বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

দাঁড়াও সময় ( কবিতাগ্রন্থ )


দাঁড়াও সময়  ( কাব্যগ্রন্থ )        

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর -২০২৫ ইং


উৎসর্গ -

মধুমতী–চন্দনা–বারাশিয়ার পলিমাটির
অববাহিকা থেকে আমার জীবনে এসে 
বন্ধুত্বের আলো জ্বেলেছিল  দুই তরুণ— 
নেয়ামুল বারী ও সিদ্দিকুজ্জামান বাহার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে
সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে গভীর মানবিকতায়
ওরা আমায় বেঁধে রেখেছিল। 

আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকা
সেই সহপাঠী দুই প্রিয়বন্ধুকেই
এই গ্রন্থটি গভীর মমতায় উৎসর্গ করলাম।



১.        লুকানো প্রেমপত্র 


চলে যাব সব ফেলে একদিন,
এই অবগুণ্ঠিত নীলাকাশের ঢেকে-রাখা স্বপ্নগুলোকে
শ্রাবণদুপুরের নোনা ভেজা হাওয়ার হাতে দিয়ে।
জলে-ভরা টইটম্বুর নদীর কাছে বলব—
"আমার না-বলা কথাগুলো বয়ে নিও ধীরে ধীরে,
যেদিকে শেষ বিকেলের রোদ সরে যায়।"

স্মৃতির বসতবাড়ির উঠোনে
ঝরে পড়বে কদম্বের সুবাসভরা নিঃশ্বাস,
খোলা দরজার ফাঁকে তুমি হয়তো
পুরোনো দিনের একটি হাসি রেখে যাবে।
আমি রেখে যাব শুধু লুকিয়ে রাখা
জীর্ণ প্রেমপত্রের হলদে পাতাগুলো—
তোমার নামের আলোয় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর।

আর রেখে যাব তোমাকে দেওয়া নাকফুল—
তার ক্ষুদ্র রূপোলি বৃত্তে জড়িয়ে আছে
সংকোচ, স্পর্শ, অচিন হাহাকার,
আর সেই প্রথম দিকের কম্পমান ভালোবাসা।

তারপর হাঁটব অচেনা পথের দিকে—
যেখানে আমার থাকবে না আমি,
থাকবে শুধু তোমাকে ভাবার
একটুখানি নীরব অনন্তকাল।


২.       অনন্ত বিচ্ছেদের আগুন

ভালোবেসে কাছে আসতে পারোনি যখন,
তখন থাক— দূরত্বই হোক চূড়ান্ত প্রমাণ।
যে পথে হাঁটেনি তোমার পদধ্বনি,
সেই পথে আজ নিঃসঙ্গতারই শপথ ধ্বনি।

বিচ্ছেদই যদি হয় অনন্তের লেখা,
তবে সেই লেখায় আমি হবো কেবল একা।
রোগে শোকে দগ্ধ হবে এই দেহখানি,
তবু রাখব না আর কোনো দায় তোমার জানি।

স্মৃতিগুলো জ্বলে যাবে ছাই হয়ে শেষে,
পোড়া পাতার মতো ঝরে পড়বে অবশেষে।
শুধু রাতঘুমে মাঝে মাঝে আসবে তুমি—
ধোঁয়া হয়ে, স্বপ্ন হয়ে, নিভে যাওয়া আলোকবিন্দু কোনো ভ্রমি।

তবু থাক— এ যন্ত্রণা আমিই বহন করি,
ভালোবেসে কাছে আসতে না পারার এ-ই মর্মপথ ভরি।
বিচ্ছেদের আগুন যদি অনন্তই হয়,
আমি তাতে হেঁটে যাব— নীরব, নির্বাক, নির্নয়।


৩.       মায়ার নদী


নদীর মতো তুমি বয়ে যাও নিঃশব্দ ধারায়,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি পাথর—নিজেকে লুকিয়ে রাখি।
সন্ধ্যার মতো তুমি মিশে যাও অচেনা আলোয়,
আমি অস্থির হাওয়ার মতো আড়মোড়া ভেঙে ডাকি।

নির্জনতার বুক জুড়ে তোমার পদচিহ্ন পড়ে,
আমি শুনি দূরের কোনো হারানো বাঁশির সুর।
অন্ধকারের মতো তুমি ঢেকে দাও সব গোপন,
আমার ভেতর দপদপ করে ওঠে আগুনের নীল নূপুর।

কোথায় যাও তুমি—কলেবরহীন ধোঁয়ার মতো?
কোথায় হারাও তুমি—স্বপ্নের ভোরের নরম আয়েশে?
আমি শুধু জানি—মায়া জড়িয়ে তুমি ফিরবে আবার,
হৃদয়ের ভেজা জানালায় বৃষ্টির মতো এসে।


৪.       নিষ্কলুষ হাতের স্বপ্ন


গতরাতের নিস্তব্ধতায়
হঠাৎই ঘুম ভেঙে দেখি—
তোমার নিষ্কলুষ একজোড়া হাত
নরম বাতাসের মতো
আমার বুক ছুঁয়ে আছে।

এটাই তোমার গুপ্ত বার্তা,
এটাই তোমার অস্তিত্বের সতর্ক ছোঁয়া—
যেন ভুলে না যাই
তোমার নিকটতার আলোয় আমি জন্মাই প্রতিদিন।

কোনোদিন, কোনো বিদায়ের ক্ষণে
যদি তোমার দুই হাত
আমার কাছে পৌঁছাতে না পারে আর,
যদি স্পর্শের সেতুটি ভেঙে যায়—

তবে তুমি নিঃশব্দে দারজা লাগিয়ে
দূরে চলে যেয়ো,
আমার অশ্রুর ভেজা আয়নায়
তোমার মুখের কোনো ছায়া
ফেলে না গিয়ে…

কারণ ছায়া থাকলে
আমি আবারও তোমাকে ডাকব,
আবারও ভুলব না
তোমার হাতের সেই নিষ্কলুষ উষ্ণতা।


৫.       হারানো আলো


ভীষণ ক্লান্তি হৃদয়ে আমার,
আত্মাও ক্ষীণ— যেন নিভু-নিভু প্রদীপ,
শীতল বাতাসে দুলে ওঠে শুধু
অপ্রকাশিত কোনো দুঃখের আলো নিয়ে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো,
দেখতে পাবে— আমি আর আগের মতো নই,
স্মৃতির নদী শুকিয়ে এসেছে অনেকটা,
নৌকার দড়িতে জড়ানো আছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে,
তাদের গন্ধে রাতের আকাশ থমকে থাকে—
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকি চাঁদের নিচে
একটি ভাঙা তটরেখার মতো নির্জন।

তুমি এলে হয়তো বাতাস জুড়ে
চুপিসারে বেজে উঠবে কোনো পুরোনো সুর,
যেন খোলা জানালায় ঢুকে
কিশোরী বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়া।

তবু জানো—
আমার ভিতরের অনল এখন অল্প,
কেবল তোমার একটি স্পর্শ
আবার জ্বালাতে পারে পুরোনো নক্ষত্র,
আবার ফিরিয়ে দিতে পারে
হারানো আলো, হারানো আমাকে।


৬.        দাঁড়িয়ে আছো


তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার চোখের পাতার খুব কাছেই—

যেন অতি সতর্ক ভোরের আলো, ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে নিস্তব্ধতার দরজা।
আমি তাকালেই দেখি, তোমার চুলে আমার দৃষ্টির ছায়া লেগে আছে;
যেন দু’জনের মাঝখানে বাতাসও আর পথ খুঁজে পায় না।

তোমার চোখের উপর তুমি রেখে দিলে তোমারই আরেক জোড়া চোখ—
এমন গভীর, এমন স্থির, এমন অনুচ্চার সৌন্দর্যে ভরা
যে সেখানে কোনো শোক নেই, কোনো বেদনার কালো ছায়া নেই,
তবুও অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ কাঁপন থরে থরে জ্বলে ওঠে।

সেই চোখের অভ্যন্তরে আমার ভালোবাসা জেগে আছে—
নিভে না যাওয়া প্রদীপের মতো,
নান্দনিক কোনো নক্ষত্রের মতো,
যে আলো নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে তোমার শিরায়, আমার নিশ্বাসে।

তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছো,
চোখের পাতার কিনারা ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের মতো,
একটি অনন্ত গদ্যকবিতা হয়ে—
যার প্রতিটি বাক্য আমি স্পর্শ করতে চাই,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে চাই,
বারবার, বারবার, যতদিন চোখে আলো থাকে।


৭.         ফেরা 


এক অস্তরাগের সন্ধ্যাবেলায়, খুব কাছে ঝুঁকে সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ নিয়েছিলাম—

হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল সেই সুবাস।

তারপর কত সন্ধ্যা অন্ধকারে ডুবে গেল,

আকাশের রক্তিম রং শুকিয়ে গেল বাতাসে,

তবু আর কোনো সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ

আমার নাকে এসে লাগেনি,

যেন সেই প্রথম সন্ধ্যাই শেষ সন্ধ্যা হয়ে রইল।

আরেকদিন চন্দ্রালোকভরা এক রাত্রি-দুপুরে

জোছনা-ভেজা কামিনীর গন্ধ গায়ে মেখেছিলাম—

সেই সুবাস যেন সাদা আলো ম্লান দুঃখ,

যেন কারও নরম নিঃশ্বাস এসে গাল ছুঁয়ে যায়।

তারপর কত জোছনা-তৃষ্ণার রাত নিঃশব্দ সরে গেল,

কামিনী আর তার স্নিগ্ধতা বিলিয়ে দেয়নি, দূরের কোনো ঘরের আঙিনায় হয়তো সে এখনও ফোটে, এখনও গন্ধ বিলায়।

তারও পরে এক অষ্টাদশীর মাথা ভরা কালো কুন্তলের গন্ধ নিয়েছিলাম, 

আর এক হেমন্ত-গোধূলির ধূসর মায়ায়

কুড়ি বছরের এক রমণীর বুকের উষ্ণতা

আমাকে  আত্মহারা করেছিল-

অষ্টাদশীর চুলের সেই গন্ধ আর রমণীর বুকের গন্ধে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি,

হয়তো ভালোবাসা এই রকমই হয়।

এইসব সুবাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে

একদিন পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম,

চেনা রাস্তা, চেনা মানুষ, চেনা ঠিকানাগুলো

হঠাৎ এক অচিন শূন্যতায় মিলিয়ে গেল।

ফেরার পথ জানতাম না,

তবু পথিকের মতো ক্লান্ত চোখে

পথের উপর বসে থেকেছি বহুদিন-

বাড়ি ফিরিনি, কেউ ডাকেনি।

আর একদিন হঠাৎ  মানিব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছিলাম—

সেই ব্যাগে ছিল প্রেমিকার পুরোনো চিঠি,

যেখানে মলিন অক্ষরে লেখা ছিল

আমার জন্য তার অপেক্ষার কথা , তার একান্ততা, তার বিরহব্যথা।

ব্যাগ হারানোর কথা শুনে সে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল চিরতরে।

তার সেই বিদায়বেলা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শোকসংগীত।

এখন প্রায়ই দেখি—পাতা ঝরে, আলো নিভে যায়, কোথায় অগোচরে সন্ধ্যা-মালতী ফোটে,

কোথায় বর্ষার রাতের গভীরে কামিনী তার গন্ধ বিলায়; অষ্টাদশীর সেই মেয়েটি জানিনা কার ঘরের বউ,

আর সেই কুড়ি বছরের রমণী  চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে তার বিগত যৌবনার গল্প বলে ,

আমি শুধু জানি, কত অপেক্ষার মৃত্যু হলো, পথ চেয়ে চেয়ে কত বসন্ত হারিয়ে গেল,

কিন্তু যাদের জন্য এ নীরব প্রতীক্ষা—

সেইসব অভিমানীরা আর কোনো পথ দিয়েই ফিরে এলো না,

কোনোদিন হয়তো ফিরবেও না আর।


৮.        পদচিহ্নের অনন্তকাল


তোমার অস্তিত্বে আমার ভালোবাসার সুবাস লাগুক,
যেন ভোরের শিশিরে নুয়ে থাকা বকুলপাতায়
অকারণ স্পর্শ নামে মৃদু স্নেহে।

তোমার পায়ের পাতার ধুলোয় থাকুক আমাদের পথচলার স্মৃতি—
যে পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে
আমরা খুঁজেছিলাম একে অপরের গভীরতম নীরবতা।

আমি চাই, আমার মমতার কোমল ছোঁয়া
তোমার দ্রোহের আগুনে শীতল হোক,
ঘৃণার কাঁটাগুলো ভিজে উঠুক স্নিগ্ধতায়—
যেন প্রেম নিজেই এসে তোমার হৃদয়ে বৃষ্টি হয়ে নামে।

আমার সমস্ত গীতিকবিতা যার নাম ধরে শ্বাস নেয়,
সেই তুমি—
আমার প্রেমের ছায়ায়, আলোয়, বর্ণে
নিতান্তই পুষ্পিত হও, পল্লবিত হও
অদ্ভুত অনন্ত কোমলতায়।

এভাবেই তুমি স্পর্শ করো আমার সমস্ত অস্তিত্ব—
প্রেমের এক গোপন নির্দেশে,
যেন জন্মান্তরে লেখা থাকে আমাদের মিলনরেখা।

আমরা একদিন থাকব না,
কিন্তু রবে ধুলোমাখা সেই পথ,
সন্ধ্যাবেলার বাতাস,
আর পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা
আমাদের গভীর, অমোচনীয় পদচিহ্ন—
অনন্তকাল।


৯.       ছায়াপথে দেখা


যে দিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে—
তার তো আর বেশি দেরি নেই,
হয়তো এই গোধূলির পরেই,
হয়তো পরের কোনো নক্ষত্রবৃষ্টির রাতে।

তোমার পায়ের ধুলো ঝরে পড়বে
দিগন্তের নীল-অন্ধকারে,
আর আমি দূর কোনো নীহারিকার সিঁড়ি বেয়ে
তোমার দিকে আসব নীরবে, নিঃশব্দে—
যেন আলো ফেরার আগে প্রথম বাতাসের স্পর্শ।

সেই অনুপম মুহূর্তে
তারারা থেমে যাবে কক্ষপথ ভুলে,
গ্রহেরা শোনবে আমাদের পদধ্বনি,
গ্যালাক্সির বুক জুড়ে জ্বলে উঠবে
অপরিচিত এক প্রেমের কম্পন।

তোমার চোখে যখন ছায়াপথের ধুলো লেগে ঝলমল করবে,
আমি চিনে নেব সেই পুরোনো আলো—
যা যুগ-যুগান্ত ধরে আমাকে ডেকে এসেছে।

যেদিন দেখা হবে,
সেদিন সব অভিমান, সব দূরত্ব,
সব না-বলা কথারা ভেসে যাবে
তারার নৌকোয় ভর করে—
শুধু আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে থাকব
অনন্তের দরোজায়,
একটি মহাজাগতিক প্রেমের প্রথম সাক্ষ্য হয়ে।

ছায়াপথের সেই দিন—
হয়তো দেরি নেই,
হয়তো এখনই নেমে আসছে
আমাদের দু’জনের পথের দিকে
একটি আলো-জ্যোৎস্না ভেজা দিগন্ত।


১০.       নিষিদ্ধ উষ্ণ রাত


নীল অন্ধকারে গোপন আলো জ্বেলে
তারা এগিয়েছিল দু’জন—
না জাত, না ধর্ম, না বয়সের কোনো সীমানা
তাদের থামাতে পারেনি।

এক-একটি দাহনময় শ্বাস
জ্বেলে তুলছিল বৈশাখের উত্তাপ—
যেন ঝড় এসে দু’টি দেহের ভেতর
খুঁজে পাচ্ছে তার অনিঃশেষ ঘর।

তাদের চোখে ছিল আগুনের ঢেউ,
হৃদয়ের ভেতর দীপ্ত স্রোত—
স্পন্দনের পর স্পন্দন
কাঁপছিল দিগন্তের মতো।

ঠোঁটের কিনারায় তখন
অতল নিষিদ্ধতার স্বাদ,
হেমলকের বিষও যেন
মধুর হয়ে উঠতে চাইত
সেই মিলনের উষ্ণ রাতে।

তারা জানত—
এ চুম্বন কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নয়,
এ এক গভীর, আদিম, অচেনা ভাষা
যেখানে শরীর শুধু অঙ্গীকার,
আর কামনা—ফেনিয়ে ওঠা নদীর জল।

তবু তারা থামেনি—
তাদের ঠোঁটের নিবিড় আলিঙ্গনে
রাতের আকাশ থমকে দাঁড়িয়েছিল,
এবং পৃথিবী বুঝেছিল—
নিষেধও কখনো কখনো
তৃপ্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্ত।


১১.       জাদুকরী সন্ধ্যার রোমাঞ্চ


এক জাদুকরী সন্ধ্যায়
সূর্য যখন রক্তিম আগুন হয়ে
দিগন্তের নীরবতায় ডুবে যাচ্ছিল,
বালুকাময় তীরে দাঁড়িয়ে তাঁরা—
দু’টি ছায়া, দু’টি স্পন্দন,
ঢেউ এসে আলতো চুমু দিচ্ছিল তাঁদের পায়ে,
যেন সমুদ্র নিজেই প্রেমের সাক্ষী।

বাতাসে লোনা গন্ধে
মিশে ছিল এক অচেনা উত্তাপ,
চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল মুখ,
আর উপরে, নীল অন্ধকারে
তারারা জ্বলছিল এমন ব্যাকুলতায়
যেন তারাও কিছু বলতে চায়।

তাঁরা হাত ধরতেই
এক অদ্ভুত কাঁপন দেহে দেহে বয়ে গেল,
হৃদয়ের গোপন কক্ষ খুলে গেল শব্দহীন—
চোখে চোখ রেখে
তিনি বললেন সেই প্রথম আলাপন,
যা হৃদয়কে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়।

তারপর ঢেউয়ের শব্দে ঢেকে
নরম স্বরে প্রতিশ্রুতি দিলেন তাঁরা—
সমুদ্র যেমন জোয়ারকে পায়,
আকাশ যেমন রাতকে জড়িয়ে ধরে,
তেমনই তাঁরা একে অপরকে
চিরকাল জড়িয়ে রাখবে মমতার উত্তাপে।

১২.      নক্ষত্র-বীথির পথে


আমার ঠিকানায় এসে
তুমি পাবে না আর—
শুধুই একটি নাম লেখা আছে
ধুলোধুসর দরজায়।

যেখানে গেছি চলে,
সেথায় কোনো পথিকেরই পৌঁছানো নয়;
কেউ পারে না থাকতে পাশে,
কেউ পারে না ডেকে নিতে ফিরে।

যে জীবন ছিল ভাঁটফুলের গন্ধে
মহুয়ার মাতাল সুরে রাঙা,
সেই জীবন ছেড়ে এবার
আমি হারিয়ে গেছি
নক্ষত্র-বীথির বিস্ময় দেশে।

সেখানে রাতেরা নীরব,
আলোয় ভাসে আমার অদেখা স্বপ্ন;
তুমি শুধু দূর থেকে
আমার নামটুকু পড়ো—
আমি আছি, অচেনা আলোর ওপারে।


১৩.       নৈশকবি


কবিতা লিখব বলে রাত জাগি—
জানলার ধারে এসে বসে নিশাচর পাখির দল,
তারারা আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে
ঝরে পড়া অক্ষরের মতো।

বাতাস আসে গোপন সুরে,
নৈঃশব্দ্যের গভীরতম গান
মনে করিয়ে দেয়—
রাতও এক অনাহত কবি।

জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে ছাতার মতো,
মুছে দেয় দিনভর ক্লান্তি,
তোমার পদধ্বনির মতো নরম প্রতিধ্বনি
অন্তর আঙিনায় বাজতে থাকে।

সকাল হলে খাতা খুলে দেখি—
না আছে কোনো শব্দ,
না আছে কোনো উপমা,
না কোনো ছন্দের রেখা।

সারা পাতা জুড়ে শুধু তোমার নাম—
যেন তুমি-ই প্রতিটি কবিতার আদি-উৎস,
যেন আমার সমগ্র রাতজাগা সৃজন
তোমার নামের দিকেই
ধারাবাহিক নক্ষত্রপতনের মতো
অবশেষে এসে থেমেছে।


১৪.       কালের দীর্ঘশ্বাস 


শত বছর পরে,
অমনই এক স্থবির বিকেলের গোধূলিতে
কারও বিষণ্ণ চোখ মেলে বসে থাকবে
এই পুরোনো বাড়ির বারান্দায়—
ক্লান্ত অফিসযাত্রী কারও পদশব্দ
ধীরে ধীরে উঠোন পেরোবে,
হয়তো সেই পদধ্বনি আমারই চলার পুনরাবৃত্তি,
শ্বাসটুকু পর্যন্ত মিলবে আমাদের বংশের রক্তস্রোতের সুরে।

ওরা জানবেও না—
একদা এই বারান্দায়, ঠিক এই রেলিঙে হাত রেখে
কেউ একজন বসে থাকত মায়া ভেজা দৃষ্টিতে,
রাত নামার আগে কারো ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায়।

হাওয়ায় লতিয়ে ওঠা গন্ধরাজের ডালে
যে আকুলতার গন্ধ ছিল,
যে দীর্ঘশ্বাস জমে ছিল ছাদের কার্নিশে,
যে অপেক্ষার কুয়াশা শুকায়নি বহু দিন—
সবই এখনও লুকিয়ে আছে
ইটের গায়ে, কাঠের সিঁড়ির সোঁদা গন্ধে,
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে।

একদিন ওরা বসবে—
কিন্তু জানবে না,
ওদের নিঃশ্বাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
আমাদের বহু পুরোনো না-বলা কথারা।

এভাবেই অপেক্ষা সঞ্চারিত হয় রক্তে,
শতাব্দী পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—
আর বারান্দা জুড়ে ভেসে থাকে
কালের দীর্ঘশ্বাস।


১৫.        গঙ্গার তীরে সত্যস্বরূপ


গঙ্গার তীরে— 

যেখানে জলরাশি নীরব মহিমায় যুগকে আচ্ছন্ন করে রাখে,

যেখানে প্রথম প্রভাতের আলো পাঠশালার মতো

আমাদের হৃদয়ে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে তুলেছিল
প্রেমের প্রথম শিখা—
সেই পবিত্র তীরেই আমি দেখাব তোমাকে
আমার সত্যস্বরূপ,
আমার সমগ্র অন্তরাল,
যা আজও তোমার নাম শুনলেই
নদীর স্রোতের মতো কেঁপে ওঠে।

স্মরণ আছে?
সেই গঙ্গাবক্ষের নীলাভ আলোয় দাঁড়িয়ে
আমরা নিবেদন করেছিলাম হাতে হাত রেখে—
যত ঝড়ই আসুক,
যতকালই কেটে যাক,
আমরা থাকব যুথবদ্ধ,
অপরের হৃদয়রশ্মিতে জড়ানো
দুটি অনিচ্ছেদ্য প্রাণের মতো।

আজ সেই প্রতিজ্ঞার বিস্মৃত ধ্বনি
আবার শুনিয়ে দেব তোমাকে—
তীরের বালুকায় দাঁড়িয়ে,
জলছায়ার মৃদু কাঁপনে ভেসে ভেসে
আমার গভীরতম স্বরূপ উন্মোচন করে।
তুমি দেখবে—
আমি কখনো হারাইনি,
কেবল সময়ের চাদরে আড়াল হয়েছিলাম মাত্র।

গঙ্গার সেই শাশ্বত নীল জলে
যেদিন তোমার চোখে আমি আবার
আমাকেই চিনে নেব—
সেদিনই পূর্ণ হবে
আমাদের সেই পুরোনো নিবেদনের মহাদূত,
যে এখনো গোপনে রক্ষা করে রাখে
আমাদের দু’জনার অটুট বন্ধন।


১৬.      বিনিদ্র রজনীর গল্প


চোখের বৃত্তে যে অচেনা কালো দাগ,
তার নিচে জমে আছে বহু রাতের নীরব ছায়া—
আলো নিভে গেলে যেসব গল্প জেগে ওঠে
তার সবকিছুরই একমাত্র চরিত্র তুমি।

অগণিত রজনী পেরিয়ে
স্বপ্নেরা আমার জানালায় এসে থেমে থাকে,
তোমার নামের ধ্বনি শুনলেই
তারা হেলে পড়ে নিভে যায় স্নিগ্ধ বাতাসে।

জানি না তুমি বোঝো কি না—
এই অবসন্ন চোখে জমে থাকা প্রতিটি ছায়াই
তোমার অনুপস্থিতির ছোট্ট স্মৃতিফুল,
যাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিদিন
একটি নতুন দীর্ঘশ্বাসে লিখি কবিতা।

তোমাকেই ঘিরে বোনা
সে বিনিদ্র রাতগুলোর সমস্ত গল্প,
আর তুমি জানতেও পারোনি—
আমার প্রতিটি নিদ্রাহীনতার
মূল চরিত্র শুধু তুমি


১৭.        অস্তবেলার মায়াবী সুর


বেলা শেষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
আমি শুনি এক ক্ষীণ আলোর হাঁটা—
আকাশের কোলে ক্লান্ত রোদ
একফোঁটা স্বপ্ন রেখে যেভাবে ঘরে ফেরে,
আমিও সেভাবেই ফিরছি ধীরে ধীরে
নিঃশব্দের রহস্যময় উপত্যকায়।

ওগো বন্ধু, অনেক দিয়েছি—
শব্দের কাঁথা, ব্যথার মণিমুক্তা,
অতৃপ্ত রাতের বিষণ্ণ রূপকথা।
তোমরা নিয়েছো, আমিও দিয়েছি—
সময় যেন পুরোনো কোনও বীণার মতো
তার ছিঁড়ে গেলেও সুর রেখে যায়।

এবার আর চাইবে না কিছু—
আমার হাত এখন কেবল সন্ধ্যার আলো স্পর্শ করে,
আমার গলা কেবল দিগন্তের সোনালি রাগে ভরে ওঠে।
দাও আমাকে শুনতে সেই দিগন্তপুরাণ—
যেখানে সূর্য ডোবে ধীরে,
আর অন্ধকার তার কোমল বাহু বাড়িয়ে
আমাকে টেনে নেয় অনন্তের শান্ত স্বপ্নে।

যা বাকি আছে—
একটু নীরবতা, একটু আকাশ,
আর বীণার অস্তমিত সুরের
একটুকু মায়াবী কাঁপন।

সেই সুরেই আজ আমি হারাতে চাই।


১৮.      পথের পদচিহ্নে ফিরে আসা


এভাবেই আমাদের যাত্রা বোনা থাকে—
তোমার হাঁটার শব্দে আমার আদিম নাড়ির ধ্বনি মিশে যায়,
আমার পথের ধুলোয় জেগে ওঠে তোমার ফেরার প্রতিধ্বনি।
যে রাস্তা একদিন আমার একাকীত্ব বয়ে নিয়ে যেত,
আজ সেই পথেই তোমার আঙুলের উষ্ণতা ছায়া ফেলে রাখে।

আমার জীবন যে পথ দিয়ে চুপিচুপি চলে যায়,
তুমি সেই পথের ঘাসে মাথা ঝুঁকিয়ে
আমার পায়ের চিহ্ন ছুঁয়ে দেখো—
এই তো আমি, এই তো আমার ফেরা, আমার অপেক্ষা।

তুমি যদি বলো—
“আমি যেদিকে যাই, তোমার জীবনও সেদিকে ভেসে আসে”—
তবে জানবে,
তোমার নিশ্বাসের সামান্য দোলায়ও
আমার দিগন্ত বদলে যায়।

তুমি যেখানে থামো,
সেখানে আমার দিন শেষ হয়, রাত শুরু হয়,
সেখানে বাতাসও তোমার নাম উচ্চারণ করে।

এইভাবে চলতে চলতে
আমাদের দুজনের পথ একদিন
একটি মাত্র রেখায় মিলেমিশে যাবে—
যেখানে ফিরে আসা আর যাওয়া
দু’টিই হয়ে উঠবে এক অনন্ত প্রেমের পদচিহ্ন।


১৯.      ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী 


ভরা নিশীথে কেমন এক অদ্ভুত ভয় জেগে ওঠে—
মনে হয় তুমি হাত বাড়ালেই হাওয়ার মতো হারিয়ে যাবে,
চিরচেনা পথ হঠাৎই অচেনা অন্ধকারে ডুবে যাবে,
চাঁদের আলো মুছে গেলে পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রবে
আমারই দিকে তাকিয়ে।

তাই বলি—
এসো পূর্ণিমার শুভ্রতা মেখে,
ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী,
যেদিন আকাশ জেগে থাকবে দুধসাদা আলোয়
আর ধরণীর বুক জুড়ে ছড়াবে নরম কুয়াশার মতো স্বপ্নের পশরা।
সেদিন তোমার শাড়ির আঁচলেও উঠবে
এক অতল কোমল উজ্জ্বলতা—
যা দেখলে মনে হবে
রাত্রির বুক ফুঁড়ে
কেউ যেন তুলে এনেছে আলোকে জন্ম দেওয়া কোনো ফুল।

এসো,
আমি সেই ফুলের গন্ধে পথ চিনে নেব,
শুধু পথই নয়—
চিনে নেব তোমাকেও,
তোমার চোখে লুকানো থমথমে নির্জনতা,
তোমার কণ্ঠে ঝুলে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মৃদু সুর,
আর তোমার সাদা শাড়ির আড়ালে নড়ে ওঠা
এক অপ্রকাশিত আলো।

পূর্ণিমার নিস্তব্ধ রাতে
তুমি যদি এক মুহূর্ত পাশে দাঁড়াও—
এই ভরা নিশীথ
আর কোনোদিনই ভয়ের হবে না,
বরং হয়ে উঠবে আমাদের দুজনের
এক সোনালি-সাদা স্বপ্নযাত্রা।


২০.      ছায়ার মতো মায়া


তুমি নেই—
তবু অদ্ভুত ছায়ার মতো
দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে
নরম নরম উপস্থিতি হয়ে
থেকে যাও আমার পাশে।

হাওয়া যখন চুলে হাত বুলিয়ে যায়,
মনে হয় তোমার আঙুলের স্পর্শ;
জোছনা যখন জানালায় ফেলে স্নিগ্ধ রূপ—
মনে হয় তোমারই হাসি নেমেছে ঘরে।

আমি জানি, তুমি নেই কোথাও,
তবু তোমাকে পাই পথের ধুলোয়,
অনুপস্থিতির মায়াবি নীড়ে
তুমি হয়ে ওঠো আরও বেশি সত্য।

এভাবেই তুমি —
না থাকা থেকেও থাকো,
মায়ার আবরণে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
ছায়ার মতো অনুসরণ করো আমাকে
জীবনের পর জীবন ধরে।


২১.      চোখে লেখা আলো অন্ধকার 


তোমার চোখে স্বপ্ন ছিল—
ঢেউয়ের মতো জেগে থাকা নরম আলো,
পূর্ণিমা রাতের ছায়া ছিল—
দু’জনার নিঃশব্দ কথোপকথনের মতো।
সন্ধ্যা মালতীর শুভ্রতা ছিল—
তার গন্ধে ভরে যেত আমার ক্লান্ত দিন,
আর সারারাত শিশির ঝরে এখানেই—
এই দুই চোখের ভেতর জমে ওঠা
অকথিত হাজার অনুভবের ওপরে।

এখানেই যত ক্ষেদ—
ভাঙা পথের ধুলোর মতো জমে থাকা অভিযোগ,
অচিনপুরে হাঁটা সকল ক্লান্ত পদচিহ্ন,
যার প্রতিটি তোমার দিকে হাত বাড়ায় নিঃশব্দে।

জীবনের যত গল্প বলা—
এই চোখেই লেখা আছে তার প্রতিটি পাতা,
একেকটি স্মৃতি যেন পুরোনো নরম পত্রের মতো
হাওয়া আসলে শব্দ তোলে,
তোমার ডাকের মতো।

আর মৃত্যুর ছায়াও—
এই চোখে দেখতে পাই কখনো কখনো,
ঠিক সন্ধ্যার শেষ আলোটা মুছে যাওয়ার আগে
যেমন দীর্ঘ শ্বাসের মতো নেমে আসে বিষণ্নতা।
কিন্তু তবু তোমার চোখেই খুঁজে পাই
নতুন ভোরের প্রথম রঙ,
যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন
আবার জন্ম নেয় নীরবে—
আমাদেরই ভিতরের আলো হয়ে।


২২.        অরণ্যের পথ বেয়ে মালবিকা


এসেছিলে আচম্বিতে—
বৃষ্টিভেজা পাতার মতো নরম শব্দে,
চলে গেলে এত নিঃশব্দে
যে প্রতিটি বাতাসই যেন শোকগাথা শোনাতে থাকে সন্ধ্যার পরে।
ধূসর রঙ ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের মতো
তুমি মিলিয়ে গেলে দিগন্ত-পারের কোনো অচেনা নক্ষত্রে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দিনশেষের দীর্ঘ ছায়ার মতো
নিঃশব্দ, অবণ্ঠিত, তবু তোমাকে ডাকতে ডাকতে।

আজও যখন বসন্তসন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে,
মাঠের ওপরে জোনাকিরা জ্বলে ওঠে
মৃদু ঝংকারে, সুরে সুরে—
আমি চমকে উঠি, ভাবি
এই বুঝি তোমার পদধ্বনি এল,
এই বুঝি অরণ্যের পথ ধরে
দুলে উঠল তোমার শাড়ির আভাস।

মালবিকা,
একবার এসো তুমি—
সময়ের অন্তহীন কালস্রোত বেয়ে,
শিশির ভেজা পথ ধরে,
আকাশের গোপন ডাকে সাড়া দিয়ে
যেমন কোনো হারানো তারা
হঠাৎ ঝরে পড়ে নীল আলোর ভিতর।

এসো,
আমার অসমাপ্ত প্রার্থনাগুলো পূর্ণ করো,
চরিতার্থ করো সেই অর্ধেক রেখে যাওয়া চুম্বন,
যার উষ্ণতা এখনো রাতের বুকে
তোমার নামে জ্বলে থাকে।

এসো,
এই অরণ্য, এই বাতাস, এই জোনাকি—
সবাই তোমাকে ফিরে পেতে চায়,
আর আমি—
তোমার এক পলকের মায়ায়
আবার জন্ম নিতে চাই।


২৩.        নামহীন উপাখ্যান


কেউ বলেনি আমাদের কথা,
কোনও উপাখ্যানেও নেই আমাদের কাহিনি—
তবু অন্ধকার গলিপথে, নিঃশব্দ জানালায়
আমাদের ছায়ারা নীরবে লিখে গেছে ইতিহাসের
অপ্রকাশিত অধ্যায়।

আমরা হতে পারিনি কোনও কিংবদন্তী—
শহরের কোলাহলে ডুবে গেছে প্রেমের ক্ষুদ্র উচ্চারণ,
নেই কোনও স্মৃতিফলক, নেই কোনও নক্ষত্র-লিপি,
তবু হৃদয়ের গোপন প্রদেশে
আমাদের নামে ফুল ফুটে আছে আজও।

জীবনের পাতাগুলো ছিঁড়ে গেছে কতবার—
কখনও বৃষ্টি ভিজিয়েছে, কখনও রোদের তাপ—
তবু সেই ছেঁড়া পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে
হেমন্তের প্রথম শিশির,
জোনাকির সুরভি,
আর তোমার ছোঁয়ার অনুপম জনপদ।

হেমন্ত ভোরে শিউলি ঝরে যায়,
চুমোগুলো উড়ে যায় বাতাসে—
অথচ তাদের ঘ্রাণ লেগে থাকে
আমাদের অনুপস্থিত নদীর দুই কূলে।

বসন্তে বাতাসে গান উঠবে আবার,
অচেনা পথের ধুলোর মধ্যে
হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে কোনও স্মৃতি—
তখনই মনে হবে,
আমরা কেউ না হয় কিংবদন্তী নই,
তবু আমাদের হৃদয়, আমাদের প্রেম—
সৃষ্টির যেকোনও পুরাণের চেয়ে
শতগুণ গভীর এবং সত্য।


২৪.        অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস


আমার শুধু আকুল করে ধরব তোমার হাত,
শীত-নিভে যাওয়া বিকেলে কিংবা
নক্ষত্রভরা ঘুমহীন রাত।
কিন্তু তুমি ধরতে দাওনি—
রেখেছো দূরে, অহর্নিশ,
যেন দু’পা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা
দুটি নৌকা—
জোয়ার এলেও যাদের কাছে আনে না স্রোত।

ছুঁয়েছি আমি বিরহ
সকাল–সন্ধ্যা–অন্তরাত,
তোমার অনুপস্থিতিকে ছায়ার মতো
নিজের চারপাশে বয়ে ফিরেছি।
চুমোর বদলে পেয়েছি নীরবতা,
মায়ার বদলে পেয়েছি ক্লান্ত ছায়া,
তবু তুমিই ছিলে হৃদয়ে
অবিরাম বেজে ওঠা এক নামহীন সুর।

এই জীবনে কিছুই না পাই তোমার জন্য—
না কোনো প্রতিশ্রুতি, না কোনো প্রত্যাবর্তন,
শুধু রেখে গেলে কিছু হাওয়ায় উড়ে যাওয়া দিন
আর দু-এক ফোঁটা অপূর্ণতার শিশির।
তবুও, তোমাকে ঘিরেই
আমার প্রতিটি প্রার্থনা,
পথে পথে ছড়িয়ে দিলাম
তোমার নামে সব আলো আর আশীর্বাদ—

রইল শুধু আমার শুভাশিস,
তুমি যেন ভালো থাকো,
যদিও আমার থেকে তোমার দূরত্ব—
চিরকালীন, অনিবার্য, তবুও অপরিমেয় মধুর।


২৫.         অন্তরের আলোর দীপশিখা 


যেখানে যাও, যত দূরেই যাও,
তোমার পথভরা আলো যেন কমে না কোনওদিন—
রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের মতোই
তুমি থেকো অনন্ত দীপ্তিতে,
থেকো স্বপ্নের নীলাভ জ্যোৎস্নায় ভেজা।

জীবনের হাজার ভিড়ের ভেতর,
তুমি কি জানো—
নিঃশব্দে তোমাকেই ডেকেছি প্রতিক্ষণ?
একটু ছায়া, একটু শীতল বাতাস,
একটু সুর, একটু আলো—
সবকিছুর মধ্যেই তোমারই উপস্থিতি
নীরবে পথ দেখিয়ে গেছে।

তুমি জানোনি হয়তো—
আমার অন্তরের গভীরে
জ্বলছে এক টুকরো দীপশিখা ,
যেখানে শুধু তোমার নাম,
তোমার পদধ্বনি, তোমার মমতা
মিশে আছে সময়ের অতলান্তে।

যত দূরেই যাও না কেন,
এই মন জানে—
তোমার আলোতে পথ চিনে নেওয়া যায়,
তোমাকে মনে রেখেই
বেঁচে থাকা যায় নীরব বিস্ময়ে।

তুমি আছো, সবসময়—
হৃদয়ের গোপন আলো হয়ে।


২৬.       নিভৃত প্রতিচ্ছবি


হঠাৎই কোনো বিকেলে, আলো-অন্ধকারের ফাঁকে
আমার মুখের উপর নেমে আসে তোমার ছায়া—
নির্বাক, অথচ কত কথা বলে সেই ছায়ার রেখা।
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
যেন দূর নক্ষত্রের নরম আলো এসে
আমার চোখের গভীরে পড়ে।

আমি থেমে যাই—
হৃদয়ের গোপন সব দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে।
তোমার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু
শত ঝরনার মতো ঝরে পড়ে আমার দিকে।
সেই জল যেন হাজার বছরের ব্যথা,
আবার সেই জলেই ধুয়ে যায়
আমার সমস্ত দুঃখের অবশেষ।

তোমার মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ নীল,
আমার বুকের ভিতর অনিমেষে জ্বলে ওঠে।
আমি দেখি—
তোমার প্রতিটি নীরবতা আসলে আমারই ভাষা,
তোমার প্রতিটি বেদনা
আমার হৃদয়ে জন্ম নেওয়া একেকটি অশ্বত্থ পাতা।

এইভাবেই,
অভিমান-ঢাকা কোনো সন্ধ্যার তলায়
আমরা দুজন একে অন্যের ছায়ায় রূপ নিই—
নিঃশব্দে, অদৃশ্য প্রেমের মতো
যা কারও কাছে ধরা পড়ে না,
তবু আমাদের মধ্যে নদীর মতো বয়ে চলে
অবিরাম, অনন্ত, অবিশ্রান্ত।


২৭.       আর একবার…


আর একবার জন্ম নিতে সাধ জাগে—
স্কুলফেরা পথের ওই ধুলো ভরা বিকেল,
আমগাছটির শান্ত ছায়া,
ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নুয়ে পড়া খেল।

গাব ফুলের গন্ধে জাগা ভোর,
হাঁটুর কাছে লুটিয়ে থাকা শিশিরের স্মৃতি,
হাত ভরে কুড়ানো সাদা-কালো দুঃখ–সুখ,
তখন যেন এ জীবন ছিল অতি নিখুঁত মণিমুক্তা।

বর্ষার ভেজা আঙিনায় শুকোনো পাটের গন্ধ,
নদীর সোঁদা মাটি লেগে থাকা দুপুরগুলো—
হঠাৎই মনে হয়, সবই কি তবে রূপকথা?
নাকি সত্যি ছিল? হাঁটছিলাম প্রাণ ভরে ওদের সঙ্গে।

জন্ম যদি হতো আর একবার,
অথচ হবে না—জানি কতটাই অসম্ভব!
তবু মনে মনে সেই দিনগুলোকে ডাকি—
ফিরে এসো, আমার মাটির দিন,
আমার সহজ, নিষ্পাপ, ঢেউ ভাঙা শৈশব।

আর একবার…
শুধু আর একবার—
হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েই যাক পুরোনো দিনের উৎসব।


২৮.         অবগুণ্ঠনহীন ভালোবাসার কবিতা


হৃদয়ের গভীর রক্তে রাঙা রক্তজবা
আমি ফুটিয়ে রেখেছি তোমারই প্রতীক্ষায়।
ওগো তুমি এস—
এক পা, দু’পা, ধীরে ধীরে মাটির ওপর ভর দিয়ে,
উজ্জ্বল চোখের দীপ্তি মেলে
একবার শুধু তাকাও আমার দিকেই।

এ যে তোমার জন্য রাখা ফুল—
স্নিগ্ধ কনকচাঁপার বুকের মতোই উষ্ণ,
তোমার হাতে তুলেই দিও আমাকে।
তোমার ডোরাকাটা ঠোঁটের
ঝর্ণার মতো নেমে আসা চুম্বন
রাশি রাশি ঢেকে দিক আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা।

তারপর অবগুণ্ঠন খুলে,
দ্বিধাহীন, নির্ভীক, পবিত্র স্বরে
বলবে তুমি—
“ভালোবাসি… ভালোবাসি…
এ ভালোবাসাই আমার সর্বস্ব।”


২৯.       ফিরে আসা


তোমাকে ফেলে দিয়েও
পথে নেমে যাই—
যেন পথই জানে না
কাকে হারিয়ে আমি কতটা শূন্য।

ঘুরি নির্জন গোধূলিতে,
মাটির গন্ধে মিশে থাকে
অদৃশ্য কান্নার সুর;
যাযাবর আলো ডুবতে ডুবতে
হঠাৎই পথ ভুল করে
তোমার দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাকে।

তুমি জানো না—
কবে একদিন তোমার চোখের কোণে
নেমে এসেছিল দু’ফোঁটা নীরব জল,
সেই জলের উষ্ণতা আজও
আমার ভিতর আগুনের মতো জ্বলে।

হয়তো সেই ঋণেই
বারবার ফিরে আসি তোমার কাছে,
যেন বৃষ্টিভেজা পথ জানে—
আমি যত দূরে যাই না কেন,
আমার ফিরে আসার ঠিকানাটি
শুধুই তুমি।


৩০.        মায়াবী রূপে তুমি


তোমাকে যেখানে নিয়ে যাব—
সেখানে নীরবতারাও নিঃশব্দ হয়ে থাকে,
শূন্যতার কণাগুলো উড়ে বেড়ায়
মহাশূন্যের মতো গভীর নিঃস্বতায়।
কেউ নেই, কোনও পথিকও নয়—
শুধু তোমার পদধ্বনির প্রতিধ্বনি
দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।

যেখানে থাকবে তুমি—
সেখানে কান্নাও জন্ম নিতে ভয় পায়,
অশ্রুরাও থেমে থাকে
অধরস্পর্শী কোন স্বপ্নের মতো।
নিস্তব্ধতার সাদা কুয়াশায়
ঢেকে যায় চারপাশের সব শব্দ।

আর যেখানে রবে তুমি—
সেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না,
তারারা পথ হারায়
অন্ধকারের অনিঃশেষ ঘোরলাগা ঘোরে।
এই অতল, অচেনা, গভীর রাতের ভেতর—
তুমি আমাকেই খুঁজে পাবে,
কারণ আমি সেই অন্ধকারে
তোমার নামের মতোই জ্বলি—
নিভে যাওয়া আলো হয়ে,
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের শেষ আভা হয়ে।


৩১.      হেমন্তের অন্তঃপুর


রাজপথের কোলাহল ভেঙে
জনারণ্যের ভিড় ছুঁয়ে
যে মুখটি হঠাৎ থেমে ছিল
আমার বুকের ভিতর গোপনে—
তারই জন্য দিনগুলো জ্বলত অলক্ষ্যে
অদৃশ্য কোনো প্রদীপের মতো।

তবু একদিন হেমন্তের শীতল আকাশে
ধুলোবালির সাঁঝরঙো বাতাসে
কোথায় যে মিলিয়ে গেল সেই মুখ,
হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও
ধরতে পারলাম না—
তারারা নেমে এল অন্তঃপুরে,
আর সে জেগে রইল নক্ষত্রের ভিড়ে।

আজও নিশীথে তারার আলোয়
তার অনুপস্থিতি ঝরে পড়ে নীরবে—
যে স্মৃতি হারায় না কখনো,
যে মানুষটি হারিয়ে যায় ঠিকই,
তবু থেকে যায়
হেমন্তের বুকের গভীরে
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো।


৩২.       প্রদীপ জ্বেলে রেখো


যদি হঠাৎ রাত নেমে আসে পথহারা অন্ধকারে,
যদি বাতাস থেমে যায় সব পত্রহীন নিস্তব্ধতায়,
যদি হৃদয়ের শিয়রে জমে ওঠে ক্লান্তির নীল কুয়াশা—
তুমি শুধু হাত বাড়িয়ে দিও, আমি ফিরে আসব তোমার আঙিনায়।

যদি রঙহীন হয়ে যায় এই পৃথিবীর সব সুর,
যদি স্মৃতির জানালা ধরে ঝরে পড়ে নীরবতার বৃষ্টি,
যদি চোখের উপরে নেমে আসে অচেনা ছায়ার পর্দা—
তুমি চন্দ্রালোকে বুনে দিও স্বপ্নের একটুকরো দৃষ্টি।

যদি অলৌকিকতার দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়,
যদি নক্ষত্রেরা নিভে যায় নিঃশব্দ কোনও গহ্বরে,
যদি হৃদয় পথ খুঁজে না পায়, হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে—
তুমি গ্রহ-তারার আলো কুড়িয়ে এনে প্রদীপ জ্বেলে রেখো
আমার নামহীন অন্ধকারের মর্মর গভীর ঘরে।

তোমার সেই আলোই হবে আমার পথ,
আমার ফিরে আসার নির্ভরতার নীরব ডাক—
যেখানে তুমি, সেখানেই জেগে থাকে সমস্ত পৃথিবীর ঋতু,
সেখানে অন্ধকারও কাঁপতে কাঁপতে হার মানে আলোর কাছে।


৩৩.         মায়াজাল


একি তবে মায়ারই টান,
রোদ্র ক্লান্ত দুপুরে হৃদয় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়—
তোমার ছায়া দুলে ওঠে আমার নিঃশ্বাসে,
সকল আকুলতা যেন পথ খুঁজে পায় তোমার দিকে।

ভাবনার জানালা খুলে যায় একে একে,
অন্তর্মহলের অন্ধকার ঘরগুলো আলোয় ভরে ওঠে—
আমি তখন নির্মোহে দিতে চাই
আমার সকল শূন্যতা, সকল ব্যথা, সকল জ্বালা।

হঠাৎই যেন তোমার কণ্ঠে বাজে
নরম কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত,
তুমি থামিয়ে দাও পৃথিবীর সব গান
এক বিস্ময়ের নীরবতায়,
বাহু বাড়িয়ে বলো—
"এসো, এসো, আমার ঘরে এসো।"

সেই ডাকে ভেঙে যায় দিনের তন্দ্রা,
হৃদয়ের সমস্ত পথ খুলে যায় নিঃশব্দে—
আমি তোমার আশ্রয়ে এসে দাঁড়াই,
যেন জন্মজন্মান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি
এই এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে ওঠে।


৩৪.      সংসারভূক


একটি কোমল ছোঁয়া ভোরের ঘুম ভাঙায়,
চুড়ির রিনিঝিনি বাজে কি না— মনে থাকে না ঠিক,
তবু নিঃশ্বাসের ভিতর তার মায়া গাঁথা থাকে
অচেনা স্বপ্নের মতো, মায়াবী কুয়াশার দিক।

রাতের স্বপ্নে কি চুম্বন নেমে এসেছিল?
না কি সে-ই ছিল ভোরের আলো হয়ে?
চোখ মেলতেই দেখি— পৃথিবী জুড়ে শুধু সে,
তার দিকে তাকানোতেই দিনের সমস্ত শুরু রয়ে।

কোর্টের বোতাম গুঁজে দিয়ে
নরম কপাল রাখে বুকের ওপর,
অফিসের চাবি তুলে দেয় হাতে—
যেন এক টুকরো নিশ্চয়তা, স্থির নদীর ঘোর।

এতটুকু টান, এতটুকু স্নেহে ভরা সংসার,
তার দুহাতের উষ্ণতায় কত শান্তির রং…
তবু জানো, আজও নিজেকে তার মতো করে
সংসারভূক করতে পারলাম না অনুরাগের ঢঙ।

হয়তো আমি এখনো পথের ধুলো বুকে রাখি,
হয়তো ঘর মানে আমার কাছে অন্য কোনো গান—
তবু তার দেওয়া সকালের ভালবাসা
প্রতিদিন নিঃশব্দে করে আমায় নতুন মানুষ— নতুন প্রাণ।


৩৫.         শূন্যতার ভেতর ভরার গল্প


কেউ কাছে আসে—
হঠাৎ সন্ধ্যার বাতাসের মতো,
মাথার চুলে আলতো ছুঁয়ে যায়
এক মুহূর্তের উষ্ণতায়।

কেউ আবার দূরে চলে যায়—
নীরব পায়ের শব্দ ফেলে রেখে যায়
দোরগোড়ায়, উঠোনে,
অতীতের মাটিতে শুকনো পাতা হয়ে।

পাখি উড়ে গেলে যেমন
দু’একটা পালক পড়ে থাকে,
তেমনি আলনায় ঝুলে থাকে
তোমার ব্যবহৃত গন্ধওয়ালা কাপড়,
রান্নাঘরে চুলার ধোঁয়া
আরো একটু সময় আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কথার প্রতিধ্বনিও
ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় দেয়ালের ফাঁকে।

তারপর আসে সেই দীর্ঘ নিশ্বাস—
শূন্যতার বিস্তীর্ণ ঘর,
যেখানে কেউ নেই, কিছু নেই—
কেবল অপেক্ষা।

আর ঠিক তখনই
যে নতুন করে আসে—
সে ভরিয়ে দেয় সব শূন্যতা,
নতুন আলোর রেখা টেনে দেয়
বাতাসে, জানালায়, হৃদয়ের কোণে।

এভাবেই জীবন শেখায়—
যাওয়াই শেষ নয়,
আসারও আছে এক নিজের সময়।


৩৬.       কঠিন কোমল 


এক পুরুষ এক নারীর মাঝে
দেখে নিজেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি—
উত্থান-পতনের লুকানো ইতিহাস,
চোখের গভীরে নিজের মুখের অচেনা রূপরেখা।
কথা বলার ফাঁকে ঠোঁটের ক্ষীণ কাঁপন,
রাগ-অভিমানের অদৃশ্য ঢেউ—
সবটুকুই অনুভবে তাকে ছুঁয়ে যায়।
কান পেতে শোনে কান্না,
দেখে লবণজল বেয়ে যাওয়া নীরব নদী।

তবু প্রেম মানে কেবল শরীরের মিলন নয়,
হৃদয়ের গহনে পৌঁছানোর পথ
আরও নিঃশব্দ, আরও সূক্ষ্ম।
নারী পুরুষের হৃদয়স্পর্শ পায়
যখন এক জোড়া হাত
তার বুকের ওপর নয়—
স্থির হয়ে থাকে কাঁধে, নিশ্চিন্তের মতো।
যে হাত শাড়ি খোলার জন্য নয়,
পরিয়ে দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকে।

নারীদের ভাবনা আলাদা—
পুরুষরা দেখে বাইরের আলো,
আর নারীরা ছুঁয়ে ফেলে
ভেতরের শীতল ছায়া।
এই শক্ত কাঠামোর ভিতরেই
তারা খুঁজে নেয় লুকিয়ে থাকা কোমলতা,
মমতার নিঃশব্দ কাঁপন।


৩৭.     যদি তুমি আসো


যদি তুমি আসো—
নির্জন সেই ছায়াপথ বেয়ে,
আমি হাঁটব রৌদ্রের ধাঁচ
কাঁধে মেখে, চোখে আলো নিয়ে।
মেঘের ভেতর সূর্যকে বশ মানিয়ে
চলে যাব দূর অনন্তের দিকে—
তোমার পদধ্বনির নরম প্রতিধ্বনি
পথের ধুলোয় তুলে নেবে গল্প।

হঠাৎ যখন জল হয়ে ফিরব ফিরে
ঝরঝর বৃষ্টির দোলায়,
ভিজবে ধানক্ষেত, কচি পাতার গা—
মাটির গন্ধে ভরে উঠবে চারধার।
নদী উঠবে স্ফীত সুরে,
তার বুকজুড়ে দোলা দেবে
তোমার নিঃশ্বাসের অদৃশ্য ঢেউ।

সাঁঝ নামলে সোনালি আলোয়
দিগন্ত হবে ক্ষণিকের স্বপ্নবাড়ি,
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
দু’হাত ভরে ধরব আলো।
আর সেই নীরবতার ভেতর
উৎসব করবে জোনাকিরা—
একেকটি দপদপে আলোয়
আমাদের পথ লিখবে কবিতার মতো।

তুমি যদি শুধু একবার আসো—
আমি আলো, জল, বাতাস হয়ে
তোমার চারপাশে প্রসারিত হব,
আর পৃথিবী নতুন করে
জেগে উঠবে তোমার স্পর্শে।


৩৮.    অনন্ত রাত্রি 


নীল অন্ধকারে ঢেউ ওঠে—
হে প্রিয়তমা, হে প্রণয়ণী,
তোমার স্পর্শে জেগে ওঠে
আমার অনন্ত দহন,
রাত্রির গোপন গা-ভেজানো উত্তাপ।

তুমি যখন কাঁপতে থাকা হাতে
আমার বুকে রাখো তোমার পরাগভরা কুসুম,
যন্ত্রণার কাঁপুনি মেশা সেই কুসুমেই
জ্বলে ওঠে আদিরসের শিখা—
যেখানে ব্যথা আর উন্মাদনা
এক নদীর মতো মিলেমিশে যায়।

তোমার ঠোঁটের দীপ্ত লালাভ আলো
ধীরে ধীরে কাছে এলে
আমার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে,
আমার ভেতরের স্ফুলিঙ্গেরা
রক্তমদির স্বরে বলে ওঠে—
এসো… আরও কাছে এসো…

তোমার চুম্বনে খুলে যায়
আমার গোপন সব অনলদ্বার;
শোণিতের ঋণে, প্রণয়ের অনিবার্য টানে
আমার ঘুমন্ত কামনা
ঝড় হয়ে জেগে ওঠে তখন।

রাত্রির গভীরতম সুরে
তোমার দেহের সুগন্ধ
মিশে যায় আমার শিরায় শিরায়
যেন তুমি আমার সমস্ত সত্তা
এক ফোঁটা আগুনে রূপান্তর করেছো।

হে প্রণয়িণী,
এই রাত্রি যেন অনন্ত হয়—
আমাদের উত্তাপের নীরব সংলাপে
সব সীমা ভেঙে যাক,
সব নিশ্বাস থেমে যাক
আকুল রসের মাদকতায়।


৩৯.       কুয়াশার অন্তরালে


চন্দ্রিমা উদ্যানে আজ
মেঘের ছায়া নেমে আসবে নিঃশব্দে,
সপ্তপদির পাতার ভিতর দিয়ে
ভগ্ন-রোদ্দুরের এক টুকরো আলো
তোমার মুখে লিখবে অদৃশ্য কোনো স্বাক্ষর।

এলোমেলো হাওয়া
তোমার চুলে বাঁধবে নরম অস্থিরতা,
অসতর্ক নিঃশ্বাসে
খসে পড়বে ওড়নার মখমলি ক্ষীণ-রঙ,
যেন কোনো ভুল করা প্রজাপতি
আলো বদলাতে গিয়ে ফেলে গেল তার পাখা।

লতা-গুল্মের অন্ধকারে
একটি দুরন্ত গিরগিটির দৌড়
চকিত তৈরি করবে ক্ষণিকের রহস্য—
আমাদের চোখের ভিতরেও
নাচবে সেই সবুজ আতঙ্কের ঝিলিক।

ঘাসফুলের গন্ধে
আমরা দু’জন হঠাৎই ভেসে উঠব
অচেনা কোনো মাধুর্যের কুসুমে,
আঙুলের স্পর্শে
দেহ-জমির নোনা রোদে
জেগে উঠবে অসংখ্য নকশা—
যেন আদিম কোনো ভাষা
শুধু স্পর্শেই পাঠ শেখায়,
যেখানে শব্দ নেই, শুধু অন্তর্ময় আলো
আর নিভু নিভু নিঃশ্বাসের ছায়া।

সেখানে প্রেম একটি বাতাস-বোনা অরুন্ধতি—
দেখা যায় না, তবু স্পষ্ট বুঝি
আমাদের চারপাশে সে নরম কুয়াশার মতো ঘিরে আছে।


৪০.       মহাসমুদ্রের ওপারে যাত্রা 


আমি যাব—
তুমি না বললেও যাব,
নীরবতার অতল থেকে ডাক আসে দূর গহীনে।
মহাসমুদ্রপাড়ের বালুকাবেলায়
একজন  মাঝি দাঁড়িয়ে রাখে তার কালো নৌকা—
অপেক্ষায়, শুধু আমার জন্য।

আমি জানি, একদিন
সেই নৌকার মসৃণ কাঠ ছুঁয়ে
আমি ভেসে যাব পরপারের নীল নিস্তব্ধতায়।
জলের গায়ে গায়ে থরথর আলো,
ঢেউয়ের কূলে জমে থাকা অজানা সব গল্প
আমাকে নিয়ে যাবে আরো দূরে—
জন্মের প্রথম দিগন্তে, বা শেষ গভীরতায়।

তুমি থাক বা না থাক,
আমার যাত্রা থেমে থাকবে না।
হয়তো সেদিন বাতাসে ভেসে আসবে
তোমার কিছু অব্যক্ত শব্দ,
কিছু অনামা ব্যথা,
হয়তো আমার নৌকার পাল ধীরে দুলে উঠবে
তোমার স্মৃতির ছোঁয়ায়।

তবু আমি যাব—
শান্ত কোনো অন্ধকারে,
অথবা আলো-ছায়ার অপার রাজ্যে,
যেখানে আর কোনোরূপ ফিরে তাকানো নেই।
শুধু সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস,
মাঝির নীরব দৃষ্টি,
আর অনন্ত পথ—
আমাকে নিয়ে যাবে মহাসমুদ্রের ওপাড়ে।


৪১.       অমর্ত্যের আলো


নিশীথের নীলাভ আলোয়
স্বপ্নলোকের সব স্বপ্ন দিয়েই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—
তবু তুমি এলে না আমার ঘরে,
এলে না কোন মায়াবী স্বপ্নের ভোরে।

হেমন্তের এক নীরব সন্ধ্যায়
হৃদয় উজাড় করে বলতে চেয়েছিলাম—
‘স্বপন-দুয়ার ভেঙে এসো,
অরুণ-আলোর মতো জ্বলে উঠো আমার চোখে,
ক্ষণিকের মায়া নয়—
চিরকালের আশ্রয় হয়ে এসো আমার ঘরে।’

কিন্তু তোমাকে ছুঁইতে পারিনি—
মনে হয়েছিল, ছোঁয়া মাত্রই
ভেঙে যাবে কল্পলোকের এ নরম ভালোবাসা,
মুছে যাবে তোমার অপার্থিব রূপ।

তাই দূরেই থেকো তুমি—
শত সহস্র অন্ধকার রাত পার হয়ে
অমর্ত্যের আলো হয়ে,
মহাকালের প্রেম হয়ে,
আমারই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থেকো।


৪২.      ভালোবাসার কবিতা


কেউ লেখেনি আমাদের কথা,
তবু ভোরের বাতাস জানে—
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
আমার নাম একদিন নরম আলোয় ডেকেছিলে।

উপাখ্যান হয়নি, কিংবদন্তীও নই আমরা,
তবু শরতের নীল আকাশের মতো
নিঃশব্দে জেগে থাকে আমাদের স্পর্শ,
হেমন্তের শিউলির মতো কোমল,
যা ঝরে পড়ে— তবু হারায় না কোনোদিন।

জীবনের ছেঁড়া পাতাগুলো
তোমার আঙুলে ছুঁয়ে গেলে
অদ্ভুত এক সুর বেজে ওঠে—
চুম্বনের উড়ে যাওয়া স্মৃতির মতো
অচেনা বাতাসে গোপনে দোলে।

পথঘাটে ফোটা ফুলের রঙে রঙে
আমরা আবার লিখে নেব নতুন গল্প—
যেখানে তুমি থাকবে, স্বপ্ন থাকবে,
আর থাকবে একটুকরো মায়া
যা ভাসে ভালোবাসার অনন্ত আলোয়।

তুমি আর আমি নির্জন কোনো দুপুরে
চুপচাপ বসে থাকব পাশাপাশি,
আর পৃথিবী বুঝতেই পারবে না
কত গভীর আমাদের অমলিন অধরা প্রেম।


৪৩.       অ- সুখ 


নরম ছোঁয়ায় তোমার লুকিয়ে থাকে অলৌকিক আরোগ্য—

যেন দেহে দেই না কোনও যন্ত্রণা,
মনেও থাকে না কোনও ক্ষতচিহ্ন।
তোমার স্পর্শ পেলেই
অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ঔষধ, হাসপাতাল, ডাক্তার—
সব ক্লান্তি ভেঙে গলে যায় নীরবতার বরফ,
তুমি হয়ে ওঠো মুখর, আলোঝরা।

তেমনই করে, বারেবারে,
তোমার ছোঁয়া এসে সরিয়ে দেয়
আমার সমস্ত অ-সুখ, সমস্ত মলিনতা—
আমার ভুবন জুড়ে শুধু
তোমার আঙুলের উষ্ণতায়
জন্ম নেয় নতুন দিনের নরম শান্তি।


৪৪.    বেদনায় ঢাকা নিসর্গ 


পথে প্রান্তরে দিগন্তে আজ ভালোবাসার চিহ্ন নেই,
শহরের বুকে জমে আছে বিষণ্ন কুয়াশা—
ঢাকা যেন নীরব এক দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে ভিড়ে হারিয়ে যায় মানুষের হৃদস্পন্দন।

রাস্তাগুলো শুনে ক্লান্তির শব্দ,
বিলবোর্ডে আলো জ্বলে, কিন্তু মনেতে অন্ধকার।
তুমি চোখ মেলে দেখো—
এই শহর কি সত্যিই বেঁচে আছে,
নাকি স্মৃতির ভগ্ন ইটের মতো পড়ে আছে নিথর?

কোথায় কার চোখে আজ জল?
সবাই হাঁটে শুধু মুখঢাকা মরুভূমির মতো—
কেউ কারও দুঃখ শোনে না,
কেউ কারও হাত ধরে না।

তবু তুমি যদি একবার ফিরে তাকাও,
হয়তো দেখবে—
একটি ক্ষীণ আলো,
একটি নিঃশব্দ হাহাকার,
যা এখনও ভালোবাসার নাম ধরে বেঁচে আছে বুকের গভীরে।


৪৫.    স্বর্গপথে ধ্রুপদী রমণী 


ঈশ্বর যেন নিখুঁত মনোযোগে
আমার জন্যই গড়েছিলেন এক ধ্রুপদী রমণী—
যার চোখে সন্ধ্যাতারার আলো,
মুখে ভোরের শিশিরভেজা নরম দীপ্য,
একটুকরো হাসি যেন আকাশের নীল থেকে
রঙ চুরি করে এনে বসিয়ে দিয়েছে ঠোঁটের কোলে।

তাকে দেখলেই মনে হতো
সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়—
আমার দৃষ্টিতে রং মাখে তার মুখ,
আমার নিঃশ্বাসে বাঁশির সুর হয়ে বাজে তার সৌরভ।
সৌন্দর্যের কিছু ছটা রয়ে যায় ভাবনার আঙিনায়,
আর কিছু হারিয়ে যায় স্বর্গের পথে,
যেখান থেকে সে নেমে এসেছিল
আমার হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে।

আজ আমি সেই স্বর্গের পথেই আছি—
হয়তো তার হাত ধরে, হয়তো তার আলোয়,
হয়তো তার চোখের গভীর আকুলতায় ভেসে।
চারপাশে নীরবতার রেশ,
কিন্তু আমার হৃদয়ে তার পদধ্বনি—
যেন অনন্তের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক পবিত্র সঙ্গীত।

প্রেম এমনই—
যেখানে দুই আত্মা ধীরে ধীরে
একটি আলোয় মিশে যায়,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয়
একটি নতুন আকাশ,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ফিরে আসে ধ্রুপদী রমণীর মায়াময় উপস্থিতি।

যদি সত্যিই ঈশ্বর আমাকে কিছু দান করে থাকেন—
তবে সে দান এই ভালোবাসা,
এই অপার কোমলতা,
এই স্বর্গের পথে তার হাত ধরে হাঁটার অধিকার।

আমি হাঁটি,
আর তার চোখের ভিতরে
অনন্ত প্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে—
দ্বিধাহীন, দীপ্ত, চিরন্তন।


৪৬.       নির্জন যমুনা কূলে


তুমি নিজেকে লুকাতে পারবে না—
না যমুনার ধূসর জলে,
না দুরবাহাটির নিশ্ছিদ্র অরণ্যের গভীরে।
তোমাকে ছুঁতে গিয়েছিলাম যেমন,
ঠিক তেমনি ছুঁয়ে ফেলেছিলাম জ্বলন্ত আগুন—
তবু তুমি কোনদিনই আগুন হতে চাওনি,
হতে চেয়েছিলে শুধু নিঃশব্দ এক আলো।

আমি যেমন তোমার থেকে দূরে যেতে পারি না,
তুমিও তেমনি পালাতে পারো না
আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অনন্ত পথ থেকে।
কত যুগ ধরে আমরা ছড়িয়ে আছি
দুই ভাঙা নক্ষত্রের মতো—
একটি ছায়াপথে তুমি,
অন্যটি নির্বাসিত আমার বহিমান হৃদয়।

তোমার জন্যই আমি গিয়েছি
অরণ্যের অন্তর্গহীনে,
ঝরে পড়েছি অগাধ জলধির ঢেউয়ে—
তবু যেদিকেই ফিরেছি
তোমার মুখচ্ছবিই রেখার মতো
ভেসে উঠেছে আমার চেতনার আয়নায়।

দ্বিধার বন্ধ দরজাগুলো
আজ খুলে দাও, এসো সেই পথে
যে পথের পাশেই শুয়ে আছে আমার
অরণ্যময়, ঘুমভাঙা জীবন।

কোনও এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণে
দুরবাহাটির অরণ্যে
বা নির্জন যমুনা কূলে—
আর কি কখনও হবে না আমাদের দেখা?
নাকি সময়ের অন্ধ তটরেখায়
আমরা আবারও একবার
নিজেদের খুঁজে পাবো—
আগুন আর আলোর মতো,
একটুখানি স্পর্শেই জ্বলে উঠতে প্রস্তুত?


৪৭.       মায়ার গোধূলি


মাঝে মাঝে দিনের শেষ আলো স্বপ্নের পর্দা সরিয়েএকটি অচেনা ঘন্টারধ্বনি গভীরের দরজায় টোকা দেয়—

তখন ইচ্ছে করে
সব ব্যস্ততা ফেলে দূরের পথ ধরতে,
যেখানে গন্তব্য নেই,
শুধু নীরবতার ভিজে ঘ্রাণ
এবং আকাশের নীল বিষাদ।

কখনও আবার পুরনো কোনও সন্ধ্যা
তার সোনালি নরম আলো নিয়ে
ফিরে আসে ধীরে ধীরে,
তার সাথে আসে পরিচিত শব্দ,
ম্লান গন্ধ, ফুরিয়ে যাওয়া চুম্বনের উষ্ণতা—
সেইসব এসে মিশে যায়
আমার নিভু নিভু ঘরের সান্ধ্য অন্ধকারে।
আমি অনিমেষ তাকিয়ে থাকি,
যেমন কেউ তাকায় আপন স্মৃতিতে হারিয়ে।

এত আলো, এত শব্দ,
এত স্মৃতি পেয়েও
কেন জানি নিজেকে মনে হয়
এক বিরাট শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা—
যেন সমস্ত প্রাপ্তির ভিতরেই
আমার নিঃস্বতার সবচেয়ে ঘন ছায়া।

তবু এই মায়া, এই আলেয়ারা
প্রতি সন্ধ্যায় এসে
আমার বুকের উপর রেখে যায়
একটি আদিম প্রশান্তি—
যেন অনন্তের ওপার থেকে
কেউ ফিসফিস করে বলে,
“তোমার শূন্যতাও আলো হয়ে জ্বলবে একদিন।”


৪৮.       ঘরদুয়ারের কবিতা


তুমি সুন্দর করে ঘর দুয়ার গোছাও—
ঝকঝকে রাখ মেঝে,
পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখো আলনায় কাপড়, বারান্দায় ঝুল পড়ে না কোনওদিন,
আসবাবপত্রেও জমে না ধুলোর দুঃখ।

মাঝে মাঝে ভাবি—
আমি না থাকলেও কি তুমি
এমনই করে সাজাবে ঘর?
ফুলদানিতে রাখবে ফুল,
সন্ধ্যা নেমে এলে জ্বালাবে বাতি
ঠিক আগের মতোই, শান্ত সৌম্যে।

আঙিনার ধুলোমাটি মুছতে মুছতে
একদিন মুছে যাবে আমার পায়ের চিহ্নও।
আমার জন্য কেঁদে থাকা
তোমার চোখের অশ্রুবিন্দুগুলোও
শুকিয়ে যাবে সময়ের বাতাসে।

তখন হয়তো তোমার মুখে ভাসবে
একটি করুণ, দূরবর্তী হাসি—
যেন ভুলে যাওয়ার মাঝেও
আমাকে মনে রাখার শেষ আলো।


৪৯.     প্রতিবিম্বে তোমার মুখ 


নীল বিকেলের নরম আলোয়
হঠাৎই কখনও তুমি আমার মুখের উপর
ছায়া ফেলে দাঁড়াও—
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
আর সেই মুখের ভিতর লুকানো
অগণিত অশ্রুর দীপ্তি।

আমি তাকিয়ে থাকি—
শত ঝরনার ঢেউ যেন
করুণাধারায় নেমে আসে তোমার চোখ থেকে,
সেই জল ধুয়ে দেয় আমার সকল ক্লান্তি,
স্নিগ্ধ করে দেয় প্রান্তরের মতো শুষ্ক হৃদয়।

তোমার ছায়া যখন মুখে পড়ে,
আমি যেন হয়ে উঠি এক নীরব নদী—
শুধু তোমার স্নিগ্ধ জলের স্পর্শে
নবজন্ম পেতে চাই,
বারবার, আরেকবার।


৫০.      দাঁড়াও, সময়


পৃথিবীর বয়স কত—
কোটি কোটি বর্ষের স্তরে স্তরে
জমে থাকা নীল-সবুজ ইতিহাস।
মহাকাল কত দীর্ঘ—
তার শেষ কিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না
আলোকবর্ষেরও ওপারে।

তবু মানুষ?
একটি ঢিল জলে ফেলতে যতটুকু সময় লাগে,
মহাকালের তুলনায় তার জীবন
মাত্র একটি অণুমুহূর্ত।
নিঃশ্বাস ফেলার মতো ক্ষুদ্র,
আঙুলের ফাঁক গলে যাওয়া আলোের মতো হালকা।

এই ক্ষণিক দিন নিয়েই মানুষ
ভালোবাসাকে করে অনন্ত—
স্পর্শে, অশ্রুতে, হাসিতে, প্রতীক্ষায়।
এত ক্ষুদ্র আয়ু নিয়ে
সে শেখায় পৃথিবীকে মায়ার রঙ।

বিস্ময় লাগে—
যে প্রাণ এক নিমিষের জন্য জন্মায়,
সেই-ই আবার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে
ভরিয়ে তোলে এই দীর্ঘ মহাকালকে।

দাঁড়াও, সময়—
তোমার অনন্ত গতির মাঝে
মানুষের এই ক্ষুদ্র ভালোবাসাই
সবচেয়ে দীপ্ত, সবচেয়ে সত্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন