বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

যারা আর ফিরে আসে না ( কাব্যগ্রন্থ)





যারা আর ফিরে আসে না  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

এই বন্ধুটি আমাদের মেলবন্ধনের 
রূপকার, যার উপস্থিতি রবীন্দ্রনাথের 
গীতবিতানের অমল গানের মতো শব্দে-নিঃশব্দে ছড়িয়ে দেয় ঐক্যের সুর।
আমাদের সব আয়োজন, সব উৎসবের 
প্রাণসঞ্চারিনী সে। 

দিলরুবা জলিল শাহীন,
এই গ্রন্থখানি তোমারই নামে।
তোমার মমতা, সৃজন আর অনাবিল ভালোবাসার 
প্রতি এক নীরব কৃতজ্ঞতা।


১.       বিষণ্নতার বারান্দায় তুমি



বিষণ্নতার বারান্দায় তুমি দাঁড়িয়ে থাক
সন্ধ্যার নরম আলোয় ভিজে
যেন কেউ নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেলো
তোমার ম্লান চোখের উপকথা।

হালকা হাওয়ায় দুলে ওঠে তোমার চুল,
আমি দেখি
কত না বলা কথা জমে আছে
নিঃশ্বাসের ভেজা জানালায়।

তুমি যখন বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে
দিগন্তে তাকাও
আমি বুঝি, তোমার দূরত্বে
আমার হৃদয়ের সব নীলচে অনুরাগ
আলতো কুয়াশায় মিলিয়ে যায়।

তবুও তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
আমি দেখি
বিষণ্নতার ভেতর থেকেও
একটা ছোট্ট দীপশিখা জ্বলে ওঠে,
যেন তুমি ডাকছো আমাকে
অদেখা কোনো আলোয়।

এবার তুমি ফিরে তাকাও,
বারান্দার বিষণ্নতাকে পেরিয়ে
আমার দিকে আসো ধীরে,
হৃদয়ের ভেজা পথে ফুটুক
নতুন ভোরের সূর্যরঙা উষ্ণতা।


২.   অনন্ত পর্বত জুড়ে 

নিভৃতে রামগিরির পথে
ঝড়ের ডানায় ভেসে আসে তোমার নাম
পর্বতের বুক জুড়ে তখন
জ্বলে ওঠে নীলাভ আগুন,
তুষারগুচ্ছের ফাঁকে ফাঁকে
নির্ঝরের মতো বাজে প্রেমের গোপন সুর।

আমরা হেঁটে যাই মেঘ-ভেজা শৃঙ্গের ধারে
কপোল ছুঁইয়ে দেয় হিমেল বাতাস,
আর তুমি যেন দূর থেকে
শেফালির সুবাস হয়ে এসে
আমার অস্থিমজ্জায় ঢেলে দাও আলো।

এসো প্রিয়ে,
তোমার রাঙা পদতলে ফুটুক তারার দল
নুপূরের রিনিঝিনি ছড়িয়ে যাক
নীল ছায়াঘেরা উপত্যকায়।
বনমল্লিকার ঝাড় পেরিয়ে
এসো তুমি সঙ্গীতের মতো ধীরে,
এসো হৃদয়ের মিলনদুয়ারে।

রক্তিম চাঁদ আজ উঠেছে শুধু আমাদের জন্য
রামগিরির গাঢ় নীরবতা ভেঙে
তোমার আমার মিলনের গান

গুঞ্জরিত হোক অনন্ত পর্বতজুড়ে।


৩.       ময়ুরাক্ষী, তুমি আমার


তোমার চোখে নদীর ঢেউ,
সেই ঢেউয়ের ভেতর নীল-রঙা স্বপ্নেরা
নীরব গোপন মায়ায় ডেকে যায় আমাকে।
তোমার চুলে রাতের গন্ধ,
যেন আকাশ নিজের অন্ধকার খুলে
তোমার কাঁধে রেখে দিয়েছে সুধার পরশ।

তোমার হাসি
একটি অচেনা সকাল,
যেখানে শিশিরেরা কাঁপতে কাঁপতে
সূর্যের প্রথম আলোয় প্রেম শেখে।

আমি শুধু বলি
আর কতো দূরে থাকো ময়ুরাক্ষী?
এই বুকের ভেতর যে নদী বয়ে যায়
তা তোমার নাম উচ্চারণ করেই
চিরকালীন স্রোত হয়ে থাকতে চায়।

চাইলে তোমাকে কাবিননামার শব্দে নয়,
হৃদয়ের নরম কাগজে লিখে দিতে পারি
একটি মাত্র প্রতিশ্রুতি
তুমি থাকো, এই ভুবন থাকবে আলোকিত।

এসো তবে,
তোমার তরুণ হাসির আলোয়
আমার সমস্ত দিনকে পুষ্পিত করে দাও
ময়ুরাক্ষী, তুমি আমারই হয়ে যাও।


৪.       একটি প্রেমের কবিতা


তুমি ছিলে জন্মজল
গভীর, স্নিগ্ধ, মায়াভরা এক প্রবাহ,
যার কাছে পৌঁছাতে গেলে
পুনর্জন্ম নিতে হয় শরীর-স্মৃতির ভেতর।

তোমার ছাঁপ ছুঁয়ে আসে পৃথিবীর প্রথম স্নেহ,
প্রথম গোপন আলো
যা হাত বাড়াতেই নরম উষ্ণতায় গলে যায়।

তোমার জলরেখায়
আমি শিখেছি নীরবতার গভীর নতজানু ভাষা,
শিখেছি কী করে
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে
দীর্ঘশ্বাসের মতো এক অচেনা প্রাণস্পর্শ।

তুমি নড়লে জল কেঁপে ওঠে
ফেনার নীচে লুকানো থরথর রহস্য
ধীরে ধীরে উঠে আসে আলোর কাছে।

আমি ভাসি তোমার স্রোতে
আদিম জ্যোৎস্নার মতো সাদা,
নদীর দেহে দেহ রেখে খুঁজে ফিরি সেই প্রথম কম্পন,যা পৃথিবীকে এক মুহূর্তে

 নতুন করে বানায়

তোমার তীরে দাঁড়িয়ে
আজও মনে হয়
আমি যেন সেই অজানা নোঙ্গর,
যাকে ডেকে নেয়
তোমার গোপন ভাটার দোল, আর তুমি
অলক্ষ্যে, নরম ঢেউ হয়ে
আমাকে টেনে নাও
তোমার গভীর, উষ্ণ, অন্তঃসলিলায়।


৫.      স্পন্দন

যে চুম্বন শুধু ঠোঁটের ছুঁইছুঁই নয়

দু’টি দেহের উষ্ণ রেখা যখন

নিভৃত অন্ধকারে একে অন্যের দিকে বেঁকে আসে

যে আশ্লেষ শুধু বাহুর বলয়ে আটকে থাকে না,

দেহের ভিতরে  লুকোনো স্পন্দন

ধীরে ধীরে আরেক স্পন্দনের সাথে

গোপনে তাল মিলিয়ে ফেলে।


যে ঘনিষ্ঠতা শুধু গভীর স্রোতে ডুবে যাওয়া নয়,

বরং শরীরের ভাঁজে ভাঁজে

একটি নরম অন্ধ আলো জন্ম দেয়

যে সাড়া শুধু উত্তুঙ্গ স্বরের মুক্তি নয়,

বুকের নিঃশ্বাসে জমে থাকা

একটি দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের কম্পন।


তবু দেহের সমস্ত ভাষা সেখানে থাকে,

ঠোঁটের আর্দ্র কোণায়, শরীরের উন্মত্ত ঢেউয়ে,

গোপন কোনো কেন্দ্রে জমে থাকা

নামহীন আকর্ষণের ভারে।


সবকিছু প্রকাশ্য নয়, তবু সবকিছু ঘটে

দেহই জানে, দেহই তার নীরব উপাখ্যান 

লিখে যায়।


৬.       পথ যেন শেষ না হয়


জলপাইগুড়ির চা-বাগানে হেলে পড়ে সন্ধের আলো,

পাতার ভাঁজে ভাঁজে হেসে ওঠে অচেনা কোনো গোপন বনগীতি।

সবুজের দোলায় ভিজে ওঠে জানালার কাচ,

আর ট্যাক্সির মৃদু দোলায় মনে হয়

সমস্ত পৃথিবী ধীরে ধীরে আমাদের পাশে এসে বসেছে।


একদিকে তোমার উষ্ণ নিঃশ্বাসের শান্ত নিশ্চিন্ততা,

আরেকদিকে বন্ধু শিশির রায়ের গল্পে ভেসে থাকা পুরোনো দিনের সৌরভ।

আমি মাঝখানে বসে শুনি পথের গান,

শুনি চাকার ঘুরে ওঠা দূরের প্রতিধ্বনি,

শুনি নিজের মনে জন্ম নিতে থাকা ছোট্ট অনন্তের স্বপ্ন।


বনের গভীরতা যত বাড়ে, তত স্পষ্ট হয় মায়ার রেখা,

গাছেরা দূর থেকে হাত বাড়িয়ে বলে,

'আর একটু থেকে যাও, আরেকটু ধীরে যাও'

কুয়াশা যেন নরম শাল জড়িয়ে দেয় গাড়ির গায়ে,

আমরা তিনজন যেন ভেসে যেতে থাকি সময়ের ওপারে।


ফুয়েন্টসোলিং-এর দিকে টান পড়ে ঠিকই,

তবুও মনে হয়

এই পথ, এই বন, এই দোলা,

এই তিনজনের নিঃশব্দ হাসি

কতটা সুন্দর, কতটা আপন, কতটা অনন্ত।


যেন পথটাই আমাদের ধরে রাখতে চায়,

যেন সে-ও জানে

কিছু যাত্রা শেষ হলে মন খালি হয়ে যায়,

তাই সে ফিসফিস করে বলে যায়

'যেও না এখনই…

এই পথটুকুই তো আসলে তোমাদের সত্যি আশ্রয়।'


৭.       চোখ বুঝলেই নীল ভোর 


তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করলে
চোখ দু’টো নিঃশব্দে বন্ধ করি,
অতঃপর নীলোচ্ছ্বাস এক আলো
আমার অন্তর্লোকে ভেসে ওঠে ধীরে।

দেখি
বারান্দার রেলিং ধরে তুমি হেঁটে যাচ্ছো,
নীল শাড়ির আভা বাতাসে ঢেউ তোলে,
চুলে লেগে থাকা সূর্যরেখা
এক নিঃশ্বাসে আমাকে ডেকে নেয়।

তোমার চোখেও নীলেরই ছায়া
যেন অনন্ত সমুদ্র খুঁজছে তীর,
যেন বহুদিনের অপেক্ষা
হঠাৎ ফিরে পেয়েছে তার সঙ্গীকে।

কিন্তু চোখ খুললেই দেখি
অন্য মানুষ, অন্য কলরব,
আকাশের রঙও বদলে গেছে,
দূরে ধূঁ–ধূ প্রান্তরের ভোঁতা নীরবতা।

তবু জানি, চোখ বুজলেই
ফিরে আসবে তোমার সেই নীল ভোর,
ফিরে আসবে তোমার চলার শব্দ
যেন পৃথিবীর গোপন মায়া
শুধু আমার জন্যই বারবার জন্ম নেয়।


৮.         সন্ধ্যা মালতীর সুবাস


ঝরা পাতার শব্দে

তোমার আগমনের গান শুনি

নীল আলোয় ভিজে থাকা বিকেলে

হঠাৎই বাতাস বলে ওঠে, তুমি এসেছ।


খোঁপায় পরো তুমি সাদা সন্ধ্যা মালতী,

তোমার বাগানের তুমি যেন মালিনী একজন,

প্রতিদিন জল ঢালো সেখানে।

তুমি নিজেই হয়ে যাও কখনও সন্ধ্যা মালতী

নিজের সুবাসে নিজেই মোহিত,

নিজের আলোয় নিজেই আলোকিত।


তোমার পায়ের ধ্বনি  শিশিরের ভিজে

যার শব্দে থমকে যায় দুপুর

তোমার চাহনি ছুঁয়ে দিলে

মাটির ওপর খেলা করে গোধূলির লাজুক আলো।


যখন তুমি হাসো,

আলতো দোল খায় সমস্ত বাগান,

মালতীর পাপড়ি নেমে আসে তোমার মৃত্তিকায়

তখন মনে হয়, ভালোবাসা আসলে

একটি স্নিগ্ধ আকাশ,

যেখানে তুমি চাঁদ হয়ে ধীরে ধীরে ওঠো।


এসো, আজ রাতেও তোমার হাত রেখে দিও

আমার হাতে,

মালতীর দুঃখী সুবাসে আমরা দু’জন

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাব

ঝরা পাতার শব্দে, নিঃশব্দ সন্ধ্যায়,

একটি দীর্ঘ, গভীর, অনন্ত কবিতার ভেতর।


৯.         পিছনে ফিরে তাকিও না


কাউকে ছেড়ে যখন চলে আসে মানুষ,
পথের ধুলোয় তখন থামে না কোনও নিশ্বাস
পিছন ফিরে তাকালে
মায়ার ঘূর্ণি হঠাৎ পা জড়িয়ে ধরে,
ডেকে বলে “এবারও কি যাবে?
এবারও কি আমাকে ফেলে এগোবে?”

তুমি তাকিও না।
স্মৃতিরা জানে কেমন করে হৃদয় নরম হয়,
জানালার কাঁচে জমা কুয়াশার মতো
আচমকা দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয় তারা।
একবার থেমে গেলে
আবার যাত্রা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চলতেই হবে
তোমার ভিতরের আলো, অদেখা পথের ডাক
তোমাকে ডাকে আরও দূরে, আরও সামনে।
পেছনের দরোজায় হাত রাখো না,
বাতাসের মতো হালকা হয়ে এগিয়ে চলো;
কারণ যে সম্পর্ক নিজের ভারে ভেঙে যায়,
তাকে বহন করার দায় তোমার নয়।

পিছনে ফিরে তাকিও না
মায়া সুন্দর, কিন্তু বাঁধনও বটে।
তুমি যে মুক্ত আকাশের মানুষ,
তোমার হাওয়া থেমে থাকলে চলবে কেন?

চলে যাও, ধীরে ধীরে দৃঢ় পায়ে
আজকের সূর্য তোমার জন্যই উঠেছে,
আগামীকালও ঠিক উঠে যাবে
তোমার এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে।


১০.        অর্পণ 


তুমি তুলে দিয়েছিলে হাতে

ভালোবাসবার ভার

তোমাকে ভালোবেসে আজ

আমি নির্ভার, 


যার বুকে এত ভালোবাসা

নির্ঝরিণীর মতো নিরলস ঝরে,

তাকে ফিরিয়ে দেবো কী করে

সে শক্তি কি আছে আমার অন্তরে।


ভালোবাসা তো দান, অর্পণ,

ফিরিয়ে দেওয়ার জিনিস নয় কখনো

তাই তোমায় রেখে হৃদয়ের গহীনে

আমি শুধু ভালোবাসি নিঃশব্দে

অবিরত, অনন্ত, অক্ষয়ভাবে।


১১.       উদাস মন


মাঝে মাঝে ভালো লাগে না কিছুই
মন হয়ে যায় শ্রাবণের মেঘ,
কাঙাল হাওয়ার মতো ভাসতে থাকে
অচেনা কোন দূরদেশের দিকে।

খরা-লাগা বিকেলে
হঠাৎই নেমে আসে ভিজে অন্ধকার,
মনের উঠোনে নুয়ে পড়ে
অকারণ বেদনাভেজা এক নিমন্ত্রণ।

তবু এই মন চায় উড়ে যেতে
নীল পাহাড়ের ওপার
বা অচিন সমুদ্রের গোপন শব্দে,
যেখানে কেউ রাখে না বাঁধন,
যেখানে বিষণ্নতাও গান হয়ে যায়।

শ্রাবণের মেঘে মেঘে
এই মন আজও খোঁজে আশ্রয়
হয়তো ঠিক সেইখানেই
নতুন এক ভোরের দরজায়
কেউ নিঃশব্দে আলো রেখে গেছে।


১২.       কোনও যতিচিহ্ন নেই


কিছু সময় আসে ভালোবাসা উন্মাতাল হয়ে ওঠে
নিঃশব্দ উপত্যকার মতো নম্র বুকের ঢালে রেখে দিই চোখ
তোমার দেহে তখন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে অচেনা উষ্ণতা
মদিরার নেশা ভাসে হৃদয়ের ভিতর থেকে

জানালাহীন ঘরে হঠাৎ বাতাস থমকে দাঁড়ায়
স্বপ্ন ভেঙে কর্কশ শব্দে ছড়িয়ে যায় বাতাসে
তোমার ছায়ার ভিতর আমায় টেনে নেয় অদৃশ্য আলো
ডানায় ডানায় ছুঁয়ে যায় জন্মান্তরের কোনো স্মৃতি

শরীরের উপর শরীরের ঢেউ ভাঙে নীরব সাগরতটে
বুকের নিঃশ্বাসে ওঠা নামায় তৈরি হয় রহস্যের গোপন জোয়ার
আঙুলের স্পর্শে খুলে যায় রাত্রির অরণ্য
বুকে পিঠে কাঁধে উষ্ণতার ক্ষুদ্র আগুন জ্বলে ওঠে নিভৃতে

বেহিসাবী চাওয়াগুলো একে একে দুঃসহ আলোয় দীপ্ত হয়ে ওঠে
তোমার দেহরেখা ধরে বয়ে চলে মৃদু ঘূর্ণির মতো ঘাম
যেন বৃক্ষে চাঁদের আলো নেমে এসে দোল খায়
হৃদয়ের গভীরে তৈরি হয় এক প্রগাঢ় আলোড়ন
এক অন্তহীন নিমগ্নতা
যেখানে তুমি আমি মিলেমিশে হয়ে যাই শুধু দিগন্তের দীর্ঘশ্বাস। 


১৩.        ধরিত্রীর টানে


কি করে ভুলি
এই আকাশের নীল শান্ত ছায়া,
ধরিত্রীর উষ্ণতা, বাতাসের সতেজ গান,
জলের ঝিকিমিকি আলোতে ভেসে থাকা রূপকথা।

পৃথিবীর প্রতিটি অংশ যেন
আমার চোখে একেকটি নতুন বিস্ময়
পাইন গাছের চকচকে ডগা,
বালুকাময় সমুদ্রতটের নিঃশব্দ ঢেউ,
অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা রহস্য কুয়াশা,
আদিগন্ত ফসলের সবুজ প্রান্তর।

ঝিলিমিলি বাতাস যখন
ধানক্ষেত ছুঁয়ে যায়,
অশোকের গাছ থেকে
পাতারা যখন ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে
তখন মনে হয়,
এই পৃথিবীই আমাকে ডাকছে গভীর প্রেমে।

এইসব সৌন্দর্যই
আমাকে প্রতিদিন
ঘর থেকে টেনে বের করে আনে
প্রকৃতির অনন্ত টানে,
জীবনের অনিবার্য টানে।


১৪.       যেতে যেতে পথে


যেতে যেতে পথের উপর হবে দেখা,
চলতে চলতে নদীর কূলে হবে আমাদের মিলন,

হাওয়ার ডানায় ভর করে কোনো এক সাঁঝবেলার আলো
ছুঁয়ে যাবে তোমার চুলে লেগে থাকা ঘাসফড়িংয়ের গন্ধ,
আমরা থেমে থাকব দু’জন
অদেখা কোনো স্বপ্নের ঢেউয়ে ভাসব নীরব অনুভবে।

ফুলেরা নিজেদের মতো ফুটবে, ঝরবে,
আমরা তবু হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে নেবো এক টুকরো ধ্যানমগ্ন সময়
যেখানে তোমার হাত ছুঁয়ে আমার হাত
গোপনে বুনে নেবে অপরূপ কোনো অবাক বন্ধন।

তারারা নামবে মাথার উপর,
রাত ধীরে ধীরে নরম আর মায়াবী হয়ে উঠবে,
আর আমরা দু’জন
পথের শেষ কোথায় ভুলে গিয়ে
শুধু একে অপরের ভেতর
খুঁজে নেবো ফিরে পাওয়ার নিঃশব্দ সীমানা।


১৫.         মাধবীর কাছে 


নীল ভোরের অন্ধ জানালা খুলে

মাধবী এসেই বলে -

তোমার নামেই আজ সূর্য উঠুক,

তোমার চোখেই যেন দিনটা ভরে যায়।


পথের হাওয়া থমকে দাঁড়ায়

তার পদচারণার নরম সুরে,

তার কেশে ঝরে পড়ে আকাশের আলো,

চাঁদের নীরব নেশা জড়িয়ে থাকে তার মুখে।


সে হাসলেই মনে হয়

ঝরে পড়া পাপড়ির মতো

আমার বুকও হালকা হয়ে উড়ে যায়।

সে বলে

ভালোবাসা মানে তো থাকা নয়,

চোখ ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যেও থাকে অনন্ত জোয়ার।


আমি প্রতিদিন ভোরে

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকি

যদি আবার মাধবী এসে বলে যায়,

তোমার হৃদয়ে আজও জায়গা কি আছে 

আমার জন্য?


মাধবী এসে থমকে দাঁড়ায়,

তার ওড়নায় জড়ানো সন্ধ্যার গন্ধ,

সে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলে

তোমার স্পর্শে আজ আমার সব ক্লান্তি গলে যাক।


চাঁদের আলো তার চুলে লেগে

ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসে,

তার হৃদয়ের ধ্বনি ভেসে আসে

দূরের কোনো নরম বাঁশির সুর হয়ে।


সে বলে

ভালোবাসা মানেই প্রতিদিন নতুন করে

তোমার দিকে ফিরে আসা।

তার কণ্ঠ নরম কুয়াশার মতো

আমাকে ঘিরে থাকে নিঃশব্দে।


হঠাৎ থেমে সে তাকায় আমার দিকে

তার চোখে জমে ওঠে অলস দুপুরের আলো,

সে ধীরে বলে

তোমার নীরবতাতেই আমি সবচেয়ে জোরে

আমাকে ডাকার শব্দ শুনি।


তার হাসি শুকনো পাতায় ভোরের শিশিরের মতো

নরম করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

মাধবী বলে

তোমাকে ভাবলেই সমস্ত শহর

কাশফুল হয়ে দোলে হাওয়ায়।


সে এক পা এগিয়ে কাঁধে রাখে হাত

তার স্পর্শে হাওয়া পর্যন্ত

গরম হয়ে ওঠে ভালোবাসার কারণে।

সে ফিসফিস করে বলে

আমার পথ যত দূরেই যাক,

শেষরাতে তোমার স্বপ্নেই ফিরে আসি।


আর আমি ভাবি

এই একটুখানি মুহূর্তই বুঝি

প্রেমের সমস্ত মহাকাব্য হয়ে ওঠে। 


১৬.       তুমি এবং শূন্যতা 


তুমি আমার দুঃখের কারণ,
তুমি থাকলে উৎসব, না থাকলে শূন্যতা।

তোমার অভিমানের দেয়ালে থমকে যায় সব শব্দ,
তোমার হাসির আলোয় খুলে যায় মনের জানালা।

তুমি না বললে দিনগুলো হয় নির্জন উপকূল,
তুমি বললেই জোয়ার ওঠে—হৃদয় ভেসে যায় অজানা স্রোতে।

তুমি আমার পথের দূরত্ব, আবার পথচলার প্রেরণা,
তোমার স্পর্শে জীবনের নিঃস্বতা পায় পূর্ণতার জন্ম।

তুমি গেলে সময় থেমে যায়,
তুমি ফিরলে সময় আবার ডানা মেলে উড়ে…

এভাবেই তোমাকে নিয়ে
আমার প্রতিটি দিন
একটু কষ্ট, একটু আলো, আর অনন্ত ভালোবাসা।


১৭.       অপ্রেমে রয়ে গেলে তুমি


তুমি এখনও সম্পূর্ণ রমণী হয়ে উঠতে পারোনি
তোমার চোখে জমে আছে কিশোরী দ্বিধার কুয়াশা
স্পর্শ এলে দোল খায় লাজুক চঞ্চলতা
দীর্ঘ শ্বাসে ঝরে পড়ে অর্ধেক খোলা স্বপ্নের দাহ।

তুমি রয়ে গেলে অপ্রেমে
যেন নদী, উৎস আছে কিন্তু স্রোত নেই
যেন গহন রাত্রির নরম চাঁদ
আলো আছে, উত্তাপ নেই।

তোমার শরীরে লেখা ছিলো বহু অক্ষর
কিন্তু পাঠকের মতো কেউ
ঠাঁই করে নিল না তার গভীরতায়
তাই সব শব্দই রয়ে গেল অসমাপ্ত।

তুমি রয়ে গেলে অপ্রেমে
যেন প্রথম বর্ষার গন্ধ মাটিকে ভিজায়,
কিন্তু মাটির ভেতরে জন্মায় না কোনও উন্মত্ত সবুজ।

হয়তো কোনোদিন প্রেমের হাওয়ায়
তোমার রক্ত উথলে উঠবে
হয়তো সেইদিন তুমি সম্পূর্ণ রমণী হয়ে উঠবে
নিজের কাছে, নিজের ভেতরেই।


১৮.     কোমলে কুসুমে প্রিয়া


কোমলে কুসুমে প্রিয়া যখন আসে
নরম আলোয় ভেসে ওঠে তার রূপ
ভোরের শিশিরে ভেজা পাপড়ির মতো
মৃদু কাঁপে তার হাসির ধূপ।

তার গায়ের ছায়া ফুলবনের হাওয়া,
নরম ছুঁয়ে যায় বুকের উপত্যকা;
রঙিন সন্ধ্যার ধীরে নামা আলো
ঢেকে দেয় তার চোখের নীরবতা।

তার চুলে যেন রাতের মেঘেরা
গোপনে বুনে রাখে আলোর গন্ধ,
তার ত্বকে ফুটে ওঠে মধুমল্লিকার
স্নিগ্ধ, নিস্তব্ধ, উষ্ণ ছন্দ।

প্রিয়া যখন কাছে আসে ধীরে,
কম্পিত বাতাসে ভর করে প্রেম
সে হয় রূপকথার নরম স্পর্শ
যেখানে হৃদয় ডাকে একাকীত্বের নিমেষে।

কোমলে কুসুমে তার সকল রূপ
উষ্ণ জোছনার মতো বিছিয়ে থাকে,
প্রেমের গভীর নীরব সম্ভাষণে
দু’টি মন গোপনে জড়িয়ে থাকে।


১৯.     আলো আসুক 


আলো না আসুক,
দুঃখই কাঁদিয়ে দিক চোখ
তোমার প্রাণের খাতায়
কেবলই আলোর কথা লেখা হোক।

অন্ধকারের ভাঁজে ভাঁজে
যদি লুকিয়ে থাকে আমারই নাম,
তবু তোমার পথের ধুলোর মতো
নির্মল হয়ে থাকুক আমার সব অভিমান।

রাত নামলে নীরবতার গা ছুঁয়ে
হয়তো কোথাও জেগে উঠবে একটুকু ব্যথা,
কিন্তু তোমার জানালার পাশে
সকালের রোদ হয়ে ফুটুক আমার যত কথা।

তোমার আকাশে যদি ঝড়ে
ভিজে যায় দিনের অঙ্গীকার,
আমি দূরেই থাকব,
তোমার আলোয় রক্ষার প্রহরী হয়ে থাকব বারবার।


২০.     কেউ আসে, কেউ যায়


কেউ আসে, কেউ চলে যায়,

মনের আঙিনায় রেখে যায় হালকা স্পর্শের ছায়া

ঠিক যেমন সময়ে বদলায় রাজা,

রাজ্য থাকে রাজা আসে রাজা যায়।


হৃদয়ের সিংহাসনে অনেকেই এলো, গেলো,

কেউ কেউ হাওয়ার মতো ছুঁয়ে বিলীন হলো

কিন্তু তুমি এলে এক ভোরের আলো হয়ে,

দীর্ঘ অন্ধকারের পর এসে আলো জ্বালালে।


যেমন পুরনো রাজা হারায় সিংহাসন ,

নতুন রাজা খুঁজে পায় তার সুরভি ভরা মুকুট,

তেমনি আমি ভুলেছি কত স্মৃতি, কত নাম,

তোমাকে পেয়ে হৃদয় ফিরেছে নতুন প্রভাতের ধাম।


জীবন বলে—কেউ থাকে না চিরকাল,

তবু তুমি থাকো আমার মাঝে, নীরব মহাকাল।

কেউ আসে, কেউ যায় ঠিক রাজাদের মতোই,

তবু প্রেমের রাজ্যটি চিরদিন শুধু তোমারই।


২১.       অমর জাতির গান


জাতি উঠে দাঁড়ায় যখন অন্ধকার ভেদ করে,
তখন পাহাড়ও থমকে শোনে তার পদধ্বনি।
রক্তে লেখা ইতিহাস জ্বলে ওঠে দীপ্ত মশালের মতো,
সময় থেমে থাকে তার আত্মগৌরবের সামনে।

মাটির বুকের গভীরে শত বছরের আর্তি,
তবু মাথা নোয়ায় না
কারণ প্রতিটি শেকড়ে আছে অসংখ্য স্বপ্নের নীল নকশা,
যা ভেঙে যায় না ঝড়েও, ঝলসে যায় না রক্তঝরা দিনে।

যে জাতি শেখে চোখের জলকে শক্তি করতে,
যে জাতি শেখে ক্ষুধার মধ্যেও ন্যায় বলতে,
যে জাতি জানে মৃত্যু নয়
স্বাধীনতাই তার চূড়ান্ত পরিচয়,
সে জাতি কখনও হারায় না অমরত্বের আলো।

এই জাতির বুকেই জন্ম নেয় কবিতা,
যে কবিতা একদিন যুদ্ধের পোড়া ধুলো মুছে
পৃথিবীর মানচিত্রে আঁকে নতুন সূর্য।
হাজার বছর পরও সেই কবিতা বাঁচবে
একটি নামের মতোই
স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাহসের অমরশিখা হয়ে।

আমরা সেই জাতির সন্তান
যে জাতি মাথা তোলে দাঁড়ায়,
যে জাতি অন্ধকারকে জ্বালিয়ে আলো বানায়,
যে জাতি নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে
ইতিহাসের পাতায় লিখে যায়
অমরতার ঘোষণা।


২২.       প্রতিফলনের নিয়ম 


ভালোবাসা দিলে ভালোবাসাই ফিরে আসে,
নরম মাটিতে বীজ রোপার মতো
একদিন অঙ্কুর ফোটে, সবুজে ভরে ওঠে জীবন।

ঘৃণা দিলে ঘৃণাই ফিরে আসে,
শুষ্ক মরুর বুকে ঝড় ডাকার মতো
বালুঝড়েই ঢেকে যায় নিজেরই পদচিহ্ন।

মানুষের হৃদয় এক আয়না,
যা দাও, তাই প্রতিদিন ফিরিয়ে দেয়
হাসি দিলে আলো বাড়ে,
অসহিষ্ণুতা দিলে অন্ধকার ঘন হয়।

তাই এসো, আমরা হাতে রাখি কোমল আলো,
শব্দে রাখি উষ্ণতা
পৃথিবী যতটুকু দেই,
ঠিক ততটুকুই আমাদের কাছে ফিরে আসে।

রাগ দিলে রাগই জন্ম নেয়,
কিন্তু ক্ষমা দিলে ফোটে নির্মল শান্তি
দূরের মানুষও হয়ে ওঠে আপন।

এক বিন্দু মমতা দিলে
সমুদ্র হয় স্নেহের ঢেউয়ে
তাই বুকে জমা করো ভালোবাসা,
তবেই পৃথিবী বদলাবে তোমার চোখে।


২৩.      ঘোষণাপত্র


বিজয়ের এই মাসে
রক্তের নদী পেরিয়ে উঠতে থাকা সূর্য আমাদের আবার ডাকে
স্মৃতি জাগাও, দাঁড়িয়ে যাও,
কারণ ভুলে যাওয়া মানেই আবার অন্ধকারকে সুযোগ দেওয়া।

এই মাসে আমরা দেখি
নির্যাতনের সেই কালো রাত,
যেখানে মানুষের শরীর নয়,
জানোয়ারের নৃশংসতাও লজ্জায় কেঁপে উঠেছিল।
আমরা শুনি সেই কান্না, সেই আর্তনাদ,
যা বাংলা ভাষার প্রতিটি বর্ণকে চিরকাল ভা করে রেখেছে।

আমরা ঘোষণা করি
এই দেশের বুক বিদীর্ণ করা বিশ্বাসঘাতকদের নাম
ইতিহাসের পাথরে খোদাই হয়ে থাকবে
লজ্জার দগদগে দাগ হয়ে।
যারা রাতের আঁধারে
বুকের ভিতর জন্ম দেওয়া ভয়ের হাত ধরে
শান্ত গ্রামে নেমে এসেছিল হত্যাযজ্ঞ চালাতে,
যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মৃত্যুর বাজার বসিয়েছিল
তাদের অপরাধের ছায়া আমরা কখনও ক্ষমা করব না।

বিজয়ের এই মাসে
আমরা আরও জোরে, আরও দৃপ্ত কণ্ঠে বলি—
স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রতিটি হাত,
মানুষ হত্যার প্রতিটি ষড়যন্ত্র,
মায়ের কোলে ফিরতে না পারা প্রতিটি শিশুর নিঃশ্বাস
মিলেমিশে তৈরি করেছে আমাদের ন্যায়ের শপথ।

এই শপথ শুধু রাগের নয়,
এই শপথ বিচারচেতনার,
যেখানে অপরাধের সামনে মাথা নত করার প্রশ্ন নেই,
যেখানে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড
শুধুই ঘৃণার নয়
চিরকালীন নিন্দার প্রতীক।

আজ তাই আমরা বলি
বাংলার আকাশে আর কোনও অন্ধকারের স্থান নেই,
এই ভূমি যুদ্ধের রক্তে পবিত্র হয়েছে,
এই নদী, এই বাতাস, এই ধুলো
স্বাধীনতার সন্তানদের বুকের আগুনে উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
বিজয় শুধু উৎসব নয়
বিচারের আগুন জ্বালিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা।

বিজয়ের মাসে তাই আবারও ঘোষণা
যারা মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছিল
তারা ইতিহাসের অন্ধকারে নির্বাসিত থাকবে;
আর যারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল,
তারা চিরকাল আলো হয়ে থাকবে
আমাদের হৃদয়ের পতাকায়।


২৪.         তোমার অনুপস্থিতি


আমার প্রতিটি বিষণ্ণতাই
আসলে তুমি কাছে না থাকা এক অদৃশ্য রোগ
যেন শরীরের ভিতর
অতল সমুদ্রের ঢেউ জমে থাকা একটি ধুকধুকে শোক।

তোমার অনুপস্থিতি হলো
দীর্ঘ রাত্রির মাথায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ চাঁদ,
তার আলোয় জন্ম নেয় কুয়াশা,
সেই কুয়াশায় আমার স্বপ্নগুলো পথহারা পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ফিরে আসতে জানে না আর।

তোমাকে ছাড়া সময় থমকে থাকা
একটি ভাঙা রূপকথা,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠা ছড়িয়ে দেয়
অনবরত উদাসী বিষাদের বর্ণমালা।

এই রোগে জ্বর আসে নরম,
হৃদয়ের ভেতর তুলোর মতো
কিন্তু জ্বালাটি গভীর,
যেমন গভীর হয় পাহাড়চূড়ায়
এক মুঠো সূর্যের নিঃসঙ্গ হাহাকার।

তোমার সান্নিধ্যই শুধু ওষুধ,
যার স্পর্শে খোলে হৃদয়ের বন্ধ জানালা,
তুমি কাছে এলেই মনে হয়
ডুবে যাওয়া নক্ষত্রেরা আবার জ্বলে ওঠে,
অন্ধকার গলে সোনালি আলো হয়ে
আমার শিরায় শিরায় বয়ে যায়।

তাই বলি, আমার প্রতিটি বিষণ্ণতা
তোমার না-থাকার নির্মম এক যন্ত্রণা,
তুমি ফিরে এলে সমস্ত রোগ সেরে ওঠে
এক নিমিষেই তোমার মায়ার স্পর্শে।


২৫.       দুঃখের অনিবার্য আগমন


ভালোবাসায় দুঃখ আসবেই
মৃত্যুর মতো নীরব, ধীর, তবু অনিবার্য,
যেন চাঁদের আলো ফুরিয়ে গেলে
অচেনা অন্ধকার এসে বসে জানালার পাশে।

যাকে ভালোবাসি, তারই ছায়া
আমার পায়ের আঙুলে কাঁটা হয়ে লাগে,
হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়লে
আনন্দ আর শোক একই গৃহে
পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে।

ভালোবাসা মানে আলো,
কিন্তু সেই আলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে
দীর্ঘ এক ছায়া
যেখানে হারানোর ভয়,
অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস,
ফেরার পথের গোপন কুয়াশা।

তবু এ-ই তো তার মহিমা
দুঃখকে বুকে ধরে রাখার সাহস,
ভালোবাসার প্রতিটি হাসির আড়ালে
ত্রস্ত এক মৃত্যুর মতো নীরব ক্ষয়,
আর সেই ক্ষয়ের মধ্যেই
আমরা খুঁজে পাই বেঁচে থাকার নতুন অর্থ।

ভালোবাসায় দুঃখ আসবেই
মৃত্যু যেমন আসে শান্তির সাথে,
তেমনি দুঃখ এসে শেখায়
ভালোবাসার গভীরতম সত্য:
যাকে আমরা হারাতে ভয় পাই,
তাকে নিয়েই আমাদের সমস্ত আলো।


২৬.        মায়াবী নদী


প্রেম কি শুধু শরীরের দাগ?
না-শরীরও তো শেষমেশ ভেসে ওঠা এক অদৃশ্য নদী,
যার স্রোত কখনও ভাঙে, কখনও গড়ে,
হৃদয়ও তো তারই মতো
নামহীন জোয়ারের ভেতর জন্ম নেয়,
হারায়, আবার ফিরে আসে।

গোধূলি নামে যখন
নদীর বুকে অচেনা নরম কম্পন,
তখন তুমি যাও
জলের ধারে বসে থাকো নিঃশব্দে।

তোমার সঙ্গিনীর কানে কানে
কিছু স্বপ্নের মতো কথা বলো
যে কথার কোনো মানচিত্র নেই,
যে শব্দ কেবল বাতাসে ভেসে ওঠে
আর সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়
তবুও থেকে যায় পর্দার ওপারে
মায়ার মতো, ছায়ার মতো।

তাকে দুঃখ দিও না
তার ভেতরেও তো আছে অনাবিষ্কৃত গ্রহ,
গোপন স্রোতের গা ছমছমে ডাক।

সে তোমাকে যা দেবে,
তা হয়তো আলো নয়, অন্ধকারও নয়,
এক অচেনা স্পর্শ
যার ব্যাখ্যা তুমি কখনও পাবে না,
তবুও জানবে
এটাই প্রেমের সেই অদৃশ্য নদীমাঠ,
যেখানে সবকিছু সত্য,
তবু কিছুই পুরোপুরি বোঝা যায় না।


২৭.        নিঃসঙ্গ আলোর গোপন সুর


মাঝে মাঝেই দিনের শেষ আলো
স্বপ্নের জানালায় নরমভাবে টোকা দেয়
দূরাগত কোনও অদৃশ্য ঘন্টার ধ্বনি
মনে দোলা তোলে জোয়ার ভাটার মতো,
তখন মনে হয় সব ছেড়ে
স্বপ্নঢাকা কোনও পথের মাথায়
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি বহুক্ষণ,
যেন বাতাসের ভেতরই জন্ম নিচ্ছে
এক গোপন গন্তব্যের মায়া।

কখনও আবার অকারণে ফিরে আসে
হারানো সন্ধ্যার মধুময় মুহূর্ত
আলো, শব্দ, গন্ধ সব মিলেমিশে
সন্ধের নরম অন্ধকারে
আমার ঘরটাকে ভরে তোলে অচেনা জাদুতে।
সেই জাদুর ভেতর আমি অনিমিখ চেয়ে থাকি,
যেন কোনও পুরনো স্মৃতি এসে
আঙুল ছুঁয়ে বলে যায়
“আমি এখনও আছি।”

তখন বুঝি,
আমার সমস্ত পাওয়া না-পাওয়ার মাঝেই
কত গভীর শূন্যতা লুকিয়ে থাকে
এক অদ্ভুত মায়াময় নিঃসঙ্গতা,
যার সামনে আমি
নিঃশব্দে, নিঃস্ব হয়ে দাঁড়াই।


২৮.        অদৃশ্য স্পর্শের গান


আমার নিঃশ্বাসে ভেসে আসে তোমার অদৃশ্য স্পর্শের গান,
যেন দূর–নক্ষত্রের আলো ছুঁয়ে যায় নরম অন্ধকার।
হঠাৎ কেঁপে ওঠে জানলার ধারে শুকনো বাতাস,
মনে হয় তুমি পাশ কাটিয়ে গেলে অচেনা কোনো স্রোতের মতো।

চোখ বুঁজে ভেবে দেখি
তোমার স্পর্শ আসলে কোনো আঙুল নয়,
এ এক রহস্যমাখা আলো,
যা ছায়া হয়ে নামিয়ে দেয় হৃদয়ের ভিতর ঝরনার শব্দ।

রাত গভীর হলে
তোমার অদৃশ্য হাত এসে ছুঁয়ে দেয় কপালের কাছে,
নামহীন এক উষ্ণতা নিয়ে
যেন বহু পুরোনো এক স্মৃতি আজও হাঁটছে আমার সঙ্গে।

আমি তখন একা নই,
কারণ তোমার সেই নীরব স্পর্শ
অদৃশ্য হলেও জ্বালিয়ে রাখে অন্তরের প্রদীপ।
তার আলোয় আমি শুনি
ভালোবাসা আসলে ঠিক এরকমই,
দেখা যায় না, তবু ভরে রাখে সমগ্র পৃথিবী।


২৯.       এসো

এসো, আমাকে আলিঙ্গন করো সেই শান্ত নদীর মতো
নরম স্রোতে বুকে ঢেউ তোলো,
যেন বহুদিনের তৃষ্ণা মেটে এক ছোঁয়ায়।

জড়িয়ে ধরো সমুদ্রের গভীরতায়,
যেখানে অসীম নীলতার মতো
তোমার নীরব প্রেম ছড়িয়ে থাকে চারদিকে।

মিশে যাও মোহনার গোপন রহস্যে,
যেখানে দুই আলোর পথ এসে
একটি সুরে গাঁথা হয় নিঃশব্দে।

তোমার চুম্বন দাও সেই দেবশিশুর মাতৃক্রোড়ের উষ্ণতায়,
যেখানে নিরাপত্তার ঘ্রাণ,
আর জন্মের প্রথম আলো মিশে থাকে।

এসো, বাহুবন্ধনে আমাকে সম্পূর্ণ করো
আমার সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে
জ্যোতির্ময় করো সূর্যের মতো,
নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি হয়ে
আমার বুকে নিঃশব্দে উদিত হও।


৩০.        উন্মোচিত নক্ষত্র সময়


প্রস্ফুটিত শরীর খুলে খুলে দাও
একান্ত ঐশ্বর্যগুলি উৎসর্গ করো
নির্জন পরশমণি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দাও
আমাদের কোনো অপূর্ণকাল নেই;
আমরা দু’জনই যেন কোনও রহস্যের ভাজ খুলে
গোপন আলো বর্ষণ করি একে অপরের অন্তরে।

এই সন্ধ্যার বাতাসে অদৃশ্য যে সুর বেজে ওঠে,
তা তোমার নিঃশ্বাসে জন্ম নিয়ে আমার বুকে নেমে আসে।
আমরা দু’জন মিলে যেন আদিম কোনও আকাঙ্ক্ষার নদী
স্রোতের ভিতর স্রোত, আলোয় ঢেকে থাকা সুধা,
যেখানে রাতের সব ক্লান্ত তারাগুলো
আমাদের দেহের উপর নেমে এসে বিশ্রাম নেয়।

তোমার স্পর্শের ভিতর যে নীলাভ দিগন্ত,
আমি সেখানে প্রতিদিন ডুব দিতে চাই,
যেমন কুয়াশা ভোরের বুক ভিজিয়ে ফেলে
ধীরে, নরম, পরম নিবিড়তায়।
তুমিও আমার ভেতরে রেখে দাও তোমার সমস্ত অনুচ্চারিত সঙ্গীত,
যেমন কোনও লুকানো দেবালয় আপন আলো জ্বালে
নিস্তব্ধ প্রার্থনার মতো।

এসো, এই জন্মে, এই মুহূর্তে,
আমরা পরস্পরকে সম্পূর্ণ করে দিই—
অদৃশ্য আলো, দেহজ গন্ধ, কোমল উত্তাপ,
সব মিলেমিশে যাক একই নাক্ষত্রিক ঘূর্ণিতে।
কোনো আক্ষেপ, কোনো অসম্পূর্ণতা, কোনো অপেক্ষা নয়
শুধু তুমি আর আমি,
আর আমাদের বিস্ময়ে ভরা উন্মুক্ত মিলন-সময়।


৩১.       নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী


ওষ্ঠদ্বয়ের উপর  চুম্বনরাশি ঢেলে দিতাম নিরালায়,পায়ের আঙুল থেকে মাথার কালো চুল পর্যন্ত ঢেউ উঠত, সবখানে ছড়িয়ে দিতাম গভীর সোহাগের মণিরত্ন, অদৃশ্য আলোয় জ্বলত তোমার দেহের উপাসনা।

তবু কোনো এক সন্ধ্যায়, যদি ঝরে পড়ে তোমার এক ফোঁটা অশ্রু, রূপের নির্মম অধিপত্নী তুমি, সেই অশ্রু ম্লান করে দিতে পারে তোমার চোখের তীব্র জ্যোতি, ভেঙে দিতে পারে তোমার সব অভিমান, সব নিবেদন, সব অবনত প্রেম।

তবু তোমাকেই কেন্দ্র করেজ্বলে ওঠে আমার সমগ্র রাতের আকাশ, নিষ্ঠুরতমা হে রূপবতী, তোমার ক্ষণিক অশ্রুই আমার সকল আলো-অন্ধকারের নিয়তি।


৩২.       যেখানে যাও 


যেখানে যাও যত দূরে, ভোরের সূর্যের মতো দীপ্ত তুমি,

হাওয়ার ভেসে যাওয়া গানে লুকিয়ে থাকে তোমার নাম,

দূরত্ব যতই বাড়ুক, হৃদয়ের দিগন্ত ততই বলে

তুমি আছো হৃদয় গহীনে আমার নীরব প্রার্থনার তলে।

তাই যেখানে যাও, উড়ে যাও যদি নক্ষত্রেরও ওপারে,

নিজের অজান্তে থেকো তুমি আমার প্রতিটি শ্বাসে প্রশ্বাসে।


৩৩.        শঙ্খনদের পাড়ে


এত বছর পেরিয়ে গেছে

তবু স্মৃতিরা নরম কুয়াশা ভোরের মতো ফিরে আসে।

মনে পড়ে সেই বিকেল

পাহাড়ি পথের নীরব নুড়ি,

শঙ্খ নদীর কাঁধ ছুঁয়ে

দুজন মানুষের পাশাপাশি হাঁটার উষ্ণ প্রতিধ্বনি।


মনে পড়ে

তোমার চুলে বাতাসের নরম দোল,

আমার কথার মাঝখানে তোমার মৃদু হাসি,

দূরের বন থেকে ভেসে আসা নাম-না-জানা পাখির ডাক,

আর আমাদের পদধ্বনির অপ্রকাশিত সুর।


মনে পড়ে

এক ঝুম বৃষ্টির দুপুরে কুয়াশার আড়াল থেকে

হঠাৎ তোমার মুখ দেখার মোহ,

হাওয়ায় ভিজে যাওয়া তোমার চোখের পাতা,

আর আমার শিউরে ওঠা হৃদয়ের শব্দ।


মনে পড়ে

খোলা মাঠে শুকনো ঘাসের উপর বসে

সূর্যাস্তের কমলা রঙে

তোমার মুখটাকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা,

যেন পৃথিবীর সব আলো তোমাতে এসে থেমে আছে।


মনে পড়ে

রাত নামার আগেই তোমার হাত ধরে বলা

চলো, আরও একটু পথ হাঁটি

আর তুমি বলেছিলে,

এই হাঁটাই তো আমাদের ছোট্ট জীবনের

সবচেয়ে বড়ো যাত্রা।


এত বছর পরেও,স্মৃতিরা শুকায় না

তারা নদীর মতোই বয়ে আসে,

পাহাড়ের মতোই অটল থাকে,

আর তোমার মতোই অবিরাম, মধুর,

অপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে।


৩১.         জানি দূরে চলে যাব 


দূরে চলে যাব, জেনেও
এমন নিখুঁত আদরে রাখি তোমাকে,
যেন প্রতিটি ছোঁয়ায়
গোপন করে দিই বিদায়ের সমস্ত ভার।

তোমার চোখে যখন মৌনতার আলো নামে
আমি তখন সযত্নে সাজিয়ে রাখি
একটি সন্ধ্যার রূপকথা
যেখানে বাতাসও তোমার নাম ধরে ডাকে।

জানি, কোনও একদিন হঠাৎ
আমি ভেসে যাব অচেনা নক্ষত্রপথে,
তবু তোমার কাঁধে আজও রাখি
আমার নির্লোভ উষ্ণ হাত,
যেন সে স্পর্শটুকু তোমাকে বলে,

“রাখো আমাকে, যতক্ষণ থাকা যায়,
হয়তো কাল অনন্ত দূরের হবো
তবু আজ তোমার পাশে
একটি অশ্রুজল-ভেজা চাঁদের আলো হয়ে থাকি।”


৩২.      ঠোঁটের আগুন


দাও তোমার ঠোঁটের আলো,

দাও ঠোঁটের আগুন,

হাওয়ার মতো দুরন্ত বেগে কে

এসে নেভালো সেই আগুন।


রোদ থেকে ডেকে তাকে বসাও কাছে 

ভালোবাসো সৌম্য সুন্দর যতনে-

জড়াও দু’হাতে পৃথিবী যেন পাছে

থেমে থাকে স্পন্দনে।


রাত নামলে  ফিরিয়ে দেবো

স্বপ্নের সব রঙ, সব ছোঁয়া, সব উষ্ণতা-

তুমি শুধু কাছে থেকো 

চুমুর ভিতর লুকিয়ে রেখো

আমার সকল মুগ্ধতা।


৩৩.      ঢেউহীন জলের বিষণ্ণ সৌন্দর্য 


যে জলে উন্মাতাল ঢেউ নেই,
আমি কি সেই নিঝুম, নির্জীব জলে আমার রাজহংস ভাসাতে পারি?
শুষ্ক বাতাসে দুলে ওঠা শাপলা–পাতার মতো
আমার মনও থির থির করে, তবু ঢেউ তো জন্মায় না হঠাৎ।

বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা ঝরতে ঝরতে যদি উত্তাল হয় দিঘি,
তবু কি তার বুক থেকে সমুদ্রের নোনাধরা স্বাদ উঠবে?
নাকি কেবল নীরবতার কুয়াশা ছড়িয়ে
আমাকে ফিরে দেবে আমার নিজের গভীর একাকিত্বে?

যদি সে উর্বশী না হয়, আলো ছড়ানো দেবী,
যদি না হয় অহল্যা, পাথর ছাড়িয়ে মুক্ত হওয়া এক নিশ্বাস,
তবে আমি পাষাণই রয়ে যাব, প্রেমে কিংবা অপ্রেমে,
কারণ যে হৃদয় জাগতে জানে না, তাকে তো কোনো নক্ষত্রই জাগাতে পারে না।

তবু অদ্ভুত এ জীবনে কখনও সামান্য ছোঁয়াতেও
প্রতিধ্বনির মতো জন্ম নেয় আলোক, ক্ষুদ্র তরঙ্গও ভেঙে দেয় নীরবতা;
হয়তো কোনো অচেনা হাত এসে ছুঁয়ে দিলে
পাষাণের গায়েও ফুলের রঙ লাগে,
হয়তো সেদিন রাজহংসও ভেসে যাবে
ঢেউহীন জলেই, অদ্ভুত এক বিষণ্ণ সৌন্দর্যের ভিতর।


৩৪.      হে রাজ- রাজেশ্বরী


হে রাজ, রাজ্যশ্বরী প্রিয়তমা আমার,
তোমার পদতলে জমে থাকা মৃত্তিকা যেন আমারই শিরায় ঢেউ তোলে,
তুমি আমাকে দাও সেই মাটির ছোঁয়া,
যার গন্ধে সহস্র জন্মের স্মৃতি জেগে ওঠে।
মহাকালের নির্জন প্রাচীরে থেকে
এক দণ্ড সময় তুলে এনে দাও,
আমি তোমার হৃদয়ের কোলে রাখব
হেমশস্যের সোনালি বীজ,
যা থেকে পৃথিবী জেগে উঠবে নতুন দীপ্তিতে।

তুমি তোমাকে উৎকর্ষিত কর, প্রস্ফুটিত কর,
অন্তর্লীনে, অন্তর-শরীরে ছড়াও অপরূপ সৌরভ,
যেন নীরব সন্ধ্যায় জোনাকির সারি
চাঁদের আলোকে ভাষা দেয়।
সমুদ্র মন্থনের গোপন আলোড়নে
ফুটে উঠুক পারিজাত- আমার ভূমিকন্যা,তোমার আশীর্বাদের শিরায় জন্ম নিক তাদের প্রথম আলোকদৃষ্টি।

তোমার কণ্ঠে যদি ওঠে কোনো প্রার্থনা,
আমি তা বাতাসে বুনে দেব,
ঘূর্ণি হয়ে তা নেমে আসবে
তোমার কেশে, তোমার হাতে, তোমার স্বপ্নে।
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণতায়
আমি জাগ্রত করব প্রতিটি ঋতুর সঙ্গীত
বসন্তের আঙুলে রঙিন অশোকপাতা,
বর্ষার বুকে নদীভরা গান,
হেমন্তের শিউলি-গন্ধে ভাসা প্রভাত,
শীতের কুয়াশায় লুকিয়ে থাকা অনন্ত আকুলতা।

হে অবর্ণনীয়া,
তুমি আমার মাটির উৎস,
আমি তোমার বুকে বপন করি জ্যোতির্ময় বীজ,
যাতে আগামী দিনের শিশুরা
তোমার নাম শুনলে
আকাশে তুলসীপাতার মতো ঘ্রাণ পায়।

তুমিই আমার অনন্ত ভূমি,
তুমিই আমার চিরজাগ্রত আকাশ।
তোমার প্রেমের অভিষেকে
আমি প্রতিটি শ্বাসে লিখে যাই একটাই শপথ—
যতদিন আমার নিশ্বাসে আগুন আছে,
আমি তোমাকে প্রস্ফুটিত রাখব
এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের চিরন্তন পারিজাত হয়ে। 


৩৫.       হাসির আড়ালে কান্না 


হাসিখুশি মানুষেরাই রাতের আধারে অসহায়ের মতো কাঁদে
দিনভর তারা রোদ্দুর বয়ে আনে মুখে,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে ক্ষতচিহ্ন,
ভাঙা স্বপ্নের নীরব শব্দ কেউ শোনে না।

তারা জানে, কাঁদলে প্রশ্ন আসবে,
তাই হাসিরই পোশাক পরে নেয় বারবার,
লোকচক্ষুর মেলায় তারা শক্ত, অটল
ভেতরে ভেতরে গলে যায় বরফের পাহাড়।

রাত নামলে সব মুখোশ খুলে পড়ে,
নিভে যায় দিনের সাজানো আলো,
বালিশ ভিজে ওঠে অনুচ্চারিত নামেই,
অশ্রুতে ভাসে না-বলা হাজার কথা।

হাসিখুশি মানুষেরাই সবচেয়ে একা,
কারণ কেউ ভাবেই না
এই হাসির ভেতরেও
একটি ক্লান্ত হৃদয় নীরবে কাঁদে।


৩৬.         স্বপ্নের ঠিকানা


আমি স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসি,
কিন্তু যাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনি
সে এখনো আমার কাছেই থাকে,
দিনের আলোয়, নিঃশ্বাসের পাশে।

তাই স্বপ্নগুলো আপাতত
চুপচাপ বসে থাকে চোখের কোণে,
জেগে থাকাই তখন যথেষ্ট,
তার হাত ছোঁয়ার উষ্ণতায়।

যেদিন হঠাৎ দূরত্ব নামবে,
পথের মাঝে নীরবতা জমবে,
সেদিনই স্বপ্নের দরজা খুলব
তাকে ডেকে নেব ঘুমের দেশে।

স্বপ্নের ভিতর সে থাকবে আমার,
কোনো বিদায়ের ব্যথা ছাড়াই,
চোখ বুজলেই কাছে আসবে,
হৃদয়ের ঠিকানায় ফিরে আসবে বারবার।

দূরে গেলে তবেই স্বপ্ন,
কাছে থাকলে জাগরণ
এইভাবেই ভালোবাসা
আমার দিন আর রাত ভাগ করে নেয়।


৩৭.       লেখার কাছে ফিরে যেও


কখনও যদি নিজেকে খুব একা লাগে,
যদি তোমার পাশে বসবার মতো কেউ না থাকে,
যদি নিঃসঙ্গতার ধূপ আগুনে
নিঃশব্দে পুড়তে থাকো সারাক্ষণ

তবে তুমি লেখার কাছে ফিরে যেও।

সেখানে শব্দেরা জল হয়ে আসবে,
তোমার শুকনো চোখে ভিজিয়ে দেবে রাত,
কবিতারা চুপিচুপি হাত ধরবে,
আর গল্পেরা গল্প হয়ে নয়
সহযাত্রী হয়ে পাশে বসবে।

তুমি কবিতার সঙ্গে কথা বলো,
তার শূন্যতার বুকে রেখে দাও নিজের ভার,
গল্পের সঙ্গে গল্প করো
সে তোমাকে শোনাবে
তোমারই বলা হয়নি এমন কত কথা।

লেখা কখনও ছেড়ে যায় না,
সে নিঃসঙ্গতার ছাইয়ের ভেতর
আগুনটুকু লুকিয়ে রাখে।
আর তুমি, শব্দে শব্দে
নিজেকে আবার খুঁজে পাও
অল্প আলোয়, গভীর নির্জনে।


৩৮.         নিকষিত হেম


সৃষ্টিকর্তার মুঠোয় গড়া
অতি ক্ষুদ্র এক সময়ের জীবন
সে জীবনের সমস্ত আলো ছায়া
তুমিই হলে আমার একমাত্র সহচরী।

তোমার এলোমেলো চুলের আড়ালে
মুখ লুকিয়ে নিঃশ্বাস নিই প্রাণভরে,
তোমার বুকের পাঁজরে ঠেস দিয়ে
মহাকালের সুখ-দুঃখ শিখে নিই ধীরে ধীরে।

জীবননদী বয়ে চলে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ক্ষয় হয় দিন, ক্ষয় হয় আমি,
তবু তোমার নাম উচ্চারণ করলে
সময় হয়ে ওঠে নিকষিত হেম।

যেদিন পার হতে হবে ওপার তট,
শেষ আলো নিভে আসবে দিগন্তে,
সেদিনও চাই
তোমাকেই ভালোবাসতে ভালোবাসতে
এই জীবন ছেড়ে যেতে।


৩৯.           নদীর কাছে নমিতা


কি পাগল মেয়ে সে নমিতা,

আমার একখানা হাত তার পাঁজরে জড়িয়ে

জলের দিকে টেনে নিয়ে যায় আমাকে।

চোখে তার টলটলে বিস্ময়,

কণ্ঠে স্বচ্ছতার প্রার্থনা।


সে বলে

দেখো, কী অপার এই জল,

কী নির্মল রূপ, কী পবিত্র শ্বাস!

এসো, আমার সাথে তুমি এই জল স্পর্শ করো,

আমাকে অশেষ করো

দাও জগৎ, দাও জন্মান্তরের দান,

দাও তোমার মঙ্গল ছোঁয়া।


আমি যদি বলি

নাও আমার ধনদৌলত,

নাও সকল সঞ্চিত ঐশ্বর্য,

নাও আমার নাম, আমার অহংকার,

নাও সব

তবে কি তুমি ফিরিয়ে দেবে না নিজেকে?


কত যুগ আগে তোমাকে দেখেছিলাম,

সময়ের কুয়াশায় ভুলে গিয়েছিলাম মুখ,

তবু এই নদীর মতোই

তোমার ডাকে ছিল চিরচেনা টান।

কতকাল ধরে এমনই এক ক্ষণ

আমি প্রার্থনা করে এসেছি

একটি নদী,

আর তোমার মতো একজন,

যার কাছে আমার সমস্ত কিছু

নিঃশর্তে দান করতে পারি।


আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

নেমে এসেছে জীবনের তীরে।

জল কাঁপে, বাতাস থেমে শোনে,

নদী সাক্ষী থাকে আমাদের নীরব অঙ্গীকারে।


এই মুহূর্তকে তুমি ফিরিয়ে দিও না রঞ্জন

আমাকে, এই জলকে,

এই অনন্ত স্পর্শকে,  এই চিরন্তন দানের ইচ্ছেটুকুকে

তুমি অস্বীকার কোরো না।


৪০.         আত্মা প্রস্থানের সময়


যখন আত্মা দেহ থেকে প্রস্থান করবে,

সময়টা তখন হবে যেন থেমে থাকা এক নিঃশব্দ সন্ধ্যা।

চারদিকের আলো যেন একটু ক্ষীণ হয়ে আসবে,

হাওয়ায় ভাসবে অদ্ভুত এক শূন্যতার গন্ধ—

না ভয়, না সান্ত্বনা;

এক অচেনা অপেক্ষার অমোঘ টান।


মনের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিগুলো

হঠাৎ করে যেন নদীর স্রোতের মতো ফিরে আসবে

স্মৃতিগুলো তখন নদীর উজান ধরে ফিরে আসে।

ভেসে ওঠে শৈশবের কাদায় হাঁটা দুপুর,

মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া বিকেল,

প্রথম প্রেমের কাগজ-চিঠির মৃদু কাঁপুনি,

ভুলে যাওয়া বন্ধুর হাসি,

ভুল করে কাঁদানো কারও মুখ।

সবকিছু তখন এক পর্দায় ভেসে ওঠে

কখনও উজ্জ্বল, কখনও ফিকে,

তবে সবই অদ্ভুতভাবে স্পর্শহীন,

যেন দূর কোনও জানালা থেকে দেখা পুরোনো জীবন

কারও অচেনা ক্ষমা, কারও গভীর অভিমান।


ঠিক কোন সময়ে হবে?

যখন শরীর আর ধরতে পারবে না বেদনার ভার;

যখন নিঃশ্বাসের ভাঙা তালের মাঝে

জীবন ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে আসবে।

হয়তো কোনো গভীর রাতে,

যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকবে,

রাতের বাতি নিভে আসবে,

আর অন্ধকারের বুকেও শোনা যাবে এক চিরপরিচিত ডাক।

অথবা কোনো দুপুরে, রোদের ম্লান সোনালি ছায়ায়,

যেখানে নীরবতা এসে হাত রাখে কাঁধে।

সময় তখন নিজের নিয়ম ভুলে যায়।

রাতের গভীরে হতে পারে

যখন সবাই ঘুমিয়ে কঠিন পৃথিবীর চাপ ভুলে আছে।

অথবা ভোরে, যখন প্রথম আলোয় আকাশ ভিজছে,

আর পাখিরা মনে করছে

আজও জীবন শুরু হচ্ছে আরেকবার।

বা দুপুরে, যখন রোদ সামান্য ঢলে পড়ে,

আর বাতাস ফিসফিস করে বলে

"এটাই হয়তো শেষ যাত্রার সঠিক সময়।"


প্রস্থানের সেই মুহূর্তে হয়তো দেহ হবে ভারী,

কিন্তু আত্মা হয়ে উঠবে অদ্ভুত হালকা

যেন বহুদিনের বোঝা নামিয়ে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে।

তারপর ধীরে ধীরে খুলে যাবে এক অদেখা পথের দরজা,

যেখানে আর কোনও ব্যথা নেই,

শুধু থাকে এক নিশ্চুপ, করুণাময় আলো।


৪১.        পদ্মা পাড়ের দীর্ঘশ্বাস 


রঞ্জন,

দীর্ঘ অসুখের নীরব লড়াই শেষে

দেড় মাস আগে

আমার স্বামী আলোর মতো নিভে গেল।

ধরে রাখার সব চেষ্টা

হাওয়ার কাছে হার মানল।


এই শহরে

দেয়ালগুলো হঠাৎ খুব উঁচু হয়ে গেল,

রাস্তাগুলো ভয় শেখাতে লাগল।

নিজেকে এত একা, এত অনিরাপদ মনে হলো যে

ফিরে এলাম আমার ছোট্ট শহর—ভেড়ামারায়।

জানি, এখানেও ভালো লাগবে না;

তবু দূরের কোলাহল থেকে

এই নীরবতার কাছেই আশ্রয় নিলাম।


মনটা প্রায়ই অপার্থিব কোনো ছায়াপথে

ছুটে যেতে চাইবে

যেখানে দুঃখেরও ক্লান্তি আছে, 

শোকেরও বিশ্রাম।


একটি স্কুলে পড়াব

ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের, ওদের অক্ষরের ফাঁকে

আমার ভাঙা দিনগুলো লুকিয়ে রাখব।

ওদের হাসির শব্দে মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকব

আমার স্বামীর নাম,

আমার বুকের ভিতর জমে থাকা শূন্যতা।


তবু সন্ধ্যা নামলেই

ঘরে আলো জ্বালাতে গিয়ে হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসবে।

এই আলো তো ওর হাতেই প্রতিদিন জ্বলে উঠত,

সে কথা মনে পড়লে

আলোই যেন অন্ধকার হয়ে যায়।


কোনো কোনো দিন মনটাকে ভালো করতে

একাই হেঁটে চলে যাব পদ্মা পাড়ে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে দেখব

পদ্মায় কত জল! অজস্র, অবিরাম, গভীর।

কী যে ভালো লাগবে আমার

জল দেখলে কেমন করে চোখ ভরে যায়।


সেই জলের ঢেউয়ে ছায়ার মতো ভেসে উঠবে

তোমার মুখ।

পদ্মা তখন আর নদী থাকবে না

সে হবে স্মৃতির আয়না,যেখানে হারিয়ে যাওয়া

আর পাওয়া না-পাওয়ার সব কাহিনি

একসাথে জ্বলে উঠবে।


রঞ্জন,

এইভাবেই আমি বাঁচব, কিছুটা ভুলে,

কিছুটা মনে রেখে জলের ভেতর মুখ খুঁজে নিয়ে,

আলো জ্বালিয়ে আবার নিভিয়ে।

— রুনু


৪২.         চোখের জল


পৃথিবীর সব জল শুকিয়ে গেলেও
আমার আঁখিতে তখনও জোয়ার থাকবে
নোনা নয়, লোনা নয়,
সে জল স্মৃতির,
ভালোবাসার অনিবার্য দায়ে ভেজা।

নদী থেমে গেলে কী আসে যায়,
সমুদ্র যদি নিজের নাম ভুলে যায়,
আমার চোখে তখনও ভাসবে
তোমার মুখের সেই নীরব আলো,
যেখানে হারিয়েছিলাম
সব চাওয়া-পাওয়ার হিসাব।

আমি কিছু চাইনি কখনও,
পাইনি বলেও কোনও অভিযোগ রাখিনি
শুধু বুকের গভীরে
একটি অদৃশ্য চুক্তি লিখে রেখেছি,
যেখানে লেখা
ভুলে যেও না, এটাই আমার প্রাপ্য।

সময় যদি সমস্ত চিহ্ন মুছে দেয়,
যদি সম্পর্কেরা ধুলো হয়ে যায়,
আমার চোখে তখনও জমে থাকবে
এক ফোঁটা অনন্ত স্মরণ,
যা তোমাকে দোষ দেবে না,
শুধু মনে রাখবে।

কিছু ভালোবাসা থাকে যা স্পর্শ চায় না,
কথা চায় না,
শুধু নীরবে বেঁচে থাকার একটি দায় তুলে দেয়—
সে দায়টুকুই নিও, আমায় মনে রাখিতে।


৪৩.         গভীর ব্যথার কবিতা


ডিসেম্বরের শেষ প্রহর,

স্বাধীনতার আলো তখন

হেমন্তের কুয়াশা ভেদ করে

বাংলার আকাশ ছুঁতে চাইছে

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই

নেমে এলো এক শীতল, অশ্রুভেজা অন্ধকার।


রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতায়

পাকিস্তানি সেনারা,

তাদের দোসর আলবদর–আলশামসের হাত ধরে

চিহ্নিত করতে লাগল

দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের

যারা বন্দুক নয়,

কলম আর জ্ঞানের আগুনে

স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিল।


মিরপুরের নিস্তব্ধতা, রায়েরবাজারের গহর,

ঢাকার দুয়ারে দুয়ারে

চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো

শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক

এই মাটির মেধা,

এই দেশের স্বপ্নবুননকারীরা।


অন্ধকারের বুকেই

তাদের শেষ নিশ্বাস থেমে গেল,

রক্তে ভিজল বাংলার ভোর,

চিহ্ন হয়ে রইল ইতিহাসের পাতায়

কেননা তারা জানত

স্বাধীনতা জন্ম নেয় না কথায়,

জন্ম নেয় ত্যাগে,

অপূরণীয় ক্ষতির বেদনায়।


১৪ ডিসেম্বর তাই শুধু দিন নয়,

একটি জাতির অভিমান,

একটি দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতি—

যেখানে মৃত্যুর মধ্যেও

বেঁচে আছে আলোর দীপশিখা।


আর বিজয়ের সকাল যখন উঠল

লালসবুজ পতাকা নিয়ে,

তখন আমরা বুঝলাম

যারা মাটিতে মিশে গেলেন,

তারা আসলে মিশে রইলেন আমাদের আত্মায়,

শহীদ বুদ্ধিজীবী

বাংলাদেশের চিরন্তন আলোকশিখা।


৪৪.            এই দেশ শহীদদের


রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ 

তবু আমরা নত হব না।

রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ,

পচা অন্ধকারে ঢেকে গেছে পথঘাট,

কিন্তু আমাদের শিরায় শিরায় জ্বলে

রক্তঝরা একাত্তরের অগ্নিস্মৃতি।

যারা দেশ তুলে দিয়েছিল অমানুষের হাতে,

আজও তারা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়

কাগজে-কলমে নতুন চেহারা,

কিন্তু ভেতরে একই বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ।


আমরা যারা মাটির কাছে মাথা রাখি,

জানি এই দেশের প্রতিটি দানা

শহীদের রক্তে সিক্ত

এই সত্য তারা মুছতে পারবে না কোনোদিন।


তাই প্রতিবাদ ওঠে বুকের গভীর থেকে

ধুলো ঝেড়ে দাঁড়িয়ে যায় ইতিহাস,

লাল-সবুজ পতাকা মেলে ধরে বলে

মৃত্যুর ভয়ে নয়, স্বপ্নের বিনিময়ে জন্মেছে আমার স্বাধীনতা।


রাজাকারেরা যতই দাপাক,

যতই বিকৃত করুক সময়ের আখ্যান

আমাদের কণ্ঠে উঠবে বজ্রনাদ:

দেশদ্রোহীর স্থান নেই এ মাটিতে,

এই দেশ শুধু মুক্তিযোদ্ধারই উত্তরাধিকার।


রাজাকারে ভরে গেছে এই দেশ 

তাই আমাদের ঘৃণা, ধিক্কার, প্রতিবাদ

আগুন হয়ে উঠুক।

যাদের মুখ দেখলে আজও মনে পড়ে

গর্ভবতী মায়ের চিৎকার, 

জ্বলন্ত গ্রামের ধোঁয়া, নির্যাতিত কিশোরীর ভাঙা স্বপ্ন।


ওরা মানুষ নয়

ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম জীব

দেশের বুকের ওপর লেগে থাকা

অপমানের দগদগে ক্ষত।


আমরা ঘৃণা করি

কারণ ওরা ঘৃণারই যোগ্য। ওদের নাম উচ্চারণ মানে রক্তাক্ত হাহাকারের দরজা খুলে দেওয়া।


ওরা মুখ পাল্টে এসেছে আবার,

কখনও নেতা, কখনও উপদেষ্টা,

কখনও নীতির মুখোশ পরে

কিন্তু ভেতরে একই কালিমা,

একই বিশ্বাসঘাতক ।

এই মাটি জানে ওদের আসল চেহারা

এই বাতাস আজও কাঁদে তাদের পাপে

এই নদী বহন করেছে লাশ,

যারা ওদের হাতে নিথর হয়েছিল।


তাই আজ আমরা ঘোষণা করি

রাজাকারকে মানুষ ভাবব না,

ইতিহাসের বর্জ্য বলে ধিক্কার দেব,

প্রতিটি মঞ্চে, প্রতিটি শপথে

তাদের কালো নাম উচ্চারিত হবে ।


এই দেশ শহীদের, এই পতাকা বীরদের,

রাজাকারদের জন্য শুধু ঘৃণা, শুধু ধিক্কার,

আর আমাদের অদম্য প্রতিবাদ।


৪৫.        ফিরে না-আসার গান


এই ঘরে রেখে যাব খা-খা শূন্যতা
দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকবে নিঃশ্বাসহীন সময়,
চৌকাঠে ঝুলে থাকবে না-বলা কথার ধুলো,
উঠোনে পড়ে থাকবে ঝরা পাতা,
যেন প্রতিটা পাতাই আমারই অসমাপ্ত বিদায়।

তুমি জীর্ণ পাতার মর্মর ডিঙিয়ে হাঁটবে ধীরে ধীরে,
নাম ধরে ডাকবে
ডাকে শুধু প্রতিধ্বনি ফিরবে,
আমার অস্তিত্ব নয়,
আমার ঘ্রাণ নয়,
আমার উপস্থিতির ছায়াও নয়।

কখনো যদি ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামে,
থইথই জলের উঠোনে দাঁড়িয়ে তুমি একা ভিজবে,
বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায়
জেগে উঠবে পুরোনো হাসি, পুরোনো কান্না,
স্মৃতিরা এসে বসবে তোমার কাঁধে
নিঃশব্দ, ভারী, অবুঝ।

কিন্তু আমি আসব না।
আমি থাকব না ভেজা আকাশে,
না কাদামাটির গন্ধে,
না তোমার চোখের জলে।

মানুষ চলে গেলে
ঘর থাকে, উঠোন থাকে, বৃষ্টি থাকে
শুধু মানুষ আর ফিরে আসে না।


৪৬.        আমাদের কোনো কথা হয় না


কুসুমপুর আজও আছে। ঝোপেঝাড়ে ভাঁটফুল ফোটে, ঠিক আগের মতোই। ঘুঘু ডাকে একা বসে, পলাশের ডালে রোদ লেগে থাকে রক্তিম, দূর আকাশে চিল ডানা মেলে উড়ে যায়। প্রকৃতি জানে না—আমাদের কথা ফুরিয়ে গেছে। সে তার কাজ করে যায় নিঃশব্দে, নির্লিপ্তভাবে।

কত কথা জমে ছিল বুকের গভীরে—কখনও বলা হয়নি। কত গল্প ছিল, যাদের শুরু হয়েছিল, শেষ হয়নি। দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল বিষাদের পাতায় পাতায়। ক্লান্ত সন্ধ্যারা একে একে পেরিয়ে গেল, আমরা কেবল চুপ করে রইলাম। শব্দরা আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিল।

শীর্ণা নদীটি আজও বয়ে চলে, দু’কূলে নির্জনতার ভার। গাঙচিল আর ডাকে না, কাশবনের ফুল ঝরে পড়ে মাটিতে—কেউ আর তা কুড়োয় না। নদী জানে, জল জানে,  আমাদের মধ্যে এখন কেবল নীরবতা।

সন্ধ্যামণি আর গন্ধ ছড়ায় না, দূর্বাঘাসে বসার জায়গা তৈরি হয় না। সন্ধ্যা নামে, ঝিঁঝি ডাকে, রাতের পাখিরা নিজেদের ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীর সবকিছুতেই কথা আছে শুধু আমাদের মধ্যে নেই।

অনেকে চলে গেছে প্রিয় মানুষের হাত ধরে। আমরাও চলে গেছি, তবে আলাদা আলাদা পথে। একই স্মৃতির দরজা পেরিয়ে দু’দিকে হেঁটে গেছি আমরা। তাই হয়তো আর ফেরার ভাষা নেই।

এখন দূর শহরে বসে আমি গল্প লিখি, গান লিখি, অকারণ দীর্ঘশ্বাস ফেলি। রাতের নিঃশব্দে সরে যেতে থাকা তারাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা শোনে। আকাশ শোনে। শুধু তুমি শোনো না।
আমাদের কোনো কথা হয় না, এখন আর কোনোদিনই হয় না।


৪৭.        পূর্ণিমা রাত্রিপ্রহরে


পূর্ণিমা রাত্রির প্রহরে আমি জেগে থাকি

ঘুম নয়, নিস্তব্ধতার সঙ্গে চোখের দীর্ঘ আলাপ।

দু’চোখ মেলে রাখি চাঁদের দিকে,
যেন চন্দ্রকিরণের প্রতিটি সুতোর ফাঁকে
তোমার আসার শব্দ লুকিয়ে আছে।
তুমি যদি নিঃশব্দে এসে আবার ফিরে যাও,
তবু সেই ক্ষণ
আমার জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তিতে
একটি অনন্ত বিরতির মতো থেমে থাকবে।

আমার সব শ্রান্ত অবসর তখন
নিজের ভারে নুয়ে পড়ে,
দিনের শেষে জমে থাকা অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাসগুলো
নিমগ্ন হয় তোমার ভাবনায়।
তুমি যদি শান্ত চরণে এসে
আমার বুকে মাথা রাখো,
তবে হৃদয় আর বোঝা হয়ে থাকে না—
সে হয়ে ওঠে আশ্রয়,
যেখানে ক্লান্তি নাম ভুলে যায়,
যন্ত্রণাও বিশ্রাম নিতে শেখে।

চাঁদের আলো আর আকাশের বিষয় থাকে না,
সে ধীরে ধীরে রূপ নেয় তোমার স্পর্শে
কোমল, নীরব, গভীর ও অদৃশ্য।
রাত্রি তখন শব্দহীন প্রার্থনার মতো
আমাদের চারপাশে গুটিয়ে বসে থাকে,
সময় শ্বাস ফেলতে ভুলে যায়,
আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে বুঝতে পারি
ভালোবাসা কখনও উচ্চারণ চায় না।

যদি ভোর আসে,
যদি দিনের কোলাহলে তুমি আবার হারিয়ে যাও,
এই পূর্ণিমা, এই নিঃশব্দ আলিঙ্গন
আমার ভেতরে রয়ে যাবে
ঘুমহীন চোখের গভীরে,
চাঁদের আলোয় লেখা
একটি অমোচনীয় গদ্য কবিতা হয়ে।


৪৮.         যারা গল্প হয়ে থাকে


কিছু মানুষকে দুঃখের দিনে
হঠাৎ মনে পড়ে
ভোরের মিষ্টি রোদ্দুর হাতে
যারা এসে
অন্ধকারের দাগ মুছে দিত নিঃশব্দে।

তারা এসেছিল জীবন-প্রান্তে,
ক্লান্ত দিনের শেষ বাঁকে,
আমি কাঙালের মতো
আজও তাদের হাত ধরতে চাই
শূন্যতার ভিক্ষা হাতে নিয়ে।

আর তারা আসে না।
কেউ আর বলে না
“মুখখানি কেমন মলিন,
এসো, আঁচলে মুছে দিই।”
সে কণ্ঠ আজ নিঝুম রাতের ঘুমে
চুপ করে থাকে।

তারা চলে গেছে স্বপ্ন হয়ে,
চাঁদের আলোর মতো
ছোঁয়া যায় না, তবু
অন্ধকার হলে ঠিকই মনে পড়ে।

এখন তারা আমার গল্প,
পাতায় পাতায় বেঁচে থাকা স্মৃতি।
আমি যখন একা বসে থাকি,
দুঃখ আমাকে ছুঁলে
তাদের নাম উচ্চারণ করি না,
তবু তারা এসে পড়ে
হৃদয়ের গভীর প্রান্তরে,
নিঃশব্দ ভালোবাসার মতো।


৪৯.      জোছনার লীলাবতী


আশ্বিনের নিঝুম জোছনায়
সাদা শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে নেমে এলে তুমি
রাধিকার মতো নীরব,
চোখে লাজ আর ঠোঁটে অমৃতের ইশারা।

আমলকীর বনে সন্তর্পণে হারিয়ে গেলাম দু’জন,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের শ্বাস,
জোনাকিরা জ্বালাল শরীরের গোপন প্রদীপ,
চাঁদের গায়ে লেগে রইল আগুনের দাগ।

কুসুমের গন্ধে মাতাল বাতাস
আমার বুক ছুঁয়ে তোমার কেশে জড়িয়ে পড়ে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে মিশে যায় অচেনা ভাষা
স্পর্শের আগে যে ভাষা শেখানো হয় না।

তোমার কাঁধে নেমে আসে আমার নির্ভরতা,
চোখের পলকে কাঁপে বহু জন্মের তৃষ্ণা,
তুমি তখন আর রাধিকা নও
লীলাবতী,
আমার রাতভর জাগ্রত প্রার্থনা।

জোছনা ধীরে ধীরে গলে যায় দেহের ভেতর,
সময় থমকে দাঁড়ায় আমাদের মাঝে—
কোনো উচ্চারণ নয়, কোনো প্রতিজ্ঞা নয়,
শুধু স্বর্গীয় ভালোবাসা, নীরব, গভীর, অনিবার্য।


৫০.         যারা আর ফিরে আসে না


যারা আর ফিরে আসে না
তাদের পায়ের শব্দ আজও শোনা যায় ভোরের উঠোনে,
শিউলি ঝরার ফাঁকে ফাঁকে
হালকা হাওয়ার মতো এসে বসে থাকে স্মৃতির বেঞ্চে।
কেউ ডাকে না, তবু নাম ধরে ডেকে ওঠে মন,
চা–কাপের ধোঁয়ার ভেতর ভেসে ওঠে
তাদের মুখ—অল্প হাসি, অল্প ক্লান্তি।

যারা আর ফিরে আসে না
তারা রয়ে গেছে পুরোনো দেয়ালের ফাটলে,
ক্যালেন্ডারের ছেঁড়া পাতায়,
একটি অসমাপ্ত চিঠির ভাঁজে ভাঁজে।
বিকেলের রোদ নামলে
হঠাৎ মনে হয়
এই তো বুঝি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে,
বলবে, “কেমন আছ?”
কিন্তু দরজাটা শুধু নীরবতাই খোলে।

যারা আর ফিরে আসে না
তারা জানে না,
রাতের গভীরে কীভাবে হঠাৎ কান্না জেগে ওঠে,
কীভাবে বুকের ভেতর
একটা নাম বারবার ধাক্কা খায়।
জানে না
একটি গান, একটি গন্ধ, একটি পুরোনো রাস্তা
কীভাবে আমাদের ভেঙে দেয়
অচেনা শিশুর মতো।

তবু যারা আর ফিরে আসে না
তারা পুরোপুরি যায়ও না।
তারা বেঁচে থাকে
আমাদের অভ্যাসে, অপেক্ষায়,
ভুল করে বলা একটি নামের ভেতর।
তারা বেঁচে থাকে
যে শূন্যতাকে আমরা ভালোবাসা বলে ভুল করি।

এই জীবন জুড়ে আমরা তাদেরই নিয়ে বাঁচি
যারা আর ফিরে আসে না,
কিন্তু আমাদের ভেতর থেকে
কোনোদিন চলে যেতে শেখেনি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন