ভোরের প্রথম গান ( কাব্যগ্রন্থ )
প্রথম প্রকাশ -
উৎসর্গ -
১. নদী উপাখ্যান
সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাস ফাঁকা হলে
যে নীরবতা নামে,
সেই নীরবতার ভেতর দিয়েই কবিতা হাঁটে।
এটি স্মৃতির কবিতা, যেখানে বিষণ্নতা
চিৎকার করে না, চুপচাপ জমে থাকে।
চোখে মুখে তখনো দেশভাগের ধুলো,
বুকের ভেতর সদ্য স্বাধীনতার রোদ,
আমরা দু’জনেই বাংলা সাহিত্যের ছাত্র,
শব্দের কাছে আশ্রয় নিতে শিখছি,
জানি না, শব্দই একদিন আমাদের ছেড়ে যাবে।
প্রথম দিনের কথোপকথন
খুব সাধারণ ছিল,
যেমন হয় জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ শুরু।
— তোমার নাম কী?
— রঞ্জন।
নামের ভেতর কেমন যেন রোদের রেখা,
চোখে যমুনার ঢেউ।
— কোথা থেকে এসেছ?
— যমুনা নদীর পাড়ের কুসুমপুর থেকে।
নদীর মতোই কথা,
চলে যায়, থামে না।
আবার প্রশ্ন ফিরে যায় তার দিকে।
— তোমার নাম কী?
— মাধবী।
নামের ভেতর তখনো জানতাম না
এত নীরব বসন্ত লুকিয়ে থাকে।
— কোথা থেকে এসেছ?
— পদ্মাপাড়ের বিক্রমপুর থেকে।
পদ্মার মতোই সে,
গভীর, অথচ অনিবার্য ভাঙনের অভ্যাসে অভ্যস্ত।
এইটুকুই ছিল প্রথম দিন।
পদ্মা তখন আমার বুকের ভেতর,
প্রশস্ত, গম্ভীর, ভাঙনের ভাষা জানা এক নদী,
যার গন্তব্য আগেই ঠিক করা।
সেদিন ক্যাম্পাসের বাতাসে
দু’টি নদী অদৃশ্যভাবে হাত ধরেছিল,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো গাছেরা
সব দেখেও চুপ করে ছিল-
কারণ তারা জানত, সব মিলন মোহনায় পৌঁছায় না,
কিন্তু ওই দু’টি নদী সেদিন ক্যাম্পাসের বাতাসে
অদৃশ্যভাবে মিলেছিল।
এরপর দিনগুলো এল বাংলা বিভাগের সিঁড়ি বেয়ে,
ক্যান্টিনের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে,
রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের কবিতার
লাইনে লাইনে।
আমরা কবিতা পড়তাম,
আর কবিতা আমাদের পড়ত,
কথা থেকে কথায় সম্পর্ক জড়িয়ে গেল-
ক্লাস নোটের ফাঁকে, চিঠির ভাঁজে,
চুপচাপ হাঁটার শব্দে।
ভালোবাসা তখন কোনো ঘোষণা নয়,
ছিল শুধু পাশে বসে থাকা,
কিন্তু কিছু ভালোবাসা
নিজের ভবিষ্যৎ বয়ে আনে না,
বয়ে আনে শুধু স্মৃতি।
মাধবী আগেই বাগদত্তা ছিল,
এই সত্যটা শেষের দিকে নয়,
শুরুর দিকেই লেখা ছিল,
আমরা শুধু পড়তে ভুল করেছিলাম।
ভালোবাসার সম্পর্ক বিবাহে রূপ নেয়নি,
রঞ্জন থেকে গেল যমুনার মতো,
দূরে সরে গেলেও প্রবাহমান,
মাধবী চলে গেল পদ্মার দিকে,
নিজের নির্ধারিত মোহনায়।
অনিবার্য বিচ্ছেদ- কোনো চিৎকার ছাড়াই,
কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
শুধু কিছু কবিতা অসম্পূর্ণ থেকে গেল খাতায়,
আর প্রথম দিনের কথোপকথন
চিরকাল পূর্ণ রইল স্মৃতিতে।
আজ এত বছর পরে সেই কথোপকথন
সবচেয়ে স্পষ্ট- দুটি নাম, দুটি নদী,
আর একটি সময় যা আর কোনোদিন
ফিরে আসে না।
ভালোবাসা চলে যায়, মানুষ বদলে যায়,
শহরও বদলায়, কিন্তু প্রথম প্রশ্নটি
চিরকাল রয়ে যায় মনের ভেতর-
তোমার নাম কী?
আজও যদি কেউ জিজ্ঞেস করে-
ভালোবাসা কী? আমি বলি, একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্র
নদীর নাম বলেছিল, আর সারাজীবন ধরে
নিজেদের ভেতর বয়ে নিয়ে গেছে তারা
নদীর সেই জল।
২. অজ্ঞাত যাত্রা
আমি আগে কখনও প্রেম চিনতাম না,
তাই ঠোঁটকে মনে হতো রক্তকরবীর পাপড়ি,
চোখ- ময়ূরের পালকে জমে থাকা রোদের ফোঁটা,
শরীর শরীর বলে ধরা দিত না নিজেকে,
মনে হতো মণিরত্নখচিত এক সর্পিণী
যে নদীর মতো এঁকে–বেঁকে চলে,
নিঃশব্দে, অথচ অপ্রতিরোধ্য।
সবই ছিল রহস্যে মোড়া
আমি বুঝিনি গন্তব্য কোথায়।
সালভাদর দালির তুলির মতো
তোমার আঙুলেরা
উপত্যকার বুকে আঁকতে আঁকতে
হারিয়ে যেত অরণ্যপথে,
যে পথ কখনও চেনা ছিল না,
যেখানে পা রাখেনি আমার কোনো স্মৃতি।
গ্রিক দেবী আফ্রোদিতিও
আমাকে শেখাননি প্রেমের ব্যাকরণ,
কোনো কলাকৌশল,
কোনো অলিখিত শাস্ত্র
শুধু হৃদয়ের ভেতর
ধ্বনিত হতে থাকা এক আদিম ডাক
আমাকে টেনে নিয়েছিল অজানার দিকে।
আমি জানতাম না
কীভাবে সন্ততি জন্মায়,
কীভাবে বিস্তার ঘটে সভ্যতার,
কীভাবে জল ভেঙে
জলধির তল থেকে
মুক্তা তুলে আনতে হয়।
তবু আমাকে নামতে হয়েছিল
সাগরতলের নীল অন্ধকারে
অজ্ঞাত যাত্রার অভিযাত্রী হয়ে,
ভয়ের সঙ্গে ভালোবাসা জড়িয়ে,
নিজেকে ভেঙে
নিজেকেই আবিষ্কার করতে।
৩. পূর্ণতা
আমার জীবন পূর্ণ, সে গ্রহণে নয়,
অর্পণে স্থিত,
ভালোবাসা, যা তোমার কাছ থেকে পেয়েছি,
তা আবেগ নয়,
সে ঈশ্বর জ্ঞানের মতো
অদৃশ্য, অথচ ধারক।
এই শক্তি দিয়েই আমি গমন করি
পথে নয়,
অস্তিত্বের ভিতর দিয়ে।
চলা মানে এগোনো নয়,
চলা মানে স্থিত হওয়া।
যদি কোনোদিন আমি ক্লান্ত হই
সে ক্লান্তি দেহের,
আত্মার নয়।
কারণ আত্মা জানে, সে একা নয়
যেখানে ভালোবাসা আছে,
সেখানেই তুমি আছ।
৪. ছায়াপথের অন্য পারে
চলে গিয়েছে জেনেও আশায় থাকি,
তার সাথে আবার দেখা হবে একদিন
পৃথিবীর ছায়াপথে,
পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যাব
আমিও সেখানে,
যেখানে সময় থেমে থাকে স্মৃতির
নীল প্রান্তরে।
রাত্রির নক্ষত্রগুলো তখন নাম ধরে ডাকবে,
চাঁদের বুকের গভীরে লেখা থাকবে
আমাদের না–বলা কথা।
এই পৃথিবীতে তার ছায়া শুধু কুয়াশা
হয়ে থাকে,
তবু প্রতিটি ভোরে আমি খুঁজি সেই অচেনা
আলো।
হয়তো একদিন, সব দূরত্ব পেরিয়ে,
আকাশের অন্য পারে খুলবে আবার
সেই দরজা,
যেখানে কোনো বিদায় নেই, নেই অশ্রু
বা বেদনা,
শুধু চিরকাল অপেক্ষার শেষে মিলনের গান।
৫. চন্দ্রালোকের পথে
যে একাকী হাঁটে চন্দ্রালোকের আলোয় কোনো
অচেনা নদীর কূলে,
তাকে খামাখা খুঁজি আমি জোনাক-জ্বলা সন্ধ্যা রাত্রির বনবীথি বনে।
সে কি আজও ডাকে নাম ধরে শিশির-ভেজা
হাওয়ার ভিতর,
নাকি নক্ষত্রের দেশে গিয়েই ভুলে গেছে পৃথিবীর ক্লান্ত ঘর?
তার হাসির রোদ্দুর এখন পড়ে না
জানালার কোণে,
তবু সন্ধ্যার ছায়ায় বসে থাকে এক
নীরব শোকের সনে।
আমি কথা বলি তার সঙ্গে নির্জনতায় ছায়ায়
শূন্য ঘরের কোণে তারই দীর্ঘশ্বাস বেগ পায় -
কখনো মনে হয়, সে লুকিয়ে আছে শিশুর হাসিতে,
কখনো জোছনার ধারে দাঁড়িয়ে আছে অশ্রু-ভেজা স্মৃতিতে।
তার অনুপস্থিতি ভরে দেয় বুকের আকাশ,
তবু তার স্মৃতিতেই জ্বলে আমার
জীবনের বাতাস।
হে প্রিয়, যদি শুনতে পাও এ হৃদয়ের নীরব ডাক,
একটিবার ছুঁয়ে যেয়ো স্বপ্নে, যেমন ছুঁয়েছিলে
জীবনের বাঁক।
চন্দ্রালোকের সেই পথে তুমি যদি
একাকী হাঁটো আজও-
জেনে রেখো, এই পৃথিবীর এক কোণে আমি
তোমাকেই ভালোবাসি এখনো।
৬. আমি সেই মেয়েটা
আমি সেই মেয়েটা,
যে আজ চুলে জবা গুঁজে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে
তোমার চোখ এড়িয়ে রেখেছিল,
কারণ জানতাম- তোমার দিকে তাকালেই
ভেঙে পড়বে আমার সমস্ত দেহশিল্প।
আমি সেই মেয়েটা,
যাকে তুমি শাড়ির রঙে আকাশ দেখাতে চেয়েছিলে,
কিন্তু এনে দিলে সন্ধ্যার ঝিলমিল আলো,
যখন ফুল চাইতাম- তুমি দিতে দু’মুঠো সময়,
আর যখন কিছুই চাইতাম না-
তুমি চুপচাপ এঁকে দিতে
আমার কপালে একবিন্দু অলস চুম্বন।
তুমি আমার প্রেমিক-
যে আমার বুকের কাছে এসে
শুধু নিঃশ্বাস গুনে ফিরে গিয়েছিলে,
ভেতরের আগুনে হাত পুড়াতে সাহস হয়নি,
তবু তোমার চোখে
আমি নিজেকে সবথেকে নিরাপদ ফুলবাগিচা
মনে করতাম।
তুমি আমার প্রেমিক-
যে ভিড়ের মাঝে আমাকে খুঁজে নিতো
শব্দহীন দৃষ্টিতে,
বন্ধুদের আড্ডায় আমার নাম
আড়ালে রেখে বাঁচিয়ে রাখতো,
যেন আমি তার একান্ত আকাশ,
তার নিঃশ্বাসের গোপন দিগন্ত।
শার্টের বোতাম খোলা তোমার বুকে,
তোমার নিরাসক্ত কাঁধে মাথা রেখে
আমি শিখেছিলাম ভালোবাসার ব্যাকরণ,
তোমার সংসারের ভারে
আমার কাঁধও ভারী হতো-
তবু মনে হতো, এই বোঝাই আমার ঘর,
এই ক্লান্তিতেই আমার শান্তি।
তুমি জানো না ফুলের সব নাম,
জানো না নদীর দিকনির্দেশ,
তবু তুমি জানো কিভাবে আমার নামটা
ডাকতে হয় ধীরে ধীরে,
যেন প্রতিবারই প্রথম,
যেন প্রতিবারই নতুন জন্ম।
কাল আমি যদি অন্য কারো হাত ধরে দাঁড়াই,
অন্য চোখে নিজের ভবিষ্যৎ দেখি,
আমার শরীর যদি অন্য কারোর গল্প বলে,
তবু কোথাও তুমি থেকে যাবে
আমার পুরনো দুপুরে,
ঝরা পাতার ভেতর লুকোনো একটুকরো
রোদ হয়ে।
আর কোনো বিকেলে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠলে
হঠাৎ বলেই ফেলবো-
একদিন সে আমাকে খুব ভালোবাসতো,
তারপর হাসবো, কারণ কিছু প্রেম
হারিয়েই চিরকালের হয়।
৭. প্রেম ক্ষুধা
হে আমার জন্ম-আজন্ম প্রিয়তমা,
আমার সর্বগ্রাসী প্রেমিকা,
এবং সকল অবাধ্য রমণীকূল
তোমরাও তো প্রেমজ,
তোমরাও মনভোলাও সকল পুরুষকে;
তোমাদের স্পর্শেই তারা নতজানু হয়,
তোমাদের চোখের ইশারায়।
হে আমার স্ত্রী, পরস্ত্রী, যুবতী স্বৈরিণীরা,
যদি তোমাদের প্রেম মিথ্যা হয়,
যদি তোমাদের ঠোঁট মিথ্যে ভাষা শেখায়,
যদি তোমাদের দেহের সমস্ত দৃশ্যপট হয় প্রতারণা,
যদি পিকাসোর ক্যানভাসে আঁকা নারীর মতো
তোমাদের সৌন্দর্যও সৌন্দর্যের না হয়,
যদি তোমাদের প্রগাঢ় চুম্বন,
গভীর আলিঙ্গন,
স্বপ্নলোকের গান—সবই বেসুরো হয়ে যায়;
যদি তোমরা প্রতারণা করো,
যদি সন্ধ্যার তারারা আর না জ্বলে,
দিনের রোদ যদি আঁধারে ঢেকে যায়,
যদি হৃদয়ের স্পন্দন নিস্তব্ধ হয়,
চোখের তারা অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে,
যদি সব স্বপ্নসৌধ ভেঙে পড়ে ধূলায়,
তবে আমি মনে করব,
এই জগতে আর কোনো প্রেম নেই।
যদি তোমাদের শরীরের সকল ঐশ্বর্য
অব্যবহৃত পড়ে থাকে,
যদি আলো আলেয়া হয়ে ভেসে যায়,
যদি প্রাচীন নগরীর আঁধার নেমে আসে
এই ভূলোকে,
যদি হঠাৎ সব মেঘ বৃষ্টিতে ঝরে পড়ে,
যাতে তোমাদের প্রবঞ্চনাগুলি
আর কখনো ফাঁকি দিতে না পারে,
যেন কোনোদিনই প্রেম মুছে না যায়
এই পৃথিবী থেকে।
হে রমণীকূল,
হে আমার জন্ম-আজন্ম স্বৈরিণীরা,
তোমরাই আমার সকল বৈভব,
তোমরাই আমার প্রেম ক্ষুধা;
যদিও আমি স্ত্রৈণ নই,
তবু প্রেমেই আমার সকল তৃষ্ণা।
৮. আকাশের দম্ভ
যে মানুষটি
নিজের ইচ্ছে মতো রং না মিললেই
দেয়াল থেকে তুলে ফেলে দেয় ছবিটা
তার চোখে পৃথিবী শুধু আয়না,
তার হৃদয়ে কোনো জানালা নেই।
একদিন সে বলেছিল, সূর্য কেন এত উজ্জ্বল?
আলো কেন আমার চোখে লাগে?
সে আলোকে দোষ দেয়,
অথচ নিজের চোখে অন্ধকার জমে আছে।
সে হাঁটে শহরের ভেতর,
কিন্তু কোনো ঋতুর শব্দ শোনে না,
পাতার পতন তাকে কাঁদায় না,
নদীর ফুলে ওঠা তাকে শিখায় না অপেক্ষা,
ঝরার কান্নায় সে চিনতে পারে না বিদায়ের ভাষা।
সে জানে কেবল বস্তু, নামে ডাকে জিনিস,
কিন্তু হৃদয়ের মানে বোঝে না,
প্রেমিক হতে হলে
তোমাকে হতে হয় মাটির মতো নত,
বাতাসের মতো সহিষ্ণু,
বর্ষার মতো ধৈর্যশীল।
যে অপেক্ষা করতে পারে না,
যে ঝরে পড়াকে মানতে পারে না,
সে কেবল আকাশ হতে চায়,
কিন্তু আকাশ জানে না কীভাবে ছায়া হতে হয়,
তাই সে ছুঁয়ে দেখে,
কিন্তু কখনও জড়িয়ে ধরে না।
৯. পরের জন্মের প্রেম
পরের জন্মে ঠিকই আমরা দুজন প্রেমে পড়ব,
আমাদের বয়স আঠারো পেরোনোর আগেই
চিনে নেব আমাদের মধুরিমা লেনদেন।
পরের জন্মে তুমি হাঁটবে কুয়াশা মাখা ভোরে,
আমি তোমার পায়ের শব্দ চিনে নেব,
যেন শত শত জন্মের পরিচয়
একটি নিঃশ্বাসে ফিরে আসে।
আমাদের চোখে থাকবে না কোনো ভয়,
থাকবে না বিচ্ছেদের পুরনো দাগ,
শুধু থাকবে অনন্ত অপেক্ষার কোমলতা,
যা ভালোবাসাকে আরও গভীর করে।
হাতে হাত রেখে আমরা শিখব নতুন করে বাঁচতে,
নদীর মতো ধীরে, বাতাসের মতো অবাধ্য হয়ে,
আকাশ দেখলেই তোমাকে মনে পড়বে,
আমাকে দেখলেই তুমি খুঁজে পাবে ঘর।
যদি এই জন্মে কিছু অপূর্ণ থেকে যায়,
পরের জন্মে তা ফুল হয়ে ফুটবে,
প্রতিটি সকালে, প্রতিটি সন্ধ্যায়
আমরা একে অপরের জন্য করব প্রথম ও
শেষ প্রার্থনা।
আর যদি পৃথিবী আবার বদলে যায়,
নতুন নামে, নতুন রঙে, নতুন কালে-
তবু হৃদয়ের গভীরে লেখা থাকবে
আমাদের সেই চিরন্তন প্রেম কাহিনি।
১০. রুপাই খালের পাড়ে
রামগড়ের রুপাই খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে,
চোখে ভোরের নীল-
জলের উপর তখন আকাশ ভেসে আছে।
কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস,
বাঁশপাতার কাঁপনে এক ধরনের গোপন সুর,
যেন কেউ আমাদের গল্প গুনগুন করে পড়ছে।
একদিন এই পাড়েই সে ভিজে গিয়েছিল বৃষ্টিতে,
ভেজা ওড়নায় মুখ ঢেকে হেসেছিল,
আর বলেছিল-
বৃষ্টি থামলেও মন ভেজা থাকুক,
সেই হাসি এখনও খালের জলে
চুপচাপ ভাসে।
আরেকদিন, দুপুরের রোদে আমরা খালের ধারে
বসে পা ডুবিয়েছিলাম,
সে জল ছুঁয়ে বলেছিল-
দেখো, নদীও কাউকে ধরে রাখে না।
তখন বুঝিনি,
সে আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল বিদায়,
আজ আবার সে দাঁড়িয়ে আছে-
নৌকার ঢেউ মৃদু করে এসে পাড়ে লাগে,
মাছরাঙা উড়ে যায়, বক স্থির হয়ে থাকে,
সবকিছু যেন শোনে তার কণ্ঠ।
সে খুব ধীরে বলে,
তোমার সাথে আবার কী দেখা হবে?
আমি তাকাই বয়ে যাওয়া জলের দিকে,
যেখানে কোনো উত্তর থাকে না,
সে আবার বলে,
আবার শত বছর পরে হবে কী দেখা?
তার কণ্ঠে কোনো দাবি নেই,
শুধু এক ধরনের বিশ্বাস,
যেন সময়ও একদিন আমাদের জন্য
ফিরে আসবে।
রুপাই খাল তখনও বয়ে চলবে,
আমরা কেবল স্মৃতি আর দুটি ছায়া হয়ে
তার জলে স্রোতে হারিয়ে যাই।
১১. একটি মাত্র ছবি
সেদিনের সেই মুহূর্তের আর কোনো স্থির ফ্রেম নেই।
বছরের পর বছর দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিটিতে ধুলো জমে-
আজ একুশের শহীদ বেদীর মতো ঝেড়ে নিই তাকে।
মুছতে গিয়ে হাত পড়ে কপালে-
বালিকার সেই আরক্ত মুখ, পুতুল-পুতুল চাহনি।
খোপা বাঁধা চুল আজ আর মাঘনিশীথের হাওয়ায় উড়ে না।
যে রূপ দেখেছিলাম, আজ মনে হয় সে রয়ে গেছে অরূপ হয়েই।
আলোছায়ার ভেতর অপলক তাকিয়ে থাকা এক দিগবালিকা—
পায়ের ভঙ্গিতে বংশীধারীর ছন্দ,
চোখে কাজল, কণ্ঠে স্বর্ণহার, কানে মুক্তা ঝুমকা।
দৃষ্টি মেলেছিল আমার ভূবনের উপর,
দূরের যমুনা থেকে যেন জলধ্বনি আসছিল।
কত বছর কেটে গেছে,
গণনা করতে চাই না।
জীবন নদীর মতো বাঁক নিয়েছে,
দুপাশে নরম চর, সন্ধ্যায় জোনাকি, রাতে তারার আলো।
ঘরের এক কোণে মৃদু পীতবর্ণ আলো জ্বলে।
সেই স্বল্প আলোয় গোপনে দেখি তার মুখ,
বারবার দেখি।
ছায়ামেঘ ভেসে যায়, ধূসর আঁধার নামে।
প্রেম, বিরহ, অশ্রু, মিলন-
এই নিয়েই আমাদের জীবন।
বসন্ত এসেছে বহুবার,
আষাঢ়ে কদমের ঘ্রাণ ভেসেছে জানালায়।
আজ বাইরে শীতের রাত।
আকাশে তারা, বাতাসে বকুলের সুবাস।
কোথা থেকে ভেসে আসে গান—
“তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা…”
______________________________
আজ আমাদের বিয়ে বার্ষিকী।
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ইং
১২. তুমি নাহয় রহিতে কাছে
এক বিয়ে-বার্ষিকীর দিনে
চাঁদপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম ছোট একটি লঞ্চে।
পশ্চিম আকাশে ডুবছিল সূর্য,
মেঘনার ঢেউয়ে লাল আভা ভেসে যাচ্ছিল।
রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে
আমরা দু’জন দেখছিলাম জল, দূরের গ্রাম আর রক্তিম সন্ধ্যা।
হঠাৎ সে বলেছিল,
“ছিলাম বালিকা, কিছুই বুঝিনি,
কেমন করেই যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল!”
আমি বলেছিলাম,
“তোমার তো কত স্বপ্ন ছিল,
গায়ে হলুদ, হলুদ শাড়ি, গাঁদা ফুল…
কিন্তু সেদিন কিছুই তো হয়নি।”
সে মৃদু হেসে বলেছিল,
“আমাদের বিয়েটা হয়েছিল খুব নিঃশব্দে,
না ছিল ধান-দূর্বা,
না ছিল চন্দন,
না ছিল তোমার জন্য পাঞ্জাবি,
না আমার জন্য রাখি।”
অনাদরে, অনাড়ম্বরে,
এক বিকেলে একজন কাজী
আমার কাঁধে তুলে দিয়েছিলেন
তার সমস্ত দায়ভার।
আজ বুঝি-
এই দায়গুলো সে কবে আমার কাছ থেকে
নিজেই নিয়ে গেছে,
আমি টেরই পাইনি।
জীবন কখনো ভরেছে, কখনো ভেঙেছে,
তবু সেই হাতধরা এখনও আছে।
কে আগে নিথর হবে,
এই ভাবনায় আমরা দু’জনই নীরব হই।
এই নীরবতার মাঝেই বাজে গান—
“তুমি নাহয় রহিতে কাছে…”
আজ আমাদের বিয়ে-বার্ষিকী।
আজ মনে হয়-
এই কাছাকাছি থাকাই
আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব।
_______________________________
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ইং
১৩. আলোর ঠিকানা
তুমি এসেছিলে জীবনের দরজায়
মৃদু পায়ে, অথচ আলো নিয়ে-
সেদিন বুঝিনি,
এই আলোই একদিন বদলে দেবে
আমার অন্ধকারের মানচিত্র।
তোমার হাত ধরেই শিখেছি
ভালোবাসা মানে ঝড়ের ভেতরেও
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা,
নিভে যাওয়া রাতে আলো হয়ে থাকা।
আমরা হেঁটেছি বহু ভাঙা দিনের ভেতর,
কখনো ক্লান্ত, কখনো উদ্বিগ্নে-
তবু ফিরেছি একই ঘরে, একই বিশ্বাসে।
এই জীবনে জমে আছে
ছোট ছোট কতো স্মৃতি, অভিমান ভাঙার হাসি,
ঘুম ভাঙা সকালের ডাক।
আজ আমাদের বিয়ে বার্ষিকী—
আমাদের দু’জনের জন্য কল্যাণ কামনা করবেন।
১৪. চির আলিঙ্গন
আমি আছি,যেভাবে নদী থাকে তার
চাঁদের কাছে,
তোমার নাম জলে জলে লিখে রাখি।
আমার বুকের ভেতর নীল এক সন্ধ্যা নামে,
যেখানে তোমার চোখ জ্বলে ওঠে
নীরব দীপের মতো।
হে প্রিয়, নোঙর ভাঙো-
আমার হৃদয়ের ঘাটে এসে ভেড়াও,
ভেসে যাক সব দূরত্ব, সব ভয়,
আমরা ডুবে যাই একে অন্যের গভীরে,
যেখানে সময় শুধু আমাদেরই চেনে।
তোমার স্পর্শে ঢেউ জেগে ওঠে,
আমার শরীরের প্রতিটি তটরেখা
তোমার নামে ডাকে,
চাঁদের আলোয় আমাদের নিঃশ্বাস
জলের ওপর সোনালি পথ আঁকে।
রাত নামে আরব্য রজনীর মতো,
তারারা আমাদের গোপন কথা শোনে,
অন্ধকারও তখন আলোরই ছায়া
কারণ তুমি পাশে আছো।
হে প্রেম, তোমার পথেই আমার ঠিকানা,
তোমার হাসিতে আমি ঘর খুঁজে পাই,
সুরের ভেতর তোমার নাম,
বাঁশির দীর্ঘশ্বাসে আমি ডুবে যাই,
ক্ষনিকের নয়-
তোমার চিরস্থায়ী আলিঙ্গনে।
১৫. আমি আছি
আমি আছি-
তোমার নিঃশ্বাসের কিনারায়,
যেখানে রাত ধীরে খুলে যায়।
আমার শরীর এক বেপথু নদী,
তোমার স্পর্শে জোয়ার ওঠে,
সব তট ভেঙে যায়।
হে প্রিয়, কাছে এসো-
নোঙর নয়, শুধু ডুব,
ঢেউ মানে কাঁপুনি,
অন্ধকার মানে আশ্রয়।
তোমার আঙুলে আমার নাম জ্বলে,
আমার ঠোঁটে তোমার সৌরভতা
আমরা হারাই নিজেদের ছায়া,
শুধু আগুন হয়ে থাকি।
চাঁদ ঝরে আমাদের কাঁধে,
ঘামের নোনাজলে তারা জ্বলে,
এই রাত-
শুধু আমাদের।
১৬. মায়ার সন্ধ্যা
সব কথা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখন,
সব আলো নিভে গিয়েছিল,
দীঘির জলে গাঁদা ফুলের গন্ধের
সৌরভের মতো সন্ধ্যা নেমেছিল।
নীরবতার বুক চিরে চুপচাপ হাঁটছিল ছায়ারা, পাতার ফাঁক গলে
চাঁদের অনিশ্চিত হাসি
মাটিতে ছড়িয়ে দিচ্ছিল রূপালি কুয়াশা।
দীঘির জলে জোছনার কাঁপুনি,
মনে পড়ে যাওয়া সেই পুরোনো স্পর্শ,
যেখানে দুঃখও হয়ে উঠেছিল
এক টুকরো নীল মায়া।
রাত নামছিল ধীরে,
তারাদের চোখে জ্বলছিল
অপরিচিত স্মৃতির আলো,
আর আমার বুকের ভেতর
একটি অদেখা পথ খুলে যাচ্ছিল
তোমার দিকে।
সব শেষের মাঝেই শুরু হয়ে যাচ্ছিল
নতুন এক অপেক্ষা-
মায়ার, নীরবতার আর না-বলা কথার।
১৭. রাধা-বিরহ
শ্যাম বিনে রাধা নাহি জীয়ে,
চক্ষু ভরি জল ঝরে।
দখিন হাওয়া ডাকে তার নাম,
বুকের মাঝে বজ্র পড়ে।
পথ চাহি চাহি নিশি গেল,
চাঁদ লুকায় মেঘের কোলে,
কুঞ্জবনে আজ নীরবতা,
মুরলী ডাকে দূর তলে।
কবে আসিব শ্যাম সখা,
মোর প্রাণে প্রাণ ফিরাইবে?
পদ্মনয়ন, করুণ হিয়া,
বিরহ আগুন নিভাইবে।
দিবস গেল দুঃখের রঙ্গে,
রাত জাগে নীরব কান্নায়,
হৃদয়খানি কুঞ্জের লতা,
শুকায় তোমার অনুপায়।
শ্যাম যদি আজ না ফেরে,
রাধা যাবে বৃন্দাবন ছেড়ে,
নিশ্বাসে শুধু তার নাম,
জাগে-ঘুমে, দিন-ভোরে।
১৮. এই জীবন
একটা জীবন এমনই এমনই কেটে গেল,
একটা জীবন ভালোবাসাহীন হয়ে শেষ হয়ে গেল,
কতো বসন্ত ঝরে গেল অজান্তে,
কতো চাঁদের রাত্রি ব্যর্থ হলো,
কোনো মধুময় মুহূর্তে কাউকে জড়াতে পারিনি…
তবু প্রতিটি ভোর আমাকে নতুন করে ডেকেছে,
আমি ফিরেছি শূন্য হাতে, শূন্য চোখে-
রোদ্দুরের ছায়ায় বসে থেকেছি অনেকক্ষণ,
ভেবেছি, আজ বুঝি কেউ নাম ধরে ডাকবে।
পথের ধুলোয় আমার পদচিহ্ন মুছে গেছে,
হাওয়ার কাছে রেখে এসেছি অর্ধেক নিঃশ্বাস,
যে কথাগুলো বলা হয়নি কখনো,
সেগুলোই আমার বুকের ভেতর গান হয়ে বাঁজে।
জানালার ফাঁকে ফাঁকে সময় জমে আছে,
মুখচোরা বিকেলের মতো নিরুপম একা,
আমি ছুঁতে পারিনি কোনো উষ্ণ কাঁধ,
তবু স্বপ্ন দেখেছি আগুনের মতো আলোকিত।
কুয়াশায় ঢাকা ভোরের মতো এই জীবন
অস্পষ্ট, কারও কাঁধে মাথা রাখার স্বপ্ন আজও বুকের ভেতর নিঃশব্দে কাঁপে -
তবু জানি- এই দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে
আমার জন্য কেউ প্রদীপ জ্বালাবে না।
১৯. বর্ষার ওপারে তুমি
এক বসন্তের বিকেলে
তুমি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলে-
শীত এলে, আমরা নিরুদ্দেশ হবো।
আমি বিশ্বাসের ঘরে শীতের কম্বল রেখে দিয়েছিলাম,
ভেবেছিলাম ভালোবাসা এমনই-
আগে স্বপ্ন, পরে জীবন।
কিন্তু শীত আসেনি, বর্ষা এসেছিল হঠাৎ,
চোখের ভিতর নেমে এসেছিল অথৈ জল,
সেই বর্ষার ঢেউ ভেঙে
তুমি চলে গেলে অন্য একজনকে নিয়ে
সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে।
আমার শহরটা তখন কেবল মেঘে ঢাকা ,
তোমার নামটা প্রতিদিন
বৃষ্টির জলে ভিজে যায়,
তবু মুছে যায় না।
আমি এখনো শীতের অপেক্ষায়-
যে শীত আর আসবে না,
যে শীতের প্রতিশ্রুতি
আমাকে একা করে দিল।
কখনো মনে হয়, তুমি শুধু মানুষ ছিলে না,
তুমি ছিলে একটি ভুল ঋতু,
যে এসে আমার সমস্ত সময়কে
বর্ষায় ডুবিয়ে দিল।
২০. তোমার নামেই
তোমার নামেই জেগে থাকে রাতের সব প্রহর,
তোমার নামেই বাঁচে আমার হৃদয়ের শহর।
তুমি তাকালে থেমে যায় সময়ের প্রতিটি ক্ষণ,
তোমার চোখেই খুঁজে পাই জীবনের আসল মন।
আমি ছিলাম পথহারা, তুমি এলে দিশার মতো,
তোমার স্পর্শে ঝরে পড়ে ক্লান্ত সব ক্ষত।
তোমার নীরবতায়ও শুনি অজানা গান,
তোমার দুখেই মিশে আছে আমার সব আত্মদান।
কোয়েল বলে-তোমার ইশ্কই আমার নাজাত,
তোমার নামেই লিখে রাখি জীবনের সব প্রভাত।
২১. রাধার অভিসার
নিশীথ জাগে বৃন্দাবনে,
চাঁদ লাজে ঝরে আলো,
যমুনা ডাকে নিঃশব্দে-
এসো, হে শ্যাম, ভালো।
রাধা বলে, লাজে কাঁপে
এই অনন্ত মন,
তোমা বিনে নিশা শূন্য,
ভাঙে প্রাণের ধন।
ঘুঙুর নাহি, শব্দ নাহি,
পদচিহ্নও থামে,
বাঁশির ডাকে পথ খুলে
অন্ধকারের গ্রামে।
শ্যাম দাঁড়ায় কদমতলে,
চোখে নীল দীপ,
রাধার নয়ন জ্বলে ওঠে
ভক্তির অমৃত-সীপ।
'এসো রাধে' শ্যাম কহে,
এই নিশা তব ঘর,
রাধা লীন হয় চরণে,
ভোলে দেহের পর।
যমুনা ঢাকে লাজে মুখ,
চাঁদ থামে আকাশে,
দুটি প্রাণে এক নামধ্বনি,
মাধুরী প্রকাশে।
এই অভিসার দেহের নয়,
অন্তরের কথা,
যেথা প্রেমই ঈশ্বর হয়,
মুছে যায় সকল ব্যথা।
২২. মাধুর্যলোক
নিশীথে বৃন্দাবনের বুকে
নাম-আলো জ্বলে ধীরে,
যমুনা শোনে মন্ত্রধ্বনি
নীরব প্রেমের তীরে।
শ্যাম এলে চিত্ত-আকাশে
ভাঙে অহংকারের ঘোর,
রাধার হৃদয় কুড়োয় আলো
ভক্তির অমৃত-ঝর।
“হে নাথ, তুমি অন্তরবাসী,”
রাধা বলে লাজে,
কৃষ্ণ বলেন— “এই প্রেমই
মুক্তির গোপন সাজে।”
রাধার নয়নে ভাসে প্রভু
অনন্ত রূপের ঢেউ,
কৃষ্ণের বুকে লীন হয় রাধা,
আমি আর তুমি নেই কেউ।
বাঁশির সুরে থামে কালচক্র,
নিভে যায় সকল ভয়,
দুটি প্রাণে এক নামধ্বনি,
শূন্য ভরে সদয়।
এই মিলন দেহের সীমা ছুঁয়ে
উঠে চৈতন্যলোকে,
রাধা–কৃষ্ণ এক হয়ে যান
ভক্তির অমল ঝোকে।
২৩. অলিতে গলিতে
এই শহরের অলিতে-গলিতে
কতো রেস্টুরেন্টে বসে খেয়েছি আমরা,
চামচের শব্দের ফাঁকে ফাঁকে
ঝরে পড়ত আমাদের কতো কথা, কতো
অপ্রয়োজনীয় হাসি।
কতো গল্প লরেছি,
শেষ হবে ভেবে শুরু করতাম,
শেষ না হওয়া গল্পের মতোই
কফির কাপে ঠাণ্ডা হয়ে যেত সময়।
পার্কে বসে কড়োই গাছের পাতা ঝরা
গুনেছি নিঃশব্দে,
যেন প্রতিটা পাতার ভাঁজে লুকানো ছিল
আমাদের একেকটা অপূর্ণ ইচ্ছা।
হঠাৎ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে
চা খেতাম দু’টাকা বাড়তি চিনি দিয়ে,
তোমার ঠোঁটে লেগে থাকা ফেনা
মুছে দিতাম হাতের পিঠে,
কেউ বুঝত না, এই ছোট্ট স্পর্শেই
আমাদের সারাদিনের উৎসব।
তুমি বলেছিলে,
এই শহর একদিন আমাদের চিনে ফেলবে,
আমাদের পায়ের শব্দে,
আমাদের নীরবতার গন্ধে।
আজও এই শহরের অলিতে গলিতে
হাঁটতে গিয়ে রেস্টুরেন্টের জানালায় দেখি
আমাদের বসে থাকা এক জোড়া ছায়া-
যারা এখনো কথা বলে, কিন্তু শব্দ নেই।
আর আমি বুঝি,
ভালোবাসা কখনো হারায় না,
সে কেবল শহরের জনারণ্যে অদ্ভুতভাবে
থেকে যায়।
২৪. তুমি থাকলে
তুমি পাশে থাকলে
আমি পোড়া বাড়ির ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে
ফুল ফোটাতে পারি,
ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে ফাঁকে
জোনাকির আলো জ্বালাতে পারি।
চারদিকে যখন সব কিছু
পুড়ে যাওয়া খবরের কাগজের মতো ছড়িয়ে থাকে,
মানুষেরা যখন নিজেদের ছায়া থেকে পালায়,
তখন তোমার হাতটা
আমার কাঁধে রাখলেই
আমি আবার মানুষ হয়ে উঠি।
এই শহরটা হয়তো ভেঙে পড়েছে,
দেয়ালগুলোতে শুধু দীর্ঘশ্বাসের দাগ
তবু তোমার চোখে
এক টুকরো আকাশ খুঁজে পাই,
যেখানে আমি নিঃশ্বাস নিতে শিখি নতুন করে।
তুমি পাশে থাকলে আমি ধ্বংসের মাঝেও
ভবিষ্যতের শব্দ শুনি,
একটা ছোট্ট সকাল, একটা অক্ষত স্বপ্ন,
আর আমাদের দুজনের হেঁটে চলা।
সব হারানোর পরেও যদি কিছু বেঁচে থাকে,
সে শুধু তুমি-
আর তোমাকে ঘিরে আমার আবার শুরু
করার সাহস।
২৫. ডুবে না যে প্রেম
সব ঢেউ থেমে গেলে
যখন সমুদ্রও ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
আমি তখনো তোমার নাম ভাসিয়ে রাখি
নীরবতার নীল জলে।
তুমি নেই-
তবু তোমার না-থাকাটুকু
আমার বুকের ভেতর এত ভারী,
যেন প্রতিটি শ্বাসে
তোমার ছায়া উঠে আসে।
সময় কেবল ঘড়ির কাঁটা বদলায়,
আমাদের গল্প বদলায় না,
মৃত্যু দরজা বন্ধ করতে পারে,
কিন্তু জানালার ফাঁক দিয়ে
ভালোবাসা ঢুকেই পড়ে।
কিছু স্মৃতি আছে যারা জল চিনে না,
ভাঙন মানে না,
তুমি দূরে, তবু আমার রক্তে ভাসমান
একটি আলো হয়ে আছো,
যে আলো নিভে গেলে এই পৃথিবীই অচেনা।
যেদিন আমি ডুবে যাবো শেষ নীরবতায়,
সেদিনও আমার হৃদয়ের গভীরে
তুমি জেগে থাকবে- একটি অমর ঢেউ হয়ে।
২৬. সাগর কিনারে
সব কিছু ভেঙে গেল ঢেউয়ের ঝাপে,
তবু তোমার নাম ভাসে আমার চোখের জলে।
তুমি নেই, তবু বুকের ভেতর
তোমারই গান বাজে প্রতিটি রাতে।
শেষ বিদায়ের দিনে বলোনি কিছু,
চোখের ভাষায় ডুবে ছিল হাজার কথা।
আমি আজও সেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে,
তোমার পায়ের শব্দ খুঁজি হাওয়ায় মিশে থাকা।
তুমি হারালে নিজেকে সময়ের জলে,
আমি হারালাম নিজের সব রঙ।
তবু তোমার ছায়া জ্বলে থাকে,
এই বুকের অন্ধকার ঘরে রোজ।
রাতগুলো আজও তোমার গন্ধে ভেজা,
ভোরগুলো কাঁদে জানালার পাশে।
তুমি ছাড়া পৃথিবী যেন থেমে গেছে,
ঘড়ির কাঁটা চলে, হৃদয়টা হারে।
যদি আবার কোনো জন্ম হয়,
আমি তোমাকেই খুঁজব সাগরের ধারে।
ঢেউ যদি নেয় আমাকে দূরে,
তোমার নাম থাকবে আমার নিঃশ্বাসে।
২৭. অসম বন্ধু
পাশের বাড়ির ছেলেটা চলে গেল,
যেখানে গেল- সেখান থেকে আর ফিরে
আসবে না,
ও ছিল আমার অসম বন্ধু-
আমার একাকী বিকেলগুলোতে এসে
পুরনো চায়ের কাপে, আধখাওয়া গল্পে
আমাকে হাসিখুশি করে রাখত।
তখন জানালার পাশে বসে
আমরা আকাশে ভাসতে থাকা মেঘ গুনতাম,
বিমান বন্দরের রানওয়েতে বিমান ওঠানামা দেখতাম, সময় ছিল ধীর, দিন ছিল দীর্ঘ,
হাসির ভিতরেও ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।
তারপর জীবন অনেক বছর পার হলো,
ঘরে মায়াবতী এল,
আলোয় ভরে উঠল ঘর,
কিন্তু কোথাও এক মায়াময় ছায়া রয়ে গেল।
আমার অসম বন্ধু
ধীরে ধীরে দূরের হয়ে গেল,
প্রতিদিন কর্ম আর সংসার ধর্মে ব্যস্ত হলাম,
ওর নামটুকু রইল শুধু পুরোনো ডায়েরির
পাতায়।
আজ ও চলে গেল,
এই শহরের বাতাস হঠাৎ ভারী,
রাস্তাগুলো যেন চিনে নেয় তার পদচিহ্ন,
বিকেলের রোদে ঝিলমিল করে ওঠে
আমাদের ফেলে আসা দিনগুলো।
আমি জানালার কাঁচে হাত রাখি-
ওখানে ওর হাসির প্রতিচ্ছবি দেখি,
শুনি সেই চেনা ডাক-
যা আর কোনোদিন কেউ ডাকবে না।
আজ আমার চোখে জল,
কিন্তু সেই জলের ভিতরেও ভেসে থাকে
ওর প্রতিচ্ছবি, সে যে অস্তিত্বেই আছে,
কারণ কেউ একবার হৃদয়ে ঢুকে গেলে
সে কখনো পুরোপুরি চলে যায় না।
২৮. অপঠিত কবিতা
রঞ্জন - আমার সৌভাগ্য ছিল,
তোমার মতো ভীতু, উদাসীন এক উন্মূল বন্ধু
হঠাৎ করেই আমার জীবনে এসে জুটেছিল।
প্রতিদিন তুমি এনে দিতে
মনভোলানো নতুন নতুন কবিতা,
আমি বিশ্বাস করতাম তার প্রতিটি শব্দ,
প্রতিটি মিথ্যে-সত্যের আবেশে
ডুবে যেতাম।
মনে আছে?
ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কফির কাপে ভাগ করে
নেওয়া এক বিকেল ,
নোটবুকের পাতায় লুকিয়ে রাখা গোপন কথা-
কি লিখেছিলে তুমি , আজও কে জানে?
শাহবাগ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
বৃষ্টির ফোঁটা গুনেছিলাম,
তুমি ভেজা চোখে, ভেজা কণ্ঠে বলেছিলে,
'একদিন অনেক দূরে চলে যাব।'
লাইব্রেরির বারান্দায় বসে
আমি চেয়েছিলাম ঝালমুড়ি খেতে,
তুমি বলেছিলে—
শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের গরম সিঙ্গাড়া খাবে,
সেদিন খেয়েছিলাম গরম সিঙ্গাড়াই।
তুমি যেন কিছু বলতে চেয়েছিলে,
কিন্তু বললে-
'জিভ পুড়ে গেছে, আজ আর বলা হবে না।'
তারপর কতো দিন, কতো প্রহর কেটে গেছে,
ক্লাসের বেঞ্চ ফাঁকা,
হৃদয়ের কোঠরে জমে রইল তোমার সাথে
না কাটানো বিকেলগুলো,
তোমার পাঠানো শেষ কবিতাটির উপর
জমে উঠল একপুরু ধুলো।
এখনো ক্যাম্পাসের দিকে গেলে লাইব্রেরির
বারান্দার দিকে তাকাই -
সেখান থেকে ভেসে আসে তোমার কণ্ঠস্বর,
দেখতে পাই ভীতু, থমকে থাকা এক বহিমিয়ানের মুখচ্ছবি।
একটি কৌতূহল এখনও পোড়ায়-
সেইদিন তুমি কী বলতে চেয়েছিলে?
তোমার সেই না বলা কথা
আজও আমার জীবনে অপঠিত কবিতা
হয়ে আছে।
--- মাধবী।
২৯. চর্যাপদের হরিণী
হরিণী, তোমাকে প্রথম দেখি চর্যাপদের
পাতায়, চোখে তোমার কুয়াশা, দেহে সংকেত -
তুমি নারী নও, তুমি সাধনার প্রতীক
অরণ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা মুক্তি।
আজও আমি তোমাকে খুঁজি
শহরের কংক্রিটে, বিজ্ঞাপনের পোস্টারে
হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলে
মনে হয়, ওই তো, হরিণী!
তুমি ছুটে যাও আমার চিন্তার ভেতর দিয়ে,
আমি ধরি না, কারণ জানি-
তোমাকে ধরা মানেই হারিয়ে ফেলা।
তুমি আছো অচেনা কারও চোখে
যে তাকায়, কিছু বলতে চেয়েও পারে না,
চর্যাপদের সাধক যেমন
তোমাকে দেখে বলেছিল-
তুমি মায়া, তুমি পথ, তুমি দ্বার।
হরিণী, তুমি আজও পালাও,
আর আমি আজও পালাতে পালাতে
তোমার কাছেই ফিরে আসি।
৩০. দরজার ওপাশে
তুমি আমার দরজার কাছে এসে দাঁড়ালে,
আমি কী করে বলি—চলে যাও?
তোমার চোখে ভেসে থাকা নরম আলো
আমার অন্ধকার ঘরে জ্বালিয়ে দেয় প্রদীপ।
তুমি হাত বাড়ালে-
আমার সমস্ত একাকীত্ব গুটিয়ে নিল ডানা,
মনে হলো, এই সামান্য ছোঁয়াতেই
জীবন নতুন করে শুরু হতে পারে।
তুমি আমার দরজার কাছে এসে দাঁড়ালে,
আমি কী করে বলি—চলে যাও?
এই দরজার ওপারে তো শুধু তুমিই আছো,
আমার সব হারানো দিনের একমাত্র ঠিকানা।
৩১. একলা যেও না
নদীর ধারে একলা যেও না
নদী তার বুকে টেনে নেয়।
পূর্ণিমার চাঁদের তলায় হাঁটিও না,
চাঁদ রাক্ষসী হয়ে নিঃশব্দে
হরণ করে।
বনের পথে সন্ধ্যা নামলে
নাম ধরে ডেকো না,
পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকে
ছায়াদের ঘর।
ঝিঁঝিঁর গানে থেমে গেলে,
ঘুমপাড়ানি ভয় জড়িয়ে ধরে।
পুরোনো কুয়োর ধারে দাঁড়িও না,
ওখানে জমে আছে হারানো শ্বাস।
জোনাকির আলো অনুসরণ কোরো না,
ওরা পথ নয়, মৃত্যুর মায়া।
নিস্তব্ধ মাঠে শিশির ভেজা ঘাসে
বসো না একা,
মাটির নিচে জেগে ওঠে
নীল কান্না।
ঝড়ের আগের হাওয়া যে ডাকে,
সে ডাক মানে না ফেরার ভাষা।
তবু যদি একা যাও অন্ধকারে,
মনে রেখো—তুমি শুধু মানুষ।
এই পৃথিবীতে যেমন আলোয় প্রেম,
তেমনই ছায়ার বুকে বাস করে
টেনে নেওয়া এক মায়াভয়।
৩২. পাথরে ফুল ফুটুক
ভালোবাসাহীন সম্পর্ক পাথরের মতো,
আমি এই পাথরে ভালোবেসে ফুল
ফোঁটাতে চাই-
রুক্ষতার বুকে বুঁনে দিতে চাই বসন্ত বীজ ,
নীরবতার ফাঁকে জ্বালাতে চাই আলো।
যেখানে কথা নেই, সেখানে ছুঁয়ে দেবো স্বপ্ন,
যেখানে অভিমান, সেখানে রাখবো ক্ষমার চুম্বন।
তোমার ক্লান্ত চোখে আমি ভোর নামাতে চাই,
ভাঙা দিনের শেষে একটু আশ্রয় হতে চাই।
যদি তোমার বুকের ভেতর জমে থাকে শীতল বরফ,
আমি আগুন হবো—নিভে যাওয়া হৃদয়ে উষ্ণতা আনবো।
যদি তুমি নিজেকে হারাও অচেনা ভিড়ে,
আমি হবো সেই পথ, যে তোমাকে ঘরে ফেরায়।
এই পাথরের বুকে যদি কোনোদিন কাঁপে প্রাণ,
তবে জেনো—ভালোবাসা মরেনি, ঘুমিয়ে ছিল মাত্র।
আমি ডাক দিলেই সে জেগে উঠবে ধীরে ধীরে,
আর এই শুষ্ক পৃথিবীতেই ফুটে উঠবে
আমাদের ভালোবাসার প্রথম ফুল।
৩৩. স্বপ্ন
পাহাড়ের পাদদেশে নদী,
সেই নদীর তীরে একটি কাঠের বাংলো বাড়ি,
এইরকম একটি বাড়িতে
আমৃত্যু কাটাতে চাই…
সকালের কুয়াশা জানালায় এসে
নরম হাতের মতো ডাক দেবে,
চায়ের কাপে ভাসবে রোদের গন্ধ,
পাখিরা ছড়িয়ে দেবে দিনের প্রথম গান।
নদীর জলে ভেসে যাবে ক্লান্ত সময়,
পাথরের বুকে বসে শুনবো
জলের অনন্ত গল্প-
যেখানে দুঃখের নামও ধুয়ে যায়।
বিকেলে পাহাড় ছায়া মেলে ধরবে,
হাওয়া হবে পুরনো বন্ধুর মতো,
ঝরা পাতার ভেতর লুকিয়ে থাকবে
নতুন কোনো শুরুর ইশারা।
রাতে চাঁদ এসে ঘরের কোণে বসবে,
দেয়ালে নাচবে জ্যোৎস্নার ছায়া,
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
নিজের নিঃশ্বাসে খুঁজে নেবো শান্তি।
সেই বাড়িতে থাকবে নীরব সুখ,
অল্প চাওয়া, গভীর অনুভব-
পাহাড়, নদী আর কাঠের ঘ্রাণে মিশে
আমার জীবন হবে মৃত্যু পথগামী।
৩৪. অদৃশ্য সেতু
এত কাছে এসেও
আমরা যেন দুই প্রান্তের আলো,
মাঝখানে নীরবতার নদী
অদৃশ্য সেতু হয়ে বয়ে যায়।
তোমার স্পর্শে
আমার বুকের ভেতর খুলে যায়
ঘুমন্ত আকাশ,
রাতের কালো বুক চিরে
ঝরে পড়ে নক্ষত্রের শব্দ।
আমরা পাশাপাশি হাঁটি,
তবু সময় আমাদের
ভিন্ন দু’টি জানালায় দাঁড় করিয়ে দেয়,
তোমার চোখে আগামী সকালের রোদ,
আমার চোখে গত সন্ধ্যার বৃষ্টি।
ভয় হয়, এই মুহূর্ত যদি
হাওয়ার মতো ফসকে যায়,
এই ভালোবাসা যদি
ঘুম ভাঙা স্বপ্ন হয়ে যায়।
তাই তোমাকে ছুঁয়ে থাকি,
স্পর্শের ভেতরেই সময় থেমে থাকে,
যেন ভালোবাসা
চিরদিনের জন্য নিঃশ্বাস নেয়।
৩৫. গোপনে সুন্দর
ভালোবাসা গোপনেই সুন্দর,
নীরবতার ভাঁজে লুকোনো আলো,
চোখের চাহনিতে লেখা থাকে নাম,
ঠোঁটের প্রান্তে এসে থেমে যায় কথা
কারণ কিছু অনুভব
উচ্চারণে ভেঙে পড়ে।
হৃদয়ের গহনে রাখি তাকে,
যেন অদেখা প্রদীপ,
যার শিখা ছুঁয়ে যায়
আমার সমস্ত অন্ধকার।
সে জানে না, তবু আমার প্রতিটি সকাল
তার স্মৃতিতে ভিজে ওঠে,
আমরা পাশাপাশি হেঁটে যাই
অচেনা পথের ছায়ায়,
দু’জনের মাঝখানে থাকে
অদৃশ্য এক সেতু-
যেখানে ছুঁই না, তবু ছোঁয়া থাকে।
এই গোপন ভালোবাসা
কারও কাছে প্রমাণ চায় না,
এ কেবল হৃদয়ের ভেতর
নিঃশব্দে ফুল ফোটায়।
সে থাকুক হৃদয়েই, হৃদয়েই লালিত হোক,
কারণ কিছু মানুষ পৃথিবীর নয়,
শুধু অনুভবের জন্যই জন্মায়।
৩৬. বইমেলায় তুমি
কথা ছিল এইবারের বইমেলায়
দুজন হাত ধরে হাঁটব,
বাংলা একাডেমির পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে
জলের ভেতর আমাদের মুখ খুঁজব,
খোলা আকাশের নিচে
পানি ফুসকার ঝাল-মিষ্টি ভাগ করে নেব
হাসির ফাঁকে ফাঁকে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দীঘির ধারে
বাতাসে ভাসবে বইয়ের গন্ধ,
আমি তোমার দিকে তাকিয়ে বলব,
এই জল যেমন স্থির,
আমার ভেতরের ভালোবাসাটাও তেমন।
বন্ধু বাবলু দূর থেকে হাত নেড়ে ডাকবে,
বলবে - এই যে কবি, তোমার মায়াবতী
তোমাকে খুঁজছে!
বাংলা গবেষণা স্টলের সামনে
প্রিয় কোনো পাঠকের নামে লিখব অটোগ্রাফ,
আর তুমি পাশে দাঁড়িয়ে
আমার কবিতার পাতার মতোই
আরক্ত সুন্দর মুখে তাকিয়ে থাকবে,
তোমার মুখটা কিন্তু
আমার এই কবিতার বইটির মতোই,
প্রতিটি লাইনে লুকানো আছে
একেকটা সন্ধ্যা, একেকটা জগজিৎ সিংহের গজলের মতো আনন্দ বেদনার সুর।
কথা ছিল,
ভিড়ের মাঝেও আমরা হারাবো না,
হাতে হাত ধরা থাকবে,
শুধু একে অন্যের নিঃশ্বাস চিনব-
আর যখন রাত নামবে,
মেলার আলো একে একে নিভে যাবে,
তুমি বলবে, 'চল, আরেকটা বছর বাঁচি
এই স্বপ্নে।'
আমি বলব, না, বছর কেন?
সারাজীবনই এই বইমেলার মানচিত্রে
একই জায়গায়, একই কবিতায়
হাঁটতে থাকব।
৩৭. ফিরে যাব কুসুমপুর
এই শহর আর ভালো লাগছে না,
অট্টালিকার পরতে পরতে শুনি
বঞ্চনার আর্তধ্বনি,
মানুষগুলো রোবটের মতো, চোখে নেই মায়া, হাতে নেই উষ্ণতা,
কেবল ক্লান্ত হৃদয়ের ধ্বংসাবশেষ।
চলো, ফিরে যাই কুসুমপুর,
তোমার হাতটা আমার আঙুলে গুঁজে,
বর্ষার রাত্রিতে টিনের চালে
ঝমঝম করে বৃষ্টি নামবে,
আমরা দু’জন শুনব মাটির হৃদয়ের স্পন্দন।
পুকুর পারে বকুল তলায় বসে থাকব,
তোমার কাঁধে মাথা রেখে
জলের জোছনায় কাঁপতে দেখব
আমাদের ভবিষ্যৎ।
মাঘ মাসে মাঘীপূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাবে আমাদের না বলা ক্লান্তি,
জোছনায় ভাসবে চরাচর,
আর আমি বলব,
তুমি থাকলেই, পৃথিবী সুন্দর।
ভোরে কুয়াশার ভেতর গরু হাম্বা
ডাকবে দূরে,
ধানক্ষেতের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটবে রোদ্দুর,
তুমি আমার পাশে থাকবে,
আমার দিনের শুরু হয়ে।
সন্ধ্যায় মাটির চুলায় ফুটবে ভাতের গন্ধ,
তোমার চোখে খুঁজে পাব
আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
চলো, ফিরে যাই, যেখানে আকাশটা কাছের, আর জীবনটা হবে আকাশের
মতো নির্মল।
৩৮. জ্যোৎস্নাস্বচ্ছ রাত্রি
এমন জ্যোৎস্নাস্বচ্ছ বর্ষণমুখর রাত্রি,
কাল কি আবার হবে?
নাকি আজকের এই আলো ছায়া
কাল শুধু স্মৃতির পাতায় জমে থাকবে।
বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা জানালায়
তোমার মুখে পড়ে চাঁদের আলো,
হাওয়ার বুক চিরে ধেয়ে আসে
অজানা কোনো ডাক,
যেন বলছে, থেকে যাও, এখনই চলে
যেও না।
এই রাতের প্রতিটি নিঃশ্বাসে
লুকিয়ে আছে হারানোর ভয়,
কাল যদি সব বদলে যায়
তবে আজকের এই স্পর্শ, এই
নীরবতা কোথায় যাবে?
চাঁদের জলে ভেসে থাকা স্বপ্নগুলো
ভোরের আলোয় কি মুছে যাবে?
নাকি বৃষ্টির মতোই
আমার ভেতরে বারবার ঝরবে
এই আক্ষেপের গান?
এমন জ্যোৎস্নাস্বচ্ছ বর্ষণমুখর রাত্রি,
কাল কি আবার হবে? নাকি এই
মুহূর্তই আমার জীবনের একমাত্র
অমলিন চাঁদরাত হয়ে থাকবে…
৩৯. তুমি নেই
কতো বছর পর এলাম,
তোমার থাকার কথা ছিল,
কিন্তু তুমি নেই,
বাড়িতে ঢুকতেই বুকের ভেতর
হঠাৎ করে কিছু ভেঙে পড়ল-
জানালা বন্ধ,
অথচ জানালার ধারে তোমার বসে থাকার কথা ছিল,
আমার ফেরার পথের দিকে তাকিয়ে।
আমি আসব জেনে
তুমি ময়নালকে দিয়ে দুধ কিনে রাখতে,
আমি দুধভাত খেতে পছন্দ করতাম বলে,
আজও রান্নাঘরের কোণে
সেই গন্ধটা খুঁজে ফিরি,
মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা
মায়ের হাতের উষ্ণতা।
তোমার নামাজের জলচৌকিটি
পুরনো হয়ে ধুলো জমে গেছে,
পানদানিটিও তাই-
কেউ আর যত্ন করে রাখে না।
আমি ছুঁতেই কেঁপে ওঠে ঘর,
মনে হয়, এইমাত্র তুমি উঠে গেলে।
দম বন্ধ হয়ে আসে মা,
তোমার ছায়া নয়, তুমি সারা বাড়িতে আছ।
দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে
তোমার নিশ্বাস লুকিয়ে আছে,
চুলোর পাশে, খাটের কোণে,
আমার ডাক শোনামাত্র
তুমি বলছ - “খিদে পেয়েছে ?”
পিছনের উঠোনে দাঁড়ালে
শিউলি গাছটা আজও কাঁপে,
তুমি বলেছিলে-
ফুল ঝরলে ঘর ভরে যায় শান্তিতে।
আজও ফুল ঝরে,
কিন্তু শান্তিটা আর নামে না।
তোমার আলনার ভাঁজে ভাঁজে
আমার শৈশব ঝুলে থাকে,
চিরুনির দাঁতে আটকে আছে
তোমার চুলের শেষ সুবাস।
রাতে ঘুমোতে গেলে খাটের পাশে বসে থাকা
তোমার ছায়াটাকে ডাকি-
সে আসে না,
তবু আমি অনুভব করি।
মা, তুমি নেই, এই কথাটা এই ঘর
কোনোদিন শেখেনি,
এই দেয়াল, এই জানালা, এই বাতাস,
সবাই এখনো তোমার অপেক্ষায়।
আমি চলে গেলে তুমি হয়তো আবার এসে
জানালার ধারে বসবে,
আমার জন্য দুধ কিনে রাখবে,
এই আশাতেই
আমি বারবার ফিরে আসি।
৪০. তোমার উপস্থিতি
তোমাকে সামনে পাই না,
তবু তোমার ছায়া আমার চারপাশে
নিঃশব্দে হাঁটে,
যেন বাতাসের ভেতর লুকোনো কোনো গান,
শোনা যায়, ধরা যায় না।
জানালার ধারে রাখা মাটির প্রদীপ
আমার অপেক্ষার কথা বলে দেয়,
রাতের নীল পাখিরা জানে
কোন নামে আমি নিঃশ্বাস ফেলি।
বিকেলের মৌন সময়ে
হঠাৎ তোমার মুখ ভেসে ওঠে,
কফির তিক্ততায়ও লেগে থাকে
অজানা কোনো মিষ্টি গন্ধ।
তুমি দূরে, নিজের কর্মে ব্যস্ত,
আমি এখানে দাঁড়িয়ে ব্যাকুলতা বয়ে বেড়াই,
মনে হয় ডাক দিই-
কিন্তু কণ্ঠে আটকে যায় শব্দ,
পরক্ষণেই নিজেকেই বুঝাই,
হাসি দিয়ে ঢেকে ফেলি শূন্যতা।
তুমি জানো না, তবুও আমি জানি
যেখানেই তুমি থাকো -
আমার হৃদয়ের প্রদীপ হয়ে হৃদয়েই
একাকী জ্বলতে থাকো।
৪১. স্বপ্ন সত্যি হয়
আজ আমার স্বপ্নের দরজাটা খুলে গেছে,
ভাঙা রাতের চোখে জ্বলে উঠেছে ভোরের আলো,
যেন অন্ধকার নিজের বুক চিরে-
হাত বাড়ালেই আকাশ ধরা দেয়,
কত কাছে এসে গেছে আমার দীর্ঘদিনের চাওয়া!
আর হারিয়ে যাই না কোথাও,
কারণ আজ নিজেকেই খুঁজে পেয়েছি
নিজের ভেতরের নীল আকাশে।
আমি এসেছি কত ঝড় পেরিয়ে,
কাঁটার পথ পা রক্তাক্ত করেছে,
শূন্য পকেট, ভেজা চোখ, তবু হাল ছাড়িনি,
কারণ মায়ের চোখে ছিল ভরসার আলো,
বাবার প্রার্থনায় ছিল পাহাড়সম শক্তি।
এই দুই হাত ধরেই
আমি আবার দাঁড়াতে শিখেছি।
সব না-পাওয়ার গল্পগুলো
আজ চুপ করে বসে আছে দূরে,
হেরে যাওয়ার ভয়গুলো
পেছনে পড়ে আছে—
ভাঙা কাঁচের মতো ঝরে ঝরে।
স্টেশনের ভিড়, ক্লান্ত পথ, ধুলোমাখা দিনগুলো
আজও মনে পড়ে, হাজার প্রশ্নের মাঝেও
আমি বুকে লুকিয়ে রেখেছিলাম
একটা রঙিন আশা।
আজ নামের পাশে পরিচয়, বুকে জমেছে
সাহসের আলো-
আমার লড়াইয়ের প্রতিদান
এই ছোট্ট, অথচ অসীম আকাশ।
যারা বলেছিল, “হবে না,”
আজ তারাও থেমে তাকায়,
কারণ আমার ঘামে লেখা গল্প
আজ নিজেরই কাছে অপরিচিত এক বিস্ময়।
আর আমি হাঁটি হেসে হেসে,
যতটা পথ বাকি আছে তার দিকে,
কারণ আজ আমি জানি, স্বপ্ন সত্যি হয়
বিশ্বাসের গভীর আলোয়।
৪২. পৃথিবীর ধুলোমাখা পথে
আমি ফিরব না স্বর্গে, ফিরব পৃথিবীর ধুলোমাখা পথে,
যেখানে সকালের কুয়াশা ঘাসের পাতায় ঝুলে থাকে
আর রোদের প্রথম ছোঁয়ায়
সবুজেরা জেগে ওঠে নিঃশব্দ হাসিতে।
আমি দেখব-
কীভাবে হলুদ ঘাস ঝরে পড়ে সময়ের কোলে,
কীভাবে পুরোনো পাতা মাটিতে মিশে
নতুন স্বপ্নের সার হয়ে যায়।
আমি দেখব, আকাশ ভোরে সাদা হয়ে ওঠে,
আর সন্ধ্যায় রক্তিম হয়ে
দিনের ক্লান্তি ঢেকে দেয় নীল অন্ধকারে।
অনন্তকাল আমি হাঁটব এই চেনা পথে-
একই নদী, একই বাঁক, একই নিস্তব্ধতা,
তবু প্রতিদিনই নতুন,
এখানে বদলায় আলো, বদলায় ছায়া,
বদলায় মানুষের চোখের ভেতরের পৃথিবী।
আমি শুনব পাখির প্রথম ডাক,
বৃষ্টি নামার আগের নিঃশ্বাস,
রাতের বুক চিরে ওঠা দূর ট্রেনের হুইসেল,
সব কিছুই বলবে:
জীবন প্রতিবার নতুন করে জন্ম নেয়।
যদি জীবনে সুযোগ আসে -
আমি সময়কে জয়ের জন্য বাঁচব না
আমি বাঁচব দেখবার জন্য,
এই পৃথিবী কীভাবে বারবার নিজেকে ভেঙে
আবার নিজেকেই গড়ে তোলে।
৪৩. তিনি আর আসবেন না
ফাগুনের মরা পাতারা মর্মর করে ঝরে পড়বে,
পথের ধুলো বাতাসে উড়ে ঢেকে দেবে
আকাশের নীল,
উদ্যানের সবুজ ঘাস রৌদ্রে ক্লান্ত হয়ে
ধীরে ধীরে ফিকে হবে—
তবু সেই ঘাসের ওপর দিয়ে
হেঁটে হেঁটে হুমায়ুন আহমেদ আর কোনোদিন
মেলায় আসবেন না।
স্টলের সারি, বইয়ের গন্ধ, মানুষের কোলাহল,
সবই থাকবে,
ফাগুন আসবে, পাতা ঝরবে, মেলা বসবে-
শুধু তাঁর না-থাকার শূন্যতাটা সবচেয়ে বেশি
চোখে পড়বে।
হৃদয়ের ভেতরে একটা দুঃখবোধ জমে
থাকবে চিরকাল--
যিনি আমাদের স্বপ্নগুলোকে তাঁর লেখায়
ভাষা দিয়েছিলেন,
তিনি আর কোনো পথ দিয়ে এই শহরের
বইমেলায় ফিরে আসবেন না।
৪৪. নীল চোখের শহর
তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করলেই
আমি চোখ বন্ধ করি
আর সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় একটি নীল জানালা।
বারান্দার রোদে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো
আমার কথামতো নীল শাড়িতে,
চোখে নীলের গভীরতা, যেন এই ভিড়ের ভেতরেও আমাকেই খুঁজছো তুমি।
উতল হাওয়ায় তোমার চুল নড়ে,
সময় থমকে থাকে আমাদের মাঝখানে।
কিন্তু চোখ খুললেই সব বদলে যায়।
ভেঙে পড়ে নীল জানালা,
শব্দে ভরে ওঠে আকাশ।
দেখি অন্য মানুষ, অন্য মুখ, অন্য দিন,
জনারণ্যের ধুলোয় হারানো পথ,
দূরের ধূঁ-ধূ প্রান্তর
যেখানে তোমার কোনো ছায়া নেই।
তবু আমি আবার চোখ বন্ধ করি,
কারণ ওই নীল শহরটায় তুমি আছো,
আর তুমি থাকলেই আমার পৃথিবী
একটুখানি সত্য হয়ে ওঠে।
৪৫. কে আর আমার হবে
কে আর আমার হবে,
কে আর আমায় দেবে অমৃত সুধা,
এই প্রশ্নে নিঝুম হয়ে থাকে প্রতিটি সন্ধ্যা,
বারান্দায় ঝরে পড়ে একাকিত্বের ছায়া।
তুমি ছিলে,
আধো আলোয় জ্বলে থাকা প্রদীপের মতো,
তোমার চোখে আমি খুঁজে পেতাম
হাজার বছরের আশ্রয়।
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই বুকের
ভেতর জেগে উঠত বসন্ত,
শুকনো দিনগুলো ভরে যেত অলক্ষ্য ফুলের গন্ধে।
এখন শুধু শূন্যতা,
তোমার রেখে যাওয়া আলোয় আমি হাঁটি,
পথ জানি না, তবু তোমার দিকেই যাই।
যদি কোনোদিন ফিরে আসো, এই হৃদয়
দরজা খুলে রাখবে, কারণ কে আর আমার হবে,
কে আর আমায় দেবে অমৃত সুধা?
৪৬. মহাকালের বুকে
মহাকালের বুকে খোদিত তোমার নাম-
আমি পড়েছি ধ্বংসস্তূপের আগুনে আগুনে,
সভ্যতার ছাই মেখে হাঁটতে হাঁটতে
যেখানে সময় থেমে যায়।
আমি শুধু তোমাকেই খুঁজেছি-
চিম্বুক পাহাড়ের নির্জন পথে,
মেঘে মোড়া নীল শৈলের গভীরে,
মগধের প্রাচীন ছায়ায়, কামরূপের
ম্লান ভোরে।
তোমাকে খুঁজেছি তক্ষশিলার ভাঙা স্তম্ভে,
যেখানে বাতাস বহন করে বিদ্যার ধুলো -
পাটলিপুত্রের বিস্মৃত রাজপথে
তোমার কল্পিত পায়ের শব্দ শুনেছি,
যেন তুমি এখনও হেঁটে আসছ আমার দিকে।
খুঁজেছি মোহেঞ্জোদাড়োর পোড়া ইটে,
রক্তিম সূর্যাস্তের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত নগরে,
হরপ্পার ভাঙা চৌকাঠে কানে তুলেছি
সহস্র বছরের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস।
নালন্দার ধ্বংসস্তূপে বসে দেখেছি
পুড়ে যাওয়া জ্ঞানের অক্ষরগুলো
তোমার নামেই জ্বলে ওঠে-
ডাকে আমাকে, ডাকে তোমাকেও।
খুঁজেছি উজ্জয়িনীর অন্ধকার গলিতে,
চন্দ্রগুপ্তের ছায়া আর কালিদাসের শ্লোকের ভেতরে,
মথুরার ভাঙা মন্দিরে-
যেখানে পাথর আজও প্রার্থনার মতো কাঁপে।
কাশীর ঘাটে দাঁড়িয়ে গঙ্গার ঢেউয়ে
তোমার নাম ভাসতে দেখেছি,
অযোধ্যার স্তব্ধ প্রাসাদে শুনেছি
নির্বাসনের নীরব কান্না।
দিল্লির লালকেল্লার ক্ষতবিক্ষত দেয়ালে
ইতিহাসের রক্তাক্ত হাতের ছাপ,
ফতেপুর সিক্রির পরিত্যক্ত বারান্দায়
শূন্যতার সঙ্গে কথা বলেছি দীর্ঘক্ষণ।
খুঁজেছি রোমের ধ্বংসস্তূপে,
এথেন্সের ভাঙা স্তম্ভে,
মিশরের পিরামিডের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
শুনেছি মরুর দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
পম্পেইয়ের ছাইঢাকা পথে
তোমার থেমে থাকা পদচিহ্ন কল্পনা করেছি,
অ্যাঞ্জকরের শ্যাওলাধরা মন্দিরে
দেখেছি তোমার ম্লান মুখখানি।
তোমাকে খুঁজেছি জেরুজালেমের প্রাচীরঘেঁষে,
বাবিলনের ঝুলন্ত বাগানের স্বপ্নে,
সমরকন্দের নীল গম্বুজে
ঝুলে থাকা সন্ধ্যার আলোয়।
শেষমেশ বুঝেছি-
তুমি কোনো নগরে নও, কোনো ধ্বংসস্তূপে নও,
তুমি আছ আমার বুকের গভীরে,
যেখানে ইতিহাস থেমে যায়,
আর ভালোবাসা অনন্ত হয়ে ওঠে।
৪৭. নির্জন দুপুরে
নির্জন দুপুরে যে মেয়ে এসে
আমার দুয়ার ছুঁয়ে ফিরে গিয়েছিল,
সে এখন চির অভিমানী,
সে আর কোনো বসন্ত দুপুরে ফিরে
আসেনি।
তার পায়ের শব্দ আজও পড়ে আছে
পুরোনো বারান্দায় ধুলোর চিহ্ন হয়ে,
আমি প্রতিদিন বিকেলের রোদে
চায়ের কাপ রেখে বসে থাকি,
যেন সে আসবে।
বসন্ত এলে শহর ভরে ওঠে নতুন পাতার সবুজে,
আমার ঘরে শুধু ছায়া পড়ে থাকে তার নামে,
জানালার কাঁচে ছুঁয়ে থাকা আলোয় ভেসে থাকে
তার মুখ।
নির্জন দুপুর হাহা করে হেসে চলে যায়,
আমি কেবল অপেক্ষায় থাকি,
যেন সে আসবে কিন্তু সে আর আসে না।
৪৮. ভোরের প্রথম গান
তুমি ফুল হতে চেয়েছিলে,
আমি হৃদয়ের জমিন দেখিয়ে বলেছিলাম-
এইখানে বীজ বুনে দাও,
এইখানেই তোমার ফোটার সময়।
আমি তোমার নাম লিখে দিয়েছি
রাত্রির নীল কপালে,
চাঁদ তার রুপালি আলোয়
আমাদের গল্পে সই করেছে।
যখন ক্লান্ত হয়ে ঝরে পড়ে সময়,
দিনের কোল ঘুমে ঢলে যায়-
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো আমার পাশে,
সব ব্যথা ঢেকে দাও ভালোবাসায়।
তুমি যদি কখনো ঝড় হয়ে আসো,
আমি হবো নীরব আশ্রয়ের আকাশ;
তুমি যদি হও নিঃশব্দ রাত,
আমি হবো ভোরের প্রথম গান।
৪৯. শীতের শেষ
শীতের শেষ, বসন্ত অগ্রগামী, কালো পিচের বুকে সারাদিন ঝরে পড়ে শুকনো পাতা
চাঁপাগাছের বেষ্টনীতে।
ভোরেরা আসে আধখানা স্বপ্ন হয়ে,
ছায়াতলে ঢাকা এক নির্জন আশ্রম
ঘুমায় আলো-অন্ধকারের মাঝখানে।
আরণ্যের শ্বাসে দাঁড়িয়ে একহারা একটি ঘর
যেখানে যুগের পর যুগ
অগণন মুহূর্ত এসে আশ্রয় নিয়েছে।
সেখানে থাকত একটি মানুষ,
কয়েকটি বই, কাগজ, পত্রিকা,
আর ক্লান্তিহীন সিগারেটের ধোঁয়া,
যেন সময়কে পোড়ানোর নীরব আয়োজন।
এর বাইরে যা কিছু আছে,
তা অকিঞ্চিৎকর।
৫০. অবিনশ্বর প্রেম
চোখ বন্ধ করে দেখি তোমাকে
চোখ খুলেও দেখি তোমাকে
দুই বারেই দেখতে পাই
তোমার আরক্ত সুন্দর মুখ,
অসীম সৌন্দর্যখচিত
প্রাচীন কোনো নগরীর মতো।
তোমার চোখ-
যেন ব্যাবিলনের ভগ্ন মিনার,
যার গভীরে আমি দেখি
ডুবে যাওয়ার সূর্যাস্তের আভা
যেখানে মহাবিশ্বের ছায়া পড়ে
নিঃশব্দ প্রার্থনায়।
তোমার ঠোঁট,
পম্পেইয়ের আগুনে পোড়া গোলাপ,
যেন শেষ বসন্তের রং,
যা আগুনেও মুছে যায়নি-
যার ছাইয়েও লুকিয়ে আছে
অমর আকুলতা।
তোমার মাথার চুল,
রাত্রির ঘন অরণ্য,
যেখানে আমার আঙুল হারিয়ে যেতে চায়
চাঁদের গোপন পথে।
তোমার কপাল-
মগধের প্রাচীন প্রাসাদের দেয়াল,
যেখানে সময় নিজেই
নিজের নাম খোদাই করে গেছে,
যেখানে আলো নামে
নিঃশব্দ চুমুর মতো।
তোমার বুক,
প্রাচীন মন্দিরের স্তম্ভ,
যেখানে মাথা রেখে
আমি শুনি হৃদয়ের মৃদু দোলা।
তোমার কোমর,
ইন্দাসের বাঁকানো নদী,
যার ঘূর্ণিতে
আমার সমস্ত ধৈর্য ভেঙে যায়।
তোমার জঙ্ঘা,
শ্বেতপাথরে খোদাই করা রহস্যপথ,
যে পথে আমার ইচ্ছেগুলো
নগ্ন পায়ে হেঁটে যেতে চায়।
আমি যখন তোমার দিকে তাকাই,
আমি কেবল একজন মানুষকে দেখি না-
আমি দেখি সভ্যতার শেষ আলো,
ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা
এক অবিনশ্বর প্রেম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন