শনিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৭

তিস্তার আথালি পাথালি পানি

'নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে
ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া চলুক মাঝ দইরা দিয়া
উড়ালি বিড়ালি বাওয়ে নাওয়ের বাদাম নড়ে 
আথালি পাথালি পানি ছলাৎ ছলাৎকরে রে।'

গানটি কে লিখেছিলো জানা নেই।যিনিই লিখেছিলেন তিনি হয়তো তিস্তা পাড়ের কেউ ছিলেন।তখন তিস্তায় এতো জল ছিলো যে- 'আথালি পাথালি পানি ছলাৎ ছলাৎকরে।' গিরীশ চক্রবর্তীর সুরে গানটি গেয়েছিলেন মরমী কন্ঠ শিল্পী মরহুম আব্বাস উদ্দীন আহমেদ।
আহা ! সেই গানের 'আথালি পাথালি পানি' আজ কোথায় হারালো ? তিস্তার এই চর আমরা চাইনি। এই চরাচরও নয়।বালুচরে এই শুভ্র কাশবনও দেখতে চাইনা। দেখতে চাই সেই-'আথালি পাথালি পানি।' যেখানে কোনো এক বর্ষার ভর দুপুরে নতুন কোনো আব্বাস উদ্দীন আবার গাইবে-

'ঢেউয়ের তালে পাওয়ের ফালে নাওয়ের গলই কাঁপে
তির তিরাইয়া নাওয়ের খৈয়াই রোইদ তুফান মাপে,
আরে খল খলাইয়া হাইসা উঠে, 
বৈঠার হাতল চাইয়া হাসে, বৌঠার হাতল চাইয়া।'

চিত্রা নদীর পাড়ে

এই অনন্তলোকে একটি ছায়ামূর্তি আমি দেখতে পাই। সদাই মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে তার।যাকে দেখা যায় তাকে চেনা যায়না। হাজার বছর আগে একবার দেখেছিলাম চিত্রা নদীর পাড়ে। সেই মুখ.সেই চোখ মনে ভেবে আমি এখনো গান ও কবিতা লিখে যাই।

নর্তকী জরিনা

সম্রাট আকবর তখন ফতেপুর সিক্রিতে থাকতেন। একদিন তিনি তার কাছে আসা অতিথীদের জন্যে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তিনি গায়ক তানসেনকে ডাকেন সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে। সম্রাট তানসেনকে বললেন, আপনার গানের সাথে সেখানে কাউকে নাচতেও হবে। তানসেন বললেন, আচ্ছা। আমি চেষ্টা করবো নর্তকী রাখতে কিন্তু আমি এখানে কোনো নর্তকীকে চিনি না। দাসীদের মধ্য থেকে কেউ একজন সম্রাট আর তানসেনের এই আলাপ শুনেছিলেন। সম্রাট চলে গেলে সেই দাসী তানসেনকে গিয়ে জরিনার কথা বললেন, এবং পরামর্শ দিলেন তানসেন যাতে জরিনাকে নাচার জন্য প্রস্তাব দেয়। যখন তানসেনের মতো বিখ্যাত গায়ক জরিনাকে সম্রাট আকবরের প্রাসাদে নাচার জন্য প্রস্তাব দিলেন তখন জরিনার বাবা আর না করতে পারলেন না।

জরিনা ফতেপুর সিক্রিতে চলে আাসার সময় বাবার কাছে বিদায় নিতে যান।বাবা জরিনাকে পরামর্শ দিলেন- একটা ব্যাপার মাথায় রাখবে, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে বিপদও আছে। সাবধানে থাকবে, আর মনে রাখবে তোমার জন্য আমি সবসময়ই আছি। জরিনা প্রাসাদে গিয়ে আকবর এবং তার সভাসদদের সামনে সারারাত নাচলেন। জরিনার কাছে এটা ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার ব্যাপার। সম্রাট জরিনাকে এতো পছন্দ করলেন যে তিনি জরিনাকে প্রাসাদে রেখে দিলেন যাতে প্রয়োজন হলে তাকে ডাকতে পারেন। 

