বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

অনন্ত নীল বিষণ্ণতা ( কবিতাগ্রন্থ )


অনন্ত নীল বিষণ্ণতা   ( কবিতাগ্রন্থ ) 

প্রথম প্রকাশ  --

উৎসর্গ   --


১.      আবার এই পৃথিবীতে


আশ্চর্য সুন্দর এই পৃথিবী
এক জীবনে তার কতটুকুই বা দেখা হয়!
একটি ভোরের শিশিরে যতটা নীল আকাশ থাকে,
একটি নদীর জলে যতটা চাঁদ ভেসে যায়,
তারও কত কম ছুঁয়ে যাই আমরা।

পৃথিবী যেন এক অনন্ত গ্রন্থ -
প্রতিটি পাতা খুললেই নতুন বিস্ময়,
একটি পাহাড়ের নীরবতা,
একটি বৃষ্টিভেজা বিকেল,
ধানের গন্ধে জেগে ওঠা কোনো গ্রাম,
অচেনা কোনো পাখির ডাকে
হঠাৎ থমকে যাওয়া মন।

তার সৌন্দর্যের শুধু সূচীপত্র পড়তেই
যদি একটি জীবন ফুরিয়ে যায় -
তবে তার সব রূপ দেখব কখন?

তাই কোনো একদিন ঈশ্বর যদি বলেন -
“সহস্র বছর বাঁচতে পারো,
বলো, কোন গ্রহে ফিরে যেতে চাও?”

আমি কোনো নক্ষত্রের নাম বলব না,
চাঁদের কাছেও যাব না -
বলব,
আমাকে আবার সেই পৃথিবীতেই পাঠাও।

যেখানে সন্ধ্যা নামে নদীর বুকে,
কাশফুল দোলে অকারণ বাতাসে,
কোনো জানালায় জ্বলে ওঠে
একটি মানুষের ঘর-ফেরার আলো।

আমি সহস্র বছর ধরে
তার পথের ধুলো মেখে হাঁটতে চাই,
প্রতিটি ঋতুর কাছে বসে
নতুন করে প্রেম শিখতে চাই,
আর যতবার পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠবে,
ততবার মনে মনে বলব -

এই পৃথিবী ছেড়ে
আর কোথাও যেতে নেই;
এখানেই তো
আমার সমস্ত জন্মের ঠিকানা।


২.      অমরতার লগ্ন


নিভু নিভু করে নিভে যায় দিন—
সন্ধ্যার শেষ রক্তিম আলোটুকু
অস্তরাগের কপাল থেকে মুছে নিয়ে
নক্ষত্রের আকাশে ধীরে নামে রাত।

চারদিক যখন নিস্তব্ধ অন্ধকার,
যখন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ
ঘুমিয়ে পড়ে দূর কোনো কবরের পাশে,
তখন কে যেন এসে
খুব কাছে—কানের কাছে বলে,

ক্লান্ত হইও না তুমি,
এখনও অমরতার লগ্ন আসেনি।
এখনও তোমার অনেক পথ বাকি।
সময়ের কাছে পরাজিত হয়ো না—
সময়কে বরণ করো সৃষ্টির ভিতর।

তোমার তো অনেক কিছুই আছে—
ফেলে আসা কুসুমপুরের মাটি,
শৈশবের পায়ের কাছে লেগে থাকা ধুলো,
কুর্চি ফুলের গন্ধ,
জোনাকির ঝিল্লি-ভেজা গান,
শরতের সাদা জ্যোৎস্না,
কস্তুরী-ঢাকা জলাভূমির নিঃশ্বাস,
নদীর বুক,
রুপালি বালুচর,
বাঁশবনের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া
কোনো এক বিকেলের বাঁশি।

তোমার আছে
হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখ,
মায়ের আঁচলে লেগে থাকা পৃথিবী,
বাবার হাতের উষ্ণতা,
প্রথম প্রেমের অসমাপ্ত বাক্য,
আর আছে—
অসংখ্য স্বপ্ন,
যাদের এখনও নাম দেওয়া হয়নি।

তাই থেমো না।

তুমি অতিক্রম করো তোমার কাল—
একটি শব্দ রেখে যাও,
একটি কবিতা,
একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো গান,
কিংবা এমন কোনো ভালোবাসা
যা তোমার চলে যাওয়ার পরও
কোনো এক অচেনা মানুষের হৃদয়ে
হঠাৎ জ্বলে উঠবে জোনাকির মতো।

মনে রেখো—
মানুষ মরে যায়,
দিনের আলো নিভে যায়,
নদীর গতিপথও একদিন বদলে যায়;
কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টি
সময়ের কবর মানে না।

তুমি লিখে যাও।

যতদিন কুসুমপুরের মাটিতে
কোনো শিশুর পা পড়বে,
যতদিন শরতের রাতে
জ্যোৎস্না নামবে নদীর জলে,
যতদিন কোনো একাকী মানুষ
নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে
নিজেকে খুঁজবে—

ততদিন তোমার কোনো একটি শব্দ
তার অন্ধকারে
আলোর মতো জেগে থাকুক।

অমরতার জন্য অপেক্ষা করো না—
সৃষ্টির ভিতরেই
অমর হয়ে ওঠো।


৩.      পৃথিবীর হৃদয় আছে


পৃথিবীর হৃদয় আছে, প্রাণ আছে
তাই তো এত ভালোবাসি তাকে।
ভোরের প্রথম রোদ যখন ঘাসের বুকে নামে,
মনে হয়, কেউ আদর করে হাত রেখেছে
আমার সমস্ত ক্লান্তির কপালে।

নদী যখন বয়ে যায়, সে শুধু জল বয়ে নেয় না,
বয়ে নেয় কত মানুষের কান্না, কত গোপন প্রেম,
বৃক্ষ যখন ছায়া দেয়, সে শুধু ছায়া দেয় না,
অচেনা পথিকের মাথায় তুলে দেয়
মায়ের মমতামাখা আঁচল।

এই পৃথিবী অভিমান বোঝে,
বোঝে বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস,
তাই তো ঝরে যাওয়া পাতার জন্যও
কখনো কখনো বুকের ভেতর
কেমন এক শূন্যতা জেগে ওঠে।

এখানে মৃত মানুষেরাও বেঁচে থাকে
পুরোনো উঠোনে, শিউলি-ঝরা সকালে,
কোনো মায়ের শূন্য আঁচলে,
বাবার হাত ধরে হেঁটে যাওয়া
হারিয়ে-ফেলা শৈশবের পথে।

পৃথিবী, তুমি কেবল মাটি নও,
তুমি আমার সমস্ত মায়ার আধার,
তোমার বুকে যত দুঃখ, যত মৃত্যু,
ততই তোমাকে ভালোবাসি
যেন তোমার হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে
আমারও একটু জায়গা আছে।

একদিন যখন চলে যাব,
আমার শরীর মিশে যাবে তোমার মাটিতে
তখন কোনো বসন্তের সকালে
ঘাসের ডগায় শিশির হয়ে ঝরব,
কিংবা অচেনা কোনো ফুলের সুবাসে
নিঃশব্দে ছুঁয়ে দেব কারও মন।

পৃথিবীর হৃদয় আছে, প্রাণ আছে
তাই তাকে ছেড়ে যেতে ভয় হয়,
এ পৃথিবী যে শুধু বেঁচে থাকার জায়গা নয়,
এ আমার ভালোবাসা,
আমার সমস্ত জন্মের চেয়ে
অধিক আপন এক আশ্রয়।


৪.     পাইনি এই বিশ্বলোকে


তাকে আমি পাইনি এই বিশ্বলোকে,
পাইনি তার চোখে আমার জন্য রাখা
একটুখানি নীল আকাশ,
একটি বিষণ্ণ সন্ধ্যার মতো ভালোবাসা।

তবু মনে হয়, সে আছে কোথাও -
পৃথিবীর মানচিত্রের বাইরে,
কোনো নক্ষত্রের নিভৃত দীর্ঘশ্বাসে,
কোনো অচেনা গ্রহের কক্ষপথে
আমারই প্রতীক্ষায় ঘুরছে অনন্তকাল।

হয়তো কোনোদিন মহাকালের ছাই ভেঙে
ফিনিক্স পাখি হয়ে সে ফিরে আসবে,
তার ডানায় জ্বলবে আমাদের অসমাপ্ত প্রেম,
চোখে থাকবে কত জন্মের চেনা বিষাদ।

আমি তখন পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছেড়ে
উড়ে যাব তার নক্ষত্রের দেশে -
যেখানে কোনো বিচ্ছেদ নেই,
কোনো শেষ বিকেল নেই,
শুধু দুটি আত্মা পাশাপাশি জ্বলে থাকে
দুই অনন্ত নক্ষত্রের মতো।

এ জন্মে তাকে পাইনি বলে
ভালোবাসা কি তবে মিথ্যে হয়ে যাবে?
যে প্রেম পৃথিবীতে পূর্ণতা পায়নি,
হয়তো তারই জন্য ঈশ্বর
অন্য কোনো গ্রহে
আরেকটি আকাশ রেখে দিয়েছেন।


৫.      অনঙ্গের ফুলশর


যমুনার জলে চাঁদ নেমেছে,
কদম্বশাখায় রাত,
বাঁশির সুরে ঘুম ভেঙেছে
ব্রজের গোপিনীর গোপন প্রণয়পাত।

কৃষ্ণ বলে, “এসো সখী,
আজকে খেলি চাঁদের সঙ্গে,
তোমার চোখের কাজলটুকু
হারিয়ে যাক আমার রঙে।”

এক সখী কয়, “দুষ্টু নাগর,
কথায় তোমার মধু,
আড়াল থেকে হৃদয় চুরি,
এই কি তোমার সাধু?”

কৃষ্ণ হাসে, “চুরি যদি
হৃদয় নেওয়ার নাম,
তবে তো সখী, তোমার প্রেমেই
চোর হয়েছে শ্যাম।”

লাজে রাঙা মুখটি তুলে
সখী বলে, “যাও না—
এমন করে কাছে এসে
মন ভুলিয়ে দাও না!”

চাঁদ তখন মেঘের আড়াল,
যমুনা জলে ঢেউ,
কৃষ্ণ জানে, প্রেমের ভাষা
বুঝতে পারে কেউ?

রাত ফুরোয়, ফুল ঝরে যায়,
বাঁশি থামে বনে
যে রস লুকায় পুরাণের পাতায়,
সে রস জাগে আজও
নারী-পুরুষের গোপন মনে।

কারণ প্রেমের আদি শাস্ত্র
লেখেনি কোনো ঋষি,
একটি চোখের দুষ্টু চাহনি,
একটু হাসি, একটু বাঁশি,

সেই তো অনঙ্গের ফুলশর,
সেই তো সৃষ্টির আদি রস,
যার আঘাতে দেবতারাও
হারায় আপন বশ।


৬.     পাশের ঘরেই আছি

আমরা ঘর বাঁধি, স্বপ্ন বুনি,
সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিই দুজনে।
কত অভিমান, কত ভাঙাগড়া,
তবু ভালোবাসা থেকে যায় গোপনে।

একদিন তো যেতেই হবে -
হয়তো আমি আগে, নয়তো তুমি।
একটি ঘর শূন্য হবে,
নিভে আসবে চেনা দিনের আলো,
বুকের ভেতর জমবে নিঃসঙ্গতা,
চোখের কোণে অশ্রু নামবে।

তবু প্রিয়, ভেবো না তুমি একা,
আমি যদি আগে চলে যাই -
মনে কোরো, হারিয়ে যাইনি,
শুধু ঘর বদলেছি,
আছি তোমার পাশের ঘরেই।

তুমি যখন গভীর রাতে
আমার স্মৃতি ছুঁয়ে কাঁদবে,
নীরবতার বুক চিরে
ভালোবাসা তোমায় বলবে -
‘এই তো আমি, খুব কাছেই আছি,
তোমার হৃদয়েই রয়ে গেছি।’

মৃত্যু শুধু শরীরকে সরায়,
ভালোবাসাকে পারে না মুছতে।
এক জীবনের মায়া কি শেষ হয়
একটি বিদায়ের ওপারে?

তাই তুমি দরজাটা খোলা রেখো—
আমি যদি আগে চলে যাই,
মনে কোরো, দূরে নই প্রিয়,
আমি আছি পাশের ঘরেই।


৭.       অথচ সেই আমারই অপেক্ষায়


উপেক্ষা করে দূরে দূরে সরিয়ে রেখেছি
যাকে,
দিনশেষে সেই আমারই পথ চেয়ে থাকে
সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলোয়
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে,
বুকের ভেতর এক আকাশ প্রতীক্ষা মাখে।

আদর তো দূরের কথা,
কত দিন তার হাতখানিও ধরিনি,
তার চোখের জমে থাকা অভিমান
একটিবার পড়ে দেখিনি
অথচ সেই-ই আমাকে ভালোবেসে
উজাড় করে দিয়েছে তার সমস্তটুকু,
নিজের শূন্যতা ঢেকে রেখেছে
আমার সুখের আঁচলে।

আমি ফিরেছি যখন,
সে দুয়ারে জ্বেলেছে আলো;
আমি মুখ ফিরিয়ে থেকেছি,
সে তবু চেয়েছে আমার ভালো।
আমার অবহেলার প্রতিটি ক্ষত
নিজের বুকে নীরবে সয়ে
আমারই জন্য সাজিয়ে রেখেছে
একটুকরো মায়ার আশ্রয়।

কী আশ্চর্য,
যাকে সবচেয়ে কম দিয়েছি আমি,
সেই আমাকে দিয়েছে সবচেয়ে বেশি!
যার চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার
সময়টুকুও আমার ছিল না,
সেই আমার দুঃসময়ে
নিজের সমস্ত সুখ দিয়েছে বিসর্জন।

হায়,
যার হাত একদিন ধরিনি ভালোবেসে,
সময় ফুরোলে সেই হাতই খুঁজব
সমস্ত পৃথিবীর ভিড়ে,
সমস্ত শূন্যতার শেষে।


৮.     জীবন এত ছোট কেন


কত নক্ষত্র ঝরে গেল,
কত নতুন আলো জ্বলে উঠল মহাকাশে।
কত জীবন এলো পৃথিবীর বুকে,
কত জীবন হারাল নিকষ আঁধারে।

মহাকাল বয়ে চলে অনন্তের পথে,
আমি দাঁড়িয়ে ক্ষণিকের এক বাঁকে।
পাশে ছিল কত মুখ, কত প্রিয়জন—
আজ কেউ স্মৃতি, কেউ অচেনা দূরত্ব।

এই ব্রহ্মাণ্ড বেঁচে থাকবে অনাদিকাল,
শুধু আমার আয়ু ফুরিয়ে আসবে।
অথচ কত প্রেম, কত মায়া,
কত না-বলা কথা পড়ে আছে হৃদয়ে!

সব ভালোবাসা পূর্ণ হওয়ার আগেই
কেন জীবনের প্রদীপ নিভে যায়?
এত অপরূপ পৃথিবী, এত মায়ার সংসার—
তবু কেন এত অল্প সময়?

আহা, জীবন!
এত ভালোবাসার পৃথিবীতে
জীবন এত ছোট কেন?


৯.      মানবতার জয়গান


পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে আসে,
পশ্চিমের আকাশে নিভে যায় শেষ আলো
মহাকালের দ্বারে দাঁড়িয়ে তবু
মানুষের মুখে শুনতে চাই ভালোবাসার গান।

যত যুদ্ধ, যত রক্ত, যত হাহাকার,
যত অশ্রু ঝরে পড়ে ধূলির বুকে
সব মুছে দিয়ে যেতে চাই
একটি সবুজ স্বপ্নের বীজ রেখে।

যেদিন সময়ের শেষ ঘণ্টা বাজবে,
আকাশ বিদায়ের বিষাদে হবে নীল,
সেদিনও আমার কণ্ঠে জেগে থাক
মানবতার অমলিন জয়গান।

যেদিন থেমে যাবে সময়ের স্পন্দন, 
নিভে যাবে পৃথিবীর শেষ প্রদীপখানি, 
সেদিনও আমার কণ্ঠে উঠুক গর্জে 
মানুষের মুক্তির অমর জয়ধ্বনি!


১০.     করুণাধারায় এসো


জীবন যখন ক্লান্ত পাখি, ডানা মেলে না আর,
স্বপ্ন যখন ধূসর হয়ে হারায় অন্ধকার,
ফুলের বুকে গন্ধ মরে, নদীর বুকে ক্ষয়—
তখন তুমি বৃষ্টি হয়ে এসো হৃদয়ময়।

যখন আমার গানের পাখি নীরব অভিমানে,
সুর হারিয়ে কাঁদে একা বিরহী সন্ধ্যাবেলায়,
যখন সকল ভালো লাগা ধুলোর মতো ওড়ে,
এসো তুমি মায়ার পরশ হয়ে আমার ঘরে।

যখন আমার আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা,
চোখের জলে ভিজে ওঠে স্মৃতির আলপনা,
যখন আমার আপন মানুষ দূর নক্ষত্র হয়,
এসো তুমি চাঁদের আলো, এসো হৃদয়ময়।

কিছুই যখন চাওয়ার নেই, পাওয়ার নেই কিছু,
জীবন যখন ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যাতারার পিছু—
তখন তুমি তোমার সুধায় ভরিয়ে দিয়ো প্রাণ,
মৃত্যুর মুখেও যেন শুনি জীবনেরই গান।

হে চিরসুন্দর, সকল মাধুরী যেদিন যাবে ফুরিয়ে,
আমার সকল ব্যথার প্রদীপ দেবে আঁধার ঘিরে—
সেদিন তুমি করুণাধারা হয়ে এসো নেমে,
আমায় একটু রেখো তোমার অনন্ত প্রেমে।

যতদিন এই পৃথিবীতে শেষ পলাশটি ফোটে,
যতদিন কোনো নদী তার বিরহকথা ছোটে,
ততদিন এই একটি প্রার্থনা থাকুক মোর—
জীবন শুকাক, সুর না শুকাক,
প্রেমের না হোক ভোর।


১১.     মুছে যাওয়া অক্ষর


পৃথিবীর মাটির গায়ে একদিন
লিখেছিলাম এক হৃদয়তমার নাম -
বৃষ্টির অশ্রু, রোদের আঙুল
মুছে দিয়েছে তার নামের অক্ষরগুলো। 

কত কথা ছিল বলার বাকি,
কত স্বপ্নের অসমাপ্তি—
আলো-আঁধারের যাতায়াতে
হারিয়ে গেছে জীবনের চিঠি।

তবু কোনো গোধূলিবেলায়
বাতাস যদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
মনে হয়, সেই মুছে যাওয়া অক্ষর
আজও কাঁদে পৃথিবীর মাটির গায়ে।

শুধু কেউ পড়তে জানে না তার
বিষাদময় গোপন ভাষা—
যে ভালোবাসা লেখা হয়েছিল অশ্রুতে
তা মুছে গিয়েও রায় গেছে।


১২.      পৃথিবীর মায়া


মরে গেলে মনে হবে
যদি পৃথিবীতে আরও কিছুদিন
রয়ে যেতাম,
হাঁটতাম কুসুমপুরের ধানক্ষেতের আলপথে,
দেখতাম, বাতাসের আদরে
পাকা ধানের শিষ কীভাবে মাথা নোয়ায়,
শিশিরের আয়নায় কীভাবে ধরা পড়ে
এক টুকরো অনন্ত আকাশ।

আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে
মায়ের কোলে মাথা রেখে
আরেকবার শৈশবে ফিরে যেতাম,
প্রিয় মানুষের হাতখানি ধরে
বলতাম— ভালোবাসি,
যে কথাটি বলতে গিয়ে
কত সন্ধ্যা নীরবতায় কেটে গেছে।

অথচ মৃত্যু তো অপেক্ষা করে না,
সে জানে না ধান পাকার সময়,
বোঝে না শিউলি ফোটার ব্যাকুলতা,
তার কোনো প্রিয় মুখ নেই,
কোনো ফেলে আসা বিকেল নেই,
কোনো নদীর কাছে তার ঋণ নেই।

কিন্তু আমি যে মানুষ!
আমার বুকের ভেতর কত অসমাপ্ত ঋতু,
কত অনুচ্চারিত ভালোবাসা,
কতবার ফিরে তাকানোর ইচ্ছা!
আমি চলে যেতে পারি,
কিন্তু কীভাবে ফেলে যাব
বৃষ্টির গন্ধে ভিজে থাকা এই মাটিকে,
সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখিদের,
জানালায় পড়ে থাকা রোদের শেষ টুকরোটিকে?

মৃত্যু এসে বলবে, সময় শেষ।
আমি বলব, দাঁড়াও—
আরেকবার কুসুমপুরের পথে হেঁটে আসি,
আরেকবার মায়ের নাম ধরে ডাকি,
আরেকবার প্রিয় চোখের গভীরে
আমার সমস্ত পৃথিবী দেখে নিই।

মৃত্যু নীরব থাকবে।
তার নীরবতায় কোনো সান্ত্বনা নেই,
ফিরে আসার কোনো আশ্বাস নেই।
তখন বুঝব—
মৃত্যুর কাছে হেরে যাওয়া
আর মায়ার কাছে হেরে যাওয়া
এক কথা নয়।

মৃত্যু আমার শরীরকে নিয়ে যাবে,
কিন্তু যে পথে একদিন হেঁটেছিলাম,
যে মানুষটিকে ভালোবেসেছিলাম,
যে আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে
নিজেকে পৃথিবীর অংশ ভেবেছিলাম—
সেসব কি মৃত্যুরও নাগালের মধ্যে?

হয়তো একদিন আমার নাম
কেউ মনে রাখবে না,
আমার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাবে
সময়ের ধূসর কুয়াশায়।
তবু কুসুমপুরের আলপথে
যখন বাতাসে দুলবে ধানের শিষ,
আমি কি সেই দোলার ভেতর
একটুখানি বেঁচে থাকব না?

তাই মৃত্যু, তুমি এসো—
আমি জানি, একদিন আসতেই হবে তোমাকে।
কিন্তু তার আগে
আমাকে আরও কিছুদিন বাঁচতে দাও।

আরেকবার পৃথিবীর দিকে তাকাই,
আরেকবার প্রিয় মানুষকে বলি— ভালোবাসি,
আরেকবার মাটির গন্ধে
আমার সমস্ত অস্তিত্ব ভরে নিই।

তারপর যখন সমস্ত পথ
এসে থামবে অনিবার্য অন্ধকারে,
আমি তোমার হাত ধরব।

কিন্তু জেনো,
তোমার সঙ্গে চলে গেলেও
আমার মন পড়ে থাকবে পৃথিবীতে।

মৃত্যু শেষ করে দেয় জীবন,
মায়া শেষ হতে দেয় না পৃথিবীকে।


১৩.      মায়াবী নদী 


কখনো তোমাকে মায়াবী নদীর মতো মনে হয়,
যার কূলে আমি মগ্ন হয়ে বসে থাকি—
জলের বুকে ভাসে নীল আকাশের ছায়া,
আর আমার সমস্ত বিষাদ ধুয়ে যায়
তোমার ঢেউয়ের গোপন দীর্ঘশ্বাসে।

কখনো তোমাকে মনে হয়
জোছনায় ভেজা এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ,
যেখানে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল পেরিয়ে
আমি একটু শান্তির মতো ঘুমিয়ে পড়তে চাই।

কখনো তুমি শরতের আকাশ,
আমার একলা চোখে মেঘের ভেলা ভাসাও,
কখনো তুমি বৃষ্টিভেজা কৃষ্ণচূড়া,
যার ঝরে-পড়া ফুলে আমি
হারানো বসন্তের ঘ্রাণ খুঁজে পাই।

কখনো তোমাকে মনে হয়
বহু জন্মের চেনা কোনো বিষণ্ণ সুর,
যা ভুলে যেতে চেয়েও ভুলতে পারিনি—
যার প্রতিটি বিষাদময় কম্পনে
আমার হৃদয় তোমার নাম ধরে কাঁদে।

অথচ তুমি কত দূরে!
তবু সন্ধ্যা নামলে মনে হয়,
তোমার আঁচল ছুঁয়ে হেঁটে যায় বাতাস,
তোমার চোখের মায়ায় ডুবে থাকে চাঁদ,
আর আমার সমস্ত না-পাওয়া
গোপনে তোমার কাছে ফিরে যেতে চায়।

জীবন যদি একদিন ফুরিয়ে যায়,
যদি থেমে আসে হৃদয়ের নদী,
তবু আমার শেষ ইচ্ছেটুকু রেখো—
তোমার মায়াবী কূলে
একটি নুড়িপাথর হয়ে পড়ে থাকতে চাই,
যাতে তোমার ঢেউ এসে
বারবার আমাকে ছুঁয়ে যায়।


১৪.     আকাশ ও নদী


আকাশকে ভালোবাসে নদী 
যোজন যোজন দূরে তার নীল প্রেমিক,
তবু প্রতিটি ঢেউয়ে ঢেউয়ে
নদী তার ছায়া মেখে রাখে।

কখনো আকাশ মেঘের আঁচলে
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে তার বুকে,
কখনো নক্ষত্রের নিঃশব্দ চুম্বন
রেখে যায় জলের গোপন মুখে।

কখনো রৌদ্রের তীব্র অভিমানে
নদীর শরীর ওঠে জ্বলে,
তীরের লতাগুল্ম বিষণ্ণ চোখে
দেখে প্রেমের দহন অনলে।

নদী জানে, আকাশ তার নয়,
তবু তার সমস্ত জলরাশি জুড়ে
আকাশেরই নীলিমা বয়ে চলে।
কত কথা, কত ব্যাকুলতা
ঢেউয়ের গোপন কান্নায় দোলে।

ইচ্ছে করে, এক বিন্দু জল
বাষ্প হয়ে উড়ে যাক নীলের দেশে,
বলে আসুক—‘তোমায় ভালোবাসি,
রাখো আমায় তোমার বুকের শেষে।’

কিন্তু নদী নদীই থেকে যায়,
আকাশ থাকে বহুদূরের আকাশ,
মাঝখানে শুধু বাষ্পের দীর্ঘশ্বাস,
আর ভালোবাসার অনন্ত আকাশ।

তবু প্রতিদিন নদী বয়ে চলে,
আকাশকে বুকে নিয়ে—
যে প্রেম কখনো ছুঁতে পারে না,
সে-ই প্রেম বেঁচে থাকে
সবচেয়ে গভীরে।


১৫.     চরিতার্থ প্রেম


তুমি আমার জীবন চরিতার্থ করেছিলে,
তোমার স্পর্শে সব ফুলের আগুন
নীল দিগন্তে মিশে গিয়েছিল,
আর আমাদের সমস্ত ভালোবাসা
নত হয়েছিল পৃথিবীর বুকে।

সেইখানে, ঠিক একই বিন্দুতে,
তুমি আর আমি -
দুটি পৃথক সত্তা ভুলে
একাকার হয়েছিলাম প্রেমের আদিম মন্ত্রে।
বলো, সেইখানে শূন্যতা আসে কী করে?
ম্লান হয় কি আজও সেই স্বেদবিন্দু,
সেই অনাবৃত শিহরণ,
অধরের গভীরে জমে থাকা
অমৃতময় আকুলতা?

প্রেম কি কখনো মুছে যায়?
দেহের উত্তাপ পেরিয়ে
যে চিহ্ন গেঁথে থাকে আত্মার গভীরে,
কাল কি পারে তার একটি পাপড়িও ঝরাতে?

জ্বলুক তোমার দীপ্তিময় সুধা,
সেই আলোয় ধুয়ে যাক
নশ্বর জীবনের সমস্ত আর্তি,
দুঃখের দীর্ঘ ছায়া, সুখের ক্ষণিক মায়া।

এসো, আরও কাছে এসো -
তোমার সমস্ত ভালোবাসায়
আমাকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করো;
আমার প্রতিটি শিহরণে
রেখে যাও তোমার অনন্ত স্বাক্ষর।

আজ আর কোনো দূরত্ব নয়,
কোনো দ্বিধা নয়, কোনো আড়াল,
তোমার হৃদয়ে আমার চিরনিবাস হোক,
আমার হৃদয়ে তোমার অনন্তকাল।

যতদিন শরীরে প্রাণের প্রদীপ জ্বলে,
ততদিন প্রেমের এই অমোঘ অর্ঘ্যে
চরিতার্থ হোক আমাদের দুটি হৃদয় -
আর মৃত্যুর পরেও
ভালোবাসা বেঁচে থাকুক
একই বিন্দুতে,
একই আত্মায়,
এক অনিঃশেষ মিলনের নাম হয়ে।


১৬.      শুধুই মায়া


জীবনের কোনো এক তন্ময় বিকেলে
মানুষ আর কাউকে ঘৃণা করতে পারে না,
ভালোবাসার জন্যও কেঁপে ওঠে না বুক—
অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
সবকিছু ঝরে পড়ে জীর্ণ পাতার মতো।

তখন হৃদয় কেবল মায়া চায়,
শরতের আকাশভাঙা বৃষ্টির মতো—
যে বৃষ্টিতে ভিজলে
কোনো স্মৃতি ফিরে পেতে হয় না,
কাউকে হারানোর ভয় থাকে না আর।

শুধু একটুখানি স্নিগ্ধতা,
একটি মায়াময় হাতের ছায়া,
আর জানালার ওপারে ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দ—
যেন পৃথিবী তার সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে
মাথা রাখে এক বিষণ্ন বিকেলের কোলে।

তখন মানুষ প্রেমিক নয়, বিরহীও নয়—
সে কেবল এক আশ্রয়হীন মায়ার নাম;
যার কিছু চাওয়ার নেই,
কিছু পাওয়ার নেই—
শুধু বৃষ্টির মতো ঝরে যেতে ইচ্ছে করে
কারও বুকের নীরবতায়।

ভালোবাসারও ওপারে বুঝি এমন এক দেশ আছে—
যেখানে মানুষ কাউকে চায় না,
শুধু চায়, কেউ তাকে একটু মায়া করুক।


১৭.      ক্ষণিকের অতিথি


জীবনের দীর্ঘ পথে
কেউ কেউ আসে হঠাৎ
নির্জন দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি,
অন্ধকার ঘরে এক ফালি চাঁদ,
কিংবা ক্লান্ত চোখে নেমে আসা
অচেনা কোনো মায়ার মতো।

তাদের সঙ্গে ঘর বাঁধা হয় না,
একই পথে হাঁটার প্রতিশ্রুতিও নয়;
তবু কী আশ্চর্য,
তারা চলে যাওয়ার পরও
হৃদয়ের গোপন অলিন্দে
তাদের পায়ের শব্দ থেকে যায়।

হয়তো কোনো কথা হয়নি,
হয়তো চোখের ভাষায় লেখা হয়েছিল
এমন এক উপাখ্যান
যার কোনো সাক্ষী নেই,
কোনো সমাপ্তি নেই,
শুধু বুকের গভীরে তার অনন্ত বসবাস।

সে জানেও না,
কোনো এক মানুষের নিঃসঙ্গ জীবনে
সে এসেছিল দু-দণ্ড শান্তির মতো;
একটু হাসি, একটুখানি মায়া দিয়ে
চিরকালের জন্য রেখে গিয়েছিল
এক আকাশ নক্ষত্রের আলো।

এমন মানুষই বুঝি
ক্ষণিকের অতিথি
ক্ষণিকের জন্য আসে,
অথচ হৃদয়ের কালপঞ্জিতে
চিরকালের নাম লিখে যায়।

বনলতা সেন কি শুধু নাটোরের এক নারী?
নাকি ক্লান্ত পৃথিবীর বুকে
প্রতিটি মানুষেরই থাকে
এমন কোনো বনলতা
যার কাছে পৌঁছানো হয় না,
অথচ যার চোখের শান্তি
সারাজীবন খুঁজে ফেরে মন?

আজ একবার বুকের গভীরে হাত রাখুন।
স্মৃতির ধুলো সরিয়ে দেখুন
কেউ কি আসেনি আপনার জীবনে
শরতের বিকেলে হঠাৎ ঝরে পড়া
অঝোর বৃষ্টির মতো?

যার কাছে কিছু চাওয়া হয়নি,
যাকে কিছু বলাও হয়নি,
অথচ যার জন্য আজও
কোনো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায়
মন কেমন করে ওঠে অকারণে!

বলুন তো,
এমন কেউ কি সত্যিই চলে যায়?
মানুষ চলে যায়
তারপরও তার মায়া থেকে যায়।
আর সেই মায়ারই নাম হয়তো
ক্ষণিকের অতিথি—
যে এক মুহূর্তের জন্য এসেছিল,
অথচ রয়ে গেল
আমাদের সমস্ত জীবন জুড়ে।


১৮.     শৈশবের কাছে ফিরে যাব


আমি আবার শৈশবের কাছে ফিরে যেতে চাই—
যেখানে কাশবনে শরতের রোদ
সোনালি হাসির মতো ছড়িয়ে থাকত,
যেখানে যমুনার বাতাসে আজও ভেসে আসে
আমার ফেলে আসা দুরন্ত বেলার গন্ধ।

হেঁটে যাব যমুনার পাড় ধরে,
হেঁটে যাব, আরও দূরে—
যতক্ষণ না রমণীর এলো চুলের মতো
নদীর বুকে সন্ধ্যা নেমে আসে,
যতক্ষণ না চরভরা কাশফুলের আড়ালে
দিনের শেষ পাখিটি নীড়ে ফেরে।

তারপর বসব কাশের বনে,
শুনব ঝিঁঝি পোকার একটানা গান—
মনে হবে, পৃথিবী বড়ো শান্ত,
জীবন বড়ো মায়াময়,
হারিয়ে যাওয়ার কিছুই নেই এখানে,
কেবল ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

রাতের মধ্যপ্রহরে মাথার ওপর
খুঁজে নেব লুব্ধক, স্বাতী, অরুন্ধতী, কালপুরুষ—
যেন আকাশের আদিম পুঁথিতে লেখা আছে
আমার বালকবেলার নাম।

দূর নক্ষত্রের আলো গায়ে মেখে
মনে মনে ফিরে যাব সেই দিনগুলোয়,
যখন সামান্য সুখের জন্যও
হৃদয় উজাড় করে হাসতে পারতাম।

কোনো এক বালিকার বেণিবাঁধা চুলে
মুখ ডুবিয়ে নেব গোপন সুবাসে,
যে সুবাস একদিন বুকের মধ্যে রেখে
বড়ো হয়ে গিয়েছিলাম অজান্তে—
আজও যার রেশ লেগে আছে
আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতার গায়ে।

তারপর দাদিমার আঁচলতলে
শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে বসব,
শুনব পিতামহের পুঁথি পাঠ—
কুপির আলোয় কাঁপবে ঘরের দেয়াল,
বাইরে যমুনার জলে জোছনা,
আর আমার চোখে ঘুমের ঘোরে
রূপকথার রাজ্য খুলে যাবে।

আহা, যদি একবার ফিরে যাওয়া যেত!
যদি সময়ের নদী উজিয়ে
ফিরে পেতাম সেই হারানো উঠোন,
সেই মাটির গন্ধ, সেই চাঁদের রাত,
সেই আপনজনের স্নেহমাখা মুখ—
তবে আর কিছুই চাইতাম না জীবনের কাছে।

আজ বুঝি, শৈশব কোনো বয়স নয়,
শৈশব এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ—
যার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল,
তবু তার চাবিটি আজও
আমার বুকের গভীরে
অশ্রুভেজা স্মৃতির মতো
নীরবে রয়ে গেছে।


১৯.     মায়ালোকে


এই মায়ালোকে মায়ায় ভরে আছে মন,
পাতার শিরায় শিরায় বয়ে যায় জীবনের স্পন্দন।
এখানে অশ্রুও একদিন শিশির হয়ে ঝরে,
দুঃখেরা ঘুমিয়ে পড়ে মমতার নরম আঁচলে।

কত বেদনা তুচ্ছ হয়ে যায়
একটুখানি ভালোবাসার স্পর্শে,
কত দীর্ঘ রাত ভোর হয়ে আসে
কারও নীরব উপস্থিতির পরশে।

পৃথিবী তো কেবল পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাব নয়,
কিছু মায়া থাকে—যার কোনো নাম হয় না,
কিছু টান থাকে—যার কোনো গন্তব্য নেই,
তবু তারই কাছে মন বারবার ফিরে যায়।

এই মায়ালোকে তাই হারিয়েও সুখ,
কাঁদলেও বুকের গভীরে জেগে থাকে আলো—
জীবন যতই বিষণ্ন হোক,
মায়ার কাছে এলে
সব দুঃখ ভুলে যেতে ইচ্ছে করে,
আর পৃথিবীকে বড় আপন বলে মনে হয়। 


২০.      মায়ার ওপারে


কোনো এক নীল সন্ধ্যার নির্জন কিনারে
যদি রেখে আসা যেত সমস্ত চাওয়া,
যদি বুকের ভিতর ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যেত
জন্মজন্মান্তরের না-বলা কথারা—
তবে হয়তো মানুষ আর কাঁদত না,
বৃষ্টির কাছে খুলে দিত না গোপন জানালা।

পৃথিবী তখনও ঘুরত আপন নিয়মে,
নদী ভাসাত তার সমস্ত হারানো জল,
শুধু মানুষের চোখে জমত না আর
ফিরে না-পাওয়ার স্থবির মহাকাল।

অথচ, বেদনা না থাকলে
কী দিয়ে চিনতাম মায়ার মুখ?
যে ফুল ঝরে যায়, তারই জন্য
বসন্তের বুকে এত দীর্ঘশ্বাস,
যে মানুষ দূরে চলে যায়,
তারই ছায়া ঘিরে সন্ধ্যা নামে
আমাদের নিঃসঙ্গতার পাশে।

তাই সব স্বপ্ন ফুরিয়ে গেলেও
একটুখানি মায়া বেঁচে থাক -
যেন শীতের শেষে ঘাসের ডগায়
অদৃশ্য শিশিরের কাঁপন,
যেন কেউ নেই জেনেও
দরজাটি আধখোলা রাখার অভ্যাস।

জীবন তো শেষ পর্যন্ত
কিছু হারানো মুখের কাছে ফিরে যাওয়া,
কিছু লুপ্ত ব্যথাকে বুকে নিয়ে
নিঃশব্দে ভালো থাকার অভিনয়।


২১.      মায়াবী দুপুরের গান


ইচ্ছে করে, কোনও এক বাউল দুপুরে
লিখে ফেলি ছন্দহীন একটি কবিতা—
যার কোনও অন্ত্যমিল থাকবে না,
থাকবে শুধু মনখারাপের মতো
এলোমেলো কিছু শব্দ,
আর বুকের গোপনে বেজে ওঠা
এক অচেনা একতারার সুর।

একাকী কোনও ক্লান্ত পাখি
যেমন দূর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে,
আমিও তেমন করে তাকিয়ে থাকি পৃথিবীর মুখে—
যদি কোথাও ভালোবাসার কোনও গান শুনতে পাই,
যদি বাতাসের আঁচলে ভেসে আসে
ফেলে আসা কোনও বিকেলের মায়া।

নিস্তব্ধ দুপুরের এই যে নিঃশব্দ কথারা,
এই যে বুকের ভিতর ঢেউহীন নদীর দীর্ঘশ্বাস,
এদের কি কেউ কণ্ঠে তুলে নিতে পারে না?
কেউ কি নেই, যার ঠোঁটে ছুঁয়ে দিলে
ম্লান হয়ে যাওয়া রোদেরাও জেগে উঠবে,
নীরবতার বুক চিরে বেজে উঠবে
বিসমিল্লাহ খাঁর সানাইয়ের মতো
এক বিষণ্ণ অথচ স্বর্গীয় সুর?

কেউ কি নেই এ পৃথিবীতে—
যে আমার সমস্ত না-বলা কথাকে
একটু মায়া দিয়ে ছুঁয়ে দেবে?

আমি তার কাছে কোনও প্রেম চাইব না,
চাইব না জীবনের কাছে কোনও প্রতিশ্রুতি।
শুধু পাশাপাশি বসে থাকব কিছুক্ষণ—
যেমন নদীর পাশে বসে থাকে উদাস বিকেল,
যেমন ঝরে-পড়া পাতার গায়ে
শেষ রোদটুকু মমতা হয়ে লেগে থাকে।

তারপর সুর থেমে যাবে,
পাখিটি উড়ে যাবে অচেনা আকাশে,
পৃথিবী আবার ডুবে যাবে তার নিজস্ব কোলাহলে।

শুধু আমার ভেতর, বহুকাল ধরে,
বেজে যেতে থাকবে সেই ছন্দহীন কবিতা—
যার কোনও নাম নেই,
কোনও শেষ পঙ্‌ক্তি নেই,
আছে কেবল এক বাউল দুপুরের বুকে
ভালোবাসা হয়ে বেঁচে থাকার
একটুকরো মায়াবী আকুতি।


২২.     উজানহীন


কথা চুপ হলো,
যেন কোনোদিন কেউ কিছু বলেনি,
বাতাস থেমে গেল, আকাশের বুকে
জমে রইল প্রাচীন মেঘের বিষাদ,
তারপর বৃষ্টি নামল,
অঝোর, অবিরাম, দিগন্তভাঙা কান্নার মতো।

নদী সেদিন কাউকে ফেরায়নি,
শুধু দু’কূল ছাপিয়ে বয়ে নিয়ে গেছে
কত চেনা মুখ, কত প্রিয় নাম,
কত অসমাপ্ত কথার নিভে যাওয়া প্রদীপ।

যে জন একবার জলে ভেসে গেল,
তার জন্য ঘাটে আজও সন্ধ্যা নামে,
ভেজা সিঁড়িতে পড়ে থাকে অপেক্ষা,
বাতাসে কাঁপে তার ফেলে যাওয়া গন্ধ -
তবু সে ফেরে না।

নদী জানে, সে আর ফিরবে না কোনোদিন -
উজানের পথে তার পায়ের চিহ্ন নেই,
নেই কোনো নৌকা, কোনো মাঝির গান,
শুধু বৃষ্টির জলে ভেসে আসে
একটি হারানো জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

আহা, মানুষ কি এমন করেই হারায়! 
কোনো বিদায় না বলে, পেছন ফিরে না চেয়ে?
একদিন যার চোখে ছিল ঘরে ফেরার আলো,
আজ সে অনন্ত জলের অন্ধকারে
নামহীন, ঠিকানাহীন, নিঃশেষ।


২৩.      লক্ষ বছর পরে কুসুমপুরে


মৃত্যুটা নাকি শেষ ঘুমের,
যে ঘুম থেকে আর জেগে ওঠা হয় না
আচ্ছা, লক্ষ বছর পরে যদি অলৌকিক কোনো ভোরে
আবার চোখ মেলে দেখি পৃথিবী,
তখন কি এমনই থাকবে কুসুমপুরের আকাশ?
যমুনার বুকে ভেসে বেড়াবে কি আগের মতোই
সাদা মেঘের ছেঁড়া পাল,
ধনিদহ বিলের জলে ফুটবে গোলাপি পদ্ম,
ঠাকুরবাড়ির দীঘিতে কাঁপবে রোদের সোনালি মুখ,
আর বাড়ির পাশের ছোট্ট মসজিদ থেকে
ভেসে আসবে কি ফজরের আজান?

মাঝিবাড়ির পুরোনো ভিটায়
আবার কি জেগে উঠবে দেবী দুর্গার মুখ,
শিউলি ঝরবে উঠোনে, কাশফুল দুলবে চরে,
আর আমাদের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের
সেই টিনের চালের ঘরটিতে
কোনো শিশু কি এখনো পড়বে—
অ, আ, ক, খ?
বৃষ্টির দিনে চালের ফুটো দিয়ে
টুপটাপ জল পড়বে কি মাটির মেঝেতে,
কালো পাটির ওপর চক দিয়ে লেখা
নামগুলো কি মুছে যাবে চিরকালের মতো?

লক্ষ বছর পরে ফিরে এসে
খুঁজব সেই মেঠোপথ, যে পথে ধুলো উড়িয়ে
ছুটে যেতাম বিকেলের খেলায়,
খুঁজব সেই আমগাছ, জামগাছ,
যাদের ছায়ায় কত দুপুর ঘুমিয়ে পড়েছিল,
খুঁজব পুকুরপাড়ের কদমতলা,
যেখানে বর্ষার জলে ব্যাঙ ডাকত সারারাত,
আর জোনাকিরা অন্ধকারের বুকে
জ্বেলে রাখত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্র।

দেখতে ইচ্ছে হবে—
এখনো কি বর্ষা এলে খাল উপচে জল নামে,
এখনো কি নৌকার গলুইয়ে বসে
কোনো মাঝি ভাটিয়ালি গায়,
এখনো কি যমুনার চরে গরুর পাল ফেরে,
রাখাল বালকের বাঁশিতে
সন্ধ্যা কি বিষণ্ণ হয়ে ওঠে?
জামতৈল স্টেশনের দিকে ছুটে যাওয়া ট্রেন
এখনো কি বুকের ভেতর হুইসেল বাজিয়ে
কাউকে নিয়ে যায় দূর পরবাসে?

তারপর যাব আমাদের বাড়ির উঠোনে,
যেখানে মা একদিন আঁচল পেতে
রোদে শুকোতে দিয়েছিলেন ধান,
যেখানে মাটির থালায় দুধভাত মেখে
আমাকে খাইয়েছিলেন পরম মমতায়।
কোথায় সেই মায়ের হাত,
কোথায় তাঁর কণ্ঠের নরম ডাক—
কোথায় সেই চোখ, যার দিকে তাকালে
পৃথিবীর সমস্ত ভয় ঘুমিয়ে পড়ত!

বাবাকে খুঁজব বাড়ির পথের বাঁকে,
মনে হবে, এই বুঝি দূর থেকে হেঁটে আসছেন,
আমার ছোট্ট হাতটি ধরবেন বলে।
ঈদের সকালে নামাজ শেষে
আমার মাথায় হাত রেখে বলবেন,
‘চলো, বাড়ি যাই।’
অথচ লক্ষ বছর পরেও
সেই বাড়ি হয়তো থাকবে,
শুধু বাবা থাকবেন না, মা থাকবেন না—
থাকবে তাঁদের পায়ের চিহ্নহীন উঠোন,
থাকবে স্মৃতির কাছে পরাজিত
একটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

বন্ধুদের খুঁজব স্কুলের মাঠে,
যাদের সঙ্গে মার্বেল খেলেছি,
কখনো ডাংগুলি, কখনো গোল্লাছুট,
কখনো সামান্য কারণে অভিমান করে
পরক্ষণেই ভুলে গেছি সব।
কোথায় তারা? কোন মাটির নিচে
ঘুমিয়ে আছে আমার হারানো দুপুরগুলো?
কোন অচেনা নক্ষত্রের দেশে
তারা কি এখনো আমার নাম জানে?

হয়তো কোনোদিন লক্ষ বছর পরে
পৃথিবী নতুন করে সাজবে,
নদীর নাম বদলে যাবে,
বিলের বুকে গড়ে উঠবে নগর,
আমাদের গ্রামের পথ চিনবে না কেউ,
কোনো মানচিত্রে থাকবে না কুসুমপুর।
তবু কি কোথাও, কোনো অদৃশ্য স্মৃতির কোষে
জমা থাকবে আমার শৈশবের হাসি,
মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ, বাবার হাতের উষ্ণতা,
যমুনার বাতাসে উড়ে যাওয়া
এক মুঠো ধুলোর মায়া?

জানি না, মৃত্যুর ওপারে সত্যিই
আর কোনো সকাল আছে কি না;
জানি না, মহাকালের ঘুম ভেঙে
কোনোদিন ফিরে আসা যায় কি না।
তবু যদি ফিরে আসি—
দেবদূতের মতো কোনো অলৌকিক আলোয়
যদি আবার দাঁড়াই কুসুমপুরের বুকে,
পৃথিবীর কাছে আমার প্রথম প্রার্থনা হবে—

আমাকে নতুন কোনো জীবন দিয়ো না,
নতুন কোনো পরিচয়ও নয়;
শুধু একবার সেই ছোট্ট ছেলেটি করে দাও,
যে মায়ের আঁচল ধরে বাড়ি ফিরত,
বাবার আঙুলে পৃথিবী চিনত,
আর যমুনার জলে নিজের মুখ দেখে
ভাবত—এই পৃথিবী বুঝি অনন্তকাল থাকবে।

লক্ষ বছর পরে যদি আর কিছুই না থাকে,
তবু কোথাও একটুখানি শৈশব রেখো—
যেখানে মা আছেন, বাবা আছেন,
আকাশজুড়ে নীল, বিলভরা পদ্ম,
আর পৃথিবীর সমস্ত পথ পেরিয়ে
একটি ছোট্ট ছেলে আজও বাড়ি ফেরে—
তার নাম কুসুমপুর,
তার সমস্ত জীবনই শৈশব।


২৪.      রক্তক্ষরণের দায়


কেন আমাকে কষ্ট পেতে হয়,
কেন প্রতিটি বিষাদের শেষে
আমারই হৃদয়ে রক্ত ঝরে?
যে ব্যথা আমার নয়,
তারও সমস্ত দায় কেন
আমার বুকের গভীরে এসে ঘর করে?

আমি তো কারও আকাশ থেকে
এতটুকু সুখের নীল চুরি করিনি,
কারও চোখের স্বপ্ন ভেঙে
নিজের ঘরে আলো জ্বালিনি।
তবু কেন সন্ধ্যা নামলেই
আমার জানালায় বিষণ্ণতার ছায়া,
কেন এত অন্ধকারের পরেও
হৃদয় শুধু ভালোবাসার মায়া চায়?

যারা চলে যায়, তারা কি জানে—
কতখানি শূন্যতা রেখে যায় পেছনে?
একটি বিদায়ের শব্দ
কতকাল বাজতে পারে বুকের গোপনে!
যে অশ্রু কারও চোখে দেখা যায় না,
যে দীর্ঘশ্বাস বাতাসও শোনে না,
সেইসব গোপন ক্ষত বয়ে বেড়ানোর
দায় কি কেবল আমারই, বলো?


২৫.      প্রেম মৃত্যুঞ্জয়ী


আমি জানি না,
মৃত্যুর পরে কতখানি আকাশ,
কতখানি অন্ধকার,
কিংবা আত্মা সত্যিই ফিরে আসে কি না
পৃথিবীর মায়াময় উঠোনে।

শুধু জানি, কিছু ভালোবাসা
বিদায়ের ট্রেনের মতো চলে যায়,
তবু তার শব্দ থেকে যায় বুকের ভিতর
বহু রাত, বহু জন্ম, বহু জনমান্তর -
পৃথিবীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজও
আমি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজি।

কুয়াশা নামে, দূরের বাতিগুলো নিভে যায়,
শুধু মনে হয় -
প্রেম যদি মৃত্যুর কাছেও হেরে যায়,
তবে কেন কিছু মুখ
মৃত্যুর পরেও হৃদয় থেকে হারায় না?

হয়তো প্রেমের কোনো পরকাল নেই,
হয়তো পুনর্জন্মও কেবলই মানুষের স্বপ্ন
তবু যদি কোনোদিন অন্য কোনো জীবনে
আমাদের আবার দেখা হয়ে যায়,
আমি তোমাকে চিনব না তোমার নামে,
চিনব না তোমার মুখের আদলে। 

চিনে নেব শুধু সেই চোখের মায়ায়,
যে চোখ একদিন যমুনাবতীর কূলে 
আমাকে করুণস্বরে জিজ্ঞেস করেছিল—
বিশ্বাস করো কি,
প্রেম মৃত্যুঞ্জয়ী?


২৬.      যা হারায়, তাকে যেতে দাও


যে পাখি উড়ে গেছে দূর অচিন আকাশে,
তার ফেরার আশায় আর জানালা খুলে রেখো না,
যে নদী একদিন ভাসিয়ে নিয়েছে
তোমার সাধের ঘর, ভালোবাসার উঠোন,
তার জলে দাঁড়িয়ে আর নিজের ছায়াকে
বারবার ডেকে কাঁদিও না।

যা হারিয়ে গেছে, তাকে হারাতেই দাও
সব হারানোরই কি ফিরে পাওয়া হয়!
কিছু কিছু শূন্যতা থাকে জন্মের মতো সত্য,
কিছু কিছু বিচ্ছেদ বয়ে চলে
নিঃশব্দ মৃত্যুর মতো,
যার কোনো শেষ বিদায় নেই,
নেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

তবু দেখো, সন্ধ্যা নামে,
আকাশের বুকে একটি দুটি তারা জ্বলে
যে আলো একদিন তোমার ছিল,
আজ সে অন্য কোনো জানালায় গিয়ে থামে।
তাতে আকাশের কিছু যায় আসে না,
শুধু বুকের ভেতর একটা পাখি
ডানা ঝাপটায় নিঃশব্দ অভিমানে।

যে মানুষ চলে গেছে,
যে সময় আর কোনোদিন ফিরে আসবে না,
যে স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে মিশেছে
মহাকালের ধূসর কুয়াশায়—
তাদের নিয়ে প্রতিদিন আফসোস কোরো না;
তাতে হারানো ফিরে আসে না,
শুধু হৃদয়ের পুরোনো ক্ষত থেকে
আরও একটু রক্ত ঝরে।

বরং একদিন বিকেলের  রোদে
সব না-পাওয়াকে  ছুঁয়ে বলো—
তোমরা ছিলে, তাই আমার জীবন সুন্দর ছিল
তোমরা নেই, তবু জীবন থেমে নেই।

তারপর জানালাটা খুলে দাও,
দেখো, দূরের গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে,
পথের ধারে একলা ফুল ফুটেছে,
আর তোমারই অজান্তে
জীবন তার ক্লান্ত হাত বাড়িয়ে
তোমাকে আবার ডাকছে।

যা হারিয়েছে, তাকে ভালোবেসে বিদায় দাও
ফিরে পাওয়ার জেদে নয়,
মনে রাখার মায়ায়।
কারণ, সব হারানোই কান্না নয়,
কিছু হারানো একদিন শিখিয়ে দেয় -
যাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না,
তাকে হৃদয়ে রেখে দিতে হয়;
কিন্তু তার শোকে নিজের বেঁচে থাকাটুকু
কখনোই হারিয়ে ফেলতে নেই।


২৭.     মৃত্যুর পদশব্দ


সময় চলে যায়
নিঃশব্দে ঝরে পড়ে আয়ুর পাতা,
ক্যালেন্ডারের বুকে জমে ওঠে
পৃথিবী থেকে বিদায়ের গোপন বারতা।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে না শুধু,
শুনি— কে যেন এগিয়ে আসে
অন্ধকারের পায়ের শব্দ মেখে,
আমারই দরজার কাছে।

অথচ কত কাজ বাকি!
কত কথা বলা হয়নি,
কত অভিমান ছুঁয়ে দেখা হয়নি শেষবার,
কত প্রিয় মুখের দিকে তাকিয়ে
বলা হয়নি— ভালো থেকো,
পৃথিবী ছেড়ে গেলে তোমাদের জন্য
আমার বুকের ভেতরটায়
একটু আকাশ খালি পড়ে থাকবে।

মৃত্যু কোনো বিদায়ের আয়োজন চায় না,
চায় না শেষ বিকেলের দীর্ঘ আলাপন,
সে আসে আকস্মিক ঝড়ের মতো -
নিভিয়ে দেয় চোখের সমস্ত নক্ষত্র,
শব্দের শরীর থেকে খুলে নেয় ধ্বনি,
তারপর এক অচেনা নিস্তবতা
ঢেকে দেয় চেনা পৃথিবীর মুখ।

কোথায় যাবে এত সাধের সংসার,
আলমারিতে রাখা পুরোনো চিঠি,
বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে থাকা ফুল,
কিংবা কারও চোখে রেখে যাওয়া
এক ফোঁটা জলমাখা স্মৃতি?
যে হাত একদিন হাত ধরেছিল,
সে হাতও একদিন শূন্যে ঝুলে থাকবে -
পৃথিবী তখন নিজের নিয়মে
অন্য কোনো সকালের দিকে হাঁটবে।

তবু কেন ভালোবাসি?
কেন সন্ধ্যা নামলে কারও ফেরার অপেক্ষায়
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি?
কেন দূরের আকাশে চাঁদ উঠলে
মনে হয়, এই সৌন্দর্যটুকু
কোনো প্রিয় চোখের সঙ্গে ভাগ করে নিই?

জানি, সবই ক্ষণিকের
তবু কেন হৃদয় চিরকালের
স্বপ্ন দেখে যায়?
হয়তো মৃত্যুই ভালোবাসার গভীরতম কারণ,
যেহেতু ফুল ঝরে যাবে,
তাই তার গন্ধে আজ মেতে উঠি;
যেহেতু নদী একদিন হারাবে সাগরে,
তাই তার জলে পা ডুবিয়ে রাখি, 
যেহেতু মানুষের আয়ু এত ছোট,
তাই মানুষের বুকে মাথা রেখে
একটু অনন্তের স্বাদ খুঁজি।

হে জীবন, তোমার কাছে আর
দীর্ঘ দিনের প্রতিশ্রুতি চাই না,
চাই শুধু বিদায়ের আগে
কারও চোখে একটুখানি মায়া হয়ে থাকতে -
কোনো বিষণ্ণ বিকেলের বাতাসে
আমার নামহীন দীর্ঘশ্বাস মিশে যাক,
কোনো পুরোনো কবিতার পঙ্‌ক্তিতে
আমার হৃদয়ের সামান্য রক্তপাত
ফুল হয়ে ফুটে থাক।


২৮.      চোখ


সেই কতকাল ধরে তোমার চোখের দিকে চেয়ে আছি
যেন অনন্তকাল ধরে এক নীলিমার কাছে
নিঃশব্দে বসে আছে আমার সমস্ত বিস্ময়,
যেন তোমার দুই চোখে ডুবে গিয়ে
আমি ভুলে গেছি পৃথিবীর সমস্ত পথের নাম।

কতবার আমার নয়নের ছায়া
নেমে এসেছে তোমারই নয়নের গভীর জলে,
কত না-বলা কথা, কত গোপন দীর্ঘশ্বাস
ঢেউ হয়ে ভেঙেছে তোমার আঁখিতারার তীরে
অথচ তুমি কিছুই বলোনি,
শুধু চেয়ে থেকেছ এক আশ্চর্য মায়ায়।

কী গভীর তোমার চোখ!
যেন কোনো আদিম অরণ্যের গোপন হ্রদ,
যেখানে যুগের পর যুগ
জমে আছে পৃথিবীর সমস্ত বিষাদ,
আর তারই বুকের গভীরে
ঘুমিয়ে আছে এক অনন্ত ভালোবাসা।

তোমার চোখে আমি দেখেছি জীবনের মুখ,
দেখেছি জন্মের প্রথম আলো,
দেখেছি ঝরে যাওয়া পাতার দীর্ঘশ্বাস,
দূর নক্ষত্রের নিঃসঙ্গতা,
আর সন্ধ্যা নামার আগে
পাখিদের নীড়ে ফেরার আকুলতা।

আমি শুধু চেয়ে থাকি,
যদি কোনোদিন তোমার চোখের অতল থেকে
এক বিন্দু মায়া উঠে এসে
আমার ক্লান্ত হৃদয় ছুঁয়ে যায়;
যদি সমস্ত পৃথিবী হারিয়ে ফেলার পরও
তোমার চোখে খুঁজে পাই
আমার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

জানো,
পৃথিবীর সব সৌন্দর্য দেখা হয়ে গেলেও
কিছু চোখের দিকে তাকানো
কখনো শেষ হয় না—
সেখানে প্রতিবারই নতুন করে
জন্ম নেয় একটি পৃথিবী,
একটি আকাশ,
একটি অনন্ত নীল বিষণ্ণতা।


২৯.        অচেনা গানের সুরে


ছায়া-রোদ্দুর বিকেলে কোথায় যেন গান বাজে,
কে যে গায়, কোন সুদূরের পাখি
তাকে আমি চিনি না,
শুধু তার গানের সুরে কেমন ঘুম নেমে আসে
আমার চোখের পাতায়,
মনে হয়, সন্ধ্যা বুঝি নেমে এল
তারই করুণ সঙ্গীতের হাত ধরে -
পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে যাওয়ার আগে।

মাঝে মাঝে তার ছায়াখানি দেখি,
যেন চেনা কোনো মুখ অচেনা কুয়াশায়
একবার দাঁড়ায়, একবার মিলিয়ে যায়
রোদ্দুরের উত্তাপ হিমেল বাতাসে
কেমন নিঃশব্দে জমে ওঠে বরফের মতো,
বিকেলের শেষ আলোটুকু ঝরে পড়ে
বিষণ্ণ কোনো নদীর জলে।

তখন সত্যিই রাত নামে
গাছের পাতায় পাতায় অন্ধকারের দীর্ঘশ্বাস,
দূরের আকাশে একে একে জ্বলে ওঠে তারা
আমার ভীষণ ঘুম পায়,
তবু ঘুমোতে পারি না কিছুতেই -
যদি সে আসে!

যদি কোনো নিঃশব্দ পায়ে
আমার জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়,
যদি সেই অচেনা গানের সুরে
একবার আমার নাম ধরে ডাকে
যদি তার ছায়ার আড়াল থেকে
একটুখানি মুখ তুলে তাকায় আমার দিকে!

তাই রাত গভীর হয়,
চাঁদ ডুবে যায়, শিশির জমে ঘাসের বুকে,
পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে তার সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে
শুধু আমার চোখে ঘুম আসে না।

আমি জেগে থাকি,
অচেনা সেই গানের শেষ সুরটুকু বুকে নিয়ে,
জেগে থাকি
যদি কোনোদিন সত্যিই সে আসে।

অথবা, কোনোদিন যদি বুঝতে পারি -
সে আসেনি কোনোদিনই,
শুধু তার গানের মায়ায়
আমার সমস্ত জীবন ধরে
একটি বিকেলই সন্ধ্যা হয়ে আছে!


৩০.      চিরকালের মায়াবতী


জীবনের প্রতি কেমন যেন ক্লান্তি এসে জমেছে আজকাল,
শরীরের চেয়ে মনটাই যেন বেশি অবসন্ন—
বুকের ভেতর কত না-বলা দীর্ঘশ্বাস,
কত অপ্রাপ্তির ধুলো জমে আছে হৃদয়ের পুরোনো জানালায়।
কত বঞ্চনা, কত প্রেমহীন রাত,
কত ভুলের কাছে নতজানু হয়ে থাকা,
কত অনুশোচনা ফিরে ফিরে আসে
গোধূলির পাখির মতো—
অথচ এই জীবনেই একদিন
প্রেম এসেছিল বসন্তের প্রথম কোকিল হয়ে,
বিরহ এসেছিল শ্রাবণের অশ্রুজল নিয়ে
কিছু পেয়েছি, কিছু হারিয়েছি,
কিছু হারিয়ে আজও তার শূন্যতা বয়ে বেড়াই।

এখন মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে,
সব হিসাবের খাতা বন্ধ করে দিয়ে
একদিন পরিব্রাজক হয়ে বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর পথে—
কাঁধে ছোট্ট একটি ঝোলা,
চোখে অনন্তের নীল,
আর পাশে তুমি—
আমার চিরকালের মায়াবতী,
আমার সমস্ত ক্লান্তির শেষে
একটুখানি শান্তির মতো যে নারী।

চলো, একদিন হারিয়ে যাই দুজনে
মিশরের পিরামিডের ছায়ায়,
ফারাওদের ঘুমন্ত ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়ে
খুঁজে দেখি—
হাজার হাজার বছর পেরিয়েও
মানুষ কেন ভালোবাসার জন্যই
এত দীর্ঘ জীবন গড়ে যায়!

চলো, যাই এথেন্সের পার্থেননে,
রোমের কলোসিয়ামের ভাঙা পাথরে,
পম্পেই নগরীর ছাইঢাকা অলিগলিতে—
যেখানে সময় তার সমস্ত অহংকার নিয়ে
একদিন থেমে গিয়েছিল;
তোমার হাতখানি ধরে ভাবব,
আমাদের এই ক্ষণিকের জীবনও
একদিন ইতিহাসের ধুলোর নিচে হারাবে,
শুধু কোনো এক বিকেলের ভালোবাসা
হয়তো রয়ে যাবে বাতাসের স্মৃতিতে।

চলো, যাই ভারতের অজন্তা-ইলোরা,
খাজুরাহোর পাথরে খোদাই করা প্রাচীন প্রেমের কাছে,
বারাণসীর ঘাটে, গঙ্গার আরতির আলোয়;
সন্ধ্যা নামবে, শঙ্খ বাজবে,
দূরের মন্দিরে জ্বলে উঠবে প্রদীপ,
আর গঙ্গার কালো জলে ভেসে যাবে
আমাদের যত গোপন দুঃখ।
তুমি তখন নীরবে আমার কাঁধে মাথা রাখবে—
পৃথিবীর সমস্ত প্রার্থনার চেয়ে
সেই নীরবতাটুকুই আমার কাছে
বেশি পবিত্র মনে হবে।

চলো, যাই বাগদাদের পুরোনো পথে,
ইস্তাম্বুলের নীল মসজিদের গম্বুজতলে,
জেরুজালেমের প্রাচীন অলিগলিতে,
আল-আকসার আকাশছোঁয়া মিনারের দিকে চেয়ে
একটু নীরবে দাঁড়াই।
মানুষের কত যুদ্ধ, কত রক্তপাত,
কত ধর্মের নামে বিচ্ছেদ—
অথচ একটি কোমল হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা
সেই একই রয়ে গেছে যুগ থেকে যুগান্তরে
কেউ তার হাত ধরে বলুক,
‘ভয় নেই, আমি আছি—
তোমার দুঃখের দিনেও, তোমার শেষ বিকেলেও।’

চলো, যাই কম্বোডিয়ার আংকরভাটে,
প্রাচীন পাথরের গায়ে লেগে থাকা
জঙ্গল ও সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস শুনতে;
মিয়ানমারের বাগানের সহস্র প্যাগোডার পাশে
সূর্য যখন ধীরে ধীরে ডুবে যাবে,
তখন তোমার চোখে সন্ধ্যার ছায়া দেখে
মনে হবে—
পৃথিবীর সব সৌন্দর্য বুঝি
একটি মুখেই এসে আশ্রয় নিয়েছে।

চলো, যাই নেপালের পাহাড়ি পথে,
পশুপতিনাথের মন্দির পেরিয়ে
হিমালয়ের নীল-সাদা নির্জনতায়;
তিব্বতের প্রার্থনাচক্র ঘুরবে বাতাসে,
দূর থেকে ভেসে আসবে ঘণ্টার ধ্বনি,
আর বরফের শিখরে শেষ সূর্যের আলো
লেগে থাকবে আমাদের ক্লান্ত চোখে।
সেখানে কোনো অভিমান থাকবে না,
কোনো পুরোনো ভুলের বিচার নয়—
শুধু তুমি, আমি,
আর পৃথিবীর আদিম নীরবতা।

চলো, যাই পেত্রার গোলাপি পাথুরে নগরে,
জর্ডানের মরুপ্রান্তে বালুর ওপর পা রেখে
অনেক দূরের কাফেলার মতো হেঁটে যাই;
যাই পারস্যের ইসফাহানে,
নীল টালির মসজিদে, ফুলেল বাগিচায়,
যেখানে প্রাচীন কবিদের দীর্ঘশ্বাস
আজও বুঝি গোলাপের গন্ধ হয়ে জেগে আছে।

তোমাকে নিয়ে বসব কোনো নির্জন চায়ের দোকানে,
দুটি পেয়ালা চায়ের পাশে
আমাদের ফুরিয়ে আসা জীবনের গল্প বলব—
কোনো তাড়া থাকবে না,
কোথাও ফেরার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

চলো, যাই গ্রিসের দ্বীপে,
ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির ধারে;
যাই সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি হ্রদে,
আন্দিজের মেঘছোঁয়া পথে,
মাচুপিচুর প্রাচীন পাথরের শহরে।
ইনকা সভ্যতার নীরব ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়ে
তোমাকে বলব,
‘দেখো মায়াবতী, কত রাজ্য হারিয়ে গেছে,
কত সম্রাটের নাম মুছে গেছে মহাকালের খাতায়,
কত সভ্যতা ঘুমিয়ে আছে পাহাড়ের বুকে—
তবু মানুষের বুকের মধ্যে
একটি ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা
কেন কিছুতেই ফুরোয় না!’

চলো, আরও দূরে যাই—
চীনের মহাপ্রাচীর ধরে হাঁটি,
জাপানের প্রাচীন মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি শুনি,
কিয়োটোর বাগানে ঝরে পড়া চেরি ফুলের নিচে
দুজন দুজনের দিকে চেয়ে থাকি;
ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুরে
পাথরের স্তব্ধ বুদ্ধমূর্তির সামনে
কিছুক্ষণ নিজের ভেতরটাকে শুনি।
হয়তো বুঝতে শিখব,
শান্তি মানে সব দুঃখ মুছে যাওয়া নয়,
শান্তি মানে—
দুঃখের সমস্ত ভার নিয়েও
কারও পাশে নির্ভয়ে বসে থাকতে পারা।

তারপর একদিন ফিরব বাংলার নদীর কাছে—
পদ্মা, মেঘনা, যমুনার চিরচেনা জলে;
হয়তো ফিরে যাব আমার কুসুমপুরে,
যেখানে শৈশবের নীল আকাশ আজও
ধনিদহ বিলের গোলাপি পদ্মের ওপর ঝুঁকে থাকে,
যেখানে সন্ধ্যা নামলে দূরের কোনো মসজিদে
আজানের সুর ভেসে আসে বাতাসে।
তোমাকে নিয়ে বসব নদীর পাড়ে,
দেখব সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে—
জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি
যেন ভেসে যাচ্ছে স্রোতের সঙ্গে।

তখন তোমাকে বলব,
‘দেখো, কত দূর ঘুরলাম আমরা,
কত প্রাচীন নগর, কত মন্দির, কত মসজিদ,
কত পাহাড়, কত সমুদ্র, কত নদী দেখলাম;
পৃথিবী তার সমস্ত বিস্ময় মেলে ধরেছিল আমাদের সামনে।
তবু জানো, আমার সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়
কোনো প্রাসাদ ছিল না,
কোনো বিখ্যাত নগর কিংবা তীর্থস্থানও নয়—
আমার সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয় ছিল
তোমার পাশে কাটানো সেই সামান্য সময়টুকু।’

জীবনের কাছে আমার আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই,
নেই কোনো প্রাপ্তির দীর্ঘ তালিকা;
শুধু যদি শেষ বয়সের বিকেলগুলোতে
তোমার হাতখানি আমার হাতে থাকে,
যদি পথের ধারে কোনো অচেনা গাছের ছায়ায়
একটু বসে তুমি আমার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাও,
যদি দূরের নদী দেখে হঠাৎ বলো—
‘চলো, আজ আর কোথাও যাব না,
এইখানেই থাকি কিছুক্ষণ’—

তবে পৃথিবীর সমস্ত পথ ঘোরা হয়ে যাবে,
সমস্ত ইতিহাস পড়া হয়ে যাবে,
সমস্ত তীর্থে মাথা নত করা হয়ে যাবে।
কারণ, মায়াবতী,
আমি পৃথিবী দেখতে চাই ঠিকই,
কিন্তু পৃথিবীর কাছে আমার যাওয়ার চেয়েও
বড় একটি আকাঙ্ক্ষা আছে—
তোমার হাত ধরে পৃথিবীটাকে অনুভব করা।

জীবনের যে ক্লান্তি আমাকে প্রতিদিন
একটু একটু করে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়,
তোমার ভালোবাসার পাশে বসে
সেই ক্লান্তিকে একদিন নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে চাই।

তারপর যদি সন্ধ্যা নামে,
যদি আকাশে প্রথম তারা জ্বলে ওঠে,
যদি আমাদের ফেরার পথটুকু
ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে—
তবু ভয় পাব না।

তুমি পাশে থাকলে
পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও আমার ঘর আছে,
অচেনা পথের ধুলিতেও আমার বসন্ত আছে,
আর জীবনের সমস্ত দীর্ঘশ্বাসের শেষে
একটি শান্ত নদীর মতো
আমার বেঁচে থাকার কারণ আছে।

তুমি—আমার চিরকালের মায়াবতী।


৩১.     তারপর আর এলে না


পূর্ণিমা নিশীথিনীর মতো,
নিশীথ বাতাসের মতো,
সেই রাতে এসেছিলে ক্ষণিকার মতো—
তারপর আর এলে না।
তোমার চোখে সেদিন কী মায়া ছিল,
কী আশ্চর্য জোছনা মেখেছিল তোমার মুখ,
মনে হয়েছিল, এই বুঝি চিরকাল
আমার একাকী জীবনে বসন্ত রবে—
অথচ তুমি বসন্তের পাখি হয়ে
কোন সুদূর অরণ্যে হারিয়ে গেলে,
একবারও ফিরে চাইলে না।

কত রাত চাঁদকে জিজ্ঞেস করেছি,
কোন আকাশে লুকিয়ে রেখেছে তোমাকে?
কত ভোরের শিশিরে খুঁজেছি তোমার মুখ,
কত গোধূলির ম্লান আলোয়
ভেবেছি, এই বুঝি ফিরে আসবে তুমি—
দূরের পথ পেরিয়ে।

কিন্তু প্রতীক্ষারও একদিন মৃত্যু হয়,
দরজায় জমে ওঠে ধুলোর বিষাদ,
বাতাসে উড়ে যায় পুরোনো চিঠির গন্ধ,
আর হৃদয়ের গোপন ঘরে
নিভে যায় একটি প্রদীপ—
যে প্রদীপ তোমার ফিরে আসার আশায়
সারারাত জেগে থাকত।

পূর্ণিমা নিশীথিনীর মতো,
নিশীথ বাতাসের মতো,
সেই রাতে এসেছিলে ক্ষণিকার মতো—
আমার সমস্ত অন্ধকারে
একটুখানি চাঁদের আলো হয়ে।
তারপর আর এলে না।


৩২.     নক্ষত্রলোকে 


আমার সেই  ছন্নছাড়া জীবন
গত হয়েছে বহুদিন আগে -
সেই উদাসী সন্ধ্যা,
অকারণ পথে পথে হেঁটে যাওয়া,
আর হঠাৎ কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে
অস্তরাগের আকাশে হারিয়ে ফেলা চোখ—
সেসব দিনের কত এলোমেলো মুহূর্ত
আজও কেমন মায়া হয়ে ফিরে আসে।

মাঝে মাঝে মন কেমন করে ওঠে,
যেন বহুদিন আগে ফেলে আসা কোনো বসন্ত
নিঃশব্দে ডাকছে আমাকে
তার ঝরে যাওয়া ফুলের গন্ধে।

হারানো বসন্তের জন্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে
কোনো লাভ নেই;
যে নদী একবার বয়ে গেছে,
তার বুকে দ্বিতীয়বার সেই জল আসে না—
আসে অন্য জল, অন্য ঢেউ,
অন্য কোনো আকাশের ছায়া।

মহাকালের দীর্ঘ ছায়াপথে
অনাগত দিনের কত শত বসন্ত
ডানা মেলে অপেক্ষা করে আছে;
কত অচেনা পাখির কাকলিতে
আবার মুখর হবে পৃথিবী,
কত নতুন ফুলের গন্ধে
ভরে উঠবে পুরোনো বাতাস।

প্রিয় মানুষটী চলে গেছে কত দিন হলো—
এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে
কোনো এক অচেনা অনন্তলোকে,
নক্ষত্রদের নিঃসঙ্গ রাজ্যে।
এখন সে বোধ হয় নক্ষত্রেরই মতো,
সময়হীন, বয়সহীন,
পৃথিবীর সমস্ত ক্ষয় আর ক্লান্তির ঊর্ধ্বে
এক অনন্ত আলোর বিন্দু হয়ে আছে।

সব চলে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া নয়,
সব হারানো বিস্মৃতির অন্ধকারে মিশে যায় না।
কেউ কেউ চলে গিয়েও থেকে যায়
আমাদের ঘুমের গভীরে,
আমাদের নিঃসঙ্গ বিকেলের পাশে,
আমাদের সমস্ত অনুতাপের ওপারে—
নক্ষত্রের মতো দূরে,
অথচ আশ্চর্য মায়ায়
হৃদয়ের কত কাছে।


৩৩.     অপার্থিবের অন্ধকারে


বহু সহস্রাব্দের ধূলিমাখা পথ পেরিয়ে,
কত জনপদ, কত নদী, কত বিস্মৃত জনপথের
বুকের ওপর দিয়ে
অবশেষে তুমি এলে আমারই সন্ধানে—
যখন পৃথিবীর সমস্ত পথ ফুরিয়ে
আমি তখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছি।

যে পার্থিবের নির্জন প্রান্তে
একদিন আমার ছোট্ট পর্ণকুটির ছিল,
যেখানে গোধূলি নামত পাখির ডানায়,
আর সন্ধ্যাতারা জ্বলে উঠত আমার জানালায়,
সেইখানেই তুমি এসে দাঁড়ালে—
অথচ তখন সেখানে আমি নেই,
শুধু আমার ফেলে যাওয়া কিছু দীর্ঘশ্বাস
বাতাসের বুকে নিঃশব্দে ভেসে বেড়ায়।

শান্ত, বিষণ্ণ তুমি
অপলক তাকিয়ে রইলে শূন্য কুটিরের দিকে,
তোমার চোখে কোনো অভিযোগ নেই,
নেই ফিরে যাওয়ার তাড়া—
শুধু ক্লান্তিহীন প্রতীক্ষার মতো
এক অনন্ত নীরবতা তোমাকে ঘিরে রাখে।

তারপর তুমি খুঁজতে থাকো আমাকে
অপার্থিবের ঘন অন্ধকারে,
নক্ষত্রের নিভে যাওয়া আলোয়,
মৃত চাঁদের শীতল ছায়ায়,
যেখানে মানুষের নাম মুছে যায়,
মুছে যায় পরিচিত মুখের সমস্ত রেখা,
শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রেমের দীর্ঘশ্বাস
মহাকালের কানে কানে কথা কয়।


৩৪.    তোমার আভাস


প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোয় শিশিরভেজা ঘাসে,
তোমার ছায়া জেগে ওঠে অচেনা সুবাসে।
ফুলের বুকে মৃদু হাওয়া তোমার কথা কয়,
পাখির গানে ঘুম ভাঙে, মন উদাসী হয়।

দূর আকাশের নীলিমাতে তোমার চোখের মায়া,
রোদ্দুর হয়ে ছুঁয়ে যায় মন হারানোর ছায়া।
কোন অদৃশ্য মায়ার বাঁশি বাজে নিরালায়,
তোমার আভাস রেখে যায় হৃদয়েরই গায়।

তুমি কি সেই আলোর পাখি, নাকি স্বপ্নছায়া—
যার আসাতে পৃথিবীজুড়ে অনন্ত মায়া!


৩৫.      ভালোবাসার কাছে


ভালোবাসার কাছেই আমি বারবার নত হই,
তার চোখের ইশারায় ভুলে যাই
পৃথিবীর সমস্ত মানচিত্র,
পায়ের নিচে হারিয়ে যায়
চেনা পথের শেষ সীমানাটুকুও।

সে যদি বলে—
‘চলো, নরকে যাব।’
আমি তার হাত ধরে নেমে যাব
আগুনের লেলিহান অন্ধকারে;
দহনকে মনে হবে বসন্তের উষ্ণতা,
যন্ত্রণাকে মনে হবে প্রেমের অর্ঘ্য।

সে যদি বলে—
‘চলো, স্বর্গে যাব।’
আমি তার চোখে চোখ রেখে
পেরিয়ে যাব নক্ষত্রের সিঁড়ি,
জ্যোৎস্নার নদী, মেঘের ওপারে
অচেনা কোনো অনন্ত আলোর দেশে।

আমার কাছে স্বর্গের আলাদা কোনো ঠিকানা নেই,
নরকের জন্যেও নেই কোনো ভয়।
আমার সমস্ত গন্তব্য জুড়ে
শুধু তার পদধ্বনি, তার ছায়া, তার মায়া—
তারই কাছে হারিয়ে যাওয়ার এক দুর্নিবার আশ্রয়।


৩৬.     যমুনার ঘাটে 


অনেক ঘুরেছি আমি এই বাংলার পথে পথে,
বনবাদাড়, উপকূল, বালিয়াড়ির নির্জন প্রান্তরে;
কত নদী, কত দীঘি, কত অচেনা ঘাট,
কত জনপদ পেরিয়ে দেখেছি পৃথিবীর হাট।
তবু কেন জানি, একটি ঘাটই ডাকে বারবার—
সে আমার শৈশবের যমুনা, সে আমার জন্মভূমির পাড়।

ধানক্ষেতের আলপথ বেয়ে, ইছামতী পেরিয়ে,
তেপান্তরের মাঠ মাড়িয়ে, কত দুপুর গড়িয়ে
সন্ধ্যা নেমেছে এসে যমুনারই বালুচরে,
কত স্বপ্ন ভেসেছে তার ঢেউয়ের পর ঢেউ ধরে।
তখন ভেঁপু বাজিয়ে স্টিমার যেত দূর বন্দরে,
গয়না নৌকা সারি বেঁধে হারাত নীলের অন্তরে।

আজও মনে হয়, সেই ভেঁপুর বিষণ্ণ ডাক
ভেসে আসে বহুদূর থেকে, ভেঙে দিয়ে নীরবতা;
আজও শুনি যমুনার জলে ছলাৎ ছলাৎ সুর,
যেন কত জন্মের স্মৃতি ফিরে আসে বহুদূর।
বালুচরে কাশফুলগুলো হেমন্তের হাওয়ায় দোলে,
হারানো দিনের দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে তাদের দোলে।

কতকাল পেরিয়ে গেল, কত নদী শুকিয়ে গেল,
কত প্রিয় মুখ সময়ের কুয়াশায় হারিয়ে গেল;
শুধু সেই ঘাটটি আজও দাঁড়িয়ে আছে একা,
আমার ফেলে আসা শৈশবের সমস্তটুকু মেখে।
সেখানে গেলে মনে হয়, কেউ ডাকছে নাম ধরে—
কোন সুদূরের মায়া যেন বাঁশি বাজায় অন্তরে।

একদিন কোনো সোনালি সন্ধ্যায়,
যখন সূর্য ডুবে যাবে যমুনার ওপার-আকাশে,
যখন মেঘের গায়ে শেষ আলোটুকু
নিভু নিভু প্রদীপের মতো জ্বলবে ভালোবাসায়,
আমি দাঁড়াব সেই ঘাটে—নিঃশব্দ, একাকী,
বুকের ভেতর বহমান এক নদী নিয়ে বাকি।

তারপর হঠাৎ যদি মেঘের আড়ালে মিশে যাই,
যদি সোনালি আকাশের পথে অচেনা হয়ে হারাই,
যদি আর ফিরে না আসি এই পৃথিবীর ঘরে—
আমাকে খুঁজো না কেউ জনারণ্যের ভিড়ে।
আমি হয়তো মিশে রব যমুনার জলছবিতে,
কাশফুলের দোলায়, কিংবা হেমন্তের বিষণ্ণ গীতিতে।
 
 
৩৭.     যে পথে তুমি নেই


যে পথে কোনোদিন আমার যাওয়া হয়নি,
আজ চলে যাচ্ছি সেই পথ ধরে—
বহু দূরে, আরও বহুদূরে,
যেখানে দিগন্তেরাও ক্লান্ত হয়ে
মুখ লুকোয় কুয়াশার চাদরে।

কেমন অবশ হয়ে আসে পা,
কেমন বিষণ্ণতার ধুলো উড়ে
লেগে থাকে পথের শরীরে
মনে হয়, এই পথের প্রতিটি বাঁকে
কেউ যেন কেঁদেছিল একদিন
আমারই মতো নিঃশব্দ অভিমানে।

যেখানে যাচ্ছি, সেখানে তুমি নেই—
তাই বুঝি দুঃখেরও কোনো বসতি নেই;
নেই বিরহের দীর্ঘশ্বাস,
নেই অপেক্ষার জানালায়
একজোড়া উদাস চোখের ছায়া।

শুধু ক্লান্তিরা পড়ে আছে পথে পথে,
বৃক্ষের ছায়ায়, ধূসর ঘাসের বুকে
তবু আমার পায়ে কোনো ক্লান্তি নেই—
আমি হেঁটে চলেছি অবিরাম,
কোনো গন্তব্যের আশায় নয়,
কোনো প্রাপ্তির মোহে নয়—

শুধু যে পথে তোমার সঙ্গে
কোনোদিন যাওয়া হয়নি,
সেই পথের শেষটুকু ছুঁয়ে দেখতে
আজ আমি অবিরাম হেঁটে চলেছি।


৩৮.     যে নামে বাঁধা যায় না


তোমাকে আকাশ বলি না -
আকাশেরও একদিন সীমানা ফুরোয়,
তোমাকে নদী বলি না -
নদী একদিন সাগরে গিয়ে
নিজের নাম হারিয়ে ফেলে।

তোমাকে ফুল বললে ভয় হয়,
বসন্তেরও তো বিদায়ের দিন আছে
তোমাকে গান বলতেও সাহস পাই না,
সুর থেমে গেলে বুকের ভেতর
কেবল শূন্যতার প্রতিধ্বনি বাজে।

তোমাকে যদি পথ বলে ডাকি,
কোনো এক ক্লান্ত সন্ধ্যায়
তুমি হয়তো অন্যদিকে চলে যাবে
যদি বলি নক্ষত্র,
কালের কালো মেঘে
একদিন তোমার আলোও মুছে যাবে।

তাই আজ তোমাকে কোনো উপমা দেব না,
কোনো সুন্দর নামে ডেকে
সময়ের হাতে তুলে দেব না তোমায়।
শুধু আমার বুকের গোপন ঘরে
একটি নামহীন প্রদীপ জ্বেলে রাখব—
যেখানে তোমার আসা-যাওয়ার
কোনো হিসাব থাকবে না।


৩৯.     কর্মের মাঝে রয়ে যাব


আমার জন্য অশ্রু রেখো না
নিভৃত সন্ধ্যার কোলে,
আমি রয়ে যাব নক্ষত্র হয়ে
তোমাদের পথের তলে।

যে ফুল ঝরে যায় শাখা থেকে,
সে কি হারায় বসন্তের কাছে?
তারই গন্ধ বাতাসে ভেসে
নতুন কুসুমের মাঝে বাঁচে।

যে নদী সাগরে মেশে একদিন,
তার কি ফুরায় পথচলা?
তারই জল মেঘ হয়ে ফিরে আসে,
সবুজ পাতায় দেয় কথা বলা।

আমার যত গান, যত ভালোবাসা,
যত স্বপ্নের বীজ বোনা,
রেখে যাব এই ধুলির পৃথিবীতে—
আমাকে খুঁজো না, কেঁদো না।

আমি আছি শ্রমিকের ঘামে,
কবির কলমে, কৃষকের গানে,
শিশুর চোখের বিস্ময় হয়ে,
মায়ের স্নেহের অমলিন টানে।

যদি কোনোদিন আমার কথা
মনে পড়ে গোধূলিবেলায়,
একটি প্রদীপ জ্বেলে রেখো
অন্ধকারের নির্জন আলয়।

আমার জন্য থামিও না পথ,
থামিও না জীবনের গান,
যে আলো আমি রেখে গেলাম,
তাতেই খুঁজো আমার সন্ধান।

মৃত্যু কেবল দেহের বিদায়,
জীবনের নয় অবসান—
মাটির বুকে কর্মের ভিতর
বেঁচে থাকে মানুষের প্রাণ।

আমার জন্য ফেলো না জল,
বিরহে ম্লান কোরো না মুখ,
আমি তো শুধু একা নই আর—
বিশ্বজুড়ে আমার সুখ।

যতদিন এই আকাশ নীল,
যতদিন নদী বয়ে যায়,
যতদিন প্রেম মানুষের বুকে
নীরব প্রদীপ জ্বালায়।

ততদিন আমি রয়ে যাব
পৃথিবীর অগণন লোকে,
আমারে খুঁজো কর্মের মাঝে,
মানুষের ভালোবাসার চোখে।


৪০.     হরিণ চোখের মেয়ে 


হরিণ চোখের মেয়ে তুমি, বনের গোপন মায়া,
তোমার চোখে সন্ধ্যা নামে, জোছনা মাখা ছায়া।
তোমার চাহনিতে জেগে ওঠে নিঝুম নদীর ঢেউ,
তোমার মতো এমন করে ডাকেনি তো কেউ।

তুমি এলে কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসন্ত জেগে ওঠে,
চাঁদের আলো পথ হারিয়ে তোমার জানালায় ছোটে।
তোমার চুলে রাতের মেঘেরা বাঁধে কালো বাসা,
তোমার ঠোঁটে লুকিয়ে থাকে আমার সর্বনাশা ভালোবাসা।

তোমার চোখে চোখ রাখলে সময় থেমে যায়,
অচেনা এক স্বপ্ন এসে হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
মনে হয়, কত জন্ম আগে কোনো এক পূর্ণিমায়,
তোমায় আমি খুঁজেছিলাম নক্ষত্রের ছায়ায়।

তুমি কি জানো, তোমার জন্য আজও সন্ধ্যাতারা
আকাশজুড়ে জ্বেলে রাখে প্রতীক্ষারই ধারা?
তুমি কি জানো, তোমার নামে বৃষ্টি ঝরে রাতে,
বিরহী চাঁদ একলা জাগে তোমার কথাট সাথে?

হরিণ চোখের মেয়ে তুমি, এসো না একবার,
তোমার জন্য খুলে রেখেছি হৃদয়-দুয়ার।
তোমার হাতে হাতটি রেখে হারিয়ে যাব দূরে,
যেখানে প্রেম নদী হয়ে চাঁদকে ছোঁয় আপন করে।

হরিণ চোখের মেয়ে তুমি, আমার মায়ার বন,
তোমায় ঘিরেই লিখে যেতে চাই ভালোবাসার জীবন।


৪১.      তুমি অমরাবতী
(পৌরাণিক প্রেম, তপস্যা ও অনন্ত বিরহের উপাখ্যান)


আমি বিশ্বামিত্র নই, তবু আমার বুকে
কোন দুর্নিবার ঋষিত্বের আগুন জ্বলেছিল—
কোন অমৃতলোভী সাধনায়
পৃথিবীর সমস্ত রক্তিম প্রলোভন
একদিন পায়ের নিচে রেখে
আমি ছুঁতে চেয়েছিলাম নক্ষত্রের অমরত্ব!

তবু তুমি এলে—
স্বর্গের নন্দনকানন থেকে নেমে আসা
কোনো শক্তা ঊর্বশী, কোনো দুর্বার মেনকা,
তোমার চোখে ছিল আষাঢ়ের প্রথম মেঘ,
তোমার অধরে সন্ধ্যাতারার গোপন কম্পন,
তোমার নিতম্বে পৃথিবীর আদিম বাঁক,
তোমার পদক্ষেপে জেগে উঠেছিল
সৃষ্টির প্রথম বসন্ত, প্রথম কামনা।

বলেছিলে কি কিছু?
নাকি শুধু তাকিয়েছিলে একবার—
আর আমার সহস্র বছরের তপস্যা
একটি দীর্ঘশ্বাসে ছাই হয়ে গিয়েছিল?

তুমি কি সেই পুষ্করের তীর্থজলে
স্নানরত কোনো দেবকন্যা ছিলে,
যার ভেজা কেশ থেকে ঝরে পড়েছিল
স্বর্গের নীল অন্ধকার?

জলবিন্দুতে কাঁপছিল তোমার শরীর,
সূর্যের সোনালি আঙুল
ছুঁয়ে যাচ্ছিল তোমার কাঁধ,
আর আমার সমস্ত মন্ত্র, সমস্ত সংযম
জলের তলায় ডুবে যাচ্ছিল ক্রমশ!

আমি তো তোমার কাছে শরীর চাইনি,
চাইনি রাত্রির গোপন অভিসার,
চাইনি উষ্ণ বাহুর বেষ্টনীতে
আমার সমস্ত পুরুষকার বিসর্জন দিতে।
আমি চেয়েছিলাম নিকষিত হেমের মতো
নির্মল এক আত্মা,
চেয়েছিলাম মৃত্যুকে অস্বীকার করা অমরত্ব—
তবু কেন তোমার চোখের গভীরে
নিজেরই মৃত্যুর মধুর মুখ দেখলাম?

তুমি কি দশটি বছর, না দশটি যুগ,
আমার চৈতন্যের গোপন কক্ষে
নিঃশব্দে সহবাস করেছিলে?
আমার মন্ত্রোচ্চারণের ফাঁকে ফাঁকে
তোমার নূপুর বাজত,
যজ্ঞের ধোঁয়ায় ভেসে আসত তোমার কেশের গন্ধ,
কুশাসনের নির্জনতায়
তোমার অনুপস্থিত শরীর
আমার সমস্ত অস্তিত্বকে ঘিরে রাখত।

আমি তোমাকে বিরহিণী করে
দক্ষিণের দগ্ধ প্রান্তর ছেড়ে
উত্তরে চলে গেলাম—
হিমালয়ের তুষারমৌন শিখরে,
কৌশিকী নদীর নীলাভ তীরে,
যেখানে পাথরও যুগ যুগ ধরে
নিজের কান্না গোপন করে রাখে।

ভেবেছিলাম, বরফের শীতলতা
আমার রক্তের আগুন নিভিয়ে দেবে;
ভেবেছিলাম, দেবদারুর দীর্ঘ ছায়ায়
তোমার স্মৃতি একদিন নির্বাসিত হবে।
কিন্তু হায়, কী আশ্চর্য এই প্রেম!
হিমবাহের গভীরেও
তোমার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করি,
নদীর কল্লোলে শুনি তোমার হাসি,
রাত্রির নক্ষত্রে দেখি
তোমার অনাবৃত চোখের বিস্ময়।

আমি মহর্ষি হতে চাই না, অমরাবতী,
আমি দেবতাদের সভায় আসন চাই না;
ইন্দ্রের বজ্র, ব্রহ্মার বর,
স্বর্গের ঐশ্বর্য—কিছুই নয়।
আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করে,
কেন তোমাকে ভুলতে গিয়ে
আমি আরও গভীরভাবে তোমার হয়ে যাই?
কেন তপস্যার প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে
ঈশ্বরের দিকে উঠতে উঠতে
শেষ পর্যন্ত তোমার কাছেই ফিরে আসি?

তারপর আবার দেবরাজের ষড়যন্ত্র—
স্বর্গের সিংহাসনে বসে ইন্দ্র
কোন নতুন ভয়ের সংবাদ শুনলেন?
আমার তপস্যার তেজে
দেবলোকে কি আবার কম্পন উঠেছিল?
তাই কি এবার মেনকার বদলে
রম্ভাকে পাঠালে—
অপ্সরাদের সেই মোহনময়ী অধিষ্ঠাত্রী,
যার নৃত্যে বসন্তের শিরায় শিরায়
কামদেবের রক্ত প্রবাহিত হয়?

এসো, রম্ভা, এসো—
আমি আর চোখ বন্ধ করব না।
দেখব তোমার নৃত্য,
শুনব তোমার নূপুরের মাদকতা,
দেখব কীভাবে স্বর্গের সমস্ত সৌন্দর্য
একটি নারীশরীরে এসে আশ্রয় নেয়।
কিন্তু সাবধান—
আমার হৃদয় এখন আর সেই তপস্বীর নয়,
যে কামনার কাছে পরাজিত হয়ে
নিজেকে অভিশাপ দিত;
এখন আমার বুকের ভিতর
একটি অনন্ত বিরহ জেগে আছে,
যার কাছে স্বর্গও বড় ক্ষুদ্র।

তুমি এলে—
কিন্তু এবার আমার ইন্দ্রিয়ের দুয়ারে নয়,
রতির নিবিড় আহ্বানে নয়,
কোনো গোপন শয্যার স্বপ্ন হয়ে নয়।
তুমি এলে পাথরের নীরবতা নিয়ে,
চোখে এক অচেনা বিষাদ,
অধরে অনুচ্চারিত অভিশাপের ছায়া।
কোন ক্রুদ্ধ ঋষির শাপে
তোমার রক্তিম শরীর পাথর হয়ে গেল?
কোন অপরাধের দায়ে
তোমার সৌন্দর্যকে নির্বাক করে দিল মহাকাল?

আমি হাত বাড়ালাম—
তুমি স্পর্শ দিলে না।
আমি নাম ধরে ডাকলাম—
তোমার ঠোঁটে ফুটল না কোনো শব্দ।
শুধু কৌশিকীর জলে
একটি দীর্ঘশ্বাস কেঁপে উঠল,
হিমালয়ের শিখরে শিখরে
ফিরে এল আমারই ডাক—

অমরাবতী! অমরাবতী!

তুমি কি তবে সেই নগরী,
যেখানে দেবতারা অমর,
অথচ প্রেমিকেরা চিরকাল মরণশীল?
তুমি কি সেই স্বর্গ,
যার দুয়ারে দাঁড়িয়ে মানুষ
নিজের সমস্ত মানবজন্ম হারায়?
নাকি তুমি আমারই অন্তর্গত
এক অনন্ত, অধরা নারী—
যাকে পাওয়ার জন্য আমি তপস্বী,
যাকে হারানোর জন্য আমি কবি,
আর যাকে ভুলতে না পেরে
আজও মহাকালের কাছে
একটি অসমাপ্ত শ্লোক হয়ে রইলাম?

আমি আর অমৃত চাই না,
চাই না দেবত্বের অভিষেক।
আমার সমস্ত তপস্যা আজ
তোমার পাথর হয়ে থাকা মুখের কাছে নতজানু।

তুমি অমরাবতী—
স্বর্গের নয়,
আমার অন্তরের সেই অমর নগরী,
যেখানে কামনা একদিন প্রেম হয়েছিল,
প্রেম একদিন বিরহ,
আর বিরহ—
জন্মজন্মান্তরের এক অনির্বাণ তপস্যা।

আমি বিশ্বামিত্র নই, তবু আজ বুঝি—
ব্রহ্মর্ষি হওয়া কঠিন নয়,
কঠিন শুধু তোমাকে ভালোবেসে
তোমারই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে থাকা।


৪২.     স্বপ্নেরা মরে না


একদিন সমস্ত আলো নিভে যাবে,
পাখিরা ভুলে যাবে ফেরার পথ,
নদীর বুক থেকে মুছে যাবে
কোনো এক নৌকার দীর্ঘশ্বাস—
তবু সন্ধ্যাতারার চোখে
জেগে থাকবে কারও ফিরে আসার স্বপ্ন।

যে মানুষ আজ রৌদ্রের মতো
ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বুকে,
কাল হয়তো তার নামটুকুও
হারিয়ে যাবে সময়ের ধুলোয়,
শুধু কোনো বিষণ্ণ দুপুরে
অচেনা বাতাস এসে
তার কথা বলবে গোপনে।

পুরোনো বটের ছায়ায়
যেখানে বসেছিল দুটি মন,
সেখানে আজও ঘাসের ডগায়
জমে ওঠে শিশিরের কান্না -
কে জানে, সেই জলবিন্দুতে
কোনো হারানো মুখের ছায়া
এখনো কাঁপে কি না!

পৃথিবী তার সমস্ত পথ
একদিন ফিরিয়ে নেবে মাটির কাছে,
আকাশ তার নীলিমা মুছে
ডুবে যাবে মহাকালের অতলে;
তবু যে স্বপ্ন একদিন
দুটি চোখের নীরবতায় জন্মেছিল,
তার মৃত্যু হবে না কোনোদিন।


৪৩.      কোজাগরী চাঁদের রাতে


কোজাগরী চাঁদ ওঠে নীল আকাশের বুকে,
রুপোলি জোছনা নামে পৃথিবীর চোখে,
নদীর বুকে ভাসে যেন স্বপ্নের শ্বেতপদ্ম,
নীরব রাতের ঠোঁটে জাগে প্রেমের মৃদু ছন্দ।

এই রাতে কে জেগে থাকে, কে বা ঘুমায় ঘরে,
কার চোখে জল জমেছে স্মৃতির শিশির ঝরে?
কার অপেক্ষায় প্রদীপ জ্বলে জানালারই পাশে,
কার বুকের গোপন ব্যথা জোছনা হয়ে ভাসে?

কোজাগরী, তোমার আলো মায়ার মতো নামে,
ঘুমন্ত সব স্বপ্ন জাগে অচিন কোনো গ্রামে।
যে কথা বলা হয়নি আজও, যে প্রেম পায়নি ভাষা,
তোমার আলোয় ফিরে আসে তারই ভালোবাসা।

আমি বসে থাকি একা নদীর ঘাটের ধারে,
জোছনা এসে হাতটি রাখে বিষণ্ণতার পারে।
মনে হয়, এই তো তুমি—বহু জন্মের চেনা,
তোমার চোখে চাঁদ উঠেছে, ঠোঁটে নীরব জ্যোৎস্না।

কোজাগরী, তুমি জেগো অনন্তকাল ধরে,
স্বপ্ন হয়ে থেকো তুমি পৃথিবীর অন্তরে।
মানুষ যাবে, ফুল ঝরবে, নিভবে জীবনের বাতি—
তোমার বুকে জেগে থাকবে প্রেমের পূর্ণিমার রাতই।


৪৪.     স্বপ্ন কথা 


সেদিন রাতে ঘুমের ঘোরে
স্বপ্নের ভিতর তুমি বলছিলে—
“তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না কিছুতেই,
কেউ নিয়ে যেতে চাইলে
আমার হাত টেনে ধরে রাখবে তুমি।”

আমি তোমার হাত ধরেছি
যেমন করে ডুবন্ত মানুষ
শেষ আশ্রয় ভেবে আঁকড়ে ধরে তীর—
তেমন করেই তোমাকে রেখেছি
আমার  হৃদয়ের গহীনের ভিতর।

তুমি কি জানো, প্রিয়,
স্বপ্নেরও কিছু নিষ্ঠুর সকাল আছে—
যে সকালে ঘুম ভাঙে,
অথচ ভেঙে যায় সারা পৃথিবী
বালিশের পাশে পড়ে থাকে শুধু শূন্যতা,
আর বুকের ভিতর তোমার কণ্ঠস্বর
গুমরে কাঁদতে থাকে।

তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছিল কে?
মৃত্যু, নাকি সময়ের কোনো অদৃশ্য দূত?
আমি তো আজও তোমার হাত ধরে আছি 
অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দেখি—
আমার আঙুলে আঙুল রেখে রয়েছ তুমি। 

ভয় পেওনা, এই দুটি হাতের বন্ধন
কখনো ছিন্ন করতে পারবে না কেউ।


৪৫.      আবার যদি ফিরে আসি


এই পৃথিবীর দিকে মুখ রেখে ভাবি—
চলে গেলেও একদিন, শতবর্ষের ওপারে,
আবার ফিরে আসব এই মাটির বুকেই;
যেখানে ধুলোর ভেতর ঘুমিয়ে আছে
আমার ফেলে আসা জন্মের সমস্ত মায়া,
আর বাতাসে ভাসে কত না-বলা কথার দীর্ঘশ্বাস।

যে স্বপ্ন ভেঙে যাবে মৃত্যুর অমোঘ অন্ধকারে,
যে প্রেম অসমাপ্ত থেকে যাবে জীবনের খাতায়,
যে অভিমান বুকে নিয়ে একদিন
নিঃশব্দে পাড়ি দেব অনন্তের ওপারে—
সেই ভাঙা স্বপ্ন, সেই প্রেম, সেই অভিমান
বুকে নিয়ে আবার কি ফিরব এই ধরণির কোলে?

আবার কি চিনতে পারব
আমার ফেলে যাওয়া বিষণ্ণ বিকেলবেলা?
নন্দনকাননের স্নিগ্ধ ছায়ায়
আবার কি ফুটবে সেই অলকানন্দা ফুল?
তার পাপড়িতে জমে থাকবে কি
আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের গোপন ব্যাকুলতা?

অলস দুপুরে বাড়ির আঙিনায়
কেউ কি বসে গাঁথবে বকুলের মালা—
আমারই ফেরার প্রতীক্ষায়,

যাকে এক জীবনে পেয়েছিলাম
হৃদয়ের সমস্ত আলো দিয়ে,
যার চোখে রেখে এসেছি আমার আকাশ,
যার কণ্ঠে শুনেছিলাম বেঁচে থাকার গান—
পরজন্মের কোনো অচেনা প্রভাতে
তাকেই কি আবার খুঁজে পাব?
নাকি পাশাপাশি হেঁটে যাব দুজন,
অথচ চিনব না কেউ কাউকে—
শুধু অকারণ এক মায়ায়
দুজনেরই বুক কেঁপে উঠবে হঠাৎ!

এই শস্যক্ষেত, এই নদী, এই নীল আকাশ,
ধানের শিষে লেগে থাকা রোদের মায়া,
নদীর বুকে সন্ধ্যার শেষ সোনালি দীর্ঘশ্বাস—
সব কি থাকবে আগের মতো?
নাকি নদী তার পথ বদলাবে,
আকাশ মুছে ফেলবে পুরোনো নক্ষত্রের নাম,
আর আমার চেনা পৃথিবী
অচেনা কোনো স্বপ্নের মতো
হারিয়ে যাবে সময়ের অতল গহ্বরে?


৪৬.     কুসুমপুরের বাড়ির উঠোন 



কাঁটালতা একদিন ঘিরে ধরবে ঘরের বন্ধ দরজাগুলো,
যে উঠোনে একদিন মানুষের কণ্ঠে সকাল হতো,
সেখানে এখন বুনো ঘাসের বুকে জমে থাকে
নিঃসঙ্গ দুপুরের দীর্ঘশ্বাস।
ফুলের বাগান হারিয়ে গেছে বনবাসের অন্ধকারে,
শুকনো পাতার নিচে চাপা পড়ে আছে
কত চেনা পায়ের শব্দ, কত ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

কেউ থাকে না এই বাড়িতে—
জানালাগুলো সারাদিন শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে,
দরজার কপাটে জমে ওঠে অভিমানের ধুলো,
আর বাতাস এসে বারবার খুঁজে ফেরে
সেই মানুষগুলোর গায়ের গন্ধ,
যারা একদিন এই ঘরকে ঘর করে রেখেছিল।

এখন উঠোনজুড়ে বনজঙ্গল, আগাছার দখল,
তবু কোথাও কোথাও পড়ে আছে
পুরোনো দিনের একটুখানি রোদ,
কোনো এক বিকেলে ফেলে যাওয়া ছায়া,
কিংবা কারও অসতর্ক হাতে রাখা
ভাঙা মাটির প্রদীপ।

সন্ধ্যা নামলে এই বাড়ির বুকের ভেতর
কে যেন নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে—
তার কান্না শোনার কেউ নেই,
দরজা খুলে বলার কেউ নেই,
‘এতদিন কোথায় ছিলে? এসো, ঘরে এসো।’

একদিন হয়তো এই বাড়ির নামও মুছে যাবে,
পথিক জানবে না—এখানে একদিন সংসার ছিল,
হাসি ছিল, অভিমান ছিল,
কারও জন্য কারও বুকের ভেতর
একটা আস্ত পৃথিবী জেগে থাকত।

শুধু কাঁটালতারা জড়িয়ে ধরবে ভাঙা দরজা,
ঘাসেরা ঢেকে দেবে মানুষের ফেরার পথ—
আর এই পরিত্যক্ত বাড়ি
মাটির দিকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবে
একটি মৃত ভালোবাসার মতো।


৪৭.    মান


ঘরে বউয়ের সাথে রাগ করে কথা বলা বন্ধ রেখে বেশিক্ষণ টিকে থাকা যায় না। উঠতে বসতে চলতে ফিরতে খেতে ঘুমুতে সবকিছুতে তার প্রয়োজন  হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাকে আদর করে ডেকে মান ভাঙ্গিয়ে কথা বলতেই হয়।

আসলে সংসার এমনই—
এখানে রাগ করে থাকা যায়,
কিন্তু দূরে থাকা যায় না
কথা বন্ধ রাখা যায়,
কিন্তু মায়ার দরজা বন্ধ হয় না।

দিনের শেষে যত অভিমানই জমুক,
ভালোবাসা তার চেয়ে বড়—
তাই তো বারবার নিজের রাগ ভুলে
তোমার কাছেই ফিরে আসি।

কারণ, এই জীবনে তোমার সঙ্গে
ঝগড়া করে জেতার চেয়ে
তোমাকে বুকে টেনে নিয়ে
হেরে যাওয়াটাই আমার
সবচেয়ে প্রিয় সুখ।


৪৮.    নিভে যায় আলো


যতবার সন্ধ্যার বুকে
একটি প্রদীপ জ্বালাতে চাই,
ততবার কে যেন নিঃশব্দে এসে
আঙুল রাখে শিখার গায়।

যতবার মেঘের আড়াল থেকে
একফালি চাঁদ খুঁজে নিই,
ততবার আকাশ অশ্রু ঝরায়—
আমি একা জানালায় বসে রই।

আমারও তো ইচ্ছে ছিল
একটি সকাল আপন করে পাব,
শিশিরভেজা ঘাসের বুকে
হারানো স্বপ্ন কুড়িয়ে নেব।

আমারও তো ইচ্ছে ছিল
কেউ বলুক— আছি, ভয় কী তোমার?
অন্ধকারের দীর্ঘ প্রহরে
কেউ রাখুক হাত হাতের উপর।

অথচ আমার ঘরের কোণে
নৈঃশব্দ্যেরা বাসা বাঁধে,
যে পাখিটি গান শোনাত
সে-ও আজ আর ফিরে না আসে।


৪৯.     মায়ার ফুল


তোমারে কি কেউ বুকে করে রাখে,
অভিমানের অশ্রু মুছিয়ে দেয় পলকে?
কেউ কি বোঝে তোমার নীরবতার ভাষা,
কেউ কি আগলে রাখে তোমার সর্বনাশা
বিষাদগুলো, বুকের গোপন কুঠুরিতে?

কেউ কি কখনো সন্ধ্যা নামার আগে
তোমার ফেরার পথ চেয়ে জেগে থাকে?
কেউ কি তোমার শূন্য বিছানার পাশে
একটু মায়া রেখে যায় নিঃশব্দ নিঃশ্বাসে?

হয়তো তোমার জন্য কেউ কাঁদে গোপনে,
নাম না জানা কোনো বিষণ্ণ ক্ষণে
হয়তো কেউ তোমার কথা ভাবতে গিয়ে
হারিয়ে যায় নিজেরই অজানা নদীতে।

তবু যদি কেউ না রাখে বুকে,
কেউ যদি না ডাকে মায়াভরা সুখে
নিজেকে রেখো তুমি নিজেরই কাছে,
যেমন করে ফুল তার সুবাস বাঁচিয়ে রাখে।

তুমি একা হয়ো না, হে বিষণ্ণ প্রাণ,
তোমার বুকেও জেগে থাকুক ভালোবাসার গান,
যে পৃথিবী তোমায় আজও চিনল না ঠিক,
তারই কোনো ভোরে তোমার জন্য
একটি মায়ার ফুল দিক।


৫০.      মৃত্যুদূত


তিনি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন।
ভাবগম্ভীর স্বরে বললেন—
“তোমাকে নিতে এসেছি...”

আমি চমকে তাকালাম তাঁর মুখে,
কী আশ্চর্য! কোথাও কোনো ক্রোধ নেই,
চোখে নেই নিষ্ঠুরতার ছায়া,
শুধু এক অনিবার্য নীরবতা
সন্ধ্যার পাখির মতো ডানা গুটিয়ে
বসে আছে তাঁর দুই চোখের কোণে।

আমি বললাম,
আর একটু সময় হবে?
জানালার পাশে আমার কিছু স্বপ্ন পড়ে আছে,
কিছু চিঠি লেখা হয়নি আজও,
কাউকে বলা হয়নি—
তাকে কতখানি ভালোবেসেছিলাম!

আমার মায়ের কবরের পাশে
একবার কি দাঁড়াতে দেবে?
এক মুঠো মাটি বুকে নিয়ে
বলতে চাই— মা, আমি আসছি!
বাবার ঘুমন্ত কবরের মাটিতে
একটু কপাল ছুঁইয়ে
শৈশবের কাছে ক্ষমা চেয়ে আসি।

আর ওই যে ঘরে আমার প্রিয় মানুষটি,
আমার জন্য যার চোখে জমে থাকে
অভিমানের মেঘ,
যার হাতের স্পর্শে প্রতিদিন
পৃথিবীটাকে নতুন মনে হয়—
তাকে কি একবার জড়িয়ে ধরতে পারি?


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন