সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

একলা বিকেলের মেয়ে ( কাব্যগ্রন্থ )


একলা বিকেলের মেয়ে  ( কাব্যগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  - জানুয়ারি, ২০২৬ ইং


উৎসর্গ -

আমার ছোট ভাই জ্যোতি ও
ছোটবোন এলিজা - কে। 


১.   একলা বিকেলের মেয়ে 


যখন বৃষ্টি নামে,
যখনই জলের শব্দ শুনি
তখনই মনে পড়ে তুমি কী 
আজও একলা বিকেলের মেয়ে?

এখনও কি তুমি
বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকো
ভেজা আকাশের দিকে তাকিয়ে
কারও নাম নীরবে ভাবো?
নাকি সময় তোমার চারপাশে
নতুন সংসারের দেয়াল তুলে দিয়েছে?

আমি যখন দূরের এই শহরে
হঠাৎ বৃষ্টির শব্দে থেমে যাই,
মনে হয় -
কোথাও এক বিকেল এখনো বেঁচে আছে,
যেখানে তুমি বসে আছো
চুপচাপ, বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে।

আর পৃথিবীর সব নদী, সব বৃষ্টি
এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে
আমাকে জিজ্ঞেস করে -
তুমি কি এখনও
সেই একলা বিকেলের মেয়ের কথা
ভুলতে পারো নি।


২.      দূরের তারা


সাহানা আজ দূরের তারা
আকাশের অগম্য নীলিমায় জ্বলে,
সাধ্য কি আছে তাকে
মর্তের মাটিতে ফিরিয়ে আনার?

তবু একদিন, এই সাহানাই শুধু নয়,
অদিতি, পল্লবী আর আরও কিছু নাম
মায়াবী বিকেলের আলোয়
আমার চারপাশে বুনেছিল অদ্ভুত এক আবেশ।

তারা যেন হারতে চেয়েছিল
তারা যেন হারার জন্য জীবনে এসেছিল 
জিতিয়ে দিতে চেয়েছিল আমাকে
কোনো অদৃশ্য সুখের খেলায়।

কিন্তু জীবন তো ইতিহাসের গোপন নাট্যমঞ্চ,
দৃশ্য পাল্টায়, আলো বদলায়,
মানুষের মুখে ওঠে জনমানসের ঢেউ।
সেই ঢেউ একদিন
আমার হৃদয়ের তীরে আছড়ে পড়ে
শুধু দুঃখের শামুক কুড়িয়ে দিয়ে গেল।

আজ বুঝি, তাদের সে জোর ছিল না,
যে জোরে দূরত্ব গলে গিয়ে
হয়ে ওঠে ঘরের বাতাস,
যে শক্তিতে আকাশের তারা
নেমে আসে জানালার কাছে।

যার সে জোর থাকে জীবন ঘুরে ঘুরে
শেষমেশ তাকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়,
তার চারপাশেই গড়ে ওঠে
সমস্ত ভালোবাসার মহাবিশ্ব।

আর আমি রাতের নির্জন আকাশে দাঁড়িয়ে
দূরের সেই তারাটির দিকে তাকিয়ে ভাবি,
কত আলো ঝরে পড়ে -
তবু কত দূরেই থাকে সে। 


৩.     গোধূলির গোপন মায়া


মেয়েটির নাম শায়লা,
যেন বিকেলের মায়াবী ফুল, সন্ধ্যার অবকাশ,
রোদ ঝরা দিনের শেষে
আলোর ক্লান্তি যেখানে এসে নরম হয়ে বসে।

তার চোখে থাকে অদ্ভুত এক নীল নীরবতা,
যেন দূর আকাশের গোপন ভাষা।
চুলের ভাঁজে গোধূলি এসে জড়িয়ে থাকে,
যেন সূর্যাস্তের শেষ আগুনে লেখা কোনো কবিতা।

সে হাঁটলে পথের ধুলোও থমকে দাঁড়ায়,
শিউলি ঝরা ভোরের মতো নরম শব্দ হয় চারদিকে।

তার হাসি,
নদীর জলে হালকা ঢেউ তুলে যাওয়া বাতাস,
অথবা বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা
অচেনা বাঁশির সুর।

কখনো মনে হয়
সে বুঝি কোনো গন্ধর্ব-নগরীর মেয়ে -
রূপকথার অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে
মর্ত্যের আকাশে একটু আলো রেখে যায়।

আমি তাকে ছুঁতে চাইনি,
শুধু তার পাশে বসে শুনেছি সন্ধ্যার শব্দ।
তবু অদ্ভুতভাবে
আমার সমস্ত নীরবতা তার দিকে ঝুঁকে পড়ে,
যেন জোছনা চুপিচুপি নেমে আসে
অলস নদীর বুকে।

শায়লা,
তুমি কি জানো?
আমার যত কবিতা, যত অব্যক্ত স্পর্শ,
সবই তোমার নামের চারপাশে ঘোরে।

কারণ তুমি
কোনো সাধারণ নাম নও -
তুমি বিকেলের শেষ আলো,
তুমি গোধূলির গভীর মায়া,
তুমি সেই স্বপ্ন
যাকে ছুঁতে গেলে হৃদয়
ধীরে ধীরে কবিতায় পরিণত হয়।


৪.      পুরনো কবিতা


একদিন অনেক পুরনো একটা কবিতা পড়ব, 
লেখাটি হবে আমারই -
কবিতায় খুঁজব কুড়ি বছর আগের প্রেম,
আবেগ, অনুভূতি, শিহরণ, উন্মুখ -
সেইসব আগের মতো আছে কী নেই।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মনে হবে,
এই শব্দগুলো কি সত্যিই আমারই ছিল?
কোনো এক বসন্ত দুপুরে লেখা,
কোনো এক অস্থির হৃদয়ের নিঃশ্বাসে ভেজা।

কোথায় হারাল সেই দুঃসাহসী স্পন্দন,
যে অক্ষরগুলো একদিন তোমার নামের দিকে ছুটত?
আজ তারা নিঃশব্দ, ধুলো জমা -
পুরনো আলমারির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা চিঠির মতো।

হয়তো কোথাও একটা পংক্তিতে
হঠাৎ জেগে উঠবে তোমার মুখ,
অস্পষ্ট, তবু দীপ্ত -
মেঘের ফাঁকে হঠাৎ দেখা দেওয়া পুরনো চাঁদের মতো।

আমি চুপ করে বসে থাকব,
শব্দগুলো ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যাবে আমাকে,
আর বুঝতে পারব -
সময় শুধু মানুষকে নয়, কবিতাকেও বদলে দেয়।

তবু সেই পুরনো কবিতার ভেতরে
এখনও লুকিয়ে থাকবে এক তরুণ হৃদয়,
যে বিশ্বাস করত -
একটি নাম লিখলেই পৃথিবী ভরে উঠত আনন্দে।


৫.      কবরস্থানের নীরবতা


কবরস্থান, বড় আশ্চর্য এক জায়গা,
এক চিলতে মাটিতে প্রতিদিন
কারও না কারও জীবনের শেষ ঠিকানা লেখা হয়।
হাজার মানুষের ভিড় এখানে,
তবু কোথাও কোনো শব্দ নেই।

যে মানুষ একদিন
কোলাহল আর কলরবে ভরিয়ে রাখত ঘর,
তার কবরের উপর আজ
নেমে আছে অনিঃশেষ নীরবতা
তার নামটাও মাটির ভেতর ঘুমিয়ে আছে অন্ধকারে।

যারা বেঁচে থাকতে
দম্ভে আর অহংকারে মাটি কাঁপাত,
অহংকারের উঁচু মিনারগুলো
এখানে এসে ভেঙে পড়ে
তাদের সমাধির বুকে আজ
নির্লিপ্ত আগাছা আর নামহীন বুনো ঘাস।

এখানে কেউ আর কাউকে শাসায় না,
চোখ রাঙায় না,
বুক ভরা চিৎকার করেও
কাউকে আর ডাকা যায় না,
শুধু স্তব্ধতার গভীর কূপে
ডুবে থাকে সব শব্দ।

শেষমেশ মানুষ এক মুঠো মাটি,
আর এক বুক অনুচ্চারিত হাহাকার
এইটুকুই তার চূড়ান্ত পরিচয়
আর অনন্ত নীরবতার ভেতর
হারিয়ে যায় সে চিরতরে।


৬.     এক জীবনের অনুবাদ


একটা জীবন শেষ হয়ে গেল
আর একটা পুনর্জীবন আর পাবো না,
সময়ের নদী বয়ে গেল নিঃশব্দে
ফিরে আসার জন্য রেখে গেল না কোনো ঘাট।

কত স্বপ্ন ছিল
সকালবেলার শিশিরের মতো কাঁপা,
কত আশা ছিল
আকাশের দিকে ছুড়ে দেওয়া নীল ঘুড়ির মতো,
সবই একদিন আলগা হয়ে
হাওয়ার হাতে উড়ে গেল দূর অজানায়।

জীবনের চাওয়া পাওয়া
কখনো ছিল মুঠোভরা রোদ,
কখনো বা সন্ধ্যার আলোছায়া 
যেখানে মুখগুলো ঝাপসা হয়ে যায়।

যাদের পাশে বসে ভেবেছিলাম
এ পথ দীর্ঘ হবে,
তারা অনেকেই নেমে গেছে
অন্য কোনো অচেনা স্টেশনে।

শোকগুলো আজও বসে থাকে
বুকের এক কোণে,
দুঃখগুলো কখনো সন্ধ্যার পাখি হয়ে
ফিরে আসে স্মৃতির জানালায়,
তবু জীবন
সব হারিয়েও অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকে।

একদিন বুঝেছি
এই পৃথিবীতে আমাদের প্রাপ্তি
হয়তো খুব সামান্যই,
কিন্তু অপূর্ণতার মাঝেই
জীবনের সবচেয়ে গভীর কবিতা লেখা হয়।

তাই আজও সন্ধ্যার আলোয় মনে হয় 
যা কিছু হারিয়ে গেছে জীবন থেকে,
তা-ই বোধহয় আমাকে
সবচেয়ে বেশি ফতুর করে গেছে।


৭.     অনুতাপের আগুন


কী যে অনুতপ্তের আগুনে জ্বলছি,
তোমাকে ছেড়ে এসে বুঝতে পারছি
কী অমূল্য জিনিস আমি হারিয়ে ফেলেছি।

কেউই তোমার মতো করে মনে করে না,
ভালোবাসে না, আদর করে না -
এই ভিড়ভাট্টা পৃথিবীর মাঝেও
একটা গভীর শূন্যতা আমাকে ঘিরে থাকে,
মানুষের কোলাহল পেরিয়ে
তোমার মুখটাই শুধু মনে পড়ে।

কখনো বিকেলের হালকা বাতাসে
তোমার কণ্ঠস্বর শুনি বলে মনে হয়,
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি
হয়তো তুমি এসে ডাকবে আবার।

আজ বুঝি -
ভালোবাসাক অবহেলা করা ঠিক না,
তার দাম বোঝা যায়
যখন তাকে হারিয়ে ফেলা হয়।

তোমার দেওয়া ছোট ছোট যত্নগুলো
আজ স্মৃতির মতো এসে বসে বুকের ভেতর,
কেউ জিজ্ঞেস করে না,
আমি খেয়েছি কি না, ক্লান্ত কি না।

রাত নামলে আকাশের তারাগুলো
অদ্ভুতভাবে ঝাপসা হয়ে যায়,
মনে হয় প্রতিটা তারা যেন
তোমারই অমলিন চোখের দৃষ্টি।

যদি সময়কে ফিরিয়ে আনা যেত
এক মুহূর্তের জন্য হলেও
তোমার হাতটা আবার ধরতাম,
বলতাম- “ভুল করেছিলাম,
তোমাকে হারানোর মতো বড় ভুল আর নেই।”

এখন শুধু অনুতাপের দীর্ঘ রাত
আর স্মৃতির নীল আগুনে পুড়ে পুড়ে
আমি বুঝে যাচ্ছি ধীরে ধীরে -
তোমার মতো মানুষ জীবনে একবারই 
আসে।


৮.      অতৃপ্তির তুমি


তোমার সাথে কত সময় কাটিয়েছি,
তোমাকে দেখেছি সারা দিন, সারা বছর -
তবুও অতৃপ্তি রয়ে গেছে জীবনে।

সেই তুমি চলে গেছ
কীভাবে বেঁচে আছি, কীভাবে সময় কাটে,
সে তুমি জানো না…

কখনো সন্ধ্যার নির্জনতায় হঠাৎ মনে হয়,
এই বুঝি তুমি এসে দাঁড়াবে দরজার পাশে,
মৃদু হাসিতে বলবে -
“এতদিন পরেও কি আমাকে ভুলতে পারোনি?”

তোমার রেখে যাওয়া কিছু কথা
এখনও বাতাসে ভেসে আসে,
রাতের তারাদের দিকে তাকালে মনে হয়
ওদের ভিড়েই তুমি লুকিয়ে আছো কোথাও।

যে পথ ধরে একদিন পাশাপাশি হেঁটেছিলাম,
আজও সে পথ চেনে তোমার পায়ের শব্দ;
আমি শুধু একা দাঁড়িয়ে শুনি
স্মৃতির ভাঙা প্রতিধ্বনি।

তোমাকে আর ছুঁতে পারি না -
তবু তোমার ছায়া লেগে আছে জীবনের প্রতিটি কোণে,
ঘুমের ভিতর, জাগরণের ভেতর,
নিঃশব্দে তুমি রয়ে গেছো।

হয়তো এভাবেই কাটবে বাকি জীবন
অপূরণ আর অপেক্ষার মাঝখানে;
তোমাকে কাছে পেয়েও যে ভালোবাসা
কখনো পূর্ণ হলো না।

তবু জানো,
যদি আরেকটি জন্ম সত্যি কোথাও থাকে,
আমি আবারও খুঁজে নেব তোমাকে,
শুধু একবার তৃপ্তির মতো করে
তোমাকে ভালোবাসার জন্য।


৯.       বদলে যাওয়া পৃথিবী


যে-পৃথিবীতে আমি এসেছিলাম
সেই পৃথিবী ছিল ভোরের শিশিরের মতো নির্মল,
মানুষের চোখে ছিল বিশ্বাসের আলো,
বাতাসে ভাসত অদেখা এক মমতার গন্ধ।

গাছের ছায়ায় বসে মানুষ গল্প বলত,
একটি হাসি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেত,
আকাশ ছিল নীল -
আর মন ছিল তার চেয়েও স্বচ্ছ।

কিন্তু আজ চারদিকে তাকিয়ে দেখি -
সেই পৃথিবী আর নেই।
রাস্তার ভিড়ে মানুষ আছে,
কিন্তু মানুষের ভেতর মানুষ যেন নেই।

শব্দ আছে, কোলাহল আছে,
তবু কোথাও এক অদ্ভুত নীরবতা জমে থাকে;
মুখে হাসি থাকে,
কিন্তু চোখের ভেতর ভাঙা আয়নার মতো ক্লান্তি।

যে পৃথিবীতে আমি এসেছিলাম,
আর যে পৃথিবী ছেড়ে যাব,
তারা আর এক নয় কোনোভাবেই।
সময়ের অদৃশ্য হাত
সবকিছু একটু একটু করে বদলে দিয়েছে।

স্বপ্নগুলো ছেঁড়া কাগজের মতো উড়ে গেছে,
বিশ্বাসগুলো ধুলোর মতো ঝরে পড়েছে,
আর ভালোবাসা -
সে যেন আজকাল খুব লাজুক, খুব দুর্লভ।

তবু কখনো কখনো সন্ধ্যার আকাশে
একটা তারা জ্বলে ওঠে,
আমি তখন ভাবি,
সবকিছু কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?

হয়তো না, হয়তো এখনো কোথাও
একটি শিশুর হাসি, একটি মানুষের মমতা,
এই ক্লান্ত পৃথিবীকে
নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।


১০.     খোঁজ


কত পথ, কত প্রান্তর, কত বন্দর কত লোকালয় ঘুরেছি,
ধুলোমাখা রেলপথ, নদীর ঘাট, অচেনা শহরের ভিড়ে
কত অন্ধকারে চোখ রেখে এতকাল যাকে খুঁজে ফিরেছি,
তারই ছায়া যেন ভেসে উঠেছে বারবার অদৃশ্য নীড়ে।

বহু সন্ধ্যা কেটেছে একাকী, বহু ভোর জেগেছে অপেক্ষায়,
নিস্তব্ধ রাতের জানালায় কেবল বাতাস এসে বলেছে কথা।

অপরিচিত মুখের ভিড়ে, হারিয়ে যাওয়া পদচিহ্নের রেখায়
আমি শুধু তারই স্পর্শ খুঁজেছি, তারই মায়ার ব্যথা।

কখনো দূরের কোনো ট্রেনের বাঁশি শুনে মনে হয়েছে -
সে বুঝি এইমাত্র নামল কোনো অচেনা প্ল্যাটফর্মে,
কখনো সন্ধ্যার ম্লান আলোয় মনে হয়েছে,
সে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে আমার পথের ধারে।

কিন্তু এতদিনে বুঝি নিয়তি হেসে দিয়েছে গোপন ইশারা,
যাকে খুঁজে ফিরেছি শহর থেকে শহরে, প্রান্তর থেকে প্রান্তরে,
তারই কী-না দেখা পেয়ে গেলাম হঠাৎ একদিন
সিরাজগঞ্জের জামতৈল স্টেশনের কাছে
এক নির্জন, শ্রান্ত, শান্ত কুটীরে।

সেখানে বাতাসে ছিল ধানের গন্ধ,
দূরে শোনা যাচ্ছিল সন্ধ্যার আজানের সুর,
আর সে বসে ছিল জানালার পাশে,
মুখে নীরবতার আলো, চোখে বহুদিনের অপেক্ষার নীল নূর।

চোখে যেন বহুদিনের না বলা গল্প,
মুখে নিঃশব্দ এক মায়াময় ক্লান্তি।
তখন মনে হলো -
এতদিনের পথচলা, এত ক্লান্তি, এত দীর্ঘ প্রতীক্ষা
হয়তো বৃথা ছিল না।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তার প্রিয় মুখটি
খুঁজে পায়ই 
কোনো না কোনো নিভৃত কুটিরে,
কোনো এক অচেনা স্টেশনের পাশে,
যেখানে অপেক্ষা নিঃশব্দে বসে থাকে।


১১.     অসম্পূর্ণ গল্প


একদিন চলে যাব গল্পটা অসম্পূর্ণ রেখে,
একদিন আর গল্প বলা হবে না,
একদিন দূর ছায়াপথে তারাদের গল্প শোনাবো,
এই পৃথিবীর আকাশ তখন নীরব হয়ে রবে না।

একদিন সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে যাবে আমার নাম,
কোনো পুরোনো গাছের পাতায় কাঁপবে স্মৃতির অবসান,
তুমি হয়তো জানালার ধারে বসে ভাববে -
কেন হঠাৎ থেমে গেল সেই চেনা কণ্ঠের গান।

একদিন আমার পথ হারিয়ে যাবে কুয়াশার ভিতর,
চেনা পথগুলোও চিনবে না আমার পায়ের ধ্বনি,
শুধু কোনো নিঃসঙ্গ রাত্রির গহীন প্রহরে
মনে হবে আমি যেন এখনও আছি তোমার সঙ্গেই কোথাও গোপনে জ্বলি।

একদিন পুরোনো খাতার ভাঁজে খুঁজে পাবে কিছু শব্দ,
যেখানে লেখা ছিল অর্ধেক স্বপ্ন, অর্ধেক ভালোবাসা,
পড়তে পড়তে হঠাৎ বুঝবে -
সেই গল্পের শেষ পাতা আর লেখা হলো না ভাষা।

একদিন নক্ষত্রের কাছে বসে বলব পৃথিবীর কথা,
এই মাটির সুখ দুঃখ, হাসি আর অশ্রুর ইতিহাস,
আর দূর থেকে দেখব -
তুমি কি এখনও সেই অসম্পূর্ণ গল্পের অপেক্ষায় উদাস।

কারণ মানুষ একদিন চলে যায় নীরবে 
কিছু কথা না বলেই, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে,
তবু তার মায়া রয়ে যায় বাতাসের মতো -
নিভে যাওয়া প্রদীপের আলো হয়ে হৃদয়ের গভীর এক কোণে থেকে। 


১২.      কারও কারও থাকা


গল্পে কেউ থাকে, কেউ থাকে কবিতায়,
কেউ থাকে জনম জনম, কেউ ক্ষণিকা হয়।
কেউ থাকে মেঘের আড়ালে নীরব আবেশে,
কেউ নদী হয়ে অকূলে ভেসে যায় অনায়াসে।

কেউ থাকে চোখের কোণে নিভৃত আলোর মতো,
কেউ থাকে নীরব রাতে স্বপ্ন দেখায় সে অবিরত 
কেউ আসে বসন্ত হয়ে গোপন বাগানে,
কেউ ঝরে যায় শরতের হলুদ পাতার টানে।

কেউ থাকে স্মৃতির ভাঁজে শুকনো ফুলের গন্ধে,
কেউ হারায় সময়ের স্রোতে অজানা কোন দ্বন্দ্বে
কেউ থাকে নীরবতায় অচেনা প্রতীক্ষায়,
কেউ হাওয়ার মতো এসে হাওয়াতেই মিলায়।

কেউ থাকে দূর নক্ষত্র হয়ে ছোঁয়া যায় না কখনো,
তবু সে নিভৃতে অন্ধকারে জ্বেলে রাখে আলো।
কেউ থাকে স্বপ্ন হয়ে গভীর রাত জুড়ে,
ভোর হলেই মিলিয়ে যায় শিশিরভেজা ঘাসের ঘোরে।

কেউ আসে ক্ষণিকের মতো, তবু থেকে যায় মনে,
পুরনো চিঠির গন্ধ হয়ে রয় দীর্ঘ জীবনের কোণে-
কেউ থাকে অশ্রুজলে অদৃশ্য নীল ছায়ায়,
কেউ আবার ভালোবেসে নীরবেই হারায়।

কেউ থাকে স্মৃতির মতো ধরা দেয় না স্বরূপ 
হৃদয়ের গোপন কোণে রেখে যায় ব্যথার ধূপ,
গল্পে কেউ থাকে, কেউ থাকে কবিতায় -
আর কেউ রয়ে যায় শুধু অপূর্ণ ভালোবাসায়।


১৩.        বিষনাগমণির রাত


কালরাতে ঝাউঝোপের অন্ধকারের ভেতর থেকে
উন্মুখ বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছিল তোমার দেহ -
তোমার বাজুবন্ধ তখন ঝুমঝুম করে বাজছিল
যেন কোনো প্রাচীন দেবালয়ের গোপন ঘণ্টাধ্বনি।

চাঁদের ধবধবে আলো নেমে এসেছিল কটিতে,
রূপার বিছা হয়ে জড়িয়ে ছিল তোমার সরু নিতম্বে -
তোমার দেহরেখা তখন জ্যোৎস্নায় ভেজা
অপরূপ এক লাবণ্যময় তরঙ্গ।

কালো কেশের খোঁপায় হঠাৎ ফুটে উঠল
কুন্দফুলের শুভ্র নেশা,
কণ্ঠে পদ্মকুসুম খচিত মণিহার
তোমার নিঃশ্বাসের ছন্দে দুলছিল ধীরে ধীরে।

বসন্তবাতাসে উড়ে যাচ্ছিল তোমার চুল -
যেন স্বর্গের অপ্সরারা
রাত্রির আকাশে খুলে দিয়েছে তাদের গোপন কেশরাশি।

চোখের কোণে এসে পড়ছিল
শত নক্ষত্রের দীপ্ত অস্থির আলো,
তুমি যেন তখন
মানুষ নও, কোনো পৌরাণিক উর্বশী।

জ্যোৎস্নার দ্যুতিতে তোমার শরীর কাঁপছিল মৃদু,
সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়ছিল
রাত্রির নিস্তব্ধতা জুড়ে।

নাভির ঠিক উপরে জ্বলছিল
এক অলৌকিক বিষনাগমণি -
গাঢ় নীল আগুনে দীপ্ত সেই মণি
ডেকে নিচ্ছিল আমার সমস্ত প্রাণ।

তুমি তখন ফিসফিস করে বললে, 
এসো… স্পর্শ করো…
তোমার কণ্ঠে ছিল
অরণ্যের গভীর কোনো মোহিনী সুর।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যাই,
আঙুল ছুঁই সেই নীল মণিখণ্ডে।
মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে দহন -
অস্থিচর্ম ভেদ করে
নীল আগুন ছড়িয়ে পড়ে রক্তের ভিতরে,
আমার শরীর হয়ে ওঠে এক জ্বলন্ত নক্ষত্র।

চারদিক লেলিহান শিখায় কাঁপতে থাকে,
রাত্রির আকাশ নীল বিষে দগ্ধ হয়ে ওঠে।
আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠি -
এ কী দহন!
আমাকে তুমি এ কী করলে?

তুমি তখনও দাঁড়িয়ে আছো -
নিরুত্তর, স্তব্ধ, অলৌকিক হেম,
চোখে তোমার গাঢ় কোনো অনন্ত রাত।

তোমার ঠোঁটে ছিল অদ্ভুত এক অর্ধেক হাসি
যেন তুমি জানো
এই দহনই প্রেমের শেষ পরিণতি।

আর আমি ধীরে ধীরে
জ্যোৎস্নার ভিতর ঢলে পড়তে থাকি -
এক অদ্ভুত নীল মৃত্যুর কোলে,
যেন বিষনাগমণির আগুনে
পুড়ে নিভে যাচ্ছে
এক দগ্ধ নক্ষত্রের শেষ আলো।


১৪.     জেসমীন


মেয়েটির নাম জেসমীন, সাদা ফুলের মতো 
নির্মল কোমল প্রাণের এক মেয়ে,
প্রাণোচ্ছল তার হৃদয়মন -
সুদূর বোস্টন শহর থেকে সাহিত্য–সংস্কৃতির 
সুবাস ছড়িয়ে দেয় অদৃশ্য বাতাসের মতো
পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

জেসমীনের জন্ম বাংলাদেশের কালীগঙ্গার পারে,
সবুজ গ্রাম আর নদীর নরম স্রোতের পাশে,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের আলোয়
সে গড়ে তোলে স্বপ্নের ভিত -
তারপর একদিন স্বপ্নের ডানায় ভর করে
পাড়ি জমায় সুদূর মার্কিন মুলুকে।

দূর সমুদ্রের ওপারেও
তার কণ্ঠে ভেসে থাকে দেশের সুর,
শিউলি-ভেজা ভোরের মতো নির্মল
তার অন্তরের নিলয়।

কখনো সে লেখে কবিতার পঙ্‌ক্তি -
শরতের মেঘের মতো শুভ্র, শান্ত ও স্বচ্ছ;
কখনো তার কথার ফাঁকে
নীরবে ঝরে পড়ে বাংলার মাটির অমল গন্ধ।

অচেনা শহরের ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে
সে ভুলে না গ্রামের আকাশ,
ভুলে না নদীর ধারে কাশফুল দোলার দিন,
কালীগঙ্গার জলে এখনও ভাসে
তার শৈশবের স্বপ্নের ছায়া,
সেই স্বপ্ন আজও তাকে ডাকে
নির্মল কোনো বিকেলের মতো।

জেসমীন যেন দুই তীরের মাঝখানে
জেগে থাকা এক অলৌকিক সেতু -
এক পাশে বাংলাদেশ,
অন্য পাশে দূর আমেরিকার বোস্টন নগরী।

তবু হৃদয়ের গভীরে
সে রয়ে গেছে মাটির কাছাকাছি,
সাদা ফুলের মতো কোমল
আলো ছড়ানো এক মানবী।

ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের বন্ধনটিও বড়ো আশ্চর্যের,
কবে থেকে, কীভাবে জন্ম নিয়েছে
তা ঠিক জানা নেই।

কেবল দিনশেষে জানি, সে আমার বন্ধু,
শুধু বন্ধুই একজন,
যে নীরবে আমার জন্য মঙ্গল প্রার্থনা করে প্রতিদিন,
যেখানে দূরত্বও হার মানে
একটুখানি আন্তরিক শুভেচ্ছার কাছে।

জেসমীন, তুমি পৃথিবীর যেখানেই যে 
ছায়ালোকে থাকো, তোমার এই নির্মল, মঙ্গলময় 
হৃদয়ই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর কবিতা।


১৫.    বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে


বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে,
সবসময় কেউ একজন মাথার উপর ছাতা 
ধরবে না,
জীবনের পথে অনেক দূর
নিজেকেই হাঁটতে হবে নীরবতা জড়িয়ে।

যে হাত একদিন ছায়া হয়ে ছিল মাথার উপর,
সে হাতও কোনো এক বিকেলে
অচেনা ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যায়।

আকাশ তখনও ঝরে,
কিন্তু পাশে থাকে না কারও উষ্ণতা,
মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে তখন বুঝি -
সব পথ একসাথে হাঁটার নয়,
কিছু পথ শুধু নিজেরই জন্য
একাকী লিখে রাখা নিয়তি।

তাই বৃষ্টি নামলে আজ আর ভয় পাই না,
ভেজা শরীরেই শিখে নিয়েছি দাঁড়িয়ে থাকতে -
কারণ জীবন শেখায়
ছাতা হারালে আকাশকে দোষ দিতে নেই,
বরং ভিজে ভিজেই
নিজের ভেতর জন্ম দিতে হয় নতুন সাহস।

বৃষ্টিতে একাই ভিজতে হবে -
এই সত্যটা মেনে নিলেই দেখা যায়,
মেঘের আড়াল পেরিয়ে
একদিন রোদও ঠিক নিজেরই হয়ে ওঠে।


১৬.      প্রেম মানে


প্রেম মানে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
লক্ষ বার মরে যাওয়া যায়,
তোমার দৃষ্টির গভীরে ডুবে গিয়ে
আবার নতুন করে বেঁচে ওঠা যায়।

প্রেম মানে তুমি ঘুমাও
আমি একটা আস্ত রাত জেগে থেকে তোমাকে দেখি,
চাঁদের আলোয় তোমার নিঃশ্বাস গুনি
আর নীরবে স্বপ্নের পাহারায় থাকি।

প্রেম মানে তোমার কপালের পাশে
চুলের এলোমেলো ছায়া সরিয়ে দেওয়া,
তোমার নিদ্রিত মুখের দিকে তাকিয়ে
হৃদয়ের সব ক্লান্তি ভুলে যাওয়া।

প্রেম মানে কোনো শব্দ নয়,
তবু হাজার গল্প বলা হয় নীরবে;
তোমার হাতের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত শীত গলে যায় ধীরে ধীরে।

প্রেম মানে পৃথিবী থেমে যাক তবু
তোমার পাশেই সময় কাটুক,
তোমার একটুখানি হাসির জন্য
জীবনটাও নিঃসংকোচে হারিয়ে যাক।

প্রেম মানে
তুমি আছো বলেই আকাশ এত নীল,
তুমি আছো বলেই রাত এত মায়াময়,
আর তোমার চোখের ভেতরেই
আমার সমস্ত জীবন শান্ত হয়ে রয়। 


১৭.         শিমুলের মধুবেলা


এবারও শিমুলের রক্তগন্ধ নেওয়া হলো না,
লাল পাপড়ির ভেতর জমে থাকা উষ্ণ অমৃত ঠোঁটে ছুঁয়ে দেখার আগে
সন্ধ্যার হাওয়ায় ভেসে গেল অচেনা কোনো নেশা হয়ে।

এবারও রোদ্রগন্ধী দেহখানি
চৈত্রের রৌদ্রে ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকল,
তবু স্পর্শের ঢেউ এলো না,
কাঁপেনি হৃদয়ের গোপন অরণ্য,
জাগেনি শরীরের অগোচর বসন্ত।

মধুমাস এলো, কিন্তু মধুক্ষণগুলো রইল
অপরিণত ফুলের মতো নীরব,
অপেক্ষায় টলমল করা
অব্যক্ত এক উন্মাদনার ভিতর।

তুমি তখন এই শহরেই
হেমবতীর শাড়ি পরে হাঁটছিলে বসন্তের পথ ধরে,
তোমার কাঁধে ঝরে পড়ছিল পলাশের আগুনগন্ধ,
চুলের ফাঁকে ফাঁকে বসন্তের মাতাল রোদ।

চৈত্রের নরম বাতাসে
তোমার মখমল ওড়না উড়ে উঠছিল বারবার, মনে হচ্ছিল, আকাশের নীলের ভিতর একটি উন্মুক্ত পাখি ডানা মেলেছে।

শিমুলের মধুকুসুম তুলে
তুমি ঠোঁটে ছুঁয়েছিলে রক্তিম রস,
ধীরে ধীরে তোমার চোখে উঠেছিল
এক আদিম দীপ্তি -
মাটির গভীর উর্বরতার মতো
স্নিগ্ধ অথচ উন্মত্ত।

তুমি তখন হয়ে উঠেছিলে
বসন্তের উষ্ণ উর্বরতা,
এক পূর্ণ, দীপ্ত, দহনময় বীর্যাবতী।

জেনো, আবারও শিমুল ফুটবে এখানেই,
লাল অগ্নিশিখা হয়ে উঠবে বনভূমির বুকে।

আমরা তখন মধুবনের ছায়ায়
কুসুমের পাত্র থেকে মধু তুলে নেব ধীরে ধীরে,
আর শরীরভরা বসন্তের গন্ধে
মাতাল হয়ে উড়ব দু’জন
দিগঙ্গনার মতো উন্মুখ, অবাধ, উন্মত্ত
পাগল হাওয়ার উষ্ণ প্লাবনে
ভেসে যাব দূর, আরও দূর
অপরূপ কোনো নীল অজানায়।


১৮.      অদৃশ্য  মানচিত্র


তুমি আমায় খুঁজতে চেয়েছো
তবে খুঁজো, আমায় পড়ো -
আমার চোখের গভীরে জমে আছে
নক্ষত্রহীন বহু অনুচ্চারিত বাক্য,
আমার নীরবতাই তোমার জন্য লেখা
অদৃশ্য কোনো গানের মতো কবিতা।

তুমি জীবন জানতে চেয়েছো
আমায় ছুঁয়ে দেখো -
আমার শ্বাসের ভেতর বয়ে যায়
ঋতুর পালাবদলের দীর্ঘ পথ,
আমার চলার ধুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে
অজানা দিনের মানচিত্র।

তুমি ক্রন্দন শুনতে চেয়েছো
তবে আমায় শোনো -
আমার হৃদয়ের আঙিনায় জেগে থাকে
নিদ্রাহীন বহু তারার কম্পন,
আমার নাম উচ্চারণ করলেই
তোমার ভোরে বাজে অচেনা বাঁশির ধ্বনি।

তুমি সুখের খোঁজ করেছো
আমায় কাছে নাও -
আমার হাসির ভেতর গলে থাকে
সোনালি রোদে ধোয়া অলস দুপুর,
আমার হাত ধরলেই তোমার ক্লান্তি ঝরে পড়ে
পাতাঝরার মতো নীরবে।

তুমি পথের দিশা চেয়েছো
আমার পাশে বসো -
আমার দিন আর রাতের সীমানায় লুকিয়ে আছে
অনেক অচেনা পথের স্মৃতি,
তুমি এলেই সেই পথগুলো হঠাৎ
আলোর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।

আর যদি কখনো আমায় ছেড়ে যেতে চাও
চলে যেও, পিছনে না তাকিয়ে -
আমি মেঘের ওপারে খুলে দেবো
আরেকটি নীল দরজা,
যেখানে হারিয়ে যাওয়া মানেই
নতুন করে ফিরে পাওয়া তোমার আর 
আমার প্রেম।


১৯.      মা'কে মনে পড়ে 


ভাত খেয়ে হাত ধুয়ে
মায়ের আঁচলে হাত-মুখ মুছি -
সেই আঁচলেই লেগে থাকে
ভাতের গন্ধ, বিকেলের রোদ,
আর আমার হাতের ছোঁয়া।

ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরে আসি,
মা তখন সেই একই আঁচলে
গোপনে মুছে নেয় চোখের জল।

কী আশ্চর্য মায়া -
মায়ের আঁচলের এক পাশে আমার শৈশব,
আরেক পাশে মায়ের কান্না।


২০.     তোমার নামে সব 


তোমার নামে সব লিখে দিতে চাই -
আমার নদী, সাগর, পাহাড়, অরণ্য, 
তোমাকে দিয়ে দিতে চাই
আমার গ্লানি, দুঃখ, দীনতা।

আমার হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা দান করে
নিজেকে ফতুর করতে চাই,
তোমার দু’চোখের গভীর নীলিমায়
ডুবিয়ে দিতে চাই আমার সমস্ত ক্লান্তি।

তোমার নামে উৎসর্গ করতে চাই
আমার জাগ্রত ভোরের প্রথম আলো,
আমার রাত্রির গোপন দীর্ঘশ্বাস,
আমার বুকের ভেতর জেগে থাকা
অসংখ্য অব্যক্ত উচ্চারণ।

তোমার স্পর্শে ছড়িয়ে দিতে চাই
আমার শিরায় শিরায় জেগে থাকা বসন্ত,
আমার রক্তে বয়ে যাওয়া
অরণ্যের গোপন সবুজ সুর,
আমার মাটির গন্ধমাখা সমস্ত স্বপ্ন।

আর একদিন -
যখন আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো
সব দান শেষ করে,
তখন শুধু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
বলব - দেখো,
আমি তো কিছুই রাখিনি নিজের জন্য।

আমার আকাশ, বাতাস, নদী, হৃদয়,
সবই তোমার নামে লিখে দিয়েছি,
তুমি শুধু আমাকে রেখো
তোমার ভালোবাসার এক কোণে।

সন্ধ্যার আকাশে হারিয়ে যাওয়া পাখির মতো
আমার পথভোলা দিনগুলো
তোমারই নীড়ে ফিরে আসুক -
আর আমি সারা জীবন
তোমারই নামেই বেঁচে থাকতে চাই।


২১.      নিবিড় রাতের অশ্রু 


পৃথিবীর কোন্ কোণে কে আমাকে মনে রেখেছে,
তা কী আমি অনুভব করতে পারি? 
কে কোথায় এক ফোঁটা অশ্রু ফেলেছে রাত্রির নিবিড়ে,
কার নিঃশ্বাসে জেগে আছে আমার নামের গোপন আলো?

হয়তো কোনো দূর জানালার পাশে
নিঃশব্দে বসে আছে কেউ -
তার আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে আছে স্মৃতিরা,
আমার কথা ভেবে হঠাৎ থেমে যায় তার রাতের গান।

হয়তো কোনো নির্জন নদীর ধারে
আমার জন্য রেখে গেছে কেউ অপ্রকাশিত কথা,
চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠে সেই সব অনুচ্চারিত বাক্য
আর বাতাসে ভেসে আসে এক অচেনা মমতার গন্ধ।

পৃথিবী এত বড় -
তবু কোথাও না কোথাও
কোনো এক হৃদয়ের গভীরে
আমার জন্য একটু কোমল জায়গা রয়ে গেছে নিশ্চয়ই।

হয়তো কেউ ঘুমের আগে
আমার নামটুকু মনে করে একবার,
হয়তো অকারণে ভিজে ওঠে তার চোখ
যেন আমারই কোনো অদৃশ্য স্পর্শে।

আমি তা দেখি না, জানি না -
তবু মাঝেমাঝে হঠাৎ মনে হয়,
এই নিস্তব্ধ রাতের ভেতর
কারও নিঃশব্দ ভালোবাসা আমাকে ঘিরে আছে।


২২.      থেকে যাওয়ার ইচ্ছে


যে চলে যাবে তাকে হাত টেনে ধরে রাখলেও 
সে চলে যাবে,
যে সময় কাটাতে চায় তাকে একান্ত কাছের করে 
দিয়া বাড়ির মোড়ে টং দোকানের বেঞ্চে বসে 
চা খেতেও ভালো লাগবে,
আর ভালো না লাগলে রেডিসনের কিটক্যাট ক্যাফেতে বসেও কফি খেতে তার ইচ্ছে হবে না।

যে মনটা সত্যি পাশে থাকতে চায়
সে সন্ধ্যার ম্লান আলোয় ফুটপাথ ধরে হেঁটেও 
সুখ খুঁজে পায়,
আর যে মন চলে যেতে চায়
সে হাজার আলো ঝলমলে শহরেও অকারণ 
অন্ধকার খুঁজে নেয়।

যে মানুষটা আপনার গল্প শুনতে চায়
সে মাঝরাতে ফোনের ওপাশে নিঃশব্দেও বসে থাকে,
আর যে শুনতে চায় না
সে দিনের আলোতেও আপনার কথা এড়িয়ে যায়।

যে সত্যি ভালোবাসে
সে পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের ধুলোমাখা বিকেলেও 
স্বপ্ন দেখে,
আর যে ভালোবাসে না
সে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েও কোনো ঢেউ 
অনুভব করে না।

কারণ থাকা–না থাকার হিসাবটা
জায়গা, সময় কিংবা কফির কাপে লেখা থাকে না,
লেখা থাকে শুধু মানুষের মনে,
থেকে যাওয়ার এক নীরব ইচ্ছেতে।

তাই কাউকে ধরে রাখার জন্য
পৃথিবীর সব সুন্দর জায়গা সাজিয়ে রাখার 
দরকার নেই,
যে থাকতে চায়
সে আপনার একাকীত্বের পাশেও বসে থাকবে
এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের মতো উষ্ণ হয়ে।


২৩.      নিরঞ্জনার পথে



তোমাকে নিয়ে একদিন এই শহরের বাইরে 
চলে যাব, ধুলো, শব্দ, ক্লান্তি পেরিয়ে
কোনো নির্জন বিকেলের দিকে।

তুমি হাত ধরে থাকবে,
তোমার আঙুলে তখন থাকবে
আমার সমস্ত পথের নিশ্চয়তা।

নিরঞ্জনা নদীর মতো কোনো একটি নদী 
খুঁজে বের করব,
যার জলে আকাশের নীল ঘুমিয়ে থাকে,
যার ঢেউয়ের ভেতর শোনা যায়
অতীতের অচেনা কোনো বাঁশির সুর।

সেখানেও থাকবে উলুখাগড়ার বন 
শরতের হালকা বাতাসে দুলবে সাদা 
তুলোর মতো ফুল,
তার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
তোমার শাড়ির আঁচলে লেগে থাকবে
ঘাসের শিশির আর বুনো মাটির গন্ধ।

আমরা হারিয়ে যাব গভীর অরণ্যে -
যেখানে মাটির গায়ে ঝরে পড়া পাতার শব্দ
মনে হবে বহুদিনের কোনো চিঠি খুলে পড়ছি,
যেখানে গাছেরা মাথা ঝুঁকিয়ে
আমাদের প্রেমের গল্প শুনবে।

দূরে কোনো নাম না-জানা পাখি ডাকবে,
সূর্য ডুবে যাবে লাল রঙের গভীরতায়,
তুমি চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে
যেন চোখের ভেতর দিয়ে
একটি দীর্ঘ নদী বয়ে যাচ্ছে।

আমরা আজ শুধু  মানুষ নই -
আমরা আজ নদীর ধারে জন্ম নেওয়া
দুটি বাতাস, দুটি হারিয়ে যাওয়া পথের মায়া।

যদি কোনোদিন কেউ আমাদের খুঁজতে আসে,
তারা হয়তো শুধু দেখবে
উলুখাগড়ার বনে দুলছে সাদা আলো,
নদীর জলে ভাসছে সন্ধ্যার রঙ,
আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে
দুটি মানুষের অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।


২৪.       অনন্ত রাত্রির ভিতর 



কোন এক সূর্য অস্তমিত মৌন সন্ধ্যায়
সূর্য তার লাল আভা ছড়িয়ে দিয়ে ডুবে যাবে,
পাখিরা কুলোয় ফিরে যাবে,
সন্ধ্যামালতী সুবাসিত হয়ে ফুটে উঠবে,
সারা আকাশ তারায় তারায় জ্বলে উঠবে -
আমি সব সৌন্দর্যের আবেশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।

যদি ভোরবেলায় আমার আর ঘুম না ভাঙ্গে!
আমি সেই রুপালি সকালের ঝকঝকে রোদ দেখতে পাবো না।

তখন হয়তো জানালার পাশে এসে দোল খাবে 
দখিনা নির্মল বাতাস,
দূরের কোনো গাছে বসে শালিক ডাকবে ধীরে,
কিন্তু সেই ডাক আমার কানে আর পৌঁছাবে না।

শিশিরভেজা ঘাসের উপর সূর্যের প্রথম আলো পড়বে,
তবু সেই ঝিলমিল সকাল আমার চোখে 
ধরা দেবে না।

কেউ হয়তো এক কাপ চা বানাবে অভ্যাসবশে,
বাষ্প উঠবে ধোঁয়ার মতো -
আর পৃথিবী তার নিজস্ব ছন্দে চলতে থাকবে।

নদী তার জলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সকালের রোদ,
হাওয়ায় ভেসে আসবে কিশোর বাঁশির সুর,
শিউলি ফুল ঝরে পড়বে নির্ঝর শব্দে -
কিন্তু আমি থাকব অন্য এক গভীর নীরবতায়।

হয়তো তখন আমার স্বপ্নগুলো
তারাদের ভিড়ে ছোট ছোট প্রদীপ হয়ে জ্বলবে,
আর এই পৃথিবীর সব সৌন্দর্য
নিঃশব্দে এসে বসবে আমার ঘুমের পাশে, 
যেন আমি ঘুমিয়ে আছি -
এই মহাবিশ্বের এক মায়াময়, অনন্ত রাত্রির ভেতর। 


২৫.       অজানা তারিখ



আমার মৃত্যুর তারিখ
ঐ তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের ভেতরেই কোথাও 
লুকিয়ে আছে -
কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায়
চুপচাপ দাগ কেটে রাখা এক অদৃশ্য দিন।

কিন্তু সে তারিখটা
আমার জানা হবে না কোনোদিন,
আমি শুধু প্রতিদিনের সূর্যোদয় দেখে ভাবব,
আজও কি সে দিনটি নয়?

হয়তো কোনো ভোরবেলা
শিউলি ঝরা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ থেমে যাবে আমার সমস্ত পথচলা,
পাখিরা তখনও গান গাইবে,
আকাশে রোদ উঠবে স্বাভাবিকের মতোই।

হয়তো কোনো গোধূলিতে
সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে ডুবে যাবে,
আর আমি বুঝতেই পারব না -
এটাই ছিল আমার শেষ দেখা সন্ধ্যা।

পৃথিবী তবু তার নিয়মে ঘুরবে -
কোথাও শিশুরা হাসবে,
কোথাও নদী নীরবে বয়ে যাবে,
কোথাও কোনো অচেনা মানুষ
আমার নামটাও জানবে না।

শুধু আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে
একটি তারিখ নিঃশব্দে জ্বলে উঠবে -
যেদিন আমি পৃথিবী থেকে সরে গিয়ে
মিশে যাব বাতাসে, মেঘে, নক্ষত্রের আলোয়।

আর বাকি তিনশো চৌষট্টি দিন
আমার জন্য রয়ে যাবে
একটি মায়াময় স্মৃতির মতো -
যেন আমি হেঁটে গেছি এখানে,
একটু ভালোবাসা রেখে গেছি পৃথিবীর বুকে।


২৬.       কুসুমপুরের মাটি


নওদাফুল কোচা,
ইছামতীর উপনদী বয়ে যেত যে গাঁয়ের বুক চিরে,
যেখানে দুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকার গান
আর সন্ধ্যায় খোলা ভিটায় শুয়ে
তারাভরা আকাশ নামত চোখের তারায়।

আঁড়াবনে পেঁচার ডাক,
মসজিদে কামাল মুন্সীর এশার আযান,
মাঝি বাড়ি, ঘোষ বাড়ি,
ছোনগাছার হাটে পুজোর মেলা -
সব মিলিয়ে এক গ্রাম,
ধূপ-ধুনোর মতো মায়াময়।

জারুল বনের পাশে খেলার মাঠ,
শিমুল-কৃষ্ণচূড়ার আগুনরঙা বসন্ত,
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদ,
পুকুরের জলে ভেসে থাকা আরেকটা চাঁদ
চেয়ে দেখত আমার গ্রামকে।

একদিন হলুদ এক প্রজাপতি
এসে বসেছিল আমার হাতে -
সেদিনই নীরবে
বাবা হারিয়ে গিয়েছিলেন পৃথিবীর চেতনা থেকে।

আজ শহরের ভিড়েও
ভেসে আসে সেই মাটির গন্ধ 
মহুয়ার মতো পাগল করা,
কুসুম কুসুম সুবাসে ভরা।

তাই আমার গ্রামকে
আজ ডাকতে ইচ্ছে করে 
কুসুমপুর।

হায়, কবে ফিরব আবার
সেই মাটির কাছে -
যেখানে নিঃশব্দে
ঘুমিয়ে আছেন আমার মা।


২৭.      চোখ


তুমি আমার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তির রেখাগুলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখেই ভোরের শিশিরভেজা মাধুর্য যে জেগে আছে, তা দেখলে না।

তুমি আমার দৃষ্টির নিস্তব্ধতা পড়লে,
কিন্তু তার ভেতরে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রের মতো ক্ষুদ্র আলোদের কথা শুনলে না।

তুমি আমার চোখের নিচে জমে থাকা সন্ধ্যার ছায়া দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের ভেতরে আঁকা নীল আকাশের অসংখ্য তারা দেখলে না।

তুমি আমার চাহনির স্থিরতা বুঝলে,
কিন্তু তার গভীরে ঢেউ তোলা আলোর ভাষা বুঝলে না।

তুমি আমার চোখে জমে থাকা ক্লান্ত দিনের ধুলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখেই গোপনে বোনা রঙিন স্বপ্নের অরণ্য দেখলে না।

তুমি আমার চাহনির অবসাদ পড়লে,
কিন্তু তার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আশার স্বচ্ছ নদীটা দেখলে না।

তুমি আমার চোখের কোণে জমে থাকা সন্ধ্যাতারার ম্লান আলো দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের গভীরে জেগে থাকা ভোরের প্রথম সূর্যরেখা দেখলে না।

তুমি আমার দৃষ্টির নীরবতা চিনলে,
কিন্তু তার ভেতরে বাজতে থাকা অদৃশ্য স্বপ্নের সুর শুনলে না।

তুমি আমার চোখের পাতায় নেমে আসা ক্লান্ত রাতের ছায়া দেখলে,
কিন্তু সেই চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা আলোকময় প্রতীক্ষা দেখলে না।

তুমি আমার দৃষ্টির নিস্তব্ধতা বুঝলে,
কিন্তু সেই দৃষ্টির অন্তরালে জেগে থাকা আশার দীপশিখাটা দেখলে না।


২৮.      পাগলামির প্রেম


চৈত্রের তপ্ত দুপুরে প্রেমিকাকে সাথে নিয়ে পিচঢালা পথের উপর হারমণিকা বাজিয়ে
চিৎকার করে সবাইকে ডেকে পরিচয় করে দেবো -
এই মেয়ে আমার প্রেয়সী।

তারপর রোদে গরম হয়ে ওঠা রাস্তাটাকে 
মঞ্চ বানিয়ে দু’হাত তুলে বলবো -
শোনো পৃথিবী,
এই মেয়েটার হাসির কাছে সব শহরের আলো  হার মানে।

হাটের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ দাঁড়িয়ে তার 
নাম ধরে ডাকবো বারবার,
যেন নামটা আকাশে উড়ে যায় ঘুড়ির মতো।

বিকেলের শেষে নদীর পাড়ে গিয়ে
জল ছুঁড়ে লিখে দেবো তার নাম,
আর বলবো - দেখো নদীও আজ আমাদের গল্প বয়ে নিয়ে যাবে।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে তার হাত ধরে হাঁটবো দীর্ঘ রাস্তা,
আর পথচারীরা অবাক হয়ে দেখবে -
দুইটা মানুষ কীভাবে এতখানি পাগল 
হতে পারে।

তারপর কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায়
শহরের সব আলো নিভে গেলে আমি আবার হারমণিকা বাজাবো ধীরে,
আর ফিসফিস করে বলবো -
পৃথিবীর যত পাগলামি আছে সব আমি 
করতে রাজি -
যদি তুমি শুধু বলো - আমি আছি, 
তোমার পাশে চিরদিন।


২৯.      অতিরিক্ত সময়


এই ব্রহ্মাণ্ডের বিশাল স্টেডিয়ামে
আমি নেমেছিলাম একদিন খেলোয়াড় হয়ে,
সময়ের রেফারি বাঁশি বাজিয়েছিল জন্মের মুহূর্তে,
আর ঘাসভেজা এই পৃথিবীর মাঠে
শুরু হয়েছিল জীবনের খেলা।

দৌড়েছি বহুবার, কখনো জয়ের উল্লাসে,
কখনো হারের নিঃশব্দ ক্লান্তিতে,
বন্ধুত্বের পাস পেয়েছি,
ভালোবাসার গোলও করেছি বহুবার,
আবার কত সুযোগ
নিজের পায়ের কাছেই হারিয়েছি।

নব্বই মিনিটের খেলা কখন যে শেষ হয়ে গেল
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোই শুধু
চুপচাপ জানে তার হিসাব।

এখন আমি খেলছি অতিরিক্ত সময়,
এই সময়ের আকাশে একটু মেঘ থাকে
হাওয়া একটু ধীর, আর দর্শকসারির শব্দও
অদ্ভুতভাবে মায়াময়।

এখন আর গোল করার তাড়াহুড়ো নেই,
শুধু মাঠের ঘাস ছুঁয়ে দেখি -
কতদিন ধরে এই পৃথিবী
আমার পায়ের ছাপ বহন করে আছে।

কখনো মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে
রেফারির শেষ বাঁশি বাজবে,
তবু ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ধীরে ধীরে বলটা 
এগিয়ে নিয়ে যাই।

সূর্যাস্তের আলো পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে,
কারণ জানি - খেলা শেষ হলেও
এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের স্টেডিয়ামে আরও কত খেলোয়াড় নামবে,
আর আমার খেলার স্মৃতি বাতাসে ভেসে থাকবে মহাকালের সন্ধ্যার আলোয়।


৩০.       হাসিমুখে বিদায়


আমার জন্য একদিন একটি দরজা খুলবে,
যে দরজার ওপারে আছে নিঃশব্দের গভীর আলো।

আমি ভয় পাই না সেই দরজাকে,
বরং মনে হয়, দীর্ঘ পথ হাঁটার পরে
কেউ যেন ভারী কণ্ঠে বলছে -
এবার এসো, বিশ্রাম নাও।

আমি তো বেঁচে ছিলাম পূর্ণ হয়ে
জীবনের রোদে, বৃষ্টিতে, জোছনায়।

একজন অসাধারণ স্ত্রীর হাত ধরে
দীর্ঘ পথ হেঁটেছি,
তার চোখের ভেতর আমি দেখেছি
ঘর নামের এক অনন্ত আশ্রয়।

আমার জীবনে
কোনো অপূর্ণতার ভার জমে নেই,
কোনো অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘশ্বাসও না।

যা পেয়েছি তা যেন আকাশভরা নক্ষত্র -
হাতে ধরতে পারিনি
তবু আলোয় ভরে গেছে পুরো জীবন।

তাই যখন যাব,
আমার জন্য কেউ কাঁদবে না,
আমি চাই না চোখে জল জমুক কারও।

আমাকে মনে রেখো একটা হাসির মতো,
একটা শান্ত বিকেলের বাতাসের মতো।
কারণ আমি তো যাচ্ছি না হারিয়ে-
আমি কেবল একটি দীর্ঘ দিনের শেষে
সূর্যের মতো ধীরে ধীরে ডুবে যাবো
রঙ ছড়িয়ে দিয়ে আকাশজুড়ে।

আর বিশ্বাস করো,
যে জীবন আমি কাটিয়েছি
তার চেয়ে সুন্দর জীবন সম্ভবত আর 
হয় না।

তাই আমার বিদায় কোনো শোক নয়,
এ এক পরিপূর্ণতার নীরব উৎসব,
যেখানে আমি হাসিমুখে শেষ আলোয় ভেসে যেতে চাই অনন্তলোকে।


৩১.       শেষ পথের যাত্রী 


কোর্টের সিঁড়ি পেরিয়ে
একটি সম্পর্কের কাগজে সই করে
দুজন মানুষ আলাদা হয়ে গেল,
যেন নদীর দুই তীর, হঠাৎ বুঝতে পারে
তাদের মাঝখানে জল বেড়ে গেছে অনেক।

স্বামীটি বেরিয়ে এসে
একটি অটোতে গিয়ে বসে, মুখে ক্লান্ত নীরবতা,
চোখে ভাঙা দশ বছরের সংসার।

হঠাৎ অটোর অন্য পাশে
মৃদু পায়ে এসে বসে নমিতা, যার সঙ্গে একসময়
শীতের সকালের চা
আর বর্ষার দুপুর ভাগ করে খেয়েছিল সে।

একবার চোখ তুলে তাকায় পুরুষটি
সেই দৃষ্টি যেন প্রশ্নে ভরা,
এত সহজে কি শেষ হয়ে যায়
একটি ঘর?

নমিতা নিভে আসা হাসি দিয়ে বলে -
রেল স্টেশন বাস পর্যন্ত শেষ পথটা
তোমার সাথেই যেতে চাই।

কথাগুলো খুব ছোট ছিল,কিন্তু তার ভেতরে
দশ বছরের অগণিত দিন নিঃশব্দে কেঁপে উঠল।
স্বামী ধীরে মাথা নাড়ল, বললো,
ঠিক আছে।

অটো চলতে শুরু করল, রাস্তার ধুলো উড়ল,
মানুষজন এলো গেল,
শহর তার স্বাভাবিক শব্দে ভরে রইল,
কিন্তু অটোর ভেতরে সময় যেন থমকে ছিল।
দুজনেই চুপ।

কেউ কারও দিকে তাকায় না,তবু দুজনেই জানে
এই নীরবতার ভেতরে অনেক না বলা ক্ষমা,
অনেক অব্যক্ত ভালোবাসা
এখনও বেঁচে আছে।

রেল স্টেশনটা হয়তো খুব কাছে
কিন্তু এই ছোট পথটাই হয়তো তাদের
একসঙ্গে চলার শেষ দীর্ঘ যাত্রা।

( অনলাইনে একজনের একটি স্টাটাস থেকে কবিতায় রূপান্তরিত। ) 



৩২.         সীমার ভেতরের আলো



জীবনের ঘরে ঘরে দায়িত্বের প্রদীপ জ্বলে,
চুলোর ধোঁয়া, সন্তানের হাসি,
দিনশেষের ক্লান্ত কাঁধে রাখা হাত
এসব নিয়েই গড়ে ওঠে সংসারের উষ্ণ অরণ্য।

তবু কোথাও না কোথাও
রয়ে যায় একটি অদেখা জানালা,
যেখানে বিকেলের নিঃসঙ্গ বাতাসে
হঠাৎ এসে বসে
কোনো নির্ভরতার মানুষ।

সব কথা তো ঘরের দেওয়ালে বলা যায় না,
কিছু কথা উড়ে যায় নীলাভ আকাশে
বিশ্বাসের পাখনা মেলে
বন্ধুত্বের কোমল ডানায় ভর করে।

সে হয়তো শুধু সহযাত্রী
মনের ক্লান্ত বিকেলের একটি শীতল ছায়া,
ঝড়ের দিনে
নিঃশব্দে কাঁধে রাখা একটুকু সাহস।

কিন্তু মনে রেখো
নদীরও একটি নির্ধারিত তীর থাকে
কারণ মানুষের মন বড় অদ্ভুত
নির্ভরতার উষ্ণতায় কখনো কখনো
চোখে নেমে আসে এক অলিক জ্যোৎস্না,
শব্দের ভেতর লুকিয়ে পড়ে
স্পর্শের অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা।

একটি মাত্র পা সীমার বাইরে পড়লেই
স্বচ্ছ নদীর জল হঠাৎ ঘোলা হয়ে যায়;
নির্মল বন্ধুত্বের নাম
হারিয়ে যায় অন্ধকার কোনো অভিধানে।

মনের শান্তি যত স্বচ্ছ,
শরীরের তৃষ্ণা তত অস্থির
আর সেই অস্থিরতার এক ফোঁটা আগুনেই
দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে
একটি ঘরের সমস্ত বিশ্বাস।

তাই বন্ধুত্ব থাকুক
বসন্তের বাতাসের মতো নির্মল
দূর থেকে ছুঁয়ে যাক, কিন্তু দহন হয়ে না উঠুক।

কারণ একদিন
যদি মাটি সরে যায় পায়ের নিচ থেকে,
তখন ফিরে তাকিয়ে দেখবে
যে ঘরের জন্য এত আলো জ্বেলেছিলে
সেই সবচেয়ে আপন দরজাটিই
নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে তোমারই অজান্তে।


৩৩.      ছোট ছোট রীতি


জড়িয়ে ধরো আমাকে
যেন পৃথিবীর সব ঝড় থেমে থাকে
তোমার দুই বাহুর ভেতর।

চুমু খাও
গালে, কপালে, চোখের কোণে,
যেখানে ভালোবাসা এসে নিঃশব্দে বসে থাকে।

আমরা দুজনেই একটু শিশু হই
তোমার অভিমানের মুখটা দেখি,
আমার হাসিটা তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঋজু 
 হয়ে যায়।

তুমুল ঝগড়ার পরেও
যখন দরজার কাছে অভিমান দাঁড়িয়ে থাকে,
তখন হঠাৎ এসে একটা ছোট্ট চুমু দিও
সব ভুলগুলো যেন
পাতাঝরার মতো ঝরে পড়ে মেঝেতে।

ফিরে আসার পরে জড়িয়ে ধরো,
যেন আমি দূরের কোনো দেশ থেকে
তোমার বুকের ভেতরেই ফিরে এলাম।

ঘুম থেকে ওঠার সময় চোখ আধখোলা 
রেখেই বলো - এই যে, এখনও আছো তো?
আর আমি উত্তর দিই একটা চুমু দিয়ে।

কাজে বেরোনোর আগে
তোমার হাতটা একটু শক্ত করে ধরি
যেন দিনভর পৃথিবীর ভিড়ে
আমরা দুজনেই জানি
কোথাও একজন অপেক্ষা করে আছে।

বয়স বাড়ুক, চুলে রূপালি ধুলো পড়ুক,
তবু এই ছোট ছোট রীতিগুলো
কখনো পুরোনো না হোক।

পুরোনো জিনিসপত্রের মতো
ধুলো জমা দুটো মানুষ যেন না হই,
বরং প্রতিদিন একটু করে নতুন হয়ে উঠি -
একটা আলিঙ্গনে,একটা চুমুতে,
আর অবিরাম উষ্ণ ভালোবাসায়।


৩৪.        আদিম তৃষ্ণা 



নিঝুম রাতের গভীরতা যখন ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে,
পৃথিবী যেন তার সমস্ত শব্দ গুটিয়ে নেয়
ঠিক তখনই আমার ভেতরে জেগে ওঠে
এক প্রাচীন নদীর অস্থির স্রোত।

মনে হয়, অনেকদিন ধরে আটকে রাখা জোয়ার
হঠাৎ চাঁদের ডাকে উথলে উঠতে চাইছে।
তোমার কথা মনে পড়লেই
রক্তের ভেতর জ্বলে ওঠে এক অদ্ভুত নীল আগুন।

যেন দূর অরণ্যের গোপন কোথাও
বৃষ্টি নামার আগে
বিদ্যুতের আলো নীরবে জমে আছে।

তোমার চুলের ঘ্রাণ অদ্ভুত এক মায়া,
সে ঘ্রাণ এসে বসে আমার নিঃশ্বাসে,
যেন পথ হারানো কোনো পাখি
হঠাৎ একটি নিরাপদ ডাল খুঁজে পেয়েছে।

তোমার শরীরের উষ্ণতা আমার শরীরের ভেতরে
এক অজানা ঢেউ তোলে
তখন ভাষা আর দরকার হয় না।
একটি হাতের স্পর্শ
অসংখ্য বাক্যের চেয়ে বেশি কথা বলে।

চোখের গভীরতা হয়ে ওঠে নীরব কবিতা,
আমরা তখন দুটি প্রাচীন বৃক্ষের মতো
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকি,
কিন্তু বাতাস এলে
ডালপালা গোপনে জড়িয়ে যায়।

তোমার কাছে এলে
মনে হয় আমি আর আমি নই।
আমি হয়ে যাই এক অস্থির সমুদ্র,
তুমি তার চাঁদের আলো।

আমি এক জ্বলন্ত অরণ্য, তুমি তার নরম বৃষ্টি।
এই যে দহন, এই যে তৃষ্ণা—
এ কেবল শরীরের ক্ষুধা নয়।
এ এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ।

কারণ তোমাকে স্পর্শ করতে চাওয়ার ভেতরে
আসলে লুকিয়ে থাকে আমার সমস্ত ক্লান্তি,
সমস্ত একাকীত্ব,
সমস্ত অপ্রকাশিত ভালোবাসা।

আর তোমার বুকের উষ্ণতায়
আমি তখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যাই
যেন বহুদিন পথ চলার পর এক আদিম নদী
অবশেষে সমুদ্র খুঁজে পেয়েছে। 


৩৫.        অভ্যাসের আগে



শুরুটা ছিল শ্রাবণের ধারার মতো উত্তাল,
বৃষ্টিভেজা নদীর মতো উথালপাথাল ভালোবাসা
প্রতিটি স্পর্শে ছিল পাগলামি,
আর একরাশ মুগ্ধতা ঝরে পড়ত দু’জনের চোখে।

তখন রাত মানেই ছিল গল্পের ভেতর হারিয়ে যাওয়া,
একটি হাত অন্য হাতকে খুঁজে নিত অন্ধকারে,
একটি বুক হয়ে উঠত আরেকটি মানুষের আশ্রয়।

কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে
কখন যে সেই মুগ্ধতা
চুপিচুপি এসে দাঁড়াল “অভ্যাস” নামের এক নীরব ঘরে,
কেউ ঠিক বুঝতেই পারল না।

মিলনের পর
একটি শরীর উল্টো পাশে ফিরে শোয়,
আর অন্য একটি মন
নিঃশব্দে প্রশ্ন করে যায়—
শরীর কি তবে শুধু জৈবিক প্রয়োজন ছিল?
মনের খোঁজ নেওয়ার অবসর
এত দ্রুতই ফুরিয়ে গেল?

সম্পর্ক তো কেবল শরীরের উম্মাদনা নয়,
সম্পর্ক মানে দীর্ঘ ক্লান্তির শেষে
কারও বুকে মাথা রেখে
নির্ভয়ে স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়া।


৩৬.       অন্য ভ্রমণের গল্প


তুমি দূরদেশ থেকে ফিরে এসে গল্প শোনালে-
দানিউবের নীলাভ স্রোতের দীর্ঘশ্বাস,
প্রাগের শতবর্ষী সেতুর নিচে জমে থাকা
পাথরের নীরবতা,
ভেনিসের সরু জলপথে দুলতে থাকা গন্ডোলা,
যেন কোনো পুরোনো প্রেমের চিঠি
ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে জলের বুক বেয়ে।

বললে -
বার্সেলোনার এক অচেনা গলির পানশালায়
লাল মদের গাঢ় নেশায় ডুবে ছিল এক রাত,
যেখানে বাতাসেও নাকি লেগেছিল
শরীরের প্রাচীন উষ্ণতার গন্ধ।

আর সেখানে -
এক স্ক্যান্ডিনেভীয় শ্বেতত্বকের নারী,
উত্তরের বরফগলা নদীর মতো তার দৃষ্টি,
সোনালী চুলে জড়িয়ে ছিল
অর্ধেক গ্রীষ্ম, অর্ধেক চাঁদের আলো।

সে নাকি বসেছিল তোমার সামনে
মোমবাতির ক্ষীণ আলোয়,
তার সরু কটিদেশে রাতের ছায়া বাঁধা,
আর তার কণ্ঠে ভেসে উঠছিল
সমুদ্র আর শরীরের বহু পুরোনো উপকথা।

সে বলেছিল -
মানুষের নাভিমূলে নাকি লুকিয়ে থাকে
প্রথম জোয়ারের স্মৃতি,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ জাগিয়ে তোলে 
আদিম কোনো ঢেউ।

তোমার সেই গল্প শুনতে শুনতে
আমি বসেছিলাম নিঃশব্দে -
শিকারীর ছায়া এড়িয়ে ফিরে আসা
এক ক্লান্ত হরিণীর মতো।

তবু আমার চোখে ছিল কৌতূহলের আলো 
হয়তো কোনো এক অদৃশ্য মুহূর্তে
তুমি হঠাৎ থেমে যাবে,
আমার চোখের দিকেও তাকাবে।

আমি শুধু চেয়েছিলাম -
তুমি নিঃশব্দে একবার বলো,
'এড্রিয়াটিকের নোনাধরা বাতাসে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ কি তোমার কথা মনে পড়েনি?
সমুদ্রের ঢেউ যখন পায়ের কাছে এসে
বারবার ভেঙে পড়ছিল, তখন কি মনে হয়নি
তোমার কোমরের বক্রতাও
এমনই কোনো ঢেউয়ের মতো?'

তোমরা পুরুষেরা বুঝতে পারো না -
প্রিয় নারীর হৃদয় আসলে এক গোপন প্রদীপঘর,
সেখানে ভালোবাসা জ্বলে একটিমাত্র শিখায় -
নিঃশব্দ, নিবিড়, অনড়।

সেই আলো যদি ভেঙে যায় অন্য কোনো 
জানালার বাতাসে,
তবে শিখাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়
বৃষ্টিভেজা জোনাকির মতো।

আর তখন নারী শুধু শরীর নয়—
সে হয়ে ওঠে এক নিঃসঙ্গ উপকূল,
যেখানে ঢেউ আসে, ফিরে যায়,
কিন্তু কোনো জাহাজ আর নোঙর 
ফেলে না।

তবু গভীর রাতে সেই উপকূলের বালিতে
লুকিয়ে থাকে এক অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা -
কেউ যদি আবার এসে বলে,
'সমুদ্রের এত পথ ঘুরেও শেষ পর্যন্ত
আমি তোমার কাছেই ফিরতে চেয়েছি।'


৩৭.      উত্তাল ঢেউ


রাত যখন আরও গভীর হয়ে
নিঃশব্দ অন্ধকারে রক্তের ভেতর বাজে
কোনো আদিম ঢাকের শব্দ,
তখন শরীর খুলে দেয়
তার বহুদিনের গোপন দরজা।

পুরোনো ক্লান্ত আঁচল
অচেনা বাতাসে সরে যায় ধীরে,
নিষিদ্ধ কোনো ডাকে
জেগে ওঠে ঘুমন্ত নদী।

আজ একটিমাত্র স্পর্শে নয়
শরীর চায় বহুস্বরের জাগরণ,
যেন শ্যাওলা ধরা পাথুরে ঘাটে
বারবার এসে ভাঙে
লবণাক্ত উত্তাল ঢেউ।

উষ্ণ নিশ্বাসের আগুনে
গলে যাক জমে থাকা শীত,
পেশির উঁচু পাহাড়ে
হারিয়ে যাক শরীরের সব গোপন পথঘাট।

একটি দিগন্তেই কি থামে নারীর সমস্ত ঝড়?
শরীর হোক উন্মত্ত প্রান্তর, যেখানে প্রতিটি হার
আসলে আরেকটি গোপন জয়ের
অদৃশ্য দরজা খুলে দেয়।


৩৮.      মায়াবিনীর কথা


আমি চেয়েছিলাম তুমি হও
গীতবিতানের কোনো গানের মতো মায়াবিনী।
রাত গভীর হলে,
চোখে যখন ঘুমের পাখি বসতে চায় না,
তখন ধীরে ধীরে গেয়ে ওঠো—
“এসো, এসো আমার ঘরে,”
আর সেই সুরে আমার অস্থির রাতগুলো
একটু একটু করে ঘুমের ভেলায় ভেসে যায়।

আমি চেয়েছিলাম,
মাঝে মাঝে তুমি হঠাৎই আবদার করবে -
চলো না কোথাও গিয়ে টং হোটেলে বসি,
ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গারা ভেঙে
আধখানা আমার মুখে তুলে দেবে, তারপর 
গরম কাপে চায়ে চুমু-ক।

তারপর খাওয়া শেষে
খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে
রিকশায় চড়ে বসবে,
আর শহরটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাবে,
আমরা দু’জন তখন 
একটি ছোট্ট পৃথিবীর ভেতর বসে থাকবো।

বৃষ্টি নামলেই তুমি শাড়ি পরবে,
হাতভরা চুড়ি থাকবে, চোখে গাঢ় কাজল, 
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনবে,
আর তোমার আঁচলে লাগবে
দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির গোপন স্পর্শ।

আর যখন তোমার জন্মদিন আসবে
আমি সারা শহর খুঁজে থোকা থোকা কদমফুল
এনে তোমার খোঁপায় ভরিয়ে দেবো।

কদম ঘ্রাণে ভরে উঠবে আমাদের ছোট্ট ঘর,
কোনো এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায়
তুমি হঠাৎ বলবে,
তোমার এইসব ছোট ছোট স্বপ্নগুলো
আমি খুব যত্ন করে রেখে দেবো।


৩৯.       মাটির নিচে থেকেও

মরে গেলে এই দেহ
চিহ্নহীন হয়ে যাবে মাটির ভেতর,
ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে হাড়ের অস্তিত্ব,
রক্তের লাল স্মৃতি মিশে যাবে
অচেনা ধুলোর সঙ্গে।

হয়তো সেই মাটির বুকেই
একদিন জন্ম নেবে মাধবীলতার ঝাড়,
লতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাবে
আমার অদৃশ্য কোনো নিঃশ্বাস,
ফুল ফুটলে হেমন্ত সন্ধ্যা
হঠাৎ কেন যেন একটু বেশি গন্ধে ভরে উঠবে।

রাত্রির গভীরে
জোনাকিরা এসে জ্বালাবে ক্ষুদ্র প্রদীপ,
মনে হবে তারা যেন অন্ধকারের ভেতর বসে
আমার পুরোনো কোনো গান গুনগুন করছে।

কোনো নিঝুম দুপুরে একটি কিশোরী
সেই মাটি ছেনে পুতুল বানাবে,
তার আঙুলের ভেজা স্পর্শে
হয়তো আমার ঘুমন্ত অনুভূতিগুলো
এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠবে।

তখন কি আমি কিছুই টের পাব না?
মাধবীলতার গন্ধ,জোনাকির আলো,
কিশোরীর হাসি,
সবই কি শুধু পৃথিবীর হবে?

নাকি মাটির গভীর অন্ধকারে
আমার আত্মা অদৃশ্য এক বাতাস হয়ে
সবকিছু ছুঁয়ে যাবে,
আর কেউ না জানলেও আমি নিঃশব্দে বলব, আমি আছি এই গন্ধে,
এই আলোয়, এই মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকা অদেখা জীবনের মতো।


৪০.     নুপুরের ঝংকারে


তার পায়ে রূপার নুপুর পরিয়ে দিয়ে বললাম-
যখন তুমি হাঁটবে ঝনঝন শব্দে মনে পড়বে আমার কথা,
আর তোমার হৃদয়ও ঝলমল করে
উঠবে 
যেন পূর্ণিমার আলোয় হঠাৎ জেগে ওঠা
নদীর নীল ঢেউ।

তুমি যখন নিঃশব্দে উঠোন পেরিয়ে যাবে,
নুপুরের সেই মৃদু ঝংকারে
রাতের ঘুম ভাঙবে জোনাকির,
আর আমার নিঃসঙ্গতার জানালায়
টোকা দেবে এক ফালি চাঁদ।

আমি চাই,
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে
আমার নামের গোপন সুর লুকিয়ে থাকুক,
যেন বাতাস ছুঁলেই
বকুলফুলের গন্ধের মতো
ছড়িয়ে পড়ে আমার ভালোবাসা।

যদি কোনোদিন দূরের শহরে
আমাকে ভুলে যেতে চাও,
তবু হেঁটে যেও ধীরে -
নুপুরের ঝনঝনে শব্দে হঠাৎ মনে পড়ে যাবে
একজন মানুষ তোমার পায়ের শব্দ শুনেই
পুরো একটি জীবন
ভালোবাসতে শিখেছিল।


৪১.     পুন্যে স্নাত


ভালোবাসা হোক পুন্যে স্নাত।
তুমি আমাকে দগ্ধ করো।
মেঘমল্লার আকাশকে বলি - তুমি বৃষ্টি ঢেলে দাও,
নিভিয়ে দাও দহন।
নদীকে বলি - তুমি ভাসিয়ে নিয়ে যাও
শঙ্খনীল সাগরে।

তারপর দেখি -
তোমার চোখের ভেতর জেগে ওঠে
কোনো অচেনা জোয়ারের নীল আলো।
সেখানে আমার সমস্ত ক্লান্তি
ধুয়ে যায় জলের গোপন মন্ত্রে।

তখন 
ভালবাসা শুধু আগুন নয়,
ভালবাসা হবে শরীর ছুঁয়ে ওঠা গোপন জোয়ার,
তোমার উষ্ণ নিশ্বাসে কাঁপবে
আমার রাত্রির নিঃশব্দ উপকূল।

তুমি যদি হাত রাখো আমার বুকে,
দেখবে হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে
অসংখ্য ঢেউয়ের অস্থিরতা।
তোমার আঙুলের স্পর্শে
জেগে উঠবে ঘুমন্ত সমস্ত নদী,
ধীরে ধীরে তারা মিশে যাবে
এক উন্মত্ত সাগরের নীল আলিঙ্গনে।

তখন -
ভালবাসা হবে শরীর ও আত্মার
এক গোপন পূর্ণিমা-রাত্রি,
যেখানে তোমার বাহুর ভেতর
আমার সমস্ত দহন গলে গিয়ে
নরম জ্যোৎস্নার মতো ঝরে পড়বে।

আর আমরা দু’জন
অন্ধকার আকাশের নিচে স্পর্শের দীপ্ত আগুনে নিঃশব্দে জ্বলে উঠব। ✨


৪২.       যদি আর না ফিরি


ঘরে থেকে বের হওয়ার সময় প্রিয় মানুষের হাতছানি ছুঁয়ে বের হই,
মনে হয়,ফিরে এসে যদি আর তাকে ছুঁতে না পারি,
তবে এই ছোঁয়াটুকুই কি শেষ হয়ে থাকবে সমস্ত জীবনের জন্য?

দরজার কাঠে কপাল ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়াই,
অদৃশ্য কোনো বিদায়ের ক্রন্দনের সুর  বাজে ভেতরে,
সে কিছু বলে না, তবু চোখের ভাষায়
এক অনন্ত অপেক্ষার নীল নদী বয়ে যায়।

বাইরের পথগুলো অচেনা লাগে,
প্রতিটি মোড়ে যেন লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের ছায়া,
আর আমার হাতের মুঠোয়
ধরে রাখা উষ্ণতা ধীরে ধীরে শিতল হয়ে আসে,
যেন সময় নিজেই নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে দূরে।

ভিড়ের ভেতর হঠাৎ থেমে যাই,
মনে হয়, কেউ যেন নাম ধরে ডাকল,
পেছনে ফিরে দেখি -
শুধুই বাতাস, আর একফোঁটা অনুপস্থিতি।

কোনো এক অন্যমনস্ক বিকেলে
তার হাসির প্রতিধ্বনি এসে লাগে বুকে,
আর আমি বুঝতে পারি -
ভালোবাসা আসলে এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা,
যেখানে প্রতিটি বিদায়ই
ফিরে না আসার সম্ভাবনায় ভেজা।

তাই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি,
একটি তারার কাছে নিঃশব্দে প্রার্থনা করি,
যদি আর ফিরতে না পারি,
তবে তার স্মৃতির ভেতরেই আমাকে বাঁচিয়ে রেখো। 

তার হাতছানির ভেতরেই
আমার সমস্ত অনুপস্থিতি জেগে থাকুক।


৪৩.     যাত্রী আমি


আমি পথের সন্তান,
দিগন্ত আমাকে ডেকে নিয়েছে নামহীন আত্মীয়ের মতো,
ফেলে এসেছি চেনা উঠোন,
দরজায় ঝুলে থাকা শৈশবের বিকেল।

নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
আমি ছুঁয়েছি ব্রাহ্মপুত্রের দীর্ঘ ইতিহাস,
তারপর দূরদেশে গিয়ে
অচেনা স্রোতে মিশে গেছে আমার ক্লান্তি।

বরফঢাকা শহরের জানালায় দাঁড়িয়ে
শুনেছি তুষার পতনেরও শব্দ আছে -
আর পাথরের পুরনো নগরে
পায়ের ধুলোয় জমেছে শত বছরের গল্প।

পথই আমার আশ্রয়,
প্রতিটি মোড়েই নতুন করে জন্ম নিই আমি,
অসংখ্য রঙের ভিড়ে
আমি খুঁজেছি আমার নিজের রং
যেখানে ফুল ফুটেছে,
সেখানে আমি গেছি মুগ্ধ হয়ে,
আর যেখানে কুঁড়ি ঝরে গেছে অনাদরে,
সেখানে নীরবে কেঁদেছি একা।

ভালোবাসার নামে কত ভাঙা ঘর, 
কত নিঃশব্দ শূন্যতা, তবুও অচেনা মুখগুলো
হঠাৎই হয়ে উঠেছে কাছের মানুষ।

এই পথই আমার ঠিকানা,
এই ভেসে চলাই আমার নিয়তি,
তাই আজও বলি - আমি ঘরহারা নই,
পৃথিবীটাই আমার ঘর।


৪৪.       শ্রদ্ধার অর্ঘ্য : আশা ভোসলে


যে কণ্ঠ একসময় প্রেমের প্রথম স্পর্শ হয়ে এসেছিল,
যে সুরে রঙিন হয়েছে অসংখ্য রাতের নিঃসঙ্গতা,
সেই কণ্ঠ  নিশ্চুপ হয়ে যাবে, 
এই ভাবনাটুকুই যেন বুকের ভেতর অদৃশ্য ব্যথা হয়ে বাজে।

আশা ভোসলে শুধু একটি নাম নয়,
তিনি এক অনন্ত সুরধারা,
যেখানে জীবনের সব রঙ মিশে আছে,
ভালোবাসা, বেদনা, উল্লাস আর নীরব কান্না।

তিনি সত্যিই অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন,
তবে পৃথিবীর আকাশে নিশ্চয়ই একটুখানি সুর কমে যাবে,
রাতগুলো হবে একটু বেশি নির্জন,
আর পুরোনো গানগুলো বাজবে আরও বেশি কাঁদিয়ে।

তবুও তিনি থাকবেন, প্রতিটি সুরের মায়াজালে,
প্রতিটি প্রেমের স্মৃতিতে,
প্রতিটি নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে।

কারণ কিছু মানুষ চলে যান না,
তারা রয়ে যান, গানের মতো,
অনন্তকাল।

তারিখ - ২৬/৪/২০২৬ ইং


৪৫.      নিশ্চিন্ত মানুষ


একটা মনের মানুষ থাকুক
যার ভেতর আমি ডুবে যেতে পারি
সমুদ্রের মতো নিশ্চিন্ত নীলতায়,
যেখানে হারিয়ে যাওয়াও একধরনের পাওয়া,
আর ফিরে আসা মানে
নিজেকেই আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া।

সে থাকুক,
ভোরের প্রথম শিশিরবিন্দুর মতো নির্মল,
অথবা সন্ধ্যার ধূপছায়া আলো,
যেখানে ক্লান্ত দিন মাথা রাখে
নিঃশব্দ আশ্রয়ের কোলে।

ভালো-মন্দের সব ঋতুতে
সে হোক আমার চিরসবুজ বৃক্ষ,
ঝড় এলে যে আরও গভীরে গেঁথে দেয় শিকড়।

চোখ বন্ধ করলেই তার অস্তিত্ব ভেসে উঠুক
নক্ষত্রের মতো স্থির, অবিচল,
অন্ধকার যত গভীর হোক,
তার আলো ততটাই নির্ভুল হয়ে পথ দেখাক।

তার হাসি হোক
শুকনো নদীর বুকে হঠাৎ নেমে আসা বর্ষা,
যেখানে আমার সব বিষণ্ণতা
জলের স্রোতে ভেসে যায় অজানার দিকে।

যখন মেঘ জমে ভালোবাসার আকাশে,
সে যেন বিদায় নয়,
বৃষ্টির ভাষায় কথা বলে, ভাঙনের কিনারায় দাঁড়িয়ে সে খুঁজে নেয় জোড়ার সুর,
আঙুলে আঙুল জড়িয়ে
আরও দৃঢ় করে তোলে সম্পর্কের বুনন।

সে মানুষটা থাকুক,
যার ভালোবাসা শঙ্খের ভেতর লুকানো সুরের মতো,
শুনতে হলে কান পেতে থাকতে হয়,
আর একবার শুনলে
চিরকাল হৃদয়ের গভীরে বাজতে থাকে।

একটা মনের মানুষ থাকুক,
যার কাছে সম্পর্ক মানে শুধু থাকা নয়,
বরং বারবার বেছে নেওয়া;
প্রতিটি ভাঙনের পর
আরও নিখুঁত করে গড়ে তোলা।


৪৬.      ফেরাহীন প্রস্থান 


একটি চলে যাওয়া আছে, সে আর 
ফিরে আসে না,
সে শুধু বলতে পারে, আমি চলে যাচ্ছি...

তারপর নিঃশব্দে দরজার ফাঁক দিয়ে
বয়ে যায় এক অদৃশ্য শূন্যতা,
যেখানে শব্দও আর শব্দ থাকে না
থাকে শুধু ভাঙা প্রতিধ্বনি।

জানালার ধারে বসে থাকে বিকেল,
হাতে তার এক মুঠো আলো -
কিন্তু সে আলোও কেমন মলিন,
যেন তোমার স্পর্শহীন হয়ে পড়েছে বহুদিন।

রাত এলে আকাশ ভরে ওঠে তারায়,
কিন্তু কোনো তারাই আর গল্প বলে না,
সবাই যেন জানে -
একটি চলে যাওয়া মানেই
অসংখ্য নীরবতার জন্ম।

বালিশে জমে ওঠা অশ্রুগুলো
ভোর হলে শুকিয়ে যায় ঠিকই,
কিন্তু তাদের লবণাক্ত দাগে
থেকে যায় তোমার অনুপস্থিতির ইতিহাস।

একটি চলে যাওয়া আছে
যার কোনো ফেরার পথ নেই,
শুধু স্মৃতির ভাঙা সেতু পেরিয়ে
মনে মনে ডেকে যাওয়া -
'আরেকবার এসো…'। 

কিন্তু সে আর ফিরে আসে না,
সে শুধু বলে, আমি চলে যাচ্ছি,
আর রেখে যায় -
একটি দীর্ঘ, অনন্ত, নিঃসঙ্গ অপেক্ষা।


৪৭.     অর্ধেক তুমি, অর্ধেক আমি 



অর্ধেক তুমি, অর্ধেক আমি
দূরে চলে গেলে তোমার অর্ধেক আমার কাছে থাকে,
যেমন আমার অর্ধেক থাকে তোমার কাছে,
যখন কাছে থাকি তখন দুজন হয়ে যাই একটি মানুষ
একটি শ্বাসে বেঁচে থাকা, একটি হৃদয়ের স্পন্দন।

তুমি দূরে গেলে বাতাসে তোমার গন্ধ মিশে থাকে,
আমার জানালার পর্দা ছুঁয়ে যায় তোমার অদৃশ্য হাত,
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি ;
মনে হয় তুমি ঠিক পেছনেই আছো।

রাত গভীর হলে
আমার ঘুমের ভেতর তোমার ছায়া নেমে আসে,
স্বপ্নের ভিতর  তুমি  আলো হয়ে জ্বলো,
আমি তোমার নাম ডাকি -
আর অন্ধকার আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

আমরা দুজন আলাদা থেকেও
কোনো অদৃশ্য সেতুতে বাঁধা,
তোমার চোখের জল আমার বুক ভিজিয়ে দেয়,
আমার হাসি পৌঁছে যায় তোমার ঠোঁটের কোণে।

যখন তুমি আমার পাশে থাকো,
সময় থমকে দাঁড়ায়
ঘড়ির কাঁটা ভুলে যায় তার গতি,
আমাদের নীরবতা কথা বলে হাজার ভাষায়।

তুমি আমার ভেতরে বেঁচে থাকা আরেকটি আমি,
আমি তোমার ভিতরে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী,
তাই দূরত্ব শুধু শরীরের,
মন তো সবসময় পাশাপাশি হাঁটে।

একদিন যদি সব দূরত্ব মুছে যায়,
আর আমরা আবার একসাথে হই
তখন বুঝব,
আমরা কখনোই আলাদা ছিলাম না,
শুধু ভালোবাসার ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায় ছিলাম।


৪৮.     নিমন্ত্রণ


তুমি কাছে এসো আবেগের উন্মত্ততায়,
প্রগাঢ় ভালোবাসার উষ্ণতায়,
বিশ্বাসের গভীরতায় -
যেখানে শব্দেরা থেমে যায়,
আর চোখের ভাষাই হয়ে ওঠে অনন্ত।

তুমি কাছে এসো, নিঃশ্বাসের ভেজা দূরত্বে
যেখানে তোমার গন্ধে জেগে ওঠে
আমার সুপ্ত সমস্ত নদী,
আর হৃদয়ের ভেতর ঢেউ তুলে অচেনা 
এক জোয়ার।

তোমার আঙুলের স্পর্শে জেগে উঠুক 
শরীরের নিঃশব্দ সুর,
অন্ধকারে গোপন আলোয়
হারিয়ে যাক সকল সংশয়
শুধু তুমি আর আমি, এক অবিচ্ছেদ্য 
আবেশে বাঁধা।

তুমি কাছে এসো, যেন রাত ধীরে ধীরে 
মিশে যায় ভোরে,
যেন দু’টি ছায়া মিলেমিশে
একটি শরীরের ভাষা খুঁজে পায়।

ভালোবাসা হোক নিভন্ত আগুন,
যা দহন নয়, বরং আলো হয়ে জ্বলে ওঠে অন্তরে।

তুমি কাছে এসো, এই অনির্বচনীয় টানে
যেখানে স্পর্শ মানে শুধু স্পর্শ নয়,
বরং আত্মার গভীরে লেখা চিরন্তন দলিল।


৪৯.      যে থাকে নীরবে



যে মানুষটি পাশে থাকে
অসুস্থ রাতে জেগে থেকে নীরবে জল এগিয়ে দেয় পরম মমতায়
এমন একজন মানুষকেই পাশে রেখে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

হয়তো সে কবিতা জানে না,
সে জানে না বড় বড় শব্দ -
কবিতার অলংকারে সাজাতে পারে না
তবুও তার প্রতিটি যত্ন
অঘোষিত একেকটি পংক্তি
যেখানে ভালোবাসা লেখা থাকে
অতি সরল ভাষায়।

সে জানে,
এই পৃথিবীতে শব্দের চেয়ে মমতার প্রয়োজন বেশি,
তার চোখে কোনো নাটক নেই 
শুধু গভীর নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

আমি ভাবি,
কবিতা কি তবে এমনই?
যেখানে ছন্দ নেই, তবু হৃদয় দোলে,
শব্দ নেই, তবু ভালোবাসা বলে ওঠে।

যে মানুষটি পাশে থাকে,
সব ঝড়-জ্বরে, ক্লান্তির রাতে -
তার হাত ধরে জীবন পার করতে ইচ্ছে করে,
কারণ সে কবিতা জানে না ঠিকই,
কিন্তু সে নিজেই এক জীবন্ত কবিতা।


৫০.      শেষ অস্তরাগ


পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা বিষাদগুলি
আনন্দে রূপান্তরিত হয়ে চলে গেল
ঐ শেষ অস্তরাগে,
দিনের শেষ আলোয় মিশে গিয়ে
অশ্রুরাও যেন খুঁজে পেল একটুখানি মুক্তি।

দূরে ছড়িয়ে থাকা মেঘকণাগুলি
অশ্রু হয়ে উড়ে এলো চোখের ‘পরে,
স্মৃতির ভেজা পাতায় রেখে গেল
কিছু না বলা গল্প, কিছু অপূর্ণতা,
কিছু নাম যাদের আর ডাকা হয় না।

একটা বছর ফুরিয়ে গেলে
কিছু স্বপ্ন ঝরে পড়ে নিঃশব্দে,
কিছু আশা কাঁপতে কাঁপতে টিকে থাকে,
আর কিছু ভালোবাসা হারিয়ে যায়
অজানা কোনো দূরত্বে।

তবুও,
শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগে
আকাশ একটু লাল হয়ে ওঠে,
ঠিক তেমনি, সব হারানোর মাঝেও
মনে জন্ম নেয় একটুখানি নতুন ভোরের আলো।

যে কষ্টগুলো বয়ে এনেছি এতদিন,
সেগুলো রেখে যাই পেছনের বছরে
নতুন বছরে যেন আসে
একটু শান্তি, একটু নির্ভরতা,
একটু ভালোবাসা।

সবাইকে জানাই
নতুন বছরের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

৩০ চৈত্র,  ১৪৩২ বাংলা। 



মাধুরীর কাছে ( কাব্যগ্রন্থ )



মাধুরীর কাছে   ( কাব্যরন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  - ডিসেম্বর - ২০২৫ ইং


উৎসর্গ  -

ওরা দুজনই ছিল আমার প্রিয় বন্ধু,
আমারই সহপাঠী।

একদিন আমরা তিনজন সারাদিন কাটিয়েছিলাম
বোটানিক্যাল গার্ডেনের ফুলে ভরা পথ আর সবুজ ছায়ার ভেতর।
দিনটি ছিল — ৭.৭.৭৭।

একজন মোশাররফ,
আরেকজন লুসী।
আজ তারা দুজনেই দূর দেশে, মার্কিন মুলুকে।
সময় তাদের একসাথে বেঁধেছে সুখী দাম্পত্যে।

আমি জানি না,
ওরা এখনো আমাকে মনে রেখেছে কি না—
তবু এই গ্রন্থখানি
সপ্রেমে তুলে দিলাম
ওদের করকমলে।


ভূমিকা -

কবিতা কখনও নিছক শব্দের সাজ নয়,
এ যেন হৃদয়ের ভেতর জন্ম নেওয়া এক অনিবার্য জ্যোতি,
যা কখনও প্রেম হয়ে জ্বলে ওঠে,
কখনও প্রকৃতির সবুজ নীরবতায় ভিজে যায়,
আবার কখনও দ্রোহের আগুন হয়ে
অন্যায় আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।

এই বইয়ের কবিতাগুলো সেই তিনটি নদীর স্রোত -
প্রেম, প্রকৃতি এবং দ্রোহ।
তিনটি স্রোত, কিন্তু উৎস একটাই,
মানুষের হৃদয়।

প্রেম এখানে কেবল দু’টি মানুষের মৃদু স্পর্শের গল্প নয়;
এ প্রেম কখনও অপেক্ষার, কখনও হারানোর,
কখনও বা অদ্ভুত এক নীরব আকুলতার।
যে প্রেম চোখের গভীরে জ্বলে ওঠে,
আবার অন্ধকার রাতের ভেতর নিঃশব্দে
কারও নাম ডেকে যায়।

প্রকৃতি এই কবিতাগুলোর আরেকটি নিবিড় সঙ্গী।
এখানে আছে বৃষ্টির ভেজা গন্ধ,
শীতের কুয়াশায় জড়িয়ে থাকা ভোর,
হেমন্তের সন্ধ্যায় ঝরে পড়া পাতা,
আর দূর আকাশে উড়ে যাওয়া একাকী পাখির ডাক।
প্রকৃতি এখানে শুধু দৃশ্য নয়,
এ যেন মানুষের আত্মার প্রতিবিম্ব।

আর আছে দ্রোহ,
যে দ্রোহ মানুষের অন্তরে জন্ম নেয়
অবমাননা, অবিচার আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে।
এই দ্রোহ কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়,
কখনও তা নিঃশব্দ আগুনের মতো জ্বলে,
শব্দের ভেতর, নীরবতার ভেতর,
একটি মানুষের অবিচল বিশ্বাসের ভেতর।

এই বইয়ের কবিতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ নয়।
এগুলো এসেছে জীবনের কাছ থেকে,
ভালোবাসার কাছ থেকে,
মাটির গন্ধ থেকে,
এবং মানুষের অদম্য স্বপ্ন থেকে।

যদি কোনো পাঠক এই কবিতার ভেতর
নিজের কোনো হারানো অনুভূতি খুঁজে পান,
যদি কোনো শব্দ তাকে একটু থামিয়ে দেয়,
কিংবা কোনো পঙক্তি তার মনে অচেনা আলো জ্বালায় -
তাহলেই এই শব্দগুলোর জন্ম সার্থক।

এই বই তাই কেবল কবিতার সংকলন নয়,
এ এক যাত্রা।
হৃদয় থেকে হৃদয়ে,
মানুষ থেকে মানুষের কাছে।

— লেখক


১.      মাধুরীর কাছে 


তোমার মাধুরী, তোমার অপার সৌন্দর্য
আমাকে উন্মুখ করে তোলে,
যেন গোপন বসন্তরাতে নিশীথ বনের 
বুকে হঠাৎ অজানা কোনো ফুল 
মধুর গন্ধে জেগে ওঠে।

তোমার চোখের গভীরতায়
আমি ডুবে যাই ধীরে ধীরে,
যেন নক্ষত্রভরা আকাশে
হারিয়ে যাওয়া কোনো পথিক
তার নিজের দিক ভুলে ফেলে।

তোমার ঠোঁটের লালিমা
অচেনা কোনো মধুমাখা পুষ্পের মতো,
যার কাছে এলেই আমার হৃদয়
এক উন্মনা ভ্রমরের মতো কেঁপে ওঠে।

তোমার হাসি যখন নীরবে ঝরে পড়ে
আমার চারপাশে আলো ছড়িয়ে যায়,
যেন পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলো
অন্ধকার নদীর জলে নিঃশব্দে দুলে ওঠে।

তোমার কাছে দাঁড়ালে
দেহের ভেতর জেগে ওঠে অদ্ভুত এক স্পন্দন,
যেন লাজুক কোনো লতা
মলয় বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে
প্রিয় বৃক্ষের বুকে আশ্রয় খোঁজে।

তোমার চুলের গন্ধে
রাত্রি হয়ে ওঠে আরও গভীর,
তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়
আমার সমস্ত সত্তা জেগে ওঠে
অজানা এক মধুর আকাঙ্ক্ষায়।

তুমি যখন খুব কাছে এসে দাঁড়াও
মনে হয় সময় থেমে গেছে,
শুধু হৃদয়ের ভিতরে
একটি গোপন আগুন জ্বলে,
যার শিখায় জড়িয়ে থাকে
তোমার মায়াময় শরীরের স্বপ্ন।

সত্যি বলছি,
তোমার এই মাধুরী, এই মোহময় রূপ
আমার সমস্ত বোধকে বন্দী করেছে,
আমি প্রতিদিন নতুন করে
তোমার প্রেমে হারিয়ে যাই।

আর যদি কখনো
এই জীবনের সব পথ শেষ হয়ে যায়,
তবু আমি চাই -
তোমার মধুর আলিঙ্গনের ভেতর
এক অনন্ত বসন্ত হয়ে
চিরদিন উন্মুখ হয়ে থাকতে।


২.     যে মেয়েকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে


যে মেয়েটি প্রেমিকের সাথে ঝগড়া করে
হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে,
তারপর নাক চোখ লাল করে
ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে -
সরি, আর রাগ করো না প্লিজ…
আর হঠাৎই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে,
সেই মেয়েটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি অভিমানে চুপ করে থাকে,
কিন্তু একটু আদর পেলে
হঠাৎ শিশুর মতো কোমল হয়ে যায়
মুঠোফোনের ওপাশে মৃদু কণ্ঠে বলে,
তুমি না থাকলে আমার একদম ভালো লাগে না…
সেই মেয়েটাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি বৃষ্টির দিনে জানালায় দাঁড়িয়ে
অকারণে ভিজতে চায়, আর বলে -
চলো না, আজ পৃথিবীটাকে একটু ভিজিয়ে দেখি,
তার চোখে জমে থাকা
অদ্ভুত মায়া আর দুরন্ত স্বপ্ন দেখে
ভীষণ করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

যে মেয়েটি রাগ করে দূরে সরে যায়,
তবু একটু ডাকলেই ফিরে এসে
বুকের ভেতর মাথা রাখে -
যেন পৃথিবীর সব ঝড়ের
একটাই নিরাপদ আশ্রয় আছে।

হ্যাঁ,
এমন অদ্ভুত, সরল, মায়ামাখা
অল্প রাগী, অল্প বোকা, অল্প শিশুসুলভ 
এক মেয়েকে -
ভীষণ করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।


৩.     একাকীত্বের বাঁকে


তুমি চলে গেছ এইজন্য কোনো অনুযোগ নেই
শুধু খারাপ লাগবে তখন -
বুড়িগঙ্গার নদীর কূল, রেসকোর্সের দীঘিরপাড়,
বোটানিক্যাল গার্ডেনের ঝাউতলা, দিয়াবাড়ির কাশবন,
ওরা সবাই আমাকে একা দেখলে হাসবে,
পরিহাস করে বলবে - 
একলা মানুষ একা একা কেমন লাগে!

তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা যে চা খেয়েছিলাম
শিশুপার্কের সামনে, সেই গরম কাপের গন্ধ এখনও মিশে আছে বাতাসে।

শীতের বিকেলে হেঁটে হেঁটে আমরা যে আকাশ দেখেছি,
নীল রোদে ভেজা পাখির গান শুনেছি
আজ সেগুলো একাকী মনে পড়ে,
আর চোখের কোণ ঝাপসা হয়ে আসে, অচেনা নদীর মতো।

তুমি একবার বলেছিলে - এই পথটাতে আবার আমরা একসাথে হাঁটব,
আজ সেই কথার প্রতিটি শব্দ আমার কানে বাজে
যেন বাতাসের সাথে ভেসে আসা পুরোনো গান।

স্মৃতির পাতায় আঁচড় খায় আমার মন,
কাছে কেউ নেই, শুধু আমার ছায়া, এবং হাহাকার,
ছায়াবীথির ধুলোমাখা বেঞ্চে বসে
আমি তোমার না থাকা অনুভব করি --
হৃদয়ের গহীনে যে মায়া জমেছে, 
তাকে শুধু দম দিয়ে রাখি, নদীর কূল, দীঘির পাড়, 
নির্জন পথ- কাউকে কিছু বুঝতে দিই না।


৪.     সেদিনের বৃষ্টি


একদিন আমরা  ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজব
যেদিন আমাদের জন্য আকাশ কালো করে 
নামবে মুশল ধারায় বৃষ্টি।

শহরের ভিড় তখন দূরে সরে যাবে,
রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা হয়ে
জলরঙে আঁকা ছবির মতো কাঁপবে-
আর তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে
আমার খুব কাছাকাছি।

তোমার ভেজা চুলের ফাঁকে
জলবিন্দু জমে থাকবে ছোট ছোট স্বপ্ন হয়ে,
আমি নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে
সেই স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে দেখব।

তখন হয়ত তুমি হেসে বলবে
আজ বৃষ্টি শুধু আমাদের জন্যই নেমেছে।
আর আমি ভাবব -
এই পৃথিবীতে যত নদী, যত আকাশ,
সবই বুঝি এমন মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে।

আমরা হাঁটব ধীরে ধীরে,
জলভেজা রাস্তায় পায়ের শব্দ তুলে,
বুকের ভিতর জমে থাকা ভালোবাসা
বৃষ্টির মতো ঝরে পড়বে নীরবে।

সেদিন কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না -
শুধু কালো আকাশ আর বৃষ্টি জানবে,
দুজন মানুষ ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে
একটা ছোট পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছিল
অঝোর ধারায় বৃষ্টির ভিতর। 


৫.     নিয়মভাঙা রাত


চলো,
ভুল করে নিয়ম ভাঙার পথে হেঁটে যাই দুজনে
যেখানে পৃথিবীর সব বিধি
আমাদের নিঃশ্বাসের কাছে হার মানে।

তোমার বুকের যে ক্ষতগুলো
অভিমান হয়ে জমে আছে বহুদিন,
আমি সেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি -
চুমুর উষ্ণ ঔষধে
ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলি প্রতিদিন।

তুমি চোখ বন্ধ করলেই রাত একটু 
বেশি গাঢ় হয়,
আমার আঙুলের স্পর্শে তোমার কাঁপা নিঃশ্বাস
অদ্ভুত এক আগুন হয়ে জ্বলে রয়।

চলো,
ভুল করে নিয়ম ভাঙার পথে আবার হাঁটি
উন্মাদ বাতাসে ঝাপটে ধরি একে অপরকে,
তোমার কাঁধে এলিয়ে পড়ে শুনি
হৃদয়ের গোপন সুর।

তোমার শীৎকারে জেগে ওঠে রাত,
জানলার বাইরে থেমে থাকে চাঁদের আলো,
আমরা দুজন -
ভালোবাসার উষ্ণতায়
ভেঙে ফেলি সব নীরবতার তালা।

শেষে ক্লান্ত হয়ে
তোমার বুকের বাঁ পাশে মাথা রাখি
যেখানে রোজ একটু ব্যথা জমে,
সেখানে আমি প্রগাঢ় ভালোবাসা হয়ে
নিঃশব্দে জড়িয়ে থাকি।

চলো,
এই ভুলের পথেই হাঁটি আরও দূর
কারণ কিছু ভুলই
সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা হয়ে থাকে। 


৬.     হারিয়ে যাওয়ার গল্প


যারা ছেড়ে যায়, তারা আসলে কখনোই ছিল না
তাদের চোখে ছিল সাময়িক রোদের মতো উষ্ণতা,
কিছু কথার মায়া, কিছু প্রতিশ্রুতির ছায়া-
তারপর একদিন তারা হাওয়ার মতো সরে যায় 
যেন পথের ধুলো, হালকা ছোঁয়ায় উড়ে যায় দূরে।

কিন্তু যারা সত্যিই থাকার জন্য এসেছিল,
তারা কখনো বিদায়ের শব্দ শেখেনি 
তারা শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সময়ের ভেতর,
পুরোনো চিঠির গন্ধে, কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে,
অথবা নিঃসঙ্গ রাতের দীর্ঘশ্বাসে।

তখন মনে হয় কেউই সত্যি ছেড়ে যায় না, 
সে থেকে যায় স্মৃতির ম্লান আলো হয়ে,
একটা নামহীন অনুভূতির মতো বুকের গভীরে,
যেখানে হারিয়ে যাওয়াই হয়ত থেকে যাওয়ার 
সবচেয়ে মায়াময় রূপ।


৭.    দার্জিলিংয়ের ভোর 


ডিসেম্বরের দার্জিলিংয়ের সেই ভোর
টয়ট্রেনের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে
গরম চায়ের ধোঁয়া উঠতে উঠতে
আঙুলে জড়িয়ে থাকত কুয়াশা
আর তোমার ঠোঁটের কাছে জমে থাকত
অকথিত চুমুর উষ্ণতা।

মনে পড়ে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটা,
মল রোডের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে থাকা,
দূরে মেঘের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা
কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপালি নীরবতা,
তুমি বলেছিলে,
পাহাড়ের নীরবতাও কখনো কখনো প্রেমে পড়ে।

মনে পড়ে সন্ধ্যার বাতাস,
চায়ের দোকানে ভেসে আসা দার্জিলিং টি-র গন্ধ,
শীতের কাঁপুনি আর তোমার উষ্ণ হাত,
আর টয়ট্রেনের সেই ধীর হুইসেল,
যেন বিদায়ের আগে
আমাদের গল্পটাকে একটু দীর্ঘ করতে চাইছিল।

আজও কখনো শীতের ভোর নামলে
মনে হয় পাহাড়ের কোনো স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি
হাতে ধোঁয়া ওঠা চা, চারপাশে কুয়াশা,
আর স্মৃতির ভিতর তোমার সেই চুমু
নিঃশব্দে আবার ফিরে আসে।


৮.     মায়াবতী, যেও না


এখনো অনেক কবিতা লেখা বাকি
অলিখিত পৃষ্ঠায় ঘুমিয়ে আছে শব্দেরা,
তোমার চোখের ভেতর যে নীল আকাশ দেখি
তারও তো অনেক অনুবাদ বাকি।

বাকি আছে অসমাপ্ত কিছু ছবি
রঙতুলির ডগায় কাঁপে অনন্ত বিকেল,
তোমার চুলে জড়িয়ে থাকা বাতাসটুকু
ক্যানভাসে ধরার চেষ্টা এখনো শেষ হয়নি।

চারাগাছগুলো বনানী হতে
অনেক অনেক ঋতু বাকি
শিশিরভেজা ভোরের ভিতর দিয়ে
তাদের স্বপ্নগুলোকে দেখতে হবে আমাদেরই।

মায়াবতী , এখন কি তবে যাবার সময়?
এখনো তো হেমন্তের ঘাসের উপর
দুজনের পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়া বাকি,
কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা ভোরে
তোমার হাতের উষ্ণতা খুঁজে নেওয়া বাকি।

বাকি আছে রাত্রির তারা খসা
নিস্তব্ধ আকাশের বুক চিরে
হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলো দেখে তোমার নামে 
একটি গোপন প্রার্থনা করা বাকি।

বিদ্যুতের বারুদ আলোয়
অচেনা পৃথিবী দেখা বাকি
ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে
আমাদের হৃদয়ের আগুন চিনে নেওয়া বাকি।

এই সময় যেও না মায়াবতী
এসো, অনাদিকালের সাথে মগ্ন হয়ে থাকি,
সময়ের স্রোত থেমে যাক
আমাদের দুজনের নিঃশ্বাসের মাঝখানে।

দেখবে,
আমাদের সেই স্বপ্নমগ্নতা
নক্ষত্রের সিঁড়ি বেয়ে উঠবে ধীরে ধীরে,
ছায়াপথ ছাড়িয়ে অচেনা কোন আলোর দেশে
আমাদের নামে লিখা হয়ে যাবে এক 
অনন্ত প্রেমের গল্প । 


৯.     একটা জনমের অপেক্ষা 


একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার নামের পাশে আমার অপেক্ষা রয়ে গেল অমলিন।

সময় তার ক্যালেন্ডার বদলেছে বহুবার,
কিন্তু আমার দিনগুলো এখনো তোমার দিকেই 
তাকিয়ে থাকে।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার স্মৃতিরা আমার ভেতরে নদীর মতো 
বয়ে যায়,
কখনো নিঃশব্দে, কখনো জোয়ারের মতো অস্থির হয়ে।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু তোমার জন্য রেখে দেওয়া কিছু বিকেল আছে,
কিছু অকারণ দীর্ঘশ্বাস,
আর আছে অচেনা আকাশের নিচে তোমাকে ভাবার একান্ত অধিকার।

একটা জনম শেষ হয়ে গেল, তোমাকে পাওয়া হলো না,
তবু মনে হয়, এই না-পাওয়াটাই যেন এক অদ্ভুত প্রাপ্তি,
কারণ তোমাকে না-পাওয়ার মধ্যেই
আমি শিখেছি ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে।

হয়তো আরেকটা জনম আসবে -
সেখানে কোনো ভুল সময় থাকবে না,
কোনো দূরত্ব থাকবে না।

সেদিন হয়তো বলবো -
এই জনমে তোমাকে পেয়েছি, আর হারাতে চাই না।


১০.     গোপনের তুমি


যাকে গোপনে ভালোবেসেছিলাম সে গোপনেই 
থেকে গেল,
তার সাথে মিলনও হলো না,
বিচ্ছেদও হলো না,
শুধু হৃদয়ের এক গোপন কোণে
তার জন্য একটা আলো জ্বলে রইল।

কেউ জানল না তার নাম,
কেউ শুনল না তাকে ডাকার আমার গোপন স্বর,
শুধু রাতের তারা আর জানালার বাতাস
জেনে গেল আমার গোপন ভালোবাসার গল্প।

তাকে ছুঁইনি কোনোদিন,
তবু কত অকারণ বিকেলে মনে হয়েছে
তার হাতটা আমার হাতেই আছে
যেন অদৃশ্য কোনো পথ ধরে
আমরা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি।

সে ছিল আমার জীবনের সেই কবিতা
যা কখনো লেখা হয়নি পুরো,
শুধু কয়েকটা অসমাপ্ত লাইন
ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে ঘুমিয়ে আছে।

যাকে গোপনে ভালোবেসেছিলাম সে গোপনেই 
থেকে গেল,
তাই আমাদের গল্পে কোনো বিদায়ের শব্দ নেই,
কোনো ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিও নেই,
শুধু এক অদ্ভুত মায়া আছে
যা সময় পেরিয়েও নীরবে বেঁচে থাকে।


১১.    চন্দনের শেষ গন্ধ


চন্দনের গন্ধ মাখা চিতার উপর
যখন মুখে আগুন দেওয়া হয়
তখন কি সত্যিই পুড়ে যায় সেই মুখ,
যে মুখ একদিন স্নিগ্ধ আলোয়
কারও নাম ধরে ডেকেছিল।

সেই চোখ কি সত্যিই নিভে যায়
যে চোখ একদিন সন্ধ্যার আকাশের মতো
প্রিয় মানুষের দিকে চেয়ে থাকত,
আগুনের ভেতর কি হারিয়ে যায়
তার সবটুকু অপেক্ষা?

তার ঠোঁট কি আর খোঁজে না
অপর এক জোড়া ঠোঁটের উষ্ণতা
যেখানে একদিন জমা ছিল
অগণিত অনুচ্চারিত আদর।

নাকি আগুনের পরেও
কোথাও থেকে যায় একটু আলো,
কোনো অদৃশ্য বাতাসে ভেসে থাকে
চন্দনের গন্ধের মতো স্মৃতি।

যেখানে মৃত মানুষটিও
শেষবারের মতো ফিরে তাকায়,
আর প্রিয় মানুষটি বুঝতে পারে -
ভালোবাসা আসলে
কখনোই পুরোপুরি পুড়ে যায় না। 


১২.     একদিন ভালোবাসা 


একদিন সমস্ত অপেক্ষা এসে তোমার দরজায় বসে থাকবে।
একদিন সমস্ত পথ শেষ হয়ে গিয়ে তোমার হাতেই মিশে যাবে।
একদিন সমস্ত নীরবতা চোখের ভেতর কথা বলতে শিখবে।

একদিন সমস্ত চাঁদ জানালার ধারে এসে বলবে -
আজও কি তাকে মনে পড়ে?

একদিন সমস্ত বাতাস তোমার চুলে মুখ লুকিয়ে
আমার নাম উচ্চারণ করবে ধীরে।
একদিন সমস্ত দূরত্ব ক্লান্ত হয়ে
আমাদের মাঝখানে ভেঙে পড়বে।

একদিন সমস্ত রাত তারাগুলো গুনে গুনে বলবে -
ভালোবাসা আসলে হারিয়ে যায় না।

একদিন সমস্ত অভিমান ঘুমিয়ে পড়বে
তোমার কাঁধে মাথা রেখে।
একদিন সমস্ত স্পর্শ নতুন করে আবিষ্কার করবে
মানুষের হৃদয়ের গোপন ভাষা।

একদিন এইসব হবে বলেই
এখনও জানালায় চাঁদের আলো নামে,
এখনও বাতাসে তোমার গন্ধ ভেসে আসে,
এবং এখনও
ভালোবাসার কবিতা লেখা হয়।


১৩.     অচেনা সমীকরণ


কে যে কখন কার হয়
কে যে কাকে ছেড়ে চলে যায়
কে যে কাকে মনে রাখে
কে যে কাকে চিরতরে ভুলে যায়।

জীবন যেন এক অচেনা সমীকরণ,
যেখানে উত্তরগুলো কখনো মেলে না।

কে যে কার অপেক্ষায় জানালা খোলে
কে যে কার জন্য নীরবে দরজা বন্ধ করে,
কে যে কার নাম লিখে রাখে বৃষ্টির কাচে
কে যে কার নাম মুছে দেয় এক ফুঁয়ে।

কে যে কার স্বপ্ন হয়ে আসে নিঃশব্দে
কে যে কার ঘুম ভেঙে দিয়ে হারিয়ে যায়,
কে যে কার চোখে রেখে যায় নীল বিষাদ
কে যে কার বুকভরা আলো হয়ে রয়।

কেউ আসে অল্প দিনের অতিথি হয়ে,
কেউ থেকে যায় সারাজীবনের মতো -
তবু শেষমেশ বোঝা যায়,
মানুষের হৃদয়টাই পৃথিবীর সবচেয়ে
মায়াময় আর অদ্ভুত রহস্য।


১৪.     ভালোবাসার নাম


মর্মমূলে গেঁথে আছে অদৃশ্য বজ্রের দাগ,
তার নাম ভালোবাসা।
কাঁটাঝোপের আঁচড়ে যেমন রক্তিম হয় পথ,
তেমনি ব্যথায় জ্বলে ওঠে শরীর
তবু তাকে ডাকি, ভালোবাসা।

দাদীমা বলতেন -
যে নিভে যাওয়া সন্ধ্যার ভেতর
এক মুঠো জোনাকি জ্বালিয়ে দেয়,
অন্ধ ঘরের কপালে
চাঁদের আলোয় আলতা পরে দেয় পায়ে 
তারই নাম ভালোবাসা।

যে নদী শুকিয়ে গেলেও
এক ফোঁটা জলের স্বপ্ন দেখে,
যে রাত জেগে থাকে কারও পথ চেয়ে
তারও নাম ভালোবাসা।

যে বুকের ভেতর আগুন জ্বলে
তবু ঠোঁটে থাকে শিশিরের মতো স্বচ্ছ হাসি,
যে হারিয়েও ফিরে আসে
একটি নামের ভেতর বারবার
তারই নাম ভালোবাসা।

পৃথিবীর সব কষ্ট, সব আলো, সব অপেক্ষা
এক জায়গায় এসে যদি দাঁড়ায়,
মানুষ তাকে ডাকে একটি মাত্র নামে -
ভালোবাসা।


১৫.      আবদুর রহমান 


আবদুর রহমান আমার সহপাঠি বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
ওর খাতার পাতায় থাকত ধুলোর গন্ধ,
মাঠের ঘাসের দাগ,
আর আঙুলে লেগে থাকত কাদামাটির স্বপ্ন।

রোজ ভোরে উঠে সে যেত বাবার সঙ্গে জমিতে,
তাই ক্লাসে এসে মাথা নামিয়ে বসে থাকত,
যেন ধানক্ষেতে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে
ওর চোখের ভিতর দিয়ে।

মেট্রিক পেরিয়ে তার পথ থেমে গিয়েছিল
একটা ভাঙা সেতুর মতো,
তারপর একদিন দেখলাম, পড়াশোনা বাদ দিয়ে  সে কামলা হয়ে গেছে,
দুপুরের রোদে পুড়ে পুড়ে
তার চামড়া হয়ে উঠেছে মাটির মতো শক্ত,
তবু চোখে ছিল শীতল জল
যেন ভোরের শিশির এখনো মরতে শেখেনি।

একদিন শুনলাম, যমুনার চরে কাশ কাটতে গিয়ে
ফিরে আসেনি আবদুর রহমান।
লোকজন বলল, দূর্বৃত্তরা তাকে মেরে
নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে
যেন একটা নাম, একটা জীবন,
এভাবে সহজেই মুছে ফেলা যায়।

আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে বেঁচে রইলাম,
এক আবদুর রহমান ছাড়া,
সে এখন নিঃশব্দে মিশে আছে যমুনা নদীর 
অতল জলের গভীর অন্ধকারে,
যেখানে আলো পৌঁছায় না,
শুধু কান্না জমে থাকে।

কখনো কখনো মনে হয়,
যমুনার জলে কোনো রূপালি মাছ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে
তার চোখে কি একটু চেনা বিষণ্ণতা থাকে?
নাকি সেটাও কেবল আমার ভুল দেখা
কারণ কিছু মানুষ হারিয়ে গেলে
তারা আর ফিরে আসে না,
শুধু থেকে যায় অদৃশ্য শূন্যতার মতো।

এখনও বিকেলের দিকে কাশফুল দুলতে 
থাকলে আমি থেমে যাই -
ওই সাদা ঢেউয়ের ভেতর
মনে হয় কেউ হেঁটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে,
হয়তো সে-ই, আবদুর রহমান।


১৬.     স্মৃতির মায়া


তোমাকে ভুলে থাকা যায় না
যেমন ভোরের শিশির ভুলে না ঘাস
যেমন নদী ভুলে না তার উৎসের প্রথম কান্না।

তোমার সাথে কাটানো সময়গুলো
এখনও মনের আঙিনায় রোদ হয়ে নামে,
কখনও আবার বৃষ্টির মতো ছুঁয়ে যায়
অকারণেই ভিজে ওঠে ভেতরটা।

যে বিকেলে তুমি হেসেছিলে,
সে হাসি আজও সন্ধ্যার পাখিদের ডানায় বাজে;
যে নীরবতায় আমরা পাশাপাশি ছিলাম,
সে নীরবতা এখনো কথা বলে একা ঘরে।

ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি
কিন্তু স্মৃতিরা বড় অবাধ্য,
তারা তোমার নাম ধরে ডাকে
ঠিক তখনই, যখন সবচেয়ে বেশি ভুলতে চাই।

তাই বুঝে গেছি -
তোমাকে ভুলে থাকা নয়,
তোমাকে নিয়েই বেঁচে থাকা শিখতে হয়
মায়ার মতো, অদৃশ্য অথচ অনিবার্য।


১৭.     ফিরে পাওয়া 


লাবণ্যকে হারিয়ে
যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম শূন্যতার রং,
সেদিনই বনলতা এসে
চোখে চোখ বলেছিল আমার আছে
সবুজ আশ্রয়।

তার কণ্ঠে ছিল বিকেলের হাওয়া,
তার চুলে ছিল অচেনা বনভূমির গন্ধ
আমি ভেবেছিলাম,
এবার বুঝি দুঃখেরও শেষ আছে।

কিন্তু মানুষ তো ক্ষণিকেরই আলো,
বনলতাও একদিন
অলক্ষ্যে মিশে গেল অনন্তলোকে
যেন হঠাৎ নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো।

সেদিন থেকে আকাশটা আর নীল নয়,
রাতগুলো শুধু দীর্ঘশ্বাসে ভেজা
কোনো মাধবীলতা এসে আর বলে না -
আমি তো আছি তোমার পাশে। 

এখন আমি শুধু পথ হেঁটে যাই,
হারানোর নামগুলো বুকের ভেতর নিয়ে
লাবণ্য, বনলতা…
আর এক নিঃশব্দ অপেক্ষা,
যেখানে কেউ আর ফিরে আসে না।


১৮.      ফিরে যাও


হে জাগ্রত হৃদকমল, থেমে যাও ক্ষণিক,
মূলে ফিরে যাও, নীরবতার গভীরে
নিজের আলোর কাছে ফিরে যাও,
দুটি চোখের ভেজা জানালায়,
আঙুলের স্পর্শে ফিরে আসো ধীরে।

ভুলে যাওয়ার ধুলোমাখা পথে
নুয়ে পড়ে কুড়িয়ে নাও স্মৃতির কাঁটা একে একে,
যত ব্যথা ছিল, সবটুকু তুলে নাও বুকে
তবু ভালোবাসা যেন ফুরোয় না।

অসীম আকাশের মুঠোয়
এই ক্ষুদ্র হৃদয়টুকু তুলে দাও,
যেখানে অল্পতেই জন্ম নেয় অনন্ত-
আর তোমার নামেই জেগে থাকে ভালোবাসা।


১৯.      অধিকারহীন স্পর্শ


মনোরমা এসেছিল তার শরীর নিয়ে,
স্পর্শে ছিল উষ্ণতা,
তবু কোথাও এক শীতল দূরত্ব,
আমি ভেবেছিলাম এটাই প্রেম,
তার চোখের ভাঁজে লুকানো কথা
আমাকে ডাকে অবিরত।

কিন্তু হঠাৎ বুঝি
তার দেহ আমার কাছে ঋণী,
আর হৃদয়?
সে তো অন্য কারও গোপন ভাণ্ডার।

তার স্পর্শের স্মৃতি রয়ে যায় আগুন হয়ে,
নিজেকেই মনে হয় অচেনা, দূরের কেউ
আর তার সুবাস ভেসে আসে
অধিকারহীন এক ভালোবাসার মতো।


২০.      অনুপস্থিতির ভিতর তুমি


তোমাকে না দেখেও প্রতিদিন দেখি,
জানালার কাঁচে জমে থাকা কুয়াশায়,
অথবা সন্ধ্যার আলোয়
যেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে
তোমার মতো।

তোমার নাম উচ্চারণ করি না,
তবু শব্দেরা জানে
কার দিকে উড়ে যেতে হয়,
একটা নিঃশ্বাসের ভিতর
লুকিয়ে রাখি অগণিত ডাক,
শুধু তুমি শুনবে বলে।

ভালোবাসা কি তবে এমনই -
যেখানে পাওয়া নেই,
তবু হারানোও অসম্ভব?
যেখানে দূরত্ব মানে
আরও গভীর হয়ে ওঠা কাছে আসা?

রাত নামলে মনে হয় -
তুমি ঠিক পাশেই আছো,
অন্ধকারের আড়ালে বসে
আমার নীরবতা ছুঁয়ে দাও।

আমি হাত বাড়াই,
স্পর্শ পাই না,
তবু আঙুলে লেগে থাকে
একটা উষ্ণ অনুপস্থিতি।

তোমাকে হারাইনি কখনো,
কারণ তুমি তো ছিলেই না সম্পূর্ণ,
তুমি ছিলে -
আমার ভিতরে জন্ম নেওয়া
এক অনন্ত মায়া।


২১.     অকথিত ভালোবাসা 


তোমার সাথে দেখা হলো
দূরত্বটা ছিল হাতের মতোই কাছে,
তবু শব্দেরা পথ হারালো,
চোখ দুটোই শুধু কথা বলে গেল নিঃশব্দে।

সম্পর্কই কি সব?
নাম, পরিচয়, বাঁধন -
এইসবের ভেতরেই কি ভালোবাসা বাস করে?

নাকি সে জন্মায় অচেনা কোনো মুহূর্তে,
যেখানে কেউ কারও কিছুই নয়,
তবু সবকিছু হয়ে ওঠে?

তুমি যখন স্ত্রী ছিলে, 
ভালোবাসা ছিল, নিশ্চয়ই ছিল -
রুটিনের ভিতর, দায়িত্বের নিঃশ্বাসে,
চেনা স্পর্শের অভ্যেসে লুকানো।

আর এখন?
এখন তুমি শুধু তুমি -
কোনো সম্পর্কের সংজ্ঞায় আবদ্ধ নও,
তবু তোমার এক ঝলকেই
মনের ভেতর জেগে ওঠে পুরোনো বসন্ত।

ভালোবাসা কি হারিয়ে যায়?
না কি শুধু তার রূপ বদলায়, 
একসময় ছিল অধিকার,
এখন সে শুধুই স্মৃতি আর মায়া,
একটা ম্লান আলো
যা নিভে যায় না, শুধু দূরে সরে থাকে।

তোমার সাথে দেখা হলো-
কথা হলো না,
তবু মনে হলো -
অকথিত এই নীরবতাই
সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার ভাষা।


২২.      চোখের চাহনিতে 


চোখের চাহনিতেই সে বলে দিয়েছিল, এসো,
আমি তখনও শব্দ খুঁজে পাইনি,
শুধু হৃদয়ের ভেতর কাঁপছিল কোমল এক সুর।

তার চোখে ছিল সন্ধ্যার আলো,
যেন গোধূলির রঙ মেখে ডেকে নিচ্ছে নিঃশব্দে -
আমি হেঁটে গেলাম,
অচেনা পথও তখন পরিচিত মনে হলো।

কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না,
ছিল না কোনো লিখিত ভালোবাসা,
তবু তার দৃষ্টির ভাঁজে ভাঁজে
লুকিয়ে ছিল এক অনন্ত আশ্রয়।

হাত ছুঁইনি, তবু স্পর্শ লেগেছিল,
কথা বলিনি, তবু কথা হয়েছিল 
নীরবতারও যে ভাষা আছে,
সে-ই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।

আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি
সেই ডাক, সেই মায়া, সেই প্রথম ‘এসো’,
যেখানে ভালোবাসা জন্ম নেয়
একটি চাহনির মধ্যেই।


২৩.      অপূর্ণ ফিরে দেখা


মনে পড়ে, ঢাকার ধুলোভরা বিকেলে
ক্লান্ত শরীর, অথচ অদ্ভুত এক আলো
মনের ভেতর জেগে উঠত নিঃশব্দে।

টিকিটের জন্য হাহাকার,
মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নাম,
দমবন্ধ বাসের ভেতর
ঘামে আর দীর্ঘশ্বাসে লেখা হতো
ফিরে যাওয়ার এক অনিবার্য কবিতা।

জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে 
দেখতাম -
পেছনে পড়ে যাচ্ছে শহর,
আর সামনে খুলে যাচ্ছে
শৈশবের ধূসর দরজা।

কত ক্লান্তি, কত বিরক্তি, তবুও হৃদয়ের গভীরে
কেউ যেন ফিসফিস করে বলত,
আর একটু পথ,
ওপারে আছে তোমার সমস্ত ভালোবাসা...।

মা হয়তো উঠোনে দাঁড়িয়ে,
চোখে জমে থাকা সন্ধ্যার আলো
বাবা দরজার পাশে নীরব,
তার অপেক্ষা শব্দহীন, অথচ গভীর।

পাড়ার সেই পথ,
ধুলোর ভেতর লুকানো ছেলেবেলা,
সব যেন কুয়াশার মতো এসে
ছুঁয়ে যেত ক্লান্ত মন।
বন্ধুদের ডাকে ভেসে আসত
হারিয়ে যাওয়া দিনের হাসি,
সব মিলিয়ে এক অন্য রকম পৃথিবী।

এখনো ঈদ আসে-
আলো জ্বলে, ভিড় হয়, মানুষ ছুটে,
কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে
সেই কষ্টের ভেতর লুকানো আনন্দ,
সেই পথচলার নিঃশব্দ উল্লাস।

এখন আর ভিড় আমাকে টানে না,
টানে না দীর্ঘ যাত্রা,
তবুও হঠাৎ কোনো সন্ধ্যায়
হৃদয় ভেঙে ভেঙে বলে ওঠে,
ফিরে যাই… কিন্তু জানি -
ফিরে যাওয়া আর হয় না আগের মতো,
কারণ সময় শৈশবকে নিয়ে গেছে দূরে,
আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি
নিজেদেরই অচেনা প্রান্তে।

তবুও, মায়ের আঁচলের গন্ধ, বাবার নীরবতা,
আর সেই ঈদের ভিড় -
সব মিলিয়ে এখনও বুকের ভেতর
নিঃশব্দে কাঁদে
একটি পুরোনো, অপূর্ণ ফিরে দেখা।


২৪.      চোখের তারার ভিতর 


হে আমার প্রিয়তমা,
তোমার চোখে আমি দেখেছি এক জ্যোৎস্নার দেশ
যেখানে স্বপ্নেরা জেগে থাকে
নিভৃত রাতের মতো গভীর।

তোমার দৃষ্টির ভেতরে
আমার ভালোবাসা আশ্রয় খোঁজে,
যেমন পথহারা নৌকা
নদীর বাঁকে খুঁজে পায় ঘাট।

আমি তোমাকে ভালোবাসি
যেমন মেঘ ভালোবাসে বৃষ্টির ভার,
যেমন কিশোর বাতাস ভালোবাসে কাশফুলের দোলা,
অথবা এক নিঃশব্দ প্রদীপ ভালোবাসে অন্ধকারকে ভেঙে দিতে।

তুমি আমাকে দিয়েছ জীবনের উচ্ছ্বাস,
হৃদয়ে জ্বেলে দিয়েছ আলোর স্পন্দন,
তাই আমি তোমাকে ভালোবাসি -
আমার সমস্ত স্পন্দন, সমস্ত সত্তা দিয়ে।

আমার আনন্দ যদি তোমার চোখে প্রশান্তি হয়ে নামে,
তবে সেই প্রশান্তির ছায়াতেই আমি থাকব,
নিঃশব্দে, অনন্তকাল, তোমার চোখের তারার ভিতর।


২৫.      হারানোর পরে পাওয়া 


যখন তোমার হাত ছেড়ে দিলাম,
তখনই বুঝলাম -
ওই উষ্ণ আঙুলে জড়িয়ে ছিল
আমার সমস্ত নিশ্চিন্ততা।

তুমি ছিলে আশ্রয়,
ঝড় এলে যে বুকে টেনে নেয়
আমি তা বুঝিনি,
বুঝতে চেয়েও বুঝিনি,
কারণ তখন তুমি ছিলে আমারই।

কতো মানুষ প্রার্থনায় ভিজে যায়,
কতো রাত তারা চোখ মেলে রাখে
একটুখানি ভালোবাসার ছোঁয়ার আশায়,
একফোঁটা নির্ভরতার জন্য।

আর আমি -
পেয়েও হারালাম তোমাকে,
যেন মুঠোভরা আলো
নিজের অজান্তেই ফেলে দিলাম অন্ধকারে।

এখনও হাত বাড়ালে শূন্যতা পাই,
তবু মনে হয়,
তোমার সেই স্পর্শ কোথাও রয়ে গেছে,
আমার ভেতরের নীরব প্রার্থনায়।

হয়তো একদিন -
তোমার ছায়া মিশে যাবে আমার নিঃশ্বাসে
আর আমি ধীরে ধীরে শিখে নেবো,
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়,
কখনো কখনো হারিয়েও
অন্তরে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।


২৬.      আম্রপালির দহন


আম্রপালি, নামটা শুনলেই যেন ফোটে 
ফুলের মতো মুখ,
চোখে নীল ভোরের আভা,
হাসিতে ঝরে বসন্তের রোদ।

তবু তার নিয়তি লিখে দেওয়া ছিল
সে কারও হবে না, সবার হবে।
কে ঠিক করেছিল এই বিধান?
কে মেপেছিল তার সৌন্দর্য,
আর বলেছিল -
এ সৌন্দর্য এক জনের নয়।

আম্রপালি তখনও মানুষ ছিল,
তারও ছিল স্বপ্ন,
কারও কাঁধে মাথা রেখে
একটি সন্ধ্যা পার করার,
একটি নাম ধরে ডাক শোনার,
একটি ঘরের ভেতর
নিজেকে সম্পূর্ণ করে রাখার।

কিন্তু তাকে বানানো হলো উৎসব,
একটি প্রদর্শনী,
একটি চোখের লোভ
যেখানে ভালোবাসা নেই,
আছে শুধু দৃষ্টির ক্ষুধা।

প্রতিদিন নতুন মুখ, নতুন বিস্ময়,
নতুন দাবি,
আর তার ভেতর ভেঙে পড়ে
একটি নির্জন হৃদয়।

তার চোখে একদিন ছিল নদীর মতো স্বচ্ছতা,
আজ সেখানে জমে আছে অগণিত রাত -
অশ্রু শুকিয়ে গিয়ে হয়ে গেছে নোনাধরা স্মৃতি।

সে কি কখনও চেয়েছিল এ জীবন?
সে কি কখনও বলেছিল -
আমাকে সবার করে দাও, 
না,
সে শুধু চেয়েছিল -
একটি নাম ধরে ডাকা হোক তাকে,
একটি হাত ধরা থাকুক সারাজীবন,
একটি দরজা থাকুক
যেখানে ফিরে এসে বলতে পারে “আমি আছি।”
কিন্তু তার জন্য খোলা ছিল অসংখ্য দরজা,
আর কোনো ঘর ছিল না।

প্রতিটি সন্ধ্যায়,
আলোর নিচে তার রূপ জ্বলে ওঠে
মানুষ মুগ্ধ হয়,
তালির শব্দে ঢেকে যায় তার নিঃশব্দ কান্না।

রাত গভীর হলে সব আলো নিভে গেলে
আম্রপালি একা বসে থাকে,
নিজের ভেতরের ভাঙা আয়নার সামনে,
যেখানে প্রতিটি টুকরোতেই
একটি অসম্পূর্ণ ভালোবাসা কাঁদে।


২৭.     অপেক্ষা ভঙ্গ


অনিকা,
তোমার নামটা এখনো বুকের ভেতর
নিঃশব্দে কাঁদে -
যেন কোনো ভাঙা বেহালার সুর,
যার তার ছিঁড়ে গেছে,
তবুও থামেনি ব্যথার সংগীত।

মনে পড়ে, সেই বিকেলগুলো,
যখন রোদ হেলে পড়ত তোমার কাঁধে,
আর তুমি চুপচাপ চুল সরিয়ে বলতে -
এত দেরি করো না, হারিয়ে ফেলব তোমায়…
আমি হেসে বলতাম-
আরেকটু সময় দাও,
চাকরিটা হোক, তারপর—শুধুই তুমি…
সেই ‘তারপর’ আর এলো না।

মনে আছে,
আমাদের হাত ধরা পথগুলো 
নদীর ধারে বসে তোমার নীরবতা,
আমার অযথা স্বপ্ন বোনা,
চোখের কোণে জমে থাকা আলো
সবই ছিল এক ভবিষ্যতের অপেক্ষা।

তুমি বিশ্বাস করেছিলে,
আমি সময়ের ওপর ভরসা করেছিলাম
ভুলটা সেখানেই ছিল।

আজ শুনলাম, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে,
অন্য কারও নামে জড়িয়ে গেছে তোমার সকাল-সন্ধ্যা।

অনিকা,
তুমি কি একবারও ভেবেছিলে,
এই অপেক্ষা আমারও ছিল?
তোমার মতোই আমিও গুনতাম দিন,
তোমার মতোই আমিও চাইতাম
একটা ছাদের নিচে
দুটো স্বপ্ন পাশাপাশি বাঁচুক।

কিন্তু তুমি চলে গেলে সময়ের আগেই,
আমার সব ‘হবে’-র আগেই।

এখন রাতে ঘুম আসে না,
তোমার বলা ছোট ছোট কথাগুলো
তারার মতো জ্বলে,
আর আমি হারিয়ে যাই
সেই পুরোনো দিনগুলোর ভেতর।


২৮.      ত্রিশ বছরের দূরত্ব


শেষবার যখন হাত ছেড়েছিলে,
বয়সটা ছিল তরুণ -
চোখে তখনও ছিল রোদের ঝিলিক,
স্বপ্নেরা হাঁটত পাশাপাশি।

বয়স সাতাশের সেই বিকেলে
আমরা কেউ বুঝিনি 
বিদায় আসলে কত দীর্ঘ হতে পারে,
কত নিঃশব্দে গিলে ফেলে জীবন।

তারপর কেটে গেছে ত্রিশটি বছর,
কত ঋতু, কত মানুষ, কত অচেনা পথ,
তবু কোথাও জমে ছিলে তুমি,
অবিকল, এক বিন্দু অশ্রুর মতো।

যেদিন আবার দেখা হলো,
আমাদের চোখে বয়সের ছায়া,
কিন্তু ভেতরে সেই একই কাঁপন
অচেনা হয়ে ওঠার ভান করা পরিচয়।

বিদায়ের মুহূর্তে বলেছিলাম-
'আবার দেখা হবে কোনো একদিন,
হয়তো ত্রিশ বছর পর…'
কথাটা ছিল অর্ধেক স্বপ্ন, অর্ধেক মায়া।

তুমি তখন ধীরে, খুব ধীরে বললে -
'ত্রিশ বছর বাঁচব তো?'
তারও পরে, 'তুমি বাঁচবে?'
কথাগুলো ঝরে পড়েছিল নিঃশব্দে,
যেন সময় নিজেই থেমে গিয়েছিল,
আর আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম
দুই প্রান্তের অনিশ্চয়তায়।

তারপর বুঝলাম -
ভালোবাসা আসলে সময় মানে না,
শুধু অপেক্ষা জমিয়ে রাখে,
যতদিন না জীবন শেষ হয়ে যায়।

হয়তো আর দেখা হবে না,
হয়তো হবেও, কিন্তু সেই প্রশ্নদুটি
রয়ে যাবে অনন্তের ভেতর:
আমরা কি বাঁচব ততদিন?
নাকি ভালোবাসাটাই বেঁচে থাকবে -
আমাদের আগেই, আমাদের পরেও?


২৯.      করুণা করো না


যে মানুঢটি আমার স্বপ্নের মতো নয়
তবু সে আসে কখনও -
শীতের শেষ বিকেলের বাতাস যেমন
ধানক্ষেত পেরিয়ে
ক্লান্ত হয়ে থামে বকুলগাছের নিচে।

সে এসে নিঃশব্দে মাথা রাখে আমার কাঁধে
যেন বহু দূরের পথ পেরিয়ে আসা
এক নদী
সন্ধ্যার আলোছায়ায় ধীরে ধীরে থেমে গেছে।

আমি তাকে ফিরিয়ে দিই না
কারণ আমি জানি
অপেক্ষাহীন হাতের শূন্যতা কত দীর্ঘ,
জানি -
নক্ষত্রভরা কত রাত মানুষ কাটিয়ে দেয়
কোনো স্পর্শ না পেয়ে।

তার আঙুলের ক্লান্ত অস্থিরতা
যখন ছুঁয়ে যায় আমার নীরবতা
তখন মনে হয়
দূরের মাঠে রোদ্দুর নেমেছে;
শালিকেরা ধানের গন্ধে
নির্জন আকাশে উড়ে যায় ধীরে।

আমার ভেতরেও তখন
অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে
যেন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর
চাঁদের আলো হেঁটে যাচ্ছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি
যেমন কেউ
হাজার বছরের পুরোনো নক্ষত্রের দিকে
চেয়ে থাকে নিঃশব্দ বিস্ময়ে।

ভাবি, কবে সে এসে
ধানক্ষেতের বাতাসের মতো উদাস হয়ে
আমার কপালে হাত রাখবে;
কবে তার চোখে জেগে উঠবে
একটি ধীর, গভীর আকাঙ্ক্ষা -
যেখানে মমতা আর ভালোবাসা 
একই নদীর জলের মতো
অন্ধকারে বয়ে যায়।

ততদিন আমি প্রেমিকা নই
আমি শুধু করুণায় ভেজা এক নারী -
যার কাঁধে মাঝে মাঝে
ক্লান্ত কোনো মানুষের মাথা নেমে আসে
প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যার  মতো।


৩০.      জ্বরের দিনগুলো


এখনও জ্বর এলে
একজোড়া কোমল হাতের স্পর্শ খুঁজি,
বাটিতে সাগুদানা রেঁধে এনে বলছে 
খেয়ে নাও সোনা…।

কপালে আলতো হাত রেখে
মা জিজ্ঞেস করত
জ্বরটা কি একটু কমেছে?
আর সেই প্রশ্নের ভেতরেই
কেমন এক আশ্চর্য শান্তি নেমে আসত।

রাত গভীর হলে
চুপচাপ বসে থাকত মাথার পাশে,
মাঝে মাঝে ভেজা কাপড় কপালে চেপে দিয়ে
আস্তে বলত -
ঘুমিয়ে পড়ো, আমি আছি তো।

জানালার বাইরে তখন
বৃষ্টি নামত ধীরে ধীরে,
ঘরের ভেতর কেবল মায়ের হাতের উষ্ণতা
আর মৃদু কণ্ঠের স্নেহ
আমাকে জড়িয়ে রাখত।

আজও জ্বর এলে
ওইসব দিনের কথা মনে পড়ে -
মনে হয় দরজা খুললেই বুঝি
মা ঢুকবে নিঃশব্দ পায়ে,
হাতে ধোঁয়া ওঠা সাগুদানার বাটি,
চোখে সেই চেনা মায়া।

কিন্তু ঘর এখন নিঃশব্দ 
শুধু জ্বরের উত্তাপে আমি খুঁজে ফিরি
একজোড়া কোমল হাত,
যে হাত একদিন আমার সমস্ত 
অসুখের ওপর উপশমের আশীর্বাদ 
হয়ে নেমে আসত।


৩১.     শেষ আলিঙ্গন


চলেই যখন যাবে,
এসো শেষ আর একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরি,
বুকের ভেতর জমে থাকা অতৃপ্তিগুলো
একবার তোমার কাঁধে রেখে যাই।

হয়তো এই স্পর্শের পর
আমাদের পথ দু’দিকে বাঁক নেবে -
তবু এই ক্ষণিক উষ্ণতা
থেকে যাবে দীর্ঘ শীতের মতো জীবনে।

এসো, একটু কাছে দাঁড়াও,
তোমার চুলে যে পরিচিত গন্ধ
বহুদিন ধরে আমার নিঃশ্বাসে বাসা বেঁধে আছে
আজ শেষবারের মতো তাকে মনে রাখি।

চোখে চোখ রাখো,
যেন কিছু না বলেও
অনেক কথা বলে ফেলি -
যে কথাগুলো এতদিন
ভয়ের মতো বুকের ভেতর লুকিয়ে ছিল।

চলেই যখন যাবে,
এসো শেষ আর একবার তোমাকে জড়িয়ে ধরি,
যেন বিদায়ের মাঝেও
একটু ভালোবাসা থেকে যায় -
যেন অনেক বছর পরেও
কোনো এক মৌন সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে পড়ে - 
আমরা একদিন এভাবেই শেষবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।


৩২.     শেষ স্টেশনের আগে 


পরের স্টেশনেই আমি নেমে যাব,
এরপর আর হয়ত দেখা হবে না কখনো,
ট্রেনটা তখনও ছুটে যাবে দূরের দিকে -
আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব প্ল্যাটফর্মের ধূসর বিকেলে।

জানালার কাঁচে তোমার মুখটা
শেষবারের মতো ভেসে উঠবে কি না জানি না,
তবু মনে হবে -
এই তো, একটু আগে তুমি এখানেই ছিলে।

হয়তো বাতাসে রয়ে যাবে
তোমার চুলের মৃদু গন্ধ,
হয়তো বেঞ্চের পাশে বসে থাকবে
অপূর্ণ কিছু কথার ছায়া।

ট্রেনটা চলে গেলে
নিঃশব্দ হয়ে যাবে চারদিক,
শুধু রেললাইনের ওপর
দু’ফোঁটা সন্ধ্যা পড়ে থাকবে।

আর বহু বছর পর
কোনো এক অচেনা স্টেশনে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ মনে পড়বে -
একদিন এইভাবেই আমরা বিদায় নিয়েছিলাম।

আর আমি নেমে গিয়েছিলাম
তোমার জীবন থেকে
একটি ছোট্ট, নির্দিষ্ট স্টেশনে।


৩৩.      দ্বিখণ্ডিত আলো


তুমি দূরদেশ থেকে ফিরে
আমাকে শহরের গল্প শোনালে
পাথরের রাস্তা, বরফঢাকা চূড়া,
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী বাতিঘর,
আর সেই সব ক্যাফের টেবিল
যেখানে রাত জেগে মানুষরা
নিজেদের ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে পানীয় খায়।

তুমি বললে-
একটি অচেনা মেয়ের হাসি
কী অদ্ভুতভাবে মিশে গিয়েছিল
হ্রদের জলে ভেসে থাকা আলোয়,
বললে -
বৃষ্টি শেষে কেমন ঝরে পড়ছিল
বিদেশি শহরের নিঃসঙ্গতা।

আমি শুনছিলাম, ঠিক যেমন
ঝড়ের রাতে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে
একটি নিভতে থাকা প্রদীপ।

তবু মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম -
হয়তো কোনো এক ফাঁকে
তুমি থেমে যাবে,
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে,
এই সব দৃশ্যের ভিড়েও
হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়েছিল,
কিন্তু তুমি বলোনি।

তোমরা পুরুষেরা বুঝতে পারো না,
একজন নারীর হৃদয় কোনো শহর নয়
যেখানে বহু পথ এসে মিলতে পারে।

সে তো কেবল একটি ছোট্ট প্রদীপ -
যার আলো যদি একবার ভাগ হয়ে যায়,
তবে ধীরে ধীরে
নিজের গলতে থাকা উষ্ণতার মধ্যেই
নিভে আসে তার সমস্ত ভালোবাসা।


৩৪.      সুপ্রভাত


কোনো একদিন হঠাৎ ঘুম নেমে আসবে চোখে
এমন গভীর ঘুম,
যার ভেতর থেকে আর কোনো সকাল ডেকে তুলতে পারবে না আমাকে।

তখন শরীরের সব চেনা গন্ধ মুছে যাবে ধীরে,
কেউ আতর ছিটিয়ে দেবে,
কর্পূরের নীরব সুবাস ভেসে থাকবে বাতাসে-
আমি শুয়ে থাকব স্থির,
পৃথিবীর সমস্ত শব্দের বাইরে।

কবরের মাটি যখন ধীরে ধীরে ঢেকে দেবে শরীর,
তখন আর দেখব না কোনো সূর্যাস্তের লালিমা,
দেখব না সন্ধ্যার নিঃশব্দ আকাশে
চাঁদের পাশে জেগে থাকা নক্ষত্রদের।

জোনাকিরা তখনও জ্বলবে অন্ধকার বাগানে -
শুধু তাদের আলো আর পৌঁছাবে না আমার চোখে।

তবু ভোর হবে,
পূর্ব আকাশে আবার রোদ উঠবে,
পাখিরা উড়ে যাবে দূরের সবুজ মাঠে,
মানুষেরা খুলে দেবে দিনের দরজা।

পৃথিবী তখনও চলবে তার আপন ছন্দে -
শুধু আমি থাকব না সেই ভোরের ভিতরে।

আর কোনো এক মায়াভরা সকালে
হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না জানালার পাশে,
কেউ নরম স্বরে ডেকে বলবে না আর -
'সুপ্রভাত'।


৩৫.     ভাদ্রের বৃষ্টি


ভাদ্রের মেঘে আকাশ ভরে আসে,
কদমতলে অমিয় জলধারা ঝরে। 
বাঁশির সুর যেন দূর যমুনা পারে -
শ্যাম কি ডাকিছে আবার রাধা'রে?

বৃষ্টি নামে ধীরে, মাটির গন্ধ জাগে,
কাঁপে কদমপাতা বাতাসের ছোঁয়ায়।
রাধার আঁচলে জমে নীল বিষাদ,
প্রেম কি তবে আসে এমনই বেলায়?

দূরে বিজলি ওঠে, মেঘ ডাকে গোপনে,
মনে হয় শ্যাম বুঝি পথ খুঁজে ফেরে।
নয়ন ভিজে যায় ভাদ্রের বৃষ্টিধারায় -
রাধা দাঁড়িয়ে থাকে কদমের তলে ঘিরে।

'এসো নাথ,' ডাকে সে কাঁপা কণ্ঠে,
'এই ভেজা রাতে আর দেরি কোরো না।'
বৃষ্টির ভিতরে প্রেমের মৃদু জপ 
রাধার হৃদয় শুধু শ্যামেরই উপসনা।


৩৬.     দু’টি চাঁদের গোপন জোয়ার


রাত্রির গভীরে
যখন পৃথিবী তার সমস্ত নিয়ম খুলে রেখে ঘুমোয়,
তখন তুমি আর আমি 
দু’টি রমণী
একটি অদৃশ্য জোয়ারের ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে উঠি।

তোমার কাঁধে চুল ছড়িয়ে দিলে
মনে হয় অরণ্যের ভেতর হঠাৎ
একটি ত্রস্ত হরিণ এসে দাঁড়িয়েছে,
তার নিঃশ্বাসে জেগে ওঠে
অপরিচিত ফুলের আদিগন্ধ।

তোমার একান্ত কাছে এলে
আমার শরীরের ভেতর
সহস্র পুরোনো নদী কেঁপে ওঠে -
যেন জন্মের আগের কোনো ভাষা
হঠাৎ আবার মনে পড়ে গেছে।

আমরা একে অপরকে ছুঁই
যেমন বৃষ্টি ছোঁয় কাদামাটির ঘ্রাণ,
যেমন দুইটি জোৎস্না
একই জলের ওপর নেমে এসে
ধীরে ধীরে মিশে যায়।

কেউ জানে না -
এই প্রেমের ভেতর কত গভীর
প্রাচীন নারীত্বের সঙ্গীত বাজে।

তুমি যখন আমার ঠোঁটের কাছে
তোমার নির্জনতা রেখে দাও,
আমি বুঝি -
পৃথিবীর প্রথম ফুলটি
সম্ভবত এভাবেই ফুটেছিল
দু’টি রমণীর নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়।


৩৭.      বিশ্বাসের গোপন অগ্নি


যে স্পর্শ শুধু আঙুলে আঙুল রাখা নয়
যে আলিঙ্গন শুধু
দুটি শরীরের কাছে আসা নয়
যেন দুইটি নদী অদৃশ্য মোহনায়
নিজেদের নাম ভুলে যায়।

যে চুম্বন শুধু ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখা নয়,
তার গভীরে থাকে
অকথিত প্রতিজ্ঞার উষ্ণতা,
একটি দীর্ঘ বিশ্বাস শ্বাসের ভেতর লুকোনো।

যে উল্লাস শুধু শরীরের উত্তাপ নয়,
তার ভেতর ধীরে ধীরে
খুলে যায় মানুষের গোপন দরজা,
যেখানে ভয় ঘুমিয়ে পড়ে
আর আত্মা নগ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

অথচ শরীরও থাকে চুলের গন্ধ,
কাঁধের উষ্ণতা, বুকের নিঃশ্বাসে জেগে থাকা অদৃশ্য ফুলের মতো কম্পন।

এসবের আড়ালে আরও গভীর কিছু 
জন্ম নেয় দুটি মানুষের মধ্যে
একটি নীরব আস্থা,
যা লুকিয়ে থাকে চোখের ভেজা আলোর ভেতর,
মুঠোবন্দী হাতের ভিতরে,
আর সেই দীর্ঘ শ্বাসে যেখানে ভালোবাসা
নিজেকে ধীরে ধীরে চিনে নেয়।



৩৮.       অচ্ছূতের দিকে 



যে রমণী আমার নয়
তবু অদ্ভুত এক সন্ধ্যায়
সে এসে দাঁড়ায় খুব কাছে,
যেন বাতাসে ভেসে আসা
অচেনা কোনো ফুলের গন্ধ।

আমি জানি -
এই স্পর্শ আমার জন্য নয়,
এই শরীরের দিকে হাত বাড়ানো
কোনো নীতির ভেতর পড়ে না।

তবু তার চোখের ভেতর
এক ধরনের ইশারার ডাক থাকে,
যা ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

ছুঁই না, তবু মনে হয়
আমার আঙুলে তার উষ্ণতা লেগে আছে।
ছুঁই, তবু মনে হয়
আমি যেন দূর থেকেই তাকে দেখি।

এ কেমন প্রেম,
যেখানে কাছে এলে দূরত্ব জন্মায়,
দূরে গেলে বুকের ভেতর
এক অদৃশ্য স্পর্শ জেগে ওঠে?

সে রমণী,
যাকে আমি কখনো নিজের বলিনি,
তবু আশ্চর্যভাবে 
আমার সমস্ত নীরবতার ভিতর
দেবীর মতো ফিরে ফিরে আসে।


৩৯.       সৃষ্টিকর্তা


আমি সৃষ্টিকর্তাকে সমীহ করি,
ভয়ও পাই,
রাত্রির নক্ষত্র দেখে তার অসীমতা মনে পড়ে,
ভোরের শিশিরে দেখি তার উপস্থিতি।

আমি তাকে প্রশংসা করি,
বাতাসের ভেতর তার দয়া খুঁজি,
তবু কেন জানি মনে হয়-
তিনি আমার উপর সন্তোষ্ট নন।

হয়তো আমি অতিরিক্ত প্রশ্ন করি,
হয়তো প্রার্থনার মাঝখানে
হঠাৎ সন্দেহের একটি কালো পাখি উড়ে যায়।

আমি তাকে ডাকি -
ডাকের ভেতরও হয়ত একটু অস্পষ্টতা থাকে,
একটু অবাধ্যতা,
হয়তো সেই কারণেই
তিনি আমার দিকে তাকান না দীর্ঘক্ষণ।

তবু আমি জানি,
যে মানুষ ভয় পায়, প্রশ্ন করে,
তবুও প্রার্থনা থামায় না -
সৃষ্টিকর্তা হয়তো তাকেই ভালোবাসেন।


৪০.     দুটি বাবার রাজকন্যা


আমার স্ত্রী কারোর না কারোর বাবার মেয়ে,
কোনো এক উঠোনে
সে-ও একদিন রাজকন্যার মতো বড় হয়েছিল।

কোনো এক বাবা
তার কপালে চুমু এঁকে বলেছিলেন
সাবধানে থাকিস মা, পৃথিবী খুব সহজ নয়।

আজ সে আমার ঘরে থাকে,
কিন্তু তার ভেতরে এখনো রয়ে গেছে
সেই ছোট্ট মেয়েটি,
যে বাবার হাত ধরে মেলায় যেত,
আকাশ দেখে গল্প বানাত।

আমারও একটি মেয়ে আছে -
তাকেও আমি রাজকন্যার মতো ভালোবাসি।
তার হাসি শুনলে মনে হয়
পৃথিবী এখনো ভাঙেনি পুরোপুরি।

তখন হঠাৎ মনে পড়ে
আমার স্ত্রীও তো
কারো এক বাবার রাজকন্যা ছিল।

তাই আমি শিখে যাই ধীরে ধীরে -
যে হাতে আমি মেয়ের চুলে আলতো হাত রাখি,
সেই হাতেই
স্ত্রীর ক্লান্ত কপাল ছুঁয়ে দিই মমতায়।

কারণ ভালোবাসা মানে শুধু অধিকার নয়,
ভালোবাসা মানে
আরেকজনের বাবার স্বপ্নকে
নিজের ঘরে সম্মান করে রাখা।

এভাবেই আমাদের ঘরে
দুটি বাবার রাজকন্যা থাকে -
একজন ছোট, আর একজন বড়।

আর আমি
দুজনকেই সযত্নে পাহারা দিই
ভালোবাসার মতো। 


৪১.      শেষ নিঃশ্বাসের আকাঙ্ক্ষা


সেই জীবন, সেই আকাশ, সেই আলো,
হঠাৎ যেন সমস্ত পৃথিবীর
মণিমাণিক্যের চেয়েও দুর্মূল্য হয়ে উঠছে  আমার কাছে।

আমার মনে হয় -
ধনরত্নের কোনো মূল্য নেই,
কেবল এক মুহূর্তের জীবনের কাছে
সবই তুচ্ছ, সবই ম্লান।

যদি একবার -
মাত্র এক ক্ষণকালের জন্য
আমার সেই শ্যামা জননীর ধরিত্রীর ধূলিক্রোড়ে
শুয়ে থাকতে পারতাম!

যদি একবার
সেই উন্মুক্ত নীলাম্বরের তলে
সূর্যালোকের ধোয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে
শেষবারের মতো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতাম! 

তৃণপাতার গন্ধ মেশানো বাতাস
যদি শেষবার এসে ছুঁয়ে দিত আমার বক্ষ,
মাটির স্নিগ্ধ গন্ধে
যদি ভরে উঠত প্রাণের অন্তিম প্রহর -
তবে মৃত্যু এলেও ভয় নেই।

সেই একটিমাত্র শেষ নিঃশ্বাসে
যদি আমার এই পৃথিবীকে গ্রহণ করতে পারি -
তবে এই জীবন,
এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বও
নিশ্চয়ই সার্থক হয়ে উঠবে।


৪২.     টং দোকানের বিকেল


রাস্তার পাশে টং চায়ের দোকানটার কথা মনে পড়ে,
কত বিকেল গরম চায়ের কাপে দিতাম চুমুক -
ধোঁয়া উঠত ধীরে,
যেন বিকেলের শরীর থেকে উঠছে
কোনো নীরব দীর্ঘশ্বাস।

একটা পুরোনো বেঞ্চ ছিল,
রঙ উঠে যাওয়া টিনের চালের নিচে
বৃষ্টি পড়লে টুপটাপ শব্দ হতো,
মনে হতো পৃথিবীর সব গল্প
সেই টিনের ছাদের ওপরই লেখা হচ্ছে।

কেউ বলত রাজনীতির কথা,
কেউ বলত প্রেমে পড়ার গল্প,
আর কেউ চুপচাপ দূরে তাকিয়ে থাকত
অচেনা কোনো ভবিষ্যতের দিকে।

কাপে কাপে জমত বিকেল,
চায়ের ভেতর ডুবে থাকত
বন্ধুত্বের অনুচ্চারিত শপথ,
আর কিছু মধুর স্বপ্ন
যেগুলো পরে কোনোদিন
পৃথিবীর কোথাও জন্ম নিতে পারেনি।

দূরের রাস্তায় ধুলো উঠত,
সূর্য ধীরে ধীরে নামত শহরের ক্লান্ত কাঁধে-
আর আমাদের তরুণ সময়
নিঃশব্দে ঝরে পড়ত
চায়ের কাপে ভাঙা আলোর মতো।

এখন সেই দোকান
সম্ভবত এখনো দাঁড়িয়ে আছে,
কিন্তু সেখানে আর বসে নেই
আমাদের সেই বিকেলগুলো।

শুধু মাঝে মাঝে
কোনো অকারণ সন্ধ্যায় 
মনে হয়,
এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার ভিতর
আমাদের হারিয়ে যাওয়া বয়স
এখনো ধীরে ধীরে
আকাশে ভেসে যাচ্ছে।


৪৩.      চৈত্রের আকাশে তোমার ছায়া



হঠাৎই চৈত্র সন্ধ্যায়
আকাশের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে
কিংবা লিখতে ইচ্ছে করে কবিতা
কারণ এই রঙ বদলানো আকাশ
জানে এক হারানো মুখের গোপন ইতিহাস।

সেদিনও এমনই চৈত্র ছিল
বাতাসে ধুলো আর শুকনো পাতার দীর্ঘশ্বাস,
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল ধীরে
কোনো নিঃশব্দ নদীর মতো।

আমরা পাশাপাশি হেঁটেছিলাম
কিন্তু শব্দ ছিল খুব কম;
তোমার নীরবতা যেন দূরের কোনো গ্রাম,
যেখানে সন্ধ্যা নামে ধূপের ধোঁয়ার মতো।

তোমার চুলে তখন
শেষ আলোর হলুদ পাখিরা বসে ছিল,
আমি ভাবছিলাম
মানুষের জীবনে যদি কোনো মুহূর্ত
চিরদিনের জন্য রেখে দেওয়া যেত
তবে এই ক্ষণটিকেই রাখতাম
একটি গোপন নক্ষত্রের মতো।

তারপর সময়
অদৃশ্য শিকারির মতো এসে
আমাদের সেই পথটাকে ভেঙে দিল
তুমি চলে গেলে
আর পৃথিবী ঠিক আগের মতোই রইল।

আজও যখন চৈত্রের সন্ধ্যা নামে
মনে হয় আকাশের কোথাও
তোমার একটি ক্ষীণ ছায়া ভেসে আছে;
হয়তো বাতাসে যে বিষণ্নতা বাজে
তা তোমারই কোনো অপ্রকাশিত কথা।

তাই হঠাৎই চৈত্র সন্ধ্যায়
আকাশের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে,
কিংবা লিখতে ইচ্ছে করে কবিতা
কারণ হারানো প্রেমিকারা
মানুষের জীবনে আর ফিরে আসে না,
তারা শুধু থেকে যায়
সন্ধ্যার রঙে,পাতাঝরার শব্দে,
আর কিছু গভীর, অসমাপ্ত পংক্তির ভিতরে।


৪৪.     রাত্রির আলিঙ্গন 


সে স্বপ্নে এসেছিল, ঘুম ঘোরে তাকে জড়িয়ে 
ধরেছিলাম -
মনে হয়েছিল রাতের সমস্ত নক্ষত্র
আমাদের বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার চুলে ছিল অদ্ভুত এক গন্ধ,
যেন দূরের কোনো বৃষ্টিভেজা বাগান
আমার বুকে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

আমি তার কানের কাছে মুখ রেখে
ধীরে ধীরে বলেছিলাম কিছু অস্পষ্ট কথা,
সে শুধু চোখ বুজে আরও কাছে সরে এলো -
যেন আমার বুকই তার একমাত্র আকাশ।

তার উষ্ণতা গড়িয়ে পড়ছিল
আমার নিঃশ্বাসের ভেতর দিয়ে,
দুজনের শরীরের মাঝে
রাত ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিল উতল নদী।

সে আমার কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল -
'এই স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমাকে কি মনে রাখবে?'
আমি তার আঙুল জড়িয়ে ধরে বললাম -
স্বপ্ন ভাঙলেও তুমি থাকবে,
আমার ঘুমের গভীরে
আর জাগরণের গোপন আগুনে।'

তারপর আমরা দুজন
রাত্রির নিঃশব্দ দোলনায় ভেসে রইলাম -
যেন প্রাচীন কোনো অবিনশ্বর প্রেম
পৃথিবীর প্রথম ভোরের আগে
আবার জন্ম নিতে চাইছে।


৪৫.      ফিরে আসার কবিতা


কোথায় চলে যাবে? কোন্ পথ দিয়ে? 
সব পথে পথে আমি কবিতা লিখে এসেছি,
ধুলোর ভেতর, বাতাসের গায়ে,
নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছি তোমার নাম।

যে পথেই তুমি যাও
দেখবে হঠাৎ কোনো বিকেলের রোদে
একটি পংক্তি দাঁড়িয়ে আছে
তোমাকে ডাকার জন্য।

আমি জানি, তুমি দূরে গেলে
আকাশও একটু নীল কম হয়,
আর আমার জানালায় বৃষ্টি নামে অকারণে।

তবু ভয় নেই -
আমি তোমাকে হারানোর মতো
কোনো কবিতা লিখিনি কখনো,
আমি শুধু লিখেছি
ফিরে আসার সব দরজা।

যে পথে তুমি হাঁটবে
সেই পথের ঘাসেরা বলবে -
'ফিরে যাও, কেউ একজন অপেক্ষায় আছে।'

আর একদিন অচেনা সন্ধ্যার ভেতর
হঠাৎ তুমি থেমে যাবে,
কারণ বাতাসে ভেসে উঠবে
আমার লেখা কোনো পুরোনো পংক্তি।

তখন বুঝবে,
সব কবিতার ভেতর লুকিয়ে ছিল
একটি ঘর, একটি আলো,
আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে
আমি তোমার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি। 


৪৬.      গন্ধর্ব-নগরীর হেম


তোমাকে আজ বড় উদাসীন লাগে,
যেন ভোরের আলো নিভে গেছে কারও অদৃশ্য স্পর্শে।

গতকালও তুমি শ্রাবণ-ধারার মতো
আমার সমস্ত আকাশ ভিজিয়ে দিয়েছিলে
আজ তুমি দাঁড়িয়ে আছো
একটি জলহীন নদীর মতো নির্জন।

তোমার চোখে আজ কোনো ঢেউ নেই,
কোনো নির্মল বাতাসও না
যেন সব সুর হঠাৎ থেমে গেছে
অদেখা কোনো দূর গন্ধর্ব-পুরীতে।

তুমি শুরু করতে জানো,
আহা, কী অপূর্বভাবে জানো!
প্রথম স্পর্শের মতো কোমল,
প্রথম বৃষ্টির মতো মধুর
কিন্তু শেষের কাছে এলে
তুমি হঠাৎ হারিয়ে যাও
কোনো অচেনা নক্ষত্রের অন্ধকারে।

কাল তুমি ছিলে আহলাদী,
হাসিতে ভরা এক বসন্ত দুপুর
আজ তুমি হতচ্ছারী বিষণ্নতা
যেন শরতের আকাশে
হঠাৎ মেঘহীন এক নিঃসঙ্গতা।

তোমাকে কখনো মনে হয় চন্দন
শীতল, সুগন্ধী, মমতার মতো নীরব।
আবার কখনো তুমি
গন্ধর্ব-নগরীর হেম,
দূরের, অলৌকিক, ছোঁয়া যায় না,
তবু হৃদয়ের গভীরে
অদ্ভুত আলো হয়ে জ্বলে থাকো।

এই কোন্ রহস্যে তুমি গড়া,
হে প্রাণেশ্বরী?
কোন্ আকাশের মায়ায় তুমি
এভাবে রূপ বদলাও বারবার?

আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি
তোমার সব ঋতুর সামনে,
কখনো বৃষ্টিতে ভিজি,
কখনো মরুভূমির মতো শুকিয়ে যাই।

তবু জানো,
তুমি যদি গন্ধর্ব-নগরীর হেমও হও
আমি তবু সেই পথিক,
যে প্রতিদিন
তোমার অলীক নগরীর দিকেই
হেঁটে যায় নিঃশব্দে।


৪৭.        চলে গেলে তুমি 


কোনো এক নিস্তব্ধ রাতের জানালায়
তোমার ছায়া ঝুলে থাকে কুয়াশার পর্দায়,
আমি ভেবেছিলাম তুমি চাঁদেরই কোনো দাগ
অথবা দূরের কোনো অচেনা আলোর আগুন।

নদীর মতো ধীরে ধীরে সরে গেলে তুমি,
বালুচরে পড়ে রইল কিছু ভাঙা জোছনা,
আর আমার বুকের ভিতর
শুকনো পাতার মতো শব্দ করে ওঠে স্মৃতি।

হয়তো তুমি ছিলে হেমন্তের বাতাস,
অথবা কোনো অস্থির পাখির ডানা
এসেছিলে কিছুক্ষণ
তারপর আকাশ বদলে গেলে উড়ে গেলে অজানা।

তবু আজও রাত নামলে
জোছনা এসে আমার দরজায় কড়া নাড়ে,
মনে হয়,
তোমার ক্লান্ত পায়ের শব্দ
এখনও ঘাসের ভিতর লুকিয়ে আছে।

আর আমি একা বসে শুনি
শীতের পাতাঝরা সেই দূরের পথ,
যেখানে তুমি হেঁটে গিয়েছিলে
অনুভবের মতো নিঃশব্দে।


৪৮.     অর্ধনগ্ন জ্যোৎস্না 


বিহ্বল হয়ে শরীরের গোপন বৃত্তে
যখন তুমি আবিষ্ট হয়ে থাকো,
তখন অন্ধকারে জ্বলে ওঠে এক অচেনা নক্ষত্র তোমার চোখের ভেতর।

চুলের গভীরে জমে ওঠে নিশ্বাস,
আঙুলের অদৃশ্য স্পর্শে
রাত্রি ধীরে ধীরে কাছের হয়ে আসে।

তখন তুমি অভিমানী হয়ে উঠো -
অন্তরের দুয়ার খুলে প্রগল্ভ স্বরে বলো,
আমি কি শুধু বন্ধুই তোমার?

আমি তখন তোমার দিকে তাকিয়ে
একটু জোছনা, একটু আগুন
মিশিয়ে বলি - ওগো হতচ্ছারি,
তোমার কাছেই তো আমি
যখন যা চাই, তখনই তা পাই,
এক ফোঁটা শরীরের উষ্ণতা,
এক মুঠো স্বপ্নের গন্ধ,
আর অনন্ত কোনো মায়া।

এমন অনিঃশেষ ভালোবাসা
যে নিঃশব্দে ঢেলে দেয় রাত্রির গভীর পাত্রে,
সে তো কেবল বন্ধু নয় -
সে যেন বহতা কোনো নদী,
যার জলে ডুবে থাকে প্রেমের প্রাচীন শরীর।

তাই বলি -
তুমি বন্ধু, আবার তারও অধিক কিছু,
তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে
আমার সব গোপন আকাঙ্ক্ষার
অর্ধনগ্ন জ্যোৎস্না।


৪৯.       আক্ষেপগুলি মোর


জীবনটা এত ক্ষণস্থায়ী! 
সোনালি মুহূর্তগুলো কবে যে ডানায় ভর করে উড়ে গেল,
আমি টেরও পাইনি।

মনে হয়েছিল, সুন্দরের পথ ধরে
একদিন আমরা দু’জন পাশাপাশি হেঁটে
এই পৃথিবীর শেষ বিকেলটুকু পার হয়ে যাব।

চার চোখ মিলে কত স্বপ্ন এঁকেছিলাম -
নীল আকাশে ভাসমান মেঘের মতো,
নদীর জলে জোছনার মতো নীরব ও দীপ্ত।

আজ এত দূর এসে
পেছনে ফিরে দেখি -
আমাদের হাত ভরা নেই কিছুই,
শুধু কিছু উড়ে যাওয়া বিকেল,
কিছু অচেনা রাতের দীর্ঘশ্বাস
আর অমলিন কয়েকটি নামহীন স্মৃতি।

তবু আমি পথেই আছি -
বাতাসে ছড়িয়ে দিই আক্ষেপের ধুলো,
আর ভাবি, হয়তো কোনো এক অচেনা ভোরে
নতুন করে জন্ম নেবে আরেকটি স্বপ্ন।

কিন্তু ঘরের কোণে
পিতামহের রেখে যাওয়া সেই পুরোনো দেয়াল ঘড়ি
ধীরে ধীরে বাজিয়ে যাচ্ছে শেষ সময়ের ধ্বনি -
ঢং... ঢং... ঢং...
প্রতিটি শব্দে যেন ঝরে পড়ে
আমার অপূর্ণ জীবনের অতৃপ্ত ইতিহাস।

যেন সময় বলছে -
সব আক্ষেপ নিয়েও
একদিন আমাকেই চলে যেতে হবে
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুর সঙ্গে।


৫০.      অধরা শিউলি


ভোরের শিউলি ঝরে পড়ে নির্জন আঙিনায়,
আমি কুড়িয়ে কুড়িয়ে খুঁজি তার অদৃশ্য পরশ।
শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটি ধীরে
মনে হয়, এই তো এখানেই লেগে আছে
তার আঙুলের নিঃশব্দ স্পর্শ।

ভোরের বাতাস হঠাৎ কাঁপিয়ে যায় মন,
কোন অচেনা ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্মৃতি
মনে হয়, সে বুঝি একটু আগে
এ পথ দিয়ে হেঁটে গেছে নীরবতায়।

সন্ধ্যার কুহেলি যখন নেমে আসে ধীরে,
অস্পষ্ট আলো অন্ধকারের ভেতর
আমি দেখি এক অবয়ব -
চেনা, অথচ দূরের কোনো নক্ষত্রের মতো
হাত বাড়ালেই মিলিয়ে যায়।

সে তো আমারই ছিল
তবু ছিল না কখনও,
অধরা কোনো নীল আকাশের মতো,
অনাঘ্রাতা কোনো ফুলের মতো
দূরে দূরে জেগে থাকে।

আমার স্বপ্নগুলো
তারই নামে একদিন উড়েছিল আকাশে,
আজ ভাঙা ডানার শব্দে
ছড়িয়ে আছে বুকের ভেতর।

তবু মাঝে মাঝে ভাবি -
কেন পারলাম না ঝড়ের মতো
জোর করে তাকে ছিনিয়ে নিতে!
হয়তো ভালোবাসা ছিনিয়ে নেবার নয়,
ভালোবাসা কেবল শিউলির মতো 
ঝরে পড়ে কারও অচেনা ভোরে।