রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

চিত্রিতা - ২

আমি চিত্রাকে বললাম - এই নিঝুম রাত্রি নিশীথে আপনি আমার এখানে কেন এসেছেন? কেউ জানলে কেউ দেখলে আপনার বদনামি হবে, আমারও বিপদ হবে। আপনি চলে যান।

চিত্রা পরিহাস করে বলছিল - আমার একদণ্ড সান্নিধ্য পাবার জন্য কত পুরুষ হাহুতাস করে, আর তুমি কী না তোমার ঘরের মধ্যে এই নির্জন গভীর রাত্রিতে আমাকে একা পেয়েও তাড়িয়ে দিতে চাইছ। সত্যি তুমি এক আহম্মক তরুণ!

আমি বললাম - ঠিক আছে, আপনি আপনার পরিচয় দিন। কী জন্য এসেছেন, বলুন। দেখি, আপনার জন্য কী করতে পারি।

চিত্রা বলছিল -- আমি জমিদার বাড়ির বধু। জমিদারের বড়ো ছেলের সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল চার বছর আগে। আমাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। ডাক্তার কবিরাজ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে -- আমার স্বামীই সন্তান প্রদানে অক্ষম।

-- এই রকম তো হতেই পারে। তো এই সমস্যার জন্য আপনি এত রাতে আমার এখানে কেন এলেন?

-- রাতে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। দিনের বেলায়, দিনের আলোয় জনসম্নূখ দিয়ে এসে আমার সমস্যা তোমাকে বলা সম্ভব হতো না। তাই এত রাতে নিরুপায় হয়ে তোমার কাছে আসতে হলো।

-- তো কী সমস্যা আপনার?

-- আমি দেড়মাসের সন্তান সম্ভবা। আমার গর্ভে অন্য পুরুষের সন্তান এসেছে। যার সন্তান এসেছে তাকে আমি ভালোবাসি না। এটি ক্ষণিক আনন্দের একটি দূর্ঘটনা। আমি গর্ভপাত করার জন্য তোমার এখানে এসেছি। আমার এই অবৈধ গর্ভধারণের খবর জানাজানি হলে জমিদার বাড়ির মান সম্মান হানি হবে। তুমি আামাকে রক্ষা করো - আমাকে বাঁচাও।

-- কীভাবে সম্ভব হবে? আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি এখানে নতুন এসেছি। নতুন চাকরি। আমার খুব ভয় লাগছে। আমি এটা করতে পারব না।

চিত্রা আমার অপারগতার কথা শুনে কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে বলে - তুমি যত টাকা চাও, তাই দেব। তবুও করে দাও।

আমি বললাম -- টাকার লোভ আমাকে দেখাবেন না। আমার কোনো টাকা পয়সার দরকার নেই।

চিত্রা বলছিল -- তবে গর্ভপাত করাতে চাচ্ছ না কেন?

-- এটি একটি অবৈধ কাজ। গর্ভপাত করানো হবে আমার জন্য বেআইনি। তাই।

-- দেখো, তুমি বয়সে তরুণ। আমি তোমার চেয়ে বয়সে পাঁচ ছয় বছরের বড়ো হবো। তোমাকে আমি মিনতি করছি। তুমি আমার এই উপকারটা করে দাও। কী করবে না?

-- না, করব না। আমার খুব ভয় লাগছে। যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়, যদি বিপদ হয়। আমার চাকরি চলে যাবে।

চিত্রা এবার বলছিল -- আমি যৌবনবতী রূপসী রমণী। আমাকে তোমার ভোগ করতে ইচ্ছে করে না? আমার সৌকর্য, আমার গোপন রূপ তোমার দেখতে মন চায় না? আমি কালরাতে আসব। তুমি সব সার্জিক্যাল জিনিসপত্র নিয়ে রেডি থাকবে। ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করবে। আমি আসব মধ্য নিশীথে একাকী। কাল পরব কালো রঙের তাঁতের শাড়ি। শরীরে গহনা পরা থাকবে আজকের গহনাগুলোই। তোমাকে আমি আজই প্রথম দেখলাম -- খুব সুদর্শন তুমি। তোমাকে খুব ভালো লেগেছে। কেন জানি জীবনে আর একটি ভুল করতে খুব ইচ্ছে করছে। তোমাকে এই রাত্রি নিশীথে হেরিকেনের ম্লান আলোয় যতটুকু দেখলাম- খুব ভালো লাগছে। অদ্ভুত সরল তুমি। এই কলঙ্কিত জীবন, এই দেহ এই মন তোমাকে দিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে আবার! কী আমাকে নেবে তুমি!

আমি কোনো কথা বলছিলাম না। শুধু নিষ্পলক চেয়ে দেখছিলাম চিত্রাকে। কী মোহিনী রূপ! কী আবেদনময়ী! কী চুম্বক আমন্ত্রণ! এই চিত্রিত রাত থমকে যাচ্ছিল অসীমে!

চিত্রা এসে আমার একটি হাত ধরে বলে -- চলো, একটু বাইরে যাই। এই আঁধার রাতে আজ আকাশে চাঁদ নেই। কিন্তু কোটি কোটি তারা জ্বলছে। সেই কোটি তারার আলোয় তুমি আমাকে একবার দেখ প্রাণ ছুঁয়ে। দেখবে -- আমাকে তোমার ভালো লাগবে। আমার শরীরে এক অলৌকিক গন্ধে পাগল হবে তুমি!

চিত্রা আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। আকাশে জ্বলে থাকা কোটি কোটি তারার আলোয় দেখলাম চিত্রাকে! কী মাধুর্যময় ওর মুখ। কী নিষ্কলুষ মায়াভরা চোখ! কী যে স্বর্গীয় ক্ষণ ছিল তখন! অন্তরে আমার তখন অন্য অনুভব, যেন --
"আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।"

বিমুগ্ধ হয়ে দুজনেই আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে থেকেছিলাম কতক্ষণ জানিনা। একসময় চিত্রা বুক ছেড়ে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল -- কাল আসব। 

সকালে আমার  ঘুম ভাঙে নাই স্বাভাবিক নিয়মে। শ্যামল এসে ঘরের কড়া নাড়ছিল খুব জোরে জোরে এবং ডাকছিল 'স্যার, স্যার' ওঠেন।  আমি যেয়ে দরজা খুলে দেই।  শ্যামলের চোখ মুখ কেমন যেন ভয়ার্ত ও বিষাদময়!  

শ্যামল বলছিল - স্যার আপনাকে এখনই জমিদার বাড়িতে যেতে হবে। গতরাতে জমিদার বাড়ির বউ চিত্রিতা খুন হয়েছে। আপনাকে তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। 

****  ****  ****








চিত্রিতা - ১

এই গল্পের কাহিনিকাল গত শতাব্দীর ষাটের দশকের। গল্পের নায়ক একজন ডাক্তার। আমি তার হয়ে উত্তম পুরুষে কাহিনিটি বর্ণনা করছি মাত্র।

এলএমএফ পাস করার পর চাকুরি নিয়ে নবাবগঞ্জের একটি পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তার হিসাবে যোগদান করি। স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ছিল কালিগঙ্গা নদীর তীরে। বান্দুরা-কলাকোপা থেকে কেন্দ্রটি বেশি দূরে না হলেও আসা যাওয়ার পথ ছিল খুবই খারাপ। সেই সময়ে গ্রামের কাঁচা পথে বৃষ্টিতে কাদা হতো, শুকনো দিনে ধুলো উড়ত আর বর্ষায় অথৈ পানিতে থৈথৈ করত।

আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয় কেন্দ্রের পিছনে একটি পুরানো আধা পাকা ঘরে। যেটিতে গত এক দেড়বছর ধরে কেউ থাকত না। অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। আমার কেন্দ্রের কম্পাউন্ডার শ্যামল গোমেজকে দিয়ে ঘরটি সাজ সজ্জা করিয়ে নেই। সেখানে তখন বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। আমাকে রাতে হারিকেন কিংবা লণ্ঠন জ্বালাতে হতো।

শ্যামল ওখানকার স্থানীয় ছেলে। আমার চেয়ে তিন চার বছরের বড়ো হবে। বিয়ে করেছে। একটি বাচ্চাও আছে। বউ সন্তান নিয়ে থাকে। বাড়ি থেকেই ডিসপেনসারিতে আসা যাওয়া করে। শ্যামল আমার জন্য একটি কাজ করেছিল, তাহলো পাশের একটি বাড়ি থেকে আমাকে পেয়িং খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

এলাকাটির নাম সোনাবাজু। নিভৃত গ্রাম। অদূরে বয়ে চলেছে কালিগঙ্গা নদী। আমি বিকাল হলেই হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম গঙ্গার তীরে। জেলে পাড়া দিয়ে হাঁটতাম। ওরা আমাকে খুব মান্য করত। বলত - ডাক্তার বাবু এসেছে। কোথায় বসতে দেই! কী খেতে দেব! তারপরও কাঠের টুলে বসতে দিত। বেতের টুরিতে মুড়ি খেতে দিত নারিকেল দিয়ে, না হয় আখের গুড়। গাছের পিয়ারাও খেতে দিত।

আবার কোনো কোনো দিন একাকী হেঁটে নদীর কূল ধরে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যেতাম। সন্ধ্যা নামত নদীর কূলেই। বক, পানকৌড়ি, বালিহাঁসের দল উড়ে চলে যেত মাথার উপর দিয়ে ওদের কুলায়। সন্ধ্যা ঘোর হয়ে রাত্রি নেমে এলে আমি ঘরে চলে আসতাম। ঘরে এসে নিজ হাতে সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতাম।

সন্ধ্যার পরে কেউ থাকত না। মাঝে মাঝে শ্যামলকে বলতাম, তুমি কিছু সময় আমার এখানে থাকো, কথা বলো, গল্প করো আমার সাথে। শ্যামল আমার অনুরোধে প্রায়ই সন্ধ্যা রাত্রি পর্যন্ত থাকত, এবং গল্প গুজব করে চলে যেত।

আমি শুনতাম ওর অনেক গল্প কথা। বলত এখানকার অনেক পুরাণ কাহিনিও। দুইশত বছর আগের কলাকোপার কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির কেচ্ছা কাহিনিও শোনাত। বলত ব্রজেন নিকেতনের নানা রঙ্গ-লীলার কথা। ভালোই লাগত সেই সব কল্পকথা শুনতে। আমি শ্যামলকে বলতাম -- তুমি এসব কার কাছে থেকে শুনেছ? শ্যামল বলত, আমার পিতামহের কাছে থেকে। পিতামহ আবার শুনেছে নাকি তার পিতামহের কাছে। এইভাবেই শোনা কাহিনি। সবই কিংবদন্তি।

সারাদিন ডিসপেনসারিতে রোগীরা আসত, ভালোই লাগত। বিকালবেলা এদিক সেদিক ঘুরতে বের হতাম, সময় কেটে যেত। কিন্তু সমস্যা হতো সন্ধ্যা হতে রাত্রিতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত। ঐ সময়টুকু কেমন যেন ভয় ভয় লাগত। যেদিন শ্যামল থাকত সেদিন ভালোই লাগত, যেদিন থাকত না, সেদিন খারাপ লাগত।

একদিন সন্ধ্যায় শ্যামল বহু বছর আগের কোকিলপিয়ারির জমিদার বাড়ির এক কাহিনি আমাকে শোনায়। পুরোটা বলেনি, আংশিক বলছিল। ওর গল্প শোনার পর আমি কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। একবার মনে হলো দরজা খুলে বাইরে যাই। এই নিশীথে সন্তর্পণে হেঁটে চলে যাই ব্রজেন নিকেতনে। কিন্তু পা থেমে গেল!

খুব অস্থির লাগছিল। পায়চারি করছিলাম কক্ষের ভিতর। কী মনে করে দরজা খুললাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি -- প্রাচীন বিধ্বস্ত নগরীর মতো নিকষ অন্ধকার, কেমন ভূতুড়ে লাগছিল চারদিকে। কেমন যেন হুহু করছে আঁধার। আমার হাত পা ভয়ে হিম হয়ে আসছিল। আমি আর বাইরে এগুলাম না। ঘরের ভিতর এসে দরজা বন্ধ করে দেই। বিছানায় শুয়ে থাকি চুপচাপ।

হারিকেন জ্বলছে টেবিলের উপর। নিভালাম না। কালিগঙ্গার কূলবর্তী সোনাবাজুর চরাচরে ক্রমে গভীরভাবে রাত নেমে আসছে। নিস্তব্ধতার ভিতর শুধু নিশি পোকাদের গুনগুনানি শুনছিলাম। ভয়ে ঘুম নেমে আসছিল চোখে। অবশে বুক থরথর করছিল। কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। হয়ত ঘুমিয়েও পড়েছিলাম।

হঠাৎ বাইরে কার যেন পায়ের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। হারিকেন তখনও জ্বলছে। আমি চুপচাপ কান পেতে শুনছিলাম পায়ের শব্দ। একটুপর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। খুব ভয় লাগছিল। ঘড়িতে চেয়ে দেখি রাত ১.৪০ মিঃ। আমি দরজা খুলছিলাম না। কাঁপা কাঁপা পায়ে দরজার এপাশ থেকে বলছিলাম -- আপনি কে? কিছুক্ষণ নীরব। কোনো কথা নেই। আবার বলি-- কে আপনি? ওপাশ থেকে রমণীকণ্ঠে জবাব এল, 'আমাকে তুমি চিনবে না, দরজা খোলো, দেখলে আমাকে চিনবে, আবার নাও চিনতে পারো।'

আমি দুরুদুরু বুকে দরজা খুলে দেই। চেয়ে দেখি - বাইরে এক অপরূপ রমণী মূর্তি দাঁড়িয়ে। আমার কোনো অনুমতি না নিয়েই সে গৃহের ভিতর প্রবেশ করে। সোজা যেয়ে খাটের উপর বসে। হারিকেনের আলোয় দেখলাম - পরনে তার ধূসর রঙের ফিনফিনে ঢাকাই জামদানী শাড়ি। কানে সোনার ঝুমকা, গলায় সীতাহার। দুহাত ভরে সোনার চুড়ি। মৃদু রিনঝিন করছে। রমণীর মুখ অপার মাধুর্যে পরিপূর্ণা। গায়ের রং উজ্জ্বল গৌরীয়। চোখ দুটো টানাটানা। কালো ভ্রুকুটি। নিরাভরণ মুখশ্রী, কিন্তু লাবণ্যময়। আমি ভয়মিশ্রিত বিস্ময়ে দেখছিলাম তাকে। রমণী আমাকে বলছিল - তুমি চেয়ে দেখছ আমাকে কিন্তু চিনতে পারছ না। আর চিনবে কী করে? এর আগে আমাকে কখনও দেখনি! আমার নাম চিত্রিতা। সবাই আমাকে চিত্রা বলে ডাকে। তুমিও আমাকে চিত্রা বলে ডাকতে পারো।
চলবে ---

বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১

ঘাস ফড়িং-এর রং

অনেক বছর আগের কথা। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি এসে দেখি -- আমার দূর সম্পর্কিত একজন মামু তার দশ এগারো বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছে। এই মামুকে এর আগেও আমাদের বাড়িতে প্রায়ই একা আসতে দেখেছি। উনি সকালে আসত, এবং বিকালেই চলে যেত। এই প্রথম দেখলাম -- উনি একা নয়, এবার ওনার মেয়েকে সাথে করে আমাদের বাড়িতে এসেছে।

মার কাছে শুনেছিলাম, তার এই ভাইটি দূর সম্পর্কের খালাত ভাই হয়। বয়সে মার থেকে অনেক ছোট। মেয়েটির জন্মের পরেই ওনার স্ত্রী মারা যায়। এর পরে আর বিয়ে করেনি। এই মেয়েকে নিয়েই থাকে। উনি খুব গরীব। অনেক অভাব অনটনের ভিতর জীবন নির্বাহ করে।

মেয়েটির নাম ফিরোজা। ক্লাস ফাইভ পাস করেছে। ওকে আরও পড়ানোর ইচ্ছে আমার সেই মামুর। তাদের গ্রামে আশেপাশে কোনো হাই স্কুল নেই। আবার অভাব অনটনও আছে। তাই এই মেয়েটিকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। ওনার ইচ্ছে, এখানে থেকে তার মেয়ে লেখাপড়া করুক।

মার সাথে এই ব্যাপারে কী আলাপ আলোচনা করেছিল -- সে কথা আমি জানিনা। শুধু দেখলাম, ফিরোজাকে আমাদের বাড়িতে রেখে আমার সেই মামু চলে গেল। যাবার সময় তার মেয়েকে ডেকে কাছে জড়িয়ে নিয়ে বলল - মা, তুমি ভালোভাবে এখানে থাকবে। সবার কথা শুনবে। সবাইকে মান্য করে চলবে।

ফিরোজা মাথা নেড়ে বলেছিল --' আচ্ছা। তুমি আবার আইসো, আমাকে দেখে যাইবা।' দেখলাম, বাবা মেয়ে দুজনেই অশ্রু মোচন করছে।

মেয়েটি এখন থেকে এখানেই থাকবে, আমার খুব ভালোই লাগল, মনে হলো-- একজন সাথী পেলাম। যে আমার ছোট বোনের মতো, খেলার সাথীর মতো। ঐ বয়সে ফিরোজা আমার প্রেমিকার মতো কেউ একজন হবে, এই কথা ভাবিনি।

প্রথম দিন সন্ধ্যা রাতে হেরিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি, ফিরোজা আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। টেবিলের উপর রাখা আমার বইগুলো নেড়েচেড়ে বলে -- রতন ভাই, তুমি মনে হয় অনেক ভালো ছাত্র, ক্লাসে তোমার রোল নং কত?

আমি বললাম, 'আমার রোল নং চব্বিশ।' ফিরোজা শুনে খুব মন খারাপ করল। ও ভেবেছিল - আমার রোল নং এক হবে। আমি খুব ভালো ছাত্র।

টুকটাক করে কথা বলতে বলতে আমি ওকে বললাম, এখন থেকে তুমি তো আমাদের বাড়িতেই থাকবে, তাই না? ফিরোজা বলল, 'হে। তুমি খুশি হও নাই ?' বললাম, 'খুশি হয়েছি।'

পরের দিন আমি স্কুলে গেলে স্কুলের ক্লাসগুলো কেমন যেন শেষ হচ্ছিল না। মন খুব আকুবাকু করছিল -- কখন ছুটি হবে, কখন বাড়ি যাব, কখন ফিরোজার সাথে গল্প করব?

স্কুল ছুটি হলে বাড়িতে আসতে আসতে পথে মনে হলো, ফিরোজাও নিশ্চয়ই আমার জন্য এমন ছটফট করছে, ভাবছে-- কখন আমি বাড়ি আসব, কখন আমাকে ও দেখতে পাবে, আমার সাথে গল্প করবে।

দ্বিতীয় দিন বিকালবেলা, ফিরোজাকে নিয়ে পাড়ার অন্যান্য খেলার সাথীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ওদের বলি - ওর নাম, ফিরোজা, ও আমার বোন হয়। এখন থেকে ও আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমি ফিরোজাকে নিয়ে সারা আঙ্গিনা ঘুরে ঘুরে দেখাই। পুকুর পাড় ধরে হাঁটতে থাকি। কদমগাছ তলায় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যায় জল থেকে উঠে আসা হাঁসগুলোর ঘরে ফেরা দেখি।

মাত্র দুতিনদিনেই ফিরোজা আমার সারাক্ষণের সাথী হয়ে ওঠে। আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে অন্য খেলার সাথীদের সাথে খুব বেশি মিশতাম না। ফিরোজাকে নিয়েই এ বাড়ি ও বাড়ি যেতাম। কোনো কোনো দিন পুকুর পাড় পেড়িয়ে আলপথ দিয়ে হাঁটতাম। তখন ছিল হেমন্তের দিন। সারা প্রান্তর জুড়ে ছিল সরিষার ক্ষেত। চারদিকে শুধু হলুদের সমারোহ। আমরা বিমুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখতাম হলুদ গালিচার মতো সরিষা ফুলের মাঠ। মৌ মৌ গন্ধ নিতাম নাক ভরে।

আমি চার পাঁচ দিনেই ফিরোজাকে খুব আপন করে নিলাম। ফিরোজাও আমাকে আপন করে নেয়। ভাবছিলাম, কবে ওকে ভর্তি করে দেবে স্কুলে। দুজন প্রতিদিন একসাথে স্কুলে যাব। প্রতিদিন স্কুলে যেতে যেতে সারা পথে কথা বলব, গল্প বলব। গল্প করতে করতে, কথা বলতে বলতে -- কথা ফুরাবে না, গল্পও ফুরাবে না, কিন্তু পথ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।

সেদিন ছিল বুধবার, গুনে দেখলাম ছয়দিন ধরে ফিরোজা আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমি স্কুলে চলে যাই। সেদিনও ক্লাসে মন বসছিল না পড়ায়। খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ হচ্ছিল ক্লাস। মনে হচ্ছিল, কখন ছুটি হবে, কখন বাড়ি যাব, কখন দেখব যেয়ে ফিরোজাকে।

ক্লাস শেষে ছুটির পর আমি খুব জোরে জোরে পা ফেলে বাড়ির দিকে আসতে থাকি। পায়ে পায়ে পথের ধুলি উড়িয়ে আসছিলাম, আর ভাবছিলাম কখন এই পথ চলা শেষ হবে।

যখন বাড়িতে আসি, এসে দেখি-- আজ ফিরোজা বাড়ির গলি মুখে দাঁড়িয়ে নেই। ওকে না দেখে মন খারাপ করে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করি। উঠোনেও কোথাও ওকে দেখতে পেলাম না। ঘরের ভিতর যেয়ে দেখি, ঘরেও নেই। ভাবলাম, হয়তো পাশের বাড়ি বেড়াতে গেছে।

মা আমাকে খেতে দিল। আমি ভাত খেতে খেতে মাকে বললাম -- ফিরোজা কোথায় গেছে? মা জবাব দেয় , ওর বাবা এসে ওকে আজ নিয়ে গেছে। আমি বললাম, কবে আবার আসবে? মা, বলল, এমনিতেই আর কখনও আসবে না, তবে বেড়াতে আসলে আসতে পারে।

ফিরোজার চলে যাবার কথা শুনে, আমি আর এক নকলা ভাতও মুখে দিতে পারিনি। আমার চোখে জল চলে আসে। আমি হাতে পানি ঢেলে হাতও ধুইনি। এঁটো হাতেই মাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে
থাকি। আমার সেই কান্নার অর্থ সেদিন মা কী বুঝেছিল, আমি জানিনা।

পরে শুনেছি -- ফিরোজার বাবাই ফিরোজাকে আমাদের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। মেয়েকে ছাড়া সে নাকি একদণ্ড একাকী থাকতে পারেনা।

সেই কত বছর চলে গেছে কত দিনকাল ক্ষণ। এত বছর পরেও সেই বালিকাকে আমি ভুলতে পারিনি। কী মায়া করেই না আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কথা বলত, স্মিত হাসি লেগে থাকত চোখে মুখে, সন্ধ্যার দীপশিখায় দেখতাম সেই মুখ, হাঁটত ছোট ছোট পা ফেলে আমাদের বাড়ির উঠোনে। ওর কিছু কথা এখনও ক্ষীণ করে আমার কানে বাজে। বিশেষ করে আদুরে কণ্ঠের সেই ডাক -- রতন ভাই।

খুব করে মন চায় রাঙা পথের ধুলো উড়িয়ে চলে যাই পল্লীর নিভৃত ওর সেই গাঁয়ে। যেয়ে যদি দেখা পাই ঐ বালিকার, কিংবা খুঁজতে খুঁজতে যদি দেখা মেলে ফিরোজা রঙের কোনো ঘাস ফড়িং কিংবা অপরাজিতার। দেখতে তো পাব তবু তার রূপ রং ঠিক অনেক বছর আগে দেখা ঐ বালিকার মতো। আম-কাঁঠালের ঝাড়ের উপর দেখতে পাব নীল আকাশ, দেখব রাতের নক্ষত্র বীথি, আলো আঁধারে চেয়ে দেখতে পারি কারোর চোখের অশ্রু ছল ছল।…

~ কোয়েল তালুকদার




শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ৫

পর্ব - ৫

আমার জীবন দুইদিক থেকে বয়ে আসা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হাওয়ায় এলমেল হতে লাগল। যেন হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল তছনছ হয়ে গেল! আনিসের দিক থেকে বয়ে আসা ঝড়টি কেন জানি বেশি অমঙ্গলের মনে হলো। তাই এই ঝড়টিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য প্রাণমনে চেষ্টা করতে থাকি।

এরপর থেকে আনিসকে বুঝতে দিতে চাইনি যে -- আমি ওকে ভালোবাসি। দূর থেকে দিনের পর দিন ভালোবেসেছি, কিন্তু কখনও বুঝতে দেইনি ওকে।  নিজে নিজেই একটি সিদ্ধান্ত নেই --  মাইনুলই আমার জীবনের প্রথম পুরুষ। কত কিছু দিয়ে, কত অর্ঘ্য আর চোখের জলে ওকে জীবনে পেয়েছিলাম -- ও-ই আমার জীবনে চির জীবনের বাঁধন হয়ে থাক্।

সেমিনার কক্ষে বসে পড়াশোনা, লাইব্রেরি যেয়ে বসে বসে নোট করা, ক্যান্টিনে চা সিঙ্গারা খাওয়ার মধ্যেই আনিসের সাথে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করে রাখলাম। এরপর মাঝে মাঝে আনিস অনেক কবিতা লিখে আমার কাছে নিয়ে এসেছে, কিছু তার শুনেছি, কিছু তার শোনা হয়নি। 

মাইনুলের সাথে আমার গোপন অবৈধ সম্পর্ক, আমার গর্ভধারণ, গর্ভপাত এসব কিছুই আনিসকে কোনোদিন বলিনি। আমার এই গোপন অন্ধকার জীবনের গ্লানির কথা আনিসের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। 

অনার্স শেষ বর্ষের এক গ্রীষ্মের ছুটির দিনে বাড়ি গেলে অনেকটা অনাড়ম্বর করে মাইনুলের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়। এই বিয়ের কথাও আনিসকে আর বলিনি। ইতোমধ্যে আমাদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। 

পারিবারিক ভাবে সিদ্ধান্ত ছিল -- আমার আর মাস্টার্স পড়া এখানে হবে না। আর আমারও ইচ্ছে করছি না পড়তে। 

এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাব। এই স্মৃতিময় নবাব ফয়জুন্নেসা হল। এই সবুজ ক্যাম্পাস!  দূরে বয়ে  যাওয়া বংশী নদীর কলধ্বনিও আর শুনব না। এখানে আর সন্ধ্যা নামা দেখব না পাখিদের মুখর করা সন্ধ্যার গানে। 

খুব ইচ্ছে হলো -- আনিসের সাথে একটি বিকাল কাটাতে বংশী নদীর তীরে। চলেই তো যাচ্ছি আনিসকে ছেড়ে চিরদিনের করে, আর কোনোদিন হয়ত দেখা হবে না। স্বামী - সংসার, সন্তান নিয়ে গদবাঁধা জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকতে হবে। 

যেদিন চলে আসব - ঠিক তার আগের দিন আমি আর আনিস চলে যাই -- বংশী নদীর তীরে। কাকতালীয় ভাবে সেদিনও ছিল আষাঢ় মাস। কিন্তু এর আগে যে এখানে এসেছিলাম ঠিক সেই সবুজের ধানক্ষেত আজ দেখতে পেলাম না। নেই সেই কদমগাছটিও। কোনো বৃক্ষরাক্ষস  সম্ভবত কদম গাছটি কেটে ফেলেছে।  তবে নদীর দিকে চেয়ে দেখলাম, নদী কুলকুল করে বয়ে চলেছে ঠিক আগের মতোই। 

আমরা নির্জন মেঠোপথে নদীর কূল ধরে হাঁটতে থাকি।  একজায়গায় দেখতে পাই একটি বাবলা গাছ। সারা বাবলাগাছ ধরে হলুদ ফুল ফুটে আছে।  আমরা দাঁড়াই এই বাবলা তলে।  আনিস বলছিল -- তুমি কী এখানে বসতে চাও? 

আমি বললাম, বসব, তোমাকে নিয়ে দেখব নদীর জল।  হয়ত এমন করে আর তোমাকে নিয়ে নদী দেখা হবে না। 

তখন সন্ধ্যা পূর্ব বিকাল। আমরা দুজন বসে আছি। টুকটাক করে অনেক কথা বলছি, আবার নীরবতায়ও কেটে যাচ্ছিল সময়। আজ আনিসের একটি হাত খুব ধরতে ইচ্ছা করল -- আমি ওর একটি হাত ধরি। হাত ধরে বলি -- এই হাতে একটি চুমু কী আমি দিতে পারি? আনিস বলল, 
দাও। 

আনিস আমাকে ওর বাহুডোরে বেঁধে  নিয়ে বলে, 'আমরা কী চিরদিনের জন্য দুজন দুজনের হতে পারি না?'

আমি আনিসের মুগ্ধ দুচোখের দিকে চেয়ে বলি -- না। আমি যে অনেক আগেই আর একজনের জন্য চিরদিনের হয়ে গেছি। আমার জীবন তোমার জীবনে নেই।  

দেখলাম -- আনিসের বাহু মুহূর্তেই শিথিল ও নির্জীব হয়ে গেল। হাঁটুতে মাথা গুজিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।  সেদিনের অস্তবেলার শেষ সন্ধ্যা নেমেছিল নদীর বুকে। দুজন চেয়ে থেকে দেখছি -- কী ভাবে সোনালি আবীর মাখা রং আকাশ থেকে মুছে গেল। 

ফিরবার পথে সন্ধ্যার সেই বিলুপ্ত  মেঘের দিকে চেয়ে ভাবছিলাম -- যাকে বেশি করে ভালোবাসা যায়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ বুঝি তার সাথেই করা যায়, আবার এই ভেবে মনে শান্তিও পেলাম -- আনিসের জীবনে আমি যে জড়াইনি এইটাই ওর জন্য চির কল্যাণ হয়ে থাক্। ওর সামনে যে অনেক কর্ম।

পথে আসতে আসতে আবারও মনে হলো ওর একটি হাত আমার হাত ধরে আছে -- কিন্তু কেমন যেন অসার সেই হাত। আমাকে কেমন মায়া করে ডাক দিল আনিস -- কঙ্কাবতী! 

-- জ্বী।
-- তোমার সাথে আর কী কখনো দেখা হবে না আর? 
-- না। লুকিয়ে রাখব তোমার থেকে  নিজেকে বাকী জীবনকাল। 

পথের উপর সেই সন্ধ্যার আঁধারে থেমে যাই। পা চলছিল না। কেমন যেন ব্যথা করছিল পায়ে।  আমি আনিসকে বলি - তোমার বুকে একটু মুখ লুকোতে দেবে? 

-- দাও। 
-- একটু কাঁদতে দেবে? 
-- কাঁদো। 
 
তারপর আমার জীবনের কত পিঙ্গল পথ, কত পটে কত বর্ণের হয়ে জীবনের এই অস্ত পর্বে এসে দাঁড়ালাম। কত শুকতারার আলোকোজ্জ্বল রাত আঁধারে উড়িয়ে অদৃশ্য হয়েছে – প্রতিদিনই কোনো কোনো  সন্ধ্যায় সেই হারিয়ে ফেলা বংশী নদীর কূলের মতো হাসি আনন্দের সন্ধ্যা নেমেছে, আপন ভালবাসার রঙে আমার প্রাণ রাঙিয়ে তুলেছি কত। আমি শুধু অনুভব করেছি -- একজনকে ভালোবেসে পেয়েছি, আর একজনকে ভালোবেসে হারিয়েছি। একজনকে দেহ মন দিয়ে  কেবল আনন্দ দিয়ে গিয়েছি, আর একজনকে জীবনভর মনে রেখে দুঃখ কুড়িয়েছি।


***  *** *** ****

তারপর চলে গেছে জীবনের পয়ত্রিশ বছর।  আমি এখন বিগত যৌবনা এক রমণী। জানো! এই শহরেই আমি থাকি। 
তোমাকে আমি অনেক কথাই বললাম, আবার অনেক কথা বলিনি। জীবনের এমন অনেক কথা আছে, লেখা যায় না, বলাও যায় না, চোখে এসে দেখতে হয়। তোমাকে কফি খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলাম -- যদি আসো তাহলে তুমি দেখতে পাবে  আমার জীবন ছবি। 

আমার ঠিকানা ঃ রোড নং ২৩,
বাসা নং ... , বনশ্রী, রামপুরা -- ঢাকা। 

আমি একদিন সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম কঙ্কণার বাড়িতে। বাসায় নক করতেই  একটি লোক এসে দরজা খুলে দেয়। লোকটি আমাকে দেখে বুঝতে পারে - আমি কে?  মনে হলো কঙ্কণা আমার কথা আগেই বলে রেখেছিল ওনাকে। পরে জেনেছি - লোকটি হচ্ছে কঙ্কণার স্বামী মাইনুল। 

ভিতরে শোবার ঘরে যেয়ে দেখি একজন পঞ্চাশোর্ধ মহিলা অন্যদিকে কাত হয়ে শুয়ে আছে। মাইনুল ওনাকে ডাকে -- দেখ কে এসেছে! 

কঙ্কণা, আস্তে করে ঘুরে আমার দিকে তাকায়, কী করুণ শীর্ণা রোগক্লিষ্ট মুখ। চোখের নীচে কালো দাগ। চোখের কোণে  বিন্দু বিন্দু জল। আমি ওকে দেখে আৎকে উঠি। আমি যে একে চিনি। বহু জন্মজন্মান্তরের সে যে আমার একজন ছিল। শুধু নামটি ভিন্ন, কঙ্কণা নয় -- ও যে দিলারা জাহান। 

এইরকম কতকিছু পরিবর্তন করে আমাকে লিখেছিল দিলারা -- বংশী নদী নয়, নদী ছিল বুড়িগঙ্গা, জাহাঙ্গীরননগর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর, আনিস রহমান সে নয়, সে ছিল রঞ্জন রহমান। 

দিলারা কর্কট রোগে আক্রান্ত ছিল। পৃথিবীর সমস্ত ঔষধ ও  চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল ওর শরীরে। ডাক্তার হাসপাতাল থেকে ওকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। 

সেদিন একটি সন্ধ্যাই কেবল দিলারার শিয়রে বসেছিলাম -- খুব আবছা করে দেখতে পাচ্ছিলাম অনেক দূরের একটি নদী। শ্রাবণের  বুড়িগঙ্গা বয়ে চলছিল যেন কুলুকুলু করে...  
দিলারা আমাকে একদিন বুকে মাথা রেখে বলেছিল, "প্রাণের হিল্লোলে তুমি এসো, সকল মাধুরি শুকায়ে গেলে গীতসুধারসে তুমি এসো।"

সমাপ্ত। 

~  কোয়েল তালুকদার 
 







বুধবার, ৯ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো -৪

পর্ব - ৪

কর্ণঝরা নদীর স্বচ্ছ জলের উপর  দিয়ে ভাসতে ভাসতে আমি এসে পড়েছিলাম আরেক রূপবতী নদী ব্রহ্মপুত্রের উদ্দাম বুকে। নাহ্, ঠিক জলে নয়। এর কূলে একটি শহরে। জীবনের যত ঝড় ঝাপটা এর কূল দিয়েই বয়ে গেল আমার। গ্রামের একটি  লাস্যময়ী তরুণীর জীবন হঠাৎ কঠিন দুর্মর ব্যাথা বেদনার ভরে উঠল। এক করুণ কাব্য গাঁথা রচিত হলো এই শহরে।  

ময়মনসিংহের সরকারী মমিনুন্নিসা মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। থাকতাম ছাত্রী হোস্টেলে। সারা শরীরে তখনও গ্রামের রোদ্র তাপের তামাটে দাগ। ভেজা চুল থেকে গন্ধ বের হতো কর্ণঝরার জলের। বেণীর ভিতর থেকে খুঁজে পাওয়া যেত হাঁসুলীগাঁওয়ের বন মল্লিকার শুকনো পাপড়ি।  

এখানে এসে পড়াশোনা করছিলাম ভালোই। ইন্টারমিডিয়েট পাস করি ভালো রেজাল্ট নিয়ে। আর এখানেই কী না ঘটে গেল আমার জীবনের এক কলুষিত ঘটনা। কলুষিত হলো ব্রহ্মপুত্রের জল। আমার এই জীবন ব্যথার মর্মর কথা জেনেছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর জল, নদীর উপরের রাতের আকাশ, আকাশের যত তারা। আর সেখানকার আঁধার। 

কলেজের পাঠ শেষ করে এই শহর থেকে একদিন ট্রেনে করে ঢাকা চলে আসি। ভর্তি হই সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

তখন আশির দশক।  কী চমৎকার গ্রামীণ পরিবেশ, ছায়া ঢাকা, পাখিদের কলকাকলি মুখর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গন। দূরে দিগন্তের নীচ দিয়ে দেখা যেত কলধ্বনিতে বয়ে যাওয়া বংশী নদীর জল।

ভূগোল বিভাগের প্রথম দিনের ক্লাস। ক্লাসে যেতে আমার সেদিন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। স্যারের অনুমতি নিয়ে শ্রেণি কক্ষে ঢুকি। বুক হাত পা থরথর করে কাঁপছিল। ক্লাস রুমের মাঝখানের স্পেস দিয়ে হেঁটে যেতেই একটি ছেলের পায়ের গোড়ালিতে হোঁচট খেয়ে মেঝেতে ধাম্ করে পড়ে যাই। মুহূর্তে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কেউই এগিয়ে এসে উঠাল না আমাকে। আমি একাই বই খাতা কুড়িয়ে নিয়ে পিছনের একটি খালি  সিটে গিয়ে বসি। 

ক্লাস শেষে করিডরে একাকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। যার পায়ে লেগে হোঁচট খেয়েছিলাম, সেই ছেলেটি আমার কাছে এসে বিনম্র ভঙ্গিতে বলে -- "আমি একান্তভাবে দুঃখিত ও ক্ষমা প্রার্থী।"
 
আমি বলি -- আমারও তো পা লেগেছিল আপনার পায়ে। আমিও দুঃখিত। 

এইভাবেই ঐ ছেলেটির সাথে আমার প্রথম কথা হয় এবং সখ্যতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ওর নাম-- আনিস রহমান। 

আমার ভাগ্য কী এই রকমই হয়, জগতের যত সহজ সরল ছেলের সাথে পরিচয় হয়। তাদের জন্য মায়া লাগে। আর এই মায়ায় পড়ে তাদের সাথে এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে যাই।

আনিস এসেছিল ফরিদপুরের রাজবাড়ি থেকে। গোয়ালন্দের কাছে পদ্মাপাড়ে ওদের বাড়ি। আনিসকে আস্তে আস্তে চিনতে লাগলাম। ভালো লাগলো বন্ধুর মতো করে। একটু সতর্ক থাকলাম -- কোনো ভাবেই যেন দূর্বল হয়ে না যাই। 

ছেলেটি ভালো কবিতা লিখত।  নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হেলাল হাফিজদের মতো সুন্দর সুন্দর কবিতা। ও প্রায়ই  কবিতা লিখে এনে আমাকে দেখাত এবং পড়ে শোনাত। খুব ভালো লাগত ওর কবিতা। আনিসের একটাই দোষ ছিল, ও কবিতা কোথাও ছাপানোর জন্য পাঠাত না। বলত -- আমি কবি হতে চাইনা। আমি কবিতা লিখি আমার জন্য। ছাপিয়ে কী হবে। 

-- শুধু তোমার জন্য? 

-- আমার জন্য এতদিন লিখেছি, এখন লিখি তোমার জন্য। 

আমি বলতাম, আমার জন্য কেন লেখ? আমি আবার কবিতা লেখার তোমার কেউ হয়েছি নাকি? 

আনিস বলত -- তুমি আমার অনেক কিছু। তুমি পছন্দ করো, তাই লিখি। 


একটা কবিতার কথা মনে আছে। একদিন  ক্লাস শেষে করিডরে দাঁড়িয়ে আছি। আনিস আমার কাছে এসে বলে -- কঙ্কাবতী। 
-- বলো।  
-- চলো আজ বংশী নদীর পারে। ওখানে কূলে বসে নদীর জল, আর নীল আকাশ দেখে আসি।
আমি বললাম - চলো। 

আমরা চলে যাই বংশী নদীর তীরে। তখন ছিল আষাঢ় মাস। নদী সবে মাত্র জলে ভরে উঠেছে। তখনও জল উপচে ক্ষেতে খামারে  ঢুকে পড়েনি। চারদিকে আউশ ধানের প্রান্তর। ধানক্ষেত পার হলেই নদী। ঠিক নদীর কূল ঘেষে একটি কদম গাছ আছে। গাছ ভর্তি ডালে ডালে কদমফুল ফুটে আছে। অপরাহ্ণের রোদ লেগে ফুলগুলো থেকে তীব্র গন্ধ বের হচ্ছিল। আমরা যেয়ে কদমতলায় ঘাসের উপর বসি। নদীর জল বয়ে যাচ্ছিল ছলাৎছল করে। কিছু সময়ে নদীও কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়। আমরা দেখলাম- আষাঢ় মাসের এই ভরা নদী আমাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। নদীর কথা সবাই সবসময় শুনতে পায় না। কেউ কেউ কখনও পায়। আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম সেই কথা নির্জন সেই অপরাহ্ণ বেলায়। 

আনিস ওর বুক পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে। সেই কাগজে লেখা আছে একটি  কবিতা। পড়ে শোনায় সেই কবিতাটি। যেন নদী এসে কথা বলছিল নিভৃতে আমার কানে কানে।  

আনিস কবিতাটি পড়ার পর আমাকে দিয়ে দিয়েছিল কাগজটি। আমি রেখে দিয়েছিলাম তা আমার বইয়ের পাতায়। পয়ত্রিশ বছর চলে গেছে। বইটি এবং কবিতাটি রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে একটি পুরনো কাঠের তোরঙ্গে। আনিসের লেখা  সেই কবিতাটি ছিল ---

" একদিন এক নিরাভরণ আয়োজনহীন বিকালে আমরা হাঁটছিলাম, কাঁচা ধান শীষের নির্জন সেই পথ, পাশে দূর্বা ঘাসের উপর দুপুরের এক পশলা বৃষ্টির মুক্তো লেগেছিল। তখন আকাশ ছিল ধূসর নীল।

আষাঢ়ে কাশফুল ফোঁটার কথা না। দয়িত হারানো বিরহী রমণীর মত শেফালিকাও কোথাও নেই। ধুলোর পথ ছেড়ে দূর্বা ঘাসের উপর আমাদের চরণ পড়ে দূর্বাও রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিল।

যে পাশে ছিল সে ছিল আমার আনন্দময়ী, আমার প্রাণাধিকা। বিকালের রোদ্র মেখে স্বর্ণপ্রভা হয়ে উঠেছিল সে। যেন কতকালের পরিচিত আরক্ত মুখশ্রী। দেখেছি কত সন্ধ্যার ছায়ায়, কত চন্দ্রালোকিত নিশীথে। সে প্রকৃতিভৈরবী হয়ে আমাকে ঘর থেকে কত যে বের করে নিয়ে আসে ।

কতদিন পর আজকে এই বিকালে এখানে এসেছি। পশ্চিম দিগন্তে আলো নেভে নাই, তখনও দিগন্তে কমলা রঙে ছেয়েছিল..
আমরা হেঁটে চলেছি ........
এমন কত পথ পাশাপাশি হেঁটেছি
হাঁটতে হাঁটতে কত দূর চলে গেছি
কত কথা বলেছি, কত কথা বলতে ইচ্ছা করত !
পথের পাশে অচ্যূত ঘাসফুলের দিকে চেয়ে
কত প্রাণের ছোঁয়া যে তাকে দিতে চেয়েছি।

আমি দেখেছি তার মাথার  চুল উড়ছে আসন্ন সন্ধ্যার ধূপগন্ধ বাতাসে,
তাকে একাকার করে নিতে ইচ্ছা করত আমার সকল একাকীত্বে...

অন্তরের ভিতর তখন অন্য তরঙ্গ --

'জানি না কোথা অনেক দূরে   বাজিল গান গভীর সুরে,
           সকল প্রাণ টানিছে পথপানে
           নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।'"



সন্ধ্যায় যখন ফিরে আসি তখন আনিস ধরেছিল আমার একটি হাত। আমি  কিছুই বলিনি ওকে। জগতে কিছু হাতের স্পর্শে অনুভব করা যায়, এই হাত বিশ্বাসের। আনিসের হাতটা ছিল তেমনই জাদু স্পর্শের মতো। গত একবছর ধরে ওকে আমি দেখে আসছি। এত ভালো ছেলে। ওর হাতে পাপ নেই। 

কিন্তু আমার? এমন একটি ছেলেকে আমি কী নোংরা করে দিতে পারি? কিংবা নস্ট করতে পারি ওর আসন্ন নবীন জীবন? আমি আনিসকে সেদিন থেকে এমন আচরণ করতে থাকি, যেন ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি, 'আমি কেবলই বন্ধু তোমার একজন। আর কিছু না। কিছুই হবো না তোমার কোনোদিন।'

চলবে --

~  কোয়েল তালুকদার  

রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ৩

পর্ব- ৩

আমি যে ছেলেটির কথা বলছি -- 
ভালো লাগার আমার এই সহপাঠীর নাম মাইনুল ইসলাম। 

এক অপার্থিব মাধুর্যের রূপ ধারণ করে ক্ষণে ক্ষণে ওর ছায়ামূর্তি আমার চোখের সামনে এসে ভাসতে থাকে। কখনও সন্ধ্যার আকাশের অপরূপ শোভায়, কিংবা কখনও  দূরের খাসিয়া পাহাড়ের ধূসর মেঘের ছায়ায়, কর্ণঝরা নদীর কুলকুল কলতানের মধ্যে -- ওর অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকি। মনে হয়, অনেক দূর থেকে সুর ভৈরবীর তানে হেঁটে হেঁটে সে আমার দিকে আসছে। আমি কান পেতে ওর আগমনের পদধ্বনি শুনছি। আমার অবুঝ অবলা মন কেন যে ওর মাঝে থিতু হলো, কী এমন ঐশ্বর্য দেখতে পেয়েছিলাম, যা আমি চাইলাম এমন আকুল করে। 

মাইনুল ছিল পল্লী গ্রাম-নিবিড়ের প্রস্ফুট বন-কুসুম-গন্ধ ছড়ানো একটি সহজ সরল তরুণ। তাই তো ওকে আমি এমন পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছিলাম

আমার লেখা চিঠিখানি ভূগোল বইয়ের পাতায় পুরনো হয়ে পড়ে থাকে প্রায় দেড় দু'বছর। এতদিনেও মাইনুলকে চিঠিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। মাঝের সময়ে টুকটাক ওর সাথে যদিও কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে স্কুলের বারান্দায় কিংবা পথের উপরে। কিন্তু  চিঠিটি ওকে দিতে পারিনি। আমার ভালোলাগার কথাও বলার সুযোগ হয়নি কখনও। সবসময় কেউ না কেউ আমাদের কাছাকাছি থেকেছে।

কেমন করে কখন স্কুল জীবনের এতগুলো দিন চলে গেল! কত বিরহে কত অপেক্ষায় সময় করেছি পার। মাঝে মাঝে অজানা আশঙ্কায় মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠত। ভাবতাম -- যা চাইছি তা পাব তো? 

একসময় আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে। ক্লাসও বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল থেকে আমাদের ফেয়ারওয়েল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেই বিদায় অনুষ্ঠানে ছাত্র- ছাত্রীদের পক্ষ থেকে মায়নুল খুব সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে বিদায়ী সহপাঠীদের সাথে আমাদের একে অপরের কথা বলার সুযোগ হয়। কথা বলি আমি মাইনুলের সাথেও --

-- পাস করার পর তুমি কোথায় ভর্তি হবে? 
-- জানি না কোথায় ভর্তি হবো। পড়ার আর ভাগ্য হবে কী না তাও জানি না। 
-- পড়া থামিয়ে রেখ না।
-- তুমি কোথায় ভর্তি হবে? 
-- ময়মনসিংহ।  
-- আচ্ছা। ভালো ভাবে লেখা পড়া করবে। ভালো থেকো। তো যাই এখন। 

মাইনুল খুব তাড়াহুরো করছিল, অস্বস্তি ও বিব্রতও হচ্ছিল লজ্জায়। আমি আস্তে করে ওকে বলি -- 'যেওনা তুমি। একটু  দাঁড়াও।' আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যাগ থেকে দু'বছর আগের লেখা সেই পুরনো চিঠিটি বের করে ওর হাতে দেই এবং  বলি -- বাড়িতে যেয়ে এটি পড়বে। 

বাড়িতে যেয়ে মায়নুল চিরকুটটি পড়েছিল হয়ত কোনো প্রদীপ জ্বালা সন্ধ্যার আলোয়। হয়ত পুলকিত হয়ে উঠেছিল আমার মতো একজন প্রস্ফুটিত রক্ত জবার উন্মত্ত ভালোবাসার এমন নিবেদন দেখে! একটি মেয়ের এমন প্রাণ হিল্লোল দেখে, এমন দ্যুতি ছড়ানো অরুণ আলো! 

তারপর কর্ণঝরা নদীর জল গড়েছে ব্রহ্মপুত্র নদীর দিকে। কত বাঁকে স্রোত হয়েছে ধীর,  খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে বয়ে এসেছে কত হিমেল বাতাস, আমি ওকে পেয়েছিলাম আমার জীবনের সকল গ্লানি ও যাতনাকে হারিয়ে দিয়ে। সে যে সত্যি এসেছিল প্রাণের হিল্লোলে। সেই তরুণী বয়সের সপ্তরঙের রঙধনুর মতো অতীত দিনের কত কথা মনে পড়ে আমার। কত কম্পিত প্রেম দান। কেন যে মাইনুলের উপর মাঝে মাঝে এতটা নিষ্ঠুর আচরণ করতাম। সেসবের জন্য অনুশোচনাও করি। কত কথা মনে পড়ে, কত বেদনায়, কত দীর্ঘশ্বাসে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু জল ঝরে পড়ে। 

মাইনুলের সাথে আমার জীবনের প্রকৃত ঘটনাটা আমি ব্লাক আউট করলাম। মানুষের জীবনের কিছু অন্ধকার পর্যায় থাকে, সেই অন্ধকারের কথা একান্তই তার একার। সেই অন্ধকারের কথা কাউকে বলা যায় না। তারপরও যদি সম্ভব হয় আমি বলব সেই আঁধারের কথা। 

শুধু এইটুকু বলছি -- আমার সেই অল্প বয়সের কুমারী জীবনের পূর্ণচ্ছেদ পড়েছে অনেকদিন আগেই। তবু সে-সব দিনের কিছু আনন্দ বেদনার মুহূর্তগুলোর জন্যে এখনও মাঝে মাঝে মন কেমন করে ওঠে। সেই সারল্যমুখর স্মিত মুখ, সেই পূর্ণিমা ঝালরের আলো মাখা স্বর্গীয় রাতের বিমুগ্ধ ক্ষণ, হারানো সেই সুখস্মৃতির জন্যে আক্ষেপ করি। শুধু ভাবি, যা পেয়েছিলাম তা সত্যি করেই পেয়েছিলাম। মানুষ অনেক কিছুই পায়, তা আবার ফুরিয়েও যায়। শূন্য হয়ে গেলে আবার পাওয়ার আশায় পথে নামে। কোনো অচেনা পথিক অকাতরে কিছু দেওয়ার জন্য হয়ত দাঁড়িয়ে পথের উপর আমার জন্য  অপেক্ষা করছে। 

এখন শুরু করব আমার ইউনিভার্সিটি জীবনের কথা। 'পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি' র মতো কেউ কী আমার সেই জীবনে প্রাণের হিল্লোল তুলে এসেছিল? আবার কী ভেঙেচুরে রক্তক্ষরণ হয়েছিল আমার হৃদয় মন? 

( চলবে) 

~  কোয়েল তালুকদার  

বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ২

পর্ব -- ২

মেঘালয়ের লুসাই পাহাড়ের কোল থেকে ধিতাং ধিতাং বালিকার মতো এঁকেবেঁকে একটি নদী চলে এসেছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দিকে। ওপারে ওর যেই নামই থাক, এপারে এই নদীটির নাম কর্ণঝরা। কর্ণঝরার আরও কতগুলো বোন আছে, যারা একই মায়ের গর্ভে জন্ম। ওদের মা'ও লুসাই পাহাড়। এই লুসাইয়ের অন্য মেয়েরা হচ্ছে ভোগাই, কংস ও সোমেশ্বরী। 

লুসাই থেকে মেঘ বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ে কত ঝর্ণা যে নদী হয়েছে। পাথর, বালু,মাটি, বৃক্ষ, লতাগুল্ম চিরে চিরে বয়ে এসেছে তারা সমতলের দিকে। কত হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এই স্রোতধারা, কে তার কতটুকু জানে। এরই একটি ধারা কর্ণঝরা। এই কর্ণঝরা নদীর তীরে ছবির মতো একটি গ্রাম নাম তার হাঁসুলিগাঁও। 

আমি সেই হাঁসলিগাঁওয়ের মেয়ে কঙ্কণা। 

আমাদের বাবা চাচা'রা ছিলেন বিত্তবান কৃষক পরিবারের মানুষ। গোলাভরা ধান ও পুকুর ভরা মাছ ছিল আামাদের। আমাদের বাড়ি ছিল ফুলে ফলে বৃক্ষ শোভিত। ছিল নানা জাতের ঔষধি গাছও। বাড়ির সামনে পুকুর। পুকুরের পর শস্য ক্ষেত। তারপর কর্ণঝরা নদী। 

এই নদীর পারে আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। বালিকা এখানে গোল্লাছুট খেলতো। মাথার দু'বেণী দুলিয়ে এক্কা দোক্কা খেলতো। আমগাছের পাতা আর বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সন্ধ্যা রাত্রিতে 'পলাতকা' খেলা খেলতো খেলার সাথীদের সাথে। খেলতে খেলতে একদিন বালিকা তরুণী হয়ে উঠল। 

আমাদের বাড়ির উঠোনের একপাশে ছিল ফুলের বাগান। ওখানে ছিল বিভিন্ন রকমের ফুল। জুঁই, কনকচাঁপা, রক্তজবা, কামিনী, গাঁদা, বেলী, গন্ধরাজ, সন্ধ্যা মালতী ও রংবেরঙের পাতাবাহার। লোকে বলত কঙ্কণা নাকি ঐ বাগানের একটি ফুল। কেউ বলত আমি নাকি কনকচাঁপার মতো দিনে দিনে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছি। কেউ বলত কঙ্কণা একদম রক্তজবার মতো রক্তিম। কেউ বলত সন্ধ্যামণির মতো সুবাসিত। 

পড়তাম গ্রামের স্কুলে। কোনো বালিকা বিদ্যালয় তখন ছিল না ওখানে। আমাদের স্কুলে ছেলেমেয়ে একসাথে পড়াশোনা করত। তবে নিয়ম ছিল কঠিন। মেয়েরা কথা বলতে পারত না ছেলেদের সাথে। কমনরুম থেকে স্যারদের পিছে পিছে ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে আবার কমনরুমে ফিরে আসতাম। কোনো ছেলের সাথে কথা বললে অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হতো। স্কুল থেকে বের করে দেওয়ারও নিয়ম ছিল। তাই কারোর সাথে কথা বলার সাহস করতাম না আমি। 

আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন আমাদের ক্লাসে একজন নতুন ছাত্র এসে ভর্তি হয়। ছেলেটি দূর গ্রামের। গরীব দিনমজুরের ছেলে। প্রায় তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসে ক্লাস করত। ছেলেটি ছিল মেধাবী। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে।  ছেলেটির গায়ের রং শ্যাম বর্ণ। চুল কোঁকড়ানো। লিকলিকে লম্বা ধরনের। চোখ দুটো মায়াময়। কেন জানি দূর থেকে দেখে ছেলেটিকে আমার খুব ভালো লাগল।  

আমি ক্লাসে বসে ছেলেটিকে চুপিচুপি  খুঁজতাম কোথায় কোন্ বেঞ্চে বসে আছে। হয়ত দেখতে পেতাম কোনো কোনো দিন। আবার দেখা পেতাম না কোনো দিন। যেদিন দেখতে পেতাম না সেদিন খুব মন খারাপ করে বাড়ি চলে আসতাম। পথে আসতে আসতে পা চলত না, পা অবশ হয়ে থেমে যেত পথের উপরে। মনে হতো, আহা!  ঐ ছেলেটি এসে যদি আমার সাথে পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটত, তবে পথের উপর এমন করে পা আমার থেমে যেত না। 

বাড়িতে খুব মনমরা হয়ে থাকতাম। কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। মা জিজ্ঞাসা করত -- কঙ্কণ, তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগে? '
আমি বলতাম -- না মা, কিছু হয়নি আমার। 

আমি যে ঘরে শুতাম, ঠিক আমার বিছানার পূর্ব দিকে একটি জানালা আছে। জানালার একপাশে লাগোয়া পড়ার টেবিল। আমি একদিন সন্ধ্যা রাতে হেরিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। পড়ার মন বসছিল না!  জানালাটা খুলে দেই। দেখি - বাইরে আলো আর অন্ধকার একসাথে মিশে আছে। আঁধারের মাঝে যে আলো তা ছিল চাঁদের আলো। রাতের আকাশ যেন ছুঁয়ে আছে নিঃশব্দে আকন্দ গাছের ঝাড় পাতায়। জ্যোৎস্নার এই  চন্দনমাখা স্বর্গীয় ক্ষণে চোখ মেলে অনেক দূরে আবছা আবছা দেখতে পেলাম ঐ ছেলের মুখ, রাতের তারার মতো চেয়ে আছে যেন আমারই দিকে। এই বিরাট আলো আঁধারের  বিশ্বজগতে কতকিছুই অদৃশ্যমান, কত প্রাপ্তিতা অপ্রাপ্তি হয়ে হারিয়ে যায়। একজন অবুঝ তরুণী কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে কী চেয়ে বসল বিধাতার কাছে, তা কী বিধাতা আমার করে দেবে? 

দূরে কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসছিল শীতল বাতাস, জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল কাঁচা দুধের মতো ফিনকি দিয়ে জোছনা। কাউকে দু'কলম লিখতে ইচ্ছে করছিল খুব। কোনো কবিতা বা গানের পংক্তি নয়, ছোট্ট একটি চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে। ভাবছিলাম, একটি চিঠি লিখে রাখি কাছে। বইয়ের পাতায় সেই চিঠি গোপনে রেখে দেব। যদি কখনও সুযোগ আসে চিঠিখানি দিয়ে দেব ঐ ছেলেকে।

কল্যাণীয়ষু

খুব ভালো লাগে তোমাকে। এত ভালো লাগে যে, জনম জনম তোমাকে কাছে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছা করে। তুমি এসো গো আমার জীবনে। 'প্রাণের হিল্লোলে এসো'। জনম জনমকাল ধরে অপেক্ষা করব।

-- কঙ্কণা। 


হেরিকেনের পুষ্পিত আলোয় কী লিখলাম! অক্ষরগুলো ফুটে হয়ে আছে যেন কনকচাঁপাপুষ্পবর্ণাভা। বাইরে তখন চাঁদ ডুবছে নিভছে। চরাচর জুড়ে বিষণ্ণ আঁধার আর ম্লান আলো। আকাশের তারা'রা জ্বলছে নিভছে। কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস হঠাৎ থমকে গেল যেন । কুমারী মেয়ের কুন্তলের মতো  নৈঃশব্দ্য এসে ঘরটি ভরে গেল। বুকের তলায় দীর্ঘশ্বাস জট পেকে ধরল। আকাশে কোথাও আর দেখতে পেলাম না মণিনীল নক্ষত্র। 

( চলবে)