ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের
আমার প্রাণপ্রিয় সহপাঠী বন্ধুদের প্রতি—
যাদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি ক্লাস,
প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি তর্ক ও হাসি
আমার চিন্তা, মনন ও যাপনের ভাষা গড়ে দিয়েছে।
শব্দের নৌকায় ভেসে চলার পথে
তোমরাই ছিলে ঢেউ, দিগন্ত ও বাতাস—
কেউ প্রশ্নে তীক্ষ্ণ, কেউ ব্যখ্যায় গভীর,
কেউ বা নিছক ভালোবাসায় অনন্ত।
এই বইয়ের প্রতিটি পাতায়
আমাদের যৌবনের কোরিডোর,
নীলক্ষেতের দুপুর,
টিএসসির সন্ধ্যা,
আর জ্ঞান–পিপাসু হৃদয়ের গোপন স্বপ্নেরা ছড়িয়ে আছে।
তাই এই গ্রন্থ—
আমাদের বন্ধুত্বের নিকষিত অক্ষরে
তোমাদের নামেই উৎসর্গ করলাম,
ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতির অমলিন ঋণে।বন্ধুত্বের এই অক্ষয় আলোয়, তোমরাই আমার উৎসর্গের প্রথম ও শেষ ঠিকানা। সময় বদলায়, স্মৃতি ধূসর হয় না— তোমাদের নামেই আমার সকল শব্দের জয়যাত্রা।
ইতিহাস বয়ে চলে
গৌরব আর কলঙ্কের ছায়া জড়িয়ে,
কাল থেকে কালান্তরে।
সীমান্তের শহর মেহেরপুরের কোল ঘেঁষে
দাঁড়িয়ে আছে আমঝুপি।
মোঘল সেনাপতির বিজয়রথ ছুটেছে এখানে,
ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গীদল ধুলি উড়িয়েছে,
নবাব আলীবর্দ্দীর মৃগয়ায় স্মৃতি রয়েছে,
পলাশীর পরাজয়ের নীল-নকশাও এখানে লেখা হয়েছে।
এক হেমন্তের সকালে
কাজলা নদীর তীরে গিয়েছিলাম নীলকুঠি দেখতে,
সাথে ছিল জেসমিন,
মেহেরপুর থেকে আধাপাকা পথে রিকসা বয়ে চলছিল।
রাস্তার দু’পাশে নীল অপরাজিতার ঝাড়,
জেসমিনের নীল সালোয়ার কামিজ,
আমার নীল টি-শার্ট,
মাথার উপর নীল আকাশ —
সব মিলিয়ে এক মুহূর্তের নীল মহিমা।
সে বলেছিল —
“কেমন যেন এই নীল, কেমন বিষাদময়,
এত নির্জন! মনে হচ্ছে কেউ আছে কেউ নেই।”
আমি শুনলাম, কিন্তু বুঝতে দেরি হয়ে গেল,
মুহূর্তে উত্তর দিতে পারিনি।
তার আফসোসের কথা রইল।
আমরা হেঁটেছি কাজলা নদীর ধুলি পথে,
দেখেছি স্থির, স্বচ্ছ জল,
নীলকুঠির ভগ্ন কুঠিরের পলেস্তারা,
লতাগুল্মের বিষণ্ণ সবুজ।
মন ভালো লাগছিল না;
শত বছর আগে কৃষকের করুণ হাহাকার
কানে বাজছিল।
বছর কেটে গেছে,
কাজলা নদীর ধুলি এখনও উড়ে,
নীল অপরাজিতা এখনও ফুটে,
হেমন্তের রোদ্দুর আলো ছড়ায়।
মুহূর্তগুলো লুপ্ত হয়,
জেসমিনের মতো কেউ পাশে নেই,
কোনও দিন আর দেখা যায় না
ক্ষণিকা এই জীবনে,
যেমন নীল অপরাজিতার মতো
ফুটে ঝরে যায়।
২৩. একটিই মুখ
যেখানেই যাই, যত দূরেই যাই,
যাই না আমি কোনো অন্তরীক্ষে,
নক্ষত্রের নির্বাক মিছিলে কিংবা
গ্যালাক্সির ঘূর্ণিজালেও নয়—
কিংবা ধুলো হয়ে পড়ে থাকি
এই পৃথিবীরই বুকের ’পরে।
সমুদ্রের ফেনিল দীর্ঘশ্বাসে,
পথের বাঁকে অচেনা শহরের
হলুদ বাতির কম্পমান দোলায়,
বৃষ্টিভেজা গলির নির্জন ভাষায়—
সর্বত্রই মিশে থাকে এক প্রতীক্ষা,
এক অব্যক্ত নাম, এক গভীর মুখ।
একটি মুখের দিকেই চেয়ে থাকি,
একটিই মুখ বারবার ভেসে ওঠে
মনের অগোচর জলসীমায়;
যেন সমস্ত দিগন্ত, সমস্ত পথ
তারই দিকে ধাবমান এক নদী।
তার মুখের নিঝুম ছায়াপাত
নেমে আসে ধীরে ধীরে—
রাত্রির পাখির মৃদু ডানার মতো,
নিস্তব্ধ শিশিরের পতনের মতো;
এসে পড়ে আমারই মুখের উপরে,
আর আমার মুখ হারিয়ে যেতে থাকে
তারই অববাহিকার ছায়ায়।
চোখের পাতা বন্ধ করলেই
সে মুখ আরো স্পষ্ট হয়—
আলো ও আঁধারের সীমাহীন পরতে
একমাত্র মানচিত্র হয়ে জেগে থাকে।
আমি আয়নায় তাকাই না আর—
কারণ প্রতিফলনে এখন
আমার মুখও তারই মুখেরই অনুবাদ।
যেখানে সময় থেমে থাকে,
যেখানে ভাষা নিরর্থক হয়ে যায়,
যেখানে পৃথিবী নিজেই ছায়া—
সেখানেও শুধু একটি সত্য জেগে থাকে :
একটিই মুখ, একটিই মুখ, একটিই মুখ।
২৪. অস্তরাগের আগুন
নীহারিকা-রাঙা এক অস্তরাগের সাঁঝে
তুমি এসো ধীরে—মৃদু পায়ে, গোধূলির কাঁধ ছুঁয়ে।
ধান-ধূপের ধোঁয়া উঠবে আকাশের বুক বেয়ে,
প্রদীপের আলো নরম হয়ে জড়িয়ে ধরবে আমাদের ছায়া।
তারার বাতি একে একে জ্বলে উঠবে
তোমার চোখের উষ্ণ আবেশে—
সেই আলোয় আমার অন্তর হবে রঙিন,
তোমার সুরভিতে কেঁপে উঠবে নিশীথের নিঃশ্বাস।
তারপর দু’জন জ্বলব আগুনের মতো—
রাতভর শরীরের ভিতর বয়ে যাবে
গোপন তরঙ্গের অগ্নি-রূপী স্রোত,
কেউ আসবে না নেভাতে, কেউ থামাবে না।
বর্বর আদিম সেই অনলে
ছাই হয়ে যাবে সব সীমানা, সব লাজ-লজ্জা—
তখন তুমি আমার, আমি তোমার,
শুধুই মিলনের জ্যোৎস্না ও উত্তাপের উর্বর রাত্রি।
সেই রাতের শেষে
ভোরের নরম আলোয়
আমাদের দেহে থাকবে শুধু
শৃঙ্গারের ধূপ-জ্বলা গন্ধ
আর নিঃশেষ হওয়া আগুনের পরম তৃপ্তি।
২৫. বিজয়ের ডিসেম্বর
ডিসেম্বর…
শীতের কুয়াশা ভেদ করে আসে
রক্তে লেখা লাল ভোর।
এক সাগর অশ্রু,
লাখো প্রাণের বিনিময়ে
জন্ম নেয় এক স্বাধীন দেশ—
সবুজের বুকে লাল সূর্যের ঘোর।
মুক্তির ডাক উঠেছিল ৭১–এ—
জয় বাংলা!
সে ডাক ছিল বজ্রকণ্ঠ,
সে ডাক ছিল অগ্নিশপথ।
কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক—
সবার শিরায় জেগে উঠেছিল
স্বাধীনতার রক্তিম রথ।
মুক্তিযোদ্ধা…
তোমাদের হাতে অস্ত্র ছিল,
হৃদয়ে ছিল দেশ,
চোখে ছিল মুক্তির আগুন,
পায়ে ছিল কাদামাখা পথ।
তবু থামেনি তোমাদের পদযাত্রা,
ভয় ভেঙে এগিয়ে গেছে বুক—
মায়ের মুক্তির জন্য
জীবন ছিল তোমাদের ব্রত।
মা কেঁদেছে…
বধূ জ্বেলেছে দীপ,
শিশু বুক চেপে কাটিয়েছে
নির্ঘুম রাত।
আর বীরেরা?
জল–জঙ্গলে গড়ে তুলেছে
মুক্তির দুর্জয় দুর্গ,
নদীর স্রোতেও ভেসে উঠেছে
রণগানের মাত।
তারপর—
১৬ ডিসেম্বর।
পতন হলো শত্রুর অহংকার,
নিঃশেষ হলো অন্ধকার।
আকাশে উড়ল বিজয়ের পতাকা,
মুঠো খুলে দেশ দাঁড়াল গৌরবে—
রক্তস্নাত বাংলাদেশ,
অদম্য, অনন্য, দুর্বার!
শহীদ…
তোমরা ঘুমিয়ে আছ মাটির বুকে,
তবু জেগে আছ প্রতিটি নিশ্বাসে।
তোমাদের রক্তে আঁকা মানচিত্র
রবে চিরকাল বাংলার আকাশে।
যতবার পতাকা দোলে—
ততবার মনে পড়ে,
এ দেশ তোমাদের ত্যাগে কেনা,
এ বিজয় তোমাদের ভালোবাসা।
ডিসেম্বর শুধু মাস নয়—
এটি গৌরবের গান,
ত্যাগের মহাকাব্য,
স্বাধীনতার অমর ধ্বনি।
যেখানে বীরের রক্ত সোনা ফলায়,
স্বপ্ন নতুন ভোর আনে অবিরত বাণী।
মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ—
তোমাদেরই ঋণে
আমরা পেয়েছি স্বাধীন প্রাণ,
স্বাধীন ভাষা,
স্বাধীনতাই আমাদের পরিচয়,
তোমাদের ত্যাগই আমাদের অহংকার।
জয় বাংলা! জয় স্বাধীনতা!
জয় লাখো শহীদের আত্মদান!
২৬. স্বপ্ন-আলোক
কবরের মতো নীরব ঘর,
চারদিকে গহিন অন্ধকার—
আমি শুধু শুয়ে আছি,
চোখের ভেতর ঘুরছে অদেখা শূন্যতার ছায়া।
হঠাৎ দূর-দূরান্তে জ্বলে ওঠে
একটি ছোট্ট আলোকবিন্দু—
যেন দিগন্তের ওপার থেকে
কারও নরম পায়ের শব্দ ভেসে আসে।
আলো ধীরে ধীরে কাছে আসে,
আমি তাকিয়ে দেখি—
একটি মেয়ে,
অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত,
মায়াবতীর মতো, আবার নয়ও।
সে কিছু বলে না,
শুধু তার আলোটা পাশে রেখে
নম্র ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে
আমার বুকের ওপর
তার কপালটি রাখে।
সেই ছোঁয়া—
ঠান্ডা, নিস্তব্ধ, অথচ
অদ্ভুত উষ্ণ কোনো আশ্বাসের মতো।
সে ফিসফিস করে—
“স্পর্শটুকু মনে রেখো,
ভুলে যেয়ো না কখনো…”
হঠাৎ সমস্ত ঘর
আলো-অন্ধকারে ভেঙে পড়ে—
আমি জেগে উঠি,
কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো বাজে
বুকের গভীর কোনো অন্ধ কোণে।
কোন মেয়ে ছিল সে?
স্বপ্নের?
নাকি কোনো পূর্বজন্মের ব্যথা?
শুধু জানি—
তার রেখে যাওয়া স্পর্শটি
আজও ধুকধুক করে
মায়াবী আলোর মতো।
২৬. বিজয় একাত্তর
ডিসেম্বর আসে শিশিরের বুকে রক্তে লেখা লাল ইতিহাস,
হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসে মুক্তির বারুদ–ভেজা নিঃশ্বাস।
মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্মৃতি, জাগ্রত হয় বিজয়ের ধ্বনি—
এই দেশ, এই পতাকা, এই ভোর— শহীদেরই অমর বাণী।
বাংলার কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক— সবার রক্তের মিলনে,
স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয় ৭১–এর উত্তাল ক্ষণে।
ঘরে ঘরে আগুন, বুকে বুকে শোক— তবু দৃঢ় ছিল প্রাণ,
মুক্তির শপথে কেঁপে উঠেছিল প্রতিটি হৃৎপিণ্ডের গান।
ওরা এসেছিল খালি হাতে— হৃদয়ে অসীম সাহস,
চোখে ঘৃণার বিরুদ্ধে দ্রোহ, শিরায় স্বাধীনতার স্পন্দন উচ্ছ্বাস।
রাইফেলের নলে ছিল না শুধু যুদ্ধ— ছিল মাতৃভূমির দাবি,
প্রতিটি গুলি বলেছিল— “বাংলা কারও গোলাম হবে নাবি!”
পথ ছিল দুর্গম— পাহাড়সম ভাঙা স্বপ্নের ভার,
জীবন ছিল বাজি— দেশ ছিল ধ্যান, যুদ্ধ ছিল অভিমান–প্রাচীরের তার।
কাদা–জলে ভিজেছে দেহ, ক্ষুধায় কেঁদেছে ভোরের পাখি,
তবু পিছু হটেনি পা— এগিয়ে গেছে শহীদের কাফেলায় রাখি।
কোথাও মা কেঁদেছে নীরবে, কোথাও বধূ রেখেছে দীপ,
কোথাও শিশু ঘুমিয়েছে ভয় বুকে— তবু অপেক্ষা ছিল গভীর।
বীরেরা ফিরবে— দেশের আলোর মুকুট আনবে হাতে,
বিজয় আসবে— শত্রুর পতন লিখবে শেষ রাতের প্রান্তে।
জলজঙ্গলে পাকিয়েছে যুদ্ধ, নদী দিয়েছে মুক্তির পথ,
শাল–বন আর ধানক্ষেতে শোনা গেছে রণহুঙ্কারের শপথ।
মরা গাঙের বুকেও জেগেছে স্রোত, হাজারো রক্তের ডাকে,
বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে লড়াইয়ে— বুকের গভীর মাটিকে আঁকে।
শহীদের লাশে মাঠ লাল ছিল, আকাশে ছিল আগুন–দাগ,
তবু ছাই ভেদ করে উঠেছে শস্য, রাত ভেদ করে হয়েছে জাগ।
১৬ ডিসেম্বর এলো একদিন— পতন হলো পরাজয়ের রাত,
বিজয়ের বুকে উঠল দেশ— অশ্রু মুছে ধরল স্বাধীনতার হাত।
লাখো শহীদের ঋণ মাথায় নিয়ে আমরা হাঁটি বিজয়ের পথে,
ওদের রক্তে লেখা মানচিত্র আঁকা— আমাদের প্রতিটি শপথে।
ওরা ঘুমিয়েছে মাটির নিচে— আমরা জেগে আছি আলোয়,
ওদের ত্যাগে যাপন করি গৌরব— পতাকার ছায়ায় ও ছলোয়।
ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, তোমাদের নাম হৃদয়ে অম্লান হয়ে রবে,
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তোমাদের বীরগাথা অমর কাব্যে কবে।
ডিসেম্বর শুধু মাস নয়— এটি রক্তে কেনা অহংকারের গাঁথা,
বিজয় মানে শুধু জয় নয়— এটি শহীদের অক্ষয় আত্মত্যাগের ভাষা।
আজও যখন পতাকা দোলে বিজয়ের সুউচ্চ মিনারে,
প্রতিটি লাল সূর্য মনে করায়— ওরা বেঁচে আছে দেশের প্রাণধারে।
বাংলাদেশ চিরজাগরুক থাক— শহীদের রক্তে লেখা গান,
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক— ধর্ম, বিভেদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনন্ত মহান।
জয় বাংলা — জয় স্বাধীনতা — জয় শহীদের আত্মদান।
২৭. বিজয় আসে
ডিসেম্বর আসে রক্ত–গৌরবে, বিজয়ের রঙে রাঙিয়ে,
স্বাধীন পতাকা দোলে বাতাসে শহীদের নাম জাগিয়ে।
লাখো প্রাণের দাম দিয়ে কেনা এই সবুজের প্রান্তর,
যেথায় মাটির প্রতিটি কণায় মিশে আছে ভোরের মন্ত্র।
পথে পথে আজও শোনা যায় ধ্বনি, বাঁশির বেজে ওঠা সুর—
“জয় বাংলা” স্লোগান আকাশ ছোঁয়, ভাঙে শত্রুর সকল দূর।
কাঁধে রাইফেল, বুকে দৃঢ় শপথ, মুখে আগুন-গাঁথা গান,
মুক্তিযোদ্ধারা জ্বালিয়েছিল আলো— অন্ধকারে মহান।
তাদের পায়ে ছিল ভাঙা বুট, গায়ে মলিন শীতের রাত,
তবু চোখে ছিল সূর্যের দীপ্তি, মুঠোতে ছিল দেশ–দায়িত্বের হাত।
জল–জঙ্গল আর নদীর বুকেই রচিত সংগ্রামের ইতিহাস,
যুদ্ধের ধোঁয়া, কান্না আর আগুন— শেষে বিজয়ের নিশ্বাস।
শহীদের কবর ঘুমায় নীরবে, তবু ওরা ঘুমায় না,
যতদিন রবে স্বাধীন বাংলাদেশ— ততদিন ওরা বাঁচে জানা–অজানায়।
রক্তে ভেজা শস্য হাসে মাঠে, নতুন প্রজন্ম গায়,
মুক্তির লাল সূর্য চির অমলিন— অনন্ত আলো ছড়ায়।
ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, ও শহীদ ভাই, তোমাদেরই ঋণে,
আমরা পেয়েছি স্বপ্নের দেশ— লাল–সবুজের গর্ব–মীনে।
ডিসেম্বরের বিজয় শুধু মাস নয়— এক অমর অনুভব,
ত্যাগ–সংগ্রাম–স্বাধীনতার— এক মহাকাব্যিক স্তব।
২৮. চাঁপাগন্ধ দিনের প্রতিশ্রুতি
এইসব অন্ধকার দিন পেরিয়ে,
নিবিড় তিমির রাত্রির গভীরতা ভেদ করে
একদিন ঠিকই দেখা হবে —
চাঁপাগন্ধ ভরা কোনো বসন্ত সকালে,
যখন বাতাসে রোদ ঝরে পড়ে
প্রেমের প্রথম চুম্বনের মতো।
তখনই তুমি খোঁপায় বেঁধে দেবে নিশি-চন্দনের সুবাস,
আমার কাঁধে রেখে দেবে ক্লান্ত দিনের স্বপ্ন,
আর আমি নিঃশব্দ স্থানু হয়ে
গ্রহণ করব তোমার চোখের পার্থিব সব আনন্দ,
শূন্য হাওয়ায় দুলতে থাকা
স্বপ্ন-বাসর সাজানো অনন্ত শান্তি।
সেই অপার্থিব সাক্ষাৎ-মুহূর্তে—
আমাদের মাঝখানের সব দূরত্ব ভেসে যাবে,
সব বেদনা নরম হয়ে গলে যাবে
জোনাকির মতো নিঃশব্দ আলোর ভিতর।
তোমার হাতের উষ্ণতা হয়ে উঠবে
আমার সমস্ত দিনের দিগন্ত,
আর তোমার হাসির ভিতরেই খুঁজে পাব
এক জীবনের আশ্রয়।
বসন্তের সেই গোপন সকালে
যখন প্রথমবার তোমাকে স্পর্শ করব—
মনে হবে, অন্ধকার ভেঙে
সমস্ত পৃথিবী শুধু আমাদের জন্যই
আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।
২৯. তুমি আমার সর্বস্ব
আমার সমস্ত তৃপ্তি–অতৃপ্তির কেন্দ্র তুমি,
আমার প্রেমের দীপশিখা আর অপ্রেমের নীরবতা—
সবই তোমাকে ঘিরে শ্বাস নেয়, জ্বলে, বেঁচে থাকে।
অপূর্ণ সুখের সাঁঝবাতাসে তুমি ছুঁয়ে দাও মনে,
তৃষ্ণার গোপন নদীতে তুমি জোয়ারের আলো,
আমার উম্মাদনার প্রতিটি অগ্নিশিখায়
তোমারই নাম ধ্বনিত হয় গোপনে–প্রকাশ্যে।
চৈতন্যে তুমি, অবচৈতন্যে তুমি,
অন্তরের অন্তরতমে লুকিয়ে থাকা এক নিত্য দীপ।
তোমাকে ছাড়া কোনো পথ নেই, কোনো দূরত্ব নেই—
তোমাকে ছেড়ে আমি কখনোই বহুদূরে যাই না,
যত দূরেই যাই, তুমি থেকে যাও আমার ভেতরের আকাশ হয়ে।
তুমি আমার অনন্তের একমাত্র ঠিকানা।
৩০. দহনময় সমর্পণ
নি:সঙ্গ নাভির নিবিড় গহিনে ডুবে
দেখি নিসর্গ— নরম পুষ্পবৃন্তে কেঁপে ওঠে আলো,
দেখি তৃণভূমি— দোলায়িত শরীরের সবুজ স্পর্শ,
দেখি অরণ্য— দু’হাতে ধরা উষ্ণ ছায়ার মতো।
অরণ্যের গন্ধ আমি মুঠোয় ভরি—
মায়ার টান ছিঁড়ে যায়, যতিচিহ্ন উল্টে ফেলে সময়;
হঠাৎ ঠোঁটের স্পর্শে জেগে ওঠে প্রেম
আর প্রেমের নিচে দাউ দাউ করে জ্বলে বহ্নিশিখা।
তার পর্দা সরিয়ে নিই— শেষ আলোটুকু
ছিনিয়ে আনার উন্মাদ তৃষ্ণায় কেঁপে ওঠে দেহ,
নিঃশেষ হয়ে আসে স্বেদ কণিকা—
তবু আরো, আরো চাই—
কারণ শৃঙ্গার তো এমনই—
জ্বালা আর জলের
এক নিঃশব্দ, দহনময় সমর্পণ।
৩১. মায়ার টান
তার প্রাণের কথা ভেসে আসে হঠাৎ—
বাতাসে ভাসমান কোনো অনুচ্চারিত শব্দের মতো।
মায়াবী কাজল চোখ দুটো
অন্ধকারের ভেতরেও নিজের আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—
যেন স্মৃতির ভিজে জানালায় জমে থাকা কুয়াশা।
বহুদিনের চেনা গন্ধ
ঘুরে বেড়ায় ঘরের কোণে কোণে,
বালিশে লেগে থাকা সুগন্ধি
হঠাৎই খুলে দেয় দরজা—
যার ওপারে সময় থেমে থাকে
তোমার অনুপস্থিতির নরম অথচ তীক্ষ্ণ স্পর্শ হয়ে।
গল্প বলা অজস্র রাতেরা
এখনো চাঁদের আলোয় পাতার মতো কাঁপে।
অস্পষ্ট ডাকনামগুলো
কখনো ভোঁতা ছুরির মতো,
কখনো জলরেখার মতো নরম হয়ে
মনে পড়ে, হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে।
সবকিছু আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে—
কেউ যেন অদৃশ্য সুতো ছুড়ে দিয়েছে
আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতরে,
যা টানলেই শুধু
তোমার দিকে ঝুঁকে পড়ে
পুরো দিন, রাত, শরীর, স্মৃতি, মন।
সবই তোমার মায়ার টানে—
এক অদৃশ্য কেন্দ্রের চারদিকে
আমার প্রতিটি অনুভব
নক্ষত্রের মতো ঘুরে ঘুরে
অবশেষে এসে থামে
তোমারই গোপন আকর্ষণে।
৩২. মায়াবতী
তপ্ত দুপুর হোক, পরন্ত বিকেল হোক, কিংবা সন্ধ্যার আড়াল—
আমি দরজায় কড়া না দিতেই নীরব স্নিগ্ধতায় খুলে যায় কপাট,
একজন মায়াবতী দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক ওপারে,
যেন আমার ফেরা তার প্রতিদিনের নিশ্চিত প্রত্যাশা।
আমাকে এক মুহূর্তও থামতে হয় না—
টেবিলে সাজানো থাকে উষ্ণ খাবার,
বিছানা থাকে ধোওয়া রোদের গন্ধে পরিপাটি,
ফুলদানিতে ঝরে পড়তে থাকে অদৃশ্য সুবাসের মায়া।
শোবার ঘরে মশারি নামানোর ছোট্ট কাজটুকুও
তার অদেখা হাতে নিজে থেকেই নেমে আসে।
তবু আশ্চর্য—
শুক্লপক্ষের রুপালি জোৎস্নায়
আমি কোনোদিন তাকে এনে দিইনি
একটি রজনীগন্ধার ক্ষুদ্র শাখাও,
দিইনি নীলকণ্ঠ পাখির কোনো আশীর্বাদী পালক।
মায়ার এত ঋণ নিয়ে বেঁচে থাকা
কখনো কখনো চাঁদের আলোতেও লজ্জা দেয়।
৩৩. উপেক্ষিতা
ভোরের অস্ফুট আলোয় একদিন
ইনবক্সে এসে থেমেছিল একটি বার্তা—
“সুপ্রভাত আপনাকে,
ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি,
এড করে নেবেন?”
নতুন করে কাউকে জুড়ে নেওয়ার
ইচ্ছেগুলো তখন শুকনো পাতা,
তবুও অবশেষে
একজন মানুষ ঢুকে পড়ল বন্ধুত্বের তালিকায়।
তারপর প্রতিদিন ভোরে
ঝরে পড়ত শুভেচ্ছার শিশির—
সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা,
রাত্রির নরম গোধূলি পর্যন্ত।
ফরোয়ার্ড করা সেই শুভেচ্ছাগুলো
দেখতেই ইচ্ছে হতো না—
সময়ের অভাবে, ক্লান্ত হৃদয়ে,
জীবন থেকে যে গান হারিয়ে গিয়েছিল বহু আগেই।
তবুও সে পাঠাত সুরের দোলা—
“তুমি চেয়েছিলে জানতে…”
“জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে না পারো…”
“আমারে তুমি অশেষ করেছ…”
অসংখ্য গানের লিঙ্ক,
যার কোনোটিই আর শোনার সময় হয়নি আমার।
একদিন হঠাৎ দেখি—
সব সুর থেমে গেছে।
সকালের সুপ্রভাত নেই,
নেই রাত্রির শান্ত শুভেচ্ছা,
নেই কোনো গান, কোনো কণ্ঠ।
জানতেও ইচ্ছে হলো না—
কেন থেমে গেল তার শব্দের সেতার।
তবুও, মানুষের মন তো কখনও কখনও
পদ্মপাতার মতো কোমল হয়,
কৌতূহলের হাওয়ায় ভিজে ওঠে।
চলে গেলাম তার প্রোফাইলে—
দেখলাম, ফুলে ফুলে ভরে আছে দেয়াল,
বন্ধুরা রেখে গেছে কান্নার ঝর্ণাধারা।
নীরব বিদায়ে ভেসে যাচ্ছে মেয়ে মানুষটি—
যাকে আমি কত উপেক্ষা করেছি নির্দ্বিধায়।
খারাপ লাগল খুব,
চোখও চিকচিক করল অজান্তে।
জগতে এমন নিঃশব্দ প্রস্থান
এতটা কাছে থেকেও অচেনা থাকে!
জানি, সে আর কোনো কমেন্ট দেখবে না—
তবুও ছোট্ট করে লিখলাম—
“ওপারে তুমি ভালো থেকো—
Rest in Peace.”
৩৪. আমি আসব
নীলিমার নীরব আকাশ ভেদ করে
যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্ত বাতাস,
পথের ধুলোয় জমে থাকা পুরোনো মনখারাপ উড়ে যাবে হাওয়ায়,
সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব তখন ঝিরি ঝিরি করে দুলে উঠবে—
ঠিক যেন প্রকৃতি নিজেই তোমার নামে উচ্চারণ করছে
কোনও গোপন, মধুর, দূরাগত আহ্বান।
যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া
নেমে আসবে পদ্মপুকুরের নীল জলের উপরে,
তারার আলো গায়ে মেখে জেগে থাকবে জলরেখা,
চাঁদের রূপালি দোলায় ভেসে উঠবে অগণন স্মৃতি;
সেই মায়াময় রাতে তুমি যদি দরজার সামনে
এক মুহূর্ত স্থির হয়ে শোনো—
হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসবে আমার পদধ্বনি।
সেদিন, সেই দিনেই, সেই শিউলি-সুগন্ধি রাত্রিতে
আমি আসব তোমার কাছে—
হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও,
অপেক্ষার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ব্যথা,
সমস্ত নিঃসঙ্গতা ভেঙে আমি আসব।
কারণ প্রেমের পথে সময় কখনও অন্তরায় নয়;
প্রেম শুধু পথ চেনে, আলো চেনে, চেনা মুখের আকুলতা চেনে।
তুমি থাকলেই বসন্ত ফিরে আসে,
তুমি ডাকলেই পূর্ণিমা জ্বলে ওঠে আবার—
আর আমি?
তোমার সব অপেক্ষার গভীরে
নিঃশব্দে, নিবিড় বিশ্বাসে
অবশেষে পৌঁছে যাই।
৩৫. অপেক্ষার বসন্তরাত
যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্তের নরম বাতাস,
ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির দুলে উঠবে মৃদু স্পর্শে,
যেদিন সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব ঝিরিঝিরি মন্ত্রে
গেয়ে উঠবে নীরব কোনো প্রাচীন সুর—
সেদিন পৃথিবী জুড়ে এক অদৃশ্য আলো নেমে আসবে।
যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া
নেমে আসবে পদ্মপুকুরের স্থির জলে,
চাঁদ যেন মুগ্ধ হয়ে হাত রাখবে জলের কপালে,
মাছেরা থেমে যাবে—
শুধু জলের ভেতর সেই আলো দোল খেয়ে উঠবে।
সেদিন সেই দিনে, সেই রাত্রির হৃদয়ভরা নিস্তব্ধতায়
আমি আসব তোমার কাছে।
হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও
পথ খুঁজে নেব তোমার জানালার ঠিকানায়,
ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দ পায়ে
দাঁড়াব তোমার দরজার সামনে।
তুমি হয়তো বুঝতেও পারবে না—
কোনো পুরোনো জীবনের ডাক,
কোনো অব্যক্ত প্রতিশ্রুতির আলো
আমাকে টেনে আনবে তোমার দিকে।
একা বসন্তরাতের মতোই নরম,
পূর্ণিমার ছায়ার মতোই স্নিগ্ধ হয়ে
আমি আবারো ফিরে আসব—
তোমার কাছে,
তোমার অনন্ত প্রতীক্ষার গভীরতায়।
৩৬. অলৌকিক আলো
মনে হয়—
জগতের সকল অন্ধকার
দিয়ে তোমাকেই ঢেকে রাখি আমি,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো
তোমাকে আঁধারের মাঝে লুকিয়ে রাখি।
তবু তুমি—
কখন যে শত সহস্র আলোকবর্তিকা হয়ে
অদৃশ্য কোনো শক্তিতে
অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠো—
আমি টের পাই না।
মুহূর্তেই তখন
আমার সব নীরব ঘর
অলৌকিক আলোয় ভেসে ওঠে,
ছায়ারা ফেলে যায় দুঃখের ভার,
আর তুমি দাঁড়াও
আমার সমস্ত অন্ধকারের
অমর দীপশিখা হয়ে।
৩৭. চেনা গন্ধ
তার প্রাণের সব কথা জাগে,
মায়াবী সেই কাজল চোখ—
নিভৃত ক্ষণে হঠাৎ এসে
মনকে করে নীরব শোক।
বহুদিনের চেনা গন্ধ
ঘুরে ফিরে ভাসে মনে,
বালিশভরা সুগন্ধির ধোঁয়া
জাগায় স্মৃতি গোপন সনে।
গল্প বলা অজস্র রাত্রি,
হাসি-কান্নার অসংখ্য ঢেউ,
অস্পষ্ট কত ডাকনামে
হৃদয় আজও ডুবে রয় সে-ই।
কত কী যে আষ্টেপৃষ্ঠে
বাঁধে আমাকে প্রতি ক্ষণে,
কতভাবে যে জড়িয়ে ধরে
প্রাণের গভীর আদরে।
সবই যেন তোমার টানে,
তোমার নীরব মায়ার ছোঁয়া—
তোমার জন্যই জেগে থাকে
আমার অন্তর, হদয়-রোয়া।
৩৮. মা, তুমি জান্নাতের পথে গেছ
মা, তুমি আর ঘরের আলোয় দাঁড়াও না,
কিন্তু ফজরের আজানে এখনো তোমার কণ্ঠ মিশে সাড়া দেয়।
মোনাজাতের হাত যখন তুলতে যাই,
তোমার আঙুলগুলো অদৃশ্য হয়ে এসে
আমার আঙুলে জড়িয়ে যায়,
শিখিয়ে দেয়— কীভাবে চাইতে হয় আল্লাহর কাছে।
তুমি পরপারের পথিক—
যে পথের শেষ নেই আঁধারে,
শেষ আছে কেবল নূরে, রহমতে, মাগফিরাতে।
আমি বিশ্বাস করি—
মৃত্যু কোনো বিচ্ছেদ নয়,
এটা রবের ডাকে ফিরে যাওয়া,
এটা জান্নাতের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া।
মা, তোমার কপালের সিজদার দাগ
মাটি মুছে ফেলতে পারেনি,
ফিরেশতারা তাকে নিয়ে গেছে
বরকতের আলোকণায়।
যে চোখ আমাকে ঘুম পাড়াতো শৈশবে,
সে চোখ আজ কবরে নরম আলো হয়ে জ্বলে—
মুনকার-নাকিরের প্রশ্নেও
শান্ত উত্তর খুঁজে পায় রবের তাওফিকে।
মা, তোমার জন্য আজও বিছাই ফুল নয়—
বিছাই আয়াত, দুরুদ, দোয়ার পাপড়ি।
"রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা"
এই এক আয়াতের ডানায় ভর করে
প্রতিদিন তোমার কবর পর্যন্ত পৌঁছে যায়
আমার ভালোবাসার সালাম।
কত ঈদ কেটেছে তোমার হাসিতে,
এখন ঈদ আসে তোমার স্মৃতিতে।
সেহরির থালায় তোমার ছোঁয়া নেই—
কিন্তু রমজানের বরকত যখন নামে,
মনে হয় তুমি অন্য জগতের রোজাদার,
ইফতারের সময় নূরের পেয়ালা হাতে
আমার জন্য দোয়া পাঠাও।
মা, তুমি কোরআনের তিলাওয়াতে ছিলে নদীর মতো,
ধীর, গভীর, অবিরাম।
আমি হয়তো সব শব্দ শিখিনি তোমার মতো,
কিন্তু তোমার শেখানো বিসমিল্লাহর সুর
আজও আমার প্রতিটি কাজে প্রথম লাইন।
যখন রাত দ্বিধায় ভেঙে পড়ে,
তোমার উপদেশ ফিরে আসে—
“আল্লাহ যা নেন, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন,
ধৈর্যই মুমিনের শক্তি।”
মা, তুমি কবরে কিন্তু একা নও,
তোমার সাথে আছে—
আমল, তাসবিহ, দান-সাদাকার ফসল,
আর সন্তানদের পাঠানো দোয়ার সওগাত।
আমি জানি মা,
কবর এখন তোমার জন্য বাগান—
আখেরাতের বাগানের এক টুকরো শান্ত জমিন।
তুমি ঘুমাও সেখানে
রবের দয়ার চাদরে,
ভোরের নরম শিশিরে।
মা, তোমার বিছানার পাশে আর বসি না,
বসি জায়নামাজে—
তোমার জন্য চাই ক্ষমা, রহমত, উচ্চ মাকাম,
প্রভুর কাছে বলি—
“হে আল্লাহ, যিনি আমাকে দুনিয়ায় মা দিয়েছিলেন,
তাঁকে আখেরাতে জান্নাত দিন।”
তুমি চলে গেছ,
কিন্তু তোমার ছায়া যায়নি—
কারণ মায়ের ছায়া কখনো মাটিতে পড়ে না,
পড়ে সন্তানের হৃদয়ে।
মা, কিয়ামতের ময়দানে
তুমি যখন দাঁড়াবে—
আমি চাই তোমার নামের সাথে লেখা থাকুক:
"ধৈর্যশীল বান্দা, ক্ষমাপ্রাপ্ত আত্মা,
জান্নাতের সম্মানিত অতিথি।"
আর আমি সেখানে, দূরের এক সারিতে দাঁড়িয়ে,
দেখব—
আমার মা ডাকছেন না আমাকে আর—
ফিরেশতারা ডাকছেন তাঁকে,
রবের পক্ষ থেকে বলছেন—
“প্রবেশ করো, শান্তির জান্নাতে…
যা প্রস্তুত করা হয়েছে তোমার মতো মায়েদের জন্য।”
মা, তুমি সত্যিই গেছ—
দূরে নয়, হারিয়ে নয়,
তুমি গেছ রবের কাছে,
আর রবের কাছে যাওয়াই তো
সব ফেরার চেয়েও উত্তম ফেরা।
৩৯. মা, তুমি আলো হয়ে আছ
মা, তুমি চলে গেছ—
কিন্তু কি সত্যি চলে যাওয়া যায় কখনও?
তোমার পায়ের ধুলোর গন্ধ এখনও
ভোরের বাতাসে মিশে ঘরে ফেরে,
ডেকে বলে— “বাছা, একটু উঠে আয়।”
তুমি পরপারে, আমি এই পারে,
কিন্তু মাঝখানে তো নদী নেই আর—
শুধু মায়ার সেতু,
যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে
আমি তোমার দিকে চেয়ে থাকি।
তুমি হাত নাড়ো কি না দেখি না—
তবুও বুক ভরে যায়,
মনে হয় তুমি দেখছ আমাকে।
তোমার শাড়ির আঁচল আজ নেই কাঁধে,
কিন্তু তার ছায়া পড়ে আমার হৃদয়ে—
যখন জীবন রোদে পুড়ে খসখসে হয়,
তুমি শীতল মেঘ হয়ে নেমে আসো।
মা, তোমার কথা আজ নীরব,
তবু প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি দোয়ার ধ্বনিতে
তুমি উচ্চারিত হও— আগের চেয়েও বড়ো।
তুমি ঘুমিয়ে নেই,
তুমি হারিয়ে যাওনি,
তুমি শুধু অন্য আকাশে উঠে গেছ
আর সেখান থেকে আলো ছড়াচ্ছ
আমার পথের উপর।
যে পথ শিশুকালে তুমি ধরে দিয়েছিলে হাত,
আজও সেই হাত ধরে রেখেছ— অদৃশ্য হয়ে,
আমাকে ফেলে না দিয়ে,
আমাকে ভুলে না গিয়ে।
মা, তুমি স্বশরীরে নেই বলে
চোখে জল আসে—
কিন্তু তুমি হৃদয়ে আছ বলে
চোখ মুছে ফেলেও হাসি ফোটে।
কারণ,
মা কখনও মুছে যায় না,
মা শুধু আলো হয়ে থাকে—
চিরকাল… পরম যত্নে।
৪০. মা রাবেয়া খাতুন
মা,
তোমার নাম রাবেয়া খাতুন—
শুধু একটি নাম নয়,
এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম পাঠশালা।
তুমি যার কাছে বেতন নাওনি,
তারাই তোমার কাছে শিখেছে—
অক্ষর, স্বপ্ন আর মানুষ হওয়ার বর্ণমালা।
গ্রামের মাটির স্কুলঘরে
চকের ধুলোর গন্ধে মিশে আছে
তোমার নিঃস্বার্থ কণ্ঠের ধ্বনি—
“শেখো, জানো, বড়ো হয়ে ওঠো—
জীবনই সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা।”
শাড়ির আঁচলে বাঁধা ছিল বইয়ের ভার,
কিন্তু তোমার কাঁধে ভার ছিল না—
দানের মতোই ছিল শিক্ষা,
নিঃশব্দে বিলিয়ে দেওয়া এক সদকায়ে জারিয়া।
মা,
তোমার ক্লাসে শুধু পড়া পড়ানো হতো না,
সেখানে শেখানো হতো—
সত্য কথা বলা,
ছোটকে স্নেহ,
বড়োকে সম্মান,
আর প্রতিরাতে রবের কাছে ফিরে যাওয়া।
তারপর একদিন,
আল্লাহ ডাক দিলেন,
তুমি প্রস্তুত হলে—
হাজারো শিশুর দোয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে
হজ্জের সাদা ইহরামে জীবন লিখে
চলে গেছিলে কাবার ছায়ায়।
হাজারো মানুষের ভিড়ে
একজন তুমি,
তবু আল্লাহর কাছে
তুমি ছিলে অদ্বিতীয় এক প্রার্থনাকারিণী।
লাব্বাইক ধ্বনির স্রোতে ভেসে
তুমি ধুয়ে এসেছিলে
নিজের আত্মা নয় শুধু,
আমাদের পুরো পরিবারের ভাগ্য।
সেই হাত,
যে হাতে চক ছিল—
তাতে জড়িয়েছিল তাসবিহও।
সেই কপাল,
যে কপালে সিজদার নরম দাগ ছিল—
সে কপাল স্পর্শ করেছিল
বাইতুল্লাহর পবিত্র সালামের হাওয়া।
মা,
তুমি চলে যাওয়ার পর
স্কুলঘর হয়তো রঙ হারিয়েছে,
ক্লাসঘর হয়তো নীরব…
কিন্তু তোমার পড়ানো প্রতিটি অক্ষর
আকাশে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়,
তোমার আমল হয়ে জমা হয়
রবের খাতায়।
মা,
তুমি এই দুনিয়ার স্কুলে ছিলে অবৈতনিক,
কিন্তু আখেরাতের দরবারে
তুমি আজ মূল্যবান—
কারণ তুমি শুধু শিক্ষক ছিলে না,
ছিলে আল্লাহর এক দয়ার দূত,
যে দয়া দিয়ে মানুষ গড়ত।
আজ যখন জায়নামাজে বসি,
তখন মনে হয়—
তুমি আমার সামনে নেই,
কিন্তু তোমার মাকামের দিকে তাকিয়ে
ফিরেশতারা হাসেন,
আর আল্লাহ বলেন—
“বান্দা রাবেয়া, তুমি শিখিয়েছ আমার পথ,
আমি আজ তোমাকে দিচ্ছি চিরশান্তির গৃহ।”
মা,
যারা তোমাকে মা ডাকেনি,
তারাও তোমাকে মন থেকে মা জানে—
কারণ দুনিয়ায় কিছু মা থাকেন
যারা সবার মা হয়ে ওঠেন।
তুমি গেছ, তবু আছ—
রহমতের মেঘ হয়ে,
শিক্ষার আলো হয়ে,
হজ্জের পবিত্র স্মৃতি হয়ে,
আর দোয়ার কবুল দরজায়
এক উজ্জ্বল মিনার হয়ে।
মা রাবেয়া খাতুন,
তুমি শুধু পরপারে যাওনি,
তুমি পৌঁছে গেছ
আমার ঈমানের গোপন শক্তি হয়ে,
আর আমাদের দোয়াগুলোকে ডানা দিয়ে
চিরদিন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেওয়ার
এক পবিত্র ঠিকানা হয়ে।
৪১. কলাভবনের দিনগুলো
কলাভবনের পুরনো সিঁড়ি বেয়ে উঠতাম প্রতিদিন,
নরেন্দ্র বিশ্বাস স্যারের ক্লাসে জমে থাকত বিকেলের রোদ–ঘ্রাণ।
নাট্য স্বরে কথপোকথন , আলোচনার দীর্ঘ ঢেউ,
বন্ধুর কণ্ঠে ভেসে আসত হাসি, আর তর্কের গান।
লাইব্রেরি চত্বর ছিল নীরবতার সবুজ জগৎ,
বইয়ের পাতায় ঘুমিয়ে থাকত ইতিহাসের নীল নদ।
কখনো ক্লান্ত দুপুরে ঘাসে বসে ভাবনার আড্ডা,
জ্ঞান আর স্বপ্ন মিলেমিশে বুনত নতুন শুরু–পদ।
টিএসসির মেঝেতে পায়ের ছন্দ ছিল স্বাধীন,
চায়ের কাপে সাহিত্য, প্রেম, রাজনীতির মিশেল কথা।
কত সন্ধ্যা কেটে গেছে ব্যান্ডের সুরে আর ভিড়ে,
বন্ধুত্বের টানেই বুঝি হৃদয়ের সত্য প্রার্থনা।
বটতলার ছায়ায় বেজে উঠত জীবনের আলাপন,
কবিতা আর স্মৃতিরা ওখানেই হয়েছিল জাগ্রত।
পলাশ ঝরা দুপুর, কিংবা রাতজাগা ক্যাম্পাস হাঁটা,
সহপাঠীদের চোখেই খুঁজতাম নিজের প্রতিচ্ছবি দীর্ঘপথ।
আজ সময় বহুদূর, পথ ঘুরে গেছে অন্যখানে,
কিন্তু স্মৃতির দরজায় ডাক দেয় পরিচিত মুখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তুমি হৃদয়ের অনিঃশেষ ঠিকানা,
ফেলে আসা দিনগুলোতেই জমে আছে জীবনের সুখ।
৪২. অপেক্ষার হাহাকার
এখনও রাস্তায় হাঁটলে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—
কেউ একজন আসবে বলেছিল,
কিন্তু আসেনি কখনো।
চলে আসে সেইসব দিন,
যেদিন তার জন্য সাজিয়েছিলাম
অগণিত ছোট ছোট আয়োজন;
পুরোনো চিঠির ভাঁজে ভাঁজে
লুকিয়ে রাখা কবিতা,
সুন্দরতম শব্দমালা,
মুগ্ধ করা কয়েকটি মুহূর্ত,
হৃৎস্পন্দনের নিবিড় অনুরণন—
সব উঠে আসে একসাথে।
বুকের ভেতর কেমন এক হাহাকার,
ঠিক কষ্ট বলা যায় না,
কেমন যেন এক অচেনা ভার।
সবার চোখ এড়িয়ে
একলা রাতে
বালিশে মুখ গুঁজে থাকতে ইচ্ছে করে।
মনে হয়, হাতের সব কাজ ফেলে
স্টেশনের সেই কাঠের বেঞ্চটায় গিয়ে বসি—
শূন্য সন্ধ্যার মতো।
মনে হয়, বসন্তের ঝরে যাওয়া পাতার উপর
মর্মর শব্দ তুলে
হেঁটে হেঁটে
দূরে— আরও দূরে—
চলে যাই,
যেখানে কেউ অপেক্ষা করে না,
তবুও হৃদয়ের প্রতিটি ধ্বনি
কারও জন্য অপেক্ষায় থাকে।
৪৩. বৃষ্টি-ভেজা প্রতীক্ষা
আমার চোখ এখনও তাকিয়ে থাকে
সেই পথের দিকে—
যে পথে লতা-গুল্ম, শিশিরধোয়া ঘাস
চূর্ণ হয়ে আছে তোমার পদচিহ্নের নিচে।
তারপর একদিন আকাশ ভরেছে মেঘে,
ঝরেছে নিরন্তর জল,
পথের সব রেখা ভেসে গেছে
কাদার ঢেউয়ের অনুতাপে।
তবুও মেঘের নিচে
সেই কাদামাখা পথে
কেউ আর ফেরেনি—
একজনও না।
এত জল, এত অন্ধকার মেঘ—
ভিজে ভিজে আমি হাঁটি একাই,
হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে
জলধারার মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
হায়, আমার এই বৃষ্টি-ভেজা নিঃসঙ্গ ভালোবাসা
অনুভব করল না কেউ—
দেখল না কেউ—
শুধু আকাশ নেমে এসে
আমার কাঁধে রাখল
তার অনন্ত সান্ত্বনার হাত।
৪৪. গ্রহণ করেছি যত
প্রত্যন্ত ভোরের দোরগোড়ায়,
অলস কুয়াশার ভেতর দিয়ে
আদরের শেষ আলোটুকু ক্ষীণ হয়ে আসে—
সে তখন অর্ধনিদ্রায় ভেসে যায়,
কোমল নিঃশ্বাসের ঢেউয়ে
ঘুম আর জাগরণের মাঝেকার
এক বিস্মৃত অন্দরে হারিয়ে পড়ে।
আমি থাকি নিঃশব্দে।
এমন এক নীরবতা যেখানে
আমার নিশ্চিন্ত মুখের ওপর
সময় নিজের হাত রেখে
সান্ত্বনার আদেশ লিখে যায়।
দূর থেকে ভেসে আসে
রাগ-ভৈরবীর অস্পষ্ট সুর—
যেন আকাশের শিরায় শিরায়
ভোরের আলো জেগে ওঠার চেষ্টা করছে।
শিউলির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
নাকে নয়—মনের চারপাশে।
এই ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর, অনামা মুহূর্তটাই
তার পরম প্রাপ্তি—
আমার মুখের প্রশান্তি দেখে
তার সমগ্র ভেতরের জগৎ
নীরবে পুনর্বিন্যাসিত হয়।
সব গ্লানি ঝরে পড়ে,
সব আক্ষেপ ম্লান হয়,
চাওয়া-পাওয়ার সব রেখা
এক অনন্ত সাদা জায়গায় বিলীন হয়ে যায়।
সুখ কেউ খুঁজে ফেরে
ধনদৌলতের অগণিত আলোয়,
কেউ আবার খুঁজে পায় এমনই কোনও ক্ষণে—
যেখানে ভোরের রঙ জানে না
তার নিজস্ব নাম,
শিউলি জানে না সে কোথা থেকে ঝরেছে,
আর মুখের উপর রাখা শান্তি
নিজেই হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত, বিমূর্ত,
অবর্ণনীয় প্রাপ্তি।
৪৫. মায়ামুখের স্মৃতি
বিস্মৃতির ধুলোমাখা কত মুখ
এখনও ঘুম ভাঙায় আমার অন্তরে—
নরম কোনো নিশ্বাসের মতো
ভেসে আসে তাদের অবয়ব,
অপরাহ্নের আলোয় ধূলিকণার মতোই
ঝলসে উঠে মিলিয়ে যায়।
তাদের ডাক নিঃশব্দ,
তবু আমার বুকের গভীরতলে
হালকা শিহরণ তোলে—
যেন বহুদিন আগে রাখা
একটি ভেজা চিঠির গন্ধ
হঠাৎ ফিরে পায় জীবন।
অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অশ্রুগুলো
জানালার ধারে শিশিরের মতো জমে থাকে,
চোখের কোণে নরম ভেজা ঝিলিক—
তারা বলে দেয়,
ভুলে যাইনি আমি,
ভুলে যাওয়া তো কোনোদিনই পারিনি।
কিছু মুখের স্মৃতি
বাতাসেও বিলীন হয় না—
সে মুখগুলো ফিরে আসে
রাত্রির নিঃশব্দতার ভেতর দিয়ে,
স্বপ্নের কোমল আলো হয়ে,
স্মৃতির অদৃশ্য মায়াজাল বুনে।
আর আমি—
অঁচল ভেজা সেই নরম আলোয়
চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনি
সেই পুরোনো মায়ামুখদের
নীরব ডাক—
যারা হারিয়েও
ফিরে আসে অশ্রুকণার ছদ্মবেশে।
৪৬. নীরব অন্তরালের কবিতা
মানুষ আসে—
মুঠোভরা উষ্ণতা নিয়ে,
কিছু স্বপ্ন, কিছু আলো,
কিছু রোদের মতো হাসি সঙ্গে করে।
তারপর একদিন হঠাৎ
সময়ের কুণ্ডলী খুলে যায়—
অচেনা এক দরজায়
কাকে যেন ডেকে নেয় অদৃশ্য কোনো পথ।
জীর্ণ জীবনের মলিন পোশাকে
সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়
নীরব এক অন্তরালে,
যেখানে শব্দ নেই, কোলাহল নেই,
রয়ে যায় শুধু অসীম নিস্তব্ধতা।
হায়! মানুষ কোথায় যে চলে যায়—
কোন দূরতম পরপারের আহ্বানে
কোন অদ্ভুত স্বর্গ-ছায়ায়
লীন হয়ে যায় তার দগ্ধ দিনরাত্রি।
আমরা শুধু দেখি
তার হাঁটার শেষ রেখাটি—
যার পরে আর কোনো পায়ের ধ্বনি নেই,
কোনো ফিরে আসা নেই,
শুধু স্মৃতির দোলাচলে
অল্প কিছু আলো আর বেদনা বেঁচে থাকে।
মানুষ আসে, আবার চলে যায়—
অতঃপর থাকে না কিছুই,
থেকে যায় শুধু প্রশ্নভরা বাতাস—
আর আমাদের দু’চোখ ভরা
অচেনা এক শূন্যতার নীল।
৪৭. সায়াহ্নে
কত পথের ধুলো মেখে,
কত ক্লান্তির সিঁড়ি বেয়ে
যখন শেষমেশ তোমার দরজায় এসে দাঁড়ালাম—
দেখলে কি, আমার শ্বাস কত ক্ষীণ,
আমার সময় কত সামান্য?
জীবন যেন এক দগ্ধ প্রদীপ,
যার আলো এখনো ক্ষীণ সুরে কাঁপছে—
এই অল্প ক্ষণের ভিতর
কীভাবে বুঝাই তোমায়
আমার ভালোবাসার দীর্ঘ নদী,
যার উৎস অচেনা, যার স্রোত অনিঃশেষ?
আমি জানি, এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তে
হৃদয়ের সব রঙ দেখানো যায় না—
তবু তোমার চোখের গভীরে
আমার সমস্ত না-বলা ভালোবাসা
ধরে রাখতে চাই এক ফোঁটা নিঃশ্বাসে।
যদি সময় খুব কম হয়,
তবে আমার প্রেমকে সময় দিও—
তোমার মায়ার স্পর্শে
হয়তো সে দীর্ঘ হয়ে উঠবে,
হয়তো আমার সংক্ষিপ্ত জীবন
তোমার নিঃশব্দ আলিঙ্গনে
চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
৪৮. কুসুমপুরের কিশোরের স্বপ্নগাথা
কুসুমপুরে রুক্ষ বসন্তদিনে,
ঘুঘুডাকা নীরব অপরাহ্নে
এক কিশোর বসে থাকত পুকুরপাড়ে—
অকারণ, অথচ গভীর কোনো ডাকে।
সে জানত না তখনই
তার পথ বাঁক নেবে দূর শহরের দিকে,
ধুলি–ধূসর ঢাকা তাকে ডেকে নেবে
অপরিচিত মানুষের ভিড়ে।
শত আশাভঙ্গের বেদনা
জীবনের বিবর্ণ পৃষ্ঠায় জমে ওঠার পর
সে লিখতে শুরু করে
গল্প, কাব্য, আর ভাঙা দিনের মায়া।
এখনও সে হাঁটে পৃথিবীর
কণ্টকাকীর্ণ পথে,
স্বপ্নভরা এক ঝুলি কাঁধে—
যেন পথই তার সঙ্গী,
আর সঙ্গী তার সৃষ্ট চরিত্রেরা—
কমলিকা, অদিতি, মেহেরজান, রেবেকা,
রোহিত ও রঞ্জন—
সবাই মিলে তার একান্ত ভুবন।
সে ভাবে—
এই দেশের মানুষ
স্বচ্ছতোয়া নদীর জলের মতো
প্রীতিময় হবে পরস্পরে,
চিরহরিৎ অরণ্যের মতো
মুক্ত মনে বেঁচে থাকবে,
লাবণ্যঘেরা দিগন্তের মতো
উদারতায় ভরবে দিন,
পাখিডাকা কুসুমপুরের মতোই
সারল্যের আলোয় ভাসবে জীবন।
আর সে—
স্বপ্নের কিশোর—
এখনও হারায় না পথ,
শুধু স্বপ্ন দেখে যায়
নিঃশব্দ এক দৃপ্ত ভবিষ্যতের।
৪৯. হেমন্তের জনারণ্যে
আজ অনেকটা হঠাৎই দেখা হয়ে গেল দু’জনের,
শহরের পিচঢালা পথে, নিস্তব্ধ ল্যাম্পপোস্টের তলে—
যেখানে ভিড় থেকেও আলাদা ছিল এক টুকরো নির্জনতা।
আলো–আঁধারের মগ্ন সীমায় তোমাকে দেখলাম—
ঠোঁট শুষ্ক, দীর্ঘদিন যেখানে চুমুর আল্পনা আঁকা হয়নি,
বুকের আঁচল বিবর্ণ, সুগন্ধিহীন এক শীতল বিষাদের মতো—
মনে হলো, এ বুকে কত কাল কোনো আলিঙ্গনের শব্দ ঝরে পড়েনি।
আজ আর তোমার হাত ধরা হলো না,
মেহেদিহীন নখগুলোও যেন অচেনা হয়ে গেছে পথে—
হাঁটছিলাম এলোমেলো দুই সমান্তরাল নীরবতা হয়ে,
এভাবে তো হাঁটে না কোনো প্রেমিক–প্রেমিকা…
তবু আমি বারবার খুঁজে নিচ্ছিলাম তোমার চোখ—
সেই কাজলবেষ্টিত দীঘির গভীরতা আর নেই,
এখন সেখানে জলপড়া পাথরের কালচে নিস্তেজ আভা—
যে চোখকে কোনোদিন দুঃখ কিংবা অনাদরে ছুঁইতে দেইনি,
সেই তুমিই আজ ক্লান্ত, দীনহীনা, অভাগিনীর ছায়া হয়ে দাঁড়ালে।
পথেরা আজ লক্ষ্য করল না তোমার বিষণ্নতার পদধ্বনি,
অথচ এই শহরই তো একসময় আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী ছিল—
পার্কের পাখির ডাকে লেগে আছে কত চুমুর ইতিহাস,
বনের কাকাতুয়ার ডানায় জমে আছে কত আলিঙ্গনের গোধূলি।
আজ সে সবই ফিরে ফিরে আসে— নষ্ট নস্টালজিয়ার মতো।
কোনো কথা না বলে,
কোনো চুমু, কোনো আলিঙ্গন না রেখে—
এই হেমন্তের বিষাদসন্ধ্যায়,
জনারণ্যের অন্তরালে তুমি মিলিয়ে গেলে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম— তোমার ফেলে যাওয়া বাতাসে।
৫০. এপিটাফ
এখানে নক্ষত্রের মতো নিভে-না-যাওয়া শান্তিতে
শুয়ে আছেন কোয়েল তালুকদার—
কার্তিকের সোনালি আলোয় জন্ম,
যমুনা-পারের পলিমাটির আশীর্বাদে বড় হওয়া এক আত্মা।
মা রাবেয়া খাতুন—হৃদয়ে মানচিত্রের বিস্তার,
পিতা হারুন অর রশিদ তালুকদার—মাটি ও মানুষের স্থির প্রতীক।
তিনি চেয়েছিলেন কবি হতে;
হতে পারেননি—
তবু তাঁর জীবনই হয়ে রইল
এক অসমাপ্ত, দীপ্ত, চিরজাগরুক কবিতা।
যে বাতাস এই ফলকের ওপর এসে থামে,
সে যেন এখনো বলে—
“স্বপ্ন মরে না;
শুধু নতুন আলোয় ফিরে আসে।”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন