভীর মুহূর্ত হয়ে থাকে।
২৮. যেখানে নদী থেমে যায়
নদী যেমন চলতে চলতে
হঠাৎ এক জায়গায় এসে থেমে যায়—
নিজের সমস্ত গতি খুলে রেখে
সরোবর হয়ে ওঠে নিঃশব্দে,
তেমনি সে—
কোনো দেবতার মঙ্গল-আলোক মেখে
অসীম ভালোবাসা নিয়ে
আমার কাছে এসে থেমেছে।
আমার ক্লান্ত বুকের ভেতর
আজ সে এক গভীর সরোবর।
যেন পলাতকা কোনো ঝর্নার জল,
প্রতিদিন আঁজলায় ভরি তাকে—
স্বচ্ছ, শীতল, অবিরাম,
তৃষ্ণার সমস্ত ভাষা মুছে দেয়।
তার মনটি আজ
সকালের প্রথম শিশিরের মতো,
ঝির্ ঝির্ করে কাঁপে—
পাতার ডগায় জমে থাকা আলো,
স্পর্শ করলে ভেঙে যাবে বলে
ভয় পায় ভালোবাসা।
এই থেমে থাকা, এই কাঁপন
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ,
এই নদীর শান্ত স্নিগ্ধ উচ্চারণ -
আমি তোমার ভালোবাসার নীরব
সরোবর।
২৯. বেলা শেষের কথা
জীবনের বহু আশা আজও অপূর্ণ,
অনেক চাওয়া—এই জীবনে আর পূর্ণ হবে না।
অতৃপ্তির ছায়া জমে আছে
হৃদয়ের অলিখিত প্রান্তরে—
তবু জীবনকে ভালো লাগে,
এই পৃথিবীর মায়ায়
আমি নীরবে বাঁধা পড়ে থাকি।
অপ্রাপ্তির কাছে নেই কোনো অভিযোগ,
আক্ষেপকে দিইনি আশ্রয়,
গ্লানির সঙ্গে আমার
কখনো গোপন বোঝাপড়া হয়নি।
গতকাল তুমি বলেছিলে—
“কোনো ঐশ্বর্য পাইনি ঠিকই,
তবু তোমার কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি,
যদি তাকেই দৌলত ধরি—
তার ওজন, তার মূল্য
অগণন স্বর্ণের চেয়েও বেশি।”
এই কথাতেই তুমি আমাকে
কৃতজ্ঞতার বন্ধনে বেঁধে ফেলো—
অথচ কত সহজে, কত গভীর করে—
“আমারে তুমি অশেষ করেছ,
এমনি লীলা তব—
ফুরিয়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।"
বেলা ফুরোয়, আলো নরম হয়,
কিন্তু তোমার দেওয়া এই প্রেম
শেষ আলো হয়েই
আমার সমস্ত সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে।
৩০. নির্জনতার অন্তরালে
রাতের গভীর নির্জনতায়
তোমার শরীর একটি নীরব মন্দির,
আমি প্রণামের মতো ধীরে ধীরে প্রবেশ করি
এর স্তবকে স্তবকে।
চুলের ফাঁকে জমে থাকা অন্ধকার
আমার আঙুলে খুলে যায়,
ঘাড়ের কাছে শিউলির সুবাসে
চন্দনের মতো গলে পড়ে নিঃশ্বাস।
তুমি নীরব,
তবু তোমার বুকের ওঠানামায়
সমুদ্রের ঢেউ শোনা যায়—
আমার বুক সেখানে তীর্থযাত্রী।
ঠোঁট ছুঁই না,
তবু ঠোঁটের ভাষা পড়ে ফেলি,
নাভির চারপাশে ঘুরে বেড়ায়
অতৃপ্ত চাঁদের আলো।
এই মুহূর্তে
সব দুঃখ কাপড় খুলে ফেলে,
শরীরের উষ্ণতায়
ভুলে যায় নিজের নাম।
তুমি আমাকে শেখাও—
ভালোবাসা কখনো উচ্চারণ নয়,
ভালোবাসা
একটি দীর্ঘ, ধীর, দগ্ধ স্পর্শ।
৩১. অস্তবেলার গান
দিন ফুরোয়—
অবসাদের কাঁধে ভর দিয়ে আসে স্মৃতিরা,
জোছনার মতো নরম আলোয়
পুরোনো গান জেগে ওঠে মনে।
বাউলের ডাকে, ভাটিয়ালির ঢেউয়ে
টপ্পা আর কীর্তনের মাঝখানে
জীবনটা যেন দাঁড়িয়ে থাকে—
কিছু চাওয়া আজও অপূর্ণ।
জীবনতৃষ্ণা বড় ব্যাকুল,
নদীর ঘাটে ঘাটে জল তুলতে চায় মন,
হাতে লাগে না—তবু তেষ্টা যায় না,
স্বপ্নের কলস ভরে ওঠে না কখনো।
মেঠো পথ ধরে স্কুল ফেরার সেই বিকেল,
এক পাতার বাঁশিওয়ালার সুর—
আজও বাতাসে ভেসে আসে,
চোখ বুজলেই শুনি সেই ডাক।
আকাশে ছিল কত গান,
আমরা কুড়িয়ে নিতে শিখিনি।
কত কথা উড়ে গেছে বাতাসে,
কত অস্তবেলার সূর্য
নিঃশব্দে ডুবে গেছে অস্তাচলে—
রেখে গেছে শুধু রাঙা রেশ,
সন্ধ্যার বুকের ভেতর
নস্টালজিয়ার নরম আগুন।
৩২. মাধবীর মাধুরী
মাধবী বলেছিল—
আমার ভেতরে মাধুরী খুঁজো না,
আমি বাগদাদের ফুল নই,
নই মীরা বাঈয়ের গানের করুণ ভক্তি।
তবু আমি জানি,
মাধুরী শুধু নামের ভিতর থাকে না—
সে থাকে হাঁটার ভাঁজে,
ঘাড়ের কাছে নেমে আসা চুলের ছায়ায়,
চোখের পাতার নীরব ওঠানামায়।
তোমার শরীর—
একটি অনাবিষ্কৃত শিল্পভূমি,
যেখানে আলো হাত বুলিয়ে শেখে
কীভাবে কোমল হতে হয়।
কাঁধের বাঁকে জমে থাকা বিকেল,
বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়া রোদের দাগ—
এসব কোনো উপমা চায় না।
তুমি বলেছিলে, মাধুরী খুঁজো না—
কিন্তু তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমি যে গান শুনি,
তা কোনো মন্দিরের নয়,
তা শরীরের ভেতর ভেসে ওঠা
নিখাদ প্রেমের আর্তি।
মাধবী,
তুমি ফুল নও, গানও নও—
তুমি সেই স্পর্শ,
যেখানে নাম ফুরিয়ে যায়,
আর ভালোবাসা
নগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
৩৩. বাগদাদের রাত -
রাজস্থানের সকাল
আমি চাই বাগদাদের একটি রাত আর রাজস্থানের একটি সকাল—
যেখানে রাতের আকাশ নীল রেশমে মোড়া,
চাঁদ ঝুঁকে পড়ে মিনারের ছায়ায়,
আর ভালোবাসা শরাব হয়ে ঢলে পড়ে ঠোঁটের কিনারে।
সাকীর চোখে জমে থাকে সহস্র গল্প,
এক চুমুকেই ভেঙে যায় দূরত্ব, সময়, নিষেধ-
নিঃশব্দে হৃদয় জুড়ে নামে উষ্ণ আগুন,
যেন প্রেম নিজেই এক প্রাচীন দোয়া।
সেই রাতে শব্দেরা নাচে সুগন্ধি ধোঁয়ার মতো,
নিশ্বাসে নিশ্বাসে জড়িয়ে পড়ে অনন্তের স্বাদ।
অচেনা শহরেও চিনে নিই তোমাকে,
কারণ ভালোবাসা কখনো মানচিত্র মানে না।
আর তারপর চাই রাজস্থানের একটি সকাল-
রোদ্দুরে ধুয়ে যাওয়া মরুর বুকে
ঘুঙুরের মতো ঝরে পড়ে আলোর শব্দ।
মন্দিরের দ্বারে ধ্বনিত হয় মীরা বাঈয়ের কণ্ঠ,
প্রভুর নামে গাওয়া গান
ভেদ করে যায় হৃদয়ের সমস্ত প্রাচীর।
ভক্তি সেখানে প্রেম হয়ে ওঠে,
আর প্রেম—এক নিঃস্বার্থ প্রার্থনা।
সেই সকালের হাওয়ায় তোমার নাম জপ করি,
তুমি যেন প্রভু আর প্রিয়া—একই সত্তা,
চোখে চোখ রেখে বুঝে নিই
ভালোবাসার শেষ নেই কোনো সন্ধ্যা বা ভোরে।
বাগদাদের রাত আমাকে শেখায় আকুলতা,
রাজস্থানের সকাল দেয় সমর্পণের আলো।
এই দুইয়ের মাঝখানেই আমি বাঁচতে চাই-
যেখানে শরাব আর সংগীত মিলেমিশে বলে যায়,
ভালোবাসাই শেষ সত্য,
ভালোবাসাই একমাত্র পথ।
৩৪. কুসুমপুর
ছোট্ট একখানি গ্রাম—নাম তার কুসুমপুর,
মাটির ঘরের দেয়ালে রোদ্দুর লেখে নীল
নকশার সুর।
মেটে পথে ধুলোর সাথে হাঁটে সময়
ধীরে ধীরে,
পথের ধারে ভাঁটিফুল, কস্তুরী হাসে
নীরবে ঘিরে।
লাল-সাদা নয়নতারা চাপ বেঁধে
ফোটে রোজ,
বনতুলসীর বাবুরি জঙ্গলে ভাসে
গন্ধের খোঁজ।
ছোট ছোট ডোবায় নারীর হাসি, জলের
শব্দ মেশে,
বাসন-মাজা, কাপড়-কাচা—জীবন চলে
এমন বেশে।
বাঁশবনে বাতাস কাঁদে সকরুণ এক সুরে,
কদম-শিরীষ-বকুলে পাখি ডাকে দুপুরে।
আম-জাম-কাঁঠালের ঘন ছায়া
ঘিরে বনভূমি,
সেই পাতার আড়াল থেকে জেগে
ওঠে গ্রামভূমি।
কোকিল ডাকে, পাপিয়া, বেনেবউ,
ঘুঘুর গান,
ফিঙে উড়ে কালো ডানায় ভাঙে
আকাশের টান।
বউ কথা কও বলে ওঠে সাঁঝের
নরম বেলা,
উঠোনে কাকেরা ঘোরে—চেনা
সংসারের খেলা।
সড়ক শালিক ধুলোর মাঝে কিচিমিচি
ঝগড়া তোলে,
চালের ধারে পায়রারা বাসা বেঁধে সুখ
খোঁজে বলে।
ঝুড়ি আর হাঁড়ির ভেতর বকবক
করে আশা,
সুখের ঘরেই নাকি থাকে পায়রার
ভালোবাসা।
এই গ্রাম কোনো মানচিত্রে বড় করে লেখা নয়,
তবু কুসুমপুর মানেই প্রাণের নির্ভেজাল পরিচয়।
মাটির গন্ধে, পাখির ডাকে, মানুষের
সহজ সুরে-
আমার শিকড়, আমার শ্বাস চিরদিন
কুসুমপুরে।
৩৫. আগুনের স্মৃতিতে বাঁধা
নয়নে নয়ন রেখে তোমায় দেখেছিলাম—
তুমি বলেছিলে, অন্তরে তাকাও।
অন্তরের গভীরে হাত বাড়াতেই
তুমি ফিসফিসিয়ে বললে, বুকে তুলে নাও।
বুকে বুক রাখার সেই ক্ষণে
শীতের সকাল হঠাৎ আগুন হয়ে উঠল,
নিভৃত নীল বাতাসে জ্বলে উঠল লেলিহান,
দেহ থেকে দেহান্তরে ছড়িয়ে পড়ল উত্তাপের ফুল।
তুমি জ্বললে, আমাকেও জ্বালালে—
দুটি শ্বাস এক হয়ে আগুনে রূপ নিল,
ভালোবাসার তাপে পুড়ে পুড়ে
দেহের ভাষা হারিয়ে গেল নীরবতায়।
এখন আমরা ছাই, আমরা ভস্ম—
তবু শেষ নই কোথাও,
ছিন্ন তুলোর মতো হালকা হয়ে
একই আকাশে উড়ি, একই আগুনের স্মৃতিতে বাঁধা।
৩৬. চন্দ্রকিরণ তলে
যদি কোনো রাত্রির মধ্যাহ্নে
চন্দ্রকিরণতলে দাঁড়িয়ে তুমি
নীরবতার ভাষায় ললাটে চুম্বন দাও—
তবে জোছনা আর কুয়াশা মিলে
একটি স্বপ্নের নদী হয়ে বয়ে যাবে হৃদয়ের ভেতর।
বাঁশঝাড়ের ছায়ায় মর্মর পথ ধরে
হাঁটবো আমরা ধীরে ধীরে,
পাতার ফাঁক গলে নামা আলোয়
ঝরে পড়বে অব্যক্ত প্রতিশ্রুতি,
নিশ্বাসে নিশ্বাসে জড়িয়ে নেবে সময়।
সেই নির্জনতার গভীরে
আমি খুলে দেবো বুকের সব দরজা,
অলক্ষ্যে জমে থাকা ব্যথা, আশা, আকুলতা
চন্দ্রালোকের হাতে তুলে দিয়ে বলবো—
নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা।
রাত্রি থেমে থাকবে আমাদের জন্য,
তারারা সাক্ষী হবে নীরব শপথে,
আর ভোর আসলেও জোছনার স্মৃতি
চিরকাল জ্বলবে হৃদয়ের গোপন দীপে।
৩৭. হার্ডিঞ্জ ব্রিজে দাঁড়িয়ে
পদ্মা পাড়ের সাহানা জোয়ার্দার
একদিন এক চিঠিতে লিখেছিল—
'তুমি একবার এসে দেখে যাও আমাকে'।
চিঠির ভাঁজে ভাঁজে লেখা ছিল
অকথিত কান্না, ভেজা নিঃশ্বাস।
সে জানত, সময় আর তার বেশি নেই,
শরীরের ভেতর সন্ধ্যা নেমেছে আগেভাগে,
দিনগুলো ক্রমে ছোট হয়ে আসছে-
তবু সে শুনতে পায় নদীর আমন্ত্রণ,
পদ্মার ঢেউ তাকে ডাকে নাম ধরে।
তার অন্তিম ইচ্ছে ছিল খুব সাধারণ,
কোনো অলৌকিক স্বর্গ নয়,
কোনো রাজকীয় প্রার্থনাও না,
শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে
যদি একবার দেখে নেওয়া যেত
এই পৃথিবীর সবচেয়ে আপন জল।
সে বলত- পদ্মা জানে, পদ্মাই বুঝে
আমার দুঃখের ভাষা ও বঞ্চনার কথা
হাওয়ার সাথে চুল ওড়াতে ওড়াতে
শেষবারের মতো বলেছিল নদীকে—
'আমি যাচ্ছি, তুমি বইতে থেকো।'
কিন্তু তুমি গেলে না, চিঠিটা পড়ে রেখে
দিলে আলমারির কোণে,
সময়কে বললে— ‘পরে যাবো।’
আর সেই ‘পরে’ শব্দটা
চিরকালের মতো দেরি হয়ে গেল।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে দিয়ে পদ্মা বয়ে
চলেছে আগের মতোই, কিন্তু সাহানা নেই,
দেখারও কেউ নেই জল-
দেখার নেই ব্রিজের লোহার রেলিংয়ে
লেগে থাকা এক ফোঁটা অদৃশ্য অশ্রু।
আজও কেউ কেউ বলে—
নদী নাকি গভীর রাতে থেমে যায়,
মৌনতায় একটি নাম ফিসফিস করে ডাকে-
সাহানা জোয়ার্দার!
৩৮. নিরুদ্দেশবাস
একদিন তোমার হাত ধরে
নিরুদ্দেশলোকে চলে যাব—
যেখানে অন্য আর কেউ নেই,
যেখানে দিগন্ত জোড়া শূন্যতার গান
সেখানে সময় ঘুমিয়ে পড়ে ঘাসের উপর,
আর আমরা হেঁটে যাব তার বুকের
ভেতর দিয়ে।
স্বচ্ছ নদীতে নামবো দু’জনে,
জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিনবো একে অন্যকে,
ঢেউয়েরা হেসে বলবে—
এরা তো প্রেমের ভাষা জানে।
ভেজা চুলে রোদ্দুর জড়িয়ে
তোমার কাঁধে রাখবো আমার সমস্ত ক্লান্তি।
পাহাড়ের কাছে গিয়ে বলবো—
দেখো, আমরা যুগলবন্দী,
ভাঙা-গড়া একসাথে শিখেছি।
আমাদের পূর্ণ করো, পূণ্য করো,
অথচ একটু পাপের রোদও দিও—
যাতে দেহমন খেলতে পারে
পাপ-পুণ্যের দোলনায়।
রাতে চাঁদের কাছে আবদার করবো—
আজ আর উঠো না,
আমাদের কথা শুনে যাও।
তারাদের দিয়ে লিখে নেবো
অদ্ভুত সব প্রতিশ্রুতি,
যেগুলো কখনো পূরণ করতে হয় না—
শুধু ভালোবেসে বাঁচলেই চলে।
সেই দেশে কেউ প্রশ্ন করে না—
কে তুমি, কেন এলে?
সব উত্তর মিলে যায় একটা দীর্ঘশ্বাসে,
একটা হাত ধরা সাহসে।
যদি কখনো ফিরে আসতে হয়,
ফিরবো না আমরা পুরোটা—
কিছু উন্মাদ হাসি, কিছু নদীর জল,
আর পাহাড়ের কাছে বলা
অন্তরঙ্গ সেই প্রার্থনাগুলো
সেখানেই রেখে দেবো।
যদি কোনোদিন ফিরতেই হয় পৃথিবীর ভিড়ে,
ফিরবো না আমরা সম্পূর্ণ—
তোমার বুকের ভাঁজে রেখে আসবো
আমার নামহীন নিশ্বাসগুলো,
স্বচ্ছ নদীর জলে ভাসিয়ে দেবো
আমাদের প্রথম ছোঁয়ার স্মৃতি।
পাহাড়ের কানে কানে বলে যাবো—
এখানে একদিন দু’টি হৃদয়
ভালোবাসাকে ঘর বানিয়ে
চিরদিনের জন্য বসবাস করতে চেয়েছিল।
৩৯. তোমাকে দেখার সাধ
তোমাকে দেখার সাধ মেটে না—
চোখের পর চোখ ক্ষুধার মতো খুঁজে ফেরে তোমার মুখ,
দিনের আলো ফুরোয়, রাত নামে,
তবু দৃষ্টির পাত্র ভরে না।
তোমাকে দেখবার যে এক প্রগাঢ় বাসনা,
সে বাসনা নদীর মতো—
যতই জল পায়, ততই গভীর হয়,
যতই কাছে আসি, ততই দূরত্ব শেখায়।
তুমি জানো না—
আমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
তোমার অবয়ব লুকিয়ে থাকে,
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন
তোমাকে দেখবার অনুমতি চায়।
আমি তাকিয়ে থাকি—
তোমার চোখে, ঠোঁটে, নীরবতায়,
যেন এই দেখা দিয়েই
জীবনের বাকি পথটা হেঁটে নেওয়া যায়।
তোমাকে দেখার সাধ মেটে না, প্রিয়—
কারণ তুমি শুধু দেখা নও,
তুমি আমার না-দেখা স্বপ্ন,
যাকে যত দেখি, ততই
আরও একবার দেখবার ইচ্ছে জন্ম নেয়।
৪০. হাতে হাত রেখে
হাতের ভাঁজে হাত রেখে আমরা চলেছি,
কোনো মানচিত্র নেই, তবু পথ হারানোর ভয় নেই।
কারণ তোমার স্পর্শই আমার দিকচিহ্ন,
আর আমার নিঃশ্বাসে তুমি পেয়েছ আশ্রয়ের শব্দ।
আমাদের সামনে যে জীবন
সে আর অচেনা নয়,
তার চোখে এখন আর প্রশ্ন নেই,
শুধু ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া দরজা,
ভেতরে আলো, ভেতরে নীরব নিশ্চয়তা।
আমরা হেঁটে যাই
ভাঙা দিন পেরিয়ে, ক্লান্ত সন্ধ্যার বুক চিরে,
পেছনে পড়ে থাকে দ্বিধা,
ভয়গুলো নিজেরাই সরে দাঁড়ায়
আমাদের নির্ভরতার কাছে এসে।
তুমি জানো, আমি আছি,
এই জানা থেকেই জন্ম নেয় সাহস,
এই সাহস থেকেই জন্ম নেয় আগামীকাল।
কোনো প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ দরকার হয় না,
হাতের উষ্ণতাই বলে দেয়-
আমরা একে অপরের ঘর।
যদি ঝড় আসে,
আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকব।
যদি আকাশ নুয়ে পড়ে,
আমাদের বিশ্বাস তাকে ধরে রাখবে।
হাতের ভিতর হাত—
এই তো আমাদের সমগ্র দর্শন,
এই তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রার্থনা।
৪১. দু’হাত পেতেছি
আমি দু’হাত পেতেছি—
শূন্য আকাশের নিচে,
যদি ভালোবাসা থাকে,
নিঃশব্দে এসে দিয়ে দাও।
কোনো শর্ত রেখো না,
প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির হিসাব কোরো না,
আমি ভিক্ষা চাইনি,
শুধু হৃদয়ের সত্যটুকু চেয়েছি।
তোমার আদর আর যত্ন
আমার সমস্ত ক্লান্তি মুছে দেবে,
একটু ছোঁয়া, একটু আশ্বাস—
এই নিয়েই আমি বাঁচতে পারি।
যদি দুঃখ থাকে,
আমার বুকে রেখে দাও,
যদি সুখ থাকে,
দু’হাতে ভরে দিও নির্ভয়ে।
আমি দু’হাত পেতেছি প্রত্যাশাহীন,
যদি ভালোবাসা থাকে—
দিয়ে দাও নিঃশঙ্ক চিত্তে দ্বিধাহীন।
৪২. হেমন্তের বিকেলে
আজ উদাসী হাওয়ার হেমন্তে বিকেলে,
নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়েছিলে বারান্দায়—
রোদের শেষ আলো তোমার চুলে এসে
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার মতো বসে পড়ছিল।
তোমার চোখে তখন অচেনা এক নীরবতা,
যেন অনেক কথা জমে আছে বলবার অপেক্ষায়।
হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল কাঁপতেই
আমার সমস্ত অপ্রকাশিত ভালোবাসা
হঠাৎ করে জেগে উঠল বুকের ভেতর।
সেই মুহূর্তে মনে হলো—
ভালোবাসা আসলে কোনো ঘোষণা নয়,
এ এক নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থাকা,
একটি বিকেল,
একটি নীল শাড়ি,
আর তোমাকে দূর থেকে দেখেই
অকারণে হৃদয় ভরে যাওয়ার নাম।
তোমাকে তখন না ডেকেও ডাকতে ইচ্ছে করে,
না ছুঁয়েও ছুঁয়ে থাকতে চাইলাম।
কারণ এমন করে দেখলে তোমাকে—
প্রতিবারই নতুন করে
ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
৪৩. জোছনার আলোকধারায়
যদি কোনো রাত্রির মধ্যাহ্নে
চন্দ্রকিরণতলে দাঁড়িয়ে কেউ
নিঃশব্দে ললাটে চুম্বন দিত—
সময় থমকে যেতো,
নক্ষত্রেরা ভুলে যেতো তাদের কক্ষপথ।
জোছনাধারা বইত ধীরে ধীরে,
যেন চাঁদ নিজেই হেঁটে আসছে হৃদয়ের দিকে;
কুয়াশা-নিবিড় নির্জনতায়
আমি চলে যেতাম অচেনা এক পথে—
বাঁশঝাড়ের ছায়া মর্মর করত
নরম পায়ের নিচে,
পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ত
অতীতের সমস্ত দীর্ঘশ্বাস।
সেখানে কোনো প্রশ্ন থাকত না,
থাকত না পাওয়ার হিসাব,
শুধু বুকের ভেতর নীল আলো জ্বেলে
দু’টি নিঃশ্বাস একে অপরকে চিনে নিত।
তোমার চোখে ভিজে থাকত
আমার না-বলা সমস্ত প্রার্থনা,
আমার হাতের রেখায় ঘুমিয়ে পড়ত
তোমার অনন্ত অপেক্ষা।
আমি তখন বলতাম—
নাও, দাও তুমি আমার অনন্ত ভালোবাসা,
যে ভালোবাসা কোনো ঋতু জানে না,
যে ভালোবাসা ক্ষয় জানে না,
চন্দ্রগ্রহণেও যার আলো ফুরোয় না।
যদি হারিয়েও যাই সময়ের গহ্বরে,
যদি নামহীন হয়ে যাই পৃথিবীর ভিড়ে—
এই জোছনা, এই বাঁশঝাড়,
এই ললাট-চুম্বন সাক্ষী থাকবে,
আমি একদিন ভালোবাসায় সম্পূর্ণ ছিলাম।
৪৪. উত্তরাধিকার
আজন্ম প্রেমিক আমি—
আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকা আমার স্বভাব,
পূর্বপুরুষের রক্তে মিশে আছে
এই উন্মুক্ত হাসি, এই দেহভাষা।
তুমি কি পারবে আনন্দে নামতে?
শরীরের গভীরে আলো জ্বালাতে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে
আগুনের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিতে উষ্ণতা?
আমি চাই না ভীরু স্পর্শ,
চাই না অর্ধেক চাওয়া—
আমার প্রেম সম্পূর্ণ নগ্ন,
চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা দেহের মতো নিঃসংকোচ, নির্ভীক।
যদি পারো— তবে এসো,
আমার বুকে কান রাখো,
শোনো হৃদপিণ্ডের ঢাক,
সেখানে আনন্দের তাল লুকানো।
আর যদি না পারো, তবে চলে যাও,
যেমন চলে গেছে আগে
অক্ষম সব প্রেমিকারা, যারা দেহে আগুন চিনত না, ভালোবাসাকে ভয় পেত।
আমি রয়ে যাই—
আনন্দের উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে,
আবার কারো অপেক্ষায়,
যে জানে—
প্রেম মানে শুধু অনুভব নয়,
প্রেম মানে সাহস করে জ্বলে ওঠা।
৪৫. নির্মলার কথা
রাজা রাম মন্দির—
