সোমবার, ৩১ জুলাই, ২০১৭

জ্যোৎস্না পড়ুক গায়ে

তার সাথে আমার কোনো রাগ নেই, কোনো অভিমানও নেই। তারপরও আমরা দুইজন দুইজনের সাথে ঠিকমতো কথা বলিনা। আজ রিক্সায় আসছিলাম ওর মামার বাড়ি থেকে । সারা রাস্তা সে আমার সাথে কথা বললোনা অথচ গোপনে গোপনে আমি তার চুলের গন্ধ নিচ্ছিলাম। উত্তরের এলোমেলো হাওয়ায় ওর মাথার এক গুচ্ছ চুল এসে পড়েছিলো আমার গালে। মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছিলো আমার চোখ। সে কি নির্বিকার ছিলো, নাকি সেও দেখছিলো এ সব।
একবার রমনা পার্ক থেকে বেরিয়ে মিন্টো রোড ধরে শেরাটনের দিকে আসছিলাম। বৃষ্টি নেই, রাস্তায় জল নেই, কোনো খানা খন্দক নেই। হঠাৎ শাড়ীর পাঁড়ে জুতা প্যাঁচ লেগে পা ফসকে পড়ে যাচ্ছিলো সে। আমি আমার শক্ত হাতে তার বাহু ধরে ফেলি। দেখলাম তিরিশ সেকেন্ড আমার বুকে সে আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে থাকলো। পথচারীরা সে দৃশ্য দেখে হতচকিত হয়ে উঠেছিলো।
প্রায়ই খাট ছেড়ে সে সোফার উপর যেয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর সে দেখতে পেতো, তার মাথার নিচে বালিশ রাখা আছে, আর শরীর তার চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি খাটের উপর ওপাশ ফিরে শুয়ে থাকি তখন। আমি জানি সে বিস্ময়ে দেখছিলো তার রাতের বেলার এই পরিবর্তনগুলো।
আবার কোনো কোনো দিন উল্টোটাও হয়। একদিন খুব ক্লান্ত্ হয়ে অফিস থেকে ফিরেছি। বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাই। যখন ঘুম ভাঙ্গে দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত দেড়টা। আমার চোখের চশমাটি সে খুলে ওয়্যারড্রবে রেখে দিয়েছে। বুকের উপর পরে থাকা পত্রিকাটি ভাঁজ করে সাইড টেবিলে রাখা। খাবার টেবিলে খাবার সাজানো রয়েছে। সে সোফায় বসে মাথা হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি বিস্ময়ে দেখছিলাম এসব। সে কি ঘুমের ভিতরে আমার এই বিস্ময় ভরা চোখ দেখতে পেয়েছিলো?
খাটের দুই পাশে দুইজন শুয়ে আছি। কথা বলিনা কেউই। মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব। সারাদিন অফিসে কাজ করেছি। ক্লান্ত ছিলো শরীর। তাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যাই। সে ওপাশ ফিরে হয়তো জেগেই ছিলো। রাতের শেষ প্রহরে যখন জেগে যাই, দেখি সে আমার বাহুর উপর মাথা রেখে বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার একহাত আমার পাজর জড়িয়ে রয়েছে। আমি নিঃশব্দে চোখ মেলে সবই দেখলাম। আমি জানি তার এই অবস্থাটি ঘুমের ঘোরে হয়েছে।
দেখা গেলো,ডাইনিং টেবিলে বসে একসাথে দুইজন খেতে বসেছি। আমার পাতের ভাত খাওয়া শেষ হয়েছে। সে আর দ্বিতীয় বার দিচ্ছে না। আমি চুপচাপ খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ি। দেখলাম সেও পূর্ণ খাবার না খেয়ে উঠে চলে গেলো।
সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার সময় টাইয়ের নট বেঁধে দেয়না। আমিও বলতামনা, তুমি বেঁধে দাও। অফিস থেকে বিকাল বেলা বাসায় এসে দেখি, সে আর সেদিন তার চুল বাঁধেনি। চোখে কাজল নেই। হাতের চুড়ি রিনিঝিনি করে বাজেনা।
কেন এই অস্বাভাবিক আচরণ তার? তখন আশ্বিনের মধ্য সময়। তাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। পরনে তার লাল পাঁড়ের সাদা শাড়ি। সেদিন ছিলো পূর্ণিমার রাত। বানের পানি নেমে গেলেও পুকুর ভরা ছিলো জল। সন্ধ্যায় আম আর কদম গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা গেলো। প্রগাঢ় আকুলতা দেখলাম তার ভিতরে। পুকুর পাড়ে বসে থাকবে সে, দেখবে পূর্ণিমার চাঁদ।
পূরানো কাঠের চেয়ার পেতে বসে আছি দুইজন। সে বলছিলো প্রথম কথা -- সারারাত বসে থাকতে ইচ্ছে করছে এইখানে!
আমি : আমার সারা জীবনই বসে থাকতে ইচ্ছা হয়।
আমি : একটা গান গেয়ে শোনাও না।
সে : আমি তো গান গাইতে পারিনা।
আমি : গুণ গুণ করে শুধু কথাগুলো শোনাও।
সে : ' একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে
ওগো বন্ধু কাছে থেকো, কাছে থেকো
রিক্ত আমার ক্ষুদ্র প্রাণে
তোমার আঁখিটি রেখো। '
আমি : এই গানটি আমার খুব প্রিয়। আমার এক বন্ধু এই গানটি খুব পছন্দ করতো।
সে : কোন বন্ধু? নাম কি?
আমি : মানসী
সে : কেমন বন্ধু?
আমি : ভালো বন্ধু!
সে : সে এখন কোথায়?
আমি : জানিনা কোথায়, হয়তো দূর পাহাড়ে সে ঘুরে বেড়ায়! অথবা চেঙ্গী ভ্যালীর বাঁকে বাঁকে।
সে : তুমি তাকে মিস করো?
আমি : করি।
সে : আমি আর এই গান কোনো দিন গাইবো না।
আমি : কেন?
সে : আমার আর চাঁদ দেখতে ইচ্ছা করছেনা।
এইটি তার রাগ না অভিমান আমি এই ব্যাপারে খুব কনফিউজড্। সে আমাকে যে পাগলের মতো ভালোবাসে এটা আমি বুঝতে পারি। আমি অনুভব করতে পারি সে আমাকে এক দন্ড না দেখে থাকতে পারেনা।
সেদিন ছিলো ছুটির দিন। দুপুরে খাবারের পর শুয়ে আছি। তাকে বললাম -- এসো, পাশে শোও। সে সোফায় যেয়ে শুয়ে পড়লো। তাকিয়ে দেখলাম, দুই চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তারও কিছু পরে সে ঘুমিয়ে যায়। আমি তার মুখখানি দেখছিলাম। কিছু দুঃখ সেখানে ছেয়ে আছে। সে এখনো নিতান্তই একজন বালিকা। ওকে তৈরী করতে হবে যে আমাকেই।
আমার আর ঘুম এলোনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। টেবিলের কাছে বসে লিখছিলাম ---' তুমি আগের মতো চুল বাঁধোনা কেনো মেয়ে? দুই বেনী বেঁধে খুকু হয়ে যাও। পায়ের আলতা তুলে আবার আলতা লাগাও। যখন তুমি আলতা উঠাও তখন তোমার পা আরো গোলাপী হয়ে যায়। আমি সুন্দর আলপনা আঁকতে পারি। এসো তোমার পায়ে আলপনা এঁকে দেই। আমি দেখছি তোমার আনত মুখ! ঐ মুখে দুঃখ রাখতে নেই। তুমি জেগে থাকলে তোমাকে নিয়ে তুরাগ নদীর পারে নিয়ে যেতাম। এই মায়াবী সন্ধ্যায় দু'জনে বসে থাকতাম তুরাগ নদীর তীরে। আজও তো পূর্ণিমা সেখানে। আমরা দেখতাম অসম্পূর্ণ সেই পূর্ণিমা তিথি। যা তুমি একদিন না দেখে চলে এসেছিলে। '
অনেকটা মন খারাপ করেই ঘর হতে বেরিয়ে যাই। পাশেই রেলস্টেশন। একাকী হাটতে হাটতে স্টেশনে চলে যাই। চা 'র দোকানে বসে চা খাই। একটা লোকাল ট্রেন স্টেশনে দাড়ানো ছিলো। ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ছেড়ে চলে গেল। আমি শুন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কতোক্ষণ। মনটা ভালো করতে পারলামনা। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে রাত নয়টার দিকে বাসায় চলে আসি।
ঘরে এসে দেখি সে একটা লাল পেঁড়ে সাদা শাড়ি পড়ে বিছানায় পা মেলে বসে আছে। সন্ধ্যা মালতী ফুল দিয়ে খোঁপা বাঁধা তার। কপালে কালো টিপ পড়েছে অপর্ণা সেনের মতো। আজ ওকে দেখে আর বালিকা মনে হলোনা। যেনো সে একজন সম্পূর্ণ রমণী। পাশে তার আলতার বাটি। সে বলছিলো -- 'পায়ে আলপনা এঁকে দাও। '
আমি তার পায়ে আলপনা এঁকে দেই। রাতে দুইজন পাশাপাশি শুয়ে আছি। জানালা দিয়ে পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছিলো ঘরে। আমি বলি -- 'জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আসি।' সে বলছিলো -- 'খোলাই থাক্। জ্যোৎস্না এসে পড়ুক আমাদের গায়ে! '

রবিবার, ৩০ জুলাই, ২০১৭

বাজিগর হতে চাইনা

হঠাৎ মধ্যেরাতে ঘোড়ার খটখট শব্দ
হঠাৎ প্রান্তর জুড়ে সাওয়ারের আওয়াজ,
এই রাতদুপুরে আমি বাপু কোনো বাজিগর হতে চাইনা 
তুমি ছুটে যাও তোমার মতো দিগ্বিদিক্।
এই ঘোর মধ্য প্রহরে তিমির আমাকে টানে
না আমি অশ্বারোহী নই
আমি বাজিগরও নই
আমার মাঝেই বসত তখন মধ্যরাতের এক মধুময়ীর ---
ধবল তুষারপাতের সময়ে আমি কোনো স্বপ্ন দেখিনা হৃদ মাঝেই তখন ঝন্ঝার মতো বেজে ওঠে
মাধুকরী এক হ্রেশ্বা ধ্বনি।

রক্তজবার লাল রং

রক্তজবা ফেরৎ দিলো রক্তের রঙ। সেও কি শুঁষে ফেলতে চেয়েছিল? পারেনি বলে আমাদের আজ শ্রাবন মাস। আহির গাঁয়ে যে-ফাগ উড়েছিল কানুকে একটু শুধু ছোঁবে বলে, তার প্রতিটি কণা ব্রজবালারা শুঁষে নিতে চেয়েছিল। পারেনি। কানু চলে গেল দ্বারকায়। সে তখন কৃষ্ণ। রাধা কেঁদে কেঁদে সব রঙ ধুয়ে দিয়েছিল বাদল মেঘের অঝোর ধারায়। সেও এক রঙ। রঙ ধুয়ে যাওয়ার রঙ। আর সে রঙ ধুলে যায়না। মাথা কুটে মরে গেলেও সে রঙ পিছু ছাড়েনা। 
সবাইকে রক্তজবার লাল রংএর শুভেচ্ছা।

আলোগুলো জ্বালিয়ে দাও

ধরুন আপনি মৃত্যু শয্যায় শুয়ে আছেন। আপনার শেষ বাক্যটি কি হতে পারে? কিংবা আপনি কি বলতে চান? আমি যে কথাটি বলবো বা ঐসময় উচ্চারিত হবে আমি কি তখন তা বুঝতে পারবো- সেইটি আমার শেষ বাক্য? আমি যতোটুকু জানি , মানুষ সেই সময়ে জীবনেও থাকেনা, মরণেও থাকেনা। সে এক বিষাদময় সন্ধিক্ষণ! আসলে কিছু কি বলতে পারবো তখন? কিংবা তারও কিছু আগে? হয়তো শেষ কথাটি হবে -- 'আলোগুলো এক এক করে নিভে যাচ্ছে কেন? সব আলো জ্বালিয়ে দাও। '
হয়তো কোনো কথাই বলা হবেনা। তার চেয়ে বরং সেই সময়ে কেউ যেনো আমার চোখের সামনে আমার মায়ের একখানা ছবি মেলে ধরে। সেই ছবিটি দেখতে দেখতেই আমার দুই চোখ যেনো বন্ধ হয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

সন্ধ্যার অরণ্যে

আমাকে টেনে নিয়ে যায় আমারই পথ 
ধূসর সেই পথে যে গথ চলে গেছে মনুষ্যহীন দূর অরণ্যে
তুমি হাত ছেড়ে দিয়েছিলে তারও আগে
বলেছিলে-- বিদায়!
সেদিন তুমি বলতে চেয়েছিলে আরো অনেক কথাই
বলতে চেয়েছিলে আমারই কানে কানে।
সেবার রিক্সাপথে মার সাথে গিয়েছিলাম মামাদের বাড়ি
বাবার ছিলো খুব অসুখ, রেখে যায় তাকে
সারা রাস্তা মা ভেবেছিলো বাবার কথা
তার ক্রন্দনহীন নিরব চোখ
উদাস হয়ে তাকিয়েছিলো আমাদের দিকে ।
আজ এই নির্জন সন্ধ্যায় আমি চলে যাচ্ছি
আমারই পথ ধরে বাবার সেই ক্রন্দনহীন চোখের মতো
যে পথে এর আগে আমি হাঁটিনি কখনো
প্রিয়তমা, আমার যে অনেক পথ যেতে হবে
অন্তহীন সে পথ, হাটতে হাটতে যদি ক্লান্তি আসে
আমি যেনো সেথায় পৌঁছার আগে ঘুমিয়ে না যাই।

পৃথিবীর শেষ মানুষ

যদি এমন হয়, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একে একে সবাই মারা গেছে। শেষ মানুষটি হিসেবে আমিই কেবল বেঁচে আছি। তখন কেমন লাগবে আমার? এতো বড়ো পৃথিবীটা শুধু আমারই হবে। আমি হবো এর মালিক। বলুন, সেই পৃথিবীর কি কোনো মূল্য থাকবে ?
সারা পৃথিবী তখন নির্জন নিরালা হয়ে রইবে। কোথাও একজন মানুষও নেই। ক্লান্ত প্রাণে একাকী শুয়ে থাকবো ঘরে। নির্ঘুম চেয়ে রইবো শূন্যতার দিকে। চোখে ঘুম নেই। সেই গভীর রাতে হঠাৎ যদি কেউ এসে ঘরের দরজায় নক্ করে, আর যদি দরজা খুলে দেখতে পাই-- আমারই প্রিয় মানুষটি বাইরে দাড়িয়ে আছে । তখনকার সেই অনুভূতিটি কেমন হবে, বলুনতো?

একাকী সী-গাল

ক্যাপ্টেন সাহেব যখন বাসায় আসলেন তখন রাত্রি বারোটা। তার স্ত্রী কুমকম মির্জা তখন সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ক্যাপ্টেন জুতার খটখট শব্দ তুলে সোজা বেডরুমে চলে যায়। তার পায়ের শব্দে কুমকুমের ঘুম ভেঙে যায়। কুমকুম যেয়ে দেখে তার স্বামী সু পায়ে দিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়েছে এবং চোখ বন্ধ করে রয়েছে। কুমকুম তাকে ডাকলো কিন্তু সে আর উঠলোনা। এতোক্ষণ কুমকুম না খেয়েই তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। সেই রাতে কুমকুমের আর খাওয়া হলোনা।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ঝরঝর বৃষ্টি হচ্ছিল। কখনো হালকা দমকা বাতাস। দেয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে থাকে কুমকুম, একে একে রাত বারোটা, এক টা, দুই টা বেজে গেলো। তারপর এক সময় ডাইনিং টেবিলে মাথা রেখে কুমকুম ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের আলোছায়ার ভিতরে ক্যাপ্টেন রেইনকোট গায়ে দিয়ে বৃষ্টিমুখর রাতে একাকী বড়ো রাস্তা থেকে হেটে হেটে বাসার গলিতে প্রবেশ করে। বাসার দরজায় যখন নক্ করে তখন রাত্রি আড়াইটা। কুমকুম দরজা খুলে দেয়। ক্যাপ্টেন সোজা বেডরুমে চলে যায়।
কুমকুম: খাবেনা তুমি?
ক্যাপ্টেন : না, খেয়ে এসেছি।
কুমকুম নিজেই আজ স্বামীর পায়ের জুতা খুলে দেয়। ক্যাপ্টেন বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। আজ রাতেও আর কুমকুমের খাওয়া হলোনা।
সকালে যখন ক্যাপ্টেন বেরিয়ে যায়, তখন সে কুমকুমকে বলে - দুই দিন বাসায় ফিরবোনা।
কুমকুম : কেন, কোথায় যাবে?
ক্যাপ্টেন : মংলা পোর্ট, খুলনা।
কুমকুম : আমার একাকী ভালো লাগেনা।
ক্যাপ্টেন শুনলো কিনা সে কথা,বোঝা গেলোনা। সে কোনো কথা না বলে গলির পথ দিয়ে হেটে হেটে বড়ো রাস্তার দিকে চলে গেলো। কুমকুম শুধু তার স্বামীর চলে যাওয়াটাই দেখলো। কিন্তু ক্যাপ্টেন পিছনের দিকে আর ফিরে তাকালোনা।
ক্যাপ্টেন মংলা থেকে এসে তিন দিন ঢাকায় ছিলো। এই তিন দিনও সে অধীক রাতে বাড়ী ফিরেছে। এই তিন দিনও কুমকুম স্বামীর জন্য অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। কখনও ঘুমে কখনও নির্ঘুমে বসে থেকেছে। ক্যাপ্টেন এবার পাঁচ দিনের জন্য চট্টগ্রাম পোর্টে চলে যায়। চট্টগ্রাম থেকে যথারীতি আবার ঢাকায় চলে আসে।
একদিন ক্যাপ্টেন সকালে নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার জন্য বের হবে, তখন কুমকুম স্বামীর কাছে এসে বলে - কখন ফিরবে বাসায়?
ক্যাপ্টেন : কেন? আজও রাত হবে।
কুমকুম : তুমি বাসার চাবিটি তোমার কাছে রাখো।
ক্যাপ্টেন : কেন?
কুমকুম : আমি একটু বড়ো আপার ওখানে যাবো। আজ নাও আসতে পারি।
ক্যাপ্টেন : ঠিক আছে, চাবি দাও।
ক্যাপ্টেন আজ রাতে যখন বড়ো রাস্তা দিয়ে একাকী হেটে হেটে গলিতে ঢুকেছিল, তখন মহল্লায় বিদ্যুৎ ছিলোনা, আজকের আকাশে কোনো চাঁদও নেই । রাত তখন বারোটার উপরে বাজে। নির্জন অন্ধকারে শুধু তার জুতার খটখট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। জনশূন্য রাস্তায় হাটতে হাটতে সে বাসায় চলে আসে। প্রতি দিনের মতো আজও সে দরজায় নক করে। কিন্তু ভিতরে থেকে কেউ দরজা খুলে দিলোনা। হঠাৎ তার মনে হলো, ঘরের চাবি তো তারই কাছে!
তালা খুলে ক্যাপ্টেন যখন ঘরে প্রবেশ করে, দেখে ভিতরে নিঃসিম এক আঁধার। দিয়াসলাই দিয়ে সে আলো জ্বালায় একবার। কিন্তু সে আলো নিভে যায়। অন্ধকারেই সোফার উপরে যেয়ে বসে পড়ে। প্রায় তিরিশ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে আসে। সে রুমের সুইসগুলো জ্বালিয়ে দেয়। বুকের ভিতরে শুন্যতায় হূহু করে ওঠে। আজ আর কেউ অপেক্ষায় নেই। টেবিলে কোনো খাবারও রেডী নেই। সে খেয়েও আসে নাই। রাতে তার আর খাওয়া হলোনা। পায়ের জুতোও কেউ খুলে দিলোনা। জুতা পায়ে রেখেই সে বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়ে এবং ঘুমিয়ে যায়।
সকালে ক্যাপ্টেনের যখন ঘুম ভাঙে তখন আর সকাল ছিলোনা। অনেক বেলা হয়ে গেছে তখন। বিছানা থেকে উঠে বসে সে। বালিশ সরাতে যেয়ে দুই বালিশের মাঝে সে একটি চিঠি দেখতে পায়। চিঠিটি কুমকুমের লেখা।
'' প্রিয়তম, মনকে তৈরী করছিলাম অনেক দিন ধরে। তুমি আমাকে একটা মুহূর্ত বুঝতে পারোনি। অসীম একাকীত্ব আর তোমার অবহেলা প্রতিদিনই তোমার থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজ আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। তুমি আমাকে কোনোদিন খুঁজবেনা। সন্ধ্যায় বাসার সামনে গলি আর বড়ো রাস্তা পর্যন্ত আমি আজও তাকিয়েছিলাম। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন তোমার চলে যাবার দিকে আমি তাকিয়ে থাকতাম। একটু পর চাঁদহীন এই রাতে এই পথ দিয়ে হেটে হেটে আমি অনেক দূর চলে যাবো। অথচ তুমি আমাকে দেখতে পাবেনা। "
অনেক বেলা করেই ক্যাপ্টেন আজ ঘর হতে বের হলেন। বাসার সামনে গলিতে নামতেই দেখে ঠিক সামনের বাসার কাছে কতোগুলো মানুষের ভীড়। জানতে পারে সাবলেটে থাকা এক যুবক গতরাতে কাউকে কিছু না বলে চলে গেছে। ক্যাপ্টেন মুহূর্তে বুঝতে পারে পুরো ঘটনাটি। এরপর দিন কয়েক ঐ বাড়িতে ক্যাপ্টেন ছিলো। তারপর সে ঐ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।
যে থাকে, যখন থাকে, অন্তরে অন্তরেই থাকে। বোঝা যায়না তা। সে ভালবাসা অনেক সময় দূরেরও হয়ে যায়। সে তখন প্রকৃতই একা হয়। বড়োই মায়া হয় ক্যাপ্টেনের জন্য। কিন্তু কুমকুমের জন্য নয়। কী আশ্চর্য! কেন? অথচ তারই তো সহানুভুতি প্রাপ্য ছিল। তবু কেন জানিনা বৃষ্টি নামলে আজও ক্যাপ্টেনকেই মনে পড়ে। হতভাগ্য একজন মূর্খ দুঃখী। আজও সে না জানি কোন বন্দরের সোঁ সোঁ লোনা হাওয়ায় সী-গালের ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে। বুড়ো চামড়ার গালে অনেকদিনের দাড়ি। কেউ একবারও তাকে বলেনা, এত কষ্টভোগের পরও তুমি তাকেই চাও? যাকে কারণে অকারণে এত অবহেলা করেছিলে?
ক্যাপটেন কি কাউকে জবাব দেয়? নাকি বালির ওপর অস্তসূর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হেটে হেটে সে কোনো অচিনপুরের দিকে চলে যায়?