অপূর্ণ গোধূলি
প্রথম প্রকাশ - জুন, ২০২৬ ইং
উৎসর্গ -
ভূমিকা -
১. অপূর্ণ গোধূলী ( কবিতাগ্রন্থ )
জীবন এখন বিকেলের শেষ আলো,
দিগন্তের কাঁধে মাথা রেখে ঝিমিয়ে থাকা এক ক্লান্ত দিন,
সোনালি রঙে মিশে আছে অদৃশ্য কোনো বিষণ্ণতা,
যেন আলো নিজেই নিজের ছায়াকে জড়িয়ে
নিঃশব্দে বিদায়ের মহড়া দিচ্ছে।
সময় এখন ধীর নদী -
জল নেই তেমন, শুধু স্মৃতির ঢেউ,
তীরে এসে ভাঙে, আবার সরে যায়,
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
নিজেরই ভাঙনের শব্দ শুনতে শুনতে।
দুপুরের সেই তপ্ত রোদ -
যার দাহে জ্বলে উঠত শিরা-উপশিরা,
যার উগ্রতায় হারিয়ে ফেলতাম ক্লান্তির মানে,
আজ মনে হয়, সে-ই ছিল জীবনের প্রকৃত উল্লাস,
সে-ই ছিল বেঁচে থাকার নির্লজ্জ ঘোষণা,
অসীমের দিকে ছুটে যাওয়ার বেপরোয়া সাহস।
তখন বুঝিনি,
আগুনও একদিন হয়ে উঠবে স্মৃতির শীতল প্রদীপ,
আর সেই দহনই হবে সবচেয়ে আপন উষ্ণতা।
এখন রোদ নরম,
শিশুর গালের মতো কোমল,
বা মায়ের হাতের ছোঁয়ার মতো শান্ত,
আঙুলের ডগায় এসে লাগে
মায়ার মতো, অব্যক্ত কোনো ক্ষমার মতো।
তবুও কেন জানি,
হৃদয়ের ভেতর এক অদৃশ্য আকুলতা
ফিরে যেতে চায় সেই দহনভরা দুপুরে,
যেখানে ছিল না এত হিসেব, এত থেমে যাওয়া।
এই পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে
হঠাৎ মনে হয় -
পৃথিবীটা আসলে কত গভীরভাবে সুন্দর!
যেন ভাঙা কাচের টুকরোয়ও
রোদ লেগে ওঠে রঙিন।
একটা পাতার নড়াচড়া,
যেন চুপিসারে বলা কোনো গোপন কথা,
একটা শিশিরবিন্দুর কাঁপন -
যেন অপূর্ণ কোনো স্বপ্নের শেষ স্বাক্ষর,
একটা মানুষের চোখে অচেনা মায়া,
যেন হারিয়ে যাওয়া দিনের ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
তবুও কোথাও এক হাহাকার থেকে যায়
যা পাওয়া হলো না,
যে কথাগুলো বলা হলো না,
যে হাতগুলো ছোঁয়া হলো না কোনোদিন,
তারা সবাই মিলে আজ
এই ম্লান রোদের ভেতর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছু আক্ষেপ জমে আছে,
অযত্নে ফেলে রাখা পুরোনো চিঠির মতো,
যার অক্ষরগুলো মুছে গেছে,
তবুও গন্ধে রয়ে গেছে না-বলা ভালোবাসা।
আমি বাঁচতে চাই,
এই শেষ আলোয়, এই নিঃশব্দ অবসানে,
যেখানে অসম্পূর্ণতাই সবচেয়ে সত্য,
অপ্রাপ্তিই সবচেয়ে গভীর প্রাপ্তি হয়ে ওঠে।
আমি বাঁচতে চাই,
আরও কিছু বিকেল দেখতে,
আরও কিছু রোদ গায়ে মেখে নিতে,
আরও কিছু ভুল করতে,
আরও কিছু ক্ষমা চাইতে,
আরও কিছু ভালোবাসা জমাতে
অপ্রকাশিত শব্দের মতো বুকের ভেতর।
আমি ছড়িয়ে দিতে চাই নিজেকে -
গোধূলির আকাশে ভাসা পাখির ডানায়,
ঝরা পাতার মৃদু শব্দে,
অথবা কোনো নির্জন পথের ধুলোর সাথে মিশে গিয়ে।
যদি শেষ আলো নেমেও আসে
যদি সন্ধ্যা ধীরে ধীরে গ্রাস করে সব রঙ,
তবুও আমি চাই -
এই জীবনটুকু থাকুক আলোর মতোই,
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিঃশেষ না হয়ে জ্বলে উঠুক।
ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাক -
কিন্তু নিভে যাওয়ার আগে
একবার অন্তত জ্বলে উঠুক তীব্র দীপ্তিতে,
যেন সমস্ত আক্ষেপ, সমস্ত অপূর্ণতা,
শেষ আলোয় গলে গিয়ে
একটা দীর্ঘ, উষ্ণ প্রার্থনায় রূপ নেয়।
আর সেই প্রার্থনায় -
থাকুক একটু বিষণ্ণতা,
থাকুক একটু অনন্তের স্বাদ,
আর থাকুক এই স্বীকারোক্তি -
বেঁচে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।
২. নামহীন যশহীন
বহু বছর আগে এই বঙ্গভূমির মলিন বিকেলে
জন্মেছিল এক নামযশহীন কবি,
পুণ্ড্রভূমির ধুলো মেখে, করতোয়ার স্রোতে ধুয়ে
যার নিঃশ্বাসে ছিল মাটির গন্ধ আর সান্ধ্য জোনাকীর সুর।
তালপাতার বুকে, কাঁপা হাতের অক্ষরে
মৃৎপাত্রে গুলানো লাল মাটি দিয়ে
সে এঁকেছিল কিছু স্বপ্ন -
যেন বৃষ্টিহীন আকাশে হঠাৎ উড়ে যাওয়া মেঘের মতো।
লিখেছিল -
আমার আঙিনাতে আন্ধার কেনে,
তোমার হেথায় যে চান্দের আলো
আমার কাননে ফুল ফোটে নাই,
তোমার বাগানে কে ফুল ফুটালো...
তার শব্দগুলো ছিল না কেবল প্রশ্ন,
ছিল এক অব্যক্ত হাহাকার,
অন্যের আলো দেখে নিজের অন্ধকারকে
নিভৃতে ছুঁয়ে দেখার আকুলতা।
কবি হারিয়ে গেছে বহু যুগের অন্ধকারে,
তার নাম মুছে গেছে ইতিহাসের ধুলোয় -
তবুও তার লেখা রয়ে গেছে
কোনো অচেনা হৃদয়ের ভেতর গোপন প্রদীপ হয়ে।
আজও সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায়
যখন করতোয়ার জল ধীরে বয়ে যায়,
মনে হয়,
সেই নামযশহীন কবি এখনও বসে আছে কোথাও,
তালপাতার বুকে লিখে যাচ্ছে
অন্ধকার আর আলোর অনন্ত প্রেমকথা।
৩. তুমি আছো সবখানে
তুমি জীবনে থাকো আর নাই থাকো,
তবু তুমি আছো
আমার প্রতিটি শ্বাসের ভেতর নীরব স্পন্দনের মতো,
অদৃশ্য অথচ অমোঘ।
কখনো তুমি ছুঁয়ে যাও
অস্তিত্বের গভীরতম নীল অন্ধকারে,
যেখানে একা বসে আমি শুনি
নিজেরই হৃদয়ের প্রতিধ্বনি,
সেই প্রতিধ্বনির ভেতরেও তোমার নাম জেগে থাকে।
কখনো তুমি পার্থিব হয়ে ওঠো
হঠাৎ বাতাসে উড়ে আসা শিউলির গন্ধে,
অথবা বিকেলের রোদে ধুলোমাখা পথে
অচেনা কোনো ছায়া হয়ে
আমি থেমে যাই, মনে হয় তুমি পাশেই হাঁটছো।
আবার কখনো অপার্থিব
স্বপ্নেরও ওপারে কোনো এক জ্যোৎস্না-রাত্রিতে,
যেখানে শব্দেরা হারিয়ে যায়,
শুধু অনুভূতিরা কথা বলে
সেখানে তুমি, আলো হয়ে, নিঃশব্দে জ্বলে ওঠো।
তুমি না থেকেও থেকে যাও,
থেকেও না থাকার এক বিস্ময়কর অনুপস্থিতি,
যেন নদী নেই, অথচ ঢেউ আছে,
যেন আকাশ নেই, অথচ নক্ষত্রেরা জেগে আছে নিরন্তর।
আমি জানি -
এই থাকা-না-থাকার খেলাতেই
তোমার সবচেয়ে গভীর উপস্থিতি,
কারণ তুমি কখনো শুধু মানুষ নও,
তুমি এক অনুভব,
যে অনুভবের কোনো মৃত্যু নেই।
তাই তুমি থাকো, বা না-ই থাকো
আমার জীবনজুড়ে তুমি আছো,
কখনো পবিত্র প্রার্থনায়,
কখনো অশ্রুজলে, আর কখনো -
সবচেয়ে একান্ত অদেখা জগতের
আলোর মতন।
৪. পরানে বাজে বাঁশি
আটলান্টিকের ওপারে সুদূর টরেন্টো শহরে তুমি আত্মজনহীন একাকী থাকো।
বরফ পড়া কোনো রাত্রিতে হয়তো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে তুমি তাকিয়ে থাকো দূরের অন্ধকারে,
মনে মনে ভেবে ওঠো, এই মুহূর্তে বাবা মা কি করছে।
জানো মা,
তোমার জন্যই আজ ঘরের বাতাস একটু অন্যরকম,
মনে হয় তুমি বুঝি পাশের ঘরেই আছো-
হঠাৎ দরজা খুলে এসে বলবে,
“আজ আমার জন্মদিন, কিছুই করলে না?”
কিন্তু দরজা খোলে না,
শুধু স্মৃতিরা মৃদু পায়ে এসে বসে থাকে বুকের ভেতর।
তোমাকে খুব মনে পড়ে মা।
তোমার ছোটবেলার হাসি, তোমার ডাক,
তোমার ছুটে এসে জড়িয়ে ধরার সেই উষ্ণতা।
এই দূরত্বের সমুদ্র পেরিয়েও
আমাদের ভালোবাসা প্রতিদিন তোমার কাছে উড়ে যায়-
বরফ ঝরা সেই জানালার পাশে গিয়ে
নিঃশব্দে তোমার কাঁধে হাত রাখে।
ভালো থেকো মা।
প্রাণের গভীর থেকে, মনের সমস্ত আলো দিয়ে আমাদের আশীর্বাদ তোমার জন্য সবসময়।
শুভ জন্মদিন, আমার আদরের মেয়ে।
আজ এই বিশেষ দিনে তুমি কাছে নেই। পরানে বাজে বাঁশি। নয়নে বহে ধারা।
৫. শূন্যতার প্রতিধ্বনি
কিছু নদী ছিল,
যারা কোনোদিন সাগরের কাছে পৌঁছায়নি,
পথের মাঝেই থেমে গেছে নীরবতার বালুচরে।
কিছু আলো ছিল,
যারা অন্ধকার ভেদ করার আগেই
নিজেদের ভেতরেই নিভে গেছে নিঃশব্দে।
ভেঙে ফেলার মতো দৃঢ় তো কিছু ছিল না,
তবু ভাঙনের শব্দ বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি তোলে
যেন অদৃশ্য কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
যে গল্পটি বলা হয়নি কোনোদিন,
তার প্রতিটি অক্ষর ঝুলে আছে সময়ের প্রান্তে
অপ্রকাশিত, অথচ ভারী।
ঠিক যেভাবে বাতাসের কোনো রঙ নেই,
তবু ছুঁয়ে গেলে বুঝি -
কোথাও এক অদৃশ্য শূন্যতা
ধীরে ধীরে আমাকে জড়িয়ে ধরে।
৬. সহস্র রাতের কথা
বুকের মধ্যে সহস্র রাতের অস্ফুট কান্না লুকিয়ে আছে,
সেই অদৃশ্যমান বেদনার কথা কেউ কান পেতে শোনেনি,
চোখের কোণে জমে থাকা নোনাজলও
কখন যে শুকিয়ে গেছে খেয়াল রাখেনি কেউই।
অন্ধকারে ডুবে থাকা স্মৃতিরা আগুন হয়ে জ্বলে,
নিভতে চায় না, শুধু ধোঁয়া হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্তরে।
একটা নাম, একটা স্পর্শ, এক ফালি উষ্ণতা -
সবই যেন আজ দূরের নক্ষত্র, ছোঁয়ার বাইরে।
বাতাসে ভেসে আসে পুরোনো দিনের গন্ধ,
কিন্তু সেই দিনগুলো আর ফিরে আসে না কোনোদিন।
সময় শুধু পায়ের নিচে ফেলে যায় শুকনো পাতা,
আর আমরা হেঁটে যাই অশ্রু লুকিয়ে, মুখে নীরবতার আবরণ।
কেউ জানে না, কত রাত জেগে থাকি নিরালায়,
কত কথা জমে থাকে অব্যক্ত শব্দের ভিড়ে।
হয়তো এই নিঃশব্দ কষ্টই একদিন
গল্প হয়ে লিখবে নিজের অস্তিত্ব।
আর তখনও কেউ বুঝবে না,
এই মায়াময় বিষাদের ভিতরেই
লুকিয়ে ছিল এক অমলিন ভালোবাসা।
৭. লাবণ্যপ্রভা
স্বপ্ন থেকে, স্মৃতি থেকে, রূপকথা থেকে, প্রণয়োপখ্যাণ থেকে, বিভ্রান্তি থেকে -
একটি নামই উঠে আসে, সে লাবণ্যপ্রভা।
কী অমোঘ দুঃখ সে আজ শতসহস্র আলোকরশ্মির ওপারে,
কোনো ধূপছায়া রাতের একাকী নক্ষত্র হয়ে জ্বলছে,
অস্পষ্ট চাঁদের নিচে জেগে থাকে তার অনুচ্চারিত আহ্বান,
নির্জন বাতাসে ভেসে আসে নামহীন কোনো আর্তি।
বিষণ্ণ গোধূলির রঙে রঙিন হয় তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো,
যেন অর্ধলিখিত চিঠির মতো ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে নীরবতা।
লাবণ্যপ্রভা -
তুমি কি তবে সময়ের ভুলে যাওয়া কোনো স্বপ্নের প্রতিধ্বনি?
নাকি বিস্মৃত কোনো প্রেমের শেষ দীর্ঘশ্বাস,
যা আজও ঝরে পড়ে নক্ষত্রের ক্ষয়ে যাওয়া আলো হয়ে?
তোমার চোখে ছিল এক অদ্ভুত নীল শূন্যতা,
যেখানে ডুবে যেত সমস্ত না-বলা কথার ভিড়।
তোমার হাসিতে ছিল বৃষ্টিহীন মেঘের মতো ক্লান্তি,
তবু সেই ক্লান্তিতেই লুকিয়ে ছিল অসীম মায়ার ছায়া।
আমি যখন একা হই
নিভে যাওয়া প্রদীপের পাশে বসে শুনি তোমার পদধ্বনি,
অদৃশ্য কোনো পথ ধরে তুমি এগিয়ে আসো,
আবার ঠিক ততটাই নিঃশব্দে হারিয়ে যাও দূর অজানায়।
লাবণ্যপ্রভা -
তুমি কি তবে আমার সমস্ত কবিতার অব্যক্ত উপসংহার?
নাকি সেই অসমাপ্ত গল্প,
যার শেষ পংক্তি লিখতে গিয়ে কলম থেমে যায় বারবার?
আজও রাত গভীর হলে
আমি আকাশে খুঁজি তোমার সেই একাকী আলো,
যেখানে দুঃখও জ্বলে ওঠে সৌন্দর্যের মতো
আর নিঃসঙ্গতাও হয়ে ওঠে এক অনির্বচনীয় মায়া।
তুমি নেই, তবু তুমি আছো,
স্বপ্নের আড়ালে, স্মৃতির ভেতরে,
আর প্রতিটি মায়াবী শব্দের অন্তরালে -
লাবণ্যপ্রভা হয়ে।
৮. সমর্পণ
সেখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই
আছে নিস্তব্ধ গভীরতার দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে সময় নিজেই হারিয়ে ফেলে তার গতিপথ।
দুপুরের আলোয় ঝলমল করা দিগন্তের মতো
তার দেহের প্রতিটি রেখা
কোমল অথচ দৃঢ় এক গোপন ভাষা,
যা স্পর্শ না করেও ছুঁয়ে যায় অন্তর্লোক।
তার বুকে জমে থাকা উষ্ণতা
মেঘের মতোই ভারী, স্নিগ্ধ
যেন অদেখা কোনো বৃষ্টির প্রতীক্ষা,
যা নেমে আসবে একান্ত নির্জন প্রহরে।
উন্মুক্ত পিঠ বেয়ে নেমে যাওয়া ঢেউখেলানো ঢাল
সেটি কোনো স্বপ্ন নয়,
বরং নিঃশব্দে গড়ে ওঠা এক পূর্ণতা,
যেখানে দৃষ্টি থেমে থাকে দীর্ঘক্ষণ।
তার চলার ছন্দে ছন্দে জমে আছে
অসংখ্য অজানা রাতের ইশারা
অভিজ্ঞতার মৃদু ছোঁয়ায়
যেখানে দেহ হয়ে ওঠে অনুভবের ভাষ্য।
হাসির আড়ালে লুকানো শান্তি,
আর অনন্তের গভীরে জ্বলতে থাকা আগুন
সেই রহস্যের দুয়ার খুলে যায় কেবল তার জন্যই,
যে নির্ভীকভাবে ডুব দিতে জানে।
কারণ এই শরীর কোনো সাধারণ গল্প নয়
এ এক অবাধ ছন্দ,
যার প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে আকাঙ্ক্ষার সুর,
আর শেষ পঙক্তিতে -
নিঃশর্ত সমর্পণের নিভৃত স্বাক্ষর।
৯. তোমার জন্য
তোমার জন্য খুলে রাখলাম এক অন্য ঋতুর দরজা
সেখানে আকাশ নেই, আছে স্বচ্ছ কাচের মতো ভাঙা স্বপ্ন,
মেঘ নেই, আছে ধোঁয়ার মতো ভেসে থাকা অনুচ্চারিত কথা।
আমার আছে এক জোড়া পথহারা জুতো,
যে জুতোর ভেতরে জমে আছে বহু বিকেলের ক্লান্তি,
আর একখানা ছেঁড়া ডায়েরি
যার পাতায় পাতায় কেবল অসমাপ্ত স্বীকারোক্তি।
এই শহরের জনারণ্যের মোড়গুলো,
হলুদ বাতির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো,
রাত জেগে শোনা অচেনা ট্রেনের হুইসেল
সবই এখন তোমার জন্য রেখে দিলাম।
আমার অকারণ হেসে ওঠা,
হঠাৎ নিভে যাওয়া রাগ,
বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা অদৃশ্য কম্পন
এসব তুমি তুলে নাও, যদি বহন করতে পারো।
তুমি নিতে পারো কিছু অপরাধবোধ,
কিছু ভুল সময়ে বলা নিষ্ঠুর শব্দ,
এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের পাশে বসে
নিজেকেই অচেনা মনে হওয়ার অভ্যাস।
কবিতার সামনে নতজানু হয়ে থাকা রাতগুলো,
আয়নায় নিজের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্ত,
আর হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে চাওয়া এক টুকরো ইচ্ছা
এসবই একান্ত আমার।
আমার পুরোনো দিনগুলো
এখন কেবল ফিকে হয়ে যাওয়া রঙের মতো,
এক সময় ছিল প্রিয়, এখন শুধু ভারী লাগে
তাই খুলে রেখে দিলাম দোরগোড়ায়।
তুমি চাইলে পরতে পারো,
চাইলে বাতাসে উড়িয়ে দাও
কারণ এগুলোর কোনো দাবি নেই আর।
শুধু এইটুকু ইচ্ছে -
তোমার বয়সের মতো নির্মল কিছু
আরেকবার ছুঁয়ে দেখতে পারি তোমার চোখে।
১০. উদাসী হাওয়া
উদাসী হাওয়ার পথে পথে হাঁটতে গিয়ে
মনে পড়ে নিজের গ্লানির কথা,
প্রবঞ্চিত হওয়ার কথা -
যাকে চেয়েছিলাম তাকে না পাওয়ার বেদনার
কথা মনে পড়ে...
মনে পড়ে, অকারণে জেগে থাকা কিছু রাত,
যেখানে স্বপ্নগুলো ভেঙে গেছে নিঃশব্দে,
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুরা
কখন যে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে, টের পাইনি।
মনে পড়ে, একদিন খুব কাছাকাছি ছিলাম আমরা,
কথারা ছিল কোমলস্নিগ্ধ, স্পর্শ ছিল উষ্ণ,
আজ সেইসব শব্দগুলো শুকনো পাতার মতো
মর্মরে ঝরে পড়ে বুকের নির্জন উঠোনে।
কখনও মনে হয়, ভুল ছিল না ভালোবাসা,
ভুল ছিল শুধু সময়টা,
আর হয়তো আমাদের অদৃশ্য দূরত্বগুলো।
নিঃসঙ্গ বিকেলের আলোয় বসে
নিজেকেই প্রশ্ন করি বারবার
কেন এত চাওয়া ছিল?
কেন এত বিশ্বাস রেখেছিলাম ভাঙা প্রতিশ্রুতির উপর?
উত্তর আসে না,
শুধু নীরবতা এসে পাশে বসে,
আর উদাসী হাওয়া
আস্তে আস্তে ছুঁয়ে যায় পুরোনো ক্ষতগুলো।
তবুও কোথাও এক চিলতে আশা বেঁচে থাকে
হয়তো কোনো একদিন,
এই বেদনারও ক্লান্তি আসবে,
আর হৃদয় আবার শিখবে -
ভাঙা সুরে নতুন গান গাইতে।
১১. একাকীত্বের অন্ধকার
একাকী জীবন ভয়ংকর নিমগ্নতায় ডুবে রাখে -
নিস্তব্ধতার গহ্বরে যেন শব্দও হারায় পথ,
দু’চোখ ভরে থাকে অদেখা অশ্রুর ভারে,
আর হৃদয়, এক বিস্মৃত দ্বীপের মতো নিঃসঙ্গ।
রাত নামে ধীরে, অচেনা বিষাদের চাদর মেলে,
তারাদের আলোও যেন দূর থেকে কেবল তাকায় -
ছুঁয়ে না, বুঝে না, কেবল জ্বলে থাকে নির্বাক,
যেন তারা জানে না মানুষের ভিতরের শূন্যতা।
স্মৃতিরা আসে, কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে,
কিছু হাসি, কিছু না বলা কথার প্রতিধ্বনি
হাত বাড়ালেই মুছে যায়,
তবু বুকের ভেতর এক নীরব ঝড় তোলে বারবার।
একাকীত্ব সে কেবল একা থাকা নয়,
সে এক অদৃশ্য সঙ্গী,
যে প্রতিটি নিঃশ্বাসে ফিসফিসিয়ে বলে -
তুমি আছো, কিন্তু কেউ নেই তোমার জন্য।
তবু এই গভীর নিমগ্নতার মাঝেও
একটি ক্ষীণ আলো কোথাও জ্বলে
হয়তো কোনো ভোরের প্রতিশ্রুতি,
হয়তো নিজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা এক নতুন জীবন।
কারণ, একাকীত্ব যতই ভয়ংকর হোক,
তার অন্তরেই জন্ম নেয় অলৌকিক শক্তি
যা ভাঙা মনকে আবার গড়ে তোলে,
আর শূন্যতার ভিতরেই খুঁজে নেয় নিজের আকাশ।
১২. লীলাবতীর ঋতু উপাখ্যান
একজন মাধবীলতা ছিল,
গত শতাব্দীর এক ক্ষণস্থায়ী আলো,
আজ আর তার মুখ মনে পড়ে না,
তবু অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে তার শরীরের ভেতর
লুকিয়ে থাকা উষ্ণতা।
এই ভুলে যাওয়া, এই না-পারা
আমাকে আজও নীরবে দগ্ধ করে,
বিকেলের দিকে তুমি ডাকতে
বংশী নদীর তীরে।
সেখানে রোদ ছিল মোলায়েম,
হাওয়া ছিল শরীর ছুঁয়ে যাওয়ার মতো কোমল।
তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে,
শাড়ির আলগা ভাঁজে আলো জমে উঠত
আর আমি, দূরত্ব রেখেও,
তোমার খুব কাছে চলে যেতাম।
তোমার বুকের কাছে মাথা আনলেই
মনে হতো -
কোনো নিষিদ্ধ বনভূমিতে ঢুকে পড়েছি,
যেখানে গন্ধই একমাত্র ভাষা,
আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে জেগে ওঠে এক অচেনা আকাঙ্ক্ষা।
তুমি কিছু বলতে না, তবু শরীর বলত অনেক কথা।
সেই হেমন্তের সন্ধ্যায়
তোমার চোখে ছিল এক গোপন ইশারা।
আমরা হাঁটছিলাম আলোছায়ার সরু পথে,
যেন প্রতিটি ছায়া আমাদের গোপন করে রাখছে।
সাহানা ভাবীর বাড়িতে
একটু কাঁচা পিয়ারা কামড় দিতে গিয়ে
জিহবায় যে ব্যথা লেগেছিল -
তা যেন শরীরের ভেতর কোথাও অন্যরকম
আগুন জ্বেলে দিয়েছিল।
পান্থপথের সেই নীল আলো
চিরোকীর ভেতরে সময় থেমে গিয়েছিল।
ওয়েটার আলো বদলে দিলে
তোমার মুখ বদলে গেল
ঠোঁট হয়ে উঠল অদ্ভুত উজ্জ্বল,
কমলার কোয়ার মতো টানটান আর সিক্ত।
এক মুহূর্তের স্পর্শে আমরা যেন হারিয়ে গেলাম
দুপুর গড়িয়ে গেল আবেশে,
কেউ টের পেল না।
এক রাত নিঝুমে, জোছনায় স্নাত হয়েছিলাম,
তুমি সাদা শাড়িতে এসে দাঁড়ালে,
ধীরে ঘোমটা তুললে আর আমি দেখলাম,
তুমি আর তুমি নও, তুমি তখন রাধিকা -
অন্য এক সময়ের, অন্য এক আকাঙ্ক্ষার প্রতিমা।
আমলকীর জঙ্গলে আমরা ঢুকে পড়লাম
পায়ের শব্দ পর্যন্ত গিলে নিচ্ছিল নির্জনতা।
তুমি আমাকে টেনে নিলে কাছে,
অতল এক আলিঙ্গনে
যেখানে শরীর আর আলাদা থাকে না,
শুধু অনুভব হয়ে ওঠে একাকার।
জোনাকিরা জ্বলে উঠছিল চারপাশে,
চাঁদ যেন আমাদের খুব কাছে নেমে এসেছিল
তোমার চুলের গন্ধে
আমি ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিলাম,
তোমার স্পর্শে
সময়ের রেখাগুলো মুছে যাচ্ছিল।
সেই দীর্ঘ রাতে
তোমার শরীর হয়ে উঠেছিল এক গোপন ভূগোল,
যেখানে প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি গোপন পথে
আমাকে ডেকে নিচ্ছিল আরও গভীরে।
আমি কোনো পথ খুঁজিনি,
শুধু হারিয়ে যেতে চেয়েছি, বারবার।
ভোর হলে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়,
তুমি হয়ে যাও সাধারণ,
আমি ফিরে আসি আমার একাকীত্বে।
তবু কোথাও, হৃদয় গভীরে এক লীলাবতী
চিরদিনের হয়ে থেকে যায় -
যে আজও নিঃশব্দে জেগে ওঠে
প্রতিটি নির্জন রাতের ভেতরে।
১৩. চন্দ্রালোকের অন্তরালে তুমি
তোমাকে দেখলেই মনে হয়
রাত্রির আকাশে হেলে পড়া চাঁদ,
স্বর্ণভূষণের মৃদু ঝংকারে
জেগে ওঠে কোনো প্রাচীন সুর।
তোমার গাত্রে যেন আলো মাখানো দুধসাদা স্বপ্ন,
আঙুল ছুঁতে গেলেই ভেঙে যাবে
এমন কোমল এক আশঙ্কা
আমার প্রতিটি স্পন্দনে কেঁপে ওঠে।
ঘন কেশের ভিতরে লুকিয়ে থাকে
বৃষ্টিভেজা মেঘের অন্ধকার ডাক,
আর তোমার চোখ
সমুদ্রের মতো গভীর, অথচ টানে অবিরাম,
ডুবিয়ে দেয় আমাকে কোনো নীলতায়।
ওষ্ঠের কোণে লালিমা
ফুটে থাকা অচেনা ফুলের মতো
আমি শব্দ খুঁজে পাই না,
শুধু শ্রান্ত হয়ে দেখি
ভালোবাসা কীভাবে রূপ নেয় তোমার শরীরে।
তোমার দিকে তাকালে মনে হয়
সময় থেমে গেছে কোথাও,
সূর্যও যেন আকাশের উচ্চতা ভুলে
নেমে এসেছে তোমার দিগন্ত ছুঁতে।
তুমি শুধু রূপ নও,
তুমি এক অদৃশ্য আকর্ষণ
যেখানে আমার সকল ক্লান্তি এসে থামে,
আর হৃদয় বলে ওঠে -
এই তো, এটাই আমার চাওয়া।
তোমাকে ভালোবাসা মানে
চাঁদের আলো হাতে ধরে রাখা নয়,
বরং অন্ধকারের ভেতরেও
তোমার আলোয় পথ খুঁজে নেওয়া।
১৪. সেই তুমি
কতকাল চলে গেছে, কত বিষণ্ন
প্রহর, কত রাত্রি।
কত মুগ্ধ মুখ দেখেছি নতুন করে।
কিন্তু
সেই পুরোনো আরক্ত সুন্দর
মুখখানি বহু যুগের কঠিন শীলার
উপর আজও খচিত,
আজও চির মর্মরিত অভিজ্ঞান
হয়ে আছে।
কত বৃষ্টি ঝরেছে, কত রোদ্দুরের উত্তাপ,
স্বপ্নঘোরে কত স্পন্দন
স্পন্দিত হয়েছে,
সেই মুখ, সেই তুমি তেমনি আছ।
নিভে যাওয়া প্রদীপের ধোঁয়ার মতো স্মৃতি,
তবু তোমার হাসি যেন পূর্ণিমার জোছনার ঢেউ,
অবিরাম ভেসে আসে হৃদয়ের তটে।
সময়ের মরুভূমি পেরিয়েও তুমি এক মরূদ্যান,
যেখানে আজও সবুজ হয়ে ওঠে আমার সমস্ত ক্লান্তি।
১৫. স্মৃতির পথে তোমার সাথে
তোমার সাথে কি আর একবার দেখা হবে না
চিত্রা নদীর সেই বৃষ্টিভেজা তীরে,
যেখানে এক বিকেল
আমাদের দু’জনকে
পৃথিবী থেকে আলাদা করে রেখেছিল?
মনে আছে,
হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির ভেতর
তোমার সেই প্রথম আলিঙ্গন।
কোনো পূর্বাভাস ছিল না
তবু যেন বহু জন্মের চেনা
তুমি যখন আমাকে টেনে নিয়েছিলে কাছে,
ভিজে গিয়েছিল শুধু শরীর নয়,
গভীর গোপন, অব্যক্ত কিছু আকাঙ্ক্ষা,
যেগুলো এতদিন শব্দ খুঁজে পায়নি,
তোমার আঙুলের চাপ, ভেজা চুলের গন্ধ,
শ্বাসের উষ্ণতা,
সব মিলিয়ে সেই মুহূর্ত আজও আমার ভেতর
এক অনন্ত বর্ষা হয়ে ঝরে।
তোমার সাথে আর একবার
হাত ধরে হাঁটা হবে না
মধুপুরের অরণ্যের অন্ধকার পথে
যেখানে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম
পথের চেয়ে বেশি একে অপরের ভেতর।
সেই রাতে,
চাঁদের আলো আমাদের গায়ে পড়েনি,
পড়েছিল আমাদের নীরবতায়।
তুমি কিছু বলোনি, কিন্তু তোমার স্পর্শ
আমার সমস্ত ভাষা কেড়ে নিয়েছিল।
তোমার বুকে মুখ রেখে
আমি অনুভব করেছিলাম,
হৃদস্পন্দনেরও একটি ভাষা আছে,
যা উচ্চারণ করা যায় না,
শুধু ডুবে থাকা যায়।
মনে আছে,
মহাস্থানগড়ের দেয়ালে হেলান দিয়ে
তুমি যখন ইতিহাস ছুঁয়েছিলে,
আমি তখন তোমার চোখে দেখছিলাম-
সময়ের চেয়েও প্রাচীন এক প্রেম,
যা শুধু অনুভব করা যায়।
আর কান্তজির মন্দিরের নিখুঁত কারুকাজের মাঝে
তুমি যখন মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলে,
আমি ভাবছিলাম,
মানুষ এত সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে,
তবু তোমার হাসির কাছে
সবই এত তুচ্ছ কেন লাগে?
ষাটগম্বুজ মসজিদের নীরবতায়
আমরা যখন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলাম,
আমার মনে হয়েছিল,
এই নীরবতাই হয়তো সবচেয়ে পবিত্র,
কারণ সেখানে তুমি ছিলে,
আর আমি ছিলাম,
কোনো শব্দের প্রয়োজন হয়নি।
আর সেই সন্ধ্যা-
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের শেষ আলোয়, তুমি বলেছিলে -
দেখো, আলোও কেমন করে বিদায় নেয়…
আমি তখন তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম,
তুমি যদি চলে যাও,আমার আকাশও কি এমন নিঃশব্দে নিভে যাবে?
সেই মুহূর্তে, তোমার ঠোঁট ছুঁয়ে গিয়েছিল আমার কপাল,
তারপর খুব ধীরে,
আমাদের মাঝখানে দূরত্বটা
নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল।
সময় থেমে ছিল না, বরং আমাদের ভেতরেই চিরদিনের জন্য আটকে গিয়েছিল।
মনে পড়ে,
কলমাকান্দা হাওরের জলে ভাসতে ভাসতে
তুমি হঠাৎ চুপ হয়ে গিয়েছিলে,
আর সেই নীরবতায় আমি শুনেছিলাম,
তোমার ভেতরের অস্থিরতা,
যা আমারই মতো।
তোমার আঙুল জড়িয়ে ধরেছিল আমার আঙুল,
সেই আঁকড়ে ধরা যেন বলছিল,
ছাড়বে না…
তবু আমরা দু’জনেই জানতাম,
সবকিছু চিরদিন ধরে রাখা যায় না।
আজও সেইসব জায়গা আছে, আকাশ একই, বাতাস একই, কিন্তু তুমি নেই,
আর নেই আমাদের সেই অবুঝ, বেপরোয়া ভালোবাসা।
আমি মাঝে মাঝে ফিরে যাই চিত্রার ধারে, বা কোনো নির্জন পথে
হয়তো হঠাৎ বাতাসে পাই তোমার গায়ের গন্ধ,
হয়তো কোনো অদৃশ্য স্পর্শে
চমকে উঠি একা।
যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়,
মহাস্থানগড়ের ধুলোয়,
কুয়াকাটার শেষ আলোয়,
বা কোনো অচেনা নদীর বাঁকে,
আমি কিছুই বলবো না।
শুধু খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াবো
এতটাই কাছে,
যেন আবার অনুভব করতে পারি,
তোমার শ্বাস, তোমার উষ্ণতা,
তোমার সেই চিরচেনা কাঁপন।
আর তখন, নীরবে, গভীরে,
নিজেকেই বলবো - আমরা হারাইনি,
আমরা শুধু এক অনন্ত স্মৃতির ভেতর
বেঁচে আছি।
১৬. স্বপ্নের ভিখারি
তুমি কি ভেবেছো আমি ভিখারি, শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে আছি শুধু তোমার দরজায়? জানো না, এই হাতেই একদিন নক্ষত্র ছুঁয়ে আনবো আকাশ থেকে, তোমার কপালে টিপ হয়ে জ্বলবে তারা।
আমি আজ মাটির মানুষ, ধুলোর সাথে মিশে থাকা এক স্বপ্নবাজ, কিন্তু বুকের ভেতর যে আগুন, তা দিয়ে একদিন সূর্যও ধার চাইবে আলো।
শোনো, আমি নদী হবো, তুমি হবে আমার সাগর, সব ক্লান্তি বয়ে এনে ঢেলে দেবো তোমার বুকে। আমি বাতাস হবো, তুমি জানালার পর্দা, তোমার স্পর্শে দুলে উঠবে আমার প্রতিটি দমকা হাওয়া।
আমি শূন্য আকাশ, তুমি একটিমাত্র চাঁদ, তোমাকে ঘিরেই পূর্ণ হবে আমার সমস্ত রাত।
যেদিন সময় আমার পক্ষে দাঁড়াবে, সেদিন আমি কেবল ঘর না, একটা রাজ্য গড়বো তোমার জন্য, সেখানে দুঃখের কোনো প্রবেশাধিকার থাকবে না, হাসিই হবে একমাত্র আইন।
তোমার জন্য বানাবো রাজপ্রাসাদ, ইট-পাথরে নয়, ভালোবাসার স্পন্দনে গড়া এক অনন্ত আশ্রয়, যেখানে প্রতিটি দেয়াল বলবে - তুমি আমার, শুধু আমার।
তুমি হবে আমার রাজরাণী, আর আমি, তোমার চোখের ভেতর বন্দী এক রাজা, যে সিংহাসন ভুলে গিয়ে শুধু তোমার হাতটা ধরেই বাঁচতে চায়।
তাই আজ আমাকে ভিখারি ভাবো যদি, ভাবো, কিন্তু মনে রেখো, এই ভিখারির স্বপ্নই একদিন তোমার পৃথিবী বদলে দেবে।
১৭. কবে কখন
বলতে পারো -
ঠিক কবে প্রথম তোমাকে ভালো লেগেছিল?
কোন গোপন মুহূর্তে তোমার চোখের গভীরে
আমি ডুবে গিয়েছিলাম নিঃশব্দে?
কোন অচেনা স্পর্শে
শরীরের ভেতর কেঁপে উঠেছিল অজানা সুর,
আর তুমি হয়ে উঠেছিলে
আমার সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার একমাত্র নাম?
বলতে পারো -
কখন শ্রাবণের বৃষ্টি থেমে গিয়ে
জমে উঠেছিল তোমার চোখের কোণে,
আর আমি সেই জলে ডুবে গিয়ে
নিজেকে হারাতে চেয়েছিলাম বারবার?
কখন বাতাস ছুঁয়ে গিয়েছিল তোমার খোলা চুল,
আর সেই গন্ধে আমার সমস্ত অস্তিত্ব
অবাধ্য হয়ে উঠেছিল?
কখন সন্ধ্যাতারা ঝরে পড়েছিল উঠোনে,
আর তুমি এসে দাঁড়িয়েছিলে এত কাছে
যে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশে গিয়েছিল?
কখন চম্পা-বকুলের মাদক গন্ধে
তোমার দেহভাষা হয়ে উঠেছিল
অলিখিত কোনো কবিতার মতো?
বলতে পারো -
ভালোবাসার সেই প্রথম উৎসব
শুরু হয়েছিল কোন জ্যোৎস্নাভেজা গভীর রাতে,
যখন অন্ধকারও আমাদের আলাদা করতে পারেনি,
আর আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম
স্পন্দনে, উষ্ণতায়, রক্তের গোপন ঢেউয়ে?
কোন ক্ষণে -
তোমার আঙুলের ছোঁয়ায়
আমার সমস্ত সংযম ভেঙে গিয়েছিল,
আর আমি তোমার ভেতরেই খুঁজে নিয়েছিলাম
নিজের সমস্ত পূর্ণতা?
কখন থেকে -
দুটি শরীরের নীরব ভাষা
একই ছন্দে কেঁপে উঠেছিল,
আর দুটি আত্মা
অবিচ্ছেদ্য একাত্মতায় জড়িয়ে গিয়েছিল?
বলতে পারো?
নাকি এসব মুহূর্তের কোনো দিন-তারিখ নেই,
শুধু আছে দহন, স্পর্শ, আর স্মৃতি,
যা আজও নিঃশব্দে জ্বলে
আমাদের ভেতরেই।
১৮. পরমা
এই পৃথিবী সাজানো হয়েছে
একটি মাত্র অক্ষকে কেন্দ্র করে
যেখানে ক্ষমতা মানে দখল,
আর দখল মানেই পুরুষ।
এই যে খেলনা বন্দুক,
এই যে যুদ্ধের রিহার্সাল -
ছেলেদের শৈশবকে বানানো হয় যুদ্ধক্ষেত্র,
আর মেয়েদের শৈশব
ঘরের ভেতর বন্দি এক অনুশীলন।
এ এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত
শৈশব থেকেই শেখানো হয়
কে শাসন করবে,
আর কে শাসিত হবে।
কিন্তু শোন -
এই স্ক্রিপ্ট আমি মানি না,
চিত্রাঙ্গদা যখন নিজের তলোয়ার নিজেই তুলে নেয়,
জোয়ান অব আর্ক
যখন আগুনের ভেতর দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ভাষা লেখে,
দ্রোপদী যখন অপমানকে আগুনে বদলে দেয়
তখন তোমাদের তত্ত্ব ভেঙে পড়ে,
কারণ আমরা কারও প্রতিলিপি নই
আমরা নিজস্ব সৃষ্টি।
তোমরা যাকে বলেছিলে হিংসা,
সেটা আসলে ছিল
তোমাদের ভয়।
ভয়,
যদি আমরা বুঝে যাই
আমরা কখনোই অসম্পূর্ণ ছিলাম না!
আমি সেই কণ্ঠ -
যে কণ্ঠকে ইতিহাস চুপ করাতে চেয়েছিল,
আমি সেই শরীর -
যাকে সংজ্ঞা দিতে চেয়েছিল অন্য কেউ।
আজ আমি ঘোষণা করছি -
আমার দেহ কোনো কমতি নয়,
কোনো অপেক্ষা নয়,
কোনো অধীনতা নয়।
এই দেহ -
একটি সম্পূর্ণ ভূখণ্ড,
যেখানে আমি নিজেই রাষ্ট্র,
নিজেই সংবিধান,
এবং আজ থেকে -
তোমাদের সব তত্ত্বের বিরুদ্ধে
আমিই বিদ্রোহ।
১৯. উর্মীর আলিঙ্গন
একটি ছবির ভেতর ভেঙে পড়েছে এক পৃথিবী,
একটি আলিঙ্গন, শেষবারের মতো—
যেখানে সময় থেমে থাকে,
আর জীবন নিঃশব্দে সরে যায় দূরে।
উর্মী দাঁড়িয়ে আছে,
না, দাঁড়িয়ে নয় -
ভেঙে পড়া আকাশের নিচে নিজেকে ধরে রেখেছে কেবল,
দু’হাত জড়িয়ে আছে প্রিয় শরীরের চারপাশে,
যেনো ভালোবাসা দিয়ে মৃত্যুকেও ফিরিয়ে আনবে।
চোখের জল কি তখন শুধু জল?
না -
ওটা এক সমুদ্র,
যেখানে ডুবে গেছে হাজারো অসমাপ্ত সকাল,
হাজারো না বলা কথা,
হাজারো স্বপ্নের রোদেলা দুপুর।
পুরুষটি নিথর -
কিন্তু উর্মীর বুকে এখনো তার স্পন্দন,
তার নাম, তার হাসি, তার প্রতিশ্রুতি -
সবকিছু জমাট বেঁধে আছে এক দীর্ঘশ্বাসে।
এই পৃথিবী চলেছে, চলবেই -
কিন্তু এই এক মুহূর্ত
চিরকাল থেমে থাকবে ইতিহাসের বুকের ভেতর,
একটি স্ত্রীর আলিঙ্গনে বন্দী হয়ে।
উর্মী,
তুমি শুধু একজন নারী নও,
তুমি এক অনন্ত ভালোবাসার নাম,
যে ভালোবাসা মৃত্যুকেও হার মানায়,
যে ভালোবাসা পৃথিবীকে এখনো টিকিয়ে রাখে।
সব মাঠ, সব নদী, সব আকাশ
আজ তোমার হয়ে কাঁদুক,
সব কবিতা এসে জড়ো হোক তোমার পায়ের কাছে,
কারণ তুমি আজ হয়ে গেছো
সমস্ত বেদনার এক অনন্ত প্রতীক।
আর আমরা -
দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো
শুধু দেখি, আর শিখি
ভালোবাসা কত গভীর হতে পারে,
কত নিঃশব্দে ভেঙে পড়তে পারে একটি জীবন।
উর্মী, তুমি বেঁচে থাকো,
এই পৃথিবীর প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
প্রতিটি বাতাসে, প্রতিটি শব্দে
কারণ তোমাদের মতো ভালোবাসাই
এই পৃথিবীকে এখনো সত্য করে রাখে।
২০. তোমাকে দেখি আলোর রঙে
ভোর নামে খুব আস্তে আলো গায়ে মেখে।
শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখলেই মনে হয়, তুমি আগে হেঁটেছিলে এখানে,
স্বপ্নগুলোও যেন তোমার ছোঁয়ায় ভিজে থাকে,
সূর্যের প্রথম কিরণ যখন আকাশ ছুঁয়ে ওঠে,
তার ভেতরেই শুনি তোমার নাম -
নিঃশব্দ, অথচ গভীর।
দুপুর আসে আগুন হয়ে,
রোদ পুড়িয়ে দেয় শরীর, মন সবকিছু,
তবু সেই দহনেও তোমাকেই খুঁজি,
ঘামের নোনা স্বাদে মিশে থাকে তোমার অদৃশ্য স্পর্শ,
যেন প্রতিটি ক্লান্তি আসলে তোমারই দিকে এগিয়ে যাওয়া।
বিকেলে আলো ম্লান হয়, ছায়া লম্বা হয়,
সেই ফাঁকে তোমার হাসি হঠাৎ এসে বসে আমার পাশে,
কোনো শব্দ নেই, তবু মনে হয় তুমি ডাকছো,
হাওয়ার ভেতর ভেসে অজানার দিকে।
সন্ধ্যা নামে ধীরে,
রঙ বদলায় আকাশের
আর সেই রঙের ভেতর তোমার মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে -
অন্ধকার নীল হয়ে এলে দেখি,
তোমার চোখ দুটো নক্ষত্রের মতো জ্বলছে।
নিস্তব্ধতার ভেতর তুমি গান গাও
আমি শুনি, আর ক্লান্তি ঝরে পড়ে নিঃশব্দে, তারপর রাত,
গভীর, দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ।
তোমাকে হারিয়ে ফেলতে ভয় লাগে,
তাই আলো জ্বালি বাইরে না, ভেতরে-
হৃদয়ের ভেতর একটুকরো প্রদীপ রেখে দিই,
যেন তুমি পথ ভুলে না যাও।
চাঁদের আলোয় তোমার মুখ আঁকি,
বারবার, নতুন করে,
নক্ষত্র গুনি, আর প্রতিটাকে তোমার গল্প বানাই,
স্বপ্নের জানালায় তুমি এসে দাঁড়াও -
কিছু বলো না, শুধু থাকো
আর আমি পুরো রাত কাটাই তোমার নীরব উপস্থিতি বুকে নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বুঝি -
তুমি কোথাও দূরে নও।
তুমি আছো প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি শ্বাসে।
দিনের আলো, রাতের অন্ধকার
সবকিছু মিলেই তুমি,
সময় যদি থেমে যেত,
তবে হয়তো এই দেখাটুকুই অনন্ত হয়ে থাকত -
তোমাকে দেখার এই নেশা,
আলোর সব রঙে।
২১. হৃদয়ের অনুপস্থিতি
যে চোখে জল আসে না
অন্যের কান্না দেখে,
সে চোখে আকাশ থাকে ঠিকই
কিন্তু মেঘ জমে না কখনও।
যে হৃদয় কাঁপে না
অপরের ভাঙা স্বপ্নের শব্দে,
সে হৃদয় স্পন্দিত হয় বটে
কিন্তু জীবিত নয় আসলে।
পথের ধারে পড়ে থাকা ক্লান্ত মানুষ,
ক্ষুধার্ত শিশুর নীরব চাহনি,
অথবা নিঃশব্দে ভেঙে পড়া কারও জীবন -
সবই তার কাছে দৃশ্য মাত্র,
কোনো অনুভব নয়।
সে হাঁটে, দেখে, চলে যায় -
যেন পৃথিবী কেবল নিজের জন্যই,
অন্যের বেদনা তার অভিধানে নেই।
তবুও সে বুঝে না,
এই অনভিজ্ঞতা, এই শূন্যতাই
তার সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
কারণ
যে কাঁদতে পারে না অন্যের জন্য,
সে হাসতেও পারে না পূর্ণতায়।
মানুষ হওয়া মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়,
মানুষ হওয়া মানে
অন্যের ব্যথায় নিজের হৃদয় ভিজে ওঠা।
যে তা পারে না, সে শুধু দুর্ভাগা নয় -
সে এক নিঃসঙ্গ গ্রহ,
যেখানে ভালোবাসার কোনো ঋতু আসে না।
২২. বৃষ্টির বহমানতায়
যখন ঝমঝম শব্দে আকাশ ভাঙ্গিয়া নামিয়া আসে বৃষ্টি,
ধরিত্রীর বুকে সজল মৃত্তিকা হইয়া ওঠে
যেন প্রিয় স্পর্শে কাঁপে কোনো লাজুক হৃদয়,
ভূবন জুড়িয়া তখন বহে শীতল বাতাস,
নদীর বুকে সন্ধ্যার মেঘ ফেলিয়া দেয় নীলাভ ছায়া,
বৃক্ষরাজির অন্তরালে নামিয়া আসে অন্ধকার,
নিশীথের আঁচলে ঢাকা কোনো গোপন আকুলতা।
ঠিক তখনই আমি আসিব তোমার কাছে,
বৃষ্টিধারার মতো নিঃশব্দ,
বাতাসের মতো অদৃশ্য অথচ স্পর্শময়।
তুমি দেখিতে পাইবে -
দক্ষিণা বাতাসে রুক্ষ চরাচর হইয়াছে মোলায়েম,
যেন বিরহের পর মিলনের প্রথম আলিঙ্গন;
মেঘ ভাঙ্গিয়া নামিয়াছে বৃষ্টি,
অভিমান ভাঙার মতো অশ্রুসজল, নির্মল।
নদী ভরিয়া উঠিয়াছে জলে,
যেন হৃদয় উপচে পড়ে ভালোবাসায়,
বৃক্ষপল্লব হইয়া উঠিয়াছে নবীন সবুজ,
যেন পুনর্জন্ম পাওয়া স্বপ্নেরা ডানা মেলিয়াছে আবার।
তখনই তুমি দেখিতে পাইবে আমাকে
এই বহমানতায়, এই স্রোতে, এই সজীবতায়,
বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দুতে,
মেঘের ভাঙা টুকরোয়,
আকাশের বিস্তৃত নীলিমায়,
বাতাসের নিঃশব্দ ছোঁয়ায়,
নদীর গভীর স্রোতে,
আর বৃক্ষরাজির সবুজ নিশ্বাসে।
আমি ছড়িয়া থাকিব তোমার চারপাশে,
অদৃশ্য অথচ অনিবার্য,
ঠিক ভালোবাসার মতো।
২৩. শেষ উষ্ণতার আলিঙ্গন
যখন চোখ শেষবারের মতো বন্ধ হয়ে যাবে নিঃশব্দে,
সময়ের সব শব্দ থেমে যাবে এক অনন্ত স্তব্ধতায়,
ঠিক তখনই তুমি এগিয়ে আসবে,
ভাঙা আলো আর ঝরে পড়া নিশ্বাসের ভেতর দিয়ে।
আমার নিথর হয়ে যাওয়া দেহটাকে
তোমার দুই বাহুর ঘেরাটোপে জড়িয়ে রাখবে,
যেন মৃত্যু ভুল করে ভাবে -
এ এখনো জীবনেরই কোনো উষ্ণ অধ্যায়।
তোমার বুকের ধ্বনি
শেষবারের মতো ছুঁয়ে দিক আমার নীরবতা,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা
ধীরে ধীরে গলিয়ে দিক জমে যাওয়া শীতলতা।
আমি আর কিছু চাইবো না,
না কোনো অমরত্ব, না ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি-
শুধু চাই, তোমার সেই আলিঙ্গনে
শেষ হোক আমার সব অপ্রকাশিত অনুভব।
যেন মৃত্যুও হিংসে করে বলে ওঠে -
এ কি বিদায়, না কি ভালোবাসার আরেক জন্ম?
আর তুমি -
আমার নিঃশেষের মাঝেও রেখে দিও
একটুখানি অনন্ত উষ্ণতা,
যেখানে আমি চিরদিন বেঁচে থাকবো
তোমার নিঃশ্বাসের গভীরে।
২৪. নক্ষত্রলোকের পথে
একা নয়, দু'জনেই চলে যেতে চাই নক্ষত্রলোক
চন্দ্রালোকিত বসন্ত রাত উদ্ভাসিত তব মাঝে
পথে পথে লোনা জলের ধারা বয়ে যাক না -
আমাদের পথচলায় সমস্ত সমর্পণ সত্য হোক।
তোমার হাত ধরে ছুঁয়ে দেখি অজানা নীলিমা,
যেখানে সময় থেমে থাকে নিঃশব্দ প্রতীক্ষায়,
ভাঙা স্বপ্নের টুকরোগুলো জুড়ে দিই আলতো ছোঁয়ায়,
আর হারিয়ে যাই অনন্তের গোপন দিগন্তে।
যদি ঝড়ে ভেঙে পড়ে এই ক্ষণিক পৃথিবীর বাঁধন,
তবুও তোমার চোখে খুঁজে নেব চিরন্তন আশ্রয়,
যেখানে নেই কোনো বিদায়, নেই কোনো অবসান -
শুধু দু’টি হৃদয়ের অবিরাম জ্যোৎস্না-বোনা গল্প।
নক্ষত্রেরা ডাক দিক, আকাশ খুলে দিক দ্বার,
আমরা পেরিয়ে যাব সব সীমারেখা, সব সংশয়,
ভালোবাসার নিঃশ্বাসে লিখব নতুন মহাকাব্য -
যেখানে তুমি আর আমি, এক অবিনশ্বর আলো।
২৫. অপেক্ষার খোলা দরজা
ফিরে আসবে না জানি, তবুও দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকব তোমার জন্য,
অন্ধকার বারান্দায় জোনাকির মতো জ্বলবে আমার অপেক্ষা,
নিভে যাওয়া প্রদীপে বারবার আগুন ধরাব তোমার নামে।
জানি, পথগুলো আর তোমার পায়ের শব্দে ভরবে না,
তবুও প্রতিটি বাতাসে খুঁজে ফিরব তোমার পদশব্দ,
প্রতিটি ছায়ায় আঁকব তোমার মুখ অস্পষ্ট, তবুও আপন।
রাত নামলে চুপিচুপি বসে থাকব জানালার ধারে,
চাঁদের আলোয় লিখব তোমার জন্য খোলা চিঠি,
যার কোনো ঠিকানা নেই, তবুও পৌঁছে যাবে তোমার হৃদয়ের ভেতর।
তুমি আসবে না, এই সত্যটা জেনেও
মেঘের ভেলায় তোমার স্মৃতি ভাসাব,
আর ভেজা বাতাসে রেখে দেবো অব্যক্ত ভালোবাসা।
একদিন হয়তো সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে,
অপেক্ষার আলো নিভে যাবে নিঃশব্দে,
তবুও আমার ভেতরের এক কোণে
তোমার জন্য খোলা থাকবে
একটা দরজা, মহিমান্বিত কিছু আলো, আর অনন্ত অপেক্ষা।
২৬. কবরস্থান
মাসের কোনো এক নির্জন বিকেলে
নিজের ভেতরটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ো
না থাকুক ফোনের ক্রীং ক্রীং শব্দ ,
না থাকুক মানুষের কোলাহল,
শুধু নিঃশব্দে পাশে বসুক তোমার ছায়া।
দেখবে -
সময় এখানে থেমে থাকে না,
তবুও সবকিছু অদ্ভুত স্থির।
একটার পর একটা দেহ আসে,
নামগুলো ঝরে পড়ে বাতাসে,
পরিচয়গুলো ভাঙা পাতার মতো উড়ে যায়।
যে মানুষটা একদিন ছিল কেন্দ্রবিন্দু,
আজ সে শুধু নিঃশ্বাসহীন এক অবয়ব -
সব দাবি, সব অধিকার,
মুছে গেছে এক নিমিষে।
কাঁধগুলো, যেগুলো ছিল পাহাড়ের মতো দৃঢ়, আজ নুয়ে নেই -
কারণ আর কোনো বোঝা নেই,
কোনো প্রতিশ্রুতির ভার নেই।
হাতগুলো, যেগুলো ধরেছিল ভালোবাসা, এখন স্থির, শীতল,
কোনো উষ্ণতা ফেরে না,
কোনো ডাক পৌঁছায় না।
তারপর এগিয়ে যেও -
কবরের খুব কাছে।
দেখবে, মাটি কত নিরপেক্ষ
সে জানে না কে রাজা, কে পথের মানুষ,
সে শুধু গ্রহণ করে,
সবকিছুকে সমান করে ফেলে।
এক মুহূর্তে -
স্বপ্ন, অহংকার, আকাঙ্ক্ষা,
অভিমান, প্রতিশোধ, মায়া,
সব ঢাকা হয়ে যায় মৃত্তিকা তলে
যে জীবনের জন্য এত দৌড়,
সে জীবনই হারিয়ে যায়
কবরে মিলিয়ে যায় অচেনা হয়ে।
শেষে থাকে কিছু জল -
আর কিছু অদৃশ্য স্মৃতি,
যেগুলোও একদিন হারিয়ে যাবে
সময়ের গভীর স্রোতে।
ফিরে আসার আগে,
নিজেকেই জিজ্ঞেস করো -
এই যে এত তাড়া, এত লড়াই,
সব কিসের জন্য?
যখন শেষটা এতটাই নিঃশব্দ,
তখন এই অহংকার কেন?
তাই কখনো কখনো -
নিজেকে সত্যের সামনে দাঁড় করাতে,
নিঃশব্দ সেই প্রান্তরে যেও -
যেখানে জীবন শেষ হয়ে
অর্থ খুঁজে পায় নতুন করে।
২৭. আলো হয়ে যায়
বোন’রা একদিন আলো হয়ে যায়,
নিজের ঘরের আঙিনা ছেড়ে
অচেনা এক উঠোনে জ্বেলে দেয় নতুন প্রদীপ।
যেখানে তাদের নাম নতুন,
পরিচয় নতুন,
কিন্তু বুকের ভেতরটা থেকে যায় পুরোনোই,
শৈশবের গন্ধে ভেজা।
তারা ফেলে আসে মায়ের আঁচলের উষ্ণতা,
বাবার কঠিন কণ্ঠের আড়ালের ভালোবাসা,
ভাইয়ের সাথে ঝগড়া,
বোনের সাথে ভাগাভাগি করা গোপন স্বপ্ন।
সব কিছু গুছিয়ে রেখে যায় স্মৃতির বাক্সে,
চোখের কোণে লুকিয়ে রাখে শেষ বিদায়ের জল।
তারপর -
হাসিমুখে পা বাড়ায় অন্য এক জীবনে,
যেখানে দায়িত্বের নাম ভালোবাসা,
আর ভালোবাসার নাম কখনো কখনো ত্যাগ।
বোন’রা কাঁদতে জানে,
কিন্তু কাঁদতে কাঁদতেই হাসতে শেখে
কারণ তাদের চোখের জল
নতুন ঘরের সুখ নষ্ট করুক, তা তারা চায় না।
তারা রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি ফিরে যায়,
মনের ভেতর সেই পুরোনো ঘরে -
যেখানে তারা এখনও মেয়ে,
কারো বোন,
কারো অভিমানী আদরের মানুষ।
বোন’রা আসলে শুধু মানুষ নয়,
তারা একেকটা প্রদীপ -
নিজে জ্বলে,
অন্যের ঘর আলো করে।
আর তাদের এই নিঃশব্দ ত্যাগেই
দু’টি ঘর বেঁচে থাকে - একটি স্মৃতিতে,
আরেকটি বাস্তবতায়।
২৮. শূন্যতার গল্প
দীর্ঘশ্বাসের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়,
পাশ ফিরে দেখি - শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতার বিছানা, কেউ নেই -
শুধু বালিশে লেগে আছে তার চুলের গন্ধ।
আমি হাত বাড়াই অন্ধকারে -
কেউ নেই ধরার, তবু মনে হয় তুমি আছো।
রাত যত গভীর হয়, তত স্পষ্ট হয় তোমার অনুপস্থিতি,
তত ভারী হয় এই নিঃশ্বাস, এই একাকীত্ব।
তুমি নেই, এই সত্যটা জানি,
তবুও কেন মনে হয়
এই ঘর, এই বালিশ, এই বিছানা, এই নিঃশ্বাস -
সবকিছু এখনো তোমাকেই আঁকড়ে ধরে আছে?
শূন্যতা কখনো এত পূর্ণ হতে পারে
তা আমি শুধু তোমার অনুপস্থিতিতেই শিখেছি।
২৯. দূরে কোথায়
সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের কোনো
দূর শহর থেকে
যখন মেয়েটি ভিডিও কলে কথা বলে,
তখন পর্দার ওপারে তার মুখটা যেন আলো
হয়ে ভেসে ওঠে -
আমি হাত বাড়াই, ছুঁয়ে দিতে চাই তার গাল,
বুকে টেনে নিতে চাই নিঃশব্দে, গভীর ভালোবাসায়,
কিন্তু স্পর্শটা থেমে যায় কাচের এপারে।
ওর হাসিটা ভেসে আসে,
শব্দগুলো এসে জড়িয়ে ধরে হৃদয়,
তবুও দূরত্বটা থেকে যায়—নিঃশব্দ, অনন্ত।
মনে হয়, সে যেন কোনো মরিচীকা,
চোখ ভরে দেখি, অনুভবে জড়িয়ে রাখি,
কিন্তু কাছে টেনে নেওয়ার সাধটুকু
অধরাই থেকে যায় প্রতিটি মুহূর্তে।
তবুও এই দূরত্বের মাঝেই
একটা অদ্ভুত মায়া জন্ম নেয় -
যেখানে স্পর্শ নেই, তবু ভালোবাসা আছে,
যেখানে কাছে পাওয়া যায় না,
তবু হারিয়েও ফেলা যায় না কখনো।
তবুও এই দূরত্বের মাঝেই
একটা অদ্ভুত মায়া জন্ম নেয় -
যেখানে স্পর্শ নেই, তবু ভালোবাসা আছে,
যেখানে কাছে পাওয়া যায় না,
তবু হারিয়েও ফেলা যায় না কখনো।
৩০. সকালের শোকগাথা
আজ তুমি চলে গেলে এই শহর ছেড়ে,
যেখানে গেলে সেখান থেকে কেউ আর ফেরে না,
সে দূর কক্ষপথ, সে আর এক জগৎ-
তুমি সেই জগতের আকাশে তারা হয়ে জ্বলে থাকবে।
এই শহরের ব্যস্ততা তেমনই থাকল,
মেট্রো স্টেশনের প্লাটফর্মে দীর্ঘ লাইন,
হুইসেল বাজিয়ে শতশত গাড়ি ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে,
কর্মমুখী মানুষ হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে,
ছাত্রছাত্রীরা কাঁধে বই নিয়ে স্বপ্নের পথে হাঁটে,
শ্রমিকের ঘামে ভিজে ওঠে কারখানার দেয়াল,
কেবল তুমি আর যাবে না কোথাও,
কারণ তুমি আজ চিরতরে মৃত্তিকার অন্ধকার গহ্বরে হারালে নিজেকে।
তুমি আর কবিতা লিখবে না মাছরাঙা গ্রুপের জন্য,
তোমার শব্দেরা আর কাঁপাবে না কারও নিঃশব্দ রাত,
ফেসবুকের টাইমলাইনে আর হঠাৎ ভেসে উঠবে না
তোমার সেই অমলিন পংক্তিগুলো,
যেগুলো পড়লে মনে হতো,
কেউ যেন খুব কাছে বসে মনের কথা বলে যাচ্ছে।
এ শহরের আকাশ সবসময় নীল,
কিন্তু তার নীচে একরাশ শূন্যতা রয়ে গেছে,
একটি কণ্ঠ থেমে যাওয়ার শব্দ
নীরবেই প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে চারপাশে।
তোমার চায়ের কাপটা হয়তো এখনো তোমার ঘরেরটেবিলে পড়ে আছে,
অর্ধেক লেখা খাতার পাতায় শুকিয়ে গেছে কালি,
কোনো এক অসমাপ্ত কবিতা
অপেক্ষা করে আছে তোমার ফেরার -
যা আর কোনোদিনই পূর্ণ হবে না।
রাতের আকাশে যখন নতুন কোনো তারা জ্বলে উঠবে,
আমরা ভাবব, ওটা কি তুমি?
নাকি তোমারই কোনো অব্যক্ত শব্দ
আলো হয়ে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে?
তুমি নেই,
তবুও তোমার অনুপস্থিতি যেন সবচেয়ে বেশি উপস্থিত,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্মৃতিতে,
প্রতিটি একাকী সন্ধ্যায়।
এই শহর বেঁচে থাকবে,
মানুষ বেঁচে থাকবে, সময় বয়ে যাবে -
কিন্তু কিছু নাম, কিছু কণ্ঠ, কিছু অনুভব
সময়ও মুছে ফেলতে পারে না।
তুমি সেখানেই থাকো,
দূর নক্ষত্রের নিঃসঙ্গ আলো হয়ে,
আর আমরা এখানে -
তোমার রেখে যাওয়া কবিতার ভিতরেই
ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবো।
৩১. সত্য মিথ্যা
আমি মিথ্যার কাছে যাই না সহজে,
সত্যের দোরগোড়ায় বসে থাকি দীর্ঘক্ষণ -
শব্দগুলোকে ছেঁকে নিই,
যেন তারা কারো হৃদয় না ভাঙে,
কারো চোখে না জমে অকারণ অশ্রু।
তবু কখনো, খুব গোপনে,
একটু মিথ্যা এসে বসে আমার ঠোঁটে -
নরম, নিরীহ, অনাহুত অতিথির মতো।
সে মিথ্যা কারো ক্ষতি করে না,
বরং কারো ভাঙা মনটাকে
একটু জোড়া লাগাতে চায়।
যখন দেখি,
কঠিন সত্যটা শীতল ছুরির মতো,
আর আমার একটি মিথ্যা
হয়ে উঠতে পারে উষ্ণ কম্বল,
তখন আমি দ্বিধায় পড়ি -
সত্য কি সবসময়ই শ্রেষ্ঠ,
নাকি মায়াটুকুও কখনো প্রয়োজন?
আমি জানি,
প্রতিটি মিথ্যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক টুকরো অপরাধবোধ,
তবু কিছু মিথ্যা আছে, যারা অপরাধ নয়,
বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অদ্ভুত ভাষা।
তাই আমি বলি -
আমি মিথ্যাবাদী নই,
কেবল মাঝে মাঝে
মানুষ হয়ে উঠতে গিয়ে
সত্যকে একটু আড়াল করি।
৩২. হে বৈশাখ
হে অগ্নিগর্ভ বৈশাখ, হে দাহনের প্রবাহ,
হে ঝড়ের বুক চিরে আসা বিদ্যুৎ-উল্লাস -
তুমি পোড়াও, তুমি ভস্ম করো
জীর্ণ শৃঙ্খলের প্রতিটি পরত,
দুর্নীতির গাঢ় অন্ধকার,
শোষণের কালো প্রাচীর,
আর সভ্যতার মুখোশ-পরা পচন।
তোমার আগুনে জ্বলে উঠুক
সহস্র বছরের জমাট বেদনা,
তুমি হাওয়ার চাবুক তুলে
মুছে দাও ভীরুতার চিহ্ন,
উড়িয়ে দাও দাসত্বের নরম শিকল,
আর ভেঙে দাও নীরবতার ভণ্ড মঞ্চ।
হে বৈশাখ, হে বজ্রের গর্জন,
তুমি আছো প্রতিরোধের লাল নিশানে -
যেখানে অন্যায় মাথা তোলে,
সেখানেই তুমি নামাও তাণ্ডবের আঘাত।
কূপমণ্ডুকদের অন্ধ কুয়ো
তোমার ঝড়ে ধসে পড়ুক,
সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত শিকড়
উপড়ে যাক মাটির গভীর থেকে।
তুমি শুধু ঋতু নও,
তুমি বিদ্রোহের আগুন-ঘোষণা -
তুমি ঘোষণা করো:
'আর নয় নতজানু জীবন,
আর নয় শোষণের নিঃশব্দ মৃত্যু!'
হে বৈশাখ, হে নবজাগরণের রক্তিম শিখা,
তুমি জ্বালিয়ে দাও এই জনপদে
মুক্তির অগ্নিপথ,
যেখানে ভয় নয়,
শুধু মানুষের গর্জন বেঁচে থাকে।
তুমি আছো লালন সাঁই-এর দ্রোহী সুরে,
জসীম উদ্দীন-এর নক্সীকাঁথার স্পন্দনে,
জয়নুল আবেদিন-এর ক্ষুধার্ত রেখায়,
কামরুল হাসান-এর বিদ্রোহী রঙে—
আর আমাদের বুকের ভেতর
এক অবিনাশী আগুন হয়ে।
হে বৈশাখ, তুমি আর একবার দাহ করো
এই স্থবির পৃথিবীকে,
যাতে ছাইয়ের ভেতর থেকেও জন্ম নেয়
নতুন মানুষ, নতুন আলো, নতুন বিপ্লব।
৩৩. শেষ আলিঙ্গনের আগে
তুমি যদি আমাকে জড়িয়ে ধরো
একদম শক্ত করে ধরো,
যেন ভেঙে না যায় এই অদৃশ্য ভেতরটা,
যেন থেমে না যায় বুকের গোপন কান্না।
সময় তো কখনো বলে না -
কোনটা শেষ দেখা, কোনটা শেষ ছোঁয়া,
কোনটা শেষবারের মতো তোমার কাঁধে মাথা রাখা।
তাই বলি -
প্রতিটা আলিঙ্গন হোক শেষ ভেবে,
প্রতিটা স্পর্শে থাকুক বেঁচে থাকার শপথ।
আমরা কত সহজে চুপ থাকি,
কত কথা বুকের ভেতর পাথর হয়ে জমে থাকে
বলতে পারি না,
'আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো,
আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে তোমাকে ছাড়া…'
কতবার ঠোঁট কেঁপে ওঠে
তবু শব্দ হয়ে বেরোয় না -
আমার নিঃশ্বাস আটকে আসে,
তুমি কি আমাকে একটু বাঁচাবে?
এতটুকু চাওয়া, এতটুকু আশ্রয়,
এতটুকু মানুষ হয়ে ওঠা, এটা কি খুব বেশি কিছু?
না, কখনোই না।
কারণ -
একদিন হঠাৎ তুমি শুয়ে থাকবে
নীরব, নিশ্চল, সাদা চাদরের নিচে,
আর আমি তখনও বুক ভেঙে বলবো,
একবার… শুধু একবার জড়িয়ে ধরো আমাকে…
কিন্তু তখন
তোমার হাত আর নড়বে না,
তোমার বুক আর দুলবে না,
তোমার উষ্ণতা শুধু স্মৃতি হয়ে যাবে।
সেদিন
এই না বলা আলিঙ্গন, এই না চাওয়া স্পর্শ,
আমার ভেতর কুড়ে কুড়ে খাবে।
তাই আজ যখন তুমি আছো,
যখন আমি এখনো তোমার সামনে -
এসো, কোনো লজ্জা না রেখে,
কোনো দ্বিধা না রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরো।
একদম শক্ত করে ধরো,
যেন এই পৃথিবীর সব হারানো এই এক
আলিঙ্গনে ফিরে আসে।
৩৪. ফিরে যাওয়ার আগে
ফিরে যাবো একদিন, বসন্ত ফুরোনো বিকেলে,
রঙ ঝরবে , কাঁপবে না কোনো শব্দ -
তুমি হয়তো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকবে,
অথচ আমায় চিনবে না ঠিক।
ফিরে যাবো, ওগো বন্ধু , নিঃশব্দ কোনো পথ ধরে,
যেখানে সন্ধ্যা নামে অপ্রকাশিত ভালোবাসার মতো,
তোমার চুলে লেগে থাকা রাতের গন্ধ
আমার আঙুল ছুঁয়ে যাবে শেষবারের মতো।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুদের আমি
নাম দেবো না বিদায়, বলবো- এ শুধু ক্ষণিক বৃষ্টি,
তোমার ঠোঁটের অনুচ্চারিত কথা
আমার বুকের ভেতর ঝরে পড়বে নক্ষত্র হয়ে।
তারপর আমি হারিয়ে যাবো দূরের অন্ধকারে,
নিঃসঙ্গ কোনো নির্বাসনে, শব্দহীন এক জীবন নিয়ে-
ওগো বন্ধু, ওগো মায়াবতী- শুধু তোমার স্মৃতি
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে জেগে থাকবে চিরকাল।
৩৫. চিরকালের প্রাণ
তুমি কাছে থেকো জীবনে জীবনে
তুমি পাশে থেকো জীবনে মরণে
তোমার ছোঁয়ায় জেগে উঠুক নিভে যাওয়া আলো।
ঝড় এলে তুমি হও নীরব আশ্রয়,
অন্ধকারে তুমি আমার একমাত্র জয়,
তুমি কাছে থেকো হৃদয়ের গভীরে,
তুমি নাম হয়ে বাজো প্রতিটি শ্বাসে ধীরে।
হাসির মাঝে, কান্নার ভিড়ে,
তুমি থেকো আমার সবটুকু নীড়ে
যত দূরেই যাই, পথ যদি হারাই,
তোমার হাত ধরে আবার ফিরে আসি তাই।
সময় থেমে যাক, ক্ষণ হোক অনন্ত,
তোমার সাথেই লিখি জীবনের সব গন্তব্য,
শেষ বিকেলের রঙে, ভোরের আলোয়,
তুমি থেকো আমার প্রতিটি ভালোয়।
যতদিন বেঁচে থাকি, যতদিন গান,
তুমি হও আমার চিরকালের প্রাণ।
৩৬. হারজিৎ
জীবনের কাছে হেরে গিয়ে শিখেছি জীবনকে
কীভাবে আলোকিত করতে হয়,
অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে প্রথম
আলোয়ের বীজ,
ভাঙা স্বপ্নের টুকরো দিয়েই গড়ে ওঠে নতুন আকাশ।
হারিয়ে গিয়ে বুঝেছি, পথ কখনো শেষ হয় না,
শুধু দিক বদলায়, শুধু নাম বদলায় সময়ের -
যে কষ্ট একদিন বুক ভাসাতো নোনাজলে,
আজ সে-ই অভিজ্ঞ শিক্ষক হয়ে পাশে দাঁড়ায়।
একাকিত্বের দীর্ঘ রাতে শিখেছি নিজের সঙ্গ,
নিঃশব্দের ভেতর শুনেছি হৃদয়ের আসল ভাষা -
যে হাত ছেড়ে গেছে, তার শূন্যতাতেই
ধরে ফেলেছি নিজের ভেতরের শক্ত আঙুল।
জীবন যখন থামতে বলেনি, আমিও থামিনি,
ঝড়ের ভেতর দিয়েই হেঁটেছি, ভিজেছি, কেঁদেছি,
তবু কোথাও এক ফোঁটা রোদ জমিয়ে রেখেছি
বুকের কোণে।
আজ আর হার মানা মানে শেষ নয়,
এ শুধু এক নতুন শুরুর খোলা দরজা -
যেখানে ভাঙা মানুষটাও একদিন
নিজের আলোয় জ্বলে উঠতে শেখে।
৩৭. বিষাক্ত মোহ
পরপুরুষের মায়া যেন ক্ষণিকের আলো,
দূর থেকে লাগে মধুর, কাছে এলেই কালো
চোখে তার স্বপ্ন থাকে, কথায় মায়ার জাল,
হৃদয় জড়িয়ে ফেলে অজান্তে অবহাল।
প্রথমে শুধু হাসি, তারপর কিছু কথা,
তারপর অকারণে বাড়ে নীরব ব্যথা
ভুল করে হাত ধরা, ভুল করে মন দেওয়া,
নিজেকেই হারানো, নিজেরে ভুলে যাওয়া।
সম্ভ্রম যে নারীর মুকুট, আত্মার গৌরব,
একবার ভেঙে গেলে থাকে না আর রূপ
ক্ষণিক সুখের মোহে যে হারায় নিজ মান,
শেষে সে কাঁদে একা, পায় না কোনো প্রাণ।
জীবন শেখায় ধীরে সব ভালো নয় সত্য,
যা ঝলমলে বাইরে, ভেতরে তার শূন্য
নিজেকে রাখো শক্ত, মর্যাদায় দৃঢ় থেকো,
ভালোবাসা বেছে নাও, মায়ার পথে না যেয়ো।
কারণ সত্যিকারের প্রেম লুকায় না ছলে,
সে আসে সম্মান নিয়ে, আলোরই দলে।
৩৮. এক পাগল প্রেমিক
একটি পাগল ছেলের সাথে দেখা হয়েছিল,
সে সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখত -
পংক্তিগুলো যেন কাঁপা আলোর মতোন,
হৃদয়ের ভেতর ঢেউ তুলে যেত নিঃশব্দে।
ওকে আমার ভালো লেগেছিল,
প্রস্তাবও দিলাম একদিন,
ছেলেটি স্মিত হেসে কিছু শর্ত দিল -
শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদের রাতে
তার সাথে ভাওয়ালের শালবনে
ঘুরতে যেতে হবে।
আরও বলল -
বাতাস যদি হঠাৎ থেমে যায়,
তবে আমাকে তার নাম ধরে ডাকতে হবে তিনবার,
আর প্রতিবার ডাকার আগে
চোখ বন্ধ করে একটি অপূর্ণ স্বপ্ন ভাবতে হবে।
সে চায়,
আমি যেন একদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে
ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকি তার পাশে,
আর সে আমার ভেজা চুলের মধ্যে খুঁজবে
অদ্ভুত কোনো কবিতার প্রথম লাইন।
আরও এক শর্ত,
নদীর ঘাটে বসে জোয়ার নামার আগ পর্যন্ত
আমরা কেউ কোনো কথা বলব না,
শুধু চোখের ভেতর চোখ রেখে ভাষা পড়তে হবে।
সে বলল,
যদি ভালোবাসি সত্যি,
তবে একদিন রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে উঠে
তার জন্য একটি অসম্পূর্ণ চিঠি লিখতে হবে,
যেখানে শেষ লাইনটা ইচ্ছে করে ফেলে রাখব,
যেন সে এসে নিজে পূর্ণ করে।
আমি বলেছিলাম - তুমি সত্যিই পাগল!
সে বলেছিল,
ভালোবাসায় পাগলামি না হলে,
তা কি আর কবিতা হয়?
আমি ওর শর্তগুলো প্রত্যাখান করি -
তারপর থেকে ছেলেটি কোথায় যেন নিরুদ্দেশ
হয়ে গেল।
তারপর থেকে প্রতিটি চাঁদের রাতে,
প্রতিটি নিঃশব্দ বাতাসে,
অপূরণ রেখা হয়ে থাকা প্রতিটি পংক্তিতে
আমি তাকে খুঁজে ফিরি এক অদৃশ্য ছায়ার মতো।
কখনো মনে হয়, সে বুঝি ঠিক পাশেই আছে,
শুধু ছুঁতে গেলেই মিলিয়ে যায় কুয়াশার ভেতর...
কখনো আবার—
অসমাপ্ত সেই চিঠির শেষ লাইনে চোখ
ভিজে আসে অকারণে,
কারণ জানি, সে আর কোনোদিন ফিরে এসে
সেটা পূর্ণ করবে না।
তবু আজও, শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ উঠলে
আমি নিঃশব্দে হাঁটি একা,
ভাওয়ালের শালবনের অন্ধকার পথে খুঁজি তাকে -
হয়তো সেথায় কোনো এক পাগল কবি
এখনো নির্জন জ্যোৎস্না তলায় বসে আমার
জন্য অপেক্ষা করছে।
৩৯. নীরবতার কাছে যাই
যারা জীবনে এসেছিল কোলাহল প্রহরে
তারা কি সত্যিই কোথাও চলে গেছে?
নাকি থেকে গেছে মনের অন্ধকার গলির ভেতর
নিঃশব্দে হাঁটাহাঁটি করে?
যখনই তাদের কথা মনে পড়ে,
আমি ভিড় এড়িয়ে চলে যাই কোনো নিরিবিলি বিকেলের ধারে,
অথবা গোধূলির আলো-ছায়ার পাশে
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি।
হাওয়ায় ভেসে আসে পুরোনো ডাক,
ভেজা পাতার গন্ধে মিশে থাকে কিছু অসমাপ্ত গল্প,
যেগুলো আমরা বলিনি, বলতে পারিনি,
অথবা সময়ই দেয়নি বলার সুযোগ।
মন তখন অকারণই কেঁপে ওঠে,
এক অদ্ভুত শূন্যতা বুকের ভেতর ধীরে ধীরে
জমে ওঠে -
যেন হারানো কোনো নাম
বারবার কানে ফিসফিস করে।
চোখের কোণে জমে ওঠা জল
কেউ দেখে না,
আমি নিজেও লুকিয়ে ফেলি তাড়াতাড়ি,
কারণ এই অশ্রু শুধু আমার নয়,
এগুলো সেইসব মানুষের যারা এসেছিল,
একটু থেকে আবার চলে গিয়েছিল।
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, ওরা কোথাও যায়নি,
আমার নির্জনতাতেই বসে আছে,
আমি যখন চুপ করে দাঁড়াই, ওরা তখন নিঃশব্দে এসে
আমার পাশে দাঁড়িয়ে যায়।
৪০. পথের ভালোবাসা
হাত ধরেছি, ধরা যেন শুধু হাত না,
একটা নিশ্চিত নিশ্চিন্ততা।
কড়া দুপুরের রোদেও হেঁটে যাই,
তবু মনে হয়, এই রোদ জোছনার মতোই কোমল,
যখন তুমি পাশে থাকো।
আমরা হাঁটি, খুব ধীরে, কথা কম বলি -
কিন্তু নিস্তব্ধতার ভেতরেও
অজস্র বাক্য জন্ম নেয়।
হঠাৎ বিকেল ভিজে ওঠে,
তোমার চুল উড়ে এসে আমার চোখে লাগে,
আমি দেখি, একটা ছোট্ট পৃথিবী
তোমার হাসির ভেতর লুকিয়ে আছে।
দূর্বা ঘাসে বসে থাকি,
মন ভিজে যায় অকারণে, কেউ দেখে না -
তবু এই ভেজা অনুভূতিগুলোই
সবচেয়ে সত্যি।
সময় থেমে থাকে না, জানি - তবু সেই মুহূর্তে
আমরা তাকে একটু থামিয়ে রাখি,
দু’হাতের মাঝে, তুমি কিছু বলো না,
আমি কিছু বলি না, তবু দু’জনেই বুঝি -
এই পথ, এই হাঁটা, এই স্পর্শ এটাই আমাদের ভালোবাসা।
৪১. তোমার সুবাস
তোমার অঙ্গে যে গন্ধ ওঠে
সে কি কেবল ফুলের সুবাস?
নাকি কোনো অদৃশ্য নক্ষত্রের ডাকে
আমার সমগ্র সত্তা হয়ে ওঠে উদাস।
তোমার ছোঁয়ায় আলো ঝরে
যেন ত্রিভুবনের সব প্রদীপ একসাথে জ্বলে,
আমি বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি দূরে,
তবু হৃদয় এগিয়ে আসে ধীরে ধীরে।
লাজ কি তবে শুধু চোখের ভাষা?
নাকি হৃদয়ের গভীর কোনো গোপন ভয়
তোমার কাছে এলে হারিয়ে ফেলি নিজেকে,
তবু সেই হারানোতেই খুঁজে পাই অদ্ভুত এক পরিচয়।
কেমন করে বলি
তোমার পাশেই আমার সমস্ত সাহস জন্মায়,
তোমার ডাকেই আমি বারবার ফিরে আসি,
যেন চিরকাল তোমারই হয়ে থাকি, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে জড়িয়ে যাই।
এসো তবে, আর দূরে নয়
এই নীরবতারও শেষ হোক আজ,
তোমার হাত ধরা মানেই যেন
আমার ব্রহ্মাণ্ডে নতুন এক ভালোবাসার
বসবাস ।
৪২. ভুল প্রেম
ভুল করেছিলাম তোমার প্রেমে পড়ে
তবু সেই ভুলের ভেতরেই ছিল
আমার সবচেয়ে নির্মল সত্য।
তুমি এসেছিলে মৌন এক বিকেলের মতো,
চুপচাপ, শব্দহীন -
যেন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির
নিজের অস্তিত্বও জানে না।
আমি ভেবেছিলাম
এই পথ একসাথে হাঁটা যাবে অনেক দূর,
হাত ধরে রাখার ভেতরেই
চিরকাল লুকিয়ে থাকবে পৃথিবীর সব উত্তর।
কিন্তু তুমি ছিলে ক্ষণিকের আলো,
আমি ছিলাম স্থায়ী অন্ধকার -
তোমার ঝলকানিতে আলোকিত হয়েছিলাম,
তারপর আবার নিঃশেষে নিভে গেছি।
ভুল করেছিলাম, হ্যাঁ -
কারণ তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম
নিজের থেকেও বেশি,
আর তুমি নিজেকেও রাখোনি আমার মতো করে।
এখনো কখনো রাতে
হঠাৎ হাওয়া এলে মনে হয় তুমি পাশেই আছো -
একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ডাকছো আমায়।
কিন্তু জানি, ওটা শুধু স্মৃতি,
যার কোনো শরীর নেই, তবু স্পর্শ আছে।
তোমার প্রেমে পড়াটা ভুল ছিল,
তবু সেই ভুলই আমাকে শিখিয়েছে,
কিছু মানুষ আসে শুধু হৃদয় ভাঙার জন্য না,
হৃদয়কে গভীর করার জন্যও।
আর তাই আজও, অদৃশ্য এক হাসিতে বলি -
ভুল করেছিলাম…কিন্তু সেই ভুলটাই ছিল
আমার সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা।
৪৩. নিঃসঙ্গতার রাজ্যে তুমি
একাকী জীবনের মুহূর্তগুলো বেশ সুখের হয়ে ওঠে,
ভাবনায় কত কিছু যে হই আমি -
রাজ্যের রাজা হই, সাম্রাজ্যের প্রেমিক হই,
যেন হাওয়ায় ভেসে যাই দূর নীলিমায়,
কতজন যে রাণী হতে চায়,
কত চোখে জ্বলে ওঠে অচেনা ভালোবাসার আলো…
এই নির্জনতায় আমি এক অদৃশ্য সাম্রাজ্যের অধিপতি,
যেখানে তোমারই নাম লিখি বাতাসের গায়ে,
যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন তোমার চুলের গন্ধে জড়িয়ে থাকে।
কখনো আমি জোছনার মতো ছুঁয়ে যাই
তোমার কল্পিত হাত,
কখনো বিকেলের হাওয়ায় শুনি তোমার মৃদু হাসি -
যেন তুমি আছো, অথচ নেই,
তবুও হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে।
এই একাকীত্বই আমার গোপন আশ্রয়,
যেখানে তুমি প্রতিদিন নতুন করে জন্মাও
কখনো লাজুক রাণী হয়ে,
কখনো দুষ্টু প্রেমিকা হয়ে,
কখনো আবার নিঃশব্দ ভালোবাসার এক অব্যক্ত ভাষা হয়ে।
বাস্তবের ভিড়ে তোমায় না পেলেও,
স্বপ্নের রাজ্যে তুমি আমারই -
একা থাকি, তবুও পূর্ণ থাকি,
কারণ আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা জুড়ে তুমি আছো, একটি অনন্ত প্রেম হয়ে।
৪৪. ফিরে আসা
আমি সেই অনুচ্চারিত শব্দ,
ঠোঁটের কোণে এসে থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস,
আমি সেই পথহারা বিকেল,
যে সন্ধ্যার আগে আর ঘরে ফেরে না।
নিভে যাওয়া প্রদীপের ধোঁয়ার মতো
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাই তোমার অগোচরে,
তবু বুকের ভেতর কোথাও
একটা নিভু নিভু আলো জেগে থাকে -
তুমি কি তার উষ্ণতা টের পাও?
আমি সেই অব্যক্ত কষ্ট,
যাকে কেউ নাম ধরে ডাকে না,
আমি সেই জমে থাকা বৃষ্টি,
চোখের কোণে নেমে আসার আগেই
ফিরে যায় চির অভিমানে।
সময়ের কঠিন প্রাচীরে
নিজেকে বারবার ঠুকে ঠুকে
আমি হয়েছি কঠিন পাথর,
তবু সেই পাথরের ভেতরেই
লুকিয়ে আছে সোঁদা মাটির স্পন্দন,
যেখানে এখনো অঙ্কুর গজায় স্বপ্নের।
তুমি কি শুনতে পাও?
রাতের গভীরে কান পেতে থাকলে
আমার ভিতরের নদী
কেমন করে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তীরে?
আমি সেই অভিমানী,
অপেক্ষার ভারে ক্লান্ত এক ছায়া,
আমি সেই অশ্রু, যার কোনো শব্দ নেই,
তবু পৃথিবীর সব গল্প বহন করে।
যদি কখনো ফিরে তাকাও
দেখবে, আমি হারাইনি,
শুধু রূপ বদলে দাঁড়িয়ে আছি
তোমারই একটুখানি মমতার অপেক্ষায়।
৪৫. অকারণ রাতজাগা
সোমা, তোমাকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলাম,
ওখানে কিছু বানানো কথা ছিল,
তুমি চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলো
খামাখা তোমাকে রাত জাগিয়েছিলাম।
কিছু শব্দ ছিল নিছক একাকীত্বের,
কিছু বাক্য ছিল দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতো
যেগুলো আমারই ছিল না পুরোপুরি,
তবু তোমার নাম জুড়ে দিয়েছিলাম।
সেই রাতের নীরবতায়
আমি নিজেকেই ভুল বুঝেছিলাম,
ভাবছিলাম, তোমার জানালায় কড়া নাড়লেই
সব অনুভূতি সত্যি হয়ে উঠবে -
কিন্তু ভোর হলে বুঝেছি,
সব আলোই তোমার জন্য নয়।
সোমা, তুমি যদি ক্লান্ত হয়ে থাকো
আমার অযথা শব্দের ভিড়ে,
তবে নিঃসংকোচে ভুলে যেও
যেন এক অসমাপ্ত খসড়া কবিতা,
যার কোনো পাঠক ছিল না কখনো।
কিছু চিঠি লেখা হয় শুধু ছিঁড়ে ফেলার জন্য,
কিছু ভালোবাসা জন্মায় শুধু
নিজেকে চিনে নেওয়ার জন্য -
তুমিও তেমনই এক অকারণ উপলব্ধি।
তাই বলছি, চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলো, সোমা,
শব্দগুলো বাতাসে উড়িয়ে দাও -
হয়তো কোনো এক অচেনা সন্ধ্যায়
আমি নিজেই ফিরে পাবো
আমার সেই হারানো সত্যগুলো।
৪৬. ফুরানো পথের মায়া
কখন যে পথ ফুরালো, টের পাইনি একবারও
আলোর মতো দিনগুলো যে কোথায় হারালো -
সন্ধ্যা এসে বসলো চুপচাপ পাশে,
নাম না জানা পাখির ডাকে।
মনে হলো, এই তো সবে শুরু, অথচ শেষেরও পরে,
পিছনে চাহিয়া দেখি-
ধুলোমাখা কত স্মৃতির রেখা,
হাসির ভেতর লুকানো ছিল অশ্রুর গোপন ভাষা।
যারা ছিল খুব কাছাকাছি, হাত ছুঁয়ে থাকা দূরত্বে,
তারাও কবে হারিয়ে গেল, অচেনা কোনো ঘোরে -
বাতাসে ভাসে তাদের ছোঁয়া, মৃদু কোনো
অভিমানের মতো।
কত কথা ছিল বলার, কত স্বপ্ন ছিল আঁকার,
সবই আজ রয়ে গেছে অর্ধেক লেখা কাব্যপত্রে-
তবু এই ফুরানো পথেই মায়া লেগে থাকে অদ্ভুত,
শেষের ভেতর খুঁজি আবার শুরুর কোনো ইশারা।
হয়তো কোনো এক ভোরে, হারানোরা ফিরে আসবে
সন্ধ্যার সেই নিঃশব্দ ডাক পেরিয়ে -
নতুন আলোর ধারে।
৪৭. হারিয়ে যাওয়ার গল্প
সেই কবে থেকে বেঁচে আছি -
বেঁচে থাকতে থাকতে নিজেকেই হারিয়েছি ব’লে
তুমি খেয়াল করো নি।
সেই কবে থেকে লিখে যাচ্ছি -
শব্দের ভেতর রক্ত মিশে গেছে ব’লে
তুমি পড়ো নি কোনোদিন।
সেই কবে থেকে ভিজে আছি -
অশ্রু আর বৃষ্টির ফারাক মুছে গেছে ব’লে
তুমি বুঝতে পারো নি।
সেই কবে থেকে হেঁটে চলেছি -
পথই আমাকে গিলে খেয়েছে ব’লে
তুমি থামিয়ে দাও নি একবারও।
সেই কবে থেকে স্বপ্ন বুনি -
স্বপ্নগুলো ছিঁড়ে ধুলো হয়ে উড়ে গেছে ব’লে
তুমি ধরতে চাও নি হাত বাড়িয়ে।
সেই কবে থেকে তোমাকেই ডাকি -
ডাকতে ডাকতে নামটাই হারিয়ে ফেলেছি ব’লে
তুমি চিনতে পারো নি আমায়।
সেই কবে থেকে ভালোবেসেছি -
ভালোবাসা নিজেই শূন্য হয়ে গেছে ব’লে
তুমি কোনোদিন ভালোবাসো নি।
৪৮. একাকী সময়
বিষণ্ণতার কিনারায় দাঁড়িয়ে আমি শুনি
ভাঙা দিনের শব্দ যেন পুরোনো ঘড়ির কাঁটা
হঠাৎ থেমে গিয়ে আবার কাঁদে।
হাওয়ায় উড়ে যায় কাগজের স্মৃতি,
ধুলোয় মিশে যায় নামহীন কিছু বিকেল,
একটা নীলচে আলো চোখের ভেতর ঢুকে বলে
সব হারানোই কি সত্যি হারানো?
পথগুলো আজ ক্লান্ত,
নগরের দেয়ালে লেগে আছে অজস্র না-বলা
কথার ছায়া, আর বাতাসে ভাসে
অচেনা কোনো নিঃসঙ্গতার গন্ধ।
ঠিক তখনই তুমি হঠাৎ বৃষ্টির মতো এসে
ছুঁয়ে দিলে এই শুকনো সময়,
তোমার ভেজা মুখে আমি দেখলাম
আকাশের দুঃখ।
কেন এলে? এই ভাঙা মুহূর্তের ভেতর
এত আলোর মতো ঢুকে আমার সমস্ত অন্ধকারে
তোমার নীরবতার ঢেউ তুলে?
তবু ভালো লাগে, কারণ বিষণ্ণতারও একদিন
নিজস্ব কোনো রং হয়,
আর সেই রঙেই হয়তো তুমি এসে দাঁড়াও -
আমার সবচেয়ে একাকী সময়ে।
৪৯. নিঝুম জ্যোৎস্নায়
নিঝুম রাত নেমে আসে
জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে গায়ে মাখে তোমার ছায়া।
আমি তাকিয়ে থাকি,
কিছু বলি না
তবুও ভেতরে ভেতরে কত কথা জন্ম নেয়।
তোমার নিঃশ্বাস
আমার বুকের ভেতর ঢেউ তোলে,
অস্থিরতা যেন আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে।
কাছে এলে সমস্ত দূরত্ব ভেঙে পড়ে এক মুহূর্তে,
ঠোঁটের উষ্ণতায় জেগে ওঠে অজানা শিহরণ,
দেহ আর মনের সীমানা
কোথায় যে মিলিয়ে যায়, বোঝা যায় না।
তোমার স্পর্শে বাতাসেও যেন গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
মৃদু, মাদক, গভীর।
আমি ডুবে যাই, তোমার সম্ভোগের ভেতর,
যেখানে শব্দের প্রয়োজন হয় না -
শুধু অনুভবই যথেষ্ট।
সব গ্লানি, সব ক্লান্তি এক এক করে খসে পড়ে,
থেকে যায় শুধু দু’জন মানুষের নিভৃত মিলন,
এক অনন্ত জ্যোৎস্নামাখা সুর।
৫০. দহন
তুমি সেই আগুন -
জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দাও
আমাকে।
তোমার দহনেই আমি খুঁজি
অদ্ভুত এক আশ্রয়,
যেখানে পুড়ে গিয়ে
আমি নতুন করে জন্ম নিই।
তোমার চোখের শিখায়
নিভে যায় আমার সব দ্বিধা,
ভস্ম হয়ে উড়ে যায়
অতীতের সব ক্লান্তি।
তুমি যখন ছুঁয়ে দাও -
দেহ নয়, আত্মা জ্বলে ওঠে,
নীরবতার ভেতরেও
শুনি আগুনের উচ্চারণ।
আমি কি তবে সেই চন্দন
যার নিয়তি কেবল জ্বলা?
নাকি সেই ছাই -
যেখানে লুকিয়ে থাকে পুনর্জন্মের গল্প?
তুমি জ্বালো -
আর আমি নিঃশেষ হয়ে
তোমারই আলো হয়ে উঠি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন