বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

কালো জোনাকির গান ( কাব্যগ্রন্থ )


কালো জোনাকির গান  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

ওরা দু’জন- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আমার প্রথম সহপাঠী বন্ধু, একজন বেলায়েত হাসান, আরেকজন হাসি চৌধুরী।

বেলায়েত- এখনো কাছে, হাত বাড়ালেই 
ছোঁয়া যায়। হাসি চলে গেছে জীবন-নদীর ওপারে, ওর ম্লান হাসি এখনও ভেসে আসে অতীতের নরম ঢেউ হয়ে।

আজও কে কাকে কতটা মনে রেখেছে,
তা হয়তো আমার হৃদয় জানে,

এই বইটি 
দু’জনের হাতেই অর্পণ করলাম -
একজনের উষ্ণ করতলে, আরেকজনের নক্ষত্র-ছাওয়া করুণ আলোয়।





১.      মাধবীর অমাধুরীর গান

মাধবী বলেছিল
“পৃথিবীতে দুটো জিনিসেই মাধুরী আছে
বাগদাদের ফুল, যার সুগন্ধে মরুভূমিও নরম হয়,
আর রাজস্থানের মীরা বাঈ,
যার পদাবলির সুরে ভোরের আকাশও কাঁপে।
আমি তার কিছুই নই
আমার ভিতরে কোনো মাধুরী খুঁজো না।”

কিন্তু আমি দেখেছি
তার চোখের আড়ালে নদীর মতো হেলে থাকা নীরবতা,
যেন গোধূলির কুয়াশায় লুকোনো মেঘের সোনালি রেখা।
তার কণ্ঠে কখনও শুষ্ক পাহাড়ি বাতাস,
কখনও ভোরের শিশিরের মতো অদৃশ্য স্পর্শ,
যা ছুঁয়ে না গিয়েও মনকে ঘিরে ফেলে।

মাধবী বোঝেনি
মাধুরী সবসময় ফুল বা গান নয়,
কখনও তা নির্জন বটগাছের তলে পড়ে থাকা আলোর ছায়া,
কখনও পথ চলে যাওয়া হাওয়ার অদ্ভুত মৃদু শব্দ,
কখনও নদীর স্রোতে টলমল করা সন্দিগ্ধ রূপালি দীপ্তি।

তিনি ভেবেছেন তাঁর ভেতর শুষ্কতা—
আর আমি দেখেছি ঠিক সেই শুষ্কতার মধ্যেই
এক ফোঁটা গোপন বৃষ্টি
যা কারও নজরে আসে না,
তবু পৃথিবীকে ভিজিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

মাধবী
তুমি বাগদাদের ফুল নও,
তুমি মীরা বাঈও নও—
তুমি তার চেয়েও দুরূহ,
এক অচেনা মরূদ্যান,
যেখানে পানির শব্দ নেই,
তবু তৃষ্ণা মেটে।

তুমি বলো- “মাধুরী খুঁজো না।”
আর আমি দেখি
তোমার প্রতিটি উচ্চারণে, প্রতিটি নীরবতায়,
কোনো এক অজ্ঞাত সুর
নিজের মতো করে জন্ম নিচ্ছে
যাকে নাম দেওয়া যায় না,
শুধু অনুভব করা যায়।


২.      শিলালিপিতে আমাদের প্রেম

কোনো এক প্রাচীন প্রস্তরের বুকে
আমরা দু’জনে দাঁড়িয়ে লিখে রাখব
নাম— দুইটি দীপ্ত অক্ষর,
আর কিছু নির্মল নিঃশ্বাসে-জন্মানো শব্দ,
যারা সময়ের গর্ভে থেকেও
আমাদের হৃদয়স্পন্দনের প্রতিধ্বনি বহন করবে।

হেমন্তের নীরব শিশির
দূর্বাঘাস ছুঁয়ে যখন ঝরে পড়বে
সেই শিলালিপির উপরে,
অচেতন শব্দগুচ্ছ তখনও
চেয়ে থাকবে পৃথিবীর অনাদি রূপের দিকে
যেন প্রত্যেক ঝলমলে শিশিরবিন্দু
আমাদের প্রেমকে নতুন আলোয় জাগিয়ে দেয়।

রাত্রির গভীর প্রহরে
যখন চারদিকে শুধু নীরবতার নিশ্বাস,
খোদাই করা সেই অভিজ্ঞান চিহ্ন
জেগে থাকবে অনন্ত কালের প্রহরী হয়ে
রেখে যাবে আমাদের স্বপ্নের ছায়া,
রেখে যাবে লজ্জারঙা আরক্ত মুখমণ্ডল,
রেখে যাবে সেই অমলিন মুহূর্ত
যেখানে তুমি আর আমি,
দুইটি জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে
এক হয়ে ছিলাম।

আমাদের প্রেম,
প্রস্তরেও থেমে থাকবে না
সময়ের ভিতর দিয়ে
সে বয়ে যাবে শিলালিপির মতোই
নীরব অথচ চিরস্থায়ী আলোয়।


৩.      অনুসঙ্গের আদিম জ্বলন 


ধরতে গিয়েই দেখলাম
তোমার স্পর্শের ভিতর লুকোনো
এক অগ্নিগর্ভ নিশ্বাস,
যেন এলোমেলো বৃষ্টির মতো
গাছে–গাছে ছড়িয়ে পড়ছে তৃষ্ণা।

তুমি এগিয়ে দিলে বক্ষ,
আমি শুনলাম ধুকপুক করা
এক অনাবিষ্কৃত প্রান্তরের ডাক
সেখানে বাতাসও দহনময়,
সেখানে রাতও উষ্ণতার শস্যশ্যামল।

আমার আঙুল জেগে উঠল
তোমার ত্বকের আলোক-তরঙ্গে
যেন চাঁদের আলো
তোমার শিরায় শিরায় বয়ে যায়,
আর আমি পথ হারাই তার ঢেউ-লাগা পথে।

“শীতল করো”- বললে তুমি,
আর আমি সমস্ত উত্তাপ দিয়ে
তোমার গোপন নক্ষত্রলোকে
মেখে দিলাম মৃদু কুয়াশা,
দুজনার শরীর মিলেমিশে
এক অনির্বাণ অমৃতের উৎস ধরে।

সেই অমাবস্যা রাতের মতো
যেখানে শুধু দেহের ভাষা বলে
অস্পষ্ট, তবু অশেষ,
অদৃশ্য, তবু অগ্নিবর্ণ।

আমরা দু’জন একই আগুনে পুড়ে
একই জলে তৃপ্তি খুঁজি
যেন পৃথিবীর প্রথম দাহন
আর শেষ বৃষ্টি একসাথে নামছে
আমাদের দু’হাতের ভাঁজে।


৪.        অস্তমিত বেলার শূন্য খেলা


কখন যে ঢলে পড়ল বেলা,
কখন যে ফুরিয়ে গেল ক্ষণ
জানে না কেউ, শুধু নিঃশব্দে
ঝরে পড়ে সময়ের মন।

যে খেলায় শূন্য করে ভরেছিল
আমার প্রাণের সমস্ত স্থান,
সে-খেলার আলো-ছায়ায় আমি
রইলাম বসে জীবনজুড়ে অনুধ্যান।

অদেখা কোনো হাত ছুঁয়ে যায়
দেয় শূন্যতা, দেয় ভরাও,
মাঝে মাঝে মনে হয় যেন
হারিয়েও তাকে ফিরে পাও।

তাই আজও চুপ করে বসে আছি,
স্মৃতির আলো-ছায়ার কোণে,
যার জন্য শূন্যও পূর্ণ হয়
সে-ই আছে আমার জীবনবৃণে।


৫.      যদি তুমি আসতে


যদি তুমি আসতে,
বহুদূরের জলছবি ভেঙে
হাতে রেখে যেতে এক মুঠো উষ্ণতা,
আমি তোমার পথের ধূলিকণাও
পুনর্জন্মের মতো ধারণ করতাম।

তুমি এগোলে
হাওয়ার পোশাকে মেঘের মতো নরম হয়ে
ছুঁয়ে যেত তোমার নীরবতা;
আমি তাতে বুনে দিতাম রাঙা লাজুক সন্ধে,
যেন চোখের পাতা ভিজে ওঠে অকারণে।

তুমি যদি দাঁড়াতে
আমার শূন্য বুকে থমকে থাকা হৃদয়-ধ্বনির পাশে,
আমি তোমার কণ্ঠস্বরের আলোয়
উৎসব জ্বালাতাম অন্তরে
আবীর, গন্ধ, রঙে রঙে পূর্ণিমার মতো ভরে উঠতাম।

আর তুমি
যদি এক মুহূর্ত তাকাতে
আমার কাঁপা দেহের আল্পনায়,
তবে বুঝতে
আমি আসলে কতদিন ধরে
শুধু তোমাকেই ভালোবাসার রূপকথায় লিখে রেখেছি
একটি অনন্ত, অদৃশ্য, জ্বলন্ত কবিতার মতো।


৬.      মায়ার পথরেখা


তুমি রবে না আমি রবো না
রবে না এই সময়ও;
তবু কুয়াশার ভেতর দিয়ে
ভেসে থাকবে আমাদের হেঁটে-যাওয়া পায়ের শব্দ,
নিভে-নিভে জ্বলা চাঁদের ধূসর আলোয়
যেন কোনো পুরোনো স্মৃতির দোলা।

কথা থাকবে না
কথারা তো সময়ের সঙ্গে ফুরোয়;
শুধু থাকবে গল্প,
অদৃশ্য নক্ষত্রের গোপন ভুবনে
যেখানে নিশীথিনী তার সোনালি নিশ্বাসে
জাগিয়ে তোলে এক দেবযানীর স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নে আমরা দু’জন
অর্ধেক ছায়া, অর্ধেক আলো হয়ে
হেঁটে যাই নীরবতার সিঁড়ি বেয়ে
আর পিছনে পড়ে থাকে
মহাজাগতিক ধুলোর মতো
অলৌকিক, অবিনশ্বর আমাদের পথরেখা
অমলিন, অচঞ্চল, 
চিরকালের মায়ায় বাঁধা।


৭.       চন্দ্রালোকের আদিরস


জোছনার দুধসাদা ঢালে
তোমার শরীর ছিল তীর্থের মতো 
শ্বাসের ধূপ ছড়িয়ে দিয়েছিল রাত।

নিভৃত বাঁশবনের মর্মর-ঝরনা পেরিয়ে
আমি ছুঁয়েছিলাম তোমার ললাট
সেই ছোঁয়া ধীরে ধীরে
নেমে গিয়েছিল তোমার চোখের জলীয় রেখায়,
গলায়, কলারবোনে,
যেন আলোকধারা বিন্দু বিন্দু গলে
দেহে খুলছে নক্ষত্রের দরজা।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
রাতের অর্ধ-জাগ্রত স্বপ্নের মতো
দেহ যেন স্নিগ্ধ অরণ্যের উষ্ণ পাতাল,
যেখানে স্পর্শ মানে আগুন,
নিঃশ্বাস মানে গলন,
নিকটতা মানে জন্ম নেয়া নতুন পৃথিবীর।

আমার আঙুলে তোমার ত্বক
ধীর তরঙ্গে কেঁপে উঠেছিল
একটি উষ্ণ নদীর মতো,
যার গোপন স্রোতে নিমজ্জিত হতে হতে
আমি হারাচ্ছিলাম নিজেকে।

তোমার ঠোঁট
চাঁদের আলোয় রক্তিম শপথের মতো—
আমার নামে কাঁপছিল;
হৃদয়ের ভেতর শুনছিলাম
দেহের গভীরতম নীরব স্পন্দন।

বলেছিলে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…"
আমি সেই সুরে, সেই দেহের ভাষায়
ডুবে গেলাম পুরোপুরি
আলোর, আঁধারের, শ্বাসের, উষ্ণতার
মহাজাগতিক আদিরসে।


৮.        চন্দ্রালোকে দেহ-তন্ত্র

রাত্রির মধ্যাহ্নে
চাঁদের আলো হঠাৎ থমকে দাঁড়াল
যেন জানত, আমাদের দেহেরা
আজ এক অজ্ঞাত রহস্যের দরজা খুলবে।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে
কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসা
কোনো প্রাচীন স্বপ্নদেবীর মতো
চোখে নীরব মন্ত্র,
চুলের ডগায় জোনাকির গোপন আগুন।

আমি তোমার ললাটে চুম্বন দিলে
মনে হল
দূর নক্ষত্রের পথে
একটি অদেখা দরজা খুলে গেল ধীরে,
আর তার থেকে নেমে আসছে
অপরিচিত নীল আলোর উষ্ণ তরল।

শরীরের উপর শরীর,
ছায়ার উপর ছায়া,
বাঁশঝাড়ের মর্মর শব্দে
আমরা হারিয়ে যেতে লাগলাম
কে আমি? কে তুমি?
স্পর্শই যেন আমাদের পরিচয় পাল্টে দিচ্ছে
মুহূর্তে মুহূর্তে।

তোমার ত্বক ছুঁতেই
একটি শীতল আগুন
আমার হাত ধরে
অন্তরালের অন্ধকারে নিয়ে গেল,
যেখানে দেহের সীমানা নেই
শুধু স্পন্দন,
শুধু উষ্ণতার অদ্ভুত আলোড়ন,
শুধু শ্বাসের মধ্যে জন্ম নেওয়া রহস্য।

তোমার ঠোঁটের উপর
চাঁদের মায়া জমে ওঠে
সেই আলোতে প্রতিটি স্পর্শ
অপরাধের মতো নিষিদ্ধ,
আবার পরিত্রাণের মতো পবিত্র।

তুমি নরম কণ্ঠে বললে
“নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা…”
আর আমি বুঝলাম,
এই প্রেম কোনো ঋতুর নয়,
এই দেহ কোনো দেহের নয়—
এ এক লুকানো তন্ত্র,
যেখানে আমরা দু’জন
একই আলোর ভিন্ন ছায়া।


৯.       নীলাভ অধ্যায় 


নীল-অর্ধরাত্রির সেই নীরব মুহূর্তে
তোমাকে মনে হয় এক অদৃশ্য দীপশিখা
দূর নক্ষত্রবীথি যেমন ধীরে ধীরে
নরম আলো ছড়ায় আকাশের গভীরে,
তুমিও তেমনি গোপন রূপে নীলাভ,
নরম পরশে জাগাও অজানা স্মৃতি।

নগ্নতায় তুমি পিকাসোর এক বন্য রেখাচিত্র,
বাঁকা, বেপরোয়া, তবু আশ্চর্য সুরেলা
যেন শরীরের প্রতিটি টানে আছে
অদ্ভুত কোনো অসমাপ্ত শিল্পকাহিনি।
ঢাকাই মসলিনের মতোন তন্বী তুমি
হাওয়ায় দুললে যার স্বপ্নও কাঁপে,
কাঁচা মাটির ভাঁজে-ভাঁজে
তোমার বাঁকগুলো জন্ম নেয় আবার।

তোমার গা জুড়ে জ্বলে পূর্ণিমার
মৃদু-বাঁকা গোলাপী আলো
চাঁদের সিঁথি থেকে যেন
ঝরে পড়ে রেশমি জোছনা।
আর তুমি
সেই আলোতে গলে পড়ো,
ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে,
সারারাত্রি জুড়ে
অকারণ এক কোমল আকুলতায়।

তোমার কাছে এ রাত যেন
শৃঙ্গারময় এক উপাখ্যান
দেহ নয় শুধু,
স্পর্শ নয় শুধু,
বরং জোৎস্নার ভেতর লুকিয়ে থাকা
অদেখা হৃদয়ের নিঃশ্বাস।


১০.        বুকের গভীর খাঁজে

অন্ধকারই তোমার প্রিয়
তাই বুকের গভীর খাঁজে তোমাকে লুকিয়ে রাখি,
যেন গোপন কোনো শস্যভাণ্ডার,
যার উষ্ণতা জানে শুধু চাঁদহীন রাত্রি।

রাত্রি হিংসা করে তোমার সেই আবেশ
শরীরের ঘ্রাণে তুমি যখন আলতো কেঁপে ওঠো,
আমি শুনি দূরবর্তী স্রোতের মতো
একটি নরম নিশ্বাসের ঢেউ।

সেই মুহূর্তেই
স্বপ্নের বীজ বুনে দিই তোমার উর্বর মৃত্তিকায়
এক টুকরো ছায়া,
এক ফোঁটা আলো,
এক বিন্দু আদিরসের নিঃশব্দ স্পন্দন।

তুমি তখন দিগন্তের মতো প্রসারিত,
আমি তখন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ি
মাটির সঙ্গে মিশে যাই,
আর জন্ম নেয়
এক অনাদৃত ভোরের অন্তরঙ্গ অঙ্কুর।


১১.       শরীর বৃত্তের উপাখ্যান 

কালো মেঘের মতো চুল
ঢেকে দিয়েছিল তোমার দৌড়ে–ফেরা বয়সের পিঠ,
যেন প্রাচীন কোনো অরণ্য
ধীরে ধীরে নেমে আসছে উপত্যকার ঢালে।

অর্ধেক এসে থেমে থাকা সেই অন্ধকার
টিলার গায়ে ঝুঁকে পড়ে,
যেখান থেকে শরীরের মানচিত্র
প্রথম আলোর মতো খুলে যায়
গোপন উপকূল, গোপন ঢেউ,
অচেনা পথের হালকা কুয়াশা।

ঈশাণে জমে থাকা মেঘ
জল হয়ে যখন গিরিপথ বেয়ে নামে,
তোমার অঙ্গভূমির প্রতিটি বাঁক
সেই নেমে–আসা জলের কাঁপুনি পায়।
নরম আলোয় তরল হয়ে ওঠে
ঢালের প্রতিটি নিঃশ্বাস।

আর সেই অতল খাদে
যেখানে দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়,
যেখানে শব্দ জন্ম নেয় আবার,
ফুটে থাকে লক্ষ লক্ষ বুনো জলপদ্ম
অচেনা, অদৃষ্ট, আত্মাভাষী।

প্রতিটি জলপদ্ম যেন বলে ওঠে
শরীর আসলে একটি প্রাচীন অরণ্য,
যার সব পথই যুগের পর যুগ
অপরিচিতের দিকে খোলে;
যেখানে স্পর্শ মানে শুধু স্পর্শ নয়
একটি আদিম বৃত্তে ফিরে যাওয়া।


১২.       পোড়ামাটির প্রেম


তোমার শরীরে ছিল মাটির উষ্ণতা
গ্রামের গোধূলিবেলার মতো শান্ত,
চুলের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ধোঁয়া-গন্ধ
বলত— আগুন পেরিয়ে এসেছ তুমি,
তবু জ্বলা শেষ হয়নি অন্তরান্ত।

কাঁচা মাটি ছুঁইতে গিয়ে বুঝেছিলাম
ভালোবাসা প্রথমে নরম, তারপর শক্ত,
তোমার চোখে তখনো শুকায়নি
আদিম নদীর ভেজা স্রোত।

যে প্রেমে পোড়া দাগ থাকে,
সেখানে আলোও জন্ম নেয়
দু’হাতের ছাঁচে তোমাকে গড়তে গড়তে
নিজেকেই নতুন করে চিনেছি
মাটির মতো ধুলোমাখা, তবু পবিত্র বেশ।

জ্বলে ওঠো আবার,
আমার বুকে আগুন রেখেই
পোড়ামাটির প্রতিমার মতো
তোমার প্রেম আজো
অভ্রান্ত, অটল, নিখাদ দাঁড়িয়ে আছে
আমার সমস্ত দিনের মাঝে।


১৩.       প্রেমময়ী তুমি


মনখারাপের নীল রাতটিতে
চোখ বুঝে শুয়ে ছিলাম নিঃশব্দে,
দূর অতীতের সব মুখভাসা স্মৃতিরা
ভেসে ভেসে আসছিল ধীরে ধীরে।

বুকের উপর রাখা ধর্মগ্রন্থ
আঁধারের কোলে শান্ত জ্যোতির মতো
শব্দেরা থামিয়ে দিচ্ছিল ব্যথা,
কিন্তু ঘুমের ভিতরেও ছিল এক শূন্যতা।

হঠাৎই পায়ের মৃদু শব্দ
স্বপ্ন নাকি জাগরণের সীমানায়?
চেয়ে দেখি তুমি!
সবসময়ের হাসি-ভরা সেই চেনা মুখখানি।

আমার বুকে রাখা বইটিকে
তুমি স্নেহে সরিয়ে রাখো টেবিলের কোণে,
আর আমি তোমাকে টেনে নিই হৃদয়ের গভীরে
যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা পূরণ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে।

ওই একটুখানি আলিঙ্গনের উষ্ণতায়
কী অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে!
মেঘ সরে জ্যোৎস্না যেমন
চুপিচুপি ছুঁয়ে যায় নদীর গায়ে।

প্রেমময়ী তুমি
তোমার ছোঁয়াতেই মিলিয়ে যায় সব দুঃখ, সব বিষাদ,
তুমি এলে বলেই বুঝি
জীবন আবার গায় নতুন আশার গান।


১৪.       পরম নির্ভরতার আলিঙ্গন 


নীল-অন্ধকার গোধূলিতে তোমার অকম্পিত হাত

আমার দিকে বাড়িয়ে এসেছিল

যেন বহু যুগের প্রতীক্ষা শেষে পাওয়া

এক আশ্রয়দায়ী দীপশিখা।

বলেছিলে- “পরম নির্ভর বাহুডোর…

এসো, আমার উষ্ণতায় তোমাকে আবদ্ধ করি।”


আমি তখন ভেসে গিয়েছিলাম

তোমার বুকে ছায়াবীথির মতো জেগে থাকা

সেই প্রশান্ত সবুজপাতার নরম বনানীতে।

তুমি দেখিয়েছিলে হৃদয়ের ঠিকানা

যেখানে নীরবে ধুকধুক করছে

রক্তের লাল সমুদ্র, স্মৃতির জ্যোৎস্না,

আর কিছু অদ্ভুত নীরব ঝড়।


বলেছিলে

“এই স্থান তোমার,

অপনার মতো করে সাজিয়ে রেখো।

ধুলো জমতে দিও না,

বেদনার কালো ছাইও নয়।

যত্ন নিলে, এ হৃদয় তোমাকে

হাজার বছর আলো দেবে।”


তোমার শব্দে

মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর রঙ

আকাশের নক্ষত্রেরা যেন চমকে তুলে

আমাদের নাম উঁচু করে ধরল।

শরীরের ছায়া আর আলোর সীমারেখা মিশে গিয়ে

এক সমুদ্রজোয়ার তুলেছিল

অদৃশ্য অনুভূতির উর্ধ্বমুখী ঢেউ।


আমি দু’হাত ভরে তুলে নিয়েছিলাম

সেই অনির্বচনীয় নির্ভরতা,

তোমার বুকের উষ্ণ প্রবাহ,

হৃদয়ের গভীর লাল রঙ।


আর বলেছিলাম

“এই স্থানকে আমি রক্ষা করব,

আমার ধ্বনি, আমার নিশ্বাস, আমার দিনরাত্রি দিয়ে।

কারণ এই বুকের অন্তরালে

আমার সমস্ত পথ, আমার সমস্ত ঘর।”


এভাবেই আমাদের আলিঙ্গনের ভিতরে

জন্ম নিয়েছিল এক দীর্ঘ, অনন্ত,

ধুকধুক করা পৃথিবী।


১৫.       সততার শরীরবাণী


তুমি যদি তার শরীর চাও,
তবে খোলাখুলি বলো
অন্ধকারের কোণে নয়,
চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট হও।

ভালোবাসার আবরণে
লোভের আগুন ঢেকে
দূষণ কোরো না তার বিশ্বাসে
মিথ্যে স্পর্শে ভেঙো না তার নিজস্বতা।

ইচ্ছের ভাষা সৎ হওয়ারই নাম,
সাহসী হও, স্বীকার করো খোলামেলা প্রার্থনা—
তবেই শরীর হবে সম্মত আলোক,
তবেই স্পর্শের পথ হবে পবিত্র ও সত্য।

ভালোবাসার অভিনয় কোরো না
সততার হাত ধরেই
মানুষের হৃদয় জেতা যায়,
আর শরীরও দেয় আপনাকে
নিজের মতো সম্মত করে,
নিজের মতো সত্য হয়ে।


১৬.     দু'দরজার পূর্ণতা


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৭.     বিনিদ্রতার অন্তর্লিখন


একা শরীরের উল্লাসে কি সম্পূর্ণতা আসে?
একা মনের আনন্দেও কি জ্বলে পূর্ণ চাঁদ?
এই দু’য়ের মাঝখানে লুকিয়ে থাকে
সম্পর্কের গভীরতম নদী।

স্পর্শ যদি শুধু ত্বক ছুঁয়ে যায়
তবে সে সময়ের মতো ক্ষণিক,
ঢেউয়ের মতো আসে যায়।
কিন্তু স্পর্শ যদি মন ছুঁয়ে বসে,
তবে শরীরও হয়ে ওঠে পূর্ণগ্রহ।

আমি জানি
আনন্দের দুটি দরজা আছে
একটি শরীর, অন্যটি মন।
কোনও একটিতে তালা পড়লে
অপরটিও বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে।

যখন দুটোই খোলে একসাথে
তখনই জ্বলে ওঠে আলোর সেতু,
তখনই দুজন মিলিয়ে সৃষ্টি হয়
একটিমাত্র দীর্ঘশ্বাসহীন মুহূর্ত,
যেখানে নেই অভাব, নেই অতৃপ্তি
শুধুই সম্পূর্ণতার কোমল দীপ্তি।


১৮.       বুকের গভীরের দান

তুমি ভালোবাসা দাও
বুকের গভীর থেকে উঠে আসে উষ্ণ জোয়ার,
নরম অন্ধকার ভেদ করে
একটা অচেনা আলো এসে থামে আমার চোখের কোলে।

আমি তখন করতল পেতে রাখি
তোমার বুকের ঠিক বাহিরে,
যেন কোনও পূর্ণিমা রাতের আগে
মেঘে ঢাকা চাঁদকে ধরে রাখতে চাই
এক মুহূর্তের জন্য হলেও।

তোমার ভালোবাসা ঢলে পড়ে
আমার নিঃশব্দ ফাঁকফোকরে,
আঙুলের রেখায় জমে ওঠে
নতুন জীবনের স্বচ্ছ দীপ্তি।

তুমি দাও
আমি গ্রহণ করি।
তোমার গভীরতা
আমার বিস্তার হয়ে ওঠে।

এই বিনিময়েই
আমাদের দু’জনের ভেতর
একটি অনন্ত নরম ক্ষয়হীন পৃথিবী
নিঃশব্দে জন্ম নেয়।


১৯.       কবিতা, নদী ও নারী


কবিতা নদীর মতো
নিরন্তর বয়ে চলে শব্দের স্বচ্ছ স্রোত,
গভীর থেকে গভীরতর আবেগ তুলে আনে
নরম ঢেউয়ের গোপন স্পর্শে।

নদী নারীর মতো
কখনও শান্ত, কখনও উচ্ছ্বসিত,
ধারে-ধারে জন্ম দেয় উর্বরতা,
জলের ভাষায় লিখে রাখে আকুলতার অনলিখিত গান।

নারী কবিতার মতো
এক এক শব্দে খোলে অপরূপ বিস্ময়,
চোখের ভেতর লুকিয়ে রাখে হাজার রূপকথা,
স্পর্শের নিশ্বাসে ফুটিয়ে তোলে সৃষ্টির প্রথম আলো।

অথচ তিনজনই যেন এক
একই সুরের বহমানতা, একই আদিম টান,
একই দহন, একই বিশ্রাম,
কবিতা, নদী ও নারী
একই বৃন্তে ফুটে থাকা
অন্তহীন সৃষ্টির তরঙ্গমান রূপ।

সবাই মিলে তারা
পৃথিবীর বুক জুড়ে বয়ে চলা
এক অনন্ত মহাকাব্যের তিন অধ্যায়।


২০.     আসব তোমার কাছেই


আসব তোমার কাছেই
যদি তুমি খুলে দাও তোমার নীলাভ আকাশ,
যদি ছুঁয়ে দাও আমার কাঁধে
বহমান নদীর কুলকুল শব্দের স্নিগ্ধ জলছায়া।

যদি দেখাও সবুজ উপত্যকার নিঃশ্বাস,
আমি হামাগুড়ি দেব তার ঢালে,
ঝর্ণা উপচে পড়বে পুকুর-নালার গোপন স্রোতধারায়,
জলের গায়ে লেপ্টে থাকবে আমাদের দু’জনের
নামহীন বিকেলের ঘ্রাণ।

যদি নিয়ে যাও হাত ধরে
পূর্ণিমার স্বপ্ন-আলোকিত পথ ধরে কোনও নিরুদ্দেশে,
যেখানে সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে,
আর রাতের অন্ধকারে থেকে থেকে
জোনাকিরা জ্বলে ওঠে তোমার চোখের মতো।

যেখানে রাতভোর ভিজে থাকা যায়
নির্বাক শিশিরের কোমলতায়,
আর মনে হয়
বিশ্বের সব পথই শেষে এসে মেশে
তোমার কাছেই,
তোমার অনন্ত আলিঙ্গনে।


২১.       ঐশ্বর্যের দান


তোমাকে দিলাম আমার সন্ন্যাস

ঝরে-পড়া ছিন্ন পাতা, অনাস্বাদিত অপূর্ণ প্রেম,

দীর্ঘ দিনের দীনতা, আমার নিজেরই গোপন গ্লানি।

শূন্য হস্তে দাঁড়িয়ে আছি তোমার দরজায়,

যেন গোধূলির তীর্থযাত্রী

যার সবই শেষ, শুধু অভিসারের আকাঙ্ক্ষা বাকি।


তুমি দাও আমাকে সপ্তপর্ণীর সবুজ পাতা,

যার শিরার ভিতর দিয়ে দেহের নরম আলো চুইয়ে পড়ে;

দাও নীলকণ্ঠ পাখির পালক,

যাতে ছুঁয়ে দেখি তোমার গ্রীবার নীল ছায়া

সেই ছায়া ঠিক নদীর কলধ্বনির মতো

ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে বক্ষের উপত্যকায়।


দাও শুভ্র মেঘের জলকণা,

যা এসে নামে তোমার শরীরের উষ্ণ ভূখণ্ডে

যেন শীতল বর্ষার বিন্দু

শিল্পীর ক্যানভাসে সারা রাত নাচে,

বুকে, কাঁধে, উরুর ঘন সবুজ প্রান্তরে।


আমাকে দাও তোমার সৌধ,

দেহের স্থাপত্য

যেখানে বক্ররেখায় বাঁক নেয় নীরবতা,

যেখানে চোয়ালের কাছে বাঁশরির সুর,

বাহুর কাছে আয়েশী খড়ির দাগ,

আর নাভির ঠিক ওপরেই জোনাকির আলো জমা হয়।

আমি সেই সৌধে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাই

যেন কোন আদিম নগরের ভিতর

যেখানে স্তম্ভ, শীর্ষ, পর্ণশিখর

সবই কোনো মহাজাগতিক শিল্পীর মেঘ-মায়া স্পর্শ।


দাও আমাকে নিস্তব্ধতা,

তোমার শ্বাসের আড়ালে থাকা সেই সুবর্ণ নীরব আলো;

দাও অমরত্ব

তোমার উরুর ধার বেয়ে নেমে আসা উষ্ণ রেশে;

দাও মর্মরিত বেদনা,

যখন হাত ছুঁয়ে যায় তোমার কাঁধের কোণে,

গোপন কাঁপন বাজে তোমার অস্থিমজ্জায়।


আর দাও সেই ঘন আকুল নিঃশ্বাস

যা আমার শরীরের উপরে

জোছনার মতো পড়ে গভীর নরমতায়।


আমি তখন তোমার সামনে অগ্নিশিখার মতো উন্মুক্ত,

তুমি আমার সামনে দেবযানীর মতো গাঢ়

একা তুমি আর আমি,

আর আমাদের শরীরের স্থাপত্য,

যার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি রেখা

একেকটি আদিম শিল্প,

একেকটি পূজা,

একেকটি অনন্ত সৃষ্টি।


২২.      অচ্ছ্যুত ছোঁয়া 


যে রমণীটি আমার নয়,
সে যদি হঠাৎ নিঃশব্দে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়,
বুকের ভেতর অদ্ভুত এক তাপ জেগে ওঠে,
যেন নিষিদ্ধ বনের ভিতর প্রথমবার পদচিহ্ন রাখলাম আমি।

যে শরীর ছুঁইতে চাই না,
তা যদি নিজেই এসে ছুঁয়ে দেয় নিশ্বাসের গোপন ঘরে,
তবে কি তা পাপ,
নাকি দেবতার হাতে খোদাই করা কোনও গুপ্ত পূজার আয়োজন?
হাত বাড়ালেই আগুনের মতো শিহরণ,
তবু হাত সরাতেই জমে ওঠে বরফের দাহ,
কাছে পেলে তৃষ্ণা বাড়ে, দূরে গেলে বিষাদ নামে।

মন তখন অদ্ভুত এক ভাসমান নৌকা,
তটের কাছে গিয়ে আবার ভেসে যায় অচেনা স্রোতে।
ছুঁইতে চাই না
কিন্তু তার ছায়া, তার উষ্ণতা, তার শ্বাসের নরম ছোঁয়া
আমাকে বারবার টেনে আনে এক অনিবার্য জোয়ারে।

এ কি কেবল মুহূর্তের আবেশ?
নাকি শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম কোনও উপাসনা?
না কি এ এক অচিন্ত্য প্রেম
যেখানে স্পর্শের আগে জন্ম নেয় অনির্বচনীয় আকুলতা?

অচ্ছূত সেই রমণী
প্রতিবার যখন আমার কাছে ফিরে আসে,
তার চোখে অগ্নি, গলায় ঝড়,
আর আমার কাছে সে হয়ে ওঠে
স্পর্শে জন্মানো সন্ধ্যাতারার দেবী।


২৩.       সঞ্চারিণী তুমি


এই নীল আকাশ কেঁপে ওঠে নীরব সম্মোহনে,
অরণ্যের আদিম ছায়া দোল খেয়ে বলে
তুমি চির প্রণয়ীতমা,
প্রকৃতির শ্যামল বুকের গোপন সুরভি।

সাগরের ফেনায়িত গভীর গর্জন
বুকে তুলে আনে অনন্ত প্রত্যয়
শত ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে উচ্চারণ করে,
তুমি চির স্বরূপা, তুমি জলের গানের বেদনা ও বীণার সুর।

ধরিত্রীতে বয়ে যাওয়া প্রতিটি বাতাস
মৃদুমন্দ স্পর্শে উচ্চারণ করে
তুমি আনন্দময়ী, তুমি শাশ্বত অস্তিত্বের দীপ্ত নক্ষত্র।

বিশ্বলোকের এক ঝাঁক শুকপাখি
অসীম নীলের তীরে উড়ে যেতে যেতে
গেয়ে যায় নির্মল সুখের গান
আর সেই গানের চিত্রিত অন্তরা তুমি,
তুমিই তার লুকানো রাগিণী, তার অরূপ মাধুর্য।

তুমি সঞ্চারিণী
সমস্ত সুরের ভিতর ছড়িয়ে থাকা
অলৌকিক এক কম্পন,
আকাশ থেকে অরণ্য,
সাগর থেকে স্বর্গলোক অবধি
তোমার নামেই বাজে পৃথিবীর সব সংগীত।


২৪.        নীলাভ অবকাশ 


নীলাভ এক অবকাশে কখনো এমন সময় আসে-

ভালোবাসা হঠাৎই উন্মাতাল হয়ে ওঠে,

তোমার নরম বুকের উপত্যকায় আমি রেখে দিই
দুই চোখের সমস্ত নিবেদন,
যেন দু’টি ভিজে পাখি আশ্রয় চায় সন্ধ্যার নীরবতায়।

মদিরার মতো ঘন, অচেনা এক গন্ধ
তোমার শরীর থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে
জড়িয়ে ধরে আমার সমস্ত অনুভব।
তখন স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়
ভঙ্গুর কাঁচের মতো কাঁপতে কাঁপতে,
তবুও সেই স্বপ্নের টুকরোতেই
আমরা খুঁজে পাই এক গোপন দীপ্তি।

শরীর থেকে শরীরে হতে থাকে
অজস্র অস্বীকৃত লেনদেন
কোনও হিসাব নেই, কোনও খতিয়ান নেই,
শুধুই দু’জনার দূরন্ত আকাঙ্ক্ষার
উন্মুক্ত দেবদারু-ছায়া।

চাওয়া-পাওয়া মিলেমিশে যায়
এক অনন্ত পূর্ণতায়,
যেন দিগন্তে জেগে ওঠা
অগ্নিবর্ণ সূর্যের মতো।

এভাবেই, দেহের গভীরতম গোপনে
নিশ্চুপে গড়ে ওঠে
এক প্রগাঢ় আলোড়ন
যার কম্পন ছড়িয়ে পড়ে
আমাদের নশ্বর পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে
অসীম আলোর ভুবনে।


২৫.       প্রেমোৎসব


তুমি নও কোনো স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর দুরন্ত ছায়া,

তুমি প্রেম-অর্চনার দেবী

গ্রীষ্মদহনে মেঘমালা যেমন আকুল,

আমি তেমনই তোমার সোহাগ-শীতলে আশ্রয় খুঁজি।


আমিও চাইলে স্ত্রৈণ নই,

তুমিও পারোনি কখনো স্বৈরিণীর মুখোশ পরতে;

কারণ আমরা যে দু’জন

প্রেমবুভূক্ষু যুগল, জন্মেছি একই অগ্নিতৃতীয়ার আলোয়।


যেন হেমন্ত-সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায়

নাগেশ্বরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে,

তেমনি আমাদের দেহে দেহে ওঠে উৎসবের ঢেউ

সেখানে নেই নিষেধ, নেই পৃথক কোনো স্বর্গ-নরক,

শুধুই স্পর্শের রাজ্য, নিশ্বাসের মন্দ্র প্রতিধ্বনি,

শুধুই প্রেম

যে প্রেম দেহকে শুচি করে, নরককে পরিণত করে স্বর্গোদ্যানে।


২৬.      অগ্নিসংযোগে প্রেম


তুমি নও স্বৈরিণী, নও ময়ুরাক্ষীর প্রলুব্ধ ছায়া

তুমি সেই মৌলিক নারী,

যার দৃষ্টির এক বিন্দুতে শ্যামঘন মেঘের গর্ভে

বিদ্যুৎ জন্মায়,

যার পদধ্বনিতে কুসুমিত হয় নিষ্প্রাণ অরণ্য।


আমি চাইলে শক্ত; তুমি চাইলে কোমল

তবু আমাদের কারও নাম নেই,

কারণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে

আমরা এক প্রবল অগ্নিশিখা,

যেখানে দেহের ভাষা ঢেউ হয়ে ওঠে

আর আত্মা কেঁপে ওঠে তার সঙ্গীতে।


তোমার গ্রীবায় ঝুলে থাকা নিশ্বাস

আমাকে আছড়ে ফেলে নীললোহিত ধ্যানের গভীরে,

যেখানে তোমার ত্বকের গোধূলিচ্ছায়ায়

জ্বলে ওঠে প্রজ্জ্বলিত সন্ধ্যারা।

তোমার চোখে তখন কামনামেঘ

তাহার নিচে ঝরে পড়ে তপ্ত নীরবতার বৃষ্টি।


আমার বক্ষের উপত্যকায় তুমি

বিজলির রেখার মতো জেগে ওঠো

একবার ডানায় আগুন,

একবার ঠোঁটে শীতের শিশির,

আর মাঝখানে অচিন এক দেবীর হাসি।


স্বর্গ নাকি নরক?

ওসব তুচ্ছ বিভাজন

আমরা যখন মিলিত হই হৃদয়ের গহ্বর-দীঘিতে,

সেখানে ইন্দ্রও নাম লেখায়,

যমও ফিরে তাকায় বিস্ময়ে।


কারণ আমাদের প্রেম

অগ্নিযজ্ঞে উত্থিত ধূপের মতো,

দেহে দেহে দুলে ওঠা মদির অর্ধচন্দ্রের মতো,

এক আদিম, অনন্ত, নিশ্বাস-উৎসব;

যেখানে তুমি দাও আলো,

আমি দিই জ্যোৎস্নার পথ,

আর দু’জনে মিলে সৃষ্টি করি

এক অচঞ্চল, অচিন্ত্য, অগ্নি-রূপী প্রেমলোক।


২৭.        প্রেমাগ্নির গুপ্তলোক


তুমি নও কোনো স্বৈরিণীর তীব্র ছায়া,

তুমি নও ময়ুরাক্ষীর উন্মত্ত ক্ষুধাও

তুমি সেই অরণ্যদেবী,

যার গোপন তমসায় প্রথম আলো জন্মায়,

যার নিঃশ্বাসে বুনো হাওয়া দিক পরিবর্তন করে,

যার কোমল শিরায় বয়ে চলে

অচিন আম্রবনের মধুর অন্ধকার।


আমি চাইলে কঠোর, তুমি চাইলে লাজুক,

তবু দেখো, এই পরিচয়ও টিকে না,

কারণ আমাদের মিলন কোনো নামে বাঁধা পড়ে না,

তা হলো বনের নিদাঘের মতো,

যেখানে দুই বৃষ্টি-দেবতা

গোপনে অগ্নিকে আলিঙ্গন করে।


তোমার চুলের আঁধারে যে গন্ধ,

তা দীপশিখার কুণ্ডলি তোলে আমার বুকে,

একবার শীতল ধূপ,

একবার অগ্নিমেঘ,

আর তার মাঝখানে হঠাৎ

তোমার চোখ

যেন ক্ষুদ্র দুই যজ্ঞকুণ্ড,

আমি যার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে

হই বিলীন, হই বারবার জন্ম।


তোমার ত্বকের কান্তিধূসর ঢেউ

আমার হাতের ছায়ায় কেঁপে ওঠে

আমি শুনতে পাই

দূর কোনো প্রাচীন মন্দিরের ঢাক,

তার গম্ভীর রেশ এসে নামে

তোমার কণ্ঠগাত্রে,

তুমি তখন কেবল নারী নও

তুমি আদিম উৎসর্গ,

যেখানে প্রেমেরই পুরোহিত আমি।


আমরা যখন কাছে যাই,

বায়ু থমকে দাঁড়ায়

রাত্রির কালো বেণী লুটিয়ে থাকে মাটিতে,

দূরে কোনো নক্ষত্র

অর্ধেক অন্ধকার হয়ে যায় আমাদের তাপ টেনে,

আর স্বর্গ-নরকের সীমা ভেঙে

এক নতুন অগ্নিপথ খোলে।


সেই পথে আমরা দুই দেহ নয়

দুই প্রাচীন শক্তি,

যারা স্পর্শের ভেতর দিয়ে

তৈরি করে এক আলো-অন্ধকারের পৃথিবী,

যেখানে তোমার ঠোঁটে আছে রাত্রির ধূপ-গন্ধ,

আর আমার বুকের ভিতর

জ্বলে উঠে সৃষ্টি হয়

এক নতুন যুগ, এক নতুন রস,

এক অগ্নিদেবতার আশীর্বাদে গড়া

অতল প্রেমলোক।


২৮.       হে পুণ্যশীলা


কত শত যুগের কালনাগ ছুঁয়েছে তোমার শরীর,
তবুও শ্বেত কমলের পাপড়িগুলো নীল হয়ে ওঠে
তীব্র উত্তাপে, ঘামজলে রং বদলায় তোমার শাড়ি,
মেঘলা গোধূলির মতো গাঢ়, আবার ঝড়ের পর স্নিগ্ধ।

কপাট খুললেই দেখি প্রথম আদিম প্রান্তর,
মুগ্ধতার নিঃশ্বাসে কেঁপে ওঠে লতাগুল্ম,
তরঙ্গায়িত রুপালি জল গড়িয়ে পড়ে
তোমার উপত্যকার গভীর নীল নদী থেকে।
লাজুক আলোয় তোমার সেই প্রান্তর
পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টির মতো সজীব হয়ে ওঠে।

তুমি লজ্জার স্রোতে সাঁতার কাটো, ঈর্ষার জলে ডুব দাও,
একেকটি ঢেউয়ে হারিয়ে ফেলো পরিধেয় অলঙ্কার,
অবেলায় খুলে রাখো পৃথিবীর সব ভার—
নিরাভরণ হয়ে ওঠো নবজাত ভোরের মতো নির্মল,
আদিম, অস্পর্শ, অচিন্ত্যরূপা।

আমি তখন তোমার অস্তনদীর জলে নামি ধীরে,
সেও এক পবিত্র গহ্বর
যেখানে জল গাঢ়, আলো নরম, বাতাস উদ্দাম।
আমি অবগাহন করি তোমার নরম ঢেউয়ে,
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ বাষ্পে ধুয়ে যায় আমার পাপ,
অন্তর শুষে নেয় স্রোতের শুদ্ধতা।
আমি ক্রমে পুণ্যবাণ হয়ে উঠি
তোমার দেহধারার পবিত্র স্নিগ্ধতায়—

হে পুণ্যশীলা,
তোমার আদিম জলে ডুবে জন্মাই আমি আবার,
নতুন, অনাবৃত, অনন্তের মতো পবিত্র।


২৯.         অমৃত না–মেলা প্রেম

হাতের রেখায় যতটা উষ্ণতা ছিল
সবই ঢেলে দিলাম তোমার দিকে,
তবু কেন জানি অমৃতভরা সেই সুধাপাত্র
কখনো পূর্ণ হলো না।

সময়ের গায়ে গায়ে জমে ওঠা নীরবতা
ভেঙে তুমি একদিন চলে গেলে দূরে,
হৃদয়ের দ্বার তখনও ছিল খোলা—
তুমি শুধু তাকাও, এই আশায়।

বৃষ্টিভেজা রাত্রির মতো
তোমার স্মৃতি আজও ছুঁয়ে যায়,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো আমি
অল্প আলোয় এখনও তোমাকেই খুঁজি।

ভুলে যেতে চাই, পারি না
হৃদয়ের গভীরতম কুঠুরিতে
তোমার নাম লেখা আছে কাঁটার অক্ষরে;
বেদনাতেও এক অদ্ভুত মাধুর্য জ্বলে।

জানি, একদিন তুমি আর ফিরবে না,
তবু হৃদয় তার আপন নিয়মে
আজও তোমার জন্যই ঢেউ তোলে
অমৃত না–মেলা প্রেমের সাগর হয়ে।


৩০.        রহস্যময় প্রকোষ্ঠ


নারীর শরীর
রহস্যময় এক প্রকোষ্ঠ,
আলো আর অন্ধকারের যুগল নিবাস,
যেখানে দরজা খুললেই
কেউ জেগে ওঠে সৌরালোকে,
কেউ আবার তলিয়ে যায়
অদৃশ্য গভীরের ছায়ায়।

একজন রমণী
জীবনের সব বিষাক্ত তোলপাড়
নিঙড়ে দেয় শহরের আবছায়া স্তম্ভে,
অঙ্কন করে নীরব চিত্র
যেখানে তার আত্মা
শান্তির জন্য ডাকে
নিজের অন্তরতম অবচেতনে।

শহরের বৃষ্টিসন্ধ্যা যখন নেমে আসে,
তার দেহ ভিজে ওঠে অবলীলায়,
ধরে রাখে সেই পুরুষকে
যার কাছে বিশ্ব কোনো একদিন
ঋণী হয়ে থাকে নিঃশব্দে
যে ঋণ ফেরত দেয়
দু’টি দেহের মিলনে।

সব সঙ্গমে আনন্দ জন্মায় না,
কিছু মুহূর্তে জন্ম নেয় জীবন
সেই জীবন সে উৎসর্গ করে
মাত্র একজনকেই,
যার কাছে সে পেখম মেলে
ময়ূরের সুধামাখা ভঙ্গিতে।

অন্যদের কাছে সে শুধু প্রাণহীন প্রতিমা
নিঃশব্দ, নিরাবেগ, অস্পর্শ্য এক মূর্তি।


৩১.      অন্তঃসলিলা মিলনরাগ


তুমি শুধু একবার খুলে দাও হৃদয়ের গোপন কপাট,
এই উচ্ছ্বল যুবকের সামনে আর বন্ধ কোরো না কোনো দরজা।
লজ্জার অবগুন্ঠনটুকু সরিয়ে ফেলো
দেখো, আলো কেমন নেমে আসে তোমার চোখে,
আমার শ্বাসে কেমন জন্ম নেয় নতুন সব উচ্চারণ।

তোমাকে শেখাবো ভালোবাসা কী—
ভাঙা আর গড়ার অনন্ত কারুকাজ,
শরীরের নিখুঁত শিল্প, আবেগের গভীর নকশা
যেখানে সব তছনছ হয়ে আবারও জন্ম নেয়
নতুন এক সৃষ্টির রূপে।

আমি হাঁটু মুড়ে দু’হাতে ছুঁতে চাই
তোমার সঞ্চিত স্মৃতির স্বর্ণরেণু,
যে সব মণিমুক্তা তুমি আজও বুকের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছো,
যে যন্ত্রণাগুলো তোমার ভেতর নরম আলো হয়ে জ্বলে
সেগুলোকে আজ মুক্তি দাও, রাখো আমার বুকে।

এসো, মাথা রাখো এই উন্মূল যুবকের হৃদস্পন্দনে,
অকাতরে বিলিয়ে দাও তোমার সব মণিকাঞ্চন,
তোমার অলৌকিক স্নিগ্ধতা, তোমার নিশ্বাসের ভোর।

আমরা মিলব নদীর মতো
শিরায় শিরায়, স্রোতে স্রোতে,
অন্তঃশীল ধারার অনির্বাণ রূপে।
আমরা ভেসে ভেসে তুলে আনব
অলক্তমাখা পদ্ম-কুসুম,
যেখানে দেহ জল হয়, হৃদয় হয়ে যায় নীরব ঢেউ,
আর ভালোবাসা রূপ নেয়
অমোঘ, আদিযৌবনের কোনও প্রাচীন মন্ত্রে।


৩২.       এসো দু’জনে


হাতখানি বাড়িয়ে দাও
চুড়ির রিনঝিন সুরে আজ যেন অর্ধচন্দ্র দোলে,
মেহেদির গাঢ় রং তোমার আঙুলে গোপন মাধুরী লিখে রেখেছে;
এসো, সে হাতেই আমি অঙ্গুরীর চিরন্তন দীপ্তি পরিয়ে দিই।

মাথাটি ঝুঁকিয়ে দাও
কুচবরণ কেশে তুমি বেঁধেছ রাজকুমারীর নীল খোঁপা,
তার ভাঁজে লুকিয়ে আছে স্বপ্নের কুয়াশা;
এসো, সে খোঁপায় আমি রক্তগোলাপের রেশমি সুবাস ছুঁইয়ে দিই।

মুখখানি তুলো
কপালে পরা টিপে জ্বলে থাকে সন্ধ্যাতারার আলো,
চোখের কাজলে গভীর রাতের নরম ছায়া;
এসো, সে মুখে লোধ্ররেণুর লাজুক কোমলতা মেখে দিই।

কোমরটি এগিয়ে দাও
মোঘল নর্তকী আনারকলির বিছা জ্বলছে রেশম অগ্নিশিখায়,
তার দোলায় দেহের চিত্রল খেয়াল ফুটে ওঠে;
এসো, নাভীপদ্মে চারুকলার নক্ষত্ররেখা এঁকে দিই।

পা দুটি বাড়িয়ে দাও
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো পদধ্বনি বাজে তোমার পায়ে,
আলতার আঁচলে ফুটে থাকে রক্তিম ভোরের লাবণ্য;
এসো, সে পায়ে নুপুর জড়িয়ে দিই নীরব রাতের সুরমালা।

বুকখানি কাছে আনো
আতরের গন্ধ, চন্দনের ধূপ, আর অদৃশ্য পূর্ণিমা-মলয়
তোমার বুকে আজ সমুদ্রের ন্যায় ধ্বনি তোলে;
এসো, সে বুকখানি আমি আলিঙ্গনে বন্ধন দিই,
শান্তির মতো, প্রেমের মতো, চিরন্তন নিবিড়তায়।

ভালোবাসা ভরিয়ে দাও
পূর্ণিমার আলোয় আজ চারিধার উন্মুখ, সমর্পিত, জাগ্রত;
এসো দু’জনে এই নিশীথে
প্রেমের ফল্গুধারা বইয়ে দিই
নক্ষত্রের নীচে, বাতাসের সুরে, নিঃশব্দ আকাশের বুকে।


৩৩.       ম্রিয়মাণ হেমন্ত সন্ধ্যা


কী এক মায়বী শব্দের ধ্বনি  ভেসে এলো, বন্ধু

তোমার সেই ম্রিয়মান সন্ধ্যার স্মৃতিরা যেন আজও বাতাস ছুঁয়ে যায়।

স্বপ্নের সারথিরা যে গভীর অন্ধকারে তোমায় নামিয়ে দিয়েছিল,

সেখানে অলীক মাছেরা, অদৃশ্য শোক, আর না-পাওয়ার আলো জ্বলে ছিল

তার সবটাই অনুভব করলাম তোমার শব্দে।

তুমি যে বেদনার রৌদ্রোজ্জ্বল সকালটির নাম খুঁজে পাওনি,

সেই নামহীন নগ্নতার মধ্যে

আমি দেখলাম তোমার আত্মার নিরাবরণ সাদা চিঠি

যা উড়ে গেল নীল আকাশ ছুঁয়ে,

যমুনা পারের বন্ধুর কাছে।

বন্ধু, তোমার সেই ‘কবি-পাগল’ মনটাকে

হেমন্তের ম্রিয়মান আলোয় ভালোবাসার যে হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল,

তা আজও জ্বলজ্বল করে ওঠে শব্দের ভিতরে।

লাশকাটা ঘরের নিঃসঙ্গতা ভেদ করে

যে প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়েছিল,

তারা এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে তোমার স্বপ্নের রং,

আর সেই রঙেই তোমার কথার বিপরীতে লিখছি আমি।

বন্ধু, তোমার বেদনার ভিতরে যে আলো লুকানো,

আমি সেই আলোরই পাশে বসে আছি

নির্জন হেমন্তের সন্ধ্যা জুড়ে

তোমার শব্দের মায়া ছুঁয়ে।


৩৪.       চন্দনে চন্দনে 


শাড়ির আঁচলটুকু আধখানা মুখে রেখে
যেভাবে তুমি দাঁড়িয়েছিলে রাতের নির্জনা ভেদ করে
সেই রাত ভোর হয়েছিল বুনো চন্দনের গাঢ় গন্ধে,
যেন তোমার ত্বকেই জন্ম নিয়েছিল সুগন্ধের প্রথম আভা।
তার আগের রাত- কোজাগরীর পূর্ণিমা ভিজে উঠেছিল
তোমার চোখের জ্যোৎস্নার মতো দীপ্ত সুধায়।

তুমি এমনই,
মায়ায়, মদিরায়, অচেনা এক আকর্ষণে ভরা
যে আকর্ষণের নেশায় আমি
অগণিত রাত বসে থেকেছি নিঃশব্দে,
বুকে মেখে নিয়েছি চন্দনের কুহক আর
গভীর নিশীথে ভাসিয়ে দিয়েছি জ্যোৎস্নার নরম ঢেউ।

আজ তুমি এত কাছে
আমার নিঃশ্বাসের বাঁকে বাঁকে মিশে আছো,
তোমার ত্বকে ছড়িয়ে আছে চন্দনের নরম উত্তাপ,
তোমার দেহভরা আলোয় ঝরে পড়ছে পূর্ণিমার স্বর্ণধারা।
চন্দনে চন্দনে, জ্যোৎস্নায় জ্যোৎস্নায়—
তুমি আর আমি একাকার হয়ে আছি,
তারারাও যেন থমকে আছে আমাদের গোপন নীরবতার সামনে।


৩৫.        ধবলতুষারের নিশীথরাগ


সারারাত তোমার শরীরের উষ্ণতা
জ্বলতে ছিল আমার বুকে
সকালে দেখি তুমি নেই,
শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ভেসে আসে
ধবলতুষারের কুচি,
যেন তোমার ছোঁয়ার শীতল স্মৃতি।

কখন যে ভেঙে গিয়েছিল
আমাদের জোড়া-শরীরের মায়াবী বাঁধ,
কখন যে তরঙ্গ উঠে
ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দুই দেহকে
মনে নেই, কিছুই নেই,
শুধু ভেজা চাদরে তোমার আঙুলের দাগ,
উন্মাতাল নিশ্বাসের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।

রাতের গভীরে তুমি ছিলে
এক উষ্ণ আদিম ঝড়
আমার বুকে ঝরে পড়েছিলে
জ্যোৎস্নার মতো,
চুলে লেগে ছিল তোমার কামরসের গন্ধ,
শরীরের প্রতিটি কোণে
তোমার উত্তাপের স্বাক্ষর।

সকালের বিমুগ্ধ আলোয়
আমি শুধু ভাবি
রাতের সেই বুনো উচ্ছ্বাসে
তুমি কি সত্যিই ছিলে,
নাকি তুমি
ধবলতুষার গলে তৈরি হওয়া
এক ক্ষণিক উষ্ণ অলৌকিকতা?


৩৬.        অগ্নিশিখার গোপন রাত্রি


তোমার দেহে যখন গোধূলি নামে,
আমি দেখি
মধ্যরাত্রির গোপন বাগান
ধীরে ধীরে খুলে যায় অবিমিশ্র আলোয়।

শিহরণে কেঁপে ওঠা ত্বক
জ্যোৎস্নার মতো গলে আসে আঙুলের উপর,
তোমার কেশে লুকানো সুগন্ধ
হঠাৎ উন্মোচিত হয় বজ্রনিশির নিস্তব্ধতায়।

তুমি কাছে এলে,
দূরাগত নদী গর্জে ওঠে নিশ্বাসের তালে,
জলরেখার মতো বাঁক নেয় তোমার গ্রীবা,
চোখে জমাট বাঁধে
অদৃশ্য অগ্নিশিখা
যেখানে আমার ছায়া ছুঁয়ে যায় তোমার তৃষ্ণার তটরেখা।

প্রেম তখন ক্ষুধার রূপ ধরে,
শরীর তখন মন্দিরের দরজার মতো
ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার আগুনজড়ানো রহস্য।

আমি তোমাকে ছুঁই না
তুমি নিজেই হয়ে ওঠো সংবেদনার আকাশ,
আমি শুধু হাওয়া,
যার স্পর্শে কম্পিত হয়
তারুণ্যের লতা,
রাত্রির পর্দা,
এবং তোমার সমগ্র দেহের দীপ্ত অতল।

এই মিলনের অগ্নিবীজে
আমরা দু’জনেই
এক নতুন ভোরের জন্ম দিই
যেখানে কাম আর প্রেম
একই শিখায় জ্বলে,
একই ছায়ায় নিভে যায়,
আবার জ্বলে ওঠে।


৩৭.     অগ্নিজ হিমালয়ের নিচে


রাত্রি যখন রক্তিম ছাই হয়ে ওঠে,
তোমার দেহ তখন জ্বালামুখ
এক অনন্ত আগ্নেয় প্রান্তর
যেখানে আমার ছায়া পড়তেই
ধোঁয়ায় ভরে যায়
তারুণ্যের জ্বলে-পোড়া বাতাস।

তোমার শ্বাস
ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে আমার বুকে,
আমি শুনি দগ্ধ লতার আর্ত শব্দ,
শোনাই জ্বলে ওঠা রক্তের নাচন।

তোমার গ্রীবা বাঁকে যেন বজ্রপাতের আগে
আকাশের শেষ সঙ্কোচ,
তারপর হঠাৎফেটে যায় নীরবতার খোলস,
আমাদের উভয়ের ভিতরের দাহ
এক হয়ে ওঠে উন্মাদ নদীর স্রোতে।

তুমি যখন চোখ বন্ধ করো,
পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যায়,
কিন্তু সেই অন্ধকারেই
আমাদের মিলিত উত্তাপ
পাহাড়ের হৃদয়ে সঞ্চিত
লাল লাভার মতো
ফেটে ফেটে ওঠে।

দেহ তখন সীমানাহীন
স্পন্দনের ঢেউয়ে ঢাকা পড়ে
সমস্ত লজ্জা, সমস্ত প্রতিরোধ।

অতঃপর আমরা দুটি জ্বলন্ত ধূমকেতু,
কক্ষপথ ভেঙে
আছড়ে পড়ি পরস্পরের জীবনে,
ফুটে ওঠে এক নির্জন অগ্নিবৃক্ষ
যার পাতায় ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে
অবদমিত কামনা,
এবং শেকড়ে জমে থাকে আমাদের স্পন্দিত রাত্রির গভীরতম নীরব উত্তাপ।


৩৮.        জামতৈলের নির্জন কুটীরে


কত পথের ধুলো মেখে হেঁটেছি,
বাতাসের কাছে রেখে গেছি দীর্ঘশ্বাস,
শূন্য খেয়াঘাটে রাত কাটিয়েছি
অচেনা তারার সঙ্গে কথাবার্তায়।

কত বন্দর, কত জনপদ,
সবাই যেন ক্ষণিক ছায়া,
সবাই যেন চলে যায় হাতছাড়া হয়ে,
কিন্তু হৃদয়ের সেই একটিমাত্র সুর
কোথাও মিলেনা, কোনো কোলাহলেই না।

তবু খুঁজে গেছি…
শহরের ভিড়ে, নদীর কূলে,
ঝড়ের ভিতর, নীরব দুপুরে,
অন্ধকারে চোখ রেখে
জ্বলে ওঠা কোনো সঙ্গী-আলোর সন্ধানে।

অবশেষে পেলাম,
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে,
এক নির্জন, শ্রান্ত, শান্ত কুটীরে;
বাতাসে ছিলো ধানের গন্ধ,
বারান্দায় শুকাচ্ছিল রোদ্দুরের নীরবতা,
আর তুমি
আমার হারানো সকল পথ
এক ক্ষণে ফিরে এনে
দাঁড়িয়েছিলে দুয়ারের সামনে।

সেদিন বুঝলাম,
যাকে এতকাল খুঁজেছি
সে আসলে কোনো দূরের অলৌকিকতা নয়,
বরং এক নিভৃত ঘরের কোমল আলো,
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক নিঃশব্দ উপস্থিতি,
যার কাছে পৌঁছে গেলে
সব পথের কষ্ট, সব ঘুরে বেড়ানো,
অবশেষে পায় তার অর্থ।


৩৯.       জামতৈলের নির্জন কুটীরে 


কত পথ হেঁটেছি
জলধারায় ভেজা মাটি, পুড়ে যাওয়া দুপুরের তাপ,
রাতের বুকে কালো ঝিঁঝিঁর শব্দ
সবই যেন আমাকে ঠেলে নিয়ে গেছে
কোনো অজ্ঞাত গন্তব্যের দিকে।

কত প্রান্তর
পদচিহ্নহীন, ছায়াহীন,
যেখানে বাতাসও কখনো
আমার নাম উচ্চারণ করেনি;
তবু আমি হেঁটেছি,
কারণ হৃদয়ের ভিতর
একটি অপরূপ আকুলতা
চিরকাল বলেছে
“আরও একটু এগোও…
ওপাশেই কেউ অপেক্ষায় আছে।”

কত বন্দর, কত লোকালয়
মানুষ এসেছে, মানুষ গেছে,
জোয়ার-ভাটা স্রোতের মতো
সব ভালোবাসা এসেছে দূরে মিলিয়ে গেছে।
আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি
অন্তরের গহীন গৃহে
এক আলোর প্রতীক্ষায়।

অন্ধকারেও চোখ রেখে
যাকে খুঁজেছি এতকাল
সে যে কোনো মুখ ছিল না,
সে ছিল এক উচ্চারিত না হওয়া নাম,
এক অচিহ্নিত স্পর্শ,
এক অদেখা অথচ অনুভূত সঙ্গ।

অবশেষে পেলাম
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে
এক নির্জন শ্রান্ত শান্ত কুটীরে।

সেদিন সন্ধ্যা নেমেছিল ধীরে,
কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরেছিল কাশফুলের ডগা,
রেললাইনে জমে ছিল বহুদিনের বেদনা
তার মধ্যেই তুমি এসে দাঁড়ালে
দু’হাত ভরে অথচ নিস্তব্ধ আলো হয়ে।

তোমার চোখে তখন
দুপুরের ধানক্ষেতের মতো শান্ত সবুজ,
শ্বাসে ছিলো নদীর স্নিগ্ধ সুর,
কণ্ঠে ছিলো অব্যক্ত অথচ পূর্ণ কোনো ডাক।

তোমাকে দেখে মনে হল
এই তো সেই,
এই তো সেই দীর্ঘ খোঁজা আশ্রয়,
এই তো সেই ছায়া
যার কাছে পথ-ফুরানো ক্লান্তি
ফিরে পায় নতুন অর্থ।

জামতৈলের সেই কুটিরে
আমরা বসেছিলাম পাশাপাশি
বাতাসে উড়ে যাচ্ছিল
পৃথিবীর সব ব্যর্থ যাত্রার গল্প,
আর আমাদের নীরবতার ভিতর
দু’টি হৃদয় ধীরে ধীরে
এক নদী হয়ে মিলেছিল।

তখন বুঝলাম
এতদিন যে সকল পথ, সকল প্রান্তর,
সব লুকানো কান্না, সব একাকীত্ব,
সবকিছুই আমাকে নিয়ে এসেছে
এই অল্প আলোয় ভেজা
তোমার ছোট্ট ঘরটিতে।

আর তুমি
দূরের কোনো স্বপ্ন নও,
তুমি এ পৃথিবীরই এক নিভৃত আশ্রয়,
যেখানে গেলে ক্লান্ত পথিকরা
নিজেদের হারিয়ে না ফেলে
বরং খুঁজে পায়
তাদের সত্যিকার ঘর।


৪০.       গতস্য শোচনা নাস্তি


জীবনের কত হাস্নাহেনা-সুরভি
নিভে গেছে গ্লানির গাঢ় অন্ধকারে,
কত রাত্রি, কত প্রভাত
ভেসে গেছে অশ্রুজলের অচেনা স্রোতে—
তবু সময় বলে যায় নরম স্বরে,
গতস্য শোচনা নাস্তি
যা গেছে, তার আর ফেরবার পথ নেই।

যে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে নিঃশব্দে,
তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদার কোনো মানে নেই,
কারণ আলোর মতোই ভবিষ্যৎ আসে
নিজের তাল, নিজের দোলা নিয়ে।
ঝরে যাওয়া ফুলের গন্ধও
শ্যামল মাটিতে মিশে নতুন জন্ম ডাকে
জীবন বড় বিচিত্র পুনর্জন্মের কারিগর।

তাই আজও, ক্লান্ত বুকের গভীরে
একটি শান্ত শ্বাস ভাসে
যত ক্ষত, যত হারানো সুরভি,
সবকিছু পেরিয়েও সময়ের নদী বয়ে যায়,
আর আমরা শিখি,
যা ছিল, তা ছিলই
কিন্তু যা আসছে,
তা-ই আমাদের সত্য, আমাদের ভোর।

গতস্য শোচনা নাস্তি
তবু এগিয়ে চলাই জীবনের প্রথম ধর্ম।


৪১.        প্রথম অনুভবের পথে

হাত ছুঁয়ে দেখলাম
রেখাগুলো আজও ফিসফিসিয়ে বলে পুরনো কোনো গান,
যেন সময়ের মুঠোয় আটকে থাকা
এক টুকরো চিরসবুজ স্মৃতি।

তোমার চোখের তারায়
এখনো জ্বলে ওঠে প্রথম দেখার বিস্ময়—
ঝলমলে, দীপ্ত, অচেনা আলোর মতো
যা আমাকে টেনে নিয়ে যায় নীরবতার গভীরে।

ঠোঁটের পৃষ্ঠে কাঁপন,
বুকের নিচে উতল ভালোবাসা
সবই যেন ফিরে আসে নবজন্মের ছায়াপথে,
ইচ্ছাগুলোও মায়াবদ্ধ,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
তারারা নেমে আসে ভোরের দিগন্তে।

চলো তবে,
অনাগতের পথে হাঁটতে থাকি
সেই প্রথম অনুভবের মতো,
যেখানে দু’জনার চাওয়া-পাওয়া
আলোর রেখায় বাঁধা হয়ে
নতুন ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকে।


৪২.    তুমি ভোরের চাঁপাফুল 


 তুমি ভোরের চাঁপা ফুল আর জুঁই,এত মধুর সুবাস আমি কোথায় থুই,হৃদয়ের গোপন কোষে রাখি তুলে, নিঃশব্দ ভোরের শিশিরভেজা দুলে দুলে।

তুমি দিতে চাও না কিছুই, আমি জানি,
তবু তোমার ছায়া এসে ছুঁয়ে যায় প্রাণই;
অদৃশ্য স্রোতে ভাসাও হৃদয়গীত,
স্পর্শ না ছুঁয়েও তুমি দাও উষ্ণ নীতি।

নির্বিকার থাক, সে আমি নিঃশব্দে বুঝি,
তবুও তোমার মাঝেই নিমগ্নতা খুঁজি;
তোমার মুখের লাজুক আলোর রেখা,
চোখের কোণে যেন কোন্‌ অতল দেখা।

তুমি দূরে দাঁড়ালেও কেমন এক টান,
শিউলি ভেজা বাতাসে দোলে তোমার গান;
অচেনা স্বপ্নেরা জপে তোমার নাম,
নীরব আকাশে জ্বলে প্রেমেরই চাঁদ-ধাম।

তাই বলি
তুমি থাকো, থাকো শুধু এই মায়ার মতন,
আমি তোমারই পথে ছড়িয়ে রাখব মন;
তোমার সুবাসে চলুক জীবনের ধারা,
ভোরের চাঁপাজুঁই তুমি আমার সৌরভসারা।


৪৩.        জলকাব্য 


কোন্ অচেনা মেঘের ছায়া থেকে
হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আমি জানি না
রবিকিরণ পেরিয়ে যাওয়া আলোও
আমার চোখে ধরা দেয় না কখনো।

রাতের আকাশে তারাদের দীপ্তি
সূর্যের বেপথু কিরণে
লুকিয়ে পড়ে নিঃশব্দে
ঠিক তেমনই লুকিয়ে থাকে
আমার অনুচ্চারিত প্রণয়ের ভাষা।

কখনও হঠাৎ মন আমার
বৈরাগীর মতো নির্জন হয়,
অপ্রকাশিত শিহরণের ঢেউ
অদেখা মেঘ থেকে ঝরে পড়ে
জলের মতো কোনো নদীর বুকে।

সেই নদীও হঠাৎই বিহ্বল হয়ে
আকুল স্রোতে ছুটে যায় সাগরপানে,
মেঘ তখন পরাজিত,
রবিকিরণ তরঙ্গের কোলঘেঁষে
উথলে ওঠে নূতন আলোয়।

শেষে সব জলবিন্দু
নদীর আবক্ষ গহ্বরে মিলিয়ে যায়
নিশ্চুপ, নিঃশেষ,
তবু চিরন্তন সঙ্গমের
অমলিন সুর ছড়িয়ে রেখে।


৪৪.      নিঃশব্দ পদচিহ্ন 


কাল সারারাত ছিল তারা-ভরা রাত,
আকাশ জেগে ছিল জেগে ছিল শুধু নিস্তব্ধতার বাতি।
চাঁদের গায়ে জমেছিল শীতল নীলের আবেশ,
তবু আমার চোখের উপকূলে
কেউ এসে রাখেনি স্বপ্নের হালকা স্পর্শ।

নির্জনতা যেন নিঃশব্দ পদচিহ্ন ফেলে
বসে ছিল আমার মাথার কাছে,
ঘুম আসেনি এসেছে শুধু ক্লান্তির নরম কুয়াশা।
দূরের তারা এক এক করে ডেকেছে,
বলেছে “দেখো, এ রাতও কারো জন্য জ্বলে!”
কিন্তু আমার জানালায়
কেউ খোলেনি গল্পের দরজা।

হায়, এ নির্ঘুম রাতও হলো ব্যর্থ,
স্বপ্নরাণী কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি?
কার আকাশে নক্ষত্র ছুঁতে গেলে
আমার চোখ রেখে গেলে শূন্য?

আজও ভোর হবে, আলো উঠবে ধীরে,
তবু জমে থাকা সেই আক্ষেপ
মুছে যাবে কিনা জানি না।
তোমার একটুখানি উপস্থিতি
হলে রাত জেগে থাকা কত সহজ হতো,
আর স্বপ্নহীন ঘুমগুলো
হতো তোমারই নামে লেখা একেকটি কবিতা।


৪৫.       অচেনা পদচিহ্নর মায়া 


শত বছর পরে,
নিশীথের বৃষ্টিভেজা ঘ্রাণে
জেগে উঠবে অচেনা কোনো ঝোপ,
মাটির ফোঁড়া কাটা লুকোনো কোনে
ঝিঁঝি পোকা ডাকবে নীরবতার বুক চিরে।

বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষা আঁধারে
বনমৌরির সুগন্ধ উড়ে বেড়াবে
পুরোনো কোনো গান হয়ে,
জোনাকিদের চোখে উঠবে
আলো আর আকুলতার দোল।

সেই অগোচর রাতে,
আমি ফিরে আসব অতি ক্ষুদ্র সত্তা হয়ে,
নিভৃতে ভেসে উঠব জোনাকির আঁচলে,
কিংবা ঝিঁঝি পোকার কম্পিত ডানায়।
কারো চেনা মুখ থাকবেনা হয়ত,
মাটি শুধু স্মরণ করবে অচেনা পদচিহ্নের মায়া।

তবু এই পৃথিবীতে
ফিরে আসার যে গভীর আকাঙ্ক্ষা
তার কোন নাম নেই,
শুধুই আলো হয়ে, শব্দ হয়ে,
অথবা এক বিন্দু নরম প্রাণ হয়ে
আবার জন্মাতে চাওয়া
এই অনন্ত নীল গ্রহের হৃদয়ে।


৪৬.        বিদায় বীণা 

এই যে রাত্রির বুকের ভেতর
হঠাৎই নিভে গেল তোমার পদধ্বনি
মনে হয়, ঘুমন্ত আকাশ থেকে কেউ
তারাদের গায়ে ছায়া মেখে
তোমাকে খুব ধীরে তুলে নিয়ে গেছে।

কী নিয়তি তবে এভাবে ডাকে?
কোন্ অদৃশ্য তীর্থপথে তুমি
অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে হেঁটে গেলে
আমরা শুধু শুনে রইলাম
তোমার বিষণ্ন শ্বাসের প্রতিধ্বনি।

জীবন-বীণার সুর থেমে গেছে ঠিকই,
তবু তার ছিন্ন তারে আজো
মৃদু কান্নার মতো কোথাও কাঁপে আলো।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদ
হয়তো এখনো তোমার খোঁজে জেগে থাকে।

তুমি যে রেখে গেলে অশ্রুর নীরব মেঘ,
সেই মেঘ ভিজিয়ে রাখে কত অনামা রাত।
আর আমরা, এই ধূলিমাখা পৃথিবীর মানুষ,
তোমার শূন্যতার দিকে তাকিয়ে
নিঃশব্দে উপলব্ধি করি
বিদায় কখনও শেষ নয়,
শুধু আরেক যাত্রার আরম্ভ।


৪৭.      তোমার আমার পৃথিবী 


তুমি নও
তোমার ছায়া পড়ুক আমার প্রাণে,
স্পর্শ নয়
তোমার চেয়ে থাকা তান তুলুক আমার গানে।
এখন একটু দূরেই থাকো—
এই দূরত্বেই জমে উঠুক নীরব কথার ঢেউ,
এই ফাঁকে জমে উঠুক আকুলতার নরম রোদ্দুর।

আবার একদিন বকুলঢাকা বনে হাঁটব দু’জনে,
আবার একদিন
শ্রাবণ আকাশ নীলাদ্রি হবে হৃদস্পন্দনে—
তোমার হাতের উষ্ণতায় খুলে যাবে ভুলে থাকা সব জানালা,
ঝরনার জলে কাঁপবে আমাদের অনুচ্চারিত সময়গুলো।

হয়তো সেদিন
চোখের ভেতর ভেজা আলোয় দেখব
কতদিনের না-বলা ভালোবাসা,
হয়তো সেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে
ফুটে উঠবে আমাদের একসাথে থাকা সুরের কাব্য।

এখন শুধু একটু দূরে থেকো
এই দূরত্বটুকু হোক আমাদের পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি,
যেন ফিরে আসার মুহূর্তে
তোমার আমার পুরো পৃথিবী
একটি চুম্বনের মতো নীরবে জেগে ওঠে।


৪৮.    রহস্যময় রাতের অমৃতসুধা


কোথায় সেই রহস্যময় রাত
যার অন্ধ তারায় জ্বলত আমাদেরই অচেনা নাম,
যার নিঃশ্বাসে ভেসে আসত লুকোনো কোনো পুরনো প্রতিশ্রুতি,
চোখে চোখে লেখা হতো নীরবতার গভীরতম বাণী।

কোথায় সেই হৃদয়–দুয়ার খুলে দেওয়া আশ্চর্য সন্ধ্যা,
যেখানে বাতাসও থমকে দাঁড়াত তোমার পদক্ষেপের শব্দে,
যেখানে ছায়ারা জানত আমাদের গোপন আকুলতা,
আর চাঁদের আলোয় লেপ্টে থাকত অগোচর অভিমান।

কোথায় সেই অনাস্বাদিত মখমলের সমুদ্র জল,
যার ঢেউয়ে কাঁপত শরীরের ভেতর লুকোনো সুর,
যার নোনাজলে ডুবে যেত ভয়, দুঃখ, একাকীত্ব,
শুধু জন্ম নিতো নবপ্রেমের তরঙ্গ ভারী নরম আলোয়।

কোথায় সে দাঁড়িয়ে অমৃত–সুধা পাত্র হাতে,
উল্লাসে, নিবিড় প্রার্থনায়, অধীর চোখে ডাক দিত,
“দাও ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে…”
আর আমরা দু’জন ডুবে যেতাম সেই চিরচেনা অজানায়,
যেখানে সময় থেমে থাকে, ফুলেরা নিশব্দ হয়ে শোনে,
আর আকাশের নীচে জন্ম নেয় অব্যক্ত এক প্রেমের মহারাত্রি।

সেই রাত কি এখনও আছে কোথাও—
নাকি তোমার হৃদয়েই লুকিয়ে রাখা,
নিস্তব্ধ কোনো শিরায় অনন্তের মতো?


৪৯.        স্পর্শের  কবিতা


রাতের জানালায় জ্বলে ওঠে তোমার ছায়া-

সেই ছায়াই আমার সব পাপের জন্মদাতা।

আমরা দু’জনই জানি, এই পথ বৈধ নয়,

তবু অকারণের উষ্ণতা

কেন যেন শরীরের ভেতর

জ্বলে ওঠা মোমবাতির মতো টেনে নেয়।


তোমার গলার হালকা ঢেউ

আমার শ্বাসে এসে লাগে

কানে কানে তুমি ফিসফিস করলে

আমার বুকের ভেতর

ঝড় ওঠে অস্থির বৃষ্টির।

তোমার কাঁধের মোলায়েম ঢাল

আমার আঙুলে এলে কাঁপে,


লাজুক অন্ধকারে

তোমার পিঠের উপত্যকায়

আমার দৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে

গোপন জ্যোৎস্নার মতো।

তোমার ঠোঁট

কোমল নিষিদ্ধ কোনো ফলের মতো,

ছুঁতেই মনে হয়

সারা শরীর উষ্ণ হাওয়া হয়ে উঠছে।

তুমি যখন একটুখানি ঝুঁকে

আমার বুকে হাত রাখো

মনে হয় দাহন জ্বলে উঠে

গোপনে রাখা সব অগ্নিকণা থেকে।


আমাদের মাঝে থাকে না কোনো আইন,

থাকে শুধু  নীরব চুক্তি

তোমার বুকে উঠে-নেমে যাওয়া

অচেনা ঢেউ

আমার হাতের তালুতে

প্রতিবারই নতুন অপরাধ লিখে দেয়।

এই পরকীয়া পাপ নয়,

বরং এমন এক দহন  যা নিভে গেলে

সারা দেহ শীতল হয়ে যায়।

তাই তুমি যখন রাতের গভীরে আমার দিকে আসো

তোমার আলোর মতো দেহ নিয়ে

আমি সমস্ত ভ্রম ভেঙে

তোমাকে আবার স্পর্শ করি

অন্যায় জেনেও, অবশ হয়ে।


৫০.         নিঃশ্বাসে তুমি, প্রশ্বাসে তুমি 


আমি নিঃশ্বাস নেই

তোমার শরীর থেকে ছুঁয়ে আসা উষ্ণ বাতাসে,

যেন ভোরের কুয়াশা গায়ে মেখে

নরম হয়ে ওঠে আমার প্রতিটি কোষ।


আমি প্রশ্বাস রেখে যাব

তোমার নিঃশ্বাসের অনুরণনে—

যেখানে তুমি আছো,

সেখানে ঢেউ তোলে আমার হৃদয়ের নীরব স্পন্দন।


তোমার কণ্ঠের ক্ষীণ কম্পনে

জেগে ওঠে আমার ঘাসফুলের মতো স্বপ্ন,

তোমার আঙুলের অদেখা ছোঁয়ায়

জ্বলে ওঠে শরীরজোড়া অনন্ত জ্বালাময়ী আকুলতা।


আমি তোমার নিশ্বাসে বাঁচি

যেন প্রতিটি শ্বাসই আমাদের দু’জনার

অদৃশ্য কোনো গোপন বাঁধন,

যা ছিন্ন হলেও আবার জুড়ে যায়

ভালোবাসার মায়াবী শব্দহীন স্পর্শে।


তুমি দূরে গেলে

আমি বাতাসে খুঁজি তোমার ফেরা পদধ্বনি,

তুমি পাশে এলে

আমি নিজেকে হারাই তোমার অনামিক স্নিগ্ধ গন্ধে।


হয়তো ভালোবাসা এতটুকুই

এক শ্বাস থেকে আরেক শ্বাসে

দু’জনার অদৃশ্য বিনিময়,

যেখানে আমরা নেই আলাদা

শুধুই হই একে অপরের

চিরন্তন বায়ুর মতো সঙ্গী। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন