শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

পদ্মরাগে আঁকা আনন্দিতা ( কাব্যগ্রন্থ)



পদ্মরাগে আঁকা আনন্দিতা   ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর -  ২০২৫ ইং

উৎসর্গ  -


১.        অপেক্ষার আশ্রয়

তোমার জন্য ঠাঁই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি,
তুমি আসবে বলে—
দরজার কপাটে হাওয়া থেমে আছে,
সময় নিজের শ্বাস আটকে রেখেছে আমার পাশে।

যদি না আসো—
যতক্ষণ আয়ু আছে, ততক্ষণই অপেক্ষা করব,
হোক তা শতবছর,
হোক তা ধূসর হয়ে যাওয়া দিনপঞ্জির দীর্ঘশ্বাস।

আমি দাঁড়িয়ে থাকব প্রহরের কিনারায়,
ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে পড়লেও
আমার চোখে ক্লান্তি নামবে না;
কারণ আশা কখনো অবসর নেয় না।

রোদ এলে ছায়া মেলে ধরব তোমার নামে,
বৃষ্টি এলে ভিজে যাব নির্বাক,
রাত্রি নামলে তারা গুনব—
প্রতিটি তারায় লিখব তোমার অনুপস্থিতির ইতিহাস।

মানুষ যাবে, শহর বদলাবে,
পথের নাম পাল্টাবে বহুবার—
তবু এই জায়গাটুকু
তোমার জন্য অক্ষত রেখে দেব হৃদয়ের ভেতর।

যদি কোনোদিন এসে বলো—
“আমি দেরি করে ফেলেছি,”
আমি হাসব, বলব—
না, তুমি ঠিক সময়েই এসেছ,
অপেক্ষা তো কখনো দেরি বোঝে না।

আর যদি কোনোদিন না-ই আসো,
তবু এই অপেক্ষাই হবে আমার প্রাপ্তি—
কারণ ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে দাঁড়িয়ে থাকা,
শেষ শ্বাস পর্যন্ত,
একটি নামের আশ্রয়ে।


২.       এই শহর 


এই শহর অনেক নস্টালজিক—এই শহর জুড়ে কেবল মায়া
ভাঙা ফুটপাথে জমে আছে পায়ের ছাপের ইতিহাস,
পুরোনো দোকানের সাইনবোর্ডে ঝুলে থাকা বিকেলের আলো,
চায়ের কাপে ধোঁয়ার মতো উঠে আসে কত না বলা কথা,
একদিনের মানুষ, একদিনের হাসি—সবাই কোথায় হারালো?
এই শহরে সন্ধ্যা নামলে ঘড়ির কাঁটা ধীরে চলে,
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠে স্মৃতির মতো কাঁপতে কাঁপতে।
বন্ধ জানালার ওপাশে শোনা যায় অচেনা রেডিওর গান,
যেন কারো ফেলে যাওয়া শৈশব এখনো বাজে অদৃশ্য ঢেউতে।
কলেজ ফেরত বিকেলের আড্ডা, পকেটে লুকানো স্বপ্ন,
বৃষ্টিতে ভেজা খাতা, দেয়ালে আঁকা প্রথম ভালোবাসার নাম।
রিকশার ঘণ্টায় মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ,
এই শহর জানে—ফিরে আসে না সময়, শুধু রেখে যায় দাম।
এখানে প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একখণ্ড বিদায়,
প্রতিটি গলিতে ঘুমিয়ে আছে পুরোনো প্রতিশ্রুতি।
চেনা মুখগুলো আজ অচেনা জানালার আড়ালে,
তবু শহরটা আজও ডাকে—আয়, ভুলে যাস না স্মৃতি।
এই শহর অনেক নস্টালজিক, এই শহর জুড়ে কেবল মায়া,
যত দূরে যাই, তত গভীরে টানে তার নিরব ছায়া।
        

৩.         তুমি নও, তবু তুমি আছ


তুমি নও—
তোমার ছায়াটুকু পড়ুক আমার প্রাণে,
স্পর্শ নয়,
তোমার চেয়ে থাকা নীরব তান
তুলুক আমার গানের গভীর তলে।

এখন একটু দূরেই থাকো—
এই দূরত্বেই থাকুক মায়ার নিরাপদ আশ্রয়,
চোখের আড়ালে জমে উঠুক অপেক্ষার আলো,
অভিমানহীন নীরবতায় পাক শিকড় আমাদের সময়।

আমি জানি,
আবার একদিন
বকুলঢাকা বনে হাঁটব দুজনে—
শ্বাসে শ্বাসে মিশে যাবে অচেনা সুগন্ধ,
পাতার ফাঁকে ঝরে পড়বে পুরোনো দিনের হাসি।

আবার একদিন
শ্রাবণ-আকাশ নীলাদ্রি হবে হৃদস্পন্দনে,
বৃষ্টির শব্দে জেগে উঠবে চাপা আকুতি,
মেঘের ভাঁজে ভাঁজে লিখে নেব
ফিরে পাওয়ার অমোঘ প্রতিশ্রুতি।

সেই দিনের জন্যই আজ এই বিরতি—
না পাওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকুক পাওয়ার মানে,
তুমি নও, তবু তোমার উপস্থিতি
অদৃশ্য প্রদীপ হয়ে জ্বলে থাকুক
আমার সমস্ত প্রাণে।



৪.          এখনও


এখনও ভালোবাসি—
সময় যত দূরে সরে যায়, ততই গভীরে নামে তুমি,
ভাঙা ঘড়ির কাঁটার মতো থেমে থেমে
আমার হৃদয়ের ভেতর তোমার নাম বাজে।

এখনও কাছে আসি নিঃশব্দ চরণে,
রাত্রির ঘুমন্ত প্রহরে
যখন সব শব্দ অবসর নেয়,
আমি তখন তোমার স্মৃতির দরজায়
হালকা করে কড়া নাড়ি।

এখনও স্মরি তোমায় অনিঃশেষ অশ্রু ক্ষরণে—
এই অশ্রুগুলো কোনো অভিযোগ নয়,
এরা কেবল ভালোবাসার অব্যক্ত ভাষা,
যে ভাষা উচ্চারিত হলে
ভেঙে পড়ত নীরবতার সমস্ত দেয়াল।

তুমি না থাকলেও তোমার ছায়া থাকে,
আমার দীর্ঘশ্বাসে, আমার প্রার্থনায়,
আমার প্রতিটি অসমাপ্ত বাক্যে।

ভুলে যাওয়ার অভিনয় করি বটে,
কিন্তু জানি,
ভালোবাসা কখনো স্মৃতির বাইরে যায় না,
সে কেবল নিঃশব্দে বেঁচে থাকে,
আমার মতোই, এখনও।


৫.         জোৎস্নাবিধৌত প্রত্যাবর্তন


তোমাকে ছোঁয়ার আগেই
চাঁদ পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল,
রাতের কপালে ঝরে পড়ল শেষ আলো—
তোমার বন্ধ চোখের নীচে
নিভে গেল সব দীপশিখা।

যে উষ্ণতার আনন্দ
হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে নেওয়া যেত,
সে আনন্দ আজ অচেনা দূরত্বে,
শ্বাসের আগে শ্বাস হারিয়ে
নিঃশব্দে সরে গেল।

সব জোৎস্না তোমাকে পাওয়ার আগেই
আকাশলীন হয়ে গেল,
নক্ষত্রেরা মুখ ফিরিয়ে নিল,
রাত বুঝে নিল—
কিছু প্রাপ্তি দেরি হলে
চিরকালের অপেক্ষা হয়ে যায়।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম
অপূর্ণ স্পর্শের কিনারায়,
মুঠো ভরা আলো নিয়ে
শূন্যতার দিকে তাকিয়ে।

সময় শুধু বলল—
সব ভালোবাসা এক রাতেই জেগে ওঠে না।
তবু প্রশ্ন জাগে অবিরাম—
জোৎস্না বিধৌত হয়ে
তুমি কি আবার চাঁদ হয়ে ফিরে আসবে?
নাকি আলোয় আলোয় ক্ষয়ে গিয়ে
আমার রাতেই হারিয়ে যাবে?

যদি ফেরো,
এই অন্ধকারকে সঙ্গে এনো না,
শুধু একটু আলো দিও—
যাতে আর কোনো ভালোবাসা
ছোঁয়ার আগেই ডুবে না যায়।



৬.       রাত্রি তুমি দ্বিধা হও


ঘোর লাগা নির্জন পাতার গায়ে
লিখে রাখি তোমার নাম—
শিশিরের অক্ষরে, অদৃশ্য কালি দিয়ে।
উদ্বেলিত রাত্রির আকাশে
জ্বলে ওঠে বিগলিত চাঁদ,
তার আলোয় নরম হয় অন্ধকারের গিরে ধরা গাঁট।
তারা’রা যে যার মতো ভেসে যায়—
কেউ স্মৃতির নদীতে, কেউ আকাঙ্ক্ষার বাতাসে।

নীরবতার বুক চিরে
হেঁটে যায় রাতখোর যুগল,
ম্লান সময়ের কোল থেকে তুলে নেয়
তাদের আরাধ্য সর্গীয় স্বাদ।

আমি তোমার দিকে তাকাই—
চোখে জমে ওঠে দূরত্বের নীল,
ঠোঁটে কাঁপে উচ্চারণহীন প্রার্থনা।
পাতার ছায়ায় ছায়ায়
আমাদের নিঃশ্বাসেরা গোপন চুক্তি করে,
বলতে শেখে—এখনো বেঁচে আছে আলো।

এই রাত দীর্ঘ হোক,
ঘড়ির কাঁটা ভুলে যাক পথ।
চাঁদের গলিত দুধে ধুয়ে যাক দুঃখ,
তারার পতনে ভিজে উঠুক আশা।
নির্জন পাতার গায়ে লেখা নামের মতো
তুমিও থেকে যাও—
অমোচনীয়, নিঃশব্দ, 



৭.         সৎ থাকো


যদি চাও শরীর—
তবে চোখে চোখ রেখে বলো,
ভাষা লুকিয়ে রেখো না মিথ্যার পর্দায়,
ভালোবাসার মুখোশ পরে
কামনার হাত বাড়িও না।

ভালোবাসা কোনো ফাঁদ নয়,
যেখানে বিশ্বাস নামিয়ে
ইচ্ছের শিকার করা যায়।
ভালোবাসা মানে স্পষ্টতা—
হ্যাঁ কিংবা না—
দুটোই সমান মর্যাদার।

যে হৃদয় দেয়,
সে সত্য চায়;
অভিনয়ের উষ্ণতা নয়,
চায় সৎ উচ্চারণ।


৮.         সুরের স্মৃতি 


রাতের দিকে ঘন মেঘ এলে
বুকের ভিতর সকরুণ বাঁশি বাজে—
কে যেন অদৃশ্য আঙুলে ছুঁয়ে দেয়
হারিয়ে যাওয়া সুরের স্মৃতি।

আবছা আঁধারের পরত ভেদ করে
ভেসে ওঠে তার মুখ,
চাঁদের আলোয় নয়—
বরং মেঘের ছায়া মেখে,
নরম, নীরব, অচেনা এক চেনা অবয়ব।

হাওয়ার দোলায় কাঁপে জানালার পর্দা,
আমার শ্বাসে জমে থাকে নামহীন ডাক;
কত কথা বলার ছিল,
কিন্তু শব্দরা ভিজে যায় অন্ধকারে।

সে কি জানে—
এই রাতগুলো এখনও তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে?
মেঘ জমলে হৃদয় ভারী হয়,
আর স্মৃতির আকাশে
একটিমাত্র মুখই জ্বলে থাকে
নিভু নিভু আলো। 


৯.      শহর জুড়ে শূন্যতা


এই শহর জুড়ে কেবল শূন্যতা
যেন পরিত্যক্ত স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী ট্রেন,
ঘণ্টা বাজে, কিন্তু কোনো যাত্রী নামে না।
রাস্তাগুলো দুঃখময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
প্রতিটি মোড়ে জমে থাকে তোমার না-থাকার ধুলো।

এই শহরের জানালাগুলো
বন্ধ খামে রাখা চিঠির মতো—
ঠিকানা আছে, পাঠক নেই।
বিকেলের আলো নামে দেওয়ালে,
কিন্তু ছায়ার ভেতর তোমার অবয়ব আর ফেরে না।

এখানকার নদী এখন আয়না ভাঙা,
জল বয়ে যায়—অর্থহীন বাক্যের মতো,
কোনো তীর তাকে ডাকে না।
চাঁদ ওঠে ঠিকই,
তবে সে যেন নির্বাসিত প্রদীপ—
আলো আছে, উষ্ণতা নেই।

তুমি ছিলে এই শহরের, শেষ উজ্জ্বল তারা,  তুমি চলে গেছ—
শহরটা কেবল বিশেষণ হয়েই রইল,
নামহীন, অর্থহীন, শূন্যতায় মোড়া।


১০.      আগুনের পরশমণি 


প্রথমে মনে করেছিলাম, তুমি সন্ধ্যা তারার মতো মৃদু, স্নিগ্ধ আলোর আশ্বাস,
ক্লান্ত দিনের শেষে যে আলো কপালে ছুঁয়ে দেয় শান্তির হাত।
কাছে এলে বুঝলাম, তুমি কেবল আলো নও, তুমি আগুনও, গভীর ও নিঃশব্দ দহন।
ছুঁতে গিয়েই জানলাম, রূপেরও উত্তাপ থাকে, স্বপ্নেরও জ্বালা আছে।

তোমার চোখের ভেতর লুকোনো নীল আগ্নেয়গিরি
আমার সমস্ত অনিশ্চয়তাকে জ্বালিয়ে দিল।
আমি ধীরে ধীরে পুড়তে শিখলাম,
পুড়ে অঙ্গার হয়ে উঠেও
তোমাকেই আঁকড়ে রইলাম।

তোমার নীরবতার ছায়ায়
আমার শব্দেরা ঝরে পড়ল,
শ্বাসের মধ্যে জমে থাকল এক অদ্ভুত তৃষ্ণা-
যা নিভে না, কেবল গভীর হয়।

আমি বুঝলাম, ভালোবাসা মানে কেবল স্নিগ্ধতা নয়,
ভালোবাসা মানে দহনকে আশ্রয় করা।

এখন আর সন্ধ্যাতারার আলো খুঁজি না,
রাত্রির বুক চিরে যে আগুন জ্বলে থাকে
তার দিকেই তাকিয়ে থাকি,
যদি আবার পুড়তে হয় তোমার আলোতেই পুড়ব, অঙ্গার হয়েও তোমার নামেই প্রদীপ জ্বালাবো।


১১.       হেমন্ত সন্ধ্যায় নীরব দেখা


সেদিন হেমন্ত সন্ধ্যায় তোমার সাথে দেখা হলো পথের উপরে,
কোনও কথাই বলা হলো না—
কেমন উদাস নীরব তোমার চেয়ে থাকা,
চলে গেলে পথের অন্য বাঁক ধরে অন্য পথে।

ঝরাপাতার মতো শব্দহীন পড়ে রইল দৃষ্টি,
বাতাসে কাঁপছিল অপূর্ণ বলা কতশত কথা।
দু’জনের মাঝখানে জমে উঠল এক ফোঁটা নিঃশ্বাস,
যেন সময় নিজেই থেমে শুনছিল আমাদের নীরবতা।

আকাশে তখন হালকা কুয়াশার পর্দা,
চাঁদটাও অর্ধেক লুকিয়ে ছিল মেঘের আড়ালে।
তোমার চোখে পড়েছিল অচেনা দূরত্ব,
আমার বুকে জমে উঠেছিল অজানা ভালোবাসার হাহাকার।

পথটা অনেকক্ষণ তোমার গন্ধ বয়ে নিয়ে গেল,
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম—একাকী ছায়ার মতো।
সেদিনের সেই না-বলা কথাগুলো আজও হেমন্ত সন্ধ্যায়,
ঝরা পাতার ফাঁকে ফাঁকে তোমাকে খুঁজে ফেরে নিরন্তর।


১২.      ভোরের প্রতিশ্রুতি 


এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন,
আজ ভাসিয়ে দাও—
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমাকে নাও,
হে নিশীথিনী।
এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্রবীথিকে- আকুল করে তোলো,
দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল।

নীরব চাঁদের ছায়ায় খুলে যাক সব দ্বিধা,
শ্বাসে শ্বাসে জড়িয়ে পড়ুক অব্যক্ত ব্যাকুলতা;
সময়ের কপাট ভেঙে ঝরে পড়ুক মুহূর্তের স্বর্ণ,
ভুলে যাক পৃথিবী, ভুলে যাক নাম-পরিচয়।

তোমার চোখের গভীরে ডুবে যাক আমার রাত,
কণ্ঠে কণ্ঠে বোনা হোক নীরবতার গান;
শিশিরভেজা এই অন্ধকারে
আমি হই তোমার—
আর তুমি হও একমাত্র ভোরের প্রতিশ্রুতি।


১৩.       অস্তিত্ব 


ভালোবাসার প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম কোনও নদীর কাছে, খোলা আকাশের নীচে- গ্রীষ্মের প্রখর দীপ্তিতে,
বর্ষার ধারায় ভেজা চুলে,
শীতের উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরা নিঃশ্বাসে।

প্রাণখোলা বসন্তবাতাসে শরীর শিখেছিল ছন্দ, শরতের ঔদার্যে চোখ শিখেছিল প্রশান্তি, হেমন্তের পেলবতায় চিনেছিল স্পর্শের ভাষা।

সৌন্দর্যে আর বীভৎসতায়,
উৎস আর মোহনায়, নগ্নতায় এবং আড়ালে-
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ সব শব্দের সাথে
তোমার নামটিই জড়িয়ে আছে।

তোমার কাঁধে মাথা রাখলে
আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়,
তোমার বুকে মুখ রাখলে
রক্তে রক্তে নামে এক আদিম আলো।
তুমি কাছে এলে শব্দেরা লজ্জা পায়,
নীরবতা হয়ে ওঠে উষ্ণ, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে জন্ম নেয় অদৃশ্য অথচ স্পষ্ট 
এক ভাষা।

আমাদের শরীর তখন আর শরীর থাকে না-
হয়ে যায় নদী, হয়ে যায় ঢেউ ,
একটি আরেকটিকে চিনে নেয়
প্রাচীন কোনো স্মৃতির মতো।

আঙুলের হালকা স্পর্শে সময়ের গিঁট 
খুলে যায়,
দেহের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা আগুন
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

এই ভালোবাসা শিখিয়েছে দেহের কোনো অপরাধ নেই, দেহও এক প্রার্থনা-
যেখানে আত্মা নীরবে নতজানু হয়।

তাই আজও ধূসর পৃথিবীর সব নিষেধ ভেঙে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় জানে ভালোবাসা মানে তুমি, আর তুমি মানেই আমার অস্তিত্ব ।


১৪.       আলো তুমি আলেয়া


আলো তুমি—
কিন্তু নীরব, রাতের গভীরে জ্বলে ওঠো,
আমার নাম উচ্চারণ করো
কুয়াশার ঠোঁটে ঠোঁট রাখো।

তুমি আলেয়া—
চোখে চোখ রাখলে সমস্ত দিক হারিয়ে যায়,
তোমার শরীরজুড়ে
ভেসে থাকে নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না।

আমি জানি—
তুমি প্রতিশ্রুতি নও, তবু তোমার দিকে এগোই
কারণ তোমার দূরত্বেই
আমার ভালোবাসা নিঃশ্বাস নেয়।

তুমি কাছে এলে
অন্ধকার কাঁপে, তোমার আলোয় পুড়ে যায়
আমার সমস্ত সংযম, সমস্ত ভয়।

আলো তুমি, আলেয়া তুমি—
ধরা দিলে হারিয়ে যাও, হারিয়ে গিয়েও বুকের ভেতর
চিরকাল জ্বলে থাকো
গোপন প্রেমের মতো।


১৫.        টুনি 

শৈশবে হারিয়েছিলাম
অতি প্রিয় খেলার সাথীকে,
নাম ছিল টুনি।
বিকেলের রোদে ও ছুটে বেড়াত,
আমার হাতের তালুতে, আর ওর পালকের নিচে লুকিয়ে থাকত নরম, উষ্ণ এক জীবন।

আজও কখনও কখনও
হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে সেই মৃদু গন্ধ—
ভেজা পালক, রোদ আর নিষ্পাপ সময়ের
অদ্ভুত মিশ্র সুগন্ধ।

টুনি ছিল আমার নিঃশব্দ আনন্দ,
শৈশবের আকাশে ওড়ার প্রথম স্বপ্ন।
ওর চোখে ছিল কোনো প্রশ্ন নয়,
শুধু বিশ্বাস, আমি আছি, তাই ভয় নেই।

একদিন হঠাৎ করেই খেলার মাঠ 
ফাঁকা হয়ে গেল, ডানার শব্দ থেমে 
গেল বিকেলে।
শিখেছিলাম তখন হারানো মানে কী,
কিছু শূন্যতা, কখনও পূরণ হয় না।

তবু আশ্চর্য, এই দুঃখের ভেতরেই
একটা ক্ষীণ হাসি লেগে থাকে
চোখে, মুখে।
কারণ টুনি হারিয়ে যায়নি পুরোপুরি—
ও রয়ে গেছে গন্ধে, স্মৃতিতে, 
আর আমার শৈশবের সবচেয়ে কোমল ভালোবাসায়।


১৬.        দুঃখের ওপারে সুখ


দুঃখ তোমারও আছে, আমারও আছে,
চুপচাপ জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মতো,
নীরব রাতের বুকে লুকিয়ে থাকা
অভিমানী অন্ধকারের মতো।

জীবনের পথে পথে কাঁটার আঁচড়,
ভাঙা স্বপ্নের ক্ষতচিহ্ন
আমাদের দু’জনেরই সমান প্রাপ্য।
তবু যখন আমরা মুখোমুখি হই—
দুটি ক্লান্ত হৃদয় একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়ে,
তখন দুঃখগুলো আর ভারী থাকে না।

তোমার চোখের একটুকরো আলো
আমার বুকের অন্ধকার ভেদ করে যায়,
আমার নীরব হাত তোমার কাঁধে রাখলেই
শান্তির বাতাস বইতে শুরু করে।

আমরা একসাথে থাকলে
দুঃখ আর শেকড় গাঁড়তে পারে না—
হাওয়ার মতো উড়ে যায় দূরে,
ভাঙা মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়ে আকাশে।

হাসির আড়ালে লুকিয়ে পড়ে কান্না,
ভয়ের জায়গা নেয় সাহস,
একাকিত্ব হার মানে ভালোবাসার কাছে।

তখন বুঝি—
সুখ মানে নিখুঁত জীবন নয়,
সুখ মানে কাউকে পাওয়া
যার কাছে দুঃখও নিরাপদ আশ্রয়।
তোমার পাশে থাকলেই
সব অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে,
সব ভারী দিন হালকা হয়ে যায়।

দুঃখ থাকুক, থাকুক তার ইতিহাস—
আমরা মিলিত হলেই
জীবন হয়ে ওঠে সহনীয়, সুন্দর, মানবিক।
দু’টি হৃদয়ের সংলাপে দুঃখ হারিয়ে যায় নিঃশব্দে, আর সুখ জন্ম নেয়—
একসাথে থাকার গভীর অর্থে।

দুঃখ থাকুক দূরে, স্মৃতির মতো—
আমরা কাছাকাছি থাকলেই
এই মুহূর্ত, এই স্পর্শ, এই উষ্ণতা
আমাদের পৃথিবী হয়ে ওঠে।


১৭.        জোনাকির অন্ধকারে


তোমার হৃদয়ের গভীর অন্ধকারে
ঘুরেছি অনেক—জোনাকির মতো,
ডানায় ডানায় বেঁধে এনেছিলাম
অপেক্ষার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো।

ভেবেছিলাম, কোনো এক নিঃশ্বাসে
জ্বলে উঠবে প্রেমের প্রদীপ,
তোমার নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে
খুঁজে পাবো উষ্ণ কোনো দীপ।

কিন্তু প্রতিটি স্পর্শে ফিরেছি শূন্য হাতে,
চোখের সামনে শুধু নীরব দেয়াল,
ভালোবাসা সেখানে ছিলো না—
ছিলো কেবল অন্ধকারের দীর্ঘকাল।

আমি জোনাকি হয়েই জ্বলে উঠতে চেয়েছিলাম,
নিজেকে পুড়িয়ে আলো দিতে,
তুমি শুধু আঁধার আগলে রেখে
শিখিয়েছো নিভে যেতে।

আজ আর আলো খুঁজি না তোমার ভেতরে,
অন্ধকারকেও করেছি আপন,
তবু গভীর রাতে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে-
আমি বলি,
একদিন খুব ভালোবেসেছিলাম একজন।


১৮.       পদ্মরাগে আঁকা আনন্দিতা


আমরা যখন কাছাকাছি আসি তখন 
তোমার উচ্ছ্বসিত দেহখানি কাঁপছিল,
মুখ ঝিকমিক করছিল—
কটির কিঙ্কিনী রুমঝুম শব্দে বাজছিল
মৃদঙ্গের মতো এক অন্তর্লীন রাগ।

তোমার নাভি-বৃত্তে আঁকা ছিল
পদ্মরাগমণির সুরভিত কারুকার্য,
মনে হয়েছিল—
তুমি আনন্দিতা, এক মায়াবতী।

চুলের ফাঁক দিয়ে নেমে আসছিল সন্ধ্যার আলো,
কাঁধে কাঁধে লেগে থাকত চাঁদের নরম নিঃশ্বাস।
তোমার চোখে তখন নদীর মতো গভীরতা-
যেখানে ডুবে গেলে ফিরে আসার ইচ্ছে জাগে না, শুধু ভেসে থাকতে মন চায়
নীরব নিবিড় ভালোবাসায়।

তোমার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি
ভেঙে দিচ্ছিল সমস্ত দূরত্ব,
আমি স্পর্শ করিনি, তবু ছুঁয়ে ছিলাম—
শব্দে, দৃষ্টিতে, হৃদয়ের গোপন কম্পনে।
আমাদের মাঝখানে বাতাসও ছিল উষ্ণ,
সে জানত—এই মুহূর্ত প্রার্থনার মতো পবিত্র।

তুমি কাছে এলে সময় থমকে দাঁড়ায়,
দিন-রাত্রি ভুলে যায় নিজের নাম-
তোমার শরীরের ভাষা পড়ে আমি বুঝে নিই- ভালোবাসা কখনো শুধু বলা নয়,
কখনো সে দেহের স্নিগ্ধ আলো,
কখনো গভীর নিঃশ্বাসে লুকোনো গান।

সেই রাতে তুমি ছিলে
স্বপ্ন আর সত্যের মাঝামাঝি এক নীলিমা,
আর আমি- তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা
চিরকালের এক প্রেমিক মুহূর্ত।


১৯.       হৃদয়ের গোপন দুপুর


এই দুপুরটা রোদ্দুরে ভেজা,
তোমার কণ্ঠে লুকোনো নরম ডাক—
ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে দু’চোখের মাঝখানে,
সময়ও আজ প্রেমের কাছে পরাজিত।

হৃদয়ের গোপন দুপুরে
তুমি আসো নিঃশব্দ পায়ের ছাপে,
শ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে রেখে যাও
অলিখিত কিছু প্রতিশ্রুতি।

জানালার ফাঁক দিয়ে আলো নামে,
তোমার চুলে লেগে থাকে সোনালি বিস্ময়,
আমি শব্দ ভুলে যাই,
শুধু অনুভব করি—
ভালোবাসা এমনই উষ্ণ।

এই দুপুরে কোনো প্রশ্ন নেই,
নেই ভবিষ্যতের ভিড়,
শুধু দু’টি হাত—
একটি আরেকটির মানচিত্র খোঁজে।

যদি সন্ধ্যা নামে, নামুক,
রাতও আসুক নীরবতার চাদর মেলে—
এই হৃদয়ের গোপন দুপুরে
তুমি থাকলেই
সব সময় আমার হয়ে যায়।


২০.       তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে


তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে—
দিনের সব ক্লান্ত রোদ
নরম হয়ে যায়,
অবুঝ পাখিরা ডানা গুটোয়
আমার বুকের ভেতর।

ওই চোখে তাকালেই
শহরের কোলাহল থেমে যায়,
আকাশ নুয়ে পড়ে তোমার পাপড়ির ধারে,
আর সময়—
অল্প একটু থেমে
আমাদের দিকে তাকায়।

তোমার দৃষ্টির গোধূলিতে
আমি ধীরে ধীরে হারাই,
ভালোবাসা তখন আর শব্দ চায় না,
শ্বাসে শ্বাসে জড়িয়ে
নীরবতার গান গায়।

চোখের কোণে জমে থাকা
অচেনা আলো-ছায়া
আমাকে ডাকে,
আমি জানি—
এই সন্ধ্যার শেষে
রাত আসবে না একা।

কারণ তোমার চোখেই
সব অন্ধকার আলো হয়ে যায়,
তোমার চোখেই
আমার সমস্ত ফেরার পথ
শান্ত হয়ে নামে।


২১.         কলাবতী


ভালোবাসি কলাবতী নারীর শরীর,
করি কুর্নিশ তার দেহপল্লবে—
যেখানে যুগ যুগান্তরের ক্ষুধা
নীরবে মাথা নত করে দাঁড়ায়।

তার অবয়বে লেখা আছে ইতিহাস,
নখের আঁচড়ে, নিঃশ্বাসের ভাঁজে,
দেখি তার ভোগচিহ্ন, যেন যুদ্ধশেষের মাঠ,
যেখানে প্রেম আর ধ্বংস, একই মুদ্রার 
দুই পিঠ।

যখন রক্তাক্ত হয় সর্বভূক মাংস ও করোটি,
তখনও সে নারী, অবিনশ্বর, অনমনীয়,
ভাঙনের মধ্যেই যার নতুন জন্ম।

তার বুকের গভীরে জমে থাকে আগুন,
চোখে জ্বলে ওঠে অদম্য প্রশ্ন,
সে জানে—দেহ শুধু ভোগের নয়,
দেহ একেকটি মানচিত্র,
যেখানে আঁকা থাকে ক্ষমতা, ক্ষুধা,
আর বেঁচে থাকার নির্মম সত্য।

আমি তাকে ভালোবাসি এই জন্যই—
তার ক্ষতগুলো কথা বলে,
তার নীরবতা চিৎকার হয়ে ওঠে,
আর তার শরীর শেষ পর্যন্ত এক মহাকাব্য,
রক্ত আর আলোয় লেখা মানব অস্তিত্বের কবিতা।



২২.       মহুয়া বনে একরাত্রি 


আমরা তখন মহুয়া বনে—
ঝরাপাতার গন্ধে ভেজা নীরবতা,
তুমি তাকালে অন্ধকারের দিকে,
অবসন্ন, দ্বিধাহীন—
আঁধারের ক্লান্তি জড়ানো চোখে
মুখের উপর বিচ্ছুরিত হচ্ছিল নক্ষত্রের আলো।

আকাশ আর মাটিকে মমতায় কাছের করে নিলে তুমি,
তোমার নিঃশ্বাসে নড়ে উঠল বনের বুক,
বাতাস থমকে দাঁড়াল ঝাউঝোপের আড়ালে—
সমস্ত ক্ষণগুলো ঝলমল করে উঠল যেন
অচেনা কোনো উৎসবের দীপশিখায়।

তারপর ধীরে ধীরে—
তোমার শরীরের উষ্ণতা এসে ছুঁয়ে দিল আমার রাত,
মহুয়ার গন্ধ মিশে গেল  নিঃশব্দ ভাষায়।
চোখের পাতায় কাঁপন তুলে
তুমি নেমে এলে আরও কাছে,
নক্ষত্রেরা তখন লজ্জায় ঝরে পড়ছিল
আমাদের মাঝখানের অল্প অল্প ফাঁকে।

শেষ মুহূর্তে আমরা আর আলাদা 
রইলাম না—
আদিম কোনো স্মৃতির মতো জড়িয়ে গেলাম একে অন্যে,
অন্ধকারের গায়ে লিখে দিলে শরীরের কবিতা,
স্পর্শে স্পর্শে জেগে উঠল সৃষ্টির প্রথম গান।
মহুয়া বন সাক্ষী রইল—
প্রেম যখন রক্তে, নিঃশ্বাসে, নিস্তব্ধতায়
শুদ্ধ শৃঙ্গারে পূর্ণ হয়ে ওঠে।



২৩.     ধ্রুপদী এক মানচিত্র 



অপেক্ষায় থাকি—
শাড়ির আঁচল সরিয়ে দেখব তোমার পিঠের আঁচিল, কালো তিলকের গোপন মানচিত্র,
যেখানে আলো থেমে যায়, ছায়া কথা বলে।

তুমি ঘুরে দাঁড়ালে, সন্ধ্যার মতো নরম—
একটু লাজ, একটু সাহস,
চোখের পাতায় জোছনার কাঁপুনি।

রমণীর কাছে কবিরা পরপুরুষ—
প্রেমভোগী প্রজাপতি,
ছিন্নভিন্ন ফুলের পাপড়িতে ঠোঁট রাখে,
ভালোবাসে ক্ষণিকের মধু।
তবু তোমার কাছে এসে
আমার কবিতা হাঁটে ধীরে,
শব্দগুলো খুলে রাখে জুতো,
নীরবতায় শুয়ে পড়ে।

নরম মাংসের শরীর শুয়ে থাকে
গ্রীবা বাঁকিয়ে নদীর মতো—
স্রোত নেই, তবু গভীরতা আছে।
শ্বাসে শ্বাসে ভিজে ওঠে রাত,
ঝরে জ্যোৎস্না, কাঁপে বসন্তের বাতাস
দিগ্বিদিগ ঊর্ধশ্বাসে।

পাতার ফাঁকে ফাঁকে তোমার নাম লিখে যায় হাওয়া, আমি হাত বাড়াই না—
অপেক্ষাই আমার স্পর্শ, দূরত্বের এই মিষ্টি তীর বুকে গেঁথে রাখি যত্নে,
তুমি এক পা এগোলে সমস্ত পৃথিবী এগোয়-
চাঁদ থামে, নদী শোনে,
আর আমার কবিতা তোমার পিঠের সেই তিলকের কাছে চিরদিনের ঠিকানা খুঁজে।



২৪.        বাবা

বাবা মানে ভোরের প্রথম আলো,
চুপচাপ উঠোন ঝাঁট দেওয়া একাকী মানুষ,
যার কাঁধে ভর করেই
আমার সকালগুলো হাঁটতে শিখেছিল।

শৈশবে বুঝিনি—
ওই শক্ত হাতের তালু আসলে ছিল
নরম আশ্রয়ের ছাতা,
রোদে-ঝড়ে মাথার ওপর অবিচল।

বাবা কথা কম বলত,
কিন্তু সন্ধের বাতাসে
ওর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর
লুকিয়ে থাকত হাজার না-পাওয়া স্বপ্ন,
যেগুলো সে আমার চোখে তুলে দিয়েছিল
নিজের চোখ খালি রেখে।

স্কুলফেরত বিকেলে
বাবার সাইকেলের বেল
এখনো কানে বাজে—
সেই শব্দে ছিল নিরাপত্তা,
ছিল ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা।

একদিন বড় হয়ে দেখি,
বাবার চুলে রূপালি চাঁদ নেমেছে,
হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তির ছায়া—
তবু আমাকে দেখে
চোখের কোণে ঠিকই জ্বলে ওঠে
অচেনা এক গর্বের আলো।

বাবার হাতটা আর আগের মতো শক্ত নয়,
কিন্তু সেই হাত ধরলেই
আমার বুকের ভেতর
শৈশব ফিরে আসে দৌড়ে।

বাবা— তুমি এখন নেই,
জীবন নদীর ওপারে নৌকো বেঁধে
চুপচাপ বসে আছো ।
এপারে দাঁড়িয়ে আমি হাত নাড়ি,
জানি—দেখতে পাও না,
তবু নদীর জল বেয়ে
তোমার আশীর্বাদ এসে
আমার কপালে পড়ে।

বাবা, তুমি কোনো কবিতা নও,
তুমি সেই নীরব পাঠ,
যা না পড়লেও
সারা জীবন মুখস্থ হয়ে থাকে।


২৫.        প্রথম  নিঃশ্বাস 


মসৃণ গাত্রবর্ণ, জলভরা ঘন মেঘের মতো 
কুঞ্চিত কেশদাম,
আরক্ত মুখে জমে আছে অবদমিত কোনো 
সন্ধ্যার ডাক।

এই রাতে শরীর জানে, কীভাবে নীরবতা 
ভেঙে পড়ে, কীভাবে অচেনা স্পর্শ
রক্তে তোলে গোপন ঢেউ।

শক্ত দু’হাত এসে ছুঁয়ে দিক লুকানো অস্থি,
যেখানে নাম নেই, যেখানে ভাষা পৌঁছয় না—
সেখানেই জ্বলে উঠুক আলো।

অন্তর্গুহার তমসা সরিয়ে দিক এক ঝলক প্রলয়,
দু’পাড়ে উঠুক উদ্ধত জোয়ার,
শরীরের মানচিত্রে হোক আদিম বিজয়ের দাগ।

কোনো দূরন্ত হাঙর নয়, বরং এক অবাধ সাহস
ভেঙে দিক সমস্ত সংযম,
নরম করোটিতে বাজুক অপরিমেয় উচ্ছ্বাসের ঢাক।

কিছু মুহূর্ত হোক হেমবর্ণ, কিছুটা সময় মধুময়,
ঘামে, নিঃশ্বাসে, কম্পনে
মিশে যাক দুই ক্লান্ত পৃথিবী।
তারপর— সব শব্দ থেমে যাক,
সমস্ত ক্লান্তি নেমে আসুক একটি দীর্ঘ, গভীর
অবসন্ন সুখে…

না— এটি শেষ নয়,
এটি কেবল শুরু, এটি প্রেম লীলার 
প্রথম নিঃশ্বাস।


২৬.       চড়াইকোল স্টেশনে জোছনার রাত

স্টেশনটি ছিল বিদ্যুৎহীন—
তবু অন্ধকার ছিল না একটুও,
কারণ চাঁদ তখন সমস্ত চরাচর জুড়ে
নিজের আলো ঢেলে দিচ্ছিল নিঃশব্দে।

প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম তার চড়াইকোল,
লোকাল ট্রেনটি আসছিল দেরিতে,
যেন সময়ও এখানে
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
পুরনো কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম আমরা—
আমি আর মায়াবতী,

চারপাশে জোছনার অথৈ সমুদ্র,
রেললাইনের লোহার দাগ বেয়ে
চাঁদের আলো গড়িয়ে যাচ্ছিল দূরে,
কোথাও ডাকছিল নিশাচর পাখি,
কোথাও ঘাসের ভেতর
নিঃশব্দে কেঁপে উঠছিল প্রেম।

মায়াবতী  ফিসফিস করে বলল—
“জোছনায় ভিজতে ইচ্ছে করছে…”
তার চোখে তখন
একটি পূর্ণিমা থরথর করে কাঁপছে,
আমি বুঝে গেলাম,
এই ইচ্ছে আসলে শরীরের নয়—
এই ইচ্ছে আত্মার।

বলেছিলাম আমি, চলো -
কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই,
যেন এই শব্দের ভেতর
সমস্ত জীবনের সম্মতি জড়িয়ে আছে।

আমরা নেমে গেলাম রেললাইনের পাশে,
জুতো খুলে রাখলাম বাস্তবতার ধুলো,
পায়ের তলায় জোছনা,
মাথার ওপর আকাশের নীল নিঃশ্বাস।

সে হেসেছিল, চাঁদের আলো গড়িয়ে পড়েছিল
তার গালের ঢালে,
আমি হাত বাড়িয়ে ধরেছিলাম
আলো আর শরীরের মাঝখানের সেই নরম দূরত্ব।

লোকাল ট্রেন তখনও আসেনি,
ঘড়ি থেমে ছিল, স্টেশন নিঃশব্দে দেখছিল
দু’টি মানুষ কীভাবে অল্প অল্প করে
জোছনার ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে।

চড়াইকোল, তুমি সেদিন শুধু একটি স্টেশন ছিলে না,
তুমি ছিলে আমাদের প্রথম নিঃশর্ত রাত,
যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না,
কিন্তু ভালোবাসা পুরো চরাচর আলোকিত করে রেখেছিল।


২৭.        হৃদয় হরণ করো 


তার হাতের উপর হাত রেখে বলি—
তুমি কী অপূর্ব সুন্দর, তুমি হৃদয় হরণ করো
তুমি আমার ভালোবাসা।

এই প্রেম কোনো স্পষ্ট রেখায় আঁকা নয়,
এখানে শব্দরা আগে লজ্জা পায়,
তারপর ধীরে ধীরে শরীর খুঁজে নেয় শরীর।

তোমার চোখ ঢেকে দিলে
অন্ধকারের মধ্যেই আমি আলো দেখি—
কারণ তুমি না দেখলেও,
আমার ভেতরে তোমার দেখা জমে থাকে।

তুমি বিমূর্ত—
কখনো বিকেলের হালকা বাতাস,
কখনো ঘুমের ভেতর হঠাৎ জেগে ওঠা দীর্ঘশ্বাস।

তোমাকে ছুঁই না, তবু ছোঁয়ার কাঁপন
আমার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেমে উচ্চারণ নেই,
আছে শুধু অনুভবের নীরব আর্তনাদ।

তোমার চোখের পাতা বন্ধ থাকলে
আমার ঠোঁট আরও সাহসী হয়,
আমি প্রেম বলি স্পর্শ দিয়ে,
নিঃশব্দে শরীরের ভাষায়।

তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত ক্লান্তি খুলে পড়ে,
আমি বুঝে যাই—
ভালোবাসা মানে দেখা নয়,
ভালোবাসা মানে বিশ্বাস।

এই প্রেম কোথাও যায় না,
কোথাও থামে না।
এটা আমাদের মাঝখানে
একটি দীর্ঘ, গভীর মুহূর্ত হয়ে থাকে।



২৮.       যেখানে নদী থেমে যায় 


নদী যেমন চলতে চলতে
হঠাৎ এক জায়গায় এসে থেমে যায়—
নিজের সমস্ত গতি খুলে রেখে
সরোবর হয়ে ওঠে নিঃশব্দে,
তেমনি সে—
কোনো দেবতার মঙ্গল-আলোক মেখে
অসীম ভালোবাসা নিয়ে
আমার কাছে এসে থেমেছে।

আমার ক্লান্ত বুকের ভেতর
আজ সে এক গভীর সরোবর।
যেন পলাতকা কোনো ঝর্নার জল,
প্রতিদিন আঁজলায় ভরি তাকে—
স্বচ্ছ, শীতল, অবিরাম,
তৃষ্ণার সমস্ত ভাষা মুছে দেয়।

তার মনটি আজ
সকালের প্রথম শিশিরের মতো,
ঝির্ ঝির্ করে কাঁপে—
পাতার ডগায় জমে থাকা আলো,
স্পর্শ করলে ভেঙে যাবে বলে
ভয় পায় ভালোবাসা।

এই থেমে থাকা, এই কাঁপন
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ,
এই নদীর শান্ত স্নিগ্ধ উচ্চারণ -
আমি তোমার ভালোবাসার নীরব 
সরোবর।


২৯.       বেলা শেষের কথা


জীবনের বহু আশা আজও অপূর্ণ,
অনেক চাওয়া—এই জীবনে আর পূর্ণ হবে না।
অতৃপ্তির ছায়া জমে আছে
হৃদয়ের অলিখিত প্রান্তরে—
তবু জীবনকে ভালো লাগে,
এই পৃথিবীর মায়ায়
আমি নীরবে বাঁধা পড়ে থাকি।

অপ্রাপ্তির কাছে নেই কোনো অভিযোগ,
আক্ষেপকে দিইনি আশ্রয়,
গ্লানির সঙ্গে আমার
কখনো গোপন বোঝাপড়া হয়নি।

গতকাল তুমি বলেছিলে—
“কোনো ঐশ্বর্য পাইনি ঠিকই,
তবু তোমার কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি,
যদি তাকেই দৌলত ধরি—
তার ওজন, তার মূল্য
অগণন স্বর্ণের চেয়েও বেশি।”

এই কথাতেই তুমি আমাকে
কৃতজ্ঞতার বন্ধনে বেঁধে ফেলো—
অথচ কত সহজে, কত গভীর করে—
“আমারে তুমি অশেষ করেছ,
এমনি লীলা তব—
ফুরিয়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।"

বেলা ফুরোয়, আলো নরম হয়,
কিন্তু তোমার দেওয়া এই প্রেম
শেষ আলো হয়েই
আমার সমস্ত সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে।


৩০.       নির্জনতার অন্তরালে 


রাতের গভীর নির্জনতায়
তোমার শরীর একটি নীরব মন্দির,
আমি প্রণামের মতো ধীরে ধীরে প্রবেশ করি
এর স্তবকে স্তবকে।

চুলের ফাঁকে জমে থাকা অন্ধকার
আমার আঙুলে খুলে যায়,
ঘাড়ের কাছে শিউলির সুবাসে
চন্দনের মতো গলে পড়ে নিঃশ্বাস।

তুমি নীরব,
তবু তোমার বুকের ওঠানামায়
সমুদ্রের ঢেউ শোনা যায়—
আমার বুক সেখানে তীর্থযাত্রী।

ঠোঁট ছুঁই না,
তবু ঠোঁটের ভাষা পড়ে ফেলি,
নাভির চারপাশে ঘুরে বেড়ায়
অতৃপ্ত চাঁদের আলো।

এই মুহূর্তে
সব দুঃখ কাপড় খুলে ফেলে,
শরীরের উষ্ণতায়
ভুলে যায় নিজের নাম।

তুমি আমাকে শেখাও—
ভালোবাসা কখনো উচ্চারণ নয়,
ভালোবাসা
একটি দীর্ঘ, ধীর, দগ্ধ স্পর্শ।


৩১.        অস্তবেলার গান


দিন ফুরোয়—
অবসাদের কাঁধে ভর দিয়ে আসে স্মৃতিরা,
জোছনার মতো নরম আলোয়
পুরোনো গান জেগে ওঠে মনে।
বাউলের ডাকে, ভাটিয়ালির ঢেউয়ে
টপ্পা আর কীর্তনের মাঝখানে
জীবনটা যেন দাঁড়িয়ে থাকে—
কিছু চাওয়া আজও অপূর্ণ।

জীবনতৃষ্ণা বড় ব্যাকুল,
নদীর ঘাটে ঘাটে জল তুলতে চায় মন,
হাতে লাগে না—তবু তেষ্টা যায় না,
স্বপ্নের কলস ভরে ওঠে না কখনো।

মেঠো পথ ধরে স্কুল ফেরার সেই বিকেল,
এক পাতার বাঁশিওয়ালার সুর—
আজও বাতাসে ভেসে আসে,
চোখ বুজলেই শুনি সেই ডাক।
আকাশে ছিল কত গান,
আমরা কুড়িয়ে নিতে শিখিনি।

কত কথা উড়ে গেছে বাতাসে,
কত অস্তবেলার সূর্য
নিঃশব্দে ডুবে গেছে অস্তাচলে—
রেখে গেছে শুধু রাঙা রেশ,
সন্ধ্যার বুকের ভেতর
নস্টালজিয়ার নরম আগুন।



৩২.       মাধবীর মাধুরী


মাধবী বলেছিল—
আমার ভেতরে মাধুরী খুঁজো না,
আমি বাগদাদের ফুল নই,
নই মীরা বাঈয়ের গানের করুণ ভক্তি।

তবু আমি জানি,
মাধুরী শুধু নামের ভিতর থাকে না—
সে থাকে হাঁটার ভাঁজে,
ঘাড়ের কাছে নেমে আসা চুলের ছায়ায়,
চোখের পাতার নীরব ওঠানামায়।

তোমার শরীর—
একটি অনাবিষ্কৃত শিল্পভূমি,
যেখানে আলো হাত বুলিয়ে শেখে
কীভাবে কোমল হতে হয়।

কাঁধের বাঁকে জমে থাকা বিকেল,
বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়া রোদের দাগ—
এসব কোনো উপমা চায় না।

তুমি বলেছিলে, মাধুরী খুঁজো না—
কিন্তু তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমি যে গান শুনি,
তা কোনো মন্দিরের নয়,
তা শরীরের ভেতর ভেসে ওঠা
নিখাদ প্রেমের আর্তি।

মাধবী,
তুমি ফুল নও, গানও নও—
তুমি সেই স্পর্শ,
যেখানে নাম ফুরিয়ে যায়,
আর ভালোবাসা
নগ্ন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।



৩৩.       বাগদাদের রাত -
             রাজস্থানের সকাল 


আমি চাই বাগদাদের একটি রাত আর রাজস্থানের একটি সকাল—
যেখানে রাতের আকাশ নীল রেশমে মোড়া,
চাঁদ ঝুঁকে পড়ে মিনারের ছায়ায়,
আর ভালোবাসা শরাব হয়ে ঢলে পড়ে ঠোঁটের কিনারে।

সাকীর চোখে জমে থাকে সহস্র গল্প,
এক চুমুকেই ভেঙে যায় দূরত্ব, সময়, নিষেধ-
নিঃশব্দে হৃদয় জুড়ে নামে উষ্ণ আগুন,
যেন প্রেম নিজেই এক প্রাচীন দোয়া।

সেই রাতে শব্দেরা নাচে সুগন্ধি ধোঁয়ার মতো,
নিশ্বাসে নিশ্বাসে জড়িয়ে পড়ে অনন্তের স্বাদ।
অচেনা শহরেও চিনে নিই তোমাকে,
কারণ ভালোবাসা কখনো মানচিত্র মানে না।

আর তারপর চাই রাজস্থানের একটি সকাল-
রোদ্দুরে ধুয়ে যাওয়া মরুর বুকে
ঘুঙুরের মতো ঝরে পড়ে আলোর শব্দ।
মন্দিরের দ্বারে ধ্বনিত হয় মীরা বাঈয়ের কণ্ঠ,
প্রভুর নামে গাওয়া গান
ভেদ করে যায় হৃদয়ের সমস্ত প্রাচীর।

ভক্তি সেখানে প্রেম হয়ে ওঠে,
আর প্রেম—এক নিঃস্বার্থ প্রার্থনা।
সেই সকালের হাওয়ায় তোমার নাম জপ করি,
তুমি যেন প্রভু আর প্রিয়া—একই সত্তা,
চোখে চোখ রেখে বুঝে নিই
ভালোবাসার শেষ নেই কোনো সন্ধ্যা বা ভোরে।

বাগদাদের রাত আমাকে শেখায় আকুলতা,
রাজস্থানের সকাল দেয় সমর্পণের আলো।
এই দুইয়ের মাঝখানেই আমি বাঁচতে চাই-
যেখানে শরাব আর সংগীত মিলেমিশে বলে যায়,
ভালোবাসাই শেষ সত্য,
ভালোবাসাই একমাত্র পথ।


৩৪.       কুসুমপুর


ছোট্ট একখানি গ্রাম—নাম তার কুসুমপুর,
মাটির ঘরের দেয়ালে রোদ্দুর লেখে নীল 
নকশার সুর।
মেটে পথে ধুলোর সাথে হাঁটে সময় 
ধীরে ধীরে,
পথের ধারে ভাঁটিফুল, কস্তুরী হাসে 
নীরবে ঘিরে।
লাল-সাদা নয়নতারা চাপ বেঁধে 
ফোটে রোজ,
বনতুলসীর বাবুরি জঙ্গলে ভাসে 
গন্ধের খোঁজ।

ছোট ছোট ডোবায় নারীর হাসি, জলের 
শব্দ মেশে,
বাসন-মাজা, কাপড়-কাচা—জীবন চলে 
এমন বেশে।
বাঁশবনে বাতাস কাঁদে সকরুণ এক সুরে,
কদম-শিরীষ-বকুলে পাখি ডাকে দুপুরে।

আম-জাম-কাঁঠালের ঘন ছায়া 
ঘিরে বনভূমি,
সেই পাতার আড়াল থেকে জেগে 
ওঠে গ্রামভূমি।
কোকিল ডাকে, পাপিয়া, বেনেবউ, 
ঘুঘুর গান,
ফিঙে উড়ে কালো ডানায় ভাঙে 
আকাশের টান।
বউ কথা কও বলে ওঠে সাঁঝের 
নরম বেলা,
উঠোনে কাকেরা ঘোরে—চেনা 
সংসারের খেলা।
সড়ক শালিক ধুলোর মাঝে কিচিমিচি 
ঝগড়া তোলে,
চালের ধারে পায়রারা বাসা বেঁধে সুখ 
খোঁজে বলে।
ঝুড়ি আর হাঁড়ির ভেতর বকবক 
করে আশা,
সুখের ঘরেই নাকি থাকে পায়রার 
ভালোবাসা।

এই গ্রাম কোনো মানচিত্রে বড় করে লেখা নয়,
তবু কুসুমপুর মানেই প্রাণের নির্ভেজাল পরিচয়।
মাটির গন্ধে, পাখির ডাকে, মানুষের 
সহজ সুরে-
আমার শিকড়, আমার শ্বাস চিরদিন 
কুসুমপুরে।


৩৫.         আগুনের স্মৃতিতে বাঁধা 


নয়নে নয়ন রেখে তোমায় দেখেছিলাম—
তুমি বলেছিলে, অন্তরে তাকাও।
অন্তরের গভীরে হাত বাড়াতেই
তুমি ফিসফিসিয়ে বললে, বুকে তুলে নাও।

বুকে বুক রাখার সেই ক্ষণে
শীতের সকাল হঠাৎ আগুন হয়ে উঠল,
নিভৃত নীল বাতাসে জ্বলে উঠল লেলিহান,
দেহ থেকে দেহান্তরে ছড়িয়ে পড়ল উত্তাপের ফুল।

তুমি জ্বললে, আমাকেও জ্বালালে—
দুটি শ্বাস এক হয়ে আগুনে রূপ নিল,
ভালোবাসার তাপে পুড়ে পুড়ে
দেহের ভাষা হারিয়ে গেল নীরবতায়।

এখন আমরা ছাই, আমরা ভস্ম—
তবু শেষ নই কোথাও,
ছিন্ন তুলোর মতো হালকা হয়ে
একই আকাশে উড়ি, একই আগুনের স্মৃতিতে বাঁধা। 


৩৬.     চন্দ্রকিরণ তলে 


যদি কোনো রাত্রির মধ্যাহ্নে
চন্দ্রকিরণতলে দাঁড়িয়ে তুমি
নীরবতার ভাষায় ললাটে চুম্বন দাও—
তবে জোছনা আর কুয়াশা মিলে
একটি স্বপ্নের নদী হয়ে বয়ে যাবে হৃদয়ের ভেতর।

বাঁশঝাড়ের ছায়ায় মর্মর পথ ধরে
হাঁটবো আমরা ধীরে ধীরে,
পাতার ফাঁক গলে নামা আলোয়
ঝরে পড়বে অব্যক্ত প্রতিশ্রুতি,
নিশ্বাসে নিশ্বাসে জড়িয়ে নেবে সময়।

সেই নির্জনতার গভীরে
আমি খুলে দেবো বুকের সব দরজা,
অলক্ষ্যে জমে থাকা ব্যথা, আশা, আকুলতা
চন্দ্রালোকের হাতে তুলে দিয়ে বলবো—
নাও, এ আমার অনন্ত ভালোবাসা।

রাত্রি থেমে থাকবে আমাদের জন্য,
তারারা সাক্ষী হবে নীরব শপথে,
আর ভোর আসলেও জোছনার স্মৃতি
চিরকাল জ্বলবে হৃদয়ের গোপন দীপে।


৩৭.       হার্ডিঞ্জ ব্রিজে দাঁড়িয়ে 

পদ্মা পাড়ের সাহানা জোয়ার্দার
একদিন এক চিঠিতে লিখেছিল—
'তুমি একবার এসে দেখে যাও আমাকে'।
চিঠির ভাঁজে ভাঁজে লেখা ছিল
অকথিত কান্না, ভেজা নিঃশ্বাস।

সে জানত, সময় আর তার বেশি নেই,
শরীরের ভেতর সন্ধ্যা নেমেছে আগেভাগে,
দিনগুলো ক্রমে ছোট হয়ে আসছে-
তবু সে শুনতে পায় নদীর আমন্ত্রণ,
পদ্মার ঢেউ তাকে ডাকে নাম ধরে।

তার অন্তিম ইচ্ছে ছিল খুব সাধারণ,
কোনো অলৌকিক স্বর্গ নয়,
কোনো রাজকীয় প্রার্থনাও না,
শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে
যদি একবার দেখে নেওয়া যেত
এই পৃথিবীর সবচেয়ে আপন জল।

সে বলত- পদ্মা জানে, পদ্মাই বুঝে
আমার দুঃখের ভাষা ও বঞ্চনার কথা 
হাওয়ার সাথে চুল ওড়াতে ওড়াতে
শেষবারের মতো বলেছিল নদীকে—
'আমি যাচ্ছি, তুমি বইতে থেকো।'

কিন্তু তুমি গেলে না, চিঠিটা পড়ে রেখে
দিলে আলমারির কোণে,
সময়কে  বললে— ‘পরে যাবো।’
আর সেই ‘পরে’ শব্দটা
চিরকালের মতো দেরি হয়ে গেল।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে দিয়ে পদ্মা বয়ে 
চলেছে আগের মতোই, কিন্তু সাহানা নেই,
দেখারও কেউ নেই জল-
দেখার নেই ব্রিজের লোহার রেলিংয়ে
লেগে থাকা এক ফোঁটা অদৃশ্য অশ্রু।

আজও কেউ কেউ বলে—
নদী নাকি গভীর রাতে থেমে যায়,
মৌনতায় একটি নাম ফিসফিস করে ডাকে-
সাহানা জোয়ার্দার!


৩৮.      নিরুদ্দেশবাস


একদিন তোমার হাত ধরে
নিরুদ্দেশলোকে চলে যাব—
যেখানে অন্য আর কেউ নেই,
যেখানে দিগন্ত জোড়া শূন্যতার গান
সেখানে সময় ঘুমিয়ে পড়ে ঘাসের উপর,
আর আমরা হেঁটে যাব তার বুকের 
ভেতর দিয়ে।

স্বচ্ছ নদীতে নামবো দু’জনে,
জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিনবো একে অন্যকে,
ঢেউয়েরা হেসে বলবে—
এরা তো প্রেমের ভাষা জানে।
ভেজা চুলে রোদ্দুর জড়িয়ে
তোমার কাঁধে রাখবো আমার সমস্ত ক্লান্তি।

পাহাড়ের কাছে গিয়ে বলবো—
দেখো, আমরা যুগলবন্দী,
ভাঙা-গড়া একসাথে শিখেছি।
আমাদের পূর্ণ করো, পূণ্য করো,
অথচ একটু পাপের রোদও দিও—
যাতে দেহমন খেলতে পারে
পাপ-পুণ্যের দোলনায়।

রাতে চাঁদের কাছে আবদার করবো—
আজ আর উঠো না,
আমাদের কথা শুনে যাও।
তারাদের দিয়ে লিখে নেবো
অদ্ভুত সব প্রতিশ্রুতি,
যেগুলো কখনো পূরণ করতে হয় না—
শুধু ভালোবেসে বাঁচলেই চলে।

সেই দেশে কেউ প্রশ্ন করে না—
কে তুমি, কেন এলে?
সব উত্তর মিলে যায় একটা দীর্ঘশ্বাসে,
একটা হাত ধরা সাহসে।

যদি কখনো ফিরে আসতে হয়,
ফিরবো না আমরা পুরোটা—
কিছু উন্মাদ হাসি, কিছু নদীর জল,
আর পাহাড়ের কাছে বলা
অন্তরঙ্গ সেই প্রার্থনাগুলো
সেখানেই রেখে দেবো।

যদি কোনোদিন ফিরতেই হয় পৃথিবীর ভিড়ে,
ফিরবো না আমরা সম্পূর্ণ—
তোমার বুকের ভাঁজে রেখে আসবো
আমার নামহীন নিশ্বাসগুলো,
স্বচ্ছ নদীর জলে ভাসিয়ে দেবো
আমাদের প্রথম ছোঁয়ার স্মৃতি। 

পাহাড়ের কানে কানে বলে যাবো—
এখানে একদিন দু’টি হৃদয়
ভালোবাসাকে ঘর বানিয়ে
চিরদিনের জন্য বসবাস করতে চেয়েছিল।


৩৯.      তোমাকে দেখার সাধ 


তোমাকে দেখার সাধ মেটে না—
চোখের পর চোখ ক্ষুধার মতো খুঁজে ফেরে তোমার মুখ,
দিনের আলো ফুরোয়, রাত নামে,
তবু দৃষ্টির পাত্র ভরে না।

তোমাকে দেখবার যে এক প্রগাঢ় বাসনা,
সে বাসনা নদীর মতো—
যতই জল পায়, ততই গভীর হয়,
যতই কাছে আসি, ততই দূরত্ব শেখায়।

তুমি জানো না—
আমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
তোমার অবয়ব লুকিয়ে থাকে,
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন
তোমাকে দেখবার অনুমতি চায়।

আমি তাকিয়ে থাকি—
তোমার চোখে, ঠোঁটে, নীরবতায়,
যেন এই দেখা দিয়েই
জীবনের বাকি পথটা হেঁটে নেওয়া যায়।

তোমাকে দেখার সাধ মেটে না, প্রিয়—
কারণ তুমি শুধু দেখা নও,
তুমি আমার না-দেখা স্বপ্ন,
যাকে যত দেখি, ততই
আরও একবার দেখবার ইচ্ছে জন্ম নেয়।



৪০.       হাতে হাত রেখে 


হাতের ভাঁজে হাত রেখে আমরা চলেছি,
কোনো মানচিত্র নেই, তবু পথ হারানোর ভয় নেই।
কারণ তোমার স্পর্শই আমার দিকচিহ্ন,
আর আমার নিঃশ্বাসে তুমি পেয়েছ আশ্রয়ের শব্দ।

আমাদের সামনে যে জীবন
সে আর অচেনা নয়,
তার চোখে এখন আর প্রশ্ন নেই,
শুধু ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া দরজা,
ভেতরে আলো, ভেতরে নীরব নিশ্চয়তা।

আমরা হেঁটে যাই
ভাঙা দিন পেরিয়ে, ক্লান্ত সন্ধ্যার বুক চিরে,
পেছনে পড়ে থাকে দ্বিধা,
ভয়গুলো নিজেরাই সরে দাঁড়ায়
আমাদের নির্ভরতার কাছে এসে।

তুমি জানো, আমি আছি,
এই জানা থেকেই জন্ম নেয় সাহস,
এই সাহস থেকেই জন্ম নেয় আগামীকাল।
কোনো প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ দরকার হয় না,
হাতের উষ্ণতাই বলে দেয়-
আমরা একে অপরের ঘর।

যদি ঝড় আসে,
আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকব।
যদি আকাশ নুয়ে পড়ে,
আমাদের বিশ্বাস তাকে ধরে রাখবে।
হাতের ভিতর হাত—
এই তো আমাদের সমগ্র দর্শন,
এই তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রার্থনা।



৪১.     দু’হাত পেতেছি


আমি দু’হাত পেতেছি—
শূন্য আকাশের নিচে,
যদি ভালোবাসা থাকে,
নিঃশব্দে এসে দিয়ে দাও।

কোনো শর্ত রেখো না,
প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির হিসাব কোরো না,
আমি ভিক্ষা চাইনি,
শুধু হৃদয়ের সত্যটুকু চেয়েছি।

তোমার আদর আর যত্ন
আমার সমস্ত ক্লান্তি মুছে দেবে,
একটু ছোঁয়া, একটু আশ্বাস—
এই নিয়েই আমি বাঁচতে পারি।

যদি দুঃখ থাকে,
আমার বুকে রেখে দাও,
যদি সুখ থাকে,
দু’হাতে ভরে দিও নির্ভয়ে।

আমি দু’হাত পেতেছি  প্রত্যাশাহীন,
যদি ভালোবাসা থাকে—
দিয়ে  দাও নিঃশঙ্ক চিত্তে দ্বিধাহীন।


৪২.        হেমন্তের বিকেলে 


আজ উদাসী হাওয়ার হেমন্তে বিকেলে,
নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়েছিলে বারান্দায়—
রোদের শেষ আলো তোমার চুলে এসে
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার মতো বসে পড়ছিল।

তোমার চোখে তখন অচেনা এক নীরবতা,
যেন অনেক কথা জমে আছে বলবার অপেক্ষায়।
হালকা বাতাসে শাড়ির আঁচল কাঁপতেই
আমার সমস্ত অপ্রকাশিত ভালোবাসা
হঠাৎ করে জেগে উঠল বুকের ভেতর।

সেই মুহূর্তে মনে হলো—
ভালোবাসা আসলে কোনো ঘোষণা নয়,
এ এক নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থাকা,
একটি বিকেল,
একটি নীল শাড়ি,
আর তোমাকে দূর থেকে দেখেই
অকারণে হৃদয় ভরে যাওয়ার নাম।

তোমাকে তখন না ডেকেও ডাকতে ইচ্ছে করে,
না ছুঁয়েও ছুঁয়ে থাকতে চাইলাম।
কারণ এমন করে দেখলে তোমাকে—
প্রতিবারই নতুন করে
ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।


৪৩.      জোছনার আলোকধারায়


যদি কোনো রাত্রির মধ্যাহ্নে
চন্দ্রকিরণতলে দাঁড়িয়ে কেউ
নিঃশব্দে ললাটে চুম্বন দিত—
সময় থমকে যেতো,
নক্ষত্রেরা ভুলে যেতো তাদের কক্ষপথ।

জোছনাধারা বইত ধীরে ধীরে,
যেন চাঁদ নিজেই হেঁটে আসছে হৃদয়ের দিকে;
কুয়াশা-নিবিড় নির্জনতায়
আমি চলে যেতাম অচেনা এক পথে—
বাঁশঝাড়ের ছায়া মর্মর করত
নরম পায়ের নিচে,
পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ত
অতীতের সমস্ত দীর্ঘশ্বাস।

সেখানে কোনো প্রশ্ন থাকত না,
থাকত না পাওয়ার হিসাব,
শুধু বুকের ভেতর নীল আলো জ্বেলে
দু’টি নিঃশ্বাস একে অপরকে চিনে নিত।
তোমার চোখে ভিজে থাকত
আমার না-বলা সমস্ত প্রার্থনা,
আমার হাতের রেখায় ঘুমিয়ে পড়ত
তোমার অনন্ত অপেক্ষা।

আমি তখন বলতাম—
নাও, দাও তুমি আমার অনন্ত ভালোবাসা,
যে ভালোবাসা কোনো ঋতু জানে না,
যে ভালোবাসা ক্ষয় জানে না,
চন্দ্রগ্রহণেও যার আলো ফুরোয় না।

যদি হারিয়েও যাই সময়ের গহ্বরে,
যদি নামহীন হয়ে যাই পৃথিবীর ভিড়ে—
এই জোছনা, এই বাঁশঝাড়,
এই ললাট-চুম্বন সাক্ষী থাকবে,
আমি একদিন ভালোবাসায় সম্পূর্ণ ছিলাম।


৪৪.        উত্তরাধিকার


আজন্ম প্রেমিক আমি—
আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকা আমার স্বভাব,
পূর্বপুরুষের রক্তে মিশে আছে
এই উন্মুক্ত হাসি, এই দেহভাষা।

তুমি কি পারবে আনন্দে নামতে?
শরীরের গভীরে আলো জ্বালাতে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে
আগুনের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিতে উষ্ণতা?

আমি চাই না ভীরু স্পর্শ,
চাই না অর্ধেক চাওয়া—
আমার প্রেম সম্পূর্ণ নগ্ন,
চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা দেহের মতো নিঃসংকোচ, নির্ভীক।

যদি পারো— তবে এসো,
আমার বুকে কান রাখো,
শোনো হৃদপিণ্ডের ঢাক,
সেখানে আনন্দের তাল লুকানো।

আর যদি না পারো, তবে চলে যাও,
যেমন চলে গেছে আগে
অক্ষম সব প্রেমিকারা, যারা দেহে আগুন চিনত না, ভালোবাসাকে ভয় পেত।

আমি রয়ে যাই—
আনন্দের উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে,
আবার কারো অপেক্ষায়,
যে জানে—
প্রেম মানে শুধু অনুভব নয়,
প্রেম মানে সাহস করে জ্বলে ওঠা।


৪৫.     নির্মলার কথা


রাজা রাম মন্দির—
ভগ্ন পাথরে আটকে থাকা শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাস,
লতাগুল্মে ঢাকা সিঁড়ি
নিজের দুঃখ নিজেই আগলে রাখে।

আশ্বিনের অস্তসূর্যে
আমি হাঁটছিলাম ধ্বংসের ভেতর,
হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ—
“পা বাড়াবেন না, ওখানে সর্প থাকে।”
সাদা শাড়ির মেয়ে, নাম নির্মলা—
চোখে জমে থাকা
অকাল বিধবার নীরব ইতিহাস।

সে দেখাল দীঘি,
বলল— এ জল মন্দিরের চেয়েও পুরোনো,
মাঝরাতে নাকি জ্বলে ওঠে অচেনা দীপ।
বলল স্বামীর কথা—
দুই বছরের সংসার,
একদিন জ্বরে পুড়ে নিভে যাওয়া মানুষ,
কান্নাহীন কণ্ঠে বলা শেষ গল্প।

সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে
দীঘির পাড়ে সে ধরেছিল আমার হাত,
কাঁপা আঙুলে দৃঢ় অনুরোধ—
“আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
আমি হাত ছাড়িয়েছিলাম,
তার ইচ্ছেটাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম জলে,
জল নড়েছিল ক্ষণিক,
তারপর স্তব্ধ।

আজও আশ্বিন এলে
কোনো এক দীঘির কালো জলে
ভেসে ওঠে সেই প্রশ্ন—
“আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
কোনো উত্তর
আর দেওয়া হয় না।



৪৬.        পৃথিবীর মায়া


কেন যে কিছু মুখে পৃথিবীর মায়া লেগে থাকে—
মাটি, জল, রোদ আর শ্যাওলার এক নিবিড় চিহ্ন,
যেন বহু জন্মের হাঁটা থেমে আছে
একজোড়া চোখের কিনারায়।
সে মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়,
পৃথিবী কেবল গ্রহ নয়—
এ এক দীর্ঘ অভ্যাস, এক নীরব টান।

কেন যে কিছু মুখে পাই শুকপাখির পালকের ঘ্রাণ—
অতীতের উড়ান, অচেনা আকাশ,
ডানার ক্লান্তি আর দূরত্বের রৌদ্রঝরা স্মৃতি।
সে মুখে থাকে উড়ে যাওয়ার ইচ্ছে,
আবার ফিরে আসার অদৃশ্য দায়;
স্বাধীনতার স্বাদ আর ঘরের টান
একসঙ্গে বাসা বাঁধে সেখানে।

কেনই আবার দুঃখ-কাতরতা দেখি সেই মুখখানিতে—
না বলা কথার জমাট নীল,
চোখের ভাঁজে জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষা,
ভাঙা স্বপ্নের শব্দহীন চিৎকার।
সে দুঃখ চিৎকার করে না,
বরং ধীরে ধীরে মানুষের মতো
নিজেকে সহ্য করতে শেখে।

সেই মুখেই—
জীবন-মৃত্যুর খেয়া পারাপার দেখি।
একদিকে জন্মের আলো, অন্যদিকে নিভে যাওয়ার ছায়া;
মাঝখানে একটি মানুষ
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে,
হাতে কিছু স্মৃতি, বুকে কিছু ভালোবাসা,
আর চোখে অমীমাংসিত বিদায়ের জল।
সে মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝি—
জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়,
মৃত্যুকেও প্রতিদিন একটু একটু করে
আলিঙ্গন করা।
কিছু মুখ তাই আয়নার মতো—
তাতে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের ক্ষয়,
নিজের ফিরে আসার পথ
অস্পষ্ট হলেও সত্য হয়ে ধরা দেয়।



৪৭.        পলাশবনের দুপুর


একদিন তপ্ত দুপুরবেলায় তুমি আগুন পলাশ বনে এসে দাঁড়াবে—
রাঙা পলাশের আবীর মাখবে তোমার গালে।
দু’চোখে রোদের ঝিলিক, বুক দুরুদুরু—
হাওয়ার কাঁধে ভর দিয়ে সময় থমকে যাবে খানিক।
আমার নামে কাজল দিবে চোখে,
আদর মেখে নেবে ঠোঁটে—
জুঁইফুলে গাঁথবে চুলের বিনুনি,
খোঁপায় গুঁজবে হলুদ গোলাপ,
যেন দুপুরের তাপে হঠাৎ ফুটে ওঠা একটি প্রার্থনা।

পায়ের নিচে শুকনো পাতা ফিসফিস করবে,
পাখিরা থামিয়ে দেবে গান—
শুধু শোনা যাবে তোমার নিঃশ্বাসের ওঠানামা।
রোদ্দুর ছায়ার সিঁড়ি বেয়ে নামবে আমাদের দিকে,
পলাশের ডালে ডালে ঝুলে থাকবে
লাল লাল অপেক্ষা।
তুমি চোখ নামালে,
আমার নাম পড়ে যাবে তোমার পাপড়ির ছায়ায়।

আমি বলব না কিছু—
নীরবতাই তখন ভাষা হয়ে উঠবে।
তোমার কণ্ঠে দুপুর গলবে,
হলুদ-লাল রঙে ভিজে যাবে পথ।
দূরে কোথাও জল ঝিলমিল করবে,
আর আমাদের মাঝখানে জন্ম নেবে
একটি মায়াময় আলো—
যার তাপে দুঃখ গলে যায়,
আর ভালোবাসা হয়ে ওঠে চিরসবুজ।

সেদিন পলাশবন শুধু বন থাকবে না,
হয়ে উঠবে ঘর—
যেখানে রোদ্দুর জানালা দিয়ে ঢুকে
আমাদের দু’জনকে একসাথে ডাকবে,
আর সময় শিখে নেবে
কীভাবে ধীরে হাঁটতে হয়।


৪৮.        আমার নামে 


আমার নামে কাজল দিও চোখে,
যেন তোমার দৃষ্টির কালোয়
আমি চিরকাল লুকিয়ে থাকতে পারি।

আমার নামে টিপ পরো কপালে—
সময় থমকে যাক এক মুহূর্ত,
সংসারের সব ক্লান্তি বাইরে রেখে।

আমার নামে আলতা রাঙাও পায়ে,
পথ যেন কেবল আমার দিকেই আসে।
হাঁটার শব্দে ঝরে পড়ুক লজ্জা,
নূপুরের ভিতর বাজুক গোপন ভালোবাসা।

আমার নামে ঠোঁটে দিও লাজুক রং,
যে রং কথা বলে না শুধু ছুঁতে জানে।
চুম্বনের আগেই ঠোঁট কাঁপুক,
ভেতরে ভেতরে ডাকুক আমাকে।

আমার নামে চুলে গাঁথো জুঁই,
নিঃশ্বাসে মিশুক রাতের সুবাস।
বিনুনির ফাঁকে ফাঁকে
আমি থাকি নীরব আশ্রয়ে।

আমার নামে শাড়ির আঁচল ভিজে থাকুক,
পড়ুক বিকেলের নরম রোদে।
ঝড় এলে আঁচল টেনে নিও বুকে—
আমি হব তোমার ভয়হীনতা।

আমার নামে একটুখানি অভিমান রেখো,
একটুখানি মান ভাঙার সুখ।
ভিড়ের মাঝেও যখন হারিয়ে যাবে সব নাম,
তখন শুধু ফিসফিস করে বলো—
এই চোখের কাজল, এই বুকের ধুকপুক,
সবটাই আমার নামে।


৪৯.        তুমি আছ বলেই


আমি জল থেকে নিয়েছি তোমার শীতল ছোঁয়া,
রোদ্দুর থেকে নিয়েছি তোমার উষ্ণতা।
পথে চলতে চলতে জারুল ফুলের গন্ধে
খুঁজেছি তোমার বুকের গোপন সুবাস।

ভোরের শিশিরে ধুয়ে নিয়েছি তোমার চোখ,
নদীর ঢেউ থেকে শিখেছি তোমার ডাক—
ডেকে ওঠা, আবার সরে যাওয়া,
নীরবতার ভেতর লুকোনো এক গভীর প্রেম।

বিকেলের আকাশে যখন মেঘ জমে,
আমি বুঝে নিই, ওটা তোমার অভিমান।
আর সন্ধ্যার দীপ জ্বলে উঠলে ঘরে ঘরে,
তোমার নামেই আলোয় ভরে ওঠে মন।

চাঁদের আলোয় তোমার মুখের রেখা এঁকে নিই,
হাওয়ার কানে কানে শুনি তোমার নিঃশ্বাস।
এই পৃথিবীর সবকিছু থেকেই
আমি ধীরে ধীরে গড়ে নিয়েছি তোমাকে—
আমার একান্ত ভালোবাসা।

তুমি না থাকলে কিছুই আমার নয়,
আর তুমি আছ বলেই
এই না-থাকাও সহ্য হয়।


৫০.       অভিবাদন 


আজ কোনো বিবর্ণ শব্দে নয়,
আনন্দের রঙেই শুরু হোক নতুন বছর।
জীবন পেয়েছিলাম একদিন ক্রন্দনের ধ্বনিতে—
চলে যাব একদিন আঁখিকোণে রেখে যাওয়া নীরব অশ্রু নিয়ে।
আর এই মাঝখানের সময়টুকু—
কখনো দুঃখের, কখনো আনন্দের,
কখনো হারানোর, কখনো ভালোবাসার।

নতুন বছরে সেই মাঝখানের দিনগুলো
হোক আরও বেশি আলোয় ভরা,
হোক হাসিতে, স্নেহে আর স্বপ্নের সাহসে উজ্জ্বল।
সব বেদনা ছাপিয়ে আনন্দ এসে
আমাদের হাতে, মনে, জীবনে মেখে দিক নতুন আশ্বাস।

শুভ নববর্ষ।
জীবন সুন্দর হোক—ঠিক তার সমস্ত অনুভব নিয়েই। 

৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
ঢাকা। 

ওসিয়তনামা ( কাব্যগ্রন্থ)


ওসিয়তনামা  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ -

উৎসর্গ  -

১.   শেষ শক্তি 

একে একে তুমি
আমার ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিয়ে যাচ্ছ,
যেন আমি একা থাকলেই
তোমার রাজত্ব সম্পূর্ণ হয়।

জানি, তোমার অনেক পাওয়ার-
তুমি পাহাড় ভাঙতে পারো,
সমুদ্র থামাতে পারো,
সূর্যের আলো পর্যন্ত ঢেকে দিতে পারো।
কিন্তু সেই পাওয়ার
আমার বুকের ভেতরই কেন বারবার নামাও?

আমার ঘরের কোণে এখন
খালি চেয়ারগুলো পড়ে আছে,
নাম ধরে ডাকে নীরবতায়-
আমি শুনি, অথচ কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারি না।

তুমি বলো, সবই নিয়ম-
আমি বলি, তবু কেন আমারই পালা?
প্রতিটি বিদায়ের পরে
আমাকে নতুন করে মরতে হয়।

আমি তো কারও সর্বনাশ চাইনি,
আমি শুধু মানুষ ভালোবেসেছি-
তাহলে কেন ভালোবাসাই
তোমার চোখে সবচেয়ে বড় অপরাধ?

যদি তোমার শক্তি দেখাতেই হয়,
তবে একবার আমার চোখে তাকাও,
দেখবে- এই ভাঙা হৃদয়েই
তোমার সব যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন লেখা আছে।

তবু আমি দাঁড়িয়ে থাকি,
শূন্যতার মাঝেও নিঃশ্বাস নিই,
কারণ জানি- ভালোবাসা হারালেও
মানুষ হয়ে থাকা এখনো
আমার শেষ শক্তি।


২.     নিশ্ছিদ্র সন্ধ্যার শরীর


যাও, অন্ধকারের কোমল কুঞ্জে যাও
গোধূলির গন্ধ মেখে
চুপচাপ ঘুমের দরজা খুলে দাও।
ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেই
আমরা হারিয়ে যাব
দেয়ালের ছায়া ছুঁয়ে।

এখানেই দেখা হবে
ভাঁজে ভাঁজে খোলা নির্জনতায়,
শব্দের কাপড় খুলে
শ্বাসের তাপে লেখা পড়ব আমরা।

বুকে নেমে আসবে নক্ষত্রের ধুলো,
চোখে জমবে মেঘের জল।
তুমি কাছে এলে
একাকীত্বও দু’জন হয়ে যায়।

তোমার শরীরে সন্ধ্যার নীল,
আমার আঙুলে আলো-ছায়ার কাঁপন
কোনো নাম নেই এই মিলনের,
তবু গভীরভাবে চেনা।

স্পর্শে স্পর্শে জন্ম নেবে মধুর গান,
সময় থেমে দাঁড়াবে দরজায়।
এভাবেই, অদেখা আগুনে
আমরা দু’জন পুড়ে
আবার নতুন হয়ে ফিরব।



৩.    মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়বে



মৃত্যু যেদিন এসে দরজায় কড়া নাড়বে,
আমি হাসব, ভয় নয়- একরাশ অভিমানে,
বলব,
'এলেই যখন, আরও আগে আসো নাই কেন?
কেন পৃথিবীর প্রতি এতদিন মায়া বাড়িয়ে দিলে?'

আমি তো প্রস্তুত ছিলাম শিশুর মতো ঘুমিয়ে যেতে,
কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছ
ভোরের আলো ভালোবাসতে,
বৃষ্টির গন্ধে বুক ভিজাতে,
নদীর ঢেউয়ে শোনাতে হারিয়ে যাওয়া নাম।

তুমি আমাকে দিলে মায়ের বুকে আশ্রয়,
ভালোবাসার চোখে অনন্ত সুখ, 
দু’ফোঁটা হাসির ভেতরেও অপরাজেয় এক জীবন।

তারপর হঠাৎ বলো, সব শেষ?
এই শরীর, এই স্মৃতি, এই প্রার্থনা
সবই কি ধুলো হয়ে যাবে?

মৃত্যু, তুমি বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক,
আগে শেখাও বেঁচে থাকার সব মন্ত্র,
তারপর ছিনিয়ে নাও পাঠ্যবই।

তবু জানি, যেদিন তুমি আবার ডাকবে,
আমি পিছু হটব না।
শুধু একবার ফিরে তাকাব এই পৃথিবীর দিকে-
যাকে তুমি আমার হৃদয়ে এত গভীর করে লিখে দিলে।


৪.     ভালোবাসাকে প্রশ্ন 


ভালোবাসাকে ডেকে এনে সামনে বসিয়ে 
বললাম-এই নাও রৌদ্রছায়া দুপুর।
তাকে বলা হলো -
তুমি কী ওকে কাছে টেনে নেবে?”
ভালোবাসা চোখ বুজে গুনগুন করে বললো-
আমি যাকে ছুঁই, সে তো গান হয়ে যায়….

তারপর ডেকে আনা হলো
এক ক্লান্ত সন্ধ্যাকে, শরীরজুড়ে দাগ,
মনের ভেতর পুরনো কান্নার চিহ্ন,
ভালোবাসাকে  বলো হলো- নেবে একে? 
ভালোবাসা মাথা নুইয়ে বলল,
ও তো নদী, মোহনায় মিলিয়ে যায় ।

তারপর একে একে আনা হলো
রুক্ষ, কোমল, এলোমেলো চুলের, 
ভোরের আলোকে - আর শীতল মুখ, 
উজ্জ্বল চোখের গোধূলির বিষণ্ণতাকে, 
দুজনকেই সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন 
ছুড়ে দেওয়া হলো - এদের কী ভালো লাগে? 

ভালোবাসা হেসে উঠে বললো -
তুমি যাদের আমার কাছে নিয়ে এসেছ , 
ওরা ক্ষণিকের মোহ, অচেনা টান, 
এমনিতেই এরা দূরের হয়ে যায়। 


৫.     ঘুম ভাঙার পর


প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায়
দেহ জুড়ে ক্লান্তির আবেশ,
তখনও রাত ফুরায়নি,
অন্ধকারের বুকের ভেতর
চাঁদের মতো জেগে থাকে তোমার নাম।

পাঁজরে ধরে আছে তোমার কোমল হাত,
যেন ভাঙা শ্বাসের মধ্যে
একটুখানি আশ্রয়।
হৃদপিণ্ডের গভীরে
শব্দহীন এক আলো জ্বলে ওঠে,
যার ভাষা শুধু আমি বুঝি।

ঘুমের ভেতরেও তুমি
আমার রক্তের ছন্দে মিশে থাকো,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে
লিখে দাও অস্তিত্বের জানান
যেখানে আমিই শুধু নই,
আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে তুমিই।

ভোর আসার আগেই বুঝে যাই-
আমি বেঁচে আছি,
কারণ তুমি আছো
আমার ভেতরের সবচেয়ে গোপন জায়গায়।


৬.       ওসিয়তনামা


ভালোবাসব বলে যে ওসিয়ত আমরা করেছি,
তার যেন কোনোদিন বরখেলাপ না হয়,
এই প্রার্থনায় আজ আমি নিয়তবদ্ধ
তোমার চিরপ্রেমিক হয়ে থাকার জন্য।

ঠোঁটে জমে আছে নাগলিঙ্গমের রক্তিম ছায়া,
বুকে বহমান আগুনের গোপন স্রোত-
আজ ভালোবাসা দিবস,
এসো, আলিঙ্গনের ভেতর দিয়ে
আমরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করি।

আমার যা কিছু প্রেমময়, তার সবটাই তোমার,
সব ব্যবচ্ছেদের ছেদ উঠিয়ে দিই,
দেবার-নেবার সকল হিসাবের সঙ্গী হও তুমি।

পাথরে পাথরে ঘষে যে আগুন জ্বলে ওঠে,
সেই আগুনে আমরা পুড়িয়ে দিই
আমাদের সমস্ত একাকিত্ব।

বদনাম যা হবার হোক,
আমি চিৎকার করে বলব-
তুমি আমার, প্রিয়তমা, কেবলই আমার।

যদিও তুমি আমার,
তবু তুমি অন্য কারোর নও,
বিশ্বলোকের অগাধ ভিড় থেকে
আমি তুলে এনেছি তোমাকেই,
তোমার কম্পিত দেহের শিহরণে
আমিও শিহরিত হই।

তারপর আর কোনো কথা থাকে না-
নিঃশব্দে শেষ হয় সব প্রশ্ন।
তারপর আমরা আমাদের মিলনের পর্ব শেষে
ভালোবাসার এই ওসিয়তনামায়
দু’জন একসাথে স্বাক্ষর করি।


৭.      বৃষ্টিভেজা আগমন


যখন বৃষ্টি নামে, তখন তুমি খালি পায়ে
হেঁটে হেঁটে আসো,
তোমার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় বৃষ্টির ধ্বনিতে,
আর আমার বুকের ভিতর ঝরে পড়ে
অদৃশ্য জলধারা।

চুলে লেগে থাকে মেঘের শীতল গন্ধ,
তোমার চোখে ভিজে থাকা আকাশ,
আমি হাত বাড়ালে বৃষ্টি থেমে যায় না
শুধু আমাদের মাঝখানে
একটু চুপ হয়ে দাঁড়ায়।

তোমার পায়ের ছাপ ভিজে মাটিতে
লিখে যায় আমার নাম,
প্রতিটি ফোঁটা যেন বলে- ভালোবাসা মানে 
ফিরে আসা,
ভালোবাসা মানে এই ভেজা পথ।

তুমি যখন হাসো,
বৃষ্টির শব্দ হালকা হয়ে যায়,
মনে হয় পৃথিবীর সব বর্ষণ
শুধু আমাদের দুজনের জন্যই।


৮.      রাধার মানভঞ্জন


নিশিথ নিঃশ্বাসে কাঁপে বৃন্দাবন,
মল্লিকাগন্ধে ভিজে শ্যাম-চরণ।
বাঁশির ডাকেতে পাগল রজনী,
রাধা-হৃদয়ে জ্বলে অনল-রণী।

চরণে ধূলি মেখে শ্যাম ফিরে আসে,
চোখে জোছনার অবাধ্য হাসে।
রাধা বলে—“ওরে ছলনাময়!
আজ আর ধরা দেব না হে নির্দয়।”

শ্যাম বলে—“হে প্রাণ! মান কেন এত?
বাঁশির প্রতিটি সুরে আছ তুমি সতত।”
রাধা চেয়ে দেখে, কপোল লাজে রাঙা,
চুলে গাঁথা জোছনা, কেশে বনফুল ভাঙা।

নয়নে নয়নে গোপন উচ্চারণ,
শ্বাসে শ্বাসে প্রেমের গভীর জ্বালান।
অধরে অধর ছোঁয়ার আগে,
থেমে যায় কাল বৃন্দাবন-সাঁঝে।

রাধা মুছে মান, বক্ষে রাখে শ্যাম,
মিলনে জাগে অনন্ত ধাম।
নিশিথে লুপ্ত হয় বিরহের কোলাহল,
দুটি হৃদয়ে এক প্রেম-জ্বলজ্বল।


৯.       পথ


এই পথ জানে কত পা এসে থেমেছে,
কত স্বপ্ন হোঁচট খেয়ে
ধুলো হয়ে গেছে সন্ধ্যার কোলের ভেতর।

এই পথ জানে
কে ফিরেছে বুকভরা আলো নিয়ে,
আর কে ফিরেছে চোখে
অপরাজেয় অন্ধকারের নোনা জল।

রোদ্দুরের নিচে সে পুড়ে পুড়ে শিখেছে সহনশীলতা,
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে শিখেছে
নিজেকে নতুন করে ধুয়ে নেওয়ার মন্ত্র।

পথের কাঁধে জমে থাকে অজস্র 
বিদায়ের ছায়া,
তবু সে প্রতিদিন ভোরে
নতুন যাত্রার ডাক দেয়।

হেঁটে যাওয়া মানুষ বদলায়,
ঋতু বদলায়, শহর বদলায়-
শুধু পথ বদলায় না,
সে অপেক্ষায় থাকে,
চুপচাপ, নির্ভর, অবিচল।

যে দিন তুমি ক্লান্ত হয়ে নিজেকে 
হারাতে বসবে,
এই পথই তোমাকে বলবে-
চলো, এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি।


১০.     অল্পে পূর্ণতা


বেশি দীর্ঘ জীবন আমি চাই না,
রোগে শোকে ন্যূজ হয়ে যাওয়া,
কিংবা সংসারের বোঝা হয়ে থাকা
আমার কোনো প্রার্থনা নয়।

আমি চাই এমন কিছু সকাল-
যেখানে শ্বাস নেবে আলো,
জানালার ধারে বসে থাকবে পাখির গান,
আর আমার বুকের ভেতর
জ্বলবে কৃতজ্ঞতার উজ্জ্বল দীপ।

আমি চাই এমন কিছু বিকেল-
যেখানে ক্লান্তি মানে বিশ্রাম,
অপমান মানে নয় পরাজয়,
আর সময় আমাকে ছুঁয়ে যাবে
বন্ধুর মতো, ঋণীর মতো নয়।

যেদিন হাত কাঁপবে কলম ধরতে,
সেদিন যেন চোখে থাকে আকাশ,
পায়ের নিচে থাকে নিজের জমিন,
আর মুখে থাকে একফোঁটা হাসি
যা কাউকে বোঝা করে না।

আমি চাই না অগণিত বছর,
আমি চাই পূর্ণ কয়েকটি মুহূর্ত-
যেন জীবন বলে উঠতে পারে,
তুমি আমাকে ভোগ করোনি,
তুমি আমাকে অশেষ করেছ। 

আর শেষ বিকেলে,
যখন সূর্য নামবে কোমল আগুনে,
আমি যেন বলি-
এতটুকুই যথেষ্ট ছিল, এর বেশি হলে
আমি নিজেকেই হারাতাম।


১১.      দীপালির বিয়ে


আজ দীপালির বিয়ে,
কতই বা ওর বয়স—চৌদ্দ?
সানাই বাজছে, কী অসাধারণ করুণ সুর,
সাথে বীনার বিদায়ী ঝংকার 
কাঁপছে বাতাসে।

দীপালি নদীর সাথে কথা বলত,
জলের ধ্বনি শুনত কান পেতে-
ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে খুঁজে নিত
নিজের দীপ্ত নাম।

দীপালি পাখির সাথে কথা বলত,
অলিন্দে দাঁড়িয়ে ডেকে নিত রোদ্দুর,
তার চোখে তখন ছিল আকাশের নীল
আর ঘাসফুলের মতো নরম স্বপ্ন।

আজ সে লাল শাড়িতে বাঁধা,
মায়ের চোখের জলে ভিজে আছে তার কপাল,
হাতে মেহেদির অক্ষরে লেখা
একটি অনুচ্চারিত বিদায়।

ঘরের কোণে তার শৈশব
মাটির পুতুলের মতো পড়ে আছে,
হাসির ভাঙা ডানা গুটিয়ে
অচেনা গৃহের পথে হাঁটছে সে।

নদী আজ চুপ করে আছে,
পাখিরা জানালার ধারে থমকে গেছে-
যেন তারাও বুঝে গেছে
একটি ছোট্ট স্বপ্ন আজ হারিয়ে গেল।

দীপালি, তুমি কি শুনতে পাও?
সানাইয়ের সুরে আজ কাঁদছে তোমার নাম,
চৌদ্দ বছরের বুকের ভিতর
ডুবে যাচ্ছে একখানা নীল আকাশ।

আজ দীপালির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে…
আর কোথাও একটি নদী
নিঃশব্দে তার ঢেউ গুনে গুনে
একটি মেয়েকে খুঁজে ফেরে।


১২.      ভালোবাসা মানে 


ভালোবাসা মানে কণ্ঠে কণ্ঠে গান নয়,
ভালোবাসা মানে নীরবতার ভেতরে
হৃদয়ের শব্দ চিনে নেওয়া।

ভালোবাসা মানে হাত ধরা দুপুর নয়,
ভালোবাসা মানে অন্ধকার রাতেও
একটি আলো হয়ে জেগে থাকা।

ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে হারিয়ে গিয়েও
ফিরে আসার পথ জানিয়ে রাখা।

ভালোবাসা মানে চোখে চোখে স্বপ্ন নয়,
ভালোবাসা মানে চোখ ভিজে গেলে
আকাশ হয়ে ঝরে পড়া।

ভালোবাসা মানে শুধু সুখের গল্প নয়,
ভালোবাসা মানে দুঃখের পাশে বসে
অদৃশ্য হয়ে কাঁদা।

ভালোবাসা মানে শরীরের তৃষ্ণা নয়,
ভালোবাসা মানে আত্মার গভীরে
নীরব আগুন জ্বালানো।

ভালোবাসা মানে দু’জন থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে দু’জন হয়েও
একজন হয়ে যাওয়া।


১৩.     বংশী নদীর জল


সেই কবে থেকে বংশী নদীর পাড়ে যেতে মন চায়-
যেখানে সন্ধ্যার মৌন আকাশের নিচে
নদীর জল নাকি নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকে,
চোখ বুজে শোনে দিনের ক্লান্ত শ্বাস।

আবার কখনও মন চায়
তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে
তোমাদের বাড়ির পাশের ছোট্ট জামতৈল স্টেশনে-
যেখানে প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে
এক দুপুরে বসে
আমরা দু’জন গরম চা খেয়েছিলাম,
আর সময় তখন থেমে ছিল
ধোঁয়ার মতো হালকা, নীল।

আরেক বিকেলে,
রেললাইনের পাশে হেঁটে হেঁটে
চলে গিয়েছিলাম ছোট্ট সেই ব্রিজটির কাছে-
সেখান থেকে দেখেছিলাম
দূরের ধানক্ষেতের সবুজ সমুদ্র,
দক্ষিণা হাওয়ার শীতল স্পর্শ
আমাদের গায়ে এসে লেগেছিল
মায়ার মতো, অদৃশ্য চাদর হয়ে।

ওমর খৈয়াম পড়তে পড়তে
বারবার মদ আর মদিরার কথা পড়েছি—
মদের অর্থ আমি জানি,
তবু কোনো মদিরাতে মত্ত হতে চাই না;
আমার নেশা কেবল স্মৃতি,
আর সেই স্মৃতির ভেতরেই
তুমি নিঃশব্দে জ্বলে থাকো।

একাকী হলে আমার খুব ঘুম পায়,
আর ভয় লাগে ঘুমিয়ে পড়তে-
যদি আর জাগা না হয়!
কারণ এখনও তো দেখা হয়নি
বংশী নদীর সেই নিঃস্তব্ধ জল,
শোনা হয়নি জামতৈল স্টেশনে দাঁড়িয়ে
দ্রুতগামী ট্রেনের
চলে যাওয়ার শেষ হুইসেলের কান্না।

তাই আমি জেগে থাকি, স্বপ্নের কোল ঘেঁষে,
অপেক্ষার বাতি জ্বালিয়ে-
যেন একদিন সত্যিই
বংশীর জলে ছুঁয়ে নিতে পারি
নিজেরই হারিয়ে যাওয়া ছায়া।


১৪.     অচেনা সুখের গান 


শিলিগুড়ি থেকে ভোরের ট্যাক্সিতে
পথ ছুটে গিয়েছিল পাহাড়ের বুক চিরে,
সবুজের ঢালে ঢালে
রোদ আর কুয়াশা খেলছিল লুকোচুরি।

সুকনা হেরিটেজ স্টেশন—
পুরনো ঐতিহ্যের  গায়ে জমে থাকা শতাব্দীর নিঃশ্বাস,
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল
সময় যেন থমকে গেছে
একটি পোস্টকার্ডের ফ্রেমে।

বন্ধু শিশির রায়,
তোমারই আহ্বানে এই যাত্রা,
তোমার কথাতেই জেগে উঠেছিল
ভুলে যাওয়া পথের ডাক।

পথের ধারে কুঞ্জলতার নীল ডাক,
জারুল ফুলের রাঙা শাখা ঝুঁকে পড়া ছায়ায়,
হাওয়ার গায়ে লেগে থাকত ফুলের গন্ধ,
মুহূর্তগুলো ফুলের মতোই ঝরে পড়ত 
পথের উপরে,

পাহাড়ের ঢাল ছিল ছবির মতো,
মেঘের ছায়া এসে বসত আমাদের চোখে,
হাওয়ার ভেতর ভাসত
অচেনা কোনো সুখের গান।

ভয় ছিল না সেদিন,
শুধু নিঃশ্বাসভরা প্রশান্তি,
আমার এক পাশে ছিল স্বামী,
আরেক পাশে বন্ধু-
দুই ভালোবাসার মাঝখানে
আমি যেন এক নিঃশব্দ নদী।

সেই মুহূর্তগুলো আজও
মনের অ্যালবামে ঝুলে থাকে,
রোদে ভেজা পাহাড়,
পুরনো স্টেশনের চুপচাপ হাসি,
আর আমাদের তিনজনের
অমলিন, অনন্ত যাত্রা।

----  মায়াবতী। 


১৫.     ফেরার পথে কেউ নেই


ঝরাপাতার মর্মর শব্দে তোমার আগমনের 
পদধ্বনি শুনি,
চোখ মেলে রাখি পথের দিকে-
আসলে সব ভ্রম,
কোনো পথ দিয়েই কেউ আর আসেনি ফিরে…

তবু সন্ধ্যার আলো নুয়ে পড়লে
আমি তোমার ছায়া খুঁজি জানালার কাঁচে,
বাতাসে ভেসে আসে তোমার নাম—
অথচ কোথাও তুমি নেই,
শুধু স্মৃতির ঘুমন্ত দ্বার খোলে নিঃশব্দে।

ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে
তোমার চোখের জল মনে পড়ে,
রাতের আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদ
আমাকে তোমার মায়াবী মুখের কথা বলে।

আমি জানি-
তুমি ফেরার পথে নেই,
তবু প্রতিটি ভোরে দরজা খুলে বসে থাকি,
যেন কোনো এক অসম্ভব মুহূর্তে
তুমি হঠাৎই এসে বলবে-
এখনও কি আমাকে চাও?

কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথের মতো
আমার অপেক্ষা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়,
তবু হৃদয়ের গভীরে
তোমার নামটুকু জ্বলে থাকে-
একটি মায়াময় প্রদীপ,
যা নিভে গিয়েও আলো দেয়।

তাই আজও ঝরাপাতার শব্দে থমকে যাই,
মনে হয়- এই বুঝি তুমি…
এই বুঝি ফিরে এলে…



১৬.      শেষ ডাক



শেষ মুহূর্তে মানুষ আর বড় থাকে না 
সে হয়ে যায় ছোট্ট একটি শিশু,
যার চোখে জমে থাকে
অচেনা অন্ধকারের ভয়।

শ্বাসের প্রতিটি ঢেউ
ডুবে যেতে চায় গভীর কোনো স্মৃতিতে,
যেখানে ছিল প্রথম আলো, প্রথম স্পর্শ,
প্রথম 'তুমি নিরাপদ: বলা কণ্ঠ।

কেউ ডাকে— মা,
কারণ মায়ের নাম মানে আশ্রয়।
কেউ ডাকে— ও,
কারণ সেই মানুষটি ছিল জীবনের ছায়া।
কেউ ডাকে— আমার সন্তান,
কারণ তার ভেতর লুকিয়ে আছে নিজেরই আগামী।

শেষ সময়ে আমরা নাম ডাকি না,
ডাকি সেই হৃদয়টিকে
যার কাছে ভেঙে পড়লেও লজ্জা নেই,
যার বুকে মাথা রাখলে
মৃত্যুও কিছুটা কম ভয়ংকর লাগে।

তখন আর সম্পর্ক থাকে না,
থাকে শুধু নিরাপত্তার আলো,
একটুকরো উষ্ণতা
অন্ধকারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

আর সেই ডাক আকাশে মিলিয়ে যায়,
যেন বলছে-
ভালোবাসা কখনও মরে না,
সে শুধু অন্য আলোয় চলে যায়।


১৭.       আলোকবর্তিকা


মনে হয়,
জগতের সকল অন্ধকার
আমি তোমার কাঁধে জড়ো করে রাখি,
ঢেকে রাখি তোমাকে
রাত্রির দীর্ঘ শাল দিয়ে।

রাখিও তাই,
আমার অক্ষম আলো,
আমার ভীত স্বপ্ন,
আমার সমস্ত ছায়ার বোঝা
তোমার নিঃশ্বাসে রেখে।

কিন্তু জানি না কখন,
কোন অদৃশ্য ক্ষণে
তুমি নিজেই হয়ে ওঠো
শত সহস্র আলোকবর্তিকা-
অন্ধকারের বুক চিরে
নীরবে জ্বলে ওঠো।

তখন মুহূর্তেই
আমার অন্ধকার ঘর
রৌদ্রের মত উজ্জ্বল হয়ে যায়,
ছায়ারা পিছু হটে,
দেয়ালের গায়ে নাচে আলো।

আমি বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি-
যাকে ঢাকতে চেয়েছিলাম অন্ধকারে,
সে-ই তো আমার
সবচেয়ে উজ্জ্বল সকাল।


১৮.    কিচ্ছু হয়নি 


একবার স্কুলের স্মরণিকার জন্য 
এক মুঠো স্বপ্ন দিয়ে লিখেছিলাম কবিতা-
স্যারের ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি,
“কিচ্ছু হয়নি, তোর দ্বারা কবিতা হবে না।”
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম,
শব্দও আঘাত দিতে পারে।

কলেজে পড়ার সময়
একটা গল্প লিখে জমা দিয়েছিলাম-
সম্পাদক চোখ তুলে তাকাল না,
বলল, “কিছুই হয় নাই, ছাপানো যাবে না।”
কাগজের ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে গেল আমার বুক। তবু আমি থামিনি।

শহরের দেয়ালে দেয়ালে
নামহীন পংক্তি লিখে রেখেছি-
কেউ পড়ে, কেউ পড়ে না,
কেউ মুছে দেয়, কেউ রেখে দেয়
নিজের নিঃশ্বাসে।

রাতে যখন সবাই ঘুমোয়,
আমি জেগে থাকি শব্দের পাশে-
অবহেলার ছাই থেকে
আমি জ্বালাই অক্ষরের আগুন।

আমাকে কেউ ডাকেনি কবি বলে,
কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি মঞ্চে ওঠার জন্য,
তবু প্রতিটি না-শোনা শব্দের ভেতর
আমি শুনি নিজের অস্তিত্বের শব্দ।

আমি লিখি-
কারণ লেখা ছাড়া আমার আর কোনো ঘর নেই,
কারণ আমাকে যে লেখক হতে হবে।

একদিন হয়তো আমার নামও
কোনো অচেনা হৃদয়ে আলো হয়ে জ্বলবে-
সেদিন আর কেউ বলবে না,
“কিচ্ছু হয়নি।”


১৯.     থাকব পাশাপাশি


এই বাড়ির আঙিনায়
কৌতূহলের পাখিরা ডানা মেলে
নীল আকাশে ভেসে যায়-
তোমার চোখে তখন জ্বলে ওঠে 
নীলমণির মৃদু দীপ্তি।

দিন গুনব না আর,
সময়ের ক্যালেন্ডার ছিঁড়ে ফেলে শুধু বাঁচব-
মাটির সোঁদা গন্ধে, বৃষ্টিভেজা ঘাসের শিরায়,
নামহীন শান্তির মতো থাকব পাশাপাশি।

সন্ধ্যা নামলে আমাদেরই ছায়া
দু’দিক থেকে এগিয়ে এসে এক হবে-
আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় হবে,
তারারা জানালার কপাট খুলে
অন্তরালের গল্প শোনাবে।

আমরা দু’জন পৃথিবীর কোলাহল 
পেরিয়ে আরও গভীরে ডুবে যাব কৌতূহলের উষ্ণ স্পর্শে, 
আর মায়ার স্বচ্ছ আলোয়।


২০.     শেষ বিদায় 


আজ একজন আপন মানুষের জানাজায় 
দাঁড়িয়ে ছিলাম-
কাতারে কাতারে নীরব মানুষ,
চোখে অশ্রুর ধারা,
বুকে অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস।

মসজিদের ইমাম সাহেব
নামাজ শুরুর আগে কফিনটির দিকে তাকিয়ে বললেন-
“দেখুন, এই কফিনটি আপনারও হতে পারত;
হয়তো পরের কফিনটাই হবে আপনার।”

কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল না,
ধীরে ধীরে নেমে এলো আমাদের হৃদয়ের ভেতর,
একটি অদৃশ্য হাত যেন টোকা দিল-
সময়ের দরজায়, জীবনের আয়নায়।

চার কাঁধে ভর দিয়ে যে চলে গেল আজ,
সেও তো গতকাল আমাদের মতোই হাঁটছিল আলোয়,
হাসছিল, কথা বলছিল,
অপূর্ণ স্বপ্ন বুকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ছিল।

কফিনের কাঠে আজ নিথর যে দেহ,
সে-ই তো ছিল একদিন উষ্ণ স্পন্দন,
একটি পরিবার, একটি গল্প,
অগণিত স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু।

মাটি অপেক্ষায় থাকে নীরবে-
কারো নাম ধরে ডাকে না,
কেবল সময় হলেই
আলতো করে টেনে নেয় আপন বুকে।

ইমামের সেই বাক্য এখনও কানে বাজছে-
জীবন বড়ই ক্ষণিক, বড়ই অনিশ্চিত;
আমরা সবাই পথিক,
নিজ নিজ কফিনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি।

তবু এই সচেতনতা যদি
আমাদের হৃদয়কে করে নরম, কর্মকে করে সৎ,
ভালোবাসাকে করে গভীর-
তবে হয়তো কফিনের ভয় নয়,
বরং প্রস্তুতির আলোয় একদিন আমরা-ও ফিরব
শান্ত, নিশ্চিন্ত, প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে।


২১.      প্রেমিক 


তোমাকে অনেকেই ভালোবেসেছে,
তোমাকে যে বেশি ভালোবেসেছে, সে আমি।
ভিড়ের ভিতর নাম না-জানা এক আলো হয়ে
তোমার চোখের ভাষা পড়েছি আমি।

তোমার হাসিতে যতজন খুঁজেছে সকাল,
আমি খুঁজেছি অনন্ত দুপুরের শান্তি,
তোমার নীরবতায় যতজন শুনেছে অভিমান,
আমি শুনেছি অব্যক্ত প্রতিশ্রুতির ক্লান্তি।

তোমার চুলে লেগে থাকা বাতাসের গন্ধে
যতজন লিখেছে ক্ষণিকের গান,
আমি লিখেছি ঋতুর পর ঋতু জেগে থাকা
এক দীর্ঘ অমলিন প্রাণ।

তুমি হয়তো অনেকের স্বপ্নের জানালা,
আমি তোমার ঘরের প্রদীপ হতে চেয়েছি,
ঝড় এলে নিভে না যাওয়া ক্ষুদ্র আলো,
অন্ধকারে কাঁপলেও পাশে রয়েছি।

তোমাকে অনেকেই ভালোবেসেছে,
ফুলের মতো, উৎসবের মতো, ক্ষণিক রঙে;
আমি ভালোবেসেছি শিকড়ের মতো-
নিভৃতে, গভীরে, মাটির ঢঙে।

যদি কোনোদিন ফিরে তাকাও
সব ভালোবাসার ভিড়ের মাঝে-
দেখবে, সবচেয়ে নীরব যে মানুষটি দাঁড়িয়ে,
সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে সে-ই তোমাকে। 


২২.     ফিরে যাই সেই গ্রামে


গ্রামে যেতে ইচ্ছে করে,
উন্মাতাল বসন্ত বাতাস গায়ে মেখে
পথের ধুলোর সাথে মিশে যাই আবার।

শিরিষপাতা উড়ে এসে ছুঁয়ে দিক কপাল,
দিগন্তজোড়া নীল আকাশ হোক আমার চাদর।

তপ্ত দুপুরে রোদ্দুরের আগুন পেরিয়ে
খালি পায়ে হেঁটে যাই কাঁচা বাঁশের সাঁকো ধরে,
ঘাসফড়িং লাফিয়ে উঠুক পায়ের কাছে,
আর দূর তেপান্তরের মাঠের ওপারে
জলস্রোতের মতো দুলুক মরীচিকার স্বপ্ন।

ঠাকুর বাড়ির জারুল বনে
বেগুনি ফুল ঝরে পড়ুক নীরবতায়,
কোকিলের ডাকে কেঁপে উঠুক শৈশবের দুপুর,
সেই ডাক যেন মায়ের ডাকার মতোই পরিচিত,
অচেনা শহরের ভিড়ে যার প্রতিধ্বনি নেই।

পুকুরপাড়ে কাশফুলের দোলায়
হারিয়ে যাক জমে থাকা ক্লান্তি,
কাদামাটির গন্ধে জেগে উঠুক ভোলা দিন,
মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে
আবার খুঁজে পাই নিজের ছোট্ট আমিকে।

এই শহুরে কোলাহল ছেড়ে
ফিরে যেতে চাই সেই সরল বিকেলে,
যেখানে সন্ধ্যা নামে ধীরে,
আর আকাশের প্রথম তারা দেখে
মনে হয়, জীবন আসলে খুব বেশি কিছু নয়,
শুধু একটু বাতাস, একটু রোদ,
আর কিছু অমলিন স্মৃতির ঘ্রাণ।


২৩.     একই মাটির গন্ধ 


আকাশে কাঁটাতারের বেরা নেই,
নদীতেও নেই কোনো সীমানার দাগ,
মেঘেরা ভেসে যায় দেশ থেকে দেশে
বৃষ্টি নামে নির্দ্বিধায় সকলের ভাগ।

শালিক জানে না পাসপোর্টের ভাষা,
পাখিরা শেখেনি মানচিত্রের পাঠ,
সমুদ্রের ঢেউ কারো নাম ধরে ডাকে না,
তবু তীরে তীরে ওঠে অদৃশ্য প্রহরীর ঘাট।

এই মাটির গন্ধ কি আলাদা কোথাও?
ধানের শিষে কি বদলায় রং?
রোদ কি আলাদা করে দেখে মানুষ,
কার কপালে দেবে আলোর ঢং?

শিশুর কান্না একই রকম,
মায়ের ডাকে একই সুর,
ভালোবাসার ভাষা তো অনুবাদ চায় না
হৃদয় জানে তার ভরপুর।

তবু কেন কাঁটাতারের জাল বিছাই
এই ধুলো-মাটির বুকে?
কার ভয়ে আমরা ভাগ করি পৃথিবী,
নিজেরই ছায়াকে রেখে দূরে?

হয়তো একদিন ভোরের আলো
সব রেখা মুছে দেবে ধীরে,
মানুষ মানুষকে চিনবে শুধু
মানুষ বলেই-
সীমানাহীন নীলের নীড়ে।


২৪.    চিরন্তন ভালোবাসা


তুমি মন চাইলে, 
নিঃসংকোচে মন খুলে দিলাম তোমার আকাশে,
যেন পাখিরা উড়ে যায় নির্ভয়ে।

তুমি হৃদয় চাইলে, 
বুকের গোপন কুঠুরি থেকে তুলে দিলাম স্পন্দন,
তোমার নামে লিখে দিলাম সমস্ত রক্তকণিকা।

তুুমি চুমু চাইলে,
অধরের নরম আলো ছুঁয়ে দিল তোমার সন্ধ্যা,
লাজুক বাতাসে কেঁপে উঠল নীল জানালা।

তারপর তুমি বললে, 
আরও কাছে, আরও গভীরে,
আমার সমগ্র সত্তা চাও।

আমি মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম,
সবটুকু দিলে,
আমার ভেতর আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকবে?

তুমি বললে,
থাকবে আমাদের আগামী,
একটি নতুন সূর্যোদয়,
রক্তে লেখা ভবিষ্যৎ,
সন্তান।

আমি বললাম, সন্তানও দেবো,
স্বপ্নের মতো করে,
ভালোবাসার বীজ বুনে।

তারপর আমরা দুজন
একই সুরে, একই নিঃশ্বাসে বললাম -
শরীরের চেয়ে গভীর হোক আমাদের বন্ধন,
সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হোক আমাদের পথচলা,
জন্ম থেকে জন্মান্তর জুড়ে  ভালোবাসা 
চিরকালের হোক।


২৫.      গল্পের নায়িকারা


আমাকে কেউ কেউ বলে -
তোমার গল্প পড়লে মনে হয়, ঐ গল্পের নায়িকারা
তোমার প্রেমিকা ছিল,
আমি হেসে বলি— হ্যাঁ, ছিল তো বটেই।

কীর্তিকা ছিল বর্ষার প্রথম ভেজা বিকেল,
কমলিকা শরতের সাদা মেঘে ভাসা আলো,
দোলা মিত্র কুয়াশা ঢাকা রেলস্টেশনের অপেক্ষা,
হৈমন্তী ছিল হেমন্তের হলুদ পাতা ঝরার শব্দ।

লায়লা নামাজ শেষে নিঃশব্দ প্রার্থনা,
কুসুম ছিল রোদে ফোটা শিউলির ঘ্রাণ,
মিত্রা নীলচে সন্ধ্যার গভীরতা,
নিলোৎসী দূর নদীর ওপারে ঝিলমিল করা আলো।

জরি ছিল উৎসবের শাড়ির সোনালি কারুকাজ,
মরিয়ম ছিল ভোরের আজানের সুর,
পল্লবী কচি পাতার মতো কাঁপা প্রথম স্বীকারোক্তি,
নমিতা অভিমানের ঝুমঝুম বৃষ্টি,
অমৃতা নামের মতোই এক চুমুক অমলিন স্বাদ।

তারা কেউ আমার হাতে হাত রাখেনি,
কেউ কপালে আলতো ছোঁয়া দেয়নি -
তবু প্রত্যেকে আমার হৃদয়ের 
একেকটি  গোপন ঘরে আলোর প্রদীপ 
জ্বেলে রেখেছিল।

আমি তাদের প্রেম করিনি,
আমি তাদের লিখেছি,শব্দে শব্দে ছুঁয়েছি,
বাক্যে বাক্যে জড়িয়ে ধরেছি।

যতদিন গল্প বেঁচে থাকবে,
ততদিন তারা আমারই থাকবে,
রক্তে নয়, কল্পনায় নয়,বরং সেই অদৃশ্য জায়গায়
যেখানে লেখকের কলম
ভালোবাসার আরেক নাম হয়ে ওঠে।


২৬.      প্রতীক্ষা


ভেবেছিলাম, 
এই শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে তুমি এসে 
রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনায়ে যাবে,
আমি গীতাঞ্জলি খুলে বসে রইলাম --
তুমি আর এলে না।

বৃষ্টি নেমেছিল নীল ময়ূরাক্ষীর মতো 
বারান্দার ধারে,
শিউলির গন্ধে ভরে উঠেছিল নিঝুম আঙিনা,
দূরের বাঁশবাগানে হাওয়ার মৃদু সুর -
ভাবতাম, এ কি তোমার পায়ের শব্দ?

বৃষ্টির নুপুরে তোমার মুখ কল্পনা করে
আমি ছুঁয়েছি কেবল শূন্যতা -
অপেক্ষারও যে একটি শরীর আছে,
সেদিন তা বুঝেছি।

তোমার জন্য রেখে দেওয়া কাঁসার বাটিতে দুধভাত
শুকিয়ে গেছে বহু আগেই,
কিন্তু আমার ভেতরের শিশুটি এখনো বিশ্বাস করে,
তুমি হঠাৎই এসে বলবে -
শোনো, এই গানটা শুধু তোমার জন্য।

রাত পেরিয়ে ভোর হয়,
ভোর পেরিয়ে আবার রাত্রি আসে -
আমি  দরজার কপাট অল্প ফাঁক রেখে দিই,
যদি হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে
তোমার গানের প্রথম সুর।

তুমি আসোনি,
তবু শ্রাবণ এলে আজও আমার বুকের ভেতর
অনেকগুলো মেঘ এসে জড়ো হয়,
আর আমি নীরবে ভাবি -
অপেক্ষাও এক ধরনের প্রেম,
যার শেষ নেই।



২৭.     সময়ের আগেই বিদায়



প্রিয় মানুষকেও অনেক সময় ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়,
হারাবার কষ্ট যেন প্রলম্বিত না হয়,
ক্ষত যদি হবেই, হোক একবারেই গভীর,
ধীরে ধীরে পচে উঠুক না কোনো নীরব দাহ।

যে হাত একদিন শপথে কেঁপেছিল,
আজ সে হাতই ছাড়তে শেখে -
ভালোবাসা মানে শুধু আঁকড়ে ধরা নয়,
কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়ার কঠিন শিক্ষাও বটে।

আমরা জানি, কিছু সম্পর্কের আয়ু
শরতের কাশফুলের মতো-
দূর থেকে অপার সাদা,
ছুঁলেই ঝরে যায় তুলোর মতো ভঙ্গুরতায়।

তাই হৃদয়ের দরজা নিজেই বন্ধ করি,
যেন ঝড় ঢুকে সব ভেঙে না দেয়,
আগুন নেভাই নিজের হাতে,
যেন ধোঁয়ায় অন্ধ না হয় ভবিষ্যতের পথ।

প্রিয় মানুষকেও তাই কখনো বিদায় বলতে হয়
অভিমান নয়, প্রতিশোধ নয়,
শুধু বাঁচার জন্য,
শুধু ভেঙে পড়ার সময়টুকু ছোট করার জন্য।

কারণ আমরা জানি,
অতিরিক্ত ভালোবাসা যখন বিষ হয়ে ওঠে,
তখন দূরত্বই একমাত্র ওষুধ,
আর সময়ের আগেই বিদায়ই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।


২৮.     নোলক


নাকের নোলক পরিয়ে দিয়েছিলে তুমি
লাজুক বিকেলের রোদে কেঁপেছিল তোমার আঙুল,
সেদিন থেকে আমার শ্বাসে তোমার 
নামেরই নীরব ঝংকার।

এই নোলক শুধু রূপার বৃত্ত নয়,
এ এক প্রতিজ্ঞা,
আমার হাসি, কান্না, অভিমান
সবকিছুর মধ্যিখানে তোমার স্পর্শের সীলমোহর।

এই নোলক খুলবেও তুমি,
যেদিন আমার চোখে আর আলো থাকবে না,
শরীর নিথর হয়ে শুয়ে থাকবে সাদা কাফনের ভাঁজে,
তখনও যেন তোমার হাতই শেষবার
আমার মুখ ছুঁয়ে বলে - এ আমার প্রিয়তমা।

আমাকে যেন না খুলতে হয় অলংকার,
না মুছতে হয় চোখের কাজল 
না গুনতে হয় নিঃশ্বাসের অবশিষ্ট সংখ্যা-
সে ভার যেন না আসে আমার কাঁধে।

আল্লাহর কাছে আমার একটাই প্রার্থনা-
আমার আয়ু তোমার চেয়ে কম হোক,
আমি আগে যাই,
তোমার বুকের ভিতর আমার স্মৃতির ব্যথা রেখে।

আমার নোলক খুলে রেখো একটি 
কাঠের বাক্সে যত্নে,
তুমি বেঁচে থেকো আমার নামটুকু নিয়ে।

যদি কখনো একলা রাতে চাঁদের আলো 
জানালায় এসে পড়ে,
নোলকটা হাতে নিয়ে একটু অশ্রুপাত করিও --
আমি তখন বাতাস হয়ে এসে তোমার 
কপালে চুমু দিয়ে বলব,
ভালোবাসা কখনো প্রাণহীন হয় না।


২৯.     অন্ধকারে আলো



মৃত্যুশয্যায় কাতর হয়ে মেয়েটি বলেছিল-
আমি চলে গেলে
তোমায় ভালোবাসবে কে?
রাত জাগলে বকবে কে,
না খেলে জোর করে খাওয়াবে কে?
তুমি বিয়ে করে নাও
আমি দেখে যেতে চাই, তুমি ভালো থাকবে।

ছেলেটি তাকে জড়িয়ে বলেছিল—
চুপ, তুমি ছাড়া আমি কারও নই।
তুমিই আমার সব আলো,
স্রষ্টা এমন নিষ্ঠুর হবেন না।

মেয়েটি ফিসফিস করে বলেছিল—
অন্ধকারে খুব ভয় লাগে আমার,
তবু কি না আমাকেই যেতে হবে
চির-অন্ধকারের দেশে…
তোমার বুকে মাথা রেখে
আলোয় থাকতে খুব ইচ্ছে করে।

তারপর একদিন সত্যিই সে চলে গেল।
ছেলেটি প্রতি রাতে কবরের পাশে বসে
মোমবাতি জ্বালায়-
যেন অন্ধকার তাকে ছুঁতে না পারে।

ইদানীং ছেলেটির ক্যান্সার ধরা পড়েছে,
মৃত্যু নয়, তার ভাবনা শুধু একটাই-
সে চলে গেলে
মোমের আলো জ্বালাবে কে?

হায়! ভালোবাসা এমনই- আলো হয়ে বেঁচে 
থাকতে চায়।

(ফেসবুকে একজনের স্টাটাস অবলম্বনে।) 


৩০.     একবার আলো দাও


বারে বারে ভেঙে পড়ি, প্রভু,
নিজের হাতেই নিজেকে মাটি করি
ধুলোর চেয়ে তুচ্ছ হয়ে যাই।

অন্ধকারের সঙ্গে সখ্য করি,
তবু ভোরের জন্য কাঁদি
এই দ্বন্দ্বেই দিন ফুরোয়।

প্রভু, আমাকে একবার ধুয়ে দাও
অভিমান আর অবহেলার কাদামাটি থেকে,
ভেতরের গোপন কালিমা মুছে দাও
যাতে মানুষ শুধু খোলস না দেখে,
দেখে অন্তরের স্বচ্ছ আলো।

আমি বারবার হারাই পথ,
পাপের কাছে হেরে যাই,
নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাই।

তুমি একবার ছুঁয়ে দাও
যদি বাঁচাটাই মূল কথা হয়,
তবে বাঁচার মতো করেই বাঁচাইও।

প্রভু,
একবার আমাকে নির্মল করো-
যেন নষ্ট হওয়ার আগে
নিজেকে ফিরে পাই।


৩১.     ফুরানোর আগে


ফুরিয়ে গেল এই ভুবনের ইতিকথা,
হায় জীবন, তুমি ফুরিয়ে নিঃশেষ করে দিলে,
অথচ কত কথা বাকি ছিল,
কত অশ্রু জমে ছিল চোখের কোণে।

সূর্য ডুবে গেলে যেমন
আকাশে একটু লালচে স্মৃতি রয়ে যায়,
তেমনি আমার দিনগুলোও
শেষ আলোয় ঝিমিয়ে পড়ে
তোমার নাম উচ্চারণ করে।

আমি তো ভেবেছিলাম -
আরও কিছু পথ হাঁটব কাঁধে কাঁধ রেখে,
আরও কিছু পূর্ণিমা গুনব
তোমার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে;
কিন্তু সময় বড়ো নির্দয় সে কারও হাত ধরে না।

হায় জীবন,
তুমি কেন এত দ্রুত শেষের দিকে টেনে নিলে?
কেন সব স্বপ্নের উপর
ঝরাপাতার মতো শীত নামিয়ে দিলে?

তবু ফুরিয়ে যাওয়ার মাঝেও আলো থাকে-
তোমার ছোঁয়া, তোমার হাসি,
বিকেলের বাতাসে এখনও ভেসে আসে।

মৃত্যুরও কি সবকিছু নেওয়ার সাধ্য আছে?
সে কি নিতে পারে সেই স্পর্শ,
যা মিশে গেছে আমার রক্তে?
সে কি মুছে দিতে পারে
তোমার নামে লেখা সকল প্রার্থনা। 

ফুরিয়ে যাক ভুবনের ইতিকথা, ফুরিয়ে যাক 
আমার দিনলিপি -
তবু যদি কোনো এক অন্তিম রাতে তারারা 
শুনতে চায় আমার গল্প,
তারা জানুক - আমি শেষ অবধি বেঁচেছিলাম
ভালোবাসার আলোয়।


৩২.      দিগবালিকার প্রতিশ্রুতি


ছোট বেলার এক বাল্য সখীকে বলেছিলাম, 
তুই কী আমার হবি?
দিগবালিকা মিষ্টি হেসে কাছে এসে
বলেছিল, হবো তোর, তবে চিরকালের জন্যে। 

কাঁঠালতলার ছায়ায় বসে কত যে স্বপ্ন 
বুনেছিলাম দু’জনে
তুই বলতিস, আকাশ যদি ভেঙে পড়ে,
আমি হাত ছেড়ে যাবো না কোনো ক্ষণে।

বিকেলের রোদে ধুলো মেখে
আমরা লিখতাম নাম কাদামাটির দেয়ালে,
তোর চুলে রোদের সোনালি আগুন,
আমার বুক ভরা আলো জ্বালায়।

বৃষ্টিভেজা দুপুরগুলোয় এক ছাতার নিচে 
লুকিয়ে থাকা,
তুই হেসে বলতিস - “বড় হয়ে গেলেও
এই হাতটা যেন ছাড়িস না।”

সময় কিন্তু বড় নির্দয়-
সে কাঁধে তুলে নেয় আলাদা পথের ঝুলি,
তোর মাথায় লাল শাড়ির রোদ উঠল,
আমার আকাশে জমল ভুলে-যাওয়া কুয়াশার ধুলি।

তবু আজও গভীর রাতে
হঠাৎ জেগে উঠলে শুনি সেই স্বর
তুই কী আমার হবি?
আর বাতাস ভেসে আনে উত্তর
হবো তোর অন্য কোনো জন্মে, 
অন্য কোনো ভোর।

সেই প্রতিশ্রুতি আজও ঝরে
শিউলি ফুলের মতো ভোরের শিশিরে,
ছোট্ট বেলার বাল্য সখী-
তুই রয়ে গেছিস হৃদয়ের গোপন নীল নীড়ে।


৩৩.     গণতন্ত্রের সংজ্ঞা


কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতেন শারমিন আপা,
আপা যখন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বলতেন -
“জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য…”
আমি তখন গোপনে তাঁর দেহরূপে মুগ্ধ হয়ে 
অন্য এক রাষ্ট্রের মানচিত্র আঁকতাম।

বোর্ডে চক ঘষে লিখতেন-
Abraham Lincoln-এর উদ্ধৃতি,
আর আমার ভেতর কেঁপে উঠত
অপ্রকাশিত এক স্বাধীনতার ঘোষণা।

তিনি বলতেন -
Jean-Jacques Rousseau এর সামাজিক চুক্তির কথা, বলতেন --
''Man is born free, and everywhere he is in chains''.
আমি মনে মনে ভাবতাম,
হৃদয়েরও কি কোনো চুক্তিপত্র হয়?
স্বাক্ষরহীন, তবু বাধ্যতামূলক?

আপার শাড়ির আঁচলে ছিল গোধূলির রঙ, কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা -
যেন সংসদে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন,
আর আমি বিরোধীদলহীন এক তরুণ প্রতিনিধি,
নিঃশব্দে সমর্থন জানাচ্ছি
প্রতিটি উচ্চারণে।

সেই অসম বয়সে প্রেমে পড়েছিলাম তাঁর-
কিন্তু নিবেদন করতে পারিনি…
কারণ পাঠ্যসূচিতে প্রেম ছিল না,
ছিল শুধু রাষ্ট্র, সংবিধান, নীতি ও ন্যায়।

পরীক্ষার খাতায় লিখেছিলাম
গণতন্ত্রের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য -
কিন্তু লিখিনি তাঁর চোখের ভেতর লুকানো
আমার ব্যক্তিগত বিপ্লবের কথা।

আজও যখন কোনো সভায় গণতন্ত্রের 
কথা শুনি, মনে পড়ে—
একটি শ্রেণিকক্ষ, একজন শারমিন আপা,
আর এক কিশোর হৃদয়,
যে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল,
কিন্তু কখনো তা প্রকাশ্যে পাঠ করেনি।


৩৪.     মখমল স্পর্শের ভিতর


তোমার শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি
মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আকাশ
হঠাৎ নেমে এসেছে দু’হাতে ছোঁয়ার মতো কাছে।

এমন মখমল রূপ আগে দেখিনি,
চাঁদের আলোও এত মসৃণ নয়,
নদীর ঢেউও এত গোপন কাঁপনে কাঁপে না।

তোমার কাঁধে রাখা আলোর রেখা
আমার আঙুলকে ডাকে,
যেন অচেনা কোনো বাগানের ভিতর
ফুটে আছে নিশিগন্ধার গোপন উচ্ছ্বাস।

তোমার শ্বাসের ভেতর জেগে ওঠে উষ্ণ বসন্ত, বুকের ধকধক শব্দে 
বাজে মৃদু মাদল -
আমি শুনি, আর ধীরে ধীরে ডুবে যাই 
সেই সুরের গভীরে।

তোমার গায়ে সন্ধ্যার রঙ, তোমার দৃষ্টিতে অদৃশ্য আগুন,
আমার সমস্ত সংযম পতঙ্গের মতো ঘুরে ঘুরে জ্বলে ওঠে সেই আলোর কাছে।

এমন বিহ্বল করা সৌন্দর্য শুধু দেখা যায় না, ছুঁতে হয়,
অনুভবের গভীর জলে ডুব দিতে হয়,
যেখানে দুই শরীর দুই নদীর মতো এসে
এক গোপন মোহনায় মিলিয়ে যায়।

সেই মিলনের ভিতর শব্দ থাকে না,
থাকে শুধু উষ্ণতা, আর ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া রাত্রি --
তখন তার মখমল শরীরে ওঠে আমার নিঃশ্বাসের দীর্ঘ ঝড়।


৩৫.     ছুঁয়ে আছো


আমার জামায় ছুঁয়ে আছে তোমার শরীরের মধুরিমা,
কবোষ্ণ বুকের ঘ্রাণ,
যেন সন্ধ্যার শেষ আলোয় ভেজা শিউলিফুলের  অবগাহন।

চুলের গন্ধে লেগে আছে অদৃশ্য এক বসন্ত,
আঙুলে এখনও কাঁপে তোমার স্পর্শের রেশ,
হৃদয়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে
নাম না-জানা এক সুরের কম্পন।

তুমি হেঁটে গেলে
বাতাসও যেন তোমার পায়ের শব্দ ধার করে নেয়,
আমার চারপাশে উষ্ণতা রেখে
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় দূরে।

তোমার গলার কাছে যে নীল শিরা কাঁপে,
তার ছন্দে আমার অস্থিরতা দোলে;
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণ ঢেউ
আমার রাত্রির জানালায় এসে ধাক্কা দেয়।

এখনও বুকের ভেতর
তোমার মাথা রাখার ভার অনুভব করি-
সে ভার কোনো বোঝা নয়,
সে যেন শান্ত এক আকাশ
আমার সমস্ত অস্থিরতা ঢেকে রাখে।

জামার পরতে পরতে তোমার উপস্থিতি,
ঘ্রাণে, উষ্ণতায়, অনুচ্চারিত স্বীকারোক্তিতে-
আমি চোখ বন্ধ করলেই
তোমার দেহের কোমল আলোকছটা
আমার একাকিত্বে মিশে যায়।

স্পর্শের পরে যে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি থাকে,
আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে
সেই মৃদু, মধুর অনুরণন প্রতিক্ষণ বাজে।


৩৬.     নোঙর


যে ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে এসেছিল
সেই ঘাটে আর ফেরা হলো না-
স্মৃতির কাশবনে আজও দোলে
প্রথম বিদায়ের কাঁপা হাওয়া।

পেছনে পড়ে রইল শৈশবের জলসিঁড়ি,
অদেখা স্বপ্নের কাদামাটি,
আর অচেনা নদীর ডাকে ভেসে যাওয়া দিনগুলো।

আমি ভেবেছিলাম, সব নদীই সাগরের দিকে যায়,
সব যাত্রাই শেষ হয় বিস্তারে।
কিন্তু আমার নৌকা অদৃশ্য স্রোতের টানে
তোমার ঘাটেই এসে থামল।

তোমার চোখ ছিল শান্ত জলের মতো,
যেখানে ঢেউ উঠলেও শব্দ হয় না,
তোমার হাসি ছিল বাতিঘর,
দূর অন্ধকারেও যে আলো ফেলে।

আমি আর ফেরার পথ খুঁজিনি।
ছেঁড়া পাল মেরামত করিনি,
দিকচিহ্ন আঁকিনি আকাশে।

তোমার ঘাটের কাশফুলে আমার 
ক্লান্তি নেমে এলো,
তোমার পাড়ের নরম বালিতে আমার 
নোঙর গেঁথে গেল
তবু জানি, একদিন জোয়ার বদলাবে,
তোমার ঘাটও হয়তো চিনবে না আমাকে।

তখন আমি নিঃশব্দে খুলে নেব নোঙর,
ভেসে যাব অচেনা স্রোতে -
ফিরব না কোনো ঘাটেই আর,
শুধু নদীর বুকেই হারিয়ে থাকব
অপূর্ণ যাত্রার মতো।


৩৭.    অস্তরাগের আগে


তীর্যক রোদ্ররাশির উপর যখন বিকালের ছায়া 
নেমে আসে তখন মনটা সত্যি খারাপ লাগে,
অনেকটা মুখর জীবনের উপর সন্ধ্যার ম্লান অস্তরাগের    বিষণ্নতার মতো,
যেন হঠাৎ থেমে যায় হাসির কলরোল,
নির্জন বারান্দায় কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস ভেসে থাকে।

দূরের আকাশে পাখিরা ফেরে নীড়ে,
তাদের ডানায় জমে থাকে সারাদিনের ক্লান্ত রোদ,
আমার বুকেও তেমনি জমে থাকে অকারণ বিষণ্ণতা,
যার কোনো ঠিকানা নেই, তবু ভারী হয়ে ওঠে শ্বাস।

গাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসে পথের বুকে,
যেন পুরোনো স্মৃতিগুলো হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায়,
কোনো এক অদেখা নাম ধরে ডাকে -
কিন্তু ফিরতি সাড়া মেলে না কোথাও।

দিনের রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়,
রক্তিম আভা গলে পড়ে ধূসরতায়,
ঠিক তেমনি স্বপ্নগুলিও আলো হারায়
অব্যক্ত ক্লান্তির অনামা সন্ধ্যায়।

তবু জানি,
অন্ধকার একেবারে শেষ কথা নয়,
এই ম্লান অস্তরাগের পরেই
নক্ষত্রেরা জ্বলে উঠবে নীরব আশ্বাস হয়ে।

তাই বিষণ্ণ বিকেলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি,
ছায়ার ভিতর থেকে আলো খুঁজি-
কারণ প্রতিটি দিনশেষই হয়তো
নতুন কোনো প্রভাতের গোপন প্রস্তুতি।


৩৮.     ফিরে আসবে


তুমি আবার ফিরে আসবে -
যে শ্রাবণে চলে গেছ, তেমনি বৃষ্টিমুখর আরেক শ্রাবণে,
জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে অশ্রুর মতো জল,
আমি ভাবব, এ বুঝি তোমারই গোপন অশ্রুপাত।

আর যদি না আসো সেই ভেজা দুপুরে,
হয়তো আসবে পাগল-করা ধবল জোছনা রাতে,
পরনে থাকবে দার্জিলিং থেকে আনা
সেই সাদা রঙের জর্জেট শাড়ি,
চুলে কদমফুলের গন্ধ -
চাঁদের আলোয় তোমাকে দেখাবে অলৌকিক, স্বপ্নময়।

হয়তো হঠাৎ বাতাস দুলে উঠবে,
আমার উঠোনে হাস্নাহেনারা ফিসফিস করে
বলবে - সে এসেছে...
আমি দরজা খুলে দাঁড়াবো -
দেখব, শুধু জোছনা আর শূন্যতা।

তুমি যদি শরীর হয়ে না-ও আসো,
আসবে কি স্মৃতি হয়ে?
ভেজা মাটির গন্ধে, পুরনো চিঠির ভাঁজে,
অথবা ঘুম ভাঙা কোনো নিশীথে
হৃদয়ের ভেতর নীরব স্পন্দন হয়ে।

আমি জানি, প্রতিটি ঋতুই তোমার অজুহাত-
শ্রাবণ তোমার চোখের জল,
শরৎ তোমার শুভ্র শাড়ি,
হেমন্ত তোমার বিদায়ের নিঃশ্বাস,
আর বসন্ত তোমার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

তুমি আবার ফিরে আসবে -
হয় বৃষ্টি হয়ে, নয়তো জোছনা হয়ে,
নয়তো এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে আমার কানে কানে বলবে -
আমি তো আছিই,
তোমার অপেক্ষার ভেতরেই।


৩৯.     বৃষ্টির জন্য 


বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছি তপ্ত রোদে 
পুড়ে যায় শরীর,
জানি তুমি আসলেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হবে,
তুমি আমার বুকের তলায় ছায়া নেবে,
কী অদ্ভুত সেই শীতল উচ্ছ্বাস।

দিগন্তজোড়া ধুলোয় যখন দিনটি ঝাপসা হয়ে যায়,
আমার চোখে তখন শুধু তোমার মেঘের রেখা—
তুমি কি টের পাও,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই বাতাসের গায়ে জল জমে?

রোদ্দুরের দহন যত বাড়ে,
আমার ভেতরে তত জন্ম নেয় নীল এক শ্রাবণ
সেখানে তোমার চুলের গন্ধে ভিজে থাকে ঘাস,
তোমার মসৃণ কণ্ঠে কাঁপে প্রথম বজ্রের আলো।

আমি জানি, তুমি এলে
শুকনো নদীগুলো গোপনে স্রোত খুঁজে পাবে,
মরুভূমির বুকে হঠাৎ সবুজের আর্তি উঠবে -
আমার এই পোড়া বুকেও ফুটবে কচি ঘাসের স্বপ্ন।

তুমি এলে আমি আর রোদে দগ্ধ মানুষ থাকব না,
তোমার দু’হাতের আড়ালে লুকিয়ে
আমি হয়ে উঠব এক অস্ত সূর্যের বিকেল,
যেখানে কেবল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর কাঁপতে থাকা ভালোবাসা।

এসো,
আমার দহনকে তোমার জলে ভাসাও,
আমার শুষ্ক দিনগুলোকে ভিজিয়ে দাও অনন্ত আদরে,
আমি আজও বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছি -
তোমার বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার জন্য।


৪০.      দিলরুবা 


সেই কবে কাকে প্রথম প্রেমপত্র লিখেছিলাম, 
তা আজ আর মনে নেই..
অস্পষ্ট মনে পড়ে একটি নাম— দিলরুবা।

মনে পড়ে, নীল কালির কলমে কাঁপা কাঁপা অক্ষর,
খাতার পাতা ভিজে যেত লজ্জায়, ঘামে, 
লআর অকারণ দীর্ঘশ্বাসে।

পোস্ট অফিসের লাল বাক্সটার সামনে দাঁড়িয়ে
কতবার যে চিঠিটা ঢোকাতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে এনেছি, ভয় ছিল, সে পড়বে তো?

আরও ভয় ছিল, যদি সত্যিই পড়ে ফেলে!
সেই সময়টা ছিল কাঁচা আমের মতো টক-মিষ্টি,
বিকেলের মাঠে হাওয়ার ভেতর উড়ত তার ওড়না,
আমি দূর থেকে দেখতাম,
দেখেই ভেবে নিতাম, এ-ই বুঝি প্রেম।

স্কুলের বারান্দায় চকচকে রোদ পড়লে
তার মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠত,
আমি অঙ্কের খাতায় অকারণে লিখতাম তার নাম,
যেন সংখ্যার ভিড়ে সে-ই একমাত্র সমাধান।

প্রথম প্রেমপত্রে লিখেছিলাম,
তুমি হাসলে পৃথিবীটা বদলে যায়।
আজ ভাবি, পৃথিবী বদলায়নি,
শুধু বদলে গিয়েছিল আমার ভেতরের অনুভব।

তারপর কত বছর কেটে গেছে,
কত শহর, কত মুখ, কত অজানা সম্পর্ক,
তবু মাঝে মাঝে বর্ষার রাতে
পুরোনো ট্রাঙ্ক খুললে কাগজের গন্ধে ভেসে আসে
একটি নাম— দিলরুবা।

সে এখন কোথায় আছে জানি না,
হয়তো কারও সংসারের উঠোনে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালে,
হয়তো সন্তানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে
ভুলে গেছে এক কিশোরের লেখা নীল কালির চিঠি। 

কিন্তু আমি যখন নিজের বয়সের দিকে তাকাই,
দেখি, ভেতরে কোথাও এক কিশোর 
এখনো দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ভাঁজ করা চিঠি,
চোখে অনন্ত দ্বিধা আর অসমাপ্ত স্বপ্ন।

প্রথম প্রেমপত্রের সেই কাঁপা অক্ষরগুলোই
হয়তো আমাকে লেখক বানিয়েছে,
অথবা অন্তত শিখিয়েছে,
ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি পুরোনো হয় না,
শুধু স্মৃতির ভেতর একাত্মা হয়ে থাকে,
দিলরুবার নামের মতোই।


৪১.     নিঃসঙ্গতার অনুশীলন


সব ভিড় পেরিয়ে
আমি একটু নীরবতার কাছে বসি
যেন কোলাহলের শহরে
নিজের জন্য গোপন একটি জানালা খুলি।

সবাই হাত ধরে পথ চলে,
আমি পথের ধুলো ছুঁয়ে বুঝি
হাত না থাকলেও
পায়ের ছাপ রেখে যাওয়া যায়।

নিঃসঙ্গতা কোনো অভিমান নয়,
এ এক দীর্ঘ সাধনা
নিজের ভিতরের অন্ধকারে
নিজেকেই প্রদীপ বানানো।

অনেক মুখের ভিড়ে থেকেও
আমি আমার নাম ধরে ডাকি নিজেকে,
কারণ সব সঙ্গই আশ্রয় নয়,
কিছু সঙ্গ শুধু শব্দের বাড়াবাড়ি।

দিন কেটে যায়
অপ্রকাশিত কথারা বুকের ভেতর ঢেউ তোলে,
তবু ভাঙি না, ডুবি না পুরোপুরি
কারণ আমি শিখেছি
ডুবে গিয়েও শ্বাস নিতে।

জানি, সবাই পাশে থাকে না শেষ পর্যন্ত,
সব পথেই সহযাত্রী মেলে না
তাই একাকীত্বকে সঙ্গী করে
আমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠি সম্পূর্ণ।

যদি কোনোদিন মুক্তি আসে,
সে আসুক ভেতর থেকে
কারণ একা থাকার যে শিল্প রপ্ত করেছি,
তা-ই আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত।


৪২.      প্রার্থনা সঙ্গীত


আমার ছোট ছোট কর্মের ভিতর, 
পথ চলতে চলতে পদধ্বনিতে, কিংবা রাতের
নিশ্ছিদ্র নীরবতার ভিতর -
প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো প্রাণে করুণ সুর বাজে
তোমার অনুপস্থিতিতে। 

ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাসে পা রাখলেই মনে হয়
কোনো এক অদৃশ্য হাত ছুঁয়ে দিল -
হয়তো তুমি, অন্য কোনো আকাশের আড়াল থেকে
আমার একাকীত্বের কাঁধে হাত রাখছো চুপিচুপি।

দুপুরের ক্লান্ত রোদে জানালার পাশে দাঁড়ালে
হঠাৎ হাওয়ার দোলায় পর্দা কেঁপে ওঠে,
মনে হয় তোমার সাদা শাড়ির আঁচল
আবারও আমার ঘরে ঢুকে পড়ে অনাহূত।

সন্ধ্যার আকাশে যখন প্রথম তারা জ্বলে,
আমি তাকিয়ে থাকি,
ভাবি, তুমি কি ওই দূর নক্ষত্রের পাশে বসে
আমার নামটুকু এখনও উচ্চারণ করো?

শহরের কোলাহলে হেঁটে যাই নিরুত্তাপ,
তবু ভিড়ের ভেতর আচমকা চমকে উঠি -
কারণ কারও হাসির ভঙ্গিতে,
কারও চুলে বাতাস লাগার ঢঙে
তোমার হারিয়ে যাওয়া মুখখানি ভেসে ওঠে।

বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ঘুম ভাঙলে
মনে হয়, এ শুধু বর্ষণ নয়,
এ আমার জমে থাকা অশ্রুরই পুনর্জন্ম,
যা তোমার অনুপস্থিতিকে ভিজিয়ে দেয় অন্তহীন।

রাত গভীর হলে বুকের ভেতর
একটি নীরব প্রার্থনা জেগে থাকে,
ফিরে এসো না, যদি না আসতে পারো,
তবু আমার স্বপ্নের জানালায়
একটু জোছনা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো।

কারণ আমি আজও বিশ্বাস করি -
হারানো প্রেম কখনও সম্পূর্ণ হারায় না,
সে রয়ে যায় প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো,
অশ্রুর মতো পবিত্র,
এক দীর্ঘ, মায়াময় প্রতিধ্বনি হয়ে।


৪৩.     পাষাণের প্রার্থনা


যে জলে উন্মাতাল ঢেউ নেই,
আমি সেই নির্জীব জলে কী আমার রাজহংস ভাসাতে পারি?
নিস্তব্ধতার বুক চিরে কি ওঠে কোনো নীল শিহরণ,
নাকি সবই কেবল আয়নার মতো ঠান্ডা, নিরাবেগ?

বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা ঝরতে ঝরতে যদি উত্তাল হয় দিঘিও,
সেখানেও যে সমুদ্রস্বাদ পাব তার নিশ্চয়তা কী!
ছোট ছোট কম্পনে যদি কেঁপে ওঠে তটরেখা,
তবু কি জোয়ারের গভীরতা মাপা যায়
শুধু আঙুল ডুবিয়ে?

আমার ভেতর যে আগুন,
সে কি কেবল ধূপের ধোঁয়া হয়ে মিলাবে আকাশে,
নাকি একদিন বজ্রের মতো ফেটে পড়বে
তোমার অবনত কপালের উপরে?

শ্বাসে শ্বাসে জমে থাকা আদিম আকাঙ্ক্ষা
তোমার চুলের ঘ্রাণে কি খুঁজে পাবে মুক্তি?
যদি সে উর্বশী না হয় -
স্বর্গ থেকে নামা কোনো অলৌকিক আলো,
যদি না হয় অহল্যাও—
পাষাণ ভেঙে জন্ম নেওয়া কোনো শুদ্ধ আর্তি,
তবে আমি কেন জাগাই অগ্নিস্রোত
এই মাটির শরীরে?

আমি পাষাণই থেকে যাব প্রেমে কিংবা অপ্রেমে,
যতদিন না কোনো উষ্ণ হাত
আমার স্তব্ধ বুকে রাখে তার স্পন্দন।

যতদিন না কোনো নারীর নিবিড় নৈকট্যে
নির্জীব জল হঠাৎ সাগর হয়ে ওঠে -
ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে
আমাকে ডুবিয়ে দেয় আদিম শৃঙ্গারে।

তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, সব দিঘি কি সাগর হয়?
সব স্পর্শ কি জন্ম দেয় ঝড়?
নাকি কিছু জল কেবল জলই থাকে,
আর কিছু হৃদয় চিরকাল হৃদয়ই থাকে।



৪৪.      আলোকবর্তিকার স্পর্শ



একটি স্বপ্ন দেখছিলাম -
কবরের মতো নীরব এক ঘর,
দেয়ালগুলো যেন মাটির স্তব্ধতা,
ছাদের ভেতর জমে আছে অজস্র অন্ধকার।

আমি শুয়ে আছি চোখ মেলে,
তবু কিছুই দেখি না,
শুধু নিজের শ্বাসের শব্দ
কানে ফিরে আসে মৃত প্রতিধ্বনির মতো।

হঠাৎ দূরে,
অস্পষ্ট এক আলোর বিন্দু কেঁপে ওঠে,
যেন অমাবস্যার গর্ভে জন্ম নেয় ক্ষীণ চাঁদ।
আলোটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে,
তার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে এক রমণীর অবয়ব।

চিনতে চাই তাকে,
সে কি কোনো হারানো প্রেয়সী?
নাকি কোনো অচেনা মায়াবতী
যে জন্মান্তরের পথ পেরিয়ে এসেছে?
তার চোখে ছিল অদ্ভুত শান্তি,
অথচ সেই শান্তির ভেতর
গভীর এক অনন্ত বিষাদ।

সে আলোকবর্তিকাটি আমার পাশে রেখে
নিঃশব্দে ঝুঁকে পড়ে,
আমার বুকের ওপর তার কপাল,
তার কপালে জেগে ওঠে উষ্ণ এক স্পর্শের নদী। মৃদু স্বরে বলে,
“স্পর্শটুকু মনে রেখ, ভুলে যেও না।”
সেই কণ্ঠস্বর যেন
মাটির নীচে শুয়ে থাকা বীজে জল ঢালে,
আমার বুকের ভিতর অন্ধকার কেঁপে ওঠে।

আমি তাকে ধরতে চাই,
নাম ধরে ডাকতে চাই -
কিন্তু নাম তো জানি না!
শুধু স্পর্শের ভিতর দিয়ে
এক অদ্ভুত পরিচয়ের জন্ম হয়।

ঠিক তখনই স্বপ্ন ভেঙে যায়,
ঘুমহীন রাতের মধ্যে আমি একা,
বুকের উপর এখনো রয়ে গেছে
তার কপালের উষ্ণতা,
আর অন্ধকার ঘরে আলোর মতো ভেসে থাকে একটি বাক্য -
“ভুলে যেও না…”


৪৫.      মায়ার অন্য নাম


আমি তাকে বললাম,
তুমি কী আমাকে ভালোবাসো?
সে বলল, না।
বললাম, তাহলে কী করো?
সে দ্বিধাহীন বলে ফেলল, মায়া করি।

আমি শুনে বললাম না কিছুই,
শুধু ভাবলাম,
মায়া ছাড়া আর কে-ই বা অকারণে 
কারো কথা ভাবে?
মায়া ছাড়া আর কে-ই বা
অভিমান জমিয়ে রাখে বুকের ভিতর।

তবু অন্য কারও সামনে
তার নামে কোনো অভিযোগ তোলে না?
সে জানুক আর না জানুক,
এই মায়াটাই ভালোবাসা।

যে ভালোবাসা উচ্চারণে লজ্জা পায়,
কিন্তু নীরবে পাশে বসে থাকে
শীতের সকালের রোদ হয়ে।

সে বলে, ভালোবাসি না,
তবু আমার জ্বর এলে তার গলা কেঁপে ওঠে,
আমি চুপ থাকলে সে অকারণে প্রশ্ন তোলে -
কী হয়েছে?

ভালোবাসা যদি ঝড় হয়,
তবে মায়া তার স্থির আকাশ;
ভালোবাসা যদি অগ্নি হয়,
তবে মায়া তার দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতা।

আমি জানি,
একদিন সে হয়তো বলবে না কখনোই
ভালোবাসি -
তবু আমার পথের ধুলোয়
তার মসৃণ পদচিহ্ন রয়ে যাবে।

কারণ,
ভালোবাসা কখনও কখনও
নিজের নাম গোপন করে
মায়া হয়ে বেঁচে থাকে।


৪৬.     শেষের কবিতায় মায়াবতী 


রবি ঠাকুর, তুমি তোমার শেষের কবিতায়
লাবণ্য, কেতকীর পাশাপাশি আর একটি চরিত্র রেখে দিতে পারতে,
হয়তো তার নাম দিতে মায়াবতী,
যে দূর হতে গোপনে অমিত রায়কে ভালোবাসতো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তোমার সেই অনন্ত আকাশে
যেখানে শব্দেরা নক্ষত্র হয়ে জ্বলে,
সেখানে কি একটু জায়গা ছিল না
এক নীরব প্রেমের জন্য?

শেষের কবিতা–র পাতায় পাতায়
যেখানে তর্কের ছলে প্রেম,
প্রেমের ভেতরে অহংকার,
অহংকারের আড়ালে গোপন কান্না -
সেখানে কি এক ফোঁটা অশ্রু ঝরাতে পারত না
অদেখা কোনো চোখ?

মায়াবতী হয়তো শিলং পাহাড়ের কুয়াশার মতো
অমিতের পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকত,
কথা বলত না,
শুধু তার ছায়ার সঙ্গে ছায়া মিশিয়ে
ফিরে যেত সন্ধ্যার আগে।

লাবণ্য পেত অমিতের মননের দীপ্তি,
কেতকী পেত সংসারের নিশ্চিন্ত ছায়া -
আর মায়াবতী?
সে পেত শুধু কাহিনির আড়ালে না-লেখা 
একটি নাম,
রাতের অন্ধকারে অমিতের অজান্তে
একটি দীর্ঘশ্বাসের অধিকার।

রবি ঠাকুর, তুমি তো জানতেই -
সব প্রেম উচ্চারণের জন্য নয়,
কিছু প্রেম কেবল বাতাসে মিশে থাকে,
বুকের ভেতর নীল ধোঁয়ার মতো।

তাই যদি রাখতে
মায়াবতীকে সেই শেষের কবিতায়
তবে হয়তো বুঝতাম,
অমিতের সমস্ত যুক্তির আড়ালে
একটু অযৌক্তিক ব্যথাও ছিল,
যা কেবল দূরের কারও নীরব ভালোবাসায়
চিরদিন অমলিন হয়ে থাকে।


৪৭.    জোছনাহত পদচিহ্ন


জোছনাহত পদচিহ্ন রেখে গেছ যে রাতে,
সেই রাত এখনো সাদা ধূপের মতো জ্বলে,
রমনার নির্জন ঘাসে শুয়ে থাকে তোমার ছায়া,
আমি আঙুল ছুঁই, অথচ তুমি নেই কোথাও।

চাঁদ ছিল অকারণ উদার,
তোমার চুলে তার রূপালি অবাধ্যতা,
আমি ভেবেছিলাম, এই আলোর ভিতরেই
চিরদিনের মতো থেমে যাবে পৃথিবী।

তুমি হেঁটে গেলে দূর্বাঘাসের পথ মাড়িয়ে,
পায়ের শব্দে কেঁপে উঠল নীরবতা;
আমি পেছন থেকে ডাকিনি,
ডাকলে যদি ভেঙে যেতো জোছনার মায়া।

আজও শ্রাবণের ভেজা জানালায়
তোমার নাম লিখি আঙুলের কুয়াশায়,
মুছে যায়, তবু থেকে যায়-
যেন নদীর বুকে জেগে থাকা বালুচর।

যে শহর আমাদের দেখেছিল পাশাপাশি,
সে শহর এখনো জোছনায় ভিজে যায়;
কেবল তুমি অন্য কোনো আলোর দিকে হেঁটেছ,
আর আমি এই আলোতেই বন্দী।

জোছনাহত সেই পদচিহ্ন
এখনো আমার বুকের ভিতর কাঁটার মতো বিঁধে থাকে,
ধুয়ে ফেলতে চেয়েছি বহু পূর্ণিমা, তবু মুছে যায়নি কিছুই;
শুধু আমি ক্ষয়ে গেছি একটু একটু করে।


৪৮.    মায়াবতীর মুখচ্ছবি


মায়াবতীর মুখচ্ছবি এঁকে রেখেছি মনের দেয়ালে,
ধূলো জমে, তবু মুছে যায় না তার হাসির রেখা।
এক বিকেলের কমলা রোদে প্রথম দেখেছিলাম তাকে,
চুলের ফাঁকে লেগে ছিল কাঁচা কদমফুলের গন্ধ।

সেই দিনগুলো ছিল মধুমাসের মতো,
পুকুরপাড়ে নীল জলের ভেতর ডুবে যেত আকাশ,
আমরা দু’জন বসতাম ঘাসের উপর,
কথার চেয়ে নীরবতাই বলত বেশি।

তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্বপ্নালু ছায়া,
যেন বহু জন্মের চেনা কোনো নদী;
আমি নাম জানতাম, ঠিকানা জানতাম না,
তবু মনে হতো, সে-ই আমার চিরপরিচিতা।

বইমেলার ভিড়ে একবার হারিয়ে গিয়েছিল সে,
আমি ভেবেছিলাম, এই বুঝি গল্পের শেষ -
হঠাৎ পিছন থেকে ডেকে উঠল,
এত সহজে কী মায়া ফুরোয়?

আজ এত বছর পর,
শ্রাবণের জানালায় বৃষ্টির টুপটাপে
আমি খুঁজি সেই মুখচ্ছবি,
অস্পষ্ট কাঁচে ভেসে ওঠে তার আধখানা হাসি।

মায়াবতী এই শহরের রোদে দাঁড়িয়ে আছে,
আমার ভেতর সে রয়ে গেছে
মধুময় নস্টালজিয়া হয়ে,
যেন পুরোনো ডায়েরির পাতায় রাখা শুকনো ফুল,
স্পর্শ করলেই যার গন্ধে ভরে ওঠে সমগ্র জীবন।


৪৯.    তুমি এলে


তোমার চোখে সন্ধ্যার নীল -
বুকে চাঁদের ঢেউ,
স্পর্শহীন স্পর্শে জাগে নীরবে 
কোথাও কেউ -
তুমি এলে হাওয়ার মতো, নাম না জানা গন্ধ মেখে,
আমি শুধু জেগে থাকি তোমারই স্বপ্ন বুকে রেখে।


৫০.      নোঙর ফেলা হৃদয়


তোমার ঘাটে নোঙর ফেলেছি এক বিকেলে,
শহর তখন ব্যস্ত ছিল,
আমরা লুকিয়ে রেখেছি নদীর গোপন স্রোত,
চোখে চোখে লিখেছি নিষিদ্ধ গান।

তোমার আঙুল ছুঁয়ে ছিল আমার কবজির শিরা,
কাঁপন উঠেছিল অচেনা ঢেউয়ের মতো,
সেই কাঁপনে ডুবে গিয়েছিল সংসারের দেয়াল,
থেমে গিয়েছিল দায়িত্বের অনুশাসন।

তোমার কাঁধের উষ্ণতায় মুখ রাখতেই
পৃথিবী সরে গিয়েছিল দূরের কোনো গ্রহে,
শরীরের ভেতর জেগে উঠেছিল আগুন,
দু’টি নিঃশ্বাস মিশে হয়েছিল এক প্রার্থনায়।

তুমি বলেছিলে, এই প্রেমের নাম নেই,
আমি বলেছিলাম, নাম থাকলেই বা কী হয়?
আমাদের ঠোঁটের ভাষা ছিল অন্য অভিধানে লেখা,
যেখানে পাপের পাশে ফুটে থাকে কদমফুল।

রাতের শেষে যখন ফিরেছি আলাদা ঘরে,
বালিশে লেগে ছিল তোমার চুলের গন্ধ;
আমি জানি, এ নোঙর স্থায়ী নয়,
তবু হৃদয় বারবার ভিড়ে যায় তোমার ঘাটে।

সংসার নদী বয়ে চলে নিয়মমাফিক,
কিন্তু গোপন উপনদী খুঁজে নেয় নিজের পথ,
সেই উপনদীর জলে ডুব দিয়ে
আমরা রেখে যাই শরীরের স্বাক্ষর,
আর একে অপরের বুকে ফেলে যাই
নোঙর ফেলা এক অনিবার্য হৃদয়।