সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

চন্দ্রাহত মেয়েটির কথা

মালা নামের মেয়েটি নিতান্তই গ্রামের একটি বালিকা ছিলো । ছোটবেলা় থেকেই ও ছিলো কিছুটা পাগলি স্বভাবের। সে পছন্দ করতো চাঁদ। দশমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত সে বেশি অস্বাভাবিক থাকতো। নির্জন সন্ধ্যা রাতে পুকুরের পারে বসে দেখতো জলে ভাসা চাঁদ। ঝিরিঝিরি ঢেউয়ের দোলায় চাঁদ ভাসতো, সাথে এই বালিকা মেয়েটির অন্তরও দুলে উঠতো। রাতে কুয়ার জলেও দেখতো চাঁদ। কলসি নামিয়ে দিতো জলে। জলে শুয়ে থাকা সেই চাঁদ কলসির ঢেউয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যেতো।

আমি তখন কৃষি বিভাগে চাকুরী করতাম। একটি এ্যাসাইনমেন্টে তিন মাসের জন্য আমাকে সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে যেতে হয়েছিলো। এই থানাটি চারদিকে নদী বেস্টিত। একদিকে ধলেশ্বরী অন্য দিকে প্রমত্তা যমুনা। এক আষাঢ়ে মেঘের দিনে টাংগাইলের নাগরপুর থেকে নৌকায় করে চৌহালীতে চলে যাই। আমি ওখানে যেয়ে অবাক! নদী ভাঙ্গনের জন্য থানা সদর স্থানান্তর হয়েছে চরের মধ্যে। তখনও কোনো ভবন তৈরি হয়নি ঠিকমতো। অস্থায়ী টিনের ঘরে চলতো যাবতীয় অফিসিয়াল কার্যাদি।

আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো অফিস থেকে অদুরে ধূধূ চরের মধ্য এক গৃহস্থ বাড়ির কাচারি ঘরে। এর জন্য ঐ বাড়ির মালিককে কিছু পে করতে হয়েছিলো। বাড়িটি থেকে পশ্চিম পার্শ্বে যমুনা নদী বেশি দূরে নয়। ভালো লাগছিলো নদী মুখোমুখি এই রকম একটি বাড়ি। আমার অফিসের পিয়ন ছমির আলী ঐ গাঁয়েরই  চাঁদ পাগলী মালা নামের এতিম এক বালিকাকে আমার টুকটাক ফয় ফরমাস পালনের জন্য ঠিক করে দেয়।

মেয়েটির বয়স কতোই হবে। এগারো বারো বছর হবে। গরীবের ঘরে মেয়ে হলেও সে ছিলো খুব পরিচ্ছন্ন। চেহারায় ছিলো এক ধরনের সরলতা। খুব মায়া করে কথা বলতো। ওর সাথে আমার কথা বলতে এতো ভালো লাগতো যে, ওকে আমি কখনোই তুই সম্বোধন করিনি। যখন আমি জানলাম মেয়েটি চাঁদ পাগল, তখন আরো বেশি ওর প্রতি আমার আলাদা কেয়ার চলে আসে।

আমার একাকী অবসর সময়গুলোতে এই মালার সাথে কথা বলে কাটাতাম। ছোট ছোট করে ও অনেক কথাই বলতো, অনেক কিছুই জানতে চাইতো। ঢাকায় আমার চার বছরের মেয়েকে রেখে এসেছি, তার কথা মালা শুনতে চাইতো। জিজ্ঞাসা করতো, ও কেমন দেখতে! প্রায়ই বলতো বাবুকে তার কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছা করে। এমনি করেই ওর সাথে কথা বলতে বলতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে মালা আমার ভালো ক্ষুদে বন্ধু হয়ে উঠলো।

একদিন বিকাল থেকেই মালা আসছিলোনা। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরে বসে আছি। তারপরও ও আসেনি। আমি ঘর থেকে বের হই। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। পূর্ব আকাশে দেখলাম দশমীর চাঁদ উঠেছে। চরের চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্না নেমে পড়েছে। আমি হেটে হেটে মালাদের বাড়ির দিকে যাই। ওখানে যেয়ে শুনি, সন্ধ্যা থেকেই সে ছোট্ট পুকুর পারে বসে ছিলো। ঐসময়ে সে নাকি কারো সাথে কথা বলেনা। দেখলাম বাড়ির বারান্দায় মাদুর পেতে মালা শুয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, কিন্তু শুনলোনা। কথা বলতে চাইলাম, কথাও বললোনা।

পরের তিন দিনও মালা আসেনি। আমার খুব ইচ্ছা হলো, একদিন সন্ধ্যা রাতে ওর সাথেই আমি পুকুর পারে বসে থাকবো। দেখবো চাঁদের সাথে ও কিভাবে সময় কাটায়। সেদিন ছিলো পূর্ণিমার রাত। বাড়ির কাচারি ঘর হতে বের হয়ে কাশবনের পাশ দিয়ে হেটে হেটে মালাদের বাড়ি যাই। যেয়ে দেখি মালা নেই। সন্ধ্যাই সে নদীর তীরে চলে গেছে। মালার মা মেয়ের সাথেই রয়েছে। আমি আর নদীর তীরে যাইনি।

চার পাঁচটি দিন মালার অভাব আমি খুব অনুভব করছিলাম। আমার ঘরে ঠিকমতো রান্না হয় নাই। প্রতিদিনের একাকী বিকেলগুলো ঘরের মধ্যেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেই। যে মেয়েটি আমার সাথে ছোট ছোট করে কথা বলে আমার সময় পার করে দিতো, সে আজ চারদিন ধরে নেই। কি এক চন্দ্রালোক তাকে এই জগৎ থেকে আলাদা করে রেখেছে, সে এক বিস্ময়ই শুধু।

এক মাস পার হতেই হেড অফিস থেকে হঠাৎ টেলিগ্রাম পেলাম, আমাকে আবার ঢাকাতে থাকতে হবে এক মাস। আমি পরের দিন সকালে ঢাকায় চলে আসার প্রস্তুতি নেই। মালাই আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছিলো। মালা বলছিলো -- 'দাদাভাই, আপনি আর আসবেন না?
আমি :   এক মাস পরে আসবো।
মালা :    আপনি আমাকে সাথে করে নিয়ে যান। আমি বাবুকে দেখে রাখবো। ঘরের কাজ সব করে দিবো।'
আমি :   ঠিক আছে, তোমাকে আমি নিয়ে যাবো। তবে এবার না। আমি তোমার আপার সাথে আলাপ করে আসবো। এর পরেরবার আমি যখন একেবারে এখান থেকে চলে যাবো, তখন তোমাকে নিয়ে যাবো। '
মালা :    আচ্ছা।

একমাস ঢাকায় থেকে আমি আবার চৌহালী চলে আসি। পিয়ন ছমির আলী কে বললাম, মালাকে খবর দিতে যে, আমি এসেছি। ও যেনো আমাকে একটু দেখভাল করে। ছমির বললো - 'স্যার, মালা খুব অসুস্থ। ও এখন চলাফেরা করতে পারেনা। '
আমি :   কি হয়েছে ওর?
ছমির আলী :  আপনি চলে যাবার পরপরই ওকে ময়মনসিংহে এক সাহেবের বাসায় কাজ করতে পাঠিয়েছিলো। পাঁচ দিন ওখানে ছিলো। তারপর অসুস্থ হয়ে সে ফিরে আসে। '
আমি  :  ওহ!  তাই।

হেড অফিসের সিদ্ধান্তে চৌহালীর এই এ্যাসাইন্টমেন্ট তাড়াতাড়ি ক্লোজ করতে হ্চ্ছে। এবং তা আগামী আট দশ দিনের ভিতরেই। আমি ছমির আলীকে বললাম, মালার এ্যাবসেন্টে সেই যেনো আমার একটু দেখভাল করে। কাজের ব্যস্ততার কারণে আমি আর তিন চার দিন মালার কোনো খোঁজখবর নিতে পারি নাই। মালা'ই একদিন বিকেলে ওর মার সাথে আমার এখানে চলে আসে। ওকে দেখার পর আমার মনটা হাহাকার করে ওঠে। একি অবস্থা মালার! একদম শুকিয়ে গেছে। মায়াবী সেই চোখ দু'টো কোঠরে চলে গেছে। চোখের নীচের পাতা কালচে হয়ে গেছে।

মালা'র মা বলছিলো, আপনি এসেছেন একথা শোনার পর মালা আপনাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলো। ও বলছিলো -- 'আমাকে দাদা ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাও। '  মালা ছলোছলো চোখে আমাকে দেখছিলো । ও বসে থাকতে পারছিলোনা, ওর মা মালা'কে বুকের পাজরে ধরে বাড়ি নিয়ে যায়। মালা যখন চলে যায় তখন সন্ধ্যা। আমি ওর চলে  যাবার সময়ে অতোটুকু খেয়াল করিনি। চলে যাবার পরপরেই দেখি - যে পথ দিয়ে মালা হেটে হেটে চলে গেছে, সেই পথে টপ টপ করে তাজা রক্ত মাটিতে পড়ে আছে। ছমির আলীর মুখে পরে জানতে পারি-- মালা ময়মনসিংহে একাধিক বার ধর্ষিত হয়েছিলো।

ছমির আলী আরো বললো, মালা আগের মতো চাঁদ দেখে আর ঘরের বাইরে যায়না। বিনম্র হয়ে শুয়ে থাকে বিছানায়। মেয়েটির জন্য কেন জানি খুব মায়া হলো। অন্তর টা হুহু করে কাঁদতে লাগলো। আমারও তো ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। মালার মুখচ্ছবিতে আমার মেয়ের মুখ দেখতে পেলাম। বেতনের টাকা উঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে ঢাকা যাবার সামান্য টাকা রেখে বাকিটা ছমির আলীর মারফতে মালা'র মা'র কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

অফিসের ব্যস্ততার জন্য আমি আর মালাদের বাড়ি যাই নাই। সেদিন বিকাল থেকেই একটু অবসরে ছিলাম। অফিসের কাজও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একাকী বসে আছি। ভালো লাগছিলোনা কিছুই। যে মেয়েটি থাকলে ওর সাথে ছোট্ট ছোট্ট করে কথা বলে সময় কাটাতাম, সেই মেয়েটি আজ নেই। ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে বুঝতে পারি নাই। হারিকেনটাও জ্বালানো হয় নাই। মালা থাকতে সন্ধ্যা আলোটা ঐ জ্বালিয়ে রাখতো। মালা নেই তাই ঠিকমতো সন্ধ্যা বাতিটাও জ্বলে ওঠেনা। হারিকেনের কাঁচের চিমনি  ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে।

সন্ধ্যার পর ঘর হতে নেমে আসি। সারা চর জুড়ে সন্ধ্যা রাতের নির্জন পূর্ণিমার চাঁদের অন্ধকার। সমস্ত কাশবন জ্যোৎস্নায় ছেয়ে গেছে। একবার মনে হলো হাটতে হাটতে যমুনা তীরে চলে যাই। যেয়ে যমুনার জলে চাঁদের মুখ দেখি, কিন্তু ওদিকে আর গেলামনা। মালার করুণ মুখখানি মনে পড়তে লাগলো। আমি চলে যাই মালাদের বাড়ি। মালা  মাদুর পেতে বারান্দায় শুয়ে আছে। আমি কাঠের একটি টুলে ওর পাশে বসি। ওকে বলি - 'মালা,আজতো আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। পুকুরের জলে চাঁদ দেখবেনা? '
মালা :  'দাদা ভাই, আপনি আমাকে একটু ধরে পুকুরের পারে নিয়ে যান। আমি চাঁদ দেখবো আজ। '
আমি সেই সন্ধ্যা রাতে মালাকে ধরে পুকুর পারে নিয়ে গিয়েছিলাম।  পাড়ের দূর্বা ঘাসের উপর বসে ও কিছুক্ষণ জলের উপর চাঁদ দেখেছিলো।

পরের দিন সকালবেলা ছমির আলী এসে আমাকে খবর দেয় - 'মালা রাতেই মারা গেছে।'  এরপর আরো দুইদিন আমি চৌহালীতে ছিলাম। তৃতীয় দিন ঢাকায় চলে আসার প্রস্তুতি নেই। আজ আর আমার ব্যাগটি কেউ গুছিয়ে দিলোনা। আমিই গোছালাম। ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে যখন ঘর হতে বের হচ্ছিলাম, তখন পাশ থেকে মালার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম -- 'দাদাভাই, আপনি আমাকে সাথে করে নিয়ে যান। বাবুকে দেখে রাখবো। ঘরের কাজ সব করে দিবো। '

খেয়াঘাটে এসে নৌকায় উঠে বসি। ধলেশ্বরীর প্রবল ভাটির স্রোতে নৌকাটি ভেসে যাচ্ছিলো নাগরপুরের দিকে। পাড়ের গ্রাম, আর বৃক্ষ শৈলীর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রাহত সেই মেয়েটির কথা খুই মনে হচ্ছিলো। দূরে কোন্ নৌকার মাঝি গাইছিলো তখন --

'' তুই ফেলে এসেছিস কারে,  মন, মন রে আমার।
তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার।
যে পথ দিয়ে চলে এলি, সে পথ এখন ভুলে গেলি--
কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে, মন, মন রে আমার।''

এতো জল

আহা! এতো জল এখন আমাদের!
মমতাদি, তোমার কাছে এখন আর জল মাঙ্গতে হয়না
কি সুন্দর তোমার সেই শুকিয়ে যাওয়া মন
জলে ভরেছে তোমারও হৃদয়, কি উদার তুমি!

এখন জল আসছে গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে
এখন জল আসছে দেবী পার্বতীর আবক্ষ বক্ষ থেকে
গঙ্গা ভাগিরথী উপচে পড়ে এই মরু পদ্মায়।
এখন জল আসছে কৈলাস শৃঙ্গ থেকে
মানস সরোবর হয়ে আমাদের ব্রহ্মপুত্রে আর যমুনায়।
এখন জল আসছে শেভক গোলা গিরি থেকে
আসছে জল দেহাং কালিজানি ভরিয়ে এই তিস্তায়।

এখন জল ছুঁয়ে যায় বঙ্গোপসাগরের উপদ্রুত উপকুল
সুন্দরবনের মোহনায় কুমিররা খায় ডিগবাজী
রূপালী ইলিশরা লাফাচ্ছে মেঘনার কোল জুড়ে
রেল ব্রীজ ভাঙ্গছে, ভাসছে দুইকূল, ডুবছে জনপদ
গরু ছাগল পশুরাও ভেসে যায় বানের তোড়ে।

আহা! এতো জল এখন আমাদের!
মমতা, লক্ষ্মী দিদি আমার!  তুমি কততো মমতাময়ী
তোমাকে নমস্কার।

ছবি : ইন্টারনেট।

রোড টু গৌরীপুর

অনেক ছোট বেলায় বাবার কাছ থেকেই শুনেছিলাম আমার এক ফুফুর কথা। সে ছিলো বাবার সবচেয়ে ছোট বোন। তখন অবিভক্ত ভারতবর্ষ। বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিম জেলাগুলোর সাথে আসামের সঙ্গে ছিলো একটি নিবিড় সম্পর্ক। ব্যবসা বানিজ্য, বিয়ে সাদি এবং অন্যান্য যোগাযোগ ছিলো প্রাত্যাহিক মেলবন্ধনের মতো। আমাদের বাড়ি উত্তরের জেলা বৃহত্তর পাবনাতে। আমার বাবা ব্যাবসায়িক কাজে আসামের ধুবড়ি এবং গোয়ালপাড়াতে যেতেন। ঐখানে কিছু আত্মীয় ছাড়াও বাবার পরিচিত জনেরাও ছিলো।

আমার সেই ফুপুটির নাম ছিলো নুরজাহান। সে নাকি বেশ সুন্দরী ছিলো। বাবার ইচ্ছাতেই আমার এই ফুফুর ৰিয়ে হয় আসামের ধুবড়িতে। নিতান্ত বালিকা বয়স ছিলো তার। অসম্ভব সুন্দরী হওয়ার কারণে মাত্র তেরো চৌদ্দ বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। ছেলে ছিলো নাকি ওখানকার খান্দানী পরিবারের। প্রচুর জমি জিরাতের মালিক ছিলো তারা।

এক শ্রাবণ বর্ষায় তিনটি বড়ো পানসী নৌকা করে ফুপুকে বিয়ে করার জন্য ধুবড়ি থেকে বরযাত্রীরা আসে। ঢাকঢোল, বাদ্য যন্ত্র আর কলের গান বাজিয়ে এসেছিলো তারা। ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা নদীর ভাটি বেয়ে ভরা বর্ষায় পানসীগুলো এসেছিলো। আর বিয়ে করে উজান বেয়ে সে নৌকাগুলো চলে গিয়েছিলো আবার ধুবড়িতে। এই বিয়ে ছিলো নাকি বিশাল আয়োজনের আর মহা ধুমধামের। এতো সমারোহ, এতো উৎসব আর এতো আনন্দের মাঝে আমার সেই নুরজাহান ফুফু লাল শাড়ি পড়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন শ্বশুর বাড়ি চলে গিয়েছিলো।

নূরজাহান ফুফুর সেই যে লাল শাড়ি পড়ে চলে গিয়েছিলো তারপর আর ফিরে আসে নাই। ফুফুর শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, স্বামী ও বাড়ির লোকজন সবাই নাকি ফুফুকে খুব ভালোবাসতো ও আদর করতো।  বিয়ের পরপরই ফুফু সন্তানসম্ভবা হয়ে যায়। এবং সন্তান প্রসবকালীন সময়ে তিনি ওখানে মারা যান। একটি মেয়ে নাকি হয়েছিলো। সে মেয়েটি বেঁচে আছে কিনা বাবা আর তা বলতে পারে নাই। ঠিক সেই বছরেই অর্থাৎ সাতচল্লিশে ভারত বিভক্ত হয়ে যায়। তারপর আসামের ধুবড়ি আর ঐ পরিবারের সাথে বাবাদের সকল যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে।

বাবার মুখে এই ফুপুর কথা শুনে সেই কিশোর বয়সে আমার মনে রেখাপাত করেছিলো। তাকে আমি কোনোদিন দেখি নাই, তার কোনো ছবি নাই, সে ছিলো আমার জন্মেরও আগে। অথচ তার জন্য আমার প্রাণ কাঁদতো। কেন কাঁদতো, তাও জানি নাই। আমি মনে মনে তার একটি মুখচ্ছবি অন্তরে গেঁথে রেখেছিলাম। বাবার মুখে ফুপুর কথা শোনার পর, আরো অনেক বছর চলে গেছে। ইতোমধ্যে বাবাও মারা যান।

বাবার মুখ থেকে শোনা ফুপু বাড়ির দুই তিনটি তথ্য আমার মনে ছিলো। আমার ফুপার নাম : আব্দুল রশিদ মন্ভল। গ্রামের নাম গৌরীপুর, ধুবড়ি, আসাম। প্রাণের এক অসম্ভব তাড়নায় আমার এই ফুপুর সমাধি খূঁজতে আমি এক ফাল্গুন মাসে চলে গিয়েছিলাম ধুবড়ির সেই গৌরীপুরে।

ট্রেন নং ১৫৭৬৬, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস, শিলিগুড়ি টু ধুবড়ি। প্রত্যুষ ৬.৩০ মিনিটে শিলিগুড়ির নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে ট্রেনটি ধুবড়ির উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে । আমি সামনে মুখি জানালার পাশে বসে আছি। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম জলপাইগুড়ির নয়নাভিরাম চা বাগান। ট্রেনটি যখন হাশিমারা স্টেশনে দাড়ায় তখন মনে পড়ছিলো সমরেশ মজুমদারের কালবেলা কালপুরুষ উপন্যাস দুইটির কথা। পথে পথে আসছিলাম আর মিলাচ্ছিলাম উপন্যাসের সব চিত্রকল্পগুলি।

আলিপুর দুয়ার জংশনে ট্রেনটি অনেকক্ষণ দাড়িয়েছিলো। আমি নেমে একটি রেস্টুরেন্টে ঘীএ ভাজা লুচি আর মহিষের দুধের ছানা দিয়ে নাস্তা করে নেই। ট্রেনটি কয়েকটি ছোট বড়ো নদী অতিক্রম করে, রাইডাক, কালিজানি তাদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে রাইডাক নদীটি আমাকে ভীষণরকম মুগ্ধ করেছিলো।

কোচবিহার স্টেশন থেকে একজন ছাত্র উঠেছিলো, ওর নাম শ্যামল রায়। ও পুন্ডিবারী আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ কলেজের  দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলো। ওর কাছ থেকে আমি ধুবড়ি ও গৌরীপুর সম্পর্কে জেনে নেই। গৌরীপুরও একটি স্টেশন, ধুবড়ির ঠিক আগের স্টেশনটাই হচ্ছে গৌরীপুর। ও আমাকে ধুবড়িতেই নামবার ও থাকবার পরামর্শ দেয়। শ্যামলের সাথে আরো অনেক কথা হয়েছিলো। ও তুফানগন্জ স্টেশনে নেমে যায়। অল্প কিছুক্ষণ সময়েই খুব ভালো লেগেছিলো ছেলেটিকে।

ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন টি ধুবড়ির খুব কাছাকাছি এসে যায়। শ্যামল বলেছিলো, ঠিক ধুবড়ির আগের স্টেশনটি গৌরীপুর। আমি স্টেশনটি দেখার জন্য জানালার কাছে বসে আছি। একসময় দেখলামও। আমার আত্মা কেমন যেন হিম হয়ে গেলো। মুহূর্তেই চোখ মুখ বিষাদে ছেয়ে যায়। দ্রুতগামী ট্রেনটি এখানে থামলোনা। ঝিকঝিক শব্দ করে ট্রেন ধুবড়ির দিকে চলে গেলো।

ধুবড়ি স্টেশনে নেমে ছোট এই শহরটির দিকে একবার তাকালাম। শহরটিকে কেমন যেনো চেনা শহর মনে হলো। আজ থেকে অর্ধ শত বছর আগে এখানে আমার বাবার হাজারো পদচিহ্ন পড়েছিলো। আমার নুরজাহান ফুপুরও অনেক পদচিহ্ন আছে এই শহরেই। ব্রহ্মপুত্র তীরে যোগমায়া ঘাটেই হয়তো বরযাত্রীর সেই পানসী নৌকাগুলো এসে ভীঁড়েছিলো। এই ঘাট থেকেই হয়তো লাল শাড়ি পড়ে ঘোমটা দিয়ে হেটে হেটে স্টেশনে এসেছিলো ফুপু ।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিক্সা ডাকলাম। বললাম - আমাকে এনএস রোডে মহামায়া হোটেলে নিয়ে যাও। তখন বিকাল হয়ে গেছে। আমি হোটেলে একটু রেস্ট নিয়ে আবারও শহরের ভিতর বের হই। একটি রিক্সা রিজার্ভ করে ঘুরতে থাকি শহরময়। চলে যাই ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে। এই শহরের তিন দিকেই নদী। আমি একটি তীর থেকে ফিরে তাকালাম পশ্চিম পাড়ে। কে একজন বললো ঐপাড়েই বাংলদেশের রৌমারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই যমুনা - ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে নৌকায় হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আর স্মরণার্থীরা এসেছিলো এই ধুবড়িতে।

পরের দিন সকাল বেলায় হোটেল থেকে চেক আউট নেই। ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে চলে আসি স্টেশনে। একটি লোকাল ডেমো ট্রেনে উঠে বসি। নামবো সামনের স্টেশন গৌরীপুর।

ট্রেনটি আস্তে আস্তে চলে আসে গৌরীপুরে। আমি কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে নেমে পড়ি প্লাটফর্মে। মৃদু পায়ে হাটতে থাকি প্লাটফর্মের উপর দিয়ে। আমি কোথায় যাবো, কাকে বলবো আমার ফুফুর কথা। কেউ চেনা নেই, কোনো আপন মানুষ নেই। স্টেশনেই একটি ছোট চা'র দোকানে যেয়ে বসি। দেখি একজন পৌঢ় লোক ওখানে বসে আছে। বয়স সত্তরউর্দ্ধো হবে। অমি ওনাকে নমস্কার দিয়ে বলি - 'কাকা আপনি কি এই গাঁওয়ের আব্দুল রশিদ মন্ডল নামে কাউকে চেনেন?' পৌঢ় লোকটি কিছুক্ষণ ঝিম ধরে রইলেন। একটু পর জিজ্ঞাসা করলেন - 'ওনার বাবার নাম কি?
আমি :  বাবার নাম জানিনা।
পৌঢ় :   ওনার কোনো ছেলে মেয়ের নাম জানো কি?
আমি :   একটি মেয়ে থাকতে পারে, তার নামও জানিনা।
পৌঢ় :    তুমি কোথায় থেকে এসেছো?
আমি  :   বাংলাদেশ থেকে।
পৌঢ় :   উনি তোমার কি হয়?
আমি  : আমার ফুপা হয়। উনি বিয়ে করেছিলেন অনেক আগে, অবিভক্ত ভারত বর্ষের পূর্ব বাংলায়।

পৌঢ় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন -- ' চিনতে পারছি। উনিতো মারা গেছেন সে অনেক বছর আগে। '
আমি খুশিতে স্তব্ধ হয়ে যাই। পৌঢ়ের দুই হাত ধরে বলি -- 'কাকা, আপনি কি ওনার বাড়িটি কি আমাকে চিনিয়ে দিবেন? '
কাকা :  আসো তুমি আমার সাথে।

গ্রামের মেঠো পথ ধরে আমি কাকার পিছনে পিছনে চলতে থাকি। প্রায় হা়ফ কিলো যাওয়ার পর দূরে নদী দেখা গেলো। কাকাবাবু বলছিলেন, ঐটা ব্রহ্মপুত্র নদী। এক সময় অনেক দূরে ছিলো, এখন কাছে চলে এসেছে।তবে এখন আর আগের মতো ভাঙ্গেনা। আমরা হাটতে হাটতে অনেকটা নদীর কাছেই চলে আসি। একটি টিনের বাড়ির কাছে এসে কাকাবাবু থামে। ফলের গাছ বেষ্টিত ছায়া ঢাকা খুবই ছিমছাম একটি বাড়ি। আমাকে বাড়ির বাইরে দাড় করিয়ে রেখে উনি ভিতরে চলে যান।

কিছুক্ষণ পর চল্লিশোর্ধ্ব একজন মহিলা কাকাবাবুর সাথে বাইরে চলে আসে। ওনাকে দেখার পরেই আমার ধমনির সকল রক্ত প্রবাহ থেমে গেলো। জগতের সকল হাহাকার যেনো সুখের আতিশয্যে ভরে উঠলো। বহু বছরের পূর্ব পুরুষদের রক্তের ঋণ পরিশোধ হওয়ার জন্য সমস্ত শরীর অসীম এক আবেগে চন্চল হয়ে উঠলো। কাকাবাবু বললেন - 'ইনি তোমার বোন, তোমার ফুপির মেয়ে।' আমি তাকে 'বুবু' বলে ডাক দেই। বুবু আমাকে তার বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন।

সেদিন আমার বোনটির বাড়িতেই ছিলাম। তার কাছেই জানতে পারি, ফুপুর মৃত্যুর পর ফুপা আর বিয়ে করে নাই। কিন্তু সেও বেশী দিন বাঁচে নাই। অকালেই সে মারা যায়। আমার এই বোনটির নাম, আলো জান। আমি আলো বুবু কে জিজ্ঞাসা করি, 'ফুপুর কবরটি কোথায়?'
আলো বুবু আমাকে বাড়ির পশ্চিম পার্শ্বে ভিটায় নিয়ে যায়। ওখানে বেশ কয়েকটি কবর দেখতে পাই। তার ভিতর দুইটি কবর আলাদা করে বাঁধানো। একটি ফুপু'র, আরেকটি ফুপার। ফুফু 'র কবরে শ্বেতপাথরের উপর লেখা আছে :  মোছাম্মাৎ নুরজাহান খাতুন। মৃত্যু তারিখঃ ৮ই আগস্ট, ১৯৪৭ ইং। আমরা দুই ভাই বোন দাড়িয়ে কবর জিয়ারত করি। মোনাজাতে অঝোর ধারায় দুইজনই কেঁদেছিলাম।

পরের দিন অপরাহ্নে ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন ধুবড়ি থেকে ছেড়ে চলে আসে। ট্রেনটি আজকেও গৌরীপুর অতিক্রম করলো। আমি ফিরে তাকালাম আলো বুবুদের গ্রামের দিকে। পাশেই ব্রহ্মপুত্র চিরন্তন ধারায় বয়ে চলেছে। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ হঠাৎই যেনো বেগ পেলো এখানে। কিন্তু মনে হলো চাকা থেমে যাচ্ছে। এই মাটি এই দেশ অনেক দূরের দীর্ঘশ্বাস হয়ে পড়ে রইলো। এই মাটির নীচে মিশে রয়েছে আমারই রক্ত ধারার অযুত বিন্দু,অশ্রু বিন্দু হয়ে।

সমান্তরাল পথে ট্রেনটি তখন দ্রুত গতিতে চলে  আসছিলো আরো দূরের দিকে। পিছনে ফিরে তাকিয়ে থাকলাম, মনে হলো আলো বুবু এখনো কাঁদছে।

সুখ নেই

সুখ নেই তারপরেও শুকপাখি এসে বসলো
ঘরের অলিন্দে ..
ওকেই বলি- যতো সুখ আছে তোর
সব আজ ভাসিয়ে দে...

জাতীয় পতাকা

জাতীয় পতাকা আজ অর্ধনমিত --
পিতার রক্ত সিঁড়ি বেয়ে গড়ে গেছে
রবীন্দ্র সরোবরে,
কে গায় আজ গান পথে পথে মর্মর সুরে
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

আমার স্বপ্নেরা

একসময় তুমি মেঘনাপাড়ের মেয়ে আমি মেঘনাপাড়ের নেয়ে পড়তে যেয়ে মন চন্চল হতো , রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়তে পড়তে চেঙ্গী ভ্যালীর পথে পথে খুঁজে মরতাম এক লাবন্যকে, কিন্তু অমিত আধারকার হয়েই রয়ে গেছে।

আমি এখনো রয়ে গেছি জীবনানন্দের একাকী এক শঙ্খচিল, ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস, ধূসর পান্ডুলিপির অস্পষ্ট অক্ষর হয়ে , নির্ঘুম চোখে এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই , বুদ্ধদেব বিষ্ণু সমর সেনদের মতো কবিতা লিখতে যেয়ে হারিয়েছি অনেককেই।

সেদিন সবই ছিলো, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছিলো, ভালোলাগার ঘোর ছিলো,ভালোবাসার আকুলতা ছিলো, মৌনতার দুঃখ ছিলো, এখন আর কোনো কিছুই নেই। আমার স্বপ্নেরা মৃত হয়ে চলে গেছে অনেক আগেই।রা

একসময় তুমি মেঘনাপাড়ের মেয়ে আমি মেঘনাপাড়ের নেয়ে পড়তে যেয়ে মন চন্চল হতো , রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়তে পড়তে চেঙ্গী ভ্যালীর পথে পথে খুঁজে মরতাম এক লাবন্যকে, কিন্তু অমিত আধারকার হয়েই রয়ে গেছে।

আমি এখনো রয়ে গেছি জীবনানন্দের একাকী এক শঙ্খচিল, ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস, ধূসর পান্ডুলিপির অস্পষ্ট অক্ষর হয়ে , নির্ঘুম চোখে এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই , বুদ্ধদেব বিষ্ণু সমর সেনদের মতো কবিতা লিখতে যেয়ে হারিয়েছি অনেককেই।

সেদিন সবই ছিলো, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছিলো, ভালোলাগার ঘোর ছিলো,ভালোবাসার আকুলতা ছিলো, মৌনতার দুঃখ ছিলো, এখন আর কোনো কিছুই নেই। আমার স্বপ্নেরা মৃত হয়ে চলে গেছে অনেক আগেই।

কঙ্কনা দাসী

হাজার বছর আগের কথা। কেমন ছিলো তখন নবদ্বীপ? ভাগিরথী ও জলাঙ্গী নদীর সঙ্গমস্থল তখনো কি প্লাবনে ভরে থাকতো? এখনকার এই নীল আকাশ, এখনকার বাতাসের এই ঝিরি ঝিরি দোলা তখনও কি বইতো সেখানে ? খুব মন চায়, ভাগিরথী তীরে যেতে। দেখতে ইচ্ছা হয়, কোথায় আমার সেই পূর্ব পুরুষদের রাজধানী নবদ্বীপ।

কৃষ্ণনগর। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কৃষ্ণনগর।গোপাল ভাঁড়ের কৃষ্ণনগর। মাটির পুতুলের কৃষ্ণনগর।সরপুরিয়া-সরভাজার কৃষ্ণনগর । বাংলার ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কৃষ্ণনগর । হ্যাঁ, আমি নদিয়ার কথা বলছি। নবদ্বীপের কথা বলছি। হাজার বছর আগে আমার পূর্ব পুরুষদের রাজধানীর কথা বলছি।

এক রবিবারের সকালে 'কৃষ্ণনগর সিটি জংশন' লোকাল ট্রেন ধরে গিয়েছিলাম কৃষ্ণনগরে। সারাদিনে শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার অনেকগুলো ট্রেন চলে । সপ্তাহের অন্যদিনে এই ট্রেনগুলো গ্যালপিং হলেও রবিবার সব স্টেশনে থামে। প্রায় তিন ঘন্টা লেগে যায় কৃষ্ণনগর পৌঁছতে। ওখানে পৌঁছে শহরের জগজিৎ হোটেলে আমি উঠি।

বিকেলে রিক্সা করে প্রথমে যাই রাজবাড়ি। নদীয়া অধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিরাট বড় রাজবাড়ি, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে দেয় না । বাইরে থেকে ভেতরটা যতদূর দেখা যায় দেখলাম। কিন্তু আমার কৃষ্ণনগরে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য বাংলার সেন বংশের রাজাদের লুপ্ত প্রায় রাজ প্রাসাদের ধংসাবশেষ দেখা।

নদিয়া জেলায় বর্তমান নবদ্বীপের প্রায় তিনক্রোশ উত্তর পূৰ্বদিকে বল্লালদীঘি নামক গ্রাম আছে । সেখানে অতি উচ্চ এক ভূমিখণ্ড আছে । তাঙ্গকে লোকে “বল্লাল টিবি" বলে থাকে । শোনা যায় সেখানে বল্লাল সেনের রাজ প্রাসাদ ছিল । আমি একটি টাঙার মতো ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করি। ইতিহাসের এক পোড়া মাটির ধূলো পথ ধরে  আমার টাঙা গাড়িটি চলতে থাকে ভাগিরথীর তীর ধরে বল্লাল সেনের সেই ধ্বংস প্রায় রাজ প্রাসাদের দিকে।

আমার টাঙা গাড়ির কোচোয়ান ছিলো পৌঢ় বয়সের একটি লোক, নাম বিষ্ণুপদ ঘোষ। সে বহু বছর ধরে এই পরগনায় টাঙা গাড়ি চালায়। তার যাত্রী বেশির ভাগ বাইরে থেকে আসা পর্যটক। সে অনেকটা গাইডের মতোও কাজ করে । পথ চলতে চলতে আমি ওনার কাছ থেকে অনেক কিছুই জেনে নেই। সবকিছু শুনে একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম। একা একা যাচ্ছি অপরিচিত নির্জন এক ভগ্ন প্রাসাদের দিকে।

সেই নির্জন দুপুরে আমি এখন আমাদের পূর্ব পুরুষদের রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদের সামনে। এক সময়ের সেই জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদটি ভাঙ্গা পোড়া ইট আর মাটির স্তুপ হয়ে আছে। ইটের ভিতর থেকে গাছ গাছালী বেড়ে উঠেছে, কতো গাছে পরগাছা হয়ে আছে। আমার চোখের সামনে দেখলাম একটি বিষধর গোক্ষুর সাপ গর্তে যেয়ে লুকালো। প্রাসাদের কাছেই দেখি একটি শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের পাশেই আর একটি জরাজীর্ণ প্রাসাদ। বিষ্ণুপদ বলছিলো ওটা ছিলো একটি প্রমোদশালা। আমি ঘাট আর ঐ জীর্ণ প্রমোদ ঘরের দিকে এগুতে থাকি। তখন ছিলো তপ্ত দুপুর সময়। অদূরে ভাগিরথী নদী। ওখানকার শীতল হাওয়া এসে তপ্ত দুপুরের উষ্ণতাকে শীতল করে তুলেছিলো।

কি এক অদ্ভুত টানে আমি এগুতে থাকি সেই ঘাটের দিকে, সেই ভগ্ন প্রমোদশালার দিকে। বিষ্ণুপদ ঘোষ আমাকে বাঁধা দিচ্ছিলো, কিন্তু আমার চোখে তখন একাদশ শতকের এক স্বপ্নের ঘোর। মনে হলো যেনো হাজার বছর আগে আমার পূর্ব পুরুষদেরই কেউ আমি। ঠিক আবার তাও নয় - আমি যেনো এই রাজ্যের এক রাজকুমার।

ফ্লাসব্যাক ---

আমি নাকি আমার পিতামহ বিজয় সেনের মতো দেখতে। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো কালো চুল। বাউলের মতো লম্বা হয়ে তা পিছনে ঘাড় পর্যন্ত নেমে গেছে। চোখ নীল পাথরের মতো জ্বলজ্বল করে। প্রশস্ত বুকের খাঁজে নাগ কেশরের গন্ধ ছড়ায়। ধবল সাদা বাহুদ্বয় বাজ পাখির পালকে উড়ে। লম্বা লম্বা পা ফেলে আমি যখন পাসাদ প্রাঙ্গণে হাটতে থাকি, তখন সব রমণীকুল, দাসী, নর্তকীরা  আমাকে কুর্নিশ করে। তাদের হৃদয় আত্মা কেঁপে উঠতো আমাকে পাওয়ার আকুলতায়। শুধু একজনের হৃদয় আত্মা কেঁপে উঠতো না, নাম তার কঙ্কনা দাসী।

রাজ প্রাসাদের খাস দাসী রত্নাবতীকে নিয়ে এসেছিলো আমার মাতা রামদেবী। আমার মা পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের রাজকুমারী ছিলেন। এই রত্নাবতী ছিলো আমার মাতার পরিচারিকা । বিবাহের পরেও আমার মা রত্নাবতীকে নবদ্বীপের এই প্রাসাদে নিয়ে আসে। কারণ সে ছিলো আমার মায়ের বিশ্বস্ত দাসী। আর এই রত্নাবতীর গর্ভের মেয়েই হচ্ছে কঙ্কনা দাসী।

কঙ্কনা ছিলো আমার খেলার সাথী। দিনের পর দিন সে বেড়ে ওঠে আমার চোখের সামনে। কঙ্কনা যেনো বাগানের অপ্রয়োজনীয় ফুল নয়। সে প্রস্ফুটিত হতে থাকে গোলাপের সৌরভ নিয়ে। তার উন্মেলিত চোখে আমার স্বপ্ন দেখতাম। চুল থেকে গুন্জ ফুলের সুবাস পেতাম। কাঁচা হলুদের গায়ের রঙে আবিরের দরকার হতোনা। বুকে তার কালান্তরের কুন্দন, বক্র শরীরে হাটতো প্রাসাদময় সর্পিনী্র মতো। নিকষিত হেমের ছোবলটি এসে পড়তো যেনো আমার বুকে। কণ্ঠতল থেকে বুক হয়ে নাভিমূলে তার উত্তাল ভাগিরথীর বাঁক। তার সেই প্রমত্ত শরীরের বাঁকে বাঁকে আমি আমার দৃষ্টি হারাতাম।

সেদিন ছিলো হেমন্তের পূর্ণিমার রাত। বিকাল থেকেই মনটা উদাসী হয়ে উঠেছিল। প্রগাঢ় এক আকাঙ্ক্ষা মন প্রাণ জুড়ে, আজকের এই চাঁদের সন্ধ্যায় কঙ্কনাকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ভাগিরথীর তীর ধরে বেড়াতে নিয়ে যেতে মন চায়।  বনারন্যের সবুজে সবুজে, পাতায় পাতায় ঢলে পড়ছিলো জ্যোৎস্নার প্লাবন। কঙ্কনা একজন দাসী হলেও তার অহংকার ছিলো রাজকুমারীর মতো। তন্বী এই তরুণী আমার সকল সকল শৌর্য বীর্য কেড়ে নিয়েছিলো। গোপনে গোপনে ইচ্ছা পোষন করে রেখেছিলাম, ওকেই আমি বিয়ে করবো, হোক না সে দাসী।

পাইককে বললাম আস্তাবল থেকে ঘোড়া বের করতে। দাসী মহলে খবর পাঠিয়েছি কঙ্কনাকে অপরূপ সাজে সাজাতে। এই যে এতো আয়োজন, এতো সাজ সাজ রব, সবকিছুই আমার মা রামদেবী আর পিতা বল্লাল সেনের অগোচরে। সেদিনের সেই মনোরম সন্ধ্যা রাতে  দেবদারু গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা দিলো। প্রাসাদের দাসীদের দরজা দিয়ে চন্দ্রালোকে হাটতে হাটতে কঙ্কনা দাসী বের হয়ে আসে। পরনে ছিলো কারুকার্যখচিত চোলি ও ঘাঘরা। চাঁদের আলো পড়ে ওর পোশাকে লাগানো পাথর আর চুমকিগুলি ঝিকমিক করছিলো।

অশ্বের খুরের খটখট শব্দ তুলে ভাগিরথীর তীর ধরে ঘোড়া ছুটতে থাকে বনের দিকে। আমার হাতে সোয়ার। পিছনে কঙ্কনা দাসী। চাঁদের আলো বাঁধ ভেঙে পড়েছে আরো আগেই। উতলা কুন্তলা হয়ে কেঁপে ওঠে ভরা পুর্ণিমার চাঁদ। একি পাগল কাড়া এই ক্ষণ! বুঁনো জ্যোৎস্নায় বনের মরা পাতার সব মর্মরধবনি একসময় থেমে যেতে থাকে । যেনো সব গান আর সব সুর বনের গভীরে হারিয়ে যায়। এতো আলো আর এতো জ্যোৎস্না সব আধারে ভেসে যায়।

আমরা যখন রাজ প্রাসাদে ফিরে আসি তখন চাঁদ মধ্য গগনে মেঘের নীচে নিস্তব্ধ হয়ে ডুবে গেছে। কঙ্কনা দাসী চলে যায় দাসী মহলে তার মায়ের কাছে। সেদিন সকাল বেলা পুকুরের জলে কঙ্কনা দাসীর মা রত্নাবতীর মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়।

তারপর --

বিষ্ণুপদ ঘোষের টাঙা গাড়িতে আমি বসে আছি। লাল পোড়া মাটির ধুলো উড়তে উড়তে ঘোড়ার গাড়িটি ছুটে চলতে থাকে কৃষ্ণনগরের দিকে। তখন বিকাল হয়ে গেছে। আমি বিষ্ণুপদ ঘোষকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম - কঙ্কনা দাসীর পরে কি হয়েছিলো? পথে আসতে আসতে বিষ্ণুপদ বলছিলো, ঠিক পরের রাত্রিতেই কঙ্কনা দাসীও একই পুকুরের জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলো। সত্য মিথ্যা জানিনা -- জনশ্রুতি আছে যে, রাজকুমারের পিতার ঔরসে রত্নাবতীর গর্ভে কঙ্কনার জন্ম হয়। এই কথাটি রত্নাবতী যে রাতে আত্মহত্যা করেছিলো, সেই রাতেই কঙ্কনাকে সে বলে গিয়েছিলো।
এখনো নাকি হেমন্তের পুর্ণিমা রাতে ভাগিরথী তীরের জীর্ণ এই প্রাসাদ থেকে মা মেয়ের দু 'জনেরই কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে।

-------------------------------------------------------------------
ডিসক্লেইমার : এই কাহিনীর তথ্যগুলো বিষ্ণুপদ ঘোষের দেওয়া। আমার কাছে মনে হয়েছে এইসবই ছিলো তার কল্প কাহিনী। সেন রাজাদের কারও সাথে এর কোনো মিল নেই।