বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তোমার নামেই সব বিকেল ( কাব্যগ্রন্থ )


তোমার নামেই সব বিকেল  ( কাব্যরন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর  ২০২৫ ইং


উৎসর্গ  -

ওদের দুজনেরই নাম রীনা-
তবু স্মৃতির পাতায় তারা দু’জন দু’রকম আলো।

একজন—পল্লবীর রীনা, মানে রীনা ইসলাম, 
চিত্রালীর পাঠকের পাতায়
যাকে প্রথম চিনেছিলাম শব্দের ভেতর দিয়ে,
তারপর দেখেছি
বাংলা বিভাগের শ্রেণিকক্ষে,
চোখে ছিল ওর স্বপ্নের দীপ্তি।

আরেকজন—মতিঝিলের রীনা,
যার কণ্ঠে গানের ভেতর জেগে উঠত হৃদয়ের স্পন্দন,
স্পন্দনের সেই বিখ্যাত শিল্পী—রীনা আহমেদ,
যাকে চিনেছিলাম সুরের আকাশে।

আজ তারা দুজনেই আটলান্টিকের ওপারে
হাডসন নদীর তীরে আলো-ছায়ার শহর নিউইয়র্কে থাকে, দূরত্বের মাঝেও
আমার স্মৃতিতে ওরা কাছেই থাকে।

এই গ্রন্থখানি
আমার এই দুই সহপাঠী বান্ধবীর করকমলে 
তুলে দিলাম।


১.      তোমার নামেই সব বিকেল


তোমার নামেই সব বিকেল
রোদ ঝরে পড়ে পাতার ফাঁকে ফাঁকে,
হালকা বাতাসে ভেসে আসে কাশফুলের দোলা,
নদীর জলে সূর্য ডুবে গেলে
আমি দেখি তোমার চোখের নীরব হাসি।

এই বিকেলগুলোতে
পাখিরা ডানা মেলে ফেরে নীড়ে,
আর আমি ফিরি তোমার স্মৃতির ভেতর,
শিউলি গাছের নিচে জমে থাকা গন্ধে
হঠাৎ করে তোমার নামটা উচ্চারণ করি।

মেঘেরা যখন রঙ বদলায়,
আকাশের নীল ধীরে ধীরে গাঢ় হয়,
তখন তোমার স্পর্শের কথা মনে পড়ে,
নরম, মায়াবী, ঠিক বিকেলের মতোই।

তোমার নামেই সব বিকেল,
সব আলো-ছায়ার গল্প,
দিনশেষের ক্লান্তি, আর হৃদয়ের শান্তি।
যতবার সন্ধ্যা নামে পৃথিবীতে,
আমার ভেতরে তখন
ভালোবাসা হয়ে তুমি জ্বলে ওঠো।


২.       যে গল্পে তুমি ছিলে না 


যে গল্পে তুমি ছিলে না শেষ অধ্যায়ে,
সেই গল্পের সব শব্দ আজও তোমায় খোঁজে।
পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে তোমার ছায়া,
অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে নীরব দীর্ঘশ্বাস বোঝে।

আমরা শুরু করেছিলাম আলো দিয়ে,
ভোরের জানালায় রোদ এসে বসেছিল হাসি মেখে।
কিন্তু সময় হঠাৎ কলম থামিয়ে দিল,
শেষ পৃষ্ঠায় তোমার নাম আর লেখা হলো না রেখে।

তুমি চলে গেলে—অথচ যাওয়ার শব্দ হলো না,
শূন্যতা শুধু আসন পেতে বসে রইল ঘরে।
আমি প্রতিদিন গল্পটা আবার খুলে বসি,
ভাবি, যদি হঠাৎ শেষ পরিচ্ছেদে তুমি আসো ফিরে। 

যে গল্পে তুমি ছিলে না শেষ অধ্যায়ে,
সেই গল্পটাই সবচেয়ে বেশি পড়ি আমি।
কারণ অপূর্ণতার ভেতরেই আজও বেঁচে আছে
আমাদের না–লেখা, না–শেষ হওয়া প্রেমকাহিনি।


৩.        অন্তরের বাসিন্দা


সে চলে গেছে অনন্তের দিকে,
মাটি আজ তার দেহকে আগলে রেখেছে,
শীতল নীরবতায় অন্তরীণ এক স্পর্শহীন 
ঠিকানা তার, 
আর কোনোদিন ছোঁয়া যাবে না তাকে,
এই দুই হাতের সীমার ভেতরে আর আসবে না সে।

তবু আশ্চর্য,
সে নেই বলে কিছুই শূন্য হয়নি।
চোখ বন্ধ করলেই দেখি তাকে,
অপার্থিব আলো হয়ে ভাসে স্মৃতির আঙিনায়।
নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকে তার গন্ধ,
হৃদস্পন্দনের ফাঁকে ফাঁকে তার নাম।

সে এখন দেহে নয়,সে থাকে অন্তরেতে,
আমার ভাবনায়, আমার প্রার্থনায়,
একাকী রাতের নীরব কথোপকথনে,
কখনো বিষাদের ছায়া হয়ে পাশে বসে,
কখনো শান্তির মতো মাথায় হাত রাখে।

মৃত্যু তাকে দূরে নেয়নি,
বরং আরো গভীরে এনেছে,
প্রাণের ভেতর, আত্মার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।
সে এখন আমি, আমার কান্নার জলে,
আমার হাসির আলোয়,
আমার বেঁচে থাকার প্রতিটি স্পন্দনে।

যে চলে যায়, সে কি সত্যিই চলে যায়?
না— ভালোবাসা জানে, কেউ কেউ চিরকাল
অন্তরের বাসিন্দা হয়ে থাকে।


৪.      একটি নদী একটি সূর্যাস্ত


শরীরের এক মায়াবী গন্ধ পাচ্ছিলাম তার
অচেনা কোনো ফুলের মতো,
যার নাম জানি না, তবু নেশা চিনি।
পাশ ফিরে সে পাঁজরে হাত রেখে বলেছিল ধীরে, যেন কথা নয়,
কোনো সন্ধ্যার আবাহন- 'কোথাও নিয়ে যাবে আমাকে?'

তার চোখে তখন নরম কুয়াশা,
দিনভর ক্লান্ত রোদের শেষে
একটুখানি জোছনার আকুলতা।
সন্ধ্যায় তুরাগ নদীর তীরে
লাল আভা ছড়ানো সূর্যাস্ত দেখতে ইচ্ছে করছে।

আমি চুপ করে ছিলাম,
কারণ কিছু ইচ্ছে উচ্চারণ চায় না,
শুধু নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে।

নদীর দিকে তাকিয়ে আমি তখন
ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকছিলাম,
যেখানে তার হাত আমার হাতে,
আর জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে সময়।

সে বলল আবার-
'যদি কোথাও থেকে শীতল বাতাস আসে,
আমার চুলে, আমার কপালে
দিনের সব অবসাদ মুছে দেবে।'
তার কণ্ঠে তখন
পাখা ঝাপটানো বিকেলের শব্দ,
পাতা নড়ার মতো একান্ত আশা।

আমি শুনছিলাম
নিঃশেষিত অস্ত দিনের মর্মর ধ্বনি-
রোদের বিদায়বেলা,
জলের গায়ে লালচে বিষণ্নতা,
নৌকার দড়িতে বাঁধা দীর্ঘশ্বাস।

সে পাশে বসে, নিঃশব্দে,
আমার বুকের ভেতর সন্ধ্যা নামাচ্ছিল,
তুরাগের তীরে পৌঁছোলে
হয়তো কিছু বলব না আমরা,
শুধু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে
নিজেদের একটু একটু হারাব।

হাতের উষ্ণতায় ভর করে বুঝব,
ভ্রমণ মানে দূরে যাওয়া নয়,
ভ্রমণ মানে কারও পাশে
দিনের শেষ আলোটুকু রেখে আসা।

আর যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে,
শীতল বাতাস সত্যিই যদি আসে,
সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে,
ঠিক যেমন এখন, পাঁজরে হাত রেখে
একটি নদী আর একটি সূর্যাস্ত
আমার কাছে চাইছে সে।


৫.      শেষ চিঠি পরের কবিতা


চিঠিটা লেখা শেষ,
কাগজে আর শব্দ নেই,
কালির ভেতর শুকিয়ে গেছে
সব অনুরোধ, সব অপেক্ষা।

ডাকঘর জানে না,
এই চিঠি পৌঁছবে না কোথাও
তবু হৃদয়ের খামে ভরে
আমি তাকে বিদায় পাঠালাম।

চিঠির পরেই যে নীরবতা নামে,
সে নীরবতা আর শূন্য নয়,
তার বুকভরা স্মৃতি,
তার শ্বাসে পুরোনো সন্ধ্যার গন্ধ।

এখন আর লিখি না,
শব্দেরা ক্লান্ত হয়ে গেছে,
ভালোবাসা বদলে গেছে
নিস্তব্ধ এক স্বীকারোক্তিতে।

শেষ চিঠির পর
যে কবিতা জন্ম নেয়
সে কবিতায় তুমি নেই,
তবু প্রতিটি পংক্তির মাঝখানে
তোমার ছায়া বসে থাকে।


৬.       প্রেমের পরে কেবল নির্জনতা


প্রেমের পরে কেবল নির্জনতা-
দু’চোখ ভরা শব্দহীন বিকেল,
যেখানে চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়
তোমার নাম উচ্চারণের আগেই।

ঘরে ঘরে তোমার ছায়া ঘুরে বেড়ায়,
কিন্তু তুমি নেই,
জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলোও
আজ প্রশ্ন করে, কাকে খুঁজছো?

যে হাসি একদিন বুকের ভেতর
নদীর মতো বয়ে যেত,
আজ সে নদী শুকিয়ে গেছে,
তলদেশে পড়ে আছে কিছু স্মৃতি,
ভাঙা চুড়ির মতো ঝনঝন শব্দ তোলে।

রাত নামলে নির্জনতা আরও গভীর হয়,
বালিশে জমে থাকা নিঃশ্বাসগুলো
শুধু তোমার দিকেই হাঁটে।
কিন্তু পথের শেষে
আর কোনো দরজা খোলে না।

প্রেমের পরে কেবল নির্জনতা,
তবু এই শূন্যতার মাঝেই
আমি বাঁচতে শিখে যাই ধীরে ধীরে,
কারণ তোমাকে ভালোবাসা
আমাকে একা থাকার ভাষা শিখিয়েছে।


৭.      শেষ দেখা, শেষ কথা নয়


শেষ দেখা মানেই কি বিদায়,
চোখের কোণে জমে থাকা নীরব জলরেখা?
শেষ কথা মানেই কি থেমে যাওয়া
সব উচ্চারণের পরিসমাপ্তি?

না,
শেষ দেখা কেবল চোখের সীমা পর্যন্ত,
তারপরও তুমি থেকে যাও
আমার নিঃশ্বাসের গোপন ভাঁজে।

শেষ কথা নয়,
কারণ কিছু অনুভব ভাষা ছাড়িয়ে যায়,
কিছু ভালোবাসা উচ্চারণহীন হয়,
নীরবতাই সেখানে সবচেয়ে গভীর সংলাপ।

তুমি চলে গেলে,
কিন্তু তোমার ছায়া রয়ে গেল
আমার দিনের আলোয়,
আমার রাতের নির্জন চাঁদের নিচে।

শেষ দেখা কেবল দৃশ্যের,
শেষ কথা কেবল কণ্ঠের
হৃদয়ের গল্পগুলো
কখনোই শেষ হয় না।


৮.        ঈশ্বরকে খুঁজছি


তোমাকে হারিয়ে আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি,
মসজিদের নীরবতায়, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিতে,
চার্চের প্রার্থনার ভাঁজে ভাঁজে
তোমার মুখখানি খুঁজে পাই না তবু।

তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে সহজ প্রার্থনা,
কোনো শব্দ ছাড়াই কবুল হয়ে যেত।
এখন শব্দ জমে যায় বুকে,
দোয়ার মতো খুলতে চায় না কিছুই।

তোমাকে হারিয়ে আমি বুঝেছি,
ঈশ্বর বোধহয় খুব একা,
তাই তিনি মানুষের হৃদয়ে
ভালোবাসা হয়ে লুকিয়ে থাকেন।

তোমার স্পর্শ ছিল আমার বিশ্বাসের 
শেষ আয়াত,
তোমার হাসি ছিল আলো-ভরা উপাসনা।
তুমি চলে যাওয়ায়
আলোকিত পথ হঠাৎ অন্ধকার।

এখন প্রতিটি সিজদায়, প্রতিটি চোখের জলে, আমি শুধু একটাই মিনতি রাখি,
যদি ঈশ্বর সত্যিই থাকেন, তবে তিনি যেন
তোমার মতোই দয়ালু হন।


৯.         তোমার সাথে শুরু


তোমার হাত ধরেই শব্দ শিখেছিলাম,
ভয়কে কীভাবে ছুঁয়ে ফেলতে হয়,
ভালোবাসা যে কেবল পাওয়া নয়,
থেমে থাকা, অপেক্ষা করাও তার ভাষা।

পথে অনেক ঋতু বদলেছে,
পাতাঝরা, বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা,
তবু তোমার নামটুকু
আমার ভেতর চিরসবুজ রয়ে গেছে।

আর যদি শেষ বলে কিছু থাকে,
তবে সে-ও তোমাতেই শেষ হোক,
শেষ নিঃশ্বাসের আগে শেষ যে নামটি ডাকব,
সে-ও তোমারই।

তোমার সাথে শুরু, তোমাতেই শেষ,
এর বাইরে আমার আর কোনো 
গল্প জানা নেই।


১০.     প্রেম ছুঁয়ে গেল, রইয়ে গেল না


প্রেম ছুঁয়ে গেল হালকা বাতাসের মতো,
বুকের উপর দিয়ে বয়ে গেল,
একটু কাঁপিয়ে, একটু উষ্ণতা রেখে।

দু’চোখ ভরা ছিল আলো,
হাতের মুঠোয় ছিল স্বপ্ন,
কিন্তু সময় নামের নিষ্ঠুর ঢেউ
সব ভাসিয়ে নিল নীরবে।

কথাগুলো আজও দেয়ালে লেগে থাকে,
নীরব ঘরের প্রতিধ্বনিতে শোনা যায় নাম,
যে নাম একদিন ছিল প্রার্থনা,
আজ সে নাম শুধু স্মৃতি।

প্রেম এসেছিল অতিথির মতো,
থাকবার প্রতিশ্রুতি দেয়নি কখনো,
তবু তার চলে যাওয়ায়
ঘরটা হঠাৎ খুব বড় হয়ে গেল।

প্রেম ছুঁয়ে গেল, রইয়ে গেল না,
শুধু রেখে গেল একখণ্ড শূন্যতা,
যেখানে আজও বসে থাকে মন,
ফিরে আসবে ভেবে।
     

১১.       ভালোবাসা ছিল, মানুষটি ছিল না


ভালোবাসা ছিল, হাওয়ার মতো নরম,
জোছনার মতো নীরব, কিন্তু মানুষটি ছিল না,
ছিল না সেই চোখ, যার দিকে তাকালে
পৃথিবী একটু থেমে যেত।

আমি ভালোবাসাটাকে আগলে রেখেছি,
পুরোনো চিঠির ভাঁজে, 
অব্যক্ত কথার দীর্ঘশ্বাসে।
মানুষটি নেই, শুধু তার অনুপস্থিতির শব্দ
রাতভর দরজায় কড়া নাড়ে।

ভালোবাসা ছিল বলেই শূন্যতাটা 
এত ভারী, একটা নামহীন ব্যথা হয়ে বুকে 
জমে থাকে।
মানুষটি ছিল না, তাই ভালোবাসা আজ
নিজেকেই খুঁজে ফেরে আমার 
নিঃসঙ্গতার ভেতর।


১২.       আমি বেঁচে আছি, প্রেম নেই


আমি বেঁচে আছি,
শ্বাস চলছে, রোদ আসে জানালায়,
রাত নামলে বাতি জ্বলে ওঠে ঘরে।
তবু কোথাও এক গভীর অভাব-
প্রেম নেই।

কথারা আসে, কিন্তু কারও নাম ধরে ডাকে না।
হাত দুটো খালি থাকে,
ছোঁয়ার অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আমি বেঁচে আছি-
সময় ঠিকই এগোয়, ক্যালেন্ডার বদলায়,
মানুষ হাসে, উৎসব হয়।

আমার ভেতরে শুধু নীরবতার চাষ,
ফল ধরে না, ফুলও ফোটে না।
প্রেম ছিল একদিন-
চোখের ভেতর আলো, বুকের ভেতর গান।
আজ সে স্মৃতি হয়ে বসে আছে
অন্ধকারের এক কোণে, ধুলো জমে তার গায়ে।

আমি বেঁচে আছি, প্রেম নেই-
তবু আশ্চর্য, এই বেঁচে থাকাটুকু
এখনো টেনে রাখে আমাকে,
হয়তো কোনো এক সকালে প্রেম আবার পথ হারিয়ে আমার দরজায় এসে দাঁড়াবে।


১৩.      কান্না যেখানে থামে না


কান্না যেখানে থামে না
সেখানে নীরবতাও ভেঙে পড়ে,
শব্দহীন আর্তনাদে ভিজে যায়
অভ্যস্ত রাতের বুক।

চোখের কোণে জমে থাকা জল
আর শুধু জল থাকে না,
তা হয়ে ওঠে জমে থাকা সময়-
যে সময় কখনো সুখ ছিল।

প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে
একটি করে স্মৃতি ঝরে পড়ে,
ভাঙা স্বপ্নের কাঁচে পা কেটে
মন হাঁটে অভ্যেসের পথে।

কান্না যেখানে থামে না,
সেখানে মানুষ শক্ত হয় না-
সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে
অন্যরকম বেঁচে থাকতে শেখে।

আর শেষ পর্যন্ত এই না-থামা কান্নাই
শিখিয়ে দেয়,
সব হারানোর মাঝেও কীভাবে নিজেকে
অল্প অল্প করে ধরে রাখতে হয়।


১৪.      ছোঁয়ার বাইরে, তবুও কাছে


ছোঁয়ার বাইরে তুমি
তবুও প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার উপস্থিতি।
হাত বাড়ালেই শূন্যতা,
চোখ বন্ধ করলেই তুমি।

দূরত্বের ওপারে দাঁড়িয়ে
তুমি আমার নীরবতার ভাষা হয়ে যাও,
রাতের গভীরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা
একটি একলা তারার মতো।

তোমাকে ছুঁই না আর
তবু প্রতিদিন স্পর্শ করি স্মৃতিতে,
সময়ের ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালে
তোমার নাম আজও অমলিন।

তুমি নেই পাশে,
তবু হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের ঘরে
তোমারই বসবাস,
ছোঁয়ার বাইরে, তবুও কাছে।


১৫.      চোখ বুঝলেই তুমি 

চোখ বুঝলেই তুমি
অন্ধকারের ভেতর জ্বলে ওঠা এক নীরব আলো।
পলকের ফাঁকে ফাঁকে তোমার মুখ 
ভেসে আসে,
যেন স্মৃতির নদীতে রাখা এক চিরচেনা নৌকা।

চোখ বুঝলেই তুমি, শব্দহীন কথার মতো,
হৃদয়ের গভীর ঘরে
আস্তে পা ফেলে ঢুকে পড়ো।
কোনো প্রশ্ন করো না, কোনো উত্তরও 
চাও না—
তবু সবকিছু বলে দাও।

চোখ বুঝলেই তুমি, ঘুম নয়, 
এক জাগরণ।
হারিয়ে যাওয়ার ভেতরেই
তোমাকে আবার খুঁজে পাই।

চোখ খুললে তুমি নেই,
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই পৃথিবীর 
সবটুকু তুমি।


১৬.     একদিন প্রেম ছিল

একদিন প্রেম ছিল রোদ্দুরের মতো সহজ,
চোখে চোখ রাখলেই
পৃথিবী থেমে যেত কয়েক মুহূর্তে।

একদিন হাত ধরেছিলাম,
ভবিষ্যৎ তখন খুব কাছের ছিল,
স্বপ্নগুলো কাঁধে মাথা রেখে
নিঃশব্দে ঘুমোত।

তারপর একদিন
প্রেমটা স্মৃতির খাতায় উঠে গেল,
নামহীন পাতায় জমে রইল
হাসি, কান্না, অপেক্ষা।

আজ প্রেম নেই,
আছে শুধু সব স্মৃতি,
হঠাৎ হাওয়া লাগলে জেগে ওঠা
পুরনো কোনো গান।

একদিন প্রেম ছিল,
আজ সে দিনটাই সবচেয়ে বেশি
মনে পড়ে। 


১৭.       স্পর্শের পরেও যে থাকে


স্পর্শের পরেও যে থাকে, সে শরীর নয়, স্মৃতি।
আঙুল ছুঁয়ে ফিরে আসে
নিঃশব্দ এক কাঁপুনি,
দেহের ভেতর ঢুকে থাকা অদৃশ্য আলোর মতো।

তুমি চলে গেলে হাত ফাঁকা হয়,
কিন্তু উষ্ণতা যায় না।
বালিশে লেগে থাকে শ্বাসের ছায়া,
ঘরে ঘুরে বেড়ায় তোমার বলা না-বলা কথা।

যে স্পর্শ শেষ হয়ে গিয়েও শেষ হয় না,
সে অভ্যাস হয়ে থাকে, অন্তরের ভাঁজে ভাঁজে
মৃদু ব্যথার মতো জেগে থাকে।

কিছু স্পর্শ বিদায় নেয় না,
তারা রক্তে মিশে যায়,
নিঃসঙ্গ রাতে নাম ধরে ডাকে,
আর বলে- আমি আছি, স্পর্শের পরেও।



১৮.       প্রতিটি রাত তোমার অভাবে


প্রতিটি রাত তোমার অভাবে
আরও দীর্ঘ হয়ে ওঠে,
ঘড়ির কাঁটাগুলো যেন হাঁটে না,
শুধু বুকের ভেতর শব্দ করে পড়ে থাকে।

চাঁদ জানে, তার আলো আজও অসম্পূর্ণ,
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে-ও খোঁজে তোমাকে।
নীরবতার শরীরে জমে ওঠে শীত,
আমার শ্বাসে শ্বাসে কেবল তোমার নাম।

ঘুম আসে, কিন্তু ছুঁয়ে যায় না,
স্বপ্নগুলোও তোমার ঠিকানা ভুলে গেছে।
প্রতিটি রাত তোমার অভাবে
ভোরের আগেই ভেঙে পড়ে একাকীত্বে।


১৯.       চলেই যখন যাবে 


চলেই যখন যাবে, তবে আর একবার তাকাও
এই চোখে জমে আছে কত না বলা সন্ধ্যা।
এক মুহূর্ত থামাও পা,
সময়কে বলি, আজ সে অপেক্ষা করুক।

তোমার দৃষ্টিতে যেন শেষবার
আলো জ্বলে ওঠে আমার সমস্ত অন্ধকারে,
যেন এই তাকানোতেই
জীবনের বাকি দিনগুলো আলো পায়।

আমি কিছু চাই না,
না প্রতিশ্রুতি, না ফিরে আসার শপথ,
শুধু এই একবার
প্রাণ ভরে দেখে নেওয়ার অধিকার।

যদি কোনোদিন স্মৃতির দরজায়
হঠাৎ বাতাস লাগে,
এই তাকানোর উষ্ণতাই যেন বলে-
ভালোবাসা একদিন সত্যিই ছিল।


২০.      অনন্ত অভ্যাস

তোমাকে হারানোর অভ্যাসটা
ধীরে ধীরে রক্তে মিশে গেছে
যেন প্রতিদিনের নিঃশ্বাসে
একটু করে কমে যাওয়ার নাম।

ভোর হলে বুঝি, তুমি নেই,
তবু জানালায় আলো ঢুকলেই
অজান্তে তোমার দিকেই তাকাই,
এই তাকিয়ে থাকাই বোধহয় অভ্যাস।

রাস্তায় হাঁটলে ছায়ার ভিড়ে
তোমার অবয়ব খুঁজে ফিরি,
হারানোর পরেও
খোঁজ ফুরায় না-
এও এক অনন্ততা।

রাতে ঘুম আসে না বলে নয়,
ঘুমের মধ্যেই তুমি থাকো বলে-
জেগে ওঠার মুহূর্তটাই
সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যাই।

তোমাকে না-পাওয়ার এই দীর্ঘ সাধনা
আমাকে প্রতিদিন নতুন করে শেখায়-
কীভাবে শূন্যতাকে বুকের মধ্যে রেখে
বেঁচে থাকতে হয় নিঃশব্দে।

তোমাকে হারানোর অনন্ত অভ্যাস
এখন আর ব্যথা নয় শুধু,
এ আমার অস্তিত্বের ভাষা-
আমি যেভাবে আজও তোমাকে
ভালোবাসি, না-থাকার ভেতর দিয়ে।


২১.       অন্তরে রয়ে গেলে তুমি


অন্তরে রয়ে গেলে তুমি
ছোঁয়ার বাইরে, তবু সবচেয়ে কাছে,
নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে তোমার নাম
হৃদয়ের গভীরে আলো জ্বলে থাকে।

চলে গেলে, তবু যাওনি কখনো,
শ্বাসে শ্বাসে তোমার উপস্থিতি।
ভাঙা বিকেল, ক্লান্ত রাত-
সবখানে তোমারই অনুপস্থিত উপস্থিতি।

সময় বদলায়, স্মৃতি রঙ বদলায়,
তবু তুমি অমলিন, অবিনশ্বর।
অন্তরে রয়ে গেলে তুমি-
আমার সব হারানোর মধ্যেও সবচেয়ে আপন।


২২.       প্রেম এখন প্রার্থনার মতো


প্রেম এখন প্রার্থনার মতো-
চুপচাপ, নীরব, চোখ বুজে করা।
হাত জোড়া করি তোমার নামে,
কণ্ঠে উচ্চারণ নেই, তবু হৃদয় ভরে যায়।

আগে প্রেম ছিল স্পর্শের ভাষা,
এখন তা ধূপের ধোঁয়ার মতো-
দেখা যায়, ধরা যায় না,
তবু সমস্ত ঘর সুবাসে ভরে রাখে।

আমি আর চাই না অধিকার,
চাই না প্রতিদান বা প্রতিশ্রুতি,
শুধু চাই তুমি ভালো থাকো-
এই কামনাই আমার প্রতিদিনের মন্ত্র।

কখনো রাতে ঘুমের আগে,
কখনো ভোরের প্রথম আলোয়,
আমি তোমাকে চাই না কাছে,
আমি তোমাকে চাই অক্ষত।

প্রেম এখন প্রার্থনার মতো-
পাওয়ার নয়, ছেড়ে দেওয়ার শিক্ষা।
ভক্তির মতো নিঃস্বার্থ,
নীরবতার মধ্যেই সম্পূর্ণ।


২৩.     আত্মার ক্ষত


ভালোবাসা যখন আত্মার ক্ষত,
তখন নীরবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে উচ্চস্বরে কাঁদা।
হাসির আড়ালে জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস,
চোখের গভীরে ভিজে থাকে অপূর্ণতার নদী।

সে ক্ষত রক্ত ঝরায় না,
তবু প্রতিটি শ্বাসে শ্বাসে ব্যথা দেয়।
দিনের আলোয় তাকে লুকিয়ে রাখি,
রাতে সে জেগে ওঠে স্মৃতির ছুরিতে।

ভালোবাসা তখন প্রার্থনা নয়,
একটি নিরব অভিশাপ-
যাকে বুকে বয়ে চলি আজীবন,
আর নিজের কাছেই হারতে থাকি ধীরে ধীরে।

তবু এই ক্ষতই শেখায়-
ভেঙে যাওয়ার মধ্যেও বেঁচে থাকা,
কারণ ভালোবাসা যখন আত্মার ক্ষত,
তখন যন্ত্রণাই হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে গভীর পরিচয়।


২৪.     রাণী ভিক্টোরিয়ার সমাধির 
           কাছে দাঁড়িয়ে


রাণী ভিক্টোরিয়ার সমাধির কাছে দাঁড়িয়ে
সময়কে দেখি—পাথরের মতো নিশ্চুপ।
যে নারী প্রেমে রাজ্য শাসন করেছিল,
করুণায় মানুষের দুঃখ ছুঁয়ে দেখেছিল,
আজ তিনি নেই।

শুধু শীতল শিলালিপিতে আটকে আছে তাঁর শ্বাস,
মুকুট ঝরে গেছে ইতিহাসের ধুলোয়,
রাজদণ্ড ক্লান্ত হয়ে হেলান দিয়েছে শতাব্দীর দেয়ালে।

তবু ভালোবাসা, সে তো মরেনি কোনোদিন।
রাণীর চোখে যে প্রেম জ্বলেছিল,
তা এখনো বাতাসে ভাসে, নিঃশব্দ প্রার্থনার মতো।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
নিজের বুকের ভেতর হাত রেখে বুঝতে চাই-
আমাদের প্রেমও কি একদিন
এমনই স্মৃতি হয়ে যাবে?
নামহীন, রাজহীন, তবু গভীর।

রাণী নেই, রাজ্য নেই, কিন্তু আমাদের 
প্রেম আছে।
এটাই হয়তো ইতিহাসের আসল বিজয়:
সবকিছু হারিয়ে গেলেও
ভালোবাসা থেকে যায়-
নস্টালজিয়ার আলোয়, মানুষের হৃদয়ে।


২৫.       যে শহরে তুমি ছিলে


যে শহরে তুমি ছিলে,
সেখানে সকালগুলো ঘুম ভাঙত তোমার নাম ধরে,
চায়ের কাপে ভাসত তোমার ঠোঁটের উষ্ণতা,
আর ফুটপাথের ধুলোতেও লেগে থাকত
আমাদের হাঁটার শব্দ।

যে শহরে তুমি ছিলে,
বিকেল নামলেই জানালার পাশে বসে থাকত বাতাস,
গাছের পাতারা জানত-
আজও তুমি আসবে,
হালকা হাসি নিয়ে, অলস চোখে।

এখনো সেই শহর আছে,
রাস্তা আছে, বাড়ি আছে, আলো আছে-
শুধু তুমি নেই।
তাই শহরটা প্রতিদিন
নিজেরই ছায়া হয়ে বেঁচে থাকে।

যে শহরে তুমি ছিলে,
সেখানে প্রেম ছিল স্বাভাবিক,
শ্বাস নেওয়ার মতো সহজ।
তুমি চলে যাওয়ার পর শহরটা শিখেছে-
কীভাবে মানুষ হয়ে থেকেও
নিঃসঙ্গ হতে হয়।


২৬.      তুমি হারিয়ে গেলে 


তুমি হারিয়ে গেলে কোনো ঠিকানায় নয়, 
কোনো মানচিত্রেও না,
শহরের কোলাহলে তোমার নাম ডাকলেও
শব্দ ফিরে আসে, তুমি আসো না।

আমি খুঁজেছি তোমায়
ভেজা সন্ধ্যার আলোয়,
শেষ ট্রেনের জানালায় জমে থাকা কুয়াশায়,
চেনা রাস্তার প্রতিটি মোড়ে
যেখানে একদিন আমরা থেমেছিলাম।

তুমি কি আছো
নিঃশব্দ কোনো প্রার্থনার ভেতর?
নাকি চোখ বন্ধ করলেই যে আলো জ্বলে ওঠে
সেই আলোর গভীরে, 

যদি জিজ্ঞেস করো, কোথায় তোমায় খুঁজে পাব,
আমি বলবো, আমার দীর্ঘশ্বাসের ফাঁকে,
অসম্পূর্ণ বাক্যের শেষে,
আর সেই সব রাতে যখন ঘুম আসে না,
তখনই তুমি থাকো,
হারিয়ে গিয়েও পুরোটা জুড়ে।


২৭.      একদিন আমরাও ছিলাম


একদিন আমরাও ছিলাম -
হাওয়ার মতো হালকা,
চোখভরা স্বপ্ন আর বুকভরা বিশ্বাস নিয়ে
ভবিষ্যতের দিকে হাঁটতাম।

একদিন আমরাও ছিলাম -
অল্প কথায় সুখ পেতাম,
একটু ছোঁয়ায় পৃথিবী বদলে যেত,
রাতগুলো ভোর হতো অপেক্ষায়।

তারপর সময় শিখিয়ে দিল
কীভাবে মানুষ ফুরিয়ে যায়,
কীভাবে হাসির ভেতরেও
লুকিয়ে থাকে দীর্ঘশ্বাস।

আজ স্মৃতির কোণে দাঁড়িয়ে
নিজেকেই প্রশ্ন করি-
যে আমরা ছিলাম একদিন,
সে কি সত্যিই আমরা ছিলাম?

তবু ইতিহাসের পাতায়
নীরবে লেখা থাকে-
ভাঙার আগে, হারানোর আগে,
একদিন আমরাও ছিলাম।



২৮.      যে রাতগুলো তোমার নামে কেঁদেছে


যে রাতগুলো তোমার নামে কেঁদেছে,
তারা কেউ ঘুমোতে শেখেনি,
নীরবতার বুক চিরে
তোমার নাম ডেকে গেছে বারবার।

চাঁদের আলো এসে বসেছিল জানালায়,
কিন্তু আলোও জানত -
এই ঘরে আর উষ্ণতা নেই,
শুধু অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস।

বালিশ ভিজেছে অজানা অশ্রুতে,
তার প্রতিটি ফোঁটায় ছিল
অসম্পূর্ণ কিছু কথা,
যেগুলো আর বলা হয়নি।

ঘড়ির কাঁটা থেমে থেমে চলেছে,
সময়ও যেন ক্লান্ত -
তোমার ফিরে না আসার খবর
বারবার শুনতে শুনতে।

যে রাতগুলো তোমার নামে কেঁদেছে,
তারা আজও জেগে আছে আমার ভেতরে-
আমি শুধু দিন কাটাই,
আর রাতগুলো…
তোমার নামেই বেঁচে থাকে।


২৯.      শেষ দেখা


শেষ দেখা আর কোনোদিন শেষ হয়নি—
তুমি চলে গেছ বলেই কি যাওয়া শেষ?
চোখের পাতায় এখনো ভিজে থাকে
সেই বিদায়ের বিকেল, থমকে থাকা শ্বাস।

তোমার বলা শেষ কথাগুলো
আজও বাতাসে ঘুরে বেড়ায়,
নীরব রাতে হঠাৎ হঠাৎ
আমার নাম ধরে ডাকে- অচেনা ছায়া।

আমরা শেষবার তাকিয়েছিলাম যেদিন,
সময় সেদিন থেমে গিয়েছিল কোথাও,
তারপর থেকে প্রতিটি দিনই
একটা অসমাপ্ত শেষ দেখা- অবিরাম চাও।

তুমি নেই, তবু দেখা হয় প্রতিদিন,
স্বপ্নে, স্মৃতিতে, নিঃশব্দ প্রার্থনায়।
শেষ দেখা আর কোনোদিন শেষ হয়নি,
কারণ ভালোবাসা তো শেষ মানে না,
মানে না কোনো বিদায়।


৩০.       পাতা ঝরার দিনে 


পাতা ঝরার দিনে তুমি এসেছিলে,
সবুজের ভেতর লুকোনো ছিল বিদায়ের ছায়া।
আমি জানতাম না, নতুন পাতার কোমল স্পর্শে
এত তাড়াতাড়ি শীত নামে।

ডালে ডালে স্বপ্ন ঝুলে ছিল,
তুমি ছুঁতেই কেঁপে উঠেছিল সময়।
হাসির ভাঁজে ভাঁজে জমে ছিল
অচেনা কান্নার জল।

তুমি এসেছিলে আলো হয়ে,
কিন্তু আলোও যে ক্লান্ত হয়,
সন্ধ্যা নামল,
পাতারা একে একে ছেড়ে দিলো হাত।

আজও পাতা ঝরার সেই দিনটাকে
আমি শোকের মতো বয়ে বেড়াই,
কারণ সেদিনই বুঝেছিলাম,
কিছু আগমন মানেই চিরবিদায়।


৩১.     শেষবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে


শেষবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে
কোনো দাবি নয়, কোনো অধিকারও নয়,
শুধু বিদায়ের আগে
হাতের ভাঁজে জমে থাকা নীরবতা ছুঁয়ে দেখা।

তুমি যেমন ছিলে-
হালকা আলোয়, অল্প হাসিতে,
তেমনি করে ছুঁয়ে নিতে চাই
সময়ের কাঁটা থামিয়ে এক মুহূর্ত।

শব্দ নয়, প্রতিশ্রুতি নয়,
শুধু স্পর্শের ভেতর একটু থাকা-
যেন হৃদয় বুঝে নেয়,
সব শেষ হলেও
ভালোবাসা পুরোপুরি যায় না।

শেষবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে-
যেন আঙুলের ডগায়
তোমার অস্তিত্ব রেখে
আমি একা ফেরার সাহস পাই।


৩২.       শীতল হাওয়ায় লেখা চিঠিগুলো


শীতল হাওয়ায় লেখা চিঠিগুলো
ডাকবাক্সে পৌঁছায় না কখনও-
ওরা থামে জানালার কাচে,
কুয়াশার মতো অস্পষ্ট,
তবু স্পষ্ট অনুভবে ভেজা।

প্রতিটি অক্ষর ছিল নিঃশ্বাসে গড়া,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
হাওয়ার বুক কেঁপে উঠত,
পাতারা জানত-
কোনো এক অপেক্ষা আজও জেগে আছে।

রাতের নীরবতায় চিঠিগুলো খুলে পড়ি,
শব্দ নয়, ছোঁয়া পড়ে হাতে,
শীতলতার ভেতরেও
একটা উষ্ণতা লুকিয়ে থাকে-
যেমন তুমি ছিলে, দূরে থেকেও কাছে।

ভোর এলে হাওয়া সব মুছে নেয়,
চিঠিগুলো মিলিয়ে যায় আকাশে,
কিন্তু আমার বুকের ভাঁজে
রয়ে যায় সেই লেখা-
যা কখনও পাঠানো হয়নি,
তবু আজও প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে যায়।


৩৩.      বৃষ্টির ভেতর তোমার গন্ধ


বৃষ্টির ভেতর তোমার গন্ধ
ভেজা মাটির মতো নীরব, গভীর,
আকাশ যখন ক্লান্ত হয়ে ঝরে পড়ে,
আমার বুকের ভেতর তখন তোমার নাম জেগে ওঠে ধীর।

ছাতার নিচে জমে থাকা স্মৃতিগুলো
হঠাৎ হাওয়ায় খুলে যায়,
প্রতিটি ফোঁটা বৃষ্টি যেন
তোমার স্পর্শের পুরোনো ডাক বহন করে আনে।

জানালার কাচে নামহীন রেখা টানি,
সেখানে ভিজে থাকে তোমার মুখ,
শব্দহীন শহর বুঝে ফেলে—
কিছু ভালোবাসা উচ্চারণ চায় না, শুধু থাকুক।

বৃষ্টি থেমে গেলে সব শুকিয়ে যায়,
কেবল যায় না তোমার গন্ধ,
ভেতরের কোনো এক অদৃশ্য ঋতুতে
সে আজও নীরবে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে অনন্ত।


৩৪.      ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে

তোমাকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে
যেন আঙুলের ডগায় থেমে থাকে তোমার উষ্ণতা,
যেন বিদায়ের আগে সময়টা
হঠাৎ নরম হয়ে বসে আমার পাশে।

এই স্পর্শে আর চাওয়া নেই কোনো কথা,
নেই প্রতিশ্রুতির ভার-
শুধু এক মুহূর্তের নীরবতা,
যেখানে হৃদয় বলে ওঠে সব।

যদি যেতে হয়, যাও
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার
আমার হাতটা ধরে রাখো,
যেন শূন্যতাও শেখে, কীভাবে পূর্ণ হতে হয়।

তোমাকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে
এই ইচ্ছেটুকু নিয়েই
আমি বেঁচে থাকব বহুদিন,
স্পর্শহীন স্মৃতির কাছে।


৩৫.       জ্যোৎস্না, নদী ও তুমি


জ্যোৎস্না নামলে নদীর বুকে
রুপোলি নীরবতা নামে,
ঢেউগুলো তখন আর ঢেউ থাকে না-
তোমার চুলের মতো এলোমেলো স্মৃতি হয়ে যায়।

নদী জানে তোমার হাঁটার শব্দ,
চেনা পায়ের ছায়া ধরে সে বয়ে চলে,
তার বুকের গভীরে লুকোনো থাকে
আমাদের বলা হয়নি এমন কত কথা।

জ্যোৎস্না তোমার কপালে এসে বসে,
চোখের ভেতর জ্বলে ওঠে দূর কোনো রাত,
আমি দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখি-
তুমি, নদী আর আলো— এক হয়ে যাও।

সেই রাতে নদী থামে না,
জ্যোৎস্না ফুরোয় না,
আর তুমি-
আমার সমস্ত নীরবতার নাম হয়ে থাকো।


৩৬.     দার্জিলিংয়ে শীতের বিকেল 


দার্জিলিংয়ে এক শীতের বিকেল,
কুয়াশা আর চায়ের ধোঁয়ার ফাঁকে
এক রমণীর উপর দৃষ্টি আটকে গেল
পাহাড় থমকে গেল সময়ও যেন।

তারপর এল কিছু মধুর সময়,
হাসির উষ্ণতায় গলে গেল শীত,
হাতের ভাঁজে জমে রইল স্বপ্ন,
চোখে চোখে লেখা হল নীরব প্রতিশ্রুতি।

তারপর বিচ্ছেদ,শব্দহীন, অথচ ভারী।
একজন চলে গেল আটলান্টিকের ওপারে, নোনা হাওয়ার দেশে, 
আরেকজন পড়ে রইল যমুনা তীরে,
চেনা জলের কাছে।

মাঝখানে পড়ে রইল স্মৃতি,
দার্জিলিংয়ের সেই শীতের বিকেল-
যেখানে আজও কুয়াশা নামলে
দু’টি ভিন্ন পৃথিবী এক মুহূর্তের জন্য
আবার মুখোমুখি হয়।


৩৭.      পাইনঘেরা পথ

জলাপাহাড় ছাড়িয়ে পাইনঘেরা পথ নিঝুম,
দিনের বেলাতেও ঝিঁঝির একাকী ডাক।
ছোট্ট শহর মাঝে মাঝে
একটা-দুটো গাড়ি এসে থেমে যায়,
যেন শব্দও এখানে সাবধানে হাঁটে।

তুষার-শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে
আত্মনিমগ্ন এক লেখক,
ভাষা হারায়, শব্দ গলে যায় চোখে।

১৯৯৫, দার্জিলিং
গরমকালের ভেতরেও শীতের মতো নীরবতা।
হঠাৎ এক রমণীর দর্শন+
নিস্তরঙ্গ পুকুরে ছোঁয়া পড়ার মতো,
চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে যায় অবাক হয়ে।

মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা,
জ্বলন্ত সিগারেট কখন পুড়ে খাক-
চেইন স্মোকার ভুলে যায়
পরের আগুন ধরাতে।

এইসব কিছুর নীরব সাক্ষী দার্জিলিং।
কতো বছর আগের সেই নির্বাক প্রেম
শান্ত দীঘির শীতল জল হয়েই রয়ে গেল।
দু’জনেই আজ অতীত-
একজন পড়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে, 
আরেকজন এপারে স্মৃতির পাড়ে। 


৩৮.      তুমি নেই


তুমি নেই 
তবু সকালের আলোয় তোমার ছায়া জেগে ওঠে,
জানালার ধারে বসে থাকা নীরবতায়
তোমার নিঃশ্বাসের মতো কিছু একটা কাঁপে।

তুমি নেই
তবু প্রতিটি পথে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ থেমে যাই,
মনে হয় এই তো, তুমি ডাকলে পেছন থেকে।

তুমি নেই
তবু বৃষ্টির শব্দে তোমার নাম ঝরে পড়ে,
ভেজা শহরের বুকের ভেতর
আমাদের বলা হয়নি এমন কথারা ভেসে যায়।

তুমি নেই
তবু রাতে ঘুম আসে না,
কারণ অন্ধকার জানে
কাকে না-পাওয়ার ব্যথা নিয়ে আমি বেঁচে আছি।

তুমি নেই
তবু সবখানে তুমি,
আমার স্মৃতি, আমার শূন্যতা,
আর বেঁচে থাকার প্রতিটি দীর্ঘ মুহূর্তে।


৩৯.    তুমি চলে গেছ


তোমার না থাকা আমার বুকের গভীরে
অদৃশ্য ঢেউ তুলে হাহাকার করে।
নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে স্মৃতির ঘর,
দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকে
তোমার বলা না বলা কথাগুলো।

রাত নামলে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে
আমি তোমার ছায়াকে ডাকি-
রাতগুলো এখন দীর্ঘ, অতল,
একাকিত্বের সিঁড়ি বেয়ে নামে।
ঘড়ির কাঁটা থেমে থেমে চলে,
সময়ের প্রতিটি ফাঁকে
আমি একাই বসে থাকি,
তোমার ফেলে যাওয়া নীরবতার পাশে।

তোমার অনুপস্থিতি এক মায়াবী উপস্থিতি—
সবকিছুর ভেতর ঢুকে থাকে,
আমার নিঃশ্বাসে, আমার দীর্ঘশ্বাসে।
তুমি নেই, তবু এই হৃদয়ের গভীরে
তুমি অদ্ভুতভাবে রয়ে গেছ চিরকাল।

তুমি চলে গেছ, আর তোমার না থাকা
আমার বুকের গভীরে এক নীল নীরবতা।
শ্বাস নিলেই কাঁপে সেই শূন্যতা,
যেন কোনো অচেনা পাখি
ভাঙা ডানায় ডেকে ওঠে ভেতর থেকে।

শহর ঘুমোয়, আলো নিভে যায়,
কেবল আমার জানালায় জেগে থাকে
তোমার নামহীন স্মৃতি।
কথা বলার কেউ নেই, তবু বুকের ভেতর
অবিরাম কথোপকথন চলে।

তোমার অনুপস্থিতি এখন এক মায়া—
স্পর্শহীন, অথচ ভারী, 
আমি একা, নিঃসঙ্গতার গভীর জলে দাঁড়িয়ে
প্রতিদিন ডুবে যাই তোমাকে না পাওয়ার দিকে।


৪০.     হাওয়ার রাত 


সেদিন বৃষ্টিমুখর হাওয়ার রাত ছিল,
জানালার কাঁচে কাঁচে ভিজে যেতো চাঁদের আলো।
তোমার চুলে বৃষ্টির গন্ধ,
আর চোখে অকথিত হাজারটা কথা।

হাওয়ারা চুপিচুপি এসে
তোমার আঁচলের কোণায় আশ্রয় নিত,
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন
আমাদের নিঃশ্বাসের তাল মিলিয়ে পড়ছিল।

আমি বলিনি কিছু,
নীরবতার ভেতরেই প্রেম জমে উঠেছিল।
তোমার হাতের উষ্ণতায়
সেই রাতটা ধীরে ধীরে আমার হয়ে গিয়েছিল।

আজও যখন বৃষ্টি নামে,
হাওয়ার বুক চিরে সেই রাত ফিরে আসে-
একফোঁটা বৃষ্টি,
একটুখানি তুমি,
আর অসীম রোমান্টিক স্মৃতি।


৪১.     সেদিন রাত ছিল বৃষ্টির


সেদিন বৃষ্টিমুখর হাওয়ার রাত ছিল,
শ্যামল অন্ধকারে ভিজে ছিল দিগন্ত।
কদম্বতলে ঝরে পড়া বৃষ্টিধারা
যেন শ্যামের বাঁশির তানে তানে কেঁপে 
উঠেছিল মন।

নয়নভরা কাজল-জল, ওগো প্রিয়া,
অভিসারের লাজে কাঁপে দেহমন।
ভেজা আঁচল সরে সরে যায়,
হৃদয়খানি ডাকে আয় রে, আপনজন!

পায়ে পায়ে বাজে নূপুরের শব্দ,
বিজলি-আলোর চমকে জ্বলে ওঠে চরণ।
বুকের গোপন বৃন্দাবনে
জাগে রসের লীলা, জাগে মধুর অন্বেষণ।

বৃষ্টি বলে- মিলন হোক,
হাওয়া বলে- বিলম্ব কেন?
আমি নীরবে লুটাই তোমার চরণে,
তুমিই যে আমার রাধা,
আর এই বিরহভেজা রাত আমার 
শ্যাম-স্বপনে।


৪২.    তুমি আছ বলেই পৃথিবী


তুমি আছ বলেই পৃথিবী ভালো লাগে,
আকাশের নীলটুকু আমার চোখে ধরে।
ভোরের আলো ডাকে নাম ধরে,
রাতের চাঁদ জানে— আমি একা নই আর।

তুমি থাকলে পথও কথা বলে,
ধুলো মাখা শহর ফুল হয়ে ওঠে।
ক্লান্ত দিনের শেষে বুকের ভেতর
একটুখানি আশ্রয় জ্বলে থাকে।

তুমি না থাকলে কী থাকবে বলো-
রোদ, বৃষ্টি, গান সবই অর্থহীন।
সময় তখন ভারী পাথরের মতো
বুকে চেপে বসে, শ্বাস নিতে দেয় না।

তাই বলি, তুমি আছ বলেই আমি আছি,
এই পৃথিবীটুকু ধরে রেখেছি হাতে।
তুমি না থাকলে-
আমি হয়তো পৃথিবী ছেড়ে
নীরব কোনো দূরত্বে হেঁটে যাব।


৪৩.      তুমি না থাকলে 


তুমি না থাকলে রাস্তাঘাটও খালি হয়ে যায়,
হর্ণ বাজে না,
রাক্ষুসী নিরবতা নেমে আসে তোমার 
না থাকার নামে।
দোকানের শাটার অকারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
জানালার কাঁচে আটকে থাকে অব্যক্ত আলো,
পথচলার শব্দগুলো হঠাৎ থেমে গিয়ে
নিজেরই প্রতিধ্বনি শুনতে থাকে।

তুমি না থাকলে সময়ও হাঁটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে,
ঘড়ির কাঁটা যেন ভুলে যায় এগোতে,
একেকটা মুহূর্ত জমে ওঠে ধুলোর মতো
বুকের গভীর কোনো অচেনা তাকের ওপর।

নদীও তখন তার স্রোত লুকিয়ে ফেলে,
চাঁদ মুখ ফিরিয়ে নেয় আকাশের কিনারা থেকে,
শহর জুড়ে শুধু প্রশ্ন-
এত আলো ছিল, এখন অন্ধকার কার?

তুমি না থাকলে
সব কিছু আছে, অথচ কিছুই নেই,
আমার অস্তিত্বটুকুও দাঁড়িয়ে থাকে
তোমার অনুপস্থিতির পাশে-
নিঃশব্দ, মায়াবী, নিঃস্ব।


৪৪.     সন্ধ্যার আলোছায়া 


সূর্যাস্তের লাল আভার মতো হারিয়ে যাও তুমি
সন্ধ্যার আলোছায়ার অন্ধকারে নিঃশব্দে, ধীর।
পাখিরা ফেরে নীড়ে, 
আকাশ নামিয়ে আনে ক্লান্তি,
আমার চোখে জমে থাকে তোমার শেষ 
বিকেলের নীরব নীল।

বাতাসে ভাসে না-বলা কথা, অর্ধেক স্পর্শের স্মৃতি,
দূরের প্রদীপগুলো কাঁপে তোমার নামের আলোয়।
রাত্রি নামে, তারাদেরও যেন জিজ্ঞাসা-
কেন কিছু মানুষ হারিয়েও থেকে যায় হৃদয়ের ছায়ায়।

তুমি মিলিয়ে গেলে সময়ের কোমল ভাঁজে,
আমি রয়ে গেলাম সন্ধ্যার মতো 
অল্প আলোয়, অল্প অন্ধকারের আঁধার হয়ে।


৪৫.      হঠাৎ দেখা

হঠাৎ করে একদিন তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল—
যেন অচেনা দুপুরে আচমকা নেমে এলো বৃষ্টি।
চেনা রাস্তাটাও তখন নতুন হয়ে উঠল,
আমার দীর্ঘ নীরবতার ভেতর ডাক দিলে তুমি।

চোখে চোখ পড়তেই সময় থমকে দাঁড়াল,
শব্দেরা ভুলে গেল তাদের উচ্চারণ।
তোমার হাসির কোণে আটকে রইল আমার দিনগুলো,
যেগুলো এতকাল কেবল ক্লান্ত হয়ে ফিরত।

আমি জানতাম না-
এক মুহূর্তেই এত স্মৃতি জন্ম নিতে পারে,
একটা দেখা এত গভীর দাগ রেখে যায়
হৃদয়ের অদৃশ্য পাতায়।

হঠাৎ দেখা, তবু মনে হলো
তোমাকে আমি চিনি বহু জন্ম ধরে-
এই অচেনা ভালোবাসা
আজও আমাকে ধীরে ধীরে নিজের করে নেয়।


৪৬.       নিখোঁজ বিজ্ঞাপন


হারিয়ে গেছ তুমি, খুঁজি তোমাকে
পত্রিকার বিজ্ঞাপনে,
কালো অক্ষরে ছাপা থাকে কি তোমার খবর?
ঠিকানা ছাড়া এক নাম, এক টুকরো বয়স,
আর 'শেষবার দেখা গেছে'- এই কথাটুকুতে
আমার সমস্ত রাত আটকে যায়।

আমি প্রতিদিন চা ঠান্ডা হতে দিই,
পাতা উল্টাই ধীরে,
যেন কোনো কলামের ফাঁকে
হঠাৎ পড়ে যাবে তোমার চোখের দৃষ্টি।
কেউ হারিয়েছে কুকুর,
কেউ ঘড়ি, কেউ ছায়া-
আমি হারিয়েছি মানুষ,
সে খবরের জায়গা কি এতই ছোট?

শহর ভরে ওঠে অফার আর ঘোষণা,
আমার বুক ভরে ওঠে নীরবতায়।
যদি কখনও ছাপা হয় তোমার ফিরে আসার খবর,
আমি বিজ্ঞাপনের ভাষা ভুলে যাব,
কাগজ ভিজিয়ে দেব চোখের জলে,
আর শিখব নতুন করে-
পাওয়া মানে শুধু পাওয়া নয়,
হারিয়ে খুঁজে পাওয়া মানেই বেঁচে থাকা।


৪৭.     প্রথম রাত প্রথম স্পর্শ 


তোমার নাভীতে পদ্মরাগমণি ফুটে আছে,
সন্ধ্যার দীপের মতো জ্বলজ্বল করছে -,
তার চারপাশে আলো ছায়ার ঢেউ,
যেন সৃষ্টির প্রথম বৃত্তে
একটুখানি আগুন রেখে গেছে ঈশ্বর।

আর একটি শঙ্খচূড় ওঁৎ পেতে আছে
সময় নয়, কামনার প্রহরী,
ছোবল দিতে নয়,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা মাপতে।

তোমার দেহে হাত রাখলে
হঠাৎ শাস্ত্র ভুলে যায় শব্দ,
মন্ত্রগুলো খুলে পড়ে চুলের ভাঁজে,
নীরবতা শেখে নতুন উচ্চারণ।

চোখের পাতায় জমে থাকে অলক্ষ্য ডাক
এসো, কিন্তু ভেঙো না সীমার রেখা,
মাধুরি তো তৃষ্ণার নাম নয়,
সে তো ছুঁয়ে না-ছোঁয়ার চিরন্তন কাঁপুনি।

তোমার নাভীর কাছে এসে
আমার সমস্ত ভাষা থেমে যায়-
আমি শুধু মানুষ হয়ে থাকি,
আর তুমি প্রথম রাতের প্রথম স্পর্শের
মতো কেঁপে ওঠো।


৪৮.       যে রাতগুলো তোমাকে ডাকে


যে রাতগুলো তোমাকে ডাকে
চাঁদের নীল ঠোঁটে ভেজা নাম ধরে-
আমি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
অন্ধকারের সাথে কথা বলি।

নক্ষত্রেরা জ্বলে ওঠে পুরোনো স্মৃতির মতো,
হাওয়ার ভেতর ভেসে আসে
তোমার অনুচ্চারিত নিঃশ্বাস,
শহর ঘুমোয়—আমার ভেতর জেগে থাকে তোমার ছায়া।

ঘড়ির কাঁটা থেমে যায় একসময়,
সময়ের বুকের উপর পড়ে থাকে
আমাদের না-বলা কথাগুলো,
রাত তাদের লুকিয়ে রাখে শিশিরে।

যে রাতগুলো তোমাকে ডাকে
তারা জানে-
ভোর এলে তুমি আর আসবে না,
তবু অন্ধকার বিশ্বাস করে অপেক্ষাকে।

আমি সেই রাতগুলোর সাথে হেঁটে যাই,
নিঃশব্দ দীর্ঘ পথে,
যেখানে প্রতিটি পা ফেলার শব্দে
তোমার নাম আরেকবার উচ্চারিত হয়।


৪৯.      যমুনা তীরে শেষ প্রার্থনা


যমুনা তীরে দাঁড়িয়ে আছি
জল ছুঁয়ে আছে সন্ধ্যার নীল বিষাদ,
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে আসে
অধরা দিনের নাম, তোমার নাম।

পাড়ের কাশবনে বাতাস থেমে যায়,
যেন সে-ও শোনে হৃদয়ের শেষ উচ্চারণ,
আমি হাত জোড় করি—কোনো দেবতার নয়,
তোমার স্মৃতির কাছে।

জলের বুকে জ্বলে ওঠে জ্যোৎস্না,
চোখের জলে মিশে যায় তার আলো,
যা কিছু চাইবার ছিল জীবনে,
সবই ছিল তুমি—আর কিছু নয়।

যমুনা জানে কত কথা বলিনি,
কত বিদায় গোপনে রেখে দিয়েছি,
তার স্রোতে ভাসাই আজ শেষ প্রার্থনা-
যদি কখনও ফিরে আসো,
এই তীরেই এসো,
আমার নীরবতার কাছে।


৫০.      নাভিকাব্য


কালিদাসের বর্ণিত নিম্ননাভি-
যেন বসন্তের গোপন হ্রদ,
যেখানে মেঘ এসে থমকে যায়,
আর দৃষ্টি হারায় নিজের সংযম।

চন্দনের রেখা ভেঙে ভেঙে নামে
কোমল উদরের নিঃশ্বাসে,
নাভির গভীরে লুকানো এক বিন্দু রহস্য-
প্রেমের আদ্যশ্লোক, অনুচ্চারিত।

শকুন্তলার লজ্জা সেখানে
আজও কাঁপে অলক্ষ্যে,
মেঘদূতের বার্তা এসে
সেই বৃত্তে ঘুরে ঘুরে হারায়।

নিম্ননাভির নীরবতায় 
রতি দেবীর মৃদু হাসি,
শরীর নয় এ এক কাব্যভূমি,
যেখানে স্পর্শ মাত্র পদ্য হয়ে যায়।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন