বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

কালো জোনাকির গান ( কাব্যগ্রন্থ )


কালো জোনাকির গান  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

ওরা দু’জন- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আমার প্রথম সহপাঠী বন্ধু, একজন বেলায়েত হাসান, আরেকজন হাসি চৌধুরী।

বেলায়েত- এখনো কাছে, হাত বাড়ালেই 
ছোঁয়া যায়। হাসি চলে গেছে জীবন-নদীর ওপারে, ওর ম্লান হাসি এখনও ভেসে আসে অতীতের নরম ঢেউ হয়ে।

আজও কে কাকে কতটা মনে রেখেছে,
তা হয়তো আমার হৃদয় জানে,

এই বইটি 
দু’জনের হাতেই অর্পণ করলাম -
একজনের উষ্ণ করতলে, আরেকজনের নক্ষত্র-ছাওয়া করুণ আলোয়।





১.      মাধবীর অমাধুরীর গান

মাধবী বলেছিল
“পৃথিবীতে দুটো জিনিসেই মাধুরী আছে
বাগদাদের ফুল, যার সুগন্ধে মরুভূমিও নরম হয়,
আর রাজস্থানের মীরা বাঈ,
যার পদাবলির সুরে ভোরের আকাশও কাঁপে।
আমি তার কিছুই নই
আমার ভিতরে কোনো মাধুরী খুঁজো না।”

কিন্তু আমি দেখেছি
তার চোখের আড়ালে নদীর মতো হেলে থাকা নীরবতা,
যেন গোধূলির কুয়াশায় লুকোনো মেঘের সোনালি রেখা।
তার কণ্ঠে কখনও শুষ্ক পাহাড়ি বাতাস,
কখনও ভোরের শিশিরের মতো অদৃশ্য স্পর্শ,
যা ছুঁয়ে না গিয়েও মনকে ঘিরে ফেলে।

মাধবী বোঝেনি
মাধুরী সবসময় ফুল বা গান নয়,
কখনও তা নির্জন বটগাছের তলে পড়ে থাকা আলোর ছায়া,
কখনও পথ চলে যাওয়া হাওয়ার অদ্ভুত মৃদু শব্দ,
কখনও নদীর স্রোতে টলমল করা সন্দিগ্ধ রূপালি দীপ্তি।

তিনি ভেবেছেন তাঁর ভেতর শুষ্কতা—
আর আমি দেখেছি ঠিক সেই শুষ্কতার মধ্যেই
এক ফোঁটা গোপন বৃষ্টি
যা কারও নজরে আসে না,
তবু পৃথিবীকে ভিজিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

মাধবী
তুমি বাগদাদের ফুল নও,
তুমি মীরা বাঈও নও—
তুমি তার চেয়েও দুরূহ,
এক অচেনা মরূদ্যান,
যেখানে পানির শব্দ নেই,
তবু তৃষ্ণা মেটে।

তুমি বলো- “মাধুরী খুঁজো না।”
আর আমি দেখি
তোমার প্রতিটি উচ্চারণে, প্রতিটি নীরবতায়,
কোনো এক অজ্ঞাত সুর
নিজের মতো করে জন্ম নিচ্ছে
যাকে নাম দেওয়া যায় না,
শুধু অনুভব করা যায়।


২.      শিলালিপিতে আমাদের প্রেম

কোনো এক প্রাচীন প্রস্তরের বুকে
আমরা দু’জনে দাঁড়িয়ে লিখে রাখব
নাম— দুইটি দীপ্ত অক্ষর,
আর কিছু নির্মল নিঃশ্বাসে-জন্মানো শব্দ,
যারা সময়ের গর্ভে থেকেও
আমাদের হৃদয়স্পন্দনের প্রতিধ্বনি বহন করবে।

হেমন্তের নীরব শিশির
দূর্বাঘাস ছুঁয়ে যখন ঝরে পড়বে
সেই শিলালিপির উপরে,
অচেতন শব্দগুচ্ছ তখনও
চেয়ে থাকবে পৃথিবীর অনাদি রূপের দিকে
যেন প্রত্যেক ঝলমলে শিশিরবিন্দু
আমাদের প্রেমকে নতুন আলোয় জাগিয়ে দেয়।

রাত্রির গভীর প্রহরে
যখন চারদিকে শুধু নীরবতার নিশ্বাস,
খোদাই করা সেই অভিজ্ঞান চিহ্ন
জেগে থাকবে অনন্ত কালের প্রহরী হয়ে
রেখে যাবে আমাদের স্বপ্নের ছায়া,
রেখে যাবে লজ্জারঙা আরক্ত মুখমণ্ডল,
রেখে যাবে সেই অমলিন মুহূর্ত
যেখানে তুমি আর আমি,
দুইটি জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে
এক হয়ে ছিলাম।

আমাদের প্রেম,
প্রস্তরেও থেমে থাকবে না
সময়ের ভিতর দিয়ে
সে বয়ে যাবে শিলালিপির মতোই
নীরব অথচ চিরস্থায়ী আলোয়।


৩.      অনুসঙ্গের আদিম জ্বলন 


ধরতে গিয়েই দেখলাম
তোমার স্পর্শের ভিতর লুকোনো
এক অগ্নিগর্ভ নিশ্বাস,
যেন এলোমেলো বৃষ্টির মতো
গাছে–গাছে ছড়িয়ে পড়ছে তৃষ্ণা।

তুমি এগিয়ে দিলে বক্ষ,
আমি শুনলাম ধুকপুক করা
এক অনাবিষ্কৃত প্রান্তরের ডাক
সেখানে বাতাসও দহনময়,
সেখানে রাতও উষ্ণতার শস্যশ্যামল।

আমার আঙুল জেগে উঠল
তোমার ত্বকের আলোক-তরঙ্গে
যেন চাঁদের আলো
তোমার শিরায় শিরায় বয়ে যায়,
আর আমি পথ হারাই তার ঢেউ-লাগা পথে।

“শীতল করো”- বললে তুমি,
আর আমি সমস্ত উত্তাপ দিয়ে
তোমার গোপন নক্ষত্রলোকে
মেখে দিলাম মৃদু কুয়াশা,
দুজনার শরীর মিলেমিশে
এক অনির্বাণ অমৃতের উৎস ধরে।

সেই অমাবস্যা রাতের মতো
যেখানে শুধু দেহের ভাষা বলে
অস্পষ্ট, তবু অশেষ,
অদৃশ্য, তবু অগ্নিবর্ণ।

আমরা দু’জন একই আগুনে পুড়ে
একই জলে তৃপ্তি খুঁজি
যেন পৃথিবীর প্রথম দাহন
আর শেষ বৃষ্টি একসাথে নামছে
আমাদের দু’হাতের ভাঁজে।


৪.        অস্তমিত বেলার শূন্য খেলা


কখন যে ঢলে পড়ল বেলা,
কখন যে ফুরিয়ে গেল ক্ষণ
জানে না কেউ, শুধু নিঃশব্দে
ঝরে পড়ে সময়ের মন।

যে খেলায় শূন্য করে ভরেছিল
আমার প্রাণের সমস্ত স্থান,
সে-খেলার আলো-ছায়ায় আমি
রইলাম বসে জীবনজুড়ে অনুধ্যান।

অদেখা কোনো হাত ছুঁয়ে যায়
দেয় শূন্যতা, দেয় ভরাও,
মাঝে মাঝে মনে হয় যেন
হারিয়েও তাকে ফিরে পাও।

তাই আজও চুপ করে বসে আছি,
স্মৃতির আলো-ছায়ার কোণে,
যার জন্য শূন্যও পূর্ণ হয়
সে-ই আছে আমার জীবনবৃণে।


৫.      যদি তুমি আসতে


যদি তুমি আসতে,
বহুদূরের জলছবি ভেঙে
হাতে রেখে যেতে এক মুঠো উষ্ণতা,
আমি তোমার পথের ধূলিকণাও
পুনর্জন্মের মতো ধারণ করতাম।

তুমি এগোলে
হাওয়ার পোশাকে মেঘের মতো নরম হয়ে
ছুঁয়ে যেত তোমার নীরবতা;
আমি তাতে বুনে দিতাম রাঙা লাজুক সন্ধে,
যেন চোখের পাতা ভিজে ওঠে অকারণে।

তুমি যদি দাঁড়াতে
আমার শূন্য বুকে থমকে থাকা হৃদয়-ধ্বনির পাশে,
আমি তোমার কণ্ঠস্বরের আলোয়
উৎসব জ্বালাতাম অন্তরে
আবীর, গন্ধ, রঙে রঙে পূর্ণিমার মতো ভরে উঠতাম।

আর তুমি
যদি এক মুহূর্ত তাকাতে
আমার কাঁপা দেহের আল্পনায়,
তবে বুঝতে
আমি আসলে কতদিন ধরে
শুধু তোমাকেই ভালোবাসার রূপকথায় লিখে রেখেছি
একটি অনন্ত, অদৃশ্য, জ্বলন্ত কবিতার মতো।


৬.      মায়ার পথরেখা


তুমি রবে না আমি রবো না
রবে না এই সময়ও;
তবু কুয়াশার ভেতর দিয়ে
ভেসে থাকবে আমাদের হেঁটে-যাওয়া পায়ের শব্দ,
নিভে-নিভে জ্বলা চাঁদের ধূসর আলোয়
যেন কোনো পুরোনো স্মৃতির দোলা।

কথা থাকবে না
কথারা তো সময়ের সঙ্গে ফুরোয়;
শুধু থাকবে গল্প,
অদৃশ্য নক্ষত্রের গোপন ভুবনে
যেখানে নিশীথিনী তার সোনালি নিশ্বাসে
জাগিয়ে তোলে এক দেবযানীর স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নে আমরা দু’জন
অর্ধেক ছায়া, অর্ধেক আলো হয়ে
হেঁটে যাই নীরবতার সিঁড়ি বেয়ে
আর পিছনে পড়ে থাকে
মহাজাগতিক ধুলোর মতো
অলৌকিক, অবিনশ্বর আমাদের পথরেখা
অমলিন, অচঞ্চল, 
চিরকালের মায়ায় বাঁধা।


৭.       চন্দ্রালোকের আদিরস


জোছনার দুধসাদা ঢালে
তোমার শরীর ছিল তীর্থের মতো 
শ্বাসের ধূপ ছড়িয়ে দিয়েছিল রাত।

নিভৃত বাঁশবনের মর্মর-ঝরনা পেরিয়ে
আমি ছুঁয়েছিলাম তোমার ললাট
সেই ছোঁয়া ধীরে ধীরে
নেমে গিয়েছিল তোমার চোখের জলীয় রেখায়,
গলায়, কলারবোনে,
যেন আলোকধারা বিন্দু বিন্দু গলে
দেহে খুলছে নক্ষত্রের দরজা।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
রাতের অর্ধ-জাগ্রত স্বপ্নের মতো
দেহ যেন স্নিগ্ধ অরণ্যের উষ্ণ পাতাল,
যেখানে স্পর্শ মানে আগুন,
নিঃশ্বাস মানে গলন,
নিকটতা মানে জন্ম নেয়া নতুন পৃথিবীর।

আমার আঙুলে তোমার ত্বক
ধীর তরঙ্গে কেঁপে উঠেছিল
একটি উষ্ণ নদীর মতো,
যার গোপন স্রোতে নিমজ্জিত হতে হতে
আমি হারাচ্ছিলাম নিজেকে।

তোমার ঠোঁট
চাঁদের আলোয় রক্তিম শপথের মতো—
আমার নামে কাঁপছিল;
হৃদয়ের ভেতর শুনছিলাম
দেহের গভীরতম নীরব স্পন্দন।

বলেছিলে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…"
আমি সেই সুরে, সেই দেহের ভাষায়
ডুবে গেলাম পুরোপুরি
আলোর, আঁধারের, শ্বাসের, উষ্ণতার
মহাজাগতিক আদিরসে।


৮.        চন্দ্রালোকে দেহ-তন্ত্র

রাত্রির মধ্যাহ্নে
চাঁদের আলো হঠাৎ থমকে দাঁড়াল
যেন জানত, আমাদের দেহেরা
আজ এক অজ্ঞাত রহস্যের দরজা খুলবে।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসা
কোনো প্রাচীন স্বপ্নদেবীর মতো
চোখে নীরব মন্ত্র,
চুলের ডগায় জোনাকির গোপন আগুন।

আমি তোমার ললাটে চুম্বন দিলে
মনে হল
দূর নক্ষত্রের পথে
একটি অদেখা দরজা খুলে গেল ধীরে,
আর তার থেকে নেমে আসছে
অপরিচিত নীল আলোর উষ্ণ তরল।

শরীরের উপর শরীর,
ছায়ার উপর ছায়া,
বাঁশঝাড়ের মর্মর শব্দে
আমরা হারিয়ে যেতে লাগলাম
কে আমি? কে তুমি?
স্পর্শই যেন আমাদের পরিচয় পাল্টে দিচ্ছে
মুহূর্তে মুহূর্তে।

তোমার ত্বক ছুঁতেই
একটি শীতল আগুন
আমার হাত ধরে
অন্তরালের অন্ধকারে নিয়ে গেল,
যেখানে দেহের সীমানা নেই
শুধু স্পন্দন,
শুধু উষ্ণতার অদ্ভুত আলোড়ন,
শুধু শ্বাসের মধ্যে জন্ম নেওয়া রহস্য।

তোমার ঠোঁটের উপর
চাঁদের মায়া জমে ওঠে
সেই আলোতে প্রতিটি স্পর্শ
অপরাধের মতো নিষিদ্ধ,
আবার পরিত্রাণের মতো পবিত্র।

তুমি নরম কণ্ঠে বললে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…”
আর আমি বুঝলাম,
এই প্রেম কোনো ঋতুর নয়,
এই দেহ কোনো দেহের নয়—
এ এক লুকানো তন্ত্র,
যেখানে আমরা দু’জন
একই আলোর ভিন্ন ছায়া।


৯.       নীলাভ অধ্যায় 


নীল-অর্ধরাত্রির সেই নীরব মুহূর্তে
তোমাকে মনে হয় এক অদৃশ্য দীপশিখা
দূর নক্ষত্রবীথি যেমন ধীরে ধীরে
নরম আলো ছড়ায় আকাশের গভীরে,
তুমিও তেমনি গোপন রূপে নীলাভ,
নরম পরশে জাগাও অজানা স্মৃতি।

নগ্নতায় তুমি পিকাসোর এক বন্য রেখাচিত্র,
বাঁকা, বেপরোয়া, তবু আশ্চর্য সুরেলা
যেন শরীরের প্রতিটি টানে আছে
অদ্ভুত কোনো অসমাপ্ত শিল্পকাহিনি।
ঢাকাই মসলিনের মতোন তন্বী তুমি
হাওয়ায় দুললে যার স্বপ্নও কাঁপে,
কাঁচা মাটির ভাঁজে-ভাঁজে
তোমার বাঁকগুলো জন্ম নেয় আবার।

তোমার গা জুড়ে জ্বলে পূর্ণিমার
মৃদু-বাঁকা গোলাপী আলো
চাঁদের সিঁথি থেকে যেন
ঝরে পড়ে রেশমি জোছনা।
আর তুমি
সেই আলোতে গলে পড়ো,
ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে,
সারারাত্রি জুড়ে
অকারণ এক কোমল আকুলতায়।

তোমার কাছে এ রাত যেন
শৃঙ্গারময় এক উপাখ্যান
দেহ নয় শুধু,
স্পর্শ নয় শুধু,
বরং জোৎস্নার ভেতর লুকিয়ে থাকা
অদেখা হৃদয়ের নিঃশ্বাস।


১০.        বুকের গভীর খাঁজে

অন্ধকারই তোমার প্রিয়
তাই বুকের গভীর খাঁজে তোমাকে লুকিয়ে রাখি,
যেন গোপন কোনো শস্যভাণ্ডার,
যার উষ্ণতা জানে শুধু চাঁদহীন রাত্রি।

রাত্রি হিংসা করে তোমার সেই আবেশ
শরীরের ঘ্রাণে তুমি যখন আলতো কেঁপে ওঠো,
আমি শুনি দূরবর্তী স্রোতের মতো
একটি নরম নিশ্বাসের ঢেউ।

সেই মুহূর্তেই
স্বপ্নের বীজ বুনে দিই তোমার উর্বর মৃত্তিকায়
এক টুকরো ছায়া,
এক ফোঁটা আলো,
এক বিন্দু আদিরসের নিঃশব্দ স্পন্দন।

তুমি তখন দিগন্তের মতো প্রসারিত,
আমি তখন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ি
মাটির সঙ্গে মিশে যাই,
আর জন্ম নেয়
এক অনাদৃত ভোরের অন্তরঙ্গ অঙ্কুর।


১১.       শরীর বৃত্তের উপাখ্যান 

কালো মেঘের মতো চুল
ঢেকে দিয়েছিল তোমার দৌড়ে–ফেরা বয়সের পিঠ,
যেন প্রাচীন কোনো অরণ্য
ধীরে ধীরে নেমে আসছে উপত্যকার ঢালে।

অর্ধেক এসে থেমে থাকা সেই অন্ধকার
টিলার গায়ে ঝুঁকে পড়ে,
যেখান থেকে শরীরের মানচিত্র
প্রথম আলোর মতো খুলে যায়
গোপন উপকূল, গোপন ঢেউ,
অচেনা পথের হালকা কুয়াশা।

ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
জল হয়ে যখন গিরিপথ বেয়ে নামে,
তোমার অঙ্গভূমির প্রতিটি বাঁক
সেই নেমে–আসা জলের কাঁপুনি পায়।
নরম আলোয় তরল হয়ে ওঠে
ঢালের প্রতিটি নিঃশ্বাস।

আর সেই অতল খাদে
যেখানে দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়,
যেখানে শব্দ জন্ম নেয় আবার,
ফুটে থাকে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম
অচেনা, অদৃষ্ট, আত্মাভাষী।

প্রতিটি জলপদ্ম যেন বলে ওঠে
শরীর আসলে একটি প্রাচীন অরণ্য,
যার সব পথই যুগের পর যুগ
অপরিচিতের দিকে খোলে;
যেখানে স্পর্শ মানে শুধু স্পর্শ নয়
একটি আদিম বৃত্তে ফিরে যাওয়া।


১২.       পোড়ামাটির প্রেম


তোমার শরীরে ছিল মাটির উষ্ণতা
গ্রামের গোধূলিবেলার মতো শান্ত,
চুলের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ধোঁয়া-গন্ধ
বলত— আগুন পেরিয়ে এসেছ তুমি,
তবু জ্বলা শেষ হয়নি অন্তরান্ত।

কাঁচা মাটি ছুঁইতে গিয়ে বুঝেছিলাম
ভালোবাসা প্রথমে নরম, তারপর শক্ত,
তোমার চোখে তখনো শুকায়নি
আদিম নদীর ভেজা স্রোত।

যে প্রেমে পোড়া দাগ থাকে,
সেখানে আলোও জন্ম নেয়
দু’হাতের ছাঁচে তোমাকে গড়তে গড়তে
নিজেকেই নতুন করে চিনেছি
মাটির মতো ধুলোমাখা, তবু পবিত্র বেশ।

জ্বলে ওঠো আবার,
আমার বুকে আগুন রেখেই
পোড়ামাটির প্রতিমার মতো
তোমার প্রেম আজো
অভ্রান্ত, অটল, নিখাদ দাঁড়িয়ে আছে
আমার সমস্ত দিনের মাঝে।


১৩.       প্রেমময়ী তুমি


মনখারাপের নীল রাতটিতে
চোখ বুঝে শুয়ে ছিলাম নিঃশব্দে,
দূর অতীতের সব মুখভাসা স্মৃতিরা
ভেসে ভেসে আসছিল ধীরে ধীরে।

বুকের উপর রাখা ধর্মগ্রন্থ
আঁধারের কোলে শান্ত জ্যোতির মতো
শব্দেরা থামিয়ে দিচ্ছিল ব্যথা,
কিন্তু ঘুমের ভিতরেও ছিল এক শূন্যতা।

হঠাৎই পায়ের মৃদু শব্দ
স্বপ্ন নাকি জাগরণের সীমানায়?
চেয়ে দেখি তুমি!
সবসময়ের হাসি-ভরা সেই চেনা মুখখানি।

আমার বুকে রাখা বইটিকে
তুমি স্নেহে সরিয়ে রাখো টেবিলের কোণে,
আর আমি তোমাকে টেনে নিই হৃদয়ের গভীরে
যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা পূরণ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে।

ওই একটুখানি আলিঙ্গনের উষ্ণতায়
কী অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে!
মেঘ সরে জ্যোৎস্না যেমন
চুপিচুপি ছুঁয়ে যায় নদীর গায়ে।

প্রেমময়ী তুমি
তোমার ছোঁয়াতেই মিলিয়ে যায় সব দুঃখ, সব বিষাদ,
তুমি এলে বলেই বুঝি
জীবন আবার গায় নতুন আশার গান।


১৪.       পরম নির্ভরতার আলিঙ্গন 


নীল-অন্ধকার গোধূলিতে তোমার অকম্পিত হাত

আমার দিকে বাড়িয়ে এসেছিল

যেন বহু যুগের প্রতীক্ষা শেষে পাওয়া

এক আশ্রয়দায়ী দীপশিখা।

বলেছিলে- “পরম নির্ভর বাহুডোর…

এসো, আমার উষ্ণতায় তোমাকে আবদ্ধ করি।”


আমি তখন ভেসে গিয়েছিলাম

তোমার বুকে ছায়াবীথির মতো জেগে থাকা

সেই প্রশান্ত সবুজপাতার নরম বনানীতে।

তুমি দেখিয়েছিলে হৃদয়ের ঠিকানা

যেখানে নীরবে ধুকধুক করছে

রক্তের লাল সমুদ্র, স্মৃতির জ্যোৎস্না,

আর কিছু অদ্ভুত নীরব ঝড়।


বলেছিলে

“এই স্থান তোমার,

অপনার মতো করে সাজিয়ে রেখো।

ধুলো জমতে দিও না,

বেদনার কালো ছাইও নয়।

যত্ন নিলে, এ হৃদয় তোমাকে

হাজার বছর আলো দেবে।”


তোমার শব্দে

মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর রঙ

আকাশের নক্ষত্রেরা যেন চমকে তুলে

আমাদের নাম উঁচু করে ধরল।

শরীরের ছায়া আর আলোর সীমারেখা মিশে গিয়ে

এক সমুদ্রজোয়ার তুলেছিল

অদৃশ্য অনুভূতির উর্ধ্বমুখী ঢেউ।


আমি দু’হাত ভরে তুলে নিয়েছিলাম

সেই অনির্বচনীয় নির্ভরতা,

তোমার বুকের উষ্ণ প্রবাহ,

হৃদয়ের গভীর লাল রঙ।


আর বলেছিলাম

“এই স্থানকে আমি রক্ষা করব,

আমার ধ্বনি, আমার নিশ্বাস, আমার দিনরাত্রি দিয়ে।

কারণ এই বুকের অন্তরালে

আমার সমস্ত পথ, আমার সমস্ত ঘর।”


এভাবেই আমাদের আলিঙ্গনের ভিতরে

জন্ম নিয়েছিল এক দীর্ঘ, অনন্ত,

ধুকধুক করা পৃথিবী।


১৫.       সততার শরীরবাণী


তুমি যদি তার শরীর চাও,
তবে খোলাখুলি বলো
অন্ধকারের কোণে নয়,
চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট হও।

ভালোবাসার আবরণে
লোভের আগুন ঢেকে
দূষণ কোরো না তার বিশ্বাসে
মিথ্যে স্পর্শে ভেঙো না তার নিজস্বতা।

ইচ্ছের ভাষা সৎ হওয়ারই নাম,
সাহসী হও, স্বীকার করো খোলামেলা প্রার্থনা—
তবেই শরীর হবে সম্মত আলোক,
তবেই স্পর্শের পথ হবে পবিত্র ও সত্য।

ভালোবাসার অভিনয় কোরো না
সততার হাত ধরেই
মানুষের হৃদয় জেতা যায়,
আর শরীরও দেয় আপনাকে
নিজের মতো সম্মত করে,
নিজের মতো সত্য হয়ে।


১৬.     দু'দরজার পূর্ণতা


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৭.     বিনিদ্রতার অন্তর্লিখন


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৮.       বুকের গভীরের দান

তুমি ভালোবাসা দাও
বুকের গভীর থেকে উঠে আসে উষ্ণ জোয়ার,
নরম অন্ধকার ভেদ করে
একটা অচেনা আলো এসে থামে আমার চোখের কোলে।

আমি তখন করতল পেতে রাখি
তোমার বুকের ঠিক বাহিরে,
যেন কোনও পূর্ণিমা রাতের আগে
মেঘে ঢাকা চাঁদকে ধরে রাখতে চাই
এক মুহূর্তের জন্য হলেও।

তোমার ভালোবাসা ঢলে পড়ে
আমার নিঃশব্দ ফাঁকফোকরে,
আঙুলের রেখায় জমে ওঠে
নতুন জীবনের স্বচ্ছ দীপ্তি।

তুমি দাও
আমি গ্রহণ করি।
তোমার গভীরতা
আমার বিস্তার হয়ে ওঠে।

এই বিনিময়েই
আমাদের দু’জনের ভেতর
একটি অনন্ত নরম ক্ষয়হীন পৃথিবী
নিঃশব্দে জন্ম নেয়।


১৯.       কবিতা, নদী ও নারী


কবিতা নদীর মতো
নিরন্তর বয়ে চলে শব্দের স্বচ্ছ স্রোত,
গভীর থেকে গভীরতর আবেগ তুলে আনে
নরম ঢেউয়ের গোপন স্পর্শে।

নদী নারীর মতো
কখনও শান্ত, কখনও উচ্ছ্বসিত,
ধারে-ধারে জন্ম দেয় উর্বরতা,
জলের ভাষায় লিখে রাখে আকুলতার অনলিখিত গান।

নারী কবিতার মতো
এক এক শব্দে খোলে অপরূপ বিস্ময়,
চোখের ভেতর লুকিয়ে রাখে হাজার রূপকথা,
স্পর্শের নিশ্বাসে ফুটিয়ে তোলে সৃষ্টির প্রথম আলো।

অথচ তিনজনই যেন এক
একই সুরের বহমানতা, একই আদিম টান,
একই দহন, একই বিশ্রাম,
কবিতা, নদী ও নারী
একই বৃন্তে ফুটে থাকা
অন্তহীন সৃষ্টির তরঙ্গমান রূপ।

সবাই মিলে তারা
পৃথিবীর বুক জুড়ে বয়ে চলা
এক অনন্ত মহাকাব্যের তিন অধ্যায়।


২০.     আসব তোমার কাছেই


আসব তোমার কাছেই
যদি তুমি খুলে দাও তোমার নীলাভ আকাশ,
যদি ছুঁয়ে দাও আমার কাঁধে
বহমান নদীর কুলকুল শব্দের স্নিগ্ধ জলছায়া।

যদি দেখাও সবুজ উপত্যকার নিঃশ্বাস,
আমি হামাগুড়ি দেব তার ঢালে,
ঝর্ণা উপচে পড়বে পুকুর-নালার গোপন স্রোতধারায়,
জলের গায়ে লেপ্টে থাকবে আমাদের দু’জনের
নামহীন বিকেলের ঘ্রাণ।

যদি নিয়ে যাও হাত ধরে
পূর্ণিমার স্বপ্ন-আলোকিত পথ ধরে কোনও নিরুদ্দেশে,
যেখানে সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে,
আর রাতের অন্ধকারে থেকে থেকে
জোনাকিরা জ্বলে ওঠে তোমার চোখের মতো।

যেখানে রাতভোর ভিজে থাকা যায়
নির্বাক শিশিরের কোমলতায়,
আর মনে হয়
বিশ্বের সব পথই শেষে এসে মেশে
তোমার কাছেই,
তোমার অনন্ত আলিঙ্গনে।


২১.       ঐশ্বর্যের দান


তোমাকে দিলাম আমার সন্ন্যাস

ঝরে-পড়া ছিন্ন পাতা, অনাস্বাদিত অপূর্ণ প্রেম,

দীর্ঘ দিনের দীনতা, আমার নিজেরই গোপন গ্লানি।

শূন্য হস্তে দাঁড়িয়ে আছি তোমার দরজায়,

যেন গোধূলির তীর্থযাত্রী

যার সবই শেষ, শুধু অভিসারের আকাঙ্ক্ষা বাকি।


তুমি দাও আমাকে সপ্তপর্ণীর সবুজ পাতা,

যার শিরার ভিতর দিয়ে দেহের নরম আলো চুইয়ে পড়ে;

দাও নীলকণ্ঠ পাখির পালক,

যাতে ছুঁয়ে দেখি তোমার গ্রীবার নীল ছায়া

সেই ছায়া ঠিক নদীর কলধ্বনির মতো

ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে বক্ষের উপত্যকায়।


দাও শুভ্র মেঘের জলকণা,

যা এসে নামে তোমার শরীরের উষ্ণ ভূখণ্ডে

যেন শীতল বর্ষার বিন্দু

শিল্পীর ক্যানভাসে সারা রাত নাচে,

বুকে, কাঁধে, উরুর ঘন সবুজ প্রান্তরে।


আমাকে দাও তোমার সৌধ,

দেহের স্থাপত্য

যেখানে বক্ররেখায় বাঁক নেয় নীরবতা,

যেখানে চোয়ালের কাছে বাঁশরির সুর,

বাহুর কাছে আয়েশী খড়ির দাগ,

আর নাভির ঠিক ওপরেই জোনাকির আলো জমা হয়।

আমি সেই সৌধে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাই

যেন কোন আদিম নগরের ভিতর

যেখানে স্তম্ভ, শীর্ষ, পর্ণশিখর

সবই কোনো মহাজাগতিক শিল্পীর মেঘ-মায়া স্পর্শ।


দাও আমাকে নিস্তব্ধতা,

তোমার শ্বাসের আড়ালে থাকা সেই সুবর্ণ নীরব আলো;

দাও অমরত্ব

তোমার উরুর ধার বেয়ে নেমে আসা উষ্ণ রেশে;

দাও মর্মরিত বেদনা,

যখন হাত ছুঁয়ে যায় তোমার কাঁধের কোণে,

গোপন কাঁপন বাজে তোমার অস্থিমজ্জায়।


আর দাও সেই ঘন আকুল নিঃশ্বাস

যা আমার শরীরের উপরে

জোছনার মতো পড়ে গভীর নরমতায়।


আমি তখন তোমার সামনে অগ্নিশিখার মতো উন্মুক্ত,

তুমি আমার সামনে দেবযানীর মতো গাঢ়

একা তুমি আর আমি,

আর আমাদের শরীরের স্থাপত্য,

যার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি রেখা

একেকটি আদিম শিল্প,

একেকটি পূজা,

একেকটি অনন্ত সৃষ্টি।


২২.      অচ্ছ্যুত ছোঁয়া 


যে রমণীটি আমার নয়,
সে যদি হঠাৎ নিঃশব্দে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়,
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তাপ জেগে ওঠে,
যেন নিষিদ্ধ বনের ভিতর প্রথমবার পদচিহ্ন রাখলাম আমি।

যে শরীর ছুঁইতে চাই না,
তা যদি নিজেই এসে ছুঁয়ে দেয় নিশ্বাসের গোপন ঘরে,
তবে কি তা পাপ,
নাকি দেবতার হাতে খোদাই করা কোনও গুপ্ত পূজার আয়োজন?
হাত বাড়ালেই আগুনের মতো শিহরণ,
তবু হাত সরাতেই জমে ওঠে বরফের দাহ,
কাছে পেলে তৃষ্ণা বাড়ে, দূরে গেলে বিষাদ নামে।

মন তখন অদ্ভুত এক ভাসমান নৌকা,
তটের কাছে গিয়ে আবার ভেসে যায় অচেনা স্রোতে।
ছুঁইতে চাই না
কিন্তু তার ছায়া, তার উষ্ণতা, তার শ্বাসের নরম ছোঁয়া
আমাকে বারবার টেনে আনে এক অনিবার্য জোয়ারে।

এ কি কেবল মুহূর্তের আবেশ?
নাকি শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম কোনও উপাসনা?
না কি এ এক অচিন্ত্য প্রেম
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় অনির্বচনীয় আকুলতা?

অচ্ছূত সেই রমণী
প্রতিবার যখন আমার কাছে ফিরে আসে,
তার চোখে অগ্নি, গলায় ঝড়,
আর আমার কাছে সে হয়ে ওঠে
স্পর্শে জন্মানো সন্ধ্যাতারার দেবী।


২৩.       সঞ্চারিণী তুমি


এই নীল আকাশ কেঁপে ওঠে নীরব সম্মোহনে,
অরণ্যের আদিম ছায়া দোল খেয়ে বলে
তুমি চির প্রণয়ীতমা,
প্রকৃতির শ্যামল বুকের গোপন সুরভি।

সাগরের ফেনায়িত গভীর গর্জন
বুকে তুলে আনে অনন্ত প্রত্যয়
শত ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে উচ্চারণ করে,
তুমি চির স্বরূপা, তুমি জলের গানের বেদনা ও বীণার সুর।

ধরিত্রীতে বয়ে যাওয়া প্রতিটি বাতাস
মৃদুমন্দ স্পর্শে উচ্চারণ করে
তুমি আনন্দময়ী, তুমি শাশ্বত অস্তিত্বের দীপ্ত নক্ষত্র।

বিশ্বলোকের এক ঝাঁক শুকপাখি
অসীম নীলের তীরে উড়ে যেতে যেতে
গেয়ে যায় নির্মল সুখের গান
আর সেই গানের চিত্রিত অন্তরা তুমি,
তুমিই তার লুকানো রাগিণী, তার অরূপ মাধুর্য।

তুমি সঞ্চারিণী
সমস্ত সুরের ভিতর ছড়িয়ে থাকা
অলৌকিক এক কম্পন,
আকাশ থেকে অরণ্য,
সাগর থেকে স্বর্গলোক অবধি
তোমার নামেই বাজে পৃথিবীর সব সংগীত।


২৪.        নীলাভ অবকাশ 


নীলাভ এক অবকাশে কখনো এমন সময় আসে-

ভালোবাসা হঠাৎই উন্মাতাল হয়ে ওঠে,

তোমার নরম বুকের উপত্যকায় আমি রেখে দিই
দুই চোখের সমস্ত নিবেদন,
যেন দু’টি ভিজে পাখি আশ্রয় চায় সন্ধ্যার নীরবতায়।

মদিরার মতো ঘন, অচেনা এক গন্ধ
তোমার শরীর থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে
জড়িয়ে ধরে আমার সমস্ত অনুভব।
তখন স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়
ভঙ্গুর কাঁচের মতো কাঁপতে কাঁপতে,
তবুও সেই স্বপ্নের টুকরোতেই
আমরা খুঁজে পাই এক গোপন দীপ্তি।

শরীর থেকে শরীরে হতে থাকে
অজস্র অস্বীকৃত লেনদেন
কোনও হিসাব নেই, কোনও খতিয়ান নেই,
শুধুই দু’জনার দূরন্ত আকাঙ্ক্ষার
উন্মুক্ত দেবদারু-ছায়া।

চাওয়া-পাওয়া মিলেমিশে যায়
এক অনন্ত পূর্ণতায়,
যেন দিগন্তে জেগে ওঠা
অগ্নিবর্ণ সূর্যের মতো।

এভাবেই, দেহের গভীরতম গোপনে
নিশ্চুপে গড়ে ওঠে
এক প্রগাঢ় আলোড়ন
যার কম্পন ছড়িয়ে পড়ে
আমাদের নশ্বর পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে
অসীম আলোর ভুবনে।


২৫.       প্রেমোৎসব


তুমি নও কোনো স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর দুরন্ত ছায়া,

তুমি প্রেম-অর্চনার দেবী

গ্রীষ্মদহনে মেঘমালা যেমন আকুল,

আমি তেমনই তোমার সোহাগ-শীতলে আশ্রয় খুঁজি।


আমিও চাইলে স্ত্রৈণ নই,

তুমিও পারোনি কখনো স্বৈরিণীর মুখোশ পরতে;

কারণ আমরা যে দু’জন

প্রেমবুভূক্ষু যুগল, জন্মেছি একই অগ্নিতৃতীয়ার আলোয়।


যেন হেমন্ত-সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায়

নাগেশ্বরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে,

তেমনি আমাদের দেহে দেহে ওঠে উৎসবের ঢেউ

সেখানে নেই নিষেধ, নেই পৃথক কোনো স্বর্গ-নরক,

শুধুই স্পর্শের রাজ্য, নিশ্বাসের মন্দ্র প্রতিধ্বনি,

শুধুই প্রেম

যে প্রেম দেহকে শুচি করে, নরককে পরিণত করে স্বর্গোদ্যানে।


২৬.      অগ্নিসংযোগে প্রেম


তুমি নও স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর প্রলুব্ধ ছায়া

তুমি সেই মৌলিক নারী,

যার দৃষ্টির এক বিন্দুতে শ্যামঘন মেঘের গর্ভে

বিদ্যুৎ জন্মায়,

যার পদধ্বনিতে কুসুমিত হয় নিষ্প্রাণ অরণ্য।


আমি চাইলে শক্ত; তুমি চাইলে কোমল

তবু আমাদের কারও নাম নেই,

কারণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে

আমরা এক প্রবল অগ্নিশিখা,

যেখানে দেহের ভাষা ঢেউ হয়ে ওঠে

আর আত্মা কেঁপে ওঠে তার সঙ্গীতে।


তোমার গ্রীবায় ঝুলে থাকা নিশ্বাস

আমাকে আছড়ে ফেলে নীললোহিত ধ্যানের গভীরে,

যেখানে তোমার ত্বকের গোধূলিচ্ছায়ায়

জ্বলে ওঠে প্রজ্জ্বলিত সন্ধ্যারা।

তোমার চোখে তখন কামনামেঘ

তাহার নিচে ঝরে পড়ে তপ্ত নীরবতার বৃষ্টি।


আমার বক্ষের উপত্যকায় তুমি

বিজলির রেখার মতো জেগে ওঠো

একবার ডানায় আগুন,

একবার ঠোঁটে শীতের শিশির,

আর মাঝখানে অচিন এক দেবীর হাসি।


স্বর্গ নাকি নরক?

ওসব তুচ্ছ বিভাজন

আমরা যখন মিলিত হই হৃদয়ের গহ্বর-দীঘিতে,

সেখানে ইন্দ্রও নাম লেখায়,

যমও ফিরে তাকায় বিস্ময়ে।


কারণ আমাদের প্রেম

অগ্নিযজ্ঞে উত্থিত ধূপের মতো,

দেহে দেহে দুলে ওঠা মদির অর্ধচন্দ্রের মতো,

এক আদিম, অনন্ত, নিশ্বাস-উৎসব;

যেখানে তুমি দাও আলো,

আমি দিই জ্যোৎস্নার পথ,

আর দু’জনে মিলে সৃষ্টি করি

এক অচঞ্চল, অচিন্ত্য, অগ্নি-রূপী প্রেমলোক।


২৭.        প্রেমাগ্নির গুপ্তলোক


তুমি নও কোনো স্বৈরিণীর তীব্র ছায়া,

তুমি নও ময়ুরাক্ষীর উন্মত্ত ক্ষুধাও

তুমি সেই অরণ্যদেবী,

যার গোপন তমসায় প্রথম আলো জন্মায়,

যার নিঃশ্বাসে বুনো হাওয়া দিক পরিবর্তন করে,

যার কোমল শিরায় বয়ে চলে

অচিন আম্রবনের মধুর অন্ধকার।


আমি চাইলে কঠোর, তুমি চাইলে লাজুক,

তবু দেখো, এই পরিচয়ও টিকে না,

কারণ আমাদের মিলন কোনো নামে বাঁধা পড়ে না,

তা হলো বনের নিদাঘের মতো,

যেখানে দুই বৃষ্টি-দেবতা

গোপনে অগ্নিকে আলিঙ্গন করে।


তোমার চুলের আঁধারে যে গন্ধ,

তা দীপশিখার কুণ্ডলি তোলে আমার বুকে,

একবার শীতল ধূপ,

একবার অগ্নিমেঘ,

আর তার মাঝখানে হঠাৎ

তোমার চোখ

যেন ক্ষুদ্র দুই যজ্ঞকুণ্ড,

আমি যার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে

হই বিলীন, হই বারবার জন্ম।


তোমার ত্বকের কান্তিধূসর ঢেউ

আমার হাতের ছায়ায় কেঁপে ওঠে

আমি শুনতে পাই

দূর কোনো প্রাচীন মন্দিরের ঢাক,

তার গম্ভীর রেশ এসে নামে

তোমার কণ্ঠগাত্রে,

তুমি তখন কেবল নারী নও

তুমি আদিম উৎসর্গ,

যেখানে প্রেমেরই পুরোহিত আমি।


আমরা যখন কাছে যাই,

বায়ু থমকে দাঁড়ায়

রাত্রির কালো বেণী লুটিয়ে থাকে মাটিতে,

দূরে কোনো নক্ষত্র

অর্ধেক অন্ধকার হয়ে যায় আমাদের তাপ টেনে,

আর স্বর্গ-নরকের সীমা ভেঙে

এক নতুন অগ্নিপথ খোলে।


সেই পথে আমরা দুই দেহ নয়

দুই প্রাচীন শক্তি,

যারা স্পর্শের ভেতর দিয়ে

তৈরি করে এক আলো-অন্ধকারের পৃথিবী,

যেখানে তোমার ঠোঁটে আছে রাত্রির ধূপ-গন্ধ,

আর আমার বুকের ভিতর

জ্বলে উঠে সৃষ্টি হয়

এক নতুন যুগ, এক নতুন রস,

এক অগ্নিদেবতার আশীর্বাদে গড়া

অতল প্রেমলোক।


২৮.       হে পুণ্যশীলা


কত শত যুগের কালনাগ ছুঁয়েছে তোমার শরীর,
তবুও শ্বেত কমলের পাপড়িগুলো নীল হয়ে ওঠে
তীব্র উত্তাপে, ঘামজলে রং বদলায় তোমার শাড়ি,
মেঘলা গোধূলির মতো গাঢ়, আবার ঝড়ের পর স্নিগ্ধ।

কপাট খুললেই দেখি প্রথম আদিম প্রান্তর,
মুগ্ধতার নিঃশ্বাসে কেঁপে ওঠে লতাগুল্ম,
তরঙ্গায়িত রুপালি জল গড়িয়ে পড়ে
তোমার উপত্যকার গভীর নীল নদী থেকে।
লাজুক আলোয় তোমার সেই প্রান্তর
পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টির মতো সজীব হয়ে ওঠে।

তুমি লজ্জার স্রোতে সাঁতার কাটো, ঈর্ষার জলে ডুব দাও,
একেকটি ঢেউয়ে হারিয়ে ফেলো পরিধেয় অলঙ্কার,
অবেলায় খুলে রাখো পৃথিবীর সব ভার—
নিরাভরণ হয়ে ওঠো নবজাত ভোরের মতো নির্মল,
আদিম, অস্পর্শ, অচিন্ত্যরূপা।

আমি তখন তোমার অস্তনদীর জলে নামি ধীরে,
সেও এক পবিত্র গহ্বর
যেখানে জল গাঢ়, আলো নরম, বাতাস উদ্দাম।
আমি অবগাহন করি তোমার নরম ঢেউয়ে,
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ বাষ্পে ধুয়ে যায় আমার পাপ,
অন্তর শুষে নেয় স্রোতের শুদ্ধতা।
আমি ক্রমে পুণ্যবাণ হয়ে উঠি
তোমার দেহধারার পবিত্র স্নিগ্ধতায়—

হে পুণ্যশীলা,
তোমার আদিম জলে ডুবে জন্মাই আমি আবার,
নতুন, অনাবৃত, অনন্তের মতো পবিত্র।


২৯.         অমৃত না–মেলা প্রেম

হাতের রেখায় যতটা উষ্ণতা ছিল
সবই ঢেলে দিলাম তোমার দিকে,
তবু কেন জানি অমৃতভরা সেই সুধাপাত্র
কখনো পূর্ণ হলো না।

সময়ের গায়ে গায়ে জমে ওঠা নীরবতা
ভেঙে তুমি একদিন চলে গেলে দূরে,
হৃদয়ের দ্বার তখনও ছিল খোলা—
তুমি শুধু তাকাও, এই আশায়।

বৃষ্টিভেজা রাত্রির মতো
তোমার স্মৃতি আজও ছুঁয়ে যায়,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো আমি
অল্প আলোয় এখনও তোমাকেই খুঁজি।

ভুলে যেতে চাই, পারি না
হৃদয়ের গভীরতম কুঠুরিতে
তোমার নাম লেখা আছে কাঁটার অক্ষরে;
বেদনাতেও এক অদ্ভুত মাধুর্য জ্বলে।

জানি, একদিন তুমি আর ফিরবে না,
তবু হৃদয় তার আপন নিয়মে
আজও তোমার জন্যই ঢেউ তোলে
অমৃত না–মেলা প্রেমের সাগর হয়ে।


৩০.        রহস্যময় প্রকোষ্ঠ


নারীর শরীর
রহস্যময় এক প্রকোষ্ঠ,
আলো আর অন্ধকারের যুগল নিবাস,
যেখানে দরজা খুললেই
কেউ জেগে ওঠে সৌরালোকে,
কেউ আবার তলিয়ে যায়
অদৃশ্য গভীরের ছায়ায়।

একজন রমণী
জীবনের সব বিষাক্ত তোলপাড়
নিঙড়ে দেয় শহরের আবছায়া স্তম্ভে,
অঙ্কন করে নীরব চিত্র
যেখানে তার আত্মা
শান্তির জন্য ডাকে
নিজের অন্তরতম অবচেতনে।

শহরের বৃষ্টিসন্ধ্যা যখন নেমে আসে,
তার দেহ ভিজে ওঠে অবলীলায়,
ধরে রাখে সেই পুরুষকে
যার কাছে বিশ্ব কোনো একদিন
ঋণী হয়ে থাকে নিঃশব্দে
যে ঋণ ফেরত দেয়
দু’টি দেহের মিলনে।

সব সঙ্গমে আনন্দ জন্মায় না,
কিছু মুহূর্তে জন্ম নেয় জীবন
সেই জীবন সে উৎসর্গ করে
মাত্র একজনকেই,
যার কাছে সে পেখম মেলে
ময়ূরের সুধামাখা ভঙ্গিতে।

অন্যদের কাছে সে শুধু প্রাণহীন প্রতিমা
নিঃশব্দ, নিরাবেগ, অস্পর্শ্য এক মূর্তি।


৩১.      অন্তঃসলিলা মিলনরাগ


তুমি শুধু একবার খুলে দাও হৃদয়ের গোপন কপাট,
এই উচ্ছ্বল যুবকের সামনে আর বন্ধ কোরো না কোনো দরজা।
লজ্জার অবগুন্ঠনটুকু সরিয়ে ফেলো
দেখো, আলো কেমন নেমে আসে তোমার চোখে,
আমার শ্বাসে কেমন জন্ম নেয় নতুন সব উচ্চারণ।

তোমাকে শেখাবো ভালোবাসা কী—
ভাঙা আর গড়ার অনন্ত কারুকাজ,
শরীরের নিখুঁত শিল্প, আবেগের গভীর নকশা
যেখানে সব তছনছ হয়ে আবারও জন্ম নেয়
নতুন এক সৃষ্টির রূপে।

আমি হাঁটু মুড়ে দু’হাতে ছুঁতে চাই
তোমার সঞ্চিত স্মৃতির স্বর্ণরেণু,
যে সব মণিমুক্তা তুমি আজও বুকের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছো,
যে যন্ত্রণাগুলো তোমার ভেতর নরম আলো হয়ে জ্বলে
সেগুলোকে আজ মুক্তি দাও, রাখো আমার বুকে।

এসো, মাথা রাখো এই উন্মূল যুবকের হৃদস্পন্দনে,
অকাতরে বিলিয়ে দাও তোমার সব মণিকাঞ্চন,
তোমার অলৌকিক স্নিগ্ধতা, তোমার নিশ্বাসের ভোর।

আমরা মিলব নদীর মতো
শিরায় শিরায়, স্রোতে স্রোতে,
অন্তঃশীল ধারার অনির্বাণ রূপে।
আমরা ভেসে ভেসে তুলে আনব
অলক্তমাখা পদ্ম-কুসুম,
যেখানে দেহ জল হয়, হৃদয় হয়ে যায় নীরব ঢেউ,
আর ভালোবাসা রূপ নেয়
অমোঘ, আদিযৌবনের কোনও প্রাচীন মন্ত্রে।


৩২.       এসো দু’জনে


হাতখানি বাড়িয়ে দাও
চুড়ির রিনঝিন সুরে আজ যেন অর্ধচন্দ্র দোলে,
মেহেদির গাঢ় রং তোমার আঙুলে গোপন মাধুরী লিখে রেখেছে;
এসো, সে হাতেই আমি অঙ্গুরীর চিরন্তন দীপ্তি পরিয়ে দিই।

মাথাটি ঝুঁকিয়ে দাও
কুচবরণ কেশে তুমি বেঁধেছ রাজকুমারীর নীল খোঁপা,
তার ভাঁজে লুকিয়ে আছে স্বপ্নের কুয়াশা;
এসো, সে খোঁপায় আমি রক্তগোলাপের রেশমি সুবাস ছুঁইয়ে দিই।

মুখখানি তুলো
কপালে পরা টিপে জ্বলে থাকে সন্ধ্যাতারার আলো,
চোখের কাজলে গভীর রাতের নরম ছায়া;
এসো, সে মুখে লোধ্ররেণুর লাজুক কোমলতা মেখে দিই।

কোমরটি এগিয়ে দাও
মোঘল নর্তকী আনারকলির বিছা জ্বলছে রেশম অগ্নিশিখায়,
তার দোলায় দেহের চিত্রল খেয়াল ফুটে ওঠে;
এসো, নাভীপদ্মে চারুকলার নক্ষত্ররেখা এঁকে দিই।

পা দুটি বাড়িয়ে দাও
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো পদধ্বনি বাজে তোমার পায়ে,
আলতার আঁচলে ফুটে থাকে রক্তিম ভোরের লাবণ্য;
এসো, সে পায়ে নুপুর জড়িয়ে দিই নীরব রাতের সুরমালা।

বুকখানি কাছে আনো
আতরের গন্ধ, চন্দনের ধূপ, আর অদৃশ্য পূর্ণিমা-মলয়
তোমার বুকে আজ সমুদ্রের ন্যায় ধ্বনি তোলে;
এসো, সে বুকখানি আমি আলিঙ্গনে বন্ধন দিই,
শান্তির মতো, প্রেমের মতো, চিরন্তন নিবিড়তায়।

ভালোবাসা ভরিয়ে দাও
পূর্ণিমার আলোয় আজ চারিধার উন্মুখ, সমর্পিত, জাগ্রত;
এসো দু’জনে এই নিশীথে
প্রেমের ফল্গুধারা বইয়ে দিই
নক্ষত্রের নীচে, বাতাসের সুরে, নিঃশব্দ আকাশের বুকে।


৩৩.       ম্রিয়মাণ হেমন্ত সন্ধ্যা


কী এক মায়বী শব্দের ধ্বনি  ভেসে এলো, বন্ধু

তোমার সেই ম্রিয়মান সন্ধ্যার স্মৃতিরা যেন আজও বাতাস ছুঁয়ে যায়।

স্বপ্নের সারথিরা যে গভীর অন্ধকারে তোমায় নামিয়ে দিয়েছিল,

সেখানে অলীক মাছেরা, অদৃশ্য শোক, আর না-পাওয়ার আলো জ্বলে ছিল

তার সবটাই অনুভব করলাম তোমার শব্দে।

তুমি যে বেদনার রৌদ্রোজ্জ্বল সকালটির নাম খুঁজে পাওনি,

সেই নামহীন নগ্নতার মধ্যে

আমি দেখলাম তোমার আত্মার নিরাবরণ সাদা চিঠি

যা উড়ে গেল নীল আকাশ ছুঁয়ে,

যমুনা পারের বন্ধুর কাছে।

বন্ধু, তোমার সেই ‘কবি-পাগল’ মনটাকে

হেমন্তের ম্রিয়মান আলোয় ভালোবাসার যে হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল,

তা আজও জ্বলজ্বল করে ওঠে শব্দের ভিতরে।

লাশকাটা ঘরের নিঃসঙ্গতা ভেদ করে

যে প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়েছিল,

তারা এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে তোমার স্বপ্নের রং,

আর সেই রঙেই তোমার কথার বিপরীতে লিখছি আমি।

বন্ধু, তোমার বেদনার ভিতরে যে আলো লুকানো,

আমি সেই আলোরই পাশে বসে আছি

নির্জন হেমন্তের সন্ধ্যা জুড়ে

তোমার শব্দের মায়া ছুঁয়ে।


৩৪.       চন্দনে চন্দনে 


শাড়ির আঁচলটুকু আধখানা মুখে রেখে
যেভাবে তুমি দাঁড়িয়েছিলে রাতের নির্জনা ভেদ করে
সেই রাত ভোর হয়েছিল বুনো চন্দনের গাঢ় গন্ধে,
যেন তোমার ত্বকেই জন্ম নিয়েছিল সুগন্ধের প্রথম আভা।
তার আগের রাত- কোজাগরীর পূর্ণিমা ভিজে উঠেছিল
তোমার চোখের জ্যোৎস্নার মতো দীপ্ত সুধায়।

তুমি এমনই,
মায়ায়, মদিরায়, অচেনা এক আকর্ষণে ভরা
যে আকর্ষণের নেশায় আমি
অগণিত রাত বসে থেকেছি নিঃশব্দে,
বুকে মেখে নিয়েছি চন্দনের কুহক আর
গভীর নিশীথে ভাসিয়ে দিয়েছি জ্যোৎস্নার নরম ঢেউ।

আজ তুমি এত কাছে
আমার নিঃশ্বাসের বাঁকে বাঁকে মিশে আছো,
তোমার ত্বকে ছড়িয়ে আছে চন্দনের নরম উত্তাপ,
তোমার দেহভরা আলোয় ঝরে পড়ছে পূর্ণিমার স্বর্ণধারা।
চন্দনে চন্দনে, জ্যোৎস্নায় জ্যোৎস্নায়—
তুমি আর আমি একাকার হয়ে আছি,
তারারাও যেন থমকে আছে আমাদের গোপন নীরবতার সামনে।


৩৫.        ধবলতুষারের নিশীথরাগ


সারারাত তোমার শরীরের উষ্ণতা
জ্বলতে ছিল আমার বুকে
সকালে দেখি তুমি নেই,
শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ভেসে আসে
ধবলতুষারের কুচি,
যেন তোমার ছোঁয়ার শীতল স্মৃতি।

কখন যে ভেঙে গিয়েছিল
আমাদের জোড়া-শরীরের মায়াবী বাঁধ,
কখন যে তরঙ্গ উঠে
ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দুই দেহকে
মনে নেই, কিছুই নেই,
শুধু ভেজা চাদরে তোমার আঙুলের দাগ,
উন্মাতাল নিশ্বাসের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।

রাতের গভীরে তুমি ছিলে
এক উষ্ণ আদিম ঝড়
আমার বুকে ঝরে পড়েছিলে
জ্যোৎস্নার মতো,
চুলে লেগে ছিল তোমার কামরসের গন্ধ,
শরীরের প্রতিটি কোণে
তোমার উত্তাপের স্বাক্ষর।

সকালের বিমুগ্ধ আলোয়
আমি শুধু ভাবি
রাতের সেই বুনো উচ্ছ্বাসে
তুমি কি সত্যিই ছিলে,
নাকি তুমি
ধবলতুষার গলে তৈরি হওয়া
এক ক্ষণিক উষ্ণ অলৌকিকতা?


৩৬.        অগ্নিশিখার গোপন রাত্রি


তোমার দেহে যখন গোধূলি নামে,
আমি দেখি
মধ্যরাত্রির গোপন বাগান
ধীরে ধীরে খুলে যায় অবিমিশ্র আলোয়।

শিহরণে কেঁপে ওঠা ত্বক
জ্যোৎস্নার মতো গলে আসে আঙুলের উপর,
তোমার কেশে লুকানো সুগন্ধ
হঠাৎ উন্মোচিত হয় বজ্রনিশির নিস্তব্ধতায়।

তুমি কাছে এলে,
দূরাগত নদী গর্জে ওঠে নিশ্বাসের তালে,
জলরেখার মতো বাঁক নেয় তোমার গ্রীবা,
চোখে জমাট বাঁধে
অদৃশ্য অগ্নিশিখা
যেখানে আমার ছায়া ছুঁয়ে যায় তোমার তৃষ্ণার তটরেখা।

প্রেম তখন ক্ষুধার রূপ ধরে,
শরীর তখন মন্দিরের দরজার মতো
ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার আগুনজড়ানো রহস্য।

আমি তোমাকে ছুঁই না
তুমি নিজেই হয়ে ওঠো সংবেদনার আকাশ,
আমি শুধু হাওয়া,
যার স্পর্শে কম্পিত হয়
তারুণ্যের লতা,
রাত্রির পর্দা,
এবং তোমার সমগ্র দেহের দীপ্ত অতল।

এই মিলনের অগ্নিবীজে
আমরা দু’জনেই
এক নতুন ভোরের জন্ম দিই
যেখানে কাম আর প্রেম
একই শিখায় জ্বলে,
একই ছায়ায় নিভে যায়,
আবার জ্বলে ওঠে।


৩৭.     অগ্নিজ হিমালয়ের নিচে


রাত্রি যখন রক্তিম ছাই হয়ে ওঠে,
তোমার দেহ তখন জ্বালামুখ
এক অনন্ত আগ্নেয় প্রান্তর
যেখানে আমার ছায়া পড়তেই
ধোঁয়ায় ভরে যায়
তারুণ্যের জ্বলে-পোড়া বাতাস।

তোমার শ্বাস
ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে আমার বুকে,
আমি শুনি দগ্ধ লতার আর্ত শব্দ,
শোনাই জ্বলে ওঠা রক্তের নাচন।

তোমার গ্রীবা বাঁকে যেন বজ্রপাতের আগে
আকাশের শেষ সঙ্কোচ,
তারপর হঠাৎফেটে যায় নীরবতার খোলস,
আমাদের উভয়ের ভিতরের দাহ
এক হয়ে ওঠে উন্মাদ নদীর স্রোতে।

তুমি যখন চোখ বন্ধ করো,
পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যায়,
কিন্তু সেই অন্ধকারেই
আমাদের মিলিত উত্তাপ
পাহাড়ের হৃদয়ে সঞ্চিত
লাল লাভার মতো
ফেটে ফেটে ওঠে।

দেহ তখন সীমানাহীন
স্পন্দনের ঢেউয়ে ঢাকা পড়ে
সমস্ত লজ্জা, সমস্ত প্রতিরোধ।

অতঃপর আমরা দুটি জ্বলন্ত ধূমকেতু,
কক্ষপথ ভেঙে
আছড়ে পড়ি পরস্পরের জীবনে,
ফুটে ওঠে এক নির্জন অগ্নিবৃক্ষ
যার পাতায় ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে
অবদমিত কামনা,
এবং শেকড়ে জমে থাকে আমাদের স্পন্দিত রাত্রির গভীরতম নীরব উত্তাপ।


৩৮.        জামতৈলের নির্জন কুটীরে


কত পথের ধুলো মেখে হেঁটেছি,
বাতাসের কাছে রেখে গেছি দীর্ঘশ্বাস,
শূন্য খেয়াঘাটে রাত কাটিয়েছি
অচেনা তারার সঙ্গে কথাবার্তায়।

কত বন্দর, কত জনপদ,
সবাই যেন ক্ষণিক ছায়া,
সবাই যেন চলে যায় হাতছাড়া হয়ে,
কিন্তু হৃদয়ের সেই একটিমাত্র সুর
কোথাও মিলেনা, কোনো কোলাহলেই না।

তবু খুঁজে গেছি…
শহরের ভিড়ে, নদীর কূলে,
ঝড়ের ভিতর, নীরব দুপুরে,
অন্ধকারে চোখ রেখে
জ্বলে ওঠা কোনো সঙ্গী-আলোর সন্ধানে।

অবশেষে পেলাম,
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে,
এক নির্জন, শ্রান্ত, শান্ত কুটীরে;
বাতাসে ছিলো ধানের গন্ধ,
বারান্দায় শুকাচ্ছিল রোদ্দুরের নীরবতা,
আর তুমি
আমার হারানো সকল পথ
এক ক্ষণে ফিরে এনে
দাঁড়িয়েছিলে দুয়ারের সামনে।

সেদিন বুঝলাম,
যাকে এতকাল খুঁজেছি
সে আসলে কোনো দূরের অলৌকিকতা নয়,
বরং এক নিভৃত ঘরের কোমল আলো,
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক নিঃশব্দ উপস্থিতি,
যার কাছে পৌঁছে গেলে
সব পথের কষ্ট, সব ঘুরে বেড়ানো,
অবশেষে পায় তার অর্থ।


৩৯.       জামতৈলের নির্জন কুটীরে 


কত পথ হেঁটেছি
জলধারায় ভেজা মাটি, পুড়ে যাওয়া দুপুরের তাপ,
রাতের বুকে কালো ঝিঁঝিঁর শব্দ
সবই যেন আমাকে ঠেলে নিয়ে গেছে
কোনো অজ্ঞাত গন্তব্যের দিকে।

কত প্রান্তর
পদচিহ্নহীন, ছায়াহীন,
যেখানে বাতাসও কখনো
আমার নাম উচ্চারণ করেনি;
তবু আমি হেঁটেছি,
কারণ হৃদয়ের ভিতর
একটি অপরূপ আকুলতা
চিরকাল বলেছে
“আরও একটু এগোও…
ওপাশেই কেউ অপেক্ষায় আছে।”

কত বন্দর, কত লোকালয়
মানুষ এসেছে, মানুষ গেছে,
জোয়ার-ভাটা স্রোতের মতো
সব ভালোবাসা এসেছে দূরে মিলিয়ে গেছে।
আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি
অন্তরের গহীন গৃহে
এক আলোর প্রতীক্ষায়।

অন্ধকারেও চোখ রেখে
যাকে খুঁজেছি এতকাল
সে যে কোনো মুখ ছিল না,
সে ছিল এক উচ্চারিত না হওয়া নাম,
এক অচিহ্নিত স্পর্শ,
এক অদেখা অথচ অনুভূত সঙ্গ।

অবশেষে পেলাম
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে
এক নির্জন শ্রান্ত শান্ত কুটীরে।

সেদিন সন্ধ্যা নেমেছিল ধীরে,
কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরেছিল কাশফুলের ডগা,
রেললাইনে জমে ছিল বহুদিনের বেদনা
তার মধ্যেই তুমি এসে দাঁড়ালে
দু’হাত ভরে অথচ নিস্তব্ধ আলো হয়ে।

তোমার চোখে তখন
দুপুরের ধানক্ষেতের মতো শান্ত সবুজ,
শ্বাসে ছিলো নদীর স্নিগ্ধ সুর,
কণ্ঠে ছিলো অব্যক্ত অথচ পূর্ণ কোনো ডাক।

তোমাকে দেখে মনে হল
এই তো সেই,
এই তো সেই দীর্ঘ খোঁজা আশ্রয়,
এই তো সেই ছায়া
যার কাছে পথ-ফুরানো ক্লান্তি
ফিরে পায় নতুন অর্থ।

জামতৈলের সেই কুটিরে
আমরা বসেছিলাম পাশাপাশি
বাতাসে উড়ে যাচ্ছিল
পৃথিবীর সব ব্যর্থ যাত্রার গল্প,
আর আমাদের নীরবতার ভিতর
দু’টি হৃদয় ধীরে ধীরে
এক নদী হয়ে মিলেছিল।

তখন বুঝলাম
এতদিন যে সকল পথ, সকল প্রান্তর,
সব লুকানো কান্না, সব একাকীত্ব,
সবকিছুই আমাকে নিয়ে এসেছে
এই অল্প আলোয় ভেজা
তোমার ছোট্ট ঘরটিতে।

আর তুমি
দূরের কোনো স্বপ্ন নও,
তুমি এ পৃথিবীরই এক নিভৃত আশ্রয়,
যেখানে গেলে ক্লান্ত পথিকরা
নিজেদের হারিয়ে না ফেলে
বরং খুঁজে পায়
তাদের সত্যিকার ঘর।


৪০.       গতস্য শোচনা নাস্তি


জীবনের কত হাস্নাহেনা-সুরভি
নিভে গেছে গ্লানির গাঢ় অন্ধকারে,
কত রাত্রি, কত প্রভাত
ভেসে গেছে অশ্রুজলের অচেনা স্রোতে—
তবু সময় বলে যায় নরম স্বরে,
গতস্য শোচনা নাস্তি
যা গেছে, তার আর ফেরবার পথ নেই।

যে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে নিঃশব্দে,
তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদার কোনো মানে নেই,
কারণ আলোর মতোই ভবিষ্যৎ আসে
নিজের তাল, নিজের দোলা নিয়ে।
ঝরে যাওয়া ফুলের গন্ধও
শ্যামল মাটিতে মিশে নতুন জন্ম ডাকে
জীবন বড় বিচিত্র পুনর্জন্মের কারিগর।

তাই আজও, ক্লান্ত বুকের গভীরে
একটি শান্ত শ্বাস ভাসে
যত ক্ষত, যত হারানো সুরভি,
সবকিছু পেরিয়েও সময়ের নদী বয়ে যায়,
আর আমরা শিখি,
যা ছিল, তা ছিলই
কিন্তু যা আসছে,
তা-ই আমাদের সত্য, আমাদের ভোর।

গতস্য শোচনা নাস্তি
তবু এগিয়ে চলাই জীবনের প্রথম ধর্ম।


৪১.        প্রথম অনুভবের পথে

হাত ছুঁয়ে দেখলাম
রেখাগুলো আজও ফিসফিসিয়ে বলে পুরনো কোনো গান,
যেন সময়ের মুঠোয় আটকে থাকা
এক টুকরো চিরসবুজ স্মৃতি।

তোমার চোখের তারায়
এখনো জ্বলে ওঠে প্রথম দেখার বিস্ময়—
ঝলমলে, দীপ্ত, অচেনা আলোর মতো
যা আমাকে টেনে নিয়ে যায় নীরবতার গভীরে।

ঠোঁটের পৃষ্ঠে কাঁপন,
বুকের নিচে উতল ভালোবাসা
সবই যেন ফিরে আসে নবজন্মের ছায়াপথে,
ইচ্ছাগুলোও মায়াবদ্ধ,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
তারারা নেমে আসে ভোরের দিগন্তে।

চলো তবে,
অনাগতের পথে হাঁটতে থাকি
সেই প্রথম অনুভবের মতো,
যেখানে দু’জনার চাওয়া-পাওয়া
আলোর রেখায় বাঁধা হয়ে
নতুন ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকে।


৪২.    তুমি ভোরের চাঁপাফুল 


 তুমি ভোরের চাঁপা ফুল আর জুঁই,এত মধুর সুবাস আমি কোথায় থুই,হৃদয়ের গোপন কোষে রাখি তুলে, নিঃশব্দ ভোরের শিশিরভেজা দুলে দুলে।

তুমি দিতে চাও না কিছুই, আমি জানি,
তবু তোমার ছায়া এসে ছুঁয়ে যায় প্রাণই;
অদৃশ্য স্রোতে ভাসাও হৃদয়গীত,
স্পর্শ না ছুঁয়েও তুমি দাও উষ্ণ নীতি।

নির্বিকার থাক, সে আমি নিঃশব্দে বুঝি,
তবুও তোমার মাঝেই নিমগ্নতা খুঁজি;
তোমার মুখের লাজুক আলোর রেখা,
চোখের কোণে যেন কোন্‌ অতল দেখা।

তুমি দূরে দাঁড়ালেও কেমন এক টান,
শিউলি ভেজা বাতাসে দোলে তোমার গান;
অচেনা স্বপ্নেরা জপে তোমার নাম,
নীরব আকাশে জ্বলে প্রেমেরই চাঁদ-ধাম।

তাই বলি
তুমি থাকো, থাকো শুধু এই মায়ার মতন,
আমি তোমারই পথে ছড়িয়ে রাখব মন;
তোমার সুবাসে চলুক জীবনের ধারা,
ভোরের চাঁপাজুঁই তুমি আমার সৌরভসারা।


৪৩.        জলকাব্য 


কোন্ অচেনা মেঘের ছায়া থেকে
হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আমি জানি না
রবিকিরণ পেরিয়ে যাওয়া আলোও
আমার চোখে ধরা দেয় না কখনো।

রাতের আকাশে তারাদের দীপ্তি
সূর্যের বেপথু কিরণে
লুকিয়ে পড়ে নিঃশব্দে
ঠিক তেমনই লুকিয়ে থাকে
আমার অনুচ্চারিত প্রণয়ের ভাষা।

কখনও হঠাৎ মন আমার
বৈরাগীর মতো নির্জন হয়,
অপ্রকাশিত শিহরণের ঢেউ
অদেখা মেঘ থেকে ঝরে পড়ে
জলের মতো কোনো নদীর বুকে।

সেই নদীও হঠাৎই বিহ্বল হয়ে
আকুল স্রোতে ছুটে যায় সাগরপানে,
মেঘ তখন পরাজিত,
রবিকিরণ তরঙ্গের কোলঘেঁষে
উথলে ওঠে নূতন আলোয়।

শেষে সব জলবিন্দু
নদীর আবক্ষ গহ্বরে মিলিয়ে যায়
নিশ্চুপ, নিঃশেষ,
তবু চিরন্তন সঙ্গমের
অমলিন সুর ছড়িয়ে রেখে।


৪৪.      নিঃশব্দ পদচিহ্ন 


কাল সারারাত ছিল তারা-ভরা রাত,
আকাশ জেগে ছিল জেগে ছিল শুধু নিস্তব্ধতার বাতি।
চাঁদের গায়ে জমেছিল শীতল নীলের আবেশ,
তবু আমার চোখের উপকূলে
কেউ এসে রাখেনি স্বপ্নের হালকা স্পর্শ।

নির্জনতা যেন নিঃশব্দ পদচিহ্ন ফেলে
বসে ছিল আমার মাথার কাছে,
ঘুম আসেনি এসেছে শুধু ক্লান্তির নরম কুয়াশা।
দূরের তারা এক এক করে ডেকেছে,
বলেছে “দেখো, এ রাতও কারো জন্য জ্বলে!”
কিন্তু আমার জানালায়
কেউ খোলেনি গল্পের দরজা।

হায়, এ নির্ঘুম রাতও হলো ব্যর্থ,
স্বপ্নরাণী কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি?
কার আকাশে নক্ষত্র ছুঁতে গেলে
আমার চোখ রেখে গেলে শূন্য?

আজও ভোর হবে, আলো উঠবে ধীরে,
তবু জমে থাকা সেই আক্ষেপ
মুছে যাবে কিনা জানি না।
তোমার একটুখানি উপস্থিতি
হলে রাত জেগে থাকা কত সহজ হতো,
আর স্বপ্নহীন ঘুমগুলো
হতো তোমারই নামে লেখা একেকটি কবিতা।


৪৫.       অচেনা পদচিহ্নর মায়া 


শত বছর পরে,
নিশীথের বৃষ্টিভেজা ঘ্রাণে
জেগে উঠবে অচেনা কোনো ঝোপ,
মাটির ফোঁড়া কাটা লুকোনো কোনে
ঝিঁঝি পোকা ডাকবে নীরবতার বুক চিরে।

বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষা আঁধারে
বনমৌরির সুগন্ধ উড়ে বেড়াবে
পুরোনো কোনো গান হয়ে,
জোনাকিদের চোখে উঠবে
আলো আর আকুলতার দোল।

সেই অগোচর রাতে,
আমি ফিরে আসব অতি ক্ষুদ্র সত্তা হয়ে,
নিভৃতে ভেসে উঠব জোনাকির আঁচলে,
কিংবা ঝিঁঝি পোকার কম্পিত ডানায়।
কারো চেনা মুখ থাকবেনা হয়ত,
মাটি শুধু স্মরণ করবে অচেনা পদচিহ্নের মায়া।

তবু এই পৃথিবীতে
ফিরে আসার যে গভীর আকাঙ্ক্ষা
তার কোন নাম নেই,
শুধুই আলো হয়ে, শব্দ হয়ে,
অথবা এক বিন্দু নরম প্রাণ হয়ে
আবার জন্মাতে চাওয়া
এই অনন্ত নীল গ্রহের হৃদয়ে।


৪৬.        বিদায় বীণা 

এই যে রাত্রির বুকের ভেতর
হঠাৎই নিভে গেল তোমার পদধ্বনি
মনে হয়, ঘুমন্ত আকাশ থেকে কেউ
তারাদের গায়ে ছায়া মেখে
তোমাকে খুব ধীরে তুলে নিয়ে গেছে।

কী নিয়তি তবে এভাবে ডাকে?
কোন্ অদৃশ্য তীর্থপথে তুমি
অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে হেঁটে গেলে
আমরা শুধু শুনে রইলাম
তোমার বিষণ্ন শ্বাসের প্রতিধ্বনি।

জীবন-বীণার সুর থেমে গেছে ঠিকই,
তবু তার ছিন্ন তারে আজো
মৃদু কান্নার মতো কোথাও কাঁপে আলো।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদ
হয়তো এখনো তোমার খোঁজে জেগে থাকে।

তুমি যে রেখে গেলে অশ্রুর নীরব মেঘ,
সেই মেঘ ভিজিয়ে রাখে কত অনামা রাত।
আর আমরা, এই ধূলিমাখা পৃথিবীর মানুষ,
তোমার শূন্যতার দিকে তাকিয়ে
নিঃশব্দে উপলব্ধি করি
বিদায় কখনও শেষ নয়,
শুধু আরেক যাত্রার আরম্ভ।


৪৭.      তোমার আমার পৃথিবী 


তুমি নও
তোমার ছায়া পড়ুক আমার প্রাণে,
স্পর্শ নয়
তোমার চেয়ে থাকা তান তুলুক আমার গানে।
এখন একটু দূরেই থাকো—
এই দূরত্বেই জমে উঠুক নীরব কথার ঢেউ,
এই ফাঁকে জমে উঠুক আকুলতার নরম রোদ্দুর।

আবার একদিন বকুলঢাকা বনে হাঁটব দু’জনে,
আবার একদিন
শ্রাবণ আকাশ নীলাদ্রি হবে হৃদস্পন্দনে—
তোমার হাতের উষ্ণতায় খুলে যাবে ভুলে থাকা সব জানালা,
ঝরনার জলে কাঁপবে আমাদের অনুচ্চারিত সময়গুলো।

হয়তো সেদিন
চোখের ভেতর ভেজা আলোয় দেখব
কতদিনের না-বলা ভালোবাসা,
হয়তো সেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে
ফুটে উঠবে আমাদের একসাথে থাকা সুরের কাব্য।

এখন শুধু একটু দূরে থেকো
এই দূরত্বটুকু হোক আমাদের পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি,
যেন ফিরে আসার মুহূর্তে
তোমার আমার পুরো পৃথিবী
একটি চুম্বনের মতো নীরবে জেগে ওঠে।


৪৮.    রহস্যময় রাতের অমৃতসুধা


কোথায় সেই রহস্যময় রাত
যার অন্ধ তারায় জ্বলত আমাদেরই অচেনা নাম,
যার নিঃশ্বাসে ভেসে আসত লুকোনো কোনো পুরনো প্রতিশ্রুতি,
চোখে চোখে লেখা হতো নীরবতার গভীরতম বাণী।

কোথায় সেই হৃদয়–দুয়ার খুলে দেওয়া আশ্চর্য সন্ধ্যা,
যেখানে বাতাসও থমকে দাঁড়াত তোমার পদক্ষেপের শব্দে,
যেখানে ছায়ারা জানত আমাদের গোপন আকুলতা,
আর চাঁদের আলোয় লেপ্টে থাকত অগোচর অভিমান।

কোথায় সেই অনাস্বাদিত মখমলের সমুদ্র জল,
যার ঢেউয়ে কাঁপত শরীরের ভেতর লুকোনো সুর,
যার নোনাজলে ডুবে যেত ভয়, দুঃখ, একাকীত্ব,
শুধু জন্ম নিতো নবপ্রেমের তরঙ্গ ভারী নরম আলোয়।

কোথায় সে দাঁড়িয়ে অমৃত–সুধা পাত্র হাতে,
উল্লাসে, নিবিড় প্রার্থনায়, অধীর চোখে ডাক দিত,
“দাও ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে…”
আর আমরা দু’জন ডুবে যেতাম সেই চিরচেনা অজানায়,
যেখানে সময় থেমে থাকে, ফুলেরা নিশব্দ হয়ে শোনে,
আর আকাশের নীচে জন্ম নেয় অব্যক্ত এক প্রেমের মহারাত্রি।

সেই রাত কি এখনও আছে কোথাও—
নাকি তোমার হৃদয়েই লুকিয়ে রাখা,
নিস্তব্ধ কোনো শিরায় অনন্তের মতো?


৪৯.        স্পর্শের  কবিতা


রাতের জানালায় জ্বলে ওঠে তোমার ছায়া-

সেই ছায়াই আমার সব পাপের জন্মদাতা।

আমরা দু’জনই জানি, এই পথ বৈধ নয়,

তবু অকারণের উষ্ণতা

কেন যেন শরীরের ভেতর

জ্বলে ওঠা মোমবাতির মতো টেনে নেয়।


তোমার গলার হালকা ঢেউ

আমার শ্বাসে এসে লাগে

কানে কানে তুমি ফিসফিস করলে

আমার বুকের ভেতর

ঝড় ওঠে অস্থির বৃষ্টির।

তোমার কাঁধের মোলায়েম ঢাল

আমার আঙুলে এলে কাঁপে,


লাজুক অন্ধকারে

তোমার পিঠের উপত্যকায়

আমার দৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে

গোপন জ্যোৎস্নার মতো।

তোমার ঠোঁট

কোমল নিষিদ্ধ কোনো ফলের মতো,

ছুঁতেই মনে হয়

সারা শরীর উষ্ণ হাওয়া হয়ে উঠছে।

তুমি যখন একটুখানি ঝুঁকে

আমার বুকে হাত রাখো

মনে হয় দাহন জ্বলে উঠে

গোপনে রাখা সব অগ্নিকণা থেকে।


আমাদের মাঝে থাকে না কোনো আইন,

থাকে শুধু  নীরব চুক্তি

তোমার বুকে উঠে-নেমে যাওয়া

অচেনা ঢেউ

আমার হাতের তালুতে

প্রতিবারই নতুন অপরাধ লিখে দেয়।

এই পরকীয়া পাপ নয়,

বরং এমন এক দহন  যা নিভে গেলে

সারা দেহ শীতল হয়ে যায়।

তাই তুমি যখন রাতের গভীরে আমার দিকে আসো

তোমার আলোর মতো দেহ নিয়ে

আমি সমস্ত ভ্রম ভেঙে

তোমাকে আবার স্পর্শ করি

অন্যায় জেনেও, অবশ হয়ে।


৫০.         নিঃশ্বাসে তুমি, প্রশ্বাসে তুমি 


আমি নিঃশ্বাস নেই

তোমার শরীর থেকে ছুঁয়ে আসা উষ্ণ বাতাসে,

যেন ভোরের কুয়াশা গায়ে মেখে

নরম হয়ে ওঠে আমার প্রতিটি কোষ।


আমি প্রশ্বাস রেখে যাব

তোমার নিঃশ্বাসের অনুরণনে—

যেখানে তুমি আছো,

সেখানে ঢেউ তোলে আমার হৃদয়ের নীরব স্পন্দন।


তোমার কণ্ঠের ক্ষীণ কম্পনে

জেগে ওঠে আমার ঘাসফুলের মতো স্বপ্ন,

তোমার আঙুলের অদেখা ছোঁয়ায়

জ্বলে ওঠে শরীরজোড়া অনন্ত জ্বালাময়ী আকুলতা।


আমি তোমার নিশ্বাসে বাঁচি

যেন প্রতিটি শ্বাসই আমাদের দু’জনার

অদৃশ্য কোনো গোপন বাঁধন,

যা ছিন্ন হলেও আবার জুড়ে যায়

ভালোবাসার মায়াবী শব্দহীন স্পর্শে।


তুমি দূরে গেলে

আমি বাতাসে খুঁজি তোমার ফেরা পদধ্বনি,

তুমি পাশে এলে

আমি নিজেকে হারাই তোমার অনামিক স্নিগ্ধ গন্ধে।


হয়তো ভালোবাসা এতটুকুই

এক শ্বাস থেকে আরেক শ্বাসে

দু’জনার অদৃশ্য বিনিময়,

যেখানে আমরা নেই আলাদা

শুধুই হই একে অপরের

চিরন্তন বায়ুর মতো সঙ্গী। 

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

দাঁড়াও সময় ( কাব্যগ্রন্থ )


দাঁড়াও সময়  ( কাব্যগ্রন্থ )        

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর -২০২৫ ইং




উৎসর্গ -

মধুমতী–চন্দনা–বারাশিয়ার পলিমাটির
অববাহিকা থেকে আমার জীবনে এসে 
বন্ধুত্বের আলো জ্বেলেছিল  দুই তরুণ— 
নেয়ামুল বারী ও সিদ্দিকুজ্জামান বাহার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে
সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে গভীর মানবিকতায়
ওরা আমায় বেঁধে রেখেছিল। 

আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকা
সেই সহপাঠী দুই প্রিয়বন্ধুকেই
এই গ্রন্থটি গভীর মমতায় উৎসর্গ করলাম।



১.        লুকানো প্রেমপত্র 


চলে যাব সব ফেলে একদিন,
এই অবগুণ্ঠিত নীলাকাশের ঢেকে-রাখা স্বপ্নগুলোকে
শ্রাবণদুপুরের নোনা ভেজা হাওয়ার হাতে দিয়ে।
জলে-ভরা টইটম্বুর নদীর কাছে বলব—
"আমার না-বলা কথাগুলো বয়ে নিও ধীরে ধীরে,
যেদিকে শেষ বিকেলের রোদ সরে যায়।"

স্মৃতির বসতবাড়ির উঠোনে
ঝরে পড়বে কদম্বের সুবাসভরা নিঃশ্বাস,
খোলা দরজার ফাঁকে তুমি হয়তো
পুরোনো দিনের একটি হাসি রেখে যাবে।
আমি রেখে যাব শুধু লুকিয়ে রাখা
জীর্ণ প্রেমপত্রের হলদে পাতাগুলো—
তোমার নামের আলোয় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর।

আর রেখে যাব তোমাকে দেওয়া নাকফুল—
তার ক্ষুদ্র রূপোলি বৃত্তে জড়িয়ে আছে
সংকোচ, স্পর্শ, অচিন হাহাকার,
আর সেই প্রথম দিকের কম্পমান ভালোবাসা।

তারপর হাঁটব অচেনা পথের দিকে—
যেখানে আমার থাকবে না আমি,
থাকবে শুধু তোমাকে ভাবার
একটুখানি নীরব অনন্তকাল।


২.       অনন্ত বিচ্ছেদের আগুন

ভালোবেসে কাছে আসতে পারোনি যখন,
তখন থাক— দূরত্বই হোক চূড়ান্ত প্রমাণ।
যে পথে হাঁটেনি তোমার পদধ্বনি,
সেই পথে আজ নিঃসঙ্গতারই শপথ ধ্বনি।

বিচ্ছেদই যদি হয় অনন্তের লেখা,
তবে সেই লেখায় আমি হবো কেবল একা।
রোগে শোকে দগ্ধ হবে এই দেহখানি,
তবু রাখব না আর কোনো দায় তোমার জানি।

স্মৃতিগুলো জ্বলে যাবে ছাই হয়ে শেষে,
পোড়া পাতার মতো ঝরে পড়বে অবশেষে।
শুধু রাতঘুমে মাঝে মাঝে আসবে তুমি—
ধোঁয়া হয়ে, স্বপ্ন হয়ে, নিভে যাওয়া আলোকবিন্দু কোনো ভ্রমি।

তবু থাক— এ যন্ত্রণা আমিই বহন করি,
ভালোবেসে কাছে আসতে না পারার এ-ই মর্মপথ ভরি।
বিচ্ছেদের আগুন যদি অনন্তই হয়,
আমি তাতে হেঁটে যাব— নীরব, নির্বাক, নির্নয়।


৩.       মায়ার নদী


নদীর মতো তুমি বয়ে যাও নিঃশব্দ ধারায়,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি পাথর—নিজেকে লুকিয়ে রাখি।
সন্ধ্যার মতো তুমি মিশে যাও অচেনা আলোয়,
আমি অস্থির হাওয়ার মতো আড়মোড়া ভেঙে ডাকি।

নির্জনতার বুক জুড়ে তোমার পদচিহ্ন পড়ে,
আমি শুনি দূরের কোনো হারানো বাঁশির সুর।
অন্ধকারের মতো তুমি ঢেকে দাও সব গোপন,
আমার ভেতর দপদপ করে ওঠে আগুনের নীল নূপুর।

কোথায় যাও তুমি—কলেবরহীন ধোঁয়ার মতো?
কোথায় হারাও তুমি—স্বপ্নের ভোরের নরম আয়েশে?
আমি শুধু জানি—মায়া জড়িয়ে তুমি ফিরবে আবার,
হৃদয়ের ভেজা জানালায় বৃষ্টির মতো এসে।


৪.       নিষ্কলুষ হাতের স্বপ্ন


গতরাতের নিস্তব্ধতায়
হঠাৎই ঘুম ভেঙে দেখি—
তোমার নিষ্কলুষ একজোড়া হাত
নরম বাতাসের মতো
আমার বুক ছুঁয়ে আছে।

এটাই তোমার গুপ্ত বার্তা,
এটাই তোমার অস্তিত্বের সতর্ক ছোঁয়া—
যেন ভুলে না যাই
তোমার নিকটতার আলোয় আমি জন্মাই প্রতিদিন।

কোনোদিন, কোনো বিদায়ের ক্ষণে
যদি তোমার দুই হাত
আমার কাছে পৌঁছাতে না পারে আর,
যদি স্পর্শের সেতুটি ভেঙে যায়—

তবে তুমি নিঃশব্দে দারজা লাগিয়ে
দূরে চলে যেয়ো,
আমার অশ্রুর ভেজা আয়নায়
তোমার মুখের কোনো ছায়া
ফেলে না গিয়ে…

কারণ ছায়া থাকলে
আমি আবারও তোমাকে ডাকব,
আবারও ভুলব না
তোমার হাতের সেই নিষ্কলুষ উষ্ণতা।


৫.       হারানো আলো


ভীষণ ক্লান্তি হৃদয়ে আমার,
আত্মাও ক্ষীণ— যেন নিভু-নিভু প্রদীপ,
শীতল বাতাসে দুলে ওঠে শুধু
অপ্রকাশিত কোনো দুঃখের আলো নিয়ে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো,
দেখতে পাবে— আমি আর আগের মতো নই,
স্মৃতির নদী শুকিয়ে এসেছে অনেকটা,
নৌকার দড়িতে জড়ানো আছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে,
তাদের গন্ধে রাতের আকাশ থমকে থাকে—
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকি চাঁদের নিচে
একটি ভাঙা তটরেখার মতো নির্জন।

তুমি এলে হয়তো বাতাস জুড়ে
চুপিসারে বেজে উঠবে কোনো পুরোনো সুর,
যেন খোলা জানালায় ঢুকে
কিশোরী বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়া।

তবু জানো—
আমার ভিতরের অনল এখন অল্প,
কেবল তোমার একটি স্পর্শ
আবার জ্বালাতে পারে পুরোনো নক্ষত্র,
আবার ফিরিয়ে দিতে পারে
হারানো আলো, হারানো আমাকে।


৬.        দাঁড়িয়ে আছো


তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার চোখের পাতার খুব কাছেই—

যেন অতি সতর্ক ভোরের আলো, ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে নিস্তব্ধতার দরজা।
আমি তাকালেই দেখি, তোমার চুলে আমার দৃষ্টির ছায়া লেগে আছে;
যেন দু’জনের মাঝখানে বাতাসও আর পথ খুঁজে পায় না।

তোমার চোখের উপর তুমি রেখে দিলে তোমারই আরেক জোড়া চোখ—
এমন গভীর, এমন স্থির, এমন অনুচ্চার সৌন্দর্যে ভরা
যে সেখানে কোনো শোক নেই, কোনো বেদনার কালো ছায়া নেই,
তবুও অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ কাঁপন থরে থরে জ্বলে ওঠে।

সেই চোখের অভ্যন্তরে আমার ভালোবাসা জেগে আছে—
নিভে না যাওয়া প্রদীপের মতো,
নান্দনিক কোনো নক্ষত্রের মতো,
যে আলো নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে তোমার শিরায়, আমার নিশ্বাসে।

তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছো,
চোখের পাতার কিনারা ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের মতো,
একটি অনন্ত গদ্যকবিতা হয়ে—
যার প্রতিটি বাক্য আমি স্পর্শ করতে চাই,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে চাই,
বারবার, বারবার, যতদিন চোখে আলো থাকে।


৭.         ফেরা 


এক অস্তরাগের সন্ধ্যাবেলায়, খুব কাছে ঝুঁকে সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ নিয়েছিলাম—

হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল সেই সুবাস।

তারপর কত সন্ধ্যা অন্ধকারে ডুবে গেল,

আকাশের রক্তিম রং শুকিয়ে গেল বাতাসে,

তবু আর কোনো সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ

আমার নাকে এসে লাগেনি,

যেন সেই প্রথম সন্ধ্যাই শেষ সন্ধ্যা হয়ে রইল।

আরেকদিন চন্দ্রালোকভরা এক রাত্রি-দুপুরে

জোছনা-ভেজা কামিনীর গন্ধ গায়ে মেখেছিলাম—

সেই সুবাস যেন সাদা আলো ম্লান দুঃখ,

যেন কারও নরম নিঃশ্বাস এসে গাল ছুঁয়ে যায়।

তারপর কত জোছনা-তৃষ্ণার রাত নিঃশব্দ সরে গেল,

কামিনী আর তার স্নিগ্ধতা বিলিয়ে দেয়নি, দূরের কোনো ঘরের আঙিনায় হয়তো সে এখনও ফোটে, এখনও গন্ধ বিলায়।

তারও পরে এক অষ্টাদশীর মাথা ভরা কালো কুন্তলের গন্ধ নিয়েছিলাম, 

আর এক হেমন্ত-গোধূলির ধূসর মায়ায়

কুড়ি বছরের এক রমণীর বুকের উষ্ণতা

আমাকে  আত্মহারা করেছিল-

অষ্টাদশীর চুলের সেই গন্ধ আর রমণীর বুকের গন্ধে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি,

হয়তো ভালোবাসা এই রকমই হয়।

এইসব সুবাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে

একদিন পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম,

চেনা রাস্তা, চেনা মানুষ, চেনা ঠিকানাগুলো

হঠাৎ এক অচিন শূন্যতায় মিলিয়ে গেল।

ফেরার পথ জানতাম না,

তবু পথিকের মতো ক্লান্ত চোখে

পথের উপর বসে থেকেছি বহুদিন-

বাড়ি ফিরিনি, কেউ ডাকেনি।

আর একদিন হঠাৎ  মানিব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছিলাম—

সেই ব্যাগে ছিল প্রেমিকার পুরোনো চিঠি,

যেখানে মলিন অক্ষরে লেখা ছিল

আমার জন্য তার অপেক্ষার কথা , তার একান্ততা, তার বিরহব্যথা।

ব্যাগ হারানোর কথা শুনে সে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল চিরতরে।

তার সেই বিদায়বেলা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শোকসংগীত।

এখন প্রায়ই দেখি—পাতা ঝরে, আলো নিভে যায়, কোথায় অগোচরে সন্ধ্যা-মালতী ফোটে,

কোথায় বর্ষার রাতের গভীরে কামিনী তার গন্ধ বিলায়; অষ্টাদশীর সেই মেয়েটি জানিনা কার ঘরের বউ,

আর সেই কুড়ি বছরের রমণী  চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে তার বিগত যৌবনার গল্প বলে ,

আমি শুধু জানি, কত অপেক্ষার মৃত্যু হলো, পথ চেয়ে চেয়ে কত বসন্ত হারিয়ে গেল,

কিন্তু যাদের জন্য এ নীরব প্রতীক্ষা—

সেইসব অভিমানীরা আর কোনো পথ দিয়েই ফিরে এলো না,

কোনোদিন হয়তো ফিরবেও না আর।


৮.        পদচিহ্নের অনন্তকাল


তোমার অস্তিত্বে আমার ভালোবাসার সুবাস লাগুক,
যেন ভোরের শিশিরে নুয়ে থাকা বকুলপাতায়
অকারণ স্পর্শ নামে মৃদু স্নেহে।

তোমার পায়ের পাতার ধুলোয় থাকুক আমাদের পথচলার স্মৃতি—
যে পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে
আমরা খুঁজেছিলাম একে অপরের গভীরতম নীরবতা।

আমি চাই, আমার মমতার কোমল ছোঁয়া
তোমার দ্রোহের আগুনে শীতল হোক,
ঘৃণার কাঁটাগুলো ভিজে উঠুক স্নিগ্ধতায়—
যেন প্রেম নিজেই এসে তোমার হৃদয়ে বৃষ্টি হয়ে নামে।

আমার সমস্ত গীতিকবিতা যার নাম ধরে শ্বাস নেয়,
সেই তুমি—
আমার প্রেমের ছায়ায়, আলোয়, বর্ণে
নিতান্তই পুষ্পিত হও, পল্লবিত হও
অদ্ভুত অনন্ত কোমলতায়।

এভাবেই তুমি স্পর্শ করো আমার সমস্ত অস্তিত্ব—
প্রেমের এক গোপন নির্দেশে,
যেন জন্মান্তরে লেখা থাকে আমাদের মিলনরেখা।

আমরা একদিন থাকব না,
কিন্তু রবে ধুলোমাখা সেই পথ,
সন্ধ্যাবেলার বাতাস,
আর পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা
আমাদের গভীর, অমোচনীয় পদচিহ্ন—
অনন্তকাল।


৯.       ছায়াপথে দেখা


যে দিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে—
তার তো আর বেশি দেরি নেই,
হয়তো এই গোধূলির পরেই,
হয়তো পরের কোনো নক্ষত্রবৃষ্টির রাতে।

তোমার পায়ের ধুলো ঝরে পড়বে
দিগন্তের নীল-অন্ধকারে,
আর আমি দূর কোনো নীহারিকার সিঁড়ি বেয়ে
তোমার দিকে আসব নীরবে, নিঃশব্দে—
যেন আলো ফেরার আগে প্রথম বাতাসের স্পর্শ।

সেই অনুপম মুহূর্তে
তারারা থেমে যাবে কক্ষপথ ভুলে,
গ্রহেরা শোনবে আমাদের পদধ্বনি,
গ্যালাক্সির বুক জুড়ে জ্বলে উঠবে
অপরিচিত এক প্রেমের কম্পন।

তোমার চোখে যখন ছায়াপথের ধুলো লেগে ঝলমল করবে,
আমি চিনে নেব সেই পুরোনো আলো—
যা যুগ-যুগান্ত ধরে আমাকে ডেকে এসেছে।

যেদিন দেখা হবে,
সেদিন সব অভিমান, সব দূরত্ব,
সব না-বলা কথারা ভেসে যাবে
তারার নৌকোয় ভর করে—
শুধু আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে থাকব
অনন্তের দরোজায়,
একটি মহাজাগতিক প্রেমের প্রথম সাক্ষ্য হয়ে।

ছায়াপথের সেই দিন—
হয়তো দেরি নেই,
হয়তো এখনই নেমে আসছে
আমাদের দু’জনের পথের দিকে
একটি আলো-জ্যোৎস্না ভেজা দিগন্ত।


১০.       নিষিদ্ধ উষ্ণ রাত


নীল অন্ধকারে গোপন আলো জ্বেলে
তারা এগিয়েছিল দু’জন—
না জাত, না ধর্ম, না বয়সের কোনো সীমানা
তাদের থামাতে পারেনি।

এক-একটি দাহনময় শ্বাস
জ্বেলে তুলছিল বৈশাখের উত্তাপ—
যেন ঝড় এসে দু’টি দেহের ভেতর
খুঁজে পাচ্ছে তার অনিঃশেষ ঘর।

তাদের চোখে ছিল আগুনের ঢেউ,
হৃদয়ের ভেতর দীপ্ত স্রোত—
স্পন্দনের পর স্পন্দন
কাঁপছিল দিগন্তের মতো।

ঠোঁটের কিনারায় তখন
অতল নিষিদ্ধতার স্বাদ,
হেমলকের বিষও যেন
মধুর হয়ে উঠতে চাইত
সেই মিলনের উষ্ণ রাতে।

তারা জানত—
এ চুম্বন কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নয়,
এ এক গভীর, আদিম, অচেনা ভাষা
যেখানে শরীর শুধু অঙ্গীকার,
আর কামনা—ফেনিয়ে ওঠা নদীর জল।

তবু তারা থামেনি—
তাদের ঠোঁটের নিবিড় আলিঙ্গনে
রাতের আকাশ থমকে দাঁড়িয়েছিল,
এবং পৃথিবী বুঝেছিল—
নিষেধও কখনো কখনো
তৃপ্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্ত।


১১.       জাদুকরী সন্ধ্যার রোমাঞ্চ


এক জাদুকরী সন্ধ্যায়
সূর্য যখন রক্তিম আগুন হয়ে
দিগন্তের নীরবতায় ডুবে যাচ্ছিল,
বালুকাময় তীরে দাঁড়িয়ে তাঁরা—
দু’টি ছায়া, দু’টি স্পন্দন,
ঢেউ এসে আলতো চুমু দিচ্ছিল তাঁদের পায়ে,
যেন সমুদ্র নিজেই প্রেমের সাক্ষী।

বাতাসে লোনা গন্ধে
মিশে ছিল এক অচেনা উত্তাপ,
চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল মুখ,
আর উপরে, নীল অন্ধকারে
তারারা জ্বলছিল এমন ব্যাকুলতায়
যেন তারাও কিছু বলতে চায়।

তাঁরা হাত ধরতেই
এক অদ্ভুত কাঁপন দেহে দেহে বয়ে গেল,
হৃদয়ের গোপন কক্ষ খুলে গেল শব্দহীন—
চোখে চোখ রেখে
তিনি বললেন সেই প্রথম আলাপন,
যা হৃদয়কে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়।

তারপর ঢেউয়ের শব্দে ঢেকে
নরম স্বরে প্রতিশ্রুতি দিলেন তাঁরা—
সমুদ্র যেমন জোয়ারকে পায়,
আকাশ যেমন রাতকে জড়িয়ে ধরে,
তেমনই তাঁরা একে অপরকে
চিরকাল জড়িয়ে রাখবে মমতার উত্তাপে।

১২.      নক্ষত্র-বীথির পথে


আমার ঠিকানায় এসে
তুমি পাবে না আর—
শুধুই একটি নাম লেখা আছে
ধুলোধুসর দরজায়।

যেখানে গেছি চলে,
সেথায় কোনো পথিকেরই পৌঁছানো নয়;
কেউ পারে না থাকতে পাশে,
কেউ পারে না ডেকে নিতে ফিরে।

যে জীবন ছিল ভাঁটফুলের গন্ধে
মহুয়ার মাতাল সুরে রাঙা,
সেই জীবন ছেড়ে এবার
আমি হারিয়ে গেছি
নক্ষত্র-বীথির বিস্ময় দেশে।

সেখানে রাতেরা নীরব,
আলোয় ভাসে আমার অদেখা স্বপ্ন;
তুমি শুধু দূর থেকে
আমার নামটুকু পড়ো—
আমি আছি, অচেনা আলোর ওপারে।


১৩.       নৈশকবি


কবিতা লিখব বলে রাত জাগি—
জানলার ধারে এসে বসে নিশাচর পাখির দল,
তারারা আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে
ঝরে পড়া অক্ষরের মতো।

বাতাস আসে গোপন সুরে,
নৈঃশব্দ্যের গভীরতম গান
মনে করিয়ে দেয়—
রাতও এক অনাহত কবি।

জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে ছাতার মতো,
মুছে দেয় দিনভর ক্লান্তি,
তোমার পদধ্বনির মতো নরম প্রতিধ্বনি
অন্তর আঙিনায় বাজতে থাকে।

সকাল হলে খাতা খুলে দেখি—
না আছে কোনো শব্দ,
না আছে কোনো উপমা,
না কোনো ছন্দের রেখা।

সারা পাতা জুড়ে শুধু তোমার নাম—
যেন তুমি-ই প্রতিটি কবিতার আদি-উৎস,
যেন আমার সমগ্র রাতজাগা সৃজন
তোমার নামের দিকেই
ধারাবাহিক নক্ষত্রপতনের মতো
অবশেষে এসে থেমেছে।


১৪.       কালের দীর্ঘশ্বাস 


শত বছর পরে,
অমনই এক স্থবির বিকেলের গোধূলিতে
কারও বিষণ্ণ চোখ মেলে বসে থাকবে
এই পুরোনো বাড়ির বারান্দায়—
ক্লান্ত অফিসযাত্রী কারও পদশব্দ
ধীরে ধীরে উঠোন পেরোবে,
হয়তো সেই পদধ্বনি আমারই চলার পুনরাবৃত্তি,
শ্বাসটুকু পর্যন্ত মিলবে আমাদের বংশের রক্তস্রোতের সুরে।

ওরা জানবেও না—
একদা এই বারান্দায়, ঠিক এই রেলিঙে হাত রেখে
কেউ একজন বসে থাকত মায়া ভেজা দৃষ্টিতে,
রাত নামার আগে কারো ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায়।

হাওয়ায় লতিয়ে ওঠা গন্ধরাজের ডালে
যে আকুলতার গন্ধ ছিল,
যে দীর্ঘশ্বাস জমে ছিল ছাদের কার্নিশে,
যে অপেক্ষার কুয়াশা শুকায়নি বহু দিন—
সবই এখনও লুকিয়ে আছে
ইটের গায়ে, কাঠের সিঁড়ির সোঁদা গন্ধে,
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে।

একদিন ওরা বসবে—
কিন্তু জানবে না,
ওদের নিঃশ্বাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
আমাদের বহু পুরোনো না-বলা কথারা।

এভাবেই অপেক্ষা সঞ্চারিত হয় রক্তে,
শতাব্দী পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—
আর বারান্দা জুড়ে ভেসে থাকে
কালের দীর্ঘশ্বাস।


১৫.        গঙ্গার তীরে সত্যস্বরূপ


গঙ্গার তীরে— 

যেখানে জলরাশি নীরব মহিমায় যুগকে আচ্ছন্ন করে রাখে,

যেখানে প্রথম প্রভাতের আলো পাঠশালার মতো

আমাদের হৃদয়ে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে তুলেছিল
প্রেমের প্রথম শিখা—
সেই পবিত্র তীরেই আমি দেখাব তোমাকে
আমার সত্যস্বরূপ,
আমার সমগ্র অন্তরাল,
যা আজও তোমার নাম শুনলেই
নদীর স্রোতের মতো কেঁপে ওঠে।

স্মরণ আছে?
সেই গঙ্গাবক্ষের নীলাভ আলোয় দাঁড়িয়ে
আমরা নিবেদন করেছিলাম হাতে হাত রেখে—
যত ঝড়ই আসুক,
যতকালই কেটে যাক,
আমরা থাকব যুথবদ্ধ,
অপরের হৃদয়রশ্মিতে জড়ানো
দুটি অনিচ্ছেদ্য প্রাণের মতো।

আজ সেই প্রতিজ্ঞার বিস্মৃত ধ্বনি
আবার শুনিয়ে দেব তোমাকে—
তীরের বালুকায় দাঁড়িয়ে,
জলছায়ার মৃদু কাঁপনে ভেসে ভেসে
আমার গভীরতম স্বরূপ উন্মোচন করে।
তুমি দেখবে—
আমি কখনো হারাইনি,
কেবল সময়ের চাদরে আড়াল হয়েছিলাম মাত্র।

গঙ্গার সেই শাশ্বত নীল জলে
যেদিন তোমার চোখে আমি আবার
আমাকেই চিনে নেব—
সেদিনই পূর্ণ হবে
আমাদের সেই পুরোনো নিবেদনের মহাদূত,
যে এখনো গোপনে রক্ষা করে রাখে
আমাদের দু’জনার অটুট বন্ধন।


১৬.      বিনিদ্র রজনীর গল্প


চোখের বৃত্তে যে অচেনা কালো দাগ,
তার নিচে জমে আছে বহু রাতের নীরব ছায়া—
আলো নিভে গেলে যেসব গল্প জেগে ওঠে
তার সবকিছুরই একমাত্র চরিত্র তুমি।

অগণিত রজনী পেরিয়ে
স্বপ্নেরা আমার জানালায় এসে থেমে থাকে,
তোমার নামের ধ্বনি শুনলেই
তারা হেলে পড়ে নিভে যায় স্নিগ্ধ বাতাসে।

জানি না তুমি বোঝো কি না—
এই অবসন্ন চোখে জমে থাকা প্রতিটি ছায়াই
তোমার অনুপস্থিতির ছোট্ট স্মৃতিফুল,
যাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিদিন
একটি নতুন দীর্ঘশ্বাসে লিখি কবিতা।

তোমাকেই ঘিরে বোনা
সে বিনিদ্র রাতগুলোর সমস্ত গল্প,
আর তুমি জানতেও পারোনি—
আমার প্রতিটি নিদ্রাহীনতার
মূল চরিত্র শুধু তুমি


১৭.        অস্তবেলার মায়াবী সুর


বেলা শেষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
আমি শুনি এক ক্ষীণ আলোর হাঁটা—
আকাশের কোলে ক্লান্ত রোদ
একফোঁটা স্বপ্ন রেখে যেভাবে ঘরে ফেরে,
আমিও সেভাবেই ফিরছি ধীরে ধীরে
নিঃশব্দের রহস্যময় উপত্যকায়।

ওগো বন্ধু, অনেক দিয়েছি—
শব্দের কাঁথা, ব্যথার মণিমুক্তা,
অতৃপ্ত রাতের বিষণ্ণ রূপকথা।
তোমরা নিয়েছো, আমিও দিয়েছি—
সময় যেন পুরোনো কোনও বীণার মতো
তার ছিঁড়ে গেলেও সুর রেখে যায়।

এবার আর চাইবে না কিছু—
আমার হাত এখন কেবল সন্ধ্যার আলো স্পর্শ করে,
আমার গলা কেবল দিগন্তের সোনালি রাগে ভরে ওঠে।
দাও আমাকে শুনতে সেই দিগন্তপুরাণ—
যেখানে সূর্য ডোবে ধীরে,
আর অন্ধকার তার কোমল বাহু বাড়িয়ে
আমাকে টেনে নেয় অনন্তের শান্ত স্বপ্নে।

যা বাকি আছে—
একটু নীরবতা, একটু আকাশ,
আর বীণার অস্তমিত সুরের
একটুকু মায়াবী কাঁপন।

সেই সুরেই আজ আমি হারাতে চাই।


১৮.      পথের পদচিহ্নে ফিরে আসা


এভাবেই আমাদের যাত্রা বোনা থাকে—
তোমার হাঁটার শব্দে আমার আদিম নাড়ির ধ্বনি মিশে যায়,
আমার পথের ধুলোয় জেগে ওঠে তোমার ফেরার প্রতিধ্বনি।
যে রাস্তা একদিন আমার একাকীত্ব বয়ে নিয়ে যেত,
আজ সেই পথেই তোমার আঙুলের উষ্ণতা ছায়া ফেলে রাখে।

আমার জীবন যে পথ দিয়ে চুপিচুপি চলে যায়,
তুমি সেই পথের ঘাসে মাথা ঝুঁকিয়ে
আমার পায়ের চিহ্ন ছুঁয়ে দেখো—
এই তো আমি, এই তো আমার ফেরা, আমার অপেক্ষা।

তুমি যদি বলো—
“আমি যেদিকে যাই, তোমার জীবনও সেদিকে ভেসে আসে”—
তবে জানবে,
তোমার নিশ্বাসের সামান্য দোলায়ও
আমার দিগন্ত বদলে যায়।

তুমি যেখানে থামো,
সেখানে আমার দিন শেষ হয়, রাত শুরু হয়,
সেখানে বাতাসও তোমার নাম উচ্চারণ করে।

এইভাবে চলতে চলতে
আমাদের দুজনের পথ একদিন
একটি মাত্র রেখায় মিলেমিশে যাবে—
যেখানে ফিরে আসা আর যাওয়া
দু’টিই হয়ে উঠবে এক অনন্ত প্রেমের পদচিহ্ন।


১৯.      ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী 


ভরা নিশীথে কেমন এক অদ্ভুত ভয় জেগে ওঠে—
মনে হয় তুমি হাত বাড়ালেই হাওয়ার মতো হারিয়ে যাবে,
চিরচেনা পথ হঠাৎই অচেনা অন্ধকারে ডুবে যাবে,
চাঁদের আলো মুছে গেলে পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রবে
আমারই দিকে তাকিয়ে।

তাই বলি—
এসো পূর্ণিমার শুভ্রতা মেখে,
ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী,
যেদিন আকাশ জেগে থাকবে দুধসাদা আলোয়
আর ধরণীর বুক জুড়ে ছড়াবে নরম কুয়াশার মতো স্বপ্নের পশরা।
সেদিন তোমার শাড়ির আঁচলেও উঠবে
এক অতল কোমল উজ্জ্বলতা—
যা দেখলে মনে হবে
রাত্রির বুক ফুঁড়ে
কেউ যেন তুলে এনেছে আলোকে জন্ম দেওয়া কোনো ফুল।

এসো,
আমি সেই ফুলের গন্ধে পথ চিনে নেব,
শুধু পথই নয়—
চিনে নেব তোমাকেও,
তোমার চোখে লুকানো থমথমে নির্জনতা,
তোমার কণ্ঠে ঝুলে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মৃদু সুর,
আর তোমার সাদা শাড়ির আড়ালে নড়ে ওঠা
এক অপ্রকাশিত আলো।

পূর্ণিমার নিস্তব্ধ রাতে
তুমি যদি এক মুহূর্ত পাশে দাঁড়াও—
এই ভরা নিশীথ
আর কোনোদিনই ভয়ের হবে না,
বরং হয়ে উঠবে আমাদের দুজনের
এক সোনালি-সাদা স্বপ্নযাত্রা।


২০.      ছায়ার মতো মায়া


তুমি নেই—
তবু অদ্ভুত ছায়ার মতো
দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে
নরম নরম উপস্থিতি হয়ে
থেকে যাও আমার পাশে।

হাওয়া যখন চুলে হাত বুলিয়ে যায়,
মনে হয় তোমার আঙুলের স্পর্শ;
জোছনা যখন জানালায় ফেলে স্নিগ্ধ রূপ—
মনে হয় তোমারই হাসি নেমেছে ঘরে।

আমি জানি, তুমি নেই কোথাও,
তবু তোমাকে পাই পথের ধুলোয়,
অনুপস্থিতির মায়াবি নীড়ে
তুমি হয়ে ওঠো আরও বেশি সত্য।

এভাবেই তুমি —
না থাকা থেকেও থাকো,
মায়ার আবরণে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
ছায়ার মতো অনুসরণ করো আমাকে
জীবনের পর জীবন ধরে।


২১.      চোখে লেখা আলো অন্ধকার 


তোমার চোখে স্বপ্ন ছিল—
ঢেউয়ের মতো জেগে থাকা নরম আলো,
পূর্ণিমা রাতের ছায়া ছিল—
দু’জনার নিঃশব্দ কথোপকথনের মতো।
সন্ধ্যা মালতীর শুভ্রতা ছিল—
তার গন্ধে ভরে যেত আমার ক্লান্ত দিন,
আর সারারাত শিশির ঝরে এখানেই—
এই দুই চোখের ভেতর জমে ওঠা
অকথিত হাজার অনুভবের ওপরে।

এখানেই যত ক্ষেদ—
ভাঙা পথের ধুলোর মতো জমে থাকা অভিযোগ,
অচিনপুরে হাঁটা সকল ক্লান্ত পদচিহ্ন,
যার প্রতিটি তোমার দিকে হাত বাড়ায় নিঃশব্দে।

জীবনের যত গল্প বলা—
এই চোখেই লেখা আছে তার প্রতিটি পাতা,
একেকটি স্মৃতি যেন পুরোনো নরম পত্রের মতো
হাওয়া আসলে শব্দ তোলে,
তোমার ডাকের মতো।

আর মৃত্যুর ছায়াও—
এই চোখে দেখতে পাই কখনো কখনো,
ঠিক সন্ধ্যার শেষ আলোটা মুছে যাওয়ার আগে
যেমন দীর্ঘ শ্বাসের মতো নেমে আসে বিষণ্নতা।
কিন্তু তবু তোমার চোখেই খুঁজে পাই
নতুন ভোরের প্রথম রঙ,
যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন
আবার জন্ম নেয় নীরবে—
আমাদেরই ভিতরের আলো হয়ে।


২২.        অরণ্যের পথ বেয়ে মালবিকা


এসেছিলে আচম্বিতে—
বৃষ্টিভেজা পাতার মতো নরম শব্দে,
চলে গেলে এত নিঃশব্দে
যে প্রতিটি বাতাসই যেন শোকগাথা শোনাতে থাকে সন্ধ্যার পরে।
ধূসর রঙ ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের মতো
তুমি মিলিয়ে গেলে দিগন্ত-পারের কোনো অচেনা নক্ষত্রে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দিনশেষের দীর্ঘ ছায়ার মতো
নিঃশব্দ, অবণ্ঠিত, তবু তোমাকে ডাকতে ডাকতে।

আজও যখন বসন্তসন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে,
মাঠের ওপরে জোনাকিরা জ্বলে ওঠে
মৃদু ঝংকারে, সুরে সুরে—
আমি চমকে উঠি, ভাবি
এই বুঝি তোমার পদধ্বনি এল,
এই বুঝি অরণ্যের পথ ধরে
দুলে উঠল তোমার শাড়ির আভাস।

মালবিকা,
একবার এসো তুমি—
সময়ের অন্তহীন কালস্রোত বেয়ে,
শিশির ভেজা পথ ধরে,
আকাশের গোপন ডাকে সাড়া দিয়ে
যেমন কোনো হারানো তারা
হঠাৎ ঝরে পড়ে নীল আলোর ভিতর।

এসো,
আমার অসমাপ্ত প্রার্থনাগুলো পূর্ণ করো,
চরিতার্থ করো সেই অর্ধেক রেখে যাওয়া চুম্বন,
যার উষ্ণতা এখনো রাতের বুকে
তোমার নামে জ্বলে থাকে।

এসো,
এই অরণ্য, এই বাতাস, এই জোনাকি—
সবাই তোমাকে ফিরে পেতে চায়,
আর আমি—
তোমার এক পলকের মায়ায়
আবার জন্ম নিতে চাই।


২৩.        নামহীন উপাখ্যান


কেউ বলেনি আমাদের কথা,
কোনও উপাখ্যানেও নেই আমাদের কাহিনি—
তবু অন্ধকার গলিপথে, নিঃশব্দ জানালায়
আমাদের ছায়ারা নীরবে লিখে গেছে ইতিহাসের
অপ্রকাশিত অধ্যায়।

আমরা হতে পারিনি কোনও কিংবদন্তী—
শহরের কোলাহলে ডুবে গেছে প্রেমের ক্ষুদ্র উচ্চারণ,
নেই কোনও স্মৃতিফলক, নেই কোনও নক্ষত্র-লিপি,
তবু হৃদয়ের গোপন প্রদেশে
আমাদের নামে ফুল ফুটে আছে আজও।

জীবনের পাতাগুলো ছিঁড়ে গেছে কতবার—
কখনও বৃষ্টি ভিজিয়েছে, কখনও রোদের তাপ—
তবু সেই ছেঁড়া পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে
হেমন্তের প্রথম শিশির,
জোনাকির সুরভি,
আর তোমার ছোঁয়ার অনুপম জনপদ।

হেমন্ত ভোরে শিউলি ঝরে যায়,
চুমোগুলো উড়ে যায় বাতাসে—
অথচ তাদের ঘ্রাণ লেগে থাকে
আমাদের অনুপস্থিত নদীর দুই কূলে।

বসন্তে বাতাসে গান উঠবে আবার,
অচেনা পথের ধুলোর মধ্যে
হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে কোনও স্মৃতি—
তখনই মনে হবে,
আমরা কেউ না হয় কিংবদন্তী নই,
তবু আমাদের হৃদয়, আমাদের প্রেম—
সৃষ্টির যেকোনও পুরাণের চেয়ে
শতগুণ গভীর এবং সত্য।


২৪.        অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস


আমার শুধু আকুল করে ধরব তোমার হাত,
শীত-নিভে যাওয়া বিকেলে কিংবা
নক্ষত্রভরা ঘুমহীন রাত।
কিন্তু তুমি ধরতে দাওনি—
রেখেছো দূরে, অহর্নিশ,
যেন দু’পা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা
দুটি নৌকা—
জোয়ার এলেও যাদের কাছে আনে না স্রোত।

ছুঁয়েছি আমি বিরহ
সকাল–সন্ধ্যা–অন্তরাত,
তোমার অনুপস্থিতিকে ছায়ার মতো
নিজের চারপাশে বয়ে ফিরেছি।
চুমোর বদলে পেয়েছি নীরবতা,
মায়ার বদলে পেয়েছি ক্লান্ত ছায়া,
তবু তুমিই ছিলে হৃদয়ে
অবিরাম বেজে ওঠা এক নামহীন সুর।

এই জীবনে কিছুই না পাই তোমার জন্য—
না কোনো প্রতিশ্রুতি, না কোনো প্রত্যাবর্তন,
শুধু রেখে গেলে কিছু হাওয়ায় উড়ে যাওয়া দিন
আর দু-এক ফোঁটা অপূর্ণতার শিশির।
তবুও, তোমাকে ঘিরেই
আমার প্রতিটি প্রার্থনা,
পথে পথে ছড়িয়ে দিলাম
তোমার নামে সব আলো আর আশীর্বাদ—

রইল শুধু আমার শুভাশিস,
তুমি যেন ভালো থাকো,
যদিও আমার থেকে তোমার দূরত্ব—
চিরকালীন, অনিবার্য, তবুও অপরিমেয় মধুর।


২৫.         অন্তরের আলোর দীপশিখা 


যেখানে যাও, যত দূরেই যাও,
তোমার পথভরা আলো যেন কমে না কোনওদিন—
রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের মতোই
তুমি থেকো অনন্ত দীপ্তিতে,
থেকো স্বপ্নের নীলাভ জ্যোৎস্নায় ভেজা।

জীবনের হাজার ভিড়ের ভেতর,
তুমি কি জানো—
নিঃশব্দে তোমাকেই ডেকেছি প্রতিক্ষণ?
একটু ছায়া, একটু শীতল বাতাস,
একটু সুর, একটু আলো—
সবকিছুর মধ্যেই তোমারই উপস্থিতি
নীরবে পথ দেখিয়ে গেছে।

তুমি জানোনি হয়তো—
আমার অন্তরের গভীরে
জ্বলছে এক টুকরো দীপশিখা ,
যেখানে শুধু তোমার নাম,
তোমার পদধ্বনি, তোমার মমতা
মিশে আছে সময়ের অতলান্তে।

যত দূরেই যাও না কেন,
এই মন জানে—
তোমার আলোতে পথ চিনে নেওয়া যায়,
তোমাকে মনে রেখেই
বেঁচে থাকা যায় নীরব বিস্ময়ে।

তুমি আছো, সবসময়—
হৃদয়ের গোপন আলো হয়ে।


২৬.       নিভৃত প্রতিচ্ছবি


হঠাৎই কোনো বিকেলে, আলো-অন্ধকারের ফাঁকে
আমার মুখের উপর নেমে আসে তোমার ছায়া—
নির্বাক, অথচ কত কথা বলে সেই ছায়ার রেখা।
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
যেন দূর নক্ষত্রের নরম আলো এসে
আমার চোখের গভীরে পড়ে।

আমি থেমে যাই—
হৃদয়ের গোপন সব দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে।
তোমার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু
শত ঝরনার মতো ঝরে পড়ে আমার দিকে।
সেই জল যেন হাজার বছরের ব্যথা,
আবার সেই জলেই ধুয়ে যায়
আমার সমস্ত দুঃখের অবশেষ।

তোমার মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ নীল,
আমার বুকের ভিতর অনিমেষে জ্বলে ওঠে।
আমি দেখি—
তোমার প্রতিটি নীরবতা আসলে আমারই ভাষা,
তোমার প্রতিটি বেদনা
আমার হৃদয়ে জন্ম নেওয়া একেকটি অশ্বত্থ পাতা।

এইভাবেই,
অভিমান-ঢাকা কোনো সন্ধ্যার তলায়
আমরা দুজন একে অন্যের ছায়ায় রূপ নিই—
নিঃশব্দে, অদৃশ্য প্রেমের মতো
যা কারও কাছে ধরা পড়ে না,
তবু আমাদের মধ্যে নদীর মতো বয়ে চলে
অবিরাম, অনন্ত, অবিশ্রান্ত।


২৭.       আর একবার…


আর একবার জন্ম নিতে সাধ জাগে—
স্কুলফেরা পথের ওই ধুলো ভরা বিকেল,
আমগাছটির শান্ত ছায়া,
ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নুয়ে পড়া খেল।

গাব ফুলের গন্ধে জাগা ভোর,
হাঁটুর কাছে লুটিয়ে থাকা শিশিরের স্মৃতি,
হাত ভরে কুড়ানো সাদা-কালো দুঃখ–সুখ,
তখন যেন এ জীবন ছিল অতি নিখুঁত মণিমুক্তা।

বর্ষার ভেজা আঙিনায় শুকোনো পাটের গন্ধ,
নদীর সোঁদা মাটি লেগে থাকা দুপুরগুলো—
হঠাৎই মনে হয়, সবই কি তবে রূপকথা?
নাকি সত্যি ছিল? হাঁটছিলাম প্রাণ ভরে ওদের সঙ্গে।

জন্ম যদি হতো আর একবার,
অথচ হবে না—জানি কতটাই অসম্ভব!
তবু মনে মনে সেই দিনগুলোকে ডাকি—
ফিরে এসো, আমার মাটির দিন,
আমার সহজ, নিষ্পাপ, ঢেউ ভাঙা শৈশব।

আর একবার…
শুধু আর একবার—
হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েই যাক পুরোনো দিনের উৎসব।


২৮.         অবগুণ্ঠনহীন ভালোবাসার কবিতা


হৃদয়ের গভীর রক্তে রাঙা রক্তজবা
আমি ফুটিয়ে রেখেছি তোমারই প্রতীক্ষায়।
ওগো তুমি এস—
এক পা, দু’পা, ধীরে ধীরে মাটির ওপর ভর দিয়ে,
উজ্জ্বল চোখের দীপ্তি মেলে
একবার শুধু তাকাও আমার দিকেই।

এ যে তোমার জন্য রাখা ফুল—
স্নিগ্ধ কনকচাঁপার বুকের মতোই উষ্ণ,
তোমার হাতে তুলেই দিও আমাকে।
তোমার ডোরাকাটা ঠোঁটের
ঝর্ণার মতো নেমে আসা চুম্বন
রাশি রাশি ঢেকে দিক আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা।

তারপর অবগুণ্ঠন খুলে,
দ্বিধাহীন, নির্ভীক, পবিত্র স্বরে
বলবে তুমি—
“ভালোবাসি… ভালোবাসি…
এ ভালোবাসাই আমার সর্বস্ব।”


২৯.       ফিরে আসা


তোমাকে ফেলে দিয়েও
পথে নেমে যাই—
যেন পথই জানে না
কাকে হারিয়ে আমি কতটা শূন্য।

ঘুরি নির্জন গোধূলিতে,
মাটির গন্ধে মিশে থাকে
অদৃশ্য কান্নার সুর;
যাযাবর আলো ডুবতে ডুবতে
হঠাৎই পথ ভুল করে
তোমার দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাকে।

তুমি জানো না—
কবে একদিন তোমার চোখের কোণে
নেমে এসেছিল দু’ফোঁটা নীরব জল,
সেই জলের উষ্ণতা আজও
আমার ভিতর আগুনের মতো জ্বলে।

হয়তো সেই ঋণেই
বারবার ফিরে আসি তোমার কাছে,
যেন বৃষ্টিভেজা পথ জানে—
আমি যত দূরে যাই না কেন,
আমার ফিরে আসার ঠিকানাটি
শুধুই তুমি।


৩০.        মায়াবী রূপে তুমি


তোমাকে যেখানে নিয়ে যাব—
সেখানে নীরবতারাও নিঃশব্দ হয়ে থাকে,
শূন্যতার কণাগুলো উড়ে বেড়ায়
মহাশূন্যের মতো গভীর নিঃস্বতায়।
কেউ নেই, কোনও পথিকও নয়—
শুধু তোমার পদধ্বনির প্রতিধ্বনি
দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।

যেখানে থাকবে তুমি—
সেখানে কান্নাও জন্ম নিতে ভয় পায়,
অশ্রুরাও থেমে থাকে
অধরস্পর্শী কোন স্বপ্নের মতো।
নিস্তব্ধতার সাদা কুয়াশায়
ঢেকে যায় চারপাশের সব শব্দ।

আর যেখানে রবে তুমি—
সেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না,
তারারা পথ হারায়
অন্ধকারের অনিঃশেষ ঘোরলাগা ঘোরে।
এই অতল, অচেনা, গভীর রাতের ভেতর—
তুমি আমাকেই খুঁজে পাবে,
কারণ আমি সেই অন্ধকারে
তোমার নামের মতোই জ্বলি—
নিভে যাওয়া আলো হয়ে,
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের শেষ আভা হয়ে।


৩১.      হেমন্তের অন্তঃপুর


রাজপথের কোলাহল ভেঙে
জনারণ্যের ভিড় ছুঁয়ে
যে মুখটি হঠাৎ থেমে ছিল
আমার বুকের ভিতর গোপনে—
তারই জন্য দিনগুলো জ্বলত অলক্ষ্যে
অদৃশ্য কোনো প্রদীপের মতো।

তবু একদিন হেমন্তের শীতল আকাশে
ধুলোবালির সাঁঝরঙো বাতাসে
কোথায় যে মিলিয়ে গেল সেই মুখ,
হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও
ধরতে পারলাম না—
তারারা নেমে এল অন্তঃপুরে,
আর সে জেগে রইল নক্ষত্রের ভিড়ে।

আজও নিশীথে তারার আলোয়
তার অনুপস্থিতি ঝরে পড়ে নীরবে—
যে স্মৃতি হারায় না কখনো,
যে মানুষটি হারিয়ে যায় ঠিকই,
তবু থেকে যায়
হেমন্তের বুকের গভীরে
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো।


৩২.       প্রদীপ জ্বেলে রেখো


যদি হঠাৎ রাত নেমে আসে পথহারা অন্ধকারে,
যদি বাতাস থেমে যায় সব পত্রহীন নিস্তব্ধতায়,
যদি হৃদয়ের শিয়রে জমে ওঠে ক্লান্তির নীল কুয়াশা—
তুমি শুধু হাত বাড়িয়ে দিও, আমি ফিরে আসব তোমার আঙিনায়।

যদি রঙহীন হয়ে যায় এই পৃথিবীর সব সুর,
যদি স্মৃতির জানালা ধরে ঝরে পড়ে নীরবতার বৃষ্টি,
যদি চোখের উপরে নেমে আসে অচেনা ছায়ার পর্দা—
তুমি চন্দ্রালোকে বুনে দিও স্বপ্নের একটুকরো দৃষ্টি।

যদি অলৌকিকতার দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়,
যদি নক্ষত্রেরা নিভে যায় নিঃশব্দ কোনও গহ্বরে,
যদি হৃদয় পথ খুঁজে না পায়, হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে—
তুমি গ্রহ-তারার আলো কুড়িয়ে এনে প্রদীপ জ্বেলে রেখো
আমার নামহীন অন্ধকারের মর্মর গভীর ঘরে।

তোমার সেই আলোই হবে আমার পথ,
আমার ফিরে আসার নির্ভরতার নীরব ডাক—
যেখানে তুমি, সেখানেই জেগে থাকে সমস্ত পৃথিবীর ঋতু,
সেখানে অন্ধকারও কাঁপতে কাঁপতে হার মানে আলোর কাছে।


৩৩.         মায়াজাল


একি তবে মায়ারই টান,
রোদ্র ক্লান্ত দুপুরে হৃদয় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়—
তোমার ছায়া দুলে ওঠে আমার নিঃশ্বাসে,
সকল আকুলতা যেন পথ খুঁজে পায় তোমার দিকে।

ভাবনার জানালা খুলে যায় একে একে,
অন্তর্মহলের অন্ধকার ঘরগুলো আলোয় ভরে ওঠে—
আমি তখন নির্মোহে দিতে চাই
আমার সকল শূন্যতা, সকল ব্যথা, সকল জ্বালা।

হঠাৎই যেন তোমার কণ্ঠে বাজে
নরম কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত,
তুমি থামিয়ে দাও পৃথিবীর সব গান
এক বিস্ময়ের নীরবতায়,
বাহু বাড়িয়ে বলো—
"এসো, এসো, আমার ঘরে এসো।"

সেই ডাকে ভেঙে যায় দিনের তন্দ্রা,
হৃদয়ের সমস্ত পথ খুলে যায় নিঃশব্দে—
আমি তোমার আশ্রয়ে এসে দাঁড়াই,
যেন জন্মজন্মান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি
এই এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে ওঠে।


৩৪.      সংসারভূক


একটি কোমল ছোঁয়া ভোরের ঘুম ভাঙায়,
চুড়ির রিনিঝিনি বাজে কি না— মনে থাকে না ঠিক,
তবু নিঃশ্বাসের ভিতর তার মায়া গাঁথা থাকে
অচেনা স্বপ্নের মতো, মায়াবী কুয়াশার দিক।

রাতের স্বপ্নে কি চুম্বন নেমে এসেছিল?
না কি সে-ই ছিল ভোরের আলো হয়ে?
চোখ মেলতেই দেখি— পৃথিবী জুড়ে শুধু সে,
তার দিকে তাকানোতেই দিনের সমস্ত শুরু রয়ে।

কোর্টের বোতাম গুঁজে দিয়ে
নরম কপাল রাখে বুকের ওপর,
অফিসের চাবি তুলে দেয় হাতে—
যেন এক টুকরো নিশ্চয়তা, স্থির নদীর ঘোর।

এতটুকু টান, এতটুকু স্নেহে ভরা সংসার,
তার দুহাতের উষ্ণতায় কত শান্তির রং…
তবু জানো, আজও নিজেকে তার মতো করে
সংসারভূক করতে পারলাম না অনুরাগের ঢঙ।

হয়তো আমি এখনো পথের ধুলো বুকে রাখি,
হয়তো ঘর মানে আমার কাছে অন্য কোনো গান—
তবু তার দেওয়া সকালের ভালবাসা
প্রতিদিন নিঃশব্দে করে আমায় নতুন মানুষ— নতুন প্রাণ।


৩৫.         শূন্যতার ভেতর ভরার গল্প


কেউ কাছে আসে—
হঠাৎ সন্ধ্যার বাতাসের মতো,
মাথার চুলে আলতো ছুঁয়ে যায়
এক মুহূর্তের উষ্ণতায়।

কেউ আবার দূরে চলে যায়—
নীরব পায়ের শব্দ ফেলে রেখে যায়
দোরগোড়ায়, উঠোনে,
অতীতের মাটিতে শুকনো পাতা হয়ে।

পাখি উড়ে গেলে যেমন
দু’একটা পালক পড়ে থাকে,
তেমনি আলনায় ঝুলে থাকে
তোমার ব্যবহৃত গন্ধওয়ালা কাপড়,
রান্নাঘরে চুলার ধোঁয়া
আরো একটু সময় আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কথার প্রতিধ্বনিও
ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় দেয়ালের ফাঁকে।

তারপর আসে সেই দীর্ঘ নিশ্বাস—
শূন্যতার বিস্তীর্ণ ঘর,
যেখানে কেউ নেই, কিছু নেই—
কেবল অপেক্ষা।

আর ঠিক তখনই
যে নতুন করে আসে—
সে ভরিয়ে দেয় সব শূন্যতা,
নতুন আলোর রেখা টেনে দেয়
বাতাসে, জানালায়, হৃদয়ের কোণে।

এভাবেই জীবন শেখায়—
যাওয়াই শেষ নয়,
আসারও আছে এক নিজের সময়।


৩৬.       কঠিন কোমল 


এক পুরুষ এক নারীর মাঝে
দেখে নিজেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি—
উত্থান-পতনের লুকানো ইতিহাস,
চোখের গভীরে নিজের মুখের অচেনা রূপরেখা।
কথা বলার ফাঁকে ঠোঁটের ক্ষীণ কাঁপন,
রাগ-অভিমানের অদৃশ্য ঢেউ—
সবটুকুই অনুভবে তাকে ছুঁয়ে যায়।
কান পেতে শোনে কান্না,
দেখে লবণজল বেয়ে যাওয়া নীরব নদী।

তবু প্রেম মানে কেবল শরীরের মিলন নয়,
হৃদয়ের গহনে পৌঁছানোর পথ
আরও নিঃশব্দ, আরও সূক্ষ্ম।
নারী পুরুষের হৃদয়স্পর্শ পায়
যখন এক জোড়া হাত
তার বুকের ওপর নয়—
স্থির হয়ে থাকে কাঁধে, নিশ্চিন্তের মতো।
যে হাত শাড়ি খোলার জন্য নয়,
পরিয়ে দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকে।

নারীদের ভাবনা আলাদা—
পুরুষরা দেখে বাইরের আলো,
আর নারীরা ছুঁয়ে ফেলে
ভেতরের শীতল ছায়া।
এই শক্ত কাঠামোর ভিতরেই
তারা খুঁজে নেয় লুকিয়ে থাকা কোমলতা,
মমতার নিঃশব্দ কাঁপন।


৩৭.     যদি তুমি আসো


যদি তুমি আসো—
নির্জন সেই ছায়াপথ বেয়ে,
আমি হাঁটব রৌদ্রের ধাঁচ
কাঁধে মেখে, চোখে আলো নিয়ে।
মেঘের ভেতর সূর্যকে বশ মানিয়ে
চলে যাব দূর অনন্তের দিকে—
তোমার পদধ্বনির নরম প্রতিধ্বনি
পথের ধুলোয় তুলে নেবে গল্প।

হঠাৎ যখন জল হয়ে ফিরব ফিরে
ঝরঝর বৃষ্টির দোলায়,
ভিজবে ধানক্ষেত, কচি পাতার গা—
মাটির গন্ধে ভরে উঠবে চারধার।
নদী উঠবে স্ফীত সুরে,
তার বুকজুড়ে দোলা দেবে
তোমার নিঃশ্বাসের অদৃশ্য ঢেউ।

সাঁঝ নামলে সোনালি আলোয়
দিগন্ত হবে ক্ষণিকের স্বপ্নবাড়ি,
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
দু’হাত ভরে ধরব আলো।
আর সেই নীরবতার ভেতর
উৎসব করবে জোনাকিরা—
একেকটি দপদপে আলোয়
আমাদের পথ লিখবে কবিতার মতো।

তুমি যদি শুধু একবার আসো—
আমি আলো, জল, বাতাস হয়ে
তোমার চারপাশে প্রসারিত হব,
আর পৃথিবী নতুন করে
জেগে উঠবে তোমার স্পর্শে।


৩৮.    অনন্ত রাত্রি 


নীল অন্ধকারে ঢেউ ওঠে—
হে প্রিয়তমা, হে প্রণয়ণী,
তোমার স্পর্শে জেগে ওঠে
আমার অনন্ত দহন,
রাত্রির গোপন গা-ভেজানো উত্তাপ।

তুমি যখন কাঁপতে থাকা হাতে
আমার বুকে রাখো তোমার পরাগভরা কুসুম,
যন্ত্রণার কাঁপুনি মেশা সেই কুসুমেই
জ্বলে ওঠে আদিরসের শিখা—
যেখানে ব্যথা আর উন্মাদনা
এক নদীর মতো মিলেমিশে যায়।

তোমার ঠোঁটের দীপ্ত লালাভ আলো
ধীরে ধীরে কাছে এলে
আমার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে,
আমার ভেতরের স্ফুলিঙ্গেরা
রক্তমদির স্বরে বলে ওঠে—
এসো… আরও কাছে এসো…

তোমার চুম্বনে খুলে যায়
আমার গোপন সব অনলদ্বার;
শোণিতের ঋণে, প্রণয়ের অনিবার্য টানে
আমার ঘুমন্ত কামনা
ঝড় হয়ে জেগে ওঠে তখন।

রাত্রির গভীরতম সুরে
তোমার দেহের সুগন্ধ
মিশে যায় আমার শিরায় শিরায়
যেন তুমি আমার সমস্ত সত্তা
এক ফোঁটা আগুনে রূপান্তর করেছো।

হে প্রণয়িণী,
এই রাত্রি যেন অনন্ত হয়—
আমাদের উত্তাপের নীরব সংলাপে
সব সীমা ভেঙে যাক,
সব নিশ্বাস থেমে যাক
আকুল রসের মাদকতায়।


৩৯.       কুয়াশার অন্তরালে


চন্দ্রিমা উদ্যানে আজ
মেঘের ছায়া নেমে আসবে নিঃশব্দে,
সপ্তপদির পাতার ভিতর দিয়ে
ভগ্ন-রোদ্দুরের এক টুকরো আলো
তোমার মুখে লিখবে অদৃশ্য কোনো স্বাক্ষর।

এলোমেলো হাওয়া
তোমার চুলে বাঁধবে নরম অস্থিরতা,
অসতর্ক নিঃশ্বাসে
খসে পড়বে ওড়নার মখমলি ক্ষীণ-রঙ,
যেন কোনো ভুল করা প্রজাপতি
আলো বদলাতে গিয়ে ফেলে গেল তার পাখা।

লতা-গুল্মের অন্ধকারে
একটি দুরন্ত গিরগিটির দৌড়
চকিত তৈরি করবে ক্ষণিকের রহস্য—
আমাদের চোখের ভিতরেও
নাচবে সেই সবুজ আতঙ্কের ঝিলিক।

ঘাসফুলের গন্ধে
আমরা দু’জন হঠাৎই ভেসে উঠব
অচেনা কোনো মাধুর্যের কুসুমে,
আঙুলের স্পর্শে
দেহ-জমির নোনা রোদে
জেগে উঠবে অসংখ্য নকশা—
যেন আদিম কোনো ভাষা
শুধু স্পর্শেই পাঠ শেখায়,
যেখানে শব্দ নেই, শুধু অন্তর্ময় আলো
আর নিভু নিভু নিঃশ্বাসের ছায়া।

সেখানে প্রেম একটি বাতাস-বোনা অরুন্ধতি—
দেখা যায় না, তবু স্পষ্ট বুঝি
আমাদের চারপাশে সে নরম কুয়াশার মতো ঘিরে আছে।


৪০.       মহাসমুদ্রের ওপারে যাত্রা 


আমি যাব—
তুমি না বললেও যাব,
নীরবতার অতল থেকে ডাক আসে দূর গহীনে।
মহাসমুদ্রপাড়ের বালুকাবেলায়
একজন  মাঝি দাঁড়িয়ে রাখে তার কালো নৌকা—
অপেক্ষায়, শুধু আমার জন্য।

আমি জানি, একদিন
সেই নৌকার মসৃণ কাঠ ছুঁয়ে
আমি ভেসে যাব পরপারের নীল নিস্তব্ধতায়।
জলের গায়ে গায়ে থরথর আলো,
ঢেউয়ের কূলে জমে থাকা অজানা সব গল্প
আমাকে নিয়ে যাবে আরো দূরে—
জন্মের প্রথম দিগন্তে, বা শেষ গভীরতায়।

তুমি থাক বা না থাক,
আমার যাত্রা থেমে থাকবে না।
হয়তো সেদিন বাতাসে ভেসে আসবে
তোমার কিছু অব্যক্ত শব্দ,
কিছু অনামা ব্যথা,
হয়তো আমার নৌকার পাল ধীরে দুলে উঠবে
তোমার স্মৃতির ছোঁয়ায়।

তবু আমি যাব—
শান্ত কোনো অন্ধকারে,
অথবা আলো-ছায়ার অপার রাজ্যে,
যেখানে আর কোনোরূপ ফিরে তাকানো নেই।
শুধু সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস,
মাঝির নীরব দৃষ্টি,
আর অনন্ত পথ—
আমাকে নিয়ে যাবে মহাসমুদ্রের ওপাড়ে।


৪১.       অমর্ত্যের আলো


নিশীথের নীলাভ আলোয়
স্বপ্নলোকের সব স্বপ্ন দিয়েই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—
তবু তুমি এলে না আমার ঘরে,
এলে না কোন মায়াবী স্বপ্নের ভোরে।

হেমন্তের এক নীরব সন্ধ্যায়
হৃদয় উজাড় করে বলতে চেয়েছিলাম—
‘স্বপন-দুয়ার ভেঙে এসো,
অরুণ-আলোর মতো জ্বলে উঠো আমার চোখে,
ক্ষণিকের মায়া নয়—
চিরকালের আশ্রয় হয়ে এসো আমার ঘরে।’

কিন্তু তোমাকে ছুঁইতে পারিনি—
মনে হয়েছিল, ছোঁয়া মাত্রই
ভেঙে যাবে কল্পলোকের এ নরম ভালোবাসা,
মুছে যাবে তোমার অপার্থিব রূপ।

তাই দূরেই থেকো তুমি—
শত সহস্র অন্ধকার রাত পার হয়ে
অমর্ত্যের আলো হয়ে,
মহাকালের প্রেম হয়ে,
আমারই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থেকো।


৪২.      ভালোবাসার কবিতা


কেউ লেখেনি আমাদের কথা,
তবু ভোরের বাতাস জানে—
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
আমার নাম একদিন নরম আলোয় ডেকেছিলে।

উপাখ্যান হয়নি, কিংবদন্তীও নই আমরা,
তবু শরতের নীল আকাশের মতো
নিঃশব্দে জেগে থাকে আমাদের স্পর্শ,
হেমন্তের শিউলির মতো কোমল,
যা ঝরে পড়ে— তবু হারায় না কোনোদিন।

জীবনের ছেঁড়া পাতাগুলো
তোমার আঙুলে ছুঁয়ে গেলে
অদ্ভুত এক সুর বেজে ওঠে—
চুম্বনের উড়ে যাওয়া স্মৃতির মতো
অচেনা বাতাসে গোপনে দোলে।

পথঘাটে ফোটা ফুলের রঙে রঙে
আমরা আবার লিখে নেব নতুন গল্প—
যেখানে তুমি থাকবে, স্বপ্ন থাকবে,
আর থাকবে একটুকরো মায়া
যা ভাসে ভালোবাসার অনন্ত আলোয়।

তুমি আর আমি নির্জন কোনো দুপুরে
চুপচাপ বসে থাকব পাশাপাশি,
আর পৃথিবী বুঝতেই পারবে না
কত গভীর আমাদের অমলিন অধরা প্রেম।


৪৩.       অ- সুখ 


নরম ছোঁয়ায় তোমার লুকিয়ে থাকে অলৌকিক আরোগ্য—

যেন দেহে দেই না কোনও যন্ত্রণা,
মনেও থাকে না কোনও ক্ষতচিহ্ন।
তোমার স্পর্শ পেলেই
অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ঔষধ, হাসপাতাল, ডাক্তার—
সব ক্লান্তি ভেঙে গলে যায় নীরবতার বরফ,
তুমি হয়ে ওঠো মুখর, আলোঝরা।

তেমনই করে, বারেবারে,
তোমার ছোঁয়া এসে সরিয়ে দেয়
আমার সমস্ত অ-সুখ, সমস্ত মলিনতা—
আমার ভুবন জুড়ে শুধু
তোমার আঙুলের উষ্ণতায়
জন্ম নেয় নতুন দিনের নরম শান্তি।


৪৪.    বেদনায় ঢাকা নিসর্গ 


পথে প্রান্তরে দিগন্তে আজ ভালোবাসার চিহ্ন নেই,
শহরের বুকে জমে আছে বিষণ্ন কুয়াশা—
ঢাকা যেন নীরব এক দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে ভিড়ে হারিয়ে যায় মানুষের হৃদস্পন্দন।

রাস্তাগুলো শুনে ক্লান্তির শব্দ,
বিলবোর্ডে আলো জ্বলে, কিন্তু মনেতে অন্ধকার।
তুমি চোখ মেলে দেখো—
এই শহর কি সত্যিই বেঁচে আছে,
নাকি স্মৃতির ভগ্ন ইটের মতো পড়ে আছে নিথর?

কোথায় কার চোখে আজ জল?
সবাই হাঁটে শুধু মুখঢাকা মরুভূমির মতো—
কেউ কারও দুঃখ শোনে না,
কেউ কারও হাত ধরে না।

তবু তুমি যদি একবার ফিরে তাকাও,
হয়তো দেখবে—
একটি ক্ষীণ আলো,
একটি নিঃশব্দ হাহাকার,
যা এখনও ভালোবাসার নাম ধরে বেঁচে আছে বুকের গভীরে।


৪৫.    স্বর্গপথে ধ্রুপদী রমণী 


ঈশ্বর যেন নিখুঁত মনোযোগে
আমার জন্যই গড়েছিলেন এক ধ্রুপদী রমণী—
যার চোখে সন্ধ্যাতারার আলো,
মুখে ভোরের শিশিরভেজা নরম দীপ্য,
একটুকরো হাসি যেন আকাশের নীল থেকে
রঙ চুরি করে এনে বসিয়ে দিয়েছে ঠোঁটের কোলে।

তাকে দেখলেই মনে হতো
সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়—
আমার দৃষ্টিতে রং মাখে তার মুখ,
আমার নিঃশ্বাসে বাঁশির সুর হয়ে বাজে তার সৌরভ।
সৌন্দর্যের কিছু ছটা রয়ে যায় ভাবনার আঙিনায়,
আর কিছু হারিয়ে যায় স্বর্গের পথে,
যেখান থেকে সে নেমে এসেছিল
আমার হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে।

আজ আমি সেই স্বর্গের পথেই আছি—
হয়তো তার হাত ধরে, হয়তো তার আলোয়,
হয়তো তার চোখের গভীর আকুলতায় ভেসে।
চারপাশে নীরবতার রেশ,
কিন্তু আমার হৃদয়ে তার পদধ্বনি—
যেন অনন্তের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক পবিত্র সঙ্গীত।

প্রেম এমনই—
যেখানে দুই আত্মা ধীরে ধীরে
একটি আলোয় মিশে যায়,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয়
একটি নতুন আকাশ,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ফিরে আসে ধ্রুপদী রমণীর মায়াময় উপস্থিতি।

যদি সত্যিই ঈশ্বর আমাকে কিছু দান করে থাকেন—
তবে সে দান এই ভালোবাসা,
এই অপার কোমলতা,
এই স্বর্গের পথে তার হাত ধরে হাঁটার অধিকার।

আমি হাঁটি,
আর তার চোখের ভিতরে
অনন্ত প্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে—
দ্বিধাহীন, দীপ্ত, চিরন্তন।


৪৬.       নির্জন যমুনা কূলে


তুমি নিজেকে লুকাতে পারবে না—
না যমুনার ধূসর জলে,
না দুরবাহাটির নিশ্ছিদ্র অরণ্যের গভীরে।
তোমাকে ছুঁতে গিয়েছিলাম যেমন,
ঠিক তেমনি ছুঁয়ে ফেলেছিলাম জ্বলন্ত আগুন—
তবু তুমি কোনদিনই আগুন হতে চাওনি,
হতে চেয়েছিলে শুধু নিঃশব্দ এক আলো।

আমি যেমন তোমার থেকে দূরে যেতে পারি না,
তুমিও তেমনি পালাতে পারো না
আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অনন্ত পথ থেকে।
কত যুগ ধরে আমরা ছড়িয়ে আছি
দুই ভাঙা নক্ষত্রের মতো—
একটি ছায়াপথে তুমি,
অন্যটি নির্বাসিত আমার বহিমান হৃদয়।

তোমার জন্যই আমি গিয়েছি
অরণ্যের অন্তর্গহীনে,
ঝরে পড়েছি অগাধ জলধির ঢেউয়ে—
তবু যেদিকেই ফিরেছি
তোমার মুখচ্ছবিই রেখার মতো
ভেসে উঠেছে আমার চেতনার আয়নায়।

দ্বিধার বন্ধ দরজাগুলো
আজ খুলে দাও, এসো সেই পথে
যে পথের পাশেই শুয়ে আছে আমার
অরণ্যময়, ঘুমভাঙা জীবন।

কোনও এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণে
দুরবাহাটির অরণ্যে
বা নির্জন যমুনা কূলে—
আর কি কখনও হবে না আমাদের দেখা?
নাকি সময়ের অন্ধ তটরেখায়
আমরা আবারও একবার
নিজেদের খুঁজে পাবো—
আগুন আর আলোর মতো,
একটুখানি স্পর্শেই জ্বলে উঠতে প্রস্তুত?


৪৭.       মায়ার গোধূলি


মাঝে মাঝে দিনের শেষ আলো স্বপ্নের পর্দা সরিয়েএকটি অচেনা ঘন্টারধ্বনি গভীরের দরজায় টোকা দেয়—

তখন ইচ্ছে করে
সব ব্যস্ততা ফেলে দূরের পথ ধরতে,
যেখানে গন্তব্য নেই,
শুধু নীরবতার ভিজে ঘ্রাণ
এবং আকাশের নীল বিষাদ।

কখনও আবার পুরনো কোনও সন্ধ্যা
তার সোনালি নরম আলো নিয়ে
ফিরে আসে ধীরে ধীরে,
তার সাথে আসে পরিচিত শব্দ,
ম্লান গন্ধ, ফুরিয়ে যাওয়া চুম্বনের উষ্ণতা—
সেইসব এসে মিশে যায়
আমার নিভু নিভু ঘরের সান্ধ্য অন্ধকারে।
আমি অনিমেষ তাকিয়ে থাকি,
যেমন কেউ তাকায় আপন স্মৃতিতে হারিয়ে।

এত আলো, এত শব্দ,
এত স্মৃতি পেয়েও
কেন জানি নিজেকে মনে হয়
এক বিরাট শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা—
যেন সমস্ত প্রাপ্তির ভিতরেই
আমার নিঃস্বতার সবচেয়ে ঘন ছায়া।

তবু এই মায়া, এই আলেয়ারা
প্রতি সন্ধ্যায় এসে
আমার বুকের উপর রেখে যায়
একটি আদিম প্রশান্তি—
যেন অনন্তের ওপার থেকে
কেউ ফিসফিস করে বলে,
“তোমার শূন্যতাও আলো হয়ে জ্বলবে একদিন।”


৪৮.       ঘরদুয়ারের কবিতা


তুমি সুন্দর করে ঘর দুয়ার গোছাও—
ঝকঝকে রাখ মেঝে,
পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখো আলনায় কাপড়, বারান্দায় ঝুল পড়ে না কোনওদিন,
আসবাবপত্রেও জমে না ধুলোর দুঃখ।

মাঝে মাঝে ভাবি—
আমি না থাকলেও কি তুমি
এমনই করে সাজাবে ঘর?
ফুলদানিতে রাখবে ফুল,
সন্ধ্যা নেমে এলে জ্বালাবে বাতি
ঠিক আগের মতোই, শান্ত সৌম্যে।

আঙিনার ধুলোমাটি মুছতে মুছতে
একদিন মুছে যাবে আমার পায়ের চিহ্নও।
আমার জন্য কেঁদে থাকা
তোমার চোখের অশ্রুবিন্দুগুলোও
শুকিয়ে যাবে সময়ের বাতাসে।

তখন হয়তো তোমার মুখে ভাসবে
একটি করুণ, দূরবর্তী হাসি—
যেন ভুলে যাওয়ার মাঝেও
আমাকে মনে রাখার শেষ আলো।


৪৯.     প্রতিবিম্বে তোমার মুখ 


নীল বিকেলের নরম আলোয়
হঠাৎই কখনও তুমি আমার মুখের উপর
ছায়া ফেলে দাঁড়াও—
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
আর সেই মুখের ভিতর লুকানো
অগণিত অশ্রুর দীপ্তি।

আমি তাকিয়ে থাকি—
শত ঝরনার ঢেউ যেন
করুণাধারায় নেমে আসে তোমার চোখ থেকে,
সেই জল ধুয়ে দেয় আমার সকল ক্লান্তি,
স্নিগ্ধ করে দেয় প্রান্তরের মতো শুষ্ক হৃদয়।

তোমার ছায়া যখন মুখে পড়ে,
আমি যেন হয়ে উঠি এক নীরব নদী—
শুধু তোমার স্নিগ্ধ জলের স্পর্শে
নবজন্ম পেতে চাই,
বারবার, আরেকবার।


৫০.      দাঁড়াও, সময়


পৃথিবীর বয়স কত—
কোটি কোটি বর্ষের স্তরে স্তরে
জমে থাকা নীল-সবুজ ইতিহাস।
মহাকাল কত দীর্ঘ—
তার শেষ কিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না
আলোকবর্ষেরও ওপারে।

তবু মানুষ?
একটি ঢিল জলে ফেলতে যতটুকু সময় লাগে,
মহাকালের তুলনায় তার জীবন
মাত্র একটি অণুমুহূর্ত।
নিঃশ্বাস ফেলার মতো ক্ষুদ্র,
আঙুলের ফাঁক গলে যাওয়া আলোের মতো হালকা।

এই ক্ষণিক দিন নিয়েই মানুষ
ভালোবাসাকে করে অনন্ত—
স্পর্শে, অশ্রুতে, হাসিতে, প্রতীক্ষায়।
এত ক্ষুদ্র আয়ু নিয়ে
সে শেখায় পৃথিবীকে মায়ার রঙ।

বিস্ময় লাগে—
যে প্রাণ এক নিমিষের জন্য জন্মায়,
সেই-ই আবার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে
ভরিয়ে তোলে এই দীর্ঘ মহাকালকে।

দাঁড়াও, সময়—
তোমার অনন্ত গতির মাঝে
মানুষের এই ক্ষুদ্র ভালোবাসাই
সবচেয়ে দীপ্ত, সবচেয়ে সত্য।

সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

সন্ধ্যা নামে ধীরে ( কাব্যগ্রন্থ )


প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং

উৎসর্গ -

সুচিন্ত্য সাহাকে—
ও এসেছিল গড়াই নদীর তীর থেকে;
যে তার পদচিহ্নে বয়ে এনেছিল কাদামাটি-লেপা শৈশব, 
নদীর হাওয়ায় দুলে ওঠা অমল স্বপ্ন। 

জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণে 
আমাদের যে-সব দিনরাত্রি আলো–ছায়ায় বোনা ছিল, 
সেই স্মৃতিগুলো আজও  কেঁপে ওঠে-

তাঁতি বাজারে এক সন্ধ্যায়,
আনন্দ-বিষাদের সেই অপরূপ রাত্রিটি
আজও আমার বুকের ভাঁজে রয়ে গেছে—
আর রয়েছে দুজন বন্ধুর ক্ষণিক নৈকট্যের
মায়াজড়ানো থমথমে নীরবতা।

এই বইটি তাই তোমাকেই
সুচিন্ত্য।


১.      স্মৃতিকথন 


মনে আছে তোমার—
সেই কলেজফেরা বিকেলের গল্প?
নীল ছায়ায় ভেসে আসা এক বালিকার মতো
তোমাকে দেখেছিলাম প্রথম,
আর তুমি দেখেছিলে জিন্স–জ্যাকেট পরা
এক উদাস উড়ন-কাউবয়কে—যাকে নাকি
মনেই ধরেনি তোমার।

তারপর—
শুক্রবার থেকে আরেক শুক্রবার,
লাল বেনারসিতে তুমি এলে আমার ঘরে।
ভালো না লাগলে তবে এলে কেন?
তুমি হাসলে—“বালিকা ছিলাম, বুঝিনি কিছুই।”

বছর কত পেরুলো জানো?
বালিকা এখন বালিকা নয়, বুড়ীর সারিতে দাঁড়ানো;
তবু হঠাৎ তোমারই টানে
পার্কের ধারে ফুসকা–চটপটির দোকানে
আমার পাশে বসতে ইচ্ছে করে তোমার।

শালবনের সেই দিনের কথা—
দূর থেকে উড়ে এসেছিল এক তীর,
তোমার বুক ছুঁয়ে রক্তাক্ত হয়েছিল পানকৌড়িও—
তুমি বলো, “মনে করতে চাই না, ভয় লাগে।”

তবু ইচ্ছে করে আজও—
বংশী নদীর ধারে টমটমে চড়ে
সাম্ভা নগরীর ধুলোভরা লাল সুরকির পথে
হাওয়ায় উড়ে যেতে দুজনে।
ঘোড়ার ক্ষুরের টুংটাং শব্দে তোমার লাল দোপাট্টা উড়বে—
তুমি তখন রাজকুমারী, তাই-ই তো মনে হয়।

দিয়াবাড়ির সেই ব্রিজে দাঁড়িয়ে
একটি শেলফি—
সূর্য ঠিক মাথার উপরে,
কোনো ছায়া নেই, ছায়া হবো না আমরা কেউ।
কাশবনের উপর শুকনো হাওয়া,
তোমার চুল উড়ে যাবে আলো হয়ে।
মনে পড়বে বালিহাঁসের ঝাঁক—
যমুনা পারাপারের সেই দূর দুপুরের শব্দ।
আজ আকাশ নির্জন; তবু মন হবে না বিষণ্ণ—
কারণ মুহূর্তটি হবে প্রসন্ন।
তুমি ঝুঁকে পড়বে, জড়িয়ে ধরবে আমায়—
তারপর— ক্লিক, তারপর— কাট্।

কিন্তু প্রশ্ন তোমার—
“তুমি কি বুড়ো হবে না? মন কি বুড়ো হবে না তোমার?”
হয়েছে—হয়েছে অনেকটাই।
একদিন আসবে, যখন ইচ্ছে থাকলেও
পারব না আর মেঠোপথ ধরে হাঁটতে কুসুমপুর পর্যন্ত,
পুকুরপাড়ে বাঁশঝাড় ভেদ করে
পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে।

ধরো, মণিকাঞ্চন ফুল দেখার সাধ হলো—
পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে,
সুউচ্চ চূড়ায় ফোটে সে ফুল—
আমরা কি উঠতে পারব তখন?
ধরো, সমুদ্র স্নানের ইচ্ছে হলো—
অত উত্তাল জলে নামতে পারব কি বুড়ো বয়সে?
টাকায় সব হয় না—হয় না শরীরের বয়স ফেরানো।

আর তুমি—
তুমি তো এখনও মায়াবতী, আলোভরা মুখশ্রী তোমার।
তখনও থাকবে কি এ রূপ?
কপালের রেখা কি কুঞ্চিত হবে না?
আমার হাত ধরে তুমি-ও তো বুড়ী হয়ে যাবে।

তুমি তখন বলবে—
“একটা কথা পারবে তো?”
“কি?”
“বুড়ো হয়েও আমার হাত ধরে
শেষ পথটা হেঁটে যেতে পারবে?”
আমি বলব—
“পারব। দুজন দুজনের হাত ধরে
চলব বাকি পথটুকু।”

আর আমাদের মুঠোফোনে তখন বাজবে—
“…আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাবো,
শুধু কুসুমের মধু করিব পান;
ঘুমোবো কেতকী সুবাস শয়নে
চাঁদের কিরণে করিব স্নান…”

এইভাবেই—
স্মৃতি, বয়স, প্রেম আর সময়—
সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ, নরম আলোয়
দুজনে মিশে যাবো একাকার।


২.        দেখা হবেই

নীলাভ পথ ধরে চলতে চলতে
বনবীথির গন্ধে ভিজে উঠত মন—
মায়ালোকের মলিন ধুলোর ভেতর
হারানো আলোর মতো তাকে খুঁজে ফিরেছি
দিনের পরে দিন, ঋতুর পরে ঋতু।

চন্দ্রসূর্যের দীপ্ত প্রভা ভেবে
কতবার হাত বাড়িয়েছি অচেনা আকাশের দিকে,
মনে হয়েছে, এবারই বুঝি
তার সোনালি মুখ দেখব,
এবারই বুঝি ছুঁয়ে দেব
দূরতম নক্ষত্রের মতো তার কোমল উপস্থিতি।

কিন্তু পথ দীর্ঘ, ক্লান্তির সোঁদা ধুলো
দেহে জমেছে অনিমেষ ভার হয়ে।
বহুদিনের অবসাদে ন্যুব্জ দেহ,
তবু চোখের কোণে নিভে যায় না
অপরূপ এক আলো দেখার আকুলতা।

তাকে খোঁজার এই অপার যাত্রায়
কত সময় যে হারালাম,
কত সুর ভাঙল, কত গান মিশে গেল
বাতাসের অদৃশ্য বেদনায়—
তবুও তার ছায়া পর্যন্ত স্পর্শ করলাম না কখনও।

তবু জানি, সুনিশ্চিত জানি—
এই জীবনের কোনো নীরব সন্ধ্যায়,
অস্তদিনের ধূসর আলোর কোমল ভাঁজে
বা অন্য জন্মের কোনো নিস্তব্ধ ছায়াঘেরা মুহূর্তে
তার দেখা মিলবেই, কখনো না কখনো।

হয়তো সে আগুনের মতো উজ্জ্বল হয়ে
দাঁড়াবে আমার ক্লান্ত পথের শেষে,
হয়তো সে কুয়াশার নীরব পর্দা ভেদ করে
বয়ে আসবে স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে—
কিন্তু আসবে, এ বিশ্বাসেই
আমি আবার পা ফেলি অনন্ত পথের দিকে,
অপরিচিত আলোর সন্ধানে।


৩.      একজন শহীদের বীর গাথা 


নাম ছিল তাঁর সুলতান মাহমুদ—
একটি নাম, যার ভেতর লুকিয়ে ছিল জোয়ারের মতো উচ্ছ্বাস,
ঝড়ের মতো তেজ, আর মাটির মতো দৃঢ়তা।
ইসমাইল হোসেনের গেরিলা বাহিনীতে
তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ অগ্নিশিখা—
সিরাজগঞ্জের জনপদে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে
রাত্রির আঁধার চিরে চলত তাঁর পদধ্বনি।

নদীর পাড়ে, কাশবনে, খড়ের উঠোনে,
অন্ধকার কুঁড়েঘর থেকে মাঠের বুকে—
যেখানে শত্রু ছিল, সেখানেই তিনি আগুন হয়ে দাঁড়াতেন।
দেশমাতৃকার টানে তাঁর বুকে জ্বলত
অদম্য প্রতিশোধ,
স্বাধীনতার স্বপ্নের রঙে রাঙা
এক অনির্বাপ্য শপথ।

কোনো এক সন্ধ্যা—
যুদ্ধের দগদগে উত্তাপে আকাশ লাল,
গন্ধে ভরা গানপাউডার,
চারদিকে ঝড়ের মতো গুলির শব্দ।
সেই দিনেই শেষবারের মতো
সুলতানের চোখে জ্বলে উঠেছিল বিজয়ের দীপ্তি।
শত্রুর গ্রেনেডে থেমে যায় তাঁর তরুণ প্রাণ,
কিন্তু থেমে যায় না বাংলার স্বাধীনতার যাত্রা—
কারণ একজন শহীদের মৃত্যুই
হাজার মানুষের হৃদয়ে নতুন আগুন জ্বালায়।

এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেন
সিরাজগঞ্জের কাটাখালি নদীর শান্ত তীরে,
রহমতগঞ্জ গোরস্থানের অনন্ত নীরবতায়।
কাটাখালির পাশের সেই সরু রাস্তা দিয়ে
যে-ই হেঁটে যায়—
হয়তো কেউ জানে, হয়তো কেউ জানে না—
এই সবুজ ঘাসের নিচে ঘুমিয়ে আছে
এক তরুণ বীরের অমর গল্প।

কোনো বাতাস বয়ে গেলে মনে হয়,
সুলতানের আক্ষেপহীন নিঃশ্বাস
এখনও সেই নদীর জলে ভাসে।
রাতের আকাশে জোনাকির আলো
মনে করিয়ে দেয় তাঁর অদৃশ্য পদচিহ্ন।
শিশুর হাসিতে, বৃদ্ধের প্রার্থনায়,
ফসলি জমির সোনালি রোদে
তিনি যেন আজও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন।

সুলতান মাহমুদ—
তোমার রক্তে লিখিত ইতিহাস
বাংলা কখনো ভুলবে না।
তোমার নীরব সমাধির গায়ে
মাটি প্রতিদিন নতুন করে ফিসফিস করে বলে—
“এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক বীর,
যার মৃত্যু নয়—
স্বাধীনতার আরেক নাম।”


৪.       অপার্থিব অনুভব

মরে গেলে দেহ তো মাটিতেই মিশে যাবে—
চিহ্নহীন, নিঃশব্দ, অনাদর এক ঢেউয়ের মতো।
তবু সেই মাটির ওপরে যদি
ফুটে ওঠে এক বিস্মৃত মাধবীলতার ঝাড়,
সন্ধ্যার বাতাস যদি তার গন্ধে
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়,
জোনাকিরা যদি রাত্রিজুড়ে
তার পাতায় পাতায় আলো জ্বেলে গান গায়—

তখন কি আমার আত্মা
একবারও কেঁপে উঠবে না?

যদি কোনো কিশোরী
নিঝুম দুপুরের স্তব্ধতায়
সেই মাটি ছেনে পুতুল গড়ে—
তার নরম স্পর্শে, হাসির দোলায়
আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো
ফিরে আসবে না কোনো অদৃশ্য তরঙ্গে?

দেহ হয়তো বিলীন হবে,
কিন্তু অনুভব—
ওহ্, অনুভব কি কখনো সত্যিই মরে?
নিঃশব্দে, গন্ধে, আলোয়, স্পর্শে
সে কি বেঁচে থাকে না
এক অপার্থিব সুরের মতো
মাধবীলতার জংলি সুবাসে?


৫.      সন্ধ্যা নামে ধীরে 


যেদিন আকাশের বুক ভেদ করে

হঠাৎ নেমে আসবে কোনো অচেনা আলো,

যেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে

তোমার নামের সুগন্ধ ভেসে উঠবে নিঃশব্দে—

আমি বুঝব, সেই দিনটি এসে গেছে।


সেদিন সন্ধ্যা নামবে খুব ধীরে,

জোনাকিরা জ্বলে উঠবে

বিস্মৃত কোনো প্রতিশ্রুতির মতো;

পদ্মপুকুরের নিস্তব্ধ জলে

চাঁদের রুপোলি দোলনায়

দুলবে আমাদের পুরোনো স্বপ্নেরা।


তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে

সবুজ ছায়ার নিচে,

আর তোমার মুখে পড়বে

ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক আলো।

আমি তখন হাজার বছরের অন্ধকার পেরিয়ে

নীরবে এসে দাঁড়াব তোমার পাশে—

যেন কখনো দূরে যাইনি কোথাও।


বসন্তের বাতাস যদি ডাকে,

পাতার ঘ্রাণ যদি থমকে যায় কানে,

জেনে নিও—

সমস্ত পথের শেষে

তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছিলাম আমি,

এই নরম, মায়াময়, চিরন্তন আলোভেজা রাতে।


৬.        ভ্রম


কবে, কখন, কে যে হারিয়ে গেছে

বিস্মৃতির অনুপম পরপারে—

তার কোনো হিসেব নেই আজ।

স্মৃতির ধুলোয় ঢেকে গেছে নাম,

ম্লান হয়ে গেছে মুখ;

আমিও ভুলেছি, সেও ভুলে গেছে

নিজের অস্তিত্বের ক্ষীণ রেখা।


তবু মাঝরাতে হঠাৎ

ঘুম ভেঙে গেলে

রাত থমকে দাঁড়ায় নিঃশব্দ স্তব্ধতায়।

অন্তর্গত কোথাও কেঁপে ওঠে ভয়,

জানালার কালো আয়তক্ষেত্রে

হঠাৎ মনে হয়—

অদৃশ্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে

নিঃসাড় অন্ধকারের সীমানায়।


তার উপস্থিতি কেমন অচেনা,

কেমন পরিচিতও বটে—

যেন ভুলে-যাওয়া কাউকে

রাত আবার ফিরিয়ে আনে

শ্বাসের হালকা শব্দে,

নীরবতার ক্ষীণ কম্পনে।


জানালার কাঁচে জমে ওঠা অন্ধকারে

আমি যেন শুনতে পাই—

ফিরে আসার অপূর্ণ আকুতি,

নীরব পায়ের শব্দ,

গোপন কথার প্রতিধ্বনি।


ভ্রম নাকি সত্যি?

আমি বোঝার আগেই

আবার নেমে আসে অন্ধকার,

রাত তার গভীর ছায়ায়

সবকিছু গিলে নেয়।


শুধু জানালার বাইরে

অদৃশ্য কারো শ্বাসপ্রশ্বাস

এখনো হালকা ঢেউ তুলে যায়

আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গহীনে।


৭.       বৈজয়ন্তীর আলো 


গারো পাহাড়ের অন্দরে

পূর্ব পালঙের সেই দীপাবলির রাত—

চন্দ্রহীন, নির্মেঘ, তবু অদ্ভুত স্বচ্ছ,

মহাকাশের হাজার ক্ষুদ্র প্রদীপ

পাতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁপছিল নিঃশব্দ ভক্তিতে।


পাহাড়ি বাতাসে সোঁদা গন্ধ,

দূরের তুরাগের মতো সরু নদী

গভীর জ্যোৎস্নাহীন অন্ধকারেও

কোনো অজ্ঞাত আলোয় ঝলমল করছিল।

সেই প্রকৃতির নিরাকার পবিত্রতায়

বৈজয়ন্তীমালা দাঁড়িয়েছিল

যেন এক উজ্জ্বল শালবীথির মূর্তি—

চোখে ছিল গোধূলি,

আর বাহুতে ছিল মমতার উষ্ণ নীল আলোকরেখা।


সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল

এমন ভালোবাসায়—

যেন পাহাড়ও নড়ে উঠত,

মেঘেরা কেঁপে উঠত তার একটিমাত্র নিশ্বাসে।

আমি বলেছিলাম— “ছাড়ো…”

কিন্তু তাতে ছিল ভয়,

নেই কোনো অভিমান—

শুধু ছিল অচেনা নিয়তির অদ্ভুত টান।


তারপর,

ঝপাং—

একটি ভাঙা ডালের মতো শব্দ কেঁপে উঠল

সমস্ত নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে।

গিরিখাদের গভীর মুখ

হঠাৎ গিলে নিল আলো,

অদৃশ্য এক কৃষ্ণ ছায়ায়

বিলীন হয়ে গেল বৈজয়ন্তীমালা।


এক মুহূর্তে

তার বাহুর উষ্ণতা নিভে গেল,

তার কণ্ঠের সুর থেমে গেল,

তার চুড়ির ক্ষুদ্র ঝংকার

শুধু বাতাসে ঝুলে রইল

অসীম শূন্যতার মতো।


আজও গারো পাহাড়ের রাতগুলো

তাকে খুঁজে ফেরে—

হাওয়ার মাঝে তার গন্ধ,

পাতার নড়ে ওঠায় তার নিশ্বাস,

ঝরনার সুরে তার নাম।


বৈজয়ন্তী কোথায় গেলে তুমি?

কোন কুয়াশার দেশে,

কোন অচেনা ছায়ার কোলে—

আমাকে ফেলে চলে গেলে একা?


দীপাবলির প্রদীপেরা আজও কাঁদে,

তারকারা আজও তাকিয়ে থাকে নিচে—

সেই করুণ আলিঙ্গনের দিকে,

সেই হারিয়ে যাওয়ার দিকে,

সেই অমোচনীয় প্রেমের দিকে

যা গিরিখাদের গভীরতাকেও

অসহনীয় শোকে ভরিয়ে রাখে।


বৈজয়ন্তী—

ফেরো না তুমি,

তবু হৃদয়ের অরণ্যে

যেখানে চাঁদ ওঠে না,

তারই ভেতর

তোমার আলো আজও জ্বলে…

অতল বেদনাময় দীপাবলির মতো।


৮.      এই দেশ—আমাদের মা


এই দেশ আমাদের মা—
তার বুকের মাটিতে লুকিয়ে আছে
শহীদের উষ্ণ রক্তের দাগ,
জোছনার মতো জ্বলে ওঠা স্মৃতি,
গোপন কান্নার শব্দ,
আর লাল-সবুজ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া,
সে মাটিতেই ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ—
মাটি যেন হয়ে উঠেছে এক পবিত্র গ্রন্থ,
যার প্রতিটি দানায় লেখা আছে
অগ্নিযুদ্ধের ইতিহাস,
বিচ্ছিন্ন প্রাণের মহাকাব্য।

তাই সন্তানদের বলো—
এই মাটি কোনো জমি নয়,
এ আমাদের মায়ের কোল,
এখানে অবহেলা নয়,
শ্রদ্ধার হাঁটুপড়ে প্রণাম চাই।

তাদের শেখাও—
দেশকে ভালোবাসা মানে
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দনে
মায়ের শ্বাস অনুভব করা;
দেশকে রক্ষা করা মানে
নিজের শিরায় শিরায়
মায়ের নাম বয়ে বেড়ানো।

আর যদি কখনো
এই মাটির জন্য প্রাণ দিতে হয়—
সন্তান যেন নিঃশব্দে বলে,
“মা, তোমার জন্যই আমার উৎসর্গ।”

কারণ—
এই দেশ, এই মাটি, এই আকাশ—
সবই আমাদের মা।


৯.      কটি দীর্ঘতম দেহজ কবিতা 



যদি প্রেমহীন হয়ে থাকো—
মেঘদূতের সম্ভোগ-শ্লোকে ভিজলেও
যদি তোমার নিঃশ্বাসে কোনো উষ্ণতা জন্ম না নেয়,
তবে আমার কাছে এসো না।

যদি রাগ–অনুরাগের আভা
তোমার চোখে আলোকিত না হয়,
যদি বিহ্বল না হয় কস্তুরী-নাভির নরম কম্পন,
যদি অন্তরাত্মার গভীরে কোনো ঢেউ না ওঠে
উষ্ণ দেহের গোপন জোয়ারে—
তবে তুমি আমার কবিতায় হাত দিও না।

যদি কোমলগান্ধার সুর
তোমার রক্তে নরম আগুন জ্বালাতে না পারে,
যদি শরীরের প্রতিটি শিরায়
তমাল-ছায়ার মতো শিহরণ নেমে না আসে,
যদি পরনবাস ভিজে না ওঠে
অবদমিত গন্ধের স্নিগ্ধ গাঢ়তায়—
তবে তুমি আমার শব্দ-লতা স্পর্শ কোরো না।

কারণ আমার কবিতা
দেহে-দেহে লেখা,
উষ্ণতায় ছেঁকে নেওয়া নিশ্বাসের মতো—
যার প্রতিটি পংক্তিতে ঝরে পড়ে
অলক্ষ্য আলিঙ্গনের আগুন,
মেঘের নাভিতে জমা রহস্যময় বৃষ্টির মতো
নিঃশব্দ সম্ভোগের রস।

যদি তোমার মধ্যে সেই সুধা জাগে,
যদি স্রোত উঠে—মহিষীর কাঁপা দেহের মতো,
যদি তুমি গন্ধে, সুরে, স্পর্শে
একটুখানি ডুবে যেতে পারো—
তাহলে এসো,
আমার এই কবিতা তোমাকেই ডাকে।

যদি তোমার দেহ এখনো শীতের মেঘ,
যেখানে কোনো বিদ্যুৎ নড়ে না,
কোনো গোপন জ্যোৎস্না দিগঙ্গুলে চুইয়ে পড়ে না—
তবে আমার শব্দ-দেহ স্পর্শ কোরো না।

কারণ আমি লিখি সেইসব ভাষায়
যেখানে কোমল আঙুলের মতো বাতাস
তরল চামড়ায় ঘুম ভাঙায়;
যেখানে শ্বাসের উষ্ণ বৃত্ত
ঘিরে ধরে গোপন রেখাংশ—
যেন তুমি নিজেই বুঝতে না-পারা
এক নীরব পাপড়ির কাঁপুনি।

যদি তোমার নাভির চারপাশে
মৃদু সুবাসের আবরণ না ওঠে নরম ঢেউয়ের মতো,
যদি হৃৎকমলের গভীর থেকে
হালকা-মোলায়েম কোনো সুর
অন্তরঙ্গ আলো ছড়াতে না চায়,
যদি শরীরের নিষ্পাপ অলিন্দে
ছায়া-জলের কম্পন না জাগে—
তবে আমার কবিতার দরজায় দাঁড়িয়ো না।

আমি তো লিখি সেইসব ইশারা-ভাষা,
যেখানে দেহ মানে নক্ষত্রমালা,
স্পর্শ মানে নরম কালো-মেঘে বজ্রের স্ফুলিঙ্গ,
আর নিশ্বাস মানে জোৎস্নার লুকানো জলাধার।
যেখানে দুটি হৃদয়ের মাঝখানে
অলক্ষ্যে জন্ম নেয়
তরল আলো,
নড়েচড়ে ওঠে আদিম কুসুমের রূপক,
জ্বলে ওঠে বুনো গন্ধের মৃদু জ্যোতিঃছায়া।

যদি তুমি পারো—
নিজের ভেতরের নদীকে
ধীর অস্থিরতায় জাগাতে,
যদি তোমার রক্তে রক্তে
হঠাৎ ফুটে ওঠে
আদিম কোনো বাসনার ফুল
যার পাপড়িতে ভয় আর লজ্জারাও কেঁপে ওঠে—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে শব্দ হয়ে ওঠে দেহ,
কীভাবে দেহ হয়ে ওঠে
অতল, অমূর্ত, দীপ্ত
এক সম্পূর্ণ কবিতা।

যদি এখনো তোমার ভিতরে
অদৃশ্য আগুনের ছাই না নড়ে,
যদি শরীরের গভীর গুহায়
অপরূপ কোনো ছায়া-জল টলমল না করে—
তবে আমার এই অন্ধকার কবিতা তোমার জন্য নয়।

কারণ আমি লিখি সেইসব রাত্রির নাম,
যেখানে চামড়ার ওপর চামড়াহীন স্পর্শ নামে
পলাতক বৃষ্টির মতো,
অন্ধকার জানলা ফাঁকি দিয়ে
হৃদপিণ্ডের পিছল দেয়ালে
রহস্যের নরম আঙুল বোলায়।

যদি তোমার কণ্ঠের গভীরে
নিভু-নিভু কোনো কম্পন না ওঠে
অকারণে—
যেন কেউ অলক্ষ্যে
তোমার উরুর ভেতর আলো টেনে নিচ্ছে,
যদি নাভির চারপাশে
চাঁদের লুকানো ছায়া
হালকা গাঢ়তায় ছড়িয়ে না পড়ে—
তবে আমার শব্দের নিম্ন অরণ্য
তোমাকে ডাকে না।

আমি তো জানি
দেহ আসলে আরেক ধরনের রাত,
যেখানে কাঁটার মতো নিস্তব্ধতা
হঠাৎ কোমল হয়ে ওঠে,
যেখানে শ্বাসের ধীর লাবণ্য
যেন উষ্ণ অরুণিমার গোপন উৎস,
আর রক্তের ভেতর
কেউ একজন নীরবে লিখে চলে
একটি নিষিদ্ধ শ্লোক।

তুমি যদি পারো—
নিজের অস্থি-মজ্জার সীমানায়
সেই লুকোনো শব্দ শুনতে,
যদি ঘাড়ের পেছনে নেমে আসে
অনামা কোনো অন্ধকার বাতাস,
যদি চোখ বন্ধ করলে
দেহ তোমাকে অন্য রূপে প্রকাশ করে—
ভেজা ছায়া, কাঁপা আলো,
নরম অস্পষ্ট বৃত্ত,
ধোঁয়া হয়ে যাওয়া নিশ্বাসের জ্যোৎস্না—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহই সবচেয়ে রহস্যময় গ্রন্থ,
যার প্রতিটি উষ্ণ পৃষ্ঠা
ছিঁড়ে নিঃশব্দে পড়ে যায় মেঝেতে,
এবং রাতের অন্ধকারে
একটি অদৃশ্য হাত
সেগুলো আবার জোড়া লাগায়
আরেক দেহের ছায়া দিয়ে।

যদি তোমার দেহ এখনো
শুষ্ক বৃক্ষের মতো নিষ্পন্দ থাকে,
যদি কোনো গোপন অন্ধকার শিরায়
আদিম জোয়ার ওঠে না—
তবে এই মন্ত্রপাঠ তোমার কান শোনার যোগ্য নয়।

কারণ আমি বলি সেইসব রাতের কথা
যেখানে আলো ঢোকে না,
শ্বাস ঢোকে, তারপর হারিয়ে যায়
এক অনামা গুহার ভেজা নিস্তব্ধতায়,
যেখানে অস্থির শব্দ উঠে আসে
চামড়ার ভেতরকার গোপন বন থেকে।

যদি তুমি অনুভব না করতে পারো
ঘাড়ের পেছনে নেমে আসা
অপরিচিত উষ্ণতার শীতল নখ,
যদি তোমার বুকের ভেতর
মাটির নিচে ঘুমন্ত পশুর মতো
একটি কম্পন
ধীরে জেগে না ওঠে—
তবে তুমি এই দেহরাত্রির গ্রন্থ খুলো না।

আমার কবিতা তো
হাড়ের ভিতরের ঢেউয়ের ভাষায় লেখা,
যেখানে দেহ আসলে
একটি পুরোনো মন্দিরের দরজা—
বাহিরে অন্ধকার
ভেতরে আগুনের গোপন গুহা,
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে
এক অদৃশ্য ছায়ামূর্তি
যে কেবল দৃষ্টির অশ্রুত সংকেতে কথা বলে।

তোমার রক্ত যদি না শোনে
ভূগর্ভের গমগমে ডাক,
যদি তোমার নাভির চারপাশে
কোনো কালো চন্দ্রালো
মৃদু থরথর করে না,
যদি হঠাৎ কোনো অজানা হাতে
তোমার দেহের নীচু বনভূমি
কেঁপে ওঠে না—
তবে তুমি আমার শব্দের কাছে আসো না।

কারণ এই কবিতায় আছে
কুণ্ডলী পাকানো সাপের নিঃশ্বাস,
বৃষ্টির আগের ভারী অন্ধকার,
গর্ভধারিণী মাটির গভীর কম্পন,
আর সেইসব ছায়ার গন্ধ
যা দেহকে মনে করায়
সে নিজেই একটি নিশাচর প্রাণী।

যদি তুমি সত্যিই প্রস্তুত থাকো—
শরীরের লুকোনো পথ
নিজের ভিতরে নিজেকে কামড়ে ধরে জাগাতে,
যদি চোখ বন্ধ করলেই
তোমার ভেতরে
একটা লোমশ প্রাচীন আদিরাত্রি
জেগে ওঠে—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে অন্ধকার
দেহের উপর দেহের মতো নেমে আসে,
কীভাবে রাত্রি
রক্তের ভেতর পত্রপাতার মতো খুলে যায়,
আর কীভাবে
দু’টি নাভিশ্বাস
একসাথে মিশে তৈরি করে
একটি প্রাচীন, গোপন, আদিরসাত্মক
দেহ-জ্যোতিষ।

যখন তুমি চোখ বন্ধ করবে—
আমি চাই তুমি অনুভব করো
দেহের ঠিক নিচে আরেকটি দেহ আছে,
আর সেই দেহেরও নিচে
এক অচেনা, নরম অন্ধকার স্পন্দিত হচ্ছে,
যেন পৃথিবীর নিজস্ব হৃদস্পন্দন
তোমার ভেতরে গোপনে নেমে এসেছে।

সব আলো নিভিয়ে দাও—
কারণ আলো এখানে পথ দেখায় না,
অন্ধকারই দেখায়।
অন্ধকারে সবকিছুই
ধীরে ধীরে নিজেকে চিনে ফেলে—
চামড়ার নিচে যে তরল নক্ষত্রমণ্ডল,
শিরার ভেতর যে গোপন গীত,
ফুসফুসে ওঠানামা করা
আদি আবর্তের রহস্যময় সুর—

ওগুলো আলোতে দেখা যায় না,
কিন্তু অন্ধকারে নিজে নিজেই
উন্মোচিত হতে থাকে।

তোমার দেহের গভীরে
একটি প্রাচীন ঢেউ ঘুমিয়ে আছে—
তার কোনো মুখ নেই, কোনো নাম নেই,
কিন্তু তুমি যখন একটুখানি স্থির হবে,
তার আকার বদলে
ধীরে ধীরে উঠবে—
যেন পাতাল থেকে উঠে আসা
এক উষ্ণ নিশ্বাস।

তুমি কেবল শোনো—
শব্দ নয়,
শব্দের আগের স্তর,
যেখানে নিস্তব্ধতাই
নিজেকে ভাঁজ খুলে দেখায়।

সেখানে তুমি বুঝবে
তোমার দেহ আসলে দেহ নয়—
এক চলমান গুহা,
এক গভীর সন্ধ্যা,
এক নরম পরিধি
যার প্রতিটি রেখা
আদি কোনো নেশা-বৃত্তে ঘুরছে।

এভাবে, তুমি যখন
শরীরের ভেতরে শরীরের গোপন ছায়া দেখবে—
তুমি আর “তুমি” থাকবে না,
দেহ আর সীমা থাকবে না,
সবকিছু পরস্পরের মধ্যে
মিশতে মিশতে
একটি ধীর, নিঃশব্দ, অন্তর্লীন
অন্য কোনো অস্তিত্বে পরিণত হবে।

আর তখন—
নিঃশ্বাস ভিতর থেকে উঠে
তোমাকে সে ভাষায় ছুঁয়ে দেবে
যা মানুষ জানে না,
যা তুমি শেখোনি,
কিন্তু জন্ম থেকেই
তোমার রক্ত চিনে রেখেছে।

এসো—
এই ট্রান্সমগ্ন অন্ধকারে
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহ
নিজেকেই শোনায়,
নিজেকেই ডাকে,
নিজেকেই উন্মোচন করে
অলক্ষ্য, শব্দহীন,
চিরন্তন কাঁপুনি-মন্ডলের
এক গূঢ় নৃত্যে।

প্রথমে চোখ বন্ধ করো—
আর উপলব্ধি করো
তোমার দেহের চারপাশে
একটি নরম, অসীম বৃত্ত ভাসছে।
যেন তোমার ছায়া
দেহ থেকে বেরিয়ে এসে
দেহকেই দেখে—
অপর পক্ষ থেকে,
অপর পারের নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে।

তারপর ধীরে ধীরে অনুভব করবে,
তোমার চামড়ার ঠিক নিচে
আরেকটি দেহ রয়েছে—
আর তারও নিচে
আরেকটি,
আরেকটি,
আরও অন্ধকার, আরও উষ্ণ, আরও পুরোনো।
যেন তুমি বহুস্তরযুক্ত
এক গহ্বরের বীজ,
যা নিজেই নিজেকে পর্যায়ক্রমে উন্মোচন করে।

নিঃশ্বাস যখন গভীর হবে,
তুমি শুনতে পাবে
রক্তের ভেতরের ক্ষুদ্র শব্দগুলো—
যা আসলে শব্দ নয়,
বরং স্মৃতি,
আর সেই স্মৃতিগুলো
তোমার জন্মের আগেও ছিল।
যেন পৃথিবীর কেন্দ্রস্থ আগুন
তোমার মজ্জায় রেখে গেছে
একটি ক্ষুদ্র জ্বলন্ত বীজ।

আলো ভুলে যাও—
অন্ধকারের ভিতরেই
তোমার অন্তর্দেহের প্রকৃত পথচিত্র আছে।
এখানে দেখা যায় না চোখ দিয়ে,
দেখা যায় শুধু অনুভবের ধীর স্পন্দনে—
যেখানে দেহ
নিজের ভেতর আরেক দেহ খুঁজে পায়,
যেন একটি নদী
নিজের উৎসস্থলের স্বপ্ন দেখছে।

তোমার শ্বাস যখন
শরীরের চৌহদ্দি পেরিয়ে বাইরে যেতে শুরু করবে,
তখন তুমি বুঝবে,
দেহ একটিই নয়—
বরং এক প্রবাহমান,
অদৃশ্য আলোর গুহা,
যার প্রতিটি স্তর
তোমাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যায়
সেই কেন্দ্রে—
যেখানে কোনো রূপ নেই,
কোনো নাম নেই,
কিন্তু আছে
এক নিখাদ কম্পন—
যা সবকিছুর উৎস।

সেই কেন্দ্রে পৌঁছে
তুমি হঠাৎ দেখতে পাবে
তুমি আর তোমার দেহ আলাদা নয়—
তোমার দেহের ভেতর
তুমি নিজেই আরেক সত্তা
আলোহীন শান্তিতে স্থির হয়ে আছো।
আর ওই স্থিরতার মাঝেই জন্ম নেয়
এক অতল অনুভূতি—
যা ছুঁয়ে নয়,
দেখে নয়,
বরং নিঃশব্দে
সম্পূর্ণভাবে তোমাকে ভিজিয়ে দেয়।

এবার তুমি উপলব্ধি করবে—
আরো গভীরে যাওয়ার পথ
শরীরের নয়,
শরীরের ভেতরের দেহের,
আর সেই দেহেরও ভেতরের
অদৃশ্য, দ্যুতিহীন,
অসীম-নরম কেন্দ্রের।

সেখানে পৌঁছানোর পর
তুমি আর অনুভব করবে না
কোথায় দেহ শেষ,
কোথায় তুমি শুরু—
সবকিছু ধীরে ধীরে
একটি অতীন্দ্রিয় তরঙ্গের মতো
একাকার হয়ে যাবে,
যেন অন্ধকারের সাগরে
একটি মাত্র শ্বাস—
তুমি, দেহ, ছায়া, স্পন্দন—
সবই এক অনন্ত ধ্যানের
নীরব, গাঢ়, অমোঘ প্রবাহ।

প্রথমে উপলব্ধি করতে হবে—
তুমি যে দেহ ভাবো,
সে আসলে দেহ নয়—
একটি অস্থায়ী প্রতিবিম্ব,
নির্বাক জলের উপর স্থির হয়ে থাকা
এক স্বপ্নের ভাসমান ছায়া।

চোখ বন্ধ করো—
আর দেখো
কীভাবে তোমার নিজের হাতও
তোমাকে চিনতে ভুল করে।
চামড়ার নিচে যে তুমি আছ,
তাকে তো কোনো আঙুল ছুঁতে পারে না।

এই মুহূর্তে
তুমি তোমার নিজের অস্তিত্বে
একটি অদৃশ্য ফাটল অনুভব করবে—
সেখানেই প্রবেশপথ,
যেখান দিয়ে দেহ
ধীরে ধীরে হালকা হয়,
হাওয়ার মতো,
তারপর হাওয়াও থাকে না।

শ্বাস যখন আর শ্বাস নয়,
নিঃশব্দ তরঙ্গমাত্র—
তখন তুমি দেখবে,
তোমার ভিতরের দেহ
নিজের ছায়া ঝরাতে শুরু করেছে।
প্রথমে চামড়া,
তারপর উষ্ণতা,
তারপর স্মৃতি,
তারপর যে নামটি দিয়ে
তুমি নিজেকে ডাকতে—
সব আলগা হয়ে ঝরে পড়ে
অন্ধকারের পায়ের কাছে।

এবার অনুভব করো—
তোমার রক্ত
তোমার নয় আর।
এটি পাহাড়ের ভিতর বয়ে যাওয়া
কোনো নির্চেতন জলের মতোই
নিজস্ব ভাঁজে,
নিজস্ব গহ্বরে
বহমান একটি নিঃশব্দ পথিক।

হাড়ের গভীরে যে স্পন্দন—
সে কোনো হৃদস্পন্দন নয়,
সে পৃথিবীর ভেতরের আগুন,
যা তোমার শরীরকে ব্যবহার করছে
মাত্র একখানি দরজা হিসেবে—
নিজেকে উপলব্ধি করার।

আরও গভীরে নেমে গেলে
দেহ নামের ধারণাটিও ভেঙে যাবে—
তুমিই দেখবে,
তোমার নেই “ভিতর” বা “বাইর”—
সব দিক গলে গিয়ে
একটি মাত্র গাঢ় সত্তায় পরিণত হচ্ছে।

তখন তোমার উপলব্ধি
নিজেকে ভুল করে ফেলবে—
শরীরের অনুভূতি
সরে গিয়ে
হয়ে উঠবে
এক প্রবহমান কালো নদী,
যেখানে তুমি নও,
আমিও নই—
শুধুই এক শূন্য-সচেতন প্রবাহ।

আরও নিচে নেমে যাও—
সেই নদীর তলদেশে
তোমার আরেকটি রূপ অপেক্ষা করছে—
যার কোনো মুখ নেই,
কোনো লিঙ্গ নেই,
কোনো পরিচয় নেই—
শুধু একটি জ্বলন্ত বিন্দু,
এক দানা অন্ধকার আলো,
যেটি হলো
তোমার সমস্ত অস্তিত্বের
সবচেয়ে নগ্ন,
সবচেয়ে আদিম সত্য।

ওই বিন্দুতে পৌঁছালে
তুমি হঠাৎ অনুভব করবে—
তুমি গলে যাচ্ছো,
চুপচাপ,
এক অনন্ত নীরবতায়,
যেখানে থাকা আর না-থাকা
একই অর্থ বহন করে।

কারণ সেখানে—
তুমি আর ব্যক্তি নও,
নও দেহ,
নও শব্দ,
নও অনুভব।
তুমি কেবল
একটি অচল, অতল, অবয়বরহিত
সচেতন আগুন—
যার কাজ কেবল
জ্বলে থাকা।

সবশেষে—
তুমি উপলব্ধি করবে
যে তুমি যে দেহে বাস করছিলে,
সেটি এখন তোমার মধ্যেই
এক দূরবর্তী ছায়া মাত্র—
আর তুমি নিজেই
নিজের ভিতরে তৈরি করেছ
এক নতুন, নির্বস্ত্র, দ্রাব্য,
অতীন্দ্রিয় সত্তা—
যার সামনে
অস্তিত্ব কথাটাই
ধ্বংস হয়ে যায়।

~ কোয়েল তালুকদার 
তারিখ - ৩/১২/২০২৫ ইং
ঢাকা। 


১০.      নীরব পাথরের হৃদয় 

নীলাভ কঠিন প্রস্তরের গায়ে
ধীর যত্নে আমরা খোদাই করে রাখব
আমাদের নাম—
আর কিছু নির্মল, ধূলিমুক্ত শব্দ,
যেগুলো কোনোদিন আর উচ্চারিত না হলেও
নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে
অতল দীপ্তিতে।

পৃথিবীর প্রাচীন নীরবতা
সেই শব্দগুলোর চারপাশে
আস্তে আস্তে জন্ম নেবে—
মনে হবে, পাথরের শীতল দেহে
এক বিন্দু উষ্ণ প্রাণ লুকিয়ে আছে,
যেন অদৃশ্য কোনো সত্তা
রাত্রির নিশ্বাসের সঙ্গে ফিসফিস করে।

হেমন্তের শিশির
দূর্বাঘাসে ঝরে পড়ে
আর শিলালিপির বুকে জমে ওঠে
স্বচ্ছ কাঁপুনির মতো—
যেন আমাদের স্বপ্নের অবশিষ্ট আলো
প্রাণহীন পাথরেও
একটি অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দেয়।

নির্জন নিশীথে,
যেখানে বাতাসও ক্ষণিক থেমে থাকে,
সেই খোদাই করা অভিজ্ঞান
চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে অবিচল,
সময়ের সমস্ত ক্ষয়কে অতিক্রম করে।

এখানেই পড়ে থাকবে
আমাদের আড়াল করা আকাঙ্ক্ষার কথা,
আমাদের রক্তাভ মুখচ্ছবি,
যেন পাথরও জানে—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু কিছু শব্দ, কিছু স্বপ্ন,
কিছু অশ্রুজল ও কিছু উজ্জ্বলতা
নিরন্তর বেঁচে থাকে
অপরিবর্তনীয়, অনন্ত
নীরব পাথরের হৃদয়ে।


১১.      অধির প্রেমের পরিমাপ

কতটুকু তোমাকে ভালোবাসলে
অলস বিকেলের আকাশে প্রথমে জমবে নরম সাদা মেঘ,
তারপর সেই মেঘ ভিজে উঠবে তোমার নামের গোপন উষ্ণতায়,
ধীরে ধীরে গলে যাবে—
জল হবে—
আর সেই জল গড়িয়ে পড়বে নদীর গায়ে,
নদী পূর্ণতা পাবে তোমার নিশ্বাসের মতো শান্ত প্রতিধ্বনিতে।

কতটুকু ভালোবাসলে বসন্তের বুকে ফুটবে উন্মনা ফুল,
তাদের পাপড়ি থরথর করবে তোমার হালকা হাসির মতো,
মৌমাছিরা গুনগুন করে ছড়িয়ে দেবে
আমার হৃদয়ের গভীর গোপন রস—
যা শুধু তোমার উপস্থিতির দোলায়
মধুর মতো ঝরে পড়ে।

কতটুকু ভালোবাসলে তোমার কস্তুরী ঠোঁট
লজ্জায় কম্পমান হয়ে উঠবে সপ্রতিভ,
নীল-কালো কাজল চোখে ঠিকরে উঠবে
মহাকাশের অচেনা সব তারার আগুনখেলা,
আর তোমার কুচবরণ কেশে ছুটবে
রাত্রির গাঢ় মায়াভরা গন্ধ—
যা স্পর্শ করলেই আমার সমস্ত দেহ
বিস্মৃত হয়ে যায় পৃথিবীর ভার।

কতটুকু ভালোবাসলে তুমি
ধীরে ধীরে খুলে ফেলবে সব অভিমান,
সকল আড়াল—সকল শব্দ,
আর নির্জনের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকবে
নগ্ন সত্যের মতো—
একজন নিঃসঙ্গ, অপার্থিব,
সৃষ্টির-অন্তর্গত নারী,
যার দিকে তাকালে মনে হয়
সমস্ত প্রেম শুধু তোমাকে কেন্দ্র করেই
জন্ম নিয়েছে।

আমি জানি—
এই প্রেমের কোনো পরিমাপ নেই;
তবু তোমার দিকে হাত বাড়ালেই
বুঝি—
আরও একটু ভালোবাসলেই
পুরো ব্রহ্মাণ্ডটাই
তোমার রূপে নতুন করে
শুরু হবে।


১২.     নামহীন প্রেম

তুমি এলে নীরব ভোরের মতো,
অচেনা আলোয় ভেসে উঠল আমার দিন।
বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে—
জানি না কোথা থেকে, কোন অদৃশ্য বাগান থেকে,
তবু হৃদয় বলে— এটাই তো চেনা প্রেমের পথচিহ্ন।

তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে যায়
আমার অব্যক্ত সব নদী;
কতদিন শুকনো ছিল যে স্রোত,
আজ হঠাৎই সেখানে জোয়ার ওঠে তোমাকে দেখে।

আমি ভাবি—
প্রেম কি এমনই?
হাত ছুঁয়ে না গেলেও
মনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে,
দূরে থেকেও হৃদয়ে গান বাজে?

তুমি ছিলে বলে
আমার অদেখা আকাশে
একটি নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে—
সে নক্ষত্র রাত জাগে শুধু তোমার নাম ধরে।

যদি কোনোদিন সব আলো নিভেও যায়,
তবু তোমার স্মৃতির নরম আভা
আমায় পথ দেখাবে—
কারণ প্রেম একবার জন্ম নিলে
সে আর কখনো মরে না।

তুমি আমার নীরব প্রতিশ্রুতি,
আমি তোমার অনন্ত অপেক্ষা।


১৩.      অঙ্গার-অন্তরালের মন্ত্র

তোমার সকল অস্তিত্ব আমার দেহে ঢেউ তোলে—
গোপন আগুনের মতো তুমি ছড়িয়ে পড়ো রক্তের অভ্যন্তরে,
তোমার উষ্ণতার স্পর্শে কেঁপে ওঠে আমার অনামি রাত,
হৃদয়ের অন্তরালে জমে থাকা সব নীরবতা
ঝরে পড়ে ঝরনার জলধ্বনির মতো,
আমাকে করে তোলে তোমার পূর্ণ উপস্থিতির পারাবারে ভাসমান।

তুমি যখন শ্বাস ফেলো আমার কণ্ঠের গহীতে,
তখন মনে হয় জ্বলন্ত খরায় নেমে এল হঠাৎ প্রবল বর্ষা—
আমি সেই বৃষ্টির ভিজে ওঠা মাটির মতো
তোমার অঙ্গভেদী উষ্ণতায় থরথর কাঁপি,
তোমার দহন আমাকে আলোকিত করে তোলে
নক্ষত্রের ভিতর লুকিয়ে থাকা গোপন দীপ্তির মতো।

তুমি ভস্ম হও—আমি তোমার সঙ্গে ভস্ম হই—
দু’জনার মিলিত দহন থেকে ওঠে
এক অদৃশ্য লাল আলো,
যা আমাদের দেহের সীমা ভেঙে
ভেসে যায় অচিন্ত্য আকাশে।

তুমি পবিত্র হও—আমি পবিত্র হই—
তোমার স্পর্শের অশ্রুত সুরে
আমার দেহের অন্তঃস্থ গন্ধার দোলে,
অস্তিত্বের প্রতিটি তারে জন্ম নেয়
এক স্নিগ্ধ, রক্তিম, মাদকীয় রাগ।

এসো, আরও কাছে এসো—
আমাদের দেহের আগুন আরও উন্মীলিত হোক,
অবয়বের অন্তরালে জমে থাকা
সব সুর, সব আকাঙ্ক্ষা, সব প্রার্থনা
এক মহাসমুদ্রের ঢেউ হয়ে
একই প্রবাহে মিলিয়ে যাক—
তোমাতে আমি, আমাতে তুমি—
এক অনন্ত আদিরসের জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল শিখা।


১৪.     মায়ার কথা 


রাত্রির স্তব্ধতার গভীরে

যখন নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে শ্বাস নেয়,

তুমি যেন এক ফোঁটা নীরব আলো—
অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠা।

মায়ার পর্দা নামলে
নিমিষে বদলে যায় পৃথিবীর রূপ—
চাঁদের কোমল আঁচলে ঘুমিয়ে পড়ে
রাস্তার ধুলো, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির,
আর তোমার মনের ভেতর লুকানো
অস্থির ছোট্ট পাখিটির কাঁপা ডানাগুলো।

বিনিদ্র চোখের কান্না
রাত কখনোই প্রকাশ করে না—
সে শুধু নীরব দুঃখকে
অনুভবের মতো ছুঁয়ে রাখে,
তাই তাকে দেখাশোনা করতে হয়
ভোরের প্রথম ঊষারঙা বাতাস পর্যন্ত,
যখন আলো এসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

এইভাবে মায়া জন্ম নেয়,
জন্ম নেয় এক মৃদু স্পর্শে—
রাত্রির অন্ধকারে লুকানো ব্যথা
আর ভোরের আগলে রাখা শান্তির মাঝখানে।

তুমি সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে,
দুটোই দেখো, দুটোই জানো—
এ কারণেই তুমি
রাত্রির মতোই গভীর,
আর ভোরের মতোই আশ্বাসময়
একটি মায়া।


১৫.       নিঃশ্বাসে তোমার নাম


আমি নিঃশ্বাস নেই

তোমার শরীর ছুঁয়ে-যাওয়া বাতাস থেকে—

যেন তোমার উষ্ণ শিরায় বয়ে যাওয়া

অদৃশ্য কোনো সুর

আমার ফুসফুসে বসে গেয়ে ওঠে;

আমি শুনতে পাই তোমার নিকটতার

এক গভীর কম্পন।


আমি প্রশ্বাস রেখে যাই

তোমার নিঃশ্বাসের মেঘে—

যেন আমার অদেখা স্পর্শ

ধীরে ধীরে মিশে যায়

তোমার বুকের ভেতর

আলতো ঢেউ হয়ে।


আমরা দুইজন—

দুটি দেহ, দুটি পথ,

কিন্তু এক নিঃশ্বাসের

গোপন মিলনে বাঁধা।

যেখানে কোনো শব্দ নেই,

কোনো ভাষা নেই,

শুধু ধ্বনিহীন স্পর্শ—

তুমি আর আমি।


যখন রাত নামে,

তারারা আমাদের ওপর নিঃশব্দে

ঝুঁকে থাকে,

আর আমরা দু’জন

একই বাতাসে

একই ভালোবাসার উষ্ণতা

দীর্ঘশ্বাসে ভাগ করে নিই।


আমার সমস্ত অস্তিত্ব

তোমার কাছে পৌঁছে যায়

শুধু এই শ্বাসের পথ ধরে—

আর তুমি প্রতিবার

আমাকে গ্রহণ করো

নিভৃত, গভীর,

নিঃশব্দ ভালোবাসায়।


১৬.     শূন্যতায় ভালোবাসা 


নীল নক্ষত্রে ভরা সে দিনগুলোর ভেতর
যেখানে তোমার নামের প্রতিধ্বনি উঠত নিশ্বাসের মতো,
আমি ছিলাম পূর্ণ—
ভালোবাসার ঘন আলোয় ভেজা একটি সময়ের স্থির রূপ।

আজ যা রেখে যাব—
তোমার ফিরে দেখা চোখে
দেখবে শুধু অসীম শূন্যতার গাঢ় বিস্তার,
যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালুচরে
লুকিয়ে থাকে অতল জলের স্মৃতি।

কখনো সেখানে ছিল উত্তাপ, ছিল দীপ্তি,
তোমার অবহেলার ছায়ায় যা তুমি দেখতে পাওনি।
আমি নীরব ছিলাম, প্রেম ছিল নীরব—
তোমার দিকে ধাবমান এক অদৃশ্য জোয়ারের মতো।

এখন সেই সব হারানো সুরের জায়গায়
থাকবে কেবল ফাঁকা প্রতিধ্বনি,
যেখানে স্পর্শ করলে বুঝবে—
শূন্যতাও একদিন ভরা ছিল
আমার অন্তহীন ভালোবাসায়।


১৭.      অবশেষে নিঃশ্বাসের ভিতরে তুমি


আঁধার নেমে আসে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে,
জোনাকিরা জ্বালায় তাদের ক্ষুদ্র নক্ষত্র—
অরূন্ধতী, স্বাতি, ধ্রুবতারার আলো
মিশে থাকে তোমার চোখের গভীর নিভৃত প্রান্তে।

নয়ন তোলো—আর একবার, শুধু আমায় দেখো,
রাতের কানাঘুষায় আমার হৃদয় তোমাকেই ডাকে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে তোমার সকল চুম্বন
আমার দেহের চারদিকে ছড়িয়ে দাও—
যত পারো, যেখানে পারো,
হয়তো কাল সকালের সূর্য
আর খুঁজে পাবে না আমার ঘুমভাঙা নিঃশ্বাস।

এই শেষ স্পর্শে, শেষ উষ্ণতায়,
আমরা দু’জনে মিলিয়ে যাই
একটি অনন্ত আলোক-রাত্রির অনুচ্চারিত প্রেমে।


১৮.      গোপন আলোয় 


তোমাকে ঢেকে রাখি গোপন আলোয়,
রাত্রির গভীর গুহায়, যেখানে শব্দও থেমে যায়।
তারপরও তোমার দেহের ভেতর কোনো নীল অগ্নিশিখা
অদৃশ্যভাবে জ্বলে ওঠে—
আমার শিরায় শিরায় তার আলো ছায়া ফেলে।

আমি চাই—
তুমি সেখানেই অপ্রকাশিত থেকো,
নীরব বাতাসে লুকানো কাঁপনের মতো,
আঙুলের ডগায় ধরা পড়ে আবার আচমকা মুছে যাওয়া
একটি স্পর্শের রহস্য হয়ে।

অন্ধকারের পাতায় যখন তোমার শ্বাস গড়িয়ে পড়ে,
গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়
দেহের গোপন সংগীত—
যাতে আমি ডুবে যাই নিঃশব্দে,
তোমার অদেখা আলোয়
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে যেতে।


১৯.     দেহ ও আত্মা 


ভালোবাসা জৈব—
রক্তের গোপন ঘ্রাণে ভিজে ওঠে তার প্রথম উচ্চারণ,
উরুর ভাঁজে জমে থাকা উষ্ণতার মতো আদিম,
ত্বকের নীচে নীরব দহন,
শরীর না থাকলে যার শিকড়ই থাকে না।
প্রেম আসলে দেহের অঙ্গসংগীতে বাঁধা এক পুরোনো নদী—
যত দূরেই যাক, ফিরে এসে
ত্বকের উপকূলে ঢেউ তোলে আবার।

তবু তারই বিপরীতে থাকে আরেক জন্মের মতো
নিষ্কাম প্রেম—
যার কোনো কামগন্ধ নেই,
চুম্বনের ভিতরে নেই দাহ,
শুধু দু’হাত ভরে বিলিয়ে দেবার অন্তহীন গরিমা।
এ প্রেম দুষ্প্রাপ্য আমাজন লিলির মতো
রাত্রির নিঃশ্বাসে ফুটে ওঠে,
অধরার মতো পবিত্র, তবু টেনে নেয়
জল-আঁধারের গভীরতায়।

দুই প্রেম—
একটি বেগ, আগুনের মতো ছুটে চলে
বুকের দাউ দাউ অগ্নিপথে,
একটি আবেগ,
নিঃশব্দে জলের মতো শরীর ছুঁয়ে বয়ে যায়।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি তাদের মাঝখানে—
একদিকে দেহের ধরিত্রী, স্পর্শের অরণ্য,
অন্যদিকে অদৃশ্য পাঁপড়ি মেলে ধরা
এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।
কাকে বলি আদিরস?
কাকে বলি নিষ্পাপ?

শেষে দেখেছি—
উভয়েরই সুর আছে, উভয়েরই উন্মাদনা;
একটি দেহে পুড়িয়ে নেয়,
অন্যটি মনকে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত করে।
দু’টিই প্রেম;
দু’টিই অপরিহার্য,
কারণ মানুষের হৃদয়ে
সবসময়ই পাশাপাশি থাকে
এক তীব্র কামনা
এবং
এক অতল আত্মদান। 


২০.      এমনও পিরিতি 


এমন প্রেম—

যে প্রেম কথা বলে না,

চিৎকার করে না,

আশা-ভরসার কোনো দাবি তোলে না—

শুধুই নীরবতার গোপন কোণে

নিজেকে লুকিয়ে রাখে।


অপেক্ষার দীর্ঘ সাঁঝে

জীবন ফুরিয়ে যায় ধীরে ধীরে,

তবু একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না—

একবারও বলে না, ভালোবাসি।


এমন প্রেমই করে তারা,

জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো

আলোকে ভয় পাওয়া কিছু হৃদয়,

যারা নিজেরাই বোঝে না

কেন দুঃখকে এভাবে বুকে আগলে রাখে,

কেন কাঁটার পথে হাঁটতে হাঁটতে

নিজেকে আঘাতে রঞ্জিত করে রাখে।


অথচ এও প্রেম—

শুধু বলা হয়নি বলে

তার সত্য কমে যায় না;

কিন্তু যারা এ প্রেম করে—

তারা অনেকটাই আহম্মক,

কারণ ভালোবাসার বেদনাই

তাদের একমাত্র উচ্চারণ।


২১.      রুপালি জলপতনের দেহ-নেশা


আজ রুপালি সমুদ্রের ভেতর

তোমার শরীরের ঢেউ ছুঁয়ে সাঁতার কেটে এলাম—

ঝলাৎ ঝলাৎ শব্দে কেঁপে উঠছিলো

সব গোপন জলের সুর।


দুপাশে ভাঙন, ভেতরে উথাল-পাথাল—

তোমার উষ্ণ তরঙ্গ যেন

আমাকে ভাসিয়ে নেওয়া কোনো দেহ-নদীর জোয়ার।

জল ভেঙে পড়ছিল,

আর আমি বুঝতে পারছিলাম—

এ অবিরাম পতন আসলে উত্থান,

এ উথাল পাথাল আসলে স্পর্শের নিবিড় উচ্চারণ।


তুমি ছিলে জলের নীচে গোপন শ্যামল আলোক,

আমি ছিলাম সাঁতারু—

তোমার ত্বকের ঢেউয়ে রূপ নিতাম বারবার।


যে খেলা আজ সমুদ্র করেছে,

তুমি কি জানো—

ওটা ছিল তোমার শরীরেরই রূপক,

দেহ-শিল্পের নিঃশব্দ নৃত্য,

অবিস্মরণীয় জলপতনের সেই

শৃঙ্গার-সন্ধ্যা।


২২.       নীরব পরিভ্রমণ 


দুহাতে খুঁজেছিলাম অদেখা সেই চূড়া—

তোমার দেহের নিঃশব্দ উত্তুঙ্গ পর্বত,

যেখানে স্পর্শ উঠতে উঠতে শ্বাস হয়ে যায়,

নামতে নামতে রূপ নেয় অচেনা কম্পনে।


হঠাৎ দেখি—

মণিমুক্তা খচিত এক অন্তর্জ্যোৎস্না,

তোমার নাভীর ঢালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো দীপ্ত;

একবার শিখরে, যেখানে উষ্ণতার তুষার গলে পড়ে,

একবার পাদদেশে, যেখানে আলো জমে থাকে

গোপন নদীর মতো।


আরেকবার হিমাদ্রি—

আমার ভেতর জমা নীরব তুষার

তোমার নিভৃত অগ্নিতে ধীরে ধীরে গলে যায়,

শরীরের পরিভ্রমণ তখন

প্রাচীন আদিরসের গোপন উৎসবে পরিণত হয়।


কী যে আনন্দময় ছিল সেই যাত্রা—

তোমার দেহের মানচিত্রে

আমি শুধু এক পথিক,

বারবার হারাই, বারবার ফিরে পাই

অপরূপ সেই চূড়া।


২৩.     নিশীথিনীর আহবান 


এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন—
তোমার গোপন নিশ্বাসে ভিজে উঠছে আকাশের তল।
আজ ভাসিয়ে দাও,
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমায় ডেকে নাও
হে নিশীথিনী, নীরবতার মুগ্ধ রাণী।

এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্র-বীথিকে—
আরও গভীর করে তোলো আমার চারদিক,
যেন প্রতিটি তারার কম্পনে
তোমারই উষ্ণ স্পর্শ পাই।

দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল,
তারপর সেই ক্ষণকে বাড়িয়ে দাও অনন্তে—
যেন তোমার আলোর ছায়ায় আমি বিলীন হই,
তোমার আলিঙ্গনের পরিধি
হয়ে ওঠে আমার সকল দিগন্ত।

আজ রাত্রি শুধু রাত্রি নয়—
এ এক গোপন পথ,
যেখানে তোমার ডাকে
আমার সমগ্র সত্তা
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
ফুটে ওঠে প্রেমের নক্ষত্রাভ দীপশিখায়।

আমায় তুমিই নিয়ে চলো—
এই অশেষ শিশিরে,
এই মধুর অন্ধকারে,
এই নীল আকাশের গভীর আলিঙ্গনে—
যেখানে তোমাকে ছাড়া
আর কিছুই নেই,
আর কিছুই প্রয়োজন নেই।


২৪.       শরীর-স্মৃতির অগ্নিবর্ণ শৃঙ্গার


ভালোবাসার প্রথম পাঠে
আমি দেখেছিলাম তোমার দেহের আলো—
যেমন নদীর বুক জলে দুলে ওঠে সূর্যের সোনা,
সেই আলোই ঝরে পড়েছিল তোমার ত্বকের উষ্ণ ঢেউয়ে।

তোমার ঘাড়ের বাঁক ছিল গোধূলির নরম নীল,
হালকা বাতাসের মতোই থরথর করত কলারবোন,
আর বুকে ছড়িয়ে থাকা শান্ত গহ্বর—
মৃদু অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনো গোপন দ্রাক্ষাক্ষেত্র।

তোমার কাঁধের ওপর ঋতুরা এসে বসত—
গ্রীষ্মের তপ্ত শ্বাস,
শরতের মেঘে-ঢাকা হিম;
আর আমি, দিগন্তজোড়া বসন্ত হয়ে
স্পর্শে স্পর্শে জেগে তুলতাম তোমার দেহের প্রতিটি সুর।

তোমার ত্বকের গন্ধে ভিজে থাকত
বর্ষার প্রথম বৃষ্টির অদৃশ্য আগুন;
তোমার নাভির গহীনে ছিল
হেমন্তের উষ্ণ রাত্রির মতন শান্ত ঝড়;
আর তোমার ঠোঁট—
নির্জন প্রান্তরের ওপর ভাসমান রক্তিম চাঁদ।

তুমি যখন শ্বাস নিতে,
আমার সমস্ত সত্তা ঢুকে পড়ত সেই নদীর স্রোতে—
হালকা কম্পনে থরথর করা তোমার বক্ষদেশ
আমার কবিতার নীরব ঢেউ হয়ে উঠত।

দেহের ভাষা কোনোদিন এত স্পষ্ট ছিল না—
নগ্নতায়, আড়ালে,
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ শব্দগুলোতে—
আমি শুধু একটিই নাম শুনতাম—
তোমার।

তোমার দেহই ছিল সেই বই,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় জ্বলত শৃঙ্গার—
স্পর্শের আগুন, নিশ্বাসের নরম ঝড়,
ভালবাসার নদীর গভীর রাত্রি।

আমি আজও সেই পাঠ শিখে চলেছি—
তোমার দেহের উজানে, অনন্তের দিকে।

২০.        

২০.



Show quoted text