প্রাসাদের সবাই জরিনাকে পছন্দ করলেও রানী যোধা বাঈয়ের একজন দাসী জরিনাকে পছন্দ করলো না। সম্রাটের কাছ থেকে জরিনা বেশী মনোযোগ পাওয়ার কারণে মাধবী জরিনার প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিলো। জরিনা যেন সম্রাটের চোখে অপরাধী হয় সেজন্য একটা বুদ্ধি বের করে মাধবী। রানী যোধা বাঈ যখন স্নান করছিলেন তখন মাধবী তার গয়নার বাক্স থেকে একটি সোনার বালা চুরি করে জরিনার জিনিসপত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। যোধা বাঈ যখন দেখে যে তার একটি বালা নেই তখন তিনি মারাত্মক ক্রোধান্বিত হয়ে সারা প্রাসাদ তল্লাশি করার নির্দেশ দিলেন। মাধবী তখন রানী যোধা বাঈকে বলে, আমি জরিনার ঘরে সেই বালাটি দেখেছি। বালাটি যখন জরিনার ঘরে পাওয়া গেলো যোধা বাঈ তখন রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি সম্রাট আকবরের কাছে গিয়ে নালিশ দিলেন,বললেন নর্তকী জরিনা একটা চোর। এই ব্যাপারে আপনি কী করবেন এখন? 

জরিনা তখন আকবরের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হুজুর, আমি বালা চুরি করিনি। সম্রাট আকবর তখন বললেন, তোমার ঘরে বালা কিভাবে পাওয়া গেলো সেই ব্যাখ্যা কি তুমি দিতে পারবে? স্বাভাবিকভাবেই জরিনার তখন বলার কিছু ছিলোনা। সে জানতোনা বালা কিভাবে তার ঘরে গেলো। সম্রাট মাথা নেড়ে বললেন, প্রমাণ যেহেতু দেখাই যাচ্ছে, জরিনা চোর এবং মিথ্যুক। চুরি করার শাস্তি হিসেবে হাত কেটে দেওয়া হবে। জরিনা তখন বলেন- হুজুর, আমি একজন নর্তকী। আমার হাত কেটে ফেললে আমি নাচবো কীভাবে?  তাছাড়া আমি চুরি করিনি। সম্রাট আকবর চিৎকার করে উঠলেন, চুপ ! আগামীকাল সকালে তোমাকে শাস্তি দেওয়াই হবে প্রথম কাজ। সম্রাট আকবর এরপর দরবার ত্যাগ করলেন।

জরিনা সারাদিন কাঁদলেন। রাতে জরিনা অন্যান্য দিনের মতই সম্রাটের সামনে নাচলেন। কিন্তু এটা আনন্দের নাচ ছিলোনা, এটা ছিলো খুবই ধীরগতির দুঃখের একটি নাচ। আকবরের সভাসদদের কেউই এতো সুন্দর নাচ জীবনে দেখেনি। তার নাচ আর দেখতে পারবেন না ভেবে আকবরও খুব দুঃখ পেলেন। 

পরের দিন সকালে আকবর তার সকল সভাসদদের ডাকলেন। তিনি একজন রক্ষীকে পাঠালেন জরিনাকে নিয়ে আসার জন্য। সারা প্রাসাদ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও জরিনাকে পাওয়া গেলোনা। সে এসে সম্রাটকে এ কথা জানালো। সম্রাট আকবর জিজ্ঞাসা করলেন, কেউ কি জরিনাকে দেখেছে? সভায় উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।

 তখন সভায় এক বৃদ্ধ লোক প্রবেশ করেন। সিংহাসনে বসা সম্রাট আকবরের সামনে গিয়ে তিনি বললেন, হুজুর, কোনো প্রমাণ ছাড়াই জরিনাকে অভিযুক্ত করে আপনি ভুল করেছেন। আকবর জরিনার বাবাকে চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, জরিনা কোথায় আমাকে বলুন, আমি দেখবো তার সাথে যাতে ন্যায়বিচার ঘটে। জরিনার বাবা মাথা নেড়ে বললেন, অনেক দেরী করে ফেলেছেন আপনি। আর কিছুই করা যাবে না। আপনি আমার মেয়ের জীবনে অনেক দুঃখ এনে দিয়েছেন, আর ফতেহপুর সিক্রি অবশ্যই এই বেঈমানির শাস্তি পাবে। বৃদ্ধ লোকটির এই কথার অর্থ কী আকবর তা জিজ্ঞাসা করার আগেই সেই লোকটি ভিড়ের মধ্যে মিশে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

দুই সপ্তাহ পরে ফতেহপুর সিক্রির কুয়াগুলি শুকিয়ে গেলো। সম্রাটের উট ও ঘোড়ার জন্য এবং মানুষের জন্য কোনো পানি আর কুয়াগুলিতে অবশিষ্ট ছিলো না। সম্রাট আকবর তার স্ত্রীদের ও সন্তানদের নিয়ে আগ্রার দুর্গে গিয়ে উঠলেন। তারা আর কখনোই ফতেহপুরে ফিরে আসেননি। 

সিক্রি গ্রামে এই গল্প এখনো প্রচলিত আছে। গ্রামের কেউ কেউ বলে যে পূর্নিমা রাতে ফতেহপুর সিক্রির প্রধান ফটক, বুলন্দ দরজাতে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা বলে যে এটা আসলে মাধবী, সে জরিনার জন্য অপেক্ষা করে যাতে তার কাছে ক্ষমা চাইতে পারে।

তথ্যসূত্র : 1,The Hindu: Akbar's folly  2. quora.com 3. Natunsomoy.                                                                                               . 
                                                                                               

শুক্রবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৭

তুমি গীতি কবিতা

তোমাকে নিয়ে গীতি কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম হলোনা
তোমাকে নিয়ে গানে সুর সাজাতে চেয়েছিলাম তা হলোনা
কবিতার কোনো ছন্দে তুমি নেই
গানের  কোনো কথায় তুমি নেই
তোমাকে নিয়ে বাঁধতে চেয়েছিলাম ঘর তা আর হলোনা
তোমাকে নিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম স্বপ্ন তা আর হলোনা
যদি মনে পড়ে আমায় কবিতায় এসো
যদি সুরে ভাসে প্রাণ তবে গানে এসো
তোমাকে নিয়ে তাজমহল গড়তে চেয়েছিলাম তা হলোনা
তোমাকে নিয়ে গীতি কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম হলোনা



তুমি আসো

দমকা বাতাস জানালা দিয়ে প্রবেশ করতে যেমন অনুমতি নেয়না-
তেমনি কোনো অনুমতি ছাড়াই তুমি চলে আসো আমার ঘরে-
'তোমার ঐ দেহখানি তুলে ধরো,আমার এই দেবালয়ের প্রদীপ করো।'।'

আলোর প্রতিধ্বনি

দুইটি জীবন চলছিলো আলাদা আলাদা করে। দুইটি নদী যেমন ভিন্ন ভাবে প্রবাহিত হয় তেমনি। দুই নদী কি কখনো এক হতে পারে ? কিন্তু আমরা হয়েছিলাম, আমরা একই মোহনায় মিশেছিলাম, যেনো এক জীবন ছুঁয়ে ফেললো আরেক জীবনকে। এ যেনো এক বিস্ময়কর নিয়তির খেলা।

তারপর নদীর জল তরঙ্গায়িত হলো। ছোটো ছোটো ঢেউ তৈরী হলো।নতুন আরো জীবন এলো। সব যেনো এক অদ্ভূত প্রেমে বাঁধা। মনে হয় এই প্রেম আছে, আবার মনে হয় প্রেম নেই। জীবনের এই সব রহস্য বুঝতেই এক জীবন চলে গেলো।

জীবনের যতোটুকু সুখ তা হঠাৎ আলোর প্রতিধ্বনি মতো ক্ষণকালের। জীবন চলছে জীবনের দিকে- কখন এই চলা শেষ হয়, জানেনা কেউ। আমরাও চলছি অচেনা একটি প্রান্তের দিকে যাকে বলে মানুষের Death end.
                                                                                                                                           

বৃহস্পতিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৭

চন্দনে মৃগপদচিহ্ন

কবি সাংবাদিক সাজ্জাদ কাদির আর নেই।
আপনি কাউকে না বলে, হঠাৎ করে এই ভাবে চলে গেলেন।

ফেইসবুকে নিউজ ফিডে আপনি প্রতিদিন থাকতেন।আমি অনেক লেখায় লাইক দিতাম। আর আজকে আপনাকে নিয়ে আমাকে স্টাটাস লিখতে হচ্ছে। যা নিউজ ফিডে থাকবে। সবাই দেখবে, শুধু আপনি দেখতে পাবেননা। মাত্র দুই দিনের জ্বর সইতে পারলেননা কবি।আপনি সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন,। আপনার কালজয়ী সৃষ্টি ' চন্দনে মৃগপদচিহ্ন' ও 'দূরতমার কাছে' র বই দু'টি হাতে নিয়ে উদাস নয়নে পৃষ্ঠার পর উল্টিয়ে যাচ্ছি আর পড়ছি এবং  চোখের কোনে জলে ভরে উঠছে। Rest in Peace,-  Sazzad Quadir' আমিন।