বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১

প্রাণের হিল্লোলে এসো - ২

পর্ব -- ২

মেঘালয়ের লুসাই পাহাড়ের কোল থেকে ধিতাং ধিতাং বালিকার মতো এঁকেবেঁকে একটি নদী চলে এসেছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দিকে। ওপারে ওর যেই নামই থাক, এপারে এই নদীটির নাম কর্ণঝরা। কর্ণঝরার আরও কতগুলো বোন আছে, যারা একই মায়ের গর্ভে জন্ম। ওদের মা'ও লুসাই পাহাড়। এই লুসাইয়ের অন্য মেয়েরা হচ্ছে ভোগাই, কংস ও সোমেশ্বরী। 

লুসাই থেকে মেঘ বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ে কত ঝর্ণা যে নদী হয়েছে। পাথর, বালু,মাটি, বৃক্ষ, লতাগুল্ম চিরে চিরে বয়ে এসেছে তারা সমতলের দিকে। কত হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এই স্রোতধারা, কে তার কতটুকু জানে। এরই একটি ধারা কর্ণঝরা। এই কর্ণঝরা নদীর তীরে ছবির মতো একটি গ্রাম নাম তার হাঁসুলিগাঁও। 

আমি সেই হাঁসলিগাঁওয়ের মেয়ে কঙ্কণা। 

আমাদের বাবা চাচা'রা ছিলেন বিত্তবান কৃষক পরিবারের মানুষ। গোলাভরা ধান ও পুকুর ভরা মাছ ছিল আামাদের। আমাদের বাড়ি ছিল ফুলে ফলে বৃক্ষ শোভিত। ছিল নানা জাতের ঔষধি গাছও। বাড়ির সামনে পুকুর। পুকুরের পর শস্য ক্ষেত। তারপর কর্ণঝরা নদী। 

এই নদীর পারে আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। বালিকা এখানে গোল্লাছুট খেলতো। মাথার দু'বেণী দুলিয়ে এক্কা দোক্কা খেলতো। আমগাছের পাতা আর বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সন্ধ্যা রাত্রিতে 'পলাতকা' খেলা খেলতো খেলার সাথীদের সাথে। খেলতে খেলতে একদিন বালিকা তরুণী হয়ে উঠল। 

আমাদের বাড়ির উঠোনের একপাশে ছিল ফুলের বাগান। ওখানে ছিল বিভিন্ন রকমের ফুল। জুঁই, কনকচাঁপা, রক্তজবা, কামিনী, গাঁদা, বেলী, গন্ধরাজ, সন্ধ্যা মালতী ও রংবেরঙের পাতাবাহার। লোকে বলত কঙ্কণা নাকি ঐ বাগানের একটি ফুল। কেউ বলত আমি নাকি কনকচাঁপার মতো দিনে দিনে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছি। কেউ বলত কঙ্কণা একদম রক্তজবার মতো রক্তিম। কেউ বলত সন্ধ্যামণির মতো সুবাসিত। 

পড়তাম গ্রামের স্কুলে। কোনো বালিকা বিদ্যালয় তখন ছিল না ওখানে। আমাদের স্কুলে ছেলেমেয়ে একসাথে পড়াশোনা করত। তবে নিয়ম ছিল কঠিন। মেয়েরা কথা বলতে পারত না ছেলেদের সাথে। কমনরুম থেকে স্যারদের পিছে পিছে ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে আবার কমনরুমে ফিরে আসতাম। কোনো ছেলের সাথে কথা বললে অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হতো। স্কুল থেকে বের করে দেওয়ারও নিয়ম ছিল। তাই কারোর সাথে কথা বলার সাহস করতাম না আমি। 

আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন আমাদের ক্লাসে একজন নতুন ছাত্র এসে ভর্তি হয়। ছেলেটি দূর গ্রামের। গরীব দিনমজুরের ছেলে। প্রায় তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসে ক্লাস করত। ছেলেটি ছিল মেধাবী। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে।  ছেলেটির গায়ের রং শ্যাম বর্ণ। চুল কোঁকড়ানো। লিকলিকে লম্বা ধরনের। চোখ দুটো মায়াময়। কেন জানি দূর থেকে দেখে ছেলেটিকে আমার খুব ভালো লাগল।  

আমি ক্লাসে বসে ছেলেটিকে চুপিচুপি  খুঁজতাম কোথায় কোন্ বেঞ্চে বসে আছে। হয়ত দেখতে পেতাম কোনো কোনো দিন। আবার দেখা পেতাম না কোনো দিন। যেদিন দেখতে পেতাম না সেদিন খুব মন খারাপ করে বাড়ি চলে আসতাম। পথে আসতে আসতে পা চলত না, পা অবশ হয়ে থেমে যেত পথের উপরে। মনে হতো, আহা!  ঐ ছেলেটি এসে যদি আমার সাথে পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটত, তবে পথের উপর এমন করে পা আমার থেমে যেত না। 

বাড়িতে খুব মনমরা হয়ে থাকতাম। কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। মা জিজ্ঞাসা করত -- কঙ্কণ, তোমার কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগে? '
আমি বলতাম -- না মা, কিছু হয়নি আমার। 

আমি যে ঘরে শুতাম, ঠিক আমার বিছানার পূর্ব দিকে একটি জানালা আছে। জানালার একপাশে লাগোয়া পড়ার টেবিল। আমি একদিন সন্ধ্যা রাতে হেরিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। পড়ার মন বসছিল না!  জানালাটা খুলে দেই। দেখি - বাইরে আলো আর অন্ধকার একসাথে মিশে আছে। আঁধারের মাঝে যে আলো তা ছিল চাঁদের আলো। রাতের আকাশ যেন ছুঁয়ে আছে নিঃশব্দে আকন্দ গাছের ঝাড় পাতায়। জ্যোৎস্নার এই  চন্দনমাখা স্বর্গীয় ক্ষণে চোখ মেলে অনেক দূরে আবছা আবছা দেখতে পেলাম ঐ ছেলের মুখ, রাতের তারার মতো চেয়ে আছে যেন আমারই দিকে। এই বিরাট আলো আঁধারের  বিশ্বজগতে কতকিছুই অদৃশ্যমান, কত প্রাপ্তিতা অপ্রাপ্তি হয়ে হারিয়ে যায়। একজন অবুঝ তরুণী কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে কী চেয়ে বসল বিধাতার কাছে, তা কী বিধাতা আমার করে দেবে? 

দূরে কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসছিল শীতল বাতাস, জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল কাঁচা দুধের মতো ফিনকি দিয়ে জোছনা। কাউকে দু'কলম লিখতে ইচ্ছে করছিল খুব। কোনো কবিতা বা গানের পংক্তি নয়, ছোট্ট একটি চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে। ভাবছিলাম, একটি চিঠি লিখে রাখি কাছে। বইয়ের পাতায় সেই চিঠি গোপনে রেখে দেব। যদি কখনও সুযোগ আসে চিঠিখানি দিয়ে দেব ঐ ছেলেকে।

কল্যাণীয়ষু

খুব ভালো লাগে তোমাকে। এত ভালো লাগে যে, জনম জনম তোমাকে কাছে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছা করে। তুমি এসো গো আমার জীবনে। 'প্রাণের হিল্লোলে এসো'। জনম জনমকাল ধরে অপেক্ষা করব।

-- কঙ্কণা। 


হেরিকেনের পুষ্পিত আলোয় কী লিখলাম! অক্ষরগুলো ফুটে হয়ে আছে যেন কনকচাঁপাপুষ্পবর্ণাভা। বাইরে তখন চাঁদ ডুবছে নিভছে। চরাচর জুড়ে বিষণ্ণ আঁধার আর ম্লান আলো। আকাশের তারা'রা জ্বলছে নিভছে। কর্ণঝরা নদী থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস হঠাৎ থমকে গেল যেন । কুমারী মেয়ের কুন্তলের মতো  নৈঃশব্দ্য এসে ঘরটি ভরে গেল। বুকের তলায় দীর্ঘশ্বাস জট পেকে ধরল। আকাশে কোথাও আর দেখতে পেলাম না মণিনীল নক্ষত্র। 

( চলবে) 




প্রাণের হিল্লোলে এসো

পর্ব - ১

একদিন আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটি ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটি ছিল একটি মেয়ের। মেয়েটি লিখেছে -- "আমার নাম কঙ্কণা। কেউ কেউ আমাকে কঙ্কণ ও কঙ্কা বলে ডাকে। একজনই শুধু আমাকে কঙ্কাবতী বলে ডাকতো সে কোন্ জন তা পরে একদিন  আপনাকে বলব। 

তার আগে বলে নেই, আপনি আমাকে চেনেন না। কোনোদিন দেখেননিও। আমিও আপনাকে দেখেনি। ফেসবুকে আপনার লেখা আমি পড়ি। আপনি অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প লিখেন, আমি আপনার একজন মুগ্ধ পাঠিকা।  আপনার অনেক গল্প আমি বহুবার পড়েছি। কত গল্পে আপনি যে আমাকে কাঁদিয়েছেন। সে কান্নার কথা কেউ জানেনা। আপনিও না।

আপনার গল্প পড়ে পড়ে মনে হয়েছে আমার কিছু কথা আপনাকে বলব। আমার জীবনের কিছু কথা আপনার গল্প হয়ে থাক্। আমি গল্পকার নই, নই কথাকারও। আপনার মতো করে গুছিয়ে আমি লিখতে পারব না আমার কথা। তাই আপনার কাছে এই লেখা, আমার এই নিবেদন।... "

আমি কঙ্কণাকে উত্তরে লিখলাম -- আমার কাজই তো মানুষের জীবন কাহিনি নিয়ে গল্প কিংবা উপন্যাস লেখা। আপনি বলতে পারেন দ্বিধাহীন ভাবে সব কথা। আমি আপনার জীবন কথা নিয়ে লিখব গল্পকথা। 

কঙ্কণা লিখল -- " আমি হয়ত সব কথা একদিনে একই সময়ে লিখতে পারব না। দু একদিন পরপর বলব। আর আপনি যেন বিরক্ত না হন।... "

আমি বললাম -- আপনি যে রূপ মনে করেন, যেভাবে বলতে চান, সেইভাবেই লিখবেন। আর আমি লিখব আপনার কথা গল্পের মতো করে। সত্য বললে সত্য কথাই  লিখব, মিথ্যা বললে মিথ্যা কথাই লিখব। 

আমি কঙ্কণাকে আরও বললাম -- সবচেয়ে ভালো হয়, আপনি আপনার কথাগুলো এখানে লিখে রাখবেন আপনার সুবিধা মতো সময়ে। আর আমি আমার সুবিধা মতো সময়ে আপনার কথাগুলো পড়ে গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করব। 

কঙ্কণা লিখল -- আচ্ছা, তাই হবে। তবে একটা ব্যাপারে আমাকে মার্জনা করবেন তাহলো -- আমার প্রকৃত পরিচয়টি আমি ইচ্ছা করে গোপন রাখছি আপনার কাছে। যদি কখনও মনে হয় আমার প্রকৃত পরিচয় আপনাকে বলা দরকার, -- তখন বলব আমার পরিচয়। আপনি যেন তার আগে জানতে না চান আমার পরিচয় । তাহলে আমি খুব বিব্রত হবো। 

আমি কঙ্কণাকে বললাম -- তাই হবে। আপনি আমার কাছে শুধু কঙ্কণা। কঙ্কণ, কঙ্কা কিংবা কঙ্কাবতীও নন্। আমি আপনাকে আমার গল্প লেখা পর্যন্ত কঙ্কণা বলেই ডাকব, কঙ্কণা বলেই জানব। আপনার কথা বলা যেদিন শেষ হবে, আর আপনার কথাগুলো নিয়ে আমার গল্প লেখাও যেদিন সমাপ্ত হবে , সেদিন থেকে এই নাম, এই কঙ্কণা উপাখ্যানও আমার কাছে শেষ হয়ে যাবে। আপনি হারিয়ে যাবেন আপনার পৃথিবীর কোনো জনারণ্যে। আর আমি হারিয়ে থাকব, অন্য কোনো এক কঙ্কণার জীবন কাহিনি নিয়ে গল্প লেখার জগতে। আপনার সাথে এই কথকতা, রাত জেগে আপনার এই কথা শোনা, আর আপনাকে নিয়ে এই গল্প লেখারও পরিসমাপ্তি ঘটবে।

কঙ্কণা লেখে -- এমন করে বলবেন না। খুব কোমল প্রাণের মেয়ে আমি। কোনো কিছুতে একটুতেই আমার কান্না পায়। 

আমি বললাম -- ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব আমার কোনো আচরণে আপনাকে যেন কাঁদতে না হয়। তো, শুরু করুন আপনার জীবন কাহিনি বলা...। 

কঙ্কণা লিখল -- ঠিক আছে, আমি লিখে রাখব আমার কথা এখানে। তবে জীবনের সব কথা তো লেখা সম্ভব না। আমি লিখে রাখব জীবনের কিছু খণ্ডিত অধ্যায়ের কথা। কিছু সুখ দুঃখের কথা, কিছু বঞ্চনা ও আক্ষেপের কথা।... 

কঙ্কণার সাথে সেদিনের মতো ম্যাসেজিং শেষ হয়। 

একদিন দেখি -- কঙ্কণা ওর কিছু কথা লিখে রেখেছে। অনেকটা পয়েন্ট আউট করে লিখেছে। কথাগুলো  এলোমেলো ও অগোছালোও। অনেক কথার ইঙ্গিত আছে, কিন্তু বর্ণনা নেই।  সংলাপগুলোও কেমন ভাঙা ভাঙা। 

আমি কঙ্কণার সেদিনের কথাগুলো গুছিয়ে গল্পের মতো করে এখানে লিখলাম। কঙ্কণা যা লিখেছে  সব ঠিক আছে। শুধু প্রকৃতি, নিসর্গ, মানুষ, স্থান, কাল, পাত্র একটু হেরফের করা  হয়েছে। কঙ্কণা যা লিখেছে ঠিক তেমনটি নয়। আমার ধারণা কঙ্কণাও ইচ্চাকৃতভাবে অনেক কথা আড়াল বা গোপন করার চেষ্টা করেছে। আমি কেবল কঙ্কণার কথাগুলো, উত্তম পুরুষে কঙ্কণার হয়ে এখনে লিখলাম। 

চলবে --


রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

এক রাজকন্যার গল্প

এক রাজকন্যার গল্প /

আমার মেয়ে আমার হাত পায়ের নোখগুলো নেইল কাটার দিয়ে কেটে দিতে দিতে বলেছিল-

'কাল আমার বিয়ে। কাল আমাকে শ্বশুর বাড়ি চলে যেতে হবে। আমার যাবার সময় তুমি একটুও কাঁদবে না। তুমি কাঁদলে আমি কিন্তু হাউমাউ করে কেঁদে ফেলব। আমি তখন আর শ্বশুর বাড়িতেই যাব না।'

আমি মাথা নেড়ে বলছিলাম -- না মা, আমি কাঁদব না একটুও। তুমি দেখে নিও।

বিয়ের দিন সানাই বাজল। বর আসল। বর যাত্রীরা এল। কত হৈহুল্লর হলো। কত আনন্দ, কত রকম খাওয়া দাওয়া হলো। কোথাও কোনো দুঃখের লেশ নেই। চারিদিকে কেবল হাসি রাশি। কোথাও কোনো ক্রন্দন ধ্বনি নেই।

যথারীতি মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় হলো। বিদায়কালীন আমার মুখে কোনো বেদনার ছায়াপাত পড়ল না। চোখে মুখে আনন্দময় হাসি। আমার হাসি মুখ দেখে মেয়েও তার মুখখানিতে হাসি মেখে রেখেছে। কোনো কান্না নেই। চোখ থেকে একবিন্দু অশ্রুও ঝরে পড়ল না। আগত অতিথিদের কেউ কেউ সমালোচনা করে বলল - কেমন বাবা মেয়ে! কারোর চোখে জল নেই।

মেয়েকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে ঘরে চলে আসি। আর মেয়েও হাসি মুখে ওর শ্বশুর বাড়ি চলে গেল।

বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছি। কেমন নিঝুম সারা ঘরময়। মুহূর্ত পরেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে মেয়ের কিছু কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। যে কথাগুলো গত চার পাঁচ দিন ধরে আমাকে বলে এসেছে। আমি খুব কানের কাছে থেকে ওর এই কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম --

' বাবা, তুমি ঔষধগুলো সময়মতো খাবে। ভুলে যাবে না। কখন কোন্ ঔষধ খাবে আমি কাগজে সব লিখে রেখেছি। সাজিয়ে রেখেছিও ঐ ভাবেই৷'

' মশারী টানাতে ভুলবে না। আমি সুন্দর করে মশারী টানানোর ব্যবস্থা করে রেখেছি। '

' সুমীর মাকে বলে গেছি, উনি তোমাকে গোসলের পানি গরম করে দেবে। কখনও ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করবে না।'

' তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল ভালো করে মুছবে। ভেজা চুল আঁচড়িবে না।'

' বেশি রাত জাগবে না কখনও, সময় মতো ঘুমিয়ে পড়বে।'

' ট্রাঙ্ক খুলে পুরনো এ্যালবাম বের করে মা'র ছবি একাকী বসে দেখে দেখে কাঁদবে না।'

' ময়লা কাপড়গুলো বালতিতে রেখে দিও। সুমীর মাকে বলে গেছি -- দুতিন দিন পর পর সে পরিষ্কার করে রেখে যাবে। '

' খাওয়া নিয়ে অনিহা করবে না। সময়মতো খেয়ে নেবে।'

' এক দুটো সিগারেট খাওয়ার অনুমতি দিলাম। এর বেশি একটিও খাবে না। '

'আমি মাঝে মাঝে এসে তোমাকে দেখে যাব। তুমি কোনো অনিয়ম করেছ কী না, অনিয়ম করলে আমি কিন্তু তোমাকে দেখলেই ধরতে পারব।'

' হাত পায়ের নখ বড়ো হয়ে গেলে আমিই এসে কেটে দিয়ে যাব। তুমি কাটতে যেও না।'

' আর... পানি খেতে ভুলো না। শিয়রে জগের ভিতর পানি ভরে রাখবে সবসময়। '

' আমি যা বলে যাচ্ছি, সেই সব কথা মনে রাখবে এবং পালন করবে। আমার মাথা ছুঁয়ে তুমি দিব্বি দাও, বলো -- শুনবে সব কথা।'

এই রকম ওর আরও অনেক কথা শূন্য এই কক্ষের ভিতর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। দেখলাম -- আমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বালিশ ভিজে যাচ্ছে।

মেয়েটা আমার হারানো মা এবং স্ত্রীর শূন্যতা কখনো বুঝতে দেয়নি একটুও। আজ যেন মনে হচ্ছে -- ঐ দুজনসহ তিনজনকে আমি হারিয়ে ফেললাম।

এই পৃথিবীতে মেয়েরা বাবার কাছে রাজকন্যার মতো, আর বাবাও যেন মেয়ের কাছে রাজার মতো বেশ থাকে। পৃথিবীর কোনো রাজাই রাজ্য হারিয়ে মনে হয় কাঁদে না, কিন্তু রাজকন্যা হারিয়ে কাঁদে।

এই যেমন আমি কাঁদছি।

~  কোয়েল তালুকদার

বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০

রোড টু কুসুমপুর

রোড টু কুসুমপুর 

এই ঘটনাটি গত শতাব্দীর আশির দশকের কথা।সালটি ছিল ১৯৮৯ ইং।  

সেদিন ছিল ছুটির দিন। আমি বাসায়ই ছিলাম। মনটা কেমন যেন এলমেল লাগছিল।  ঠিক সেই সময় আমাদের গাঁয়ের কালাম এসে খবর দিল-- মা নাকি খুব অসুস্থ। কালাম টঙ্গীতে একটি কারখানার ফোরম্যান এর চাকুরি করে । ছুটি কাটিয়ে ও বাড়ি থেকে আজই এসেছে। পরের দিন আমার অফিস। ছুটি নেবার সময় নেই। মায়ের অসুস্থতার কথা  শুনলে পৃথিবীর বাকি সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়।  তখন বেলা  দুইটা বাজে।  আমি আর দেরি না করে সোজা আব্দুল্লাহপুর বাস স্ট্যান্ডে চলে যাই। 

রোড টু কুসুমপুর,  সিরাজগঞ্জ।  

বাস ছাড়তে ছাড়তে তিনটা বেজে যায়। সময় হিসাব করে দেখলাম -- টাংগাইলের ভূয়াপুরের চর গাবসারা লঞ্চ ঘাটে পৌঁছতে সন্ধে সাতটা বেজে যাবে।  হলোও তাই। বাস যখন চর গাবসারা যমুনা নদীর তীরে এসে পৌঁছে তখন সাতটা পঁচিশ বেজে যায়।  দিনের  শেষ লঞ্চ ঘাটে নোঙর করা আছে। আমি দোতালায় ছোট্ট কেবিনে যেয়ে বসি। 

রাত্রি আটটার দিকে লঞ্চ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে চলে আসে। আশ্বিনের রাত্রি।  অন্য কোনো সময়ে হলে লঞ্চের ছোট্ট কাঠের কেবিন থেকে বেরিয়ে রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশে চাঁদ উঠেছে কী না দেখতাম, কিংবা অজস্র নক্ষত্রের আলোয় খুঁজতাম, চরে ফুটে থাকা কাশফুল। নদীর জল ছুঁয়ে দূর থেকে বয়ে আসা লি-লি হাওয়া লাগাতাম গায়ে।  আজ আর কোনোকিছু ইচ্ছে করল না। 

আজ এই রাত্রিতে নদীর জলের উপরে লঞ্চের কেবিনে চুপচাপ বসে আছি।  চোখ বন্ধ করে থাকি, দেখি মায়ের মুখ।  চোখ খুলে চেয়ে থাকি, দেখি মায়ের মুখ। জলের শব্দ শুনি -- মায়ের অসুখের ব্যথা বেদনার আর্তি শুনতে পাই। কেবিনের ভিতর আরও ক'জন যাত্রী আছে। কিন্তু তাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। 

লঞ্চ চলছে ভটভট আওয়াজ করে। কেমন যেন কর্কশ মনে হচ্ছে শব্দ। কেবিনে বসে থাকা একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব লোক আমাকে বলে -- তুমি কোথায় যাবে?

-- কুসুমপুর।  সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে? 
-- এলাকাটা চিনি। তুমি কী এই রাতেই ওখানে যাবে?  নাকি শহরে থেকে যাবে? 
-- না, শহরে থাকব না। রাতেই চলে যাব। আমার মায়ের অসুখ। যেতেই হবে। 
-- অনেক  রাত হয়ে যাবে। আধাপাকা খানিক পথ। তারপর বেশির ভাগ কাঁচা রাস্তা। মাঝে নদী। খেয়া পারাপার হতে হবে।  পথে বিপদ হতে পারে তো!  

-- বিপদ হোক।  আমি যাবই। 

লঞ্চ সিরাজগঞ্জ ঘাটে এসে যখন ভেড়ে তখন রাত সাড়ে দশটা বাজে। বয়স্ক লোকটা আমার সাথে সাথেই লঞ্চ থেকে নামে। সে আবারও আমাকে বলছিল -- শহরের কালীবাড়িতে আমার বাসা।  তুমি ইচ্ছে করলে আমার বাসায় আজ রাতে থাকতে পারো। 

-- না। আমি আজ এই রাতেই চলে যাব। 
-- ঠিক আছে। তা না থাকলে, দুটো ডালভাত খেয়ে যাও। অনেকখানি পথ যেতে হবে।  তোমার খিদে লেগে যাবে। কষ্ট পাবে। 

-- না, আমার খিদে লাগে নাই। খেতে হবে না। 

দেখলাম লোকটি একটু হতাশ হলো। দুঃখও পেল মনে হয়। আমি ওনার কাছে থেকে বিদায় নেই। তারপর একটা রিকশা নিয়ে প্রথমে রহমতগঞ্জ কাঠের পুল চলে আসি। এখানে এসে দেখি -- কুসুমপুর যাওয়ার একটা রিকশাও নেই।  যে রিকশাওয়ালা আমাকে ঘাট থেকে নিয়ে এসেছে তাকে বলি -- ' তুমি কী আমাকে শালুয়াভিটা খেয়াঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাবে? ' রিকশাওয়ালা বলে -- 'না যাব না। আমার ভয় লাগে। ফকিরতলা পার হলেই  যে নিরিবিলি নির্জন জায়গা আছে, ঐ জায়গাটা ভালো না। আমি আমার রিকশাটা হারাতে পারব না।  '

কী করব। রিকশাওয়ালা যাবে না।  অগত্যা আমি একাই হেঁটে রওনা হই। কাটাখালি নদী পার হয়ে আকাশের দিকে তাকাই। দেখি আধাভাঙ্গা চাঁদ। নবমীর চাঁদ হবে হয়ত। আবছা আলোয় পথ দেখা যাচ্ছে।  হেঁটে হেঁটে যখন রহমতগঞ্জ গোরস্তানের কাছে আসি দেখতে পাই , একটি বৃদ্ধা সাদা ধবধবে কাপড় পড়ে গোরস্তানের ভিতর থেকে হেঁটে হেঁটে আমার দিকে আসছে। সে ক্রমশঃ যত আমার দিকে আসছে তত তাঁর মুখখানি চিনবার চেষ্টা করি। নবমীর চাঁদের আলোয় বৃদ্ধার যে মুখচ্ছবি দেখলাম, তা অস্পষ্ট। কেমন স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রাতের এই আঁধার, চাঁদের যে স্ফুরিত রশনি, আকাশ ভরা নক্ষত্রের যে ঝিলিমিলি আলো-- সেই আলোয় বৃদ্ধাকে যতটুকু দেখলাম,  মনে পড়ে গেল অনেক আগে দেখা একটি মুখ ---

আমার বয়স তখন পাঁচ কী ছয় হবে। সেই শিশু বয়সে  একজনের মুখ আমার আজো মনে আছে।  সে আমার মাতামহীর মুখ। আবছা আবছা সেই মুখখানি আমি এখনও মনে রেখেছি। সে বেঁচে নেই। তার কবর হয়েছিল -- এই গোরস্তানেই। 

বৃদ্ধাকে দেখে কেন যেন মনে হলো সেই তারই মুখ, মাতামহীর সেই অস্পষ্ট আবছায়া মুখচ্ছবির মতোন। বৃদ্ধা যেন বলছে -- ' তুমি ভয় পেওনা। পথে তোমার কিছু হবে না। আমার রাবেয়াকে তুমি দেখতে যাচ্ছ, যাও। আমার আশীর্বাদ রইল।'

বৃদ্ধা আর কোনো কথা না বলে হাঁটতে হাঁটতে গোরস্তানের দিকে চলে গেল। তাকে চেয়ে দেখতে দেখতেই  সে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।  আমি শুধু অস্ফুট করে একবার ডাকলাম তাকে -- নানী মা। 

কেমন যেন একটা উদ্যোম পেলাম। সারা শরীর মনে এক স্বর্গীয় অনুভব অনুভূত হতে লাগল। আমি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা ধরে সামনের দিকে হাঁটতে থাকি।  আমার কাছে মনে হলো -- এই নিশীথ রাতে এই পথে আমি একাকী হলেও কে যেন আমার সাথে আছে। আকাশ ভরা তারার ছায়া, ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ, ঝিঁঝি পোকা, নিশি পাখি সব আছে। ঘেঁটুফুল ফুটেছে রাস্তার ধারে, আকুল করা গন্ধ পাচ্ছি তার। কী একটা পাখি ডাকছে নাম জানিনা,  আখ ক্ষেতের ভিতর শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছিল।  

জন কোলাহলহীন পথে নিঃশব্দচারীর মতো  আমি পথ চলতে থাকি।  ফকির তলা পার হয়ে আরও নির্জন পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাই।  হঠাৎ পাশের শন ক্ষেতের ভিতর থেকে পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের দুটো ছেলে  রাস্তার উপর উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। অনেকটা গম্ভীর ও ধমকের স্বরে আমাকে বলে  -- দাঁড়াও। 

একজনকে নেতা মনে হচ্ছিল। আর একজন তার চেলা মনে হলো। নেতা ছেলেটি বলছিল -- বাড়ি কই তোমার? 
-- কুসুমপুর। তা তোমার নাম কী?
-- বক্কার।  এই নাম শুনেছ আগে? 
-- না। 
-- তেলকুপীর বক্কারকে সবাই চেনে। তুমি চেনো না? 
-- চিনি না। 
-- চিনবা একটু পরই !  

বক্কার ওর চেলাকে ডাক দিয়ে বলে -- 'এই সিদ্দিক মাল বের কর্।' সিদ্দিক ওর কোমর থেকে একটা চকচকা ডেগার বের করে। বক্কার ডেগারটি সিদ্দিকের হাত থেকে নিয়ে আমার চোখের সামনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলে -- 'কাছে কত টাকা আছে? 

-- হাজার বারো শ হবে। 
-- বের করো। 
আমি পকেট থেকে টাকাগুলো বের করে বক্কারকে দিয়ে দেই। বক্কার সিদ্দিককে বলে -- ঐ সিদ্দিক, ওর সবগুলো পকেট ভালো করে চেক কর্।  সিদ্দিক আমার সবগুলো পকেট চেক করে বলে -- 'আর নেই ওস্তাদ।'

বক্কার আমাকে বলে --  ' এবার চলে যাও।' 

আমি রাস্তার উপর মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। সামনে আর এগুই না। বক্কার বলে -- তুমি যাচ্ছ না কেন? 
-- এমনই যাচ্ছি না। 

কেন জানি  আমার চোখ দিয়ে জল চলে এল। মার জন্য কিছু পথ্য কিনতে চেয়েছিলাম, যদি ঔষধ কিনতে হয়? ঔষধ কিনব। ছোনগাছা হাট থেকে মার জন্য পান শুপারী কিনতে চেয়েছিলাম। আমার আর মার জন্য কিছু কেনা হবে না। এই ভেবে কাঁদছিলাম। 

বক্কার বুঝতে পারে আমি কাঁদছি।  সে বলে -- এই তুমি কাঁদছ কেন? 

-- আমার মা খুব অসুস্থ।  মার অসুস্থতার খবর শুনে কত পেরেশান  হয়ে ঢাকা থেকে আসতেছি।  তোমরা আমার টাকাগুলো  নিয়ে  নিলে।  আমি মার জন্য ঔষধ পথ্য কিছুই কিনতে পারব না।  এইজন্য কাঁদছি। 

আমার কথাগুলো শুনে বক্কারের  মুখ কেমন যেন দুঃখী দুঃখী হয়ে গেল। একধরনের কোমল এবং মায়াময়। আমি সেই অন্ধকারে তা দেখতে পাচ্ছিলাম।

বক্কার আমার টাকাগুলো আমাকে ফেরৎ দেয়।  এবং বলে -- সামনে তো আরও বেশ কিছু পথ বাকী  আছে।  তুমি একা যাবে কী করে? এত রাতে? তোমার বিপদ হতে পারে।  আমরা তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব। 

বক্কার এবং সিদ্দিক আমাকে অনেকটা পাহারা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসে। পথে ওদের সাথে আমার অনেক কথাই হয়, শুনি ওদের জীবন কাহিনি। আমিও বলি - আমার অনেক কথা।  

এইটুকু পথে আসতে আসতে একজন মানুষের সব কথা  কী শোনা হয়?  কিংবা বলা হয়? 'আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বক্কার  বলে -- তুমি ঘরে যাও। মাকে গিয়ে দেখো,  আমরা যাই। 

-- তোমরাও ঘরে চলো। আমার মাকে দেখে যাও। 

বক্কার বলে --  আর একদিন দিনের বেলায় এসে  তোমার মাকে দেখে যাব।  আজ আর এত রাতে  না।  আর একটি কথা,  আমার মার জন্য তুমি একটু দোয়া করবে।  আমার মাও তোমার মার মতো খুব অসুস্থ।  
তোনাকে একটা সত্যি কথা বলি -- তোমার কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছিলাম সেই টাকা দিয়ে মার চিকিৎসা করতে চেয়েছিলাম। 

বক্কারের কথা শুনে আমার খুব কান্না পেল। আমার অসুস্থ মায়ের মুখের সাথে বক্কারের মায়ের মুখটি মিলে গেল। মনে হলো -- জগতের সব মা-ই এক। একই রকম স্নেহ একই রকম মায়া একই রকম মমতাময়ী। 

আমি আমার বারোশত টাকা থেকে  বক্কারের হাতে  ছয়শত টাকা দিয়ে বললাম -- এটি নাও --মায়ের চিকিৎসা করবে। 

~ কোয়েল তালুকদার 






 






শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো



হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো

একদিন কর্মহীন এক অলস অপরাহ্নে আত্ম পরিজনহীন আমার গৃহকোণে শুয়ে শুয়ে পড়ছিলাম শামসুর রাহমানের 'হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো' থেকে এই পংক্তিগুলো --

'... তোমার মদির চোখ, গোধূলি-রঙিন গ্রীবা,/জীবন স্পন্দিত টসটসে ঠোঁট/ অর্থাৎ তোমার সৌন্দর্যে সচকিত হয়েও/ শুধু সেজন্যেই আমার অনুরাগের আংটি/ পরিয়ে দিই নি তোমার আঙুলে।

তোমার হাসি, যা হতাশাকে করে তোলে দীপান্বিতা,
আমাকে নিয়ে গ্যাছে সেই ঘাটে, / যেখানে ফোটে মনোজ কহলার। / না, কেবলমাত্র সেজন্যেও
ভালোবাসি না তোমাকে।'

ঘরের পশ্চিম পাশে জানালাটা খোলা। বাঁশঝাড় থেকে দু'একটা করে শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে। এত নির্জন যে, আর কোনো শব্দ নেই কোথাও। ঘুম আসতে চায় চোখে, মুদে আসছিল দুচোখ। তন্দ্রা, ঘুম ও স্বপ্ন নাকি পরপর আসে -- তন্দ্রায় বোঝা যায় আমি কী করছি, কী ভাবছি। কিন্তু ঘুম ও স্বপ্নে কিছুই বোঝা যায় না। 

মনে হলো কার যেন পদধ্বনি বাজছে বাইরে। শুধুই পায়ের শব্দ। নুপুর কিংবা চুড়ির শব্দ নয়। পদ শব্দ আস্তে আস্তে নিস্তব্ধ হলো। কে যেন দরজায় কড়া নারল একবার। আমি যেয়ে দরজা খুলে দেই। দেখি --সম্মুখে দাঁড়িয়ে জেবা সাহানি। পরনে তার টাংগাইলের হালকা নীল রঙের তাঁতের শাড়ি। ম্যাচিং করে ব্লাউজ, টিপ, কানে ইমিটেশনের দুল ও গলায় নীল পাথর বসানো লকেটের সোনার চেন পরেছে। মুখে স্মিত হাসি। হাসিটা শুধু মুখে নয়, হাসিটা চোখে এবং চোখের তারায়। মেয়েদের এমন হাসি দেখতে খুবই ভালো লাগে। জেবা সাহানিকেও খুব ভালো লাগছিল। 

জেবা আমার পড়ার টেবিলটার সামনে চেয়ারটাতে এসে বসে। জেবা বলছিল -- আমি হঠাৎ করে আপনার এখানে চলে এলাম আপনাকে কিছু না জানিয়ে। খুব অবাক হচ্ছেন বুঝি? 

-- জ্বী, একটু চমকিয়ে উঠেছি। তুমি আসবে জানলে ঘরটা ভালো করে গুছিয়ে রাখতাম। আলনার কাপড়গুলো ভাজ করে সাজিয়ে রাখতাম। পড়ার টেবিলের বইখাতাগুলো এত এলমেল থাকত না। ফুলদানিতে কোনো ফুল নেই। অন্তত কয়েকটি গাঁদাফুল এনে ফুলদানিটা সাজিয়ে রাখতে পারতাম। 

-- এই যে এলমেল সবকিছু এইটাই ভালো লাগছে। ছেলেদের ঘর সাজানো গোছানো মানায় না। সবকিছু পরিপাটি করে রাখে মেয়েরা।  ছেলেরা নয়। খুব বেশি মনে হয় সিগারেট খান। এ্যাসট্রেটা একদম ভরে ফেলেছেন। 

-- নাহ্ খুব বেশি খাই না। বেশ কয়েকদিনের এই ছাইগুলো। ফেলে দেয়া হয়নি।

-- বিছানার উপরে 'হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো'। তা কোন্ কবিতাটা পড়ছিলেন? 

-- ' কেন তোমাকে ভালোবাসি? ' কবিতাটি পড়ছিলাম --
".... দৈবাৎ এক রাতে ভুলক্রমে তোমার সঙ্গে আমার/ অদৃশ্য যোগাযোগ। এমনই আকস্মিক
সেই ঘটনা, আজো কেমন ধন্দ লাগে। / বস্তুত

মধুর এক ধাক্কা খেয়ে পথচলা
মেঘের আলপথে। / একটি ভুলের কুঁড়ি বিকাশের বাঁশির তানে/ চমৎকার এক ফুল হয়ে
দুলে উঠবে সত্যের মুখোমুখি, কে জানতো?...''

*****  *****  *****

( এখানে একটু বলি -- জেবার সাথে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। আমার এক বন্ধুর কাজিন সে। আমি বিয়ে করব, মেয়ে খুঁজছি। এই কথা জেনে আমার সেই বন্ধু বলেছিল-- আমার একটি কাজিন আছে, ইডেনে পড়ে। ট্রেডিশনাল সিস্টেমে বাংলা অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেবে।  তুমি ওকে দেখতে পারো। ' 

বললাম, ঠিক আছে দেখব। 

ধানমন্ডির একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে আমরা তিনজন একদিন লাঞ্চ করি।  ঐদিনই জেবাকে আমি প্রথম দেখি। দেখে ওকে ভালো লাগল। 

আমি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বাংলায় অনার্স এবং মাস্টার্স করেছি। জেবা তাই আমাকে অনুরোধ করে বলেছিল -- 'আমি মাঝে মাঝে  আপনার কাছে থেকে একটু হেল্প নেব।' আমি বলেছিলাম, অবশ্যই তোমাকে প্রয়োজনীয় হেল্প করব।'

শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বারান্দায়, ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের লনে বসে আমি এবং জেবা সাহানি  একাডেমিক বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি, এবং জেবাকে যতটুকু পারি, টিপস্ দিয়েছি। ব্যাস, এই পর্যন্তই। কিন্তু কোনো ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়িনি কেউই।

একদিন আমার সেই  বন্ধুটির সাথে আমার দেখা হয়। এবং সে বলে -- 'জেবাকে কি তোমার পছন্দ হয় ?' আমি ওকে বলি -- 'জেবা খুব ভালো মেয়ে। ওকে নিয়ে ঘর করা যায়।'

আমার সেই বন্ধুটি বলে -- 'তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।' আমি বললাম -- কী কথা? 

-- জেবার একটি বিয়ে হয়েছিল। ওদের বাসর রাতও হয়েছিল।  কিন্তু সেই একটি রাতই কেবল, কিংবা একটি দিনই বিয়ে টিকেছিল। তারপরের দিনই সে বিয়ে ভেঙে যায়। দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। কী জন্য বিয়েটা ভেঙে যায়, তা জানি না। জেবা সে কথা  কাউকে বলেনি কখনও। 

আমি শুধু কথাগুলো শুনলাম। এবং বললাম -- আমি আমার বাড়িতে আলাপ আলোচনা করে, তোমাকে মতামত জানাব। 

আমি বাড়িতে আলাপ আলোচনা করে -- আমার সেই বন্ধুকে নেগেটিভ মতামত জানিয়ে দিলাম। বললাম -- আমাদের বাড়িতে কেউই এই বিয়েতে রাজি নয়। ) 

*****  *****  *****

জেবা বলছিল -- আপনার কবিতার খাতাটি কই?  একটু দেখব। দেখি -- সর্বশেষ কোন্ কবিতাটি আপনি লিখেছেন, একটু পড়ব। 

টেবিলের উপরেই আমার কবিতার খাতাটি ছিল।  আমি খাতাটি জেবার হাতে দিলাম।  জেবা খাতাটি হাতে নিয়ে আমার লেখা শেষ কবিতাটা পড়তে লাগল --

" আমি একটি ছেলেকে চিনি
সেই ছেলে 

সন্ধ্যা আকাশের তারার আলো হতে চেয়েছিল
কিন্তু মেঘের ছায়ায় ঢেকে গেছে সেই তারা 
নিভে গেছে সেই আলো।

ছেলেটি একটি অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন ছুঁতে চেয়েছিল
কিন্তু অলৌকিক ঝরনাধারায় ভেসে গেছে সেই স্বপ্ন, জীবনের ক্যানভাসে সেই স্বপ্ন সে আঁকতে পারেনি। 

ছেলেটি চেয়েছিল একটি ঘর 
আনন্দলোক থেকে সুখ কুড়িয়ে আনতে চেয়েছিল
ফুলের রেণু থেকে অমৃত
মাধুকর হতে চেয়ে হারিয়ে ফেলেছে তার মাধবীকে।

সে চেয়েছিল কেউ একজন চিরকালের হোক,
নিপবনের পাখির বাসার মতো ঘর হবে তার
পূর্ণিমা রাতের উদ্দাম জোছনার প্লাবন বইবে ভাঙা অলিন্দ দিয়ে।

ছেলেটি একটা অমল সুন্দর প্রিয়তমা চেয়েছিল
যার কাছে  মন খুলে বলা যায় সব কথা
ইচ্ছে করলেই যাকে বুকে জড়িয়ে 
চুমু খেয়ে নেওয়া যায় একটার পর একটা
চোখে চোখ রেখে স্বপ্ন দেখা যায়
হাতে হাত রেখে সব ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়া যায়
কিন্তু সে পারেনি।

হাতের মুঠোয় সে ভরতে পারেনি প্রেম
চিরকাল যৌবনের মোহ ভেঙে খুঁজেছে তার শৈশব 
ময়ুরাক্ষী দিনগুলো কখন যে চলে গেছে সে বুঝতেই পারেনি।

এক একজন এভাবেই ভাবে
আর এভাবেই ভুল অঙ্কের খাতায় হারাতে থাকে
একের পর এক তার প্রিয়মুখ
দিনশেষে পড়ে থাকে শুধু অতৃপ্ত কিছু অভিমান।"


কবিতাটা পড়া শেষ হলে জেবা অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকে। কোনো কথা বলছিল না সে। মনে হলো ওর বুকের গভীর থেকে একটি লুপ্ত হয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে চাচ্ছিল। 

জেবা বলছিল -- 'আমার কাজিন, অর্থাৎ আপনার বন্ধু আমাকে সব কথা বলে দিয়েছে।  তবুও আজ আসলাম আপনার এখানে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল আপনার ঘর, আপনার ঘরের এলমেল সব জিনিসপত্র। আপনার লেখার টেবিল যেখানে বসে আপনি কবিতা লেখেন। 

আজ এই বিষণ্ণ বিকালে খুব ইচ্ছে করছিল -- আপনাকে নিয়ে দূরে কোথাও নদীর কূলে একটু বেড়াতে যেতে। নদীর জলের ধ্বনি শুনতে আপনাকে নিয়ে। একটি সূর্যাস্ত দেখতাম হৃদয়ে পৃথিবীর সব আলো নিভিয়ে দিয়ে।' 

নাহ্ , সেইদিন সেই বিষণ্ণ বিকালে আমাদের নদীর তীরে যাওয়া হয়নি। দেখা হয়নি তীরে দাঁড়িয়ে শেষ সূর্যাস্ত। মনের ভিতর জীবনানন্দ দুঃখ তখন -- '
সব পাখি ঘরে আসে -- সব নদী ফুরায় জীবনের সব লেনদেন, থাকে শুধু অন্ধকার।'

জেবা সাহানি সন্ধ্যার আগেই ফিরে চলে যায়। যাবার সময় একটুও সে পিছনে ফিরে তাকাল না। জানিনা,  ওর চোখে হয়ত জল ছিল, তাই  ফিরে তাকায় নি। 

জেবা আমার কেউ নয়, সামান্য  কিছুদিনের  পরিচয় ছিল মাত্র। তবুও সেই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় খুব  শূন্যতা বোধ করেছিলাম।

~ কোয়েল তালুকদার 

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০

রুপালী আলো

রুপালী আলো

লোকটা একটা খচ্চর। বয়স পয়ত্রিশ হবে।  এই পর্যন্ত বিয়ে করেছে পাঁচটা। প্রথম চার বউ ছেড়ে চলে গেছে।  বর্তমানে যে বউ আছে -- ওর নাম রুপালী। বছর খানেক আগে রুপালীর বিয়ে হয়েছে এই খচ্চর রফিকের সাথে।  এখনও এই বিয়েটা  টিকে আছে। 

খচ্চর রফিক অটো চালাত রাজেন্দ্রপুর মাস্টার বাড়ি এলাকায়। রুপালীর সাথে ওর প্রথম দেখা এই অটো চালাতে গিয়ে। রুপালী কাজ করত চৌরাস্তায় একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে। মাস্টার বাড়ি এক বাড়িতে ওরা কয়েকজন মেয়ে মিলে ভাড়া থাকত ।  রফিক প্রতিদিন ফ্রী তে আনা নেওয়া করত রুপালীকে।  আর এই ভাবেই রফিকের সাথে ওর প্রণয় হয়। এবং পরবর্তীতে বিয়ে হয়।

খচ্চর রফিক ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী। সুদর্শনও বলা যায়। ওর এই সৌন্দর্যের কারণে মেয়েদেরকে সে প্রলুব্ধ করতে পারত।  ওর প্রধান অভ্যাস ছিল তারি খাওয়া। তারি খেয়ে মাতাল হয়ে ওর বউদের সাথে সে মাতলামি করত। অকারণে তাদের মারপিট করত।  ওর এই আচরণের কারণে ওর আগের বউরা ওকে ছেড়ে চলে যায়। 

রুপালীকে বিয়ে করার দুইদিনের মাথায় একদিন সন্ধ্যায় তারি খেয়ে মাতলামি করতে করতে রুপালীকে বলে -- 'তুই কাল থাইকা আর গারমেনে যাইতে পারবি না।'
রুপালী বলে -- ' ক্যান যাইতে পারুম না? '

-- আমি তরে কইলাম, যাবি না।  ব্যাস,  আর যাবি না। '

-- কারনডা আমারে কও। 

-- তুই তো রূপের ছেরি, তোর ডবকা যৌবন, আরেক ব্যাডার লগে তুই  পিরিত করবি। এবং আমারে ছাইড়া চলে যাবি। এই জন্য। 

-- আমি গারমেন্টে কামে যামুই। 

খচ্চর রফিক রুপালীর এই কথা  শোনা মাত্র ওকে ধরে পেটাতে থাকে। সেকি তুমুল মাইর। চুল ধরে কিলাইতে কিলাইতে রুপালীকে বলে -- কী যাবি মাগী? ক। 

রুপালী ভয়ে  কাঁদতে কাঁদতে কাতর হয়ে বলে -- 'না, যাব না।'

শালবনের পাশে নান্দুয়াইন গ্রামে একটি ছোট্ট মাটির বাড়িতে রফিক ওর বউ রুপালীকে নিয়ে থাকে।  বনপাশে এমন নিরিবিলি বাড়িতে একা একা থাকতে রুপালীর ভালো লাগে না। রুপালীর মনে পড়ে ওর সহকর্মীদের কথা।  মনে পড়ে ফিরোজা, রুবী, খাদিজাদের কথা। মনে পড়ে আরও একজনের কথা, নাম -- শাহীন।  শাহীনও ওর সহকর্মী ছিল। শাহীন  একদিন ওকে বলেছিল, ' তোমাকে আমার ভালো লাগে রুপালী।' 
ঐ পর্যন্তই। শাহীনকে আর কিছু বলা  হয়নি রুপালীর। এর মধ্যেই ওর বিয়ে হয়ে যায় -- খচ্চর রফিকের সাথে। 

রফিক একটা গোয়ার। তরকারিতে লবন কম হলে রুপালীকে ধরে পিটায়। ঘরের বাইরে  কোনো লোকের সাথে রুপালী একটু কথা বললেই -- ওকে ধরে পিটায়। রফিক  রুপালীকে বাপের বাড়ি মির্জাপুর যেতে দিত না। যেতে চাইলে ধরে পিটাত।  রফিক ভাবত -- রুপালী বাপের বাড়ি চলে গেলে আর ফিরে  আসবে না। রফিক অনেক সময় রুপালীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনও করত। বাধা দিলে মারপিট করত। 

রুপালী হাঁপিয়ে ওঠে রফিকের সাথে ঘর করতে।  এক একসময় রুপালীর মনে হতো -- এই ঘর, এই সংসার ছেড়ে চলে যাবে সে। মনে হতো -- শাহীন যদি আবার এসে বলত,  'তোমাকে আমি ভালেবাসি রুপালী,  তুমি আমার ঘরে চলো।'  রুপালী ঠিকই শাহীনের হাত ধরে পালিয়ে যেত। এই পাষাণ স্বামীর ঘর করতে তার কিছুতেই আর ভালো লাগছে না। 

একদিন সন্ধ্যা রাত্রিতে রুপালী ঘরে বাতি জ্বালিয়ে বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়াতেই ছায়ার মতো কাকে যেন দেখতে পায়। কে যেন বরোই গাছ তলায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা এগিয়ে আসে রুপালীর কাছে।  এসে বলে -- আমি শাহীন রুপালী।  তুমি আমাকে চিনতে পারছ না ?'  তোমার খোঁজ জেনে তোমাকে দেখতে আসলাম। তুমি কেমন আছো ? '

-- 'আমি ভালো নেই।  কিন্তু তুমি এ কী করলে !  প্রতিবেশী কেউ দেখে ফেললে তারা আমার স্বামীকে বলে দেবে।  ঐ গোয়ার লোকটা আমাকে মেরেই ফেলবে।  তুমি এক্ষুনি চলে যাও।'

সেদিনের মতো শাহীন চলে আসলেও এর পরে প্রায়ই গোপনে রুপালীর সাথে সে দেখা করত।  দেখা করে কথা বলত। ওদের এই দেখা  করাটা খুব সাবধানে হতো। অল্প সময় নিয়ে দেখা করে কথা বলে চলে আসত শাহীন। ঘরে বসত না। দেরিও করত না।  

এরই মধ্যে ওদের সাথে প্রণয় গড়ে ওঠে। একদিন রুপালীর সাথে শাহীনের শলাপরামর্শ হয় -- ওরা দুজন রাতে দেখা করবে শালবনের ভিতর। ঘন বনের ভেতর চলে আসবে রুপালী একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। শাহীন অপেক্ষা করবে ওর জন্য  সেখানে। যেখানে ওরা মিলিত হবে। 

কথামতো সেই রাতে শাহীন চলে যায় শালবনে। রাত ক্রমে গভীর হতে থাকে। শাহীন অপেক্ষা করতে থাকে রুপালীর জন্য।  বনের ভিতর ঝিঁঝি পোকারা ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে থেমে যেতে থাকে। জোনাকিদের আলো জ্বলা নিভে যেতে থাকে।  পঞ্চমীর চাঁদও ডুবে গেছে সেই  সন্ধ্যা রাতেই।  তারারা জ্বলছে, নিভছে। কেমন নীরব হয়ে আছে  বন নিভৃতে। বন জুড়ে তখনও স্তব্ধ অন্ধকার ।

হঠাৎ শুকনো পাতার মর্মর ধ্বণি শোনা গেল। পথের উপর পড়ে থাকা বনের  শুকনো পাতা  মাড়িয়ে নগ্ন পায়ে চলে আসে রুপালী।  রুপালী শাহীনকে দেখে বলে -- আমি দেরি করতে পারব না, এখনই যেতে হবে।  গোয়ার কসাইটা জেগে উঠতে পারে । '

