সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

মাধুরীর কাছে ( কাব্যগ্রন্থ )



মাধুরীর কাছে   ( কাব্যরন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং


উৎসর্গ  -

ওরা দুজনই ছিল আমার প্রিয় বন্ধু,
আমারই সহপাঠী।

একদিন আমরা তিনজন সারাদিন কাটিয়েছিলাম
বোটানিক্যাল গার্ডেনের ফুলে ভরা পথ আর সবুজ ছায়ার ভেতর।
দিনটি ছিল — ৭.৭.৭৭।

একজন মোশাররফ,
আরেকজন লুসী।
আজ তারা দুজনেই দূর দেশে, মার্কিন মুলুকে।
সময় তাদের একসাথে বেঁধেছে সুখী দাম্পত্যে।

আমি জানি না,
ওরা এখনো আমাকে মনে রেখেছে কি না—
তবু এই গ্রন্থখানি
সপ্রেমে তুলে দিলাম
ওদের করকমলে।


ভূমিকা -

কবিতা কখনও নিছক শব্দের সাজ নয়,
এ যেন হৃদয়ের ভেতর জন্ম নেওয়া এক অনিবার্য জ্যোতি,
যা কখনও প্রেম হয়ে জ্বলে ওঠে,
কখনও প্রকৃতির সবুজ নীরবতায় ভিজে যায়,
আবার কখনও দ্রোহের আগুন হয়ে
অন্যায় আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।

এই বইয়ের কবিতাগুলো সেই তিনটি নদীর স্রোত -
প্রেম, প্রকৃতি এবং দ্রোহ।
তিনটি স্রোত, কিন্তু উৎস একটাই,
মানুষের হৃদয়।

প্রেম এখানে কেবল দু’টি মানুষের মৃদু স্পর্শের গল্প নয়;
এ প্রেম কখনও অপেক্ষার, কখনও হারানোর,
কখনও বা অদ্ভুত এক নীরব আকুলতার।
যে প্রেম চোখের গভীরে জ্বলে ওঠে,
আবার অন্ধকার রাতের ভেতর নিঃশব্দে
কারও নাম ডেকে যায়।

প্রকৃতি এই কবিতাগুলোর আরেকটি নিবিড় সঙ্গী।
এখানে আছে বৃষ্টির ভেজা গন্ধ,
শীতের কুয়াশায় জড়িয়ে থাকা ভোর,
হেমন্তের সন্ধ্যায় ঝরে পড়া পাতা,
আর দূর আকাশে উড়ে যাওয়া একাকী পাখির ডাক।
প্রকৃতি এখানে শুধু দৃশ্য নয়,
এ যেন মানুষের আত্মার প্রতিবিম্ব।

আর আছে দ্রোহ,
যে দ্রোহ মানুষের অন্তরে জন্ম নেয়
অবমাননা, অবিচার আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে।
এই দ্রোহ কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়,
কখনও তা নিঃশব্দ আগুনের মতো জ্বলে,
শব্দের ভেতর, নীরবতার ভেতর,
একটি মানুষের অবিচল বিশ্বাসের ভেতর।

এই বইয়ের কবিতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ নয়।
এগুলো এসেছে জীবনের কাছ থেকে,
ভালোবাসার কাছ থেকে,
মাটির গন্ধ থেকে,
এবং মানুষের অদম্য স্বপ্ন থেকে।

যদি কোনো পাঠক এই কবিতার ভেতর
নিজের কোনো হারানো অনুভূতি খুঁজে পান,
যদি কোনো শব্দ তাকে একটু থামিয়ে দেয়,
কিংবা কোনো পঙক্তি তার মনে অচেনা আলো জ্বালায় -
তাহলেই এই শব্দগুলোর জন্ম সার্থক।

এই বই তাই কেবল কবিতার সংকলন নয়,
এ এক যাত্রা।
হৃদয় থেকে হৃদয়ে,
মানুষ থেকে মানুষের কাছে।

— লেখক


১.      মাধুরীর কাছে 


তোমার মাধুরী, তোমার অপার সৌন্দর্য
আমাকে উন্মুখ করে তোলে,
যেন গোপন বসন্তরাতে নিশীথ বনের 
বুকে হঠাৎ অজানা কোনো ফুল 
মধুর গন্ধে জেগে ওঠে।

তোমার চোখের গভীরতায়
আমি ডুবে যাই ধীরে ধীরে,
যেন নক্ষত্রভরা আকাশে
হারিয়ে যাওয়া কোনো পথিক
তার নিজের দিক ভুলে ফেলে।

তোমার ঠোঁটের লালিমা
অচেনা কোনো মধুমাখা পুষ্পের মতো,
যার কাছে এলেই আমার হৃদয়
এক উন্মনা ভ্রমরের মতো কেঁপে ওঠে।

তোমার হাসি যখন নীরবে ঝরে পড়ে
আমার চারপাশে আলো ছড়িয়ে যায়,
যেন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো
অন্ধকার নদীর জলে নিঃশব্দে দুলে ওঠে।

তোমার কাছে দাঁড়ালে
দেহের ভেতর জেগে ওঠে অদ্ভুত এক স্পন্দন,
যেন লাজুক কোনো লতা
মলয় বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে
প্রিয় বৃক্ষের বুকে আশ্রয় খোঁজে।

তোমার চুলের গন্ধে
রাত্রি হয়ে ওঠে আরও গভীর,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত সত্তা জেগে ওঠে
অজানা এক মধুর আকাঙ্ক্ষায়।

তুমি যখন খুব কাছে এসে দাঁড়াও
মনে হয় সময় থেমে গেছে,
শুধু হৃদয়ের ভিতরে
একটি গোপন আগুন জ্বলে,
যার শিখায় জড়িয়ে থাকে
তোমার মায়াময় শরীরের স্বপ্ন।

সত্যি বলছি,
তোমার এই মাধুরী, এই মোহময় রূপ
আমার সমস্ত বোধকে বন্দী করেছে,
আমি প্রতিদিন নতুন করে
তোমার প্রেমে হারিয়ে যাই।

আর যদি কখনো
এই জীবনের সব পথ শেষ হয়ে যায়,
তবু আমি চাই -
তোমার মধুর আলিঙ্গনের ভেতর
এক অনন্ত বসন্ত হয়ে
চিরদিন উন্মুখ হয়ে থাকতে।


২.     যে মেয়েকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে


যে মেয়েটি প্রেমিকের সাথে ঝগড়া করে
হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে,
তারপর নাক চোখ লাল করে
ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে -
সরি, আর রাগ করো না প্লিজ…
আর হঠাৎই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে,
সেই মেয়েটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি অভিমানে চুপ করে থাকে,
কিন্তু একটু আদর পেলে
হঠাৎ শিশুর মতো কোমল হয়ে যায়
মুঠোফোনের ওপাশে মৃদু কণ্ঠে বলে,
তুমি না থাকলে আমার একদম ভালো লাগে না…
সেই মেয়েটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি বৃষ্টির দিনে জানালায় দাঁড়িয়ে
অকারণে ভিজতে চায়, আর বলে -
চলো না, আজ পৃথিবীটাকে একটু ভিজিয়ে দেখি,
তার চোখে জমে থাকা
অদ্ভুত মায়া আর দুরন্ত স্বপ্ন দেখে
ভীষণ করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি রাগ করে দূরে সরে যায়,
তবু একটু ডাকলেই ফিরে এসে
বুকের ভেতর মাথা রাখে -
যেন পৃথিবীর সব ঝড়ের
একটাই নিরাপদ আশ্রয় আছে।

হ্যাঁ,
এমন অদ্ভুত, সরল, মায়ামাখা
অল্প রাগী, অল্প বোকা, অল্প শিশুসুলভ 
এক মেয়েকে -
ভীষণ করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।


৩.     একাকীত্বের বাঁকে


তুমি চলে গেছ এইজন্য কোনো অনুযোগ নেই
শুধু খারাপ লাগবে তখন -
বুড়িগঙ্গার নদীর কূল, রেসকোর্সের দীঘিরপাড়,
বোটানিক্যাল গার্ডেনের ঝাউতলা, দিয়াবাড়ির কাশবন,
ওরা সবাই আমাকে একা দেখলে হাসবে,
পরিহাস করে বলবে - 
একলা মানুষ একা একা কেমন লাগে!

তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা যে চা খেয়েছিলাম
শিশুপার্কের সামনে, সেই গরম কাপের গন্ধ এখনও মিশে আছে বাতাসে।

শীতের বিকেলে হেঁটে হেঁটে আমরা যে আকাশ দেখেছি,
নীল রোদে ভেজা পাখির গান শুনেছি
আজ সেগুলো একাকী মনে পড়ে,
আর চোখের কোণ ঝাপসা হয়ে আসে, অচেনা নদীর মতো।

তুমি একবার বলেছিলে - এই পথটাতে আবার আমরা একসাথে হাঁটব,
আজ সেই কথার প্রতিটি শব্দ আমার কানে বাজে
যেন বাতাসের সাথে ভেসে আসা পুরোনো গান।

স্মৃতির পাতায় আঁচড় খায় আমার মন,
কাছে কেউ নেই, শুধু আমার ছায়া, এবং হাহাকার,
ছায়াবীথির ধুলোমাখা বেঞ্চে বসে
আমি তোমার না থাকা অনুভব করি --
হৃদয়ের গহীনে যে মায়া জমেছে, 
তাকে শুধু দম দিয়ে রাখি, নদীর কূল, দীঘির পাড়, 
নির্জন পথ- কাউকে কিছু বুঝতে দিই না।


৪.     সেদিনের বৃষ্টি


একদিন আমরা  ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজব
যেদিন আমাদের জন্য আকাশ কালো করে 
নামবে মুশল ধারায় বৃষ্টি।

শহরের ভিড় তখন দূরে সরে যাবে,
রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হয়ে
জলরঙে আঁকা ছবির মতো কাঁপবে-
আর তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে
আমার খুব কাছাকাছি।

তোমার ভেজা চুলের ফাঁকে
জলবিন্দু জমে থাকবে ছোট ছোট স্বপ্ন হয়ে,
আমি নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে
সেই স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে দেখব।

তখন হয়ত তুমি হেসে বলবে
আজ বৃষ্টি শুধু আমাদের জন্যই নেমেছে।
আর আমি ভাবব -
এই পৃথিবীতে যত নদী, যত আকাশ,
সবই বুঝি এমন মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে।

আমরা হাঁটব ধীরে ধীরে,
জলভেজা রাস্তায় পায়ের শব্দ তুলে,
বুকের ভিতর জমে থাকা ভালোবাসা
বৃষ্টির মতো ঝরে পড়বে নীরবে।

সেদিন কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না -
শুধু কালো আকাশ আর বৃষ্টি জানবে,
দুজন মানুষ ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে
একটা ছোট পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছিল
অঝোর ধারায় বৃষ্টির ভিতর। 


৫.     নিয়মভাঙা রাত


চলো,
ভুল করে নিয়ম ভাঙার পথে হেঁটে যাই দুজনে
যেখানে পৃথিবীর সব বিধি
আমাদের নিঃশ্বাসের কাছে হার মানে।

তোমার বুকের যে ক্ষতগুলো
অভিমান হয়ে জমে আছে বহুদিন,
আমি সেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি -
চুমুর উষ্ণ ঔষধে
ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলি প্রতিদিন।

তুমি চোখ বন্ধ করলেই রাত একটু 
বেশি গাঢ় হয়,
আমার আঙুলের স্পর্শে তোমার কাঁপা নিঃশ্বাস
অদ্ভুত এক আগুন হয়ে জ্বলে রয়।

চলো,
ভুল করে নিয়ম ভাঙার পথে আবার হাঁটি
উন্মাদ বাতাসে ঝাপটে ধরি একে অপরকে,
তোমার কাঁধে এলিয়ে পড়ে শুনি
হৃদয়ের গোপন সুর।

তোমার শীৎকারে জেগে ওঠে রাত,
জানলার বাইরে থেমে থাকে চাঁদের আলো,
আমরা দুজন -
ভালোবাসার উষ্ণতায়
ভেঙে ফেলি সব নীরবতার তালা।

শেষে ক্লান্ত হয়ে
তোমার বুকের বাঁ পাশে মাথা রাখি
যেখানে রোজ একটু ব্যথা জমে,
সেখানে আমি প্রগাঢ় ভালোবাসা হয়ে
নিঃশব্দে জড়িয়ে থাকি।

চলো,
এই ভুলের পথেই হাঁটি আরও দূর
কারণ কিছু ভুলই
সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা হয়ে থাকে। 


৬.     হারিয়ে যাওয়ার গল্প


যারা ছেড়ে যায়, তারা আসলে কখনোই ছিল না
তাদের চোখে ছিল সাময়িক রোদের মতো উষ্ণতা,
কিছু কথার মায়া, কিছু প্রতিশ্রুতির ছায়া-
তারপর একদিন তারা হাওয়ার মতো সরে যায় 
যেন পথের ধুলো, হালকা ছোঁয়ায় উড়ে যায় দূরে।

কিন্তু যারা সত্যিই থাকার জন্য এসেছিল,
তারা কখনো বিদায়ের শব্দ শেখেনি 
তারা শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সময়ের ভেতর,
পুরোনো চিঠির গন্ধে, কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে,
অথবা নিঃসঙ্গ রাতের দীর্ঘশ্বাসে।

তখন মনে হয় কেউই সত্যি ছেড়ে যায় না, 
সে থেকে যায় স্মৃতির ম্লান আলো হয়ে,
একটা নামহীন অনুভূতির মতো বুকের গভীরে,
যেখানে হারিয়ে যাওয়াই হয়ত থেকে যাওয়ার 
সবচেয়ে মায়াময় রূপ।


৭.    দার্জিলিংয়ের ভোর 


ডিসেম্বরের দার্জিলিংয়ের সেই ভোর
টয়ট্রেনের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে
গরম চায়ের ধোঁয়া উঠতে উঠতে
আঙুলে জড়িয়ে থাকত কুয়াশা
আর তোমার ঠোঁটের কাছে জমে থাকত
অকথিত চুমুর উষ্ণতা।

মনে পড়ে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটা,
মল রোডের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে থাকা,
দূরে মেঘের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা
কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপালি নীরবতা,
তুমি বলেছিলে,
পাহাড়ের নীরবতাও কখনো কখনো প্রেমে পড়ে।

মনে পড়ে সন্ধ্যার বাতাস,
চায়ের দোকানে ভেসে আসা দার্জিলিং টি-র গন্ধ,
শীতের কাঁপুনি আর তোমার উষ্ণ হাত,
আর টয়ট্রেনের সেই ধীর হুইসেল,
যেন বিদায়ের আগে
আমাদের গল্পটাকে একটু দীর্ঘ করতে চাইছিল।

আজও কখনো শীতের ভোর নামলে
মনে হয় পাহাড়ের কোনো স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি
হাতে ধোঁয়া ওঠা চা, চারপাশে কুয়াশা,
আর স্মৃতির ভিতর তোমার সেই চুমু
নিঃশব্দে আবার ফিরে আসে।


৮.     মায়াবতী, যেও না


এখনো অনেক কবিতা লেখা বাকি
অলিখিত পৃষ্ঠায় ঘুমিয়ে আছে শব্দেরা,
তোমার চোখের ভেতর যে নীল আকাশ দেখি
তারও তো অনেক অনুবাদ বাকি।

বাকি আছে অসমাপ্ত কিছু ছবি
রঙতুলির ডগায় কাঁপে অনন্ত বিকেল,
তোমার চুলে জড়িয়ে থাকা বাতাসটুকু
ক্যানভাসে ধরার চেষ্টা এখনো শেষ হয়নি।

চারাগাছগুলো বনানী হতে
অনেক অনেক ঋতু বাকি
শিশিরভেজা ভোরের ভিতর দিয়ে
তাদের স্বপ্নগুলোকে দেখতে হবে আমাদেরই।

মায়াবতী , এখন কি তবে যাবার সময়?
এখনো তো হেমন্তের ঘাসের উপর
দুজনের পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়া বাকি,
কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা ভোরে
তোমার হাতের উষ্ণতা খুঁজে নেওয়া বাকি।

বাকি আছে রাত্রির তারা খসা
নিস্তব্ধ আকাশের বুক চিরে
হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলো দেখে তোমার নামে 
একটি গোপন প্রার্থনা করা বাকি।

বিদ্যুতের বারুদ আলোয়
অচেনা পৃথিবী দেখা বাকি
ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে
আমাদের হৃদয়ের আগুন চিনে নেওয়া বাকি।

এই সময় যেও না মায়াবতী
এসো, অনাদিকালের সাথে মগ্ন হয়ে থাকি,
সময়ের স্রোত থেমে যাক
আমাদের দুজনের নিঃশ্বাসের মাঝখানে।

দেখবে,
আমাদের সেই স্বপ্নমগ্নতা
নক্ষত্রের সিঁড়ি বেয়ে উঠবে ধীরে ধীরে,
ছায়াপথ ছাড়িয়ে অচেনা কোন আলোর দেশে
আমাদের নামে লিখা হয়ে যাবে এক 
অনন্ত প্রেমের গল্প । 


৯.     একটা জনমের অপেক্ষা 


একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার নামের পাশে আমার অপেক্ষা রয়ে গেল অমলিন।

সময় তার ক্যালেন্ডার বদলেছে বহুবার,
কিন্তু আমার দিনগুলো এখনো তোমার দিকেই 
তাকিয়ে থাকে।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার স্মৃতিরা আমার ভেতরে নদীর মতো 
বয়ে যায়,
কখনো নিঃশব্দে, কখনো জোয়ারের মতো অস্থির হয়ে।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার জন্য রেখে দেওয়া কিছু বিকেল আছে,
কিছু অকারণ দীর্ঘশ্বাস,
আর আছে অচেনা আকাশের নিচে তোমাকে ভাবার একান্ত অধিকার।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু মনে হয়, এই না-পাওয়াটাই যেন এক অদ্ভুত প্রাপ্তি,
কারণ তোমাকে না-পাওয়ার মধ্যেই
আমি শিখেছি ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে।

হয়তো আরেকটা জনম আসবে -
সেখানে কোনো ভুল সময় থাকবে না,
কোনো দূরত্ব থাকবে না।

সেদিন হয়তো বলবো -
এই জনমে তোমাকে পেয়েছি, আর হারাতে চাই না।


১০.     গোপনের তুমি


যাকে গোপনে ভালোবেসেছিলাম সে গোপনেই 
থেকে গেল,
তার সাথে মিলনও হলো না,
বিচ্ছেদও হলো না,
শুধু হৃদয়ের এক গোপন কোণে
তার জন্য একটা আলো জ্বলে রইল।

কেউ জানল না তার নাম,
কেউ শুনল না তাকে ডাকার আমার গোপন স্বর,
শুধু রাতের তারা আর জানালার বাতাস
জেনে গেল আমার গোপন ভালোবাসার গল্প।

তাকে ছুঁইনি কোনোদিন,
তবু কত অকারণ বিকেলে মনে হয়েছে
তার হাতটা আমার হাতেই আছে
যেন অদৃশ্য কোনো পথ ধরে
আমরা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি।

সে ছিল আমার জীবনের সেই কবিতা
যা কখনো লেখা হয়নি পুরো,
শুধু কয়েকটা অসমাপ্ত লাইন
ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে ঘুমিয়ে আছে।

যাকে গোপনে ভালোবেসেছিলাম সে গোপনেই 
থেকে গেল,
তাই আমাদের গল্পে কোনো বিদায়ের শব্দ নেই,
কোনো ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিও নেই,
শুধু এক অদ্ভুত মায়া আছে
যা সময় পেরিয়েও নীরবে বেঁচে থাকে।


১১.    চন্দনের শেষ গন্ধ


চন্দনের গন্ধ মাখা চিতার উপর
যখন মুখে আগুন দেওয়া হয়
তখন কি সত্যিই পুড়ে যায় সেই মুখ,
যে মুখ একদিন স্নিগ্ধ আলোয়
কারও নাম ধরে ডেকেছিল।

সেই চোখ কি সত্যিই নিভে যায়
যে চোখ একদিন সন্ধ্যার আকাশের মতো
প্রিয় মানুষের দিকে চেয়ে থাকত,
আগুনের ভেতর কি হারিয়ে যায়
তার সবটুকু অপেক্ষা?

তার ঠোঁট কি আর খোঁজে না
অপর এক জোড়া ঠোঁটের উষ্ণতা
যেখানে একদিন জমা ছিল
অগণিত অনুচ্চারিত আদর।

নাকি আগুনের পরেও
কোথাও থেকে যায় একটু আলো,
কোনো অদৃশ্য বাতাসে ভেসে থাকে
চন্দনের গন্ধের মতো স্মৃতি।

যেখানে মৃত মানুষটিও
শেষবারের মতো ফিরে তাকায়,
আর প্রিয় মানুষটি বুঝতে পারে -
ভালোবাসা আসলে
কখনোই পুরোপুরি পুড়ে যায় না। 


১২.     একদিন ভালোবাসা 


একদিন সমস্ত অপেক্ষা এসে তোমার দরজায় বসে থাকবে।
একদিন সমস্ত পথ শেষ হয়ে গিয়ে তোমার হাতেই মিশে যাবে।
একদিন সমস্ত নীরবতা চোখের ভেতর কথা বলতে শিখবে।

একদিন সমস্ত চাঁদ জানালার ধারে এসে বলবে -
আজও কি তাকে মনে পড়ে?

একদিন সমস্ত বাতাস তোমার চুলে মুখ লুকিয়ে
আমার নাম উচ্চারণ করবে ধীরে।
একদিন সমস্ত দূরত্ব ক্লান্ত হয়ে
আমাদের মাঝখানে ভেঙে পড়বে।

একদিন সমস্ত রাত তারাগুলো গুনে গুনে বলবে -
ভালোবাসা আসলে হারিয়ে যায় না।

একদিন সমস্ত অভিমান ঘুমিয়ে পড়বে
তোমার কাঁধে মাথা রেখে।
একদিন সমস্ত স্পর্শ নতুন করে আবিষ্কার করবে
মানুষের হৃদয়ের গোপন ভাষা।

একদিন এইসব হবে বলেই
এখনও জানালায় চাঁদের আলো নামে,
এখনও বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে,
এবং এখনও
ভালোবাসার কবিতা লেখা হয়।


১৩.     অচেনা সমীকরণ


কে যে কখন কার হয়
কে যে কাকে ছেড়ে চলে যায়
কে যে কাকে মনে রাখে
কে যে কাকে চিরতরে ভুলে যায়।

জীবন যেন এক অচেনা সমীকরণ,
যেখানে উত্তরগুলো কখনো মেলে না।

কে যে কার অপেক্ষায় জানালা খোলে
কে যে কার জন্য নীরবে দরজা বন্ধ করে,
কে যে কার নাম লিখে রাখে বৃষ্টির কাচে
কে যে কার নাম মুছে দেয় এক ফুঁয়ে।

কে যে কার স্বপ্ন হয়ে আসে নিঃশব্দে
কে যে কার ঘুম ভেঙে দিয়ে হারিয়ে যায়,
কে যে কার চোখে রেখে যায় নীল বিষাদ
কে যে কার বুকভরা আলো হয়ে রয়।

কেউ আসে অল্প দিনের অতিথি হয়ে,
কেউ থেকে যায় সারাজীবনের মতো -
তবু শেষমেশ বোঝা যায়,
মানুষের হৃদয়টাই পৃথিবীর সবচেয়ে
মায়াময় আর অদ্ভুত রহস্য।


১৪.     ভালোবাসার নাম


মর্মমূলে গেঁথে আছে অদৃশ্য বজ্রের দাগ,
তার নাম ভালোবাসা।
কাঁটাঝোপের আঁচড়ে যেমন রক্তিম হয় পথ,
তেমনি ব্যথায় জ্বলে ওঠে শরীর
তবু তাকে ডাকি, ভালোবাসা।

দাদীমা বলতেন -
যে নিভে যাওয়া সন্ধ্যার ভেতর
এক মুঠো জোনাকি জ্বালিয়ে দেয়,
অন্ধ ঘরের কপালে
চাঁদের আলোয় আলতা পরে দেয় পায়ে 
তারই নাম ভালোবাসা।

যে নদী শুকিয়ে গেলেও
এক ফোঁটা জলের স্বপ্ন দেখে,
যে রাত জেগে থাকে কারও পথ চেয়ে
তারও নাম ভালোবাসা।

যে বুকের ভেতর আগুন জ্বলে
তবু ঠোঁটে থাকে শিশিরের মতো স্বচ্ছ হাসি,
যে হারিয়েও ফিরে আসে
একটি নামের ভেতর বারবার
তারই নাম ভালোবাসা।

পৃথিবীর সব কষ্ট, সব আলো, সব অপেক্ষা
এক জায়গায় এসে যদি দাঁড়ায়,
মানুষ তাকে ডাকে একটি মাত্র নামে -
ভালোবাসা।


১৫.      আবদুর রহমান 


আবদুর রহমান আমার সহপাঠি বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
ওর খাতার পাতায় থাকত ধুলোর গন্ধ,
মাঠের ঘাসের দাগ,
আর আঙুলে লেগে থাকত কাদামাটির স্বপ্ন।

রোজ ভোরে উঠে সে যেত বাবার সঙ্গে জমিতে,
তাই ক্লাসে এসে মাথা নামিয়ে বসে থাকত,
যেন ধানক্ষেতে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে
ওর চোখের ভিতর দিয়ে।

মেট্রিক পেরিয়ে তার পথ থেমে গিয়েছিল
একটা ভাঙা সেতুর মতো,
তারপর একদিন দেখলাম, পড়াশোনা বাদ দিয়ে  সে কামলা হয়ে গেছে,
দুপুরের রোদে পুড়ে পুড়ে
তার চামড়া হয়ে উঠেছে মাটির মতো শক্ত,
তবু চোখে ছিল শীতল জল
যেন ভোরের শিশির এখনো মরতে শেখেনি।

একদিন শুনলাম, যমুনার চরে কাশ কাটতে গিয়ে
ফিরে আসেনি আবদুর রহমান।
লোকজন বলল, দূর্বৃত্তরা তাকে মেরে
নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে
যেন একটা নাম, একটা জীবন,
এভাবে সহজেই মুছে ফেলা যায়।

আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে বেঁচে রইলাম,
এক আবদুর রহমান ছাড়া,
সে এখন নিঃশব্দে মিশে আছে যমুনা নদীর 
অতল জলের গভীর অন্ধকারে,
যেখানে আলো পৌঁছায় না,
শুধু কান্না জমে থাকে।

কখনো কখনো মনে হয়,
যমুনার জলে কোনো রূপালি মাছ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে
তার চোখে কি একটু চেনা বিষণ্ণতা থাকে?
নাকি সেটাও কেবল আমার ভুল দেখা
কারণ কিছু মানুষ হারিয়ে গেলে
তারা আর ফিরে আসে না,
শুধু থেকে যায় অদৃশ্য শূন্যতার মতো।

এখনও বিকেলের দিকে কাশফুল দুলতে 
থাকলে আমি থেমে যাই -
ওই সাদা ঢেউয়ের ভেতর
মনে হয় কেউ হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে,
হয়তো সে-ই, আবদুর রহমান।


১৬.     স্মৃতির মায়া


তোমাকে ভুলে থাকা যায় না
যেমন ভোরের শিশির ভুলে না ঘাস
যেমন নদী ভুলে না তার উৎসের প্রথম কান্না।

তোমার সাথে কাটানো সময়গুলো
এখনও মনের আঙিনায় রোদ হয়ে নামে,
কখনও আবার বৃষ্টির মতো ছুঁয়ে যায়
অকারণেই ভিজে ওঠে ভেতরটা।

যে বিকেলে তুমি হেসেছিলে,
সে হাসি আজও সন্ধ্যার পাখিদের ডানায় বাজে;
যে নীরবতায় আমরা পাশাপাশি ছিলাম,
সে নীরবতা এখনো কথা বলে একা ঘরে।

ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি
কিন্তু স্মৃতিরা বড় অবাধ্য,
তারা তোমার নাম ধরে ডাকে
ঠিক তখনই, যখন সবচেয়ে বেশি ভুলতে চাই।

তাই বুঝে গেছি -
তোমাকে ভুলে থাকা নয়,
তোমাকে নিয়েই বেঁচে থাকা শিখতে হয়
মায়ার মতো, অদৃশ্য অথচ অনিবার্য।


১৭.     ফিরে পাওয়া 


লাবণ্যকে হারিয়ে
যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম শূন্যতার রং,
সেদিনই বনলতা এসে
চোখে চোখ বলেছিল আমার আছে
সবুজ আশ্রয়।

তার কণ্ঠে ছিল বিকেলের হাওয়া,
তার চুলে ছিল অচেনা বনভূমির গন্ধ
আমি ভেবেছিলাম,
এবার বুঝি দুঃখেরও শেষ আছে।

কিন্তু মানুষ তো ক্ষণিকেরই আলো,
বনলতাও একদিন
অলক্ষ্যে মিশে গেল অনন্তলোকে
যেন হঠাৎ নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো।

সেদিন থেকে আকাশটা আর নীল নয়,
রাতগুলো শুধু দীর্ঘশ্বাসে ভেজা
কোনো মাধবীলতা এসে আর বলে না -
আমি তো আছি তোমার পাশে। 

এখন আমি শুধু পথ হেঁটে যাই,
হারানোর নামগুলো বুকের ভেতর নিয়ে
লাবণ্য, বনলতা…
আর এক নিঃশব্দ অপেক্ষা,
যেখানে কেউ আর ফিরে আসে না।


১৮.      ফিরে যাও


হে জাগ্রত হৃদকমল, থেমে যাও ক্ষণিক,
মূলে ফিরে যাও, নীরবতার গভীরে
নিজের আলোর কাছে ফিরে যাও,
দুটি চোখের ভেজা জানালায়,
আঙুলের স্পর্শে ফিরে আসো ধীরে।

ভুলে যাওয়ার ধুলোমাখা পথে
নুয়ে পড়ে কুড়িয়ে নাও স্মৃতির কাঁটা একে একে,
যত ব্যথা ছিল, সবটুকু তুলে নাও বুকে
তবু ভালোবাসা যেন ফুরোয় না।

অসীম আকাশের মুঠোয়
এই ক্ষুদ্র হৃদয়টুকু তুলে দাও,
যেখানে অল্পতেই জন্ম নেয় অনন্ত-
আর তোমার নামেই জেগে থাকে ভালোবাসা।


১৯.      অধিকারহীন স্পর্শ


মনোরমা এসেছিল তার শরীর নিয়ে,
স্পর্শে ছিল উষ্ণতা,
তবু কোথাও এক শীতল দূরত্ব,
আমি ভেবেছিলাম এটাই প্রেম,
তার চোখের ভাঁজে লুকানো কথা
আমাকে ডাকে অবিরত।

কিন্তু হঠাৎ বুঝি
তার দেহ আমার কাছে ঋণী,
আর হৃদয়?
সে তো অন্য কারও গোপন ভাণ্ডার।

তার স্পর্শের স্মৃতি রয়ে যায় আগুন হয়ে,
নিজেকেই মনে হয় অচেনা, দূরের কেউ
আর তার সুবাস ভেসে আসে
অধিকারহীন এক ভালোবাসার মতো।


২০.      অনুপস্থিতির ভিতর তুমি


তোমাকে না দেখেও প্রতিদিন দেখি,
জানালার কাঁচে জমে থাকা কুয়াশায়,
অথবা সন্ধ্যার আলোয়
যেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে
তোমার মতো।

তোমার নাম উচ্চারণ করি না,
তবু শব্দেরা জানে
কার দিকে উড়ে যেতে হয়,
একটা নিঃশ্বাসের ভিতর
লুকিয়ে রাখি অগণিত ডাক,
শুধু তুমি শুনবে বলে।

ভালোবাসা কি তবে এমনই -
যেখানে পাওয়া নেই,
তবু হারানোও অসম্ভব?
যেখানে দূরত্ব মানে
আরও গভীর হয়ে ওঠা কাছে আসা?

রাত নামলে মনে হয় -
তুমি ঠিক পাশেই আছো,
অন্ধকারের আড়ালে বসে
আমার নীরবতা ছুঁয়ে দাও।

আমি হাত বাড়াই,
স্পর্শ পাই না,
তবু আঙুলে লেগে থাকে
একটা উষ্ণ অনুপস্থিতি।

তোমাকে হারাইনি কখনো,
কারণ তুমি তো ছিলেই না সম্পূর্ণ,
তুমি ছিলে -
আমার ভিতরে জন্ম নেওয়া
এক অনন্ত মায়া।


২১.     অকথিত ভালোবাসা 


তোমার সাথে দেখা হলো
দূরত্বটা ছিল হাতের মতোই কাছে,
তবু শব্দেরা পথ হারালো,
চোখ দুটোই শুধু কথা বলে গেল নিঃশব্দে।

সম্পর্কই কি সব?
নাম, পরিচয়, বাঁধন -
এইসবের ভেতরেই কি ভালোবাসা বাস করে?

নাকি সে জন্মায় অচেনা কোনো মুহূর্তে,
যেখানে কেউ কারও কিছুই নয়,
তবু সবকিছু হয়ে ওঠে?

তুমি যখন স্ত্রী ছিলে, 
ভালোবাসা ছিল, নিশ্চয়ই ছিল -
রুটিনের ভিতর, দায়িত্বের নিঃশ্বাসে,
চেনা স্পর্শের অভ্যেসে লুকানো।

আর এখন?
এখন তুমি শুধু তুমি -
কোনো সম্পর্কের সংজ্ঞায় আবদ্ধ নও,
তবু তোমার এক ঝলকেই
মনের ভেতর জেগে ওঠে পুরোনো বসন্ত।

ভালোবাসা কি হারিয়ে যায়?
না কি শুধু তার রূপ বদলায়, 
একসময় ছিল অধিকার,
এখন সে শুধুই স্মৃতি আর মায়া,
একটা ম্লান আলো
যা নিভে যায় না, শুধু দূরে সরে থাকে।

তোমার সাথে দেখা হলো-
কথা হলো না,
তবু মনে হলো -
অকথিত এই নীরবতাই
সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার ভাষা।


২২.      চোখের চাহনিতে 


চোখের চাহনিতেই সে বলে দিয়েছিল, এসো,
আমি তখনও শব্দ খুঁজে পাইনি,
শুধু হৃদয়ের ভেতর কাঁপছিল কোমল এক সুর।

তার চোখে ছিল সন্ধ্যার আলো,
যেন গোধূলির রঙ মেখে ডেকে নিচ্ছে নিঃশব্দে -
আমি হেঁটে গেলাম,
অচেনা পথও তখন পরিচিত মনে হলো।

কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না,
ছিল না কোনো লিখিত ভালোবাসা,
তবু তার দৃষ্টির ভাঁজে ভাঁজে
লুকিয়ে ছিল এক অনন্ত আশ্রয়।

হাত ছুঁইনি, তবু স্পর্শ লেগেছিল,
কথা বলিনি, তবু কথা হয়েছিল 
নীরবতারও যে ভাষা আছে,
সে-ই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।

আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি
সেই ডাক, সেই মায়া, সেই প্রথম ‘এসো’,
যেখানে ভালোবাসা জন্ম নেয়
একটি চাহনির মধ্যেই।


২৩.      অপূর্ণ ফিরে দেখা


মনে পড়ে, ঢাকার ধুলোভরা বিকেলে
ক্লান্ত শরীর, অথচ অদ্ভুত এক আলো
মনের ভেতর জেগে উঠত নিঃশব্দে।

টিকিটের জন্য হাহাকার,
মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নাম,
দমবন্ধ বাসের ভেতর
ঘামে আর দীর্ঘশ্বাসে লেখা হতো
ফিরে যাওয়ার এক অনিবার্য কবিতা।

জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে 
দেখতাম -
পেছনে পড়ে যাচ্ছে শহর,
আর সামনে খুলে যাচ্ছে
শৈশবের ধূসর দরজা।

কত ক্লান্তি, কত বিরক্তি, তবুও হৃদয়ের গভীরে
কেউ যেন ফিসফিস করে বলত,
আর একটু পথ,
ওপারে আছে তোমার সমস্ত ভালোবাসা...।

মা হয়তো উঠোনে দাঁড়িয়ে,
চোখে জমে থাকা সন্ধ্যার আলো
বাবা দরজার পাশে নীরব,
তার অপেক্ষা শব্দহীন, অথচ গভীর।

পাড়ার সেই পথ,
ধুলোর ভেতর লুকানো ছেলেবেলা,
সব যেন কুয়াশার মতো এসে
ছুঁয়ে যেত ক্লান্ত মন।
বন্ধুদের ডাকে ভেসে আসত
হারিয়ে যাওয়া দিনের হাসি,
সব মিলিয়ে এক অন্য রকম পৃথিবী।

এখনো ঈদ আসে-
আলো জ্বলে, ভিড় হয়, মানুষ ছুটে,
কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে
সেই কষ্টের ভেতর লুকানো আনন্দ,
সেই পথচলার নিঃশব্দ উল্লাস।

এখন আর ভিড় আমাকে টানে না,
টানে না দীর্ঘ যাত্রা,
তবুও হঠাৎ কোনো সন্ধ্যায়
হৃদয় ভেঙে ভেঙে বলে ওঠে,
ফিরে যাই… কিন্তু জানি -
ফিরে যাওয়া আর হয় না আগের মতো,
কারণ সময় শৈশবকে নিয়ে গেছে দূরে,
আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি
নিজেদেরই অচেনা প্রান্তে।

তবুও, মায়ের আঁচলের গন্ধ, বাবার নীরবতা,
আর সেই ঈদের ভিড় -
সব মিলিয়ে এখনও বুকের ভেতর
নিঃশব্দে কাঁদে
একটি পুরোনো, অপূর্ণ ফিরে দেখা।


২৪.      চোখের তারার ভিতর 


হে আমার প্রিয়তমা,
তোমার চোখে আমি দেখেছি এক জ্যোৎস্নার দেশ
যেখানে স্বপ্নেরা জেগে থাকে
নিভৃত রাতের মতো গভীর।

তোমার দৃষ্টির ভেতরে
আমার ভালোবাসা আশ্রয় খোঁজে,
যেমন পথহারা নৌকা
নদীর বাঁকে খুঁজে পায় ঘাট।

আমি তোমাকে ভালোবাসি
যেমন মেঘ ভালোবাসে বৃষ্টির ভার,
যেমন কিশোর বাতাস ভালোবাসে কাশফুলের দোলা,
অথবা এক নিঃশব্দ প্রদীপ ভালোবাসে অন্ধকারকে ভেঙে দিতে।

তুমি আমাকে দিয়েছ জীবনের উচ্ছ্বাস,
হৃদয়ে জ্বেলে দিয়েছ আলোর স্পন্দন,
তাই আমি তোমাকে ভালোবাসি -
আমার সমস্ত স্পন্দন, সমস্ত সত্তা দিয়ে।

আমার আনন্দ যদি তোমার চোখে প্রশান্তি হয়ে নামে,
তবে সেই প্রশান্তির ছায়াতেই আমি থাকব,
নিঃশব্দে, অনন্তকাল, তোমার চোখের তারার ভিতর।


২৫.      হারানোর পরে পাওয়া 


যখন তোমার হাত ছেড়ে দিলাম,
তখনই বুঝলাম -
ওই উষ্ণ আঙুলে জড়িয়ে ছিল
আমার সমস্ত নিশ্চিন্ততা।

তুমি ছিলে আশ্রয়,
ঝড় এলে যে বুকে টেনে নেয়
আমি তা বুঝিনি,
বুঝতে চেয়েও বুঝিনি,
কারণ তখন তুমি ছিলে আমারই।

কতো মানুষ প্রার্থনায় ভিজে যায়,
কতো রাত তারা চোখ মেলে রাখে
একটুখানি ভালোবাসার ছোঁয়ার আশায়,
একফোঁটা নির্ভরতার জন্য।

আর আমি -
পেয়েও হারালাম তোমাকে,
যেন মুঠোভরা আলো
নিজের অজান্তেই ফেলে দিলাম অন্ধকারে।

এখনও হাত বাড়ালে শূন্যতা পাই,
তবু মনে হয়,
তোমার সেই স্পর্শ কোথাও রয়ে গেছে,
আমার ভেতরের নীরব প্রার্থনায়।

হয়তো একদিন -
তোমার ছায়া মিশে যাবে আমার নিঃশ্বাসে
আর আমি ধীরে ধীরে শিখে নেবো,
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
কখনো কখনো হারিয়েও
অন্তরে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।


২৬.      আম্রপালির দহন


আম্রপালি, নামটা শুনলেই যেন ফোটে 
ফুলের মতো মুখ,
চোখে নীল ভোরের আভা,
হাসিতে ঝরে বসন্তের রোদ।

তবু তার নিয়তি লিখে দেওয়া ছিল
সে কারও হবে না, সবার হবে।
কে ঠিক করেছিল এই বিধান?
কে মেপেছিল তার সৌন্দর্য,
আর বলেছিল -
এ সৌন্দর্য এক জনের নয়।

আম্রপালি তখনও মানুষ ছিল,
তারও ছিল স্বপ্ন,
কারও কাঁধে মাথা রেখে
একটি সন্ধ্যা পার করার,
একটি নাম ধরে ডাক শোনার,
একটি ঘরের ভেতর
নিজেকে সম্পূর্ণ করে রাখার।

কিন্তু তাকে বানানো হলো উৎসব,
একটি প্রদর্শনী,
একটি চোখের লোভ
যেখানে ভালোবাসা নেই,
আছে শুধু দৃষ্টির ক্ষুধা।

প্রতিদিন নতুন মুখ, নতুন বিস্ময়,
নতুন দাবি,
আর তার ভেতর ভেঙে পড়ে
একটি নির্জন হৃদয়।

তার চোখে একদিন ছিল নদীর মতো স্বচ্ছতা,
আজ সেখানে জমে আছে অগণিত রাত -
অশ্রু শুকিয়ে গিয়ে হয়ে গেছে নোনাধরা স্মৃতি।

সে কি কখনও চেয়েছিল এ জীবন?
সে কি কখনও বলেছিল -
আমাকে সবার করে দাও, 
না,
সে শুধু চেয়েছিল -
একটি নাম ধরে ডাকা হোক তাকে,
একটি হাত ধরা থাকুক সারাজীবন,
একটি দরজা থাকুক
যেখানে ফিরে এসে বলতে পারে “আমি আছি।”
কিন্তু তার জন্য খোলা ছিল অসংখ্য দরজা,
আর কোনো ঘর ছিল না।

প্রতিটি সন্ধ্যায়,
আলোর নিচে তার রূপ জ্বলে ওঠে
মানুষ মুগ্ধ হয়,
তালির শব্দে ঢেকে যায় তার নিঃশব্দ কান্না।

রাত গভীর হলে সব আলো নিভে গেলে
আম্রপালি একা বসে থাকে,
নিজের ভেতরের ভাঙা আয়নার সামনে,
যেখানে প্রতিটি টুকরোতেই
একটি অসম্পূর্ণ ভালোবাসা কাঁদে।


২৭.     অপেক্ষা ভঙ্গ


অনিকা,
তোমার নামটা এখনো বুকের ভেতর
নিঃশব্দে কাঁদে -
যেন কোনো ভাঙা বেহালার সুর,
যার তার ছিঁড়ে গেছে,
তবুও থামেনি ব্যথার সংগীত।

মনে পড়ে, সেই বিকেলগুলো,
যখন রোদ হেলে পড়ত তোমার কাঁধে,
আর তুমি চুপচাপ চুল সরিয়ে বলতে -
এত দেরি করো না, হারিয়ে ফেলব তোমায়…
আমি হেসে বলতাম-
আরেকটু সময় দাও,
চাকরিটা হোক, তারপর—শুধুই তুমি…
সেই ‘তারপর’ আর এলো না।

মনে আছে,
আমাদের হাত ধরা পথগুলো 
নদীর ধারে বসে তোমার নীরবতা,
আমার অযথা স্বপ্ন বোনা,
চোখের কোণে জমে থাকা আলো
সবই ছিল এক ভবিষ্যতের অপেক্ষা।

তুমি বিশ্বাস করেছিলে,
আমি সময়ের ওপর ভরসা করেছিলাম
ভুলটা সেখানেই ছিল।

আজ শুনলাম, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে,
অন্য কারও নামে জড়িয়ে গেছে তোমার সকাল-সন্ধ্যা।

অনিকা,
তুমি কি একবারও ভেবেছিলে,
এই অপেক্ষা আমারও ছিল?
তোমার মতোই আমিও গুনতাম দিন,
তোমার মতোই আমিও চাইতাম
একটা ছাদের নিচে
দুটো স্বপ্ন পাশাপাশি বাঁচুক।

কিন্তু তুমি চলে গেলে সময়ের আগেই,
আমার সব ‘হবে’-র আগেই।

এখন রাতে ঘুম আসে না,
তোমার বলা ছোট ছোট কথাগুলো
তারার মতো জ্বলে,
আর আমি হারিয়ে যাই
সেই পুরোনো দিনগুলোর ভেতর।


২৮.      ত্রিশ বছরের দূরত্ব


শেষবার যখন হাত ছেড়েছিলে,
বয়সটা ছিল তরুণ -
চোখে তখনও ছিল রোদের ঝিলিক,
স্বপ্নেরা হাঁটত পাশাপাশি।

বয়স সাতাশের সেই বিকেলে
আমরা কেউ বুঝিনি 
বিদায় আসলে কত দীর্ঘ হতে পারে,
কত নিঃশব্দে গিলে ফেলে জীবন।

তারপর কেটে গেছে ত্রিশটি বছর,
কত ঋতু, কত মানুষ, কত অচেনা পথ,
তবু কোথাও জমে ছিলে তুমি,
অবিকল, এক বিন্দু অশ্রুর মতো।

যেদিন আবার দেখা হলো,
আমাদের চোখে বয়সের ছায়া,
কিন্তু ভেতরে সেই একই কাঁপন
অচেনা হয়ে ওঠার ভান করা পরিচয়।

বিদায়ের মুহূর্তে বলেছিলাম-
'আবার দেখা হবে কোনো একদিন,
হয়তো ত্রিশ বছর পর…'
কথাটা ছিল অর্ধেক স্বপ্ন, অর্ধেক মায়া।

তুমি তখন ধীরে, খুব ধীরে বললে -
'ত্রিশ বছর বাঁচব তো?'
তারও পরে, 'তুমি বাঁচবে?'
কথাগুলো ঝরে পড়েছিল নিঃশব্দে,
যেন সময় নিজেই থেমে গিয়েছিল,
আর আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম
দুই প্রান্তের অনিশ্চয়তায়।

তারপর বুঝলাম -
ভালোবাসা আসলে সময় মানে না,
শুধু অপেক্ষা জমিয়ে রাখে,
যতদিন না জীবন শেষ হয়ে যায়।

হয়তো আর দেখা হবে না,
হয়তো হবেও, কিন্তু সেই প্রশ্নদুটি
রয়ে যাবে অনন্তের ভেতর:
আমরা কি বাঁচব ততদিন?
নাকি ভালোবাসাটাই বেঁচে থাকবে -
আমাদের আগেই, আমাদের পরেও?


২৯.      করুণা করো না


যে মানুঢটি আমার স্বপ্নের মতো নয়
তবু সে আসে কখনও -
শীতের শেষ বিকেলের বাতাস যেমন
ধানক্ষেত পেরিয়ে
ক্লান্ত হয়ে থামে বকুলগাছের নিচে।

সে এসে নিঃশব্দে মাথা রাখে আমার কাঁধে
যেন বহু দূরের পথ পেরিয়ে আসা
এক নদী
সন্ধ্যার আলোছায়ায় ধীরে ধীরে থেমে গেছে।

আমি তাকে ফিরিয়ে দিই না
কারণ আমি জানি
অপেক্ষাহীন হাতের শূন্যতা কত দীর্ঘ,
জানি -
নক্ষত্রভরা কত রাত মানুষ কাটিয়ে দেয়
কোনো স্পর্শ না পেয়ে।

তার আঙুলের ক্লান্ত অস্থিরতা
যখন ছুঁয়ে যায় আমার নীরবতা
তখন মনে হয়
দূরের মাঠে রোদ্দুর নেমেছে;
শালিকেরা ধানের গন্ধে
নির্জন আকাশে উড়ে যায় ধীরে।

আমার ভেতরেও তখন
অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে
যেন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর
চাঁদের আলো হেঁটে যাচ্ছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি
যেমন কেউ
হাজার বছরের পুরোনো নক্ষত্রের দিকে
চেয়ে থাকে নিঃশব্দ বিস্ময়ে।

ভাবি, কবে সে এসে
ধানক্ষেতের বাতাসের মতো উদাস হয়ে
আমার কপালে হাত রাখবে;
কবে তার চোখে জেগে উঠবে
একটি ধীর, গভীর আকাঙ্ক্ষা -
যেখানে মমতা আর ভালোবাসা 
একই নদীর জলের মতো
অন্ধকারে বয়ে যায়।

ততদিন আমি প্রেমিকা নই
আমি শুধু করুণায় ভেজা এক নারী -
যার কাঁধে মাঝে মাঝে
ক্লান্ত কোনো মানুষের মাথা নেমে আসে
প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যার  মতো।


৩০.      জ্বরের দিনগুলো


এখনও জ্বর এলে
একজোড়া কোমল হাতের স্পর্শ খুঁজি,
বাটিতে সাগুদানা রেঁধে এনে বলছে 
খেয়ে নাও সোনা…।

কপালে আলতো হাত রেখে
মা জিজ্ঞেস করত
জ্বরটা কি একটু কমেছে?
আর সেই প্রশ্নের ভেতরেই
কেমন এক আশ্চর্য শান্তি নেমে আসত।

রাত গভীর হলে
চুপচাপ বসে থাকত মাথার পাশে,
মাঝে মাঝে ভেজা কাপড় কপালে চেপে দিয়ে
আস্তে বলত -
ঘুমিয়ে পড়ো, আমি আছি তো।

জানালার বাইরে তখন
বৃষ্টি নামত ধীরে ধীরে,
ঘরের ভেতর কেবল মায়ের হাতের উষ্ণতা
আর মৃদু কণ্ঠের স্নেহ
আমাকে জড়িয়ে রাখত।

আজও জ্বর এলে
ওইসব দিনের কথা মনে পড়ে -
মনে হয় দরজা খুললেই বুঝি
মা ঢুকবে নিঃশব্দ পায়ে,
হাতে ধোঁয়া ওঠা সাগুদানার বাটি,
চোখে সেই চেনা মায়া।

কিন্তু ঘর এখন নিঃশব্দ 
শুধু জ্বরের উত্তাপে আমি খুঁজে ফিরি
একজোড়া কোমল হাত,
যে হাত একদিন আমার সমস্ত 
অসুখের ওপর উপশমের আশীর্বাদ 
হয়ে নেমে আসত।


৩১.     শেষ আলিঙ্গন


চলেই যখন যাবে,
এসো শেষ আর একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরি,
বুকের ভেতর জমে থাকা অতৃপ্তিগুলো
একবার তোমার কাঁধে রেখে যাই।

হয়তো এই স্পর্শের পর
আমাদের পথ দু’দিকে বাঁক নেবে -
তবু এই ক্ষণিক উষ্ণতা
থেকে যাবে দীর্ঘ শীতের মতো জীবনে।

এসো, একটু কাছে দাঁড়াও,
তোমার চুলে যে পরিচিত গন্ধ
বহুদিন ধরে আমার নিঃশ্বাসে বাসা বেঁধে আছে
আজ শেষবারের মতো তাকে মনে রাখি।

চোখে চোখ রাখো,
যেন কিছু না বলেও
অনেক কথা বলে ফেলি -
যে কথাগুলো এতদিন
ভয়ের মতো বুকের ভেতর লুকিয়ে ছিল।

চলেই যখন যাবে,
এসো শেষ আর একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরি,
যেন বিদায়ের মাঝেও
একটু ভালোবাসা থেকে যায় -
যেন অনেক বছর পরেও
কোনো এক মৌন সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে পড়ে - 
আমরা একদিন এভাবেই শেষবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।


৩২.     শেষ স্টেশনের আগে 


পরের স্টেশনেই আমি নেমে যাব,
এরপর আর হয়ত দেখা হবে না কখনো,
ট্রেনটা তখনও ছুটে যাবে দূরের দিকে -
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব প্ল্যাটফর্মের ধূসর বিকেলে।

জানালার কাঁচে তোমার মুখটা
শেষবারের মতো ভেসে উঠবে কি না জানি না,
তবু মনে হবে -
এই তো, একটু আগে তুমি এখানেই ছিলে।

হয়তো বাতাসে রয়ে যাবে
তোমার চুলের মৃদু গন্ধ,
হয়তো বেঞ্চের পাশে বসে থাকবে
অপূর্ণ কিছু কথার ছায়া।

ট্রেনটা চলে গেলে
নিঃশব্দ হয়ে যাবে চারদিক,
শুধু রেললাইনের ওপর
দু’ফোঁটা সন্ধ্যা পড়ে থাকবে।

আর বহু বছর পর
কোনো এক অচেনা স্টেশনে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ মনে পড়বে -
একদিন এইভাবেই আমরা বিদায় নিয়েছিলাম।

আর আমি নেমে গিয়েছিলাম
তোমার জীবন থেকে
একটি ছোট্ট, নির্দিষ্ট স্টেশনে।


৩৩.      দ্বিখণ্ডিত আলো


তুমি দূরদেশ থেকে ফিরে
আমাকে শহরের গল্প শোনালে
পাথরের রাস্তা, বরফঢাকা চূড়া,
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী বাতিঘর,
আর সেই সব ক্যাফের টেবিল
যেখানে রাত জেগে মানুষরা
নিজেদের ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে পানীয় খায়।

তুমি বললে-
একটি অচেনা মেয়ের হাসি
কী অদ্ভুতভাবে মিশে গিয়েছিল
হ্রদের জলে ভেসে থাকা আলোয়,
বললে -
বৃষ্টি শেষে কেমন ঝরে পড়ছিল
বিদেশি শহরের নিঃসঙ্গতা।

আমি শুনছিলাম, ঠিক যেমন
ঝড়ের রাতে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে
একটি নিভতে থাকা প্রদীপ।

তবু মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম -
হয়তো কোনো এক ফাঁকে
তুমি থেমে যাবে,
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে,
এই সব দৃশ্যের ভিড়েও
হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়েছিল,
কিন্তু তুমি বলোনি।

তোমরা পুরুষেরা বুঝতে পারো না,
একজন নারীর হৃদয় কোনো শহর নয়
যেখানে বহু পথ এসে মিলতে পারে।

সে তো কেবল একটি ছোট্ট প্রদীপ -
যার আলো যদি একবার ভাগ হয়ে যায়,
তবে ধীরে ধীরে
নিজের গলতে থাকা উষ্ণতার মধ্যেই
নিভে আসে তার সমস্ত ভালোবাসা।


৩৪.      সুপ্রভাত


কোনো একদিন হঠাৎ ঘুম নেমে আসবে চোখে
এমন গভীর ঘুম,
যার ভেতর থেকে আর কোনো সকাল ডেকে তুলতে পারবে না আমাকে।

তখন শরীরের সব চেনা গন্ধ মুছে যাবে ধীরে,
কেউ আতর ছিটিয়ে দেবে,
কর্পূরের নীরব সুবাস ভেসে থাকবে বাতাসে-
আমি শুয়ে থাকব স্থির,
পৃথিবীর সমস্ত শব্দের বাইরে।

কবরের মাটি যখন ধীরে ধীরে ঢেকে দেবে শরীর,
তখন আর দেখব না কোনো সূর্যাস্তের লালিমা,
দেখব না সন্ধ্যার নিঃশব্দ আকাশে
চাঁদের পাশে জেগে থাকা নক্ষত্রদের।

জোনাকিরা তখনও জ্বলবে অন্ধকার বাগানে -
শুধু তাদের আলো আর পৌঁছাবে না আমার চোখে।

তবু ভোর হবে,
পূর্ব আকাশে আবার রোদ উঠবে,
পাখিরা উড়ে যাবে দূরের সবুজ মাঠে,
মানুষেরা খুলে দেবে দিনের দরজা।

পৃথিবী তখনও চলবে তার আপন ছন্দে -
শুধু আমি থাকব না সেই ভোরের ভিতরে।

আর কোনো এক মায়াভরা সকালে
হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না জানালার পাশে,
কেউ নরম স্বরে ডেকে বলবে না আর -
'সুপ্রভাত'।


৩৫.     ভাদ্রের বৃষ্টি


ভাদ্রের মেঘে আকাশ ভরে আসে,
কদমতলে অমিয় জলধারা ঝরে। 
বাঁশির সুর যেন দূর যমুনা পারে -
শ্যাম কি ডাকিছে আবার রাধা'রে?

বৃষ্টি নামে ধীরে, মাটির গন্ধ জাগে,
কাঁপে কদমপাতা বাতাসের ছোঁয়ায়।
রাধার আঁচলে জমে নীল বিষাদ,
প্রেম কি তবে আসে এমনই বেলায়?

দূরে বিজলি ওঠে, মেঘ ডাকে গোপনে,
মনে হয় শ্যাম বুঝি পথ খুঁজে ফেরে।
নয়ন ভিজে যায় ভাদ্রের বৃষ্টিধারায় -
রাধা দাঁড়িয়ে থাকে কদমের তলে ঘিরে।

'এসো নাথ,' ডাকে সে কাঁপা কণ্ঠে,
'এই ভেজা রাতে আর দেরি কোরো না।'
বৃষ্টির ভিতরে প্রেমের মৃদু জপ 
রাধার হৃদয় শুধু শ্যামেরই উপসনা।


৩৬.     দু’টি চাঁদের গোপন জোয়ার


রাত্রির গভীরে
যখন পৃথিবী তার সমস্ত নিয়ম খুলে রেখে ঘুমোয়,
তখন তুমি আর আমি 
দু’টি রমণী
একটি অদৃশ্য জোয়ারের ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে উঠি।

তোমার কাঁধে চুল ছড়িয়ে দিলে
মনে হয় অরণ্যের ভেতর হঠাৎ
একটি ত্রস্ত হরিণ এসে দাঁড়িয়েছে,
তার নিঃশ্বাসে জেগে ওঠে
অপরিচিত ফুলের আদিগন্ধ।

তোমার একান্ত কাছে এলে
আমার শরীরের ভেতর
সহস্র পুরোনো নদী কেঁপে ওঠে -
যেন জন্মের আগের কোনো ভাষা
হঠাৎ আবার মনে পড়ে গেছে।

আমরা একে অপরকে ছুঁই
যেমন বৃষ্টি ছোঁয় কাদামাটির ঘ্রাণ,
যেমন দুইটি জোৎস্না
একই জলের ওপর নেমে এসে
ধীরে ধীরে মিশে যায়।

কেউ জানে না -
এই প্রেমের ভেতর কত গভীর
প্রাচীন নারীত্বের সঙ্গীত বাজে।

তুমি যখন আমার ঠোঁটের কাছে
তোমার নির্জনতা রেখে দাও,
আমি বুঝি -
পৃথিবীর প্রথম ফুলটি
সম্ভবত এভাবেই ফুটেছিল
দু’টি রমণীর নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়।


৩৭.      বিশ্বাসের গোপন অগ্নি


যে স্পর্শ শুধু আঙুলে আঙুল রাখা নয়
যে আলিঙ্গন শুধু
দুটি শরীরের কাছে আসা নয়
যেন দুইটি নদী অদৃশ্য মোহনায়
নিজেদের নাম ভুলে যায়।

যে চুম্বন শুধু ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখা নয়,
তার গভীরে থাকে
অকথিত প্রতিজ্ঞার উষ্ণতা,
একটি দীর্ঘ বিশ্বাস শ্বাসের ভেতর লুকোনো।

যে উল্লাস শুধু শরীরের উত্তাপ নয়,
তার ভেতর ধীরে ধীরে
খুলে যায় মানুষের গোপন দরজা,
যেখানে ভয় ঘুমিয়ে পড়ে
আর আত্মা নগ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

অথচ শরীরও থাকে চুলের গন্ধ,
কাঁধের উষ্ণতা, বুকের নিঃশ্বাসে জেগে থাকা অদৃশ্য ফুলের মতো কম্পন।

এসবের আড়ালে আরও গভীর কিছু 
জন্ম নেয় দুটি মানুষের মধ্যে
একটি নীরব আস্থা,
যা লুকিয়ে থাকে চোখের ভেজা আলোর ভেতর,
মুঠোবন্দী হাতের ভিতরে,
আর সেই দীর্ঘ শ্বাসে যেখানে ভালোবাসা
নিজেকে ধীরে ধীরে চিনে নেয়।



৩৮.       অচ্ছূতের দিকে 



যে রমণী আমার নয়
তবু অদ্ভুত এক সন্ধ্যায়
সে এসে দাঁড়ায় খুব কাছে,
যেন বাতাসে ভেসে আসা
অচেনা কোনো ফুলের গন্ধ।

আমি জানি -
এই স্পর্শ আমার জন্য নয়,
এই শরীরের দিকে হাত বাড়ানো
কোনো নীতির ভেতর পড়ে না।

তবু তার চোখের ভেতর
এক ধরনের ইশারার ডাক থাকে,
যা ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

ছুঁই না, তবু মনে হয়
আমার আঙুলে তার উষ্ণতা লেগে আছে।
ছুঁই, তবু মনে হয়
আমি যেন দূর থেকেই তাকে দেখি।

এ কেমন প্রেম,
যেখানে কাছে এলে দূরত্ব জন্মায়,
দূরে গেলে বুকের ভেতর
এক অদৃশ্য স্পর্শ জেগে ওঠে?

সে রমণী,
যাকে আমি কখনো নিজের বলিনি,
তবু আশ্চর্যভাবে 
আমার সমস্ত নীরবতার ভিতর
দেবীর মতো ফিরে ফিরে আসে।


৩৯.       সৃষ্টিকর্তা


আমি সৃষ্টিকর্তাকে সমীহ করি,
ভয়ও পাই,
রাত্রির নক্ষত্র দেখে তার অসীমতা মনে পড়ে,
ভোরের শিশিরে দেখি তার উপস্থিতি।

আমি তাকে প্রশংসা করি,
বাতাসের ভেতর তার দয়া খুঁজি,
তবু কেন জানি মনে হয়-
তিনি আমার উপর সন্তোষ্ট নন।

হয়তো আমি অতিরিক্ত প্রশ্ন করি,
হয়তো প্রার্থনার মাঝখানে
হঠাৎ সন্দেহের একটি কালো পাখি উড়ে যায়।

আমি তাকে ডাকি -
ডাকের ভেতরও হয়ত একটু অস্পষ্টতা থাকে,
একটু অবাধ্যতা,
হয়তো সেই কারণেই
তিনি আমার দিকে তাকান না দীর্ঘক্ষণ।

তবু আমি জানি,
যে মানুষ ভয় পায়, প্রশ্ন করে,
তবুও প্রার্থনা থামায় না -
সৃষ্টিকর্তা হয়তো তাকেই ভালোবাসেন।


৪০.     দুটি বাবার রাজকন্যা


আমার স্ত্রী কারোর না কারোর বাবার মেয়ে,
কোনো এক উঠোনে
সে-ও একদিন রাজকন্যার মতো বড় হয়েছিল।

কোনো এক বাবা
তার কপালে চুমু এঁকে বলেছিলেন
সাবধানে থাকিস মা, পৃথিবী খুব সহজ নয়।

আজ সে আমার ঘরে থাকে,
কিন্তু তার ভেতরে এখনো রয়ে গেছে
সেই ছোট্ট মেয়েটি,
যে বাবার হাত ধরে মেলায় যেত,
আকাশ দেখে গল্প বানাত।

আমারও একটি মেয়ে আছে -
তাকেও আমি রাজকন্যার মতো ভালোবাসি।
তার হাসি শুনলে মনে হয়
পৃথিবী এখনো ভাঙেনি পুরোপুরি।

তখন হঠাৎ মনে পড়ে
আমার স্ত্রীও তো
কারো এক বাবার রাজকন্যা ছিল।

তাই আমি শিখে যাই ধীরে ধীরে -
যে হাতে আমি মেয়ের চুলে আলতো হাত রাখি,
সেই হাতেই
স্ত্রীর ক্লান্ত কপাল ছুঁয়ে দিই মমতায়।

কারণ ভালোবাসা মানে শুধু অধিকার নয়,
ভালোবাসা মানে
আরেকজনের বাবার স্বপ্নকে
নিজের ঘরে সম্মান করে রাখা।

এভাবেই আমাদের ঘরে
দুটি বাবার রাজকন্যা থাকে -
একজন ছোট, আর একজন বড়।

আর আমি
দুজনকেই সযত্নে পাহারা দিই
ভালোবাসার মতো। 


৪১.      শেষ নিঃশ্বাসের আকাঙ্ক্ষা


সেই জীবন, সেই আকাশ, সেই আলো,
হঠাৎ যেন সমস্ত পৃথিবীর
মণিমাণিক্যের চেয়েও দুর্মূল্য হয়ে উঠছে  আমার কাছে।

আমার মনে হয় -
ধনরত্নের কোনো মূল্য নেই,
কেবল এক মুহূর্তের জীবনের কাছে
সবই তুচ্ছ, সবই ম্লান।

যদি একবার -
মাত্র এক ক্ষণকালের জন্য
আমার সেই শ্যামা জননীর ধরিত্রীর ধূলিক্রোড়ে
শুয়ে থাকতে পারতাম!

যদি একবার
সেই উন্মুক্ত নীলাম্বরের তলে
সূর্যালোকের ধোয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে
শেষবারের মতো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতাম! 

তৃণপাতার গন্ধ মেশানো বাতাস
যদি শেষবার এসে ছুঁয়ে দিত আমার বক্ষ,
মাটির স্নিগ্ধ গন্ধে
যদি ভরে উঠত প্রাণের অন্তিম প্রহর -
তবে মৃত্যু এলেও ভয় নেই।

সেই একটিমাত্র শেষ নিঃশ্বাসে
যদি আমার এই পৃথিবীকে গ্রহণ করতে পারি -
তবে এই জীবন,
এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বও
নিশ্চয়ই সার্থক হয়ে উঠবে।


৪২.     টং দোকানের বিকেল


রাস্তার পাশে টং চায়ের দোকানটার কথা মনে পড়ে,
কত বিকেল গরম চায়ের কাপে দিতাম চুমুক -
ধোঁয়া উঠত ধীরে,
যেন বিকেলের শরীর থেকে উঠছে
কোনো নীরব দীর্ঘশ্বাস।

একটা পুরোনো বেঞ্চ ছিল,
রঙ উঠে যাওয়া টিনের চালের নিচে
বৃষ্টি পড়লে টুপটাপ শব্দ হতো,
মনে হতো পৃথিবীর সব গল্প
সেই টিনের ছাদের ওপরই লেখা হচ্ছে।

কেউ বলত রাজনীতির কথা,
কেউ বলত প্রেমে পড়ার গল্প,
আর কেউ চুপচাপ দূরে তাকিয়ে থাকত
অচেনা কোনো ভবিষ্যতের দিকে।

কাপে কাপে জমত বিকেল,
চায়ের ভেতর ডুবে থাকত
বন্ধুত্বের অনুচ্চারিত শপথ,
আর কিছু মধুর স্বপ্ন
যেগুলো পরে কোনোদিন
পৃথিবীর কোথাও জন্ম নিতে পারেনি।

দূরের রাস্তায় ধুলো উঠত,
সূর্য ধীরে ধীরে নামত শহরের ক্লান্ত কাঁধে-
আর আমাদের তরুণ সময়
নিঃশব্দে ঝরে পড়ত
চায়ের কাপে ভাঙা আলোর মতো।

এখন সেই দোকান
সম্ভবত এখনো দাঁড়িয়ে আছে,
কিন্তু সেখানে আর বসে নেই
আমাদের সেই বিকেলগুলো।

শুধু মাঝে মাঝে
কোনো অকারণ সন্ধ্যায় 
মনে হয়,
এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার ভিতর
আমাদের হারিয়ে যাওয়া বয়স
এখনো ধীরে ধীরে
আকাশে ভেসে যাচ্ছে।


৪৩.      চৈত্রের আকাশে তোমার ছায়া



হঠাৎই চৈত্র সন্ধ্যায়
আকাশের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে
কিংবা লিখতে ইচ্ছে করে কবিতা
কারণ এই রঙ বদলানো আকাশ
জানে এক হারানো মুখের গোপন ইতিহাস।

সেদিনও এমনই চৈত্র ছিল
বাতাসে ধুলো আর শুকনো পাতার দীর্ঘশ্বাস,
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল ধীরে
কোনো নিঃশব্দ নদীর মতো।

আমরা পাশাপাশি হেঁটেছিলাম
কিন্তু শব্দ ছিল খুব কম;
তোমার নীরবতা যেন দূরের কোনো গ্রাম,
যেখানে সন্ধ্যা নামে ধূপের ধোঁয়ার মতো।

তোমার চুলে তখন
শেষ আলোর হলুদ পাখিরা বসে ছিল,
আমি ভাবছিলাম
মানুষের জীবনে যদি কোনো মুহূর্ত
চিরদিনের জন্য রেখে দেওয়া যেত
তবে এই ক্ষণটিকেই রাখতাম
একটি গোপন নক্ষত্রের মতো।

তারপর সময়
অদৃশ্য শিকারির মতো এসে
আমাদের সেই পথটাকে ভেঙে দিল
তুমি চলে গেলে
আর পৃথিবী ঠিক আগের মতোই রইল।

আজও যখন চৈত্রের সন্ধ্যা নামে
মনে হয় আকাশের কোথাও
তোমার একটি ক্ষীণ ছায়া ভেসে আছে;
হয়তো বাতাসে যে বিষণ্নতা বাজে
তা তোমারই কোনো অপ্রকাশিত কথা।

তাই হঠাৎই চৈত্র সন্ধ্যায়
আকাশের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে,
কিংবা লিখতে ইচ্ছে করে কবিতা
কারণ হারানো প্রেমিকারা
মানুষের জীবনে আর ফিরে আসে না,
তারা শুধু থেকে যায়
সন্ধ্যার রঙে,পাতাঝরার শব্দে,
আর কিছু গভীর, অসমাপ্ত পংক্তির ভিতরে।


৪৪.     রাত্রির আলিঙ্গন 


সে স্বপ্নে এসেছিল, ঘুম ঘোরে তাকে জড়িয়ে 
ধরেছিলাম -
মনে হয়েছিল রাতের সমস্ত নক্ষত্র
আমাদের বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার চুলে ছিল অদ্ভুত এক গন্ধ,
যেন দূরের কোনো বৃষ্টিভেজা বাগান
আমার বুকে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

আমি তার কানের কাছে মুখ রেখে
ধীরে ধীরে বলেছিলাম কিছু অস্পষ্ট কথা,
সে শুধু চোখ বুজে আরও কাছে সরে এলো -
যেন আমার বুকই তার একমাত্র আকাশ।

তার উষ্ণতা গড়িয়ে পড়ছিল
আমার নিঃশ্বাসের ভেতর দিয়ে,
দুজনের শরীরের মাঝে
রাত ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিল উতল নদী।

সে আমার কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল -
'এই স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমাকে কি মনে রাখবে?'
আমি তার আঙুল জড়িয়ে ধরে বললাম -
স্বপ্ন ভাঙলেও তুমি থাকবে,
আমার ঘুমের গভীরে
আর জাগরণের গোপন আগুনে।'

তারপর আমরা দুজন
রাত্রির নিঃশব্দ দোলনায় ভেসে রইলাম -
যেন প্রাচীন কোনো অবিনশ্বর প্রেম
পৃথিবীর প্রথম ভোরের আগে
আবার জন্ম নিতে চাইছে।


৪৫.      ফিরে আসার কবিতা


কোথায় চলে যাবে? কোন্ পথ দিয়ে? 
সব পথে পথে আমি কবিতা লিখে এসেছি,
ধুলোর ভেতর, বাতাসের গায়ে,
নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছি তোমার নাম।

যে পথেই তুমি যাও
দেখবে হঠাৎ কোনো বিকেলের রোদে
একটি পংক্তি দাঁড়িয়ে আছে
তোমাকে ডাকার জন্য।

আমি জানি, তুমি দূরে গেলে
আকাশও একটু নীল কম হয়,
আর আমার জানালায় বৃষ্টি নামে অকারণে।

তবু ভয় নেই -
আমি তোমাকে হারানোর মতো
কোনো কবিতা লিখিনি কখনো,
আমি শুধু লিখেছি
ফিরে আসার সব দরজা।

যে পথে তুমি হাঁটবে
সেই পথের ঘাসেরা বলবে -
'ফিরে যাও, কেউ একজন অপেক্ষায় আছে।'

আর একদিন অচেনা সন্ধ্যার ভেতর
হঠাৎ তুমি থেমে যাবে,
কারণ বাতাসে ভেসে উঠবে
আমার লেখা কোনো পুরোনো পংক্তি।

তখন বুঝবে,
সব কবিতার ভেতর লুকিয়ে ছিল
একটি ঘর, একটি আলো,
আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে
আমি তোমার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি। 


৪৬.      গন্ধর্ব-নগরীর হেম


তোমাকে আজ বড় উদাসীন লাগে,
যেন ভোরের আলো নিভে গেছে কারও অদৃশ্য স্পর্শে।

গতকালও তুমি শ্রাবণ-ধারার মতো
আমার সমস্ত আকাশ ভিজিয়ে দিয়েছিলে
আজ তুমি দাঁড়িয়ে আছো
একটি জলহীন নদীর মতো নির্জন।

তোমার চোখে আজ কোনো ঢেউ নেই,
কোনো নির্মল বাতাসও না
যেন সব সুর হঠাৎ থেমে গেছে
অদেখা কোনো দূর গন্ধর্ব-পুরীতে।

তুমি শুরু করতে জানো,
আহা, কী অপূর্বভাবে জানো!
প্রথম স্পর্শের মতো কোমল,
প্রথম বৃষ্টির মতো মধুর
কিন্তু শেষের কাছে এলে
তুমি হঠাৎ হারিয়ে যাও
কোনো অচেনা নক্ষত্রের অন্ধকারে।

কাল তুমি ছিলে আহলাদী,
হাসিতে ভরা এক বসন্ত দুপুর
আজ তুমি হতচ্ছারী বিষণ্নতা
যেন শরতের আকাশে
হঠাৎ মেঘহীন এক নিঃসঙ্গতা।

তোমাকে কখনো মনে হয় চন্দন
শীতল, সুগন্ধী, মমতার মতো নীরব।
আবার কখনো তুমি
গন্ধর্ব-নগরীর হেম,
দূরের, অলৌকিক, ছোঁয়া যায় না,
তবু হৃদয়ের গভীরে
অদ্ভুত আলো হয়ে জ্বলে থাকো।

এই কোন্ রহস্যে তুমি গড়া,
হে প্রাণেশ্বরী?
কোন্ আকাশের মায়ায় তুমি
এভাবে রূপ বদলাও বারবার?

আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি
তোমার সব ঋতুর সামনে,
কখনো বৃষ্টিতে ভিজি,
কখনো মরুভূমির মতো শুকিয়ে যাই।

তবু জানো,
তুমি যদি গন্ধর্ব-নগরীর হেমও হও
আমি তবু সেই পথিক,
যে প্রতিদিন
তোমার অলীক নগরীর দিকেই
হেঁটে যায় নিঃশব্দে।


৪৭.        চলে গেলে তুমি 


কোনো এক নিস্তব্ধ রাতের জানালায়
তোমার ছায়া ঝুলে থাকে কুয়াশার পর্দায়,
আমি ভেবেছিলাম তুমি চাঁদেরই কোনো দাগ
অথবা দূরের কোনো অচেনা আলোর আগুন।

নদীর মতো ধীরে ধীরে সরে গেলে তুমি,
বালুচরে পড়ে রইল কিছু ভাঙা জোছনা,
আর আমার বুকের ভিতর
শুকনো পাতার মতো শব্দ করে ওঠে স্মৃতি।

হয়তো তুমি ছিলে হেমন্তের বাতাস,
অথবা কোনো অস্থির পাখির ডানা
এসেছিলে কিছুক্ষণ
তারপর আকাশ বদলে গেলে উড়ে গেলে অজানা।

তবু আজও রাত নামলে
জোছনা এসে আমার দরজায় কড়া নাড়ে,
মনে হয়,
তোমার ক্লান্ত পায়ের শব্দ
এখনও ঘাসের ভিতর লুকিয়ে আছে।

আর আমি একা বসে শুনি
শীতের পাতাঝরা সেই দূরের পথ,
যেখানে তুমি হেঁটে গিয়েছিলে
অনুভবের মতো নিঃশব্দে।


৪৮.     অর্ধনগ্ন জ্যোৎস্না 


বিহ্বল হয়ে শরীরের গোপন বৃত্তে
যখন তুমি আবিষ্ট হয়ে থাকো,
তখন অন্ধকারে জ্বলে ওঠে এক অচেনা নক্ষত্র তোমার চোখের ভেতর।

চুলের গভীরে জমে ওঠে নিশ্বাস,
আঙুলের অদৃশ্য স্পর্শে
রাত্রি ধীরে ধীরে কাছের হয়ে আসে।

তখন তুমি অভিমানী হয়ে উঠো -
অন্তরের দুয়ার খুলে প্রগল্ভ স্বরে বলো,
আমি কি শুধু বন্ধুই তোমার?

আমি তখন তোমার দিকে তাকিয়ে
একটু জোছনা, একটু আগুন
মিশিয়ে বলি - ওগো হতচ্ছারি,
তোমার কাছেই তো আমি
যখন যা চাই, তখনই তা পাই,
এক ফোঁটা শরীরের উষ্ণতা,
এক মুঠো স্বপ্নের গন্ধ,
আর অনন্ত কোনো মায়া।

এমন অনিঃশেষ ভালোবাসা
যে নিঃশব্দে ঢেলে দেয় রাত্রির গভীর পাত্রে,
সে তো কেবল বন্ধু নয় -
সে যেন বহতা কোনো নদী,
যার জলে ডুবে থাকে প্রেমের প্রাচীন শরীর।

তাই বলি -
তুমি বন্ধু, আবার তারও অধিক কিছু,
তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে
আমার সব গোপন আকাঙ্ক্ষার
অর্ধনগ্ন জ্যোৎস্না।


৪৯.       আক্ষেপগুলি মোর


জীবনটা এত ক্ষণস্থায়ী! 
সোনালি মুহূর্তগুলো কবে যে ডানায় ভর করে উড়ে গেল,
আমি টেরও পাইনি।

মনে হয়েছিল, সুন্দরের পথ ধরে
একদিন আমরা দু’জন পাশাপাশি হেঁটে
এই পৃথিবীর শেষ বিকেলটুকু পার হয়ে যাব।

চার চোখ মিলে কত স্বপ্ন এঁকেছিলাম -
নীল আকাশে ভাসমান মেঘের মতো,
নদীর জলে জোছনার মতো নীরব ও দীপ্ত।

আজ এত দূর এসে
পেছনে ফিরে দেখি -
আমাদের হাত ভরা নেই কিছুই,
শুধু কিছু উড়ে যাওয়া বিকেল,
কিছু অচেনা রাতের দীর্ঘশ্বাস
আর অমলিন কয়েকটি নামহীন স্মৃতি।

তবু আমি পথেই আছি -
বাতাসে ছড়িয়ে দিই আক্ষেপের ধুলো,
আর ভাবি, হয়তো কোনো এক অচেনা ভোরে
নতুন করে জন্ম নেবে আরেকটি স্বপ্ন।

কিন্তু ঘরের কোণে
পিতামহের রেখে যাওয়া সেই পুরোনো দেয়াল ঘড়ি
ধীরে ধীরে বাজিয়ে যাচ্ছে শেষ সময়ের ধ্বনি -
ঢং... ঢং... ঢং...
প্রতিটি শব্দে যেন ঝরে পড়ে
আমার অপূর্ণ জীবনের অতৃপ্ত ইতিহাস।

যেন সময় বলছে -
সব আক্ষেপ নিয়েও
একদিন আমাকেই চলে যেতে হবে
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুর সঙ্গে।


৫০.      অধরা শিউলি


ভোরের শিউলি ঝরে পড়ে নির্জন আঙিনায়,
আমি কুড়িয়ে কুড়িয়ে খুঁজি তার অদৃশ্য পরশ।
শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটি ধীরে
মনে হয়, এই তো এখানেই লেগে আছে
তার আঙুলের নিঃশব্দ স্পর্শ।

ভোরের বাতাস হঠাৎ কাঁপিয়ে যায় মন,
কোন অচেনা ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্মৃতি
মনে হয়, সে বুঝি একটু আগে
এ পথ দিয়ে হেঁটে গেছে নীরবতায়।

সন্ধ্যার কুহেলি যখন নেমে আসে ধীরে,
অস্পষ্ট আলো অন্ধকারের ভেতর
আমি দেখি এক অবয়ব -
চেনা, অথচ দূরের কোনো নক্ষত্রের মতো
হাত বাড়ালেই মিলিয়ে যায়।

সে তো আমারই ছিল
তবু ছিল না কখনও,
অধরা কোনো নীল আকাশের মতো,
অনাঘ্রাতা কোনো ফুলের মতো
দূরে দূরে জেগে থাকে।

আমার স্বপ্নগুলো
তারই নামে একদিন উড়েছিল আকাশে,
আজ ভাঙা ডানার শব্দে
ছড়িয়ে আছে বুকের ভেতর।

তবু মাঝে মাঝে ভাবি -
কেন পারলাম না ঝড়ের মতো
জোর করে তাকে ছিনিয়ে নিতে!
হয়তো ভালোবাসা ছিনিয়ে নেবার নয়,
ভালোবাসা কেবল শিউলির মতো 
ঝরে পড়ে কারও অচেনা ভোরে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন