বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১

ঘাস ফড়িং-এর রং

অনেক বছর আগের কথা। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি এসে দেখি -- আমার দূর সম্পর্কিত একজন মামু তার দশ এগারো বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছে। এই মামুকে এর আগেও আমাদের বাড়িতে প্রায়ই একা আসতে দেখেছি। উনি সকালে আসত, এবং বিকালেই চলে যেত। এই প্রথম দেখলাম -- উনি একা নয়, এবার ওনার মেয়েকে সাথে করে আমাদের বাড়িতে এসেছে।

মার কাছে শুনেছিলাম, তার এই ভাইটি দূর সম্পর্কের খালাত ভাই হয়। বয়সে মার থেকে অনেক ছোট। মেয়েটির জন্মের পরেই ওনার স্ত্রী মারা যায়। এর পরে আর বিয়ে করেনি। এই মেয়েকে নিয়েই থাকে। উনি খুব গরীব। অনেক অভাব অনটনের ভিতর জীবন নির্বাহ করে।

মেয়েটির নাম ফিরোজা। ক্লাস ফাইভ পাস করেছে। ওকে আরও পড়ানোর ইচ্ছে আমার সেই মামুর। তাদের গ্রামে আশেপাশে কোনো হাই স্কুল নেই। আবার অভাব অনটনও আছে। তাই এই মেয়েটিকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। ওনার ইচ্ছে, এখানে থেকে তার মেয়ে লেখাপড়া করুক।

মার সাথে এই ব্যাপারে কী আলাপ আলোচনা করেছিল -- সে কথা আমি জানিনা। শুধু দেখলাম, ফিরোজাকে আমাদের বাড়িতে রেখে আমার সেই মামু চলে গেল। যাবার সময় তার মেয়েকে ডেকে কাছে জড়িয়ে নিয়ে বলল - মা, তুমি ভালোভাবে এখানে থাকবে। সবার কথা শুনবে। সবাইকে মান্য করে চলবে।

ফিরোজা মাথা নেড়ে বলেছিল --' আচ্ছা। তুমি আবার আইসো, আমাকে দেখে যাইবা।' দেখলাম, বাবা মেয়ে দুজনেই অশ্রু মোচন করছে।

মেয়েটি এখন থেকে এখানেই থাকবে, আমার খুব ভালোই লাগল, মনে হলো-- একজন সাথী পেলাম। যে আমার ছোট বোনের মতো, খেলার সাথীর মতো। ঐ বয়সে ফিরোজা আমার প্রেমিকার মতো কেউ একজন হবে, এই কথা ভাবিনি।

প্রথম দিন সন্ধ্যা রাতে হেরিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি, ফিরোজা আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। টেবিলের উপর রাখা আমার বইগুলো নেড়েচেড়ে বলে -- রতন ভাই, তুমি মনে হয় অনেক ভালো ছাত্র, ক্লাসে তোমার রোল নং কত?

আমি বললাম, 'আমার রোল নং চব্বিশ।' ফিরোজা শুনে খুব মন খারাপ করল। ও ভেবেছিল - আমার রোল নং এক হবে। আমি খুব ভালো ছাত্র।

টুকটাক করে কথা বলতে বলতে আমি ওকে বললাম, এখন থেকে তুমি তো আমাদের বাড়িতেই থাকবে, তাই না? ফিরোজা বলল, 'হে। তুমি খুশি হও নাই ?' বললাম, 'খুশি হয়েছি।'

পরের দিন আমি স্কুলে গেলে স্কুলের ক্লাসগুলো কেমন যেন শেষ হচ্ছিল না। মন খুব আকুবাকু করছিল -- কখন ছুটি হবে, কখন বাড়ি যাব, কখন ফিরোজার সাথে গল্প করব?

স্কুল ছুটি হলে বাড়িতে আসতে আসতে পথে মনে হলো, ফিরোজাও নিশ্চয়ই আমার জন্য এমন ছটফট করছে, ভাবছে-- কখন আমি বাড়ি আসব, কখন আমাকে ও দেখতে পাবে, আমার সাথে গল্প করবে।

দ্বিতীয় দিন বিকালবেলা, ফিরোজাকে নিয়ে পাড়ার অন্যান্য খেলার সাথীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ওদের বলি - ওর নাম, ফিরোজা, ও আমার বোন হয়। এখন থেকে ও আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমি ফিরোজাকে নিয়ে সারা আঙ্গিনা ঘুরে ঘুরে দেখাই। পুকুর পাড় ধরে হাঁটতে থাকি। কদমগাছ তলায় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যায় জল থেকে উঠে আসা হাঁসগুলোর ঘরে ফেরা দেখি।

মাত্র দুতিনদিনেই ফিরোজা আমার সারাক্ষণের সাথী হয়ে ওঠে। আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে অন্য খেলার সাথীদের সাথে খুব বেশি মিশতাম না। ফিরোজাকে নিয়েই এ বাড়ি ও বাড়ি যেতাম। কোনো কোনো দিন পুকুর পাড় পেড়িয়ে আলপথ দিয়ে হাঁটতাম। তখন ছিল হেমন্তের দিন। সারা প্রান্তর জুড়ে ছিল সরিষার ক্ষেত। চারদিকে শুধু হলুদের সমারোহ। আমরা বিমুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখতাম হলুদ গালিচার মতো সরিষা ফুলের মাঠ। মৌ মৌ গন্ধ নিতাম নাক ভরে।

আমি চার পাঁচ দিনেই ফিরোজাকে খুব আপন করে নিলাম। ফিরোজাও আমাকে আপন করে নেয়। ভাবছিলাম, কবে ওকে ভর্তি করে দেবে স্কুলে। দুজন প্রতিদিন একসাথে স্কুলে যাব। প্রতিদিন স্কুলে যেতে যেতে সারা পথে কথা বলব, গল্প বলব। গল্প করতে করতে, কথা বলতে বলতে -- কথা ফুরাবে না, গল্পও ফুরাবে না, কিন্তু পথ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।

সেদিন ছিল বুধবার, গুনে দেখলাম ছয়দিন ধরে ফিরোজা আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমি স্কুলে চলে যাই। সেদিনও ক্লাসে মন বসছিল না পড়ায়। খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ হচ্ছিল ক্লাস। মনে হচ্ছিল, কখন ছুটি হবে, কখন বাড়ি যাব, কখন দেখব যেয়ে ফিরোজাকে।

ক্লাস শেষে ছুটির পর আমি খুব জোরে জোরে পা ফেলে বাড়ির দিকে আসতে থাকি। পায়ে পায়ে পথের ধুলি উড়িয়ে আসছিলাম, আর ভাবছিলাম কখন এই পথ চলা শেষ হবে।

যখন বাড়িতে আসি, এসে দেখি-- আজ ফিরোজা বাড়ির গলি মুখে দাঁড়িয়ে নেই। ওকে না দেখে মন খারাপ করে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করি। উঠোনেও কোথাও ওকে দেখতে পেলাম না। ঘরের ভিতর যেয়ে দেখি, ঘরেও নেই। ভাবলাম, হয়তো পাশের বাড়ি বেড়াতে গেছে।

মা আমাকে খেতে দিল। আমি ভাত খেতে খেতে মাকে বললাম -- ফিরোজা কোথায় গেছে? মা জবাব দেয় , ওর বাবা এসে ওকে আজ নিয়ে গেছে। আমি বললাম, কবে আবার আসবে? মা, বলল, এমনিতেই আর কখনও আসবে না, তবে বেড়াতে আসলে আসতে পারে।

ফিরোজার চলে যাবার কথা শুনে, আমি আর এক নকলা ভাতও মুখে দিতে পারিনি। আমার চোখে জল চলে আসে। আমি হাতে পানি ঢেলে হাতও ধুইনি। এঁটো হাতেই মাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে
থাকি। আমার সেই কান্নার অর্থ সেদিন মা কী বুঝেছিল, আমি জানিনা।

পরে শুনেছি -- ফিরোজার বাবাই ফিরোজাকে আমাদের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। মেয়েকে ছাড়া সে নাকি একদণ্ড একাকী থাকতে পারেনা।

সেই কত বছর চলে গেছে কত দিনকাল ক্ষণ। এত বছর পরেও সেই বালিকাকে আমি ভুলতে পারিনি। কী মায়া করেই না আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কথা বলত, স্মিত হাসি লেগে থাকত চোখে মুখে, সন্ধ্যার দীপশিখায় দেখতাম সেই মুখ, হাঁটত ছোট ছোট পা ফেলে আমাদের বাড়ির উঠোনে। ওর কিছু কথা এখনও ক্ষীণ করে আমার কানে বাজে। বিশেষ করে আদুরে কণ্ঠের সেই ডাক -- রতন ভাই।

খুব করে মন চায় রাঙা পথের ধুলো উড়িয়ে চলে যাই পল্লীর নিভৃত ওর সেই গাঁয়ে। যেয়ে যদি দেখা পাই ঐ বালিকার, কিংবা খুঁজতে খুঁজতে যদি দেখা মেলে ফিরোজা রঙের কোনো ঘাস ফড়িং কিংবা অপরাজিতার। দেখতে তো পাব তবু তার রূপ রং ঠিক অনেক বছর আগে দেখা ঐ বালিকার মতো। আম-কাঁঠালের ঝাড়ের উপর দেখতে পাব নীল আকাশ, দেখব রাতের নক্ষত্র বীথি, আলো আঁধারে চেয়ে দেখতে পারি কারোর চোখের অশ্রু ছল ছল।…

~ কোয়েল তালুকদার




শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ৫

পর্ব - ৫

আমার জীবন দুইদিক থেকে বয়ে আসা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হাওয়ায় এলমেল হতে লাগল। যেন হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল তছনছ হয়ে গেল! আনিসের দিক থেকে বয়ে আসা ঝড়টি কেন জানি বেশি অমঙ্গলের মনে হলো। তাই এই ঝড়টিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য প্রাণমনে চেষ্টা করতে থাকি।

এরপর থেকে আনিসকে বুঝতে দিতে চাইনি যে -- আমি ওকে ভালোবাসি। দূর থেকে দিনের পর দিন ভালোবেসেছি, কিন্তু কখনও বুঝতে দেইনি ওকে।  নিজে নিজেই একটি সিদ্ধান্ত নেই --  মাইনুলই আমার জীবনের প্রথম পুরুষ। কত কিছু দিয়ে, কত অর্ঘ্য আর চোখের জলে ওকে জীবনে পেয়েছিলাম -- ও-ই আমার জীবনে চির জীবনের বাঁধন হয়ে থাক্।

সেমিনার কক্ষে বসে পড়াশোনা, লাইব্রেরি যেয়ে বসে বসে নোট করা, ক্যান্টিনে চা সিঙ্গারা খাওয়ার মধ্যেই আনিসের সাথে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করে রাখলাম। এরপর মাঝে মাঝে আনিস অনেক কবিতা লিখে আমার কাছে নিয়ে এসেছে, কিছু তার শুনেছি, কিছু তার শোনা হয়নি। 

মাইনুলের সাথে আমার গোপন অবৈধ সম্পর্ক, আমার গর্ভধারণ, গর্ভপাত এসব কিছুই আনিসকে কোনোদিন বলিনি। আমার এই গোপন অন্ধকার জীবনের গ্লানির কথা আনিসের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। 

অনার্স শেষ বর্ষের এক গ্রীষ্মের ছুটির দিনে বাড়ি গেলে অনেকটা অনাড়ম্বর করে মাইনুলের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়। এই বিয়ের কথাও আনিসকে আর বলিনি। ইতোমধ্যে আমাদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। 

পারিবারিক ভাবে সিদ্ধান্ত ছিল -- আমার আর মাস্টার্স পড়া এখানে হবে না। আর আমারও ইচ্ছে করছি না পড়তে। 

এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাব। এই স্মৃতিময় নবাব ফয়জুন্নেসা হল। এই সবুজ ক্যাম্পাস!  দূরে বয়ে  যাওয়া বংশী নদীর কলধ্বনিও আর শুনব না। এখানে আর সন্ধ্যা নামা দেখব না পাখিদের মুখর করা সন্ধ্যার গানে। 

খুব ইচ্ছে হলো -- আনিসের সাথে একটি বিকাল কাটাতে বংশী নদীর তীরে। চলেই তো যাচ্ছি আনিসকে ছেড়ে চিরদিনের করে, আর কোনোদিন হয়ত দেখা হবে না। স্বামী - সংসার, সন্তান নিয়ে গদবাঁধা জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকতে হবে। 

যেদিন চলে আসব - ঠিক তার আগের দিন আমি আর আনিস চলে যাই -- বংশী নদীর তীরে। কাকতালীয় ভাবে সেদিনও ছিল আষাঢ় মাস। কিন্তু এর আগে যে এখানে এসেছিলাম ঠিক সেই সবুজের ধানক্ষেত আজ দেখতে পেলাম না। নেই সেই কদমগাছটিও। কোনো বৃক্ষরাক্ষস  সম্ভবত কদম গাছটি কেটে ফেলেছে।  তবে নদীর দিকে চেয়ে দেখলাম, নদী কুলকুল করে বয়ে চলেছে ঠিক আগের মতোই। 

আমরা নির্জন মেঠোপথে নদীর কূল ধরে হাঁটতে থাকি।  একজায়গায় দেখতে পাই একটি বাবলা গাছ। সারা বাবলাগাছ ধরে হলুদ ফুল ফুটে আছে।  আমরা দাঁড়াই এই বাবলা তলে।  আনিস বলছিল -- তুমি কী এখানে বসতে চাও? 

আমি বললাম, বসব, তোমাকে নিয়ে দেখব নদীর জল।  হয়ত এমন করে আর তোমাকে নিয়ে নদী দেখা হবে না। 

তখন সন্ধ্যা পূর্ব বিকাল। আমরা দুজন বসে আছি। টুকটাক করে অনেক কথা বলছি, আবার নীরবতায়ও কেটে যাচ্ছিল সময়। আজ আনিসের একটি হাত খুব ধরতে ইচ্ছা করল -- আমি ওর একটি হাত ধরি। হাত ধরে বলি -- এই হাতে একটি চুমু কী আমি দিতে পারি? আনিস বলল, 
দাও। 

আনিস আমাকে ওর বাহুডোরে বেঁধে  নিয়ে বলে, 'আমরা কী চিরদিনের জন্য দুজন দুজনের হতে পারি না?'

আমি আনিসের মুগ্ধ দুচোখের দিকে চেয়ে বলি -- না। আমি যে অনেক আগেই আর একজনের জন্য চিরদিনের হয়ে গেছি। আমার জীবন তোমার জীবনে নেই।  

দেখলাম -- আনিসের বাহু মুহূর্তেই শিথিল ও নির্জীব হয়ে গেল। হাঁটুতে মাথা গুজিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।  সেদিনের অস্তবেলার শেষ সন্ধ্যা নেমেছিল নদীর বুকে। দুজন চেয়ে থেকে দেখছি -- কী ভাবে সোনালি আবীর মাখা রং আকাশ থেকে মুছে গেল। 

ফিরবার পথে সন্ধ্যার সেই বিলুপ্ত  মেঘের দিকে চেয়ে ভাবছিলাম -- যাকে বেশি করে ভালোবাসা যায়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ বুঝি তার সাথেই করা যায়, আবার এই ভেবে মনে শান্তিও পেলাম -- আনিসের জীবনে আমি যে জড়াইনি এইটাই ওর জন্য চির কল্যাণ হয়ে থাক্। ওর সামনে যে অনেক কর্ম।

পথে আসতে আসতে আবারও মনে হলো ওর একটি হাত আমার হাত ধরে আছে -- কিন্তু কেমন যেন অসার সেই হাত। আমাকে কেমন মায়া করে ডাক দিল আনিস -- কঙ্কাবতী! 

-- জ্বী।
-- তোমার সাথে আর কী কখনো দেখা হবে না আর? 
-- না। লুকিয়ে রাখব তোমার থেকে  নিজেকে বাকী জীবনকাল। 

পথের উপর সেই সন্ধ্যার আঁধারে থেমে যাই। পা চলছিল না। কেমন যেন ব্যথা করছিল পায়ে।  আমি আনিসকে বলি - তোমার বুকে একটু মুখ লুকোতে দেবে? 

-- দাও। 
-- একটু কাঁদতে দেবে? 
-- কাঁদো। 
 
তারপর আমার জীবনের কত পিঙ্গল পথ, কত পটে কত বর্ণের হয়ে জীবনের এই অস্ত পর্বে এসে দাঁড়ালাম। কত শুকতারার আলোকোজ্জ্বল রাত আঁধারে উড়িয়ে অদৃশ্য হয়েছে – প্রতিদিনই কোনো কোনো  সন্ধ্যায় সেই হারিয়ে ফেলা বংশী নদীর কূলের মতো হাসি আনন্দের সন্ধ্যা নেমেছে, আপন ভালবাসার রঙে আমার প্রাণ রাঙিয়ে তুলেছি কত। আমি শুধু অনুভব করেছি -- একজনকে ভালোবেসে পেয়েছি, আর একজনকে ভালোবেসে হারিয়েছি। একজনকে দেহ মন দিয়ে  কেবল আনন্দ দিয়ে গিয়েছি, আর একজনকে জীবনভর মনে রেখে দুঃখ কুড়িয়েছি।


***  *** *** ****

তারপর চলে গেছে জীবনের পয়ত্রিশ বছর।  আমি এখন বিগত যৌবনা এক রমণী। জানো! এই শহরেই আমি থাকি। 
তোমাকে আমি অনেক কথাই বললাম, আবার অনেক কথা বলিনি। জীবনের এমন অনেক কথা আছে, লেখা যায় না, বলাও যায় না, চোখে এসে দেখতে হয়। তোমাকে কফি খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলাম -- যদি আসো তাহলে তুমি দেখতে পাবে  আমার জীবন ছবি। 

আমার ঠিকানা ঃ রোড নং ২৩,
বাসা নং ... , বনশ্রী, রামপুরা -- ঢাকা। 

আমি একদিন সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম কঙ্কণার বাড়িতে। বাসায় নক করতেই  একটি লোক এসে দরজা খুলে দেয়। লোকটি আমাকে দেখে বুঝতে পারে - আমি কে?  মনে হলো কঙ্কণা আমার কথা আগেই বলে রেখেছিল ওনাকে। পরে জেনেছি - লোকটি হচ্ছে কঙ্কণার স্বামী মাইনুল। 

ভিতরে শোবার ঘরে যেয়ে দেখি একজন পঞ্চাশোর্ধ মহিলা অন্যদিকে কাত হয়ে শুয়ে আছে। মাইনুল ওনাকে ডাকে -- দেখ কে এসেছে! 

কঙ্কণা, আস্তে করে ঘুরে আমার দিকে তাকায়, কী করুণ শীর্ণা রোগক্লিষ্ট মুখ। চোখের নীচে কালো দাগ। চোখের কোণে  বিন্দু বিন্দু জল। আমি ওকে দেখে আৎকে উঠি। আমি যে একে চিনি। বহু জন্মজন্মান্তরের সে যে আমার একজন ছিল। শুধু নামটি ভিন্ন, কঙ্কণা নয় -- ও যে দিলারা জাহান। 

এইরকম কতকিছু পরিবর্তন করে আমাকে লিখেছিল দিলারা -- বংশী নদী নয়, নদী ছিল বুড়িগঙ্গা, জাহাঙ্গীরননগর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর, আনিস রহমান সে নয়, সে ছিল রঞ্জন রহমান। 

দিলারা কর্কট রোগে আক্রান্ত ছিল। পৃথিবীর সমস্ত ঔষধ ও  চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল ওর শরীরে। ডাক্তার হাসপাতাল থেকে ওকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। 

সেদিন একটি সন্ধ্যাই কেবল দিলারার শিয়রে বসেছিলাম -- খুব আবছা করে দেখতে পাচ্ছিলাম অনেক দূরের একটি নদী। শ্রাবণের  বুড়িগঙ্গা বয়ে চলছিল যেন কুলুকুলু করে...  
দিলারা আমাকে একদিন বুকে মাথা রেখে বলেছিল, "প্রাণের হিল্লোলে তুমি এসো, সকল মাধুরি শুকায়ে গেলে গীতসুধারসে তুমি এসো।"

সমাপ্ত। 

~  কোয়েল তালুকদার 
 







বুধবার, ৯ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো -৪

পর্ব - ৪

কর্ণঝরা নদীর স্বচ্ছ জলের উপর  দিয়ে ভাসতে ভাসতে আমি এসে পড়েছিলাম আরেক রূপবতী নদী ব্রহ্মপুত্রের উদ্দাম বুকে। নাহ্, ঠিক জলে নয়। এর কূলে একটি শহরে। জীবনের যত ঝড় ঝাপটা এর কূল দিয়েই বয়ে গেল আমার। গ্রামের একটি  লাস্যময়ী তরুণীর জীবন হঠাৎ কঠিন দুর্মর ব্যাথা বেদনার ভরে উঠল। এক করুণ কাব্য গাঁথা রচিত হলো এই শহরে।  

ময়মনসিংহের সরকারী মমিনুন্নিসা মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। থাকতাম ছাত্রী হোস্টেলে। সারা শরীরে তখনও গ্রামের রোদ্র তাপের তামাটে দাগ। ভেজা চুল থেকে গন্ধ বের হতো কর্ণঝরার জলের। বেণীর ভিতর থেকে খুঁজে পাওয়া যেত হাঁসুলীগাঁওয়ের বন মল্লিকার শুকনো পাপড়ি।  

এখানে এসে পড়াশোনা করছিলাম ভালোই। ইন্টারমিডিয়েট পাস করি ভালো রেজাল্ট নিয়ে। আর এখানেই কী না ঘটে গেল আমার জীবনের এক কলুষিত ঘটনা। কলুষিত হলো ব্রহ্মপুত্রের জল। আমার এই জীবন ব্যথার মর্মর কথা জেনেছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর জল, নদীর উপরের রাতের আকাশ, আকাশের যত তারা। আর সেখানকার আঁধার। 

কলেজের পাঠ শেষ করে এই শহর থেকে একদিন ট্রেনে করে ঢাকা চলে আসি। ভর্তি হই সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

তখন আশির দশক।  কী চমৎকার গ্রামীণ পরিবেশ, ছায়া ঢাকা, পাখিদের কলকাকলি মুখর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গন। দূরে দিগন্তের নীচ দিয়ে দেখা যেত কলধ্বনিতে বয়ে যাওয়া বংশী নদীর জল।

ভূগোল বিভাগের প্রথম দিনের ক্লাস। ক্লাসে যেতে আমার সেদিন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। স্যারের অনুমতি নিয়ে শ্রেণি কক্ষে ঢুকি। বুক হাত পা থরথর করে কাঁপছিল। ক্লাস রুমের মাঝখানের স্পেস দিয়ে হেঁটে যেতেই একটি ছেলের পায়ের গোড়ালিতে হোঁচট খেয়ে মেঝেতে ধাম্ করে পড়ে যাই। মুহূর্তে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কেউই এগিয়ে এসে উঠাল না আমাকে। আমি একাই বই খাতা কুড়িয়ে নিয়ে পিছনের একটি খালি  সিটে গিয়ে বসি। 

ক্লাস শেষে করিডরে একাকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। যার পায়ে লেগে হোঁচট খেয়েছিলাম, সেই ছেলেটি আমার কাছে এসে বিনম্র ভঙ্গিতে বলে -- "আমি একান্তভাবে দুঃখিত ও ক্ষমা প্রার্থী।"
 
আমি বলি -- আমারও তো পা লেগেছিল আপনার পায়ে। আমিও দুঃখিত। 

এইভাবেই ঐ ছেলেটির সাথে আমার প্রথম কথা হয় এবং সখ্যতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ওর নাম-- আনিস রহমান। 

আমার ভাগ্য কী এই রকমই হয়, জগতের যত সহজ সরল ছেলের সাথে পরিচয় হয়। তাদের জন্য মায়া লাগে। আর এই মায়ায় পড়ে তাদের সাথে এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে যাই।

আনিস এসেছিল ফরিদপুরের রাজবাড়ি থেকে। গোয়ালন্দের কাছে পদ্মাপাড়ে ওদের বাড়ি। আনিসকে আস্তে আস্তে চিনতে লাগলাম। ভালো লাগলো বন্ধুর মতো করে। একটু সতর্ক থাকলাম -- কোনো ভাবেই যেন দূর্বল হয়ে না যাই। 

ছেলেটি ভালো কবিতা লিখত।  নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হেলাল হাফিজদের মতো সুন্দর সুন্দর কবিতা। ও প্রায়ই  কবিতা লিখে এনে আমাকে দেখাত এবং পড়ে শোনাত। খুব ভালো লাগত ওর কবিতা। আনিসের একটাই দোষ ছিল, ও কবিতা কোথাও ছাপানোর জন্য পাঠাত না। বলত -- আমি কবি হতে চাইনা। আমি কবিতা লিখি আমার জন্য। ছাপিয়ে কী হবে। 

-- শুধু তোমার জন্য? 

-- আমার জন্য এতদিন লিখেছি, এখন লিখি তোমার জন্য। 

আমি বলতাম, আমার জন্য কেন লেখ? আমি আবার কবিতা লেখার তোমার কেউ হয়েছি নাকি? 

আনিস বলত -- তুমি আমার অনেক কিছু। তুমি পছন্দ করো, তাই লিখি। 


একটা কবিতার কথা মনে আছে। একদিন  ক্লাস শেষে করিডরে দাঁড়িয়ে আছি। আনিস আমার কাছে এসে বলে -- কঙ্কাবতী। 
-- বলো।  
-- চলো আজ বংশী নদীর পারে। ওখানে কূলে বসে নদীর জল, আর নীল আকাশ দেখে আসি।
আমি বললাম - চলো। 

আমরা চলে যাই বংশী নদীর তীরে। তখন ছিল আষাঢ় মাস। নদী সবে মাত্র জলে ভরে উঠেছে। তখনও জল উপচে ক্ষেতে খামারে  ঢুকে পড়েনি। চারদিকে আউশ ধানের প্রান্তর। ধানক্ষেত পার হলেই নদী। ঠিক নদীর কূল ঘেষে একটি কদম গাছ আছে। গাছ ভর্তি ডালে ডালে কদমফুল ফুটে আছে। অপরাহ্ণের রোদ লেগে ফুলগুলো থেকে তীব্র গন্ধ বের হচ্ছিল। আমরা যেয়ে কদমতলায় ঘাসের উপর বসি। নদীর জল বয়ে যাচ্ছিল ছলাৎছল করে। কিছু সময়ে নদীও কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়। আমরা দেখলাম- আষাঢ় মাসের এই ভরা নদী আমাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। নদীর কথা সবাই সবসময় শুনতে পায় না। কেউ কেউ কখনও পায়। আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম সেই কথা নির্জন সেই অপরাহ্ণ বেলায়। 

আনিস ওর বুক পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে। সেই কাগজে লেখা আছে একটি  কবিতা। পড়ে শোনায় সেই কবিতাটি। যেন নদী এসে কথা বলছিল নিভৃতে আমার কানে কানে।  

আনিস কবিতাটি পড়ার পর আমাকে দিয়ে দিয়েছিল কাগজটি। আমি রেখে দিয়েছিলাম তা আমার বইয়ের পাতায়। পয়ত্রিশ বছর চলে গেছে। বইটি এবং কবিতাটি রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে একটি পুরনো কাঠের তোরঙ্গে। আনিসের লেখা  সেই কবিতাটি ছিল ---

" একদিন এক নিরাভরণ আয়োজনহীন বিকালে আমরা হাঁটছিলাম, কাঁচা ধান শীষের নির্জন সেই পথ, পাশে দূর্বা ঘাসের উপর দুপুরের এক পশলা বৃষ্টির মুক্তো লেগেছিল। তখন আকাশ ছিল ধূসর নীল।

আষাঢ়ে কাশফুল ফোঁটার কথা না। দয়িত হারানো বিরহী রমণীর মত শেফালিকাও কোথাও নেই। ধুলোর পথ ছেড়ে দূর্বা ঘাসের উপর আমাদের চরণ পড়ে দূর্বাও রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিল।

যে পাশে ছিল সে ছিল আমার আনন্দময়ী, আমার প্রাণাধিকা। বিকালের রোদ্র মেখে স্বর্ণপ্রভা হয়ে উঠেছিল সে। যেন কতকালের পরিচিত আরক্ত মুখশ্রী। দেখেছি কত সন্ধ্যার ছায়ায়, কত চন্দ্রালোকিত নিশীথে। সে প্রকৃতিভৈরবী হয়ে আমাকে ঘর থেকে কত যে বের করে নিয়ে আসে ।

কতদিন পর আজকে এই বিকালে এখানে এসেছি। পশ্চিম দিগন্তে আলো নেভে নাই, তখনও দিগন্তে কমলা রঙে ছেয়েছিল..
আমরা হেঁটে চলেছি ........
এমন কত পথ পাশাপাশি হেঁটেছি
হাঁটতে হাঁটতে কত দূর চলে গেছি
কত কথা বলেছি, কত কথা বলতে ইচ্ছা করত !
পথের পাশে অচ্যূত ঘাসফুলের দিকে চেয়ে
কত প্রাণের ছোঁয়া যে তাকে দিতে চেয়েছি।

আমি দেখেছি তার মাথার  চুল উড়ছে আসন্ন সন্ধ্যার ধূপগন্ধ বাতাসে,
তাকে একাকার করে নিতে ইচ্ছা করত আমার সকল একাকীত্বে...

অন্তরের ভিতর তখন অন্য তরঙ্গ --

'জানি না কোথা অনেক দূরে   বাজিল গান গভীর সুরে,
           সকল প্রাণ টানিছে পথপানে
           নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।'"



সন্ধ্যায় যখন ফিরে আসি তখন আনিস ধরেছিল আমার একটি হাত। আমি  কিছুই বলিনি ওকে। জগতে কিছু হাতের স্পর্শে অনুভব করা যায়, এই হাত বিশ্বাসের। আনিসের হাতটা ছিল তেমনই জাদু স্পর্শের মতো। গত একবছর ধরে ওকে আমি দেখে আসছি। এত ভালো ছেলে। ওর হাতে পাপ নেই। 

কিন্তু আমার? এমন একটি ছেলেকে আমি কী নোংরা করে দিতে পারি? কিংবা নস্ট করতে পারি ওর আসন্ন নবীন জীবন? আমি আনিসকে সেদিন থেকে এমন আচরণ করতে থাকি, যেন ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি, 'আমি কেবলই বন্ধু তোমার একজন। আর কিছু না। কিছুই হবো না তোমার কোনোদিন।'

চলবে --

~  কোয়েল তালুকদার  

রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ৩

পর্ব- ৩

আমি যে ছেলেটির কথা বলছি -- 
ভালো লাগার আমার এই সহপাঠীর নাম মাইনুল ইসলাম। 

এক অপার্থিব মাধুর্যের রূপ ধারণ করে ক্ষণে ক্ষণে ওর ছায়ামূর্তি আমার চোখের সামনে এসে ভাসতে থাকে। কখনও সন্ধ্যার আকাশের অপরূপ শোভায়, কিংবা কখনও  দূরের খাসিয়া পাহাড়ের ধূসর মেঘের ছায়ায়, কর্ণঝরা নদীর কুলকুল কলতানের মধ্যে -- ওর অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকি। মনে হয়, অনেক দূর থেকে সুর ভৈরবীর তানে হেঁটে হেঁটে সে আমার দিকে আসছে। আমি কান পেতে ওর আগমনের পদধ্বনি শুনছি। আমার অবুঝ অবলা মন কেন যে ওর মাঝে থিতু হলো, কী এমন ঐশ্বর্য দেখতে পেয়েছিলাম, যা আমি চাইলাম এমন আকুল করে। 

মাইনুল ছিল পল্লী গ্রাম-নিবিড়ের প্রস্ফুট বন-কুসুম-গন্ধ ছড়ানো একটি সহজ সরল তরুণ। তাই তো ওকে আমি এমন পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছিলাম

আমার লেখা চিঠিখানি ভূগোল বইয়ের পাতায় পুরনো হয়ে পড়ে থাকে প্রায় দেড় দু'বছর। এতদিনেও মাইনুলকে চিঠিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। মাঝের সময়ে টুকটাক ওর সাথে যদিও কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে স্কুলের বারান্দায় কিংবা পথের উপরে। কিন্তু  চিঠিটি ওকে দিতে পারিনি। আমার ভালোলাগার কথাও বলার সুযোগ হয়নি কখনও। সবসময় কেউ না কেউ আমাদের কাছাকাছি থেকেছে।

কেমন করে কখন স্কুল জীবনের এতগুলো দিন চলে গেল! কত বিরহে কত অপেক্ষায় সময় করেছি পার। মাঝে মাঝে অজানা আশঙ্কায় মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠত। ভাবতাম -- যা চাইছি তা পাব তো? 

একসময় আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে। ক্লাসও বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল থেকে আমাদের ফেয়ারওয়েল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেই বিদায় অনুষ্ঠানে ছাত্র- ছাত্রীদের পক্ষ থেকে মায়নুল খুব সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে বিদায়ী সহপাঠীদের সাথে আমাদের একে অপরের কথা বলার সুযোগ হয়। কথা বলি আমি মাইনুলের সাথেও --

-- পাস করার পর তুমি কোথায় ভর্তি হবে? 
-- জানি না কোথায় ভর্তি হবো। পড়ার আর ভাগ্য হবে কী না তাও জানি না। 
-- পড়া থামিয়ে রেখ না।
-- তুমি কোথায় ভর্তি হবে? 
-- ময়মনসিংহ।  
-- আচ্ছা। ভালো ভাবে লেখা পড়া করবে। ভালো থেকো। তো যাই এখন। 

মাইনুল খুব তাড়াহুরো করছিল, অস্বস্তি ও বিব্রতও হচ্ছিল লজ্জায়। আমি আস্তে করে ওকে বলি -- 'যেওনা তুমি। একটু  দাঁড়াও।' আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যাগ থেকে দু'বছর আগের লেখা সেই পুরনো চিঠিটি বের করে ওর হাতে দেই এবং  বলি -- বাড়িতে যেয়ে এটি পড়বে। 

বাড়িতে যেয়ে মায়নুল চিরকুটটি পড়েছিল হয়ত কোনো প্রদীপ জ্বালা সন্ধ্যার আলোয়। হয়ত পুলকিত হয়ে উঠেছিল আমার মতো একজন প্রস্ফুটিত রক্ত জবার উন্মত্ত ভালোবাসার এমন নিবেদন দেখে! একটি মেয়ের এমন প্রাণ হিল্লোল দেখে, এমন দ্যুতি ছড়ানো অরুণ আলো! 

তারপর কর্ণঝরা নদীর জল গড়েছে ব্রহ্মপুত্র নদীর দিকে। কত বাঁকে স্রোত হয়েছে ধীর,  খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে বয়ে এসেছে কত হিমেল বাতাস, আমি ওকে পেয়েছিলাম আমার জীবনের সকল গ্লানি ও যাতনাকে হারিয়ে দিয়ে। সে যে সত্যি এসেছিল প্রাণের হিল্লোলে। সেই তরুণী বয়সের সপ্তরঙের রঙধনুর মতো অতীত দিনের কত কথা মনে পড়ে আমার। কত কম্পিত প্রেম দান। কেন যে মাইনুলের উপর মাঝে মাঝে এতটা নিষ্ঠুর আচরণ করতাম। সেসবের জন্য অনুশোচনাও করি। কত কথা মনে পড়ে, কত বেদনায়, কত দীর্ঘশ্বাসে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু জল ঝরে পড়ে। 

মাইনুলের সাথে আমার জীবনের প্রকৃত ঘটনাটা আমি ব্লাক আউট করলাম। মানুষের জীবনের কিছু অন্ধকার পর্যায় থাকে, সেই অন্ধকারের কথা একান্তই তার একার। সেই অন্ধকারের কথা কাউকে বলা যায় না। তারপরও যদি সম্ভব হয় আমি বলব সেই আঁধারের কথা। 

শুধু এইটুকু বলছি -- আমার সেই অল্প বয়সের কুমারী জীবনের পূর্ণচ্ছেদ পড়েছে অনেকদিন আগেই। তবু সে-সব দিনের কিছু আনন্দ বেদনার মুহূর্তগুলোর জন্যে এখনও মাঝে মাঝে মন কেমন করে ওঠে। সেই সারল্যমুখর স্মিত মুখ, সেই পূর্ণিমা ঝালরের আলো মাখা স্বর্গীয় রাতের বিমুগ্ধ ক্ষণ, হারানো সেই সুখস্মৃতির জন্যে আক্ষেপ করি। শুধু ভাবি, যা পেয়েছিলাম তা সত্যি করেই পেয়েছিলাম। মানুষ অনেক কিছুই পায়, তা আবার ফুরিয়েও যায়। শূন্য হয়ে গেলে আবার পাওয়ার আশায় পথে নামে। কোনো অচেনা পথিক অকাতরে কিছু দেওয়ার জন্য হয়ত দাঁড়িয়ে পথের উপর আমার জন্য  অপেক্ষা করছে। 

এখন শুরু করব আমার ইউনিভার্সিটি জীবনের কথা। 'পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি' র মতো কেউ কী আমার সেই জীবনে প্রাণের হিল্লোল তুলে এসেছিল? আবার কী ভেঙেচুরে রক্তক্ষরণ হয়েছিল আমার হৃদয় মন? 

( চলবে) 

~  কোয়েল তালুকদার  

বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ২

পর্ব -- ২

মেঘালয়ের লুসাই পাহাড়ের কোল থেকে ধিতাং ধিতাং বালিকার মতো এঁকেবেঁকে একটি নদী চলে এসেছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দিকে। ওপারে ওর যেই নামই থাক, এপারে এই নদীটির নাম কর্ণঝরা। কর্ণঝরার আরও কতগুলো বোন আছে, যারা একই মায়ের গর্ভে জন্ম। ওদের মা'ও লুসাই পাহাড়। এই লুসাইয়ের অন্য মেয়েরা হচ্ছে ভোগাই, কংস ও সোমেশ্বরী। 

লুসাই থেকে মেঘ বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ে কত ঝর্ণা যে নদী হয়েছে। পাথর, বালু,মাটি, বৃক্ষ, লতাগুল্ম চিরে চিরে বয়ে এসেছে তারা সমতলের দিকে। কত হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এই স্রোতধারা, কে তার কতটুকু জানে। এরই একটি ধারা কর্ণঝরা। এই কর্ণঝরা নদীর তীরে ছবির মতো একটি গ্রাম নাম তার হাঁসুলিগাঁও। 

আমি সেই হাঁসলিগাঁওয়ের মেয়ে কঙ্কণা। 

আমাদের বাবা চাচা'রা ছিলেন বিত্তবান কৃষক পরিবারের মানুষ। গোলাভরা ধান ও পুকুর ভরা মাছ ছিল আামাদের। আমাদের বাড়ি ছিল ফুলে ফলে বৃক্ষ শোভিত। ছিল নানা জাতের ঔষধি গাছও। বাড়ির সামনে পুকুর। পুকুরের পর শস্য ক্ষেত। তারপর কর্ণঝরা নদী। 

এই নদীর পারে আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। বালিকা এখানে গোল্লাছুট খেলতো। মাথার দু'বেণী দুলিয়ে এক্কা দোক্কা খেলতো। আমগাছের পাতা আর বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সন্ধ্যা রাত্রিতে 'পলাতকা' খেলা খেলতো খেলার সাথীদের সাথে। খেলতে খেলতে একদিন বালিকা তরুণী হয়ে উঠল। 

আমাদের বাড়ির উঠোনের একপাশে ছিল ফুলের বাগান। ওখানে ছিল বিভিন্ন রকমের ফুল। জুঁই, কনকচাঁপা, রক্তজবা, কামিনী, গাঁদা, বেলী, গন্ধরাজ, সন্ধ্যা মালতী ও রংবেরঙের পাতাবাহার। লোকে বলত কঙ্কণা নাকি ঐ বাগানের একটি ফুল। কেউ বলত আমি নাকি কনকচাঁপার মতো দিনে দিনে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছি। কেউ বলত কঙ্কণা একদম রক্তজবার মতো রক্তিম। কেউ বলত সন্ধ্যামণির মতো সুবাসিত। 

পড়তাম গ্রামের স্কুলে। কোনো বালিকা বিদ্যালয় তখন ছিল না ওখানে। আমাদের স্কুলে ছেলেমেয়ে একসাথে পড়াশোনা করত। তবে নিয়ম ছিল কঠিন। মেয়েরা কথা বলতে পারত না ছেলেদের সাথে। কমনরুম থেকে স্যারদের পিছে পিছে ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে আবার কমনরুমে ফিরে আসতাম। কোনো ছেলের সাথে কথা বললে অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হতো। স্কুল থেকে বের করে দেওয়ারও নিয়ম ছিল। তাই কারোর সাথে কথা বলার সাহস করতাম না আমি। 

আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন আমাদের ক্লাসে একজন নতুন ছাত্র এসে ভর্তি হয়। ছেলেটি দূর গ্রামের। গরীব দিনমজুরের ছেলে। প্রায় তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসে ক্লাস করত। ছেলেটি ছিল মেধাবী। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে।  ছেলেটির গায়ের রং শ্যাম বর্ণ। চুল কোঁকড়ানো। লিকলিকে লম্বা ধরনের। চোখ দুটো মায়াময়। কেন জানি দূর থেকে দেখে ছেলেটিকে আমার খুব ভালো লাগল।  

আমি ক্লাসে বসে ছেলেটিকে চুপিচুপি  খুঁজতাম কোথায় কোন্ বেঞ্চে বসে আছে। হয়ত দেখতে পেতাম কোনো কোনো দিন। আবার দেখা পেতাম না কোনো দিন। যেদিন দেখতে পেতাম না সেদিন খুব মন খারাপ করে বাড়ি চলে আসতাম। পথে আসতে আসতে পা চলত না, পা অবশ হয়ে থেমে যেত পথের উপরে। মনে হতো, আহা!  ঐ ছেলেটি এসে যদি আমার সাথে পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটত, তবে পথের উপর এমন করে পা আমার থেমে যেত না। 

বাড়িতে খুব মনমরা হয়ে থাকতাম। কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। মা জিজ্ঞাসা করত -- কঙ্কণ, তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগে? '
আমি বলতাম -- না মা, কিছু হয়নি আমার। 

আমি যে ঘরে শুতাম, ঠিক আমার বিছানার পূর্ব দিকে একটি জানালা আছে। জানালার একপাশে লাগোয়া পড়ার টেবিল। আমি একদিন সন্ধ্যা রাতে হেরিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। পড়ার মন বসছিল না!  জানালাটা খুলে দেই। দেখি - বাইরে আলো আর অন্ধকার একসাথে মিশে আছে। আঁধারের মাঝে যে আলো তা ছিল চাঁদের আলো। রাতের আকাশ যেন ছুঁয়ে আছে নিঃশব্দে আকন্দ গাছের ঝাড় পাতায়। জ্যোৎস্নার এই  চন্দনমাখা স্বর্গীয় ক্ষণে চোখ মেলে অনেক দূরে আবছা আবছা দেখতে পেলাম ঐ ছেলের মুখ, রাতের তারার মতো চেয়ে আছে যেন আমারই দিকে। এই বিরাট আলো আঁধারের  বিশ্বজগতে কতকিছুই অদৃশ্যমান, কত প্রাপ্তিতা অপ্রাপ্তি হয়ে হারিয়ে যায়। একজন অবুঝ তরুণী কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে কী চেয়ে বসল বিধাতার কাছে, তা কী বিধাতা আমার করে দেবে? 

দূরে কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসছিল শীতল বাতাস, জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল কাঁচা দুধের মতো ফিনকি দিয়ে জোছনা। কাউকে দু'কলম লিখতে ইচ্ছে করছিল খুব। কোনো কবিতা বা গানের পংক্তি নয়, ছোট্ট একটি চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে। ভাবছিলাম, একটি চিঠি লিখে রাখি কাছে। বইয়ের পাতায় সেই চিঠি গোপনে রেখে দেব। যদি কখনও সুযোগ আসে চিঠিখানি দিয়ে দেব ঐ ছেলেকে।

কল্যাণীয়ষু

খুব ভালো লাগে তোমাকে। এত ভালো লাগে যে, জনম জনম তোমাকে কাছে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছা করে। তুমি এসো গো আমার জীবনে। 'প্রাণের হিল্লোলে এসো'। জনম জনমকাল ধরে অপেক্ষা করব।

-- কঙ্কণা। 


হেরিকেনের পুষ্পিত আলোয় কী লিখলাম! অক্ষরগুলো ফুটে হয়ে আছে যেন কনকচাঁপাপুষ্পবর্ণাভা। বাইরে তখন চাঁদ ডুবছে নিভছে। চরাচর জুড়ে বিষণ্ণ আঁধার আর ম্লান আলো। আকাশের তারা'রা জ্বলছে নিভছে। কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস হঠাৎ থমকে গেল যেন । কুমারী মেয়ের কুন্তলের মতো  নৈঃশব্দ্য এসে ঘরটি ভরে গেল। বুকের তলায় দীর্ঘশ্বাস জট পেকে ধরল। আকাশে কোথাও আর দেখতে পেলাম না মণিনীল নক্ষত্র। 

( চলবে) 




প্রাণের হিল্লোলে এসো

পর্ব - ১

একদিন আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটি ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটি ছিল একটি মেয়ের। মেয়েটি লিখেছে -- "আমার নাম কঙ্কণা। কেউ কেউ আমাকে কঙ্কণ ও কঙ্কা বলে ডাকে। একজনই শুধু আমাকে কঙ্কাবতী বলে ডাকতো সে কোন্ জন তা পরে একদিন  আপনাকে বলব। 

তার আগে বলে নেই, আপনি আমাকে চেনেন না। কোনোদিন দেখেননিও। আমিও আপনাকে দেখেনি। ফেসবুকে আপনার লেখা আমি পড়ি। আপনি অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প লিখেন, আমি আপনার একজন মুগ্ধ পাঠিকা।  আপনার অনেক গল্প আমি বহুবার পড়েছি। কত গল্পে আপনি যে আমাকে কাঁদিয়েছেন। সে কান্নার কথা কেউ জানেনা। আপনিও না।

আপনার গল্প পড়ে পড়ে মনে হয়েছে আমার কিছু কথা আপনাকে বলব। আমার জীবনের কিছু কথা আপনার গল্প হয়ে থাক্। আমি গল্পকার নই, নই কথাকারও। আপনার মতো করে গুছিয়ে আমি লিখতে পারব না আমার কথা। তাই আপনার কাছে এই লেখা, আমার এই নিবেদন।... "

আমি কঙ্কণাকে উত্তরে লিখলাম -- আমার কাজই তো মানুষের জীবন কাহিনি নিয়ে গল্প কিংবা উপন্যাস লেখা। আপনি বলতে পারেন দ্বিধাহীন ভাবে সব কথা। আমি আপনার জীবন কথা নিয়ে লিখব গল্পকথা। 

কঙ্কণা লিখল -- " আমি হয়ত সব কথা একদিনে একই সময়ে লিখতে পারব না। দু একদিন পরপর বলব। আর আপনি যেন বিরক্ত না হন।... "

আমি বললাম -- আপনি যে রূপ মনে করেন, যেভাবে বলতে চান, সেইভাবেই লিখবেন। আর আমি লিখব আপনার কথা গল্পের মতো করে। সত্য বললে সত্য কথাই  লিখব, মিথ্যা বললে মিথ্যা কথাই লিখব। 

আমি কঙ্কণাকে আরও বললাম -- সবচেয়ে ভালো হয়, আপনি আপনার কথাগুলো এখানে লিখে রাখবেন আপনার সুবিধা মতো সময়ে। আর আমি আমার সুবিধা মতো সময়ে আপনার কথাগুলো পড়ে গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করব। 

কঙ্কণা লিখল -- আচ্ছা, তাই হবে। তবে একটা ব্যাপারে আমাকে মার্জনা করবেন তাহলো -- আমার প্রকৃত পরিচয়টি আমি ইচ্ছা করে গোপন রাখছি আপনার কাছে। যদি কখনও মনে হয় আমার প্রকৃত পরিচয় আপনাকে বলা দরকার, -- তখন বলব আমার পরিচয়। আপনি যেন তার আগে জানতে না চান আমার পরিচয় । তাহলে আমি খুব বিব্রত হবো। 

আমি কঙ্কণাকে বললাম -- তাই হবে। আপনি আমার কাছে শুধু কঙ্কণা। কঙ্কণ, কঙ্কা কিংবা কঙ্কাবতীও নন্। আমি আপনাকে আমার গল্প লেখা পর্যন্ত কঙ্কণা বলেই ডাকব, কঙ্কণা বলেই জানব। আপনার কথা বলা যেদিন শেষ হবে, আর আপনার কথাগুলো নিয়ে আমার গল্প লেখাও যেদিন সমাপ্ত হবে , সেদিন থেকে এই নাম, এই কঙ্কণা উপাখ্যানও আমার কাছে শেষ হয়ে যাবে। আপনি হারিয়ে যাবেন আপনার পৃথিবীর কোনো জনারণ্যে। আর আমি হারিয়ে থাকব, অন্য কোনো এক কঙ্কণার জীবন কাহিনি নিয়ে গল্প লেখার জগতে। আপনার সাথে এই কথকতা, রাত জেগে আপনার এই কথা শোনা, আর আপনাকে নিয়ে এই গল্প লেখারও পরিসমাপ্তি ঘটবে।

কঙ্কণা লেখে -- এমন করে বলবেন না। খুব কোমল প্রাণের মেয়ে আমি। কোনো কিছুতে একটুতেই আমার কান্না পায়। 

আমি বললাম -- ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব আমার কোনো আচরণে আপনাকে যেন কাঁদতে না হয়। তো, শুরু করুন আপনার জীবন কাহিনি বলা...। 

কঙ্কণা লিখল -- ঠিক আছে, আমি লিখে রাখব আমার কথা এখানে। তবে জীবনের সব কথা তো লেখা সম্ভব না। আমি লিখে রাখব জীবনের কিছু খণ্ডিত অধ্যায়ের কথা। কিছু সুখ দুঃখের কথা, কিছু বঞ্চনা ও আক্ষেপের কথা।... 

কঙ্কণার সাথে সেদিনের মতো ম্যাসেজিং শেষ হয়। 

একদিন দেখি -- কঙ্কণা ওর কিছু কথা লিখে রেখেছে। অনেকটা পয়েন্ট আউট করে লিখেছে। কথাগুলো  এলোমেলো ও অগোছালোও। অনেক কথার ইঙ্গিত আছে, কিন্তু বর্ণনা নেই।  সংলাপগুলোও কেমন ভাঙা ভাঙা। 

আমি কঙ্কণার সেদিনের কথাগুলো গুছিয়ে গল্পের মতো করে এখানে লিখলাম। কঙ্কণা যা লিখেছে  সব ঠিক আছে। শুধু প্রকৃতি, নিসর্গ, মানুষ, স্থান, কাল, পাত্র একটু হেরফের করা  হয়েছে। কঙ্কণা যা লিখেছে ঠিক তেমনটি নয়। আমার ধারণা কঙ্কণাও ইচ্চাকৃতভাবে অনেক কথা আড়াল বা গোপন করার চেষ্টা করেছে। আমি কেবল কঙ্কণার কথাগুলো, উত্তম পুরুষে কঙ্কণার হয়ে এখনে লিখলাম। 

চলবে --


রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

এক রাজকন্যার গল্প

এক রাজকন্যার গল্প /

আমার মেয়ে আমার হাত পায়ের নোখগুলো নেইল কাটার দিয়ে কেটে দিতে দিতে বলেছিল-

'কাল আমার বিয়ে। কাল আমাকে শ্বশুর বাড়ি চলে যেতে হবে। আমার যাবার সময় তুমি একটুও কাঁদবে না। তুমি কাঁদলে আমি কিন্তু হাউমাউ করে কেঁদে ফেলব। আমি তখন আর শ্বশুর বাড়িতেই যাব না।'

আমি মাথা নেড়ে বলছিলাম -- না মা, আমি কাঁদব না একটুও। তুমি দেখে নিও।

বিয়ের দিন সানাই বাজল। বর আসল। বর যাত্রীরা এল। কত হৈহুল্লর হলো। কত আনন্দ, কত রকম খাওয়া দাওয়া হলো। কোথাও কোনো দুঃখের লেশ নেই। চারিদিকে কেবল হাসি রাশি। কোথাও কোনো ক্রন্দন ধ্বনি নেই।

যথারীতি মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় হলো। বিদায়কালীন আমার মুখে কোনো বেদনার ছায়াপাত পড়ল না। চোখে মুখে আনন্দময় হাসি। আমার হাসি মুখ দেখে মেয়েও তার মুখখানিতে হাসি মেখে রেখেছে। কোনো কান্না নেই। চোখ থেকে একবিন্দু অশ্রুও ঝরে পড়ল না। আগত অতিথিদের কেউ কেউ সমালোচনা করে বলল - কেমন বাবা মেয়ে! কারোর চোখে জল নেই।

মেয়েকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে ঘরে চলে আসি। আর মেয়েও হাসি মুখে ওর শ্বশুর বাড়ি চলে গেল।

বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছি। কেমন নিঝুম সারা ঘরময়। মুহূর্ত পরেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে মেয়ের কিছু কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। যে কথাগুলো গত চার পাঁচ দিন ধরে আমাকে বলে এসেছে। আমি খুব কানের কাছে থেকে ওর এই কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম --

' বাবা, তুমি ঔষধগুলো সময়মতো খাবে। ভুলে যাবে না। কখন কোন্ ঔষধ খাবে আমি কাগজে সব লিখে রেখেছি। সাজিয়ে রেখেছিও ঐ ভাবেই৷'

' মশারী টানাতে ভুলবে না। আমি সুন্দর করে মশারী টানানোর ব্যবস্থা করে রেখেছি। '

' সুমীর মাকে বলে গেছি, উনি তোমাকে গোসলের পানি গরম করে দেবে। কখনও ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করবে না।'

' তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল ভালো করে মুছবে। ভেজা চুল আঁচড়িবে না।'

' বেশি রাত জাগবে না কখনও, সময় মতো ঘুমিয়ে পড়বে।'

' ট্রাঙ্ক খুলে পুরনো এ্যালবাম বের করে মা'র ছবি একাকী বসে দেখে দেখে কাঁদবে না।'

' ময়লা কাপড়গুলো বালতিতে রেখে দিও। সুমীর মাকে বলে গেছি -- দুতিন দিন পর পর সে পরিষ্কার করে রেখে যাবে। '

' খাওয়া নিয়ে অনিহা করবে না। সময়মতো খেয়ে নেবে।'

' এক দুটো সিগারেট খাওয়ার অনুমতি দিলাম। এর বেশি একটিও খাবে না। '

'আমি মাঝে মাঝে এসে তোমাকে দেখে যাব। তুমি কোনো অনিয়ম করেছ কী না, অনিয়ম করলে আমি কিন্তু তোমাকে দেখলেই ধরতে পারব।'

' হাত পায়ের নখ বড়ো হয়ে গেলে আমিই এসে কেটে দিয়ে যাব। তুমি কাটতে যেও না।'

' আর... পানি খেতে ভুলো না। শিয়রে জগের ভিতর পানি ভরে রাখবে সবসময়। '

' আমি যা বলে যাচ্ছি, সেই সব কথা মনে রাখবে এবং পালন করবে। আমার মাথা ছুঁয়ে তুমি দিব্বি দাও, বলো -- শুনবে সব কথা।'

এই রকম ওর আরও অনেক কথা শূন্য এই কক্ষের ভিতর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। দেখলাম -- আমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বালিশ ভিজে যাচ্ছে।

মেয়েটা আমার হারানো মা এবং স্ত্রীর শূন্যতা কখনো বুঝতে দেয়নি একটুও। আজ যেন মনে হচ্ছে -- ঐ দুজনসহ তিনজনকে আমি হারিয়ে ফেললাম।

এই পৃথিবীতে মেয়েরা বাবার কাছে রাজকন্যার মতো, আর বাবাও যেন মেয়ের কাছে রাজার মতো বেশ থাকে। পৃথিবীর কোনো রাজাই রাজ্য হারিয়ে মনে হয় কাঁদে না, কিন্তু রাজকন্যা হারিয়ে কাঁদে।

এই যেমন আমি কাঁদছি।

~  কোয়েল তালুকদার