ভগ্ন পাথরে আটকে থাকা শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাস,
লতাগুল্মে ঢাকা সিঁড়ি
নিজের দুঃখ নিজেই আগলে রাখে।
আশ্বিনের অস্তসূর্যে
আমি হাঁটছিলাম ধ্বংসের ভেতর,
হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ—
“পা বাড়াবেন না, ওখানে সর্প থাকে।”
সাদা শাড়ির মেয়ে, নাম নির্মলা—
চোখে জমে থাকা
অকাল বিধবার নীরব ইতিহাস।
সে দেখাল দীঘি,
বলল— এ জল মন্দিরের চেয়েও পুরোনো,
মাঝরাতে নাকি জ্বলে ওঠে অচেনা দীপ।
বলল স্বামীর কথা—
দুই বছরের সংসার,
একদিন জ্বরে পুড়ে নিভে যাওয়া মানুষ,
কান্নাহীন কণ্ঠে বলা শেষ গল্প।
সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে
দীঘির পাড়ে সে ধরেছিল আমার হাত,
কাঁপা আঙুলে দৃঢ় অনুরোধ—
“আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
আমি হাত ছাড়িয়েছিলাম,
তার ইচ্ছেটাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম জলে,
জল নড়েছিল ক্ষণিক,
তারপর স্তব্ধ।
আজও আশ্বিন এলে
কোনো এক দীঘির কালো জলে
ভেসে ওঠে সেই প্রশ্ন—
“আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
কোনো উত্তর
আর দেওয়া হয় না।
৪৬. পৃথিবীর মায়া
কেন যে কিছু মুখে পৃথিবীর মায়া লেগে থাকে—
মাটি, জল, রোদ আর শ্যাওলার এক নিবিড় চিহ্ন,
যেন বহু জন্মের হাঁটা থেমে আছে
একজোড়া চোখের কিনারায়।
সে মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়,
পৃথিবী কেবল গ্রহ নয়—
এ এক দীর্ঘ অভ্যাস, এক নীরব টান।
কেন যে কিছু মুখে পাই শুকপাখির পালকের ঘ্রাণ—
অতীতের উড়ান, অচেনা আকাশ,
ডানার ক্লান্তি আর দূরত্বের রৌদ্রঝরা স্মৃতি।
সে মুখে থাকে উড়ে যাওয়ার ইচ্ছে,
আবার ফিরে আসার অদৃশ্য দায়;
স্বাধীনতার স্বাদ আর ঘরের টান
একসঙ্গে বাসা বাঁধে সেখানে।
কেনই আবার দুঃখ-কাতরতা দেখি সেই মুখখানিতে—
না বলা কথার জমাট নীল,
চোখের ভাঁজে জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষা,
ভাঙা স্বপ্নের শব্দহীন চিৎকার।
সে দুঃখ চিৎকার করে না,
বরং ধীরে ধীরে মানুষের মতো
নিজেকে সহ্য করতে শেখে।
সেই মুখেই—
জীবন-মৃত্যুর খেয়া পারাপার দেখি।
একদিকে জন্মের আলো, অন্যদিকে নিভে যাওয়ার ছায়া;
মাঝখানে একটি মানুষ
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে,
হাতে কিছু স্মৃতি, বুকে কিছু ভালোবাসা,
আর চোখে অমীমাংসিত বিদায়ের জল।
সে মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝি—
জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়,
মৃত্যুকেও প্রতিদিন একটু একটু করে
আলিঙ্গন করা।
কিছু মুখ তাই আয়নার মতো—
তাতে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের ক্ষয়,
নিজের ফিরে আসার পথ
অস্পষ্ট হলেও সত্য হয়ে ধরা দেয়।
৪৭. পলাশবনের দুপুর
একদিন তপ্ত দুপুরবেলায় তুমি আগুন পলাশ বনে এসে দাঁড়াবে—
রাঙা পলাশের আবীর মাখবে তোমার গালে।
দু’চোখে রোদের ঝিলিক, বুক দুরুদুরু—
হাওয়ার কাঁধে ভর দিয়ে সময় থমকে যাবে খানিক।
আমার নামে কাজল দিবে চোখে,
আদর মেখে নেবে ঠোঁটে—
জুঁইফুলে গাঁথবে চুলের বিনুনি,
খোঁপায় গুঁজবে হলুদ গোলাপ,
যেন দুপুরের তাপে হঠাৎ ফুটে ওঠা একটি প্রার্থনা।
পায়ের নিচে শুকনো পাতা ফিসফিস করবে,
পাখিরা থামিয়ে দেবে গান—
শুধু শোনা যাবে তোমার নিঃশ্বাসের ওঠানামা।
রোদ্দুর ছায়ার সিঁড়ি বেয়ে নামবে আমাদের দিকে,
পলাশের ডালে ডালে ঝুলে থাকবে
লাল লাল অপেক্ষা।
তুমি চোখ নামালে,
আমার নাম পড়ে যাবে তোমার পাপড়ির ছায়ায়।
আমি বলব না কিছু—
নীরবতাই তখন ভাষা হয়ে উঠবে।
তোমার কণ্ঠে দুপুর গলবে,
হলুদ-লাল রঙে ভিজে যাবে পথ।
দূরে কোথাও জল ঝিলমিল করবে,
আর আমাদের মাঝখানে জন্ম নেবে
একটি মায়াময় আলো—
যার তাপে দুঃখ গলে যায়,
আর ভালোবাসা হয়ে ওঠে চিরসবুজ।
সেদিন পলাশবন শুধু বন থাকবে না,
হয়ে উঠবে ঘর—
যেখানে রোদ্দুর জানালা দিয়ে ঢুকে
আমাদের দু’জনকে একসাথে ডাকবে,
আর সময় শিখে নেবে
কীভাবে ধীরে হাঁটতে হয়।
৪৮. আমার নামে
আমার নামে কাজল দিও চোখে,
যেন তোমার দৃষ্টির কালোয়
আমি চিরকাল লুকিয়ে থাকতে পারি।
আমার নামে টিপ পরো কপালে—
সময় থমকে যাক এক মুহূর্ত,
সংসারের সব ক্লান্তি বাইরে রেখে।
আমার নামে আলতা রাঙাও পায়ে,
পথ যেন কেবল আমার দিকেই আসে।
হাঁটার শব্দে ঝরে পড়ুক লজ্জা,
নূপুরের ভিতর বাজুক গোপন ভালোবাসা।
আমার নামে ঠোঁটে দিও লাজুক রং,
যে রং কথা বলে না শুধু ছুঁতে জানে।
চুম্বনের আগেই ঠোঁট কাঁপুক,
ভেতরে ভেতরে ডাকুক আমাকে।
আমার নামে চুলে গাঁথো জুঁই,
নিঃশ্বাসে মিশুক রাতের সুবাস।
বিনুনির ফাঁকে ফাঁকে
আমি থাকি নীরব আশ্রয়ে।
আমার নামে শাড়ির আঁচল ভিজে থাকুক,
পড়ুক বিকেলের নরম রোদে।
ঝড় এলে আঁচল টেনে নিও বুকে—
আমি হব তোমার ভয়হীনতা।
আমার নামে একটুখানি অভিমান রেখো,
একটুখানি মান ভাঙার সুখ।
ভিড়ের মাঝেও যখন হারিয়ে যাবে সব নাম,
তখন শুধু ফিসফিস করে বলো—
এই চোখের কাজল, এই বুকের ধুকপুক,
সবটাই আমার নামে।
৪৯. তুমি আছ বলেই
আমি জল থেকে নিয়েছি তোমার শীতল ছোঁয়া,
রোদ্দুর থেকে নিয়েছি তোমার উষ্ণতা।
পথে চলতে চলতে জারুল ফুলের গন্ধে
খুঁজেছি তোমার বুকের গোপন সুবাস।
ভোরের শিশিরে ধুয়ে নিয়েছি তোমার চোখ,
নদীর ঢেউ থেকে শিখেছি তোমার ডাক—
ডেকে ওঠা, আবার সরে যাওয়া,
নীরবতার ভেতর লুকোনো এক গভীর প্রেম।
বিকেলের আকাশে যখন মেঘ জমে,
আমি বুঝে নিই, ওটা তোমার অভিমান।
আর সন্ধ্যার দীপ জ্বলে উঠলে ঘরে ঘরে,
তোমার নামেই আলোয় ভরে ওঠে মন।
চাঁদের আলোয় তোমার মুখের রেখা এঁকে নিই,
হাওয়ার কানে কানে শুনি তোমার নিঃশ্বাস।
এই পৃথিবীর সবকিছু থেকেই
আমি ধীরে ধীরে গড়ে নিয়েছি তোমাকে—
আমার একান্ত ভালোবাসা।
তুমি না থাকলে কিছুই আমার নয়,
আর তুমি আছ বলেই
এই না-থাকাও সহ্য হয়।
৫০. অভিবাদন
আজ কোনো বিবর্ণ শব্দে নয়,
আনন্দের রঙেই শুরু হোক নতুন বছর।
জীবন পেয়েছিলাম একদিন ক্রন্দনের ধ্বনিতে—
চলে যাব একদিন আঁখিকোণে রেখে যাওয়া নীরব অশ্রু নিয়ে।
আর এই মাঝখানের সময়টুকু—
কখনো দুঃখের, কখনো আনন্দের,
কখনো হারানোর, কখনো ভালোবাসার।
নতুন বছরে সেই মাঝখানের দিনগুলো
হোক আরও বেশি আলোয় ভরা,
হোক হাসিতে, স্নেহে আর স্বপ্নের সাহসে উজ্জ্বল।
সব বেদনা ছাপিয়ে আনন্দ এসে
আমাদের হাতে, মনে, জীবনে মেখে দিক নতুন আশ্বাস।
শুভ নববর্ষ।
জীবন সুন্দর হোক—ঠিক তার সমস্ত অনুভব নিয়েই।
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
ঢাকা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন