সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মায়াবী বেদনা ( কাব্যগ্রন্থ)



মায়াবী বেদনা  ( কাব্যগ্রন্থ ) 
প্রথম প্রকাশ -- ২০২৫ ইং

উৎসর্গ -

লেখাপড়ার দিনগুলো পেরিয়ে
আমরা যখন যে যার জীবনের ব্যস্ত স্রোতে 
ভেসে গেছি,
তখনো একজন নীরবে, অবিচল হাতে
আমার খবর রেখেছে,
ভুলে যায়নি বন্ধুত্বের ঠিকানা।
সে আমার বন্ধু, আব্দুল হক—
বাংলা সাহিত্যকে হৃদয়ে ধারণ করে
যে হয়ে উঠেছিল একদিন
মস্ত বড়ো ব্যাংকার।

বন্ধু, এই গ্রন্থখানি তোমারই করকমলে 
তুলে দিলাম,
আমার স্মৃতি, আর আমার হৃদয়ের উষ্ণতা হয়ে।


১.     নিজেকে ছুঁয়ে দেখি অন্ধকারে

নিজেকে ছুঁয়ে দেখি অন্ধকারে
হাতের তালুতে জমে থাকে নীরবতা,
চেনা শরীর, অথচ অচেনা স্পন্দন,
ভেতরের দিকে হেঁটে যাওয়া একা একা পথ।

আলো নিভে গেলে
আয়নাগুলো সত্য কথা বলে,

নামহীন ক্ষতগুলো তখন
শব্দ ছাড়াই চোখে চোখ রাখে।

আমি নিজের কাঁধে রাখি নিজের মাথা,
নিজের দীর্ঘশ্বাসে নিজেকেই সান্ত্বনা দিই,
অন্ধকারের বুকের ভেতর
নিজের আলো খুঁজে ফিরি ধীরে ধীরে।

সব হারানো মুখেরা আসে না আর,
তবু তাদের শূন্যতা
আমার আঙুলে লেগে থাকে
ঠান্ডা, অথচ গভীরভাবে চেনা।

নিজেকে ছুঁয়ে দেখি অন্ধকারে,
ভাঙা আমি, তবু সম্পূর্ণ,
কারণ কেউ না থাকলেও
আমি তখনও নিজের সঙ্গে আছি।


২.         শ্রান্ত চরণের গান


দিন ফুরিয়ে এলে আমার চরণদুটি কথা বলতে শুরু করে।
ওরা বলে—পথ আজ খুব লম্বা ছিল, বাতাস ভারী ছিল স্মৃতিতে,
আর প্রতিটি ধুলোকণা যেন বহন করছিল কোনো না–বলা ক্লান্তি।
হাঁটতে হাঁটতে আমি বুঝে যাই, শরীর নয়, আসলে হৃদয়ই আগে শ্রান্ত হয়।

চরণের তলায় জমে থাকে কত অদৃশ্য ক্ষত,
কিছু আশা ভেঙে পড়ার শব্দ,
কিছু অনুচ্চারিত প্রার্থনা,
কিছু মুখ—যাদের দিকে ফিরে তাকানো হয়নি আর কোনোদিন।
এই পথ জানে, কোথায় আমি থেমে গিয়েছিলাম,
কোথায় থামতে চেয়েও থামিনি।

রাত এলে অন্ধকার মাটির মতো নরম হয়ে আসে।
চাঁদের আলো চরণ ছুঁয়ে বলে,
এত বোঝা বহন করেও তুমি হাঁটছো,
এতেই তোমার সমস্ত গান।
ক্লান্ত পায়ের স্পন্দনে জন্ম নেয় এক নিঃশব্দ সুর,
যা শোনা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়।

ঘুম নামলে চরণদুটি বিশ্রাম নেয় স্বপ্নের উঠোনে।
সেখানে কোনো পথ নেই, কোনো গন্তব্য নেই,
শুধু হালকা ঘাস, শিশির, আর অকারণ শান্তি।
শ্রান্তি সেখানে আর বোঝা নয়,
সে হয়ে ওঠে আশ্রয়।

ভোর আসার আগে চরণ আবার প্রস্তুত হয়।
কারণ তারা জানে,
এই থেমে যাওয়াই শেষ নয়,
শ্রান্ত চরণের গানই আসলে পথচলার সাহস।


৩.          রাত্রি জানে আমার নাম


রাত্রি জানে আমার নাম,
ডাক দেয় না, তবু চিনে রাখে।
অন্ধকারের বুকের ভেতর
আমার নিঃশ্বাসের শব্দ আলাদা করে শোনে সে।

সব আলো ঘুমিয়ে পড়লে
আমি বসে থাকি নীরবতার পাশে,
চাঁদের ছায়া এসে পড়ে কপালে,
রাত্রি তখন আমার কপালের রেখা পড়ে নেয়।

দিনের মানুষগুলো যে প্রশ্ন করে,
রাত্রি সেগুলো করে না,
সে শুধু জানে,
কোথায় আমার ভাঙন, কোথায় আমার প্রার্থনা।

নক্ষত্রের ফাঁকে ফাঁকে
আমি লুকিয়ে রাখি আমার অশ্রু,
রাত্রি সেগুলো গুনে রাখে
ভোরের আলোকে কিছুই বলে না।

আমি যখন নিজের কাছেই অপরিচিত,
রাত্রি তখন ধীরে বলে
“তুমি একা নও।”
এই বলেই সে আমার নাম বলে ।


৪.         তুমি যেখানেই যাও 


তুমি যেখানেই যাও
রোদে পুড়ে যাওয়া দুপুরে,
অথবা হঠাৎ নামা অচেনা সন্ধ্যার কুয়াশায়
আমি থাকি তোমার ছায়ার ভিতর,
পা ফেলার আগেই মাটিকে চিনিয়ে দিই
তোমার নরম পদচিহ্ন।

তুমি যখন দূরের শহরে ট্রেন ধরো,
জানালার পাশে বসে
পিছিয়ে পড়া মাঠ, নদী, ঘরবাড়ি দেখো
আমি তখন জানালার কাঁচে লেগে থাকা
অদৃশ্য বৃষ্টির মতো
চুপচাপ তোমার চোখে এসে পড়ি।

তুমি যদি ভুল পথে মোড় নাও,
অথবা হঠাৎ থেমে যাও ক্লান্তিতে
আমি দিকনির্দেশের ফলক হয়ে দাঁড়াই,
ভেঙে পড়া কণ্ঠে
নিঃশব্দে উচ্চারণ করি— “চলো, আর একটু।”

রাত গভীর হলে,
যখন ঘুম আসে না
অথচ সব শব্দ ঘুমিয়ে পড়ে
আমি তখন তোমার বুকের ভিতর
একটি জোনাকির আলো জ্বালিয়ে রাখি,
যেন অন্ধকার ভয় পেয়ে
তোমাকে ছেড়ে চলে যায়।

তুমি যেখানেই যাও
জলের কাছে, আগুনের কাছে,
ভিড়ের মধ্যে বা নিঃসঙ্গতার চূড়ায়
আমি থাকি তোমার নিঃশ্বাসের ছন্দে,
হৃদস্পন্দনের ফাঁকে ফাঁকে
একটি নির্ভরতার নাম হয়ে।

আমি প্রতিজ্ঞা নই,
আমি গল্পও নই
আমি সেই অনুভব
যা পথ হারালেও হারায় না,
যা বিদায়ের ভাষা জানে না।

তুমি যেখানেই যাও,
আমি সঙ্গে আছি
আকাশের মতো বিস্তৃত হয়ে,
মাটির মতো অবিচল হয়ে,
নামের বাইরে, সময়ের বাইরে,
শুধু তোমার হয়েই।


৫.        ভাবনা যতো 


অনেক সময় শুয়ে থেকে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি,

ছাদের  ফাটলে জমে থাকে আমার না বলা অনেক কথা, কতগুলো অসমাপ্ত বাক্য হাঁটাহাঁটি করে, কত রাতের ক্লান্তিচুপচাপ বুকের ভেতর ভাঁজ হয়ে থাকে।

ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি আসলেনিজের দিকেই তাকাই—যে মানুষটা ধীরে ধীরে কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে।

কিছু ভাবনা আছে যেগুলো বললে সংসারের ঘরে হঠাৎ অকারণে বাতাস ভারী হয়ে যাবে,

চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে যাবে,

চোখের ভেতর জমে উঠবে জল।

তাই সেগুলো বলি না।ভাবনা গুলোকে ছাদের মতোই নির্বাক রেখে দিই।

রাত বাড়ে, পাখা ঘোরে একঘেয়ে শব্দে,

স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ে— তার নিঃশ্বাসে ঘরের অন্ধকার নরম হয়,

আমি জেগে থাকি আরও কিছুক্ষণ,

অব্যক্ত কথাগুলোকে

মনে মনে শুইয়ে দিই আমার পাশে,

যেন তারা অন্তত জানুক তাদেরও একটা ঠিকানা আছে।

পাশে ঘুমন্ত শরীরের উষ্ণতা আমাকে ফিরিয়ে আনে না,

বরং আরও দূরে পাঠায় একটা অচেনা জগতের দিকে, সেখানে ভাবনারা কথা বলে না, তারা আলো আঁধারের মতো নিজেরাই নিজেদের হয়।

ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি, আসলে কোথাও তাকাই না, এই তাকিয়ে থাকাটুকুই আমার সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা,

যেটা কেউ শোনে না, তবু সারারাত

আমাকে বলে যায়।


৬.        ফেরত হয় না


এক কমলিত ঊষা প্রহরে তোমার কণ্ঠে গলে পড়েছিল প্রতিজ্ঞা—'জীবন জীবনকাল আমি তোমার হয়ে থাকব।'

সে-দিন রুপালি জলের ঢেউয়ে তুমি ঢেলে দিয়েছিলে সমস্ত আলো, আমার শরীর ছুঁয়ে উঠেছিল সকালবেলার রোদ।

তোমার নিঃশ্বাসে তখন সমুদ্রের নোনা স্বাদ, চোখে চোখে জমেছিল অলক্ষ্য আগুনের নীল শিখা।

দুটি হৃদয় ধীরে ধীরে একই ছন্দে হাঁটতে শিখেছিল, স্পর্শের ভিতর দিয়ে ভাষাহীন গান জন্ম নিত।

রাত নামলে চাঁদের নরম আঙুলে আমাদের ছায়া জড়িয়ে যেত,

আলিঙ্গনের গভীরতায় সময় থেমে থাকত ক্ষণিক। সেই নিমগ্ন মুহূর্তে ভালোবাসা আর শরীর আলাদা কিছু ছিল না,

ছিল শুধু একাকার হয়ে যাওয়া।

তারপর একদিন তুমি চলে গেলে সব স্রোত থামিয়ে, সব ডাক অশ্রুত রেখে।কিন্তু বলো তো, এই ভালোবাসা কি তুমি নিয়ে যেতে পেরেছ?

না, পারোনি, কারণ ভালোবাসার চুম্বন, নিঃশ্বাসে মিশে থাকা উষ্ণতা, আলিঙ্গনে জমে থাকা নীরব অঙ্গীকার কখনও ফেরত নেওয়া যায় না।

এই প্রেম মিথ্যা নয়, এরা শরীর ছাড়িয়ে স্মৃতিতে থাকে, রক্তের ভেতর আলো হয়ে বেঁচে থাকে।


৭.        যারা বদলে যায় না 


পৃথিবীর রমণীগুলো যেন নদীরই বংশধর
চিরচঞ্চল, চিরস্রোতস্বিনী।
আজ যে তীর ছুঁয়ে হাসে, কাল সে তীর আর তার থাকে না;
রোদ্দুরে ঝলমল করে, আবার অচেনা ঘাটে নিঃশব্দে লীন হয়ে যায়।
ভালোবাসা তাদের কাছে জলরেখা
হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায় না,
চোখের সামনে থাকলেও
একদিন অন্য দয়িতের সমুদ্রে মিশে যায়।

নদীর চেয়ে পাহাড় ভালো
ওরা প্রতিশ্রুতির মতো স্থির।
ঝড় আসে, বজ্র নামে,
তবু তারা জায়গা ছাড়ে না;
শতাব্দীর ভার কাঁধে নিয়েও
অবিচল দাঁড়িয়ে থাকে নীরবতায়।

আকাশও ভালো
সে রাতভর তারা জ্বেলে রাখে,
অন্ধকারকে ভয় পেতে দেয় না;
কেউ না চাইলে দূরে থাকে,
কেউ কাঁদলে তার বুক জুড়ে
নীল আশ্বাস বিছিয়ে দেয়।

মেঘমালাও সুন্দর
ওরা জমে জমে দুঃখ শেখে,
তারপর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে;
পৃথিবীর কপালে হাত রেখে বলে,
“শান্ত হও, সব তৃষ্ণা চিরকাল থাকে না।”

বৃক্ষও ভালো
ওরা কারও কাছে কিছু চায় না,
শুধু ছায়া হয়ে পাশে থাকে;
পাখির গান, পথিকের ক্লান্তি,
সবকিছু নীরবে বহন করে
নিজের শেকড় আঁকড়ে ধরে।

এইসব দেখে মনে হয়
ভালোবাসা যদি নদী না হয়ে
পাহাড় হতো, আকাশ হতো,
মেঘ কিংবা বৃক্ষ হতো,
তবে হৃদয়ের মানচিত্রে
এত ভাঙন, এত প্লাবন
হয়তো আর লেখা থাকত না।


৮.        রাত্রিভূক অনাহারী


রাত গভীর হলেই
ঘরের দরজাটা যেন আপনিই খুলে যায়
কাঠের কপাট পেরিয়ে মন ছুটে যায়
বনের নিবিড়, অচেনা সবুজ অন্ধকারে।
যেখানে গাছেরা দাঁড়িয়ে থাকে
নিঃশব্দ প্রহরীর মতো,
আর পাতার ফাঁকে ফাঁকে
চাঁদের আলো পড়ে ভাঙা রূপোর মতো।

বনের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলে
এক স্বচ্ছতোয়া নদী
তার জলে রাত নিজের মুখ দেখে,
আর ঢেউয়ের বুক থেকে উঠে আসে
শীতল নিশ্বাস,
যেন কারও দীর্ঘশ্বাস এসে ছুঁয়ে যায়
আমার ক্লান্ত কপাল।
সে বাতাসে মিশে থাকে
ভেজা মাটির গন্ধ,
অতীতের স্মৃতি,
আর না-বলা ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস।

অন্ধকারে চোখ মেলে খুঁজি কাউকে
কেউ কি আছে? নক্ষত্রের আড়ালে,
ছায়ার গহ্বরে, নদীর কলধ্বনির ফাঁকে?
মন তখন ধীরে ধীরে বলে ওঠে
“কোথাও আমার কেউ নেই,
কেউ নেই…”
এই শব্দগুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে
বুকে জমে থাকে।

তবু আমি ডাক দিই
নিঃশব্দ রাতের বুক চিরে ডাক দিই,
“এসো, এসো তুমি এই রাতের নিভৃতে,
তারার আলোয় ছায়াপথ ধরে হেঁটে এসো।
এসো এই বনকুঞ্জে, এই নদীর কূলে
যেখানে আমার অপেক্ষা
শিশিরে ভেজা একাকিত্বের মতো
চুপচাপ বসে আছে।”

আমার আর্ত ডাক কি সত্যিই শোনে না কেউ? আকাশ কি এতটাই দূরে,
তারারা কি এতটাই নীরব?
তবু আমি ডাকি— বারবার ডাকি,
ভাঙা কণ্ঠে, ভাঙা স্বপ্নের মতো করে।

এসো গো তুমি, এসো।
এই রাত্রি আমার কাছে উপোসী দেবীর মতো আমি তার পূজারী,
কিন্তু হাতে নেই কোনো অর্ঘ্য,
শুধু শূন্য হৃদয় আর অফুরন্ত চাওয়া।

আমি বড়ই রাত্রিভূক অনাহারী এই রাতে
চাঁদের আলোয় আমার ক্ষুধা বাড়ে,
নক্ষত্রের নীরবতায় আমার তৃষ্ণা জাগে।
ভালোবাসার একফোঁটা উষ্ণ স্পর্শের জন্য
আমি কাঙালের মতো হাত পাতে থাকি
অন্ধকারের দরবারে।

যদি তুমি না-ও আসো,
এই বন জানবে, এই নদী জানবে
কেউ একজন রাতের গভীরে দাঁড়িয়ে ছিল
ভালোবাসার আশায়,
অনাহারে, নিঃসঙ্গতার মহাযজ্ঞে
নিজেকে পুড়িয়ে দিতে দিতে।


৯.       আমার কক্ষপথ তুমি 


আমি বলি— তোমার ঠোঁটের কিনার ঘেঁষে নেমে আসে আগুনের শব্দ,

শ্বাসে শ্বাসে জেগে ওঠে আমার আদিম নাম।বুকের গভীর থেকে ঝরে পড়ে লবণাক্ত আলো, আলিঙ্গনের পর আলিঙ্গন

আমি জানি, ক্লান্তি আমাদের জন্য নয়,
আমরা জন্মাই জ্বালার ভেতর।

আমি তোমাকে দেখি
তৃষ্ণার্ত হরিণীর মতো নদীর কাছে নত হও,
আর আমি হয়ে উঠি সেই তীর,
যার শীতলতায় তোমার সমস্ত দহন
ধীরে ধীরে ভাষা পায়।
তোমার চোখে বন, অন্ধকার, ডাক
আমি সেখানে হারিয়ে যেতে শিখি।

মায়ানাভীর গভীরে
আমি এক অস্থির সৈনিক
আকাঙ্ক্ষার শূল বুকে গেঁথে দাঁড়িয়ে থাকি।
আর তুমি, রক্ত ও উষ্ণতার গোপন ঘরে
খুঁজে নাও সৃষ্টির উল্লাস,
যন্ত্রণাকেও বানাও আনন্দের সহচর।

পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘোরে নির্বিকার,
আমি ঘুরি তোমার চারদিকে
নক্ষত্রের ঘাম, নিশ্বাসের বিস্তার।
তুমি তখন মেতে ওঠো জন্মের মহোৎসবে,
আমি সাক্ষী থাকি
এক পুরুষের সমস্ত অহং ভেঙে
সৃষ্টির সামনে নত হয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্তে।


১০.       নদী জানে


একই নদীতে সাঁতার কেটেছি দুজন—অনবরত, বিরামহীন।
জলের বুক কেটে কেটে এগিয়েছে আমাদের শ্বাস,
ঢেউয়ের মধ্যে মিশে গেছে হৃদস্পন্দনের শব্দ।

কখনো তুমি সামনে,
আমি তোমার ছায়া হয়ে অনুসরণ করেছি স্রোত,
কখনো আমি ক্লান্ত হলে
তুমি হাত বাড়িয়ে ধরেছ
নদী তখন একটু থেমে গেছে,
জল যেন আমাদের জন্যই নরম হয়েছে।

রোদ্দুর নামলে
জলরেখায় ঝিলমিল করেছে তোমার হাসি,
রাত নামলে চাঁদের ভাঙা আলোয়
আমরা দুজন একে অপরের নাম ভুলে
নদীর নামেই ডুবে গেছি।

জানি, নদী বদলায়,
স্রোত কখনো তীব্র, কখনো শান্ত
তবু একসময় পর্যন্ত
একই জলে ভিজেছে আমাদের শরীর,
একই স্বপ্নে ভেসেছে নিঃশ্বাস।

যদি কোনোদিন তীর আলাদা হয়,
যদি সাঁতার থেমে যায়
নদী জানবে,
একদিন এখানে
দুজন মানুষ ভালোবাসার মতো করে
বিরামহীন সাঁতার কেটেছিল।


১১.      কালো কুন্তলের ছায়ায়


তোমার কালো কুন্তলে আমার চোখ ঢেকে দাও,
তোমার রূপের আগুনে আমি পুড়তে চাই না।
আমি চাই না দগ্ধ হোক দৃষ্টি
শুধু অন্ধকারে তোমার নিশ্বাসের উষ্ণতা থাকুক।

তোমার চুলের ছায়ায় লুকিয়ে থাকুক দুপুর,
সূর্য যেন পথ ভুলে ফিরে যায় পশ্চিমে।
আমার সমস্ত অহংকার খুলে রাখি তোমার পায়ের কাছে,
শিখতে চাই—নীরবতায়ও কীভাবে ভালোবাসা হয়।

তোমার কণ্ঠে যখন নাম উচ্চারিত হয়,
আমার ভেতরের নদীগুলো থেমে যায়।
ঢেউ আর কল্লোল ভুলে
শুধু একফোঁটা জলের মতো
তোমার তালুতে জমে থাকতে ইচ্ছে করে।

আমাকে স্পর্শ কোরো না আগুন হয়ে,
আমি ছাই হতে চাই না।
আমাকে ঢেকে দাও মেঘ হয়ে,
যেন বৃষ্টি নামতে নামতে
আমার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে যায়।

তুমি থাকো
কালো কুন্তলের ছায়া হয়ে,
নরম অন্ধকার হয়ে,
যেখানে চোখ বন্ধ করলেই
ভালোবাসা জ্বলে না,
শান্ত হয়ে জোনাকির মতো আলো দেয়।


১২.       শরীর ও মন


শরীর ছোঁয়া পায় যখন মনের সম্মতি,
তখনই প্রেম পূর্ণ হয়—নইলে সে কেবল স্পর্শের ভ্রান্তি।
দেহের ভিতরে যে ঢেউ ওঠে,
তা যদি হৃদয়ের তটে এসে ভাঙে না
তবে সে ঢেউ কেবল শব্দ, জল নয়।

ঠোঁটের কাছে শরীর চাই,
আর চোখের কাছে চাই বিশ্বাস
একটি ছাড়া অন্যটি থাকলে
রাত্রি জ্বলে, কিন্তু আলো দেয় না।

আনন্দ তখনই সত্যি,
যখন উষ্ণতার ভেতরেও থাকে নীরব আশ্রয়,
যখন নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশে
মনের দরজায় টোকা দেয় শরীর।

শরীর আর মন—দুটি নদী,
একই মোহনায় এসে মিললে তবেই সাগর।
একটি যদি পথ হারায়,
অন্যটিও শুকিয়ে যায়
তখন মনে হয়, কিছুই ছিল না আদৌ।


১৩.      মাধবীলতার সৌরভে


চপল ঢেউয়ের মতো এঁকেবেঁকে
পুষ্পকানন থেকে মাধবীলতা এলেন
হঠাৎ, সজল বাতাসে উন্মুখ হয়ে উঠল এক ভ্রমর।
মাধবী তার পদ্মযৌবন পাপড়ি মেলে ধরলেন,
কোনো বিষাদ নেই
সে যেন বিস্মরণের এক রমণীর মতো
উতলা হয়ে আছে আলো-ছায়ার সীমানায়।

বহুকাল পরে ভ্রমর যেন প্রাণ পেল
মাধবীর পুষ্পিত দেহ বল্লরীর সৌরভে,
আর স্নাত হলেন
তার অন্তঃপুরের সকল ধারায়
মধুর, গোপন, অনির্বচনীয়।
শিশির ঝরে পড়ল পাতার কোল ঘেঁষে,
নীরবতার বুক ভরে উঠল
অদৃশ্য সংগীতে।

পথের ধুলোয় লেখা ছিল অনুপস্থিতির নাম,
তা মুছে দিলেন মাধবী
একটুখানি হাসি,
একটুখানি দোলায়িত দৃষ্টি দিয়ে।
ভ্রমর ডানায় তুলে নিল সময়ের ক্লান্তি,
ঘূর্ণির মতো ঘুরে উঠল মুহূর্ত,
আর বনভূমি বুঝে নিল
আজ বসন্ত কেবল ঋতু নয়,
একটি প্রত্যাবর্তন।

দূরের আকাশে রৌদ্র নরম হয়ে এল,
ছায়ারা শিখে নিল সহমর্মিতা।
মাধবী দাঁড়িয়ে রইলেন নিজেরই সুবাসে
স্থির অথচ প্রবাহমান।
ভ্রমর ফিরলেন না আর, থাকলেন পাপড়ির মাঝখানে,  যেখানে নিঃশ্বাসও ফুল হয়ে ফোটে, যেখানে স্মৃতি আর কামনা একই স্রোতে মিলিত হয়।


১৪.    ঋদ্ধ হওয়া 


আমরা ঋদ্ধ হতে পেরেছিলাম দীর্ঘ সঙ্গমের পর,
পোড়া মাটির শুদ্ধতার মতো,
যেন আগুন ছুঁয়ে মাটি আবার বৃষ্টির কাছে ফিরে যায়।
মেঘ ও জলের স্বচ্ছ স্রোতধারায়
আমাদের ক্লান্তি ধুয়ে গিয়েছিল নীরবতায়।

তুমি এলে, বিকেলের আলো নরম হয়ে বসল কাঁধে,
হাতের রেখায় জেগে উঠল নদীর মানচিত্র।
আমার বুকের ভেতর যে অনাবাদি মাঠ ছিল,
তোমার শ্বাসে সেখানে ফসল ফলল
আশার সবুজ, অপেক্ষার সোনালি দানা।

আমরা কথা কম বলেছি,
কিন্তু চোখে চোখে গাঁথা ছিল দীর্ঘ বাক্য
ভাঙা ঘড়ির মতো সময় থেমে থেকেছে
একটি মুহূর্তকে বড়ো করে রাখতে।
তুমি হাসলে, আকাশে ছড়িয়ে পড়ল নীলের গভীরতা,
আমি নীরব হলাম— নীরবতাই তখন প্রার্থনা।

রাত নামলে, চাঁদের সাদা আঙুল
জানালার কাচে আঁকল আমাদের নাম।
ক্লান্ত দেহে বিশ্রাম এল,
মন জেগে রইল— মৃদু, বিশ্বাসী।
আমরা বুঝে গেলাম, ভালোবাসা মানে
একসঙ্গে পুড়ে যাওয়া নয়,
একসঙ্গে শুদ্ধ হওয়া
মাটি, মেঘ আর জলের মতো
নতুন ভোরের দিকে ধীরে ধীরে ঋদ্ধ হয়ে ওঠা।


১৫.           রক্তজবার অঞ্জলি 


হৃদয়ের রক্তে আমি রক্তজবা ফুটিয়ে রেখেছি
নীরব প্রার্থনার মতো, দীপের শিখার মতো জেগে।
ওগো, তুমি এসো তোমার সমস্ত মায়া নিয়ে,
এক’পা দু’পা করে চরণ রাখো আমার দোরগোড়ায়;
উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি মেলে একবার দেখো আমায়
আমি অপেক্ষার নাম, আমি তোমারই হওয়ার ভাষা।

নাও এই ফুল
আমার শিরায় শিরায় জ্বলা লালের আরাধনা।
আর দাও তোমার কনকচাঁপার বুক
যেখানে সুগন্ধে ভিজে থাকে দুপুরের রোদ,
ডোরাকাটা ঠোঁটের চুম্বন দাও রাশি রাশি
যেন বর্ষার প্রথম বৃষ্টি ভাঙে দীর্ঘ খরা।

অবগুণ্ঠন খুলে ফেলো, দ্বিধা নামিয়ে রাখো দূরে,
আজ শব্দেরা যেন আর লুকোচুরি না খেলে।
সোজাসাপ্টা, নির্ভীক কণ্ঠে তুমি বলো
ভালোবাসি, ভালোবাসি
আর সেই উচ্চারণে
আমার সমস্ত রক্তজবা একসাথে ফোটে।


১৫.        জয় বাংলা


জয় বাংলা,

এই ডাকেই জেগে উঠেছিলো

শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষিত এক জনপদ,

মাটির বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছিলো

অগ্নিশপথের প্রথম শব্দ।


লাঙলের ফলা, জেলের জাল,

মজুরের ঘামে ভেজা শার্ট

সবকিছুর ভেতর একটাই স্বপ্ন

একটাই উচ্চারণ

জয় বাংলা।


এই শ্লোগানে

মায়ের কোল থেকে নামলো ছেলে,

কলম ছেড়ে রাইফেল ধরলো ছাত্র,

ভাঙা পায়ে হেঁটে এলো কৃষক

কারণ দেশ ডাকছিলো।


পদ্মা-মেঘনা-যমুনা সাক্ষী আছে,

এই মাটির প্রতিটি ইঞ্চি জানে

স্বাধীনতা ভিক্ষা নয়,

এ রক্ত দিয়ে লেখা অধিকার।


বুকের ভেতর গুলি নিয়েও

যারা পিছু হটেনি একচুল,

শেষ নিঃশ্বাসে যারা বলেছিলো

“আমার বাংলা বাঁচুক”

তাদের কণ্ঠেই ছিলো জয় বাংলা।


আজও লাল-সবুজ যখন ওড়ে

স্কুলের মাঠে, সীমান্তে,

প্রবাসীর চোখে জমে ওঠা জলে

তখন ইতিহাস নতুন করে বলে

এই দেশ মাথা নত করে না।


জয় বাংলা মানে

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,

জয় বাংলা মানে

মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা।


জয় বাংলা

এই দুই অক্ষরের আগুনে

জ্বলে উঠেছিলো নীরব বুকের ভিতর

একটি জাতির প্রথম উচ্চারণ।


পদ্মার ঢেউয়ে ঢেউয়ে

মেঘনার দীর্ঘশ্বাসে

ধানক্ষেতের সবুজ শিরায়

রক্তের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো এই ডাক

জয় বাংলা।


এ ছিলো শ্লোগান নয় শুধু,

এ ছিলো শপথ

ক্ষুধার বিরুদ্ধে, ভয়ের বিরুদ্ধে,

শেকলের লোহার দাঁতের বিরুদ্ধে

মানুষ হয়ে ওঠার শপথ।


মায়ের আঁচলে লুকানো কান্না

হঠাৎ শক্ত মুষ্টি হয়ে উঠেছিলো,

কিশোরের চোখে জন্ম নিয়েছিলো আকাশ,

বুড়োর কাঁপা কণ্ঠেও ছিলো দৃঢ়তা

জয় বাংলা।


যুদ্ধ শেষে ধুলো ঝরানো পতাকায়

রোদ উঠেছিলো নতুন দিনের,

ক্লান্ত শরীরের ভেতর

স্বপ্ন আবার হাঁটা শিখেছিলো।


আজও যখন অন্ধকার নামে,

যখন প্রশ্ন করে ইতিহাস

তখন বাতাসে আবার ভেসে ওঠে

একই অমর ধ্বনি,

একই নির্ভীক উচ্চারণ


জয় বাংলা।


যতদিন এই মাটি, এই মানুষ,

ততদিন একটাই অমোঘ শপথ

জয় বাংলা,

জয় স্বাধীনতা।


১৬.       আমার স্পর্ধিত অহংকার


রক্তমাখা ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাসে গড়া

আমার এই দেশ

রক্তের আখরে তৈরি আমার  স্বপ্নের মানচিত্র,

এই মাটির ধুলোয় লেগে আছে

শহীদের রক্ত , কৃষকের প্রার্থনা,

আর অনাগত দিনের অবিনাশী আশা।


আমার মাটি

লাঙলের ফলা চুমু খায় যে বুক,

যেখানে বীজ বুনলে জন্ম নেয় গান,

দুর্ভিক্ষের রাত পেরিয়ে

ভোরের আলো জ্বলে ওঠে অবিচল বিশ্বাসে।


আমার জাতীয় পতাকা

সবুজে শস্যের শান্তি,

লালে স্বাধীনতার অমোঘ দাম।

বাতাসে ওড়ার প্রতিটি মুহূর্তে

সে আমাকে মনে করিয়ে দেয়

আমি মাথা নত করার জন্য জন্মাইনি।


আমার জাতীয় সঙ্গীত

শুনলেই বুকের ভেতর নদী বয়ে যায়,

চোখে জমে ওঠে ইতিহাসের জল।

সে সুরে আছে মায়ের ডাক,

সে সুরে আছে সংগ্রামের শপথ।


এই দেশ, এই মাটি,

এই পতাকা, এই গান

আমার পরিচয়, আমার সাহস।

সব হারাতে পারি,

কিন্তু এ অহংকার নয়

এ আমার স্পর্ধিত অহংকার,

এ আমার চিরন্তন বাংলাদেশ।


১৭.        কদমফুলের মালা


কত বর্ষার মেঘ আকাশ ভেঙে 

বৃষ্টি ঝরালো, কদম ফুলের মালাটা কেউ  গেঁথে গলায় পরালো না, 

আঙিনার রোদ্দুর প্রতিদিন এসে দাঁড়াল

অপেক্ষার দরজা কেউ খুলল না।


শিউলি ঝরল ভোরের অঞ্জলিতে,

কিন্তু আমার কপালে কেউ ছুঁয়ে দিল না,

হাওয়ারা খবর বয়ে আনল দূরদেশ থেকে,

আমি চিঠির মতো ভাঁজ করে রাখলাম        বুকের ভিতর।


নদী বারবার বদলাল তার নাম,

ঘাটে ঘাটে রেখে গেল ভেজা পায়ের ছাপ       কিন্তু তুমি এলে না।

আমি শুধু জল ছুঁয়ে বুঝলাম,

সব স্রোতের শেষ কোথাও না কোথাও থাকে।


এখনো সন্ধ্যা নামে ধীরে , 

চুল খুলে বসে থাকি একা বারান্দার অন্ধকারে,

কদম ফুলের মালাটা শুকিয়ে গেছে 

সময়ের আলমারিতে, এখনো আকুল 

করা গন্ধ রয়ে গেছে তার।


ঘড়ির কাঁটা ক্লান্ত হয়ে ঘোরে একই বৃত্তে,

সময় আর এগোয় না, শুধু ক্ষয় হয়-

তোমার নামে রাখা ডাকনামগুলো

আজ অনাথ শব্দ হয়ে পড়ে থাকে কেবল       খাতার কোণে।


রাত্রি জানে আমার না-বলা কথার কথা ,

জোনাকির আলোয় তারা জ্বলে ওঠে আকাশে, চাঁদ প্রশ্ন করে এত অপেক্ষা কার জন্য,         আমি নীরব থাকি,

উত্তরগুলো এখনো তোমার দিকেই হাঁটে।


একদিন যদি হঠাৎ এসে দাঁড়াও

এই  উঠোনে, দেখবে আমি কোথাও  নেই-

শুধু পড়ে আছে বর্ষার জলে ভেজা 

ছিন্ন একটি কদম ফুলের মালা।


১৮.        রক্তে-লেখা স্বাধীনতার গান


এই দেশটি হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি

একে জন্ম নিতে হয়েছে রক্তের মধ্য দিয়ে,

আর্তচিৎকারের ভেতর দিয়ে,

একাত্তরের দীর্ঘ রাত পেরিয়ে।


মুক্তিযোদ্ধারা কোনো গল্পের নায়ক নয়

তারা ছিল রক্তমাংসের মানুষ,

তবু ভয়কে জয় করে

অস্ত্র বানিয়েছিল বুকের সাহসকে।

মায়ের মুখ, সন্তানের মুখ, প্রিয় মানুষের মুখ

চোখের সামনে ভেসে উঠত,

তবু তারা পিছু ফেরেনি।


শহীদের রক্ত মাটিতে পড়তেই

এই ভূমি বদলে গিয়েছিল

আগাছা নয়, জন্ম নিতে শুরু করেছিল

স্বাধীনতার অঙ্কুর।

প্রতিটি লাল ফোঁটা রক্ত

একটি করে প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠেছিল

এই দেশ আর দাস থাকবে না।


হানাদারের বন্দুকের নলের সামনে

নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ বুকগুলো

আমাদের জন্য রেখে গেছে

একটি উড়তে-জানা পতাকা।

নীল আকাশ আজ যে এত প্রশস্ত,

তা আসলে তাদের বিস্তৃত আত্মারই প্রতিচ্ছবি।


আমাদের বিজয়

কেবল যুদ্ধের শেষদিন নয়,

এ এক দীর্ঘ শোকের মধ্য দিয়ে পাওয়া আলো,

একটি জাতির পুনর্জন্ম।


আজ যখন আমরা স্বাধীন বাতাসে শ্বাস নিই,

রাস্তায় হাঁটি মাথা উঁচু করে,

তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসে জড়িয়ে থাকে

মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ,

শহীদদের নীরব রক্তভাষা।


মুক্তিযোদ্ধা— জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান,

যাদের বুকের ভেতর আগুন ছিল,

আর চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।


হানাদারের কালো বুটে পিষ্ট মাটি

যেদিন কেঁপে উঠেছিল আর্তনাদে,

সেদিনই তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল

খালি হাতে, ভাঙা অস্ত্র আর অদম্য সাহসে।


শহীদের রক্তে রাঙা পথ

আজও কথা বলে নীরবে

এই লাল মাটির প্রতিটি দানা

স্বাধীনতার শপথে ভেজা।


মায়ের কোল শূন্য করে,

প্রিয়জনের অশ্রু উপেক্ষা করে

তারা লিখে গেছে বিজয়ের ইতিহাস

নিজেদের প্রাণের দামে।


তাদের আত্মত্যাগেই

হানাদারমুক্ত হলো এই দেশ,

উড়ল স্বাধীন পতাকা

নীল আকাশের বুকে মাথা উঁচু করে।


আমাদের বিজয়

কেবল একটি দিনের উল্লাস নয়,

এ এক রক্তঋণ,

যা বহন করি প্রতিটি নিঃশ্বাসে।


শ্রদ্ধায় মাথা নত করি আমরা

শহীদদের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি,

কারণ তোমাদের রক্তেই জন্ম নিয়েছে

আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।


এই দেশ

শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লেখা এক মহাকাব্য,

যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি শুরু হয়

শ্রদ্ধা আর দায়বদ্ধতার শব্দ দিয়ে।


১৯.       না কবি, না বিপ্লবী 


হতে পারলাম না কিছুই

না কবি,

না বিপ্লবী,

কিংবদন্তীও হতে পারলাম না।


শব্দেরা আমাকে চিনল,

কিন্তু আমাকে বেছে নিল না

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম

উপমার দরজার বাইরে,

ভেতরে ঢুকে পড়ল অন্য কেউ।


মুঠোয় আগুন ধরেছিল বহুবার,

কিন্তু সময়ের হাওয়া

প্রতিবারই নিভিয়ে দিল

আমি শুধু ছাই হাতে

নিজেকে বুঝিয়ে বললাম,

এটুকুও তো উষ্ণতা।


আমি হাঁটলাম ইতিহাসের পাশে পাশে,

কিন্তু পাতায় নাম লেখাতে পারলাম না

পদচিহ্ন রেখে গেলাম বালুচরে,

জোয়ার এসে সেগুলো মুছে নিল

নিঃশব্দে।


স্বপ্ন দেখেছিলাম উচ্চারণের মতো স্পষ্ট,

বাস্তব হলো দীর্ঘশ্বাসের মতো ঝাপসা

কেউ শুনল না,

আমি ছাড়া।


তবু একেবারে শূন্যও নই

রাতের শেষে আমি ছিলাম

নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে,

পরাজিত হলেও

অক্ষত কিছু প্রশ্ন নিয়ে।


হতে পারলাম না কিছুই

কিন্তু বেঁচে রইলাম

অপূর্ণতার ভার নিয়ে,

এই ভারই হয়তো আমার একমাত্র পরিচয়,

নামহীন মানুষের

নীরব মহাকাব্য।


২০.          তারা ঝরে পড়ে 


রাজপথের জনারণ্য থেকে যাকে তুলে এনেছিলাম কোলাহলের ধুলো ঝেড়ে

বুকের গভীর অন্ধকারে সে রয়ে গিয়েছিল অনুজ্জ্বল আলো হয়ে,


সে ছিল ভিড়ের ভেতর একখণ্ড নীরবতা,

হঠাৎ পাওয়া শ্বাস,

ভাঙা দিনের পাশে রাখা

একটুকরো বিশ্বাসের ছায়া।


তারপর একদিন

সে হারিয়ে গেল রাত্রির আকাশে,

অনেক তারার অন্তঃপুরে

যেখানে আমার ডাকে আর সাড়া মেলে না,

শুধু আলো জ্বলে থাকে দূরে,

চেনা যায় অথচ ছোঁয়া যায় না।


আজও রাজপথ দিয়ে হাঁটলে

কোলাহলের মাঝেই শুনি তার নীরব প্রস্থান,

তারা ঝরে পড়ে, অন্ধকার নামে,

তারা নিভে যায়।


২১.        না বলা কথা 


অনেক সময় শুয়ে থেকে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি

ছাদের  ফাটলে জমে থাকে আমার না বলা অনেক কথা, কতগুলো অসমাপ্ত বাক্য হাঁটাহাঁটি করে, কত রাতের ক্লান্তি

চুপচাপ বুকের ভেতর ভাঁজ হয়ে থাকে।


ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি আসলে

নিজের দিকেই তাকাই

যে মানুষটা ধীরে ধীরে কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে।


কিছু ভাবনা আছে যেগুলো বললে সংসারের ঘরে হঠাৎ অকারণে বাতাস ভারী হয়ে যাবে,

চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে যাবে,

চোখের ভেতর জমে উঠবে জল।

তাই সেগুলো বলি না।

ভাবনাগুলোকে ছাদের মতোই

নির্বাক রেখে দিই।


রাত বাড়ে, পাখা ঘোরে একঘেয়ে শব্দে,

স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ে— তার নিঃশ্বাসে ঘরের অন্ধকার নরম হয়,

আমি জেগে থাকি আরও কিছুক্ষণ,

অব্যক্ত কথাগুলোকে

মনে মনে শুইয়ে দিই আমার পাশে,

যেন তারা অন্তত জানুক তাদেরও একটা ঠিকানা আছে।


পাশে ঘুমন্ত শরীরের উষ্ণতা আমাকে ফিরিয়ে আনে না,

বরং আরও দূরে পাঠায় একটা অচেনা জগতের দিকে, সেখানে ভাবনারা কথা বলে না, তারা আলো আঁধারের মতো নিজেরাই নিজেদের হয়।


ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি, আসলে কোথাও তাকাই না, এই তাকিয়ে থাকাটুকুই আমার সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা

যেটা কেউ শোনে না, তবু সারারাত

আমাকে বলে যায়।


২২.         অসম্পূর্ণ রমণী 


তুমি কখনো হতে পারোনি সম্পূর্ণ রমণী, কোনো বসন্তও শেষ করতে পারোনি; হয়ে থাকলে কেবল বাসনার কুসুম—অধরা, অর্ধফোটা, ভোরের শিশিরে ভেজা একটুকরো সুগন্ধ, যা ছুঁলেই মিলিয়ে যায়।

কত রাত শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে রুমাল বানিয়েছচোখের জল লুকোবার জন্য, আমার দীর্ঘশ্বাস মুছবার জন্য; অথচ ভোর এলে সেই আঁচলই আবার পতাকার মতো উড়েছে নতুন দিনের বাতাসে, যেন সব দুঃখ ভুলে যাওয়ার অনুশীলন।

কত রাত দাবার বোর্ডে রাণী হেরে গেছে ধাবমান অশ্বের ক্ষুরে, সৈনিকের তলোয়ারের খোঁচায়; তবু তুমি জানো, রাণীর হার মানে খেলার শেষ নয়—সে কেবল আরও সূক্ষ্ম কৌশলের জন্ম দেয়, আরও গভীর অপেক্ষা শেখায়।

তোমার চুলে লুকিয়ে থাকত অসংখ্য সন্ধ্যার নীরবতা, ঠোঁটে জমে থাকত অব্যক্ত কথার মধু; আমি ছুঁতে চাইতাম, অথচ ছোঁয়ার আগেই তুমি হয়ে যেতে দূরের তারা—দৃষ্টিতে ধরা, হাতে নয়, কেবল দীর্ঘশ্বাসে অনুভূত।

আমরা প্রেম করেছি অর্ধেক আলো আর অর্ধেক অন্ধকারে; চাঁদের পিঠে লেখা ছিল আমাদের নাম, কিন্তু ভোরের সূর্য তা পড়তে পারেনি, কারণ কিছু নাম কেবল রাতই বুঝতে পারে।

তুমি বলেছিলে—ভালোবাসা মানে সম্পূর্ণ হওয়া নয়, ভালোবাসা মানে অপূর্ণ থেকেও পাশাপাশি থাকা; আজও কোনো বসন্ত এলে তুমি সম্পূর্ণ রমণী হয়ে ওঠোনি, আমিও সম্পূর্ণ প্রেমিক নই।

তবু এই অপূর্ণতার মাঝেই আমাদের প্রেম বেঁচে থাকে—শাড়ির ছেঁড়া আঁচল, হেরে যাওয়া রাণী, আর কখনো শেষ না হওয়া এক দীর্ঘ, কোমল রাতের মতো, যা ভোরের আগে নিজেকে ফুরিয়ে দিতে জানে না।


২৩.      পুণ্যস্নান


এসো,
আজ আর নিজেকে ঢেকে রাখার দরকার নেই।
শব্দ, পরিচয়, অভ্যাস—সব পোশাক
জলের ধারে খুলে রাখি।
প্রেমে প্লাবিত হওয়া মানে তো নিজেকে হারানো নয়, নিজের গভীরে প্রবেশ করা
তোমার সঙ্গে।

আমরা ধীরে জলে নামি।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
জল প্রথমে পায়ে লাগে,
তারপর হাঁটু, তারপর বুক— ঠিক যেমন প্রেম আসে, অল্প অল্প করে,
অথচ একসময় আর ফেরার পথ থাকে না।

নিরাভরণ সখ্য— এখানে শরীরের কথা কম,
চোখের কথা বেশি।
তুমি আমার দিকে তাকাও
যেন বহুদিনের চেনা কেউ,
যাকে কিছু বলতে হয় না,
শুধু পাশে থাকলেই সম্পূর্ণ।

জল আমাদের সমান করে দেয়।
তুমি আর আমি— দুটি আলাদা ইতিহাস
এই মুহূর্তে একই প্রবাহ।
শ্বাস নেওয়া এক তালে,
নীরবতা ভাগ করে নেওয়া এক বিশল

ভালবাসা মানে দখল নয়, ভেসে থাকা।
ডুবে যাওয়া নয়,
ভরসা করে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া।

এসো,
এই জলেই থাকি কিছুক্ষণ।
পৃথিবী ডাকলে পরে শোনা যাবে।
এখন শুধু প্রেম
অগভীর নয়, অথচ অন্ধকারও নয়
এক গভীর, স্বচ্ছ নীরবতা।


২৪.        গীতবিতানের মতো তুমি


তুমি গীতবিতানের মতো সুন্দর
ঠিক সেইসব গানের মতো
যেগুলো সন্ধ্যার আলো নিভে এলে
আমি চোখ বুজে শুনি,
তন্দ্রার ভিতর দিয়ে ভেসে আসে সুর,
আর হৃদয় জুড়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত শান্তি।

গীতবিতানে যেমন কিছু গান থাকে
অল্প স্বরে বলা,
কিন্তু গভীর অর্থে ভরা,
ঠিক তেমনি তোমার ভিতরেও
কিছু সৌন্দর্য আছে
যা উচ্চস্বরে নয়,
চুপিচুপি মনপ্রাণ ভরে দেয়।

তোমার হাসিতে আছে
‘এসো, এসো’ ডাকার কোমলতা,
তোমার নীরবতায় লুকিয়ে থাকে
বহুদিনের সাধনার সুর।
কখনো তুমি সকালের প্রভাতী,
কখনো সন্ধ্যার করুণ রাগিণী
শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হই না।

তোমার চোখের গভীরে
আমি খুঁজে পাই সেইসব গান
যেগুলো বারবার শুনেও
পুরোনো হয় না,
বরং প্রতিবার
নতুন করে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

তুমি এমন এক সুর,
যা মনকে ভাসিয়ে নেয়
কোনো অচেনা, অথচ আপন দেশে।
তোমার কাছে এলে
শব্দের প্রয়োজন পড়ে না
গীতবিতানের মতো
তুমিই হয়ে ওঠো সম্পূর্ণ অনুভব।


২৫.       ফিরিয়ে দাও


যে চুম্বন তোমাকে আমি দিয়েছিলাম,

তা তুমি ফিরিয়ে দাও আমার ঠোঁটে
ঠিক সেই নীরবতার মতো করে,
যেখানে কথা বলার দরকার হয় না,
শুধু শ্বাসের ওপর শ্বাস রেখে
অতীতকে বর্তমান করে তোলা যায়।

যে জল ফেলেছিলাম আমার চোখ,
তা তুমি তুলে নাও তোমার চোখের বৃন্তে
দুটি চোখে জমে উঠুক একই আকাশ,
একই মেঘ, একই দীর্ঘ বর্ষা।
আমার ব্যথা তোমার দৃষ্টিতে ভিজুক,
তোমার নীরবতা আমার বুক ছুঁয়ে কেঁপে উঠুক।

আমি যা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিলাম তোমাকে
অলক্ষ্যে, অনুচ্চারে,
রাত্রির গভীরে গোপন প্রার্থনার মতো
সবটুকু আজ ফেরত দাও।
স্পর্শে স্পর্শে হিসেব মিলুক,
অধর থেকে অধরে, চোখ থেকে চোখে।

ভালোবাসা তো দেনা-পাওনার নয়,
তবু আজ হিসেব চাই
যাতে আর কেউ ঋণী না থাকে,
যাতে আমরা দু’জনই সমানভাবে
ক্ষতবিক্ষত ও সম্পূর্ণ হই।

শেষ পর্যন্ত, যদি কিছু বাকি থাকে
এক ফোঁটা শ্বাস, এক চিলতে উষ্ণতা
তাও ভাগ করে নিও।
আমি চাই না একা ফিরতে,
আমি চাই, ফেরার পথেও আমরা দু’জন পাশাপাশি থাকি।


২৬.        সম্পর্ক


কেমন করে ধীরে ধীরে নির্মোহ হয়ে যাচ্ছ তুমি
দিনের পর দিন,
সময়কে পার করে দিচ্ছ নিঃশব্দ সাঁকোর মতো,
যেখানে আর কোনো পায়ের শব্দ নেই।

আনন্দের জোয়ার থেমে গেছে,
ঢেউগুলো আর তীরে এসে ভাঙে না,
সমুদ্রটুকু শুধু নামমাত্র পড়ে আছে
জল আছে, অথচ সাড়া নেই।

এই সম্পর্ক যেন ছিন্ন কাগজের জোড়াতালি,
হাওয়ায় কাঁপে,
আঠা শুকিয়ে গেলে খুলে পড়ে যেকোনো মুহূর্তে।
আমার একার তো নয়
এ যে তোমারও হাতে ধরা এক টুকরো অনিশ্চয়তা।

তুমি চাইলেই ছেড়ে যেতে পারো,
চাইলেই থেকে যেতে পারো
থাকার ভেতরেও দূরে,
যাওয়ার ভেতরেও অনুপস্থিত।

তুমি চাইলেই আমাকে
কোনো ব্যস্ত দিনের আবর্জনার মতো
ছুঁড়ে ফেলতে পারো
কেউ প্রশ্ন করবে না,
শব্দটুকুও পড়ে থাকবে না।

অদ্ভুত, তাই না?
সম্পর্ক গড়তে লাগে দু’জন মানুষের শ্বাস,
দু’জনের বিশ্বাস,
দু’টি অসম্পূর্ণতার সহাবস্থান
আর ভাঙতে লাগে
একজনের নিঃশব্দ সরে যাওয়া,
এক মুহূর্তের উদাসীনতা।

শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক নয়, ভেঙে পড়ে আসলে একটি মানুষ
আরেকটি মানুষের ভেতর থেকে।


২৭.       ধূলোর শয্যা


পৃথিবীর ধূলো পথে তুমি শুয়ে থাকবে
শরীরে তোমার আনন্দরেণু,
বাতাসে চন্দনের মৃদু উষ্ণতা।
রোদের নরম স্পর্শে খুলে যাবে
দিনের গোপন কপাট,
চোখের পাতায় জমবে অচেনা দীপ্তি।

এই যে সময়
নীরব আকাঙ্ক্ষার,
শ্বাসে-শ্বাসে ডুবে যাওয়া।
তোমার ত্বক ছুঁয়ে যায় হাওয়া,
হাওয়ার ভেতর আমি
নামহীন, অথচ উপস্থিত।

মাটির ঘ্রাণে মিশে থাকে লবণাক্ত স্মৃতি,
তোমার কেশরেখায় দুপুরের আলো।
স্পর্শেরা কথা বলে না
শুধু কাঁপন, শুধু দোল।

ধূলো পথের বুকে
আমরা দুই অনুচ্চারিত অঙ্গীকার
শরীরের ভেতর শরীরের গান,
মনে মিশে থাকা নিঃশব্দ তৃষ্ণা।
এখন যে কেবল মিলনের সময়
আলো, হাওয়া, আর আমাদের
অবিরাম, মধুর নিকটতা।


২৮.        শরীরলিপি


লিখেছি কিন্নরীর কথা, ঘন মেঘের চুলের কথা,
কমলা রঙের ঠোঁটের কথা, চুম্বনের কথা,
মৃগনাভির সুগন্ধির কথাও লিখেছি।

লিখেছি রমণীর কথা, তার শরীর-বৃত্তের কথা,
বালিকা থেকে নারী হয়ে ওঠার কথা
তার অভিসারিকা হয়ে ওঠার কথাও লিখেছি।

লিখেছি ঋতুর গোপন সংকেত, নুপূরের মৃদু ধ্বনি,
চোখের পাতায় জমে থাকা অলস দুপুরের আলো,
নাভির আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো উষ্ণ ছায়া,
শ্বাসে-শ্বাসে জেগে ওঠা আকাঙ্ক্ষার নীল আগুন।

লিখেছি শাড়ির ভাঁজে লুকোনো নদীর বাঁক,
কোমরের কাছে থেমে যাওয়া হাতের দ্বিধা,
ঘামের লবণাক্ত কণায় ঝিলমিল রাত,
ঠোঁটের প্রান্তে কাঁপতে থাকা অর্ধেক বলা কথা।

আরও লিখেছি—স্পর্শের শেষে যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস থাকে,
যেখানে ক্লান্তি নিজেই এক প্রাপ্তির নাম,
আর দেহের ভাষা মিলিয়ে যায় মনের গভীর স্বরে।


২৯.   সত্য স্বরূপে


নখ–দাঁত–জিহ্বা
হঠাৎই বড় হয়ে উঠেছে ওদের
মিথ্যার নখে আঁচড়,


দাঁতে দাঁতে বিদ্বেষ,
জিহ্বায় বিষের ঝাঁঝ।
পাকি হানাদারের ছায়া বুকে নিয়ে
এরা আজও ইতিহাসের গায়ে থুতু ছোড়ে।

কিন্তু এ মাটি স্মৃতিভোলা নয়
রক্তে লেখা বর্ণমালা জানে,
কোন কণ্ঠ সত্য, কোনটা প্রলাপ।
শহীদের নাম উচ্চারিত হলেই
ওদের দাঁত কাঁপে,
মুক্তিযুদ্ধের গান উঠলেই
জিহ্বা জড়িয়ে আসে।

প্রতিহত করতে হবে
ঘুষির ভাষায় নয়,
প্রতিহত করতে হবে সত্যে,
প্রতিহত করতে হবে স্মৃতিতে,
প্রতিহত করতে হবে অটল বিবেকে।

আমরা দাঁড়াবো আলোর পক্ষে
ইতিহাসকে ঢাল করে,
ন্যায়ের কলম হাতে।
এই দেশ সাক্ষী থাকবে:
মিথ্যা ক্ষণস্থায়ী,
সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী।


৩০.         মায়াবী বেদনা 


রমণী যেন এক সুন্দর বেদনা
হাসির ভাঁজে লুকোনো দীর্ঘশ্বাস,
চোখের তারায় জ্বলে ওঠা আলো নয়,
বরং নিভে যেতে যেতে শেখানো আগুন।

আনন্দময়ী নয় সে,
সে আসে ক্ষতের মতো
ধীরে, নিঃশব্দে,
রক্ত না ঝরিয়েও বুক ভিজিয়ে দেয়।

তার স্পর্শে সুখ আছে,
কিন্তু সেই সুখের ভেতরেই
একটি অব্যক্ত কান্না ঘুমিয়ে থাকে,
যেন জোছনার আলোয়
ছায়ারা বেশি সত্য।

রমণী ভালোবাসে বেদনা দিতে
কারণ সে জানে,
বেদনা ছাড়া প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
আনন্দ কেবল উৎসব,
আর বেদনা— বসবাস।

সে যখন পাশে থাকে,
মন শেখে গভীর হওয়া,
নিঃসঙ্গতা শেখে গান গাইতে,
আর হৃদয় বুঝে নেয়
সব সুন্দর জিনিসই
অল্প একটু করে পোড়ায়।

তাই রমণী এক মায়াবী বেদনা,
যাকে না পেলে শূন্যতা,
আর পেলে—
নীরব, মধুর ক্ষয়।


৩১.    মায়ালোকের যোগিনী 


এই খেলাঘর, এই ধুলো-মাটির সীমানা ছাড়িয়ে
আমি কী বহন করব?
শব্দ? স্মৃতি? না কি অপূর্ণতার এক নীরব থলি? গিয়ে কী বলব
আমি পূর্ণ, না আমি কেবল ভরে থাকার ভান?

সংসারের চার দেওয়াল একটি নির্দিষ্ট আকাশ দেয়,
কিন্তু সেই আকাশে কি বিস্ময় নামে?
যে বিস্ময় আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম
মায়াবতীর এক নির্জন আশ্রমে
সন্ধ্যা নামার আগের ক্ষীণ, অনির্ধারিত আলোয়, যখন দিন ও রাত কেউ কাউকে পুরোপুরি দখল করেনি।

সে অনুভব কি সংসার হয়ে ওঠে?
যে অনুভব আমাকে শিখিয়েছিল
উত্তরকাশীর ক্ষীণধারা গঙ্গার ভাষা
যেখানে শব্দ নেই, অথচ প্রবাহ থামে না,
যেখানে চলাই একমাত্র স্থায়ী সত্য।

আমি যোগিনী হয়েই আছি
এ কোনো ঘোষণা নয়,
এ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
পথে পথে মানুষ জুটে যায়,
গল্পেরা জন্ম নেয় আবার ঝরে পড়ে,
অভিজ্ঞতারা কখনো আশীর্বাদ,
কখনো ক্ষত— তবু সব মিলিয়ে তারা পথেরই অংশ।

ভাটিয়ারী ভোর আসে ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে,
বাগেশ্রীর সন্ধ্যায় মন ধীরে ধীরে নিজের ভেতর ঢুকে পড়ে,
আর মালকোষী রাত— অন্ধকারকে ভয় নয়, বরং আশ্রয় মনে হয়।

এগুলো ছেড়ে যাব?
কোনো চার দেওয়ালের নিরাপদ খাঁচায়?
এখানে কি সঙ্গীর অভাব
এই বাতাস, এই অনিশ্চয়তা,
এই অজানা পরের ডাক
যারা আমাকে প্রতিদিন ভেঙে আবার গড়ে?

যমুনার পাড়ের ছায়ামাখা কুসুমপুর
আমাকে ডেকো না।
নয়নের জল ফুরিয়ে গেছে,
এখন আর ডুবে যাওয়ার মতো কোনো জল নেই।
শুকনো চোখেই আমাকে পথ দেখতে হয়।

বিশ্বলোকের সারসত্য আমি জানি না
জানার চেষ্টাও করি না।
তবে নিজের সত্তাকে আমি খুঁজে পেয়েছি এই মায়ালোকে,
মায়াবতীর এই অদ্বৈত আশ্রমে
যেখানে প্রশ্নই প্রার্থনা, আর প্রত্যাবর্তন
কোনো পরিচিত পথ নয়।


৩২.         ভাঙনের বাসনা


নদী চেয়েছিল ভাঙন
শুধু পাড় নয়, সময়েরও,
জলের অতলের সেই গাঢ় তল
যেখানে আলো ডুবে গিয়ে
অন্ধকারে আরও দীপ্ত হয়।

সে রাতে নদী ছিল রমণী,
উষ্ণ নিঃশ্বাসে কাঁপছিল দুই তীর,
জঙ্ঘার দু’পাড়ের মতো টানটান
একটুখানি স্পর্শেই
ভেঙে পড়ার প্রস্তুতি।

ঢেউ এসে আঙুল রাখে বালুকায়,
মুছে দেয় সীমারেখা,
নির্বাক লজ্জা ঝরে পড়ে জলে,
শরীর শেখে কীভাবে
নিজেকে খুলে দিতে হয়।

নদী তখন আর শুধু নদী নয়
সে এক দীর্ঘ সঙ্গম,
বুকভরা স্রোত, কোমল অথচ দুর্নিবার,
ভাঙনের মধ্যেই তার পূর্ণতা,
দুই পাড় মিলিয়ে নেওয়াতেই
তার গভীরতম সুখ।


৩৩.       রজনীগন্ধার রাত 


কে রজনীগন্ধার লজ্জাহীন গোপন সুবাস ছড়িয়েছিল
রাত জানে, নক্ষত্র জানে, জানে নিঃশ্বাসের অন্ধকার।
চাঁদের ফাঁকে ফাঁকে সেই সুবাস নেমে এলো,
জলের মতো ধীরে, আগুনের মতো গোপনে
ভালো লেগেছিল তার রাতের বেলার বুভুক্ষু গন্ধ নিতে,
যেন ক্ষুধা নিজেই এক প্রার্থনা,
যেন স্পর্শহীন ছোঁয়াতেই জেগে ওঠে শরীরের মানচিত্র।

ভালো লেগেছিল তাকে পুণ্য জলধারায় ভিজিয়ে দিতে,
শিশিরের নাম জানা হাত দিয়ে,
পাপের ভার হালকা করে
নিঃশব্দে ধুয়ে দিতে লজ্জা।
রজনীগন্ধা তখন কেবল ফুল নয়,
সে এক দীর্ঘ নিশ্বাস,
সে এক অব্যক্ত আকুতি
রাতের বুক চিরে বেরোনো সাদা আগুন।

পৃথিবীর নির্জনে, যেখানে পথের শব্দ থেমে যায়,
কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে ফেলতে পাপড়ি
না, কোনো হিংসা নয়,
এ ছিল আত্মসমর্পণের উৎসব।
প্রতিটি পাপড়ি খুলে যেত একটি করে গোপন দরজা, ভিতরে জমে থাকা আলো                ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতো।

রাত তখন আরও ঘন, আরও মোলায়েম,
তার আঁচলে রজনীগন্ধার শরীর জড়িয়ে।
আমি সুবাসে ডুবে থাকি,
সে গন্ধে নিজেকে ভুলে যায়
এভাবেই ভালোবাসা শেখে
কীভাবে শব্দ ছাড়াই বলা যায় সব,
কীভাবে লজ্জাহীনতাও হয়ে ওঠে
নিখাদ পবিত্রতা।


৩৪.       মনে পড়ার অভ্যাস 


যতটুকু ভুলে যাই তারও বেশি মনে পড়ে তোমাকে
ভুলে থাকার ফাঁকে ফাঁকে
তুমি ফিরে আসো নীরব ঢেউয়ের মতো,
মনের তটরেখা ভেঙে আবার ভিজিয়ে দাও।

যতটুকু চুপ থাকি
তারও বেশি শব্দ হয়ে ওঠে তোমার নাম,
নিঃশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে
অযাচিত প্রার্থনার মতো জেগে থাকে।

যতটুকু দূরে সরি
তারও কাছে টেনে নেয় স্মৃতি,
তোমার ছায়া পড়ে থাকে
আমার প্রতিটি আলো–অন্ধকারে।

যতটুকু নিজেকে সামলাই
তারও বেশি এলোমেলো হয়ে যাই,
কারণ তোমাকে ভুলতে বসলে
হঠাৎই মনে পড়ে
মনে পড়াই ছিল আমাদের সবচেয়ে অভ্যস্ত অভ্যাস।


৩৫.        রাত্রি-দুপুরের বিচ্ছেদ


আর কোনদিন দেখতে পাব না তোমাকে
এই রাত্রি দুপুরে—এই কথাটি মনে হচ্ছে,
যেন সময় হঠাৎ থেমে গেছে
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।

আর কোনদিন তোমার নাম উচ্চারণ হবে না
চায়ের ধোঁয়ার ফাঁকে,
হঠাৎ পাওয়া বিকেলের নরম আলোয়
তোমার মুখ ভেসে উঠবে না আর।

এই রাত্রি দুপুরে
শব্দগুলোও ক্লান্ত
তারা জানে, আর ফেরার পথ নেই,
জানে, অপেক্ষা এখন শুধু অভ্যাস।

আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি,
যেখানে তুমি কখনো দাঁড়াওনি,
তবু তোমার না-থাকাটাই
সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আর কোনদিন দেখতে পাব না তোমাকে
এই কথাটা ধীরে ধীরে
আমার ভেতরে ঘর বানায়,
ঠিক যেমন নীরবতা বানায়
নিজস্ব এক দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ কবিতা।


৩৬.         জলতরঙ্গ 


চাঁদ ওঠে জোছনা ভিজিয়ে দেয় আমাদের,

মেঘও বৃষ্টি নামিয়ে ভিজিয়ে দেয়,
আমরা ভিজি জলে
আমরা পুণ্য করি সঙ্গম শেষে আমাদের দেহকে।

তারপর নদীর মতো নীরব হয়ে যাই দু’জন,
শ্বাসে শ্বাসে জড়িয়ে থাকে রাতের কুয়াশা,
শরীরের উপর শরীর রেখে
আমরা শুনি হৃদয়ের জলতরঙ্গ।

ভেজা চুলে ঝরে পড়ে নক্ষত্রের আলো,
কপালে কপাল রেখে
নীরব প্রার্থনার মতো
আমরা ছুঁয়ে থাকি একে অপরকে।

এই ভেজা শরীর, এই ক্লান্ত সুখ
জলের কাছে ফিরে যায় সব অহংকার,
ভোর আসার আগেই
আমরা আবার শুদ্ধ হই প্রেমে,
জোছনা-বর্ষা-জলে ধুয়ে।


৩৭.       কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর 


শীতের ভোরে
পঞ্চগড় স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেনটির মতো
আমরাও তখন ক্লান্ত ছিলাম
ভ্রমণ, অপেক্ষা, আর গন্তব্যে।

চারদিকে কুয়াশা,
যেন পৃথিবী নিজেই চোখ বুজে আছে।
ট্রেন থেকে নামার সময় নাজনীন বলেছিল
'হাতটি ধরো।'

সেই প্রথম, একটি হাত ধরেছিলাম
যার উষ্ণতায় শীত সরে গিয়েছিল,
কুয়াশার ভেতর এক টুকরো আলো জন্ম নিয়েছিল।

তারপর কখন যে সে হাত
বুকের ভেতর ঘর বানিয়ে নিল
মনে নেই।
হৃদয়ের অচেনা করিডোরে
সে যে কবে ঠিকানা লিখে ফেলল
তা হিসেবেও ছিল না।

ভোরের আলোয় আমরা দেখেছি দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা, দেখেছি সফেদ তুষার আর কমলা রঙের আলো রাশি রাশি...  মহানন্দার নির্জন কূলে দাঁড়িয়ে দেখেছি সন্ধ্যার মায়া।

তারপর দিনগুলো
নীরবে হেঁটেছে, রোদ্দুর-ছায়া পালা করে এসেছে,
নাজনীন হেসেছে, আমি বিশ্বাস করেছি
কিছু ট্রেন আর থামে না।

হঠাৎ বিচ্ছেদ, হঠাৎ এক অচেনা স্টেশন,
যেখানে কোনো কুয়াশা ছিল না
সবকিছু ছিল অস্বস্তিকর স্পষ্ট, আমাদের কত চুম্বনের ক্ষণ, কত  মাধুকরী মুহূর্ত মিছে হয়ে গেল,

এখনো শীতের ভোরে ট্রেনের হুইসেল শুনলে
হাত খুঁজে ফেরে কারোর কোমল হাত-
কুয়াশার ভেতর নাজনীন নামে একটি মেয়ের  আলোর ছ্বটা আজও ক্ষণিক জ্বলে ওঠে
তারপর নিভে যায়, বিষাদের ছায়া রেখে যায় বুকের পাাঁজরে।


৩৮.        দেবযানীর কথা


আমার সৌভাগ্য ছিল
তোমার মতো ভীতু ও উদাসীন এক বন্ধু
আমার জীবনে এসে পড়েছিল।
যে সাহস পেত কেবল শব্দে,
বাস্তবের মুখোমুখি হলে
নিজেকে গুটিয়ে নিত নীরবতার খোলে।
তুমি জানতেই
কীভাবে কবিতায় মেয়েদের মন ভোলাতে হয়, কিন্তু জানতে না
কীভাবে একটি মন ধরে রাখতে হয়।

প্রতিদিন নয়, মাঝে মাঝে
একেক দিন একেকটি কবিতা নিয়ে আসতে, পড়ে শোনাতে এমন ভঙ্গিতে,
যেন তুমি নিজেও ঠিক বিশ্বাস করছ না
যা লিখেছ।
সেই কবিতাগুলোয় ছিল প্রেমের অতিরিক্ত আলো, উচ্ছ্বাসের অযাচিত বন্যা, ভবিষ্যতের অস্পষ্ট অথচ মোহময় আশ্বাস। আর আমি
এক নির্বোধ, আবেগপ্রবণ তরুণী
বিশ্বাস করতাম সেই বেগ, সেই তীব্র উচ্চারণ, ভাবতাম, এত শব্দ মিথ্যে হতে পারে না।

তুমি ছিলে অদ্ভুত
ভালোবাসার কথা বলতে বলতে
হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পড়তে,
গভীরতায় পৌঁছনোর আগেই ফিরে যেতে নিরাপদ দূরত্বে।
প্রতিশ্রুতির কাছে এলেই তোমার চোখে ভয় জমত, আর উদাসীনতা হয়ে উঠত
তোমার সবচেয়ে সহজ আশ্রয়।

তুমি কখনো বলোনি
এই কবিতাগুলো কেবল অভ্যাস,
এই প্রেম কেবল কল্পনার আরাম।
তুমি আমাকে ছেড়ে দিলে
অর্ধেক বলা কথার মধ্যে,
অসম্পূর্ণ বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে
আমি নিজেই অর্থ খুঁজে নিলাম।
সেদিন বুঝিনি— নীরবতাও কথা বলে,
আর উদাসীনতাও ভীষণ স্পষ্ট এক উত্তর।

আজ দূর থেকে তাকিয়ে দেখি
তোমার সব কবিতাই ছিল
নিজেকে আড়াল করার কৌশল,
আর আমি ছিলাম সেই আড়ালের ভিতর ঢুকে পড়া এক সরল পাঠক।
তবু সৌভাগ্য ছিল— তোমার ভীরুতায় আমি নিজের দৃঢ়তা চিনেছি,
তোমার উদাসীনতায় ভালোবাসার দায় শিখেছি।

এখন জানি, সব কবিতাই প্রেম নয়,
আর সব নীরবতাই নিষ্পাপ নয়।


৩৯.       হে আমার দেশ, এই কি তুমি


কেমন আছে হতভাগিনী এই দেশ

প্রশ্নটা আর প্রশ্ন থাকে না,

উত্তর নিজেই জ্বলছে রাস্তায়, পুড়ছে ঘরে ঘরে,

ভাঙছে মানুষের ভেতরের মানুষটা।

স্বাধীনতার নামে যে বাতাস বইবার কথা ছিল,

সে বাতাস আজ বারুদের গন্ধে ভারী,

নিঃশ্বাস নিলেই বুকের ভেতর আগুন ধরে।


এই কি সেই দেশ

যার জন্য বুক পেতে দিয়েছিল কেউ,

যার জন্য রক্ত লিখেছিল ইতিহাস?

এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম

যেখানে ভয়ই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়,

আর নীরবতাই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম?


এই ধ্বংসযজ্ঞের দেশ আমার নয়।

আমার দেশ ছিল মানুষের

মানুষে-মানুষে হাত রাখার দেশ,

ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার দেশ।

আজ সে দেশ খুঁজে ফিরি ধ্বংসস্তূপে,

দেয়ালে দেয়ালে আঁকা পোস্টারে,

টেলিভিশনের চিৎকারে

কিন্তু পাই শুধু বিকৃত মুখ,

ঘৃণার ভাষা, বিভক্তির মানচিত্র।


থামাও এই জঙ্গিপনা

থামাও বিশ্বাসের নামে খুন,

নীতির নামে লুণ্ঠন,

ক্ষমতার নামে অন্ধত্ব।

কারা শিখিয়েছে আমাদের

একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আলাদা হয়ে যেতে?

কারা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে

পাথর, আগুন আর কুৎসিত স্লোগান?


কে আমাদের ত্রাণকর্তা?

রাষ্ট্র? নেতা? নাকি কোনো  ফেরেশতা?

নাকি ত্রাণকর্তা আসবে না

কারণ আমরা নিজেরাই

নিজেদের বাঁচাতে ভুলে গেছি?

সেই মহামানব কই,

যিনি মানুষকে মানুষ বলে ডাকবেন,

যিনি সংখ্যার আগে নাম উচ্চারণ করবেন,

যিনি বলবেন

“এই দেশ ধ্বংসের জন্য নয়,

এই দেশ বাঁচার জন্য।”


হে আমার দেশ

তোমার মলিন মুখখানি দেখলে

আমি নয়নজলে ভাসি।

এই কান্না দুর্বলতার নয়,

এই কান্না ভালোবাসার।

কারণ আমি এখনও বিশ্বাস করি

ছাইয়ের নিচে আগুনের চেয়েও গভীরে

লুকিয়ে আছে আলো।

একদিন এই দেশ আবার মানুষ হবে,

যদি আমরা

একটিবার, সত্যিই একটিবার,

মানুষ হওয়ার সাহস করি।

--------

তারিখ - ১৯/ ১২ / ২০২৫ ইং

ঢাকা।


৪০.      ঘাস ও বুনোফুলের মেয়ে


মেয়ে তুমি মৃত্তিকার উপর দাঁড়াও,

প্রেমিকা হও ঘাসের, আর বুনোফুলের

পায়ের নিচে মাটি যেন তোমার নাম জানে,

শেকড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওঠে নরম এক গান।

তোমার চোখে থাকুক আকাশের নীল,

মেঘের মতো ভেসে যাক দীর্ঘশ্বাস,

হাওয়ার সঙ্গে চুল মেলাও

হাওয়াও আজ প্রেম শিখুক তোমার কাছে।

ঘাসের ডগায় শিশিরের মতো

হালকা হেসে ওঠো ভোরবেলায়,

বুনোফুলের রঙে রঙে

নিজেকে ছড়িয়ে দাও নিঃশর্তে।

কেউ তোমাকে বেঁধে রাখবে না নিয়মে,

তুমি হাঁটবে নিজের ছন্দে, নিজের পথে

নদীর মতো মুক্ত,

বনের মতো গভীর।

মেয়ে, মৃত্তিকার গন্ধে গন্ধে

তোমার ভালোবাসা জন্ম নিক,

ঘাস আর বুনোফুল জানুক

এই পৃথিবীতে প্রেম এখনো বেঁচে আছে,

তোমার পায়ের শব্দে,

তোমার হৃদ মোহনায়। 



৪১.        মশাল কার হাতে


অন্ধকার,
ভোরও অন্ধকার,
সূর্যের তীর্যক রশ্মিও আজ অন্ধকারের কাছে পরাজিত।
দিন হাঁটে রাতের ছায়া গায়ে মেখে,
মানচিত্রের প্রতিটি শহর—এক একটি নিভে যাওয়া চিতা।

চারদিকে কেবল হুংকার,
বিবেকের গলা চেপে ধরা শ্লোগান,
আইনের খাতায় আগুন,
মানুষের হাতে পাথর
প্রশ্ন করা আজ রাষ্ট্রদ্রোহ।

আলো চাই
কিন্তু বাতি ভাঙা,
মশাল লুকোনো,
যে হাত জ্বালাতে পারে
সেই হাতই আগে কেটে ফেলা হয়।

মব কি শাসককে ঘিরে ধরে?
নাকি শাসকই মব হয়ে ওঠে
ক্ষমতার অন্ধ উল্লাসে?
কার লাঠিতে লেখা থাকে ন্যায়,
কার রক্তে সই হয় আইন?

শিশুর চোখে ভয়ের ঘুম,
মায়ের স্তনে আর্তনাদ,
দেশটা আজ প্রশ্নবিদ্ধ কবরস্থান
যেখানে সত্যকে চাপা দিতে
সবচেয়ে বেশি মাটি লাগে।

তবু শোনো
একটুকরো আলো এখনো বেঁচে আছে
কোনো এক নাগরিকের বুকে।
যেদিন ভয় পুড়ে ছাই হবে,
সেদিনই উঠবে মশাল
হাত বদলাবে ইতিহাস।

কার হাতে উঠবে সেই আগুন?
এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে বিপজ্জনক,
আর সবচেয়ে জরুরি।


৪২.       পৃষ্ঠা উল্টানোর মতো


পৃষ্ঠা উল্টানোর মতো শরীর উন্মোচন
প্রথমে প্রচ্ছদ, তারপর মলাটের ভাঁজে লুকোনো শ্বাস,
একটি একটি করে খুলে যায় শব্দ, অক্ষর,
কালো কালি নয়—ঘামে লেখা সুগন্ধি বাক্য।

কী সুঘ্রাণ ফুলের!
যেন রাতের বাগানে চাঁদের নীচে
রজনীগন্ধা নিজেই নিজের দেহ পড়ে শোনাচ্ছে,
পাতা থেকে পাপড়ি—সবই পাঠ্য,
সবই নিষিদ্ধ পাঠাগার।

তোমার কাঁধ
একটি নীরব শ্লোকের মতো,
যেখানে মাথা রাখলে শব্দ থেমে যায়,
শুধু থাকে নিঃশ্বাসের ব্যাকরণ।

তোমার গলা বেয়ে নামা আলো
দুধে ভেজানো চন্দনের রেখা,
স্পর্শ করলে মনে হয়
কেউ আঙুল দিয়ে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে
অন্ধকারের শরীরে।

স্তনের উপমা দিতে গিয়ে থেমে যাই
ফল না কি পূর্ণিমা?
না কি দুইটি মৌন প্রশ্নচিহ্ন,
যাদের উত্তর দিতে গিয়ে
ঠোঁট ভুলে যায় ভাষা।

নাভি
একটি প্রাচীন ঘূর্ণি,
যেখানে প্রেম বারবার ডুবে যায়,
আর উঠে আসে আরও তৃষ্ণা নিয়ে।

উরু দুটি
দু’পাশে দাঁড়ানো দেবদারু,
মাঝখানে গোপন বনপথ,
যেখানে ঢুকলে সময় খুলে যায়,
সভ্যতার পোশাক ঝরে পড়ে।

তুমি হাঁটো
আর মাটি শেখে কেমন করে কাঁপতে হয়,
তুমি বসো
আর আসবাবপত্রে জন্ম নেয় ঈর্ষা।

এই মিলন কোনো হঠাৎ ঝড় নয়,
এ এক দীর্ঘ ঋতু,
যেখানে শরীর শরীরকে পড়ে,
বারবার,
কখনো কবিতার মতো,
কখনো প্রার্থনার মতো নীরবে।

শেষ পৃষ্ঠায় এসে দেখি
বই শেষ নয়, শুধু শরীরের আলো নিভেছে,
ঘরে রয়ে গেছে ফুলের মতো উষ্ণ এক গন্ধ, আর আমার হাতে
তোমার শরীর-পাঠের অমোচনীয় স্মৃতি।


৪৩.          তুমি কী উদ্বেলিত


আমি চন্দন যোগার করেছি ভালোবাসার জন্য
রাত্রি সহচরী রমণীর বুকে
গন্ধ বিলাব নীরব মন্ত্রের মতো।

পাখি হয়ে রোজ আকাশে উড়তে চাই,
ডানায় ডানায় জড়িয়ে রাখব
অচেনা নীলের তৃষ্ণা,
হাওয়ার শরীরে লিখে দেব নামহীন আকাঙ্ক্ষা।

ভালবাসা তখন প্রদীপের শিখা,
অন্ধকারে একলা যুবকের হাতে জ্বলে ওঠে
সে আলো নয়, সে তাপ;
ভেসে যাওয়া নয়, ডুবে গিয়ে বাঁচা।

রাত্রি আমাকে ডাকে গোপন স্বরে,
আমি তার কানে কানে বলি
ভয় পেয়ো না,
ভালবাসা মানেই তো এমন উদ্বেলিত হওয়া,
অন্ধকারে ভেসে গিয়েও
আকাশ খুঁজে নেওয়া।


৪৪.         হাত ধরো


কেউ একজন আমার হাতটি ধরুক,
ভালোবাসা থাকলেই হাত ধরো
তাকে নিয়ে হেঁটে চলে যাব
বনপথ দিয়ে বহুদূর…

যেখানে পায়ের নিচে শুকনো পাতার শব্দ
আমাদের কথা ঢেকে রাখবে,
যেখানে আকাশ নেমে আসবে গাছের ডালে
আর নিঃশ্বাসে মিশবে কাঁচা রোদের গন্ধ।

কেউ একজন থাকুক,
যার নীরবতায়ও আশ্রয় আছে,
যার চোখে তাকালেই বুঝে নেব
পৃথিবীর সব তাড়া এখানেই থামুক।

হাত ধরে হাঁটব
কোনো তাড়াহুড়ো নেই, ফেরার সময় নেই,
শুধু দু’জন মানুষ,
আর ভালোবাসার দীর্ঘ ছায়া।

যদি ক্লান্ত হই,
গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ব পাশাপাশি,
আমার কাঁধে তার মাথা,
তার কণ্ঠে সন্ধ্যার শান্ত গান।

এইভাবেই
হাত ধরে, বনপথে, বহুদূর,
যতদিন ভালোবাসা আছে,
ততদিন পথ ফুরোয় না।


৪৫.    সন্ধ্যার চুলে গান


তোমার চুলে সন্ধ্যা নামুক,
বুকের ভেতর বাজুক গীতবিতানের গান।
চোখের কোণে ঝরে থাকুক
শান্ত দুপুরের নীলাভ ধ্যান।

ঠোঁটের প্রান্তে আলো–ছায়া
অদৃশ্য চুম্বনের মতো থেমে থাকুক,
নিঃশ্বাসে মিশে যাক বকুলফুল,
নীরব প্রেমের ভাষা হয়ে থাকুক।

তোমার হাঁটার ছন্দে ছন্দ পাক
নদীর গোপন ঢেউয়ের ডাক,
পায়ের নিচে ঘাসের বুক
শুনুক হৃদয়ের মিহি ফাঁক।

আমি থাকি দূরে—তবু জানি,
তোমার ভেতরেই আমার ঘর,
একটি সন্ধ্যা, একটি গান
আর সারাজীবনের নরম স্বর।


৪৬.       নিবেদন 


বাতাসের কানে কানে লিখব নাম—অক্ষরে,

তোমার চুলে সন্ধ্যা নামুক, জ্বলুক জোনাকির দীপমালা,

বুকের ভেতর বাজুক বংশীর আদিম তান।

চন্দনের বনে ছায়ারা আজ হবে আমাদেরই,

সময়ের কপালে আঁকব চুমু,  মুছে দেব যাবতীয় কালিমা।

শুধু আরেকবার ডাক দিও—নীরব ইশারায়,

আমি এসে দাঁড়াব ঠিকই, প্রেমের চিরকালীন প্রহরায়।


৪৭.     ম্যাগনোলিয়ার ডালে


ম্যাগনোলিয়ার ডালে বসে থাকবে একটি ম্যাগপাই, তার কিচিরমিচিরে ভরে উঠবে সকালের নরম হাওয়া

আমি কি তখন পাখির ভাষা শুনব,
নাকি দেখব তাকে, যে এসে বসবে পাশে?

কী রূপশ্রী রূপ তার!
জলভরা কুঞ্চিত কেশদাম,
ভোরের শিশিরে ভেজা কৃষ্ণকমলের মতো,
শঙ্খের মতো সুউন্নত বুক
যেন প্রার্থনার দুই হাত আকাশের দিকে উঠেছে।
গোলাপের পাপড়ি জড়ানো চোখে
লজ্জা আর আগ্রহ একসাথে দোল খায়,
ক্ষীণ কটিদেশে বাতাসও থেমে যেতে চায়
স্পর্শের অনুমতি চাইতে।

আমি কি শুধু দেখব তাকে
নাকি চোখের ভাষায় হারিয়ে যাব?
ম্যাগপাই তখন ডানা ঝাপটাবে,
তার কিচিরমিচিরে মিশে যাবে
আমাদের নিঃশ্বাসের অদৃশ্য কথোপকথন।

কথা বলব কি?
নাকি নীরবতার মধ্যেই জন্ম নেবে প্রেম
যেখানে শব্দের দরকার নেই,
শুধু একটি বসে থাকা,
একটি তাকিয়ে থাকা,
আর ম্যাগনোলিয়ার ডালে
দুটি হৃদয়ের একসাথে দুলে ওঠা।


৪৮.        নিশীপূদ্ম


ওই মেয়েটির কাছে নিশিপদ্ম আছে           রাত্রির নিশীথে সে নিঃশব্দে সুবাস ছড়ায়।

চাঁদের নরম পাপড়িতে ভিজে থাকে তার গন্ধ,
অন্ধকারও তখন পথ ভুলে আসে আলোর দিকে।

মেয়ে, তুমি তোমার সুবাস দাও
যে সুবাসে ক্লান্ত হৃদয় শুয়ে পড়ে আশ্রয়ে,
যে সুবাসে নিঃশ্বাসগুলো শেখে প্রার্থনার ভাষা।
তোমার স্পর্শ দাও
হালকা, শিশিরের মতো,
যেন কাঁপতে কাঁপতে ভোরের পাতায় নেমে আসে শান্তি।

তোমার চোখে রাত জেগে থাকে,
তারারাও সেখানে নাম লেখায়।
তোমার চুলে হাওয়ারা লুকিয়ে থাকে গল্প,
খুললেই শোনা যায় দূর গ্রামের বাঁশির সুর।

আমি চাই না উচ্চারণের ভারী শব্দ,
চাই শুধু তোমার পাশে বসে থাকা
নিশিপদ্মের নীরবতা হাতে নিয়ে।
যখন শহর ঘুমিয়ে পড়ে,
তখন তুমি তোমার সুবাস দিও,
আমি আমার একান্ত নিঃশব্দতা মেলে ধরব তোমার কাছে।

এইভাবেই থাকুক
রাত্রি, নিশিপদ্ম, আর তোমার স্পর্শ।
আর মাঝখানে আমি,
ভালোবাসার আলোয় ধীরে ধীরে জেগে ওঠা।


৪৯.      সোনার মেয়ে 


সোনার মেয়ে, তখন যে আমার
একবার শুধু তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করে
তোমার দু’টি হাতে এই কঠিন পৃথিবীর মুখ ঢেকে
আমি একটু অদৃশ্য হয়ে থাকতে চাই।

সোনার মেয়ে, তোমার আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে
রোদ এসে থেমে যায় নিঃশব্দে,
সময়ের সমস্ত কোলাহল
তোমার স্পর্শে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

সোনার মেয়ে, তুমি পাশে থাকলে
ভুল পথে হাঁটা দিনগুলোও ঘরে ফেরে,
আমার বুকের গভীর আঁধারে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস
তোমার নিঃশ্বাসে আলো হয়ে ওঠে।

সোনার মেয়ে, আমি চাই না আকাশ ছোঁয়া কিছু,
শুধু একটুখানি তোমার ছায়া,
একটুখানি হাত ধরা সন্ধ্যা,
আর সারাজীবন তোমার দিকেই ফিরে থাকা।

সোনার মেয়ে, এই পৃথিবী যত ভারীই হোক,
তোমার দু’হাতেই আমি
আমার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত স্বপ্ন
নিঃশব্দে লুকিয়ে রাখতে চাই। 


৫০.    যখন ছায়া পড়ে থাকে 


তখন পড়ে রইবে আমার ছায়া
নীরব, নিরুপম, বিকেলের শেষে লম্বা হয়ে থাকা একটুকরো স্মৃতি।
তখন বাজবে না বাঁশি,
বাঁশির ফাঁকে ফাঁকে যে নিশ্বাস ঢুকে গান হতো,
সেও হারিয়ে যাবে বাতাসের অচেনা গলিতে।
গাইবে না আর কেউ কোনো গান
শব্দরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে ধুলোর নিচে।

তখন সকাল আসবে ঠিকই,
কিন্তু তার চোখে থাকবে না বিস্ময়,
রোদ্দুর নামবে উঠোনে,
কিন্তু উষ্ণতা নয়—শুধু অভ্যাসের আলো।
পাখিরা উড়বে আকাশে,
তবু ডানার শব্দে থাকবে না ডাক
যেন উড়ানও কেবল এক রকম চলমানতা।

তখন সব স্বপ্ন মিশে থাকবে
পৃথিবীর স্বপ্নের ভিতর
কার কোনটা, আর আলাদা করে চেনা যাবে না।
ভাঙা স্বপ্ন, অসমাপ্ত ইচ্ছে,
কিছু না বলা ভালোবাসা
একই নদীতে নেমে পড়বে,
নামহীন স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাবে দূরে।

আমি থাকব না,
তবু আমার অনুপস্থিতি থাকবে
দরজার পাশে রাখা এক জোড়া জুতো처럼,
যা দেখে বোঝা যায়,
কেউ একদিন বেরিয়েছিল,
ফিরে আসেনি।

তখন শুধু সময় চলবে,
নির্বিকার, নির্দয়, নিরলস
আর পড়ে থাকবে আমার ছায়া,
পৃথিবীর দীর্ঘ বিকেলে,
কোনো এক দেওয়ালে হেলান দিয়ে,
চুপচাপ।