শনিবার, ৬ জুন, ২০২০

তোমার দেওয়া অঙ্গুরীয়

তোমার দেওয়া অঙ্গুরীয়

বর্ষা মাসের  এক মধ্যাহ্ণে আমাদের বাড়ির ঘাটে একটি ছোট ছইওয়ালা নৌকা এসে থামে। নৌকার ভিতর থেকে একজন মধ্যবয়সী লোক ও আর একজন মধ্যবয়সী মহিলা নামে।  তারা দুজনেই বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করে।      

মহিলাটি আমার মায়ের দূর সম্পর্কের বোন। নাম মোছাঃ শিরিনা খাতুন। আমরা তাকে শিরিন খালা বলে ডাকতাম। এই শিরিন  খালা খুব কম আসত আমাদের বাড়িতে।  সে কম আসলেও আমাদের ভাই বোনদের খুব স্নেহ করতেন তিনি ।                                  
শিরিন খালার সাথে যে লোকটি এসেছেন, তিনি আমাদের খালু।  মা, শিরিন খালা ও খালুকে দেখে খুব খুশি হন। এবং তাদেরকে দুপুরেই উপস্থিত মতো ভালো খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করলেন।                
শিরিন খালা মার তিন চার বছরের ছোট ছিল।  শিরিন খালা মার আপন ছোট বোন না হলেও, মা তাকে ছোট বোনের অধিক স্নেহ করতেন।  

দুপুরের খাওয়ার পরে শিরিন খালা মার কাছে একটি কথা পারলেন।  সে মাকে বলল -- 'বুবু আমরা একটা শুভ প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।'
--- কী প্রস্তাব এনেছ।      
--- 'মঞ্জুর একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। মেয়ে আমাদের গায়েরই। বাবা মার একটাই মেয়ে আর কেউ নেই। মেয়ে খুব রূপবতী। ক্লাস সেভেনে পড়ে। বয়স তেরো চোদ্দ হবে। 
আমি খুব আশা নিয়ে এসেছি।  তোমরা মেয়েটিকে একবার দেখো।  পছন্দ হবে তোমাদের। খুব সুন্দরী এবং অমায়িক।  তাছাড়া, মেয়ের বাবা অনেক ধন সম্পদের মালিক। এই ধন সম্পত্তি সব একদিন মেয়ের হবে।    
আমি মেয়ের বাবা মায়ের সাথে আলাপ করেছি।  তারা বলেছে -- আপনি ছেলের মায়ের সাথে আলাপ করে দেখেন। আমাদের এই সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই। '
  
মা বলছিল - ' তোমরা তো জানো,  মঞ্জু মাস্টার্স করে কেবল সরকারি চাকুরিতে ঢুকেছে। ও এখানে থাকে না।  ঢাকায় থাকে।  ওর সাথে আলাপ না করে তোমাকে কোনো কিছু বলতে পারছি না।'

-- 'ঠিক আছে, মঞ্জুর সাথে তো আলাপ করবেই।  কিন্তু তার আগে তোমরা মেয়েটিকে একবার দেখে রাখো, তোমাদের পছন্দ হলেই পরে না হয় মঞ্জুরকে মেয়ে দেখালে।'             
                              
-- 'কথাটি খারাপ বলো নাই।  আমরা না হয় আগেই দেখে নিলাম। আমাদের পছন্দ হলেই মঞ্জুরকে দেখাব। মঞ্জুর পছন্দ হলেই আমরা বিয়ের কথা পাকাপাকি করব।'

-- তাহলে কবে যাবে মেয়ে দেখতে? 
-- সামনের শুক্রবারই যাব।  আমরা চার পাঁচজন যাব।  তুমি মেয়ের বাবা মাকে বলে রেখো।

-- আচ্ছা।    

ঘটনাক্রমে আমার সবচেয়ে বড়ো বোন তখন বাড়িতেই ছিল।  সে তখন  বেড়াতে এসেছিল। আমার এই বোন আমাদের পরিবারের ভালো মন্দের সবকিছুতে মাকে পরামর্শ দিত।  মাও তার পরামর্শ গ্রহণ করত। 

একটি বড়ো ছইওয়ালা নৌকায় করে আমার মা, বড়ো বোন, এক জেঠাত ভাবি,  ছোট বোন ও ছোট ভাই সামনের ঐ শুক্রবারেই মেয়ে দেখতে চলে  য়ায়।  তারা প্রথমে শিরিন খালার বাড়িতে যায়। তারপর ওখান থেকে কণে বাড়িতে যায়।                                                                                    
একদম ঘরোয়া ভাবে এবং কোনো প্রকার  ফর্মালিটিস না করে আমাদের বাড়ির লোকজন মেয়েটিকে দেখে। মেয়ে অপ্রস্ফুটিত চন্দ্রমল্লিকার মতো দিগবালিকা। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ। গোলাপি জবার মতো গাল, অবাক করা চোখে তার মায়া মায়া মাধুর্য লুকিয়ে আছে । আশ্বিনের বৃষ্টির রাতের মতো কালো মাথার চুল। এই তেরো চোদ্দ বছরের মেয়েটির উপরে হেমন্ত সকালের কমলা রঙের রোদের আলো এসে পড়েছে যেন। সবার দৃষ্টি ওর উপর স্থির হয়ে ছিল।    
   
আমি এই মেয়ের কিছুই জানিনা, কিছুই দেখিনি আমি। নিষ্পাপ নিষ্কলুষ ছিল কী সে ! স্বচ্ছ জলের মতো  নিবিড় ও পবিত্র?  হয়ত তার অপ্র্স্ফুটিত পাপড়িগুলো আমার আঙুলের ছোঁয়ায় এক এক করে মেলিতে পারিত। হয়ত তার শরীর মন আমার অলৌকিক যাদুরকাঠীর স্পর্শে উদ্বেলিত হয়ে উঠত।          

আমার মা মেয়েটিকে কাছে বসিয়ে বলেছিল --
'তোমার নাম কী মা?' মার মুখের দিকে চেয়ে মেয়েটি স্মিত বলেছিল -- রেশমা আলী। আমার বাবা আমাকে ডাকে -- রেশমী বলে।    

রেশমীকে সবাই আমার বউ করার জন্য পছন্দ করে।  এবং এই পছন্দ হওয়ার ব্যাপারটা তাৎক্ষণিক প্রকাশও হয়ে যায়।  মেয়ের বাবা মা
খুব খুশি হন। মেয়ের মা একপর্যায়ে তার মেয়েকে আমার মায়ের হাতের ভিতর সমর্পণ করে দিয়ে মাকে বলে -- 'বুবু, আজ থেকে আমার মেয়ে তোমার। তুমি ওকে তোমার বউমা করে ঘরে নিয়ে যেও।' আমার মা ও বলেছিল -- রেশমীকে আমরা যত দ্রুত আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাব। ওযে সাক্ষাৎ লক্ষী মেয়ে!'              
রেশমীকে সবাই বলছিল -- 'তোমার শ্বাশুড়ি মাকে কদমবুসি করো।' বালিকা সেদিন স্বলজ্জিত
হয়ে আমাদের বাড়ির গুরুজনদের কদমবুসি 
করেছিল। মা, তার হাতের আঙুল থেকে একটি অঙ্গুরীয় খুলে পরিয়ে দিয়েছিল রেশনীর অনামিকায়।                

একদিন অফিসের ঠিকানায় মার একটি চিঠি পাই।মা লিখেছিল ---
'স্নেহের মঞ্জুর,
আশা করি তুমি ভালো আছো।  তোমার চাকুরি ভালোভাবেই হয়ত চলছে।  পর সমাচার এই যে, আমরা তোমার বিবাহের পাত্রী দেখেছি।  মেয়ে খুবই সুন্দরী। ক্লাস সেভেনে পড়ে।  বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে রাণীগ্রামে।  তোমার শিরিন খালার পরিচিত।  আমরা মেয়েটিকে দেখেছি।  তোমার বড়ো বুবুসহ আমাদের সবার পছন্দ হয়েছে। 

তুমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে একবার বাড়িতে আসবে।  তুমিও মেয়েটিকে দেখবে।  তোমার পছন্দ হলে আমরা বিয়ের পাকাপাকি কথা বলব ওনাদের সাথে।  তুমি অবশ্যই বাড়ি চলে আসবে।  কোনোরূপ গাফিলতি করবে না।  

ভালো থাকবে। তোমার জন্য আমার দোয়া ও আশীর্বাদ রইল। 

ইতি --- তোমার মা।                                                     
মার পত্রখানি পড়ে একটাই খটকা মস্তিস্কে ঘুরপাক খাচ্ছিল -- ' মেয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ে। তার মানে মেয়ের বয়স খুব জোর তেরো চোদ্দ বছর হবে। লেখাপড়ার কথা বাদই দিলাম,  শেষ পর্যন্ত কী না একটি বালিকা কে বিয়ে করব? '                      

আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম,  আমি কিছুতেই এই বালিকাকে বিয়ে করব না। অফিসের ব্যস্ততার কথা বলে ও নানা অযুহাত দেখিয়ে  মেয়েটিকে আমি কখনোই দেখতে যাব না।  আমি না দেখতে গেলে বিয়ে তো হবে না।  একসময় এমনি এমনি বিয়ের প্রস্তাবটা ভেঙে যাবে।  মেয়ে পক্ষ অন্তত এইভেবে শান্তি পাবে যে, তাদের  মেয়েটিকে দেখে অপছন্দ করে ছেলেটা বিয়ে করেনি।  ভাববে তারা তখন অন্য কথা।    

আমি আর বাড়িতে যাই না। মা পর পর আরও কয়েকটি পত্র লেখে। প্রতি চিঠিতেই বাড়িতে যাবার কথা লেখা থাকে। আমি প্রতিবার উত্তর লিখে পাঠাই --- 'মা, অফিসের কাজে আমি খুব ব্যস্ত হয়ে গেছি।  বাড়িতে যাওয়ার কোনোরূপ সুযোগ পাচ্ছি না।  সুযোগ পাইলেই চলে আসব।'                                                         
এইভাবে ছয়-সাত মাস চলে যায়।  আমি আর বাড়িতে যাই না। 

আমরা অফিসিয়াল ট্যুরে কয়েকজন কর্মকর্তা একবার নেত্রকোনার বারহাট্টা গিয়েছিলাম।  কয়েকদিন ছিলাম ওখানে।  আমাদের সাথে দুটো মেয়েও গিয়েছিল। সেদিন ছিল ছুটির দিন। আমরা একটি নৌকা করে কংশ নদীতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কী মায়াময় অপরাহ্ণ। ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছিল। বিমুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম কংশের দুকূলে ঘরবাড়ি, বৃক্ষ, শস্যের ক্ষেত।  বিকালের সোনা রোদ্দুর বৃক্ষের পাতায় পড়ে ঝিকমিক করছিল।  ঝলমল করছিল কংসের শান্ত জলও।  কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতা আবৃত্তি করছিলাম --
                                     
'একবার এসেই দেখুন কংশ নদের সাথে সমুদ্রের বেশ মিল আছে।
হাসবেন না, দোহাই, আমাদের গাঁয়ের লোকেরা খুব কষ্ট পাবে।....
আরে, এ তো শুধু নদী নয়, এ যে সমুদ্রের ছদ্মবেশী রূপ।.....
কোনো দিন কাউকে বলিনি, শুধু সুদূর শৈশব থেকে মনে-মনে..... 
মিলিয়েছি বারহাট্টার সাথে কক্সবাজার, কংশের সাথে বঙ্গোপসাগর।’

নৌকার পাটাতনের উপর চাদর বিছিয়ে আমরা বসেছিলাম, খালি কন্ঠে গান গেয়ে শোনায়েছিল নাসরিন। -- এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়,  একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু। 

ফেরার পথে গৌরীপুর জংশনে অপেক্ষা করছিলাম ঢাকাগামী ট্রেনের জন্য।  ট্রেন আসতে তখনও অনেক দেরি ছিল।  নাসরিন কী যেন বলতে চাইছিল আমাকে। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিল না।  তারপর এক পর্যায়ে  বলছিল -- 'আমার খুব প্লাটফর্ম ধরে  হেঁটে হেঁটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে ঐ দূরে ব্রিজটার কাছে। দুপাশে কী সুন্দর  মহুয়া গাছ। বাবলাও আছে। ফুলও ফুটে আছে। তুমি  যাবে আমার সাথে ঐ ব্রিজটার কাছে ?'

আমি বলেছিলাম -- না, যাব না। সহকর্মীরা মন্দ বলবে।'

সেই গৌরীপুর জংশন, সেই মনুষ্য কোলাহলের প্লাটফর্ম, সেই মহুয়া গাছের সারি, সেই  বাবলা ফুলের সুবাস নিতে আর যাওয়া হয়নি। কোনোদিন আর হেঁটে হেঁটে যেয়ে দেখা হয়নি দূরের সেই নির্জন ব্রীজটা।                    
   
                                
একদিন আমার ঢাকার বাসায় শিরিন খালার ছেলে এসে হাজির হয়। সে আমার হাতে মার একটি চিঠি তুলে দিয়ে বলে -- খালা তোমাকে আমার সাথে জরুরি ভাবে বাড়িতে যেতে বলেছে।  আমি চিঠিখানা পড়ে একটি উত্তর লিখি --- 

শ্রদ্ধেয়া মা, 
আমার কদমবুসি নিও।  পর সমাচার এই যে ---আমি তোমাদের পছন্দ করা এই বালিকাকে বিবাহ করতে পারব না।  এত অল্প বয়সের একটি মেয়েকে বিবাহ করা আমার পক্ষে কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়।
আমি এখানে একটি মেয়েকে পছন্দ করে রেখেছি। তোমরা এসে এই মেয়েটিকে দেখে যেও ।  পছন্দ হলে এই মেয়ের সাথেই আমার বিবাহের ব্যবস্থা করবে। 

ইতি --- মঞ্জুর।                                                          
নাহ্ কাউকেই পাওয়া হয়নি এই জীবনে। না রেশমীকে,  না নাসরিনকে। যাকে এই জীবনে জীবন সঙ্গিনী করে পেলাম সে অন্য আর একজন মায়াবতী। যাকে চাইনি, যে আমাকেও চায়নি কোনোদিন -- সেই হলো আমার ভূবনের ভূবন বাসিনী।          

কারোর জন্যই কোনো আফসোস নেই।  কোনো আক্ষেপও কখনো ঠাঁই দেইনি অন্তরে।  কে কোথায় ভালো আছে, কে কোথায় দুঃখে আছে -- তারও কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। কতজন তো কতভাবে কতজনকে চায়, সব চাওয়া কী পাওয়া হয়? হয় না। কী যে লীলা ঈশ্বরের !   

২০১২ সালের কথা।  বাইশ বছর চলে গেছে।  মার মৃত্যুর পর বাড়িতে চল্লিশার একটি অনুষ্ঠান হয়।  অনুষ্ঠান শেষে যখন ঢাকায় চলে আসব,  কী মনে করে মার কাঠের সিন্দুকটা আমরা ভাই বোনরা খুলি।  সিন্ধুকে মার অনেক কিছু ছিল। তার ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, সামান্য কিছু টাকা ও কিছু গহনা।  একটি ছোট্ট কাপড়ের টোপলা ছিল আলাদা করে।  টোপলার ভিতরে একটি বহু পুরনো জীর্ণ চিঠি দেখতে পাই।  হলুদ রঙ হয়ে গেছে কাগজের।  ধরলেই ছিঁড়ে যাচ্ছিল।  চিঠিটার সাথে একটি সোনার অঙ্গুরীয়। 
চিঠিটা রেশমীর মায়ের হাতে লেখা ---     

প্রিয় বুবু, 
সালাম নিও। কত আশা বুকে বেঁধেছিলাম। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম --  আমার মেয়েটি তোমাদের ঘরে যাবে।  জানো বুবু,  এত ছোট্ট একটা মেয়ে !  তারপরও তোমাদের জন্য ও খুব কান্না করে। কী যে এক অসীম ক্ষত ওর ছোট্ট প্রাণে দিয়ে দিলাম।  তোমার দেওয়া অঙ্গুরীটা ফেরত দিলাম।  এই বেদনার ভারটি আমার মেয়েকে দিয়ে বইতে দিতে চাচ্ছি না।  তোমার দেওয়া এই অভিজ্ঞান তোমার কাছেই থাক্।  

ইতি --- রেশমীর মা। 
২৩ - ১-- ১৯৮৯ ইং
রাণীগ্রাম, সিরাজগঞ্জ।  
                                                                                           

শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০

পরজন্ম

শত বছর পরে এমন বৃষ্টি বৃষ্টি সন্ধ্যা রাত্রিতে মাটির ফোড়া কাটা ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে ঝিঁঝি পোকা ডাকবে।  বাঁশঝাড়ের আড়ালে আঁধার করা বনমৌরির গন্ধে যখন রাতের জোনাকিরা আকুল হবে -- সেই রাতের  গোপনে আমি ফিরে আসব ওদের মতো করে।
  
চেনার মতো আজিকার কোনো মানুষ হয়ত তখন থাকবে না।      

এই পৃথিবী নামে গ্রহে আবার যে  ফিরে আসতে ইচ্ছে করে, তা যে রূপেই হোক, যত তুচ্ছ কিছু হয়ে হলেও --- ঝিঁঝি পোকা কিংবা জোনাকি।                         

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

অঞ্জলি


তোমার অকম্পিত হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলে -- ধরো।  পরম নির্ভর বাহু, ছায়াবীথির মতো বুক দেখিয়ে  বলেছিলে -- এখানে হৃদয়।  জমাট বেঁধে আছে লাল রক্তের ছোপ ! 
যত্ন করো, পরিচর্যা করো, নিজের স্থানকে পবিত্র করে রাখো.....       
 

সোমবার, ১ জুন, ২০২০

মৌয়াল

মৌয়াল

জব্বর মৌয়াল একজন ভূমিহীন প্রান্তিক মানুষ। সংসারে তার অভাব অনটন লেগেই থাকে । দুটো ছোট মেয়ে আছে তার। বয়স একজনের পাঁচ বছর, আর একজনের তিন বছর। একজনের নাম নূরী, আর ছোট জনের নাম -- বুড়ী।       

সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করে জব্বার সংসার চালায়। কিন্তু সবসময় সে বনে মধু পায় না। আর তখনই তার সংসারে অভাব লেগে থাকে।  অভুক্ত থাকতে হয় তাদের প্রায় সময়। 

জব্বারের বউ আছিয়া এই অভাব অনটন নিয়ে প্রায় দিনই জব্বার মিয়ার সাথে ঝগড়া করে। সেদিন দুপুরবেলা তুমুল ঝগড়া করছিল জামাই বউ দুজনে।  একে অপরে তুই তোকারি করে কথা বলছিল । আর অশ্লীল যত গালি গালাজ করছিল। শুরুটা করেছিল জব্বার মিয়ার বউ। 

--- মরদ তুই আমারে বিয়া করছিলি ক্যা.. বউ পোলাপানরে খাওন দিতে পারবি না.. 
--- চুপ কর মাগী, বেশি কতা কবিনা। 
-- চুপ করমু ক্যা..  মাইয়া দুউডা কাল থাইকা না খাইয়া রইচে.. 
--- আমি কী করমু.. কই থেইকা দিমু? 
--- তো জন্ম দিছিলি ক্যা.. 
--- তরে চুদছিলাম। তাই হইয়া গেছে। 
--- চোদার সময় তো মজা লউছোস,  হুস আছিল না। 
-- তুইও তো মজা লইছোস। 
-- চুপ কর্ মর্দা,  বউরে খাওন দিতে পারোস না, আবার কতা কস্। তুই আবার আমারে চুদতে আসিস।  তোর ধোন কাইটা দিমু। 
--- মাগী চুপ কর!  কইচি। 
---  মাইয়া দুইডা কখন থেকে ক্যানতাছে!  তুই শোনস না!  তুই ঘর থাইকা বের অইয়া যা মর্দ। তরে দেখতে চাই না।     

আছিয়া জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। 
     
জব্বার মিয়া মাথায় গামছা বাঁধল। নূরী আর বুড়ীকে বলল -- এই তোরা আমার সাথে আয়। নূরী বুড়ী খুব খুশি হয়।  ওরা বলল -- বাবা,  তুমি আমাগো কই নিয়া যাইবা? 
--  চল্। খোন্তাকাটা বাজার থোন তোগোর খাওয়াইয়া লইয়া আসি। 

নূরী ও বুড়ীকে নিয়ে জব্বার নৌকায় উঠল।  ছোট ডিঙি নৌকার পাটাতনের উপর দুই বোন বসে আছে।  ওদের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক।  জব্বার মিয়া বৈঠা চালাচ্ছে।  ছোট্ট নৌকাটি চলছে বলেশ্বর নদীর উপর দিয়ে। 

তখন সন্ধ্যা পূর্ব বিকাল।  ভাটি স্রোতের টানে নৌকাটি সুন্দরবনের তীরে এসে থামে। জব্বার মিয়া নৌকাটি একটি গাছের গুরির সাথে বাঁধে। তারপর মেয়ে দুটোকে হাত ধরে কূলে নামায়।  জব্বার মিয়া ওদের বনের গভীরে নিয়ে যায়।  এক জায়গায় ওদের বসিয়ে রেখে বলে -- 'তোরা এখানে বসে থাক্।  আমি আসছি।' 

মেয়ে দুটো বলছিল -- বাবা,  তুমি কই যাও? 
-- আমি তোগোর জন্য খাবার নিয়া আসমু। 
-- তাড়াতাড়ি আইসো বাবা,  আমাগো খুব খিদা লাগছে।
-- আচ্ছা। 

জব্বার মিয়া মেয়ে দুটোকে জঙ্গলের ভিতর রেখে আস্তে আস্তে এসে নৌকায় ওঠে। 

তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বনের ছোট্ট ছোট্ট পাখিরা সন্ধ্যার আকাশ জুড়ে চ্রিহি চ্রিহি শব্দ করছে। আঁধার নামছে ঘনঘোর করে। জব্বার মিয়া বলেশ্বর নদীর উজান বেয়ে  বৈঠা চালাতে থাকে। কিন্তু  বৈঠাটি চালাতে পারছিল না সে।নৌকা যেন চলছে না আর।
 
হাতে বল পাচ্ছিল না জব্বার মিয়া। তারও পেটে যে তখন প্রচন্ড খিদা ছিল ।              
                                     

কোয়েল তালুকদার
২ জুন, ২০২০ ইং, ঢাকা।                                         

   
                   
                             

রবিবার, ৩১ মে, ২০২০

রোল নং ১৭, দোলা মিত্র

রোল নং ১৭, দোলা মিত্র
   
১৯৭২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের কোনো একটি দিন। আজ এতদিন পর সঠিক দিন তারিখ মনে নেই।  দেশ মাত্র স্বাধীন হয়েছে। 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল।' 

মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের স্কুল প্রথম খোলার দিন ছিল সেদিন।  দীর্ঘ দশমাস পর স্কুল খুলবে।  দীর্ঘ দশ মাস পর সবার সাথে দেখা হবে। কেমন একটি উৎসব উৎসব মুহূর্ত ছিল সেদিন , কেমন একটি উত্তেজনা উত্তেজনা ভাব ছিল।     

ক্লাস নাইনে পড়ি।  প্রথম ক্লাসটি ছিল ওয়াহিদ স্যারের অংকের ক্লাস।  আমাদের ক্লাসে প্রায় পঞ্চাশ জনের মতো ছাত্র ছাত্রী ছিল। এর মধ্যে ছাত্রী ছিল মাত্র সাতজন। তখন মেয়েরা স্যারদের পিছে পিছে ক্লাসে আসত।  এবং ক্লাস শেষ হলে স্যারদের পিছেপিছে বেরিয়ে যেত।     

দীর্ঘ দশ মাস পর স্যার প্রথম রোল কল করছে। ক্লাসে সেদিন অনেকেই আসেনি,  ষারা আসেনি তারা কেন আসেনি, সহপাঠীরা যারা জানত তারা কেউ কেউ বলে দিচ্ছিল। 

স্যার একসময় কল করে -- 'রোল নং ১৭, দোলা মিত্র।' কোনো রেসপন্স নেই। কেউ বলছে না -- 'ইয়েস স্যার'। মেয়েদের বেঞ্চে ছয়জন ছাত্রী বসা ছিল। তাদের ভিতর দোলা মিত্র নেই।   

ক্লাস কক্ষ নিরব নিস্তব্ধ। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। দোলাদের বাড়ি ছিল ধলডোব গ্রামে। ঐ গ্রামেরই একটি ছেলে ছিল, নাম বিমল। বিমল আমাদের সাথে পড়ত।  স্যার ওকে জিজ্ঞাসা করে-- 'তুমি কী দোলার কোনো খবর বলতে পারো?' বিমল বলছিল --  ' স্যার, দোলা' রা ভারতে চলে গিয়েছে। এখনও ফিরে আসেনি।'        

দোলা' রা ভারত থেকে আর কোনো দিন ফিরে আসেনি।  কেন আসেনি।  সে অনেক দুঃখের কথা। অনেক দাম দেওয়া কাহিনি।  