সেই  স্বল্প সময়ের ভিতরই সেই বন নিবিড়ে দুটি মানব মানবী এক আশ্চর্য রাতের গভীরে মিলে গেল। বনতলে সেই আঁধারে দুজন হারিয়ে যেতে লাগল, হারিয়ে দিতে লাগল, ধরা দিল নিজেদেরকে, খুঁজে পেল একে অপরকে। মনে হয়েছিল ওদের -- রাতকে কখনও ভোর হতে দেবে না। শালবনের সব পাখি তখন ঘুমে বেঘোর। সব বৃক্ষ অন্ধকারের সাক্ষী হয়ে রইল অনেক কিছুর। সাক্ষী হলো আকাশ, আকাশের তারা, ঘুমন্ত জোনাকি আর বনশয্যার বিছানো শুকনো মর্মর পাতা। 

তারপর রুপালী  উঠে দাঁড়িয়ে শাহীন কে জড়িয়ে ধরে বলে -- তুমি আমাকে কবে নিয়া যাইবা। 

-- খুব শীঘ্রই। তুমি যখন যাবে, তখনই। 
 

রুপালী বাড়ির দিকে আসার জন্য তখন পা বাড়ায়।  পা ফেলতেই তার খালি পায়ে কাঁটার মতো  কী যেন বিঁধে যায়। অন্ধকারে দেখতে পায় একটি মরা গাছের শুকনো চোখা গুরি বিঁধেছে। বেশ রক্ত ঝরছে।  রুপালী খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে বাড়ি চলে আসে। বাড়িতে এসে দেখে ওর স্বামী তখনও  ঘুমিয়ে আছে। 

খুব ভোরে  রফিকের ঘুম ভাঙে।  সে বিছানা থেকে উঠে বাইরে আসে।  তখনও সূর্য দেখা যাচ্ছিল না বন প্রান্তরে।  কিন্তু ভোরের আলোয় সে দেখতে পেল উঠানে পায়ের ছাপের রক্তের দাগ। সেই  ছাপ ঘরের মেঝে পর্যন্ত চলে গেছে। সে ঘরের ভিতর যেয়ে রুপালীকে ডেকে তোলে। সে দেখতে পায় -- রুপালীর পায়ে থেকে তখনও  একটু  একটু করে  রক্ত ঝরছে। 

রফিক রুপালীকে বলে -- 'ওঠ্।  আমার সাথে বাইরে আয়।' রুপালী উঠে রফিকের সাথে উঠানে আসে।  রফিক পায়ের রক্তের ছাপ ধরে হাঁটতে হাঁটতে রুপালীকে নিয়ে  পিছনে শালবনে চলে যায়।  য়েখানে রুপালী শাহীনের সাথে দেখা করেছিল সেখান পর্যন্ত।  রফিক রুপালীকে বলে -' 'ক মাগী,  রাইতে তুই কার সাথে দেখা করেছিলি এইখানে ?  কী করেছিলি, ক।'

রুপালী কোনো কথা বলে না।  চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।  রফিক ওর গলা চেপে  ধরে বলে -- 'ক মাগী,  তুই  কার সাথে দেখা করেছিলি?' রুপালী নিশ্চুপ।  রফিক শক্ত করে আরও হজোরে গলা চেপে ধরে বলে -- 'ক মাগী।'  রুপালী ততক্ষণে নির্জীব হয়ে গেছে। 

একসময় ভোরের আলো শালবৃক্ষের পাতার ফাঁক দিয়ে নীচে  মরে পড়ে থাকা রুপালীর মুখের উপর এসে পড়ছিল। কী সুন্দর রুপালী আলো, কী শুচি শুভ্র দেখতে লাগছিল রুপালীর মুখখানি। 

~  কোয়েল তালুকদার 
 

সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০২০

কংসাবতীর তীরে

কংসাবতীর তীরে 

তেমন কোনো বিত্ত ছিল না আমাদের। ছিল না দৌলতও। টিউশনি করে লেখাপড়া করেছি। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর লেখাপড়া চালিয়ে  যাওয়া আর সম্ভব হয় নাই। পরিবারের প্রয়োজনে  একটি এনজিও তে চাকুরি নেই। আমার পোস্টিং হয় শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মেঘালয় সীমান্তবর্তী এক অজো পাড়া গাঁয়ে।  আমার পদবী ছিল মাঠকর্মী। যারা এনজিও থেকে ঋণ নেয়, তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তির টাকা আদায় করাই আমার কাজ ছিল।  

আমি এর আগে কখনও এই নালিতাবাড়ী আসিনি। বাড়ি থেকে আসার পথে খুব দুর্ভাবনা করেছি, ঐ অপরিচিত জায়গায় যেয়ে কোথায় উঠব, কোথায় থাকব। কিন্তু এখানে আসার পর সেই ভাবনা অনেকটা দূর হয়েছে। আমাদের কেন্দ্রের ম্যানেজার সাহেব অফিস সংলগ্ন একটি ছোট্ট রুমে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। 

এখানে নিজেই রান্না করে খাই। বেশিরভাগ সময়  সকালবেলা রান্না করে তিন বেলা খেয়ে খেতাম। ভাত রান্না করার সময় ভাতের মধ্যে ডিম সিদ্ধ দিতাম। সেই ডিম কাঁচা মরিচ ও পিয়াজ দিয়ে ভর্তা করতাম। আবার ডিম মামলেটও করতাম মাঝে মাঝে।  কোনো কোনো সময় মসুর ডাল ভর্তাও করতাম। মাছ মাংস তেমন কেনা হতো না। ওগুলো কাটাকুটি করে রান্না করে খাওয়া আমার পক্ষে  সম্ভব ছিল না।
  
এলাকাটি দারুণ প্রকৃতি শোভাময়। অদুরেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। সীমান্ত শুরু হয়েছে সুউচ্চ গারো পাহাড় দিয়ে। সেই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে  এসেছে কংসা নদী। জেনেছি  ভারতের শিলং মালভূমির পূর্বভাগে তুরার কাছে এ নদীর উৎপত্তি। কী অদ্ভুত ! যে নদীর জন্ম দিল শৃঙ্গে জমে থাকা মেঘ আর চেরাপুঞ্জির অজস্র বৃষ্টির জলধারা। আর সেই ধারা কী-না বয়ে এল আমাদের দেশে নদী হয়ে। কী স্বচ্ছ এর জল।  পাথর, পাথরকুচি আর সিলিকন বালু এই নদীর অতল দিয়ে ভেসে আসে এ দেশে । 

এই নদীর এখানে অন্য নাম -- ভোগাই। নাহ্ আমি  তাকে সে নামে ডাকতাম না। ভালো লাগত না এই নামটি। আমি ওকে কংসাবতী বলে ডাকতাম। আমিই  ডাকি, আমি তা শুনি। আমিই তার অরূপ রূপ দেখি । 

আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না এখানে। তাই এই নদীটাকে আমি আমার বন্ধু করে নিয়েছিলাম। এর কূল ধরে হাঁটতাম, কত সন্ধ্যা নেমেছে কংসাবতীর তীরে, কত সূর্য ডুবে গেছে গারো পাহাড়ের শৃঙ্গের আড়ালে। অস্তাচলের কত সোনালি আভার দিগন্ত আঁধারে কালো  হয়ে গেছে।  মনে হতো জীবনের সব গান  হারিয়ে ফেলেছি ঐ দূর আকাশে,  ঐ পাহাড় শৃঙ্গের ঘন লতাগুল্মের নিভৃতে । 

এই কংসাবতীর তীরের একটি গ্রাম নয়াগাঁও।  আমাদের এনজিওর একটি কেন্দ্র ছিল এখানে। কেন্দ্রটির অফিসিয়াল নাম দেওয়া হয়েছিল 'সন্ধ্যাতারা'।  এই কেন্দ্র থেকে গরীব, দুস্থ ভূমিহীন মেয়েরা ঋণ গ্রহণ করত।  আছিয়া, নুরজাহান, নুরী, বুলবুলি, নসিরণ, জরিনা সহ আরও এমন অনেক মেয়ে এই সন্ধ্যাতারা কেন্দ্র থেকে ঋণ নিয়ে  তারা নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে । শাখার ম্যানেজার সাহেব প্রথম দিনই ঋণ গ্রহিতাদের তালিকা আমাকে দিয়ে বললেন -- এই সন্ধাতারা কেন্দ্রে আপনাকে কাজ করতে হবে। তিনি এই ব্যাপারে আমাকে আরও কিছু প্রয়োজনীয় ব্রিফিং দিলেন। 

পথম দিনের কথা। 

শাখা অফিস থেকে কংসাবতীর তীর  ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলাম নয়াগাঁও সন্ধ্যাতারা কেন্দ্রে। তখন ছিল আশ্বিন মাস। কংসাবতীর বুক ভরা অথৈই জল। কংসার স্বচ্ছ পানির উপরে পড়েছে শরতের সাদা মেঘের ছায়া। জলের উপর রোদ্দুর ঝিলমিল করছে। নদীর কূল ধরে যখন হাঁটছিলাম তখন দেখছিলাম জল আর মেঘ-রোদ্দুরের খেলা।  আরেক দিকে  দেখছিলাম হলুদ ফুলের সরিষার ক্ষেত। ফড়িং আর প্রজাপতি এসে পড়ছিল গাদা গাদা ফুলের উপর। অদূরে দেখতে পাই একটি প্রাচীন বটবৃক্ষ। কোথাও একটি মানুষও নাই। একদম  বিজন। বটবৃক্ষটি পার হয়ে সামনের দিকে হাটঁতে থাকি। 

তখন বেলা বারোটা হবে। নয়াগাঁও গ্রামের নিকটবর্তী হতেই দেখতে পাই -- একটি স্ত্রীলোক নির্জন কংসাবতীর জলে নেমে সে স্নান করছে। বক্ষের বসন ঈষৎ উন্মোচন করা,  সাদা ঝকঝকে গায়ের রং, হাতে বালা , পরনে লালপাড় শাড়ি, বয়স চব্বিশ পঁচিশ হবে। স্ত্রীলোকটি প্রথমে আমাকে দেখতে পায় নাই, যখন আমাকে দেখতে পায়, সে লজ্জাশীলা হয়ে উঠে। বুকের বসন ঠিক করে  নদীর কূলে অবস্থিত  তার বাড়ির দিকে হেঁটে চলে যায় । 

তখন আমার বয়সই কত !  বিশ হবে। একজন উচ্ছল তরুণ,  বিয়ে করি নাই। আমি  অত বড়ো বিদ্বান ব্যক্তিও ছিলাম না। তেমন কিছু পড়া হয় নাই উপন্যাস, গল্প, নাটিকা। পড়লে বুঝতে পারতাম -- মঞ্জুলিকা, বাসন্তী, শকুন্তলা, বিনোদিনী, অভিসারিকা এইসব  কী !  কিন্তু সেদিন সেই আশ্বিনের মিষ্টি রোদের নীচে কংসাবতীর জলে যে রমণীকে স্নানরত দেখলাম -- তা আমার তরুণ হৃদয় মনে একধরনের মদিরার মতো চির আসক্তির অনুভব হয়ে থাকল। 

নয়াগাঁও গ্রামে ঢুকে কেন্দ্র প্রধান নুরজাহান খাতুনের বাড়িটি খুঁজে বের করি। আমি নুরজাহানের বাড়িতে ঢুকে  আমার পরিচয় দেই। নুরজাহান আমাকে ছালাম দিয়ে বলে -- 
'স্যার আপনি বসেন। আমি সব সদস্যদের ডেকে নিয়ে আসি।'  

আমি উঠোনে একটি কাঠের চেয়ারে বসে থাকি। আমার ভালোই লাগছিল এই জন্য যে, সামান্য একটা চাকুরী করি। আর এই মেয়েটি কিনা আমাকে স্যার ডাকল। আমাকে তাহলে এখানকার সবাই স্যার ডাকবে। 

ঘন্টা খানেকের মধ্যে প্রায় বিশ বাইশ জনের মতো মেয়ে জড়ো হলো। তাদের সবার বয়স কুড়ি থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। আমি ওদের নিকট আমার পরিচয় দিলাম -- বললাম, 'আমার নাম আনিসুর রহমান। এই কেন্দ্রে নতুন জয়েন করেছি। আমার বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ি থানায়। শাখা অফিসেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি নবীন, অল্প বয়স।  আপনেরা আমাকে স্যারও ডাকতে পারেন, আবার আনিস ভাইও ডাকতে পারেন।' নুরজাহান বলে উঠল -- স্যার, আমরা সবাই আপনাকে স্যারই ডাকব। '

সবাই তাদের ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তিগুলোা আমাকে প্রদান করে তাদের জমা বইয়ে এন্ট্রি করে নিচ্ছিল।  একটি মেয়ে ঘোমটা টেনে একটু  দূরে দাঁড়িয়েছিল। সে আসছিল না আমার কাছে।  নুরজাহান ঐ মেয়েটিকে ডেকে বলে -- ও জরী, তুই দাঁড়িয়ে রইছোস ক্যান, কিস্তি জমা দে। '

মেয়েটি ঘোমটা টেনে মৃদু পায়ে আমার কাছে এসে টাকা ও জমা বইটি  আমার হাতে দেয়।  আমি ঘোমটাটার ফাঁক দিয়ে দেখলাম তার মুখ। এ যে সেই  মেয়ে যাকে আমি কংসাবতীর জলে স্নানরত দেখেছিলাম। জমা বইতে নাম দেখলাম -- মোছাঃ জরিনা খাতুন, স্বামী  -- সোলাইমান মিয়া, সাকিন -- নয়াগাঁও। মেয়েটি আমার দিকে একবারও তাকাল না। খুব সলজ্জ ভঙ্গিতে টাকা জমা দিয়ে সে চলে গেল। 

সেদিনের মতো কাজ শেষ করে  চলে আসি। ফিরে আসছিলাম কংসাবতীর তীর ধরে। নদীর জলগুলো কেমন স্থির হয়ে আছে।  বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের প্রান্তরের দিকে তাকালাম -- ফুলগুলো দুপুরের  রোদে ম্রিয়মাণ হয়ে আছে। বটবৃক্ষের তলে যেয়ে দেখি -- একটি মধ্যবয়সী গারো গায়েন বসে গান গাইছে বাঁশের দোতারা বাজিয়ে। আমি তার গান শুনি। কী অপূর্ব গাইছিল।  ওর গানের ভাষা আমি  বুঝিনি। কিন্তু গানের সুরটি ছিল দুঃখের। 

রুমে এসে খেয়ে একটু বিশ্রাম নেই। বিকালবেলা কংসাবতীর তীরে  গিয়ে চুপ করে বসে থাকি। নদীর নীরব তরঙ্গধ্বনি শুনি।  গারো পাহাড়ের  মাথার ওপর দিয়ে  সূর্য অস্তমিত হতে থাকে। সোনালী আভা সরিয়ে ক্রমে আকাশ ধূসর হয়ে উঠে। তারপর অন্ধকার নামে আদিম গুহার আঁধারের মতো। সেই আঁধার জগতে একটি সিক্ত বসনার রমণী মূর্তি ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল। যাকে আমি দেখে এসেছিলাম আজ কংসাবতীর 
তীরে। 

রাতে বিছানায় শুয়ে  ভাবছিলাম অনেক কথা। ঘুম আসছিল না চোখে। মধ্য প্রহরে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াই।  দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়কে দৈত্যের মতো লাগছিল। একবার মনে হলো -- কংসাবতীর তীরে যেয়ে ঘুরি। কিন্তু এত অন্ধকার যে,  ঐ জনমানবহীন নদীর তীরে যেতে শঙ্কা লাগছিল। বারান্দা থেকে রুমে এসে আবার শুয়ে পড়ি। তারপর কখন ঘুমিয়ে যাই জানতে পারি নাই। 

সপ্তাহে একদিন আমাকে নয়াগাঁও এ সন্ধ্যাতারা কেন্দ্রে যেতে হতো। বাকী কর্ম দিনগুলোতে অফিসে কাজ করতাম। নয়াগাঁও কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সারা সপ্তাহ উন্মুখ হয়ে থাকতাম। 

একদিন নয়াগাঁও যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। যখন বের হয়েছি তখন ঝকঝকে রোদ ছিল।  সেই একই রাস্তা, একই নদীর কূল ধরে চলেছি সন্ধ্যাতারা কেন্দ্রের দিকে।  অর্ধ রাস্তা যাওয়ার পর হঠাৎ আকাশে মেঘ হয়। প্রাচীন বটবৃক্ষের নিকট যাওয়া মাত্র ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে থাকে। আমি বটগাছের নীচে দাঁড়াই। কিছুটা বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেলেও ভিজে যায় জামা ও মাথার চুল । বৃষ্টি ছাড়লে আমি আবার রওনা হই। ভেজা শরীর নিয়েই নয়াগাঁও পৌঁছি। 

জরিনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে আমি যাচ্ছিলাম। বাড়ির আঙিনা থেকে জরিনা আমাকে ভেজা অবস্থায় দেখে ফেলে।  একটি ছয় সাত বছরের বালক কাছে  এসে বলে -- 'আপনাকে মায়ে ডাকছে।' আমি দেখলাম -- জরিনা ঘোমটা মাথায়  দিয়ে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাছে যেতেই সে মুখ আড়াল করে বলে -- 'আপনি ভিজে গেছেন। বারান্দায় টুলের উপর বসেন।' 

আমি টুলের উপর বসি। জরিনা একটি গামছা এনে দিয়ে সেই একই রকম মাথায় ঘোমটা টেনে বলে -- 'এইটা দিয়ে মাথা মুছে নিন। আপনার  ঠান্ডা লেগে যাবে।'

মাথা মুছে এবং জামা একটু শুকিয়ে নিয়ে নুরজাহানের বাড়ি যাই। সেদিনও জরিনা মাথায় ঘোমটা দিয়ে কিস্তির টাকা আমার কাছে এসে জমা দিয়ে যায়। জরিনার এমন ঘোমটা দেওয়া দেখে নুরজাহান ওকে বলে -- 'কী লো জরী, তুই মাথায় এমন ঘোমটা দ্যাস ক্যান?  স্যারেরে দেইখা তুই কি লজ্জা পাস? '

কাজ শেষে কাঠের চেয়ারের উপর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। দেখলাম, জরী মুখ ঘুরিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর  সলজ্জিত মুখখানি দেখতে বড়ই সাধ হয়। জরী মনে হয় -- ওর সেদিনের সেই নির্জন নদীর কূলে ঈষৎ উদোম হওয়া দেহখানি দেখেছি যে, সেই লজ্জা ঘোমটা দিয়ে আড়াল করে  ফেলতে চাইছে। কিন্তু জরী জানে না -- তার সেই অপরূপ রূপ আমার অন্তরের কোণে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে রেখেছে। 

সেদিনও পথে আসতে আসতে চেয়ে দেখছিলাম কংসাবতীর জল। কেমন অতৃপ্ত বিষাদ বাতাস ঝাপটার বেগে আমার দেহ মনে এসে লাগল। কেমন শীতল অনুভব হলো -- জরি আমার সব না। কেউ না। কিন্তু আমি এই কদিনে অনেক কিছু ভেবে বসলাম। জরির মতো এমন একটি মেয়েকে নিয়ে এমন ভাবনা করা ঠিক নয়। জীবনের মধুকাল তো ধরতে গেলে শুরুই হয়নি। সামনে আরও কত সময় আসবে। দেখা পাব কত কুমারী মেয়ের।  কত উদ্যোত প্রস্ফুটিত সন্ধ্যামালতী ফুল  ফুটে থাকবে পুষ্প কাননে। যা কিছু পাব তার গন্ধ বিলাস উপভোগ করব।  তখন মনে হবে আমিই জগতের সুখী মানুষ। 


বিকাল বেলা রুম থেকে  বাইরে আর বের হলাম না। শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। ঘরে আলো জ্বালাতে ইচ্ছা করল না।  অন্ধকারেই শুয়ে  থাকলাম আরও কিছু সময়।  তারপর উঠে আলো জ্বালাই। সকালের রান্না করা ভাত খেয়ে নেই।  খেয়ে বিছানায় এসে আবার শুয়ে পড়ি। আজও চোখে কোনো ঘুম নেই।  আজও দরজা খুলে বাইরে আসি। 

নিস্তব্ধ তারাভরা রাত্রি। কংসাবতীর পাড় থেকে হু-হু হাওয়া বইয়ে আসছিল। এই রকম তারাভরা অন্ধকার আকাশের তলে দাঁড়ালে কত কথা মনে আসে। জীবনের গ্লানিগুলো মনে জাগে। আবার কত পাওয়া আঁধারে হারিয়ে যেতে থাকে। আসলে জীবন বড়োই পলাতকা। পাওয়া হয় না কোনো  কিছু, যা আমি চাই। 

আর একদিন যখন নয়াগাঁও যাই, পথে যেতে যেতে ভাবছিলাম, আহা! আজ যদি জরী ওর ঘোমটাখানি সরিয়ে ফেলত।  তাহলে প্রাণ ভরে  দেখে নিতাম ওর মুখ , স্থির শান্তদৃষ্টিতে আমার দিকে যদি একবার চাইত। ঐ সুশ্রী মুখ যে আমি এখনো মন ভরে  দেখিনি। ঐ চোখ নিশ্চয়ই ডাগর কালো হবে। ঠোঁটের নীচে আলগা ভাঁজ আছে, হাসলে নিশ্চয়ই গালে টোল পড়ে। এর আগে ওকে যতটুকু দেখেছিলাম তা দূর থেকে। দেখতে না দেখতে সেই শুভ দৃষ্টি মিলিয়ে গিয়েছিল বিন্দুর মতো। জরীর বাড়ির কাছে যেয়ে  ওকে খুজলাম, কিন্তু আজ সে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে নেই। 

সন্ধ্যাতারায় যেয়ে দেখলাম -- জরী দূরে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। কারোর সাথে কথা বলছে  না।  আজও নীরবে এসে সবার আগে কিস্তির টাকা দিয়ে চলে গেল।  জরীর সাথে কথা বলার তেমন সুযোগ নেই।  আর বললেও মাথা থেকে ঘোমটা তো সে সরাবে না।  

জরী তাড়াতাড়ি করে চলে যাওয়াতে মন ভালো লাগছিল না।  সকালে আমি কোনো রান্না করে খেয়ে আসিনি। অভুক্ত ছিলাম। পেটে খুব খিদা ছিল। দ্রুত কাজ সেরে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে পড়ি। জরীর বাড়ির পাশ  দিয়ে যখন আসছিলাম, তখন দেখি -- জরী পথের উপরে একটি ছোট্ট টোপলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  টোপলাটি আমার হাতে দিয়ে বলে -- আপনার মুখটি খুব শুকনো দেখেছিলাম। এর ভিতর কিছু খাবার আছে।  ঘরে গিয়ে খেয়ে নেবেন।'

আমি বললাম -- তুমি একটু ঘোমটা সরাও না জরী। তোমাকে একটু দেখি। 

-- না। 

-- কেন না। 

-- এই মুখ আপনাকে দেখাতে লজ্জা করে। 

জরি আরও বলছিল -- আমি যাই। আপনার সাথে একাকী দাঁড়িয়ে কথা বলছি, কেউ দেখে ফেললে আমার বদনামি হবে।  আমার স্বামী আমাকে মারধর করবে। আপনি জানেন না, সে একটা কসাই। 


ঘরে এসে টোপলাটা খুললাম। টোপলার ভিতর তেলের পিঠা, নারিকেলের কুশলি পিঠা, আর মুড়ির কয়েকটি মোয়া দেখলাম।  আমার পেটে প্রচণ্ড খিদা ছিল। আমি বেশ পরিমাণ খেয়ে নিলাম। 


এরই মধ্যে সন্ধ্যাতারা কেন্দ্রে আমার কাজ করা দুই মাস পূর্ণ হয়।  প্রতি সপ্তাহেই জরীর সাথে কেন্দ্রে আমার দেখা হতো।  ঘোমটা টেনে কোনো কথা না বলে কিস্তি দিয়ে  নিঃশব্দে সে চলে যেত। আমার দিকে একটুও তাকাত না। ওর বাড়ির কাছে দিয়ে আসা যাওয়ার পথে ওকে খুঁজতাম ওর আঙিনায়। ঘোমটা টেনে মাঝে মাঝে চুপচাপ  দাঁড়িয়ে থাকত অদূরে। দেখতাম ওকে দূর থেকেই।   

দুই মাস পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিতে আমাকে অন্য একটি কেন্দ্রে বদলি করে। এরপর থেকে নয়াগাঁও সন্ধ্যাতারা কেন্দ্রে আমার আর যাওয়া হতো না। মনটা প্রায়ই বিষণ্ণ হয়ে থাকত।  যেখানেই যাই, কেমন যেন অবসন্ন লাগত। সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম কংসাবতীর তীরে। নদীর জলের দিকে তাকিয়ে বলতাম -- 'আমার সাথে তুমি একটু কথা বলো। তোমার জলে আমাকে টেনে নাও।' সেই ধূসর সন্ধ্যায় বক ও বালিহাঁসগুলো নদীর চরাচর ছেড়ে উড়ে  চলে যেত গারো পাহাড়ের দিকে। হয়ত ওখানেই ওদের বাসা।ওখানেই ওদের কুলো। 

কূলেই রাত্রি নেমে আসত।  নদীর কোনো কথাই শোনা হতো না।  আকাশ ভরা নক্ষত্রবীথি তখন জ্বলে উঠত। ফিরে আসি ঘরে। আমি কী বুঝি অত কোনো গান, কোনো সুর। জীবন মর্মরে তখন অন্য কথা বাজে -- 

'যে-পৃথিবী জেগে আছে, তার ঘাস—আকাশ তোমার। জীবনের স্বাদ ল’য়ে জেগে আছো, তবুও মৃত্যুর ব্যথা দিতে পারো তুমি...'।


আরও চার মাস পর ---

আমার বদলি অর্ডার আসে জেলা সদর অফিস থেকে। ইতোমধ্যে বাড়িতে আমার দাদাজানের পীড়াপীড়ি তে আমার বিবাহ ঠিক হয়ে যায়। আমার দাদা খুব অসুস্থ। মৃত্যুর আগে সে তার নাত্ বউকে দেখে যেতে চায়। 

আমি শাখা অফিসে সমস্ত খাতাপত্র ও হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দেই।  ব্যাবস্থাপক সাহেবকে বলি, আমার চাকুরি জীবনে প্রথম যাদেরকে নিয়ে কাজ করেছিলাম, নয়াগাঁও এর সন্ধ্যাতারার সেই  মেয়েগুলোর কাছ থেকে একটু বিদায় নিয়ে আসতে চাই। উনি আমাকে অনুমতি দিলেন এবং বললেন -- 'যান, দেখা করে আসেন নুরজাহান, নুরী, নসিরন ও জরিনাদের সাথে।'

আমি আজও গেলাম নয়াগাঁও-এ সেই প্রথম দিনের মতো কংসাবতীর তীর ধরে একাকী হেঁটে হেঁটে। যেদিন প্রথম যাই --  সেদিন ছিল হেমন্তের রোদ্দুর।  আজ চৈত্রের দুপুর। সেদিন মাঠ ভরা ছিল সরিষা ফুলের হলুুদ প্রান্তর। আজ ধুঁ-ধূঁ  বিস্তীর্ণ খালি মাঠ। সেদিন ছিল কংসাবতীতে ভরা জল, আজ সেখানে স্বল্প পাথুরে পানি , বালি আর নুড়ি । 

পথের পাশে বৃক্ষগুলির পাতা চৌচির হয়ে ঝরে পড়ছে। ধুলো উড়ছে। পাখিদের সুমধুর গান নেই। কংসাবতীর জলে ঠোঁট চুবিয়ে জল খাচ্ছে তৃষিত কয়েকটি বক ও পানকৌড়ি। রুক্ষ বাতাস এসে লাগছিল আমার গায়ে। একসময় প্রাচীন সেই বটবৃক্ষ তলে এসে দাঁড়াই। আজ আর কোনো গায়েন নেই এখানে। একটু জিরিয়ে আবার নয়াগাঁও এর দিকে হাঁটতে থাকি। 

একসময় নয়াগাঁও-এ জরীদের বাড়ির কাছে চলে আসি। কংসাবতীর তীরে যে ঘাটে জরী সেদিন স্নান করেছিল, সেখানে এসে দাঁড়াই। আজ আর  সেখানে জরী স্নানরত নেই। কিন্তু আমার মানসপটে দেখতে পাচ্ছিলাম, সেদিনকার সেই স্বর্গীয় দৃশ্য ! একটি পল্লীবালা, যার দেহবল্লরী ছিল  এই কংসাবতী নদীর মতো উচ্ছলা, স্বচ্ছ জলের ঢেউ আছরে পড়ছিল যেন শরীরের বাঁকে।  আজও কম্পিত হলাম কিছু মুহূর্তের জন্য । চোখ ফিরিয়ে আনলাম কংসাবতীর জল থেকে। 

আমি জরীর বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকি।  ওর বাড়ির আঙিনায় যেয়ে দেখতে পাই ওর ছেলেটাকে। ওকে বলি -- 'তোমার মাকে একটু ডেকে নিয়ে আসো। যেয়ে বলো -- তোমার স্যার এসেছে।'

জরী ঘর থেকে বের হয়ে আসে। আজকেও সে ঘোমটা টেনে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়।  আমি জরীকে ডাকি -- জরী। 

-- জ্বী। 

-- কেমন আছো তুমি? 

-- ভালো। 

-- জরী...

-- বলেন। 

-- আমার বদলি হয়েছে,  আগামীকালই চলে যাচ্ছি এখান থেকে। 

-- আর আসবেন না? 

-- না। 

জরী কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।  কেমন যেন স্থির, এবং নির্বাক। কথা বের হচ্ছিল না মুখ থেকে। আমি আবার ওকে ডাকি -- জরী... 

জরী কথা বলছে না। 

আমি জরীকে বললাম -- 'আমার  বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তোমাদের সবাইকে আমি  নিমন্ত্রণ করব।  তুমি যাবে না আমার বিয়েতে? '

জরী এবার মাথা থেকে ঘোমটা সরিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি খুব কাছে থেকে  দেখলাম তার বিষাদস্নাত ম্লান মুখ ও চোখ। দেখলাম, ওর চোখ দুটো জলে ভরে আছে !  কংসাবতীর জলের মতো সেই জল স্বচ্ছ ও নির্মল।


পরিশিষ্ট --

আমার সেই অল্প বয়সের জীবনঅধ্যায় শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই জীবনের  প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির কথা ভেবে  এখনকার জীবনেও অবসাদ নামে। হঠাৎই মন কেমন করে ওঠে। হারানো মধুময় কোনো দৃশ্য কখনোই আর দেখতে পাব না। সেই সবের জন্যে আক্ষেপও নেই।  মহাকালের বীথিপথের দিকে চোখ মেলে দেখব -- কংসাবতীর তীরে এক পল্লী রমণী  হাঁটছে ফিরছে, জলের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে আছে। দক্ষিণা শীতল হাওয়া এসে তার শরীরে লাগছে, তার মাথার চুল উড়ছে।

আমি যা পেয়েছিলাম, তা সত্য। আবার হয়ত কখনও পাব তা, এটি আশা। পেলেও তা আবার ফুরিয়ে যাবে, এটা অমোঘ । 


~ কোয়েল তালুকদার