রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

দাঁড়াও সময় ( কাব্যগ্রন্থ )


দাঁড়াও সময়  ( কাব্যগ্রন্থ )        

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর -২০২৫ ইং




উৎসর্গ -

মধুমতী–চন্দনা–বারাশিয়ার পলিমাটির
অববাহিকা থেকে আমার জীবনে এসে 
বন্ধুত্বের আলো জ্বেলেছিল  দুই তরুণ— 
নেয়ামুল বারী ও সিদ্দিকুজ্জামান বাহার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোতে
সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে গভীর মানবিকতায়
ওরা আমায় বেঁধে রেখেছিল। 

আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকা
সেই সহপাঠী দুই প্রিয়বন্ধুকেই
এই গ্রন্থটি গভীর মমতায় উৎসর্গ করলাম।



১.        লুকানো প্রেমপত্র 


চলে যাব সব ফেলে একদিন,
এই অবগুণ্ঠিত নীলাকাশের ঢেকে-রাখা স্বপ্নগুলোকে
শ্রাবণদুপুরের নোনা ভেজা হাওয়ার হাতে দিয়ে।
জলে-ভরা টইটম্বুর নদীর কাছে বলব—
"আমার না-বলা কথাগুলো বয়ে নিও ধীরে ধীরে,
যেদিকে শেষ বিকেলের রোদ সরে যায়।"

স্মৃতির বসতবাড়ির উঠোনে
ঝরে পড়বে কদম্বের সুবাসভরা নিঃশ্বাস,
খোলা দরজার ফাঁকে তুমি হয়তো
পুরোনো দিনের একটি হাসি রেখে যাবে।
আমি রেখে যাব শুধু লুকিয়ে রাখা
জীর্ণ প্রেমপত্রের হলদে পাতাগুলো—
তোমার নামের আলোয় ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষর।

আর রেখে যাব তোমাকে দেওয়া নাকফুল—
তার ক্ষুদ্র রূপোলি বৃত্তে জড়িয়ে আছে
সংকোচ, স্পর্শ, অচিন হাহাকার,
আর সেই প্রথম দিকের কম্পমান ভালোবাসা।

তারপর হাঁটব অচেনা পথের দিকে—
যেখানে আমার থাকবে না আমি,
থাকবে শুধু তোমাকে ভাবার
একটুখানি নীরব অনন্তকাল।


২.       অনন্ত বিচ্ছেদের আগুন

ভালোবেসে কাছে আসতে পারোনি যখন,
তখন থাক— দূরত্বই হোক চূড়ান্ত প্রমাণ।
যে পথে হাঁটেনি তোমার পদধ্বনি,
সেই পথে আজ নিঃসঙ্গতারই শপথ ধ্বনি।

বিচ্ছেদই যদি হয় অনন্তের লেখা,
তবে সেই লেখায় আমি হবো কেবল একা।
রোগে শোকে দগ্ধ হবে এই দেহখানি,
তবু রাখব না আর কোনো দায় তোমার জানি।

স্মৃতিগুলো জ্বলে যাবে ছাই হয়ে শেষে,
পোড়া পাতার মতো ঝরে পড়বে অবশেষে।
শুধু রাতঘুমে মাঝে মাঝে আসবে তুমি—
ধোঁয়া হয়ে, স্বপ্ন হয়ে, নিভে যাওয়া আলোকবিন্দু কোনো ভ্রমি।

তবু থাক— এ যন্ত্রণা আমিই বহন করি,
ভালোবেসে কাছে আসতে না পারার এ-ই মর্মপথ ভরি।
বিচ্ছেদের আগুন যদি অনন্তই হয়,
আমি তাতে হেঁটে যাব— নীরব, নির্বাক, নির্নয়।


৩.       মায়ার নদী


নদীর মতো তুমি বয়ে যাও নিঃশব্দ ধারায়,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি পাথর—নিজেকে লুকিয়ে রাখি।
সন্ধ্যার মতো তুমি মিশে যাও অচেনা আলোয়,
আমি অস্থির হাওয়ার মতো আড়মোড়া ভেঙে ডাকি।

নির্জনতার বুক জুড়ে তোমার পদচিহ্ন পড়ে,
আমি শুনি দূরের কোনো হারানো বাঁশির সুর।
অন্ধকারের মতো তুমি ঢেকে দাও সব গোপন,
আমার ভেতর দপদপ করে ওঠে আগুনের নীল নূপুর।

কোথায় যাও তুমি—কলেবরহীন ধোঁয়ার মতো?
কোথায় হারাও তুমি—স্বপ্নের ভোরের নরম আয়েশে?
আমি শুধু জানি—মায়া জড়িয়ে তুমি ফিরবে আবার,
হৃদয়ের ভেজা জানালায় বৃষ্টির মতো এসে।


৪.       নিষ্কলুষ হাতের স্বপ্ন


গতরাতের নিস্তব্ধতায়
হঠাৎই ঘুম ভেঙে দেখি—
তোমার নিষ্কলুষ একজোড়া হাত
নরম বাতাসের মতো
আমার বুক ছুঁয়ে আছে।

এটাই তোমার গুপ্ত বার্তা,
এটাই তোমার অস্তিত্বের সতর্ক ছোঁয়া—
যেন ভুলে না যাই
তোমার নিকটতার আলোয় আমি জন্মাই প্রতিদিন।

কোনোদিন, কোনো বিদায়ের ক্ষণে
যদি তোমার দুই হাত
আমার কাছে পৌঁছাতে না পারে আর,
যদি স্পর্শের সেতুটি ভেঙে যায়—

তবে তুমি নিঃশব্দে দারজা লাগিয়ে
দূরে চলে যেয়ো,
আমার অশ্রুর ভেজা আয়নায়
তোমার মুখের কোনো ছায়া
ফেলে না গিয়ে…

কারণ ছায়া থাকলে
আমি আবারও তোমাকে ডাকব,
আবারও ভুলব না
তোমার হাতের সেই নিষ্কলুষ উষ্ণতা।


৫.       হারানো আলো


ভীষণ ক্লান্তি হৃদয়ে আমার,
আত্মাও ক্ষীণ— যেন নিভু-নিভু প্রদীপ,
শীতল বাতাসে দুলে ওঠে শুধু
অপ্রকাশিত কোনো দুঃখের আলো নিয়ে।

শুক্লা যামিনীতে যদি তুমি আসো,
দেখতে পাবে— আমি আর আগের মতো নই,
স্মৃতির নদী শুকিয়ে এসেছে অনেকটা,
নৌকার দড়িতে জড়ানো আছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

দূরে কোথাও হাস্নাহেনারা ফুটে আছে,
তাদের গন্ধে রাতের আকাশ থমকে থাকে—
কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকি চাঁদের নিচে
একটি ভাঙা তটরেখার মতো নির্জন।

তুমি এলে হয়তো বাতাস জুড়ে
চুপিসারে বেজে উঠবে কোনো পুরোনো সুর,
যেন খোলা জানালায় ঢুকে
কিশোরী বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়া।

তবু জানো—
আমার ভিতরের অনল এখন অল্প,
কেবল তোমার একটি স্পর্শ
আবার জ্বালাতে পারে পুরোনো নক্ষত্র,
আবার ফিরিয়ে দিতে পারে
হারানো আলো, হারানো আমাকে।


৬.        দাঁড়িয়ে আছো


তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার চোখের পাতার খুব কাছেই—

যেন অতি সতর্ক ভোরের আলো, ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে নিস্তব্ধতার দরজা।
আমি তাকালেই দেখি, তোমার চুলে আমার দৃষ্টির ছায়া লেগে আছে;
যেন দু’জনের মাঝখানে বাতাসও আর পথ খুঁজে পায় না।

তোমার চোখের উপর তুমি রেখে দিলে তোমারই আরেক জোড়া চোখ—
এমন গভীর, এমন স্থির, এমন অনুচ্চার সৌন্দর্যে ভরা
যে সেখানে কোনো শোক নেই, কোনো বেদনার কালো ছায়া নেই,
তবুও অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ কাঁপন থরে থরে জ্বলে ওঠে।

সেই চোখের অভ্যন্তরে আমার ভালোবাসা জেগে আছে—
নিভে না যাওয়া প্রদীপের মতো,
নান্দনিক কোনো নক্ষত্রের মতো,
যে আলো নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে তোমার শিরায়, আমার নিশ্বাসে।

তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছো,
চোখের পাতার কিনারা ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের মতো,
একটি অনন্ত গদ্যকবিতা হয়ে—
যার প্রতিটি বাক্য আমি স্পর্শ করতে চাই,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতে চাই,
বারবার, বারবার, যতদিন চোখে আলো থাকে।


৭.         ফেরা 


এক অস্তরাগের সন্ধ্যাবেলায়, খুব কাছে ঝুঁকে সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ নিয়েছিলাম—

হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিল সেই সুবাস।

তারপর কত সন্ধ্যা অন্ধকারে ডুবে গেল,

আকাশের রক্তিম রং শুকিয়ে গেল বাতাসে,

তবু আর কোনো সন্ধ্যা-মালতীর গন্ধ

আমার নাকে এসে লাগেনি,

যেন সেই প্রথম সন্ধ্যাই শেষ সন্ধ্যা হয়ে রইল।

আরেকদিন চন্দ্রালোকভরা এক রাত্রি-দুপুরে

জোছনা-ভেজা কামিনীর গন্ধ গায়ে মেখেছিলাম—

সেই সুবাস যেন সাদা আলো ম্লান দুঃখ,

যেন কারও নরম নিঃশ্বাস এসে গাল ছুঁয়ে যায়।

তারপর কত জোছনা-তৃষ্ণার রাত নিঃশব্দ সরে গেল,

কামিনী আর তার স্নিগ্ধতা বিলিয়ে দেয়নি, দূরের কোনো ঘরের আঙিনায় হয়তো সে এখনও ফোটে, এখনও গন্ধ বিলায়।

তারও পরে এক অষ্টাদশীর মাথা ভরা কালো কুন্তলের গন্ধ নিয়েছিলাম, 

আর এক হেমন্ত-গোধূলির ধূসর মায়ায়

কুড়ি বছরের এক রমণীর বুকের উষ্ণতা

আমাকে  আত্মহারা করেছিল-

অষ্টাদশীর চুলের সেই গন্ধ আর রমণীর বুকের গন্ধে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি,

হয়তো ভালোবাসা এই রকমই হয়।

এইসব সুবাসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে

একদিন পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম,

চেনা রাস্তা, চেনা মানুষ, চেনা ঠিকানাগুলো

হঠাৎ এক অচিন শূন্যতায় মিলিয়ে গেল।

ফেরার পথ জানতাম না,

তবু পথিকের মতো ক্লান্ত চোখে

পথের উপর বসে থেকেছি বহুদিন-

বাড়ি ফিরিনি, কেউ ডাকেনি।

আর একদিন হঠাৎ  মানিব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছিলাম—

সেই ব্যাগে ছিল প্রেমিকার পুরোনো চিঠি,

যেখানে মলিন অক্ষরে লেখা ছিল

আমার জন্য তার অপেক্ষার কথা , তার একান্ততা, তার বিরহব্যথা।

ব্যাগ হারানোর কথা শুনে সে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল চিরতরে।

তার সেই বিদায়বেলা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শোকসংগীত।

এখন প্রায়ই দেখি—পাতা ঝরে, আলো নিভে যায়, কোথায় অগোচরে সন্ধ্যা-মালতী ফোটে,

কোথায় বর্ষার রাতের গভীরে কামিনী তার গন্ধ বিলায়; অষ্টাদশীর সেই মেয়েটি জানিনা কার ঘরের বউ,

আর সেই কুড়ি বছরের রমণী  চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে তার বিগত যৌবনার গল্প বলে ,

আমি শুধু জানি, কত অপেক্ষার মৃত্যু হলো, পথ চেয়ে চেয়ে কত বসন্ত হারিয়ে গেল,

কিন্তু যাদের জন্য এ নীরব প্রতীক্ষা—

সেইসব অভিমানীরা আর কোনো পথ দিয়েই ফিরে এলো না,

কোনোদিন হয়তো ফিরবেও না আর।


৮.        পদচিহ্নের অনন্তকাল


তোমার অস্তিত্বে আমার ভালোবাসার সুবাস লাগুক,
যেন ভোরের শিশিরে নুয়ে থাকা বকুলপাতায়
অকারণ স্পর্শ নামে মৃদু স্নেহে।

তোমার পায়ের পাতার ধুলোয় থাকুক আমাদের পথচলার স্মৃতি—
যে পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে
আমরা খুঁজেছিলাম একে অপরের গভীরতম নীরবতা।

আমি চাই, আমার মমতার কোমল ছোঁয়া
তোমার দ্রোহের আগুনে শীতল হোক,
ঘৃণার কাঁটাগুলো ভিজে উঠুক স্নিগ্ধতায়—
যেন প্রেম নিজেই এসে তোমার হৃদয়ে বৃষ্টি হয়ে নামে।

আমার সমস্ত গীতিকবিতা যার নাম ধরে শ্বাস নেয়,
সেই তুমি—
আমার প্রেমের ছায়ায়, আলোয়, বর্ণে
নিতান্তই পুষ্পিত হও, পল্লবিত হও
অদ্ভুত অনন্ত কোমলতায়।

এভাবেই তুমি স্পর্শ করো আমার সমস্ত অস্তিত্ব—
প্রেমের এক গোপন নির্দেশে,
যেন জন্মান্তরে লেখা থাকে আমাদের মিলনরেখা।

আমরা একদিন থাকব না,
কিন্তু রবে ধুলোমাখা সেই পথ,
সন্ধ্যাবেলার বাতাস,
আর পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা
আমাদের গভীর, অমোচনীয় পদচিহ্ন—
অনন্তকাল।


৯.       ছায়াপথে দেখা


যে দিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে—
তার তো আর বেশি দেরি নেই,
হয়তো এই গোধূলির পরেই,
হয়তো পরের কোনো নক্ষত্রবৃষ্টির রাতে।

তোমার পায়ের ধুলো ঝরে পড়বে
দিগন্তের নীল-অন্ধকারে,
আর আমি দূর কোনো নীহারিকার সিঁড়ি বেয়ে
তোমার দিকে আসব নীরবে, নিঃশব্দে—
যেন আলো ফেরার আগে প্রথম বাতাসের স্পর্শ।

সেই অনুপম মুহূর্তে
তারারা থেমে যাবে কক্ষপথ ভুলে,
গ্রহেরা শোনবে আমাদের পদধ্বনি,
গ্যালাক্সির বুক জুড়ে জ্বলে উঠবে
অপরিচিত এক প্রেমের কম্পন।

তোমার চোখে যখন ছায়াপথের ধুলো লেগে ঝলমল করবে,
আমি চিনে নেব সেই পুরোনো আলো—
যা যুগ-যুগান্ত ধরে আমাকে ডেকে এসেছে।

যেদিন দেখা হবে,
সেদিন সব অভিমান, সব দূরত্ব,
সব না-বলা কথারা ভেসে যাবে
তারার নৌকোয় ভর করে—
শুধু আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে থাকব
অনন্তের দরোজায়,
একটি মহাজাগতিক প্রেমের প্রথম সাক্ষ্য হয়ে।

ছায়াপথের সেই দিন—
হয়তো দেরি নেই,
হয়তো এখনই নেমে আসছে
আমাদের দু’জনের পথের দিকে
একটি আলো-জ্যোৎস্না ভেজা দিগন্ত।


১০.       নিষিদ্ধ উষ্ণ রাত


নীল অন্ধকারে গোপন আলো জ্বেলে
তারা এগিয়েছিল দু’জন—
না জাত, না ধর্ম, না বয়সের কোনো সীমানা
তাদের থামাতে পারেনি।

এক-একটি দাহনময় শ্বাস
জ্বেলে তুলছিল বৈশাখের উত্তাপ—
যেন ঝড় এসে দু’টি দেহের ভেতর
খুঁজে পাচ্ছে তার অনিঃশেষ ঘর।

তাদের চোখে ছিল আগুনের ঢেউ,
হৃদয়ের ভেতর দীপ্ত স্রোত—
স্পন্দনের পর স্পন্দন
কাঁপছিল দিগন্তের মতো।

ঠোঁটের কিনারায় তখন
অতল নিষিদ্ধতার স্বাদ,
হেমলকের বিষও যেন
মধুর হয়ে উঠতে চাইত
সেই মিলনের উষ্ণ রাতে।

তারা জানত—
এ চুম্বন কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নয়,
এ এক গভীর, আদিম, অচেনা ভাষা
যেখানে শরীর শুধু অঙ্গীকার,
আর কামনা—ফেনিয়ে ওঠা নদীর জল।

তবু তারা থামেনি—
তাদের ঠোঁটের নিবিড় আলিঙ্গনে
রাতের আকাশ থমকে দাঁড়িয়েছিল,
এবং পৃথিবী বুঝেছিল—
নিষেধও কখনো কখনো
তৃপ্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্ত।


১১.       জাদুকরী সন্ধ্যার রোমাঞ্চ


এক জাদুকরী সন্ধ্যায়
সূর্য যখন রক্তিম আগুন হয়ে
দিগন্তের নীরবতায় ডুবে যাচ্ছিল,
বালুকাময় তীরে দাঁড়িয়ে তাঁরা—
দু’টি ছায়া, দু’টি স্পন্দন,
ঢেউ এসে আলতো চুমু দিচ্ছিল তাঁদের পায়ে,
যেন সমুদ্র নিজেই প্রেমের সাক্ষী।

বাতাসে লোনা গন্ধে
মিশে ছিল এক অচেনা উত্তাপ,
চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল মুখ,
আর উপরে, নীল অন্ধকারে
তারারা জ্বলছিল এমন ব্যাকুলতায়
যেন তারাও কিছু বলতে চায়।

তাঁরা হাত ধরতেই
এক অদ্ভুত কাঁপন দেহে দেহে বয়ে গেল,
হৃদয়ের গোপন কক্ষ খুলে গেল শব্দহীন—
চোখে চোখ রেখে
তিনি বললেন সেই প্রথম আলাপন,
যা হৃদয়কে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়।

তারপর ঢেউয়ের শব্দে ঢেকে
নরম স্বরে প্রতিশ্রুতি দিলেন তাঁরা—
সমুদ্র যেমন জোয়ারকে পায়,
আকাশ যেমন রাতকে জড়িয়ে ধরে,
তেমনই তাঁরা একে অপরকে
চিরকাল জড়িয়ে রাখবে মমতার উত্তাপে।

১২.      নক্ষত্র-বীথির পথে


আমার ঠিকানায় এসে
তুমি পাবে না আর—
শুধুই একটি নাম লেখা আছে
ধুলোধুসর দরজায়।

যেখানে গেছি চলে,
সেথায় কোনো পথিকেরই পৌঁছানো নয়;
কেউ পারে না থাকতে পাশে,
কেউ পারে না ডেকে নিতে ফিরে।

যে জীবন ছিল ভাঁটফুলের গন্ধে
মহুয়ার মাতাল সুরে রাঙা,
সেই জীবন ছেড়ে এবার
আমি হারিয়ে গেছি
নক্ষত্র-বীথির বিস্ময় দেশে।

সেখানে রাতেরা নীরব,
আলোয় ভাসে আমার অদেখা স্বপ্ন;
তুমি শুধু দূর থেকে
আমার নামটুকু পড়ো—
আমি আছি, অচেনা আলোর ওপারে।


১৩.       নৈশকবি


কবিতা লিখব বলে রাত জাগি—
জানলার ধারে এসে বসে নিশাচর পাখির দল,
তারারা আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে
ঝরে পড়া অক্ষরের মতো।

বাতাস আসে গোপন সুরে,
নৈঃশব্দ্যের গভীরতম গান
মনে করিয়ে দেয়—
রাতও এক অনাহত কবি।

জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে ছাতার মতো,
মুছে দেয় দিনভর ক্লান্তি,
তোমার পদধ্বনির মতো নরম প্রতিধ্বনি
অন্তর আঙিনায় বাজতে থাকে।

সকাল হলে খাতা খুলে দেখি—
না আছে কোনো শব্দ,
না আছে কোনো উপমা,
না কোনো ছন্দের রেখা।

সারা পাতা জুড়ে শুধু তোমার নাম—
যেন তুমি-ই প্রতিটি কবিতার আদি-উৎস,
যেন আমার সমগ্র রাতজাগা সৃজন
তোমার নামের দিকেই
ধারাবাহিক নক্ষত্রপতনের মতো
অবশেষে এসে থেমেছে।


১৪.       কালের দীর্ঘশ্বাস 


শত বছর পরে,
অমনই এক স্থবির বিকেলের গোধূলিতে
কারও বিষণ্ণ চোখ মেলে বসে থাকবে
এই পুরোনো বাড়ির বারান্দায়—
ক্লান্ত অফিসযাত্রী কারও পদশব্দ
ধীরে ধীরে উঠোন পেরোবে,
হয়তো সেই পদধ্বনি আমারই চলার পুনরাবৃত্তি,
শ্বাসটুকু পর্যন্ত মিলবে আমাদের বংশের রক্তস্রোতের সুরে।

ওরা জানবেও না—
একদা এই বারান্দায়, ঠিক এই রেলিঙে হাত রেখে
কেউ একজন বসে থাকত মায়া ভেজা দৃষ্টিতে,
রাত নামার আগে কারো ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায়।

হাওয়ায় লতিয়ে ওঠা গন্ধরাজের ডালে
যে আকুলতার গন্ধ ছিল,
যে দীর্ঘশ্বাস জমে ছিল ছাদের কার্নিশে,
যে অপেক্ষার কুয়াশা শুকায়নি বহু দিন—
সবই এখনও লুকিয়ে আছে
ইটের গায়ে, কাঠের সিঁড়ির সোঁদা গন্ধে,
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে।

একদিন ওরা বসবে—
কিন্তু জানবে না,
ওদের নিঃশ্বাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
আমাদের বহু পুরোনো না-বলা কথারা।

এভাবেই অপেক্ষা সঞ্চারিত হয় রক্তে,
শতাব্দী পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—
আর বারান্দা জুড়ে ভেসে থাকে
কালের দীর্ঘশ্বাস।


১৫.        গঙ্গার তীরে সত্যস্বরূপ


গঙ্গার তীরে— 

যেখানে জলরাশি নীরব মহিমায় যুগকে আচ্ছন্ন করে রাখে,

যেখানে প্রথম প্রভাতের আলো পাঠশালার মতো

আমাদের হৃদয়ে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে তুলেছিল
প্রেমের প্রথম শিখা—
সেই পবিত্র তীরেই আমি দেখাব তোমাকে
আমার সত্যস্বরূপ,
আমার সমগ্র অন্তরাল,
যা আজও তোমার নাম শুনলেই
নদীর স্রোতের মতো কেঁপে ওঠে।

স্মরণ আছে?
সেই গঙ্গাবক্ষের নীলাভ আলোয় দাঁড়িয়ে
আমরা নিবেদন করেছিলাম হাতে হাত রেখে—
যত ঝড়ই আসুক,
যতকালই কেটে যাক,
আমরা থাকব যুথবদ্ধ,
অপরের হৃদয়রশ্মিতে জড়ানো
দুটি অনিচ্ছেদ্য প্রাণের মতো।

আজ সেই প্রতিজ্ঞার বিস্মৃত ধ্বনি
আবার শুনিয়ে দেব তোমাকে—
তীরের বালুকায় দাঁড়িয়ে,
জলছায়ার মৃদু কাঁপনে ভেসে ভেসে
আমার গভীরতম স্বরূপ উন্মোচন করে।
তুমি দেখবে—
আমি কখনো হারাইনি,
কেবল সময়ের চাদরে আড়াল হয়েছিলাম মাত্র।

গঙ্গার সেই শাশ্বত নীল জলে
যেদিন তোমার চোখে আমি আবার
আমাকেই চিনে নেব—
সেদিনই পূর্ণ হবে
আমাদের সেই পুরোনো নিবেদনের মহাদূত,
যে এখনো গোপনে রক্ষা করে রাখে
আমাদের দু’জনার অটুট বন্ধন।


১৬.      বিনিদ্র রজনীর গল্প


চোখের বৃত্তে যে অচেনা কালো দাগ,
তার নিচে জমে আছে বহু রাতের নীরব ছায়া—
আলো নিভে গেলে যেসব গল্প জেগে ওঠে
তার সবকিছুরই একমাত্র চরিত্র তুমি।

অগণিত রজনী পেরিয়ে
স্বপ্নেরা আমার জানালায় এসে থেমে থাকে,
তোমার নামের ধ্বনি শুনলেই
তারা হেলে পড়ে নিভে যায় স্নিগ্ধ বাতাসে।

জানি না তুমি বোঝো কি না—
এই অবসন্ন চোখে জমে থাকা প্রতিটি ছায়াই
তোমার অনুপস্থিতির ছোট্ট স্মৃতিফুল,
যাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিদিন
একটি নতুন দীর্ঘশ্বাসে লিখি কবিতা।

তোমাকেই ঘিরে বোনা
সে বিনিদ্র রাতগুলোর সমস্ত গল্প,
আর তুমি জানতেও পারোনি—
আমার প্রতিটি নিদ্রাহীনতার
মূল চরিত্র শুধু তুমি


১৭.        অস্তবেলার মায়াবী সুর


বেলা শেষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
আমি শুনি এক ক্ষীণ আলোর হাঁটা—
আকাশের কোলে ক্লান্ত রোদ
একফোঁটা স্বপ্ন রেখে যেভাবে ঘরে ফেরে,
আমিও সেভাবেই ফিরছি ধীরে ধীরে
নিঃশব্দের রহস্যময় উপত্যকায়।

ওগো বন্ধু, অনেক দিয়েছি—
শব্দের কাঁথা, ব্যথার মণিমুক্তা,
অতৃপ্ত রাতের বিষণ্ণ রূপকথা।
তোমরা নিয়েছো, আমিও দিয়েছি—
সময় যেন পুরোনো কোনও বীণার মতো
তার ছিঁড়ে গেলেও সুর রেখে যায়।

এবার আর চাইবে না কিছু—
আমার হাত এখন কেবল সন্ধ্যার আলো স্পর্শ করে,
আমার গলা কেবল দিগন্তের সোনালি রাগে ভরে ওঠে।
দাও আমাকে শুনতে সেই দিগন্তপুরাণ—
যেখানে সূর্য ডোবে ধীরে,
আর অন্ধকার তার কোমল বাহু বাড়িয়ে
আমাকে টেনে নেয় অনন্তের শান্ত স্বপ্নে।

যা বাকি আছে—
একটু নীরবতা, একটু আকাশ,
আর বীণার অস্তমিত সুরের
একটুকু মায়াবী কাঁপন।

সেই সুরেই আজ আমি হারাতে চাই।


১৮.      পথের পদচিহ্নে ফিরে আসা


এভাবেই আমাদের যাত্রা বোনা থাকে—
তোমার হাঁটার শব্দে আমার আদিম নাড়ির ধ্বনি মিশে যায়,
আমার পথের ধুলোয় জেগে ওঠে তোমার ফেরার প্রতিধ্বনি।
যে রাস্তা একদিন আমার একাকীত্ব বয়ে নিয়ে যেত,
আজ সেই পথেই তোমার আঙুলের উষ্ণতা ছায়া ফেলে রাখে।

আমার জীবন যে পথ দিয়ে চুপিচুপি চলে যায়,
তুমি সেই পথের ঘাসে মাথা ঝুঁকিয়ে
আমার পায়ের চিহ্ন ছুঁয়ে দেখো—
এই তো আমি, এই তো আমার ফেরা, আমার অপেক্ষা।

তুমি যদি বলো—
“আমি যেদিকে যাই, তোমার জীবনও সেদিকে ভেসে আসে”—
তবে জানবে,
তোমার নিশ্বাসের সামান্য দোলায়ও
আমার দিগন্ত বদলে যায়।

তুমি যেখানে থামো,
সেখানে আমার দিন শেষ হয়, রাত শুরু হয়,
সেখানে বাতাসও তোমার নাম উচ্চারণ করে।

এইভাবে চলতে চলতে
আমাদের দুজনের পথ একদিন
একটি মাত্র রেখায় মিলেমিশে যাবে—
যেখানে ফিরে আসা আর যাওয়া
দু’টিই হয়ে উঠবে এক অনন্ত প্রেমের পদচিহ্ন।


১৯.      ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী 


ভরা নিশীথে কেমন এক অদ্ভুত ভয় জেগে ওঠে—
মনে হয় তুমি হাত বাড়ালেই হাওয়ার মতো হারিয়ে যাবে,
চিরচেনা পথ হঠাৎই অচেনা অন্ধকারে ডুবে যাবে,
চাঁদের আলো মুছে গেলে পৃথিবীটা যেন নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রবে
আমারই দিকে তাকিয়ে।

তাই বলি—
এসো পূর্ণিমার শুভ্রতা মেখে,
ওগো পূর্ণিমা নিশীথিনী,
যেদিন আকাশ জেগে থাকবে দুধসাদা আলোয়
আর ধরণীর বুক জুড়ে ছড়াবে নরম কুয়াশার মতো স্বপ্নের পশরা।
সেদিন তোমার শাড়ির আঁচলেও উঠবে
এক অতল কোমল উজ্জ্বলতা—
যা দেখলে মনে হবে
রাত্রির বুক ফুঁড়ে
কেউ যেন তুলে এনেছে আলোকে জন্ম দেওয়া কোনো ফুল।

এসো,
আমি সেই ফুলের গন্ধে পথ চিনে নেব,
শুধু পথই নয়—
চিনে নেব তোমাকেও,
তোমার চোখে লুকানো থমথমে নির্জনতা,
তোমার কণ্ঠে ঝুলে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মৃদু সুর,
আর তোমার সাদা শাড়ির আড়ালে নড়ে ওঠা
এক অপ্রকাশিত আলো।

পূর্ণিমার নিস্তব্ধ রাতে
তুমি যদি এক মুহূর্ত পাশে দাঁড়াও—
এই ভরা নিশীথ
আর কোনোদিনই ভয়ের হবে না,
বরং হয়ে উঠবে আমাদের দুজনের
এক সোনালি-সাদা স্বপ্নযাত্রা।


২০.      ছায়ার মতো মায়া


তুমি নেই—
তবু অদ্ভুত ছায়ার মতো
দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে
নরম নরম উপস্থিতি হয়ে
থেকে যাও আমার পাশে।

হাওয়া যখন চুলে হাত বুলিয়ে যায়,
মনে হয় তোমার আঙুলের স্পর্শ;
জোছনা যখন জানালায় ফেলে স্নিগ্ধ রূপ—
মনে হয় তোমারই হাসি নেমেছে ঘরে।

আমি জানি, তুমি নেই কোথাও,
তবু তোমাকে পাই পথের ধুলোয়,
অনুপস্থিতির মায়াবি নীড়ে
তুমি হয়ে ওঠো আরও বেশি সত্য।

এভাবেই তুমি —
না থাকা থেকেও থাকো,
মায়ার আবরণে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
ছায়ার মতো অনুসরণ করো আমাকে
জীবনের পর জীবন ধরে।


২১.      চোখে লেখা আলো অন্ধকার 


তোমার চোখে স্বপ্ন ছিল—
ঢেউয়ের মতো জেগে থাকা নরম আলো,
পূর্ণিমা রাতের ছায়া ছিল—
দু’জনার নিঃশব্দ কথোপকথনের মতো।
সন্ধ্যা মালতীর শুভ্রতা ছিল—
তার গন্ধে ভরে যেত আমার ক্লান্ত দিন,
আর সারারাত শিশির ঝরে এখানেই—
এই দুই চোখের ভেতর জমে ওঠা
অকথিত হাজার অনুভবের ওপরে।

এখানেই যত ক্ষেদ—
ভাঙা পথের ধুলোর মতো জমে থাকা অভিযোগ,
অচিনপুরে হাঁটা সকল ক্লান্ত পদচিহ্ন,
যার প্রতিটি তোমার দিকে হাত বাড়ায় নিঃশব্দে।

জীবনের যত গল্প বলা—
এই চোখেই লেখা আছে তার প্রতিটি পাতা,
একেকটি স্মৃতি যেন পুরোনো নরম পত্রের মতো
হাওয়া আসলে শব্দ তোলে,
তোমার ডাকের মতো।

আর মৃত্যুর ছায়াও—
এই চোখে দেখতে পাই কখনো কখনো,
ঠিক সন্ধ্যার শেষ আলোটা মুছে যাওয়ার আগে
যেমন দীর্ঘ শ্বাসের মতো নেমে আসে বিষণ্নতা।
কিন্তু তবু তোমার চোখেই খুঁজে পাই
নতুন ভোরের প্রথম রঙ,
যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন
আবার জন্ম নেয় নীরবে—
আমাদেরই ভিতরের আলো হয়ে।


২২.        অরণ্যের পথ বেয়ে মালবিকা


এসেছিলে আচম্বিতে—
বৃষ্টিভেজা পাতার মতো নরম শব্দে,
চলে গেলে এত নিঃশব্দে
যে প্রতিটি বাতাসই যেন শোকগাথা শোনাতে থাকে সন্ধ্যার পরে।
ধূসর রঙ ছড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের মতো
তুমি মিলিয়ে গেলে দিগন্ত-পারের কোনো অচেনা নক্ষত্রে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দিনশেষের দীর্ঘ ছায়ার মতো
নিঃশব্দ, অবণ্ঠিত, তবু তোমাকে ডাকতে ডাকতে।

আজও যখন বসন্তসন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে,
মাঠের ওপরে জোনাকিরা জ্বলে ওঠে
মৃদু ঝংকারে, সুরে সুরে—
আমি চমকে উঠি, ভাবি
এই বুঝি তোমার পদধ্বনি এল,
এই বুঝি অরণ্যের পথ ধরে
দুলে উঠল তোমার শাড়ির আভাস।

মালবিকা,
একবার এসো তুমি—
সময়ের অন্তহীন কালস্রোত বেয়ে,
শিশির ভেজা পথ ধরে,
আকাশের গোপন ডাকে সাড়া দিয়ে
যেমন কোনো হারানো তারা
হঠাৎ ঝরে পড়ে নীল আলোর ভিতর।

এসো,
আমার অসমাপ্ত প্রার্থনাগুলো পূর্ণ করো,
চরিতার্থ করো সেই অর্ধেক রেখে যাওয়া চুম্বন,
যার উষ্ণতা এখনো রাতের বুকে
তোমার নামে জ্বলে থাকে।

এসো,
এই অরণ্য, এই বাতাস, এই জোনাকি—
সবাই তোমাকে ফিরে পেতে চায়,
আর আমি—
তোমার এক পলকের মায়ায়
আবার জন্ম নিতে চাই।


২৩.        নামহীন উপাখ্যান


কেউ বলেনি আমাদের কথা,
কোনও উপাখ্যানেও নেই আমাদের কাহিনি—
তবু অন্ধকার গলিপথে, নিঃশব্দ জানালায়
আমাদের ছায়ারা নীরবে লিখে গেছে ইতিহাসের
অপ্রকাশিত অধ্যায়।

আমরা হতে পারিনি কোনও কিংবদন্তী—
শহরের কোলাহলে ডুবে গেছে প্রেমের ক্ষুদ্র উচ্চারণ,
নেই কোনও স্মৃতিফলক, নেই কোনও নক্ষত্র-লিপি,
তবু হৃদয়ের গোপন প্রদেশে
আমাদের নামে ফুল ফুটে আছে আজও।

জীবনের পাতাগুলো ছিঁড়ে গেছে কতবার—
কখনও বৃষ্টি ভিজিয়েছে, কখনও রোদের তাপ—
তবু সেই ছেঁড়া পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে
হেমন্তের প্রথম শিশির,
জোনাকির সুরভি,
আর তোমার ছোঁয়ার অনুপম জনপদ।

হেমন্ত ভোরে শিউলি ঝরে যায়,
চুমোগুলো উড়ে যায় বাতাসে—
অথচ তাদের ঘ্রাণ লেগে থাকে
আমাদের অনুপস্থিত নদীর দুই কূলে।

বসন্তে বাতাসে গান উঠবে আবার,
অচেনা পথের ধুলোর মধ্যে
হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে কোনও স্মৃতি—
তখনই মনে হবে,
আমরা কেউ না হয় কিংবদন্তী নই,
তবু আমাদের হৃদয়, আমাদের প্রেম—
সৃষ্টির যেকোনও পুরাণের চেয়ে
শতগুণ গভীর এবং সত্য।


২৪.        অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস


আমার শুধু আকুল করে ধরব তোমার হাত,
শীত-নিভে যাওয়া বিকেলে কিংবা
নক্ষত্রভরা ঘুমহীন রাত।
কিন্তু তুমি ধরতে দাওনি—
রেখেছো দূরে, অহর্নিশ,
যেন দু’পা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা
দুটি নৌকা—
জোয়ার এলেও যাদের কাছে আনে না স্রোত।

ছুঁয়েছি আমি বিরহ
সকাল–সন্ধ্যা–অন্তরাত,
তোমার অনুপস্থিতিকে ছায়ার মতো
নিজের চারপাশে বয়ে ফিরেছি।
চুমোর বদলে পেয়েছি নীরবতা,
মায়ার বদলে পেয়েছি ক্লান্ত ছায়া,
তবু তুমিই ছিলে হৃদয়ে
অবিরাম বেজে ওঠা এক নামহীন সুর।

এই জীবনে কিছুই না পাই তোমার জন্য—
না কোনো প্রতিশ্রুতি, না কোনো প্রত্যাবর্তন,
শুধু রেখে গেলে কিছু হাওয়ায় উড়ে যাওয়া দিন
আর দু-এক ফোঁটা অপূর্ণতার শিশির।
তবুও, তোমাকে ঘিরেই
আমার প্রতিটি প্রার্থনা,
পথে পথে ছড়িয়ে দিলাম
তোমার নামে সব আলো আর আশীর্বাদ—

রইল শুধু আমার শুভাশিস,
তুমি যেন ভালো থাকো,
যদিও আমার থেকে তোমার দূরত্ব—
চিরকালীন, অনিবার্য, তবুও অপরিমেয় মধুর।


২৫.         অন্তরের আলোর দীপশিখা 


যেখানে যাও, যত দূরেই যাও,
তোমার পথভরা আলো যেন কমে না কোনওদিন—
রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের মতোই
তুমি থেকো অনন্ত দীপ্তিতে,
থেকো স্বপ্নের নীলাভ জ্যোৎস্নায় ভেজা।

জীবনের হাজার ভিড়ের ভেতর,
তুমি কি জানো—
নিঃশব্দে তোমাকেই ডেকেছি প্রতিক্ষণ?
একটু ছায়া, একটু শীতল বাতাস,
একটু সুর, একটু আলো—
সবকিছুর মধ্যেই তোমারই উপস্থিতি
নীরবে পথ দেখিয়ে গেছে।

তুমি জানোনি হয়তো—
আমার অন্তরের গভীরে
জ্বলছে এক টুকরো দীপশিখা ,
যেখানে শুধু তোমার নাম,
তোমার পদধ্বনি, তোমার মমতা
মিশে আছে সময়ের অতলান্তে।

যত দূরেই যাও না কেন,
এই মন জানে—
তোমার আলোতে পথ চিনে নেওয়া যায়,
তোমাকে মনে রেখেই
বেঁচে থাকা যায় নীরব বিস্ময়ে।

তুমি আছো, সবসময়—
হৃদয়ের গোপন আলো হয়ে।


২৬.       নিভৃত প্রতিচ্ছবি


হঠাৎই কোনো বিকেলে, আলো-অন্ধকারের ফাঁকে
আমার মুখের উপর নেমে আসে তোমার ছায়া—
নির্বাক, অথচ কত কথা বলে সেই ছায়ার রেখা।
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
যেন দূর নক্ষত্রের নরম আলো এসে
আমার চোখের গভীরে পড়ে।

আমি থেমে যাই—
হৃদয়ের গোপন সব দরজা খুলে যায় ধীরে ধীরে।
তোমার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু
শত ঝরনার মতো ঝরে পড়ে আমার দিকে।
সেই জল যেন হাজার বছরের ব্যথা,
আবার সেই জলেই ধুয়ে যায়
আমার সমস্ত দুঃখের অবশেষ।

তোমার মুখের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিঃশব্দ নীল,
আমার বুকের ভিতর অনিমেষে জ্বলে ওঠে।
আমি দেখি—
তোমার প্রতিটি নীরবতা আসলে আমারই ভাষা,
তোমার প্রতিটি বেদনা
আমার হৃদয়ে জন্ম নেওয়া একেকটি অশ্বত্থ পাতা।

এইভাবেই,
অভিমান-ঢাকা কোনো সন্ধ্যার তলায়
আমরা দুজন একে অন্যের ছায়ায় রূপ নিই—
নিঃশব্দে, অদৃশ্য প্রেমের মতো
যা কারও কাছে ধরা পড়ে না,
তবু আমাদের মধ্যে নদীর মতো বয়ে চলে
অবিরাম, অনন্ত, অবিশ্রান্ত।


২৭.       আর একবার…


আর একবার জন্ম নিতে সাধ জাগে—
স্কুলফেরা পথের ওই ধুলো ভরা বিকেল,
আমগাছটির শান্ত ছায়া,
ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নুয়ে পড়া খেল।

গাব ফুলের গন্ধে জাগা ভোর,
হাঁটুর কাছে লুটিয়ে থাকা শিশিরের স্মৃতি,
হাত ভরে কুড়ানো সাদা-কালো দুঃখ–সুখ,
তখন যেন এ জীবন ছিল অতি নিখুঁত মণিমুক্তা।

বর্ষার ভেজা আঙিনায় শুকোনো পাটের গন্ধ,
নদীর সোঁদা মাটি লেগে থাকা দুপুরগুলো—
হঠাৎই মনে হয়, সবই কি তবে রূপকথা?
নাকি সত্যি ছিল? হাঁটছিলাম প্রাণ ভরে ওদের সঙ্গে।

জন্ম যদি হতো আর একবার,
অথচ হবে না—জানি কতটাই অসম্ভব!
তবু মনে মনে সেই দিনগুলোকে ডাকি—
ফিরে এসো, আমার মাটির দিন,
আমার সহজ, নিষ্পাপ, ঢেউ ভাঙা শৈশব।

আর একবার…
শুধু আর একবার—
হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়েই যাক পুরোনো দিনের উৎসব।


২৮.         অবগুণ্ঠনহীন ভালোবাসার কবিতা


হৃদয়ের গভীর রক্তে রাঙা রক্তজবা
আমি ফুটিয়ে রেখেছি তোমারই প্রতীক্ষায়।
ওগো তুমি এস—
এক পা, দু’পা, ধীরে ধীরে মাটির ওপর ভর দিয়ে,
উজ্জ্বল চোখের দীপ্তি মেলে
একবার শুধু তাকাও আমার দিকেই।

এ যে তোমার জন্য রাখা ফুল—
স্নিগ্ধ কনকচাঁপার বুকের মতোই উষ্ণ,
তোমার হাতে তুলেই দিও আমাকে।
তোমার ডোরাকাটা ঠোঁটের
ঝর্ণার মতো নেমে আসা চুম্বন
রাশি রাশি ঢেকে দিক আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা।

তারপর অবগুণ্ঠন খুলে,
দ্বিধাহীন, নির্ভীক, পবিত্র স্বরে
বলবে তুমি—
“ভালোবাসি… ভালোবাসি…
এ ভালোবাসাই আমার সর্বস্ব।”


২৯.       ফিরে আসা


তোমাকে ফেলে দিয়েও
পথে নেমে যাই—
যেন পথই জানে না
কাকে হারিয়ে আমি কতটা শূন্য।

ঘুরি নির্জন গোধূলিতে,
মাটির গন্ধে মিশে থাকে
অদৃশ্য কান্নার সুর;
যাযাবর আলো ডুবতে ডুবতে
হঠাৎই পথ ভুল করে
তোমার দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাকে।

তুমি জানো না—
কবে একদিন তোমার চোখের কোণে
নেমে এসেছিল দু’ফোঁটা নীরব জল,
সেই জলের উষ্ণতা আজও
আমার ভিতর আগুনের মতো জ্বলে।

হয়তো সেই ঋণেই
বারবার ফিরে আসি তোমার কাছে,
যেন বৃষ্টিভেজা পথ জানে—
আমি যত দূরে যাই না কেন,
আমার ফিরে আসার ঠিকানাটি
শুধুই তুমি।


৩০.        মায়াবী রূপে তুমি


তোমাকে যেখানে নিয়ে যাব—
সেখানে নীরবতারাও নিঃশব্দ হয়ে থাকে,
শূন্যতার কণাগুলো উড়ে বেড়ায়
মহাশূন্যের মতো গভীর নিঃস্বতায়।
কেউ নেই, কোনও পথিকও নয়—
শুধু তোমার পদধ্বনির প্রতিধ্বনি
দূরে কোথাও হারিয়ে যায়।

যেখানে থাকবে তুমি—
সেখানে কান্নাও জন্ম নিতে ভয় পায়,
অশ্রুরাও থেমে থাকে
অধরস্পর্শী কোন স্বপ্নের মতো।
নিস্তব্ধতার সাদা কুয়াশায়
ঢেকে যায় চারপাশের সব শব্দ।

আর যেখানে রবে তুমি—
সেখানে আলো পৌঁছাতে পারে না,
তারারা পথ হারায়
অন্ধকারের অনিঃশেষ ঘোরলাগা ঘোরে।
এই অতল, অচেনা, গভীর রাতের ভেতর—
তুমি আমাকেই খুঁজে পাবে,
কারণ আমি সেই অন্ধকারে
তোমার নামের মতোই জ্বলি—
নিভে যাওয়া আলো হয়ে,
হারিয়ে যাওয়া প্রেমের শেষ আভা হয়ে।


৩১.      হেমন্তের অন্তঃপুর


রাজপথের কোলাহল ভেঙে
জনারণ্যের ভিড় ছুঁয়ে
যে মুখটি হঠাৎ থেমে ছিল
আমার বুকের ভিতর গোপনে—
তারই জন্য দিনগুলো জ্বলত অলক্ষ্যে
অদৃশ্য কোনো প্রদীপের মতো।

তবু একদিন হেমন্তের শীতল আকাশে
ধুলোবালির সাঁঝরঙো বাতাসে
কোথায় যে মিলিয়ে গেল সেই মুখ,
হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়েও
ধরতে পারলাম না—
তারারা নেমে এল অন্তঃপুরে,
আর সে জেগে রইল নক্ষত্রের ভিড়ে।

আজও নিশীথে তারার আলোয়
তার অনুপস্থিতি ঝরে পড়ে নীরবে—
যে স্মৃতি হারায় না কখনো,
যে মানুষটি হারিয়ে যায় ঠিকই,
তবু থেকে যায়
হেমন্তের বুকের গভীরে
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো।


৩২.       প্রদীপ জ্বেলে রেখো


যদি হঠাৎ রাত নেমে আসে পথহারা অন্ধকারে,
যদি বাতাস থেমে যায় সব পত্রহীন নিস্তব্ধতায়,
যদি হৃদয়ের শিয়রে জমে ওঠে ক্লান্তির নীল কুয়াশা—
তুমি শুধু হাত বাড়িয়ে দিও, আমি ফিরে আসব তোমার আঙিনায়।

যদি রঙহীন হয়ে যায় এই পৃথিবীর সব সুর,
যদি স্মৃতির জানালা ধরে ঝরে পড়ে নীরবতার বৃষ্টি,
যদি চোখের উপরে নেমে আসে অচেনা ছায়ার পর্দা—
তুমি চন্দ্রালোকে বুনে দিও স্বপ্নের একটুকরো দৃষ্টি।

যদি অলৌকিকতার দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়,
যদি নক্ষত্রেরা নিভে যায় নিঃশব্দ কোনও গহ্বরে,
যদি হৃদয় পথ খুঁজে না পায়, হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে—
তুমি গ্রহ-তারার আলো কুড়িয়ে এনে প্রদীপ জ্বেলে রেখো
আমার নামহীন অন্ধকারের মর্মর গভীর ঘরে।

তোমার সেই আলোই হবে আমার পথ,
আমার ফিরে আসার নির্ভরতার নীরব ডাক—
যেখানে তুমি, সেখানেই জেগে থাকে সমস্ত পৃথিবীর ঋতু,
সেখানে অন্ধকারও কাঁপতে কাঁপতে হার মানে আলোর কাছে।


৩৩.         মায়াজাল


একি তবে মায়ারই টান,
রোদ্র ক্লান্ত দুপুরে হৃদয় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়—
তোমার ছায়া দুলে ওঠে আমার নিঃশ্বাসে,
সকল আকুলতা যেন পথ খুঁজে পায় তোমার দিকে।

ভাবনার জানালা খুলে যায় একে একে,
অন্তর্মহলের অন্ধকার ঘরগুলো আলোয় ভরে ওঠে—
আমি তখন নির্মোহে দিতে চাই
আমার সকল শূন্যতা, সকল ব্যথা, সকল জ্বালা।

হঠাৎই যেন তোমার কণ্ঠে বাজে
নরম কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত,
তুমি থামিয়ে দাও পৃথিবীর সব গান
এক বিস্ময়ের নীরবতায়,
বাহু বাড়িয়ে বলো—
"এসো, এসো, আমার ঘরে এসো।"

সেই ডাকে ভেঙে যায় দিনের তন্দ্রা,
হৃদয়ের সমস্ত পথ খুলে যায় নিঃশব্দে—
আমি তোমার আশ্রয়ে এসে দাঁড়াই,
যেন জন্মজন্মান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি
এই এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে ওঠে।


৩৪.      সংসারভূক


একটি কোমল ছোঁয়া ভোরের ঘুম ভাঙায়,
চুড়ির রিনিঝিনি বাজে কি না— মনে থাকে না ঠিক,
তবু নিঃশ্বাসের ভিতর তার মায়া গাঁথা থাকে
অচেনা স্বপ্নের মতো, মায়াবী কুয়াশার দিক।

রাতের স্বপ্নে কি চুম্বন নেমে এসেছিল?
না কি সে-ই ছিল ভোরের আলো হয়ে?
চোখ মেলতেই দেখি— পৃথিবী জুড়ে শুধু সে,
তার দিকে তাকানোতেই দিনের সমস্ত শুরু রয়ে।

কোর্টের বোতাম গুঁজে দিয়ে
নরম কপাল রাখে বুকের ওপর,
অফিসের চাবি তুলে দেয় হাতে—
যেন এক টুকরো নিশ্চয়তা, স্থির নদীর ঘোর।

এতটুকু টান, এতটুকু স্নেহে ভরা সংসার,
তার দুহাতের উষ্ণতায় কত শান্তির রং…
তবু জানো, আজও নিজেকে তার মতো করে
সংসারভূক করতে পারলাম না অনুরাগের ঢঙ।

হয়তো আমি এখনো পথের ধুলো বুকে রাখি,
হয়তো ঘর মানে আমার কাছে অন্য কোনো গান—
তবু তার দেওয়া সকালের ভালবাসা
প্রতিদিন নিঃশব্দে করে আমায় নতুন মানুষ— নতুন প্রাণ।


৩৫.         শূন্যতার ভেতর ভরার গল্প


কেউ কাছে আসে—
হঠাৎ সন্ধ্যার বাতাসের মতো,
মাথার চুলে আলতো ছুঁয়ে যায়
এক মুহূর্তের উষ্ণতায়।

কেউ আবার দূরে চলে যায়—
নীরব পায়ের শব্দ ফেলে রেখে যায়
দোরগোড়ায়, উঠোনে,
অতীতের মাটিতে শুকনো পাতা হয়ে।

পাখি উড়ে গেলে যেমন
দু’একটা পালক পড়ে থাকে,
তেমনি আলনায় ঝুলে থাকে
তোমার ব্যবহৃত গন্ধওয়ালা কাপড়,
রান্নাঘরে চুলার ধোঁয়া
আরো একটু সময় আকাশে ভেসে বেড়ায়,
কথার প্রতিধ্বনিও
ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় দেয়ালের ফাঁকে।

তারপর আসে সেই দীর্ঘ নিশ্বাস—
শূন্যতার বিস্তীর্ণ ঘর,
যেখানে কেউ নেই, কিছু নেই—
কেবল অপেক্ষা।

আর ঠিক তখনই
যে নতুন করে আসে—
সে ভরিয়ে দেয় সব শূন্যতা,
নতুন আলোর রেখা টেনে দেয়
বাতাসে, জানালায়, হৃদয়ের কোণে।

এভাবেই জীবন শেখায়—
যাওয়াই শেষ নয়,
আসারও আছে এক নিজের সময়।


৩৬.       কঠিন কোমল 


এক পুরুষ এক নারীর মাঝে
দেখে নিজেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি—
উত্থান-পতনের লুকানো ইতিহাস,
চোখের গভীরে নিজের মুখের অচেনা রূপরেখা।
কথা বলার ফাঁকে ঠোঁটের ক্ষীণ কাঁপন,
রাগ-অভিমানের অদৃশ্য ঢেউ—
সবটুকুই অনুভবে তাকে ছুঁয়ে যায়।
কান পেতে শোনে কান্না,
দেখে লবণজল বেয়ে যাওয়া নীরব নদী।

তবু প্রেম মানে কেবল শরীরের মিলন নয়,
হৃদয়ের গহনে পৌঁছানোর পথ
আরও নিঃশব্দ, আরও সূক্ষ্ম।
নারী পুরুষের হৃদয়স্পর্শ পায়
যখন এক জোড়া হাত
তার বুকের ওপর নয়—
স্থির হয়ে থাকে কাঁধে, নিশ্চিন্তের মতো।
যে হাত শাড়ি খোলার জন্য নয়,
পরিয়ে দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকে।

নারীদের ভাবনা আলাদা—
পুরুষরা দেখে বাইরের আলো,
আর নারীরা ছুঁয়ে ফেলে
ভেতরের শীতল ছায়া।
এই শক্ত কাঠামোর ভিতরেই
তারা খুঁজে নেয় লুকিয়ে থাকা কোমলতা,
মমতার নিঃশব্দ কাঁপন।


৩৭.     যদি তুমি আসো


যদি তুমি আসো—
নির্জন সেই ছায়াপথ বেয়ে,
আমি হাঁটব রৌদ্রের ধাঁচ
কাঁধে মেখে, চোখে আলো নিয়ে।
মেঘের ভেতর সূর্যকে বশ মানিয়ে
চলে যাব দূর অনন্তের দিকে—
তোমার পদধ্বনির নরম প্রতিধ্বনি
পথের ধুলোয় তুলে নেবে গল্প।

হঠাৎ যখন জল হয়ে ফিরব ফিরে
ঝরঝর বৃষ্টির দোলায়,
ভিজবে ধানক্ষেত, কচি পাতার গা—
মাটির গন্ধে ভরে উঠবে চারধার।
নদী উঠবে স্ফীত সুরে,
তার বুকজুড়ে দোলা দেবে
তোমার নিঃশ্বাসের অদৃশ্য ঢেউ।

সাঁঝ নামলে সোনালি আলোয়
দিগন্ত হবে ক্ষণিকের স্বপ্নবাড়ি,
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
দু’হাত ভরে ধরব আলো।
আর সেই নীরবতার ভেতর
উৎসব করবে জোনাকিরা—
একেকটি দপদপে আলোয়
আমাদের পথ লিখবে কবিতার মতো।

তুমি যদি শুধু একবার আসো—
আমি আলো, জল, বাতাস হয়ে
তোমার চারপাশে প্রসারিত হব,
আর পৃথিবী নতুন করে
জেগে উঠবে তোমার স্পর্শে।


৩৮.    অনন্ত রাত্রি 


নীল অন্ধকারে ঢেউ ওঠে—
হে প্রিয়তমা, হে প্রণয়ণী,
তোমার স্পর্শে জেগে ওঠে
আমার অনন্ত দহন,
রাত্রির গোপন গা-ভেজানো উত্তাপ।

তুমি যখন কাঁপতে থাকা হাতে
আমার বুকে রাখো তোমার পরাগভরা কুসুম,
যন্ত্রণার কাঁপুনি মেশা সেই কুসুমেই
জ্বলে ওঠে আদিরসের শিখা—
যেখানে ব্যথা আর উন্মাদনা
এক নদীর মতো মিলেমিশে যায়।

তোমার ঠোঁটের দীপ্ত লালাভ আলো
ধীরে ধীরে কাছে এলে
আমার নিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে,
আমার ভেতরের স্ফুলিঙ্গেরা
রক্তমদির স্বরে বলে ওঠে—
এসো… আরও কাছে এসো…

তোমার চুম্বনে খুলে যায়
আমার গোপন সব অনলদ্বার;
শোণিতের ঋণে, প্রণয়ের অনিবার্য টানে
আমার ঘুমন্ত কামনা
ঝড় হয়ে জেগে ওঠে তখন।

রাত্রির গভীরতম সুরে
তোমার দেহের সুগন্ধ
মিশে যায় আমার শিরায় শিরায়
যেন তুমি আমার সমস্ত সত্তা
এক ফোঁটা আগুনে রূপান্তর করেছো।

হে প্রণয়িণী,
এই রাত্রি যেন অনন্ত হয়—
আমাদের উত্তাপের নীরব সংলাপে
সব সীমা ভেঙে যাক,
সব নিশ্বাস থেমে যাক
আকুল রসের মাদকতায়।


৩৯.       কুয়াশার অন্তরালে


চন্দ্রিমা উদ্যানে আজ
মেঘের ছায়া নেমে আসবে নিঃশব্দে,
সপ্তপদির পাতার ভিতর দিয়ে
ভগ্ন-রোদ্দুরের এক টুকরো আলো
তোমার মুখে লিখবে অদৃশ্য কোনো স্বাক্ষর।

এলোমেলো হাওয়া
তোমার চুলে বাঁধবে নরম অস্থিরতা,
অসতর্ক নিঃশ্বাসে
খসে পড়বে ওড়নার মখমলি ক্ষীণ-রঙ,
যেন কোনো ভুল করা প্রজাপতি
আলো বদলাতে গিয়ে ফেলে গেল তার পাখা।

লতা-গুল্মের অন্ধকারে
একটি দুরন্ত গিরগিটির দৌড়
চকিত তৈরি করবে ক্ষণিকের রহস্য—
আমাদের চোখের ভিতরেও
নাচবে সেই সবুজ আতঙ্কের ঝিলিক।

ঘাসফুলের গন্ধে
আমরা দু’জন হঠাৎই ভেসে উঠব
অচেনা কোনো মাধুর্যের কুসুমে,
আঙুলের স্পর্শে
দেহ-জমির নোনা রোদে
জেগে উঠবে অসংখ্য নকশা—
যেন আদিম কোনো ভাষা
শুধু স্পর্শেই পাঠ শেখায়,
যেখানে শব্দ নেই, শুধু অন্তর্ময় আলো
আর নিভু নিভু নিঃশ্বাসের ছায়া।

সেখানে প্রেম একটি বাতাস-বোনা অরুন্ধতি—
দেখা যায় না, তবু স্পষ্ট বুঝি
আমাদের চারপাশে সে নরম কুয়াশার মতো ঘিরে আছে।


৪০.       মহাসমুদ্রের ওপারে যাত্রা 


আমি যাব—
তুমি না বললেও যাব,
নীরবতার অতল থেকে ডাক আসে দূর গহীনে।
মহাসমুদ্রপাড়ের বালুকাবেলায়
একজন  মাঝি দাঁড়িয়ে রাখে তার কালো নৌকা—
অপেক্ষায়, শুধু আমার জন্য।

আমি জানি, একদিন
সেই নৌকার মসৃণ কাঠ ছুঁয়ে
আমি ভেসে যাব পরপারের নীল নিস্তব্ধতায়।
জলের গায়ে গায়ে থরথর আলো,
ঢেউয়ের কূলে জমে থাকা অজানা সব গল্প
আমাকে নিয়ে যাবে আরো দূরে—
জন্মের প্রথম দিগন্তে, বা শেষ গভীরতায়।

তুমি থাক বা না থাক,
আমার যাত্রা থেমে থাকবে না।
হয়তো সেদিন বাতাসে ভেসে আসবে
তোমার কিছু অব্যক্ত শব্দ,
কিছু অনামা ব্যথা,
হয়তো আমার নৌকার পাল ধীরে দুলে উঠবে
তোমার স্মৃতির ছোঁয়ায়।

তবু আমি যাব—
শান্ত কোনো অন্ধকারে,
অথবা আলো-ছায়ার অপার রাজ্যে,
যেখানে আর কোনোরূপ ফিরে তাকানো নেই।
শুধু সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস,
মাঝির নীরব দৃষ্টি,
আর অনন্ত পথ—
আমাকে নিয়ে যাবে মহাসমুদ্রের ওপাড়ে।


৪১.       অমর্ত্যের আলো


নিশীথের নীলাভ আলোয়
স্বপ্নলোকের সব স্বপ্ন দিয়েই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—
তবু তুমি এলে না আমার ঘরে,
এলে না কোন মায়াবী স্বপ্নের ভোরে।

হেমন্তের এক নীরব সন্ধ্যায়
হৃদয় উজাড় করে বলতে চেয়েছিলাম—
‘স্বপন-দুয়ার ভেঙে এসো,
অরুণ-আলোর মতো জ্বলে উঠো আমার চোখে,
ক্ষণিকের মায়া নয়—
চিরকালের আশ্রয় হয়ে এসো আমার ঘরে।’

কিন্তু তোমাকে ছুঁইতে পারিনি—
মনে হয়েছিল, ছোঁয়া মাত্রই
ভেঙে যাবে কল্পলোকের এ নরম ভালোবাসা,
মুছে যাবে তোমার অপার্থিব রূপ।

তাই দূরেই থেকো তুমি—
শত সহস্র অন্ধকার রাত পার হয়ে
অমর্ত্যের আলো হয়ে,
মহাকালের প্রেম হয়ে,
আমারই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থেকো।


৪২.      ভালোবাসার কবিতা


কেউ লেখেনি আমাদের কথা,
তবু ভোরের বাতাস জানে—
তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে
আমার নাম একদিন নরম আলোয় ডেকেছিলে।

উপাখ্যান হয়নি, কিংবদন্তীও নই আমরা,
তবু শরতের নীল আকাশের মতো
নিঃশব্দে জেগে থাকে আমাদের স্পর্শ,
হেমন্তের শিউলির মতো কোমল,
যা ঝরে পড়ে— তবু হারায় না কোনোদিন।

জীবনের ছেঁড়া পাতাগুলো
তোমার আঙুলে ছুঁয়ে গেলে
অদ্ভুত এক সুর বেজে ওঠে—
চুম্বনের উড়ে যাওয়া স্মৃতির মতো
অচেনা বাতাসে গোপনে দোলে।

পথঘাটে ফোটা ফুলের রঙে রঙে
আমরা আবার লিখে নেব নতুন গল্প—
যেখানে তুমি থাকবে, স্বপ্ন থাকবে,
আর থাকবে একটুকরো মায়া
যা ভাসে ভালোবাসার অনন্ত আলোয়।

তুমি আর আমি নির্জন কোনো দুপুরে
চুপচাপ বসে থাকব পাশাপাশি,
আর পৃথিবী বুঝতেই পারবে না
কত গভীর আমাদের অমলিন অধরা প্রেম।


৪৩.       অ- সুখ 


নরম ছোঁয়ায় তোমার লুকিয়ে থাকে অলৌকিক আরোগ্য—

যেন দেহে দেই না কোনও যন্ত্রণা,
মনেও থাকে না কোনও ক্ষতচিহ্ন।
তোমার স্পর্শ পেলেই
অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ঔষধ, হাসপাতাল, ডাক্তার—
সব ক্লান্তি ভেঙে গলে যায় নীরবতার বরফ,
তুমি হয়ে ওঠো মুখর, আলোঝরা।

তেমনই করে, বারেবারে,
তোমার ছোঁয়া এসে সরিয়ে দেয়
আমার সমস্ত অ-সুখ, সমস্ত মলিনতা—
আমার ভুবন জুড়ে শুধু
তোমার আঙুলের উষ্ণতায়
জন্ম নেয় নতুন দিনের নরম শান্তি।


৪৪.    বেদনায় ঢাকা নিসর্গ 


পথে প্রান্তরে দিগন্তে আজ ভালোবাসার চিহ্ন নেই,
শহরের বুকে জমে আছে বিষণ্ন কুয়াশা—
ঢাকা যেন নীরব এক দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে ভিড়ে হারিয়ে যায় মানুষের হৃদস্পন্দন।

রাস্তাগুলো শুনে ক্লান্তির শব্দ,
বিলবোর্ডে আলো জ্বলে, কিন্তু মনেতে অন্ধকার।
তুমি চোখ মেলে দেখো—
এই শহর কি সত্যিই বেঁচে আছে,
নাকি স্মৃতির ভগ্ন ইটের মতো পড়ে আছে নিথর?

কোথায় কার চোখে আজ জল?
সবাই হাঁটে শুধু মুখঢাকা মরুভূমির মতো—
কেউ কারও দুঃখ শোনে না,
কেউ কারও হাত ধরে না।

তবু তুমি যদি একবার ফিরে তাকাও,
হয়তো দেখবে—
একটি ক্ষীণ আলো,
একটি নিঃশব্দ হাহাকার,
যা এখনও ভালোবাসার নাম ধরে বেঁচে আছে বুকের গভীরে।


৪৫.    স্বর্গপথে ধ্রুপদী রমণী 


ঈশ্বর যেন নিখুঁত মনোযোগে
আমার জন্যই গড়েছিলেন এক ধ্রুপদী রমণী—
যার চোখে সন্ধ্যাতারার আলো,
মুখে ভোরের শিশিরভেজা নরম দীপ্য,
একটুকরো হাসি যেন আকাশের নীল থেকে
রঙ চুরি করে এনে বসিয়ে দিয়েছে ঠোঁটের কোলে।

তাকে দেখলেই মনে হতো
সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়—
আমার দৃষ্টিতে রং মাখে তার মুখ,
আমার নিঃশ্বাসে বাঁশির সুর হয়ে বাজে তার সৌরভ।
সৌন্দর্যের কিছু ছটা রয়ে যায় ভাবনার আঙিনায়,
আর কিছু হারিয়ে যায় স্বর্গের পথে,
যেখান থেকে সে নেমে এসেছিল
আমার হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে।

আজ আমি সেই স্বর্গের পথেই আছি—
হয়তো তার হাত ধরে, হয়তো তার আলোয়,
হয়তো তার চোখের গভীর আকুলতায় ভেসে।
চারপাশে নীরবতার রেশ,
কিন্তু আমার হৃদয়ে তার পদধ্বনি—
যেন অনন্তের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক পবিত্র সঙ্গীত।

প্রেম এমনই—
যেখানে দুই আত্মা ধীরে ধীরে
একটি আলোয় মিশে যায়,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শে জন্ম নেয়
একটি নতুন আকাশ,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে
ফিরে আসে ধ্রুপদী রমণীর মায়াময় উপস্থিতি।

যদি সত্যিই ঈশ্বর আমাকে কিছু দান করে থাকেন—
তবে সে দান এই ভালোবাসা,
এই অপার কোমলতা,
এই স্বর্গের পথে তার হাত ধরে হাঁটার অধিকার।

আমি হাঁটি,
আর তার চোখের ভিতরে
অনন্ত প্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে—
দ্বিধাহীন, দীপ্ত, চিরন্তন।


৪৬.       নির্জন যমুনা কূলে


তুমি নিজেকে লুকাতে পারবে না—
না যমুনার ধূসর জলে,
না দুরবাহাটির নিশ্ছিদ্র অরণ্যের গভীরে।
তোমাকে ছুঁতে গিয়েছিলাম যেমন,
ঠিক তেমনি ছুঁয়ে ফেলেছিলাম জ্বলন্ত আগুন—
তবু তুমি কোনদিনই আগুন হতে চাওনি,
হতে চেয়েছিলে শুধু নিঃশব্দ এক আলো।

আমি যেমন তোমার থেকে দূরে যেতে পারি না,
তুমিও তেমনি পালাতে পারো না
আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অনন্ত পথ থেকে।
কত যুগ ধরে আমরা ছড়িয়ে আছি
দুই ভাঙা নক্ষত্রের মতো—
একটি ছায়াপথে তুমি,
অন্যটি নির্বাসিত আমার বহিমান হৃদয়।

তোমার জন্যই আমি গিয়েছি
অরণ্যের অন্তর্গহীনে,
ঝরে পড়েছি অগাধ জলধির ঢেউয়ে—
তবু যেদিকেই ফিরেছি
তোমার মুখচ্ছবিই রেখার মতো
ভেসে উঠেছে আমার চেতনার আয়নায়।

দ্বিধার বন্ধ দরজাগুলো
আজ খুলে দাও, এসো সেই পথে
যে পথের পাশেই শুয়ে আছে আমার
অরণ্যময়, ঘুমভাঙা জীবন।

কোনও এক বিষণ্ণ অপরাহ্ণে
দুরবাহাটির অরণ্যে
বা নির্জন যমুনা কূলে—
আর কি কখনও হবে না আমাদের দেখা?
নাকি সময়ের অন্ধ তটরেখায়
আমরা আবারও একবার
নিজেদের খুঁজে পাবো—
আগুন আর আলোর মতো,
একটুখানি স্পর্শেই জ্বলে উঠতে প্রস্তুত?


৪৭.       মায়ার গোধূলি


মাঝে মাঝে দিনের শেষ আলো স্বপ্নের পর্দা সরিয়েএকটি অচেনা ঘন্টারধ্বনি গভীরের দরজায় টোকা দেয়—

তখন ইচ্ছে করে
সব ব্যস্ততা ফেলে দূরের পথ ধরতে,
যেখানে গন্তব্য নেই,
শুধু নীরবতার ভিজে ঘ্রাণ
এবং আকাশের নীল বিষাদ।

কখনও আবার পুরনো কোনও সন্ধ্যা
তার সোনালি নরম আলো নিয়ে
ফিরে আসে ধীরে ধীরে,
তার সাথে আসে পরিচিত শব্দ,
ম্লান গন্ধ, ফুরিয়ে যাওয়া চুম্বনের উষ্ণতা—
সেইসব এসে মিশে যায়
আমার নিভু নিভু ঘরের সান্ধ্য অন্ধকারে।
আমি অনিমেষ তাকিয়ে থাকি,
যেমন কেউ তাকায় আপন স্মৃতিতে হারিয়ে।

এত আলো, এত শব্দ,
এত স্মৃতি পেয়েও
কেন জানি নিজেকে মনে হয়
এক বিরাট শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা—
যেন সমস্ত প্রাপ্তির ভিতরেই
আমার নিঃস্বতার সবচেয়ে ঘন ছায়া।

তবু এই মায়া, এই আলেয়ারা
প্রতি সন্ধ্যায় এসে
আমার বুকের উপর রেখে যায়
একটি আদিম প্রশান্তি—
যেন অনন্তের ওপার থেকে
কেউ ফিসফিস করে বলে,
“তোমার শূন্যতাও আলো হয়ে জ্বলবে একদিন।”


৪৮.       ঘরদুয়ারের কবিতা


তুমি সুন্দর করে ঘর দুয়ার গোছাও—
ঝকঝকে রাখ মেঝে,
পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখো আলনায় কাপড়, বারান্দায় ঝুল পড়ে না কোনওদিন,
আসবাবপত্রেও জমে না ধুলোর দুঃখ।

মাঝে মাঝে ভাবি—
আমি না থাকলেও কি তুমি
এমনই করে সাজাবে ঘর?
ফুলদানিতে রাখবে ফুল,
সন্ধ্যা নেমে এলে জ্বালাবে বাতি
ঠিক আগের মতোই, শান্ত সৌম্যে।

আঙিনার ধুলোমাটি মুছতে মুছতে
একদিন মুছে যাবে আমার পায়ের চিহ্নও।
আমার জন্য কেঁদে থাকা
তোমার চোখের অশ্রুবিন্দুগুলোও
শুকিয়ে যাবে সময়ের বাতাসে।

তখন হয়তো তোমার মুখে ভাসবে
একটি করুণ, দূরবর্তী হাসি—
যেন ভুলে যাওয়ার মাঝেও
আমাকে মনে রাখার শেষ আলো।


৪৯.     প্রতিবিম্বে তোমার মুখ 


নীল বিকেলের নরম আলোয়
হঠাৎই কখনও তুমি আমার মুখের উপর
ছায়া ফেলে দাঁড়াও—
প্রতিবিম্বে দেখি তোমার মুখ,
আর সেই মুখের ভিতর লুকানো
অগণিত অশ্রুর দীপ্তি।

আমি তাকিয়ে থাকি—
শত ঝরনার ঢেউ যেন
করুণাধারায় নেমে আসে তোমার চোখ থেকে,
সেই জল ধুয়ে দেয় আমার সকল ক্লান্তি,
স্নিগ্ধ করে দেয় প্রান্তরের মতো শুষ্ক হৃদয়।

তোমার ছায়া যখন মুখে পড়ে,
আমি যেন হয়ে উঠি এক নীরব নদী—
শুধু তোমার স্নিগ্ধ জলের স্পর্শে
নবজন্ম পেতে চাই,
বারবার, আরেকবার।


৫০.      দাঁড়াও, সময়


পৃথিবীর বয়স কত—
কোটি কোটি বর্ষের স্তরে স্তরে
জমে থাকা নীল-সবুজ ইতিহাস।
মহাকাল কত দীর্ঘ—
তার শেষ কিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না
আলোকবর্ষেরও ওপারে।

তবু মানুষ?
একটি ঢিল জলে ফেলতে যতটুকু সময় লাগে,
মহাকালের তুলনায় তার জীবন
মাত্র একটি অণুমুহূর্ত।
নিঃশ্বাস ফেলার মতো ক্ষুদ্র,
আঙুলের ফাঁক গলে যাওয়া আলোের মতো হালকা।

এই ক্ষণিক দিন নিয়েই মানুষ
ভালোবাসাকে করে অনন্ত—
স্পর্শে, অশ্রুতে, হাসিতে, প্রতীক্ষায়।
এত ক্ষুদ্র আয়ু নিয়ে
সে শেখায় পৃথিবীকে মায়ার রঙ।

বিস্ময় লাগে—
যে প্রাণ এক নিমিষের জন্য জন্মায়,
সেই-ই আবার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে
ভরিয়ে তোলে এই দীর্ঘ মহাকালকে।

দাঁড়াও, সময়—
তোমার অনন্ত গতির মাঝে
মানুষের এই ক্ষুদ্র ভালোবাসাই
সবচেয়ে দীপ্ত, সবচেয়ে সত্য।

সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

সন্ধ্যা নামে ধীরে ( কাব্যগ্রন্থ )


প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং

উৎসর্গ -

সুচিন্ত্য সাহাকে—
ও এসেছিল গড়াই নদীর তীর থেকে;
যে তার পদচিহ্নে বয়ে এনেছিল কাদামাটি-লেপা শৈশব, 
নদীর হাওয়ায় দুলে ওঠা অমল স্বপ্ন। 

জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণে 
আমাদের যে-সব দিনরাত্রি আলো–ছায়ায় বোনা ছিল, 
সেই স্মৃতিগুলো আজও  কেঁপে ওঠে-

তাঁতি বাজারে এক সন্ধ্যায়,
আনন্দ-বিষাদের সেই অপরূপ রাত্রিটি
আজও আমার বুকের ভাঁজে রয়ে গেছে—
আর রয়েছে দুজন বন্ধুর ক্ষণিক নৈকট্যের
মায়াজড়ানো থমথমে নীরবতা।

এই বইটি তাই তোমাকেই
সুচিন্ত্য।


১.      স্মৃতিকথন 


মনে আছে তোমার—
সেই কলেজফেরা বিকেলের গল্প?
নীল ছায়ায় ভেসে আসা এক বালিকার মতো
তোমাকে দেখেছিলাম প্রথম,
আর তুমি দেখেছিলে জিন্স–জ্যাকেট পরা
এক উদাস উড়ন-কাউবয়কে—যাকে নাকি
মনেই ধরেনি তোমার।

তারপর—
শুক্রবার থেকে আরেক শুক্রবার,
লাল বেনারসিতে তুমি এলে আমার ঘরে।
ভালো না লাগলে তবে এলে কেন?
তুমি হাসলে—“বালিকা ছিলাম, বুঝিনি কিছুই।”

বছর কত পেরুলো জানো?
বালিকা এখন বালিকা নয়, বুড়ীর সারিতে দাঁড়ানো;
তবু হঠাৎ তোমারই টানে
পার্কের ধারে ফুসকা–চটপটির দোকানে
আমার পাশে বসতে ইচ্ছে করে তোমার।

শালবনের সেই দিনের কথা—
দূর থেকে উড়ে এসেছিল এক তীর,
তোমার বুক ছুঁয়ে রক্তাক্ত হয়েছিল পানকৌড়িও—
তুমি বলো, “মনে করতে চাই না, ভয় লাগে।”

তবু ইচ্ছে করে আজও—
বংশী নদীর ধারে টমটমে চড়ে
সাম্ভা নগরীর ধুলোভরা লাল সুরকির পথে
হাওয়ায় উড়ে যেতে দুজনে।
ঘোড়ার ক্ষুরের টুংটাং শব্দে তোমার লাল দোপাট্টা উড়বে—
তুমি তখন রাজকুমারী, তাই-ই তো মনে হয়।

দিয়াবাড়ির সেই ব্রিজে দাঁড়িয়ে
একটি শেলফি—
সূর্য ঠিক মাথার উপরে,
কোনো ছায়া নেই, ছায়া হবো না আমরা কেউ।
কাশবনের উপর শুকনো হাওয়া,
তোমার চুল উড়ে যাবে আলো হয়ে।
মনে পড়বে বালিহাঁসের ঝাঁক—
যমুনা পারাপারের সেই দূর দুপুরের শব্দ।
আজ আকাশ নির্জন; তবু মন হবে না বিষণ্ণ—
কারণ মুহূর্তটি হবে প্রসন্ন।
তুমি ঝুঁকে পড়বে, জড়িয়ে ধরবে আমায়—
তারপর— ক্লিক, তারপর— কাট্।

কিন্তু প্রশ্ন তোমার—
“তুমি কি বুড়ো হবে না? মন কি বুড়ো হবে না তোমার?”
হয়েছে—হয়েছে অনেকটাই।
একদিন আসবে, যখন ইচ্ছে থাকলেও
পারব না আর মেঠোপথ ধরে হাঁটতে কুসুমপুর পর্যন্ত,
পুকুরপাড়ে বাঁশঝাড় ভেদ করে
পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে।

ধরো, মণিকাঞ্চন ফুল দেখার সাধ হলো—
পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে,
সুউচ্চ চূড়ায় ফোটে সে ফুল—
আমরা কি উঠতে পারব তখন?
ধরো, সমুদ্র স্নানের ইচ্ছে হলো—
অত উত্তাল জলে নামতে পারব কি বুড়ো বয়সে?
টাকায় সব হয় না—হয় না শরীরের বয়স ফেরানো।

আর তুমি—
তুমি তো এখনও মায়াবতী, আলোভরা মুখশ্রী তোমার।
তখনও থাকবে কি এ রূপ?
কপালের রেখা কি কুঞ্চিত হবে না?
আমার হাত ধরে তুমি-ও তো বুড়ী হয়ে যাবে।

তুমি তখন বলবে—
“একটা কথা পারবে তো?”
“কি?”
“বুড়ো হয়েও আমার হাত ধরে
শেষ পথটা হেঁটে যেতে পারবে?”
আমি বলব—
“পারব। দুজন দুজনের হাত ধরে
চলব বাকি পথটুকু।”

আর আমাদের মুঠোফোনে তখন বাজবে—
“…আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাবো,
শুধু কুসুমের মধু করিব পান;
ঘুমোবো কেতকী সুবাস শয়নে
চাঁদের কিরণে করিব স্নান…”

এইভাবেই—
স্মৃতি, বয়স, প্রেম আর সময়—
সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ, নরম আলোয়
দুজনে মিশে যাবো একাকার।


২.        দেখা হবেই

নীলাভ পথ ধরে চলতে চলতে
বনবীথির গন্ধে ভিজে উঠত মন—
মায়ালোকের মলিন ধুলোর ভেতর
হারানো আলোর মতো তাকে খুঁজে ফিরেছি
দিনের পরে দিন, ঋতুর পরে ঋতু।

চন্দ্রসূর্যের দীপ্ত প্রভা ভেবে
কতবার হাত বাড়িয়েছি অচেনা আকাশের দিকে,
মনে হয়েছে, এবারই বুঝি
তার সোনালি মুখ দেখব,
এবারই বুঝি ছুঁয়ে দেব
দূরতম নক্ষত্রের মতো তার কোমল উপস্থিতি।

কিন্তু পথ দীর্ঘ, ক্লান্তির সোঁদা ধুলো
দেহে জমেছে অনিমেষ ভার হয়ে।
বহুদিনের অবসাদে ন্যুব্জ দেহ,
তবু চোখের কোণে নিভে যায় না
অপরূপ এক আলো দেখার আকুলতা।

তাকে খোঁজার এই অপার যাত্রায়
কত সময় যে হারালাম,
কত সুর ভাঙল, কত গান মিশে গেল
বাতাসের অদৃশ্য বেদনায়—
তবুও তার ছায়া পর্যন্ত স্পর্শ করলাম না কখনও।

তবু জানি, সুনিশ্চিত জানি—
এই জীবনের কোনো নীরব সন্ধ্যায়,
অস্তদিনের ধূসর আলোর কোমল ভাঁজে
বা অন্য জন্মের কোনো নিস্তব্ধ ছায়াঘেরা মুহূর্তে
তার দেখা মিলবেই, কখনো না কখনো।

হয়তো সে আগুনের মতো উজ্জ্বল হয়ে
দাঁড়াবে আমার ক্লান্ত পথের শেষে,
হয়তো সে কুয়াশার নীরব পর্দা ভেদ করে
বয়ে আসবে স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে—
কিন্তু আসবে, এ বিশ্বাসেই
আমি আবার পা ফেলি অনন্ত পথের দিকে,
অপরিচিত আলোর সন্ধানে।


৩.      একজন শহীদের বীর গাথা 


নাম ছিল তাঁর সুলতান মাহমুদ—
একটি নাম, যার ভেতর লুকিয়ে ছিল জোয়ারের মতো উচ্ছ্বাস,
ঝড়ের মতো তেজ, আর মাটির মতো দৃঢ়তা।
ইসমাইল হোসেনের গেরিলা বাহিনীতে
তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ অগ্নিশিখা—
সিরাজগঞ্জের জনপদে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে
রাত্রির আঁধার চিরে চলত তাঁর পদধ্বনি।

নদীর পাড়ে, কাশবনে, খড়ের উঠোনে,
অন্ধকার কুঁড়েঘর থেকে মাঠের বুকে—
যেখানে শত্রু ছিল, সেখানেই তিনি আগুন হয়ে দাঁড়াতেন।
দেশমাতৃকার টানে তাঁর বুকে জ্বলত
অদম্য প্রতিশোধ,
স্বাধীনতার স্বপ্নের রঙে রাঙা
এক অনির্বাপ্য শপথ।

কোনো এক সন্ধ্যা—
যুদ্ধের দগদগে উত্তাপে আকাশ লাল,
গন্ধে ভরা গানপাউডার,
চারদিকে ঝড়ের মতো গুলির শব্দ।
সেই দিনেই শেষবারের মতো
সুলতানের চোখে জ্বলে উঠেছিল বিজয়ের দীপ্তি।
শত্রুর গ্রেনেডে থেমে যায় তাঁর তরুণ প্রাণ,
কিন্তু থেমে যায় না বাংলার স্বাধীনতার যাত্রা—
কারণ একজন শহীদের মৃত্যুই
হাজার মানুষের হৃদয়ে নতুন আগুন জ্বালায়।

এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেন
সিরাজগঞ্জের কাটাখালি নদীর শান্ত তীরে,
রহমতগঞ্জ গোরস্থানের অনন্ত নীরবতায়।
কাটাখালির পাশের সেই সরু রাস্তা দিয়ে
যে-ই হেঁটে যায়—
হয়তো কেউ জানে, হয়তো কেউ জানে না—
এই সবুজ ঘাসের নিচে ঘুমিয়ে আছে
এক তরুণ বীরের অমর গল্প।

কোনো বাতাস বয়ে গেলে মনে হয়,
সুলতানের আক্ষেপহীন নিঃশ্বাস
এখনও সেই নদীর জলে ভাসে।
রাতের আকাশে জোনাকির আলো
মনে করিয়ে দেয় তাঁর অদৃশ্য পদচিহ্ন।
শিশুর হাসিতে, বৃদ্ধের প্রার্থনায়,
ফসলি জমির সোনালি রোদে
তিনি যেন আজও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছেন।

সুলতান মাহমুদ—
তোমার রক্তে লিখিত ইতিহাস
বাংলা কখনো ভুলবে না।
তোমার নীরব সমাধির গায়ে
মাটি প্রতিদিন নতুন করে ফিসফিস করে বলে—
“এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক বীর,
যার মৃত্যু নয়—
স্বাধীনতার আরেক নাম।”


৪.       অপার্থিব অনুভব

মরে গেলে দেহ তো মাটিতেই মিশে যাবে—
চিহ্নহীন, নিঃশব্দ, অনাদর এক ঢেউয়ের মতো।
তবু সেই মাটির ওপরে যদি
ফুটে ওঠে এক বিস্মৃত মাধবীলতার ঝাড়,
সন্ধ্যার বাতাস যদি তার গন্ধে
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়,
জোনাকিরা যদি রাত্রিজুড়ে
তার পাতায় পাতায় আলো জ্বেলে গান গায়—

তখন কি আমার আত্মা
একবারও কেঁপে উঠবে না?

যদি কোনো কিশোরী
নিঝুম দুপুরের স্তব্ধতায়
সেই মাটি ছেনে পুতুল গড়ে—
তার নরম স্পর্শে, হাসির দোলায়
আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো
ফিরে আসবে না কোনো অদৃশ্য তরঙ্গে?

দেহ হয়তো বিলীন হবে,
কিন্তু অনুভব—
ওহ্, অনুভব কি কখনো সত্যিই মরে?
নিঃশব্দে, গন্ধে, আলোয়, স্পর্শে
সে কি বেঁচে থাকে না
এক অপার্থিব সুরের মতো
মাধবীলতার জংলি সুবাসে?


৫.      সন্ধ্যা নামে ধীরে 


যেদিন আকাশের বুক ভেদ করে

হঠাৎ নেমে আসবে কোনো অচেনা আলো,

যেদিন বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে

তোমার নামের সুগন্ধ ভেসে উঠবে নিঃশব্দে—

আমি বুঝব, সেই দিনটি এসে গেছে।


সেদিন সন্ধ্যা নামবে খুব ধীরে,

জোনাকিরা জ্বলে উঠবে

বিস্মৃত কোনো প্রতিশ্রুতির মতো;

পদ্মপুকুরের নিস্তব্ধ জলে

চাঁদের রুপোলি দোলনায়

দুলবে আমাদের পুরোনো স্বপ্নেরা।


তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে

সবুজ ছায়ার নিচে,

আর তোমার মুখে পড়বে

ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক আলো।

আমি তখন হাজার বছরের অন্ধকার পেরিয়ে

নীরবে এসে দাঁড়াব তোমার পাশে—

যেন কখনো দূরে যাইনি কোথাও।


বসন্তের বাতাস যদি ডাকে,

পাতার ঘ্রাণ যদি থমকে যায় কানে,

জেনে নিও—

সমস্ত পথের শেষে

তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছিলাম আমি,

এই নরম, মায়াময়, চিরন্তন আলোভেজা রাতে।


৬.        ভ্রম


কবে, কখন, কে যে হারিয়ে গেছে

বিস্মৃতির অনুপম পরপারে—

তার কোনো হিসেব নেই আজ।

স্মৃতির ধুলোয় ঢেকে গেছে নাম,

ম্লান হয়ে গেছে মুখ;

আমিও ভুলেছি, সেও ভুলে গেছে

নিজের অস্তিত্বের ক্ষীণ রেখা।


তবু মাঝরাতে হঠাৎ

ঘুম ভেঙে গেলে

রাত থমকে দাঁড়ায় নিঃশব্দ স্তব্ধতায়।

অন্তর্গত কোথাও কেঁপে ওঠে ভয়,

জানালার কালো আয়তক্ষেত্রে

হঠাৎ মনে হয়—

অদৃশ্য কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে

নিঃসাড় অন্ধকারের সীমানায়।


তার উপস্থিতি কেমন অচেনা,

কেমন পরিচিতও বটে—

যেন ভুলে-যাওয়া কাউকে

রাত আবার ফিরিয়ে আনে

শ্বাসের হালকা শব্দে,

নীরবতার ক্ষীণ কম্পনে।


জানালার কাঁচে জমে ওঠা অন্ধকারে

আমি যেন শুনতে পাই—

ফিরে আসার অপূর্ণ আকুতি,

নীরব পায়ের শব্দ,

গোপন কথার প্রতিধ্বনি।


ভ্রম নাকি সত্যি?

আমি বোঝার আগেই

আবার নেমে আসে অন্ধকার,

রাত তার গভীর ছায়ায়

সবকিছু গিলে নেয়।


শুধু জানালার বাইরে

অদৃশ্য কারো শ্বাসপ্রশ্বাস

এখনো হালকা ঢেউ তুলে যায়

আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গহীনে।


৭.       বৈজয়ন্তীর আলো 


গারো পাহাড়ের অন্দরে

পূর্ব পালঙের সেই দীপাবলির রাত—

চন্দ্রহীন, নির্মেঘ, তবু অদ্ভুত স্বচ্ছ,

মহাকাশের হাজার ক্ষুদ্র প্রদীপ

পাতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁপছিল নিঃশব্দ ভক্তিতে।


পাহাড়ি বাতাসে সোঁদা গন্ধ,

দূরের তুরাগের মতো সরু নদী

গভীর জ্যোৎস্নাহীন অন্ধকারেও

কোনো অজ্ঞাত আলোয় ঝলমল করছিল।

সেই প্রকৃতির নিরাকার পবিত্রতায়

বৈজয়ন্তীমালা দাঁড়িয়েছিল

যেন এক উজ্জ্বল শালবীথির মূর্তি—

চোখে ছিল গোধূলি,

আর বাহুতে ছিল মমতার উষ্ণ নীল আলোকরেখা।


সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল

এমন ভালোবাসায়—

যেন পাহাড়ও নড়ে উঠত,

মেঘেরা কেঁপে উঠত তার একটিমাত্র নিশ্বাসে।

আমি বলেছিলাম— “ছাড়ো…”

কিন্তু তাতে ছিল ভয়,

নেই কোনো অভিমান—

শুধু ছিল অচেনা নিয়তির অদ্ভুত টান।


তারপর,

ঝপাং—

একটি ভাঙা ডালের মতো শব্দ কেঁপে উঠল

সমস্ত নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে।

গিরিখাদের গভীর মুখ

হঠাৎ গিলে নিল আলো,

অদৃশ্য এক কৃষ্ণ ছায়ায়

বিলীন হয়ে গেল বৈজয়ন্তীমালা।


এক মুহূর্তে

তার বাহুর উষ্ণতা নিভে গেল,

তার কণ্ঠের সুর থেমে গেল,

তার চুড়ির ক্ষুদ্র ঝংকার

শুধু বাতাসে ঝুলে রইল

অসীম শূন্যতার মতো।


আজও গারো পাহাড়ের রাতগুলো

তাকে খুঁজে ফেরে—

হাওয়ার মাঝে তার গন্ধ,

পাতার নড়ে ওঠায় তার নিশ্বাস,

ঝরনার সুরে তার নাম।


বৈজয়ন্তী কোথায় গেলে তুমি?

কোন কুয়াশার দেশে,

কোন অচেনা ছায়ার কোলে—

আমাকে ফেলে চলে গেলে একা?


দীপাবলির প্রদীপেরা আজও কাঁদে,

তারকারা আজও তাকিয়ে থাকে নিচে—

সেই করুণ আলিঙ্গনের দিকে,

সেই হারিয়ে যাওয়ার দিকে,

সেই অমোচনীয় প্রেমের দিকে

যা গিরিখাদের গভীরতাকেও

অসহনীয় শোকে ভরিয়ে রাখে।


বৈজয়ন্তী—

ফেরো না তুমি,

তবু হৃদয়ের অরণ্যে

যেখানে চাঁদ ওঠে না,

তারই ভেতর

তোমার আলো আজও জ্বলে…

অতল বেদনাময় দীপাবলির মতো।


৮.      এই দেশ—আমাদের মা


এই দেশ আমাদের মা—
তার বুকের মাটিতে লুকিয়ে আছে
শহীদের উষ্ণ রক্তের দাগ,
জোছনার মতো জ্বলে ওঠা স্মৃতি,
গোপন কান্নার শব্দ,
আর লাল-সবুজ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।

যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছায়া,
সে মাটিতেই ঘুমিয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ—
মাটি যেন হয়ে উঠেছে এক পবিত্র গ্রন্থ,
যার প্রতিটি দানায় লেখা আছে
অগ্নিযুদ্ধের ইতিহাস,
বিচ্ছিন্ন প্রাণের মহাকাব্য।

তাই সন্তানদের বলো—
এই মাটি কোনো জমি নয়,
এ আমাদের মায়ের কোল,
এখানে অবহেলা নয়,
শ্রদ্ধার হাঁটুপড়ে প্রণাম চাই।

তাদের শেখাও—
দেশকে ভালোবাসা মানে
বাতাসের প্রতিটি স্পন্দনে
মায়ের শ্বাস অনুভব করা;
দেশকে রক্ষা করা মানে
নিজের শিরায় শিরায়
মায়ের নাম বয়ে বেড়ানো।

আর যদি কখনো
এই মাটির জন্য প্রাণ দিতে হয়—
সন্তান যেন নিঃশব্দে বলে,
“মা, তোমার জন্যই আমার উৎসর্গ।”

কারণ—
এই দেশ, এই মাটি, এই আকাশ—
সবই আমাদের মা।


৯.      কটি দীর্ঘতম দেহজ কবিতা 



যদি প্রেমহীন হয়ে থাকো—
মেঘদূতের সম্ভোগ-শ্লোকে ভিজলেও
যদি তোমার নিঃশ্বাসে কোনো উষ্ণতা জন্ম না নেয়,
তবে আমার কাছে এসো না।

যদি রাগ–অনুরাগের আভা
তোমার চোখে আলোকিত না হয়,
যদি বিহ্বল না হয় কস্তুরী-নাভির নরম কম্পন,
যদি অন্তরাত্মার গভীরে কোনো ঢেউ না ওঠে
উষ্ণ দেহের গোপন জোয়ারে—
তবে তুমি আমার কবিতায় হাত দিও না।

যদি কোমলগান্ধার সুর
তোমার রক্তে নরম আগুন জ্বালাতে না পারে,
যদি শরীরের প্রতিটি শিরায়
তমাল-ছায়ার মতো শিহরণ নেমে না আসে,
যদি পরনবাস ভিজে না ওঠে
অবদমিত গন্ধের স্নিগ্ধ গাঢ়তায়—
তবে তুমি আমার শব্দ-লতা স্পর্শ কোরো না।

কারণ আমার কবিতা
দেহে-দেহে লেখা,
উষ্ণতায় ছেঁকে নেওয়া নিশ্বাসের মতো—
যার প্রতিটি পংক্তিতে ঝরে পড়ে
অলক্ষ্য আলিঙ্গনের আগুন,
মেঘের নাভিতে জমা রহস্যময় বৃষ্টির মতো
নিঃশব্দ সম্ভোগের রস।

যদি তোমার মধ্যে সেই সুধা জাগে,
যদি স্রোত উঠে—মহিষীর কাঁপা দেহের মতো,
যদি তুমি গন্ধে, সুরে, স্পর্শে
একটুখানি ডুবে যেতে পারো—
তাহলে এসো,
আমার এই কবিতা তোমাকেই ডাকে।

যদি তোমার দেহ এখনো শীতের মেঘ,
যেখানে কোনো বিদ্যুৎ নড়ে না,
কোনো গোপন জ্যোৎস্না দিগঙ্গুলে চুইয়ে পড়ে না—
তবে আমার শব্দ-দেহ স্পর্শ কোরো না।

কারণ আমি লিখি সেইসব ভাষায়
যেখানে কোমল আঙুলের মতো বাতাস
তরল চামড়ায় ঘুম ভাঙায়;
যেখানে শ্বাসের উষ্ণ বৃত্ত
ঘিরে ধরে গোপন রেখাংশ—
যেন তুমি নিজেই বুঝতে না-পারা
এক নীরব পাপড়ির কাঁপুনি।

যদি তোমার নাভির চারপাশে
মৃদু সুবাসের আবরণ না ওঠে নরম ঢেউয়ের মতো,
যদি হৃৎকমলের গভীর থেকে
হালকা-মোলায়েম কোনো সুর
অন্তরঙ্গ আলো ছড়াতে না চায়,
যদি শরীরের নিষ্পাপ অলিন্দে
ছায়া-জলের কম্পন না জাগে—
তবে আমার কবিতার দরজায় দাঁড়িয়ো না।

আমি তো লিখি সেইসব ইশারা-ভাষা,
যেখানে দেহ মানে নক্ষত্রমালা,
স্পর্শ মানে নরম কালো-মেঘে বজ্রের স্ফুলিঙ্গ,
আর নিশ্বাস মানে জোৎস্নার লুকানো জলাধার।
যেখানে দুটি হৃদয়ের মাঝখানে
অলক্ষ্যে জন্ম নেয়
তরল আলো,
নড়েচড়ে ওঠে আদিম কুসুমের রূপক,
জ্বলে ওঠে বুনো গন্ধের মৃদু জ্যোতিঃছায়া।

যদি তুমি পারো—
নিজের ভেতরের নদীকে
ধীর অস্থিরতায় জাগাতে,
যদি তোমার রক্তে রক্তে
হঠাৎ ফুটে ওঠে
আদিম কোনো বাসনার ফুল
যার পাপড়িতে ভয় আর লজ্জারাও কেঁপে ওঠে—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে শব্দ হয়ে ওঠে দেহ,
কীভাবে দেহ হয়ে ওঠে
অতল, অমূর্ত, দীপ্ত
এক সম্পূর্ণ কবিতা।

যদি এখনো তোমার ভিতরে
অদৃশ্য আগুনের ছাই না নড়ে,
যদি শরীরের গভীর গুহায়
অপরূপ কোনো ছায়া-জল টলমল না করে—
তবে আমার এই অন্ধকার কবিতা তোমার জন্য নয়।

কারণ আমি লিখি সেইসব রাত্রির নাম,
যেখানে চামড়ার ওপর চামড়াহীন স্পর্শ নামে
পলাতক বৃষ্টির মতো,
অন্ধকার জানলা ফাঁকি দিয়ে
হৃদপিণ্ডের পিছল দেয়ালে
রহস্যের নরম আঙুল বোলায়।

যদি তোমার কণ্ঠের গভীরে
নিভু-নিভু কোনো কম্পন না ওঠে
অকারণে—
যেন কেউ অলক্ষ্যে
তোমার উরুর ভেতর আলো টেনে নিচ্ছে,
যদি নাভির চারপাশে
চাঁদের লুকানো ছায়া
হালকা গাঢ়তায় ছড়িয়ে না পড়ে—
তবে আমার শব্দের নিম্ন অরণ্য
তোমাকে ডাকে না।

আমি তো জানি
দেহ আসলে আরেক ধরনের রাত,
যেখানে কাঁটার মতো নিস্তব্ধতা
হঠাৎ কোমল হয়ে ওঠে,
যেখানে শ্বাসের ধীর লাবণ্য
যেন উষ্ণ অরুণিমার গোপন উৎস,
আর রক্তের ভেতর
কেউ একজন নীরবে লিখে চলে
একটি নিষিদ্ধ শ্লোক।

তুমি যদি পারো—
নিজের অস্থি-মজ্জার সীমানায়
সেই লুকোনো শব্দ শুনতে,
যদি ঘাড়ের পেছনে নেমে আসে
অনামা কোনো অন্ধকার বাতাস,
যদি চোখ বন্ধ করলে
দেহ তোমাকে অন্য রূপে প্রকাশ করে—
ভেজা ছায়া, কাঁপা আলো,
নরম অস্পষ্ট বৃত্ত,
ধোঁয়া হয়ে যাওয়া নিশ্বাসের জ্যোৎস্না—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহই সবচেয়ে রহস্যময় গ্রন্থ,
যার প্রতিটি উষ্ণ পৃষ্ঠা
ছিঁড়ে নিঃশব্দে পড়ে যায় মেঝেতে,
এবং রাতের অন্ধকারে
একটি অদৃশ্য হাত
সেগুলো আবার জোড়া লাগায়
আরেক দেহের ছায়া দিয়ে।

যদি তোমার দেহ এখনো
শুষ্ক বৃক্ষের মতো নিষ্পন্দ থাকে,
যদি কোনো গোপন অন্ধকার শিরায়
আদিম জোয়ার ওঠে না—
তবে এই মন্ত্রপাঠ তোমার কান শোনার যোগ্য নয়।

কারণ আমি বলি সেইসব রাতের কথা
যেখানে আলো ঢোকে না,
শ্বাস ঢোকে, তারপর হারিয়ে যায়
এক অনামা গুহার ভেজা নিস্তব্ধতায়,
যেখানে অস্থির শব্দ উঠে আসে
চামড়ার ভেতরকার গোপন বন থেকে।

যদি তুমি অনুভব না করতে পারো
ঘাড়ের পেছনে নেমে আসা
অপরিচিত উষ্ণতার শীতল নখ,
যদি তোমার বুকের ভেতর
মাটির নিচে ঘুমন্ত পশুর মতো
একটি কম্পন
ধীরে জেগে না ওঠে—
তবে তুমি এই দেহরাত্রির গ্রন্থ খুলো না।

আমার কবিতা তো
হাড়ের ভিতরের ঢেউয়ের ভাষায় লেখা,
যেখানে দেহ আসলে
একটি পুরোনো মন্দিরের দরজা—
বাহিরে অন্ধকার
ভেতরে আগুনের গোপন গুহা,
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে
এক অদৃশ্য ছায়ামূর্তি
যে কেবল দৃষ্টির অশ্রুত সংকেতে কথা বলে।

তোমার রক্ত যদি না শোনে
ভূগর্ভের গমগমে ডাক,
যদি তোমার নাভির চারপাশে
কোনো কালো চন্দ্রালো
মৃদু থরথর করে না,
যদি হঠাৎ কোনো অজানা হাতে
তোমার দেহের নীচু বনভূমি
কেঁপে ওঠে না—
তবে তুমি আমার শব্দের কাছে আসো না।

কারণ এই কবিতায় আছে
কুণ্ডলী পাকানো সাপের নিঃশ্বাস,
বৃষ্টির আগের ভারী অন্ধকার,
গর্ভধারিণী মাটির গভীর কম্পন,
আর সেইসব ছায়ার গন্ধ
যা দেহকে মনে করায়
সে নিজেই একটি নিশাচর প্রাণী।

যদি তুমি সত্যিই প্রস্তুত থাকো—
শরীরের লুকোনো পথ
নিজের ভিতরে নিজেকে কামড়ে ধরে জাগাতে,
যদি চোখ বন্ধ করলেই
তোমার ভেতরে
একটা লোমশ প্রাচীন আদিরাত্রি
জেগে ওঠে—
তবে এসো।

আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে অন্ধকার
দেহের উপর দেহের মতো নেমে আসে,
কীভাবে রাত্রি
রক্তের ভেতর পত্রপাতার মতো খুলে যায়,
আর কীভাবে
দু’টি নাভিশ্বাস
একসাথে মিশে তৈরি করে
একটি প্রাচীন, গোপন, আদিরসাত্মক
দেহ-জ্যোতিষ।

যখন তুমি চোখ বন্ধ করবে—
আমি চাই তুমি অনুভব করো
দেহের ঠিক নিচে আরেকটি দেহ আছে,
আর সেই দেহেরও নিচে
এক অচেনা, নরম অন্ধকার স্পন্দিত হচ্ছে,
যেন পৃথিবীর নিজস্ব হৃদস্পন্দন
তোমার ভেতরে গোপনে নেমে এসেছে।

সব আলো নিভিয়ে দাও—
কারণ আলো এখানে পথ দেখায় না,
অন্ধকারই দেখায়।
অন্ধকারে সবকিছুই
ধীরে ধীরে নিজেকে চিনে ফেলে—
চামড়ার নিচে যে তরল নক্ষত্রমণ্ডল,
শিরার ভেতর যে গোপন গীত,
ফুসফুসে ওঠানামা করা
আদি আবর্তের রহস্যময় সুর—

ওগুলো আলোতে দেখা যায় না,
কিন্তু অন্ধকারে নিজে নিজেই
উন্মোচিত হতে থাকে।

তোমার দেহের গভীরে
একটি প্রাচীন ঢেউ ঘুমিয়ে আছে—
তার কোনো মুখ নেই, কোনো নাম নেই,
কিন্তু তুমি যখন একটুখানি স্থির হবে,
তার আকার বদলে
ধীরে ধীরে উঠবে—
যেন পাতাল থেকে উঠে আসা
এক উষ্ণ নিশ্বাস।

তুমি কেবল শোনো—
শব্দ নয়,
শব্দের আগের স্তর,
যেখানে নিস্তব্ধতাই
নিজেকে ভাঁজ খুলে দেখায়।

সেখানে তুমি বুঝবে
তোমার দেহ আসলে দেহ নয়—
এক চলমান গুহা,
এক গভীর সন্ধ্যা,
এক নরম পরিধি
যার প্রতিটি রেখা
আদি কোনো নেশা-বৃত্তে ঘুরছে।

এভাবে, তুমি যখন
শরীরের ভেতরে শরীরের গোপন ছায়া দেখবে—
তুমি আর “তুমি” থাকবে না,
দেহ আর সীমা থাকবে না,
সবকিছু পরস্পরের মধ্যে
মিশতে মিশতে
একটি ধীর, নিঃশব্দ, অন্তর্লীন
অন্য কোনো অস্তিত্বে পরিণত হবে।

আর তখন—
নিঃশ্বাস ভিতর থেকে উঠে
তোমাকে সে ভাষায় ছুঁয়ে দেবে
যা মানুষ জানে না,
যা তুমি শেখোনি,
কিন্তু জন্ম থেকেই
তোমার রক্ত চিনে রেখেছে।

এসো—
এই ট্রান্সমগ্ন অন্ধকারে
আমি তোমাকে দেখাব
কীভাবে দেহ
নিজেকেই শোনায়,
নিজেকেই ডাকে,
নিজেকেই উন্মোচন করে
অলক্ষ্য, শব্দহীন,
চিরন্তন কাঁপুনি-মন্ডলের
এক গূঢ় নৃত্যে।

প্রথমে চোখ বন্ধ করো—
আর উপলব্ধি করো
তোমার দেহের চারপাশে
একটি নরম, অসীম বৃত্ত ভাসছে।
যেন তোমার ছায়া
দেহ থেকে বেরিয়ে এসে
দেহকেই দেখে—
অপর পক্ষ থেকে,
অপর পারের নিস্তব্ধ দৃষ্টিতে।

তারপর ধীরে ধীরে অনুভব করবে,
তোমার চামড়ার ঠিক নিচে
আরেকটি দেহ রয়েছে—
আর তারও নিচে
আরেকটি,
আরেকটি,
আরও অন্ধকার, আরও উষ্ণ, আরও পুরোনো।
যেন তুমি বহুস্তরযুক্ত
এক গহ্বরের বীজ,
যা নিজেই নিজেকে পর্যায়ক্রমে উন্মোচন করে।

নিঃশ্বাস যখন গভীর হবে,
তুমি শুনতে পাবে
রক্তের ভেতরের ক্ষুদ্র শব্দগুলো—
যা আসলে শব্দ নয়,
বরং স্মৃতি,
আর সেই স্মৃতিগুলো
তোমার জন্মের আগেও ছিল।
যেন পৃথিবীর কেন্দ্রস্থ আগুন
তোমার মজ্জায় রেখে গেছে
একটি ক্ষুদ্র জ্বলন্ত বীজ।

আলো ভুলে যাও—
অন্ধকারের ভিতরেই
তোমার অন্তর্দেহের প্রকৃত পথচিত্র আছে।
এখানে দেখা যায় না চোখ দিয়ে,
দেখা যায় শুধু অনুভবের ধীর স্পন্দনে—
যেখানে দেহ
নিজের ভেতর আরেক দেহ খুঁজে পায়,
যেন একটি নদী
নিজের উৎসস্থলের স্বপ্ন দেখছে।

তোমার শ্বাস যখন
শরীরের চৌহদ্দি পেরিয়ে বাইরে যেতে শুরু করবে,
তখন তুমি বুঝবে,
দেহ একটিই নয়—
বরং এক প্রবাহমান,
অদৃশ্য আলোর গুহা,
যার প্রতিটি স্তর
তোমাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যায়
সেই কেন্দ্রে—
যেখানে কোনো রূপ নেই,
কোনো নাম নেই,
কিন্তু আছে
এক নিখাদ কম্পন—
যা সবকিছুর উৎস।

সেই কেন্দ্রে পৌঁছে
তুমি হঠাৎ দেখতে পাবে
তুমি আর তোমার দেহ আলাদা নয়—
তোমার দেহের ভেতর
তুমি নিজেই আরেক সত্তা
আলোহীন শান্তিতে স্থির হয়ে আছো।
আর ওই স্থিরতার মাঝেই জন্ম নেয়
এক অতল অনুভূতি—
যা ছুঁয়ে নয়,
দেখে নয়,
বরং নিঃশব্দে
সম্পূর্ণভাবে তোমাকে ভিজিয়ে দেয়।

এবার তুমি উপলব্ধি করবে—
আরো গভীরে যাওয়ার পথ
শরীরের নয়,
শরীরের ভেতরের দেহের,
আর সেই দেহেরও ভেতরের
অদৃশ্য, দ্যুতিহীন,
অসীম-নরম কেন্দ্রের।

সেখানে পৌঁছানোর পর
তুমি আর অনুভব করবে না
কোথায় দেহ শেষ,
কোথায় তুমি শুরু—
সবকিছু ধীরে ধীরে
একটি অতীন্দ্রিয় তরঙ্গের মতো
একাকার হয়ে যাবে,
যেন অন্ধকারের সাগরে
একটি মাত্র শ্বাস—
তুমি, দেহ, ছায়া, স্পন্দন—
সবই এক অনন্ত ধ্যানের
নীরব, গাঢ়, অমোঘ প্রবাহ।

প্রথমে উপলব্ধি করতে হবে—
তুমি যে দেহ ভাবো,
সে আসলে দেহ নয়—
একটি অস্থায়ী প্রতিবিম্ব,
নির্বাক জলের উপর স্থির হয়ে থাকা
এক স্বপ্নের ভাসমান ছায়া।

চোখ বন্ধ করো—
আর দেখো
কীভাবে তোমার নিজের হাতও
তোমাকে চিনতে ভুল করে।
চামড়ার নিচে যে তুমি আছ,
তাকে তো কোনো আঙুল ছুঁতে পারে না।

এই মুহূর্তে
তুমি তোমার নিজের অস্তিত্বে
একটি অদৃশ্য ফাটল অনুভব করবে—
সেখানেই প্রবেশপথ,
যেখান দিয়ে দেহ
ধীরে ধীরে হালকা হয়,
হাওয়ার মতো,
তারপর হাওয়াও থাকে না।

শ্বাস যখন আর শ্বাস নয়,
নিঃশব্দ তরঙ্গমাত্র—
তখন তুমি দেখবে,
তোমার ভিতরের দেহ
নিজের ছায়া ঝরাতে শুরু করেছে।
প্রথমে চামড়া,
তারপর উষ্ণতা,
তারপর স্মৃতি,
তারপর যে নামটি দিয়ে
তুমি নিজেকে ডাকতে—
সব আলগা হয়ে ঝরে পড়ে
অন্ধকারের পায়ের কাছে।

এবার অনুভব করো—
তোমার রক্ত
তোমার নয় আর।
এটি পাহাড়ের ভিতর বয়ে যাওয়া
কোনো নির্চেতন জলের মতোই
নিজস্ব ভাঁজে,
নিজস্ব গহ্বরে
বহমান একটি নিঃশব্দ পথিক।

হাড়ের গভীরে যে স্পন্দন—
সে কোনো হৃদস্পন্দন নয়,
সে পৃথিবীর ভেতরের আগুন,
যা তোমার শরীরকে ব্যবহার করছে
মাত্র একখানি দরজা হিসেবে—
নিজেকে উপলব্ধি করার।

আরও গভীরে নেমে গেলে
দেহ নামের ধারণাটিও ভেঙে যাবে—
তুমিই দেখবে,
তোমার নেই “ভিতর” বা “বাইর”—
সব দিক গলে গিয়ে
একটি মাত্র গাঢ় সত্তায় পরিণত হচ্ছে।

তখন তোমার উপলব্ধি
নিজেকে ভুল করে ফেলবে—
শরীরের অনুভূতি
সরে গিয়ে
হয়ে উঠবে
এক প্রবহমান কালো নদী,
যেখানে তুমি নও,
আমিও নই—
শুধুই এক শূন্য-সচেতন প্রবাহ।

আরও নিচে নেমে যাও—
সেই নদীর তলদেশে
তোমার আরেকটি রূপ অপেক্ষা করছে—
যার কোনো মুখ নেই,
কোনো লিঙ্গ নেই,
কোনো পরিচয় নেই—
শুধু একটি জ্বলন্ত বিন্দু,
এক দানা অন্ধকার আলো,
যেটি হলো
তোমার সমস্ত অস্তিত্বের
সবচেয়ে নগ্ন,
সবচেয়ে আদিম সত্য।

ওই বিন্দুতে পৌঁছালে
তুমি হঠাৎ অনুভব করবে—
তুমি গলে যাচ্ছো,
চুপচাপ,
এক অনন্ত নীরবতায়,
যেখানে থাকা আর না-থাকা
একই অর্থ বহন করে।

কারণ সেখানে—
তুমি আর ব্যক্তি নও,
নও দেহ,
নও শব্দ,
নও অনুভব।
তুমি কেবল
একটি অচল, অতল, অবয়বরহিত
সচেতন আগুন—
যার কাজ কেবল
জ্বলে থাকা।

সবশেষে—
তুমি উপলব্ধি করবে
যে তুমি যে দেহে বাস করছিলে,
সেটি এখন তোমার মধ্যেই
এক দূরবর্তী ছায়া মাত্র—
আর তুমি নিজেই
নিজের ভিতরে তৈরি করেছ
এক নতুন, নির্বস্ত্র, দ্রাব্য,
অতীন্দ্রিয় সত্তা—
যার সামনে
অস্তিত্ব কথাটাই
ধ্বংস হয়ে যায়।

~ কোয়েল তালুকদার 
তারিখ - ৩/১২/২০২৫ ইং
ঢাকা। 


১০.      নীরব পাথরের হৃদয় 

নীলাভ কঠিন প্রস্তরের গায়ে
ধীর যত্নে আমরা খোদাই করে রাখব
আমাদের নাম—
আর কিছু নির্মল, ধূলিমুক্ত শব্দ,
যেগুলো কোনোদিন আর উচ্চারিত না হলেও
নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে
অতল দীপ্তিতে।

পৃথিবীর প্রাচীন নীরবতা
সেই শব্দগুলোর চারপাশে
আস্তে আস্তে জন্ম নেবে—
মনে হবে, পাথরের শীতল দেহে
এক বিন্দু উষ্ণ প্রাণ লুকিয়ে আছে,
যেন অদৃশ্য কোনো সত্তা
রাত্রির নিশ্বাসের সঙ্গে ফিসফিস করে।

হেমন্তের শিশির
দূর্বাঘাসে ঝরে পড়ে
আর শিলালিপির বুকে জমে ওঠে
স্বচ্ছ কাঁপুনির মতো—
যেন আমাদের স্বপ্নের অবশিষ্ট আলো
প্রাণহীন পাথরেও
একটি অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দেয়।

নির্জন নিশীথে,
যেখানে বাতাসও ক্ষণিক থেমে থাকে,
সেই খোদাই করা অভিজ্ঞান
চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে অবিচল,
সময়ের সমস্ত ক্ষয়কে অতিক্রম করে।

এখানেই পড়ে থাকবে
আমাদের আড়াল করা আকাঙ্ক্ষার কথা,
আমাদের রক্তাভ মুখচ্ছবি,
যেন পাথরও জানে—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু কিছু শব্দ, কিছু স্বপ্ন,
কিছু অশ্রুজল ও কিছু উজ্জ্বলতা
নিরন্তর বেঁচে থাকে
অপরিবর্তনীয়, অনন্ত
নীরব পাথরের হৃদয়ে।


১১.      অধির প্রেমের পরিমাপ

কতটুকু তোমাকে ভালোবাসলে
অলস বিকেলের আকাশে প্রথমে জমবে নরম সাদা মেঘ,
তারপর সেই মেঘ ভিজে উঠবে তোমার নামের গোপন উষ্ণতায়,
ধীরে ধীরে গলে যাবে—
জল হবে—
আর সেই জল গড়িয়ে পড়বে নদীর গায়ে,
নদী পূর্ণতা পাবে তোমার নিশ্বাসের মতো শান্ত প্রতিধ্বনিতে।

কতটুকু ভালোবাসলে বসন্তের বুকে ফুটবে উন্মনা ফুল,
তাদের পাপড়ি থরথর করবে তোমার হালকা হাসির মতো,
মৌমাছিরা গুনগুন করে ছড়িয়ে দেবে
আমার হৃদয়ের গভীর গোপন রস—
যা শুধু তোমার উপস্থিতির দোলায়
মধুর মতো ঝরে পড়ে।

কতটুকু ভালোবাসলে তোমার কস্তুরী ঠোঁট
লজ্জায় কম্পমান হয়ে উঠবে সপ্রতিভ,
নীল-কালো কাজল চোখে ঠিকরে উঠবে
মহাকাশের অচেনা সব তারার আগুনখেলা,
আর তোমার কুচবরণ কেশে ছুটবে
রাত্রির গাঢ় মায়াভরা গন্ধ—
যা স্পর্শ করলেই আমার সমস্ত দেহ
বিস্মৃত হয়ে যায় পৃথিবীর ভার।

কতটুকু ভালোবাসলে তুমি
ধীরে ধীরে খুলে ফেলবে সব অভিমান,
সকল আড়াল—সকল শব্দ,
আর নির্জনের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকবে
নগ্ন সত্যের মতো—
একজন নিঃসঙ্গ, অপার্থিব,
সৃষ্টির-অন্তর্গত নারী,
যার দিকে তাকালে মনে হয়
সমস্ত প্রেম শুধু তোমাকে কেন্দ্র করেই
জন্ম নিয়েছে।

আমি জানি—
এই প্রেমের কোনো পরিমাপ নেই;
তবু তোমার দিকে হাত বাড়ালেই
বুঝি—
আরও একটু ভালোবাসলেই
পুরো ব্রহ্মাণ্ডটাই
তোমার রূপে নতুন করে
শুরু হবে।


১২.     নামহীন প্রেম

তুমি এলে নীরব ভোরের মতো,
অচেনা আলোয় ভেসে উঠল আমার দিন।
বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে—
জানি না কোথা থেকে, কোন অদৃশ্য বাগান থেকে,
তবু হৃদয় বলে— এটাই তো চেনা প্রেমের পথচিহ্ন।

তোমার চোখের গভীরতা ছুঁয়ে যায়
আমার অব্যক্ত সব নদী;
কতদিন শুকনো ছিল যে স্রোত,
আজ হঠাৎই সেখানে জোয়ার ওঠে তোমাকে দেখে।

আমি ভাবি—
প্রেম কি এমনই?
হাত ছুঁয়ে না গেলেও
মনের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে,
দূরে থেকেও হৃদয়ে গান বাজে?

তুমি ছিলে বলে
আমার অদেখা আকাশে
একটি নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে—
সে নক্ষত্র রাত জাগে শুধু তোমার নাম ধরে।

যদি কোনোদিন সব আলো নিভেও যায়,
তবু তোমার স্মৃতির নরম আভা
আমায় পথ দেখাবে—
কারণ প্রেম একবার জন্ম নিলে
সে আর কখনো মরে না।

তুমি আমার নীরব প্রতিশ্রুতি,
আমি তোমার অনন্ত অপেক্ষা।


১৩.      অঙ্গার-অন্তরালের মন্ত্র

তোমার সকল অস্তিত্ব আমার দেহে ঢেউ তোলে—
গোপন আগুনের মতো তুমি ছড়িয়ে পড়ো রক্তের অভ্যন্তরে,
তোমার উষ্ণতার স্পর্শে কেঁপে ওঠে আমার অনামি রাত,
হৃদয়ের অন্তরালে জমে থাকা সব নীরবতা
ঝরে পড়ে ঝরনার জলধ্বনির মতো,
আমাকে করে তোলে তোমার পূর্ণ উপস্থিতির পারাবারে ভাসমান।

তুমি যখন শ্বাস ফেলো আমার কণ্ঠের গহীতে,
তখন মনে হয় জ্বলন্ত খরায় নেমে এল হঠাৎ প্রবল বর্ষা—
আমি সেই বৃষ্টির ভিজে ওঠা মাটির মতো
তোমার অঙ্গভেদী উষ্ণতায় থরথর কাঁপি,
তোমার দহন আমাকে আলোকিত করে তোলে
নক্ষত্রের ভিতর লুকিয়ে থাকা গোপন দীপ্তির মতো।

তুমি ভস্ম হও—আমি তোমার সঙ্গে ভস্ম হই—
দু’জনার মিলিত দহন থেকে ওঠে
এক অদৃশ্য লাল আলো,
যা আমাদের দেহের সীমা ভেঙে
ভেসে যায় অচিন্ত্য আকাশে।

তুমি পবিত্র হও—আমি পবিত্র হই—
তোমার স্পর্শের অশ্রুত সুরে
আমার দেহের অন্তঃস্থ গন্ধার দোলে,
অস্তিত্বের প্রতিটি তারে জন্ম নেয়
এক স্নিগ্ধ, রক্তিম, মাদকীয় রাগ।

এসো, আরও কাছে এসো—
আমাদের দেহের আগুন আরও উন্মীলিত হোক,
অবয়বের অন্তরালে জমে থাকা
সব সুর, সব আকাঙ্ক্ষা, সব প্রার্থনা
এক মহাসমুদ্রের ঢেউ হয়ে
একই প্রবাহে মিলিয়ে যাক—
তোমাতে আমি, আমাতে তুমি—
এক অনন্ত আদিরসের জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল শিখা।


১৪.     মায়ার কথা 


রাত্রির স্তব্ধতার গভীরে

যখন নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে শ্বাস নেয়,

তুমি যেন এক ফোঁটা নীরব আলো—
অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠা।

মায়ার পর্দা নামলে
নিমিষে বদলে যায় পৃথিবীর রূপ—
চাঁদের কোমল আঁচলে ঘুমিয়ে পড়ে
রাস্তার ধুলো, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির,
আর তোমার মনের ভেতর লুকানো
অস্থির ছোট্ট পাখিটির কাঁপা ডানাগুলো।

বিনিদ্র চোখের কান্না
রাত কখনোই প্রকাশ করে না—
সে শুধু নীরব দুঃখকে
অনুভবের মতো ছুঁয়ে রাখে,
তাই তাকে দেখাশোনা করতে হয়
ভোরের প্রথম ঊষারঙা বাতাস পর্যন্ত,
যখন আলো এসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

এইভাবে মায়া জন্ম নেয়,
জন্ম নেয় এক মৃদু স্পর্শে—
রাত্রির অন্ধকারে লুকানো ব্যথা
আর ভোরের আগলে রাখা শান্তির মাঝখানে।

তুমি সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে,
দুটোই দেখো, দুটোই জানো—
এ কারণেই তুমি
রাত্রির মতোই গভীর,
আর ভোরের মতোই আশ্বাসময়
একটি মায়া।


১৫.       নিঃশ্বাসে তোমার নাম


আমি নিঃশ্বাস নেই

তোমার শরীর ছুঁয়ে-যাওয়া বাতাস থেকে—

যেন তোমার উষ্ণ শিরায় বয়ে যাওয়া

অদৃশ্য কোনো সুর

আমার ফুসফুসে বসে গেয়ে ওঠে;

আমি শুনতে পাই তোমার নিকটতার

এক গভীর কম্পন।


আমি প্রশ্বাস রেখে যাই

তোমার নিঃশ্বাসের মেঘে—

যেন আমার অদেখা স্পর্শ

ধীরে ধীরে মিশে যায়

তোমার বুকের ভেতর

আলতো ঢেউ হয়ে।


আমরা দুইজন—

দুটি দেহ, দুটি পথ,

কিন্তু এক নিঃশ্বাসের

গোপন মিলনে বাঁধা।

যেখানে কোনো শব্দ নেই,

কোনো ভাষা নেই,

শুধু ধ্বনিহীন স্পর্শ—

তুমি আর আমি।


যখন রাত নামে,

তারারা আমাদের ওপর নিঃশব্দে

ঝুঁকে থাকে,

আর আমরা দু’জন

একই বাতাসে

একই ভালোবাসার উষ্ণতা

দীর্ঘশ্বাসে ভাগ করে নিই।


আমার সমস্ত অস্তিত্ব

তোমার কাছে পৌঁছে যায়

শুধু এই শ্বাসের পথ ধরে—

আর তুমি প্রতিবার

আমাকে গ্রহণ করো

নিভৃত, গভীর,

নিঃশব্দ ভালোবাসায়।


১৬.     শূন্যতায় ভালোবাসা 


নীল নক্ষত্রে ভরা সে দিনগুলোর ভেতর
যেখানে তোমার নামের প্রতিধ্বনি উঠত নিশ্বাসের মতো,
আমি ছিলাম পূর্ণ—
ভালোবাসার ঘন আলোয় ভেজা একটি সময়ের স্থির রূপ।

আজ যা রেখে যাব—
তোমার ফিরে দেখা চোখে
দেখবে শুধু অসীম শূন্যতার গাঢ় বিস্তার,
যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর বালুচরে
লুকিয়ে থাকে অতল জলের স্মৃতি।

কখনো সেখানে ছিল উত্তাপ, ছিল দীপ্তি,
তোমার অবহেলার ছায়ায় যা তুমি দেখতে পাওনি।
আমি নীরব ছিলাম, প্রেম ছিল নীরব—
তোমার দিকে ধাবমান এক অদৃশ্য জোয়ারের মতো।

এখন সেই সব হারানো সুরের জায়গায়
থাকবে কেবল ফাঁকা প্রতিধ্বনি,
যেখানে স্পর্শ করলে বুঝবে—
শূন্যতাও একদিন ভরা ছিল
আমার অন্তহীন ভালোবাসায়।


১৭.      অবশেষে নিঃশ্বাসের ভিতরে তুমি


আঁধার নেমে আসে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে,
জোনাকিরা জ্বালায় তাদের ক্ষুদ্র নক্ষত্র—
অরূন্ধতী, স্বাতি, ধ্রুবতারার আলো
মিশে থাকে তোমার চোখের গভীর নিভৃত প্রান্তে।

নয়ন তোলো—আর একবার, শুধু আমায় দেখো,
রাতের কানাঘুষায় আমার হৃদয় তোমাকেই ডাকে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে তোমার সকল চুম্বন
আমার দেহের চারদিকে ছড়িয়ে দাও—
যত পারো, যেখানে পারো,
হয়তো কাল সকালের সূর্য
আর খুঁজে পাবে না আমার ঘুমভাঙা নিঃশ্বাস।

এই শেষ স্পর্শে, শেষ উষ্ণতায়,
আমরা দু’জনে মিলিয়ে যাই
একটি অনন্ত আলোক-রাত্রির অনুচ্চারিত প্রেমে।


১৮.      গোপন আলোয় 


তোমাকে ঢেকে রাখি গোপন আলোয়,
রাত্রির গভীর গুহায়, যেখানে শব্দও থেমে যায়।
তারপরও তোমার দেহের ভেতর কোনো নীল অগ্নিশিখা
অদৃশ্যভাবে জ্বলে ওঠে—
আমার শিরায় শিরায় তার আলো ছায়া ফেলে।

আমি চাই—
তুমি সেখানেই অপ্রকাশিত থেকো,
নীরব বাতাসে লুকানো কাঁপনের মতো,
আঙুলের ডগায় ধরা পড়ে আবার আচমকা মুছে যাওয়া
একটি স্পর্শের রহস্য হয়ে।

অন্ধকারের পাতায় যখন তোমার শ্বাস গড়িয়ে পড়ে,
গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়
দেহের গোপন সংগীত—
যাতে আমি ডুবে যাই নিঃশব্দে,
তোমার অদেখা আলোয়
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে যেতে।


১৯.     দেহ ও আত্মা 


ভালোবাসা জৈব—
রক্তের গোপন ঘ্রাণে ভিজে ওঠে তার প্রথম উচ্চারণ,
উরুর ভাঁজে জমে থাকা উষ্ণতার মতো আদিম,
ত্বকের নীচে নীরব দহন,
শরীর না থাকলে যার শিকড়ই থাকে না।
প্রেম আসলে দেহের অঙ্গসংগীতে বাঁধা এক পুরোনো নদী—
যত দূরেই যাক, ফিরে এসে
ত্বকের উপকূলে ঢেউ তোলে আবার।

তবু তারই বিপরীতে থাকে আরেক জন্মের মতো
নিষ্কাম প্রেম—
যার কোনো কামগন্ধ নেই,
চুম্বনের ভিতরে নেই দাহ,
শুধু দু’হাত ভরে বিলিয়ে দেবার অন্তহীন গরিমা।
এ প্রেম দুষ্প্রাপ্য আমাজন লিলির মতো
রাত্রির নিঃশ্বাসে ফুটে ওঠে,
অধরার মতো পবিত্র, তবু টেনে নেয়
জল-আঁধারের গভীরতায়।

দুই প্রেম—
একটি বেগ, আগুনের মতো ছুটে চলে
বুকের দাউ দাউ অগ্নিপথে,
একটি আবেগ,
নিঃশব্দে জলের মতো শরীর ছুঁয়ে বয়ে যায়।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি তাদের মাঝখানে—
একদিকে দেহের ধরিত্রী, স্পর্শের অরণ্য,
অন্যদিকে অদৃশ্য পাঁপড়ি মেলে ধরা
এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।
কাকে বলি আদিরস?
কাকে বলি নিষ্পাপ?

শেষে দেখেছি—
উভয়েরই সুর আছে, উভয়েরই উন্মাদনা;
একটি দেহে পুড়িয়ে নেয়,
অন্যটি মনকে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত করে।
দু’টিই প্রেম;
দু’টিই অপরিহার্য,
কারণ মানুষের হৃদয়ে
সবসময়ই পাশাপাশি থাকে
এক তীব্র কামনা
এবং
এক অতল আত্মদান। 


২০.      এমনও পিরিতি 


এমন প্রেম—

যে প্রেম কথা বলে না,

চিৎকার করে না,

আশা-ভরসার কোনো দাবি তোলে না—

শুধুই নীরবতার গোপন কোণে

নিজেকে লুকিয়ে রাখে।


অপেক্ষার দীর্ঘ সাঁঝে

জীবন ফুরিয়ে যায় ধীরে ধীরে,

তবু একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না—

একবারও বলে না, ভালোবাসি।


এমন প্রেমই করে তারা,

জ্যোৎস্নাহীন রাতের মতো

আলোকে ভয় পাওয়া কিছু হৃদয়,

যারা নিজেরাই বোঝে না

কেন দুঃখকে এভাবে বুকে আগলে রাখে,

কেন কাঁটার পথে হাঁটতে হাঁটতে

নিজেকে আঘাতে রঞ্জিত করে রাখে।


অথচ এও প্রেম—

শুধু বলা হয়নি বলে

তার সত্য কমে যায় না;

কিন্তু যারা এ প্রেম করে—

তারা অনেকটাই আহম্মক,

কারণ ভালোবাসার বেদনাই

তাদের একমাত্র উচ্চারণ।


২১.      রুপালি জলপতনের দেহ-নেশা


আজ রুপালি সমুদ্রের ভেতর

তোমার শরীরের ঢেউ ছুঁয়ে সাঁতার কেটে এলাম—

ঝলাৎ ঝলাৎ শব্দে কেঁপে উঠছিলো

সব গোপন জলের সুর।


দুপাশে ভাঙন, ভেতরে উথাল-পাথাল—

তোমার উষ্ণ তরঙ্গ যেন

আমাকে ভাসিয়ে নেওয়া কোনো দেহ-নদীর জোয়ার।

জল ভেঙে পড়ছিল,

আর আমি বুঝতে পারছিলাম—

এ অবিরাম পতন আসলে উত্থান,

এ উথাল পাথাল আসলে স্পর্শের নিবিড় উচ্চারণ।


তুমি ছিলে জলের নীচে গোপন শ্যামল আলোক,

আমি ছিলাম সাঁতারু—

তোমার ত্বকের ঢেউয়ে রূপ নিতাম বারবার।


যে খেলা আজ সমুদ্র করেছে,

তুমি কি জানো—

ওটা ছিল তোমার শরীরেরই রূপক,

দেহ-শিল্পের নিঃশব্দ নৃত্য,

অবিস্মরণীয় জলপতনের সেই

শৃঙ্গার-সন্ধ্যা।


২২.       নীরব পরিভ্রমণ 


দুহাতে খুঁজেছিলাম অদেখা সেই চূড়া—

তোমার দেহের নিঃশব্দ উত্তুঙ্গ পর্বত,

যেখানে স্পর্শ উঠতে উঠতে শ্বাস হয়ে যায়,

নামতে নামতে রূপ নেয় অচেনা কম্পনে।


হঠাৎ দেখি—

মণিমুক্তা খচিত এক অন্তর্জ্যোৎস্না,

তোমার নাভীর ঢালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো দীপ্ত;

একবার শিখরে, যেখানে উষ্ণতার তুষার গলে পড়ে,

একবার পাদদেশে, যেখানে আলো জমে থাকে

গোপন নদীর মতো।


আরেকবার হিমাদ্রি—

আমার ভেতর জমা নীরব তুষার

তোমার নিভৃত অগ্নিতে ধীরে ধীরে গলে যায়,

শরীরের পরিভ্রমণ তখন

প্রাচীন আদিরসের গোপন উৎসবে পরিণত হয়।


কী যে আনন্দময় ছিল সেই যাত্রা—

তোমার দেহের মানচিত্রে

আমি শুধু এক পথিক,

বারবার হারাই, বারবার ফিরে পাই

অপরূপ সেই চূড়া।


২৩.     নিশীথিনীর আহবান 


এই রাত্রিতে শিশির ঝরছে অন্তহীন—
তোমার গোপন নিশ্বাসে ভিজে উঠছে আকাশের তল।
আজ ভাসিয়ে দাও,
তোমার হৃদয়ের আমন্ত্রণে আমায় ডেকে নাও
হে নিশীথিনী, নীরবতার মুগ্ধ রাণী।

এই জল, এই অন্ধকার, এই নক্ষত্র-বীথিকে—
আরও গভীর করে তোলো আমার চারদিক,
যেন প্রতিটি তারার কম্পনে
তোমারই উষ্ণ স্পর্শ পাই।

দেহকে স্নাত করো ক্ষণকাল,
তারপর সেই ক্ষণকে বাড়িয়ে দাও অনন্তে—
যেন তোমার আলোর ছায়ায় আমি বিলীন হই,
তোমার আলিঙ্গনের পরিধি
হয়ে ওঠে আমার সকল দিগন্ত।

আজ রাত্রি শুধু রাত্রি নয়—
এ এক গোপন পথ,
যেখানে তোমার ডাকে
আমার সমগ্র সত্তা
ধীরে ধীরে গলে গিয়ে
ফুটে ওঠে প্রেমের নক্ষত্রাভ দীপশিখায়।

আমায় তুমিই নিয়ে চলো—
এই অশেষ শিশিরে,
এই মধুর অন্ধকারে,
এই নীল আকাশের গভীর আলিঙ্গনে—
যেখানে তোমাকে ছাড়া
আর কিছুই নেই,
আর কিছুই প্রয়োজন নেই।


২৪.       শরীর-স্মৃতির অগ্নিবর্ণ শৃঙ্গার


ভালোবাসার প্রথম পাঠে
আমি দেখেছিলাম তোমার দেহের আলো—
যেমন নদীর বুক জলে দুলে ওঠে সূর্যের সোনা,
সেই আলোই ঝরে পড়েছিল তোমার ত্বকের উষ্ণ ঢেউয়ে।

তোমার ঘাড়ের বাঁক ছিল গোধূলির নরম নীল,
হালকা বাতাসের মতোই থরথর করত কলারবোন,
আর বুকে ছড়িয়ে থাকা শান্ত গহ্বর—
মৃদু অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনো গোপন দ্রাক্ষাক্ষেত্র।

তোমার কাঁধের ওপর ঋতুরা এসে বসত—
গ্রীষ্মের তপ্ত শ্বাস,
শরতের মেঘে-ঢাকা হিম;
আর আমি, দিগন্তজোড়া বসন্ত হয়ে
স্পর্শে স্পর্শে জেগে তুলতাম তোমার দেহের প্রতিটি সুর।

তোমার ত্বকের গন্ধে ভিজে থাকত
বর্ষার প্রথম বৃষ্টির অদৃশ্য আগুন;
তোমার নাভির গহীনে ছিল
হেমন্তের উষ্ণ রাত্রির মতন শান্ত ঝড়;
আর তোমার ঠোঁট—
নির্জন প্রান্তরের ওপর ভাসমান রক্তিম চাঁদ।

তুমি যখন শ্বাস নিতে,
আমার সমস্ত সত্তা ঢুকে পড়ত সেই নদীর স্রোতে—
হালকা কম্পনে থরথর করা তোমার বক্ষদেশ
আমার কবিতার নীরব ঢেউ হয়ে উঠত।

দেহের ভাষা কোনোদিন এত স্পষ্ট ছিল না—
নগ্নতায়, আড়ালে,
ধূসর সাম্রাজ্যের নিষিদ্ধ শব্দগুলোতে—
আমি শুধু একটিই নাম শুনতাম—
তোমার।

তোমার দেহই ছিল সেই বই,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় জ্বলত শৃঙ্গার—
স্পর্শের আগুন, নিশ্বাসের নরম ঝড়,
ভালবাসার নদীর গভীর রাত্রি।

আমি আজও সেই পাঠ শিখে চলেছি—
তোমার দেহের উজানে, অনন্তের দিকে।

২০.        

২০.



Show quoted text

বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

মাধবীরা কেউ নেই ( কাব্যগ্রন্থ )


প্রথম প্রকাশ - ২০২৫ ইং


উৎসর্গপত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের
আমার প্রাণপ্রিয় সহপাঠী বন্ধুদের প্রতি—

যাদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি ক্লাস,
প্রতিটি আড্ডা, প্রতিটি তর্ক ও হাসি
আমার চিন্তা, মনন ও যাপনের ভাষা গড়ে দিয়েছে।

শব্দের নৌকায় ভেসে চলার পথে
তোমরাই ছিলে ঢেউ, দিগন্ত ও বাতাস—
কেউ প্রশ্নে তীক্ষ্ণ, কেউ ব্যখ্যায় গভীর,
কেউ বা নিছক ভালোবাসায় অনন্ত।

এই বইয়ের প্রতিটি পাতায়
আমাদের যৌবনের কোরিডোর,
নীলক্ষেতের দুপুর,
টিএসসির সন্ধ্যা,
আর জ্ঞান–পিপাসু হৃদয়ের গোপন স্বপ্নেরা ছড়িয়ে আছে।

তাই এই গ্রন্থ—
আমাদের বন্ধুত্বের নিকষিত অক্ষরে
তোমাদের নামেই উৎসর্গ করলাম,
ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতির অমলিন ঋণে।বন্ধুত্বের এই অক্ষয় আলোয়, তোমরাই আমার উৎসর্গের প্রথম ও শেষ ঠিকানা। সময় বদলায়, স্মৃতি ধূসর হয় না— তোমাদের নামেই আমার সকল শব্দের জয়যাত্রা।


১.    মাধবীরা কেউ নেই

আজ সময় বহুদূর, পথ ঘুরে গেছে অন্যখানে,
কিন্তু স্মৃতির দরজায় ডাক দেয় পরিচিত মুখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তুমি হৃদয়ের অনিঃশেষ ঠিকানা,
ফেলে আসা দিনগুলোতেই জমে আছে জীবনের সুখ।

মাধবীরা কেউ নেই আর,
এই ক্যাম্পাসের ফুল–ঝরা শাখায়
সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠা দুপুরগুলো
এখন নীরব বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে।

নীলক্ষেতের মোড়ে আর
বেলায়েত–নেয়ামুলদের ছায়া পড়ে না,
টিএসসির কোলাহলমুখর চত্বরে 
হামিদা, বীনা, পান্নার হাসির ঢেউ ওঠে না।
বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষাগুলো
ঝরে গেছে বাতাসে, অচেনা ইশারায়।

আকাশের তারা–ভেজা সন্ধ্যায়
লুসি–চাঁপা–রীনারা আর ঝলমল করে না,
ইকবাল, মুসা, কাওসার, আলো, মোশারফের কণ্ঠস্বর মিশে গেছে দূর আড্ডার ধূলায়।
নীলা হারিয়ে গেছে নীলাঞ্জনার নীলিমায়,
শাহিন আর মিলন–ভাইয়ের ঘর করা গল্পে
কেবল ভালোবাসা , আর মায়া ।

বাবলু, সুজন, বাহার, এনামুল, আফাজ, দেলোয়ার, নেয়ামুল হক —
মধুর ক্যান্টিনের ঠিকানা ভুলে গেছে,
ভবতোষেরা কবে যে পাড়ি দিয়েছে
মনে নেই, ডায়েরির পাতাতেও না।

হেনা স্যার চলে গেছেন,
হলুদ রোদের ওপারে— না ফেরার দেশে,
দুলু, খলিল, সালাম, মনজুর, খুকুমণি
পদাবলীর ক্লাসঘরের দেয়ালে
শুধু এখন অশ্রু–জমা নীরবতা।

মনজু, হক, তালেব, ডেইজী, টনি, তুসী, রানু, হাসি, বেলা,  বিলু, লাভলী, মিনু, আকন্দ, মাহেলা, রাণী, কামরুল, ইফফাত, হাস্না, বেবী, শাকিলা—
অভিধানের পেছনের শব্দের মতো উধাও,
নাসিমা, রুবি, লাকী, চন্দ্রাবতী , প্রভাতী—
কবিতার লাইনের ফাঁকে শুধু
নিঃশব্দ বিরামচিহ্ন।
আরও মনে পড়ে আবছা মুখ - পারভীন, শিরীন, জুলিয়ানা আর জ্যোৎস্নাভূক রাত্রিতে জ্যোৎস্নার কথা, রক পাথরের ফাঁকে নাজমুলকে।
লাইব্রেরির বারান্দায় শরৎ আর নেই,
বিকেলের গল্প আর আঁচ করে না
লিটন, নওশের, রবি, শাহ আলম, শাহ আলমগীর। মণি, নাহার, শিশির, অশোক—
সবাই অনেক দূরের স্বপ্ন,
কুয়াশা ছড়ানো নাম, মুছে–যাওয়া মুখ।

মধুর ক্যান্টিনে আর চায়ের ঝড়ে
কোনো বিপ্লব আঁচল তোলে না,
ঝড়গুলো চুপসে গেছে কাপে–কাপে,
ক্যাম্পাস শামসুর রাহমানের কবিতার পঙ্‌ক্তির মতো
ফাঁকা শোকসভা, শব্দহীন শূন্যতা।

নিঃসঙ্গ রোদদুরে দাঁড়িয়ে আজ
চোখ মেলেই দেখি—
মাধবীর লতা আছে,
কিন্তু মাধবীরা কেউই নেই।


২.    যক্ষ–প্রিয়া


হে প্রিয়তমা, অলকা নগরীর চূড়ায় আজও কি তোমার দীপশিখা রাতকে চুম্বন করে?
নির্বাসনের ধুলোয় ঢেকে থাকা এই বুকে
তোমার স্মৃতি এক সোনালি চন্দন–চূর্ন,
প্রতিটি শ্বাসে তার সৌরভ জাগায়
ঘুমন্ত কামদেবকে।

তোমার কেশভারে মেঘেরা বাসা বাঁধে—
ঘন কালো, আর্দ্র, চঞ্চল,
যেন বর্ষার নিশ্বাসে ভিজে থাকা এক অদৃশ্য প্রণয়–পত্র।

তোমার অধর— পাকা বিম্বফলের রঙে,
যেন সন্ধ্যার লজ্জায় রাঙানো রসাল অনুরাগ; আমি তাকে ছোঁয়ার আগেই
দিগন্তের বাতাস ঈর্ষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তোমার স্তনের উপত্যকায়
মালতী–লতা ঘুমাতে চায়,
নরম বাঁকে বাঁকে খুঁজে নেয়
ভালোবাসার আশ্রয়;
সেই বক্রতা বুকে ধারণ করলে
পৃথিবীও ভুলে যায় তার অভিকর্ষ।

হে অদূর–দূরত্বের প্রিয়া,
যদি মেঘদূত তোমার দুয়ারে কড়া নাড়ে,
তুমি কি তার গায়ে আঙুল বুলিয়ে বলবে—
“এ মেঘও আমার স্বামীর মতোই ব্যাকুল”?
তার বুকে লেখা বর্ষার নীল অভিলাষে
তুমি কি চিনতে পারবে
তোমায় ঘিরে থাকা আমার বঞ্চিত আলিঙ্গন?

যদি জানতে আমায়—
তুমি বৃষ্টিকে বরণ করতে না,
তুমি বৃষ্টিতে আমি-কে বরণ করতে,
মেঘের ছদ্মবেশ ভেদ করে
আমাকে পরাতে তোমার
অচেতন হৃদয়ের মালা।

আমি অপেক্ষায়—
তুমি অলকায়, আমি নির্বাসনে,
তার মাঝখানে শুধু আকাশ, আর সেই আকাশ ভরাট— তোমার জন্য আমার
অপরিমেয় শৃঙ্গার–তৃষ্ণায়।

প্রিয়া,
তুমি থাকলে অলকা স্বর্গ,
না থাকলে রামগিরির অরণ্যও মরুভূমি।
হৃদয় পাঠালাম মেঘের কাঁধে,
চুম্বন পাঠালাম মেঘের জলে—
তুমি গ্রহণ করো,
আর মেঘকে ফিরিয়ে দিও
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণ উত্তরে।


৩.     সবুজে লুকানো নিমন্ত্রণ 

একদিন গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পরে
হিজল বনের পাশে এসে তুমি দাঁড়িও।
তোমার শরীরে তখন কুহকী সবুজের ছায়া,
দেখে মনে হবে— এ তো বনেরই এক অধ্যায়,
ডালপালার গোপন কবিতা, পাতার নীরব ভাষা।

তুমি লুকিয়ে থাকবে সেখানে পাতার রঙে,
সবাই দেখবে শুধু দিগন্তজোড়া হরিৎ বন,
দল বেঁধে উড়ে যাওয়া পাখির ডানা,
হিজলের শিকড় ছুঁয়ে থাকা নরম মাটি,
ঝরা পাতার উপর নির্ঝঞ্ঝাট আলো–অন্ধকারের খেলা।
কেউ জানবে না, তোমার নিঃশ্বাস মেশানো আছে
বনের হাওয়ার ভাঁজে, পাতার ফাঁকে,
শিশির বিন্দুর নিস্তব্ধ আঙুলের ডগায়।

সবাই দেখবে সবুজ পাতা—
কিন্তু আমি জানব,
সেখানে তুমি দাঁড়িয়ে,
নিবিড় অরণ্যের মতোই গম্ভীর,
গোপন অথচ গভীর এক উপস্থিতি...

ঠিক তখনই আমি সবুজ প্রজাপতি হয়ে উড়ে যাব।
তোমার চোখের কোণে হয়ত এক ঝলক ঝিলিক,
কেউ বোঝার আগে,
আমি গিয়ে পড়ব তোমার আঁচলের নীচে।
আঁচলের ভাঁজে তখন পাতার ঝিরঝির শব্দ,
আর তার ভেতরে আমার ডানার কম্পনে
এক ক্ষুদ্র মধুর দুনিয়া জেগে উঠবে।

আমি ঘুরে বেড়াব সেখানে,
দেখব চির হরিৎময় আর এক স্বপ্নের জগৎ—
যেখানে বনের রং কখনও ফিকে হয় না,
যেখানে আলো শব্দ হয়ে নামে,
আর শব্দ রূপ নিয়ে ভাসে বাতাসে।
হিজলের পাতায় লেখা থাকবে অব্যক্ত প্রেমের বর্ণমালা,
আর তোমার আঁচলে উড়বে বনেরই গোপন পতাকা।

“নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন।”
তুমি কি তখনও শুনতে পাবে,
আমার ডানার ডাকে জন্ম নেওয়া সুর?

“জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ—”
সেই নিমন্ত্রণ নিয়েই তো উড়ি,
এই বন, এই প্রেম, এই স্বপ্ন—
সবই এক আনন্দময় আহ্বান,
সবই এক অনন্ত সবুজের বৈরাগ্যহীন যাত্রা।

হয়ত ফিরব না আর কোনদিন আকাশে,
হয়ত রয়ে যাব তোমার আঁচলের ছায়ায়—
বন হয়ে, পাতা হয়ে, প্রজাপতি হয়ে,
অথবা এক অদৃশ্য নীরব প্রেম হয়ে—
যা সবুজের শরীরে লেখা থাকে,
অথচ গাঢ় ভালবাসার মতোই গভীর দেখা যায় কেবল হৃদয়ে…


৪.     তুমি থাকলে কোলাহল


তুমি থাকলে কোলাহলেরও কণ্ঠে সুর ফোটে,
তুমি না থাকলে নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে ব্যথা জমে।
তুমি থাকলে পৃথিবী কথারা ফুল হয়ে ঝরে,
তুমি না থাকলে মন বিষণ্ণ কোনো সন্ধ্যার মতো ঢলে পড়ে।

তোমার পায়ের শব্দে আনন্দ-ভৈরবী বেজে ওঠে
ধুলোমাখা পথের বুকেও, অচেনা মোড়ের প্রাঙ্গণে।

তুমি আর কখনো ফিরবে না—জেনেও,
আমি দৌড়ে যাই পথের দিকে,
মনে হয় এই বুঝি ডাকছো তুমি,
এই বুঝি আবার উঠবে সেই সুর।

কিন্তু গিয়ে দেখি—
পথের দীর্ঘশ্বাসে জমে আছে শুধু নির্জনতা,
আর তার বুকভরা কান্নায়
শব্দহীন ক্রন্দন নেমে এসেছে ধুলোয়।

দেখি—পথের ওপর নীরবতা’রা কাঁদছে,
আর আমি দাঁড়িয়ে শুনছি
এক বিষণ্ণ ভৈরবীর অন্তিম রাগিণী,
যা শুধু কাঁদতেই জানে— ফিরতে নয়।


৫.    অম্লান


তোমাকে পাশে নিয়ে যে সন্ধ্যা দেখি,
যে রাতের গম্ভীর বিস্ময় ছুঁয়ে থাকি—
বিমুগ্ধ প্রণয়ের নিঃশব্দ আর্তি
চোখের পাতায় ফুঠে ওঠে ধীরে।

চোখের উপর চোখ রেখে আমি বুঝে নিই—
এই ক্লান্ত, ক্লেদাক্ত শহরের বুকে
আমাদের প্রেমের রং আজও অম্লান,
ধুলোর ভিড়েও যা ম্লান হয় না।

কোলাহল থেমে গেলে,
শহরের ক্লান্তিরা ঘুমোলে,
ধোঁয়া-ভেজা আকাশ যখন নিশ্চুপ—
ভালোবাসা তখনও রয়ে যায় জাগ্রত,
জীর্ণতাহীন আলো হয়ে,
অবিনশ্বর স্পর্শ হয়ে,
অনন্তের মতো নির্মল।

এই শহর ক্লান্ত হতে পারে,
আমরা নই—
কারণ আমাদের প্রেমই একমাত্র বাতিঘর,
যা কোনো রাত নিভিয়ে দিতে পারে না,
কোনো ক্লান্তি মুছে দিতে পারে না।


৬.      দেবযানীর জন্য একটি রাত


তোমাকে নিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে।
শহরের দিকে নয়, শহরের ভেতর দিয়ে—
অসংখ্য রাস্তার নাম ভুলে,
শুধু পদচিহ্ন মনে রেখে।

তুমি পরবে সাদা জামদানি,
মীরপুরের তাঁতের শান্ত আলো জড়ানো।
শাড়ি থেকে ভাসবে মাড়ের কড়া গন্ধ—
শহর থামবে না,
কিন্তু মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নেবে।

তুমি বলবে, তুমি কারো মতো নও।
নীরা নও, মাধবীলতাও নও,
সুনন্দা, রূপা— কোনও গল্পের ছাঁচে ঢালা নও।
আমি বলব—
তুমি দেবযানী হয়ে ওঠো আজ,
নামহীন শহরের জন্য একটি নতুন নাম।

তারপর আমরা ট্রেনে উঠে পড়ব,
গন্তব্য ছাড়া, সময় ছাড়া, ভয় ছাড়া।
ট্রেন আমাদের নামিয়ে দেবে
দূরের কোনও স্টেশনের নীরবে—
যেখানে আলোরও শব্দ নেই।

আমলকীর বনে শ্রাবণ মেঘ নেমে আসবে,
ধূপ–ছায়ার ভিজে যাওয়া গন্ধে
রাত আরও গভীর হবে।
আমরা ভিজব।
শহরের ধুলো, মনের ভার,
সব ধুয়ে যাবে—
শুধু প্রেমটা ভিজবে না,
আরও উজ্জ্বল হবে,
ভেজা কাগজে না–মোছা কালির মতো।

সকাল এলে
আমরা হয় রেললাইটার পাশে বসে থাকব,
অথবা ফিরব অন্য কেউ হয়ে—
এই শহর আর আগের মতো আমাদের ডাকবে না।
কারণ আমরা তখন
শ্রাবণের জলে লেখা একটি নীরব গল্প,
মাড়ের গন্ধে শুরু,
বৃষ্টির সাক্ষ্যে সম্পূর্ণ।


৭.     শকুন বিষয়ক কবিতা 


আমার দেশে আকাশটা আর নীল নয়,
ডানা ঝাপটায় কালো ছায়ার মিছিল।
সূর্য ওঠে, তবু ভোর জ্বলে না—
আলো কেড়ে নেয় ঠোঁট-তীক্ষ্ণ শকুনদল।

গাছের ডালে এখন বসে থাকে হিসেব,
হাড় গোনে, মাংসের ভাগ মাপে।
মাঠে আর ফসলের ঘ্রাণ নেই—
লালসার গন্ধে পচে ওঠে প্রতিটি বাতাস।

নদীর স্রোতেও ভেসে আসে পালক,
পানির বুকে ক্ষুধার বৃত্ত আঁকে,
জল আর শীতল করে না পা—
জলেও শিকার খোঁজে লোভী চোখ।

দেশের মানচিত্রে এখন নখের দাগ,
খচিত ক্ষতের মতো সীমানা।
মায়ের বুকেও জমে ওঠে ভয়—
স্নেহের বদলে রক্তের হিসাব।

কিন্তু শোনো, শকুনের আহ্বান শেষ সত্য নয়—
মাটির গভীরে এখনো বীজ ঘুমিয়ে আছে।
একদিন ঠিক ঝড় উঠবে গর্বের ডাকে,
পালকের অন্ধকার ছিঁড়ে বের হবে নতুন ভোর।

সেদিন আকাশ আর দখলে থাকবে না ঠোঁটের,
ডানা ঝাপটাবে স্বাধীনতার পাখি,
শকুনের শহর পুড়ে ছাই হবে বাতাসে—
আর আমার দেশ আবার বাঁচবে মানুষের নিঃশ্বাসে।

- ঢাকা 
ডিসেম্বর ২০২৫ ইং


৮.    সন্ধ্যার গান 


এই নীরব বাতাসে ভেসে আসে অচেনা মধুর সুর,
তোমার ডাকে জেগে ওঠে হৃদয়—স্বপ্নে জাগে নূতন নূপুর।
কেন যে এমন স্পর্শে মন হয় কুসুমের মতো নরম,
তোমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে দেখি জীবন কত আলোভরম।

বন্ধু, তুমি এলে বলেই আজ সন্ধ্যাটা হয়ে উঠেছে গান,
রংধনুর সাত রঙ মিশে যেন ছুঁয়ে দিলো প্রাণ।


৯.     মা 


মা চলে গেছে—আজ এক যুগেরও উপরে,
তবু বুকে জমে আছে শিশির ভেজা ডাক, “মা”।

খুব ইচ্ছে করে,
তোমার পাশে বসে
আরও একটুখানি সকাল ছুঁয়ে নিতে,
এক প্রহর তোমার কোলের আঁচলে বাঁধা পড়ে থাকতে।
সেই ছোট্ট আমি হয়ে,
খালি পায়ে উঠোন মাড়াই—
স্কুলব্যাগের চাইতেও মায়াবী 
দুটো চোখে তোমাকেই রাখি।

তুমি আমার অগোছালো বইগুলো
আলতো হাতে গুছিয়ে দাও,
মলাটে লুকোনো মাঙ্গলিক স্পর্শ ছুঁয়ে দাও,
সাদা পাতার গায়ে লিখে দাও,
ভয় পাস না, পড়া হয়ে যাবে।

চুলে চিরুনির শব্দ নামে ঝিরঝির বাতাসের মতো,
তুমি আঙুলে আঙুলে মাথার চুল বুলাও,
আমি আয়নায় দেখি—
আমার মাথার ভেতর
একটা ছোট্ট আকাশের নীচে তুমি দাঁড়িয়ে।

তুমি আমার কপালে আঁচল ছোঁয়াও,
স্কুলপথের রোদটাকেও
মায়ের ছায়া মনে হয়।
আমি হাঁটি,
তুমি চেয়ে থাকো দরজার ফাঁকে—
যেন তোমার দৃষ্টি-দড়ি ধরে
আমি হারিয়ে না যাই।

আজ সেই প্রহর নেই,
বই গুছিয়ে দেবার হাত নেই,
চুল আঁচড়ে দেবার বাতাস নেই…
তবু আমার প্রতিটি সকালের ভেতর
একটা ছোট ছেলে এখনও স্কুলে যায়,
আর তার ব্যাগের ভেতরে
সবচেয়ে ভারী বইয়ের নাম— “মা।”

যদি আর একবার
ফেরার টিকিট পেতাম শৈশবে,
আমি কিছুই চাইতাম না,
শুধু বলতাম—
“মা, স্কুলে যাবার আগে
আর একটিবার চুলটা আঁচড়ে দাও।”


১০.     পোড়া বাড়িটা 


ধানমন্ডি ৩২-এর ভাঙা পোড়াবাড়িটা
আজও দাঁড়িয়ে থাকে—
শূন্য এক প্রহরীর মতো,
যার চোখে জমে আছে ইতিহাসের কালো ধুলো,
নিঃশব্দ আর্তনাদ, আর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্মৃতির আগুন।

দেয়ালগুলো ভেঙে গেছে,
কিন্তু ক্ষতের মতো টিকে আছে গুলির দাগ—
সেই দাগে লুকিয়ে থাকে
একদিনের আতঙ্ক, একদিনের বিদ্রোহ,
একদিনের হাহাকার, যেখানে
মানুষের চিৎকার ছাপিয়ে উঠেছিল অন্যায়ের গর্জন।

জানালার ভাঙা কাচে
এখনো নাকি বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ে,
যেন কেউ দরজায় কড়া নাড়বে—
যেন কেউ ফিরে আসবে…
কিন্তু কেউ আসে না, আসেও না আর।
ইতিহাসের ফেরার পথ থাকে না কখনো।

বাড়িটির প্রতিটি ইটে
আছে একেকটি অশ্রুবিন্দু,
প্রতিটি সিঁড়িতেই রয়েছে
অপূর্ণ স্বপ্নের ছায়া।
রাত হলে বাতাস যখন ফিসফিস করে,
মনে হয়—
সেই দিনগুলোর নিঃশ্বাস
আজও ঘুরে বেড়ায় ভাঙা বারান্দায়।

ধানমন্ডি ৩২-এর পোড়াবাড়ি—
তুমি শুধু একটা বাড়ি নও,
তুমি এক জাতির বুকের ক্ষত,
এক রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস,
যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়
মাটি পর্যন্ত কেঁদে উঠছে
কেউ হারিয়ে যাওয়া সেই প্রভাতের জন্য।

তোমার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে
আমরা শিখি—
ইতিহাস কখনো ভাঙে না,
ভাঙে শুধু দেয়াল;
স্মৃতি, ত্যাগ আর ক্ষরণের ব্যথা
চিরদিন বেঁচে থাকে
তোমার মতোই নিঃশব্দ,
কিন্তু অমর এক পোড়াবাড়ির ভস্মে।

~ ঢাকা 
ডিসেম্বর  ২০২৫ ইং


১১.     বত্রিশ নম্বর বাড়ি



বত্রিশ নম্বর শুধু ইট-সুরকির ঘর নয়,
এ ইতিহাসের শিকড়—
স্বপ্নে রাঙানো এক জাতির আত্মা।

সেই দেয়ালে আছে রক্তের দাগ,
অশ্রুর লোনাজল,
স্বাধীনতার ডাক।

যেখানে এক কণ্ঠস্বর গর্জে উঠেছিল—
“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম!”
যেখানে জন্মেছিল আমাদের
অস্তিত্বের ঘোষণা।

আজ যদি হাতুড়ি উঠে, উঠে বুলডোজার -
সে যদি স্মৃতির বুক চিরে দেয়,
তবে ভাঙবে শুধু দেয়াল নয়—
ভাঙবে বাঙালির চেতনাও।

বত্রিশ নম্বর ভাঙা মানে
ইতিহাসকে হত্যা করা,
রক্তের দামে পাওয়া স্বাধীনতাকে মুছে ফেলা।

না, আমরা মানি না এ অপমান—
এ শুধু বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নয়,
এ আমাদের হৃদয়,
আমাদের জাতির প্রাণ।

এসো স্লোগান তুলি -

বত্রিশ নম্বর ভাঙতে দেবো না,
ইতিহাসের দেয়াল কাঁপতে দেবো না।

এ ঘর মানে স্বাধীনতার গান,
বঙ্গবন্ধুর রক্তে লেখা অবিচল মান।

বাড়ি ভাঙা মানে স্বপ্ন হত্যা,
বাঙালির হৃদয়ে জ্বলে প্রতিবাদের অগ্নি-শিখা।

রুখে দাঁড়াও, বলো সবে
বত্রিশ নম্বর চিরদিন রবে। 

---------------------------------
স্বাধীনতা বিরোধীরা যখন আস্ফালন করছিল ৩২ নং বাড়ি ভেঙে ফেলবে, সেই 
অস্থির সময়ে এই কবিতাটি লেখা হয়েছিল।
ঢাকা - ২০২৫ ইং


১২.       মধুকর


পুরুষকে তুমি কী ভেবেছো—
শুধুই কি মধুকর, ফুলে–ফুলে যার অবাধ বিচরণ?
না, তুমি স্বৈরিণী নও, ময়ুরাক্ষীও নও,
তুমি প্রেমেরই প্রেয়সী— নিছক কোনো উপাধি-নয়ন।

আমি চাইলেই স্ত্রৈণ হতে পারি না,
আর তুমি?— চাইলেও স্বৈরিণীর মুখোশ পরে নিতে পারো না।
স্ত্রৈণ কিংবা স্বৈরিণী— শব্দের কোলাহল ছাড়িয়ে
আমরা আসলে এক প্রেম–বুভূক্ষু যুগল,
যার রক্তে কেবল ভালোবাসার উল্লাস বোনা।

যে প্রেম দেহে উৎসব তোলে,
স্বর্গে কিংবা নরকে— সবখানে যার মহোৎসব,
সেই প্রেমই আমাদের ধর্ম, আমাদের ক্ষুধা, আমাদের বাসনা—
দেহহীন, দেহময়, স্বর্গীয়, নরকীয়—
তবু প্রেমই চরম, প্রেমই শাশ্বত সব।



১৩.      তিনটি এলিজি


কত অন্ধকারে বসে থেকেছি আলোহীন,
কত করুণার চাওয়া ফিরিয়ে এসেছে নিজের দু'হাতে-
তবুও  চলছি অন্ধকারেই আলো খোঁজার পথের দিকে, কিছু পেতে জীবনের পাতে।
বিস্মৃতির ধুলোমাখা কিছু মায়ামুখের কথা 
এখনও পড়ে মনে-
অলক্ষ্যে অশ্রুকণা হয়ে লুকিয়ে আছে তারা 
আমার আঁখিকোণে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়ার আগেই কোনও এক তারাভরা রাতে আকাশের সবগুলো তারার মাঝে যেন ঘুমিয়ে পড়তে পারি। এমন ঘুম যেন হয়, সে ঘুম যেন আর না ভাঙ্গে।


১৪.     সুরভি-মোহিনী 


তব অলক-লতায় মকরন্দের কোমল ছায়া,
মদন-মোহনী চক্ষে জ‍্যোতির্ময়ী বৃষ্টি—স্নিগ্ধ শ্রাবণম্।

তব হাস্যে মিশে যায় রতি-রঙ্গীন সুধা,
অধর-পুটে বিম্ব-ফল-এর রাগ,
বায়ুতে উড়ে ভাসে সুরভি-চন্দন-এর সুগভীর মাধুর্য।

তব পদ-নূপুরে নর্তন করে রাগিণী-লহরী,
মোর চিত্তে জাগে মন্মথ-অনল,
স্পর্শ-কামনায় কম্পিত হয় মোর প্রাণ-তরঙ্গম্।

চরণে ধরণী গায় মিলন-মন্ত্র,
দেহ-মেঘে নেমে আসে আনন্দ-বিদ্যুৎ,
নিমেষেই জড়িয়ে ধরি—অর্দ্ধ-চন্দ্র আলিঙ্গনম্।

তোমা বিনা ক্ষণগুলি ক্লান্ত-শূন্যম্,
তোমা সহ সন্ধ্যাগুলি কাম-কলিকায় পূর্ণ,
যেন রতি-উৎসব-এ সুরা ঢালা রজনী।

হে মোর প্রিয়ন্তী, হে শৃঙ্গার-লক্ষ্মী,
তব স্নানে আমি কৃষ্ণ-নীল পদ্মম্—
খুঁজি কেবল মিলন-সাম্রাজ‍্য,
যেখানে প্রেমই উপাসনা,
দৃষ্টি-স্পর্শ-স্মৃতিই—চির মধুর-বন্দনম্।


১৫.     একদিন


একদিন খুব মন খারাপ হবে, মেঘে ঢেকে যাবে আকাশ, 
অথচ চোখে বৃষ্টি নেমে আসবে না।

তোমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ানোর সেই ক্ষণে—
শব্দহীন দুঃখের ডানা ভাঙা পাখির মতো,
জমে থাকা দীর্ঘ নীরবতা হয়তো হঠাৎ কেঁদে উঠবে।

তখন পৃথিবী অচেনা লাগবে,
প্রতিটি রাস্তা ভুল ঠিকানার দিকে নিয়ে যাবে ,
সব পরিচিত আলো ম্লান হয়ে প্রশ্নবোধক তারার মতো জ্বলবে।

একদিন সমস্ত কিছু ফুরোবার আগেই
আমিও কবিতার শেষ লাইনের মতো হারিয়ে যাব—
হবো অনুচ্চারিত, অথচ অনুভূত।

আর সেদিন হয়তো কেউ কাঁদবে না,
তবু কারও চোখের কোণে জমে থাকবে আমার কান্না,

আমি থাকব না,
শুধু থেকে যাবে একফোঁটা নোনা জলের স্মৃতি, বেদনার, ভালোবাসার, নীরবতার।    

১৬.     রাধা–কৃষ্ণের পদাবলী


যমুনা-নীল জল দুলে দুলে,
নিকুঞ্জে মাদকী রাত,
কদম্ব-ছায়ায় রাধা দাঁড়ায়—
অলকে জাগে পরাগী বাত।

শ্যামের মুরলী লুকায় কুঞ্জে,
সুর নামে গোপন বীথি,
রাধার বক্ষে সুরের স্পর্শে
মদন আঁকে মৃদু লিখি।

অধর-রঙে কৃষ্ণ হাসিয়া চায়,
চোখে চায় চির-ধরা,
রাধা কাঁপে ক্ষণিক লাজে—
দেহে ঢেউ, মনে জোয়ার-ভরা।

চন্দনের টিকা আঙুলের ডগায়,
রাধা রাখে শ্যামের গায়ে,
রেখা খুঁজি রতি-লিখনে—
শ্যাম ভাসে সেই লিখা চায়ে।

কৃষ্ণ ধরিয়া রাধার কর-তল,
ধীরে টানে কাছে বুকে,
হৃদয়-কমল খুলে খুলে যায়,
শ্বাসে শ্বাসে অমৃত ঝুকে।

কুঞ্জ-লতার মর্মর-ডাক শোনে,
মুঞ্জরী লাজুক পাতে,
দুটি ছায়া এক ছায়া হয়—
মিলন গাঢ় নিশীথ রাতে।

রাধা বলে— “এমনি কেন শ্যাম,”
স্বর ভিজে অভিমানী,
কৃষ্ণ বলে— “লীলা প্রেম-নদী,
তুমি তার কূল-ধরা বাণী।”

আলুথালু কেশে কৃষ্ণ ছুঁয়ে যায়,
রাধা গলে নত চোখে,
রস-লীলার মধুর বন্ধনে
জগত ভুলে মগন সুখে।

যমুনা-তীরে যুগল মিলনে,
রতি-সুধা নিকুঞ্জ ভরা,
দেহ মিলে, সত্তা মিলে—
শৃঙ্গারে অমর প্রেম ধরা।


১৭.     মহাশূন্যে তোমার পদশব্দ


বহু সহস্রকাল ধরে কতো জনপদ,
কতো জনপথ পেরিয়ে ধুলোয় লিখেছ নাম—
সেই তুমি আসলে যখন ক্লান্তিহীন পায়ে,
আমি তখন হারিয়ে গেছি অন্য আকাশে।

যে পার্থিবে, যে পর্ণকুটিরে
তুমি একদিন পাতা–ঢাকা স্বপ্নের মতো দাঁড়ালে,
সেখানে মাটি তখনও উষ্ণ,
কিন্তু বাতাসে আমার নিঃশ্বাস নেই।

তুমি অপলক চেয়ে রইলে—
ক্লান্তিও নেই, প্রশ্নও নেই, শুধু এক দীর্ঘ খোঁজ,
তোমার চোখে হাজার বছরের পরিযায়ীর ম্লান দিঘি,
স্থির, অথচ অনিঃশেষ যাত্রার ঢেউয়ে আহত।

ডাকো নি, তবুও তোমার নীরবতা ডাকছিল,
তবুও তোমার ছায়া হেঁটে গেল শূন্য উঠোনে,
পাঠ করল দেয়ালে লেপ্টে থাকা পুরোনো স্মৃতি,
যেখানে আমি নেই, কেবল থাকার প্রতিধ্বনি আছে।

আমাকে খুঁজতে থাকলে তুমি
অপার্থিবের অন্ধকারে—
যেখানে আলোও কাঁদে নীল শিখায়,
যেখানে পথও থেমে গেছে শোকের শিলায়।

আমি কি শুনতে পাই তোমার পদশব্দ?
হয়তো পাই—
কারন দুঃখ কখনও দেহ চায় না,
দুঃখ শুধু দূরের পায়ের শব্দে চিনে নেয় প্রিয়।

তুমি হেঁটে গেলে—
অন্ধকারেই, যেখানে আমি আর নেই,
কিন্তু তোমার খোঁজের শব্দ
আমার অস্তিত্বেও রেখে গেল এক মর্মরিত নাম।

আর আমি, ধুলো নয়, আলোও নয়,
শুধু এক অনন্ত অপেক্ষার শূন্যতা—
যেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
তুমিও হয়তো একদিন আর থাকবে না…   
 

১৮.      মহাপ্রস্থানের পথে 


চোখ মেলেছি—
শুধু তোমাকেই দেখব বলে,
অথচ এ ভোরের আলোয়, শ্রাবণের বাতাসে,
তুমি নেই… তুমি নেই…
দৃষ্টি জুড়ে শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাসের নীল।

মহাপ্রস্থানের ডাকে পা বাড়ালাম,
বাঁকে বাঁকে পথ—
ধুলোয় আঁকা স্মৃতির রেখা,
নীরবতার গহ্বর, বেদনার দিকচিহ্ন,
পেরিয়ে যাচ্ছি একা, অনাদিকালের সুরে
বাজে যাত্রার মৃদঙ্গধ্বনি।

তোমাকে রেখে যাচ্ছি…
হৃদয়ের প্রদীপে তেল ফুরায়,
তবু বাতি নিভে না—
দুশ্চিন্তার ছায়া কাঁধে ভর করে আসে,
আমাকে ছাড়া তুমি তো ভালো থাকো না,
তাই দিব্যি দিয়ে গেলাম—
হাস্যকল্লোলে ক্ষুধা ভুলবে না,
নিদ্রাহীন রাতের পাগলামি করো না,
খেয়ো, ঘুমোও, যত্নে থেকো,
ভালোবাসা যেন উন্মাদনার আগুনে না ঝরে।

যে পথে আমি যাচ্ছি—
সে পথ আমারও অচেনা,
সেখানে কি যমুনার শীতল জল?
কুসুমপুরের আগুন কি ঝরে আঙিনা জুড়ে?
থাকে কি আমাদের পুরনো উঠোনের মাটির ঘ্রাণ?
অলকানন্দার গুচ্ছ ছায়া—
থাকে কি আঙিনার কোণে, শৈশবের দোল খাওয়া ঝাড়ে?

আমি চিনি না সে দেশ,
কিন্তু জানি—
নদী থাকবে, তীরও থাকবে,
আর থাকবে তোমার জন্য এক প্রতীক্ষার রাগিণী—
অলকানন্দার ছায়াতলে,
অচেনা নক্ষত্রের বুকে,
আমি দাঁড়িয়ে থাকব একা,
মিলনের তানপুরা বাজিয়ে।

তুমি এসো… এসো পরকালেই,
লক্ষ লক্ষ তারা দীপ জ্বেলে দেবে,
জোনাক-সারি আলোর অলংকারে
বিহঙ্গ-পথে সাজবে অভিসারের রথ,
সেখানকার গন্ধবাতাস তোমায়
ঠিকই পায়ের চিহ্ন চিনিয়ে আনবে—
আমারই কাছে, আমারই কাছে।

ইহকাল স্রোতের মতো ভেসে গেছে,
ফুলঝুরি শোকও ঝরে যায় ম্লান,
তবু পরকাল রয়ে গেছে—
মিলনের শাশ্বত মঞ্চ,
যেখানে প্রেম মৃত্যুর পরেও
পথ চেনে, সুর চেনে, আপন চেনে।

সেখানেই দেখা হবে…
সেই অনন্ত উঠোনে—
যেখানে বিদায়ের পরেও
ভালোবাসার পায়েরচিহ্ন মুছে যায় না,
গান থামে না, অপেক্ষা ফুরায় না।       
       

১৯.     দীপ্ত করো


তোমার নীল নয়নে শ্রাবণ মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক—
সে ঝলক ভাঙা কাঁচে প্রতিফলিত হয়,
এবং অসংখ্য কোণ তৈরি করে আলোকোজ্জ্বল করে ,
যেন তোমার দৃষ্টির ভিতরেই জন্ম নেয় এক বহুবর্ণী বৃষ্টিপাত,
যেখানে জল, আগুন, আকাশ— একসাথে বসতি স্থাপন করে।

কণ্ঠে তোমার মধুমঞ্জরির মালা—
একটি পুষ্প, আবার একটি শব্দ, আবার একটি দরোজা,
যেখান দিয়ে তোমার উচ্চারণ ঘরের বাহির  হলে বাতাসজুড়ে জন্ম নেয় সংগীতের বহুভুজ।
তোমার দেহলতা পদ্মদামের লাবণ্যে
প্রসারিত— সুশৃঙ্খল নয়,
বরং স্তরে স্তরে সাজানো রূপচিত্র;
প্রতিটি অঙ্গ একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য ,
প্রতিটি অঙ্গ অজানা ভাষায় লাবণ্যের ব্যাকরণ লেখে;
সেখানে কোমলতা কেবল অনুভূতি নয়,
কোমলতা একটি ত্রিমাত্রিক স্থাপনা, 
যার ভিতর বসা যায়,
যাকে স্পর্শ করলে শব্দ ধ্বনিত হয়।

তোমার শরীর অমল ধবল জ্যোৎস্নায় স্নাত,
কেবল আলো নয়,
এ এক আলোর ঘনত্ব;
শুভ্রতা এখানে রঙ নয়—
শুভ্রতা এক প্রকার নির্বাক দীপ্তির স্থাপত্য,
যেখানে রাতও আলোয় ছাপ ফেলতে আসে,
কিন্তু আলোই তাকে আবরণ করে রাখে।

চোখের পাতায় নাগকেশরের স্পর্শ—
এই স্পর্শ সরলরেখা নয়,
একবার ছোঁয়া, আবার সুবাস, আবার স্মৃতির ধার,
যে ছোঁয়া তোমার চোখ বন্ধ করলেও
জগৎ খোলা রাখে।

হে আমার প্রিয়ন্তী,
তোমার কেশ কুন্তলের গন্ধে
এই ঘর শুধু মদির নয়,
এই ঘর গন্ধে ঘনীভূত;
সুবাস এখানে বাষ্প নয়—
সুবাস এখানে দেয়ালের মতো দাঁড়ায়,
ছাদের মতো ভাসে,
তাকের ভিতর লুকায়,
আবার প্রদীপের শিখায় নীরবে নৃত্য করে।

তুমি প্রবেশ করলে ঘরের মধ্যেই
আরো একটি ঘর তৈরি হয়—
সব মিলিয়ে তোমার উপস্থিতি এক অপূর্ব দ্যোতনা সৃষ্টি করে,

তোমাকে ছুঁলে ভাবনা ছড়িয়ে পড়ে
পিকাসোর রেখা আর নক্ষত্রের দূরত্ব ঘনিয়ে,
আর প্রতিটি ঘনমুহূর্তের ভিতর
তুমি আমাকে দীপ্ত করো,
যা আমাকে আলোকস্তম্ভের মতো দাঁড় করায়
আমারই ভেতরের বহুমাত্রায়,
যেন তোমারই আলো, সুবাস, স্পর্শ—
আমার অস্তিত্বটিকে দীপ্ত করে তোলে,
যা ভাঙে না, ছড়ায় না—
শুধু ক্রমশ অধিকতর দীপ্ত ঘন হয়।                     

২০.       বন্ধু তুমি স্বামী তুমি 


( কবিতাটি আমার স্ত্রীর বয়ানে লেখা।) 

শিলিগুড়ি থেকে সেভক পাহাড়—
মেঘ-লাগা চুলের মতো বাঁক নিয়ে উঠে যায় পথ।
হলুদ ট্যাক্সির ভেতর আমি,
দু’ধারে দু’টুকরো নিশ্চিন্ততা—
একপাশে স্বামীর প্রশান্ত নিঃশ্বাস,
আরেক পাশে বন্ধু শিশির রায়ের চেনা হাসি।

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ঘূর্ণিতে গাড়ি উঠছে,
চাকার নিচে যেন বাজে এক নিরব রাগিণী।
নিচে গাঢ় সবুজ গিরিখাত, গভীর খাদ—
তবু বুকের ভেতর একফোঁটাও কাঁপন নেই।
কারণ আমার দু’হাতে ধরা দু’টি ভরসা,
দুই ভিন্ন সুরে গাঁথা এক অটুট বন্ধন।
এই দুই মানুষ মিলেই আমার পাহাড়ের সাহস।

সেভকের চূড়ায় যখন পৌঁছাই,
হাওয়ায় ভেসে আসে ধূপ আর সিঁদুরের গন্ধ—
পুরনো মাটির কাছে ফেরা এক আদি আহ্বান।
কালীর মন্দিরে পা রাখতেই মনে হয়,
মা ডাকছেন— ভয়হীনতার পুরস্কার নিতে।
কালো পাথরের প্রতিমার চোখে জ্বলে নীরব দহন,
সেই দহনে নেই শঙ্কা, আছে পরম আশ্বাস।

তারপর তিস্তার ব্রিজে দাঁড়াই তিনজনেই—
লোহার কাঠামোর ফাঁক দিয়ে নদী বইছে নীল আত্মায়,
স্রোতের গর্জনে মিশে আছে পাহাড়ের প্রাচীন গল্প।
জল নয়, যেন এক চলমান কবিতা—
অক্ষরহীন, সীমাহীন, অবিরত।
দেখি দূরে দূরে ঢেউয়ের চকিত রোদ-চুম্বন,
শুনতে পাই জলের অন্তরমিল,
যেখানে প্রতিটি শব্দ মানে ‘ভরসা’, ‘ভালোবাসা’, ‘সঙ্গ’।

বন্ধু আঙুল বাড়িয়ে দেখায় নদীর রূপ,
স্বামী নীরব চোখে দেখে আমার মুখের আলো—
ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমিও বুঝতে শিখি:
সঙ্গ মানে শুধু পাশে থাকা নয়,
সঙ্গ মানে ভয়কে ভাষা দিতে না-দেওয়া,
ভালো লাগাকে স্মৃতি করে বাঁচিয়ে রাখা।

সন্ধে নেমে এলে তিস্তা হয়ে ওঠে স্তব্ধ দরিয়া,
আকাশে ম্লান কমলা রঙ, জলে তার প্রতিচ্ছায়া—
আমি দেখি, আর মনের ভেতর জমে ওঠে অনিন্দ্য পঙক্তিমালা:

‘পাহাড় বাঁক নিলেও জীবন ভেঙে পড়ে না,
যদি হাতে থাকে প্রেম, আর পাশে থাকে ভরসা।’

ব্রিজ থেকে যখন ফিরি,
চেতনায় থেকে যায় জলের শীতল স্পর্শ,
মনের গহনে পাহাড়ি পথের মিছিল,
আর সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে বাজতে থাকে—
দু’ধারে দাঁড়ানো ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের যুগল ধ্বনি,
যে ধ্বনি আমায় শিখিয়েছিল,
পৃথিবীর গভীরতম খাদও ভয় দেখাতে পারে না
যদি মানুষ দু’টি থাকে—
একজন স্বামী, একজন বন্ধু—
আর তাদের মাঝখানে থাকে একটি নির্ভীক আমি। 


২১.      দেহান্তরের আগুন 


নয়নে নয়ন রেখে দেখলাম তোমায়,
তুমি মৃদু হেসে বললে— “অন্তরে দেখো”।

অন্তরে অন্তর ছুঁয়ে ভালোবাসতে চাইলাম,
তুমি নরম স্বরে জানালে— “বুকে তুলে নাও”।

বুকে বুক রাখতেই শীতের সকাল আগুনে রূপ নিল,
দুই হৃদয়ের সীমানা পেরিয়ে জ্বলে উঠল আকুল উষ্ণতা।

সেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে গেল
দেহ থেকে দেহান্তরে,
রক্তে রক্তে, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে।

তুমি জ্বললে, আমাকেও জ্বালালে,
পুড়ে গেলাম দু’জনে একই ভস্মের স্পর্শে,
একই উন্মাদ আলোর অনলে।

ছাই-ভস্মে মিশে দেহ দুটি এখন
ছিন্ন তুলোর মতো হালকা—
আকাশের নীল প্রান্তে উড়ে বেড়ায় স্বচ্ছন্দ,
দেহ নেই, তবুও প্রেম রয়ে যায় অনন্ত ছন্দে।

দহন শেষে জন্ম নেয় নতুন ভালোবাসা—
পোড়া ডানায় ভর করে উড়ন্ত, মুক্ত, চিরন্তন।


২২.     নীল অপরাজিতা

ইতিহাস বয়ে চলে
গৌরব আর কলঙ্কের ছায়া জড়িয়ে,
কাল থেকে কালান্তরে।
সীমান্তের শহর মেহেরপুরের কোল ঘেঁষে
দাঁড়িয়ে আছে আমঝুপি।

মোঘল সেনাপতির বিজয়রথ ছুটেছে এখানে,
ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গীদল ধুলি উড়িয়েছে,
নবাব আলীবর্দ্দীর মৃগয়ায় স্মৃতি রয়েছে,
পলাশীর পরাজয়ের নীল-নকশাও এখানে লেখা হয়েছে।

এক হেমন্তের সকালে
কাজলা নদীর তীরে গিয়েছিলাম নীলকুঠি দেখতে,
সাথে ছিল জেসমিন,
মেহেরপুর থেকে আধাপাকা পথে রিকসা বয়ে চলছিল।

রাস্তার দু’পাশে নীল অপরাজিতার ঝাড়,
জেসমিনের নীল সালোয়ার কামিজ,
আমার নীল টি-শার্ট,
মাথার উপর নীল আকাশ —
সব মিলিয়ে এক মুহূর্তের নীল মহিমা।

সে বলেছিল —
“কেমন যেন এই নীল, কেমন বিষাদময়,
এত নির্জন! মনে হচ্ছে কেউ আছে কেউ নেই।”
আমি শুনলাম, কিন্তু বুঝতে দেরি হয়ে গেল,
মুহূর্তে উত্তর দিতে পারিনি।
তার আফসোসের কথা রইল।

আমরা হেঁটেছি কাজলা নদীর ধুলি পথে,
দেখেছি স্থির, স্বচ্ছ জল,
নীলকুঠির ভগ্ন কুঠিরের পলেস্তারা,
লতাগুল্মের বিষণ্ণ সবুজ।
মন ভালো লাগছিল না;
শত বছর আগে কৃষকের করুণ হাহাকার
কানে বাজছিল।

বছর কেটে গেছে,
কাজলা নদীর ধুলি এখনও উড়ে,
নীল অপরাজিতা এখনও ফুটে,
হেমন্তের রোদ্দুর আলো ছড়ায়।

মুহূর্তগুলো লুপ্ত হয়,
জেসমিনের মতো কেউ পাশে নেই,
কোনও দিন আর দেখা যায় না
ক্ষণিকা এই জীবনে,
যেমন নীল অপরাজিতার মতো
ফুটে ঝরে যায়।


২৩.       একটিই মুখ


যেখানেই যাই, যত দূরেই যাই,

যাই না আমি কোনো অন্তরীক্ষে,

নক্ষত্রের নির্বাক মিছিলে কিংবা

গ্যালাক্সির ঘূর্ণিজালেও নয়—

কিংবা ধুলো হয়ে পড়ে থাকি

এই পৃথিবীরই বুকের ’পরে।


সমুদ্রের ফেনিল দীর্ঘশ্বাসে,

পথের বাঁকে অচেনা শহরের

হলুদ বাতির কম্পমান দোলায়,

বৃষ্টিভেজা গলির নির্জন ভাষায়—

সর্বত্রই মিশে থাকে এক প্রতীক্ষা,

এক অব্যক্ত নাম, এক গভীর মুখ।


একটি মুখের দিকেই চেয়ে থাকি,

একটিই মুখ বারবার ভেসে ওঠে

মনের অগোচর জলসীমায়;

যেন সমস্ত দিগন্ত, সমস্ত পথ

তারই দিকে ধাবমান এক নদী।


তার মুখের নিঝুম ছায়াপাত

নেমে আসে ধীরে ধীরে—

রাত্রির পাখির মৃদু ডানার মতো,

নিস্তব্ধ শিশিরের পতনের মতো;

এসে পড়ে আমারই মুখের উপরে,

আর আমার মুখ হারিয়ে যেতে থাকে

তারই অববাহিকার ছায়ায়।


চোখের পাতা বন্ধ করলেই

সে মুখ আরো স্পষ্ট হয়—

আলো ও আঁধারের সীমাহীন পরতে

একমাত্র মানচিত্র হয়ে জেগে থাকে।


আমি আয়নায় তাকাই না আর—

কারণ প্রতিফলনে এখন

আমার মুখও তারই মুখেরই অনুবাদ।


যেখানে সময় থেমে থাকে,

যেখানে ভাষা নিরর্থক হয়ে যায়,

যেখানে পৃথিবী নিজেই ছায়া—

সেখানেও শুধু একটি সত্য জেগে থাকে :

একটিই মুখ, একটিই মুখ, একটিই মুখ।


২৪.     অস্তরাগের আগুন 


নীহারিকা-রাঙা এক অস্তরাগের সাঁঝে

তুমি এসো ধীরে—মৃদু পায়ে, গোধূলির কাঁধ ছুঁয়ে।

ধান-ধূপের ধোঁয়া উঠবে আকাশের বুক বেয়ে,

প্রদীপের আলো নরম হয়ে জড়িয়ে ধরবে আমাদের ছায়া।


তারার বাতি একে একে জ্বলে উঠবে

তোমার চোখের উষ্ণ আবেশে—

সেই আলোয় আমার অন্তর হবে রঙিন,

তোমার সুরভিতে কেঁপে উঠবে নিশীথের নিঃশ্বাস।


তারপর দু’জন জ্বলব আগুনের মতো—

রাতভর শরীরের ভিতর বয়ে যাবে

গোপন তরঙ্গের অগ্নি-রূপী স্রোত,

কেউ আসবে না নেভাতে, কেউ থামাবে না।


বর্বর আদিম সেই অনলে

ছাই হয়ে যাবে সব সীমানা, সব লাজ-লজ্জা—

তখন তুমি আমার, আমি তোমার,

শুধুই মিলনের জ্যোৎস্না ও উত্তাপের উর্বর রাত্রি।


সেই রাতের শেষে

ভোরের নরম আলোয়

আমাদের দেহে থাকবে শুধু

শৃঙ্গারের ধূপ-জ্বলা গন্ধ

আর নিঃশেষ হওয়া আগুনের পরম তৃপ্তি।


২৫.       বিজয়ের ডিসেম্বর 


ডিসেম্বর…

শীতের কুয়াশা ভেদ করে আসে

রক্তে লেখা লাল ভোর।

এক সাগর অশ্রু,

লাখো প্রাণের বিনিময়ে

জন্ম নেয় এক স্বাধীন দেশ—

সবুজের বুকে লাল সূর্যের ঘোর।


মুক্তির ডাক উঠেছিল ৭১–এ—

জয় বাংলা!

সে ডাক ছিল বজ্রকণ্ঠ,

সে ডাক ছিল অগ্নিশপথ।

কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক—

সবার শিরায় জেগে উঠেছিল

স্বাধীনতার রক্তিম রথ।


মুক্তিযোদ্ধা…

তোমাদের হাতে অস্ত্র ছিল,

হৃদয়ে ছিল দেশ,

চোখে ছিল মুক্তির আগুন,

পায়ে ছিল কাদামাখা পথ।

তবু থামেনি তোমাদের পদযাত্রা,

ভয় ভেঙে এগিয়ে গেছে বুক—

মায়ের মুক্তির জন্য

জীবন ছিল তোমাদের ব্রত।


মা কেঁদেছে…

বধূ জ্বেলেছে দীপ,

শিশু বুক চেপে কাটিয়েছে

নির্ঘুম রাত।

আর বীরেরা?

জল–জঙ্গলে গড়ে তুলেছে

মুক্তির দুর্জয় দুর্গ,

নদীর স্রোতেও ভেসে উঠেছে

রণগানের মাত।


তারপর—

১৬ ডিসেম্বর।

পতন হলো শত্রুর অহংকার,

নিঃশেষ হলো অন্ধকার।

আকাশে উড়ল বিজয়ের পতাকা,

মুঠো খুলে দেশ দাঁড়াল গৌরবে—

রক্তস্নাত বাংলাদেশ,

অদম্য, অনন্য, দুর্বার!


শহীদ…

তোমরা ঘুমিয়ে আছ মাটির বুকে,

তবু জেগে আছ প্রতিটি নিশ্বাসে।

তোমাদের রক্তে আঁকা মানচিত্র

রবে চিরকাল বাংলার আকাশে।

যতবার পতাকা দোলে—

ততবার মনে পড়ে,

এ দেশ তোমাদের ত্যাগে কেনা,

এ বিজয় তোমাদের ভালোবাসা।


ডিসেম্বর শুধু মাস নয়—

এটি গৌরবের গান,

ত্যাগের মহাকাব্য,

স্বাধীনতার অমর ধ্বনি।

যেখানে বীরের রক্ত সোনা ফলায়,

স্বপ্ন নতুন ভোর আনে অবিরত বাণী।


মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ—

তোমাদেরই ঋণে

আমরা পেয়েছি স্বাধীন প্রাণ,

স্বাধীন ভাষা,

স্বাধীনতাই আমাদের পরিচয়,

তোমাদের ত্যাগই আমাদের অহংকার।


জয় বাংলা! জয় স্বাধীনতা!

জয় লাখো শহীদের আত্মদান! 


২৬.       স্বপ্ন-আলোক


কবরের মতো নীরব ঘর,

চারদিকে গহিন অন্ধকার—

আমি শুধু শুয়ে আছি,

চোখের ভেতর ঘুরছে অদেখা শূন্যতার ছায়া।


হঠাৎ দূর-দূরান্তে জ্বলে ওঠে

একটি ছোট্ট আলোকবিন্দু—

যেন দিগন্তের ওপার থেকে

কারও নরম পায়ের শব্দ ভেসে আসে।


আলো ধীরে ধীরে কাছে আসে,

আমি তাকিয়ে দেখি—

একটি মেয়ে,

অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত,

মায়াবতীর মতো, আবার নয়ও।


সে কিছু বলে না,

শুধু তার আলোটা পাশে রেখে

নম্র ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে

আমার বুকের ওপর

তার কপালটি রাখে।


সেই ছোঁয়া—

ঠান্ডা, নিস্তব্ধ, অথচ

অদ্ভুত উষ্ণ কোনো আশ্বাসের মতো।

সে ফিসফিস করে—

“স্পর্শটুকু মনে রেখো,

ভুলে যেয়ো না কখনো…”


হঠাৎ সমস্ত ঘর

আলো-অন্ধকারে ভেঙে পড়ে—

আমি জেগে উঠি,

কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো বাজে

বুকের গভীর কোনো অন্ধ কোণে।


কোন মেয়ে ছিল সে?

স্বপ্নের?

নাকি কোনো পূর্বজন্মের ব্যথা?


শুধু জানি—

তার রেখে যাওয়া স্পর্শটি

আজও ধুকধুক করে

মায়াবী আলোর মতো।


২৬.      বিজয় একাত্তর 


ডিসেম্বর আসে শিশিরের বুকে রক্তে লেখা লাল ইতিহাস,

হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসে মুক্তির বারুদ–ভেজা নিঃশ্বাস।

মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্মৃতি, জাগ্রত হয় বিজয়ের ধ্বনি—

এই দেশ, এই পতাকা, এই ভোর— শহীদেরই অমর বাণী।


বাংলার কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক— সবার রক্তের মিলনে,

স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয় ৭১–এর উত্তাল ক্ষণে।

ঘরে ঘরে আগুন, বুকে বুকে শোক— তবু দৃঢ় ছিল প্রাণ,

মুক্তির শপথে কেঁপে উঠেছিল প্রতিটি হৃৎপিণ্ডের গান।


ওরা এসেছিল খালি হাতে— হৃদয়ে অসীম সাহস,

চোখে ঘৃণার বিরুদ্ধে দ্রোহ, শিরায় স্বাধীনতার স্পন্দন উচ্ছ্বাস।

রাইফেলের নলে ছিল না শুধু যুদ্ধ— ছিল মাতৃভূমির দাবি,

প্রতিটি গুলি বলেছিল— “বাংলা কারও গোলাম হবে নাবি!”


পথ ছিল দুর্গম— পাহাড়সম ভাঙা স্বপ্নের ভার,

জীবন ছিল বাজি— দেশ ছিল ধ্যান, যুদ্ধ ছিল অভিমান–প্রাচীরের তার।

কাদা–জলে ভিজেছে দেহ, ক্ষুধায় কেঁদেছে ভোরের পাখি,

তবু পিছু হটেনি পা— এগিয়ে গেছে শহীদের কাফেলায় রাখি।


কোথাও মা কেঁদেছে নীরবে, কোথাও বধূ রেখেছে দীপ,

কোথাও শিশু ঘুমিয়েছে ভয় বুকে— তবু অপেক্ষা ছিল গভীর।

বীরেরা ফিরবে— দেশের আলোর মুকুট আনবে হাতে,

বিজয় আসবে— শত্রুর পতন লিখবে শেষ রাতের প্রান্তে।


জলজঙ্গলে পাকিয়েছে যুদ্ধ, নদী দিয়েছে মুক্তির পথ,

শাল–বন আর ধানক্ষেতে শোনা গেছে রণহুঙ্কারের শপথ।

মরা গাঙের বুকেও জেগেছে স্রোত, হাজারো রক্তের ডাকে,

বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে লড়াইয়ে— বুকের গভীর মাটিকে আঁকে।


শহীদের লাশে মাঠ লাল ছিল, আকাশে ছিল আগুন–দাগ,

তবু ছাই ভেদ করে উঠেছে শস্য, রাত ভেদ করে হয়েছে জাগ।

১৬ ডিসেম্বর এলো একদিন— পতন হলো পরাজয়ের রাত,

বিজয়ের বুকে উঠল দেশ— অশ্রু মুছে ধরল স্বাধীনতার হাত।


লাখো শহীদের ঋণ মাথায় নিয়ে আমরা হাঁটি বিজয়ের পথে,

ওদের রক্তে লেখা মানচিত্র আঁকা— আমাদের প্রতিটি শপথে।

ওরা ঘুমিয়েছে মাটির নিচে— আমরা জেগে আছি আলোয়,

ওদের ত্যাগে যাপন করি গৌরব— পতাকার ছায়ায় ও ছলোয়।


ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, তোমাদের নাম হৃদয়ে অম্লান হয়ে রবে,

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তোমাদের বীরগাথা অমর কাব্যে কবে।

ডিসেম্বর শুধু মাস নয়— এটি রক্তে কেনা অহংকারের গাঁথা,

বিজয় মানে শুধু জয় নয়— এটি শহীদের অক্ষয় আত্মত্যাগের ভাষা।


আজও যখন পতাকা দোলে বিজয়ের সুউচ্চ মিনারে,

প্রতিটি লাল সূর্য মনে করায়— ওরা বেঁচে আছে দেশের প্রাণধারে।

বাংলাদেশ চিরজাগরুক থাক— শহীদের রক্তে লেখা গান,

মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক— ধর্ম, বিভেদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনন্ত মহান।


জয় বাংলা — জয় স্বাধীনতা — জয় শহীদের আত্মদান।


২৭.       বিজয় আসে 


ডিসেম্বর আসে রক্ত–গৌরবে, বিজয়ের রঙে রাঙিয়ে,

স্বাধীন পতাকা দোলে বাতাসে শহীদের নাম জাগিয়ে।

লাখো প্রাণের দাম দিয়ে কেনা এই সবুজের প্রান্তর,

যেথায় মাটির প্রতিটি কণায় মিশে আছে ভোরের মন্ত্র।


পথে পথে আজও শোনা যায় ধ্বনি, বাঁশির বেজে ওঠা সুর—

“জয় বাংলা” স্লোগান আকাশ ছোঁয়, ভাঙে শত্রুর সকল দূর।

কাঁধে রাইফেল, বুকে দৃঢ় শপথ, মুখে আগুন-গাঁথা গান,

মুক্তিযোদ্ধারা জ্বালিয়েছিল আলো— অন্ধকারে মহান।


তাদের পায়ে ছিল ভাঙা বুট, গায়ে মলিন শীতের রাত,

তবু চোখে ছিল সূর্যের দীপ্তি, মুঠোতে ছিল দেশ–দায়িত্বের হাত।

জল–জঙ্গল আর নদীর বুকেই রচিত সংগ্রামের ইতিহাস,

যুদ্ধের ধোঁয়া, কান্না আর আগুন— শেষে বিজয়ের নিশ্বাস।


শহীদের কবর ঘুমায় নীরবে, তবু ওরা ঘুমায় না,

যতদিন রবে স্বাধীন বাংলাদেশ— ততদিন ওরা বাঁচে জানা–অজানায়।

রক্তে ভেজা শস্য হাসে মাঠে, নতুন প্রজন্ম গায়,

মুক্তির লাল সূর্য চির অমলিন— অনন্ত আলো ছড়ায়।


ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, ও শহীদ ভাই, তোমাদেরই ঋণে,

আমরা পেয়েছি স্বপ্নের দেশ— লাল–সবুজের গর্ব–মীনে।

ডিসেম্বরের বিজয় শুধু মাস নয়— এক অমর অনুভব,

ত্যাগ–সংগ্রাম–স্বাধীনতার— এক মহাকাব্যিক স্তব। 


২৮.      চাঁপাগন্ধ দিনের প্রতিশ্রুতি


এইসব অন্ধকার দিন পেরিয়ে,

নিবিড় তিমির রাত্রির গভীরতা ভেদ করে

একদিন ঠিকই দেখা হবে —

চাঁপাগন্ধ ভরা কোনো বসন্ত সকালে,

যখন বাতাসে রোদ ঝরে পড়ে

প্রেমের প্রথম চুম্বনের মতো।


তখনই তুমি খোঁপায় বেঁধে দেবে নিশি-চন্দনের সুবাস,

আমার কাঁধে রেখে দেবে ক্লান্ত দিনের স্বপ্ন,

আর আমি নিঃশব্দ স্থানু হয়ে

গ্রহণ করব তোমার চোখের পার্থিব সব আনন্দ,

শূন্য হাওয়ায় দুলতে থাকা

স্বপ্ন-বাসর সাজানো অনন্ত শান্তি।


সেই অপার্থিব সাক্ষাৎ-মুহূর্তে—

আমাদের মাঝখানের সব দূরত্ব ভেসে যাবে,

সব বেদনা নরম হয়ে গলে যাবে

জোনাকির মতো নিঃশব্দ আলোর ভিতর।

তোমার হাতের উষ্ণতা হয়ে উঠবে

আমার সমস্ত দিনের দিগন্ত,

আর তোমার হাসির ভিতরেই খুঁজে পাব

এক জীবনের আশ্রয়।


বসন্তের সেই গোপন সকালে

যখন প্রথমবার তোমাকে স্পর্শ করব—

মনে হবে, অন্ধকার ভেঙে

সমস্ত পৃথিবী শুধু আমাদের জন্যই

আলো হয়ে ফুটে উঠেছে।


২৯.        তুমি আমার সর্বস্ব


আমার সমস্ত তৃপ্তি–অতৃপ্তির কেন্দ্র তুমি,

আমার প্রেমের দীপশিখা আর অপ্রেমের নীরবতা—

সবই তোমাকে ঘিরে শ্বাস নেয়, জ্বলে, বেঁচে থাকে।


অপূর্ণ সুখের সাঁঝবাতাসে তুমি ছুঁয়ে দাও মনে,

তৃষ্ণার গোপন নদীতে তুমি জোয়ারের আলো,

আমার উম্মাদনার প্রতিটি অগ্নিশিখায়

তোমারই নাম ধ্বনিত হয় গোপনে–প্রকাশ্যে।


চৈতন্যে তুমি, অবচৈতন্যে তুমি,

অন্তরের অন্তরতমে লুকিয়ে থাকা এক নিত্য দীপ।

তোমাকে ছাড়া কোনো পথ নেই, কোনো দূরত্ব নেই—

তোমাকে ছেড়ে আমি কখনোই বহুদূরে যাই না,

যত দূরেই যাই, তুমি থেকে যাও আমার ভেতরের আকাশ হয়ে।


তুমি আমার অনন্তের একমাত্র ঠিকানা।


৩০.      দহনময় সমর্পণ 


নি:সঙ্গ নাভির নিবিড় গহিনে ডুবে

দেখি নিসর্গ— নরম পুষ্পবৃন্তে কেঁপে ওঠে আলো,

দেখি তৃণভূমি— দোলায়িত শরীরের সবুজ স্পর্শ,

দেখি অরণ্য— দু’হাতে ধরা উষ্ণ ছায়ার মতো।


অরণ্যের গন্ধ আমি মুঠোয় ভরি—

মায়ার টান ছিঁড়ে যায়, যতিচিহ্ন উল্টে ফেলে সময়;

হঠাৎ ঠোঁটের স্পর্শে জেগে ওঠে প্রেম

আর প্রেমের নিচে দাউ দাউ করে জ্বলে বহ্নিশিখা।


তার পর্দা সরিয়ে নিই— শেষ আলোটুকু

ছিনিয়ে আনার উন্মাদ তৃষ্ণায় কেঁপে ওঠে দেহ,

নিঃশেষ হয়ে আসে স্বেদ কণিকা—

তবু আরো, আরো চাই—

কারণ শৃঙ্গার তো এমনই—

জ্বালা আর জলের

এক নিঃশব্দ, দহনময় সমর্পণ।


৩১.      মায়ার টান 


তার প্রাণের কথা ভেসে আসে হঠাৎ—

বাতাসে ভাসমান কোনো অনুচ্চারিত শব্দের মতো।

মায়াবী কাজল চোখ দুটো

অন্ধকারের ভেতরেও নিজের আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—

যেন স্মৃতির ভিজে জানালায় জমে থাকা কুয়াশা।


বহুদিনের চেনা গন্ধ

ঘুরে বেড়ায় ঘরের কোণে কোণে,

বালিশে লেগে থাকা সুগন্ধি

হঠাৎই খুলে দেয় দরজা—

যার ওপারে সময় থেমে থাকে

তোমার অনুপস্থিতির নরম অথচ তীক্ষ্ণ স্পর্শ হয়ে।


গল্প বলা অজস্র রাতেরা

এখনো চাঁদের আলোয় পাতার মতো কাঁপে।

অস্পষ্ট ডাকনামগুলো

কখনো ভোঁতা ছুরির মতো,

কখনো জলরেখার মতো নরম হয়ে

মনে পড়ে, হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে।


সবকিছু আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে—

কেউ যেন অদৃশ্য সুতো ছুড়ে দিয়েছে

আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতরে,

যা টানলেই শুধু

তোমার দিকে ঝুঁকে পড়ে

পুরো দিন, রাত, শরীর, স্মৃতি, মন।


সবই তোমার মায়ার টানে—

এক অদৃশ্য কেন্দ্রের চারদিকে

আমার প্রতিটি অনুভব

নক্ষত্রের মতো ঘুরে ঘুরে

অবশেষে এসে থামে

তোমারই গোপন আকর্ষণে।


৩২.       মায়াবতী


তপ্ত দুপুর হোক, পরন্ত বিকেল হোক, কিংবা সন্ধ্যার আড়াল—

আমি দরজায় কড়া না দিতেই নীরব স্নিগ্ধতায় খুলে যায় কপাট,

একজন মায়াবতী দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক ওপারে,

যেন আমার ফেরা তার প্রতিদিনের নিশ্চিত প্রত্যাশা।


আমাকে এক মুহূর্তও থামতে হয় না—

টেবিলে সাজানো থাকে উষ্ণ খাবার,

বিছানা থাকে ধোওয়া রোদের গন্ধে পরিপাটি,

ফুলদানিতে ঝরে পড়তে থাকে অদৃশ্য সুবাসের মায়া।

শোবার ঘরে মশারি নামানোর ছোট্ট কাজটুকুও

তার অদেখা হাতে নিজে থেকেই নেমে আসে।


তবু আশ্চর্য—

শুক্লপক্ষের রুপালি জোৎস্নায়

আমি কোনোদিন তাকে এনে দিইনি

একটি রজনীগন্ধার ক্ষুদ্র শাখাও,

দিইনি নীলকণ্ঠ পাখির কোনো আশীর্বাদী পালক।


মায়ার এত ঋণ নিয়ে বেঁচে থাকা

কখনো কখনো চাঁদের আলোতেও লজ্জা দেয়।


৩৩.       উপেক্ষিতা


ভোরের অস্ফুট আলোয় একদিন

ইনবক্সে এসে থেমেছিল একটি বার্তা—

“সুপ্রভাত আপনাকে,

ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছি,

এড করে নেবেন?”


নতুন করে কাউকে জুড়ে নেওয়ার

ইচ্ছেগুলো তখন শুকনো পাতা,

তবুও অবশেষে

একজন মানুষ ঢুকে পড়ল বন্ধুত্বের তালিকায়।


তারপর প্রতিদিন ভোরে

ঝরে পড়ত শুভেচ্ছার শিশির—

সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা,

রাত্রির নরম গোধূলি পর্যন্ত।


ফরোয়ার্ড করা সেই শুভেচ্ছাগুলো

দেখতেই ইচ্ছে হতো না—

সময়ের অভাবে, ক্লান্ত হৃদয়ে,

জীবন থেকে যে গান হারিয়ে গিয়েছিল বহু আগেই।


তবুও সে পাঠাত সুরের দোলা—

“তুমি চেয়েছিলে জানতে…”

“জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে না পারো…”

“আমারে তুমি অশেষ করেছ…”

অসংখ্য গানের লিঙ্ক,

যার কোনোটিই আর শোনার সময় হয়নি আমার।


একদিন হঠাৎ দেখি—

সব সুর থেমে গেছে।

সকালের সুপ্রভাত নেই,

নেই রাত্রির শান্ত শুভেচ্ছা,

নেই কোনো গান, কোনো কণ্ঠ।


জানতেও ইচ্ছে হলো না—

কেন থেমে গেল তার শব্দের সেতার।

তবুও, মানুষের মন তো কখনও কখনও

পদ্মপাতার মতো কোমল হয়,

কৌতূহলের হাওয়ায় ভিজে ওঠে।


চলে গেলাম তার প্রোফাইলে—

দেখলাম, ফুলে ফুলে ভরে আছে দেয়াল,

বন্ধুরা রেখে গেছে কান্নার ঝর্ণাধারা।

নীরব বিদায়ে ভেসে যাচ্ছে মেয়ে মানুষটি—

যাকে আমি কত উপেক্ষা করেছি নির্দ্বিধায়।


খারাপ লাগল খুব,

চোখও চিকচিক করল অজান্তে।

জগতে এমন নিঃশব্দ প্রস্থান

এতটা কাছে থেকেও অচেনা থাকে!


জানি, সে আর কোনো কমেন্ট দেখবে না—

তবুও ছোট্ট করে লিখলাম—


“ওপারে তুমি ভালো থেকো—

Rest in Peace.”


৩৪.       আমি আসব


নীলিমার নীরব আকাশ ভেদ করে

যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্ত বাতাস,

পথের ধুলোয় জমে থাকা পুরোনো মনখারাপ উড়ে যাবে হাওয়ায়,

সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব তখন ঝিরি ঝিরি করে দুলে উঠবে—

ঠিক যেন প্রকৃতি নিজেই তোমার নামে উচ্চারণ করছে

কোনও গোপন, মধুর, দূরাগত আহ্বান।


যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া

নেমে আসবে পদ্মপুকুরের নীল জলের উপরে,

তারার আলো গায়ে মেখে জেগে থাকবে জলরেখা,

চাঁদের রূপালি দোলায় ভেসে উঠবে অগণন স্মৃতি;

সেই মায়াময় রাতে তুমি যদি দরজার সামনে

এক মুহূর্ত স্থির হয়ে শোনো—

হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসবে আমার পদধ্বনি।


সেদিন, সেই দিনেই, সেই শিউলি-সুগন্ধি রাত্রিতে

আমি আসব তোমার কাছে—

হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও,

অপেক্ষার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ব্যথা,

সমস্ত নিঃসঙ্গতা ভেঙে আমি আসব।

কারণ প্রেমের পথে সময় কখনও অন্তরায় নয়;

প্রেম শুধু পথ চেনে, আলো চেনে, চেনা মুখের আকুলতা চেনে।


তুমি থাকলেই বসন্ত ফিরে আসে,

তুমি ডাকলেই পূর্ণিমা জ্বলে ওঠে আবার—

আর আমি?

তোমার সব অপেক্ষার গভীরে

নিঃশব্দে, নিবিড় বিশ্বাসে

অবশেষে পৌঁছে যাই।


৩৫.        অপেক্ষার বসন্তরাত


যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্তের নরম বাতাস,

ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির দুলে উঠবে মৃদু স্পর্শে,

যেদিন সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব ঝিরিঝিরি মন্ত্রে

গেয়ে উঠবে নীরব কোনো প্রাচীন সুর—

সেদিন পৃথিবী জুড়ে এক অদৃশ্য আলো নেমে আসবে।


যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া

নেমে আসবে পদ্মপুকুরের স্থির জলে,

চাঁদ যেন মুগ্ধ হয়ে হাত রাখবে জলের কপালে,

মাছেরা থেমে যাবে—

শুধু জলের ভেতর সেই আলো দোল খেয়ে উঠবে।


সেদিন সেই দিনে, সেই রাত্রির হৃদয়ভরা নিস্তব্ধতায়

আমি আসব তোমার কাছে।

হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও

পথ খুঁজে নেব তোমার জানালার ঠিকানায়,

ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দ পায়ে

দাঁড়াব তোমার দরজার সামনে।


তুমি হয়তো বুঝতেও পারবে না—

কোনো পুরোনো জীবনের ডাক,

কোনো অব্যক্ত প্রতিশ্রুতির আলো

আমাকে টেনে আনবে তোমার দিকে।


একা বসন্তরাতের মতোই নরম,

পূর্ণিমার ছায়ার মতোই স্নিগ্ধ হয়ে

আমি আবারো ফিরে আসব—

তোমার কাছে,

তোমার অনন্ত প্রতীক্ষার গভীরতায়।


৩৬.       অলৌকিক আলো


মনে হয়—

জগতের সকল অন্ধকার

দিয়ে তোমাকেই ঢেকে রাখি আমি,

নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো

তোমাকে আঁধারের মাঝে লুকিয়ে রাখি।


তবু তুমি—

কখন যে শত সহস্র আলোকবর্তিকা হয়ে

অদৃশ্য কোনো শক্তিতে

অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠো—

আমি টের পাই না।


মুহূর্তেই তখন

আমার সব নীরব ঘর

অলৌকিক আলোয় ভেসে ওঠে,

ছায়ারা ফেলে যায় দুঃখের ভার,

আর তুমি দাঁড়াও

আমার সমস্ত অন্ধকারের

অমর দীপশিখা হয়ে।


৩৭.         চেনা গন্ধ 


তার প্রাণের সব কথা জাগে,

মায়াবী সেই কাজল চোখ—

নিভৃত ক্ষণে হঠাৎ এসে

মনকে করে নীরব শোক।


বহুদিনের চেনা গন্ধ

ঘুরে ফিরে ভাসে মনে,

বালিশভরা সুগন্ধির ধোঁয়া

জাগায় স্মৃতি গোপন সনে।


গল্প বলা অজস্র রাত্রি,

হাসি-কান্নার অসংখ্য ঢেউ,

অস্পষ্ট কত ডাকনামে

হৃদয় আজও ডুবে রয় সে-ই।


কত কী যে আষ্টেপৃষ্ঠে

বাঁধে আমাকে প্রতি ক্ষণে,

কতভাবে যে জড়িয়ে ধরে

প্রাণের গভীর আদরে।


সবই যেন তোমার টানে,

তোমার নীরব মায়ার ছোঁয়া—

তোমার জন্যই জেগে থাকে

আমার অন্তর, হদয়-রোয়া।


৩৮.       মা, তুমি জান্নাতের পথে গেছ


মা, তুমি আর ঘরের আলোয় দাঁড়াও না,

কিন্তু ফজরের আজানে এখনো তোমার কণ্ঠ মিশে সাড়া দেয়।

মোনাজাতের হাত যখন তুলতে যাই,

তোমার আঙুলগুলো অদৃশ্য হয়ে এসে

আমার আঙুলে জড়িয়ে যায়,

শিখিয়ে দেয়— কীভাবে চাইতে হয় আল্লাহর কাছে।


তুমি পরপারের পথিক—

যে পথের শেষ নেই আঁধারে,

শেষ আছে কেবল নূরে, রহমতে, মাগফিরাতে।

আমি বিশ্বাস করি—

মৃত্যু কোনো বিচ্ছেদ নয়,

এটা রবের ডাকে ফিরে যাওয়া,

এটা জান্নাতের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া।


মা, তোমার কপালের সিজদার দাগ

মাটি মুছে ফেলতে পারেনি,

ফিরেশতারা তাকে নিয়ে গেছে

বরকতের আলোকণায়।


যে চোখ আমাকে ঘুম পাড়াতো শৈশবে,

সে চোখ আজ কবরে নরম আলো হয়ে জ্বলে—

মুনকার-নাকিরের প্রশ্নেও

শান্ত উত্তর খুঁজে পায় রবের তাওফিকে।


মা, তোমার জন্য আজও বিছাই ফুল নয়—

বিছাই আয়াত, দুরুদ, দোয়ার পাপড়ি।

"রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা"

এই এক আয়াতের ডানায় ভর করে

প্রতিদিন তোমার কবর পর্যন্ত পৌঁছে যায়

আমার ভালোবাসার সালাম।


কত ঈদ কেটেছে তোমার হাসিতে,

এখন ঈদ আসে তোমার স্মৃতিতে।

সেহরির থালায় তোমার ছোঁয়া নেই—

কিন্তু রমজানের বরকত যখন নামে,

মনে হয় তুমি অন্য জগতের রোজাদার,

ইফতারের সময় নূরের পেয়ালা হাতে

আমার জন্য দোয়া পাঠাও।


মা, তুমি কোরআনের তিলাওয়াতে ছিলে নদীর মতো,

ধীর, গভীর, অবিরাম।

আমি হয়তো সব শব্দ শিখিনি তোমার মতো,

কিন্তু তোমার শেখানো বিসমিল্লাহর সুর

আজও আমার প্রতিটি কাজে প্রথম লাইন।


যখন রাত দ্বিধায় ভেঙে পড়ে,

তোমার উপদেশ ফিরে আসে—

“আল্লাহ যা নেন, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেন,

ধৈর্যই মুমিনের শক্তি।”


মা, তুমি কবরে কিন্তু একা নও,

তোমার সাথে আছে—

আমল, তাসবিহ, দান-সাদাকার ফসল,

আর সন্তানদের পাঠানো দোয়ার সওগাত।


আমি জানি মা,

কবর এখন তোমার জন্য বাগান—

আখেরাতের বাগানের এক টুকরো শান্ত জমিন।

তুমি ঘুমাও সেখানে

রবের দয়ার চাদরে,

ভোরের নরম শিশিরে।


মা, তোমার বিছানার পাশে আর বসি না,

বসি জায়নামাজে—

তোমার জন্য চাই ক্ষমা, রহমত, উচ্চ মাকাম,

প্রভুর কাছে বলি—

“হে আল্লাহ, যিনি আমাকে দুনিয়ায় মা দিয়েছিলেন,

তাঁকে আখেরাতে জান্নাত দিন।”


তুমি চলে গেছ,

কিন্তু তোমার ছায়া যায়নি—

কারণ মায়ের ছায়া কখনো মাটিতে পড়ে না,

পড়ে সন্তানের হৃদয়ে।


মা, কিয়ামতের ময়দানে

তুমি যখন দাঁড়াবে—

আমি চাই তোমার নামের সাথে লেখা থাকুক:

"ধৈর্যশীল বান্দা, ক্ষমাপ্রাপ্ত আত্মা,

জান্নাতের সম্মানিত অতিথি।"


আর আমি সেখানে, দূরের এক সারিতে দাঁড়িয়ে,

দেখব—

আমার মা ডাকছেন না আমাকে আর—

ফিরেশতারা ডাকছেন তাঁকে,

রবের পক্ষ থেকে বলছেন—

“প্রবেশ করো, শান্তির জান্নাতে…

যা প্রস্তুত করা হয়েছে তোমার মতো মায়েদের জন্য।”


মা, তুমি সত্যিই গেছ—

দূরে নয়, হারিয়ে নয়,

তুমি গেছ রবের কাছে,

আর রবের কাছে যাওয়াই তো

সব ফেরার চেয়েও উত্তম ফেরা।


৩৯.        মা, তুমি আলো হয়ে আছ


মা, তুমি চলে গেছ—

কিন্তু কি সত্যি চলে যাওয়া যায় কখনও?

তোমার পায়ের ধুলোর গন্ধ এখনও

ভোরের বাতাসে মিশে ঘরে ফেরে,

ডেকে বলে— “বাছা, একটু উঠে আয়।”


তুমি পরপারে, আমি এই পারে,

কিন্তু মাঝখানে তো নদী নেই আর—

শুধু মায়ার সেতু,

যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে

আমি তোমার দিকে চেয়ে থাকি।

তুমি হাত নাড়ো কি না দেখি না—

তবুও বুক ভরে যায়,

মনে হয় তুমি দেখছ আমাকে।


তোমার শাড়ির আঁচল আজ নেই কাঁধে,

কিন্তু তার ছায়া পড়ে আমার হৃদয়ে—

যখন জীবন রোদে পুড়ে খসখসে হয়,

তুমি শীতল মেঘ হয়ে নেমে আসো।


মা, তোমার কথা আজ নীরব,

তবু প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি দোয়ার ধ্বনিতে

তুমি উচ্চারিত হও— আগের চেয়েও বড়ো।


তুমি ঘুমিয়ে নেই,

তুমি হারিয়ে যাওনি,

তুমি শুধু অন্য আকাশে উঠে গেছ

আর সেখান থেকে আলো ছড়াচ্ছ

আমার পথের উপর।


যে পথ শিশুকালে তুমি ধরে দিয়েছিলে হাত,

আজও সেই হাত ধরে রেখেছ— অদৃশ্য হয়ে,

আমাকে ফেলে না দিয়ে,

আমাকে ভুলে না গিয়ে।


মা, তুমি স্বশরীরে নেই বলে

চোখে জল আসে—

কিন্তু তুমি হৃদয়ে আছ বলে

চোখ মুছে ফেলেও হাসি ফোটে।


কারণ,

মা কখনও মুছে যায় না,

মা শুধু আলো হয়ে থাকে—

চিরকাল… পরম যত্নে।


৪০.      মা রাবেয়া খাতুন


মা,

তোমার নাম রাবেয়া খাতুন—

শুধু একটি নাম নয়,

এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম পাঠশালা।


তুমি যার কাছে বেতন নাওনি,

তারাই তোমার কাছে শিখেছে—

অক্ষর, স্বপ্ন আর মানুষ হওয়ার বর্ণমালা।

গ্রামের মাটির স্কুলঘরে

চকের ধুলোর গন্ধে মিশে আছে

তোমার নিঃস্বার্থ কণ্ঠের ধ্বনি—

“শেখো, জানো, বড়ো হয়ে ওঠো—

জীবনই সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা।”


শাড়ির আঁচলে বাঁধা ছিল বইয়ের ভার,

কিন্তু তোমার কাঁধে ভার ছিল না—

দানের মতোই ছিল শিক্ষা,

নিঃশব্দে বিলিয়ে দেওয়া এক সদকায়ে জারিয়া।


মা,

তোমার ক্লাসে শুধু পড়া পড়ানো হতো না,

সেখানে শেখানো হতো—

সত্য কথা বলা,

ছোটকে স্নেহ,

বড়োকে সম্মান,

আর প্রতিরাতে রবের কাছে ফিরে যাওয়া।


তারপর একদিন,

আল্লাহ ডাক দিলেন,

তুমি প্রস্তুত হলে—

হাজারো শিশুর দোয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে

হজ্জের সাদা ইহরামে জীবন লিখে

চলে গেছিলে কাবার ছায়ায়।


হাজারো মানুষের ভিড়ে

একজন তুমি,

তবু আল্লাহর কাছে

তুমি ছিলে অদ্বিতীয় এক প্রার্থনাকারিণী।

লাব্বাইক ধ্বনির স্রোতে ভেসে

তুমি ধুয়ে এসেছিলে

নিজের আত্মা নয় শুধু,

আমাদের পুরো পরিবারের ভাগ্য।


সেই হাত,

যে হাতে চক ছিল—

তাতে জড়িয়েছিল তাসবিহও।

সেই কপাল,

যে কপালে সিজদার নরম দাগ ছিল—

সে কপাল স্পর্শ করেছিল

বাইতুল্লাহর পবিত্র সালামের হাওয়া।


মা,

তুমি চলে যাওয়ার পর

স্কুলঘর হয়তো রঙ হারিয়েছে,

ক্লাসঘর হয়তো নীরব…

কিন্তু তোমার পড়ানো প্রতিটি অক্ষর

আকাশে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়,

তোমার আমল হয়ে জমা হয়

রবের খাতায়।


মা,

তুমি এই দুনিয়ার স্কুলে ছিলে অবৈতনিক,

কিন্তু আখেরাতের দরবারে

তুমি আজ মূল্যবান—

কারণ তুমি শুধু শিক্ষক ছিলে না,

ছিলে আল্লাহর এক দয়ার দূত,

যে দয়া দিয়ে মানুষ গড়ত।


আজ যখন জায়নামাজে বসি,

তখন মনে হয়—

তুমি আমার সামনে নেই,

কিন্তু তোমার মাকামের দিকে তাকিয়ে

ফিরেশতারা হাসেন,

আর আল্লাহ বলেন—

“বান্দা রাবেয়া, তুমি শিখিয়েছ আমার পথ,

আমি আজ তোমাকে দিচ্ছি চিরশান্তির গৃহ।”


মা,

যারা তোমাকে মা ডাকেনি,

তারাও তোমাকে মন থেকে মা জানে—

কারণ দুনিয়ায় কিছু মা থাকেন

যারা সবার মা হয়ে ওঠেন।


তুমি গেছ, তবু আছ—

রহমতের মেঘ হয়ে,

শিক্ষার আলো হয়ে,

হজ্জের পবিত্র স্মৃতি হয়ে,

আর দোয়ার কবুল দরজায়

এক উজ্জ্বল মিনার হয়ে।


মা রাবেয়া খাতুন,

তুমি শুধু পরপারে যাওনি,

তুমি পৌঁছে গেছ

আমার ঈমানের গোপন শক্তি হয়ে,

আর আমাদের দোয়াগুলোকে ডানা দিয়ে

চিরদিন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেওয়ার

এক পবিত্র ঠিকানা হয়ে। 


৪১.        কলাভবনের দিনগুলো


কলাভবনের পুরনো সিঁড়ি বেয়ে উঠতাম প্রতিদিন,

নরেন্দ্র বিশ্বাস স্যারের ক্লাসে জমে থাকত বিকেলের রোদ–ঘ্রাণ।

নাট্য স্বরে কথপোকথন , আলোচনার দীর্ঘ ঢেউ,

বন্ধুর কণ্ঠে ভেসে আসত হাসি, আর তর্কের গান।


লাইব্রেরি চত্বর ছিল নীরবতার সবুজ জগৎ,

বইয়ের পাতায় ঘুমিয়ে থাকত ইতিহাসের নীল নদ।

কখনো ক্লান্ত দুপুরে ঘাসে বসে ভাবনার আড্ডা,

জ্ঞান আর স্বপ্ন মিলেমিশে বুনত নতুন শুরু–পদ।


টিএসসির মেঝেতে পায়ের ছন্দ ছিল স্বাধীন,

চায়ের কাপে সাহিত্য, প্রেম, রাজনীতির মিশেল কথা।

কত সন্ধ্যা কেটে গেছে ব্যান্ডের সুরে আর ভিড়ে,

বন্ধুত্বের টানেই বুঝি হৃদয়ের সত্য প্রার্থনা।


বটতলার ছায়ায় বেজে উঠত জীবনের আলাপন,

কবিতা আর স্মৃতিরা ওখানেই হয়েছিল জাগ্রত।

পলাশ ঝরা দুপুর, কিংবা রাতজাগা ক্যাম্পাস হাঁটা,

সহপাঠীদের চোখেই খুঁজতাম নিজের প্রতিচ্ছবি দীর্ঘপথ।


আজ সময় বহুদূর, পথ ঘুরে গেছে অন্যখানে,

কিন্তু স্মৃতির দরজায় ডাক দেয় পরিচিত মুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তুমি হৃদয়ের অনিঃশেষ ঠিকানা,

ফেলে আসা দিনগুলোতেই জমে আছে জীবনের সুখ।


৪২.        অপেক্ষার হাহাকার


এখনও রাস্তায় হাঁটলে হঠাৎ মনে পড়ে যায়—

কেউ একজন আসবে বলেছিল,

কিন্তু আসেনি কখনো।


চলে আসে সেইসব দিন,

যেদিন তার জন্য সাজিয়েছিলাম

অগণিত ছোট ছোট আয়োজন;

পুরোনো চিঠির ভাঁজে ভাঁজে

লুকিয়ে রাখা কবিতা,

সুন্দরতম শব্দমালা,

মুগ্ধ করা কয়েকটি মুহূর্ত,

হৃৎস্পন্দনের নিবিড় অনুরণন—

সব উঠে আসে একসাথে।


বুকের ভেতর কেমন এক হাহাকার,

ঠিক কষ্ট বলা যায় না,

কেমন যেন এক অচেনা ভার।

সবার চোখ এড়িয়ে

একলা রাতে

বালিশে মুখ গুঁজে থাকতে ইচ্ছে করে।


মনে হয়, হাতের সব কাজ ফেলে

স্টেশনের সেই কাঠের বেঞ্চটায় গিয়ে বসি—

শূন্য সন্ধ্যার মতো।

মনে হয়, বসন্তের ঝরে যাওয়া পাতার উপর

মর্মর শব্দ তুলে

হেঁটে হেঁটে

দূরে— আরও দূরে—

চলে যাই,

যেখানে কেউ অপেক্ষা করে না,

তবুও হৃদয়ের প্রতিটি ধ্বনি

কারও জন্য অপেক্ষায় থাকে।


৪৩.        বৃষ্টি-ভেজা প্রতীক্ষা


আমার চোখ এখনও তাকিয়ে থাকে
সেই পথের দিকে—
যে পথে লতা-গুল্ম, শিশিরধোয়া ঘাস
চূর্ণ হয়ে আছে তোমার পদচিহ্নের নিচে।

তারপর একদিন আকাশ ভরেছে মেঘে,
ঝরেছে নিরন্তর জল,
পথের সব রেখা ভেসে গেছে
কাদার ঢেউয়ের অনুতাপে।
তবুও মেঘের নিচে
সেই কাদামাখা পথে
কেউ আর ফেরেনি—
একজনও না।

এত জল, এত অন্ধকার মেঘ—
ভিজে ভিজে আমি হাঁটি একাই,
হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে
জলধারার মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

হায়, আমার এই বৃষ্টি-ভেজা নিঃসঙ্গ ভালোবাসা
অনুভব করল না কেউ—
দেখল না কেউ—
শুধু আকাশ নেমে এসে
আমার কাঁধে রাখল
তার অনন্ত সান্ত্বনার হাত।


৪৪.       গ্রহণ করেছি যত


প্রত্যন্ত ভোরের দোরগোড়ায়,

অলস কুয়াশার ভেতর দিয়ে

আদরের শেষ আলোটুকু ক্ষীণ হয়ে আসে—

সে তখন অর্ধনিদ্রায় ভেসে যায়,

কোমল নিঃশ্বাসের ঢেউয়ে

ঘুম আর জাগরণের মাঝেকার

এক বিস্মৃত অন্দরে হারিয়ে পড়ে।


আমি থাকি নিঃশব্দে।

এমন এক নীরবতা যেখানে

আমার নিশ্চিন্ত মুখের ওপর

সময় নিজের হাত রেখে

সান্ত্বনার আদেশ লিখে যায়।

দূর থেকে ভেসে আসে

রাগ-ভৈরবীর অস্পষ্ট সুর—

যেন আকাশের শিরায় শিরায়

ভোরের আলো জেগে ওঠার চেষ্টা করছে।

শিউলির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে

নাকে নয়—মনের চারপাশে।


এই ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর, অনামা মুহূর্তটাই

তার পরম প্রাপ্তি—

আমার মুখের প্রশান্তি দেখে

তার সমগ্র ভেতরের জগৎ

নীরবে পুনর্বিন্যাসিত হয়।

সব গ্লানি ঝরে পড়ে,

সব আক্ষেপ ম্লান হয়,

চাওয়া-পাওয়ার সব রেখা

এক অনন্ত সাদা জায়গায় বিলীন হয়ে যায়।


সুখ কেউ খুঁজে ফেরে

ধনদৌলতের অগণিত আলোয়,

কেউ আবার খুঁজে পায় এমনই কোনও ক্ষণে—

যেখানে ভোরের রঙ জানে না

তার নিজস্ব নাম,

শিউলি জানে না সে কোথা থেকে ঝরেছে,

আর মুখের উপর রাখা শান্তি

নিজেই হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত, বিমূর্ত,

অবর্ণনীয় প্রাপ্তি।


৪৫.        মায়ামুখের স্মৃতি


বিস্মৃতির ধুলোমাখা কত মুখ
এখনও ঘুম ভাঙায় আমার অন্তরে—
নরম কোনো নিশ্বাসের মতো
ভেসে আসে তাদের অবয়ব,
অপরাহ্নের আলোয় ধূলিকণার মতোই
ঝলসে উঠে মিলিয়ে যায়।

তাদের ডাক নিঃশব্দ,
তবু আমার বুকের গভীরতলে
হালকা শিহরণ তোলে—
যেন বহুদিন আগে রাখা
একটি ভেজা চিঠির গন্ধ
হঠাৎ ফিরে পায় জীবন।

অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অশ্রুগুলো
জানালার ধারে শিশিরের মতো জমে থাকে,
চোখের কোণে নরম ভেজা ঝিলিক—
তারা বলে দেয়,
ভুলে যাইনি আমি,
ভুলে যাওয়া তো কোনোদিনই পারিনি।

কিছু মুখের স্মৃতি
বাতাসেও বিলীন হয় না—
সে মুখগুলো ফিরে আসে
রাত্রির নিঃশব্দতার ভেতর দিয়ে,
স্বপ্নের কোমল আলো হয়ে,
স্মৃতির অদৃশ্য মায়াজাল বুনে।

আর আমি—
অঁচল ভেজা সেই নরম আলোয়
চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনি
সেই পুরোনো মায়ামুখদের
নীরব ডাক—
যারা হারিয়েও
ফিরে আসে অশ্রুকণার ছদ্মবেশে।


৪৬.       নীরব অন্তরালের কবিতা


মানুষ আসে—
মুঠোভরা উষ্ণতা নিয়ে,
কিছু স্বপ্ন, কিছু আলো,
কিছু রোদের মতো হাসি সঙ্গে করে।

তারপর একদিন হঠাৎ
সময়ের কুণ্ডলী খুলে যায়—
অচেনা এক দরজায়
কাকে যেন ডেকে নেয় অদৃশ্য কোনো পথ।

জীর্ণ জীবনের মলিন পোশাকে
সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়
নীরব এক অন্তরালে,
যেখানে শব্দ নেই, কোলাহল নেই,
রয়ে যায় শুধু অসীম নিস্তব্ধতা।

হায়! মানুষ কোথায় যে চলে যায়—
কোন দূরতম পরপারের আহ্বানে
কোন অদ্ভুত স্বর্গ-ছায়ায়
লীন হয়ে যায় তার দগ্ধ দিনরাত্রি।

আমরা শুধু দেখি
তার হাঁটার শেষ রেখাটি—
যার পরে আর কোনো পায়ের ধ্বনি নেই,
কোনো ফিরে আসা নেই,
শুধু স্মৃতির দোলাচলে
অল্প কিছু আলো আর বেদনা বেঁচে থাকে।

মানুষ আসে, আবার চলে যায়—
অতঃপর থাকে না কিছুই,
থেকে যায় শুধু প্রশ্নভরা বাতাস—
আর আমাদের দু’চোখ ভরা
অচেনা এক শূন্যতার নীল।


৪৭.       সায়াহ্নে 


কত পথের ধুলো মেখে,

কত ক্লান্তির সিঁড়ি বেয়ে

যখন শেষমেশ তোমার দরজায় এসে দাঁড়ালাম—

দেখলে কি, আমার শ্বাস কত ক্ষীণ,

আমার সময় কত সামান্য?


জীবন যেন এক দগ্ধ প্রদীপ,

যার আলো এখনো ক্ষীণ সুরে কাঁপছে—

এই অল্প ক্ষণের ভিতর

কীভাবে বুঝাই তোমায়

আমার ভালোবাসার দীর্ঘ নদী,

যার উৎস অচেনা, যার স্রোত অনিঃশেষ?


আমি জানি, এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তে

হৃদয়ের সব রঙ দেখানো যায় না—

তবু তোমার চোখের গভীরে

আমার সমস্ত না-বলা ভালোবাসা

ধরে রাখতে চাই এক ফোঁটা নিঃশ্বাসে।


যদি সময় খুব কম হয়,

তবে আমার প্রেমকে সময় দিও—

তোমার মায়ার স্পর্শে

হয়তো সে দীর্ঘ হয়ে উঠবে,

হয়তো আমার সংক্ষিপ্ত জীবন

তোমার নিঃশব্দ আলিঙ্গনে

চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।


৪৮.        কুসুমপুরের কিশোরের স্বপ্নগাথা

কুসুমপুরে রুক্ষ বসন্তদিনে,
ঘুঘুডাকা নীরব অপরাহ্নে
এক কিশোর বসে থাকত পুকুরপাড়ে—
অকারণ, অথচ গভীর কোনো ডাকে।

সে জানত না তখনই
তার পথ বাঁক নেবে দূর শহরের দিকে,
ধুলি–ধূসর ঢাকা তাকে ডেকে নেবে
অপরিচিত মানুষের ভিড়ে।

শত আশাভঙ্গের বেদনা
জীবনের বিবর্ণ পৃষ্ঠায় জমে ওঠার পর
সে লিখতে শুরু করে
গল্প, কাব্য, আর ভাঙা দিনের মায়া।

এখনও সে হাঁটে পৃথিবীর
কণ্টকাকীর্ণ পথে,
স্বপ্নভরা এক ঝুলি কাঁধে—
যেন পথই তার সঙ্গী,
আর সঙ্গী তার সৃষ্ট চরিত্রেরা—
কমলিকা, অদিতি, মেহেরজান, রেবেকা,
রোহিত ও রঞ্জন—
সবাই মিলে তার একান্ত ভুবন।

সে ভাবে—
এই দেশের মানুষ
স্বচ্ছতোয়া নদীর জলের মতো
প্রীতিময় হবে পরস্পরে,
চিরহরিৎ অরণ্যের মতো
মুক্ত মনে বেঁচে থাকবে,
লাবণ্যঘেরা দিগন্তের মতো
উদারতায় ভরবে দিন,
পাখিডাকা কুসুমপুরের মতোই
সারল্যের আলোয় ভাসবে জীবন।

আর সে—
স্বপ্নের কিশোর—
এখনও হারায় না পথ,
শুধু স্বপ্ন দেখে যায়
নিঃশব্দ এক দৃপ্ত ভবিষ্যতের।    


৪৯.       হেমন্তের জনারণ্যে


আজ অনেকটা হঠাৎই দেখা হয়ে গেল দু’জনের,

শহরের পিচঢালা পথে, নিস্তব্ধ ল্যাম্পপোস্টের তলে—

যেখানে ভিড় থেকেও আলাদা ছিল এক টুকরো নির্জনতা।


আলো–আঁধারের মগ্ন সীমায় তোমাকে দেখলাম—

ঠোঁট শুষ্ক, দীর্ঘদিন যেখানে চুমুর আল্পনা আঁকা হয়নি,

বুকের আঁচল বিবর্ণ, সুগন্ধিহীন এক শীতল বিষাদের মতো—

মনে হলো, এ বুকে কত কাল কোনো আলিঙ্গনের শব্দ ঝরে পড়েনি।


আজ আর তোমার হাত ধরা হলো না,

মেহেদিহীন নখগুলোও যেন অচেনা হয়ে গেছে পথে—

হাঁটছিলাম এলোমেলো দুই সমান্তরাল নীরবতা হয়ে,

এভাবে তো হাঁটে না কোনো প্রেমিক–প্রেমিকা…


তবু আমি বারবার খুঁজে নিচ্ছিলাম তোমার চোখ—

সেই কাজলবেষ্টিত দীঘির গভীরতা আর নেই,

এখন সেখানে জলপড়া পাথরের কালচে নিস্তেজ আভা—

যে চোখকে কোনোদিন দুঃখ কিংবা অনাদরে ছুঁইতে দেইনি,

সেই তুমিই আজ ক্লান্ত, দীনহীনা, অভাগিনীর ছায়া হয়ে দাঁড়ালে।


পথেরা আজ লক্ষ্য করল না তোমার বিষণ্নতার পদধ্বনি,

অথচ এই শহরই তো একসময় আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী ছিল—

পার্কের পাখির ডাকে লেগে আছে কত চুমুর ইতিহাস,

বনের কাকাতুয়ার ডানায় জমে আছে কত আলিঙ্গনের গোধূলি।


আজ সে সবই ফিরে ফিরে আসে— নষ্ট নস্টালজিয়ার মতো।


কোনো কথা না বলে,

কোনো চুমু, কোনো আলিঙ্গন না রেখে—

এই হেমন্তের বিষাদসন্ধ্যায়,

জনারণ্যের অন্তরালে তুমি মিলিয়ে গেলে,

আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম— তোমার ফেলে যাওয়া বাতাসে।


৫০.        এপিটাফ


এখানে নক্ষত্রের মতো নিভে-না-যাওয়া শান্তিতে

শুয়ে আছেন কোয়েল তালুকদার—

কার্তিকের সোনালি আলোয় জন্ম,

যমুনা-পারের পলিমাটির আশীর্বাদে বড় হওয়া এক আত্মা।


মা রাবেয়া খাতুন—হৃদয়ে মানচিত্রের বিস্তার,

পিতা হারুন অর রশিদ তালুকদার—মাটি ও মানুষের স্থির প্রতীক।


তিনি চেয়েছিলেন কবি হতে;

হতে পারেননি—

তবু তাঁর জীবনই হয়ে রইল

এক অসমাপ্ত, দীপ্ত, চিরজাগরুক কবিতা।


যে বাতাস এই ফলকের ওপর এসে থামে,

সে যেন এখনো বলে—

“স্বপ্ন মরে না;

শুধু নতুন আলোয় ফিরে আসে।”