কেমন ছিল দোলা নামের মেয়েটা?  ক্লাসে চুপিচুপি ছেলেরা ওকে  ডাকত কাননবালা বলে।  উজ্জ্বল গৌরবর্ণের এই মেয়েটির চোখ দুটো ছিল বিনোদিনীর মতো টানাটানা, কেশবতী ছিল সে। হাতে কঙ্কণ পরত। কিন্তু কিনিকিনি শব্দ হতো না হাতে। স্কুলের বারান্দা দিয়ে স্যারদের পিছনে পিছনে হেঁটে যখন সে ক্লাসে যেত, তখন সিনিয়র ছেলেরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত ওকে। 'বধূ তুমি চলে যাও গো বকুল বিছানো পথে পথে।'    

দোলা ভালো গান গাইতে পারত।  স্কুলে বার্ষিক  সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ও গানে প্রথম হত।  সেই বার আমাদের ক্লাসে দুজন ছাত্র ছাত্রী পুরস্কার পেয়েছিল। একটি পেয়েছিল গানে দোলা মিত্র।  আর একটি পেয়েছিলাম আমি -- স্বরচিত কবিতা পাঠে। শহর থেকে ক্যামেরাম্যান এনে বিজয়ীদের স্টীল ছবিও তুলেছিল।                                                                                    
দোলা আমার সহপাঠী হলেও ওর সাথে আমার কিংবা অন্য ছেলেদের সাথে ওর  তেমন কোনো  কথা হত না।  কারণ কথা বলার সুযোগ ছিল না তখন।  ছুটির পরে একদিন বাড়ি যেতে যেতে দোলা আমাকে বলেছিল -- 'তুমি তোমার কবিতাটি কপি করে  আমাকে দিও। খুব ভালো লিখেছ, একেবারে গানের মতো।'  

আমি লাইনটানা একটি সাদা কাগজে আমার সেই কবিতাটি লিখে দোলাকে দিয়েছিলাম। তাও গোপনে, কেউ দেখতে পায়নি। সেদিনও ছুটির পর বাড়ি যেতে যেতে কথা হয়েছিল দোলার সাথে।      কবিতাটি দেওয়ার সময় আমি ওকে বলেছিলাম -- 'তুমি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের যে গানটি অনুষ্ঠানে গেয়েছিলে, ঐ গানটি আবার একদিন আমায় গেয়ে শোনাবে?' 

দোলা বলেছিল --  'গেয়ে শোনাব তোমাকে '। 

তারপর তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।  একদিন ভোরবেলা শহর থেকে ধলডোব গ্রামে মিলিটারি গেল।  ম্যাসাখার করল বাগবাটি, হরিনাগোপাল ও ধলডোবসহ হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামগুলো। জ্বালিয়ে দেওয়া হলো তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দির। ঘর থেকে মানুষ ধরে নিয়ে পাখির মতো গুলি করে  হত্যা করে। ধর্ষণ করে মেয়েদের। পাক সৈন্যদের কালো হাতের থাবা থেকে সেদিন দোলাও রক্ষা পায়নি। সেও ধর্ষিত হয়েছিল।                                                                                                         
লজ্জ্বায় আর গ্লানিতে দোলাদের পরিবার স্মরণার্থী হয়ে সেই যে ভারতে চলে গিয়েছিল, তারপর আর তারা ফিরে আসে নাই এই দেশে।      

তারপর জীবন থেকে কত পৃষ্ঠা উল্টে গেছে। কতদিন কত বছর চলে গেছে কালের অতল তলে। আমিও চলে এসেছি গ্রাম থেকে শহরে। সেই কবে অজ পাড়াগাঁয়ের এক স্কুলের, ক্ষণকালের এক  সহপাঠিনী ছিল দোলা মিত্র!  তাকে জীবন ভর মনে রাখার দায় কী ছিল আমার?  যে আবার  চলে গেছে অন্য দেশে।  

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কত গান শুনেছি কত জনের কাছ থেকে। কত সুরে সুরে ভেসে গেছে কত আনন্দের ক্ষণ !  সেই কবে পল্লীর এক স্কুলের অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে দোলা মিত্র নামে অখ্যাত  কেউ একজন -- কী এমন গান গেয়েছিল যে, তার সেই কণ্ঠ, তার সেই সুর এত দিন ধরে মনে রাখতে হবে !  কিংবা তা কী এখনও  হৃদয় বীণায় অনুরণিত হবে চিরকাল !     
    
অনেক বছর পর  পিপুলবাড়িয়া বাজারে সহপাঠী   বিমলের সাথে আমার একবার দেখা হয়।  ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, দোলা এখন কোথায় থাকে?  বিমল বলেছিল -- 'শুনেছি, দোলা শিলিগুড়িতে থাকে।  ইসকন মন্দির রোডে ওদের বাসা।  দোলা ওখানকার একটি স্কুলের গানের মাস্টার। ওর স্বামীর নাম -- সুনীল চক্রবর্তী।      

২০০৪ সালে আমি ও আমার স্ত্রী দার্জিলিং গিয়েছিলাম বেড়াতে। ফেরার পথে শিলিগুড়িতে দুইদিন ছিলাম। খুব ইচ্ছা হলো, দোলার সাথে দেখা করার। একদিন বিকালে আমার স্তীকে নিয়ে ইসকন মন্দির রোডে দোলাদের বাড়ি খুঁজতে বের হই।  পেয়েও যাই ওর বাড়ি। 

আধাপাকা টিনসেড ছোট্ট ছিমছাম একটি  বাড়ি। বাড়ির গেটে নক করতেই গেটটি খুলে দেয় মধ্যবয়সী একটি লোক। বুঝতে পারছিলাম,  ইনি দোলার স্বামী হবে।  উনি বলছিলেন -- কোথা থেকে আপনেরা এসেছেন?  
-- আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। 
-- কার কাছে এসেছেন? 
-- এখানে দোলা মিত্র নামে কেউ থাকে?
-- থাকে।  তবে দোলা মিত্র নয়, সে এখন দোলা চক্রবর্তী। উনি আমার স্ত্রী।   
-- ওহ!  আচ্ছা! আমরা দোলার সাথে একটু দেখা করব।    
-- আসুন, ভিতরে বসুন।                         
                                                               
ছোট্ট সাজানো গোছানো একটি ড্রয়িং রুমে আমাদের বসতে দেয়।  একটু পর একজন মহিলা প্রবেশ করে। দেখলাম তাকে! এ যে দোলা মিত্র !  
সেই অপূর্ব সুন্দর মুখচ্ছবি! আজও তেমনই আছে  লাবণ্যময় রূপ মাধুর্য!  মার্জিত বাচনভঙ্গী, আনত নয়ন! কী যে দেবী দেবী লাগছিল ওকে! 

আমি ওকে বললাম -- চিনতে পারছ আমাকে?  
-- পারছি!  তুমি রঞ্জন! 
-- হ্যাঁ,  আমি রঞ্জন।  তেত্রিশ বছর পর আমাদের  দেখা হলো। 

আমার স্ত্রীকে দেখিয়ে দোলা বলছিল,  তোমার বউ নিশ্চয়ই! 
--- হুম! ওর নাম -- মায়াবতী!    
দোলা ওর স্বামীর সাথেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়।

দোলাকে দেখছিলাম আর বিষাদে মনটা ভারী হয়ে উঠছিল। ওর মায়াময় মুখখানি দেখে কান্না পাচ্ছিল খুব। বলতে ইচ্ছে করছিল, দোলা -- 'তুমিও তো আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য অনেক  ত্যাগ স্বীকার  করেছ।  তোমার এই আত্মত্যাগ আমরা ভুলি কী করে?'                
        

সেদিন রাত অবধি দোলার বাসায় ছিলাম।  অনেক কথা হয়েছিল দোলা ও দোলার স্বামীর  সাথে। দোলা না খেয়ে  আসতে দেয়নি।

দোলার ড্রইংরুমে  একটি জিনিস দেখে অবাক হয়েছিলাম -- ওয়ালে কাঁচের ফ্রেমে একটি ছবি যত্ন সহকারে সে টানিয়ে রেখেছে।  ছবিটি আমাদের স্কুলের একটি পুরস্কার বিতরণীর।  ছবিতে আমি ও দোলা পুরস্কার গ্রহণ করছি হেড স্যারের কাছে থেকে। সবুজ ছায়া সুনিবিড় স্কুল আঙিনা। আম সুপারির ঝাড়,  খোলা মাঠ, খোলা আকাশ সবই ছবিতে দেখা যাচ্ছে। এ যেন বাংলাদেশের একটি চিরায়ত রূপ !     

ওর বাড়ি থেকে  যখন চলে আসব,  তখন দোলা বলছিল -- রঞ্জন, তুমি আমার গান শুনবে না? 

--- শুনব, গাও। 

দোলা হারমোনিয়াম বাজিয়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই গানটি গেয়ে শোনায়।  যে গানটি স্কুলের অনুষ্ঠানে সে গেয়েছিল,  যে গানটি আমাকে গেয়ে শোনাবে বলে একদিন কথা দিয়েছিল ---
       
'তুমি না হয় রহিতে কাছে-
কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে,
আরও কিছু কথা না হয় বলিতে মোরে। 
এই মধুক্ষণ মধুময় হয়ে নাহয় উঠিত ভরে-
আরও কিছু কথা না হয় বলিতে মোরে,
কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে......। '

তারপর আরও কত বছর চলে গেছে। 
"রোল নং ১৭, দোলা মিত্র।" ক্লাস কক্ষের ভিতর  রোল কলের সেই আওয়াজটি দিনে দিনে আরও অস্পষ্ট ও ক্ষীণ হয়ে আসছে !     


কোয়েল তালুকদার
৩১ মে, ২০২০ ইং,  ঢাকা।              
-------------------------------------------------------
ডিস্ক্লেইমারঃ  লেখককে গল্পের নায়ক ভাবা ঠিক হবে না।                                                                       

শনিবার, ৩০ মে, ২০২০

সিল্কসিটি এক্সপ্রেস

সিল্কসিটি এক্সপ্রেস 

সদানন্দপুর স্টেশন থেকে ষাটোর্ধ একটি লোক ও  এক বৃদ্ধা রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ট্রেনটিতে উঠে। তারা কোথায় যাবে, বা নামবে কেউ জানে না। লোকটার বয়স ষাটের উপর হলেও এখনও সে অনেক শক্ত সামর্থ্য। কিন্তু স্ত্রীলোকটি খুব অসুস্থ।  পুরুষ লোকটা অনেকটা বোগল কোল করেই তাকে ট্রেনের কামড়াতে  উঠিয়ে বসায়। কথায় বোঝা গেল বৃদ্ধা তার স্ত্রী হয়। 

বৃদ্ধাা মহিলাটির ঠোঁট মুখ বাঁকা হয়ে গেছে। কথা বলতে পারে না। শরীরের  বাঁ পাশটা পুরো অবশ।  তার যে দুতিন বার স্ট্রোক করেছিল, তাকে দেখলে তা বোঝা যায়।  

কোনো শক্ত খাবার সে খেতে পারে না। নিজে হাত দিয়ে তুলে কোনো কিছু খেতে পারে না।  তাকে তুলে খাওয়াতে হয়।  তার আরও অসুবিধা আছে, তাহলো সে নিজে বাথরুমে যেতেও পারে না।  অন্য কারোর সাহায্য নিতে হয়।    

বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাকে দেখে মনে হলো ওনারা নিম্নবিত্তের গ্রামের মানুষ। ওনারা যেহেতু সদানন্দপুর থেকে উঠেছে এদের বাড়ি কামারখন্দ-ভদ্রঘাট- কোনাবাড়ি- সিরাজগঞ্জ সদরের কোনো এলাকায় হয়ত হবে। আবার নাও হতে পারে। অন্য কোথাও থেকে এসে এই সদানন্দপুর স্টেশন থেকে তারা উঠতে পারে।       

ট্রেনটি চলছে।  ওনারা সাধারণ শোভন সিটে বসে আছে।  লোকটা খুব সেবা সুশ্রুষা করছে ওনার স্ত্রীকে।  তার সেবা সুশ্রুষা দেখে মনে হলো -- তাদের ভিতর একসময় খুব প্রেন মহব্বত ছিল।  একটা শিশুকে যে ভাবে মা যত্ন করে খাওয়ায়,  ঠিক সেইভাবে যত্ন করে স্ত্রীলোকটিকে সে খাওয়াচ্ছিল।  কখনও তাকে দুহাত দিয়ে বুকের পাশে জড়িয়ে রাখছিল,  কখনও তার কোলের উপর মাথা রেখে  চুল বিলিয়ে ঘুম পারিয়ে দিচ্ছিল লোকটি।          

কামড়ার অন্যান্য যাত্রীরা সবাই মুগ্ধ হয় স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এমন ভালোবাসা দেখে। বৃদ্ধা মহিলাটি  একসময় তার প্রিয়তম স্বামীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যায়। মনে হলো, এমন কেউ একজন গান গেয়ে গেয়ে তাকে ঘুম পারালো --  
'তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার
কানে কানে শুধু একবার বলো, তুমি যে আমার,
জীনন মরণ মাঝে....  '    
    
লোকটির সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে হলো আমার।  বললাম -- আপনারা কোথায় যাবেন? লোকটি বলল -- পাকসীর কাছেই, পদ্মার পাড়ে একটি গ্রামে। 
--- ওনাকে আপনি খুব ভালোবাসেন বুঝি? 
--- জ্বী, আমার পরানের চেয়ে বেশি। 
--- তাই?  শুনে অনেক খুশি হলাম।     
--- জানেন,  আমার সংসারে কিছু ছিলনা। সেই বাবার বাড়ির যা কিছু পেয়েছিল,  সবই আমাকে এবং আমার সংসারের জন্য  দিয়ে দিয়েছে।  নিজের জন্য কিছু রাখেনি।'
-- যাক,  আপনিও অকৃতজ্ঞ হননি।  স্ত্রীর এই অসুস্থতার সময় তার পাশে রয়েছেন। 

লোকটি স্মিত হাসলো। 

ট্রেনটি ইতোমধ্যে ঈশ্বরদী জংশনে এসে থামে।  লোকটি -- তার কোলের উপরে ঘুমিয়ে থাকা তার স্ত্রীকে ডাকে -- 'এই, ওঠো, এসে গেছি।'

বৃদ্ধা মায়া করে তার স্বামীর চোখের দিকে চোখ মেলে তাকায়। 
                
লোকটি আবারও বৃদ্ধাকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ট্রেন থেকে নামে। এবং তার স্ত্রীকে বামপাশ করে আস্তে আস্তে করে হেঁটে বিশ্রামাগারের দিকে নিয়ে যায়।                     

লোকটি তার অসুস্থ স্ত্রীকে বিশ্রামাগারের বেঞ্চের উপর শোয়ায়ে দেয়।  তার মাথায় ও কপালে হাত বুলায়ে বলে -- 'খুব খারাপ লাগছে তোমার?'
বৃদ্ধা কথা বলতে পারছিল না।  মাথা নেড়ে বলছিল শুধু ,  হে। 
           
--- 'তুমি একটু শুয়ে থাকো।  ভালো লাগবে। 
আমি  তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।'  এই কথা বলে সে বিশ্রামাগারের বাইরে চলে আসে।    
              
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সিল্কসিটি ট্রেনটি তখন  হুইসেল বাজিয়ে পুনরায় চলতে থাকে। লোকটি একবার এদিক সেদিক তাকায়। তারপর  দৌড়ে গিয়ে  পিছনের কামড়ার একটি  দরজা দিয়ে ত্বরিৎ ট্টেনটিতে উঠে পড়ে। 

সিল্কসিটি এক্সপ্রেস  ট্রেনটি  ঝিকঝিক করে দ্রুত বেগে  ছুটে চলতে থাকে  রাজশাহীর দিকে।     


কোয়েল তালুকদার
৩০ মে, ২০২০ ইং,  ঢাকা।      

           
                               
                                                     

                                                   

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

দ্বিধা

দ্বিধা
 
লায়লা আমার সহপাঠী ছিল। ইউনিভার্সিটিতে  তিন বছর একসাথে অনার্স পড়েছি।  আমরা দুজন একে অপরের ভালো বন্ধুও ছিলাম। 

লায়লা আমাকে একটি চিঠি লিখেছিল। আমাদের অনার্স পরীক্ষা যেদিন শেখ হয়ে যায় সেদিন।  তিন বছরে কত ক্ষণ ছিল, কত মুহূর্ত ছিল, কত আনন্দময় সময় ছিল,  কত আকাঙ্খা করতাম কোনো নিবেদন পাওয়ার -- তখন সে লেখেনি। ইউনিভার্সিটি  যেদিন বন্ধ হয়ে গেল, যেদিন থেকে আর কোনো দিন ক্লাস হবে না, সেদিন সে আমাকে চিঠি লিখেছে। তাও বিদায় বেলায় যাবার সময়।    
    
চিঠিটি দেওয়ার সময় লায়লা শর্তও দিয়েছিল একটা -- 'আমি যখন চলে যাব। স্টেশন থেকে ট্রেনখানি যখন ছেড়ে চলে যাবে অনেক দূর, তখন  প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে তুমি পড়বে আমার চিঠিখানা, এর আগে নয়। '
আমি লায়লাকে বলেছিলাম, 'ঠিক আছে, তাই পড়ব।'     

রাজশাহী এক্সপ্রেস ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ঝিকঝিক করে প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যায়। এই ট্রেনেই চলে যায় লায়লা । কী সুন্দর হাসিখুশি ভাবে চলে গেল সে।  মুখে কোনো মন খারাপ নেই।  চোখে কোনো বিষণ্ণতাও নেই । জানালার কাছে বসে ছিল সে। তাই দেখতেও পেলাম ওর যাবার বেলাকার দু চোখ। ট্রেন আড়াল হয়ে  যতদূর পর্যন্ত  মিলিয়ে গেল, ততদূর পর্যন্ত ওর চোখের দিকে চেয়ে রইলাম ।      

পথে যেতে যেতে ওর চোখ থেকে একটুও কী কান্না ঝরে পড়েনি আমার জন্য?  ও কী পাষাণী?  নাকি আমি পাষাণ?  কারোর চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও ঝরে পড়ল না!  তবে কী মিছে ছিল সব তিন বছরের মায়া মমতা ! 
                      
লায়লা চলে যাবার পর প্লাটফর্মেের কোলাহল মুহূর্তেই যেন মুখরহীন হয়ে গেল। কতক্ষণ এমনি দাঁড়িয়ে থাকলাম একাকী ।  তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে একটি খালি কংক্রিটের বেঞ্চের উপর যেয়ে  বসি।  ফ্লাস্কে করে এক চা বিক্রেতা ছেরা বলছিল -- স্যার চা খাইবেন? 
বললাম -- দে। 
--- লাল চা কিন্তু! 
--- তাই দে।
--- সিগারেট দিব?
--- দে। 
--- কোনটা খান?
--- ছাত্তার।
--- ছাত্তার কী স্যার! 
--- স্টার দে। স্টারকে ছাত্তার কই।          

চা খেয়ে স্টার টানতে থাকি। একটু জোরে জোরেই টানলাম।  মাথা ধরে গেল বেশ !  মাথা ধরা নিয়েই  লায়লার চিঠিখানি বের করে পড়তে থাকি ---

রঞ্জন, 

আমি চলে যাচ্ছি। আবার কবে আসব জানি না।  মাস্টার্স করা হয়ত আর হবে না।  আবার হতেও পারে। যদি তুমি চাও। 
আমার বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে আছে।  আমি গেলেই আমার মতামত নিয়ে হয়ত কথা পাকাপাকি করে ফেলবে।  
                      
তুমি এমন কেন বলো তো?  ছেলে মানুষের এত দ্বিধা থাকে?  তিন বছরে কতগুলো দিন ছিল, সে কী তুমি গুণেছিলে কখনও?  কত কথা বলেছি তোমার সাথে, কত ক্ষণ তোমার পাশে বসেছি, কত কিছু দিতে নিতে কত যে আঙুলের ছোঁয়া লেগেছে দুজনের ! কার শরীরের কেমন গন্ধ,  তাও জানা হয়ে গেছে।  চেহারার রূপ, অপরূপ, অরূপ -- সবই দেখা হয়ে গেছে ! 

আমাকে কী তোমার ভালো লাগেনি? দ্বিধাটা  ছিল তোমার কোথায়? কেন তুমি গত তিন বছরেও বলতে পারোনি -- ' লায়লা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে আমি চাই।  তোমাকে ছাড়া বাকী জীবন আমার  চলতে চাইবে না। '            
  
না কী,  তুমি চেয়েছিলে আমি তোমাকে আগে বলি!  তাই না?  

কী আশ্চর্য!  আমারও বলতে বলতে তিনবছর লেগে গেল।  যখন এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি ঠিক তখন। হঠাৎ করেই কেমন জানি লাগছে!  মনে হচ্ছে -- তুমি ছাড়া আমি খুব একা!  তোমাকে ছাড়া আমার বাকী জীবন অর্থহীন।               

এই শহরে কোথায় আমরা যাইনি বলো?  পথে 
পথে কত হেঁটেছি , কত বৃক্ষের সবুজে, ইউক্যালিপটাসের কত ছায়াতলে!  কত সময় পার করেছি অহেতুক কোনো কথা না বলে। শুধু আসল কথাটাই তোমাকে বলা হয়নি -- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি রঞ্জন।'       

হ্যাঁ -- রঞ্জন, আমি তোমাকে ভালোবাসি।  এই চিঠির অপর পৃষ্ঠায় আমার ঠিকানা লেখা আছে।  তুমি আমাকে দ্রুত পত্র লিখে তোমার মতামত জানাবে।  আমি তোমার পত্রের জন্য অপেক্ষা করব।  ভালো থেকো। 

-----  লায়লা।                

আমি চিঠিখানা পড়ে কংক্রিটের বেঞ্চের উপর রাখি।  ঐ চা-ওয়ালা ছেরাকে আবার ডাকি।  ওকে বলি -- চা দে এক কাপ!  
ছেরা চা দেয়। এবং বলে -- ছাত্তার দিব?
-- না,  আবদুল লতিফ দে। 
-- স্যার আবদুল লতিফ কী? 
-- চিনোস না!  গোল্ড লীফ!  গোল্ড লীফ দে।                    
চা ওয়ালা ছেরাকে বলি -- তোর নাম কী?  ও বলে, এমডি আবুল কাসেম। 
আমি এমডি আবুল কাসেমকে বলি -- তুই আমাকে আরও দুই রাউন্ড চা সিগারেট খাওয়াবি।  তারপর,  বিল নিয়ে চলে যাবি।  কাসেম মাথা নেড়ে বলে -- আচ্ছা।                    
                                 

প্লাটফর্ম থেকে যখন চলে আসব তখন কংক্রিটের বেঞ্চের উপর রাখা চিঠিখানি খুঁজি।  দেখি চিঠিটি নেই। ফাল্গুণের দমকা বাতাসে কখন চিঠিটি উড়ে যেয়ে প্লাটফর্মের নীচে রেললাইনের উপর পড়ে গেছে দেখতে পাইনি।  ট্রেনের ঘূর্ণোন চাকায় সে চিঠি ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ছিন্ন চিঠি কুড়িয়ে চিঠির পিছনে লেখা লায়লার ঠিকানাটা যে উদ্ধার করব,  তা আর ইচ্ছে হলো না !         

প্লাটফরমের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছিলাম আর ভাবছিলাম, কী করব এই জীবনে?  বিয়ে করে খাওয়াব কী?  সেই একই দ্বিধা! একই অনীহা!  চাল চুলোহীনদের বিয়ে করার সাধ হওয়া ঠিক না।  ওর বিয়ে হয়ে যাক।  ভালো থাক্ আমার আজীবন চির- সখা লায়লা। এর বেশি কিছু চাওয়া ঠিক না !         

পাঁচ বছর পর...... 

একটা সরকারি কাজে চাঁপাই নবাবগঞ্জ  গিয়েছিলাম।  ওখানে কাজ সেরে একটি লোকাল বাসে করে  ফিরছিলাম রাজশাহীতে। পথিমধ্যে গোদাগাড়ী থেকে একটি মেয়ে ওঠে।  আমি দেখে তাকে চিনতে পাই,  এ যে লায়লা।  

সিট ছিল না!  ওকে  বসতে দেই।  আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বলে --  তুমি, এখানে! 

টুকটাক অনেক কথাই হল ওর সাথে।  রাজশাহীতে এসে দুজনই নামি।  লায়লা বলছিল -- চলো আমার স্বামীর বাসায়।  
--- আমি বললাম, না -- আজ না। আজই আমাকে ঢাকা চলে যেতে হবে।  
---   আচ্ছা।  
--- চলো তোমাকে এমনি একটু এগিয়ে দিয়ে আসি! 
--- এসো।  

হাঁটতে হাঁটতে লায়লা আমাকে বলছিল -- বিয়ে করেছ? 
-- না। 
-- কেন করো নাই? 

হঠাৎ ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।  লায়লা বলছিল --  তুমি একটা রিকশা নিয়ে বাস স্টান্ডে চলে যাও। ঠান্ডা লাগবে।  তোমার তো একটুতেই ঠান্ডা লাগে।        
আমি বললাম -- আচ্ছা। 
লায়লা হেঁটে হেঁটে  চলে গেল।  

অনেক দূর পর্যন্ত যেয়ে লায়লা একবার পিছনে ফিরে তাকায়।  ও দেখতে পায় -- তখনও রাস্তার উপর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে আমি ওর চলে যাবার পথের  দিকে তাকিয়ে আছি, তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি বৃষ্টিতে ভিজছি।   
                  
 
কোয়েল তালুকদার
২৮ মে, ২০২০ ইং, ঢাকা।