শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

সেদিন বিকাল বেলা ( কবিতাগ্রন্থ )


সেদিন বিকাল বেলা     (  কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ - ২০২৫ ইং

উৎসর্গ -

সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে একদিন গিয়েছিলাম বানারীপাড়া, তারপর গৌরনদী।
আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে ছিল নাজনীন—নদীর মতোই শান্ত, অথচ অকারণে মনখারাপ করে দেওয়া এক মেয়ে। শেরেবাংলার বাড়ির সামনে পদ্মপুকুরের ধারে বসে আমরা দেখেছিলাম জলের বুক চিরে ফুটে ওঠা পদ্মফুল, মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে সৌন্দর্য বুঝি এমনই—নিঃশব্দে ফোটে, আর অজান্তেই হৃদয়ের ভেতর তার শিকড় গেড়ে বসে।

তারপর কত পথ পেরিয়েছি আমরা।

দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের পোড়ামাটির গায়ে ইতিহাসের গল্প পড়েছি, রামসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে দেখেছি দীঘির টলমলে স্বচ্ছ জল। পঞ্চগড়ের এক শীতল ভোরে দূর দিগন্তের ওপারে চেয়ে দেখেছি কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র শিখর—মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব দূরত্ব বুঝি সেদিন আমাদের হাতের মুঠোয়।

গিয়েছি সীতাকুণ্ডে। চন্দ্রনাথের মন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের বুক পেরিয়ে নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছি। চকোরিয়া, রামু—বৌদ্ধ মন্দিরের শান্ত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে শুনেছি প্রাচীন নীরবতার ভাষা। তারপর কক্সবাজার—অন্তহীন সমুদ্রের বালুকাবেলায় পাশাপাশি হেঁটেছি, আর দেখেছি সূর্য কীভাবে ধীরে ধীরে ডুবে যায় নীল জলের গভীরে।

এত পথ, এত নদী, এত পাহাড়, এত সমুদ্র—
এত আলো-ছায়া, এত বিকেল, এত সন্ধ্যা,
এত কথা, এত গান, এত রাত্রিজাগা গল্প—
সবকিছুরই কোথাও না কোথাও নাজনীনের ছায়া মিশে আছে।

কথা ছিল, একদিন এই মেয়েটি আমার ঘরে আসবে।
আমার দীর্ঘ জীবনের ক্লান্ত সন্ধ্যাগুলোতে সে পাশে বসবে, জানালার বাইরে বৃষ্টি নামলে দুজন মিলে তার শব্দ শুনব।
কথা ছিল—অনেক কিছুই ছিল।

কিন্তু মানুষের জীবনে সব কথা শেষ পর্যন্ত কথা হয়ে থাকে না।
কিছু স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই পথ হারায়, কিছু মানুষ কাছে এসেও থেকে যেতে পারে না, আর কিছু ভালোবাসা—অপূর্ণ বলেই হয়তো—আজীবন মনের সবচেয়ে নির্জন ঘরে আলো জ্বেলে রাখে।

নাজনীন আমার বউ হতে চেয়েছিল।
হতে পারেনি।

সে আমার জীবনের একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায় -
তবু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমার সবচেয়ে পূর্ণ কিছু স্মৃতি।

এই গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠায় যে-সব পথের ধুলো, নদীর জল, পাহাড়ের নীল, সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর হারিয়ে যাওয়া দিনের গন্ধ লেগে আছে—তার কোনো এক গোপন প্রান্তে নাজনীনও আছে।

তাই আমার দেখা পৃথিবীর, আমার না-বলা কথার, আমার কিছু হারানো দিনের এবং এক অসমাপ্ত ভালোবাসার স্মারক হিসেব—

এই গ্রন্থখানি সেই অসম্পূর্ণ মেয়েটি, নাজনীনের নামে উৎসর্গ করলাম।

— কোয়েল তালুকদার


১.     তোমার পথ চেয়ে

তোমার পথ চেয়ে বসে থাকি
এ বসে থাকা কোনো স্থির ভঙ্গি নয়,
এটা ভেতরের এক দীর্ঘ, চলমান অপেক্ষা।

দরজার বাইরে নয়,
আমি অপেক্ষা করি সময়ের ভেতরে।
বিকেলের আলো সরে যায় ধীরে,
আর বুঝে নিই,
আলো নয়, ফিরে যাওয়ার অভ্যাসটাই
আমাকে কাঁদায়।

পথটা প্রতিদিন একই থাকে,
তবু তোমার না-আসায়
সে নতুন করে শূন্য হয়।
হাওয়ার শব্দে খুঁজি তোমার পায়ের আওয়াজ,
জানি- এই শহরের শব্দগুলো
এখন আর কাউকে ফেরায় না।

ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, কিন্তু সময় এগোয় না;
সে শুধু আমাকে ঘিরে ঘুরপাক খায়,
যেন আমিই তার একমাত্র অবলম্বন।

রাতে জানালার কাচে মুখ রাখলে
অন্ধকারে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখি
তার চোখে জমে থাকে তোমার অনুপস্থিতি।

চাঁদ ওঠে, নামহীন তারা জ্বলে,
অথচ একটুও আলো হয় না ভেতরে।
কারণ আলো আসলে
কারও ফিরে আসার আরেক নাম।

আমি এখনও তোমার পথ চেয়ে আছি।
হয়তো তুমি আসবে না,
তবু এই অপেক্ষাটাই
এখন আমার ঠিকানা,
আমার শেষ বিশ্বাস।


২.      রমণী ও নদী


রমণীর চেয়ে নদীই বেশি উতলা,
তার বুকে সারা বছর ঢেউয়ের জ্বর
চুলে চুলে স্রোতের চিঠি,
নীরবতার ভেতরেও গর্জন লুকোনো।

স্রোতের টানে ভেসে যায় দয়িত,
কখনো নৌকার ছায়া হয়ে,
কখনো নামহীন ভাঙা স্বপ্ন—
তটভূমিতে পড়ে থাকে শুধু পায়ের ছাপ।

রমণী অপেক্ষা জানে,
নদী জানে না থামতে,
সে বহে, সে ভাঙে, সে নেয়,
আর রেখে যায় নোনা দীর্ঘশ্বাস।

চাঁদের রাতে নদী আরও উন্মুখ,
আকাশের বুক থেকে আলো ছিনিয়ে নেয়,
দয়িতের হাত আলগা হয়ে আসে,
জলের ভেতর ডুবে যায় প্রতিশ্রুতি।

শেষে বোঝা যায়,
ভালোবাসা কখনো তীর, কখনো স্রোত;
যে তীরে দাঁড়িয়ে ডাকে, সে হারায়,
আর যে ভেসে যায়— সে-ই পায়।


৩.      কী লিখব তোমায়


কী লিখব তোমায় আজ শব্দেরা
সবাই ক্লান্ত,
কলমের ডগায় এসে ভেঙে পড়ে 
নীরবতার ভারে।

কী গান শোনাব তোমায়
আজ সুরগুলোও জানে,
মন ভালো নেই বলে
তারা কেউ উচ্চস্বরে ওঠে না।

আজ মন ভালো নেই
আকাশটা বুকের ভেতর নেমে এসেছে,
মেঘেরা জমে আছে চোখের কোণে,
কিন্তু বৃষ্টি নামতে চায় না।

তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম অনেক কিছু,
ভালোবাসা, অভিমান, কিছু অপূর্ণ প্রার্থনা,
সবই আজ স্তব্ধ হয়ে আছে
হৃদয়ের বন্ধ জানালায়।

তবু যদি কিছু লেখা হয়,
তবে এই একটিই বাক্য—
আজ মন ভালো নেই,
আর সেই না-ভালোর মধ্যেও
তোমার নামটা নীরবে ভালো লাগে।


৪.     বসন্ত এলো, তুমি এলে না

বসন্ত এলো-
শিমুলে আগুন জ্বলে,
পলাশে রক্তিম হাসি,
কোকিল ডাকে ভোরের কাননে,
হাওয়ায় ওড়ে নবজন্মের গান।

বসন্ত এলো-
রাস্তায় রাস্তায় রঙিন স্বপ্ন,
পাতার ফাঁকে ফাঁকে আলো,
মাটির বুকে উষ্ণ নিঃশ্বাস,
সবাই পেল আপনজনকে।
শুধু তুমি এলে না।

তোমার না আসায়
ফুলের গন্ধে বিষাদ মিশে যায়,
কোকিলের ডাকে শুনি হাহাকার,
রঙিন আকাশও হয়ে ওঠে ফ্যাকাসে।

আমি বসন্তের ভিড়ে দাঁড়িয়ে
একলা শীতের মানুষ,
হাত বাড়িয়ে থাকি-
যদি হঠাৎ তুমি এসে বলো,
'দেরি হয়ে গেছে, তবু এসেছি।'

কিন্তু বসন্ত ফুরিয়ে যায়,
পাতা ঝরে, রঙ নিভে আসে,
আর আমার ভেতরে
চিরকাল বসন্ত হয়েও
তুমি আর আসো না।


৫.    প্রাণখানা দিলাম 


প্রাণখানা দিলাম, তুমি নিলে না
তবু হাত বাড়িয়ে রইলাম শূন্যতায়।
আমার বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলে ছিল,
তুমি তাকে নাম দিয়েছিলে- সময় নয়।

আমি শব্দে শব্দে ঘর বেঁধেছিলাম,
তোমার একটুখানি থাকার আশায়।
তুমি এসে দরজায় দাঁড়াওনি কোনোদিন,
চলে গেলে নিঃশব্দ বিকেলের ছায়ায়।

প্রাণখানা দিলাম-
কোনো হিসাব রাখিনি, কোনো শর্তও না।
তুমি নিলে না,
তবু সে প্রাণ আজও তোমার নামেই কাঁদে,
ভাঙা হৃদয়ের প্রতিটি শিরাতন্ত্র বলে-
ভালোবাসা কখনও ফেরত চায় না।


৬.     রাধার দিনলিপি


আজও বৃন্দাবন নিঝুম হয়ে আছে, শ্যাম,
তোমার বাঁশির সুর নেই-
কুঞ্জবনে কেবল দীর্ঘশ্বাসের ছায়া।

যমুনা জিজ্ঞেস করে -কোথায় তোমার কানাই?
আমি চোখ নামাই জলে,
ঢেউ জানে আমার লজ্জা, জানে আমার দহন।

পলাশের ডালে বসে কোকিল ডাকে নাম ধরে,
ডাকে- শ্যাম… শ্যাম…
আর আমার বুকের ভেতর পুড়ে যায় দিনের প্রদীপ।

চন্দন মাখি, তবু শীতল হয় না প্রাণ,
বিরহের আগুনে দগ্ধ দেহ, দগ্ধ মন।
সখীরা বোঝে না কেন এমন ব্যাকুলতা—
তারা জানে না প্রেমই আমার ধর্ম।

হে নন্দনন্দন,
তুমি আছ বলেই আমি বিরহে বাঁচি,
তুমি নেই বলেই প্রতিক্ষণে মরি।

এই দিনলিপি রাখলাম যমুনার তীরে-
যদি কোনো ভোরে ফিরে আসো, শ্যাম,
পড়ো রাধার অশ্রু-লেখা প্রেম।
 

৭.      আকাশ কাঁদে 


চুপচাপ কাঁদে যে আকাশ
সে কান্নার শব্দ নেই—
বৃষ্টি নামে না,
শুধু মেঘের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে
অপ্রকাশিত হাহাকার।

পাখিরা জানে,
ডানা ভেজে না তবু উড়ান ভারী হয়—
কারণ আকাশ আজ নিজের মধ্যেই
ভেঙে পড়ে।

শহরের আলো বুঝতে পারে না,
জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হয়
একটি দীর্ঘশ্বাস,
যার নাম নীরবতা।

চুপচাপ কাঁদে যে আকাশ,
তার চোখে জমে থাকা জল
নেমে আসে না পৃথিবীতে—
সে জল হয়ে থাকে
আমার বুকের ভেতর।


৮.     আমি তোমাকে ভালোবাসি


আমি চিৎকার করব-
যেন আমার গলার শিরা ফেটে যায়,
যেন আকাশ থমকে শোনে,
যেন পৃথিবী জানে-
হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আমি লুকোব না,
ভয়কে চেপে ধরব না বুকের কোণে।
তোমার নাম উচ্চারণ করব
আইনের সামনে, সমাজের সামনে,
সব নিষেধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

যারা আঙুল তুলবে- তুলুক।
যারা আগুন ধরাতে চাইবে- ধরাক।
আমি ছাই হয়েও আবার বলব,
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এই ভালোবাসা কোনো ফিসফাস নয়,
এটা যুদ্ধঘোষণা।
এই ভালোবাসা কোনো অনুরোধ নয়,
এটা আমার অস্তিত্বের স্বাক্ষর।
যদি এই উচ্চারণে আমার সর্বনাশও হয়,
তবু শেষ নিঃশ্বাসে আমি চিৎকার করে বলব-
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

রাষ্ট্র শুনুক, সমাজ শুনুক,
নৈতিকতার প্রহরীরা কান পেতে থাকুক-
আমি দাঁড়িয়ে বলছি,
গলা ফাটিয়ে বলছি-
আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এই ভালোবাসা অনুমতির ধার ধারে না,
সিলমোহর চায় না,
সভ্যতার লাইসেন্স লাগে না একে।
এটা জন্মেছে রক্তের ভেতর,
এটা আমার অধিকার।

যদি তোমাকে ভালোবাসা অপরাধ হয়-
তবে আমি অপরাধী।
যদি এটা বিদ্রোহ হয় তবে আমি বিদ্রোহী।
আমি প্রেমকে লুকোতে শিখিনি,
আমি প্রেমকে অস্ত্র করেছি।
এই উচ্চারণে ভেঙে পড়ুক ভণ্ডামি, ভয়, ভীরু নিয়ম।

শুনে রাখো, আমি ভালোবাসি,
এবং এই ভালোবাসা
কোনো দিন আত্মসমর্পণ করবে না।



৯.     নদী ভেসে যায়



নদী ভেসে যায় পাড় ভেঙে, ঠোঁটে কাদামাটি লেগে-
সে কথা বলে না আর, শুধু বুকভরা স্রোতে জেগে।
তার চোখে জমে থাকে গ্রামের হারানো ঘর,
ডুবন্ত পথ, ভাঙা উঠোন, অনাথ দুপুর-ভোর।

নদী জানে ক্ষুধার মানে, জানে কান্নার স্বাদ,
ভেজা ঠোঁটে লেগে থাকে মানুষের দীর্ঘ হাহাকার।
সে বয়ে নেয় গোপন নাম, মুছে যাওয়া ইতিহাস,
নিঃশব্দে লিখে যায় ভাঙনের উপাখ্যান-আকাশ।

পাড়ের মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে—কিছুই বলার নেই,
নদী শুধু চলে যায়, থামে না কারও দোহাইয়ে।
ঠোঁটে কাদামাটি লেগে, বুকভরা নোনা জল,
নদী ভেসে যায়—আমাদের মতোই অনির্বচনীয়, নিশ্চল। 


১০.      বিরহে ভিজে 


বিরহে ভিজে বৃন্দাবনের পথ—
ধূলোর বুকে লেগে আছে কান্নার ছাপ,
কদমতলার ছায়ায় আজো থেমে থাকে
অপূর্ণ আলাপ, অশ্রু-ভেজা জপ।

যমুনা আজ ধীরে বয়ে যায়,
ঢেউয়ের কোলেও শূন্যতার সুর—
কৃষ্ণহীন বাঁশি কাঁপে হাওয়ায়,
রাধার নিশ্বাসে ভাঙে দূর।

মঞ্জরীরা জানে, রাত কেন দীর্ঘ,
তারারা কেন জ্বলে নিভে—
প্রতিটি পদচিহ্নে লেখা থাকে
ফেরার প্রতীক্ষা, প্রেমের শিবে।

বৃন্দাবনের পথ আজ সাক্ষী হয়ে
শোনে হৃদয়ের অনন্ত ডাক—
বিরহই এখানে পূর্ণতা পায়,
প্রেমই এখানে চির অটল থাক।


১১.      চোখ : নিষিদ্ধ বিদ্রোহ


তোমার চোখ রাষ্ট্রদ্রোহী
এক নজরেই উল্টে দেয় আমার ভেতরের সংবিধান।
যে নিয়মে বাঁচতাম,
সব ভেঙে পড়ে তোমার পাপী তাকানোর নিচে।

তোমার চোখ খুনি,
প্রেমের নামে গণহত্যা চালায়
আমার স্বপ্ন, বিশ্বাস, আগামী
সব সারিবদ্ধ লাশ হয়ে পড়ে থাকে বুকে।

তোমার চোখ অন্ধকার গির্জা,
আমি সেখানে ঢুকি প্রার্থনা নয়, পাপ করতে।
তোমার চোখের সামনে দাঁড়ালে
আমার ঈশ্বরও মুখ ফিরিয়ে নেয়।

তোমার চোখ আগুন নয়
তোমার চোখ যুদ্ধ,
যেখানে আমি অস্ত্রহীন দাঁড়িয়ে থাকি
আর আনন্দের সাথে পরাজয় স্বীকার করি।

তোমার চোখ রক্তিম পতাকা,
আমি সেই পতাকায় চুমু খাই বিদ্রোহীর মতো।
জানি, এর শাস্তি মৃত্যু-
তবু ভালোবাসা মানে তো ফাঁসি মেনে নেওয়া।

তোমার চোখ আমাকে ধ্বংস করে,
আর সেই ধ্বংসেই আমি প্রেম খুঁজি।
কারণ নিরাপদ ভালোবাসা নয়-
আমি ভালোবাসি শুধুই নিষিদ্ধ বিপদ।

তোমার চোখই আমার শেষ বিদ্রোহ,
শেষ অপরাধ, শেষ চুম্বন-
এরপর যা থাকে,
তা শুধু রক্তে লেখা নীরবতা।


১২.      চোখের অপরাধ


তোমার চোখ আমাকে খুন করে প্রতিদিন,
নিঃশব্দে—কোনো ছুরি নেই, শুধু তাকানো।
এক ফোঁটা দৃষ্টি ঝরে পড়লেই
আমার দেহ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্তাক্ত স্মৃতি।

তোমার চোখ আগুন-
ছোঁয়া লাগে না, তবু পোড়ায়,
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা
সব শান্ত জল শুকিয়ে যায়।

তোমার চোখ আদালত,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি কাঠগড়ায়-
কোনো সাফাই নেই,
এক চাহনিতেই ঘোষিত হয় শাস্তি।

তোমার চোখ নদী,
যেখানে আমি বারবার ডুবে যাই,
সাঁতার জানি, তবু বাঁচতে চাই না-
ডুবেই আমার মুক্তি।

তোমার চোখ অভিশাপ,
তবু সেই অভিশাপেই আমি আশ্রয় খুঁজি,
কারণ তোমার চোখ ছাড়া
আমার শোকের কোনো নাম নেই।

তোমার চোখই আমার অনিষ্ট,
তোমার চোখই শেষ প্রার্থনা-
এই দুইয়ের মাঝখানেই
আমার সমস্ত প্রেম রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকে।


১৩.     অর্ধেক আলোয় অর্ধেক অন্ধকারে


আমি এক যৌবনবতীর শরীর দেখেছিলাম
অর্ধেক আলোয়, অর্ধেক অন্ধকারে-
যেন সন্ধ্যার সাথে ভোরের গোপন চুক্তি।

তার কাঁধে আলো থেমে ছিল 
লাজুক পাখির মতো,
অন্ধকার নামছিল কোমরের ঢেউয়ে,
নীরব জোয়ারের মতন শ্বাসে শ্বাসে।

চুলের ছায়া গলে পড়ছিল গলায়,
রাতের কালি মেখে চাঁদের দুধে,
আমি দেখছিলাম- ছুঁইনি,
তবু চোখেই পুড়ছিল আঙুল।

তার শরীর ছিল না শুধু শরীর,
ছিল প্রতীক্ষা, ছিল মন্ত্র, ছিল সেই মুহূর্ত-
যেখানে কাম কথা বলে না,
শুধু দৃষ্টি দিয়ে ধীরে ধীরে খুলে যায়।

অর্ধেক আলো আমাকে ডেকেছিল,
অর্ধেক অন্ধকার টেনে নিয়েছিল ভেতরে-
আমি তখন পুরুষ নই,
আমি তখন কেবল বিস্ময়।


১৪.       তুমিই মেঘ, তুমিই বৃষ্টি


আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল নিঃশব্দে,
দূরের নীলচে আহ্বানে বৃষ্টি নামার আগে,
পথের ধুলো ভিজছিল একাকীত্বে,
হাওয়া অপেক্ষা করছিল তোমার নাম ধরে।

তারপর তুমি এলে,
বৃষ্টিভেজা চোখে, মেঘলা হাসিতে।
হঠাৎ করে আকাশ শূন্য হয়ে গেল,
মেঘের আর দরকার রইল না কিছুতেই।

যখন তুমি কাছে থাকো,
আকাশ নিজেই খুলে দেয় ছাতা,
বৃষ্টি থেমে যায় লজ্জায়,
কারণ তোমার ছোঁয়াতেই
ভিজে যায় আমার সমস্ত ভুবন।

তখন তুমি মেঘ,
নরম, গভীর, আশ্রয়ের মতো।
তখন তুমি বৃষ্টি,
নিঃশব্দ, অবিরাম, হৃদয়ের ভেতর নামে।
আকাশ তখন আর ওপরে থাকে না,
নেমে আসে বুকের গভীরে।

মেঘ-বৃষ্টি মিলিয়ে
একটাই নাম লেখা থাকে সেখানে,
তুমি।


১৫.      বাসন্তী পূর্ণিমার কাছে 


সে আমাকে চিনিয়েছিল জীবনের অর্থ
শুধু বেঁচে থাকা নয়,
বরং বেঁচে ওঠার মানে।
তার লাস্যে ছিল বসন্তের প্রথম দোলা,
হাস্যে ছিল ভোরের রোদের নির্ভীক স্পর্শ,
বিভঙ্গে বিভঙ্গে আমার চিত্তে
সে ঢেলে দিয়েছিল
যৌবনের প্রথম লাবণ্যজ্যোৎস্না।

আমি তখন শব্দ চিনতাম না ভালো করে,
তবু তার চোখে চোখ রেখে
হৃদয়ের প্রথম দ্রাবিত অক্ষর
পড়ে নিয়েছিলাম নিঃশব্দে।

সেও ভালোবেসেছিল,
কোনো শর্তের ব্যাকরণ ছাড়াই,
হৃদয় দিয়ে হৃদয় পড়ার সেই আদিম পাঠে। এই কক্ষেই, যেখানে দেয়ালে আজও আটকে আছে আমাদের নিঃশ্বাসের গন্ধ।

এক বাসন্তী পূর্ণিমার রাত্রে
আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম।
অলংকারহীন, জোরহীন,
এক পুরুষ যেমন করে কথা দেয়
তার নারীর কাছে, চোখে চোখ রেখে,
সময়ের চোখে চোখ রেখে।
চাঁদ তখন জানত এই প্রতিশ্রুতি সহজ নয়,
বাতাস জানত এই ভালোবাসা চিরন্তনও হতে পারে, ভাঙনও হতে পারে।

তবু সেই রাতে
আমরা দু’জনেই বিশ্বাস করেছিলাম,
ভালোবাসা মানে
একটি জীবনকে আরেকটি জীবনের হাতে
নিঃশর্তে তুলে দেওয়া।

আজও সেই পূর্ণিমা এলে আমি থমকে দাঁড়াই, নিজেকে জিজ্ঞেস করি-
কতটা পেরেছি আমি সেই পুরুষ হয়ে উঠতে,    যে সেদিন কথা দিয়েছিল
একটি নারীর জীবনের কাছে।


১৬.      তুমি না থাকলে 


তুমি কাছে থাকলে বুকের ভিতর ঢুকে পড়ে 
বন্যার জলের মতো ভালোবাসা,
সব বাঁধ ভেঙে, সব ভয় ডুবিয়ে
হৃদয় উপচে ওঠে অতলান্ত জলে,
নিঃশ্বাসগুলোও তখন উৎসবের ঢোল বাজায়,
আমার একাকিত্ব হার মানে তোমার স্পর্শে।

আর তুমি না থাকলে,
হা হা করে শূন্যতা এসে বসে হৃদয়ের ঘরে,
চেয়ারের ওপর, জানালার ধারে,
নাম না-জানা দীর্ঘশ্বাস হয়ে।

সময় থেমে থাকে, ঘড়ির কাঁটা কেবল তোমার অনুপস্থিতির হিসাব লেখে।
তুমি থাকো বলেই আমি পূর্ণ,
তুমি না থাকলে আমি কেবল একখণ্ড প্রতীক্ষা।

এই দুই অবস্থার মাঝখানেই
আমার সমস্ত প্রেম, আমার সমস্ত জীবন
তোমার দিকেই ঝুঁকে থাকে।


১৭.      বিষের প্রেমপত্র


সারা শরীরে আমার তোমার বিষ দাঁতের দংশন
ক্ষতগুলো জ্বলছে, তুমি বলো-
এ নাকি ভালোবাসা নয়,
এ নাকি তোমার অপ্রেমের বিষাক্ত চিহ্ন।

তবু আমি জানি,
এই বিষে আছে এক অদ্ভুত নেশা,
যেখানে যন্ত্রণা আর কাম
একই শিরায় একসাথে হাঁটে।

তোমার স্পর্শ মানেই
কালো আগুনের মতো জ্বালা,
তোমার নিঃশ্বাস মানেই
রাত্রির গোপন ছুরি-
যা কাটে, তবু মারতে পারে না।

তুমি দাও ক্ষত,
আমি তাকে আদর করে রাখি,
তুমি ছুঁড়ে দাও অবহেলা,
আমি তাতেই শরীর ভিজিয়ে নিই।

তোমার ঠোঁটের কাছে গেলে
ভয় আর লোভ একসাথে কাঁপে,
মনে হয়, এই বুঝি বিষ ঢুকবে,
এই বুঝি বাঁচার শেষ স্বাদ পাবো।

আমরা দু’জনেই জানি,
এ প্রেম সুস্থ নয়,
এ প্রেমে আছে পচন, আঁধার, দহন-
তবু এই অসুখেই আমার শরীর তোমার নামে
বারবার আত্মসমর্পণ করে ।


১৮.     যেখানেই যাই 


যেখানেই যাই তোমার উপস্থিতি থাকে আমার হৃদয় জুড়ে,
তুমি কাছে নেই তবুও তুমি আছ আমার সকল গানের সুরে।

চোখ বন্ধ করলে দেখি তোমার ছায়া, আলো-অন্ধকারের মায়াবনে,
নীরব রাতের নিঃশ্বাসে তুমি জেগে থাকো আমার জানালার কোণে।

পথের ভিড়ে মানুষের কোলাহলে হঠাৎ থমকে যায় যদি,
প্রতিটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে তোমার নাম নিরবধি।

সময় এগোয় ঋতু বদলায়, বদলায় 
শহরের দৃশ্য,
তবুও আমার ভেতরে তুমি একই রকম গভীর, একই রকম নিশ্চুপ স্পর্শ।

তুমি না থেকেও আছ এই অদ্ভুত 
উপস্থিতির টানে,
আমার জীবন জুড়ে বাজে তোমারই গান, আমারই প্রাণে।


১৯.     নীরব নীড়


নদীর ঘাটে তখন সন্ধ্যার আলো,
জলছায়া কাঁপে মেঘ আর শরতের কোলাহলে।
ময়ূরকণ্ঠিরঙা নীলাভ দুকূল জড়ানো 
তার শরীর,
নদীর স্রোতের মতোই শান্ত অথচ গভীর।

শ্বেত উত্তরীয়ে ঢাকা বক্ষোজ কুসুম,
যেন ভোরের শিশিরে লাজুক কোনো পদ্ম।
ভ্রমরের মতো চোখ কালো, নীরব, চঞ্চল,
অপাঙ্গ দৃষ্টিতে ডাক দেয় মধুর ও প্রবল।

সে কি আমাকেই ডাকল? বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে প্রশ্ন,
ঘাটের ধুলো, নৌকার দড়ি সবই হয়ে ওঠে স্পর্শ।

নদী থেমে শোনে, বাতাসও রাখে শ্বাস,
এক মুহূর্তে জমে যায় অনন্তের অভিলাষ।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি ডাকা আর না-ডাকার মাঝখানে,
তার চোখে ভেসে ওঠে এক অচেনা মানে।

নদীর ঘাটে সেই দেখা অল্প, তবু গভীর,
একটি অপাঙ্গ দৃষ্টিতেই বদলে গেল আমার নীরব নীড়।


২০.      রুপোলী ডাক


রুপোলী জ্যোৎস্নার মতো
সে দাঁড়িয়ে বারান্দার ধারে,
নীরব ইশারায় ডাকে,
চলো, রাতের অচেনা পথে।
তার চোখে ভাসে দূরযাত্রার নীল মানচিত্র,
তার নিঃশ্বাসে ঝরে পড়ে
মুক্তির গোপন সুর।

কিন্তু ঘরের ভেতর আরেকজন মায়াবতী,
প্রদীপের আলোয়
তার ছায়া লেপ্টে আছে দেয়ালে।
তার চুলে বাঁধা দিনের সব চেনা ক্লান্তি,
তার চোখে জমে আছে
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

বাইরে জ্যোৎস্না বলে,
চলো, নিজেকে হারাও।
ভিতরে মায়া বলে, থামো, এখানেই তুমি পূর্ণ।
দুটো ডাকে
ছিঁড়ে যায় বুকের নরম মানচিত্র,
পা বাড়াতে চাইলে শেকড় জড়িয়ে ধরে হৃদয়।

আমি জানি না
কোন ডাক সত্য, কোনটা স্বপ্ন-
রুপোলী আলো, না প্রদীপের স্থির উষ্ণতা।
তাই দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি
নিঃশব্দ প্রহরী হয়ে,
এক পা ঘরের ভেতর,
এক পা জ্যোৎস্নার সীমান্তে।

যাই না কোথাও,
তবু ভেতরে ভেতরে ভেসে যাই বহুদূর।
মায়া আর মুক্তির মাঝখানেই
আমার নিরুদ্দিষ্ট বাস।


২১.     তুমি নেই জীবনে


তুমি নেই জীবনে,
অথচ তুমি আছ ছায়ার মতোন, মায়ার মতোন আমারই জীবনে জীবনে।
চোখ বুজলেই নাম ধরে ডাকে তোমার নীরবতা,
হাওয়ার ভেতর ভেসে আসে তোমার না-বলা কথারা।

পথে হাঁটি একা, তবু পাশে হেঁটে চলে তোমার স্মৃতি,
প্রতিটা বিকেল রোদে পুড়ে যায় তোমার অপেক্ষায়।
তুমি স্পর্শ নও, তবু স্পর্শের মতো গভীর,
তুমি বাস্তব নও, তবু সত্যের চেয়েও বেশি সত্য।

যেখানে তুমি নেই, সেখানেই তোমার সবচেয়ে বেশি বাস,
আমার শূন্যতার বুক জুড়ে তুমি অদৃশ্য, অবিনাশ।
এই জীবনটা বুঝি তোমাকে ছাড়া নয়,
তুমি নেই, এই কথাটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যে হয়ে রয়।


২২.     শেষ অভিযাত্রা 


জ্যোৎস্নায় প্লাবিত তারার আকাশে হারিয়ে 
যাব একদিন,
এই ভাবনাটুকু বুকের ভিতর রেখে
আমি হাঁটি প্রতিদিনের ভিড়ের মধ্যে,
মুখে হাসি, হাতে কাজ,
চোখে জমে থাকে অনন্তের নীরব ডাক।

একদিন শরীর নামিয়ে রাখব সময়ের দোরগোড়ায়,
নিঃশ্বাস খুলে যাবে সব বন্ধন থেকে
নাম, পরিচয়, অভিমান, ভালোবাসা
সবাই দাঁড়িয়ে থাকবে দূরে,
আমি শুধু হালকা হয়ে যাব।

মৃত্যু তখন কোনো শত্রু হবে না,
সে হবে দীর্ঘ ক্লান্তির শেষে
একটি শান্ত আলো-ঘর,
যেখানে প্রশ্ন নেই, নেই আর ফেরার তাড়া।

জ্যোৎস্নার স্রোতে ভেসে যাবে আমার ছায়া,
তারারা চিনে নেবে আমাকে আপন করে,
আমি মিলিয়ে যাব নক্ষত্রের নিঃশব্দ গানে-
থেকে যাবে শুধু স্মৃতির মৃদু কম্পন,
আর পৃথিবীর বুকে আমার অনুপস্থিতির শান্তি।


২৩.       সুরভীর স্পর্শ 


আমার জামায় ছুঁয়ে আছে তোমার শরীরের 
মধুরিমা, আশ্চর্য কিছু সুরভী,
অদৃশ্য আলিঙ্গনে ভিজে আছে প্রতিটি সুতো, 
প্রতিটি স্মৃতি।

তুমি চলে গেলেও, তবু তোমার উষ্ণতা
রয়ে যায় আমার বুকের কাছাকাছি, 
নিঃশব্দ আগুন হয়ে।
এই জামা জানে তোমার নীরব হাসি,
জানে লাজুক ঘ্রাণ, জানে ক্ষণিক স্পর্শের ইতিহাস।

হাওয়ায় দুললে মনে হয়, তুমি পাশেই দাঁড়িয়ে,
চুল সরিয়ে বলছো- 'আমি আছি, ভয় নেই।'
আমি জামাটা গায়ে জড়াই, আর রাত গভীর হয়,
তোমার সুরভীতে ভরে ওঠে নিঃসঙ্গতা।

এই তো ভালোবাসা, স্পর্শ না করেও ছুঁয়ে থাকা,
চলে গিয়েও কাছে থেকে গেছ।


২৪.      সুবাসিত রমণী


এত সুন্দর সুবাস, কোন রমণীর গা থেকে 
ভেসে আসে রাতের নিবিড় অন্ধকার চিরে?
চাঁদের আলো থেমে যায় নাকে এসে,
শ্বাস নিলেই বুকের ভেতর
অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে।

এই গন্ধে আছে
ভেজা চুলের গোপন দীর্ঘশ্বাস,
অর্ধখোলা ব্লাউজের ভাঁজে লুকোনো
উত্তপ্ত দুপুরের স্মৃতি।

জুঁই, চন্দন আর ঘামের মাঝখানে
একটি শরীর নীরবে কথা বলে।
রাত যত গভীর হয়, গন্ধ ততই সাহসী হয়ে ওঠে,
সে আর শুধু ফুল নয়, সে যেন শরীরের ভাষা, নখের আঁচড়,  ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যাওয়া অধীর চুম্বন।

আমি চোখ বন্ধ করি, কিন্তু গন্ধ আমাকে খুলে দেয়, একটি রমণী দাঁড়িয়ে থাকে অদৃশ্য আলোয়,
তার শরীর জুড়ে রাতের রাজত্ব,
আর আমি নিঃশব্দে হেরে যাই সুবাসের কাছে।


২৫.      চেনা মুখ 


এই মুখ অনেক চেনা, অস্পষ্ট কোনো 
স্মৃতির মতো, চোখে চোখ রেখে কিছু না বলেই 
একদিন  হেঁটে চলে গিয়েছিল সময়ের 
উল্টো দিকে।

পথের উপর তাকে দেখেছিলাম,
ধুলো আর আলোয় মিশে থাকা একদণ্ড উপস্থিতি,
ঠিক পথের প্রান্তেই মুছে গিয়েছিল তার রেখা,
যেন মানচিত্র ভুল করে রেখে গেছে ।

আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ক্ষণিক মুহূর্ত-
পথ তখন প্রান্ত খুঁজছিল, 
একটিই প্রশ্ন- সে কী ছয়ামূর্তি তবে, উত্তর নেই - 
ওই চেনা মুখ, মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে।


২৬.     ঘাসের ঘটনা 


দীঘির পাড়ে ঘাসের উপর চাঁদের আলোয় 
শয্যা পেতেছিল এক কুমারী মেয়ে,
চোখে মুখে আকুল করা ভালোবাসার জোর,
সে সেই রাতে মা হতে চেয়েছিল।

কিন্তু সেটি ছিল একটি দুঃখের গল্প,
যে গল্পটি কেউ জানে না,
ঐ মেয়ের সমস্ত সম্ভ্রম সেই রাতে ভুলুণ্ঠিত হয়েছিল চোখের জলে।

চাঁদ তখনও নির্বাক ছিল,
ঘাস জানত না কোন দোষে ভিজছে তারা,
দীঘির জল কাঁপছিল অকারণ লজ্জায়,
আর বাতাস বয়ে আনছিল ভাঙা নিঃশ্বাস।

ভালোবাসা সেদিন আসেনি হাত ধরে,
এসেছিল মুখোশ পরা নিষ্ঠুরতা,
স্বপ্নের গর্ভে ঢুকে হিমশীতল নীরবতা রেখে গেছে।

সে মেয়ে এখনো হাঁটে, কিন্তু পায়ের শব্দ নেই,
হাসে কিন্তু চোখের ভেতর রাত জমে থাকে।
তার দুঃখের গল্প কেউ শোনে না,
সমাজ কান পেতে শোনে শুধু তার নিঃশব্দ
চিৎকার।


২৭.      বন্ধুত্বের পঞ্চাশ বছর


পঞ্চাশ বছর! কী আশ্চর্য শব্দ,
সময় এখানে সংখ্যা নয়,
এ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে
আমাদের যৌবনের আনন্দ বেদনা।

ক্লাসরুমের কাঠের বেঞ্চে গোপনে লেখা 
প্রিয় সহপাঠীর নামগুলো
আজও কি হৃদয়ে শিহরণ তোলে? 
খাতার ভাঁজে লুকোনো কবিতা,
ক্যান্টিনের চায়ের ধোঁয়ার ভেতর
রাজনীতি, প্রেম আর বিপ্লবের তর্ক—
সবাই যেন আজও অপেক্ষায় ছিল
এই পুনর্মিলনের।

চুলে রুপালি চাঁদ নেমেছে,
চোখের কোণে জমেছে বহু বর্ষার রেখা,
তবু একে অপরকে দেখামাত্র
আমরা আবার সেই আগের আমরা-
যাদের স্বপ্ন ছিল অদম্য,
যাদের রাত ছিল দীর্ঘ,
আর ভবিষ্যৎ ছিল অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল।

কেউ হারিয়েছে শহর, কেউ দেশ,
কেউ হারিয়েছে প্রিয় মানুষ,
তবু বন্ধুত্ব, এই একমাত্র ঠিকানা
কখনও বদলায়নি।

সময়ের নদী ভেঙে গেছে বহু পাড়,
কিন্তু এই সেতু ভাঙেনি।
আজ হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালে
শুনতে পাই হারানো দিনের ডাক-
“এই তো, দেরি করিস না,
ক্লাস শুরু হয়ে যাবে!”

আর আমরা হাসি, নিজেদেরই বয়স দেখে নয়,
নিজেদেরই বেঁচে থাকা দেখে।
বন্ধুত্বের পঞ্চাশ বছর মানে শুধু অতীত নয়,
এ এক সাহসী অভিজ্ঞান,
সব হারালেও কিছু সম্পর্ক সময়কে হার মানায়।

আজকের এই মিলনমেলায় আমরা 
প্রতিজ্ঞা করি নীরবে—
যতদিন শ্বাস, ততদিন স্মৃতি,
আর যতদিন স্মৃতি, ততদিন আমরা বন্ধু। 

তারিখ - ৫/১/২০২৬ ইং
ঢাকা। 


২৮.      রাত্রি


রাত্রি, তোমাকে আমার ভালো লাগে
দিনের সমস্ত ক্লান্তি যখন চোখ বুজে পড়ে,
তখন তোমার নীরব হাত
আমার কপালে ছুঁয়ে দেয় শান্তির চিহ্ন।

অন্ধকারের ভেতর তুমি ভয় নও,
তুমি তো আলো লুকোনো এক গোপন প্রতিশ্রুতি,
তারাদের চোখে চোখ রেখে
আমাকে একা থাকতে শেখাও।

দিনের কোলাহল ভেঙে
তুমি দাও নিঃশব্দের আশ্রয়,
আমার না বলা কথাগুলো
তোমার বুকেই সবচেয়ে নিরাপদ।

রাত্রি, তোমাকে আমার ভালো লাগে,
কারণ তোমার মধ্যেই আমি নিজেকে পাই
সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য করে।


২৯.      তুমি দেখে যাও 


তুমি ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আসো,
রাস্তা থেকে আমার ঘরে,
দু’দিকের দূরত্ব ভাঙে তোমার পায়ের শব্দে।

তবু তুমি কি দেখো
ঘরের কোণে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস?
আমার যন্ত্রণা পড়ে থাকে
খোলা রাস্তার ধুলোয়,
নিভে যাওয়া বাতির কালো ছায়ায়।

তুমি এসে বসো,
চোখ বুলিয়ে যাও দেয়ালের ছবি,
বুকের ভেতর যে আর্তনাদ নীরবে রক্তক্ষরণ করে।
সে কি তোমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে?

তুমি যাতায়াত করো অবলীলায়,
ঘর আর রাস্তার মাঝখানে,
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকি একটাই প্রশ্ন নিয়ে,
তুমি দেখে যাও, নাকি শুধু দেখে 
যাওয়ার ভান করো?


৩০.     এক্স প্রেমিক


আমি তোমার এক্স প্রেমিক
অতীতের পরতে পরতে আটকে থাকা এক নাম,
যাকে এখন উচ্চারণ করো
নির্লিপ্ত এক নিঃশ্বাসে।

তোমার নতুন হাসির পাশে
আমার স্মৃতি কেবল ছায়া,
একটা পুরোনো গান, যার সুর জানো,
কিন্তু আর গাও না।

আমি দেখেছি তোমার চোখে
ভবিষ্যতের আলো,
সেই আলোয় আমি ছিলাম না
তবু একদিন
আমি ছিলাম তোমার রাত।

এখন তোমার আঙুলে অন্য কারও স্পর্শ,
আমার জন্য পড়ে থাকে অনাহুত মায়া,
আমি তোমার এক্স প্রেমিক, এখন কেউ না
এখন শুধু কিছু অসমাপ্ত বাক্য
আর ভালোবাসার ব্যর্থ ইতিহাস।


৩১.     অথৈ স্বপ্ন


স্বপ্নগুলোও এখন আর ভালো দেখি না
পরিযায়ী পাখিরা ডানা মেলে  উড়ে যায়
নীলিমার গভীরে, 
মিলিয়ে যায় তারা নামহীন গন্তব্যে।

রাতের আকাশ ভেঙে পড়ে 
সাগরের জলোচ্ছ্বাসে সারা পৃথিবী ডুবে যায় 
একটানা কান্নায়,
ঘর, পথ, স্মৃতি—সব ভেসে যায়,
শুধু ভয় আর নিঃশ্বাসের লড়াই রয়ে যায়।

আমি অথৈ জলে হাবুডুবু খাই,
কোনো তীর নেই, কোনো আলোর রশ্মি নেই,
প্রার্থনাগুলোও শূন্যে উড়ে যায়,
হাত বাড়ালেই কেবল শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতা। 

তবু এই ডুবে যাওয়ার মাঝেই
আমি আঁকড়ে ধরি আলোনঝলমল সকাল,
হয়তো কোনো এক ভোরে স্বপ্নেরা আবার ফিরবে,
ভেজা ডানা মেলে আমাকে ভাসিয়ে নিতে।



৩২.     কোনো বন্ধু নেই 


তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই
এই সত্যটা প্রতিদিন নতুন করে ব্যথা দেয়।
ভিড়ের শহরে দাঁড়িয়ে থাকি নির্বাক,
সব মুখের ভিড়ে তোমার মুখটাই খুঁজি শুধু।

তুমি ছিলে আমার অর্ধেক বলা কথা,
অপূর্ণ বাক্যের শেষ যতিচিহ্ন,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা কান্না
তোমার কাছেই এসে হতো নির্ভয়।

আজ কেউ জিজ্ঞেস করে না-কেমন আছি,
কেউ শোনে না দীর্ঘ নীরবতার ভাষা।
রাতগুলো তাই তোমার নামেই ডুবে যায়,
তারারাও যেন আমাকে চিনতে ভুলে যায়।

তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু নেই,
এই একাকীত্বই এখন বুকের ভিতর বাসা বেঁধেছে।
তবু প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি,
যদি কোনো একদিন তুমি আবার বন্ধু 
হয়ে ফিরে আসো।


৩৩.     স্মৃতির মায়াজাল


কিছু স্মৃতি একজীবন বেঁচে থাকে হৃদয়ের গোপন ঘরে,
তারা যায় না মুছে বরং নীরবে শেকড় ছড়ায় ভেতরে।
হাসির চেয়েও তারা ভারী, আনন্দের চেয়েও গভীর,
অদেখা এক বেদনার মতো বুকের ভেতর স্থির।

যে মুহূর্তগুলো একদিন আলো ছিল,
আজ তারা ছায়া হয়ে নামে সন্ধ্যার নীল।
চেনা গন্ধ, পুরোনো গান, হঠাৎ দেখা কোনো পথএ,
সবাই মিলে ডেকে তোলে হারিয়ে যাওয়া অতীতের রথ।

স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর সে কাঁদে না, কাঁদায়,
হালকা ছোঁয়ায়ও বুকের ভিতর ঝড় লাগায়।
তবু মানুষ স্মৃতিকে তাড়ায় না দূরে,
কারণ দুঃখের মাঝেও সে ভালোবাসার চিহ্ন রেখে যায় চুপে।

হঠাৎ কোনো গান, কোনো গন্ধ
বুকের ভেতর খুলে দেয় শোকের দরজাখানা।
যে দিনগুলো একদিন আলো ছিল,
আজ তারা ক্লান্ত ছায়া, হাসির মুখোশ খুলে
চুপচাপ বসে থাকে চোখের জলে ভেজা বিকেল।

শেষমেশ বুঝি এই দুঃখই আমাদের করে মানব,
স্মৃতির ভার নিয়েই তো এগিয়ে যায় জীবন অবিরাম।
কিছু স্মৃতি তাই দুঃখ হয়ে থেকেও অমূল্য,
এই স্মৃতি নিয়েই আমরা গভীরভাবে বেঁচে থাকি।


৩৪.      দ্রোহী হও 


আমাকে তুমি পাবে না বালিকা, প্রেমে তুমি 
যতই দ্রোহী হও
আমি সেই নদী নই যে ডাক দিলেই 
তটে এসে ভাঙে,
আমি শিখেছি ফিরতে, শিখেছি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে,
তোমার আগুনে হাত পুড়িয়েও নির্বাক 
দাঁড়িয়ে থাকতে।

তুমি বলো, ভাঙবে নিয়ম, ভাঙবে দূরত্বের দেয়াল,
আমি জানি, কিছু দেয়াল ভাঙলে আকাশও ভেঙে পড়ে।

তোমার চোখে যে ঝড়, তা আমার বুকে 
এসে থামে না,
আমি এখন নিঃশব্দের পক্ষপাতী, 
শান্তির সহোদর।

আমাকে তুমি পাবে না, যত চিঠি 
লেখো অভিমানে,
যত রাত জাগো নাম ধরে, যত গান 
গাও ডাকে।

আমি হারিয়ে গেছি নিজেরই নির্জন মানচিত্রে,
যেখানে প্রেম মানে দূরে থাকা, 
ছুঁয়ে না ছোঁয়ার শপথে।
তবু জেনে রেখো, তোমার দ্রোহের 
প্রতি রইল শ্রদ্ধা,
সব ভালোবাসা পাওয়া হয় না হলেও 
তার মাহাত্ম্য অসীম।


৩৫.     তোমার স্বপ্ন চাই 


আমি তোমার শরীর চাই না, আমি তোমার স্বপ্ন চাই,
যে স্বপ্নে ভোরের আলোয় তুমি নিজের নাম খুঁজে পাও।
আমি চাই না রাতের তাড়াহুড়ো, উষ্ণ স্পর্শের দাবি,
আমি চাই তোমার দীর্ঘশ্বাসে লুকোনো অনুচ্চারিত কথা।

আমি চাই তোমার চোখের ভেতর জমে থাকা দূর আকাশ,
যেখানে ক্লান্তির পরে একটু ভর দিয়ে বসা যায়।
আমি চাই তোমার ভয়ের হাত ধরে হাঁটার সাহস,
ভেঙে পড়লেও যেন আমাকে পাশে পাও।

আমি তোমার ঠোঁট নয়, তোমার নীরবতা ভালোবাসি,
যে নীরবতায় জমে থাকে হাজার অনুচ্চারিত গান।
আমি তোমার শরীর চাই না, আমি তোমার স্বপ্ন চাই—
যেখানে আমি কেবল প্রেম হয়ে থাকি, কোনো অধিকার হয়ে নয়।


৩৬.       সেদিন বিকাল বেলা

সেদিন বিকাল বেলা,
রোদটা হঠাৎ নরম হয়ে এসেছিল,
গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে
আলোরা যেন ধীরে ধীরে নামছিল মাটিতে।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সময়টুকু
হঠাৎ থমকে গিয়েছিল,
চায়ের কাপে ধোঁয়ার মতো
কিছু না বলা কথা ভেসে উঠেছিল বাতাসে।

তুমি এসেছিলে খুব সাধারণভাবে,
কিন্তু বিকালটা আর সাধারণ থাকেনি;
তোমার চোখে লুকোনো ছিল
অজানা দূরত্ব আর ফেরার ইচ্ছে।

পাখিরা ডানায় ভর দিয়ে ফিরছিল নীড়ে,
আর আমাদের মাঝখানে
একটি বিকাল বসে ছিল চুপচাপ,
জানত এই মুহূর্ত আর ফিরে আসবে না।

সেদিন বিকাল বেলা,
দিনটা সন্ধ্যার দিকে হেলে পড়েছিল,
আর আমি শিখে নিয়েছিলাম,
কিছু বিদায় আলোতেই লেখা হয়।


৩৭.     রাত নামে শহরে


রাত নামে শহরে, আঁধার নামে তার সঙ্গে আজও পূর্ণ চন্দ্ররাতে
তুমি কি এখনও সেজে আছো?

নীরব রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো
হেলে পড়ে ক্লান্ত ছায়ার কাঁধে,
জানালার ফাঁকে জমে থাকে অচেনা অপেক্ষা,
ঘড়ির কাঁটাও যেন ধীরে হাঁটে তোমার নাম ধরে।

রাতের এই নিরালে
কত ভালোবাসাই যে বাসতে ইচ্ছে হয়,
চাঁদের ঐ আড়ালে
লুকিয়ে রাখা কথা, না বলা স্পর্শ,
অধরা সব স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

হাওয়ার গায়ে লেগে আসে তোমার গন্ধ,
শহরের বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে স্মৃতির আলো,
এই অন্ধকারেও চোখ বন্ধ করলে
দেখি, তুমি দাঁড়িয়ে আছো রুপোলি নীরবতায়।

আজও কি জানালায় বসে আছো তুমি,
চাঁদের দিকে তাকিয়ে, আমাকেই ভেবে?
রাত গভীর হলে শহর ঘুমিয়ে পড়ে,
জেগে থাকে শুধু-
আমার বুকভরা ভালোবাসা আর তোমার অদৃশ্য অপেক্ষা।


৩৮.      অচেনা প্রসন্ন মুখ 


নীরবতার গহ্বরে যখন নিজেরই ছায়া 
ভারী হয়ে আসে,
চারদিক জুড়ে থাকে শুধুই একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস,
ঠিক তখনই, অচেনা এক প্রসন্নমুখ
নীরব পদধ্বনিতে এসে পাশে দাঁড়ায়।

সে কিছু বলে না,
তার চোখে থাকে আশ্বাসের আলো,
হালকা হাসিতে ভেঙে যায়
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকার।

হয়তো সে বন্ধু,
হয়তো স্মৃতি, কিংবা নিছকই এক মানবিক স্পর্শ, তবু তার উপস্থিতিতে বুঝে যাই,
আমি একা নই এই পথচলায়।

যখনই ভেঙে পড়ি,
যখনই নিঃসঙ্গতার দরজা বন্ধ হয়ে আসে,
ঠিক তখনই কেউ একজন
নীরবে এসে পাশে দাঁড়ায়, আর আমার বিষণ্ণতার মুখচ্ছবি অলক্ষ্যে হয়ে ওঠে প্রসন্নময়।


৩৯.       আমরা মিশিনি


আমরা মিশিনি উন্মত্ত হয়ে অথৈ জোৎস্নায়,
চাঁদের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিইনি রাতে।
আমরা উড়িনি মুক্ত ডানায় লক্ষ তারার নীড়ে,
নীল আকাশের বুক চিরে দুঃসাহসী স্বপ্ন আঁকিনি।
আমরা ভাসিনি বুঁদ হয়ে স্বেদ জলে
দেহের উত্তাপে পৃথিবী কাঁপাইনি এক মুহূর্তে।

তবু আমাদের ক্ষণগুলো ছিল,
নীরব অথচ দীপ্ত,
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের কবিতার মতো গীতিময়।
অল্প কথায় গভীর, চোখের চাহনিতে সম্পূর্ণ।

আমরা বসেছিলাম বিকেলের শেষ রোদে,
দুটি ছায়া লম্বা হয়ে পাশাপাশি হাঁটছিল।
কোনো প্রতিজ্ঞা ছিল না,
তবু সময় থমকে শুনছিল আমাদের নীরবতা।

তুমি একবার হাসলে, আর সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল আমার সমস্ত দিনলিপিতে।
আমি একটুখানি থামলাম,
তোমার নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
নিজেকে চিনে নিতে।

আমাদের ভালোবাসা ছিল সংযত দীপশিখার মতো, ঝড় ডেকে আনেনি,
তবু অন্ধকারকে ভয় দেখিয়েছে।
কোনো উচ্চারণ ছাড়াই হৃদয়ের পাতায় লিখে গেছে অক্ষয় কিছু পঙ্‌ক্তি।

আজও সেই ক্ষণগুলো হঠাৎ এসে দাঁড়ায়,
চা-কাপের ধোঁয়ায়,বিকেলের জানালায়,
অথবা অকারণ কোনো গানে।

আমরা বড়ো কিছু হইনি, তবু অল্প হয়ে থেকেও অম্লান রয়ে গেছি,
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকার মতোই সময়ের মুঠোয় ধরা একটি চিরন্তন মুহূর্ত।


৪০.     স্বৈরিণী 


তুমি স্বৈরিণী নও, ময়ুরাক্ষীও নও,
তুমি প্রেমিকা,
যার চোখে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে,
যার নীরব দৃষ্টিতে শরীর নয়,
আগে কেঁপে ওঠে আত্মা, আমরা দু’জনেই প্রেমে অনাহারী।

তোমার আঙুল যখন আমার কবজিতে নামে, তা কোনো শাসন নয়,
তা এক নিঃশব্দ আমন্ত্রণ।
আমার নিঃশ্বাস যখন তোমার কানের কাছে
অল্প কেঁপে ওঠে, তা লালসা নয়
তা বহুকালের জমানো আকুলতা।

আমরা ভালোবাসি সেই প্রেম, যে দেহে দেহে উৎসব করে, ভিতরে আগুন জ্বালায়,
কিন্তু চোখে চোখে রেখে দেয় অগাধ বিশ্বাস,
যে প্রেম স্বর্গ হলে লজ্জা পায় না,
আর নরক হলে অনুতপ্ত হয় না।

তোমার শরীর আমার কাছে যুদ্ধক্ষেত্র নয়,
আমার শরীর তোমার কাছে রাজ্যও নয়,
এ দু’টি কেবল দুটি তৃষ্ণার নদী,
যারা মিলতে চায় মোহনায়।

তাই তুমি স্বৈরিণী নও, আমিও 
কেবল পুরুষ নই 
আমরা এক যুগল প্রেমবুভূক্ষু প্রাণ,
যারা জানে ভালোবাসা মানে দখল নয়,
ভালোবাসা মানে সমর্পণ, সমান উত্তাপে,    সমান দাহে।


৪১.     পাশাপাশি হাঁটি 


সে আর আমি পাশাপাশি হাঁটি
কারণ আমাদের জন্য পথ বেঁধে দিয়েছে
এক বন্ধনহীন গ্রন্থি-
না নাম আছে তার, না নিয়ম,
শুধু স্পন্দন, অদৃশ্য, অথচ অনিবার্য।

আমরা হাঁটি নীরবতার ভেতর দিয়ে,
পায়ের শব্দে শব্দ জমে না,
মাঝখানে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই,
তবু বাতাস জানে আমরা একসঙ্গে চলেছি।

তারপর আর কী থাকে?
থাকে শুধু অন্ধকার-
যেখানে চোখের চেয়ে হৃদয় আগে দেখে ফেলে,
যেখানে আলো না থাকলেও
স্পর্শের মানচিত্র আঁকা থাকে।

মুখোমুখি বসিবার সেই ক্ষণ,
দু’টি চেয়ারের দূরত্বে
সময়ের সমস্ত প্রশ্ন জমে ওঠে,
কথা বলতে হয় না,
নিঃশ্বাসই হয়ে ওঠে ভাষা।

আমি তার চোখে দেখি
আমার অজানা ভাঙাচোরা স্বপ্নগুলো,
সে আমার দিকে তাকিয়ে
নিজের একাকীত্ব রেখে যায়
আমার কাঁধের কাছে।

আমরা জানি,
এই হাঁটা কোনো গন্তব্যে পৌঁছোবে না,
তবু পাশাপাশি হাঁটার মধ্যেই
জীবন তার গভীর অর্থ খুঁজে নেয়,
অন্ধকারের ভেতরেও
দু’জন মানুষের নীরব আলো জ্বলে ওঠে।


৪২.     স্মৃতি হয়ে যাব


একদিন সব স্মৃতির মায়া ভেসে যাবে জলে,
খড়কুটোর মতো আমিও একদিন ভেসে যাব-
নামহীন স্রোতে, অচেনা দিকে।

যে মুখগুলো একদিন আশ্রয় ছিল,
যে কথাগুলো বুকের ভেতর আগুন জ্বালাতো,
সবই ধীরে ধীরে জলছাপ হয়ে মুছে যাবে।

আমি থাকব না কোনো কোলাহলে,
থাকব না কোনো অপেক্ষার ঘরে-
শুধু নিঃশব্দ ভাসমান এক অস্তিত্ব,
জল আর আকাশের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া।


৪৩.    পূর্ব নাম 


তুমি আর আমাকে ডাকো না পূর্ব নাম ধরে,
যে নামটি তুমি রেখেছিলে শুধু আমাকে
ডাকার জন্য, সে নাম এখন বাতিল চিঠির মতো,
ঠিকানা আছে, প্রাপক নেই।

সব আজ বিষণ্ণ অতীত, তুমি ভুলে গেছ 
সেই নাম, অথচ আমি এখনও থমকে যাই
যখন হঠাৎ কেউ ডাকে, মনে হয় তুমি।

সে নামের মধ্যে ছিল অপরাহ্ণের রোদ,
চায়ের কাপে জমে থাকা নীরবতা,
আর দু’জনের মাঝে গোপন হাসি।

এখন নামহীন হয়ে ঘুরি আমি,
ভিড়ের ভিতর একা, শব্দহীন পরিচয়ে 
বেঁচে থাকা মানুষ।

ডাকবে না বলেই জানি, তবু রাতে ঘুম ভাঙে,
মনে হয়, হয়তো আজ তুমি পুরনো অভ্যাসে
একবার শুধু নামটা ধরে ডাকবে।


৪৪.     নতুন ভোর 


এই আঁধার কেটে যাবে, আসবে নতুন ভোর,
ভাঙা স্বপ্নের ছাই থেকে জ্বলে উঠবে রোদ্দুরের ঘোর।
যে রাত আজ বুকের ভেতর জমিয়েছে দীর্ঘ শীত,
তারই শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে আছে আলোর সঙ্গীত।

ক্লান্ত পথিকের চোখে জমে থাকা যত অশ্রু-রেখা,
ভোরের শিশির ছুঁয়ে দেবে, সুখের সব স্বপ্ন দেখা।
হারিয়ে যাওয়া নামগুলো, ব্যর্থতার সব দাগ,
নতুন সকালে কপালে লিখবে নতুন কোনো রাগ।

এই আঁধার চিরকাল নয়, যতই হোক গভীর,
সময়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকে আশার বীজ স্থির,
আজ না হোক কাল, তবু বিশ্বাস রেখো মন,
আঁধার কেটে যাবে ভোর আসবেই একদিন।


৪৫.     আলোকবর্তিকা 


তুমি আঁধার রাতে প্রদীপ জ্বালাও আমার ঘরে,
তুমি নিজই হয়ে যাও আলো।
যখন সব শব্দ ক্লান্ত হয়ে যায়,
নীরবতার বুক চিরে তুমি এসে দাঁড়াও,
নিভে যাওয়া বিশ্বাসের সলতেটুকু
তোমার নিঃশ্বাসে আবার জ্বলে ওঠে।

আমি পথ হারাই অজানা ভয় আর প্রশ্নের ভিড়ে,
তুমি চুপচাপ হাত বাড়াও,
কোনো দিকনির্দেশ ছাড়াই
আমাকে ফিরিয়ে আনো নিজের কাছে।

বাইরে ঝড় হলে জানালার কাঁপুনি শোনা যায়,
ভেতরে তখন তোমার আলো,
স্থির, উষ্ণ, অবিচল।

অন্ধকার যত গভীরই হোক,
তোমার একফোঁটা উপস্থিতিই যথেষ্ট
রাত্রিকে সকাল করে তুলতে।
তুমি আলো,
আমার সমস্ত আঁধারের বিরুদ্ধে তুমি 
নিঃশর্ত এক আলোকবর্তিকা।


৪৬.     বন্ধু


আজকাল তোকে মনে পড়ে
একটা পুরনো গানের মতো
সুরটা চিনি,
কিন্তু কথাগুলো আর ঠিক মনে আসে না।

আমরা একসঙ্গে হাঁটিনি সব পথ,
তবু প্রতিটা মোড়ে
তোর ছায়াটা লেগে আছে
ভাঙা ইটের দেয়ালে, চা-স্টলের ধোঁয়ায়,
অসমাপ্ত কথার দীর্ঘশ্বাসে।

তুই জানিস, আমি খুব সহজে হাসি না,
আর কাঁদলে কাউকে ডাকি না
তবু ঠিকই তুই বুঝে যাস
কখন আমার বুকের ভেতর নীরবে জমে 
ওঠে অশ্রু।

অনেক রাত কেটেছে
আমাদের না-বলা কথায়
চাঁদের আলো জানালায় থেমে ছিল,
আর আমরা শুধু সময়ের শব্দ শুনেছি
দুইটা হৃদয়ের মাঝখানে।

জীবন আমাদের একই স্বপ্ন দেয়নি,
একই গন্তব্যও নয়,
তবু একটুকরো সময় দিয়েছে
যেখানে আমরা ছিলাম
অবিশ্বাস্য রকম সত্য।

বন্ধু,
হয়তো একদিন আমাদের দেখা কমে যাবে,
কথা ছোট হবে,
নাম ধরে ডাকাও থেমে যাবে 
কিন্তু বিশ্বাস কর তোর উপস্থিতি
আমার জীবনের পাতায়
চিরস্থায়ী দাগ হয়ে থাকবে।

কারণ কিছু মানুষ জীবনের গল্পে আসে না,
তারা গল্পটাকেই মানুষ হয়ে বাঁচিয়ে রাখে।
তুই ঠিক তেমনই, বন্ধু-
আমার জীবনের সবচেয়ে নীরব,
সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য অনুভব।

আজ চারপাশে এত মানুষ,
তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা,
কারণ তোর পাশে বসে নীরব থাকার মানুষটা
আর সহজে মেলে না।

বন্ধু,
যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি,
আমি আজও তোর নামটা মনে মনে ডাকি,
জানি তুই শুনবি না, তবু ডাকাটা থামে না।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও
চলে যায় না, তারা থেকে যায়
একটা অভ্যাস হয়ে, একটা ব্যথা হয়ে।

যদি কোনো এক সন্ধ্যায়
হঠাৎ দেখা হয়ে যায়,
আমরা হয়তো বলব- “অনেকদিন পর দেখা!”
তারপর আবার নীরব হয়ে যাব।
সেই নীরবতার মধ্যেই সব কথা থাকবে, 
আমাদের হারানো সময়, ফুরিয়ে যাওয়া স্বপ্ন,
আর না-বলা ভালোবাসা।

যদি জীবন আবার একটা সুযোগ দিত,
আমি নতুন করে কিছু চাইতাম না,
শুধু চাইতাম আরেকটা সন্ধ্যা, 
তোর পাশে বসে চুপচাপ হারিয়ে যেতে।

সেই সন্ধ্যার পর
আমি আর তোকে ডাকব না,
কারণ ডাকলে শূন্যতা আরও বড় হয়।


৪৭.      দূরত্ব 


একটুখানি ইশারা করলেই কেউ কেউ 
কাছে চলে আসে
চোখের কোণে অদৃশ্য ডাক,
নীরবতার ভিতরেও তারা শুনে ফেলে নাম।

আর কাউকে হাত ধরে টানলেও
সে কাছে আসে না,
দূরত্ব তখন মাপা হয় না পায়ে,
মাপা হয় অনীহা আর অনুপস্থিতিতে।

কাছাকাছি থাকা আর কাছে থাকা
এক জিনিস নয়,
একই ছাদের নীচে থেকেও
মানুষ কত সহজে প্রবাসী হয়ে যায়।

যে আসে ইশারায়,
সে বোঝে স্পর্শের আগেই হৃদয়ের ভাষা;
আর যাকে টানতে হয়,
সে অনেক আগেই চলে গেছে
নিজের ভেতরের কোনো দূর দেশে।

তাই আজ আর হাত বাড়াই না,
ইশারাও করি না কাউকে-
যে আসার, সে এমনিই আসে;
আর যে আসে না,
তার জন্য দূরত্বই হোক শেষ পরিচয়।


৪৮.    আমার না-থাকার উৎসব


আমি চলে গেলে কেউ কাঁদবে না,
আমার নামে টিপ পরবে না কেউ কপালে।
শূন্য উঠোনে বাতাস আসবে-যাবে,
নামহীন এক ছায়া হয়ে থাকব দেয়ালে।

কেউ আর বলবে না- 'ফিরে এসো, সন্ধ্যা নামছে।'
আমার অপেক্ষার বেঞ্চে
জমে থাকবে ধুলো, অবহেলা আর নীরবতা।

আমার ব্যবহৃত কাপটিতে
শেষ চুমুকের স্মৃতি শুকিয়ে যাবে,
ডায়েরির পাতায় অর্ধেক লেখা বাক্যগুলো
কারও চোখে আর প্রশ্ন তুলবে না।

আমি যে এতটা মানুষ ছিলাম,
এতটা নিঃশব্দে ভালোবেসেছিলাম,
সেই হিসেব কেউ রাখবে না,
ভালোবাসার খাতায় নামটা কেটে দেবে সময়।

আমার ঘরের জানালায় আলো জ্বলবে ঠিকই,
কিন্তু সে আলো আর আমাকে খুঁজবে না অন্ধকারে।
কেউ বুঝবে না, আমি চলে যাইনি অভিমানে,
আমি ফুরিয়ে গেছি ধীরে ধীরে,
অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার ক্লান্তিতে।

শেষমেশ আমি থাকব
কেবল একটি না-বলা কথার মতো,
যা কেউ শোনেনি কখনও-
তাই চলে গেলেও কাউকে কাঁদাতে 
পারল না।


৪৯.    দেখা হবে 


কবে কোন্ দিন কোন্ ছায়াপথে দেখা হবে 
বলে দাও,
নক্ষত্রের ঠিকানায় লিখে রাখি সেই সময়।

অচেনা আলোর ভিড়ে চিনে নেব তোমার ছায়া,
মহাকাশের নীরবতায় দু’টি নিঃশ্বাস-
একই কক্ষপথে এসে থামুক, এই প্রার্থনা।


৫০.     দুঃখী কবিতা 


আকাশ আজ ফুরিয়ে গেছে রঙহীনতায়,
বাতাস বইছে, তবু কোনো বার্তা আনে না।
মানুষে ভরা এই গ্রহে দিনলিপির প্রতিটি কাজ
অভ্যাসের মতো নিস্তেজ,
ক্লান্ত হাতের ঘড়ির কাঁটা ঘোরে শুধু।

পেছনে তাকালে স্মৃতি, পোড়া বালুর ঢিবি,
পায়ের ছাপ টেকে না সেখানে।
এখনের মাটি আরও কঠিন,
ফাটলের ভেতর দিয়ে
শুকনো দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে।

আগামীকালও যেন একই মরুপ্রান্তর,
দূরে দিগন্ত আছে, কিন্তু মেঘ নেই,
ছায়া নেই,
নেই সন্ধ্যার নরম আলো
আর আঁধারের মৃদু আশ্রয়।

তবু বুকের গভীরে
একফোঁটা জল জমে থাকে
অচেনা, অনুচ্চারিত।
হয়তো কোনোদিন
এই ঊষরতার মাঝেই
একটি সবুজ অক্ষর জন্ম নেবে।

তবু বুকের গভীরে
একফোঁটা জল জমে থাকে না আর,
শুধু তৃষ্ণার স্মৃতি, অচেনা, অনুচ্চারিত।
হয়তো কোনোদিন এই ঊষরতার মাঝেই
কিছু একটা জন্ম নেবে,
সবুজ নয়, নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের মতো
আরও একটি দুঃখী কবিতা।

মায়া নদীর বুকে ( কবিতাগ্রন্থ )

মায়া নদীর বুকে  ( কাব্যগ্রন্থ) 
মায়া নদীর বুকে ( কাব্যগ্রন্থ৷)

প্রথম প্রকাশ - জানুয়ারি, ২০২৬ ইং

উৎসর্গ -


১.     মায়া নদীর বুকে 


মায়া নদী তুমি কোথায় বয়ে চলেছ
চাঁদের ছায়া মেখে, নক্ষত্রের ঘুম ভেঙে?
তোমার জলে হাত ডুবালেই
সময় গলে যায়, স্মৃতি হয় তরল আলো।

আমাকে তোমার বুকে নিয়ে ভাসিয়ে নাও,
এই ক্লান্ত তীর থেকে দূরে
যেখানে নামহীন পাখিরা গান শেখে
আর দুঃখেরা জলে ডুবে শ্বাস ভুলে যায়।

তোমার স্রোতে আছে কি মায়ের ডাক,
আছে কি কোনো হারানো মুখের হাসি?
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে দেখি
অন্য এক জন্মের জানালা খুলে যাচ্ছে।

মায়া নদী, তোমার জল কি স্বপ্নের?
নাকি স্বপ্নই তোমার জল হয়ে বয়ে চলে?
আমাকে ভাসাও, কোনো মোহনায় নয়,
ভাসাও সেইখানে
যেখানে পৌঁছলে আর ফিরতে হয় না।


২.     চোখের ভিতর 


দৃষ্টির সীমা থেকে তুমি কতো দূরে,
তবু চোখ বুজলেই কাছে এসে দাঁড়াও
মায়ার আলো জ্বেলে দাও অন্ধকার হৃদয়ে,
নিঃশব্দে ছুঁয়ে যাও আমার সমস্ত না-পাওয়া।

একবার যদি সামনে পেতাম,
রেখে দিতাম চোখের ভিতরে,
যেন পলক পড়লেও হারিয়ে না যাও,
যেন সময় তোমাকে ছুঁতে না পারে।

তুমি নদীর মতো ধরা দাও না,
তবু তৃষ্ণা বাড়াও প্রতিদিন।
তুমি স্বপ্নের মতো ভাঙো না,
তবু জাগরণে আরও গভীর হও।

এই দূরত্বই কি তোমার মায়া?
নাকি আমার ভালোবাসার সীমাহীনতা?
তাই তো চোখের ভেতর রাখার স্বপ্ন দেখি-
যেখানে দৃষ্টি শেষ, সেখানেই তুমি শুরু।



৩.      নীশিথের আলো


নিশীথের আলোয় তুমি অর্ধেক গোপন, 
অর্ধেক প্রকাশ,
রেশমের ছায়া নামে উরুতে,
বক্ষের উপর চাঁদের দ্যুতি এসে
থামে।

কোন্ অন্তরালের খনি থেকে
কোহিনুরের মতো ঝরে পড়ে আলো
শ্বাসে শ্বাসে নড়ে ওঠে পর্দা,
মোগল হেরেম নীরবে কেঁপে ওঠে।

চোখে চোখে আগুনের ভাষা,
নিঃশব্দে জ্বলে ওঠে প্রদীপ,
ঘরের দেয়াল শোনে হৃদস্পন্দন,
শয্যা জানে স্পর্শের প্রতীপ।

শরীরে নামে উষ্ণতার ঢেউ,
নামহীন তৃষ্ণা নেয় আকার,
আমি তুমি দুই ছায়া মিলি,
রাত্রি লেখে আদিরসের বয়ান।


৪.      প্রেম বুভুক্ষুর আগুনে


এক অপ্রস্তুত বিকেলে আমরা হঠাৎ প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে উঠেছিলাম,
সময় তখন নিঃশ্বাস ধরে ছিল।
আমি প্রথমে ছুঁয়ে দেখেছিলাম তোমার হাত, আঙুলের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে গিয়েছিল, তুমি চোখ বন্ধ করে থাকলে,
যেন দৃষ্টি নয়, স্পর্শই ছিল তোমার ভাষা।

আকাশের বিনম্র মেঘ সরে গিয়েছিল ধীরে,
আমি মুহূর্তে বুঝে নিয়েছিলাম
তোমার ভেতরের দীপ্তমান মানব-অস্থি,
দেহের গোপন মানচিত্র,
যেখানে অলকানন্দার সুবাস
বিন্দু বিন্দু ঝরে পড়ছে শিরায়-শিরায়।

আমার শক্ত উদ্বাহু বাহু
ধীরে ধীরে ধাবমান হলো তোমার দিকে,
তুমি নৈঃশব্দ্যে আসমানের ছায়ায় শুয়ে থাকলে,
তোমার শরীরের কোমল কিনারায়
তখন পাড় ভাঙছিল,
উত্তাপের ঢেউ, অনিবার্য আকর্ষণ।

আমার হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে আসে
তোমার আন্তঃসীমানা থেকে বহিঃসীমানায়,
তোমার সকল কক্ষপথ পেরিয়ে
সুনির্মল নাভির তলে সব গোপন প্রান্তরেখায়, যেখানে ভাষা থেমে যায়, 
শুধু নিঃশ্বাস কথা বলে।

আমি অনুভব করি দেহের সকল তপ্ত দাহে,
শীৎকারের অব্যক্ত হ্রেষাধ্বনিতে,
প্রেম বুভুক্ষুর আগুনে জ্বলে
আমাদের সকল শৌর্য, সকল বীর্য,
একসময় পুড়ে খাক হয়ে যায়,
রয়ে যায় শুধু দুই দেহের ছাইয়ের ভেতর
একটি দীর্ঘ, নিঃশব্দ আলিঙ্গন।



৫.        সাদা শাড়ির নিরবতায় নদী



খুব ভালো লাগে তোমাকে
যখন তুমি সাদা শাড়ি পরে
নদীর ধারে ঘুরতে যাও
হাওয়ার সঙ্গে শাড়ির আঁচল কথা বলে,
জলের ঢেউ তোমার পায়ের কাছে এসে
থেমে থেমে নিশ্বাস নেয়।

তোমার চুলে তখন রোদ্দুরের আঙুল,
নদীর ওপারে নীল আকাশ
চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে
মনে হয়, পৃথিবীর সব নীরবতা
আজ তোমার দিকেই ঝুঁকে আছে।

তুমি হাঁটো ধীরে,
ঘাসে ভেজা শিশির পায়ে মাখে,
শিউলি গাছের ছায়া
তোমার কাঁধে এসে আশ্রয় চায়।

নদীতীরে আলো নামে শব্দহীন,
ছায়ারা বসে থাকে ভাঙা সময়ের মতো,
তোমার পায়ের কাছে মাটি
নিজেকে মুছে ফেলে বারবার,
যেন তুমি হাঁটলে
পৃথিবী নতুন করে লেখা যায়।

আমি তখন দৃশ্য নই,
আমি একটি দূরের অনুভব,
জলের ওপরে ভাসতে থাকা
একটি অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি—
তুমি তাকাও না,
তবু আমি ভিজে যাই
তোমার সাদা শাড়ির নীরবতায়।



৬.        তুমি যদি না আসো 



তুমি যদি না আসো, তারপরও ফুল ফুটবে, 
ফুল ঝরে যাবে, কেউ সেই ফুল নেবে না।
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামবে ধীরে- 
টেবিলে বিকেলের চা দিয়ে যাবে, 
চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, তুমি আর আসবে না।

রাতের তারা জ্বলে উঠবে আকাশে, 
চাঁদের আলোয় বন্যা নামবে চরাচর জুড়ে , 
তুমি শুধু আর আসবে না।

তুমি যদি আর না-ই আসো,
তবুও ভোর হবে,
পাখিরা জানালার কাঁচে ঠোকর দেবে,
সূর্য ধীরে ধীরে উঠবে দেয়ালের ফাটল বেয়ে,
কেউ খেয়াল করবে না।

তুমি যদি আর না আসো,ঘড়ির কাঁটা 
ঠিকই চলবে, একটা সময় আরেকটাকে 
ঠেলে সরিয়ে দেবে,
ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে,
তারিখ বদলাবে,শুধু তুমি বদলাবে না।

তুমি যদি আর না-ই আসো, রাত গভীর হবে নিঃশব্দে,
তারা গুনতে গুনতে ঘুম আসবে না,
চাঁদ জানবে সব আলো থাকা সত্ত্বেও কিছু 
অন্ধকার দূর হয় না।

আর আমি,
তুমি না এলেও থাকব, এই না-আসার ভেতরেই
এক অদ্ভুত মায়া হবে তোমার জন্য,
তুমি তা বুঝতে পারবে না।


৭.      তোমার মুখখানি


মৌনতা দিয়েই ঢেকে থাক তোমার মুখখানি, অভিমান নয়, 
বিস্মৃতির মেঘে ঢেকে যাক আকাশটিও,
তারাদের নাম ভুলে যাক রাত,
চাঁদ আর আলো ছড়াতে না শিখুক আজ।

প্রতিরাত বেঘোর ঘুমের মাঝখানে
কোনো স্বপ্ন এসে দরজায় কড়া নাড়ে না,
চোখের পাতায় জমে থাকে কেবল
দিনের ক্লান্ত ধুলো।

শোনা হয় না আর কারোর গল্পকথা,
ঘরের কোণে রাখা ঘড়িটাও
সময়ের হিসেব ভুলে থেমে যায়,
দেয়ালের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়
কিন্তু কোনো প্রশ্ন তোলে না।
আমার বুকের ভেতর জমে ওঠা
অজস্র না-বলা কথা
মৌনতাকেই বেছে নেয় আশ্রয়।

যদি কোনো দিন শব্দেরা ফিরে আসে,
তবে তারা আসুক ধীরে, মৌনতার হাত ধরেই, আলোর মতো নয়, ছায়ার মতো নীরবে।


৮.     ঘুমাও 



কেউ একজন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে, তুমি ঘুমাও।
রাতটি ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার অদৃশ্য দরজা, ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়
সময় ভুলে বসে নিজের নাম।

এটি কোনো সাধারণ রাত নয়, এটি অনন্ত,
যেখানে ভোরের কোনো তাড়া নেই,
পাখির ডাক নেই, জেগে ওঠার কোনো শর্ত নেই।

চোখ বন্ধ করলেই নেমে আসে অন্ধকার,
তার ভেতরে ভাসে অগণিত স্বপ্ন,
কিছু অসম্পূর্ণ চিঠির মতো,
কিছু প্রথম স্পর্শের উষ্ণতার মতো,
কিছু আবার হারিয়ে যাওয়া মুখ,
যাদের নাম তুমি ভুলে গেছ,
কিন্তু মায়া ভুলতে পারোনি।

স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন জন্ম নেয়,
একটি আয়নার সামনে আরেকটি আয়না,
শেষ কোথায় কেউ জানে না।
এখানে দুঃখ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,
আনন্দেরও নেই কোনো চূড়ান্ত সীমা।

কেউ একজন আবার ফিসফিসিয়ে বলে,
ভয় পেয়ো না, জেগে উঠতে হবে না।
এই রাতেই সব প্রশ্ন বিশ্রাম নেয়,
এই স্বপ্নেই সব উত্তর ধীরে ধীরে
অদৃশ্য হয়ে যায়।

তুমি ঘুমাও, কারণ এই অনন্ত রাতে
জেগে থাকা মানে, সব হারানোকে মনে রাখা, আর ঘুমানো মানে-
সবকিছুকে স্বপ্ন হয়ে বাঁচতে।


৯.      নদীর মায়া


বারে বারে নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করে,
সে কেবল জল নয়, সে এক রমণী,
নিজের শরীরকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাকে ডাকে

তার তটরেখা জুড়ে কোমলের বাঁক,
নরম বালুর উষ্ণতায় আমি খুঁজে পাই লুকানো স্পর্শ,
হাওয়ার শিহরণে কাঁপে তার শাড়ির আঁচল,
ঢেউ এসে আলতো করে সরিয়ে দেয়।

রোদে তার গা ঝিলমিল করে,
জলরাশির ভেতর দ্যুতি খেলে যায়,
আমি চোখ নামাতে পারি না,
লজ্জা আর লোভ একসাথে জেগে ওঠে।

নদী জানে, আমি তাকিয়ে থাকি,
নিঃশব্দে, অপরাধী প্রেমিকের মতো,
সে তখন আরো উন্মুক্ত হয়,
ঢেউ ভেঙে ভেঙে কাছে আসে,
আমাকে ছুঁয়ে যায় হাঁটুর নিচে,
তারপর হেসে সরে যায় আবার।

এই জন্যই বারে বারে নদীর কাছে যাই,
সে আমাকে কিছু দেয় না, তবু সব নিয়ে নেয়, আমি ফিরে আসি খালি হাতে,
কিন্তু শরীরজুড়ে লেগে থাকে
তার জল, তার গন্ধ, তার মায়া।


১০.     ঝাউবনের আঁধার 


কক্সবাজারের বালুকাবেলায় ঝাউবনের ছায়া গাঢ় হয়ে এলে
সন্ধ্যার কাঁধে নেমে এসেছিল আঁধার -
নাজনীনের কণ্ঠে তখন মৃদু ফিসফাস,
'আরও আঁধার হোক,
আলো যেন আমাদের খুঁজে না পায়।'

সাগরের দিক থেকে আসে লবণাক্ত হাওয়া,
ঢেউয়ের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসে
আমাদের হাত দুটি জড়িয়ে থাকে,
ভালোবাসা তখন কোনো নাম চায় না,
শুধু একাকার হয়ে থাকতে চায়।

ঝাউপাতার ফাঁক দিয়ে
চাঁদও যেন চোখ সরিয়ে নিয়েছিল,
পৃথিবী ভুলে গিয়েছিল আমাদের ঠিকানা,
সে বলেছিল- ভয় নেই,
আমি বলেছিলাম- থাকুক এই মুহূর্ত, অনন্তকাল।

যদি হঠাৎ সাগর জেগে ওঠে, যদি ঢেউ অস্থির হয়ে নামে তটে,
আমরা তবু দাঁড়িয়ে থাকব, ভালোবাসার গভীর জলে একসাথে ভেসে, একসাথে ডুবে, একই স্বপ্নের নীলে।



১১.     ছায়ার ভেতর আলো



আমরা দু’জন আইনত নয়, লোকচক্ষুর নয়, দিনের আলোয় যার নাম নেই,
রাতের নিঃশ্বাসে সে-ই ভুল ঠিকানা। 

তোমার হাত ধরলে কাঁপে না শুধু হাত,
কাঁপে সংসারের দেয়াল,
কাঁপে শপথ, কাঁপে দায়িত্বের ভারী দরজা,
তবু এই স্পর্শে
জীবন প্রথমবারের মতো জীবিত।

আমরা জানি, এই প্রেমের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কোনো বৈধ সকাল নেই,
আছে শুধু চুরি করা সন্ধ্যা আর দীর্ঘশ্বাসে ভেজা বিদায়।

তুমি ফিরবে তোমার নামে,
আমি ফিরব আমার দায়িত্বে,
মাঝখানে পড়ে থাকবে কিছু চুম্বন,
কিছু না-বলা কথা আর একরাশ অপরাধবোধ।

তবু কেন জানি এই নিষিদ্ধ আগুনে হাত পুড়িয়েও মন বলে ওঠে-
সব প্রেম যদি পবিত্র হতো,
তবে এই ব্যথাটুকু এত গভীর করে ভালোবাসতে শিখাত না।


১২.     অপূর্ণ পূজার গান


একে একে চলে গেল কত বসন্তদিন,
পাতাঝরা ক্যালেন্ডারে জমে থাকে নামহীন ঋতু,
সুখ–দুঃখের হিসেব কষলে
দুঃখের দিকেই কাঁটা বেশি ঝুঁকে,
তবুও সাধ হয়,
এই আকাশের ছায়া, এই পৃথিবীর ধুলো মেখে আরও একটু থেকে যেতে।

কত কথা বলা হলো না-
কত হাত বাড়িয়েও ছুঁতে পারিনি আপনজন,
পাওয়ার তালিকায় ফাঁক,
দেবার খাতায় অসমাপ্ত লাইন,
আজ প্রাণের ভেতর সেই অপূর্ণতার ঢেউ বড় বেশি বাজে।

তবু জানি- হারিয়ে যায়নি সব,
যা দিতে পারিনি, তার ইচ্ছেটুকু বেঁচে আছে,
যা পাইনি, তার স্বপ্ন আজও আলো জ্বালে।

এই বুকের ভেতর ভাসে স্বীকারোক্তি,
‘জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।’
এই জানা-নাজানার মাঝেই হেঁটে যাই প্রতিদিন- অপূর্ণতার কাঁটা বুকে নিয়ে পূর্ণতার দিকে।


১৩.      বদলে যাই


কোনো কোনো দিন 
নিজেকে নদী মনে হয়, মনে হয় আমার জলে তোমাকে ভাসিয়ে দিই,
ভেসে যাক ক্লান্তি,
তোমার কপালে লেগে থাকুক আমার ঢেউয়ের চুম্বন।

কোনো কোনো দিন
নিজেকে আগ্নেয়গিরি মনে হয়, 
মনে হয় তপ্ত আগুনে তোমাকে পুড়িয়ে দিই, পুড়ে যাক ভয়, 
ছাই হয়ে যাক দূরত্ব, তাপের মধ্যেই 
জন্ম নিক, আরও গভীর 
কাছাকাছি আসা।

কোনো কোনো দিন
আমি আকাশ হয়ে তোমাকে ঢেকে রাখি মেঘে মেঘে, তুমি বৃষ্টি হয়ে নামো,
আমার বুক ভিজিয়ে দাও নিঃশব্দে।

কোনো কোনো দিন আমি রাত হই,
তুমি হও নক্ষত্র -
আমার অন্ধকারে তোমার আলোয় পথ খুঁজি।

হঠাৎ কোনোদিন গীতি কবিতা হয়ে যাই, মনে হয়- তুমি আমার সঞ্চারী
গানে গানে তোমার নাম জপি, তোমার নামটাই শুধু বলে যাই।

আসলে আমি প্রতিদিনই বদলে যাই, 
কখনো নদী, আগুন, আকাশ, রাত, গান -
যে রূপেই আসি না কেন,
শেষ পর্যন্ত আমি শুধু তোমার কাছেই
ফিরে আসতে চাই।


১৪.      নিঃশব্দ উপমা 


তুমি সন্ধ্যার কুসুমগন্ধ, কখনো পথের ধুলো,
কখনো বসন্তের ঝরা পাতা,
জীর্ণ হয়ে বসন্ত বাতাসেই উড়ে হারিয়ে যাও।

তুমি ভোরের শিশিরবিন্দু,
রোদের প্রথম ছোঁয়ায় অদৃশ্য,
তুমি নদীর বাঁক, ঢেউয়ে ভেঙে যায় 
নামহীন তটে।

তুমি জানালার ধারে ফেলে রাখা চিঠি,
যা পড়া হয়নি কখনো,
তুমি দীপশিখার কাঁপা আলো,
অল্প হাওয়াতেই নিভে যাওয়ার ভয়।

তুমি রাতের শেষ তারাটি,
ভোর নামলেই যে হারিয়ে যায় আকাশের গভীরে।
তুমি কাছে থেকেও দূর,
ধরা দিয়েও অধরা,
এই জীবনের সব অসম্পূর্ণতার ভেতর
তুমি আমার নিঃশব্দ উপমা।


১৫.      বাল্যকালের রাজ্য


কত কিছু ছিল বাল্যকালে, খেলার ঘরের মাটির চুলায় চড়ত মিছেই ভাত,
খেলার বউয়ের চোখে লাজ,
কাগজের ফুলে সাজত বাসররাত।

লাল ওড়নায় ঢেকে রাখা হাসির সংসার,
কাঠির পুতুলই ছিল সন্তান,
নাম দেওয়া হতো দুপুরের রোদে বসে,
কেউ রাজকন্যা, কেউবা যোদ্ধা।

ছেঁড়া চাদরেই রাজসিংহাসন,
ভাঙা বেঞ্চই সিংহদরবার,
আমরাই রাজা, আমরাই প্রজা,
আইন ছিল না,ছিল কেবল স্বপ্নের অধিকার।

এক মুহূর্তে বিয়ে, পরমুহূর্তে বিচ্ছেদ,
আবার সন্ধ্যায় মিলন,
কান্নাও ছিল অভিনয়, হাসিটাই ছিল আসল জীবন।

সেই বাল্যকালে সবকিছু ছিল, হারানোর ভয় ছিল না, কারণ জানতাম,
খেলা শেষ হলেই মা ডাকবে নাম ধরে,
আর সব দুঃখ মুঠোয় ভরে ঘরে ফেরা যাবে।

আজ বড় হয়ে বুঝি, সেই খেলাগুলোই ছিল
আমাদের সবচেয়ে সত্যি জীবন,
যেখানে ভালোবাসা শেখা হয়েছিল
কোনো শর্ত ছাড়াই।



১৬.      অরণ্যের মানচিত্র



কে বলবে এখানে একদিন অরণ্য ছিল,
পাখিরা ভোরে ডাক দিত পাতার ঘুম ভেঙে,
আজ কংক্রিটের দেয়ালে দেয়ালে
শুধু প্রতিধ্বনি, শুধু যন্ত্রের নিঃশ্বাস।

কে বলবে এখানে একদিন নদী ছিল,
জল বয়ে যেত নীল স্বপ্নের মতো,
আজ সেই পথে হাঁটে ধুলো,
বালুর চরে পড়ে থাকে শুকনো ঢেউয়ের স্মৃতি।

বৃক্ষরাজি কেটে আমরা বানিয়েছি নগর,
ছায়া কেটে বানিয়েছি আলো, পাতার সবুজ মুছে চিহ্ন এঁকেছি মানচিত্রে
এইখানে মানুষ থাকে।

রাত নামলে শহর ঘুমোয়,
কিন্তু মাটির গভীরে জেগে থাকে
একটি বন, একটি নদী, যাদের নাম আর কেউ ডাকে না।

তবু বাতাস হঠাৎ কাঁপে, কোনো পুরোনো পাতার শব্দে,
বালুর বুক ফুঁড়ে উঠে আসে জলের আকুলতা।
প্রকৃতি ভুলে যায় না কিছুই, আমরাই শুধু ভুলে যাই,
এই শহরের নীচে চাপা পড়ে আছে
একটি অরণ্য, একটি নদীর কান্না।


১৭.      আলো আঁধারে তুমি 


তুমি শান্ত সকালের প্রথম রোদ
আমি চোখ বন্ধ করে গায়ে মেখে নিই তোমার উষ্ণতা,
যেন দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি ধুয়ে যায় আলোয় আলোয়।

তুমি আমার শ্রান্ত দুপুর,
টুপটুপ করে ঝরে পড়ে হলুদ পাতা,
সময় তখন নিঃশব্দে হাঁটে,
ঘাম আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে।

তুমি বিকেলের শীর্ণা নদী,
কূলে বসে আমি শুনি তোমার জলের গান,
ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে লেখা থাকে
অবাক্ত কথার নীল চিঠি।

তুমি সন্ধ্যাতারা,
একাকী আকাশে জ্বলে থাকো অবিচল,
ইশারায় ডেকে বলো,
আমাকেও একদিন তারা হয়ে উঠতে।

তুমি রাতের অন্ধকার, 
যেখানে হারিয়ে গেলে আমি সারারাত তোমাকেই খুঁজি,
নীরবতার গভীরে জ্বালাই নামহীন প্রদীপ।

তুমি সময়, তুমি ঋতু,
তুমি আলো-ছায়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি অবিনাশী অনুভব,
যাকে হারালেই আমার সমস্ত কবিতা
হঠাৎ করে আরও দুঃখী হয়ে ওঠে।


১৮.     তুমি পাশে থাকলে 


তুমি যখন পাশে থাকো
ঘরের কোণে জমে থাকা ছায়াগুলোর
উপর হঠাৎ আলো এসে পড়ে,
নিঃসঙ্গতা তখন দৌড়ে পালায়
অচেনা কোনো দেশের দিকে।

বিষাদের নামে যে কবর খুঁড়েছিল মন,
সেখানে জন্মায় বুনোফুল,
একাকীত্ব মাথা নত করে
মাটির ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ে।

দুঃখগুলো চুপিচুপি বিদায় নেয়,
শেষবারের মতো ফিরে তাকায়
আর সুখ,
শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে
তোমার উপস্থিতির উষ্ণতায়।

তুমি পাশে থাকলে সময় থেমে যায় 
মায়ায়, আর আমি বিশ্বাস করি, 
এই পৃথিবী এখনো
ভালোবাসার জন্যই বেঁচে আছে।


১৯.     আলোর নিচে অদৃশ্য


আনন্দ সিনেমা হলের সামনে
মেয়েটি এসে দাঁড়ায়,
আলো ঝরে পড়ে তার শরীরে,
কিন্তু আলো পৌঁছায় না
ভেতরের গভীরতম অন্ধকারে।

সে সাজে, যেন সাজ নয়, একখণ্ড 
মুখোশ- যা পরে নিলে
কান্না চিনে ফেলা যায় না।

রাত তার কাছে সময় নয়,
রাত মানে দরকষাকষি,
কয়েকটি নোটের বিনিময়ে
স্বপ্নগুলো নীরবে হস্তান্তর।

তার শরীরের উপর দিয়ে
হেঁটে যায় অচেনা ছায়ারা,
কিন্তু আত্মাটা বসে থাকে
এক কোণে, চোখ বুঁজে।

ভোর আসে ধীরে,
যেন অপরাধবোধে ভেজা আলো,
মেকআপ গলে পড়ে
অবশ মুখের কিনারায়।

হাতে চালডাল, কাঁধে অদৃশ্য ঋণ
সে বাড়ি ফেরে,
নিজেকে রেখে আসে কোথাও।

আনন্দ সিনেমা হলের সামনে
হাসির পোস্টার কাঁপে বাতাসে,
আর তার জীবন, একটি করুণ দৃশ্য-
যার জন্য কোনো টিকিট 
কাটা হয় না।


২০.      সেই কবে একদিন 


সেই কবে একদিন আমার এলোমেলো জীবনে বুড়িগঙ্গার পাড়ে সন্ধ্যা নেমেছিল,
এক আলস্য দিনে বৃষ্টি নেমেছিল ঢের,
সেই কবে কোনদিন এক উন্মূল তরুণী আমার জন্য উন্মুখ হয়েছিল।

ভাঙা ঘড়ির কাঁটায় সময় থেমে গিয়েছিল,
চায়ের কাপে জমে ছিল দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়া,
ফুটপাতের আলোয় ছায়ারা প্রেম শিখেছিল,
সেই কবে শব্দহীন গানে কান পেতে ছিল নিঃসঙ্গতা।

ভিড়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে পাইনি কাউকেই ,
অচেনা কোনো শহর আমার নাম জানত,
সেই কবে পকেটে ছিল না কিছু, 
তবু স্বপ্ন ছিল অঢেল।

রাতের শেষে ভোরকে ডেকেছিলাম 
প্রাণ ভরে , সেই কবে একদিন জীবনটা এমনই বিপন্ন ছিল -
মধুময় স্মৃতিরা ঝরনা ধারার মতো বুকের ভেতর চুপচাপ বয়ে যেত স্মৃতি থেকে স্মৃতির দিকে।


২১.     ভাঙচুর করিনি 


তুমি চলে যাবার পর নিজেকে ভাঙচুর করিনি,
নষ্ট হতে দিইনি যকৃত, হৃদযন্ত্র, কণ্ঠনালি,
আমার প্রতিক্ষণ মনে হয়, এই হৃদয়ের ভিতর তুমি একদিন ছিলে।

তোমার শূন্যতায় আমি আগুন জ্বালাইনি,
চুপচাপ শিখেছি নিঃশ্বাসের শুদ্ধ ব্যাকরণ,
রাত নামলে বুকের ভেতর হাহাকার হয়,
একটি স্থির নীরবতায় শুয়ে থাকে
তোমার প্রতিচ্ছায়া এবং তোমার অস্তিত্ব। 

আমি ভেঙে পড়িনি আয়নার সামনে,
চুল এলোমেলো করে কাঁদিনি দিনভর,
বরং ক্ষতগুলোর উপর সময় দিয়ে 
পরিচর্যা করেছি।

কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে, জলের দাগের 
মতো দেয়ালে,
মুছতে গেলেই আরও স্পষ্ট হয়,
তবু ঘর ভেঙে ফেলিনি।

আজও বাঁচি, স্বাভাবিক মানুষের মতো,
হাসি, কাজ করি, পথ পার হই-
তবু গভীর রাতে,
হৃদয়ের এক কোণে আলো জ্বলে ওঠে-
সেখানে তুমি ছিলে,
এবং আশ্চর্যভাবে এখনো আছো।


২২.     তুমি ফিরে এসো

তুমি ফিরে এসো, তুমি প্রাণে এসো
এই শূন্য ঘরে বাতাস থেমে আছে -
তুমি এলে জানালা খুলে যাবে 
ক্লান্ত দুপুর মাথা রাখবে তোমার কাঁধে।

তুমি ফিরে এসো ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগাতে,
অভিমানের নীল দাগ ধুয়ে দিতে বৃষ্টিতে,
যে হৃদয় মরুভূমি হয়ে ছিল এতকাল,
সেখানে আবার নদী নামুক তোমার নামে।

তুমি প্রাণে এসো, শুধু পাশে নয়,
রক্তের ভেতর, বিশ্বাসের ভেতর,
যেন হারিয়ে গেলে আবারও খুঁজে পাই
নিজেকেই তোমার স্পর্শে, তোমার আলোয়।

তুমি ফিরে এসো, অচেনা কোনো বাতাসে,
ঠিক নাম ধরে নয়, ধীরে ধীরে হেঁটে এসে
সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বেলো নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে।


২৩.    প্রেম মৃত্যুঞ্জয়ী


মৃত্যু এসেছিল নিঃশব্দ পায়ে,
সব আলো নিভিয়ে দিয়ে
কিন্তু তোমার নামটুকু
অন্ধকারের বুকেও জ্বলে উঠল।

যে ঠোঁট আর কথা বলে না,
সেই নীরবতায় আজও
তোমার হাসির শব্দ লেগে থাকে
এক অনন্ত প্রতিধ্বনি।

দেহ মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে,
স্বপ্নগুলো ছাই হয়ে যায়,
তবু ভালোবাসা মরতে জানে না
সে কবর ভেঙে উঠে আসে।

যেখানে শেষ বলেই কিছু নেই,
সেখানেই তুমি আছো
মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে।

সব শেষের পরে একটাই সত্য
নিঃশ্বাসের মতো বেঁচে থাকে,
প্রেম বেঁচে রইল মৃত্যুতে।


২৪.      জন্মদিনে


আজ জন্মদিনে দাঁড়িয়ে বুঝি, অপূর্ণতাগুলিই আমার সবচেয়ে আপন স্মৃতি।
যা পাইনি, তা আজ আর শূন্য লাগে না;
সে-সব না-পাওয়া মিলেই তো আমাকে বানিয়েছে,
নীরব, ধৈর্যশীল, ভেতরে ভেতরে আলো জমিয়ে রাখা এক মানুষ।

যে কাজগুলো সম্পূর্ণ হল না,
তারা সময়ের কোণে কোণে ধূপের গন্ধ হয়ে রইল,
মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে-
বিকেলের রোদে, পুরোনো গান শুনতে শুনতে,
বা কোনো এক নির্জন রাতে নিজের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে।

আজকের দিনে তাই কোনো হিসেব নেই, কোনো অভিযোগও নেই,
শুধু কৃতজ্ঞতা,
এই অসমাপ্ত জীবনকে এতখানি অনুভব করার সুযোগ দেওয়ার জন্য।

আজ আর কিছু চাইবার নেই,
চাওয়াগুলো অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
হাত বাড়ালে ধরা পড়ে কেবল বাতাস,
আর বুকের ভেতর জমে থাকে
নামহীন কিছু শূন্যতা,
যাদের কোনো ভাষা নেই, কোনো দাবি নেই। এই অস্ত বেলায় এসে মনে হচ্ছে, একটু আফসোস তবু রয়ে গেল --

'জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা...।'

তারিখ - ১৮/১/২০২৬ ইং
ঢাকা।। 


২৫.       তুমি আছ বিষণ্নতায়



তুমি আছ বিষণ্নতায়,
ঠিক যেমন থাকে সন্ধ্যার শেষ আলো,
দিন ফুরোনোর পরও
আকাশ ছেড়ে যেতে পারে না।

তুমি আছ বিষণ্নতায়,
নির্জন জানালার পাশে বসে থাকা
এক কাপ ঠান্ডা চায়ের মতো
যাকে কেউ আর ছুঁতে চায় না,
তবু সে নিজের উষ্ণতা ভুলে যায়নি।

আমার দুঃখগুলো যখন
কথা বলতে পারে না,
তখন তোমার উপস্থিতি
একটা অদৃশ্য হাত হয়ে
ভেতরের ভাঙা শব্দগুলো জোড়া লাগায়।

তুমি আছ বিষণ্নতায়,
কান্না নও, আবার হাসিও নও,
শুধু বুকের গভীরে জমে থাকা
একটা দীর্ঘশ্বাস,
যার মানে বোঝে কেবল রাত।

আমি জানি,
সব আলোই উৎসবের জন্য নয়,
কিছু আলো থাকে
অন্ধকারের পাশে বসে থাকার জন্য।

আর সেই আলোর মতোই
তুমি আছ বিষণ্নতায়, নিঃশব্দ, গভীর,
অপরিহার্য।


২৬.      দুঃখ নিতে এসেছি 


দুঃখ নেবার জন্য তোমার কাছে এসেছি
সুখ তো বহুদিন নিজেই আমার কাছে আসে না,
হৃদয়ের ভাঙা ঘরে জমে থাকা নীরবতা
আজ তোমার চোখে রেখে হালকা হতে চাই।

আমি চাইনি সান্ত্বনার ভাষা,
চাইনি আশ্বাসের কৃত্রিম আলো
শুধু চাই, তুমি চুপ করে বসে থাকো,
যেন আমার দুঃখগুলো কথা বলার সাহস পায়।

এই বুকভরা দীর্ঘশ্বাস,
এই ক্লান্ত সন্ধ্যাগুলো
সব তোমার হাতে তুলে দিয়ে বলি,
একটু ধরে রাখো, ভেঙে পড়ছি আমি।

দুঃখ নেবার জন্য তোমার কাছে এসেছি,
ফেরার পথে যদি হালকা হয়ে যাই,
তবে জেনো, তুমি কিছু না বলেও
আমাকে বাঁচিয়ে দিলে।


২৭.       গভীর নিঃশ্বাসে


বাড়ির বাইরের আঙিনায় আমি দাঁড়িয়ে,
রাত গভীর, ঘুম আসে না চোখে,
ঘুমের ভেতরেও তোমার অনুপস্থিতি জেগে আছে বলে বাইরে এসেছি।

নিস্তব্ধতা আজ গান গাইছে,
শব্দহীন, অথচ ভারী,
তার সুরে সুরে হাঁটে আমার একাকীত্ব।

তারাভরা আকাশ মাথার ওপর,
কিন্তু প্রতিটি তারার আজ নির্বাক প্রশ্ন
তুমিও কি আমাকে খুঁজছ কোথাও?
আমি তাকাই অন্ধকারে,
তোমাকে খুঁজি বাতাসের দোলায়,
পাতার কাঁপুনিতে, রাত্রির দীর্ঘশ্বাসে।

কিন্তু তুমি নেই, না ঘুমে, না জাগরণে,
না নিস্তব্ধতার গভীরে,
না আকাশের ঝলমলে নীল রহস্যে।

তবু কী আশ্চর্য,
এই না-থাকাই যেন তোমার উপস্থিতি,
আমার চোখের ক্লান্তিতে,
বুকের গভীর নিঃশ্বাসে,
এই নিরুপায় ভালোবাসায়।



২৮.      তোমাকে দেবো



তোমাকে একটি সন্ধ্যামালতী ফুলের গাছ দেবো,
তুমি সেটি লাগাবে তোমার ঘরের কোণে, জানালার পাশে,
বিকেলের আলোয় তার সুবাস ভেসে আসবে।

তোমাকে রবি ঠাকুরের গীতবিতান উপহার দেবো, তুমি গান শিখবে,
গাইবে- এসো এসো আমার ঘরে এসো,
আর আমার নিঃশব্দের গানহীন দিনগুলো
হঠাৎ করে উৎসব হয়ে উঠবে।

তোমাকে একটি পাতার বাঁশি দেবো, নিশুতি রাতে কিংবা অলস দুপুরে
তুমি বাজাবে;
বাঁশির সুরে ঘুম ভাঙবে পাখিদের,
আমার হৃদয়ে নামবে নীরবতা।

তোমাকে নদীর কূলে একটি বাড়ি 
বানিয়ে দেবো,
ভরা বর্ষায় শুনবে স্রোতের ধ্বনি,
জলের ভাষায় লেখা থাকবে
আমাদের না-বলা কথাগুলো।

তোমাকে দেবো একটি কাঠের দোলনা,
বকুলগাছের ছায়ায় ঝুলবে,
দোল খেতে খেতে তুমি হাসবে,
আর সময় থমকে দাঁড়াবে
তোমার একফোঁটা হাসির কাছে।

তোমাকে দেবো একটি মাটির প্রদীপ,
ঝড়ের রাতে জ্বালাবে তুমি,
আলোয় আলোয় ভরে উঠবে ঘর,
অন্ধকার শিখবে হেরে যেতে।

তোমাকে দেবো একটি নীল আকাশ,
ছেঁড়া মেঘ থাকবে, দু-একটা তারা,
রাত জেগে তুমি গুনবে তারা,
আর আমি গুনবো তোমার নিঃশ্বাস।

তোমাকে দেবো আমার জীবন,
কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো দাবি ছাড়া,
তুমি যদি চাও থাকবে-
না চাইলে, এই দেওয়াটুকুই আমার 
গ্লানি হয়ে থাকবে।


২৯.       আলোর দিকে 


আমি যে ক্লান্ত আত্মা রূপের কাছে নয়,
রূপের ভেতর লুকোনো মমতার কাছে আশ্রয় চাই,
আমার অন্তর জুড়ে বিস্তৃত খরাতাপ,
তবু সে তাপ নিভুক অন্যের হাসির জলে,
অন্যের শান্ত সুখে।

আমি যে শান্তির নাম জানি, কিন্তু তার ঠিকানা 
ভুলে গেছি,
কোন্ দিগন্তে সে দাঁড়িয়ে,
কোন্ আকাশের নিচে তার নিঃশব্দ আলো নামে?

অন্ধকারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আমি তোমার কণ্ঠ খুঁজি,
যদি একটি শব্দ দাও, আমি পথ চিনে নেব,
বলো-  কোন পথে প্রাণ জেগে ওঠে?
কোন স্রোতে মানুষ মানুষের হাত ধরে হাঁটে?

যেখানে জীবন আর একা নয়,
স্বপ্ন সেখানে লজ্জা পায় না,
আর আগামী দিন ভয় নয়, বিশ্বাসের মিছিল 
হয়ে হৃদয়ের দিকে এগিয়ে আসে।



৩০.      এত ভালোবাসি 



কেমন করে যে তোমাকে এত ভালোবাসি
তা ভাষায় বলতে পারি না,
শুধু বুকের ভেতর এক গোপন ঘর জানে
যেখানে আলো ঢোকে না, বাতাসও নয়
সেখানে আমি তোমাকে লুকিয়ে রাখি
গোপন প্রার্থনার মতো।

তুমি একদিন ভেসে যাবে নদীর মতো,
নিজস্ব জলস্রোতে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব তীরে,
আমাদের চার চোখ মিলিয়ে
কতো কথা জন্ম নিয়েছিল
কতো স্বপ্ন, রাত্রি জাগা কতো আঁধার
আর ভোরের  প্রতিশ্রুতি।

সব কথা, সব স্বপ্ন
কি তবে এমনই হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে
একটি বিদায়ের উচ্চারণে?

তুমি চলে গেলেই কি ভালোবাসার মৃত্যু হবে? আমি জানি না মৃত্যু কী, 
জানি না বিচ্ছেদ কাকে বলে, 
আমি শুধু জানি, তুমি ছিলে বলেই আমার অন্তর্ আলোময়।

আমি তোমাকে কুড়িয়ে এনেছিলাম
আমারই দুঃখ-বেদনার উঠান থেকে,
এক মর্মরিত জীবনের কোণায় পড়ে থাকা
বস্তুবৃক্ষের ঝরা ফুলের মতো,
তবু সেই ঝরা ফুলেই আমার সমস্ত বসন্ত
নিঃশব্দে ফুটে উঠেছিল।

ভালোবাসা হারায় না, সে থেকে যায়, 
বুকের গভীরতায়, কোনো এক অদৃশ্য নদীর তলায় চিরদিনের মতো।


৩১.         যে জীবন চলে গেছে



জীবনের পথে পথে হারিয়েছি কত মুখ, 
কত নাম, কত অচেনা হয়ে যাওয়া 
আপন মানুষ।
তাদের অনেকেই আজ নেই 
নেই সন্ধ্যার চায়ের সময়ে... 

আহা! যদি আবার দেখা পেতাম
কোনো শীষ-ডাকা দোয়েলের ভোরে,
কুয়াশা মাখা মাঠের প্রান্তে,
যেখানে আলো  নামে ধীরে ধীরে,
অথবা আমলকী ঝাড়ের পাশে,
সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে
তাদের চোখে পড়ত স্নিগ্ধ হাসির রোদ।

কিংবা ছলাৎ ছলাৎ জলছবির নদীর কূলে,
বসে আছে কেউ
কথা নেই, তবু কত কথা জমে আছে
জলের ঢেউয়ের মতো বুকের ভিতর।

আমি কাছে গিয়ে কিছু বলতাম না,
শুধু বসে থাকতাম
সময়কে একটু থামিয়ে রাখার জন্য।

যে জীবন চলে গেছে,
সে জীবনের মানুষগুলো ফিরে আসে না,
তবু স্মৃতির ভেতর তারা হাঁটে,
ভোরের পাখির ডাকে, জীর্ণ পাতার মর্মরে
শীর্ণ নদীর দীর্ঘশ্বাসে।

এইভাবেই তারা বেঁচে থাকে, 
আমার পাওয়া  না-পাওয়ার  জীবন্ত
প্রার্থনা হয়ে।



৩২.      শীত ও আগুন 



গ্রীষ্মের গভীর রাতে একদিন 
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল,
চারপাশে তখন নিস্তব্ধতার ঘন ছায়া,
হিমেল কোনো পাহাড়ি রাজ্যে যেন,
আমার শরীর শীতে  কাঁপছে।

এত শীত যে, আমি স্ত্রীকে কম্পিত 
কণ্ঠে বললাম,“আমাকে জড়িয়ে ধরো,
দুই–তিনটা লেপ এনে দাও,
আমি খুব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি।”

তুমি কাঠের তোরঙ্গ খুলে লেপ নামালে দ্রুত,
আমাকে জড়িয়ে ধরলে আগুনের উষ্ণতায়
কপালে তোমার হাত- না, জ্বর নেই।
পায়ের তালু ছুঁয়ে দেখলে, হিম শীতল।
হাতের করতল পরখ করলে
তাও বরফের মতো হিম,
তোমার চোখে তখন এক অজানা ভয়,
নীরব প্রার্থনায় তুমি। 

আমি শুয়ে ভাবছিলাম, এই কি তবে
মৃত্যুর দরজার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা?
মৃত্যু কি এমনই হয়, নিঃশব্দ, শীতল,
শরীরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে
উষ্ণতা চুরি করে নেয়?

তুমি আমাকে জড়িয়ে রাখলে
আরও শক্ত করে কিছুক্ষণ, আমি বেঁচে রইলাম
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়।

সেই রাতে বুঝেছিলাম, মৃত্যু যদি শীতের হয়,
তবে কারোর  ভালোবাসা একটি চিরন্তন 
আগুন।


৩৩.      আমরা



আমরা এমনই করে কাছে আসি,
অচেনা বিকেলের মায়াবী আলোয়
একটু চুপচাপ একটু দ্বিধায়,
তবু হৃদয় জুড়ে যায় আকুল মমতায়।

আমরা এমনই করে ভালোবাসি,
বেশি কথা নয়, গভীর নীরবতায়
চোখের ভেতর কথা লুকিয়ে রেখে
ভরসা বুনি নিঃশব্দ সময়ের গাঁথায়।

আমরা এমনই করে হাত ধরি,
ভিড়ের মাঝে থাকে হারাবার ভয় 
কোনো অঙ্গীকারের কথা ছাড়াই
থাকি পাশে, থাকে থাকার দায়। 

আমরা এমনই করে বেঁচে থাকি
অল্প চাওয়ায়, দীর্ঘ অপেক্ষায়
ভালোবাসা যে ঢেউ নয়, নদী-
জানে সে, কেমন আপন হয়ে যায়।



৩৪.     অধরা রোদ্দুর



অজান্তে কোন ভোরের গন্ধে মনটা 
আজ আবার কেঁপে ওঠে,
হাওয়ায় ভেসে আসে অচেনা 
এক নাম—তোমারই।

দিগন্ত জুড়ে ধানের গন্ধ,সবুজ মাঠে 
ঝিলমিল আলো,
তবু বুকের গভীর কোথাও অকারণ 
এক আগুন জ্বালো।

চোখের কোণে জমে থাকা অব্যক্ত 
কোনো নদীর জল,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অভিমান 
ভরা নীরব ছল।

তুমি তো নেই তবু প্রতিটি শ্বাসে 
তোমার ছায়া পড়ে,
জীবনের প্রতিটি বাঁকে তোমার 
মুখই কথা বলে।

এ কোন প্রেম, যা পেতে নেই তবু হৃদয় 
ছাড়ে না তারে,
যে ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখে মৃত্যুর 
ভেতরেও সংসারে।

যদি আবার কোনো জন্মে এই মন 
খুঁজে পায় তোমায়,
তবে আর কাঁদবে না চোখ, ভালোবেসে 
ভরবে হৃদয়খানায়।



৩৫.        ঝাউপাতার খাতা



ক্লাসরুমের জানালায় এখনো কতো নাম
চকডাস্টে মুছে যায়
তবু আমার চোখে থেকে যায়
পুরোনো রোল নম্বরের মতো,
সেই দুপুরগুলো এখনো জানালার কাঁচে
জমে থাকে রোদ আর চকমাখা ধুলো। 

আমার স্কুল সহপাঠী ঝর্ণা
আমার প্রেমিকা হতে চেয়েছিল,
বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে রাখা
ভাঙা কলম আর ভাঁজ-করা স্বপ্ন,
খাতার শেষ পাতায় আঁকা হৃদয়ের পাশে
ঝর্ণার নামটা আজও ঝাপসা নয়।

মাজেদা, শিউলি, দোলা
আমাদের বেঞ্চের চার কোণে বসে
স্বপ্ন আঁকত অংক খাতার পাতায় পাতায় 
কে কার দিকে তাকায়
সেই নিয়ে কত চাপা হাসি, কত লুকোনো কাঁপুনি!

কেউই শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিরিতে বসতে 
পারেনি প্রিয় মানুষের সাথে-
ভেঙে গেছে শৈশবের কাঁচের ঘর।

দোলা একাত্তরের আগুনে পোড়া নাম,
ধর্ষিত শরীর নিয়ে
শিলিগুড়ির অচেনা রাস্তায় মিলিয়ে গেছে,
ওর চোখে আমি দেখেছিলাম
ইছামতীর নদীর মতো দীর্ঘ কান্না-
এখন হয়ত জলপাইগুড়ির তিস্তা নদীতে 
কান্না ঝরায়।

শিউলি বিয়ে করেছে এক স্কুল শিক্ষককে,
সাদা শাড়ির নিচে ঢেকে রেখেছে
সব না-বলা বসন্ত।

মাজেদা আটলান্টিকের ওপারে
ওর চিঠিতে এখন শুধু
সমুদ্রের লবণ আর দূরত্বের গন্ধ।

আর ঝর্ণা,
সে বিয়ে করল এক মাতালকে,
শুনেছি, ও এখন বদ্ধ পাগল,
চুল ধুলোর মতো জমে হয়েছে জট
পুরোনো সেই কালোকেশ আর নেই। 

ঝর্ণা একবার আমার কাছে থেকে
নোটখাতা নিয়েছিল
ফেরত দিতে গিয়ে ভেতরে রেখেছিল
একটি ঝাউপাতা,
সেই পাতা কবে জীর্ণ হয়ে গেছে,
তবু খাতার ভাঁজে আজও
ওর আঙুলের উষ্ণতা খুঁজে পাই।

বিকেলের ঘন্টা বাজার পর
যে পথটুকু একসাথে হেঁটেছিলাম,
সেই ধুলো-মাখা করিডোরে
এখনো ওর হাসির শব্দ জমে আছে।

শীর্ণতোয়া ইছামতীর নদীর ধারে বসে
ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প করতাম,
কে হবে ডাক্তার, কে কবি, কে বিপ্লবী
আর কে ভালোবাসবে কাকে
আজীবন।

এখন সন্ধ্যার বাতাসে
ওদের নামগুলো উড়ে আসে
ঝর্ণা, মাজেদা, শিউলি, দোলা,
চারটি ঋতুর মতো
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ব্যথা।

স্কুলের পুরোনো গেটে ঝুলে থাকা তালা
আমাদের মতোই বয়স নিয়েছে,
তবু খুললেই মনে হয়-
তোমরা ভেতরে অপেক্ষা করছ।

আমি একা বসে থাকি, 
পুরোনো খাতার  পাতায় ঝাউপাতার গন্ধে 
আদ্র সময় নিয়ে,
যেখানে প্রেম ছিল নিষ্পাপ,
আর ভবিষ্যৎ ছিল একটি খোলা জানালা-
যে জানালা দিয়ে এখনো বহু বছর 
আগের  মায়াবী বাতাস এসে অন্তরকে 
দোলা দেয়।



৩৬.       গোপন অলিন্দ 



সবার জীবনে একটি নিভৃত কক্ষ থাকে,
যেখানে আলো ঢোকে না,
শব্দ ফিরে আসে ক্লান্ত হয়ে।

সেখানে জমে থাকে পুরোনো নিঃশ্বাস,
অপূর্ণ কথার ধুলো,
আর ভাঙা সময়ের ছায়া।

নিঝুম রাত্রিতে দুপুরের মতো নেমে আসে জোৎস্না, অলিন্দের ফাঁক গলে
গায়ে লাগে শীতল স্মৃতি।

ঘুম ভাঙলে
সে বসে থাকে অন্ধকারের ধারে,
চেয়ে দেখে বহু বছর আগের
একটি নিভে আসা দীপ,
যার আলোতে ছিল একদিন বেঁচে থাকার অদম্য সাহস।

কখনও অন্ধকার তাকে ধীরে গ্রাস করে,
চোখের ভেতর ডুবে যায়
নামহীন সব মুখ।

না—এগুলো কোনো ভ্রান্তি নয়,
এগুলোই তার একান্ত সত্য, দূর অতীতের
অশ্রু-মাখা মায়া,
যা আজও প্রতিরাতে হৃদয়ের দরজায় 
এসে নিঃশব্দে কাঁদে।



৩৭.      সুজাতা সান্যাল



কালিগঙ্গার বাঁকে সেদিন সন্ধ্যায় উঠেছিল চাঁদ,
তারায় তারায় ভরে গিয়েছিল হেমন্তের নির্জন রাত।
রঙিন জোনাকীর মতো ব্রণে ভরা তার গাল,
‘ভালোবাসি’ কথাটি বলেনি সুজাতা সান্যাল।

সন্ধ্যার সন্ন্যাসীকে কেউ ভালোবাসে কি?
বুনো হাঁসদের কি থাকে কোনো ঘর, কোনো নীড় কি?
আমারও ঘর নেই, চুলো নেই, নেই কোনো চাল,
এই কথাটি জেনে গিয়েছিল সুজাতা সান্যাল।

কালিগঙ্গার জলে ভাসিয়েছিলাম ডিঙি নাও,
অন্ধকারে বলেছিলাম ওকে—এসো, প্রেম দাও।
গালভরা হাসিতে বলেছিল—‘দেখা হবে কাল’,
তারপর আর আসেনি সুজাতা সান্যাল।

কত রাত্রি পড়ে রইনু একা কালিগঙ্গা তীরে,
কৃষ্ণপক্ষের কত তারা ঝরে গেছে ধীরে ধীরে।
কত যে দুঃখ-বেদনায় কাটাইলাম এতকাল,
গোপন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে গেছে সুজাতা সান্যাল।

আজও নদীর জলে ভাসে তার ছায়ার আবছা আলো,
জোছনার ফাঁকে ফাঁকে রাত কখনো আঁধার কালো,
সময়ের ধুলোয় ঢেকে গেছে চেনা মুখের জাল,
তবু বুকের গভীরে বেঁচে আছে সুজাতা সান্যাল।


৩৮.     নদীর ধারে ভাঙা স্বপ্ন



কী যে এক স্বপ্ন ছিল
নদীর কাছে থাকবে বাড়ি,
নদীর কূলে করব বাস তুমি আর আমি,
সবই এখন স্বপ্ন ভাঙা কাঁচের টুকরো -
নদীর কূলে এখন নির্জন,
তুমিও নেই, আমিও নেই।

ভোরের কুয়াশায় ভিজে থাকা ঘাসে
আমাদের পায়ের ছাপ খুঁজে ফিরি
জোছনার আলোয় হাত ধরার কথা ছিল,
এখন শুধু ঢেউয়ের দীর্ঘশ্বাস।

যে জানালায় বসে আমরা দেখতাম
নৌকার আলো, সন্ধ্যার লণ্ঠন,
সেই জানালায় আজ ঝুলে থাকে
নিস্তব্ধতার ভারী পর্দা।

নদী এখনো বয়ে যায়,
কিন্তু তার জলে আর আমার মুখ নেই,
তোমার হাসির প্রতিবিম্ব নেই
শুধু ভাঙা আকাশের ছায়া।

চায়ের কাপে জমে থাকা ধোঁয়ার মতো
আমাদের কথা উড়ে যায়,
মনে পড়ে— থাকব এখানেই,
আর সেই কথাই আজ সবচেয়ে দূর।

রাতে যখন ঝিঁঝিঁ পোকার গান নামে,
আমি শুনি আমাদের অপূর্ণ গল্প,
চাঁদটা থেমে থাকে ওপারে
ডাকে, কিন্তু আমি আর যাই না।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আমি বলি,
স্বপ্নরা কি ফিরে আসে কখনও?
ঢেউ শুধু মাথা নেড়ে চলে যায়
নীরব, অব্যক্ত, দীর্ঘ।

এই কূলেই রেখে যাই
আমাদের অচেনা ভবিষ্যৎ,
ভাঙা স্বপ্নের ভেলায় ভাসিয়ে দিই
আমার সব মনখারাপ।



৩৯.      ভাঙনের নদী 



তুমি কী বুঝতে পারছ, এই চোখ কতটুকু কেঁদেছে
কতটুকু জল ফেলেছে,
ভেঙেছে নদীর পাড়ের মতো চোখের পাতা?

এই চোখের ভেতর এখনো জমে আছে
অপ্রকাশিত বৃষ্টির শব্দ,
রাতের অন্ধকারে  ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

আমি হাঁটি নির্জন পথে,
যেখানে প্রতিটি পা ফেলে শব্দহীন কাঁদে ছায়ারা, আর বাতাসে ঝুলে থাকে
পুরোনো নামের ধুলো।

কেউ জানে না,
আমার বুকের ভিতর কতখানি অভিমান জমে আছে, কতখানি প্রেম
অচেনা হয়ে গেছে নিজের কাছেই।

চাঁদের আলোও আজ আর ছুঁতে চায় না,
সে জানে এই মুখে অভ্যস্ত বিষাদের ছাপ,
রাতের মতো গভীর ক্ষত।

আমি কথা বলি না, তবু প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ভেসে ওঠে হারানোর গান,
কেউ শোনে না, শুধু আকাশ নুয়ে পড়ে
আমার নীরবতার ভারে।

এখন এই চোখ
নদীর মতো বয়ে যায় ভিতরের দিকে,
কেউ দেখে না, কেউ বোঝে না,
শুধু আমি জানি এই অশ্রুরও ক্লান্তি আছে,
এই ভাঙনেরও শেষ কোথাও নেই।



৪০.     কংস নদীর জল


দেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকে দুপুরের দীর্ঘশ্বাস
জানালায় ধুলো জমে থাকা আলো
কংস নদীর ঢেউয়ের মতো আর নড়ে না।

বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই
নেত্রকোনার সেই নিরিবিলি ঘাট,
ডায়েরীর পাতায় কুসুমের অক্ষর
হঠাৎ করেই বুকে নেমে আসে
ভাঙা শামুকের মতো বেদনায়।

'আমি তোমাকে ভালোবাসি'
এই তিনটি শব্দ আজও কাঁদে,
জলের বুকের মতো গভীর,
কিন্তু জল ছুঁতে গেলে হাতে আসে শুধু শূন্যতা।

তুমি বলেছিলে,
এই স্বপ্ন কেউ ভাঙতে পারবে না।
তবু দেখো, স্বপ্নের কাঁধে
সময়ের নখর বসে গেছে নিঃশব্দে।

আজ কংস নদী হয়তো বয়ে যায় আগের মতোই,
কিন্তু আমার ভেতর নদী থেমে আছে,
শুকনো পাথরের উপর ভেঙে পড়া
অদৃশ্য কান্নার শব্দে।



৪১.      মুক্তির গল্প 



মিলা একদিন বলেছিল,“আমাকে মুক্তি দাও,
আমাকে আর ধরে রেখো না,
মায়া কোরো না,আমাকে ঘৃণা দাও।”

আমি তো লিখি মানুষের মুক্তির গল্প,
রাত্রি জেগে জেগে অসীমের বুক চিরে খুঁজি
জীবনের জয়গান।
কিন্তু কখন যে কোনো কাহিনী
নিজের জীবনের হয়ে যায়, আমি নিজেও 
জানি না।

মিলা যখন এলো, তার অতীতের দরজায়
আমি কড়া নাড়িনি।
আজ যখন সে চলে যেতে চায়,
তাকেও বলিনি,“কোথায় যাবে তুমি?”
“কে তোমার ভালোবাসা?”
আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি,
নিজের বুকের খাঁচা ভেঙে, নিজের জীবন থেকেই।

এখন আমার ভেতরে
একটাই প্রতিধ্বনি  চিরদিনের বলে
এই জগতে কিছু নেই।
হাসি নেই,কান্না নেই, দুঃখ নেই, বেদনা নেই,
ঘৃণাও নয়,ভালোবাসাও নয়।
সবই কেবল ফুরিয়ে যাওয়ার নাম,
মুক্তির আরেকটি গল্প।



৪২.      বনকুঞ্জবন



এই বনকুঞ্জবন থেকে আমি একদিন চলে যাব সন্ধ্যার অতসী ঝাড়ে
তবু গুঞ্জন করে গান গাইবে জোনাকিরা।

সমুদ্রের বুকে আকাশ ছড়িয়ে দেবে লাল আভা,
সাঁজের সূর্য ডুবে যাবে অচেনা বিষাদের ভেতর।

এই পর্ণকুটিরে কে এসেছিল অবগুণ্ঠনে,
চকিত চোখে লাজুকতা
সন্ধ্যা তারার মতো কাঁপছিল।

কণ্ঠে নেই তার চন্দ্রহার, কর্ণে নেই কুসুম কলি,
বক্ষপথে নেমে গেছে গোলাপী জলের নদী।

সেই সমুদ্রের দিকে পাড়ে দাঁড়িয়ে খুঁজি
ঝিনুকের ভিতর মুক্তা,
কিন্তু মুক্তা নেই ঝিনুকেও, নেই সেই সমুদ্রেও, শুধু রয়ে যায় অফুরন্ত সন্ধ্যা।



৪৩.     অস্তসন্ধ্যার বীণা



তোমাদের জন্য লিখেছি বহু গল্প ও কবিতা, 
কাগজে কাগজে রেখে এসেছি আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ -
এখন বেলা শেষ হয়ে এসেছে,
ছায়ারা লম্বা, স্মৃতিরা নীরব।
ওগো বন্ধু আর চেও না,
আমার হৃদয়ের ঘরে আর শব্দ নেই,
শুধু কিছু নিঃশব্দ প্রার্থনা জমে আছে।

বীণায় অস্তমিত সন্ধ্যার সুর বাজছে,
শুনতে দাও সেই করুণ সুর
এই সুরের ভিতরে লুকিয়ে আছে
হারানো দিনের ধূলোয় আঁকা পদচিহ্ন।

আকাশ আজ কপালে জোছনার টিপ পরে,
তারার চোখে জল,
তারা জানে, বিদায় মানেই শেষ নয়,
এ শুধু আরেকটা নীল দরজা।
আমি সেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে
হাওয়ার সঙ্গে কথা বলি,
সে বলে— “থাকো, আরও একটু থাকো”
আর সময় চুপচাপ সরে যায়।

যদি কিছু দিতে না পারি,
তবু এই সুরটা নিও,
অস্তসন্ধ্যার বীণায় যে মায়া বাজে,
সেই মায়াতেই আমি রয়ে যাবো।


৪৪.      নির্জনতা


কেউ এসে দরজায় দাঁড়াবে
এমন কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না,
তবু বুকের ভেতর
একটা অকারণ অপেক্ষা
দিনভর কাঁপতে থাকে।

হাওয়ার শব্দেও চমকে উঠি,
মনে হয় এই বুঝি কেউ ডাকল,
ছায়ার নড়াচড়াতেও
চোখ চলে যায় জানালার দিকে,
কিন্তু ফিরে আসে শুধু
শূন্যতার প্রতিচ্ছবি।

রাস্তাগুলো আজ খুব চুপ,
দেয়ালের গায়ে জমে আছে
পুরনো সন্ধ্যার ছায়া,
ঘড়ির কাঁটাও যেন
কারো জন্য থেমে আছে
অথচ কেউ নেই।

হঠাৎ মনে হয় এই একাকিত্বই বুঝি
আমার নিত্যসঙ্গী,
যাকে আমি নাম দিই অভ্যাস,
যার অন্য নাম নির্জনতা।


৪৫.      আক্ষেপ 


কোনো এক চন্দ্রালোকিত রাত্রিতে
আকাশ থেকে নাকি-
ঘরের চালের উপর টুপটাপ করে
ঝরে পড়বে সাদা মুক্তোর মতো জোছনা,
আমি সেই মুক্তাঝরা রোশনির আলো দেখব না।

কোনো এক বর্ষার দিনে
পৃথিবীর সমস্ত কদমফুল
প্রেয়সীদের খোঁপায় ফুটে থাকবে,
খোঁপার সেই সুবাস, সেই শোভা
আমার চোখ ছুঁয়ে যাবে না।

কোনো এক শীতের রাতে
রাতভর শিশির ঝরবে
বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের সুরের মতো,
সে-সুরে ভিজে যাবে পৃথিবী,
আমার কানে সে সুর ধরা দেবে না।

কোনো এক শরতে
যমুনার চরে কাশফুল এমনভাবে ফুটবে
যেন আকাশ আর নদী
একই শ্বেত রঙে মিশে গেছে
সে শুভ্র বিস্তার আমার দেখা হবে না।

নিঝুম সন্ধ্যার শেষে রাত্রি নামবে চরাচরে,
বেতস লতার ঝাড়ে লক্ষ লক্ষ জোনাকি জ্বলে উঠবে,
নীল আলোয় ভরে যাবে লোকালয়,
আমি সেই নীল জনপদে হাঁটব না।

এক বসন্তদিনে শিমুল-পলাশের বনে
লাল ফুলকির মতো আগুন জ্বলবে,
আকাশ জুড়ে খঞ্জনা পাখির গান,
সে-মুখর সুর আমার শোনা হবে না।

এক মেঘ–বৃষ্টি–রোদ্রের দিনে
হঠাৎ ময়ূরাক্ষীর মতো রুপোলি জল
ঝরে পড়বে উঠানের উপর,
ভিজবে নবীন যুগলেরা,
আমার শরীর সে-জলে শীতল হবে না।

এক হেমন্তের সোনালি ভোরে পাখিরা অলিন্দে বসে ডাকবে, ভৈরবী সুর বাজবে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় -
চায়ের কাপে উঠবে কুয়াশার ধোঁয়া,
আমি সেই ভোরে জাগব না।

কোনো এক মায়াময় প্রদীপজ্বলা সন্ধ্যায়
কারও চোখে আমার নাম ঝলমল করবে,  আঁখিকোণে জল টলমল করবে -
ভালোবাসা চেয়ে রবে নীরবে,
আমি তার দিকে তাকাতে পারব না।

ফাগুন রাতে  আনমনা হয়ে 
কেউ আমার পুরোনো চিঠি খুলে পড়বে,
পড়তে পড়তে চিঠির শব্দ ভিজে
অশ্রু ললাটগামী হবে -
আমি সেই কান্না মুছতে পারব না।

আমি থাকব না, আমার স্বপ্ন থাকবে না,
এই রূপ, রং, সৌন্দর্য, মায়া 
কিছুই আর ছোঁবে না আমাকে-
তবু আমার আক্ষেপগুলো সকরুণ 
দীর্ঘশ্বাস হয়ে পৃথিবীর বুকের উপর 
পড়ে থাকবে।


৪৬.     চলে গেল নীরবে 


চলে গেল সে নীরবে,
যাবার বেলায় সে বলে গেল না-
'যাচ্ছি, দুচোখ ভরে দেখে নাও।'

তার পায়ের শব্দ
রয়ে গেলো আমার উঠোনে 
হাওয়ার গায়ে লেগে থাকা
অদৃশ্য কাঁপনের মতো।

ঘরে তখনো তার ছায়া
আলনায় কাপড় সাজানো, ভাঙা বিকেলের 
আলোয়  সে বসে আছে।

আমি জিজ্ঞেস করিনি, কেন এই চলে যাওয়া,
কেন চোখে কোনো অশ্রুর দাগ নেই?
বিদায় কি এমনই হয়-
অচেনা, অদৃশ্য, হঠাৎ?

সে চলে গেছে,
কিন্তু তার না-বলা কথারা আমার ভেতর
দিনরাত দরজা খোলে,
এখন প্রতিটি সন্ধ্যা তার নাম ধরে ডাকে,
আর আমি শিখে নিচ্ছি-
যে চলে যায়, সে কখনো পুরোপুরি যায় না।



৪৭.      একবার যদি বলতে


একবার যদি বলতে- ভালোবাসি তোমাকে,
এই কথাটুকু বললেই ধর্মগ্রন্থের বাক্য
কী বদলে যেত,
নাকি আকাশের নীল রঙ হয়ে যেত কালো ধূসর!

একবার যদি বলতে-
তোমার চোখের ভেতর আমি ঘর বাঁধতে চাই,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত শীত গলে যাক।

কী এমন অপরাধ ছিল এতে, বলো?
ফুল কি বসন্তকে দোষী করে,
নদী কি সাগরের দিকে যেতে ভয় পায়?
তবু আমরা দাঁড়িয়ে থাকি
শব্দের কাঁটাতারের এপারে-ওপারে।

আমি জানি,
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
আমার ভেতরে আলো জ্বলে ওঠে,
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো নয়,
বরং পূর্ণিমার মতো শান্ত, দীপ্ত।

একবার যদি বলতে-
এই জীবনের ক্লান্ত পথে
তোমার হাতটাই আমার ভরসা,
তোমার কাঁধেই রেখে দিতে চাই
আমার সকল অজানা দুঃখ।

তাতে কি আকাশ ভেঙে পড়ত?
নাকি পৃথিবী থেমে যেত ঘূর্ণনে?
নাকি কেবলই আমাদের বুকের ভেতর
একটু বেশি করে বাঁচত প্রেম!



৪৮.      বাঁশিওয়ালা



ছেলেবেলায় এক আম্রমুকুলের ফাগুন দিনে
এক বাঁশিওয়ালা এসেছিল আমাদের পাড়ায়
কাবুলিওয়ালার মতো পরণে পোশাক,
নজরুলের মতো বাবরি চুল,
চোখে দূরযাত্রার ধুলো, ঠোঁটে রোদের রেশ।

তার ঝাঁপিতে ছিল রংবেরঙের বাঁশি,
একেকটা বের করত
আর আকাশের রঙ বদলে যেত,
কখনও মাঠে ছুটত হাওয়ার দল,
কখনও নদী থমকে দাঁড়াত শুনতে,
কখনও মায়ের চোখে জমে উঠত
অচেনা কোনো পুরোনো গান।

আমরা তখন ছোট,
মুঠোয় ধরা কয়েকটা পয়সা,
চোখ ভরা বিস্ময়,
আর হৃদয়ে অজানা এক দীর্ঘ পথ।

বাঁশির সুরে গলে যেত দুপুর,
ছায়া নেমে আসত আমাদের কাঁধে,
সে চলে গেলে,
আম্রমুকুলের গন্ধও কেমন যেন ফিকে হয়ে যেত,
রোদে পুড়ে যাওয়া বিকেলগুলো
আর ফিরে পেত না সেই সুরের ডাক।

আজও হঠাৎ কোনো বাতাসে
ভেসে আসে তার সেই বাঁশির রেশ
আমি থমকে দাঁড়াই, 
ছেলেবেলার উঠোনে ফিরে যাই,
এক বাঁশিওয়ালা বলেছিল- বাঁশি বাজাও,  হারানো গান বাঁশির সুরে ফিরে আসে।



৪৯.     জ্যোৎস্না-ভেজা মহুয়া বন

দূরন্ত চাঁদের রাত্রিতে
আমাদের অন্তরে আনন্দের হিল্লোল 
বহিয়া যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি-
জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে
চলে যাই মহুয়া বনে,
যেখানে রাত ভালোবাসার গন্ধে 
নেশাগ্রস্ত।

পাতার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো
তোমার মুখে ছায়া এঁকে দেয়,
চুলে জড়িয়ে থাকে বাতাসের কোমল গান,
যেখানে আমি বারবার হারিয়ে যেতে চাই।

মহুয়ার সুবাসে মিশে থাকে
আমাদের অচেনা শিহরণ,
হৃদয় ধীরে ধীরে শেখে নাম না জানা এক প্রার্থনা,
ভালোবাসা মানে জ্যোৎস্নাতলায় হাঁটা,
এই স্পর্শহীন ছোঁয়া,
এই চুপচাপ পাশে থাকা।

চাঁদের আলোয় আমাদের ছায়া
এক হয়ে যায় মাটির ওপর,
কথাহীন দু’টি হৃদয় একই সুরে কাঁপে,
এই রাত জানে-
আমরা কেউ কাউকে ধরে রাখি না,
কেবল হারিয়ে যাই  জ্যোৎস্না-ভেজা 
মহুয়া বনে।


৫০.     দোলনচাঁপার ঘ্রাণ


কতো দোলনচাঁপা ফুটে ঝরে গেল,
কতো রোদ্দুর ছায়ায় ঢেকে গেল-
সন্ধ্যার নির্জনতায় কোনো দোলনচাঁপা-ই
বলল না- ভালোবাসি।

যদি বলত,
আমিও তোমার খোঁপায় গুঁজিয়ে দিতাম 
একটি সুগন্ধী ফুল 
আর আবেশ কণ্ঠে বলতাম— ভালোবাসি।

শিউলির মতো কোমল হয়ে যেত মন,
চাঁদের আলোয় ভিজে যেত প্রেম 
দু’চোখে জমে থাকা অজস্র কথা
শব্দস্বরে বলত -  ভালোবাসি।

প্রতিটি না-বলা বাক্যও বুকের ভেতর
আগুনের মতো জ্বলে ওঠে-
প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি খুঁজি তোমাকে,
যেন বাতাসও তোমার নাম যপে।

পৃথিবীর কোলাহলে হারিয়ে যায় কতো ফুল 
তুবুও একদিন ঠিক ফুল হয়ে ফুটবে
ভালোবাসা, তার রং হবে দোলনচাঁপার 
মতো শুভ্র।

কোনো এক সন্ধ্যায় যদি তুমি হঠাৎ 
বলে ওঠো- 'ভালোবাসি'
আমি তখন আকাশ ভরে হাসব,
আর সব নক্ষত্রদের চিৎকার করে শোনাব,
আমিও তোমাকে ভালোবাসি।