শুক্রবার, ৫ মে, ২০১৭

আবার শুনবো গান

আবার যেতে ইচ্ছা করে স্টেশন থেকে সেই পথে
যে পথ দিয়ে প্রথম হেটে গিয়েছিলাম তোমাদের বাড়ী-
লোকাল ট্রেনটি থেমেছিলো জামতৈল স্টেশনে
ট্রেনের হুইসেলের সেই শব্দ এখনো কানে বাজে ।

সেই যে প্রথম শহর থেকে তোমাকে নিয়ে বাড়ী যাওয়া
ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তার উপর দিয়ে চলেছিলো টমটম
দুর থেকে দেখিয়েছিলাম তোমাকে আমাদের সবুজ গ্রাম,
তুমি লাল শাড়ী পড়ে ঘুরে বেড়াতে এ বাড়ী ও বাড়ী
বালক বালিকা, বৌঝিরা দেখতো তোমাকে অবাক বিস্ময়ে,
হাটতে হাটতে আমরা একদিন চলে গিয়েছিলাম যমুনার পাড়ে
দূরে জেগে ওঠা চরে চেয়ে দেখেছিলাম কাশবন
স্টীমার যাচ্ছিলো তখন জগন্নাথ গঞ্জের ঘাটের দিকে।

আবার ইচছা করে তোমাকে নিয়ে গ্রামে চলে যেতে
ইচ্ছা করে মেঠো পথে হেটে হেটে সরিষার ফুলের গন্ধ নিতে
আবার ঘুরবো তোমাকে নিয়ে সেই পদ্মপুকুর পারে
শুনবো গান দোয়েলের- নিঝুম কোনো অলস দুপুরে।

সেই বন্ধু আমার

তুমি আইরিশ রমণীও নও,স্ক্যান্ডিনেভিয়ানও নও
তোমার চোখ পিঙ্গল নয়, চুল সোনালী নয়,তুমি বাঙ্গালী
ডাবলিনের ঐ নির্জন বাড়ীর আঙ্গিনায়
একাকী পায়চারী করো ,
সবুজ ঘাসে পায়ের চিহু ফেলে দেখো তুমি দূরের আকাশ
তোমার চোখ তখন খোঁজে বাংলাদেশের নীল।

তুমি ইজি চেয়ারে বসে কোনো মেঘ কি দেখেছো ?
কাল তুমি নিঃসঙ্গ হরিণীর মতো হেটেছিলে
লিফী নদীর তীরে
দাড়িয়ে দেখেছো তার কালো জল,কি সুন্দর স্থির !
কখনো কি ভিজিয়েছিলে পা সেই জলে ?

নির্জন রাস্তায় হাটতে হাটতে তুমি চলে যাও কফিশপে
'কস্তা'য় বসে একাকী পান করো শীতল কফি
তুমি একাকী ড্রাইভ করে চলে যাও দূর কান্ট্রি সাইডে
ওখানে যেয়ে তুমি বাংলাদেশের ছবি খোঁজো,
শ্যামলিমা দেখো-
মাটির রঙ্গের কাউকে দেখে কি ভ্রম হয়, এই সেই বন্ধু তোমার !




মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

অথৈ জলে ভাসি

তখন ভরা বর্ষাকাল। খাল,বিল,নদী,মাঠ, ঘাট সব জলে ভেসে গেছে। মা'র হাতের কড়া করে লেখা একটি পত্র পেলাম। আমাকে বাড়ী যেতে হবে। কি জন্য বাড়ী যেতে হবে পত্রে তার কোনো উল্লেখ নাই। শুধু বলেছে 'পত্র পাওয়া মাত্র চলিয়া আসিবে। কোনো রূপ দেরী করিবেনা।' আমি নতুন চাকুরী নিয়েছি। তারপরেও মায়ের ডাক ,যেতেই হবে। চাকুরী চলে গেলেও যেতে হবে, চাকুরী থাকলেও যেতে হবে। তবে এরূপ কোনো কিছু হয়নাই। কর্তৃপক্ষ আমাকে পাঁচ দিনের ছুটি দিয়েছে।

আমি ভূয়াপুর থেকেই দেখতে পাই রাস্তার দু'পাশে বানের জলে থৈথৈ করছে। ভরা যমুনার উপর লঞ্চ চলতে চলতে যখন সিরাজগঞ্জ শহরে পৌঁছি তখন বিকাল হয়ে যায়। শহরের বাহিরগোলা থেকে কাটাখালী নদীর উপর দিয়ে নৌকায় আমাদের বাড়ী যাওয়া যেতো। আমি  ছইওয়ালা ছোট্র একটি ডিঙ্গি নৌকা ভাড়া করি। অথৈ জলের উপর দিয়ে ডিঙ্গিটি ভাসতে ভাসতে যখন বাড়ীতে পৌঁছে তখন সন্ধ্যা গত হয়ে গিয়েছে।

রাতে যখন মা আমাকে খাবার খাওয়াচ্ছে তখন তিনি বললেন- ' ইউনুস ঘটক একটি পাত্রীর অনুসন্ধান দিয়াছে। বংশ মর্যাদা নাকি ভালো। শুনিয়াছি মেয়ে খুবই দর্শনদারী। কালকে তোমাকে নিয়া সে মেয়ে দেখিতে যাইবো। আমি মনস্থির করিয়া রাখিয়াছি, মেয়ে যদি পছন্দ হয়, তবে  এই মেয়ের সাথেই তোমার বিবাহের কথা পাকাপাকি করিয়া আসিবো।'  আমি বিদ্যাসাগরের মতো মাথা নেরে মাকে সম্মতি জানিয়ে দিলাম।

রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম- মা'কে তো সম্মতি জানিয়েই দিলাম। মেয়ে দেখতে না জানি কেমন হয়, সেই কথাই ভাবছিলাম। যদি পছন্দ না হয়, যদি দেখতে অসুন্দর হয়, তখনতো মার উপর দিয়ে কথা বলতে পারবো না। মা যাই পছন্দ করবে তাই আমাকে বিবাহ করতে হবে। জীবনে বড়ো আশা করেছিলাম- আমার বউয়ের চোখ হবে বনলতা সেনের মতো স্নিগধতাময়, কুচবরণ কন্যার মতো কালো লম্বা চুল হবে, অনঙ্গ বউয়ের মতো লাবন্যময় মুখ হবে, চাঁপা ডাঙ্গা বউয়ের মতো লক্ষ্মী হবে, আর আনোয়ারা উপন্যাসের নায়িকার মতো সতি সাধবী হবে। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে যাই।

পরের দিন একটি পানসি নৌকা এসে ঘাটে ভিরে। নিকট পরিজনদের মধ্যে একটি সাজ সাজ রব উঠলো। আমার বিয়ের কন্যা দেখতে যাবে। সবাই সুন্দর সুন্দর কাপড় পরিধান করলো। মা, বড়ো বোন, ভাবীসহ আট দশ জন হবে। যেহেতু এটা শুধুই কন্যা দেখা তাই আমাকে কেবল পায়জামা আর পাঞ্জাবী পড়তে হলো। আমরা সবাই যেয়ে নৌকায় উঠি, তারপর নৌকা ছেড়ে দেয়।

কখনো মাঠের জলের উপর দিয়ে, কখনো খাল দিয়ে, কখনো নদী পথ দিয়ে আমাদের নৌকা পৌঁছে যায় ব্রহ্মগাছা গ্রামে। এই গ্রামের পাশ দিয়ে যমুনার একটি শাখা নদী বয়ে গেছে। যার নামও ব্রহ্মগাছা নদী। ভরা বর্ষার মৌসুমে নদীটি খরস্রোতা থাকে। দুপুরের ঠিক পরপরেই আমাদের নৌকাটি শেখ বাড়ীর ঘাটে পৌঁছে যায়। বাড়ীর অন্দরমহলে তখন উৎসবের আমেজ। আমাদের বসবার ব্যবস্থা বাড়ীর খাস মহলেই করা হয়েছে। খাওয়া পর্ব শেষ হয়েছে। এবার কন্যা দেখানোর পালা।


আমরা ঘরের মধ্যে বসে আছি। জরি করা লাল রংয়ের জর্জেট শাড়ী পড়ে ঘোমটা টেনে একটি মেয়েকে আমাদের সামনে আনা হলো। কেউ একজন তার ঘোমটা খুলে দিলো। উন্মোচন হলো ওর মুখখানি। কেউ দেখছে চুল, কেউ দেখছে নাক, কেউ দেখছে ভ্রূ। কেউ দেখছে চোখ, কেউ দেখছে ওর উচ্চতা- কেউ দেখছে মেয়ে কেমন করে হাটে। দেখছে গায়ের রং কেমন, দেখছে হাসিতে গালে টোল পড়ে কিনা,  দেখছে মুক্তার মতো দাঁত কিনা। আমিও দেখলাম মেয়েটিকে। ওর নাম শোভা। শোভা দেখতে বেশ সুন্দরী, ওর হাসিতে মুক্তা ঝরে, ডাগর ডাগর চোখ, নির্মল ওর মুখশ্রী। কিন্তু আমার চেতনার রং এর সাথে ওর রং মিললো না। আমি যাকে এতোদিন খুঁজছি, এই পৃথিবীর পথে পথে- এই মেয়ে সেই মেয়ে নয়। আমার চোখ বিনম্র হলো। আমি কোনো কথা বলছিলামনা। আমি মাঝে মাঝে দেখছিলাম- শোভার পাশে বসে থাকা ওর ছোট বোন প্রভাকে। আমার চেতনার রংএর সাথে এই মেয়ের রং মিলে গেছে। এ যে দেখছি সেই মেয়ে- যাকে আমি এতোদিন বিভিন্ন জনারণ্যে খুঁজে বেড়েয়েছি।



আজ আর কোনো মতামত মেয়ে পক্ষকে জানানো হলোনা। সন্ধ্যা রাতের মধ্যেই আমাদের নৌকা বাড়ীর ঘাটে এসে পৌঁছলো। আমি ঘরে যেয়ে শুয়ে পড়ি। ভাবী এসে টিপ্পনী মারলো- 'হায় আল্লাহ, দেখতে না দেখতে ধ্যান শুরু হয়েছে।' আমি কিছুই বললাম না। রাতে যখন খেতে বসেছি মা তখন বললো- 'কন্যা আমার ভারী পছন্দ হইয়াছে। আমি এই মেয়েকে আমার বউমা করিয়া ঘরে তুলিয়া আনিবো।' আমার মন খারাপ দেখে মা প্রশ্ন করে - 'তোমার কি কন্যাকে দেখিয়া পছন্দ হয়নাই ?' তখন আমার খাবার খাওয়া শেষ হয়েছে। হাত ধুতে ধুতে বললাম- 'তোমরা যে মেয়েকে পছন্দ করেছো, তাকে আমার পছন্দ হয়নাই। পছন্দ হয়েছে প্রভাকে। 'এই বলে আমি আমার ঘরের ভিতর চলে আসি।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম সেই ত্বন্নী তরুণী প্রভার কথা-

কি চঞ্চলা হলো তোমার চোখ, বাঁকা চোখে চেয়ে তুমি কাকে দেখেছিলে মেয়ে ?
এমন এই চোখেই বনলতা সেন কে আমি দেখলাম
আমার সারা জনমের চাহনী তোমার চোখেই  স্থির হয়ে গেলো
আকাশে মেঘ ছিলোনা তবু বূষ্টি ঝরছিলো তখন-
এতো অথৈ জল ভেঙ্গে আমি যেয়ে তোমাকেই দেখলাম
মনে হয়েছিলো এই মেয়ে তো আমার জন্ম জন্মান্তরের,
এই ছায়াশীতল ব্রহ্মগাছা নদীর তীরের এই গ্রামে-
জলবতী মায়াবতী এই মেয়ে আমার জন্যই জন্মেছে।



আবার মনটা এই ভেবে বিষন্ন হলো শোভা'র জন্য । ওতো কোনো অন্যায় করে নাই। আমি রাজি হলেই শোভা'ও তো আমার বউ হতে পারে। ওতো স্বপ্ন দেখতে পারে এই রকম-

এ কোন্ ধ্রুবতারার ঔজ্জাল্য নিয়ে আমার আকাশে তুমি আবির্ভূত হলে
তুমি কি দেখতে পাচ্ছো তোমার পাশে একটি নিষ্প্রভ স্বাতি জ্বলে আছে
তুমি অরুন্ধতিকে কেনো খুঁজে বেড়াও-
এতো অথৈ জলে নৌকা ভাসিয়ে তুমি আমাকেই দেখতে এলে
তুমি আছো আমার চোখে, আমার চোখের তারায়-
তুমি দেখেছো ব্রহ্মগাছা নদীতে এখন কতো জল,
সে জলে ভেসে ভেসে এক রাজপুত্রের বাড়ী আমার যেতে ইচ্ছা করে।


একবার মনে হলো, মাকে বলে দেই- শোভাকেই আমার পছন্দ হয়েছে। ওর সাথেই আমার বিবাহের ব্যবস্থা করো। কিন্তু তা আর হলোনা। পরের দিন সারাদিন বাল্য বন্ধুদের সাথে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। আমাদের বাড়ীর সাথে ঐ একই নদী বহমান, সেই নদীর তীরে আনন্দেই সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম। তাই মাকে আর কোনো কথা বলা হলোনা। মনে করলাম মা যা করে, আমি তাই করবো।

রাতে খেতে বসেছি। মা তখন বললেন- 'আমি আজকে ইউনুস ঘটককে শেখ বাড়ী পাঠিয়াছিলাম। প্রভার সাথেই তোমার বিবাহের তারিখ পাকাপাকি করিয়া আসিয়াছে। আমি বেশী দেরী করিবোনা। আগামী পরশু দিনই বিবাহের তারিখ ধার্য্য করা হইয়াছে।'

বিয়ের দিন সকালবেলা লাহিড়ী মোহনপুর এলাকা থেকে বড়ো বড়ো দু'টি দক্ষিনা পানসি নৌকা বাড়ীর ঘাটে এসে ভিড়লো। নৌকা দুটিকে রঙ্গিন কাগজ দিয়ে সাজানো হলো। সানাই আর ব্যান্ড পার্টি আনা হোলো। শহর থেকে কলের গানও নিয়ে এসেছে। ফেরদৌসি রহমানের একটি গান বাজছে। 'ওকি বন্ধু কাজল ভ্রোমারে,কোন্ দিন আসিবেন বন্ধু কইয়া যাও, কইয়া যাওরে।'


বিয়ের দিন আকাশে নির্মল রোদ ছিলো। আমাকে শেরওয়ানী ও টুপি পরানো হলো। নৌকায় যেয়ে উঠলাম। দখিন দিক থেকে বাতাস বয়ে আসছে। নৌকায় বাদাম টানানো হলো। মাঝি মাল্লারা গান ধরলো। সানাই বাজছে। কলের গান বাজাচ্ছে। ব্যান্ড পার্টির ঢোলের শব্দে আকাশ বাতাশ মুখরিত হয়ে উঠলো।

শেখ বাড়ীতে বিকালের আগেই বরযাত্রীরা যেয়ে পৌঁছে। এখানেও সানাই বাজছে। চারিদিকে হাসি রাশি রাশি, চারিদিকে উৎসবের আনন্দ। কাজী এসে বিবাহ পড়ালেন। সন্ধ্যার সময় আমাকে নিয়ে প্রভার পাশে বসানো হলো। বাড়ীর বৌঝিরা আনন্দ করছে। আয়নাতে প্রভার মুখ দেখানো হলো। এই সেই মুখ যাকে আমি হাজার বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, তাকেই আজ পেয়ে গেলাম এই ব্রহ্মগাছা নদীর তীরে।


রাতেই নতুন বউকে নিয়ে বাড়ীতে ফিরি। ধান দূর্বা সোনা পানি ছিটিয়ে নববধুকে বরন করে ঘরে তোলা হলো। রাত ততোক্ষণে অনেক হয়ে গেছে। সানাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কলের গান আর বাজছেনা। ঢাকের বারিও থেমে গেছে। ভাবী কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন- 'নাও, এখন থেকে আমার কোমড়ের বাঁকের উপর তোমার আর তাকাতে হবেনা। আমার তুলতুলে গালও তোমার আর টিপতে হবেনা। এবার দরজাটা বন্ধ করে দাও।'


সকালবেলা পাখীর ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তার আগে আযানের সুরও ধ্বনিত হয়েছে। প্রভারও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বাড়ীর ঘাটে লোকজনের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। সবাই বলাবলি করছে কোথা থেকে এক মেয়ের লাশ এসে ঘাটে ঠেকে আছে। আমি এবং প্রভা ঘাটের দিকে এগিয়ে যাই। লাশটি তখন ঘাটের উপর মাটিতে শুয়ে রাখা হয়েছে। আকাশ বাতাশ বিদীর্ণ করে প্রভা চিৎকার করে তখন বুবু বলে লাশটিকে জড়িয়ে ধরে।


এরপরে পঁচিশ বছর চলে গিয়েছে। আমার জীবনটাকে পুরাপুরি সুখী করতে পারি নাই। একটা অপরাধবোধ আমাকে প্র্তিনিয়ত দহন করে। যদি কখনো বাড়ীতে যাই, যদি তখন ভরা বর্ষার দিন থাকে, যদি সারা নদীর বুকে জুড়ে অথৈ জল থাকে, যদি তখন পূর্ণিমার তিথী হয়- ব্রহ্মগাছা নদীর কুলুকুলু জলের শব্দে তখন শোভার কান্নার ধবনি শুনতে পাই।




ডিসক্লেমেয়ার:  এই কাহিনী আমার নিজের জীবনের নয়।












এখনো তুমি

এখনো স্বপ্নে দেখি তোমার ঐ মায়াবী চোখে
এখনো মর্মে শুনি ভোরের পাখীদের গান
এখনো সুর তোলে চর্যাগীতির পদাবলী
এখনো শরীরে তোমার গড়ের মাটির ঘ্রান।

এখনো বকুলের সুবাস ঝরে উত্তরের বাতাসে
এখনো ঝরা ফুল ঝরে পরে বনছায়া তলে
এখনো  মূর্ছণা জাগায় শতো বাঁশির তান
এখনো অক্লেশে বুঝতে পারি অনুভবের টান।

এখনো তুমি ফোটাও ফুল বসন্ত ফাল্গুনে
এখনো পাঁপড়ি মেলো কুসুমিত ডানায়
এখনো সুরধ্বনি বাজে রাত্রির কানে কানে
এখনো কাছে পাই তোমায় প্রেমময় গানে।


সোমবার, ১ মে, ২০১৭

ঝিক ঝিক ঝিক

এতোটুকু মেয়ে বুঝতে পারেনি- সঙ্গম কি ?
এতোটুকু মেয়ে  জানেনা উল্লাস কাকে বলে-
এতোটুকু মেয়ে জানেনা মানুষ কি ভাবে পশু হয় !
সে বুঝেছিলো রক্ত ঝরার বেদনা,
সে হয়েছিলো তীরবিদ্ধ এক রক্তাক্ত হরিণী শাবক।

তুমি রাজা বিচার তোমার কাছে
দীনহীন হযরত বিচার পাওয়ার যোগ্য হয়নি এখনো
হালিমা নির্বাক, কি দিয়ে মেয়ের রক্তাক্ত সম্ভ্রম ঢাকবে ?
পিতা কেবল আহাজারী করেছে ধর্ষকের বিচার চেয়ে-
তার কান্নার ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে মিলিয়ে গেছে আসমানে।

আয়েশা  তার বাবার হাত ধরে স্টেশনের দিকে যায়
বাবা তাকে আজ লাল সবুজ রঙ্গের ট্রেন দেখাবে
যখন হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন এলো
আয়েশার চোখে তখন স্বপ্ন এলো।

আহা ! কি সুন্দর স্বপ্নের দেশ !
কি সুন্দর পরীর দেশ !
কি সুন্দর প্রজাপতির দেশ !
পিতা হাত ধরে আছে এক রাজকন্যার-
স্বপ্নের উপর চাকা মাড়িয়ে ছুটে গেলো ট্রেন
ঝিক ঝিক ঝিক।

জাতীয় দৈনিকগুলোতে পরের দিন খবর বের হলো-
শ্রীপুরে রেল ক্রসিংএর কাছে ট্রেনে কাটা পরে বাবা ও মেয়ের করুণ মৃত্যু।


  

খেয়া

একসময় ছবির এই খেয়া নৌকার মতো শৈলাভিটা নদী পার হয়ে গঞ্জে যেতাম। সে বার বাবার সাথে শহরে আসছিলাম। খেয়া ঘাটে নৌকা আসতে তখনো দেরী। এপাড়ে নদীর কূলে তখন বৌস্টুমীদের গান হচ্ছিলো। বৌস্টুমের হাতে ছিলো খঞ্জুরী, আর বৌস্টুমী গেয়ে যাচ্ছিলো গান। দু'জনেরই পরনে ছিলো গেরুয়া রঙ্গের ধূতি। বাবার হাত ধরে আমি গান শুনছিলাম। ভীড়ের ওপাশে চেয়ে দেখি- আমাদের পাড়ার আনোয়ারাও গান শুনছে ওর বাবার হাত ধরে। ওর পরনে ছিলো ঝালরওয়ালা ফ্রক।

বৌস্টুমী যে গানটা গাচ্ছিলো-
'ও তোরা মন দিয়ে শোন্-
সে যে ছিলো আমার মনেরই মতোন........।'

গান শুনতে না শুনতেই নৌকা এসে যায় ঘাটে। আমি বাবার হাত ধরে যেয়ে নৌকায় উঠি। বৌস্টুমী তখনো গেয়ে যাচ্ছিলো গান। আনোয়ারা ওর বাবার হাত ধরে তখনো শুনছিলো সেই গান।


রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭

জিপসি ছেলে

তখন ইউনিভার্টিতে পড়ি। থাকতাম কবি জসিম উদ্দীন হলে। আমার বড়ো বোনের চিকিৎসা চলছিলো পিজি হাসপাতালে।  যে কয়দিন আপা হাসপাতালে ছিলো প্রতিদিন সন্ধ্যায়  চলে যেতাম তাকে দেখতে। আমার মাথায় নজরুলের ইসলামের মতো ঝাঁকরা চুল। হাতে পড়তাম পিতলের ব্রেসলেট। গায়ে থাকতো বুক খোলা টি-সার্ট, আর পরনে থাকতো কাউবয় মার্কা জিন্স প্যান্ট। আপার পাশের কেবিনে এক ভদ্রমহিলার চিকিৎসা চলছিলো। ওনার একটি টিনেজ মেয়ে ছিলো  ,সে  প্রায়ই আসতো হাসপাতালে। ঐ মেয়েকে আমি চেয়ে দেখতাম, কিন্তু কথা বলতাম না। আবার ওর সাথে কথা বলতেও ইচ্ছা করতো। একদিন হাসপাতালের কোরিডরে একাকী দাড়িয়ে আছি। মেয়েটি হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করে- আপনারা কি খ্রীষ্টান ?
আমি :  না
মেয়ে :  তাহলে কি ?
আমি:  সুন্নী মুসলমান। আমার বাবার নাম মৌলভী..............।
মেয়ে:   আপনাকে দেখে খ্রীষ্টান মনে হয়।
আমি:   তাই নাকি ?
মেয়ে :  হু।

সন্ধ্যার পর হলে চলে আসি। সখ করে তখন একটু আধটু কবিতা লিখতাম। আর আমার যে বয়স সে বয়সে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে থাকে। সে প্রেমে পড়লেও লেখে, প্রেমে না পড়লেও লেখে। জুনিয়র রুমমেট সাহিদ বলছিলো- আপনাকে আজ বেশ খুশী খুশী লাগছে ।কবিতার খাতায় লিখলাম-

আমিতো তোমাকে আজ দেখলাম মেয়ে,
পরীবাগের খোলা আকাশের দিক থেকে এসেছিলো বাতাস,
হাওয়ায় দুলছিলো তোমার চুল,
কাজল ছিলোনা চোখে, বাঁকা হয়ে যাওয়া ভ্রু ছিলো তোমার সুচিত্রা সেনের মতো,
ইশারা কি ছিলো সেই ভ্রুতে- আমি বুঝি নাই তা-
কামিজের ভাজে ঢাকা ছিলো সব নদীর বাঁক
মেয়ে তোমার চোখে মুগ্ধতা ছিলো, পরানের নীচে ছিলো কেবলই ঘাস ।


পরের দিনও দেখা হয় ঐ মেয়ের সাথে। পাখীর পাখার মতো উড়ছে তার ওড়না। মাথার চুল পিছনে ব্যানড দিয়ে বাঁধা। পায়ে সেমি হিল জুতো। খট্ খট্ করে হাটছে হাসপাতালের করিডোরে।  আমি তার চরণ ধ্বনি শুনি।  সে শোনে এলিফ্যান্ট রোডের গাড়ীর হর্ণ। আমি অপেক্ষা করছি তার জন্য, দাড়িয়ে আছি কোরিডোরে একাকী।  চোখ একবার তাকালো দূরে বেতার ভবনের দিকে। তরঙ্গে ভেসে এলো রুনা লায়লার সেই গান- 'অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে,যেনো এক মুঠো রোদ্দুর,আমার দু'চোখ ভরে তুমি এলে।' হঠাৎ পাশে থেকে সে মেয়ের কন্ঠস্বর শোনা গেলো-

মেয়ে :  কেমন আছেন ?
আমি : ভালো আছি। 
মেয়ে:  আপনি কোথায় পড়েন ? কি পড়েন ?
আমি:  ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, বাংলা সাহিত্যে।
মেয়ে:  আপনাকে দেখে মনে হয় ইংরেজীতে পড়েন।
আমি:  কেনো মনে হলো ?
মেয়ে:  হিপ্পি হিপ্পি চুল, ছেঁড়া জিন্স, ম্যাগি হাতা গেঞ্জি পড়েন, তাই মনে হলো।
আমি:  আপনি কোথায় পড়েন ,কি পড়েন ?
মেয়ে: ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার, ইডেন কলেজে।
আমি: নাম কি আপনার ?
মেয়ে:  জিনিয়া
জিনিয়া আমার নামটিও জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়।


রূমে এসে রাত জেগে খাতার পাতায় লিখলাম হিবিজিবি কথা-

তোমার চোখে দেখলাম অসীম দৃস্টি এক, চেয়ে দেখো অন্তর গভীরে
উড়ে চিল ডানা মেলে, নিঃসীম নীল মেঘের উপর দিয়ে
তোমার চঞ্চল ডানা মেলতে চায় তারও উপর দিয়ে
আফ্রোদিতির মতো প্রেম বুকে নিয়ে ডাক দাও আমাকে-
আমি সানাইওয়ালাদের খবর দিবো,
পাল্কি নিয়ে চলে যাবো তোমার রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাড়ী।

আজ আগে ভাগেই দেখা পাই জিনিয়ার। একাকী দাড়িয়ে আছে কোরিডোরে, মনে হলো আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। দু'জন দাড়িয়ে কথা বলছিলাম। আমি যখন কথা বলি,তখন দেখি- আমাকে দেখতে দেখতে জিনিয়ার চোখ উদাসীন হয়।  ও কি ভাবছিলো আমি তা জানিনা।  আবার জিনিয়া যখন কথা বলে আমি তখন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি,  দেখতে পাই- নীল সমুদ্রপাড়ে, সাগরের ঢেউ আছড়িয়ে পড়ছে বালুকাবেলায়।  সাদা শাড়ী পড়ে ধবল আঁচল উড়িয়ে জিনিয়া আসছে আমারই দিকে।  দূর থেকে আস্তে আস্তে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছে বুকে।

আমরা দু'জন 'মৌলি'র দোতালায় গিয়ে বসি। ওখানে কিছু স্নাকস্ জাতীয় খাবার খাই। কথা বলতে বলতে ভালোবাসার কোনো কথাই বলা হলোনা। বলা হলোনা- 'তোমাকে আমার ভালোলাগে', বলতে পারলামনা- 'জিনিয়া আমি তোমাকে ভালোবাসি।'  জিনিয়াও কিছু বললোনা।  মৌলি থেকে যখন উঠবো- তখন ও বলছিলো-  'তুমি কবি জসীম উদ্দীন হলের কতো নাম্বার রুমে থাকো ?'  আমি বললাম- '৪২৬ নং রুমে।'  জিনিয়া যেনো ভুলে না যায়- ,তাই ওর হাতের তালুতে নম্বরটি লিখে দেই।

রাতে বিছানায় শুয়ে আছি।  কেমন যেনো এক মুগ্ধতায় দু'চোখে ঘূম আসছিলোনা।  মানুষের যেমন দুঃখের কারনে চোখে ঘুম আসেনা। আবার অনেক সময় অনাবিল সুখের ভাবনাতেও ঘুম আসেনা।  মনে হচ্ছিলো অচেনা অজানা এক মেয়ের দেখা পেলাম,  তাকে ভালোও লাগলো,  হয়তো এই মেয়ে আমার বউ হয়ে ঘরে আসবে একদিন।  বিছানা থেকে উঠে কবিতার খাতায় লিখছিলাম-

তোমার ঐ মায়াবী চোখ আমাকে টানে
তোমার লাবন্যের মুখ আমাকে বের করে নিয়ে যায়
মখমলের চাদর বিছানো মসৃন পথে-
তুমি কোনো স্বপ্ন নও, আমি জানালা খুলে দেখি শাহবাগের আকাশ,
এতো তারা কখনো এক সাথে দেখিনি
এতো গানের সুর কখনো একসাথে বাতাসে ভাসেনি।

পরের দিন হলুদ রঙ্গের একটি টি-সার্ট গায়ো দিলাম। গাঢ় নীল রঙ্গের একটি জিন্স প্যান্ট পড়লাম। খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো রয়েই গেলো। আয়নায় ঘুরে ফিরে দেখলাম নিজের মুখ খানি। আজ জিনিয়াকে মৌলিতে ডেকে নিয়ে যে করেই বলবো- 'তোমাকে ভালোবাসি।'

সন্ধ্যায় হাসপাতালে যাই। আজ কোরিডোরে কাউকে দাড়ানো দেখলাম না। আপার কেবিনে যেয়ে শুনি- পাশের কেবিনের ঐ মহিলা রোগীটি আজ সকালে রিলিজ নিয়ে চলে গেছে। বুকের ভিতর কেমন যেনো হাহাকার করে উঠলো।  আমি আজ আর বেশীক্ষণ দেরী করলামনা।  হাসপাতালের শূন্য কোরিডোর দিয়ে হাটতে হাটতে হলে ফিরে চলে আসি।

তারপর কতো দুপুর কতো বিকেল অপেক্ষা করেছি জিনিয়ার একটি চিঠির জন্য।  তারো অনেক পরে একটি বিদেশী নীল খামের চিঠি পাই।  প্রেরক- জিনিয়া নাওসীন, নিউ ইয়র্ক, ইউ এস এ ।  চিঠিটির কিছু অংশ এই রকম ছিলো- ''তোমাকে অনেক দিন ধরে লিখবো লিখবো করে লেখা হয়না।  তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছিলো,  কিন্তু আমি একজনের বাগদত্তা ছিলাম।  তাই তোমাকে বলতে পারিনি- 'ভালোবাসি'।....এখানে প্রায়ই আমার স্বামীর হাত ধরে হাডসন নদীর তীরে বেড়াতে যাই,  সেখানে দেখতে পাই বড়ো বড়ো চুলের জিপসি ছেলে হলুদ রঙ্গের টি-সার্ট গায়ে দিয়ে,  ছেঁড়া জীন্স পড়ে হাডসন নদীর তীরে ঘুরে বেড়াতে।  তখনই মনে হয় এমনই একজন জিপসি ছেলেকে আমি দেখে এসেছিলাম পিজি হাসপাতালের বারান্দায়।''