প্রথম প্রকাশ - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং
মরে গেলে দেহ তো মাটিতেই মিশে যাবে—
চিহ্নহীন, নিঃশব্দ, অনাদর এক ঢেউয়ের মতো।
তবু সেই মাটির ওপরে যদি
ফুটে ওঠে এক বিস্মৃত মাধবীলতার ঝাড়,
সন্ধ্যার বাতাস যদি তার গন্ধে
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়,
জোনাকিরা যদি রাত্রিজুড়ে
তার পাতায় পাতায় আলো জ্বেলে গান গায়—
তখন কি আমার আত্মা
একবারও কেঁপে উঠবে না?
যদি কোনো কিশোরী
নিঝুম দুপুরের স্তব্ধতায়
সেই মাটি ছেনে পুতুল গড়ে—
তার নরম স্পর্শে, হাসির দোলায়
আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো
ফিরে আসবে না কোনো অদৃশ্য তরঙ্গে?
দেহ হয়তো বিলীন হবে,
কিন্তু অনুভব—
ওহ্, অনুভব কি কখনো সত্যিই মরে?
নিঃশব্দে, গন্ধে, আলোয়, স্পর্শে
সে কি বেঁচে থাকে না
এক অপার্থিব সুরের মতো
মাধবীলতার জংলি সুবাসে?
৫. সন্ধ্যা নামে ধীরে
যেদিন আকাশের বুক ভেদ করে
হঠাৎ নেমে আসবে কোনো অচেনা আলো,
যেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে
তোমার নামের সুগন্ধ ভেসে উঠবে নিঃশব্দে—
আমি বুঝব, সেই দিনটি এসে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যা নামবে খুব ধীরে,
জোনাকিরা জ্বলে উঠবে
বিস্মৃত কোনো প্রতিশ্রুতির মতো;
পদ্মপুকুরের নিস্তব্ধ জলে
চাঁদের রুপোলি দোলনায়
দুলবে আমাদের পুরোনো স্বপ্নেরা।
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে
সবুজ ছায়ার নিচে,
আর তোমার মুখে পড়বে
ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক আলো।
আমি তখন হাজার বছরের অন্ধকার পেরিয়ে
নীরবে এসে দাঁড়াব তোমার পাশে—
যেন কখনো দূরে যাইনি কোথাও।
বসন্তের বাতাস যদি ডাকে,
পাতার ঘ্রাণ যদি থমকে যায় কানে,
জেনে নিও—
সমস্ত পথের শেষে
তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছিলাম আমি,
এই নরম, মায়াময়, চিরন্তন আলোভেজা রাতে।
৬. ভ্রম
কবে, কখন, কে যে হারিয়ে গেছে
বিস্মৃতির অনুপম পরপারে—
তার কোনো হিসেব নেই আজ।
স্মৃতির ধুলোয় ঢেকে গেছে নাম,
ম্লান হয়ে গেছে মুখ;
আমিও ভুলেছি, সেও ভুলে গেছে
নিজের অস্তিত্বের ক্ষীণ রেখা।
তবু মাঝরাতে হঠাৎ
ঘুম ভেঙে গেলে
রাত থমকে দাঁড়ায় নিঃশব্দ স্তব্ধতায়।
অন্তর্গত কোথাও কেঁপে ওঠে ভয়,
জানালার কালো আয়তক্ষেত্রে
হঠাৎ মনে হয়—
অদৃশ্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে
নিঃসাড় অন্ধকারের সীমানায়।
তার উপস্থিতি কেমন অচেনা,
কেমন পরিচিতও বটে—
যেন ভুলে-যাওয়া কাউকে
রাত আবার ফিরিয়ে আনে
শ্বাসের হালকা শব্দে,
নীরবতার ক্ষীণ কম্পনে।
জানালার কাঁচে জমে ওঠা অন্ধকারে
আমি যেন শুনতে পাই—
ফিরে আসার অপূর্ণ আকুতি,
নীরব পায়ের শব্দ,
গোপন কথার প্রতিধ্বনি।
ভ্রম নাকি সত্যি?
আমি বোঝার আগেই
আবার নেমে আসে অন্ধকার,
রাত তার গভীর ছায়ায়
সবকিছু গিলে নেয়।
শুধু জানালার বাইরে
অদৃশ্য কারো শ্বাসপ্রশ্বাস
এখনো হালকা ঢেউ তুলে যায়
আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গহীনে।
৭. বৈজয়ন্তীর আলো
গারো পাহাড়ের অন্দরে
পূর্ব পালঙের সেই দীপাবলির রাত—
চন্দ্রহীন, নির্মেঘ, তবু অদ্ভুত স্বচ্ছ,
মহাকাশের হাজার ক্ষুদ্র প্রদীপ
পাতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁপছিল নিঃশব্দ ভক্তিতে।
পাহাড়ি বাতাসে সোঁদা গন্ধ,
দূরের তুরাগের মতো সরু নদী
গভীর জ্যোৎস্নাহীন অন্ধকারেও
কোনো অজ্ঞাত আলোয় ঝলমল করছিল।
সেই প্রকৃতির নিরাকার পবিত্রতায়
বৈজয়ন্তীমালা দাঁড়িয়েছিল
যেন এক উজ্জ্বল শালবীথির মূর্তি—
চোখে ছিল গোধূলি,
আর বাহুতে ছিল মমতার উষ্ণ নীল আলোকরেখা।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল
এমন ভালোবাসায়—
যেন পাহাড়ও নড়ে উঠত,
মেঘেরা কেঁপে উঠত তার একটিমাত্র নিশ্বাসে।
আমি বলেছিলাম— “ছাড়ো…”
কিন্তু তাতে ছিল ভয়,
নেই কোনো অভিমান—
শুধু ছিল অচেনা নিয়তির অদ্ভুত টান।
তারপর,
ঝপাং—
একটি ভাঙা ডালের মতো শব্দ কেঁপে উঠল
সমস্ত নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে।
গিরিখাদের গভীর মুখ
হঠাৎ গিলে নিল আলো,
অদৃশ্য এক কৃষ্ণ ছায়ায়
বিলীন হয়ে গেল বৈজয়ন্তীমালা।
এক মুহূর্তে
তার বাহুর উষ্ণতা নিভে গেল,
তার কণ্ঠের সুর থেমে গেল,
তার চুড়ির ক্ষুদ্র ঝংকার
শুধু বাতাসে ঝুলে রইল
অসীম শূন্যতার মতো।
আজও গারো পাহাড়ের রাতগুলো
তাকে খুঁজে ফেরে—
হাওয়ার মাঝে তার গন্ধ,
পাতার নড়ে ওঠায় তার নিশ্বাস,
ঝরনার সুরে তার নাম।
বৈজয়ন্তী কোথায় গেলে তুমি?
কোন কুয়াশার দেশে,
কোন অচেনা ছায়ার কোলে—
আমাকে ফেলে চলে গেলে একা?
দীপাবলির প্রদীপেরা আজও কাঁদে,
তারকারা আজও তাকিয়ে থাকে নিচে—
সেই করুণ আলিঙ্গনের দিকে,
সেই হারিয়ে যাওয়ার দিকে,
সেই অমোচনীয় প্রেমের দিকে
যা গিরিখাদের গভীরতাকেও
অসহনীয় শোকে ভরিয়ে রাখে।
বৈজয়ন্তী—
ফেরো না তুমি,
তবু হৃদয়ের অরণ্যে
যেখানে চাঁদ ওঠে না,
তারই ভেতর
তোমার আলো আজও জ্বলে…
অতল বেদনাময় দীপাবলির মতো।
৮. এই দেশ—আমাদের মা
এই দেশ আমাদের মা—
তার বুকের মাটিতে লুকিয়ে আছে
শহীদের উষ্ণ রক্তের দাগ,
জোছনার মতো জ্বলে ওঠা স্মৃতি,
গোপন কান্নার শব্দ,
আর লাল-সবুজ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।
যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া,
সে মাটিতেই ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ—
মাটি যেন হয়ে উঠেছে এক পবিত্র গ্রন্থ,
যার প্রতিটি দানায় লেখা আছে
অগ্নিযুদ্ধের ইতিহাস,
বিচ্ছিন্ন প্রাণের মহাকাব্য।
তাই সন্তানদের বলো—
এই মাটি কোনো জমি নয়,
এ আমাদের মায়ের কোল,
এখানে অবহেলা নয়,
শ্রদ্ধার হাঁটুপড়ে প্রণাম চাই।
তাদের শেখাও—
দেশকে ভালোবাসা মানে
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দনে
মায়ের শ্বাস অনুভব করা;
দেশকে রক্ষা করা মানে
নিজের শিরায় শিরায়
মায়ের নাম বয়ে বেড়ানো।
আর যদি কখনো
এই মাটির জন্য প্রাণ দিতে হয়—
সন্তান যেন নিঃশব্দে বলে,
“মা, তোমার জন্যই আমার উৎসর্গ।”
কারণ—
এই দেশ, এই মাটি, এই আকাশ—
সবই আমাদের মা।
৯. একটি দীর্ঘতম দেহজ কবিতা
কতটুকু তোমাকে ভালোবাসলে
অলস বিকেলের আকাশে প্রথমে জমবে নরম সাদা মেঘ,
তারপর সেই মেঘ ভিজে উঠবে তোমার নামের গোপন উষ্ণতায়,
ধীরে ধীরে গলে যাবে—
জল হবে—
আর সেই জল গড়িয়ে পড়বে নদীর গায়ে,
নদী পূর্ণতা পাবে তোমার নিশ্বাসের মতো শান্ত প্রতিধ্বনিতে।
কতটুকু ভালোবাসলে বসন্তের বুকে ফুটবে উন্মনা ফুল,
তাদের পাপড়ি থরথর করবে তোমার হালকা হাসির মতো,
মৌমাছিরা গুনগুন করে ছড়িয়ে দেবে
আমার হৃদয়ের গভীর গোপন রস—
যা শুধু তোমার উপস্থিতির দোলায়
মধুর মতো ঝরে পড়ে।
কতটুকু ভালোবাসলে তোমার কস্তুরী ঠোঁট
লজ্জায় কম্পমান হয়ে উঠবে সপ্রতিভ,
নীল-কালো কাজল চোখে ঠিকরে উঠবে
মহাকাশের অচেনা সব তারার আগুনখেলা,
আর তোমার কুচবরণ কেশে ছুটবে
রাত্রির গাঢ় মায়াভরা গন্ধ—
যা স্পর্শ করলেই আমার সমস্ত দেহ
বিস্মৃত হয়ে যায় পৃথিবীর ভার।
কতটুকু ভালোবাসলে তুমি
ধীরে ধীরে খুলে ফেলবে সব অভিমান,
সকল আড়াল—সকল শব্দ,
আর নির্জনের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকবে
নগ্ন সত্যের মতো—
একজন নিঃসঙ্গ, অপার্থিব,
সৃষ্টির-অন্তর্গত নারী,
যার দিকে তাকালে মনে হয়
সমস্ত প্রেম শুধু তোমাকে কেন্দ্র করেই
জন্ম নিয়েছে।
আমি জানি—
এই প্রেমের কোনো পরিমাপ নেই;
তবু তোমার দিকে হাত বাড়ালেই
বুঝি—
আরও একটু ভালোবাসলেই
পুরো ব্রহ্মাণ্ডটাই
তোমার রূপে নতুন করে
শুরু হবে।
১২. নামহীন প্রেম
তুমি এলে নীরব ভোরের মতো,
অচেনা আলোয় ভেসে উঠল আমার দিন।
বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে—
জানি না কোথা থেকে, কোন অদৃশ্য বাগান থেকে,
তবু হৃদয় বলে— এটাই তো চেনা প্রেমের পথচিহ্ন।
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে যায়
আমার অব্যক্ত সব নদী;
কতদিন শুকনো ছিল যে স্রোত,
আজ হঠাৎই সেখানে জোয়ার ওঠে তোমাকে দেখে।
আমি ভাবি—
প্রেম কি এমনই?
হাত ছুঁয়ে না গেলেও
মনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে,
দূরে থেকেও হৃদয়ে গান বাজে?
তুমি ছিলে বলে
আমার অদেখা আকাশে
একটি নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে—
সে নক্ষত্র রাত জাগে শুধু তোমার নাম ধরে।
যদি কোনোদিন সব আলো নিভেও যায়,
তবু তোমার স্মৃতির নরম আভা
আমায় পথ দেখাবে—
কারণ প্রেম একবার জন্ম নিলে
সে আর কখনো মরে না।
তুমি আমার নীরব প্রতিশ্রুতি,
আমি তোমার অনন্ত অপেক্ষা।
১৩. অঙ্গার-অন্তরালের মন্ত্র
তোমার সকল অস্তিত্ব আমার দেহে ঢেউ তোলে—
গোপন আগুনের মতো তুমি ছড়িয়ে পড়ো রক্তের অভ্যন্তরে,
তোমার উষ্ণতার স্পর্শে কেঁপে ওঠে আমার অনামি রাত,
হৃদয়ের অন্তরালে জমে থাকা সব নীরবতা
ঝরে পড়ে ঝরনার জলধ্বনির মতো,
আমাকে করে তোলে তোমার পূর্ণ উপস্থিতির পারাবারে ভাসমান।
তুমি যখন শ্বাস ফেলো আমার কণ্ঠের গহীতে,
তখন মনে হয় জ্বলন্ত খরায় নেমে এল হঠাৎ প্রবল বর্ষা—
আমি সেই বৃষ্টির ভিজে ওঠা মাটির মতো
তোমার অঙ্গভেদী উষ্ণতায় থরথর কাঁপি,
তোমার দহন আমাকে আলোকিত করে তোলে
নক্ষত্রের ভিতর লুকিয়ে থাকা গোপন দীপ্তির মতো।
তুমি ভস্ম হও—আমি তোমার সঙ্গে ভস্ম হই—
দু’জনার মিলিত দহন থেকে ওঠে
এক অদৃশ্য লাল আলো,
যা আমাদের দেহের সীমা ভেঙে
ভেসে যায় অচিন্ত্য আকাশে।
তুমি পবিত্র হও—আমি পবিত্র হই—
তোমার স্পর্শের অশ্রুত সুরে
আমার দেহের অন্তঃস্থ গন্ধার দোলে,
অস্তিত্বের প্রতিটি তারে জন্ম নেয়
এক স্নিগ্ধ, রক্তিম, মাদকীয় রাগ।
এসো, আরও কাছে এসো—
আমাদের দেহের আগুন আরও উন্মীলিত হোক,
অবয়বের অন্তরালে জমে থাকা
সব সুর, সব আকাঙ্ক্ষা, সব প্রার্থনা
এক মহাসমুদ্রের ঢেউ হয়ে
একই প্রবাহে মিলিয়ে যাক—
তোমাতে আমি, আমাতে তুমি—
এক অনন্ত আদিরসের জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল শিখা।
১৪. মায়ার কথা
রাত্রির স্তব্ধতার গভীরে
যখন নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে শ্বাস নেয়,
তুমি যেন এক ফোঁটা নীরব আলো—
অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠা।
মায়ার পর্দা নামলে
নিমিষে বদলে যায় পৃথিবীর রূপ—
চাঁদের কোমল আঁচলে ঘুমিয়ে পড়ে
রাস্তার ধুলো, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির,
আর তোমার মনের ভেতর লুকানো
অস্থির ছোট্ট পাখিটির কাঁপা ডানাগুলো।
বিনিদ্র চোখের কান্না
রাত কখনোই প্রকাশ করে না—
সে শুধু নীরব দুঃখকে
অনুভবের মতো ছুঁয়ে রাখে,
তাই তাকে দেখাশোনা করতে হয়
ভোরের প্রথম ঊষারঙা বাতাস পর্যন্ত,
যখন আলো এসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এইভাবে মায়া জন্ম নেয়,
জন্ম নেয় এক মৃদু স্পর্শে—
রাত্রির অন্ধকারে লুকানো ব্যথা
আর ভোরের আগলে রাখা শান্তির মাঝখানে।
তুমি সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে,
দুটোই দেখো, দুটোই জানো—
এ কারণেই তুমি
রাত্রির মতোই গভীর,
আর ভোরের মতোই আশ্বাসময়
একটি মায়া।
১৫. নিঃশ্বাসে তোমার নাম
আমি নিঃশ্বাস নেই
তোমার শরীর ছুঁয়ে-যাওয়া বাতাস থেকে—
যেন তোমার উষ্ণ শিরায় বয়ে যাওয়া
অদৃশ্য কোনো সুর
আমার ফুসফুসে বসে গেয়ে ওঠে;
আমি শুনতে পাই তোমার নিকটতার
এক গভীর কম্পন।
আমি প্রশ্বাস রেখে যাই
তোমার নিঃশ্বাসের মেঘে—
যেন আমার অদেখা স্পর্শ
ধীরে ধীরে মিশে যায়
তোমার বুকের ভেতর
আলতো ঢেউ হয়ে।
আমরা দুইজন—
দুটি দেহ, দুটি পথ,
কিন্তু এক নিঃশ্বাসের
গোপন মিলনে বাঁধা।
যেখানে কোনো শব্দ নেই,
কোনো ভাষা নেই,
শুধু ধ্বনিহীন স্পর্শ—
তুমি আর আমি।
যখন রাত নামে,
তারারা আমাদের ওপর নিঃশব্দে
ঝুঁকে থাকে,
আর আমরা দু’জন
একই বাতাসে
একই ভালোবাসার উষ্ণতা
দীর্ঘশ্বাসে ভাগ করে নিই।
আমার সমস্ত অস্তিত্ব
তোমার কাছে পৌঁছে যায়
শুধু এই শ্বাসের পথ ধরে—
আর তুমি প্রতিবার
আমাকে গ্রহণ করো
নিভৃত, গভীর,
নিঃশব্দ ভালোবাসায়।
১৬. শূন্যতায় ভালোবাসা
নীল নক্ষত্রে ভরা সে দিনগুলোর ভেতর
যেখানে তোমার নামের প্রতিধ্বনি উঠত নিশ্বাসের মতো,
আমি ছিলাম পূর্ণ—
ভালোবাসার ঘন আলোয় ভেজা একটি সময়ের স্থির রূপ।
আজ যা রেখে যাব—
তোমার ফিরে দেখা চোখে
দেখবে শুধু অসীম শূন্যতার গাঢ় বিস্তার,
যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালুচরে
লুকিয়ে থাকে অতল জলের স্মৃতি।
কখনো সেখানে ছিল উত্তাপ, ছিল দীপ্তি,
তোমার অবহেলার ছায়ায় যা তুমি দেখতে পাওনি।
আমি নীরব ছিলাম, প্রেম ছিল নীরব—
তোমার দিকে ধাবমান এক অদৃশ্য জোয়ারের মতো।
এখন সেই সব হারানো সুরের জায়গায়
থাকবে কেবল ফাঁকা প্রতিধ্বনি,
যেখানে স্পর্শ করলে বুঝবে—
শূন্যতাও একদিন ভরা ছিল
আমার অন্তহীন ভালোবাসায়।
১৭. অবশেষে নিঃশ্বাসের ভিতরে তুমি
আঁধার নেমে আসে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে,
জোনাকিরা জ্বালায় তাদের ক্ষুদ্র নক্ষত্র—
অরূন্ধতী, স্বাতি, ধ্রুবতারার আলো
মিশে থাকে তোমার চোখের গভীর নিভৃত প্রান্তে।
নয়ন তোলো—আর একবার, শুধু আমায় দেখো,
রাতের কানাঘুষায় আমার হৃদয় তোমাকেই ডাকে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে তোমার সকল চুম্বন
আমার দেহের চারদিকে ছড়িয়ে দাও—
যত পারো, যেখানে পারো,
হয়তো কাল সকালের সূর্য
আর খুঁজে পাবে না আমার ঘুমভাঙা নিঃশ্বাস।
এই শেষ স্পর্শে, শেষ উষ্ণতায়,
আমরা দু’জনে মিলিয়ে যাই
একটি অনন্ত আলোক-রাত্রির অনুচ্চারিত প্রেমে।
১৮. গোপন আলোয়
তোমাকে ঢেকে রাখি গোপন আলোয়,
রাত্রির গভীর গুহায়, যেখানে শব্দও থেমে যায়।
তারপরও তোমার দেহের ভেতর কোনো নীল অগ্নিশিখা
অদৃশ্যভাবে জ্বলে ওঠে—
আমার শিরায় শিরায় তার আলো ছায়া ফেলে।
আমি চাই—
তুমি সেখানেই অপ্রকাশিত থেকো,
নীরব বাতাসে লুকানো কাঁপনের মতো,
আঙুলের ডগায় ধরা পড়ে আবার আচমকা মুছে যাওয়া
একটি স্পর্শের রহস্য হয়ে।
অন্ধকারের পাতায় যখন তোমার শ্বাস গড়িয়ে পড়ে,
গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়
দেহের গোপন সংগীত—
যাতে আমি ডুবে যাই নিঃশব্দে,
তোমার অদেখা আলোয়
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে যেতে।
১৯. দেহ ও আত্মা
ভালোবাসা জৈব—
রক্তের গোপন ঘ্রাণে ভিজে ওঠে তার প্রথম উচ্চারণ,
উরুর ভাঁজে জমে থাকা উষ্ণতার মতো আদিম,
ত্বকের নীচে নীরব দহন,
শরীর না থাকলে যার শিকড়ই থাকে না।
প্রেম আসলে দেহের অঙ্গসংগীতে বাঁধা এক পুরোনো নদী—
যত দূরেই যাক, ফিরে এসে
ত্বকের উপকূলে ঢেউ তোলে আবার।
তবু তারই বিপরীতে থাকে আরেক জন্মের মতো
নিষ্কাম প্রেম—
যার কোনো কামগন্ধ নেই,
চুম্বনের ভিতরে নেই দাহ,
শুধু দু’হাত ভরে বিলিয়ে দেবার অন্তহীন গরিমা।
এ প্রেম দুষ্প্রাপ্য আমাজন লিলির মতো
রাত্রির নিঃশ্বাসে ফুটে ওঠে,
অধরার মতো পবিত্র, তবু টেনে নেয়
জল-আঁধারের গভীরতায়।
দুই প্রেম—
একটি বেগ, আগুনের মতো ছুটে চলে
বুকের দাউ দাউ অগ্নিপথে,
একটি আবেগ,
নিঃশব্দে জলের মতো শরীর ছুঁয়ে বয়ে যায়।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি তাদের মাঝখানে—
একদিকে দেহের ধরিত্রী, স্পর্শের অরণ্য,
অন্যদিকে অদৃশ্য পাঁপড়ি মেলে ধরা
এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।
কাকে বলি আদিরস?
কাকে বলি নিষ্পাপ?
শেষে দেখেছি—
উভয়েরই সুর আছে, উভয়েরই উন্মাদনা;
একটি দেহে পুড়িয়ে নেয়,
অন্যটি মনকে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত করে।
দু’টিই প্রেম;
দু’টিই অপরিহার্য,
কারণ মানুষের হৃদয়ে
সবসময়ই পাশাপাশি থাকে
এক তীব্র কামনা
এবং
এক অতল আত্মদান।
২০. এমনও পিরিতি
এমন প্রেম—
যে প্রেম কথা বলে না,
চিৎকার করে না,
আশা-ভরসার কোনো দাবি তোলে না—
শুধুই নীরবতার গোপন কোণে
নিজেকে লুকিয়ে রাখে।
অপেক্ষার দীর্ঘ সাঁঝে
জীবন ফুরিয়ে যায় ধীরে ধীরে,
তবু একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না—
একবারও বলে না, ভালোবাসি।
এমন প্রেমই করে তারা,
জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো
আলোকে ভয় পাওয়া কিছু হৃদয়,
যারা নিজেরাই বোঝে না
কেন দুঃখকে এভাবে বুকে আগলে রাখে,
কেন কাঁটার পথে হাঁটতে হাঁটতে
নিজেকে আঘাতে রঞ্জিত করে রাখে।
অথচ এও প্রেম—
শুধু বলা হয়নি বলে
তার সত্য কমে যায় না;
কিন্তু যারা এ প্রেম করে—
তারা অনেকটাই আহম্মক,
কারণ ভালোবাসার বেদনাই
তাদের একমাত্র উচ্চারণ।
২১. রুপালি জলপতনের দেহ-নেশা
আজ রুপালি সমুদ্রের ভেতর
তোমার শরীরের ঢেউ ছুঁয়ে সাঁতার কেটে এলাম—
ঝলাৎ ঝলাৎ শব্দে কেঁপে উঠছিলো
সব গোপন জলের সুর।
দুপাশে ভাঙন, ভেতরে উথাল-পাথাল—
তোমার উষ্ণ তরঙ্গ যেন
আমাকে ভাসিয়ে নেওয়া কোনো দেহ-নদীর জোয়ার।
জল ভেঙে পড়ছিল,
আর আমি বুঝতে পারছিলাম—
এ অবিরাম পতন আসলে উত্থান,
এ উথাল পাথাল আসলে স্পর্শের নিবিড় উচ্চারণ।
তুমি ছিলে জলের নীচে গোপন শ্যামল আলোক,
আমি ছিলাম সাঁতারু—
তোমার ত্বকের ঢেউয়ে রূপ নিতাম বারবার।
যে খেলা আজ সমুদ্র করেছে,
তুমি কি জানো—
ওটা ছিল তোমার শরীরেরই রূপক,
দেহ-শিল্পের নিঃশব্দ নৃত্য,
অবিস্মরণীয় জলপতনের সেই
শৃঙ্গার-সন্ধ্যা।
২২. নীরব পরিভ্রমণ
দুহাতে খুঁজেছিলাম অদেখা সেই চূড়া—
তোমার দেহের নিঃশব্দ উত্তুঙ্গ পর্বত,
যেখানে স্পর্শ উঠতে উঠতে শ্বাস হয়ে যায়,
নামতে নামতে রূপ নেয় অচেনা কম্পনে।
হঠাৎ দেখি—
মণিমুক্তা খচিত এক অন্তর্জ্যোৎস্না,
তোমার নাভীর ঢালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো দীপ্ত;
একবার শিখরে, যেখানে উষ্ণতার তুষার গলে পড়ে,
একবার পাদদেশে, যেখানে আলো জমে থাকে
গোপন নদীর মতো।
আরেকবার হিমাদ্রি—
আমার ভেতর জমা নীরব তুষার
তোমার নিভৃত অগ্নিতে ধীরে ধীরে গলে যায়,
শরীরের পরিভ্রমণ তখন
প্রাচীন আদিরসের গোপন উৎসবে পরিণত হয়।
কী যে আনন্দময় ছিল সেই যাত্রা—
তোমার দেহের মানচিত্রে
আমি শুধু এক পথিক,
বারবার হারাই, বারবার ফিরে পাই
অপরূপ সেই চূড়া।
২৩. নিশীথিনীর আহবান
এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন—
তোমার গোপন নিশ্বাসে ভিজে উঠছে আকাশের তল।
আজ ভাসিয়ে দাও,
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমায় ডেকে নাও
হে নিশীথিনী, নীরবতার মুগ্ধ রাণী।
এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্র-বীথিকে—
আরও গভীর করে তোলো আমার চারদিক,
যেন প্রতিটি তারার কম্পনে
তোমারই উষ্ণ স্পর্শ পাই।
দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল,
তারপর সেই ক্ষণকে বাড়িয়ে দাও অনন্তে—
যেন তোমার আলোর ছায়ায় আমি বিলীন হই,
তোমার আলিঙ্গনের পরিধি
হয়ে ওঠে আমার সকল দিগন্ত।
আজ রাত্রি শুধু রাত্রি নয়—
এ এক গোপন পথ,
যেখানে তোমার ডাকে
আমার সমগ্র সত্তা
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
ফুটে ওঠে প্রেমের নক্ষত্রাভ দীপশিখায়।
আমায় তুমিই নিয়ে চলো—
এই অশেষ শিশিরে,
এই মধুর অন্ধকারে,
এই নীল আকাশের গভীর আলিঙ্গনে—
যেখানে তোমাকে ছাড়া
আর কিছুই নেই,
আর কিছুই প্রয়োজন নেই।
২৪. শরীর-স্মৃতির অগ্নিবর্ণ শৃঙ্গার
ভালোবাসার প্রথম পাঠে
আমি দেখেছিলাম তোমার দেহের আলো—
যেমন নদীর বুক জলে দুলে ওঠে সূর্যের সোনা,
সেই আলোই ঝরে পড়েছিল তোমার ত্বকের উষ্ণ ঢেউয়ে।
তোমার ঘাড়ের বাঁক ছিল গোধূলির নরম নীল,
হালকা বাতাসের মতোই থরথর করত কলারবোন,
আর বুকে ছড়িয়ে থাকা শান্ত গহ্বর—
মৃদু অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনো গোপন দ্রাক্ষাক্ষেত্র।
তোমার কাঁধের ওপর ঋতুরা এসে বসত—
গ্রীষ্মের তপ্ত শ্বাস,
শরতের মেঘে-ঢাকা হিম;
আর আমি, দিগন্তজোড়া বসন্ত হয়ে
স্পর্শে স্পর্শে জেগে তুলতাম তোমার দেহের প্রতিটি সুর।
তোমার ত্বকের গন্ধে ভিজে থাকত
বর্ষার প্রথম বৃষ্টির অদৃশ্য আগুন;
তোমার নাভির গহীনে ছিল
হেমন্তের উষ্ণ রাত্রির মতন শান্ত ঝড়;
আর তোমার ঠোঁট—
নির্জন প্রান্তরের ওপর ভাসমান রক্তিম চাঁদ।
তুমি যখন শ্বাস নিতে,
আমার সমস্ত সত্তা ঢুকে পড়ত সেই নদীর স্রোতে—
হালকা কম্পনে থরথর করা তোমার বক্ষদেশ
আমার কবিতার নীরব ঢেউ হয়ে উঠত।
দেহের ভাষা কোনোদিন এত স্পষ্ট ছিল না—
নগ্নতায়, আড়ালে,
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ শব্দগুলোতে—
আমি শুধু একটিই নাম শুনতাম—
তোমার।
তোমার দেহই ছিল সেই বই,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় জ্বলত শৃঙ্গার—
স্পর্শের আগুন, নিশ্বাসের নরম ঝড়,
ভালবাসার নদীর গভীর রাত্রি।
আমি আজও সেই পাঠ শিখে চলেছি—
তোমার দেহের উজানে, অনন্তের দিকে।
২০.
২০.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন